- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
‘ইরিনা’ নামটি শুনে একটু চমকে গেল অনন্ত। যদিও একই নামে অনেকজন থাকতে পারে, তবু ‘ইরিনা’ নাম খুব বেশি শোনেনি ও। পাশের রুম থেকে অনন্তের সেক্রেটারী ইন্টারকমে জানালো ইরিনা নামে একটি মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। প্রথমে ভেবেছিল ‘না’ বলে দেবে। কারণ, অনন্ত আজ ভীষণ ব্যস্ত। দেড় ঘন্টা পর বোর্ড মিটিং। ও এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখে শেষ করতে পারেনি। নতুন অফিস। অফিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা ঢিলেঢালা ভাব। অফিস গুছানোর কাজ এখনো শেষ হয়নি। কাউকে কোন ফাইল আনতে বললে, অনেকক্ষণ পর এসে হয়তো বলবে, ‘স্যার, কোথায় যে ফাইলগুলো রেখেছি! কাল দিচ্ছি। খুঁজে বের করতে হবে।’ বড় পরিসরের অফিস নেয়া হয়েছে। আগের অফিসের চেয়ে এই অফিসে অনেক বেশি জায়গা। অফিসে প্রবেশ মুখে ওয়েটিং রুমটিও বেশ বড়। দু’সেট সোফা বসানো হয়েছে এই রুমে। অনন্তের রুমটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে চার শ’ স্কয়ার ফুট। ওর রুমে ঢুকলে একটা বিশালত্ব টের পাওয়া যায়। অনন্তের খুব পছন্দ হয়েছে এই অফিস। ব্যবসা বেড়েছে, বাৎসারিক টার্ণওভারও বেড়েছে। ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অফিসও বদলিয়েছে অনন্ত। সাত বছর আগে বনানীতে দু’কক্ষ বিশিষ্ট একটি অফিস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল অনন্তের বাইংহাউজ ব্যবসা। এখন উত্তরায় একটি ভবনের চারতলার পুরো ফ্লোর জুড়ে তার প্রতিষ্ঠান। সাত বছরে ও অনেক এগিয়েছে। অনন্ত কয়েকমূহুর্তে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটু ভেবে নিল। ফাইল দেখার কাজে মগ্ন ছিল। ‘ইরিনা’ নামটি ওর চিন্তার মধ্যে বিজলীর মত ঝলসে উঠলো। প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে লোরে শহরে ‘ইরিনা’ নামের একটি মেয়ের সঙ্গে ওর আকস্মিক পরিচয় হয়েছিল। ‘পরিচয়’ বললে ঠিক বলা হবে না, মেয়েটি রহস্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে ওর সামনে হাজির হয়েছিল। ইরিনার আচরণ ছিল রহস্যময়। অথচ ওর চোখের দৃষ্টি ছিল শান্ত, গভীর এবং পবিত্র। ওর চোখ বলছিল, ওর মুখের কথা একটাও মিথ্যা নয়। অথচ ইরিনা মুখে যা বলছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য! বলা যায়, আধুনিক শহরে গিয়ে অতিপ্রাকৃত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল অনন্ত। সেদিনের ঘটনা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
ব্যবসায়িক কাজে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়েছিল অনন্ত। ওয়াশিংটন ডিসি ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের লগোয়া। এখানে এলে সাধারণত ট্যুরিষ্টরা লোরে শহরের পাহাড়ের গুহা দেখতে যায়। প্রায় তিন শ’ বছর আগে এই গুহাটি আবিস্কৃত হয়। গুহাটি প্রায় নয় শ’ ফুট গভীর। গুহায় বাঁক আছে, খাদও আছে। গুহা জুড়ে শিল্পকর্মের নির্দশনের মত নানা পাথুরে অবয়ব রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় তিন শ’ বছর আগে আদিবাসীরা এই গুহায় বাস করতো। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গুহাটির ভেতরে ইট বিছানো কৃটিম পথ এবং বিভিন্ন স্থানে বিজলীবাতি স্থাপন করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে প্রচুর ট্যুরিষ্ট এই গুহা পরিদর্শন করতে আসে। অনন্তও গুহা পরিদর্শন করেছিল। গুহা থেকে বের হবার প্রান্তিক পথে স্যুভেনির বিক্রির স্টোর থেকে ও একটা দৃষ্টি নন্দন স্কার্ফ কিনেছিল। মেরুন রঙের স্কার্ফটির ওপর নীল রঙেন কারুকাজ এবং মাঝখানে একটি আদিবাসী মেয়ের লাবণ্য উজ্জ্বল মুখ আঁকা ছিল। স্কার্ফটি দেখেই তা কিনে ফেলে অনন্ত। হাতের মুঠোয় স্কার্ফ পেঁচিয়ে ও যখন গাড়ি উঠতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখুনি একটি মেয়ে এসে ওর পেছন থেকে ইংরেজীতে বলল,
‘আমাকে সঙ্গে নেবে না, অনন্ত?’
