মিথ্যাগুলোর নন্দন মুখশ্রী

মিথ্যাগুলোর নন্দন মুখশ্রী

 Author: দর্পণ কবীর  Category: কবিতা  Publisher: অনুস্বর পাবলিকেশনস্  Published: August 13, 2020  ISBN: 3214569871236 More Details
 Description:

উৎসর্গ: লেখকের কথা

সূচিপত্র

মিথ্যাগুলোর নন্দন মুখশ্রী         দেয়াল ভেঙে যাক

আমাদের কান্না                           আগ্নেয়গিরি

কী আশ্চর্য সম্পর্ক                     তোমার আঘাত

আঁধার ওভাবেই থাক                  তুমিও হারোনি

এলিয়েন                                       কল্পনা ও স্বপ্ন

অরণ্যে পূর্ণিমা উৎসব                 ভোট

বেশ আছে                                   সেই দীর্ঘশ্বাস

প্রবাহমান নদী                             নিজের আয়নায়

সরকার                                        সবুজ আকাশ

কান্নার স্বাধীনতা চাই                   আসুন ঘৃণা করতে শিখি

আপনারা                                     দুঃখ বিলাস

জলভেজা কবিতা                       রোদনভরা বসন্ত

কুহক রাতের সমর্পণ                  আমার কবিতাগুলো

সত্য স্বীকার                                 কবির ছবি

মায়াবী মিথ্যেগুলো                     প্রেমের সহজ মানে

স্পর্শের গল্প                                 বিলাসী গাঙচিল

পদ্মফুল                                       ব্যর্থ প্রেমিক

নদীর গল্প                                     জুঁই ফুলের দুঃখ

ভাঙন                                          একই পথ

প্রায়শ্চিত্ত                                    ছায়া ও মায়া

কাব্যকথন                                   অভিনয়

কী আশ্চর্য                                   ধুম্রজাল

যবনিকা টানতে                           কবিতার ছত্র

আমার কোন জীবন নেই            মৃত্যু প্রলয়

দুঃখ এবং জাতিসংঘ                   আরেকটি জীবন চাই

নীরব কবি                                    রাজি

যাসনে থেমে                               স্রষ্টা

অন্তরের কথামালা                      ভুল

আসন্ন আলোর গান                    হলুদ শার্টের নিরুদ্দেশ বোতাম

অসুর বধের মন্ত্রণা                      তুলনা

কবি ও ঈশ্বর                               নক্ষত্র গুনি

ধূলোর আস্তরণ                           শহরের গল্প এবং আমি

দৃষ্টিভ্রম                                         অসমাপ্ত গল্প

আমাকে কে থামায়                     বায়না

বৃষ্টি দুঃখ ভেজায় না                    মুখ বুঁজে আছি

কবির কাছে                                 দুরন্ত বালক

দেয়াল ভেঙে যাক                       রাষ্ট্র ও বাতিঘর

বেহুলা বিরহ                                 কান্নার আশ্রম

যা দেখি                                         দুঃখ বিলাসী

জেনে রাখো                                  এমন মোহ আমি চাইনা

একই কথা                                     যা ভাবতাম

সেই যে থামলেম                           সাপুড়ে ও সাপ

তোমার মঙ্গল হোক                      একদলা নিরেট পাপ

গোপন সিন্ধুক                               তাইত আকাশ নীল

সেই ছেলেটি                                  অশ্রুজলই কবিতা

আমি আছি আগের মতো             আলোর কৈফিয়ত

সেই বিকেল আর কোনদিন আসেনি         কবিতা

নন্দিত ভোর                                   কথাগুলো

মেঘ বৃষ্টি রোদ                                পাহাড়ের গল্প

তোমার কাছে অনুরোধ                 জীবন বড় অদ্ভূত

অসুখ                                              পথ ও তুমি

গল্প ও তুমি                                      আকাশের নক্ষত্র

ডুবে আছি                                       কথা ও সম্পর্ক

কোথায় তোমার দেশ                      ইচ্ছে পাখি

একুশে ফেব্রুয়ারি                            তফাৎ

আলো আঁধার                                   তুমি তখন কোথায় ছিলে

একটি ভুলই পারিজাত                    সুবর্ণ রেখা

                বোকা পথ                                        নামকরণ
                যেভাবে পাশাপাশি                          তুমি জানো না
                বসন্ত নয়                                          অবহেলা

মিথ্যেগুলোর নন্দন মুখশ্রী

 

অচিন বৃক্ষের মতো এক সত্য একদিন আমাকে
স্বপ্নঘোর থেকে জাগিয়ে বলেছিল, আমার মিথ্যেগুলো
ফাগুন হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে তোমার
সামনে আমি যেন একবিন্দু সত্য হয়ে দাঁড়াই।
আমি ফুলের পরাগ মুঠোয় নিয়ে ফাগুনের
অন্তর্গত ব্যাঞ্জনায় কবিতার তরল মেখে
দেখেছি এক ধরনের কুহক ওখানেও আছে।
আরও দেখেছি, যে অশ্রুজল প্রত্যাখানের দহনকে
বিরহের লাবণ্য মাখিয়ে রাখে, তা ঘৃণাকেও
দিতে পারে উল্টো রূপ! মিথ্যে নিংড়ে নিতে পারে
প্রেমের অবচেতন সত্য! আমার কথা হলো
তোমার কলহাস্যের স্বরলিপি!

সত্য হবো বলে আমি তোমার সামনে যেদিন
দাঁড়িয়েছিলাম, সেদিন পৃথিবীতে কোন ফুল ঝরেনি,
নদীগুলো দূষণ সহেছে মুখ বুজে আর নাগরিক
জৌলুস হার স্বীকার করে বলেছে,
সত্যের মতোই সুন্দর আরণ্যক জীবন! তুমি
আমার চোখে চোখ রেখে সেদিনও বিভ্রম খুঁজে
পেলে! তুমি ছায়ায়-ছায়ায় পারিজাত ছড়িয়ে
প্রেমকে আয়না করে নিজেকে দেখে নিচ্ছিলে বারবার।
আমি তোমাকে সতর্ক করে বলেছিলাম, ছায়ারও
বিভ্রম আছে, মায়াও কখনও কখনও খোঁজে
মিথ্যের মিথ! কিন্তু সেদিন তোমার চোখের কোণে

আমি কোন রঙধনু দেখতে পেলাম না!

অন্য সকলের মতো তুমি আলো, ছায়া, সত্য, সুন্দর,
জয় ও প্রেম চেয়েছিলে। বলেছিলে, বেঁচে থাকার সোপান
বা জীবনের মহিমা নিহিত এখানেই। কী জানি কেন, আমি
রোদের সঙ্গে কানামাছি খেলে ছায়াকে দিয়েছি দূরে
ঠেলে, কবিতার নামে যা লিখেছি, তা ছিল এলেবেলে!
নির্মোহ চিত্তে আমি নিজের হাতেই লিখেছি নিজের সব
পরাজয়, তারপরও তুমি অচিন বৃক্ষ হয়ে আমার
সামনে এসে ভেঙে দাও স্বপ্নঘোর। আমার পাশে
আর কেউ নেই, শুধু আমার মুখোমুখি দেখি
বেশ পরিপাটি মিথ্যেগুলোর নন্দন মুখশ্রী!

 

দেয়াল ভেঙে যাক

পেছনের দিনগুলো দেয়ালের মতো আড়াল
তুলে অনড় দাঁড়িয়ে আছে! ওখানে
কুয়াশার চাদর আর স্মৃতির কীর্তন থাকার কথা।
দিনেদিনে কখন যে দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে টের পাইনি!
যদি দেয়ালগুলো পেরিয়ে যেতে পারতাম, শুনতে পারতাম
তোমার আকুলতার বিভাস-রাগ নিংড়ানো গান।
এতদিন গানটি শোনা হয়নি বসন্ত রোদন
ভেবে। যে কথা পাহাড়ের একগুঁয়েমী মৌনতা মনে করে
উপেক্ষিত ছিল, ঐ কথাও শুনে নিতাম।

ভেবেছিলাম, দিনগুলো হারিয়ে যাবে অতীত নামকরণে,
ফের চাইলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে, তোমার
না বলা কথাগুলোর দায়মুক্তি হতে। কথাগুলো
পুড়ে নদী হলো, জলের কাব্য ডানা মেলে উড়ে গেল। শুধু
তুমি দেয়ালে ঠেস দিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছ!

একদিন দেয়াল ভেঙে যাক, মনে-প্রাণে
চাই আমি। বজ্রাঘাতে পুড়ে যাওয়া
গাছ, ফের হোক তোমার অন্তর্যামী!

 

আমাদের কান্না

আমাদের কান্নাগুলো বুঝি রোদের উল্টোপিঠ?
চোখের জলে কি হিরন্ময় আয়না দেখা যায়?
তাহলে কান্নার রঙ বদলে দিতে হাসির
স্প্রে করুন, গোলাপের বনে এমন এক রঙ-মেদুর
ছবি টানিয়ে দিন, যেন মনে হবে সমুদ্র
নতজানু বশ্যতায় স্থির হয়ে আছে। আমাদের
বুকের ভেতরে যে আবেগ থৈথৈ করে,
সে তো ভণিতা জানে না! নির্জলা অনুভবের
স্রোতে ভেসে জলের ফোঁটা হয়। আমাদের কান্নার
কোন দাবি নেই, প্রত্যাশাও নেই। আমরা
কেঁদে হালকা হওয়ার জন্যই কাঁদি!
আমাদের চোখের জলে পা ভিজিয়ে আপনারা
হাসতে থাকুন, কেবল হাসতেই থাকুন!

 

আগ্নেয়গিরি

আনন্দ আসে দমকা হাওয়ার মতো।
কিন্তু বিষন্ন মুখের ভিড়ে আমিও যে, বিষাদগ্রস্থ
পথিক! দুঃখের পুঁথি পাঠ করে সময়
চলে যায়, আর বলে যায় নরম
ভোর, সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যার
রূপছবি হয়ে কিভাবে সূর্যাস্তে
হয়ে যায় সমর্পণের গল্প।
কদাচিৎ আনন্দ আসে জলের স্রোতে
ভেসে আসা খড়কুটোর মতো,
চৈত্রের খটখটে রোদে মেঘের ছায়ার মতো।
অথচ তপ্তদাহ মনের দহন
আগ্নেয়গিরি হয়ে পুড়িয়ে দেয় সবকিছু!

হয়েছি আগ্নেয়গিরি, খুঁজি সাগর অতল!

 

কী আশ্চর্য সম্পর্ক

আমাদের দেখা হয়নি, অথচ
আমরা একে অন্যকে বড্ড চিনি। আমাদের
জানাশোনা নেই, অথচ আমাদের লেখাগুলো জানাশোনার
সেতুবন্ধন তৈরি করে বিহ্বলতার ভুবন ছড়িয়ে রেখেছে।

দেশ, মহাদেশ, বা মহাসমুদ্রের ফারাক অথবা জাত-ধর্ম-বর্ণ
নিয়ে কথা উঠলে আমাদের নিজস্ব ভাবুলতায় মৃদু
কম্পনও হয় না। এমনকি, আমরা যেভাবে ও
যে পরিচয়ে বেঁচে আছি, ওর হিসেব
টানলেও আমাদের মন বিষণ্ন হয়না। মুঠো ধরে রাখা
সম্মোহনকে তোমরা যখন ‘ভুল’ বলো, আমরা মনে মনে বলি,
ভালোবাসা। বাস স্টপেজে শেষ বাসের শেষ যাত্রী যেমন
সহযাত্রীর দৃষ্টিকে ভালোবাসে, আমরাও আমাদের
ভালোবাসা অনুভব করি ওভাবে, তবে স্বীকার করি না।
আশ্চর্য কথা, তাই না? পৃথিবীতে কখনওকখনও
আশ্চর্য কথা, আশ্চর্য ঘটনা, আশ্চর্য সম্পর্ক বা আশ্চর্য ভালোবাসা
সৃষ্টি হয়। ওসব নিয়ে কেউ ভাবে না ঠিক, কিন্তু
কবির হৃদয় কখনও পুড়ে খাঁক হয়, কখনও ভাসে শ্রাবণ ধারায়,
কখনও তার মনে অবিশ্বাস্য স্বপ্ন এসে দাঁড়ায়।

আমাদের দেখা হয়নি, ভালোবাসার কথাও হয়নি।
আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি না, আবার
ভালোওবাসি! কি আশ্চর্য, এই সম্পর্ক!

 

তোমার আঘাত

ফুলের মতো রেখেছি তোমার আঘাত।
অনুভবে এই আঘাতের কাব্যকথা,
নিজের কাছে নিঃসঙ্গতার নীরবতা,
কখনও বা বসন্তময়, না হয় জলপ্রপাত!

 

আঁধার ওভাবেই থাক

আঁধার ওভাবেই থাক
জ্বেলোনা স্মৃতির জোনাক।
সবকিছু দেখো না আলোতে এনে
কিছু কথা নির্বাক, নিয়ো তা মেনে।

বোশেখের ঝড় উঠে ভেঙে দিলে ঘর
বসন্ত অভিমানে হয়ে গেলে পর
ভোর ফিরে আসবেই, হেসো-তা জেনে।

আকাশের সব তারা না জ্বলে যদি
কূল শুধু ভেঙে যায় বিরহের নদী
ভালোবাসাকে তুমি নিয়ে যেয়ো টেনে।

তুমিও হারোনি

একটি গোলাপই তো দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু
আজও দিতে পারিনি তোমাকে। তোমার
হাতে গোলাপ তুলে দিতে না পেরে
আমি অনেকদিন বিষাদগ্রস্থ হয়ে ভেবেছি, ঈশ্বর
কোথায়, কোনখানে বসে কী করছেন!

সতেজ হাওয়ার মতো নির্মল, নদীর
জল প্রবাহের মতো উচ্ছ্বল আর দিন ও রাত্রির
যে প্রেমময় মেলবন্ধন, ওর সবটুকুই যেন
ছিল তোমাকে নিয়ে আমার অনুরাগে।
আমি তোমাকে এক পলক দেখেই নিজের বোধে
কাঁচা রঙ মেখে দিতে পারতাম
স্বপ্ন সাজানোর বিহ্বলতায় ডুবে যেতে
যেতে! কথার পাপড়ি উড়িয়ে দিতে পারতাম
নিজস্ব ভূবনে বা কালজয়ী সবগল্প লিখে
ফেলার ধ্রুপদ কল্পনার পেখম ছড়িয়ে
দিতে পারতাম! এতসব পারতাম, অথচ
তোমার মুখোমুখি হলে একটি কথাও বলতে
পারতাম না! একটি শব্দও কাঁপা ঠোঁটে
ফুল হওয়ার সাহস পেত না, হাতের মুঠোয়
গোলাপ ভাষাহীন কবিতা হয়ে যেত শুধু!

আচ্ছা, যে গোলাপগুলো আমার কিশোর বুকে
মমি হয়ে যেত, তারুণ্যের চোখে জলছবি
এঁকে দিত, সেই গোলাপ কি অভিশাপ দিতে
পারত না সময়কে? আমাদের অবুঝ প্রেম
কি ভালোবাসার হলুদ সীমানা পেরুতে পারতো না?
নাকি ওসব ছিল তোমার চপল হাসির মতো
অর্থহীন বা অনেক অর্থদ্যোতনাময়? না, গোলাপ
কখনও কারও হাতে অর্থহীন হয়ে শোভিত
হয় না। গোলাপ দিতে না পারাটা অসমাপ্ত ছোট
গল্পের মতো বিষন্নকাতর হতে পারে, তবে
প্রেমের মহিমা ঠিকই লেপ্টে থাকে!

জানি, তুমিও মনে মনে চাইতে গোলাপ, শুধু
হাত বাড়িয়ে নিতে পারোনি। গোলাপ আজও কাঁদে,
কাঁদুক! হারেনি প্রেম, হারিনি আমি, তুমিও হারোনি!

 

এলিয়েন

লক্ষ-কোটি আলোক বর্ষ দূর থেকে
লাল-নীল কক্ষপথ ধরে ভয়াল কালো গহ্বর
পেরিয়ে এক এলিয়েন আমার সামনে
এসে বলল, তোমাদের নাকি ‘দুঃখ’ নামক
ঐশ্বর্য আছে, কষ্ট নামক লাবণ্যপ্রভা!
তোমাদের দু’চোখে নাকি কখনও জল টলমল
করে, আবার সেই চোখে খুশির দ্যুতিও
ছড়ায়! আরও বলল, তোমাদের নাকি ভালোবাসা
নামক দৈবশক্তি আছে, ভালোবেসে
তোমরা হাসিমুখে মরে যেতেও পারো!
অবাক চোখে আমি বলি, দুঃখ,কষ্ট,
চোখেল জল, আনন্দ বা ভালোবাসা তোমাদের
রাজ্যে নেই বুঝি! এলিয়েন লজ্জিত কণ্ঠে
বলে, না, নেই। তাইত ছুটে এলাম
এ সব দেখতে! ও হেসে বলে, আচ্ছা, বলো তো
পৃথিবীতে সবচেয়ে রহস্যময় কি?
আমি নির্মোহ কণ্ঠে বলি, মানুষ!

