- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
মেয়েটি রোমেলের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলো, যেন রোমেল ওকে চিনতে পারছে না এটা ভীষণ হাস্যকর একটা ব্যাপার। অথচ রোমেল মেয়েটিকে সত্যিই চেনে না। কোনদিন ওকে দেখেনি। কিন্তু মেয়েটি ওর পথ আটকে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কথা বলছে যেন রোমেলের সঙ্গে ওর গভীর এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একটা ব্যাপার রোমেলকে তৎক্ষণিকভাবে ভীষণ ভাবনায় ফেলে দিয়েছে, তা হলো মেয়েটি ওর নাম ধরে কথা বলছে। মেয়েটি ওর নাম কী করে জানলো, এটি ও ভেবে পাচ্ছে না।। রোমেল হচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটির সামনে। মেয়েটি এক সময় হাসি থামিয়ে রোমেলের ডান হাতের কব্জি ওর দু’ হাতের মুঠোবন্দি করে নিল। রোমেল বিব্রত হলেও ওকে বাধা দিতে পারলো না। অন্যরকম এক শিহরণ রোমেলের ইন্দ্রিয়ে ছড়িয়ে পড়লো সঙ্গেসঙ্গেই। অন্য কোন সময় হলে রোমেল হয়তো এর জন্য রেগে যেত। মেয়েদের এ ধরনের হ্যাংলামো ও একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হচ্ছে, অপরিচিত মেয়েটি ওর হাত ধরে আছে, আর ও কিছুই বলতে পারছে না। শুধু তাই নয়, মেয়েটি ওর হাত ধরে আছে, এটা ওর ভালো লাগছে। এ রকম রোমেলের কখনো হয়নি। বাংলা ব্যাকরণে ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ শব্দের অর্থ ওকে অনেকদিন মুখস্থ করতে হয়েছে। এই শব্দ দিয়ে বাক্য গঠনও করতে হয়েছে পরীক্ষায় খাতায়। সে অনেকদিন আগের কথা। নিজের জীবনে এই শব্দের প্রয়োগ বা প্রয়োজনীয়তা ওর কখনো হয়নি। কিন্তু এই মুহুর্তে অচেনা মেয়েটির সামনে ও আপাদমস্তক কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে আছে। মেয়েটি এবার সিরিয়াস হবার ভান করে বললো,
‘রোমেল, তুমি কি আমাকে সত্যিই চিনতে পারছো না!’
রোমেল একটু ধাতস্ত হলো। ও ক্ষীণ কণ্ঠে বললো,
‘বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে সত্যিই চিনতে পারছি না।’
‘সত্যি!’
‘হ্যাঁ, সত্যি!’
‘তাহলে আপনি রোমেল নন!’
এ কথা বলেই মেয়েটি রোমেলের হাত ঝট করে ছেড়ে দিল। হঠাৎ মেয়েটি লজ্জিত হলো। রোমেল বললো,
‘কিন্তু আমি রোমেল। আপনি মনে হয়, অন্য কোন রোমেলকে খুঁজছেন?’
মেয়েটি ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। মেয়েটির দৃষ্টি এতোটা শানিত যে, রোমেলের মনে হচ্ছে ওর ভেতরের সবটুকু পড়ে নিতে চাইছে। ও বললো,
‘আপনি কোন রোমেলকে খুঁজছেন? সে কি হারিয়ে গেছে?’
