বসন্ত নয়, অবহেলা

বসন্ত নয়, অবহেলা

 Author: দর্পণ কবীর  Category: কবিতা More Details
 Description:

১. বসন্ত নয়, অবহেলা

বসন্ত নয়, আমার দরোজায় প্রথম কড়া নেড়েছিল
অবহেলা। ভেবেছিলাম, অনেকগুলো বর্ষা শেষে,
শরতের উষ্ণতা মিশে এলো বুঝি বসন্ত। দরোজা খুলে
দেখি আমাকে ভালবেসে এসেছে অবহেলা। মধ্য
দুপুরের কড়কড়ে রোদের মতো অনেকটা নির্লজ্জভাবে
আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল অনাকাক্সিক্ষত
অবহেলা। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম আমার
দীন-দশায় কারো করুণা বা আর্তি পেখম ছড়িয়ে
আছে কিনা, ছিল না। বৃষ্টিহীন জনপদে খরখরে রোদ
যেমন দস্যূর মতো অসহনীয়, তেমনি অবহেলাও
আমাকের আগলে রাখতে ছিল নির্মোহ-নিঃশঙ্কোচিত।

আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভৌঁ-দৌড়
দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। তখন দেখি, আমার সামনে
কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষা। উপেক্ষার সঙ্গেও
একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের
কোলাহলমুখর আনন্দ-সভায়! কী মিলেছিল? ঠোঁট
উল্টানো ভর্ৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মতো একতাল অবজ্ঞা।
তাও সহে গিয়েছিল একটা সময়। ধরেই নিয়েছিলাম,
আমার কোনোকালেই হবে না রাবিন্দ্রিক প্রেম, তোমাদের
জয়গানে, করতালিতে নতজানু থেকেছিল আমার চাপা
আক্ষেপ-লজ্জা। বুঝে গিয়েছিলাম, জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে
ছোঁবে না। জয়নুলের রং নিয়ে কল্পনার বেসাতি, হারানো
দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা বা ফুল-পাখি-নদীর
কাব্যালাপে কারা মশগুল হল এ নিয়ে কৌতূহল
দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনও। এত কিছু নেই
জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হবÑ সেই অমিত
শক্তিও আমার ছিল না। মেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে
আমার কিছুই ছিল না। ছিল শুধু অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা।

হ্যাঁ, একবার, তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা
চোখে তাকিয়েছিলে আমার দিকে। তাচ্ছিল্য নয়, একটু
মায়াই যেন ছিল, হতে পারে কাঁপা আবেগও মিশ্রিত
ছিল তোমার দৃষ্টিতে। ওইটুকুই আমার যা পাওয়া! আমি
ঝরে যাওয়া পাতা, তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়া।
তারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়ে, উপেক্ষার দেয়াল
ডিঙিয়ে ও অবজ্ঞার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা
ভাঙতে পারিনি আমি। এ কথা জানে শুধু অন্তর্যামী।

অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলাম, এই
অবহেলা-তুষারপাতের মুখচ্ছবি, উপেক্ষাÑকাচের দেয়াল,
অবজ্ঞা ঘোরতরÑঅন্ধকার। এর কিছুই থাকবে না
একটি বসন্তের ফুৎকারে। একটি ঝলমলে পোশাক গায়ে
চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল
করে নেব-এমন ভাবাবেগও ছিল আকাশের কার্নিশে
লেপ্টে থাকা পেঁজামেঘের মতো। ঐ মেঘ কখনও বৃষ্টি হয়ে
নামেনি। তোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনও থামেনি।

অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি, অনেক কিছু বদলে গেছে,
সেকী! কোথায় হারাল কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন
করা অবহেলা, স্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে
ফেলা উপেক্ষা আর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার
অবজ্ঞা? ওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক,
তবে এখনও পোড়খাওয়া দিন, বড্ড রঙিন!

আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারি
কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন
অশ্রুকণা,আকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে
ঝরে পড়ছে নক্ষত্র। এমন কী, তুমি যে সম্রাজ্ঞীর
বেশের আড়ালে মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছ লাবণ্যময়
পাষাণপাথর, এটাও দেখতে পাই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।

আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এই আখ্যান যদি পেত
কবিতার রূপ, সেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরূপ!

২. হারিয়ে যাও

আমিও চেয়েছিলাম, তুমি হারিয়ে যাও। আমি
বার বার পিছিয়ে পড়ি, তুমি এগিয়ে গিয়েও
কেন আমার জন্য দাঁড়াও? একবার, এক
প্রজাপতি সকাল ডানা ঝাপটিয়ে বলেছিলÑভোর
আর সূর্যোদয়ের অবিচ্ছেদ্য প্রেম এনে
রেখে দেবে আমার করতলে। চাইলে কালের
পুরাকীর্তিও দেখিয়ে দেবে এমন একটা ভোর,
যেদিন কোনো ফুল ঝরবে না বৃন্ত থেকে।
এমনকি, একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেলবে না
পৃথিবীর কোনো মানুষ। বিস্ময়ভরা ঘোরে এমন
পার্থিব ভোরের জন্য আমি আজো ধ্যানমগ্ন,
এখনো হই সেই প্রজাপতি সকালের স্মরাণাপন্ন।

হতে পারে, সেই সকাল হেলুসিনেশন সৃষ্ট
এক ভ্রম, হতে পারে হেরে যাব বলেই
এ আমার স্বপ্নগ্রস্থ বিলাপ। মসজিদের আযান, মন্দিরের
শঙ্খধ্বনি, গীর্জার ঘণ্টার গাম্ভীর্যতা আর মানুষের
প্রার্থনায় ভোর যতটা পবিত্র হয়, আমি এর
চেয়ে ঢের পবিত্র হতে সূর্যোদয়ের স্বরলিপি খুঁজি।
দু-এক ছত্র কবিতা লেখার মতো সহজ নয়
এটাও বুঝি। তবু মনের ভেতরে লোভের স্বর্ণরেণু
উড়ে, ভোর-সূর্যোদয় করতলগত হবে
বাজে সুর অন্তরে। স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে আমি শ্লথ,
ধীরে পা বাড়াই। পথ হারালেও ঘুরে ফিরে
কেন তোমার সামনেই দাঁড়াই?

 

৩. সেই দুপুর

একটি অপ্রকাশিত কবিতার পঙ্ক্তিতে, ছন্দের
পরতে-পরতে, রিদমমুখর অন্তমিলে তুমিই
রেখেছিলে বসন্তে লুট হয়ে যাওয়া এক নির্জন দুপুর।
যে দুপুর, নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে
করোজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে, বন্ধ্যা নদীকে
জলস্রোতে গড়িয়ে, এমন কী ডানা ভাঙা
স্বপ্নগুলোয় ব্যঞ্জনা জড়িয়ে আমাদের আলিঙ্গন
করেছিল জীবন জাগানিয়া গানে। বসন্ত দুপুর কানে
কানে বলেছিল আমাদের যুগলবন্দী হতে
হলে যেতে হবে কতদূর, কোনখানে। রুদ্র শোভিত দুপুর
যতটা বর্ণময় ছিল, ততটা মাতাল-বাকরুদ্ধ
ছিল আমাদের হৃদয়। ঝলসানো দুপুর তোমাকে
বলে দিয়েছিল-আদম-ইভসের অভিসারে
দমকে দমকে কেন হেসেছিল ঈশ্বর।

রোমান্টিক দুপুর কবিতা হবে বলে
হয়েছিল তোমার পায়ের নূপুর। সেই দুপুর
নিরুদ্দেশ, নূপুরও হারিয়েছে, কবিতা হয়েছে মেঘের
প্রচ্ছদ। একবার, শুধু একবার ফিরে পেতে চাই সেই
বিমূর্ত দুপুর, ফেলা আসা যৌবন, হারানো সুর..!

 

৪. দুঃখবতী মেঘ

এক টুকরো দুঃখবতী মেঘ বলল, এক সমুদ্র জল
জমে আছে বুকে। জলের ছায়ায় ঐন্দ্রালিক মায়ায়
নিঃসঙ্গ পাহাড় দিব্যি আছে সুখে।
ভেবেছিলাম, নক্ষত্রগুলো স্নান করবে
জলে, হামলে পড়বে বৃষ্টি অরণ্যের দাবানলে।
পৃথিবীর তাবৎ ব্যর্থ কবিদের দীর্ঘশ্বাস
এসে নক্ষত্র উড়িয়ে নিয়ে যায়
ঠিকানাহীন কক্ষপথে..
আমি মেঘের দুঃখ হয়ে পড়ে আছি কোনোমতে।

স্বপ্ন ছিল, পাহাড়ের বুকে নেমে
গোপন ঝর্ণা হব, লতা-গুল্মে জড়িয়ে
পাখিদের বিবাদহীন জীবনের কথা কুড়াব।
হয়নি নামা পাহাড়ে, তোমাকে দেখা হয়নি
দু’চোখ মেলে-আহারে! মেঘ হয়েই যদি
থাকি, তুমি জানালায় দু’হাত বাড়িয়ে
করো না ডাকাডাকি? আমি বলি, হে
দুঃখবতী মেঘ, ব্যর্থ কবি-র জীবন
কেমন, দেখ! জমাট জলের কষ্ট পুষে
হাওয়ায় তুমি উড়ছ। তুমি কি আর
আমার মতো সব হারিয়ে পুড়ছ? আমার বুকে
পাহাড় চাপা, চোখেও জল রাখি। আমি
তোমার প্রতিবিম্ব, তাইতো তোমায় ডাকি।

 

৫. না আসলেই পারতে

এতটা কাছে তুমি না আসলেই পারতে!
মাটির ঘরে নামে যদি পূর্ণিমার চাঁদ, মনে হতেই পারে
মায়াবী বিভ্রম, ভ্রান্তি বিলাস-ফাঁদ।
যে পরাজয়ে অহংকার আছে, কবি সেটাই তো
নেবে। জয় কি যাচে? তাই তোমার সামনে
একটুও কাঁপিনি প্রতিরোধহীন হারতে।
এতটা কাছে তুমি না আসলেই পারতে!

নদীর কাছ থেকে বাঁক নেয়ার স্বরলিপি শিখে,
পথের ধূলোয় লোনা জলে না বলা কথা
শুধু গিয়েছি লিখে। অচেনা অন্ধকার করতলগত করে
কাব্য রোদনে ছিলাম ধ্যানমগ্ন, তুমি এক ফুঁ
দিয়ে বদলে দিলে লগ্ন। তোমাকে অবজ্ঞা করে
জিতব বলে বড্ড ছিলাম কাতর, তুমি দীঘল ঘুমের
আগল ভেঙে জাগালে এক অভিশপ্ত পাথর!

এখন যে ভালবেসে বেঁচে থাকার লোভে
দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে কেবল ছাড়তে। এতটা কাছে
তুমি না আসলেই পারতে!

 

৬. নিঃসঙ্গতার মলাটে

আনন্দ-উৎসবে এতটা মুখর তুমি
মায়াবী রাতে মুঠো মুঠো জোছনা উড়াও
অন্ধকারের স্বরূপ জানার কাব্যময়ী
স্বপ্ন ছড়াও। তোমাকে নিয়ে এতটা নাগরিক
কোলাহল দেখেনি কেউ, তোমাকে কেবল
ভাসিয়ে নেয় মুগ্ধ-গুণাগ্রাহীর ঢেউ!
সব প্রাপ্তিই যেন লেখা তোমার ললাটে, আমি
আদ্যোপান্ত আটকে আছি নিঃসঙ্গতার মলাটে!

