- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
১. দ্বিতীয় সত্ত্বা
ইচ্ছে করলেই আমার দ্বিতীয় সত্ত্বা
ভৈরবী রাগের মূর্ছনার মত নদীর গহীনে উল্টোমুখি
প্রবাহ হতে পারে আকাশের সর্বত্র রঙধনু
হবার প্রতিশ্রুতি রেখে। প্রথম সত্ত্বা তো
সেই কবে থেকেই মোহগ্রস্থ জীবনের
সোনার খাঁচায় বন্দি! জানো তো, মেঘের শরীরে
আকুলতা রেখে একটি স্বপ্ন দুর্বিনীত হয়েছিল
একদিন, তোমাকে ছুঁয়ে দিতে জীবনের
সঙ্গে করতে চেয়েছিল সন্ধি। জীবন বলেছিল, আকাশের
যেমন অস্থিত্ব নেই অথচ দৃশ্যমানের প্রহসন
আছে, তেমনি তুমিও কেবল স্বপ্নের চৌহদ্দিতে এক
রাজকন্যার আখ্যান। যাকে ভালবাসা যায়,
ভালবেসে ধরে রাখা যায় না। সেই থেকে প্রথম
সত্ত্বা স্বপ্ন ছেড়ে হয়েছিল জীবনের দাস, আর
মিহিন কষ্টের শ্বাসের নামকরণ হয়েছিল দীর্ঘশ্বাস!
দ্বিতীয় সত্ত্বাটা কবিতার শিল্প সুষমা হতে পারে
বলে ও যখন-তখন আকাশ ছোঁয়, নদীর
স্বরলিপি জেনে কণ্ঠ মেলায় জলতরঙ্গে বা তোমাকে
এক লহমায় বুকে টেনে নেয় নিজস্ব অধিকারে।
জীবনের ভার টেনে চলা প্রথম সত্ত্বা
অবাক চোখে দেখে ক্ষণজন্মা দ্বিতীয় সত্ত্বার
জয়রথ। আর কী আশ্চার্য, সত্যি হবে না জেনেও প্রথম
সত্ত্বা সঙ্গোপনে খোঁজে দ্বিতীয় সত্ত্বার পথ!
২. আহবান
প্রেম ও অপ্রেমের অচল কাব্য ফেলে, এসো,
সচল গদ্যের নান্দনিক নির্মাণে। চোখের কোণে
জমে থাকা শিল্পিত জলে ভিজিয়ে দাও
হৃদয়ে আঁকা অস্পষ্ট মুখ। সৃষ্টিশীল হোক
দেয়ার দাম্ভিক গর্জন, বৃষ্টির রং, রুদ্রালী
খুনসুটি বা দমকা হাওয়ার মাতম..!
৩. অনুরোধ
শুধু একবার ফিরে তাকাও, দেখতে পাবে
শ্রাবণভেজা এক মুখ, অনুচ্চারিত বেদনায় ভাষামূক!
অর্ঘ্যরে ফুল দলে হয়ো না পাষাণ পথিক।
জানি, সব কথা হয়ে গেছে- অভিমানী মেঘ, স্বপ্নেরা
উড়ে গেছে সীমারেখা ভেঙে। তারপরও অনুরোধ,
শুধু একবার ফিরে তাকাও। দেখে নাও,
রংধনুর আভায় কতটা শিল্পময় হয় মেঘলা
আকাশ। সামনে একাকী যতই যাবে, স্মৃতির আকাশ
কীভাবে তাড়াবে? তুমি কি নিজে আকাশ হয়ে
আমার জন্য একটু দাঁড়াবে?
৪. ছায়া
কবিতা নদীর মত এঁকে-বেঁকে চলে যাবে-আর আমি
সূয্যমুখি ফুলের মত উদাসীন থেকে একটা জল-জোছনার
আখ্যান হবো, এমন ভাবনার বৃত্তে আমার ঘুরপাক। ভাবনার
কর্নিশে কখনও শরত শিশির, কখনও রোদমাখা
কুয়াশা, আবার কখনও বিলম্বিত রাগের নিমগ্নতা। মগ্ন
হবার নেপথ্যেও এক ছায়ার অপার্থিব মায়া জড়ানো।
ছায়াটা কূড়ি হয়েই সুখি, কখনও হয়নি
স্বপ্নমুখি। স্বপ্নজাল কেবল আমিই গিয়েছি বুনে, সঠিক
সংখ্যা কখনও হবে না জানা, জেনেও আকাশের
নক্ষত্র গিয়েছে গুনে। নক্ষত্রের যত আলো, আকাশের
রঙ জমকালো, দু’হাত বাড়িয়ে ধরি বারবার।
আর তখুনি কবিতা নদী না হয়ে দহনে করে ছারখার।
ছায়া তুমি আরশী হও, আমার গোপন দুঃখ লও।
৫. তুমি ও ঈশ্বরের ধ্যান
তুমি বললে, ভোর প্রার্থনার পবিত্রতা, সকাল
হচ্ছে খোলা জানালা। দুপুর ভরাট সৌন্দর্য, বিকেল
কবির শিল্পসত্ত্বার অনুভব, আর সন্ধ্যা স্বর্গের প্রচ্ছদ। আরো
বললে, রাত জলপরীদের খুনসুটি, মধ্যরাত ঈশ্বরের ধ্যান!
এ কথা বলে তুমি রংধনুকে রং পেন্সিল বানিয়ে
এঁকে দিলে দিবস-রজনীর বর্ণিল এক ছবি।
তোমাকে ভালবেসে আমি পবিত্রতা মুঠোবন্দি করে
খোলা জানালা গলে সৌন্দর্যের লাবণ্য সরাই।
এরপর শিল্পসত্ত্বার অনুভব আত্মস্থ করে স্বর্গের প্রচ্ছদে
রাখি ব্যক্তিগত বিহবলতা। এক সময় জলপরীদের
সহচর্য ফেলে ঈশ্বরের ধ্যান ভাঙতে গিয়ে
দেখি, ঈশ্বর তোমাকে নিয়েই ধ্যানমগ্ন!
এই ধ্যান কী করে ভাঙি, বলো তো?
৬. অসমাপ্ত গল্প
বসন্ত পালক গায়ে ঝুলিয়ে অসমাপ্ত গল্পটা
হঠাৎ হাজির। কুশল বিনিময়ের ছলে
ও বলতে চাইলো-একটা দীর্ঘশ্বাস কীভাবে
কবিতা হয়েছিল, বন্ধ্যা নদী কীভাবে আগ্নেয়গিরি
হয়ে জ্বলেছিল। গল্পটার প্রচ্ছদে হিমালয়ের
বরফ-অহম আর গ্রীষ্মের করোজ্জ্বল
রোদের দীপ্তি লেপ্টে একাকার! গল্পটার
কখনও সমাপ্তি হয়নি বলে ওর কোন অভিমান
নেই। বরং অসমাপ্ত থাকার এক ধরনের
শিল্পদ্যোতনা ওর মধ্যে সপ্রতিভ।
আমিও গল্পটাকে একটা সীমারেখায়
সূর্যমুখি করে দিতে বললাম-এসো জীবনের
গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে নিই তোমার আখ্যান।
গল্প বলে-বিরহে যার পূর্ণতা, মিলনে
পাবে সে কি পরিত্রাণ?
৭. আমার শুধু অভিমান
আমার তো কিছুই নেই, আছে
শুধু অভিমান! এই অভিমানেরও অনেক
বিভাস, নানা রঙ, বুনো গন্ধ।
অভিমান জানে ঢং! মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা প্রেম
বা কেতাবি বিরহে ছড়াতে পারে দ্বন্দ্ব।
আমার দু’হাত রিক্ত বলে কবিতাগুলো
রইল ডুবে চোখের জলে! জলের
ছায়ায় অভিমান কেবল পেখম ছড়ায়। সুবাস
মাখা আমার যে কথাটি আজো পৌঁছেনি
তোমার কানে, সে কথাটাই বুকের
ভেতর ভীষণ কাতর-পাথুরে এক অভিমানে!
স্বপ্নের অনুরণনে কেঁপে ওঠা কিছু সময়
স্মৃতির ক্যানভাসে অন্তত ধূসর প্রচ্ছদ
হবে-এমনটাই ভেবেছিলাম। এখানেও
অভিমানের কালো মেঘ জমাট
বেঁধে তাড়িয়েছে হৃদয়ের বৃষ্টিপাত।
যে পথে তোমার যাওয়া-আসা ছিল, সে
পথে রেখে এসেছি কত রোদেলা
সকালের আখ্যান, গনগনে দুপুরের নিঃশব্দের
বুনন, কাব্য বিলাসী বিকেলের মাদকতা!
ভেবেছিলাম, তোমার শরীরের এক
ফোঁটা সুগন্ধ হাওয়ায় ভেসে এসে আমাকে
নিয়ে যাবে অন্য কল্পলোকে। এখানেও
অভিমান এসে আমাকে বানিয়েছে
নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিষন্ন পথিক।
তোমার আসা-যাওয়ার পথে কখনও চোখ
তুলে দেখেনি তোমার দু’চোখে
চিকচিক করেছিল কিনা কোন আকুলতা।
কে জানে, কোথায় গিয়ে আছড়ে
পড়েছে না বলা কথার গান, আমার বুকে,
মুঠোয়-চোখে-মুখে লেপ্টে আছে অভিমান!