 

কল্পনা ও স্বপ্ন

হলুদ রঙের ভাবুলতা এসে
সবুজ রঙের স্বপ্নের কাছে নতমুখে
দাঁড়িয়ে বলল, জীবনের শিল্পমান কি?
স্বপ্ন বলল, ‘কল্পনা!’
‘কল্পনা?’ ভাবুলতা প্রশ্ন করেই নিজের
মধ্যে কল্পনার এক রঙধনু এঁকে
নিল। আর তখুনি দেখল
স্বপ্ন সবুজ নয়, কল্পনার সাত রঙে
আঁকা বিমূর্ত ছবি!
সকালে মিঠে রোদ বিকেল হবার
প্রতিশ্রুতি রেখে বলল, কল্পনার
রঙ নিয়ে রাত মানলেও গল্পকুহক
ছড়ায় না ভোরের নির্জনতায়।

কিন্তু তুমি যখন ভোরের মতো
নির্মল হাসিতে কল্পনার বৃন্ত হয়ে
পাপড়ি মেলো, তখন সকাল-দুপুর-বিকেল
বা রাত স্বপ্নের কোরাস গেয়ে চলে।

 

অরণ্যে পূর্ণিমা উৎসব
(শিল্পী তাজুল ইমামকে উৎসর্গ)

আমি যখন অন্ধকারের অতলে ডুবে যেতে যেতে
জানলাম পরাজয়েরও মহিমা আছে, তুমি
তখন জয়ের মালা পড়ে নাগরিক সভার
করতালিতে আপ্লুত খুব।
বেমালুম ভুলে যাওয়া স্মৃতিগুলো তোমার
সামনে মুখ বাঁকিয়ে হাসতে চাইছিল বলে তুমি
‘প্রেম, একবার এসেছিল জীবনে’ গানটির
সুর ও কথাকে অভিশাপ দিতে লাগলে। আর তখুনি
তোমার সামনে উচ্চকিত প্রশংসার করতালিকে
কী কারণে যেন অনুশোচনার মতো শোনাচ্ছিল!
করতালির তো একটাই ভাষা- প্রশংসা,
অথচ তোমার মনে হচ্ছিল শ্লেষ-বিদ্রুপ!
জয়ের মালায় যে অহংকার দ্যুতিময়
হলো, তুমি ওখানে না হয়, অন্তত নিজের
কাছে আমার পরাজয়ের কথাটা বলো।
আমি হার মেনে নিয়েছি বলেই তো তোমার
জয়ের গৌরব! আমি ঝরা পাতা হয়েছি তাতে কি?
তুমি হয়ে থাকো ফুলের সৌরভ।
আমাকে আরও দিয়ো দহন-জ্বালা, অন্ধকারের
কলরব। তা হোক অরণ্যে পুর্ণিমা উৎসব।

 

ভোট

জাদুঘরের গাইড একদল শিশুকে একটি মেশিনের
সামনে দাঁড় করিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘এটি ভোটযন্ত্র!
ব্যালেট পেপারও আছে, নির্বাচনে ব্যবহৃত হয়!’
স্কুলের বালক-বালিকারা অবাক চোখ তুলে
বলল, ‘ভোট আবার কী জিনিস! ভোট কারা দেয়,
কী হয়?’ একটি বালক মাথা চুলকে প্রশ্ন করল, ‘ভোট
কি খাওয়া যায়?’ প্রশ্ন শুনে গাইড হচকিত হলো,
সে মনে করার চেষ্টা করল এ দেশে ভোট যেন কবে
হয়েছে বা ভোট হলে কী হয়! ভাবনায় ডুবে
যেতে যেতে সে দেখতে পেল খটখটে রোদের পিঠে
হিজল-তমালের ছায়া এসে পড়ছে, পুঁতিদূর্গন্ধময়
পথের দু’ধারে কাঁঠালচাঁপার সুবাস ছড়াচ্ছে,
বা জুঁই,বেলী,হাসনাহেনা ফুলের সৌরভ হতে পারে!

গাইড আরও দেখল, একটা নদীর খরস্রোত
চলে আসছে বোধের অচলায়তনে, দোয়েলের শীষ
বাজছে, ময়ূরের কেকা! কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর
ভেসে আসছে যেন কবিতার আবেশ! হারিয়ে যাওয়া গান,
স্বরলিপি, অবরুদ্ধ সুর ভোটযন্ত্রটির সামনে ‘তা ধিন
তা-ধিন’ নাচতে লাগল! এমন কখনও হয়নি, বা
এমন প্রশ্ন কখনও করেনি শিশুরা!

গাইড ভাবুলতায় ডুবে যাচ্ছে দেখে শিশুরা সমস্বরে বলল,
‘ভোট কি?’ জবাবে গাইড নিচু কণ্ঠে বলল, ‘ভোট মানুষের অধিকার!’

 

বেশ আছে

তোমাদের ক্ষেপনাস্ত্রগুলো কতটা বর্বর হতে
পারে-এই প্রতিযোগিতায় যখন হত্যা উৎসবে ব্যস্ত
তোমরা, তখন একদল মানুষও নিজের আদিম
উল্লাসকে নিজের ভেতরে বাহ্বায় দেখে নেয়! গুলি
ছোঁড়া সৈনিকদের চেয়ে অধম ও নিকৃষ্ট ওরা,
সভ্যতার কাচের দেয়ালে বাস করা প্রাণ!

এ কেমন ধর্ম, রাজনীতি, জন্মভূমি?
রক্তস্রোতে লেখা হচ্ছে যে বিব্রত বর্তমান, ভবিষ্যতের
কাছে নির্লজ্জ অপরাধী হয়ে থাকবে এই
খাণ্ডবদাহন, জানি। যে শহর, জনপদ, রাজ্যে
এখনও ফোটে ফুল, ওখানে কেন আলোর পথ
না খুঁজে পাশবিক অন্ধকার ছড়িয়ে দেয়া?

সাধারণ মানুষ জানে না আগামী ভোর দেখবে কিনা,
শিশুরা জানে না, যে কোন সময় মরে যাওয়ার
অপরাধ কি! অশ্রু শুকিয়ে যাওয়া চোখে
ওরা শুধু দেখে বেঁচে আছে এখনও! বোমারু বিমান,
রকেট লঞ্চার, একে-ফরটিসেভেন বা অসহায়ের
নিক্ষিপ্ত পাথর মুখোমুখি হয়ে ঘোর অমনিশায়
যত ডুবে যাচ্ছে শান্তির বার্তা, জাতিসংঘ তত
মিথ্যে অহংকার ছড়িয়ে গেয়ে যাচ্ছে
সাম্যের গান। তা দেখে আরেকদল মানুষ নগ্ন
হয়েও ভাবে ধোপদুরস্ত বেশ আছে!

 

সেই দীর্ঘশ্বাস

মহাকাশে খুঁজে পাওয়া গেল সেই দীর্ঘশ্বাস!
জানো তো, একটি বিকেল তন্ময় হতে
চেয়েছিল গোলাপ সমপর্ণের সাক্ষী হতে। একটি
গান আমার বুকের অতল থেকে নির্জলা
এক মুঠো আবেগ তুলে নিয়ে রাগের মূর্ছনায়
আছড়ে পড়েছিল সাত আসমান ছাড়িয়ে!
সেদিন হাওয়ায় যে আবীর ছিল, ওতে স্বর্গের দরোজা
খুলে দেবার প্রতিশ্রুতিও ছিল। একটি হৃদয়
মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছিল আরেকটি হৃদয়ের বিহ্বলতার
সামনে। পৃথিবীর কোথায় সৃষ্টি, কোথায়
প্রলয় হচ্ছে সেদিন দুটি হৃদয়ে জানেনি কিছুই!
মাত্র কিছু মুহূর্ত থমকে গিয়েছিল
বোবা কথা অনুবাদ হবে বলে। হয়নি! আর হয়নি
বলেই সবকিছু রঙ বদলে হয়ে গেল দীর্ঘশ্বাস।

দুটি হৃদয় কোনদিন খোঁজেনি সেই দীর্ঘশ্বাসের
কোথায় হয়েছে নির্বাসন বা কেন সেদিন
ভাষা বাকরুদ্ধ হয়ে হারিয়ে দিয়েছিল প্রেমকে।
এ সব নিয়ে যখন টক-শোর আলোচকরা তর্ক করছে,
তখন মহাকাশে খুঁজে পাওয়া দীর্ঘশ্বাস
আপ্লুত কণ্ঠে বলল, প্রেমের অপর নাম দীর্ঘশ্বাস!

 

প্রবাহমান নদী

যদি জল্লাদগুলো আর কারও গলায় ফাঁসির রজ্জু
পড়াবে না বলে কবিতার সমালোচক
হয়ে যেত, তাহলে সূর্যোদয়ে কোনদিন গ্লানি লাগত
না। বা প্রচণ্ড খরতাপে বৃষ্টি না নামার প্রকৃতির
যে অসহনীয় রুদ্ররূপ, ওটা দেখতে হবে না কারও।
কিছু ফুল ঝরে পড়ার যে অচেনা অভিমানের
নির্জনতা রেখে যাচ্ছে ধরায়, হয়ত কেউ
কখনও ফুলের ঝড়ে পড়ার কথাই জানত না!

যদি জল্লাদরা রাগ সঙ্গীতের সমঝদার হতো
তাহলে কাবুল, প্যালাস্টাইন, সানা, কাশ্মির বা যে কোন
খুনোখুনির শহর রক্তস্রোতে ভাসত না। শহরগুলো
ডুবে থাকত মোহাম্মদের শান্তির বাণী বা কৃষ্ণের
বাঁশীর অমিত সুরে। যিশুর ফিরে আসার
প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্মল হাওয়া বয়ে যেত, বৌদ্ধের
অহিংস দর্শন ধ্বনিত হতো পাখির কূজনেও
বা তাওরাতের আলোর ছটায় এক লহমায়
মিলিয়ে যেত হাজার বছরের অন্ধকার!

জানি, মানুষগুলো সভ্যতার তকমা ঝুলিয়েও
আত্মপরিচয়ের সংকটে দাঁত কেলিয়ে হাসে। এই
মানুষগুলো যদি রাষ্ট্রনায়ক হতে গিয়ে জনসেবক হতো,
ধর্মগুলোর আলো ছড়িয়ে দিত ঠিকঠাক বা
মরণাস্ত্রের মজুদ নষ্ট করে সাহিত্যের কোমল আর
বিজ্ঞানের তীর্যক দিয়ে মানবিক ভূবন গড়ায়
ব্রতী হতো, তাহলে যে কেউ ধার্মিক বা নাস্তিক হবার
স্বাধীনতা উপভোগ করত নিঃশঙ্ক চিত্তে!

শুধুমাত্র এমন হলেই, জল্লাদরা সত্যি সত্যি
হতে পারত রবীন্দ্রনাথ, মিল্টন, ইয়েটস, এলিয়েট, জিবরান,
বা মির্জা গালিব! আমার কলম হতো প্রবহমান নদী!

নিজের আয়নায়

তোমরা যখন ঈদের আনন্দে কোলাকুলি করো,
আমি তখন আমার অলিখিত গদ্যের
শুরু হওয়া সুবর্ণরেখা খুঁজে পাই।
তোমরা যখন দুর্গা বিসর্জন দাও জলে, আমি
তখন আমার কবিতাও ডুবিয়ে দিই
অন্তর্গত ভালোবাসার অতলে।
তোমাদের বড়দিনের উৎসব যখন গির্জার
ঘন্টধ্বনির গাম্ভীর্যতার সঙ্গে মানুষের
কল্যাণের কথা বলে যায়, আমি তখন পিকাসোর
আত্মা ধারণ করে যুদ্ধের সরঞ্জাম ও মারণাস্ত্রের
মজুদে রঙ ছড়িয়ে নানাবর্ণের ফুল
এঁকে দিই। আরও কত মানুষ, কত বিশ্বাসের
মধ্যে ডুবে থেকে নিজের ভেতরের ঈশ্বরকে খুঁজে
পেতে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, হায়!
আমি কিন্তু নিজের দিকেই তাকিয়ে
থাকি নিজের আয়নায়। এই
আয়নায় কবিতা, গল্প, ছবি..! আয়নায় দেখি
কতটা মিথ্যে জীবনের গোপন কান্না
হয়েছে, কতটা সত্যি জীবনকে দিয়েছে
মহিমা। আরও দেখি, কালস্রোতে আদিম
অভ্যাসগুলো সভ্য হতে হতে থমকে
দাঁড়ায় তোমাদের মানসিক বৈষম্য দেখে!

 

সরকার

সরকারের ছায়াতলে কত সবুজ ঘাস, নরম
রোদ, ঝাঁঝালো দিনলিপি, মৌ মৌ রাত!
সোনার খাঁচায় পোষা ময়নার গান শুনে সরকার
পুলকিত হয় বলে কেউ কেউ খাঁচাকেই
ভালোবেসে ফেলে। সরকারও একের পর এক
খাঁচা বানায়, আলস্য লাগলে পা ভিজিয়ে
নেয় আশেকানদের মহব্বদের জলে।

সরকার কখনও অহংকারী হয় না, প্রেমিকও
হয় না! অথচ সরকারের অনুকম্পাকে প্রেম ধরে নিয়ে
কতজন স্তাবক বন্দনার প্রবাহ তৈরি করে ফেলে
নতজানু থাকার বিহ্বলতায়। সরকার কদাচ
‘দিল খোশ্’ চিত্তে ওসব প্রবাহে থুথু ফেলে,
আশেকানরা পূণ্য ভেবে চেটে নেয়!

ছবি আঁকা দরকার, কবি রাখা দরকার বা
জল্লাদদের সংখ্যা বাড়ানো দরকার বলে সরকার
টাকশালের যত্ন নিতে কখনও ভোলে না।
কেউ কেউ অবশ্য সরকারকে ভুলিয়ে গোলাপের বনে
কুমিরের চাষ করিয়ে ফেলে। সরকার ওরকম
ভুল নিয়েও ভাবে না। শুধু ভাবে, কেমন আছে জনগণ!
জনগণের খবরাখবর পৌঁছে দিতে একদল প্রহরী
তথ্যের সন্ধানে প্রায় ছুটে যায় লজ্জাবতী গাছের কাছে।

ওসব দেখে সরকার মুচকি হাসে, জনগণও
সরকারের চারপাশ দেখে হাসে!

 

সবুজ আকাশ

নীল নয়, সবুজ রঙের আকাশ তোমার মাথার ওপর
রেখেছিলাম অবুঝ বিশ্বাসকে লাবণ্যময় করে
রাখব বলে! সবুজ আকাশের দিকে তাকিয়ে তোমার
একটা দীর্ঘশ্বাস হামলে পড়েছিল দীঘির জলে।
সেই থেকে দীঘির জলে নীল পদ্ম ফোটে, তোমার হারানো
দীর্ঘশ্বাসের ব্যাঞ্জনা দেখি, অর্থ খুঁজিনা মোটে। সবুজ
আকাশ আজও সুবজ, তুমি মেখেছো নীল। অবুঝ বিশ্বাস
হয়েছে মমি, মনের দরোজায় পড়েছে খিল!

 

কান্নার স্বাধীনতা চাই

আমাদের কান্নাগুলো বুঝি রোদের উল্টো পিঠ?
চোখের জলে কি দেখতে পান
মোহন আয়না? যদি কান্নার উৎস না খুঁজে
বিভাসের নানা রঙ নিয়ে আপনাদের
বিব্রত করে, তাহলে হাসির স্প্রে করে দিন!
গোলাপের বনে এমন এক রঙমেদুর ছবি টানিয়ে
দিন, যেন মনে হবে সমুদ্র ভীষণ
নতজানু, হাওয়ায় বশ্যতার শীষও বাজিয়ে দিন!
আমাদের বুকের ভেতরে যে আবেগ
থৈথৈ করে, সে তো ভণিতা জানে না! নির্জলা
অনুভবের স্রোতে ভেসে জলের ফোঁটা হয়।
নিঃশঙ্কোচে বলছি, আমাদের কান্নার কোন দাবি
নেই, প্রত্যাশাও নেই। আমরা কেঁদে হালকা
হবার জন্যই কাঁদি। চোখের জল নিয়ে
আপনাদের উৎগ্রীব-উৎকণ্ঠা বা বিব্রতবোধ
আমাদের কাছে তামাশার নামান্তর মাত্র!
আমরা কান্নার স্বাধীনতা চাই।

 

আসুন ঘৃণা করতে শিখি

আসুন আমরা ঘৃণা করতে শিখি!
এই লুটেরারা চারদিকে গিজগিজ করছে, তাদের
গালি দিতে না পারলে অন্তত মুখ ফিরিয়ে
নেয়ার অভ্যাস করি। রাষ্ট্রযন্ত্রে যে বেহায়ারা
ফুল না ছিটিয়ে কামান দাগাচ্ছে, অন্তত
তাদের ভর্ৎসনা করতে অন্তত সাহসী
হই। আমাদের স্বপ্নগুলোর গলা টিপে
যারা অন্ধকারের দেয়াল তুলে
বাকরুদ্ধ করে রাখতে চায়, তাদের
মুখোশটা হেঁচকা টানে খুলে ফেলার চেষ্টা
করি, আসুন না একবার! রাজপোশাক পরিহিত
ভাগ্যবিধাতা সেজে থাকা আমাদের
কতিপয় প্রিয়জনদের দেখে একদিন অন্তত
কুর্নিশ করা থেকে বিরত থাকি।
আসুন, গানের স্বরলিপি ফেলে একবার একা
বুক চাপড়িয়ে শোকের স্বরলিপিতে কণ্ঠ
মেলাই। আসুন, আমরা বলতে না পারার
কষ্ট চোখের জলে ধরে না রেখে
বারুদ জ্বালাতে শিখি!

 

আপনারা

আমাদের হৃদয় নিংড়ে-মুচড়ে যে বোবা কান্না
তুলে নিচ্ছেন আপনারা, তা কিন্তু কখনও সমুদ্রের তলদেশে
পড়ে থাকা গুপ্তধনের সন্ধান দেবে না। অথচ
আমাদের বুকের ভেতরে ভালোবাসার গুপ্তধন পড়ে আছে
লাবণ্য ছড়িয়ে! আপনারা ভালোবাসা নিতে চান না কেন,
বুঝি না। অবাক চোখ তুলে দেখতে গেলে আপনারা
আমাদের মুখ থেতলে দেন, খুব সহজে বুটের
তলায় পিষ্ট করেন অর্ঘ্য! এখন শুনছি, আমাদের চোখের
জল তুলে নিয়ে আপনাদের গোপন দীর্ঘশ্বাস
ভিজিয়ে রাখতে চান। এমন কী, আমাদের অসহায়ত্ব
দেখাতে নাকি অন্য দেশের প্রশিক্ষিত কুকুর
নিয়ে এসেছেন! আপনাদের বিলাসিতার কতকিছুই
দেখছি! আপনারা কত কিছু করতে পারেন,
শুধু পারেন না আমাদের ভালোবাসাটুকুর সৌরভ দিয়ে
বন্ধ্যা নদীতে জোয়ার সৃষ্টি করতে। আপনারা
নিজেদের যতটা মহান ভাবেন, আসলে
ততটা নন! এক মুঠো আলো ছড়িয়ে
আপনারা প্রতিনিয়ত করে যান অন্ধকারের কীর্তন!

 

দুঃখ বিলাস

কিছু দুঃখ রোদের পিঠে মেঘ হয়,
কিছু কথা বৃষ্টি হতে গিয়ে বর্ষাকে ভালোবাসে!
তুমি কদম ফুলের হাসিকে আমার দুঃখ
ভেবে তুলে নিতে চাও, আমি
কারও অশ্রুজল হবো না বলে টানা
বর্ষণের ধুন হয়ে ভাসিয়ে দিই চরাচর!
কিছু সময়, বিধৃত হয়ে থাকে
দুঃখ জাগানিয়া গানে, কিছু কথা
প্রকাশের পথ খুঁজে না পেয়েও
জেনে যায় ঠিক জীবনের মানে!

জলভেজা কবিতা

বর্ষাজলে ভেজা জবুথবু এক কবিতা আমার কাছে
এসে একটা পোশাক চাইল! কবিতার আবার
পোশাক হয়? কথাটা ভাবতেই কবিতাটি
ম্লান হেসে বলল, আজকাল কেউ আর নিরাপদ
নয়, কবি! বিত্তের অহম জড়ানো শহুরে ক্লাবগুলো
থেকে আগে আভিজাত্যের রঙধনু বের হতো, এখন
কসাইদের অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে চারপাশ!
কবিতার শরীর উদোম থাকাটা তাই নিরাপদ বলে
বিবেচ্য নয়! রাষ্ট্রযন্ত্র কখন জাগে, কখন
ঘুমিয়ে সেটাও ঠাওর করা যায় না!