 

৭. খোঁজ

আমার অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাসের রং মিশে
আকাশ তাবৎ নীল। দীর্ঘশ্বাসগুলো কখনও খুলতে পারেনি
তোমার হৃৎ-কপাটের খিল। কিশোর চোখের ভাষায়
ছিল ভাষাহীন বিষণ্নতা, প্রশ্রয় পাইনি তবু তোমার চঞ্চল
চোখ আমার কবিতার খাতায় হয়ে যেত জীবনানন্দের বনলতা।
ছিল কি জীবনের নিছক ঘটনা, ভাললাগার অকারণ ঘোরটেপ?
সেই অপ্রকাশিত আবেগ দুঃখ জাগানিয়া গান হবে বলে
নদী হল, চোখের জলও। জলের রঙে আকাশ আঁকি রোজ,
ভাল থেকো-শুভ কামনায় নেই না তোমার খোঁজ।

 

৮. অশ্রুভেজা চোখ
[উৎসর্গ : কবি কামাল চৌধুরীকে]

কথা ছিল, মেঘের পালক ছুঁয়ে
হিরণ¥য় করে দেব একটি বিকেল। দেয়ালে
টাঙানো থাকবে বৃষ্টি-ধূসর জলছবি, অন্য পাশে
প্রখর সূর্য কিরণ লেপ্টে থাকা ঘাসফুল।

দামাল বাতাসে পুষ্পরেণু উড়ে যাওয়ার মতো
শব্দ উড়িয়ে যাব, এমন প্রত্যয় ছিল মনে।
কাঁচা আবেগের লাজুক মদিরতা আর লড়াকু
দ্রোহের ঝাঁঝের মিশেল দিয়ে কিছু
সময় রাঙিয়ে দেব, স্মৃতিময়তায় বর্ণিল হবে
কবিতার অর্থদ্যোতনা, এমন প্রতিশ্রুতিও ছিল।

আমাদের অনেকগুলো বিকেল ম্রিয়মাণ
হয়েছে তন্ময়তার ফাঁদে। বিকেলগুলো স্মৃতির
শিশির ঝরিয়ে বুকের পাঁজরে অর্থহীন
কাঁদে। শুধু একটি বিকেল, মাত্র একটি বিকেল
চেয়েছিলাম হিরণ¥য় হোক। সেই বিকেল
কবিতা হবে বলে হয়েছে অশ্রুভেজা চোখ!

 

৯. প্রত্যাঘাত

হাতের মুঠোয় জোনাক পোকা নিয়ে ভাবি,
ছড়িয়ে দেব আলো।
তোমরা আমার দু’হাত বাঁধো, ইচ্ছে মতো
আঁধার কেবল ঢালো!
কণ্ঠ চেপে ধরে, তুমি
গলা সাধো নিজের ঘরে। অন্য সবাই কাঁপে থরেথরে!
তুমি যত যাচ্ছ চাবুক মেরে, ঐ চাবুক-ই
আসতে পারে তোমার দিকে তেড়ে!

১০. আকাশ ও আমি

আকাশটা কী বুঝে, ঘাস ফড়িং হল,
এদিক-ওদিক খুব লাফাল! ঘাস ফড়িংটা
ধরতে আমি দু’হাত বাড়াই, আকাশ আমায় ভেংচি
কাটে থমকে দাঁড়াই। আকাশ আবার নরম
ভোরের শিশির হল, কাঁচা রোদে রোদ
পোহাল। ভর দুপুরে তেপান্তরে পথিক
হয়ে পথ হারাল, নদীর বুকে কান
পেতে কয়Ñস্রোতই নদীর মান বাড়াল।

বর্ষাকালে বৃষ্টি হল, কবির ধ্যানে সৃষ্টি হল,
ঝড়-বাদলের স্বরলিপি মুঠোয় নিয়ে আকাশ
আরো আকাশ হল! আকাশ বলে-আঁধার হব,
আলোয় কেন ধাঁধিয়ে র’ব? আবার হল জোনাক
পোকা, জোনাক-আকাশ থোকা-থোকা!

বেপরোয়া আকাশটা যে কী খুঁজছে
আমার মাঝে? বিষণ্ন এক বিকেল খুঁজে, যে
ছায়াটা নিজকে তাড়ায়, সেই ছায়াটাই
চায় যে আকাশ, নগদ দামে কিংবা ভাড়ায়!
আমার ছায়া হতে আকাশ স্বপ্নপ্রবণ
সামনে দাঁড়ায়। আমি বলি-দুঃখ নেবে?
আছে চাপা কষ্ট যে! কষ্ট চেপে হয়েছি আজ
জীবন-বিমুখ তোমার মতো ভ্রষ্ট, হে।

 

১১. সিলগালা

হেরেছি বলেই কি হয়েছি পরাজিত?
আঘাতে-আঘাতে ভেঙেছ যত
চূর্ণ হয়েছি, হইনি ভীত! হার মেনে না নিলে
তোমার অহংকার কি লাবণ্য পেত?
আমাকে ফিরিয়ে গলায় পরেছ যে মালা,
সে মালায়ও আমার নামÑদীর্ঘশ্বাসে সিলগালা!

 

১২. কবি

কবিতাগুলো শিশির হল, চোখের জলও!
‘এখন কেন লিখছি না আর?’ তুমিই বল।
কবিতাগুলো উদাস হল, ঝরে পড়া ফুলের দলও,
দীর্ঘশ্বাসে হাওয়ায় ভেসে নিরুদ্দেশে উড়ে গেল!
ভেবেছিলাম জোছনা হবে, আঁধার হল, সেই আঁধারই
হামলে এসে করছে আমায় টলোমলো!

কবিতাগুলো রোদ হল না, বৃষ্টি হল।
বৃষ্টি ধরে যায় কি রাখা? তুমিই বল!
পাহাড় চূড়ায় বৃষ্টি আবার পথ হারাল,
ভবঘুরে কাব্যকথা ঝর্ণা হয়ে পা বাড়াল।
ঝর্ণা থেকে হল নদী, ব্যঞ্জনাতে কী দাঁড়াল?

কবিতাগুলো হারিয়ে গেল
নানা রূপে, নানা বাঁকে! কবির কী আর
বলার থাকে? হারায় যদি কার কী বলো?
কেউ বলে না, শুধুই তুমি আমায় কেন ‘কবি’ বল?

 

১৩. মেঘ-বৃষ্টির কথা

আমি জানি না, মেঘের ভেতরে গুমোট বেদনা
আছে কি-নেই। মেঘের পেলব স্পর্শে কেউ কেউ
হারায় খেই, কারো বাড়ে হাহাকার। জানি না, বৃষ্টির
জলকণায় কার ‘না বলা কথা’ একাকার!
আকাশ ক্যানভাসে মেঘ জমে থাকে, কখনও শাদা, কখনও
কালো-বাদামী…, যেন নৈবদ্যের শিল্পকর্ম আঁকে!
মেঘ কারো অভিমান, নাকি হাওয়ায় উড়ে যাওয়া বেলা
শেষের গান? হতে পারে ব্যর্থ কবির কবিতা না
ছাপার স্বপ্ন ভাঙার আখ্যান! ছুঁয়ে দেখেনি মেঘের শরীর,
দেখেছি শরীর এলিয়ে মেঘ ভেসে যেতে। মেঘের
কাছে তীব্র খরায় চাই জল, দু’হাত পেতে।
মেঘের ছায়ায় কত সৃষ্টি-প্রলয়, কত তোলপাড়-ক্ষয়!
মেঘ পানে তাকিয়ে কবি-র অন্তরদৃষ্টি কাঁপে, ভাবনা কাব্যময়।

বৃষ্টি সে তো জলের পতন, আকাশ থেকে জলরাশির
ছান্দসিক সমর্পণ। জলের কণায় ভিজিয়ে দিতে বৃষ্টি নামে।
মেঘ-মাল্লার রাগ আসে কি বৃষ্টির খামে? ভাবি, কারো চোখের কোণে
জমে থাকা গোপন অশ্রু জলের ভাষায় কাব্য লিখে
বৃষ্টি নামে। অভিমানী বৃষ্টি যত, তোমার কাছে পোষ্য
হতে হাওয়ায় উড়ে ধরাধামে। বৃষ্টি যতই অঝোর নামুক, প্লাবিত
হোক ঘর-বাড়ি ও অট্টালিকা, নদী ও বন, ফসলের মাঠ…।
বৃষ্টি তো নয় মরীচিকা, কারোর জন্য অভিসারের জলের প্রপাত!
মেঘ-ময়ূরী তুললে পেখম বৃষ্টি নামে, মেঘ বলো বা
বৃষ্টিকে ঠিক, যায় না কেনা কোনো দামে!

 

১৪. তুমি-আমি ১

ধুলোয় লুটিয়েছি তবু হইনি
অবনত, চোখের কোণে জলছবি হয়েছে
চাপা অভিমান যত। চাপিয়ে দিয়েছ
নির্বাসন, পরাজয়-গ্লানি…। তোমার জয়গান
আমি করে যাই, হয়নি আমার পরাজয়, তা জানি।

যে কুঁড়িগুলো ফুটবে বলে মেতেছিল
রাত জাগানিয়া গানে। কার দীর্ঘশ্বাসে ঝরে গেল?
এ বেদনার মর্ম কে বলো জানে!
ধূলোয় মিশেছে স্বপ্ন রেণু, ম্রিয়মাণ
অভিযোগ-অনুরাগ। কাঁচা ভোরের মতো
করোজ্জ্বল তুমি, আমি নির্ঘুম রাতের বেহাগ!

 

১৫. পাইনি মনের নাগাল

মেঘের কাছে জল চেয়েছ
নদীর কাছে ঢেউ,
শ্রাবণ ধারায় ভাসল বল
আমার মতো কেউ।

ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিতে
সাগর হলাম যেই,
গুমড়ে কাঁদে বেলাভূমি
তোমার দেখা নেই।

হলাম আকাশ, পাহাড় ও-যে
অরণ্য বা গাঁও,
সূর্য কিরণ, রাতের আঁধার
কোনটি তুমি চাও?

কত বিভাস, কত রূপে
নিজকে ভাঙা-গড়া,
পাইনি নাগাল তোমার মনের
হলাম দিশেহারা।

১৬. ভালবাসা

ভালবাসার অনেক আছে রং,
লালটা হল গাঢ়! তার মানে কি?
বাসবে ভাল আরো।
ভালবাসা কাঁপায় এবং কাঁপে
থরোথরো, মানুষ ভালবাসে বলে
বাঁধে সুখের ঘরও।

রংটা হলে নীল, ভেবে নেবে
ভালবাসায় বিষাদ অনাবিল! ছোবল
মারে যদি, একাকিত্বে ভাসিয়ে
নেবে বিরহ নামক নদী!

আছে সাদা-কালো, হলুদ,
কমলা কিবা সবুজ…।
ভালবাসার নানা বিভাস
নাগাল পেলে অবুঝ?

ভালবাসার অনেক, অ-নে-ক রং!
আবেগ মদির রংগুলোতে
ধরে না যে জং!

 

১৭. ফাগুন

চেয়েছি ফাগুন, দিয়েছ আগুন!
আগুন পুষে করেছি জল, জল করে যে
ছলাৎছল। জলে দেখি তোমার ছায়া,
হাত বাড়ালে কুহক মায়া!
যদি তোমার আপন হই,
তবে আমার ফাগুন
কই?
আগুন জলের জলছবিতে
আমি কেন আটকে রই?

 

১৮. মাটিচাপা বিষন্নতা

কিছু কথা হারিয়ে গেছে দীর্ঘশ্বাসকে
পাশ কাটিয়ে। কিছু প্রতিশ্রুতি ঝরা পাতার মতো
উড়ে নিরুদ্দেশ নিজস্ব অহংকারে। কিছু স্মৃতি
সময়ের স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে,
কিছু স্মৃতি অতীতকে দেখে নেবার ঝলমলে বাতিঘর।

কিছু আবেশ হয়েছে ভাষাহীন কবিতার বর্ণিল
পঙ্ক্তি, কিছু শুভাশিস পাপড়ি মেলেছে
যাপিত জীবনের অনুপ্রেরণায়। কিছু অর্থহীন
ঘটনা আবার অর্থপূর্ণ হতে পারতÑ
এমন দাবি নিয়ে হাজির অনেক পরেÑহৃদয়পুরে।

কিছু অনুরাগ দমন হতে হতে অভিমানের রাজ্যে
হয়েছে আইবুড়ো মেঘ। কিছু কামনা কল্পনার
রং হয়ে খুঁজে নিয়েছে শিল্পের ঠিকানা। কিছু
প্রেম কিছুই হতে না পারার বেদনায় হয়েছে
আমারই প্রতিচ্ছবি। কখনও কখনও বুকের গহীনে
ও সব হাতড়ে যখন খুঁজি, আমাকে হামলে এসে
জড়িয়ে ধরে বিলুপ্ত নগরীর মাটি চাপা বিষণ্নতা।

 

১৯. পরাজয়ের লাবণ্য

সূর্য ডুবে যায়, ফের উঠে কাঁচাভোরে। দিনলিপির
পাতা ফুরায় যতই থাকি স্বপ্নঘোরে। জোছনা
স্নানের পর অমাবস্যার নিকষ আঁধারও জড়িয়ে নেয়,
নদীর বুকে কান পেতে কষ্টের অবগাহন শুনে
তোমার মতো কে আর বলো নির্জলা মায়ার পরশ
দেয়? কেউ জানুক, আর না জানুক, দুঃখের ওম অভিমানে
পাথর হলে তবেই তো সন্ধ্যা-রাতে জোনাক জ্বলে!

