- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
এক.
লোকটিকে দেখে চিনতে পারলো না নীরব। লোকটিকে একপলক দেখেই বলে দেয়া যায়, সে বিত্তবান কেউ হবে। তার গায়ে নেভি ব্লু স্যুট। সাদা শার্ট। লাল রঙের ওপর নকশা করা টাই। পায়ে টিম্বারল্যান্ড ব্র্যান্ডের কালো জুতো। গা থেকে ক্যানিথকোল পারফিউমের মৌ মৌ গন্ধ ভেসে আসছে। লোকটি ভিআইপি কেউ হবে। ভিভিআইপিও হতে পারে। এমন একজন লোক ওর সঙ্গে কেনো দেখা করতে এসেছে, বুঝতে পারলো না নীরব। মনে ফেনিয়ে ওঠা কৌতূহলের ঢেউ চোখের দৃষ্টিতে যাতে ফুটে না ওঠে, এ ব্যাপারে সতর্ক হলো ও। দুই বছরের কারাজীবন ওকে অনেক বদলে দিয়েছে। সরলতা ছিল ওর জীবনবোধের অন্যতম ভিত। সেই সরলতায় মরচে ধরেছে। সব কিছু সহজভাবে বিশ্বাস করার স্নিগ্ধ চেতনা মিইয়ে গেছে। সামান্য কিছু পেয়ে উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হওয়া বা না পেয়ে বিষণ্ন হবার অনুভূতি কি ওর আছে? তাও নেই। ওর এখন অনেক কিছুই নেই। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, ও শুধু বেঁচে আছে। কারাবন্দি নিষ্প্রভ জীবন নিয়ে ও যেনো এক গন্তব্যহীন মরা নদী। এই নদীতে জোয়ার নেই, ভাটা নেই, ঢেউ নেই, তরী নেই— কিছুই নেই। দুর্ভাগ্যের পাহাড়ে আটকে থাকা ও যেনো এক অভিশপ্ত নদী। ওর পুরো জীবনজুড়ে ঘন কুয়াশার গভীর হতাশা জমাট বেঁধে আছে। লোকটিকে দেখে এ কথাগুলো ওর মনে উঁকি দিলো। ধোপদুরস্ত পোশাকের এই লোকটি ওর কাছে কেনো এসেছে, ও জানে না। নীরবকে দেখে ম্লান হাসলো লোকটি। লোকটি হাসলে তার চোখের মণি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ও মনে করতে পারলো না, এমন একটি লোকের সঙ্গে ওর পরিচয় ছিল কি-না। অথচ লোকটি ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। খুব ঘনিষ্ঠজন না হলে খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে দেখতে আসার কথা নয়। ও লোকটির চোখে চোখ রেখে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললো— `আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। আপনি কি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’
`আপনার নাম কি নীরব?’ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো লোকটি।
`হুম।’
`পুরো নাম?’
`পুরো নাম আহসান হাবিব নীরব। কেনো, বলুন তো?’
`না, আমি নিশ্চিত হতে চাচ্ছি। নাবিলা হত্যাকাণ্ডে আপনার চৌদ্দ বছর জেল হয়েছে, তা-ই না?’
প্রশ্নটা শুনতে ভালো লাগলো না। তবু ও মুখে কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটি বললো— `দুঃখিত, আপনাকে প্রশ্নটা করতে হলো বলে। মিস্টার নীরব, আমার নাম শাকিল চৌধুরী। পেশায় ব্যবসায়ী।’
`আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারছি না। শাকিল চৌধুরী নামে আমি কাউকে চিনতাম না।’ নীরব বুঝতে পারছে না, ওর সঙ্গে শাকিল চৌধুরী কেনো দেখা করতে এসেছে। ও রহস্যের মধ্যে পড়ে গেলো।
শাকিল চৌধুরীর মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে আছে। সে বললো— `এটা ঠিক, আপনি আমাকে চেনেন না এবং আমিও আপনাকে চিনতাম না।’
`তা হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন কেনো?’
নীরবের প্রশ্নে ফের ম্লান হাসলো শাকিল চৌধুরী। তার চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো। `আপনার সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্য আছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি।’
শাকিল চৌধুরীর কথায় দ্বিধান্বিত হলো নীরব। ও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে। `আমার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা! কী বলছেন! একজন খুনির সঙ্গে কী আলোচনা হতে পারে?’
শাকিল চৌধুরী নীরবের বিস্ময় গায়ে মাখলো না। সে বললো— `মিস্টার নীরব, আমি অকারণে আসিনি। এটুকু নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। তবে আপনার বিস্মিত হবার কারণ আছে। আপনি আমাকে চেনেন না, তাই বিস্মিত হচ্ছেন। আসার কারণ বললে আপনার বিস্ময় কমবে।’
`তা হলে আসার কারণ বলুন, প্লিজ।’ তাগিদ দেবার মতো করে বললো নীরব।
শাকিল চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো। নীরব তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শাকিল চৌধুরী বললো— `কী দিয়ে শুরু করবো, বুঝতে পারছি না। আপনার বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা আগে বলবো কি-না ভাবছি।’
নীরবের বুকের ভেতরে মৃদু একটা ঝড় উঠলো যেনো। এতোদিন পর বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা শুনে মুহূর্তেই ওর বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠলো। সেই কবে মা-বাবাকে দেখে এসেছে। কতো দিন হয়ে গেছে, মাকে দেখে না! নাবিলা হত্যা মামলায় গ্রেফতার হবার আগে ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল ও। মায়ের জন্য একটা কলাপাতা রঙের জামদানি শাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। নীরব কখনো মাকে একটা ভালো শাড়ি পরতে দেখেনি। শাড়ি দেখে ওর মা চোখের জল মুছে বলেছিল— `তুই এতো টাকা খরচ করেছিস কেনো? ঠিকমতো পড়াশোনা করছিস তো?’
আবেগমথিত কণ্ঠে ও বলেছিল— `মা, ঈদের দিন শাড়িটা পরো। তোমাকে কখনো ভালো শাড়ি পরতে দেখিনি।’
`কী যে বলিস! তুই যখন খুব ছোট ছিলি, তখন তোর বাবা কতো শাড়ি কিনে দিতো! এখন না হয় কিনে দিতে পারে না।’
`মা, আমি পড়শোনা শেষ করে যখন চাকরি করবো, তখন প্রতিমাসে বেতন পেয়ে তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেবো।’
ওর মা কেবল চোখের জল মুছেছিল। ছেলের কথায় তার মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠেছিল। আজ অনেক দিন পর মায়ের মুখটি ওর মনে ভেসে উঠলো। ওর মা কি শাড়িটা পরেছিল? কে জানে, হয়তো পরেনি। বাবা কেমন আছে? আমাদের চারপাশে এমন কিছু লোক আছে, যারা সারাক্ষণই চুপসে থাকে। খুব একটা কথা বলে না। কারো সঙ্গে তর্ক করে না। কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে না, আবার মাথাও ঘামায় না। এমন কী নিজের সংসারে কী আছে, বা কী নেই— এসব নিয়েও ভাবে না। তারা যেনো বেঁচে থাকার জীবন প্রণালিতে নিজেদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে অভ্যস্ত। জগৎ-সংসার নিয়ে তারা হয় উদাসীন, নয় তো অসহায়। ওর বাবাও সেরকম একজন। তিনি তরুণ বয়সে ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন, সফল হননি। বিয়ের পরপর জমি বিক্রি করে বাজারে একটি বড় মনোহারির দোকান দিয়েছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবসা বেশ জমেও গিয়েছিল। এই সফলতার অধ্যায় ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একদিন দোকানে আগুন লাগলো। অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু ধূলিসাৎ। ওর বাবা আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি, বা দাঁড়াতে চেষ্টাও করেননি। একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন। ওদের দোকানে কেউ ঈর্ষাবশত আগুন লাগিয়ে দিয়েছে— এমন কথা শোনা গিয়েছিল। বাবা ও কথার সত্যতা খুঁজতে যাননি। নিজের ভেতর চুপসে থাকা সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে সংসারে অসহায় মানুষের কাতারে নিজেকে দাঁড় করিয়ে নেন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কিছু কৃষি জমি ছিল, ওসব বর্গা দিয়ে যা আয় করতেন, তা ওর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে চোখ-কান বন্ধ করে থাকতেন যেনো। অভাব-অনটন ওদের সংসারে নিয়মিত অতিথির মতো দেখা দিতো। মায়ের ইচ্ছা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে নীরব। তখন ওদের সুদিন আসবে। কিন্তু তা আর হলো কই? আজ এতোদিন পর নীরবের চোখের সামনে একঝলক অতীত দীর্ঘশ্বাসের মোড়কে ভেসে ওঠে। ওর ছোট ভাই রায়হান কি পড়াশোনা করছে? ও নিশ্চয় কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট বোন নায়না নিশ্চয় এখন কলেজে ভর্তি হয়েছে। ও নিশ্চয় কিশোরী থেকে তন্বী তরুণী হয়েছে। ও কি নীরবের নিরুদ্দেশের কথা ভেবে কখনো কখনো ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে? প্রশ্নগুলো একের পর এক উদয় হয় আর ওর বুকের ভেতরে হাহাকার তুলে দেয়। কারাগারের চার দেয়ালের মতোই এ প্রশ্নগুলো ও বন্দি করে রেখেছিল। আজ শাকিল চৌধুরী আসায় দেয়াল ভেঙে প্রশ্নগুলো বেরিয়ে এলো। নীরবের চোখের দৃষ্টি ছলকে ওঠে। চোখের কোণ থেকে জলের ধারা নেমে আসতে উদ্যত হয়, ও তা সামলে নেয়। কারো সামনে চোখের জল ফেলা নিজের দুর্বলতার প্রকাশ। ও নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না। নীরব কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিলো। শাকিল চৌধুরী শিকার ধরার মতো করে ফের কথা বললো— `আপনার বাবা-মা, ভাইবোন কেউ জানে না যে আপনি কারাগারে বন্দি। এটা আমাকে খুব ভাবিয়েছে। এই পাবলিসিটির সমাজে কেউ কি এমন অন্তরালে থাকতে পারে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য, বলুন?’
শাকিল চৌধুরীর কথায় ককিয়ে উঠতে চায় নীরবের মন। ও নিজের ভেতরের ঝড় সামলে নেয়। নিজেকে আবেগের কাছে ছেড়ে দিলে কারাবন্দি জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, এটা ও জানে। ওর চোখ ফেটে জল নেমে আসতে চায়। ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। শাকিল চৌধুরী বলে- `আপনার ছোট বোন নায়না কলেজে পড়ছে। আপনি তাকে শেষ দেখেছেন ও যখন নাইনে পড়ছিল। আপনার ছোট ভাই রায়হান হাবিব ছোটখাটো একটা চাকরি করছে। ও অনার্স পরীক্ষা দিতে পারেনি। আপনার বাবা হাবিবুর রহমান হাই ব্লাড প্রেসারের রোগী। আপনার মা সংসার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আপনাদের সংসারে অভাব-অনটন এ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, প্রায়ই অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হয় আপনার বাবা-মা, ভাই-বোনকে। এর ওপর সংসারের মেধাবী ও বড় সন্তান নিরুদ্দেশ। ভেবে দেখুন তো, আপনার বাবা-মার মনের অবস্থা কী রকম!’
নীরব চুপ থাকতে পারলো না। ও অনেকটা আর্তনাদ করে বলে উঠলো— `শাকিল সাহেব, কী চান আমার কাছে! কে আপনি?’ নীরবের কণ্ঠ বিষণ্ন শোনায়।
নরম কণ্ঠে শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনার মন খারাপ করে দিলাম বলে আমি আবারো দুঃখ প্রকাশ করছি।’
নীরব চুপ করে থাকে।
শাকিল চৌধুরী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে শাকিল চৌধুরীর দিকে মুখ তুলে নীরব বলে— `আপনি কী চান আমার কাছে?’
`সহযোগিতা।’
`সহযোগিতা! আমার কাছে! আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?’
`পারেন। এ জন্যই তো এসেছি।’
`আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, একজন কারাবন্দি মানুষ কী সহযোগিতা করতে পারে?’ বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব।
এবারো নীরবের বিস্ময়বোধ গায়ে মাখলো না শাকিল চৌধুরী। সে কণ্ঠ নামিয়ে বললো— `আপনি আমাকে ভীষণ রকম সহযোগিতা করতে পারেন। শুধু আপনি “হ্যাঁ” বললেই হয়ে যাবে।’
নীরব দুকাঁধ উঁচিয়ে ছেড়ে দিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বললো— `আপনার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শাকিল চৌধুরী মৃদু হাসলো। `খুলে বলছি। আপনাকে ধৈর্য ধরে শুনতে হবে।’
`বলুন, আমি শুনবো। তার আগে আপনার বিশদ পরিচয় দিন।’
`পরিচয় তো দিলাম। আমি একজন ব্যবসায়ী।’
`কিন্তু আমার কাছে…’
`বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণে আপনার কাছে এসেছি। বলতে পারেন, একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। বিজনেস ডিল।’
`বিজনেস ডিল! কী রকম?’ নীরবের বিস্ময় আরো বাড়ে।
শাকিল চৌধুরীর মুখে হাসি লেগে আছে। সে বলে, `তার আগে আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই।’
`প্রশ্ন? কী প্রশ্ন?’
`বলছি। আপনি একটু স্বাভাবিক হন। আপনার মধ্যে একরাশ বিস্ময় জমাট বেঁধে আছে।’
`আমার বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কী করার আছে, বলুন? আপনি প্রশ্ন করুন। আমি তৈরি।’ বললো নীরব। ও বুঝতে পারছে, শাকিল চৌধুরী নাছোড়বান্দা ধরনের লোক। ঝানু ব্যবসায়ীর মতো তার আচরণ। সে নিশ্চয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে। তার কথা শুনতে হবে। মনে মনে একথা ভেবে নীরব নিজেকে প্রস্তুত করলো।
শাকিল চৌধুরী নীরবের চোখে চোখ রেখে বললো— `আপনি নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেননি। তার মানে আপনি এই রায় মেনে নিয়েছেন। কেনো?’
প্রশ্নটির জবাব দিতে হলে অনেক কথা বলতে হবে। নীরব এ ব্যাপারে বিশদ কিছু বলতে প্রস্তুত নয় বা বলতে চায় না। দুবছর পর এসব কথা বলেই বা কী লাভ? ও বললো— `এ ছাড়া আমি কী করতে পারতাম? আমাকে সাহায্য করতো কে? উকিলের জন্য কোথায় টাকা পেতাম? তা ছাড়া সে সময় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। তাই রায় মেনে নিই। আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব।’
`ঠিক আছে। এবার বলুন, আপনি বাকি বারো বছর জেলে থাকার জন্য প্রস্তুত?’
`এ ছাড়া আর উপায় কী? জেলে তো থাকতেই হবে।’ বললো নীরব। ও শাকিল চৌধুরীর কথার সারমর্ম বুঝতে চেষ্টা করছে।
শাকিল চৌধুরী বললো— `এটা নিয়েই আপনার সঙ্গে আমি একটা ব্যবসায়িক ডিল করতে চাই।’
`ঠিক বুঝতে পারছি না। খুলে বলুন।’ শাকিল চৌধুরীর কথায় নীরব বিরক্তবোধ করলো।
শাকিল চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত সময় পার করে বললো— `মিস্টার নীরব, আপনাকে তো আরো এক যুগ কারাগারে থাকতে হবে। কারাগার থেকে বের হবার পর আপনার জীবন কী হবে, কোন দিকে যাবে, তা আপনিই বলতে পারবেন। তবে আমি বলতে পারি, জেল থেকে বের হবার পর আপনি এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে এগুবেন। আপনার পরিবার আরো অসহায় পরিস্থিতিতে পড়বে। আপনার আজকের তারুণ্য থাকবে না। সমাজেও আপনি অপরাধী হিসেবে ট্রিটেড হবেন। এ কথাগুলোর সঙ্গে আপনি কি একমত?’
`দ্বিমত করবো কিভাবে? এটা আমার ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য বলতে পারেন!’ কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনি ভাগ্য বলে মেনে নিচ্ছেন। আর আমি আপনার ভাগ্য বদলাতে না পারলেও এখান থেকে আপনাকে কিছু পাইয়ে দেবার চেষ্টা করবো, যা আপনার ভাগ্য বদলাতে সাহায্য করবে।’
`মানে?’
`বলছি, সবটুকু না শুনলে বুঝতে পারবেন না।’ শাকিল চৌধুরী থামলো। তার সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় সিগারেট খাওয়া তার অভ্যাস। কিন্তু ওর সঙ্গে সিগারেট নেই। একটা অস্বস্তি তাকে গ্রাস করলো।
নীরব তাকিয়ে আছে শাকিল চৌধুরীর দিকে। শাকিল চৌধুরী নিজের শার্ট ও প্যান্টের পকেট হাতালো কিছুক্ষণ। সে জানে, তার সঙ্গে সিগারেট নেই, তবু সে পকেট হাতিয়ে দেখলো সিগারেট পাওয়া যায় কি-না। পকেটে সিগারেট না পেয়ে নীরবের দিকে তাকিয়ে লজ্জিতভাবে হাসলো। `মিস্টার নীরব, আপনাকে আমি জেলখানা থেকে বের করে আনবো। এরপর আপনাকে ফের একটি অপরাধের ঘটনার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে কারাগারে আসতে হবে। আপনার ফের সাজা হবে। সাজা সর্বোচ্চ আট-দশ বছরের জেল হতে পারে। তার মানে আপনার যে বারো বছর জেল খাটার কথা, একই মেয়াদকাল পর্যন্ত আপনি জেলে থাকবেন। আমার কথায় রাজি হলে বিনিময়ে আপনার পরিবারের সদস্যদের প্রতিষ্ঠিত করাসহ আপনার ভবিষ্যতের জন্যও কিছু করবো। অল্প কথার মধ্যে যা বললাম, তা বুঝতে পেরেছেন?’
শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলো নীরব। এটাও কি সম্ভব? একজন ব্যক্তি বিনা অপরাধে খুনি হয়ে গেলো, আদালত তাকে কারাদণ্ড দিলো। আবার ওই খুনিকেই কিভাবে জেলখানা থেকে বের করে ফেলা যায়? জেলখানা বা আইন আদালত কি এ ধরনের লোকদের পকেটে থাকে না-কি? প্রশ্নটা নীরবের মনে জাগলো। আবার নতুন একটা অপরাধের দায়-দায়িত্ব নিয়ে ওকে জেলে আসতে হবে। অর্থাৎ আরেকটি অপরাধের দায় ওকে স্বীকার করতে হবে। এর বিনিময়ে ওর ভাগ্য বদলাতে পারে, অর্থাৎ আর্থিক স্বচ্ছলতা আসতে পারে। অর্থের প্রতি ওর মোহ নেই। অর্থ দিয়ে ও কী করবে? নীরব চুপ করে ভাবতে লাগলো।
শাকিল চৌধুরী কিছুক্ষণ নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নীরবতা ভাঙতে সে বললো— `আমি জানি, হঠাৎ করে এ ধরনের প্রস্তাব পেয়ে আপনি অবাক হয়েছেন। এবং ভাবছেন, কী করবেন। এ প্রস্তাবটি নিয়ে আপনি কয়েক দিন ভাবুন। আমি অন্য একদিন এসে জেনে নেবো, আপনি রাজি আছেন কি-না।’ কথাটা বলে নীরবের দিকে তাকিয়ে ফের মিষ্টি করে হাসলো সে।
নীরব বললো— `আপনার উদ্দেশ্য কী, বলুন তো? আমাকে দিয়ে কী করাতে চান?’
`আমি প্রথমেই বলেছি, আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি এসেছি একটা ব্যবসা করতে। ব্যবসাটা করতে পারলে আমার অনেক লাভ হবে। আপনার হবে সামান্য। এই তো।’
`আমাকে দিয়ে ব্যবসা করাতে চাইছেন কেনো? আমার পরিচয়ই বা পেলেন কিভাবে?’
`আপনার পরিচয় কিভাবে পেয়েছি, সেটি বড় কথা নয়। প্রস্তাবটার কথা ভাবুন। এতে আপনার লাভ হবে। অন্যথায় অকারণে কারাগারের অন্ধকারে পচে মরবেন!’
`কিন্তু আপনি আসলে কী করতে চান? আমাকেই বা বেছে নিলেন কেনো?’ কৌতূহল প্রকাশ করে নীরব।
শাকিল চৌধুরীর মুখে যেনো উত্তরটা তৈরি ছিল। সে বলে, `ভেরি সিম্পল অ্যান্সার। আমি যা করতে চাই, এর মধ্যে নাটকীয়তা আছে। এই নাটকীয়তার জন্যই আপনাকে প্রয়োজন। এই প্রয়োজন থেকে আপনার খোঁজখবর নিয়েছি। আপনার সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জানি। আপনার বাবা-মা, ভাইবোন সকলের সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি।’
`কেনো?’
`প্রয়োজনেই খোঁজ নিয়েছি। অবাক হয়েছি, যখন জানতে পারলাম, তারা কেউ আপনার কারাবন্দির কথা জানে না। আপনার বাবা-মার ধারণা, আপনি হারিয়ে গেছেন বা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। মারা গিয়েও থাকতে পারেন— এমন আশঙ্কাও তাদের আছে।’
`আমি তো মৃতই!’ কথাটা বলতে গিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরব। ওর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। ও নিজেকে সামলে নেয়। শাকিল চৌধুরী ওর বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গেও দেখা করেছে। সে অনেক হিসাব করেই পা ফেলে, বুঝতে পারছে ও। কিন্তু ওকে নিয়ে তার ব্যবসাটা কী, এটা বুঝতে পারছে না। নীরব ভেবেছিল, শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বাড়াবে না। কিন্তু ওর মনের কৌতূহল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনি আসলে মৃত নন। জীবন্মৃত। আপনার সামনে দুটি অপশন আছে। তা হলো, আপনি জীবনকে বেছে নেবেন, না-কি মৃতই থেকে যাবেন। সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে।’
`আপনার কথায় রহস্য আছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আপনার উদ্দেশ্য কী?’
`আমার উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, আপনি ভাবুন আপনার লাভ কী হবে। তা হলে আলোচনাটা এগুতে পারবে।’
`শাকিল সাহেব, আপনি ব্যবসায়ী, তাই লাভ-লোকসানের কথা ভাবেন। আমি কিন্তু ব্যবসায়ী নই।’
`আপনি একটু বোকা, এরকম আমি শুনেছি। কিন্তু দুবছর জেল খাটার পর কেউ আর বোকা থাকে না, এটা আমার ধারণা। আমি জানি, জেলখানায় থাকলে বোকা, নিরীহ বা অসহায় লোকদের বুদ্ধি খুলে যায়। জেলখানা হচ্ছে অপরাধীদের আশ্রয়স্থল। এই আশ্রয়স্থলে বোকারাও অনেক কিছু শিখে ফেলে। আমি কি ভুল বললাম?’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি শাকিলের চোখে।
নীরব ম্লান হাসলো। `আপনার কথাটা ঠিক কি-না, ভেবে দেখবো। তবে আমি বোকা হলে আমাকে দিয়ে আপনার ব্যবসা হবে কিভাবে?’
`ব্যবসার জন্য আপনার মতো লোকই আমার দরকার। এখানে বোকা-চালাকের হিসাব নেই। তবে বোকার মতো আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে আমার একটু অসুবিধা হবে। যে স্ক্রিপ্ট আমি তৈরি করেছি, এর রদবদল করতে হবে। এই যা!’
`আপনার কথায় আকর্ষণ আছে।’
`আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি হলে অনেক অ-নে-ক টাকা পাবেন। টাকার আকর্ষণটা অনেক বড়, নীরব সাহেব।’
শাকিল চৌধুরীর এ কথাটায় নিজের মধ্যে মৃদু আঘাত লাগলো। নীরব কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুটিয়ে বললো— `আমার টাকার প্রতি আকর্ষণ নেই।’
নীরবের কথায় স্মিত হাসলো শাকিল। `আকর্ষণ নেই, তবে প্রয়োজন যে আছে, সেটি নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না? টাকা ছিল না বলেই আপনি খুন না করেও খুনের সাজা ভোগ করছেন।’ শ্লেষ মিশিয়ে বললো শাকিল চৌধুরী।
`শুধু কি টাকার জন্য আমার সাজা হলো? সমাজ, আইন, রাষ্ট্র কি এসব দেখবে না, বলুন?’
`শুনুন, টাকা থাকলে আপনার কিছুই হতো না। সমাজ, আইন, পুলিশ, রাষ্ট্র— সব আপনার পক্ষে থাকতো। একথা কি এখনো বুঝতে পারেননি?’
এর জবাবে কিছু বললো না নীরব। ওর মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলো। শাকিল চৌধুরীর কথা ফেলে দেয়া যায় না। টাকা থাকলে হয়তো বিনা অপরাধে ওকে জেল খাটতে হতো না। নীরব ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনাকে আরেকটা কথা বলছি। আমি খেঁাঁজ নিয়ে জেনেছি, আপনাকে নাবিলা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থ ঢেলেই আপনাকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। নাবিলার প্রকৃত খুনি ভালোভাবেই জীবনযাপন করছে। আপনি যদি নাবিলার প্রকৃত খুনিকে বিচারের সম্মুখীন করতে চান, তা হলে আপনাকে জেল থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবটা কিন্তু লোভনীয়, ভেবে দেখবেন।’
কথা শুনে কেমন শিহরণ অনুভব করলো নীরব। নাবিলার প্রকৃত খুনির সন্ধান জানে শাকিল চৌধুরী। এ কথা ভাবতেই নীরবের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেলো। দুবছর পর নীরব নিজের মধ্যে একটা তোলপাড় অনুভব করলো। শাকিল চৌধুরী ধূমকেতুর মতো উদয় হয়ে ওর ভেতরে কেমন জাগরণ সৃষ্টি করে দিলো। নীরব প্রথমে ভেবেছিল, শাকিল চৌধুরীকে উপেক্ষা করবে; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তাকে উপেক্ষা করা যাবে না। সে নীরবের ভেতরে নির্জীব বা নিষ্ক্রিয় সত্তাকে চাঙ্গা করে দিচ্ছে। নীরব কী বলবে, ঠিক করতে পারছে না। শাকিল চৌধুরী কারাগারের লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নীরবও অপরপ্রান্তে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
শাকিল নীরবের হাতে হাতের স্পর্শ রেখে বললো— `একটা চান্স নিয়ে দেখতে পারেন। আপনার তো হারাবার বা ক্ষতির কিছু নেই। অন্তত নাবিলার খুনি কে, তা জানতে হলেও আপনার জেলখানা থেকে বের হওয়া দরকার।’ শাকিল চৌধুরী কথাটা বলে নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
নীরব চুপ করে আছে। ও শাকিল চৌধুরীর কথাগুলো ভাবছে। ওর মনের মধ্যে এতোদিনের পুঞ্জিভূত রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, হতাশা একসঙ্গে তোলপাড় করছে। মরা নদীতে যেনো জোয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ওর মুখে কোনো কথা ফুটছে না।
শাকিল চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। `আমি যাচ্ছি। কয়েকদিন পর আবার আসবো। আপনার জবাব পেলে আমি আমার কাজ শুরু করবো। আশা করি, আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। এমন সুযোগ কখনো পাবেন না।’ কথাটা বলে শাকিল চৌধুরী আর দাঁড়াল না। হনহন করে চলে গেলো।
নীরব হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আকস্মিক একটা ঝড় এসে যেনো হামলে পড়েছে ওর ওপর। ও অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
দুই.
দুবছর হলো নীরব কারাগারে বন্দি। এই দুবছরে ওর সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসেনি। আসার কথাও নয়। নীরব যে কারাগারে বন্দি, এ কথা ওর পরিবারের কেউ জানে না। ও নিজেও জানায়নি। জানালেও ওর কোনো লাভ হতো না। বরং ওর মা-বাবা অনেক কষ্ট পেতেন। ছেলে হত্যা মামলায় জেল খাটছে— এ কথা শুনলে সব মা-বাবাই কষ্ট পাবেন। বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী? একথা ভেবে বাবা-মাকে নিজের বিপর্যয়ের কথা জানায়নি ও। ছেলে হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট পাচ্ছে ওর মা-বাবা। `ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে’— এ ধরনের কষ্টের চেয়ে `ছেলে হারিয়ে গেছে’ এই কষ্ট অনেক বেশি সহনশীল। নীরব তা-ই মনে করে। ওর পরিবারের লোকরা জানে, ও হারিয়ে গেছে। কিংবা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কেউ কেউ আছে, হঠাৎ করে সংসার থেকে পালিয়ে যায়। নীরব ওর পরিবারের কাছে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ। অথচ ও হারাতে চায়নি। আর সবার মতো স্বাভাবিক জীবন চেয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। ভাগ্য বিড়ম্বনায় ও জড়িয়ে গেলো হত্যা মামলায়। সাজাও হলো। রায় হয়ে গেলো খুব দ্রুত। নাবিলাকে ভালোবাসার চরম মূল্য দিতে হলো ওকে। খুন না করেও খুনি হয়ে তলিয়ে গেলো কারাগারের অন্ধকার জগতে। জগৎ-সংসারে কতো বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে! নির্দোষ ব্যক্তি খুনের দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়, খুনি থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব কি জগতের বিচিত্র ঘটনা, না-কি বিচার ব্যবস্থার বিচিত্র প্রহসন? এ প্রশ্ন নীরবের মনে আকুলি-বিকুলি করে। নীরব জানে, এ প্রশ্নের জবাব ও কারো কাছ থেকে পাবে না। তবে একটা দ্বিধা ওর মনে লেগেই আছে। যাকে ও ভালোবেসেছিল, তাকে কেনো ও খুন করবে— এ কথাটা রায় ঘোষণাকারী বিচারকের মনে কেনো প্রশ্ন জাগালো না? এ প্রশ্নটা দ্বিধার প্রচ্ছন্নে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে ওর মনে। উকিলদের প্রতি ওর রাগ-ক্ষোভ পুাঞ্জভূত। উকিলদের বিবেকবোধ আছে কি নেই, এ নিয়ে ওর ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। ওর ধারণা, উকিলরা ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে অর্থের বিনিময়ে মামলার জন্য লড়েন। তারা হরহামেশা অর্থের জন্য আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। যার জন্য আইনি লড়াই করছেন, সে প্রকৃত অপরাধী কি-না কিংবা বিবাদী নিরপরাধ হয়েও দণ্ডাদেশ পাচ্ছে কি-না, এ ন্যায়সঙ্গত বিষয়টি উকিলদের বিবেচনায় থাকে না বলে মনে করে নীরব। খুনের মামলায় জড়িয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এতে আদালতপাড়ার প্রতি ওর শ্রদ্ধাবোধ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। অকারণে হত্যা মামলায় সাজা হয়ে গেলে যে েেকানা ব্যক্তির আদালত সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে যাবে। নীরবেরও হয়েছে। নাবিলাকে ও খুন করেনি, অথচ নাবিলা হত্যাকাণ্ডের দায়ে আদালত ওকে চৌদ্দ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালতের রায় মেনে নেয়া ছাড়া ওর কোনো উপায় ছিল না। অসহায়ভাবে ও আদালতের রায় মেনে নিয়েছে। রায় ঘোষণার দিন ও টুঁ শব্দও করেনি। শুধু মামলা চলাকালে আত্মপক্ষ সমর্থনে ও আদালতের কাছে বলেছে— `আমি নির্দোষ!’ ওর এই দাবি নিষ্ফল হয়েছে। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হচ্ছে, জীবনের এই চরম দুঃসময়ে ওর পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। কোনো সহপাঠী বা বন্ধু-বান্ধব এগিয়ে আসেনি। বড় কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ও জড়িত ছিল না। তবে ছাত্রমৈত্রীর কর্মী হিসেবে পরিচিতি ছিল ওর। যদিও এই ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল না। মাঝে মাঝে সংগঠনের সভায় বা নেতাদের সঙ্গে আড্ডায় থাকতো। এতেই ছাত্রমৈত্রীর কর্মী হিসেবে পরিচিতি পায় নীরব। এ বিষয়টি ও কখনো গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখেনি। হত্যা মামলার আসামি হবার পর ওই সংগঠনের কোনো নেতা বা কর্মী ওর পক্ষে সমবেদনা জানায়নি। বরং নাবিলা হত্যা মামলা নিয়ে যখন পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হলো, ওই পার্টি থেকে বিবৃতি দেয়া হলো যে, নীরব তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মী ছিল না। এজন্যও ছাত্রমৈত্রীর প্রতি ওর রাগ জন্মেনি। তবে সংবাদপত্রগুলোর রিপোর্ট ওকে বিস্মিত ও ব্যথিত করেছে। মামলা চলাকালে সংবাদপত্রগুলো ওকে পেশাদার খুনি বানিয়ে দিয়ে হরেকরকম রিপোর্ট প্রকাশ করেছে! মামলার রায়ের আগেই পত্রপত্রিকা ওকে খুনি বানিয়ে ফেলে। একটি মফস্বল শহর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ঢাকাকে একদিন ওর যতোটা আলোকময় শহর মনে হয়েছিল, এ হত্যকাণ্ডের ঘটনায় যে অভিজ্ঞতা লাভ করে ও, এতে শহরটাকে ওর মনে হয় হিংস্র পশুদের এক গহীন জঙ্গল! পুলিশ ও পত্রপত্রিকা সম্পর্কে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা লাভ করে ও। কারাগারের দেয়ালে হেলান দিয়ে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির কথা ভাবছিল নীরব। শাকিল চৌধুরী ওর সঙ্গে দেখা করার পর থেকেই ওর পেছনের দিনগুলো বারবার ভেসে উঠছে। ওর মনের পর্দায় নাবিলার সঙ্গে ওর পরিচয় ও পরিণতির কথা ভেসে উঠলো। নীরব পড়তো লোক প্রশাসন ডিপার্টমেন্টে। নাবিলা ছিল একই ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী। নীরব যখন মাস্টার্স দিয়েছে মাত্র, তখন নাবিলার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়। একটি ছোট ঘটনা নাবিলার সঙ্গে পরিচয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করে। ঘটনাটির কথা মনে পড়লো ওর। একদিন টিএসসিতে ডাচের সামনে দাঁড়িয়ে চা-পান করছিল নীরব। ছাত্রমৈত্রীর এসএম হল শাখার সভাপতি মাহাবুব হাসান ওর কাছে এসে আন্তরিক গলায় বললো— `নীরব, তোমার ডিপার্টমেন্টের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা চলছে। পারিবারিকভাবে বিয়ের আলোচনা হচ্ছে। আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই। তবে মেয়েটিকে দেখে মত পাল্টেছি।’
`তা-ই না-কি?’
`হুম। খবরটা তোমাকে দিলাম।’
`বিয়েতে আমাকে যেতে হবে বলছো? কবে বিয়ে?’ প্রশ্ন করলো নীরব।
ওর প্রশ্নে মাহাবুব একগাল হাসলো। বললো— `না, না। বিয়ে তো আর এখনই হয়ে যাচ্ছে না। আমার মাস্টার্সটা হয়ে গেলেই বিয়ে হবে।’
`ও আচ্ছা। বিয়ের নিমন্ত্রণ দিও।’
নীরবের কথা শুনে ফের হাসলো মাহাবুব। ও বললো— `বিয়ের আগে তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে যে!’
`কাজ! কী করতে হবে?’
`খুব বেশি শক্ত কাজ নয়। এই ধরো, একটা খাম তোমাকে দেবো, তুমি ওই মেয়েটিকে দিয়ে দেবে, এই যা!’
মাহাবুবের কথায় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো নীরব। ও ঠিক বুঝতে পারছিল না মাহাবুব কী বলতে চাইছে। মাহাবুব যেনো নীরবের চোখের ভাষা পড়তে পারলো। ও বললো— `না, মানে বিয়ের আগে একটু হবু বধূর সঙ্গে কথা বলতে চাই, বুঝলে? খামটি ওকে দিলেই তোমার কাজ শেষ। আমি আসলে সামনাসামনি কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছি। তাই চিঠি লিখে ওর সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানাতে চাই। তুমি শুধু চিঠিটা ওর কাছে পৌঁছে দিলেই হবে। পারবে না?’
নীরব মাহাবুবের কথার সারমর্ম বুঝতে পেরে রাজি হয়েছিল নাবিলাকে ওর খাম পৌঁছে দিতে। নাবিলা তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। নীরব নাবিলাকে চিনতো না। নীরবকে ওদের ডিপার্টমেন্টের চত্বরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে মাহাবুব নাবিলাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। মাহাবুবের খাম নিয়ে এগিয়ে গিয়ে নাবিলার সামনে গিয়ে নীরব আন্তরিক গলায় বললো— `আপনি তো নাবিলা, তা-ই না?’
দুপুরের তাতানো রোদে দুজন সহপাঠীর সঙ্গে নাবিলা দাঁড়িয়ে ছিল ক্লাসরুমের বাইরে বারান্দায়। অবাক চোখ তুলে তাকালো নীরবের দিকে। নাবিলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতে খামটি তুলে দিয়ে নীরব বললো— `এটি দিয়েছে আমার বন্ধু মাহাবুব। পড়ে নেবেন।’
পত্রটি নাবিলার হাতে তুলে দিয়ে নীরব হনহন করে চলে এসেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একটি মেয়ের হাতে পত্র তুলে দেয়া কী আর এমন কঠিন কাজ। নীরব কাজটি সহজেই করে ফেলেছিল। এর প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলো ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই। খাম পৌঁছে দেয়ার জন্য মাহাবুব একরকম জোর করে নীরবকে নিয়ে এলো ডাচের সামনে। এখানে দুজনে গরম সিঙারা খাচ্ছিল। মাহাবুব বললো— `আজ তোমাকে হোটেলে খাওয়াবো, বন্ধু। রাতে ভদকা পার্টি দেবো।’
নীরবের ভালো লাগছিল মাহাবুবের উচ্ছ্বাস দেখে। মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিলো ও। মাহাবুব চায়ের অর্ডার দেবে, এমন সময় দেখলো, নাবিলা ওর দুই সহপাঠীকে নিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাহাবুব নাবিলাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো যেনো। মনে হলো, সে ভড়কে গেছে। অথচ নাবিলার মধ্যে কোনো রুদ্ররূপ নেই। নাবিলা মাহাবুবকে কিছু না বলে নীরবের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো— `এই যে মিস্টার! আপনার সাহস দেখে আমি ভীষণ মুগ্ধ হয়েছি। একটি মেয়েকে সরাসরি প্রেমপত্র দিতে আপনার জুড়ি নেই। কিন্তু আপনি যার প্রেমপত্র আমাকে দিয়েছেন, তার মতো দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিদের আমি খুবই অপছন্দ করি। যারা ভালোবাসার কথা ভালোবাসার মানুষকে সরাসরি বলতে পারে না, আমার কাছে সে ধরনের ব্যক্তির কোনো মূল্য নেই। আপনার মতো সাহসী যুবক আমার খুবই পছন্দ। আপনি কি আমার সঙ্গে প্রেম করবেন?’
কথা নয়, যেনো কথার ঝড় বয়ে গেলো। নীরব কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো নাবিলার দিকে। মাহাবুব এক-পা দু-পা করে স্থান ত্যাগ করলো কখন, তা সে দেখতে পেলো না। নাবিলা এক টুকরো হাসির মহিমা ছড়িয়ে ফের নীরবকে বললো— `আমি শুনেছি, আপনি একটু বোকা ধরনের মানুষ। সরলতা আছে। স্মার্ট নন। তাতে সমস্যা হবে না। আমার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে স্মার্ট হয়ে যাবেন। বোকা থাকবেন না। আমি ঠিক করে নেবো।’
নাবিলার কথাগুলো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের, না বিদ্রুপের, বুঝতে পারলো না নীরব। ও বোকার মতো `নাবিলা’ নামক অপূর্ব সুন্দরীর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। নাবিলার কথা শোনার পর নীরবের মনে হচ্ছিল, ও সত্যিই যেনো বোকা শ্রেণির একজন মানুষ। নাবিলা নীরবের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। নীরবের কাছ থেকে কোনো জবাব পায়নি সে। দমকা হাওয়ার মতো নাবিলা যেমন এসেছিল, তেমনি চলে গিয়েছিল। সেদিন ঘোরলাগা বিকেলে নীরব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। নাবিলা চলে যাওয়ার পরও ও দীর্ঘক্ষণ ভাষামূক হয়ে গিয়েছিল। নাবিলা সেদিন ওকে প্রেম করার প্রস্তাব দেয়ার পর কয়েকদিন খুব ভেবেছিল নীরব। এই ভাবনার মধ্য দিয়ে নীরব নাবিলার প্রতি আকর্ষণবোধ করতে থাকে। ডিপার্টমেন্টে নাবিলাকে ও একদিন একা পেয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বললো— `আপনার প্রস্তাবটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। এবং ভেবে ঠিক করেছি, আপনার প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া যায় না। আপনি কি সিরিয়াস?’
নীরবের কথায় খানিকটা ভড়কে গিয়েছিল নাবিলা। ও কোনো জবাব না দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল। এরপর প্রায় এক মাস নাবিলার কোনো দেখা নেই। নীরব একপর্যায়ে ধরেই নিয়েছিল নাবিলা ওর সঙ্গে রসিকতা করেছে। কিছুদিন পর টিএসসিতে নাবিলার সঙ্গে ফের দেখা হলো, কথা হয়নি। এর কয়েকদিন পর ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় নাবিলার সঙ্গে ওর দেখা হলো। নীরব নাবিলার সামনে এসে ফের পথ আটকে বললো— `ভালো আছেন?’
নাবিলা হাসলো। ওর হাসিতে মাদকতা আছে, চোখ ফেরানো যায় না। নীরব মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকে। নাবিলা বললো— `আমি তো ভালো আছি। কিন্তু আপনি দেখছি ভালো নেই!’
নাবিলার চোখের মণি উজ্জ্বল হয়। নাবিলার চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে এনে নীরব বললো— `হবে হয়তো। আপনার কথাগুলো শোনার পর থেকে বলতে পারেন অসুস্থ হয়ে গেছি। কী করি বলুন তো?’
নাবিলা দমকে দমকে হাসে। নীরব ভেবে পায় না নাবিলার সৌন্দর্য ও রহস্য একই সঙ্গে অপরূপ কেনো? শারীরিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চরিত্রের রহস্য একাকার। নীরব যেনো নাবিলার সৌন্দর্য ও রহস্যের প্রতি খরস্রোতে ধাবমান এক খড়কুটো। নীরবের ভাবুলতাকে উসকে দিয়েই যেনো নাবিলা হাসি থামিয়ে বললো— `পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন, নিজের অসুস্থতার কথা জানাতে?’
`না, সেরকম নয়। তবে আপনার প্রস্তাবটা নিয়ে অনেক ভেবেছি।’ ইতস্তত করে বলে নীরব।
নাবিলা চোখের দৃষ্টিতে কপট বিস্ময় ফুটিয়ে বলে— `তা-ই?’
`হুম। আপনি কি সত্যিই আমার সঙ্গে প্রেম করতে চান?’ সাহস করে বলে ফেলে নীরব।
এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে নাবিলা। ও বলে— `আমার সঙ্গে প্রেম করবেন? আপনি!’
একরাশ লজ্জা এসে গ্রাস করে নীরবকে। ও চোখ নামিয়ে বলে— `জানি না। আপনিই তো বলেছিলেন।’
নীরবের কথার জবাব না দিয়ে নাবিলা হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিল। নাবিলা সেদিন চলে গেলেও ওদের মধ্যে সম্পর্কের যবনিকা হয়নি। পরে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নাবিলা নিয়মিত আসছিল ক্লাসে। নিয়মিত দেখা হতে থাকে নীরবের সঙ্গেও। কিন্তু নীরব আর নাবিলাকে কিছু বলেনি। কিন্তু নাবিলাকে দেখলে চোখের দৃষ্টি আটকে যেতো। নাবিলা একদিন নীরবের সামনে এসে বলে— `আপনি দূর থেকে যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন, এতে বুঝতে পারছি আপনার অসুখটা দিন দিন খুব বেড়ে যাচ্ছে।’
নীরব এর জবাবে মুখ টিপে হাসে। এই হাসির মধ্য দিয়েই নাবিলার কথার স্বীকৃতি দেয় ও। নাবিলা বলে— `চলুন, আজ দুজনে রিকশায় ঘুরে বেড়াই। যাবেন?’
নাবিলাকে `না’ করেনি নীরব। ও নাবিলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। সেদিন থেকে ওরা একে অন্যের ঘনিষ্ঠ হয়। সেদিন রিকশায় ঘুরে বেড়ানোর সময় নীরব নাবিলার কাছে একবার জানতে চেয়েছিল নাবিলা ওকে সত্যিই ভালোবাসে কি-না। নাবিলা মুখে কিছু না বললেও হাসির দমকে দমকে ভালোবাসার সম্মতি প্রকাশ করেছিল। এটুকুই যথেষ্ট ছিল নীরবের জন্য। নাবিলার চরিত্রের রহস্যের সামনে আর কোনো আলোর সুড়ঙ্গ খুঁজে পায়নি ও। নীরব একতরফাভাবে নাবিলার প্রেমে ডুবে যায়। এক ধরনের ঘোরলাগা প্রেম। এই ঘোরটুকু ওর ভালো লাগত। নাবিলা ওকে অদৌ ভালোবাসে কি-না, এ নিয়ে ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায়নি নীরব। নাবিলার ভালোবাসা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল ওর। সন্দেহটা ওর মনে অস্বস্তির কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকতো। তারপরও নাবিলার কাছ থেকে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি ওর। যদিও নীরব ভেবেছিল যে নাবিলার চরিত্রের সঙ্গে ওর চরিত্রের একটা বৈপরীত্য আছে। এই বৈপরীত্য নিয়ে ওর অস্বস্তিও কম ছিল না। নাবিলা খুবই চটপটে ও ফ্যাশন সচেতন মেয়ে। ও সারাক্ষণই যেনো দৌড়াচ্ছে। ওকে দেখলে মনে হতো রেসের ঘোড়া। স্থির হয়ে থাকে না। নীরব ঠিক যেনো উল্টো। ধীর ও স্থির। নাবিলার সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি ও। টিএসসিতে নাবিলার সঙ্গে নীরবের দেখা হলে ওরা একসঙ্গে ঘোরে, গল্প করে— এটুকুই ওদের প্রেমের উপকরণ। নীরব জানতো না প্রেম করার মধ্যে আর কী কী পাঠ আছে। আর যতোক্ষণ ও নাবিলার সামনে থাকতো, ততোক্ষণ চুপসে থাকতো। হাজার পাওয়ার ভোল্টের বাতির সামনে পতঙ্গ যেমন থাকে। কথাবার্তা যা হতো, এর মধ্যে আবেগতাড়িত কথামালা হবার সুযোগ কোথায়? নাবিলা চঞ্চলা হরিণী! ওর কথা শুনতে শুনতে সময় ফুরিয়ে যেতো। নিজের মনের কথা বলার সুযোগ মেলেনি নীরবের। ও সে চেষ্টাও করেনি। আর নাবিলার ফ্যাশন, নাটক, সিনেমা, পার্টি-আড্ডার কথামালার মধ্যে নীরব ছিল নীরব শ্রোতা। ওদের প্রেমটা ফ্রেমে বাঁধা ছবির মতো আটকে যাওয়া একটা ব্যাপার মনে হতে পারে। নীরবের মনের ভেতরে এমন একটা ধারণা ছায়া ফেলেছিল। নীরবের সঙ্গে দেখা হলে নাবিলা কথা বলতো ঠিক; কিন্তু কখনো ফোন করতো না ওকে বা এসএমএস করতো না। নীরব ওকে ফোন করে দেখেছে, নাবিলা ওর ফোন ধরতো না। গভীরভাবে চিন্তা করলে একটা খটকা লাগতো। নীরব এ কথাটাও নাবিলার সামনে তোলেনি। ও ভেবে দেখেছে, নাবিলার প্রতি ওর ভালোবাসার চেয়ে মোহ ছিল বেশি। ভালোবাসা আচ্ছন্ন করে আর মোহ ঘোরের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। নীরব নাবিলাকে নিয়ে ঘোরের মধ্যেই ডুবে গিয়েছিল। পতঙ্গ জানে আগুনে ঝাঁপ দিলে পুড়ে যাবে, তারপরও পতঙ্গ ঝাঁপ দেয়। তেমনি নীরব নাবিলার রূপের আগুনে মন্ত্রমুগ্ধ পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দিয়েছিল। নাবিলার মনের নাগাল পায়নি, পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। এ সত্যটুকু নীরব মেনেও নিয়েছিল। ঝাঁপ দিয়ে নীরব ভেবেছিল এরপরও যদি নাবিলার ভালোবাসা পাওয়া যায়। এই আশা রং ছড়ানোর আগেই নাবিলা খুন হয়ে গেলো। ও খুন হয়েছিল গুলশানে একটি রেস্ট হাউসে। ওই রেস্ট হাউসে নীরব কখনো যায়নি। নাবিলা কেনো ওই রেস্ট হাউসে গিয়েছিল, তা ও জানে না। নাবিলা যেদিন খুন হয়, সেদিন বিকেলে নাবিলা ওকে ফোন করে বললো— `নীরব, তুমি কোথায়?’
নীরব ছিল শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের একটি রেস্টুরেন্টে। ছাত্রমৈত্রীর নেতাদের সঙ্গে একটা ঘরোয়া মিটিংয়ে ছিল ও। নীরব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করার পরও হলে ছিল। হল ছেড়ে দেয়ার নোটিস পেয়েছে মাত্র। কোথাও কোনো মেসে উঠবে, এই প্রচেষ্টা ছিল ওর। ক্যাম্পাসে জমিয়ে আড্ডা দেয়ার অভ্যাসটা বদলে ফেলতেই ও ক্যাম্পাসে যাচ্ছিল না। দুটি টিউশনি করছিল এবং এদিক-সেদিক ঘুরে চাকরি খুঁজছিল। ছাত্রজীবন থেকে বেরিয়ে পড়ার এক অম্লমধুর সময় পার করছিল ও। নীরব ছাত্রমৈত্রী সংগঠনের কয়েকজনের নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসেছিল। ছাত্রমৈত্রীর নেতা ফয়সাল ওর থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেবে বলে ও ছাত্রমৈত্রীর সভায় চলে আসে। সভায় আসামাত্র এলো নাবিলার ফোন। নীরব একটু বিরক্ত হলেও ফোন রিসিভ করে বলেছিল— `আমি আজিজ সুপার মার্কেটে। কেনো?’
`নীরব, তুমি কি এখনই গুলশানে আসতে পারবে? খুবই জরুরি।’
নাবিলার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেলো। নীরব একটু বিচলিত হলো। নাবিলার সঙ্গে পরিচয় তিন মাস হবে। এই তিন মাসে নাবিলা কখনো ওকে কোথাও যাবার জন্য অনুরোধ করেনি। এমনকি, ওরা দুজনে একসঙ্গে কোথাও ঘুরে বেড়ায়নি। শুধু একদিন পাবলিক লাইব্রেরিতে একটা শর্টফিল্ম, বেইলি রোডে মহিলা সমিতির মঞ্চে একটা নাটক এবং বসুন্ধরা মার্কেটের সিনেমা হলে একটা ইংরেজি ছবি দেখেছিল। পাবলিক লাইব্রেরিতে শর্টফিল্ম দেখার সময় নীরবের বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। কোনো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে এটাই ওর প্রথম শর্টফিল্ম দেখার অন্যরকম অভিজ্ঞতা। শর্টফিল্মের কোনো কিছুই ওর দেখা হয়নি। ও শুধু ডুবে গিয়েছিল নাবিলাকে নিয়ে শর্টফিল্ম দেখার শিহরণের আবিষ্টতায়। এক সপ্তাহ পর নাবিলা ওকে নিয়ে গেলো বেইলি রোডে মঞ্চনাটক দেখতে। মঞ্চনাটক দেখার সময় বুক দুরুদুরু কাঁপেনি ঠিক, এখানেও ভালো লাগার আবিষ্টতায় ও বুঁদ হয়ে ছিল। এর সাত দিন পর নাবিলা বায়না ধরলো সিনেমা হলে ইংরেজি মুভি দেখবে। তখন বসুন্ধরা মার্কেটে সিনে কমপ্লেক্স সিনেমা হলে হলিউডের একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছিল। নীরব একটু দ্বিধান্বিত থাকলেও নাবিলার প্রবল আগ্রহে যেতে হলো সিনেমা দেখতে। সিনেমা হলে গিয়ে নীরব দেখলো অনেক তরুণ-তরুণী ছবি দেখতে এসেছে। নীরবের জড়তা কমে আসে এবং নাবিলার উচ্ছ্বাসও বেড়ে যায়। মুভি দেখার একপর্যায়ে নাবিলা হঠাৎ নীরবের বাম হাত ওর হাতে মুঠোবন্দি করে নেয়। নীরবের ভেতরে রিনরিনিয়ে ওঠে ঘূর্ণিঝড়। আবেগ ও কামনার এক অদম্য স্রোত ওর চেতনায় বয়ে যেতে থাকে। একরাশ লজ্জায় ও চোখ বন্ধ করে। আর এতেই যেনো ক্ষিপ্ত হয়ে যায় নাবিলা। হঠাৎ নাবিলা ওর গালের কাছে মুখ এনে চট করে চুমু খায়। নাবিলার চুমু খাওয়াটা এতো অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হলো যে, নীরবের তা বুঝে উঠতে সময় লাগলো। ও কতোক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে ছিল, তা জানে না। যখন সম্বিত ফিরে এলো, ততোক্ষণে মুভিও শেষ হয়ে গেছে। নাবিলার ডাকে নীরব সিনেমা হলের সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল ঠিক; কিন্তু ও যেনো হাঁটতে পারছিল না। নাবিলার অপ্রত্যাশিত চুমুর তন্ময়তায় ও ছিল টালমাটাল। সেদিন ও হলে ফিরেছিল মাতালের মতো এক ধরনের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে। এরপর কয়েকদিন নীরব নাবিলার কাছে সিনেমা হলে চুমু খাওয়ার কথা তোলার চেষ্টা করেছে; কিন্তু নাবিলার অনাগ্রহ ও হাসির দমকে কথাটি প্রশ্রয় পায়নি। একবার শুধু নাবিলা বলেছিল— `নীরব, তুমি একটা হাঁদারাম, বোকা!’ এ বিশেষণটুকুই যা প্রাপ্তি। নীরব এর বেশি কিছু নাবিলার কাছ থেকে পায়নি। অথচ ও নাবিলার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। নাবিলার সঙ্গে প্রেম করা নিয়েও একটু খটকা লাগতো নীরবের। নাবিলার আর ওর সম্পর্কের মধ্যে আদৌ প্রেম আছে কি-না বুঝে উঠতে পারেনি নীরব। তবে নীরবের ভাবতে ভালো লাগতো যে নাবিলার মতো সুন্দরী মেয়ে ওর প্রেমিকা। নাবিলার পেছনে এতো ছেলে ঘুরে বেড়ায় যে, এর সংখ্যা গুনে রাখা মুশকিল। অথচ সেই মেয়েটি ওর সঙ্গে প্রেমিকার মতো ঘুরে বেড়ায়।
মাহাবুবের চিঠি দেবার পর নাবিলা এসে নীরবকে সরাসরি প্রপোজ করার ঘটনার পর ও তো তিন রাত ঘুমাতেই পারেনি। ওর কেবল মনে হয়েছে এ স্বপ্ন বা স্বপ্নের চেয়েও গভীর কিছু। সেই নাবিলা ওকে বলছে গুলশানে যেতে। নাবিলার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ফুটে ওঠায় ভীষণ এক তোলপাড় শুরু হলো নীরবের ভেতরে। ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বললো— `নাবিলা, গুলশানে কোথায় আসবো, বলো। তোমার কি কোনো সমস্যা হয়েছে?’
