- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
স্বত্ব : সীমা সুস্মিতা
উৎসর্গ
মেহেদী হাসান, প্রিয় আবৃত্তিশিল্পীকে
ফ্লপিতে যা যাবে :
দিল্লি থেকে কলকাতায় ফেরার পথে রাজধানী এক্সপ্রেসে বিপুল বিপাশার প্রথম দেখাটা অর্থপূর্ণ হয়, যখন ওদের পুনরায় দেখা হয় কলকাতায়। বিপাশা জুবায়েরকে ভালোবেসে এক রহস্যের বেড়াজালে পড়ে যায়। নিরুদ্দেশ প্রেমিককে কলকাতায় খুঁজতে এসে জানতে পারে সে বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশি বিপুলকে পেয়ে বিপাশা যেন আলোর সুড়ঙ্গ খুঁজে পায়। বিপুলও জেসমিনের কাছে ভালোবাসার পরীক্ষা দিয়ে বুঝে গেছে মেয়েদের মন অদ্ভুত এক ঘোরটেপ! ব্যবসার লাভ-লোকসান ছাড়া অন্যত্র মনোযোগ দেয় না বিপুল। বিপাশার সামনে জোবায়েরের রহস্যময় অন্তর্ধান এবং বিপুলের বন্ধুসুলভ ব্যক্তিত্ব আলো ও আঁধারের পাল্টা রূপ। বিপুলও জানতে পারে জুবায়ের বিপাশার সঙ্গে প্রতারণা করে কেটে পড়েছে। প্রত্যাখ্যানের চেয়ে প্রতারণার যন্ত্রণা তীব্রÑ এটা বিপুল উপলব্ধি করে বলে বিপাশার প্রতি প্রচ্ছন্ন টান অনুভব করে। কিন্তু ঢাকা-দিল্লিতে বাস করা দুজন মানব-মানবীর সম্পর্ক কতটা গভীর হবে এবং কেন বন্ধনে জড়াবেÑ প্রশ্ন ও এর জবাব গল্পের প্রবাহে রয়েছে। বিপুলের চেয়ে বিপাশা যেন বেশি অনুভূতিপ্রবণ বা দগ্ধ। তাই তো, প্রেমিক-প্রেমিকা প্রসঙ্গে বিপাশা বলে, ‘সাধারণত প্রেমিকারা অন্ধ থাকে, প্রেমিকরা থাকে ভোগবাদী। প্রেমিকারা যতটা বিশ^স্ত, প্রেমিকরা ততটা চতুর। প্রেমিকারা নদীর মতো, প্রেমিকরা পাথরের চাঁই। প্রেমিকারা ঝরনা হলে, প্রেমিকরা পাহাড়ের গুমোট মৌনতা।’
এমন কথা শোনার পর বিপুল কী বলবে? কী করতে পারে সে? বিপুল-বিপাশার সম্পর্কটা হাওয়ায় ফুলের রেণুর উড়ে বেড়ানোর মতো। হাওয়ায় মাদকতা ছড়িয়ে রেণু উড়ছে, গল্পটাও বাঁক নিয়ে ঘুরছে।
লেখক পরিচিতি
দর্পণ কবীর কথাসাহিত্যের একাধিক শাখায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তিনি কবিতা ও গল্প লেখায় মনোযোগী বেশি। গানও লিখেন। তিনি লেখালেখির প্রথম দিকে পরিচিতি লাভ করেন ছড়াকার ও কিশোর গল্পকার হিসেবে। ১৯৯১ সালে তার প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘ধপাস’ এবং ১৯৯৫ সালে প্রথম কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘ভোরের পাখি’ বের হয় একুশের বইমেলাতে। এ পর্যন্ত তার ৪টি ছড়াগ্রন্থ, ৪টি কাব্যগ্রন্থ ও ৯টি উপন্যাসসহ ২০টি বই বের হয়েছে। তার প্রথম উপন্যাস ‘স্বপ্নবিলাস’ বের হয় ২০০৫ সালে অমর একুশের বইমেলায়। তার অপরাপর উপন্যাসগুলো হচ্ছেÑ নষ্ট জীবন, বসন্ত পথিক, স্বপ্নঘোর, ফেরারী বসন্ত, বিষণ্ন বেহাগ, জলপ্রপাত, অচেনা বিভাস ও ধূসর প্রচ্ছদ। ‘যে হাওয়ায় রেণুর গল্প’ তার দশম উপন্যাস।
দর্পণ কবীর পেশায় সাংবাদিক এবং সর্বান্তকরণে একজন কবি ও লেখক। ১৯৯১ সালে দৈনিক আজকের কাগজ, ১৯৯২ সালে দৈনিক ভোরের কাগজ ও ১৯৯৩ থেকে ২০০২ সাল অবধি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় পর্যায়ক্রমে সাংবাদিকতা করেছেন। ২০০২ সাল থেকে তিনি সপরিবারে নিউইয়র্ক শহরে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। এই শহরে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত রয়েছেন। তিনি আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং অনলাইন পোর্টাল দেশকণ্ঠ’র সম্পাদক।
দর্পণ কবীরের কবিতা আবৃত্তি করেছেন প্রয়াত বরেণ্য অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মধুমিতা বসু; ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রজ্ঞা লাবনী, মেহেদী হাসান ও ফারহানা তৃণা। কবিতাগুলো কাব্যপ্রেমীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
যে হাওয়ায় রেণুর গল্প
দর্পণ কবীর
এক.
দিল্লি থেকে যখন ট্রেনে কলকাতা ফিরছিল বিপুল মেয়েটিকে দেখেছিল ওরই কামরায়। ওরা দুজন একই কক্ষের যাত্রী ছিল। দূরপাল্লার টেনে এককক্ষে চারজন যাত্রী থাকে, নিচে দুজন এবং উপরে দুজনের সিট। মেয়েটি ওর কক্ষের নিচে ছিল বলে বিপুল ভালো করে লক্ষ করেনি মেয়েটিকে। ওদের কক্ষের চার সিটের দুটি সিটই ছিল খালি। রাজধানী এক্সপ্রেসে সাধারণত সিট খালি থাকে না। হয়তো কোনো যাত্রী টিকিট কেটেছিল, কোনো কারণে ট্রেন ধরতে পারেনি। দিল্লি থেকে কলকাতার ট্রেন ভ্রমণের দীর্ঘ সময়ে ওরা এককক্ষে ছিল; কিন্তু ওদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কথা হওয়ার যৌক্তিক কারণও ছিল না। ভোরবেলার সময় আসানসোল স্টেশনে ট্রেনটি যখন পার হচ্ছিল বিপুল বাথরুমে যাওয়ার সময় মেয়েটিও বের হচ্ছিল, তখন একঝলক তাকে দেখেছিল। মেয়েটির ঘুম-ঘুম চোখের দৃষ্টিতে কোনো কথার আভাও দেখেনি বিপুল। অপূর্ব মুখশ্রীর তরুণীর চোখে কথার ঝিলিক থাকে, ভাষা অনুরণন থাকে বা অব্যক্ত কাব্যময়তাও থাকে; কিন্তু মেয়েটির মুখ ছিল নির্লিপ্ত। এক ঝলক দেখার মধ্যে এটুকু ধারণা জন্মেছিল বিপুলের, ঝড়ো হাওয়ায় পাপড়ি উড়ে যাওয়ার মতো ধারণাটুকু মিলিয়ে গিয়েছিল কয়েক সেকেন্ড পরই। টয়লেট থেকে ফিরে এসে নিজের সিটে ফের আলস্যে শরীর এলিয়ে দিয়েছিল ও। হালকা ঘুমে ডুবে গিয়েছিল। হাওড়া স্টেশনে ট্রেনটি যখন প্লাটফর্মে দাঁড়াল, ওর ঘুম ভেঙে গেল। ট্রেন ছুটে চলার ধাতব শব্দ থেমে গেল। ট্রেন ব্যস্ত স্টেশনে থামলে হৈচৈ সাড়াশব্দ পড়ে যায়। আবার এমন স্টেশন আছে সেখানে মৌনতা ভরদুপুরের রোদের মতো ছড়িয়ে থাকে। ভারতের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মৌনতার নিষ্প্রাণ ট্রেন স্টেশন রয়েছে। তবে দিল্লি থেকে কলকাতাগামী দূরপাল্লার ট্রেন যেসব স্টেশনে থামে, তা সব সময় যাত্রীতে সরগরম থাকে। হাওড়া স্টেশনের মুখরতা সবচেয়ে বেশি। এই স্টেশনে মৌনতা কোনোদিন নেমে আসেনি, এটা সবাই স্বীকার করবে। বরং স্টেশনটি সব সময় যাত্রীদের পদভারে মুখর থাকে। রাজধানী এক্সপ্রেস হাওড়া স্টেশনে থামতেই বিপুল শুনতে পেল মানুষের কোলাহল। এমন স্টেশনে যে কোলাহল সৃষ্টি হয়, তেমন কোলাহলে কারও ঘুমিয়ে থাকা সহজও নয়। মানুষের কোলাহলে ওর ঘুম ভেঙে গেল। হাওড়া স্টেশন মানেই হাজার হাজার মানুষের ছুটে চলা, চিৎকার-চেঁচামেচি, কুলিদের দৌড়ঝাঁপ, সরগরম-ব্যস্ততা। এই স্টেশনে এলেই একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায় বিপুলের। বরেণ্য কবি ও উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের একটি ঘটনার কথা ও পড়েছিল একটি ম্যাগাজিনে। ঐ ম্যাগাজিনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাক্ষাৎকার দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, তার চাকরি হলো আনন্দবাজার পত্রিকায়। পত্রিকা থেকে তার নামে কার্ড ছেপে দেওয়া হলো কয়েক হাজার। তিনি নিজের কার্ড নিয়ে এসে দাঁড়ালেন হাওড়া স্টেশনের প্লাটফর্মে। তখন তিনি নবীন লেখক। আনন্দের অতিশয্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার কার্ড প্রথম দিনেই হাওড়া স্টেশনের প্লাটফর্মে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। ঐদিন এই স্টেশনে আসা-যাওয়া যাত্রীদের কাছে কার্ড বিলিয়ে দিয়ে অপার আনন্দ ভোগ করেছিলেন। পরের দিন তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে পুনরায় কার্ড চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি বিস্ময়ভরা চোখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দিকে চেয়ে থেকেছিলেন। এ ঘটনাটি বিপুলের মনে অন্যরকম দাগ কেটে রয়েছে। তাই হাওড়া স্টেশনে এলেই ওর মনে পড়ে যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ ঘটনাটি। আজও ঘটনাটির কথা ভেবে ও নিজে নিজে মুচকি হাসলো। লেখকদের জীবনে কত ঘটনার বর্ণিল বাঁক থাকে!
বিপুল যখন ট্রেনের কক্ষ থেকে বের হচ্ছিল ও দেখতে পেল ছোট আকারের একটি কানের দুল পড়ে আছে সিটের ওপর, এক কোণে। ও বুঝতে পারল এটি অসচেতনার কারণে মেয়েটি ফেলে গেছে বা ঘুমের মধ্যে কানের দুলটি কান থেকে খুলে পড়ে গেছে, যা মেয়েটি টের পায়নি। ট্রেন থেকে নামার সময় মেয়েটি লক্ষও করেনি যে কানের একটি দুল নেই। এমন ঘটনা ঘটতেই পারেÑ ভাবল ও। ছুটে চলার গতিতে ছুটতে গিয়ে মানুষ কখনও কখনও কিছু জিনিস হারিয়ে ফেলতে পারে। বিপুল সিট থেকে কানের দুলটা তুলে নিয়েছিল। অন্যের জিনিস হলেও তা দেখে ফেলে রেখে যাওয়াটাকে ঠিক সমর্থন করেনি ওর মন। মেয়েটির সঙ্গে ওর পুনরায় দেখা হবে বা হতে পারেÑ এক বিন্দু সম্ভাবনা না থাকলেও ওর মন বলছিলÑ দেখা হয়ে যেতেও তো পারে! মানুষের মনের অতলে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে কি? যে রহস্য মাঝে মাঝে ‘রহস্য’ তৈরি করে এর কারিশমা দেখায়। কে জানে, এমন হতেও পারে! নইলে মেয়েটির সঙ্গে ওর ফের দেখা হয়ে যাবে কেন?
বিপুল কলকাতায় এলে সব সময় পার্ক স্ট্রিটের পার্ক হোটেলেই ওঠে। আজও ওই হোটেলে উঠেছে। এই হোটেলে মেয়েটির সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল রাতে ডিনার করার সময়। ও ব্যবসায়িক কাজ শেষ করে রাত দশটা নাগাদ ফিরল হোটেলে। সাড়ে দশটার সময় হোটেলের রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই মেয়েটিকে দেখে ও চমকে উঠল। মেয়েটিকে ট্রেনে দেখেছিল সালোয়ার-কামিজ পরিহিত, এবার দেখল জিন্স প্যান্ট ও শার্ট পরা। পায়ে কেডস। চুলগুলো পেছনে নিয়ে ক্লিপে আটকানো, লাবণ্যভরা মুখটায় কালো মেঘ জমে আছে যেন। এই পোশাকে অন্যরকম লাগছে মেয়েটিকে। মেয়েটি কফি পান করছিল। এত রাতে কফি পান করছে কেন, বোধোদয় হলো না বিপুলের। রাতে কফি বা চা পান করলে ওর ঘুম আসতে চায় না। অনেক রাত অবধি ছটফট করে ও। সবার তো একরকম মানসিক অবস্থা না! এটাও চট করে ভেবে নিল ও। হোটেলের রেস্টুরেন্ট ফাঁকা। মেয়েটির আশপাশের টেবিলগুলো শূন্য। বিপুল মেয়েটির পাশের টেবিলে গিয়ে বসল। একজন ওয়েটার এগিয়ে এসে ওর সামনে খাবারের মেন্যু রাখল। ও ওয়েটারের উদ্দেশে বলল,
‘আমি কাউন্টারে বলে এসেছি, কী খাব। আপনি খাবারটা তৈরি হলে এখানে দিয়ে যান, প্লিজ।’
ওয়েটার ছেলেটি মুখে হাসি ধরে রেখে চলে গেল। বিপুল এমনভাবে বসেছে যেন মেয়েটির মুখ দেখা যায়। মেয়েটি কী ভেবে চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। চোখের দৃষ্টিতে কোনো চমকে ওঠার ঝিলিক দেখতে পেল না বিপুল। আশ্চর্য! এই মেয়েটির সঙ্গে ও রাতভর এককক্ষে ছিল এবং দিল্লি থেকে কলকাতায় এসেছে। না হোক পরিচিত; কিন্তু ওরা তো অনেকটা পথের সহযাত্রী ছিল। মেয়েটি ওকে দেখে যেন চিনতে পারল না। অন্য সময় হলে বিপুলও আগ্রহ দেখাত না; কিন্তু মেয়েটির কানের দুলের জন্য ওকে কথা বলতে হবেÑ এটা ঠিক করে নিল মনে মনে। ছোট একটা কানের দুল হলেও অনেক সময় এসব মূল্যবান স্মৃতি হতে পারে। এ-কথা ভেবে বিপুল মেয়েটির উদ্দেশে বলল,
‘হ্যালো, আর ইউ লস্ট এনিথিং ইন ট্রেন, টুডে?’
মেয়েটির চোখের দৃষ্টি যেন কাঁপল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল এবং দৃষ্টি আরও তীক্ষè হলো। বিপুল মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল। মেয়েটি তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও এবার বাংলায় বলল,
‘আমরা দুজনেই দিল্লি থেকে আজ সকালে রাজধানী এক্সপ্রেসে কলকাতায় এসে পৌঁছেছি। এমন কী একই কামরায় আমরা সহযাত্রী ছিলাম। আপনি হয়তো আমাকে লক্ষ করেননি।’
‘স্ট্রেঞ্জ!’
অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল মেয়েটি। ও বলল,
‘মানে? অবাক হচ্ছেন আমার কথা শুনে?’
‘হুম। খুব অবাক হলাম আপনার কথা শুনে!’
মেয়েটির কণ্ঠে একরাশ বিরুক্তি। বিপুল মøান হেসে বলল,
‘তাই না-কি?’
‘হ্যাঁ। আমরা এক কামরায় ছিলাম?’
জানতে চাইল মেয়েটি। এবার কণ্ঠ নরম। বিপুল বলল,
‘কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘না, তা নয়। আমি লক্ষ করেছিলাম কেউ একজন আছেন ওপরের সিটে। এটুকুই। কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কী করে? ওপর থেকে কি আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন না-কি?’
মেয়েটির কথা শুনে ‘হো হো’ করে হেসে ফেলতে ইচ্ছে করল বিপুলের। কী বলল মেয়েটি? ওপর থেকে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে কেন ও? সুশ্রী একটি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে কী পাওয়া যায়? কথাগুলো ও মনে মনে ভাবল। ওর নীরবতা দেখে মেয়েটি বলল,
‘কী ব্যাপার, আমার কথা শুনে চুপ করে গেলেন যে!’
‘না, আমি ভাবছিলাম একজন সুশ্রী মেয়ের মুখের দিকে রাতভর তাকিয়ে থাকলে ইন্ডিয়ান প্যানেল কোডে কী ধরনের অপরাধ হিসেবে ধরা হয় এবং এর শাস্তি কী হতে পারে! বাই দ্যা ওয়ে, আমি ইন্ডিয়ান নাগরিক নই। তাই ভাবছি, এই অপরাধের কথা।’
এবার যেন মেয়েটি উদ্ভাসিত হলো। ওর মুখে মায়াবী এক টুকরো হাসি ফুটল, হাসলে মেয়েটিকে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। মেয়েটি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘আপনি কোন দেশের নাগরিক? বাংলাদেশের বুঝি?’
‘হ্যাঁ, কী করে বুঝলেন?’
জানতে চাইল বিপুল। মেয়েটি বলল,
‘বাংলায় কথা বলছেন, তাই!’
‘আপনি নিশ্চয়ই কলকাতার মেয়ে?’
‘আমি দিল্লির মেয়ে। দিল্লিতে আমাদের তিন পুরুষের বসবাস। তবে আমরা বাঙালি পরিবার। একসময় আমাদের পূর্ব-পুরুষরা মুর্শিদাবাদে ছিলেন।’
জবাব দিল মেয়েটি। আলাপ জমে উঠবে বলে ধরে নিল বিপুল। দিল্লি বা কলকতার মেয়েরা সপ্রতিভ, স্মার্ট। ওরা কথা বলতে সংকোচবোধ করে না। ওদের সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বললে ওরা বুঝতে পারে, বেমক্কা কথা বললে ওরা প্রবলভাবে পাল্টা জবাব দেয় এবং বেফাঁস বা অপমানজনক কথা বললে এক হাত নিয়ে নেয়! এমনটাই বিপুলের ধারণা। বাংলাদেশের শহরের মেয়েরা এ ধরনের ছেলেদের এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে আর গ্রামের মেয়েরা ভয় বা লজ্জায় চুপ করে থাকে। বিপুল কথাগুলো ভেবে নিল। মেয়েটি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও বলল,
‘আপনাকে দেখে মনে হচ্ছিল কলকাতার স্মার্ট মেয়ে।’
‘কেন, দিল্লির মেয়েরা স্মার্ট নয়? এমন কেন মনে হলো আপনার?’
জানতে চাইল মেয়েটি। বিপুল মৃদু হেসে বলল,
‘কেন জানি, আমার কলকাতার মেয়েদের স্মার্ট এবং রোমান্টিক মনে হয়। আমি অবশ্য দিল্লির মেয়েদের কদাচিৎ দেখেছি। কথা হয়নি। এই প্রথম আপনার সঙ্গে কথা হচ্ছে।’
মেয়েটি হাসলো। বিপুল আসলে কথাটা বলেছে কিছু না ভেবেই। বিপুলের কথায় আগ্রহ প্রকাশ করে মেয়েটি বলল,
‘ঠিক আছে, কলকাতার মেয়ে সম্পর্কে আর কিছু বলুন তো, শুনি!’
মনে মনে প্রমাদ গুনলো বিপুল। ও তো তেমন কিছু জানে না। কথার কথা বলে ফেলে এখন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। ও মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘কলকাতার মেয়েরা শুধু রোমান্টিকই নয়, লড়াকুও। এখানকার মেয়েরা সংসার সামলিয়ে বাইরের জগতকেও দেখে, প্রয়োজনে ঐ জগতের সঙ্গে নিজেকে মেলানোর চেষ্টা করে। কলকাতার বাইরের মেয়েরা অবশ্য কী রকম, তা বলতে পারছি না। আর পরীক্ষা নেবেন না, প্লিজ!’
মেয়েটির মুখে বড় একটা হাসি রংধনুর মতো পেখম ছড়াল। ও বলল,
‘দিল্লির মেয়েরাও যে রোমান্টিক নয়, তা ভেবে বসবেন না। তারাও ঘর-সংসার ভালোভাবেই সামলায়। বাইরের জগতটাকেও জানে এবং নিজেকে তুলে ধরতে পারে।’
‘আচ্ছা। জানলাম একটু। ফের দিল্লি গেলে ভালো করে লক্ষ করব।’
‘আপনি বুঝি মেয়েদের লক্ষ করতে পছন্দ করেন?’
কথাটা যে নিছক প্রশ্ন নয়, খোঁচা তা বুঝতে পারল বিপুল। ও খোঁচাটা সহে নিয়ে হাসিমুখে বলল,
‘লক্ষ করি জানার আগ্রহে। অন্যকিছু ভাববেন না।’
‘আমার ভাবনাতেই বা আপনার কি যায়-আসে? আমরা তো কেউ কাউকে চিনি না।’
‘তা ঠিক। আচ্ছা, আপনি চমৎকারভাবে বাংলায় কথা বলছেন! বাংলা শিখলেন কীভাবে?’
‘আরে, বলেছি না, আমার পরিবার বাঙালি। তো, বাংলায় কথা বলব না কেন?’
চোখে কেমন দৃষ্টি মেলে ধরে বলল মেয়েটি। বিপুল বলল,
‘নিশ্চয়ই, বাসায় আপনারা বাংলায় কথা বলেন?’
‘হ্যাঁ। আমার মা, বাবা ও ভাইÑ সবাই নিজেরা বাসায় বাংলায় কথা বলি।’
বিপুল প্রসঙ্গ বদলিয়ে বলল,
‘আপনি কি ডিনার করে ফেলেছেন?’
‘হ্যাঁ। এই তো ডিনার শেষ করে কফি পান করছি। ডিনার শেষে কফি পান করা আমার হবি। বদ অভ্যাসও বলা যায়। আমি রাতে মাঝে মাঝে কফি পান করি।’
‘হুম। আপনাকে একটা কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, আপনি হয়তো আমার কথাটা শোনেননি। সেটা আবার বলতে চাই।’
‘বলুন।’
‘আপনি কি কানের দুল হারিয়েছেন?’
এবার মেয়েটির চোখের দৃষ্টিতে বিস্ময়ের এক নান্দনিক ঘোর সৃষ্টি হলো। বিস্মিত হলে কোনো মেয়ের চোখ এত মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়? বিপুল ওর মুগ্ধ দৃষ্টি মেয়েটির দৃষ্টি থেকে সরিয়ে নিল। ওয়েটার ছেলেটি খাবারের ট্রে নিয়ে ওর দিকে আসছে, ও তাকালো ওয়েটারের দিকে। ছেলেটা টেবিলে যখন ট্রে রেখে খাবারের প্লেট সাজাচ্ছে, ঐ সময় মেয়েটি নিজের চেয়ার ছেড়ে এসে ওর মুখোমুখি একটি চেয়ারে বসল। ওদের মাঝখানে গোলাকার টেবিল। মেয়েটি ওর টেবিলে এসে বসায় ওর ভালো লাগল। যেন জল না চাইতেই বৃষ্টি! একটি অপরিচিত মেয়ের সামনে খাওয়া সংকোচ সৃষ্টি করবে, জানে বিপুল। তবু ওকে খেতে হবে। ভীষণ ক্ষুধার্থ ও। মেয়েটি এবার মিষ্টি করে বলল,
‘আচ্ছা, আপনি কি ম্যাজিশিয়ান?’
‘হা হা হা।’
না হেসে পারল না বিপুল। দ্রুত হাসি নিয়ন্ত্রণও করল। ও মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি একজন ব্যবসায়ী। যদিও লাভ-লোকসানের হিসাবটা এখনও ভালো করে রপ্ত করিনি। আপনি আমাকে ম্যাজিশিয়ান মনে করছেন কেন?’
‘আমার কানের দুল হারিয়ে গেছে। আর আপনি সেটা জানেন দেখছি! তাই জানতে ইচ্ছে করছে আপনি ম্যাজিশিয়ান কি না?’
‘আপনার হারানো দুলটা আমার কাছে আছে।’
বলল বিপুল। মেয়েটির দুচোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো। মুখে একটা হাসির দ্যুতি ঝলমলিয়ে উঠল। মেয়েটি অবাক চোখের দৃষ্টি মেলে বলল,
‘কী করে পেলেন!’
‘আপনি ফেলে এসেছিলেন ট্রেনের কামরায়। আমি যখন বের হচ্ছিলাম, দেখি ওটি সিটের এককোণে পড়ে আছে। দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম পড়ে থাকা অন্যের কানের দুল তুলে নেব কি না? কী মনে করে তুলে নিলাম। অথচ, কী আশ্চর্যের ঘটনা, আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল!’
‘আশ্চর্য ঘটনাই বটে! আমি খুব একসাইটেড!’
বলল মেয়েটি। বিপুলের ভালো লাগছে মেয়েটির এই আনন্দ দেখে। ও বলল,
‘আপনি অপেক্ষা করুন। আমি ডিনারটা সেরে নিই। এরপর আপনার কানের দুলটা ফেরত দেব। ওটা আমার রুমে আছে।’
বিপুলের কথায় মেয়েটি বলল,
‘ঠিক আছে। টেক ইউর টাইম। আমি অপেক্ষা করছি। আপনার টেবিলে এসে বসেছি বলে কিছু মনে করেননি তো?’
‘না, না। কিছু মনে করব কেন?’
মেয়েটি হেসে বিপুলকে বলল,
‘যেচে আপনার টেবিলে এসে কথা বলেছি বলে অবাক হননি?’
এমন প্রশ্নের জবাবে কী বলবে বিপুল? এর জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলা যায়, আবার ‘না’ও বলা যায়। বিপুল বলল,
‘অল্প অবাক হয়েছি।’
‘কেন?’
‘অপরিচিত একজন লোকের টেবিলে কোনো সংকোচ ছাড়াই এসে বসেছেন তো, তাই!’
‘হুম। এ-কথাটা অবশ্য ঠিক। সংকোচবোধ করিনি আমি। আচ্ছা, আপনি খান। আমি নজর দেব না। খেতে থাকুন আর কথা বলুন।’
সংকোচ হচ্ছিল বিপুলের। খুব ক্ষুধা চাগাড় দিচ্ছে। ও প্লেটে ভাত ও কাঁচকলা দিয়ে রান্না করা ইলিশ মাছের তরকারি তুলে নিল। মুরগির মাংস ও মুগের ডাল আছে। ও খেতে লাগল। প্রবল ক্ষুধায় লজ্জা থাকে না। কয়েক সেকেন্ড পর মেয়েটি বলল,
‘আপনার নাম কী?’
খাবার মুখে নিয়েই বিপুল ওর নাম বলল,
‘বিপুল রায়হান। আপনার?’
মেয়েটি রিনরিনে কণ্ঠে বলল,
‘আমার নাম বিপাশা। বিপাশা হোসাইন।’
‘বাহ, সুন্দর নাম তো! বিপাশা!’
‘আপনার নামও সুন্দর।’
‘ধন্যবাদ। বিপাশা নামে বাংলাদেশে একজন অভিনেত্রী আছেন। তিনি ভালো ছবিও আঁকেন। আপনার মতো সুন্দরীও।’
বিপুলের কথা শুনে বিপাশা হাসলো। ও বলল,
‘বিপাশা নামে একটা বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্র আছে। উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছিলেন। আমার বাবা উত্তম-সুচিত্রার ভীষণ ভক্ত। ঐ ছবিটা তার অনেক প্রিয়। তাই বাবা আমার নাম বিপাশা রেখেছেন। আমার ডাক নামও একটি আছে। ওটা শুধু পরিবারের লোকেরা জানে।’
বিপাশার কথা শুনে কৌতূহল প্রকাশ করে বিপুল বলল,
‘ও আচ্ছা। আপনার ডাক নামটা কী?’
কথাটা বলে বিপুল মাছ খাওয়া সম্পন্ন করে মাংসের টুকরো প্লেটে তুলে নিল। এ-সময় দৃষ্টি রাখল বিপাশার চোখে। মেয়েটি যেমন সপ্রতিভ, তেমনি সরল। ওর চোখে শান্ত ছবির মতো সরলতার সমুদ্র। চোখের দৃষ্টি পাঠ করে মনকে বোঝা গেলে বিপাশার মন পরিষ্কার আকাশের মতোÑ মনে মনে নিজেকে বলল বিপুল। বিপাশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
‘ডাক নামটা বলব না। ওটা খুব কাছের মানুষজন ছাড়া কেউ জানে না। অল্প পরিচিতদের কাছে আমার ডাক নামটা বলতে চাই না। কিছু মনে করবেন না।’
জবাবে বিপুল বলল,
‘ঠিক আছে। নো, প্রবলেম। ডাক নাম গোপনই থাক। আমি কিছু মনেও করছি না।’
হাসিমুখে বিপাশা বলল,
‘মি. বিপুল, আপনি বাংলাদেশের কোথায় থাকেন, বলবেন কি?’
‘ঢাকায় থাকি। বলতে সমস্যা কি? আরও প্রশ্ন থাকলে করুন।’
‘থ্যাংক ইউ। আচ্ছা, চট্টগ্রাম কতদূর। ওখানে রাউজান নামে একটি এলাকা আছে কি?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল মনে মনে একটু অবাক হলো বিপাশার প্রশ্ন শুনে। দিল্লির মেয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কথা বলছে। নিশ্চয়ই, বিপাশার বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা আছে। কথাট ভেবে বিপুল বিপাশার প্রশ্নের জবাব দিতে বলল,
‘চট্টগ্রাম একটি বাণিজ্যিক নগরী। ঢাকা থেকে প্রায় আড়াই শ’ মাইল দূরে। হ্যাঁ, রাউজান নামে একটি এলাকা আছে। কেন বলুন তো?’
‘আমার একটা কাজ আছে। রাউজান যেতে হবে আমাকে।’
‘বলেন কী! রাউজানে যাবেন! কেন?’
‘কারণ আছে। আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে যেতে হবে আমাকে। কিন্তু..!’
‘কিন্তু কী?’
বিপুলের প্রশ্ন।
‘কিন্তু হচ্ছে আমি কখনও বাংলাদেশে যাইনি। চট্টগ্রাম বা রাউজান এলাকা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’
কথাটা বলে বিপুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বিপাশা। বিপুল একটু ভাবলÑ ‘বিপাশার কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাউজানে?’
ও বলল,
‘খুব জরুরি না হলে কেন যাবেন বাংলাদেশে? যদি কোনো তথ্য বা খবর জানার থাকে, আমাকে বলুন। আমি চেষ্টা করব, আপনাকে ঐ তথ্য বা খবর সংগ্রহ করে জানাতে।’
গায়ে পড়ে উপকার করার মতো হয়ে গেল। কী করা, বিপুলের মনে হচ্ছিল বিপাশাকে সহযোগিতা করা যেতে পারে। ওর কথায় বিপাশার মুখ আলোয় উদ্ভাসিত হলো। ও বলল,
‘আপনি যদি আমাকে এই উপকারটা করে দেন, তাহলে ভীষণ, ভী-ষ-ণ কৃতজ্ঞ থাকব!’
‘আশ্চর্য! উপকার করার কথা তো আমি নিজ থেকেই বললাম। না-কি?’
‘হ্যাঁ। আমার যে কী ভালো লাগছে!’
বিপাশার কণ্ঠ ভাবাবেগ। বিপুল বলল,
‘আপনার সঙ্গে দেখা হবে, ভাবিনি। দেখা হওয়ার পর ভাবলাম, যাক কুড়িয়ে পাওয়া দুল ফিরিয়ে দিতে পারলাম মালিকের কাছে। এখন কাজ বাড়ল। আমার নিজের ভেতরে বিস্ময় ছড়িয়ে যাচ্ছে!’
‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনার সঙ্গে আমার দেখা হওয়া কো-ইনসিডেন্ট! কোথাও না-কোথাও এর যোগসূত্র আছে। প্রকৃতির রহস্য!’
উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলল বিপাশা। কথাটা বলার সময় ওর কণ্ঠ আবেগ মিশ্রিত হলো। বিপুল ওর কথাটা মানতে পারল না। ও বলল,
‘আপনি আমাকে হাসালেন! আপনি বাস করেন দিল্লি শহরে। আমি থাকি ঢাকা শহরে। আমাদের পরিচয় নেই। কেউ, কাউকে চিনিও না। শুধু স্বাভাবিক ঘটনার মতো আমরা আজ সকালে একটি ট্রেনের একই কামরায় যাত্রী হয়ে কলকাতায় এসেছি। এক হোটেলে উঠেছি, এ ঘটনা নিয়ে একটু রহস্য করা যেতে পারে। আপনি নিজের কানের দুল হারিয়ে ফেলেছিলেন, এটা নিয়ে আপনি একটু রহস্য অনুভব করতে পারেন। কাকতালীয় ঘটনা আর কী! এ নিয়ে অন্য কিছু খুঁজবেন না, মিস বিপাশা! সরি, আমি ঠিক জানি না, আপনি মিসেস কি না?’
কথাগুলো বলে নিজের মধ্যে এক ধরনের ঘোরটের পেল বিপুল। ও ঘোরের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিপাশার মুখের দিকে। বিপাশা কণ্ঠে সংকোচ ফুটিয়ে বলল,
‘না। আমার এখনও বিয়ে হয়নি। তবে…’
বিপাশার জবাবে বিপুলের মনটা অকারণে হেমন্তের স্বচ্ছ আকাশের মতো হয়ে গেল। ও বলল,
‘বিয়ে ঠিকঠাক?’
‘এখন সেটাও বলা যাচ্ছে না। আচ্ছা, আপনি বাংলাদেশে কবে ফিরছেন?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল বুঝতে পারল এ বিষয়ে বিপাশা কথা বাড়াতে চাচ্ছে না। ও বলল,
‘পরশু সকালে আমার ফ্লাইট। দমদম এয়ারপোর্ট থেকে। কেন?’