মেয়েটি কোন জবাব দিল না। ও রোমেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। রোমেলের অস্বস্থি হতে লাগলো। অন্য সময় হলে রোমেল আর কিছু না বলে হনহন করে একদিকে হাঁটা শুরু করতো। কিন্তু এখন ও এক পা-ও নড়তে পারছে না। চলে যেতে মনও সায় দিচ্ছে না। মানুষের জীবনে এমন ঘোর লাগা বৈপরীত সময় হয়তো আসে। রোমেল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো। তবে ওর দৃষ্টি স্বচ্ছ। ভাগ্যিস, জাতীয় জাদুঘরের সামনের ফাঁকা ফুটপাতে ওরা দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভরদুপুরের ফুটপাতে এক জোড়া তরুণ-তরুণী পরস্পর পরস্পরের দিকে বিহবল হয়ে তাকিয়ে আছে, এ ধরনের দৃশ্য দেখে পথচারীদের কৌতুহল বা বিরক্তি সৃষ্টি হবার কথা নয়। অন্য সময় বা অন্য কোথাও হলে না হয় বিষয়টা লজ্জাষ্কর হয়ে দাঁড়াতো। এ কথা ভেবে রোমেল একটু স্বস্থি পেল। কতগুলো মুহুর্ত ফুরিয়েছে কে জানে! এক সময় মেয়েটি বললো,
‘তুমি মিথ্যা বলছো, রোমেল!’
‘না, বিশ্বাস করুন, আমি অপনাকে চিনি না। কখনোই দেখেনি। হলফ করে বলছি।
‘না, আমি জানি, তুমিই আমার হারিয়ে যাওয়া রোমেল!’
‘আমি হাত জোড় করে বলছি, আপনি ভুল করছেন! আচ্ছা, আপনি বলুন তো, আপনি কে?’
এ কথায় মৃদু হাসার চেষ্টা করলো মেয়েটি। ও রোমেলের চোখে চোখ রেখে বললো,
‘আমি রিয়া! মনে করে দেখ, তোমার রিয়া তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যে রিয়াকে নিয়ে তুমি সারাদিন গান বাধতে, গান গাইতে, সেই রিয়া। যে রিয়াকে একদিন না দেখলে ব্যাকুল হয়ে যেতে, ছটফট করতে, সেই রিয়া আমি! ভুলে গেছো?’
এবার ভীষণ হতাশ হলো রোমেল। ও বুঝতে পারলো কোথায় একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে। রিয়া হয়তো রোমেলের মতো কাউকে খুঁজছে। রিয়ার হারানো রোমেলের সঙ্গে ওর হয়তো অদ্ভূত মিল আছে। গল্প-সিনেমায় এমন অনেক দেখা যায়। এ কথা ওর নিজের কাছে স্পষ্ট হতেই ও নিজেকে সামলে নিতে পারছে। রোমেল রিয়ার উদ্দেশে শান্ত গলায় বললো,
‘রিয়া, এবার বলুন, আপনি কোথায় থাকেন?’
এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো রিয়া। বললো,
‘তুমি বাংলাদেশে এসে বুঝি ইন্দেনেশিয়ার কথা ভুলে গেছো! সিংগাপুরের কথাও কি ভুলে গেছো!’
রোমেল রসিকতার মত করে বললো,
‘হ্যাঁ, ভুলে গেছি। তুমি মনে করিয়ে দাও তো!’
‘ঠিক আছে, দিচ্ছি। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় সিংগাপুরে। তুমি পড়তে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ আর আমি মার্কেটিং-এ। দু’জনে একই কলেছের স্টুডেন্ট ছিলাম। মনে পড়ছে?’
রোমেল মনে মনে বললো ‘আমি পড়ছি কম্পিটার সাইন্স। আর কোথায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং! জীবনে একবার দার্জিলিং গিয়েছিলাম। বিদেশ বলতে এই! আর তুমি করছো সিংগাপুর, ইন্দেনেশিয়ার গল্প! এ কথা মনে মনে বললেও মুখে ও বললো,
‘তারপর?’
‘আমার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে আমরা স্যাটেলড হবো কুয়ালামপুরে, আর তোমার স্বপ্ন ছিল স্যাটলড হবে জাকার্তায়। এ নিয়ে আমাদের অনেক তর্ক-ঝগড়া হতো।’
‘আমি জাকার্তা পছন্দ করতাম কেন?’
‘কারণ, সমুদ্র তোমার খুব প্রিয়। তোমার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে তাসমন সমুদ্র। ইন্দেনেশিয়ার বালি দ্বীপ হচ্ছে তোমার সবচে’ প্রিয় স্থান, মনে পড়ছে ও সব?