নাবিলা বললো— `এখনই তুমি একটা ট্যাক্সি বা সিএনজি নিয়ে চলে আসো। গুলশান দুইয়ে। কাগজ-কলম বের করো। আমি ঠিকানাটা বলছি। আর শোনো, যতো তাড়াতাড়ি পারো চলে আসো। আমি একটু বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।’
নীরবের বুকের ভেতরটা দুমড়ে উঠলো। নাবিলাকে সাহায্য করাটা জরুরি। নীরব পকেটে রাখা একটি নোটবুক বের করে সেখানে ঠিকানা লিখে নিলো চটজলদি। নাবিলা আর কথা না বলে ফোন রেখে দিয়েছিল। ফোনের কথাই ছিল নাবিলার সঙ্গে নীরবের শেষ কথা। নীরব নাবিলার কাছে পৌঁছেছিল ঠিক; কিন্তু নাবিলাকে জীবিত দেখেনি ও। রেস্ট হাউসের গেটে কোনো দারোয়ান ছিল না। নীরব একরকম দৌড়ে ঢুকেছিল রেস্ট হাউসের কক্ষে। ছুরিকাঘাতে আহত নাবিলার রক্তাক্ত দেহ পড়েছিল মেঝেতে। নাবিলার প্রাণ তখনো ছিল কি-ছিল না, তা জানে না নীরব। ওর মনে হয়েছিল নাবিলা ওকে দেখে যেনো কাছে ডেকেছিল। নীরব হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চিৎকার দিয়ে নাবিলাকে আঁকড়ে ধরেছিল। সিনেমার গল্পের মতো কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে হাজির হলো। পুলিশ নীরবকেই গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো থানায়। এরপর জেলহাজতে স্থানান্তর। নাবিলাকে বাঁচাতে গিয়ে নাবিলাকে খুনের দায়ভার চাপলো ওর ওপর।
সেদিন নাবিলা খুন হবার কিছুক্ষণ পর নীরব ওর রুমে গিয়েছিল। আর এটাই হলো ওর জন্য কাল বা দুর্ভাগ্য। অথচ নাবিলার রক্তাক্ত দেহ দেখে ও প্রথম চিৎকার করে উঠেছিল। হাউমাউ করে কেঁদেছিল। পুলিশ এসে নাবিলার মরদেহের কাছ থেকে ওকেই গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো খুনের আসামি সন্দেহে। নাবিলার খুনি হিসেবে প্রথমে পুলিশের সন্দেহ পড়ে ওর ওপর। এরপর নাবিলার পরিবারের লোকেরা ওকে অভিযুক্ত করে মামলা করে। খুন না করেও খুনের আসামি হয়ে যায় ও। আশ্চর্য! এ কথা ভাবলে নীরব কিছু বুঝে উঠতে পারে না। বিস্ময়ের রেশ ফুরায় না। ও হতভম্ব হয়ে থাকে। বিষণ্নতা গ্রাস করে ওকে। খুনের দণ্ডাদেশ মেনে না নিয়ে উপায় ছিল না ওর। ওর কাছে কোনো অর্থ ছিল না। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ও কোনো চৌকস উকিল ধরতে পারেনি। আদালতে নিজেকে `নির্দোষ’ বলে চিৎকার করা ছাড়া ওর কিছুই করার ছিল না। তাই দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হয়ে জেল খাটছে। অসহায়ভাবে নীরব মেনে নিয়েছে এই জেলজীবন।
তিন.
সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বর্ষা যাই যাই করছে। দুদিন পেরুলেই শরতের শুরু। ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল নীরবের। সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি ওর। শাকিল চৌধুরী ওর সঙ্গে দেখা করে ঘুম হরণ করে নিয়েছে যেনো। মনের অন্তঃপুরে মিহিন এক কষ্টের সঙ্গে আকুতি সন্ধ্যা তারার মতো জ্বলছে-নিভছে। ও চায় না, তবু মনের আকাশে তারা জ্বলে ওঠে। ও স্বপ্ন দেখতে চায় না, তবু ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন এসে ভিড় জমায়। ও কারাগার থেকে বের হতে চায় না, তবু বাইরের জগৎ ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার পর থেকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে ওর ভেতরে। ও নিজেকে সংযত করে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে কি? মানুষ মাত্রই কি স্বপ্নতাড়িত? মানুষ কি সবসময় মুক্তির শৃঙ্খলে থাকতে পছন্দ করে? মানুষ কি নিজের একাকিত্বের কাছে চরম অসহায়? ঘুম ভাঙার পর থেকে এ প্রশ্নগুলো ওর চিন্তার মধ্যে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। ভোরের আকাশ ছিল পরিষ্কার। সকালের গায়ে ভোরের সূর্যকিরণ একটু লেগে ছিল মাত্র। হঠাৎ কোত্থেকে একপাল কালো মেঘ এসে আকাশটাকে ঢেকে দেয়। নীরব কারাগারের সেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে। কালো মেঘগুলোর ধৈর্যও ছিল না, ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়ে নামলো। তেড়ে ঝেড়ে নামা বৃষ্টি আবার হঠাৎ করেই থামলো। সকালের কুসুম নরম কোলে বর্ষার খণ্ডকালীন বৃষ্টিবন্দনা। অনেকদিন পর বৃষ্টির তাণ্ডব ভালো লাগলো নীরবের। বৃষ্টিকে নীরব ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করে না। ওর খুব বেশি জামা-কাপড় ছিল না। তাই বৃষ্টিতে ভিজে গেলে ও সমস্যায় পড়ে যেতো। অনেকবার স্কুলে যেতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ওকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এমনো হয়েছে, ভেজা জামা শুকিয়ে ওকে স্কুলে যেতে হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কাদামাটিতে পায়ের স্যান্ডেলও ছিঁড়ে যেতো। বৃষ্টির দিনে স্কুলে যেতে বা স্কুল থেকে ফিরতে ওর খুব কষ্ট হতো। তাই স্কুল বয়সে বৃষ্টির প্রতি ওর বিরক্তি জন্মে যায়। কলেজে যাবার পরও এই বিরক্তি কমেনি। অথচ বৃষ্টি নিয়ে কবিদের কতো কাব্যিকতা! ভাবত নীরব। একবার বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়াতে গিয়েছিল মণ্ডলবাড়ির আমবাগানে। স্কুল বয়সের দস্যিপনার স্মৃতি বলতে ওই একটিই, তাও ব্যর্থতার কালিমায় লেপটে আছে। নীরব তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। খেলার মাঠ থেকে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরছিল। পথিমধ্যে মণ্ডলদের আমবাগানের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ছেলেবেলায় ও ছিল বরাবরই ভয়কাতুরে। তবু সেদিন বুকের সবটুকু সাহস এক করে ঢুকে পড়েছিল আমবাগানে। ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি হামলে পড়েছিল আর থেমে থেমে বিজলি চমকাচ্ছিল। নীরব আম কুড়িয়েছিল মাত্র দুটি, এর মধ্যে কোত্থেকে এসে আমবাগানের দারোয়ান কাদের মিয়া ওকে জাপটে ধরে ফেলে। এমন বৃষ্টিতেও যে কেউ আমবাগান পাহারা দেয়, কে জানতো। কাদের মিয়া ওকে বেঁধে রেখে খবর দিয়েছিল ওর বাবাকে। ওর বাবা এসে মণ্ডল বাড়ির কর্তা শমসের মণ্ডলের কাছে করজোরে ক্ষমা চেয়েছিল ছেলের আম চুরির অপরাধের জন্য। বাবার সঙ্গে সেদিন ও বাড়ি ফিরেছিল একরাশ লজ্জা আর ভয় নিয়ে। ভেবেছিল, বাবা ওকে এর জন্য বেত দিয়ে বেশ কয়েক ঘা দেবেন; কিন্তু সেদিন বাবা ওকে মারেননি। তবে তিনি ওর সঙ্গে বেশ কয়েকদিন কথা বলেননি। এতেই ওর মনে হচ্ছিল লজ্জায়-অপমানে মাথা কুটে ও মরে যায় না কেনো? এ ঘটনার জন্যও বৃষ্টির প্রতি ওর রাগ বেড়ে যায়। বৃষ্টির সৌন্দর্য কী, সৌন্দর্য আদৌ আছে কি নেই, এসব নিয়ে ও কখনো ভাবেনি বা ভাবতে চায় না। বৃষ্টি আসে, বৃষ্টি যায়, ও বৃষ্টি নিয়ে মাথা ঘামায় না। বৃষ্টিকে উপেক্ষা ও এড়িয়ে চলতে পছন্দ করতো নীরব। কিন্তু আজ সকালের কথা ভিন্ন। সকালে যখন চঞ্চল কিশোরীর মতো আকাশে মেঘ জমতে লাগলো, তখন ওর দৃষ্টিতে একরাশ মুগ্ধতা ঝলসে ওঠে। বৃষ্টি নামে রিমঝিম ছন্দে, ওর বুকের ভেতর অদমিত সৌন্দর্য পিপাসা আরো বাড়তে থাকে। আজ বৃষ্টি ওকে ভালো লাগার শিহরণ জাগিয়ে দেয়। বৃষ্টি যেমন হুড়মুড় করে এসেছিল, তেমনি যেনো চলে গেলো। এখন আকাশে কালো মেঘের ছায়া নেই। সূর্যালোকে সকাল তেতে উঠছে। নরম ভোর, বৃষ্টিবন্দনার সকাল এবং সূর্যালোকে ঝলমলিয়ে ওঠা বিদায়ী সকালের তিনটি রূপ গভীর মনোযোগে উপভোগ করে নীরব। এই উপভোগের মধ্য দিয়ে কারাগারটাকে ওর অভিশপ্ত এক স্থান বলে মনে হয়। এমন কখনো মনে হয়নি ওর। নীরব সেল থেকে বেরিয়ে আসে আনমনে। ওর মনে আজ অন্যরকম হাওয়া বইছে, অন্যরকম অনুভূতি পেখম ছড়াতে চাইছে, না বলা কিছু কথা যেনো উথাল-পাতাল করছে। নীরব নিজের ভেতরে এই অচেনা সত্তার সন্ধান পেয়ে নিজেই খানিকটা অবাক হয়। ওর মধ্যে কি ও দ্রুত বদলে যাচ্ছে? কথাটা ভেবে উদাসীন হয়ে হাঁটছিল ও। হাঁটতে হাঁটতে মমতাজ আহমেদের সামনে পড়ে গেলো। মমতাজ আহমেদ ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ। এই রাজনীতিবিদকে চেনে না এমন লোক কমই আছে। মমতাজ আহমেদ একসময় শিক্ষকতা করতেন। এখন পুরোপুরি রাজনীতিবিদ। এক মাস হলো তিনি কারাবন্দি হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হরতাল চলাকালে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মমতাজ আহমেদ জেলখানায় আসার পর কেমন একটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কয়েদিদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। কেউ বলেন, মমতাজ আহমেদকে জেলে ঢুকিয়ে ভালো করেছে সরকার, আবার কেউ বলেন, সরকারি দল তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলবন্দি করেছে। মমতাজ আহমেদকে নিয়ে প্রথম কয়েকদিন কয়েদিদের মধ্যে খুব আলোচনা ছিল। নীরব এসব আলোচনা কেবল শুনেছে। মমতাজ আহমেদকে অন্য সকলের মতো নীরবও চেনে। কিন্তু তার সঙ্গে কখনো পরিচয় হয়নি ওর। জেলখানায় বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে দেখা হলেও নীরব কোনো কথা বলেনি। কিন্তু আজ মমতাজ আহমেদের মুখোমুখি পড়ে গেলো ও। নীরব তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, মমতাজ আহমেদ ওকে ডাকলেন— `এই যে নীরব, কোথায় যাচ্ছো?’
মমতাজ আহমেদের মুখে ওর নাম উচ্চারিত হওয়ায় ও ভীষণ অবাক হলো। থমকে দাঁড়ালো। মমতাজ আহমেদ কয়েকজন কয়েদি পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন। তার মুখে একগাল হাসি। রাজনীতি যারা করেন, তারা হয়তো সাধারণ মানুষকে চমকে দিতে পছন্দ করেন। মমতাজ আহমেদ ওকে চমকে দিয়ে খুশি হয়েছেন বলে মনে হলো। মমতাজ আহমেদ ওর নাম ধরে ডাকায় নীরব সত্যি সত্যি চমকে গেছে। ওকে মমতাজ আহমেদের চেনার কথা নয়। অথচ মমতাজ আহমেদ ওকে এমনভাবে ডাকলেন যে, মনে হচ্ছিল ওকে তিনি অনেকদিন ধরে চেনেন। নীরব মমতাজ আহমেদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলো। মমতাজ আহমেদ বললেন— `তুমি কেনো যে জেলখানায় আটকে আছো, জানি না!’
মমতাজ আহমেদের কথায় নীরবের প্রতি সমবেদনা ফুটে উঠলো। নীরব কিছু বলতে যাচ্ছিল, মমতাজ আহমেদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হত্যা প্রচেষ্টার মামলায় বিচারাধীন কারাবন্দি সোবহান শেখ মমতাজ আহমেদের উদ্দেশে বললো, `স্যার, ওর তো খুনের মামলায় চৌদ্দ বছরের জেল হইছে। ও কারাগার থেকে বাইর হইবো ক্যামনে?’
সোবহান শেখের কথাটা সত্যি হলেও নীরবের ভালো লাগলো না। মমতাজ আহমেদেরও বোধহয় ভালো লাগেনি। তিনি তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কারাবন্দিদের বললেন— `তোমরা একটু যাও। আমি নীরবের সঙ্গে কিছু কথা বলবো।’
মমতাজ আহমেদের কথায় বন্দিরা দ্রুত সরে পড়লো। নীরব একটু অবাক হলো মমতাজ আহমেদের আচরণে। ও বুঝতে পারলো মমতাজ আহমেদ ওর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চান। বন্দিরা সরে যেতেই মমতাজ আহমেদ নীরবের উদ্দেশে বললেন— `আমি তোমার কথা জেলখানায় এসে শুনেছি। বিনা অপরাধে সাজা খাটছো শুনে কষ্ট পেয়েছি। তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কারাগারের চারদেয়ালে পচে মরছে, এটা দুঃখজনক। খুন না করেও খুনের মামলার রায় তোমার বিরুদ্ধে গিয়েছে। এটা কতটা যে নির্মম! এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একজন নিরাপরাধীকে শাস্তি দেয়া কত চরমভাবে মানবতাবিরোধী, অথচ তুমি এবং তোমার মতো আরো অনেকে এর শিকার! জেলখানায় না এলে এই অবক্ষয়ের দিকটা হয়তো জানা হতো না।’
মমতাজ আহমেদের কথাগুলো নীরবের হৃদয়তন্ত্রীতে যেনো ছুঁয়ে গেলো। রাজনীতিবিদদের প্রতি ওর ক্ষোভ ছিল পুঞ্জিভূত, এ মুহূর্তে মমতাজ আহমেদের সামনে ওর ক্ষোভ বরফ গলা নদীর মতো গলে পড়তে লাগলো। নীরবের চোখের কোণে অশ্রু জমে এলো। ওর ঠোঁট তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। মমতাজ আহমেদ ফের বললেন— `অন্যায়ের প্রতিবাদ না করাটাও এক ধরনের অন্যায়। তুমি অসহায়ভাবে একটি মিথ্যা রায় মেনে নিয়েছো, এটাও অন্যায়। নিজের সঙ্গে নিজের প্রতারণার শামিল। কেনো নিজেকে কারাগারে বন্দি রেখে জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছো। এতে তোমার কী প্রাপ্তি হবে? যে তারুণ্য জীবনকে গড়ে দেয়, সেই তারুণ্য কারাবন্দি হয়ে তোমার জীবনকে ক্ষয়ে দিচ্ছে, এটা কি জানো?’
নীরব মমতাজ আহমেদের চোখে চোখ রেখে বললো— `আমি কী করতে পারতাম? আমার অর্থ নেই, আমি উচ্চ আদালতে আপিল করলেও রায় এমনই হতো।’
`না-ও হতে পারতো। তুমি সরকারি উকিল নিতে পারতে। আর উচ্চ আদালতে যথাযথ প্রমাণ থাকলে মামলার রায় রহিত হতে পারতো বা তুমি মামলা থেকে অব্যাহতিও পেতে পারতে। অথবা যদি সাজাও হতো, সে সাজা কম হতে পারতো। আর নিজেকে সবসময় অসহায় ভাবা ঠিক নয়। তোমার চারপাশে যেমন কেউ ছিল না, আবার কেউ পাশে এসে দাঁড়াবে না— এমন কথাও ভাবা ঠিক নয়। কেউ না কেউ তোমার পাশে এসে দাঁড়াতেও পারতো।’
`আমি এভাবে ভেবে দেখিনি। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আমি ভীষণ অসহায় ছিলাম।’
`তোমার মধ্যে কনফিডেন্সের অভাব আছে। নিজের ভেতরের অসহায়ত্তকে সব সময় প্রশ্রয় দিয়েছো। অসহায়ত্তকে উপেক্ষা করে লড়াই করতে শেখোনি। এই অসহায়ত্ত তোমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে রেখেছে।’
মমতাজ আহমেদের কথায় ও অবাক হলো। ও বুঝতে পারছে না ওর সম্পর্কে এই কথাগুলো তিনি কিভাবে বলছেন। ও প্রশ্ন করলো— `আমাকে আপনি তো তেমন চেনেন না। তা হলে আপনি আমার সম্পর্কে এসব কথা বলছেন কী করে?’
মমতাজ আহমেদ স্মিত হাসলেন। তিনি বললেন— `তোমাকে আমি চিনি না ঠিক, তোমার কথা আমি শুনেছি কয়েদিদের মুখে। আর তোমার সম্পর্কে যা বললাম, তা আমার কনফিডেন্স থেকে বলেছি। তোমাকে দেখে আমার যা মনে এসেছে, তা-ই বলেছি।’
`আপনার কথায় আমি অবাক হয়েছি।’
`তোমাকে কিন্তু অবাক করার জন্য আমি কথাগুলো বলিনি।’
`কিন্তু কেনো আমাকে এ কথা বললেন?’
`ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন থেকে পাস করা একটি মেধাবী ছেলে কারাগারে বন্দি কেনো— এ প্রশ্ন আমার মধ্যে জেগেছিল। এরপর দেখলাম ছেলেটি কারো সঙ্গে মেশে না। একা একা থাকে। নিজের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে। এমন তরুণের অন্তর্কষ্ট কী? তাও জানার আগ্রহ আমার মধ্যে জেগেছিল। কিন্তু তোমাকে কাছে পাচ্ছিলাম না। ভেবেছিলাম তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। কিন্তু আসোনি। তখন বুঝলাম, তোমার কাছে পৃথিবীর সব আকর্ষণ ফুরিয়ে গেছে। হা-হা-হা।’ এ কথা বলে মমতাজ আহমেদ গলা ছেড়ে হাসতে লাগলেন।
নীরব অবাক হয়ে ভাবলো মমতাজ আহমেদ রাজনীতিবিদ, না-কি দার্শনিক। তবে তিনি মানুষকে মুগ্ধ করতে পারেন, এটা স্বীকার করতে হবে। হাসি থামার পর মমতাজ আহমেদ নীরবের দিকে তাকিয়ে বললেন— `তোমার মধ্যে জড়তা লেপটে গেছে। তুমি নিষ্প্রভ হয়ে আছো। তোমাকে জাগতে হবে, সপ্রতিভ হতে হবে।’
`জি!’
`শোনো, জীবন ফুরিয়ে যায়নি। জাগো, নিজের মধ্যে নিজেকে জাগিয়ে তোলো! সবকিছু মেনে নেয়ার মধ্যে মহত্ব নেই, বীরত্বও নেই। নিজের অসহায়ত্তকে তাড়িয়ে দাও। গর্জে ওঠো।’
`কী বলছেন আপনি! গর্জে উঠবো কেনো? কার জন্য?’ আমতা আমতা করেই কথাটা বললো নীরব।
নীরবের প্রশ্নের জবাবে মমতাজ আহমেদ বললেন— `গর্জে উঠবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তোমার সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে এর বিরুদ্ধে। গর্জে উঠবে নিজের জন্য।’
`ঠিক বুঝতে পারছি না এর জবাবে আপনাকে আমি কী বলবো।’ বললো নীরব। ও কেমন একটা উত্তেজনা অনুভব করছে নিজের মধ্যে।
মমতাজ আহমেদ বললেন, `জীবনে হার কেনো মেনে নেবে? হার যদি মানতেই হয় অন্তত যুদ্ধ করে হার মানো। বিনা যুদ্ধে হার মানায় পৌরুষত্ব নেই। অথচ তুমি হার মেনে বসে আছে। কেনো?’ এ কথা বলে ফের হাসতে লাগলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরবের মনে হলো, মমতাজ আহমেদের কথাগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। এই কথাগুলোর মধে- কেমন একটা দিক নির্দেশনা এবং জীবনের অনুপ্রেরণা রয়েছে। নীরবের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হলো। ওর ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর জমে থাকতে পারলো না। নীরব চোখের অশ্রুজলের লাগাম টেনেও ধরলো না। ওর চোখ বেয়ে দুটি জলের ধারা নেমে এলো গাল বেয়ে। মমতাজ আহমেদ ওর অশ্রুসজল মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন— `এই চোখের জলে ধুয়ে-মুছে যাক তোমার জড়তা-অসহায়ত্ত। মন ভালো হলে চলে এসো আমার সেলে। কথা হবে। ওয়েক আপ, মাই সান!’
কথাটা বলে মমতাজ আহমেদ হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন নিজের সেলের দিকে। নীরব চুপচাপ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। ওর মনে হচ্ছিল একটা ঝড়ো হাওয়া এসে ওর ওপর হামলে পড়ে চলে গেলো। মাত্র কয়েক মিনিটের কথাবার্তায় নীরবের ভেতরে ভাঙন শুরু হলো। এই ভাঙনের প্রতিরোধ ও করলো না। বিষণ্ন মনে পা বাড়ালো নিজের সেলের দিকে। ঠিক এমন সময় পেছন থেকে কারারক্ষী মুজিবুর মিয়ার কণ্ঠ শুনতে পেলো ও। `আপনার সঙ্গে একজন ভদ্রলোক দেখা করতে আইছে। যান, গেটে যান। মেইন গেটে। ভিআইপি কেউ আইছেন।’
নীরব বুঝতে পারলো শাকিল চৌধুরী হয়তো এসেছেন ওর সঙ্গে দেখা করতে। তার আসার কথা। তবু ও জানতে চাইলো— `কে এসেছে? নাম বলেছে?’
মুজিবুর মিয়া বললো— `তিনি ভিআইপি কেউ হবেন। বুজছেন না, মেইন গেটে অপেক্ষা করছেন। যান, দেখা কইরা আসেন।’
এ কথা বলে মুজিবর মিয়া প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করলো। সিগারেটের উটকো গন্ধ এসে লাগলো নীরবের ইন্দ্রিয়তে। নীরব বিরক্তি প্রকাশ করে বললো— `সিগারেট না খেলে হয় না?’
ওর কথা গায়ে না মেখে মুজিবর মিয়া এক গাল হেসে বললো— `শোনেন, ভিআইপি দর্শনার্থীর কাছ থেকে সিগারেট চেয়ে নিয়ে আসবেন! কথাটা ভুইল্যা যাইয়েন না।’
মুজিবর মিয়ার কথায় বিব্রত হলো নীরব। ও বললো— `আমি তো সিগারেট খাই না। সিগারেট চাইবো কেনো?’
`আরে আপনে খান না, আমরা তো খাই! যারা বন্দি দেখতে জেলখানায় আসে, তারা এসব কিনে দিয়ে যায়। আপনাকে কিছু দিতে চাইলে সিগারেট নিয়ে নেবেন, ব্যস।’
মুজিবর মিয়ার কথা বুঝতে পারলো নীরব। জেলখানার ভেতরে এসবই চলে। কোনো বন্দিকে দেখতে হলে দর্শনার্থীদের অর্থ দিতে হয়। এরপর দর্শনার্থীরা বন্দিকে যে উপঢৌকন দেবেন, এরও খরচপাতি দিতে হয়। উপঢৌকনও বণ্টন করে দিতে হয় কারারক্ষী বা প্রভাবশালী কারাবন্দিদের। নীরব লক্ষ্য করেছে, একটি সিগারেট বা বিড়ি উপহার দিলে বন্দি আসামি উপহারদাতার শরীর টিপে দেয় বা তার জামাকাপড় ধুয়ে দেয়। অর্থ বা প্রভাব থাকলে জেলখানায় অনেকে রাজা-বাদশার মতো জীবনযাপন করেন। শুধু জেলখানার আকাশটা ছোট। চার দেয়ালে আবদ্ধ জেলখানার জীবন। নীরবের ভাবালুতা ভেঙে মুজিবর মিয়া বলে— `কী ভাবতাছেন? যান, ভদ্রলোক অপেক্ষা করতাছেন। সিগারেট নিয়া আইসেন।’
নীরব কথা বাড়ালো না। ও এগিয়ে গেলো জেলখানার নির্ধারিত দর্শনার্থীর কক্ষের দিকে। পেছন থেকে মুজিবর মিয়া বললো— `আরে, ওই দিকে যাচ্ছেন কেনো? তিনি তো মেইন গেটে অপেক্ষা করছেন। ভিআইপি গেটে। মেইন গেটের দিকে যান।’
নীরব হাঁটতে লাগলো কারাগারের মেইন গেটের দিকে। ও বুঝতে পারলো শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে ওর দেখা হবে। ও দ্রুত পা ফেলে পৌঁছে গেলো জেলখানার মেইন গেটে। নীরবকে দেখে মজনু নামে এক কারারক্ষী হাতের ইশারায় একটি রুম দেখিয়ে দিলো। নীরব রুমটির দিকে এগিয়ে গেলো। যা ভেবেছিল, তা-ই। শাকিল চৌধুরী ও-প্রান্তে অপেক্ষা করছেন। নীরবকে দেখে তিনি হাসলেন। নীরব শাকিল চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ওদের মাঝখানে লোহার জালের ব্যারিকেড। শাকিল চৌধুরীকে বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। নীরব বললো— `আপনাকে বেশ উৎফুল্ল লাগছে।’
`হুম, আমি ভীষণ এক্সসাইটেড।’
`তা-ই? কেনো?’
`আপনার মুক্তির ব্যাপারে চেষ্টা করেছিলাম। গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছি আজ। তাই চলে এলাম। এখন আপনার মতামত জানলে কাজটা করতে পারি।’
শাকিল চৌধুরীর কথায় অবাক হয় নীরব। এই তো সেদিন মাত্র কথা বলে গেলো, এর মধ্যে ওর মুক্তির উপায় বের করে ফেলেছে।
`লোকটি ভীষণ করিৎকর্মা!’ মনে মনে ভাবলো নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনি কী ভেবেছেন? আমার প্রস্তাবের কথা মনে আছে তো?’
`আপনার প্রস্তাবটা আবার বলুন।’ কৌতূহল প্রকাশ করে বললো নীরব।
শাকিল চৌধুরী মনে হলো খুশি হলো। সে বললো— `প্রস্তাবটা ছিল, আপনাকে আমি মুক্ত করবো। আপনি কিছুদিন বাইরে থাকবেন এবং একসময় একটি অপরাধের দায় স্বীকার করে ফের জেলখানায় আসবেন। ভেরি সিম্পল। বিনিময়ে আপনার পরিবারের জন্য আমি মোটা অঙ্কের অর্থ দেবো। আপনার ভবিষ্যতের কথাও আমি ভাববো। লাইক কয়েক বছর পর আপনি জেল থেকে বের হলে আপনাকে ব্যবসা করার জন্য অর্থ দেবো।’
নীরব কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। শাকিল চৌধুরী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নীরব একসময় মুখ তুলে তাকালো। ও বললো— `আমি আপনার প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিচ্ছি। নিজেকে অর্থের কাছে বিক্রি করতে পারবো না।’
নীরবের কথায় শাকিল চৌধুরীর মুখ বিষণ্নতায় ছেয়ে গেলো। `এখানে বিক্রির বিষয় আসছে কেনো? আমি তো আপনার পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করতে চাচ্ছি আপনি আমার একটা কাজ করে দেবেন বলে। জাস্ট গিভ অ্যান্ড টেক।’
`কিন্তু আমার মনে হচ্ছে একটা অরুচিকর ও অসুস্থ বিজনেস ডিলে আমি জড়িয়ে যাচ্ছি।’ বললো নীরব।
শাকিল চৌধুরী হাল ছাড়বার পাত্র নয়। সে বললো— `মিস্টার নীরব, আপনার সঙ্গে চরম অন্যায় করা হয়েছে। আপনি খুন না করেও খুনের সাজা খাটছেন। আর ওদিকে নাবিলার প্রকৃত খুনি আরাম-আয়েশেই আছে। আপনার কি ইচ্ছা করে না, নাবিলার প্রকৃত খুনি কে, তা জানতে? অন্তত নাবিলার প্রকৃত খুনি কে, তা জানতে হলেও জেলখানা থেকে বের হয়ে আসুন।’
শাকিল চৌধুরীর কথাটা ওর মনে বারবার ধ্বনিত হলো। এরই মধ্যে মমতাজ আহমেদের কথাগুলোও ওর মনে প্রতিধ্বনিত হলো। নীরব ঘুম থেকে জেগে উঠছে যেনো। ওর সামনে এক চরম মুহূর্ত এসে দাঁড়িয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে ওকে। নীরব গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেলো। শাকিল চৌধুরী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। টেনশনে সে ঘামছে। নীরবের সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বেশ কিছুক্ষণ পর নীরব মুখ তুলে তাকালো শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে। ও বললো— `আমি নিজেকে বিক্রি করতে পারবো না শাকিল চৌধুরী। আমি কী পাবো, বা আমার পরিবারকে আপনি কী দেবেন, এসব কথা ভাবতে খারাপ লাগছে।’
নীরবের কথায় চিন্তিত হলো শাকিল চৌধুরী। নীরব কথাটা বলে চুপ করে রইলো। শাকিল চৌধুরী কিছুক্ষণ ভেবে বললো— `ঠিক আছে, আপনাকে বা আপনার পরিবারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব ফিরিয়ে নিলাম। আপনি নাবিলার খুনি কে, তা জানার জন্য হলেও জেলখানা থেকে বের হয়ে আসুন।’
নীরব কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে। সে শাকিল চৌধুরীর মনের কথা যেনো পড়ে নেবার চেষ্টা করছে। শাকিল চৌধুরীও দৃষ্টি সরিয়ে নেয়নি নীরবের দৃষ্টি থেকে। কয়েক মুহূর্ত পর নীরব বললো— `আমাকে কারাগার থেকে কিভাবে বের করবেন?’
নীরবের কথায় শাকিলের ফুসফুসে আটকে থাকা বাতাস বের হয়ে গেলো যেনো। ও হাঁফ ছাড়লো। বললো— `আপনাকে প্রেসিডেন্ট মার্সিতে বের করবো। প্রতিবছর রাষ্ট্রপতি কিছু কয়েদিকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। আপনিও আবেদন করবেন সাধারণ ক্ষমা পেতে। আশা করি, পেয়ে যাবেন।’
`কিভাবে পাবো, কেনো পাবো?’
`ওসব নিয়ে আমি ভাববো। আপনি শুধু সম্মতি দিলেই হবে।’
`বাহ! চমৎকার ব্যবস্থা!’
`ধন্যবাদ। আপনাকে কংগ্রাচুলেট করছি রাজি হওয়ার জন্য।’ হাসিমুখে বললো শাকিল চৌধুরী।
নীরব এর জবাবে বললো, `কারাগার থেকে বের হবার পর যদি আপনার কাজ করতে রাজি না হই।’
এ কথায় ফের হাসলো শাকিল চৌধুরী । বললো— `ব্যবসায় লাভ-লোকসান দুটোই আছে। তখন ধরে নেবো, ব্যবসায় লোকসান হলো।’
`ঠিক আছে, কথাটা মনে রাখবেন কিন্তু।’
`অবশ্যই। তবে আমি জানি, আমার কাজটা আপনি করে দেবেন।’
`চেষ্টা করবো। তবে জীবনের প্রতি লোভ জন্মে গেলে বদলে যেতেও পারি। হা-হা-হা।’ অনেকদিন পর হেসে উঠলো নীরব। অনেক দিন হলো ও এভাবে হাসেনি। এভাবে হাসার মধ্য দিয়ে নীরব উপলব্ধি করলো ও এতোদিন জীবন্মৃত ছিল।
নীরবের হাসির সঙ্গে হাসল শাকিল চৌধুরীও। হাসাতে হাসতে একটি ফাইল নীরবের সামনে তুলে ধরলো সে। বললো— `এই কাগজে একটা স্বাক্ষর করে দিন। সাধারণ ক্ষমা চাওয়ার আবেদনপত্র এটি।’
নীরব নিঃসকোচে আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করে দিলো। ওর মধ্যে কারাগার থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন পেখম ছড়াতে লাগলো। কী আশ্চর্য! একদিন আগেও ও কারাগার থেকে মুক্ত হবার কথা ভাবেনি।
চার.
শরতের সকাল। মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে, যেনো বর্ষার টলটলে যৌবন বৃষ্টি হয়ে হামলে পড়েছে। ভোর থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, কমার লক্ষণ নেই। গুড়ুম গুড়ুম করে আকাশও ডাকছে। থেমে থেমে আকাশের ডাক কী জানান দেয়, কে জানে! আকাশ এমনভাবে ডাকে, যেনো ভেঙে পড়ার উপক্রম! মাঝে মাঝে ভড়কে উঠতে হয়। বৃষ্টির সঙ্গে আকাশ যতোটা গর্জন করছে, ততোটা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে না। বৃষ্টির প্রতি ওর বিতৃষ্ণা কমে আসছে। নীরব ভেবেছিল পুরোদিন কম্বল মুড়ে শুয়ে থাকবে। কিন্তু দুপুরের পর থেকে ওর মধ্যে বাইরে বের হবার অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়লো। রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা লাভ করে কারাগার থেকে বের হয়েছে এক সপ্তাহ হয়েছে। শাকিল চৌধুরী গুলশানে একটি হোটেলে ওকে তুলে দিয়েছে। হোটেলের কক্ষ বেশ কয়েক মাসের জন্য বরাদ্দ করে দিয়েছে সে। হোটেলের নিচে রেস্টুরেন্ট আছে। অর্ডার দিলে হোটেল বয় খাবারও এনে দিচ্ছে। সব ব্যবস্থা করা হয়েছে ওর জন্য। শাকিল চৌধুরী ওকে কেনো কারাগার থেকে মুক্ত করে আনল— এ প্রশ্নটি ওর মনে ঘুরে-ফিরে উঁঁকি দিচ্ছে। বন্দিজীবনের গ্লানি যেমন তীব্র, মুক্তির আনন্দও গভীর। নীরবের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ ছেয়ে আছে। বাইরে যাবার জন্য আজ ওর মনটা ছটফট করছে। কিন্তু মুষলধারার বৃষ্টির কারণে ও বাইরে যেতে পারছে না। কারাগার থেকে বের হয়েই হোটেলে উঠেছে, বাইরে বের হয়নি একদিনও। দুবছর পর ঢাকা শহরের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে ও। কিন্তু মুক্তির পরিপূর্ণ স্বাদ ও পাচ্ছে না যেনো। বাইরে বেরুতে না পারলে কি মুক্ত হবার স্বাদ পাওয়া যায়? আজ মুষলধারার বৃষ্টি ওকে কক্ষবন্দি করে রেখেছে। অলসভাবে দুপুর পর্যন্ত শুয়ে থাকার পর বাইরে বের হবার তাগিদে নিজের মধ্যে ও ছটফটানি অনুভব করলো। কারাগারে এ ধরনের অনুভূতি ওর হয়নি। কারাবন্দির জীবন মেনে নেয়ার কারণে হয়তো বাইরের জগতের প্রতি ওর আকর্ষণ লোপ পেয়েছিল। নীরব নিজের রুমে পায়চারি করছিল, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ও প্রথমে কোনো সাড়া দিলো না। দরজায় এবার আরেকটু জোরে শব্দ হলো। নীরবের কাছে কেউ আসার কথা নয়, তবে হোটেলের বয় আসতে পারে ওর খোঁজ নিতে বা কিছু লাগবে কি-না জানতে। নীরব এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললো এবং খুলে ভীষণ অবাক হলো। ওর সামনে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। তরুণীর মুখে ঝলমলিয়ে আছে রংধনুর মতো একফালি অমলিন হাসি। নীরব কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো মেয়েটির মুখের দিকে। মেয়েটি রিনরিনে মিষ্টি গলায় বললো— `আপনি নিশ্চয় নীরব?’
নীরব ফের অবাক হলো। মেয়েটিকে ও চেনে না, অথচ সে ওর নাম জিজ্ঞেস করছে। এ ছাড়া ওর কাছে কেউ আসারও কথা নয়। ওর মুক্তির খবর ওর চেনাজানার মধ্যে কেউ জানে না। ও কোথায় আছে, এ কথাও কেউ জানে না। অথচ মেয়েটি ওর সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চিতভাবে ওর নাম উচ্চারণ করলো। বিস্ময়ের প্রবল ধাক্কা সামলাতে পারলো না ও। মেয়েটির মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে ও। মেয়েটির চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো। ও ফের রিনরিনে কণ্ঠে বললো— `আমাকে আপনি চিনবেন না। চেনার কথাও নয়, তবে আমি আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানি।’
নীরব বিস্ময় প্রকাশ করে বললো— `কে আপনি? আমাকে চেনেন কিভাবে? আমি এখানে, জানেন কিভাবে? কেনো এসেছেন?’
`অনেক প্রশ্ন। একসঙ্গে জবাব দেবো?’ বললো মেয়েটি।
নীরব বললো— `না, মানে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!’
`আমি একজন সাংবাদিক। আমার নাম স্বর্ণা।’
`কী নাম বললেন?’
`স্বর্ণা।’
`পুরো নাম?’
`স্বর্ণা শারমিন।’
`আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?’
নীরবের প্রশ্নে ওর দিকে কেমন গভীর দৃষ্টিতে তাকালো স্বর্ণা। নীরব লক্ষ্য করলো, স্বর্ণার মুখায়বে শান্ত একটা ভাব থাকলেও ওর চোখের দৃষ্টিতে তীক্ষè দ্যুতি আছে। এ কথা ভাবতেই পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে স্বর্ণাকে একঝলক দেখে নিলো ও। স্বর্র্ণার মুখটি মায়াবি। নাক টিকালো না হলেও পুরুও নয়। মুখের সঙ্গে মানানসই লম্বা নাকের নিচে গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁট। চিবুকটা একটু লম্বাটে। ফর্সা গালে প্রসাধনের প্রলেপ না থাকলেও রক্তিম আভা ঠিকরে বেরুতে চাইছে। স্বর্ণা সাজসজ্জার প্রতি মনোযোগী নয়— এ কথা বলা যায়। সাংবাদিক বলেই হয়তো ওর মধ্যে রূপচর্চার মেয়েলি স্বভাব প্রকটভাবে নেই। তবে স্বর্ণাকে এক কথায় `সুন্দরী’ বলে দেবে যে কেউ। খুব দ্রুত কথাগুলো ভেবে নিলো নীরব। নীরবের তাকিয়ে থাকার কারণে হয়তো স্বর্ণার চোখের দৃষ্টি কেমন বদলে গেলো। ও মিষ্টি করে হাসলো এবং ওর হাসিটা নীরবের খুব চেনা মনে হলো। ওর মনের মধ্যে কী যেনো বুদ্বুদ করে উঠলো। এমন হাসি কি ও আগে দেখেছে? প্রশ্নটা চিন্তার মধ্যে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছিল, এর মধ্যে স্বর্ণা বললো— `হ্যাঁ, আমি আসলে আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।’
`আমার সঙ্গে কথা বলতে চান?’ বলে প্রশ্নচোখে তাকিয়ে থাকে নীরব।
স্বর্ণা বলে— `ঠিক কথা নয়, আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দিলেই হবে। আমি আসলে পেশাগত কারণে আপনার কাছে এসেছি। আপনার সহযোগিতা কামনা করছি। আশা করি, আমাকে সাহায্য করবেন।’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি আটকে থাকে নীরবের চোখে। স্বর্ণা ফের বলে— `আমি জানি, আমি যা জানতে চাইবো, তা আপনার কাছে ভালো লাগবে না। অপ্রিয় কিছু কথা জানতে চাইবো। তাই প্রশ্ন করার আগে আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিতে চাই।’
স্বর্ণার কথায় এবার একটু বিচলিতবোধ করলো নীরব। ওর এখন মনে পড়লো, সকালে ফোন করে শাকিল চৌধুরী বলেছিল, একজন সাংবাদিক আসতে পারেন। সাংবাদিক তার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চান। সাংবাদিক এলে তাকে সময় দেয়ার অনুরোধ করেছিল সে। কিন্তু সাংবাদিক যে একজন মহিলা হতে পারে, একথা বলেনি সে। শাকিল চৌধুরীর কথামতো চলতে হবে নীরবকে। যদিও সাংবাদিক পছন্দ করে না ও; কিন্তু এখন তো ওর নিজের কোনো চয়েজ নেই। তবে সাংবাদিকের সঙ্গে ওর কী কাজ, বুঝতে পারছে না। ও হাসিমুখে মেয়েটিকে বললো— `ভেতরে আসুন।’
নীরব দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। স্বর্ণা নিঃসংকোচে রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো। ওয়েটিং রুমটি তেমন বড় নয়। একসেট সোফা এবং একটি টি-টেবিল আছে। স্বর্ণা সোফায় বসার পর তার মুখোমুখি বসলো নীরব। স্বর্ণ হাতের ব্যাগ থেকে একটি নোট বুক, কলম এবং ছোট্ট একটি রেকর্ডার বের করে রাখলো টেবিলের ওপর। স্বর্ণার কাজকর্ম দেখে নীরবের মনে হলো সে ওর সাক্ষাৎকার নেবে। কিন্তু ওর তো সাক্ষাৎকার দেবার মতো কিছু নেই। বলার মতোও কিছু নেই। ও মনে মনে ভাবলো শাকিল চৌধুরী কেনো ওকে সাংবাদিকের মুখোমুখি করে দিলেন? নীরব স্বর্ণার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের অস্বস্তি চেপে রাখার চেষ্টা করলো। স্বর্ণা ওর চোখে চোখ রেখে মিষ্টি করে হেসে বললো, `আমি জানি, আপনি একটু বিব্রতবোধ করছেন।’
স্বর্ণার কথায় ওর বিব্রতবোধ আরো বেড়ে গেলো। ও বললো— `আসলে আপনি আমার কাছে কেনো এসেছেন বলুন তো! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’
`বলছি, আমার একটা উদ্দেশ্য তো আছেই।’
`উদ্দেশ্যের কথাটি বলুন।’
ফের স্বর্ণা মিষ্টি করে হাসলো। ওর হাসিটা খুব চেনা চেনা মনে হলো নীরবের। কিন্তু এমন হাসি ও কোথায়— কার মুখে দেখেছে, তা মনে করতে পারলো না।
স্বর্ণা বললো— `আগে আমার কথা একটু বলে নিই। আমি সাংবাদিকতা পেশায় নতুন প্রবেশ করেছি। শিক্ষানবিস সাংবাদিকও বলতে পারেন। আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন আমার সম্পাদক। অ্যাসাইনমেন্টটা হলো কারাদণ্ড ভোগ করে জেল থেকে বেরিয়ে আসা লোকরা কী ভাবেন, কী করতে চান এবং তারা কিভাবে সমাজটাকে দেখেন। সমাজও তাদের প্রতি কেমন আচরণ করে থাকে— এসব নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে হবে আমাকে।’
কথাগুলো স্বর্ণা একটু সংকোচ প্রকাশ করেই বললো। স্বর্ণার কথাগুলো নীরবের জন্য পীড়াদায়ক। তা ছাড়া সাংবাদিকদের প্রতি ওর ক্ষোভের শেষ নেই। এখন এক সাংবাদিকের সামনে বসে ওকে কথা বলতে হবে অপ্রিয় প্রসঙ্গে। নীরব চুপ করে রইলো। স্বর্ণা কণ্ঠে বিনয় প্রকাশ করে বললো— `আমি আপনার মনের ভেতরের ঝড়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমি বুঝি, এ বিষয়ে কথা বলা যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু আমি এই অ্যাসাইনমেন্টটা সম্পন্ন করতে চাই। আপনার সহযোগিতা পেলে তা সম্ভব হবে।’
স্বর্ণার কথার জবাবে কী বলবে, বুঝতে পারছে না নীরব। ও নিজের মুখ ঘুরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। স্বর্ণা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের দৃষ্টিতে অনুরোধের মেঘ জমে আছে। ও `কিছু বলবে না’ বললেই যেনো মেঘগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে। নীরব মাথা নিচু করে ভাবতে লাগলো। স্বর্ণার কণ্ঠ ফের রিনরিনিয়ে উঠলো— `আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা আমার রিপোর্ট লেখার উপজীব্য বিষয় হোক, তা আমি কখনো চাইনি, মিস্টার নীরব। আমি এ ধরনের অ্যাসাইনমেন্ট এড়াতেও পারতাম। কিন্তু অ্যাসাইনমেন্টটা আমার ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে, এ বিষয়ে কখনো কিছু লেখা হয়নি। নতুন একটা বিষয় সামনে আসুক, পাঠক জানুক। আমি জানি, জেলখানার অভিজ্ঞতা ও জেল থেকে বের হবার পরবর্তী জীবনের কথামালা সুখের হবে, তা নয়। বরং পেইনফুল কোনো গল্প বেরিয়ে আসতে পারে। আমি কিন্তু ওই ধরনের গল্পের সন্ধানেও এই রিপোর্ট লিখতে চাচ্ছি না। আপনি শুনছেন?’ এ পর্যায়ে এসে প্রশ্ন করে স্বর্ণা।
নীরব চোখ তুলে স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বললো— `শুনছি।’
স্বর্ণ বললো— `আমি গল্পের চেয়ে আমাদের সমাজের অসঙ্গতির কথা, নিপীড়নের অজানা কথা তুলে ধরতে চাই। বুঝতে পারছেন?’
`সব কথা বুঝতে পারছি না। তবে আপনার কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছে। আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি?’ বললো নীরব।
স্বর্ণা উৎসাহী গলায় বললো— `প্রশ্ন? করুন।’
`আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার অ্যাসাইনমেন্টের জন্য আমাকে বেছে নিলেন কেনো? আর কিভাবে আমার কথা জানলেন?’
নীরবের প্রশ্নে মুখ টিপে হাসলো স্বর্ণা। কয়েক সেকেন্ড পর ও বললো— `অ্যাসাইনমেন্টটা পাবার পর ভাবছিলাম কী করবো, কিভাবে শুরু করবো বা কার কাছে যাবো। এর মধ্যে পত্রিকায় দেখতে পেলাম প্রেসিডেন্ট মার্সিতে আপনিসহ আরও তিনজন জেল থেকে বের হচ্ছেন। চারজনের মধ্যে শুধু আপনি খুনের মামলায় সাজা খাটছিলেন বলেও জানলাম। তখনই ঠিক করি, আপনাকে দিয়ে প্রথম শুরু করবো। আপনার খোঁজ নিলাম। ঠিকানা বের করে আপনাদের বাড়ি পর্যন্ত গেলাম।’
`বলেন কী! আমাদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিলেন?’ বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব। স্বর্ণা বললো— `আপনাদের বাড়ি পর্যন্ত গেলেও আপনার মা-বাবা, ভাই-বোনের সঙ্গে আমার কথা হয়নি। আপনাদের বাড়ির একটু কাছাকাছি স্থানে দাঁড়িয়ে ঠিকানা জানতে চাইলাম শাকিল চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোকের কাছে।’
`এরপর?’ কৌতূহল প্রকাশ করলো নীরব।
স্বর্ণা বললো— `তিনি প্রথমে আমাকে ঘোর সন্দেহের চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন। তাকে সংক্ষেপে জানালাম আপনাকে কেনো আমি খুঁজছি।’
`এরপর?’
`এরপর শাকিল চৌধুরী আমাকে ঢাকায় ফিরতে বললেন। এবং তিনি কথা দিলেন আপনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন। ব্যস, আমি ঢাকায় চলে এলাম।’
`আপনার সঙ্গে শাকিল চৌধুরীর কোথায় দেখা হয়েছিল?
`পঞ্চগড়ে, আপনাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা স্থানে। তিনি সম্ভবত আপনাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে ঢাকার দিকে ফিরছিলেন। কেনো বলুন তো?’
স্বর্ণার কথার জবাব দিলো না নীরব। ও বুঝতে পারলো শাকিল চৌধুরী গোপনে ওর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
নীরবকে চুপ থাকতে দেখে স্বর্ণা প্রশ্ন করলো— `আপনি কি কিছু ভাবছেন?’
`না, ভাবছি আপনি আমার কাছে কিভাবে পৌঁছলেন?’
`শাকিল চৌধুরী আপনার ঠিকানা দিয়েছেন। আচ্ছা, শাকিল চৌধুরী আপনার কী হন?’
স্বর্ণার প্রশ্নে বিব্রতবোধ করলো নীরব। ও কয়েক সেকেন্ড হকচকিয়ে গেলো। এরপর বললো— `সে আমার ভালো বন্ধু।’
`ও আচ্ছা।’ ছোট্ট করে বললো স্বর্ণা।
স্বর্ণার কথা শুনে থ’ হয়ে গেছে নীরব। স্বর্ণার মধ্যে কোনো জড়তা নেই, দ্বিধা নেই। কথা বলছে ঝটপট নিঃসংকোচে। সাংবাদিক হতে হলে এমন সাহসীই হতে হয় বুঝি, মনে মনে ভাবলো নীরব। স্বর্ণা ওর নীরবতা দেখে বললো— `আচ্ছা, আপনি কেনো আপনার বাবা-মার সঙ্গে এখনো দেখা করেননি?’
প্রশ্নটায় চমকে গেলো নীরব। এ প্রশ্নের জবাবে ও কী বলবে, মনে মনে ভাবতে লাগলো। ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে স্বর্ণা। নীরব বুঝতে পারছে ওকে কথা বলতে হবে। অনুসন্ধিৎসু এই শিক্ষানবিস সাংবাদিকের সামনে চুপ থাকা যাবে না। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। নীরব নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়। ও বললো— `আমার মা-বাবা, ভাই-বোন জানে না, আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম। অনেকদিন পর তাদের সঙ্গে দেখা করতে সংকোচবোধ করছি। নিজেকে প্রস্তুত করছি। একসময় দেখা তো করবোই।’
`হুম।’ স্বর্ণার সম্মতিমূলক ছোট্ট জবাব।
নীরব স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বিনয়ী গলায় বললো— `একজন খুনির গল্প বা অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনি হয়তো একটি রিপোর্ট লিখবেন, লিখুন। আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবো। কিন্তু আমার অনুরোধ হচ্ছে, লক্ষ্য রাখবেন, একজন মানুষের এই দুর্বিষহ বেদনার কথা যেনো পণ্য না হয়ে যায়।’
`পণ্য হবে কেনো?’ দৃষ্টিতে প্রশ্ন ফুটিয়ে জানতে চাইলো স্বর্ণা।
নীরব বললো— `সংবাদপত্রে মানুষের কথা পণ্য হয় বলেই বলছি।’
`কী রকম? সংবাদপত্রে কিভাবে মানুষের কথা পণ্য হয়?’
