কষ্টের ধারাপাত

কষ্টের ধারাপাত

 Author: দর্পণ কবীর  Category: কবিতা  Publisher: দর্পন মুদ্রণ More Details
 Description:

১.
কষ্টের ধারাপাত
আমাকে ভেঙে ভেঙে দেখবে বলে
আমি চূর্ণ-বিচূর্ণ হলাম বহুবার
তোমার ইচ্ছের টেবিলে পরমাণু হয়ে
পড়ে থেকেছি দিন, মাস, বছর…
তুমি হেলাফেলা চোখে হয়তো দেখেছ আমায়
দেখলে না হৃদয়ের অনুবিক্ষণে।

আমাকে জানবে বলে—
আমার সব কথা, ব্যথা, পাপ ও পবিত্রতা
এক বৃন্তে গেঁথে তুলে দিয়েছি বর্তমান,
অতীতকেও রেখেছিলাম তোমার হাতের নাগালে।
ভেবেছিলাম, পড়ে নেবে আদি থেকে অন্ত;
অথচ সব আয়োজন ক্রুশবিদ্ধ করে রাখলে উপেক্ষার দেয়ালে
কত তাণ্ডব করে গেল রোদ, বৃষ্টি, ঝড়…।

আমাকে ভালবাসবে বলে—
শিখেছিলাম ভালবাসার ধ্রুপদী পাঠ,
প্রেম ও প্রণয়ের শিল্পকলায় বুঁদ হয়েছিল অনুভব;
তুমি আলোর বিন্দুতে মাখলে কুহেলিকার আঁধার
বিশ্বাসের বিপরীতে শুরু হল— ফাঁক ও ফাঁকির মন্থন;

আমার ভেতরে বিরামহীন চলে কষ্টের ধারাপাত!

২.
ছায়া শিকারী

নিয়তিকে হারাব বলেই সব ছেড়ে-ছুড়ে
ছুটলাম নিয়তির উল্টো দিকে
দিগি¦দিক যাত্রায় জুটল বিপ্লবী করতালি
ছানাবড়া চোখের বিস্ময় আর সমস্বর কণ্ঠের উপহাস;
এসবও পেছনে রেখে অন্ধকার
খুঁড়ে খুঁড়ে, কখনো আলোর রেণু মেখে
পথ চললাম, ঢের!

নিজের ভেতরে মিহিন ভাঙন, সৃষ্টির হুলস্থ’ূল
পায়ে পায়ে দেখে নিই
যেন না হয় বেহিসাবী ভুল!
যেতে যেতে পথে ফুলপাখির গান হল শোনা
কত স্মৃতি-বিস্মৃতি, কথা-খুনসুটি
ইন্দ্রিয়ে বোনা, রক্ত ফোঁটায় ভিজে গেল মাটি;
তোমার কাছে পৌঁছে দেখি
তোমার পাশেই নিয়তি পরিপাটি!

৩.
কথোপকথন-১

ঃ জীবনের ব্যাপ্তিতে ডানা ঝাপটাচ্ছে লখিন্দর স্বপ্ন! আকাক্সক্ষার পিঠ থেকে তুলে নাও প্রবঞ্চনার ছোরা!
ঃ এ তোমার চিত্তবিভ্রম।
ঃ চিত্তবিভ্রম নয়, চিত্তের বিলাসিতায় আমি মগ্ন। দেখো, শ্বেত পাথরের নিঃসঙ্গ সুরম্য প্রাসাদ থেকে কেটে যাচ্ছে হাজার বছরের অন্ধকার!
ঃ কুহেলিকায় বিপন্ন তোমার স্বপ্নগ্রস্ত যাপন। দু’চোখে অন্ধকারের ছোবল দিয়ে মণির আস্ফালন কেন?
ঃ অন্ধকারই তো আলোর স্বরূপ! আমার ধ্রুপদী কল্পনাগুলো জীবনের রং মেখে ছড়িয়েছিলাম তোমার প্রেমের অর্ঘ্য;ে নয়?
ঃ ও তো সস্তা আবেগের নষ্ট রং!
ঃ অথচ তুমিই ভিনদেশী লোভাতুর বণিকের মতো দলিত করছ আমার বিশ্বাসের বেসাতি!
ঃ তোমার আদি থেকে অন্তে লেগেছে মিথ্যের কালিমা।
ঃ আমি শিখেছি মিথ্যের মৃতপুরী থেকে সত্যের অণুতে রূপান্তরিত হবার মন্ত্রণা! এবার তোমার মায়াবী মুখোশ খোলো!

৪.
শাপমোচন

কথাগুলো সেভাবেই পড়ে আছে
ছোপছোপ অন্ধকার হয়ে, পরিণামহীন।
অবরুদ্ধ স্বপ্নের শেষ উত্তাপও দুঃখের মরচে
তুলতে পারেনি কথাগুলোর স্যাঁতসেঁতে গা থেকে
এ নিয়ে সময়ের কার্নিসে হাজারো কথার আস্ফালন, আহাজারি।

চিরহরিৎ অরণ্যের সবুজাভা ফিকে করে
সেই কবে চলে গেছে গোধূলির বিষণ্ন পাখি!
আজো ভাঙেনি অভিশপ্ত রাতের আগল
চিত্তবিলাসী বাউল বাঁধেনি নতুন সূর্যের গান
ক্ষোভের আগুনে পুড়ে গেছে কিছু কথার নরম পালক।

স্মৃতিরা হয়নি নক্ষত্র বা মরীচিকা
হয়েছে অন্ধকারের ওম!
দহনে শুধু পাষাণ হয়েছে পথ
প্রায়শ্চিত্তে ব্যাকুল দু’চোখের শ্রাবণ
পড়ে থাকা কথার নুড়ি হয়েছে একেকটি দাম্ভিক পাহাড়!
সময়ের পিঠে ঠুকে যাই সাহসের
ছেনী-হাতুড়ি নান্দনিক দ্রোহে
জানি,
অবসন্ন পায়ে রক্তে ভিজে, এবার হবে শাপমোচন!

৫.
আমি যে কী

আমি যে কী, তা আমিই শুধু জানি!
অনেক প্রেমে অনেকখানি নেমে
সহজপাঠে জানতে পারোনি।
অনেক ফুলে ঢাকা ছিল পথ
সে পথ দিয়ে যাওনি তুমি
পাওনি খুঁজে আমার মনোরথ,
দুঃখের শিলায় চেপে থাকা গোপন অনুতাপ
আহা স্বপ্ন বুঝি হল অভিশাপ!

ভুলের কাঁটা খোঁপায় গুঁজে
অন্ধকারে আলো খুঁজে— হলে সে-কী হন্যে!
আমার ভেতর আমি কাঁদি
সব হারানোর জন্যে।

৬.
তুমি ও মাহেন্দ্রক্ষণ

তুমি সামনে এসে দাঁড়ালে
খোলা তরবারির মতো সপ্রতিভ
আমার ভেতরে উচ্ছ্বাস যতটা পেখম ছড়াল
তার চেয়ে ঢের বয়ে গেল ঠাণ্ডা স্রোত
যেন হাজার বছরের ইতিহাস ভেঙে
নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মাহেন্দ্রক্ষণ, মুখোমুখি!

সামনে ধাঁধিয়ে আছে পৃথিবীর সব আলো,
তোমার হাসিতে মোনালিসার চেয়েও গভীর রহস্যের ঝলকানি!
আমি বিমূঢ় হতে হতেই সহজপাঠে পড়ে নিচ্ছিলাম তোমাকে
তোমার দু’চোখে কত্থকের মুদ্রা, অভিব্যক্তি ব্যঞ্জনাময়।

আমার চোখে হামলে পড়ল পেঁজামেঘ আর রোদের তির্যক
আমি জমে একাকার অদ্ভুত বিহ্বলতায়।

আমার গাঢ় চোখে ফেললে না কোনো ছায়া
দুর্বোধ্য কবিতার মতো হলাম অবহেলিত
তুমি স্বপ্নের সব রং মুছে
সব কথা, আকুলতা— এক ঝটকায় উড়িয়ে বললে, ‘যাই’!
আমি ভেঙে ভেঙে নদী, নদী থেকে সমুদ্র
অথবা অস্তিত্ব থেকে মহাশূন্য হয়ে যাই।

৭.
অপেক্ষার উপাখ্যান

অবরুদ্ধ আঁধার ভেঙে দাঁড়িয়েছিলাম
হিরণ¥য় আলোয়, পরিণামহীন…
টুক্্রো কাচের মতো কিছু আশা ঝলমলিয়ে ছিল
আলোর মুখোমুখি;
সারি সারি পাখি ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে গেল
দিগন্তের ধ্রুপদী বাঁকে
পথ ও পথিকের
কুহূতানে মাতোয়ারা মৌসুমী হাওয়ায়।

খোলাচোখ ব্যাকুল মুখের মিছিলে
হৃৎতন্দ্রীতে জমে অপেক্ষার বিষ
ভাবি,
আলোর অবগাহনে এলো বুঝি প্রিয়মুখ
সব ধাঁধিয়ে, আমাকে কাঁপিয়ে বলবে
শুরু হোক, প্রেম ও প্রণয়ের পাঠ!