‘কাল কী করবেন?’
‘ঘুরব। কিছু কেনাকাটাও করব। কেন বলুন তো?’
‘আচ্ছা, আমি কি কাল আপনার সঙ্গে ঘুরতে যেতে পারি?’
প্রশ্নটায় হচকিয়ে গেল বিপুল। কী বলছে বিপাশা? তাকে চেনেই না, আর অচেনা বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে ঘুরতে চাচ্ছে। যদিও বিপাশার জন্য ওর সঙ্গে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ানোটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তারপরও বিপাশার মতো এমন মেয়ে কেন যেচে ঘুরতে চাইবে? বিপুলের মনের কথা বুঝতে পারল যেন বিপাশা। ও বলল,
‘আপনি ভাবছেন আমি কেন আপনার সঙ্গে ঘুরতে চাচ্ছি, তাই তো?’
‘হুম।’
‘আমার প্রয়োজনেই তা চাইছি। আপনাকে বলব কাল। ঘুরতে ঘুরতে আমার জীবনের গল্প বলব।’
‘আশ্চর্য! আপনার জীবনের গল্প আমাকে কেন বলবেন?’
বিপুলের প্রশ্নে বিপাশা মুচকি হেসে বলল,
‘কারণ, আমার জীবনের গল্পটা বাংলাদেশে গিয়ে পৌঁছেছে। আমি সেটা আজই জানতে পারলাম। আর দেখুন, আমি যখন চরমভাবে হতাশায় নিমজ্জিত, ঠিক তখনই আপনার সঙ্গে পরিচয় হলো। যেন ঘন অন্ধকারে আলোর সুড়ঙ্গ দেখতে পাচ্ছি আমি!’
ভাত খেয়ে ফেলেছে বিপুল। ও উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে ফিরে এলো টেবিলে। বিপাশা কেমন চুপসে আছে। কিছু ভাবছে। বিপাশার শেষ কথাগুলো ওর কাছে কেমন ধোঁয়াশা লাগছে। কাল শুনলে বোঝা যাবে, আসলে বিপাশার জীবনের গল্প কীভাবে বাংলাদেশ অবধি পৌঁছে গেল। বিপুল চেয়ারে এসে বসে বলল,
‘কানের দুল ফিরিয়ে দেওয়ার পরও তাহলে আমার কাজ ফুরাচ্ছে না। আপনাকে নিয়ে কাল ঘুরতে হবে।’
‘কাল ঘুরলেও শেষ হচ্ছে না কাজ। আরও কাজ আছে। সেটা বাংলাদেশে গিয়ে করবেন।’
জবাবে বলল বিপাশা। কথাটা বলে মিষ্টি করে ও হাসলো। বিপুল বলল,
‘আপনি আমাকে রহস্যের ঘোরে ডুবিয়ে দিচ্ছেন কিন্তু! আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি, এমন হতে পারে!’
‘কিছুক্ষণ আগে আমিও কি ভেবেছি?’
বিপুলের কথার জবাবে বলল বিপাশা। বিপুল হাসলো। ও বলল,
‘কী হতে চলেছে বুঝতে পারছি না।’
‘কাল কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি তাহলে?’
‘ঠিক আছে। কী আর করা?’
বিপুল ফের হাসলো, বিপাশার মুখের মেঘ সরে গিয়ে উজ্জ্বল আলোর বিভাস ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ আগেও যা ভাবনার মধ্যে আসে না, কল্পনাও তৈরি হয় না, আকস্মিক চলার পথে বাঁক সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। পেখম ছড়াতে পারে ভাবনা, কল্পনার রং মনের ক্যানভাসে এঁকে যেতে পারে অনেক কিছু!
দুই.
হাওয়ার গতিবেগ অনেক সময় এলোমেলো হয়ে যায়। দেখা যাবে দখিনা হাওয়া বইছে, আকস্মিক হাওয়াটা উত্তর দিক থেকে এসে হামলে পড়লÑ এমন কদাচিৎ হয়ে থাকে। যেমন এখন ঐ রকম একটা উড়নচণ্ডী হাওয়া উত্তর দিক থেকে এসে বিপাশার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল যেন। আঁচলটা উড়ল ঠিক, উড়ে গেল না। যাবে কী করে? আঁচল সেফটিপিনে আটকে আছে তার কাঁধে ব্লাউজের কাপড়ের সঙ্গে। তবে আঁচলটা যতক্ষণ উড়ল, ততক্ষণে পৃথিবীটা দুলে উঠল। ভূমিকম্প হয়ে থাকলেও হতে পারে। আঁচলটা বেমক্কা বাতাসে যখন উড়ল কয়েক সেকেন্ডের এক শিহরণজাগা দৃশ্য বিপুলের সামনে দৃশ্যমান হলো। আঁচলহীন ব্লাউজ ও কোমর পেঁচানো শাড়িতে বিপাশাকে অপ্সরার মতো লাগছিল। হাওয়ায় উড়ছে আঁচল আর আঁচলহীন শাড়ি-ব্লাউজ পরিহিত এক তন্বি-তরুণী ওর চোখের সামনে যেন দৃষ্টিনন্দন শরীর মেলে ধরে অনুভবে ছড়িয়ে দিল উচ্ছল কামনার আবেগ। এই আবেগের রং ওর জানা নেই। অনুভূতিতে অন্যরকম আবেশ মুহূর্তেই পেখম ছড়িয়ে গেল। নান্দনিক দৃশ্যটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার মিলিয়ে গেল। আঁচল সামলে নিতে যতক্ষণ আর কি। মেয়েরা বেপরোয়া আঁচল খুব সহজে সামলে নিতে পারে। বিপাশাও সামলে নিয়ে দেখল হা করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে বিপুল। বিপাশা বিপুলের সম্বিত ফিরিয়ে আনতে কপট বিস্ময় কণ্ঠ তুলে বলল,
‘আশ্চর্য, অমন হা করে তাকিয়ে আছেন কেন? এমনভাবে চেয়ে থাকলে নারীর প্রতি সম্মানহানি হয়, জানেন?’
আবেশিত গলায় বিপুল বলল,
‘কেন? মুগ্ধতার মর্যাদা নেই? মুগ্ধতা যদি সম্মানহানি করে, তাহলে যে কোনো শিল্পকে সম্মান দেখানোর সহজ পথ কী?’
‘বাহ রে! কাল যে বললেন আপনি ব্যবসায়ী। লাভ-লোকসান বোঝেন শুধু। এখন দেখছি কথার মায়াজালও বুনতে পারেন!’
‘কথার মায়াজাল? আমি তো ব্যবসার বাইরে তেমন কিছু বুঝি না।’
‘না মশাই! তাহলে এমন কথা বলছেন কীভাবে?’
প্রশ্ন করে চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে তোলে বিপাশা। বিপুল জবাব দেয়,
‘ব্যবসায়ীদের শুধু নিরেট জীব বোঝায় বুঝি? যাই হোক, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাবটা দিলেন না।’
‘কোন প্রশ্নটার?’
‘ঐ যে বললাম, মুগ্ধতার মর্যাদা আছে, কি নেই?’
বিপুলের কথায় বিপাশা মৃদু হেসে বলল,
‘এর আগে কৈফিয়ত দিন আমার আঁচলটা হাওয়ায় উড়ছিল যখন, আপনি আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন কেন?’
‘তাকিয়েছিলাম নয়, দৃষ্টি তো ছিল আপনার দিকে। যখন আপনার শাড়ির আঁচল উড়ল হাওয়ায়, তখন দৃষ্টি আটকে গেল মুগ্ধতায়!’
বিপুলের সহজ স্বীকারোক্তিতে বিপাশা কণ্ঠে কপট অনুযোগ তুলে বলল,
‘জানেন তো, এভাবে তাকানোটা হ্যাংলামো!’
বিপাশার অনুযোগে বিপুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলল,
‘হ্যাংলামো বলছেন? চোখ তো অত বিচার করে কিছু দেখে না! চোখের সামনে যা ঘটবে, তাই তো দেখবে? এখানে দোষ কোথায়?’
বিপাশা ওর শাড়ির আঁচলটা আরেকবার দেখে নিল। ফের দমকা হাওয়া এলে আঁচল যেন না ওড়ে, ওর মনে এক ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ও কথার জবাব দিতে বলল,
‘আচ্ছা! দোষ নেই বলে সাফাই গাইছেন! চোখের সামনে যা দেখবেন, তা দেখার মতো হলে তাকিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু দেখার মতো না হলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হয়। এটা বোঝেন না?’
কথাটা বললেও বিপাশা মনে মনে বিপুলকে ‘নির্দোষ’ মেনে নিল। বিপুল বলল,
‘দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতাম, যদি দৃশ্যটা খারাপ লাগত। এমন দৃশ্য দেখছিলাম যেন স্বর্গ থেকে দেবীর আবির্ভাব হলো!’
‘দেবী?’
কপট রাগী চোখে তাকালো বিপাশা। বিপুল হেসে ফেলল। ও বলল,
‘দেবী, পরী বা অপ্সরা যা-ই বলি না কেন, ও-রকমই লাগছিল আপনাকে!’
‘না, আমি মানছি না। মুগ্ধতার কথা বলছিলেন না? আমি তা সব সময় মানি না।’
‘কেন ছেলেরা মুগ্ধ হয় না? আপনি কি এটা বলতে চাইছেন?’
‘পুরুষের চোখে কামনা জ্বলে ওঠে, এটা আমি জানি।’
‘এ-ধরনের অভিযোগ একপেশে, জানেন?’
বলল বিপুল। মুচকি হাসলো বিপাশা। ও বলল,
‘কদাচিৎ মুগ্ধতায় বুঁদ হয় ছেলেরা! অধিকাংশ সময় কামনায় আক্রান্ত হয়!’
একটু ভাবল বিপুল। বিপাশার অভিযোগটা কি ঠিক? ও মেনে নিতে পারছে না। ও বলল,
‘কামনা জীবনের ধর্মে সহজাত বিষয় নয় কি?’
বিপুল এমন প্রশ্ন করবে বুঝতে পারেনি বিপাশা। হচকিয়ে গেল ও। কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
‘আচ্ছা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে এখন আপনার সঙ্গে তর্ক করতে হবে? সুযোগ পেয়ে কামনার বিষয়ে আপনি আমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাইছেন? দেখুন, আপনার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছি বলে আমাকে নিয়ে খারাপ কিছু ভাববেন না, বলে দিচ্ছি!’
এমন জবাব আশা করেনি বিপুল। বিপাশা কথাটা সিরিয়াসলি বলল, না রসিকতা করে বলল বুঝতে পারল ও। তবে বিপাশার কথায় ও দমে গেল। কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বিপুল বলল,
‘ছিঃ ছিঃ! আপনি এসব কেন ভাবছেন? আমিও খারাপ লোক নই, বিশ্বাস করুন!’
বিপুলের জবাবে একটু নরম গলায় বিপাশা বলল,
‘আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারতেন। তা না করে, হা করে আমাকে দেখছিলেন! আপনার ওভাবে তাকিয়ে থাকায় আমি বিব্রতবোধ করেছি!’
বিপাশার কথা শুনে লজ্জিতবোধ করল বিপুল। ও লজ্জিত কণ্ঠে বলল,
‘তাহলে সত্যি আমি ক্ষমা চাচ্ছি! আমি অতটা বুঝে উঠতে পারিনি। নইলে চোখ বন্ধ করে ফেলতাম। আমি আবারও বলছি, আমার দেখার দৃষ্টিতে খারাপ কিছু ছিল না। তবে এটাকে হ্যাংলামো মনে করছেন বলে ক্ষমা চাইছি।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। যা হওয়ার হয়েছে। এত লজ্জিত হতে হবে না!’
বলল বিপাশা। বিপুল হাসলো। ও বলল,
‘এখন বলুন তাহলে মুগ্ধতার অপরাধ কী?’
বিপুলের প্রশ্নে বিপাশা হেসে বলল,
‘প্রসঙ্গ ছাড়ছেন না দেখি! ঠিক আছে বলছি। শুনুন, মুগ্ধতার কোনো অপরাধ নেই। মুগ্ধতা শিল্পের সম্মানহানিও করে না। তবে মুগ্ধতার নামে কামনার দৃষ্টি এক ধরনের অপরাধ! চতুর পুরুষ মানুষ এ সুযোগটা নেয়!’
‘আচ্ছা!’
বিপুলের কণ্ঠে খানিকটা বিস্ময়। চোখের দৃষ্টিতে কপট উষ্মার প্রকাশ ঘটিয়ে বিপাশা বলল,
‘ওসব কথা ছাড়ুন তো! কোন দিকে যাবেন, চলুন!’
‘আপনি কোথায় যেতে চান?’
‘আপনি যেখানে যাবেন বলে ঠিক করেছিলেন, সেখানে চলুন। আমার তেমন কোনো চয়েজ নেই। এই শহর আমার চেনা। প্রায়ই তো আসতাম। গত দু-বছর আর আসা হয়নি। এই যা!’
‘আচ্ছা? কলকাতা শহরটাকে ভুলে যাননি তো?’
‘না, ভুলব কেন? কলকাতা আমার খুব প্রিয় শহর।’
বলল বিপাশা। ফের এক দমকা হাওয়া এসে লাগল ওর শরীরে। আঁচল উড়ল না। ও নিজের মধ্যে স্বস্তিবোধ করল। বিপুল বলল,
‘জানেন, আপনাকে নিয়ে ঘুরতে হবে, ভেবে ভালোই লাগছে আমার।’
‘ওই পর্যন্তই যেন থাকে! একদিনের ঘোরাঘুরিকে অত বড় করে দেখবেন না। ধরে নেবেন চলতে-ফিরতে জীবনের নিছক একটি ঘটনা মাত্র!’
‘ঠিক বলেছেন। নিছক ঘটনা। আমি সেটাই ভাবছি।’
বলল বিপুল। বিপাশা কিছু বলতে যাচ্ছিল বিপুল ফের বলল,
‘আচ্ছা, আপনি কেন আমার সঙ্গে যেচে ঘুরতে বের হলেন?’
জবাবে বিপাশা বলল,
‘আমি শুধু আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা বলতে চাই। মানে, আমার নিজের প্রয়োজনেই কথাগুলো আপনাকে বলব। আপনি আবার সাত-পাঁচ ভেবে বসবেন না!’
‘কী যে, বলেন! আপনি আমার সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে এমন কথা বলছেন। যদি আমাকে চিনতেন, জানতেন, তাহলে বলতেন না।’
‘আচ্ছা, দেখি কতটা চেনা যায়। কতটা জানা যায়। এখন চলুন।’
‘রবীন্দ্র সরোবরে যাবেন?’
‘চলুন। এছাড়া আর কোথায় যাবেন বলে ঠিক করেছেন?’
রবীন্দ্র সরোবার থেকে ফেরার পথে যে কোনো মার্কেটে যাব একটু কেনাকাটা করতে। এরপর নিউমার্কেটে গিয়ে একটা চক্কর দেব। দুপুরে আমরা হোটেলে ফিরে কেনাকাটার পণ্যগুলো রেখে চলে যাব গড়ের মাঠে বা ডায়মন্ড হারবারে। ওখানে গঙ্গার পাড়ে বসে গল্প করব আপনার সঙ্গে। আপনি চাইলে আপনাকে রাজারহাটে ইকো পার্কে নিয়ে যেতে পারি। যাবেন?’
‘না। তার চেয়ে গঙ্গার পাড়ে সন্ধ্যার সময়টুকু কাটাব। চলুন, আপনার পরিকল্পনা মতো যাওয়া যাক। যেতে যেতে কথা বলব।’
‘আচ্ছা।’
বিপুল হাতের ইশারা দিয়ে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাল। তারা উঠে পড়ল ট্যাক্সির পেছনের সিটে। বিপুল বলল,
‘রবীন্দ্র সরোবর চলুন।’
গাড়ি চলতে শুরু করল পার্ক স্ট্রিট দিয়ে। এই এলাকায় ধনীদের বাড়ি বেশি। বনেদি আবাসিক এলাকা এটি। কলকাতার উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার এই পার্ক স্ট্রিটে বাস করেন। এই এলাকায় অনেক ট্যুরিস্টও এসে থাকতে পছন্দ করে বলে এখানে বেশ কয়েকটি অভিজাত হোটেল আছে। বিপুল কলকাতায় এলে পার্ক স্ট্রিটের পার্ক হোটেলেই থাকতে পছন্দ করে। গাড়ি ছুটছে। বিপাশা জানালা দিয়ে তাকিয়েছিল বাইরে, বিপুল ওর উদ্দেশে বলল,
‘এবার আপনি আপনার গল্প বলা শুরু করুন। কথা ধরে রেখে সময় নষ্ট করবেন না।’
বিপুলের কথায় গাড়ির জানালা থেকে মুখ ঘুরিয়ে বিপাশা বলল,
‘হুম। বলছি।’
কথাটা বলে বিপাশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বিপুল আশা করছে বিপাশা কথা বলা শুরু করুক। একটু সময় পার করে বিপাশা বলল,
‘আমি একজনের সন্ধানে কলকাতায় এসেছিলাম।’
‘কে সে? কোথায় থাকেন?’
‘বলছি। শুনুন, আমি যাকে ভালোবেসেছি, তার খোঁজে এই শহরে আসতে হয়েছে আমাকে।’
কথাটা শুনে একটু চমকালো বিপুল। ও বলল,
‘আচ্ছা? কী নাম তার?’
‘ওর নাম জুবায়ের। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। দিল্লির আলিগড় ইউনিভার্সিটিতে ল’-এর স্টুডেন্ট আমি। জুবায়েরও পড়েছে।’
বলল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘তো?’
‘আমাদের ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে। পরীক্ষা শেষ হওয়ায় জুবায়ের দু-সপ্তাহ আগে কলকাতায় নিজের বাড়িতে চলে আসে। ও চলে আসার দুদিন অবধি আমার সঙ্গে সেলফোনে কথা হয়েছে। এরপর থেকে ওকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। ওর জন্য দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিল।’
এ পর্যন্ত বলে বিপাশা থামল। বিপুল বলল,
‘থামলেন কেন, বলুন।’
‘এই দুঃশ্চিন্তা নিয়ে কাল রাতের ট্রেনে চেপে কলকাতায় আসি। এরপর ওর বাড়িতে যাই।’
বিপাশা ফের চুপ হয়ে গেল। বিপুল বলল,
‘বাড়িতে গিয়ে কী দেখলেন? তার পরিবারের লোকেরা আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন?’
বিপুলের প্রশ্নে বিপাশা বলল,
‘না, তেমন ঘটনা নয়। আমি…!’
‘বলুন। কী হয়েছে, খুলে বলুন।’
তাগিদ দিল বিপুল। বিপাশা বলল,
‘ওখানে আমার জন্য আরও বড় চমক অপেক্ষা করছিল। ঠিক চমক নয়, বজ্রাঘাত! অনেক বড় আঘাতে আমি বিপন্ন!’
ফের চুপ হলো বিপাশা। বিপুল আগ্রহ নিয়ে বলল,
‘চুপ করে গেলেন কেন? বলুন, কী হলো জুবায়েরের বাড়িতে?’
‘ওখানে গিয়ে জানলাম, জুবায়ের সেখানে থাকে না। আসলে ওর পরিবারের কেউ কলকাতায় থাকে না। ওরা থাকে বাংলাদেশে।’
‘বাংলাদেশে! কী বলছেন!’
কথাটায় ভীষণ ধাক্কা খেল বিপুল। এমন কথা ও কখনও শোনেনি। একজন সহপাঠীর বাড়ি কোথায় এবং তার পরিচয় কীÑ এসব না জেনে কেউ কি প্রেম করে? অবাক কণ্ঠে বিপুল বলল,
‘এমন কথা প্রথম শুনলাম! যে আপনার সঙ্গে প্রেম করলেন, তিনি কেন নিজের বাড়ির ঠিকানা ভুল দেবেন? বুঝতে পারছি না! আপনি ভালো করে খোঁজ করেছেন তো?’
বিপুলের প্রশ্নের জবাবে বিপাশা বলল,
‘যা শুনেছি, তাই আপনাকে বলছি। জুবায়ের আমাকে মিথ্যা কথা বলেছিল। মিথ্যা ঠিকানা দিয়েছিল। এ-কথা ভাবলেই আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়!’
‘কী যে বলছেন!’
বিস্ময় প্রকাশ করে বলল বিপুল। বিপাশা বিষাদভরা কণ্ঠে বলল,
‘ও আমাকে ভালোবাসার নামে প্রতারণা করেছে। আমাকে কলকাতার যে ঠিকানা ও আমাকে দিয়েছিল, কাল ওখানে গিয়ে জানলাম ওটা জুবায়েরের এক বন্ধুর বাড়ির ঠিকানা। আমি ওই ঠিকানায়, ওই বাড়িতে গিয়ে এ খবরটা জানতে পারলাম।’
‘এমন খবর জানার পর দুঃসহ যন্ত্রণা তো হবেই!’
বলল বিপুল। বিপাশা মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করে বলল,
‘খবরটা জানার পর যেন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! বলুন তো, এটার কোনো মানে হয়? এমন প্রতারণা করার কোনো কারণ ছিল? এমন ডাহা মিথ্যে দিয়ে একজন মানুষের বিশ্বাসকে তছনছ করে দেওয়ায় কী আনন্দ আছে?’
বিপুল কী বলবে বুঝতে পারল না। এমন কথার কী জবাব হতে পারে, সেটা ওর জানা নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে এ-ধরনের প্রতারণা কার্যকারণ ও কখনও দেখেনি। তবে মানুষ ভালোবাসার নামে প্রতারণা করে, এটা দেখেছে। ও নিজেও একটি মেয়েকে ভালোবেসে প্রতারণার শিকার হয়েছে। মানুষ কেন হৃদয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলেÑ এমন প্রশ্নের জবাব বিপুল নিজেও অনেকদিন খুঁজেছে। পায়নি। এখন ও বিপাশার প্রশ্নের জবাবে কী বলতে পারে? কী বলবে, তা বলতে বিপুল নিজের মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। যদিও সে বিপাশাকে চেনে না, জানেও না। তবুও মেয়েটি যখন তার কাছে নিজের জীবনের দুঃখ ভারাক্রান্ত গল্পটা বলেছে, ওকে সান্ত¦না দেওয়া উচিত ভেবে নিল। গাড়ি ছুটে চলেছে। ওর পাশে বসে বিপাশা কি কাঁদছে? ওর শরীরটা একটু কাঁপছে যেন। বিপুল ওর দিকে তাকাতে সাহস করল না। কাঁদলে, কাঁদুকÑ ভেবে নিল ও। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তায় দৃষ্টি রেখে ও বলল,
‘ঠিক আপনাকে কী বলব বুঝতে পারছি না। সান্ত¦না জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। জুবায়ের কে, কেমন মানুষÑ সেটাও আমি জানি না।’
ওর কথায় বিপাশা নড়েচড়ে বসল। ওর উদ্দেশে বিপাশা বলল,
‘মানুষ চেনা অত কী সহজ? সহজ নয়।’
বিপুল বলল,
‘জুবায়ের সম্পর্কে আরেকটু যদি বলেন, মানে কীভাবে পরিচয়, প্রেম হলো…!’
‘জুবায়ের আমাদের ক্লাসে পড়েছে দু-বছর। আমি তাকে কয়েক মাস আগেও চিনতাম না। ক্লাসের সহপাঠী ছিলাম আমরা, এমন অনেক ছাত্র-ছাত্রীই তো লেখাপড়া করছে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কে কাকে চিনবে? জুবায়েরের সঙ্গে পরিচয় হয় ফাইনাল পরীক্ষার প্রায় তিন মাস আগে। আর পরিচয়ের মধ্য দিয়ে ওর সঙ্গে সখ্যতা হয় নোট দেওয়া-নেওয়া থেকে। ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে। দু-মাস আগে ও-ই আমাকে প্রথম প্রপোজ করে।’
বিপাশা থামল। একটা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল ওর শরীরে। বিপুল মুগ্ধ শ্রোতার মতো বলল,
‘আর প্রেম হলো কীভাবে?’
‘আমি ওর মধ্যে সরল এক মানুষ দেখতে পেয়েছিলাম। আমারও ওকে ভালো লেগেছিল। তাই ‘হ্যাঁ’ বলে দিই। জীবনের প্রথম প্রেমের উন্মাদনায় ভেসে যেতে পারিনি পরীক্ষা আসন্ন ছিল বলে। কিন্তু প্রেম তো প্রেমই! বলুন, প্রেম করতে এসে প্রতারণা করতে হবে কেন?’
বিপুলের কাছে যেন এসবের জবাব আছে, এমনভাবে তাকালো বিপাশা।
বিপুল বিপাশাকে বলল,
‘আচ্ছা, প্রতারণা তো নাও হতে পারে! মানে, অন্য কোনো কারণ কি থাকতে পারে না?’
‘তা পারে। কিন্তু বাড়ির ঠিকানা ও আসল পরিচয় গোপন করার মতো কারণ কী থাকতে পারে? প্রেম করার সময় কি আমার কোনো শর্ত ছিল? ছিল না। যদি বলতাম, তোমার জাতীয় পরিচয় কি বলো? ভারতীয় না হলে আমি প্রেম করব না। তাহলে না হয় ও মিথ্যা পরিচয়ের আশ্রয় নিতে পারত। আমি তো ও-রকম মেয়ে নই! আমি ‘মানুষ’ কেমন, সেটাই সবচেয়ে আগে দেখি এবং মানুষের মূল্যায়ন করি।’
‘হুম। আপনার এ-কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে তিনি কেন এমন কাজ করলেন ভেবে পাচ্ছি না।’
‘এ-জন্যই তো বলেছি, আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। আমি জীবনে এতটা শকড্ কখনও হইনি! জানেন?’
‘জানব কী করে। আপনার সঙ্গে পরিচয় হলোই তো কাল রাতে! আজকে দুজনে ঘুরতে বের হলাম।’
‘জানি, কথার কথা বলেছি।’
বলল বিপাশা। বিষণ্নকণ্ঠে বিপুল বলল,
‘এখন কী করবেন ভাবছেন?’
‘আপনার সহযোগিতা চাই। সহযোগিতা করবেন?’
বিপাশার কণ্ঠে অনুনয়। বিপুল হেসে বলল,
‘কী করতে হবে বলুন।’
‘আমি ওর বাড়ির ঠিকানা নিয়ে এসেছি। ওদের বাড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের রাউজানে। আপনি যদি সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আমাকে ওর খবরটা জানান, আমি পুরো জীবন আপনার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখব। কাজটা করবেন কি? প্লিজ!’
বিপাশার এই অনুরোধ রক্ষা করা খুব কঠিন নয়। বিপুল মøান হেসে বলল,
‘আচ্ছা, তা করব। এটা আমার জন্য খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। এক বা দুদিন নষ্ট হবে। আমি নিজে রাউজান যাব এবং জুবায়েরের সঙ্গে কথা বলব। এরপর আপনাকে ফোন করে জানাব। সম্ভব হলে তার সঙ্গে আপনাকে ফোনে কথা বলিয়ে দেব। হলো তো?’
‘সত্যি, বলছেন!’
‘হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আপনি চোখের জল ফেলবেন না, প্লিজ! হাসিমুখে থাকুন। হাসলে আপনাকে খুব ভালো দেখায়, কথাটা সত্যি কিন্তু!’
‘জানি। আমার হাসির প্রশংসা অনেক শুনতে হয় আমাকে।’
জবাব দিয়ে মুচকি হাসলো বিপাশা। হাসলে ওকে রজনীগন্ধা ফুলের মতো লাগেÑ মনে মনে নিজেকে বলল বিপুল। ও বিপাশাকে বলল,
‘ঠিক আছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনাকে আমি সঠিক খবরটা জানাব।’
‘আপনি অনেক ভালো মানুষ। কাল রাতে রেস্টুরেন্টে আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছিলÑ আপনি একজন পরোপকারী মানুষ। তাই তো আমি আপনার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। জানেন, আজ আমি দিল্লি ফিরে যেতাম। আপনার সঙ্গে কথা বলে সহযোগিতা চাইব বলে কলকাতায় থেকে গেলাম।’
‘ও, এখন বুঝতে পেরেছি। আমিও সংকোচবোধ করছিলাম, যখন আপনি একটু পরিচয়ের সূত্রে আমার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। মনে মনে ভাবছিলাম, আরে-এ কেমন মেয়ে!’
‘আমার কোনো উপায় ছিল না। আপনি আমার সঙ্গে কথা বলার পরই মনে হলোÑ এটা কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশনা বা প্রকৃতির রহস্য। নইলে আপনি কেন আমার কানের দুল কুড়িয়ে পেলেন এবং একই হোটেলে উঠলেন?’
‘হা হা হা।’
হাসলো বিপুল। গাড়ি ছুটে চলেছে। ওর হাসি থামলে বিপাশা আমুদে গলায় বলল,
‘আমার কথা শুনে আপনি হাসতে পারেন। আমার এসব ভাবতে ও বিশ্বাস করতে ভালো লাগে।’
‘বিশ্বাস করুন। বাধা দিচ্ছে কে?’
‘হাসলেন যে! তাই বললাম।’
‘যাক, আপনার একটা অবলম্বন হলো। প্রেমিককে খোঁজার জন্য বাংলাদেশে যেতে হচ্ছে না। কী বলেন?’
বলল বিপুল। এবার ও হাসলো শব্দ না করে। বিপাশা হাসিমুখে বলল,
‘হ্যাঁ, আপনার সহযোগিতা পাচ্ছি বলে আমাকে বাংলাদেশে যেতে হচ্ছে না।’
‘না হলে আপনি যেতেন?’
‘যেতাম। আমি এর কারণ জানতে চাই। ব্যস, এটুকুই।’
‘যাক, আপনি খোঁজ নিয়ে জানাব।’
বলল বিপুল। বিপাশা এবার বলল,
‘আপনি আমার বন্ধু হবেন?’
কথাটায় একটু কেঁপে উঠল যেন বিপুল। বিপাশার কথাটা ওর ভালো লাগল। জবাবে ও বলল,
‘বন্ধু হব কী! হয়েই তো গেছি! হা হা হা।’
‘তা ঠিক বলেছেন। গল্পের প্রয়োজনেই গল্পের এক বাঁকে আপনি হয়ে গেলেন আমার বন্ধু। বাহ্!’
বিপাশার এ-কথায় বিপুল জানতে চেয়ে বলল,
‘গল্পটা লিখল কে?’
‘প্রকৃতি লিখছে গল্পটা!’
আনমনে জবাবটা দিল বিপাশা। এ-সময় গাড়ি এসে থামল রবীন্দ্র সরোবরের গেটের সামনে। গাড়ির চালক সামনের আসন থেকে বলল,
‘স্যার, এসে গেছি রবীন্দ্র সরোবর।’
তিন.
সকাল আটটায় ছুটতে হলো দমদম এয়ারপোর্টে। বিপুলের ফ্লাইট সাড়ে এগারোটায় আর বিপাশার ফ্লাইট বারোটা পনেরো মিনিটে। বিপুল ঢাকা ফিরবে, বিপাশা ফিরবে দিল্লি। রাতেই ওরা ঠিক করে রেখেছিল একসঙ্গে দমদম এয়ারপোর্টে যাবে। এক গাড়িতেই দমদম এয়ারপোর্টে যাচ্ছে ওরা। কাল রাত অবধি ওরা ঘুরে বেড়িয়েছে কলকাতা শহর। কেনাকাটা তেমন করতে পারেনি বিপুল। বিপাশার জীবনের গল্পটা শুনে বিপুল কেমন ওর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছে। জেসমিন নামে একটি মেয়েকে বিপুল ভালোবেসেছিল; কিন্তু ওর ভালোবাসাটাও প্রবঞ্চনার চোরাবালিতে তলিয়ে গেছে। জেসমিন ওর ভালোবাসা অনুভব করেনি। অথচ জেসমিনই ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ভালোবাসাবাসির অভূতপূর্ণ মায়াবী ভুবনে। ট্যাক্সিতে বিপাশার পাশে বসে বিপুলের মনে পড়ে গেল জেসমিনের সঙ্গে পরিচয় ও ভালোবাসায় জড়ানোর কথা। অনেকটা সিনেমার ফ্লাশব্যাকের মতো ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। মগবাজারের মোড়ে জেসমিনদের বাড়ি। ওদের বাড়ির পাশে বিপুলের খালার বাড়ি। খালার বাড়িতে যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে জেসমিনের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল। খালাতো ভাই রুম্মনের জন্মদিনে জেসমিনের সঙ্গে প্রথম কথা ও পরিচয়। জেসমিন তখন ইডেন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। হাতিরপুলে বিপুলদের বাড়ি। নিউমার্কেটে নিয়মিত বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিত বিপুল। জেসমিনের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত নিউমার্কেটে। একটা সময় দেখা গেল বিপুল প্রতিদিন দুপুরে গিয়ে অপেক্ষা করছে, আর জেসমিনও ইডেন থেকে বেরিয়ে নিউমার্কেটে চলে আসছে। চটপতি, ফুচকা খাওয়ার একটা নিয়মিত অভ্যাস দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল যেন। জেসমিন চটপতি ও ফুচকা খেতে খুব পছন্দ করত। ওদের চটপটি আর ফুচকা খাওয়ার মধ্য দিয়ে সপ্তাহের পাঁচ দিন রঙিন হয়ে যেত নানা কথা আর আবেগমাখা দৃষ্টিবিনিময়ে। একদিন ওরা দুজন সিনেমাও দেখে ফেলল। ঐদিন সকালবেলা জেসমিন ওকে ফোন করে বলল,
‘বিপুল, আজ আপনার কি সময় হবে?’
জেসমিনের ফোন পেয়ে মনটা ভীষণ নেচে উঠল। জেসমিন ওকে ফোন করেছে, বিপুলের মনে সে কি খুশির জোয়ার বইতে শুরু করেছে। ও বলল,
‘সময় হবে না মানে! কী করতে হবে বলো একবার!’
‘আমার মনটা ভীষণ খারাপ, জানেন?’
‘কী করে জানব? আমি তো তোমার অন্তর্যামি নই। হতে চেষ্টা করছি!’
ও-প্রান্তে জেসমিন হাসলো। বিপুলের মনেও ঐ হাসির ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। যাকে ভালো লাগে তার হাসিটা সব সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসি বলে মনে হয়। আর যাকে ভালোবাসে তার হাসিতে যেন স্বর্গের দরজা খুলে যায়। যতবার হাসবে, স্বর্গের দরজা ততবার খুলবে। বিপুলের মন বলছেÑ জেসমিনের হাসিতে স্বর্গের দরজা খুলে গেল। ও-প্রান্তে জেসমিনের হাসিটা ওর মনে ভেসে উঠছে। জেসমিন বলল,
‘আপনি কি জাদু জানেন?’