`এই ধরুন, একটি খুন হলো। এই খুনকে কেন্দ্র করে নানারকম গল্প লিখে ফেলেন সাংবাদিকরা। তারা অনেক সময় প্রকৃত ঘটনার যাচাই-বাছাই করেন না। ঘটনার শিকার নিরপরাধ ব্যক্তি বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কতটা বিপর্যস্ত হচ্ছে, সেই বিবেচনা সাংবাদিকরা করেন না। তাদের কাছে রগরগেভাবে সংবাদ পরিবেশন মুখ্য হয়ে যায়। সংবাদ পরিবেশনে সত্যের অনুসন্ধান জরুরি, এ কথা যেনো ভুলে যান তারা। আমি দেখেছি, অনেক সময় সাংবাদিকদের কাছে সংবাদ পণ্যের মতো ব্যবহৃত হয়। তাই আপনাকে কথাটা বললাম, কিছু মনে করবেন না।’
স্বর্ণা মুগ্ধ হলো নীরবের কথায়। ও মনে মনে ভাবলো নীরব সংবাদপত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। সংবাদপত্র বিষয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে কথাগুলো বলেনি সে। এ নিয়ে তর্ক করা গেলেও তর্কে গেলো না স্বর্ণা। ও নীরবের চোখে চোখ রেখে মিষ্টি করে হেসে বললো, `ঠিক আছে, আমি আপনার কথাটা মনে রাখবো।’
নীরব বলে— `তা হলে খুশি হবো।’
`তা হলে প্রশ্ন করি?’
`করুন। আমি তৈরি।’
`জেলখানার জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। এখান থেকেই শুরু করতে চাই। আপনি বলুন আমি আপনার কথা রেকর্ড করছি।’ কথাটি বলে স্বর্ণা একটি মাইক্রো রেকর্ডার অন করে রাখলো। নীরব নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে। স্বর্ণা কী কী প্রশ্ন করবে, কে জানে। নীরব ঠিক করে নিলো প্রশ্নের জবাব ও গুছিয়ে ও সংক্ষেপে দেয়ার চেষ্টা করবে। নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল স্বর্ণা। নীরবের কোনো জবাব না পেয়ে ও ফের নিচু গলায় বললো— `জেলখানার জীবন সম্পর্কে একটু বলবেন কি?’
স্বর্ণার কথায় নীরব বলে— `জেলখানার জীবন সম্পর্কে বলার মতো কী থাকতে পারে, বলুন। জেলখানা মানেই তো চারদেয়ালে বন্দি জীবন। ছোট্ট আকাশ। সন্ধ্যা হলেই লকারে বন্দি। জেলখানা মানে চরম একাকিত্ব। জেলখানা মানে অপরাধীর সাজা খাটার নির্ধারিত স্থান, তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তিদের অকারণ জেল খাটার অভিশপ্ত স্থানও। রাজনীতিবিদদের খণ্ডকালীন আবাসস্থলও বলতে পারেন। জেলখানা আসলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উৎকৃষ্ট স্থানও। জেলখানায় টাকা খরচ করলে সবকিছু করা যায় বা সবকিছু পাওয়া যায়। জেলখানার নিয়মগুলো কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ আছে। বাস্তবে ওসব নিয়মের প্রয়োগ নেই। ঘুষ বা দুর্নীতির আদর্শ স্থান হচ্ছে জেলখানা। আমার জেলখানার জীবন নিয়ে বলার মতো এর বেশি কিছু নেই।’ এ পর্যন্ত বলে থামলো নীরব।
স্বর্ণা একগাল হাসলো। নীরবের মনে হলো, ওর জবাব ভালো লেগেছে মেয়েটির। নীরব জেলখানা সম্পর্কে সত্যি কথাই বলেছে। জেলখানা সম্পর্কে যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা সংক্ষিপ্তভাবে বললে এরকমই দাঁড়ায়। স্বর্ণা ফের প্রশ্ন করলো— `জেলে যাওয়ার আগে এবং জেল থেকে বের হবার পর আপনার দৃষ্টিতে বড় পরিবর্তন কী? সমাজ আপনাকে কিভাবে দেখছে? আপনিই বা সমাজটাকে কিভাবে দেখছেন?’
প্রশ্নটির জবাব চট করে দেয়া যায় না। নীরব একটু ভাবলো। স্বর্ণা জবাবের অপেক্ষা করছে। নীরব ওর চোখে চোখ রেখে বললো— `দেখুন, আপনি আসলে যা জানতে চাইছেন, আমি সেভাবে বা সেরকম কিছু বলতে হয়তো পারবো না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আমি একটি হত্যা মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হয়ে জেলখানায় ছিলাম ঠিক; কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমি নির্দোষ। নির্দোষ হয়েও আমি দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হই। তাই আমার কাছে সমাজটা অন্যরকম হয়ে গেছে আগেই। এই সমাজ নিয়ে বুক ভরা ক্ষোভ ছাড়া আমার কিছু নেই। এমন কী, ঘৃণাও টের পাই। কিন্তু আমি ওসব বলতে চাই না। মনের আগুন মনেই চেপে রাখতে চাই। প্রকৃত অপরাধী হলে তার একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে পারে। তার আচরণ বা তার সঙ্গে সমাজের আচরণ কী— এ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু আমার ব্যাপারটা ভিন্ন। আমার মনে হয়, আপনি অন্য কারো সাক্ষাৎকার নিতে পারেন। আমি আপনার অ্যাসাইনমেন্টের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নই।’ নীরব থামলো।
স্বর্ণা অপলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। স্বর্ণার চোখে কেমন হালকা কুয়াশার মতো বিষণ্নতা এসে জমে গেলো। নীরবের কথাগুলো কি ওকে বিষণ্ন করে দিলো? নীরব ভাবলো, এভাবে কথাগুলো বলে দেয়া ঠিক হলো কি-না। ওর কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্যও নয়। কে বিশ্বাস করবে ওর কথা? স্বর্ণাকে কথাগুলো বলে দেয়া ঠিক হলো কি-না, এ নিয়ে মনে দ্বন্দ্ব পেখম ছড়াতে লাগলো। স্বর্ণা অবাক দৃষ্টি মেলে নীরবের চোখে চোখ রেখে বললো— `আপনি খুন করেননি! অথচ খুনের দায়ভার আপনার ওপর বর্তেছে? বলেন কী!’
এর জবাবে কয়েক মুহূর্ত চুপ রইলো নীরব। ওর ভেতরে কষ্টের একটা ঝড় শুরু হলো। ভেতরের ঝড় সামলে নেবার চেষ্টা করছে ও। ও দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। স্বর্ণা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। নীরব গলা নামিয়ে বললো— `কিছু মনে করবেন না। আমি কিন্তু এসব কথা বলতে চাইনি। আর বলেও বা লাভ কী, বলুন। আপনি এসব কথা না লিখলেও পারেন।’
`সেটা পরে ভেবে দেখবো কী লিখবো, কী লিখবো না। কিন্তু আমাকে বলতে হবে কেনো এবং কিভাবে আপনি খুনের মামলায় জড়িয়ে গেলেন। আপনি যে নাবিলাকে খুন করেননি, এর প্রমাণ কি আপনার কাছে আছে?’
স্বর্ণার প্রশ্নে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরব। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ও বললো, `আমি যে খুন করেছি, এর প্রমাণ তো নেই। অথচ সাজা হয়ে গেলো। আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ কিভাবে করবো, জানি না। শুধু জানি, আমি নাবিলাকে খুন করিনি।’
`খুন করেননি, অথচ…’
`দেখুন, এখন তো এসব কথা বলে আমার কোনো লাভ নেই। তবু যা সত্যি, তা-ই বললাম। নাবিলাকে বিপদ থেকে আমি উদ্ধার করতে গিয়েছিলাম। ব্যস, ফেঁসে গেলাম খুনের মামলায়। এই তো!’
`একটা প্রশ্ন করি?’
`করুন।’
`গুলশানের রেস্ট হাউসে নাবিলার খুনের সময় আপনি কেনো সেখানে উপস্থিত ছিলেন?’
স্বর্ণার প্রশ্নটির জবাব আদালতেও নীরব দিয়েছে। আদালত বিশ্বাস করেনি। স্বর্ণাও হয়তো করবে না। তবু ও বললো— `সেদিন নাবিলা আমাকে ফোন করে অনুরোধ করেছিল গুলশানে যেতে। আমি ওর কণ্ঠে উদ্বেগ অনুভব করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, ও বিপদে পড়েছে। তাই আমি ওকে উদ্ধার করতে ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি নাবিলার বুকে চাকু বিদ্ধ হয়ে আছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় ও ছটফট করছিল। আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।’ এ পর্যন্ত বলতে গিয়ে নীরবের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে গেলো। ও মাথা নত করে ফেললো।
স্বর্ণা কিছুক্ষণ চুপ রইলো। নীরবের এই কষ্টের কথা কেউ জানে না। স্বর্ণাও জানতো না। এখন জানতে পারলো। মাস্টার্স পাস করা একটি শিক্ষিত ছেলে ঘটনাক্রমে হত্যা মামলায় ফেঁসে গেছে। শুধু ফেঁসেই যায়নি, কারাদণ্ড ভোগ করেছে। একথা ভেবে স্বর্ণার কান্না এসে গেলো। ও নিজেকে সামলে নিলো। এমন সময় কেঁদে ফেললে পরিবেশটা নষ্ট হয়ে যাবে। সাক্ষাৎকার নেয়া যাবে না। নীরব চুপ করে আছে। স্বর্ণা গলা খাঁকারি দিয়ে গুমোট পরিবেশকে হালকা করলো। ও বললো— `আপনি আদালতকে এ কথা নিশ্চয়ই বলেছেন। কিন্তু এর প্রমাণ দিতে পারেননি, তা-ই না?’
নীরব বললো— `বলেছিলাম, কিন্তু আমার পক্ষে কেউ তো দাঁড়ায়নি। নাবিলার পরিবার আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। আমি কারাবন্দি এক অসহায় মানুষ। অর্থ নেই আমার। আমি কী করতে পারি, বলুন। অসহায়ভাবে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায় মেনে নিলাম। জীবনে এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?’
নীরবের কথাগুলো স্পর্শ করলো যেনো স্বর্ণাকে। ওর চোখে অশ্রুকণা জমে এলো। ও অবাক হলো একথা ভেবে যে, সমাজে এমন ঘটনারও জন্ম হয়। নীরবের কথা যদি সত্যি হয়, তবে বলতে হবে প্রকৃত খুনি থেকে গেলো ধরাছোঁয়ার বাইরে আর নিরপরাধ একজন খুনি সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে অন্তরীণ হলো। এ ধরনের ঘটনা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চরম অন্তরায়। স্বর্ণা মনে মনে প্রমাদ গুনলো যেনো। ও নীরবের কথা থামাতে চায় না। তাই বললো— `মিস্টার নীরব, আপনার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আমি এমন ঘটনার কথা কখনো শুনিনি। আপনার প্রতি আমার সহানভূতি বেড়ে গেলো।’
`ধন্যবাদ। তবে আপনার সহানুভূতি পাবার জন্য আমি একথা বলিনি। যা বলেছি, তা-ই প্রকৃত সত্য। তবে এ কথা আপনি হয়তো লিখতে পারবেন না। তা হলে আদালত অবমাননা হবে। কথাটি বললাম, প্রকৃত সত্য জেনে রাখার জন্য। আর সাংবাদিকতা করছেন বলে একটা অনুরোধ করতে চাই।’
`করুন।’
`অনেক সময় অনেকে ঘটনাক্রমে বা দুর্ভাগ্যক্রমে বিপদে পড়ে যান। আপনারা প্রকৃত ঘটনা না জেনে মনগড়া রিপোর্ট লিখে ফেলেন। নির্দোষ ব্যক্তিকে খুনি বানিয়েও ফেলেন। রিপোর্ট লিখতে গিয়ে কাল্পনিক বিষয়ও জুড়ে দেন। এতে হয়তো পত্রিকার কাটতি বাড়ে, কিন্তু ওই রিপোর্ট একটি ব্যক্তি বা তার পরিবারকে কতোটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এটা সবসময় ভেবে দেখবেন। এ ধরনের ঘটনার শিকার হিসেবে আমি নিজেই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই অনুরোধটি করলাম।’
স্বর্ণা কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো নীরবের মুখের দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এরপর বললো— `আপনার কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করবো। কথাগুলো আমাকে খুব তাড়িত করছে। সে যাক, আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি এমন রায় মেনে নিলেন কেনো?’
`কী করতে পারতাম, বলুন?’
`রায় হয়েছিল জজকোর্টে। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারতেন। উচ্চ আদালতে রায় বহাল থাকলে সুপ্রিম কোর্টেও যেতে পারতেন।’
ম্লান হেসে নীরব বললো— `আপনাকে তো বলেছি, আমার বা আমার পরিবারের কোনো অর্থ নেই। অর্থ না থাকলে উচ্চ আদালতে উকিল নিয়োগ করা যায় না!’
`সরকারি উকিল তো ছিল।’
`দেখুন স্বর্ণা, নিম্ন আদালতে মামলা চলাকালে বুঝতে পারছিলাম যে আমাকে ফাঁসিয়ে দিতে একটি প্রভাবশালী মহল কাজ করছে। আমি তো ঘটনার শিকার। এই শিকারকে ওই মহল ছাড়বে না। এক তরফাভাবে মামলার রায় যখন জজকোর্টে হলো, তখন মনে হলো এ নিয়ে আমি পারবো না। আমাকে সাহায্য করবে এমন কেউ তো ছিলও না। তাই আদালতের রায় মেনে নিই। উচ্চ আদালতে গেলেও রায় বদলাত কি? মনে হয় না।’
`প্রভাবশালী মহল বলতে কাদের কথা মনে হয়েছে আপনার?’ জানতে চাইলো স্বর্ণা।
নীরব মুচকি হেসে বললো— `নাবিলার পরিবারই তো প্রভাবশালী। নাবিলার বাবা-মা বা ওদের আত্মীয়-স্বজনরা ধরেই নিয়েছে যে আমি নাবিলাকে খুন করেছি। তারা তো আমাকে কঠোর শাস্তি দেবার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিল। তাদের সঙ্গে তো আমার পেরে ওঠার কথা নয়। হতে পারে তারাই আমাকে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে ভূমিকা রেখেছে। আবার এটাও হতে পারে, প্রকৃত খুনি পেছন থেকে কাজ করেছে।’
এ কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো স্বর্ণা। নীরব ওর নীরবতায় অবাক হলো না। এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা চিন্তিত করবে যে কোনো শ্রোতাকে। স্বর্ণ চোখ তুলে তাকালো নীরবের দিকে। বললো— `আচ্ছা, নাবিলাকে কে খুন করেছে বলে আপনার ধারণা?’
স্বর্ণার কথায় হাসলো নীরব। ও বললো— `আপনি জেলখানার অভিজ্ঞতার কথা ফেলে দেখছি খুনের রহস্য উন্মোচনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন? আপনি সাংবাদিক, না ডিটেকটিভ?’
ওর প্রশ্নে স্বর্ণা ছোট্ট করে হাসি ফুটিয়ে তুললো ঠোঁটে। নীরব স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে। স্বর্ণা বললো— `সাংবাদিকদের কখনো কখনো ডিটেকটিভও হতে হয়। তা ছাড়া আমার ঘটনাটি যে কেউ শুনলে কৌতূহলী হয়ে উঠবে। তাই প্রশ্নটা করেছি। প্রশ্নটার জবাব দিন।’
`নাবিলাকে কে খুন করেছে এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারবো না। নাবিলার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতাও বেশিদিন হয়নি। এর মধ্যে যেটুকু মনে হয়েছে, ওর ফ্রেন্ডসার্কেল অনেক বড়। ও কার কার সঙ্গে চলতো তা আমার জানা নেই। ওর মধ্যে আমি উচ্চাভিলাষ দেখতে পেতাম।’ এ পর্যন্ত বলে থামলো নীরব।
স্বর্ণা বললো, `নাবিলা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? ওর সম্পর্কে কিছু বলুন।’
নীরব এ কথায় ওর নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। ও নাবিলার কথা স্মরণ করে ঠোঁটের ওপর থেকে দাঁতের কামড় ছেড়ে দিয়ে ধরা গলায় বললো— `ও খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ছিল। আমার জীবনযাপনের সঙ্গে ওর জীবনযাপনের বিস্তর ফারাক ছিল, তবু…’ এ পর্যন্ত বলে ফের থেমে গেলো নীরব।
`তবু নাবিলার প্রেমে পড়েছিলেন, এই তো?’
`সে রকমই বলতে পারেন। আসলে নাবিলা এমনই সুন্দরী ছিল যে, ওকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার ছিল না। ও যখন আমাকে প্রপোজ করে আমি তখন হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। নাবিলার প্রপোজ ফিরিয়ে দেবে, এমন লোক পাওয়া যাবে না। অপ্সরীর মতো সুন্দরী মেয়েকে উপেক্ষা করতে হলে মহাপুরুষ বা বৈরাগী সাধক হতে হয়। আমি সাধারণ এক মানুষ, ওকে ফেরাবো কী করে? তাই ফেরাতে পারিনি।’
`হুম। প্রেমের খেসারত দিতে হয়েছে কারাগারে গিয়ে।’ টিপ্পনি কাটলো যেনো স্বর্ণা।
নীরব ওর টিপ্পনি গায়ে না মেখে বললো— `আসলে আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল কি-না, সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। তবে নাবিলার প্রতি আমার দুর্বার আকর্ষণ ছিল। ভালো লাগার কারণে আমি ওর সান্নিধ্য পেতে চাইতাম। কিন্তু নাবিলার আচরণ ছিল রহস্যময়। ও আমার প্রতি দুর্বল ছিল কি-না এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। তবে আমাকে ও প্রশ্রয় দিতো। আমাকে নিয়ে ও দু-এক জায়গায় ঘুরতে বেড়িয়েছেও। প্রেম বলতে এটুকুই। এরপর তো খুনের ঘটনা ঘটলো।’ থামলো নীরব। নাবিলার খুনের কথা বলতে ওর ভালো লাগছে না। তবু একথা এসে যাচ্ছে।
স্বর্ণা একটু নড়েচড়ে বসলো। পরিবেশে কেমন গাম্ভীর্য পেখম ছড়িয়ে গেছে। ও প্রশ্ন করলো, `নাবিলা ও আপনার মধ্যে তা হলে প্রেম ছিল কি-না, এ নিয়ে আপনি সন্দিহান ছিলেন?’
`হুম। এ কথা তো আগেই বলেছি।’
`আপনি কি ওকে মিস করেন?’
`মিস করার চেয়ে ওর জন্য কষ্ট অনুভব করি। এই জন্য যে, ও আমার চোখের সামনে অকারণে মারা গেছে। ওকে আমি উদ্ধার করতে পারিনি। এই কথা ভাবলে আমি মর্মপীড়ায় ভুগি।’
স্বর্ণাকে বিষণ্ন মনে হলো। সাক্ষাৎকারের এ পর্যায়ে এসে নীরবের যেচে কথা বলার কিছু নেই। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ও কথা বলবে। স্বর্ণা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। নীরবও কথা বললো না। পুরো পরিবেশে একরাশ বিষণ্নতা ছেয়ে রইলো। একপর্যায়ে স্বর্ণা বললো— `মিস্টার নীরব। আমি আপনার কথা শুনে বিষণ্ন হয়ে পড়েছি। কিছু মনে করবেন না। আমি আজ আর কোনো প্রশ্ন করবো না। আমি আরেকদিন আসতে চাই। আপনি আমাকে সময় দেবেন তো?’
`ঠিক আছে, আসুন। আবার যখন আসবেন, সময় দেয়ার চেষ্টা করবো। তবে আমাকে ফোন করে আসবেন।’ বললো নীরব।
স্বর্ণা বললো— `যদি মাঝে মাঝে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসি, মাইন্ড করবেন?’
স্বর্ণার এ ধরনের প্রশ্নের জবাবে কী বলা যায়, চিন্তা করতে লাগলো নীরব। অ্যাসাইন্টমেন্টের বিষয় ছাড়া স্বর্ণা কেনো ওর সঙ্গে দেখা করবে, বুঝতে পারছে না ও। নীরব বললো— `আমার কাছে আসাটা নিশ্চয় আপনার অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, তা-ই না?’
স্বর্ণা হাসলো। ওর হাসির মধ্যে একরকম মাদকতা আছে। এই মাদকতার আকর্ষণ বড় তীব্র। কথাটা ভেবেই নিজেকে শাসাল নীরব। স্বর্ণার বিষণ্ন চোখে একরাশ লজ্জাভা ফুটে ওঠে। ও বললো— `আপনার সঙ্গে মুখোমুখি বসে প্রশ্ন করার মধ্যেই আমার অ্যাসাইনমেন্টের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হবে না। আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাই। আর ঘনিষ্ঠ হতে হলে আপনার সান্নিধ্যে আসতে হবে। তাই বলছিলাম, সময় পেলে আপনার সঙ্গে মিট করবো। আপনি কি আমাকে সময় দেবেন?’
স্বর্ণার কথার জবাবে কী বলবে, ভেবে পেলো না ও। নীরব একটু ভাবলো। এরপর বললো, `আমাকে ফোন করবেন। যদি আমার হাতে সময় থাকে এবং আমি ফ্রি থাকি, তবে আপনাকে সময় দেবো।’
`হুম। নট ব্যাড। আমি তা হলে আপনার সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ রাখবো। আপনাকে অনেক অ-নে-ক ধন্যবাদ, মিস্টার নীরব।’
`ওয়েলকাম। এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।’
স্বর্ণা উঠে দাঁড়ালো সোফা থেকে। নীরবও উঠে দাঁড়ালো। স্বর্ণার চোখে-মুখে হাস্যোজ্জ্বল দীপ্তি ফুটে আছে। নীরব এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। স্বর্ণাও এগুলো। নীরব দরজা খুলে দিয়ে বললো— `মানুষ যেখানে হেরে যায় বা ঘটনা ও দুর্ভাগ্যক্রমে কেউ যখন বিপর্যস্ত হয়, প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করে তখন ওই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হচ্ছে সাংবাদিকের দায়িত্ব। কিন্তু আমরা দেখি এর উল্টো। সাংবাদিকরা পুলিশ ও প্রভাবশালী মানুষের প্রভাবে ভুল তথ্য গ্রহণ করে ওই অসহায় বা বিপর্যস্ত মানুষকে আরো বিপদে ঠেলে দেন। তারা কেনো জানি প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করেন না। আমি আশা করবো, আপনি সেরকম সাংবাদিক হবেন না।’
নীরবের কথায় কেমন বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো স্বর্ণা। ও বললো— `বুঝতে পারছি, আপনি সাংবাদিকতা পেশার প্রতি খুব বিরক্ত হয়ে আছেন।’
`তা বলতে পারেন। আমাকে নিয়ে সংবাদপত্রগুলো কতো কিছুই না লিখেছে। তাই রাগটাও কমেনি।’ স্বীকার করলো নীরব।
স্বর্ণা বলে— `আমাকে যে উপদেশ দিলেন, তা কিন্তু ভালো। আমি আপনার কথাগুলো স্মরণে রাখার চেষ্টা করবো।’
`শুনে ভালো লাগলো। আমার মতো একজন অপাঙ্ক্তেয় ব্যক্তির কথা মনে রাখবেন বলে।’
স্বর্ণা চোখে-মুখে কপট রাগ ফুটিয়ে বলে— `আপনি নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় ভাবছেন কেনো?’
`বা রে, তা হলে কী ভাববো? খুনের মামলায় সাজা হয়েছে। জেল থেকে বের হয়েছি প্রেসিডেন্ট মার্সিতে। নিজের পরিচয় দেয়ার মতো কী আছে, বলুন?’
এ কথায় একটু হকচকিয়ে গেলো স্বর্ণা। কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললো— `আপনার সঙ্গে যা হয়েছে, তা শুধু চরম অন্যায় নয়, তার চেয়ে ঢের বেশি কিছু। আমি এর সঠিক সংজ্ঞা দিতে পারছি না। আপনার প্রতি আমার সহমর্মিতা প্রকাশ করছি।’
`এসব কী বলছেন? আমার বিপন্ন ভাগ্যের জন্য আপনি কেনো এমনভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন?’ বিব্রত ভাব প্রকাশ করে নীরব।
স্বর্ণার কণ্ঠে কেমন আদ্রতা। ও বলে— `আপনি এখন কী করবেন, ভাবছেন? যেভাবেই হোক কারাগার থেকে বের হয়েছেন। কিছু একটা করবেন নিশ্চয়?’
`হুম, ভাবছি কী করবো। তবে প্রথমে জানার চেষ্টা করবো কে নাবিলাকে খুন করেছে এবং কেনো?’
নীরবের কথায় স্বর্ণার দৃষ্টি তীর্যক হয়। ও বলে— `নাবিলার প্রকৃত খুনির সন্ধান পেলে কী করবেন?’
`কী করতে পারবো জানি না। তবে আমাকে অন্তত জানতে হবে কে নাবিলার খুনি।’
`প্রতিশোধ নিতে চান?’
`তাও জানি না। আবার প্রতিশোধ নিতে পারবো কি-না, তা তো জানি না। আমার এত শক্তি থাকলে কি বিনা অপরাধে খুনের দণ্ডাদেশ মেনে নিতাম?’ এ কথা বলতে গিয়ে একপশলা বিষণ্নতা অনুভব করে নীরব। স্বর্ণার কাছে নিজের অসহায়ত্ত প্রকাশ করে দিয়ে খানিকটা লজ্জিতও বোধ করলো সে।
স্বর্ণা আবেশিত গলায় বললো— `আপনিও তো সাংবাদিকতা পেশায় আসতে পারেন। আসবেন?’
`আমি! বলেন কী! একজন খুনি হবে সাংবাদিক!’
`কিন্তু আপনি তো খুনি নন। আপনি নিজেই তো দাবি করছেন, তা-ই না?’
`কিন্তু সমাজের চোখে আমি একজন খুনি। আমার দাবিতে সমাজের কী যায় আসে?’
`এখান থেকেই শুরু হোক।’ বললো স্বর্ণা।
নীরব অবাক চোখে জানতে চাইলো, `কীসের শুরুর কথা বলছেন?’
`সমাজবদলের কথা বলছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কথা বলছি। আপনি শুরু করুন।’
`এতে কী হবে?’
`অন্তত সমাজ জানবে আপনার মতো কেউ কেউ বা অনেকে কিভাবে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। কিভাবে একজন মেধাবী ছাত্রের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। কিভাবে একজন প্রকৃত খুনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তা ছাড়া সাংবাদিকতা করলে আপনি নাবিলার প্রকৃত খুনিকে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতাও অর্জন করতে পারেন।’
`তা-ই না-কি?’
`হুম। আমার তা-ই মনে হয়। আপনার অর্থ-বিত্ত নেই। মেধা আছে। যদি সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন, তা হলে চাকরি যেমন জুটবে, তেমনি নাবিলা খুনের রহস্য উন্মোচনে শক্তি অর্জন করবেন।’
স্বর্ণার কথায় কেমন শিহরণ অনুভব করলো নীরব। সাংবাদিক হলে কী শক্তি অর্জন হয়? এ পেশায় ও কি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারবে? সত্যিই কি নাবিলার খুনিকে বের করা সম্ভব এবং তাকে শাস্তি দেয়া যাবে? প্রশ্ন উঁকি দেয় ওর মনে। স্বর্ণা যেনো ওর মনের কথা বুঝতে পারে। সে বলে— `আপনি রাজি থাকলে আমি চেষ্টা করবো আপনার জন্য। তবে এ পেশায় নিযুক্ত হওয়া আপনার জন্য সহজ নয়। কারাগার থেকে বের হয়ে এসে স্বাভাবিক জীবনে অ্যাডজাস্ট করতে চাইলেও এই সমাজ সেটা সহজভাবে নিতে চায় না।’
স্বর্ণার কথাটা একেবারে সত্যি মনে হলো নীরবের। ও এর জবাবে কিছু বললো না। স্বর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো। এই হাসির অর্থ `আপনার কথাই ঠিক’। স্বর্ণা বিদায় নিতে বললো— `আজ যাচ্ছি, আবার দেখা হবে।’
`ওকে। বিদায়।’
স্বর্ণা দমকা হাওয়ার মতো দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। একটা ঝড়ো হাওয়া নীরবের ভেতরে তোলপাড় শুরু করলো। স্বর্ণা যেনো ওর ভেতরে অন্যরকম এক ঝড় বইয়ে দিয়ে গেলো। নীরব ডুবে যেতে লাগলো আশ্চর্য বিহ্বলতায়!
পাঁচ.
শাকিল চৌধুরী রহস্য করতে পছন্দ করে। সব কিছুর মধ্যে নাটকীয়তা আনতে চায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলে না। যে কথাই বলে, সেখানে একটা উদ্দেশ্য থাকে যেনো। অকারণে অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে দেখেনি নীরব। শাকিল চৌধুরী নিজের মধ্যেও এক ধরনের রহস্য সৃষ্টি করতে চায়। তার সঙ্গে কয়েকদিন মিশে নীরবের তা-ই মনে হয়েছে। ও বসে আছে তার বাড়ির সুবিশাল ড্রইংরুমে। ওর সামনে বিপরীত দিকের সোফায় বসে আছে শাকিল চৌধুরী। ও ভেবে পায়নি ওকে কেনো শাকিল চৌধুরী তার বাড়িতে আসতে বলেছে। শাকিল চৌধুরী তার ড্রইংরুমে বসে পেপার পড়ছিল। নীরব এই রুমে প্রবেশ করতেই চোখের ইশারায় তার সামনের সোফায় বসতে বলে ওকে। নীরব সোফায় বসে শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভেবে নিলো। নীরব আগে কে কেমন মানুষ, ভাবতো না। জেলখানায় থেকে ওর চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন এসেছে। বদলে গেছে দৃষ্টিভঙ্গি। কয়েক মুহূর্ত পর শাকিল চৌধুরী পত্রিকা থেকে মুখ তুললো। সে নীরবের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। নীরবের ভেতরে কুয়াশার মতো জমে থাকা অস্বস্তি কেটে যেতে থাকে। শাকিল চৌধুরী ওর চোখে চোখ রেখে বলে— `বাড়ি চিনতে কি অসুবিধা হয়েছে?’
`না। ট্যাক্সিওয়ালাকে ঠিকানাটা দিলাম। সে তো নামিয়ে দিলো আপনার বাড়ির গেটের সামনে। আপনার বাড়িটি অনেক বড়, সুন্দর।’
`তা-ই?’
`হুম, এটাকে বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলা যায়।’
`আপনাকে একটা কথা বলে নিচ্ছি, এই বাড়ি বা প্রাসাদের মালিক কিন্তু আমি নই।’ রহস্য সৃষ্টি হয়, এমনভাবে কথাটা বললো শাকিল চৌধুরী।
নীরব ক্ষীণকণ্ঠে জানতে চাইলো— `তা হলে এ বাড়ির মালিক কে?’
`আমার স্ত্রী। ঢাকা শহরে ওর নামে এরকম বেশ কয়েকটি প্রাসাদ সমতুল্য বাড়ি রয়েছে। ও বিপুল সম্পত্তির মালিক। বলতে পারেন, আমি একজন ধনাঢ্য মহিলার স্বামী। হা-হা-হা।’
শাকিল চৌধুরীর এ কথাটা অপ্রয়োজনীয় মনে হলো নীরবের। ও কী বলবে, ভাবছিল। শাকিল চৌধুরী ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো— `বাই দ্য ওয়ে, আপনি কী খাবেন?’
`আমি কিছু খাবো না। কিছুক্ষণ আগেই নাস্তা খেয়েছি।’
`তা হলে চা বা কফি দিতে বলি?’
`না, না। চা খেয়েছি। এখন আমি কিছুই খেতে পারবো না। আমাকে আপনার বাড়িতে কেনো ডেকেছেন, সেটি বলুন।’
নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো শাকিল চৌধুরী। `কারণ তো অবশ্যই আছে। আমাদের দিক থেকে কারণটা গুরুত্বপূর্ণ।’
`ঠিক বুঝলাম না। একটু খুলে বলবেন কি?’
`আপনি কি আমার স্ত্রীকে চেনেন?’
`না। আপনার স্ত্রী কে, তা তো আমি জানি না।’
`আমার স্ত্রীর নাম তানজিলা। চেনেন?’ শাকিল চৌধুরীর চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো।
নীরব বললো, `না। এই নামে কাউকে চিনি না আমি।’
ওর কথায় হো-হো-হো করে হেসে উঠলো শাকিল চৌধুরী। নীরব একটু বিব্রত হলো। শাকিল চৌধুরীর স্ত্রীকে না চেনার কথা সে যেনো বিশ্বাস করতে পারেনি। নীরব প্রশ্ন করলো, `আপনি হাসছেন কেনো? আমার কথা বিশ্বাস করছেন না?’
`ঠিক তা নয়। আপনি হয়তো আমার স্ত্রীর কথা স্মরণ করতে পারছেন না। আসলে আপনি তাকে চেনেন।’
`কী বলছেন? আমি চিনি!’
`হুম, চেনেন। অনেক দিন পর তানজিলার নাম হয়তো ভুলে গেছেন। আমি অবশ্য ভেবেছিলাম, নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আপনি চিনতে পারবেন।’
শাকিল চৌধুরীর কথায় একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো নীরব। ও নিজের স্মরণশক্তি প্রবলভাবে প্রয়োগ করে স্মৃতিতে হাতড়াতে লাগলো তানজিলার নাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তানজিলার কথা মনে পড়লো ওর। স্মৃতি হাতড়ে নীরব ফিরে গেলো তানজিলার সঙ্গে পরিচয়ের দিনটিতে। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো পেছনের ঘটনা। একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তানজিলার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল। নীরব তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। এফএম হলে থাকে। ঢাকা শহরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এই নাগরিক কোলাহলমুখর শহরটাকে ওর অচেনা আর রহস্যময় লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছাড়া আশপাশে ঘুরতে গেলে ওর বুক দুরুদুরু কাঁপে। এ কথা নীরব কাউকে বলতো না। নীরব প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে একটি টিউশনির জন্য ইন্টারভিউ দিলো। গ্রাম থেকে ওর বাবা যৎসামান্য যে অর্থ ওকে পাঠাতেন, এতে নীরব কুলিয়ে উঠতে পারতো না। পাবলিক লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়তে গিয়ে একদিন একটি বিজ্ঞাপনে ওর দৃষ্টি আটকে যায়। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে চতুর্থ গ্রেডের এক ছাত্রকে সপ্তাহে দুদিন পড়াতে হবে। শুক্র ও শনিবার বিকেলে দুঘণ্টা করে। শুক্রবার ছুটির দিনে টিউশনিতে অনেকের আগ্রহ সৃষ্টির কথা নয়। এই আশা নিয়ে নীরব ফোন করেছিল বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত ফোন নম্বরে। ইন্টারভিউ দিয়ে নীরব টিউশনিটা পেয়েও যায়। সাদমান নামে ৯ বছরের এক শিশুছাত্রকে ও পড়িয়েছে ছয় মাস। ভালো বেতন পেতো। সপ্তাহে দুদিন পড়িয়ে ও মাসে বেতন পেতো চার হাজার টাকা। এ যেনো স্বপ্নের মতো। ঢাকা শহরের বাস করতে গিয়ে এটাই ছিল ওর জীবনের প্রথম বিস্ময় আর গভীর আনন্দময় ঘটনা। ও ভাবতে পারেনি এতোগুলো টাকা টিউশনি করে পেয়ে যাবে। সাদমানের বাবাকে ও ছয় মাসে একবারো দেখেনি। সাদমানের বাবা শহিদুল হক এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যস্ত ব্যবসায়ী। তিনি ঢাকা, হংকং, দুবাই, লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্ক ছুটে বেড়ান। সাদমানের মা মুনমুন হক শক্ত হাতে সন্তানকে আগলে রাখতে পছন্দ করতেন। সাদমানকে নীরব যতোক্ষণ পড়াতো, সাদমানের মা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন যেনো। নীরবের এরকম মনে হতো। কিন্তু সাদমানের মা রুমে আসতেন না। পড়া শেষ হলে কাজের বুয়া এসে মুখরোচক খাবার আর চা রেখে যেতো। নীরব ওসব খেয়ে নিঃসংকোচে চলে আসতো। মাস শেষে বেতন দেবার দিন সাদমানের মা নীরবের সামনে আসতেন। তিনি একটি খাম বাড়িয়ে দিতেন নীরবের দিকে। নীরব হাসিমুখে এবং অনেকটা নতমুখেই খামটি নিতো। হিসাব করলে ছয় মাসে ছয়বার নীরব সাদমানের মাকে দেখেছে; কিন্তু সে তার মুখটি কেমন তা বলতে পারবে না। কারণ, নীরব সাদমানের মায়ের মুখের দিকে তাকায়নি। একদিন সাদমানকে পড়িয়ে রিকশায় চড়ে হলের দিকে ফিরছিল নীরব। ধানমন্ডি দুই নম্বর এলাকায় আসতেই একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার মুখোমুখি হলো ও। নীরব একটু অন্যমনস্ক ছিল, হঠাৎ ও দেখতে পেলো সন্ধ্যার আলো-ছায়ায় চার যুবক এক রিকশা আরোহী তরুণীর কাছ থেকে কী যেনো ছিনিয়ে নিচ্ছে। তরুণী কোনো বাধা দিচ্ছে না। রাস্তাটা ফাঁকা হলেও একটু দূরে দুজন লোক দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে; কিন্তু তারা কিছু বলছে না। নীরব তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারেনি যে তরুণীটি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছে। তা হলে হয়তো ও ভয় পেতো। ও জানে, ঢাকায় প্রতিনিয়ত ছিনতাই হয় এবং ছিনতাইকারীদের কাছে অস্ত্র বা বোমা থাকে। ছিনতাইকাজে বাধাপ্রাপ্ত হলে ছিনতাইকারীরা খুন করতেও পিছপা হয় না। নীরব একটু ভয়কাতুরে হলেও মাঝে মাঝে ওর বোধশক্তি কেমন জানি হয়ে যায়। ও মাঝে মাঝে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে অবিবেচকের মতো পা বাড়িয়ে দেয়। নিজেকে ধরে রাখতে পারে না নীরব। অগ্রপশ্চাৎ কিছু না ভেবে অনেকটা বোকার মতো ঘটনার আবর্তে এগিয়ে যায়। সেদিনও হলো তা-ই। তরুণীর কাছ থেকে একটি ক্যামেরা, গলায় লটকানো সোনার চেইন ছিনিয়ে নিয়ে কানে লটকানো সোনার দুল ছিনিয়ে নেবার সময় পেছন থেকে ধমকের কণ্ঠে নীরব বললো— `এই, কী হচ্ছে! তোরা কারা?’
নীরবের কণ্ঠ যেনো গর্জে ওঠে। ওর কণ্ঠ শুনে চার যুবকই ভড়কে গেলো। ওরা তরুণীটিকে ছেড়ে একরকম দৌড় দিলো। নীরব ওদের উদ্দেশে চিৎকার করে উঠলো— `এই দাঁড়া বলছি, পালাবি না!’
ছিনতাইকারীরা রাস্তার পাশে রাখা একটি ফক্সওয়াগন গাড়িতে হুড়মুড় করে উঠে পড়লো। নীরব সোৎসাহে রিকশা থেকে লাফিয়ে নেমে ছিনতাইকারীদের পেছনে দৌড়ে গেলো। দ্রুতগতিতে চলে গেলো ছিনতাইকারীদের গাড়িটি। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুজন লোক ওর দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। নীরবের ভেতরে চাপা সাহস পেখম ছড়িয়ে গেছে। ও ঘুরে এসে দেখলো তরুণীটি তার রিকশায় বসে আছে। চোখে-মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। তবে তরুণীটি ওর দিকে মুগ্ধচোখে তাকিয়ে আছে। নীরব তার কাছে এসে বললো— `দুঃখিত, ওরা পালিয়ে গেলো। আপনার জিনিসগুলো ফিরে পাবেন না।’
নীরব দাঁড়ালো তরুণীটির রিকশার সামনে। রিকশাওয়ালা রিকশার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নীরবের কথায় তরুণীটি কণ্ঠে বিস্ময় ফুটিয়ে তুলে বললো— `আপনার অনেক সাহস দেখলাম! ব্র্যাভো!’
তরুণীর কথায় নীরবের অবাক হবার পালা। ওকে কেউ কখনো সাহসী বলেনি। নীরব অনেকটা নিরীহ টাইপের ছেলে। মাঝে মাঝে ওর মধ্যে অদম্য সাহস মাথাচাড়া দেয় ঠিক, কিন্তু এর কোনো প্রকাশ কেউ দেখেছে কি-না ও বলতে পারবে না। আজ যেনো অদম্য সাহসের প্রকাশ ঘটেছে। তরুণীটির প্রশ্নে অদম্য সাহসটুকু মিলিয়ে যেতে লাগলো। নীরব চুপসে যাওয়া গলায় বললো— `আমি মোটেই সাহসী নই। আমার বন্ধুরা আমাকে ভীতু বলেই ট্রিট করে।’
নীরবের কথায় হেসে ফেললো তরুণী। সে বললো— `আপনি রসিকতা করছেন, না?’
`রসিকতা করবো কেনো? এমন একটি দুর্ঘটনার পর আপনি রসিকতা পছন্দ করবেন না, এটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার আছে।’ বললো নীরব।
তরুণীটির চোখে-মুখে হাসির দীপ্তি ফুটে আছে। ও বললো— `বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম তানজিলা।’ নিজের নাম বলে মিষ্টি করে হাসলো তানজিলা।
নীরব এর জবাবে বললো— `আমার নাম নীরব।’
`কোথায় থাকেন?’ জানতে চাইলো তানজিলা।
নীরব ঝটপট উত্তর দিলো— `বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।’
`তা-ই? কী বিষয়ে পড়ছেন?’
`লোক প্রশাসনে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে।’
`আমি পড়ছি ও লেভেলে। সাউথ-ইস্ট ইউনিভার্সিটিতে।’
`ও, আচ্ছা। আপনার কাছ থেকে ওরা কী ছিনিয়ে নিয়ে গেলো?’ কৌতূহল প্রকাশ করলো নীরব।
তানজিলা স্মিত হেসে বললো— `তেমন কিছু নেয়নি। একটা ক্যামেরা, একটি সোনার চেইন এই আর কী। কানের দুলও নিতো, তা আর পারলো কোথায়! আপনি এসে হাজির হলেন।’
`আপনি সোনার গহনা পরে রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেনো বলুন তো?’
`কেনো ঘুরবো না?’ জানতে চাইলো তানজিলা।
নীরব বললো— `আপনি কি জানেন না, এই শহরে এসব পরে রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোটা নিরাপদ নয়?’
`জানি।’
`তা হলে? এ কথা জেনেও স্বর্ণালঙ্কার পরে ঘুরছেন?’
এর জবাবে গলা নামিয়ে তানজিলা বললো— `আসলে আমি নিজেও চাচ্ছিলাম ছিনতাইকারীরা আমার গহনা ছিনিয়ে নিয়ে যাক।’
তানজিলার কথা শুনে নীরব আঁতকে ওঠে। মেয়েটি বলে কী! নীরব মনে মনে প্রমাদ গোনে। ও বলে— `ঠিক বুঝলাম না। আপনি কেনো চাচ্ছিলেন যে ছিনতাইকারীরা আপনার গহনা ও ক্যামেরা ছিনতাই করে নিয়ে যাক?’
`মানে, ছিনতাই সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাই ভাবছিলাম যদি ছিনতাইকারীর কবলে পড়ি, ভালোই হবে।’
`সত্যি বলছেন!’
`হুম, সত্যি। হলোও তা-ই। এখানে আসতেই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়লাম। কিন্তু আপনি এসে পড়ায় পুরোপুরি অভিজ্ঞতা অর্জন করা হলো না।’
`রিয়েলি! আই অ্যাম সরি। আমি ঠিক করিনি।’ নীরবের কণ্ঠে বিদ্রƒপ ধ্বনিত হয়।
তানজিলা নীরবের বিদ্রƒপ বুঝতে পারলো যেনো। ও মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, `আপনি যা করেছেন, তা কেউ করে না। দেখলাম তো দুজন লোক ছিনতাইয়ের দৃশ্য দেখছিল। তারা কিন্তু টুঁ শব্দও করেনি।’
`হুম। তাতে কী? আমারও পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া উচিত ছিল।’
`কিন্তু আপনি তা পারেননি। আপনার বিবেক আর সাহস আপনাকে ছিনতাইাকারীদের বিরুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছে। আপনি হচ্ছেন বিবেকসম্পন্ন সাহসী পুরুষ।’
`পুরুষ’ শব্দটা শুনে নীরব কেমন শিউরে ওঠে। এক ধরনের শিহরণ অনুভব করে ও। তানজিলার কথার জবাবে নীরব কিছু বললো না। তানজিলা বললো, `কিছু বলছেন না যে!’
`কী বলবো আমি? এখন আপনি কী করবেন?’
`বাসায় ফিরে যাবো। ভেবেছিলাম শাহবাগ যাবো। এখন আর যাবো না।’ বললো তানজিলা। ও নীরবের দিকে তাকিয়ে আছে।
নীরব বললো— `থানায় যেতে পারেন। ছিনতাইয়ের ঘটনা পুলিশকে জানাতে পারেন। পুলিশ হয়তো ওদের গ্রেফতার করতে পারে এবং আপনার জিনিস ফিরেও পেতে পারেন।’
নীরবের কথায় ম্লান হাসলো তানজিলা। ও বললো— `পুলিশকে এ কথা জানালে কোনো লাভ হবে না। শুনেছি, ছিনতাইকারীরা পুলিশকেও বখরা দেয়। পুলিশ সব সময় চোখ বুজে থাকে।’
`তা-ই বলে…’
`তা-ই বলে কিছুই হবে না। অহেতুক সময় নষ্ট করা।’
`ঠিক আছে, আপনি যা মনে করেন। থানায় গেলে আমি না হয় সাক্ষী দিতাম।’
`এখানেও বিপদ আছে। পুলিশ তখন প্রশ্ন করবে আপনি আমার কী হন। আমরা প্রেম করছি কি-না। আরো অশালীন প্রশ্ন করতে পারে।’
তানজিলার কথা শুনে থ’ হয়ে গেলো নীরব। এসব কী বলছে ও! এ মুহূর্তে তানজিলাকে ওর কেমন পাগলাটে মনে হলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় নীরব বিদায় নেয়ার কথা ভাবছে। ও বললো— `তা হলে আমি কি যাবো?’
`ঠিক আছে যান। আমাকে আপনার ফোন নম্বর দিয়ে যান। পরে ফোনে কথা বলবো।’
এ কথায় লজ্জায় পড়ে গেলো নীরব। ওর কোনো সেলফোন নেই। এ কথা বলতে ওর লজ্জা লাগলো। ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া ছাত্রের কাছে সেলফোন নেই, কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু নীরবের কোনো সেলফোন নেই। সেলফোনের ব্যবহার ওর কাছে অপরিহার্যও নয়। তবে বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গে কথা বলতে একটা সেলফোনের প্রয়োজনীয়তা ও অনুভব করছিল। টিউশনির বেতন পেলে এবার ও একটা সেলফোন কিনবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। তানজিলার কথার জবাবে ও লজ্জিতকণ্ঠে বললো— `আমার সেলফোন নেই। আই মিন, আমার সেলফোন লাগে না। তবে ভাবছি, একটা সেলফোন নেবো।’
নীরবের কথায় ধাক্কা খেলো যেনো তানজিলা। ও কয়েক মুহূর্ত নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তানজিলার উদ্দেশে নীরব বললো— `আপনি অবাক হচ্ছেন, এই তো? কিন্তু আমি সত্যি কথাই বলছি, আমার কোনো সেলফোন নেই। আপনার নম্বর দিন। আমি যখন সেলফোন কিনবো, সঙ্গে সঙ্গেই আমার সেলফোনের নম্বর জানিয়ে দেবো।’
সন্ধ্যার জমে যাওয়া অন্ধকারে নীরব দেখতে পেলো না, তানজিলার চোখে-মুখে ফুটে থাকা বিস্ময় কিভাবে বিষণ্নতার রংধনু হয়ে মিলিয়ে গেলো এক নিমিষে। তানজিলার ভাষামূক মদিরতাকে ভেঙে দিয়ে নীরব বললো— `আমি আসি। আপনি কি আপনার ফোন নম্বর দেবেন?’
তানজিলা ককিয়ে উঠল যেনো। বললো— `আমার ফোন নম্বর দিচ্ছি। আমাকে ফোন করবেন, এই কথা কিন্তু দিতে হবে।’
তানজিলার কথায় অবাক হয় নীরব। তানজিলাকে ফোন না করার কী আছে? একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিচিত তানজিলার সঙ্গে ফোনে কথা বললে পৃথিবীর কারো কিছু যায়-আসে না। ফোন না করলেও পৃথিবীর কারো কিছু যায়-আসে না, মনে মনে ভাবলো নীরব। তানজিলা একটা কাগজে ওর ফোন নম্বর লিখে বাড়িয়ে দিলো নীরবের দিকে। ও বললো— `আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো। আমাকে কাল একবার ফোন দেবেন। এরপর প্রতিদিন একবার ফোন দেবেন। মনে থাকবে?’ তানজিলার কণ্ঠে অনুনয় ফুটে ওঠে।
লজ্জিতকণ্ঠে নীরব বলে— `ঠিক আছে, ফোন করবো।’
`কথা দিচ্ছেন?’
`কথা দিলাম।’
`প্রমিজ!’
`প্রমিজ।’
প্রমিজ করেই তানজিলার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল সেদিন। কিন্তু নীরব ওই প্রমিজ রক্ষা করতে পারেনি। তানজিলার ফোন নম্বর লেখা টুকরো কাগজটি সেদিন রাতে হারিয়ে ফেলেছিল ও। পরের দিন তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওই টুকরো কাগজটি খুঁজে পায়নি। আর তানজিলাকে ফোনও করা হয়নি। আজ এতোদিন পর সেই তানজিলার কথা তুললো শাকিল চৌধুরী। সেই তানজিলাই কি শাকিল চৌধুরীর স্ত্রী? প্রশ্ন ওর মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই শিহরণ ছড়িয়ে পড়লো নীরবের অনুভবে। একরাশ লজ্জা এসেও গ্রাস করে। তানজিলাকে কথা দিয়েছিল তাকে ও ফোন করবে। কিন্তু ফোন ও করতে পারেনি। আজ যদি তানজিলার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তা হলে কথা না রাখার লজ্জা ওকে বিব্রত করে দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ছোট্ট একটি ঘটনার কারণে তানজিলা কেনো ওকে মনে রাখবে? শাকিল চৌধুরীই বা কেনো জানবে তানজিলার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল? এমন কী বিশেষ ঘটনা যে, শাকিল চৌধুরী ওকে বাড়িতে ডেকে এনেছে তার স্ত্রী তানজিলার সঙ্গে ফের দেখা করিয়ে দেবে? নীরব রহস্যের ঘেরাটোপে পড়ে গেলো। শাকিল চৌধুরী ওর ভেতরের বিস্ময়ের ধাক্কা কান পেতে শুনে ফেললো যেনো। সে বললো— `কী ভাবছেন? আপনাকে তানজিলার কথা কেনো বললাম, এই তো?’
`হুম। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তানজিলা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার একবার মাত্র দেখা হয়েছিল একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায়। খুব সাধারণ এবং অর্থহীন একটি ঘটনা। সে কথা তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম!’
`নীরব সাহেব, আপনার দিক থেকে যে ঘটনাটি সাধারণ ছিল, তানজিলার দিক থেকে সেদিনের ঘটনাটি অসাধারণ ছিল।’
`মানে!’ বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব।
শাকিল চৌধুরী বলে— `ওই একটিমাত্র ঘটনায় তানজিলার মানসপটে আপনি বীরের মর্যাদায় আসীন হয়ে আছেন।’
`সেটা তো খুবই তুচ্ছ ঘটনা ছিল।’
`কখনো কখনো সামান্য ঘটনা অসামান্য রেখাপাত সৃষ্টি করে। গভীর ক্ষতেরও সৃষ্টি করে।’
`আপনি কেনো যে এসব কথা বলছেন, জানি না।’ বললো নীরব। ও একটু বিব্রতবোধ করছে।
শাকিল চৌধুরী বলে— `আমি কিন্তু আজ আপনাকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো। ও খুবই চমকে যাবে। আমি ওকে চমকে দিতে চাই।’
`আপনার ধারণা ভুলও হতে পারে। আমাকে তিনি মনে রাখবেন, এমন কথা নয়।’
`আপনি কেনো এ কথা বলছেন?’
`কারণ, একটি ছোট ঘটনা জীবনে চলার পথে অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহে হারিয়ে যায়। আমি যেমন আপনার স্ত্রীর কথা ভুলে গিয়েছিলাম, তেমনি তিনিও আমার কথা ভুলে গেছেন।’
`না, না। বরং উল্টো হয়েছে। তানজিলা আপনাকে ভীষণ স্মরণ করে। আপনি জানেন, কখনো কখনো ছোট একটি ঘটনাও কারো জীবনের এমন প্রভাব ফেলে যে, সে চাইলেও তা মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। অথচ যাকে নিয়ে ঘটনার জন্ম, সে হয়তো এর বিন্দুবিসর্গও জানে না।’
`আজ এতোদিন পর এসব কথা কি গুরুত্বপূর্ণ?’ বিব্রতবোধ প্রকাশ করে জানতে চাইলো নীরব।
শাকিল চৌধুরী মৃদু হাসার চেষ্টা করলো। তার চোখে-মুখে কেমন কৌতূহল ফুটে ওঠে। নিজের স্ত্রী কোন এক যুবককে বিশেষ কোনো কারণে পছন্দ করতো, সেই ব্যক্তিকে স্ত্রীর সামনে এনে হাজির করে তার কী আনন্দ বা প্রাপ্তি, তা ভেবে পেলো না নীরব। তার মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ মানসিকতা রয়েছে কি? প্রশ্নটা উঁকি দিলো নীরবের মনে। ও এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চায় না। শাকিল চৌধুরী বললো— `কী যেনো বলছিলেন, এতোদিন পর এসব কথা গুরুত্বপূর্ণ কি-না?’