মুখ ও মুখোশের স্রোতে দাঁড়িয়ে থাকি
অনড়, কালের বিদ্রƒপে আঁধার ঘিরে আসে ফের
মাথার উপর নেমে আসে আকাশ
অথচ তুমি আসো না!

৮.
হিরণ¥য় সময়ের ফুল

এই দেখো,
এক খণ্ড আবেগ মথিত হচ্ছে পোড়খাওয়া বাস্তবতায়
ঘুণধরা সামাজিকতা, বিপন্ন মানবিকতার সামনে
মুখ ঘুরিয়ে আছে কবিতা, শিল্পের যাবতীয় পাঁচালী…
সময়ের এই টানাপড়েনে
সামলে রাখো তোমার অন্তর্গত অবদাহন।

মিথ্যে ও মুখোশের মিছিলে মুখরবেলা
স্বপ্ন ও সম্ভাবনার সবটুকু আলো বিকিয়েছে
ভিনদেশী বণিকের হা-মুখী থলিতে
আমাদের চেতনার পিঠে জং ধরিয়ে চুরি করে
নিয়ে যাচ্ছে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ।

অতীত, সে তো
অন্ধকারের কুহেলিকায় ঘূর্ণায়মান্!
এই বৈরী হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ো না শান্তির কপোত।

আজ সাজিয়ে রাখো প্রেম ও প্রণয়ের কথকতা
হৃদয়িক উষ্ণতা…
জেগে উঠো দ্রোহে
ভেঙে ফেল রক্ত পিপাসুর মুখ,
লুণ্ঠনকারী আর স্তবকের লাশের স্তূপে
ফোটাও হিরণ¥য় সময়ের ফুল।

 

৯.
নীলাঞ্জনা

হ্যাঁ, এই এখানেই থামো
গলেপড়া চোখের কোটর
ধুলোয় বিলীন ভাঙা পাঁজর
স্বপ্নগুলোর লাশ ডিঙিয়ে
আমার বুকে নামো।

পায়ে পায়ে দুঃখের নুড়ি
পিষ্ট যত আশার কুঁড়ি
ফেলতে পারো মনের ছায়া
দেখতে পাবে আঁধার, কায়া।
ছোট্ট কোন্ দীর্ঘশ্বাসে
দিতে পারো দামও।

ফিরলে যদি নীলাঞ্জনা
সামলে রাখো অশ্রুকণা
ভাঙা বীণার ছেঁড়া তারে
নতুন সুরে বাজতে পারে
সব হারানোর দহন চেপে
আবার তোমার নামও।

 

১০.
কথোপকথন (দুই)

ঃ কী চাও আমার কাছে?
ঃ জীবনের শুদ্ধতা, স্বপ্নের বিনির্মাণ, প্রায়শ্চিত্তের মন্ত্রণা, পবিত্রতার রং …।
ঃ আমার জানা নেই এসবের স্বরলিপি। বরং ভুল আর বিভ্রান্তির মায়াজালে নিজেই জড়িয়ে আছি। জীবনের ফিকে রঙে আঁকছি মৃত্যুর অবয়ব।
ঃ তুমি ইচ্ছে করেই তোমার চারপাশে অন্ধকারের পেখম ছড়িয়ে রাখো। কবির ধ্রুপদী কল্পনার মতো রহস্যময়। সহজপাঠে তোমাকে বুঝতে চাই সীমাবদ্ধ জ্ঞানে।
ঃ আমাকে পড়ে নাও মানবিক প্রেমে। আমার নিঃসঙ্গ নির্বাসন ভেঙে। বুকে পাতো কান।
শুনতে পাবে অভিশপ্ত রাতের বিষণ্ন বেহাগ।
ঃ আবারো দুঃখের বিলাসিতা!
ঃ না। এ আমার পোড়খাওয়া বাস্তবতার পরাবস্তু অবস্থান।
ঃ তুমি যাপনের যাবতীয় উৎসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ নির্মোহ অভিমানে। শুনতে পাও কি অপার্থিব অবগাহন?
ঃ আমার চোখের কোটরে পাথরের চাঁই রেখে ফেরারী হয়েছে সবুজাভ বসন্ত! আমার কাছে চাইছ কেন ফুল ফুটানো গান?
ঃ তুমিই পারো বিমূর্ত প্রেমে কাটাতে আমার অবেলার অবদাহন।

১১.
ইচ্ছে, আকাশ এবং …

ইচ্ছে করে মাথার ওপর নেমে আসা
আকাশটাকে টেনে, ছিঁড়ে
ঝুলিয়ে রাখি সদর দরোজায়
নক্ষত্রগুলো ঝনঝন করে
গড়িয়ে পড়ুক মেঝেতে;
আমার সবুজাভ দুঃখের লাবণ্য দেখে
চাঁদ লুকিয়ে রাখুক শাদা জ্যোৎস্না!

ছেঁড়া আকাশ ঝেড়ে খুঁজে নিতে চাই
আমার হারানো দীর্ঘশ্বাস—
সমুদ্রের আয়নায় মুখ দেখে দেখে
আকাশটা অহংকারী হয়ে গেছে!
আমার দু’চোখে অন্ধকার চুমো খেলেই
উপহাসের অট্টহাসিতে
মাথার উপর আকাশ ফেটে পড়ে
মৃত্যু পথযাত্রীর উপর শকুন যে রকম!
আকাশের অহংকার দু’পায়ে দলে
সব ব্যর্থতার ক্ষোভ ঝাড়তে চাই।

আমার না বলা কথাগুলোয় লেগে আছে
আকাশের রং, পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে পারিজাত স্বপ;
আকাশ তোমাকে সূর্যস্নান করিয়ে
আমাকে বার বার নিয়ে গেছে মেঘের মিছিলে!

ইচ্ছে করে তোমার সমুদ্রে মুখ দেখে
নিজেই আকাশ হয়ে যাই।

১২.
অভিমান

কাচের মশাল ভাঙুক, উস্কে উঠুক আগুন!
তবু বলব না, ‘তুমি আস না কেন?’
অপেক্ষার পেয়ালায় আর জমব না।

চোখের জলরং জানালা গলে নেমে যায়
পথে, আঁকে নৈঃশব্দ্যের গুমোট মৌনতা
পথ পড়ে থাকুক বিমর্ষ বিলাপে
জনারণ্য থেকে ফাগুনের গুঞ্জন এনে
তোমার জন্য তুলে রাখব না।

আঙিনা জুড়ে ভেঙে পড়ে পাথুরে সময়
রাতের কার্নিসে লেগে থাকে গলিত স্বপ্নের লাভা,
কথার কুঁড়ি অন্তপুরে কেবল ঝরে পড়ে সঙ্গোপনে
আকাশের উপর হাজারো আকাশ ভাঙুক
বুক চিতিয়ে আকাশ ধরে রাখব না।

১৩.
বিনীত প্রার্থনা

সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ো না
সূর্যোদয়ের গানে ভেঙেছে আমার দীঘল ঘুম
এই দেখো, বুকের পাঁজরে
খিলখিলিয়ে হাসছে অবরুদ্ধ বেদনা
ফুটছে স্বপ্নের পারিজাত;
পাখিরা গলা সাধছে বনে
নদীরা ফিরে পেয়েছে যৌবন
কবিতার মিছিলে সময় ছিঁড়েছে দুঃসময়ের শেকল।

আমার আঙিনায় সব সুন্দর মেতেছে ধ্রুপদী গপ্পে
ভোরের ডালিতে খুঁজো না দীর্ঘশ্বাস
স্মৃতির সিম্পনি…
প্রাণের আলোতে আজ প্রাণের ঝিলিমিলি।