‘আচ্ছা, আচ্ছা! তারপর?’
‘তারপর কী? তোমারই জয় হলো। আমাদের লেখাপড়া শেষ হলো। তুমি বললে দেশে ফেরার আগে বিয়েটা করতে চাও জার্কাতায়। আমি সানন্দে রাজী হলাম। আমরা বিয়ে করলাম এবং ঐ দিনই চলে গেলাম বালি দ্বীপে। মনে পড়ছে?
‘তারপর?’
‘তার আর পর কি? তারপর তো হারানোর কথা, বেদনার কথা! অথৈ জলে ডুবে যাবার কষ্টের কথা!’
এ পর্যন্ত বলে রিয়া কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল। ওর চোখের কোণে মুহুর্তেই মেঘ জমে গেল। মনে হচ্ছিলো এখুনি টলমল করে অশ্র“ফোঁটা ঝরে পড়বে। রোমেল তাড়াতাড়ি বললো,
‘থাক, থাক, আর বলতে হবে না। আমার মনে পড়ছে! সব মনে পড়ছে! ’
রিয়ার চোখের দৃষ্টি জ্বল জ্বল করে ওঠলো। ও আবার রোমেলের দু’ হাত ধরলো। রোমেল বাধা দিল না। রোমেল ভাবতে লাগলো রিয়া যদি অপ্রকৃতিস্থও হয়, এই মুহুর্তে ওর বেদনার গল্প উপেক্ষা করা যায় না। বরং স্পর্শ করটাই মহানুভবতা। রোমেল যে রহস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, তা থেকে বের হতে পারবে কিনা-সেটা এই মুহুর্তে ও মাথায় নিতে চায় না। ও রিয়ার দু’ হাত মুঠোবন্দি করে আন্তরিক স্পর্শের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে বললো,
‘আমাকে খুঁজতে কি তুমি জাকার্তা থেকে ঢাকায় চলে এসেছো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! সেই কতদিন থেকে তোমাকে এই শহরে খুঁজছি!’
‘ঠিক আছে, আমাকে তো পেয়ে গেছো। এবার তুমি বাড়ি যাও। আমি তোমাদের বাড়ি যেয়ে দেখা করে আসবো।’
‘না, না! তোমাকে ছাড়া আমি বাড়ি যাবো না। কিছুতেই না!’
এ কথা বলে রিয়া রোমেলকে জড়িয়ে ধরলো। এবার ভড়কে গেল রোমেল। ও রিয়ার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে অনেক কষ্টে ছাড়িয়ে নিয়ে নরোম গলায় বললো,
‘লক্ষ্মীটি! তুমি বাড়ি যাও। আমি সত্যিই আসবো। আমার কাজ আছে। কাজ শেষ হলেই চলে আসবো। কথা দিচ্ছি।’
‘না, না। তুমি আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে আমি আর হারাতে চাই না।’
‘কথা দিচ্ছি, আমি আর হারাবো না।’
‘না, যদি আবার সুনামী আসে!’
‘না,না। এটা বাংলাদেশ। এখানে সুনামী আসবে কেন? তুমি কী আমাকে বিশ্বাস করো না?’
‘করি।’
‘তাহলে আমার কথা শোন। শোনবে তো?’