অনন্ত গাড়িতে না উঠে পেছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটির বয়স ২২ বা ২৩ বছর হবে। গায়ের রঙ ফর্সা হলেও তামাটে রঙের মিশ্রন আছে। মুখের আদল আদিবাসীর মত, চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল। চুলগুলো খোঁপা করা, ক্লীপে আটকানো। গায়ে ঘাগড়া জাতীয় পোষাক। আদিবাসী মেয়েরা যেরকম পোষাক পড়ে। মেয়েটির মুখের অবয়বে মিশনের পিরামিডে আঁকা রাজকীয় রমণীদের মুখের ছাপ আছে। অনন্ত মেয়েটির কথায় হচকিয়ে গেলেও কয়েক মূহুর্তে ও মেয়েটিকে দেখে নিল। মেয়েটি অনন্তের চোখে চোখ রেখে ফের বলল,
‘তুমি ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?’
অনন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে ইংরেজীতে বলল,
‘আপনি কে?’
‘আমাকে চিনতে পারছো না!’
মেয়েটির চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে। অনন্ত বলে,
‘আশ্চর্য, আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না! কে আপনি?’
মেয়েটি মুখ মলিন করে বলল,
‘আমি ইরিনা। আমাকে চিনতে পারছো না, সত্যি!’
‘ইরিনা নামে কাউকে আমি চিনি না। আপনি ভুল করছেন।’
বলল অনন্ত। কথাটা বলতে গিয়ে ও কেমন অসহায় বোধ করল। ইরিনা ‘উফ্!’ শব্দের সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘এ কি বলছো, অনন্ত! অনন্তকাল আমাকে চিনবে বলেই তো তুমি অনন্ত। অথচ আজ কী বলছো! আমাকে চিনতেই পারছো না!’
ইরিনার কথায় থ’ হয়ে যায় অনন্ত। ওর নাম সম্বোধন করে এই অচেনা মেয়েটি কী বলছে। ইরিনার মুখের দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকে ও। ওর মুখে কোন কথা জোগায় না। ইরিনা বলে,
‘আমার স্কার্ফ নিয়ে চলে যাচ্ছো। আমাকে সঙ্গেও নেবে না? তাহলে তুমি এলে কেন এই গুহায়? এতোকাল ভালোই তো ছিলাম একা। তুমি এসে কেন অভিশাপের দীঘল ঘুম থেকে জাগালে?’
ইরিনার প্রশ্ন বিব্রত করে দিল অনন্তকে। ও যেন এক রহস্যময় গোলাক ধাঁধাঁয় পড়ে গেছে। ও কিছু বলতে যাচ্ছিলো গাড়ির ভেতর থেকে ওর বন্ধু জামান বলল,
‘অনন্ত, মেয়েটির সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠুন, যেতে হবে।’
জামান অনন্তের বন্ধু। তিনি ম্যারিল্যন্ডে থাকেন। জামানই ওকে এই গুহা দেখাতে নিয়ে এসেছে। জামানের কথায় সায় দিয়ে ইরিনাকে অনন্ত বলল,
‘দেখুন, আমার নাম বলে আমাকে চমকে দিয়েছেন ঠিক। তারপরও আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারছি না। তাছাড়া আমি এই দেশেও থাকি না। আমি থাকি বাংলাদেশে। বাংলাদেশে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে-এ কথাও মেনে নেয়া যাবে না। যাই হোক, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।’
অনন্তের কথায় ইরিনার মুখ বিষন্ন হয়ে গেল। ওর চোখের কোণে জল জমলো। ওর ঠোঁট তিরতির কাঁপছে। মেয়েটি কি হাউমাউ কেঁদে ফেলবে? ভাবলো অনন্ত। ও ফের বলল,
‘আমাকে যেতে হবে। আপনাকে চিনতে পারছি না বলে কিছু মনে করবেন না।’
ইরিনা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
‘তুমি এসেছো বলে আজ আমার মুক্তি হয়েছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে অভিশপ্ত হয়ে ৩ শ’ বছর এই গুহায় বন্দি ছিলাম। আজ তুমি এসে আমাকে মুক্তি করলে। অথচ আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছো!’
ইরিনার এ কথা শোনার পর অনন্ত নিশ্চিত হলো মেয়েটির মাথায় গন্ডগোল আছে। ও আর এ ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। অনন্ত স্মিত হেসে বলল,
‘আচ্ছা, আসি। আমাকে ভালোবেসে থাকলে আরো অপেক্ষা করুন। গুহা থেকে মুক্তি পেয়েছেন যখন, বাংলাদেশে আসুন। তখন দেখা যাবে আপনার ভালোবাসার শক্তি কত।’
অনন্তের কথায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ইরিনা। কান্না জড়িত কাঁপা কণ্ঠে ও বলল,
‘আরো যত বছর অপেক্ষা করতে হয়, আমি তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবো-কথাটি মনে রেখো।’
অনন্ত গাড়িতে চড়ে বসতেই ইরিনা বলল,
‘আমি কী নিয়ে থাকবো, অনন্ত?’
