- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
বৃটিশ মিউজিয়ামে প্রবেশ করতেই সেই অদ্ভূত সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেল শাকিব। এই ঘ্রাণ ওর ভীষণ চেনা। এই অদ্ভূত ঘ্রাণ ও টের পায় শুধু সামিয়া ওর সামনে এলে। মিষ্টি ও মাদকতাপূর্ণ ঘ্রাণ। এর যেন সম্মোহনী শক্তি আছে। সামিয়া ওর সামনে এলেই ও সব সময় কেমন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। সম্মোহিত হয়ে পড়ে। অপরূপা সামিয়ার ধাঁধানো সৌন্দর্যের সামনে যে কেউ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু শাকিব ওর শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য মন্ত্রমুগ্ধ হয় না। ও মুগ্ধ হয় ওর শরীর থেকে বের হয়ে আসা ঐ অদ্ভূত ঘ্রাণের জন্য। এই ঘ্রাণ শাকিবকে বুঁদ করে ফেলে। মাতাল করা গন্ধটা কিসের এই প্রশ্ন ও অনেকবার সামিয়াকে করেছিল। শুধু একদিন এর জবাবে সামিয়া দু’চোখে রহস্য ছড়িয়ে বলেছিল, ‘আমার শানিত যৌবনের অপার সৌন্দর্যই হচ্ছে এই ঘ্রাণ। বলতো পারো এটাই আমার সৌন্দর্যের ফাঁদ।’
‘ফাঁদ! এই ফাঁদ কেন? কখন পাতো এই ফাঁদ?’
এর জবাবে অনেকক্ষণ হেসেছিল সামিয়া। বলেছিল,
‘বিশেষ একটা দিনে আমার শরীরের লোমকূপ থেকে এই মিষ্টি গন্ধটা বের হয়ে আসে। আর ঠিক এই দিনটিতেই আমি তোমার কাছে ছুটে আসি। এই গন্ধ ঐশ্বরিক!’
এ পর্যন্ত বলে সামিয়া হাসির উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়েছিল। সামিয়া প্রায় সব কথাতেই রহস্য থাকে। কিংবা বলা যায় ও রহস্য তৈরি করে কথা বলে। একটু গভীর চিন্তা করে বললে বলতে হয়, সামিয়া নিজেই বড় একটা রহস্য। গভীর রহস্য। ওর কোন রহস্যই উদঘাটন করতে পারে না শাকিব। আর শাকিবকে রহস্য থেকে আরো গভীর রহস্যে ঠেলে দিয়ে সামিয়ারও খুব যেন আনন্দ। এই যে শাকিব আজ বৃটিশ মিউজিয়ামে এসেছে, সেটাও সামিয়ার তৈরি করা এক বড় রহস্য উদঘাটনের জন্য। এক অবিশ্বাস্য গল্পের ফাঁদে পড়ে ও নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন চলে এসেছে। এই গল্পের শুরু কিংবা শেষ অথবা সামিয়ার সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে যে কোন সূত্রের সন্ধান পেতে চায় ও। অন্তত একটি সূত্র ও চায়।
সামিয়া কে, কোথায় থাকে? এই প্রশ্নের জবাব ও কখনো শাকিবকে দেয়নি। অথচ গত তিন বছরে তিনবার সামিয়া ওর সঙ্গে দেখা করেছে এবং সারাদিন ও শাকিবের সঙ্গে থেকেছে। বছরের বিশেষ একটা দিনে সামিয়া চলে আসে শাকিবের কাছে। এই দিনটি হচ্ছে ১৪ই ফেব্র“য়ারী ভ্যালাইনটাইন ডে। অন্য আর কোনদিন সামিয়া ওর সঙ্গে দেখা করে না। পুরো বছর ওদের মধ্যে কথা বার্তা চলতে থাকে ই-মেইলে। কখনো কখনো চ্যাট করে সময় কাটায় ওরা। চ্যাটরুম থেকেই ওদের পরিচয় এবং বিশেষ সম্পর্ক তৈরি। তিনবছর আগে ভেলেনটাইন ডে’তে সামিয়া হঠাৎ শাকিবের সামনে এসে দাঁড়ায়। পরের বছরগুলোতেও এই দিবসে সামিয়া চলে এসেছিল শাকিবের কাছে। প্রথম বছর শাকিব কিছু না বললেও গত দু’ বছরে বিভিন্ন সময়ে ও অনেকবার সামিয়ার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সামিয়া রাজী হয়নি। চ্যাটরুমে অনেকবার প্রশ্ন করেছে শাকিব। জবাবে শুধু একদিন বলেছে, ‘আমি শুধু একদিনই দৃশ্যমান হতে পারি। আর সেই দিনটি হচ্ছে ১৪ ফেব্র“য়ারী।’
‘এ কেমন রসিকতা!’