রিয়া মাথা নাড়িয়ে জানালো ও রোমেলের কথা শোনবে। রোমেল রিয়ার মনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে ভেবে ওর ভাল লাগছে। ও বললো,
‘তুমি এখন সোজা বাড়ি চলে যাবে। ঠিক আছে? আমি রাতে তোমাদের বাড়ি যাবো। কথা দিচ্ছি।’
রিয়া মাথা নেড়ে জানালো রোমেলের প্রস্তাবে ও রাজী আছে। রোমেল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। রিয়া চলে যাবার সময় রোমেলকে ওদের বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে দিয়ে যেতে ভুল করলো না। রোমেল একটা সিএনজি ডেকে রিয়াকে তুলে দিল। যাবার সময় রিয়া এমনভাবে হাসলো যেন রোমেলকে অকপটে বিশ্বাস করার মধ্যে গভীর আনন্দ আছে।
—————————- ২ ————————————–
অবিশ্বাস্য হলেও রোমেলের সামনে আবার এক রহস্য এসে দাঁড়ালো। আলেয়ার মত দিক ভ্রান্ত করা, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া করোজ্জ্বল রহস্য! প্রকৃতি কখনো কখনো এমন কিছু রহস্য তৈরি করে, যা উন্মোচন করা অসাধ্য। কোন কোন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি খেলা করতে পছন্দ করে। মানব জন্ম থেকে মানব সভ্যতার এই প্রান্ত পর্যন্ত মহাকালের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির রহস্যের শিকার হয়েছে অনেকে। এবং মানুষ আগামীতেও বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির রহস্যের শিকার হতে পারে-এ কথা বিনা বাক্যে স্বীকার করবে ধর্মান্ধ থেকে বিজ্ঞান মনষ্ক সকলে। রোমেল তাই মনে করে। ওর সঙ্গে প্রকৃতি ভীষণরকম রহস্য করেছে। এটাকে ঠিক ‘রহস্য’ না বলে ‘রহস্যময় পরিহাস’ বলাই ভালো। মাঝেমাঝে ওর মনে হয় প্রকৃতি ওর সঙ্গে ইনজাষ্টিজ করেছে। প্রকৃতির রহস্যের জন্য অকারণে গভীর কষ্ট ও বয়ে বেড়াচ্ছে। এই কষ্টের কথা কাউকে বলাও যায় না, আবার সহ্য করাও যায় না। একদিন অচেনা এক রিয়া এসে ওর জীবনে এসে রহস্যের ধুম্রজাল ছড়িয়ে গিয়েছিলো। এই রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে আরেক রহস্যের অতলে ডুবে যেতে হয়েছে ওকে। এখন ওর সামনে যেন একই রহস্যের পুনরাবৃত্তি এসে হাজির! ওর জীবনের প্রথম রহস্যটা ছিল আচানক রিয়ার সঙ্গে দেখা। সেদিন রিয়াকে পথ থেকে বিদায় করে দিয়ে ও ভেবেছিল, অপ্রকৃতস্থ রিয়ার খোঁজ ও নেবে না। কিন্তু তা সে পারেনি। সপ্তাহ পেরুতেই ও রিয়ার খোঁজ নিতে ফোন করেছিল ওদের বাসার টেলিফোন নম্বরে। আর তখুনি রহস্যটা পরিহাসে পরিণত হয়। ফোন ধরেছিল রিয়ার মা। রিয়াকে চাইতেই তিনি বিষণ্ন গলায় বলেছিলেন,
‘বাবা, রিয়া তো বেঁচে নেই! তুমি জানো না?’
‘বলেন কি! কবে মারা গেছে! কীভাবে!’
‘সে তো দু’ বছর হলো। তুমি জানো না, ও সুনামীর আঘাতে অথৈ জলে ভেসে গিয়েছিলো?’
‘কী বলছেন! ওর সঙ্গে তো আমার গত সপ্তাহেই কথা হলো, শাহবাগে!’
‘এতো কষ্টের মধ্যেও হাসি পাচ্ছে আমার। যে দু’ বছর আগে মারা গেছে, গত সপ্তাহে তার সঙ্গে তোমার কীভাবে দেখা হবে?’
‘বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি বলছি!’
‘তুমি কে বাবা? তুমি কি রিয়াকে খুব পছন্দ করতে? ওর জন্য কি তোমার কোন মানসিক কষ্ট হচ্ছে?’
এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেনি রোমেল। ও শুধু ভাবছিলো, ওকে যে রিয়া জড়িয়ে ধরেছিল, ওর স্পর্শ তো মিথ্যা ছিল না। রোমেল ওর হাত ধরেছিল, এর স্পর্শও ওর স্পষ্ট মনে আছে। মৃত মানুষকে কি স্পর্শ করা যায়? রোমেলের নীরবতা দেখে রিয়ার মা বললো,
‘বুঝতে পারছি বাবা, আমার মত তুমিও ওকে অন্তর দৃষ্টিতে দেখতে পাও। এটা হতে পারে। এটা অলৌকিক! এর কোন অস্তিত্ব নেই। এ শুধু তোমার সামনেই হয়তো দৃশ্যমান। অন্য সকলের কাছে অদৃশ্য। তুমি ওকে ভুলে যাও, বাবা।’
‘আপনি যা ভাবছেন, আসলে আমি সে রকম কেউ নই। তবে এটা সত্য, গত রোববার দুপুরে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। ও এই ফোন নম্বর আমাকে দিয়েছিল। যদি ও দু’ বছর আগে মারাই যাবে, তবে এই ফোন নম্বর আমাকে কে দিল? তা ছাড়া ও আমাকে সুনামীর কথা বলেছিল। ইন্দেনিশয়া ও সিংগাপুরের কথা বলেছিল। আচ্ছা, ও কি সিংগাপুরে লেখাপড়া করতো?’
‘হ্যাঁ, বাবা। ও সিংগাপুরে লেখাপড়া করতো। মৃত্যুর আগে ও রোমেল নামে একজন সহপাঠীর সঙ্গে ইন্দেনেশিয়ায় গিয়েছিল।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও আমাকে এ সব কথা বলেছে। আচ্ছা বলুন তো, রিয়ার চিবুকে কি বড় একটা তিল ছিল?’
‘হ্যাঁ, ছিল।’
‘ওর কপালের ডানপাশে কি ছোট্ট একটা কাটা দাগ ছিল?’
‘হ্যাঁ, ছিল। ছোটবেলায় ও খাট থেকে পড়ে গিয়েছিল। তখন ওর কপালে ডান পাশটা একটু কেটে যায়।’
‘তাহলে আমি রিয়াকেই তো দেখেছি, তাইনা!’
‘তুমি রিয়াকে অনেকদিন আগে দেখেছো। এখন তোমার চোখের সামনে তোমার অবচেতন মনের চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে। তুমি ওকে ভুলে যাও, বাবা। ও আর ফিরে আসবে না কখনো!’
‘ও তো সুনামীতে না-ও মরতে পারে। বেঁচে ফিরে আসতে পাারে! পারে না?’
‘তা কি করে হবে, বাবা? ওর লাশ উদ্ধার হয়েছিল। আমি ইন্দেনেশিয়ায় গিয়েছিলাম। আমি নিজের হাতে ওকে ইন্দেনেশিয়ায় দাফন করে এসেছি।’
রিয়ার মায়ের কাছ থেকে এ কথা শোনার পর রোমেল আর কথা বাড়ায়নি। ও ফোনটা রেখে দিয়েছিল। সুনামীর মত এক অচেনা কান্না ওর বুকের ভেতর ধেয়ে বয়ে যেতে লাগলো। এই কান্না আছড়ে পড়তে লাগলো ওর নিজের ভেতর।
————————————- ৩ —————————————-
তিন বছর পর একই রহস্য নতুনভাবে এসে দাঁড়ালো রোমেলের সামনে। মন্ট্রিয়ল শহরের সেন্ট জোনস রোডে এক বিয়ার বিক্রির দোকানে ও রিয়াকে দেখে চমকে ওঠলো। শুধু চমকে ওঠলোই না, ওর সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে ওঠলো। ও কি ঠিক দেখছে? অনেকক্ষণ ও তাকিয়ে রইলো রিয়ার দিকে। ঠিক সেই রিয়াই! ওর চিবুকে বড় একটা তিল আর কপালের ডানপাশে ছোট্ট কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। রোমেলের হার্টবিট বেড়ে গেল। সুনামীতে মৃত্যুর ঠিকানায় হারিয়ে যাওয়া রিয়াকে