কোনো দাবি নেই, দফা নেই
ভালবাসি এবং বাসব বলেই
আমি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি।

সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ো না।

১৪.
পাষাণ পরখ

আমার বুকের পাঁজরে পাথর ঠুকে
পরখ করে নিলে হীরক খণ্ড,
ভাঙাচোরার কতটা দুঃসহ যন্ত্রণা
চেপে রাখলাম, জানতেও চাইলে না;
দু’চোখের দ্যুতি নিয়ে বাড়ালে পাথরের উজ্জ্বলতা
ঝাঁঝাল দুপুরের গুমোট মৌনতার মতো
পড়ে রইলাম নিঃসঙ্গ পথের বাঁকে।

কালের পিঠে লেগে রইল রোদের জলুস,
জোৎস্নার লাবণ্য—
অভেদ্য এক পর্দা টেনে
বিভাজন করে পৃথিবী
সুন্দরের সুষমা খোঁপায় রাখলে গুঁজে।
আমার অগোছাল দিনলিপিতে পেখম ছড়াল
স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার।

তুমি কলহাস্যে ভেতরের আগুন উস্কে
ঝলসে দিলে সজীবতা
নিবিষ্টমনে তুমি নিলে স্বপ্নের রং
আমার সবুজাভ আকাক্সক্ষার আস্ফালন
করতলে বন্দী করে
চলে গেলে বিভাজিত পৃথিবীর উৎসবে।

কতটা নিঃস্ব করে গেলে, জানলে না!

১৫.
শিরোনামহীন

কোনো পারিজাত স্বপ্নদৃশ্যের জন্যে নয়
বসে আছি
হয়তো একদিন এক টুক্্রো দমকা হাওয়া
উড়িয়ে নেবে স্বপ্নভাঙা বেদনার ওপর
জমে থাকা প্রবঞ্চনার ধুলো
সময়ের স্রোতে ভেসে যায় জীবনের ভেলা;
দুর্বোধ্য জটে, বিশৃঙ্খল পঙ্ক্তিতে, ব্যাকরণহীন
কবিতার মতো পড়ে থাকি
ভাবি,
তোমার দীর্ঘশ্বাস হবে আমার শিরোনাম।

পাহাড়ের কান্না থেকে নদী পায় যৌবন
রৌদ্রজলের মুদ্রণে আঁকা হয় রংধনু—
আমি পাই না কিছু, আমার হয় না কিছু
মুঠোভরা আঁধার বুকের ক্যানভাসে মাখি
আকাশের শবদেহ দেখে
ভিজে যায় দু’চোখের শুভ্রতাপ!

১৬.
বেহুলা বাংলাদেশ

গড়ানো পাথরের মতো দু’চোখ থেকে
নেমে গেল লক্ষ বছরের অন্ধকার ঘুম-পাথরের!
ও পিঠের অন্ধকার মুছে, পৃথিবীর এ পিঠে সূর্যস্নানের উৎসব
খরস্রোতা নদী, কবিতার দেয়ালে শব্দ—
ছেনী-হাতুড়ির নিমগ্ন কারুকম সৃষ্টি এবং স্রষ্টা— অবিনশ্বর প্রেম।

আলোকিত পৃথিবী চুমো খায় ভেজাপাতা
লক্ষ বছরের জমে থাকা গোপন অশ্রুকণায়
স্বপ্নের বিনির্মাণ, আর শৃঙ্খল ভেঙে শুরু ঋতুবিবর্তন।
আমার ভেতরে জন্মের আয়োজন।

চোখ মেলে জেগে ওঠে বেহুলা বাংলাদেশ!

১৭.
জলপ্রপাত

হিরণ¥য় এক দর্পণ তুলে ধরে
দেখে নিতে বললে আমার নিজস্বতায়
কতটা রয়েছে ভুলের বিন্যাস, কতটা শিল্পের বুনন—।

চায়ের কাপে সোনারোদ জমিয়ে
মেলে ধরলাম নিজেকে
দেখলাম
ভুলের পালক স্মৃতি-বিস্মৃতির জলে ভাসছে-ডুবছে,
যেন পানকৌড়ির ডুব সাঁতার!

শিল্প যা ছিল তাতে ছোপ ছোপ আঁধার,
গলেপড়া চাঁদের রং লেগে
হারিয়েছে তার শিল্পময়তা
ক্যানভাস জুড়ে বিবর্ণতার উপাখ্যান।

আর দেখলাম
বুকের পাঁজর ভেঙে কীভাবে
নেমে আসছে জলপ্রপাত।

১৮.
অপার্থিব সমর্পণ

না, ফুল নয়, তোমার কাছে তুলে দিলাম
আমার যাবতীয় ভুল
চোখের কার্নিসে জমে থাকা
জলের মুক্তোয় লেগেছে বোশেখের কাঁদা রোদ
মানবিক বোধ পেখম ছড়িয়েছে সৃষ্টির উল্লাসে
তোমার আঁচলার্ণবে তলিয়ে গেল হতাশা, গ্লানি, দুঃখভার…।

আমি ঘুমভাঙা চোখে দেখছিলাম একপশলা আলো
খুলছে বন্ধ দরোজা, পাখির কূজনে ভাঙছে অরণ্য নির্বাসন
ছিঁড়ে যাচ্ছে দুঃসময়ের শেকল
জরাজীর্ণতা আর ব্যর্থতার পাঁচালী উড়ে যাচ্ছে
তোমার হাসির দমকায়,
নিবিষ্ট মনে আঁকছ আমার বর্তমান, নিরপেক্ষ রঙে
তোমার হাত ধরেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওঠা
জীবন নিংড়ে তুলে আনা সত্য ও সুন্দর।

আজ কোনো ফুল নয়, তোমার কাছে
হল ভুলের অপার্থিব সমর্পণ
তুমি ছুঁয়ে দিলেই সব ভুল ফুল হয়ে ফুটবে।

১৯.
এপিঠ ওপিঠ

তুমি যখন আলোর কাচ ভেঙে
খুঁজছিলে অন্ধকারের দ্যুতি
আমি তখন নদীর বুকে কান পেতে
শুনছিলাম গুপ্তধনের নিঃসঙ্গ আহাজারি
তোমার কলহাস্যে ভাঙল পাখির উদাসীনতা
আমি পা ভিজিয়ে নিলাম লাবণ্যহীন বেদনার জলে।

তুমি দু’হাতের চুড়ি ভেঙে
সময়কে দিলে চমকে
আমি আকাশকে বললাম—
‘রংধনুর ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য নিয়ে
অহংকার করার কিছু নেই।’

তুমি হাওয়ায় আঁচল উড়িয়ে
ছায়া দিলে কবিতার নগরীতে
আমি পাহাড়ের গোপন কান্না শুনে
গলা সেধে নিলাম বিলম্বিত রাগে।

তুমি যখন স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পার হচ্ছিলে পথের পর পথ
আমি পথের ধুলো থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম
বলা না বলা কথা, বিনম্র স্মৃতি…।

তোমার খোঁপায় বসল যেই ভোরের প্রজাপতি
আমার চোখে জমে গেল অস্তাচলের রং।

২০.
খণ্ডন উপাখ্যান

তোমার অহংকারের সামনে
আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি না
এ কথা জেনেও, তুমি অহংকারের তরবারিতে
আমাকে খণ্ডিত করো
এ নিয়ে তোমার এক ধরনের অহংকার।

আমারও ছিল রাজ্য, রাজপ্রাসাদ…
সোনার মিহিন সূতোর পোশাক ঝলমল করত গায়ে
উদার হাতে বিলিয়েছি মূল্যবান উপঢৌকন
প্রতিটি ভোর শুরু হতো হাজারো স্তবকের বন্দনায়…
তোমার জন্যে একদিন ছেড়েছি সব
ছুড়ে ফেলেছি সোনার পোশাক
ভেতরের নিঃসঙ্গতার হাহাকার
ঘুম পাড়িয়ে রাখতে তোমার কাছে ছুটেছি নিশি-দিন
দুর্গম পথে রক্তাক্ত হয়েছে কোমল পা
তুমি বুকের ওড়নায় দিয়েছ বেঁধে আমার পা
চোখের সামনে একেকটা পাহাড় নদী হয়ে গলে পড়েছে
আমি অনায়াসেই সঁপেছিলাম নিজেকে তোমাতে…।

তোমার চারপাশে এখন নক্ষত্রের ঝিলিক,
কেউ কেউ ঝাঁপ দিতে চায় তোমার অহংকারের আগুনে
তুমি সকলের কেন্দ্রবিন্দু,
নিজের দীনতায় তোমাতে খুঁজি আজ
আমার স্বরলিপি
আর তুমি অহংকারের তরবারিতে আমাকে কেবল খণ্ডিত করো!