সূর্য ছুঁয়ে দেখেনি আমি, রোদ মেখেছি
নিরন্তর। অনেক হেঁটেছি আঁধার ভেঙে পারিনি
যেতে আলোর ভুবন-তেপান্তর! বেশ তো
আছ প্রাসাদ-রাণী, দীর্ঘশ্বাসের কানাকানি রাখো
চেপে, তোমার কত বন্দনাÑনগরজুড়ে কোলাহল! গুমড়ে
কাঁদুক আমার মতো মরা নদীর শান্ত জল।

চাঁদের পিঠে স্বপ্নগুলো রেখেছি জেনে
তুমিও কেবল জোছনা হও! হেরেছি আমি
জয়ী হয়েও ভাবো কেন জয়ী নও? জয়ের মালা
থাকুক তোমার, ‘জয়’ তোমার জন্য। পথে
পথে আমি কুড়াই পরাজয়ের লাবণ্য।

 

২০ জলপ্রপাত

মাঝে মাঝে হিরন্ময় ভোর আসে
আমার জানালা গলে। সে রাতেই আমার দীঘল
ঘুমের নির্বাসন, জোনাকীরা তাই হয়ত নেভে-জ্বলে।
নিঃসঙ্গতা নামক হিমপাহাড় আমার সামনে
দেঁতো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে অনড়, আমি যেন এক
অভিশপ্ত লখিন্দর! এমন রাতেই আমি
হিরন্ময় ভোরের জন্য অপেক্ষা করি। ভোর আসে
লজ্জাবতী নদীর মতো, হামলে আসে কিরণ রেণু,
হিমেল বাতাসও আসে স্বর্গের সুগন্ধ ছড়িয়ে।
এই ভোরে আকাশ প্রজাপতি হয়ে আমার বিছানায় এসে
বসে, আর তখন বুকের ভেতর থোকা থোকা
আবেগ ঘাস ফড়িংয়ের মতো লাফাতে থাকে। আমি
কবিতা মনে করে আবেগের শরীরে শব্দের
নক্ষত্র বুনে দিই অন্যরকম আচ্ছন্নতায়। এই নক্ষত্রগুলো
তোমার জন্যই রেখে দিয়েছিলাম অনেকদিন হল,
এমন কী হিরণ¥য় ভোরও। হিরণ¥য় ভোর তোমাকে কখনও
টানেনি, ভোরও তোমার হৃদয় জানেনি! তুমি
আলোর পূজারী বলেই নিজেও হয়েছ আলো ঝলমলে
রাত, আমি অন্ধকারে নিঃশব্দ জলপ্রপাত!

২১. তোমার হব

তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো, দিন-মাস বছর… এমন কি
অনন্তকাল! আমি স্বপ্ন বিলাসী কবি উচ্ছ্বাস-অনুরাগে,
তোমাকে দেব অর্ঘ্য। হাসল কি-কাঁদল স্বর্গ, অভিমানের
মলাটে মেঘ বন্দী হল কি-হল না, পরিবেশ বিপর্যয়ে
হিমালয়ের উষ্ণতা বাড়ল কি-কমল, এ নিয়ে ভাববার কিছু
নেই। কে-কি পেল, কে কোথায় খেই হারাল, নায়াগ্রার জলে
কী ভেসে গেলÑওসবে আগ্রহ নেই একবিন্দু। তুমি যে
আমার সামনে অপার বিস্ময়ের এক সিন্ধু!

পৃথিবীর কোথায় সুনামী-প্রলয়-শোক, কোথায়
উৎসব-আবিষ্কারের মাতম, যুদ্ধবাজ শাসকের অট্টহাসিতে
কে কাঁপল-কে প্যান্ট ভেজাল বা রূপের হাটে কোন
ঊর্বশী মুকুট জিতে নিল এ-সব খবরে আমার কী যায়-আসে?
নিরেট নির্মোহে আমি নদীর কলধ্বনির মতো শুধু তোমার
বন্দনায় ব্যস্ত। আমি এই জন্মে পরজন্মেও তোমার হব।

২২. দীর্ঘশ্বাস

হাতের মুঠোয় রোদ নয়, নিজেরই একটি দীর্ঘশ্বাস
সেই কবে থেকে লেপ্টে রেখেছি। তোমার চারপাশে যেমন
অলস দুপুরের মৌনতার দেয়াল, তেমনি আমার
মুঠোবন্দী দীর্ঘশ্বাসটিও পৃথিবীর তাবৎ ব্যর্থ কবিদের
আক্ষেপ টেনে নিয়ে দেয়াল তুলে যাচ্ছে অহর্নিশ।
মনে আছে, কোনো ছায়াকে তুমি সহ্য করতে পারতে না, তোমার
মনে হতো ‘ছায়া নয়, কুহেলিকা মায়া!’ অথচ আমি তোমার
ছায়া হতে চেয়েছি বার বার। আলোর স্বরূপ খুঁজে
দেখার চেষ্টা করিনি কখনও। আমি জানি, আলো ঝলমলে
শহরের মতোই তোমার দিনলিপি, তোমার বাড়ির
আঙিনায় ধবল জোছনা পেখম ছড়ালেও ফেলে আসা
কোনো স্মৃতি দীর্ঘশ্বাসের রিদম তোলে না আজো।
আমার মুঠোবন্দী দীর্ঘশ্বাসের পিঠে মাঝেমাঝে
দুঃখের পেঁজামেয় জমে গেলে আমি তোমার সব প্রাপ্তির
অহংকারের গল্প শোনাই। আর তখনই দীর্ঘশ্বাস
মুঠো গলে বেরিয়ে ঘটায় তুমুল বৃষ্টিপাত!

 

২৩. নীল কণ্ঠের বিষ

তুমিও জানতে না
পরাজয়ের দূরত্ব রেখে যত কাছেই
যাও, হয় না যাওয়া কাছে।

আমি হেরেছি বলে অভিমানী মেঘ
বৃষ্টি হয়ে নামেনি ঠিক, আমিও অনড়
দাঁড়িয়েছিলাম, ছুটিনি দ্বিগি¦দিক।
দীর্ঘশ্বাসের প্রজাপতি বুকের চৌহদ্দীতে
ডানা ঝাপটালেও প্রবহমান নদী
হারায়নি গতি। নদীর কলতানে আমিও
মেনে নিয়েছি সব ক্ষতি।

জানি, তোমার জয়গানে
কক্ষপথে নক্ষত্র জ্বলে, তাবৎ কবি
তোমার কথাই বলে। তারপরও নিঃসঙ্গ চাঁদ
কেন জোছনা হয়ে গলে? যার বুকে
কান পেতে শোন ভালবাসার কোকিল
দিচ্ছে কি-না শিস, তুমিও জানো না, অমৃতের
পেয়ালায় আছে নীলকণ্ঠের বিষ!

 

২৪. প্রেমিকা ও পূর্ণিমার চাঁদ

ভাবি, তোমার কপালে মেখে দিই
কুয়াশার রং, অনুভবে জমে থাকা হতাশায়
কবেই ধরেছে জং! শিশির কণায় লুটোপুটি
খাক দীর্ঘশ্বাস, অপ্রাপ্তির আহাজারি। জানি, দখলে
যার যায়, তারই হয় নারী! তারপরও ‘ভালবাসা’র
মোড়কে কাব্যকথা, অহেতুক বাড়াবাড়ি। জীবন
বার বার পাতে ফাঁদ, কত কথা প্রগভলতা, প্রেমিক
এক করে দেখে প্রেমিকা ও পূর্ণিমার চাঁদ!

খাঁচায় বন্দী পাখি, জানে সংসারে
কত ফাঁক, অভিনয়, চোরাগুপ্ত ফাঁকি। নারী
ও অরণ্যে শিহরণ-রহস্য উন্মোচনে গৌরব। পারফিউমে
মশগুল হয় পুরুষ, খোঁজে না ফুলের সৌরভ!

কী পাওয়া, কতটুকু পাওয়া বা আসলেই হয়েছে পাওয়া কিছু?
এই প্রশ্নের নিয়েছে কি কেউ পিছু? কালান্তরে নিয়েছে
হয়ত কেউ কেউ, তারাই তুলেছে চেতনার বোধে ঢেউ।

ভাবি, তোমাকে হয়েছে কি ঠিক করে জানা?
সর্বস্ব করেছি সমর্পণ, তবু মাঝে মাঝে থাকো কেন আনমনা?

 

২৫. সেদিনের গল্প

সেদিন আকাশ নেমেছিল সমুদ্রজলে, পথভোলা
বসন্ত বিভ্রান্ত হয়েছিল তোমাদের স্বপ্নবিধুর
কোলাহলে, তাবৎ বিষণ্নতা জমেছিল মেঘের মিছিলে, এক
ব্যর্থ কবি তোমাকে দেখে মাথা ঠুকল কবিতার
করকমলে। সেদিন কী কথা উথলেছিল তোমার মনের
অন্তপুরে? একটি কুঁড়িও যায়নি কেন ঝরে?

এখানেই শেষ নয়, বা শুরুও নয়। শুরু ও শেষের
সীমারেখা না রেখে আদম যেমন গন্ধম
খেয়েছিল, তেমনি আমিও গন্ধম খাওয়া পাপ বুকে
পুষে চকিত তাকিয়েছিলাম নির্জলা পুণ্যের
দিকে। এ কথাও সত্যি, তোমার উজ্জ্বলতার সামনে
আমি বড্ড ম্লান-ফিকে, তবু গুঞ্জরণ উঠেছিল
হৃদয়ে-জনান্তিকে! নদীর বুকে অশান্ত হয়েছিল অজস্র ঢেউ,
গন্তব্য জানা পথে অকারণ মদিরতায় পথ হারাল কেউ।
কে যেন আকাশ-সমুদ্রের মিলনস্থলে রেখেছিল
গোপন দীর্ঘশ্বাস, না বলা কথা, অনুযোগ-অনুতাপ..!
হাওয়ার কানে পাহাড় বলে, ‘আর কত একাকিত্বের অভিশাপ?’

সেদিন অরণ্যে পাখিরা ডানা জাপটাল খুব, তুমি
নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলে বুঝি নিশ্চুপ?
আকাশ নেমেছিল সমুদ্রজলে, আবার না হয় নামুক,
সেদিনের কথা বর্ণিল হোক, স্বপ্ন ভাঙার বেদনার
আহাজারি থামুক। কী পেলাম বা পেয়েও কেন হারালাম,
এ নিয়ে যতই টেনে যাই জীবনের জের,
সেদিনের মতো তোমার সামনে একবার দাঁড়াতে চাই ফের।

 

২৬. বন্ধু

হাতের মধ্যে আকাশ নিয়ে
সমুদ্র জলে স্বপ্ন ভাসিয়ে
বাতাসে পাতি কান,
ফাগুন সাজে ‘ভ্যালাইনটাইন’ নামে
না বলা কথা হৃদয়ের খামে
শুনি ভালবাসার জয়গান।

স্বপ্ন কে ভাঙে? ভাঙ্গুক তারা
বেদনার আর্তিতে নই দিশেহারা
বন্ধুত্বের হাত বাড়াই,
যার যা আছে, যার কিছু নেই
হাহাকার-হতাশায় হারিয়ো না খেই
এসো মাথা তুলে দাঁড়াই।

বন্ধু হও, বন্ধু করো
হাতে রাখো হাত,
ভালবাসার স্বরলিপি হোক
শুভ দৃষ্টিপাত।

 

২৭. তোমাকে দিতে চাই

সাগরে ছুটে যায় নদী
প্রেমের-ই সহজাত সাড়া
মনটাও নদী এক জেনো,
অনুভূতি যেন জলধারা।

আকাশে মেঘ জমে গেলে
অভিমান বুকে জলছবি
মেঘভেজা রংধনুতে
বিরহী মন হয় কবি।
চেপে রাখা কথা হয় রোদ্দুর
কখনও বৃষ্টির ধারা।

চাঁদেরই লণ্ঠনে ধরা
সাজে রাত, মাদকতা ভরা
অনুভবে বেজে উঠে সুর
কথা-গানে জাগে অপ্সরা।
তোমাকে দিতে চাই রোজ
মুঠো মুঠো নীহারিকা তারা।

 

২৮. সে

সে দীপ্তিহীন, ম্রিয়মাণ বা অচল পয়সার
মতো অপাংক্তেয় হলেও তার করতলে
এক খরস্রোতা নদী নিরবধি বয়ে চলে আশ্চর্য
বিহবলতায়! জীবন ও যাপনের যোগসূত্র কী
বা যোগসূত্র ছিন্ন জীবনের সঙ্গে যাপনের কতটা ফারাক এ
নিয়ে তার কৌতূহল নেই। স্বপ্ন দেখার অনুরণন বা
স্বপ্নভাঙার সংঘাত, প্রবঞ্চনার যন্ত্রণা বা জাগরণের
মন্ত্রণার কথা নদী তাকে বার বার বললেও
সে করতলগত নদীর বুকে কান পেতে কখনও শুনেনি
গুপ্তধনের নিঃসঙ্গ পড়ে থাকার আহাজারি।

সে প্রায়ই ভাবে, জলের ছায়াতলে
অগ্নির লাভা রেখে আগুন ও জলের মৈত্রীয়তা
তুলে এনে রেখে দেবে রুমালের ভাঁজে। ঐ রুমাল
সে আর কখনও বের করবে না পকেট থেকে, যতই যাবে দিন
ততই বাড়বে অবহেলার স্তূপ আর সন্তাপ। উপেক্ষা ছাপিয়ে
ঘৃণাও লেপ্টে যাক রুমালে, এতে তার কী যায় আসে?