রোমেল দেখেছিল-এই অবিশ্বাস্য কথাটি কেউ বিশ্বাস করবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু রোমেলের জীবনে এটি ধ্র“ব সত্য। এই রহস্যের কূল-কিনারা খুঁজে পায়নি ও। রিয়ার কথা ও অনেকদিন ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু মন্ট্রিয়লে রিয়াকে দেখে ও আবার ভীষণ চমকে ওঠলো। এ যেন রহস্যের পর রহস্য! ও বাংলাদেশ ছেড়েছে তিনবছর হলো। গত তিন বছরে ও একবারও ভাবেনি ওর সঙ্গে রিয়ার আর কখনো দেখা হবে। কিন্তু সেন্টস জোন সড়কের একটি বার হাউজে ও রিয়ার সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল আবার। সেন্ট জোনস এলাকার রাস্তার দু’ ধারে থরে থরে মদের দোকান। সন্ধ্যে হলেই মদ পিপাসুরা এখানে ভিড় জমায় এবং মধ্যরাত পর্যন্ত মদ পিপাসুদের এখনে বসে চুটিয়ে মদ বা বিয়ার পান করে। এখানে রোমেল খুব একট না এলেও মাঝেমাঝে ওকে আসতে হয়। ও এসেছে ওর বন্ধু মারুফের সঙ্গে দেখা করতে। আজ মারুফের জন্মদিন। বিয়ার পান করে মারুফের জন্মদিন পালনের উদ্দেশে ও এখানে এসেছে। মারুফ এখনো আসেনি, তবে চলে আসবে। ও বরাবরই লেটকামার। রোমেল যে মদের দোকনটিতে এসে বসেছে, রিয়া ঐ দোকানের কাষ্টমরদের মদ ও বিয়ার সার্ভ করছিলো। ও হা-করে তাকিয়ে থাকে রিয়ার দিকে। এক সময় রিয়া ওর টেবিলের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো,
‘ম্যা আই হেল্প ইউ, স্যার!’
সেই কণ্ঠ! রোমেলের গা শিরশির করে ওঠলো। এ-ও কি বিশ্বাসযোগ্য! রোমেলের চিন্তা শক্তি লোপ পেয়ে যাচ্ছিলো যেন। রিয়ার কণ্ঠ ফের রিনরিনিয়ে ওঠলো। ও ইংরেজীতে বলল,
‘আমি আপনার কী সাহায্য করতে পারি, স্যার?’
রোমেল লক্ষ্য করলো রিয়া ওকে চিনছে না বা চিনতে পারছে না। ও তাকিয়ে থাকে। রিয়ার ফের বলে,
‘আপনাকে কী দেব, স্যার?’
রিয়ার এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রোমেল বলল,
‘আপনি কি রিয়া?’
প্রশ্নটি শুনে মুহুর্তেই হচকিয়ে গেল ও। রিয়া ওর দু’ চোখের দৃষ্টিতে কৌতুহলের ঝিলিক নাচিয়ে বিস্মিত গলায় বললো,
‘আপনি আমাকে চেনেন? কী অ™ভূত!’
রিয়া বিস্ময় প্রকাশ করে। রোমেল বিগলিত গলায় বলে,
‘আমি আপনার আরো অনেক কিছু জানি।’
‘সত্যি! আশ্চার্য!’
রোমেল রিয়ার বিস্ময়কে উপভোগ করে বলে,
‘আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমার কথা মনে আছে তো?’
এবার রিয়া খুব বিস্মিত হলো। ও বললো,
‘কে আপনি? আমার মনে হয় আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।’
‘সত্যি বলছেন? কী অ™ভূত রসিকতা!’
‘আসলে কে আপনি..!’
‘অমার নাম রোমেল। বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’
‘আমি রিয়া সেন। এসেছি ক্যালকাটা। আমি কখনও বাংলাদেশে যাইনি। কিন্তু..?’
‘আপনি মনে হয় রসিকতা করছেন।’
‘না, না। আমি সত্যি বলছি! বিশ্বাস করুন!’