এমন কথা শুনে জলভেজা কবিতার সামনে
আমি লজ্জাজলে কাকভেজা হয়ে যাই!
প্রার্থনার মতো করে বলে উঠি, হে বর্ষাকাল, সমস্ত জলে
ধুয়ে দাও ছোপ ছোপ অন্ধকার যত। হে বৃষ্টি,
শুদ্ধস্নানের ব্রতে ঝরতে থাকো অবিরত।

 

রোদনভরা বসন্ত

আমি পালাতে চাইলেই সেদিনের সূর্যটা
ডুবে বক্র হাসির রেণু ছড়িয়ে, যে কুঁড়ি ফুল হবার
স্বপ্নে বিভোর, ওরা রাতের গুমোট কান্না হয়।
পালাবো বলে কিশোর বেলায় একদিন
দূরপাল্লার ট্রেনে চড়েছিলাম। কী জানি, কেন
সেদিন আমার সাহস আর দ্রোহের পথ
আটকে দাঁড়িয়েছিল অজানা ভয়। সেই থেকে
ভয়টা আমার ভেতরে আত্মীয় হয়ে যায়,
পরে আত্মার সঙ্গে অনাবিল সখ্যতার বন্ধন।

একবার রোমান্টিক এক দুপুর পালানোর
বিহ্বলতা ছড়িয়ে গিয়েছিল তোমার আসা-যাওয়ার
পথে। তোমার আহ্বান উপেক্ষা করেছিলাম
সেই ভয়ের রাঙা চোখের শাসনে। এরপর থেকে জমে
যাওয়ার গান শুরু আর বরফ গলা নদীর আখ্যান!

গলতে গলতে, পথ চলতে চলতে অনেকের মতো
আমিও পালাতে চাই এখন। পালাতে গেলেই
সূর্যটা অস্তাচলের কীর্তন শুনিয়ে বিষাদগ্রস্ত করে দেয়।
তখন রাতকে মনে হয় দীঘল, রোদনভরা বসন্ত!

 

কুহক রাতের সমর্পণ

যে দুপুরটা অভিমানের বিহ্বলতায় খুব কেঁদেছিল,
আমি ঐ দুপুরটার ধূন হতে চেয়েছিলাম।
দুপুর আমাকে হিজল ছায়ার মায়াবী ফাঁদে বিষণ্ন
পথিক করে দিয়েছিল। যে বিকেলটা প্রখর
কিরণে খুব পুড়েছিল, সেই বিকেলের
হিরন্ময় প্রচ্ছদ হতে তোমার বাড়ির সামনের
ঘাসফুলগুলোর প্রেম তুলে নিয়েছিলাম মুঠোয়।
ঘাসফুলের প্রেম বুঝি অভিশাপ হয়েছিল!
তুমি আর কখনও জানালার সামনে আসোনি,
ঘাটে নেমে জলের সঙ্গে দু’পায়ের অনুরাগ
ঝরিয়ে দাওনি বা কলেজে যাবার পথের
কাব্যকথনও হওনি। এরপর দেখলাম, তুমি
একটি কুহক রাতের সমর্পণ হয়ে গেলে!

 

আমার কবিতাগুলো

আমার অনুচ্চারিত কবিতাগুলো বৃষ্টিতে ভিজতে চায়!
খরতাপে বট,অশ্বত্থ বা হিজলের ছায়া হয়ে
ক্লান্ত-অবসন্ন পথিকের মাথার ওপর দীঘল স্বস্তি
ছড়াতে চায়। চৈত্রের খটখটে রুদ্ররূপ, বর্ষার নদী, শীতের পিঠা,
শরতের উজ্জ্বলতা, বসন্তের প্রেম বা মেঘের গোমরা
মুখও হতে চায়। পোষা কবুতর আকাশে উড়িয়ে
দেয়ার মতো আমিও কবিতাগুলো ওড়াই, ওরা উড়ে গিয়ে
একদিন আর ফিরবে না-এমনটাও ভাবি। কিন্তু ওরা ফিরে আসে
বা কখনও উড়ে যায়নি অবচেতন বোধ থেকে।
কবিতাগুলো রবীন্দ্রসঙ্গীত হতে চায়, নজরুলের গান বা
আব্বাস উদ্দিনের পল্লীগীতি। ছবি হতে চায়, রবি
হতে চায়, আবার ঘন আঁধারও হতে চায়। কবিতাগুলো
মা হতে চায়, বাবা হতে চায়, সন্তান হতে চায়, আবার সুতো
ছেঁড়া ঘুড়িও হতে চায়। ওরা কতকিছু হতে চায়!
কী আশ্চর্য, আমাকে দেখে যে বিদ্রুপপূর্ণ
হাসি ফুটে ওঠে তোমার ঠোঁটের কোণে, ওটাও হতে
চায়! অথচ, আমি চাই তোমার চোখের এক ফোঁটা জল
হোক আমার যে কোন একটি কবিতা।

 

সত্য স্বীকার

আকাশটাকে রুমালের মতো ভাঁজ করে
পকেটে রেখে দিতে পারলে তোমাকে আর
নক্ষত্রের গান শোনানোর প্রতিশ্রুতি দিতাম না। জোনাক
পোকার মিটিমিটি আলো দেখিয়ে বলতাম না
চাঁদের কলঙ্ক আছে বলেইজ্যোৎস্নার প্রতি আমার
কোন মোহ নেই। আমার কাছে যেমন নক্ষত্রের গান নেই,
তেমনি জ্যোৎস্নার প্রতি আমার উদাসীনতাও নেই। বরং
ভরা পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নায় ডুবে গিয়ে হয়ে যাই
কামিনীফুল! আর নক্ষত্রের লাবণ্য আমার ভেতরে
কখনও ভৈরবী, কখনও মালকোষ, কখনও পিলু রাগের
আবিষ্টতা ছড়িয়ে রাখে। গান হয়ে ওঠে না ঠিক,
তবে গানের চেয়ে তীব্র কিছু অনুভব শরৎকালের
মতো প্রচ্ছন্ন থাকে। তোমাকে এসব কথা বলতে
চাইনি কখনও, আজ বলছি। কথার সামনে আড়াল
দাঁড় করিয়ে রেখে কবি হওয়া যায়, নদী হওয়া যায় না। আমি
কবির মনজগতের রহস্যের চেয়ে নদীর প্রবাহকে
জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাই। তোমার সামনে যে আকাশ,
ওখানে স্বপ্নের নীলাভ মাখামাখি, আমি বা তুমি নীল রঙে
যে জীবনের গল্প আঁকি, তা অনেক সময় মিথ্যের
চোরাবালি হয় বা বিভ্রম! তাই আজ সত্য স্বীকার করে বলছি,
আকাশটা রুমাল হয়ে আমার মুঠোয় নেমে এলে
এই জীবনের সব আলোড়ন এক বৃন্তে রেখে
তোমার সামনে তুলে ধরতাম, সর্বস্ব সমর্পণের ভঙ্গিতে!

 

কবির ছবি

ছবিটা কেমন গল্প বলছে যেন!
ছবির সামনে আলোর রেখা গল্পগুলোর
মায়াবী মুখ হয়ে আছে, আর গল্পগুলো একটু দূরে
বৃষ্টির রাগ! এক পশলা বৃষ্টি ধরে নিলে
গল্পও এক পশলা, রিমঝিম বৃষ্টি হলে
রিমঝিম গল্প! আচ্ছা, যে গল্পটা তোমাকে বলব
বলে অনেকগুলো বছর পার করে দিলাম, ওই
গল্পটা এখন নাকি চাঁদের বুড়ি হতে চায়!
চড়কা কেটে কেটে গল্প না বলার কষ্টকে
এক সলতে কবিতায় ডুবিয়ে দিতে চায় চাঁদের বুড়ি।
গল্পের চেয়ে কবিতার নাকি আচ্ছন্নতা প্রবল,
আবার গল্প পথ হারালেও কবিতা পথ চিনে ফিরে
আসে শিশিরের মতো, উজ্জ্বল রোদের প্রেমে!
এ সব কথা আমার জানা ছিল না। ছবিটা আমাকে
বলে দিল তা এক ফাঁকে। আরও বলল,
এমন ছবি প্রকৃতি তৈরি করে বলে, কবিদের বিনাশ নেই!
এই ‘বিনাশ নেই’-কথাটাই কবিদের অভিশপ্ত
জীবন না তো! নাকি অভিশাপই কবিতা?

 

মায়াবী মিথ্যেগুলো

আমার মায়াবী মিথ্যেগুলো একদিন গুপ্তধন
হবে ভেবে তোমার চোখের জলের সঙ্গে
অতল সমুদ্রের সম্পর্ক এঁকেছিলাম!
তুমি বসন্ত পুড়িয়ে দেয়া আগুন
নিজের আঁচল দিয়ে নিভিয়ে দিতে দিতে
বলেছিলে, জলছবি! আমি এরপর
থেকে তোমার চোখের জলে আর সমুদ্র
খুঁজিনি। তোমার দৃষ্টি জুড়ে অনুকম্পা পৃথিবীর
সবুজ উদ্যানগুলোর চেয়ে গাঢ়! আমি ঐ সবুজের
অভিমান আছে কী-নেই, খোঁজ নিইনি তারও!
আরও কিছু মিথ্যের কুহক আমার কাছে
এখনও আছে, আজও ফাগুনের কুহুতানে
কোকিল সরব হয় গাছে গাছে। শুধু মিথ্যেগুলো
তোমার মনের সন্ধান করে না, তোমার
সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে অদ্ভূত বিহ্বলতার
অতলে ডুবে যাবে বলে আমাকে ছেড়ে এক পাও
নড়ে না! মায়াবী মিথ্যেগুলো আমার বুকে
গ্লানির জলপ্রপাত হবে, তা হয়নি। আমাকে
কবর বানিয়ে ওরা যে আজন্ম আশ্রয় নিয়েছে,
সে কথাও আমাকে কয়নি!

 

প্রেমের সহজ মানে

ভেবেছিলাম, তুমি খোলা বইয়ের মতো
আমার সামনে দাঁড়াবে, আমি
হবো মনযোগী পাঠক। কিন্তু বইয়ের
পাতায়-পাতায় অভিমানের বন্ধ কপাট,
অধ্যায়গুলো অভিযোগের বৃষ্টি বিলাসে ভিজে
একাকার! চোখ রাখতেই নীলাভ অতীত
গুনগুনিয়ে বলে, দিগন্তে যে আকাশ
নেমে আচ্ছন্নতা তৈরি করে, তা কখনই
অভিসারের রূপক নয়। ওখানেও শিল্পময়তায়
বিরহের জলছবি আঁকা হয়, যা খোলা
চোখে ভ্রম লেপ্টে দেয়।

আমি অতকিছু বুঝিনা, জানতেও চাই না
কিছু মানুষ জীবনের অংক কেন মেলাতে পারে না।
তবে ভাবি, তোমাকে সহজপাঠে পড়তে
গেলে এত বাঁক তৈরি হয় কেন? জানি,
বসন্তের কোন রহস্য নেই, অরণ্যের কোন অহমিকা
নেই, সমুদ্রের ডুবে যাওয়া নেই বা গল্প অসমাপ্ত হওয়ার
বিলাপও নেই। তবু কেন তোমার সব কথা স্বচ্ছ জলের মতো
প্রবহমান হয় না? তুমি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে
যাবে, এমন ভাবনাতে আমি সেই কবে থেকে দাঁড়িয়ে আছি।
কিন্তু তুমি অস্তাচলের রক্তিম আভার মতো ধ্রুপদ
মৌনতায় কেন যে বাকরুদ্ধ, কে জানে! আমি কি
আজও শিখিনি প্রেম, জানিনি এর সহজ মানে?

 

স্পর্শের গল্প

তোমাকে স্পর্শ করার ইচ্ছে ছিল না-এমন
কথা বলিনি কখনও। পথে দাঁড়িয়ে থাকা হতদরিদ্র
মানুষ যেমন রাজকন্যা দেখে, আমিও
তোমাকে দেখতাম আর তোমার রূপের লাবণ্য
দেখে মুগ্ধ হয়ে তা আজন্ম ধরে রাখার তন্ত্র-মন্ত্র শিখতাম।
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার লোভ ছিল, কর্পূরের মতো উড়ে
যাবার ভয়ও ছিল। কতদিন কতবার লোভের মদিরতায়
বৃষ্টি ধরেছি, সবসময় মুঠোয় ভেজাপ্রেম রেখে
মিলিয়ে গেছে বৃষ্টি। রোদের কিরণ, মেঘের পোড়া
গন্ধ, অরণ্যের শ্যামোলিমা, নদীর কলকল ধ্বনি
বা তোমার হাসির রিনরিনে শব্দকে ধরতে
চেয়েছি বারবার। ধরে রাখতে না পারার পরিহাস
হারাতে পারিনি আমি, মনে হতো ফিরে
আসতে হবে আরেকটি জীবন নিয়ে!
আমি মেঘের কালো রঙ হয়ে আকাশে
জমে যাচ্ছিলাম বলেই কিনা জানি না, তুমি একদিন
সামনে এসে ফুটলে কামিনী ফুলের মতো। আমি
বরফ গলা নদীর উচ্ছলতার মতো তোমাকে স্পর্শ করলাম,
তুমি যেন লজ্জাবতী গাছের মতো চমকে উঠে কুণ্ঠিত
হলে! পাথুরে পাহাড় পরাস্ত হতে হতে জলপ্রপাত
হতে লাগল আর স্পর্শ খুঁজে পেল ভাষা। তোমার চোখের
জলে লেখা হলো সমর্পণের এক গল্প!

 

বিলাসী গাঙচিল

তোমার ঘুঙুরে মোহন সুরের
প্রবাহ তৈরি করবে বলে নদীটির স্রোত তুমি
তুলে নিয়েছিলে একদিন! তোমার দু’চোখের নিচে
কালসিটে দাগ আড়াল করে ওখানে একটা
ঝলমলে আকাশ এঁকে নিতে মেখেছিলে জলের রঙ।
কূলের উৎসব ও নির্জনতা দুটোই মুঠোয়
পুড়েছিলে, তোমার ভ্রু নেচে উঠলেই ওখানে
থমথমে সৌন্দর্যের ঢেউ উঠত। জলভেজা উদাসী
হাওয়া আমাকে বলেছিল, তোমার দৃষ্টিতেও নৃত্য
আছে, মোহগ্রস্থ শহরগুলো তোমার দৃষ্টির নাচ
না দেখলে অকারণে অন্ধকারে ডুবে যায়!

এই যে তুমি নদীটিকে খাবলে, ছিঁড়ে নিয়ে
গেলে, আমি টু শব্দও করিনি! কেউ জানুক, আর না
জানুক, আমি জানি, যে নদীটা এখন বইছে, ওটা
‘নদী’ নামক কংকাল! মানুষের যেমন কংকাল আছে, নদীরও
আছে। সন্ন্যাসীরা লোভমুক্ত বলে এই কংকাল নদীকে
দেখে ভাবে ঈশ্বরের এক রূপ! আর কবিরা কলহাস্যে
নদীর পরাজয় তুলে নিয়ে সাজায় শব্দ-ব্যাঞ্জনা।

তুমি কিন্তু নদীটির অতল দেখনি! কংকাল নদীটি
নিজের অতলে আরেকটি নদী ধরে রেখেছে। ঐ নদীটির
সঙ্গে আমার নাকি অনেক মিল! শুনলাম, গোপন
নদীটিকেও খুঁজে বেড়ায় তোমার মতো বিলাসী গাঙচিল!

 

পদ্মফুল

আমি বললাম, জলস্মৃতি! তুমি ভ্রু নাচিয়ে
বললে, জলস্মৃতি আবার কী! বুকের ভেতর থেকে
চাপা দীর্ঘশ্বাসটা বের হতেই ওটাকে তাচ্ছিল্য
করে হাওয়ায় ভাসিয়ে বললাম, যে স্মৃতি
চোখের জলে পদ্মফুলের মতো দৃষ্টিনন্দন, ওটাই
জলস্মৃতি। আমার কথাকে তুমি তাচ্ছিল্য করলে না,
তবে কণ্ঠে গাম্ভীর্য টেনে বললে, দৃষ্টিনন্দন না ছাই!
ওসব আসলে হৃৎ ক্রন্দন। তোমরা কথা বিক্রি
করতে পারো তো বেশ! জানি, কবিরা কথাকে শিল্পের
মান দিতে গিয়ে নিজের দুঃখ-কষ্টকেও রঙ মেখে
পুতুলের মতো সাজিয়ে নেয়। কথার রঙমাখা
পুতুলকে অনেকে আনন্দ-বিলাস ভেবে নেয় আর কি!
তোমার এ কথা শুনে আমার জলস্মৃতি যা ছিল
সাহারা মরুভূমি হয়ে গেল মুহুর্তেই। কিছু কথা কবিতা
হয়ে ওঠতে গিয়ে ধূলিঝড় হলো। যেটুকু আলো
মুঠোয় ছিল, ঐ আলো গল্পের মূর্ছনা ঝেড়ে
সত্যবাদী কণ্ঠে বলল, আমি মরীচিকা!

এবার তোমার চোখের জলে আমি হয়ে
গেলাম পদ্মফুল, কী আশ্চর্য!

 

ব্যর্থ প্রেমিক

সন্ধ্যা আরতির মৃদু আলোয় তুমি নিজের অন্তরে
যে দেবতার ছবি আঁকতে, আমি তাকে খুব
ঈর্ষা করতাম! শরৎচন্দ্রকেও খুব ঈর্ষা করতাম
তাঁর লেখা তোমার মনযোগ কেড়ে নিত বলে। আমি
দেবতা হতে চাইনি বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও।
তবে তোমার শুভবোধে একটুকরো আলোর মতো
আমার অস্তিত্ব ঠাঁই পাক, চেয়েছিলাম! আমার
প্রতিও তোমার মনযোগ সৃষ্টি হোক, চেয়েছিলাম
সর্বান্তকরণে। তুমি দেবতাকেই ভালোবেসে
গেলে আর শরৎচন্দ্রের লেখার শিল্প-বিভাস থেকে
নিজেকে বের করে আনতে পারলে না।
তুমি পুজোর অর্ঘ্যরে মতো জয়রথেই থাকলে, একবারও
সাধারণ সাদামাটা প্রেমের মোহ মাখলে না!
আমি না পেয়েও তোমাকে ভালোবেসে ধীরে ধীরে
শরৎচন্দ্রের মতো ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে রইলাম!

 

নদীর গল্প

গল্প হবার মোহ নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াতেই
তুমি নদীর বাঁক নেয়ার দুঃখ কুড়িয়ে
আনতে বললে। আমি নদীর কাছে গিয়ে
বাঁকের দুঃখ চাইতেই নদী বলল, অজস্র গল্প
বাকরুদ্ধ হয়ে তলদেশে পড়ে আছে।
গল্পগুলো মানুষের প্রেমের নির্জনতায় ডুবে
থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রেম ফেলে ওরা
কপট গল্পের মায়াজালে জড়িয়ে গেছে। সত্য
গল্পগুলো কান্না চেপে আমার জলের
আখ্যান হয়েছে। আমি গল্পগুলোর
দুঃখ রোদনকে বর্ণময় করে রাখতে বাঁক
নিয়ে বয়ে চলি। এখন ওসবই আমার ঐশ্বর্য!
তোমাকে তা কী করে এনে দিই বলো?