সে ভাবে, পৃথিবীর সঙ্গে আকাশের যে দূরত্বের
অভিমান, মেঘ গলে পড়লে বৃষ্টির যে শিল্পময় নির্মাণ, বা
গোধূলির রক্তিম বিভাসে মৌনতায় যেভাবে ধ্বনিত হয় অন্যলোকে
পাড়ি দেবার আহ্বানÑএ সবই মুঠোবন্দী করে তেপান্তারের
মাঠে অলস দাঁড়িয়ে থাকবে তমাল গাছের মতো পুরো
জীবন। এক জীবনে এত চাওয়া-পাওয়ার হা-পিত্তেস কেন?

সে আরো ভাবে, সূর্যকে আড়াল করে যারা
সভ্যতার অবয়বে মেখে দিচ্ছে পাপ ও অন্ধকার, তাদের
হাতেও অনায়াসে তুলে দেবে নক্ষত্রের থলি, চাঁদের জলপ্রপাত,
নিঝুম দ্বীপের নিঃসঙ্গতা, আলো ঝলমলে শহরের
তাবৎ জৌলুস…! সে পথহারা পথিকের জন্য রেখে দিতে চায়
জোনাকী পোকার পিদিম, ঘুম জাগানিয়া গান, স্বপ্নগ্রস্থ বাতিঘর…।

সে কারণে-অকারণে অনেককিছুই ভাবে, ভাবনাতেই তার যত সুখ!
কেউ তাকে বলে ‘ভবঘুরে, ব্যর্থ কবি’, কেউ বলে ‘জীবনবিমুখ’।

 

২৯. সুখ

সুখ কি জীবনে সঙ্গে আপস, নাকি চাহিদার
বিপরীতে প্রাপ্তির নির্মল আনন্দ? সুখ কি
তাল-বেতালে নিয়ন্ত্রণে রাখার ছন্দ? সুখ কি নিছক একটি
শব্দ? আকাশ-পাতাল ফুঁড়লেও কি সুখ হয় লব্ধ?
জীবন-বিমুখ যে, তার কাছে সুখ কী? সে-ও কি
সুখ যাচে? অঢেল বিত্ত-বৈভবে কেউ কেউ হা-পিত্তেস
করে কেন বাঁচে! সুখ কি ভোরের শিশিরের মতো টলটলে, ভাতঘুম
দুপুরের সূর্যালোকের মতো গনগনে, ভরা জ্যোৎস্নার
মতো নরম-মেঘালোকের জলছবি? সুখ চায় খুনি, লোভী,
সাধু, সাধারণ, বিরহকাতর কবি..! সুখ কি আছে
সুনশান নীরবতায়, নাগরিক কোলাহলে, সভা-সেমিনারে,
গদ্যের ঝাঁঝে, কবিতার করকমলে? প্রেমিক-প্রেমিকা, নব-পরিণীতা,
বুড়ো দম্পত্তিও রোজ-করে একরত্তি সুখের খোঁজ!

সুখ কি পাহাড়ের মতো একা, সুখ অদৃশ্যÑনা, যায় দেখা?
সুখ নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল? না, পদ্মদীঘির টলমল জল? সুখ কি
ফুল-পাখিদের ভাষা বোঝে? সুখ কি নিজেও ‘সুখ’ খোঁজে?

৩০. অবুঝ বায়না

আমার কাছে রাখলে তুমি
সে এক অবুঝ বায়না
মেঘ চাওনা, রোদের কিরণ
চাইলে আকাশ আয়না।

কেমনে দেব আকাশ এনে
ভাবনা কেবল পিষে
দীর্ঘশ্বাসে কষ্ট আমার
কক্ষপথে মিশে।
হাত বাড়িয়ে আকাশ খুঁজি
আকাশ আমার হয় না।

তোমার চোখে অশ্রু জমে
আমার দু’চোখ নদী
পেখম ছড়ায় স্বপ্নগুলো
আকাশ হতাম যদি!
আমিই আকাশ আয়না তোমার
এমন কোনো হয় না?

 

৩১. আমি তুমি- ২

আমি বলি দীর্ঘশ্বাস, তুমি বলো প্রজাপতি
আমি বিষণ্ন বেহাগ, তুমি ধাবমান গতি।
আমি ভোরের শিশির, দূর্বাঘাসের লাবণ্য
তুমি কড়ামিঠে রোদ, পাখির কূজনে মুখর অরণ্য।

আমি নির্জন বেলাভূমি, অবহেলা-নিঃসঙ্গ কেউ
তুমি উত্তাল সমুদ্র, সৈকতমুখী জলরাশি-ঢেউ।
তোমার মুঠোয় স্বপ্ন কত, জীবন ভুবন রাঙা
ভালবাসা বুকে রেখেছি পুষে, তারও যে ডানা ভাঙা!

 

৩২. আমি এবং আমার ভুল

ভুলগুলোর প্রতিও জন্মে গেছে মায়া!
ভুল করেছি বলে আমি ম্রিয়মাণ,
দীর্ঘশ্বাসের মোড়কে এক অভিশপ্ত ছায়া!

অনেক অনেক দিন ফুরালে ভাবি, এ কথাও
ঠিক, তোমার কাছে তুলিনি কোনো অভিযোগ-কোনো
দাবি। কিন্তু বলার তো কিছু কথা ছিল। আমার
ভুলের কারণ জানতে ছোঁড়োনি একটি ঢিলও!

ভুলের কাঁটায় রক্তাক্ত হয়েছি আমি, আত্ম-গ্লানির
লাভায় পুড়েছি কত যে দিবস-যামি! পথের ধূলোয় মিশেছে
অশ্রুজল, অন্তপুরে কবেই থেমেছে কবিতার কোলাহল!

ভুল করেছি কি ঘটনাক্রমে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বা দুর্বিপাকে?
জানতে চাওনি, ছেড়েছ আমায় সময়ের বিবর্ণ বাঁকে!
হীরে-জহরত, বৈভবে জানি না, তুমি আজ কতটা সুখী।
আমি নিদারুণ অবহেলা, হার মেনে নেয়া দুঃখী!’

তুমি নেই, ভুলগুলো আছে, বিষণ্ন স্মৃতি হয়ে
থাকে খুব কাছে। ভুলের ছোবলে আজো হই
ক্ষত-বিক্ষত, ভুলের গুচ্ছ নিয়ে আমি অবনত!

 

৩৩. কথা ছিল

গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, নদীর জলতরঙ্গে
শুভাশিস ভাসিয়ে দিয়ে অন্য রকম মদিরতায়
মগ্ন থাকার স্বপ্ন ছিল। কথা ছিল, মায়ের দু’চোখ সন্তানহারা
শোকে পাথর হবে না, বাবা ন্যায় বিচারের সুসংবাদ
নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। স্বপ্ন ছিল, তোমাকে দেখলেই কবিতার নগরে
তুমুল বৃষ্টি ঝরিয়ে দেব, সূর্যকে বলে দেব আরো পৃথিবীর সন্ধান।
কিন্তু আমাদের হাতে গোলাপ নেই, লেগে আছে রক্তের দাগ!
নদীর জলে ভাসছে স্বজনের লাশ, আদালতগুলোয়
বসে আছে হুকুমমানা ‘জ্বি হুজুর’ দাস। আমাদের
কথা ও কণ্ঠনালীতে সেই কবে থেকে চেপে আছে ফাঁস।

 

৩৪. দেবদাস হতে চেয়েছিলাম

আমিও দেবদাস হতে চেয়েছিলাম তোমার নিপাট
অভিনয়ে পরাজিত হয়ে। আমি ম্লান কুঁকড়ে
গেলেও তুমি করোজ্জ্বল ছিলে জয়ে। পরাজয়টা ঠিক
আকস্মিক ছিল না, যেন ছক বাঁধা নির্ধারিত
পরিণতি আমাকে করেছিল আলিঙ্গন, কাঁপেনি কখনও
তোমার শিকারী মন! গিরগিটির মতো তোমার ক্ষণে ক্ষণে
বদলে যাওয়ার শিল্পমান আছে কি-নেই, ভেবে দেখিনি
সত্যি! আমি তোমার সামনে যেন মহাপ্রলয়ে
ভেঙে চূর্ণ হলাম, তুমি অনুকম্পা দেখাওনি একরত্তি!

 

৩৫. সবুজ আকাশ

নীল নয়, সবুজ রঙের আকাশ তোমার মাথার ওপর
রেখেছিলাম অবুঝ বিশ্বাসকে লাবণ্যময় করে
রাখব বলে। সবুজ আকাশের দিকে তাকিয়ে তোমার
একটা দীর্ঘশ্বাস হামলে পড়েছিল দীঘির জলে।
সেই থেকে দীঘির জলে নীল পদ্ম ফোটে, তোমার হারানো
দীর্ঘশ্বাসের ব্যঞ্জনা দেখি, অর্থ খুঁজি না মোটে। সবুজ
আকাশ আজো সবুজ, তুমি মেখেছ নীল, অবুঝ বিশ্বাস
হয়েছে মমি, মনের দরোজায় পড়েছে খিল!

 

৩৬. কোথায় কাজল চোখ

তোমার চোখে ছিল সমুদ্র জল, ছলকে উঠার
আবেগ-অতল। রাগ ছিল বা অভিমানও, কাব্যিকতা-মধুর গানও।
কী ছিল না চোখের ভাষায়? বাঁধত আমায় আলো-আশায়,
তোমার চোখে দু’চোখ রেখে বিভোর হতাম বিহ্বলতায়
স্বপ্নরঙে লিখে যেতাম অনুভবের খেরোখাতায়। রামধনু এক
ছিল বটে, নানা রঙের বর্ণিলতা হাত বাড়িয়ে নিতাম লুটে।
সেই চোখে আজ কীসের ছায়া! কোথায় গেল
শাসন-মায়া? জল দেখি না, রং যে উধাও, এমন কেন
চোখ? আমিও তো চেয়েছিলাম সুখের জীবন হোক।
তোমার চোখের ভাষা কোথায়, কেন পাথর শোক?
ঝর্ণা ধারার ছন্দ কোথায়, কোথায় কাজল চোখ!

 

৩৭. বায়না

হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরো, বুকের ভেতর
অমিত আগে-থরোথরো! বৃষ্টি বলে, ‘চোখ
মেলে দেখ, আমাকে ধরে রাখা যায় না!’
তবু আমাকে ধরে রাখার কর অবুঝ বায়না!

 

৩৮. বিবেক

তোমাদের উঠোন, ঘরের মেঝে-বারান্দা
সভ্যতার কার্পেটে মোড়ানো, তারপরও রক্তস্নানে
মানবতা কাতর! আমাদের বিবেক কখনও শুভ্র
কপোত, কখনও বিষণ্ন পাথর।
তোমরা ইসরাইল দেখ না, প্যালেস্টাইন
দেখ না। বোমার পাণ্ডুলিপি বোঝ, কবিতা বোঝ না!
তোমরা কক্ষপথে যাও, অনগ্রসর জনপদে
সাম্যের বার্তা উড়াও, নিপীড়িতের ক্রন্দন চাপা
দিয়ে কুর্নিশ-প্রশংসা সনদ কুড়াও! তোমরা
আলো ছড়াও, অন্ধকারও! কাউকে বাঁচাও, কাউকে
মার! তোমাদের বিবেক কোথায় যেন বন্দী,
তারপরও নতজানু আমরা ন্যায় বিচারের আশায়
তোমাদের সঙ্গে সদাই করি সন্ধি!