‘কী বলছেন! জাদু? জাদু জানলে কি শুধু চটপতি-ফোসকা খাওয়াতাম? প্রতিদিন কত কত সুস্বাদু খাবার খাওয়াতাম!’
‘কী রকম?’
জানতে চাইল জেসমিন। বিপুল উৎসাহ নিয়ে বলল,
‘ধরুন, বললেন ক্ষুধা লাগছে, আমি জাদুবলে এনে দিলাম হাজীর বিরিয়ানি। বললেন, তা খাবেন না। এনে দিলাম পিজাহাটের পিজা। বললেন ওটাও খাবেন না, তো এনে দিলাম ইতিলিয়ান ডিশ…!’
‘আচ্ছা হয়েছে, থামুন।’
জেসমিনের কথায় ও থেমে যায়। ভালোবাসা বড় অদ্ভুত মায়াজাল! কথা বলতে গেলে কথার স্রোত নেমে আসে। প্রেমে পড়লে বোবাও যেন গান গাইতে পারেÑ বিপুলের মনে হলো। জেসমিন ফোনের ও-প্রান্ত থেকে আদুরে কণ্ঠে বলল,
‘আজ আপনার সঙ্গে সিনেমা দেখতে চাই। আসবেন?’
‘বলুন কোথায় আসতে হবে। আমিও অনেকদিন হলো সিনেমা দেখছি না। জীবনটা কেমন তেতো হয়ে আছে!’
‘ঠিক আছে, চলে আসুন। যমুনা ফিউচার পার্কে। আমরা সিনেমা দেখব আর ওখানে ভালো একটি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করব।’
‘কিন্তু আজ তো শনিবার! বাড়ি থেকে আসতে পারবেন?’
জানতে চাইল বিপুল। ফের হাসলো জেসমিন। ও বলল,
‘আমি কি বাড়িতে বন্দি থাকি? বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা ছাড়াও আমি যখন ইচ্ছে ঘুরতে যেতে পারি। আমার মা-বাবা আমাকে এই স্বাধীনতা দিয়েছেন।’
কথাটা বলে ঝরনার জলপ্রপাতের মতো শব্দ করে হাসলো ও। মেয়েদের হাসির মধ্যে কেন যে এত মাদকতা দিয়ে রেখেছে সৃষ্টিকর্তা, কেন জানে! মনে মনে বলল বিপুল। ও জেসমিনকে বলল,
‘ভালো তো! তাহলে আমি আসছি। এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করব। ট্রাফিক জ্যাম না থাকলেই হলো!’
‘আচ্ছা, চলে আসুন। আমি ওখানেই আছি।’
‘বলেন কী! আপনি অলরেডি ওখানে! ওখানে গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল কেন?’
বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চাইল বিপুল। ও-প্রান্তে একটু চুপ থেকে জেসমিন বলল,
‘মন খারাপ হতে হলে স্থান-কাল দেখে হবে? কী সব বলছেন আপনি? আসবেন কি না বলুন!’
এমন কথায় বিপুলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। জেসমিনকে ও রাগাতে চায় না। কথাটা অত ভেবে বলেনি; কিন্তু জেসমিন একটু বিব্রত হয়েছে যেন। বিপুল আর কথা না বাড়িয়ে ‘আচ্ছা আসছি’ বলে ফোন রেখে দিল। মেয়েদের মনের মান-অভিমান বা রাগের অবস্থাও বোঝা দায়! সৃষ্টিকর্তা মেয়েদের মন ও ভাবনার মধ্যে রহস্যের রং রেখে দিয়েছেন। এই রংধনুটা কখন উঠবে বা কখন উবে যাবে, এটা কেউ বলতে পারবে না। এমন কী মেয়েরা নিজেরাও বলতে পারবে না। এ-কথা মনে মনে ভাবল বিপুল। জেসমিনের প্রতি অনুরাগ সিক্ত হওয়ার পর থেকে মেয়েদের নানা বিভাস নিয়ে ও মনে মনে কথা তৈরি করে। কথাগুলো ওর নিজের মনের ভাবনা।
সেদিন বিপুল ছুটে গিয়েছিল যমুনা ফিউচার পার্ক মলে। জেসমিনের সঙ্গে সেদিন সিনেমা দেখেছিল। সিনেমা হলে বিপুলের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে জেসমিন একটা চুমুও খেয়েছিল। তখন বিপুলের মনে হয়েছিল স্বর্গটা নেমে এসে ওদের পাশে বসে সিনেমা দেখছে। সিনেমা শেষ হওয়া পর্যন্ত বিপুল স্বর্গঘোরে ডুবে গিয়েছিল। চুমু খাওয়ার পর কী অজানা কারণে সিনেমা হলে জেসমিন হয়ে গিয়েছিল গম্ভীর। মেয়েদের মনের রং কারণে-অকারণে বদলে যায়Ñ এটা ও জানত বলে জেসমিনের গম্ভীর হয়ে যাওয়ায় অবাক হয়নি। সিনেমা শেষ হলে জেসমিন দ্রুত বিদায় নিয়েছিল। বিপুলের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করবে, এমন কথা বলেছিল। কিন্তু জেসমিন ‘মাথা ধরেছে’ বলে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। বিপুল ওই আচরণকেও সৃষ্টিকর্তার রহস্য বলে মেনে নিয়েছিল।
এরপর কয়েকদিন ওদের আড্ডা হলো নিউমার্কেটে। বিপুল জেসমিনের দিকে আগের চেয়ে মুগ্ধ চোখে তাকালেও ও যেন আগের মতোই আছেÑ এমন আচরণ করল। সেদিন জেসমিন যে সিনেমা হলে ওর হাত টেনে নিয়ে চুম্বন করেছিল, এমন ঘটনা যেন ঘটেনিÑ জেসমিনের এমন আচরণ লক্ষ করল বিপুল। অথচ চুম্বনের মতো পবিত্র ঘটনাটি বিপুল ওদের মধ্যে টেনে আনতে চাইছিল। কিন্তু জেসমিনের আচরণে বিপুল সংকোচের দেয়ালটা ভাঙতে পারছিল না। নিউমার্কেটে একদিন জেসমিন এলো না। তখন অপেক্ষার কষ্ট ও জেসমিনের প্রতি ভীষণ টান অনুভব করল বিপুল। সন্ধ্যায় জেসমিনকে ফোন করল বিপুল, ফোন ধরল না ও। এর পরের দিনও এলো না জেসমিন। সেদিন অবশ্য আজাদ নামে এক যুবক এসে নিজেকে জেসমিনের প্রেমিক দাবি করে ওকে আরও চমকে দেওয়ার মতো খবর জানাল। সেদিনের ঘটনাটাও মনে পড়ল ওর। নিউমার্কেটের জ্ঞানের আলো বুকস্টোরের সামনে দাঁড়িয়ে জেসমিনের জন্য অপেক্ষা করছিল বিপুল, লম্বা ও লিকলিকে শরীরের এক যুবক ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ভাই, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি?’
‘আপনি কে?’
জানতে চাইল বিপুল। যুবকটি বলল,
‘আমার নাম আজাদ। আজাদুর রহমান আজাদ।’
‘বুঝলাম আপনার নাম আজাদ। আমাকে চেনেন কীভাবে?’
‘আপনি তো জেসমিনকে চেনেন। তার সঙ্গে এখানে আড্ডা দেন। তাই চিনি।’
আজাদের কথা শুনে বেশ অবাক হলো বিপুল। ওর দিকে ভালো করে তাকালো। আজাদের বেশভূষায় তাকে স্মার্ট মনে না হলেও সাহসী ও জেদি চরিত্রের মানুষ মনে হলো বিপুলের। ও বলল,
‘আপনি জেসমিনকে চেনেন কীভাবে? জেসমিন আপনার কী হয়?’
‘আমি জেসমিনকে ভালোবাসি।’
কথাটা বলে আজাদ কেমন একটা সাহসী দৃষ্টিতে বিপুলের চোখে চোখ রাখল। আজাদের জবাবটা বৈশাখী ঝড়ের মতো লাগল ওর। বিপুল হচকিয়ে গেল এবং ভালো করে লক্ষ করল আজাদকে। ওর পোশাক দেখে মধ্যবিত্ত বোঝা যাচ্ছে, নিম্ন মধ্যবিত্তও হতে পারে। চুলে তেল মেখেছে, শার্র্টের পকেটে একটা সানগ্লাস রাখা। কালো প্যান্টের ডান পায়ের নিচে একটু কাদামাটি লেগে আছে, আর জুতোর সামনের অংশ রং ঝলসে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এমন একটি ছেলে কীভাবে জেসমিনের প্রেমিক হয়? ভাবতে গিয়ে কেমন মিহিন যন্ত্রণা টের পেল বিপুল। জেসমিনের দেখা না পেয়ে ওর এমনিতে মন খারাপ, এর মধ্যে ওর উদ্ভট প্রেমিক এসে হাজির। বিপুল ধাক্কা সামলে নিয়ে আজাদকে বলল,
‘জেসমিনকে ভালোবাসেন মানে? আপনার স্পর্ধা তো কম নয়! আপনি জেসমিনকে ভালোবাসার সাহস পেলেন কোত্থেকে?’
প্রেমে পড়ে অন্ধ হয়ে গেলে ভীরুরা সাহসী হয়ে যায়, বিপদগামীরা সৎ হওয়ার চেষ্টা করে, ডাকাতরা অনেক সময় ধার্মিক হয়ে যায়Ñ এটা শুনেছে বিপুল। আজাদকেও তাই মনে হলো। আজাদ সাহসী কণ্ঠে বলল,
‘শুধু আমি একা ভালোবাসবো কেন? জেসমিনও আমাকে ভালোবাসতো!’
‘ভালোবাসতো মানে? এখন বাসে না?’
জানতে চাইল বিপুল। আজাদ কষ্টমাখা মুচকি হেসে বলল,
‘এখন ভালোবাসে না, অথবা ভালোবাসে। কিন্তু জেসমিন আমাকে এড়িয়ে চলছে অনেকদিন ধরে।’
‘কেন?’
‘আপনার জন্য!’
‘আমার জন্য? আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না!’
বিপুল কথা বলে আজাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আজাদ যেন সব হারানোর শোক সহে যাওয়া এক প্রেমিক। তার চোখ দুটো জ্বলছে। সে বলল,
‘দেখুন, আপনি জেনেও না জানার ভান করছেন। প্রতিদিন আপনি এখানে জেসমিনকে নিয়ে চটপটি-ফুচকা খান, আর এখন বলছেন, ঠিক বুঝতে পারছেন না আমার কথা। এ কিন্তু ভারি অন্যায়!’
‘আচ্ছা, এখন বুঝেছি। আপনি জেসমিনকে প্রতিদিন তাহলে অনুসরণ করেন। এবং আমাদের দেখেছেন এখানে চটপটি-ফুচকা খেতে। এই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তো, আপনাকে জেসমিন ভালোবাসে এটা কীভাবে বুঝব? আর ভালোবাসবেই যদি, তাহলে ও প্রতিদিন আমার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে কেন?’
প্রশ্ন করল বিপুল। আজাদ চোখে দুঃখের দৃষ্টি ফুটিয়ে বলল,
‘এ-কথাটা বলতেই তো আপনার কাছে এসেছি! আমি আপনাকে সাবধান করতে এসেছি! আমার তো যা ক্ষতি হওয়ার হয়েছে, আপনার যেন তা না হয়, সেটা বলতে এসেছি!’
‘বাহ্! চমৎকার তো! তাহলে বলুন কী বলতে চান?’
‘জেসমিন কিন্তু ভালো মেয়ে নয়! আপনি ওর ফাঁদে পা দেবেন না! এ-কথাটা বলতে এসেছি।’
আজাদের কথা শুনে রাগ হচ্ছে ওর। কিন্তু রাগকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে বিপুল। ও বলল,
‘কেন? জেসমিন ভালো মেয়ে নয়Ñ এর কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’
‘আমি নিজেই একটা প্রমাণ। আর খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওর সঙ্গে আরও দু-তিনটে ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। জেসমিন ছেলেদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে মজা পায়!’
‘কী করে জানলেন?’
বুকের ভেতরে কষ্টের একটা ঢেউ সামলে নিল যেন বিপুল। ওর প্রশ্নের জবাবে আজাদ বলল,
‘শুনুন, আমি একটু নাছোড়বান্দা টাইপ মানুষ। আমি ওর পেছনে লেগে আছি। ও আমার প্রথম ভালোবাসা, বুঝলেন?’
‘আশ্চর্য, জেসমিন তো আমারও প্রথম ভালোবাসা!’
‘আপনি ওকে ভালোবাসার কথাটি বলেছেন?’
‘না, কিন্তু ও জানে। আমি যে কোনোদিন কথাটা বলে ফেলব।’
সরল স্বীকারোক্তির মতো কথাটা বলল বিপুল। ফের কষ্টমাখা মুচকি হাসি দেখা গেল আজাদের মুখে। ও বিপুলকে বলল,
‘আমার কথা বিশ্বাস করুন এবং নিজেকে সংযত রাখুন। এতে আপনার মঙ্গল হবে। নইলে আমার মতো একটা সময় আপনাকেও ওর পেছনে ঘুরতে হবে। বুঝলেন?’
‘আপনাকে আমার পাগল বলে ভাবতে হচ্ছে।’
‘তা ভাবতে পারেন। আমি এক অর্থে পাগলও। জেসমিনের ভালোবাসার পাগল!’
‘আচ্ছা, এখন যান। আমাকে একা থাকতে দিন তো!’
মনের ভেতর রাগের উত্তাপ বেরিয়ে এলো বিপুলের কণ্ঠে। ওর রাগকে পাত্তা না দিয়ে আজাদ বলল,
‘যাচ্ছি, তবে কথাটা মনে রাখবেন। জেসমিনের প্রেমের আগুনে ঝাঁপ দেবেন না! প্রেম, ওর কাছে একটা খেলা!’
এ-কথা বলে আজাদ চলে গেল। বিপুলের মনটা ভীষণ বিষণ্ন হয়ে গেল। এমন কথা শুনবে তা তো কল্পনাও করেনি। যাকে ও ভালোবাসতে শুরু করেছে, ভালোবাসার পাপড়িগুলো ফুটছে, তার সম্পর্কে নেতিবাচক কথাগুলো এখন মনে হুল ফুটাচ্ছে। ওর খুব রাগ হচ্ছিল আজাদের প্রতি। কিন্তু ছেলেটা বেশ হাবাগোবা টাইপ। বিপুল লক্ষ করেছে আজাদ যখন কথাগুলো বলছিল, তখন ওর চোখের দৃষ্টিতে সরলতা ছিল। সরল দৃষ্টি রেখে মিথ্যা কথা বলতে পারে না অনেকে। প্রবল রাগের উত্তাপে বিপুল ফোন করল জেসমিনকে। ওর চোখের সামনে স্বর্গটা ভেঙে যাচ্ছে যেন! এবার ও-প্রান্তে জেসমিন ফোনে বলল,
‘হ্যালো…!’
বিপুলের মনে হলো জমাট বাঁধা এক বরফপাহাড় গলে নেমে যেতে চাইছে। ওর সব রাগ মিলিয়ে গেল এক লহমায়। ও বলল,
‘তুমি, দুদিন ধরে আসছো না! ফোনও ধরছিলে না কেন?’
‘আর বলো না। আমার সে কি বিপদ!’
জেসমিন বিপুলকে এই প্রথম ‘তুমি’ সম্বোধন করল। এমনটা আশা করেনি ও। তবে এতে ওর মনে খুশির ফোয়ারা ছুটল যেন। স্বর্গটা ফের নেমে আসতে চাইছে। ও বিষণ্নকণ্ঠে বলল,
‘কীসের বিপদ!’
‘বাসায় বন্দি হয়ে আছি। দেখ না, তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না! ক্লাস করতে ইডেনেও যেতে দিচ্ছেন না মা-বাবা!’
‘কিন্তু কেন? কী হয়েছে?’
উদ্বেগ প্রকাশ করল বিপুল। ও-প্রান্তে জেসমিন বলল,
‘বাবা-মা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন!’
‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে? তোমার অনার্স ফাইনাল তো এ-বছর, তাই না?’
‘হুম। জানো, দুদিন আগে আমাকে এক পাত্র দেখে গেছে। ছেলেটি আমেরিকায় থাকে। আমাকে বিয়ে করে চলে যাবে, কয়েক মাস পর আমাকেও চলে যেতে হবে। সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহেই বিয়ে!’
বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল বিপুলের। ভালোবাসার কলি না ফুটতেই যেন চোখের সামনে ফুল ঝরে যাচ্ছে! বিপুলের কণ্ঠ শুকিয়ে এলো। বুকের ভেতরে মিহিন এক কষ্টের আলোড়ন টের পাচ্ছে ও। অন্য প্রান্ত থেকে জেসমিন বলল,
‘এই শোন, একটা প্রশ্ন করব তোমাকে?’
‘করো।’
‘তুমি আমাকে ভালোবাসো?’
প্রশ্ন নয়, যেন স্বর্গটা নেমে এসে বিপুলের সামনে দাঁড়িয়েছে। এমন একটি প্রশ্ন এতটা আকস্মিকভাবে ওর সামনে দাঁড়াবে কখনও ভাবেনি বিপুল। ও প্রশ্নটার জবাব দিতে সংকোচবোধ করল না। ও আবেগময় কণ্ঠে বলল,
‘বাসি। অনেক ভালোবাসি তোমাকে!’
যে পাহাড়টা অনড় হয়ে জমেছিল, তা একটি কথার মধ্য দিয়ে নদী বানিয়ে দিল যেন বিপুল। ও-প্রান্তে জেসমিনের কান্না জড়ানো কণ্ঠ,
‘তাহলে একটা কাজ করি, চলো।’
‘কী কাজ?’
‘আমরা পালিয়ে বিয়ে করে ফেলি!’
‘কেন? কবে? কীভাবে?’
উদ্বিগ্নকণ্ঠে জানতে চাইল বিপুল। জেসমিন বলল,
‘আজই। কীভাবে, সেটা তুমি ঠিক করবে। আমি রাত আটটার মধ্যে কমলাপুর রেলস্টেশনে চলে আসব। তুমি ঠিক সময়ে ওখানে থাকবে। এরপর আমরা ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম চলে যাব। বুঝলে!’
‘আজকে মাত্র ভালোবাসার কথাটা বললাম, আর আজই পালিয়ে যাব!’
অসহায় গলায় বলল বিপুল। আজ যে কী হলো ওর, কে জানে! এতটা শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হলো ওকে! ও-প্রান্ত থেকে জেসমিন বলল,
‘ভালোবাসাটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালোবাসলে, পালাতে আবার অত ভাবনা কেন? আজও পালালে যা, পাঁচ বছর পরও পালালে তাই। একই কাজ। তাই না?’
‘না, বলছিলাম কি। আমার মাকে বলি। খালাকে বলি। তারা তোমার বাবা-মা’র কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দেখতে পারেন। অকারণে পালাতে যাব কেন?’
বিপুলের চিন্তার মধ্যে কেমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ভালোবাসার কথা জানানো এবং পালিয়ে বিয়ে করার পরিকল্পনা দুটোর মধ্যে তীব্র আলোড়ন আছে। বিপুলের মনে দুটো আলোড়ন স্রোত বইছে। ও-প্রান্ত থেকে জেসমিন বলল,
‘তাহলে আর আমাকে বিয়ে করা তোমার হবে না, জানু! আমার জন্য আমেরিকার ডাক্তার ঠিক করে ফেলেছেন আমার বাবা-মা। তোমার পরিচয় কী? তোমাদের অর্থবিত্ত আছে ঠিক। তুমি লেখাপড়া করেছÑ এটাও ঠিক। কিন্তু পরিচয়? তুমি তোমার বাবার ব্যবসা দেখছো। নিজের বলতে কিছু নেই। এসব বিবেচনায় আমেরিকার ডাক্তার অনেক যোগ্য পাত্র! বুঝতে পারছো?’
‘হুম। পারছি। কিন্তু…!’
‘কোনো কিন্তু নেই। যদি আমাকে ভালোবাসো আর বিয়ে করতে চাও, তাহলে তোমাকে ঝুঁকি নিতে হবে। আমিও তো ঝুঁকি নিচ্ছি। বাড়ি থেকে তুমি একা তো পালাচ্ছ না, আমিও পালাচ্ছি। শুধু কিছু টাকা তুলে নিজের কাছে রাখো। আমিও টাকা নিয়ে আসব। চট্টগ্রাম গিয়ে বিয়ে করব। সেন্টমার্ন্টিনে হানিমুন করব। এরপর আমরা ফিরে আসব তোমাদের বাড়িতে। তোমাকে ফিরিয়ে দেবে তোমার বাবা-মা?’
খুব গুছিয়ে কথাগুলো বলল জেসমিন। ওর কথাগুলোকে খণ্ডনও করা যাচ্ছে না। বিপুল জবাবে বলল,
‘না, মোটেই না। আমি হচ্ছি বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। কিন্তু আমার তো এ-কথা ভাবতেই লজ্জা লাগছে!’
‘লজ্জা পেলে তো ভালোবাসা ব্যর্থ হয়ে যাবে, জানু!’
জেসমিনের কণ্ঠে ‘জানু’ ডাকটা আগে কখনও শোনেনি বিপুল। ও এমনভাবে ‘জানু’ বলে ডাকছে, যেন জলপরীদের সম্মোহনী কণ্ঠ! ভীষণ আপ্লুত হয়ে গেল ও। বিপুল রাজি হয়ে গেল পালিয়ে বিয়ে করার প্রস্তাবে। ও বলল,
‘ঠিক আছে, চলো পালিয়ে যাই।’
‘সত্যি বলছো? পালাবে তো?’
‘হ্যাঁ, এছাড়া উপায় কী? তুমি তো অন্য পথ দেখাচ্ছ না!’
‘অন্য পথ নেই তো, জানু! তাছাড়া পালিয়ে বিয়ে করার মধ্যে অ্যাডভেঞ্চারও আছে! আছে না?’
‘কী করে বলব? এই প্রথম পালাচ্ছি!’
‘আমিও তো প্রথম পালাচ্ছি! তুমি কি ভয় পাচ্ছ?’
‘একটু পাচ্ছি। তবে সামলে নেব। ভেবো না।’
‘দেখো, আমাকে আবার ফাঁকি দিও না, জানু! কমলাপুর রেলস্টেশনে চলে এসো।’
‘আসব। আমি কথা দিলে কথা রাখি।’
দৃপ্তকণ্ঠে বলল বিপুল। জেসমিনের হাসির কণ্ঠ শুনতে পেল ও।
‘আচ্ছা, রাখছি’ বলে ফোনের লাইন কেটে দিল জেসমিন। রাত আটটার মধ্যে পৌঁছে যাবে কমলাপুর রেলস্টেশনেÑ এমন প্রতিজ্ঞা করল বিপুল। লজ্জা পাবে বলে আজাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাটা ও আর তুলল না জেসমিনের কাছে। কে কি বলে গেল, এতে ওর কিছু আসে-যায় নাÑ এমনটাই নিজের ভাবনায় যুক্তি তৈরি করে নিল। জেসমিন ওকেই ভালোবাসে, এটা স্পষ্ট। ভালোবাসে বলেই তো ওর সঙ্গে পালিয়ে যেতে চাইছে। সেদিন বিকেল অবধি অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ছিল বিপুল। মায়ের আলমারি খুলে কয়েক বান্ডিল টাকা নিয়ে ব্যাগ গুছাল। উত্তেজনায় অনেকবার ফোন করেছিল জেসমিনকে, ও ফোন ধরেনি। বিপুলের ধারণা হলোÑ হয়তো বাবা-মায়ের কড়া নজরে থাকায় জেসমিন হয়তো ফোন ধরেনি। যাই হোক, রাত আটটা পনেরো মিনিটে কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছাল বিপুল। প্রথমে এদিক-সেদিকে খুঁজল জেসমিনকে। দেখতে পেল না। কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছতে ওর পনেরো মিনিট দেরি হয়েছে। খুব টেনশন হচ্ছিল ওর। ফোন করল জেসমিনকে। ফোনের কল রিসিভ করল জেসমিন। বিপুল বলল,
‘হ্যালো, জেসমিন! আমি তো কমলাপুর রেলস্টেশনে। কোথায় তুমি?’
‘বিপুল, তুমি পনেরো মিনিট দেরি করে ফেলেছো!’
‘হ্যাঁ, রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েছিলাম।’
‘তাহলে তো আমার দোষ নেই। আমি আরও দুজনকে একই সময়ে এখানে আসতে বলেছিলাম।’
‘কী বললে!’
আহত কণ্ঠে বলল বিপুল। জেসমিন বলল,
‘আমি ভেবে রেখেছিলাম, যে সবার আগে আসবে, আমি তাকেই বিয়ে করব। ইমরুল এসেছে সাতটা পঞ্চাশ মিনিটে। আমি ওর সঙ্গে পালাচ্ছি বিপুল। সরি, তোমার সঙ্গে পালাতে পারছি না। কিছু মনে করো না!’
মাথার ওপর যেন বজ্রপাত হলো বিপুলের। এ কী বলল জেসমিন! এ কেমন খেলা ওর? তাহলে আজাদের সতর্ক নোটিসই ঠিক ছিল? ও বলল,
‘এটা কেমন কথা জেসমিন? যদি বলতে, আমি আরও আগে আসতাম!’
‘বললে তো পরীক্ষা করতে পারতাম না। আমি ভালোবাসার পরীক্ষা করেছি আজ। ইমরুল জিতেছে, তাই ওর সঙ্গে পালাচ্ছি। শোন, আর কথা বলতে পারব না। ইমরুল গাড়ি ভাড়া করতে গিয়েছিল, এখন ও আমার সামনে চলে আসছে। তোমার সঙ্গে বিদায়। কিছু মনে করো না। আর আমাকে ফোনও করো না।’
বলেই ফোনের লাইন কেটে দিল জেসমিন। ‘কিছু মনে করো না’ কথাটার মধ্য দিয়ে বিপুলের ভালোবাসা যেন টুপ করে দুঃখের সমুদ্রে তলিয়ে গেল। ওর কিছুই করার ছিল না। হায় রে মানুষের জীবন, হায় রে প্রেম!
গাড়িটার ঝাঁকুনিতে স্মৃতির সেলুলয়েডের ফিতা ছিঁড়ে গেল। বিপুল ফিরে এলো কলকাতায়। বিপাশা বলল,
‘গভীর মনোযোগে আপনি কী যেন ভাবছিলেন। আমার জীবনের কথা নিয়ে আপনি কি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন?’
‘না। বিষাদগ্রস্ত হতে হলে আপনার জীবনের গল্প নিয়ে হব কেন? নিজের জীবনের গল্পও তো আছে।’
‘তাই না-কি? বলুন তো শুনি!’
‘অন্য একদিন বলব।’
‘অন্য একদিন? কবে? আপনি কি দিল্লি আসবেন? ইা-কি টেলিফোনে বলবেন?’
‘আমাকে এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লি আসতে হবে।’
‘কেন? দিল্লিতেও ব্যবসা?’
‘না, দিল্লিতে আমার মা এবং মামা আছেন। তাদের নিতে আসব।’
‘বলেন কী! আগে তো বলেননি? কোথায় আছেন তারা?’
‘আপনাকে বলা হয়নি। আমি, আমার মা ও মামাকে সঙ্গে নিয়ে আজমির শরিফ গিয়েছিলাম। দিল্লিতে যখন ফিরলাম, তখন আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে দিল্লির আকাশ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। আমার মামা তার পাশে আছেন। ব্যবসায়িক কারণে আমাকে কলকাতা আসতে হয়েছে এবং ঢাকায় ফিরছি। এক সপ্তাহ পর আমি ফের দিল্লি আসব। মা আর মামাকে নিয়ে দিল্লি থেকে ঢাকায় ফিরব।’
‘আশ্চর্য মানুষ তো আপনি! এ-কথাগুলো কাল বলেননি কেন?’
বিপাশা একটু রাগ প্রকাশ করল। বিপুল মøান হেসে বলল,
‘বলার প্রয়োজন পড়েছিল কি? আপনার কথা শুনেছি। ভেবেছি। নিজের মায়ের অসুস্থতার কথা বলে কী হবে?’
‘কী হবে মানে? আপনি জানেন না, আমি দিল্লিতে থাকি?’
‘তা জানি। কিন্তু…!’
‘আমাকে তাদের নাম লিখে দিন। হাসপাতালের কেবিন নম্বরও লিখে দিন। আমি দিল্লি ফিরে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করব। আপনি তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।’
‘আচ্ছা। ধন্যবাদ।’
‘আরেকটা কথা বলছি। ঐ হাসপাতালে আমার বাবা ডাক্তার হিসেবে চাকরি করছেন। আমার ভাইও ইন্টার্নি করছে।’
বিপাশার কথা শুনে ভালো লাগল বিপুলের। ও বলল,
‘বাহ্! ঋালো খবর। ভালো লাগল জেনে।’
‘ঠিক আছে। তাদের নাম-ঠিকানা লিখে দিন। আর আমি আপনার মা’র সঙ্গে দেখা করে আপনাকে ফোন দেব। কথা বলিয়ে দেব তার সঙ্গে।’
বিপুল একটা কাগজে ওর মা ও মামার নাম, ফোন নম্বর ও হাসপাতালের কেবিন নম্বর লিখে বিপাশাকে দিয়ে বলল,
‘লাভ দেখছি আমারই বেশি হলো!’
‘ব্যবসায়ীরা লাভ-লোকসানটাই বেশি হিসাব করে কথাটা শুনেছিলাম। এখন দেখছি কথাটা মিথ্যা নয়!’
বিপাশার হাসির সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করে হাসলো বিপুলও। দমদম এয়ারপোর্টের কাছে ওদের গাড়ি এসে গেল হাসির মদিরতা না ফুরাতেই।
চার.
রাউজানে গিয়ে জুবায়েরের বাড়ি খুঁজে পেতে বেশি বেগ পেতে হয়নি বিপুলের। কিন্তু জুবায়েরকে পাওয়া গেল না। জুবায়েরের পরিবার এই অঞ্চলের বেশ ধনী ও প্রভাবশালী। ওর বাবা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং চাচা স্থানীয় এলাকার এমপি। জুবায়েরের ছবি দেখিয়ে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলায় তার বাড়ি ও পরিবারকে খুঁজে পেতে সহজ হয়েছে ওর। বিপুল এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারল জুবায়ের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান এবং ওদের অনেক পোষ্য আছে, যারা ষণ্ডা বা মাস্তান। এমন ছেলেকে বিপাশা ভালো মানুষ হিসেবে ভালোবেসেছে কোন গুণ-আচরণ দেখেÑ তা ঠাওর করতে পারছে না বিপুল। জুবায়েরের কথা জিজ্ঞেস করতে এলাকার লোকদের চোখে-মুখে শ্রদ্ধা-বিনয় যেমন দেখেছে, তেমনি আতঙ্কও দেখেছে ও। জুবায়েরের সঙ্গে দেখা হলে ও বুঝতে পারত আসলে সে কতটা ভালো মানুষ। জুবায়েরের একটা ছবি দিয়েছিল বিপাশা। ছবি দেখে মনে হয়েছে, ছেলেটি দেখতে হ্যান্ডসাম এবং সাদাসিধে ধরনের। এতটা প্রভাবশালী পরিবরের ছেলে হতে পারে, ছবি দেখে বিপুল আন্দাজ করতে পারেনি। জুবায়েরদের বাড়ির কাছাকাছি একটি রেস্টুরেন্টে বসে চা পান করে এসব কথা ভাবছিল বিপুল। রেস্টুরেন্টে যখন বিপুল চা পান করছিল, একসময় ও লক্ষ করল এক রাগী ধরনের যুবক একা বসে চা পান করছে। যুবকটি ফোনে কথা বলছিল মোটামুটি শুদ্ধ বাংলায়, এতে বোঝা যায় লেখাপড়া করেছেÑ ভেবে নিল বিপুল। যুবকটি ফোনে কথা বলছে রাগ প্রকাশ করে, তাই যুবকটিকে ওর রাগী বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য কথা বলা থেকে মানুষের চরিত্র নির্ধারণ সব সময় ঠিক হয় না। যুবকটি ফোনে কথা বলা শেষ করলে তার কাছে গিয়ে বিপুল বলল,
‘ভাইজান, ভালো আছেন?’
রাগী চোখ-মুখের যুবক ওর দিকে অবাক চোখে তাকালো। যুবকটি জবাবে বলল,
‘আপনাকে তো চিনতে পারছি না! কে আপনি?’
যুবকটির চোখ-মুখ থেকে রাগ উবে গিয়ে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। বিপুল ওর মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘আমাকে চিনবেন না। চেনার কথাও নয়। আমি এই এলাকার লোক নই।’
‘তাই তো! আপনাকে অচেনাই লাগছে! কে আপনি? আপনি কি এই এলাকায় কোনো কাজে এসেছেন?’
‘জ্বি। আপনার সঙ্গে আমি একটু কথা বলতে চাই। আপনার সময় হবে?’
বিনয়কণ্ঠে বলল বিপুল। যুবক একটু ভাবল যেন। এরপর বলল,
‘কী বাপারে কথা বলতে চান, বলুন তো!’
বিপুল ওর সেলফোনে সংরক্ষিত জুবায়েরের ছবি তার সামনে তুলে ধরে বলল,
‘ভাই, তাকে চেনেন? তার নাম জুবায়ের। আশপাশে থাকেন। কিন্তু ঠিক কোন বাড়িটায় তিনি থাকেন, বলতে পারবেন?’
যুবকটি সতর্ক চোখে ওর আপাদমস্তক দেখে নিল। এরপর বলল,
‘এই এলাকায় আজ প্রথম এসেছেন, বুঝি?’
‘জ্বি। আমি ঢাকা থেকে এসেছি। আগেই বলেছি, আমি এই এলাকার লোক নই। তাই আপনার সহযোগিতা চাইছি।’
যুবকটি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
‘কী কাজ তার সঙ্গে?’
‘না, কাজ নয়। আমাদের এক কন্যার সঙ্গে তার বিয়ের কথা চলছে।’
‘কী বললেন, বিয়ে!’
