- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
গঙ্গাচরের ভূত
এক
আমার প্রপিতামহের নাম ছিল আদম শেখ। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার কাশীপুর গ্রামের সচ্ছল কৃষক। আমার প্রপিতামহের সময়কালে অর্থাৎ ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ছিল, তখন কাশীপুর গ্রামের যে চিত্র ছিল, এর সঙ্গে বর্তমান কাশীপুর গ্রামের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে-সময়ের অনগ্রসর গ্রাম কাশীপুরের এখনকার চেহারা ভিন্ন। গ্রামটির অনতিদূরে পশ্চিম দিকে বুড়িগঙ্গা নদী কালের সাক্ষী হয়ে আজও প্রবাহমান। তবে বর্তমান কাশীপুর গ্রাম ও বুড়িগঙ্গা নদী একইসঙ্গে লাবণ্যহীন ও দূষণময়। আদম শেখদের সময়কালে কাশীপুর গ্রামের ঔজ্জ্বল্য ছিল। কেউ কেউ অভাব অনটনে থাকলেও গ্রামের সকলের মধ্যে মিলেমিশে থাকার মধুর সম্পর্ক ছিল। আদম শেখের ছিল বিস্তর জমিজমা। গরুও ছিল অর্ধ শতাধিক। দু’জন রাখাল পালাক্রমে এই গরুর পাল মাঠে ঘাস খাওয়াত। কৃষিপণ্য ও গরুর দুধ বিক্রি থেকে আদম শেখের যথেষ্ট আয়-রোজগার হতো। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে ছোট ছেলের নাম ছিল আবিল শেখ। আবিল শেখ ছিলেন তাঁর বাবার নেউটা। তিনি বাবার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে ফতুল্লার হাটে গিয়ে বাজার-সওদা করতেন। তিনি তাঁর বাবা আদম শেখের মতো বিষয়-সম্পত্তির হিসাব ভাল বুঝতেন। আমাদের বংশের উপাধী ‘শেখ’ হলেও পরবর্তীকালে এই উপাধী হারিয়ে যায়। আদম শেখের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে কাশীপুরে আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি পরিচিতি লাভ করে ‘আদমবাড়ী’ হিসাবে। এই গ্রামে ঐ সময়কালে শিকদারবাড়ী, মাঝিবাড়ী, মুন্সীবাড়ী, জমিদারবাড়ী নামে অনেক বসতিও ছিল, এখনো আছে।
আদম শেখের সময়কালের একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা তুলে ধরছি। একবার হল কি, আদম শেখের আদরের একটি গরু হারিয়ে গেল। টকটকে লাল রঙের এই গরুটিকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। গরুটিও তাঁকে দেখলে তাঁর কাছে এসে আলতো করে মাথা ঘষত। আদম শেখ আদর করে গরুটির নাম রেখেছিলেন ‘টুসি’। এই টুসি খোলা ময়দান থেকে একদিন ভরদুপুরে হাওয়া হয়ে গেল। তিনি টুসিকে আশে-পাশের গ্রামেও তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। কোথাও নেই! টুসিকে হারিয়ে তিনি একেবারেই মনমরা হয়ে গেলেন। ঠিক মতো নাওয়া-খাওয়া করতেও ভুলে যেতে লাগলেন। এ নিয়ে বাড়ির সকলে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। স্ত্রী, পুত্রবধূরাও খুব বিচলিত হলেন। ছোট পুত্র আবিল শেখ প্রতিদিনই গরুর খোঁজে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগলেন। অবশ্য, অপর দুই পুত্র নদীর পাড়ে খেয়াঘাটে বসে একটি গরু হারানোয় তাঁদের বাবার শোক নিয়ে হাসাহাসিই করলেন। এদিকে ওই খেয়াঘাট দিয়েই নিরুদ্দেশ হবার তিনমাস পর গ্রামে ফিরল ‘ছন্নছাড়া বেচু’। বেচুই গ্রামে ফেরার সময় ‘টুসি’কে দেখার সংবাদটা প্রথমে দিল। যদিও বেচুর খেয়ালী স্বভাব আর বাউণ্ডলে চরিত্রের কারণে ওর কথাবার্তা বিশ্বাসযোগ্যতা পেত না। তবে টুসিকে সে পদ্মার পাড়ে এক মেলায় দেখে এসেছেÑ কথাটা বিশ্বাসযোগ্যতা পেল।
বেচু সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু বলে নেওয়া যাক। ঢোলের শব্দ শুনলে বেচু ঘরে থাকতে পারে নাÑ এমন একটা কথা প্রচলিত ছিল গ্রামে। ঢাক-ঢোলের শব্দ না শুনলেও সে মাঝেমধ্যে গ্রাম থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। মেলা, ওরশ, যাত্রাপালা যেখানেই হবে, বেচু সেখানেই হাজির। ওর বাপ-মা নেই। জমি-জমাও নেই। ফুপুর বাড়িতে একটা খুপরি ঘরে পড়ে থাকত। বেচুর থাকা-না থাকা নিয়ে তার ফুপু অনেক আগেই দুশ্চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই বেচু খেয়াঘাট দিয়ে ফেরার সময় বিড়বিড় করে বলল, ‘টকটকে লাল একটা গরু দেখে এলাম পদ্মাপাড়ের মেলায়। গরুটাকে মনে হল আদম শেখের।’
কথাটা এ-কান ও-কান হয়ে কানে গেল আদম শেখের। বেচুকে ডেকে আনা হল তাঁর সামনে। আদম শেখ অনুসন্ধানী দৃষ্টি রেখে বেচুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘তুই ঠিক দেখেছিস তো?’
‘জ্বে, কর্তা।’
‘গরুটার গলায় কী ছিল, বল দেখি?’
‘গরুর গলায় একটা পিতলের ঘণ্টি বাঁধা ছিল। গরু হাঁটলে ঘণ্টিটা ঢং ঢং করে বাজে। ঐ ঘণ্টি দেখেই তো চিনতে পেরেছি যে, ওটা আপনার টুসি।’
এ কথায় বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। সন্দেহ থাকে না। আদম শেখ জানতে চান, ‘কোন গ্রামে, কার বাড়িতে দেখেছিস?’
‘কর্তা, বিক্রমপুর ছাড়িয়ে পদ্মার পাড়ের মেলায় আপনার গরুটাকে দেখেছি। একটা কালো মতো লোক গরুটাকে বেচতে এনেছিল। লোকটির বাড়ি ওখানেই, গঙ্গাচর গ্রামে। এ টুকুই জেনেছি। লোকটিকে ভাল ঠেকেনি। গরুটার কথা জিজ্ঞেস করতেই আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছিল। তাই কথা আর বাড়াইনি। তবে ওর নামটা জেনেছি।’
‘বল, ওর কী নাম?’
‘ওর নাম বল্লম। চুরি-চামারীতে ওর ঐ এলাকাতে কুখ্যাতি আছে।’
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আদম শেখের রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে বেচু চুপসে যায়। এর বেশি কিছু বলতে পারেনি ’ও। তবে যেটুকু বলেছে, এতেই আদম শেখের বুকে রাগের আগুন জ্বেলে দিয়েছে। আদম শেখের পছন্দের গরু চুরি করে নিয়ে গেছে কোথাকার কোন গঙ্গাচরের পাঁজি চোর! একে শিক্ষা দিতে হবে। উদ্ধার করতে হবে টুসিকে। অনেকটা পণ করেই চারজন লাঠিয়াল নিয়ে গঙ্গাচরের উদ্দেশ্যে বজরায় চড়ে রওনা হলেন আদম শেখ। তাঁর বজরা ছুটল মুন্সীগঞ্জের বালিগাঁও-ডহুরী ছাড়িয়ে পদ্মা পাড়ের দিকে। তাঁর সঙ্গে ছোট পুত্র আবিল শেখ যেতে চাইলেও তিনি তাঁকে নেননি। এদিকে অপর দুই পুত্র বিষয়টিকে সামান্য জ্ঞান করেÑআড়ালে-আবডালে ফের হাসাহাসি করলেন।
দুই
গঙ্গাচরের সন্ধান পাওয়া গেল অনেক কষ্টে। নদী পথে যেতে যেতে কত নৌকার মাঝিদের কাছে যে গঙ্গাচরের কথা জিজ্ঞেস করেছেন আদম শেখ, এর হিসাব নেই। মাঝিদের এমন ভাব ছিল যে, গঙ্গাচরের নাম এই প্রথম শুনছে তারা। যখন মনে হচ্ছিল, গঙ্গাচর বলতে আসলে কোনো গ্রাম পদ্মার পাড়ে নেই, ঠিক তখুনি এক বয়োজ্যেষ্ঠ মাঝি শুকনো গলায় বললেন, ‘গঙ্গাচরে যাবেন কেন, কর্তা? ওখানে তো কেউ যায় না!’
অন্ধকারে আলোর সুড়ঙ্গ পেলেন আদম শেখ। তিনি আগ্রহ ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘আমাকে যেতেই হবে। ওখানে গেলে কী হবেÑ এসব পরে ভাবব। বলে দাও তো কীভাবে যাব, কোনদিকে গঙ্গাচর?’
বয়োজ্যেষ্ঠ মাঝি আমতা-আমতা করে গঙ্গাচরে যাবার পথ বাতলে দিল। আদম শেখ নিজের বজরায় রাখা একটি ছাগল বয়োজ্যেষ্ঠ মাঝিকে বকসিস দিলেন। পথ বাতলে দেওয়া মাঝির কথা মাথায় রেখে বজরার মাঝিরা আরও এক রাত নৌকা চালাল। রোদ ঝিকমিক ভোরে সুনসান গ্রাম গঙ্গাচরে ভিড়ল আদম শেখের বজরা। গঙ্গাচরের মাটিতে পা রাখতেই আদম শেখের শরীরে একটা দমকা ঠাণ্ডা বাতাস এসে হামলে পড়ল। তিনি নৌকার মাঝিদের সঙ্গে দু’জন লাঠিয়াল রেখে নিজের সঙ্গে অপর দু’জন লাঠিয়ালকে সঙ্গী করে পা বাড়ালেন গ্রামের দিকে। গ্রামটিকে ‘গ্রাম’ বলা যায় না। গ্রামটিতে প্রাণচাঞ্চল্য নেই, কেমন নিথর। চারপাশে ধূ-ধূ মাঠ। মাঝে মাঝে পোড়া বিধ্বস্ত বাড়ি-ঘর। নদী থেকে একটু হেঁটে উঁচু ঢালুতে দাঁড়াতেই আদম শেখের মনে হল, গ্রামটি প্রায় জনশূন্য। বোঝা যায়, এক সময় জনসমাগম ছিল এখানে। এখন নেই। মেঠো পথের বাঁকে বাঁকে যে কয়েকটি বাড়ি-ঘর দেখা যাচ্ছেÑ এর সবগুলো যেন পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ। আদম শেখের মনে হল, গ্রামটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল। কথাটা ভাবতেই তাঁর কানের কাছ দিয়ে একটা গরম ঝড়ো হাওয়া যেন ধেয়ে গেল। একটু হচকিয়ে গেলেন তিনি। আদম শেখ যুবক বয়সে কুস্তিগীর ছিলেন। এখনোও কুস্তির কসরৎ করেন নিয়মিত। সকালে বুকডন করে এক জগ গরুর খাঁটি-দুধ পান করেন প্রতিদিন। বয়স বাড়লেও এখনো তাঁর শরীরে মেদ জমেনি। পেটানো শরীর। এখনো হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করলে হাতের মাংশপেশী যেভাবে ফুলে উঠে, এতে ছেলে-ছোকরাদের চোখও ছানাবড়া হয়ে যায়। তিনি গঙ্গাচরের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের মধ্যে পালোয়ানসুলভ সাহস মনে মনে ঝাঁকিয়ে নেন। নিজের মধ্যে অহেতুক ভয় পেখম মেলাতে দিতে চান না। মেঠো পথ ধরে তিনি হাঁটছেন। পেছনে তাগড়া দু’লাঠিয়াল। পথিমধ্যে একটা পোড়াবাড়ীর সামনে আসতেই জবুথবু এক বুড়োর দেখা পেলেন আদম শেখ। বুড়োর শরীরে জামা নেই, পড়নে সাদা ধূতি। বুড়োকে দেখে স্বস্তি পেলেন। বুড়োর গায়ের চামড়া থলথল করছে। চোখ দু’টো কোটরের গভীরে, তবে দৃষ্টি নিষ্প্রভ নয়। বুড়ো পোড়াবাড়ী থেকে কয়েক কদম এগিয়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে খন্খনে গলায় বললেন, ‘তা এ দিকে কী কারণে আসা, বাবু! এ গ্রামে তো কেউ আসে না। আগমনের হেতু?’
‘আজ্ঞে, আমি এসেছি, বল্লম চোরের সন্ধানে। শুনেছি এই গ্রামেই তার নিবাস।’
‘ওহ, বল্লম?। তা, তেনার সন্ধানে কেন?’
‘আমার একটা গরু চুরি করেছে ও। গরুটাকে ফেরত নিতেই এই গাঁয়ে আসা।’
‘একটা গরুর জন্য এখানে আসা! সোনাদানার সন্ধানেও কেউ এই গ্রামে আসে না। তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি, বাবু।’
‘কেন এ কথা বললেন? এখানে কী আছে যে, ভয় পেতে হবে?’
‘হ্যাঁ, বলছিলাম কি- ভয়ের কারণেই কেউ এই গাঁয়ে আসে না। কত বছর যে পেরুল, এই গাঁয়ে মানুষজন দেখি না!’
বুড়োর কথার জবাবে নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চারিত করতে অথবা ভয় দেখানোর জন্য আদম শেখ বললেন, ‘জানেন, আমি একজন কুস্তিগীর। দু’চারজনকে এক পলকে ধরাশায়ী করার কসরৎ আমার জানা আছে।’
‘তা বুঝলাম। কিন্তু গঙ্গাচরে ওসবে কাজ দেবে না।…’
কেমন হেয়ালীভাবে কথা বলছিলেন বুড়ো। আদম শেখ তাঁর এ কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, ‘তা আপনি বলতে পারবেন, বল্লম চোরের বাড়ি কোনটি? কোনদিকে গেলে তাকে পাব? কুস্তির কলাকৌশল একটু পরখ করে যাই।’
‘আরও দু’ক্রোশ দক্ষিণে যাও। চারটি তালগাছের বেষ্টনীতে একটি পোড়াবাড়ী দেখতে পাবে, ওটিই ওর বাড়ি।’
‘আচ্ছা, এই গ্রামে দেখছি জনমানুষ কম। বাড়িগুলোও পুড়ে যাওয়া। গ্রামের বাড়িগুলো পুড়ে গেছে কেন?’
‘সে অনেক কথা। অনেক পুরানো ইতিহাস। এসব কথা জেনে কী হবে?’
‘বলুন, শুনে যাই। কৌতূহল অনুভব করছি।’
বুড়ো একটু ইতস্তত বোধ করলেন। কয়েক মুহূর্ত পর বললেন, ‘এই গ্রামের এক সময় ঐতিহ্য ছিল, ঐশ্বর্যও ছিল। গ্রামের মানুষগুলোর ঘরে ঘরে আনন্দ-উল্লাস ছিল।’
কথাটা বলে থামলেন। তাগিদ দিতে আদম শেখ বললেন, ‘তো? সেই আনন্দ-উল্লাস নেই কেন? কী হয়েছিল?’
‘সে অনেক পুরানো কথা, বেদনার কথা, বলতে ইচ্ছে করে না।’
‘তবু একটু বলুন। শুনে যাই।’
‘ঠিক আছে, সংক্ষেপে বলছি। এক-সময় রাজার দরবারে কাজ করে এমন কয়েকজন রাজকর্মীর পরিবাররাও গঙ্গাচরে বাস করত।’
‘বলেন কী! রাজকর্মীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এই গণ্ডগ্রামে বাস করত?’
‘এতে অবাক হওয়ার কী আছে? রাজ্য হারিয়ে রাজা লক্ষণ সেনও তো এই অঞ্চলে এসেই আশ্রয় নিয়েছিলেন, জানো? অবশ্য সেটা এখন থেকে আরও ছয়-সাত শ’ বছর আগে। লক্ষণ সেনের নাম নিশ্চয় শুনেছ?’
‘হুম, শুনেছি। বখতিয়ার খিলজী ১৭জন অশ্বারোহী নিয়ে তার রাজত্ব দখল করেছিল, তাই না?’
‘হুম। এই অঞ্চলটা একেবারে গুরুত্বহীন নয়। নইলে রাজা লক্ষণ সেন এখানে আশ্রয় নেবেন কেন?
‘এ কথাও ঠিক। সে-সব তো শত শত বছর অনেক আগের কথা।’
‘কয়েক শ’ বছর পেছনে গেলেই তোমরা কেমন ভড়কে যাও!’
বুড়োর ভ্রƒ কুঁচকে উঠে। আদম শেখ বুঝলেন এই বুড়োর সঙ্গে তর্ক করে সময় নষ্ট না করাই ভাল। বুড়ো যা বলে, বলুক। তিনি শুধু তাল মিলিয়ে কথা বলে যাবেন। তিনি কথায় ফিরে আসতে বললেন, ‘এই গ্রামের আনন্দ-উল্লাস থেমে গেল কেন?’
‘তোমাকে লক্ষণ সেনের কথা বলছিলাম। সেই লক্ষণ সেনের পরাজয়ের চার-পাঁচ শ’ বছর পর, গঙ্গাচরে নেমে আসে নির্মম অত্যাচার।’
‘অত্যাচার? কী হয়েছিল?’
‘কী হয়নি, বলো! নৃশংস অত্যাচারের শিকার হয়েছিল গঙ্গাচারের গ্রামবাসী!’
‘আমাকে সেই অত্যাচারের কথা একটু খুলে বলুন তো চট-জলদি! ঘটনাটা জানতে মন উচাটন করছে। একটু সংক্ষেপে বললে ভাল হয়।’
আদম শেখ কথা কমিয়ে আনার জন্য বললেন। বুড়োকে কথা বাড়ানোর সুযোগ দিলে সময় নষ্ট হবে। এর জবাবে বুড়ো বললেন, ‘উঁচু বর্ণের হিন্দু ভূ-স্বামীদের সঙ্গে নিচু জাতের হিন্দুদের সংঘর্ষ বেঁধেছিল এই গ্রামে। আশেপাশের গ্রাম থেকে গঙ্গাচরে প্রথম প্রথম হামলা হতো, লড়াই হতো। একদিন অত্যাচারী ভূ-স্বামীরারা আগুন দিল পুরো গ্রামে। অনেক শিশু-পুরুষ-নারী পুড়ে মারা গেল ঐ আগুনে। তাঁদের সৎকারও হয়নি! গ্রামের অনেক যুবতীকে ওরা তুলে নিয়ে গেল সেÑ দিন! ’
‘মানে উঁচু জাত-নিচু জাতের হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধেছিল? ব্রাহ্মণ বনাম নিম্নবর্ণের দাঙ্গা?’
‘এটাকে দাঙ্গা বলে? হতে পারে সে-রকমই।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বুড়ো। গম্গমে হাওয়া এসে লাগল আদম শেখের শরীরে। আদম শেখ বললেন, ‘এই গ্রামে কারা বাস করতেন, নিচু জাত যাঁদের বলা হচ্ছে তাঁরা? কথাটা বাড়ান বুড়ো মশাই!’
‘তোমার কথাই ঠিক, এই গ্রামে যাঁরা বাস করত সকলেই ছিল নিচু জাতের হিন্দু। আক্রমণকারীরা ছিল উঁচু জাতের হিন্দু। এটাকে দাঙ্গা বলতে পারো, আবার ভোগদখলের পৈশাচিক উন্মাদনাও বলতে পারো। জাত-পাতের বৈষম্যও বলতে পারো।’
‘এরপর?’
‘এরপর আর কি? গ্রামে ঘুরলেই দেখতে পাবে। গ্রামটি একটি অগ্নিকূণ্ডে পরিণত হয়েছে।’
আদম শেখ সেই নির্মম অত্যাচারের ঘটনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানার আগ্রহ দমন করলেন। তিনি বল্লম চোরের প্রসঙ্গ আনতে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, বলুন তো, বল্লম চোর এই গ্রামে কেন থাকে? তার কাজই বা কি? এই গ্রাম থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ ক্রোশেরও বেশি দূর আমাদের নিবাস। সেখান থেকে আমার গরুটাকে ব্যাটা কেন চুরি করে নিয়ে এল এখানে?’
‘ওই বল্লম, এই গাঁয়েরই লোক। ও একটু বেপরোয়া টাইপের। বলতে পারো প্রতিশোধ পরায়ণপর। ও কেন এসব করে, জানি না। আমরা ওকে বারণ করি। ও শোনে না।’
‘তাই বলে ও অন্যায় করেই যাবে। আপনাদের গ্রামে শালিস-টালিস হয় না? ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই?’
‘ন্যায়-অন্যায় কথাটা উঠলেই তো গ্রামের আগুন দিয়ে হত্যাযজ্ঞের কথাটা পাল্টাপাল্টি উঠে। আমরা তখন চুপসে যাই।’
আদম শেখ হঠাৎ খেয়াল করলেন, বুড়োকে যত বুড়ো দেখাচ্ছে কথাবার্তার মধ্যে তত বয়সের ভার পড়েনি। কথা বলছেন গুছিয়ে ও অকপটে। তাঁর বয়স কত হবে? ভাবতেই তিনি বুড়োর উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, আপনার বয়স কত হবে? দেখে তো মনে হচ্ছে এক শ’র কাছাকাছি। বেশিও হতে পারে। তারপরও গায়ে-গতরে শক্ত আছেন!’
এ কথায় বুড়োটা ম্লান হাসল। বললেন, ‘বয়স আর গণনা করি না, বাবু। বয়স, কয়েক শ’ বছরও হতে পারে।’
‘কী বলছেন? এত বয়সে কেউ কি বেঁচে থাকে?’
‘আমিও তো কত চেষ্টা করছি, মরতে পারছি না…!’
বুড়োর কথাটা অবিশ্বাস্য। অসংলগ্নও। তর্কে না গিয়ে আদম শেখ বললেন, ‘মরতে পারছেন না বা মরতে চাইছেন কেন, কথাটা বুঝতে পারলাম না।’
‘দীর্ঘদিন বেঁচে থাকাটা হচ্ছে অভিশাপ! এটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কত ঘটনার সাক্ষী হতে হচ্ছে। মরে গেলে শান্তি পেতুম। কিন্তু মরলে সৎকার হবে কোথায়? গ্রামে একটাই শ্মশান ছিল। ঐ বল্লম চোরের বাড়ির পেছনে। ঐ শ্মশানে আগুন জ্বালানোর লোক নেই, বাবু। শ্মশানটাতে অনেক কাল হবে সৎকার হয়নি কারো। এই গ্রামের বাসিন্দা বলে মরে গেলে পুড়ে বিলীন হব, এই ভাগ্যও আমার নেই।’
‘এটা আর এমন কঠিন কাজ কি? আমার গরুটিকে উদ্ধার করতে সহযোগিতা করুন। আমি ঐ শ্মশানে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’
‘সত্যি বলছ, বাবু?’
‘সত্যি বলছি। কথা দিচ্ছি, শ্মশানে আগুন জ্বালাব।’
‘তাহলে কমপক্ষে ২১ দিন যেন নিয়মিত শ্মশানে আগুন জ্বলে, এ ব্যবস্থা করো।’
‘করব। এতে আপনার কী উপকার হবে, বুঝতে পারছি না।’
‘হবে, উপকার হবে। আমার একার নয় সকলের উপকার হবে।’
‘আচ্ছা, এ কাজ আমি করব। এবার বলুন তো বল্লম চোরকে কোথায় পাব?’
জানতে চাইলেন আদম শেখ। খুশিতে গদগদে গলায় বুড়ো বললেন, ‘তুমি এই মেঠো পথ ধরে গ্রামের দক্ষিণ দিকে যাও। বল্লমের বাড়ি চিনতে কষ্ট হবে না তোমার। আমাকে একটু ঘরে ফিরতে হবে, কাজ ফেলে এসেছি…।’
বলেই বুড়োটা আগুনে ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়া একটি পোড়াবাড়ীতে ঢুকে গেল। আর তখুনি আদম শেখের মনে পড়ল বুড়োটির নামই জিজ্ঞেস করা হয়নি। আদম শেখ কয়েক মুহূর্ত বুড়োটাকে নিয়ে ভাবুলতায় ডুবে গেলেন। লাঠিয়ালদের কথায় তাঁর ভাবুলতা ভাঙল।
‘কর্তা, চলুন ফিরে যাই। গ্রামটাকে ভাল ঠেকছে না!’
দু’লাঠিয়ালের একজন কথাটা বলে ফেলল। আদম শেখ বিরক্ত চোখে দু’জনের দিকে তাকালেন। অপর লাঠিয়াল কাচুমাচু করে বলল, ‘কর্তা, বলছিলাম কি, আপনি একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছিলেন। মানে কথা বলছিলেন একা-একা, তাই…!’
আদম শেখের চোখ লাল হল এবার। তাঁর লাল চোখের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে দু’লাঠিয়াল চোখ নামিয়ে নিলেন বেফাঁস কথা বলে ফেলার অপরাধবোধে। আদম শেখ মেঠো পথ ধরে হাঁটতে লাগলেন। রাগে-ক্ষোভে তিনি পেছনে তাকালেন না। তাঁর পেছনে লাঠিয়ালরা হাঁটছে টের পাচ্ছিলেন। হাঁটার শব্দে মনে হচ্ছিল অনেকগুলো লোক তাঁর পেছনে একসঙ্গে হাঁটছে। তিনি এ নিয়ে মাথা ঘামালেন না। এক সময়ে ডাকসাইটের পালোয়ান ছিলেন। পেছনে তাকিয়ে নিজের ভয় প্রকাশ করা বেমানান। গ্রামটিতে নির্জনতা থৈ থৈ করছে। চারপাশে গুমোট পরিবেশের জাল ছড়িয়ে আছে যেন। তিনি হন্ হন্ করে হাঁটতে লাগলেন মেঠো পথ ধরে দক্ষিণ দিকে। এক সময় পৌঁছে গেলেন চার তালগাছ পরিবেষ্টিত বল্লম চোরের বাড়ি। বল্লম চোরের বাড়ির প্রবেশ মুখে আদম শেখের পথ আগলে দাঁড়াল কুচকুচে কালো রঙের কদাকার মুখায়বের কয়েকজন ষণ্ডা মার্কা লোক। তারা এতই কালো যে, ওদের চোখ দু’টি শুধু দেখা যায়। শরীরে কাপড় বলতে লেংটির মতো কিছু পরে আছে। ঐ লেংটিও ওদের মতো ময়লা-কালো। হাঁটতে হাঁটতে আদম শেখের ক্লান্তি এসেছিল, বিটকেলে লোকগুলোর সামনে পড়ে তিনি একটু বিচলিত হলেন। তবে মুখে পালোয়ানের কাঠিন্যতা ফুটে রইল। কুত্্কুতে চোখের দৃষ্টি ফেলে একজন আদম শেখের উদ্দেশ্যে বলল, ‘আজ্ঞে, আপনার পরিচয়?’