 

৩৯. করোজ্জ্বল স্মৃতি

একটা ঘাসফড়িং ভোরে ফুল কুড়ান ঘোরে
তোমাকে দেখেছিলাম বাগানে। তোমার খোলা চুল
উড়ছিল, আনমনা চোখ এদিক-সেদিক ঘুরছিল।
আমি বিহ্বলতায় দাঁড়িয়েছিলাম যেন দু পা
অনড় পাথর, তুমি নির্বিকার, আমি চাপা আবেগে
কাতর! কিশোরী নয়, অপন্সরী দেখে অনুভবে
ভাষাহীন কাব্য লিখে, হয়েছিলাম ভাষামূক।
সেই করোজ্জ্বল স্মৃতি হাতছানি দেয় খুব।

 

৪০. পদচিহ্ন খুঁজি

তোমার পা ভিজিয়ে আলতা রঙের লজ্জা মেশানো
পদচিহ্ন রেখে যে নদী আমাকে কুর্নিশ করে বলেছিলÑপাহাড়ের
একাকিত্ব ঝেড়ে উত্তার সমুদ্র হও, সে নদীটাও আর
স্রোতস্বিনী নয়, ম্রিয়মাণÑবড্ড দুঃখি! পাহাড় গলে নদীর
জল তরঙ্গে বয়ে বয়ে সমুদ্র হয়েছিলাম তোমাকে ভাসিয়ে নেব
বলে, আলোকবর্ষ দূর নক্ষত্র পিদিম উঠেছিল জ্বলে! তবে কেন
অন্ধকারের উঁকি-ঝুকি? সমুদ্র জল হাওয়ায় ভেসে কেবলই
নেমতন্ন খায় মেঘের দেশে। না পাওয়াটাই এক রকম পাওয়া
জানলাম অবশেষে। আমি নদীর সামনে আজো খুঁজি
তোমার পদচিহ্ন, সব যোগসূত্র হয়ে যায় ছিন্ন।

 

৪১. নদী ও শাড়ি

নদীটা ঠিক পথেই চলছিল। একদিন কী হল, নদীর
জলে হামলে পড়ল পথভ্রান্ত বর্ণিল সময়! আর
তখনই আবেগ মথিত হয়ে নদী হল বেপরোয়া খরস্রোতা।
কী জানি, কেন গৃহত্যাগী বসন্ত নদীর খরস্রোতে গা
ভাসাল। নদী দেখে, তার জলে মুখ দেখে ঠুমরি গায়
ভোরের প্রজাপতি, বিলম্বিত রাগে পেখম ছড়ায়
দুপুরের বিষণ্নতা, সন্ধ্যার ধ্রুবতারা বলে দেয় কেন
স্বপ্নের সঙ্গে নক্ষত্রের অভূত মিল। নদী বুঝতে পারে, চাঁদের
জলপ্রপাত মানে কবিতার অন্তর্নিহিত মাধুর্যতা। নদীটা
এসব আগে কখনও দেখেনি বা ভাবেনি। পাহাড়ের
নিঃসঙ্গতার মতো এই নদীটাও ছিল নিঃসঙ্গ, জল ছিল, কল্লোল
ছিল না কখনও। পথভ্রান্ত বর্ণিল সময় কোত্থেকে এসে
নদীকে জড়িয়ে নিল, নদী হল তোমার শাড়ির আঁচল!

 

৪২. কথোপকথন ৭

নারী : কাল রাতে ঘুমোতে পারোনি, বুঝি? টের পেয়েছি তোমার দীর্ঘশ্বাসের
দাপাদাপি।
নক্ষত্রের লাবণ্য দেখাবে বলে আকাশ খুলেছিল আকাশের ঝাঁপি?

পুরুষ : নিশি জাগা? এ তো নতুন নয়। নক্ষত্রের সঙ্গে আকাশের
যেমন কথা হয়, আমিও বলেছি কথা অবিরল। জানো, আকাশের ’পরে
যে আকাশ, এর বুকেও আছে অথৈ জল, শুনেছি কান পেতে! নক্ষত্রের
কার কী নাম, এক জলপরী বলেছে কাল রাতে!

নারী : এ তোমার স্বপ্নের খুনসুটি, কথার ব্যঞ্জনার লুটোপুটি। আকাশের
’পরে আকাশ-নক্ষত্র-জলপরী! এ কেবল কল্পনা, নিঃসঙ্গতার আহাজারি।

পুরুষ : নিঃসঙ্গ কে নয় বল? আমি-তুমি-সে, আনন্দে ভরা কত
মুখ, আড়ালে অশ্রুজলও। গৃহকোণে-জনপদে, নিরিবিলি বা জনস্রোতে
প্রত্যেকে বড় একা নিজের কাছে! আক্ষেপ কার না আছে?

নারী : কে পুড়ে খাঁক, ওসব কথা থাক।
কাল রাতে, তোমার জন্য রেখেছিলাম বৃষ্টির পালক।
ভেবেছিলাম, পুরুষ কবি হবে সন্ন্যাস বালক।

পুরুষ : বৃষ্টির পালক আমার দুঃখবোধ ছুঁয়ে গলে গলে
ভোরের পেয়ালায় হয়েছিল কুয়াশার নম্রতা। তা দেখে
কিছু না বলা কথা ঘাসফড়িংয়ের মতো লাফিয়ে
ফের নতজানু হল কালান্তরের জলছবি হবে বলে।
সে কথার প্রতিবিম্ব দেখি তোমার অবদমিত চোখের জলে। নয়?

নারী : আবেগের রঙে কথার মাধুর্যতা বাড়ে। কথার
মায়াজালে বল বাঁধে কে-কারে?

পুরুষ : শুধুই কথার মায়াজাল? হয়ত হবে! মায়া কেন নিবিড়
জড়িয়ে থাকে অনুভবে, অনুভূতির আকুতি শুনেছে কে-কবে?

নারী : যে শোনার, সে ঠিকই শুনতে পায় স্পন্দন!
যতই উঠুক স্বপ্নের অনুরণনÑজেনো, স্বপ্ন ভাঙার বেদনাও আছে।
স্পন্দন যে শুনতে পায় সেই তো থাকে সর্বদা কাছে!

পুরুষ : রাত জাগা অব্যক্ত বেদনার স্বরলিপি নিয়ে
সকালে ডানা ঝাপটালো পাখি, অরণ্যে সবুজের মাখামাখি।
আমি দেখি যে পথ এসেছি ফেলে, সেখানে শুভঙ্করের ফাঁকি!

নারী : পথিক সামনে এগুলেই সুখী, সে পথ হারালেও গন্তব্যমুখী।
সামনে দু’চোখ রাখো, কেন অকারণ রাত জেগে থাক?

পুরুষ : অকারণ কিছু নয়। এই যে কথা হল, আবেগের রং
কত জমকালো-এরও তো দেখি বিমূর্ত ছবি। কবিতার নগরে
শূন্য হাতে ঘুরে বেড়াই আমি এক শব্দভূক কবি!

 

৪৩. বিহ্বলতা

তুমি দাঁড়িয়েছিলে শেষ বিকেলের আলো গায়ে মেখে
আমি হারিয়েছিলাম শব্দশোভিত কবিতার নগরীতে, তোমাকে দেখে।

৪৪. আমি

আমি কবি নই, তবু
তোমার সামনে হয়ে যাই কেন কবি
রং বুঝি না, তবু অনুভবে
এঁকে যাই জলছবি।

 

৪৫. শব্দবিলাস

নদী এসে মিশে সমুদ্র মোহনায়, ফুলে মধুকর
দু’হাতের আলিঙ্গনে কেঁপে উঠে তোমার
অধর, কী ভাষা যেন মুদ্রিত হয় দৃষ্টিকাব্যে-উন্মাতাল
অনুরাগ নরম জোছনার মতো ছড়ায় অনুভবে।
আমি বলি এর নাম প্রেম, তুমি বল সম্মোহন!

সূর্য অস্তে গেলে সমর্পণ, উদয়ে সৃষ্টি-জাগরণ।
সৃষ্টি ও সমর্পণের বিমূর্ত জলছবি আঁকে তোমার সঙ্গে আমার
টেলিফোন আলাপন। কথায় কথায় কবিতার কথকতা
কত, আবেগের আকাশে নক্ষত্র জ্বলে অবিরত।
আমি বলি এ-ও সবুজ প্রেম। তুমি বল, শব্দবিলাস!

 

৪৬. আমার চোখের জল

আমার চোখের জল, তোলেনি কখনও কোলাহল!
টুঁ শব্দ করেনি কেউ, ভুল করেও কখনও কোথাও উঠেছিল ঢেউ?
আমার চোখের জল, ঝরে ঝরে হয়েছে বিলীন, স্বপ্ন
ভাঙার বেদনায় আমাকে করেছে দীন।

 

৪৭. স্বপ্ন উন্মুখ

নদী এসে তোমার দু’পায়ের সামনে থেমে যাবে বলে
আমি সমুদ্রের গর্জন মুঠোবন্দী করেছিলাম
তারুণ্যের রোমান্টিক দ্রোহে! শীতের মিঠে রোদ
তোমার উঠোনে ফুল ফোটানো গানে
সব সময় থাকবে মশগুল ভেবে, আমি তাবৎ
জোছনা আগলে রেখেছিলাম গোপন স্বপ্নের চৌহদ্দিতে।
মেঘের পালক ছুঁয়ে নদী হারিয়েছিল কি পথ? সমুদ্রে
ভাসিয়েছিল কি কেউ বিরহ-বিলাপ?
রোদ-জোছনার আয়নায় দেখা হয়নি আমাদের যুগল মুখ!
তারপরও তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন উন্মুখ।

 

৪৮. কয়েক ফোঁটা জল

আমি তোমার চোখের জল ছুঁইনি শুধু, ছুঁয়েছি
অন্তপুরের অতল! যেটুকু আবেগ রাঙা
হয়েছিল স্বপ্ন বিলাসে, দীর্ঘশ্বাসে দেইনি উড়িয়ে।
তোমার সামনে পড়ে কখনও নেইনি নিজের
মুখটি ঘুরিয়ে, ম্লান হাসিতে এখনও করোজ্জ্বল! কবিতা
জাগে, বর্ণিল বাঁকে-যখন বাজে তোমার পায়ের মল!
হাত বাড়ালে আজো কি পাব কয়েক ফোঁটা জল?

 

৪৯. কষ্ট

আমার হলুদ কষ্টগুলোকে তুমি এক ফুঁ
দিয়ে উড়িয়ে দিলে। নীল কষ্টগুলোকে দু’হাতের
মুঠোয় এমনভাবে নিলে, যেন তোমার পোষা
বেড়াল। টকটকে লাল হয়ে যাওয়া কষ্টগুলো
তোমার খোঁপার ফুল হলে বেশ মানাত।
তুমি মাথা ঝাঁকিয়ে জানালে লাল কষ্টগুলোকে
মাথায় তুলবে না একেবারেই। বললে, লাল কষ্ট
বড্ড বেপরোয়া, কখনও কখনও বিপ্লবীও!

জানি, খোঁপার ফুল যদি মনের গহিনে
চাপা নদীকে উস্কে দেয়, যে কথাগুলো প্রশ্ন হয়ে
তোমার সামনে কখনও দাঁড়ায়নি, তা মাথা
তুলে দাঁড়াবে এক লহমায়। প্রশ্নবাণে তুমি হবে
বিচলিত-বিব্রত। তাহলে তুমি কেনই দেবে লাল
কষ্টগুলোকে প্রশ্রয়? আমিও লাল কষ্টগুলোকে
অচল পয়সার মতো ফেলে রাখি অবহেলার ড্রয়ারে।

আমার সবুজ কষ্টগুলোকে তুমি অবুঝ অলিন্দ্যে
রেখে দিয়েছ বার বার। আশ্চর্য, সবুজ কষ্টগুলোও
কখনও নিজের অস্তিত্ব জানান দিত না, যেন সবুজ কষ্ট
হওয়াটাই ছিল ওদের ভবিতব্য! অথচ অনেকগুলো স্বপ্ন
ভাঙার দহনে অবুঝ কষ্টগুলো সবুজ হয়েছে। জন্ম
না নেয়া কবিতার কষ্ট ওদের মুখায়বে লেপ্টে
দিন দিন হয়েছে লাবণ্যময়। আজো জানি না,
তোমার সান্নিধ্যে ওরা কেন পাপড়ি হয়?