`হুম, তা-ই বলছিলাম।’
`আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, আপনাকে যে আমি জেলখানা থেকে বের করে এনেছি, এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ ঘটনা। মানে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে যদি আপনার দেখা না হতো, তা হলে আমি হয়তো আপনাকে জেলখানা থেকে বের করতাম না।’
শাকিল চৌধুরীর কথায় নীরব অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে। জীবনের কোন এক তুচ্ছ ঘটনা জীবনের এক বিশেষ সময়ে এসে কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো। নীরব এর জবাবে কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পেলো না। নীরব ভাবলো, শাকিল চৌধুরী কি ধূর্ত ব্যক্তি, না কি উদার মানসিকতাসম্পন্ন? নিজের স্ত্রী যে যুবককে পছন্দ করেছিল, তাকে স্ত্রীর সামনে এনে হাজির করে তার কি আনন্দিত হবার কথা? অথচ শাকিল চৌধুরীর আচরণে তা-ই প্রকাশ পাচ্ছে। শাকিল চৌধুরী নীরবের দিকে তাকিয়ে বললো— `চুপ করে আছেন যে!’
`কী বলবো? কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’
`আপনাকে দেখে তানজিলাও কিছু বলতে পারবে না হয়তো। ভাষা হারিয়ে ফেলবে সেও।’
`কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, এ নিয়ে আপনি এতো এক্সাইটেড কেনো?’
`হা-হা-হা।’ গলা ছেড়ে হেসে উঠলো শাকিল চৌধুরী। নীরব তার হাসির সামনে বিব্রতবোধ করলেও মুখের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করলো না। হাসি থামার পর শাকিল চৌধুরী বললো— `আমি নাটকীয়তা পছন্দ করি বলেছিলাম না?’
`হুম, বলেছিলেন।’
`তা হলে ধরে নিন, আমার স্ত্রীর পুরনো প্রেমকে তুলে এনে এক ধরনের নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে চাই।’
`আশ্চর্য! আপনি এখানে প্রেম কোথায় দেখলেন? একদিনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে প্রেম বলে চালিয়ে দিচ্ছেন?’
`আপনার দিক থেকে একদিনের ঘটনা। কিন্তু আমার স্ত্রীর দিক থেকে তা নয়। আপনি কি জানেন, আপনি তাকে ফোন না করায় সে আপনার সন্ধান করেছিল?’
`তা-ই না-কি! স্ট্রেঞ্জ!’
`হুম, সত্যি কথাই বলছি। আরো শুনবেন? সে কিন্তু আপনাকে খুঁজেও বের করেছিল।’
`মানে?’
`মানে, চার বছর পর আপনাকে সে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ক্যাম্পাসে খুঁজে বের করেছিল।’
`আপনি এবার কল্পনা করে গল্প তৈরি করছেন, মনে হচ্ছে।’
নীরবের কথায় ফের `হো-হো’ করে হেসে উঠলো শাকিল চৌধুরী। নীরব অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। হাসি থামার পর শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনাকে খুঁজে বের করলেও সে কিন্তু আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়নি।’
`কেনো? খুঁজেই যদি বের করবেন, তা হলে সামনে আসেননি কেনো?’
`কারণ, আপনাকে সে দেখতে পেয়েছিল নাবিলার সঙ্গে।’
`কী বলছেন!’
`হুম। এতে তার মন ভেঙে যায়। সে খুব শকড হয়েছিল।’
`কিন্তু চার বছর পর তিনি আমাকে খুঁজবেন কেনো? আপনার কথায় ফাঁক আছে।’
`কারণ, আপনার সঙ্গে পরিচয় হবার পরপর সে লন্ডনে চলে গিয়েছিল পড়াশোনার জন্য। কিন্তু আপনাকে সে কখনো ভুলতে পারেনি।’
`আমার বিস্ময় বাড়ছে!’ বলে নীরব। ও এসব কথায় সংকোচবোধ করছে। কিন্তু শাকিল চৌধুরী সপ্রতিভ। সে বলে, `সে একপর্যায়ে ঢাকায় ফিরে এসে আপনার সন্ধান করে এবং ক্যাম্পাসে আপনাকে খুঁজে বের করে।’
`এরপর?’ নীরবের কণ্ঠে কৌতূহল।
শাকিল চৌধুরী সোৎসাহে বলে— `এরপর সে বুঝতে পারে যে, আপনি অন্য একজনের সঙ্গে প্রেম করছেন। ব্যস, ও ফের চলে যায় লন্ডন।’
`আপনার কথা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে। আই অ্যাম ফিলিং ভেরি ব্যাড।’
`মন শক্ত করুন। আপনাকে শক্ত হতে হবে।’
`কিন্তু আপনি আমার সামনে যে গল্প তৈরি করছেন, এর জন্য আমি প্রস্তুত নই।’
`হা-হা-হা। গল্প তৈরি করছি না আমি। গল্প না হয়ে ওঠা একটি গল্পের কারণ জানিয়ে দিলাম আপনাকে। এর পেছনে আমার একটি উদ্দেশ্য অবশ্য আছে। হা-হা-হা।’
নীরব অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে। সে হাসছে। নীরবের মনে হলো শাকিল চৌধুরীর মানসিক রোগ আছে। এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। শাকিল চৌধুরী সম্পর্কে ওর ধারণা স্পষ্ট হলো যে, সে একজন মানসিক রোগী এবং ধূর্ত ব্যবসায়ী। ভাবনায় ডুবে গেলো নীরব। ওর মনে হলো, মানুষের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ একেকটি সিঁড়ির মতো। সিঁড়ি ভেঙে চলে যাওয়া, স্মৃতি রোমন্থনে ফের সিঁড়ি ভেঙে ফিরে আসা। যে ঘটনা জীবনে চলার পথে তুচ্ছ মনে হয়, সে ঘটনাটিই হয়তো গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে থাকে। নীরব যেমন জানতো না, তুচ্ছ এক ঘটনার কেন্দুবিন্দু হয়ে তানজিলা কিভাবে ওকে মনে রেখেছে। আবার তুচ্ছ ঘটনাটির কারণে তানজিলা ওকে মনে রেখেছে গভীর আন্তরিকতায় এবং ও কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু ওর জীবনে তানজিলার কোনো অবস্থান নেই। তানজিলা ভোরের দুর্বাঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুর মতো ক্ষণস্থায়ী। ভোরের শিশিরের কথা যেমন কেউ মনে রাখে না, তানজিলার কথাও ওর মনে ছিল না। আজ ও জানতে পারলো অদৃশ্যভাবে তানজিলা ওর জীবনে কতোটা প্রভাব ফেলেছে। তানজিলার কারণে ও আজ কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছে। নীরবের তন্ময়তা ভাঙলো শাকিল চৌধুরীর কথায়। শাকিল চৌধুরী বললো— `ডার্লিং, দেখো তো চিনতে পারো কি-না?’
শাকিল চৌধুরীর কথায় নীরব মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো, তানজিলা ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তানজিলাকে দেখে চিনতে কষ্ট হলো না ওর। যদিও তানজিলাকে ও একদিন মাত্র দেখেছিল। আজ ছয় বছর পর ওকে দেখে চিনতে পারলো নীরব। বিয়ের পর মেয়েরা সাধারণত নারী হয়ে যায়। তাদের মধ্যে এক ধরনের মাতৃত্ব ফুটে ওঠে। কিন্তু তানজিলার এরকম মাতৃত্বভাব দেখতে পেলো না নীরব। শাকিল চৌধুরী তানজিলার দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে কথাটা বলে তাকিয়ে ছিল স্ত্রীর মুখের দিকে। স্বামীর কথায় তানজিলা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো নীরবের মুখের দিকে। ওর মুখে এক ধরনের অনুচ্চারিত হাসির আভা ফুটে উঠলো। তানজিলার কপালে ভাঁজ পড়েছিল। ও নীরবের মুখোমুখি এসে সোফায় বসে আন্তরিক গলায় বললো— `অ-নে-ক দিন পর আপনাকে দেখলাম!’
নীরবের মুখে কোনো কথা ফুটলো না। ওর বুকের ভেতর একটা তোলপাড় চলছে। মিহিন ভাঙচুর হচ্ছে। তানজিলা ফের বললো— `আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে, এ আমি ভাবিনি! নিশ্চয় শাকিল আপনাকে নিয়ে এসেছে?’ কথাটা বলে সে তাকালো স্বামীর দিকে। শাকিল চৌধুরী হাসছে। স্ত্রীকে খুশি করতে পেরে তার যেনো মহানন্দ, নীরব লক্ষ্য করলো তা। তানজিলা নীরবের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আফসোস করে বললো- `আপনি কেমন মুটিয়ে গেছেন!’
এর জবাবে শাকিল চৌধুরী বললো— `দুবছর কারাগারে বন্দি ছিল, ডার্লিং! তার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে।’
`ওহ! তাই তো! বাই দ্য ওয়ে, আপনি খুনের মামলায় জড়িয়ে গেলেন কেনো?’
প্রশ্নটির জবাব দেয়া দরকার। ভেবে নিলো ও। তানজিলার সঙ্গে ওর দেখা হবে, এটা ও নিজেও ভাবেনি। কিন্তু ঘটনাক্রমে ও এখন তানজিলার মুখোমুখি। নীরব তানজিলার উদ্দেশে বললো— `আমি ঘটনাক্রমে খুনের মামলায় জড়িয়ে যাই। একজনকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ি। গ্রেফতার হই খুন করার অভিযোগে। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি।’
`হুম। প্রেমিকাকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন, তা-ই তো?’ তানজিলা প্রশ্নটি করে হাসতে লাগলো। নীরব এর জবাবে কী বলবে ভেবে পেলো না। নাবিলাকে প্রেমিকা বলতে ওর সংকোচ লাগছে। অথচ আগে সংকোচবোধ করতো না ও। বিশেষ করে এ মুহূর্তে তানজিলার সামনে নাবিলাকে প্রেমিকা হিসেবে পরিচয় দিতে অস্বস্তি লাগছে ওর। তানজিলার চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক লেগে আছে।
নীরব বলে— `বন্ধু হোক, প্রেমিকা হোক, নাবিলাকে বাঁচাতে পারিনি। বরং ওকে খুন করার মিথ্যা অভিযোগে ফেঁসে গেলাম।’
`আমি কিন্তু বিশ্বাস করিনি। আমার মনে হয়েছে আপনি খুন করতে পারেন না।’ কথাটা বলে তানজিলা তাকালো ওর স্বামীর দিকে।
শাকিল চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে বললো, `আমিও তা-ই মনে করেছিলাম।’
নীরব বলে— `আপনাদের কথা শুনে ভালো লাগলো। আমি তো ভেবেছিলাম, সবার চোখে আমি খুনি হয়ে গেলাম।’
তানজিলা নীরবের দিকে তাকিয়ে বললো— `নাবিলাকে আপনি খুব ভালোবাসতেন, নীরব?’
প্রশ্নটা নীরবকে বিব্রত করে দেয়। ও এর জবাবে কী বলবে? ও তানজিলার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। শাকিল চৌধুরীর চোখে-মুখে কৌতূহলের হাসি। তানজিলা ফের বলে— `থাক, প্রশ্নটার জবাব দিতে হবে না। তবে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে।’
`কী কথা বলুন।’ তাগিদ দেয় নীরব।
তানজিলা বলে, `নাবিলা খুব সুন্দরী ছিল। অসম্ভব সুন্দরী! আমার হিংসা হতো!’ কথাটা বলে তানজিলা খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলো। তানজিলার হাসির সামনে নিজেকে কেমন অসহায় লাগলো নীরবের। তানজিলার হাসির মুদ্রায় নাবিলার হাসির রহস্য দেখতে পায় ও। সব নারীর হাসিতে কি রহস্যের সৌন্দর্য বিধৃত হয়? তানজিলার সোন্দর্যবিধৃত রহস্যময় হাসির সামনে চুপসে থাকে ও। যেমন চুপসে থাকত নাবিলার হাসির সামনেও।
ছয়.
ধানমন্ডির শঙ্কর এলাকায় থাকেন মমতাজ আহমেদ। প্রাসাদতুল্য তার বাড়ি। বাড়ির গেট থেকে বাড়ির অভ্যন্তর পর্যন্ত লোকজনের ভিড় দেখতে পেলো নীরব। ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ হলে যা হয়। পার্টির লোক, সমস্যাগ্রস্ত মানুষের যাওয়া-আসা তো আছে, সে সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও মমতাজ আহমেদের বাড়িতে আসেন। গণসংযোগ রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ। এটি বিশ্বাস করেন এবং গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলেন মমতাজ আহমেদ। তার বাড়িতে প্রবেশ করে ড্রইংরুমের সামনে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল নীরব। দুই যুবক কথা বলছিল মমতাজ আহমেদকে নিয়ে। যুবকদের কথার সারমর্ম হচ্ছে মমতাজ আহমেদ রাজনীতিবিদ হিসেবে যেমন প্রাজ্ঞ, গণসংযোগেও তেমনি পারদর্শী। তার কাছে মানুষ আশা নিয়ে আসেন এবং ওই সকল মানুষদের তিনি ফেরান না। সহযোগিতা করতে পারলে করেন, নইলে আশা জাগিয়ে রাখেন। দুই যুবক নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনে নীরবের ভালো লাগলো। মমতাজ আহমেদ কাউকে ফেরান না— কথাটি শুনে ওর মনের মধ্যে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠলো। নীরব একটি আশা নিয়েই আজ তার বাড়িতে এসেছে। ও দুদিন আগে পত্রিকায় মমতাজ আহমেদের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার সংবাদটি পড়েছে। নীরবের মনে হয়েছিল, মমতাজ আহমেদকে জেলখানায় আটকে রাখা যাবে না। রাজনীতিবিদদের ভালো সময় এবং খারাপ সময় দুটোই আসে। মামলাও হয়। ভালো সময়ে জেলখানা থেকে তারা বেরিয়ে আসেন অনায়াসে, আবার মামলাও ফ্রিজ হয়ে যায়, কখনো প্রত্যাহার হয়ে যায়। রাজনীতির সুফল-কুফল মোটা দাগে বলতে গেলে এ কথা খাটে। সরকারের রোষানালে পড়লে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, অনিয়মের অভিযোগে মামলা হবে— এ ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট। আবার সরকারের সঙ্গে আপস বা সরকার বদলে গেলে ওসব মামলা থেকে তারা রেহাই পেয়ে যান। মমতাজ আহমেদ বর্তমান সরকারের আমলে কারাবন্দি হলেন এবং মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে জেলখানা থেকে বের হয়ে এলেন। সরকারের সঙ্গে তিনি নিশ্চয় আপস করেছেন, ভাবলো নীরব। তবে এই ভাবনা ওর মনে জেঁকে বসলো না। পত্রিকায় মমতাজ আহমেদের জেলখানা থেকে মুক্তির খবর পড়ে ওর মনে হয়েছে, তার সঙ্গে ওর দেখা করা উচিত। নাবিলার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে মমতাজ আহমেদ ওকে সাহায্য করতে পারবেন হয়তো। এই চিন্তা থেকে নীরব আজ মমতাজ আহমেদের বাড়ির ঠিকানা বের করে চলে এসেছে। তার বাড়িতে আসার পর ও বুঝতে পারলো মমতাজ আহমেদ চুনোপুঁটি রাজনীতিবিদ নন। তিনি যে রাজনৈতিক দলের নেতা, দলটিরও সাংগঠনিক ভিত্তি আছে। মমতাজ আহমেদের বাড়িতে লোকজনের সরব উপস্থিতি দেখে ওর মনে পড়ে গেলো ছাত্রজীবনের একটি ঘটনার কথা। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রাবস্থায় ও একবার ছাত্রলীগ নেতা সারওয়ার মাহমুদের সঙ্গে গিয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার ইস্কাটনের বাড়িতে। ওই বাড়িতেও নীরব লোকজনের ভিড় দেখেছিল। ওই নেতার পা টেপানোর অভ্যাস ছিল। প্রতিদিন তিন-চার যুবক তার পা টিপতো আর তিনি দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা বলতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা সারওয়ার মাহমুদ ওই নেতার কাছে গিয়েছিল তার আশীর্বাদ লাভের আশায়। তখন ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল। একটা সময় ছিল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওই নেতার আশীর্বাদ ছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক কেউ হতে পারত না। এমনকি আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থীও কমিটিতে ঠাঁই পেতো না। সে সময়ে ছাত্রনেতারা ভিড় জমাতো ওই নেতার বাড়িতে। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির ময়দানে ওই নেতা কোণঠাসা হয়ে যান। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে যায়। রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও বদলায়। যেমন ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আমূল এক পরিবর্তন দেখা যায়। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে। এ দুটি দলের প্রধান শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন দুটি দলের শীর্ষ নেতারা। বিএনপি তো খণ্ডিত করে ফেলেন ওই দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং তার সমর্থক নেতারা। আওয়ামী লীগের ভাঙন না হলেও পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ সেলিম এবং তাদের সমর্থকরা পার্টির প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এসব নেতাদের উসকে দিয়ে সে সময় সেনাসমর্থক তত্ত্বাবধায়ক সরকার `মাইনাস টু’ ফর্মুলা গ্রহণ করে শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এই দুই নেত্রী কারাবন্দি ছিলেন। দেশের রাজনীতিতে সে সময় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। রাজনীতিরই শেষ পর্যন্ত জয় হয়। সেনাসমর্থিত সরকার নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যায়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জয়লাভ করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। এরপর আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দলীয় রাজনীতি অন্যদিকে মোড় নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কোণঠাসা হয়ে যান তোফায়েল আহমেদ, আমীর হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুর রাজ্জাক, শেখ সেলিমসহ আরো কয়েকজন নেতা। পরে অবশ্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রী হন। আবদুর রাজ্জাক মারা যান। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শুরুতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েন আবদুল জলিল। আবার মাঠ পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে চলে আসেন অনেক নেতা। শেখ হাসিনার সরকারের মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয় অনেকগুলো নতুন মুখ দিয়ে। যারা মন্ত্রী হবেন বলে কখনো স্বপ্নও দেখেননি, তারা মন্ত্রী হয়ে যান। বিএনপির মতো একটি বড় দলের মহাসচিব ছিলেন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। তার মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত জানাজায় হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি অংশ নেন। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারের শাসনামলে দেশ চলতো জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার বারীর নির্দেশে। তারাই পরবর্তীতে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জামান। ব্রিগেডিয়ার বারী পলাতক হন। রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পাল্টে গেলে কে কখন কোথায় থাকবে, তা বলা মুশকিল। মমতাজ আহমেদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির পেছনের কিছু কথা একঝলক ভেবে নিলো নীরব। রাজনীতির সঙ্গে ও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত না হলেও রাজনীতির প্রতি ওর আকর্ষণ ছিল, এখনো আছে। মমতাজ আহমেদের বাড়িতে এসে অনেকদিন পর ও এই আকর্ষণ অনুভব করলো। নীরব ভাবছিল ও আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে। পর্যবেক্ষণ করবে রাজনীতিবিদদের বাড়িতে কোন ধরনের লোক আসে এবং কেনো আসে। কিন্তু তা আর হলো না। এক তরুণ এসে ওকে বললো— `আপনার নাম কি নীরব?’
নীরব অবাক হলো। ও তরুণের মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললো— `আমার নাম জানলেন কিভাবে? আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারছি না।’
তরুণ বললো— `আমার নাম সেলিম। আমাকে আপনি চিনবেন না। আমিও আপনাকে চিনি না।’
`তা হলে!’
নীরবের কথা শেষ হয় না। সেলিম বলে— `আপনাকে মমতাজ স্যার দেখেছেন। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে ওপরে নিয়ে যেতে।’
`ওহ, আচ্ছা!’ চিন্তিত হয় নীরব। মমতাজ আহমেদ ওকে কিভাবে দেখলেন? প্রশ্নটা উঁকি দেয় মনে। ও সেলিমের উদ্দেশে বললো, `মমতাজ স্যার আমাকে দেখলেন কিভাবে বলতে পারেন?’ মমতাজ আহমেদের নামের সঙ্গে `স্যার’ সম্বোধন করলো নীরব। একসময় মমতাজ আহমেদ শিক্ষকতা করতেন বলে তাকে সবাই `স্যার’ বলে।
নীরবের কথায় ম্লান হাসলো সেলিম। ও গলা নামিয়ে বললো— `এ বাড়ির বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। স্যার আপনাকে হয়তো সিসি ক্যামেরায় দেখেছেন।’
সেলিমের কথায় ও একটু হকচকিয়ে গেলো। মনে আরো কিছু প্রশ্ন উদয় হলেও মুখে কিছু বললো না। সেলিম বললো— `আসুন, আমার সঙ্গে। আমি আপনাকে স্যারের রুমে পৌঁছে দিচ্ছি।’ এ কথা বলে সেলিম অন্য একটি রুমের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলো। নীরব তাকে অনুসরণ করলো। সেলিম নীরবকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির দোতলায় চলে গেলো। একটি কক্ষের দরজার সামনে এসে সেলিম বললো— `আপনি ভেতরে যান। স্যার আপনার জন্য এই রুমে অপেক্ষা করছেন।’
নীরব একটু বিব্রত হলেও ওর ভালো লাগলো। মমতাজ আহমেদ ওকে গুরুত্ব দেয়ায় ওর মনে এক ধরনের পুলক ছড়িয়ে পড়লো। ও সম্মানিতবোধ করছে। নীরব দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো। ও দেখতে পেলো, মমতাজ আহমেদ বসে আছেন একটি ইজিচেয়ারে। তার কক্ষে আর কেউ নেই। নীরব অবাক হলো। রাজনীতিবিদদের কক্ষে লোকজন থাকে। শুধুমাত্র কনফিডেন্সিয়াল আলোচনা হলে লোকজন থাকে না। নীরবের সঙ্গে মমতাজ আহমেদের কনফিডেন্সিয়াল আলোচনা নেই। নীরবকে দেখে মমতাজ আহমেদ বললেন— `নীরব, এসো, এসো। আমি জানতাম, তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।’
নীরব এগিয়ে গিয়ে মমতাজ আহমেদের সামনে রাখা একটি চেয়ারে বসলো। ও বললো, `আপনার কনফিডেন্স লেভেল অনেক ভালো।’
`হা-হা-হা।’ হাসলেন মমতাজ আহমেদ। বললেন— `তুমি কি খাবে, বলো।’
`না, স্যার। কিছু খাবো না। আমি খেয়ে এসেছি। আপনার ব্যস্ত সময় বেশি নষ্ট করবো না।’
`তা-ই বলে আমার বাড়িতে এসে কিছু মুখে না দিয়ে চলে যাবে না-কি? তা হয় না। না হয় শুধু চা দিতে বলি?’
`আমি চা খাবো না। আপনাকে ধন্যবাদ।’
`তা হলে?’
`আমি কেনো এসেছি, তা নিশ্চয় আপনি বুঝতে পারছেন?’
`তুমি কি নাবিলার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে আমার সাহায্য চাচ্ছো?’
`আপনার দূরদৃষ্টি দেখে আমি বিস্মিত।’
`হা-হা-হা। নীরব, প্রশংসা শুনলে আমি বিব্রতবোধ করি।’
`আমি কিন্তু আপনাকে খুশি করতে এ কথা বলিনি। আমি তা পারিও না। যদি পারতাম, তা হলে আমার ভাগ্য বিপর্যয় হতো না। আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম।’ কথাটা নিজেকেই বললো যেনো নীরব। কথাটা বলার পর মনে হলো নিজের ব্যর্থতার কথা, আক্ষেপের কথা মমতাজ আহমেদের কাছে বলে কী হবে? এ কথা ভেবে ও নিজের মধ্যে জড়তা অনুভব করলো।
মমতাজ আহমেদ বললেন— `নীরব, তোমার সামনে দুটি পথ খোলা আছে। একটি হচ্ছে, পেছনের সব কথা ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। নতুনভাবে জীবন শুরু করা। আরেকটি পথ হচ্ছে, যে ঘটনা তোমার জীবনকে দুর্বিষহ করে দিয়েছিল, সে ঘটনার সত্য অনুসন্ধান করে এগিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটি সহজ নয়। এই পথ কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং।’
`স্যার, আমি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছি। তাই তো আপনার কাছে এসেছি।’
`কিন্তু!’
`স্যার, আমি কোনো প্রতিশোধ নেবার কথা ভাবছি না। আমার তেমন শক্তি বা সামর্থ্য নেই।’
`নীরব, তুমি রাজনীতি করবে?’ আচমকা প্রশ্ন করলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরব এ প্রশ্নের জবাবে কয়েক সেকেন্ড পর বললো, `স্যার, কিছু মনে করবেন না। হঠাৎ এ প্রশ্ন করলেন কেনো?’
`না, মনে হলো তোমার মতো তরুণদের রাজনীতিতে আসা উচিত।’
নীরব ফের কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো— `স্যার, রাজনীতি এখন এক ধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, আর প্রতিহিংসা বাড়ছে। আমি এই সংঘাতে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে পারবো না।’
নীরবের কথায় মমতাজ আহমেদের কপালে ভাঁজ পড়লো। তিনি বললেন, `মাই সান, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়েই তো সংঘাত, লড়াই। বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানুষকে প্রতিনিয়িত সংঘাত মোকাবিলা করে চলতে হয়। আর দেশের রাজনীতির কথা যা বলেছো, তা স্বীকার করছি। সে সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে, কেনো এমন হচ্ছে।’
`কেনো এমন হচ্ছে, স্যার?’
`এর অন্যতম কারণ, রাজনীতিতে শিক্ষিত, সুশীল মানসিকতাসম্পন্ন বিচক্ষণ, দেশপ্রেমিক, সৎ লোকের আগমন ঘটছে না। হয়তো তুমি যা বললে, সে কারণেই তারা আসছেন না। কিন্তু এতে লাভ হচ্ছে কাদের? লাভ হচ্ছে অসৎ লোকদের। তারা জেঁকে বসছে রাজনৈতিক দলগুলোতে।’ এ পর্যন্ত বলে থামলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরব বললো, `স্যার, এতে আমার কী করার আছে? আমি রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেই কি সব বদলে যাবে?’
`তুমি হচ্ছো একক। তোমার মতো সৎ তরুণরা এগিয়ে এলেই তো একটি সমষ্টির সৃষ্টি হবে। তখন রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও বদলাবে। একজন করে এগিয়ে এলে একদিন অনেকজন হবে, তা-ই না?’
`স্যার, দেশের রাজনীতি নিয়ে আমার আগ্রহ আছে, কিন্তু উচ্ছ্বাস নেই। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশে যে ধারায় উন্নয়ন হবার কথা ছিল, সেরকম কিন্তু হয়নি। আমি মনে করি, এর জন্য দায়ী রাজনীতিবিদরা। আপনি কি আমার সঙ্গে একমত?’
`পুরোপুরি একমত নই। দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতো বছর ছিল বলো তো? কবে থেকে গণতন্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টি হলো, এসব কথা তোমাকে বিবেচনা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল হয়েছে একাধিকবার এবং সামরিক সরকার দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে অনেক বছর। ওই সময়কালে দেশের সম্পদ লুটপাট হয়েছে। উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হয়েছে। তা-ই না?’
`আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে কোন কোন সময়ে?’
`বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ছিল। এরপর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সামরিক সরকার এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা দেশ পরিচালিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ছিল বলে আমি মনে করি। এ ছাড়া তুমি ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাŸধায়ক সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার বলে স্বীকার না করতে পারো। সুতরাং, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা কখন শুরু হলো, কখন বাধাগ্রস্ত হলো এবং কতো পরে ফের গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো, এর একটা চিত্র তুমি পেলে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তোমার কিছু বলার আছে?’ জানতে চাইলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরব স্মিত হেসে বললো, `স্যার, গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে কি দেশে ব্যাপক দুর্নীতি হয়নি? দেশের সম্পদ লুটপাট হয়নি? দুর্নীতি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এরপরও কী দেশ থেকে দুর্নীতি কমেছে?’ কথাগুলো বলার সময় নীরবের কণ্ঠে আক্ষেপ ঝলসে ওঠে।
মমতাজ আহমেদ নীরবের দিকে একটু ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বললেন— `তোমার কথা মিথ্যা দাবি করবো না। তারপরও একটা কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সরকার সমসময় জনগণের কাছে কৈফিয়ত দেয় বা তাদের কৈফিয়ত দিতে হয়। তারা দিচ্ছেও। কিন্তু সামরিক বাহিনীর শাসনামলে যারা দুর্নীতি করেছেন, তাদের কিন্তু কিছু হয়নি। শুধু সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ দুর্নীতির মামলায় কারাগারে বন্দি ছিলেন। তিনি সাজাপ্রাপ্তও হয়েছিলেন। উদাহরণ একটি মাত্র আছে।’
`তা ঠিক, স্যার।’
`রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, সাজাও হয় কখনো। কিন্তু যারা আগে আমলা ও সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, পরবর্তীতে রাজনীতি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কিন্তু কখনো মামলা হয়নি। এটা ভেবে দেখেছো?’
`আপনার এ কথাও ঠিক।’
`যাক, আলোচনা করলে অনেক কথাই বলা যাবে। রক্তক্ষরণ আড়াল করে রাখাই ভালো। এর মধ্যেই আমাদের রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে। সুস্থ রাজনীতির চর্চা করতে হবে।’
মমতাজ আহমেদের কথায় নীরব বললো, `স্যার, এখন যে ধরনের রাজনীতি চলছে, সেখানে দেশপ্রেম এবং আদর্শ খুব বেশি দেখি না আমি। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত।’
`এ কারণেই তো তোমাদের মতো তরুণদের রাজনীতিতে আসতে হবে। দেশপ্রেমিক এবং আদর্শবাদী রাজনীতিবিদ আমাদের খুবই প্রয়োজন।’
`স্যার, আপনার পার্টি অনেক ছোট। ওয়ার্কার্স পার্টি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। এই পার্টি রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক সংকটে এ পার্টি গুরুত্ব পায়। আপনি কি আপনার পার্টিতে আমাকে যোগ দিতে বলছেন?’ জানতে চাইলো নীরব।
মমতাজ আহমেদ মৃদু হাসলেন। বললেন— `আমি তো আমার পার্টিতে যোগ দিতেই বলছি। তুমি যদি মনে করো, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রাজনীতি করবে, ওই পার্টিতেও যোগ দিতে পারো। আমার চেষ্টা হচ্ছে, রাজনীতিতে সৎ ও শিক্ষিত তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। আমি আমার পার্টির লাভের কথা ভাবছি না। আমি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলের কথা ভাবছি।’
`বুঝতে পেরেছি, স্যার। কিন্তু…’
`কিন্তু কী?’
`স্যার, আমাকে যিনি জেলখানা থেকে বের করিয়ে এনেছেন, তার একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজটা শেষ করার পর আপনার প্রস্তাবের জবাব জানাবো।’
`ইটস ওকে, মাই সান। আমি সেদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। আমি জানি, তুমি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে।’
`স্যার, আমি কিন্তু এসেছিলাম আমার…।’
`ওহ! হ্যাঁ। তুমি তো নাবিলা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে চাচ্ছো?’
`জি, স্যার। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কিভাবে, কোথা থেকে শুরু করবো। কোথায় যাবো, তাও জানি না।’
নীরবের কথায় চিন্তিত হলেন মমতাজ আহমেদ। নীরব তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কয়েক মুহূর্ত পর মমতাজ আহমেদ বললেন— `তুমি আরেক দিন এসো। আমি খোঁজ নিয়ে দেখি। এটি হাই প্রোফাইল কেস। অনেক সময় হাই প্রোফাইল মামলার রহস্যের জট খোলা যায় না। আমি আমার ওয়েতে খোঁজখবর নেবো। আমি তোমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করবো, নীরব।’
`স্যার, আমি শুধু জানতে চাই, নাবিলাকে কে খুন করেছে এবং কেনো। এর বেশি কিছু নয়।’
`তা জানতে পারবে হয়তো। তবে খুনিকে বিচারের সম্মুখীন করতে পারবে কি-না, এ কথা এখনই বলতে পারছি না।’
`কেনো স্যার? তা হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কিভাবে? তা হলে রাজনীতি করেই লাভ কী?’
নীরবের প্রশ্নে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মমতাজ আহমেদ। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি বললেন— `তোমাকে দু-একটি হাই প্রোফাইল খুনের মামলার কথা বলছি, শোনো। গুলশানে থাকেন আবুল কাশেম নামে এক শিল্পপতি। তার মেধাবী একমাত্র পুত্রসন্তান তারেক খুন হয়ে গেলো একদিন। অবশ্য তার লাশ পাওয়া যায়নি। এই খুনের পেছনে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম শোনা গিয়েছিল। এই খুনের মামলায় সাবেক এক মন্ত্রীর ছেলে আসামি হয় এবং সে কারাগারে বন্দিও থাকে। বাংলাদেশ পুলিশের পাশাপাশি ইন্টারপোল পুলিশও এ হত্যারহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছে অনেকদিন। আজ অবধি ওই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত খুনি কে, তা জানা যায়নি। তারেকের লাশও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তারেকের শিল্পপতি পিতা ছেলের খুনি কে, তা বের করতে পারেননি। পত্রিকায় পড়েছিলাম, গুলশানে একটি রেস্তোরাঁর মদের পার্টি থেকে তারেক নিখোঁজ হয়েছিল। গুলশানের আরেকটি বারে চিত্রনায়ক সোহেল খুন হয়েছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডও এমন একটি হাই প্রোফাইল কেস। সোহেল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত খুনিও থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ দুটি হত্যা মামলার কথা বললাম হাই প্রোফাইল মামলার উদাহরণ হিসেবে। রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি। এমনকি বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়েও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পারেনি বা তারা করতে চায়নি। বুঝেছ?’ বলে নীরবের দিকে দৃষ্টি স্থির করলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরব ছোট্ট করে জবাব দিলো— `বুঝেছি।’
এরপর মমতাজ আহমেদ বললেন— `নাবিলার হত্যাকারীও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে। তবে আমার সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে নাবিলার প্রকৃত খুনি কে, তা জানার। আর যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললে, এ প্রসঙ্গে বলছি— রাজনীতিবিদরাই পারেন দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে। রাজনীতিতে সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে— বুঝতে পেরেছো?’
`জি, স্যার। বুঝতে পেরেছি।’
`আর কিছু বলবে?’
`জি না, স্যার। আমি তা হলে উঠি?’
`আচ্ছা যাও। সময় পেলে আবার এসো।’
নীরব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালা। মমতাজ আহমেদ ইজিচেয়ারে ফের হেলান দিয়ে বসলেন। নীরব দরজা খুলে বের হয়ে এলো। ওর মনটা কেমন ফুরফুরে লাগছে। ওর মনে হচ্ছে, মমতাজ আহমেদ নাবিলা হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারবেন। তার সঙ্গে কথা বলে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে। এখন নিজেকে কেমন হালকা লাগছে ওর। নীরব হনহন করে মমতাজ আহমেদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। ও বাড়ির গেট পেরুতেই এলো স্বর্ণার ফোন। ফোন রিসিভ করলো নীরব। `হ্যালো, কে বলছেন?’
ও-প্রান্তে স্বর্ণার কণ্ঠ, `আমি স্বর্ণা বলছি। কেমন আছেন?’
`ভালো। আপনি?’
`ভালো আছি। আপনি কোথায় আছেন, আপনার সঙ্গে কি আজ দেখা করতে পারবো?’ স্বর্ণার কণ্ঠে বিনয়।
নীরব বলে, `না। আজ আমি ব্যস্ত। কাল বা পরশু ফোন করে আসতে পারেন।’
`সত্যি ব্যস্ত আছেন? না-কি আমাকে এড়াতে চাইছেন?’
`আশ্চর্য! আপনাকে এড়াতে চাইবো কেনো?’
স্বর্ণা বলে, `সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়াতে চায় সকলে। আপনাকেও তো প্রশ্ন করবো, তাই মনে হলো আমাকে এড়াতে চাইছেন।’
জবাবে নীরব বললো— `প্রশ্ন তো ফোনেও করতে পারেন। কী জানতে চান, বলুন?’
স্বর্ণা ও-প্রান্তে কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকে। এরপর ও বলে— `ইটস ওকে। আপনার সঙ্গে ফোনে দু-একটি কথা সেরে নিই তা হলে।’
`বলুন।’
প্রশ্নের জবাব দিতে নিজেকে প্রস্তুত করে নীরব। ওর মনে হলো সেলফোনে স্বর্ণার সঙ্গে কথা বলতে খারাপ লাগছে না। স্বর্ণার কথা শোনা গেলো— `নীরব, আপনার সঙ্গে শাকিল চৌধুরীর পরিচয় কিভাবে? তিনি আপনার কেমন বন্ধু?’
স্বর্ণা প্রশ্নটা কেনো করলো, তা এক সেকেন্ড ভাবলো নীরব। ও বললো— `কেনো এ প্রশ্ন করছেন? আপনার অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ের মধ্যে এ প্রশ্ন পড়ে?’
নীরবের কথায় ও-প্রান্তে স্বর্ণার হাসির শব্দ শোনা গেলো। হাসি থামার পর স্বর্ণা বললো— `প্রশ্নটা কি খুব বেশি ব্যক্তিগত এবং বিব্রতকর? তা হলে থাক। জবাব দিতে হবে না।’
নীরব বলে— `আমি শাকিল চৌধুরীর পারিবারিক বন্ধু। তার স্ত্রীর সঙ্গে আমার ছয় বছর আগে পরিচয় হয়েছিল। জেল থেকে বের হতে সে আমাকে সাহায্য করেছে এবং জেলখানা থেকে বের হবার পর থেকেও সে আমাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করছে। এমনকি আপনার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর কিছু জানতে চান?’
স্বর্ণা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলে— `এবার অন্য একটি প্রশ্ন। ভেবে সঠিক জবাবটি দেবেন। ঠিক আছে?’
`বলুন, কী প্রশ্ন। সঠিক জবাব দেবার চেষ্টা করবো।’
`আপনার কি মনে হতো নাবিলা আপনাকে ভালোবাসত? আই মিন, নাবিলা আপনার প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করেছিল?’
প্রশ্নটায় হকচকিয়ে গেলো ও। স্বর্ণা এ প্রশ্ন করছে কেনো? ও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ভাবলো। এরপর বললো— `প্রশ্নটা আমার মনেও চোরাকাঁটার মতো বিঁধে ছিল। আজ আপনাকে অকপটে বলছি, নাবিলা আমাকে কখনোই ভালোবাসেনি। ক্যাম্পাসে এলে আমার সঙ্গে ও ভাব জমাতো, এই যা! আমার মনে হতো, ওটাই আমার প্রতি নাবিলার ভালোবাসা। আমি ওতেই খুশি ছিলাম। বলতে পারেন, বোকা প্রেমিক ছিলাম আমি। এ নিয়ে আমার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল, সংকোচ ছিল, হতাশাও ছিল। তারপরও আমি যেনো নাবিলার মিথ্যা প্রেমকে সত্য ধরে নিয়ে আনন্দ পেতাম। শুনছেন?’
স্বর্ণা বললো— `শুনছি! বলুন।’
`আর কী বলবো? প্রশ্ন থাকলে করুন।’
`নাবিলাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখতেন না? কাছে পাবার ইচ্ছে হতো না?’
`হা-হা-হা। কী বললেন, বিয়ে?’
`হাসছেন কেনো?’
`হাসছি আপনার প্রশ্ন শুনে।’
`হাসির কী হলো? প্রশ্নের জবাব দিন।’
`বলছি, বিয়ে-টিয়ে পর্যন্ত স্বপ্ন দেখিনি। পড়াশোনা, টিউশনি আর কুয়াশাঢাকা মিথ্যে প্রেমের আলোড়ন নিয়েই তো সময় চলে যেতো। বিয়ে করার ইচ্ছা জাগার মতো সাহস তো ছিল না। হা-হা-হা।’
`আপনি হাসছেন কেনো? আজ খুব মুডে আছেন, মনে হচ্ছে?’
`হুম, ভালো মুডে আছি। আপনি সামনে থাকলে একটা অনুরোধ করতাম।’
`কী অনুরোধ করতেন?’
`বলতাম, স্বর্ণা, আমার সঙ্গে রিকশায় ঘুরবেন?’
ও-প্রান্তে স্বর্ণা চুপ করে রইলো। আর এতে সংকোচবোধ করলো নীরব। স্বর্ণাকে কথাটা বলা ঠিক হয়েছে কি-না, ভাবতে লাগলো। নীরব কিছু মিন করতে চায়নি। কথাটা মুখে এসে গেছে, বলে ফেলেছে। ও বিব্রত কণ্ঠে বললো— `হ্যালো, স্বর্ণা? শুনছেন? আমি কিন্তু কিছু মিন করে কথাটি বলিনি। শুনছেন?’
নীরব স্বর্ণার জবাবের অপেক্ষা করছে। প্রায় দুসেকেন্ড পর স্বর্ণা বললো— `আমি জানি, আপনার এতো সাহস নেই। সাহস থাকলে নাবিলার ভালোবাসা হয়তো পেতেন।’ কথাটা বলে স্বর্ণা টেলিফোনের লাইন কেটে দিলো।
নীরব একটু অবাক হলো স্বর্ণার এই আচরণে। বিব্রতবোধ করলো ও। ওর সাহস আছে কী নেই, এ নিয়ে স্বর্ণার মন্তব্য এবং ফোনের লাইন কেটে দেয়া সহজভাবে নেয়া যায় না। ও একটু বিচলিতবোধ করলো। দশ সেকেন্ড পর আবার ফোন বেজে উঠলো।
`হ্যালো’ বলতেই ও-প্রান্তে স্বর্ণার কণ্ঠ। `আই অ্যাম সরি।’
`কেনো সরি বলছেন?’
`এভাবে ফোনের লাইন কেটে দেয়া ঠিক হয়নি আমার, তাই।’
`ইটস ওকে।’
`আপনি রাগ করেছেন?’
`রাগ করবো কেনো? আমি একজন জেলখাটা অপরাধী। আমার রাগ করা কি মানায়?’
`না, না। ওভাবে বলবেন না। আমার আসলে মাথাটা ঠিক নেই। ফোনের লাইন কেটে দেয়ার পরপর মনে হলো আমার আচরণ ঠিক হয়নি। তাই অনুশোচনা থেকে ফের ফোন করলাম।’
`ইটস ওকে, স্বর্ণা। আপনি অনেক ভালো মানুষ বলে নিজের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। এতোটা না করলেও পারতেন। আমি এতোটা গুরুত্বপূর্ণ কেউ নই।’
`নিজেকে এতো তুচ্ছ ভাবেন কেনো?’
`আমি আসলেই তুচ্ছ এক মানুষ। দেখলেন না, খুন না করেও খুনি হয়ে গেলাম। সাজা খাটলাম। ভাগ্যের কারণে জেল থেকে বের হয়েছি, নইলে তো আরো এক যুগ কারাগারে থাকতে হতো। এমন অসহায় আমি যে, নিজেকে তুচ্ছ ভাবা ছাড়া আর কী ভাবতে পারি?’
`ওটা আপনার ভেতরের অসহায়ত্ত। আপনি এই অসহায়ত্ত পরিত্যাগ করুন।’
`সে শক্তি আমার নেই।’
`নেই মানে? আপনি নিজের ভেতরে শক্তি আছে কি নেই, তা দেখেছেন? না কখনো দেখার চেষ্টা করেছেন?’
ওর কথার জবাবে কী বলবে ভেবে পায় না নীরব। এ ধরনের কথার জবাব দিতে গেলে অনেক রকম কথাই বলতে হবে। ওদের মধ্যে যে ধরনের সম্পর্ক, এতে এসব কথার পিঠে কথা বলাটা মানানসই কি-না, চট করে ভেবে নেয় নীরব। ওর নিজের মধ্যে দুটি পরস্পরবিরোধী সত্তার কণ্ঠস্বর শুনতে পায় ও। এক সত্তা বলে, কথা বাড়িয়ে কী লাভ? চুপ করে থাকো। আরেক সত্তা বলে, আর কত চুপ করে থাকবে? এবার জেগে ওঠো, কথা বলো। জবাব দাও। নীরবের মাথার ওপর গনগনে দুপুর, প্রখর সূর্যালোকের ভরাট অস্তিত্ব। পেছনে বাতিঘরের মতো মমতাজ আহমেদের বাড়ি, সামনে ধানমন্ডির প্রশস্ত রাজপথ। ওর ভেতরে জেগে ওঠার জাগরণ টের পায় ও। নীরবের জবাব না পেয়ে স্বর্ণা তাগিদ দেয়া কণ্ঠে বলে— `হ্যালো, শুনছেন? কথা বলছেন না যে!’
`কী বলবো বলুন? আবার আপনার কথার জবাবে যা বলতে চাই, তা বলার মতো সম্পর্কও তৈরি হয়নি আপনার এবং আমার মধ্যে।’
`মানে? কথা বলার জন্য আবার সম্পর্ক তৈরি হতে হবে কেনো? কী বলছেন?’
নীরবের মনে হলো এখন কথার পিঠে কথা আসবে, কথা কমবে না। আবার কথার এই পর্যায় থেকে থেমে যাওয়াটাও ঠিক নয়। কথোপকথনের ছন্দপতন হবে। এটাও অস্বস্তিকর। ও বললো— `স্বর্ণা, কথা বলার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় কখনো কখনো এসে যায়। এটা আগে অনুভব করিনি। আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলাম। এ নিয়ে অন্য একদিন কথা বলবো। ঠিক আছে?’ নীরবের কণ্ঠে পেঁজা মেঘের মতো একরাশ হতাশা লেপটে যায় যেনো। স্বর্ণা ওর সামনে থাকলে ওকে হতাশার একটা দীর্ঘশ্বাসও ছাড়তে দেখতো। ভাগ্যিস, ও সামনে নেই।
স্বর্ণা ও-প্রান্ত থেকে জানতে চায়— `আচ্ছা, বলুন তো, আপনার মধ্যে যে অসহায়ত্ত আছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আপনার কী প্রয়োজন?’
নীরবের মধ্যে জেগে ওঠার কম্পন সৃষ্টি হতে থাকে। ও নিজের জড়তা আড়াল করে বলে— `অসহায়ত্ত ছাড়তে হলে আমার অবলম্বন দরকার।’
`অবলম্বন?’
`হ্যাঁ, অবলম্বন।’
`কাকে অবলম্বন করবেন?’
`আপনি বলুন তো, আমি কাকে অবলম্বন করতে পারি?’ জানতে চাইলো নীরব। এ প্রশ্নটা ওর করার ইচ্ছে ছিল না। কথার পিঠে কথা যেমন চলে আসে, তেমনি প্রশ্নটি এলো।
ও-প্রান্ত থেকে স্বর্ণা বললো— `বা রে, যাকে হাতের কাছে পাবেন, তাকে অবলম্বন করার চেষ্টা করুন, এ আর কেমন কঠিন কাজ?’ স্বর্ণার হাসির শব্দ ভেসে এলো।
একরকম তন্ময়তার মধ্যে নীরব বলে ফেললো— `আপনিই কিন্তু আমার হাতের কাছে একমাত্র মানুষ। আপনি হবেন আমার অবলম্বন?’ কথাটা বলে আপন মনে লজ্জায় হেসে উঠলো ও। এমন কথা বলা ঠিক হলো কি-না, ও ভাবছে। ওর কথার কোনো জবাব দিলো না স্বর্ণা। নীরব ওর কাছ থেকে এর কোনো জবাব আশাও করছে না। এ পর্যায়ে এসে স্বর্ণা ফোনের লাইন কেটে দিলে ওর ভালো লাগতো। কিন্তু স্বর্ণা ফোনের লাইন কাটলো না। বেশ কিছু মুহূর্ত এভাবে চলে গেলো বা মুহূর্তগুলো থমকে গিয়েছিল যেনো। মুহূর্ত নিয়ে নীরব ভাবতে চায় না। ওর ভেতরের জেগে ওঠার ঢেউ ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ও ভাসছে।
একসময় স্বর্ণার কণ্ঠ ভেসে এলো— `হ্যালো, লাইনে আছেন?’
`আছি।’ তন্ময়তাভরা কণ্ঠে নীরবের ছোট্ট জবাব।
স্বর্ণা জানতে চায়— `আপনি এখন কোথায়?’
`ধানমন্ডি সাতাশ নম্বরে। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি।’
`আপনি রাপা প্লাজায় গিয়ে অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।’
`কেনো?’
`আপনার সঙ্গে রিকশায় ঘুরবো।’
`কী বলছেন!’
`আপনার আপত্তি আছে?’
`হা-হা-হা। আপত্তি থাকবে কেনো? তবে আজ নিজেকে নিয়ে ভয় আছে।’
`ভয়? কীসের?’
`জানেন তো, অসহায় মানুষের মধ্যে অবলম্বন খোঁজার লোভও কাজ করে। আমার ভয় সেখানেই।’
`খুব তো কথা বলতে শিখেছেন। নাবিলার সঙ্গেও কি এ ধরনের কথা বলেছেন?’
`না, সে সুযোগ তো পাইনি।’
`যা পারেননি, তা এখন আমার ওপর প্রয়োগ করতে চাচ্ছেন?’
প্রশ্নটি বিব্রতকর। নীরব এর জবাবে কী বলবে, বুঝতে পারলো না। ও এবার চুপ করে থাকে।
স্বর্ণা বললো— `হ্যালো, শুনছেন?’
`শুনছি। বলুন।’
`আমি আসছি। আপনি রাপা প্লাজায় অপেক্ষা করুন।’ একথা বলে ফোনের লাইন কেটে দিলো স্বর্ণা। অকারণে অন্যরকম আবিষ্টতায় ডুবে গেলো নীরব।
সাত.
দুপুরের কড়া রোদ ছড়িয়ে আছে। বাতাসে গরমের উত্তাপ। থেমে থেমে দখিনা হাওয়া এসে হামলে পড়লেও তা ঘাম শুকানোর জন্য যথেষ্ট নয়। নীরব ঘামছে। রাপা প্লাজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ও। রাপা প্লাজার সামনে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ সড়কে গিজগিজ করছে যানবাহন। কড়া রোদের দুপুরে এমন যানজটে যাত্রীদের বিড়ম্বনা বাড়ছে। কিন্তু কারো কিছু করার নেই। ঢাকা শহরের যে কোনো এলাকায় যানজটের বিড়ম্বনা নিয়মিত। লোকজন বাসা থেকে বের হয় যানজটের কষ্ট মেনে নিয়েই। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের যানজটের বিড়ম্বার মধ্যে পড়তে হয় না। বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থায় সাইরেন বাজিয়ে তাদের গাড়ি চলে যায়। নীরব দাঁড়িয়ে থেকে যানবাহনের চলাচল দেখছিল। অনেকদিন পর এমন দৃশ্য দেখছে ও। ভালোই লাগছে। মুক্ত বাতাসের স্বাদ নিচ্ছে। প্রায় চল্লিশ মিনিট ও দাঁড়িয়ে ছিল রাপা প্লাজায়। স্বর্ণা এসে ওর সামনে দাঁড়ালো মুখে একফালি হাসি ফুটিয়ে। রিনরিনে কণ্ঠে জানতে চাইলো— `আমি কি খুব বেশি দেরি করেছি। জানেন তো, রাস্তায় কী রকম যানজট হয়!’
স্বর্ণা এমনভাবে কথাটা বললো যেনো ও নীরবের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছে। নীরব নিজের ভেতরে মৃদু একটা তোলপাড় অনুভব করলো। ও মুখে হাসি বিস্তৃত করে বললো— `আপনি খুব বেশি দেরি করেননি। আরও দেরি করলেও আমি কিছু মনে করতাম না। আমার ভালোই লাগছিল এখানে দাঁড়িয়ে চলমান লোকজন, গাড়ির চলাচল দেখতে।’
নীরব লক্ষ্য করলো স্বর্ণা সালোয়ার-কামিজ পরেছে। প্রথম দিন ও পরেছিল জিন্স প্যান্ট আর শার্ট। আজ সালোয়ার কামিজে ওকে অন্যরকম লাগছে। শাড়ি পরে এলে হয়তো পরীর মতো লাগতো। স্বর্ণার ঠোঁটে লিপস্টিকের প্রলেপ। প্রথমবার দেখার সময় ওর ঠোঁটে লিপস্টিক ছিল না। মাথার চুলগুলো খোলা ছিল। আজ চুলগুলো ক্লিপে আটকানো। পোশাক ও সাজসজ্জায় পরিচ্ছন্নতা দেখতে পেলো ও। স্বর্ণার এই পরিবর্তনের মধ্যে বিশেষ কোনো কারণ নেই, মনে মনে ভাবলো ও। তবে স্বর্ণার এই উপস্থিতি কেনো জানি নীরবের ভালো লাগছে। স্বর্ণা ওর চোখে চোখ রেখে বললো— `কী ব্যাপার, অমন করে কী দেখছেন?’
স্বর্ণার কথায় হকচকিয়ে যায় নীরব। বলে— `না, মানে, আপনাকে অন্যরকম লাগছে।’
`তাই বলে একজন পুরুষ মানুষ এমনভাবে তাকিয়ে থাকলে আমি কি বিব্রতবোধ করবো না?’ কথাটা বলতে গিয়ে একরাশ লজ্জা এসে স্বর্ণার চোখে মুখে মৃদু আভা ফুটিয়ে তোলে।
নীরব স্মিত হেসে বলে— `দুঃখিত, আমার এভাবে তাকিয়ে থাকা ঠিক হয়নি।’
`আর দুঃখ প্রকাশ করতে হবে না। এখন বলুন কোথায় যাবেন?’
`কোথায় যাবো মানে?’
`বা রে, আপনিই তো বললেন, আমাকে নিয়ে রিকশায় ঘুরে বেড়াবেন!’