‘আমার নাম আদম শেখ। তোমরা কারা?’
‘আমরা এই গাঁয়ে বাস করি। আপনার এই গ্রামে আসার হেতু?’
এ কথায় আদম শেখের রাগ হল। তিনি রাগের উত্তাপে বললেন, ‘তোমরা হয়তো জানো না, আমি একজন পালোয়ান। আট-দশজনকে একসঙ্গে প্যাঁদানী দিতে পারি।’
‘তো এখানে কি কুস্তি-লড়াই হবে? এমন তো শুনিনি!’
ফিক করে হেসে বলল লোকগুলোর মধ্য থেকে আরেকজন। তিনি জবাবে বললেন, ‘কুস্তি হলেও হতে পারে, আমি বল্লমকে খুঁজছি। ওর সঙ্গেই কুস্তি হবে। এটাই তো ওর বাড়ি, তাই না?’
কথাটা বলে তাঁর সামনের বাড়িটি দেখালেন আদম শেখ। বাড়িটির বড় উঠোনের চার কোণায় চারটি তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটা চিনতে তাঁর কষ্ট হয়নি। লোকগুলো একে-অন্যের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ওরা যেন চোখে চোখ রেখে কথা বলে নিল। লোকটি ফের বলল, ‘এটাই বল্লমেরই বাড়ি। তার সঙ্গে আপনার কাজ কী?’
‘সেটা তাকেই বলব। বল্লমের সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে। তোমরা কে হে, গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চাইছ?’
‘না, না, ঝগড়া করছি কই। পালোয়ানকে একটু পরখ করে নিচ্ছি। ঠিক আছে, যান, বল্লম বাড়িতেই আছে।’
কথা না বাড়িয়ে লোকগুলো তাঁর পথের সামনে থেকে সরে গেল। আদম শেখ বল্লম চোরের বাড়িতে গট্্গট্্ করে ঢুকে পড়লেন। বাড়িতে কেউ আছে বলে তাঁর মনে হল না। মরা বাড়ির মতো নীরব বাড়িটি। সামনে যে ঘরটি, সেটিও পোড়াকাঠের ভগ্নস্তূপ। আদম শেখ গলা ছেড়ে ডাকলেন, ‘বাড়িতে বল্লম বলে কেউ আছ নাকি? বের হয়ে আসো। তোমার সঙ্গে জরুরী কথা আছে।’
কোনো সাড়া পেলেন না তিনি। ফের ডাকলেন। কোনো সাড়া নেই। এবার তিনি পেছনে তাকালেন এবং পেছনে তাকিয়েই দেখলেন তাঁর সঙ্গে থাকা দু’লাঠিয়াল নেই। এ ঘটনায় অবাক হলেন তিনি। লাঠিয়ালদের এই আচরণে ভীষণ রাগ হল তাঁর। সেই রাগের কারণেই যেন তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘কীরে বল্লম, ঘরে থাকলে বের হয়ে আস। দেখি, তোর চেহারাখানা। আমার গরু চুরি করেছিস, তোর এত বড় আস্পর্ধা!’
পোড়াবাড়ীর দরোজা দিয়ে একটা আট-দশ বছরে ছেলে দৌড়ে বেরিয়ে এল। ওর গায়েও কাপড় বলতে নেংটি। ছেলেটির হাতে টুসির গলার পিতলের ঘণ্টাটা দেখতে পেলেন তিনি। তিনি নিশ্চিত হলেন এই বাড়িতেই টুসি আছে। তিনি ছেলেটিকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকতেই সে চলে এল তাঁর সামনে। আদম শেখ এবার আদুরে গলায় বললেন, ‘তুমি কে? তুমি কি বল্লমের ছেলে?’
ছেলেটি মানা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিল। আদম শেখের ভাল লাগল। তিনি বললেন, ‘এই ঘণ্টিটা আমার টুসির। তোমার বাবা টুসিকে চুরি করে নিয়ে এসেছে। তুমি কি এই ঘণ্টিটা আমাকে দেবে?’
ছেলেটি ঘণ্টিটা আদম শেখকে দিয়ে দিল। তিনি বল্লম চোরের ছেলেটির আচরণে মুগ্ধ হলেন। চোরের ছেলে এমন সুপুত্র হয়! বল্লমের প্রতি যে রাগ জন্মেছিল, তা যেন নিচে নামতে শুরু করছে। তিনি পরম মমতাভরা কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি কি জানো, তোমার বাবা কোথায় গেছে? আমার গরুটি কোথায় আছে?’
এবার ছেলেটি কথা বলল, ‘বাবা, গরুটাকে গোসল করাতে নদীর ঘাটে নিয়ে গেছে। ঐ দিকে…!’
ছেলেটি হাতের আঙ্গুল তুলে যে দিকটা দেখাল, সেই পথ ধরেই তিনি এ বাড়িতে এসেছেন। তবে পথে বল্লমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি কেন? হতে পারে, বল্লব অন্য পথে নদীর পাড়ে গেছে। আদম শেখ সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। ছেলেটি ফের এক দৌড়ে নিজের বাড়ির ভেতরে চলে গেল। তিনি টুসির ঘণ্টিটা মুঠোয় নিয়ে নদীর দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলেন। বল্লমের বাড়ি থেকে বের হয়ে ঐ কালো কুচকুচে লোকগুলোকে তিনি দেখতে পেলেন না। লোকগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। নদীর পাড়ে পৌঁছতে গিয়ে তিনি গলদঘর্ম হয়ে গেলেন। কিন্তু নদীর পাড়ে এসেও তিনি বল্লম ও টুসিকে দেখতে পেলেন না। বজরার মাঝি ও লাঠিয়ালরা কী কারণে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বজরায় বসেছিল। তাঁকে দেখেই তড়িঘড়ি করে বজরা ছাড়ার প্রস্তুতি নিল তারা। আদম শেখ টুসিকে নিয়ে যাবার কথায় অনড় থাকতে পারলেন না। মাঝি ও লাঠিয়ালরা তাঁর পায়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। ওদের ভয়ের কাছে হার মেনে তিনি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বজরা ছাড়ার অনুমতি দিলেন। বাড়ি ফিরে টুসিকে দেখতে পাবেনÑ এমন কল্পনাও করেননি আদম শেখ। তাঁর বজরা বাড়ির সামনে নদীতে ভিড়তেই জানতে পেলেন টুসি নিজে-নিজেই বাড়ি ফিরে এসেছে। বিস্ময়ের একটা ধাক্কা এসে গ্রাস করল তাঁকে। এত দূর থেকে তাঁর আগে টুসি ফিরে এসেছেÑ এটা বিশ্বাস করা যায়? বাড়ি ফিরে তিনি টুসিকে দেখলেন। টুসির গলায় ঘণ্টিটা নেই। তিনি বল্লমের ছেলের কাছ থেকে নিয়ে আসা ঘণ্টিটা টুসির গলায় ফের বেঁধে দিলেন। টুসি ফিরে আসা নিয়ে বাড়িতে একটা উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হল। কিন্তু আদম শেখের মনের ভেতর টুসিকে ফিরে পাবার আনন্দটা রং ছড়াতে পারছিল না। কোথায় যেন খচ করে কিছু বিঁধে রইল রহস্যের কাঁটা। টুসির হারিয়ে যাওয়া এবং ফিরে আসার মধ্যে কেমন একটা রহস্য আছে বলে তাঁর মনে হচ্ছিল।
তিন
কাশীপুর গ্রাম থেকে পশ্চিম দিকে যেয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পেরুল এক প্রত্যন্ত জনপদ। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী পরিবেষ্টিত এই জনপদে নরহরি ডাকাত দলের আবির্ভাব ঘটল। নরহরি ডাকাত দলের বাস কোথায় জানা না গেলেও সিরাজদীখান, কালীনগর ও রাধানগর এলাকায় তার দলের উপদ্রবের কথা এসে পৌঁছল কাশীপুর গ্রামেও। নরহরি ডাকাত দল নাকি সচ্ছল গৃহস্থের বাড়িতে ডাকাতি করে। এই ডাকাত দলের বাহাদুরী হচ্ছে, তারা যে বাড়িতে ডাকাতি করবে, ঐ বাড়িতে আগে ডাকাতি করার খবর পাঠায়। আগাম খবর দিয়ে ডাকাতি করার কথা আগে এই বৃহৎ অঞ্চলের মানুষ শোনেনি। নরহরি ডাকাত দলের সদস্যরা যে বাড়িতে ডাকাতি করবে, আগে ঐ বাড়ির সামনে কয়েকদিন নানা ছদ্মবেশে ঘোরাঘুরি করবে। গৃহস্থের বাড়ি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেবে। এরপর একদিন রাতে ওই বাড়ির সদর দরোজায় পত্র লিখে যাবে। তারা কোনদিন ডাকাতি করতে আসবে এ কথা পত্রে লেখা থাকবে। পত্রপাঠ করে গৃহস্থকে টাকা-কড়ি, ধান-চাল মজুদ রাখতে হবে। ডাকাতরা পূর্ব ঘোষিত রাতে এসে গৃহস্থের আতিথেয়তা গ্রহণের মধ্য দিয়ে টাকা-কড়ি, মালামাল নিয়ে চলে যাবে। নরহরি ডাকাত দলে নাকি অনেক চৌকষ মাঝি-মাল্লা আছে। বিভিন্ন অঞ্চলে যারা নৌকা বাইচ করে মেডেল পায়, নরহরি তাদের ডাকাত দলের সদস্য করে নেয়। তিরিশ-চল্লিশটি নৌকায় নরহরি ডাকাত তার দল নিয়ে ডাকাতি করতে আসে। তার দলের সদস্যদের হাতে থাকে রাম দা, বল্লম, তরবারি, ধারাল ছুরি, এমনকি তীর-ধনুকও। তারা গরীবের বাড়িতে হামলা করে না, আর কেউ পুলিশে খবর দিলে ঐ গৃহস্থের বাড়িতে পরে এসে রক্তাগঙ্গা বইয়ে দেয়। রাধানগর গ্রামে গাজীবাড়ীতে গত অমাবস্যার রাতে নরহরি ডাকাত দলের ডাকাতি করার কথা ছিল। খবরটা পুলিশকে জানানো হয়েছিল। দারোগা কেদার বাবু ছয় সিপাহী নিয়ে আগ থেকেই গাজীবাড়ীর খড়ের গাদায় লুকিয়েছিলেন। নরহরি ডাকাত এই খবরটা পেয়েও গিয়েছিল। ব্যস, ডাকাতরা বাড়িতে এসে প্রথমে খড়ের গাদায় আগুন লাগিয়ে দিল। চার সিপাহীসহ দারোগা কেদার বাবু যখন খড়ের গাদা থেকে বের হয়ে এল, তখন তাদের ঘিরে উল্লাস করছিল নরহরি ডাকাত দলের সদস্যরা। এরপর ডাকাতরা দারোগা কেদার বাবুকে নাঙ্গা করে নাচিয়েছিলÑএমন কথা রটে গিয়েছিল। কেদার বাবু নাকে খত দিয়ে সিপাহী নিয়ে থানায় ফিরেছিল সে রাতে। এখানে শেষ নয়, পুলিশে খবর দেওয়ার দুঃসাহসের কারণে গৃহস্থকে তাঁর বাড়ির উঠোনে কেটে কুচি কুচি করা হল। লুটপাত তো হলই। নরহরি ডাকাত দলের নানা লোমহর্ষক কথা কাশীপুরের বাতাসে কয়েকদিন ধরে ভেসে বেড়াতে লাগল। নরহরি ডাকাত কোথায় থাকে, কবে-কোথায়-কার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে, এমন কথা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছিল না। নরহরি ডাকাত দলকে গ্রেফতার করতে দারোগা কেদার বাবুকেও আর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। নরহরি ডাকাত দলের নানা বীরত্বপূর্ণ কথা কাশীপুর গ্রামের মানুষদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। এই ডাকাত দল নিয়ে গ্রামের মানুষদের মধ্যে চাপা আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ল। একটা সময় চাপা আতঙ্কটা আর চাপা রইল না। আতঙ্ক বাড়ল কাশীপুর গ্রামে বেশ কয়েকদিন ধরে অচেনা কিছু লোকের আনাগোনা দেখে। লোকগুলোর গায়ের রং কুচকুচে কালো, শরীরে পোশাক বলতে লেংটি। সন্ধ্যা নামলে তাদের এখানে সেখানে দেখা যায়। কখনো হাটখোলা মাঠের সামনে, কখনো শিকদারবাড়ীর সামনে বা কখনো খেয়াঘাটের পাশে তারা জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের বেশি দেখা যাচ্ছিল আদমবাড়ীর সামনে। সন্ধ্যার পর লোকজন বাড়ি থেকে খুব একটা বের হয় না। এরমধ্যে যারা রাস্তায় বের হন, তারাই লোকগুলোকে দেখতে পান। তারা নরহরি ডাকাত দলের সদস্য বলে আতঙ্কের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। ফলে গ্রামের কেউ সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে যেন বের হতে চাইত না। কাউকে দেখলে লোকগুলো নাকি পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে। কোনো কথা বলে না। তাদের চোখের দৃষ্টিতে নাকি খুনের নেশা দেখেছে কেউ কেউ। লোকগুলোর সঙ্গে কেউ কথা বলতে এগিয়ে গেলে তারা নাকি আবার সটকে পড়ে। কখনো-বা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়! লোকগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়Ñ এ কথা ছড়াল বেচু। কথাটা পৌঁছল আদম শেখের কানেও। তিনি বিচলিত বোধ করলেন। নরহরি ডাকাত দলের কথা শুনে তিনি কয়েকদিন যাবত চিন্তিত ছিলেন। কাশীপুরে নরহরি ডাকাতি করলে তাঁর বাড়িতেই প্রথম করবে। এই দুশ্চিন্তার রেশ নিয়ে এক সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির সামনে তাঁর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল কালো কুচকুচে একদল মানুষ। মানুষগুলোকে দেখে তিনি চিনতে পারলেন। গঙ্গাচরে বল্লম চোরের বাড়ির প্রবেশ মুখে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। তিনি হচকিয়ে বললেন, ‘তোমরা? এখানে কেন? কীভাবে এলে এখানে?’
কালো কুচকুচে মানুষগুলোর আড়াল ঠেলে আদম শেখের সামনে এসে দাঁড়াল সেই বুড়ো। বুড়োকে দেখে ভীষণ অবাক হলেন তিনি। বিস্মিতকণ্ঠে বললেন, ‘আপনি!’
‘হুম।’
‘কী ব্যাপার? এখানে যে!’
‘তোমার জন্য এখানে আসতে হল, বাবু।’
‘আমার জন্য? আমি কী করেছি?’
‘তুমি কথা দিয়েছিলে গঙ্গাচরের শ্মশানের চিতা জ্বালাবে। কথা এখনো রক্ষা করোনি।’
আদম শেখ কথা দিয়েছিল ঠিক, কিন্তু এর জন্য এই বুড়ো দলবল নিয়ে এতদূর আসবেন, এটা ভাবেননি। তিনি কথা দিলেও গরুটিকে বল্লম শেখের বাড়িতে পাননি। বাড়ি ফিরেছিলেন শূন্য হাতে। বাড়ি ফিরে দেখেন টুসি ফিরে এসেছে। ফলে গঙ্গাচরে এই বুড়োকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবেÑএমনটি তাঁর ভাবনায় আসেনি। সাধারণত তিনি কথা দিলে কথা রক্ষা করেন। মনে মনে কথাটা ভেবে আদম শেখ খানিকটা নরমকণ্ঠে বললেন, ‘আমি কথা দিলে কথা রক্ষা করি। কিন্তু আমি তো গরুটাকে গঙ্গাচরে পাইনি। বল্লম চোরকেও পাইনি। তাই…!’
‘বাবু, পেয়েছেন তো। নিজ বাড়িতেই গরুটা পেয়েছেন, সেটা মন্দ কী? আমরা কতকিছু হারিয়েছি, কিন্তু কিছুই ফেরত পাইনি। এমন অভাগা আমরা…!’
আদম শেখের মনে হল রহস্যের আরেক ধাপ তাঁর সামনে। এই রহস্য ভেদ করতে হবে। তিনি চতুরতার আশ্রয় নিয়ে বললেন, ‘সেদিন আপনার নাম-পরিচয় জানা হয়নি। আপনার কারণে বল্লম চোরের বাড়ি পৌঁছতে পেরেছি। হুজ্জৎ হলেও হতে পারত, হয়নি। সে যে আপনারই কারণে কোনো বিপদ হয়নি, সেটা পরে বুঝতে পেরেছি। টুসিটাও বাড়িতে ফেরত এসেছে আপনার কোনো ইঙ্গিতে, তা-ও বুঝেছি। কিন্তু এটা জানি না, আপনি কে? কী আপনার পরিচয়?’
‘পরিচয় জেনে কী হবে, বাবু? তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করো।’
বললেন বুড়ো। আদম শেখ বললেন, ‘কালই বজরায় তুলে বেচুকে অর্থ-কড়ি দিয়ে গঙ্গাচরে পাঠিয়ে দেব। খুব শিগ্গির গঙ্গাচরের শ্মশানের চিতা জ্বলবে এবং তা কমপক্ষে একুশ দিন জ্বলবে, আপনাকে কথা দিচ্ছি। এ কথার বরখেলাপ হবে না, শপথ করে বলছি।’
তাঁর কথায় বুড়ো স্বস্তি পেলেন। কালো কুচকুচে লোকগুলো নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিল একবার। বুড়ো বললেন, ‘তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলে গরুটাকে ফেরত পেয়েছ। এখনো তোমার কথা বিশ্বাস করে ফিরে যাচ্ছি। তবে কথার যেন বরখেরাপ না হয়, বাবু। তাহলে তোমার ঘোরতর বিপদ হবে, বলে রাখছি!’
‘সে না-হয় বুঝলাম, কিন্তু আপনারা কারা?’
প্রবলভাবে জানতে চাইল আদম শেখ। বুড়ো চারপাশটা দেখে নিয়ে নিচু গলায় বললেন, ‘আমরা গঙ্গাচরের ভূত! তুমি তো বাবু, আবার ভূত আছে বলে বিশ্বাস করো না!’
এ কথায় গা র্শির্শি করে উঠল আদম শেখের। যে রহস্যটা ভেদ করতে পারছিলেন না, সেই রহস্য উন্মোচত হল এমনভাবে, যা তাঁর এতদিনের বিশ্বাসের ভিতে চিড় ধরাল। ভূত আছে এ কথা কখনই তিনি বিশ্বাস করতেন না। অথচ তাঁর সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা নিজেদের ভূত বলে পরিচয় দিচ্ছে। তিনি হতবিহ্বল চোখে বুড়োর দিকে তাকিয়ে রইলেন। বুড়ো বললেন, ‘আমাদের কোনো নাম নেই এখন। যখন মানুষ ছিলাম, তখন প্রত্যেকের নাম ছিল।’
‘কিন্তু…!’
‘তোমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে জানি। তুমি যে বল্লমকে খুঁজছিলে, সে-ও আমাদের সঙ্গে কয়েক শ’ বছর আগে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরে ভূত হয়েছে। বল্লমের ছেলের কাছ থেকে তুমি ঘণ্টাটা নিয়ে এসেছ। সে ছেলেটিও আমাদের সঙ্গে মরে ভূত হয়েছে।’
আদম শেখের কান যেন তালাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি এসব কী শুনছেন? বুড়ো ফের বললেন, ‘আমরা মরে ভূত হয়েও শান্তি পাচ্ছি না। আমরা বিলীন হতে চাই। আমরা শ্মশানের চিতায় পুড়ে বিলীন হতে চাই, বাবু। গঙ্গাচর গ্রামটি এতই অবহেলিত যে, এখানে কেউ আসে না। কেউ বাস করে না। চিতার আগুনও আর জ্বলেনি। ফলে নিজ গ্রামের চিতার আগুনে পুড়ে বিলীন হব, এই আকাক্সক্ষাও আমাদের পূরণ হয়নি।’
‘এমন কথা কখনো শুনিনি!’
‘শুনবে কেন? কেউ কি বলবে নাকি? ভূতের দেখাও কি সকলে পায়?’
‘তা ঠিক। তবে…!’
‘কী?’
‘একুশ দিন চিতা জ্বালিয়ে রাখার হেতু কি, জানতে পারি?’
‘আমাদের গ্রামের সকলে মরে ভূত হয়েছে। যাঁরা বিলীন হতে চাইবে, তাঁরা চিতার আগুনে ঝাঁপ দিবে। গ্রামের সকল ভূতের বিলীন হতে হলে চিতার আগুন কমপক্ষে একুশ দিন জ্বলে থাকতে হবে। তাই তোমাকে শ্মশানের চিতায় একুশ দিন আগুন জ্বালিয়ে রাখার কথা বলেছি।’
‘রাখব, রাখব। প্রয়োজনে আরও সাত দিন বেশি আগুন জ্বালিয়ে রাখব।’
‘গ্রামের সকল ভূত বিলীন হবে, এমনটা মনে হচ্ছে না। যাঁরা গ্রামে থেকে যাবে, তাঁরা সম-সময় তোমার অবদানের কথা মনে রাখবে। আমি ওদের বলে যাব, বাবু।’
কথাটা এমনভাবে বললেন বুড়ো, যেন পুরস্কার ঘোষণা করছেন। আদম শেখ খুশি হলেন কথাটা শুনে। তিনি বললেন, ‘যদি অভয় দেন, একটা আর্জি পেশ করতে চাই।’
‘বলো। আমাদের বেশি সময় নেই, হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে হবে।’
‘বলছিলাম কি, নরহরি ডাকাত দলের উপদ্রব বেড়েছে। খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।’
‘ভয় নেই। নরহরিকেও আমরা চিতায় ফেলব। ও ডাকাত দল তখন ভেঙে যাবে। হল?’
‘শতকোটি পেন্নাম জানাই, ভূত মশাই!’
আদম শেখ দু’হাত উঁচু করে প্রণাম করার ভঙ্গি করতে গিয়ে দেখলেন তাঁর সামনে কেউ নেই। সন্ধ্যার নিকষ অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এসেছে। এতগুলো লোক অন্ধকারে মিলিয়ে গেল এক লহমায়। আদম শেখ বুকের ভেতর সাহস এক করে চারপাশটা দেখে নিলেন। কোথাও কেউ নেই। নিজের হাতে একটা চিমটি কেটেও দেখলেন। অনুভূতি আছে। এটা স্বপ্ন নয়। ভূত বিশ্বাস করেন না, অথচ ভূতের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন হল। গঙ্গাচরেও হয়েছে। আশ্চর্য! গঙ্গাচরের শ্মশানে আটাশ দিন চিতায় আগুন জ্বালাতে যে পরিমাণ খরচ হবে, সেটা একেবারে বিফলেও যাচ্ছে না। বিনিময়ে নরহরি ডাকাত সর্দারের একটা হিল্লেও হবে। ভূত প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা হবেই বলে তিনি এই মুহূর্তে বিশ্বাস করছেন। তিনি গর্ব ভরা বুকে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
পাদটীকা : গঙ্গাচরের শ্মশানের চিতা আটাশ দিন নয়, প্রায় দু’মাস নিয়মিতভাবে জ্বলেছিল। এরপর গঙ্গাচরে ফের মানুষের বসতি শুরু হয়েছিল। আদম শেখের কাছ থেকে অর্থ-কড়ি পেয়ে সেখানে প্রথম বসতি গড়েছিল বেচু। এখানে সে তার নামের শেষে জুড়ে দিয়েছিল ‘ফকীর’ পদবী। গঙ্গাচরে চৈত্রমাস জুড়ে শ্মশানের নিচে নদীর তীরে জমতে লাগল বেচু ফকীরের মেলা। এ মেলায় আদম শেখ দলবল নিয়ে হাজির হতেন। আশে পাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসত। মেলাকে কেন্দ্র করে গঙ্গাচরে হতো উৎসব। গঙ্গাচরে প্রতিবছর এখনো বেচু ফকীরের মেলা বসে। অনেক কালো কুচকুচে অচেনা লোকও এই মেলায় ভিড় জমায়…।
ভূতের বার্তা
একটা নিরিবিলি জায়গায় কয়েকদিন থেকে গল্প লেখার প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন প্রকাশক আরিফুজ্জামান। ঢাকা শহরের ব্যস্তটা দিনদিন যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিণত হচ্ছে ইট-কাঠের প্রাণহীন শহরে। শহরটা বদলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কেমন জানি যান্ত্রিকও হয়ে যাচ্ছে। দম ফেলার সময় যেন কারো নেই। লেখকদের তো একটু নিরিবিলি পরিবেশ দরকার। নাগরিক কোলাহল ছেড়ে একটু নির্জনতা, নৈসর্গিক পরিবেশের সান্নিধ্য একজন লেখককে সাহিত্য চর্চায় অনুপ্রাণিত করেÑ কথাটা ফেলে দেওয়া যায় না। সাদেক আহমেদ গত কয়েক বছর ধরে লেখালেখির জগতে সুনাম কুড়িয়েছেন। বিশেষ করে ভূতের গল্প লেখায় তার প্রশংসা দিনদিন ছড়িয়ে পড়ছে। এই তো গত একুশের বইমেলায় তার ‘কয়লাখনিতে বেক্কল ভূত’ নামের বইটির চার সংস্করণ ফুরিয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সাহিত্য সভা বা লেখকদের আড্ডায় গেলে সাদেক আহমেদ আজকাল বিশেষ সমীহ পাচ্ছেন। পাঠকদের কাছ থেকে দিনদিন শ্রদ্ধা-সাড়া বাড়ছে। লেখক হিসাবে সুনামের সলতেটা যখন প্রজ্জ্বলিত হয়ে আলো ছড়াতে শুরু করেছে, ঠিক সে সময়ে যেন তার চিন্তা-মননে এক ধরনের খরা সৃষ্টি হল। গত দু’তিন মাস হল তিনি লিখতে বসে আর কিছু লিখতে পারছেন না। কম্পিউটারের সামনে মাউস নিয়ে নাড়াচাড়া করেন শুধু। কিছু লিখতে পারেন না। আর স্ক্রিনে হাবিজাবি কিছু শব্দ লিখে কেমন জব্দ হয়ে বসে থাকেন। আজকাল তার মাথা খোলে না। তার লেখক সত্তা আকস্মিভাবে যেন নির্বাসিত হয়ে গেছে! অবশ্য, মাঝেমাঝে লেখকরা এমন সংকটে পড়েন বৈকি! তারা কখনো কখনো লেখালেখির প্রবল জোয়ারে ভেসে যান, আবার কখনো কখনো ভাটায় আটকে যান। এমন সংকটের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছিলেন তিনি। মাস খানেক আগে লেখালেখি নিয়ে তার কথা হচ্ছিল আরিফুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি লেখালেখি করতে পারছেন না এ কথা আরিফুজ্জামানকে জানিয়েছিলেন। তখনই আরিফুজ্জামান তাকে বলেছিলেন শহর থেকে দূরেÑ গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে দু’-একটা দিন থেকে আসার। আরিফুজ্জামানের নিজের একটি খামারবাড়ী আছে তাদের গ্রামেÑ এ কথাও জানিয়েছেন সঙ্গে সঙ্গে। তিনি আরও জানালেন, খামারবাড়ীটি প্রায় সারাবছর খালি পড়ে থাকে। আব্দুল কাদের মিয়া নামক একজন কেয়ারটেকার বাগানবাড়ীটি দেখভাল করছেÑ এটাও জানালেন। ঐ বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য থাকার ব্যবস্থা করে দেবেনÑ এ কথাও সোৎসাহে বললেন আরিফুজ্জামান। শুধু বলেই ক্ষান্ত হননি। এক সপ্তাহ আগে বাংলাবাজার এলাকায় ফের দেখা হলে আরিফুজ্জামান তাকে তাদের বাগানবাড়ীতে কয়েকদিন বেরিয়ে আসার জন্য চেপে ধরলেন। তিনি সাদেক আহমেদের ডান হাত নিজের দু’হাতের মুঠোবন্দী করে আন্তরিক গলায় বললেন, ‘শুনুন, সব ব্যবস্থা করা আছে। আপনি আগামী শুক্রবার সকালে তৈরি থাকবেন। আমি গাড়ি পাটিয়ে দেব। আমার পরিচিত ড্রাইভার আপনাকে আমাদের খামারবাড়ীতে নিয়ে যাবে। ওখানে কয়েকদিন থাকুন। দেখবেন ফের হাত খুলে লিখতে পারছেন। আগামী বছরের বইমেলায় আমার একটা বই চাই-কিন্তু!’