এ কথায় বিব্রত ও বিরক্ত হলো ও। গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে অনন্ত ইরিনার দিকে স্কার্ফটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘এটা রেখে দিন। যদি আপনার কথা সত্যি হয়, তাহলে এই স্কার্ফ আমাদের মিলন ঘটিয়ে দেবে।’
কথাটা রসিকতা করে বলল অনন্ত। ও হাসিমুখে স্কার্ফটা তুলে দিল ইরিনার হাতে। ইরিনা স্কার্ফটা হাতে নিয়ে বিহবল চোখে তাকিয়ে রইলো অনন্তের দিকে। ওর আকুতিভরা দৃষ্টিতে কেমন সম্মোহন ছিল যেন। ওর চোখের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে অনন্তের বুকে মিহিন কাঁপুনি উঠেছিল। ইরিনা হঠাৎ ওর বাম কান থেকে একটা রিং খুলে অনন্তের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘আমারও একটা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যাও। হয়তো আমাদের মিলনের যোগসূত্র হবে এটি।’
ইরিনার বাড়িয়ে দেয়া কানের রিংটা অনন্ত নিল সম্মোহনের মত। ও তাকিয়ে থেকেছিল ইরিনার দিকে। দৃষ্টি সরাতে পারেনি। জামান ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে দিল। ওদের গাড়ি খুব দ্রুত চলে এসেছিল লোরে ক্যাভেন এলাকা থেকে। যতক্ষণ দেখা গেছে ইরিনা দাঁড়িয়ে ছিল অনড়।
আজ প্রায় এক বছর পর ‘ইরিনা’ নামটা শুনে অনন্ত একটু কেঁপে গেল। ইরিনা’র সঙ্গে দেখা করতে পারবে না-কথাটা বলতে পারলো না।
দরোজায় নক করে মেয়েটি অনন্তের রুমে প্রবেশ করলো। অনন্ত তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। মেয়েটি ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ওর টেবিলের সামনে। মুখে একফালি হাসির বিদুৎ চমকিয়ে বলল,
‘আমার নাম ইরিনা।’
রিনরিনিয়ে উঠলো যেন মিষ্টি একটা কণ্ঠ। ইরিনার হাসিতেও মাদকতা আছে। ইরিনার মুখটি প্রতিমার মত আকর্ষণীয়। চোখের দৃষ্টিতে নক্ষত্রের লাবণ্য ঠিকরে বেরুচ্ছে। ভার্জিনিয়া দেখা ইরিনার সঙ্গে এই ইরিনার কোন মিল নেই। শুধু বয়সের মিল আছে। এই ইরিনা ধবধবে ফর্সা, কোমল ত্বক ওর। মুখের গড়ন পানপাতার মত। ওর উপস্থিতির মধ্যে তীর্যকতা নেই, বরং এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, এক ধরনের বিনয় ফুটে উঠেছে। ইরিনার উপস্থিতি ভালো লাগলো অনন্তের। ও বলল,
‘বসুন।’
ইরিনা অনন্তের সামনের টেবিলের বিপরীত প্রান্তে রাখা চেয়ারে বসলো। অনন্ত বুঝতে পারছিল এই ইরিনা নামের মেয়েটি ওর কাছে কেন এসেছে। ওর মনে হচ্ছিলো মেয়েটি ওর কাছে চাকরি চাইতে পারে। ইরিনাকে চাকরি দিতে পারবে ও, দেবে কিনা ভাবতে লাগলো। ইরিনার মিষ্টি কণ্ঠ রিনরিনিয়ে উঠলো,
‘আপনি নিশ্চয়, এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান?’
‘হুম।’
‘আপনার নাম অনন্ত চৌধুরী?’
‘এটাও ঠিক।’
‘তাহলে যথাযথ ব্যক্তির কাছেই আমি এসেছি।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি কেন আমার কাছে এসেছেন। যদি চাকরির..।’
এ পর্যন্ত বলতে পারলো অনন্ত। ইরিনা কথার মাঝখানে বলল,
‘আমি কিন্তু চাকরি প্রার্থনা নিয়ে আসিনি।’
নিজের ভেতরে হোচট খেল অনন্ত। মেয়েটি তাহলে ওর কাছে কেন এসেছে? প্রশ্নটা করতে হলো না। ইরিনা বলল,
‘আমি বিশেষ একটা আবেদন নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। আশা করি, আপনি আমাকে হতাশ করবেন না।’
অনন্ত একটু বিরক্তবোধ করলেও মুখে তা প্রকাশ করলো না। এ রকম অপরূপা সুন্দরী মেয়ের রিনরিনে মিষ্টিকণ্ঠের মাধুর্য উপভোগ করার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায় না। অনন্ত মুখ টিপে হাসলো। ইরিনা বলল,
‘আপনার মূলবান সময় বেশি নষ্ট করবো না। কাজের কথায় আসি। আমার বাবা ইব্রাহিম খালিদ আপনার অফিসের ইন্ট্যারিয়ার ডিজাইনের কাজ করেছেন। আপনি নিশ্চয় জানেন?’