২১.
হিসাব-নিকাশ

তোমার থাকুক অট্টালিকার সারি
গাড়ির বহর, মদের আসর, হাত বাড়ালেই
অপ্সরী বা রহস্যময় নারী,
সোনার মডেল, করতালি
চাটুকার ও ফুলের ডালি
বিত্ত এবং বিলাসিতা…
দিনে দিনে বাড়ুক খ্যাতি, যশ।

জীবন থেকে জীবন ফেলে
হিসাব কষো, কী-ই বা পেলে
মৃত্যু অমোঘ, হয় না যে তা বশ!

আমার কিছু নাইবা থাকুক
বুক ভরে নিই শ্বাস
মাথার ওপর বন্ধু হয়ে
আছে নীলাকাশ।

২২.
নশ্বর দেহের অবিনশ্বর পবিত্রতা

সত্যের শুভ্রতায় মেখেছ কি ভুলের সন্তাপ?
নিজের ভেতরে জেগে উঠি নিজে
হাজার বছরের অন্ধকার ঘুম ভেঙে
জোৎস্না প্লাবিত মাতাল রাতের ঘুম ভাঙানিয়া গান
আমাকে জাগায় ঐন্দ্রজালিক জাগরণে
স্বরলিপি খুঁজে পায় তন্দ্রাতুর না বলা কথা!

তোমার পথে কি বসন্তের সবুজ পাথেয় হয়েছে
নতুন স্বপ্নের বিনির্মাণ?
ভাদ্রের গুমোট কান্নার রঙে বিরহ লাবণ্যময় অনুচ্চারিত বেদনা
নগরবালিকার মেকী প্রসাধনের মতো উজ্জ্বল
মধু পূর্ণিমার এই মায়াবী রাতে সাজাই থরে থরে
স্মৃতির পারিজাত,
জীবন্ত হয়ে ওঠে এক খণ্ড প্রেমের একপশলা আগুন!

পুষে রাখা আগুনের রোমান্টিক দ্রোহে
ফের খুঁজে পেতে চাই তোমার
নশ্বর দেহের অবিনশ্বর পবিত্রতায়।

 

২৪.
বিষের পেয়ালায় সমুদয় ফুল

হারাতে হারাতে সব হারিয়ে
স্মৃতির চোরালোকে নিজেকে তাড়িয়ে
নতমুখে দাঁড়ালাম ফের।
দেখে নিই—
জীবনকে ঘষে ঘষে টানা হল কতটুকু জের !
বিষের পেয়ালায় সাজিয়েছে কে সমুদয় ফুল?
বোধের পিঠে ছোবল মারে কতিপয় ভুল।

নিজের ভেতরে নিজেকে হল ঢের খোঁজা
ভারবাহী লাগে স্বপ্নের শব, জীবনের বোঝা
হাজার বছরের আঁধার ঝেড়ে
সমকাল থেকে মহাকাল নেড়ে
কিংবা ধ্রুপদী স্বপ্ন কেড়ে
আলোর ফোঁটায় হতে চাই লীন
সৃষ্টিশীলের পেখম তুলে
আসবে কি কোনোদিন?

২৫.
শাপ সমাচার

সবকিছু ধাঁধিয়ে তুমি সামনে দাঁড়ালে
প্রতিমার মতো, সপ্রতিভ।
আমার জন্মান্ধ চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল মণি
যেন হাজার বছরের
মৃত্যুশয্যা থেকে লাফিয়ে দাঁড়াল লখিন্দর।

প্রবঞ্চনার ক্রুশ খসে পড়ল
হাত, পা, বুকের পাঁজর থেকে
অনড় হয়ে চেপে থাকা পাথরের চাঁই পড়ল গড়িয়ে
এই প্রথম মাথা তুলে দাঁড়ালাম আকাশ সরিয়ে—
দেখলাম,
তোমার হিরণ¥য় আলোয় কেটে গেছে অন্ধকারের কুহেলিকা!
আমার কণ্ঠনালীতে জমে থাকা বিষ, অমৃতের ধারা হয়ে নামল
বাকরুদ্ধ কণ্ঠ ফিরে পেল প্রাণ কথা-কাকলীতে
গলিত স্বপ্নগুলো জ্বলে উঠল হীরক খণ্ডের মতো!
আমি হতবিহ্বলভাবে তোমার এই অবাক উপস্থিতিকে
প্রণতি জানালাম যেই—
তুমি খিলখিলিয়ে মিলিয়ে গেলে এক লহমায়!
আমার শাপ মোচন হলেও রয়ে গেল ভালবাসার দায়
তুমি কি আসবে ফের অপার্থিব ভালবাসায়?

২৬.
হিরণ¥য় বিকেলের খোঁজে

দুঃসময়ের ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছিলাম
একটি হিরণ¥য় বিকেলের খোঁজে,
দুঃখগুলো ফুল হয়ে ফুটে রইল পথের দু’ধারে
যেতে যেতে
স্মৃতিগুলো কলহাস্যে কিশোরী-বালিকার মতো
খিলখিলিয়ে নীল নদীতে দিল ঝাঁপ
তা দেখে আকাশ এলো নেমে
পথের ধুলি উড়ল দীর্ঘশ্বাসে।

আমার দু’চোখে চুমু খেল একতাল অন্ধকার!
স্বপ্নগুলো লাবণ্য হারিয়ে হয়ে গেল অচল পয়সা।
আমি ভেঙে যেতে যেতে
ক্ষয়ে যেতে যেতে
ঝরে যেতে যেতে
হাতড়ে খুঁজতে লাগলাম,
আমারই স্পন্দন তুমি একঝলক আলোর দ্যুতিতে ঝলসিয়ে
আমার সামনে খিলখিলিয়ে ভেঙে পড়লে হঠাৎ!

আমার গোপন বেদনার সোনালী আগুন ছুঁয়ে বললে—
‘এ তো নরম জোৎস্না’!
মুহূর্তেই আমি সবুজ হয়ে গেলাম।
দেখি, হিরণ¥য় বিকেল জমেছে তোমার খোঁপার ফুলে!

২৭.
উৎসর্গ

তোমাকে দেব সবুজ বিশ্বাস, অবুঝ অভিমান
নিতে পারো প্রাণের স্পন্দন
যদি চাও
স্নান করতে দেব বুকের গহীনে বেদনার নদীতে
তোমার নামে উৎসর্গ করে দেব দুঃখের নক্ষত্র
দীর্ঘশ্বাসের ব্যঞ্জনা।

স্বপ্নিল অনুভূতি চাও, আকাক্সক্ষার বীজ?
দেব তা-ও, এই নাও আপ্লুত আবেগ,
যেকোনো সময় দখল করে
নিতে পারো ভাবনার আকাশ;
তুমি চাইলেই উদার হাতে বিলাতে পারি
সুখের বৈভব, স্বপ্নের বিলাসিতা…।

তোমাকে সমস্ত উজাড় করে দিয়ে
আমি হতে চাই পরিপূর্ণ।

২৮.
হৃদি-করাঘাত

পথের নিঃসঙ্গতা ভেঙে যেতে যেতে
নক্ষত্রগুলোকে খুচরো পয়সার মতো
রেখে দিলাম পকেটে,
কুঁড়ির পাপড়ি মেলার আয়োজন দেখে
ভাবলাম, তোমার না বলা কথা
আজ কিনে নেব নক্ষত্রের দামে।

আকাশ জ্বেলেছে চাঁদের লণ্ঠন
জ্যোৎস্নালোকে ভেসে যাচ্ছে চরাচর
যেন আমার আকাক্সক্ষার রেশ নিয়ে
রাত হয়েছে মাতোয়ারা!