সাদেক আহমেদ তার কথায় জোরালো সম্মত্তি প্রকাশ করেননি, আবার অসম্মত্তিও জানাননি। তারও মনে হচ্ছিল কোথাও নিরিবিলি-নির্জন পরিবেশে দু’-একটা দিন ঘুরে আসলে মন্দ হয় না। আরিফুজ্জামানের কীসের যেন তাড়া ছিল সেদিন। তিনি দ্রুত সাদেক আহমেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। যাবার সময় তাদের পারিবারিক খামারবাড়ীতে যাবার প্রস্তÍতি নিয়ে রাখার কথাটা পুনরায় ব্যক্তও করেছিলেন। সাদেক আহমেদ জানেন আরিফুজ্জামান নাছোড়বান্দা টাইপের লোক। একবার কিছু বলে ফেললে সেটা করে ছাড়বেন। পরদিন সকালে সাদেক আহমেদের বাসায় সত্যি-সত্যি এক ড্রাইভার এসে হাজির। ওর নাম আবুল। আবুল এসে বলল, ‘স্যার, আরিফুজ্জামান স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে গ্রামে নিয়ে যেতে।’ মনে মনে একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন সাদেক আহমেদ। একবার ভেবেছিলেন ফোন করে নিজ থেকেই গ্রামে কয়েকদিন কাটিয়ে আসার কথাটা বলবেন। কিন্তু সঙ্কোচে আরিফুজ্জামানকে ফোন করে নিজের মনোভাবের কথা জানাননি। তার মনে হয়েছিলÑ আরিফুজ্জামান ঠিকই ড্রাইভার-সমেত গাড়ি পাঠাবেন। ড্রাইভার আবুলের আগমনে তার ধারণা সঠিক হল। সাদেক আহমেদ চট করে নিজের কয়েকটি জামা-কাপড় গুছিয়ে নিয়ে আবুলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন। সাদেক আহমেদের স্ত্রী রাহেলা অবাক চোখে তার প্রস্থানের দিকে চেয়ে রইলেন। যাবার সময় সাদেক আহমেদ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটু নিরিবিলি জায়গায় থেকে লেখালেখি করতে যাচ্ছি। ভাল লাগলে দু’-তিন থাকব। ফোনে যোগাযোগ থাকবে। খুব জরুরী না হলে আমাকে ফোন করো না।’
সাদেক আহমেদ পলাশপুর গ্রামে যখন পৌঁছলেন, তখন বিকেল সন্ধ্যায় সমর্পিত হতে যাচ্ছে। পলাশপুর গ্রামের সন্ধ্যাটা কেমন যেন লালচে রং ছড়ানো। এখানকার অন্ধকার কেমন ঘন আর শীতল মনে হল তার। সন্ধ্যারও যে একটা ভারিক্কি রূপ আছেÑ সেটা যেন নগরজীবনে অভ্যস্ত হয়ে ভুলতেই বসেছিলেন। ঢাকা শহরে সন্ধ্যা নামে রূপসী নারীর মতো জৌলুশ ছড়িয়ে। চারপাশে আলোর ফোয়ারা ঝলমলিয়ে ওঠে। এখানকার সন্ধ্যা অন্ধকারের ঘোমটা পড়ে নামে। অন্ধকারেরও গহীন লাবণ্য আছে। সাদেক আহমেদকে বাগানবাড়ীতে নামিয়ে আবুল চলে গেল ‘পরশু বিকেলে আপনাকে নিতে আসব’ এই কথা জানিয়ে। আবুল যাবার সময় এটাও বলল, ওকে ফোন করলে কাল বিকেলেও চলে আসতে পারবে সে। তিনি এখানে দু’-তিনদিন থাকবেন বলে মন স্থির করে রেখেছিলেন। তাই আবুলকে এ নিয়ে কিছু বললেন না। আবুল চলে যাবার আগে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছে বাগানবাড়ীর কেয়ারটেকারে আব্দুল কাদের মিয়ার সঙ্গে। কাদের মিয়ার বয়স ষাটের উপর। একষট্টি থেকে সত্তরের কাছাকাছিও যেকোনো সংখ্যা হতে পারে তার বয়স। প্রথম দেখাতেই তার মনে হল কাদের মিয়া কথা কম বলেন। হাঁটা-চলা করেন ধীরে-সুস্থে। বয়সের ভার বইছেন যেন। কাদের মিয়া তাকে তার থাকার রুম দেখিয়ে দিলেন। খাবার ঘরও দেখালেন। ফ্রিজে খাবার ও ফলফলাদি মজুদ আছে জানালেন। ‘আপ্যায়নের কোনো কমতি হবে না’Ñ এ কথাও বিনয়ের সঙ্গে জানালেন। বাইরে থেকে বাড়িটিকে পুরানো বাড়ি মনে হলেও ভেতরে বেশ পরিপাটি। কক্ষগুলোতে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রে সাজানো। বিশাল ড্রয়ই রুমটিতে দুই জোড়া সোফাসেট। মেঝে মখমলের কার্পেটে মোড়ানো। সিলিংয়ে বড় আকৃতির একটা ঝাড়বাতিও রয়েছে। দক্ষিণ ও পূর্ব দিকের দেয়ালে দু’টি তৈলচিত্র ঝুলানো। একটি ছবিতে রক্ত ঝরা দু’টি চোখ। অপর ছবিতে একজন নারীর মুখায়ব ঢেকে আছে অনেকগুলো গোলাপকুঁড়িতে। গোলাপ আবৃত নারীর চোখ দু’টি বড্ড মায়াবী। তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। চোখ নিয়ে পরস্পর বিরোধী বিষয়ক এই ছবি দু’টি কেন দেয়ালে শোভা পাচ্ছেÑ এ প্রশ্ন আরিফুজ্জানের সঙ্গে দেখা হলেই করবেন, মনে মনে ঠিক করে ফেলেন তিনি। ছবি দু’টো দেখার পরপরই সাদেক আহমেদের বাড়িটি ঘুরে দেখার খুব ইচ্ছে হল। তিনি কাদের মিয়াকে বললেন, ‘সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। রাত নামার আগেই আমি কি বাড়িটা ঘুরে দেখতে পারি?’
‘সকালে দেখলে হয় না, স্যার?’
পাল্টা প্রশ্ন কাদের মিয়ার। তিনি বলেন, ‘না, এখনই দেখতে চাই। বাড়িটা জুড়ে গা ছমছম করা কেমন নির্জনতা আছে। বাড়ির পেছন দিকটায় কী আছে, বলুন তো!’
প্রশ্নটা তিনি যেন করবেন এবং প্রশ্নের জবাবটা কাদের মিয়ার ঠোঁটেই ছিল। তিনি বললেন, ‘স্যার। এটি বিশাল এক বাগানবাড়ী। বাড়ির পেছনে গাছ-গাছালি এমনভাবে আছে, মনে হবে জঙ্গলে ঢুকছেন। জঙ্গল পেরুলে একটা পদ্মদীঘি আছে। দীঘির ওপারে বাঁশবন। আরও ওপারে…!’
এ পর্যন্ত আসতেই কাদের মিয়ার কথা হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন সাদেক আহমেদ। তিনি বললেন, ‘অত বলতে হবে না। চলুন একটু ঘুরে আসি। নিজের চোখেই দেখি।’
নিজের ভেতরে মৃদু উত্তেজনা টের পাচ্ছিলেন তিনি। মনে মনে আরিফুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানালেন। আসলে এমন নির্জন এক বাড়িতে থাকার প্রয়োজন ছিল তার। মনটা কেমন চনমন করছে। ভাবনার মধ্যে কেমন আবেশ পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও একটা হিমশীতল ভয়ের পরশও ছড়িয়ে যাচ্ছে। ভয়টা পরিবেশের। বাড়িটির প্রতিটি কক্ষে বিজলি-বাতি থাকলেও বাড়ির বাইরে কোনো বিজলি-বাতি নেই। বাড়ির বাইরে পা রেখে এটা বুঝতে পারলেন তিনি। একটু গা ছমছম করল বুঝি তার। গাছ-গাছালিতে ভরা বাগানে বিজলি-বাতির ব্যবস্থা থাকলে অবশ্য বনের পরিবেশ বিঘ্নিত হতো। যাই হোক, সন্ধ্যাকালীন অন্ধকারে এই বাগানটি শহরের যে কাউকে একটু ভয় ধরিয়ে দিতেই পারে। তাই বলে স্বনামখ্যাত ভূতের গল্প লিখিয়ের মনে ভয় প্রশ্রয় পাবার কথা নয়। সাদেক আহমেদেরও মনে কোনো ভয় নেই। একটু ‘ভয় ভয়’ ভাব মনে ছড়িয়ে ছিল বটে, তা আবার মিলিয়েও গেল। নিজেকে নিজে অভয় দেন তিনি। ভূত বলতে কিছু বিশ্বাস করেন না তিনি। বরং ভূত নিয়ে নানা গল্প ফাঁদেন। সাদেক আহমেদকে বাড়ি থেকে বের করে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছিলেন কাদের মিয়া। তার হাতে একটা হ্যারিকেন। হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় মেঠো পথ ধরে এগিয়ে গেলেন তারা। কোমর উঁচু নানা গাছের পাতা-লতা-গুল্ম সরিয়ে সরিয়ে হাঁটছেন তারা। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, ব্যাঙের গ্যাংগোর গ্যাং চিৎকার আরও কিছু নাম না জানা পোকার শোরগোলে কেমন একটা বন্য আবহ বাগান জুড়ে। তাদের হাঁটার সময় হঠাৎ একটা বড় আকারের কালো বিড়াল তাদের পথ কেটে দৌড়ে চলে গেল। বিড়ালের চোখ দু’টি জ্বলজ্বল করছিল। পথ পেরুবার সময় জ্বলজ্বলে দৃষ্টি দিয়ে বিড়ালটি যেন তাকে ভর্ৎসনা করে গেল। সাদেক আহমেদ বিড়ালটি নির্ভয়ে দৌড়ে ছুটে চলার আকস্মিক শব্দে একটু ভড়কেও গেলেন। তবে ভড়কে যাওয়াটাও ছিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তিনি মনে মনে ভেবে নিলেন এই বিড়ালটি নিয়ে আজ রাতে একটি ভূতের গল্প লিখবেন। এই যে বিড়ালটি তাকে ভয় দেখিয়ে চলে গেল, এর বর্ণনাও দেবেন গল্পে। তবে গল্পে বর্ণনা করবেন বিড়ালের দু’টি মাথার। দু’ মাথার বিড়ালের জ্বলজ্বলে চার চোখ! এটি একটি বিড়াল ভূত। ভূতের গল্প লিখতে হলে অনেক কিছু বাড়িয়ে লিখতে হয়। ভূতের গল্প মানেই তো ভয় জাগানিয়া কিছু বর্ণনা ও গল্পের ফাঁদ। অনেকদিন পর তার মনে গল্প উঁকি দিল। আর এই মুহূর্তে তিনি এই বাগানবাড়ীতে আসার স্বার্থকতা খুঁজে পেলেন। একটু তন্ময়তার মধ্য দিয়েই কাদের মিয়াকে অনুসরণ করে চলে এলেন পুকুর পাড়ে। পদ্মদীঘিতে বিশাল সান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের সিঁড়িগুলোতে সর্বত্র শ্যাওলা ঠেসে আছে। ঘাটটি যে অনেক বছর হল ব্যবহৃত হচ্ছে না, তা দেখেই বুঝতে পারলেন তিনি। যদিও সন্ধ্যার অন্ধকারে সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পারছিলেন না, তবে ঠাওর করতে পারছিলেন। পুকুর ঘাটের পাশে বিরাট এক বটগাছ শাখা-শিকড় এমনভাবে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন পুকুর আর ডাঙ্গার মধ্যে একটা সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে রেখেছে। বটগাছটির শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটি নেমেছে পুকুরের জলে। কতগুলো শিকড় লম্বা লম্বা স্তম্বের মতো ঢুকে গেছে মাটিরে নিচেও। গাছের বিভিন্ন ডালে অন্যগাছের বসবাসও তার চোখের দৃষ্টি এড়াল না। এক ঝটকায় বটগাছটির দিকে তাকালে গা র্শ্িির্শ্ করে উঠে। বটগাছের মূলের সামনে সমতল ভূমিতে একটা হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ার দেখতে পেলেন তিনি। তার দৃষ্টি পাঠ করেই যেন কাদের মিয়া নিজ থেকে বললেন, ‘এটি অনেক বছরের পুরানো লোহা কাঠের চেয়ার। ঝড়-বৃষ্টিতেও নষ্ট হয় না। স্যার, মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে মিলেটারিরা অনেককে ধরে এনে এই বটগাছের সামনে বা কখনো পুকুর পাড়ে দাঁড় করিয়ে তাদের হত্যা করত। এই চেয়ারটায় বসে থাকত মিলেটারিদের কমান্ডার। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এই চেয়ারটা কেউ স্পর্শ করে না ঘৃণায়! সেই থেকে চেয়ারটা এখানেই পড়ে আছে। আমরাও চেয়ারটাকে সরাই না।’
এ কথা শুনে মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে গেল তার। সন্ধ্যার আরতিপূর্ণ মুগ্ধ হবার মতো অন্য পরিবেশটা বদলে গেল এক লহমায়। তিনি অস্বস্তিতে কাদের মিয়ার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘চলুন, এবার বাড়ির ভেতরে চলে যাই। এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।’
ভূতের গল্পটা অনেকটাই লিখে ফেললেন। অনেকদিন পর একটানে গল্প লিখছিলেন একটুও না থেমে। গল্পটা শেষ করতে পারলেন না ল্যাপটপের চার্জ চলে যাওয়ায়। ল্যাপটপটির পুরো চার্জ ছিল। ল্যাপটপের চার্জ পুরো থাকলে একটানা চার-পাঁচ ঘণ্টা তিনি লিখে যেতে পারেন। কিন্তু দু’ ঘণ্টার মধ্যে আজ তাকে থামতে হল। হঠাৎ ল্যাপটপ বিগড়ে গেল চার্জ না থাকায়। তিনি দমে গেলেন না। ব্যাগ থেকে চার্জের পাওয়ার ক্যাবেল বের করে সংযুক্ত করলেন ল্যাপটপ ও ইলেক্ট্রনিক্স পাওয়ার পয়েন্টে। ল্যাপটপ চার্জ হলেই ফের লিখতে বসবেন। গল্পটা জমিয়ে তুলেছেন। আজ রাতেই শেষ করতে হবে। এই ভাবনাটা স্থির রইল না তার। লেখার টেবিলে তার কেমন তন্দ্রা চলে এল। হঠাৎ করে যেন গভীর ঘুমের হাতছানি। তিনি ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলেন। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন, তা-ও নয়। ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছেন কি? তার সামনে এরা কারা এসে দাঁড়িয়েছে? অনেকগুলো কঙ্কালসার বেখাপ্পা মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে কেমন করে যেন হাসছে। আবার ছায়ার মতো কতগুলো লোকগুলো তার সামনে নড়ছে। ওদের শারীরিক অস্তিত্ব দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি উঠতে চেষ্টা করলেন, পারলেন না। ঘোর লাগা কণ্ঠে শুধালেন, ‘তোমরা কারা? কী চাও?’
‘আমরা ভূত। যাদের নিয়ে তুমি যাচ্ছে-তাই লিখে যাচ্ছ!’
লোকগুলোর জবাব শুনতে পেলেন স্পষ্টভাবে। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে দু’ পাশে তাকালেন। দেখতে পেলেন তিনি বাড়ির বাইরে বটগাছের নিচে সেই হাতলভাঙ্গা চেয়ারটায় বসে আছেন। তার মাথার উপর বুড়ো বটগাছ। বটগাছের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন বটগাছ জুড়ে অসংখ্য মানুষের ছায়া নড়াচড়া করছে। কত হবে? শত শত বা হাজার হাজার বা তার চেয়ে বেশি। এরা কারা? তার মনের প্রশ্নের জবাব এল বটগাছ থেকে, ‘বললাম না, আমরা ভূত।’
‘ভূত!’ তার অস্ফুষ্ট উচ্চারণ।
এল পাল্টা প্রশ্ন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না?’
সাদেক আহমেদের তন্দ্রাভাব কেটে যাচ্ছে। ঘুমের রেশ ফুরিয়ে আসছে। তার দৃষ্টিও প্রখর হচ্ছে। তিনি দেখতে পেলেন চারপাশে অসংখ্য ভৌতিক অবয়ব। কুচকুচে কালো ও লিকলিকে ছায়াময় মানুষের বৈশিষ্ট্য ঠাসা চারপাশে। অনেকগুলো বিভৎস মুখ তার কাছাকাছি গোংগানীর মতো শব্দ করছে। তিনি মনের জোর ধরে রাখলেন। বললেন, ‘তোমারা সংখ্যায় এত! আমি একা। তোমাদের কোনো রাজা নেই? চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত প্রধান নেই? আমি একজনের সঙ্গে কথা বলতে চাই। থাকলে তাকে ডাক।’
এ কথায় কালো অবয়বগুলোর মধ্যে ঝড়ো সমুদ্রের ঢেউ উঠল। ভয়ার্ত কিছু শব্দও শুনতে পেলেন তিনি। কান পেতে রইলেন। নিজের বুকের ঢিবঢিব শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। ভয়ার্ত শব্দ থামল। এরপর বটগাছের মগডালে একটা চিকন আলো জ্বলে উঠল। আলোটা লকলকিয়ে নিচে নেমেও এল। আলোটা তার খুব কাছে এসে গোখরা সাপের মতো ফণা তুলল। সাপের ফণাটা তার সামনে এসে কথা বলল, ‘বলো, আমিই এই ভূতদের পঞ্চায়েত প্রধান।’
সাদেক আহমেদ একটা রহস্য গল্পের সামনে যেন দাঁড়িয়ে। তিনি রহস্য করেই বললেন, ‘ভূতরা সব-সময় আলোকে ভয় পায় জানি। আর তুমি সর্পিল এক আলো এসে দাবী করছ ভূতদের পঞ্চায়েত প্রধান। এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?’
সাপটা ছোবল মারতেই যেন চাইল। আলোটা ছোবলের ভঙ্গিমায় তার মুখের সামনে এসে গরম বাতাস ছাড়ল। বাতাসের এমন গতিবেগ ছিল যে সাদেক আহমেদের মনে হচ্ছিল তিনি উড়েই যাবেন। কিন্তু উড়লেন না। রহস্যের সঙ্গে লড়ছেন তিনি। সর্পিল আলো বলল, ‘ভূত বিশ্বাস করো না, তাহলে ভূতের গল্প লিখে মানুষকে ঠকাচ্ছ কেন?’
এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিন। কী বলবেন তিনি। ভূতের আলোটা এবার কুণ্ডলী পাকিয়ে বলল, ‘ভূত নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছ। তুমি একটা হাঁদারাম লেখক। চতুর, কপট ও ভণ্ড তুমি। ভূত সম্পর্কে তোমার বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই। অথচ ভূত নিয়ে আবোল-তাবোল লিখে যাচ্ছ। পদকও পাচ্ছ। বলি, ভূতকে সব-সময় নাকাল করো কেন তুমি? ভূত কি শুধু মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়ায়? কারো ঘাড় মটকে দেয়? যখন-তখন ভেংচি কাটে? ভূত কি পুরানো-পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতেই থাকে? ঝকঝকে অট্টালিকায় থাকতে পারে না?’
আলো ভূত এতগুলো কথা হরহর করে বলে গেল। ওর কথা শেষ হলে বটগাছ ও আশে পাশে অজস্র কালো ছায়ায় আলোর নাচন দেখতে পেলেন তিনি। যেন প্রশ্নগুলো ওদেরও। চেয়ার থেকে একটু নড়ে চড়ে দেখতে চাইলেন, পারলেন না। তার চারপাশে ও মাথার ওপরে অজস্র আলোর দাপাদাপি চলছে। তিনি ফণা তোলা আলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভূত তাহলে কী করে? আমরা তো যা জানি, তাই লিখি।’
‘মিথ্যা কথা। তোমরা ভূত সম্পর্কে কিছুই জানো না। জানার চেষ্টাও করো না। গাঁজাখুরী গল্প যা লিখো, তা তোমাদের কল্পনামাত্র। ভূত নিয়ে তোমরা খুব তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মজা পাও। ভূত এই করল, সেই করল, ফের ভূতকে নানাভাবে ঠেঙানো তোমাদের মতো ছাইপাশ লেখকদের মাথায় ঘুরপাক খায়। আর লিখছও তা। সাধারণ মানুষও এসব ছাইপাশ পড়ে আমাদের সম্পর্কে বাজে ধারণা পোষণ করে। ভূতদের সম্পর্কে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করছে তোমার মতো লেখকরা।’
কথাগুলো আগুনের হলকা হয়ে তার চোখে-মুখে এসে যেন বিঁধছে। রহস্যটা তার চেতনায় সয়ে আসছে। এতগুলো ভূতের সামনে তিনি নিজেকে সামলে রাখছেন। তিনি বললেন, ‘অভিযোগগুলো কি সঠিক?’
‘নয়তো কি? এই ধরো, তুমি লিখছিলে যে, এখানে একটা দু’ মাথা ও চার চোখের বিড়াল দেখেছ। এটি একটি ভূত। অথচ দেখেছ নিছক একটা বিড়াল। আর এতেই মিথ্যাচার ঠেসে ভূতের গল্প লিখতে বসলে। বলো ঠিক নয়?’
কথাটা তাকে যেন চাবুক মারল। এমন সত্যি কথার আঘাত তিনি পাবেন, আশা করেননি। তিনি আলো ভূতের কথায় হতভম্ব হয়ে রইলেন কয়েকমুহূর্ত। এরপর আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আমি জানি না ভূত কখনো মানব কল্যাণের জন্য কোনো কাজ করেছে কিনা। বা ভূতের কর্মকাণ্ডে মাববজাতির উপকার হয়েছেÑ এমন খবর আমার জানা নেই। জানলে তাই লিখতাম।’
এ কথার জবাবে সাপের ফণা তোলা আলোটা চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘জানবে কীভাবে? আমরা কি এসব কথা প্রচার করতে পারি? আমরা তো বইও লিখি না, খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেলেও আমাদের নেই। ভূতের সঙ্গে মনুষ্য-সমাজের কোনো যোগাযোগও নেই। তাই বলে কিÑ আমারা কি মানব কল্যাণের জন্য কাজ করি না? এই তো সেদিন, কক্ষপথ থেকে পৃথিবীর চেয়ে বড় একটি উল্কাপিণ্ড তোমাদের পৃথিবীতে আঘাত করতে উড়ে এসেছিল। মাঝপথে ওর গতিপথ ঘুরিয়ে দিল কে?’
‘কে?’
‘কে আবার, আমাদের কল্পনা চৌহান। সে তো মহাকাশেই ছিল। ভাগ্যিস, সে ওখানে ছিল। বলি, উল্কাপিণ্ডটা যদি পৃথিবীতে আঘাত করত, তাহলে তোমাদের দশা কী হতোÑ একবার ভেবে দেখো।’
‘কল্পনা চৌহান যেন কে? নামটা পরিচিত মনে হচ্ছে।’
জানতে চাইলেন তিনি। জবাব এল, ‘ভুলে গেলে? কল্পনা চৌহান ছিল তোমাদেরই মহাকাশ বিজ্ঞানী। নাসায় ছিল। মহাকাশ যান ধ্বংস হয়ে ওপার থেকে এপাড়ে এসেছেন।’
‘এখন চিনতে পেরেছি। তাহলে তিনি তো মরেও পৃথিবীকে রক্ষা করেছেন। এ খবর জানতাম না।’
‘আরও কত খবর আছে। অজস্র খবর দিতে পারি। কিন্তু তোমাকে এসব কথা বলে লাভ নেই।’
সাদেক আহমেদ বুঝতে পারছেন না এ ধরনের কথা চালিয়ে যাবেন, নাকি ওদের হাত থেকে ছাড় পাবার উপায় খুঁজবেন। ভূতের পঞ্চায়েত প্রধান কথা থামাল না। বলল, ‘তুমি শুধু ভূতের বিরুদ্ধে যত ছাইপাশ লিখো। মানুষও কত ভয়ংকর কাজ করছেÑ তা তো লিখো না।’
এ কথায় প্রতিবাদ করা দরকার ভেবে তিনি বললেন, ‘যেমন? দু’-একটি উদাহরণ দাও তো, শুনি।’
‘কত ঘটনার কথা বলব? এই যে তোমার পৃথিবীতে যুদ্ধ বাধিয়ে লাখো লাখো মানুষ মারছ। বাড়ি-ঘর ধ্বংস করছ। মানুষ হয়ে মানুষ মারছ। তোমরা যে সভ্যতা বলে গলা ফাটাও, ঐ সভ্যতাও ধ্বংস করছ। তেল লুটছ, স্বর্ণ লুটছ, রাজা হচ্ছ, প্রজা মারছ। নিজের সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছ, স্ত্রীকে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছ, ‘মানুষের সেবা করব’ শপথ নিয়ে চাকুরিতে যোগ দিয়েই ঘুষ ছাড়া কাজ করছ না। ব্যবসায় মানুষ ঠকাচ্ছÑ আরও কত কী করছ! অত কথা লিখলে আরব্য রজনীও ফুরিয়ে যাবে…। আরও শুনতে চাও?’