ইরিনার কথায় অনন্ত বুঝতে পারলো বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ইব্রাহিম খালিদের মেয়ে সে। অনন্ত ইরিনার কথার জবাবে বলল,
‘আপনি ইব্রাহিম খালিদ এর মেয়ে? নাইস টু মিট ইউ!’
‘নাইস টু মিট ইউ টু, মিঃ অনন্ত চৌধুরী।’
বলল ইরিনা। অনন্ত প্রশ্ন করল,
‘আপনি কেন আমার কাছে এসেছেন, বলুন তো?’
‘আমার বাবার বিলটা আটকে আছে। আমি গত তিনদিন ধরে আপনার হিসাব বিভাগের কর্মকর্তাদের পেছনে ঘুরেছে। কিন্তু বিলের টাকা পাইনি। আমার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে টাকাটা পাওয়া খুবই জরুরি। তাই, আপনার কাছে এসেছি।’
ইরিনার কথা শুনে লজ্জায় মূষড়ে পড়লো অনন্ত। ‘ইব্রাহিম খালিদ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন, আর তার কাজের পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি একাউন্টেন্ড’ কথাটা জানার পর একরাশ গ্লানি গ্রাস করলো ওকে। ও বলল,
‘আমি খুবই দুঃখিত এবং লজ্জিত এর জন্য। আমি এর বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নেব।’
ইরিনা বলল,
‘না,না, এর জন্য আর কী ব্যবস্থা নেবেন। এমন তো হরহামেশা হচ্ছে। আমার কোন অভিযোগ নেই। শুধু অনুরোধ আমার বাবার কাজের বকেয়া অর্থগুলো দিয়ে দিন।’
‘ঠিক আছে আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি আপনাকে চেক দিয়ে দিতে বলছি।’
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, মিঃ অনন্ত। এ সময়ে আমাদের টাকার খুব প্রয়োজন।’
‘কিছু মনে করবেন না, ইরিনা। আমি আপনার বাবার চিত্রকর্মের একজন মুগ্ধ দর্শক। তার ইন্ট্যারিয়ার ডিজাইনের সেন্স অপূর্ব। তার কাজে নান্দনিক মাত্রা ফুটে উঠে। তাইতো আমি, আমার অফিসের ইন্ট্যারিয়ার ডিজাইনের কাজ তাকে দিয়ে করিয়েছি। অথচ দেখুন, আমরাই তার অর্থ পরিশোধ করতে কাপর্ণ্য করেছি। আমি যে কীরকম লজ্জাবোধ করছি!’
‘না, না। আপনার দোষ কোথায়? তারপরও আপনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, চেক দিয়ে দিচ্ছেন-এটাই বা ক’জন করে, বলুন?’
ইরিনার কথায় মনের ওপর ছেয়ে যাওয়া গ্লানির মেঘ সরে যেতে লাগলো। অফিসের চীফ একাউন্টেন্ড করিম হাওলাদারকে ডেকে এনে ঝাল মেটানো ভৎসর্ণা করে দিতে ইচ্ছে করছিল অনন্তের। সেদিকে সে গেল না। ইন্টারকম ফোন তুলে সে চীফ একাউন্টেন্ডকে রাগী গলায় বলল,
‘করিম সাহেব, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইব্রাহিম খালিদের সমুদয় অর্থের চেক লিখে আমার রুমে নিয়ে আসুন।’
ইন্টারকমের রিসিভার রেখে দিল ও। ইরিনা মিষ্টি করে হেসে বলল,
‘যদি অনুমতি দেন, আমি বরং করিম সাহেবের কাছে যাই। চেক নিয়ে চলে যাবো। আপনার আর সময় নষ্ট করতে চাই না।’
‘হুম্। যেতে পারেন।’
বলল অনন্ত। ওর কথায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো ইরিনা। ওর মুখে মিষ্টি হাসি লেগে আছে। অনন্ত ওর মুখের দিকে চোখ রেখে বলল,
‘আমি আজ সন্ধ্যার পর আপনার বাবাকে দেখতে যেতে চাই। তিনি কোন হাসপাতালে এডমিটেড আছেন?’
‘স্কয়ার হাসপাতালে। কেবিন নম্বর ২০৪।’
‘ওকে, অল দ্যা বেষ্ট।’
‘লটস অব থ্যাংকস!’