৮. পাহাড়ের কষ্ট
গড়ানো পাথরের কষ্ট কি, পাহাড় ভালো জানে। নুড়ির
একাকী পড়ে থাকার অভিমান ভেসে যায় ঝর্ণার
জল তানে। আকাশ নেমে আসবে ভেবে, পাহাড় আকাশ
মুখি! মিলনের যোগসূত্র নেই, পাহাড়ও জনম দুঃখি।
আমিও গড়াতে গড়াতে অনেক এসেছি নেমে, ক্লান্ত-বিরষ
হলেও কখনো যাইনি থেমে।তুমি কেবল ছুটেছো হেসে
স্বপ্নরথে চড়ে, সব সুন্দর করেছে তোমায় কুর্নিশ,
আমার সব যেন গেছে সরে! মেঘপাখি, রোদের জৌলুস,
জোছনার লাবণ্য বা অন্ধকারের দ্যুতি-তোমার দু’ পায়ের কাছে
কেবল লুটোপুটি! আমি নীলবিষে লখিন্দর হয়ে, পাথরের
মত কালান্তরে গিয়েছি ক্ষয়ে, অবহেলার কষ্ট সহে-সহে!
৯. তুমি-আমি
আমি বারবার অরণ্যে হারাই, নির্জনতায়
ডুবে থাকি। তুমি সুনীল আকাশে উড্ডীন গন্তব্য
জানা পাখি। তুমি সমুদ্র বিলাসী, তোমাকে
আহলাদে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উত্তাল জলরাশি। আমি
রোদের তীর্যকে পোড় খাওয়া বালুকণা, স্বপ্ন-বিমুখ
বিষাদে আনমনা। তুমি নিঃসঙ্কোচে হাত বাড়িয়ে
নাও জৌলুষের কলতান, আমি ম্রিয়মান-চাপা অভিমান!
জানি, তোমার উচ্ছ্বাস নিয়ে আনন্দের অতিশয্যে
রঙধনু হয় বাঁকা, অন্ধকারের স্বরলিপি নিয়ে
আমার নিভৃতে পড়ে থাকা। তুমি আছো ঠিক, তোমারই
মত। আমি সামলে নিয়েছি সব হারানোর ক্ষত!
১০. কোথায় কাজল চোখ
তোমার চোখে ছিল সমুদ্র জল, ছলকে উঠার
আবেগ-অতল। রাগ ছিল বা অভিমানও, কাব্যিকতা-মধুর গানও।
কী ছিল না চোখের ভাষায়? বাঁধতো আমায় আলো-আশায়,
তোমার চোখে দু’চোখ রেখে বিভোর হতাম বিহবলতায়
স্বপ্ন রঙে লিখে যেতাম অনুভবের খেরো খাতায়। রামধনু এক
ছিল বটে, নানা রঙের বর্ণিলতা ইচ্ছে মত নিতাম লুটে!
সেই চোখে আজ কীসের ছায়া! কোথায় গেল
শাসন-মায়া? জল দেখিনা, রঙ যে উধাও, এমন
কেন চোখ! আমিও তো চেয়েছিলাস জীবন সুখের
হোক। তোমার চোখের ভাষা কোথায়, কেন পাথর
শোক? ঝর্ণা ধারার ছন্দ কোথায়, কোথায় কাজল চোখ?
১১. গল্প
হাওয়ার শরীরে যে গল্পটা লেখা হয়নি, সেটাই
আমার অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস। নদীর স্রোতে যে পাপড়ি
ভেসে যায়নি, সেটাই আমার কণ্ঠ অব্দি আটকে
থাকা কথার ফুল। যে কুয়াশা জমে যাবার আকাঙ্খা ফেলে
রোদের পেয়ালায় সমর্পণের কবিতা লিখে, সেটাই
আমার স্বপ্নকে টেনে নিয়ে মিশিয়ে দেয় রঙধনুর ক্ষণস্থায়ী
সৌন্দর্যে। যে নিশুতি রাত কখনও একা হতে
পারেনি নিজের মুখোমুখি, সে রাতই আমাকে দিয়েছে
একা থাকার আশীর্বাদ। যে কাব্যানুভূতি কবিতা
হতে পারেনি, অথচ অনুভবে শিল্পময়-সেটাই আমার
কানে কানে জীবন বোধের গল্প কয়।
১২. কথাগুলো
কথাগুলো ওখানেই থাক, মনের গহীনে
নিঃসঙ্গ দুপুরের মত! কথাগুলো সুরভী ছড়াক
জুঁই-শিউলী-কাঁঠালচাঁপার মৌতাত যত।
কথাগুলো শিশির ঝরাক শরতের
ভোরে, গ্রীষ্মকে লন্ডভন্ড করে দিক বৃষ্টিঘোরে।
কথাগুলো হোক ঝাঁঝালো রোদ, নায়াগ্রার
জল, শৈল্পিক মৌনতা, তুমুল কোলাহল
বা প্রবঞ্চনায়ও ক্ষমা করে দেয়ার মহত্বের বোধ।
কথাগুলো ওভাবেই আছে বেশ,
না ফোঁটা কূড়ি। আবেগের দমকা হাওয়ায়
দুদ্দার উড়ুক মনের ঘুড়ি। কথাগুলো
অপ্রকাশে যদি বহতা নদী, তোমার হৃদয়ে
পৌঁছুবে বলে যাক না বয়ে নিরবধি।
কথাগুলো যেভাবে আছে, ওভাবেই থাক।
জানো তো, কথা পাথর হলেও থাকে না নির্বাক!
১৩. আমি-তুমি-২
মাথার ওপর আকাশটা যে ঝলমলে, চোখের
কোণে যে জল ছিল টলমলে, জলের ছায়ায় হঠাৎ
দেখি তোমার মুখ। স্বপ্ন চোখে মুখ দেখারও
আছে সুখ। মুখটা অনেক কথা জানে,
বিধি-নিষেধ সবটা মানে, কী জাদু যে আমায় টানে!
মুখটা লাজুক হাত বাড়ালে, খুব অভিমান
না দাঁড়ালে, মাঝে মাঝে মুখটা হাজির
পথে যেতে পথ হারালে। কখনও বা ডাকি যদি
জল গড়িয়ে হয় তা নদী, নদীর বুকে কান পাতি যেই
স্রোত নামেনি অদ্যাবদি। নদী ছেড়ে আকাশ ধরি,
আবার মায়ার ফাঁদে পড়ি, নিজের ভেতর নদী-আকাশ
ইচ্ছে মত ভাঙি-গড়ি। ভাঙা-গড়ার নিত্য খেলা,
জীবনটা এক রঙিন মেলা, তুমি যত বর্ণময়ী,
আমি ধূলোয় পড়ে থাকা নিতান্ত এক অবহেলা।
১৪. হতে পারে
হতে পারে আমি শহুরে কোন গান, তুমি
নির্জলা এক গ্রাম। তুমি পথের ধারে
দাঁড়িয়ে থাকা বনফুল, আমি নাগরিক কোলাহল,
বিশ্বায়নের হুলোস্থূল! হতে পারে তুমি
লিওনার্দোর মোনালিসা, জুলিয়েট, মমতাজ বা
নাম না জানা সাধারণ কেউ। কে খবর রাখে
বলো সৈকতে কতটা আছড়ে পড়লো
সাগরের ঢেউ? হতে পারে আমি অরণ্যের
নির্জনতা, কক্ষপথের আলোছায়া বা সাদামাটা
জীবনের আখ্যান। স্বপ্ন উড়ুক, স্বপ্ন পুড়ুক!
স্বপ্ন ভাঙার গানে কেন কবিতা হবে ম্লান?
হতে পারে আমি ভাসাতে পারি খুব, তুমি
বরাবর নিশ্চুপ। হতে পারে আমি
পাখিদের ভাষা জানি, তুমি অপ্সরা বা রাজ্যবিহীন
রাণী। হতে পারে তুমি কিতাবী কথামালা,
নিয়ম-শৃঙ্খলা,আমি নিয়ম ভাঙার দুরন্ত অভিলাষ।
হতে পারে তোমার হৃদয়ে আমার বসবাস।
হতে পারে তুমি ফেলে আসা পথ, গন্তব্য নাহয় ভিন্ন।
আমি ও পথে হয়েছি শুধু বিষাদের পদচিহ্ন!
১৫. সুবর্ণ রেখা
ফেলা আসা এক সুবর্ণ রেখা হঠাৎ
সামনে মুখোমুখি-দেখা! ফেরারী বসন্ত
গুনগুনিয়ে শোনায় কুহু-কেকা।
ডানা ভাঙা গল্পের উড়্ক্কু পালক কানে কানে
বলে-হেরে হেরে অনেক তো হল শেখা!
আর কত নতমুখে স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকা?
আমি বলি-নদী দেখো, জলের মত বয়ে
চলা শেখো। হেরে হেরেও জয়ী হওয়া যায়, যদি
চাপা কষ্ট রঙধনু হয় সুবর্ণ রেখায়!
১৬. পারমিতা
বদলে গেল গল্পগুলো
কাব্য যত নদী
এমন বদল হতো না তুমি
থাকতে পাশে যদি।
বদলে গেল আকাশের রঙ
মূষরে গেল চাঁদ
জ্যোস্না ছাড়া রাত্রি হলো
লাবণ্যহীন ফাঁদ!
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল
সকল তারার জ্যোতি।
সাগর জলে ঢেউ ওঠে না
মরুর বুকে ঝড়
হাসে না কেউ, কান্না গুমোট
ভাসায় চরাচর।
ফিরলে তুমি জলের ধারা
বইবে নিরবধি।
১৭. আয়না
আমার যে এক আয়না ছিল, আয়না তো
নয় আকাশ মায়া, সবটা জুড়ে আমার
ছায়া! আয়না হঠাৎ আগল ভেঙে
পথে নেমে পথ হারালো। আমার যে
এক আয়না ছিল! বলতে পারো
আয়না থেকে আমার ছায়া কে তাড়ালো?
আয়নাটা যে ছিল আমার অহম করার
সুরের বীণা, আয়নাটা রোজ আমায় নিয়ে
নাচতো একা তা-ধিন ধিনা। গল্প কত,
কথামালা, অভিমান বা দহন জ্বালা, মধুর
প্রেমের দমকা হাওয়ায় বুঝেছিলাম
বেঁচে থাকার মানেটা কী, রঙ বাহারী আয়না
পাওয়ায়। নিকষ-কালো অন্ধকারে, হাহাকারে
বন্ধঘরে আয়নাটা যেই সামনে দাঁড়ায়,
আঁধার যত রঙ ছড়িয়ে গানের নদী যায়
গড়িয়ে, দুঃখগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে মেঘের দেশে
সব যে হারায়! আয়না যেন জিয়নকাঠি,
ওর কাছে তাই দু’হাত পাতি!