‘বলো, আরও কিছু।’
“তোমরা কারখানা-গুদামে নিজেরাই আগুন লাগিয়ে বীমার অর্থ হাতিয়ে নিতে বলোÑ ভৌতিক অগ্নিকাণ্ড! ভোটকেন্দ্রে নিজেরা ভোট দিয়ে বুথ ভরে ফেল। আরেক দল বলে ভৌতিক ভোটার এই ভোট দিয়েছে। আবার ধরো, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল জমিয়ে ফেলো। বিল বেশি এল দাবী করো ‘ভূতুরে বিল’। কারাসাজি-ষড়যন্ত্র, কারচূপি করে ধরা পড়লে ‘ভূতুরে কাণ্ড’ বলে পার পেতে চেষ্টা করো। সব দোষ চাপিয়ে দাও ভূতের নামে। বলো, ঠিক বলেছি কিনা?”
ভূতের কথাগুলো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া মানুষের সঙ্গে ভূতের কর্মকাণ্ডও মিলিয়ে দেখেননি কখনো সাদেক আহমেদ। তবে এ বিষয়ে ভূতের সঙ্গে তর্ক করার মনোবৃত্তি পরিহার করলেন তিনি। বললেন, ‘আমাকে নিয়ে তোমরা কী করতে চাও? তোমাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য কী?’
এ কথায় ফের একটা আলোর ঢেউ উঠল। ঢেউটা বটগাছ বেয়ে আকাশের নীলে গিয়ে মিশল যেন। হৈ-হল্লার মতো কিছু শব্দও শুনতে পেলেন তিনি। এর অর্থ তিনি বুঝতে পারলেন না। হয়তো ভূতেরা নিজস্ব ভাষায় কথা বলে নিচ্ছে। তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন ভূতের জবাবের। জবাব এল।
‘তুমি লেখক বলে তোমার মাধ্যমেই মনুষ্য-সমাজে একটা বার্তা পৌঁছতে চাই আমরা। তুমি আমাদের এই বার্তা গল্পের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে দেবে। তোমার কাছে আমাদের এটাই প্রত্যাশা। আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবে তো?’
‘কী বার্তা পাঠাতে চাও?’
‘এই যে ভূত হলেই যে ভূতেরা মানুষের ঘাড় মটকে দেবে, ভয় দেখাবে বা মানুষ্য-সমাজে ক্ষতি করবেÑ এমন নয়। ভূতেরাও মনুষ্য-সমাজের জন্য ইতিবাচত ভূমিকা রাখে। এই বার্তা তোমার পরবর্তী গল্পে উল্লেখ করবে। গল্প দিয়েই তুমি আমাদের বক্তব্য তুলে ধরবে। পারবে না?’
‘এ আর কঠিন কাজ কি? তোমাদের সঙ্গে এভাবে এখানে দেখা এবং এই ভূতুরে বৈঠকের কথা লিখলেও তোমাদের বার্তা প্রকাশ পাবে।’
‘ভূতুরে বৈঠক বলতে খারাপ কিছু বুঝাতে চাইছ না তো?’
“না, না। খারাপ কিছু বোঝাতে চাইব কেন? তোমাদের সঙ্গে আমার যে বৈঠক হল এ কথা ‘ভূতুরে বৈঠক’ বলে উল্লেখ না করলে মানুষের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না।”
সাপের ফণা তোলা আলোটা নাচানাচি করল কিছুক্ষণ। অজস্র আলোগুলো নিভে গিয়ে ফের ছায়ায় পরিণত হল। আলোটা নিচু ও কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘আমাদের কথা মনে থাকে যেন। কথা না রাখলে কিন্তু কঠিন শাস্তি দেব তোমাকে!’
কাদের মিয়ার ডাকে ঘুম ভাঙাল সাদেক আহমেদের। ঘুম ভাঙতেই তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন বটগাছের নিচে চেয়ারটায় বসে আছেন। বুঝতে পারলেন রাতে ঘুমের ঘোরে এখানে চলে এসেছিলেন। রাতে তার হেলুসিনেশন হয়েছিল। হেলুসিনেশনের মধ্য দিয়ে তিনি ভূতের আড্ডায় কথা বলেছেন। ডাক শুনে সাদেক আহমেদ ধড়মড় করেই জেগে ওঠেন। চোখ খুলতেই পাখির কিচির-মিচির মধুর শব্দ শুনতে পান। তার সামনে কাদের মিয়ার বিস্মিত মুখ। অবশ্য তিনি কাদের মিয়াকে ভূতের কথা একবিন্দুও বললেন না। কাদের মিয়া বললেন, ‘স্যার, রাতে রুম থেকে বের হয়ে চলে আসা ঠিক হয়নি। বাগানে সাপখোপ কামড়াতে পারত। আমি তো সকালে আপনাকে রুমে না পেয়ে ভড়কে গিয়েছিলাম। বাগানে এসে দেখি চেয়ারটার উপর শুয়ে আছেন।’
‘হুম। রাতে পায়চারী করতে করতে এখানে চলে এসেছিলাম।’
কথাটা বললেন সাদেক। এবার চারপাশটায় তাকিয়ে দেখে নিলেন। কোথায় কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার চিহ্ন নেই। কাদের মিয়া বললেন, ‘এই চেয়ারটায় আপনি বসলেন, স্যার! এই চেয়ারে কেউ বসে না।’
‘জানি। কাল বলেছিলেন। আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল, তাই বসেছিলাম। এখন বলুন তো, ঢাকায় ফিরতে হলে ট্যাক্সি বা বাস পাব কীভাবে?’
‘কেন স্যার! আপনার সেবায় কী কোনো ঘাতটি হয়েছে?’
‘না, না। আসলে বাড়িতে একটা জরুরী কাজ পড়ে আছে। এখন মনে পড়েছে, তাই চলে যেতে চাইছি।’
‘স্যার, আপনার শরীর কি খারাপ?’
‘না, না। শরীর ঠিক আছে। আসলে কাজটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বলুন তো, কীভাবে ঢাকায় ফিরতে পারি?’
কাদের মিয়া কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন। বললেন, ‘এই বাড়ি থেকে দুই ক্রোশ দূরে গেলে বাস পাবেন। রাস্তায় দাঁড়ালে রিকশা বা ভ্যানগাড়ি পেতে পারেন। চেষ্টা করে দেখতে পারেন।’
‘ঠিক আছে, চলুন। ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।’
‘স্যার, সকালের নাস্তা খেয়ে তারপর বের হন। আমি নাস্তা তৈরি করে দিচ্ছি।’
বাগান থেকে ধীর পায়ে হেঁটে তারা বাড়িতে প্রবেশ করলেন। কাদের মিয়া হন্ততন্ত হয়ে সকালের নাস্তা বানাতে চেষ্টা করতে লাগলেন। সাদেক আহমেদ সময় নষ্ট না করে চটপট তৈরি হয়ে নিলেন। কাদের মিয়ার অনুরোধ উপেক্ষা করে নাস্তা মুখে না দিয়ে তিনি দ্রুত বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তায় কয়েক মিনিট দাঁড়াতেই একটা ভ্যানগাড়ি পেয়ে গেলেন। ভ্যানচালকের নাম জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল তার নাম আব্দুর রহিম মিয়া। রহিম মিয়া তাকে বাস স্টপিজে নামিয়ে দিতে ভ্যান গাড়িতে তুলে নিলেন। ভ্যানগাড়িতে বসেই সাদেক আহমেদ নিজের অফ হয়ে থাকা সেলফোনটি অন করলেন। তার মনে হচ্ছিল রাতে তার হেনুসিলেশন হয়েছিল। ভূত বলতে কিছু নেই। তিনি ভূত নিয়ে যে ধরনের কল্পনা করেন, সেই কল্পনাই রাতে হেলুসিনেশনে ফিরে এসেছিল। প্রকাশক আরিফুজ্জামানকে বলতে হবে হেলুসিনেশন সংক্রান্ত যত বই আছে, তা যেন রেখে দেন। এ বিষয়ে বিস্তর পড়তে হবে তার। তিনি ফোন অন হতেই ফোন করলেন তার নম্বরে। কয়েকবার কল হতেই ও প্রাপ্ত থেকে ‘হ্যালো’ বললেন আরিফুজ্জামানের স্ত্রী।
‘ভাবী, আমি সাদেক আহমেদ। আরিফুজ্জামান ভাই কি ঘুমাচ্ছেন?’
‘না, না। তিনি তো পাঁচদিন আগে জার্মানীতে গিয়েছেন। ফ্রাঙ্কফুটের বইমেলায় গেছেন। আপনি জানেন না?’
‘না। আমি তো এসেছি পলাশপুর, আপনাদের বাগানবাড়ীতে। কাল আপনাদের ড্রাইভার আবুল কালাম আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেছে।’
‘পলাশপুরে আমাদের বাগানবাড়ী? কী বলছেন এসব! আমাদের বাগানবাড়ী তো বিক্রমপুরের আব্দুল্লাহপুরে। আর কী বললেন, কালাম আপনাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে? সে তো পাঁচদিন হল ছুটি নিয়ে নিজের গাঁয়ে গেছে। ভাই, আপনি ঠিক আছেন তো?’
এ কথা শোনার পর সাদেক আহমেদের শরীরে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে এল। তাহলে তিনি কোথায় এসেছিলেন? আবুল কে? কাদের মিয়া কে? তারাও কি ভৌতিক? কাল রাতে তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা কি হেলুসিনেশন নয়? প্রশ্নগুলো তার শরীরের লোমকূপ দাঁড় করিয়ে দিল। তিনি সেলফোনের লাইনটা কেটে দিলেন। ভ্যানচালক রহিম মিয়া তার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, ‘স্যার, আপনে কে? যেখানে দাঁড়াইয়া আছিলেন, সেইখানে কেউ তো দাঁড়ায় না।’
ভয়ের হিম পরশ ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন তিনি। বললেন, ‘তাই নাকি? কেন?’
কণ্ঠস্বর নিচু করে সে বলল, ‘ওইটা তো ভূতের বাড়ি, জানেন না?’
ভ্যানচালকের কথাটা তার চেতনায় ফের চাবুক পেটাল যেন কেউ। তাকে কি তাহলে ভূতের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল ভূতেরাই? ভূতের বার্তা নিয়ে ফিরেও যাচ্ছেন তিনি? তিনি ফিরছেনÑ এটাও কি সত্যি? নাকি এটাও হেলুসিনেশন? এ কথা ভেবে সাদেক আহমেদ নিজে নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখলেন। হাতে ব্যথা অনুভব করায় বুঝতে পারলেন তিনি জীবিত আছেন। ঘাড় ফিরিয়ে ভূতের বাড়ি বা বাগানবাড়ীটা দেখার ইচ্ছে হলেও তিনি পেছনে তাকালেন না। কে জানে, পেছনে তাকালে হয়তো দেখতে পাবেন কালো ছায়াগুলো বা সর্পিল আলো তাকে ‘বাই বাই’ জানাচ্ছে। আর কাদের মিয়া দাঁড়িয়ে আছে লজ্জিতভাবে। তিনি পেছনে নয়, সামনেই তাকাতে চান। ভ্যানগাড়িটা চলছে বাস স্টপিজের দিকে।
আমি ভূত বলছি
ব্লকড নম্বর থেকে ফোনটা এল। হরপদ দত্ত কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আমি ভূত বলছি!’
গত কয়েকদিন ধরে একজন তাকে এ ধরনের মশকরা করে জ্বালাতন করছে। তিনি একটু রাগের উত্তাপ ছড়িয়ে বললেন, ‘ফের ফোন করে মশকরা করছেন, মশাই!’
‘না, মশকরা করব কেন? সত্যিই আমি ভূত বলছি।’
‘ভূত কি টেলিফোন করতে পারে? আমাকে বোকা ভেবেছেন?’
‘ছিঃ ছিঃ সম্পাদক সাহেব! এটা কী বললেন! আমি কি আপনাকে বোকা ভাবতে পারি? বোকা হলে কি এমন একটি জনপ্রিয় পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন?’
‘তাহলে নিজেকে ভূত বলে পরিচয় দিচ্ছেন কেন?’
‘কারণ, আমি সত্যিই ভূত। অবশ্য ভূতেরা টেলিফোনে কথা বলেÑ এ কথা মানুষ বিশ্বাস করে না। আপনি তাই বিশ্বাস করছেন না। যাক, সে কথা। কাজের কথায় আসি।’
‘আপনার কাজের কথা আগেও আমি শুনেছি। গত সাতদিনে আপনি এ পর্যন্ত আমাকে একুশ বার ফোন করেছেন। এর আগে ফোনে যা বলেছেনÑ এবারও তাই বলবেন। কী বলবেন আমি তা জানি।’
‘হে হে হে! আপনি বিচক্ষণ ব্যক্তি বটে!’
‘শুনুন, আমিও আপনাকে একই কথা বলব। আপনার গল্পটা আমরা ছাপতে পারছি না। এমন গল্প লিখে পাঠিয়েছেন যে, একটু পড়েই চরম বিরক্তি এসে যায়!’
‘কেন বলুন তো? গল্পটা কি শিহরণ জাগায়নি!’
‘আরে রাখুন মশাই, আপনার শিহরণ! পুরো গল্পটা পড়ার মতো রুচিবোধ আমার নেই!’
‘বলেন কি! এত যত্ন করে ভূতের গল্প লিখলাম…!’
‘ছিঃ! ভূতের গল্প না, ছাই! আপনার গল্প তো আষাঢ়ে গল্পকেও হার মানিয়েছে।’
‘তাহলে তো ভালই লিখেছি বলতে হবে। ভূতের গল্প মানেই তো আষাঢ়ে গল্প, নয় কি?’
‘আরে এটা কোনো ভূতের গল্পের প্লট হল? আপনি লিখেছেনÑ এক জোড়া বাঘ আর এক জোড়া ছাগল একসঙ্গে পুষতে সুন্দরবনে গিয়ে থিতু হল অরুণ হালদার। তার খুব ইচ্ছে ছাগলের দুধ খাবে বাঘের ছানা, আর বাঘের দুধ খাবে ছাগলের বাচ্চা। আপনার গল্পের এই তো শুরু, তাই না?’
‘বিলকুল। গল্পের শুরুটা এ রকম। শুরুর পর গল্পটা ভৌতিক টার্ন নেয়। আপনি পড়ে দেখুন।’
‘আজ্ঞে মশাই, আমার এত সময় নেই যে, এমন একটা জগাখিচুড়ী মার্কা গল্প পড়তে যাব। আমার আরও অনেক অনেক কাজ করতে হয়।’
‘দয়া করে যদি পুরো গল্পটা পড়তেন।’
‘পুরো গল্প? দুবলার চরে বাঘ-ছাগল চড়াতে গিয়ে ভূতের আড্ডায় অরুণ হালদারকে রাগ সঙ্গীত গাইতে হলÑ এসব লিখেছেন, তাই না?’
‘জ্বি, আজ্ঞে! এরপর থেকে…!’
‘আর এগুতে পারিনি মশাই। আমাকে ও পর্যন্ত গিয়ে থামতে হয়েছে।’
‘আজ্ঞে সম্পাদক সাহেব, আমার গল্পটা তাহলে কোনোভাবেই কি আপনার পত্রিকার আগামী সংখ্যায় ছাপবেন না? আগামী সংখ্যাটাই তো আপনাদের ভূত সংখ্যা। এ সংখ্যার জন্যই শিহরণ জাগানিয়া ভূতের গল্পটা লিখলাম।’
‘আরে মশাই, আগামী সংখ্যা শুধু ভূত সংখ্যাই নয়। এই সংখ্যায় যাদের গল্প ছাপা হবে, তাদের গল্পগুলোর মধ্য থেকে সেরা গল্প বাছাই করা হবে। শ্রেষ্ঠ গল্পকারের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় পুরস্কারও। মোটা অংকের অর্থও দেওয়া হবে সম্মানী বাবদ। আপনার জ্ঞাতার্থে আরও জানাচ্ছি দেশের সেরা দশজন লেখক এ সংখ্যার জন্য ইতোমধ্যে গল্প পাঠিয়েছেন।’
‘কারা শ্রেষ্ঠ গল্প মনোনীত করবেন, জানতে পারি? আপনি এই জুরি বোর্ডে নেই তো!’
‘না, না। পাঠকরাই নির্বাচিত করবে শ্রেষ্ঠ গল্পকারকে। এ সংখ্যায় এ সংক্রান্ত একটা ফরমও ছাপা হচ্ছে। পাঠকের ভোটে নির্বাচিত লেখককে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ পুরস্কৃত করবে। এখন বুঝুন, এমন একটা প্রতিযোগিতামূলক ভূত সংখ্যায় আপনার গাঁজাখুরী গল্পটা ছাপা হলে আমাদের মান বলতে কিছু থাকবে?’
কথাটা বলতে হরপদ দত্তের কণ্ঠে বিরুক্তি প্রকাশ পেল। নাছোড়বান্দা লোকটি তার বিরুক্তি গায়ে না মেখে বলল, ‘সম্পাদক সাহেব, আপনি তো আমার গল্পটা পুরোটা না পড়েই বিরূপ মন্তব্য করছেন। পুরোটা পড়লে এমন অবহেলা করতেন না। অনুরোধ করছি, গল্পটা পড়ুন এবং তা ছাপিয়ে দিন। লেখক হিসাবে একটা পুরস্কার আমার বড্ড প্রয়োজন।’
‘কী যে বলছেন! এ যেন মামার বাড়ির আব্দার। আপনি আমাকে কেন যে ফোন করে জ্বালাতন করছেন, জানি না! জেনে রাখুন, আমি সম্পাদক হিসাবে খুব কঠিন। অনুরোধ-তোষামোদ বা বিশেষ খাতির পাত্তা দিই না। কথাটা ভাল করে মনে রাখবেন। আর ফোন করে জ্বালাবেন না, মশাই। আমার সময়ের মূল্য আছে। আর হ্যাঁ, ফোন করে ফেললেও নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলবেন নাÑ আমি ভূত বলছি! এ কী রকম মশকরা!’
কথাটা বলেই ‘সাত-পাঁচ’ পত্রিকার সম্পাদক হরপদ দত্ত ফোন কেটে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। ফোনের লাইনটা কাটল না। ওপ্রান্ত থেকে লোকটি গলা খাঁকারী দিয়ে বলল, ‘না, আপনি দেখছি, খুব ত্যাঁদড় লোক। খুব অবিশ্বাসী মন আপনার। গল্প না পড়েই মনগড়া মন্তব্য করে ফেলেন। আপনার পাঠক দৃষ্টি শাণিত নয়। যাই হোক, আমি কিন্তু নাছোড়বান্দা টাইপের লোক। গল্পটা না ছাপানো পর্যন্ত আমি হাল ছাড়ছি না। কথাটা মনে রাখবেন। শুভরাত্রি।’
কথাটা বলে লোকটি ফোনের লাইনটা কেটে দিল। হরপদ দত্ত একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। এমন একটা বাজে গল্প লিখিয়ে ব্যক্তি কেমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল যেন। তিনি গল্প না ছাপিয়ে ছাড়ছেন নাÑ কথাটায় স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের লেখককে কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়, ভাল জানেন হরপদ দত্ত। তিনি লেখকের নামটা মনে মনে জপে নিলেন কয়েকবার। লেখকের নাম মৃদুল রায়হান। কোনো সময় তার লেখা তিনি ছাপাবেন না বলে মনে মনে পণ করলেন। যদিও তিনি দুর্বল চিত্তের মানুষ, তবু এ ধরনের লেখকদের একটু শায়েস্তা করার পণ রক্ষা করার চেষ্টা করবেনÑ এমন ভাবনা তার মনে অনেকক্ষণ ছড়িয়ে রইল।
অবশেষে হরপদ দত্ত পারলেন না নিজের পণ রক্ষা করতে। মৃদুল রায়হান নামক অখ্যাত লেখকের গল্পটা ছাপতে হল। ভূত সংখ্যার মতো বিশেষ কলেবরে প্রকাশিত সংখ্যায় এমন বাজে ভূতের গল্পটা ছাপতে হল বলে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু প্রকাশকের নির্দেশ তো অমান্য করা যায় না। প্রকাশক হচ্ছেন ‘অন্নদাতা’। অন্নদাতার কথা রাখাটা কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু মৃদুল রায়হানের গল্পটা পণ ভেঙে ছাপতে বাধ্য হলেন বলে তার একটু পরাজয়ের লজ্জাও লাগছে। গ্লানিও আছে। তিনি বুঝতে পারছেন না, মৃদুল রায়হান কীভাবে ‘সাত-পাঁচ’ এর প্রকাশক করুণাময় গোস্বামীকে ধরলেন। প্রকাশক করুণাময় গোস্বামী সাত-পাঁচ এ কার লেখা যাচ্ছে বা যাচ্ছে নাÑ এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। বছরে দু’-একটা অনুরোধ তিনি করেন। ভূত সংখ্যার কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে এমনি সময়ে প্রকাশক করুণাময় গোস্বামী তলব করলেন তার কক্ষে। হরপদ দত্ত প্রকাশনের কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলেন করুণাময় গোস্বামী টেলিফোনে কথা বলছেন। তিনি হাতের ইশারায় হরপদ দত্তকে চেয়ারে বসতে বললেন। করুণাময় গোস্বামী কথা বলছিলেন, ‘না, না। কী যে বলেন! বলেছি তো, গল্পটা ছাপার ব্যবস্থা আমি করব। আরে না, না। আমাদের সম্পাদক সাহেব একটু কড়া মেজাজের মানুষ বটে, কিন্তু তার মনটা কোমলও। আপনি তাকে ভুল বুঝেছেন। না, না, আমি দেখছি। আচ্ছা রাখছি। নমস্কার।’
টেলিফোনে করুণাময় গোস্বামীর কথা শুনে হরপদ দত্ত মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। তিনি বুঝতে পারলেন এ সংখ্যায় গল্প ছাপার জোরালো তদবির কেউ করেছেন। প্রকাশক নিশ্চয়তাও দিয়েছেন গল্প ছাপা হবে। তার মানে গল্প যারই হোক বা যেমন-তেমন গল্পই হোক না কেন, তা ছাপতে হবে। ভূত সংখ্যার সব লেখাই নির্ধারিত হয়ে গেছে। ওসব গল্পে অলংকরণ ও পাতায় সন্নিবেশিতও হয়ে গেছে। এখন শুধু ছাপাখানায় যাবার অপেক্ষা। চূড়ান্ত এই লগ্নে অনুরোধ রক্ষা করা যেমন কঠিন, তেমনি বিব্রতকরও। কখনো কখনো অপমানজনকও। করুণাময় গোস্বামী তার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসি বিলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সম্পাদক মশাই, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।’
হরপদ দত্ত চেয়ারে বসলেন। তিনি মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে রেখেছেন। করুণাময় গোস্বামী বললেন, ‘এবারের ভূত সংখ্যায় ক’টা গল্প যাচ্ছে?’
‘১০টি বাছাই করা গল্প যাচ্ছে। দেশের নামকরা লেখকরা লিখেছেন। আমার বিশ্বাস, ভূতসংখ্যাটা লুফে নেবে পাঠক।’
‘হুম। তবে কি জানেন, শুধু নামকরা লেখকদের লেখা ছাপলেই হবে? নতুন লেখকদেরও তো জায়গা দিতে হবে। নয় কি?’
প্রকাশক করুণাময় গোস্বামী এরপর কী বলবেন, আঁচ করতে পারছেন হরপদ দত্ত। করুণাময় গোস্বামী যখন কিছু বলবেন প্রথমে এর পেছনে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করবেন। যুক্তিতে কাজ হয়ে গেলে তিনি খুশি হন। যুক্তি অসার প্রমাণিত হলে তিনি অনুরোধ করবেন। তার অনুরোধ সব-সময় রেখে এসেছেন হরপদ দত্ত। তিনি বললেন, ‘পত্রিকার পেইজমেকিং কিন্তু হয়ে গেছে। এখন শুধু ছাপাখানায় যাবে। শেষ-মুহূর্তে যদি…!’
হরপদ দত্তের কথা শেষ না হতেই করুণাময় গোস্বামী বললেন, ‘অনেক সময় শেষ-মুহূর্তে বলেও কারো কারো অনুরোধ ফেলা যায় না। আমি একজনকে কথা দিয়ে ফেলেছি। তার একটা গল্প ছাপতে হবে এ সংখ্যায়। দরকার হলে পাতা বাড়িয়ে ছাপুন। ১০টি নয় ১১টি গল্প ছাপা হোক।’
‘কিন্তু কার গল্প? গল্পটাই বা কেমন?’
‘গল্প আমি পড়িনি। কিন্তু এমন অনুরোধ এসেছে যে, আমি কথা দিয়ে ফেলেছি তার গল্পটা ছাপা হবে।’
‘এটা কি ঠিক হচ্ছে? গল্প না পড়েই তা ছাপা হবে! গল্পের মান আছে কিনা, যাচাই করে দেখতে হবে না?’
‘এবার তো পাঠকরাই গল্পের মান যাচাই করবে। আগের সংখ্যায় বিজ্ঞাপনে আমরা তো তাই বলেছি। তাই না?’
‘তা ঠিক।’
তাহলে ছেপে দিন। পাঠকরা মান নির্ণয় করুক। যার গল্প পাঠক ভোটে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হবে, সেই পাবেন পুরস্কার। পাঠকের ভোটে কোন গল্পটার মান কোন পর্যায়ে সেটাও এবার নির্ধারণ হয়ে যাবে। এখানে আমাদের এত কিছু ভাবার দরকার কী?’