‘ওয়েল কাম।’
অনাবিল উপস্থিতির মৌতাত রেখে দখিনা হাওয়ার মত অনন্তের রুম থেকে বেরিয়ে গেল ইরিনা। বেশ কিছুক্ষণ কাজে মনযোগ দিতে পারলো না অনন্ত। এমন কখনও হয়নি ওর।
দুই.
ভীষণ মন খারাপ করে অনন্ত আজ অফিসে এলো। মন খারাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। শায়লার সঙ্গে ওর এ্যাংগেজম্যন্ট হয়েছিল তিনমাস আগে। আগামী মাসের ২৪ তারিখ ওদের বিয়ে। বিয়ের আয়োজন চলছে পুরোদমে। অনন্তও কাকে কাকে ওদের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করবে, এমন একটা তালিকা বানিয়ে ফেলেছে। কার্ড ছাপতে দেয়া হয়েছে। উভয় পরিবারের লোকদের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতির কাজ চলছে। এমননি সময়ে কাল রাতে শায়লা ওর সঙ্গে দেখা করে জানালো, ও অন্য একজনকে ভালোবাসে। অনন্তকে বিয়ে করতে পারবে না। পরিবারের চাপে পড়ে শায়লা ওর এ্যাংগেজম্যান্টের আংটি গ্রহণ করেছে, কিন্তু ও এই বিয়েতে রাজী নয়। শায়লা আরো অনুরোধ করেছে, এ কথা অনন্ত যেন শায়লার পরিবারকে না বলে এবং বিয়েটা ওর দিক থেকেই যেন ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাহাড় ঠেলে সরানোর মত কঠিন অনুরোধ। শায়লা বিয়ে করতে না পারার জন্য অনন্তের আফসোস নেই, কিন্তু এরই মধ্যে অনেকে জেনে গেছে ওর আর শায়লার বিয়ে হচ্ছে। শায়লা ওর বাগদত্তা। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হবার পর যখন নিমন্ত্রণপত্র ছাপাখানায়, তখন শায়লা এসে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো অনুরোধ নিয়ে। যাকে নিয়ে পুরো জীবন কাটাতে হবে, যাকে নিয়ে সংসার সাজাতে হবে, সেই নারী যদি বিয়ে করতে না পারার অপরাগতার কথা জানায় এবং ভালেবাসার মানুষকে বিয়ে করার অদমনীয় আকাঙ্খার কথা প্রকাশ করে, তখন অনুচ্চারিত বেদনায় ভাষামূক হয়ে যেতে হয়। অনন্তও এই বেদনায় ভাষামূক। ভালোবাসার ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে আবেগের জয় হয় বারবার। এখানেও তাই হয়েছে। অনন্ত কথা দিয়েছে ও নিজ থেকেই ওর আর শায়লার বিয়ে ভেঙে দেবে কোন এক অজুহআতে। দোষটা ওর কাঁধেই নিতে হবে। প্রেমের প্রতি সম্মান দেখানো আর কি। এ সব কথা ভাবতে ভাবতে ভারাক্রান্ত মনে অনন্ত ওর রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল ওর টেবিলে দুটি খাম রাখা আছে। একটি চিঠির ছোট খাম, অপরটি একটু বড় ধরনের খাম। অনন্ত প্রথমে চিঠির খামটি খুলল। শায়লার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চিঠি। ও লিখেছে,
অনন্ত চৌধুরী,
আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা জানা নেই। রাতে শুনেছি, বাবা বলছিলেন, আপনি এখন বিয়ে করতে প্রস্তত নন। আমার মা মূষড়ে পড়েছেন। বাবা চিন্তিত। কিন্তু আমি আনন্দে বিগলিত। আমি শাকিলকে ভীষণ ভালোবাসি। সে-ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমাদের মিলনের পথ আপনি তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা আজ কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুখবরটা আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।
আমি জানি, আপনাকে যে নারী স্বামী হিসাবে পাবেন, সে অনেক ভাগ্যবতী। আপনার উদার মানসিকতা আপনার ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা বাড়িয়েছে। আপনি ঠকবেন না, এই বিশ্বাস আমার। আমার অনুরোধে আপনি যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তা আজীবন মনে রাখবো।
আপনার প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা। পত্রটি লিকে নিজে আপনার অফিসে এসে দিয়ে গেলাম। ভালো থাকবেন।
ইতি
শায়লা