আমার সাদা কষ্টগুলো বড্ড বিলাসী। তোমার
মুখের হাসির মুদ্রা গায়ে জড়িয়ে হয়ে যায়
শরতের কাশবন। ভাবি, শিউলী ফুলের কাছে
রেখে যাব তোমাকে ফিরে পাবার দাবি।

তোমাকে যে কষ্টের কথা বলিনি, ওই কষ্টের ভারে
কতবার পড়েছি নুয়ে তবু কখনও টলিনি। আজ
বলছি, আমার ঘোরতর কালো মিহিন কষ্টও
আছে। কষ্টগুলো কালো বলেই কিনা তোমার
আলোকিত জীবন, রূপের জৌলুস বা বিত্ত-বৈভবের
ঝলকানি সহ্য করতে পারে না। কষ্টগুলো
আমি যতবার তাড়াতে চেয়েছি, কক্ষপথ থেকে
নক্ষত্র ঝরে এসে কষ্টের সঙ্গে মিশে বিষণ্নতার গান
গেয়েছে কোরাসে। একবার ভেবেছিলাম, নক্ষত্রের
কান্না জড়ান ঘোরতর কালো কষ্টগুলো
তোমাকে দেব অর্ঘ্য করে। কষ্ট আমাকে ছাড়বে
না বলে অনড় পাথর হয়ে থাকে অন্তরে। আর
আমার রংহীন কষ্টগুলো হয়েছে ঘাসফড়িং।

৫০. দেখেছি

ভুলের পিরামিড পেছনে রেখে
হয়েছিলাম দিগন্তমুখী। সাগর পেরুলাম,
পাহাড় ডিঙালাম, জনারণ্যে কেউ কেউ নাকি সুখী!
এখানেও থেমে দেখেছি। সব কষ্ট-আক্ষেপ,
জোনাক পোকার আলোয় রেখেছি!

 

৫১. পাপড়ি এবং ফাঁদ

আমার স্বপ্নগুলো যদি নক্ষত্র হতো, দেখে
নিতে পারতেÑনা বলা কথার স্বরলিপি।
ভেতরের রক্তক্ষরণ চেপে কীভাবে বেঁচে আছি, বুঝতে।
জানতে অমলিন হাসির উপাখ্যান! যদি
আমার চোখের নদীও দেখতে, মথিত আবেগ
হতো না গড়ানো পাথরের আহাজারি, বিষণ্ন হতো
না কোনো বিকেল। এক জীবনে কতরকম স্বাদ
চলার পথে পাপড়ি এবং ফাঁদ!

 

৫২. কে

চারপাশে !
অদৃশ্য
মেঘের
দেয়াল
অন্তরালে কে হাসে!

 

৫৩. আজ

আজ আকাশ এসেছে নেমে
গন্তব্য পেয়ে পথ গিয়েছে থেমে।

 

৫৪. কেউ কাছে নেই

আকাশ ছুঁয়ে দেখতে গিয়ে আকাশ হলাম যেই
মেঘের দেশের দুঃখ হলাম, কেউ তো কাছে নেই।

 

৫৫. ছবি

রাতের কার্নিশে চাঁদ গলে যায়, তোমরা বলো
জোছনার প্লাবন! জানো না কেউ, চাঁদ ভেজাতে
আমি কতবার হয়েছি শ্রাবণ। শরৎ ভোরে হেঁটে যাও
আনমনে, শিশিরে ভেজাও পা কুয়াশা রঙে
এঁকে যাও তুমি, সুখের একখানা ছবি।


৫৬. এক মধ্যরাতের গল্প

ছোপ ছোপ অন্ধকারে ছাদে, তুমি
পড়েছিলে ভালবাসার উন্মাতাল ফাঁদে! দমকা হাওয়ায়
লুটিয়ে পড়েছিল তোমার বুকের আঁচল, আমার
ভেতরে উন্মাতাল অগ্নি-জল! টোপঘেরা অন্ধকারে আমার
অবাধ্য হাত যতবার করেছে দস্যিপনা, প্রশ্রয়
পেলেও তুমি নম্রলাজে তুলেছ শাসনের ফণা!
তোমার ব্লাউজের তিনটি বুতামের নাম দিই
নীহারিকা-সপ্তর্ষি, ধ্রবতারা। মাতাল করা রাতের আঁধারে
আমি দিশেহারা। নক্ষত্র বোতাম উসকে দেয় সুপ্ত
আগ্নেয়গিরির জ্বালা মুখ, ছটফট করে
তোমাকে আলিঙ্গনে জড়াতে ছিলাম উন্মুখ।

আকাশে কাঁপন, বাতাসে শিহরণ, মন কী যে চায়!
আমার দৃষ্টির সামনে আড়ষ্ট তুমি, তোমার
বুকও কাঁপছিল অদ্ভুত শিল্পময়তায়।

 

৫৭. অবহেলা অহর্নিশ

তোমার কাছে যতবার গিয়েছি আবেগের রঙে
কী আঁকিনি, বল? খরখরে কবিতার শূন্য খাতায় শব্দের
দীপ্তিময় নক্ষত্র জ্বালতে ঢেলেছিলাম জোছনার জলও!
তোমার ছোট ছোট অভিমান বুক দিয়ে আগলে
রেখে কক্ষপথে জ্বেলেছিলাম যে দ্বীপ, ‘নীহারিকা’ ‘সপ্তর্ষী’
নামে তুমিও ডাক, অথচ দেখ না
তোমার পানে পাতা আছে কার হৃদয় সাঁকো!

কী নেই বল তোমার! বিন্দু তোমার, বৃত্তও আছে!
কর্দপহীন আমাকে কে আর যাচে? ভোরের গান, কুসুম
রোদের পদাবলী, রাজপথ-চোরাগলি, শিশির বিন্দু,
নীলাভ সিন্ধু, দূর পাহাড়ের একাকিত্ব, উদাসী দুপুর,
হারানো গান-অমিত সুর, গোধূলির বিষণ্নতা,
বিশাল বৃক্ষ-কুঁড়ির দু’টি পাতা, আনন্দ-উৎসব, পথমেলা,
ফেলা আসা স্মৃতি-কালবেলা, চিরহরিৎ অরণ্য, যা
নাগরিক বা বন্য, কথামালাÑনিরেট গদ্য, ইতিহাস, যে শিল্প
সৃষ্টি হল সদ্য, সবই তোমাকে করে কুর্নিশ! আমি আঘাতেও
চুপ, অন্ধকারের স্বরূপ-এক ‘অবহেলা’ অহির্নিশ!

 

৫৮. স্বপ্নবিলাস

ইচ্ছেঘুড়ি উড়ে উড়ে যায়
জাগে কত অভিলাষ
মুঠো ভরা স্বপ্ন আছে
বল না তা স্বপ্ন বিলাস।

স্বপ্ন আছে বলেই মানুষ
আশায় বাধে বুক
স্বপ্ন ভাঙার বেদনা আছে
পূরণেরও আছে সুখ।
যাক উড়ে যাক টানাপড়েনের
গোপন দীর্ঘশ্বাস।

চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে
সব কিছু মেলে না
ফেলে দেয়া স্বপ্নগুলো
আমাকে যে ফেলে না।
যত ব্যথা চেপে রেখে
খুঁজি উচ্ছ্বাস।

 

৫৯. দিকভ্রান্ত মরু

দু’হাত বাড়ালে হামলে এসে আমাকে
আলিঙ্গন করে উত্তাল সমুদ্র, তবু
চোখের কোণে শিশির জমিয়ে দেয়
নিরুদ্দেশ হওয়া কোনো এক বসন্ত।
সমুদ্রের চেয়ে শিশিরের জল বড্ড ভারী!
আমি শিশিরে ডুবে যাই বিষণ্ন বেহাগে।

চাইলেই আমার করতলে গনগনে
সূর্য নামে, যেন বৃষ্টি পালক! তবু এক ফোঁটা
অচেনা আঁধার অনড় পাথর হয়ে
চেপে থাকে বুকের পাঁজরে! আমার প্রতিবিম্ব
হয়ে কঁকিয়ে উঠে ঝরা পাতার স্বরলিপি।

আমি অভিশপ্ত কিনাÑজানতে চেয়েছি
যতবার, কলহাস্যে তোমার দৃষ্টি
হয়েছে সরু। বলেছ একই কথা, আমি
সমুদ্রের মলাটে এক দিগ্ভ্রান্ত মরু!

 

৬০. বাবা

বাবা কি রোদেলা উঠোন, হিজলের ছায়া?
নাকি শাসনের রুদ্রতার আড়ালে দূরবর্তী মায়া?
বাবা কি পথ দেখিয়ে দেয়া বাতিঘর? দায়িত্বে বোঝা
কাঁধে তিনি ছুটে চলেন নিরন্তর। কী হলে বাবা
দুঃখ পান-কী হলে সুখী? এ প্রশ্নে আমরা হই কি কখনও
নিজের মুখোমুখি? বাবা, এসব নিয়েও ভাবেন না,
সন্তানের দাবি-দাওয়া পূরণে সদায় অমলিন। নিঃশ্ব
হলেও কোনো বাবা, আকাক্সক্ষা তার হয় না বিলীন।
বাবার পথ ধরেই সকলের হেঁটে যাওয়া,
কালস্রোতে দেখে স্রষ্টা শিশুদের বাবা হওয়া।

 

৬১. গোলাপ

একটি গোলাপ তোমাকে দিতে
কতবার গিয়েছি তোমার সামনে, সেইসব দিনে
হৃৎকম্পন ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমার। অসহায়
চোখ দেখেছে গোলাপের পাপড়ি কীভাবে হয়েছে
মেঘদল! সেই মেঘদল আজো সূর্যস্নানে গেলে
তোমার কথা বলে, আর ঐ রাতে মেঘের পালকে
লেগে থাকা আমার না বলা কথাগুলো নক্ষত্র
হয়ে জ্বলে। তোমাকে গোলাপ দিতে পারিনি বলেই
হাওয়ার দমকায় গোলাপের পাপড়ি উড়ে, আমি
ধূসর প্রচ্ছদ সরে যাই দূর থেকে আরো দূরে!

 

৬২. বাংলাদেশ

লাল বলে, ওরে সবুজ
তুই বড্ড অবুঝ।
আমাকে রেখেছিস ঘিরে
২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর
তোর কাছে আসে ফিরে।

সবুজ বলে, ওরে লাল
তুই বৃত্তাকার
আমি বৃত্তের ঢাল।

তুই-আমি মিলে আছি বেশ
আমাদের নামÑবাংলাদেশ!

 

৬৩. পরিণতি

অনেকগুলো নিদ্রাহীন রাত নিংড়ে
যে কয়েক ফোঁটা বোবা কান্না তুলে রেখেছিলাম, তুমি
গোধূলির রক্তিমাভা ভেবে ভাসিয়ে দিলে পদ্ম
দীঘির জলে। এরপর থেকে পদ্ম দীঘির জল, ভুলে
গেল জল-তরঙ্গের কোলাহল। যে কথাগুলো
লজ্জাবতী লতার মতো চুপসে থেকে থেকে কবিতার
লাবণ্য হয়ে তোমাকে কুর্নিশ করার ব্রতে মগ্ন
ছিল, তুমি ভোরের প্রার্থনা ভেবে কথাগুলো রেখে
দিলে উপসানালয়ে। এরপর থেকে আমার না বলা সব কথা
হয় পেঁজা মেঘ, কখনও দীর্ঘশ্বাস বা ঝরা পাতা।

 

৬৪. ভয়কাতুরে আকাশ

একটি আকাশ পথ হারিয়ে আকাশ খোঁজে।
আলোকবর্ষ দূরে-হাজারো
আকাশ ঝলমলিয়ে থাকে, নাগাল পায় না ও যে!
ভয়কাতুরে আকাশ তোমায় কেবল ডাকে।

 

৬৫. মেকী

যা দেখি, তা কতটা খাঁটি, কতটা মেকী?
পরাজিতের কান্না ঢাকা পড়ে
জয়ীর ডামাঢোল সে-কী!

 

৬৬. হারানোর ক্ষত

আমি বার বার অরণ্যে হারাই, নির্জনতায়
ডুবে থাকি। তুমি সুনীল আকাশে উড্ডীন
গন্তব্য জানা পাখি। তুমি সমুদ্র বিলাসী, তোমাকে
আহ্লাদে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উত্তাল জলরাশি।
আমি রোদের তীর্যকে পোড় খাওয়া বালু কণা, স্বপ্ন বিমুখ
বিষাদে আনমনা। তুমি নিঃশঙ্কোচে হাত বাড়িয়ে
নাও জৌলুসের কলতান, আমি ম্রিয়মাণ চাপা অভিমান!

জানি, তোমার উচ্ছ্বাস নিয়ে আনন্দের অতিশয্যে
রংধনু হয় বাঁকা, অন্ধকারের স্বরলিপি নিয়ে
আমার নিভৃত্যে পড়ে থাকা। তুমি আছ ঠিক, তোমারই
মতো। আমি সামলে নিয়েছি পেয়ে হারানোর ক্ষত!