করুণাময় গোস্বামীর এ কথার যুৎসই জবাব দিতে পারতেন হরপদ দত্ত। কিন্তু তিনি এর জবাবে কিছু বললেন না। কথা বললে কথা বাড়বে। কথায় হারলেও করুণাময় গোস্বামী অনুরোধ করবেন। আর তার অনুরোধ রাখতে হবে। হরপদ দত্ত জানতে চাইলেন, ‘কার গল্প ছাপতে হবে বলুন। গল্পটা কোথায়?’
এ কথায় একগাল হাসি ছড়িয়ে করুণাময় গোস্বামী বললেন, ‘গল্পটা আপনার কাছে আছে। আপনি গল্পটা ছাপবেন না বলে লেখককে জানিয়ে দিয়েছিলেন। লেখকের নাম মৃদুল রায়হান।’
নামটা শুনে হরপদ দত্তের পিত্তি জ্বলে গেল। তার কান দিয়ে কথা নয় গরম তরল যেন ঢুকে পড়ল। তিনি হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলেন করুণাময় গোস্বামীর দিকে। হরপদ দত্তের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে করুণাময় গোস্বামী নরম গলায় বললেন, ‘মানছি, আপনার বিবেচনায় গল্পটা ছাপার উপযুক্ত নয়। মৃদুল রায়হান গত কয়েকদিন ফোন করে আমাকে এমন জ্বালাতন করেছে যে, আমি তাকে কথা দিয়ে ফেলেছি। এখন আমার কথার বরখেলাপ হলে তার কাছে আমার সম্মান থাকে না।’
কয়েকমুহূর্তে ধাতস্থ হন হরপদ দত্ত। তিনি বলেন, ‘গল্পটা ছাপতে আমার গ্লানি থাকবে। তবে আপনার সম্মান রক্ষার্থে তা ছাপছি। কিন্তু পাঠক গল্পটাকে কীভাবে নেবে, তা জানি না। গল্পটা আমার ভাল লাগেনি। কেমন গাঁজাখুরী গল্প যেন। যদিও আমি পুরোটা পড়িনি। পড়তে চাইও না।’
‘হে হে হে’ করে হাসলেন করুণাময় গোস্বামী। সম্পাদক তার কথা রাখবেন, এটা তিনি জানতেন। তবে না রাখতে চাইলে একটা বিদ্ঘুটে পরিস্থিতি হতে পারত। তা হয়নি। তিনি মনে মনে বললেনÑ গল্প ভাল না লাগলে পাঠক এর বিরুদ্ধে রায় দেবেÑ এতে আমাদের কী! কোনটা ভাল, আর কোনটা খারাপ গল্প, তা পাঠকই ঠিক করুক।
সাত-পাঁচের ভূত সংখ্যা প্রকাশের পর পাঠকের ভোটে মৃদুল রায়হানের গল্পটাই শ্রেষ্ঠ গল্প হিসাবে নির্বাচিত হল। এটাকে পাঠকের সেরা রসিকতা বললে ভুল হবে না। অন্তত হরপদ দত্ত তাই মনে করেন। এ নিয়ে তিনি ভীষণ লজ্জা অনুভব করছেন। মদৃল রায়হানের পুরো গল্পটা তিনি এখনো পাঠ করেননি। মৃদুল রায়হানের স্পর্ধা তাকে মিহিন যন্ত্রণা দিয়েছে। অনেকটা রাগ করেই তার গল্পটা তিনি পড়ে দেখেননি। অথচ পাঠকের ভোটে ঐ গল্পটাই শ্রেষ্ঠ গল্প হিসাবে নির্বাচিত হল। প্রকাশক করুণাময় গোস্বামী তাকে ডেকে টিপ্পনীও কেটেছেন। বলেছেন, ‘কী বুঝলেন, দত্ত বাবু? আপনার বিচেনায় যেটি ছাপার অযোগ্য গল্প, সেটিই পাঠকের বেশি ভোট পেল। এখন বুঝলেন তো, সম্পাদকের দৃষ্টির সঙ্গে পাঠকের দৃষ্টির কত ফারাক!’
এ কথার কোনো জবাব দিতে পারেননি হরপদ দত্ত। প্রকাশকের মুচকি হাসি তার গায়ে জ্বালা দিয়েছিল। কিন্তু মুখে রা করেননি। এ রকম মুহূর্ত বড্ড বিচ্ছিরি। করুণাময় গোস্বামী মুখে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি ধরে রেখে বললেন, ‘এবার শ্রেষ্ঠ গল্পকারের পুরস্কারের অর্থের চেকটি ও পুরস্কারের সনদপত্র আপনি নিজে লেখকের বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসুন। লেখকের সঙ্গে দিনক্ষণও ঠিক করে আসুন। একটা অনুষ্ঠানে আয়োজন করে ঐ লেখককে একটা উত্তরীয় পরিয়ে দিতে হবে। তার হাতে তুলে দিতে হবে সম্মাননা। ঐ অনুষ্ঠানে সব লেখকদেরও নিমন্ত্রণ জানাতে ভুলবেন যেন! নতুন ও অখ্যাত লেখকও যে শ্রেষ্ঠ গল্পকার হতে পারেÑ এটা কিন্তু বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছেÑ কী বলেন!’
হরপদ দত্ত যেন মূক হয়েই ছিলেন। কী বলবেন তিনি? প্রকাশকের উচ্ছ্বাসকে উপেক্ষা করাও যায় না। মৃদুল রায়হান নামক অজ্ঞাত লেখক শ্রেষ্ঠ লেখকের তকমা পেয়ে গেল পাঠকের ভোটে। অথচ গল্পটা যতটুকু পাঠ করেছেনÑ এতে তিনি মুগ্ধ হতে পারেননি। বরং জগাখিচুড়ী মার্কা গল্প বলে তার মনে হয়েছিল।
মৃদুল রায়হানের স্ত্রী রাফেজা বেগম হরপদ দত্তের কথায় এতটা বিস্মিত হলেন যে, তিনি কয়েক মুহূর্ত থ’ হয়ে রইলেন। তার স্বামী মারা গেছেন প্রায় এক বছর হতে চলল। আজ এ কি শুনছেন! মৃত মানুষ কি গল্প লিখতে পারে? অথচ সাত-পাঁচ পত্রিকার সম্পাদক হরপদ দত্ত তার বাসায় এসে বলছেন মৃদুল রায়হান ভূতের গল্প লিখে পাঠকের ভোটে শ্রেষ্ঠ গল্পকার নির্বাচিত হয়েছেন। পুরস্কারের সনদপত্র ও এক লাখ টাকার একটি চেকও এনেছেন। এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা ভেবে পাচ্ছেন না। রাফেজা বেগমের হতভম্ব মুখের দিকে চেয়ে হরপদ দত্ত বললেন, ‘আপনি মনে হচ্ছে গভীর আনন্দে ভাষা হারিয়ে ফেলছেন? কিছু বলছেন না যে!’
এবার সম্বিত ফিরে পেলেন রাফেজা বেগম। তিনি বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি কী বলব, ভেবে পাচ্ছি না!’
‘বুঝেছি, স্বামীর এমন সাফল্যের খবর আসতে পারেÑ এটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। আমি নিজেও আপনার স্বামীর গল্পটা নিয়ে আশাবাদী ছিলাম না। যাই হোক, পাঠকের ভোটে তাঁর গল্পটাই শ্রেষ্ঠ হয়েছে। মৃদুল রায়হান বাসায় ফিরলে তাঁকে এই খবরটা দিয়ে চমকে দিতে পারবেন।’
এর জবাবে রাফেজা বেগম বললেন, ‘চমকে দেব কি, নিজেই তো চমকে আছি। এমন চমক কখনো কেউ অনুভব করেনি। যে লোকটি পৃথিবীতে বেঁচে নেই, তিনি গল্প লিখেছেন এবং পুরস্কারও পেয়েছেনÑ এ কথা জানার পর কতটা চমকে উঠেছি বুঝতে পারছেন, হরপদ বাবু!’
রাফেজা বেগমের কথায় হরপদ দত্তের গা ঠাণ্ডা হয়ে এল। শরীরের শিরায় রক্ত চলাচল যেন শ্লথ হয়ে এল। গলা শুকিয়ে এল। তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘কী বলছেন এসব? মৃদুল রায়হান…!’
‘প্রায় এক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। অপঘাতে মৃত্যু হয়েছিল তার…।’
‘অসম্ভব…!’
‘আমরা তার লাশ দাফন করেছি। আমি বিধবা হয়েছি, আর আপনি বলছেন অসম্ভব?’
‘না, না। এটা হতে পারে না!’
হরপদ দত্তের চোখে মুখে রাজ্যের বিস্ময়। তিনি বুঝতে পারছেন না মৃদুল রায়হান এক বছর আগে মারা গিয়ে থাকলে তিনি কীভাবে তার টেলিফোনের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়েছিলেন। তিনি যদি ধরেও নেন যে, অন্য কেউ মৃদুল রায়হান পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করেছিলেন, তাহলে গল্প পাঠানোর উদ্দেশ্য কী? প্রশ্নটা তার মনে উঁকি দিল। তিনি রাফেজা বেগমের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা, আপনার স্বামী কি গল্প লিখতেন?’
‘লেখালেখির বাতিক তাঁর ছিল। এই লেখালেখি করতে গিয়েই তো সংসার ছেড়ে একদিন সুন্দরবনে চলে গেলেন।’
‘তাই নাকি? সংক্ষেপে এই ঘটনাটা বলুন তো!’
‘কী বলব, বলুন। তাঁর চরিত্রের মধ্যে এক ধরনের পাগলামী ছিল। লেখক হবার খুব ইচ্ছে ছিল তাঁর। কিন্তু এ লাইনে কখনো সফল হননি। বেঁচে থাকতে কোনো পত্রিকায় তাঁর গল্প ছাপাও হয়নি। এ নিয়ে তাঁর এক ধরনের দুঃখ ছিল। হঠাৎ কী হল, দেড় বছর আগে তিনি চলে গেলেন সুন্দরবনে।’
‘কেন?‘
‘জানি না। সংসার ছেড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে বাস করতেন চেয়েছিলেন তিনি। আমি অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে ফেরাতে পারিনি।’
এ কথাগুলো বলে রাফেজা বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। হরপদ দত্ত কৌতূহলী গলায় বললেন, ‘আচ্ছা, তিনি সুন্দরবনে কী করতেন, তা জানতেন?’
‘কী আবার! তার স্বপ্ন ছিল বাঘের বাচ্চা আর ছাগলের বাচ্চা একসাথে বড় হবে। বাঘের দুধ খাবে ছাগলের ছানা, আর ছাগলের ছানা বাঘের দুধ খাবে। তিনি তাঁর পশু-পাখিদের গান শেখাবেনÑ এটাও স্বপ্ন ছিল। বলুন তো, এমন চিন্তা কি কোনো সুস্থ মানুষ করে? এমনই পাগল ছিলেন আমার স্বামী!’
হরপদ দত্তের বুকের ভেতর ঢিব্ঢিব্ শুরু হয়ে গেল। মৃদুল রায়হানের গল্পে বাঘ ও ছাগলের বাচ্চা একসাথে দুধ খাবার কথা উল্লেখ আছে। মৃদুল রায়হানের সুন্দরবনের থাকার এই গল্পটা তাহলে লিখল কে? গল্পটা পুরোপুরি না পড়ার জন্য এখন নিজেকে কেমন অপরাধীই মনে হচ্ছে। গল্পটা পড়া থাকলে আরও কিছু প্রশ্ন করা যেত। তিনি ফের জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা বলুন তো, সুন্দরবনে তিনি কীভাবে মারা গেলেন? আপনি বলেছেন তাঁর অপমৃত্যু হয়েছিল!’
‘তাঁর লাশ পাওয়া যায় একটি শেওড়া গাছের মগডালে। মৃত অবস্থায় মগডালে তিনি বসেছিলেন। জেলে ও বাওয়ালিরা তাঁকে প্রথম দেখতে পায়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাঁর লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ আমাদের জানিয়েছিলÑ তাঁর গলায় ফাঁসের চিহ্ন ছিল।’
‘গাছের মগডালে বসেছিলেন। একজন মৃত মানুষ কীভাবে গাছের মগডালে বসেছিলেনÑ এই প্রশ্নটা আপনাদের জাগেনি? ব্যাপারটা কেমন বিদ্ঘুটে লাগছে না?’
এ কথার জবাবে কয়েকমুহূর্ত চুপ রইলেন রাফেজা বেগম। হরপদ দত্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রশ্নটার জবাব তার জানা চাই। রাফেজা বেগম গলার স্বর নামিয়ে বললেন, ‘শুনেছি, ভূতের কবলে পড়েছিলেন তিনি। ভূত তাকে গলা টিপে মেরে গাছের মগডালে রেখে দিয়েছিল।’
‘এ কথা আপনারা বিশ্বাস করেছেন?’
‘অবিশ্বাসও করতে পারছি না। গাছের মগডালে মৃত মানুষকে কে বসিয়ে রাখবে, বলুন?’
‘কথাটা ভাববার মতো। তবু…’
‘পুলিশ অবশ্য এটাকে হত্যাকাণ্ড বলেছে। কিন্তু কারা হত্যা করেছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি।’
হরপদ দত্তের মনে এখন কয়েকটি প্রশ্ন পেখম ছড়িয়ে গেল। মৃদুল রায়হানের মৃতদেহ গাছের মগডালে কেন থাকবে? মৃদুল রায়হান এক বছর আগে মারা গেলে তাঁকে এ ক’দিন তাহলে কে ফোন করে জ্বালাতন করল? গল্পটাই বা লিখে পাঠাল কে? প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি মৃদুল রায়হানের পুরস্কার প্রাপ্তির সদনপত্র ও চেক এক রকম জোর করেই রাফেজা বেগমের হাতে তুলে দিয়ে তাদের বাসা থেকে অন্যমনস্কভাবে বের হয়ে এলেন। এমন ভূতুরে ঘটনার মুখোমুখি তিনি কখনো পড়েননি। ভূত-প্রেত নিয়ে তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। তবে মৃত মৃদুল রায়হানের টেলিফোন ও গল্প পাঠানোর ঘটনায় তিনি যেন রহস্যের গোলক ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেলেন। মৃদুল রায়হানের বাড়ির বাইরে গলির মুখে তার গাড়িটি ছিল। গলিটি সরু ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। রাত বেশি না হলেও নির্জনতায় গলিটি কেমন ঝিম মেরে আছে। গা ছমছম করা পরিবেশ। নিজের গাড়ির কাছাকাছি যেতেই হরপদ দত্তের সেলফোনটি বেজে উঠল। তিনি অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আমি ভূত বলছি! চিনতে পেরেছেন তো?’
ফের মৃদুল রায়হান বা প্রেতাত্মার ফোন। তিনি এবার ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। তার বোধ শক্তির মধ্যে শীতল এক ধারা প্রবাহ হচ্ছেÑ এটা টের পাচ্ছেন। বুকের ভেতর কোথাও একটা কাঁপনও টের পেলেন। তবে তা সামলে নিলেন। বললেন, ‘আপনি আসলে কে? নিজেকে ভূত পরিচয় দিলেই হল! প্রমাণ কী আপনি ভূত?’
এ কথায় ও প্রান্তে খিক্খিক্ শব্দ পাওয়া গেল। ভূত হাসছে। তিনি রাগলেন না। রহস্যটা বের করতে হবেÑ মনে মনে ভাবলেন। ও প্রান্ত থেকে কণ্ঠ ভেসে এল, ‘মশাই দেখছি, একেবারেই ভূত বিশ্বাস করেন না! এখনো নিজের বিশ্বাসে অটুট আছেন!’
‘তা তো বটেই। আপনি নিশ্চয় অন্য কেউ। মৃত মৃদুল রায়হানের নামে গল্প লিখেছেন এবং রহস্য করছেন। এটা আমার কাছে পরিষ্কার। ভূত কি কখনো টেলিফোন করতে পারে! এমন কথা কখনো শুনিনি।’
‘তা আপনার যা ধারণা। ভূতকে নিয়ে আপনারা কিছু নির্দিষ্ট থিম তৈরি করে রেখেছেন মশাই। এর বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না। ভূতুরে ফোনের কথা বলবেন, অথচ ভূত ফোন করতে পারেÑ এটা মানবেন না। যাই হোক, আপনি যে আমার পুরস্কারের সনদ ও অর্থের চেক আমার বাসায় দিয়ে এলেনÑ এর জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কৃতজ্ঞতাও। লেখক হিসাবে একটা স্বীকৃতি যে মিলল, এটার আনন্দ অনুভব করছি। তাই আজ ভূতদের নিয়ে একটা গানের আসর বসাব।’
এ কথায় মৃদু হেসে হরপদ দত্ত বললেন, ‘বলেন কী! ভূতেরা গানও গায় নাকি?’
‘শুনবেন? আমি কিন্তু আপনার পাশ থেকেই কথা বলছি। আমার সঙ্গে এক দঙ্গল ভূতও রয়েছে। ওদের একটা রবীন্দ্র সঙ্গীতের কয়েক লাইন শিখিয়েছি। শুনবেন?’
‘রবীন্দ্রসঙ্গীত! বলেন কী!’
‘জ্বি। একটু অপেক্ষা করুন, গাইছি। ওরাও কণ্ঠ মেলাবে। ফোন ছাড়ছি, মশাই।’
টেলিফোনের লাইনটা কেটে গেল। এরপরই শোনা গেল মৃদুল রায়হানের কণ্ঠÑ
‘তুমি মোর পাও নাই, পাও নাই পরিচয়।
তুমি যারে জানো, সে যে কেহ নয়, কেহ নয়…’
রাতের নীরবতা ভেঙে গানটা তার কানে আসছে। কয়েকমুহূর্তের মধ্যে আরও কণ্ঠ যোগ দিল এই গানে। সমবেত কণ্ঠ বাড়তে লাগল। হরপদ দত্ত চারপাশে তাকিয়ে নিকষ অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। ভূতদের কণ্ঠস্বর বাড়তে লাগল। এতে খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত নিজের গাড়িতে উঠে বসলেন তিনি। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল। হরপদ দত্তের মনে হচ্ছিল শত শত ভূতের সমবেত কণ্ঠ এসে আছড়ে পড়ছে তার বন্ধ গাড়ির কাচে। তিনি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি কিছু শুনতে পাচ্ছ? আশে পাশে কেউ কি গান গাচ্ছে?’
ড্রাইভার ছোট্ট জবাব দিল, ‘না তো স্যার!’
তিনি বুঝতে পারলেন তার হ্যালুসিনেশন হয়েছে। তিনি ড্রাইভারকে বললেন, ‘চলো। জোরে গাড়ি চালাও!’
গাড়ি ছুটল। ভূতদের হেঁড়ে গলার সমবেত সঙ্গীতও ছুটে চলল গাড়ির পিছু পিছু।
জাতিসংঘে ভূত
আকাশমুখী অট্টালিকা ও আলো ঝলমলে শহর নিউইয়র্কে কতজন যে নীরবে চোখের জল ফেলেন, এ কথা ক’জনা জানে? এই যে শহরটা কখনো ঘুমায় নাÑ কেউ কি ভেবে দেখেছে, না ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে শহরটাও দিনদিন কেমন নির্দয় হয়ে যাচ্ছে? না, এই শহর নিয়ে কেউ এভাবে ভাবে না। তারা শুধু নিউইয়র্ক শহরটার আলো, রূপ, জৌলুশ, বর্ণিল-ছটার কথা ভাবে। এসব নিংড়েও নিচ্ছে তারা। নিচ্ছে তো, নিচ্ছে…।
নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড এলাকায় ইস্ট রিভারে তীরে বসে কথাটা এক ঝলক ভেবে নেন শামীম আহমেদ। প্রতি শনিবার রাতে তিনি এখানে আসেন এবং এক টুকরো অন্ধকারের নিচে মগ্ন হয়ে নানা কথা ভাবেন। এক টুকরো অন্ধকার মানে, জাতিসংঘ সদর ভবনের উল্টোদিকে ইস্ট রিভারের ঐ পাড়ে যে পার্ক, ঐ পার্কে একটি ওক গাছের নিচে আঁধার ছায়ায় তিনি বসে থাকেন। শনিবার রাতে তাকে এখানে আসতে হয়। এই এলাকার একটি কেএফসি-র স্টোরে কাজ করে তার স্ত্রী শিখা। নিজের কাজ থেকে ফেরার পথে শিখাকে ওর কর্মস্থল থেকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। কেএফসি-র স্টোরে শনিবার রাতে ‘লেট নাইট ডিউটি’ করতে হয় শিখাকে। এদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এই পার্কে বসে থাকেন শামীম আহমেদ। শীতকালে অবশ্য তিনি শিখাকে বাড়ি নিয়ে যেতে আসেন না। তিনি লক্ষ্য করেছেন গ্রীষ্মকালে এখানে ট্যুরিস্টদের ভিড় লেগে থাকে। স্থানীয়রাও এই পার্কে হাঁটাহাঁটি করেন রোজ। পার্কটি তার ভালও লাগে। এই ভাল লাগার বড় একটি কারণ হচ্ছে ইস্ট রিভারের জল একেবারে পায়ের সামনে এসে যেন আছড়ে পড়ে। রাত যত বাড়ে পার্কের সঙ্গে নদীর জলের ফিসফিসানিও তত বাড়ে। কোলাহল ছেড়ে নিভৃতে থাকে বলে তিনি জল ও পার্কের চাপা কথার অস্পষ্ট আওয়াজ শুনতে পান। আজ অনেকক্ষণ তিনি একা বসেছিলেন পার্কের একটি নির্জন বেঞ্চিতে। বেঞ্চটির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ঝাঁকড়া ওক গাছ। চারপাশটা আলোর ছটফটানির মধ্যে এই গাছের ছায়া যেন স্বস্তির ছাতা বা বলা যায় তীব্র আলোর মাঝখানে একগুচ্ছ অন্ধকারের পেখম। শামীম আহমেদ এখানে এলে এই গাছটির নিচেই বসেন। অনেকক্ষণ মন খারাপ করে নদীমুখী হয়ে চুপচাপ বসেছিলেন তিনি। কতক্ষণ বসেছিলেন, কে জানে। হঠাৎ তার পাশ থেকে কেউ যেন বলে উঠল, ‘এত মন খারাপ করে বসে থাকলে হবে? এ দেশে থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনো মানে নেই, বাপু! দুশ্চিন্তা করে করে নিজের শরীরটাই খারাপ হয়ে যেতে পারে!’
শামীম আহমেদ ছেলেকে নিয়ে, কন্যাকে নিয়ে এবং স্ত্রী শিখাকে নিয়ে অনেকদিন যাবত দুশ্চিন্তা করছেন ঠিক। দুশ্চিন্তা কি এমনি-এমনি করছেন? করতে হচ্ছে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এই স্বপ্নের দেশে এসেছিলেন। ভাগ্য বদলে নেবেনÑ এটাই ছিল লক্ষ্য। কী বদলেছে তার? দেশে ছিলেন স্কুলের শিক্ষক, এখানে হয়েছেন নিরাপত্তা কর্মী। দেশে শিখা তার জন্য রান্না করে বসে থাকত। অসহ্য গরমে তালপাতা দিয়ে বাতাস করত। কখনো তার হাত-পাও টিপে দিত। এখন ওসব কেবল সুখের স্মৃতি। গায়ে এক শ’ চার ডিগ্রি জ্বর নিয়েও কাজে যেতে হয়। এখন শিখা তার কপালে একবার হাত দিয়ে দেখার সময়ও পায় না। ছেলে-মেয়ে যত বড় হচ্ছে, তত যেন বখে যাচ্ছে। পোশাক-আশাকের যা শ্রী! লজ্জা-শরম যেন উঠে যাচ্ছে ওদের। বাংলায় কথা বলা যেন ভুলে যাচ্ছে ওরা। ইংরেজিতে বাবা-মা সম্পর্কে অমর্যাদাকর কথা বলতেও দ্বিধা করছে না কখনো-সখনো। এর জন্যই কি তিনি এ দেশে এসেছিলেন? প্রশ্নটা নিজের মনে দলা পাকিয়ে ওঠে নিজের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে দমকা হাওয়ার মতো বেরিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। এরমধ্যে অদৃশ্য থেকে কে যেন কথাটা বলল। শামীম আহমেদ শুধু হচকিয়ে গেলেন তাই নয়, একটু স্তম্ভিতও হলেন। কণ্ঠটা তার পাশ থেকে ফের গন্গনিয়ে উঠল, ‘আলোর স্রোতে ভেসে যেতে তোমাদের কী আনন্দ, বাপু! স্রোতে ভাসতে চাও, আবার ডুবে যাবার আশঙ্কাও করো!’
কথাটা যে তাকে উদ্দেশ্য করেই কেউ বলছে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু শামীম আহমেদ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। ওক গাছের নিচে যতটুকু অন্ধকার, এতে একজন লোকের উপস্থিতি আড়াল হবার সুযোগ নেই। আমতা-আমতা করে তিনি হাওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কে আপনি? আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না! কোথা থেকে কথা বলছেন?’
একটা চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। তার ঘাড়ের উপর কেউ যেন হাত রাখলেন। তিনি চমকে গেলেন। কণ্ঠটা তার কানের কাছে ধ্বনিত হল, ‘আমি লেখাপড়া জানা এক ভদ্র ভূত!’
শামীম আহমেদের শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। তার শিরায় যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল চট করে। তিনি বিস্ময়ে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, ‘ভূত!’
‘ভূত’ শব্দটা উচ্চারিত হতেই যেন তার মনে হল ইস্ট রিভার থেকে একটা জলের ঝাঁপটা এসে হুড়মুড় করে তার গায়ে এসে পড়ল, অথচ তিনি ভিজলেন না। ভৌতিক একটা ব্যাপার ঘটল!
‘ভয় পাবার কিছু নেই। আমি ঘাড় মটকে দেওয়া বা ভয় দেখানো ভূত নই। ভূতরাজ্যের আমিই সনদপ্রাপ্ত একমাত্র শিক্ষিত ভূত।’
শামীম আহমেদ ঘাড় ঘুরিয়ে দু’ পাশে তাকালেন। কেউ নেই। কিন্তু তার পাশে কেউ বসে আছেনÑ এটা অনুভব করতে পারছেন। পাশ থেকে ভূতের কণ্ঠ ফের বলল, ‘আমাকে দেখা যায় না। বললাম তো, আমি ভূত। তুমি তো বাপু, ভয়কাতুরে নও! বিয়ের আগের বছর তোমাদের গ্রামে একবার ডাকাত পড়েছিল। তুমি তিন ডাকাত একাই পাকরাও করেছিল একটা লম্বা দা নিয়ে। ঐ বছরই তোমাদের গ্রামের সঙ্গে মোল্লাকান্দির গ্রামের ছেলেদের হা-ডু-ডু খেলা হয়েছিল। খেলায় জিতে যাওয়ার সময় মোল্লাকান্দির গ্রামের লোকেরা তোমাদের খেলোয়াড়দের প্যাঁদানী দিতে মাঠে হামলে পড়েছিল। তোমার মনে আছে নিশ্চয়? সেদিনও তুমি একটা বাঁশের লাঠি নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল ওদের। দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে প্রাণ নিয়ে নিজ গ্রামে তোমরা ফিরতে পেরেছিলে সেদিন। সেটাও হয়েছিল তোমার বুক চিতিয়ে মারামারি করার সাহসী ভূমিকার কারণে। গ্রামবাসী তোমাকে ‘গাঁয়ের বীর’ খেতাবও দিতে চেয়েছিল। তুমি নাওনি। সেই তোমাকে ভয়কাতুরে ভাবতে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, বাপু!’