`ওহ, তাই তো! আমি কেমন এলোমেলো হয়ে গেছি।’ কথাটা বলে নীরব ভাবতে লাগলো রিকশায় ওরা কোন দিকে যাবে। রিকশা সব রাস্তায় যাতায়াত করে না। টিএসসিতে যাবে কি-না, একঝলক ভাবলো ও।
স্বর্ণা বললো— `আমি একটা প্রস্তাব দেবো?’
`দিন।’
`চলুন, আমরা আজ একটু দূরে ঘুরতে যাই। গাড়িতে চড়ে। যাবেন?’
`কোথায় যাবো?’
`ধরুন, আশুলিয়ায় যেতে পারি, রাজেন্দ্রপুর যেতে পারি বা সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারি। শহর ছেড়ে একটু দূরে, নিরিবিলি পরিবেশে। যাবেন?’
স্বর্ণার কথায় কেমন মাদকতা আছে। কিন্তু স্বর্ণার সঙ্গে এভাবে ঘুরতে যাওয়া কি ঠিক হবে? নীরবের ভেতরে পেখম ছড়িয়ে থাকা তন্ময়তাকে আড়াল করে ভয় আর সংকোচ জেগে ওঠে। স্বর্ণা বলে— `আপনার মন না চাইলে থাক। রিকশায় ঘুরলেও হবে।’
`না, তা ভাবছি না। আপনার প্রস্তাবটার প্রতি মন সায় দিচ্ছে। তবে ভাবছি।’ বলে নীরব আর কিছু বললো না।
স্বর্ণা বললো— `কী ভাবছেন, বললেন না তো?’
`ভাবছি, আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, এতে দুজনের দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়ানোটা মানায় কি-না।’
নীরবের কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো স্বর্ণা। ওর হাসির মুদ্রায় সৌন্দর্যের দ্যুতি ঝলক দিয়ে ওঠে। নীরব মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। কেনো এমন হচ্ছে, ও বুঝতে পারে না। ওর নিজের মধ্যে সহজাত সংযমের বাঁধ কি ভেঙে যাচ্ছে? মনে মনে ও শিউরে ওঠে। স্বর্ণা ফের বলে— `টেলিফোনে আমাকে বলেছিলেন সম্পর্ক নিয়ে কথা অন্য একদিন হবে, তা-ই না?’
`হুম। তা-ই তো!’ বলে নীরব। এরপর বলে— `আচ্ছা, আমরা অতো দূর যাবো কিভাবে?’
`আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে রাস্তার ওপারে অপেক্ষা করছে। রাজি থাকলে চলুন, এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। তা ছাড়া সবাই কিভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে, দেখছেন না?’
নীরব লক্ষ্য করলো, রাপা প্লাজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু লোক ওদের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রয়েছে। মানুষের কৌতূলের যেনো শেষ নেই। যেখানে যা দেখবে, তাতেই তারা কৌতূহল দেখাবে। দাঁড়িয়ে যাবে দৃশ্য দেখতে। বিশেষ করে কোনো নারী হলে তো কথাই নেই, নিঃসংকোচে হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকবে। নীরব আর কিছু ভাবতে পারলো না। ও বললো— `চলুন, বেরিয়ে পড়ি। আপনার গাড়ি কোথায়?’
`ওই তো রাস্তায়। চলুন, যাই।’ বলে ওরা রাপা প্লাজা থেকে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।
নীরব জানতে চাইলো— `আপনার গাড়ি আছে, এর মানে আপনি ধনী বা স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান?’
`এ প্রশ্ন কেনো করছেন? প্রশ্নটি আপনার জানার জন্য বেশি জরুরি?’
`না, তা নয়।’
ওরা হেঁটে গাড়ির সামনে আসতেই ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিলো। প্রথমে স্বর্ণা গাড়িতে উঠলো। এরপর একটু সাবধানে উঠলো নীরব। ওরা বসলো গাড়ির পেছনের আসনে। নীরব স্বর্ণার বসার স্থান থেকে একটু দূরত্ব রেখে বসলো। স্বর্ণা গাড়ির ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো— `সাভারের দিকে যাও, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।’
স্বর্ণা তাকালো নীরবের দিকে। ও চুপসে আছে। স্বর্ণার ওর উদ্দেশে বললো— `আপনি কি জানেন, বিভিন্ন মিডিয়া হাউস থেকে সাংবাদিকদের গাড়ি দেয়?’
`না। আমি কি এতো সব খবর রাখি?’
`তা হলে জেনে রাখুন, অনেকদিন হলো সাংবাদিকতা পেশায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। সাংবাদিকরা সম্মানজনক বেতন পাচ্ছে, গাড়ি পাচ্ছে, কেউ কেউ থাকার জন্য ফ্ল্যাটও পাচ্ছে।’
`খুব ভালো খবর তো! তা হলে তো সাংবাদিক হওয়া যায় কি-না, তা আমার একবার চেষ্টা করা উচিত।’
`অবশ্যই চেষ্টা করবেন। চাইলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’
`আপনি আমাকে কেনো সাহায্য করতে চাচ্ছেন, বলুন তো? আমি লক্ষ্য করেছি, আমার প্রতি আপনার সহমর্মিতা যেনো একটু বেশি।’
নীরবের কথার জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিলো না স্বর্ণা। ও একটু চুপ করে রইলো। এ সময় ফোন বেজে উঠলো নীরবের। ও ফোন রিসিভ করলো। ও-প্রান্তে শাকিল চৌধুরী, `হ্যালো, নীরব। কোথায় আছেন?’
`ধানমন্ডিতে।’
`আপনি কি পান্থপথে বসুন্ধরা মলে যেতে পারবেন?’
`আমি একটা কাজে এখানে এসেছি। একটু ব্যস্ত আছি। ওখানে যেতে হবে কেনো বলুন তো?’
`ওখানে তানজিলা যাচ্ছে। আপনি হঠাৎ তার সামনে পড়ে যাবেন। ওর সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর ওর সঙ্গে থাকবেন। ওকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। পারবেন না?’
`তা পারবো। কিন্তু কেনো গায়ে পড়ে আমি তার সঙ্গে দেখা করবো?’
ও-প্রান্তে দুই সেকেন্ড চুপ থেকে শাকিল চৌধুরী বললো— `আমি চাচ্ছি, আপনার সঙ্গে ওর বাইরে দেখা হয়ে যাক। আপনি ওর ঘনিষ্ঠ হয়ে যান। আমার মাথায় নাটকীয় একটা পরিকল্পনা আছে। পরে ডিটেইলস বলবো।’
`ঠিক আছে, আপনি যা বলবেন, আমি তা-ই করবো। কিন্তু আজকে যে আমি আটকে গেছি।’
`খুব জরুরি কোনো কাজ?’
`না, মানে… জরুরিও বটে।’
ও-প্রান্তে শাকিল চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড চুপ। এরপর সে বললো— `ওকে। আজ তা হলে আপনি আপনার কাজ করুন। কাল আপনি গুলশানে থাকবেন বেলা এগারোটা থেকে। কাল গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে যাবে তানজিলা। সেখানে একটা পার্টিতে অ্যাটেন্ড করবে ও। আপনাকে কী করতে হবে, আমি বলে দেবো।’
নীরব যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বললো— `ঠিক আছে। আমি কাল এগারোটা থেকে গুলশানে থাকবো। আপনি যা বলবেন, তা-ই করবো।’
`ঠিক আছে, বাই।’
শাকিল চৌধুরী ফোনের লাইন কেটে দিলো। নীরব তাকালো স্বর্ণার দিকে। স্বর্ণা তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। বললো— `কার সঙ্গে কথা বলছিলেন?’
`শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে।’
`ওহ।’
`জানেন, লোকটার আচরণ-কথাবার্তায় কেমন নাটকীয়তা আছে। কখনো কখনো তাকে আমার মানসিক রোগী বলে মনে হয়।’ কথাটা বলে নীরবের মনে হলো, স্বর্ণার কাছে এমন মন্তব্য করা তার ঠিক হয়নি। ও নিজের মধ্যে এক ধরনের লজ্জায় জড়িয়ে গেলো। নীরবের কথার জবাবে কোনো প্রশ্ন করলো না স্বর্ণা। ও অন্য প্রসঙ্গে বললো— `আচ্ছা, আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। ব্যক্তিগত প্রশ্নও করতে চাই। করবো?’
স্বর্ণার গাড়ি টয়োটা সিয়েনা। চালককে বেশ দক্ষ মনে হচ্ছে। গাড়ি ছুটে চলছে। গাড়ির ভেতরে এসি চলছে। জানালা বন্ধ থাকায় বাইরের শব্দ খুব বেশি শোনা যাচ্ছে না। এই দীর্ঘ যাত্রায় স্বর্ণা অনেক কিছু জানতে চাইবে, অনেক রকম প্রশ্ন করবে, এটা বুঝতে পারছে নীরব। ও নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়। বলে— `বলুন, কী প্রশ্ন।’
`রাগ করবেন না তো?’
বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব, `রাগ করবো কেনো? রাগ করবো কি-না, এ কথা কেনো জানতে চাইছেন?’
`না, মানে, ঘুরতে বেরিয়েছি। এই ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে প্রশ্নের জবাব দেয়াকে সহজভাবে নিচ্ছেন কি-না, তা জানতে প্রশ্নটা করলাম।’
`না। আপনি আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছেন। ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন। লক্ষ্য তো একটাই। আমাকে আরো বেশি করে জানা। আর আমাকে জানতে হলে প্রশ্ন তো করবেনই। আমি প্রস্তুত। আপনি নিঃসংকোচে প্রশ্ন করতে পারেন।’
স্বর্ণার মুখে রংধনুর মতো উজ্জ্বল এক হাসি ঝলমলিয়ে উঠলো। ও বললো— `যাক, আমার ভেতর থেকে পাথর নামলো!’
`তা কী জানতে চান, বলুন। আমিই এখন তাগিদ অনুভব করছি।’ বলে স্মিত হাসলো নীরব।
স্বর্ণা বলে— `আপনি জীবন সম্পর্কে উদাসীন, না উদসীনতার ভান করে থাকেন?’
`কী বললেন?’
`আবারো বলছি, আপনি কি জীবন সম্পর্কে উদাসীন, না-কি উদাসীনতার ভান করে থাকেন?’
প্রশ্নটা শুনে একটু থমকে গেলো নীরব। প্রশ্নটা নিয়ে ও ভাবলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর বললো— `আমি জীবনবিমুখ মানুষ। সচেতনভাবে উদাসীন নই। কেনো এ প্রশ্ন করলেন?’
`আমার মনে প্রশ্নটা এসেছে, তাই প্রশ্নটা করেছি।’
`আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?’
`আপনি নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চান। নিজেকে বিকশিত করার চেষ্টা নেই আপনার মধ্যে। কেনো, বলুন তো?’
স্বর্ণার প্রশ্নের জবাবে মৃদু হাসলো নীরব। `আসলে আমার কোনো অ্যাম্বিশন নেই। জীবন নিয়ে অনাগ্রহটা প্রকট। কিংবা বলতে পারেন, বেঁচে থাকা নিয়ে আমার মধ্যে কোনো তোলপাড় নেই। তাই হয়তো গুটিয়ে থাকি।’
`গুটিয়ে থাকেন না হয় পারিপার্শ্বিক কারণে। কিন্তু আপনি জীবন সম্পর্কেও উদাসীন। কেনো?’
`আপনি আবারো জীবন নিয়ে উদাসীনতার কথা বললেন। জীবন নিয়ে উদাসীনতার মধ্যে এক ধরনের রোমান্টিকতাও আছে। কিন্তু আমার মধ্যে কোনো রোমান্টিসিজম নেই। `জীবন সম্পর্কে উদাসীন’ কথাটি আমার জন্য মনে হয় প্রযোজ্য নয়।’
`তা হলে নিজের সম্পর্কে আপনার নিজের মন্তব্য কী?’
`আমি জীবনবিদগ্ধ এক প্রাণী।’
`প্রাণী!’
`হুম। প্রাণী বললেই মানানসই।’
`কেনো?’ বিস্ময় প্রকাশ করে স্বর্ণা।
`প্রাণী এ জন্য যে, আমার মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব আছে শুধু।’
`মানে?’
`মানে বুঝলেন না? আমাকে মানুষ বললে মানুষের যে অস্তিত্ব বা বৈশিষ্ট্য, আমার মধ্যে কি আছে? নেই। তাই আমি একটি প্রাণী। মানুষ বললে দৃশ্যমান এক মানুষ বটে, সত্যিকারের মানুষ নই। আর ওই যে বললেন, উদাসীনতা, ভান করে থাকি কি-না। আসলে ভান করার কৌশল জানলে মানুষের মতোই থাকতাম।’
`তার মানে, মানুষ মাত্র ভান করে?’
`সে রকম বলতে চাই না। মানুষ মাত্র ভান করে না, মানুষ ভান করতে পারে। মানুষ ভান করার কৌশল জানে। আর আমি মনুষ্য অনুভূতির বৈশিষ্ট্যে ঠিক যেনো মানুষ নই। বেঁচে থাকা একটা প্রাণী মাত্র!’
`আপনার মধ্যে হতাশা-ক্ষোভ-গ্লানি-ক্লেদ জমাট বেঁধে গেছে। তাই এসব কথা বলছেন।’
`হয়তো বা। আমি ওসব নিয়ে ভাবতে চাই না।’
`কেনো?’
`ভাবতে গেলে জীবনের সব আয়োজন এসে হাতছানি দেবে। আমাকে স্বপ্নতাড়িত করবে। আমি ফের জীবনের স্বপ্নরেণু মেখে যাপনের বর্ণিল ধরাবাঁধা পথে ধাবিত হবো। এটা আমি চাই না।’
`এটা চাওয়াই কি স্বাভাবিক নয়? না পালিয়ে বেড়ানোর মধ্যে মুক্তি আছে?’
`আমার জীবন তো স্বাভাবিক নয়। তবে কেনো স্বাভাবিক জীবনের প্রতি মোহগ্রস্ত হবো?’
`মোহ বলছেন কেনো? স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাটাই মানুষের ধর্ম, অধিকার।’
`আপনি কেনো যে এ নিয়ে তর্ক করছেন, কে জানে। একটা কথা আবারো বলছি, আমার জীবন আপনাদের মতো নয়, এটা বুঝতে পারছেন না? আপনি বুঝতে চেষ্টা করুন, আমি জীবনবিমুখ এক মানুষ। স্বপ্নহীন, লক্ষ্যহীন, গন্তব্যহীন। কেনো এমন কথা বলছি, তা তো আপনি জানেন।’ নীরবের কথায় হতাশা প্রতিফলিত হয়।
স্বর্ণা বলে— `আপনার কথাগুলো আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। তবে বলতে চাই, আপনার এই উপলব্ধির পরিবর্তন হবে। আপনি আবার স্বপ্ন দেখবেন, কাউকে স্বপ্ন দেখাবেন!’
`হাসালেন। আমার মধ্যে এক ফোঁটাও স্বপ্ন নেই।’
`স্বপ্ন নেই মানে এই নয়, আপনি নতুন করে স্বপ্ন দেখবেন না।’
`যদি পাল্টা বলি, নতুন করে স্বপ্ন দেখবো কেনো?’
নীরবের প্রশ্নে একটু হোঁচট খায় যেনো স্বর্ণা। বলে— `এটা জীবনের ধর্ম। বেঁচে থাকার সঙ্গে স্বপ্ন দেখা পরিপূরক বিষয়। এটাকে জোর করে অস্বীকার করলে হবে না।’
স্বর্ণার কথায় তর্ক করার ভঙ্গিতে নীরব বলে— `বেঁচে থাকা আর জীবনযাপন করার মধ্যে একটা ফারাক তো আছেই। বিশেষ করে আমার মতো যারা বেঁচে আছেন, তাদের কথা ভাবুন। স্বপ্ন, লক্ষ্য, আশা-উচ্চাশা এসব অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমি বলতে চাই— আমার মধ্যে এসব নেই। আমার অনুভূতিজুড়ে বিষাদ। আমি বিষাদে জর্জরিত।’
`বুঝতে পারছি, আপনার মনের অবস্থা যা, এতে স্বাভাবিক হতে আরো সময় লাগবে।’
`ধন্যবাদ, অন্তত এটুকু বোঝার জন্য।’
`ওয়েলকাম। আরেকটা প্রশ্ন করতে চাই।’
`করুন।’
`আপনি কিভাবে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে চান?’
`আমি নিজেও এর সঠিক জবাব জানি না।’
`তবুও কিছু একটা বলুন।’
`বেঁচে থাকতে হলে একটা কিছু করতে হবে। চাকরি বা ব্যবসা। এসব করতে গেলে জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে চলতে হবে। নিজেকে মানুষ করতে হবে। আমূল পরিবর্তন আনতে হবে নিজের মধ্যে। কিন্তু তা কি পারবো? মনে হচ্ছে, পারবো না। আমার মনের জোর একেবারেই নেই। আপনার জবাব পেলেন?’
`না, জবাব পাইনি। আরেকটি প্রশ্ন করছি। সেটি হলো, চরম হতাশা গ্রাস করলে আপনার কী মনে হয়?’
`তখন ভাবি, মরে গেলে কেমন হয়? মৃত্যু আমাকে দিতে পারে নিশ্চিত ঠিকানা।’
`এ ধরনের কথা ভাবা মানসিক রোগের লক্ষণ।’
`হয়তো আমি মানসিক রোগী।’
`কিন্তু আপনার মনোবল ভালো।’
`তা-ই না-কি?’
`হুম, অন্তত আমার তা-ই মনে হয়।’
`ধন্যবাদ দেবাে কমেন্টের জন্য?’
`মানুষ হলে ধন্যবাদ দিন, নেবো। প্রাণী হলে ধন্যবাদ জানানোর দরকার নেই।’
এ কথায় হো-হো করে হেসে ফেললো নীরব। এমন করে ও অনেকদিন হাসেনি। ওর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে রইলো স্বর্ণা। নীরবের হাসি থামার পর স্বর্ণা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো— `আপনি মুক্ত হয়েছেন। এখন আপনার কিছু করা উচিত।’
`কী করবো?’
নীরবের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে স্বর্ণা বললো— `কী করবেন, তা আপনি ঠিক করবেন। কিছু একটা তো করতে হবে। না-কি?’
`হা-হা-হা। আপনি দেখছি, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তিত!’
`চিন্তিত হলে দোষ কী? পরিচয় যখন হয়েছে, তখন কী করবেন, তা জানার আগ্রহ থাকতেই পারে। এটি আমার অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ও।’
`হুম। তা ঠিক।’
`তা হলে সত্যি সত্যি বলুন, কী করবেন?’
এর জবাব দিতে একটু ভাবলো নীরব। ও বললো— `আসলে আমি কী করবো বা কী করতে পারবো, এটা ঠিক করতে পারছি না। কারণ, যিনি আমাকে কারাগার থেকে বের করেছেন, তার একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজটা কী আমি এখনো জানি না। তার কাজটা করার পর ঠিক করবো, আমি কী করবো বা করতে পারবো। কথাটা আপনাকে বলা ঠিক হয়নি, তবু বললাম। প্রশ্নটা আপনি বারবার করছেন বলে বলতে বাধ্য হলাম।’
`আশ্চর্য তো! একজন আপনাকে কারাগার থেকে বের করে এনেছেন বলে তার কাজ করে দিতে হবে? এমন তো শুনিনি!’ বিস্ময় প্রকাশ করে স্বর্ণা।
নীরব এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চায় না। ও প্রসঙ্গ ঘোরাতে বললো— `আপনার ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন করি?’
`করুন।’
`আপনি নিশ্চয় এখনো বিয়ে করেননি?’
`না, করিনি।’
`কাউকে ভালোবাসেননি?’
এ প্রশ্নে কেমন হকচকিয়ে গেলো স্বর্ণা। ও বললো— `একেবারে ভালোবাসার কথা জানতে চাচ্ছেন! কেনো?’
`এমনিই।’
`আমার পছন্দের কেউ না থাকলে কি প্রপোজ করবেন?’
স্বর্ণার প্রশ্নে ভীষণ লজ্জা পেলো নীরব। মেয়েটি এ কী প্রশ্ন করলো? ও হতভম্ব হয়ে গেলো। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। স্বর্ণা প্রশ্নটির জবাব আর চাইলো না। সেও মুখ ঘুরিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। ওদের মধ্যে অস্বস্তিকর গুমোট নীরবতা নেমে এলো। গাড়ি ছুটে চলছে সাভারের দিকে। নীরব মনে মনে ভাবলো সাভারে স্বর্ণার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করবে। কিছুক্ষণ আগেও ওরা যেমন কথা বলছিল, সে রকমভাবে কথা বলবে। ওদের সম্পর্কের মধ্যে আবেগের কুয়াশা জমতে দেবে না ও।
আট.
নীরবের মনটা বিষণ্ন হয়ে আছে। অনেকদিন পর ওর ভীষণ রকম মন খারাপ হলো। এই মন খারাপের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। আবার কারণ যেনো আছেও, শুধু কারণটা নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না। নিজের ভালো লাগার কথা জানানোর পর নাবিলা যখন ওর প্রতি চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছিল, সে সময়ও মাঝে মাঝে এমন মন খারাপ হয়ে যেতো। মন খারাপ হবার কারণ নাবিলার `উপেক্ষা’ হলেও এই উপেক্ষাকে সুনির্দিষ্ট করতে পারতো না ও। কখনো কখনো মন খারাপ হবার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে না, তবু মন খারাপ হয়ে যায়। নীরবের এরকম মন খারাপ মাঝে মাঝে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় একদিন ভরদুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ফুটপাথ দিয়ে আনমনে টিএসসির দিকে হেঁটে যাচ্ছিল নীরব। রাস্তা ছিল প্রায় জনশূন্য। হঠাৎ একটি মেয়েলি আর্তচিৎকার শুনে চমকে ওঠে ও। রাস্তায় রিকশা থামিয়ে তিন ছিনতাইকারী ছোরা উঁচিয়ে একটি মেয়ের ব্যাগ ছিনতাই করছিল। মেয়েটিকে ওর চেনাচেনা লাগছিল, সম্ভবত তাকে সে রোকেয়া হলের গেটে দেখেছে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছিল নীরব। ছিনতাইকারীরা মেয়েটির ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গলা থেকে স্বর্ণের চেইন নেবার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই নীরব গর্জে উঠেছিল। `এই, কী হচ্ছে! তোরা কারা?’
নীরব ছিনতাইকারীদের দিকে দৌড়ে গেলো। নীরবকে দেখে বিনা প্রতিরোধে তিন ছিনতাইকারী ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে দৌড়াতে লাগলো। নীরবও ওদের পিছু নিয়ে `ধরো, ধরো’ বলে দৌড়াতে লাগলো। ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রধান ফটকের সামনে কিছু লোকের জটলা ছিল। ফুটপাথের ওপর হকারও ছিল। তারা কেউ ছিনতাইকারীদের ধরার চেষ্টা করেনি। নীরব একাই বীরের বেশে ওদের ধাওয়া করেছিল। ছিনতাইকারীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে মানুষের ভিড়ে মিলিয়ে যায়। হাঁপিয়ে এবং হতাশ হয়ে মেয়েটির কাছে ফিরেছিল নীরব। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে এসে দেখে মেয়েটি সেখানে নেই। এমন হতেই পারে। কিন্তু মেয়েটিকে না দেখে ওর ভীষণ মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। যুক্তিহীন মন খারাপ। এ কথা মনে করে আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়লো ওর। নীরব যখন কলেজে পড়ছিল, তখন রাহেলা নামে এক কিশোরী অযাচিতভাবে ওকে একটি রুমাল উপহার দিয়েছিল। রুমালটিতে একটি গোলাপের ফুল আঁকা ছিল এবং ফুলটির নিচে লেখা ছিল `লাভ ইউ’। রুমালটি ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল রাহেলা। এ ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল নীরব। রাহেলা ছিল ওর বন্ধু ইলিয়াসের চাচাতো বোন। ইলিয়াসদের বাড়ি ছিল নীরবদের পাশের গ্রামে। ইলিয়াসদের বাড়ির পাশ দিয়ে ওকে কলেজে যেতে হতো। কলেজে একই ক্লাসে পড়তে গিয়ে ইলিয়াসের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বও হয়ে যায়। ইলিয়াসের বাবা ছিলেন ইউপি মেম্বার। ফলে ওদের বাড়িতে গ্রামের লোকদের উপস্থিতি হরহামেশা দেখা যেতো। ইলিয়াসের বড় দুই ভাই জাপানে থাকতো। একান্নবর্তী পরিবার ছিল ওদের। ইলিয়াসদের বাড়িতে বড় স্ক্রিনের টিভি ছিল। ক্রিকেট খেলা দেখতে মাঝে মাঝে ইলিয়াসদের বাড়ি যেতো নীরব। ওদের বাড়িতে গেলেই রাহেলার সঙ্গে দেখা হতো ওর। রাহেলা তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী, চপল-চঞ্চল স্বভাব ওর। চোখে-মুখে কিশোরী বয়সের ছটফটানি একটু বেশি। রাহেলার মাথায় সবসময় চুলের বেণি দুলে থাকত। বেণিতে কখনো বেলি, কখনো রজনীগন্ধা, কখনো গাঁদা, কখনো কাঠবেলি ফুলের মালা দেখা যেতো। ফুলের প্রতি গভীর টান ছিল রাহেলার। বয়সের তুলনায় একটু বেশি ম্যাচিউরড ছিল মেয়েটি। নীরবকে দেখলেই রাহেলা যেনো কেমনভাবে তাকাতো। চোখে চোখ পড়লেই মিটিমিটি হাসতো। চোখ নাচাতো। প্রথম প্রথম রাহেলার চোখের ভাষা বুঝতে পারেনি নীরব। একসময় বুঝতে পারে যে, ওকে দেখলে রাহেলা কেমন উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে, চোখের ভাষায় কিছু বলতে চায়। এটা বুঝতে পেরে নীরব নিজের চারপাশে কঠিন এক ব্যুহ তৈরি করে রাখতো যেনো। রাহেলাকে একেবারেই পাত্তা দিতো না। কিন্তু রাহেলা ওর উপেক্ষা গায়ে মাখতো না। একদিন সন্ধ্যায় ইলিয়াসদের বাড়ি থেকে বের হতেই বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে রাহেলা বেরিয়ে এসে নীরবের হাতে রুমালটা ধরিয়ে দেয়। `লাভ ইউ’ লেখা রুমাল দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রেম হয় কি? নীরব রুমালটি পেয়ে বিব্রতবোধ করেছিল খুব। বাড়ি ফেরার পথে ও রুমালটি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল। নদীর জলে রুমাল ভসিয়ে দিয়ে রাহেলার অযাচিত ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করেছিল ও। কিন্তু এরপর যখন রাহেলার সঙ্গে দেখা হতো তখন ওর মন খারাপ হয়ে যেতো। রাহেলার চোখের দৃষ্টিতেও কিছু একটা পাওয়ার আকুতি ফুটে থাকতো। এতে ওর কী যায় আসে? এ কথা মনে মনে ভাবলে ও রাহেলাকে দেখলে ওর মন খারাপ হতো। এই মন খারাপ হবার কোনো কারণ নেই, আবার হয়তো আছে, যা ও বুঝতে পারেনি। পরের বছরই মহা ধুমধামে রাহেলার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে বাড়ির সাজসজ্জার কাজে ইলিয়াসের সঙ্গে নিরলসভাবে খেটেছিল নীরব। বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে রাহেলার চোখে-মুখে নির্মল আনন্দের ঝিলিক দেখেছিল ও। কিশোরী মেয়েরা বিয়ের দিন কী স্বপ্নাচ্ছন্ন থাকে? রাহেলার বিয়ের দিন কিন্তু নীরবের মন খারাপ হয়নি, রাহেলাও ছিল উচ্ছ্বসিত।
নীরবের আজ মন খারাপ হয়ে গেলো মাহাবুবের সঙ্গে দেখা হবার পর থেকে। যে মাহাবুবের প্রেমপত্র পৌঁছে দিয়েছিল নাবিলার হাতে, তার সঙ্গেই আকস্মিক দেখা হয়ে গেলো ওর। দুই নম্বর গুলশানে ওয়েস্টিন হোটেলে যাবার পথে রেস্ট হাউসটা চোখে পড়েছিল নীরবের। এই রেস্ট হাউসেই নাবিলা খুন হয়েছিল। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় রেস্ট হাউসটা দেখে নীরবের বুকের ভেতর কেমন একটা ঝড় হু-হু করে ওঠে। রেস্ট হাউসটা একবার দেখে গেলে কেমন হয়, এই ভেবে নীরব সিএনজি ছেড়ে দিয়ে রেস্ট হাউসের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওকে দেখে রেস্ট হাউসের দারোয়ান জানতে চায়— কী চায় সে। নীরব দারোয়ানকে বলে— `এই রেস্ট হাউসের মালিক কে? তিনি কি আছেন?’
`আইজ মালিক আসেন নাই। তার ছেলে আছে। ভাড়া নিতে হইলে ভেতরে যান, স্যারের লগে কথা বলেন।’
`স্যার কে?’ জানতে চায় নীরব।
দারোয়ান বলে— `ছোট স্যার। মালিকের ছেলে।’
এ কথা বলে দারোয়ান গেট খুলে দেয়। নীরব ভেতরে ঢুকে পড়ে। নাবিলাকে উদ্ধার করতে যেদিন ও এই রেস্ট হাউসে এসেছিল, সেদিন ভালো করে বাড়িটি লক্ষ্য করেনি। বাড়ির সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের প্রশস্ত পাকা ড্রাইভওয়ে আছে। পেছনে ফুলগাছের বাগান। বাড়িটির চারপাশের দেয়াল একটু বেশি উঁচু। দু-পাশের দেয়ালজুড়ে কিছু লতাগুল্ম ঝুলে আছে।
রেস্ট হাউসের দরজা খোলাই ছিল। দরজায় সামনে দাঁড়াতেই ওর বন্ধু মাহাবুব হাসানকে দেখতে পেলো ও। দুজনের চোখাচোখি হতেই একটা বৈদ্যুতিক শক সৃষ্টি হলো যেনো নীরবের চেতনায়। এখানে মাহাবুবকে দেখতে পাবে, এমন আশা করেনি সে। মাহাবুবও ভীষণ চমকে যায় ওকে দেখে। নীরবের কণ্ঠে কয়েক মুহূর্ত ভাষা ফোটে না। মাহাবুব লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এসে বলে— `আরে, নীরব, তুমি! এখানে!’ এ কথা বলে নীরবের সামনে এসে ওর দুটি হাতের কব্জি নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নেয় সে।
নীরব ভাবতে থাকে, মাহাবুব কি তা হলে এই রেস্ট হাউসের মালিক? এটা সে জানতো না। এখন জেনে ওর চিন্তার মধ্যে একতাল বিস্ময় ঢেউ তোলে।
নীরবকে নিশ্চুপ দেখে মাহাবুব বলে— `বন্ধু, তুমি এভাবে চুপ করে আছো যে? এসো, ভেতরে এসো।’
মাহাবুব ওর হাত ধরে রেস্ট হাউসের ভেতরে ড্রইংরুমে নিয়ে যায়। সুসজ্জিত ড্রইংরুমের মাঝখানে দুই সেট সোফা চৌকোণভাবে রাখা। মাহাবুব নীরবকে একটি সোফায় বসিয়ে ওর মুখোমুখি অন্য সোফায় বসে। নীরব নিজেকে ধাতস্থ করে নিতে থাকে। ওর চিন্তার মধ্যে প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। চুপ করে থাকাটা শোভন হচ্ছে না ভেবে নীরব মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে— `মাহাবুব, অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো! অনেক দিন! তা-ই না?’
`হুম। তোমার কথা মনে হলেই মনটা খারাপ হয়ে যেতো। আজ তোমাকে দেখে কী যে ভালো লাগছে!’ কথা বলতে গিয়ে মাহাবুবের কণ্ঠ আবেগে কেঁপে ওঠে।
নীরব একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে— `এই রেস্ট হাউসের মালিক কি তুমি?’
`না, না। আমি ঠিক মালিক নই। আমার বাবা মালিক। কেনো, তুমি জানতে না, গুলশানে আমাদের রেস্ট হাউস আছে?’
`না, জানতাম না। তুমি কি আমাকে কখনো এ কথা বলেছিলে?’
`ঠিক মনে নেই। হয়তো বলেছিলাম, হয়তো বলা হয়নি। কেনো, বলো তো?’ মাহাবুব প্রশ্নচোখে তাকিয়ে থাকে নীরবের মুখের দিকে।
নীরব ম্লান হাসে। `তুমি কি জানো না, নাবিলা এই রেস্ট হাউসে খুন হয়েছিল আর আমি নাবিলা হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার হয়েছিলাম?’
`জানবো না কেনো? পত্রিকায় তো কতো রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম তোমার চৌদ্দ বছর কারাদণ্ড হয়েছিল বলে। আই ওয়াজ টু মাচ আপসেট, মাই ফ্রেন্ড!’ মাহাবুবের কণ্ঠ বিষণ্ন শোনায়।
নীরব বলে— `নাবিলা খুন হওয়ায় আপসেট হওনি? ওকে তো তুমি ভালোবেসেছিলে।’
`নীরব, আমি নাবিলার খুনের ঘটনায়ও ভীষণ আপসেট হয়েছিলাম। কিন্তু তুমি যে নাবিলাকে খুন করবে, এটা কিন্তু ভাবতে পারিনি। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল, ভীষণ কষ্ট হয়েছিল।’
মাহাবুবের কথায় নীরব ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ও মাহাবুবের চোখে চোখ রেখে জানতে চায়— `মাহাবুব, তুমি কি মনে করো, নাবিলাকে আমি খুন করেছি?’
নীরবের প্রশ্নে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে মাহাবুব। এরপর বলে— `আমার মনে করায় কী যায় বা আসে, নীরব? মামলায় প্রমাণ তো হয়েছে যে, তুমি নাবিলাকে খুন করেছো। পুলিশের তদন্তেও এ কথা বলা হয়েছে।’
`আমি তোমার ধারণার কথা জানতে চাচ্ছি। আমার তো যা হবার হয়েছে, বন্ধু হিসেবে তোমার ধারণা কী, জানতে ইচ্ছে করছে। তাই জানতে চাচ্ছি, তোমার কি মনে হয়, নাবিলাকে আমি খুন করেছি?’
নীরবের কথায় মাহাবুব একটু ভাবে। নীরব দৃষ্টি সরায় না মাহাবুবের মুখ থেকে। ও প্রশ্নটার জবাব আশা করছে। কয়েক মুহূর্ত পর মাহাবুব বলে— `বন্ধু, আমি বিশ্বাস করি না, তুমি নাবিলাকে খুন করেছো। হলো?’
মাহাবুবের কথায় মুচকি হাসলো নীরব। `এবার আরেকটি প্রশ্ন করি?’
`করো।’
`নাবিলাকে কে খুন করতে পারে, বলো তো?’
প্রশ্ন শুনে মাহাবুবের কপালে ভাঁজ পড়লো। ও ফের একটু ভেবে বললো— `এতো দিন পর দু-বন্ধুর দেখা হলো। আর তুমি কী সব প্রশ্ন করছো, নীরব? রাখো তো ওসব খুনের কথা!’
`বন্ধু, একটি খুনের ঘটনায় আমার জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তুমি কি জানো, কী ভাগ্যে আমি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছি? হয়তো জানো না।’
এ কথার জবাবে মাহাবুব বললো— `নীরব, আমি জানি তুমি প্রেসিডেন্ট মার্সিতে বের হয়েছো। পত্রিকায় এ খবরও পড়েছি। জানবো না কেনো?’
`তা হলে তো জানো দেখছি। তোমাকে একটা কথা বলে রাখছি, নাবিলার খুনিকে আমি বের করতে চাই। এর জন্য আমাকে যদি আবারো জেলে যেতে হয়, আমি যাবো।’
`অফকোর্স তুমি তা করবে। আমিও চাই নাবিলার খুনি কে, তা বের হয়ে আসুক। তুমি যদি আমার কোনো সাহায্য চাও, আমি করবো।’ মাহাবুবের কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুটে ওঠে।
নীরব জানে, মাহাবুব ওর কথা রাখতে পারবে না। কারণ, সে ভীতু শ্রেণির মানুষ। খুন-টুনের কথা শুনলে ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতো। ও ছাত্রমৈত্রী করতো এবং মিছিলেও যেতো। কিন্তু সংঘর্ষ বেঁধে গেলে মিছিল থেকে ও লাপাত্তা হয়ে যেতো। একদিন ছাত্রমৈত্রীর সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘর্ষ বেধে গেলে ও পালিয়ে গিয়ে ধাওয়ার মুখে ভুলক্রমে আশ্রয় নিয়েছিল সূর্যসেন হলে। সূর্যসেন হল তখন ছিল ছাত্রদলের ক্যাডার মামুনের দখলে। মাহাবুবকে পাকড়াও করেছিল মামুন গ্রুপের ছেলেরা। উত্তম-মাধ্যম দিয়ে মাথা ন্যাড়া করে ছেড়ে দিয়েছিল। এ ঘটনায় প্রায় এক মাস ডিপার্টমেন্ট এবং ক্যাম্পাসে মামুনকে দেখা যায়নি। ভয়কাতুরে মামুন এখন নীরবকে আবেগবশত নাবিলার খুনিকে বের করার কাজে সাহায্য করার আশ্বাস দিচ্ছে। নীরব আপন মনে হাসে। বলে— `ঠিক আছে, তুমি আমাকে জানাবে, নাবিলা যেদিন খুন হয়েছিল, সেদিন এই রেস্ট হাউসটা কে ভাড়া করেছিল। পারবে না?’
`কেনো, একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ভাড়া নিয়েছিল। যদিও তিনি সেদিন এখানে আসেননি। আমাদের রেকর্ডে তার নাম আছে। আদালতেও তা সাবমিট হয়েছিল, জানো না?’ হড়হড় করে কথাগুলো বললো মাহাবুব।
এ কথা নীরবও জানে। পুলিশ এ মামলার চার্জশিটে প্রমাণসহ এই তথ্য উল্লেখ করেছিল। কিন্তু নীরবের ধারণা, এর আড়ালে অন্য কেউ ছিল। সেদিন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ভাড়া নিলেও রেস্ট হাউসটি ব্যবহার করেছিল অন্য কেউ। ওই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা সেদিন ছিলেন দেশের বাইরে। এ কথা মনে করে নীরব বলে— `মাহাবুব, তোমাদের রেস্ট হাউসের রেকর্ডের কথা জানতে চাইনি। তুমি অনুসন্ধান করে বের করো, আসলে সেদিন এই রেস্ট হাউসে কে ছিল। তুমি চেষ্টা করলে হয়তো পারবে। কৌশলে এই তথ্য বের করতে হবে। স্টাফদের জিজ্ঞেস করতে পারো।’
`বন্ধু, আমাদের সব স্টাফই এখন নতুন। আগে যারা ছিল, তারা এখন নেই। তবু দেখি, কী করা যায়।’
আলোচনার এ পর্যায়ে এক মধ্যবয়সী লোক ট্রেতে করে কেক ও চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ওদের সামনে টেবিলে রাখলো। মাহাবুব ওই লোকের দিকে তাকিয়ে বললো— `জলিল সাহেব, আপনি লাঞ্চের ব্যবস্থা করুন। আমরা দুপুরে এখানে খাবো।’
লোকটা `জি আচ্ছা’ বলে চলে গেলো।
নীরব বললো— `মাহাবুব, আমি লাঞ্চ করতে পারবো না। আমাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যেতে হবে।’
`কী বলছো তুমি! এতো দিন পর দেখা হলো, তোমাকে না খাইয়ে ছাড়বো না-কি!’
`অন্য একদিন খাবো, বন্ধু। তুমি বরং আমাকে এই উপকারটা করো।’
`কোনটা?’
`ওই যে বললাম, নাবিলা যেদিন খুন হয়, সেদিন এই রেস্ট হাউসে কে ছিল, এই তথ্য বের করো। প্লিজ, বন্ধু!’ নীরব এবার মাহাবুবের দুহাত ধরে।
মাহাবুব একটু ভাবে। এরপর বলে— `চেষ্টা করবো। দেখি, তোমাকে সাহায্য করতে পারি কি-না। তবে কি…’ এ পর্যন্ত বলে থেমে যায় মাহাবুব।
নীরব ওর হাত ছেড়ে দিয়ে জানতে চায়— `তবে?’
`না, মানে। এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করলেই কি নয়? আবার যদি নতুন করে ঝামেলায় পড়ে যাও!’
`মাহাবুব, আমি কি আগের মতো আছি? নেই। আমার মধ্যে এখন লড়াই করার সাহস জন্ম নিয়েছে। এর মধ্যে আমার আছে খুনির তকমা। লড়াইয়ে একটু নেমে দেখি না, কী হয়। তা ছাড়া কৌতূহল বলেও একটা কথা আছে। আমি জানতে চাই, নাবিলাকে আসলে কে খুন করেছে। তুমিও কি জানতে চাও না? না-কি আমাকেই খুনি ভাবছো?’
নীরবের প্রশ্নে বিব্রতকণ্ঠে মাহাবুব বলে— `না, না। তা ভাবছি না। তবে প্রথম প্রথম পত্রিকার খবর পড়ে বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে, তুমি নাবিলাকে খুন করেছো। আজ কথা বলার পর ধারণা পাল্টে গেছে। সত্যি বলছি।’
`আজ আমিও কিন্তু তোমাকে এখানে দেখে চমকে গিয়েছি।’ বলে নীরব।
মাহাবুব ম্লান হেসে বলে— `কেনো, বন্ধু?’
`এই রেস্ট হাউসের মালিকের ছেলে তুমি। আর এখানে খুন হয়েছে নাবিলা। যাকে তুমি আমাকে দিয়ে প্রেমপত্র দিয়েছিল এবং প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলে। কোথাও একটা কাকতালীয় মিল আছে না?’
নীরবের কথায় মাহাবুব একটু বিমর্ষ হয়ে যায়। নীরব ওকে ভড়কে দিতেই কথাটা বললো। মাহাবুব বিমর্ষ কণ্ঠে বলে— `কাকতালীয় বটে। জানো, আমিও এ কথা ভেবে শিউরে উঠি মাঝে মাঝে। তুমি আমাকে কোনোভাবে সন্দেহ করছো না তো?’
হো-হো করে হেসে ওঠে নীরব। মাহাবুবকে ভয় পাইয়ে দিয়ে ওর ভালো লাগছে। নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে হলো নীরবের। ওর হাতে সময় তেমন নেই। ওয়েস্টিনে যেতে হবে তানজিলার সঙ্গে দেখা করতে। শাকিল চৌধুরীর নির্দেশ আজ অমান্য করা ঠিক হবে না। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। নীরব বললো— `মাহাবুব, সন্দেহ এবং বিশ্বাস দুটোই সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। আজ উঠি। আমাকে যেতে হবে।’
`সে কী, তাই বলে চা-ও খাবে না?’
`আজ নয়। আমার তাড়া আছে। তোমার ফোন নম্বরটা দাও। পরে ফোনে কথা বলবো।’
মাহাবুব প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলো। মানিব্যাগ থেকে একটা বিজনেস কার্ড বের করে নীরবের হাতে তুলে দিলো সে।
নীরব বললো— `আমি তোমাকে এখান থেকে বের হয়েই মিস কল দিয়ে দেবো। নম্বরটা সেভ করে নিও।’
`আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু নীরব, তুমি কী করবে এখন? তোমার কথা তো কিছু বললে না?’
`বলবো। কিছুদিন পর। তোমার সঙ্গে দেখা তো হবেই।’
`তা হবে। তারপরও বলে রাখছি, আমাদের ব্যবসা আছে নবাবপুরে, তুমি তো জানো। না-কি ভুলে গেছো?’
`মনে নেই। বলে ফেলো, কী বলতে চাও।’
`না, মানে। আমরা চীন থেকে ইলেকট্রনিক্স গুডস আমদানি করি। তুমি চাইলে আমাদের কোম্পানিতে তোমাকে একটা চাকরি দিতে পারি। আফটার অল তুমি আমার বন্ধু।’
`ধন্যবাদ, মাহাবুব। চাকরির প্রয়োজন হলে তোমাকে বলবো। তবে যে সহযোগিতা চেয়েছি, আগে সেই সহযোগিতা করো, কৃতজ্ঞ থাকবো। আমি যাচ্ছি, পরে কথা হবে।’
নীরব তাড়াহুড়ো করে রেস্ট হাউস থেকে বের হয়ে আসে। ওকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেয় মাহাবুব। মাহাবুবের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয় নীরব। এতো দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুকে পেয়ে ওর আনন্দিত হবার কথা; কিন্তু ওর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। ওর মনে হচ্ছিল, রেস্ট হাউসে মাহাবুবকে না দেখলে ভালো হতো। মাহাবুবকে দেখে মনটা কেমন খচখচ করছে। এখানে ওকে দেখে মন খারাপ হওয়া অর্থহীন, আবার চেতনার ভেতরে অদৃশ্য এক অর্থ দূর আকাশের নক্ষত্রের মতো জ্বলেও আছে। ও বিষণ্ন মনে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যায় বিলাসবহুল হোটেল ওয়েস্টিনে।
ওয়েস্টিনের বলরুম থেকে বের হতেই নীরবকে দেখতে পেলো তানজিলা। নীরব বলরুমের দরজার সামনে এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল যে, তাকে না দেখারও উপায় নেই। বলরুমের ভেতরে অনুষ্ঠান চলছে। তানজিলা কেনো অনুষ্ঠান শেষ হবার আগে বেরিয়ে এসেছে, তা জানার কথা নয় ওর। শাকিল চৌধুরী বলেছে, যেভাবে হোক তানজিলার সঙ্গে সে যেনো দেখা করে। দেখাটা এমনভাবে হবে, যেনো হঠাৎ করেই ওদের দেখা হয়ে গেলো। শাকিল চৌধুরীর কথামতো ও দাঁড়িয়েছিল বলরুমের দরজার সামনে। ভাবখানা, এমনিতেই দাঁড়িয়ে আছে। তানজিলা ওকে দেখে এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললো— `নীরব, আপনি! এখানে!’
তানজিলার কণ্ঠে বিস্ময়, না আনন্দ ফুটে আছে, বুঝতে পারলো না ও। নীরব মুখে হাসি বিস্তৃত করে বললো— `আপনি এখানে?’
`আমি তো একটা পার্টিতে এসেছি। আপনি?’
`আমি আমার এক বন্ধুকে খুঁজতে এসেছিলাম। ও বলেছিল ওয়েস্টিনে আসতে। কিন্তু ওকে পেলাম না। ওকে ফোনেও পাচ্ছি না।’
`আছে হয়তো। ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে। আপনি অপেক্ষা করুন।’
`না, না। আমি চলে যাচ্ছিলাম। যাবার সময় ভাবলাম, হোটেলটা একটু ঘুরে দেখি। অনেক দিন পর দেখা, বুঝলেন না?’ কথাটা বলে মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করলো ও। শাকিল চৌধুরীর নির্দেশে মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছিল। এমন নির্জলা মিথ্যা ও কখনো বলেনি। শাকিল চৌধুরীর চিত্রনাট্য অনুযায়ী ওকে অভিনয় করতে হচ্ছে।
তানজিলা কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। বললো— `আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন? আমি আপনাকে লিফট দিতে পারি, যাবেন?’
এমন প্রস্তাবের অপেক্ষাই করছিল ও। লিফট দেয়ার প্রস্তাব না দিলে ও নিজেই লিফট চাইতো। এমন কথা বলে দিয়েছেন শাকিল চৌধুরী। তানজিলার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে দেখা হয়ে যাবে, এমন চাচ্ছে সে। তানজিলার সঙ্গে নীরবকে ঘনিষ্ঠ হবার কথা বলছে। এ ধরনের কথা পাগলামি ছাড়া কিছু না। কিন্তু এ কাজ করতে ও বাধ্য হচ্ছে। শাকিল চৌধুরী শর্ত দিয়েই ওকে কারাগার থেকে বের করেছে, এ কথা ওকে ভুলে গেলে চলবে না। চট করে কথাগুলো ভেবে নেয় নীরব। তানজিলা ওর জবাব আশা করছে। ও কণ্ঠে দ্বিধা জাগিয়ে বলে— `আপনার কষ্ট হবে না তো? বা কাজের ব্যাঘাত ঘটবে না?’
নীরবের কথায় তানজিলার মুখে অমলিন হাসির মুদ্রা বিস্তৃত হয়। সে বলে— `নীরব, চলুন, আগে আপনাকে কিছু খাওয়াই। টপ ফ্লোরে একটি ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে, ওখানে যাই, চলুন।’
তানজিলার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার কোনো কারণ নেই। নীরবের কাজ হচ্ছে যতোক্ষণ পারা যায় তানজিলার সঙ্গে থাকা। ও মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো— `আপনার সময় নষ্ট করছি না তো?’
`আমার সময় আছে। চলুন।’
তানজিলা লিফটের দিকে এগিয়ে গেলো। নীরব তার সঙ্গে লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তানজিলা লং স্কার্ট ও টপস পড়েছে। কালো রঙের স্কার্ট আর লাল রঙের টপসে তাকে আকর্ষণীয় লাগছে। গায়ে কালো রঙের ব্লেজার। চুলগুলো কার্ল করা। পায়ে কালো রঙের পাম্প সু। তানজিলার শরীর থেকে পারফিউমের মৌ-মৌ গন্ধ ভেসে আসছে। লিফট এসে থামতেই তানজিলা লিফটে প্রবেশ করে, সে সঙ্গে নীরবও। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে লিফট চলে যাচ্ছে ওপরের দিকে। লিফট উঠে যাওয়ার মতো জীবনটাও যদি সফলতার লিফটে দ্রুত ওপরে উঠে যেতো! ভাবে নীরব। ভাবালুতায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল ও, তানজিলার কথায় সম্বিত ফিরে পায়।
`আচ্ছা, আপনি এখন কী করবেন, ভেবেছেন?’
নীরব কয়েক মুহূর্ত পর বলে— `আমি নিজেও জানি না, কী করবো বা কী করতে পারবো।’
`আপনি এখন কোথায় আছেন?’
`আমি আপনার স্বামী শাকিল চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে আছি। তিনিই আমার বর্তমান অভিভাবক।’
`হুম। তা হলে ওকে বলুন, ও যেনো আমাদের অফিসে আপনাকে একটা চাকরি দিয়ে দেয়।’
`জি, বলবো।’ বললো নীরব। মনে মনে বললো— তার চাকরি তো করছি। চাকরির ধরনটা জানি না, এই যা। লিফট টপ ফ্লোরে এসে মৃদু শব্দ করে থেমে যায়। লিফটের দরজা খুলে গেলো। তানজিলা লিফট থেকে বেরোয়, তার পেছনে বেরোয় নীরব। তানজিলা এগিয়ে যায় রেস্টুরেন্টের দিকে। ঠিক এ সময় ফোন আসে শাকিল চৌধুরীর। নীরব হাঁটার গতি কমিয়ে ফোন রিসিভ করে। `হ্যালো!’ নিচু গলা।
ও-প্রান্ত থেকে শাকিল চৌধুরী বলে— `আপনি কোথায়, তানজিলার সঙ্গে দেখা হয়েছে?’
`আমি তার সঙ্গেই আছি।’
`আপনারা কোথায় এখন?’
`ওয়েস্টিনের টপ ফ্লোরে। মাত্র এসেছি। ম্যাডাম আমাকে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে এসেছেন।’
`গ্রেট! আর শুনুন, ওকে ম্যাডাম বলবেন না। ওর নাম ধরে ডাকবেন। তানজিলা বলবেন, মনে থাকবে?’
`জি, থাকবে। আর কিছু বলবেন?’
`তানজিলা কোথায়, আপনার কাছাকাছি?’
`না, তিনি এগিয়ে গেছেন। আমি তার পেছনে আছি।’
`ঠিক আছে, ওর পেছন ছাড়বেন না। এখন থেকে সব সময় ওর সঙ্গে থাকবেন। ওর সঙ্গে গল্পগুজব করবেন। মনে থাকবে?’
`এটুকুই আমার কাজ?’
`আপাতত তা-ই। রাখছি, পরে কথা হবে।’ বলেই শাকিল চৌধুরী ফোন রেখে দিলো। নীরব শাকিল চৌধুরীর উদ্দেশ্য কী, এর কিছুই বুঝতে পারছে না। লোকটির মাথায় যে অস্বাভাবিক চিন্তার জট আছে, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। কিন্তু তার রহস্যময় পরিকল্পনায় নীরবের ভূমিকা কী হবে, এটা ও নির্ণয় করতে পারছে না। ধোঁয়াটে এক চিত্রনাট্যে ও একক অভিনয় শুরু করেছে। এর কোনো মানে হয়? নীরব দ্রুত পদক্ষেপে তানজিলার কাছাকাছি চলে এলো। তানজিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়াটা ঠিক হচ্ছে কি-না, কে জানে। নীরব এ মুহূর্তে ওসব ভাবতে চায় না।
নয়.