চিঠিতে পড়ে ড্রয়ারে রেখে দিল অনন্ত। শায়লার পত্রে সান্ত¦না আছে, কিন্তু সামাজিকভাবে ও যে সমস্যায় পড়লো এর কোন সমাধান নেই। অনন্ত দ্বিতীয় বড় খামটি হাতে দেখলো খামটির প্রেরক হচ্ছে ইরিনা। নামটি দেখে ওর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ইরিনা ওকে কী পাঠাতে পারে? নিশ্চয় কোনো উপহার। ওর সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল হাসপাতালে ওর বাবার কেবিনে। সেদিন অনন্ত গিয়েছিল ওর বাবাকে দেখতে। ইব্রাহিম খালিদও অনন্তকে দেখে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। সেদিনও ইরিনা অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছিল ওর বাবার পাওনা অর্থের চেক দিয়ে দেয়ার জন্য। উপর্যুপরি ধন্যবাদ পেয়ে ও বিব্রত হয়েছিল। ইব্রাহিম খালিদের কাজের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেয়াটাই স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু এই কাজের জন্য এতো ধন্যবাদ প্রাপ্তি অনুভব করিয়ে দেয়, অফিসগুলোতে শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা হয়না। সেদিনের ধন্যবাদের রেশ না ফুরাতেই এবার এলো উপহার। বিষণ্ন মনে অনন্ত উপহারের খামটি খুলল। খামটি খুলতেই ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। খাম থেকে বের হয়ে এলো সেই স্কার্ফ, যেটি ও ভার্জিনিয়ার লোরে শহরে কিনেছিল এবং ইরিনা নামের মেয়েটিকে দিয়েছিল। ঠিক সেই স্কার্ফটিই ইরিনা ওকে পাঠিয়েছে। এ-ও কি সম্ভব? স্কার্ফটি দেখে অনন্তের গা শিরশির করে কেঁপে উঠলো। যে ইরিনাকে ও স্কার্ফটি দিয়েছিল, সে ছিল অন্য জাতির বা গোত্রের মানুষ। আর এই ইরিনা বাংলাদেশের এক মেয়ে। দু’জনের মধ্যে যোগসূত্র কীভাবে? অনন্তের মাথা যেন চক্কর দিয়ে উঠলো। ও কিছু ভেবে পেল না। ও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত উঠা-নামা করছে। ও কী করবে-কিছুক্ষণ ভেবে পেল না। প্রায় এক বছর পর আবারো রহস্য এসে হাজির ওর সামনে। কেন এই রহস্য? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো। সেদিন হাসপাতালে কথা প্রসঙ্গে ও ইরিনার সেলফোন নম্বর নিয়েছিল। ও নিজের সেলফোনের নামের তালিকা থেকে ইরিনার নম্বর বের করলো। ফোন করলো ওকে। দু’বার রিং বাজতেই ও প্রান্তে ফোন রিসিভ করলো ইরিনা।
‘হ্যালো.. কে বলছেন?’
‘আমি অনন্ত, চিনতে পারছেন?’
‘বাহ, চিনতে পারবো না কেন? আপনাকে একটা উপহার পাঠিয়েছি, পেয়েছেন?’
‘হুম। উপহারটা পেয়েই ফোন করলাম। ধন্যবাদ জানাতে।’
‘ওয়েল কাম।’
‘কিন্তু আমার প্রশ্ন আছে। জবাব দিতে হবে ঠিক ঠিক।’
‘প্রশ্ন করুন, জবাব দিতে সমস্যা কী?’
‘আমাকে উপহার পাঠিয়েছেন কেন”
অনন্তের কথায় ও প্রান্তে রিনরিনিয়ে হেসে উঠলো ইরিনা। ও বলল,
‘বিশেষ কোন কারণ নেই, অনন্ত চৌধুরী। আপনার ব্যবহারে আমি ও আমার বাবা মুগ্ধ হয়েছি। এ ছাড়া আমার বাবা যেখানে বা যার কাজ করেন, লেনদেন শেষে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সৌজন্য স্মারক হিসাবে উপহার দিতে পছন্দ করেন। এবার বাবা অসুস্থ বলে আমিই উপহার পাঠানোর কাজটি সম্পন্ন করি। এইতো, আর কিছু জানতে চান?’
ইরিনার কথা শুনে অনন্তের মধ্যে ঘোরলাগা তন্ময়তা ছড়িয়ে পড়ছে। ও অবাক হলো নিজের মধ্যে এক ধরনের বিহবলতা সৃষ্টি হওয়ায়। ইরিনার কথা ওর ভীষণ ভালো লাগছে। ইরিনার প্রতি ও দূর্বার আকর্ষণ অনুভব করছে। অথচ প্রথমদিন এই আকর্ষণ অনুভব করেনি ও। কেন ওর ভেতরে এমন অমূল পরিবর্তন? কেন ইরিনার কথায় শিহরণ অনুভব করছে? অনন্ত কোথায় যেন তলিয়ে যেতে থাকে। ও বলে,
‘এই স্কার্ফটি কোথায় পেয়েছেন, সত্যি করে বলুন তো!’
‘আশ্চর্য, আপনি এমনভাবে কথা বলছেন কেন? আপনার কী হয়েছে?’
জানতে চাইলো ইরিনা। অনন্ত বলল,
‘আমার এখনও কিছু হয়নি, তবে হবে। আপনি আগে বলুন, স্কার্ফটি কোথায় পেয়েছেন, প্লিজ!’