‘হ্যাঁ, বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেছে। আমি এসেছি তার সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিতে।’
যুবকটি হাসলো। বিপুলও মুখে মøান হাসি ধরে রাখল। যাই হোক, যুবকটি জুবায়েরের বাড়ি চেনে এবং তার সম্পর্কে তথ্য দিতে পারবেÑ এটা বুঝতে পেরে বিপুলের ভালো লাগছে। যুবক হাসি থামিয়ে ওকে হাতের ইশারায় রেস্টুরেন্টের বাইরে যেতে বলল। বিপুল রেস্টুরেন্টের ক্যাশিয়ারের কাছে গিয়ে যুবকের চায়ের মূল্যসহ তার বিল পরিশোধ করে বেরিয়ে এলো রেস্টুরেন্ট থেকে। ও দাঁড়াল ফাঁকা একটা জায়গায়। যুবকটি রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে বলল,
‘আপনি আমার চায়ের দাম দিয়ে এসেছেন কেন?’
‘এমনিই। রাগ করেছেন?’
‘না, মানে…!’
‘এক কাপ চায়ের দাম আর কত? নিজের বিল দিতে গিয়ে আপনার চায়ের দামটাও দিয়ে দিলাম। সৌজন্যতা ধরে নিন।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
‘আপনি এই এলাকার ছেলে, তাই না?’
জানতে চাইল বিপুল। যুবকটি বলল,
‘আমার নাম সালাম। এই এলাকারই সন্তান। আমি রাউজান যুব উন্নয়ন সংসদের সভাপতি। মানে, এটা আমাদের ক্লাবের নাম।’
‘ও, আচ্ছা। সালাম ভাই, আমি জুবায়েরদের বাড়িটা খুঁজছি।’
রাস্তার অপর প্রান্তের একটি রাস্তা দেখিয়ে সালাম বলল,
‘ঐ রাস্তা ধরে তিন-চার মিনিট হাঁটলেই জুবায়ের ভাইদের বিশাল অট্টালিকা দেখতে পাবেন। ওইখানে দুইটা বিশাল অট্টালিকা পাশাপাশি আছে। দক্ষিণ দিকের অট্টালিকাটা এমপি সাহেবের। উত্তর দিকের অট্টালিকা জুবায়ের ভাইদের। ওইখানে গিয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বাড়ি দেখিয়ে দেবে।’
‘আপনি কি আমার সঙ্গে যেতে পারবেন?’
বিপুল অনুনয়ের কণ্ঠে বলল। সালাম একটু ভাবল। এরপর বলল,
‘চলুন। আমি বাড়ি দেখিয়ে চলে আসব। আপনার সঙ্গে থাকতে পারব না।’
‘ঠিক আছে, তাতেই হবে।’
‘একটা কথা এখানেই বলে নিই। ওখানে কিছু বলব না।’
‘বলুন, কী কথা?’
‘জুবায়ের ভাই তো গত শুক্রবার বিয়ে করেছেন। তার আবার নতুন করে কীভাবে বিয়ে হবে?’
‘কী বলছেন! বিয়ে করেছেন মানে! কাকে?’
‘আরে আপনি এমন অবাক হচ্ছেন কেন, ভাই! আমার কথা বুঝি বিশ্বাস করছেন না?’
সালাম কথাটা বলে মিটিমিটি হাসলো। বিপুল কৌতূহল প্রকাশ করে বলল,
‘জুবায়ের বিয়ে করে ফেলেছেন!’
‘এক সপ্তাহ হলো বিয়ে করেছেন। আমাদের গ্রামের মানুষ আর শহরের হাজার হাজার মানুষ এই বিয়েতে খেয়ে গেল। এমন বিয়ে তো সহজে হয় না! বিয়ে নয়, যেন উৎসব হয়ে গেল।’
‘আচ্ছা! জুবায়ের সাহেব তাহলে বাড়িতেই আছেন?’
জানতে চাইল বিপুল। সালাম ফিক্ করে হেসে বলল,
‘জুবায়ের ভাই তো নতুন বউ নিয়ে দুবাইয়ে গেছেন হানিমুনে।’
‘সত্যি বলছেন!’
‘সত্যি বলছি ভাই! জুবায়ের ভাই বিয়ে করেছেন এবং এখন হানিমুনে আছেন। আফজাল সাহেবের ছেলে তো? যার ছবি আপনি আমাকে দেখালেন, তিনি তো?’
‘তার বাবার নাম এ-মুহূর্তে বলতে পারছি না। শুধু জানি, ভারতের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন।’
‘আমি ঠিকই বলছি। দশ-বারো দিন আগেই তিনি লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরেছেন। আসামাত্র পরিবারের লোকেরা তার বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ে তো আগে থেকে ঠিক করা ছিল। চিটাগাংয়ের অনেক বড় সওদাগারের মেয়ে। অনেক ধনীর কন্যা! জুবায়ের ভাইয়েরাও অনেক ধনী। ধনীদের সঙ্গে ধনীদের সম্পর্ক হয়, বুঝলেন না!’
সালাম যে এমনভাবে গড়গড় করে কথা বলতে পারে, প্রথম দেখায় তা বুঝতে পারেনি বিপুল। কিন্তু সালাম যা বলেছে, তা শুনে ওর গা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। কী শুনল ও! আশ্চর্য! বিপুল ওর সেলফোনে সংরক্ষিত জুবায়েরের ছবিটা ফের বের করে সালামকে দেখিয়ে বলল,
‘ভালো করে ছবিটা দেখে বলুন তো, এই ছবির লোকটাই কি জুবায়ের?’
‘হ্যাঁ, জুবায়ের ভাইয়ের ছবি এটা। তার বিয়ে হয়ে গেছে। আপনি বরং ফিরে যান। যে তার সঙ্গে আপনাদের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন, তাকে জিজ্ঞেস করুন। তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
‘হুম। তাই করব। এসেই যখন পড়েছি তখন ছেলের বাড়িটা দেখেই যাই।’
‘তা দেখুন। চলুন, তাহলে।’
বলল সালাম। ওরা পাশাপাশি হেঁটে এলো দুটি প্রাসাদ সমতুল্য অট্টালিকার সামনে। একটি অট্টালিকার চারপাশে আলোকসজ্জার বাতি ঝুলে আছে এখনও। এতে বোঝা যায়, এই বাড়িতে অনুষ্ঠান হয়েছে। বিপুলকে জুবায়েরের বাড়ির সামনে এনে সালাম বলল,
‘ভাই, এটা জুবায়ের ভাইদের বাড়ি। এখন আমি যাই।’
‘আচ্ছা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, সালাম ভাই।’
সালাম চলে যাওয়ার সময় বলল,
‘শুনুন। বেশিক্ষণ একা একা ঘুরবেন না। এলাকাটা ভালো নয়। বিপদে পড়েও যেতে পারেন। সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবেন।’
একটা কার্ড বাড়িয়ে দিল সালাম। কার্ডে তার নাম-পরিচয় ও ফোন নম্বর রয়েছে। সালাম যে-পথ দিয়ে ওকে নিয়ে এসেছিল, ও-পথ ধরে চলে গেল। বিপুল দ্বিধাগ্রস্ত হলেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল জুবায়েরদের অট্টালিকার সামনে। বাড়িসহ আশপাশের কিছু ছবি তুলল সেলফোনের ক্যামেরায়। এরপর ও ফোন করল বিপাশাকে। ফোন তুলল ও। বলল,
‘হ্যালো!’
‘হাই, বিপাশা!’
‘কেমন আছেন, বিপুল?’
‘আমি ভালো। আপনি?’
‘হুম। ভালো। আপনার মাও ভালো আছেন। আমি আজও যাব, তাকে দেখতে।’
ও-প্রান্ত থেকে বলল বিপাশা। দিল্লি ফিরে বিপাশা ওর মাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল। টেলিফোনে বিপুলের সঙ্গে কথা বলিয়েও দিয়েছে। এরপর থেকে বিপাশার প্রতি মনটা কেমন সদয় হয়ে গেছে। বিপুল বিপাশাকে বলল,
‘আপনাকে কী বলে যে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, জানি না। কাল মা’র সঙ্গে যখন কথা বললাম। মা, আপনার কী যে প্রশংসা করলেন!’
‘আচ্ছা, হয়েছে। আপনার মা’র একটু খোঁজখবর রাখছি, এই আর কি!’
‘শুধু খোঁজখবর! নিজ বাড়ি থেকে রান্না করে খাবার খাইয়েও দিয়ে আসছেন! শুনেছি।’
‘আমার প্রশংসা রাখুন। বিদেশের মাটিতে মানুষ নিজেকে ভীষণ অসহায় ফিল করে। তখন কেউ পাশে দাঁড়ালে মনে হয় অনেক কিছু করে ফেলেছি। বুঝলেন?’
‘শুধু কি আপনি? আপনার বাবা-ভাইও না-কি প্রতিদিন খোঁজ নিচ্ছেন মায়ের। মা এবং মামা আপনাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ। আমার মুখ উজ্জ্বল হয়েছে।’
বিপুলের কথার জবাবে হেসে বিপাশা বলল,
‘হাসপাতালে আবার কীসের আতিথেয়তা শুনি! তিনি সুস্থ হোন, তাকে এবং আপনার মামাকে আমাদের বাড়িতে এনে রাখব। আপনি আসবেন, এরপর তাদের নিয়ে দেশে ফিরবেন। আমি কিন্তু এ-কথা বলে রাখছি!’
এমন একটি নরম মনের উদার মানসিকতার মেয়েকে বিপুল কীভাবে সবচেয়ে কষ্টের সংবাদটা দেবে? এমন সংবাদ দেওয়ারও মানসিক যন্ত্রণা আছে। আবার গোপন করাও যাবে না। বিপাশাকে সকালে ফোন করে বলেছে ও রাউজান যাচ্ছে। বিপাশা নিশ্চয়ই ওর ফোনের অপেক্ষা করছিল। বিপুলের গাড়িটা রেস্টুরেন্টের অনতি দূরে আছে। ও চালককে বলে এসেছে, ওখানেই যেন থাকে। বিপুলের কথা শুনতে না পেয়ে বিপাশা বলল,
‘কী ব্যাপার চুপ করে আছেন যে! কথা বলুন।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিপুল বলল,
‘শুনুন, আগে দু-একটা প্রশ্ন করব। জবাব দেবেন ঠিকঠাক।’
‘প্রশ্ন? আচ্ছা করুন।’
‘জুবায়েরের স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল? মানে, মদ-নারীর প্রতি আসক্তি আছে, এমন কিছু দেখেছিলেন? প্রশ্নটা করলাম বলে কিছু মনে করবেন না।’
প্রশ্নটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল বিপাশা। এরপর বলল,
‘না, তেমন তো কিছু দেখিনি বা ওর সম্পর্কে তেমন খোঁজখবর নিইনি। দু-মাসের প্রেম আর লেখাপড়ার ব্যস্ততায় হয়ে ওঠেনি। কেন বলুন তো?’
‘না, কারণটা পরে বলছি। আমি কিন্তু এখন জুবায়েরদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলছি।’
‘বলেন কি! প্লিজ, ক্যামেরায় ওদের বাড়িটা দেখাবেন?’
বিপুল কথা বলছিল হোয়াটস আপের ক্যামেরা খুলে, সেটা ঘুরিয়ে জুবায়েরদের বাড়ি এবং আশপাশের এলাকা দেখাল ও। বিপাশা বলল,
‘মাই গড! এত বড় বাড়ি! কিন্তু ওর আচরণে মনে হয়নি ওর পরিবার এত ধনী! আচ্ছা, জুবায়েরকে পেয়েছেন?’
‘না।’
‘কেন? বাড়িতে নেই ও?’
‘সেটা শুনলে আপনার খুব কষ্ট হবে।’
ও-প্রান্তে চুপ করে রইল বিপাশা। একটি বাক্য যেন হাজারটা কথার অনুরণন হয়ে গেছে। বিপাশা কথা বলছে না। বিপুল ভাবছে, কীভাবে কথাটা বলবে। ওকে সত্য কথাটা জানাতেও হবে। ও বলল,
‘যদি অনেক কষ্টের কথা বলি, শোনার মতো মনের জোর আছে?’
‘বলুন। মনের জোর আছে। সেদিন কলকাতায় গিয়ে যে মিথ্যাচারের মুখোমুখি হয়েছি, এই যন্ত্রণা কি এত সহজে মিলিয়ে যাবে? আমি প্রস্তুত, আপনি বলুন।’
‘আমি এখন সংক্ষেপে বলছি। বাড়ি গিয়ে বিস্তারিত বলব। এখানে বেশিক্ষণ থাকতে চাই না। বুঝলেন?’
‘আচ্ছা, বলুন।’
‘জুবায়ের এই এলাকার একজন ধনী ব্যবসায়ীর সন্তান। তাদের অনেক প্রভাব এখানে। পারিবারিকভাবে জুবায়েরের বিয়ে ঠিক করা ছিল। তিনি যখন দেশে ফিরে আসেন, গত শুক্রবার তার বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি এ-মুহূর্তে স্ত্রীকে নিয়ে দুবাইয়ে হানিমুনে আছেন।’
এ পর্যন্ত বলে থামল বিপুল। ও-প্রান্তে বিপাশা নিশ্চুপ। কয়েক সেকেন্ড পর বিপুল বলল,
‘বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। তবে কেন বিয়ে করতে হয়েছে তাকে, এটা জানতে পারছি না। এখানে দেখলাম, স্থানীয় লোকজন তাদের যেমন শ্রদ্ধা-সমীহ করে, আবার ভয়ও পায়। এর বেশি কিছু তথ্য জানার সুযোগ আপাতত নেই। জুবায়ের ফিরে এলে তার সঙ্গে দেখা করতে পারি। কী বলেন?’
‘আপনি চলে আসুন। অনেক, অ-নে-ক ধন্যবাদ, আপনাকে।’
‘ধন্যবাদ ফিরিয়ে নিন, যদি বন্ধু বলে স্বীকার করেন আমাকে।’
‘ও আচ্ছা, ফিরিয়ে নিচ্ছি। আপনি নিরাপদে ঢাকায় ফিরুন। আমি আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।’
‘ঠিক আছে। মনকে শক্ত রাখুন। ভেঙে পড়বেন না, প্লিজ! জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটে, যার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি না।’
‘আচ্ছা রাখছি!’
লাইন কেটে দিল বিপাশা। খুব স্বাভাবিক এই আচরণ। এতটা আঘাতের জন্য একটু নিজের মতো করে তার সময় তো চাই। বিপাশা এখন হয়তো কেঁদে নিজেকে হালকা করবে। তাকে সে-সময় দেওয়া উচিত, ভেবে নিল বিপুল। ও কী মনে করে, জুবায়েরদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। গেট পেরুতেই দুজন দারোয়ান তার পথ আটকে দাঁড়াল। আরও দুজন পেটানো শরীরের যুবক এসে পড়ল ওর সামনে। ওদের একজন ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
‘কী চাই? কাকে চাই?’
‘জুবায়েরকে চাই। ও আমার বন্ধু। কোথায় ও? আলিগড় থেকে ফিরেছে, অথচ একটা ফোন করেনি!’
সুন্দরভাবে মিথ্যা কথাটা বলে ফেলল বিপুল। ওর কথা শুনে পথ আটকে দাঁড়ানো দারোয়ান সরে গেল। যুবকের কণ্ঠ নরম হলো। সে বলল,
‘ও আচ্ছা, আপনি জুবায়ের ভাইয়ের বন্ধু! তো, আপনাকে তো বিয়ের দিন দেখলাম না!’
‘এ-জন্যই তো এলাম। ও আমাকে বিয়ের নিমন্ত্রণ করেনি।’
এ-কথায় লজ্জা পেল যুবক। সে বলল,
‘ভাইয়া তো এখন বাড়িতে নেই। ভাবীকে নিয়ে দুবাই গেছেন। আপনি ভেতরে যান। খালাম্মার সঙ্গে দেখা করবেন?’
মনে মনে খুশি হলো বিপুল। ও যুবককে বলল,
‘না, তাহলে থাক। আমি এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম দেখা করে একটু গালাগাল দেব। নতুন বউকেও দেখে যাব। আমাকে ফের আসতে হবে দেখছি!’
‘আপনি চাইলে বাড়ির ভেতরে যেতে পারেন।’
নরমকণ্ঠে বলল যুবক। বিপুল হেসে বলল,
‘না। আমি বরং জুবায়ের ফিরলে আসব। আমাকে তো ও ছাড়া বাড়ির কেউ চিনে না!’
‘ঠিক আছে, তাহলে এক সপ্তাহ পর আসুন। তারা এক সপ্তাহ পর বাড়িতে ফিরবেন।’
‘আচ্ছা, আপনি ওর কী হন? মানে নিকটাত্মীয় কেউ? আপনার নামটা জানতে পারি?’
যুবকটি হাসার চেষ্টা করল। তার মুখে হাসিটা ফুটল না। সে বলল,
‘আমি জুবায়ের ভাইয়ের খালাতো ভাই। আমার নাম জামিল।’
‘জামিল, আপনার কাছে ওদের বিয়ের ছবি আছে? ভাবছি, এসেই যখন পড়েছি, অন্তত নতুন বউয়ের ছবিটা যদি দেখে যেতে পারতাম।’
ঢিল কাজে লেগে গেল। জামিল বলল,
‘আমার সেলফোনেই তো বিয়ের ছবি আছে। দেখাচ্ছি।’
বলে জামিল সেলফোনে সংরক্ষিত জুবায়ের ও তার স্ত্রীর ছবি বের করে ওর চোখেন সামনে তুলে ধরল। বিপুল নিজের সেলফোনের ক্যামেরা অন করে জুবায়ের ও তার স্ত্রীর একটা ছবি তুলে নিল। জামিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘বাহ্! বউ তো খুব সুন্দরী! বন্ধুকে ভাগ্যবান বলতে হবে!’
‘ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলবেন? ফোন করব দুবাইয়ে?’
জামিলের কথায় বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বিপুল বলল,
‘আরে না। হানিমুনের সময় ওকে বিরক্ত করতে চাই না। এক সপ্তাহ পরে তো আসছি। ওর সঙ্গে সাক্ষাতেই কথা বলব। জামিল, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
জামিল বলল। বিপুল মুখে একটা বড় হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘আমাকে যেতে হবে। ভালো থাকবেন।’
জামিল সরল একটা হাসি মুখে ধরে রেখে বলল,
‘ভাই, আপনার নামটা কী? ভাইকে আপনার কী নাম বলব?’
‘বলবেন, ঢাকা থেকে বিপুল এসেছিল।’
‘আচ্ছা।’
বিপুল হনহন করে জুবায়েরদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। এতটা সাহস ওর আছে, এটা নিজেরও জানা ছিল না। মিথ্যা অভিনয় করে তথ্যটা নিশ্চিত করে জানা হলো। যে কোনো তথ্য একাধিকভাবে যাচাই-বাছাই করলে জানাটা সঠিক বলে ধরে নেওয়া যায়Ñ জানে বিপুল। তথ্য যেমন পেয়েছে, তেমনি ছবিটা হয়েছে অকাট্য দলিল। কিন্তু ও ভেবে পেল না, বিপাশার মতো অপ্সরাকে জুবায়ের কেন বিয়ে করেনি। বিপাশা শুধু অপরূপা সুন্দরীই নয়, বিপুল যতটুকু বুঝতে পেরেছে ও বেশ বুদ্ধিমতি মেয়েও। লেখাপড়ায় ভালো আর ব্যবহার-কথাবার্তার কথা বিচার-বিশ্লেষণ করলে এক কথায় চমৎকার মেয়ে! এমন একটি মেয়েকে বিয়ে না করার কারণ কী? পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা? তাহলে বিপাশাকে নিজের সঠিক পরিচয় না দেওয়ার কারণ কী? কেন জুবায়ের কলকাতার নিজের বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিল? শুধু বিপাশার সঙ্গে প্রেম করাটাই কি ছিল তার উদ্দেশ্য? এ প্রশ্নগুলোর ঘোর নিয়ে বিপুল যখন ওর নিজের গাড়ির সামনে এসে পৌঁছল, সালামকে ও ফের দেখতে পেল। সালামও ওকে দেখতে পেল। ওর সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময় হতেই গাড়িতে ওঠার সময় ও সালামকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল। সালাম দ্রুত পদক্ষেপে ওর কাছে চলে এলো। গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে সালামের দিকে এক হাজার টাকার পাঁচটি নোট বাড়িয়ে দিল বিপুল। অবাক চোখে টাকাগুলো নিয়ে সালাম তা নিজের প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। বলল,
‘স্যার! আমি আপনাকে চিনতে পারিনি?’
বিপুল হাসলো সালামের আচরণের পরিবর্তন দেখে। সালাম ওকে এখন ধনী কোনো ব্যবসায়ী বা পুলিশের কর্মকর্তা হয়তো ভাবছে। বিপুল সালামকে বলল,
‘জুবায়েরের সেলফোন নম্বরটা আমার দরকার। জোগাড় করে দিতে পারবেন?’
‘পারব, স্যার!’
‘ঠিক আছে, কাল আমি আপনাকে ফোন করব। ফোন নম্বরটা জোগাড় করে দেবেন বলে টাকাটা দিলাম। বুঝেছেন?’
‘জ্বি, স্যার!’
‘আর আমাকে স্যার বলবেন না। আমি স্যার নই। ভালো থাকবেন।’
‘আচ্ছা।’
‘কাল নম্বরটার জন্য ফোন করব। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে।’
বিপুলের গাড়ি স্টার্ট নিল। সালাম ওখানে দাঁড়িয়েই আছে, গাড়ির লুকিং গ্লাসে দেখল বিপুল। ছোট্ট একটা কাজের জন্য পাঁচ হাজার টাকা কেউ দেয় না। সালাম নিশ্চয়ই এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছেÑ জানে বিপুল। টাকার অনেক প্রভাব! বিপুলের গাড়ি ঢাকার দিকে ছুটছে।
পাঁচ.
বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছে বিপুল। এই ব্যবসার শুরু করেছিল ওর দাদা, এখন ওর বাবার হাত ঘুরে দেখছে ও। বিপুলের বাবাও অফিসে আসেন, তবে নিয়মিত নন। বিপুল দেশের বাইরে গেলে ওর বাবা অফিসে নিয়মিত বসেন। ওদের পণ্য আমদানির মধ্যে উল্লেখযোগ হচ্ছে সুতা এবং রং। কলকাতা থেকে প্রতি মাসে সুতা ও রং আসছে ওদের। দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও রং এবং অন্যান্য কেমিক্যাল পদার্থ আমদানি করছে ওরা। বিপুলদের কমার্শিয়াল অফিস এ্যালিফ্যান্ট রোডে এবং পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে ওদের পণ্য রাখার বড় বড় গোডাউন আছে। ও প্রতিদিন এ্যালিফ্যান্ট রোডের অফিসে বসে। ওদের কোম্পানির চেয়ারম্যান ওর বাবা এবং ও হচ্ছে এমডি। এ্যালিফ্যোন্ট রোডের অফিসে বিপুল অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল, ইন্টারকমে ওর পিএস মীনা বলল,
‘স্যার, একজন ভদ্রমহিলা এসেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।’
‘কী নাম? কেন এসেছেন?’
জানতে চাইল বিপুল। মীনা বলল,
‘স্যার কেন এসেছেন বলছেন না। নাম বললেন জেসমিন।’
নামটা শোনামাত্র ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনের কোথাও ঝলসে গেল যেন। মুহূর্তেও ওর মনে প্রশ্ন জাগলোÑ জেসমিন কেন ওর অফিসে আসবে? পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার ঘটনাটা দু-বছর পেরিয়ে গেছে। এরপর জেসমিনের কোনো খবর রাখেনি বিপুল। জেসমিনও কখনও ওকে ফোন করেনি। ঐ ঘটনার পর থেকে মগবাজারে বিপুল ওর খালার বাসায় খুব এটা যেত না। দু-বছরে মাত্র দুদিন গিয়েছিল। পাশের বাড়িতে জেসমিনকে দেখতে পায়নি। জেসমনিকে দেখার ইচ্ছেটা আর ছিল না ওর। তবু যদি দেখা হয়ে যেতÑ এমন ভেবেছিল ও। মানুষের মনের কত যে বৈচিত্র্য! যে মেয়েটি ওকে প্রবঞ্চনার গ্লানি আর প্রত্যাখ্যানের অপমানে বিষিয়ে দিয়েছে, সেই মেয়েটি ফের এক ঝলক দেখার গোপন কৌতূহলও জাগে মনে। অথচ কোনো টান অনুভব করে না। মন সব সময় রহস্য সৃষ্টি করে। রহস্য নিয়েই বেঁচে থাকে মানুষ। এ-মুহূর্তে পুরনো কথা ফিরে এলো ঝড়ো হাওয়ার মতো। ও ভাবছেÑ এতদিন পর জেসমিন ওর কাছে কী চায়? ও-প্রান্তে ওর জবাব আশা করছে পিএস মীনা। ও সিসি ক্যামেরায় চোখ রেখে দেখল জেসমিনসহ আরেকটি মেয়ে বসে আছে ওয়েটিং রুমের সোফায়। বিপুল মীনাকে বলল,
‘আচ্ছা, পাঠিয়ে দিন।’
কিছুক্ষণ পর জেসমিন ওর রুমে প্রবেশ করল। ওর মুখে সেই আগের হাসি, শুধু একটু বিষণ্নতার টোন আছে। জেসমিন পড়েছে মেরুন রঙের সালোয়ার-কামিজ, কামিজের ওপরে নকশা আঁকা গাঢ় বেগুনি রঙের একটি কুর্তা। ওর চুলগুলো খোঁপার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এক ঝলক চোখ বুলিয়ে দেখে নিল বিপুল। ওর টেবিলের বিপরীত দিকের চেয়ার দেখিয়ে ও জেসমিনকে বসার ইঙ্গিত করল। জেসমিন বসল ওর মুখোমুখি। বিপুল মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘জেসমিন! কেমন আছ?’
জেসমিন যেন আশ্বস্ত হলো। ওর চোখে-মুখে সংকোচ ছিল কি না, বিপুল বুঝতে পারল না। ছেলে ঘুরানো মেয়েদের সংকোচ থাকে না। বিপুলের প্রশ্নের জবাবে জেসমিন বলল,
‘ভালো। তবে খুব ভালো আছি, সেটা দাবি করছি না। আপনি?’
জেসমিন একদিনই ওকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেছিল, যেদিন ওকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল। সেদিন ও ভালোবাসার কথাও বলেছিল। সেদিন তাহলে ঘোরলাগা কোনো দিন ছিল। আজ জেসমিন ওকে পুরনো সম্বোধন ‘আপনি’ বলে কথা বলল। বিপুল একটু তন্ময়তায় ডুবে যাচ্ছিল। জেসমিন ফের বলল,
‘কী ভাবছেন? আমি কেন এসেছিÑ এটাই তো ভাবছেন?’
‘তা তো ভাবছিই। আরও কিছু ভাবনাও মাথায় এসে ভিড় করছে।’
‘যা মাথায় আসবে রাখবেন না। বলে ফেলবেন।’
জেসমিন একটু হেসে বলল কথাটা, বিপুল মুখে হাসি ধরে রেখে বলল,
‘আচ্ছা, এখন বলো, তুমি কী মনে করে আমার অফিসে এসেছ? আমি কিন্তু অবাক হয়েছি খুব।’
বিপুলের কথায় জেসমিন এবার মিষ্টি করে হাসলো; কিন্তু হাসিটা ওর প্রাণখোলা হলো না। ওর মুখের হাসিটা ফুল হওয়ার আগেই যেন ঝরেপড়া পাপড়ির বিষণ্নতা লাগছেÑ মনে মনে ভাবল বিপুল। জেসমিন বিষণ্ন হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
‘আপনাকে অবাক করে দিতে অবশ্য আসিনি। আমাকে দেখে অবাক হবেন, জানি। রাগও হতে পারেন। হয়তো রাগটা আছে, প্রকাশ করছেন না। এটা আপনার উদারতা। আমার ভালো লাগছে, এই উদারতা দেখে।’
জেসমিনের কথায় কেমন পরিণত ভাব এসেছেÑ মনে হলো বিপুলের। ও বলল,
‘আচ্ছা, এবার বলো তোমার হাসব্যান্ড, মানে ইমরুল কেমন আছে? তোমরা সুখে আছ তো?’
বিপুলের কথায় জেসমিন মøান হাসলো। এমন হাসির এক ধরনের অর্থ দাঁড়িয়ে যায়, তারপরও বিপুল নিজ থেকে কিছু ভাবতে চাইল না। ও তাকিয়ে রইল জেসমিনের মুখের দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর জেসমিন বলল,
‘সত্যি কথাটাই বলছি। ইমরুল ভালো নেই। ও এখন আছে একটা রিহ্যাব সেন্টারে।’
‘রিহ্যাব সেন্টারে? কেন?’
‘আহা! রিহ্যাব সেন্টারে কারা থাকে?’
‘যারা নেশাগ্রস্ত তারা। ভালো করতে তাদের ওখানে রাখা হয়।’
‘তাহলে তো জানেন-ই। ওর একই অবস্থা!’
‘বলো কী! কেন? কীভাবে এমন হলো?’
‘আহা! আপনি আসলে এখনও শিশুর মতোই আছেন!’
‘মানে?’
জেসমিনের কথায় অবাক হয় বিপুল। জেসমিন বলল,
‘মানে হচ্ছে, সহজ করে বুঝতে পারছেন না আপনি।’
‘আচ্ছা, তোমাদের ঘটনাটা কোন পর্যায়ে আছে, বলো তো? আমি কিন্তু কিছুই জানি না।’
‘তাই না-কি! আমি তো ভেবে বসে আছি, আপনি আমার খোঁজখবর রাখেন!’
অভিমান বা ঠাট্টার ছলে কথাটা বলল যেন জেসমিন। বিপুল নিজেকে স্পষ্ট করতে বলল,
‘জেসমিন, আমি হয়তো তোমার প্রেমের ফাঁদে পড়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি অতটা বেকুব নই। যখন বুঝতে পেরেছিলাম তুমি আমার আবেগ নিয়ে খেলেছ, তখন কিছুদিন কষ্ট পেয়েছিলাম সত্যি! কিন্তু চোট অতটা পাইনি। তাই তোমার খোঁজখবর রাখার কোনো আগ্রহ আমার ছিল না। থাকবে কেন বলো?’
কথাগুলো বলে হালকা হলো বিপুল। ওর মনে হলো চেপে রাখা কষ্টের একটা পাথর সরে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে জেসমিন বলল,
‘তা ঠিক। আমি এমনিতে কথাটা বললাম। আসলে আমি যা করেছি…!’
জেসমিন কথাটা শেষ করতে পারল না। বিপুল বলল,
‘থাক না ওসব কথা। এখন ওসব কথা বলে কী লাভ? কেন এসেছ, সেটা বলো। নিশ্চয়ই কোনো কারণে এসেছ?’
‘তা তো অবশ্যই। কারণ ছাড়া কেন আসব? আপনিই তো ইমরুলের কথা জানতে চাইছিলেন।’
এ পর্যন্ত বলল জেসমিন। ওর কণ্ঠ কেমন ভারী শোনাচ্ছে। বিপুল পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বলল,
‘ঠিক আছে জেসমিন, তুমি বলো। ইমরুল কেন রিহ্যাব সেন্টারে?’
ফের কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। জেসমিন বলল,
‘সংক্ষেপে বলছি। সেদিন আমরা পালিয়ে গেলাম চট্টগ্রাম। ওখানে আমরা বিয়ে রেজিস্ট্রি করি। এরপর সেন্টমার্টিন দ্বীপে হানিমুন করতে যাই। এক সপ্তাহ পর ঢাকায় ফিরি। ইমরুলের বাবা ছিলেন সচিব। মানে, ভূমি সচিব তখন। ওদের অনেক অর্থবিত্ত! আমাদের বিয়েটা ওদের পরিবার এবং আমাদের পরিবার মেনেও নিয়েছিল।’
‘বাহ্, বেশ!’
‘হুম। আমরা খারাপ ছিলাম না। কিন্তু আমি জানতাম না, ইমরুলের মাদক গ্রহণের নেশা আছে।’
জেসমিন কথাটা বলে তাকালো বিপুলের দিকে। বিপুল বলল,
‘আচ্ছা! কখন জানলে?’
‘ঢাকায় ফিরে। কয়েক মাস লেগেছিল এটা জানতে। যখন জানলাম, তখন ওকে নেশার জীবন থেকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। তা কি সহজে পারা যায়? অবশেষে আট-নয় মাস আগে ওকে ছেড়ে আমি আমাদের বাড়িতে চলে আসি।’
‘মানে?’
কথাটা বলে জেসমিনের দিকে অবাক চোখে চেয়ে রইল বিপুল। জেসমিন বলল,
‘ওকে ছেড়ে চলে এসেছি। এখনও আমাদের ডিভোর্স হয়নি। আমার বাবা-মা চাচ্ছেন, আমি ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিই। আমি দ্বিধার মধ্যে আছি।’
‘আহা, ভীষণ পেইনফুল!’
‘কার পেইন? আপনার?’
জেসমিন জানতে চাইল। বিপুল শুকনো হাসি বিলিয়ে বলল,
‘আমারও। তোমার জীবনটা সাজানো-গোছানো আছে, জানলে ভালো লাগত!’
‘সাজানো-গোছানো নেই বলে আপনার চাপা আনন্দ হচ্ছে না তো!’
‘হা হা হা। তুমি এভাবে না ভাবলেও পার। যাক, যা হওয়ার হয়েছে।’
বলল বিপুল। জেসমিন বলল,
‘সেদিন আমারই ভুল ছিল, জানেন!’
জবাবে হেসে ফেলল বিপুল। ও বলল,
‘আমি সেদিন পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। সময়মতো পৌঁছানোর কথা বলেছিলে। কে জানত বলো, ওটা পরীক্ষা ছিল!’
কথাটা বলে মুচকি হাসলো বিপুল। এখন সেদিনের ঘটনার জন্য ওর খারাপ লাগে না। এমন কী, জেসমিনকে দেখেও ওর মন বিষাদগ্রস্ত হচ্ছে না। বিপুলের উদ্দেশে জেসমিন বলল,
‘আরেকটি কথা। সেদিন ইমরুল আমার জন্য সবার আগে কমলাপুর পৌঁছেছিল বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার বিবেচনায় ওটা ঠিক ছিল না!’
‘তাহলে?’
জানতে চাইল বিপুল। জেসমিন বলল,
‘মাদক নেওয়ার জন্য ইমরুল ওখানে অনেক আগ থেকেই ছিল। কমলাপুর রেলস্টেশনের আশপাশের কোথাও যেন মাদক বেচাকেনা হয়। ইমরুল ওখানে গিয়ে মাদক কিনে খেয়ে এরপর আমাকে ফোন করেছিল। এ-কথা পরে আমাকে ও বলেছিল। সেই অর্থে সেদিন আপনিই প্রথম পৌঁছেছিলেন কমলাপুর রেলস্টেশনে। বুঝলেন?’