নদীর সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় আমার চোখর জলও!

 

জুঁই ফুলের দুঃখ

একটি সকাল দুপুর হতে হতে
জোড়া শালিকের খুনসুটি দেখে কেমন
বিহ্বল হয়ে পড়ল একদিন!
সেই সকালে জুঁই ফুল খোঁপায় জড়িয়ে তুমি
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে
বৃষ্টি হতে চেয়েছিলে। দুপুরের কাছে
গনগনে রোদের যে ঐশ্বর্য ছিল
সেদিনের সকালটা চাইল না, এমন কী
রোদের প্রেম নিয়েও ভাবল না।
রোদের উল্টোদিকে বিরহের জলরঙ
তোমার ছবি আঁকছিল বলে সকালটা স্থির
হয়ে থাকতে চেয়েছিল। তোমার মনের
আয়নায় বিহ্বল সকাল নিজের মুখ
দেখে বুঝে নিতে চেয়েছিল কোন একটি রাত
তোমার দীর্ঘশ্বাসের গজল শুনেছিল কিনা।
আমি তো রাত নামলেই তোমাকে নিয়ে
গজলের নৈবদ্য সাজাতাম আর
সকাল হলেই রোদে পুড়ে গজল অপ্রকাশের
লাজুক বিষাদ হয়ে যেত!

সেদিনের সকাল গজলের সুর হয়ে
তোমার কণ্ঠে গুনগুন করেছিল তন্ময়তায়।
আজ বলছি, সেদিন তোমার খোঁপার জুঁই
ফুলের সুবাসে আমার দীর্ঘশ্বাসও সকালটার
প্রতিবিম্ব হতে চেয়েছিল। সেই ঘোর লাগা
সকালের কথা আজও বলে জুঁই, আর জানতে চায়
তোমাকে না পাওয়ার দুঃখ কোথায় থুই!

 

ভাঙন
প্রকৃতির ভাঙন দেখা যায়,
অন্তরের ভাঙন দেখে কে?
সাগর বলে, চোখের কোণে
জল যত সামলে নে!

 

একই পথ

দ্বীপ জ্বেলে যাব শুনে
হেসেছিল সলতে
তুমি আলো আমি আঁধার
একই পথ চলতে!

প্রায়শ্চিত্ত

আমার ভুলগুলো ফুল হবে না,
সে তো জানি!
তারপরও কুড়ির কাছে
প্রায়শ্চিত্তের কানাকানি!

 

ছায়া ও মায়া

আমাদের ছায়াগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
আলোর উল্টোদিকে ছায়া দেখি না, ওখানে
বিষাদের প্রচ্ছদ টানানো! আমাদের মায়াগুলো
কারা যেন পথ ভুলিয়ে নিয়ে গেছে তেপান্তরে,
সন্ধ্যা আরতির পর আর দেখা যায়নি!
রাজার বার্তাবাহক এসে বলে গেছে ছায়া ও মায়া
নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। আকাশ ছুঁয়ে দেখার
উৎসব নিয়ে মেতে থাকো, আর আবেগের
রঙে রাজার ছবি আঁকো! আমরা
ছায়া-মায়া ফেলে ছবি এঁকে চলেছি নিরন্তর,
আমরা অন্য কারো চোখের দিকে তাকাতে
পারি না, আমরা শুনি না কী বলে অন্তর! আমরা
ভালোবাসতে পারি না, অথচ ভালোবাসার কত
কথা বলে যাই, ফুলের পাপড়ি ছেড়ে উড়াই ছাই!
আমাদের ছায়াগুলো এখন রোদ দেখলে
রাত্রির গান গায়, মায়াগুলো দিচ্ছে কেবল বখাটে শিস!

 

কাব্যকথন

পুরুষ:
আমার এত জল অথচ তুমি বললে, আমি
এক পোড়া নদী! নদী পুড়ে যায় বুঝি?
আকাশ এত মেঘ ধরে রাখে, বৃষ্টি ঝরায়
ওর কেন নদী নেই? তুমি বললে, আকাশের
অভিসারের মন্ত্রণা নেই, বিরহ নেই, কষ্ট
পুষে নীল হওয়ার যন্ত্রণাও নেই, তাই
নদীরা আকাশমুখি নয়। নীলাভ শূন্যতা
আকাশের ভালো লাগে, নদী নিয়ে ভয়!

নারী:
পুড়ে পুড়ে নিখাদ হলে নদীর শাপমোচন! তুমি
পুড়েছ নিখাদ হওনি আজো। হে কবি,
তুমি প্রেমকে পদ্মপুকুর বানিয়ে জলের গান
শোনাতে চেয়েছ যতবার, আমি পদ্মফুল হয়েছি।
বেশ তো ছিল আমাদের সাদামাটা
প্রেম আর স্বপ্নরেণু উড়িয়ে দেয়ার উৎসব।
কিন্তু পাহাড় হয়ে আমাকে বললে, ঝর্ণা হতে।
আমি ঝর্ণার অবগাহন হয়ে দেখি তুমি
নদী হয়ে ডাকছ! আমাকে তুমি ভাসিয়ে নিয়ে
গেলে আর বলে দিলে জীবনের রঙ আছে,
প্রেমের রঙ নেই। প্রেম হচ্ছে ঘোর
আচ্ছন্নতা, এক ধরনের ব্যাধি!

পুরুষ:
এরপর থেকে তুমি আচ্ছন্নতা হলে, আমাকে
বলে দিলে প্রেমের সত্যানুসন্ধান করতে।

নারী:
এরপর থেকে তুমি নদী হতে গিয়ে
পুড়ে দগ্ধ হলে! পোড়া নদীর গন্ধ এসে
মিশে যেতে চাইল আমার আচ্ছন্নতায়। আর
আমি পোড়া নদীর অতলে সেই পদ্মপুকুর খুঁজি!

পুরুষ:
আমি লখিন্দর আর তুমি বেহুলা বুঝি!

 

অভিনয়

স্বর্গের জাদুঘরে দেখা গেল মানুষের অভিনয়গুলো
থরে থরে সাজানো! আমি প্রথমে হচকিয়ে
গেলেও তোমার অভিনয় আছে কিনা দেখতে
চোখ বুলালাম চারপাশে। দৃষ্টি আটকে
গেল আমার নিজের নামকরণ করা এক আয়নার
সামনে। আয়নায় সরল-বক্র কত রেখার বিচ্ছুরণ, কত
কথার মমি আর উচ্ছ্বাসের বিবর্ণহীন কৃষ্ণচূড়া!
অবাক হয়ে ভাবলাম, অভিনয় সংরক্ষিত করার জাদুঘরে
এ সব বিষয় কেন? আমি কি অভিনয় করিনি?

দৈবকণ্ঠ বলে উঠল, তোমার অভিনয় এতই
নিখুঁত ও চতুরতাপূর্ণ যে, জীবনের সরল আখ্যানে
তা মিলিয়ে গেছে। স্বর্গদেবতারা তোমার অভিনয়ের
শিল্প-সুষমা খুঁজে পেয়েছে, তবে অর্থদ্যোতনা খুঁজে পায়নি!
দেবতারা বিস্মিত হয়ে তোমার অভিনয়গুলোর বিভাস
ধরে রেখেছে আয়নায় আর চলছে ব্যাপক গবেষণা!

দৈবকণ্ঠের কথা শুনে আমি আর তোমার অভিনয়
খুঁজতে গেলাম না। জানি, তোমার অভিনয়ের
কারুকাজ দেখে দেবতারা চলে যাবে স্বেচ্ছানির্বাসনে!

 

কী আশ্চর্য

আমার দুঃখগুলো নাকি কাশফুল!
আমার বিষণ্নতা ছাড়া নাকি দুপুর উজ্জ্বল
হতে পারে না! কী আশ্চর্য!
আমার চোখের কোণের জল নাকি
মরুর হাহাকার নিয়ে গল্প লেখে, আমার
দীর্ঘশ্বাস না থাকলে নাকি হীরকখণ্ডের জন্মই
হতো না! আমার মন খারাপ হলেই
পৃথিবী বুঝতে পারে এবার বসন্তে অনেক
ফুল ফুটবে, আমি হাসলে নাকি তুমি যে দহন
চেপে আছ, তা হয়ে যায় মেঘরাগ! আমার
কোন সুখের অনুভূতিতে মহাযজ্ঞ তো নেই-ই,
কোথাও কোন আলোড়নও নেই!

কী আশ্চর্য! আমার দুঃখগুলো
তোমার অবেহেলা পেলেই কবিতা হয়!

 

ধুম্রজাল

দূরাকাশে নক্ষত্ররা কোরাসে বলে, আমার
নিঃসঙ্গতার ধুন নেই, স্বরলিপি ছেঁড়া গানে লেপ্টে
থাকে পথহারা মেঘ! পাহাড় আকাশমুখি
হয়ে ভাবে ওর মাথায় আর কে পৌঁছুবে? অথচ
কথাগুলো পাহাড়ও ছাড়িয়ে যায়, নিচে
মুচকি হেসে নদী জোয়ার-ভাটার গান গায়!

এমন কিছু কষ্ট আছে, যা তন্ময়তা হয়ে যায়
মনের গহীনে। কখনও মুক্তো হয়, কখনও
জীবনবোধের নির্যাস, কখনও বা কিছুই না হতে
পেরে আত্মজিজ্ঞাসার দহন! ওসব কথা
তোমার কাছে কোনদিন পৌঁছুবে না, জানি।
হাওয়াও আজকাল এত ভার সইতে পারে না!

রোদের পিঠে বা জ্যোৎস্নার লাবণ্যে নিজেকে
আয়না করে মেলে ধরি মাঝেমাঝে, সবার অলক্ষ্যে।
দেখি, গান ভেবে যা ধরে আছি, ওটা ধুম্রজাল!

যবনিকা টানতে

মৃত্যু যদি এসে যায় অবেলায়! চলে
যেতে হলে-কেন যাব? বলতে চাই, আর
জানতেও চাই কোন নীলিমায়, কোন
সীমারেখা পেরিয়ে তুমি আছ,
নিষ্পলক! সাজানো বাগানে কেন এত
তাণ্ডব, মৃত্যু কেন বিভীষিকার ঝলক?

মৃত্যু আমাকে চুম্বন করুক জীবনের সেই
প্রান্তে, যেখানে অঙ্ক মেলাবো হাসিমুখে
ভুলগুলোর যবনিকা টানতে!

 

কবিতার ছত্র

আমাকে চিনে নিয়ো, পথের বনফুল আমি
কিনে নিয়ো। আমাকে সাজাতে
হবে না, যখন ইচ্ছে ফেলে দিয়ো! দমকা হাওয়ায়
বুনো গন্ধ পেলে মেনে নিয়ো আমারও
অস্তিত্ব ছিল, জলে কারও ছায়া দেখা গেলে
বুঝে নিয়ো আমিও হয়েছি স্মৃতির রোদন!

আমাকে ভুলে যেয়ো বা মনে রাখার
কোন কারণ হতে দিয়ো না। শুধু জেনো তোমার
উচ্ছ্বাসে আমি শ্বাস নিই, তোমার দীর্ঘশ্বাসে
আমি প্রার্থনায় অবনত হয়ে পৃথিবীকে অভিশাপ দিই!

 

আমার কোন জীবন নেই

আমার কোন দুঃখ নেই, আনন্দও নেই। শোক নেই,
স্বপ্ন নেই, এমন কী, কিছু নেই বলে কোন
প্রতিক্রিয়াও নেই। আমার কোন জীবনও
নেই। যে জীবনটা দেখছ, ওটা বেঁচে থাকার
নিরস এক গল্প! আমার কোন প্রবাহ নেই, থেমে
শ্লথ হওয়ার মতিভ্রমও নেই। আমার কোন দিগন্ত নেই,
চোখের সামনে দৃশ্যমান শিল্পের প্রতি অনুরাগও
নেই। সামনে কিছু নেই বা পেছনে কিছু আছে
এমন ভাবনাও নেই। ভালোবাসা নেই, ঘৃণা নেই, প্রতারিত
হবার ভয় নেই, তোমার হৃদয় লুট করে নেয়ার
লোভও নেই। কথামালা নেই, স্তম্ভিত থাকার হারানোর
আখ্যানও নেই। চোখের কোণে জল নেই, জল
থাকলেও ছলছল নেই, টলমল হবার ছবিও নেই।
মানুষ হবার হবি নেই, আমার ভেতরে কবিও
নেই। আমি গায়ে রোদ মেখেও সূর্যকে প্রণাম করি না,
বৃষ্টি যতই ভিজিয়ে দিয়ে যাক, কখনও ধরি না।
আমি ঘুম ভেঙে দিন দেখি, রাত এলে ঘুমাই, আমি
পৃথিবীর বয়স কত এ সব নিয়ে মোটেও ভাবি না।
পাখির পালকের মতো ঝরে পড়ে তোমাদের প্রেম, জানি।
আমি প্রেমের আদি-অন্তের কোথাও নেই।

আমার কোন জীবন নেই, যেটা দেখছ
ওটা শুধু বেঁচে থাকা! এক জলপরী বা বসন্ত
একদিন আমাকে ঘোরের মধ্যে রেখে
বলেছিল মরুভূমি খুড়লেই জলপ্রপাত পাবো।
বলো তো, এই ঘোর নিয়ে কার কাছে যাব?

 

মৃত্যু প্রলয়

বেত ফলের মতো থোকা থোকা মৃত্যু
শহর, গ্রাম, পথে-দরোজায়! তোমরা মৃত্যুকে
যেন তুচ্ছজ্ঞান করে যাও সেকী অবহেলায়!
আমাদের ঘর-গেরস্থালি, নাগরিক বৈভব, অভাবের
রোজনামচা সবকিছু হুমড়ি খেয়ে আছড়ে
পড়ছে জীবাণুর গ্রাসে, রাষ্ট্রযন্ত্র ঠুমরি ফেলে
নাভিশ্বাস ফেলে নিদারুণ ত্রাসে!
ধর্মভীরুরা আকাশের ওপারে বিশ্বাসের দৃষ্টি
রেখে বেঁচে থাকার উপায় ভুলে থাকে,
কেউ জানে না অদৃশ্য ছোবল মারবে কখন, কাকে!

যমদূতের প্রলয় নাচনে কাঁপে চারপাশ, খোঁজে
বুঝি নীল পদ্ম, যে দ্বীপ রাত পেরুবে বলে
জ্বলেছিল, ওটা নিভে যায়, হই বাকরুদ্ধ! যে প্রেম
তোমাকে ছুঁয়ে যাবে বলে একদিন হারিয়েছিল
অচেনা পথের বাঁকে, সেই প্রেম ফিরে এসে থামিয়ে দিক
এই মৃত্যুপ্রলয়, এবার বাসবো ভালো তোমাকে।

 

দুঃখ এবং জাতিসংঘ

আমার একটি দুঃখ অভিমানের বৃষ্টি মাথায়
নিয়ে হারিয়ে গেল একদিন! বসন্ত হাওয়ায় সুঁতো ছেঁড়া
ঘুড়ির মতো এক প্রতিশ্রুতি সামনে এসে আমাকে
বলল, হিরন্ময় পালক ছুঁয়ে দিলেই মিলিয়ে
যাবে তাবৎ দুঃখবোধ! আমার মেঘলা দৃষ্টিতে কেউ বুঝি
লাগিয়ে দিল রোদের মণি। আমি দেখি, যেখানে
জলপ্রপাত ছিল, সেখানে আমার গোপন কান্না
নেই। আর যেখানে ফুলের উদ্যান, সেখানে তোমার
হাসি জনসভা করছে! পৃথিবীর সুখি মানুষগুলোর
হাসি ঐ জনসভায় ঢেউ ছড়িয়ে বলে দিচ্ছে
রাজনীতি ফুরালেই সুখের পেছনে ছুটবে না মানুষ,
কষ্টরা মূল্যায়িত হবে জাতিসংঘে।

জাতিসংঘ আমার দুঃখ হাতে পেয়ে
মারণান্ত্রের মজুদকারি মানবতা বিলি করা রাষ্ট্রগুলোর
কথার ফিরিস্তি দিল প্রথমে। এরপর একপ্রস্থ
গদগদ ভাব প্রকাশ করে বলল, মানুষ কেন
যে শুধু নিজেদের দুঃখের কথাই বলে, একবারও
জাতিসংঘের দুঃখের কথা বলে না! আমার
দুঃখ হচকিয়ে জানতে চাইল, তোমার আবার দুঃখ
কি! জাতিসংঘ ম্লান হেসে বলল, অপরাগতা!

 

আরেকটি জীবন চাই

এক ঈশ্বর, এক প্রেম ও এক জীবন নিয়ে
সকলে যখন স্বপ্নগ্রস্ত, দ্বিধাগ্রস্ত বা আলেয়ায়
মোহগ্রস্ত, আমি তখন ঠিক করেছি একের অধিকে
নতুন অংক কষব! দিনেদিনে আমার
স্বপ্নগুলোর আর্তি এমন বেড়েছে যে, এক ঈশ্বরের
কাছে বারবার হাত পাততে লজ্জা লাগে!
যদি আরও ঈশ্বর থাকত,আলোর আরও
সুরুঙ্গ পথ জানা থাকতো তাহলে আর্তিগুলো
পুড়িয়ে নিতাম। আর কোন স্বপ্নের যেন অপমৃত্যু
না হয়, ঐ প্রার্থনাও রাখতাম এক
ঈশ্বর থেকে আরেক ঈশ্বরের দরোজায়।

এক প্রেম, সেও যেন ঐন্দ্রজালিক মায়াজাল!
যে পায় সেই তো এই মায়াজালে বুনে
যেতে পারে জীবনের সাতকাহন। কিন্তু তারা
দেখে কি জীবনের ক্ষরণ, দহন, যন্ত্রণার উপকথাগুলো
দ্যুতিময় না হয়েও নিজস্ব মহিমায় কেন উদ্ভাসিত?
এক প্রেম পুড়িয়ে পুড়িয়ে খাঁটি করে যেমন, তেমনি
ছাইভষ্মও করে দেয় কখনও! আমি তাই, আরও প্রেম চাই।
হৃদয় পুড়ে ছাই হলে খুঁজে পেতে চাই পুর্নজন্মের সিঁড়ি!

বলো তো এক জীবন নিয়ে সুখি কে?
এক জীবন নিয়ে সুখি-এমন সত্যের মিথ আমি
এখনও পাইনি। সুখি হয়ে থাকার অভিনয়
দেখে দেখে খুব ক্লান্ত! তাই আমি অন্তত আরেকটি
জীবন চাই। ঐ জীবনে, এই জীবনের কষ্ট আর
ঘৃণা বাকরুদ্ধ করে রাখতে চাই! কষ্ট জীবনকে নাড়িয়ে
দেয়, ঘৃণা প্রেমকে তাড়িয়ে দেয়, দেখেছি এই জীবনে।

দু’হাত বাড়িয়েছি, আমি আরেকটি জীবন চাই!