এ কথায় ভড়কে গেল রোমেল। এ আবার কোন রহস্য? তবে কি সে অন্য কোন রিয়া? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ও বলল,
‘আমার মনে হয়, কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে?’
‘সে হবে হয়তো!’
বলল রিয়া। রোমেল ওর দিকে মিষ্টি করে হেসে বলল,
‘যদি কিছু মনে না করেন, একটা প্রশ্ন করবো?’
‘করুন।’
‘আপনার কপালের ডানপাশে একটা কাটা দাগ আছে না?’
‘হ্যাঁ, আছে!’
‘আপনি ছোটবেলায় খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানেন কী করে!’
‘আপনি সিংগাপুরে লেখাপড়া করতেন এবং ইন্দেনেশিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন, তাই না?’
‘না। আমি বড় হয়েছি মন্ট্রিয়লে। ছেলেবেলাটা কেটেছে কলকাতায়। কিন্তু এ সব প্রশ্ন কেন করছেন?’
রোমেল বুঝতে পারছে না ও এখন কী বলবে। রিয়ার কথা যদি সত্যি হয়, তবে বলতে হবে প্রকৃতি ওর সঙ্গে ভীষণরকম পরিহাস করছে। ওর সামনে যে রিয়া দাঁড়িয়ে আছে, ঢাকায় দেখা সেই রিয়ার সঙ্গে ওর অদ্ভূত মিল। এমন কি, কপালের কাট দাগ সৃষ্টির ঘটনাটারও অবিশ্বাস্য মিল! রোমেলের হঠাৎ মনে পড়লো ওর ওয়ালেটে রিয়ার একটা পেন্সিল স্কেচ আছে। রোমেল চিত্রশিল্পী না হলেও ও ভালো পেন্সিল স্কেচ করতে পারে। ও রিয়ার একটি পেন্সিল স্কেচ এঁকেছিল। রোমেল স্কেচটি সযতনে বের করে রিয়ার সামনে তুলে ধরে বললো,
‘দেখুন তো, এটা আপনার কিনা?’
রিয়া স্কেচটি দেখে ভীষণ অবাক হলো। ও রোমেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আপনি এঁকেছেন! সত্যি!’
রোমেল জানে সত্যিই এটি অবিশ্বাস্য। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। ও বুঝতে পারছে এই রিয়া অন্য এক রিয়া। ওদের চেহেরা, জীবনের ঘটনা প্রবাহ বা সত্ত্বা হয়তো এক। কিন্তু প্রকৃতির রহস্যে ওরা স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে ভিন্ন। এই রহস্যের খবর সবাই জানে না। জানার কথাও নয়। কিন্তু রোমেল বুঝতে পারছে। রিয়া বললো,
‘আমি খুবই একসাইটেড, রোমেল! আপনি কোথায় থাকেন?’
‘আমি লেখাপড়া করছি মন্ট্রিয়লের ম্যাগগিল ইউনিভার্সিটিতে। থাকি পার্ক এলাকায়।’
‘তাই নাকি! আমিও ঐ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি, এই সেমিষ্টারে।’
‘তাই নাকি! তাহলে তো আপনার সঙ্গে দেখা হবে আবার।’
‘অবশ্যই হবে। চাইলে কালই দেখা করতে পারি।’
‘কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’
‘কেন?’
‘কারণ, এর আগেও আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। এরপর আপনি হারিয়ে যান। আজ তিনবছর পর আপনার দেখা পেলাম।’
এ কথায় খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়লো রিয়া। যেন রোমেল ভীষণ মজার কোন কথা বলে ফেলেছে। ও দমকে দমকে হাসছে। এই মুহর্তে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য রহস্যটুকু ভীষণ ভালো লাগছে রোমেলের। মনে হচ্ছে রিয়ার সঙ্গে আর দেখা না হলেও ক্ষতি নেই। রিয়ার এই উদ্দাম হাসির মুদ্রায় ওর পুরোটা জীবন আটকে যাক। আটকে যাক সময়ও। এই রহস্য থেকে ও বের হতে চায় না।