‘এর মানে?’
‘এর মানে, পরীক্ষায় আপনিই জিতেছিলেন।’
‘আচ্ছা। আজ এমন সত্য কথাটা বলেও ফেললে? কথাটা না বললেও পারতে!’
হেসে বলল বিপুল। জেসমিন শান্ত গলায় বলল,
‘ওটাকে ভাগ্য বলে ধরে নিন। আমারও দোষ নেই। যাকে আগে পেয়েছি, তাকে নিয়েই পালিয়েছি।’
বিপুল জেসমিনকে বলল,
‘কিন্তু একটা প্রশ্নের জবাব দেবে কি?’
‘দেব। বলুুন, কী জানতে চান?’
‘তুমি কতজন তরুণকে ভালোবাসতে?’
প্রশ্নটা শুনে জেসমিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওর চোখ-মুখের ভাবান্তর দেখল না বিপুল। জেসমিন স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
‘একজনকেও ভালোবাসতাম না। ভালোবাসার অভিনয় করতাম। হলো?’
‘এ-কথা সত্যি?’
‘এসব কথার সত্য-মিথ্যা যাচাই করে এখন কী হবে, শুনি! অনেক কথা হয়েছে, এখন কাজের কথায় আসি।’
বলল জেসমিন। বিপুলও জানে, ওসব কথা এখন তুলে লাভ নেই। বিপুল বলল,
‘কাজের কথা মানে? আচ্ছা, দাঁড়াও তুমি কী খাবে? চা বা কফি? ফ্রুটস খাবে?’
‘কফি। চা হলেও হবে। আমার সঙ্গে আমার এক বান্ধবীও এসেছে। ওকে ভেতরে আসতে বলা যাবে?’
বিপুল ইন্টারকমের রিসিভার তুলে ওর পিএস মীনাকে বলল,
‘ওয়েটিং রুমে যে মেয়েটি বসে আছেন, তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিন। আর আমাদের জন্য চা ও কফি পাঠাবেন।’
ইন্টারকম ফোন রেখে বিপুল জেসমিনকে বলল,
‘তোমার বান্ধবী সঙ্গে এসেছে, এ-কথা আগে বলবে তো! তাকে এতক্ষণ একা বসে থাকতে হলো।’
‘ওর সামনে এসব কথা বলা ঠিক হতো কি? আমি জানতাম, আমাকে কিছু কথার জবাব তো দিতে হবে। একদিন যাকে ফিরিয়ে দিয়ে আরেকজনকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছি, সে কি আমাকে প্রশ্নবান থেকে রেহাই দেবে?’
কথাটা বলে মৃদু হাসলো জেসমিন। এ-সময় জেসমিনের বান্ধবী ওর কক্ষে প্রবেশ করল। বিপুল জেসমিনের পাশের চেয়ার হাতের ইশারায় দেখিয়ে বলল,
‘এই চেয়ারটায় বসুন।’
মেয়েটি বসল। ওর চোখে-মুখে জড়তা আর সংকোচ মাখামাখি। চোখের দৃষ্টিতে যেন শেষ বিকালের আভা লেপ্টে আছে। মুখটা মায়াবী, চোখ দুটি টানাটানা। জেসমিন ওর বান্ধবীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
‘ওর নাম হচ্ছে ঝুমুর। আমার সঙ্গেই ইডেনে পড়েছে। ও মাস্টার্সটা কমপ্লিট করেছে। খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। মাস্টার্স শেষ করে ট্রোফেলও করেছে ও। ওর একটা চাকরি দরকার। দরকার মানে কী, ভীষণ রকম দরকার। ঝুমুর খুব ভালো মেয়ে। ও আমার মতো নয়। ঝুমুর হচ্ছে শান্তশিষ্ট পদ্মদিঘি!’
কথাগুলো বলে লম্বা একটা শ্বাস নিল জেসমিন। ঝুমুরের সংকোচিত দৃষ্টি জেসমিনের দিকে। বিপুল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
‘আচ্ছা! মানে, ঝুমুর তোমার মতো চঞ্চল নন, আর ছেলে ঘুরানোর মতো অভ্যাসও নেই তার, এটা বলতে চাইছো?’
এ-কথায় হরিণ চোখের দৃষ্টি এসে বিপুলকে তীরবিদ্ধ করল যেন। ও কথাটা ঠাট্টাচ্ছলে জেসমিনকে বলেছে ঠিক, কথাটা যেন ঝুমুরকে স্পর্শ করেছে। বিপুল কিছু বলতে যাচ্ছিল, জেসমিন বলল,
‘ঝুমুর হচ্ছে, বইপড়ুয়া ও প্রকৃতিপ্রেমী এক মেয়ে। ওর নিজের চারপাশে এত সমস্যা যে ছেলেদের দিকে তাকানোরও সময় ছিল না, এখনও নেই।’
‘ঠিক আছে বুঝলাম। আপনি কোন বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন?’
ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল বিপুল। ঝুমুর বলল,
‘ইংরেজিতে।’
বিপুল জেসমিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘জেসমিন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে তাকে চাকরি দিতে পারব কি না, এখনই বলতে পারছি না। তবে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি চাকরি দিতে পারি, হবে তো?’
‘হবে। হবে না কেন? মোট কথা, ওর জন্য একটা চাকরি ঠিক করে দিতে হবে। এ-জন্যই আমি লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে আপনার কাছে এসেছি। আমি জানি, আপনার মন অনেক বড়!’
বলল জেসমিন। বিপুল হেসে বলল,
‘আচ্ছা, রাখো ওসব। তেল মারতে হবে না। তোমার অনুরোধ রাখার আমি চেষ্টা করব।’
‘না, তেল মারছি না আমি। সত্যি কথাটাই দরাজ মনে বলছি আজ।’
জবাবে বলল জেসমিন। এ-সময় অফিস বয় মনু এসে ওদের সামনে চা, কফি ও বিস্কুটসমেত ট্রে রাখল। আলাদা দুটো প্লেটে আপেল ও পেয়েরা কেটেও দিয়েছে। বিপুল বলল,
‘ঝুমুর নিন। আপনাকে বাইরে কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে বলে কিছু মনে করবেন না। জেসমিনের সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা ছিল।’
জেসমিন কফি নিল, ঝুমুর নিল চা। বিপুলও কফির কাপ তুলে নিল। এ-সময় জেসমিন বলল,
‘একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে, প্রশ্নটা করব?’
‘করো। কী জানতে চাও?’
‘আপনি বিয়ে করবেন কবে? মানে, এভাবে একা-একা আর কতদিন? বয়স তো কম হলো না! সম্ভবত ২৬ বছর আপনার। তাই না?’
‘হো হো হো’ করে হেসে ফেলল বিপুল। ঝুমুরের চোখে কৌতূহল আর জেসমিনের কপালে ভাঁজ দেখা গেল। বিপুল হাসি থামিয়ে ঝুমুরের চোখে চোখ রেখে বলল,
‘শুনুন, আপনার বান্ধবীর কথা! দু-বছর আগে সে আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভালোবাসার নামে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে। আমি ভালোবাসার শুরুতেই প্রত্যাখ্যান আর প্রবঞ্চনার আঘাতে এতটাই নারী বিদ্বেষী হয়েছি যে, বিয়ে নামক কোনো ফাঁদে জড়াব নাÑ পণ করে বসে আছি। আর সেই মেয়ে এসে আমাকে আজ জিজ্ঞেস করছে বিয়ে কবে করব!’
কথাটা বলে ও জেসমিনের মুখের দিকে তাকালো। কথাটা ঠাট্টার মতো করে বললেও বিপুল মনের ভেতরের চাপা সত্যটাই যেন বলে ফেলেছে। জেসমিন স্মিত হেসে বলল,
‘আহা! তাহলে আমার কারণে পৃথিবীতে অন্তত একটি পুরুষ সন্ন্যাস হতে চলেছে! কী বলেন?’
জবাবে মøান হেসে বিপুল বলল,
‘না, একটি নয়! আরেকজনও হয়তো সন্ন্যাস হতে পারে!’
‘আরেকজন! কে?’
জানতে চাইল জেসমিন। বিপুল বলল,
‘তার নাম আজাদ। আজাদকে চেনো তো?’
এ-কথায় হাসতে হাসতে জেসমিন বলল,
‘আমার আরেক প্রেমিক ছিল, সত্যি! আজাদকে চিনতেন আপনি?’
জেসমিনের অবাক চোখের দিকে চেয়ে বিপুল বলল,
‘একদিনেই সব চেনা হয়েছে! একদিনেই প্রেম, একদিনেই প্রতিদ্বন্দ্বীর সন্ধান লাভ আর একদিনেই পালানোর চেষ্টা এবং প্রত্যাখ্যান! এটাই ঘটেছে আমার ভাগ্যে!’
এ-কথায় ওরা তিনজন মিটিমিটি হাসতে লাগল। জেসমিন আজ ভীষণ অবাক হলো বিপুলের আচরণে এবং কথা শুনে। ও এতটা প্রাণখোলা, তা দু-বছর আগে বুঝতে পারেনি। এখন বুঝতে পারছে, বিপুলকে ছেড়ে দিয়ে জীবনের কত বড় ভুল ও করেছে। ওর মনে হাহাকারের বিষণ্ন সুর ধীরলয়ে বাজতে লাগল। বিপুল ঝুমুরকে বলল,
‘আপনি আমার পিএস-এর কাছে আপনার কাজগপত্র মানে বায়োডাটা রেখে যান। আমার এক বন্ধু আছে, ওদের বায়িং হাউসে আপনাকে একটা চাকরি দেওয়া যায় কি না, দেখছি। বনানীতে ওদের অফিস। ওখানে যেতে পারবেন তো?’
‘জ্বি, পারব। আমি তো ফার্মগেট থাকি। যেতে সমস্যা হবে না।’
‘জেসমিন বলল,
‘ওর কথা তো বলা হলো না। ঝুমুরের বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওর বাবা ব্যবসা করতেন। ওদের মিরপুরে লেবেল তৈরির একটা কারখানা আছে। এখন ব্যবসা লাটে উঠেছে। তাই ওর পরিবারকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। ওর মা, ছোট বোন, এক ভাই আছে। বুঝতেই পারছেন, উপার্জন না থাকলে সংসারের কী হাল হয়!’
‘হুম। দেখছি! তা বান্ধবীর দেখা পেলে কীভাবে?’
জানতে চাইল বিপুল। জেসমিন জবাবে বলল,
‘গত মাসে ঝুমুরের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল বসুন্ধরা মলে। পুনরায় যোগাযোগ হলো। যখন ওদের পরিবারের কথা জানলাম, তখন ভাবলাম ওর পাশে দাঁড়ানো আমার দরকার। কী জানি কেন, মন বলল আপনার কাছে গেলে কেমন হয়? ব্যস, আপনার খালার কাছ থেকে অফিসের ঠিকানা নিয়ে চলে এলাম।’
‘তাহলে ঝুমুরের সমস্যা না হলে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হতো না, তাই না?’
‘অনেকটা সে-রকমই। তবে দেখা হতেও পারত। আপনার খালার বাড়িতে আপনি অনেকদিন হলো যাননি। যদি যেতেন, দেখা হতো।’
‘তা ঠিক। খালার বাড়িতে যেতাম না তোমার কারণে। ওই বাড়িতে গেলে তোমার কথা মনে পড়বে, তাই যেতাম না। ইদানীং অবশ্য ব্যবসার কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। বাবা এখন নিয়মিত অফিসে আসেন না। আমাকে হয়তো ব্যবসা-বাণিজ্যের ভারটা চাপিয়ে দিতে চান। আমিও ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করি। এই তো!’
বলল বিপুল। জেসমিনের মুখে শুকনো হাসি। ও বলল,
‘যাই হোক। আমাদের দেখা যখন হয়েই গেল, এবার সুযোগ পেলে খালার বাড়িতে যাবেন। আমার কথা এখন আর মনে পড়বে না। কী বলেন?’
‘ও-রকম নয়। এখন যা হবে তোমাকে নিয়ে আমার মনে যন্ত্রণা হবে না। সেদিনের ঘটনাকে প্রতারণা বলি বা প্রবঞ্চনা বলি, সেটি আমার কাছে ভাগ্য বিড়ম্বনার এক ঘটনা হয়েই থাকবে।’
‘বাহ্! বেশ। আমার কাছেই থাক আমার ভুল ও অপরাধ!’
ঝুমুর বলল,
‘যারা ভালোবাসেনি, তাদের কোনো দুঃখ নেই। কী আশ্চর্য!’
ঝুমুরের কথাটা শুনে একটু চমকে গেল বিপুল। ঝুমুরের দিকে ও তাকালে সে মুখে শুকনো হাসি মেলে ধরে বলল,
‘স্যরি, কথাটা বলে ফেললাম। আপনাদের কথার মাঝখানে আমার কথা বলা ঠিক হয়নি!’
বিপুল বলল,
‘এ-কথাটির জন্যই আমি আপনার চাকরি ঠিক করে দেব। প্রতিজ্ঞা করছি!’
বিপুলের কথায় ঝুমুরের টানা চোখে এমন আনন্দ ফুটল যে, চোখ দুটি মনে হচ্ছে নক্ষত্রভরা আকাশ!
ছয়.
বিপাশাদের বাড়ি দক্ষিণ দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকায়। এই এলাকাটিতে অনেক বাঙালি পরিবারও বাস করে। বিপুলের মা ও মামাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর বিপাশা তাদের হোটেলে উঠতে দেয়নি। তাদের রেখেছে নিজেদের বাড়িতে। এতে অভূতপূর্ব কৃতজ্ঞতার মধ্যে ডুবে গেছে বিপুল। ও কেমন লজ্জা অনুভব করছে। ওর মা ও মামার কোনো কথাই না-কি বিপাশা এবং ওর বাবা শোনেননি। তারা অনেকটা জোর করে ওর মা ও মামাকে নিয়ে গেছে ওদের বাড়ি। সামান্য পরিচয় আর একটা অনুরোধ রাখার মধ্য দিয়ে কতটুকু সম্পর্ক তৈরি হতে পারেÑ আন্দাজ করতে পারছে না বিপুল। ‘বন্ধুত্ব’ বললেও এমন আন্তরিকতাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হয়, জানে ও। বিপুল দিল্লি আসছে শুনে ওকে বিপাশা টেলিফোনে কথা বলার সময় বলেছে ও যেন বিপাশাদের বাড়িতে ওঠে। তাই বিপুল দিল্লি কবে, কখন আসছে, তা জানায়নি বিপাশাকে। মা ও মামার সঙ্গে নিজেও বিপাশাদের বাড়িতে উঠতে চায়নি ও। দিল্লিতে নেমে বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেল পার্ক নিউ দিল্লি হোটেলে। দিল্লিতে এলে এই হোটেলে ওঠে বিপুল। আজ এই হোটেল উঠে প্রথমে স্নান করল। এরপর একটু বিশ্রাম করল ও। দিল্লির আবহাওয়া এখনও তেতে ওঠেনি। এপ্রিল মাসে গরমটা জমতে শুরু করে। দিন যত এগুবে, গরমের দাপট বাড়বে এখানে। জুলাই-আগস্ট মাসে তো অসহ্য দাবদাহ থাকে দিনেরবেলায়। প্রবল দাবদাহে ঘর থেকে বের হলে নাভিশ্বাস উঠে যায়। গত বছর আগস্ট মাসে দিল্লিতে এসেছিল ও। সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পথে একদিনের যাত্রাবিরতি করেছিল দিল্লি শহরে। একদিনেই বুঝে গিয়েছিল গ্রীষ্মকালে দিল্লিতে না আসাই ভালো। তাই মার্চ মাসের শেষ দিকে মা আর মামাকে নিয়ে আজমির ভ্রমণে এলো বিপুল। গ্রীষ্মকালের অসহ্য গরমের কথা মাথায় রেখেই আজমির ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিল ও। দিল্লিতে এসে ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বুকে ব্যথা অনুভব হচ্ছিল। জ্বরও এলো শরীর কাঁপিয়ে। বাধ্য হলো মাকে দিল্লি শহরে আকাশ হাসপাতালে ভর্তি করতে। ভাগ্যিস, ওর মামা ছিলেন সঙ্গে। নইলে ওকেই থাকতে হতো মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে। ব্যবসায়িক কারণে ওর মিটিং নির্ধারিত ছিল কলকাতায়। তাই মা’র সঙ্গে মামাকে রেখে ও কলকাতায় চলে গিয়েছিল। ওখানে পরিচয় হলো বিপাশার সঙ্গে। এরপর বাংলাদেশে গিয়ে ফের দিল্লিতে ফিরে এলো ও। ভাগ্যিস, বিপাশার মতো মেয়ের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল, নইলে কী যে হতো! অবশ্য, তা না হলে আরও দু’দিন আগে ও চলে আসত দিল্লি। কথাগুলো হোটেল কক্ষে বিছানায় শুয়ে ভাবছিল বিপুল। হঠাৎ ওর মনে হলো বিপাশাকে জানানো উচিত যে, ও দিল্লি শহরে চলে এসেছে। এ-কথা ভাবতেই ও হোটেলের টেলিফোন থেকে বিপাশাকে ফোন করল। একবার রিং বাজতেই ও-প্রান্তে বিপাশার কণ্ঠ,
‘হ্যালো?’
‘কেমন আছেন?’
‘আপনি! বিপুল বলছেন তো!’
‘হুম। বলছি। কণ্ঠ শুনেই চিনতে পেরেছেন, দেখছি!’
‘আপনি কি দিল্লিতে?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘আমি আজ দিল্লি এসেছি।’
বিপাশা কপট রাগীকণ্ঠে বলল,
‘আপনি দিল্লিতে নেমে হোটেলে উঠে এরপর আমাকে ফোন করলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘এটা তো কথা ছিল না! আপনি উঠবেন আমাদের বাড়ি, এমন কথা বলে রেখেছিলাম।’
অভিমান ঝরে পড়ে বিপাশার কণ্ঠে। বিপুল চুপ করে থাকে। বিপাশার কণ্ঠ,
‘কোথায় উঠেছেন?’
‘পার্ক নিউ দিল্লি হোটেলে উঠেছি। হোটেলে উঠেই আপনাকে ফোন করলাম।’
বলল বিপুল। ও-প্রান্তে বিপাশা বলল,
‘সেটাই তো জানতে চাচ্ছি, আপনি আমাদের বাড়িতে উঠলেন না কেন? এখানে তো আপনার মা এবং মামা খারাপ আছেÑ এমন কথা বলতে পারবেন না! না-কি তা বলতে চান?’
‘না, না। তা বলব কেন? আসলে আমি প্রথমবার আপনাদের বাড়িতে উঠতে চাইনি।’
‘ও আচ্ছা! আমি আর কী বলতে পারি! আমাদের বাড়িতে উঠলে খুশি হতাম, এই আর কি!’
বলল বিপাশা। বিপুল হেসে বলল,
‘কিন্তু আমি আসছি আপনাদের বাড়ি। দুপুরে আপনাদের বাসায় ডাল-ভাত খাব। খাওয়াবেন তো?’
‘আমার অনেক রাগ হচ্ছে! অভিমানও হচ্ছে!’
বলল বিপাশা। মোলায়েম কণ্ঠে বিপুল বলল,
‘রাগ-অভিমান চেপে রাখুন তো! আপাতত অতিথির জন্য ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করুন। মাকে দেখার জন্য মন ছটফট করছে! আমি আসছি।’
‘আপনার মা আর মামাকে আমরা বন্দি করে রেখেছি। আপনি এলেও আপনাকে বন্দি করা হবে।’
বিপাশার কথায় ফের হেসে বিপুল বলল,
‘আমার অপরাধ?’
‘আপনার অপরাধ অনেক গুরুতর! দিল্লি আসার খবরটা বলেননি। না বলে চলে এসেছেন এবং হোটেলে উঠেছেন। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ!’
‘আচ্ছা, এবারের মতো ক্ষমা করে দিন। আবার যখন আসব, আপনাদের বাড়িতে উঠব, প্রমিজ করছি।’
বিপুলের অনুনয়ভরা কণ্ঠ শুনে বিপাশা ও-প্রান্ত থেকে বলল,
‘ভেবে দেখব, অপরাধ মার্জনা করা যায় কি না? তাহলে এক্ষুণি আমাদের বাড়ি চলে আসুন। না-কি আমি আসব?’
‘না, না! তা কেন? একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমিই চলে আসছি। আপনাদের বাড়ির ঠিকানা তো আছেই। আপনি আমার জন্য ভাত রান্না করুন। রান্না জানেন তো?’
‘হা-হা-হা। বাঙালি পরিবারের মেয়ে ভুলে গেলে চলবে? বাঙালি মেয়েরা চুল বাঁধতে পারে, আবার রাঁধতেও পারে। জানেন তো?’
হেসে বলল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘ঠিক আছে, তর্ক করছি না। আমি আসছি। আর শুনুন, আগেই বলে রাখছি। কাল বিকালে আমি মা আর মামাকে নিয়ে ঢাকায় ফিরব। টিকিট কনফার্ম করে রেখেছি।’
‘কী বলছেন! মাত্র একদিন থাকবেন?’
বিস্ময় প্রকাশ করে বিপাশা। বিপুল বলল,
‘হ্যাঁ। ওদিকে আমার বাবাও মা’র জন্য বিচলিতবোধ করছেন। তার জন্য চলে যেতে হবে।’
‘আচ্ছা!’
‘রাগ করলেন না তো?’
‘না। রাগ করার কী আছে?’
‘আপনি অনেক ভালো মেয়ে। তাহলে আরেকটা অনুরোধ করতে পারি?’
‘করুন।’
‘বিকালে আমাকে দিল্লি শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবেন? যতটুকু পারা যায়, দেখব। এই শহরটা আমার চেনা হয়নি।’
বিপুলের অনুরোধের জবাবে বিপাশা বলল,
‘কোনো সমস্যা নেই। দেখাব। আগে আসুন তো!’
‘আচ্ছা, আসছি।’
একটা ট্যাক্সিতে চড়ে এক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল চলে এলো বিপাশাদের বাড়ি, চিত্তরঞ্জন পার্ক এলাকায়। বিপাশাদের বাড়িটি তিনতলা। তিনতলায় বাড়ির ছাদে ফুলের বাগান, বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে বিপুল নানা ফুলের সৌরভ পেল। ও দেখল বাড়ির উঠানেও নানা ফুলের গাছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আকাশমুখী হয়ে আছে। বিপাশার মা বাগানবিলাসীÑ জানতে পেরেছিল বিপুল। ঢাকা থেকে টেলিফোনে যখন বিপাশার সঙ্গে কথা হতো একবার মায়ের বাগান বিলাসিতার কথা বলেছিল ও। সেদিনও কথা বলার সময় বিপাশা অনেক অনুরোধ রেখেছিল, দিল্লিতে এলে ওদের বাড়িতে যেন বিপুল আতিথেয়েটা গ্রহণ করে। বিপুল কোনোভাবেই রাজি হয়নি। একরকম সংকোচ তো আছেই! বিপাশাদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফের এ-কথা ভেবে নিল বিপুল। ও লক্ষ করল বিপাশাদের বাড়িটি ছিমছাম, সুন্দর। ভবনটির সৌন্দর্য আছে এবং এক ধরনের আভিজাত্য ফুটে আছে। ভবনের দোতলায় বড় একটা বারান্দা বাড়ির গেটের দিকে এগিয়ে আছে। বারান্দাটায় বসে সকাল-বিকাল চা পান করে আড্ডা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত মনে হলো ওর। গেট দিয়ে ঢুকে গাছ-গাছালির ছায়াময় সরু পথ। এই পথ ধরে কয়েক কদম এগিয়ে সদর দরোজায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল টিপল ও। দরজার ওপাশে যেন বিপাশা দাঁড়িয়েই ছিল, কলিংবেল বাজার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খুলল ও। বিপুলকে দেখে বিপাশার মুখে ভুবন ভোলানো হাসি। বিপুল একটু অবাক হলো এতে। বিপাশার অন্তরে প্রেমিকের প্রতারণার দহন নিশ্চয়ই দাউদাউ করে জ্বলছে! এই দহন চেপে মেয়েটি কী মায়াবী মুখের হাসিতে সম্ভাষণ জানাল ওকে। কিছু মানুষের সহে যাওয়ার অসাধারণ শক্তি আছে। ঝিনুক যেমন কষ্ট সহে মুক্তার জন্ম দেয়, তেমনি কেউ কেউ আছেন তারা কষ্ট চেপে হাসি-খুশি থাকতে পারেন। বিপাশা হয়তো সে-রকম মানুষ, মনে মনে নিজেকে বলল বিপুল। বিপাশার মুখের হাসির মদিরতা উপভোগ করে বিপুল হেসে বলল,
‘দেখলেন তো চলে এলাম! কোনো অসুবিধা হয়নি আমার।’
বিপাশা দরজা থেকে সরে দাঁড়াল এবং বলল,
‘ভেতরে আসুন!’
বিপুল প্রবেশ করল ওদের বিশাল ড্রইংরুমে। বিপাশা বিপুলকে বলল,
‘আপনাকে সোফায় বসতে বলছি না। ডানদিকে খাবার টেবিলে গিয়ে বসুন। আমি জানি, আপনি খুব ক্ষুধার্থ আছেন। খাবার টেবিলে বসে কথা হবে, খাবারও খাওয়া চলবে।’
বাড়িতে প্রবেশ করেই খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসার কথায় একটু অস্বস্তিবোধ করছিল বিপুল; কিন্তু ‘না’ করতে পারল না। সকালে নাস্তা খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। উড়োজাহাজের হালকা খাবার খেলেও ক্ষুধাটা পেটে সত্যিই জানান দিচ্ছে। ও বলল,
‘আপনি যা বলবেন।’
বিপুল বিপাশাকে অনুসরণ করে খাবার পরিবেশনের ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল। একজন মধ্যবয়সী নারী টেবিলে নানা খাবারের প্লেট সাজিয়ে চলে গেল। বিপুল বুঝতে পারল এই মহিলা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। দুপুরবেলা বলে বিপাশার বাবা ও ভাই বাড়িতে থাকার কথা নয়। তারা দিনভর হাসপাতালে থাকেনÑ বলেছিল বিপাশা। এ-সময় একজন মধ্যবয়সী সুশ্রী মহিলা অন্য কক্ষ থেকে ওদের কাছাকাছি চলে এলেন। তিনি যে বিপাশার মা, এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না বিপুলের। মায়ের সঙ্গে বিপাশার মুখের আদলের অনেক মিল। বিপাশা ওর মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে বলল,
‘বিপুল, ইনি আমার মা। নাম মাহফুজা শেলী। আমার বাবার বিশ্বস্ত বন্ধু ও জীবনসঙ্গী। আমার মা, আমারও বান্ধবী!’
বিপাশার মায়ের বয়স পাঁচচল্লিশ বা ছেচল্লিশ বছর হবে। মধ্য বয়সের নারীত্বের ছাপ শরীরে এবং চোখে-মুখে স্নিগ্ধ এক সৌন্দর্যও লক্ষ করল বিপুল। তিনি স্বাস্থ্যবান এবং সপ্রতিভ। বিপাশার মা তার মেয়ের কথা শুনে মিষ্টি করে হাসলেন। বিপুলকে দেখিয়ে বিপাশা ওর মাকে বলল,
‘মা, তার নাম বিপুল। তোমার দেওয়া আমার শ্রেষ্ঠ উপহার কানের দুলটা তিনিই পেয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তার কাছে আমার আরও অনেক ঋণ আছে!’
বিপুল বুঝতে পারল সেদিন বিপাশার কানের দুলটা আকারে ছোট হলেও এর গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি। মায়ের স্মৃতি ছিল ওটি। বিপাশার মা মেয়ের কথার জবাবে বিপুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘তোমাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব, বুঝতে পারছি না। কানের দুলটা আমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। ওটা আমার নানী দিয়েছিলেন আমার মাকে! আমাদের জন্য স্মৃতিচিহ্ন এই দুল!’
বিপুল বিপাশার দিকে চেয়ে টিপ্পনীর মতো করে বলল,
‘যাক, এতটা মূল্যবান জিনিস ফিরিয়ে দিতে পেরে আমার এখন ভীষণ গর্ববোধ হচ্ছে!’
বিপাশা হেসে বলল,
‘এ-কারণে আপনি এবং আপনার পরিবারের কেউ দিল্লি এলে আমাদের বাড়িতে থাকবেন। আমাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। এটা আমাদের পক্ষ থেকে পুরস্কার বলে ধরে নেবেন।’
বিপুল ওর রসিকতায় হাসলো। এ-সময় বিপুলের মা সুলতানা রাজিয়া ওর কাছে চলে এলেন। তিনি নামাজ পড়ছিলেন একটি কক্ষে। বিপুলকে দেখে ওর মা এগিয়ে এসে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। বিপুলও মাকে আলিঙ্গন করল। বিপুল ওর মাকে বলল,
‘তুমি তো একেবারে সুস্থ হয়ে গেছ, মা! তোমাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না, হাসপাতালে ছিলে!’
জবাবে ওর মা বলল,
‘বাবা, তারা কী যে সমাদর করছেন আমাদের, কী বলব! সুস্থ না হয়ে উপায় আছে?’
বিপাশা ও ওর মা’র মুখে হাসি ঝুলে আছে। মায়ের কথা শুনে বিপুলও হাসলো। বিপাশা বলল,
‘চেয়ারে বসে পড়ুন আপনারা। আগে খাবার খেয়ে নিন।’
বিপুল ওর মা’র কাছে জানতে চাইল,
‘মামা কোথায়?’
‘ও একটু বেরিয়েছে। চাঁদনীচকে গিয়েছে। চলে আসবে।’
বললেন বিপুলের মা। বিপাশা বিপুলের মাকে বলল,
‘এবার আপনি ছেলের সঙ্গে খেতে বসে পড়ুন তো! অনেকদিন ছেলের পাশে বসে খাননি, তাই না?’
‘ঠিক বলেছ, মা।’
বললেন বিপুলের মা। চেয়ার টেনে দিয়ে বিপাশা ডাইনিং টেবিলে বসাল বিপুলকে। বিপুলের পাশে বসাল ওর মাকে। তাদের সামনে খাবারের প্লেট তুলে দেওয়ার সময় বিপুলের মা বিপাশা ও ওর মা’র উদ্দেশে বললেন,
‘আপনারাও আমাদের সঙ্গে খেতে বসুন। আসুন, একসঙ্গে সকলে খাই। এতে আনন্দ বেশি। নইলে কিন্তু আমি খাব না!’
বিপাশার মা বললেন,
‘আমি বসছি না। আমাকে দেখতে হবে কে কতটুকু খাচ্ছে। বিপাশা, তুই বসে পড়। তুই না বের হবি, বলেছিলি?’
‘হ্যাঁ, মা। আগে অতিথিরা খেয়ে নিক। এরপর আমি খাব।’
‘না, মা। তুমি বসো আমার পাশে।’
‘বিপুলের মা’র অনুরোধে বিপাশা তার পাশে বসে পড়ল। বিপুল দেখল ভাত-মাছ, সবজি, ডাল, মুরগির মাংসের তরকারি এবং রোস্ট টেবিলে সাজানো। বিপাশার মা’র আচরণে মনে হচ্ছে রান্নাঘরে আরও কিছু খাবার তৈরি হচ্ছে। তিনি রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। বিপুল নিজের প্লেট দু-চামচ ভাত তুলে নিয়ে বিপাশার দিকে চেয়ে বলল,
‘দিল্লিতে মনে হচ্ছে নিমন্ত্রণের নামে নির্যাতন করার নিয়ম আছে! এত খাবার কীভাবে খাব বলুন তো!’
‘একটু একটু করে খান। বাঙালির তো আতিথেয়তার একটা সুনাম আছেই। সেটা রক্ষা করতে হবে না?’
বিপাশার কথার জবাব না দিয়ে মুচকি হেসে বিপুল খাবারের প্রতি মনোযোগী হলো।
যমুনার ক্ষীণধারা নিয়ে কুতুবমিনারের গোপন দুঃখ আছে কি? বা কুতুবমিনার কি যমুনার দুঃখগুলোর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে? প্রশ্নটা উঁকি দিল বিপুলের মনে। একটা সময় ছিল এই যমুনার জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দের গুঞ্জরণ লেগেই থাকত, জলপ্রবাহের কুলকুল ধ্বনি শোনা যেত এবং স্রোতের ছন্দে কত আখ্যান ঝলমলিয়ে বয়ে যেত। যমুনার পাড়ে যে সাম্রাজ্য-গাঁথা একসময় গমগম করত, আজ মৃত নগরীর চাপা কান্নার মতো তা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। যমুনা আছে, জলের তোড়জোড় নেই। যমুনার অস্তিত্বকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব সময় পাহারা দিয়ে রাখছে যেন কুতুবমিনার। এই কুতুবমিনার এখন কালের ধূসর আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যার পাশে এলে কিছুটা সময় ডুবে থাকার অবকাশ পাওয়া যায়। কুতুবমিনারের সামনে এ-কথাগুলো ভাবছিল বিপুল। বিপাশা আর ও একটি ট্যাক্সিতে চড়ে নয়াদিল্লির বিভিন্ন স্থান দেখতে বেরিয়েছিল। কয়েকটি স্থান ঘুরিয়ে দেখিয়ে বিপাশা ওকে নিয়ে এলো কুতুবমিনার দেখাতে। এখানে ওরা বসে আছে একটি বেঞ্চে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামিনামি করছে। গরমের উষ্ণতা কমে আসছে। ঘুরতে বেরিয়ে বিপুল বুঝতে পারছিল বিপাশা কিছু কথা বলতে চায় ওর সঙ্গে। যা ও বাড়িতে বলতে পারবে না। বেঞ্চিতে বসার কিছুক্ষণ পর বিপাশা বলল,
‘এক বিকালে দিল্লি শহরের সামান্যই দেখানো যায়। কাল সকালে বের হব। কাল ওল্ড দিল্লিতে নিয়ে যাব আপনাকে।’
‘নাহ্, দরকার নেই। আমি তো কয়েকদিন আগেও ওল্ড দিল্লিতে গিয়েছিলাম। নিজামউদ্দিনের দরগায় গিয়েছিলাম মা ও মামাকে নিয়ে। ওখানে একদিন ঘুরেছি।’
‘তাহলে অন্যদিকে যাব।’
‘কাল ঘুরব না। কাল বিকালে আমাদের ফ্লাইট। ব্যাগ গুছাতে হবে না?’