ভূতের কথাগুলো ষোলআনা খাঁটি। শামীম আহমেদকে ভূতটা এসে এক লহমায় তার উদ্দাম তারুণ্যের দিনগুলোতে নিয়ে গেল। তিনি মোমের মতো গলে পড়লেন যেন। ভূটটাকে দেখতে না পেলেও আন্দাজ করে নিজের পাশে ভূতের দিকে আবেগভরা চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। হোক ভূত, তিনি নিজের ভেতরের ভয় তাড়িয়ে ভূতটার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভূতের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘এই তো সাহস জোগাচ্ছ দেখছি। তোমার পা ঠক্্ঠকানিটা কমছে। সত্যি কথা বলতে কিÑ ভয়কাতুরে লোক আমি পছন্দ করি না!’
শামীম আহমেদ নদীর সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ভূত সাহেবের এখানে আগমনের হেতু? নিবাস কোথায় জনাবের?’
একটা গরম হাওয়া তার ঘাড়ে এসে পড়ল। হাওয়াটা যে ভূতের মুখ থেকে নির্গত হয়েছে, এটা নিশ্চিত। ভূত জবাবে বলল, ‘নিবাস ভূতরাজ্যে। ভূতরাজের আদেশে নিউইয়র্ক আসা। আমাকে গবেষণার কাজে পাঠানো হয়েছে। কাজ শেষ হয়েছে। এবার ফিরে যাবার পালা।’
কথা শুনে শামীম আহমেদের পেটে খিঁচুনী দিয়ে হাসি উঠে আসল। তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। ভূতের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া যাক। তাকে তা ভূতের কাছ থেকে আষাঢ়ে গল্প শুনতেই হবে। তিনি বললেন, ‘তা বেশ। জনাব কী বিষয়ে আপনার গবেষণা?’
‘মূল বিষয় ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন মুল্লুকের শাসনকর্তারা জাতিসংঘে কী বলেন এবং কাজে তারা কী করেন।’
‘বেশ বেশ! জনাব কি জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন?’
‘ঠিক ধরেছ, বাপু। বিগত কয়েকটি অধিবেশনেও ছিলাম। বিভিন্ন দেশের রাজা, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীদের মিথ্যাচার শুনে শুনে ইন্দ্রিয় শক্তিতে বিরক্তির পাহাড় জমে গেছে!’
‘বলেন কী! বিশ্বকে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সভ্যতার আরও বিকাশ ঘটাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আপনার এই ধারণা হয়েছে?’
‘তোমরা মানুষরা বড্ড বোকা। অবশ্য সকলে বোকা নয়। তোমরা অনেক কিছু জানো না, বা জানলেও বোঝ না। তোমরা স্বভাবগতভাবে দলকানা। কারো না কারো পক্ষে অন্ধ সমর্থক হয়ে থাকতে পছন্দ করো। তাই অনেক কিছুই তোমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না।’
‘কথাটায় কেমন যেন ভাল-লাগা আছে। তা এ কথা বলছেন যে, জনাব?’
‘বললাম, তোমরা তোমাদের রাষ্ট্রনায়ক বা সরকার প্রধানদের কথার ফুলঝুরি শুনে বিগলিত হয়ে যাও। কথাটার সত্যতা খোঁজো না। তাদের কথায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকো। তাদের জয়ধ্বনি দিতে আনন্দ পাও, মুখিয়েও থাকো। আমিও যখন মানুষ ছিলাম, এই ভুলের বৃত্তে ছিলাম।’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো, তোমরা কোনো দলের প্রতি সমর্থন করলে ঐ দলের শীর্ষ নেতারা ভুল বা অন্যায় করলেও তোমরা প্রতিবাদ করো না। উল্টো সমর্থন করো। আর সভ্যতার বিকাশের কথা বললে? জাতিসংঘে দেখলাম, এখানে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে মারণাস্ত্র প্রতিরোধের। অথচ যে রাষ্ট্রগুলো এই প্রচারণা চালায়, তারাই মারণাস্ত্র বানাচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়েছে যারা, তারাই এই অস্ত্র আর কোনো রাষ্ট্র যেন বানাতে না পারেÑ এ ব্যাপারে একহাট্টা। আরেকটি বিষয় ভীষণ খটকা লাগল। যারা বিভিন্ন মুল্লুকে সন্ত্রাসী দল তৈরি করছে, তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পর আবার ঐ সন্ত্রাসী দলের নির্মূলে যুদ্ধ পর্যন্ত বাঁধিয়ে ফেলছে!’
শামীম আহমেদ ভূতের কথায় খানিকটা মুগ্ধ হলেন। হোক ভূতের কণ্ঠ, কথাগুলো তো যৌক্তিক। তিনি আপ্লূত গলায় বললেন, ‘কথাটা অনেকক্ষেত্রেই সত্য। তা, জাতিসংঘে আপনার মোটা দাগের কী অভিজ্ঞতা অর্জন হল?’
‘জাতিসংঘে এসে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মুখে শান্তি-প্রগতি-উন্নয়নের কত কথা শুনতে হল। তাদের মিথ্যাচার, কপটতা দেখে ঘৃণায় গা রি-রি করে ওঠে, বাপু!’
এবার শামীম আহমেদের মনে হল ভূতটা শিক্ষিত বটে। পৃথিবীর অনেক খবর তার নখদর্পণে। তিনি ভূতটাকে একটু বাজিয়ে নিতে প্রশ্ন করলেন, ‘ভূত মহাশয়, আপনাকে দেখার উপায় কী? আপনি কি কোনো রূপ-ধারণ করতে পারেন না?’
‘না। আসলে, আমাদের স্থায়ী কোনো অবয়ব নেই। আমরা এক ধরনের অস্তিত্ব। দৃশ্যমান বলতে কিছু নেই। তবে আমাদের ভূতরাজ যদি কোনো ভূতকে বিশেষ-শক্তি প্রদান করেন, একমাত্র সে-ই কোনো রূপ-ধারণ করতে পারে। ঐ রূপ মাত্র কয়েক ক্ষণ স্থায়ী হয় এবং ঐ ভূত এক সময়ে একজনের সামনে রূপ-ধারণ করতে পারবে…। এমন ভূতের সংখ্যা ভূতরাজ্যে নেহাতেই কম। আমি যে শক্তি লাভ করেছি, এতে শুধু একজনের সঙ্গে কথা বলতে পারি, দেখা দিতে পারি না।’
শামীম আহমেদের কৌতূহল বাড়তে থাকে। ভূতের কথা শুনতে ভালই লাগছে তার। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই ভূতরাজ কে? তার কী ক্ষমতা?’
‘আমাদের ভূতরাজ্যের রাজা হচ্ছে ব্রাহ্মদৈত্য ভূত। তার অনেক ক্ষমতা। তবে তার ক্ষমতার বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। ভূতরাজ নিয়ে বা তার ক্ষমতা নিয়ে আমাদের কোনো কৌতূহল নেই। কৌতূহল থাকলেও এর জবাব পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর একটি কথা, ভূতরাজের মৃত্যু নেই, মুক্তি আছে।’
‘মানে?’
‘মুক্তি মানে, ইচ্ছামুক্তি। ভূতরাজ যদি মনে করেন, তিনি আর ভূতরাজ থাকবেন না। বিলীন হবেন। তখন ইচ্ছামুক্তির সাধনা করবেন সৃষ্টিকর্তার নিকট। হয়তো এক হাজার বা এক লক্ষ বছর পর তা মঞ্জুর হবে। ফলে তিনি বিলীন হবেন। বিলীন হবার সঙ্গে সঙ্গে ওই ভূতরাজ্যের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মদৈত্য ভূত ভূতরাজ হয়ে যাবেন। তার মাথায় মুকুট বসে যাবে। তার মধ্যে সীমাহীন শক্তি ভর করবে। তখন সকলে তাকে ভূতরাজ মেনে নেবে।’
‘রাজা নির্বাচনের সুযোগ নেই? গণতন্ত্র বলে কিছু নেই?’
‘না। আমাদের ভূতরাজ্যে কোনো নির্বাচন নেই। কোন দল নেই, দলাদলি নেই। চাওয়া-পাওয়া নেই। এমন কি লোভ-লালসাও নেই। আর গণতন্ত্র লাগবে কেন? যেখাতে কোনো মতবিরোধ নেই, পছন্দ-অপছন্দ নেই, রাজনীতি নেই, সমাজনীতি নেই, অর্থনীতি নেই বা কোনো নীতি-দর্শনের প্রয়োজন নেই, সেখানে গণতন্ত্র বা কোনো তন্ত্র আশা করছ কেন, বাপু?’
‘না, মানে জানতে চাচ্ছিলাম আপনাদের ভূতরাজ্যে আসলে কী কী আছে…? আর গণতন্ত্র কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।’
একটু সঙ্কোচ বোধ করলেন শামীম আহমেদ। ভূতের কণ্ঠ বলল, ‘আসলে আমাদের ভূতরাজ্যে কিছুই নেই। কেবল আছে জমাট অন্ধকার। এই অন্ধকারে আমাদের বসবাস।’
‘জনাব ভূত, কৌতূহল দমন করতে পারছি না। একটা বেমক্কা প্রশ্ন করব?’
‘করো বাপু। ভয় কি?’
‘এই ভূত কারা? আই মিন, মানুষ মরলেই কী ভূত হচ্ছে?’
‘প্রশ্নটা খাসা করেছ। তোমাদের মনে একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে বৈকি। জেনে রাখো, মানুষ মরলেই ভূত হয় না। অপঘাতে যারা মারা যায়, কেবল তারা ভূত হতে পারে। আবার অপঘাতে মরলেও সকলের ভূত হবার সনদ মেলে না। এই সনদ দেন ভূতরাজ। একটা সময় ছিল অপঘাতে মরলেই ভূত হয়ে যেত। এখন ভূতরাজ সনদ দিলেই ভূত হবার সুযোগ হচ্ছে।’
‘কেন?’
‘ভূতরাজ্যগুলো কি আগের মতো আছে, বাপু? আগে ভূতরাজ্য খাঁ-খাঁ করত। ভূত ছিল কম। এখন কী আর সেদিন আছে? পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন কত লোক অপঘাতে মরছে, হিসাব রাখো? প্রতিদিন শত শত, হাজার-হাজার মানুষ অপঘাতে মরছে। সকলে যতি ভূত হয়, ভূতরাজ্যগুলোও একদিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।’
‘বলেন কী!’
‘তা আর কি এমনি এমনি বলছি? আজকাল অনেক সেলিব্রটি মানুষ অপঘাতে মরেও ভূত হতে পারছে না। যেমন, ধরো, কণ্ঠশিল্পী মাইকেল জ্যাকসন। তাকে ভূত হবার সনদ দেওয়া হয়নি।’
‘সত্যি!’
‘নয়তো কি? এমন অনেক নজীর সৃষ্টি হচ্ছে ভূতরাজ্যগুলোতে।’
‘মানুষ মরে ভূত হতে চাইবে কেন, বলুন তো?’
‘মানুষ পটল তুললেই তো ইহজগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক চুকে গেল। মৃত্যুর পর ভূত হতে পারলে পৃথিবীতে ঘুরাফেরা তো করতে পারে। যারা পিছুটান ছাড়তে পারে না, তারা মরেও ভূত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে চায়। খুব সহজ বিষয়, বুঝেছ?’
‘এখন বুঝতে পেরেছি। অপমৃত্যু নিয়ে কী যেন বলছিলেন?’
‘বলছিলাম, পৃথিবীতে অপমৃত্যু বাড়ছে বলে আমাদের ভূতরাজের উদ্বেগও বাড়ছে। বিষয়টি আমার মাথায় প্রথম উঁকি দেয়। ভাবছিলাম, অপমৃত্যু বাড়ছে কেনÑ বিষয়টি তলিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। একদিন ভাগ্যগুণে আমাদের ভূতরাজের দেখাও পেয়ে গেলাম। তার কানে কথাটা তুললাম। ব্যস, ভূতরাজ লুফে নিলেন।’
‘এতে কী হল?’
‘ভূতরাজ প্রথমে আমাকে শিক্ষিত ভূতের সনদ দিলেন। এরপর তাকে বললাম, জাতিসংঘে গিয়ে রাষ্ট্র প্রধানদের কথাবার্তা এবং ঐ সকল রাষ্ট্রপ্রধানদের দেশে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এর তথ্য বা পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা যেত পারে।’
‘ইন্টারেস্টিং!’
‘আমার কথায় ভূতরাজ খুশি হলেন। আমাকেই এই দায়িত্ব দিলেন তিনি। বেঁচে থাকতে আমার খুব ইচ্ছে ছিলÑ পিএইচডি করব। ওটা করতে গিয়ে খুন হলাম।’
‘কীভাবে? একটু খুলে বলবেন?’
‘গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকতাম বলে স্ত্রীকে সময় দিতে পারিনি। একদিন আকস্মিকভাবে বাড়ি ফিরে দেখি স্ত্রীর সঙ্গে পাড়ার এক ছোকরা লটরপটর করছে। রাগে স্ত্রীর গালে চড় মেরেছিলাম। ব্যস, পাল্টা জবাব এল তাৎক্ষণিকভাবেই। ছোকরা রান্না ঘর থেকে বটি এনে কোপ বসিয়ে দিল আমার ঘাড়ে…। নিজ স্ত্রী ও তার প্রেমিকের হাতে খুন হয়ে ভূতরাজ্যে আশ্রয় পাই। এই হচ্ছে আমার ভূত হবার কাহিনী।’
‘পিএইচডি-র কথা বলছিলেন। ভূতরাজের কাছ থেকে অনুমতি পেলেন এরপর?’
‘ভূতরাজকে বললাম, গবেষণা করে ফিরলে আমাকে এর জন্য ডক্টরেট খেতাব দিতে হবে। আমাদের ভূতরাজ্যে কোনো খেতাব নেই। ভূতরাজ রাজী হলেন আমাকে এই খেতাব দিতে। সম্ভবত এর মধ্য দিয়ে আমিই প্রথম খেতাব পাব এবং আমিই হব আমাদের রাজ্যের প্রথম ডক্টরেট ভূত। বাঙালী ভূত হিসাবে এটা শুধু আমার একার গর্ব নয়। তুমিও করতে পারো। যদিও এই সংবাদটা মানুষ জানবে না।’
শামীম আহমেদের মধ্যে ভূত বিষয়ক ভয় এখন একেবারেই নেই। ভূতের সঙ্গে তার কথপোকথন চলছে। এ কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে? ভূতের গল্প যেন আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার। আগে গ্রামগুলো সন্ধ্যা হলেই ডুবে যেত নিকষ অন্ধকারে। এখন গ্রামগুলোতে আলো হামলে পড়ছে। এমন কি, গাছ-গাছালি, ঝোপঝাড়ও কমে যাচ্ছে। হিজল, তমাল, তেঁতুল, চালতা, জামরুল, বট, আমলকিসহ কত গাছের বাহার দেখা যেত গ্রামে। এখন গাছ তেমন দেখা যায় না। গেঁয়ো পথের বাঁকে-বাঁকে বাঁশঝাড়ও খুব একটা দেখা যায় কি? গাছ কেটে বাড়ি, আঁধার সরিয়ে আলো জায়গা করে নিচ্ছে দ্রুত। ভূতের গল্পও যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে তাই। কথাগুলো ভেবে নিলেন শামীম আহমেদ। ভূতটার খড়খড়ে কণ্ঠ ধ্বনিত হল, ‘ভূত নিয়ে তোমার দরদ আছে দেখছি, বাপু!’
শামীম আহমেদ চমকালেন। ভূতটা কি তার মনের কথা পড়তে পারে? তিনি ভূতের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার জন্য বললেন, ‘আচ্ছা জনাব, ভূতরাজ্যগুলোতে বাঙালী ভূতদের অবস্থা কী? ওখানে কারা আছেন? কেমন আছেন?’
‘তা অনেকেই তো আছেন। অনেক রাজনৈতিক নেতা আছেন। ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা তারাও আছেন। কবি জীবনানন্দ দাশও আছেন। কতজনের নাম বলব? নামের তালিকায় দীর্ঘ।’
‘বলেন কী! ওখানে রাজনৈতিক বাহাস হয় না? বিরোধ-লড়াই হয় না?’
‘ভূতের দেশে কোনো বিরোধ নেই। এই যে ধরো, যারা হিন্দু-মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা করে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে, তারা ভূতরাজ্যে গলায় গলায় ভাব করে দিনযাপন করছে। নানা জাত-পাত, সম্প্রদায়, বর্ণ ও ধর্মের লড়াই শুধু পৃথিবীতে, বাপু। আমাদের ভূতরাজ্যে ওসবের বালাই নেই।’
‘হুম।’
‘আরও শুনবে? ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভূট্টো, সাদ্দাম হোসেন, মুহাম্মদ গাদ্দাফী, জনএফ কেনেডী, আনোয়ার সাদাতসহ অসংখ্য রাষ্ট্রনায়করা এখন ভূতরাজ্যে একসঙ্গে আড্ডা দেন। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য নিজের চুল ছেঁড়ার চেষ্টা করেন। ভূতদের চুল নেই বলে রক্ষা! নইলে তাদের চুলে ভূতরাজ্যের বেহাল অবস্থা হয়ে যেত!’
শামীম আহমেদ হাসি ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি ‘হি হি হি’ করে হেসে ফেললেন। হাসির দমকে হেঁচকি উঠল তার। ভূতটাও কি তার সঙ্গে হাসছে। ওক গাছটা প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। ইস্ট রিভার থেকে বড় একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল তার পায়ের সামনে। ঢেউটা ভৌতিক মনে হলেও জলের ঠাণ্ডা স্পর্শ স্বাভাবিক লাগল। ঠিক এই সময়ে শিখার কণ্ঠ শুনতে পেলেন তিনি।
‘তুমি এখানে বসে কী করছ? ঘুমিয়ে পড়েছিলে বুঝি? কোথায় আমাকে খুঁজতে স্টোরে যাবে, উল্টো তোমাকে খুঁজতে হল আমাকে। আজকাল যে তোমার কী হয়েছে!’
ইদানীং শিখা ঝাঁঝাল কণ্ঠে কথা বলে। শামীম আহমেদ লক্ষ্য করলেন শিখার কণ্ঠে আজ ঝাঁঝ নেই। শিখা কথাগুলো বলল অনুযোগ ও অনুরাগের মিশ্রণে। তিনি কয়েক মুহূর্ত হা করে তাকিয়ে রইলেন শিখার মুখের দিকে। ভূতটা আছে-কি নেই, তিনি বুঝতে পারছেন না। ভূতের কণ্ঠ ধ্বনিত হচ্ছে না। শিখা তার কাছে এসে ইস্ট রিভারের দিকে তাকিয়ে রিনরিনে গলায় বলল, ‘বাহ, বেশ জায়গা তো। চলো, আমরা পাশাপাশি বসে কিছুটা সময় কাটিয়ে নিই।’
বলেই শিখা বেঞ্চিতে তার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। শামীম আহমেদ কেমন আবেশিত হয়ে যাচ্ছেন। শিখার কাছ থেকে এমন সান্নিধ্য অনেকদিন হল তিনি পাচ্ছিলেন না। এটা কি ভূতটার কোনো কারসাজি? কে জানে, হতেও পারে। শামীম আহমেদ শিখার একটি হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন। বিয়ের পর অনেকদিন বিশেষ মুহূর্তে তিনি শিখার হাত নিজের মুঠোবন্দী করে বসে থেকেছেন। এখন তার তেমন মুহূর্ত মনে হল। কথা না বললেও ভূতটা তাদের আশে পাশে আছে, এটা মনে হল শামীম আহমেদের। ভূতের কথা তিনি শিখাকে বলবেন না। বললে ও বিশ্বাসও করবে না। তিনি কাউকেই ভূতটার কথা বলবেন না। কত কথাই তো জগৎ-সংসারে গোপন থাকে। মনে মনে এ কথা যখন তিনি ভাবছিলেন, ঠিক তখন ইস্ট রিভার থেকে একটা বড় ঢেউ উঠে এসে আছড়ে পড়ল তাদের উপর। তারা এক পশলা ঠাণ্ডা জলে ভিজে গেলেন। তবে তারা বেঞ্চ থেকে নড়লেন না। শামীম আহমেদ বুঝতে পারলেন এই ঢেউটা ছিল ভূতের বিদায় সম্ভাষণ।
বোকা ভূত ও মাতাল জেলে
ভূত হবার পরও কেষ্টনাথের কষ্ট ঘুচল না। জীবদ্দশায় তার নামের পেছনে ‘বোকা’ পদবীটা সেঁটে গিয়েছিল। ভূতরাজ্যেও খেতাবটা থেকে যেন নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। যদিও ভূতরাজ্যগুলোতে খেতাব, প্রশংসা বা নিন্দার চর্চা নেই। তবে কেষ্টনাথের নানা কর্মকাণ্ডে ‘বোকা’ বিশেষণটি যেন আওরাতে শুরু করেছে অন্যান্য ভূতরা। বেঁচে থাকতে কোনো কাজই কেষ্টনাথ ভালভাবে করতে পারেনি। যখন যা করতে চেয়েছে, ভেস্তে যেত নিজেরই বোকামীর জন্য। ফলে তার নামের সঙ্গে ‘বোকা’ খেতাবটা লেপ্টে গিয়েছিল। কেষ্টনাথ ছিল ভীরু প্রকৃতির লোক। একটা সময় ওর ধারণা হয়েছিল ভীরু বলেই সে বোকা। এই ধারণা থেকে জীবনে একবার সাহস দেখাতে গিয়েছিল ও। আর সেই সাহস দেখানোটাই কাল হয়েছিল। সাহস দেখাতে গিয়ে ডাকাতের গুলিতে অকালে প্রাণ হারাতে হয় ওকে। এরপর থেকেই ও ভূতরাজ্যের অধিবাসী। সাহস দেখানোটাই ছিল তার জীবনের শেষ বোকামী বা বলা যায় কেষ্টর শ্রেষ্ঠ ঘটনাও। নদীতে মাছ ধরা ছিল কেষ্টনাথের শখ ও পেশা। কখনো বড়শি, কখনো জাল, কখনো টেঁটা দিয়ে মাছ ধরত ও। একদিন রাতে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জাল ফেলে মাছ ধরছিল। যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার কাছাকাছি কোনো এক বাড়িতে ডাকাত দল হামলা করল। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে নদীর পাড়ে জাল রেখে ও দৌড়ে এগিয়ে গিয়েছিল বাড়িটির দিকে। এমন কাণ্ড কখনো করেনি ও। সেদিন রাতে তার হঠাৎ সাহসী হবার সাধ জেগেছিল। কেষ্টনাথ যখন বাড়িটির প্রবেশ মুখে পৌঁছায়, বাড়ির উঠোনে তখন ডাকাত দলের সর্দার তর্জন-গর্জন করছে। বাড়ির ভেতর থেকে একটি নারীকণ্ঠের ‘বাঁচাও’ বলে আর্তনাদ ভেসে এল। ঐ আর্তনাদটাই ওর হৃদয় চূর্ণ করে দিল। কেষ্টনাথ ‘ডাকাত, ডাকাত!’ বলে চিৎকার শুরু করে দিল, যাতে আশে-পাশের লোকজন ছুটে আসে। কিন্তু কেউ এল না। শুধু তার দিকে ছুটে এল ডাকাত সর্দারের বন্দুকের গুলি। ব্যস, অসময়ে অপঘাতে মৃত্যু! ওর মৃত্যুর পর লোকজন কী বলেছে, তা সে জানতে পারেনি।
ভূতরাজ্যে স্থানান্তরিত হয়ে কেষ্টনাথের ভোগান্তি বড়ল বৈ কমল না। ভূত হবার সঙ্গে সঙ্গে এই ভূতরাজ্যে কিছু তেলেসমাতি শিখানো হয়। নতুন ভূতদের তেলেসমাতি শেখাতে পাঠানো হয় মনুষ্য-জগতে। মানুষকে ভয় দেখানোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই ওরা ভূতরাজ্যে স্থায়ী হতে পারে। নইলে মনুষ্য-জগৎ বা অন্যকোনো জগতে নির্বাসনে যেতে হয় ওদের। ভূতরাজ্য থেকে কেষ্টনাথকে মনুষ্যজগতে পাঠানোর পর অনেকগুলো অমাবস্যার রাত পেরিয়ে গেছে। কোনো রাতেই কেষ্টনাথ কাউকে ভয় দেখাতে পারেনি। এ নিয়ে ভূতরাজ্যে হাস্যরস চলছে। ওকে নিয়ে অনেক রকম টিপ্পনী-বিদ্রƒপও হচ্ছে। কেষ্টনাথ যে মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেনি, তা নয়। কাউকে না কাউকে ভয় দেখাতে প্রতি রাতেই ও চেষ্টা করেছে। কিন্তু মানুষগুলো যেন ভয় পাওয়া ভুলেই গেছে। ওকে এক শ’ রাতের সময় বেধে দেওয়া হয়েছিল। আজ রাতই ওর জন্য শেষ রাত অর্থাৎ বেঁধে দেওয়া সময়ের এক শ’তম রাত। আজ রাতে যদি ও কোনো মানুষকে ভয় দেখাতে না পারে, তাহলে দশ হাজার রাত ওকে নির্বাসনে থাকতে হবে। এই মনুষ্য-জগতে আলো এড়িয়ে আঁধারে মিশে থাকতে হবে। নির্বাসন কার ভাল লাগে? কেষ্টনাথ তালগাছের চূড়ায় দু’ পা আড়াআড়ি জড়িয়ে মাথা নিচু করে বাদুড় ঝোলার মতো ঝুলছিল এবং এসব কথা ভাবছিল। এখন ওর ভূতুরে শরীর বলতে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ভূতরাজ্য থেকে ওকে কখনো কঙ্কাল, কখনো বিকৃত মুখায়ব, কখনো গলিত শবদেহ, কখনো ভালুক সাদৃশ্য বিড়াল, কখনো অতি আকৃতির হুতোমপেঁচা হবার জাদুকরী শক্তি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ও যখন-তখন ধোঁয়ার পরিণত হতে পারবে সে। কেষ্টনাথ হঠাৎ দেখতে পেল রাধানগর গ্রামের মলয় দাসু মেঠো পথ ধরে হেলে-দুলে তালগাছের দিকেই আসছে। মলয় দাসু রাধানগর গ্রামের নিতান্ত এক দরিদ্র জেলে। সে ভীষণ অলস প্রকৃতির ও বাউণ্ডুলে। ওর যাত্রা-পালার নেশা আছে। ও নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে পালাগান বা যাত্রার আসরে গিয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। মাছ ধরার জন্য নিজের একটা মোটে জাল আছে ওর। জালটাতে কতক ফুটো অনেকদিন ধরে বহাল তবিয়তেই রয়েছে ওর আলস্যের জন্য। জাল সারানোর চেষ্টাও করে না সে। ফুটো জাল দিয়ে মাছ ধরবে কি? প্রায়ই ভোরে বাড়ি ফেরে সামান্য কিছু মাছ নিয়ে, কখনো বা শূন্য হাতে। এ নিয়ে অভাবের সংসারে মলয় দাসুর সাথে স্ত্রী রমলার সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকে। হাতের নাগালে মলয় দাসুকে পেয়ে আশার আলো দেখতে পেল কেষ্টনাথ। শেষ সময়ে একটা সহজ শিকার জুটে গেল বলে ওর মনে হল। কেষ্টনাথ ঠিক করেছিল তালগাছের নিচ দিয়ে মলয় দাসু যাবার সময় ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে তাকে ঘিরে ভড়কে দেবে। এরপরই গলিত শবদেহ হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে ভূতুরে কণ্ঠে বিকট শব্দ করবে। কিন্তু মলয় দাসু কেষ্টনাথকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে তালগাছটার গোড়ায় এসে বসে পড়ল। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি! দৌড়ে পালাবার জো নেই তার। তালগাছের নিচেও ভয় দেখানো যাবে। কেষ্টনাথ টের পেল মলয় দাসুর মুখ থেকে ভুরভুর করে চেলাই মদের উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে। সে ডান হাতে মদের বোতল ধরে রেখেছে। তালগাছের নিচে বসে আরাম করছেÑ এমন ভাব করে ঢক্ ঢক্ করে বোতলের মদ পান করে নিল মলয় দাসু। এ দৃশ্যে গা জ্বলে গেল কেষ্টনাথের। মদ পান করায় কী সুখ রে, বাবা! সে কালো কুণ্ডলী পাকিয়ে নানা ভঙ্গি করে মলয় দাসুর সামনে এল এবং তাকে নানাভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা করল। কিন্তু মলয় দাসুর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল না। এরপর কেষ্টনাথ একবার গলিত শবদেহ হয়ে, একবার বিকৃত মুখায়ব হয়ে, একবার অতি আকৃতির হুতোমপেঁচা ও একবার ভালুক সাদৃশ্য বিড়াল হয়ে মলয় দাসুর সামনে গিয়ে অনেক কসরৎ করল। কিন্তু মলয় দাসু মোটেও ভয় পেল না। এতে কেষ্টনাথ ভীষণ অবাক হল এবং মুষড়েও পড়ল। কেষ্টনাথের মনে হল, এ যেন এক অলুক্ষুণে রাত! মলয় দাসুর মতো একটা নিরীহ লোককে পেয়েও ভয় দেখাতে পারছে নাÑ এ কথা ভূতরাজ্যে জানাজানি হবার পর নিশ্চয় ফের হাস্যরসের সৃষ্টি হবেÑ ভাবল কেষ্টনাথ। ওর ভৌতিক শরীর থেকে লজ্জা ও টেনশনের চিকন ঘাম ঝরছে কি-না কে জানে! কেষ্টনাথ হাল ছাড়তে নারাজ। ও গলিত শবদেহ রূপধারণ করে মলয় দাসুর সামনে গিয়ে রাগী গলায় বলল, ‘এই হতচ্ছাড়া, তুই কি আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছিস না? এই যে আমি একটা গলিত লাশ তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখছিস না?’