আয়নাটাকে এখন দেখি, দ্বন্দ্ব মনে
নয়তো মেকী! ঝলমলিয়ে যদিও থাকে, আগের
মত আয়না ডাকে। চোরা কাটা পথের বাঁকে।
আগের মত আয়না আছে, আমিও
আছি তেমনি কাছে। কোথায় যেন দ্বন্দ্ব,
আয়না বলে ঠিকই আছে আগের মত ছন্দ।
১৮. অভিবাদন
তুমি তার কাঁধে মাথা রেখে ভাবো
পুষ্পরেণু উড়ে যাক উতলা হাওয়ায়, ফেলে আসা
এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস যদি সামনে দাঁড়ায়, জীবন
কেন হবে বিষণ্ন পথিক রোদ-ছায়ায়?
তোমার ভাবনাকে আমিও দিয়েছি মূল্য। জলহীন
চোখের সঙ্গে জলপ্রপাতের হয় কি বল তুল্য?
তুমি তার হাত ধরে আরো দূর যাবে বলে
কত কূড়ি পাপড়ি মেলে, শুধু বরফ নয়,
পাহাড়ও গলে! আমি লোভাতুর বণিকের মত
গুপ্তধন খুঁজে মরি সমুদ্র-অতলে। তুমি উড়াও স্বপ্নের
ফানুস, আমি তোমাকে দেখে যাই এক ব্যর্থ মানুষ!
জানি, এক ফোঁটা অশ্রুজলও জমেনি তোমার করতলে।
তার পাশে তোমাকে বড্ড মানায়! হার
মেনেছি বলে জীবন আমাকে অভিবাদন জানায়!
১৯. ফিরে আসা
হারানো এক বিকেল ফিরে এলো আমার সামনে
তোমার জীবনের সাতকাহন শোনাবে বলে।
ঝরে পড়া এক নক্ষত্র সন্ধ্যার মাধবী লতায় জোনাক
হলো স্মৃতির নুড়িতে ঢাকা একটি বিবর্ণ
দীর্ঘশ্বাসের মুখচ্ছবি দেখবে বলে।
একটি সমুদ্র সেই কবেই বাকরুদ্ধ হয়েছিল
তোমাকে ছুঁতে না পারার অভিমানে! সেই সমুদ্রটাও
অভিশপ্ত আখ্যান ঠেলে গান শোনালো আজ, অরণ্যের
নিঃসঙ্গতা কেড়ে নিল পাখির আওয়াজ।
কিছু স্মৃতি কখনই হতে পারে না কষ্টের
নদী, অথচ কষ্টের বিমূর্ত রূপে বয়ে চলে নিরবধি।
সেই নদীটাও আজ গোপন কষ্টগুলো
হীরে-জহরতের মত আমার কাছে বিলিয়ে
দিল। এই ফিরে আসার অদৃশ্যমান ঢেউ আমাকে
ভাসায়, জানো না তুমি-জানে না কেউ!
১৯. আমি-তুমি ও আকাশ
আকাশটা নেমে আসতে চেয়েছিল তোমাকে
সপ্তসুরের এক ঐন্দ্রালিক ঝুনঝুনি দিতে।
তুমি আকাশ নয়, আমাকেই টেনে নিলে নির্জলা
প্রেমে জীবন রাঙাতে। আকাশ তোমাকে
শোনাতে চেয়েছিল দিনরাত্রির পালাবদলের
আখ্যান, নক্ষত্রের গান, বা চাঁদ গলে
কেন জোছনা হয়-সেই গল্প। মেঘের অভিমান
কেন বৃষ্টি হয়, সেটাও বলতে চেয়েছিল
অল্প। আকাশ আরো চেয়েছিল তোমাকে
দিগন্তে নিয়ে যেতে, তুমি আকাশের আকুলতা
শোনোনি কান পেতে। তুমি আমাকে
মনে করেছিলে গনগনে সুর্যালোক, আমার
দীনতাকে মেনে বলেছিলে-জীবনের জয় হোক।
আমি আলোয় ভরিয়ে দেব তোমার
জীবন, এই স্বপ্নাতুর ভাবনায় ছিলে মশগুল।
অথচ হায়, আমি এক নিদারুন ভুল!
বিচ্ছেদে ভেঙেছে তোমার স্বপ্ন, আজ
বিরহ ফোঁটায় হুল, আমি জীবন বিমুখ বিষণ্ন
পথিক, আকাশ বদলায়নি এক চুল!
২০. মধ্যরাতের কাব্যালাপ
নিঃসঙ্গ এক মধ্যরাত পাহাড়ের কাছে
চাইলো ঝর্ণার স্বরলিপি। জানতে চাইলো
দুঃখগুলো কীভাবে নুড়ি পাথর করতে
হয়-সেই মন্ত্রণাও। পাহাড় কলহাস্যে বলল,
দুঃখকে পুড়িয়ে পাথর করে দেয় যে
ভালবাসা, সেই ভালবাসা সবাই পায় না।
যারা পায়, তারা নিঃসঙ্গ মধ্যরাতের
বোবা কান্নায়ও কবিতার মাধুর্যতা খুঁজে
পায়। হৃৎ কথনে বলে যেতে পারে
তাজমহল বানানোর হাজারটা বর্ণময় গল্প।
মধ্যরাত পাহাড়কে জড়িয়ে ধরে বলল,
কত অপার্থিব প্রেম মিলিয়ে গেছে
বিরহের কুয়াশায়, কত হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ
দেখেছি সময়ের বাঁকে! ভালবাসা বুঝি
কারো কারো কাছে অধরাই থাকে?
পাহাড় বলল, যে পায়, সে ছাই উড়িয়েও
মানিক পেতে পারে! ভালবাসা কাউকে বাঁচায়,
কাউকে দেয় আলো, আবার কাউকে পোড়ায়,
কাউকে নিয়ে যায় গহীন অন্ধকারে! মধ্যরাত এরপর
চাইলো পাহাড়ের মত অনড় দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি।
পাহাড় হেসে বলল, ভালবাসাতেই নিঃসঙ্গতার মুক্তি!
২১. আকাশ
আকাশের ওপারে আকাশ খুঁজি, থোকা থোকা
মেঘের অরণ্যে গুমোট কান্নার ঝুনঝুনি। আমার না
বলা কথাগুলো দীর্ঘশ্বাসের ব্যাঞ্জনা হবার রিনিঝিনি
ঝংকার শুনি। আকাশের রঙ দেখি আর ভাবি, কোনদিন
ছাড়বো না আকাশ মুঠোয় পুরোর দাবি।
কে যেন বলে, আকাশ পাওয়া সহজ নাকি!
এ কথা ঢের ভাল জানে সোনালী ডানার চিল, দিগন্ত
পাড়ি দেয়া যত পাখি…। হাজার হাজার বছর ধরে
একাকী দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ও যেন আমার
মত আকাশমুখি! সমুদ্রে আকাশ নামে না তবু
অভিসারের স্বপ্ন নিয়েই সুখি। কবিতার খাতায় আকাশ
রেখে আমি ভাবুলতায় ডুবে থাকি। জানি, একদিন
আকাশ আসবে নেমে, যেমন তুমি এসেছিলে প্রেমে। না হয়
ভুলের কাঁটা বিঁধেছিল বলে মাঝপথে গিয়েছিলে থেমে।
আকাশ আমায় যেদিন জড়াবে, ‘কার প্রেম অপার্থিব?’
এই প্রশ্নে সেদিন তুমি কি ডরাবে?
২১. জীবন মানে বেঁচে থাকা
ভালবাসা তো নয়-ই, তোমার এক ফোঁটা
করুণাও চাইনা। যতদিন জীবনকে
শিল্প মনে হতো, ততদিন তোমার ভালবাসার
কাঙাল ছিলাম আমি। এখন বুঝে গেছি
জীবনের কোন শিল্পমান নেই। জীবন
আমার কাছে রুটিন মাফিক বেঁচে থাকা, সময়ের
ঝুলিতে স্মৃতি-কথামালা গচ্ছিত রাখা।
হতে পারে তোমার কাছে জীবন
কাব্যময়, ক্যানভাসে ধ্রুপদী শিল্পটান যেমন
রঙে রঙে কথা কয় বা সৃষ্টির আবগাহনে
গন্তব্য জানা পথে নদী বয়। হতে পারে জীবন
মহাকাশের মত রহস্যময়, জয়ী হতে হতেও
এক নিদারুন পরাজয় বা দিন ও রাত
পেরিয়ে যাবার মত সাধারণ ঘটনা। জীবন
তোমার কাছে হয়তো বর্ণাঢ্য, আমার
কাছে যাতনা! এক ফুঁ দিয়ে প্রদ্বীপ নিভিয়ে
দেয়ার মত যদি জীবনকে নিভিয়ে দেয়া
যেত, যন্ত্রণা-প্রতারণা-প্রবঞ্চনায় জর্জরিত অনেক
হৃদয় রেহাই পেতো। কেউ কেউ ঘুমহীন
রাতের গলায় পড়ায় গোপন আশ্রুজলের বরমালা।
তুমি কি জানো, তোমার চেয়েও জীবন
আমাকে করেছে কতটুকু অবহেলা?
যত দুঃখ-অভিমান-ক্ষত, বুকের
পাঁজরে জমাট বেধেছে অবিরত, তবু
তোমার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছি কত!
যখন বুঝেছি ভালবাসা ও করুণার মানে, জীবন
কেন পুষ্পের মত ফোটে না সবখানে বা
আমারই হার নির্ধারিত সব দানে, তখন জীবনের
কোন সুষমা বা ব্যাঞ্জনা খুঁজে পাইনি। এরপর
থেকে জীবনের কাছে কোন স্বপ্নের বীজ চাইনি।
যখন বেঁচে থাকাটা মনে হয় শুধু পথচলা, আমার
কাছে অকারণ কেন জীবনের কথা বলা?