বলল বিপুল। জবাবে বিপাশা বলল,
‘তা ঠিক। যাই হোক, আমাদের বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে এয়ারপোর্টে রওনা হবেন। এটা আমার মা বলে রেখেছেন। আপনাকে জানিয়ে দিলাম। দ্বিমত করতে পারবেন না।’
‘আচ্ছা। তা না হয় রক্ষা করা যাবে। এখন বলুন, কেমন আছেন?’
জানতে চাইল বিপুল। যেন কথাটা অবরুদ্ধ হাওয়ায় আটকে ছিল। এখন কথাটা বেরিয়ে এসে মুক্তির স্বাদ নিল। প্রশ্নটা শুনে জবাবে বিপাশা বলল,
‘কেন এই প্রশ্ন করছেন? কী রকম জবাব দিলে আপনি খুশি হবেন বলুন তো! কী আশা করছেন?’
‘আমি আবার কী আশা করব? তবে আমি আশা করব, আপনি যেন শোক কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক থাকেন। এই তো!’
বলল বিপুল। বিপাশা নিজের মধ্যে একটা ডুবসাঁতার দিল কি? ওর চোখে-মুখে ডুবে যাওয়ার আচ্ছন্নতা। ও বলল,
‘আমি অনেক কোমল আবার অনেক কঠিন। আমার কোমল মনটাকে কাঁদতে দিয়েছি কয়েকদিন। তবে সামলে নিয়েছি নিজেকে। এখন আমি খুব কঠিন এক মানুষ, বুঝলেন!’
‘বাহ্! শুনে ভালো লাগল। আপনাকে জুবায়েরের সেলফোন নম্বর পাঠিয়েছিলাম। আপনি কী তাকে ফোন করেছিলেন? কথা হয়েছে কোনো? কৌতূহলবশত জানতে চাইছি। জবাব না দিলেও হবে।’
বিপুলের এ-কথায় কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বিপাশা বলল,
‘আমার একটা প্রশ্ন ছিল। জানতে চেয়েছিলাম, কেন মিথ্যা ঠিকানা দিয়েছিল সে। প্রেম করার জন্য তো সেটার প্রয়োজন ছিল না। এটা জানতে আমি তাকে অনেকবার ফোন করেছি, ফোন ধরেনি সে।’
‘আচ্ছা। এখন তাহলে আপনি নিজেকে গড়ার কাজে মন দিন।’
‘কী বলছেন আপনি? আমি কি ভেঙে গেছি? আমি কি পুতুল বা প্রতিমা, যে ভেঙে যাব!’
মৃদু হেসেই কথাটা বলল বিপাশা। বিপুলও মৃদু হেসে বলল,
‘না, তা বলছি না। তবে মন বলতে যা-ই বলি না কেন, এর একটা আদল তো আছে! আমরা তা দেখতে পাই না। এই আদলটা ভেঙে যায়, আবার গড়েও। মনেও তো ভাঙাগড়ার খেলা চলে। মনের আদলকে অনেকে মানসিক শক্তি বলে।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে বিপুল নিজের মধ্যে কেমন দার্শনিক ভাব অনুভব করে। বিপাশা বলল,
‘তাহলে আমার মানসিক শক্তি ভেঙে গেছে বলে মনে করেন আপনি?’
বিপাশার প্রশ্নে বিপুল বলল,
‘আপনি যে, এক ধরনের ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটা বুঝতে পারছি আপনার কথাতেই।’
‘বাহ্! আপনি ব্যবসায়ী, না-কি মনের জ্যোতিষী? বা মনোবিজ্ঞানী?’
‘কটাক্ষ করছেন?’
‘কটাক্ষ কেন করব? আমি জানতে চাইছি।’
স্বাভাবিকভাবে বলল বিপাশা। কিন্তু প্রশ্নটার মধ্যে গুহ্য কারণ আছে মনে হলো বিপুলের। ও বলল,
‘আসলে আপনি কী জানতে চান, বলুন তো!’
বিপুলের এ প্রশ্নে একটু ভাবল যেন বিপাশা। ও ভাবনার আবেশ জড়ানো কণ্ঠে বলল,
‘পুরুষ মানুষদের মনোজগতটা জানতে চাই। আপনি জানাতে পারবেন?’
বিপাশার কথা শুনে বিপুল হেসে ফেলল। ও বলল,
‘জেনে কী করবেন? কীভাবে মেলাবেন? একেকজন পুরুষ, একেকরকম। কার দোষ, কার ঘাড়ে চাপাবেন? কার প্রশংসাই বা কাকে দেবেন? ওসব ভাবনা ছাড়ুন।’
‘আপনি দেখছি, আমাকে নিয়ে খুব চিন্তিত?’
‘চিন্তা করব না কেন? বন্ধু বলে স্বীকৃতি তো দিয়েছেন?’
‘বুঝেছি, আপনাকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না!’
মুচকি হেসে বলল বিপাশা। বিপুল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। কথার জবাব কথা দিয়ে দিতে হয়। ও বলল,
‘আপনিও আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি নিজেও কিন্তু মেয়েদের মনের রহস্য পছন্দ করি না। মেয়েদের মনের রহস্যে অনেক ধূম্রজাল আছে!’
‘কীভাবে জানলেন তা?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল হেসে বলল,
‘আমি একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। ওই মেয়েটি আমাকে এক আঘাতেই বুঝিয়ে দিয়েছে জীবনের পথে বুঝে-সমঝে না হাঁটতে পারলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে হয়! কখনও কখনও অনেক নিচে পতন ঘটে!’
বিপুলের কথায় চোখের দৃষ্টিতে চমক ফুটিয়ে বিপাশা বলল,
‘জেসমিন আপনাকে গ্রহণ করেনি; কিন্তু ঠকিয়েছিল কি? প্রতারিত হয়েছিলেন?’
এমন প্রশ্নে হচকিয়ে গেল বিপুল। খুব অবাকও হলো। ও বলল,
‘আপনি জেসমিনের কথা কীভাবে জানলেন?’
‘আপনার মা’র কাছ থেকে শুনেছি। তার সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেছে। তিনি অনেক কথাই আমাকে এখন বলে দেন!’
‘বলেন কী! আমি এতদিন ভেবেছিলাম জেসমিনের কথা আমার মা বুঝি জানে না!’
‘মা’রা সব সময় সন্তানের কথা জেনে যায়। মা’দের অন্তর্দৃষ্টিতে সব ধরা পড়ে যায়। এমন কী, স্ত্রীর কাছেও স্বামী অনেক কিছু চাইলেও গোপন রাখতে পারে না। এ-কথা জেনে রাখুন কাজে লাগবে।’
বিপাশার কথার জবাবে বিপুল প্রশ্ন করল,
‘আর প্রেমিকার কাছে প্রেমিকের কথা কীভাবে থাকে?’
জবাব দিতে কুণ্ঠিত হলো না বিপাশা। একটু অন্যমনষ্ক হলো। এর জবাবে বলল,
‘সাধারণত প্রেমিকারা অন্ধ থাকে, প্রেমিকরা থাকে ভোগবাদী। প্রেমিকারা যতটা বিশ্বস্ত, প্রেমিকরা ততটা চতুর। প্রেমিকারা নদীর মতো, প্রেমিকরা পাথরের চাঁই। প্রেমিকারা ঝরনা হলে, প্রেমিকরা পাহাড়ের গুমোট মৌনতা।’
‘বাহ্! আপনি আইন বিষয়ে পড়লেন কেন ভাবছি। সাহিত্য নিয়ে পড়তে পারতেন।’
‘সাহিত্য পড়ার চেয়ে লালন-ধারণ করাটা বেশি জরুরি। একজন মানুষের ভেতরে সাহিত্যজ্ঞান, বোধ বা অনুরাগ না থাকলে ঐ মানুষগুলোর মনুষ্যবোধ কতটা থাকেÑ এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আর সাহিত্য লেখাপড়ার বিষয় না হলেও আধুনিক মনস্ক হতে হলে, উদার হতে হলে বা শিল্পমনা হতে হলে সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকা উচিত। আমি সাহিত্য নিয়ে পড়িনি, তবে সাহিত্যানুরাগী। সাহিত্য পড়ার চেষ্টা থাকে এবং লালনও করি অন্তরে। আঘাতপ্রাপ্ত হলে সাহিত্যই কিন্তু দুঃখ-কষ্টকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে। অন্য কোনো উপায় আমার জানা নেই।’
কথাগুলো বলে এক ধরনের আচ্ছন্নতা ছড়িয়ে পড়ল বিপাশার অনুভবে। বিপুল বেশ মুগ্ধ হলো ওর কথা শুনে। ও বলল,
‘বেশ, আজ সেটা জানলাম। আমার মতো নিছক একজন ব্যবসায়ীকে আপনি একটি পথ দেখিয়ে দিলেন।’
বিপুলের কথার জবাবে অবাক চোখ তুলে বিপাশা বলল,
‘এমনভাবে কথাটা বললেন, যেন আপনি সাহিত্যবিমুখ মানুষ!’
‘আমি লাভ-লোকসান নিয়েই তো থাকি। সাহিত্য জানি না যে!’
‘না, আপনি জানেন। আপনার ভেতরে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আছে। কতটা লালন করেন, কতটা পাঠের অভ্যাস আছে বা কতটা পছন্দ করেন, সেটা শুধু জানি না।’
‘আমি নিজেকেও নিজে খুব একটা জানি না।’
‘জানতে চেষ্টা করুন।’
বলল বিপাশা। বিপুল প্রশ্নবোধক চোখে বলল,
‘কাকে?’
‘নিজকে, আবার কাকে!’
‘ও আচ্ছা। এখন থেকে নিজকে জানার চেষ্টা করব।’
বলল বিপুল। এ-মুহূর্তে ওর ভেতরে যমুনার ক্ষীণধারার মতো অচেনা দুঃখের স্রোত বইতে শুরু করল। এই স্রোতটি জেসমিনের প্রতারণার জন্য বইছে? না-কি বিপাশা প্রতারিত হয়েছে বলে ওর প্রতি সমবেদনা জানাতে এই স্রোত বইছে? একই রকম দুঃখের সঙ্গে দুঃখ মিলে গেলে অন্যের দুঃখের স্রোত নিজের মনের গহীনেও বইতে পারেÑ এটা বুঝতে পারছে বিপুল। বিপাশার মনে কী বইছেÑ কে জানে!
সাত.
দু-মাস পর ঢাকায় এলো বিপাশা। এই দু-মাস বিভিন্ন সময়ে টেলিফোনে কথা হয়েছে বিপাশার সঙ্গে। বিপুলের মাও কথা বলতেন। বিপাশার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ওর মা। দিল্লিতে যে আতিথেয়তা পেয়েছে ওর মা এবং মামা, এরপর থেকে বিপাশাদের প্রসঙ্গ এলে প্রশংসার তুবড়ি ছোটান ওর মা। বিপুলের অবশ্য বিপাশা ও তার পরিবারের প্রশংসা শুনতে ভালোই লাগে। মাঝে মাঝে ও ভাবে বিপাশার কানের দুল যদি ট্রেনের সিটে না পড়ে যেত, তবে হয়তো এমন একটি মেয়ের সঙ্গে ওর পরিচয় হতো না। ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বলেই ঢাকা ও দিল্লিতে বসবাসকারী দুটি পরিবারের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। সময় পেলে বিপুলের মা টেলিফোন করে কথা বলেন বিপাশার মায়ের সঙ্গেও। তাদের মধ্যে কথা বলাবলি চলছে। বিপুল শুধু কথা বলে বিপাশার সঙ্গে। কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে বিপাশা জানাল ও ঢাকায় আসছে। বাংলাদেশের ভিসা নিয়েই কথাটা জানাল বিপাশা। বিপুল এ-কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। বিপাশা ঢাকায় আসবে শুনে ওর ভীষণ ভালো লেগেছে। বিপুল কথাটা শুনেই বলেছিল,
‘আমি ভীষণ খুশি হলাম। আমিও মনে মনে ভাবছিলাম, আপনাকে ঢাকায় আসতে বলি।’
জবাবে বিপাশা হেসে বলেছিল,
‘বলেননি তো! আমি এমন অতিথি যে, আমাকে যেচেই আসতে হচ্ছে!’
‘আমি দুঃখিত ও লজ্জিত এ-জন্য। আসলে বলতে সংকোচবোধ করছিলাম। যা-ই হোক, আসছেন যখন একটা জোরালো অনুরোধ রাখতে চাই।’
লজ্জিতকণ্ঠে বলল বিপুল। বিপাশা হেসে বলল,
‘বলুন, কী অনুরোধ?’
‘আপনি কিন্তু আমাদের বাড়িতে উঠবেন। হোটেলে ওঠার পরিকল্পনা থাকলে বাদ দিন। আমি কোনো কথাই শুনব না!’
ও-প্রান্তে হাসির দমকে কাঁপছিল যেন বিপাশা। বিপুল অবাক হচ্ছিল ওর হাসির শব্দ পেয়ে। হাসি থামিয়ে বিপাশা বলেছিল,
‘শুনুন। আমি আপনাদের বাড়িতেই উঠছি। আগে থেকেই এ-কথা আদায় করে নিয়েছেন আপনার মা। আমি তো ভিসার আবেদনপত্রে আপনাদের বাড়ির ঠিকানাও উল্লেখ করেছি থাকার স্থান হিসেবে।’
বিপাশার কথা শুনে অবাক হলো বিপুল। ও বলল,
‘আশ্চর্য! আমি এর কিছুই জানি না! মায়ের সঙ্গে আপনার সত্যিই দেখছি খুব ভাব!’
‘এ-কথা আপনাকে আগেও বলেছি। আমি ঢাকায় আসছি আপনার মায়ের অনুরোধে।’
‘আচ্ছা? তা কতদিন থাকবেন?’
‘দুদিন থাকব। আমি জাস্ট বাংলাদেশটা দেখতে চাই।’
‘মাত্র দুদিনে কী দেখবেন?’
আহত গলায় বলল বিপুল। ও-প্রান্ত বিপাশার হাসির শব্দ শুনতে পেল ও। বিপাশা বলল,
‘ঢাকা শহরটাই আপাতত দেখব। দুদিনের বেশি থাকতে পারব না। বড়জোর আরও একদিন থাকতে পারি। দিল্লিতে আমার কিছু জরুরি কাজ আছে।’
‘আচ্ছা, আগে আসুন। দু-তিন দিন হলেও চলবে। আমি আপনাকে ঢাকা শহর দেখাব। যদি চান রাউজানেও নিয়ে যেতে পারব।’
এ-কথার জবাবে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বিপাশা বলল,
‘আপনি যদি ভেবে থাকেন, আমি জুবায়েরের খোঁজে আসছি, তাহলে ভুল ভাবছেন!’
বিপাশার কণ্ঠে একটু গাম্ভীর্যতা যেন। বিপুল হেসে বলল,
‘রাগ করবেন না। আমি এমনিতেই কথাটা বললাম।’
‘আরেকটি কথা জেনে রাখুন। আমি প্রতারিত হয়েছি ঠিক; কিন্তু এর ক্ষত নিয়ে চোখের জলে ভাসার মতো মেয়ে নই!’
‘বাহ্! আমিও তো ঐ-রকম ছেলে!’
উৎসাহ প্রকাশ করে কথাটা বলল বিপুল। ফের বিপাশার হাসির শব্দ শুনতে পেল ও। বিপাশা বলল,
‘আপনি কি ধরনের ছেলে, সেটা আপনি নিজে বলার দরকার নেই। আমার সঙ্গে আপনি নিজেকে টেনে আনছেন কেন? উদ্দেশ্য কী আপনার?’
‘ছিঃ ছিঃ! কী বলছেন আপনি? বিশ্বাস করুন, আমার কোনো উদ্দেশ্য নেই!’
তড়িঘড়ি জবাব দিল বিপুল। বিপাশার কথায় একরাশ লজ্জা এসে গ্রাস করল ওকে। বিপাশা ও-প্রান্তে হাসছে। মেয়েদের অনেক হাসির কোনো অর্থ থাকে না। অকারণে হাসে, কারণেও হাসে। মেয়েদের হাসির কারণ নির্ণয় করার গবেষণা কি কেউ করেছে? ভাবল বিপুল। ও-প্রান্ত থেকে বিপাশা বলল,
‘কথা বলছেন না যে! কিছু ভাবছেন?’
‘ভাবছি আপনি বাংলাদেশ প্রথমবার আসছেন। আপনাকে যদি কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন দ্বীপে নিয়ে যেতে না পারি, তাহলে খারাপ লাগবে। বা কুয়াকাটা ঘুরিয়ে আনতে পারলেও হয়। সুন্দরবনও অনেক সুন্দর। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান সিলেটের চা-বাগানে নিয়ে গেলেও ভালো লাগবে। কিন্তু দু-তিন দিন থাকবেন আপনি! এটা তো আনন্দের চেয়ে বেদনা ভারী হয়ে যাবে!’
বলল বিপুল। ওর কথা শুনে বিপাশা হাসছে। ও-প্রান্ত থেকে বলল,
‘ঢাকা শহরের কত রূপ আছে, এবার সেটাই দেখাবেন। শুনেছি পুরান ঢাকার বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি খুব সুস্বাদু! খাওয়াবেন। মিষ্টিও না-কি ভালো, খাওয়াবেন। জামদানি শাড়ি কিনব, রেশমি চুড়ি কিনব, মিষ্টি পানও খাব। সদরঘাটের মিষ্টি পান না-কি খুব মিঠে? এ নিয়ে না-কি গানও আছে?’
বিপাশার কথা শুনে অবাক হলেও ভালো লাগল বিপুলের। ঢাকা সম্পর্কে বিপাশার ধারণা খানিকটা আছে বা ও জেনেছে। কৌতূহল না থাকলে এসব জানার কথা নয় দিল্লির মেয়ে বিপাশার। বিপুল উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বলল,
‘আপনি দেখি হোমওয়ার্কও করে ফেলেছেন! ঢাকা সম্পর্কে আপনার আগ্রহ দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। তবে দুদিনের জন্য আসছেন কেন বুঝতে পারছি না! কয়েকদিন থাকতে পারতেন।’
‘শুনুন মশাই, এই ঢাকা সফর হচ্ছে কনে দেখার মতো! এসে দেখে যাব। এরপরও তো আসব। আমি কি একবার এসেই থেমে যাব না-কি?’
‘বাহ্! আপনার কথা শুনে ভালো লাগছে।’
‘এবার আমাকে পদ্মার পাড়ে নিয়ে যাবেন। ওখানে গিয়ে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরা দেখা যাবে?’
‘যাবে। আপনাকে নিয়ে যাব। ওখানে ইলিশ মাছ ধরার পর রান্নাও হয়। তাও খাওয়াব। আপনি ইলিশ মাছ পছন্দ করেন?’
‘খুব একটা খাওয়া হয় না। তবে পছন্দ করি। বাঙালি পরিবারের সন্তান তো, ইলিশ মাছের স্বাদ সম্পর্কে জানি!’
বিপুল আর কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। কথা বলতে চাইলেও কথা বলার কারণ বা বিষয় লাগে। বিপাশার সঙ্গে আর কী বলতে পারে, তা ঠিক করতে না পেরে ও বলল,
‘তাহলে আসুন। দেখা হচ্ছে আমাদের।’
‘হুম।’
বিপাশার ছোট্ট জবাব। বিপুল বলে,
‘কথা কি আর বলবেন? না-কি রাখব?’
‘না, না। আমি রাখছি। পরে আবার কথা বলব।’
বিপাশা ফোন রেখে দিল। বিপাশা ঢাকা আসছে বলে এক ধরনের ঘোর বিপুলের ভাবনায় ছড়িয়ে থাকল।
বিপাশাকে বিমানবন্দর থেকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো বিপুল। বিপাশা বিমানবন্দর থেকে ফেরার সময় চারপাশে তাকাচ্ছিল। সকালের ঢাকা শহর। বর্ষাকাল। মেঘের অভিমানে যেন আকাশ ঢেকে আছে। বর্ষাকালে যখন-তখন বৃষ্টি নেমে পড়ে। গত তিন দিন টানা বৃষ্টি হয়েছে। আজ বৃষ্টি নেই, তবে বৃষ্টি নামতে কতক্ষণ! বর্ষা মানেই তো আকাশে জলের সমুদ্র নাচানাচি করে। যখন ইচ্ছে নেমে পড়ে। বৃষ্টি নিশ্চয়ই বিপাশা পছন্দ করবেÑ ভাবল বিপুল। ওদের গাড়ি বনানী দিয়ে যাচ্ছে। বিপুল তাকালো বিপাশার দিকে, ও তাকিয়ে আছে বাইরে। বিপাশা ঢাকা শহর প্রথম দেখছে। বিপুল ভাবল, বিপাশা দিল্লি শহরের সঙ্গে ঢাকা শহরের তুলনা করবে নিশ্চয়ই। ওল্ড দিল্লির চেয়ে ঢাকা শহরের চেহারা অনেক সুশ্রী, আবার পুরান ঢাকা ওল্ড দিল্লির মতো ঘিঞ্জি। আপন মনে এসব কথা ভাবছিল বিপুল। ওদের গাড়ি যখন ফার্মগেট এলাকায় এলো, বিপাশা গাড়ির জানালা থেকে মুখ ঘুরিয়ে বিপুলের দিকে চেয়ে বলল,
‘ঢাকা শহরে মানুষের বসবাস বেশি। তাই না?’
‘হ্যাঁ। মানুষের বসবাসের সংখ্যায় হিসাব করলে এটি ঘনবসতি একটি শহর।’
‘ঢাকা শহরের চেহারা বা আবহাওয়া তো কলকাতার মতো লাগছে!’
বিপাশার এক কথার জবাবে বিপুল বলল,
‘অনেকটা তাই। কলকাতার মতো লাগছে মানুষগুলো একরকম বলে। সাইনবোর্ডও বাংলায় লেখা, মানুষ কথা বলছে বাংলায়Ñ সেটাও অন্যতম কারণ। তবে…!’
‘তবে কী?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘কলকাতার সঙ্গে ঢাকা শহরের বড় কিছু পার্থক্যও আছে।’
‘কী পার্থক্য? বলুন তো! শুনে রাখি।’
বিপুল একটু ভেবে বলল,
‘বড় পার্থক্য হচ্ছে, কলকাতায় রাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ফুটপাতে ঘুমায় আর অনেক রাস্তাঘাটে নোংরা আবর্জনা তৈরি হয়। ঢাকা শহরে অনেক মানুষ বাস করলেও ফুটপাত বা রাস্তা দখল করে এত পরিমাণ মানুষ ঘুমায় না!’
বিপুলের কথা শুনে বিপাশা অবাক চোখ তুলে বলল,
‘আচ্ছা! এটা জানতাম না আমি। হতে পারে। আমিও দেখেছি কলকাতার অনেক রাস্তা ও গলিপথ নোংরা!’
বিপাশার কথায় বিপুল বলল,
‘কলকাতার মানুষদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক বেশি, ঢাকায় মুসলমানদের সংখ্যা বেশি। ওই শহরে মন্দির আর এই শহরে মসজিদ বেশি। আর শুধু বাঙালি হিসেবে চারিত্রিক-সংস্কৃতি চর্চার নানা বিষয়ে মিল পাওয়া যায়। জলবায়ু ও খাবারও একইরকম। কলকাতায় হিন্দি ভাষার প্রচলন আছে, এখানে নেই। কেনাকাটার জন্য কলকাতায় যা সুলভ, এখানে দাম একটু বেশি।’
‘বাহ্! আর কিছু পার্থক্য নির্ণয় করতে বললে কী বলবেন?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল ফের একটু ভেবে বলল,
‘কলকাতার মানুষ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ভীষণ অগ্রসর, আর আমরা অনেক পেছনে আছি। কলকাতায় কপটতা আছে প্রবলভাবে, এখানে সরলতা খুব। কলকাতার মানুষ মিতব্যয়ী আর ঢাকার মানুষ খরচ করতে উদার। কলকাতা ও ঢাকার মানুষদের মিলও আছে। তারা আড্ডাপ্রিয় এবং রাজনীতি নিয়ে সচেতন, তবে দলের নেতাদের প্রতি সমর্থনের প্রশ্নে অন্ধ। আপাতত এটুকু মনে এলো, তা বলে ফেললাম।’
‘বাহ্! ঢাকা শহর ঘুরতে গিয়ে দেখছি ভালো গাইড এবং সমাজ বিশ্লেষক পেয়েছি। কী বলেন?’
মুচকি হেসে বলল বিপাশা। জবাবে বিপুল বলল,
‘হুম। গাইড এবং বডিগার্ড হিসেবে দক্ষ লোক পেয়েছেনÑ এটা হলফ করে বলতে পারি।’
বিপুলের কথায় বিপাশা খিলখিল করে হেসে উঠল। ওদের গাড়িটা ভূতের গলিতে প্রবেশ করল। গাড়ি বিপুলদের বাড়ি পৌঁছানো অবধি বিপাশার হাসি থামল না। গাড়ির দরজা খুলে দিল ওদের ড্রাইভার মজনু মিয়া। গাড়ির হর্ন শুনে বিপুলের মা দরজা খুলে ফেলেছেন। বিপাশা গাড়ি থেকে নামল। বিপুলও নামল। বিপাশাকে নিজের বাড়িতে দেখে ওর মা ভীষণ খুশি হলো। বিপুল লক্ষ করল ওর মা’র চোখ দুটি কেমন উজ্জ্বল হয়ে গেছে। বিপাশার প্রতি কেমন মমতাময়ী চোখে চেয়ে আছেন তিনি। ওর মায়ের কাছে বিপাশা এতটা পছন্দের মেয়ে কী করে হলোÑ তা এ-মুহূর্তে ভাবতে চাইল না বিপুল। ওরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই ওর মা বিপাশাকে আলিঙ্গন করে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করলেন। বিপাশার জন্য একটি কক্ষ নির্ধারণ করা ছিল, কক্ষটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে বেশ সাজিয়ে রেখেছে ওর মা। ওই কক্ষে বিপাশাকে নিয়ে গেলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পোশাক বদল করে বিপাশা এলো। বিপাশা ওর মা-বাবা ও মামার জন্য অনেক উপহার নিয়ে এসেছেÑ ওগুলো লাগেজ থেকে বের করে তাদের হাতে তুলে দিল। এ-সময় বিপুল ওদের বাড়িতে ফোন করে বিপাশাকে ধরিয়ে দিল। বিপাশা ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানিয়ে দিল নিরাপদে এসে পৌঁছেছে এবং বিপুলদের বাড়িতেই উঠেছে। বিপুল ভাবতে লাগল কাল ঢাকা শহরের কোন কোন উল্লেখযোগ্য স্থানে বিপাশাকে নিয়ে যাবে। লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ধানমন্ডি, জাতীয় সংসদ ভবন, গুলশানে যাবে বলে মনে মনে ভেবে নিল। একদিন পর সদরঘাট থেকে নৌযানে নদীপথে চাঁদপুর গিয়ে ঘুরে আসবেÑ এটাও ঠিক করে নিল। দিল্লির মেয়ে বিপাশা নদীতে ঘুরতে পছন্দ করবে নিশ্চয়ই! তৃতীয় দিন সকালবেলায় গাড়ি নিয়ে পদ্মার পাড়ে চলে যাবে। ঢাকা থেকে মাওয়া ঘাটে যেতে যানজট না থাকলে এক বা দেড় ঘণ্টার মধ্যে চলে যাওয়া যায়। দুপুর অবধি থেকে বাড়ি ফিরে এলেই হবে। বিপাশার দিল্লির ফ্লাইট এদিন রাতে। বিপুল নিজের চিন্তার মধ্যে বিপাশাকে নিয়ে ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা তৈরি করতে থাকল। দুপুর অবধি বিপাশা ওদের বাসায় বিশ্রাম করল। এরপর দুপুরের খাবার খেয়ে বিপাশাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিপুল। বিপাশা যে কদিন ঢাকায় থাকবে বিপুল অফিসে যাবে নাÑ এটা ওর বাবাকে বলে দিয়েছিল। ফলে অফিস সামলাবেন ওর বাবা। বিপুলের মাথায় এ কদিন ব্যবসা-বাণিজ্য থাকবে না। এ-কথা ভেবে কেমন স্বস্তি অনুভব করছে ও।
নদীর এক ধরনের জাদু আছে। নদীর কাছে গেলে মানুষ কেমন জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়। জলতরঙ্গের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, আবার স্রোতের মতো মনের চাপা আবেগ উচ্ছল হয়। কখনও কখনও না-বলা কথা প্রকাশের পথ খুঁজে পায়। রাশভারী মানুষও নদীর সান্নিধ্যে অন্যরকম হয়ে যায়। বিপাশাকে নৌযানে চড়িয়ে চাঁদপুরের দিকে গিয়েছিল বিপুল। সদরঘাট থেকে বিলাসবহুল এই নৌযানটি ছেড়ে যায় এবং সন্ধ্যার আগে ফিরে আসে। বিত্তবান, মধ্যবিত্ত চিত্তবিলাসীরা টিকিট কেটে এই নৌ-ভ্রমণে যান। বিপুল আগেই এই নৌযানের টিকিট কেটে রেখেছিল। বুড়িগঙ্গা দিয়ে যখন নৌযান যাচ্ছিল, তখন বিপুল লক্ষ করেছে বিপাশার চোখে-মুখে অপার বিস্ময় আর গভীর আনন্দ ছেয়ে আছে। ঢাকায় এসে এই নৌ-ভ্রমণেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাবে বিপাশা, সেটা অনুমান করে রেখেছিল বিপুল। নৌ-ভ্রমণে এসে ওর এই অনুমানটা সত্যি হলো। ওর ভালো লাগল এতে। সদরঘাট থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত গেলে ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর মোহনায় পড়ে নৌযান। তিন নদীর তিন রকম জলের রং দেখা যায় এই মোহনায়। এ পর্যন্ত নদীপথে যেতে যেতে বিপাশার সঙ্গে বিপুলের অনেক রকম কথা হলো। শুধু জুবায়েরের প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেনি বিপাশা, বিপুলও তার কথা তোলেনি। ফেরার পথে একটু কেমন আবেশিত গলায় বিপাশা বিপুলকে বলে ফেলল,
‘আজ আমার ডাক নামটা আপনাকে বলতে চাই। শুনবেন?’
‘কিন্তু ওটা যে ঘনিষ্ঠজন না হলে …!’
বিপুলের কথার মাঝখানে বিপাশা রিনরিনে গলায় বলল,
‘আহা! আপনি বুঝি এখনও ঘনিষ্ঠজন হননি?’
‘আচ্ছা, ঘনিষ্ঠ হয়েছি বলে ধরে নিচ্ছি।’
কথাটা বলে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করে বিপুল। ওর মনের মধ্যে কেমন ঘোর সৃষ্টি হচ্ছে। বিপাশা চোখের দৃষ্টি নাচিয়ে বলল,
‘ধরে নেবেন কেন? এটাই সত্যি।’
‘আচ্ছা, তাহলে বলুন। কী নাম?
‘রেণু।’
‘রেণু!’ বাহ্!’
এ নামটি আমার মা রেখেছেন। মা আমাকে বাসায় এই নামে ডাকেন। রেণু নামটার অর্থ জানেন তো?’
‘ফুলের রেণু, এই তো?’
বলল বিপুল। বিপাশা হেসে বলল,
‘ঠিক। আমার মা প্রায়ই আমাকে বলতেন, তুই হচ্ছিস ফুলের রেণুর মতো। একদিন হাওয়ায় মিলিয়ে যাবি। ওই হাওয়ায় সুগন্ধ ছড়াবি। ফুল ফুটে থাকে গাছের শাখায়। তুই চলে যাবি তো, তাই রেণুর মতো তুই! যে-হাওয়ায় মিশে যাবি, সে-হাওয়া সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যাবে! আমি জানি, আমার মা আমাকে নিয়ে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কিন্তু ‘রেণু’ নামটা রাখার পেছনে এই যুক্তি তিনি আমার কাছে সব সময় তুলে ধরেন।’
বিপাশার কথার জবাবে বিপুল বলল,
‘খারাপ তো বলেননি! আপনার মা ঠিকই বলেছেন। আপনার মধ্যে একরকম মাদকতা আছে। বা ফুলের সুগন্ধ বললেন না, ওটা আছে! আমারও তাই মনে হয়।’
‘আচ্ছা! আর কী মনে হয়?’
ভীষণ ভাবাবেগ নিয়ে জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘রেণু! নামকরণের পেছনে যে-কথাটা আপনার মা বলেন, আমার জেনে তা বিশ্বাস করতে খুব ভালো লাগছে। আপনাকে নিয়ে ভাবলে আমার অনেক কিছুই মনে হয়!’
‘কী মনে হয়, বলুন!’
‘বললে আপনি হাসতে পারেন। আমার কথা অতিরঞ্জিতও ভাবতে পারেন।’
‘তবু বলুন, শুনি।’
মিষ্টি হেসে বলল বিপাশা। বিপুল একটু দম নিয়ে বলল,
‘একবার মনে হয়, যমুনার পাড়ে যে তাজমহলটি অপরূপ সৌন্দর্যের লীলা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আপনি ও-রকম একজন নারী! যাকে কেবল দেখেও আনন্দ আছে। সান্নিধ্যে থাকলে উচ্ছ্বাসের মধ্যে সময় পার করে দেওয়া যায়, মনে কোনো মলিনতা বা গ্লানি স্পর্শ করে না।’
‘আচ্ছা! একি বললেন আপনি! এমন কথা আমার জন্য অনেক, অ-নে-ক বড় কমপ্লিমেন্ট! কী বলব!’
কথাটা বলে চুপ করে থাকল বিপাশা। বিপুলের মধ্যে কী চলছে, কে জানে। কিছু কথা অপ্রত্যাশিতভাবে চলে আসছে। ও ফের বলল,
‘আপনাকে তাজমহলের মতো ভাবতে আমার ভালো লাগে। জানেন, তাজমহল দেখে মুগ্ধ হয়নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না।’
‘আমাকে তাজমহল ভাবছেন! তাহলে যমুনা নদীটি কে?’
বিপাশা মৃদু হেসে জানতে চাইল। বিপুল বলল,
‘যে যমুনা হতে পারত, সে তো সমুদ্রের সুনামি হয়ে চলে গেছে। রেখে গেছে প্রবঞ্চনার আখ্যান! এখন যমুনা তো একটা লাগবে! নইলে চলবে কীভাবে জীবন?’