মেহেদীকে দেখে ভীষণ বিরক্ত হলো স্বর্ণা। অবাকও হলো তাকে ওদের ড্রইংরুমে দেখে। মেহেদী ওর পেছনে এক বছর ধরে ছায়ার মতো ঘুরছে। স্বর্ণা যেখানে যাচ্ছে, খবর সংগ্রহ করে সেখানেই হাজির হচ্ছে সে। এমন কী স্বর্ণার অফিসে পর্যন্ত বেশ কয়েক দিন গিয়েছে। তার আচরণ উপদ্রবের পর্যায়ে চলে গেছে। তাকে স্বর্ণা অনেক আগেই বলে দিয়েছে, সে আর মেহেদীকে ভালোবাসে না। তার জন্য স্বর্ণার এক ফোঁটাও দুর্বলতা নেই। কিন্তু মেহেদী ওর কথা যেনো কানেই তুলছে না। হ্যাংলার মতো ওকে অনুসরণ করছে, সুযোগ পেলেই কথা বলতে চাইছে। মেহেদীকে এতোটা ব্যক্তিত্বহীন আর অনুজ্জ্বল আগে মনে হয়নি ওর। চার বছর আগে এই মেহেদীর প্রেমে সাড়া দিয়েছিল স্বর্ণা। ও তখন সাউথ-ইস্ট ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্রী। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স সম্পন্ন করছিল মেহেদী। মেহেদী এক কথায় সুদর্শন পুরুষ। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, উচ্চতা পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা, চোখ দুটো বড় না হলেও তেমন ছোট নয়। হাসলে চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মাথার চুলগুলো একটু কোঁকড়ানো, লম্বা জুলফি রাখতো সে। মেহেদী বেশিরভাগ সময় জিন্স প্যান্ট-টি শার্ট আর চোখে র্যাভোন সানগ্লাস পরতো। হ্যান্ডস্যাম লাগতো তাকে। ক্যাম্পাসে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে চুটিয়ে আড্ডা দিতো। আড্ডা দেয়ার জন্য কিছু সহপাঠীও জুটিয়ে ফেলেছিল। মেহেদীকে যে কোনো মেয়ে দেখলে পছন্দ করে ফেলতো। স্বর্ণাদের ক্লাসের অনেক মেয়ে মেহেদীর গল্প করতো। কৌতূহলী না হলেও ওসব গল্প মাঝে মাঝে ওকে শুনতে হতো। মেহেদীও মেয়েদের সঙ্গে `প্রেম-প্রেম’ খেলা করতে পছন্দ করতো, যা জানতো না স্বর্ণা। মেহেদী ওর এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরেই না-কি স্বর্ণার সঙ্গে প্রেম করেছিল, এ কথা স্বর্ণা পরে জানতে পারে। একদিন দুপুরে টিফিন আওয়ারে ক্যাম্পাসে বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার সময় মেহেদী এসে সবার সামনে স্বর্ণার উদ্দেশে বলেছিল— `আপনার সঙ্গে এখনো পরিচয় হয়নি। আমার নাম মেহেদী, আপনার?’
স্বর্ণা ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল তার কথায়। ও এর কোনো জবাব না দিয়ে আড্ডা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আরেক দিন ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্বর্ণা দেখে, তার গাড়ির চাকা পাঙ্কচার হয়ে গেছে। চালক মোকলেস মিয়া গাড়িতে রাখা নতুন চাকা লাগানোর চেষ্টা করছিল, এমন সময় মেহেদী এসে স্বর্ণাকে বলে— `আপনি তো উত্তরায় থাকেন, এক নম্বর সেক্টরে। আমাদের বাড়ি তিন নম্বরে সেক্টরে। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিই।’
`ধন্যবাদ। আমি অপরিচিত কারো সাহায্য নিই না।’ বিরক্তি প্রকাশ করে বলে স্বর্ণা।
মেহেদী দমে না। সে বলে— `অপরিচিত কই? একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি আমরা। একই এলাকায় থাকি। না হয় বাকি পরিচয়টুকু যেতে যেতে হয়ে যাবে।’
`দেখুন, মিস্টার, আমাকে বিরক্ত করবেন না। আপনি যে ধরনের মেয়েদের চেনেন, আমি সে ধরনের মেয়ে নই। এটা মনে রাখবেন। অন্য কাউকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন।’
এ ঘটনার সময় মেহেদীর সঙ্গে ওর আরো দুই বন্ধু ছিল। স্বর্ণার আচরণে বন্ধুদের কাছ থেকে ওকে বেশ টিপ্পনি সহ্য করতে হয়েছিল। সেদিনই সে স্বর্ণার সঙ্গে প্রেম করে দেখাবেই, এমন বাজি ধরেছিল ওর এক বন্ধুর সঙ্গে। স্বর্ণার কাছে পৌঁছতে মেহেদী এবার অন্যপথ ধরে। ক্লাসে স্বর্ণার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল তনুশ্রী দত্ত। তনুশ্রী থাকতো লালমাটিয়ায়। মেহেদী কিভাবে যেনো তনুশ্রীর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলে। তনুশ্রীকে বিবিএ পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নোট দিতে থাকে। এই অজুহাতে ও তনুশ্রীর বাড়িতেও যাতায়াত করার সুযোগ পেয়ে যায়। এই তনুশ্রীই স্বর্ণাকে মেহেদীর কথা বলতে বলতে এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি করে দেয়। সহপাঠী বান্ধবীর অনর্গল `মেহেদী বচন’ স্বর্ণার মনে রেখাপাত সৃষ্টি করে যাচ্ছিল নীরবে। বিবিএ পরীক্ষা শেষ হবার পর সিনেমা দেখবে বলে একদিন স্বর্ণাকে বসুন্ধরা মলে আসতে বলে তনুশ্রী। স্বর্ণা বসুন্ধরা মলের সিনেমা হলে চলে আসে। দুই বান্ধবী হলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নিজ নিজ আসনে বসে পড়ে। একটু পরেই ওর পাশের আসনে এসে বসে মেহেদী। স্বর্ণা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারে, তনশ্রী চালাকি করেই ওকে সিনেমা দেখাতে এনেছে। পাশাপাশি আসনের তিনটি টিকিট আগেই কাটা হয়েছিল। স্বর্ণা উঠে চলে আসতে চেয়েছিল; কিন্তু পারেনি। তনুশ্রীর অনুরোধ আর মেহেদীর বিনয়ী ব্যবহার ও উপেক্ষা করতে পারেনি। সেই সিনেমা দেখা থেকেই মেহেদীর সঙ্গে কথা বলা শুরু। এরপর স্বর্ণার মন জয় করতে মেহেদীর বেগ পেতে হয়নি। ওদের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টির মাঝখানে ছিল তনুশ্রীর মধ্যস্থতা। এমবিএতে ভর্তি হবার সময় স্বর্ণাকে খুব সময় দিয়েছিল মেহেদী। তনুশ্রী কেনো জানি এমবিএতে ভর্তি হলো না। সে বছর স্বর্ণার বিশতম জন্মদিনে সকালে মেহেদী একগুচ্ছ ফুল নিয়ে হাজির হলো ওদের বাসায়। সেদিন ওকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি প্রপোজ করেছিল মেহেদী। স্বর্ণাও সাড়া দিয়েছিল ভালোবাসায়। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নিজেকে ধরে রাখা যায় না। সেদিনের সকালটিও ছিল সেরকম। মেহেদীর সঙ্গে কয়েকদিন মেলামেশার পর স্বর্ণা জেনেছিল, মেহেদী ওর ভালোবাসা আদায় করতে বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরেছিল। কিভাবে তনুশ্রীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছিল, এ কথাও জানতে পারে। মেহেদীকে ভালোবাসায় কোনো গ্লানি ছিল না স্বর্ণার; কিন্তু কয়েক মাস পেরুতেই এক ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি হতে হলো ওর। যে বান্ধবীর কারণে মেহেদীর সঙ্গে ও ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েছিল, সেই বান্ধবীই একদিন ওর কাছে এসে মেহেদীকে ফেরত চাইলো। এমন ঘটনার জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। তনুশ্রী একদিন স্বর্ণার সঙ্গে দেখা করে জানালো যে, নিজের অজান্তেই ও মেহেদীকে ভালোবেসে ফেলেছিল। মেহেদীর প্রতি ওর দুর্বলতা চেপে রাখতে পারেনি বলে সে স্বর্ণার সঙ্গে এমবিএতে ভর্তি হয়নি। তনুশ্রীর দুর্বলতার কথা জেনে মেহেদী ওর স্বভাব অনুযায়ী ওকেও প্রেমিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। তনুশ্রীর সঙ্গে গোপন এক সম্পর্ক গড়ে তোলে মেহেদী। ওরা এরপরও দুজনে বসুন্ধরা মলে সিনেমা দেখেছে, ঘুরে বেরিয়েছে বিভিন্ন স্থানে। একপর্যায়ে মেহেদী ওকে নিয়ে ডেটিংও করে। অকপটেই তনুশ্রী নিজের অপরাগতার কথা, অবিবেচিত প্রেমের কথা স্বর্ণার কাছে স্বীকার করেছিল। একটি কাচের গ্লাস হঠাৎ যেমন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, স্বর্র্ণাও তনুশ্রীর কথা শুনে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে গভীর বেদনার বিষয় ছিল তনুশ্রী তখন ছিল অন্তঃসত্ত্বা। এ কথা জানার পর মেহেদীর প্রতি এক তাল ঘৃণা স্বর্ণার কণ্ঠনালি পর্যন্ত দলা পাকিয়ে উঠে আসে। ওই ঘৃণা আজ অবধি ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। স্বর্ণার প্রশ্নের মুখে তনুশ্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিল মেহেদী। স্বর্ণা বলেছিল তনুশ্রীকে বিয়ে করতে; কিন্তু সে রাজি হয়নি। মেহেদীর বক্তব্য ছিল, বিশেষ পরিস্থিতিতে তনুশ্রীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক হয়েছে কিন্তু সে তনুশ্রীকে ভালোবাসে না। সে বলেছিল— তনুশ্রীর অন্তঃসত্ত্বার জন্য সে যেমন দায়ী, তেমনি তনুশ্রীও দায়ী।’ কে দায়ী, কার দায়— এ প্রশ্ন নিয়ে অনেক ভেবেছে স্বর্ণা। তনুশ্রীকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধারে মেহেদী দায়বদ্ধ নয় বলে দূরে সরে যায় নির্বিকারভাবে। স্বর্ণাও নিঃসংকোচে মেহেদীর জীবন থেকে সরে যায়। হঠাৎ একদিন স্বর্ণা জানতে পারে, মেহেদী উচ্চতর ডিগ্রি নিতে লন্ডনে চলে গেছে। তনুশ্রীর পরিবার এ খবর জানতে পেরে অ্যাবরশন করিয়ে ওকে কুমারী মা হবার বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। আর স্বর্ণা ভুল লোককে ভালোবাসার ক্ষত বুকে পুষে পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমবিএ পাস করার পর ফের মেহেদীর দেখা পায় ও। মেহেদীই ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু স্বর্ণা ওর সঙ্গে কোনো কথাই বলেনি। গত এক বছর ধরে মেহেদী ওকে বিরক্ত করছে। মেহেদী জানে না, স্বর্ণা কতোটা জেদি, ইস্পাতের মতো কঠিন। সে নাছোড়বান্দার মতো ওর পেছনে ঘুরছে। পণ্ডশ্রম। আজ সে ওদের বাসার ড্রইংরুমে বসে আছে। পূর্বপরিচিত হিসেবে হয়তো মা মেহেদীকে বসতে দিয়েছে। মা তো আর ওসব ঘটনার কথা জানে না। স্বর্ণা মনে মনে ঠিক করে নিলো, আজ মেহেদীকে যা বলার স্পষ্ট করে বলে দেবে। মেহেদী যে অহেতুক ওর পেছনে ঘুরছে, এটা দৃঢ়তার সঙ্গে বুঝিয়ে দেবে।
স্বর্ণাকে দেখে মেহেদী কেমন অপরাধীর চোখে তাকাচ্ছিল। তার মুখে শুকনো হাসি। বেশভূষায় একটু পরিবর্তন দেখতে পেলো ও। মেহেদীর গায়ে আড়ংয়ের ফতুয়া-পায়জামা। পায়ে স্যান্ডেল। চুলগুলোতে আর্মিছাট দেয়া। তার বেশভূষার পরিবর্তন যে একটা চালাকি, এটা বুঝতে পারছে স্বর্ণা। নিজের মধ্যে নিরীহ একটা ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। স্বর্ণা আগের মতো কি আছে? ওর বয়সের চেয়ে অভিজ্ঞতার বয়স বেড়েছে। সাংবাদিকতা করছে বলে প্রতিনিয়ত মানুষের বৈচিত্র্যময় চরিত্র দেখতে পারছে, জানতে পারছে কোনটা আসল, কোনটা মেকি। বুঝতে পারছে কে সাধু, কে কপট। স্বর্ণা মেহেদীর বিপরীত দিকের সোফায় গিয়ে বসলো। স্বাভাবিক গলায় বললো— `ঠিক বুঝতে পারছি না, বাড়িতে কেনো এসেছো।’
মেহেদীকে `আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলবে ভেবেছিল স্বর্ণা; কিন্তু `তুমি’ সম্বোধনই করলো। ওরা প্রেম করেছিল প্রায় ছয় মাস। তখন থেকে স্বর্ণা মেহেদীকে `তুমি’ করে বলে। মেহেদী স্বর্ণার কথার জবাবে উসখুস করে বললো— `আমি জানি, আমার কোনো কথাই তোমার ভালো লাগবে না। তবু আমি শেষ চেষ্টা হিসেবে কিছু কথা বলতে চাই।’
`তা-ই? ঠিক আছে, বলো, কী বলতে চাও।’ তাচ্ছিল্যভাবে বলে স্বর্ণা।
মেহেদী কয়েক সেকেন্ড ভাবে। স্বর্ণার চোখে-মুখে নিষ্প্রভ ভাব। মেহেদী বলে— `আমি যা করেছি, তা ক্ষমার অযোগ্য। তারপরও কি আমাকে কোনোভাবে ক্ষমা করা যায় না?’
`আর কিছু বলবে?’ বিরক্তি প্রকাশ করে জানতে চায় স্বর্ণা।
মেহেদী কাঁচুমাচু করে বলে— `না, মানে, আমি লন্ডনে দুবছর কাটালাম। ভেবেছিলাম, সেখানেই থেকে যাবো। কিন্তু পারলাম না। শুধু তোমার কথাই মনে পড়তো।’ এ কথা বলেই স্বর্ণার মুখের দিকে পিটপিট করে তাকায় ও।
স্বর্ণা দুচোখ কপালে তুলে বলে— `কেনো, তনুশ্রীর কথা মনে পড়েনি? আশ্চর্য!’
`তুমি কি ওই ঘটনার কথা ভুলে যেতে পারো না? স্বর্ণা, এ কথা সত্যি, আমি জঘন্য কাজ করেছি। তুমি তো আমাকে কিছুদিনের জন্য হলেও ভালোবেসেছিলে। এটাও তো সত্যি।’
`ভালোবেসেছিলাম বলেই কি ভাবছো ওটা আমার দুর্বলতা? সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমার করুণা ভিক্ষা চাইতে এসেছো? এতো অসহায় তুমি?’
`করুণা যদি বলো, তবে আজ আমার কাছে তাও নেই। না হয় করুণা করে হলেও আমাকে…’ এ পর্যন্ত বলতে পারলো মেহেদী।
স্বর্ণা ওর কথা শেষ না হতেই বললো— `মেহেদী, তোমাকে একটা কথা স্পষ্ট করে আজ বলে দিচ্ছি। আমার জীবনে তোমার কোনো স্থান নেই। ভালোবাসা তো নেই, তোমাকে করুণা করতেও আমার রুচিতে বাধে। তুমি আমার পেছনে অহেতুক ঘুরছো। আমাকে বিরক্ত করছো। আমি কোনোভাবেই তোমাকে টলারেট করতে পারছি না।’ এ পর্যন্ত বলে থামে স্বর্ণা। ওর ভেতরে রাগের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। মেহেদী চোখ নামিয়ে নেয় ওর চোখ থেকে। স্বর্ণা ফের বলে— `তোমাকে অনুরোধ করতে চাই না, তবু করছি। তুমি যদি আর আমাকে বিরক্ত না করো, খুশি হবো। আমি বুঝতে পারি না, এরপর কেনো আবার তুমি আমার পেছনে ঘুরছো? আমি কি সহজ-সরল এবং হদ্দ বোকা কোনো মেয়েমানুষ?’
`না। তুমি স্মার্ট-বুদ্ধিমতি, জানি।’
`তা হলে কেনো আমার পেছনে ছুটছো? তোমার প্রতি আমার একবিন্দুও দুর্বলতা নেই, ভালো করে কথাটা জেনে রাখো।’
`এখন তোমার দুর্বলতা বুঝি ওই নীরবের প্রতি?’ বলে ফেলে মেহেদী।
ওর কণ্ঠে নীরবের নাম শুনে কয়েক সেকেন্ড থ’ বনে যায় স্বর্ণা। তার মানে মেহেদী ওকে সার্বক্ষণিক অনুসরণ করছে? ওর ভেতরে রাগ আরো বেড়ে যায়। ও বলে— `তুমি তা হলে আমাকে অল দ্য টাইম অনুসরণ করছো?’
`করছি। অল দ্য টাইম করতে পারছি না হয়তো। তবে নীরব নামে একজনকে নিয়ে যে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছ, তা দেখছি।’
স্বর্ণা নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রাগের তাপমাত্রা কেবল ওপরে উঠে যাচ্ছে। ও রাগের উত্তাপে বললো— `আরো জেনে রাখো, নীরবকে খুব শিগগির বিয়ে করছি আমি।’
`সে তো একটা খুনি। তোমার…’
`সে তোমার চেয়ে অনেক অনেক ভালো এবং সৎ ব্যক্তি। আর তুমিও কিন্তু খুনি। মায়ের গর্ভে সন্তান খুন হবার জন্য তুমি কি দায়ী নও? তুমি শুধু মানুষই খুন করোনি, মানুষের স্বপ্নও খুন করেছো। তুমি মানুষরূপী হিংস্র পশু!’ রাগে কাঁপতে থাকে স্বর্ণা। ও আর কথা বলতে পারে না। আর বলবেই বা কী। মেহেদী চুপ করে থাকে। ওর দৃষ্টি অবনত। অপরাধীদের আচরণ যে রকম হয়। স্বর্ণা মেহেদীর উপস্থিতি সহ্য করতে পারছে না। ও বললো— `তুমি এখন যাও। আর কখনো আমাদের বাড়িতে আসবে না। আশা করি, আমাকে আর বিরক্ত করবে না।’
এ কথায় মেহেদী সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। স্বর্ণার অপমানে ও বিব্রত নয়, তবে আর কথা বলে স্বর্ণার মন গলানো যাবে না, এটুকু বুঝতে পারছে। স্বর্ণা মেহেদীর দিকে তাকায় না। ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। যাবার সময় মেহেদীর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—
`নীরব অনেক ভাগ্যবান পুরুষ!’
স্বর্ণা মেহেদীর চলে যাওয়া টের পায়। দরজা বন্ধের শব্দ ভেসে আসে। মেহেদী হয়তো দরজা চাপিয়ে দিয়ে গেছে। স্বর্ণা চোখ বন্ধ করে ফেলে। ওর ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এ কান্না ভালোবাসার কোনো দুর্বলতা প্রকাশের কান্না নয়, ভুল মানুষকে ভালোবাসার কান্না, অনুশোচনার কান্না। অনুশোচনার কান্নায় কি মানুষের ভুল শুধরে যায় না? ভাবে স্বর্ণা। ও চোখ বন্ধ করে থাকে। বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ভোরের শিশির ঝরার মতো ঝরে পড়ে।
কলিংবেলের শব্দ বাজে। কলিংবেলের শব্দে কুয়াশার প্রলেপের মতো স্বর্ণার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব ত্বরিত মিলিয়ে যায়। `এ সময় আবার কে এলো?’ প্রশ্নটা ওর মনে জেগে ওঠে। শুক্রবারের সকালটা বাজেভাবে শুরু হয়েছে ওর। কিছুক্ষণ আগে অপ্রত্যাশিতভাবে মেহেদীকে মোকাবিলা করতে হলো। এখন আবার কে আসবে, কে জানে। মেহেদীই ফিরে আসেনি তো? এ কথা ভেবে স্বর্ণা শঙ্কিত হয়। ভেতরের রুম থেকে স্বর্ণার মা সুফিয়া আকরাম চেঁচিয়ে বলেন— `স্বর্ণা, দেখ তো, আবার কে এলো। আমি শাওয়ার নিতে বাথরুমে যাচ্ছি।’
ও সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় অলসভঙ্গিতে। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ও ভাবে, এবার যদি মেহেদী ফিরে আসে তা হলে নিরাপত্তা কর্মীদের ডেকে বের করে দেবে ওকে। কলিংবেলটা আরেকবার বাজলো। স্বর্ণা চাপানো দরজাটা টেনে খুললো। দরজা খুলতেই নীরবকে দেখে ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। নীরবও ওর মুখের দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। পৃথিবীতে অনেক রকম বিস্ময়কর ঘটনার জন্ম হয়, এ মুহূর্তে নীরবের মনে হচ্ছে নাবিলাদের বাড়িতে এসে স্বর্ণার মুখোমুখি হয়ে চরম এক বিস্ময়কর ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নীরবের কণ্ঠে কোনো শব্দ ফুটে ওঠে না। নাবিলার মৃতদেহ দেখে ও যেমন কথা বলতে পারেনি, এখন নাবিলার বাড়ির দরজায় স্বর্ণাকে দেখে কথা বলতে পারছে না। স্বর্ণা ততোক্ষণে তটস্থ হয়েছে। ও বিস্মিত কণ্ঠে বললো— `আপনি এখানে?’
নীরব কিছু বলতে পারে না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। স্বর্ণা ফের বলে— `অমনভাবে তাকিয়ে আছেন যে! আমাকে খুঁজতে বাড়ি পর্যন্ত এসে গেছেন। ঠিকানা পেলেন কিভাবে?’
এ কথায় নীরব স্বাভাবিক হয়ে আসতে থাকে। ও ঘোরলাগা কণ্ঠে বলে— `ভেতরে আসতে বলবেন না?’
এ কথায় লজ্জিত হয় স্বর্ণা। ও ইতস্ততভাবে বলে— `ওহ, তাই তো! আসুন, ভেতরে আসুন।’
দরজা থেকে সরে দাঁড়ায় স্বর্ণা। নীরব ওদের ড্রইংরুমে প্রবেশ করে। স্বর্ণা ওকে সোফায় বসার জন্য ইঙ্গিত করে। নীরব সোফায় বসলে স্বর্ণাও ওর মুখোমুখি সোফায় বসে। কিছুক্ষণ আগে একই স্থানে মেহেদী বসেছিল, মনে মনে ভাবে স্বর্ণা। দিনটি আজ অদ্ভুত ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হলো, ভাবে ও। নীরব বললো— `এটা আপনাদের বাড়ি?’
`হুম। আমাদের বাড়ির ঠিকানা পেলেন কিভাবে, বললেন না?’
স্বর্ণার প্রশ্নের জবাবে মুচকি হাসলো নীরব। ও বললো— `তার আগে বলুন, আপনি নাবিলার কী হন? নিশ্চয় বোন?’
প্রশ্ন নয়, স্বর্ণাকে যেনো সপাং করে চাবুক মারলো কেউ। ওর চোখে-মুখে আড়ষ্টতা আর লজ্জা একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো। স্বর্ণার বুকের ভেতরে কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে দ্রুম দ্রুম করে। ওর গায়ে ঠাণ্ডা স্রোত বইতে শুরু করলো যেনো। মুখে কোনো কথা ফুটলো না। নীরবের মনে হলো, স্বর্ণা নাবিলার ছোট বোন। নাবিলার হাসির সঙ্গে স্বর্ণার হাসির একটা মিল আছে। স্বর্ণাকে প্রথম দেখার দিন ওর মুখের হাসিটা খুব পরিচিত মনে হয়েছিল। এ মুহূর্তে সে কথা মনে হলো ওর। স্বর্ণা তা হলে সাংবাদিক নয়, নীরব বোনের সত্যিকারের হত্যাকারী কি-না, এটা জানতে সাংবাদিক সেজে ওর সঙ্গে মেলামেশা করছিল— এ কথা মনে মনে ভেবে নিলো নীরব। নীরব বললো— `আমি কিন্তু আপনাকে চমকে দিতে বা ভড়কে দিতে এখানে আসিনি। আমি জানতাম না, এই বাড়িতে আপনি থাকেন বা আপনি নাবিলার বোন। আমি আসলে নাবিলাদের বাড়ির ঠিকানা বের করে ওর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। কাল রাত থেকে মনে হচ্ছিল, আমি তো সত্যিকারের খুনি নই। এ কথাটা সাহস করে নাবিলার বাবা-মাকে বলে দিই না কেনো? আমার কিসের ভয়? এই চিন্তা থেকে নাবিলাদের বাড়িতে চলে এলাম। আর দেখুন, কী ভাগ্য আমার, এখানে এসে আপনার আসল পরিচয়টাও জেনে গেলাম।’
স্বর্ণা হাসবে, না কাঁদবে? ও আজ কী রহস্যের মধ্যে পড়ে গেলো। ও ভেবেছিল, নীরব ওর সঙ্গে দেখা করতে ওদের বাড়িতে চলে এসেছে। এখন বুঝতে পারছে, নাবিলার বাড়িতে এসেছে। ও যে নাবিলার ছোট বোন, এটা আর গোপন রইলো না। স্বর্ণার নীরবতা দেখে নীরব বললো— `কিছু বলছেন না যে! আপনি কি ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন?’
এবার কণ্ঠে কথা ফুটলো স্বর্ণার। ও বললো— `আসলে আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেছি। ভাষামূক হয়ে গিয়েছিলাম।’
`এখন ধাতস্থ হয়েছেন?’
`হুম। তা, কী খাবেন, বলুন। বুয়া!’ স্বর্ণা ওদের কাজের বুয়াকে ডাকে।
নীরব বলে, `না, না। এখন কিছু খাবো না। আমি খেয়ে এসেছি। আগে আমার কিছু কথা আছে, বলতে চাই।’
এ সময় ভেতরের রুম থেকে মধ্যবয়সী একজন মহিলা এলো। স্বর্ণা তার উদ্দেশে বললো, `বুয়া, তুমি আমাদের জন্য চা-নাস্তা তৈরি করো।’
বুয়া মাথা নেড়ে চলে গেলো।
স্বর্ণা এবার নীরবের দিকে তাকিয়ে বললো— `আপনার কী বলার আছে, বলুন। এরপর আমার কথা বলবো।’
নীরব বললো— `আপনি নাবিলার ছোট বোন, এটা বললেই পারতেন। সাংবাদিক সাজার কী দরকার ছিল?’
স্বর্ণা বুঝতে পারছে, এ প্রশ্নের জবাব ওকে দিতে হবে। ও বললো— `সত্যি কথা হচ্ছে, আমি কিন্তু সাংবাদিকতার চাকরি করি। সাংবাদিক সাজিনি।’
`তা-ই? সত্যি কথা বলছেন?’
`হ্যাঁ। তবে আমি যে অ্যাসাইনমেন্টটা করছি, সেটা আমি নিজে থেকে নিয়েছি। কারণ, আমার জানার আগ্রহ ছিল যে, নাবিলাকে সত্যিই আপনি খুন করেছিলেন কি-না। আপনার মুক্তির খবর পেয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই, সাংবাদিক হিসেবে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবো এবং প্রকৃত ঘটনা জানবো।’
`স্ট্রেঞ্জ!’
`আমি কিন্তু আমার পত্রিকার অফিস থেকে এই অ্যাসাইনমেন্ট নিই। নিজের আসল পরিচয় আপনার কাছে দিইনি, সত্য উদ্ঘাটনের জন্য। সেটা কি ভালো হয়নি, বলুন?’
`তারপর, কী বুঝলেন?’
`এটুকু বুঝতে পেরেছি যে, আপনি নাবিলাকে খুন করেননি।’
এ কথার জবাবে নীরব কিছু বললো না। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো— `একটা প্রশ্ন করবো?’
`করুন।’
নীরব ওর চোখে চোখ রেখে বলে— `আচ্ছা, আপনি এমবিএ করে সাংবাদিক হলেন কেনো? পড়াশোনার সঙ্গে কাজের বিষয় মেলে?’
এ কথা শুনে ম্লান হাসিমুখে স্বর্ণা বলে— `আসলে আমি এমবিএ করেছি বাবা-মার ইচ্ছায়। সাংবাদিক হবার স্বপ্ন ছিল না। নাবিলার খুনের ঘটনায় আমি এই পেশায় যুক্ত হই।’
`এমবিএ পাস করা কাউকে সংবাদপত্রে চাকরি দেয়?’
`দেবে না কেনো? পত্রিকায় অর্থনীতির বিষয় থাকে না? আমি পত্রিকায় চাকরি পাই অর্থনীতির রিপোর্টার হিসেবে। অর্থনীতির রিপোর্টই করছিলাম। একসময় সম্পাদকের কাছে গিয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া মানুষের জীবনযাপন কেমন হয়, এ বিষয়ের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরির কথা বলি। সম্পাদক সম্মতি দেন। অবশ্য আমার উদ্দেশ্য ছিল এই অ্যাসাইমেন্টের মাধ্যমে আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নাবিলা হত্যার কারণ জানা।’
`সাংবাদিকতা পেশায় থেকে যাবেন?’
`থাকবো হয়তো। এ পেশার প্রতি টান জন্মে গেছে। তবে বাবা-মা চাচ্ছেন, আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিই।’
`আপনাদের কিসের ব্যবসা?’
`বাবার শিপিং কোম্পানি আছে। এ ছাড়া গাজীপুরে আমাদের বড় একটা স্প্যানিং মিল আছে। বায়িং হাউস আছে উত্তরায় আর নারায়ণগঞ্জে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসও আছে। বুঝতেই পারছেন, বাবা আমাকে কেনো এমবিএ পড়িয়েছেন।’
`হুম। তা হলে আপনার উচিত বাবার ব্যবসায় নিজেকে সম্পৃক্ত করা। ব্যবসার হাল ধরলেই পারেন।’
`দেখি, সামনের দিনগুলো কেমন হয়। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবো।’
নীরব এবার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো— `আচ্ছা, আপনার বাবা-মা কি জানেন, আমি নাবিলাকে খুন করিনি; বরং হত্যা মামলায় ফেঁসে গেছি।’
`আমি আমার বাবা-মাকে আপনার কথা বলেছি। তারা ভীষণ আপসেট হয়েছেন।’
`কেনো?’
`আপনাকে নাবিলার খুনি মনে করে আমরাও তো আদালতে লড়েছি। আপনার চৌদ্দা বছরের কারাদণ্ডের জন্য আমরাও দায়ী। তাই।’
জবাবে কিছু বললো না নীরব। ওর মনে হচ্ছিল, ওর বুকের ভেতর থেকে এক জগদ্দল পাথর নেমে যাচ্ছে। ফুসফুসে একটা দীর্ঘশ্বাস আটকে আছে, ওটা বেরুতে পারছে না। স্বর্ণা ফের বলে— `আপনি ভাববেন না যে, আপনার সঙ্গে আমি লুকোচুরি করেছি। আমিও ঘটনার বাস্তবতায় যা করার করেছি। বুঝতে পারছেন কি?’
`ঠিক আছে, তা নয় বুঝলাম। আমি যে নাবিলার খুনি নই, সেটা কি আমার মুখের কথার ওপর বিশ্বাস করছেন?’
স্বর্ণা নীরবের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে। বলে, `আপনাকে কিছু কথা এখন বলতে হবে। আমার বোন নাবিলা আসলে প্রেম করতো রাশেদুল শামীম নামে এক ছেলের সঙ্গে। সে এক সচিবের ছেলে।’
`বলেন কী?’ চমকে ওঠে নীরব।
স্বর্ণা বলে— `আমি নাবিলার একটা ডায়রি খুঁজে পেয়েছি কিছুদিন আগে। ওই ডায়রিতে অনেক কথা লেখা আছে। আপনার কথাও আছে। আপনাকে ও কখনো প্রেমিক হিসেবে দেখেনি।’
এ কথা বলে স্বর্ণা কটাক্ষ দৃষ্টিতে তাকালো নীরবের দিকে। নীরব ওর চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করে বললো— `সেটি আমিও বুঝতে পারতাম। বলুন, তারপর?’
`বলতে খানিকটা বিব্রতবোধ করছি যে, নাবিলা আরো দু-একজনকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। সেটি ওর ডায়রিতে লেখা আছে। আই মিন, আপনার মতো অন্ধ লাভার ওর কয়েকজন ছিল।’
`এসব কথা বলছেন কেনো?’
`বলছি, কারণ আছে। নাবিলা খুন হবার বেশ কয়েকদিন আগ থেকে শামীমের সঙ্গে ওর দূরত্ব তৈরি হয়। ওদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি হয়। শামীম নাবিলাকে সন্দেহ করা শুরু করেছিল। এ কথা ওর ডায়রিতে আছে।’
`তা হলে?’
`আমাদের ধারণা, নাবিলা খুন হবার পেছনে শামীম বা অন্য যে কোনো প্রেমিকের যোগসাজশ আছে। অথবা তাদের যে কেউ নাবিলাকে হত্যা করেছে।’
এ কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় নীরব। ওর মনে হয়, আজ নাবিলাদের বাড়িতে এসে ঠিক কাজই করেছে। পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। যে রহস্য উদ্ঘাটনে ও ছুটছে, সেই রহস্য সহজেই খুলে যাচ্ছে ওর সামনে। বুকের ভেতর আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও বললো— `জানেন, এই খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে আমি একজন রাজনীতিবিদের সাহায্য চেয়েছিলাম। তিনি আজ আমাকে যেতে বলেছেন। অথচ আপনারাই দেখছি জানেন, নাবিলার হত্যাকারী কে।’
এ কথায় উৎসাহিত কণ্ঠে স্বর্ণা বললো— `বলেন কী! চলুন, তা হলে তার কাছে যাই। তিনি কী কথা বলেন, শুনি।’
`কেনো?’
`বা রে! আমি যা বললাম, নাবিলার ডায়রি পড়ে যা জেনেছি, তা-ই। কে জানে, হয়তো ওই রাজনীতিবিদ আরো কোনো তথ্য দিতে পারেন। অন্য কেউ খুনি হতে পারে। আমরা তো এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, নাবিলার খুনি আসলে কে?’
কথাটার মধ্যে যুক্তি আছে, ভাবলো নীরব। মমতাজ আহমেদের কাছে স্বর্ণাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। ও বললো— `তা হলে সময় নষ্ট না করে চলুন, বেরিয়ে পড়ি। উত্তরা থেকে ধানমন্ডি যেতে এক-দুই ঘণ্টা লেগে যেতে পারে। মমতাজ আহমেদ আমাকে দুপুরের মধ্যে যেতে বলেছেন।’
`ঠিক আছে আপনি বসুন, আমি তৈরি হয়ে আসছি। বুয়া চা-নাস্তা দিয়ে যাবে, খেয়ে নেবেন।’ স্বর্ণা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
নীরব বললো— `আপনার বাবা এবং মার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল।’
স্বর্ণা মিষ্টি করে হাসলো। `আজ আপনাকে তো ছাড়ছি না। ধানমন্ডি থেকে আপনাকে নিয়ে গুলশানে যাবো। এরপর বাসায় ফিরবো। এখন তো বাবাও বাসায় নেই। রাতে বাবা-মার সঙ্গে ডিনার খাবো আমরা। এরপর আপনাকে ছাড়বো।’
`না, মানে… রাত পর্যন্ত থাকতে পারবো না।’
`আজ আমি আপনার কোনো কথা শুনবো না। কোনো আপত্তি চলবে না।’
স্বর্ণার চোখে-মুখে শাসনের আভা। নীরব এর প্রতিবাদ করলো না। ও চাচ্ছে, স্বর্ণার মা-বাবার সঙ্গে দেখা হোক। তাদের সঙ্গে নাবিলার বিষয়ে কথা বলে হালকা হতে চায় ও। স্বর্ণা নীরবের জবাবের অপেক্ষা না করে ড্রইংরুম ছেড়ে ভেতরে চলে গেলো। নীরব ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। ও মনে মনে বললো— `নাবিলা, অন্তত তোমার পরিবার বুঝতে পেরেছে আমি তোমাকে খুন করিনি।’ এ কথা মনের অন্তঃপুরে উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ওর দুচোখ ভিজে গেলো। খুব সহজেই আজ নীরব যেনো খুনের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলো। সবাই যা-ই ভাবুক, নাবিলার পরিবার তো জানে, ও নাবিলাকে খুন করেনি। আজ ও যন্ত্রণার কারাগার থেকে মুক্ত হলো।
দশ.
আজ যদি কেউ প্রশ্ন করে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী আর আকর্ষণীয নারী কে, নীরব অকপটে স্বর্ণার নাম বলবে। নাবিলার সৌন্দর্য ছিল চোখ ধাঁধানো, আর স্বর্ণার সৌন্দর্য স্নিগ্ধতাপূর্ণ। এমন সৌন্দর্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না, তবে তার দিকেই মনযোগ একত্রীভূত করে দেয়। একবার চোখ রাখলে চট করেই চোখ ফেরানো যায় না। স্বর্ণাকে এক দেখাতেই যে কেউ `গর্জিয়াস’ বলবে। আজ শাড়ি পরায় ওকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। স্বর্ণাকে এই প্রথম নীরব শাড়ি পরতে দেখলো। আকাশি রঙের জর্জেট শাড়ি পরেছে ও। চুল খোঁপা করেছে। মুখে হালকা প্রসাধন। কপালে ছোট্ট নীল টিপ। শাড়িতে মনে হচ্ছিলো, সর্বাঙ্গে ও আকাশ জড়িয়ে রেখেছে। ওর গা থেকে পারফিউমের চাপা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। গাড়িতে চড়ে নীরব অকারণে কয়েকবার স্বর্ণার দিকে তাকিয়েছিল। ওর চোখে কি মুগ্ধতা ফুটে উঠেছিল? ও কি স্বর্ণার সৌন্দর্যের আকর্ষণকে মনের ভেতরে প্রশ্রয় দিচ্ছে? ও কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মনে। তারুণ্য মানেই তো তরুণীর সৌন্দর্যের আগুনে ঝাঁপ দেয়া পতঙ্গ। স্বর্ণা নিশ্চয় ওর চোখে পড়ে ফেলেছে মুগ্ধতার পরিভাষা, ভাবে নীরব।
ওরা মমতাজ আহমেদের বাড়ির একটি কক্ষে বসে আছে। কক্ষে ওরা ছাড়া আর কেউ নেই। কাজের লোক এসে চা-বিস্কুট দিয়ে গেছে। ওরা দুজনে চা পান করেছে। অপেক্ষা করছিল মমতাজ আহমেদের জন্য। অপেক্ষার সময়ে চোরা চোখে স্বর্ণার দিকে আরেকবার তাকিয়েছিল নীরব। স্বর্ণার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেলো ওর। অপরাধীকে ধরে ফেলার মতো করে স্বর্ণা মুখে লাজুক হাসি ফুটিয়ে বললো— `আপনি কেমন যেনো আড়ষ্ট হয়ে গেছেন। আজ আপনার কী হয়েছে, বলুন তো?’
ওরা যখন গাড়ি দিয়ে আসছিল, তখনো এ প্রশ্নটি করেছিল স্বর্ণা। ও জবাবে কিছু বলেনি। এবার গলা নামিয়ে বললো— `সত্যি কথা বলবো?’
`বা রে! মিথ্যা কথা বলবেন কেনো? সত্যি কথাই বলুন।’
`কিছু মনে করবেন না তো?’
এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো স্বর্ণা। ভুবন ভোলানো হাসি। এমন হাসির সামনে কঠিন হয়ে থাকা যায় না। ভেতরে মিহিন তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভাষা আবেগমথিত হয়ে যায়। নীরব আবেগ-আশ্রিত কণ্ঠে বললো— `আপনাকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে! অপূর্ব!’ কথাটা বলে চোখ নামিয়ে নিলো স্বর্ণার চোখ থেকে, যেনো ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে।
স্বর্ণার মুখে হাসির মদিরতা লেগে আছে। বললো— `এ কথাটা বলতেই এতো আড়ষ্ট ছিলেন?’
স্বর্ণার দিকে চোখ তুলে নীরব বললো— `না, মানে… কথাটা বলা ঠিক হবে কি-না, ভাবছিলাম। কথাটা বললাম বলে রাগ করলেন না তো?’
স্বর্ণা বললো— `না, রাগ করিনি। এমন কথা তো বলতেই পারেন।’
`এমন কথা বলাটা আমাদের সম্পর্কের সঙ্গে মানানসই নয় তো, তাই…’
কথা শেষ করতে পারলো না ও। স্বর্ণা বললো— `আপনি অতো সম্পর্ক খোঁজেন কেনো, বলুন তো? এতােই যখন দ্বিধা-সংকোচ, তা হলে একটা সম্পর্ক তৈরি করে নিন।’
স্বর্ণার কথায় ভীষণ ভড়কে গেলো নীরব। স্বর্ণা কি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, না পরীক্ষা করছে? এমন একটি সুন্দরী মেয়ে একজন খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামির চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব যাচাই করছে না তো? এটাও কি ওর অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ের মধ্যে পড়ে? সন্ধ্যা হলে এই শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড যেমন বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করে ওঠে, প্রশ্নগুলোও ওর মনে তেমনি ঝলমল করে উঠলো। ও দ্বিধার মধ্যে পড়ে যায়। এর জবাবে কিছু বলা দরকার; কিন্তু ও বলতে পারছে না। স্বর্ণা ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ও হয়তো একটা জবাব আশা করছে। নীরব ওর নিজের ভেতরে জবাব খুঁজে বেড়ায়। একটা গুমোট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, মমতাজ আহমেদ চলে আসায় পরিবেশটা মিলিয়ে গেলো। ওরা সোফায় বসেছিল, মমতাজ আহমেদ ওদের মুখোমুখি অবস্থানে সোফায় গিয়ে বসলেন। নরম কণ্ঠে বললেন— `সরি, আমি তোমাদের কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। কিছু মনে করো না।’
`না, না। ঠিক আছে। আমাদের হাতে সময় আছে।’ বললো নীরব।
মমতাজ আহমেদ স্বর্ণার দিকে তাকালেন। নীরব পরিচয় করিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বললো— `স্যার, ও হচ্ছে স্বর্ণা। নাবিলার ছোট বোন।’
`স্লামালাইকুম।’ মমতাজ আহমেদকে স্বর্ণা সালাম দিলো।
মমতাজ আহমেদ বললেন— `অলাইকুম সালাম। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তোমরা একসঙ্গে কিভাবে?’ এ কথা বলে প্রশ্নবোধক চোখে মমতাজ আহমেদ তাকালেন নীরবের দিকে।
নীরব বললো— `স্যার, স্বর্ণা পেশায় সাংবাদিক। আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। সেই থেকে পরিচয়। আজ জানতে পারলাম যে, সে নাবিলার ছোট বোন। এতোদিন ও এ পরিচয়টা গোপন রেখেছিল?’
`ও আচ্ছা। স্বর্ণা কি জানে, তুমি নাবিলার প্রকৃত হত্যাকারী নও?’ জানতে চাইলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরব একবার স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে ফের মমতাজ আহমেদের চোখে চোখ রেখে বললো— `স্যার, ও এবং ওর পরিবার বিশ্বাস করেছে যে, আমি নাবিলাকে খুন করিনি। ওরা অন্য কাউকে সন্দেহ করছে; কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছে না। তাই ওকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। আপনি আমাকে ফোনে বলেছিলেন, নাবিলার প্রকৃত খুনি কে, তা আপনি জানতে পেরেছেন। স্বর্ণাও জানতে চায়, নাবিলার প্রকৃত খুনি কে।’
মমতাজ আহমেদ একটু ভাবলেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বললেন— `নীরব, তোমার প্রতি আমার বিশেষ একটা টান জন্ম নিয়েছে বলেই আমি এই খুন-খারাবি নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি। এটা আমার কাজ নয়। তোমার প্রতি চরম অন্যায় হয়েছে বলে আমি সত্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়েছি। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের বেশ কয়েজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার বন্ধু। তাদের সহায়তায় এবং রাজনৈতিক নেতা ও আরো কিছু ব্যক্তিগত বন্ধুর সহযোগিতায় আমি এই হত্যাকাণ্ডের কারণ, মোটিভ এবং সম্ভাব্য কে বা কারা জড়িত ছিল, এ তথ্য সংগ্রহ করেছি। এ কাজে আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এ ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করে আমিও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি যে, নাবিলাকে কে খুন করেছে। তবে এই খুনের পেছনে দুজন ব্যক্তি জড়িত ছিল, এ কথা জানতে পেরেছি।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন মমতাজ আহমেদ।
ওরা মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো।
`দুজন! কারা?’ গভীর আগ্রহে জানতে চায় নীরব। স্বর্ণা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে মমতাজ আহমেদের মুখের দিকে। ওর বুক দুরুদুরু কাঁপছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেনো। চোখ ফেটে জলের ধারা নেমে আসতে চাইছে। ও কান্না সামলে নেয়। মমতাজ আহমেদ বললেন— `তারা দুজনেই নাবিলার প্রেমিক। একজনের সঙ্গে নাবিলা প্রেম করতো। তার নাম—’
`রাশেদুল শামীম।’ নামটি উচ্চারণ করলো স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ স্বর্ণার দিকে চেয়ে বললেন— `তা হলে তাকে তুমি চেনো, মা?’
`ঠিক চিনি না। তবে তার কথা সম্প্রতি জানতে পেরেছি নাবিলার একটি গোপন ডায়রি থেকে। দ্বিতীয় জনের নামটা বলুন, প্লিজ।’
মমতাজ আহমেদ বললেন— `আরেকজন ছিল নাবিলার প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক। নাবিলা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার নাম মাহাবুব হাসান। একসময় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে ব্যবসা করছে।’
মাহাবুবের নাম শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলো নীরব। মাহাবুবকে ও ভয়কাতুরে বলে জানে। এমন ভীতু একজন ব্যক্তি খুনের নেপথ্যে থাকতে পারে? ভাবে ও। মমতাজ আহমেদ নীরবের উদ্দেশে বললেন— `নীরব, শামীম এবং মাহাবুবকে তুমি চেনো?’
নীরব একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো— `শামীমকে আমি চিনি না, তবে মাহাবুবকে চিনি। ও আমার বন্ধু। মাহাবুব আমাকে দিয়ে নাবিলাকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। নাবিলা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই নাবিলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এবং নাবিলার সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হই।’
`হয়তো তোমাদের এই ঘনিষ্ঠতা মাহাবুবকে ক্ষুব্ধ করেছিল। হয়তো প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছিল সে।’ বললেন মমতাজ আহমেদ।
এর জবাবে নীরব বললো— `কিন্তু স্যার, মাহাবুব খুবই ভীতু শ্রেণির মানুষ। ও খুন-টুন করবে বা খুন করাবে— এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।’
এর জবাবে মমতাজ আহমেদ বললেন— `মাই সান, প্রেম বড় জটিল বিষয়। প্রেম কাউকে মহান করে, উদার করে। আবার কাউকে ভয়ঙ্কর মানুষে পরিণত করে। প্রেম কাউকে মহৎ করে, কাউকে খুনি করে। হয়তো ভয়কাতুরে মাহাবুব নীরবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল।’
নীরবের মনে ভেসে উঠলো মাহাবুবের মুখ। যে রেস্ট হাউসে নাবিলা খুন হয়েছিল, সেই রেস্ট হাউসটির মালিক মাহাবুবের বাবা, অর্থাৎ রেস্ট হাউসটির মালিক মাহাবুবও। এই খুনের সঙ্গে মাহাবুবের সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেয়া যায় না। নীরব অবাক হয়ে ভাবতে থাকে। স্বর্ণা মমতাজ আহমেদের উদ্দেশে বললো— `আচ্ছা, মাহাবুব আর শামীম এক হলো কিভাবে বলতে পারেন? তারা কি পূর্বপরিচিত ছিল বা তাদের মধ্যে কোনো বন্ধুত্ব ছিল?’
মমতাজ আহমেদ মনে মনে বললেন— `তোমার প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ’, মুখে বললেন— `মাহাবুবের সঙ্গে শামীমের পূর্বপরিচয় ছিল কি ছিল না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। আমার ধারণা, তাদের মধ্যে পূর্বপরিচয় ছিল না। সম্ভবত নাবিলাকে কেন্দ্র করে মাহাবুব এবং শামীমের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। আমি আরো জানতে পেরেছি, নাবিলার সঙ্গে শামীমের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছিল। নাবিলা মনে হয় অন্য কারো প্রেমে পড়েছিল। এতে ক্রুব্ধ হয়েছিল শামীম। সে সময় হয়তো মাহাবুব শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দুজনে এক হয়েছিল নাবিলাকে শায়েস্তা করতে।’ এ পর্যন্ত বলে থেমে যান মমতাজ আহমেদ। স্বর্ণার চোখে-মুখে বেদনার কালো মেঘ। নীরবের মুখও শুকনো। মমতাজ আহমেদ বুঝতে পারছেন, এমন ঘটনার কথা শুনে ওদের দুজনের মনের ভেতর ঝড় বইছে।
নীরব মুখ তুলে বললো— `স্যার, শামীমের সঙ্গে মাহাবুবের বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের কথা কী করে নিশ্চিত হলেন?’
`আমি জানতে পেরেছি, শামীম আর মাহাবুব যৌথভাবে একটি ব্যবসা করছে। গুলশানে ওদের অফিস আছে। এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা। নাবিলা হত্যা মামলায় তোমার বিরুদ্ধে রায় হবার পর ওরা এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছে।’
`বলেন কী!’ বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব।
মমতাজ আহমেদ বলেন— `আমার ধারণা, পরিকল্পিতভাবে নাবিলাকে হত্যা যেমন করা হয়েছে, তেমনি এ হত্যা মামলায় তোমাকেও ফাঁসানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।’
`কেনো ওরা এ কাজ করেছে, স্যার?’ আহত কণ্ঠে জানতে চায় নীরব। ওর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে।
মমতাজ আহমেদ বলেন, `ঈর্ষা। ঈর্ষার কারণে তুমি ফেঁসেছ। তুমি নাবিলার সান্নিধ্য পেয়েছো, এটা মাহাবুবকে ঈর্ষান্বিত করতো। তোমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে মাহাবুব। আর শামীম নিয়েছে নাবিলার ওপর প্রতিশোধ। ভেরি সিম্পল অ্যান্সার।’
নীরব চুপসে যায়। ওর বুকের ভেতরে তোলপাড় চলছে। কষ্টের মিহিন ভাঙচুরও হচ্ছে। যদিও নাবিলার প্রকৃত খুনি কে বা কারা, ও জানতে পারলো, তবু এই খুনের পেছনে মাহাবুবের সম্পৃক্ততায় ও স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণা মমতাজ আহমেদের কাছে জানতে চাইলো— `আমরা কি নাবিলার খুনিদের বিচারের সম্মুখীন করতে পারবো বলে মনে করেন?’
`তাদের বিচারের সম্মুখীন করতে হলে প্রমাণ লাগবে। প্রমাণ হাতে এলে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।’
`কিভাবে প্রমাণ পাবো? আপনি কি আমাদের এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন? আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি ভরসা পাচ্ছি। আশা করি, আমাকে ফেরাবেন না।’ স্বর্ণার কণ্ঠে আকুলতা ফুটে ওঠে।
মমতাজ আহমেদ স্মিত হেসে বললেন— `আমি তো আগেই বলেছি, খুন-টুন নিয়ে মাথা ঘামানো আমার কাজ নয়। নীরবের প্রতি যে অবিচার হয়েছে, তা আমাকে ভীষণভাবে আহত করেছে। তাই আমি এই খুনের রহস্য বের করার চেষ্টা করছি। এখন আসল কাজ করতে হবে তোমার পরিবারকে।’
`কী করতে হবে বলুন, আমরা করবো।’ বলে স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ বলেন— `আমি একটা প্রমাণ সংগ্রহ করেছি পুলিশের এক বড় কর্মকর্তার সাহায্যে। সেটি হলো, নাবিলার সেলফোনে সেদিন কে কে ফোন করেছিল, এর রেকর্ড বের করেছি। এর মধ্যে একটি ফোন নম্বর ছিল ওই রেস্ট হাউসের কেয়ারটেকারের। ওই নম্বর থেকে ফোন করে কথা বলেছিল শামীম। নাবিলাকে মিথ্যা কথা বলে শামীম ওই রেস্ট হাউসে নিয়ে গিয়েছিল। আমি মনে করি, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে এটি একটি ক্লু। তোমার পরিবার প্রভাব খাটিয়ে যদি মামলাটি পুনর্জীবিত করতে পারে, তা হলে নতুন করে তদন্ত করাতে হবে। তদন্তে ওই সেলফোনের সূত্র ধরে শামীমকে ধরতে পারবে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনা বেরিয়েও আসতে পারে। তবে…’
`তবে কী স্যার?’ উদগ্রীব হয়ে জানতে চায় নীরব।
মমতাজ আহমেদ বলেন— `তবে মানে, কাজটি সহজ নয়। শামীমের পরিবার প্রভাবশালী। সচিবের ছেলে সে। মাহাবুবের পরিবারও বিত্তবান। তোমাকে আগেও বলেছিলাম, হাই প্রোফাইল মামলা হলে অনেক কিছুই হয় না। সবকিছু ফ্রিজ হয়ে যায়।’
স্বর্ণা বলে— `আমার পরিবারও দুর্বল নয়। আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমরা প্রকৃত খুনিদের বের করবো এবং বিচারের সম্মুখীন করবো।’
স্বর্ণার কণ্ঠে প্রত্যয় ও দৃঢ়তায় মমতাজ আহমেদ খুশি হন। তিনিও চান নাবিলার প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ুক এবং তাদের বিচার হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এটা ভীষণ জরুরি।
নীরব বলে— `আপনাকে কিভাবে ধন্যবাদ জানাবো স্যার, জানি না। এখন আমি কী করবো, বলে দিন।’
এ কথায় মমতাজ আহমেদ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন— `তোমার এখন একটাই কাজ। তা হচ্ছে, স্বর্ণাকে সার্বক্ষণিকভাবে সময় দেয়া।’
`মানে?’ বলে নীরব।
মমতাজ আহমেদ বলেন— `মানে হচ্ছে, স্বর্ণার পরিবার প্রভাবশালী। ওর বাবা বিত্তবান। তিনি নিশ্চয়ই তার মেয়ের প্রকৃত হত্যাকারীকে বিচারের সম্মুখীন করবেন। এ কাজে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে স্বর্ণা। আর স্বর্ণাকে সহযোগিতা করবে তুমি।’
মমতাজ আহমেদের কথাটা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু স্বর্ণার পরিবার কি পারবে শামীম এবং মাহাবুবকে বিচারের সম্মুখীন করতে? স্বর্ণা বলে— `আপনার সহযোগিতা পেলে আমরা নাবিলার খুনিদের বিচারের সম্মুখীন করবোই। আজ আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গেলো।’
`হুম। তোমার কথা শুনে আমারও ভালো লাগলো। জানো মা, নীরবের ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা মনে হলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ও ছিল নিরপরাধী, অথচ ও হয়ে গেলো খুনের মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।’
মমতাজ আহমেদের কথায় লজ্জা আর গ্লানি স্বর্ণাকে গ্রাস করলো। যেদিন থেকে ও বুঝতে পেরেছে নীরব নাবিলাকে খুন করেনি, সেদিন থেকেই এই লজ্জা আর গ্লানি ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। নীরব একদিন ওর কাছে জানতে চেয়েছিল, ও কেনো তার প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছে। এর জবাবে কিছু বলেনি, তবে মনে মনে বলেছিল— `আমাদের ভুলের কারণে আপনার প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, এর জন্য আমরাই দায়ী। বিবেকের তাড়না আর গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ি। আরো গভীর অনুভূতি কাজ করে।’ স্বর্ণার মনে কথাটি এ মুহূর্তেও ভেসে উঠলো। চাপা কান্না উথলে ওঠে ওর মনে। ও নিজেকে সামলে নেয়। ওর দুঠোঁট তিরতির করে কেঁপে উঠলো অব্যক্ত বেদনায়। মমতাজ আহমেদ তা লক্ষ্য করলেন।
মমতাজ আহমেদের দিকে তাকিয়ে নীরব বললো— `স্যার, আমরা কি উঠবো? আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম।’
`ঠিক আছে, যাও। তোমরা নিজেরা ঠিক করো, কী করবে। পরে এসে আবার দেখা কোরো আমার সঙ্গে। দেখি, আরো কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি-না।’
`জি, আচ্ছা। কোনো তথ্য পেলে আমাকে ফোন করবেন, প্লিজ।’ বললো নীরব।
মমতাজ আহমেদ বললেন— `যা-ই করো, খুব সাবধানে এগুবে। যতোটা সম্ভব গোপনীয়তা বজায় রাখবে। খুনিরা তোমাদের কার্যকলাপ টের পেলে সাবধান হয়ে যাবে।’
স্বর্ণা জানতে চাইলো— `আমাদের কি টেলিফোনের রেকর্ডটি দিতে পারবেন? ওটাই তো আমাদের একমাত্র ক্লু।’
`কাল আমাকে ফোন কোরো। জানিয়ে দেবো, পুলিশের কোনো কর্মকর্তার কাছে তোমাদের যেতে হবে। ওই পুলিশ কর্মকর্তা তোমাদের টেলিফোনের রেকর্ডটি দিয়ে দেবেন। এ ছাড়া কী করতে হবে, তাও বলে দেবেন ওই কর্মকর্তা। সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার নাম গোপন রেখো, কেমন?’