রাত জাগানিয়া পাখির কাছ থেকে
চেয়ে নিলাম ঘুম ভাঙানিয়া গান,
তোমার নিদ্রাতুর ঘরের বারান্দায়
ভাসাব সুরের লহরী।

নদীর তীরে ঝোপঝাড়ে
দুরন্ত বালক যেভাবে খোঁজে
গাঙচিলের ডিম, আজ
সেভাবে তন্নতন্ন করে খুঁজব
তোমার গোপন দীর্ঘশ্বাস।

অভিমানের নরম দরোজা খুলে
তুমি শুধু ছুড়ে দিয়ো
একটি হাসির স্বর্ণমুদ্রা!

২৯.
অবুঝ অহংকার

অভিমান যেমনি ছিল
তেমনিই পড়ে রইল বেদনার অতল সমুদে
আবারো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল
তোমার মসলিন উপহাস, হলুদ অবহেলা।

স্মৃতির সবুজাভ বুক চিরে
আমি হাতড়ে বেড়ালাম স্বপ্নের খণ্ডিত হীরক!
হাতের মুঠোয় অন্ধকার জমে শুধু
চোখের কার্নিসে ডানা ঝাঁপটায় বিরহের গোপন অশ্রু।

সময়ের দুঃশাসনে লণ্ডভণ্ড আজ গোলাপের বন,
ফুল, পাখি, প্রজাপতির উৎসব নেই
যেন সব নির্বাসনে গেছে!
অভিমান গুম্রে কাঁদে শুধু
পেখম ছড়িয়ে থাকে তবু তোমার অবুঝ অহংকার।

৩০.
নীলখামে দুঃখের গান

তোমার একটি মাত্র দীর্ঘশ্বাসে
শ্বেত পাথরের সুরম্য প্রাসাদ
তলিয়ে গেল অন্ধকার গহ্বরে,
আলোর ঝাড় ভেঙে খান খান!
সুবাসিত জলের পদ্মপুকুর উল্টিয়ে
রক্তের স্রোত নেমে এলো
প্রাসাদের গা বেয়ে—
যেন অভিশপ্ত নগরীর গোপন কান্না!

তোমার একটি মাত্র দীর্ঘশ্বাসে
ফুলের কুঁড়ি আর ফুটল না বসন্তের ডালে!
মৃদু হাওয়ায় দোল খেয়ে ঝরে গেল ফুলদল।
সবুজ পাতারা শোকের আচ্ছন্নতায় বিবণ—
নির্বাসনে গেল বৃষ্টিপাত!

তোমার একটি মাত্র দীর্ঘশ্বাসে
আমার কবিতা তীরবিদ্ধ হয়ে পড়ে রইল
তোমারই বাড়ির নিঃসঙ্গ বারান্দায়!
আকাশ জ্বালল না নক্ষত্রের পিদিম
চাঁদ লুকাল অমাবস্যার আড়ালে
এই প্রথম প্রাণ খুলে কেঁদে উঠল ঝিনুক…

আমার চোখের কোণে জমল কয়েক ফোঁটা মুক্তো!

৩১.
অরক্ষিত বেদনা

তোমার অবহেলার নিবিড় আলিঙ্গনে
জড়িয়েছিল আমার অরক্ষিত বেদনা
তোমার মনের নদী তার পাশ ঘেঁষে
বয়ে গেল খরস্রোতে, বেদনার দীঘল ঘুম ভাঙিয়ে।

কোনো এক পাখি ডানা ঝাঁপটিয়ে
সরাল ধূসর শূন্যতা
কণ্ঠে তুলল বসন্তের বন্দনা
উৎসবের সাড়া পাওয়া গেল বনে,
তোমার না বলা কথা কি ভেবে ঝনঝন করে
গড়িয়ে পড়ল বুকের অবরুদ্ধ খাঁচা ভেঙে।

তুমি ছিলে পাহাড়, এখন পাহাড় গলে নদী!

আমার অরক্ষিত বেদনা নামল
যেই নদীর জলে হয়ে গেল পাথর-ফুল!

৩২.
আগুন চোখে পাথর বুক

নিখুঁত পরিহাসে
তুমি দু’চোখে জ্বাললে আগুন!
যন্ত্রণার বিলাপ তুলে
আমাকে তাড়া করল এক অসম্পূর্ণ ছায়া।

ফিকে রং বিকেল যে রকম জমে যায়
গোধূলির পেয়ালায়,
আমিও ডুবে গেলাম তেমনি ধূসর শূন্যতায়।
মেঘের মলিন পর্দা টেনে আকাশ লুকাল বিষণ্ন অন্ধকারে
মনের দরোজায় আছড়ে পড়ে গুমোট কান্না
পাপড়িহীন বৃন্তের মতো মনে হয় এ জীবন।
সময়কে চুমো খেল দুঃসময়ের কালো ঠোঁট
স্মৃতিরা নতমুখে দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে
স্বপ্ন কাঁদল বিপন্নতায়।
আমার বুকে পাথর হয়ে চেপে রইল
এক-তাল বন্যবেদনা!

৩৩.
পথভোলা বসন্ত

তোমার চোখের ক্যানভাসে
এঁকে দিলাম জলরঙের কবিতা
তা দেখে গুমোট দুপুর বিষণ্নতা ঝেড়ে
জমে গেল রোদের পেয়ালায়
একঝলক হাসির বিদ্যুতে ফাটল যেই তোমার দু’ঠোঁট
কয়েক টুকরো অচেনা আগুন দীর্ঘশ্বাসের আড়াল থেকে
বেরিয়ে এসে নামল আমার মনের নদীতে
কে যেন খুলে ফেলল অভিমানের খাম
গড়িয়ে পড়ল না বলা সব কথা।

তোমার মনে ছাউনিতলে
হয়তো র্ছিল পথভোলা এক বসন্তরাজ,
আমার না বলা কথা ফুল হয়ে
আজ সাজিয়ে দিল বসন্তকে
তাই তোমার চোখের ক্যানভাসে আঁকা
জলঙ্গের কবিতার শিরোনাম হল ‘পথভোলা বসন্ত’।

৩৪.
উপেক্ষার দেয়ালে

তোমার হাসির দমকায় ভেঙে যায়
বেদনার কারুকাজে সাজানো
আমার বোধের মন্দির।
বুকের রাজপথে নামে কষ্টের মিছিল
স্বপ্নের ভগ্নস্তূপে নড়ে চড়ে ওঠে খণ্ডিত টেরাকোটা!
যে কথাগুলো মনের উঠোনে এঁকেছিল
ধ্রুপদী নাচের মুদ্রা
তারা পাথুরে প্রতিমার মতো হল স্তব্ধ
শেষ বিকেলের আকাশে ঘুমিয়ে পড়া নীল পাহাড় যেন!

আমার আকাক্সক্ষার সোনালী পালক ছিঁড়ে নিয়ে
সাজাও তোমার অহংকারের মুকুট!
সময়ের হাত ধরে একটি স্বপ্নিল দিনে
পৌঁছাব বলে যখনি আয়োজন করি
আত্মনিবেদনের পূজো
তুমি মনের অর্ঘ্য দলিত করে যাও
নির্মম পরিহাসে!

৩৫.
অদৃশ্য ছায়া

তোমাদের মতো আমিও উৎসবে মতোয়ারা।
গান, আবৃত্তি, গল্পে বা ঠাট্টায় আমিও বিগলিত হই।
বিমোহিত হই—
সুন্দরী নারীর টোলপড়া গালে যখন কবিতা হারায় পথ।
ছয়টি ঋতুর রূপের বৈচিত্র্যে আমিও হই হারা।

বৃষ্টির গানে, নদীর কল্লোলে, পাখির সমবেত সঙ্গীতে
আমিও আমার সাথে নিমগ্ন হই ধ্যানে
পেখম ছড়িয়ে নাচে ভাবের ময়ূর
তখন তার সাথে আমার হয় কথোপকথন।

চোখের জলে আমিও দুঃখের নৌকো ভাসাই
পথের বিভ্রান্ত বাঁকে বিচলিত হই
বুক চিতিয়ে ঝড়ের আঘাত ঠেকিয়ে ঘরে ফিরি, ফের
সময়ের ক্যানভাসে রঙের টোন আঁকি ঠিকঠাক
তবু আমায় অদৃশ্য ছায়া করে তাড়া!
বুকের ভেতর চেপে বসেছে এক অচেনা পাথর
ভেতরে শুধু রক্তক্ষরণ,
ভালবাসার ধ্রুপদী আসর
গোপন ব্যথার সাড়া।

৩৬.
বন্ধ দরোজায় বসন্ত পথিক

তোমার বন্ধ দরোজায়
এটাই আমার শেষ করাঘাত—
যদি না খোল মনের অর্গল
যদি না ভাঙো পাষাণ পাথর,
যদি দু’হাত বাড়িয়ে না ডাকো,
আমি ফিরে যাব অচেনা পথে
দুঃখের নুড়ি কুড়াতে-কুড়াতে;
ভুলে যাব বন থেকে ভোরের পাখি গেয়েছিল গান,
শিখিয়েছিল জীবনের স্বরলিপি।

তোমার বন্ধ দরোজায়
এটাই আমার শেষ করাঘাত—
যদি না খোল মনের অর্গল
যদি না ভাঙো পাষাণ পাথর,
যদি দু’হাত বাড়িয়ে না ডাকো,
গোপন বেদনার কালো মেঘে
ঢাকা পড়বে কবিতার আকাশ।
নিজের ভেতরে নিজেরই হবে নির্বাসন দণ্ড!
আমার আকুলতা দু’পায়ে চেপে ভাবছ কি
শিল্প ও প্রেম অচল পয়সার মতো অপাংক্তেয়?