কথাটায় রাগ করল না বিপাশা। ও একটু গম্ভীর হলো। বলল,
‘জীবন কি একা চলে না? আরেকজনের প্রতি নির্ভর করতে হবে?’
জবাবে বিপুলও গাম্ভীর্য কণ্ঠে বলল,
‘এটা নির্ভরতা বলে চালিয়ে দিলে হয় না। জীবনের ধর্ম হচ্ছে, ভালোবাসা। মানে, বন্ধনে জড়িয়ে এগিয়ে চলা। এটাও মানছি, সবার জীবন এমন হবে না। এমন হতেই হবে, এটাও বাধ্যবাধকতা নয় বা এমন নিয়ম নেই। একজন মানুষ নিজেকে নিয়েই কাটিয়ে দিতে পারে পুরো জীবন; কিন্তু আমাদের সমাজটা এমন মানুষের জন্য প্রস্তুত নয়। ঐ মানুষটাকে তাই সমাজের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হয়। মনের সঙ্গে আপোস করতে হয়।’
‘বাহ্! ঋালো বললেন তো! আমি তো আপনার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি! কী করি, বলুন তো?’
বিপাশার কথা শুনে মুচকি হাসলো বিপুল। ও বলল,
‘ওটা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। ব্যবসায়ীরা লাভ-লোকসানের হিসাবের কথাই তো বেশি ভাবে এবং বলে। আপনার সঙ্গে কথা বললে আমার মধ্যে ভাবুক সত্তা কেন জানি সক্রিয় হয়ে যায়! আপনার জ্ঞান-মেধা আর সৌন্দর্যের প্রতি এটা আমার মনের সমীহ হয়তো!’
‘সমীহটা যদি এক বৃত্তে ঘুরপাক না খেয়ে একটু পেখম ছড়াত, ভালো লাগত!’
‘ঠিক কী বলতে চাইছেন, বুঝতে পারছি না। স্পষ্ট করে কথাটা বলা যায়?’
বলল বিপুল। বিপাশা মুচকি হেসে বলল,
‘বইয়ের প্রচ্ছদ ও নামকরণ দেখে অনেক সময় বইটির ভেতরের গল্পটার আঁচ করা যায়। আপনি হয়তো ওভাবে দেখেন না। দেখলে বুঝতে পারতেন বা আঁচ করতে পারতেন।’
‘বুঝতে পারিনি বলেই তো একবার হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম! যে প্রচ্ছদটা দেখেছিলাম, ওটা হয়ে গেল মরীচিকা। গল্পটার কোনো অংশেই ঠাঁই হলো না আমার। তাই আর কোনো গল্পের প্রথম পাতায় গেলেও অন্য পাতাগুলো উল্টাতে ভয় লাগে!’
‘কেন?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘ফের যদি গল্পটা অধরাই থেকে যায় বা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়!’
বিপুলের এ-কথায় বিপাশা বলল,
‘হুম। বুঝতে পারছি, আপনার মনের ভেতরে হীনমন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। নিজেকে নিয়ে নিজের হীনমন্যতা এটি। এটি থাকলে স্বপ্ন দেখার ইচ্ছেটা কখনও সত্যি করার মনোবল তৈরি করতে দেবে না।’
‘হীনমন্যতা!’
অবাক চোখে তাকালো বিপুল। বিপাশা বলল,
‘কঠিন ভাষায় বললেÑ ওটা তাই। শফট করে বললেÑ নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা বা মানসিক বিষাদে আক্রান্ত। কোনটি বললে আপনি পছন্দ করবেন?’
‘হা হা হা।’
হেসে ফেলল বিপুল। বিপাশা এমনভাবে কথা বলে যেন নদীর জলপ্রবাহ। জলের প্রবাহে যেন সবকিছু ভেসে যায়। বিপুলের হাসির কারণ জানতে বিপাশা বলল,
‘হাসছেন কেন?’
‘কথার ফল্গুধারায় আমাকে এককোণে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিলেন তো, তাই হাসছি!’
‘শুধু হাসলেই হবে?’
‘না। ভাবছি, আপনাকে ‘মনোবিজ্ঞানী’ খেতাব দিয়ে ঢাকায় একটি চেম্বার খুলে দেব কি না! আমাদের এখানে অনেক মানুষই মানসিক বিষাদে আক্রান্ত!’
‘আমি তো সকল মানুষের রোগ সারাতে পণ করিনি! অন্তত একজনের রোগ সারাতে পারলেই হবে। বুঝেছেন?’
‘বুঝব কী? কথার মধ্যে রেণুর সৌরভ থাকে, ফুলের পাপড়ি দেখি না। হা হা হা।’
‘আচ্ছা! কথার চালাকি করতে বেশ পারেন দেখছি!’
‘আহা, আমি আগেও বলেছি, আপনার সঙ্গে আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। একটু এলোমেলো হয়ে যাই!’
‘আমার কাছে কোনো কথাই এলোমেলো লাগছে না। মনে হচ্ছে, আপনি আলো ফেলে দেখতে চাচ্ছেন কোথায় আমার গোপন কথাটি পড়ে আছে।’
বলল বিপাশা। জবাবে বিপুল বলল,
‘সেটা কি বিব্রতকর? মানে, আপনি বিব্রত হচ্ছেন?’
‘জানি না। আমিও তো আপনার মতো আলো ফেলে দেখতে চাচ্ছিÑ কোথাও আপনার কোনো কথা আড়াল হয়ে থাকছে কি না?’
কথাটা বলে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘আমার মধ্যে কোনো আড়াল নেই। মনকে আমি সংযত যেমন করে রাখি, তেমনি কোনো ভাবনাকে আড়ালে চেপে রাখতেও চাই না।’
বিপুলের মনের কোণে জমে থাকা মেঘ যেন সরে গেল কথাটা বলার সময়। বিপাশা ফের ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তাহলে আমি কি কিছু কথা বলতে পারি? জবাব দেবেন স্পষ্ট করে। কোনো সংকোচ বা আড়াল রাখবেন না।’
‘বলুন। নিঃসংকোচে কথা বলব।’
বিপাশা কয়েক মুহূর্ত ভাবল এবং এরপর বলল,
‘আমি অনেক ভেবে ঠিক করেছি, লন্ডনে গিয়ে আমি ব্যারিস্টারি পড়ব। মানে, এটা এক বছরের সেশন। আইন বিষয়ে মাস্টার্স করেছি। এখন ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করলে মর্যাদা ও কাজের দক্ষতা দুটোই বাড়বে।’
‘খুব ভালো চিন্তা। ভালো সিদ্ধান্ত। আমি প্রবলভাবে আপনার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাচ্ছি।’
বলল বিপুল। বিপাশা বলল,
‘আমার আরেকটি ভাবনাও মনে এসেছে। এই ভাবনাটা আমি অনেকবার প্রত্যাখ্যান করেও দেখেছি। কিন্তু ভাবনাটা আমার মনে ফিরে ফিরে আসে। ভাবনাটা নিয়ে প্রথম প্রথম আমি বিব্রতবোধ করেছি। এখন বিচলিতবোধ করি। বিচলিতবোধ করি, এই ভেবে যে আমি কেন এমন ভাবনা তাড়াতে পারছি না।’
‘আচ্ছা! কী এমন ভাবনা আপনার? বলুন তো!’
কৌতূহল প্রকাশ করল বিপুল। বিপাশা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘বলছি। ভাবনাটা আমাকে শেষ অবধি বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। বা বলতে পারেন আমি আপনার কাছে আসতে বাধ্য হয়েছি। আমার মন আমাকে বাধ্য করেছে আপনার কাছে আসতে।’
‘আপনি এত ভূমিকা না করে কথাটা বলে ফেলুন তো!’
তাগিদ দিয়ে বলল বিপুল। বিপাশা বলল,
‘কিছু কথা চট করেই বলে ফেলা যায় না। বলছি, শুনুন।’
বলে চুপ করে গেল বিপাশা। বিপুল তাকিয়ে রইল। ও আশা করছে, কথাকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে না রেখে তা প্রকাশের সূর্যকিরণে উজ্জ্বল হোক। ওর দৃষ্টি আটকে রইল বিপাশার মুখের দিকে। বিপাশা কয়েক মুহূর্ত পর বলল,
‘লন্ডনে একা পড়তে যেতে মন চাইছে না আমার। একজন সঙ্গী চাই আমার। আর স্টুডেন্ট হিসেবে একজন সঙ্গী নেওয়াও যায় ওখানে।’
‘হুম। স্পাউস মানে ছেলে স্টুডেন্ট হলে স্ত্রী আর মেয়ে স্টুডেন্ট হলে স্বামীকে নেওয়া যায়। তাই না?’
‘হুম।’
বলল বিপাশা। বিপুল প্রশ্ন করল,
‘কাকে নেবেন?’
প্রশ্নটার জবাবে বিপাশা ওর চোখে চোখ রেখে বলল,
‘আমার পছন্দ আপনাকে। যাবেন আমার সঙ্গে?’
কথাটি তাজমহলের পাশ দিয়ে প্রবাহমান যমুনার মতো মনে হলো বিপুলের। ওর মনে হলো, একসময় যমুনার জলে যেমন খরস্রোতের তান ছিল, সেই তান ওদের দুজনের মাঝখানে এসে গুনগুনিয়ে উঠল। হাওয়ায় একটা গল্পও যেন প্রথম পাতা উল্টানোর কথা বলে উঠল। বিপুল এমন গল্পের কথা কখনও ভাবেনি। হাত বাড়ালেই কি গল্প ধরা যায়? বিপুলের ভেতরে জেসমিনের মুখটা কেন জানি বারবার ভেসে উঠছে। চট করে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিলে ধপাস করে পড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর। এবারও যদি তাই হয়? ভাবছে বিপুল। বিপাশা বলল,
‘এক্ষুণি কিছু বলতে হবে না। আপনি ভাবুন। এরপর আমাকে জানাবেন। আবার না জানালেও হবে। ওটাই আমি আপনার জবাব হিসেবে ধরে নেব। কাল তো আমি ফিরে যাচ্ছি। আমাকে খুব দ্রুত কাগজপত্র তৈরি করতে হচ্ছে। প্রায় সবকিছু ঠিকঠাক আছে। আপনার জবাবের পর আমি সিদ্ধান্ত নেব।’
বিপুল কিছু বলতে পারছে না। ওর ভেতরে একটা ঝড় বইছে। এই ঝড়ে উড়ে আসছে বিপাশা, জেসমিন ও জুবায়েয়ের মুখ। ও মনে মনে ভাবছেÑ বিপাশা এতটা ওর প্রতি আস্থা রাখল কেন? ভালোবাসা কি না বলে-কয়েও হয়ে যেতে পারে? এটা কি ওর প্রতি বিপাশার ভালোবাসা, না-কি অবলম্বন খুঁজছে ও? মনের ভেতরের ঝড়টা নানারূপ তৈরি করছে। ঝড় বইছে বিপাশার মনেওÑ বুঝতে পারছে বিপুল। অদ্ভুত মৌনতা ওদের গ্রাস করল হঠাৎ!
আট.
সময় যেন ঋতু বদলের মতো রং-রূপ বদলায়। এ-মুহূর্তে সময় যখন কাউকে ফুলের মালা পরিয়ে দিতে আটখানা, ঠিক অন্য সময়ে নিন্দাঝড় বা তিরস্কারের ডালি নিয়ে হাজির হতে পারে। সময়কে অনেকে ‘ভাগ্য’ নাম দিয়ে যা ঘটছে, তা মেনে নেওয়ার কথাই বলে। জীবনে সব ঘটনাকে ‘ভাগ্য’ বলে ধরে নিলে কারও দুঃখ-আফসোস থাকার কথা নয়। কিন্তু মানুষ ভাগ্যও মানে, আবার দুঃখ-আফসোসও করে। শেষ অবধি মেনে নেওয়ার পক্ষেই থাকতে হয়। দুঃখ একসময় গোপন কষ্ট হয়ে যায়, আর আফসোস পরিণত হয় দীর্ঘশ্বাসে। কথাগুলো আপন মনে ভেবে বিপুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল লন্ডন শহরের হাওয়ায়। লন্ডনের আবহাওয়া না-কি রহস্যময়। গ্রীষ্মকালে এই রোদ, এই বৃষ্টির খেলা সব সময়ে দেখা যায়। আকাশে সূর্যের চেয়ে মেঘের দাপট বেশি। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি আর শীতকালে তুষারপাত লন্ডন শহরের চিরচেনা আবহাওয়াÑ শুনেছি বিপুল। কাল সন্ধ্যায় ও যখন লন্ডনে এসে পৌঁছায় তখন আকাশে সূর্যের দীপ্তিময় কিরণ দেখে অবাক হয়েছিল। যদিও বিপুল জানে, গ্রীষ্মকালে ইউরোপ ও আমেরিকায় দিনের পরিধি অনেক বড় হয়ে যায়। সূর্য অস্তমিত হয় রাতে। কখনও রাত দশটার পরও সূর্যের তেজ দেখা যায় আকাশে। সন্ধ্যা দেরিতে হয় বলে রাতের দৈর্ঘ্য হয়ে যায় ছোট। কাল প্রথম দেখল লম্বা দিনের শেষাংশ।
বিপুল লন্ডনে এই প্রথম এলো। সে-সঙ্গে প্রথম দেখল রাত ন’টায়ও দিনের আলো ঝলমল করছে। তা দেখে অবাক হয়েছে ও। আরও অবাক হয়েছে বিমানবন্দরে বিপাশাকে না দেখে। বিপুল আশা করেছিল, বিপাশা ওকে লন্ডনে অভ্যর্থনা জানিয়ে বরণ করবে। হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যাত্রীদের অপেক্ষা করার ছাউনিতলে বিপুল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিল বিপাশার জন্য। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আশাহত হয়ে নিজের ফোন থেকে বিপাশাকে ফোনও করেছিল। বিপাশা ওর ফোন ধরেনি। কতটা অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ওর জীবনে ঘটে গেল কাল! একটা ট্যাক্সিতে চড়ে হোটেলে ফিরেছিল ও। উড়োজাহাজে বসে ও ভেবে রেখেছিল হোটেলে লাগেজ রেখে বিপাশার সঙ্গে লন্ডন শহর দেখতে বের হবে। অনেক কথা জমে আছে, কুড়ির পাপড়ি মেলার মতো তা বিপাশার কাছে মেলে ধরবে। কিন্তু ওর ভাবনার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল হলো না। যেন উল্টো ঘটনার অধ্যায়ে এসে পড়ে গেল ও। হোটেল থেকে রাতে একা বিপুল আর বের হয়নি। লম্বা ভ্রমণের ক্লান্তি ছিল বলে ঘুমাতে চেষ্টা করেও হতাশ হতে হয়েছে ওকে। অনেক রাত অবধি দুচোখে ঘুম এলো না। বুকের ভেতরে অভিমান বা দহন কুড়ে কুড়ে জানান দিচ্ছিল। মনের মধ্যে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রশ্নটা বারবার এসে আঘাত করছিলÑ ‘বিপাশা কেন এয়ারপোর্টে এলো না?’ যদিও একটা কারণ বিবেচনা করলে এ প্রশ্নটা থমকে যায়। ঢাকা থেকে বিপাশা যখন দিল্লি ফিরেছিল, ওর প্রত্যাশার কোনো সদোত্তর দিতে পারেনি বিপুল। বিপাশা যে আকাক্সক্ষার কথা ওকে বলেছিল, ওটার প্রতি সমর্থন জানানোর মতো অভিব্যক্তিও প্রকাশ করেনি। বিপাশা ঢাকা থেকে দিল্লি ফিরেছিল বিপুলের কোনো জবাব ছাড়াই। বিপাশা বলেছিল ওকে যেন বিপুল তাড়াতাড়ি ওর মতামত জানায়। বিপুল বিপাশাকে নিয়ে অনেক ভেবেছিল; কিন্তু নিজের মতামত জানাতে পারেনি। বিপুল নিজের ভেতরে একটা সংশয়ের দেয়ালে কেবল হোঁচট খেয়ে পড়েছিল। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতে ও নিজের ভেতরে নিজে জর্জরিত হয়েছে অনেকগুলো দিন। মনের এই অভিঘাত কারও সঙ্গে শেয়ারও করতে পারেনি। যখন ওর মনে হয়েছে, জেসমিনের চরিত্রের সঙ্গে বিপাশাকে মেলানো ঠিক হচ্ছে না, তখন ও ফোন করেছিল বিপাশাকে। কিন্তু ফোনে পায়নি ওকে। বিপাশার মাকে ফোন করে জানতে পেরেছিল ও লন্ডনে চলে গেছে। লন্ডনের সেলফোন নম্বর নিয়েও ফোন করেছিল, বিপাশা কথা বলতে রাজি হয়নি। আরও অনেকদিন ফোন করে কথা বলতে চেয়েছিল, পারেনি। এমন কী, বিপাশা ওর ফেসবুকে বন্ধু হওয়ার বিপুলের অফারটিও গ্রহণ করেনি। এমন আচরণে আশ্চর্য হয়েছিল ও। চাপা কষ্ট নিয়ে শুধু ভেবেছে ‘বিপাশা কেন এতটা নিষ্ঠুর হলো?’ কয়েক মাস পর বিপুল ভুলে যেতে চাইল বিপাশাকে। ভুলতে পারল কি নাÑ সেটা নিয়ে আর ভাবল না। শুধু বিপাশাকে আর ফোন করেনি। প্রায়ই বিপাশার কথা মনে পড়ত ওর। বিপাশাকে নিয়ে ভাবত আর অভিমানের কান্না লালন করত অন্তরে। এভাবেই চলছিল, গত মাসে ওর মা তার সেলফোনটি দিয়ে বললেন,
‘এই নে, কথা বল।’
বিপুল কিছু না বুঝেই ফোনটি নিয়ে বলল,
‘হ্যালো।’
‘হ্যালো, কেমন আছেন?’
বিপাশার কণ্ঠ শুনে ওর ভেতরে কেমন ঝড় উঠল। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না ও। বিপাশা ফের বলল,
‘বললেন না, কেমন আছেন? ভালো নেই?’
বিপাশা এমনভাবে কথা বলছিল যেন কোনো কিছুর পরিবর্তন হয়নি, সবকিছু আগের মতো আছে! ‘মেয়েরা পারেও!’ মনে মনে কথাটা বলল বিপুল। টেলিফোনে বিপাশার কণ্ঠ ফের রিনরিনিয়ে উঠল,
‘কথা না বললে রেখে দিচ্ছি। আমাকে কেউ উপেক্ষা করলে সহ্য করি, অবহেলা করলে ভীষণ রেগে যাই কিন্তু!’
‘আচ্ছা, বলছি। রাগছেন কেন? আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?’
নিজেকে সামলে নিয়ে সংযতকণ্ঠে বলল বিপুল। বিপাশার সঙ্গে ও কথা বলতে চায়Ñ ওর মন সেটাই ওকে বলছিল। ও-প্রান্ত থেকে বিপাশা বলল,
‘আমি খুব ভালো আছি। পরীক্ষা শেষ হলো মাত্র। আর কয়েকদিন পর এখানে প্র্যাকটিস করতে পারব। চাকরি হয়ে যাবে। বুঝলেন?’
‘বাহ, বেশ! আপনি তো নিজের জীবনটা সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিতে পারলেন। অভিনন্দন, শুভ কামনা।’
‘ধন্যবাদ। আপনি খুশি হয়েছেন তো?’
‘অবশ্যই। কেন খুশি হব না, বলুন? আমি অনেক খুশি হয়েছি।’
বলল বিপুল। অভিমান বা কষ্ট এক হয়ে জলতরঙ্গের সৃষ্টি করে যদি নদী হয়, তাহলে এমন একটি নদী বিপুলের অনুভবে বইছে, টের পেল ও। ও-প্রান্ত থেকে বিপাশা বলল,
‘শুনলাম, আপনি দাড়ি-গোঁফ রেখে দেবদাস হয়ে গেছেন! কেন? জেসমিন আপনাকে ফিরিয়ে দিল সেই কবে, আর প্রতিক্রিয়া এত পরে! আপনি এত সেøা কেন, বলুন তো?’
বিপাশার কথায় শ্লেষ থাকলেও ওর খারাপ লাগল না। ও বলল,
‘আমি আসলে একটা গর্দভ! আকাশে জমে থাকা মেঘ দেখে বুঝতে পারি না, বৃষ্টি নামবে কখন। রোদ দেখে বুঝতে পারি না দিনের উজ্জ্বলতা কতটা বা নদীর স্রোত দেখেও বুঝতে পারি না উজান, না ভাটি।’
‘কথা তো বলতে পারেন টসটস করে! কে বলবে, ব্যবসায়ীরা কথা বলতে জানে না। আপনি পারেন বটে! আপনাকে তাই তো আলাদাভাবেই দেখেছিলাম।’
‘এখন দেখেন না?’
জানতে চাইল বিপুল। জবাব দেওয়ার আগে মৃদু হাসলো বিপাশা। বিপাশা হাসলে বিপুলের বুকের ভেতরের গহীন নৈঃশব্দ ভেঙে যায়। বিপাশা বলল,
‘এখন কীভাবে দেখি বা আমি কীভাবে আছিÑ তা জানতে হলে চলে আসুন লন্ডনে। ঢাকায় বসে আর ব্যবসার হিসাব মেলাতে মেলাতে সত্যি সত্যিই দেবদাস হয়ে গেছেন, আপনি! এবার একটু হাওয়া বদল করুন। স্বপ্ন দেখে বাঁচতে শিখুন!’
বিপাশার কথাটায় রহস্য যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর অর্থদ্যোতনা। বিপুল ভাবতে চাইল নাÑ এ কথায় স্পষ্ট আহ্বান আছেÑ কি নেই। ও বলল,
‘আচ্ছা, তাহলে আমি লন্ডনে আসছি। খুব শিগগির দেখা হবে আপনার সঙ্গে।’
‘সত্যি আসবেন?’
জানতে চাইল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘হ্যাঁ, সত্যিই আসব। খুব শিগগিরই আসব। আর কোনো কাজে সময় নেব না। ইউকে’র ভিসার আবেদন করব কাল বা পরশু। ভিসা পেলেই টিকিট কাটব।’
‘জেনে ভালো লাগল। আসার আগে ফোন দিয়ে জানাবেন। আপনাকে আমি এয়ারপোর্টে আনতে যাব।’
‘অবশ্যই জানাব।’
বিপুলের সঙ্গে এটুকু কথা হয়েছিল সেদিন। বিপুল লন্ডনে আসার আগের দিন বিপাশাকে ফোন করে ওর লন্ডনে পৌঁছানোর তারিখ ও সময় জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লন্ডনে নেমে বিপাশার আচরণে অবাক হতে হলো ওকে। আহা রে, সময়! বিপাশা লন্ডনে এসে কি বদলে গেছে? পশ্চিমা হাওয়ায় অনেকে যেমন বদলে যায়! হিথ্রোতে ওকে না দেখে এ-কথাটাই ভাবল বিপুল। হোটেলে ঘুমানোর চেষ্টা করার সময় ওর খুব কান্নাও পাচ্ছিল।
বিপাশার সঙ্গে দেখা হলো পরের দিন সন্ধ্যায় হোয়াইট চ্যাপেল এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে। এই এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকে বিপাশা। এখানে এল্ডার স্ট্রিটে অবস্থিত আইকন কলেজে ব্যারিস্টারি পড়েছে ও। লেখাপড়া শেষ হয়েছে এবং সনদপত্রও নিয়ে ফেলেছে। দেখা হওয়ার পর এ তথ্য ওকে প্রথম জানাল বিপাশা নিজেই। প্রায় দেড় বছর পর বিপাশার সঙ্গে ওর দেখা হলো। বিপাশাকে কলকাতায় জিন্স প্যান্ট ও শার্ট পরিহিত দেখেছে বিপুল। আজ জিন্স প্যান্টের সঙ্গে লাল রঙের টপস পড়েছে ও। কানে দুল নেই, রিং আছে। ও নাকে নাকফুল পরেছে। এতে ওর মুখের পুরনো ছবিটা হারিয়ে অন্যরকম লাগছে। আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় লাগছে বিপাশাকে। বিপুল নিজের মুগ্ধতা আড়াল করার চেষ্টা করতে থাকে। মনে মনে নিজেকে যেন আফসোস করে বলেÑ ‘এই মেয়েটিকে ভালোবাসার কথা বলতে পারিনি!’ বিপাশা ওর কাছ থেকে জবাব আশা করেছিল, কিন্তু কিছু বলেনি। বিপাশাকে জবাব না দিয়ে এক ধরনের মানসিক কষ্ট ও পেয়ে আসছে। আজ পূর্ব লন্ডনের একটি রেস্টুরেন্টের ভেতরে বিপাশার সামনে বসে ভীষণ অপরাধী লাগছে বিপুলের। সেই গ্লানি ওর বোধে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিপাশা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আরে, আপনি দেখি সত্যি সত্যিই দেবদাস বনে গেছেন! সেই কখন থেকে শুধু আমাকে দেখছেন। মুখে কথা নেই। কেন?’
‘না, আমি ভাবছি।’
জবাব দিল বিপুল। চোখের দৃষ্টি নাচিয়ে বিপাশা বলল,
‘আপনি তো ভাবতে ভাবতে ফুরিয়ে যাবেন একদিন! জীবন তো এমন নয়! হাত বাড়িয়ে ধরতে শিখুন!’
বিপাশার কথা শুনে হেসে ফেলল বিপুল। হাসিমুখে ও বলল,
‘হ্যাঁ। আমি কিন্তু এবার হাত বাড়িয়ে ধরতেই এসেছি। আমি, আপনাকে…!’
কথাটা আবেগভরা কণ্ঠে বলতে যাচ্ছিল বিপুল, মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে বিপাশা বলল,
‘রাখুন, রাখুন। অমন কথা এখন বলবেন না! আপনার আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছে!’
বিপাশার কথা শুনে বিপুলের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে ও বলল,
‘হ্যাঁ, জানি। আমি আসলে…!’
‘আসলে আপনি যথাযথ সময়টা ধরতে পারেন না। জেসমিন আপনাকে বলেছিল রাত আটটার মধ্যে রেলস্টেশনে পৌঁছতে। আপনি সেখানে পৌঁছলেন পনেরো মিনিট দেরি করে। আমি হাত বাড়ালাম, আপনি হাত বাড়ালেন না। আমি জবাব চাইলাম, আপনি জবাব দিলেন না। আমার কাছে এলেন প্রায় দেড় বছর পর। এতটা দেরি করলেন!’
‘আমার লেট হয়ে যায়! আমি কেন জানি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম!’
বলল বিপুল। কথাটা বলতে গিয়ে ওর বুকের ভেতরে মিহিন কষ্ট ছড়াল। বিপাশা বলল,
‘হতে পারে। আপনি তো অকারণে হীনমন্যতায় ভোগেন! থাক ওসব কথা। কাল আপনাকে এয়ারপোর্টে রিসিভড করতে যেতে পারিনি। আমি কাজ থেকে ছুটি নিতে পারিনি। কাজে ছিলাম বলে আপনার ফোনও ধরতে পারিনি। আজ ফোন ধরেছি। এতে খুব বেশি রাগ করেছেন কি?’
বিপাশার কথার জবাবে বিপুল বলল,
‘জানি না। কাল আমার অনেক অভিমান হয়েছিল। এখন নেই।’
‘বাহ্! আপনার মনটা অনেক উদার! আমি হলে অভিমান শুধু নয়, রাগও করতাম।’
বিপাশার কথাগুলো অন্যদিনের মতো লাগছে না। বিপুলের মনে হচ্ছে বিপাশা কেমন আক্রমণাত্মক হয়ে কথা বলছে। ওর মনে কি রাগ জমে আছে? ভাবল বিপুল। ও বলল,
‘আচ্ছা, আপনি কি আমাকে শায়েস্তা করতে লন্ডনে ডেকেছেন?’
‘না। তা কেন? আপনাকে দেখতে মন চাইছিল। দেখলাম, মনটা ভরে গেল!’
জবাবে বলল বিপাশা। কথাটা বিশ্বাসযোগ্য লাগছে না বিপুলের। ও বলল,
‘আমারও ভালো লাগছে আপনাকে দেখে।’
‘তাহলে ক’দিন লন্ডনে থাকবেন বলে ঠিক করেছেন?’
‘এক সপ্তাহ। আপনি চাইলে আরও কিছুদিন থাকতে পারি।’
বিপুল কথায় অবাক চোখের দৃষ্টি মেলে বিপাশা বলল,
‘আচ্ছা!’
‘কেন, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার?’
‘ঠিক আছে, আমার এক বন্ধু আছে, ওর নাম রাহুল সিং। পাঞ্জাবের ছেলে ও। খুব ভালো ছেলে। ভদ্র ও বিনয়ী। আর সে চটপট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। রাহুল যে কোনো সময় চলে আসবে। ও আসলে আমরা একটা ভ্রমণ প্ল্যান তৈরি করে ফেলি। কী বলেন?’
বিপুলের মন বললÑ কোথাও কি প্রলয় হচ্ছে বা মরুঝড়? সমুদ্র কি তাবৎ জল ওর চোখে ঠেলে দিচ্ছে, চোখের কোণে জল টলমল করছে কেন? বিপাশার কথা শুনে এক ধরনের জ্বালা-দহন-যন্ত্রণায় বুকের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে যেন। ও ক্ষীণকণ্ঠে বলল,
‘মানে? রাহুল কি আমার মতো আপনার বন্ধু?’
‘না। আরেকটু ঘনিষ্ঠ এবং স্পষ্ট। আপনাকে তো বলেছিলাম, লন্ডনে আমার একজন সঙ্গী দরকার। আমি একা মেয়ে মানুষ, বয়সও চব্বিশ হলো। এভাবে একা এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে থাকা যায়, বলুন?’
‘ও আচ্ছা!’
কথাটা বলে কষ্টের একটা বিশাল ঢেউ যেন সামলে নিল বিপুল। বিপাশা ওর চোখে চোখ রেখে বলল,
‘কষ্ট পাচ্ছেন না তো, বিপুল!’
বিপাশার চোখের দৃষ্টি যেন কেমন লাগল। বিপুল ওর চোখের দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি রাখতে পারল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল,
‘না, না। কষ্ট পাব কেন? এমন তো হতেই পারে!’
বিপুলের কথা শেষ হতেই লম্বা-চওড়া এক সুদর্শন যুবক এসে ওদের টেবিলের সামনে দাঁড়াল। যুবকটিকে দেখে বিপাশার চোখ-মুখ আনন্দে ভেসে উঠল। যুবকটি বিপাশাকে বলল,
‘অ্যাম আই লেট, মাই সুইটহার্ট?’
‘লিটলবিট, হানি! বাট ইটস ওকে।’
বিপাশার হাতের ইশারায় যুবক ওদের টেবিলে বিপাশার পাশের চেয়ারে বসল। বিপাশা যুবককে পরিচয় করিয়ে দিতে বলল,
‘বিপুল, দিস ইস রাহুল। অ্যান্ড রাহুল, মিট মি. বিপুল। হি ক্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। আই টোল্ড ইউ ইয়েসটার ডে এবাউট হিম। ইউ নো, রাইট?’
রাহুল বিপুলের দিকে হাত মেলাতে ডান হাত বাড়িয়ে দিল। বিপুলও ডান হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল তার সঙ্গে। এরপর ডিনারের টেবিলে ওদের মধ্যে কথাবার্তা যা হলো, তা শুধু বিপাশা ও রাহুলের কথাই ছিল। বিপুলের অবস্থা হলো ভাঙা পুতুলের মতো, ভেঙে যাওয়ার দগদগে যাতনায় নির্বাক হয়ে গিয়েছিল ও! বিপুল ওদের কথা শুনে গেল শুধু। বিপাশা ও রাহুল টানা দশ দিন ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা করে ফেলল ডিনার খেতে খেতে। নতমুখে খাবার খেতে খেতে বিপুলের মনে হচ্ছিলÑ লন্ডন শহরটা এ মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেলে ওর কষ্ট লাগবে না। এতে ওর মৃত্যু হলেও এই ধ্বংসে ও রাজি!
হিথ্রো বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে যাত্রীদের লাউঞ্জে এক বাংলাদেশি মেয়ে এসে বিপুলকে বলবে, ‘আরে, আপনি এখানে! কী আশ্চর্য ঘটনা বলুন দেখি!’ এমনটা আশা করেনি বিপুল। কিন্তু তাই হলো। মেয়েটিকে প্রথম দেখায় চিনতে পারল না ও; কিন্তু চেনাচেনা লাগছিল। মেয়েটি পরনে নীল রঙের লম্বা স্কার্ট ও হালকা হলুদ রঙের শার্ট ও শার্টের ওপর নীল রঙের ব্লেজার। গলায় বো-টাই থাকায় বিমানবালাদের মতো লাগছে মেয়েটিকে। বিপুল মেয়েটিকে চিনতে চেষ্টা করার দৃষ্টি রেখে তাকিয়ে রইল। মেয়েটি হেসে ওকে বলল,
‘আমাকে চিনতে পারছেন না! আমি ঝুমুর! আপনি আমাকে চাকরি দিয়েছিলেন। আমি জেসমিনের বান্ধবী।’
‘ও মাই গড! আপনি! এখানে?’
বিস্ময় ঝরে পড়ে বিপুলের কণ্ঠে। ও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ভীষণ স্মার্ট ও বেশ সুন্দরী দেখাচ্ছে ঝুমুরকে। ঝুমুর উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলল,
‘জ্বি, লন্ডনে এসেছিলাম। ঢাকায় ফিরছি। আপনিও বুঝি ঢাকায় ফিরছেন?’
‘হ্যাঁ, আমিও লন্ডনে এসেছিলাম।’
বলল বিপুল। ওর বিস্ময় যেন কাটতে চাইছে না। ঝুমুরের মুখের হাসি বিস্তৃত হলো। ও বলল,
‘দেখুন, কী কো-ইনসিডেন্ট! আমার জীবনে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, তাও লন্ডনে। ফিরছি যখন দেখা হয়ে গেল আপনার সঙ্গে। জানেন, আপনাকে এখানে দেখে আমার যে কী ভালো লাগছে!’
কথাটা বলার সময় ঝুমুরের দুচোখ যেন আনন্দে চিকচিক করে উঠল। বিপুল বলল,
‘কেন?’
‘আপনি ও আমি একসঙ্গে ফিরছি, তাই!’