ও প্রান্তে কয়েক মূহুর্তের নীরবতা। অনন্তের হৃৎপিন্ডে ধুকধুকানির শব্দ। ইরিনা বলল,
‘দেখুন, রুমালটি আমি নিজে তৈরি করেছি। আই মীন, একটি সিল্কের কাপড়ে আমি রঙ মেখেছি। ছবি এঁকেছি।’
‘আপনি রুমালটি তৈরি করেছেন? আদিবাসী মেয়েটির ছবি এঁকেছেন, সত্যি বলছেন?’
‘আপনি মনে হচ্ছে, উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। এ্যানিথিং রং?’
‘না, না। প্লিজ, আমার প্রশ্নের জবাব দিন।’
ককিয়ে উঠে অনন্ত। ইরিনা বলে,
‘আপনি হয়তো জানেন না, আমি গত বছর চারুকলা ইন্সিটিউট থেকে মাষ্টার্স পাশ করেছি। বাবার মত আমিও আঁকিয়ে। রঙতুলি নিয়েই তো আমাদের কাজ। পুতুলও বানাই। কেন এ সব প্রশ্ন করছেন, বলুন তো?’
জানতে চাইলো ইরিনা। অনন্তের ভেতরে ঘোরলাগা আবেগ পেখম ছড়িয়ে গেছে। ও নিজেকে সংযত করতে পারছে না। ও বলল,
‘ইরিনা, তুমি জানো না, আমাকে কী অপার রহস্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছো। যুক্তরাষ্ট্রে তুমি দেখা দিলে আদিবাসী নারীর বেশে, ঢাকায় দেখা দিলে আমার কল্পনার মানসীরূপে। যুক্তরাষ্ট্রে আমি তোমাকে চিনতে পারিনি বলে ফিরিয়ে দিয়েছি, কিন্তু এবার আমিই আসছি তোমার কাছে। আমাকে ফেরাতে পারবে না। কিছুতেই ফেরাতে পারবে না।’
‘মিঃ অনন্ত চৌধুরী, আপনি মনে অসুস্থ। আপনি কিন্তু প্রলাপ বকছেন। আপনার কী হয়েছে?’
‘আমি তোমার কাছে আসছি, ইরিনা। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাই।’
‘আপনি আমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করছেন অনন্ত চৌধুরী। আমি বিব্রত বোধ করছি। আপনি প্রলাপ বকছেন। আপনার কী হয়েছে? ’
এ কথার জবাব দিল না অনন্ত। ও ঘোরলাগা ভাবাবেগে ফোন লাইন কেটে দিল। এরপর ইরিনার পাঠানো স্কার্ফটি নিয়ে অফিস থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল ও।
তিন.
দরোজা খুললেন ইব্রাহিম খালিদ। তার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন তিনদিন হলো। বেডরেষ্টে আছেন। অনন্ত তাকে সালাম দিয়ে বলল,
‘ইরিনা কি বাসায় আছেন? আমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি?’
ওর কথা শুনে ইব্রাহিম খালিদের মুখে বড় একটা হাসি ঝরমলিয়ে উঠলো। তিনি বললেন,
‘তুমি ওকে রাগিয়ে দিয়েছো কী বলে? তোমাদের মধ্যে কি রাগ-অনুরাগের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? হলে আমাকে জানিয়ো। যাও, ও পাশের রুমে আছে। ওটা আমাদের ছবি আঁকার রুম। ওখানে যা আছে, সবই শিল্প। আমার মেয়েটা কিন্তু বড় শিল্প। দেখো, অযত্ম, অনাদর বা অবহেলা যেন না হয়!’
ইব্রাহিম খালিদের এমন মিষ্টভাষী কথার জবাবে অনন্ত কোন কথা বলতে পারলো না। বলবেই বা কী। যে কথা ওর মনের মধ্যে রঙের ফোয়ারার মত ছড়িয়ে যাচ্ছে, সে কথার বিচ্ছুরণ তো ইরিনার বাবা ঘটালেন। এমন সমর্থন এবং সম্মতি সহজে কে পেয়েছে? অনন্ত এগিয়ে গেল ইব্রাহিম খালিদের অঙ্গুলী নির্দেশনায় দেখিয়ে দেয়া অন্যরুমের দিকে। ইরিনা কি অনন্তের জন্য অপেক্ষা করছিল? প্রশ্নটা ওর মনে ছিল। ও দেখলো আবক্ষ এক মূর্তির সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ইরিনা। অনন্ত রুমটির চারপাশে তাকিয়ে দেখলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পেইন্টিংয়ের ক্যানভাস, রঙের প্যাকেট ও রঙতুলি। দেয়ালগুলিতে লাটকানো আছে জলরঙ-তৈলচিত্রে ক্যানভাস কয়েকটি। অনন্ত ইরিনার উদ্দেশ্যে বলল,
‘ইরিনা, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমি অযাচিতভাবে আমাকে মানসিক কষ্ট দিয়েছি। আমি বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে আপনাকে ‘তুমি’ বলিনি। আমার ভেতর থেকে এই সম্বোধন উঠে এসেছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমার এই অপরাগতার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি।’
আবক্ষ মূর্তির সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়ালো ইরিনা। ওর চোখে জলের ধারা। প্রতিমার মত অপরূপা মেয়ের কান্নাও যে শিল্পের সুষমামন্ডিত হতে পারে, তা ইরিনার অশ্রুভেজা মুখের দিকে তাকালে যে কেউ স্বীকার করবে। অনন্ত বিষণ্ন না হয়ে বিহবল হল। ও লক্ষ্য করলো, যে আবক্ষ মূর্তির সামনে ইরিনা দাঁড়িয়ে আছে, সেই মূর্তির মুখচ্ছবি, স্কার্ফের মাঝখানে আঁকা আদিবাসী মেয়ের একই মুখের ছবি। রহস্যের যেন শেষ নেই। ও আরো দেখতে পেল আবক্ষ মূর্তির ডান কানে একটি রিং। বাম কানে রিং নেই। ওর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠলো। ও বলল,
‘এই মূর্তির ডান কানের রিং কোথায় পেয়েছেন? বাম কানের রিংটা কোথায়?’