২২. এমন হয়না
যে ভোরে ফোটেনি একটিও ফুল
এমন ভোর দেখাতে পারবে, বলো
এমন দু’চোখ দেখেছো কি তুমি
সে চোখ হয়নি কখনও টলমলো।
এমন একটি নদীর কথা বলো
যার বুকে উঠেনি ঢেউ
ভালবাসা আসেনি জীবনে কোনদিন
এমন আছে বলো-কেউ।
ঢেউয়ের ছন্দ আছে জানো তো
জানে নদী-সাগরের তলও।
এমন একটি ফাগুনের কথা বলো
যেখানে নেই কোকিলের কুহুতান
বিরহে পুড়ে যতই পাষাণ বাধো
ভালবাসা গলাবে অভিমান।
ফাগুনের গুনগুন গেয়ে যায়
দু’চোখের লোনাজলও।
২৩. তুমি ও কবিতা
তোমাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখবো
বলে হাত রেখেছিলাম বিরহের দাবানলে।
ভেবেছিলাম, পুড়ে অঙ্গার হয়ে খরতাপের চৈত্রকে
বলবো-নির্বাসনে যাও। হতে পারে বর্ষার কদম
ফুল আমাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেবে
শ্রাবণের মুখরতা না হয়ে পুড়ে ছাই হলাম বলে।
জেনেছি, বিরহে কবিরা সূর্যস্নান রেখে
কবিতার অলিন্দ্যে কাক জোছনা ছড়ায়। কখনও
কখনও ভোরের শিশির বিন্দুর কাছে রেখে
যায় সমুদ্রের হাহাকার। আমার বিরহের
ভেতরে দেখি নীলাভ এক বসন্ত ধ্যানমগ্ন ঋষির
মত তোমার নামে তপস্যারত। তার সামনে
পারিজাত ফুল হয়ে ফুটে আছে স্মৃতি জাগানিয়া
কিছু লগ্ন। এ দৃশ্যে আমি যতটা হত বিহবল,
তারচেয়ে ঢের বিহবলতায় ডুবে যাই। বলো তো,
হৃদয় কতটা পুড়লে লিখতে পারবো কবিতা?
২৪. স্বার্থপর
অনেক অ-নে-ক পর জানতে পারলাম,
তোমাদের মুখগুলো মুখোশ ছিল! তোমাদের
যে কথাগুলা মনে হতো পৌষের সকালে
করোজ্জ্বল মিঠে রোদ, সে কথাগুলোও ছিল
নির্জলা মিথ্যার ফানুস! তোমাদের মুখের আদলে
ছিল দেবতার নিষ্পাপ রূপ, দৃষ্টিতে ছিল
বিশ্ব’ ও নতজানু থাকার প্রত্যয়। তোমরা পাশে
থাকলে আমার কখনও ছিল না ভয়।
তোমাদের কলহাস্যকে মনে হতো
হৃদয় থেকে উৎসারিত অপার্থিব
জল-তরঙ্গ,অভিমানকে মনে হতো
পৃথিবীকে গ্রাস করছে দানবীয় কালো
মেঘ। তোমাদের ছায়াগুলোকে মনে হতো
গন্তব্য বলে দেয়া আলোর প্রক্ষেপণ।
অথচ হায়, এ ছিল বিভ্রম-অলীক মায়া!
জানতে পারলাম, অনেক অ-নে-ক পর
তোমরা মুখোশ পড়া বড্ড স্বার্থপর!
২৫. দুঃখগুলো
আমার দুঃখগুলো হাসনে হেনা হয়ে ফোটে, কখনও কাঁঠালচাপার
গণ্ধ হয়। তোমরা যখন অন্ধকারঘন রাতকে বর্ণিল
আলোয় রাঙিয়ে দিয়ে নাগরিক জীবনে সভ্যতার
পালক জড়াও, আমার দুঃখগুলো তখন গাঁয়ের ঝোপঝাড়ে
জোনাকী পোকার ম্রিয়মান আলোর দীপ্তি হয়।
সমুদ্র স্নানে গিয়ে তোমাদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের লুটোপুটি দেখে
আমার দুঃখগুলোর ঈর্ষা জাগেনি কখনও। দুঃখগুলো
ঝিনুকের মুক্তো হবে বলে দু’চোখের গোপন
অশ্রুকণা বিলিয়ে দিয়েছে সমুদ্র জলে। সমুদ্রকে বলেছি,
আমাকে পড়ে নিয়ো অন্তরকষ্টের দাবানলে।
আমার দুঃখগুলোর কোন অহংকার নেই বলে
তোমাদের অবহেলাকে বসন্তের বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্যকে
তাল কেটে যাওয়া গান ভেবে নিয়েছে বারবার। দু:খগুলো
আর কিছু হোক, না হোক, ভৈরবী রাগের বিষাদ
হতে ছিল উন্মুখ। তোমাদের কোলাহল মুখর জলসা ঘরে
আমার দুঃখগুলো চাপা পড়ে হয়েছে আত্ম জিজ্ঞাসার আখ্যান।
আমার দুঃখগুলো আমার মতই নিঃসঙ্গ, নিষ্প্রভ।
২৬. বুঝিনা
তুমি বললে, জীবন শিল্প। আরো বললে,
জীবনের রঙ আছে, রূপ আছে, বিভাসও আছে। এ ছাড়া
আছে অর্থদ্যোতনা, জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি জীবন
একটি মোহনা। জীবনে দুঃখ আছে, পরাজয় আছে,
গ্লানি-হতাশা, অসহনীয় যাতনা-বিষাদ কত ক্ষত!
জীবন বর্ণিল হয়, জয়ের অখ্যান মুঠোয় কারো।
আমি বলি, জীবন কি অগ্নি বা শীতল জল?
জীবন মানে কি বেঁচে থাকার কোলাহল?
জীবনের শিল্প আমি খুঁজিনা, জীবনের কত বাঁক,
পাওয়া-না পওয়ার হিসাব মেলেনা কেন, বুঝিনা।
২৭. নিরেট গদ্য
তুমি রোদের প্রচ্ছদ হবে বলে
আমি পরাজয়ের পদচিহৃ রেখে শরতের শিশির
হয়েছিলাম এক নির্জলা ভোরে। রোদেলা
সকালে ঘুম ভেঙে তুমি ছিলে অপার্থিব ঘোরে।
তুমি দখিনা হাওয়া হবে বলে আমি
হয়েছিলাম ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ার আখ্যান। তুমি
করোজ্জ্বল আলো, গহীন আঁধারে আমার প্রস্থান।
তুমি মোনালিসার শিল্পময় হাসি হবে বলে
হয়েছিলাম বিসাদ-সিন্ধু। যতবার হয়েছো বৃত্ত,
আমি হয়েছি কেন্দ্রবিন্দু। তুমি ভালবাসা
হবে বলে আমি বসন্তকে বিরহে পুড়িয়ে
হয়েছিলাম একাকীত্বের নৈঃবদ্য। তুমি কবিতা
হলে আমি ঝাঁঝালো-নিরেট গদ্য!
২৮. যে কবিতাগুলো
তোমার কাছে আমার কয়েকটি কবিতা
এখনও আছে। কবিতাগুলো ভেবেছিল যেদিন তুমি
অবহেলার চাদর সরিয়ে কবিতা পাঠের উষ্ণতা
দেবে, সেদিন ওরা ভোর রাতের বৃষ্টি
হবে বা কুসুম অন্ধকারের স্বরলিপি শিখে নেবে।
সকালের মিঠে রোদের প্রতি তোমার ভীষণ অনুরাগ
জেনে কবিতাগুলো অন্ধকার হয়েই থাকতে চায়
অনন্তকাল। কাঁঠালচাপা’র গন্ধ যেমন চারপাশে
ছড়ায় মৌতাত, তেমনি কবিতাও অন্ধকারের গহীনে
আলোর অবগাহন করে গেছে অহর্নিশ! তোমার
দৃষ্টিগোচর হয়নি বলে কবিতার নির্বাসন দণ্ডের হয়নি
আবসান। ওরা হয়েছে পরাজয়ের পদাবলী, বিরহের যত গান।
আমি তো ধরেই নিয়েছি কবিতাগুলো মমি
হয়ে থাকবে সময়ের বাঁকে। যে কবিতা
হয়নি আজো পাঠ বা যে পায়নি প্রেমের স্বাদ,
সে কবিতা অন্ধকার হলে কবির কি বলার থাকে?
২৯. আশ্চার্য দুঃখগুলো কষ্ট হয়নি!
আশ্চার্য, আমার দুঃখগুলো একটুও পাল্টায়নি!
বিবর্ণ হয়নি আজো, নতমুখী তবে সপ্রতিভ।
সেই চেনা মুখ, ধূসর জলছবি। একবার
বলেছিল এক কবি, ‘দুঃখগুলো কবিতার কাছে
সমর্পিত করো, হাতের মুঠোয় স্বপ্নের লাগাম ধরো!’
আশ্চার্য, দুঃখগুলো তোমার কথা আজো বলে।
অপ্রকাশিত কিছু কবিতা এখনও জ্বলে
বিরহের দাবানলে। নক্ষত্র ঝরে যেতে যেতে
কক্ষপথে কথাররেণু উড়ায় জানি। ওসব
কথা হাওয়ায় ভেসে এসে কত কথার
হয় যে কানাকানি! দুঃখগুলো অবুঝ থাকুক,
উঠলে কথা ভালবাসার, দাড়ি-কমা টানি।
আশ্চার্য. দুঃখগুলো কষ্ট হয়নি!
৩০. নতমুখেই ছিলাম
আমি নতমুখেই ছিলাম। দু’চোখ
করেনি টলমল, অথচ আমাকে বিষাদ সিন্ধু ভেবে
তুমি হাতরে দেখে নিতে চাও-সবটুকু অতল!