 

নীরব কবি
জীবন বলে আহারে,
হতাম যদি জলেরই গান
আছড়ে পড়তাম পাহাড়ে!
কষ্ট কেন প্রেমে নীলাভ,
বলে দিতাম তাহারে!

জলের গানে আকাশ যদি নামে
পাহাড় জড়ায় যদি
হাওয়ায় ফুলের সুবাস ভেসে এলে
মনটা না হোক নদী।

কোন বিরহের কত দহন-জ্বালা
চোখের কোণে ছবি
লিখবে কে আর না বলা যে কথা
বন্ধু ‘নীরব কবি’।

রাজি

আমার যত সুখ কান্নায়,
তোমার জানি হীরে-জহরত, পান্নায়।
আমি কখনও বলিনি কোনটা দুঃখ,
কীসে কষ্ট পাই। তোমার অবহেলা
মুঠো ভরে নিয়ে হাসি মুখে উচ্ছ্বাস বিলাই।
আমি আকাশ দেখি, আতশবাজিও…
আমার কল্পনায় থাকেনা কিছু মেকী,
সমুদ্রে ডুব দিতে সবসময় রাজিও।

 

যাসনে থেমে

এই নগরও চাঁদের রূপে
ভুলে যায় সন্তাপ
চাঁদ বলে, দু’হাতে আমার
তোমাকে ছোঁয়ার পাপ!
ছুঁয়েছি আরও গোলাপ,বকুল,
হাসনাহেনা, জুঁই…
ছেঁড়া ফুলের দুঃখগুলো
কোথায় বলো থুই?
চাঁদ বলে শোন্
পড়ে নে মন,
পূণ্য শুধু প্রেমে
পথটা যদি কন্টকও হয়
যাস্্নে ওরে থেমে!

 

স্রষ্টা

জনসমাগম বা ধ্যানমগ্ন চিল্লায়
নায়াগ্রার জলস্রোত, বা খালি ঠিল্লায়
ফুলের হাসিতে, দিগন্ত রেখায়
অজ্ঞের বোধে, কাব্য লেখায়
এখানে ওখানে, আলোকবর্ষ দূর
বিশ্বাস-ভরসায় বাজে এক সুর।
মহা এক শক্তি, স্রষ্টা যে হাসে
না দেখে সকলে তাকে ভালোবাসে!

মানুষেরা ভাগ হয়, নানা পরিচয়ে
ধর্মটা এসেছে কি বিভাজন হয়ে?
যা ছিল স্রষ্টা, আজও আছে সেই
মানুষে খুনোখুনি, ‘মানুষ’ আর নেই!

অন্তরের কথামালা

তোমার অন্তরের কথামালা
আমার অনুভবে রোদ ছায়া হয়
আমার যত কথা, দমকা হাওয়ায়
ঝরা পাতা লিখে পরাজয়।

তোমার চোখের দৃষ্টি শুধু
আমার বুকে ঢেউ তোলে
তোমার মুখের বাঁকা হাসি
জানি, আমি কী বলে।
আমার চোখের গল্প পড়ে
হয়ো তুমি কাব্যময়।

আমার মনের গহীন কোণে
ফাগুন সাজে নিরন্তর
তুমি কেবল পাপড়ি উড়াও
জানো সেকী ছুঁ মন্তর।
অভিমান ও অবহেলা
চুপ করে তা হৃদয় সয়।

 

ভুল

আমি ভুল করেছিলাম, ভুল করে
ভুল ফুল ধরেছিলাম! আমি ঘোরলাগা বসন্তে
ভুল সুর তুলে, কী মাদকতায়
ভুল হাওয়ায় কাশবনের মতো দুলেছিলাম!

আমি ভুল পথে হেঁটেছিলাম, ভুল গল্পে
মেতেছিলাম। ভুল করে ভুল ঠিকানায় গোলাপ
রেখে এসেছিলাম, ভুল ছায়ায়, ভুল
মায়ায় জড়িয়েছিলাম।

আমার প্রেম ছিল তুমুল সে-কী, আমার
কান্না ছিল না মেকী! আমি দেখেছি
ভাঙন, দেখেছি নদীর কূল, শিখিনি দেখে
পায়ে পায়ে কেন জড়িয়ে যেত ভুল।

আমি দেখেছি তোমাকে এঁকেছি মনে ছবি
কত, আমি কবিতার গহীনে ছিলাম
শুধু বোবা কান্নার মতো। ডাকোনি তুমি, ছুটেছি
আমি ভেঙে যত সীমারেখা, একদিন দেখি
ভুলের সাগরে ভাসছি একা, খুব একা!

 

আসন্ন আলোর গান

তোমার আলতারাঙা পায়ে শরতের শিশির জড়িয়ে
গেলে ভাবছিলাম আর লাফাবে না বুঝি
গঙ্গা ফড়িং। আলতা ভিজেও লাবণ্য হারাল
না দেখে রক্তকরবী ভোরকে বলে
দিলাম কোন পথে দেবতারা স্বর্গে গেছেন!
স্বর্গের পথ চিনে নিয়ে গঙ্গা ফড়িংয়ের দল আমাকে
কবি ভেবে কুর্নিশ করে বলল, শিশির ভেজা
আলতার রঙ হোক কবিতার জলপ্রপাত।

আমি কান পেতে রাতের আহাজারি শুনে
বলে দিতে পারতাম নদীর কোন ঢেউয়ে বিলাপ,
কোনটিতে মগ্ন থাকার ধুন আছে। মুগ্ধ থাকার
মাদকতা ছাপিয়ে তোমার অন্তর্যামী হবার
মন্ত্রণাও কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, তা বুঝতে
পারতাম। আমার এ কথা তোমার হাসির
দমকে উড়ে উড়ে সাত আসমান পেরিয়ে রঙের
হাট বসায়, জানি। ভোর হলেই ফুলের সঙ্গে হাওয়ার
কত কথার কানকানি! এই রক্তকরবী ভোরে
ভিজলো তোমার দু’পা, আমার বুকের ভেতরে
বাজতে থাকে বিকেলের আসন্ন আলোর গান!

 

হলুদ শার্টের নিরুদ্দেশ বোতাম

আমার হলুদ রঙের একটিমাত্র শার্ট ছিল। ঐ শার্টটি
রোদে পুড়ে জৌলুস হারানোর আগে একটি
বুতামও হারিয়েছিল। আমার কিশোর মন তরুণ
হতে-হতে একটি বোতামহীন শার্টের লজ্জাকে আড়াল
করতে পারেনি বলে মন খারাপ করেনি কোনোদিন।
বুক বরাবর বোতামহীন বিপণ্নতা নিয়েও আমার
হলুদ শার্টের অহংকার তোমার সামনে কখনও দমে
যেত না! তোমার সঙ্গে প্রায়ই যখন দেখা হতো
আমার গায়ে থাকত মলিন বসন্তের মতো হলুদ শার্টটি।

তোমাকে দেখতাম কত সাজে, কত বাহারি পোশাকে!
গান শেখানোর স্কুলে দেখলে মনে হতো তুমি
লতা-রুনাকেও ছাড়িয়ে যাবে, কলেজে যাবার পথে
মনে হতো সরস্বতীকে হার মানাবে বা তোমাদের বাড়ির
আঙিনায় দেখলে মনে হত পথ ভুল করে পরী
এসে নাচছে, সেকী! হলুদ শার্টের রঙ জ্বলে যাওয়ার
লাজ মনে বিষণ্নতার যত রেখা এঁকে যেত, আমি তোমার
সামনে নিজের দীনতাকে তুচ্ছজ্ঞান করতাম
অবলীলায়! তোমাকে দেখতাম প্রেমের মাদকতা ছড়িয়ে!

তুমি কখনও প্রেমে পড়েছিলে বা কারো প্রেম
তোমাকে আচ্ছন্ন করেছিল কিনা, জানি না। তবে আমি
তোমার রূপের প্রেমে পড়েছিলাম। তোমার মনকে জানার
প্রেমও ছিল, কিন্তু মনের কাছে পৌঁছুনোর পথ খুঁজে
পাইনি। রাজকন্যার নাগাল যেমন পায়না দরিদ্র-সাধারণ,
তেমনি তুমি ছিলে! হলুদ শার্টের হারিয়ে যাওয়া বোতামের মতো
ছন্দপতন মেনে নিয়ে আমি কেবল চোখের কোণে
গোপন অশ্রুজলে আখ্যান রচনা করে গেছি!

আমাদের অনেকগুলো দিন গোলাপ-অরণ্যের গান হয়েছে,
অনেকদিন রোদ-জলে একাকার। শরতের মেঘ হয়ে, হেমন্তের
ম্লান আলো মেখে, বর্ষার থৈথৈ জলকাব্যে বা পৌষের
মিঠে রোদের উষ্ণতায় কতদিন, কতভাবে নিজের পথ ধরেছে।
পড়ন্ত বিকেলের ছায়ায় সেই ভালোলাগা আয়না মেলে ধরে যখন, তখন
দেখি, হে রাজকন্যা, তুমি এখন দুঃখবতী মেঘ! আর আমি
আজও খুঁজি বিবর্ণ হলুদ শার্টের নিরুদ্দেশ বোতাম!

 

অসুর বধের মন্ত্রণা

একদিকে বর্ণিল উৎসব-আতশবাজি, আরেকদিকে
সাজানো বাগানে কসাইদের উদ্দাম নৃত্য!
জল্লাদরা মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানোর কাজে ক্লান্ত
হলেও কিছু মানুষ রাগ সঙ্গীত গাইতে থাকে
রাজদরবারে বা গলির মোড়েও। কবিদের জনপদে
ঘুম পাড়ানিয়া গান ছড়িয়ে ব্যাংক লুটেরারা
আকাশে লেপ্টে দেয় ওদের লালা, পরিমণি নামক এক
উর্বশী একরাতে জন্ম দেয় গল্পের ভেতরের
হাজারটা গল্প! আরও কত-শত-সহস্র বিষণ্ন কাতর
জীবনের গল্প বাকরুদ্ধ হয়ে থাকে সময়ের
বাঁকে! বিস্তৃত ভূখণ্ড কি দেয়ালবিহীন কারাগার?

শরৎ বার্তা এনে দেয় শুভদিনের, আলোও
ছড়ায় টালমাটাল। হিম হাওয়ায় অচলায়তন ভাঙার
দ্রোহ শুনতে পাবো বলে আমি যাবতীয় রঙের
অভ্যাস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিই। মনে মনে
বলি, আমার গোপন কান্না হোক অসুর বধের মন্ত্রণা!

 

তুলনা

আমি শরত আকাশ, তুমি কাশফুল
তুমি নদীর স্রোতধারা, আমি দু-কূল!
তুমি রাধা তাই প্রেমের মহিমা তোমাতে
কৃষ্ণ নই তবু থাকি প্রেমের কোমাতে!

 

কবি ও ঈশ্বর

কবি ঈশ্বরের কাছে বলল, যে প্রেম
জীবনের প্রতিবিম্ব হয়, খোঁজে না চাওয়া-পাওয়ার
হিসাব বা জয়-পরাজয়, সেই প্রেম অঞ্জলী
ভরে চাই! তোমার চোখের ভাষায় রঙধনু বারণ
থাকলেও কবি চাইল তোমার মনের
অলিন্দ্যে লাবণ্য জলে কবিতার ডুব সাঁতার হোক।
তোমার অন্তর্গত ভাবাবেগে নান্দনিক
মাত্রা দিতে কবি চেনা ভূবনকে আড়াল করে
দাঁড়ানোর অসীম ক্ষমতাও চাইল ঈশ্বরের কাছে।
এটাও সত্যি, যুক্তিহীন হলেও কবি তোমাকে
সর্বান্তকরণে চাইল যেন না পাওয়াটাই
ছিল পৌরাণিক অভিশাপ!

কবির দুঃসাহস দেখে ঈশ্বরের ধ্যান
ভাঙল, তোমার ভেতরে সেকী মিহিন ভাঙন!
কবি দু’হাত বাড়িয়ে নিষ্পলক চোখে দেখল ঈশ্বরও
তোমাকে ভালোবেসে কবি হতে চাইছে!

 

নক্ষত্র গুনি

কিছু ‘শহুরে বৃষ্টি’ হামলে পড়ল গ্রামের
তে-মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ ছাতিম গাছে।
এই বৃষ্টি বিলাসে ছাতিম গাছটি একদিন
গাঁয়ের এক কিশোরীকে বলে দিল
দূর পাহাড়ের রোদন কখন হয় বাঁশীর সুর,
কোন বসন্তে দেখা যাবে রোদের জ্যোৎস্না!
কিশোরী এ কথা শুনে নদীর লাবণ্য তুলে এনে
পায়ের ঘুঙুরকে দিয়ে বলল, জীবনের
ক্যানভাসে এঁকে নিয়ো পথ চলার দ্বৈরথ।

গ্রাম্য হাওয়া একদিন শহরের জৌলুস লুট করে
নিয়ে এসে বলল, বৃষ্টির নামে জলের বিলাপ
দেখে সকলে। তুমি কেন শুধু জলপরী দেখো?
আমি কবিতা ছেড়ে ঘুঙুরের শব্দ শুনি আর
আকাশ উল্টে-পাল্টে নক্ষত্র গুনি!

 

ধূলোর আস্তরণ

সুখী মানুষগুলোর গল্প নিয়ে
একটি প্রদর্শনী করব ভেবে বিষাদগ্রস্ত
কবিতার সঙ্গে সখ্যতা ছিন্ন করেছিলাম।
এরপর থেকে বিষাদ নাম শুনলেই আমার মনটা
দমকা হাওয়া হয়ে কাশবনে ঢেউ তোলে।
বিষাদও কম যায় না! একাকিত্বের গল্প হয়ে
আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, যেন
অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসাবাসির যুগল পদরেখা!
সুখের গল্পগুলো আমার সামনে অপ্সরার
মতো নাচতে থাকে আর বলে যায়
মানুষ দুঃখবিলাসী বলে সুখের ছবিতে
কেবল ধূলোর আস্তরণ জমে।
তোমার সুখের ছবিতে যে ধূলোর
আস্তরণ, ওটাই আমি!

 

শহরের গল্প এবং আমি

একপশলা আলোর কাছে এক সমুদ্র
অন্ধকারের গুরুত্ব নেই! তোমার সামনে যেমন
আমার অস্তিত্ব পদপিষ্ট ফুলের মতো!
কোন কোন শহরের সমতল ভূমির গৌরব নেই,
কোন কোন নদীর যেমন তলদেশ ভরাট হয়ে গেলেও
মানুষের বিচলিত হবার প্রতিক্রিয়া থাকেনা। ওইসব শহর
বা নদী তোমাদের অবজ্ঞাকে ভালোবেসে
যায়, কি জানি কেন! আমিও মুখ বুজে
অবনত হয়ে থাকার মন্ত্রণা পাই।
সব শহর, সব নদীর গল্প এক নয়! এমন শহর
আছে পাহাড়ের মতো আকাশ ছোঁয়ার গল্প
হতে চায়, সমতলেও মানুষের গানে মুখর থাকে।
এমন একটি শহরে তোমার সঙ্গে দেখা
হয়ে গেলে আমি সেদিন অন্ধকারের পেখম
ছেড়ে এক পশলা আলো হবো।

 

দৃষ্টিভ্রম

যা দেখি, থেকে যায় দৃষ্টিভ্রম!
যা লিখি, গল্পের ব্যপ্তি হয়ত আছে,
অতল খুঁজো না, গভীরতা কম!
যা দৃশ্যমান, মনে হতে পারে শোভিত উদ্যান।
অথচ দৃশ্যমানেও কত আড়াল ফুলের
কাঁটার মতো লুকিয়ে থাকে, রাখি না খবর। জানো তো
অনেকে প্রাসাদ বানায়, পাহাড় কিনে,
কিনে না তারা নিজের কবর!

চোখের সামনে মানুষের উৎসব দেখি, যুদ্ধও
দেখি। প্রেম দেখি,ঘৃণাও দেখি খুব। দেখি
কোলাহল, আলো, বিভাস, বর্ণিল ছটা…!
দেখি কি ধবল জ্যোৎস্নায় বিহ্বল না হয়ে কেউ কেউ
কেন একাকী নিশ্চুপ? অথবা দুপুরের নির্জনতা
পেলে কেন ঐশ্বরিক মগ্ন হয় পদ্মপুকুর?
আমার চোখে কোন শিল্প নেই, বাঁক নেই,
তোমাকে দেখে মুগ্ধ হবার হাঁকও নেই।
কিছুই পাবে না জেনেও, তুমি আমার চোখে
খোঁজ কত্থকের বোল, তা ধিন্ ধেই!

 

অসমাপ্ত গল্প

বইমেলায় একদল জলপরী
এসে জানতে চাইল আমার কবিতাগুলোর সঙ্গে
নিবিড় জড়িয়ে থাকা দুঃখগুলো শব্দ হয়,
নাকি ব্যঞ্জনা? দুঃখরা কি কবিতার ভাবার্থ বোঝে?
নাকি কবিতার বাঁকে অনাহুত গল্প খোঁজে?
বইমেলায় পথ ভুলে আসা জলপরী
হাসতে হাসতে নারী হয়, মোহহীন দৃষ্টি মেলে
বন্ধুও হয়! আমি বিহ্বলতায় কবিতার
মধ্যে ডুবে থাকা দুঃখ খুঁজি, পাইনা। দুঃখগুলো
গির্জার ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দের গাম্ভীর্যতায়
মিলিয়ে যায়। এরপর দেখি, কবিতাকে শাড়ির মতো
শরীরে জড়িয়ে জলপরীরা শেষ বিকেলের
আভার মতো মিলিয়ে যায় আকস্মিক, আমি
হয়ে যাই কবিতাহীন এক অসমাপ্ত গল্প!

 

আমাকে কে থামায়

তোমাকেই শুধু দেখি, তা নয়,
তোমার চারপাশটাও দেখি।
আকাশের নীল হাতড়ে খুঁজে নিতে
চাই, সত্যের আড়ালে কতটুকু আছে মেকী।
নক্ষত্র ঝরে তোমার অট্টালিকার ওপর
ছড়িয়ে গেলে পৌরাণিক দাবানল বা
ফুলের রেণু হাওয়ায় মদিরতা ছড়িয়ে
তোমার দরোজার সামনে হয়ে গেলে
ঐশ্বরিক বিহ্বলতা, টের পাই আমি। তুমি
বহু পথে হাঁটলেও আমি তোমার পথেই থামি।
পথে যেতে যেতে তোমাকে অনেক
জোড়া চোখের নিঃশব্দ প্রেম
ছুঁয়ে যায় জানি। গলির মোড়ে চায়ের দোকানে
বসে থাকা অলস কবির খাতায় তোমাকে
নিয়ে কাব্যের ঝনঝনানি, তোমার নামে
ঘাসফড়িং লাফায়, জোনাকিরা গায় আলো
জ্বালাবার কোরাস গান বা নিশিও
মাতাল হয় চাঁদের লাবণ্য জলে!
শুধু তোমার চোখে জল দেখিনা। এক ফোঁটা
জল দেবে কি আমায়? তবে খুঁজে নেব
সাগর অতল, আমায় বলো কে আর থামায়!