মমতাজ আহমেদের কথা শেষ হলে স্বর্ণা বলে— `আপনার ঋণ কিভাবে শোধ করবো, জানি না!’
এ কথা শুনে হো-হো করে হেসে ফেললেন মমতাজ আহমেদ। তার হাসিতে স্বর্ণা ও নীরব প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকে। এভাবে হাসার কী আছে, বুঝতে পারে না ওরা। মমতাজ আহমেদের হাসি থামার পর স্বর্ণা লাজুক মুখে বলে— `এভাবে হাসলেন কেনো? আমি কি হাসির কথা বলেছি?’
`না, না, মা। সে রকম নয়। ঋণ শোধের কথা বলেছো তো, তাই হাসলাম।’ বলেন মমতাজ আহমেদ।
স্বর্ণা বিস্ময় প্রকাশ করে বলে— `সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। এ কথার মধ্যে হাসির কী হলো?’
মমতাজ আহমেদ নীরবের দিকে তাকিয়ে বললেন— `নীরব, তুমি বাইরে যাও। আমি ওর সঙ্গে একা কিছু বলতে চাই।’
মমতাজ আহমেদের এ কথার কোনো মানে খুঁজে পেলো না নীরব। তবে কোনো প্রশ্ন না করে উঠে দাঁড়ালো ও। স্বর্ণা কৌতূহলী চোখে তাকালো একবার নীরবের দিকে, আরেকবার মমতাজ আহমেদের দিকে। নীরব কক্ষ থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেলো। স্বর্ণার দৃষ্টি আটকে গেলো মমতাজ আহমেদের মুখের ওপর। নীরব কক্ষ থেকে বের হবার পর মমতাজ আহমেদ বললেন— `তোমাকে দু-একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি? আপত্তি থাকলে করবো না।’
`করুন। আপত্তি নেই।’ সম্মতি প্রকাশ করে স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ কয়েক সেকেন্ড ভাবেন। এরপর তিনি স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বলেন— `দেখো মা, তোমার সঙ্গে আমার আজই পরিচয় হলেও কিছু কথা জানতে ইচ্ছে করছে এবং কিছু কথা বলতেও ইচ্ছে করছে। আমার কথা অযাচিত হলে মনে কিছু কোরো না।’
`না, না। কী বলতে চান, বলুন। আমি আপনার কথা শুনতে প্রস্তুত আছি।’
স্বর্ণার কথায় আশ্বস্ত হলেন মমতাজ আহমেদ। তিনি বললেন— `তুমি কি কাউকে পছন্দ করো, মা? আই মিন, এমন কেউ কি আছে, যাকে তুমি ভালোবাসো বা বিয়ে করতে চাও?’
স্বর্ণা মমতাজ আহমেদের এ ধরনের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত না থাকলেও বিব্রতবোধ করলো না। ও ঝটপট বললো— `না, আমার এমন কেউ নেই। কিন্তু আপনি এ কথা জানতে চাচ্ছেন কেনো?’
`তোমার কাছে আমি একটা অনুরোধ রাখতে চাই। অনুরোধ রাখার আগে জেনে নিলাম, অনুরোধ রাখা ঠিক হবে কি-না।’
`বলুন, কী অনুরোধ?’
`স্বর্ণা, তুমি তো জানো, তোমাদের কারণে এবং আদালত থেকে ন্যায়বিচার না পাওয়ায় নীরবের মতো একজন মেধাবী ছাত্রের ললাটে খুনির তকমা লেগে গেছে। ওর জীবনটা বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। ও চাইলেই সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে না।’
`জি, আমিও এ বিষয়ে ভেবেছি।’ বললো স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ আশ্বস্ত হয়ে বললেন— `তাই তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, যদি রাগ না করো।’
`বলুন। রাগ করবো না।’
`তুমি কি ওকে বিয়ে করতে পারো না?’ কথাটা খুব সহজভাবে বলে ফেললেন মমতাজ আহমেদ। এ কথা বলে তিনি যেনো ভারমুক্ত হলেন। তার কথা শুনে স্বর্ণা মাথা নিচু করে ফেললো। মমতাজ আহমেদ ওর চোখের দৃষ্টি পড়তে চেয়েছিলেন, পারলেন না। স্বর্ণাকে দেখে তার মনে হয়েছিল, ওদের দুজনের বিয়ে হলে মন্দ হবে না। অবশ্য স্বর্ণা একজন শিল্পপতির মেয়ে আর নীরব দরিদ্র পিতার সন্তান। এখানেই বড় পার্থক্য। নীরব মেধাবী ছাত্র, সৎ এবং নির্লোভ। দেখতে সুদর্শন। স্বর্ণার পাশে ওকে খুব মানাবে। স্বর্ণার নীরবতা দেখে মমতাজ আহমেদ বললেন— `আমার অনুরোধ রাখতে হবে, এমন নয়, মা। আমি কথাটা বলেছি, তোমাদের দেখে আমার মনে হয়েছে, তোমাদের বিয়ে হলে সুখি হতে পারবে। পাত্র হিসেবে নীরবের অযোগ্যতা একটি, সেটি হলো সে দরিদ্র এবং তার পরিবার দরিদ্র। আর সব দিক দিয়ে বিচার করলে তার তুলনা হয় না। বর্তমান সময়ে এমন সৎ, সরল এবং মেধাবী ছেলে পাওয়া সহজ নয়। ওর মধ্যে কোনো ভণিতা নেই, কপটতা নেই, অহঙ্কার নেই, লোভ-লালসাও নেই।’ এ পর্যন্ত বলে থামলেন মমতাজ আহমেদ।
স্বর্ণা এবার মুখ তুললো। ওর দুচোখ দিয়ে জলের দুটি ধারা নেমে এসেছে। মমতাজ আহমেদ এই কান্নার অর্থ খুঁজলেন না। তিনি ওর অশ্রুভেজা চোখে চোখ রেখে বললেন— `আমার কথাটা ভেবে দেখো, মা। যদি তোমার মন সায় দেয়, আমাকে জানিও। আমি নীরবের অভিভাবক হয়ে না হয় তোমার বাবা-মার সঙ্গে কথা বলবো। আর যদি মন সায় না দেয়, এ কথা আমি আর কখনো বলবো না।’
স্বর্ণা লাজুক কণ্ঠে বললো— `আমি আপনার কথাটা ভেবে দেখবো। পরে আমার মতামত জানাবো।’
মমতাজ আহমেদ মুখে অমলিন হাসি ফুটিয়ে বললেন— `তোমার সঙ্গে আমার কী কথা হলো, এ কথা কিন্তু নীরবকে বলো না। ঠিক আছে?’
`ঠিক আছে, বলবো না।’ ছোট্ট জবাব স্বর্ণার।
মমতাজ আহমেদ বলেন— `এবার তুমি বাইরে যাও। নীরব তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
স্বর্ণা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওর ইচ্ছে করছিল এগিয়ে গিয়ে মমতাজ আহমেদকে পা ছুঁয়ে সালাম করার। কিন্তু সংকোচে তা করলো না। মনে মনে তাকে সালাম করলো। এরপর ও ছোট ছোট পদক্ষেপে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। নীরব দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে, এই প্রথম ওকে দেখে অজানা লজ্জা এসে গ্রাস করলো স্বর্ণাকে। নীরব স্বর্ণাকে দেখে কৌতূহলী গলায় বললো— `মমতাজ স্যার কী বললেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, আমাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে আপনার সঙ্গে কী এমন গোপন আলোচনা করলেন।’
স্বর্ণা বললো— `চলুন, আগে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবো না-কি?’
`ওহ, হ্যাঁ, চলুন।’
মমতাজ আহমেদের বাড়ির বারান্দা দিয়ে ওরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। স্বর্ণাকে মমতাজ স্যার কী বললেন— এই জিজ্ঞাসা নীরবের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বর্ণার গাড়ি মমতাজ আহমেদের বাড়ির ড্রাইভওয়েতে পার্ক করা ছিল। ওরা গিয়ে গাড়িতে বসলো। গাড়ির চালক গাড়ি স্টার্ট দিতেই স্বর্র্ণা তার উদ্দেশে বললো— `গুলশানে যাও।’
গাড়ি চলতে শুরু করলো। ওদের গাড়ি মমতাজ আহমেদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। এরপর স্বর্ণা নীরবের দিকে তাকিয়ে বললো— `এবার বলুন, কী জানতে চান।’
`জানতে চাচ্ছিলাম, মমতাজ স্যার আপনার সঙ্গে কী কথা বললেন।’ বললো নীরব। এ কথা বলার পর ওর মনে হলো, এই কৌতূহল না দেখালেও চলতো। স্বর্ণা কী ভাববে, কে জানে। ওর মনে একরকম অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বর্ণা মিষ্টি করে হাসলো। ওর মুখে হাসি দেখে নীরবের মনের অস্বস্তি সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে গেলো। স্বর্ণা বললো— `মমতাজ আহমেদ আপনাকে নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। আমার ব্যক্তিগত কিছু কথা জানতে চেয়েছেন।’
`ওহ, আচ্ছা।’
নীরব আর কোনো প্রশ্ন না করলেও স্বর্ণা ইচ্ছে করেই বললো— `তিনি জানতে চেয়েছেন, আমি কাউকে ভালোবাসি কি-না, বিয়ে করার মতো পছন্দ করি, এমন কেউ আছে কি-না। এই আর কী। আমি তাকে বললাম— `আমার এমন কেউ নেই। আমার কথা শুনে মনে হলো তিনি বিস্মিত হলেন।’ কথাটা বলে মিটিমিটি হাসলো স্বর্ণা।
ওর হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীরব বললো— `কাউকে ভালোবাসেন কি-না বা বিয়ে করার জন্য পছন্দের কেউ আছে কি-না, একদিনের পরিচয়ে এই সত্য স্বীকার করা যায় না। আপনিও তাকে সত্য বলেননি। এটা কোনো অপরাধ নয়।’
নীরবের কথায় হোঁচট খেলো স্বর্ণা। ও পাশ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে নীরবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মেলে বললো— `সত্য বলিনি মানে? এ কথা কেনো বললেন?’
নীরব স্বর্ণার প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। এ কথা বলা ওর ঠিক হয়নি। নীরব জানে, মেহেদী নামে একজন স্বর্ণাকে ভালোবাসে। কী এক ঘটনার কারণে স্বর্ণা অভিমানে মেহেদীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কাল মেহেদী ওর সঙ্গে দেখা করে এ কথা জানিয়েছে। মেহেদীর ধারণা, স্বর্ণা নীরবকে পছন্দ করে, হয়তো ভালোও বাসে। নীরব অবশ্য মেহেদীকে জানিয়েছে স্বর্ণার সঙ্গে ওর কোনো আবেগময় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এ কথা জানতে পেরে মেহেদী ওর কাছে বিনীত অনুরোধ করেছে, ও যেনো স্বর্ণার জীবনে না জড়ায়। মেহেদীকে খুব চিন্তিত মনে হয়েছিল। স্বর্ণার সঙ্গে ওর সম্পর্ক যে আর আট-দশ জনের মতোই, এ কথা বলেও যেনো মেহেদীর সন্দেহ দূর করতে পারেনি। মেহেদীর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে। ওর মধ্যে সন্দেহ প্রবণতাও প্রকট। নীরব মনে মনে একঝলক মেহেদীর কথা ভেবে নিলো। ওর নীরবতা দেখে স্বর্ণা ফের বললো— `আমাকে অভিযুক্ত করে এখন চুপ করে আছেন যে! আমি কোন কথাটা সত্য বলিনি?’
নীরব বুঝতে পারছে, চুপ করে থাকা ঠিক হবে না। স্বর্ণাকে ও আঘাত করে ফেলেছে। কেনো এবং কার কথা ভেবে ও এ কথা বলেছে, তা এখন খোলাসা করে বলতে হবে। নইলে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি হবে। নীরব একটু ইতস্তত করে বললো— `আসলে আমি একটা কথা আপনাকে বলবো বলে ভাবছিলাম। বলতে পারিনি। আবার বলার যখন চেষ্টা করছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আপনার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি কেনো নাক গলাতে যাবো।’
নীরবের কথায় অবাক চোখ তুলে স্বর্ণা বললো— `ঠিক বুঝতে পারছি না, কী বলতে চাচ্ছেন।’
`আমি সঠিক জানি না, মেহেদী নামে কাউকে আপনি ভালোবাসেন কি-না। কাল মেহেদী নামে এক যুবক আমার সঙ্গে দেখা করেছিল।’
`ও, তা-ই? কিভাবে ওর সঙ্গে দেখা হলো?’ স্বর্ণা উদগ্রীব হলো।
স্বর্ণা মেহেদীকে চিনতে পারায় আশ্বস্ত হলো। ও বললো— `প্রথমে আমাকে ফোন করে দেখা করতে চায়। আমিও ফ্রি ছিলাম। গুলশানে দেখা করলাম তার সঙ্গে। মেহেদী কাল আমাকে জানালো যে, সে আপনাকে ভালোবাসে। আপনিও বাসেন, শুধু কী এক অভিমানে আপনি ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। আমি তাকে বললাম, এসব কথা আমাকে কেনো বলছেন?’
`সে কী বললো?’
`সে বললো— আমি না কি আপনাদের দুজনের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।’ কথা বলতে বলতে নীরব তাকালো স্বর্ণার দিকে। স্বর্ণার মুখ বিষণ্ন হয়ে গেছে। ওর বিষণ্নতা দেখে নীরবের মায়া হলো। স্বর্ণাকে বিষণ্ন করে দিতে কথাগুলো বলেনি ও। মেহেদীর কথা কতটুকু সত্যি, ও জানে না। তবে মেহেদীর কথাগুলো সত্যি হলে নীরবের উচিত স্বর্ণার সঙ্গে একটু দূরত্ব রাখা। নীরবের কাল মনে হয়েছে, কখনো কখনো স্বর্ণার কথা, অভিব্যক্তি, আবেগ ওকে ছুঁয়ে যায়। নীরব নিজের ভেতরে নিজের এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয় না।
নীরব এ কথা ভাবছিল, স্বর্ণা ওর ভাবনাকে চটকে দিয়ে বললো— `আপনার কাছে যখন মেহেদী ঁেপৗছেই গেছে, তখন আপনাকে একটা কথা জানিয়ে রাখতে চাই।’
`বলুন।’
`আমি মেহেদীকে প্রচণ্ড… প্রচণ্ড রকম ঘৃণা করি! কেনো ঘৃণা করি, সে কথা অন্য একদিন বলবো।’
`আচ্ছা।’
`আপনার কাছে একটা অনুরোধ রাখতে পারি?’
`অবশ্যই। কী অনুরোধ, বলুন।’
`আপনি আর কখনো মেহেদীর সঙ্গে কথা বলবেন না। দেখা করতে চাইলে দেখা করবেন না, ফোনেও কথা বলবেন না। অনুরোধটা রাখতে পারবেন?’
এ কথায় স্মিত হাসিতে নীরব বললো— `এতো সহজ একটা অনুরোধ করলেন?’
`এ অনুরোধটা রাখলেই আমি খুশি হবো।’
নীরব ফের হেসে বললো— `আপনাকে এতো সহজেই খুশি করা যায়, জানতাম না।’
এ কথায় কপট লাজুকতার দৃষ্টি মেলে ওর দিকে তাকালো স্বর্ণা। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ও রিনরিনে কণ্ঠে বললো— `এরপর অনেক কঠিন কাজ দেবো। তখন দেখবো, আমাকে খুশি করতে এগিয়ে আসবেন, না পিছিয়ে যাবেন।’
ওর কথাটার মধ্যে কেমন এক অর্থদ্যোতনা আছে। সাগরের অতল জলে গুপ্তধন থাকার ইঙ্গিত যেনো। নীরব কি কোনো গুপ্তধনের সন্ধানে অতল জলে তলিয়ে যাচ্ছে? ও কি আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে? ও কি নিজের অজান্তে স্বর্ণার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, না-কি স্বর্ণা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? এ প্রশ্নের মদিরতা নিয়ে নীরব গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। এ মুহূর্তে স্বর্ণার দিকে ও তাকাতে চায় না। নিজেকে ধরে রাখতে চায় ও। গাড়ি ছুটছে ফার্মগেট হয়ে গুলশানের দিকে। রাস্তার চারপাশের বাড়ি, দোকানপাট, স্থাপনা গাড়ির গতির সঙ্গে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। নীরব ভাবে, গাড়ির ছুটে চলার মতো প্রত্যেকের জীবন গতিময়। সবাই ছুটছে। শুধু নীরব কোথায় যেনো আটকে আছে। ও এগুতে পারছে না। কিন্তু ওর মন এগুতে চায়। ও স্বর্ণাকে কী বলবে, ভেবে পাচ্ছে না। ওর কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে স্বর্ণা বললো— `কিছু বলছেন না যে! ঘাবড়ে গেলেন?’
`আমি তো ঘাবড়েই যাই সব সময়। মনের মধ্যে কতো কথার আলোড়ন সৃষ্টি হয়; কিন্তু তা বলতে পারি না।’
ওর কথায় টিপ্পনি কেটে স্বর্ণা বলে— `যেমন নাবিলাকেও বলতে পারেননি।’
`কী বলতে পারিনি?’
`বলতে পারেননি, আপনি ওকে পছন্দ করেন, তা-ই না?’
`না, ওকে এ কথা বলেছিলাম।’
`না, বলেননি। নাবিলা আপনাকে ফান করে প্রশ্ন করেছিল যে, আপনি ওর সঙ্গে প্রেম করবেন কি-না, আর আপনি ওই ফোনকে সত্যি ভেবে ওর পেছনে মোহগ্রস্ত হয়ে ঘুরেছেন।’
`মোহগ্রস্ত কেনো বলছেন?’
`মোহ নয় তো কী? ভালোবাসা কি এতো ঠুনকো বিষয় যে, বললেই ভালোবাসা হয়ে যায়?’
স্বর্ণার কথায় কৌতূহল প্রকাশ করে নীরব বলে— `তা হলে ভালোবাসা কিভাবে হয়, বলুন তো!’
`পরস্পরের মধ্যে ঐশ্বরিক জাগরণ সৃষ্টি হলেই ভালোবাসা জন্ম লাভ করে। দুটি হৃদয়ে আকর্ষণ ও চাওয়া-পাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি, ভাববিনিময় না হলে কি ভালোবাসা হুট করেই জন্ম নিয়ে নেবে? ভালোবাসা তো আগাছা নয়। পরগাছাও নয়। অনুভবে শেকড় প্রোথিত হবার মধ্য দিয়ে ভালোবাসা নামক বৃক্ষ ডালপালা ছড়ায়। এক দেখাতে বা এক কথাতে যারা প্রেমে পড়ে, তারা আসলে প্রেমে পড়ে না, সাময়িক মোহগ্রস্ত হয়। কিন্তু ওই মোহগ্রস্ত মানুষ তা বুঝতে পারে না।’
`আপনি দেখছি, ভালোবাসা সম্পর্কে একরকম ভাষণ দিয়ে ফেললেন?’ কথাটা বলে হেসে ফেললো নীরব।
স্বর্ণা গম্ভীর কণ্ঠে বললো— `ভাষণ নয়। ভাষণ বললে ভালোবাসাকে ছোট করা হয়। আসলে আমি ভালোবাসা সম্পর্কে আমার ধারণার ব্যাখ্যা দিলাম।’
`ঠিক আছে, আপনার কথা মেনে নিলাম। স্বীকার করছি, নাবিলার পেছনে মোহগ্রস্ত হয়ে ঘুরেছি। মরীচিকার পেছনে যেমন কেউ কেউ ছোটে। এ কথাও সত্যি যে, আমি কিন্তু বুঝতে পারতাম, নাবিলা আমাকে ভালোবাসে না। যা-ই হোক, এখন এসব কথা টেনে আর লাভ কী?’
`লাভ-লোকসান নিয়েও আপনাকে এখন থেকে ভাবতে হবে। কী চান, বা কী চাইলেও বলতে পারেন না, এসব কথাও ভাবতে হবে। ভেবে যা চান, তার জন্য হাত বাড়াতে হবে। নইলে আপনার জীবনে কেবল না পাওয়ার কষ্টই বাড়বে।’
`আমাকে এভাবে উৎসাহিত করছেন কেনো?’
`বাহ, উৎসাহ না থাকলে কোনো সৃষ্টিই তো হয় না। কোনো কিছু পাওয়াও হয় না।’ বলে মৃদু হাসলো স্বর্ণা। ওর চোখে রহস্যময় দৃষ্টির ঝিলিক।
নীরব ভাবালুতা টের পায় নিজের অনুভবে। ও বলে— `আমি যদি অতি উৎসাহে আকাশের চাঁদের দিকে হাত বাড়াই, সেটি কি ঠিক হবে? চাঁদ কি আমার মুঠোবন্দি হবে? যা হাত বাড়িয়ে পাওয়া যাবে না, সেদিকে হাত বাড়িয়ে না পাওয়ার বেদনা কেনো চাঙ্গা করবো? এর চেয়ে নিজেকে সংযত রাখাই ভালো নয়?’
নীরবের কথাটা লুফে নেয় স্বর্ণা। ও বলে— `কী পাবেন, কী পাবেন না, এটাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। অন্তত ভালোবাসার ক্ষেত্রে, আই মিন কাউকে পছন্দ করলে, তাকে কথাটা সরাসরি বলে ফেলা উচিত। বলে ফেলার সাহস তো অন্তত প্রকাশ পায়। এই সাহসেরও একটা মানসিক মূল্য আছে।’
`কী রকম?’
`মনের আত্মতৃপ্তির কি মূল্য নেই?’
`ঠিক বলেছেন তো! এভাবে তো কখনো ভাবিনি।’
`তা হলে ভাবুন।’
`হুম। মনে হচ্ছে, আপনি আমাকে যেনো গহীন অন্ধকারে আলোর সুড়ঙ্গ দেখাচ্ছেন।’
`তা-ই? এর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাবেন?’
`কৃতজ্ঞতা? শুধু একবার কৃতজ্ঞতা জানালেই কী হবে?’
`তা হলে কতবার জানাতে চান?’ চোখের মণি নাচিয়ে জানতে চাইলো স্বর্ণা।
নীরব বললো— `পুরো জীবন আপনার পাশে থেকে প্রতিদিন একবার করে কৃতজ্ঞতা জানালে কেমন হয়?’ অসম্ভব সাহসিকতায় কথাটা বলে ফেললো ও। কথাটা বলার পর ওর মনে হলো, এমন কথা বলার মতো সম্পর্ক ওদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি এবং গড়ে ওঠার কারণও সৃষ্টি হয়নি। অথচ কথাটা ও বলে ফেলেছে। আবেগ এবং ভাবালুতার সম্মিলনে ওর মনের ভেতরে অন্য এক নীরবের আত্মপ্রকাশ হয়ে গেলো। যেনো পাহাড়বন্দি এক নদী পাথরের বেষ্টনী ভেঙে লাফিয়ে নেমে এলো। নীরব নিজের ভেতরে তোলপাড় অনুভব করে। নীরবের কথা শুনে ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে স্বর্ণা। নীরবের কথায় স্বর্ণার বুকের ভেতরে যেনো উড়ন্ত এক নদী কান্নার ঢেউ তুলে ছুটোছুটি করে দিলো। ও কি কেঁদে ফেলবে? স্বর্ণা নিজের উথলে ওঠা কান্না প্রবল চেষ্টায় সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে। ও নীরবের প্রশ্নের জবাবে আর কিছু বলতে পারলো না। নীরব কথাটা বলে স্বর্ণার সামনে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলো। এমন লজ্জায় ও কখনো পড়েনি।
এগারো.
নীরব রুমে প্রবেশ করতেই আলোচনা থেমে গেলো। রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ও ভেতরে কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেয়েছিল। ও রুমে প্রবেশ করতেই কারো মুখে কোনো কথা নেই। শাকিল চৌধুরীর জরুরি ফোন পেয়ে ওকে আসতে হলো ওয়েস্টিনে। ওয়েস্টিনের পঞ্চম তলায় নির্দিষ্ট একটি রুমে প্রবেশ করেছে নীরব। রুমে প্রবেশ করার পর ওর মনে হলো, শাকিল চৌধুরী গোপন মিটিং করছেন। রুমটির সোফায় তিনজন লোক বসে আছে। লোকগুলোর বেশভূষা ভদ্রোচিত মনে হলো না ওর। শাকিল চৌধুরীর পাশে যে লোকটি বসে আছে, তার কপালের ডান পাশ থেকে লম্বা একটা কাটা দাগ ডান চোখের পাতা হয়ে গাল অবধি নেমে এসেছে। এই কাটা দাগটা লোকটির চেহারাকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। অন্য সোফায় যে দুব্যক্তি বসে আছে, এদের চোখে-মুখে তাচ্ছিল্য ভাব স্পষ্ট। তিনটি লোকেরই স্বাস্থ্য ভালো, পেটানো শরীর। লোকগুলোর ওপর চট করে চোখ বুলিয়ে নেয় নীরব। শাকিল চৌধুরী নীরবের উদ্দেশে বললো— `থ্যাংকস, নীরব, ঠিক সময়ে চলে আসার জন্য।’
`ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি ফোনে বলেছিলেন খুব জরুরি মিটিং আছে।’
`জরুরি মিটিংই তো করছি। আমরা অনেকদূর পর্যন্ত আলোচনা করে ফেলেছি। এখন আপনার অংশগ্রহণ হলেই হবে।’
এই লোকগুলোর সঙ্গে কী জরুরি মিটিং করছেন শাকিল চৌধুরী? প্রশ্নটা খচ করে বিঁধে গেলো। ওকেও তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিছু বুঝে উঠতে না পারার দৃষ্টি মেলে নীরব বললো `আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কী নিয়ে মিটিং!’
`গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জানতে পারবেন।’ বললো শাকিল চৌধুরী।
নীরব লোকগুলোর দিকে এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করে জানতে চাইলো— `এরা কারা?’
`ও, হ্যাঁ! আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আপনি আগে সোফায় বসুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?’
শাকিল চৌধুরীর কথায় নীরব তার মুখোমুখি একটি সোফায় বসলো। শাকিল চৌধুরী তার পাশে বসা লোকটিকে দেখিয়ে বললো— `এ হচ্ছে হিমু। সবাই তাকে জল্লাদ হিমু বলে চেনে।’
শাকিল চৌধুরী কথাটা এমনভাবে বললো যে, নীরবের মনে হলো, লোকটির নামের আগে `জল্লাদ’ বিশেষণ সংযুক্ত হওয়ার মধ্যে মহত্ত্ব আছে। সে বিস্ময় প্রকাশ করে বলে— `জল্লাদ হিমু!’
`হ্যাঁ, জল্লাদ হিমু।’ মৃদু হেসে বলে শাকিল চৌধুরী।
নীরব জল্লাদ হিমুর দিকে অবাক চোখ রেখে জানতে চায়— `তাকে এই নামে সবাই চেনে কেনো?’
নীরবের প্রশ্ন শুনে শাকিল চৌধুরীর ভালো লাগে। মনে মনে সে এমন প্রশ্নই আশা করছিল। সামনে বসা তিন পেশাদার খুনির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরতে তাদের নামের একটু কার্যকারণও বলা দরকার বলে মনে করছে সে। নীরবের প্রশ্ন সে সুযোগ সৃষ্টি করে দিলো। শাকিল চৌধুরী নীরবের মুখের দিকে দৃষ্টি রেখে বললো— `হিমুর কাজ জল্লাদের মতোই। যে কাউকেই সে সহজে জবাই করে ফেলতে পারে। কর্মগুণে ওর নাম হয়েছে জল্লাদ হিমু।’
নীরব ভীষণ অবাক হলো শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে। ও ভাবতে লাগলো, লোকটি যদি সত্যিই মানুষ জবাই করতে পারদর্শী হয়, তা হলে এমন লোকের সঙ্গে কীসের মিটিং? ওর চেতনার মধ্যে একটা ধাক্কা এসে লাগে। নীরবের মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন দেখে শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো? আপনার ভয়ের কিছু নেই।’
`না, মানে…আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কেনো আমাকে এখানে ডেকেছেন।’
`বলছি। তার আগে আরো দুজনের নাম বলছি। তাদেরও চিনে রাখুন।’
`ঠিক আছে। বলুন।’ আহত কণ্ঠে বললো নীরব। ওর পানির তেষ্টা পেয়ে গেলো। কিন্তু মুখে তা বললো না। শাকিল চৌধুরী অন্য দুজনকে পরিচয় করিয়ে দেবার ভঙ্গিতে বললো— `ওদের একজনের নাম ড্যাগার মুনির আর অন্যজনের নাম রোহিঙ্গা জসিম।’
`ও আচ্ছা। নাইস টু মিট ইউ।’ নীরব লোক দুটির দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বললো।
লোক দুটি ওর কথা গায়ে মাখলো না। এ ধরনের আচরণও অপমানজনক। খুনি-মাস্তানরা সম্ভবত কথা কম বলে বা একেবারেই বলে না। কাজ কী এবং কাজের জন্য কতো টাকা পাবে, এর বেশি কথা বলা তারা পছন্দ করে না। ড্যাগার মুনির আর রোহিঙ্গা জসিমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এ কথা ভেবে নিলো নীরব। কক্ষে বসে থাকা বিদঘুটে নামের তিনজনই চুপচাপ এবং ভাবলেশহীন। নীরব এবার শাকিল চৌধুরীর চোখে চোখ রাখলো। ও বোঝার চেষ্টা করছে এ ধরনের অদ্ভুত নামধারী লোকদের সঙ্গে ওকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে কেনো। শাকিল চৌধুরী যেনো নীরবের মনের কথাটা অনুধাবন করতে পারলো। সে মুচকি হেসে নীরবের উদ্দেশে বললো— `এদের নাম ড্যাগার মুনির এবং রোহিঙ্গা জসিম কেনো হয়েছে, জানতে ইচ্ছে করছে না?’
`নামের অর্থ বুঝতে পারছি। নামকরণের কারণটা অনুমান করছি।’
`অনুমান কেনো, শুনে রাখুন। সংক্ষেপেই বলছি। ড্যাগার মুনির যাত্রাবাড়ি এলাকায় এক সময় ছিনতাই করতো, তার কোমরে সবসময় ড্যাগার লুকানো থাকতো। কথায় কথায় মানুষের সামনে ড্যাগার বের করতো এবং যার-তার ওপর চালিয়ে দিতো। ছিনতাই করতে করতে অপরাধ জগতের বাসিন্দা হয়ে যায়। এখন ছিনতাই করে না। খুন করার কাজ নেয়। আর রোহিঙ্গা জসিম অনেক দিন ছিল মিয়ানমারের জঙ্গলে। পাবর্ত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডাকাত দল গড়ে তুলেছিল। সেও অপরাধ জগতের বাসিন্দা। হিমুর কথা আগেই বলেছি, ও কী করতে পারে। ওর সম্পর্কেও আরেকটু বলছি। হিমু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। ভর্তি হওয়া পর্যন্তই পড়াশোনার দৌড়ঝাঁপ শেষ। আর এগুতে পারেনি। একটি রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে গিয়েছিল। সতেরবার জেলখানায় গিয়েছে। ও গুলি করে পাখি মারার মতো মানুষ মারতে পারে বলে জনশ্রুতি আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।’
শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে পানির তৃষ্ণা বেড়ে গেলো নীরবের। ও অনুভব করছে, ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে পানি খেতে চাইলে দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। তাই ঢোক গিলে তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা করতে লাগলো ও। এবার নীরবকে দেখিয়ে শাকিল চৌধুরী তিনজনের উদ্দেশে বললো— `পরিচয় করিয়ে দিই। ও হচ্ছে নীরব। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। একটু সফট মাইন্ডেড, তবে যে কোনো পরিস্থিতি সামলে নিতে পারে।’
নীরবের দিকে শান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো তারা। তাদের মুখে এবারো কোনো কথা নেই। তাদের চোখের দৃষ্টিতে কেমন নিষ্ঠুরতা দেখতে পেলো নীরব। লোকগুলো যে ভদ্র নয়, এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত। ও শাকিল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে শুকনো মুখে বললো— `আমাকে কি তাদের সঙ্গে কোনো কাজ করতে হবে?’
নীরবের কথায় স্মিত হাসি ফুটে ওঠে শাকিল চৌধুরীর মুখে। সে বললো— `কাজ করতে হবে বলেই তো তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তবে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আপনার কোনো কাজ নেই। তারা একটি কাজ করবে। এরপর আপনি ওই কাজের সমাপ্তি টানবেন। এই আর কী।’
`ঠিক বুঝলাম না। এ কেমন কাজ?’
`বলছি, বলছি। ধীরে ধীরে বলছি। কাজটি সহজ নয়। আবার কাজটি নিষ্ঠুরও। তাই সময় নিয়ে বলছি।’ বললো শাকিল চৌধুরী। তার কথা শুনে কেমন ভয় ধরে যাচ্ছে। নীরবের এখন মনে হচ্ছে, শাকিল চৌধুরী শুধু চতুর ব্যবসায়ীই নয়, ভয়ঙ্করও। লোকগুলো কী কাজ করবে, ও ভেবে পেলো না। ভালো কোনো কাজ করবে না তারা, এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত। শাকিল চৌধুরী নীরবের উদ্দেশে বললো— `নিজ নামেই তারা অপরাধ জগতে পরিচিত। জেলখানাতেও এদের নাম উচ্চারিত হয়। না-কি হয় না?’ শাকিল চৌধুরী জল্লাদ হিমুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো। তার প্রশ্নে হিমু মৃদু হাসার চেষ্টা করলো। তার ঠোঁট একটু ফাঁক হলো। মনে হচ্ছিল, পুরোপুরি হাসলে যেনো ঠোঁট ফেটে যাবে, তাই পুরোপুরি হাসছে না। জল্লাদ হিমুর শুকনো হাসির অর্থ হলো— `শাকিল চৌধুরী যা বলেছে তা সঠিক’, অর্থাৎ জেলখানায়ও তাদের নাম উচ্চারিত হয়। নীরব জেলখানায় তাদের দেখেনি এবং তাদের নামও শোনেনি। ও অবশ্য অপরাধী কয়েদিদের এড়িয়ে চলতো। ও বললো— `তাদের নাম মনে রাখার মতো অবশ্য।’
`শুধু তা-ই নয়, এদের নামে এই শহরে অনেক কিছুই হয়। তারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাদশা! বুঝতে পারছেন?’
`জি, পারছি’, বললো নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো— `র্যাবের হিটলিস্টেও এদের নাম আছে!’
`বলেন কী!’
`হুম।’
`তা হলে?’
`আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো?’
`না, বললেন না যে, তাদের একটা কাজের সমাপ্তি আমাকে করতে হবে?’
`হ্যাঁ, বলেছি।’
`কী কাজ বলুন তো! উৎকণ্ঠার মধ্যে রাখবেন না, প্লিজ!’ তাগাদ দিলো নীরব।
কথাটা বলতে শাকিল চৌধুরীর মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। সে নীরবের দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললো— `কথাটা শুধু শুনে রাখবেন। কাউকে কিন্তু এ কথা বলতে পারবেন না, মনে থাকবে?’
সাসপেন্স বাড়ছে পরিবেশে। নীরবের বুক দুরুদুরু করছে। ও নিজের ভেতরে সাহস সঞ্চার করে নেয়ার চেষ্টা করে যায়। ও বলে— `বলে ফেলুন। নিশ্চয় খুব গোপন কথা?’
`শুধু গোপন নয়, অতীব গুরুত্বপূর্ণও!’
`আহা, বলেই ফেলুন না! টেনশন তৈরি করছেন কেনো?’ ককিয়ে ওঠে নীরব। শাকিল চৌধুরী এবার পকেট থেকে বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেটের প্যাকেট বের করে প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট দুঠোঁটে চেপে ধরে তাতে অগ্নিসংযোগ করে। নীরব উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে থাকে শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে।
জ্বলন্ত সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে শাকিল চৌধুরী বলে— `কথাটা বলছি। কথাটা শোনার পর আঁতকে উঠবেন না কিন্তু!’
`ঠিক আছে, বলুন।’ সম্মতি প্রকাশ করার ভঙ্গিতে বলে নীরব। শাকিল চৌধুরী সিগারেটের ছাই অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে নিলো। এরপর সে বললো— `অনেকদিন ধরেই আমি পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। আমার পরিকল্পনা মোতাবেক এই তিন পেশাদার খুনি কয়েক দিন পর সুবিধামতো সময় এবং সুবিধামতো স্থানে তানজিলাকে খুন করবে।’
`কী বললেন, খুন! তানজিলাকে!’ চেঁচিয়ে ওঠে নীরব।
শাকিল চৌধুরী শান্ত গলায় বলে— `বলেছিলাম আঁতকে উঠবেন না। শান্ত হোন। আমার কথা শেষ হয়নি।’
`তানজিলাকে তারা খুন করবে! কেনো? কী বলছেন এসব!’ কথাটা বলতে গিয়ে নীরবের গা শিরশির করে ওঠে। শাকিল চৌধুরীর চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ দেখতে পায় ও।
শাকিল চৌধুরী বিরক্ত কণ্ঠে বললো— `তানজিলাকে খুন করবে তারা। আপনি আঁতকে উঠছেন কেনো?’
`আপনি কী বলছেন, শাকিল ভাই! আপনি আপনার স্ত্রীকে খুন করার কথা বলছেন।’
`তো, আপনি চেঁচাচ্ছেন কেনো? বলেছিলাম না, শান্ত থাকবেন। শান্ত হোন।’ বলে শাকিল চৌধুরী।
নীরব নিজেকে শান্ত করলেও ওর ভেতরে অশান্ত ঢেউ বইছে। পেশাদার তিন খুনির সামনে এ নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য না করাই ভালো, ভাবে ও। ও নিচু গলায় বলে— `আর কী বলবেন, বলুন। আমি শান্তভাবেই শুনছি।’
শাকিল চৌধুরী ফের নীরবের চোখে চোখ রেখে বললো— `তানজিলা খুন হবার পর আপনি ওর খুনের দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। পারবেন না?’
নীরবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এ কী কথা বলছে শাকিল চৌধুরী? সে কি আদৌ মানসিকভাবে সুস্থ? না-কি মানসিক বিকারগ্রস্ত? প্রশ্নগুলো কুণ্ডলি পাকিয়ে ওঠে মনের ভেতর। শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে ওর গা ঝিমঝিম করছে। ওর শরীরে ঠাণ্ডা একটা স্রোত সঞ্চালিত হলো যেনো। ও শাকিল চৌধুরীকে কী বলবে, ভেবে পেলো না। ও স্তম্ভিত। হতবাক। ওর বিস্ফোরিত চোখ আটকে ছিল শাকিল চৌধুরীর মুখের ওপর, ও দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। শাকিল চৌধুরী বললো— `নীরব, আমি বলেছিলাম, কোনো একটি অপরাধের দায় স্বীকার করে আপনি আবার কারাগারে ফিরে যাবেন। আশা করি, আপনি কথাটি ভুলে যাননি।’
নীরব এ কথার কোনো জবাব দিলো না। ও অবনত মুখে ভাবছে, ওর ভাগ্যে কেনো এতো বিপর্যয় দেখা দেয়? নীরবের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে শাকিল চৌধুরী বললো— `আমি আমার পরিকল্পনামতোই এগিয়েছি। আপনাকে কারাগার থেকে বের করে এনেছি, তানজিলার সঙ্গে ফের পরিচয় করিয়ে দিয়েছি এবং আপনি তানজিলার সঙ্গে ঘুরে বেড়াবেন, এটাও আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল। সব ঠিকঠাকমতোই হয়েছে। এখন শুধু আসল কাজটা করতে হবে।’
নীরব মুখ তুলে শাকিল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললো— `আপনি কি সিরিয়াসলি এসব কথা বলছেন, না রসিকতা করছেন?’
`কী আশ্চর্য, রসিকতা করবো কেনো?’
`তা হলে একটা প্রশ্ন করি?’
`করুন।’
`আপনি নিজের স্ত্রীকে খুন করতে চাইছেন কেনো?’
এ কথায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো শাকিল চৌধুরী। নীরব তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। শাকিল চৌধুরী বললো— `এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আপনার এ প্রশ্নটার জবাব দেবো না। অন্য কোনো প্রশ্ন আছে? থাকলে করুন।’
`না। আমার অন্য কোনো প্রশ্ন নেই।’
`এবার আপনাকে আমি একটা প্রশ্ন করি?’ বললো শাকিল চৌধুরী।
`করুন।’
`আপনি কি তানজিলাকে ভালোবাসেন?’
প্রশ্নটা শুধু বিব্রতকরই নয়, অসম্মানজনকও। নীরব এ প্রশ্নে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলো। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শাকিল চৌধুরীর মুখের ওপর। শাকিল চৌধুরী মিটিমিটি হাসছে। সে ফের বললো— `বললেন না, আপনি তানজিলাকে ভালোবাসেন কি-না?’
`আপনি কী মনে করেন? আমি তাকে ভালোবাসি?’ জানতে চাইলো নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো— `আপনার মনের কথা আমি জানি না। তবে তানজিলা যে আপনাকে পছন্দ করে, এটা বুঝতে পারি।’
`পছন্দ করা আর ভালোবাসা কি এক?’
`এক নয়? এক না হলেও কাছাকাছি একটি বিষয় তো, কী বলেন?’
`আপনি সাংঘাতিক লোক! নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করছেন।’
`হা-হা-হা। মিস্টার নীরব, আমার পরিকল্পিত চিত্রনাট্যে এটাও আছে যে, তানজিলাকে আপনি ভালোবাসতেন, তানজিলাও আপনাকে ভালোবাসতো। বিয়ে হয়নি আপনাদের। ভালোবেসে না পেয়ে প্রেমিকাকে খুন করেছেন, এ কথা পুলিশের কাছে এবং আদালতে বলবেন আপনি।’
`তার মানে নাবিলার পর ফের তানজিলার খুনি হবো আমি? আই মিন সিরিয়াল কিলার?’
`মন্দ কী? বিনিময়ে আপনাকে ঠকাবো না। যে পরিমাণ অর্থ আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে আমি দেবো, বাকি জীবন আরাম-আয়েশ করে কাটিয়ে দিতে পারবেন। হা-হা-হা।’
শাকিল চৌধুরী এতোটা কদাকার-কুৎসিত চরিত্রের লোক, তা ভাবেনি নীরব। নীরবের মনে হলো, এ মুহূর্তে এই মিটিং থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে ভালো হতো। ও নিজের ভেতরে রাগ বাড়ছে। ও নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। এ মুহূর্তে রেগে গেলে পরিস্থিতি ওর অনুকূলে থাকবে না। শাকিল চৌধুরীকে ওর মনের অবস্থাটা বুঝতে দেয়া ঠিক হবে না, এ কথা ভেবে নীরব বললো— `শাকিল ভাই, আপনি নাটকীয়তা পছন্দ করেন, জানি। তবে স্ত্রীকে খুন করার মতো নাটকীয়তা ঠিক নয়।’
নীরবের কথায় শাকিল চৌধুরী মুখ একটু গম্ভীর করে ফেলে। `আমি কোনো নাটক করছি না। বলতে পারেন, নাটকীয়ভাবে বা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে তানজিলাকে খুন করতে চাচ্ছি।’
`কিন্তু কেনো? আমার তো মনে হয়, আপনাদের দাম্পত্য জীবন ভালোই আছে। হতে পারে আপনাদের সন্তান নেই বা হচ্ছে না অথবা তানজিলা মা হতে চাচ্ছে না। আমি ধারণা করেই কথাটা বলছি। এমন হলেও আপনাদের আরো অপেক্ষা করার সময় আছে। নিজের স্ত্রীকে খুন করবেন কেনো?’
নীরবের কথায় ফের মিটিমিটি হাসে শাকিল চৌধুরী। নীরব বুঝতে পারে না, লোকটির মনে আসলে কী চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। তানজিলাকে খুন করার কথা বলছে সিরিয়াসলি। কিন্তু কেনো তাকে খুন করতে চায়, এটা বলছে না। ও শাকিল চৌধুরীর কাছ থেকে এর জবাব আশা করছে। শাকিল চৌধুরী ওর কথার জবাবে বলে— `আগেও বলেছি, আমি তানজিলাকে কেনো খুন করতে চাই, সেটা বলবো না। বাট আমি চাই তানজিলার খুনের দায় আপনি নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। নেবেন কি-না বলুন।’
এ কথায় ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো নীরব। ও কী বলবে, ভেবে পেলো না। এ মুহূর্তে ওর `হ্যাঁ’ বা `না’ কিছু বলা ঠিক হবে না। মনে মনে ভেবে নেয় ও। বলে— `আমাকে দু-তিন দিন ভাবতে দিন। আমি জানাবো।’
`কেনো ভাবতে হবে? এখনই বলতে অসুবিধা কোথায়?’
নীরব ম্লান হেসে বললো— `আমি মানুষ হিসবে অতোটা নিষ্ঠুর হতে পারিনি। চট করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। তাই কয়েক দিনের সময় চাইছি।’
`ঠিক আছে। তিন দিন সময় দিলাম। আপনার সিদ্ধান্ত না হলে আমি পরিকল্পনা পরিবর্তন করবো। মনে রাখবেন, তানজিলা খুন হবেই। যদি আপনি আমাকে সহযোগিতা না করেন, তা হলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন। এ কথাও মনে রাখবেন।’
`জি। এ কথা মনে আছে, থাকবে।’ বললো নীরব। ওর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ফুসফুসে শ্বাস আটকে যাচ্ছে। দম বন্ধ হবার মতো পরিবেশ। খুনিগুলোর কোনো ভাবান্তর নেই। তারা অলস ভঙ্গিতে সিগারেট ফুঁকছে। রুমটা সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ওয়েস্টিনের রুমে সিগারেট নিষিদ্ধ হলেও তারা তা মানছে না। যারা ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে পারে, তারা হোটেলের বিধিনিষেধ কি আর তোয়াক্কা করে? নীরবের মনে হলো, এই কক্ষ থেকে ওর বেরিয়ে পড়া উচিত। এ কথা ভেবে ও শাকিল চৌধুরীর উদ্দেশে বললো— `কিছু মনে করবেন না, আমি একটু অস্বস্তিবোধ করছি। যদি অনুমতি দেন, তা হলে আমি আমার হোটেলে ফিরে যেতে চাই।’
শাকিল চৌধুরী নীরবের মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো। ওর মুখের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলো যেনো। এরপর সে শান্ত গলায় বললো— `ঠিক আছে, যান। আপনার সঙ্গে পরে আমি কথা বলবো। আজ যা আলোচনা হলো, তা কিন্তু কাউকে ভুলেও বলবেন না। মনে থাকবে তো?’
`মনে থাকবে। কাউকে বলবো না। আর বলার মতো আমার আছেই বা কে? আমি তো একাই থাকি। আপনার তত্ত্বাবধানেই থাকি।’ বললো নীরব। এ কথা বলার মধ্য দিয়ে শাকিল চৌধুরীকে বোঝাতে চাইলো, সে তার হাতের মুঠোয় আছে।
শাকিল চৌধুরী বললো, `ইদানীং দেখছি, স্বর্ণা নামে মেয়েটি আপনার সঙ্গে খুব ভাব জমিয়ে ফেলেছে। ও কিন্তু সাংবাদিক! ওকে কিছু বলে ফেললে বিপদে পড়ে যাবো। তখন কিন্তু আপনিও রক্ষা পাবেন না। জল্লাদ হিমুর একটা কাজ বাড়বে আর কী।’ সরাসরি হুমকি দিলো শাকিল চৌধুরী। নীরব এর প্রত্যুত্তরে কিছু বললো না। বলবেই বা কী? ও এখন এই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচে।
`নিশ্চিত থাকুন, এসব কথা কেউ জানবে না। স্বর্ণাকেও বলবো না।’
`ঠিক আছে যান। পরে কথা হবে।’
নীরব রুম থেকে বেরিয়ে এলা। ওর মাথা যেনো ভনভন করে ঘুরছে। ওর চিন্তাশক্তিতে বিষণ্নতা ছড়িয়ে আছে। এই বিষণ্নতা গভীর থেকে গভীর হচ্ছে যেনো। নীরব অনেকটা উদভ্রান্তের মতো লিফট ধরে নিচে নেমে এলো। শাকিল চৌধুরীর পরিকল্পনাকে ঠেকাতে কী করা উচিত, এই চিন্তা ওর মনের মধ্যে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। ও জানে, ওর নিজের তেমন শক্তি বা ক্ষমতা নেই। শাকিল চৌধুরীকে মোকাবিলা করতে হলে ওকে ক্ষমতাবান হতে হবে। কিন্তু ওর কি ক্ষমতাবান হবার সুযোগ আছে? নেই। এ কথা মনে মনে ভেবে একতাল হতাশার মেঘ জমিয়ে নেয় চেতনায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও ওয়েস্টিন হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। ওয়েস্টিন থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামতেই ওর সামনে এসে দাঁড়ায় মেহেদী। নীরব ভীষণ অবাক হয় মেহেদীকে দেখে। মেহেদী নিশ্চয় ওয়েস্টিনের সামনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েছিল। এমন হবার কথা নয়, তবু এমন অভাবিত ঘটনার মুখোমুখি পড়লো নীরব। নীরব মেহেদী কিছু বলার আগেই মেহেদী বললো— `হ্যালো, নীরব, কেমন আছেন?’
`মেহেদী, আপনি এখানে?’
`আপনার জন্যই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম।’
`আমার জন্য?’
`হুম। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ভেবেছিলাম, আরো পরে বের হবেন। হোটেল থেকে তাড়াতাড়িই বের হলেন।’
মেহেদীর কথায় বিস্ময়ের ধাক্কা লাগে। ও বলে— `আমার জন্য রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন? কেনো?’ প্রশ্নটা করতে গিয়ে নীরব বিরক্তি প্রকাশ করে।
মেহেদী মুখে হাসি ফুটে ওঠে। `কী করবো বলুন। আপনার সঙ্গে আমি কিছু কথা বলতে চাই। হোটেল থেকে আপনাকে অনুসরণ করছিলাম।’
`বলেন কী! এটা তো ঠিক নয়।’
`আমার উপায় ছিল না। আপনাকে ফোন করলে আপনি ফোন রিসিভ করেন না। অথচ আপনার সঙ্গে আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা ছিল।’
`কিন্তু আপনাকে বলার মতো আমার কোনো কথা নেই। কেনো আমাকে বিরক্ত করছেন?’
`ওই যে বললাম, আমার উপায় নেই। তাই আপনাকে বিরক্ত করছি।’ কথাটা বলে রাস্তার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেনো দেখে নেয় মেহেদী।
নীরব বলে— `আমি আপনার কোনো কথা শুনতে বা বলতে প্রস্তুত নই। তবু কেনো যে আমাকে বিরক্ত করছেন, বুঝতে পারছি না!’