ইরিনা চোখ কপালে তুলে বলল,
‘রিং কোথায় আবার পাবো! আমার কানের রিং পরিয়েছিলাম। বাম কানের রিংটা হারিয়ে গেছে। কেন?’
অনন্ত প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগে সযতনে রাখা বাম কানের রিংটা বের করে ইরিনার সামনে ধরে বলল,
‘দেখুন তো, এটাই আপনার হারিয়ে যাওয়া রিং কিনা?’
অনন্তের হাত থেকে ইরিনা রিংটা নিয়ে ভালো করে দেখল। ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলল,
‘এই রিং আপনি পেলেন কোথায়? আশ্চর্য!’
ইরিনা রিংটা মূর্তির বাম কানে লাগিয়ে দিল। অনন্ত স্মিত হেসে বলল,
‘আমাকে ‘তুমি’ বলার অনুমতি দিলে বলব, এই রিংটা কোথায় এবং কীভাবে পেয়েছি। অনুমতি দেবেন?’
অনন্তের কথায় কপট রাগী চোখে তাকালো ইরিনা। অনন্ত ওর রাগকে গায়ে মাখলো না। বলল,
‘নিয়তি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। ফেরাতে পারবেন না। রিংটা যেমন হারিয়ে গিয়েও ফিরে এসেছে, আমিও ফিরে ফিরে আসবো। এই যেমন এসেছি, ফিরিয়ে দিলে ৩ শ’ পরও আবার আসবো।’
‘তাই নাকি! তাহলে শায়লার কী হবে? আগামী মাসে যার সঙ্গে বিয়ে..?’
ঠিক এ সময়ে অনন্তের ফোন বেজে উঠলো। সেলফোনের স্ক্রীণে শায়লার নাম দেখে ও ধরলো। ও প্রান্তে শায়লার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,
‘অনন্ত, জানেন, শাকিল আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ও এখন বলছে আমাকে বিয়ে করবে না। ও কাজী অফিসে আসেনি। আমি বাসায় চিঠি লিখে এসেছি যে, আজ আমি শাকিলকে বিয়ে করবো। আমি ভীষণ মূষড়ে পড়েছি। এই সময়ে যদি আপনি আমার পাশে এসে দাঁড়ান, আমি সাহস পাবো। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আমাদের বিয়ের আয়োজন তো চলছিল। আমরা কি আজকের দিনটির কথা ভুলে গিয়ে বিয়ে করতে পারি না? আমি জানি, আপনি অনেক মহৎ, অনন্ত, শুনছেন? হ্যালো..!’
অনন্ত বলল,
‘শায়লা, আমি যে আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। নিয়তি আমাকে নিয়ে রহস্য করেছে, আবার সেই রহস্য আমাকে পৌঁছে দিয়েছে আমার গন্তব্যে। আমি আসলে আপনার জন্য এই পৃথিবীতে আসিনি, আমি এসেছি ইরিনার জন্য। আমি এখন ওর সামনে দু’হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি।’
কথাটা বলে ও ফোন রেখে দিল। ইরিনা এবার অন্যভাবে তাকিয়ে আছে অনন্তের দিকে। অনন্তের মনে হচ্ছে, ইরিনার ঘোরলাগা এই দৃষ্টি এক পলকের জন্যও সরবে না। অনন্ত এগিয়ে গিয়ে ইরিনার দুটি হাতের মুঠো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। ইরিনা ওকে বাধা দিল না। অনন্ত মনে মনে ভাবলো, কে জানে, লোরে শহরের গুহাতে এখন কী হচ্ছে। যাই ঘটুক, বা না ঘটুক, ইরিনার কাছে তো ও পৌঁছেছে।