আমার কোন কথা ছিল না। এক ফুৎকারে
বসন্ত উড়ে যাওয়ার টুকরো কিছু বিনম্র স্মৃতিই যা
ছিল। দিগন্তে নেমে যাওয়া আকাশের সঙ্গে
এক চাপা দীর্ঘশ্বাসের ছিল অদ্ভূত মিলও। অন্তরে সুর
ছিল, কথা না থাকায় গান হয়নি কখনও। তবু
আমার কাছে তুমি জীবনের স্বরলিপি খুঁজে
হা-পিত্তেস করো! আমি বুঝি না, অন্ধকারের সামনে
কেন রোদের আয়না ধরো?
আমার কোন অভিযোগ ছিল না, অভিমানও।
আমার ভাল লাগাটা ‘ভালবাসা’ হয়েছিল
কিনা, সেটা তুমিও ভাল জানো। যে জীবন
তোমাকে কেন্দ্র করে একটি আখ্যান হতে পারতো, সে
কিছুই না হবার অহংকার হয়েছে। স্বীকার করছি,
সময়ের বাঁকে গচ্ছিত বর্ণিল কিছু রেখা কথা হয়, ভালবাসা
হয়, জীবনের আখ্যানও হয়-নিঃসঙ্গ অনুভবে।
নতমুখে আমি তখন ডুবে যাই আশ্চার্য বিহবলতায়!
৩১. স্বার্থপর ছিলাম না
আমার কোন মোহ ছিল না। আমি ভালবাসতেই
চেয়েছিলাম। আমি একটি সকালের মলাট হতে
চেয়ে তোমার মনের না বলা কথাগুলো
আমার কথাগুলোর সঙ্গে মালা গাঁথতে চেয়েছিলাম।
তুমি ভেবেছিলে, কুসুম ভোরের নরোম আলো
বা দুপুরের গনগনে রোদ বিলিয়ে একটি অন্যরকম
বিকেল আমি চাই। তুমি সকালের নির্মল রূপ
নিজের মুঠোয় পুড়ে আমাকে বলে গেছো জল-জোছনার
সাতকাহন। আমি দখল করতে শিখিনি বলে
রাতের কাছে ফিরে গিয়ে গচ্ছিত রেখেছি
থোকা থোকা স্বপ্ন আর চাপা অভিমান। সত্যি বলছি,
আমি তোমার সামনে একটি কাব্যময় সকাল হতেই
চেয়েছিলাম। তুমি ভেবেছিলে, তোমার কাছ
থেকে সকাল ছিনিয়ে নিয়ে প্রেমিক হবো না,হবো
স্বার্থপর! আমি কখনও স্বার্থপর ছিলাম না,
প্রেমিক ছিলাম অনড়। তুমি বোঝেনি নক্ষত্র কেনো
ঝরে, দেখোনি আমার রোদন ভরা অন্তর!
৩২. আমার কোন দুঃখ ছিল না
আমার কোন দুঃখ ছিল না, দীর্ঘশ্বাসও।
এমন কী, কোন কষ্টের কী নাম, কষ্টের
কেমন রঙ, কতটা বিভাষ..এর কিছুই
জানতাম না। সূতো ছেঁড়া ঘুড়ির হারাবার
যেমন কষ্ট থাকেনা, তেমনি আমারও
কষ্ট ছিল না। স্বপ্নবিলাসীরাই তো দুঃখ পাবে,
তারা পাক। আমার তেমন কোন
বর্ণিল স্বপ্ন ছিল না. তাই কষ্টও ছিলনা।
একটা জীবন ঘাসফড়িং হবে, বা চৈত্রের
ভরদুপুরে ছাতিম গাছের ছায়া হবে অথবা পদ্ম
দীঘির শান্ত জল হবে, নয়তো হবে
টগবগে লাল কৃষ্ণচূড়া-এমন এক সাদামাটা
স্বপ্ন ছিল শুধু। তবে হ্যাঁ, একবার এক ভবঘুরে স্বপ্ন
আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রমত্ত স্রোতে।
ঐ স্বপ্নের সঙ্গে একটা মুখচ্ছবিও ওতপ্রোতভাবে
ছিল। মুখটা মায়া হতে পারতো, হয়েছে
ছায়া! মুখটা অবলম্বন হতে পারতো,
হয়েছে নিঃসঙ্গ নির্বাসন। স্বপ্ন বিমুখ বলেই হয়তো
মুখটার জলছবি ধরে রেখেছি অনুভবে। বলিনি-তুমি
কি আমার হবে? এ সব কথা ফিরে ফিরে
আসে আর দেখি এক পশলা দুঃখ
শরতের মেঘের মত ভাসে মনের গহীনে।
৩৩. যে কথাটি
যে কথাটি বলতে পারোনি বলে
অনেকগুলো বসন্ত বোবা কান্নার ধ্রুপদী
রাগ হয়েছিল, সে কথাটাই বললে আমি
যখন রক্তক্ষয়-প্রলয় সহে সহে
শেষ বিকেলের গোধূলী প্রচ্ছদ বা কাশবনে
লেপ্টে থাকা ম্লান জোৎস্নালোক।
জানি, বসন্ত পুড়ে ছাইভষ্ম হলেও
তোমরা দেখেছো পত্র-পল্লব শ্যামোলিমার
অলীক শোভা, দেখোনি ফুলের নষ্ট
জীবন, শোনোনি কোকিলের বিভ্রান্ত কুহুতান
বা জীবনের শিল্প খোঁজোনি, নৈমিত্তিক
বেধেছো যাপনের সাদামাটা গান।
যে কথা আমিও পারিনি বলতে, স্বপ্নের
রেণু উড়িয়ে মিটিমিটি জ্বলেছিল আশার
প্রদ্বীপ-সলতে। সে কথার শিল্পমান আছে বলে
বারবার তা কবিতায় আশ্রয় পায়। বিরহ
বা অনুরাগে কবি ও প্রেম অবিচ্ছেদ্য
থাকে, এ যেন কথার দায়!
তুমি কথাটা বলবে বলে আকাশের
নক্ষত্র গড়িয়ে নামতে চেয়েছিল, মনের গহীনে
প্রবাহমান এক নদী আরো কথার ফল্গুধারায়
বয়েছিল। আশ্চার্য, সে কথা তবু ছিল নিশ্চুপ!
বিষন্ন এক ধূসর দিগন্তে আমিও ছিলাম ভাষামূক।
‘ভালোবাসি’ সে কথা বললে অনেক অ-নে-ক বছর
পর! তোমার চোখে প্লাবন, আমার বুকে ঝড়!
৩৪. জীবন শিল্পময়
আমার দুঃখগুলো তোমার কবিতার ব্যাঞ্জণা
হয়। যে কষ্ট জলকাব্যের দীপ্তিময়
বিষন্নতা হবার কথা, তাকে তুমি মেঘের
পালক বানাও! তাই, দীর্ঘশ্বাস আগলে
রাখি। দমকা হাওয়ায় কান পেতে
আমার হৃৎ কম্পন শোনো নাকি? বুকের
ভেতর দহন,জ্বালা, ক্ষয়..!
তুমি বলো, নীরবে সহো, জীবন শিল্পময়।
৩৫. দূরত্ব যে অল্প
বৃষ্টি নামলে চাইবি যে রোদ, আলোয় খুঁজিস রাত্রি
তোর পাশেতে হাঁটতে গেলে, উল্টো পথের যাত্রী!
মুঠোয় ভরে জোনাক পোকা,
অন্ধকারও থোকা থোকা
তোকে দিয়ে ভাবি
কাক জোছনার লাবণ্য সব
রাখছি তুলে, পাবি।
ফুলের পরাগ উড়ুক হাওয়ায়
বলব কথা কাব্য ছায়ায়
গল্প থেকে গল্প
কী হবে বল, কেবল ছুটে
তোর পাশে রোজ গোলাপ ফোটে
দূরত্ব যে অল্প।
৩৬. বেহুলা লখিন্দর
কালের দূর্বাঘাসে তোমার একাকীত্ব শিশির বিন্দু
আমি সময়ের বর্ণিল বাঁক নেয়া নিঃসঙ্গ সিন্ধু!
তোমার পথভোলা অভিমান হয়েছে ফাগুনের কৃষ্ণচূড়া-লাল
আমার কিছু স্বপ্ন, ধূসর জলরঙে আঁকা বিষাদ বেসামাল।
তুমি ভাবো, একদিন ঈশ্বর ছুঁয়ে দেবে তোমার বিপন্ন ললাট
আমার ভেতরে ব্যর্থ এক কবি, ছিঁড়ে উড়ায় কবিতার মলাট।
তুমি সবগুলো ভুল শুধরে নিতে, মুঠোয় পুড়তে চাও কালান্তর
তুমি হওনি বেহুলা যেমন, তেমনি আমিও হইনি লখিন্দর!
৩৭. আমাদের নাম অবক্ষয়
(উৎসর্গ: খুন হওয়া সাংবাদিক সুবর্ণ নদীকে)
সুবর্ণ,
আপনি যেখানে লাশ হয়ে পড়ে
আছেন, রাষ্ট্রও ঠিক এখানে এক গলিত লাশ!
যে কথাগুলো গণতন্ত্রের সুরভী মেখে
স্বাধীনতার ফুল হয়ে আপনার লেখনীতে ফুটে উঠতে
চেয়েছিল, সেই কথাগুলো
আপনার রক্তস্রোতের ধারা হয়ে আমাদের অবনত
করে গেল নিদারুন লজ্জা আর গ্লানিতে।
সুবর্ণ,
আমাদের মাথার ওপর লটকে থাকা
আকাশ এতোটা নিচে নেমে এসেছে,
আমরা কোনো প্রিয়মুখ দেখতে পাচ্ছি না, আর
কী আশ্চার্য
মুখোশ পড়া খুনীরা কণ্ঠ মেলাচ্ছে কোরাসে।
অন্ধকারও মেকী আলো হয়ে আমাদের দাঁড় করিয়েছে
বিভ্রান্ত-বৃত্তে!