তোমার বন্ধ দরোজায়
এটাই আমার শেষ করাঘাত—
যদি না খোল মনের অর্গল
যদি না ভাঙো পাষাণ পাথর,
যদি দু’হাত বাড়িয়ে না ডাকো,
রেখে যাব দুমড়ানো মুচড়ানো হৃদয়ের
এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস।
বসন্ত পথিক হয়ে
একদিন তোমার ঘরে ঢুকবেই…।

৩৭.
গন্তব্যে যাত্রা

দেয়াল ভাঙতেই দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়
ধ্বংসস্তূপ নিয়ে পড়ে থাকে পেছনের পথ
আমি যেন বিড়ম্বিত ক্রীতদাস
উঠে আসি ইতিহাসের অন্ধকার ঠেলে।

আমার করতলে জমে আছে
হাজারো রাত্রির বিলাপ
প্রজাপতি হয়ে উড়ে গেছে দিনগুলো
অলক্ষ্যে সময়ের চাকা আটকে গেছে কি—
দুঃসময়ের গহ্বরে?

আমি ভোরের ক্যানভাসে আকাক্সক্ষার
সবুজ রং ঢালতেই, দেখি—
পর্দা নেমে আসে মঞ্চের
অস্তাচলে হারিয়ে যায় কুসুম কথা, রোদেলা স্মৃতি…
স্বপ্ন বিনির্মাণে ভেঙে যায়— মোহন বুকের পাঁজর।

তোমার কাছে পৌঁছাব বলে
আমি দাঁড়াই ফের,
ক্লান্ত দু’পা বাড়াই
জানি, আমার প্রার্থনারত আত্মাকে
সূর্য একদিন বলে দেবে তোমার ঠিকানা।

৩৮.
বিস্মৃত প্রতিশ্রুতি

আমার তেরোটি বসন্ত খোঁপার কাঁটায়
বিদ্ধ করে তুমি খিলখিলিয়ে মিলিয়ে যাও
নতুন পথের বাঁকে!
ভাংচুর আর তোলপাড়ের মধ্য দিয়ে
পথের উপর পড়ে থাকে ধ্বংসস্তূপ।

তোমার ধ্রুপদী অহংকারে মরা আকাশে
জ্বলে চাঁদের লণ্ঠন, নিঃসঙ্গ নক্ষত্র
দেখে জোনাকীরা কেমন আছে নির্বাসনে
ভাঙা ডানা ঝাঁপটায় পাখি
সরে না অন্ধকারের পাথর তীব্র স্মৃতিগুলো
বিভ্রান্ত হয়ে ভাসতে থাকে সজল চোখের তারায়
বর্ষার জলে ভাসে যেন কাগজের নৌকো।

বেদনার কুয়াশাঢাকা দিগন্ত দেখিয়ে একদিন বলেছিলে—
ওখানে বসে ভোরের জলরঙে আঁকবে
না বলা কথার নিলাজ মুখ আর আমার গোপন দীর্ঘশ্বাস
তুলে নেবে অস্তাচলের লাল রুমালে
দেবে ঘাসফড়িংয়ের মতো একরাশ স্বপন,
মনের জমিনে করবে লাফালাফি যখন-তখন।

প্রতিশ্রুত কথার গলিত লাশ
এখন আমার বুকের পাঁজরে, চোখের কোটরে…।

৩৯.
পুষ্পযাত্রা

তোমার জন্যই এই পুষ্পিত পথ
নিঃসংকোচে রাখো কোমল পা
পাখিরা সমবেত সঙ্গীত গাইবে এখনি
পা বাড়লেই— পৌঁছে যাবে বিষণ্ন দিগন্তে।

সকালের কাঁচারোদ, ভাতঘুম দুপুর, জ্যোৎস্নাস্নাত রাত
সব তুলে রেখেছি তোমার জন্যে,
স্বপ্নের ছোপ ছোপ রং, ভাবের ময়ূরী পেখম
নান্দনিক উৎসব দিয়েছি সাজিয়ে
তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে হুমড়ি খেয়ে পড়বে
সত্য ও সুন্দর,
তোমার বন্দনা ছাড়া পৃথিবীর আজ কোনো কাজ নেই
প্রকৃতি সেজেছে সম্মোহিত সৌন্দর্যে।

দু’চোখের অশ্রুকণায় ভিজিয়ে দিয়েছি পথ
বাতাসে দিয়েছি আবেগের রেণু ছড়িয়ে
ইচ্ছে হলেই আকাশ ছুঁতে পারবে,
পেছনের কথা পেছনে থাকুক পড়ে
উচ্ছন্নে যাক চাওয়া-না পাওয়ার সাতকাহন
আমার বুকে তোমার দু’পা নামুক
চেপে রইলাম অবেলার অবদাহন…।

৪০.
মুখ ও মুখোশ

অদ্ভুত সূর্যোদয়ে খুলে গেল সে এক গুপ্ত কুটির
হাজার বছরের অন্ধকার এক লহমায় উধাও,
ছড়ানো ছিটানো অব্যক্ত কথার নুড়ি
অনুচ্চারিত বেদনার পাথর
নতুন আলোর স্রোতে দিগি¦দিক ভাসমান।

হরেক তন্ত্রের বেত্রাঘাতে নুয়েপড়া শরীর
ঘুরে দাঁড়াল ফের, নতুন দিনের অবগাহনে
গলেপড়া অস্থিমজ্জায় বুনে কেউ পুষ্পের বীজ
স্বপ্নের জলরঙে ভিজে একাকার দুঃখের লাবণ্য।

জলপাই রঙের বিধি-নিষেধ পুড়ে খাক
দ্রোহ ও প্রেমে তুমুল প্রকম্পিত বুকের পাঁজর
ইতিহাসে ফিরে এলো আমাদের দিনলিপি,
এই দিনে চিনে নেব প্রিয়জনের মুখ
খুলে দেব হায়েনার মায়াবী মুখোশ।

৪১.
নীলকণ্ঠের বিষ

গুমোট মৌনতা ভেঙে বোশেখের দমকা হাওয়ার মতো
হঠাৎ এলো তোমার টেলিফোন,
বিরহী উপাখ্যান ফেলে কেঁপে ওঠে দৈনন্দিন জীবন
যেন অবরুদ্ধ দুঃখগুলোর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল
এক ঝলক রোদ্দুর,
বেদনার স্যাঁতসেঁতে গা থেকে কেটে গেল মলিনতা
অভিমান নদী হয়ে একাকার…!

মধুর কণ্ঠের নির্যাস ঢেলে বললে—
‘হ্যালো….’
যেন সময়ের এই বিন্দুতে আটকে গেল বিমোহিত মহাকাল!
‘কেমন আছ?’
এর জবাব দিতে জমে যায়— আমার নীলকণ্ঠের বিষ!

৪২.
অসম্পূর্ণ প্রতিবিম্ব

মেঘের শরীরে খুঁজে অতৃপ্ত দহন
ফের রোদের পেয়ালায় পান করো বিষাদের অমৃত,
তুমি কি বর্ষার যৌবনে জীবনের ক্লেদ ধুয়ে
রোদেলা আকাশে আঁকতে পারো না স্বাপ্নিক ব্যঞ্জনা?