 

৬৭. পুনরাবৃত্তি

একটি অহংকারী পাথর পাহাড় হবে বলে
নদীর গতিরোধ করে দাঁড়ায়, একটি
স্বপ্নাবিষ্ট ছায়া ‘তুমি’ হবে বলে আমার সঙ্গে
সমান্তরাল পা বাড়ায়। এক পথ
ভোলা বসন্ত অরণ্য হবে বলে তোমার
‘নির্জনতা’ তুলে এনে নাগরিক
কোলাহলে ছড়ায়, দীর্ঘশ্বাসে ঝরে পড়া
এক টুকরো ভাবাবেগ বিষণ্নতার কবিতা পড়ায়।
তুমি জানো, অহংকারী পাথর হয়েছে নদীর
দুঃখ, ছায়া হয়েছে আমার বিভ্রম।
পথ ভোলা বসন্ত ফিকে হতে হতে
ভাবাবেগে জমে ফের হয় অহংকারী পাথর।
এই পুনরাবৃত্তিতে আমি বড্ড কাতর!

 

৬৮. নিদারুণ অবহেলা

আমি তোমাদের মাঝেই তো ছিলাম, এক
টুকরো অবহেলা! তোমাদের সঙ্গে জনস্রোতে ভেসে
কতবার মিলিয়েছি পা, পাশাপাশি দাঁড়াতে
গিয়ে কখনও খেয়েছি উপেক্ষার ঘা!
টু শব্দ করিনি কখনও! মেনেছি আঘাত, ভেবেছি
নিয়তি যেন। শুনতে চাওনা আর? তবু বলছি,
আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছি বার বার।

তোমাদের কণ্ঠে স্লোগান ধ্বনিত হলে, চোখের
তারায় বিপ্লবের মশাল যখন জ্বলে, অরণ্যে-নির্জনতায়
কিংবা নাগরিক কোলাহলে, যেখানেই তোমরা
ছিলে সরব, আমিও ছিলাম তোমাদের ছায়া হয়ে।
হয়ত পথ চলতে পারিনি সমান তাল-লয়ে।

যতটুকু প্রেম তোমাদের হৃদয়ে-করতলে
জমেছিল, যতটা আবেগ হৃদয়ে-হৃদয়ে কেঁপেছিল,
তার চেয়েও ঢের স্বপ্নরেণু উড়েছিল, জানি।
আমার হৃদয়েও ঝর্ণা ছিল, হয়নি তা জানাজানি।

শীতলক্ষ্যার জলে তোমাদের কত হল
নৌকো-বিলাস, চুম্বনে-চুম্বনে কত যে রঙিন
হয়েছিল কণ্ঠনালীর শ্বাস, বাতিঘর হব বলেই
যেন দেখে গেছি তোমাদের উচ্ছ্বাস।

রোদ চকচকে মিছিল আজো নামে পথে,
প্রেমিক-প্রেমিকা চড়বেই স্বপ্নরথে, শুধু আজো কেউ
হাত রাখেনি আমার বুকে চেপে রাখা ক্ষতে! দীর্ঘশ্বাসে
বিমূর্ত হয় বুঝি কালবেলা, তোমাদের কাছে আমি
হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ, নিদারুণ অবহেলা!

৬৯. কী যেন নেই

রোদ নেবে, না ছায়া?
অন্ধকারে ভয়, জোছনার প্রতি
তোমার এত বেশি মায়া?
সাগর চাও শুধু ছুঁতে, ডুবে যেতে ভয়
নাগরিক কোলাহল-জৌলুস ছেড়ে
কে হতে চায় অরণ্যময়?
পাহাড়ে হেলান দিয়ে স্বপ্নরেণু ছড়াও
শোন কি একাকিত্বের গোপন কান্না?
পাহাড় খুঁড়ে কেউ কেউ খোঁজে
হীরে-জহরত-পান্না। আকাশ তোমার, সূর্য-তারা,
বিত্ত-বৈভব, খ্যাতির স্রোতধারা..!
এত প্রাপ্তিতে কখনও তুমি হারিয়ে ফেল খেই
চাপা দীর্ঘশ্বাস বলে, ‘সব আছে, তবু
যেন একটা কিছু নেই!’ ‘কী নেই?’
জানতে আমিও উন্মুখ, রোদ-বৃষ্টি-ছায়ায়..
তুমি হাতড়ে খোঁজ না-কি ‘সুখ!’

 

৭০. একখণ্ড মেঘের কাচ

একখণ্ড মেঘের কাচ করতলগত করে
ভেবেছিলাম তোমার পাষাণ হৃদয়ে ঝর্ণা হব।
তোমার চোখের শ্যেন দৃষ্টি, উপেক্ষার
তীর্যকে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দেবার
অদম্য ইচ্ছেটা কেবলই ছিল কল্পনার বৃত্তে বন্দী,
নাগরিক কোলাহলে অপাঙ্ক্তেয় ছিলাম বলে
অরণ্যের সঙ্গে করেছিলাম সন্ধি! আকাশ দেখেছি,
আকাশ ছুঁতে বাড়িয়ে দেইনি হাত। কবিতার খাতায়
আহাজারি করেছে কত যে ব্যর্থ রাত!
তুমি এর কিছুই জান না, তোমার অবহেলাকে
মেনে নিয়েছি হাসিমুখে। একদিন দেখি, মেঘের
কাচ গলে গলে নদী হয়েছে বুকে!

 

৭১. জব্দ

কবিতা ভালবাস, ভয় পাও কবিকে
শিল্পীকে দূরে ঠেলে টেনে নাও ছবিকে!
কবি খোঁজে কল্পনা, ব্যঞ্জনা, শব্দ..!
তুমি কর কবিকে অকারণে জব্দ।

 

৭২. পথ
তোমাদের পথগুলো সবসময় ছিল
দিগন্তমুখী, ফুল ফোটান গানে পথও ছিল
বড্ড সুখী। যে পথ স্বর্গের ঠিকানা জানে,
যে পথ জীবনের লেনদেনে খুঁজে নেয়
প্রবঞ্চনার মানে, সে পথে তোমরা ছিলে
স্বপ্নচারী! আমিও তাল মিলিয়ে চলতে
চেয়েছিলাম তাড়াতাড়ি। যে পথ ঠিকঠিক
চিনে নিতে পারে কোনটা প্রেম, কোনটা
কুহেলিকা, কোনটা মোহ, কোনটা
ঠকে শিখা। বা তোমাকে নিয়ে এখনও
কেন কালজয়ী কবিতা হল না লিখাÑযে পথ
এই অনুচ্চারিত আখ্যান জানে, সে পথ
একান্তই তোমাদের। তোমাদের সোল্লাসে
ছুটে চলা আমারও দেখা হয়েছে ঢের।
স্বীকার করছি, আমিও ওই রকম গন্তব্য জানা
পথ হতে গিয়ে হয়েছি পাহাড়ের খাঁদ! তাও খাঁদ
মিশেছে আলোহীন সুড়ঙ্গে, যেন অসমাপ্ত গল্প।

তোমরা এখনও হাঁটছ চেনা পথে, আমি
সুড়ঙ্গে অন্ধকার জড়িয়ে আছি কোনো মতে।

৭৩. কিছু আনন্দ কিছু উচ্ছ্বাস

কিছু কিছু আনন্দ আছে মঞ্চে প্রক্ষেপিত
ঝলমলে আলোর মত, সুতীব্র ও সুবিন্যস্ত। আলো
মেখে যারা কলহাস্যে মশগুল, তারা হৃদয়ের
রক্তক্ষরণ ঢেকে সুখী হতে চায়। অভিনয়
শিল্পকলায় উদ্ভাসিত আনন্দে তারা সুখী হবার ভান
করে, নিজেকে প্রমোদ দিতেÑ‘সবাই তো
সুখী হতে চায়’ সান্ত¦নার গান ধরে।

জীবনের যোগসূত্র খুঁজে নিতে
যেটুকু পাওয়া হারানোর বিপরীতে, সব
হিসেব ফেলে জীবন রাঙাতে চায়
কেউ কেউ। যুগল পথচলায় শুধু ফুল নয়,
ভুলেরও কাঁটা আছে, জলছবি যেমন
আছে, তেমনি আছে উত্তাল ঢেউ! সমুদ্র
পাড়ি দিতে চায় যারা ঢেউ ছাড়া,
তারাই মেকী আনন্দে হয় মাতোয়ারা।

কিছু কিছু উচ্ছ্বাস আছে পারফিউমের
গন্ধের মত, উপস্থিতির তীব্রতা আছে-অথচ
দীর্ঘস্থায়িত্ব নেই। বুক সেলফে সাজিয়ে
রাখা অপঠিত বইয়ের মত, অস্তিত্ব আছে
অথচ অবহেলার আখ্যান। এমন উচ্ছ্বাসে
অনেকের আছে মোহ, আমার কেবলি দ্রোহ।

 

৭৪.  তোমরা

তোমাদের হম্বি-তম্বি দেখলে মনে হয়
বুক পকেটে রেখে দিয়েছ ভোল
পাল্টানো কোনো মন্ত্র, এক ইশারায় আমূল
বদলে দিতে পার যেন রাষ্ট্রযন্ত্র!
চাইলেই পাল্টে দিতে পার প্রার্থনার
নির্যাস মাখা ভোর, জলপাই রঙ
দুপুর, বিকেলের বিষণ্ন ক্যানভাস বা
গুপ্তধনের ঠিকানা জানা মাতাল রাত।

তোমাদের অহমিকা দেখলে
মনে হয়, নায়াগ্রার তাবৎ জল তুলে
এনে রেখে দিতে পার বাড়ির পেছনে
মজে যাওয়া পুকুরে। অনাত্মীয়ের মতো
পড়ে থাকা এই পদ্মপুকুরেও এক সমুদ্র
উত্তাল ঢেউ এনে আছড়ে ফেলতে পার
কোনো এক ভাতঘুম দুপুরে। তোমাদের
অহমিকা, কপট রাগে আমাদের দিকে
তাকালে আমরা এক নিমিষে উড়ে
যাই মাটি চাপা বিলুপ্ত নগরীর দীর্ঘশ্বাসে।

জানি, তোমাদের প্রতিশ্রুতি ধূসর
দিগন্তের মায়াবী হাতছানি। দৃশ্যমানে
আছে, হাত বাড়ালে দূরত্বের বিভ্রম সাঁকো।
আমরা স্বপ্ন নিয়ে যতই মুখিয়ে থাকি, তোমরা
প্রতিশ্রুতি বিলাতে থাক। আর ইচ্ছে
হলেই তোমরা আমাদের বুকের পাঁজরে
আঁচড় কেটে নগ্ন দু’পা রাখ।

 

৭৫. নীরব বিদ্রোহ

লোকটির কিছুই নেই। আছে সব
হারানোর শোক, সে জীবনবিমুখ লোক!
আশ্চর্য, লোকটি মরণাস্ত্রের কথা ভাবে
না! পায় না ভয়ও, লোকটি উপেক্ষা-বিদ্রুপ
সয়ও। তোমাদের অহংকার কতটা
উঠল তেতে, ভাবে না তাও। ময়ূরপঙ্খী
রাতে ভাসায় না অভিসারের নাও।

হ্যাঁ, লোকটি বহু আগে জানতে চেয়েছিল
কীভাবে শিল্পীত হয় কবিতার পোড়ামাটি,
কল্পরূপে কেন ব্যাঞ্জণায় জ্বলে শব্দের ধূপকাঠি।
রঙের ছোপ ছোপ বিন্যাসে কীভাবে অঙ্কিত
হয় সময়ের আখ্যান, সুর-লয়-তানে কারা গলা
ছেড়ে ধরে গান, বৃষ্টিতে ভিজেও কেন রোদ অম্লান?

লোকটি এখন বদলে যাওয়া ছবি, কেউ
কেউ বলেÑব্যর্থ কবি! কেÑকী বলে, এতেও
নেই তার একবিন্দু আগ্রহ। লোকটি
নাকি আমার মতো নীরব এক বিদ্রোহ!