সুবর্ণ,
আপনি নদী বলেই তের শ’নদীর জল
স্থির হয়েছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গনের সময়। আপনার
নেই কোনো পরাজয়, শুধু আমাদের নাম হয়েছে ‘অবক্ষয়!’
৩৮. ঝরে পড়ি রোজ
তুমি যে আকাশ দেখো, ওটা
আকাশের কাচ, আকাশ অন্যখানে।
যদি আকাশ খুঁজে পাও বদলে
নিয়ো জীবনের মানে। যে জীবন নিয়ে
বাঁচো, যেভাবে নাগরিক কোলাহলে,
বিত্ত-বৈভবে জৌলুষ রাঙিয়ে নাচো, জানি
ফুরাতে চায় না রেশ। আমি বলি,
পাখির জীবন থেকে নির্লিপ্ত বেঁচে থাকা
শেখো। সরল সুবর্ণ রেখায় অন্তত
একবার জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকো। মর্মকথা
জানে বনের পাখি, রাজপ্রাসাদেও
কোরাস গায় শুভঙ্করের ফাঁকি।
যে স্বপ্ন তুমি দেখো, স্বরলিপিহীন গান
ভেবে মনের গহীনে ফেলে রেখো।
জানো তো, কোনো স্বপ্ন ফোটায় গোলাপ,
কোনো স্বপ্ন পুড়িয়ে পুড়িয়ে হয়ে যায়
নীলকণ্ঠের বিষ। কিছু স্বপ্ন সত্যি হবে না জেনেও
বুকের পাঁজরে লেপ্টে থাকে অহর্নিশ। ওসব
স্বপ্নে করোনা আমার খোঁজ। আমি ভুলের
সন্তাপে ফুল হই, ফের ঝরে পড়ি রোজ!
৩৯. চাইনি
চাইনি।
তবু অনেক বছর পর ফের আমার সামনে
নতমুখে দাঁড়ালো মেঘের অভিমান, বসন্ত
আবেগ, স্বপ্নকেয়া, ভাবুলতার কাশবন, কবিতার নৈবদ্য,
পদচিহ্ন রেখা যাওয়া গদ্য, না বলার কথার
মধুরেণু, বলে ফেলা কথার ঐন্দ্রালিক
মায়াজাল, সম্পর্কের টক-মিষ্টি-ঝাল, আর
সম্পর্ক না থাকার সাদামাটা আখ্যান।
চাইনি, সত্যি ওসব চাইনি।
তোমাকে ছাড়া এ জীবনে কী
আর বলো পাইনি?
৪০. ছায়া
আমি তোমার ছায়াটার দিকেই তাকিয়ে
থাকি। তোমার হৃদয়ে মায়ার এক খরস্রোতা নদীর
কথা জানি, ও নদীর জলে আমার প্রতিবিম্ব
কখনও দেখোনি তুমি। ও জলের গহীনে ভোরের
প্রার্থনার মত নিবিষ্ট ইন্দ্রজাল আছে, সেটাও জানি। অথচ
জানিনা, আমাকে অবজ্ঞা করলেই কেন তোমার মুখে
সম্রাজ্ঞীর জৌলুষদীপ্ত হাসি আরো লাবণ্যময় হয়?
তুমি যতই দেয়াল টেনে আটকে রাখো
মায়া, আমিও হৃদয় জলের নিভৃত এক ছায়া!
৪১. বিষন্ন নদী
মাঝেমাঝে ভাবি ফিরে যাই সেখানে, যেখানে
সময় বর্ণময় হতে উপকরণ তুলে দিয়েছিল
আমার হৃৎতন্ত্রীতে। আমি বুঝতে পারিনি বলে বাতাস বাঁক
নিয়ে লিখেছিল এক শোকগাঁথা, পুড়েছিল আকাশের
এপিঠ-ওপিঠ। সে বছর গোলাপগুলো বিবর্ণ
হয়েছিল বলে তুমি বলেছিলে ‘বসন্ত বিলাপ’। আমি
সময় বুঝিনি, তোমার রূপের লাবণ্য মেখেছি,
মনের অতলে জলছবি আঁকছো কিনা, কখনও খুঁজিনি।
মাঝেমাঝি ভাবি, কেন ছিলাম নতমুখে-অবনত।
কালের দেয়ালে কতকিছু আঁকা হয়
হেয়ালে-খেয়ালে। হেয়ালী করেও কেন জানতে
চাইনি, তুমি কেনো কবিতার মত? জানা হতো
যদি, তাহলে জীবন হতো না বিষন্ন এক নদী!
৪২. জীবনের সঙ
তোমার রাগের কৌটা খুললেই ভৈরবী
রাগের মূর্ছনা এসে আমাকে ভাসিয়ে দেয়। তোমার
রাগের দমকা হাওয়ায় আমি বহুবার কান পেতে
শুনেছি-জীবনের আখ্যান পুড়ে ছাই হবার
বিলাপ, বিভ্রান্ত স্বরলিপি। তোমার অন্ধ চোখে
কালের লোনা জল রেখে যে স্বপ্ন হয়েছিল
নির্বাসিত, আমি সেই স্বপ্নের অনুরণন বুকে আগলে
হতে চেয়েছিলাম পথভোলা বসন্ত। আমার
হৃৎজলের কলধ্বণি এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে ফাগুন
পুড়িয়ে বললে-আগুন পুষে পাওয়া
যায় জীবনের মৌলিক রঙ! সেই থেকে আমি
আগুনে পুড়ে খাঁটি জীবনের সঙ!
৪৩. কী বলার থাকে
সরষে খেতে শিশির ভেজা হলুদ দুঃখগুলো
নরোম রোদের উষ্ণতায় অহংকারী
হয়ে বলেছিল-লাবণ্যপ্রভা! এরপর থেকে মধ্য দুপুর
গুমোট হোক বা বৃষ্টিমুখর, কোনো ভাবুলতা
আমাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। জন্ম না নেয়া
কবিতা অনুভবে এঁকে গেছে বর্ণিল বাঁক, হেরে যেতে যেতে
জীবন বলেছে ‘কিছু পরাজয় মহিমা হয়ে পড়ে থাক!’
আরণ্যক বিকেল জমকালো হবে বলে নাগরিক
সভ্যতার মুখোশ খুলিনি কখনও পাখিদের কোলাহলে। ভেবেছি,
পদচিহ্ন রেখে যাওয়া গোধূলীর প্রচ্ছদে খুঁজে পাবো
ঐন্দ্রালিক ভোর। যে ভুলগুলোর জন্য কত
চাইলাম ক্ষমা-হাতজোড়, তবু থামেনি দহন-রক্তক্ষরণ, সে
ভুলের নামকরণ করলে-শিল্পময় আঁধার!
এরপর কী বলার থাকে আর?
৪৪. শেষ বিকেলের জানা
স্বীকার করছি, আমার দু’চোখে ছিল
অন্ধকার লাগা ঘোর, তুমি চোখের কোটরে
রেখেছিলে অপার্থিব এক ভোর। ডানা ঝাপটানো
হরিৎ বসন্তকে বলেছিলে পথ কীভাবে পাথেয়
হয়-সেই গল্প, জীবন বিমুখ উড়াণচণ্ডীকে
স্বপ্নের অনুরণনে রাঙাতে চেয়েছিলে অল্প।
ওসব আমাকে টানেনি, তোমার হৃৎকপাট
কেন খুলেছিল-পাষাণ হৃদয় তা জানেনি।
জানি, জীবন গিয়েছে ক্ষয়ে-না বলা
কথাও পাথর হয়েছে সহে, খরকূটোর মত
কত স্মৃতি সময়ের স্রোতে গেছে বয়ে। আমি
থেমে যেতে চাইনি বলে রাখিনি খবর
কোথায় চাঁদ গলে বা জ্বোনাকী কেন জ্বলে।
ভেঙে যেতে যেতে অনেক নিয়েছি বাঁক, সবুজ
হয়েছি-ফের পুড়ে হয়েছি খাঁক, চাইনি
করুনা-প্রেম।তুমি আমাকে আজো ভালবাসো,
শেষ বিকেলে জানলেম।
৪৫. দুঃখ
দুঃখ কখনও কখনও এমনিতেই চলে আসে। ভরদুপুরে
অযাচিত অতিথি যেমন গৃহস্থের ঘরে এসে
হাজির, তেমনি দুঃখও হাজির হয় লাজুক মুখে।
সমুদ্রের ঢেউয়ে যেমন ভেসে আসে শ্যাওলা, জলজ
প্রাণী বা লোনা জলের অভিশপ্ত কান্না। কোন
দুঃখ দমকা হাওয়া, কোনটা বর্ষার কেয়া,
মেঘ মাল্লার রাগ, আবার কোনটা
স্মৃতির মণিকোঠায় হীরে-জহরত-পান্না।
দুঃখ কখনও রাতজাগা গান হয়, কখনও
দীর্ঘশ্বাস, ভেজা চোখ, না বলা কথার আখ্যান হয়।
দুঃখ কখনও ভয় হয়, প্রতিশ্রুতি পেলে
বুক পেতে সব আঘাত সয়। দুঃখেরও আছে
স্বরলিপি, কথামালা, তাল-লয়।
দুঃখ কখনও ডাকলেও আসে না।
যখন জনান্তিকে বসন্তকুহক, অথচ কেউ
কাউকে ভালবাসে না।
৪৬. অসমাপ্ত আখ্যান
গল্পটা আরো বিস্তৃত হতে চেয়েছিল। গল্পের গভীরে
যে চরিত্রটা অনুজ্জ্বল রেখা এঁকে বিলীন
হয়েছিল অবহেলার গলিতে,সেই চরিত্রটা জীবন্ত
কিংবদন্তী হতে চেয়েছিল। জীবনের মহত্ব
বুঝতে পারেনি বলে গল্পের চারদেয়াল ভেঙে
চরিত্রটা বেরিয়ে আসতে পারেনি কখনও।
গল্পটা তোমার মানস পটের আয়না হবে
বলে কবিতায় লেপ্টে থাকা ফাগুনের জৌলুষ
তুলে এনেছিল, গল্পের বৃত্তে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা
চরিত্রটা ফাগুনকে আগুন ভেবে মিলিয়ে গেছে
অন্তর্গত অভিমানে। তুমি প্রতীক্ষার জলরঙে
গল্পটা আঁকড়ে হয়েছো ধূসর প্রচ্ছদ!