প্রেম ও অপ্রেমের অচল কাব্য ফেলে,
এস, সচল গদ্যের নান্দনিক নির্মাণে
চোখের কার্নিসে জমে থাকা শিল্পিত জলে ভিজিয়ে দাও
অস্পষ্ট মুখ, সৃষ্টিশীল হোক দেয়ার দাম্ভিক গর্জন
বৃষ্টির রং, রুদ্রালী খুনসুঁটি বা দমকা হাওয়ার মাতম…।

৪৩.
অনুরোধ

একবার ফিরে তাকাও
শুধু একবার দৃষ্টির সীমানায় দেখবে
শ্রাবণভেজা এক মুখ অনুচ্চারিত বেদনায় ভাষামূক!

অর্ঘ্যরে ফুল, দলে হয়ো না পাষাণ পথিক।

সব কথা হয়ে গেছে—
অভিমানী মেঘ, স্বপ্নেরা উড়ে গেছে সীমারেখা ভেঙে
প্রণয়-প্রলাপ বাজবে কেন প্রাণে?

শুধু একবার পেছনে তাকাও
দেখো বিবর্ণ বৈশাখে লণ্ডভণ্ড স্মৃতির পারিজাত
ফুল, পাখি, পাহাড়, নদীর গান…
থেমে গেছে সমকাল বৃন্তে
তবু বুকের ভাঙা পাঁজরে
হামাগুড়ি দেয় এক দ্রষ্টা
বিনির্মাণের মন্ত্রে।

৪৪.
বিষ-অমৃতের সাতকাহন

সময় বা সুসময় কোনোটাই দেয় না ধরা
লাগাতার চেপে আছে অনড় দুঃসময়
রক্তাক্ত হই অহর্নিশ
আমার ছায়া ছড়ায় নিখাদ বিষ!

চোখের সমুদ্দুর ভাসাল কত কথা
আকুলতা, আস্ফালন
দীর্ঘশ্বাসে কাঁপাল পৃথিবীর যাবতীয় আয়োজন,
তবু হল না ঠাঁই কোনো ধ্রুপদী স্বপ্নের আদি বা অন্তে
গুমরে কাঁদি সীমারেখার প্রান্তে।

বিষণ্ন পথে হল চলা ঢের
হিসাবের খাতায় শূন্য, অনেক জের
জীবন ঘষেই জীবনের পদাবলী মেলে
সবকিছু ফেলে
তোমার আলোকিত আঙিনায় এসে দাঁড়ালাম…

তুমি ছুঁয়ে দিলেই হবে শাপমোচন
অমৃত হব কালের পেয়ালায়।

৪৫.
অবেলার অবদাহন

অন্ধকার ভেঙে ভেঙে সঞ্চিত করেছি
যেটুকু আলো ও আলোর ভেতরের আলোড়ন
তার সবটুকুই তোমাকে দিলাম,
তুমি বললে, ‘অন্ধকারের কুহেলিকা!’

সীমান্তে জমে থাকা কুয়াশার রঙে
বিরহের বিনম্র মুখ এঁকে
তুলে দিলাম দূরাগত স্বপ্নের লাগাম,
তুমি বললে, ‘ভ্রান্তি বিলাস!’

পথ থেকে পথে, পাথেয় হয়েছে
যা প্রেম ও পবিত্রতা আগলে
তোমার জন্যে সাজালাম
অপ্রার্থিব আয়োজন,
তুমি বললে, ‘অবেলার অবদাহন!’

৪৬.
বৃষ্টি ও প্রেম

বৃষ্টিতে ভিজব বলেই মেঘের সাথে সখ্য করি
আকাশের সাথে শত্রুতা
নির্মোহ প্রেমে ঝমঝম করে নেমে আসে
বিরহ কাতর মেঘ,
নিছক অভিমানে আকাশ কেঁদে একাকার
বৃষ্টিতে ভিজে হয়ে যাই জলছবি।

আকাশের অবিরল কান্নায় ধুয়ে মুছে যায়
ক্লান্তি, ক্লেদ, গ্লানি, দুঃখের উষ্ণতা
গোপন বেদনা পেখম ছড়িয়ে নাচে
গলা সাধে স্বপ্নাতুর স্মৃতি।

একটু প্রেমে ভাসব বলেই তোমার
মনের অন্তঃপুরে মনের আলো ফেলি
দ্রোহ ছাপিয়ে চলে রোমান্টিকতার হুলস্থূল,
ভাবি, আমার প্রণয়মুখী প্রাণে
হবে তোমার প্রাণের সম্মিলন,
আমার যত পাপ ও আঁধার ধাঁধিয়ে যাবে পবিত্রতায়

তুমি কি বৃষ্টির মতো আমাকে ভিজাবে
ভাসাবে প্রেমের অবিনশ্বর স্রোতে?

৪৭.
প্রেম-সাহস-দ্রোহ

অনেক হারানোর পর যখন আর
কিছুই হারানোর অবশিষ্ট নেই
তোমার সাথে হল তখন দেখা।

শত ছিন্ন হৃদয় আর দু’চোখে স্বপ্নভাঙার
নিকষ-কালো আঁধার নিয়ে জীবনের পথে চলছিলাম পথভ্রান্ত
সব অবলম্বন হারিয়ে বঞ্চনা ও প্রবঞ্চনার দাবানলে পুড়ে
কুহেলিকায় নিজেকে তাড়িয়ে ছিলাম ক্লান্ত…

যখন নিন্দাঝড়, অবহেলা, শ্লেষে জর্জরিত
আমার পাশে কেউ নেই দাঁড়াবার
ঠিক তখনি তুমি আমার পাশে দাঁড়ালে।

আমার চারপাশে মিথ্যে ও মুখোশে ঠাসাঠাসি
দুর্বৃত্তরা চুরি করে নিয়ে গেছে সময়
স্বপ্ন ও সব সম্ভাবনা!
যখন দুঃস্বপ্ন ও হতাশার তিমিরে ডুবে যেতে যেতে
হাতড়ে খুঁজে পাচ্ছিলাম না ভিত ও শেকড়ের সন্ধান
শেষ পরাজয়ের শেষ ক্ষণে এসে তুমি
আমায় জাগালে— ঘুরে দাঁড়ানোর দ্রোহে।

৪৮.
ইচ্ছে

ইচ্ছে করে— তোমার জানালায় রিমঝিম বৃষ্টি হয়ে
মুখর করে রাখি সারাবেলা
দমকা হাওয়া হয়ে
তোমার চাপা দুঃখগুলো উড়িয়ে নিই বিরহকাতর দিনে।

ইচ্ছে করে— তোমার চলার পথে দিগন্ত হয়ে
সুনীলাকাশ নামিয়ে আনি বুকে
পায়ে পায়ে সাজিয়ে রাখি পুষ্পবন্দনা
তোমার ডানে ও বাঁয়ে আমার অব্যক্ত কষ্টগুলো
থাকুক সুশোভিত, সুপ্রতিভ
তোমার কথার ঐশ্বর্য নিংড়ে
বেদনার্দ্র প্রিয় কথার কুঁড়ি
ফুটিয়ে দিই প্লেটোনিক প্রেমে।

ইচ্ছে করে নিজেকে ভেঙে ভেঙে
তোমাকে নিই গড়ে
তাজমহল বানাই বুকের পাঁজরে
অথবা তোমার অশ্রুকণায় হয়ে যাই
কালোত্তীর্ণ কোনো কবিতা।

৪৯.
প্রশ্নবাণে বিদ্ধ

কাতর কণ্ঠে বললে—
‘কতটুকু ভালবাসলে পরিপূর্ণ হওয়া যায়’?
তোমার জলভরা চোখ
নদী হয়ে নামল বুঝি শ্রাবণ বন্দনায়।

আমি প্রশ্নটির জবাব খুঁজতে যেয়ে ডুবে যাচ্ছিলাম
তোমার চোখের সমুদ্রে
আশংকার ঢেউ নয়, আত্মজিজ্ঞাসার জলোচ্ছ্বাসে
হলাম বিপন্ন, জাগতিকবোধ থেকে বিস্মৃত।

হাত বাড়ালেই মুঠোমুঠো আলো
স্বপ্নের অনুরণ, প্রণয়ের বিহ্বলতা
অথবা ভালবাসার খুনসুটি নিয়ে হওয়া যায় কি পরিপূর্ণ?
নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকি ভাবুলতায়।
প্রশ্নের ঘূর্ণনে ভেঙে যায় ধ্যান
উল্টে পড়ে কষ্টের পেয়ালা
ভেতরের চাপা হু-হু কান্না
এক দমকায় অশ্রু হয়ে নামে
নিজেকে সামলে, আমাকে আঁকড়ে বললে—
‘এইতো পরিপূর্ণতা’!