‘রসিকতা নয়, সত্যি!’
‘অন্যদিনগুলোতে তুমি কী করো?’
‘আমি মমি হয়ে থাকি।’
‘কি!’
‘মমি! মমি হয়ে থাকি।’
‘তাহলে এই যে আমার সঙ্গে চ্যাট করছো!’
‘তোমার সঙ্গে চ্যাট করছে আমার আত্মা। দৃশ্যমানে আমি মমি হয়ে আছি।’
‘ওফ্! সবসময় তোমার রহস্য!’
সামিয়া খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে। ওর রহস্যময় কথার অর্থ খুঁজে পায় না শাকিব। এবার ভেলেইনটাইন ডে এগিয়ে আসতেই সামিয়ার ই-মেইল পেয়ে চমকে যায় শাকিব। সামিয়া জানায় এবার ভেলইনটাইন ডে’তে শাকিবকে আসতে হবে লন্ডনে। বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত ক্লিওপেট্রার মমির সামনে ওকে অপেক্ষা করতে হবে। এখানে সামিয়া দেখা করবে ওর সঙ্গে। এই ই-মেইল পেয়ে শাকিব অবাক হলেও একটা বিষয় ও নিশ্চত হয় যে, সামিয়া লন্ডনে থাকে। ও ভাবে, রহস্যময় সামিয়ার পরিচয়ের একটা সূত্র হয়তো পাওয়া গেল।
শাকিব বরাবরই অনুসন্ধানী। রহস্যের বেড়াজালে ও আটকে থাকতে চায় না। বৃটিশ মিউজিয়ামের বিশালত্ব কিংবা বিষয় বৈচিত্রের অহংকার এতোই দ্যুতিময় যে, মহাকাল যেন এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মিউজিয়ামে ঘুরতে ঘুরতে শাকিবের তা-ই মনে হয়। সামিয়ার শরীরের ঐশ্বরিক ঘ্রাণ ওকে মাতাল করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। শাকিব টালমাটাল হয়ে হাঁটছে। ও এক সময় চলে আসে ক্লিওপেট্রার মমির সামনে। কিংবা বলা যায় ঐ ঘ্রাণ ওকে টেনে নিয়ে আসে ক্লিওপেট্রার মমির সামনে। এখানে দাঁড়িয়ে ক্লিওপেট্রার নাম অংকিত মমির মধ্যে সামিয়াকে দেখে ভীষণ চমকে ওঠে শাকিব। কাচের দেয়ালে ক্লিওপেট্রার মমি শায়িত। দর্শনৈচ্ছিুকরা ক্লিওপেট্রোর মমি দেখে চলে যাচ্ছে। তারা হয়তো সামিয়াকে দেখছে না। কিন্তু শাকিব স্পষ্ট দেখছে সামিয়াকে। ওর পা নড়ছে না। ও হতভম্ব। বিস্ময়ে চোখ ফেটে যেতে চাইছে। ওর কণ্ঠ খুলছে না। ওর এই বেহাল অবস্থা দেখে হেসে সামিয়া বললো,
‘তুমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছো না, তাইনা?’
‘হ্যাঁ, আমি, আমি..!’
‘আমি জানি, বিস্ময়ের তুমুল ঢেউ তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু!’
‘জানতে চাচ্ছো, ক্লিওপেট্রার মমিতে আমি কেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ..!’
‘আমিই ক্লিওপেট্রা। আমিই সেই ঐতিহাসিক সুন্দরী রমণী। শ’ শ’ বছর যাবত বন্দি হয়ে আছি মমির বেড়াজালে। আবার আমিই তোমার ভালোবাসার সামিয়া।’
‘এ সব কী বলছো!’
‘ঠিকই বলছি, শাকিব।’
‘তুমি আমার কাছে কী চাও?’
‘আমি মুক্তি চাই। মমির দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমি তোমার ভালোবাসা চাই। সত্যিকারের প্রেম তোমাকে দিয়ে নিজেকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে চাই। আমি ক্লিওপেট্রা নই, আমি সামিয়া হতে চাই!’
‘তাহলে তুমি সামিয়া নও! মানে, তুমি আত্মা! ক্লিওপেট্রার আত্মা!’
‘হ্যাঁ। সামিয়া হচ্ছে আমার কল্পনার নিজের স্বরূপ। আমি যে জীবনটা কামনা করি, সেটাই সামিয়ার জীবন।’
‘কিন্তু..!’