শেষে জানলাম, তোমার কাছে কোনো বসন্ত
পৌঁছেনি বলে গল্পটা গল্প হয়নি, হয়েছে অসমাপ্ত আখ্যান।
৪৭. সময়
আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সাহসী সময়।
সময়ের মন্ত্রণায় আমিও পেরিয়েছিলাম দুর্গম পথ, তেমনি
সুবর্ণ রেখা। জীবনকে উদ্দেলিত করা থোকা থোকা
স্বপ্নগুলোকে এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলাম রোমান্টিক দ্রোহে।
বেঁচে থাকার মহিমা আছে কি-নেই, এই ভাবনায় ডুবে
না গিয়ে নিজেকে ঈশ্বর ভাবতাম, সেটাও অসীম সাহসে!
সময়ের তাগিদে তোমাকে প্রচ্ছদ করে দু’পাতা
মেঘ এক আখ্যান হতে চেয়েছিল নির্মোহ তন্ময়তায়। সময়
চেয়েছিল যে লগ্নগুলো বিমূর্ত, বিহবলতাময় বা শিল্পের
সুষমামণ্ডিত, সেই ক্ষণ বিধৃত হোক আখ্যানের
পরতে পরতে। আটপৌরে জীবনালেখ্য থেকে বিচ্ছুরিত হোক
নক্ষত্রের নীলাভ, কবিতার অর্থদ্যোতনা, সুখের জৌলুষ,
মিহিন কষ্টের লাবণ্য…। সময় আরো চেয়েছিল
ভবঘুরে অন্ধকার হবে পথ দেখানো বাতিঘর,
ঝরা পাতা শোনাবে হেরে গেলেও কীভাবে অগ্রসর
হওয়া যায়, সেই উদ্দীপ্ত জয়গান।
সময় তো কত কিছুই চেয়েছিল! সময় আজো
জানে না ঈশ্বর কেন পথ ভুলেছিল। অনেক, অ-নে-ক পর,
তাকিয়ে দেখি বুকের ভেতরে অঝোরে কাঁদছে ঈশ্বর!
৪৮. ভেবেছিলাম
বাড়িয়েছিলাম হাত, ভেবেছিলাম স্বপ্নগুলোর পাপড়ি মেলে
পেরিয়ে যাবো তেপান্তরের মাঠ, খেত পেরুবো,
নদী-নগর, জুটবে পথে জবা-টগর..! শাসন-বারণ, নিন্দা কাঁটা
হবে না যে বাধা। ভেবেছিলাম কৃষ্ণ হবো, তুমি হবে রাধা!
৪৯. ভাঙা আকাশ
পুরো নয়, ভাঙা আকাশ মাথার ওপর দাঁড়িয়ে
বলল, কোন কিছুতেই পরিপূর্ণতা নেই! তুমি
স্বার্থক বলে যে জীবন মুঠো বন্দি করো
আছো, বিত্ত-বৈভবে যে সফলতার জয়গান শুনছো
বা সম্মান আর করতালিতে যেভাবে নিরন্তর
দ্যুতিময় হচ্ছে তোমার অহংকার, এরমধ্যেও অদৃশ্য
হাহাকার সমান্তরাল বহমান। ধাঁধানো আলোয় অন্ধকারের
কণা জমাট বাধলো কীনা-এ খবর কে রাখে বলো?
সাগরের এতো জল অতলে তবু দাবানালও!
ভাঙা আকাশ আরো অনেক কথাই বলে যায়। আমি
তোমার বিপন্নতার কথা শুনতে চাইনা বলে
এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই আকাশের অস্থিত্ব। ভাঙা
রেকর্ড বাজাতে আকাশ ফিরে আসে নিত্য!
৫০. সেই থেকে
সেই থেকে কোন রাত্রি আর সুখি হতে পারেনি, পবিত্র
হয়নি একটিও ভোর। আর সেদিন থেকে ভালবাসাকে
আড়াল করে দাঁড়িয়েছে মোহগ্রস্থ ঘোর!
সেই থেকে শুদ্ধ সঙ্গীত বিমূঢ় অভিমানে হয়েছে
গোধূলীর বিষণ্ন আভা, হেমন্তের শিশির দেখে
মনে হয় গনগনে লাভা। সেই থেকে শিউলি, জুঁই,
কাঠাল চাঁপার গন্ধ আগের মতই আছে,
অথচ বিমূর্ত হয়নি কোন সন্ধ্যা। খরস্রোতা
নদী সেই থেকে নিজের অতলে হয়েছে বন্ধ্যা!
সেই থেকে অন্ধকারের সামনে ধাঁধাঁনো আলো
কখনও দেখায়নি অহংকার, কোন ফাগুনও
জানতে চায়নি হৃদয় পুড়েছে কার। সেই
থেকে যত উলট-পালট, উল্টো। বিভ্রম ভেবে
পেছনে করেছি কত ভুল তো!
সেই থেকে জীবনের কোথাও দেখিনা কোন ছন্দ।
হায়, বসন্ত বিলাপে হৃদয় কপাট বন্ধ!
৫১. সুখ-দুঃখ
ভেবেছিলাম কিছু সুখস্মৃতি সহস্র গোলাপের
সুরভী হবে বা স্বপ্ন বিলাসী হাওয়ায়
ডানা জাপটানো প্রজাপতি। অথবা হিরণ্ময়
বিকেলের মায়াবী আলোছায়া হবে একদিন। হয়নি।
সুখের স্মৃতিরা কেমন অলস ও নিরাহংকারী!
এটাও ভেবেছিলাম দুঃখগুলো পরিপাটি
থেকে জীবনকে বলে যাবে, ‘পথ
কখনই কুসুমাস্তীর্ণ নয়!’ বা দুঃখগুলো
হবে অসমাপ্ত কবিতার নতজানু অহংকার। অথবা
ওরা চাপা কষ্টের লাবণ্য মেখে লোকালয়ে হতে
দেবে না বৃষ্টিপাত। উল্টো বৃষ্টি হামলে
হৃদয়ে ঝরিয়েছে অবুঝ জলপ্রপাত।
দুঃখগুলোও বোকাসোকা, সরল ও ম্লান।
৫২. গোপন হাহাকার
আমাকে ঘিরে থাকা একটি ছায়াকে সরিয়ে
দিয়ে আমি মেঘের আড়ালের সূর্যটাকে
দেখে দেখে জীবন বোধে রোমান্টিক দ্রোহ
ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। ছায়া সরে
গেলেও মায়া যেন পিছু ছাড়ল না। তেমনি
মেঘ চিরে সূর্য হাসলেও জীবন বোধে
ফাগুনের কুহতান বাজল না। এমন কী,
যে বসন্ত চোখের সামনে লুট হয়ে
গেল তার একটি পাপড়িও জুটল না আমার।
এরপর থেকে আমার অপ্রকাশিত কবিতার
বন্ধু হয়েছে গোপন হাহকার।
৫৩. হাতের মুঠোয় আকাশ নামে না
বিশ্বাসের চারদেয়ালে যখন অবিশ্বাসের
ঘুণ, যতই ভালবাসো তখন প্রগাঢ় অনুভব
হয়ে যায় খুন। তুমি আকাশকে ছায়া ভাবো,
আমি বলি, নিছক মায়া। স্বপ্নাবিষ্ট চোখ
দেখে না দিগন্তে নেমে থাকা আকাশটা ‘আকাশ’ নয়,
ওটা একরাশ মোহ বা নিদারুন ভুল। ভুলগুলো
তোমাকে দেখায় ফুলের হুলোস্থূল!
আকাশ কখনও হাতের মুঠোয় নামে না, গড়িয়ে
চলা নদী যেমন থামে না। এরপরও
তুমি দু’হাত বাড়াও আকাশ পানে, নিজকে
জড়াও নদীর গানে। আমি জীবনের
নামতা পাঠ করে দিব্যদৃষ্টি মেলে বলি, নিমগ্ন প্রেমে
যদি থাকে ফাঁকি, হৃদয়ে কেন আকাশ মাখামাখি?
৫৪. হার মানা পরাজয়
অন্তর্গত কষ্টগুলো ঘাসফড়িং হয়ে লাফায়,
আবার তোমাকে দেখলে ওরা হয়ে
যায় কাঁচা ভোরের সোনারোদ। হারিয়ে ফেলা
অচল পয়সা ফিরে এসে একদিন বলেছিল,
পেয়ে হারানোর চেয়ে না পাওয়াই ভাল। সেদিন
আমার নিঃশ্ব দু’হাত কেঁপেছিল ফাগুনের উত্তাপে!
যে আনন্দময় স্মৃতিগুলো জীবনের
আখ্যান হতে পারেনি, বরং দীর্ঘশ্বাসের
উৎস হয়েছে, সেই স্মৃতিরাও আজকাল
মধ্যরাতে এসে গোপন কান্না হয়।
যারা হৃদয়ে ধরে রেখেছে মুঠো মুঠো প্রেম,
পারিজাত স্বপ্ন এসে তাদের দেখিয়েছে
জীবন কতটা শিল্পময়। আমার মুঠোয় গোধূলীর
বিষন্ন আভা আর হার মানা পরাজয়!