৫০.
আপেক্ষিক অপেক্ষা

অনেকদিন হল তোমার দেখা পাই না,
আসে না টেলিফোনও
হৃদি-উত্তাপে প্রহর গুনে গুনে হলাম ব্যাকুল…
চোখের কার্নিস থেকে লাফিয়ে নামে
ফোঁটা ফোঁটা অভিমান,
বুকের পাঁজরে মিহিন ভাংচুর
ব্যস্ততা বা অবসরে, নিদ্রা বা জাগরণে
একটি প্রশ্্নই খুঁচিয়ে মারে—
তুমি কি এতই ব্যস্ত সাংসারিক জীবনে?

কথা ছিল, একহাতে সংসার সামলাবে
অন্যহাতে আমাকে নাড়াবে তুমুল,
আমার অবুঝ ইচ্ছেগুলো ছুঁয়ে যাবে আলতোভাবে
স্বপ্নগুলোর পথে ছড়াবে তোমার স্বপ্নের রেণু।

চাইলে, চুরি করা সময়ে ডিঙাবে নিষিদ্ধ সীমানা
সৃষ্টি ও সৃষ্টিশীলতায় দু’জনে হব একাকার
ভালবাসার বৃত্তে তোমার প্রতিশ্রুতিকে বিন্দু করে
ভেবে চলেছি পৃথিবীটা বুঝি হাতের মুঠোয়
আমাদের প্রেম মহাকালের নক্ষত্র!
অপেক্ষার প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি
চলে যায় সময়ের ট্রেন,
অন্তর্গত বেদনা চাঙা হয়ে তোলে ঝড়
স্বপ্নগুলোর লাভা বাড়ায় দহন
তবুও তুমি আসো না, নাও না খোঁজ-খবর!

৫১.
তুমি ও অন্তর্গত কষ্ট

তোমাকে মনে পড়ে বলেই কষ্ট পাই
স্মৃতির সাতকাহনে হারিয়ে ফেলি
নিজেকে বার বার,
মুষড়ে পড়ে সময় ও পরাবস্তু বর্তমান।

প্রতিদিন কত কথা, টুকরো আবেগ
ব্যাকুলতায় স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে যাই
কাম ও কামনার কল্পরসে
ভেসে যায় আক্ষেপ-অনুযোগ।

সমর্পণের অর্ঘ্য তোমার সামনে রাখলেই
তুমি কেন জানি নির্মোহ, নিষ্ঠুর হয়ে যাও
আমার আবেগ মন্থিত সব আয়োজনে
ছড়াও উপেক্ষার কাঁটা!

কতদিন তোমার অবহেলাকে
ভালবাসার উল্টো পিঠ জেনে
মেনে নিয়েছি খাণ্ডবদাহন
ভেবেছি, তুমি ও তোমার প্রেম
হয়তো পেরুবে পার্থিব সীমানা।

চাপা অভিমান, স্তব্ধ বেদনা প্রশ্রয় দিইনি,
মনের গহীনে বা গোপন অশ্রুকণায়—
তোমাকে মনে পড়ে বলেই তোমার কাছে ছুটে যাই
তোমাকে ভালবাসি বলেই নিজেকে পোড়াই কষ্টে।

৫২.
আক্ষেপ

হাত বাড়ালেই আকাশ ছুঁতে পারি,
তোমাকে ছুঁতে পারি না!
এতটা কাছাকাছি গিয়ে তোমাকে দেখি
যেন ছুঁয়ে ফেললেই তোমার অস্তিত্ব
নাড়িয়ে দিতে পারি তুমুল,
তুমি কী এক নির্মোহ রহস্য ছড়িয়ে
তুলে রাখো অদৃশ্য দেয়াল,
আমি এই দেয়ালে আছড়ে পড়ে বার বার ফিরে আসি
চূর্ণ হয়ে যাই পারিজাত বেদনায়।

ইচ্ছে হলেই আমি এক লহমায়
পৌঁছতে পারি দিগন্তের সীমারেখায়
অথবা মায়াবী চাঁদে
অথচ তোমার মনের বন্দরে পৌঁছুতে পারি না কিছুতেই।

৫৩.
অদ্ভুদ সূর্যোদয়ে

তুমি ছিলে—
আমার স্বপ্নের ভেতরে ধ্রুপদী স্বপ্ন ছিল
প্রাণে ছিল গানের স্বরলিপি
আকাক্সক্ষার বীজ ছিল ঠাসা
মুঠোভরা ছিল করোজ্জ্বল আলো
দিনলিপি লেখা হতো স্বপ্নাতুর কথামালায়।

তুমি নেই—
আমার বুকের পাঁজরে অনড় চেয়ে আছে
এক খণ্ড পাথর, একপশলা গ্লানি
আমার চোখে মুখে হাজারো রাত্রির বিলাপ
স্বপ্নিল দিনের আস্ফালন।

জানি,
অদ্ভুত এক সূর্যোদয়ে পুড়ে যাবে মায়াবী মুখোশ
তুমি ফিরে আসবে অপার্থিব প্রেমে।

৫৪.
ছেঁড়াপঙ্ক্তি-১

রাশি রাশি ফুটুক ফুল
বনে লাগুক হুলস্থূল!
আমার তাতে কী?
মনের আগুন দিয়ে শুধু
তোমায় পোড়াচ্ছি।

ছেঁড়াপঙ্ক্তি-২

বুকের ভেতর পাহাড় ছিল
এখন ভেঙে পাথর,
পাথর গলে নদী হল
তোমার প্রেমে কাতর।

ছেঁড়াপঙ্ক্তি-৩

আমায় নিয়ে তোমার ভেতর
অন্যরকম বোধ,
তোমার ওপর আমি নেব
এক জীবনের শোধ!

ছেঁড়াপঙ্ক্তি-৪

কথার পাথর জমে,
জমে তা জমাট বাঁধে
আগুন কি আর কমে?
হঠাৎ করে যদি
আগুন তোমায় দেয় পুড়িয়ে,
পোড়ায় মনের নদী।

সাধ্য বল কার
ঠেকায় তখন পাথর ও নদীর একাকার!

ছেঁড়াপঙ্ক্তি-৫

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ুক
গাছেরা কাঁপুক ঝড়ে,
ঝড়ের কাঁপন উঠুক না হয়
তোমার মনের ঘরে।

এ জীবনের যে পথ ছিল
স্বপ্নালোকে আঁকা,
সে পথ আজো তেমনি আছে
গোপন প্রেমে ঢাকা।

৫৫.
শেষ সমর্পণ

আমার শুভ্রমুখমণ্ডল, লোমশ বুক, সমান্তরাল দু’হাঁটু
নিশ্চল পায়ের পাতা…
আজ সমর্পিত তোমার আঙিনায়!
তুমি আমাকে দেখে নাও নিজস্ব অহংকারে।

আমার দু’চোখে আকাশ খুঁজে না পেয়ে
কত আহাজারি ছিল তোমার!
চোখের কার্নিসে লেগে থাকা গুমোট অন্ধকার দেখে
আঁতকে উঠতে অজানা ভয়ে
দেখোনি অনুরাগের কাঁচা রং
আমিও অভিশপ্ত চোখ নিয়ে ছিলাম স্বপ্নবিমুখ
চেয়ে দেখো—
পাথর দৃষ্টিতে আজ শান্তি ও সৌম্যের জলরং।

অজস্র কথা আর গানে
সপ্তসুর বেঁধেছিলে প্রাণে
আমার প্রাণে ছুঁয়ে ছিল সেই পরশপাথর
চেয়েছিলে ভাব ও কথার নান্দনিক সম্মিলনে স্বপ্নের
রেণু উড়বে পথে-প্রান্তরে…
হয়নি কিছুই—
পথ চলা হল ঢের, পরিণামহীন।

আজ সবকিছুর পদটীকা এঁকে
জীবনের সীমারেখা ভেঙে পৌঁছেছি মৃত্যুর ঠিকানায়
শেষ বিদায় জানাবে কি আমায়?

 Back