মলয় দাসু নেশায় বুঁদ। সে চোখ টেনে টেনে অন্ধকারে তাকিয়ে বলল, ‘কই আমি তো কিছুই দেখছি না। লাশ দিয়ে আমি কী করব? পারলে আমাকে একটু মাল এনে দাও। যা ছিল ফুরিয়ে গেছে। বোতল খালি।’
কেষ্টনাথ এবার অতি আকৃতির বিড়াল হয়ে বলল, ‘তোর ভীমরতি হয়েছে! দেখছিস না আমি ভয়ংকর ভূত! তোর ঘাড় মটকে দেব এখন!’
এতে কোনো কাজ হল না। মলয় দাসু মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘ভূত! মশকরা করা হচ্ছে আমার সঙ্গে?’
‘মশকরা করব কেন! ভাল করে চেয়ে দেখ, আমি সত্যিই ভূত!’
‘ধ্যাৎ। বললেই হল ভূত!’
‘আমি সত্যিই ভূত! ভাল করে তাকিয়ে দেখ!’
কেষ্টনাথ জোর গলায় বলল। মলয় দাসু স্কুলের ছাত্রকে প্রশ্ন করছেÑএমনভাবে বলল, ‘তা তুমি কোন প্রকারের ভূত, শুনি?’
এ কথায় একটু হচকিয়ে গেল কেষ্টনাথ। ভূতের যে আবার প্রকার আছেÑএ কথা ওর জানা নেই। ও নিজের মাথা চুলকাতে গিয়ে দেখল মাথা বলতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ও বলল, ‘ভূতের আবার প্রকার কী? ভূত তো ভূত-ই!’
ওর কথায় ‘হি হি হি’ করে উপেক্ষার হাসি হাসল মলয় দাসু । সে বলল, ‘তাই তো বলছিলাম, ভূত সেজে আমার সঙ্গে মশকরা করা হচ্ছে। ভূতের প্রকার জানো না, আবার ভূত হয়েছ!’
মলয় দাসুর কথার জবাবে কেষ্টনাথ বলল, ‘তা ভূতের প্রকার কী কী, বল দেখি! নইলে সত্যি সত্যি তোর ঘাড় মটকে দেব!’
ওর হুঙ্কারে বিচলিত হল না মলয় দাসু। সে বলল, ‘আরে বাবা, ভূতের প্রকার কি কম? আমাদের চারপাশে কত প্রকার ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে! ব্রাহ্মদত্যি ভূত, মামদো ভূত, পেতনী ভূত, শাখচুন্নী ভূত, জটাধারী ভূত, কবন্ধকাঁটা ভূত, একানেড়ে ভূত, গলাশী ভূত, গুয়াসী ভূত, পেঁচো ভূত, খবিশ ভূত, নিশিডাকা ভূত… কত-কি ভূত আছে! তা তুমি কোন প্রকারের ভূত, বাবা!’
মলয় দাসুর কথাগুলো শোনার পর কেষ্টনাথের উল্টো ভয় পাবার যোগাড় হল। এই অলস জেলে ভূতদের এত কুলজি জানে কীভাবেÑ ও ভেবে পেল না। ও গলার স্বর একটু নামিয়ে বলল, ‘তা তুমি ভূতের এত প্রকার জানো, আর আমি যে একটা ভূত-সেটা বিশ্বাস করছ কেন?’
মলয় দাসুকে সম্বোধনে ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’তে উঠে গেছে। এত প্রকার ভূতের কথা বললে ভক্তি-শ্রদ্ধা যে কারোর-ই বেড়ে যেতে পারে। মলয় দাসু অলস একটা হাই তুলে বলল, ‘বিশ্বাস কি অত সহজে হয়! বিশ্বাস করতে হলে যে তোমাকে একটা পরীক্ষা দিতে হবে।’
‘কী পরীক্ষা? বলো, শুনি।’
তড়িঘড়ি জবাব কেষ্টনাথের। মলয় দাসু বলল, ‘তুমি যদি ভূত হও, তাহলে এই বোতলে প্রবেশ করে দেখাও দেখি!’
মলয় দাসু তার ডান হাতে ধরে রাখা খালি মদের বোতলটা উঁচিয়ে ধরল। কেষ্টনাথ ভেবে দেখল পরীক্ষাটা তেমন কঠিন নয়।
ও বলল, ‘এ আর তেমন কঠিন কাজ কি?’
‘তাহলে বোতলে ঢুকে একবার দেখাও। তবেই না বিশ্বাস করব তুমি সত্যি একটা ভূত।’
কেষ্টনাথ সময় নষ্ট না করে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে হুড়মুড়িয়ে বোতলে ঢুকে গেল। মদের খালি বোতলটা কালো ধোঁয়ায় ভরে গেল এক লহমায়। মলয় দাসু এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বোতলটার মুখ ছিপি দিয়ে আটকে দিল। কেষ্টনাথ বোতলবন্দী হয়ে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ও তাকিয়ে রইল মলয় দাসুর দিকে। কিন্তু সে বোতলের ছিপিটা খুলল না। কেষ্টনাথ বোতলের ভেতরে মুক্ত হবার জন্য তারস্বরে চিৎকার করতে লাগল। ওর চিৎকার বোতলবন্দী হয়েই রইল। মলয় দাসু বোতলটা হাতে ধরে রমলার উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘আজ খালি হাতে বাড়ি ফিরছি না, গিন্নি। তোর জন্য একটা ভূত নিয়ে আসছি। মাইরি বলছি!’
রাগটা মাথায় উঠে গেল রমলার। এমনিতেই সংসারে অভাব-অনটন লেগে আছে। তারপর ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে অর্থ ঋণ নিয়ে বিপাকে রয়েছে। ঋণ করে জাল কিনেছিল। সেই ঋণের টাকা আজ অব্দি শোধ করতে পারেনি। দু’ দিন পরই মহাজনকে এ মাসের টাকা দিতে হবে। নইলে তার লাঠিয়াল লোকেরা ঘর থেকে জাল তো নেবেই, আসবাবপত্রও তুলে নিয়ে যেতে পারে। আর তার অলস স্বামী বলছেÑমাছ নয়, সে ভূত ধরে নিয়ে এসেছে। এ কথা শুনলে কার গা জ্বালা করবে না? রমলা রাগের মাথায় স্বামীর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। মেঝেয় আছড়ে পড়ে বোতলটি ভেঙে যেতেই একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী মানুষের অবয়ব নিয়ে তার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়াল। ঘটনটা এত দ্রুত ঘটল যে, রমলা হতভম্বের মতো হা করে তাকিয়ে রইল। মলয় দাসু ভয় পেল না। সে জানে কেষ্টনাথ নামক ভূতটা বোতল থেকে বেরিয়েছে। বোকা ভূত নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তার খুব ঘুম পাচ্ছিল বলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। এদিকে কেষ্টনাথ বোতলমুক্ত হওয়ায় কৃতজ্ঞকণ্ঠে হাত জোড় করে রমলার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনি আমাকে মুক্ত করেছেন! আপনার কাছে আমার ঋণের শেষ নেই! বলুন, কী করলে আপনার এই ঋণের শোধ করতে পারি?’
ভড়কে যাওয়ায় রমলা অস্ফূট কণ্ঠে বলল, ‘ভূত!’
‘জ্বী। বড় অভাগা ভূত আমি। কত কসরৎ করলাম, কাউকে ভয় দেখাতে পারলাম না। তাই আর ভূতরাজ্যে ফিরে যেতে পারলাম না। উল্টো বোতলবন্দী হয়ে গিয়েছিলাম। আপনি আমাকে নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করেছেন।’
‘নরক যন্ত্রণা! ঠিক বুঝলাম না।’
প্রশ্নবোধক চোখে রমলা তাকিয়ে থাকে কালো ধোঁয়ার মনুষ্য অবয়বের দিকে। কেষ্টনাথ বলল, ‘চেলাই মদের সে-কী উৎকট গন্ধ! এমন গন্ধের মধ্যে বাস করা মানে নরক যন্ত্রণাই তো! আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেছেন। এবার বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?’
রমলা আলাদীনের চেরাগের গল্প শুনেছেন অনেক। সে চট করে বুঝে নিল আলাদীনের চেরাগের মতো ভূতটাও বোতল থেকে মুক্ত হয়ে তাকে পুরস্কৃত করতে চাইছে। এই চিন্তা থেকে সে কৌশলী মনোভাবে বলল, ‘তা আপনি কী করতে পারবেন ভূত মহাশয়? আপনাকে বোতল থেকে মুক্ত করে দিয়েছি। এখন তো প্রতিদান আশা করতেই পারি।’
‘জ্বি-জ্বি। তাই তো বলছি, আপনার জন্য কী করতে পারি বলুন। চেষ্টা করে দেখি, আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারি কি-না। যদিও আমার খুব বেশি ক্ষমতা নেই।’
রমলা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘খুব বেশি তো আর দাবী করব না। বলছিলাম কি, আমাদের অভাব-অনটন লেগেই আছে। নদীতে জাল ফেলি, মাছ উঠে আসে সামান্য। কখনো মাছই ধরতে পারি না। তাই স্বামীটার এ কাজে মনোযোগ উঠে গেছে। তা ভূত মহাশয় কি আমাদের এ কাজে সাহায্য করতে পারেন? ধরুন, নদীর কোন স্থানে মাছ আছে, তা দেখিয়ে দিলেন। আমরা সেখানেই জাল ফেলে মাছ ধরলাম। তাহলে বাপু, বেঁচে-বর্তে যাই।’
রমলার কথা শুনে গদগদ গলায় কেষ্টনাথ বলল, ‘বড্ড বাঁচা গেল! আপনি আমার সামর্থ্যরে মধ্যে দাবী তুলেছেন। যখন মানুষ ছিলাম, তখন আমিও মাছ ধরতাম। মাছের প্রতি আমার ঝোঁক রয়ে গেছে।’
‘তাহলে মাছ ধরতে সাহায্য করবেন!’
‘অবশ্যই সাহায্য করব। কাল রাতে আমি আপনাদের সঙ্গে যাব নদীতে। নদীতে নেমে আমি মাছের ঝাঁক তাড়িয়ে নিয়ে আসব। আপনারা জাল ফেলে মাছ ধরে ফেলবেন। হল তো?’
উচ্ছ্বাস প্রকাশ পায় কেষ্টনাথের কণ্ঠে। এর জবাবে রমলার বলে, ‘ওহ্্্, আপনার কথাটা শুনে আমার সে-কী আনন্দ লাগছে, ভূত বাবু!’
‘আমার নাম কেষ্টনাথ। আমাকে কেষ্টভূত বলেই ডাকবেন!
‘তা বৈকি। কেষ্টভূত বলে ডাকব। নামটা খারাপ নয়।’
‘তাহলে আমাকে অনুমতি দিন আমি মিলিয়ে যাই। রাত ফুরিয়ে আসছে। ভোরের আলোয় আমাকে বিলীন হতে হয়।’
‘আপনাকে কাল রাতে কোথায় পাব?’
‘আমি তো আর ভূতরাজ্যে ফিরে যেতে পারছি না। অন্তত দশ হাজার রজনী আমাকে আপনাদের ধরাতেই থাকতে হবে।’
‘তা কোথায় থাকবেন?’
‘আমি আপনাদের বাড়ির পেছনে যে তেঁতুল গাছটা আছে, ওটাতেই থাকব। রাত নামলে তেঁতুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকবেন। শুধু আপনার ডাক পেলেই আমি সাড়া দেব।’
‘প্রতি রাতেই আপনি আমাদের সঙ্গে মাছ ধরতে যাবেন? কথা দিচ্ছেন তো?’
‘হ্যাঁ। এটা যে এখন আমার কর্তব্য। ভূতরা কর্তব্য পালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকে। এই কর্তব্য পালন করতে ব্যর্থ হলে লক্ষ রজনী ফুরালেও ভূতরাজ্যে আমার আর ফিরে যাওয়া হবে না।’
‘তা যেন নয় হয়। আপনি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে যাবেন ভূতরাজ্যে। আপনি যে পরোপকারী ভাল ভূত।’
রমলার প্রশংসা শুনে ভীষণ লজ্জা পেল কেষ্টনাথ। এক ধরনের লজ্জার আনন্দে ও হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে লাগল। রমলা সতর্ক চোখে দেখল কালো ধোঁয়া ফিকে হতে হতে তা হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে তেঁতুল গাছের দিকে।
রাতারাতি বদলে যেতে লাগল মলয় দাসু ও রমলার সংসারের অবস্থা। প্রতিদিন ভোরে তারা নৌকা ভর্তি মাছ নিয়ে হাজির হচ্ছে নদীর ঘাটে-মাছের আড়তে। অপরাপর জেলেদের চোখে মুখে এক রাশ বিস্ময় জাগিয়ে রেখে তারা মাছ বিক্রি করে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে তাদের বাড়ির চেহারাও বদলে গেছে। তাদের এক চালা ভাঙা টিনের ঘর ছিল। ওটা এখন পাকা বাড়ি হয়েছে। প্রথমে শোধ করেছে মহাজানের টাকা। যে মহাজন তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করত, সেই মহাজন তাদের কাছ থেকে মাছ কেনার জন্য এখন বড্ড মোলায়েম কথাবার্তা বলেন। কাছে ডেকে খোঁজ-খবর নেন। মলয় দাসু মহাজানের এই আচরণ নিয়ে মনে মনে হাসে। অবশ্য এর মধ্যে মহাজন তাদের পেছনে লোক লাগিয়েছিল। তারা নদীর কোথায় গিয়ে মাছ ধরে এবং কীভাবে মাছ ধরেÑ এসব জানতে কয়েক দফা মহাজনের লোক তাদের অনুসরণ করেছিল। অবশ্য, অদৃশ্য কেষ্টনভূতের গাট্টা খেয়ে তারা পালাতে বাধ্য হয়েছে। লোকগুলো মহাজানের কাছে কী অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেÑ তা জানে না সে। আর কয়েক মাস পেরুল মলয় দাসু বাজারে নিজেই একটা আড়ত ঘর কিনবে বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে। তার আড়ত ঘরে দশ-বারজন শ্রমিক কাছ করবে। আড়ৎঘরের নাম রাখবেÑ ‘কেষ্টনাথের মৎস্য ঘর’। এটাও সে ভেবে রেখেছে। হঠাৎ করে তাদের ভাগ্যোন্নতি দেখে পাড়া-প্রতিবেশীদের চোখে অনেক প্রশ্ন খেলছে। মাছের বাজারেও আড়ালে ওদের নিয়ে কম কথা হচ্ছে না। সকলের মধ্যেই কৌতূহল। আর কৌতূহল জাগবে না কেন? প্রতি ভোরেই নৌকা ভর্তি মাছ আর কে আনতে পারছে বাজারে? সকলের চোখ তো টাটাবেইÑ একলা হলে এসব কথা ভাবে মলয় দাসু। মনে মনে সে বলে, ‘আরে! সকলের ভাগ্যে কি কেষ্টভূত জোটে? এটা ওর বরাতে ছিল, তাই জুটে গেছে।’ হ্যাঁ, কেষ্টভূতকে পেয়ে ওকে মদ পানটা ছাড়তে হয়েছে। মদের গন্ধ পেয়ে যদি কেষ্টভূত তাদের ছেড়ে চলে যায়! রমলা ওকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। তাই মদ পান আর করছে না মলয়। নিজেকে সামলে নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে। তা ভাগ্যে গুণে আলাদীনের পিদিম পেলে, মদটা ছাড়া এমন কি কষ্ট?’ দশ হাজার রজনীতে কত বছর তা হিসাব করে দেখেনি মলয় দাসু। নিশ্চয় অনেকগুলো বছর। কেষ্টভূত ততদিন তাদের সঙ্গে থাকলে মলয় দাসু কতটা ধনী হয়ে যাবে- সেটা ভেবে সে কোনো কূল-কিনারা পায় না। শুধু একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যায়। টাকার নেশাও মদের নেশার চেয়ে কম নয়!
এলিয়েনের ডেরায় ভূত
জটেশ্বরের আসরটা আর আগের মতো জমে না। তন্ত্র-বিদ্যার প্রতি মানুষের আস্থা দিনদিন কমে আসছে। লোকজন আসরে তেমন তো আসছেই না, বরং আজকাল কেউ কেউ তো তাকে দেখে বিদ্রƒপ করতেও ছাড়ছে না। ফলে, কখনো কখনো কারো কারো বিব্রতকর প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হচ্ছে তাকে। এটা ঘোর কলিযুগের লক্ষণ। মানুষের মধ্যে ভয়-ডর কমে গেছে। কমবে না কেন? গত কয়েক বছরে তার গ্রামের চেহারাটাই রাতারাতি বদলে গেল। তাদের গ্রাম কালীনগরটা কয়েক বছর আগেও ছিল একটা গণ্ডগ্রাম। এই গণ্ডগ্রামেও বিজলি-বাতি এসে পড়েছে। এখন সন্ধ্যা নামলেই কালীনগরের ঘরে ঘরে বিজলি-বাতি জ্বলে ওঠে। এমন কথা একযুগ আগে কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। কালীনগরের আশেপাশের গ্রামগুলোও বিজলি-বাতিতে সয়লাব হয়ে গেছে। আগে মানুষ সন্ধ্যে হলেই ঘুমিয়ে পড়ত। এখন অনেক রাত অব্দি টিভি দেখে অনেকে। বাজারে সমীর মিয়ার চায়ের স্টলেও টিভি দেখা যায়। এই টিভিটাও মানুষের ভয়-ডর তাড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে। তাই টিভির প্রতিও জটেশ্বরের চাপা ক্ষোভ আছে। তান্ত্রিকদের আর আহামরি দিনকাল নেই। বাপ-দাদার পৈত্রিক বিদ্যাটাই শিখেছিলেন। এই বিদ্যা নিয়ে এখন তিনি বিপাকেই আছেন। আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় সংসারে অভাবটা চিরস্থায়ী হবার পথে। এটাই হচ্ছে কলিযুগের আগ্রাসন! খুব হিমশিম খাচ্ছেন জটেশ্বর। এরমধ্যে নতুন এক উপদ্রবে পড়েছেন তিনি। গত কয়েকদিন হল রাতে একটু বেরুলেই দূর থেকে কে যেন তাকে অনুসরণ করছেÑ টের পাচ্ছেন। শুধু অনুসরণই নয়, তার পাশ থেকে দু’-একটি কথাও বলছে। কথা বলছে এমনভাবে যেন বক্তা তার অনেকদিনের চেনা কোনো হিতৈষী। আড়াল থেকে কেউ কথা বলে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে যেন। জটেশ্বর বুঝতে পারছেন না। তার বয়স হয়েছে বটে। আজকাল অনেক কিছু ঠাহর করতে পারেন না। এটা বয়সের কারণ। জটেশ্বরের বয়স সাড়ে তিন কুড়ি, না চার কুড়ি এ নিয়ে তার মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। তার সঠিক বয়স কত তিনি তা বলতে পারেন না। তবে বয়সটা তিন কুড়ি যে পেরিয়েছে, এ কথা হলফ করে বলতে পারেন। তার বয়স নিয়ে কথাটা আজকাল প্রতিবেশীদের মধ্যে উঠছে। এক সময় তার শরীরটা ছিল পেটানো ও তাগড়া। এই শরীরটা দিনদিন কেমন নেতিয়ে আসছে। গায়ের চামড়ায় কেমন ঢলঢলে ভাব বাড়ছে। আগে যেভাবে লম্বা-লম্বা পা ফেলে মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে যেতেন, এখন তেমন তোড়জোর দেখাতে পারেন না। এমনকি, খাবারের বেলায়ও এক ধরনের শৈথিল্য চলে এসেছে। ক’ বছর আগেও একটা পাঁঠার মাংশ একাই সাবাড় করে ফেলতেন। হজমও করে ফেলতেন। এখন ভূরিভোজে শরীরের সহযোগিতা পান না। ‘প্রাকৃতিক কর্ম’ সম্পদানে আগে তার কখনো বেগ পেত হতো না। এখন মাঝেমাঝে বেগ পেতে হয়। এইতো কিছুক্ষণ আগে ভোলানাথের কলাবাগানে ‘প্রাকৃতিক কাজ’ সারতে গিয়ে কী বিপত্তিতেই না পড়লেন। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত জমে আসতেই অমলেশ শিলের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন তিনি। পথে মলত্যাগের প্রবল চাপ উঠল। প্রবল চাপ সামলাতে না পেরে পথ থেকে তিনি ঢুকে পড়লেন ভোলানাথের কলাবাগানে। তড়িঘড়ি করে ‘প্রাকৃতিক কাজ’ সম্পাদন করতে বসেছিলেন। কিন্তু মল বের হতে গিয়ে কৌষ্ঠ-কাঠিন্যের এক অপ্রত্যাশিত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হল তাকে। পিত্তথলি থেকে মল নেমে পায়ু পথের বহিঃগমনের শেষ প্রান্তে এসে অনড় পাথর হয়ে আটকে গেল। তিনি পেটের ভেতরের বায়ুশক্তি এক করে কয়েকবার নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন। পাকস্থলিতে বায়ুশক্তি প্রয়োগের সময় তার মুখ দিয়ে কয়েকবার ‘উ…!’ গোঙানীর শব্দ বেরিয়ে এল। গোঙানীর শব্দটা বেশি উচ্চকিত হয়ে রাতের নির্জনতাকে ভেঙে দিয়েছিল। গোঙানীর শব্দটা গিয়ে পৌঁছে গেল ভোলানাথের ঘর অব্দি। ‘কলাবাগানে কে রে!’ বলে সড়কি হাতে ভোলানাথ বেরিয়ে এল। এক ধরনের অপ্রত্যাশিত লজ্জাষ্কর ঘটনার মুখোমুখি হতেই যাচ্ছিলেন তিনি। ভোলানাথ কলাবাগানে প্রবেশের আগেই সে অনেকটা অর্ধ-দিগম্বর অবস্থায় লম্বা লম্বা পা ফেলে পালিয়ে এলেন। কলাবাগান থেকে পালানোর সময় ভাবছিলেন কৌষ্ঠকাঠিন্য রোগ-বালাই কোনো তান্ত্রিককে মানায় না। কিন্তু তার মতো বয়স্ক কারো এই রোগ হলে তাকে ঠেকাবে কী করে?