‘আপনি কি অ্যামিরেটসের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমিও। তাহলে একসঙ্গেই ফিরছি।’
‘জানেন, আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে।’
চোখে-মুখে হাসি-উচ্ছ্বাস ছাপিয়ে যাচ্ছে ঝুমুরের। বিপুল বলল,
‘আপনাকে আমি প্রথম যেদিন আমার অফিসে দেখেছিলাম, সেদিন আপনাকে এতটা প্রফুল্ল মনে হয়নি।’
বিপুলের কথার জবাবে ঝুমুর বলল,
‘আপনাকে কী বলে বা কীভাবে যে আপনাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাব, এটা অনেকদিন ধরে ভাবছি। আমি জেসমিনকে অনেকবার বলেছিলাম যে, আপনার সঙ্গে দেখা করা যায় কি না? ও আপনাকে কিছু বলেনি?’
বিপুলকে জেসমিন বেশ কয়েকবারই ফোন করে বলেছিল ঝুমুরের চাকরিটা খুব ভালো হয়েছে এবং এ-কারণে ঝুমুর ওর সঙ্গে দেখা করতে চায়। অন্তত একবার হলেও দেখা করে নিজের হাতে রান্না করা কিছু খাবার খাওয়াতে চায়। জেসমিনও এ নিয়ে বেশ চাপাচাপি করেছিল। ও রাজি হয়নি। আবির ওর বন্ধু। একসঙ্গে কলেজ থেকে ওরা এমবিএ সম্পন্ন করেছে। আবিরদের বায়িং হাউস আছে। রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসও আছে বেশ কয়েকটি। বায়িং হাউসে সুপারভাইজার পদে ঝুমুরকে চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছিল ও। নতুন হিসেবে এ পদের জন্য ও উপযুক্ত ছিল না, তবে প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুমুরকে তৈরি করে নিয়েছে। ‘বন্ধুর অনুরোধ বলে কথা!’ এ-কথা পরে ওকে জানিয়েছিল আবির। একটি অসহায় পরিবারের শিক্ষিতা মেয়েকে চাকরিটা পাইয়ে দিতে পেরেছেÑ এটার জন্য কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করার কী আছে?Ñ ভেবেছিল বিপুল। তাই জেসমিনের ওসব কথা পাত্তা দেয়নি ও। বিপুলের চুপ থাকা দেখে ঝুমুর বলল,
‘আপনি চুপ করে আছেন যে! জেসমিন কি আপনাকে আমার কথা বলেনি?’
‘বলেছিল। আমি এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাইনি।’
‘হ্যাঁ। জেসমিনও আমাকে এ-কথা বলেছিল। যাক, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লাগছে আমার!’
বিপুল ঝুমুরকে বলল,
‘আপনি এতটা আনন্দিত হচ্ছেন দেখে আমি কিন্তু ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি! আমি আপনাকে একটা চাকরি পাইয়ে দিতে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে অনুরোধ করেছিলাম মাত্র। এতেই এত কৃতিত্ব আমাকে দিতে চাইছেন?’
বিপুলের এ-কথার জবাবে ঝুমুর দমে গেল না। ও বলল,
‘আপনার কারণে আমার এমন একটি চাকরি হয়েছে। আমার পরিবারটি রক্ষা পেয়েছে। আমাদের কাছে আপনি দেবতুল্য! সত্যি বলছি!’
‘এমন কথা বলবেন না, প্লিজ! আমি বিব্রতবোধ করছি!’
‘যাই হোক, আমি যা বলছি, তা একবিন্দুও মিথ্যা নয়। এ-কথা আর বাড়াচ্ছি না। তা আপনি কি বেড়াতে এসেছিলেন লন্ডনে?’
প্রশ্নটা করে বিপুলের পাশের সিটে বসল ঝুমুর। চ্যানেল সেভেন পারফিউমের একটা মিষ্টি গন্ধ ওর ইন্দ্রীয়তে এসে লাগল। ঝুমুরের প্রশ্নের জবাবে বিপুল বলল,
‘একটা কাজে এসেছিলাম। ইচ্ছে ছিল কয়েকদিন বেড়াব। কিন্তু চলে যাচ্ছি। আপনি লন্ডনে এসেছিলেন কেন?’
‘আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে একটা কাজে এসেছিলাম। ব্যবসায়িক মিটিং ছিল। আপনার বন্ধু, মানে আমাদের এমডি আবির স্যার আসতে পারেননি বলে আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি সাত দিন ছিলাম। আজ ফিরে যাচ্ছি।’
‘আচ্ছা। ফিরে গিয়ে আবিরকে বলবেন যে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমিও ফোন করব ওকে। আপনাকে এমন পজিশনে তৈরি করার জন্য ওকে একটা বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হবে।’
বিপুল কথাটা বলে হাসলো। মুখে হাসি ধরে রেখে ঝুমুর বলল,
‘আপনাকে এমডি স্যার খুব পছন্দ করেন। একদিন স্যার আমাকে এ-কথা বলেছেন। অথচ আপনাকে আমাদের অফিসে একদিনও দেখলাম না!’
কথাটা বলে কেমন চোখে তাকালো ঝুমুর। চোখের দৃষ্টির ভাষা যেন বিপুলের ওদের অফিসে যাওয়ার কথা ছিল। বিপুল কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলল,
‘আমি গত দেড় বছর খুব ব্যস্ত ছিলাম। নানারকম ব্যস্ততা ছিল আমার। দেখি, একদিন যাব আপনাদের অফিসে।’
‘আমাকে জানাবেন প্লিজ! আপনার সেলফোন নম্বরটা কি আমাকে দেবেন?’
‘কেন জেসমিনের কাছ থেকে নিতে পারতেন না?’
প্রশ্নবোধক দৃষ্টি রেখে বলল বিপুল। হাসিমুখে ঝুমুর বলল,
‘নিতে পারতাম। কিন্তু সেটা ঠিক হতো কি না, ভেবে তা নিইনি। আপনাকে ফোন করার ইচ্ছে ছিল; কিন্তু সাহস পাইনি। তাই আজ ফোন নম্বর চাচ্ছি এবং ফোন করতে পারার অনুমতিও চাচ্ছি। দেবেন?’
হেসে ফেলল বিপুল। ঝুমুর কতটা ব্যবহারে ভদ্র ও শিষ্টাচার জানেÑ বুঝতে পারল ও। বিপুল নিজের একটা বিজনেস কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ফোন করতে পারবেন। তবে চাকরিটার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা আর বলবেন না। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে। আরেকটা কথা বলব?’
‘বলুন।’
‘আমার বাবা এখন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আমার মা খুব আপনার কথা বলেন। ওই চাকরিটা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন, আর কি। যদি কোনোদিন সময় হয় বা একটু সদয় হন, তাহলে আমাদের বাড়িতে কি আসতে পারবেন? মানে, আমি নিজের হাতে রান্না করে আপনাকে খাওয়াতে চাই। আমার মা আপনাকে দেখতে চান। কিছু মনে করবেন নাÑ কথাটা বললাম বলে।’
ঝুমুরের কথা শুনে বিপুল বুঝতে পারছে ভ্রমণযাত্রায় আরও অনেক কথা শুনতে হতে পারে ঝুমুরের কাছ থেকে। একসঙ্গে সিট না পড়লেও ট্রানজিটে তো কথা বলার অবকাশ রয়েছে। ঝুমুরের আরও কথা শুনতে হবে ওকে। বিপুল প্রথম যেদিন দেখেছিল ঝুমুরকে সেদিন শান্ত নদীর মতো মনে হয়েছিল, আজ ওকে চঞ্চলা ঝরনার মতো লাগছে। অন্য সময় হলে ঝুমুরের এসব কথা শুনতে ভালো লাগত। কিন্তু আজ এমন একটি দিন ওর জীবনে, যা গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত। বিপাশাকে হারিয়ে ফেলার অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে ও দেশে ফিরে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে ডুকরে ওঠা কান্না চোখের কোণের জলকে উসকে দিতে ব্যস্ত আর ও নিজেকে সামলে নিচ্ছে বারবার, ঠিক এমনি সময়ে ঝুমুরের চপল কথাবার্তায় মনযোগ দিতে পারছে না যেন। বিপুল ঝুমুরকে বলল,
‘আমি একটু আসছি। কেমন?’
‘আচ্ছা।’
বলল ঝুমুর। বিপুল উঠে চলে গেল স্টারবাক্স কফি স্টোরের দিকে। কফি কেনার নাম করে ও সরে এলো ঝুমুরের কাছ থেকে। মনে মনে বলল, কোনোভাবে যেন ঝুমুরের পাশে ওর সিট না পড়ে! তাহলে পুরো পথে কথার স্রোতে ভেসে যেতে হবে ওকে। ঝুমুর অপেক্ষা করতে লাগল বিপুলের ফিরে আসার জন্য। অনেক দেরি করে ফিরেও বিপুল দেখল ঝুমুর বসে আছে ওর সিটে। অন্য যাত্রীরা উঠে যাচ্ছে ফ্লাইটে। ওরা ফ্লাইটে উঠল শেষের দিকে। ওদের সিট অবশ্য পৃথক স্থানে পড়েছে। মনে মনে স্বস্তি পেল বিপুল।
নয়.
মায়ের কথায় বিপুলকে যেতে হলো হাইকোর্টে। পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডে একটি চারতলা বাড়ি ওর বাবা কিনেছিলেন প্রায় বিশ বছর আগে। বিশ বছর পর একজন ওয়ারিশ দাবি করে মামলা করেছে। মামলাটি নিম্ন আদালত ও জজকোর্টে জয়লাভ করলেও তা এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। মামলার কাজ ওর বাবাই তদারকি করেন। মামলার কাজ নিয়ে ওদের আইনজীবী মীর শওকত আলীর সঙ্গে ওর কখনও এ নিয়ে আলোচনা হয়নি। হাইকোর্টে আইনজীবীর চেম্বারে বাবার সঙ্গে কয়েকবার গিয়েছিল বিপুল। আজ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ওর মা বললেন,
‘কোথায় যাচ্ছিস? আজ তো অফিসে যাবি না। এখন বের হয়ে কোথায় যাবি?’
‘মা, আমি একটু বসুন্ধরা মলে যাব। কাজ আছে ওখানে। কেন?’
‘ঠিক আছে, যাওয়ার পথে হাইকোর্ট হয়ে যা। আমাদের আইনজীবী মীর শওকত আলীর সঙ্গে দেখা করে, তার কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ নিয়ে নিবি। বাসায় এলে তোর বাবাকে দিতে হবে। আইনজীবীর চেম্বারে গেলেই হবে। তারা মামলার কাগজগুলো ফাইল করে রেখে দিয়েছেন। তুই গেলেই তা তোকে দিয়ে দেবে। চেম্বার চিনিস তো?’
‘চিনি, মা। আমি সেখানে আগেও গিয়েছি।’
‘তাহলে ওখানে আগে যা। কাগজগুলো নিয়ে নিবি। রাতে তোর বাবাকে দিবি।’
‘আচ্ছা। কাগজ যা আছে নিয়ে নেব। তুমি চিন্তা করো না।’
এ-কথা বলে বেরিয়ে পড়ে বিপুল। ও মাকে বলতে পারেনি বসুন্ধরা মলে যাচ্ছে জেসমিনের অনুরোধে। ওখানে ঝুমুরও থাকবে। আজ সকালে জেসমিন ফোন করে খুব অনুনয়ভরা কণ্ঠে বলেছিল,
‘বিপুল, আপনি একবার আসুন না! ঝুমুর আমাকে এত করে ধরেছে যে আপনাকে খাওয়াবে। ওদের বাসায় যাবেন নাÑ এটা বলেছি। তখন ও বলল, ঠিক আছে বসুন্ধরা মলের ফুড কোর্টে খাওয়াবে। আমি জানি, আপনি আসতে রাজি হবেন না। তবু ওকে কথা দিয়েছে, আজ আপনাকে যেভাবে পারি নিয়ে আসব।’
জবাবে বিপুল বলেছিল,
‘আশ্চর্য! আমাকে নিয়ে তোমাদের এত আগ্রহ কেন বুঝি না! বিশেষ করে, তোমার বান্ধবী ঝুমুর কেন আমাকে নিয়ে এত উচ্ছ্বসিত? আমি একটা চাকরির ব্যবস্থা করেছি, এতে আমারও ভালো লাগছে। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা করে খেতে হবে কেন? তোমার কোনো দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য নেই তো!’
এ-কথার জবাবে জেসমিন হেসে ফেলেছিল। ও জবাবে বলেছিল,
‘যদি থাকেও, অন্যায় কিছু করছি না তো! আপনি একবার এসে আমাদের সঙ্গে এক বা দু-ঘণ্টা সময় কাটালে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? কতটা ক্ষতি হবে আপনার শুনি? আমরা কি একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিইনি?’
‘সেদিন আর আজকের দিন কি এক? আমরা কি সেই আবেগ নিয়ে সময় পার করতে পারি?’
বলেছিল বিপুল। জেসমিন ছাড়েনি, ও বলেছিল,
‘আপনি একদিন দেখা করলে পৃথিবীটা দুলে উঠবে না! আপনি যদি আজ না আসেন, ভাবব আপনার মধ্যে এক ধরনের অহঙ্কার তৈরি হয়েছে। যা মোটেই সমর্থন করা যায় না।’
এ-কথায় সংকোচবোধ করেছিল বিপুল। ওর বাবা আজ অফিস সামলাবে এবং ওর ছুটির দিন বলে ঘুরে বেড়াবেÑ এমনটাই ঠিক করেছিল। এখন ভাবল, ঠিক আছে এক-দু ঘণ্টা না-হয় জেসমিন আর ঝুমুরের সঙ্গে কাটাবে। ও জেসমিনকে বলেছিল,
‘ঠিক আছে। তোমরা থেকো। দুপুরের দিকে বসুন্ধরা মলে আসছি। দেখা হবে।’
জেসমিন খুব খুশি হয়েছিল ও রাজি হওয়ায়। অথচ একটা সময় ছিল ও বেশি খুশি হতো জেসমিন ওর সামনে এলে। সময়ের সঙ্গে কত কিছু পাল্টে যায়! আইনজীবী মীর শুওকত আলীর চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর ওর নিজের গাড়ির সামনে দাঁড়াতে ওর ফোনটা বেজে উঠল। ও দেখল অচেনা এক নম্বর থেকে ফোন এসেছে। বিপুল ভাবল এটা হয়তো ঝুমুরের সেলফোন নম্বর। ও ফোনটা রিসিভড করে বলল,
‘হ্যালো…!’
‘গাড়িতে উঠেই তা ছেড়ে দেবেন না। আমি কাছেই আছি। আসছি। আমার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন।’
কথাটা বলল বিপাশা। বিপাশার কণ্ঠ শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল বিপুল। এ কি করে সম্ভব? বিপাশা কি বাংলাদেশে চলে এসেছে? কেন? ও হাইকোর্টেই বা কেন? ওকে বিপাশা দেখল কীভাবে? প্রশ্নগুলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো ওর অনুভূতিতে তোলপাড় শুরু করে দিল। ও এতটা স্তম্ভিত হলো যে, গাড়ির ভেতরে প্রবেশ না করে দাঁড়িয়ে রইল। ওর গাড়ির পেছনের দরজা খোলা। গাড়ির খোলা দরজার সামনে ও দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড পর বিপুল দেখতে পেল বিপাশা ওর দিকেই আসছে। বিপাশার মুখে কেমন রহস্যময় ভুবন ভুলানো হাসি। বিপাশা পরেছে কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট। গলায় বো-টাই। হাইকোর্টে ব্যারিস্টার-উকিলরা যে পোশাক পরে। এই পোশাকে বিপাশাকে অন্য এক রূপ এনে দিয়েছে। ঝড়ের মতো বিপাশা ওর সামনে এসে বলল,
‘খুব অবাক হলে মানুষ পাথরের মূর্তির মতো হয়ে যায় দেখছি! গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসুন। আর হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে না!’
কোনো কথা বলতে পারল না বিপুল। ও গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসল। অন্য প্রান্ত দিয়ে বিপাশা প্রবেশ করল গাড়িতে। গাড়ির চালক মজনু মিয়াকে বিপুল আগেই বলে রেখেছিল বসুন্ধরা মলে যাবে। তারা গাড়িতে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল। বিপুলের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চাইছে না। বিপাশা বিপুলের বিস্ময় কাটাতে যেন বলল,
‘বিপুল সাহেব, আই নো, ইউ শকড্! বাট, এবার ধাতস্থ হোন। আই মিন, বি ইজি!’
‘না, মানে…!’
বলে ধাতস্ত হচ্ছে বিপুল। বিপাশা মুখে হাসির পাপড়ি মেলে রেখেছে। ও বলল,
‘আপনি অনেক চমকে গেছেন, হতবাক হয়ে গেছেন, জানি। এতটা চমকে গেছেন যে কথা বলতেও পারছেন না। কিন্তু আমার কয়েকটি প্রশ্নের জবাব অন্তত দিন তো!’
বিপুল সত্যিই হতবিহ্বল হয়েছে। ও বিহ্বলতার রেশে বলল,
‘কী প্রশ্ন? বলুন।’
‘প্রথম প্রশ্ন, আপনি আমাকে না বলে লন্ডন থেকে ঢাকায় চলে এলেন কেন? দেখা হওয়ার পরের দিন আপনি লাপাত্তা হলেন। জানতে পারি কেন পালিয়ে এলেন?’
বিপুল স্বাভাবিক হচ্ছে নিজের ভেতরে। বিপাশাকে হাইকোর্টে দেখে একটা আলোড়ন সামল দিতে হচ্ছে ওকে, এখন প্রশ্নের জবাবও দিতে হচ্ছে। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘যে প্রত্যাশা আর স্বপ্ন নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলাম, তা যখন কাচের ঘরের মতো ভেঙে খান খান হয়ে গেল, তখন কি লন্ডনে থেকে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে থাকব? আপনি কি সেই দৃশ্যটা দেখলে খুশি হতেন?’
কথাটা বলার মধ্যে যেন মেøচ্ছ প্রকাশ পেল। বিপুল তাকালো বিপাশার মুখের দিকে। বিপাশা চোখ বড় করে বলল,
‘না, তা হতাম না। তবে আপনি এতটা শকড হবেন, ভাবতে পারিনি! আবার আপনি আমাকে না জানিয়ে চলে আসায় উল্টো আমি শকড হয়েছি। আর দেখুন, দুদিনের মধ্যে আমিও ঢাকায় চলে এলাম।’
বিপাশার ঢাকায় আসাটাও বিস্ময়করÑ মনে মনে মানল বিপুল। ও বলল,
‘আপনি ঢাকায় কেন, সেটা সত্যিই বুঝতে পারছি না। তাও আবার হাইকোর্টে! ঠিক এই সময়ে! আপনাকে দেখে আমি ভীষণ বিস্মিত হয়েছি!’
বিপুলের কথায় বিপাশা বলল,
‘ঐ যে বললাম, আপনাকে পাল্টা শকড দিতে আমি ঢাকায় এলাম! আপনি শকড দিতে পারেন, আমি কি পারি না?’
কথটা বলে রহস্যময় হাসিটা মুখে ফুটিয়ে তুলল বিপাশা। বিপুল বলল,
‘তা বলুন, কীভাবে আবার নতুন করে শকড করবেন? আমি তো অলরেডি শকড! ভেঙে চৌচির! ভেঙে অণুতে পরিণত হয়েছি! আমাকে আর কতটা ভাঙবেন?’
কথটা বলে বিপুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওর কথার জবাবে বিপাশা বলল,
‘বেশ ভেঙেছেন তো! কিন্তু একটা শব্দও করলেন না। একবার জানতে চেষ্টাও করলেন না, কেন আমি আপনাকে ভেঙে দিলাম। জানতে ইচ্ছে করেনি আপনার?’
বিপাশার এ প্রশ্নে চুপ করে রইল বিপুল। জানতে ইচ্ছে করার চেয়ে অভিমানই বেশি হয়েছিল ওর। অভিমানের চেয়ে বেশি হচ্ছিল কষ্ট। বিপুল বলল,
‘অনেক কষ্ট পেলে মানুষ অনেক কিছু সঠিকভাবে ভাবতে পারে না। আমারও তেমন হয়েছিল।’
‘তাই পালিয়ে এলেন?’
‘আপনি আমার জায়গায় হলে কী করতেন? বলুন তো!’
জানতে চাইল বিপুল। বিপাশা মুচকি হেসে বলল,
‘আমি বিপাশার হাত ধরে বলতাম, আমি তোমার জন্য এতদূর ছুটে এসেছি, এই কষ্ট পাওয়ার জন্য নয়!’
কথাটা বিপাশা কেন বললÑ বুঝতে পারল না বিপুল। ওর ঘোরলাগা বাড়ছে। কথাটা শুনতে ওর ভালো লাগল। ও বলল,
‘এ-কথা বললে বিপাশা কী বলত বা করত?’
জবাব দিল বিপাশা,
‘বিপাশা ভাবত যে কীভাবে বিপুলের এই কষ্ট লাঘব করা যায়। প্রথমে ভাবত বিপুল সত্যিই বিপাশার জন্য কষ্ট পাচ্ছে কি না? যদি এটা সত্যি বলে মনে করত, তখন বিপাশা তো নিষ্ঠুর নয় যে একজনকে কষ্টে ভাসিয়ে দেবে!’
‘আচ্ছা, আপনি খোলাখুলি করে কথা বলুন না! আমি খুব ধন্দে পড়ে যাচ্ছি!’
বিপুলের কথায় বিপাশা হেসে বলল,
‘আপনি নিজের ধন্দ দূর করতে আমাকে প্রশ্ন করুন। আমি জবাব দিচ্ছি। আশা করি, জবাব পেলে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে না।’
বিপাশার কথাটা ভালো লাগল বিপুলের। ও বলল,
‘আচ্ছা, প্রথমে বলুন আপনি ঢাকায় কেন? হাইকোর্টেই বা কেন?’
‘আমি ব্যারিস্টার হয়েছি, এটা জানেন। আমি ঢাকায় এসেছি এখানকার হাইকোর্টে ল’ প্র্যাকটিস করতে। এখানে আমার ব্যারিস্টারির কাগজপত্র জমা দিলাম আজ। ব্যারিস্টার হিসেবে আমি ইংল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশে ল’ প্র্যাকটিস করতে পারব। ঢাকায়ও আমি কাজ করতে চাই। বুঝতে পেরেছেন?’
‘ও আচ্ছা! ঈরিস্কার হলো। এবার বলুন, রাহুল সাহেব কোথায়? তিনিও কি এসেছেন?’
‘না। রাহুল লন্ডনের একটি ড্রামা দলে কাজ করছেন।’
‘আপনার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?’
‘একদিনের জন্য অভিনয় করার জন্য আমি তাকে ভাড়া করেছিলাম। যেদিন আপনার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে দেখা হলো, ঐদিনই তার অভিনয় ছিল। এ-জন্য তাকে আমি পাঁচশ’ পাউন্ড দিয়েছি। এরপর আর তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই।’
কথাটা বলে ফের মুখে রহস্যের হাসি ধরে রাখল বিপাশা। অবাককণ্ঠে বিপুল বলল,
‘মানে?’
‘মানে কী? প্রশ্ন করুন।’
‘রাহুলকে আপনি ভালোবাসেন না?’
‘আমি কি এ-কথা লন্ডনে আপনাকে বলেছিলাম?’
‘না, বলেননি। তবে…!’
‘তবে কী? আপনি ধরে নিয়েছিলেন, এই তো?’
‘হ্যাঁ। আমি, আমি…।’
বিপাশা মুচকি হেসে বলল,
‘আপনি একটা বুদ্ধু! চোখের সামনে যা দেখবেন, সেটাই সত্য বলে ধরে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। জানতে চেষ্টা করবেন নেপথ্যে কিছু আছে কি না।’
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বিপুল বলল,
‘নেপথ্যে কী ছিল বলুন তো!’
বিপুলের কণ্ঠে অনুরোধ ঝরে পড়ে। বিপাশা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
‘আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি ভীষণ শকড হয়েছিলাম। তাই আপনাকেও পাল্টা আঘাত দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলাম প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা কেমন লাগে!’
বিপাশার কথার জবাবে ও বলল,
‘আমি আপনাকে প্রত্যাখ্যান করলাম কীভাবে! আমার মতামত জানতে চেয়েছিলেন, আমি ধন্দে-সংকোচে ডুবে গিয়েছিলাম। যখন মতামত জানাতে ফোন করলাম, দেখি আপনি চলে গেছেন লন্ডনে। এরপর কতভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম, আপনি রেসপন্স করেননি। আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাননি। ফেসবুকেও বন্ধুত্ব গ্রহণ করেননি। বলুন, ঠিক বলছি কি না?’
‘ঠিক বলছেন। আমি তা করেছি অনেক কষ্ট পেয়ে। আমি আপনার জন্য ঢাকায় এসে প্রপোজ করলাম, আর আপনি তখনও কিছু বললেন না। এরপরও বলতে সময় নিলেন। যখন কোনো জবাব পেলাম না আপনার, তখন আমার মনের অবস্থা কী হতে পারে? ভেবেছেন কখনও? আমি অনেক কষ্ট চেপে একা লন্ডনে চলে যাই। কষ্ট চেপে তবু ভাবতাম আর স্বপ্ন দেখতাম, আপনি চলে এসেছেন লন্ডনে; কিন্তু তা হয়নি। দেড় বছর পর আমাকে ফোন করে আপনাকে বলতে হয়েছে, লন্ডনে আসুন।’
‘তা ঠিক। কিন্তু …!’
কণ্ঠে জড়তা চলে এলো বিপুলের। ওর চিন্তার মধ্যে কেমন রোদছায়ার খেলা চলছে। বিপাশা কথার জবাবে কী বলবে, বুঝতে পারছে না। ওর মৌনতা ভেঙে বিপাশা বলল,
‘আপনার দেবদাস হওয়ার খবরটা জানতে পেরে মনের ভেতরের অভিমান গলে গেল। যখন শুনলাম দাড়ি-গোঁফ রেখে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছেন দিন দিন। কোথাও ঘুরতে যান না। কথা বলেন কম। বাড়ি আর অফিসে শুধুমাত্র আপনার মনোযোগ, তখন নিজের মনকে বুঝালাম।’
‘কার কাছ থেকে এসব জানলেন? আশ্চর্য!’
‘বাহ রে, আপনার বাড়িতে আমার একটি বিশ্বস্ত সোর্স আছে না। আমার খুব প্রিয়জন, আপনার মা!’
‘মা’র সঙ্গে আপনার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল?’
অবাক চোখ তুলে জানতে চাইল বিপুল। বিপাশা বলল,
‘সব সময় ছিল। এই আজও আপনি হাইকোর্টে আসছেন, সেটাও আমি তার কাছ থেকে জেনেছি। আপনাকে তিনি কৌশলে হাইকোর্টে পাঠিয়েছেন। আমি যে ঢাকায় আসছি, সেটাও তিনি জানতেন। এখানে এসে পৌঁছেছি জানেন। আমার সঙ্গে আপনার যেন দেখা হয়Ñ এ-কারণে আপনাকে হাইকার্টে পাঠিয়েছেন আপনার মা। সব সাজানো ঘটনা, আর কী! এমন কী, লন্ডনে অভিনেতা হায়ার করে আমার প্রেমিক বানিয়ে আপনাকে যে কষ্ট দিয়েছি, ওটাও তিনি জানেন!’
কথাটা বলে হাসতে লাগল বিপাশা। বিপুলের ভেতরে অভিমানের বরফ গলে স্রোতের ফল্গুধারা বইতে শুরু করল। ও বলল,
‘কী আশ্চর্য! কী অবিশ্বাস্য কথা শুনছি!’
‘আরও অবিশ্বাস্য ঘটনা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য?’
‘কী বলুন তো! আমার ভেতরটা কাঁপছে, জানেন?’
‘ভয়ে, না-কি আনন্দে!’
‘বিস্ময়ে কাঁপছে।’
‘আর কাঁপতে হবে না। এখন বলুন, আমরা কোনো দিকে যাচ্ছি।’
এ-কথায় সম্বিত ফিরে এলো যেন বিপুলের। ও বাইরে তাকিয়ে দেখল বাংলামটর এলাকায় গাড়ি চলে এসেছে। ও বলল,
‘গাড়ি তো দেখছি বসুন্ধরা মলের কাছাকাছি চলে এসেছে!’
এ-কথা শুনে বিপাশা বলল,
‘মল যখন সামনে, চলুন ওখানে যাই। আমি লাগেজ নিয়েও আসিনি। অনেকটা এক কাপড় পরে চলে এসেছি বলতে পারেন। জরুরিভাবে ঢাকায় চলে আসতে হয়েছে আপনার জন্য। মলে গিয়ে কিছু কাপড় কিনতে চাই।’
বুকের ভেতরটায় এবার ভূমিকম্প শুরু হলো। বসুন্ধরা মলে জেসমিন ও ঝুমুর অপেক্ষা করছে ওর জন্য। যদি ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তখন বিপাশা কী ভাববে? কথাটা ভাবছে বিপুল। বিপাশা বলল,
‘ভয় পাচ্ছেন মনে হচ্ছে? ভয় পেলেও আপনাকেই শাড়ি-কাপড়, প্রসাধনসামগ্রী সব কিনে দিতে হবে আজ। আপনার নিজের জন্যও কিছু প্রয়োজনীয় পোশাক কিনতে হবে।’
বিপাশার এ-কথাটাও রহস্যময় লাগছে। বিপুল বলল,
‘আমার জন্য কী কিনব, বাসায় তো জামাকাপড় আছে।’
‘শেরওয়ানি আছে?’
‘না। শেরওয়ানি কেন কিনতে হবে?’
‘ওটা লাগবে। আমার লাগবে বিয়ের শাড়ি, বুঝলেন?’
‘না। কী সব বলছেন আপনি? বুঝতে পারছি না! মাথা চক্কর দিচ্ছে আমার! রসিকতা করবেন না, প্লিজ!’
বিস্ফোরিত চোখের দৃষ্টি মেলে বলল বিপুল। ওর বুক সত্যি দুরুদুরু করছে। বিপাশা হেসে বলল,
‘নিজের বিয়ে নিয়ে রসিকতা করব!’
‘বিয়ে! কার সঙ্গে?’
‘আপনার সঙ্গে। আপনার আপত্তি আছে? থাকলে এক্ষুণি বলুন।’
এমন প্রশ্নের জবাবে বিপুল কী বলতে পারে। ও হেসে ফেলল। বলল,
‘আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না! সত্যি আমাকে বিয়ে করবেন?’
রিনরিনিয়ে হেসে উঠল বিপাশা। হাসির দমকে ও বলল,
‘আপনার সঙ্গে আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত!’
‘বলেন কী!’
‘হুম। এই আলোচনাটা অনেকদিন আগেই আপনার মা-বাবার সঙ্গে আমার মা-বাবার কথা হয়ে আছে। অবশ্য আমার সম্মতিতেই তা হয়েছে। আপনার সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি আপনার মা-বাবা। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপনার সব খবরাখবর আমি পেতাম আর আপনাকে লন্ডনে পাঠানোর পরিকল্পনায় আপনার মাও ছিল। ভেবেছিলাম, পরীক্ষা শেষ হয়েছে যখন, লন্ডনে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকদিন ঘুরে এখানে এসে বিয়ে করব। সেটা তো আর হতে দিলেন না আপনি! আমাকে না বলে রাগ করে চলে এলেন। ভয় পেয়ে আমিও দুদিন পর ফ্লাইট ধরলাম। কাল সকালের ফ্লাইটে আমার মা-বাবা ও ভাই দিল্লি থেকে আসছেন ঢাকায়।’
‘কাল?’
‘হুম, কাল। কাল আমাদের বিয়ে! আজ আপনাদের বাড়িতে সাজসজ্জার কাজ চলছে। আমার শাশুড়িকে একটা ফোন করলে জানতে পারবেন, আপনাদের বাড়িতে এতক্ষণে আলোকসজ্জা লাগানো হয়ে গেছে হয়তো!’
‘সত্যি! এমন হয় কখনও!’
‘এমন হয় কি না, জানি না। আমাদের এমন বিয়েই হচ্ছে!’
‘বাহ্!’
‘তাই তো এখন বিয়ের শাড়ি, বরের শেরওয়ানি কিনতে চাচ্ছি। বুঝতে পারছেন?’
‘এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে সবকিছু! আহা, এত নাটকীয়তা! আমার বিয়ে, আমিই জানি না! কনে বরকে জানাচ্ছে বিয়ের খবর, আশ্চর্য!’
খুশিতে গদগদ ভাব প্রকাশ করে বলল বিপুল। বিপাশা চোখের দৃষ্টি নাচিয়ে বলল,
‘তাতে কি খারাপ লাগছে? সময় এখনও আছে, অমত থাকলে বলে দাও। ফ্লাইট ধরব, আর চলে যাব। আমি কিন্তু তোমাকে জোর করে বিয়ে করছি না, কথাটা মনে রাখবে!’
আপনি থেকে ‘তুমি’ সম্বোধন করতে ভীষণ ভালো লাগল বিপাশার। এক ধরনের আবেশ ছড়িয়ে যাচ্ছে ওর মনে। জবাবে বিপুলও ‘তুমি’ সম্বোধন করে বলল,
‘জোর করে বিয়ে করলেও বাধা দিচ্ছে কে, শুনি! তুমি আমার বউ হবে, এটা যে কী আনন্দের, কত বড় পাওয়াÑ সেটা বলে বোঝাতে পারব না!’
‘বলেছিলাম না, প্রকৃতির রহস্য আছে। নইলে আমার কানের দুল তুমি কুড়িয়ে পাবে কেন, আর আমিও বা তোমাকে পাব কেন?’
‘তাই তো! আমাদের ভালোবাসার গল্পটা কেমন অন্যরকম, তাই না?’
বলল বিপুল, জবাবে বিপাশা বলল,
‘যদি তাই মনে করোÑ আমাদের ভালোবাসার গল্পটা লিখে ফেলো।’
‘গল্পের কী নাম দেব?’
জানতে চাইল বিপুল। বিপাশা বলল,
‘নাম দিবেÑ যে হাওয়ায় রেণুর গল্প।’
‘হ্যাঁ, সত্যিই তো, আজ থেকে রেণুর গল্প এখানকার হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে!’
রেণু বলল,
‘হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে না, হাওয়ায় গল্প লেখা হচ্ছে!’
এ-সময় বিপুল বিপাশার একটি হাত নিজের দু-হাতে তুলে নিল। বিপাশা ওর মাথাটা নির্ভরতার আশ্বাসে রাখল বিপুলের কাঁধে। কিছুক্ষণ পর ওদের গাড়ি এসে থামল বসুন্ধরা মলের সামনে। বিপুলের বুকের ভেতরটা রেণুর সৌরভে টালমাটাল!