`নীরব, আজ সকাল থেকে আপনার হোটেলের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। যখন বের হলেন, তখন আপনাকে অনুসরণ করলাম। দেখলাম, আপনি ওয়েস্টিনে ঢুকে গেলেন। আপনাকে থামালাম না। ভাবলাম, ওয়েস্টিন থেকে বের হলে কথা বলবো। তাই এতোক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই অপেক্ষার কী মূল্য পাবো না?’ মেহেদীর কণ্ঠে আকুতি ফুটে ওঠে।
নীরব চোখ কপালে তুলে বলে— `মাই গড! আপনার কথা শুনে অবাক হচ্ছি। আচ্ছা, আমাকে আপনি অনুসরণ করছেন কেনো, বলুন তো!’
`আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
`কথা বলার জন্য আমাকে অনুসরণ করবেন কেনো? এটা কি ঠিক করছেন?’
`না, অনুসরণ করা ঠিক নয়। কিন্তু আপনি আমার ফোন ধরেন না। আপনাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল। এ নিয়ে আমি খুব বিচলিত। মানসিকভাবে অসুস্থও বলতে পারেন।’ এ কথা বলতে গিয়ে মেহেদী নিজের দুকাঁধ উঁচিয়ে তা আবার ছেড়ে দেয়।
নীরবের বিরক্তি বাড়তে থাকে। ও বলে— `আমার সঙ্গে আপনার কী কথা থাকতে পারে? একদিন তো কথা হলো। আবার কী কথা বাকি রয়ে গেলো?’
কথাটা বলার মধ্য দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ পায় ওর। মেহেদী মাথা চুলকে নরম কণ্ঠে বলে— `চলুন না, কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।’
মেহেদীর প্রস্তাবে নিজের মধ্যে রাগের উত্তাপ টের পায় নীরব। ও আজ রেগে যাচ্ছে বা রেগে আছে। কিছুক্ষণ আগে ওর চেতনার মধ্যে রাগ নামক প্রতিক্রিয়া ঝড় তুলে দিয়েছে। রাগ জন্ম দেয়া এক ঘটনার পরপর আরেক রাগের ঘটনার আবর্তে ও পড়ে গেছে। ও রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বললো— `দেখুন, মেহেদী, আমি আজ খুব ব্যস্ত আছি। আমার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যাও আছে। আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার নেই।’
`দেখুন, আমার তেমন বেশি কথা নেই।’ অনুনয় করে বলে মেহেদী। ও আজ যেনো নাছোড়বান্দা।
নীরব বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এরপর বলে— `তা হলে কথাটা বলে ফেলুন। এর জন্য রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসতে হবে কেনো? কী বলবেন, বলুন।’
নীরবের কথায় মেহেদীর চোখ দুটোর মণি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মেহেদী কালক্ষেপণ না করে বলে— `না, মানে, আপনি তো জানেন, স্বর্ণাকে আমি ভালোবাসি। ও আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, এটা ঠিক। একদিন ও আমাকে হয়তো গ্রহণ করবে। কিন্তু…’ এ পর্যন্ত বলে থামে মেহেদী।
নীরব বলে— `কিন্তু কী?’
`না, মানে… মাঝখানে আপনি এসে পড়ায় আমার আশাভঙ্গ হবার উপক্রম।’
`তো আমি এখন কী করবো? আপনি আমাকে কেনো ক্লেইম করছেন? স্বর্ণা আর আপনার মধ্যে প্রেম আছে কি নেই, এর জন্য আমাকে কেনো টানছেন?’
`টানছি না। আপনি এসে দাঁড়িয়ে গেছেন। তাই…’
`দেখুন, মেহেদী। আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না, প্লিজ।’ এ কথা বলে নীরব পা বাড়াতে উদ্যত হয়। ওয়েস্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে দুজনের কথা বলা শোভনীয় নয়। এই পাঁচ তারকা হোটেলে কিছুক্ষণ পরপর গাড়ি আসছে, গাড়ি থেকে ভিআইপি ব্যক্তিরা হোটেলে প্রবেশ করছে। এমন একটি হোটেলের প্রবেশমুখের সামনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলা বেমানান। হোটেলের প্রবেশদ্বারে দণ্ডায়মান নিরাপত্তাকর্মীরা হয়তো বিরক্তি ভরা চোখে ওদের দেখছে, মনে মনে ভাবে নীরব। ও বিনয়ী কণ্ঠে মেহেদীর উদ্দেশে বলে— `আমরা ওয়েস্টিনের সামনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছি, ভালো দেখাচ্ছে না। আপনি আর কী জানতে চান, বলুন তো?’
মেহেদীর মুখে ম্লান হাসি ঝলমলিয়ে ওঠে। সে বলে— `আপনি স্বর্ণার বোন নাবিলাকে খুন করেছেন বলে সে মামলায় আপনার সাজা হয়েছে, এটা তো ঠিক?’
`ঠিক। তো?’ রাগ চেপে হতাশ কণ্ঠে বলে নীরব।
মেহেদী প্রস্তুত ছিল। সে বলে— `যেখানে আপনাকে স্বর্ণার ঘৃণা করার কথা, সেখানে ও আপনাকে পছন্দ করছে। আমি এই রহস্য ভেদ করতে পারছি না। আপনি ওকে কী করেছেন, বলবেন কি?’
এ কথার জবাব কী দেবে নীরব? সত্য কথা বলার কোনো মানে হয় না। মেহেদীর সঙ্গে নাবিলা হত্যা এবং স্বর্ণাকে নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না ওর। তবে মেহেদীর প্রশ্নের একটা জবাবও দেয়া দরকার। ও বললো— `এ প্রশ্নটা স্বর্ণাকেই করবেন। ও বলতে পারবে, কেনো ও আমাকে পছন্দ করে। আমি অবশ্য মনে করি না, ও আমাকে বিশেষরকম পছন্দ করে। আপনার ধারণা মিথ্যাও তো হতে পারে।’
`না, আমি জানি, ও আপনাকে পছন্দ করে। আমি ওকে চিনি। আপনি হয়তো স্বীকার করছেন না।’
`দেখুন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব কথা বলার কি প্রয়োজন আছে? আমার তাড়া আছে। যাচ্ছি।’ নীরব ফের পা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
মেহেদী ওর সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলে— `আরেকটি প্রশ্ন, শেষ প্রশ্ন। প্লিজ, জবাব দেবেন।’
`বলুন।’
`আপনি কি স্বর্ণাকে ভালোবাসেন?’
এমন প্রশ্ন শোভন নয়। বিশেষ করে মেহেদী আর নীরবের মধ্যে যেটুকু পরিচয়, এই পরিচয়ের সীমারেখায় প্রশ্নটি শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। মেহেদীর প্রশ্নটা নীরবের ভেতরে চেপে থাকা রাগকে উসকে দিলো। ও মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বললো— `স্বর্ণার মতো মেয়েকে যে কোনো যুবক ভালোবাসতে পারে। ভালোবাসাটাই স্বাভাবিক। আমিও ভালোবাসি। আর কী জানতে চান?’ কথাটা মিথ্যা হলেও সে জোর দিয়েই কথাটা বললো। নীরব ভেবেছিল, এ কথা শুনে মেহেদী উত্তেজিত হয়ে ওকে কিছু বলবে, গালাগালও দিতে পারে। কিন্তু মেহেদী যেনো চুপসে গেলো। মেহেদীর মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেলো মুহূর্তেই। এমন জবাব সে হয়তো আশা করেনি।
মেহেদী মৃদুকণ্ঠে বললো— `আর কিছু জানতে চাই না। আপনি যান। আর আপনাকে অনুসরণ করবো না। কোনো প্রশ্নও করবো না।’
মেহেদী নীরবের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। নীরব যেনো হঁাঁপ ছেড়ে বাঁচে। নীরব মেহেদীকে কিছু বলে না।
`আপনি ভীষণ ভাগ্যবান, নীরব!’
কথাটা বলে মেহেদী আপন মনে হেঁটে রাস্তার ওপাশে চলে যায়। নীরব মনে মনে নিজের উদ্দেশে বলে— `আমি যে কতোটা ভাগ্যবান, তা আমিই কেবল জানি।’ ওয়েস্টিনের বিপরীতে রাস্তার পাশে একটা সিএনজি থেমে ছিল। নীরব হেঁটে গিয়ে সিএনজিতে চড়ে বসলো। ঠিক এ সময় স্বর্ণার ফোন এলো ওর সেলফোনে। নীরব ফোনের স্ক্রিনে দেখলা স্বর্ণার নম্বর। রিং বাজছিল। নীরব লাল বাটন টিপে লাইন কেটে দিলো। এখন ও স্বর্ণার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। সিএনজিচালকের উদ্দেশে ও বললো— `মহাখালি যাও।’
সিএনজিচালক গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা দিলো— `একশ টাকা দিতে হবে। মিটারে যামু না।’
সিএনজিচালকরা এ কাজটা হরহামেশা করে। যাত্রী দেখলেই ভাড়া বেশি চাইবে এবং মিটারে যেতে চাইবে না। নীরব এ নিয়ে আপত্তি করলো না। ও বললো— `যাও। একশ টাকার সঙ্গে বকশিসও দেবো।’
সিএনজি স্টার্ট নিতেই ফের স্বর্ণার ফোন এলো। নীরব এবারো ফোন কেটে দিলো। স্বর্ণার ফোন এভাবে অবজ্ঞা ও কখনো করেনি। সিএনজি চলতে শুরু করলো। ফের স্বর্ণার ফোন এলো। এবার নীরব ওর ফোনের সুইচ অফ করে দিলো। স্বর্ণা আর ওকে ফোনে পাবে না। ও আশ্বস্ত হলো। মনে মনে ও স্বর্ণার উদ্দেশে বললো— `স্বর্ণা, আমার জীবনের আপনার সম্পৃক্ততা না থাকাই ভালো। আমাকে ক্ষমা করুন।’
বারো.
ভোররাতে মাকে স্বপ্ন দেখেছিল নীরব। স্বপ্নে দেখলো, ওর মা রান্না করছেন। রান্না করার সময় অসতর্ক মুহূর্তে চুলোর আগুন ছড়িয়ে পড়লো। `বাঁচাও, বাঁচাও!’ বলে ওর মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দাউদাউ করে রান্নাঘর জ্বলছে। ওর মা চিৎকার করে ওকে ডাকছে— `নীরব, বাবা আয়, ঘর পুড়ে গেলো! বাবা, আমাদের বাঁচা!’
`মা’ বলে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠলো নীরব। ঘুম ভাঙার পর বুঝতে পারলো, ও স্বপ্ন দেখছিল। নীরব যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, একদিন সন্ধ্যায় ওদের রান্নাঘরে আগুন লেগেছিল। ওর মা আগুন নেভাতে গেলে তার শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে যায়। ওর মা ভীষণ ভয় পেয়ে যান। তিনি `আগুন, আগুন!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন। মায়ের চিৎকার শুনে ঘর থেকে দৌড়ে এসে মাকে দ্রুত রান্নাঘর থেকে বের করে এনেছিল নীরব। ঘর থেকে কাঁথা এনে মায়ের শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে আগুন নিভিয়েছিল। রান্নাঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিবেশীরা এসে কলস কলস পানি ঢেলে আগুন নিভিয়েছিল। আজ এতো বছর পর ও স্বপ্নে দেখলো ওদের রান্নাঘর পুড়ে যাচ্ছে আর মা ওকে ডাকছে।
ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর ও টের পেলো, ওর হার্টবিট বেড়ে গেছে। এই স্বপ্ন ওর চিন্তার ভেতরে গভীর রেখাপাত সৃষ্টি করলো। কারাগারে থাকার দুবছরে ও মাকে স্বপ্নে দেখেনি। কাল তানজিলাকে খুন করার শাকিল চৌধুরীর লোমহর্ষক পরিকল্পনার কথা শোনার পর রাতে মাকে স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নের মধ্য দিয়ে ওর মা যেনো ওকে ডাকছে। ওকে ফিরে যেতে বলছে। নীরব সকালে ঘুম থেকে উঠেই সিদ্ধান্ত নিলো, আজ ও এই শহর ছেড়ে নিজের গ্রামে ফিরে যাবে। ভোররাতের স্বপ্নটা ওকে যেনো পথ দেখালো। কাল থেকেই ওর ভীষণ মন খারাপ। এমন আপসেট ও কখনো হয়নি। শাকিল চৌধুরী এতোটা নিচ আর হীন, ভাবেনি ও। যে ব্যক্তি অর্থের লোভে স্ত্রীকে খুন করতে চায়, সে প্রকৃতপক্ষে অমানুষ। এ কথাটা ওর মনে বারবার ফিরে আসছে। তানজিলা খুন হোক, এটা ও চায় না। ওর খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার প্রস্তাব তো কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ও এতোটা অমানুষ হতে পারবে না। আবার শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছিল, তা রাখতে না পারার গ্লানিও আছে। কষ্ট আছে। একটা অপরাধের দায় স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি সে শাকিল চৌধুরীকে দিয়েছিল। কিন্তু তানজিলা খুন হবে এবং ওর খুনের দায়ভার ওকে নিতে হবে, এমন তো ও ভাবেনি। এ কথা ভেবে রাতভর নীরব যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। কাল থেকে ও হোটেলের রুম থেকে বের হয়নি। সেলফোন বন্ধ রেখেছে। নিজেকে নিয়েই ছিল ও। শাকিল চৌধুরী নিশ্চয় ওকে ফোন করে পায়নি। তবে সে হোটেলের নম্বরে ফোন করেনি। স্বর্ণা নিশ্চয় ওকে অনেকবার ফোন করেছিল। স্বর্ণাকে হঠাৎ করে উপেক্ষা করা ওর ঠিক হয়নি, এ কথা ভেবেছে নীরব। কিন্তু ও কী করবে? এমন মানসিক চাপে ও কখনো পড়েনি। রাতে মাকে স্বপ্নে দেখে ও যে পথ হারিয়ে আলোর দিশা খুঁজে পেলো। ঘুম ভাঙার পর নিজের গ্রামে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো। ঢাকা শহরটাকে ওর কাছে এখন ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। আর শহরের মানুষগুলোকে নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। ও নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিলো দ্রুত। ব্যাগ গুছিয়ে ও অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। একপর্যায়ে ও তৈরি হয়ে নেয়। আজ ও কালো প্যান্ট আর নেভি ব্লু ফুলহাতা শার্ট পরলো। কালো রঙের টিম্বারল্যান্ডের এক জোড়া জুতো কিনেছিল গত সপ্তাহে। পরা হয়নি। সেই জুতো পরলো ও। হোটেলের রুম থেকে বের হবার আগে ও তানজিলাকে ফোন করার কথা ভাবলো। হয়তো এটাই হবে ওর শেষ ফোন। এরপর সেলফোনটা হোটেলের কাউন্টারে রেখে যাবে শাকিল চৌধুরীর জন্য। এই সেলফোন সে দিয়েছিল। তার সেলফোন সঙ্গে নেবে না ও। তানজিলার খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারবে না, এ কথা শাকিল চৌধুরীকে পরে ফোন করে জানিয়ে দেবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে নীরব। তানজিলাকে ফোন করলো ও। তানজিলার ফোনের রিং বাজছিল, রিংটোন পাঁচবার বাজার পর ও-প্রান্তে তানজিলা ফোন রিসিভ করলো।
`হ্যালো!’ তানজিলার মৃদুকণ্ঠ।
তানজিলা ফোন রিসিভ করায় নীরব আশ্বস্ত হলো। ও বললো, `হ্যালো, তানজিলা? কেমন আছেন?’
`ভালো। আপনি কেমন আছেন?’
`আমি ভালো নেই।’
`কেনো? কী হয়েছে? এনিথিং রং?’ তানজিলা উদ্বিগ্ন হয়।
নীরব বলে— `আপনার স্বামী শাকিল চৌধুরী কি বাসায় আছেন?’
`না। ও বের হয়ে গেছে। কেনো?’
`আপনাকে আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। আমার কথাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বুঝলেন?’ এ পর্যন্ত বলে থামলো নীরব। ওর বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। উত্তেজনা বাড়ছে শ্বাস-প্রশ্বাসে।
ও-প্রান্ত থেকে তানজিলা বললো— `আপনার কী হয়েছে বলুন তো? আপনি কি অসুস্থ?’
`না, না। আমি সুস্থ আছি। তবে যা বলতে চাচ্ছি, তা বলতে গিয়ে ভড়কে যাচ্ছি।’
`কী বলতে চান, বলে ফেলুন। আমাকেও বের হতে হবে কিছুক্ষণের মধ্যে।’
`বলতে চাচ্ছি, আপনি আজ কোথাও বের হবেন না।’
`কী বলছেন! কেনো এ কথা বলছেন?’
`আগে আমার কথা শুনুন। এরপর সিদ্ধান্ত নেবেন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা।’
`আহা, বলুন! কী বলতে চান?’
`তার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই। করবো?’
`করুন।’
`আপনার স্বামী, আই মিন শাকিল চৌধুরী কেমন মানুষ?’
এ কথার জবাবে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে তানজিলা বললো— `আপনি হঠাৎ এ প্রশ্ন কেনো করছেন? আপনার আজ কী হয়েছে?’
`আমার কিছু হয়নি। কিন্তু আপনার ভয়ানক কিছু হতে পারে। তাই প্রশ্নটা করেছি।’
`আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন। যা বলতে চান, তা খুলে বলুন। আমাকে বিচলিত করবেন না, প্লিজ!’
`না, না। আমি আপনাকে বিচলিত করতে চাই না। আপনি ভুল বুঝবেন না, প্লিজ।’
`তা হলে বলে ফেলুন। এতো সময় নিচ্ছেন কেনো?’
`আমি আসলে বলতে চাচ্ছি, আপনার স্বামী আপনাকে খুন করার পরিকল্পনা করছে। আমার কথাটা বিশ্বাস করুন, প্লিজ।’
ও-প্রান্তে তানজিলা হাসছে। ওর হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে নীরব। ওর কথা তানজিলা বিশ্বাস করছে না। নীরব নিজের মধ্যে অসহায়ত্ত টের পায়। ও হাল ছাড়ে না। বলে— `বিশ্বাস করুন, আমি যা বলছি, তা সত্যি। আপনি আমার কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দেবেন না, প্লিজ!’
নীরবের কথার জবাবে হাসির মদিরতা মিশ্রিত কণ্ঠে তানজিলা জানতে চাইল— `আচ্ছা, শাকিল কেনো আমাকে খুন করবে? ওর কীসের অভাব? কী কারণে আমাকে খুন করবে ও? খুন করার তো একটা রিজন থাকতে হবে, তা-ই না?’
`দেখুন, আমি সত্যি কথাটাই বলছি। আপনাকে খুন করে সে আপনার অর্থ-সম্পদের একক মালিক হতে চায় হয়তো।’
`আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! আপনি অসুস্থ! আর কিছু বলবেন?’
`আমার কথা বিশ্বাস করুন, প্লিজ! আমার কথা মিথ্যা হলেও কথাটাকে উড়িয়ে না দিয়ে একটু ভাবুন। সতর্ক থাকুন। নিজেকে নিরাপদে রাখুন।’ নীরব হড়বড় করে কথাগুলো বলে। কথাটা বলতে ওর তৃষ্ণা পেয়ে গেলো। ঢোঁক গিলে তৃষ্ণা নিবারণ করে সে।
ও-প্রান্ত থেকে তানজিলার প্রশ্ন— `নীরব, আপনি কারাগার থেকে বের হয়ে কখনো কোনো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়েছিলেন?’
`না।’
`যাওয়া দরকার ছিল। কারাগারে থাকলে অনেকের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।’
`তানজিলা, আপনি কি আমার কথা একেবারেই বিশ্বাস করতে পারছেন না?’
`এমন কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে, ভাবছেন? আমার স্বামী আমাকে কেনো খুন করবে, বলুন? আমাদের দাম্পত্য জীবনও ভালো। আমাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝিও আজ পর্যন্ত হয়নি। অকারণে সে কেনো আমাকে খুন করবে?’
নীরব বুঝতে পারছে, তানজিলা ওর কথা বিশ্বাস করছে না। তাকে বিশ্বাস করানোর মতো যথাযথ যুক্তিও ওর কাছে নেই। এখন ও কী বলবে? ভাবে নীরব। ও-প্রান্ত থেকে তানজিলা বলে— `আমি রাখছি, পরে কথা হবে।’
`শুনুন, একটা কথা বলতে চাই।’
`বলুন।’
`আপনার স্বামী আমাকে কারাগার থেকে বের করেছিলেন একটি শর্তে। শর্তটি ছিল আমি কোনো একটি অপরাধের দায় স্বীকার করে ফের কারাগারে চলে যাবো।’
`হাউ ফানি!’
`হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন। আমি নাবিলার খুনিকে শনাক্ত করার জন্য তার শর্ত মেনে কারাগার থেকে বের হয়ে আসি। আমার কথা শুনছেন?’ নীরবের কণ্ঠে অসহায়ত্ত ফুটে ওঠে।
তানজিলা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে— `ও আসলে সবসময় নাটকীয় কিছু করতে চায়। ওর কথাবার্তায়ও নাটকীয়তা থাকে। এটা ওর অদ্ভুত হবি। এ কারণে হয়তো আপনাকে নাটকীয় শর্ত দিয়েছে। আসলে আপনাকে ও কারাগার থেকে বের করে এনেছে আমার অনুরোধে। আমিই ওকে বলেছিলাম, সম্ভব হলে আপনাকে যেনো কারাগার থেকে বের করে আনে।’
`হতে পারে। কিন্তু কাল সে আমাকে বলেছে যে, আপনাকে খুন করা হবে। পেশাদার খুনি ভাড়া করেছে সে। আমার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছে। পরিকল্পনা হয়েছে, খুনিরা আপনাকে খুন করবে। এরপর এই খুনের দায়-দায়িত্ব আমি স্বীকার করবো। ব্যস, আমার কাজ শেষ। আমি ফের কারাগারে চলে যাবো। আমার কথা বিশ্বাস করুন, প্লিজ!’
ও-প্রান্তে তানজিলা চুপ। সে হয়তো ওর কথা এখন উড়িয়ে দিচ্ছে না, ভাবে নীরব। তানজিলার জবাব না পেয়ে ও বলে— `আমার কথাগুলো ভাবুন। শাকিল চৌধুরী নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে পছন্দ করেন, এটা ঠিক। তারপরও আমার মনে হচ্ছে, সে আপনাকে সত্যি সত্যি খুন করার পরিকল্পনা করছে।’
তানজিলার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার শব্দ শুনতে পায় নীরব। টেলিফোনের অন্য প্রান্ত থেকে তানজিলার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে— `নীরব, শাকিল আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমার খুশির জন্য ও সব সময় তটস্থ থাকে। আমাদের মধ্যে কোনোরকম মনোমালিন্য বা ঝগড়াও হয় না। সে আমাকে খুন করার জন্য পেশাদার খুনি ভাড়া করবে, এ কথা বিশ্বাস করতে পারছি না।’
এ কথার জবাবে কী বলা যায়, ভেবে পায় না নীরব। ও কেমন হতাশার মধ্যে তলিয়ে যায়। ও যা বলতে চাচ্ছে, তাও যে সঠিক, এ কথা হলফ করে বলা যায় না। শাকিল চৌধুরী সত্যিই নাটকীয়তা তৈরি করতে পছন্দ করে। হতে পারে, কয়েকজন অভিনেতাকে ভাড়া করে এনে ওর সামনে খুনি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছে কাল। কিন্তু সত্যি সত্যি যদি শাকিল চৌধুরী তানজিলাকে খুন করতে খুনি ভাড়া করে থাকে, তা হলে কী হবে? প্রশ্নটা কাঁটার মতো বিঁধে গেলো মানসপটে। ও অসহায় গলায় তানজিলাকে বলে— `কিন্তু আমি কেনো জানি, নিশ্চিত হতে পারছি না। মনে হচ্ছে, শাকিল চৌধুরী আপনাকে খুন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আমার কথাকে সত্যি ভেবে নিন। প্লিজ!’ নীরবের কণ্ঠে আকুতি।
তানজিলা কয়েক মুহূর্ত ভাবে। টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে তানজিলার একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় সে। তানজিলা বলে— `আপনি যখন জোরালোভাবে বলছেন, তখন আমি সতর্ক থাকবো। ওকে ওয়াচ করবো। সন্দেহজনক কিছু দেখলে আমি যা করার করবো।’
নীরবের টেনশন একটু কমল। শাকিলকে নিয়ে সন্দেহ নেই তানজিলার। বরং তার প্রতি গভীর আস্থা আছে। তারপরও ওর কথা একেবারে উড়িয়ে না দেয়ায় আশ্বস্ত হলো নীরব। তানজিলা বিত্তবান পরিবারের মেয়ে। ও নিশ্চয় নিজেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা রাখে। নীরব বললো— `আমি যেখানেই থাকি, আপনি নিরাপদ থাকবেন, এই শুভ কামনা থাকবে আমার।’
`কোথাও যাচ্ছেন না-কি?’
`হুম।’
`কোথায় যাচ্ছেন?’
`এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। পঞ্চগড়ে নিজের গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।’
`কেনো?’ তানজিলা অবাক হয় নীরবের কথায়। অবাক হবারই কথা।
নীরব জবাবে বলে— `এই শহর আমার জীবন বিপন্ন করেছিল। এখন বিষিয়ে তুলেছে। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। তাই গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।’
`কিন্তু আমি বলেছিলাম, আপনি আমাদের কোম্পানিতে একটা ভালো পজিশনে চাকরি করুন।’ বলে তানজিলা।
তানজিলার জন্য মায়া অনুভব করে নীরব। ও বলে— `না, গ্রামে ফিরে গিয়ে কিছু করবো। না হয় চাষাবাদ করবো। শহর বড় নোংরা!’ কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নীরব।
তানজিলা বলে— `ঠিক আছে, আপনি নিজের গ্রাম ঘুরে আসুন। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকায় ফিরে আসুন। ঢাকায় ফিরে আমাকে ফোন দেবেন। আপনার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করবো আমি।’
`ধন্যবাদ, তানজিলা। তবে আমি ফিরছি না। এই শহর থেকে আমি পালাতে চাই। আবারো বলছি, আপনি নিরাপদে থাকবেন।’
`আচ্ছা, আগে গ্রামে যান। কিছুদিন থাকেন বাবা-মার সঙ্গে। এরপর আপনার সঙ্গে শহর ও চাকরি নিয়ে কথা হবে।’
`ঠিক আছে। আপনি ভালো থাকবেন।’
`আপনিও ভালো থাকবেন। বাই।’
`বাই।’
তানজিলা ফোন রেখে দিলো। নীরবের বুকের ভেতর থেকে সরে গেলো জমে থাকা আশঙ্কার কালো মেঘ। তানজিলা ওর কথা বিশ্বাস করুক, বা না করুক, অন্তত নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করবে। শাকিল চৌধুরী নিশ্চয় তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করবে, তানজিলা তাকে ওয়াচ করলে হয়তো অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাবে, মনে মনে ভাবে ও। বিছানায় রাখা হ্যান্ডলাগেজ তুলে নিয়ে হোটেলের কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়লো নীরব। হোটেলের কাউন্টারে গিয়ে রুমের চাবি এবং সেলফোনটা রেখে হোটেল ম্যানেজার হাবিবকে ও বললো— `এই সেলফোনটা শাকিল সাহেবকে দিয়ে দেবেন।’
হাবিব হাসিমুখে চাবি এবং সেলফোনটা নিয়ে বললো— `জি, আচ্ছা, স্যার।’
নীরব হোটেলের লবিতে আসতেই স্বর্ণার মুখোমুখি পড়ে গেলো। এ সময় স্বর্ণার আসার কথা নয়। ওকে দেখে অবাক হলো নীরব। নীরব ও স্বর্ণা মুখোমুখি থমকে দাঁড়িয়েছে। নীরবকে দেখে চোখ কপালে তুলে স্বর্ণা বিস্মিত কণ্ঠে বললো— `আপনি কোথায় যাচ্ছেন!’
`আপনি এই সাতসকালে এখানে!’ পাল্টা প্রশ্ন করলো নীরব।
স্বর্ণা বললো— `কাল থেকে আপনাকে ফোন করছি। নো রেসপন্স। একসময় দেখলাম আপনার ফোনও বন্ধ। আমার ফোন ধরছেন না কেনো?’
নীরব ইচ্ছে করে স্বর্ণার ফোন ধরেনি, এ কথা ওকে বলা যায় না। তানজিলাকে খুন করা হবে এবং এই খুনের দায়ভার ওর কাঁধে তুলে নিতে হবে, শাকিল চৌধুরীর এই পরিকল্পনা শোনার পর থেকে ও এতোটাই আপসেট হয়ে পড়ে যে, স্বর্ণার ফোন ওর কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছিল। তাই ও ফোন ধরেনি। একথা স্বর্ণাকে এখন বলা যাবে না। ও মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে বললো— `মন ভাল ছিল না। তাই ফোন ধরিনি। সরি।’
`এটা কোনো কথা হলো! আর আপনার হাতে লাগেজ কেনো? কোথায় যাচ্ছেন?’
`আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
`কোথায় যাচ্ছেন? কেনো?’
`নিজের গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।’
`ও, আচ্ছা। তাই বলে আমাকে কিছু না বলে এভাবে চলে যাচ্ছিলেন? আমি কি আপনার কাছ থেকে একটা ফোনকল পেতে পারতাম না? আমাকে এই সাতসকালে আপনার হোটেলে এসে জানতে হলো আপনি চলে যাচ্ছেন!’ স্বর্ণার কণ্ঠে বিস্ময় ও বেদনার মিশ্রণ।
নীরব ওর কথায় বিব্রতবোধ করে। এ কথার সঠিক জবাব ও দিতে পারবে না। স্বর্ণার কথায় ও লজ্জিত হয়। স্বর্ণা এমনভাবে কথাটা বললো যে, মনে হচ্ছে ওর ওপর অভিমান করার অধিকার জন্ম নিয়েছে। কথাটা ওর ফেরারি জীবনে বসন্তের পরশ বুলিয়ে দিলো। নীরবের এ মুহূর্তে মনে হলো, ওর ফেরারি জীবনে স্বর্ণা যেনো বসন্ত। স্বর্ণা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও নীরবের কাছ থেকে জবাব আশা করছে। নীরব অস্বস্তি নিয়ে বলে— `আপনার সঙ্গে গাড়ি আছে না?’
`আছে। কেনো?’
নীরব মুচকি হেসে বলে— `আমাকে বাস টার্মিনালে নামিয়ে দেবেন?’
`দেবো।’ নীরবের অনুরোধে স্বর্ণার ছোট্ট জবাব।
নীরব বলে— `চলুন, যেতে যেতে কথা বলব। কাল থেকে আপনার ফোন ধরিনি বলে রাগ করে থাকবেন না, প্লিজ।’
স্বর্ণাও চাচ্ছিল হোটেলের লবি থেকে বের হয়ে যেতে। লবিতে দাঁড়িয়ে কথা বললে হোটেলের স্টাফদের কৌতূহলী চোখ ওদের দিকে আটকে থাকবে। ও বললো— `ঠিক আছে চলুন। বাইরে আমার গাড়ি পার্ক করা আছে। গাড়িতে কথা বলবো।’
ওরা হোটেল থেকে বের হয়ে এলো। বাইরে সকালের ঝকঝকে রোদ। শহরের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে আগেই। স্বর্ণা ড্রাইভারকে গাড়ির ব্যাকডালা খুলতে বলে গাড়ির পেছনের আসনে গিয়ে বসলো। ড্রাইভার ব্যাকডালা খুলে দিলে নীরব ওর হ্যান্ডলাগেজ সেখানে রেখে দেয়। ও ব্যাকডালা লাগিয়ে গাড়ির পেছনে গিয়ে বসলো স্বর্ণার পাশে। এবার স্বর্ণা বললো— `কোথায় যাবেন?’
`গাবতলী। পঞ্চগড় যাবার বাস ধরতে চাই।’
`ড্রাইভার, গাবতলীর দিকে যাও।’ বলে স্বর্ণা।
কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি চলতে শুরু করে। বেশ কিছুক্ষণ স্বর্ণা চুপ থেকে বলে— `আমি ভীষণ ভীষণ অবাক হয়েছি আপনার আচরণে!’
এর জবাবে অপরাধীর মতো নীরব বলে— `আমি জানি, আমি যা করেছি, তা ঠিক করিনি। কিন্তু আমার মনের অবস্থার কথা জানলে আপনি আর রাগ করবেন না।’
এ কথায় স্বর্ণা নীরবের মুখের দিকে অনুসন্ধানী চোখে তাকায়। `আপনার মধ্যে কেমন অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছি। আপনার কী হয়েছে বলুন তো? হঠাৎ করে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন কেনো? আপনার বাবা-মা ভালো আছেন তো?’
স্বর্ণার এই ব্যাকুলতা ভালো লাগে নীরবের। ওকে নিয়ে এবং ওর বাবা-মাকে নিয়ে কেউ কখনো এমন ব্যাকুলতা দেখায়নি। ও বললো— `মানসিক চাপে আমি বিপর্যস্ত। তাই এই শহর ছেড়ে পালাচ্ছি।’
`পালাচ্ছেন মানে? কেনো?’ বিস্মিত হয় স্বর্ণা।
নীরবের মনে হলো, স্বর্ণার কাছে সব কথা খুলে বলা উচিত। ও সাংবাদিক। হয়তো তানজিলাকে শাকিল চৌধুরী যেনো খুন করতে না পারে, এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে। নীরব বলে— `আপনাকে সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি। কথাগুলো শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে।’
`আচ্ছা, বলুন।’
`আমাকে শাকিল চৌধুরী কারাগার থেকে বের করেছেন একটা শর্ত দিয়ে। শর্ত ছিল, আমি কোনো এক অপরাধের দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ফের কারাদণ্ড ভোগ করবো।’
`স্ট্রেঞ্জ! এমন শর্তের কথা কখনো শুনিনি!’
`প্রথমে এই শর্ত নিয়ে বিচলিত হইনি। ভেবেছিলাম, নাবিলার খুনি কে, তা জানা হলে ফের না হয় কারাগারে ফিরে যাবো। মন্দ কী? এই চিন্তা থেকে রাজি হয়েছিলাম শাকিল চৌধুরীর প্রস্তাবে।’ এ পর্যন্ত বলে থেমে যায় নীরব।
উদগ্রীব হয়ে স্বর্ণা বলে— `এরপর কী হলো, বলুন!’
`কাল শাকিল চৌধুরী আমাকে জানান, কোনো একদিন তার স্ত্রী তানজিলা খুন হবে এবং আমাকে ওই খুনের দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। আই মিন, আমি তানজিলাকে খুন করেছি, এ কথা স্বীকার করতে হবে।’
`ও মাই গড! বলেন কী! এ তো ভয়ঙ্কর ঘটনা!’
`হ্যাঁ, ভয়ঙ্কর তো বটেই। এখন বুঝুন, আমার মনের অবস্থা কেমন হতে পারে।’
`আপনি কি শাকিল চৌধুরীর কথায় রাজি হয়েছেন?’
`রাজি হইনি— এমন কথা বলিনি। কিন্তু এ কাজ আমি করতে পারবো না। কিছুতেই না। তাই তো শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
কথা শুনে স্বর্ণা চুপসে গেলো। বিস্ময়ে ও থ’ বনে গেছে। ও মনে মনে ভাবে, এও কি বিশ্বাসযোগ্য? নিজের স্ত্রীকে খুন করতে চাইছেন কেনো শাকিল চৌধুরী, এটা ওর বোধগম্য হচ্ছে না। তবে শাকিল চৌধুরী যে ভীষণ চালাক-চতুর শ্রেণির লোক, এটা বোঝা যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নিজ স্ত্রীকে খুন করতে চাচ্ছেন এবং নিজেকে আইনের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে নীরবকে ফাঁসাতে চাচ্ছেন। চতুরতায় পরিপূর্ণ তার পরিকল্পনা। স্বর্ণা এ কথা ভেবে নীরবের উদ্দেশে বললো— `আপনি তানজিলাকে এ কথা বলে দিলেই পারেন।’
`কিছুক্ষণ আগে তাকে এ কথা বলেছি। কিন্তু সে আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না।’
`হুম। বিশ্বাস করার মতো কথা নয়। কিন্তু সে যদি খুন হয়েই যায়?’
`আমিও এ কথা ভাবছি।’
`ভাবলে এভাবে পালাচ্ছেন কেনো?’
`আমি কী করতে পারি? এমনিতেই আমি প্রতিশ্রুতি ভাঙছি। শাকিল চৌধুরী শর্ত দিয়ে আমাকে জেল থেকে বের করেছেন। শর্ত না মেনে পালিয়ে যাচ্ছি। এরও তো গ্লানি আছে।’
`শুনুন। আপনি খুন না করেও খুনের সাজা পেয়েছেন। এই অন্যায়ের জন্য দায়ী কে? এর জন্য দায়ী আইন-আদালত, পুলিশসহ আমরা অনেকে। এর জন্য আমরা কি গ্লানিতে ভুগছি? আপনি কেনো গ্লানিতে ভুগবেন? যে শর্ত আরেকটি অন্যায়ের জন্ম দেয়, সে শর্ত না মানা কোনো অপরাধ নয়। বরং আপনি সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ করেছেন। এখন আরেকটি কাজ আপনার করা উচিত।’
`কী কাজ করা উচিত?’
`শাকিল চৌধুরীকে আইনের হাতে সোপর্দ করা উচিত।’
`বলো কী! কিভাবে করবো? পুলিশকে এসব কথা বললে আমার কথা বিশ্বাস করবে না। আমার কাছে কোনো প্রমাণও নেই। উল্টো আমি ঝামেলায় পড়বো। শাকিল চৌধুরী তখন আমাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করবেন। আমি তার সঙ্গে পারবো না।’
`পুলিশকে কিছু বলতে বলছি না। আগে প্রমাণ সংগ্রহ করুন। পরে কী করতে হবে আমি করবো।’
`ঠিক বুঝলাম না।’
`আমি বলতে চাচ্ছি, আপনি শাকিল চৌধুরীর পরিকল্পনামতো কাজ করতে থাকুন। এখন থেকে তার কথা টেপ বা গোপন ক্যামেরায় ভিডিও করবেন। ঠিক খুন হবার আগে আমরা পুলিশ নিয়ে শাকিল চৌধুরী এবং খুনিদের গ্রেফতার করতে পারি।’
`কী বলছেন! এসব কেনো করবো বলুন তো?’ ভীতুর মতো জানতে চায় নীরব।
স্বর্ণা বলে— `করবেন এমন অন্যায় হতে দেয়া যায় না বলে।’
`আমার কি এতো শক্তি আছে? ওরা সব ধনী ও প্রভাবশালী। ওদের সঙ্গে আমি পেরে উঠবো না। ওরা আমাকে ভ্যানিশ করে ফেলবে। আপনি জানেন, শাকিল চৌধুরী তিনজন পেশাদার খুনিকে ভাড়া করেছে? তারা আমাকেও এক ঝটকায় খুন করে ফেলতে পারে!’
নীরবের কথায় চিন্তিত হয় স্বর্ণা। ও কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ভাবে। এরপর বলে— `আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি একবার। বরং খুনের মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। এ কথা মনে আছে তো?’
`হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেনো?’
`তা হলে আপনার নতুন করে আর ভয় কী?’
`মানে?’
`মানে, এবার প্রতিরোধ করুন। খুনিদের ঠেকান।’
`এতে ঝুঁকি আছে। আমি কেনো ঝুঁকি নেবো?’
`ঝুঁকি নেবেন একজনের জীবন বাঁচাতে। এটা করা উচিত। নাবিলার কথা ভাবুন। ওকেও পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। আমরা যদি কোনো কিছু না করি, তা হলে হয়তো তানজিলাও খুন হয়ে যাবে। এ কথা জানার পর আমরা তা হতে দিতে পারি না।’
এ কথায় গভীর চিন্তায় পড়ে যায় নীরব। ও বলে— `আপনার কথা ঠিক। কিন্তু…’
`কোনো কিন্তু নয়। লড়াই করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। ভীতুর মতো জীবনযাপন করে কিছু পাবেন না। সাহসী হন, কিছু পাবেন। অন্তত সাহস করে লড়াই করার মর্যাদা তো পাবেন।’
স্বর্ণার কথায় নীরবের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ভয়ের কুয়াশা কেটে যেতে থাকে যেনো। স্বর্ণা কি ওকে সাহসী করে তুলছে? ও নিজের মধ্যে কেমন অনুপ্রাণিত হয়। ও স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বলে— `আপনি আজ আমাকে ভীষণরকম চাঙ্গা করে দিচ্ছেন। আমার মতো একজন সব হারানো লোককে খেপিয়ে তুলছেন কেনো? আমার জীবন আর আপনাদের জীবন এক নয়।’
ওর কথা শুনে স্বর্ণা মিটিমিটি হাসতে থাকে। নীরব বুঝতে পারে না, স্বর্ণা এ কথায় কেনো হাসছে। তবে স্বর্ণার হাসির মাধুর্যে ওর ভেতরে অস্থিরতা মিলিয়ে যায়। ও তাকিয়ে থাকে স্বর্ণার মুখের দিকে। স্বর্ণা চোখে কৌতূহল ফুটিয়ে বললো— `এবার তানজিলার প্রসঙ্গ রেখে আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে। করবো?’
স্বর্ণা প্রসঙ্গ বদলাতে চাইছে। মন্দ নয়, ভাবে নীরব। ও বলে— `করুন। কী প্রশ্ন?’
`নিজের জীবন সম্পর্কে কী ভেবেছেন ?’
এমন প্রশ্ন স্বর্ণা ওকে আগেও করেছে। স্বর্ণা আসলে এ ধরনের প্রশ্ন করে জীবন সম্পর্কে ওকে সচেতন করতে চায়। নীরব এর জবাবে ভাবালুতা প্রকাশ করে বলে— `আমার ভাবনার কিছু নেই। কী ভাববো, বলুন, আমার জীবন কি আর জীবন আছে? একটা ক্ষয়ে যাওয়া জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি।’
`ক্ষয়ে যাওয়া জীবন মানে?’
`ক্ষয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবন আমার। আমার কথা বুঝতে পারছেন না?’
`কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি আপনার ধারণার সঙ্গে একমত নই।’
`যেমন?’
`যেমন, আপনি ভাবছেন আপনার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে, আমি কথাটি মেনে নিতে পারছি না। আপনার জীবনে বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা সত্যি যে, আপনি অনেক অ-নে-ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আপনি বিপন্ন। তারপরও বলবো, আপনার জীবন নষ্ট হয়ে যায়নি। আপনি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আপনার ঘুরে দাঁড়ানো উচিত।’
`ঘুরে দাঁড়াবো, কিভাবে? কার জন্য? কী পাবো?’
`একসঙ্গে তিন প্রশ্ন। জবাব দিচ্ছি। ঘুরে দাঁড়াবেন নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য। ঘুরে দাঁড়াবেন নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ে, অ্যাম্বিশন নিয়ে, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে। নিজের ভেতর নিজেকে মিইয়ে রাখলে হবে না। দ্রোহ নিয়ে জেগে উঠুন। আর বলছিলেন, কী পাবেন? আপনার কাছেই প্রশ্ন করি, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার আনন্দ কি নেই? জীবনের মহত্ত্ব কি নেই? মাধুর্য নেই?’
`আছে। কিন্তু জীবন নিয়ে আমার আকর্ষণ নেই।’
`বিহ্বলতা, অনুরাগ, দুঃখতাপ, অনুযোগ-অভিযোগ, অভিলাষ ইত্যাদি নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে। আপনিও এভাবে জীবনকে উপভোগ করবেন।’
`কিন্তু আমার জীবন তো সে রকম নয়। লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া এক জীবন। এ কথা তো আপনি জানেন।’
`পৃথিবীতে অনেক কিছুই তো লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মানুষই ফের ঘুরে দাঁড়ায়। আপনি কেনো হতাশার তলিয়ে যাবেন? হতাশায় ডুবে গেলেই বা আপনি কী পাবেন?’
`আপনার কথাগুলো ঠিক, তা আমি জানি। তারপরও আমার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। আমি যে নিজের মধ্যে মিইয়ে গেছি।’
`আসলে আপনার ভেতরে আপনি ঘুমিয়ে গেছেন। এই ঘুমন্ত সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। জেগে উঠতে হবে আপনার নিজেকেই।’
`এবার আপনি বলুন তো, জীবন সম্পর্কে আমার কেনো আকর্ষণ নেই? কেনো এমন হলো?’
`আপনি স্বপ্নহীন এবং লক্ষ্যহীন হয়ে আছেন। বিনা অপরাধে কারাদণ্ডের আঘাত আপনাকে স্বপ্নহীন-লক্ষ্যহীন করেছে। জীবন নিয়ে আপাতত আকর্ষণ নেই, তাই বলে আকর্ষণ একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি। আই বিলিভ, আপনার মধ্যে জীবন, আই মিন বেঁচে থাকার আকর্ষণ ফিরে আসবে।’
`আপনি কি হিউম্যান সাইকোলজি পড়েছেন?’
এ কথায় স্বর্ণা মিষ্টি করে হাসলো। `কেনো জানতে চাচ্ছেন যে, আমি হিউম্যান সাইকোলজি পড়েছি কি-না।’
`আপনার কথায় তা-ই মনে হলো। জীবন সম্পর্কে যেভাবে কথা বলেন, তাতে এমন মনে হতেই পারে।’
`আমি এমবিএ করেছি। গণিত নিয়ে আমার কাজ। তবে হিউম্যান সাইকোলজি সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বই পড়তে হয় না। জীবনের দিকে গভীর পর্যবেক্ষণ করলে হিউম্যান সাইকোলজির সব কিছু দেখতে পাবেন। বলতেও পারবেন।’
নীরবের মনে হলো, নাবিলার খুনি কে বা কারা এ নিয়ে স্বর্ণা কোনো আলোচনা করছে না। অথচ নাবিলার খুনি শনাক্তকরণের বিষয়টি ওদের দুজনের কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একথা মনে হতেই নীরব বললো— `আচ্ছা, নাবিলার খুনির ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি?’
এ প্রশ্ন শুনে স্বর্ণার মুখে উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠলো। ও মুখে হাসি বিস্তৃত করে বললো— `আমি আশা করছিলাম, আপনি এ ব্যাপারে কিছু জানতে চাইবেন। জানতে চাওয়ায় খুশি হলাম।’
`যাক, পরীক্ষা অনেক নিচ্ছেন। এবার বলুন, এর অগ্রগতি কী?’
`আপনাকে খুঁজছিলাম তো এর অগ্রগতি জানানোর জন্য। কিন্তু আপনাকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে অস্থির হয়ে সকালে নিজেই চলে এলাম আপনার হোটেলে। আপনাকে তো আসল কথা এখনো বলা হয়নি।’
`কী সে কথা বলুন। আমরা আরেকটি সম্ভাব্য খুনের বিষয় নিয়ে মেতে আছি। অথচ নাবিলার খুনিদের সম্পর্কে কোনা আলোচনা করিনি। বলুন, কী আপডেট আছে।’
`আপডেট হচ্ছে, আমরা নিশ্চিত হয়েছি, নাবিলাকে শামীম এবং মাহাবুব পরিকল্পিতভাবে খুন করেছে। ওরা পেশাদার খুনিদের দ্বারা নাবিলাকে খুন করেছিল।’
`কিভাবে জানলেন?’
`নাবিলাকে ফোন করে গুলশানের রেস্ট হাউসে নিয়ে গিয়েছিল শামীম। এর টেলিফোন রেকর্ড আমরা উদ্ধার করেছি। আমার ফুপা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার নির্দেশে কাল রাতে শামীমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।’
`কী বলছেন! এতো বড় একটা সংবাদ এতো পরে বললেন?’ চেঁচিয়ে ওঠে নীরব।
স্বর্ণা বলে— `বলার সুযোগ পেলাম কখন?’
`তারপর বলুন, শামীম কি মুখ খুলেছে?’
`হুম। সে-ই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, নাবিলাকে সে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করেছে। এই খুনের পেছনে মাহাবুবও জড়িত— এ কথাও সে বলেছে।’
`হাউ স্ট্রেঞ্জ!’
`পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এই মামলা নতুন করে উঠবে আদালতে। কাল আমার পত্রিকায় একটি বিশেষ রিপোর্টও ছাপা হবে এই খুন নিয়ে। আপনার সাক্ষাৎকারও ছাপা হচ্ছে।’
স্বর্ণার কথায় নীরব স্তম্ভিত হয়ে যায়। ওর ঠোঁট তিরতির করে কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরে কান্নার অজস্র ঢেউ উথাল-পাতাল করে ওঠে। ও কিছু বলতে পারে না। স্বর্ণা বলে— `নাবিলার প্রকৃত খুনিকে ধরতে পেরে আমি ও আমার পুরো পরিবার আনন্দিত। নিশ্চয় আপনিও আনন্দিত?’
`আমার খুব ভালো লাগছে। এ কথা শোনার পর কী বলবো? কিছু বলতে পারছি না। এখন মনে হচ্ছে, এই শহর বিষাক্ত হয়ে যায়নি। এইমুহূর্তে মনে হচ্ছে, শহর ছাড়া ঠিক হচ্ছে না। গ্রামে পরে গেলেও হবে। কী বলেন?’
স্বর্ণা নীরবের কথার জবাব না দিয়ে ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো— `ড্রাইভার, গাবতলী নয়, পঞ্চগড় চলুন।’
নীরব অবাক হলো। আজ ওর অবাক হবার পালা চলছে। একদিনে ঘটনার এতো বাঁক, দৃশ্যপটের এতো পরিবর্তনের জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। ও অবাক চোখ তুলে বললো— `গাড়ি পঞ্চগড় যাবে মানে?’
স্বর্ণা ঘোষণা করছে, এমনভাবে বললো— `আপনি আজ আপনাদের বাড়ি যাবেন। আমিও আপনার সঙ্গে যাবো। পঞ্চগড়ে একদিন থেকে কাল ঢাকায় ফিরবো আমরা।’
`কী বলছেন আপনি! আপনি যাবেন আমাদের বাড়িতে! আমার সঙ্গে!’
`কেনো, সঙ্গে নিতে আপত্তি আছে?’
`না। আপত্তি থাকবে কেনো?’
`তা হলে?’
`না, ভাবছি, মা-বাবাকে আপনার কথা কী বলবো? কী পরিচয় দেবো?’
নীরবের এ কথায় স্বর্ণার মুখে গোধূলি বেলার রক্তিমাভা ফুটে ওঠে। ওর দৃষ্টিতে কেমন গভীর রেখাপাত সৃষ্টি হয়। এই দৃষ্টি নীরবের দৃষ্টিতে রেখে গাঢ় ও নিচু কণ্ঠে বলে— `এমন পরিচয় দেবেন, যাতে আমি অসম্মানিত না হই।’
কথা নয়, যেনো পাহাড় ভেঙে এক খরস্রোতা নদী ধেই ধেই করে নেমে এলো। এই নদীর স্রোতে ভেসে যেতে যেতে নরম কণ্ঠে নীরব বললো— `কী পরিচয় দিলে আপনার সম্মান বাড়বে?’
`সেটিও বলে দিতে হবে? আপনি বুঝতে পারেন না, শহর থেকে একটি মেয়েকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে মা-বাবাকে কী বললে তারা খুশি হবেন?’
এ কথায় থ’ হয়ে যায় নীরব। যে অবগুণ্ঠন ও খুলতে চায়, আবার অজানা ভয়ে খুলতে চায়ও না, সেই অবগুণ্ঠন স্বর্ণা খুলে দিচ্ছে। নীরব চুপ মেরে যায়। তিন দিন আগে সাহস করে যে কথাটা স্বর্ণাকে বলে ফেলেছিল, সে কথার জবাব যেনো আজ পেলো স্বর্ণার কাছ থেকে। জবাবটা মধুর ও স্বপ্নপ্রবণ; কিন্তু নীরব কি এমন স্বপ্নের চিত্রনাট্যের বরপুত্র হতে পারবে? ওর মনে আশঙ্কার কুহেলিকা পেখম ছড়ায়। এ মুহূর্তে কী বলবে, ঠিক করতে পারে না। ও হাঁ করে তাকিয়ে থাকে স্বর্ণার মুখের দিকে। স্বর্ণার কণ্ঠ ফের রিনরিনিয়ে ওঠে— `আমার পুরো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলেন না?’
ঘোরলাগা কণ্ঠে নীরব বলে— `হ্যাঁ।’
স্বর্ণা দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে বলে— `তা হলে জড়িয়ে নিন।’
নীরবের বুকের ভেতরটা ধ্রুম ধ্রুম বাজতে থাকে। পাহাড়ভাঙা নদী আলিঙ্গনে ওকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। ও বুকের সবটুকু সাহস এক করে স্বর্ণার দুহাতের মুঠো নিজের মুঠোবন্দি করে। এক অপার্থিব স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ে ওর অনুভূতিতে। ফেরারি বসন্তটা ওকে কেমন আচ্ছন্ন করে দেয়। এই আচ্ছন্নতায় বিভোর হয়ে স্বর্ণার কোমল দুটি হাত নিজের হাতে তুলে নেয় নীরব। স্বর্ণার হাত দুটিও যেনো ওর হাতের মুঠোয় আশ্রয় খুঁজে পায়। হাতেরও এক ধরনের ভাষা আছে যেনো। স্বর্ণার হাত যেনো ওর হাতকে বলছে— `আমাকে আজীবন ধরে রাখো।’
স্বর্ণার হাতের কথাটা ওর অনুভবে ছড়িয়ে যেতেই পাহাড়ভাঙা নদীটা ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো তুমুল স্রোতে। স্বর্ণার চোখের কোণেও ওই নদী টলমল করে গড়িয়ে নামে। আশ্চর্য রকম বসন্ত!