 

বায়না

আমারও আছে অভিমান, দুঃখগুলোকে
হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়ার শক্তি। কষ্টের মেঘ সরিয়ে
আকাশের না বলা কথা পড়ে নেয়ার
মন্ত্রণাও জানি। আমারও আছে ছুঁয়ে যাওয়ার
অভিলাষ, তোর মনের চৌহদ্দিতে
বুনে দিতে পারি ধ্রুপদ স্বপ্নের বীজ। অবহেলাকে
ভেবে নিতে পারি আতশবাজি বা বিবর্ণ ঘাস!
সত্যি করে বল্্, তুই কি চাস?
তোর কাছে চেয়েছিলাম ছায়া, চাইনি নিবিড়
মায়া। তোর চোখে চোখ রেখে খুঁজিনি
বনলতা সেন, মেলাতে চাইনি কোনদিন প্রেম ও
জীবনের লেনদেন। তবু তুই আমার সামনে
রেখেছিস্্ কতবার সে এক ঘোরের
আয়না। আমি অপার্থিব ঘোরে ডুবে গেলেও
কোনদিন ভুলিনি তোকে পাবার বায়না।

বৃষ্টি দুঃখ ভেজায় না

বেশ বললে তো! বললে, বৃষ্টির জল ধরে
রাখতে। বৃষ্টির জল জমিয়ে
মহাসমুদ্র করে তা মুঠোয় নিয়ে
মরুভূমিকে বলে দিতে হবে নাকি
নাগরিক জৌলুসের দহন কত, যন্ত্রণা কি!
জানো তো, বৃষ্টি শরীর ভেজায়, দুঃখ
ভেজায় না। বরং কখনওকখনও গোপন
কষ্টগুলোকে তৃষিত করে তোলে। আমি
জানি, পৃথিবী জুড়ে যে বৈষম্য, বিবাদ বা অধিকার
হারানোর বিলাপ দেখি, বৃষ্টি কখনও তা
ভাসিয়ে নেবে না। বৃষ্টি দৃষ্টির প্রচ্ছন্নতা
হয়, অনুভবে মায়াবী প্রচ্ছদ!

আমার মরু মন বলে, তুমি হতে যদি বৃষ্টিবিলাস!

 

মুখ বুঁজে আছি

চোখের সামনে আলোর নাচন রেখে
মুগ্ধ করে রাখার তোমাদের যে কৌশল, ওই বিভ্রম থেকে
আমরা মুক্ত হতে পারছি না। জাদুমন্ত্রে আমাদের
আকর্ষণ আছে জেনে, তোমরা বাজিকর হয়ে যাও, জানি!
এমন ভেলকিবাজি দেখাও যে, আমরা
দশদিগন্তের কথা ভুলে এক বিন্দুতে রঙ-বিধুর
ঘোরে ডুবে থাকি। আমাদের সাধারণ বোধে
জৌলুসের সম্মোহন ছড়িয়ে বলে দাও, তোমরা
আলোর দেবতা আর আমরা অন্ধকারের
জগদ্দল পাথর! তোমাদের মুখের মোহন হাসি
আমাদের কাছে প্রভুর কৃপার মতো,
আমরা তোমাদের স্তাবক বন্দনা করতে করতে
দাস হয়ে উঠি। সত্যি বলছি, আমাদের
দাসত্বের সামনেই তোমাদের আলোর নাচন
ফেনিয়ে ওঠে, অথচ তোমাদের গহীন
অন্ধকার হুঁশিয়ারি বার্তা পাঠায় কত! আমরা
মুখ বুজে ঠিকঠাক আছি অবনত!

 

কবির কাছে

বসে বসে কতকিছু ভাবি
হাসির আড়ালে দুঃখের দাবি।
কষ্ট বলে, দুঃখ ওরে শোন্
ভালো করে পড় কবির মন!
দুঃখ হাসে, উড়ে যায় হাওয়ায়
‘কি বলো কবিকে পাওয়ায়!
কষ্ট তুমি কবিতার ছবি
দুঃখ মানে অস্তে ডোবা রবি!’
কষ্ট বলে, ‘বললি তো বেশ তুই
কবির কাছে চল্, সব যাতনা থুই!’

 

দুরন্ত বালক

নদী সবসময় গন্তব্যমুখী, সাগরের এত জল
যেন জনম দুঃখী! তোমার ঐশ্বর্য দেখে
মেনে নিতেই হয় ‘বেশ তো সুখী’! তবু কেন
আকাশের নীলাভ ক্যানভাসে মেঘের উঁকিঝুঁকি?
মেঘের অভিমান গলে হয় বৃষ্টির পালক,
কবি পুরুষ হয়ে সুখী হতে পারেনি
কখনও, তাই হতে চায় দুরন্ত বালক।

 

রাষ্ট্র ও বাতিঘর

মেধাবী মানুষগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য
করতে না পেরে উদ্যান শোভিত-উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটা রাষ্ট্রের
লাইটপোস্ট হয়ে যায়, যেন পলাতক বসন্ত!
রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষগুলোর জীবনবোধে সারল্যরেখা এমন যে,
তারা শুধু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।

রাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী সমীকরণ, জরিপ, জিডিপি’র মতো
গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত, তেমনি বুদ্ধিজীবীরা অলস
ঘুমের বিলাসিতায় মগ্ন। কতিপয় কবি ও লেখক পদক ও উত্তরীয়
নিয়ে যখন বাহাস করেন, সাংবাদিকরাও ব্যবসায়ী হতে
মরিয়া। আবার ব্যবসায়ীরা পায়ের নিচে আইন
পিষে অন্যরকম সুখের শ্বাস ছাড়েন, কেউ তো আছেন
টিপসই দেয়া আইনপ্রণেতা! কেউ দেখো না রাষ্ট্রের রক্তক্ষরণ!

একসময় এই রাষ্ট্রে রাজনীতি অরুণ আলোর বিভাস
ছড়াতো, মানুষের চোখের কোণের টলমলে জলে
নতুন দিনের স্বপ্ন আঁকতো। আজকাল রাজনীতি যেন
গুপ্তগুহার গুমোট কান্না! আর কেউ স্বীকার করুক, বা না করুক,
রাষ্ট্র এখন অন্ধকার হাতড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে বাতিঘর!

 

বেহুলা বিরহ

এমন বিকেল পুড়ে খাঁক হোক বসন্ত বিলাপে!
পাহাড় গড়িয়ে পড়ুক সমতলের প্রেমে।
বেহুলা আজও এল না, কী অভিশাপে?
কষ্ট আর গোপন থাকে না হাসির ফ্রেমে!

 

কান্নার আশ্রম

যে কান্নার শব্দ নেই, জল নেই, এমনকি
অভিব্যক্তিও নেই, ওই কান্নাগুলোর একটা আশ্রম খুলতে চাই।
অনেকের জীবনে এমন কিছু কথা আছে শরৎ ভোরের
শিশির হতে চেয়েছিল, হতে পারেনি। অথচ ও কথা
অপ্রকাশে অনুভবে অতল সমুদ্র হয়েছে।
ওই সমুদ্র খুঁজে এনে আশ্রমের উঠোনে
রোদে শুকাতে দিতে চাই। আর তোমাদের প্রেমের
লাবণ্যপ্রভার যত গল্প, নীলডাউন করে
রেখে দেব উঠোনের কোণে!

 

যা দেখি

লালচে বেদনার শিল্পরূপ যেন!
নীলের কাছে আশ্রয় নিয়ে প্রেম, হাওয়ার
কানে বলে, কষ্টের এত মহিমা কেন?

 

দুঃখবিলাসী

এ বছর সহস্র কোটি টাকার টার্নওভার কমে যাওয়ার
পরও তিনি দুঃখ পাননি। কিন্তু তিন সপ্তাহ যাবত
তিনি এক চামচ ভাত খেতে পারেননি, এই দুঃখটা
তার বুকের ভেতর পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে! দেশের
ডাকসাইটে শিল্পপতি দুঃখ নিয়ে কবিতা লিখতে পারলে
ঝেড়ে দিতে পারতেন দুঃখভরা কবিতা। তিনি
ভাড়াটে কবি খুঁজতে অধীনস্তদের নির্দেশ দিয়েছেন।

যার কারাগারে থাকার কথা ছিল, তার ঠাঁই হয়েছে
মন্ত্রীসভায়, এটা নিয়ে কারও দুঃখ নেই। মন্ত্রীর স্ত্রীর
দুঃখ হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণের সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
বিভিন্ন দেশে যে টাকাগুলো পাঠানো হয়েছে, ওসব ঠিকঠাক
মতো আছে কিনা, কে জানে! দুঃখটা উসখুস করছে!

সরকারের ভেতরে কলকব্জার মতো সক্রিয় আমলার পুত্রের
বিলাসবহুল ক্যাসিনো খুলতে না পারার দুঃখ বা
পরীমণির মতো উর্বশীরা কেন হাতের মুঠোয় থাকে না-
বিত্তশালী কামুকের এমন দুঃখের কথা কেউ কি ভাবে?
কিছু মানুষ আছেন, তারা নিজের অবসাদকে দুঃখ ভেবে
বেরিয়ে পড়েন ব্যাংকক, জেনেভা, ভেনিস, কানকুন,
মায়াবী বিচ বা আরও আলো ঝলমলে শহরে। তারা
খুল দুঃখ নিয়ে ‘দুঃখবিলাসী’ হয় আর সুখ
কেনার অলীক স্বপ্নে বিভোর থাকেন। তারা জানেও না, দুঃখ
জীবনবোধকে কতটা নির্জলা করে দিতে পারে।

কবি জানে, তাদের দুঃখগুলো অন্যরকম। পৌষের সকালে
শিশির ভেজা মিঠে রোদে ভাঁপা পিঠার ভাঁপ যেমন
মিলিয়ে যায়, আর ফিরে আসে না, তাদের দুঃখ তেমন।

তারা নিজেরা একেকজন জীবনের দুঃখ!

জেনে রাখো

চোখের জলে ছবি এঁকেছে কেউ?
অনুভবে সামলে রাখি জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ!
মাথার ওপর আকাশ শুধু নীল
চেপে রাখা কষ্টগুলোর সঙ্গে সে-কী মিল!

 

এমন মোহ আমি চাইনা

আমাদের দেখা হয়নি কিছুই। তোমাদের
নন্দন তত্ত্বের গল্প, কাব্য আড্ডা, বৈকালিক বিলাসে
তাস খেলার মনোরঞ্জন, অথবা সিনেমা হলে হরদম ছবি দেখার
ধনীক শ্রেণীর ব্যবধান তৈরির মতো অদৃশ্য অহংবোধ
আমাদের সবসময় মেনে নিতে হয়েছে।
মেনে নিয়েছিও। সমতলে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখার মতো
তোমাদের সবসময় দেখেছি। এই যে দেখ,
অনেক অনেক বছর পর, আমিও আকস্মিকভাবে উপরে এসে
দাঁড়িয়েছি। ক্ষণস্থায়ী এই অবস্থান আমাকে টালমাটাল
করে দিক, এমন মোহ আমি চাইনা!

 

একই কথা

আমার কি অভিশপ্ত জীবন?
জানতে চেয়েছি যতবার, কলহাস্যে
তোমার দৃষ্টি হয়েছে সরু! জবাবে তুমি
শুধু বলো একই কথা, আমি সমুদ্রের
মলাটে এক দিকভ্রান্ত মরু!

 

যা ভাবতাম

ভেবেছিলাম বৃষ্টির রঙ ধূসর, আকাশের রঙ নীল,
অন্ধকারের রঙ নিকষ কালো। মনে হতো
সমুদ্রের কোন গান নেই, কেবলি গর্জন আছে। পাখিদের
প্রেম নেই-সংসার নেই বা শিশিরের জীবন ক্ষণস্থায়ী।
তোমার হাসির মদিরতায় বুঁদ হয়ে ভেবেছিলাম
অপার আনন্দে বিলুপ্ত নগরীর সবকথা পড়ে ফেলা যাবে!
কিন্তু কই? আমার ধ্যান ভাঙিয়ে কে যেন হাওয়ার
কানে কানে বলে গেল, বৃষ্টির রঙ কালো, অন্ধকার বড্ড
উজ্জ্বল, আকাশের আবার রঙ কি? আরও বলে গেল,
সমুদ্রের গান আছে, গর্জন গানের আলাপ। পাখিদের প্রেম
সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও গভীর, শিশিরের জীবন ক্ষণস্থায়ী নয়। বরং
ফিরে আসার আখ্যান রেখে ওরা রোদ-হাওয়ায় মিশে থাকে।
হাওয়ায় কারও হাসির দাপাদাপি শুনে বুঝতে পারলাম না
তোমার হাসির উল্টো কোন রূপ আছে কিনা, অথবা ভ্রম!
এরপর যা ভাবতাম, ওতে ইতি টানলাম একদম।

 

সেই যে থামলেম

ঘোর লাগা স্বপ্নে যে আকাশটা টানিয়েছিলাম, ওখানে
নক্ষত্র পতনের গল্প ছিল না। যে হাওয়ায় ঝড়ের
তাণ্ডব থাকবে না, এমনি হাওয়ার গানও রেখেছিলাম মুঠোয়।
জলরঙে আঁকা ছবি তোমার পছন্দ বলে সমুদ্রের জল
ধরে রেখেছিলাম চোখের কোণে, আমার চোখে
তুমি দৃষ্টি রাখলেই যেন দেখতে পাও জলরঙের একেক
বিভাস! ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়া দেখলে বা
শিশুদের কান্না শুনলে তোমার অবয়বে কালো মেঘ জমে যেত।
আমি তাই প্রতিদিন তোমার চলার পথে খুঁজে
ঝরা পাপড়ি কুড়িয়ে নিতাম, শিশুদের কান্না
শুনলে কণ্ঠে তুলতাম রবীন্দ্র সঙ্গীত। আমার বেসুরা
কণ্ঠের গান পথচারীর হাস্যরোলে চাপা পড়লেও
তোমার মুখে অন্তত বিষাদ ফুটত না।

আমার সাজানো যা কিছু ছিল, ওখানে মুগ্ধ করার
কোন চেষ্টা ছিল না। বুকের ভেতরের থোকা থোকা আবেগ
নিবিড় জড়িয়ে থাকত জীবনের সাবলীল আখ্যান
রচনায়, যা ‘প্রেম’ বললেও তা অস্বীকার করার শক্তি আমার
ছিল না। ওই প্রেম তোমাকে উজার করে বিলিয়ে
দিতে চেয়েছিলাম, সত্যি। কিন্তু তুমিই একদিন আমাকে
বললে, প্রেম এক ধরনের ব্যাধি, আমি যেন এই
ব্যাধিতে আক্রান্ত না হই! এরপর থেকে আমি
লণ্ডভণ্ড হতে হতে অবাক চোখে দেখলাম তুমিও
অন্য এক আকাশের গল্প বা প্রেম! আমার
গল্পটা নিয়ে আমি সেই যে থামলেম!

 

সাপুড়ে ও সাপ

একদিন এক সাপুড়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে বলেছিল,
মনের বাসনা পূর্ণ হবে! নকশা আঁকা
সরু সাপ নেমেছিল আমার বাড়িয়ে দেয়া
হাতে, এরপর গলায়ও জড়িয়েছিল! হিমশীতল ভয়
যতটা ছিল, এরচেয়ে বেশি ছিল স্বপ্ন পূরণ
হবার অজানা উত্তেজনা! সেদিনের মেঘলা
আকাশটাকে মনে হয়েছিল রুদ্রময়, ফুটপাতকে
মনে হয়েছিল রাজপ্রাসাদের উদ্যান
আর সাপুড়ের জাদুবিদ্যা দেখতে থাকা
সমবেত মানুষগুলোকে মনে হয়েছিল স্বর্গের দেবদূত।
মনের বাসনা ঠিক করে সাপের সামনে
অর্থসমেত হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহবান ছিল
সাপুড়ের। সেদিন দরিদ্র হাতগুলো সর্বস্ব
তুলে দিতে হাত বাড়িয়েছিল। হাত নয়, নিভু নিভু
প্রদীপের মতো জীবনগুলো যেন জ্বলে থাকতে
চেয়েছিল সাপুড়ের তন্ত্রমন্ত্রে।
আমাদের দুঃখগুলো বড্ড সরল, কষ্টগুলো কখনও
চোখের জলে ধুয়ে-মুছে ফুরিয়ে যায় না! আবার
পরাজয়গুলো বোকার মতো বোবা কান্না
হয়ে বুকের পাঁজরে হাহাকার তোলে যখন-তখন।
সাপুড়ের তন্ত্র-মন্ত্র মিথ্যে হলেও আমরা সত্য ভেবে নিতে
পছন্দ করি, আশা ও স্বপ্নে ডুবে থাকতে চাই।
আমিও সেদিন চেয়েছিলাম আমার হাতে সাপটি
নেমে আসুক স্বপ্ন পূরণের বার্তা নিয়ে। সব অন্ধকার
সরিয়ে সাপটি নেমে এসেছিল আমার হাতে,
কী শিহরণ ছড়িয়ে পড়েছিল শ্বাস-প্রশ্বাসে!
সাপুড়ে টাকাগুলো তুলে নিতে নিতে বলেছিল,
তিনদিনের মধ্যে এক ঘোরলাগা স্বপ্নে
জানা যাবে, কবে তুমি আমার হাতে তুলে দেবে
একগুচ্ছ গোলাপ। দিন ফুরিয়ে যায়, তিন দশকেও
ফোটেনি গোলাপ বুঝি! আমি এখন ঐ সাপুড়ে ও সাপকে খুঁজি।

তোমার মঙ্গল হোক

তোমাদের আলোর উঠোনে যে মৌন
আঁধার, ওটাই ছিলাম আমি! তোমাদের প্রাসাদে
যে গল্পগুলো রাজকীয় অহমিকায় সপ্রতিভ
থাকত, ওদের সামনে আমার ভূবন
ভোলানো হাসি কোনদিনও অনুকম্পা পায়নি,
তুমি তা জানতে। স্কুলের শেষবেঞ্চের ছাত্ররা যেমন
অন্যমনষ্ক থাকে, পরীক্ষায় গোল্লা পেয়েও
মন খারাপ করে না, তেমনি ছিলাম আমি!