৫৫. রোদন প্রচ্ছদ
আজ হৃদয় থেকে মুছে ফেললাম একটি নাম, যা ছিল
ধবল জোছনায় লেখা। নামটি নক্ষত্র পতনের গানে
সমর্পিত হল, যা হতে পারতো গনগনে সুযালোকে পুড়ে
অনাদিকালের দীপ্তি। জানি, ঝরে যাওয়া বা সরে যাওয়ার মিহিন বেদনা
একদিন হবে অপ্রকাশিত কবিতাগুলোর রোদন-প্রচ্ছদ।
আজ আমার দু’চোখ অন্ধ হল, যে চোখ
অনবরত দেখে গেছে তোমাকে অপার্থিব মুগ্ধতায়। কেন জানি,
আমার দৃষ্টি কখনও তুমি পড়তে পড়োনি সহজপাঠে। আমার
দৃষ্টি ছুঁয়ে ছুঁয়ে তুমি কতবার অতল হাতিয়ে জানতে
চেয়েছো কিছু কথা কেন হয়েছে অভিমানের নীলাভ
নদী। দেখোনি কথাগুলোর মৌণতায় হৃৎকথন কতটা ছিল সরব।
আজ আমি ভুলগুলোর মুখোমুখি নিজেকে দাঁড়
করালাম। এই ভুলগুলো এখন আমার একাকীত্বের সঙ্গী।
৫৬. বসন্ত নয়, অবহেলা
বসন্ত নয়, আমার দরোজায় প্রথম কড়া নেড়েছিল
অবহেলা। ভেবেছিলাম, অনেকগুলো বর্ষা শেষে,
শরতের উষ্ণতা মিশে এলো বুঝি বসন্ত। দরোজা খুলে
দেখি আমাকে ভালবেসে এসেছে অবহেলা। মধ্য
দুপুরের কড়কড়ে রোদের মতো অনেকটা নির্লজ্জভাবে
আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল অনাকাক্সিক্ষত
অবহেলা। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম আমার
দীন-দশায় কারো করুণা বা আর্তি পেখম ছড়িয়ে
আছে কিনা, ছিল না। বৃষ্টিহীন জনপদে খরখরে রোদ
যেমন দস্যূর মতো অসহনীয়, তেমনি অবহেলাও
আমাকের আগলে রাখতে ছিল নির্মোহ-নিঃশঙ্কোচিত।
আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভৌঁ-দৌড়
দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। তখন দেখি, আমার সামনে
কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষা। উপেক্ষার সঙ্গেও
একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের
কোলাহলমুখর আনন্দ-সভায়! কী মিলেছিল? ঠোঁট
উল্টানো ভর্ৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মতো একতাল অবজ্ঞা।
তাও সহে গিয়েছিল একটা সময়। ধরেই নিয়েছিলাম,
আমার কোনোকালেই হবে না রাবিন্দ্রিক প্রেম, তোমাদের
জয়গানে, করতালিতে নতজানু থেকেছিল আমার চাপা
আক্ষেপ-লজ্জা। বুঝে গিয়েছিলাম, জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে
ছোঁবে না। জয়নুলের রং নিয়ে কল্পনার বেসাতি, হারানো
দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা বা ফুল-পাখি-নদীর
কাব্যালাপে কারা মশগুল হল এ নিয়ে কৌতূহল
দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনও। এত কিছু নেই
জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হব- সেই অমিত
শক্তিও আমার ছিল না। মেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে
আমার কিছুই ছিল না। ছিল শুধু অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা।
হ্যাঁ, একবার, তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা
চোখে তাকিয়েছিলে আমার দিকে। তাচ্ছিল্য নয়, একটু
মায়াই যেন ছিল, হতে পারে কাঁপা আবেগও মিশ্রিত
ছিল তোমার দৃষ্টিতে। ওইটুকুই আমার যা পাওয়া! আমি
ঝরে যাওয়া পাতা, তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়া।
তারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়ে, উপেক্ষার দেয়াল
ডিঙিয়ে ও অবজ্ঞার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা
ভাঙতে পারিনি আমি। এ কথা জানে শুধু অন্তর্যামী।
অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলাম, এই
অবহেলা ‘তুষারপাতের মুখ”ছবি, উপেক্ষা— কাচের দেয়াল,
অবজ্ঞা ঘোরতর— অন্ধকার। এর কিছুই থাকবে না
একটি বসন্তের ফুৎকারে। একটি ঝলমলে পোশাক গায়ে
চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল
করে নেব— এমন ভাবাবেগও ছিল আকাশের কার্নিশে
লেপ্টে থাকা পেঁজামেঘের মতো। ঐ মেঘ কখনও বৃষ্টি হয়ে
নামেনি। তোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনও থামেনি।
অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি, অনেক কিছু বদলে গেছে,
সেকী! কোথায় হারাল কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন
করা অবহেলা, স্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে
ফেলা উপেক্ষা আর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার
অবজ্ঞা? ওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক,
তবে এখনও পোড়খাওয়া দিন, বড্ড রঙিন!
আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারি
কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন
অশ্রুকণা, আকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে
ঝরে পড়ছে নক্ষত্র। এমন কী, তুমি যে সম্রাজ্ঞীর
বেশের আড়ালে মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছ লাবণ্যময়
পাষাণপাথর, এটাও দেখতে পাই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।
আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এই আখ্যান যদি পেত
কবিতার রূপ, সেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরূপ!
৫৭. কষ্ট
আমার হলুদ কষ্টগুলোকে তুমি এক ফুঁ
দিয়ে উড়িয়ে দিলে। নীল কষ্টগুলোকে দু’হাতের
মুঠোয় এমনভাবে নিলে, যেন তোমার পোষা
বেড়াল। টকটকে লাল হয়ে যাওয়া কষ্টগুলো
তোমার খোঁপার ফুল হলে বেশ মানাত।
তুমি মাথা ঝাঁকিয়ে জানালে লাল কষ্টগুলোকে
মাথায় তুলবে না একেবারেই। বললে, লাল কষ্ট
বড্ড বেপরোয়া, কখনও কখনও বিপ্লবীও!
জানি, খোঁপার ফুল যদি মনের গহিনে
চাপা নদীকে উস্কে দেয়, যে কথাগুলো প্রশ্ন হয়ে
তোমার সামনে কখনও দাঁড়ায়নি, তা মাথা
তুলে দাঁড়াবে এক লহমায়। প্রশ্নবাণে তুমি হবে
বিচলিত-বিব্রত। তাহলে তুমি কেনই দেবে লাল
কষ্টগুলোকে প্রশ্রয়? আমিও লাল কষ্টগুলোকে
অচল পয়সার মতো ফেলে রাখি অবহেলার ড্রয়ারে।
আমার সবুজ কষ্টগুলোকে তুমি অবুঝ অলিন্দ্যে
রেখে দিয়েছ বার বার। আশ্চর্য, সবুজ কষ্টগুলোও
কখনও নিজের অস্তিত্ব জানান দিত না, যেন সবুজ কষ্ট
হওয়াটাই ছিল ওদের ভবিতব্য! অথচ অনেকগুলো স্বপ্ন
ভাঙার দহনে অবুঝ কষ্টগুলো সবুজ হয়েছে। জন্ম
না নেয়া কবিতার কষ্ট ওদের মুখায়বে লেপ্টে
দিন দিন হয়েছে লাবণ্যময়। আজো জানি না,
তোমার সান্নিধ্যে ওরা কেন পাপড়ি হয়?
আমার সাদা কষ্টগুলো বড্ড বিলাসী। তোমার
মুখের হাসির মুদ্রা গায়ে জড়িয়ে হয়ে যায়
শরতের কাশবন। ভাবি, শিউলী ফুলের কাছে
রেখে যাব তোমাকে ফিরে পাবার দাবি।
তোমাকে যে কষ্টের কথা বলিনি, ওই কষ্টের ভারে
কতবার পড়েছি নুয়ে তবু কখনও টলিনি। আজ
বলছি, আমার ঘোরতর কালো মিহিন কষ্টও
আছে। কষ্টগুলো কালো বলেই কিনা তোমার
আলোকিত জীবন, রূপের জৌলুস বা বিত্ত-বৈভবের
ঝলকানি সহ্য করতে পারে না। কষ্টগুলো
আমি যতবার তাড়াতে চেয়েছি, কক্ষপথ থেকে
নক্ষত্র ঝরে এসে কষ্টের সঙ্গে মিশে বিষণ্নতার গান
গেয়েছে কোরাসে। একবার ভেবেছিলাম, নক্ষত্রের
কান্না জড়ান ঘোরতর কালো কষ্টগুলো
তোমাকে দেব অর্ঘ্য করে। কষ্ট আমাকে ছাড়বে
না বলে অনড় পাথর হয়ে থাকে অন্তরে। আর
আমার রংহীন কষ্টগুলো হয়েছে ঘাসফড়িং।
৫৮. গল্পটার নাম নেই
অজস্র স্বপ্ন রেণু উড়িয়ে যে গল্পটার শুরু হয়েছিল,
পথের শেষ প্রান্তে এসে তা হয়ে গেছে
রূপকথা। তোমার আসা-যাওয়ার পথে গল্পটা ডানা
ঝাপটিয়েছিল অনেকদিন। নামহীন গল্পটা
কখনও হয়েছিল বিষন্ন বেহাগ, কখনও দাখিনা হাওয়ায়
দোল খাওয়া শুভ্র কাশবন।
গল্পটা বুনো অভিমানে নিজের গা থেকে
দুঃখের পালক ছিঁড়ে আকাশে এঁকে
দিত রঙধনু। আবার তোমার চোখের দৃষ্টি
পাঠ করে হয়ে যেত জীবনানন্দ দাস বা আবুল হাসান।
গল্পটা জুড়ে অতল সমুদ্র, অথচ
ওর অশ্রুজল ছিল না! মনের গহীনে দু:খবোধ
হয়ে পড়ে থাকা এই গল্পের কেউ কোনদিন নামও দিল না!