৭৬.  গদ্য

প্রখর সূর্যালোকের মতো এক নিরেট গদ্য
তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। গদ্যের যে
তীর্যক প্রকাশ, অন্তর্নিহিত অর্থদ্যোতনা,
শব্দশোভিত অলংকরণ,কথাশিল্পের সুষমাÑ
কোনোটাই তোমার দৃষ্টিতে পড়েনি। তোমাকে
নিয়ে গদ্য ভেতরে ভেতরে যতটা ছিল
উন্মুখ, অনাবিল লজ্জায় ততটা ছিল ভাষামূক।
গদ্য ভেবেছিল, তুমি তাকিয়ে থাকবে
বিস্ময় আর ভাললাগার যুগল সম্মোহনে।
অথচ তুমি ভ্রু-কুঞ্চিত চোখে গদ্যের দিকে
এমনভাবে তাকিয়েছিলে যেন রাজফটকে
দাঁড়ান অনাথ ভিখারী! অথবা প্রাগৈতিহাসিক
যুগ থেকে উঠে আসা কোনো নষ্ট মানব
তোমাকে ছুঁয়ে পবিত্র হতে চায়।

তোমার তাচ্ছিল্যকে গায়ে মেখে গদ্যটা
কুর্নিশ করেই তোমাকে অভিবাদন জানিয়েছিল।
তোমার আলতা মাখা দু’পা ধুয়ে দিতে জোছনা জলের
এক মায়াচ্ছন্ন দীঘি মেলে ধরেছিল, তুমি সেদিকে
তাকাওনি একবারও। সেদিন স্বপ্নের চেয়ে বিভ্রম
ছিল গাঢ়, সেই বিভ্রমে বিভোর হয়েছিলে আরো।

গদ্যটা কখনও হতে চায়নি ঝাঁঝাল দুপুর, ঝুপ
করে নামা সন্ধ্যা, নিঝুম রাতের কান্না বা
নির্মল ভোর। গদ্যটা হতে চেয়েছিল শুধু তোমার
মনে জমে থাকা এক তাল বিহলতাÑঘোর।

 

৭৭. তারপরও

তারপরও আমরা কবিতার কথাই বলব।
তোমরা যত বিভ্রমে হারাও, বিকারগ্রস্থ হয়ে
সভ্যতা তাড়াও, আমরা আলোর পথেই
নির্ভীক চলব। তোমাদের নখের কোণে
টলমলে রক্তনদ দেখে আমরা আমাদের
স্বর্ণালী বিকেলগুলো লুকিয়ে রাখব
না অন্ধকারের পিরামিডে। তোমরা যতই
হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠ পৈচাশিক উল্লাসে,
আমাদের কোনো ভোরে থামবে না প্রার্থনা, কোনো
ফুল লুকাবে না তার লাবণ্য। এমন কি,
কোনো বন্য প্রাণীও অভিমানে ছেড়ে যাবে না
অরণ্য। তোমরা যতই হও বন্য!

তোমরা যতই রঙধনু ভাঙো, আকাশের
নীল পুড়িয়ে দাও বা মানুষ হয়েও
হায়েনার রূপ ধর, আমরা কবিতার
কাছেই ফিরে যাব-তারপরও।

 

৭৮. অহংকারের বিষাদ

খুন হয়ে যাওয়া একটি রাত
আর ভোর হবে না বলে তোমার
অহংকারে পেখম ছড়িয়েছিল।
একটি গুনগুন গান হবে না বলে
ছড়াল না কোনো আবিষ্টতা,
সুরের পেয়ালায় জমেছিল অভিমানের
বরফ-গলা নদী। রাতটির জৌলুস
মুঠোয় পুরে তুমিও ভেবেছিলে
লক্ষ্মীপেঁচারা তোমাকে ঠিকঠিক বলে
দেবেÑরাত কেন ভালবাসে সূর্যালোকের
গান, পথ হারালেও বিপন্ন পথিক
কীভাবে পেয়ে যায় পথের সন্ধান।

যে নদী গলে যেতে যেতে লিখে
যায় অভিমানের কাব্য, যে রাত খুন
হয়েও এঁকে যায় সূর্যোদয়ের সৌম্যরূপ, যে
গুনগুন ঐন্দ্রালিক গান না হয়ে
অপ্রকাশের মলাটে হয় বেদনার স্তূপ,তাও
করতে চাও মুঠোবন্দী। আমিও জানি,
জীবন ও স্বপ্নের সঙ্গে হয়নি এমন সন্ধি।

স্বপ্ন ভাঙার আক্রোশে তুমি
যতই খুন কর রাত, যত ছড়াও
ঘুম জাগানিয়া কষ্টের পারিজাতÑতুমিই
হবে বিভ্রমে কুপোকাত। হয়তো হয়েছ
সম্্রাজ্ঞী বা পূর্ণিমার চাঁদ, তবু লাবণ্য
পাবে না কখনও তোমার অহংকারের বিষাদ!


৭৯. মুখোশ

বসন্তের দমকা হাওয়াই হতে চেয়েছিল
কবিতাশ্রয়ী এক হৃদয়, পরাজয়েও হৃদয়ের
ছিল না সঙ্কোচ-ভয়। পৃথিবী নামক গোলার্ধের
সঙ্গে কক্ষপথে ঘূর্ণিয়মান লক্ষ-কোটি
গোলার্ধের বিরহ বা প্রেম আছে কি নেই,
মিলিয়ে দেখতে চায়নি কখনও। ঈশ্বর-নিরোশ্বরবাদে
তর্ক লড়াই, ডারউইনের তত্ত্ব-অন্ধ আবেগের
বড়াই, অথবা জলবায়ুর উষ্ণতা নিয়ে
রাষ্ট্রনায়কদের কপট উদ্বেগের বিলাসী বৈঠকে
কী অর্জিত হল-এ নিয়েও হৃদয়ের
ছিল না কৌতুহল। বসন্ত ছোঁয়ায় হৃদয় টলমল।

মহাকাশ দখল করে যারা ভেবে নেয়, তোমার
হৃদয়ের সব কথা পড়ে নেবে। আমার দীর্ঘশ্বাসে
ব্যঞ্জণা ছড়াতে ঢেলে দেবে ধ্রুবতারার তরল,
দু‘ফোঁটা গোপন অশ্রুকে করে দেবে আরেক
গোলার্ধের বৃষ্টি-বিলাস, তারাও জানে না, বসন্ত
হাওয়ায় কেন মিশে আছে সপ্তসুরের অমিত মূর্ছনা।

অগ্নিকুণ্ডে ছায়া নেই, কবিতাহীন হৃদয়ে
মায়া নেই-জেনেও কেউ কেউ তোমার রূপের
আগুনে দেয় ঝাঁপ। দু’চোখে অন্ধকারের
কাজল মেখে ধর্মান্ধরা ছড়ায় কুহেলিকাÑপাপ!
ওরা কি বুঝবে বসন্ত হাওয়ায় কতটা
বিভাস-বিভঙ্গ? কতটা নিখাঁদ হলে হৃদয়ে
প্লাবিত হয় জলতরঙ্গ অপার্থিব সম্মোহনে!
সমুদ্র-মরু-পাহাড় ডিঙিয়ে স্বপ্নচারী
মানুষ কেন ছোটে সবুজ অরণ্যে?

কবিতার সুষমা মেখে, অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা
ঢেকে গুমরে কাঁদে বসন্ত হৃদয়। মুখের
মিছিলে দেখিÑমুখ নয়, মুখোশ কথা কয়!


৮০. কি পাও

আকাশ নত হয়না জেনেও
তুমি হেঁটে যেতে যেতে আমার সামনে
রেখে যাও ঘুঙুরের শব্দশৈলী, চুড়ির
রিনিঝিনি, আটপৌড়ে ঝংকার, খুচরো হাসির
ঝলক, চকিত দৃষ্টির রাগ বর্ষিত ধূন।

আমার অভিমানের সঙ্গে এক অচেনা
অহংকার এসে কবেই যে অলস ছায়া সরিয়ে
ঝলমলে রোদছবি হয়ে আছে, টের পাইনি
নিজে। তোমার কাছে হেরে যাবার আনন্দ আছে,
এমন বোধও দেখি, গোধূলীর বিষণ্ন আভা হয়ে
গেছেÑঢের আগে! তোমার ফিরে আসায় হৃদ-কপাট
খুললেও দাঁড়িয়ে থাকে অদৃশ্য দেয়াল।

আমি জয়ী হতে চাই না জেনেও
তুমি কলহাস্যে হারতে চাও। বিমূর্ত আবেগের
রহস্য ছড়িয়ে আসলে তুমি কি পাও?


৮১. ঝুম রাতের কান্না

তুমি ধাঁধাঁনো আলো পছন্দ কর না বলে
আমি একদিন সূর্যটাকে ছুটি দিতে চেয়েছিলাম।
পৃথিবী অন্তত একটি দিন সূর্যহীন থাকুক
তোমার জন্য, শুধু তোমাকেই কুর্নিশ করে
রচিত হোক অন্ধকারের মহাকাব্য। অন্ধকারও
অপ্সরী হতে চেয়েছিল আমার মত
তোমাকে দ্বিধাহীন আলিঙ্গনে জড়িয়ে। সত্যি
বলছি, সূর্যটাও তোমার সৌন্দর্যের বন্দনা করতে
যেতে চেয়েছিল অন্য কক্ষপথে গড়িয়ে।

একটি সকাল নিরুদ্দেশ হবে বলে, একটি
দুপুর অশ্রু ঝরাবে অদৃশ্য ছায়াতলে বা
একটি বিকেল লাবণ্য হারিয়ে নিরেট অন্ধকারে
নির্বাসনে যাবে বলে রাজী হওনি তুমি।
পেখম ছড়ান অন্ধকারের বুকে কান পেতে
শুনেছিলাম, স্বপ্ন ভাঙা বেদনার সে-কী তোলপাড়!
সেই থেকে নিঝুম রাতের কান্না শুরুÑথামেনি আর।

 

৮২. অর্ঘ্য-অঞ্জলি

তোমার সামনে অকপটে, অনর্গল মিথ্যা
কথা বলি, যেন কবিতার ধূপছায়ায় বিমূর্ত
বিন্যাস। এত মিথ্যা বলি, অথচ তুমি তা
সত্য মনে করে আমাকে নিজের কাছে অপরাধী
করে রাখ। জানি, ভালবাসায় মাদকতা
আছে বলেই বিশ্বাসে অবিচল থাক।

আসলে আমি কি শুধু মিথ্যা কথাই বলি?
নাকি অন্তরের অন্তঃস্থলে সুগন্ধী জলধারায়
ভাসমান সত্যগুলো মিথ্যার ছদ্মাবরণে
প্রকাশ পায়? যেমন ধর, আমি সত্যি-সত্যিই
তোমার নামে হাজারটা তাজমহল বানাতে
চাই, পারি না। অথচ বুকের জমিনে
তাজমহলের নির্মাণ দেখি রোজ। তোমাকে
দিতে চাই সমুদ্রের কুর্নিশ, পাহাড়ের দাঁড়িয়ে
থাকার অহংকার, নীল রঙা আকাশের অস্তিত্ব,
হাওয়ার তাল-লয়, প্রকৃতির বৈচিত্র্যময়
হবার সাতকাহন, মেঘ-বৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য বন্ধন,
যেকোনো অন্ধকার পথে জোনাকী লণ্ঠন…!
আরো দিতে চাই কবিদের নির্দিষ্ট ও একাগ্র
প্রেমের মুখচ্ছবি হওয়া কবিতা, অনাদরে বেড়ে
ওঠা বনফুলের উদ্দীপ্ত সাহসের অভিধান। দিতে
পারি কই? বিলিয়ে দেয়ার সত্যটুকুর বোধে মিথ্যা
করে তোমাকে যা বলি, এ আমার অর্ঘ্য-অঞ্জলি!


৮৩. ছায়া

অন্তরে এক গোপন ছায়া আছে।
ছায়া জুড়ে তোমাকে নিয়ে অমলিন শুভাশীষ
বোধ, ছায়ায় কখনও ঝলমলিয়ে উঠে
হিরন্ময় রোদ। ছায়াটি কখনও কখনও তোমার
মুখ হয়, কখনও উদাসী সময়ে বিষাদের
সুখ হয়, কখনও আমার প্রতিবিম্ব হয়ে ফেলা
আসা ভুলগুলোর কথা কয়। কখনও চাপা দীর্ঘশ্বাসে
ছায়াটি কাঁপে, কখনও মধুর স্মৃতির রেণু
উড়িয়ে চোখের জলের অতল মাপে।

ছায়াটি কখনও আয়না হয়, কখনও মেঘের
চাদর, কখনও শ্রাবণ, কখনও শক্ত, কখনও
বড্ড কাতর। পাতা ঝরার অভিমান
দেখি, কাছে টানার শুনি গান, ছায়াটি আমার
বিশ্বস্ত এবং হৃদয় বীণার কলতান।

অন্তরে চাপা এ ছায়ায় রূপের যত বিভাস,
ছায়ার মধ্যে শুধু একান্তে তোমার বাস।
(সমাপ্ত)

 Back