শুনেছিলাম, তুমি একদিন মুগ্ধতা ছড়ানো
আলো-আঁধারিতে হেঁটেছিলে র‌্যাম্পে। সেদিন
সহস্র চোখে ঘোর লেগেছিল, ‘মিস্’ খেতাব
পেয়েছিলে বলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল সাংবাদিক!
আমাকে দেখে তোমার অবজ্ঞাও করত
আরও চিকচিক্! বলো তো, আমি কি কোনদিন
ঝলসানো রুটিকে চাঁদ বলেছিলাম?
রবীন্দ্রনাথ কেন এত গান-কবিতা লিখেছেন,
লিওনার্দো কেন মোনালিসার ছবি এঁকেছেন, এ কথা
জানতে চেয়েছিলাম? বা কারা শিল্পমনা, কারা
শুধু দু’বেলা ভাত খেতে পাবে কিনা ভাবে,
এ নিয়ে শ্রেণি-বৈষম্যের তর্ক কখনও তুলেছিলাম?

আজও বলছি, আমি তোমাদের আভিজাত্যকে
কুর্নিশ করে যেতে কখনও কুণ্ঠিত ছিলাম না। এরপরও
আমাকে দেখলে তোমার দৃষ্টি বাঁকা হয়ে যেত! আমাকে আজও
তাড়িয়ে বেড়ায় তোমার বাঁকা চোখ, যেখানেই থাকো
মনে মনে বলি, তোমার মঙ্গল হোক।

 

একদলা নিরেট পাপ
অন্ধকারে ঝুলে থাকা যেন বাদুরের জীবন,
বেশ তো ছিল! আলোর সুরুঙ্গ দেখে
ভালোবেসে ফেললাম, মনে হলো স্বর্গে যাবার
সিঁড়ি। আলোর রেণু গায়ে মেখে
ভাবলাম, তোমার সামনে দাঁড়াই আশ্চর্যবোধক
চিহ্ন হয়ে। কে জানতো, আলোর রেণুতে
তোমার এলার্জি খুব, আমাকে দেখেই
তুমি দু’হাতে ঢাকলে মুখ, হয়ে গেলে চুপ!

অন্ধকারের কাছে ফিরে যেতে যেতে
আলোকে দিই অভিশাপ। তুমি চিৎকার করে
বলছিলে, আমি প্রহসন আর একদলা নিরেট পাপ!

 

গোপন সিন্ধুক

খুব চেনা মুখটাকে একদিন ভীষণ অচেনা মনে হলো!
এমন ছায়া আছে মায়া হয়ে অনুভবে রঙধনু হয়,
কবিতায় নক্ষত্রের মতো শব্দগুচ্ছ ছড়ায়, ব্যাঞ্জনা
এঁকে যায়, গল্পের সীমাবদ্ধতায় প্রশস্ত আখ্যানের শ্বাসরুদ্ধ
সমাপ্তি টেনে দেয় বা কানে কানে বলে, বেঁচে থাকার
মহিমা আছে। সেই ছায়া বোবা দেয়াল হয়ে
সামনে দাঁড়ালে, বুকে কতটা বিস্ময় জমে? জানি,
মায়ায় কখনও বিভ্রম থাকে না, প্রেম ফুরালে মানুষের
মনে বিভ্রমের গহীন অরণ্য জন্ম নেয়। আমি
মুখটার দিকে তাকিয়ে প্রেম খুঁজি আর নিজের ভেতরে
হাতড়ে বেড়াই প্রতিশ্রুতি রাখার গোপন সিন্ধুক।

যতনে রাখা সিন্ধুকও মানুষের মতো বদলে যায়!

 

তাইত আকাশ নীল

গল্পের খোঁজে গেলাম রোদের কাছে,
বললাম, অন্তত একটা গল্প আমাকে বলো।
চারপাশে এত জীবন গল্প হয়ে যায়
দেখেও তুমি কীভাবে প্রতিদিন জ্বলো?
রোদ বলে হেসে, গল্প কোথায় পাবো? যা দেখি
রোজ, পুড়ে পুড়ে খাঁক! রোদের কাছে
গল্প খোঁজে কেউ? গাছের কাছে চাইতে পারো,
ছায়ায় গল্প খুঁজতে পারো। ছায়া বলল, পুড়ে পুড়ে
গল্প ঠিকই আসে, ছায়ায় বসে শীতল হলে
গল্পগুলো উল্টো ওরা আমার গল্প খোঁজে!
আমার যেমন প্রেম থাকে না, বিরহটা
রঙ মাখে না, বলি ওদের তাই। আমারও যে
বলার মতো গল্প কোন নাই! কথা শুনে খিলখিলিয়ে
গল্পগুলো কোথায় যেন যায় মিলিয়ে, আমি
আবার নিজের মতো ছায়া কেবল যাই বিলিয়ে!
গল্প খুঁজে হণ্যে আমি, কথা শুনে বৃক্ষ হাসে,
আমায় বলে, রোদ ও ছায়া তো আমার
গল্প! ওরা যখন মুখ খোলেনি, হাওয়ায় পাতো
কান, হাওয়ায়ই তো ভেসে বেড়ায় গল্প-কথা-গান!

হাওয়া বলল, কখনও মৃদু চলি, ঘূর্ণিঝড়ও
জানে আমার রূপ, গল্প যদি থেকেও থাকে ভীষণ,
ভীষণরকম চুপ! বৃষ্টিরা যে গল্প হয়ে নামে,
ওসব গল্প যায়না ধরে রাখা। নাওনা ধরে, রঙধনুটা
গল্পরঙে আঁকা! রঙধনুও আকাশটাকে দেখিয়ে
বলে, খোল চোখের খিল! ওখানেই তো
গল্প জমে, তাইত আকাশ নীল!

 

সেই ছেলেটি

অমাবশ্যার চেয়েও কালো রঙের ছেলেটি
পথে আমাকে দেখে যখন থমকে
দাঁড়াত, মহাকালের ধুন বাজত কিনা জানিনা।
আমার বিরক্ত চোখে চোখ পড়লে ছেলেটি
অপরাধীর মতো দৃষ্টি সরিয়ে নিত, তবে
অন্য এক চোখ যেন আমাকে দেখে যেত! ঐ
চোখে আঁধারের গভীরতার মতো চিকচিক
করত একতাল বন্য ভাষা।

আমার চোখে প্রশ্রয় ফুটলে ছেলেটির মুখে
কাশবনের মতো হাসি ফুটত, ওর এলোমেলো
চুলগুলোতে হাওয়া তুলে দিত বুঝি ভাবুলতার কাব্য।
ছেলেটির গায়ের মলিন শার্টটিতে ঊনবিংশ
শতাব্দীর তাবৎ হাহাকার লেপ্টে থাকত যেন।
তবু ওর ভীরু চোখের মুখটাকে মনে হতো
কেমন ঘোর লাগা এক রাজ্য!

অচল পয়সার মতো কালো ছেলেটি স্বর্ণমুদ্রার গল্প বলতে চাইতো,
গনগনিয়ে উঠত সামাজিক দেয়ালের অট্টহাসি।
একদিন কুহক দুপুরে আয়নার সামনে বসে ছেলেটির
মুখ দেখেছিলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম মনের
কোথাও জন্মেছে হিরন্ময় ছায়ার কম্পন। এরপর ছেলেটিকে
দেখলে আমি ছায়াটাকে আয়নায় ধরে দেখতাম, আর
ও অকারণে আকাশের দিকে চেয়ে থাকত!

সেই ছেলেটি বসন্ত বোঝেনি, কুঁড়ি কখন পাপড়ি মেলে ফুল হয়,
তা খোঁজেনি। এমনকী, আমি যে ওর উপস্থিতিকে আর
অবজ্ঞা করছি না, এই প্রশ্রয়ের রহস্যও জানতে চায়নি কোনদিন।
এমন ছেলেরা কি শুধু আকাশপানেই চেয়ে থাকে, আর
ফুল না দিয়ে দীর্ঘশ্বাস রেখে যায় পথের বাঁকে? সেই ছেলেটি
রোদে পুড়ে হয়েছে কি আরও কালো? ও কি
জানে, কোথায়, কীভাবে ফেলে গেছে এক চিলতে আলো?
শেষ অবধি জেনেছে কি নদী ও নারীর গল্প কেমন হয়?

বয়ে যাওয়া আর সয়ে যাওয়ার জীবনে আমিও
আজ আকাশমুখি। শুধু জানতে ইচ্ছে করে, বিষণ্ন পথিক
শূন্য হাতে ফিরে গিয়ে হতে পারে সুখি?

 

অশ্রুজলই কবিতা

পুতুল নাচ দেখতে গিয়ে ধূলোয় পড়ে থাকা
একটা গল্প তুলে এনেছিলাম একদিন।
হাত বাড়িয়ে রঙধনু মুঠোয় পুড়ে
আনতে পারিনি বলে তোমাকে পত্র লিখিনি
কোনদিন। হাওয়ায় খুশবু ছড়িয়ে
তুমি চলে যেতে, আমার দু’চোখে মাদকতা
রেখে যেতে অথচ আমি কবিতায়
খুঁজিনি হৃদয়ের উষ্ণতা। স্বপ্ন না দেখে
নিঃস্ব থেকেছি কতদিন!
গল্পটা আজ আকাশ হয়েছে, না বলা কথা
রঙধনু। আর আমার গোপন অশ্রুজলই কবিতা!

 

আমি আছি আগের মতো

তোমার অহংকারের সমুদ্র থেকে
এক ফোঁটা দাও, দেখি!
তোমার কান্নাও দিতে পারো,
হাসির আড়ালে যা থাকে মেকি!
জানি, তোমার কান্নার অনেক, অ-নে-ক দাম!
ও কথা ভেবেই তো হোঁচট খেয়ে
পথ হারালাম। দিগন্তে যেমন নীলিমা
নেমেছে বলে ভ্রমকে আমরা ভালোবেসে যাই,
আমিও তেমনি তোমার অহংকারকেও
ভালোবেসে যাচ্ছি। শুক্লা দ্বাদশীর দিনে তুমি
নিজের অহম শাণিয়ে নিতেই যেন
বলেছিলে, পেয়ে হারানোর চেয়ে, না পাওয়াই
ভালো! মুখে দেয়ার সময় আইসক্রিম পড়ে
যাওয়ার মতো হলুদ হতাশায় আমি ডুবে
গেলেও পরে বুঝতে পেরেছিলাম, না চাওয়ার
অহংকারও দ্যুতিময়। আমি নিঃস্ব থেকেছি,
তবু দু’হাত বাড়িয়ে তোমার অহংকারকে
তেজোদীপ্ত করিনি। যেটুকু অহংকার তোমাকে
আজ অতল সমুদ্র বানিয়েছে, ওখানে
কেউ নামে না জলের গান শুনতে। তাই না?
আচ্ছা, তোমার জলের গান শুনতে চাইলে
ভালোবাসার দাবি তুলছি বলে ভাববে
না তো! আমি কিন্তু ভিখারী আছি, আগের মতো!

 

আলোর কৈফিয়ত

আঁধারকে বললাম সাক্ষ্য দিতে। তোমার প্রেমের
রঙগুলো কতটা বাহারী আর প্রত্যাখানের চাবুক
কতটা নির্দয় ছিল, তা বলে দিলে আঁধার
অন্তত অভিশাপ মুক্ত হতো! আঁধার বলল, ওর মতো
বোবা-কালা কেউ নেই। ও শুধু দেখে যেতে পারে, কিছু
বলতে না পারার দহনই নাকি আঁধারের স্বরূপ!
আলোকে বললাম তোমার দু’চোখের ঘৃণার
পাঠোদ্ধার করতে। একদিন ঐ চোখেই তো
সাত সমুদ্রের ঢেউ ছিল, ফুলের বাগিচা ছিল, নক্ষত্রের
মতো ছিল অজস্র কথামালা। আর প্রেম ছিল প্লাবন
ছড়ানো পূর্ণিমার চাঁদের মতো! এখন ওসব কেন
হয়েছে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, ক্ষত?

আলো ম্লান হেসে বলল, ‘সাক্ষ্য দেব কি?
আমিও তো অন্ধকারকে ভালোবেসে নিজে পুড়েছি!’

 

সেই বিকেল আর কোনদিন আসেনি

বিকেলটা ঝরা পাতার শোক কুড়িয়ে নিয়ে
প্রতীক্ষার চোখে জমিয়ে দিতে চেয়েছিল আরণ্যক প্রেম।
ধরায় শুধু একটি বিকেলই বিহ্বলতার মালকোষ রাগ
তুলে বলেছিল, বিমূর্ত হোক কবিদের বিষণ্নতার
বিলাসিতা। তাই ঐ বিকেলে কবিরা কবিতা
ভুলে নাগরদোলায় চড়েছিল আর নারীবাদীদের সভা
পরিণত হয়েছিল অর্থহীন হাসির উৎসবে।
‘আকাশের রঙ নেই’ বলে বিকালটা প্রলাপও
বকছিল যেন! অন্যরকম আলোর মদিরতা ছড়ানো
বিকেলটা সব ঋতুর সুষমা একবিন্দুতে জড়ো করেছিল।
তুমি প্রথম শাড়ি পড়েছিলে বলেই বিকেলটাকে
মনে হয়েছিল পৃথিবীর উদ্ভাসিত মায়ালোক! তোমাকে
দেখে মনে হয়েছিল মহাকালের নান্দনিক বাঁকে বিকেল বাকরুদ্ধ
হয়ে গেছে, আমার চোখ তখন সম্মোহনের পারিজাত।

সেই বিকেল আর কোনদিন আসেনি!

কবিতা

তুমি দু’চোখ বড় করে জানতে চাইলে-কবিতা কি?
অরণ্যের নির্জনতার মতো মৌন ও গভীর কেন
কবিদের বোধ? আমি বললাম-ধরে নাও, কবিতা খরখরে
রোদ আর কবিরা কথা বিক্রি করা ফেরিওয়ালা।
কবিদের বোধে অকৃত্রিম আলো-ছায়া খেলা করে বলে
তারা কথা দিয়ে ছবি এঁকে ফেলতে পারেন!

তুমি ফের বললে-কবিতায় রোদ থাকে বুঝি?
কবিতায় কি জ্যোৎস্নার লাবণ্য থাকে না?
নদী ও নারীর মতো কবিতা কেন নিঃসঙ্গ থাকতে
পারে না? আমি বললাম-নিঃসঙ্গ নারী
অসমাপ্ত গল্পের মতো, ঐ গল্প হাতড়ালেও উঠে আসতে
পারে কবিতার মর্ম যত! ধরে নাও, কবিতা
নিঃসঙ্গতার গহীনে জমাট কোলাহল, কবিতা হাওয়ায়
সুবাস ছড়ানো ফুলদল, মেঘের অভিমান,
বৃষ্টির কণা বা ভাবুলতা সৃষ্টির কথার আচ্ছন্নতা!

তুমি আর কথা বললে না, তোমার দু’চোখে
দেখি রাজ্যের ঘোর। আমি মনে মনে
কবিদের কাছে ক্ষমা চাইতে করি হাতজোড়!

 

নন্দিত ভোর

হাওয়া তুলে নেয় ঘাসফুলের প্রেম, তাই
আমি হাওয়ার মদিরতা আজও নিঃশ্বাসে ধরে
রাখি। অরণ্যের নির্জনতায় কতটা বিহ্বলতা জমে
থাকে, গান গেয়ে বলে যায় ভোরের পাখি। গান শুনে
আমি ভোরের নির্মল প্রার্থনা বুকে ধরে রাখি!

কুসুম ভোর বড্ড ক্ষণস্থায়ী, আলোর তেজ
ছড়িয়ে পড়লে আমার মনে হতো ফুল
তুলতে আসবে কি তুমি। তুমি বাগানে এলে
অপ্সরা লাগত আলো-ছায়াতে! তোমার
অকারণ হাসি, আলতা রাঙা পায়ের
নূপুরের রিনিঝিনি শব্দে আমার লাগত ঘোর।
আমি ভাবতাম, তুমি এলে আটকে যেত
যদি সম্মোহনের এই নন্দিত ভোর!

 

কথাগুলো

কথাগুলো ওখানেই থাক, মনের গহীনে
নিঃসঙ্গ দুপুরের মতো! কথাগুলো সুরভী ছড়াক
জুঁই-শিউলী-কাঁঠালচাঁপার মৌতাত যত।

কথাগুলো শিশির ঝরাক শরতের
ভোরে, গ্রীষ্মকে লণ্ডভণ্ড করে দিক বৃষ্টিঘোরে।
কথাগুলো হোক ঝাঁঝালো রোদ, নায়াগ্রার
জল, শৈল্পিক মৌনতা, তুমুল কোলাহল
বা প্রবঞ্চনায়ও ক্ষমা করে দেয়ার মহত্বের বোধ।

কথাগুলো ওভাবেই আছে বেশ,
না ফোটা কুঁড়ি। আবেগের দমকা হাওয়ায়
দুদ্দার উড়ুক মনের ঘুড়ি। কথাগুলো
অপ্রকাশে যদি বহতা নদী, তোমার হৃদয়ে
পৌঁছুবে বলে যাক না বয়ে নিরবধি।

কথাগুলো যেভাবে আছে, ওভাবেই থাক।
জানো তো, কথা পাথর হলেও থাকে না নির্বাক!

 

মেঘ বৃষ্টি রোদ

মেঘ রোদকে বলল-নির্বাসনে যাও! পুড়িয়ে
তুমি কী বলো তো পাও? রোদ হেসে
বলল-মেঘ তোমার আজন্ম কান্নার নাম বৃষ্টি,
বর্ষার বৃষ্টি মানে অনাসৃষ্টি! রোদেও কথায়
বৃষ্টি বলল-মেঘের কান্না আছে বলেই কিছু মানুষ
কবি হতে পারে। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজের
ভেতরে বৃষ্টি নিয়ে খেলা করে, আর প্রেম জলে ভিজে
অপার্থিব-পবিত্র! ভবঘুরে, নিঃস্ব বা জীবনবিমুখরাও
বৃষ্টিতে কাকভেজা হলে রোমান্টিক হয়ে ওঠে।
বৃষ্টির কথা শুনে মেঘের অভিমান গলে-গলে পড়ে।
মেঘ বলল-কীসের কান্না, বৃষ্টি মানে মেঘের
পান্না! রোদ বলল ফের, শোন হে মেঘ, আড়াল
তুলে থাকো যখন, আমিও পড়ি ঢাকা।
বৃষ্টি হলে হারাও নাতো, আমার সঙ্গেই থাকা!
মেঘ বলল-রোদের পিঠে রঙধনু কে আঁকে?
গান-গল্প, কাব্যকথা বৃষ্টি নিয়ে থাকে!

রোদ বলল-ঠিক। তাই বলে কি তুচ্ছ
আমার দান? মেঘ-বৃষ্টি বলল শেষে, রোদটা
আছে বলেই সে তো আলো অফুরান!