‘শাকিব, আমি সামিয়া হতে চাই। সম্রাজ্ঞী নয়, সাধারণ হতে চাই। আমাকে মুক্ত করো।’
এ সময় দু’ হাতের তালুতে নিজের কান চেপে ধরলো শাকিব। ওর বোধ শক্তি যেন লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ওর মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ক্লিওপেট্রোর মমি যেন অদ্ভূত শক্তিতে ওকে টেনে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। ‘সামিয়া!’ বলে চিৎকার করে ও সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললো।
শাকিব চোখ মেলে দেখলো ও একটি বিছানায় শুয়ে আছে। ওর সামনে একটি চেয়ারে বসে আছে এক নার্স। নার্স ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
‘গুড ইভিনিং স্যার! আই এম নার্স জেসিকা। হাউ ফিল ইউ, নাউ?’
‘থ্যাংকস। বাট হয়ার এম আই?’
‘ইউ আর ইন লিভারপুল হসপিটাল।’
‘ইজ ইট ইন লন্ডন?’
‘হয়েস, স্যার। টেক রেষ্ট। আই হেভ টু গো। জাষ্ট এ মিনিট, ডাক্তর ইজ কামিং।’
‘ওকে। থ্যাকংস এ লট।’
‘ওয়েলকাম। হ্যাভ এ গ্রেট ডে!’
‘ইউ টু।’
ভুবন ভুলানো হাসি বিলিয়ে জেসিকা চলে গেল। শাকিব ভাবতে লাগলো ওর কী হয়েছিল। কেন ও হাসপাতালে। ওর মনে পড়তে লাগলো ক্লিওপেট্রার কথা। এ সময় দরোজা ঠেলে ডাক্তারের পোষাক পরিহিতা সামিয়া ওর রুমে প্রবেশ করলো। সেই মিষ্টি এবং মাদকতাপূর্ণ ঐশ্বরিক গন্ধটা এসে তীব্রভাবে স্পর্শ করলো ওর ঈন্দ্রীয়কে। বিস্ময়ের আরেক ধাক্কা এসে লাগলো। ওর ছানাবড়া চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি বিলিয়ে সামিয়া বললো,
‘তোমার নার্ভ এতো দূর্বল, তা জানা ছিল না।’
‘তুমি, তুমি!’
‘সামিয়া। তোমার সামিয়া। বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘সত্যিই তুমি আবার ক্লিওপেট্রা!’
‘হ্যাঁ, বছরের ৩৬৪ দিনই আমি ক্লিওপেট্রা। অর্থাৎ ক্লিওপেট্রার মমি। শুধু একদিন সামিয়া হতে পারি। এই ভেলেনটাইন ডে’তে। আজই তো সেইদিন।’
‘তুমি কেন আমার সঙ্গে এই রহস্য করছো? কে তুমি? তুমি কি মানবী? না অপ্সরী? নাকি ক্লিওপেট্রার অতৃপ্ত আত্মা?’
এ কথা বলেই চাপা কান্নার মত ককিয়ে ওঠলো শাকিব। সামিয়া আহত কণ্ঠে বললো,
‘তুমি অমন করো না শাকিব। আর কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা নামবে। তখন আমাকে চলে যেতে হবে মমির অভ্যন্তরে। এই কয়েকটা মুহুর্ত আমি তোমার পাশে থাকতে চাই।’
এ কথা বলে সামিয়া শাকিবের বিছানায় এসে বসলো। ওকে বেপরোয়া মনে হলো। শাকিব কিছু বলতে পারলো না। সামিয়ার গায়ের মিষ্টি গন্ধটা ওকে মাতাল করে ফেলছে। এ অন্য রকম মদিরতা। সামিয়া শাকিবের ডান হাতের কব্জি নিজের দু’ হাতের মুঠোতে বন্দি করলো। শাকিব মন্ত্রমুগ্ধ। ওর শরীর আজ কাঁপছে। অন্য রকম কাঁপন। সামিয়ার শরীরের ঘ্রাণ তীব্র হতে লাগলো। সামিয়ার চোখে মুখে রহস্যময় হাসি রঙধনুর মত ছড়িয়ে পড়ছে। ওর ঠোঁট প্রবল আবেগে কিংবা অতৃপ্তিতে কাঁপছে। কয়েক মুহুর্ত কাটলো মাত্র। সামিয়া হঠাৎ করে শাকিবের দিকে ঝুঁকে পড়লো। ও ঠোঁট এগিয়ে দিল শাকিবের ঠোঁটের দিকে। একটা ঝড় যেন এগিয়ে আসছে। অসহায় শাকিব ওর ভয়ার্ত চোখ বন্ধ করে ফেললো।
৩ ফেব্রয়ারী, ০৭
নিউইয়র্ক