 

পাহাড়ের গল্প

পাহাড় কখনও হাঁটতে পারেনা জেনেও
ওকে তুমি দাঁড় করিয়ে দাও ম্যারাথন দৌড়
প্রতিযোগিতায়! পাহাড়কে বলো পঙ্খিরাজ ঘোড়া
হতে, আর পাহাড় তোমার উপহাস মাথায়
নিয়ে অনড় দাঁড়িয়ে থাকে। পাহাড়ের
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার দুঃখহীন একাকীত্ব
তোমার দৃষ্টিতে কোনদিন পড়ল না!

তুমি পাহাড়ের খাদ দেখো, গোধূলি রঙের
অবয়ব দেখ বা ভাঙাচোরা শিলাখণ্ড-পাথর দেখ,
পাহাড়ের নৈঃশব্দের গভীর মূর্ছনা দেখ না।
ঝর্ণা দেখে পাহাড়ের কান্না বলো অথচ হাসির
ফোয়ারা বলেই ওতে গতি ও চঞ্চলতা মিশে একাকার!
কান্নার কি চঞ্চলতা থাকে বা গড়িয়ে পড়ায় গতি?

তুমি নিজের অহংকারকে ঝালিয়ে নিতে
পাহাড়কে বারবার তুচ্ছজ্ঞান করো
আর কী এক রহস্য চেপে তোমার সামনে
পাহাড়টা নতজানু হয়ে থাকে! কত
অবিশ্বাস্য, কত অব্যক্ত বেদনা বা কত নির্জলা
আনন্দ বিধৃত হয় ভালোবাসার বাঁকে!

 

তোমার কাছে অনুরোধ

তোমাকে অনেকেই ভালোবেসেছে, তুমিও
পুড়েছ খুব! প্রেম কখনও ভীষণ সরব,
কখনও নিশ্চুপ! তুমি দেবালয় পুড়িয়ে খোঁপায়
গুঁজে নিতে পদ্মফুল, এটাও জানি। তুমি
ক্লিওপেট্রার চেয়ে বড় প্রেমের মহারানি!

লক্ষ-সহস্র বছরের কালের দিনলিপিতে
তোমার পুনর্জন্মের আখ্যান কখনও ছিল জৌলুসময়,
কখনও আটপৌড়ে জীবনের সাতকাহন।
তোমার প্রেম কোনদিন হারায়নি লাবণ্য,
তেমনি গভীর রেখাপাত এঁকে গেছে অমরত্বের
মহিমায়। কেন জানো? তুমি যতবার
প্রেমে পড়েছ অথবা যাকে প্রেমের আগুনে
পুড়িয়েছ সেটাই ছিলাম আমি! তুমি
লাইলি হলে মজনু আমি, শিরি হলে আমি ফরহাদ।
তুমি জুলিয়েট হয়ে গল্পে অমর যেমন,
আমিও রোমিও হয়ে মৃত্যুকে করেছি তুচ্ছজ্ঞান।

পৃথিবীতে যত নামে, যত কবিতায় প্রেম
উদ্ভাসিত হয়, সেখানেই তোমার পাশে আমি
অনুচ্চারিত বেদনার মতো নীল! তাই তুমি
যখন কবিতায় আঁকবে প্রেমের রূপক, আমার
অশ্রুজলের লাবণ্য আর না বলা কথার ধুন রেখ।

 

জীবন বড় অদ্ভূত

চিলের ডানা ঝাপটালে ঝরে পড়ে
রোদের গুঁড়ো, বৃষ্টিভেজা কদম ছুঁয়ে মনের
ভেতর যে বর্ষার শুরু, ঐ বর্ষার
কান্না চেয়ো না! বর্ষার কোন কান্না নেই,
রোদের যেমন আখ্যান নেই বা
আমার যেমন পুড়ে ছাই হবার মতো
নীল কষ্ট নেই। তোমরা নীল কষ্ট খোঁজ,
দীর্ঘশ্বাস কেন নিরুদ্দেশ হয়না-ওই
যাতনাও বোঝ! শুধু খোঁজনা মনের
কোনখানে পড়ে আছে নিরেট প্রশ্নের মতো
ভালোলাগা। এমনও ভালোলাগা আছে,
যা ভালোবাসাকে অতিক্রম করে বলে দেয়,
মানুষের জীবন বড় অদ্ভূত!

অসুখ

আমি যেভাবেই দেখি না কেন, এক বিন্দুতেই
দৃষ্টি ঘূর্ণায়মান! একটিমাত্র মুখ, একটি ছবির
বিভাস হয়ে বিমূর্ত থাকে। একটিমাত্র মনের
অতলান্তে কথার মুক্ত ছড়াতে চায়।
পৃথিবীর যা দেখি, যত রূপ দৃশ্যমান,
সবকিছুতেই তোমার প্রিয় মুখ
ভেসে ওঠে! এটা কি আমার অসুখ?

 

পথ ও তুমি

নরম জ্যোৎস্নার মতো শব্দগুলোর অবয়ব,
কথাগুলো ডানা ঝাপটানো পাখি। তোমাকে বিহ্বল
করা যাবে না-জেনেও গল্পের নির্যাস ঢেলে
কবিতা লিখি। তুমি বলো, আমার মধ্যে রয়েছে
নাকি পাগলামি। হুঁশিয়ার করে বলে দাও, আমি যেন
গন্তব্য জানা পথে থামি। অথচ পথ আমাকে
বলে, গন্তব্য আবার কি? কথা শুনে তুমি
খিলখিলিয়ে হাসো, বললে ফের-পথকে ভালোবাসো।

পথ চেনা যে মন চেনারই মতো, জানলাম যখন
তুমি তখন দূরাকাশের নীলাভ আলোর মতো!

 

গল্প ও তুমি

অনেকটা পথ এগিয়ে থমকে দাঁড়াল
গল্পটা। ফেলা আসা পেছনের পথে
পেখম ছড়ানো অন্ধকার গল্পকে বলেছিল
পথে বাঁক নিতে পারলেই আলোর
ঝর্ণাধারা মিলবে। গল্পটা জানে, আখ্যান দীর্ঘ
হলে গল্পের চরিত্রগুলো আলস্যের চাদর জড়িয়ে
ঘুমিয়ে পড়ে। জেগে থাকার সম্মোহনের জন্য
গল্পটা তোমাকেই অনেককাল ধরে খুঁজছিল! আচ্ছা,
বলো তো ‘তুমি’ ছাড়া কোন গল্প কোনদিন
সুবর্ণ রেখা পেরিয়েছে? একটা ‘তুমি’ থাকলে
বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে গোধূলীর বিষন্নতায় লাবণ্যপ্রভা
দেখা যায় বা হাতের মুঠোয় ঘাসফড়িংয়ের মতো
লাফাতে থাকে কৃষ্ণচূড়া-প্রেম!

তাই গল্পটা তোমার উষ্ণতা পেতে চেয়েছিল খুব।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে গল্পটা একদিন সত্যিই বাঁক
নিয়ে ফেলল এবং দেখা পেল তোমার।
তুমিও অপেক্ষা করছিলে যেন একটা গল্পময় পথের!

 

আকাশের নক্ষত্র

আশ্চর্য, আকাশের সব নক্ষত্রগুলো
তুমি গুনে ফেললে! শুধু গুনলেই না,
প্রতিটি নক্ষত্রের নামও দিলে।
এ খবর জানতে পেরে মহাকাশ
বিজ্ঞানীরা বাকরুদ্ধ দিবস পালন করল!
আমি শুধু তোমার চোখের কোন
পাপড়ি ঝরে পড়লো কিনা, এ ভাবনাতেই
ডুবে ছিলাম। নক্ষত্রের চেয়ে
তোমার চোখের পাপড়ি, ছলকে ওঠা
হাসির মুদ্রা, বা কপট অভিমান
আমার কাছে অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ!
জানি, একদিন তুমি আমার মনের আকাশে
দৃষ্টি দেবে। সেদিন কী আর,
কোন কথা বোবা কান্নার লহরী বাজাবে?

 

ডুবে আছি

যেদিন আমাকে প্রথম ‘তুমি’ বলেছিলে, সেদিন
নিজেকে ঈশ্বর ভেবেছিলাম! মনে হচ্ছিল
পৃথিবীটা হাতের মুঠোয় ঘাস ফড়িংয়ের মতো লাফাচ্ছে।
সব ঋতুগুলো বসন্ত হবার বায়না ধরে অরণ্যের
নির্জনতাকে সুরের লহরীতে ভরিয়ে তুলছে।

তোমাকে প্রথম যেদিন শাড়ি পড়া দেখেছিলাম, সেদিন
আমার কৃষ্ণচূড়া গাছ হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল!
আমার মন খারাপ হলেই হিজল-তমাল-বটগাছের
জীবনটা চাইতাম। সেদিন তোমাকে শাড়ি পড়া
দেখে কৃষ্ণচূড়া গাছ হতে চাইলাম কেন, জানি না।
অতিশয় মুগ্ধতা মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে পারে,
বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে কালান্তর পার করিয়ে দিতেও
পারে-এ কথা অনুভব করেছিলাম। আচ্ছা,
কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো কি আমার অব্যক্ত কথা নয়?

প্রশ্নটার জবাব তুমি আজও দাওনি। আমিও দেয়ালে
টানানো ছবির মতো ‘তুমি’র মাদকতায় ডুবে আছি।

 

কথা ও সম্পর্ক

যে কথা বলা যায় না, অথচ অনুভবে
অস্তিত্ব হয়ে থাকে, এমন কথার নামকরণ কি?
প্রশ্ন রেখে তুমি শীতের কুয়াশা-সকালের
মতো ঝিম ধরে রইলে। আমি বললাম, এমন কথা
সম্পর্ক নির্ণয় করে দেয়, কিন্তু সম্পর্কটার
সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। অথচ কথা ও সম্পর্ক
দুটোই ধ্রুব সত্য। কুয়াশার সকাল যেমন আলোর
আড়াল হয়ে দাঁড়ায়, এমন কথা ও সম্পর্ক তেমনি
নামকরণহীন প্রতিপাদ্য অবহেলা! তুমি বললে,
ওসব কথার জলপ্রবাহ আছে! আমি বললাম, এমন
সম্পর্কেও প্রেমের মদিরতা আছে!

তুমি চুপ করে রইলে, কথা ও সম্পর্ক দুটোই চুপ!

 

কোথায় তোমার দেশ

মাথার ওপর আকাশ, নাকি দেয়াল?
মুঠোয় ভরা শূন্যগুলো, কী যে সুখে
হরহামেশা গায় যে ভজন,
ঠুমরি এবং খেয়াল!

আমার চোখে বসন্ত নেই, তোমায়
দেখে কেন তবু, হারিয়ে ফেলি
হৃদয় ও খেই, নিন্দুকেরা নাচে
তা ধিন ধেই!

নিজকে পারো রাখতে বেঁধে
সুখের আলাপ, গলা সেধে,
আমার কেবল বেঁচে থাকা,
মরার মতো বেশ।

আমার খরা, কারও সাগর জলে ভরা
মণি-মুক্তো চাইনি,
শুধু ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিলাম
তোমার কালো কেশ!

কন্যা তুমি কোন্্ ভূবনে,
কোথায় তোমার দেশ?

 

ইচ্ছে পাখি

হাওয়ায় উড়ে এসে ফুলের একগুচ্ছ পাপড়ি
আমাকে বলল, প্রেমের কবিতা লিখে
দিলে ফুলেরা ইচ্ছে পাখি হবে, ফুল থেকে পাপড়ি
ঝরবে না আর। কবির কাছে কবিতা চাওয়া
তুচ্ছ আবদার। আমি একটি প্রেমের কবিতা লিখতে
বসতেই তোমার দুটি চোখ ভেসে উঠল।
আমাদের শেষ দেখার দিন তোমার চোখে দমিত
বেদনার আচ্ছন্নতা ছিল। তোমার চোখ বড্ড
মায়াবী ছিল, ছায়াময় অরণ্যের মতো ঘোরটোপ
দেখতাম আমি, যা ছিল আমার কবিতার প্রতিবিম্ব!

যে চোখে দৃষ্টি রাখলে কবিতার অঝোর বৃষ্টি
নামত আমার মনে, সেই চোখ সেদিন
আমার সামনে আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়েছিল।
ফুলের পাপড়ি নয়, আজ আবার আমার সামনে সেই
আয়না হাজির! আয়নায় চোখ রেখে আমি আড়ষ্ট কণ্ঠে
বলি, ফুলেরা ইচ্ছে পাখি হয়ে গেয়ে উঠুক গান।
পাপড়িগুলো কানে কানে বলে, আমাকে দেবে
তোমার গোপন অশ্রুকণার আখ্যান!

 

একুশে ফেব্রুয়ারি

পৃথিবীতে শুধু একটি ভোরই অন্যরকম!
যে ভোরে আলো ও আঁধারের বৈষম্য নেই, বিভেদ
নেই। যে ভোরে শোক পরিণত হয় প্রভাতফেরির
গান, আর পাখিরা কান্না ভুলে যায়। এমন
ভোরে শহীদ মিনারে লেখা হয় মিছিলের স্বরলিপি,
জ্বলে ওঠে সালাম,জব্বার, রফিক, বরকতের নামে
নক্ষত্রের মশাল, যেন নতজানু অনন্তকাল!

এই ভোর পৃথিবীর সর্বত্রই অন্যরকম, সব ভাষাভাষীদের
হৃদয়ে ছড়িয়ে যায় হিরন্ময় আলো! এই ভোরে
যত ফুল ফোটে, সব ফুলের এক নাম-একুশে ফেব্রুয়ারি!

 

তফাৎ

এসো একাকীত্ব,
বরফকুচিতে ঢাকা কমলালেবু রঙের
উচ্ছ্বাসগুলো উড়িয়ে দিই।

এসো জীবন,
বসন্তের পত্র-পল্লব ছিঁড়ে
দেখে নিই শূন্য হাত কতটা নির্মোহ।

এসো প্রেম,
তোমার নামে জপ-টপ বন্ধ করে
দেখে নিই কোন্্ প্রেমে
স্রষ্টার পক্ষপাত।
এরপর মিলিয়ে নেব তুমি কেন
রাজকন্যা, আমি কেন প্রজা,
কেন এই তফাৎ?

 

আলো আঁধার

এই যে আলো মাখছ রোজ,
অন্ধকারের নিচ্ছ খোঁজ?
আজ জেনে নাও, আলো তো নই,
বাসলে ভালো তখনি হই!
তোমার প্রেমে আলোর বিভাস
প্রেম না পেলে পথেরই ঘাস,
কিংবা ধরো কান্না চাপা,
দুঃখ এমন যায় না মাপা!
তাই বলি যে শুনে রাখো
এই আঁধারে ছবি আঁকো।
আলো-আঁধার মিলেমিশে
কাটুক জীবন, পাক তা দিশে।

তুমি তখন কোথায় ছিলে

আমি যখন হাওয়ায় দোল খাওয়া ফুলের মতো কিশোর,
বা ডগমগে উচ্ছ্বাসের মতো
সদ্য তরুণ, যে কোন স্বপ্ন দেখে
ফেলতে পারার দুঃসাহস মুঠোয় নিয়ে ঘুরছিলাম।
তুমি তখন কোথায় ছিলে?
আমি যখন বেদনাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে
আকাশের নীলাভ রঙ করে দিতে পারতাম,
সূর্যোদয়ের নরম আলোয় দ্রোহ
পুড়িয়ে রোমান্টিক কবিতা লিখতে পারতাম,
অথবা সমুদ্র জলে হাত রেখে
নক্ষত্রের কিসে অভিমান, বলে দিতে পারতাম।
তুমি তখন কোথায় ছিলে?
আমি যখন ছেঁড়া স্যান্ডেল পায়ে হেঁটে হেঁটে
রাজাধিরাজকে চরম অবজ্ঞা দেখাতে
পারতাম, ব্যর্থ প্রেমিকের জন্য প্রেমপত্র লিখে দিয়ে
টাকা উপার্জন করতে পারতাম, অথবা
অপরূপা কোন মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হয়েও
না দেখার ভান করতে পারতাম।
তুমি তখন কোথায় ছিলে?

 

একটি ভুলই পারিজাত

আমার কিছু ভুল, অভিমান না হয়ে
নদীর গহীনে উল্টো স্রোত হয়েছে। কিছু ভুল
হয়েছে জ্বোনাকির আলো, কিছু আবার
বৃষ্টিমঙ্গল, কিছু ভুল পপি ফুল!
কিছু ভুল খরখরে রোদে মিশে
উষ্ণতা ছড়ায়, কিছু ভুল কথা শেখা ময়নার
মতো, কিছু ভুল ‘ভুল নয়’ দাবি করে যায় অবিরত।
পদচিহ্নের মতো পড়ে আছে কত ভুল আমার,
কখনও মনে হয় আমি যেন ভুলের খামার!
কিছু ভুল মৃত, কিছু অমৃত! কিছু ভুল
মমি, কিছু জাগ্রত। এত ভুলের মধ্যে শুধু
একটি ভুলই পারিজাত। ফিরিয়ে দিয়েছও তবু
তোমাকে ভালোবাসি আজও, যেন রোমান্টিক প্রত্যাঘাত।

 

সুবর্ণরেখা

ফেলা আসা এক সুবর্ণরেখা হঠাৎ
সামনে মুখোমুখি-দেখা! ফেরারী বসন্ত
গুনগুনিয়ে শোনায় কুহু-কেকা।
ডানা ভাঙা গল্পের উড়্ক্কু পালক কানে কানে
বলে- হেরে হেরে অনেক তো হলো শেখা!
আর কত নতমুখে স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকা?

আমি বলি- নদী দেখ, জলের মতো বয়ে
চলা শেখো। হেরে হেরেও জয়ী হওয়া যায়, যদি
চাপা কষ্ট রঙধনু হয় সুবর্ণরেখায়!

 

বোকা পথ

একটা বোকা পথ ঝরে পড়া কিছু কুঁড়ির
দুঃখ নিয়ে এসে আমার সামনে হাজির! পথটা
বলল, কুঁড়ি ফুল না হয়ে ঝরে যায়, এমন
বিষাদের কবিতা যেন আমি না লিখি। পথটির
অদ্ভূত কথা শুনে আমি অবাক হওয়ার
চেয়ে বিমূঢ় হলাম বেশি। আমার হতবিহ্বল মুখের
রেখা পাঠ করে পথটি বিনয়কণ্ঠে ফের বলল,
কবিরা কাঁদতে পারে না বলে বোবা কান্না
রেখে দেয় কবিতায়, যেন গুপ্তধন!
পথটার সঙ্গে কুঁড়ির দুঃখগুলো বলল, কবিরা
অন্তর্যামী হতে পারে বলে প্রেম শ্বাশত!
আমি বোকা পথটাকে কী বলি বা
কুঁড়ির দুঃখগুলোর এ কথার কী মানে দাঁড়ায়?
ওরা জানে না, কবিদের ঐশ্বরিক শক্তি নেই,
জাদুমন্ত্রও জানে না তারা। বোকা পথ আমার সামনে
কুঁড়ির দুঃখ ছড়িয়ে অবনত হয়ে বসে থাকে,
একটা সময় তোমার সামনে আমি যেমন বসে থাকতাম!

 Back