কয়েক বছর হল জটেশ্বরের ডান পায়ের গোড়ালিতে বাতের ব্যথা বাসা বেঁধেছে। গত পৌষ মাসে বাতের ব্যথা এমন বাড়ল যে, তিনি বুঝতে পারলেন বয়স তাকে জানান দিচ্ছে তিনি যথেষ্ট বুড়ো হয়েছেন। এ ছাড়া আছে হাঁপানীর কষ্ট। সব-সময় না হলেও হাঁপানীর কারণে কদাচিৎ শ্বাসকষ্ট হয় তার। হাঁপানীর কথাটা চেপে রেখেছেন এখনো। বাতের ব্যথায় পা হেঁচকে হাঁটলে তো আর তা গোপন রাখার উপায় নেই। শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট না হয় লোক-চক্ষুর আড়ালে রাখা যায়, খুঁড়িয়ে পা টেনে হাঁটতে হলে তা গোপন করবেন কীভাবে? আবার তান্ত্রিকদের খুঁড়িয়ে হাঁটাটাও সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এতে তার তন্ত্র-বিদ্যা সম্পর্কে জনমনে ঘোরতর সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে। যে তান্ত্রিক ঝাড়ফুঁক করে, তাবিজ-তুম্বা ও নানা বুজরুকী করে রোগী বা সমস্যাগ্রস্তদের সেবা দিয়ে আসছেন, দেব-দেবীদের নামে ফলফলাদি নিয়ে অতৃপ্ত মনের বাসনা পূরণ করছেন বা আধ্যাত্মিক মন্ত্রবলে সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছেন- তিনি নিজেই যদি রোগ-ব্যাধীতে কাবু হয়ে যান, তার প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে কেন? তান্ত্রিকদের অসুখ-বিসুখ হতে নেই। কদাচিৎ অসুখ এসে শরীরে প্রবেশ করলেও তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হয় না। এটা তিনি ভাল করেই জানেন। জটেশ্বরের বছরে একবার জ্বর আসে। বর্ষাকালের কোনো একদিন তিনি জ্বরে পড়বেন। জ্বরের সঙ্গে তার লড়াই হয় দুই বা তিনদিন। এ সময় তিনি ঘরের দরোজা বন্ধ করে পড়ে থাকেন। স্ত্রীকে কঠিন নির্দেশ দেওয়া আছে কেউ ডাকলে ভুলেও সে যেন দরোজা না খোলে। জ্বর আক্রান্ত হলে তার তন্ত্রমন্ত্রের কাজও বন্ধ থাকে। চ্যালা-চামুণ্ডারাও তার ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। স্ত্রী বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে বলে দেয়- দৈব শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করার লক্ষ্যে তান্ত্রিক ধ্যানে আছেন। কয়েকদিন তার ধ্যান ভাঙা যাবে না। স্ত্রী বিশাখা এ কাজটি ভালভাবেই করে আসছে।
ভোলানাথের কলাবাগান থেকে তাড়া খেয়ে বের হয়ে বাড়ি ফেরার পথে হাঁটছিলেন তিনি। আকস্মিক পাশ থেকে অদেখা হিতৈষী বলল, ‘মশাই, পায়জামা হাতে নিয়ে হাঁটছেন! নিচের অংশে যে কাপড় নেই! পায়জামাটা পড়ে নিন। আর কিছুদূর এগুলেই দলিল লেখক জমসেদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। জমসেদ আপনাকে নগ্ন পদে হাঁটতে দেখলে কী অবস্থা হবে, ভেবে দেখুন তো!’
কথাটায় তার সম্বিত ফিরে এল। কথাটা শোনার পরই তিনি লক্ষ্য করলেন সত্যিই তিনি পায়জামা পড়তে ভুলে গিয়েছিলেন। দাঁত দিয়ে জিহ্বা কামড়ে তিনি চট করে পায়জামা পড়ে নিলেন। পায়জামাটার নুড়ি বাঁধার কয়েক সেকেন্ড পর সত্যি-সত্যিই জমসেদকে দেখতে পেলেন তিনি। জমসেদ পথের বিপরীত দিক থেকে আসছিল। পথিমধ্যে জমসেদ তাকে দেখে বক্রচোখে তাকাল একবার। দলিল লেখালেখির কাজ করে জমসেদ র্র্ত্ত্ করে সচ্ছল হয়ে গেছে। ওর হাতে এখন ঢলঢল করছে কাঁচা পয়সা। একটা সময় হতদরিদ্র ছিল ও। কিছু গরীব লোক আছে, ওরা আকস্মিক ধনী হয়ে গেলে কাউকে মান্যগণ্য করতে চায় না। জামসেদও ঐ রকম লোক। তাকে একেবারেই পছন্দ করে না জমসেদ। প্রায় এক যুগ আগে জামসেদের ছয় বছরের কন্যা জোছনা গোখরা সাপের কামরে মারা গিয়েছিল। কন্যাটিকে জামসেদ খুব আদর করত। সাপে কাটার পর জোছনাকে বাঁচাতে জটেশ্বরকে ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। জটেশ্বর সাপে কাটা জোছনাকে বাঁচাতে পারেননি। সেই থেকে জটেশ্বরের প্রতি জমসেদের রাগ পঞ্জিভূত। জমসেদ সে-দিন ভালভাবে বুঝেছিলÑ জটেশ^রের সে ক্ষমতা নেই যে, তিনি চাইলেই কাউকে বিপদমুক্ত বা রোগমুক্ত করতে পারবেন। ফলেÑ জটেশ্বরের তন্ত্র-মন্ত্র, ঝাড়-ফুঁক নিয়ে গ্রামের যারা সন্দেহ প্রকাশ করে নানা কথা বলে, জমসেদ তাদের মধ্যে একজন। জামসেদ যখন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, তখনই তার মনে হল অদৃশ্য কণ্ঠধারীর কথা। যিনি আড়াল থেকে তাকে পায়জামাটা পড়ে নেবার কথা বলেছিল। কয়েকদিন যাবতই তিনি লক্ষ্য করছিলেন কেউ একজন তার আশে-পাশে থাকে, অথচ দেখা যাচ্ছে না। প্রথমে এ বিষয়টি আমলে নেননি, কিন্তু এখন তার কৌতূহল হল। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকালেন। কোথাও কেউ নেই। ফের তাকালেন অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে। কেউ নেই। রাতের আঁধারে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এক অন্য আবহ তৈরি করে রেখেছে। তিনি এবার খুব অবাক হলেন। অদৃশ্য কেউ তাকে অনুসরণ করছে। অশরীরী! কথাটা ভাবতেই ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে এল যেন অনুভবে। তবে ভয় পেলেন না। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। জ্বীন-ভূত নিয়ে সারাজীবন তিনি নানা কসরৎ করে গেছেন। ভয়কাতুরে লোকদের সঙ্গে ছলচাতুরী করে গেছেন। নিজে কখনো ভূত বা জ্বীনের সাক্ষাৎ পাননি। এ কথা অবশ্য কাউকে ক্ষুণাক্ষরেও বলেননি। তা এত বছর পর কি ভূত-প্রেতের সঙ্গেই সাক্ষাৎ হয়ে গেল? কথাটা ভাবছিলেন নিজের মনের সঙ্গে রসিকতা করার মানসে। কিন্তু কথাটার প্রতিধ্বনি হল যেন। আড়াল থেকে কণ্ঠটা এবার বলল, ‘মশাই, যা ভাবছেন, তা কিন্তু রসিকতা নয়। ভূত নিয়ে ব্যবসা ফেঁদে বেশ তো হাতিয়ে নিচ্ছেন। অথচ ভূত আছে কি নেই, নিজেই তা জানেন না!’
কথাটায় একটু ভড়কে গেলেন জটেশ্বের। তিনি চারপাশে তাকালেন। কেউ নেই। অদৃশ্য কণ্ঠ বলল, ‘আমাকে দেখতে পাবেন না, মশাই। আমি ভূত।’
‘ভূত!’
‘হ্যাঁ, ভূত। তবে আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই। আপনার ঘাড় মটকে দেব না।’
জটেশ্বর ভীষণ দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। অদৃশ্য কণ্ঠ বলছে সে ভূত, অথচ কথা বলছে বন্ধুর মতো আন্তরিক গলায়। তিনি অদৃশ্য কণ্ঠধারী যে ভূত, এই দাবী বিশ্বাস করবেন কিনাÑ এটা মনে মনে ভাবতে লাগলেন। জীবন সায়াহ্নে এসে এমন গোলক ধাঁধায় পড়বেনÑ এটা ভাবেননি। তিনি হতাশ গলায় অদৃশ্য কণ্ঠের উদ্দেশে বললেন, ‘তা ভূত সাহেব কি কেবল অদৃশ্যই থাকবেন, নাকি দৃশ্যমান হবেন? চোখে সহ্য হয় এমন একটা রূপ ধরুন না!’
‘না। আমি অদৃশ্য ভূত। মরে সবে মাত্র ভূত হয়েছি, মশাই। কোনো রূপ ধারণ করার ক্ষমতা এখনো পাইনি।’
‘ও আচ্ছা! তা ভূত মহাশয় কি আমার ওপর ক্ষেপে আছেন? স্বীকার করছি, ভূতে ধরা অনেকের নাকের সামনে লঙ্কা পুড়িয়ে আপনাদের নাকাল করেছি। কিন্তু আমি নিজেও জানতাম না, কাউকে সত্যি-সত্যি ভূতে ধরে কিনা।’
‘না জেনেই ভূত তাড়িয়েছেন! বলেন কী!’
‘আজ্ঞে, জ্বি। মানুষ আমার কাছে আসত, ভরসা করত। আমি প্রচলিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস রক্ষার চেষ্টা করে এসেছি। কী বলবÑ বলুন, বাপ-দাদার কাছ থেকে এই বুজরুকী-ই শিখেছি। যদি জানতাম, সত্যি সত্যি কাউকে ভূতে ধরেছে, তাহলে কি ভূত তাড়ানোর দুঃসাহস দেখাতাম!’
এ কথা বলে জটেশ্বর ভীষণ অনুশোচনায় পুড়তে লাগলেন। এতকাল ভূত নেই জেনেই ভূতের বিরুদ্ধে লঙ্কা পুড়িয়ে গেছেন। কতটা গর্হিত কাজ! এখন ভূতের সামনে পড়ে তার কেমন ত্রাহি আবস্থা। ভূতের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘মশাই, এ কথায় তো আপনাকে ছাড়ছি না। আমি তো আপনার কাছে এসেছি বড় আশা করে। কয়েকদিন ধরেই আপনার পেছনে পেছনে ঘুরছি। আজ আপনার দৃষ্টিগোচর হতে পেরেছি।’
ভূতের কথায় ভাবনায় পড়ে গেলেন জটেশ্বর। এমন ঘোর বিপদে কখনো পড়েননি। তিনি অসহায়ভাবে অদৃশ্য ভূতের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভূতটা এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমার পরিচয়টা জানিয়ে দিচ্ছি। আমি আপনার গাঁয়েরই লোক। আপনি মল্লিকবাড়ীর ভূবন মল্লিককে তো চিনতেন?’
‘চিনব না কেন? গত মাসে বটতলায় বজ্রঘাতে তিনি মারা গেলেন! লোকটি ভালই ছিলেন। বড্ড সরল ও বোকা ছিলেন। আহা, বেচারা, হঠাৎ করে অকালে মারা গেলেন!’
‘আমিই সেই ভূবন মল্লিক।’
‘কী বললেন, আপনি ভূবন মল্লিক?’
‘হ্যাঁ। এখন মরে ভূত হয়েছি। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু বজ্রঘাতে মরিনি। অবশ্য সকলে তা-ই জানে।’
‘বলেন কি! কীভাবে মরলেন তাহলে?’
‘এ কথা বলতেই তো এসেছি। আমি আসলে খুন হয়েছিলাম সেদিন রাতে।’
‘খুন! কে খুন করেছিল!’
‘এলিয়েন!’
বলল ভূত। নাম শুনে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল জটেশ্বর, ‘এলিয়েন! এটা আবার কী!’
‘আরে মশাই, এলিয়েন কি জানেন না! আপনি দেখছি অনেক পিছিয়ে আছেন!’
‘তা পিছিয়ে থাকব না? বয়স তো কম হল না। আপনাকে বলতে অসুবিধে নেই আমার বয়সটা তিনকুড়ি পেরিয়েছে সেই কবেই। ডান পা-টা টানতে অনেক কষ্ট হয় আজকাল। বাতের ব্যথা ছাড়ছেই না। বরং বাড়ছে। হাঁপানীটাও বাড়ছে। এখন দেখছি, পেটের হজমশক্তিটাও লোপাট হয়ে যাচ্ছে! তন্ত্র-মন্ত্রের কসরৎ তো সেই কবেই গেছে! তা এলিয়েন না, কী যেন বলছিলেন!’
‘এলিয়েন হচ্ছে এক ধরনের প্রাণী। পৃথিবীর মতো অন্য গ্রহে ওদের বসবাস।’
‘এলিয়েন, অন্য গ্রহ, এসব কী বলছেন! এসব ভৌতিক কথা বলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?’
‘না। না। ভয় দেখাতে চাইলে কি আপনার সঙ্গে এভাবে আলাপ করতাম? মশাই, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন তো! একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে আপনার পিছনে ঘুরছি।’
‘আচ্ছা, বলুন। শুনছি।’
‘আমাদের গাঁয়ের লোকদের ঘোর বিপদ অপেক্ষা করছে। গাঁয়ের দক্ষিণ কোণে যে প্রাচীন বটবৃক্ষটা আছে না?’
‘হুম। ওই বটগাছের কাছাকাছি একটা জায়গায় বজ্রঘাতে আপনার মৃত্যু ঘটেছিল।’
‘আবারো বজ্রঘাত বলছেন! যাই হোক, ওই বটবৃক্ষে এলিয়েনদের ডেরা। শত শত এলিয়েন এসে ওই বটবৃক্ষে আস্তানা গেড়েছে।’
‘বলেন কী!’
‘ওরা গবেষণার নামে নানা ফন্দী করছে, মশাই!’
‘গবেষণা! কী নিয়ে গবেষণা করছে ওরা?’
‘সেটাই তো আপনি জানবেন। ওদের সঙ্গে কথা বলে গাঁয়ের যাতে অনিষ্ট না হয়, সেই পদক্ষেপ নেবেন।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, আপনি ওদের সঙ্গে কথা বলে ওদের মতলব জানবেন। বটবৃক্ষ থেকে ওদের তাড়িয়ে দিতে একটা উপায় বের করবেন।’
‘আপনি দেখছি, ভূত হয়েও আমার ক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছেন। তা ছাড়া আপনি কী করে বুঝলেন যে, ওরা গাঁয়ের লোকের ক্ষতি করবে?’
‘আরে মশাই, আমাকে ওরা কৃত্রিম বজ্রঘাতে হত্যা করে গবেষণার কাজ শুরু করেছে। এমন হত্যা ওরা আরও করবে।’
‘কী করে বুঝলেন তা?’
‘আমি মারা যাবার আগে বটবৃক্ষে উঠেছিলাম।’
‘কেন? বটগাছটিতে কেউ কখনো উঠেছে বলে শুনিনি! বটগাছে ভূতের আড্ডা আছে বলে গাঁয়ের লোক গাছটিকে এড়িয়ে চলে। ঐ গাছের ধারে-কাছেও কেউ যেতে চায় না। তা আপনি কেন গাছে চড়তে গেলেন?’
‘ঐ যে আমি বোকা ও সরল মানুষ বলে। স্ত্রীর সঙ্গে রাগ করে ভেবেছিলাম বটবৃক্ষের মগডালে চড়ে রাত কাটিয়ে দেব। গাছে উঠতে গিয়েই ঘটল বিপত্তি। বটবৃক্ষের মাঝামাঝি পর্যন্ত উঠেছি, তখুনি আগুনের গোলার মতো দু’টি চোখ আমার সামনে এসে হাজির। প্রথমে ভেবেছিলাম বড় রকমের জোনাক পোকা। কাঁধে রাখা গামছা দিয়ে ঝাঁপটা দিয়েছিলেন আগুনের চোখ দু’টিকে। কিছুই হল না। চোখ দু’টি নিমেষেই হাওয়া হল, ফের জ্বলে উঠল। বটবৃক্ষে আরেকটু উঠতে গিয়েই দেখলাম, শত শত আগুন চোখ আমাকে ঘিরে ধরল।’
‘বলেন কী! কথা শুনে গা শিরশির করছে আমার!’
‘ওদের মধ্য থেকে কে যেন আমার সঙ্গে কথা বলল। জানতে চাইল এ গাঁয়ে কত লোক আছে? কণ্ঠস্বরটা শুনলাম বটে, কোত্থেকে এল বুঝতে পারছিলাম না। আমাকে ঘিরে শত শত আগুন চোখ চক্কর দিচ্ছিল আর কী যেন ওরা সুর কেটে বলে যাচ্ছিল। আমি জানতে চাইলাম গাঁয়ের লোক কত তা জেনে কী হবে? কণ্ঠস্বরটা জানাল গাঁয়ের লোকদের ওরা ওদের দেশে নিয়ে যেতে চায়। আমি বললামÑ কেন। কণ্ঠস্বর বললÑ গবেষণার জন্য। এ কাজে আমাকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিল কণ্ঠস্বরটা। আমি রাজী হলাম না। বলুন, গাঁয়ের লোক ধরে নিয়ে যাবে আর আমি এ কাজে ওদের সহযোগিতা করতে পারি?’
‘তা ঠিক। কিন্তু ওরা কারা? ওদের পরিচয় কী? জ্বীন নয়তো?’
‘আরে, না মশাই। কণ্ঠস্বরটা বলেছিল ওরা হচ্ছে এলিয়েন। অন্য গ্রহের প্রাণী।’
‘এরপর কী হল?’
‘আমি ওদের কথা বিশ্বাস করিনি। আমি মনে করেছিলাম, গাঁয়ের দুষ্ট কোনো লোক আমাকে ভয় দেখাচ্ছে।’
‘কীভাবে? আপনি না বললেনÑ আগুনের চোখ!’
‘আমি তখন কী এত কিছু ঠাওর করতে পেরেছিলাম নাকি? ভেবেছিলাম কেউ হয়তো লাইটের আলো ফেলে এবং তা ঘুরিয়েও আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল। আড়াল থেকে হয়তো কেউ এলিয়েন সেজে কথা বলছে।’
‘এরপর?’
‘আমি ওসব ভেবে হঠাৎ করে এক থাবা মেরে এক জোড়া আগুন চোখ ধরে ফেললাম। একটা বিকট শব্দ হল। এরপর শুধু দেখলাম, আলোর ঝলকানি। কী হল, আর বুঝতে পারলাম না। প্রচণ্ড আলো ও শব্দের মধ্যে আমি তলিয়ে গেলাম। আমার শরীরে বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমি মারা গেলাম। অর্থাৎ ওরা আমাকে মেরে ফেলল।’
‘ভগবান, এ কী শুনছি!’
অস্ফুষ্টভাবে বললেন জটেশ্বর। ভূতটা তাকে অভয় দেওয়ার মতো করে বলল, ‘আরে মশাই, ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনি তো এতকাল ভাইয়ে-ভাইয়ে ঝগড়া, জমি নিয়ে বিরোধ, অমুক ঘরে অশান্তি, বিদেশ যাত্রায় তাবিজ, বাড়ি বন্ধ দেওয়া, নষ্ট ছেলেকে ভাল করা, ভূতের উৎপাত বন্ধ করা, আরও কত কি করেছেন। ঝাড়ফুঁক দিয়ে তো পাগলকে সুস্থ করে ফেলেছেন বলেও শুনেছিলাম।’
‘আরও ওসব কি সব সত্যি নাকি? ওর মধ্যে অনেক ফাঁকি ছিল। ভূত বলেই বলছি, আমার তেমন কোনো কেরামতি নেই। মানুষদের বোকা বানিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি, মা কালীর কসম খেয়ে বলছি!’
‘তাহলে একটা কেরামতি তো নিশ্চয় আছে আপনার!’
‘সেটা কী?’
‘এই যে মানুষকে বোকা বানাতে পারেন।’
‘তো?’
‘এবার এলিয়েনকে বোকা বানাবেন।’
‘কী যে বলছেন ভূত বাবাজী! আমি মুখ্য-সুখ্য মানুষ, এই এলিয়েন কী জিনিস সেটাই তো জানি না। ওদের আবার বোকা বানাব কীভাবে?’
‘দেখুন তান্ত্রিক মশাই, গাঁয়ের লোকদের রক্ষা করতে হলে আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। আপনি কি চান গাঁয়ের তাবৎ লোক এলিয়েনরা তুলে নিয়ে যাক?’
‘না, না তাই চাইব কেন?’
‘তাহলে আমার সঙ্গে কাল রাতে চলুন।’
‘কোথায়?’
‘ঐ বটবৃক্ষের নিচে।’
‘ওরে মারে! বটবৃক্ষে! ওখানে রাতে কেউ কি যায়?’
‘যাবে কী করে। ওখানে গেলেই তো এলিয়েনদের খপ্পড়ে পড়তে হয়!’
‘তাহলে আমাকে নিয়ে যাবেন কেন, ভূত বাবাজী?’
‘গাঁয়ের লোকদের রক্ষা করতে হলে আপনাকেই প্রয়োজন। আমি মরে ভূত হয়ে গেছি। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারব না। তাই আপনার সাহায্য নিতে হচ্ছে। আপনাকে যেতেই হবে।’
‘ওখানে গিয়ে কী করব? এলিয়েনকে কী বলব? ওরা কি আমার ভাষা বুঝবে?
‘কাল রাতে যেতে যেতে আমি বলে দেব আপনাকে কী করতে হবে, কী বলতে হবে। আপনি শুধু আমার কথা শুনবেন। মোদ্দা কথা, এলিয়েনদের বুঝাতে হবে এই গাঁয়ের লোকেরা শান্তিপ্রিয়। ওদের নিয়ে গবেষণার কাজ যেন ওরা ছেড়ে দেয়। ব্যস।’
‘ঠিক আছে। আপনি দেখছি, নাছোড়বান্দা ভূত!’
‘কাল অমাবস্যার রাত। রাতের মধ্যপ্রহরে চলে আসবেন বটবৃক্ষের নিচে। একা আসবেন। না আসলে কিন্তু আমি আপনাকে ছাড়ছি না!’
ভূতটার আর কোনো কথা শোনা গেল না। জটেশ্বর কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ভূতটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেÑ এমন ভাবনা মনে নিশ্চিত হবার পর তিনি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন।
অমাবস্যার রাতে কালীনগর গাঁয়ের লোকেরা বাড়ি থেকে বের হয়Ñ এমন কথা কেউ শোনেনি। কদাচিৎ কেউ যদি বের হয়েও যায়, সে কখনো বটগাছের নিচে আসবেÑ এমন বুকের পাটা কারো নেই। তান্ত্রিক জটেশ্বরও কখনো বটগাছের সামনে আসেননি। অমাবস্যার রাতে তো নয়ই, কোনো ভরা পূর্ণিমার রাতেও তিনি বটগাছের ধারে কাছে আসেননি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, জটেশ্বরকে অমাবস্যার রাতে বটগাছের নিচে আসতে হল। ভূতের ভয়ে বটগাছকে এড়িয়ে চলতেন তিনি। আজ ভূতের খপ্পড়ে পড়েই তাকে এই বটগাছের নিচে আসতে হল। অমাবস্যার মধ্যরাত ঘন আঁধার ছড়িয়ে রেখেছে। আকাশমুখী বটগাছটিকে আঁধার লেপ্টানো কেমন দৈত্যের মতো লাগছে। বটগাছের ডালপালা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অনেকগুলো শিকড় নেমে গেছে বটগাছের চারপাশে। অনেক আগাছা-লতাগুল্ম বটগাছের ডালে-শাখায়। গাঢ় অন্ধকারেও ঠাওর করে নিলেন জটেশ্বর। তার বুক দুরু দুরু কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কপাল দিয়ে চিকন একটা ঘাম যেন বেরিয়ে আসছে। জটেশ্বরের গায়ে পাতলা সূতিকাপড়ের গেরুয়া পোশাক। গলায় রুদ্রাক্ষির মালা। কপালে সিঁদুর টিপ। ডানা হাতে ত্রিশূল। নগ্ন পা। জটেশ্বর জানেন ভূত বা এলিয়েনের আক্রমণ এলে ত্রিশূল দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। তবু মনের মধ্যে লড়াকু ভাব জিইয়ে রাখতে তিনি বাড়ি থেকে ত্রিশূলটা নিয়ে এসেছেন। বটগাছের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি চারপাশে তাকিয়ে ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখলেন না। জটেশ্বর নিজের ভেতরে ভয়টাকে একটু হালকা করে দিতে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘জয়, মা কালী! কোনো ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করে না এই জটেশ্বর! কোত্থেকে এল এলিয়েন, সব ব্যাটাকে ধর!’
কণ্ঠটা গমগমিয়ে উঠে গেল যেন বটগাছটার উপরে। কথাও যে গাছে তরতরিয়ে উঠে যেতে পারে, তা প্রথম বুঝতে পারলেন তিনি। কথাটা বটগাছের মগডালে পৌঁছুতেই একদল জোনাক পোকা যেন চক্রকারে নিচে নেমে আসতে লাগল। প্রথমে তার মনে হচ্ছিল শত শত জোনাক পোকা হবে। কয়েক মুহূর্তেই মনে হল হাজার হাজার জোনাক পোকা একের পর এক বৃত্তাকারে নেমে আসছে। এক ঝাঁক বৃত্তকার আলো তাকে ঘিরে ধরল। এতে হচকিয়ে গেলেন তিনি। এ সময় ভূতের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
‘তান্ত্রিক মশাই, এ কী করলেন! নিজেকে সংযত করুন। এলিয়েনকে ভড়কে দেবার চেষ্টা করবেন না। ওরা ভড়কে গেলে আপনাকেও বজ্রঘাতে মরতে হবে!’
জটেশ্বর কিছু বলতে পারলেন না। অনেকগুলো বৃত্তাকার আলো তার সামনে এসে ঘুরছে। আলোগুলো তাকে ঘিরে যেন নৃত্য করছে। তার বুকের ভেতরের কাঁপনটা বেড়ে গেল। জলের তৃষ্ণা এমন বাড়ল যে, তার মনে হচ্ছিল জল পান করতে না পারলে তিনি এক্ষুণি মারা যাবেন। তাকে ঘিরে আলোর ঘূর্ণন আরও বাড়তে লাগল। তার মনে হতে লাগল আলোর ঘূর্ণিপাকে তিনি কোথাও উড়ে যাবেন হয়তো। জটেশ্বর ত্রিশূলটা তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারলেন তার হাত অনড় পাথরের মতো হয়ে আছে। হাত নাড়াতে পারলেন না। ভূতের কণ্ঠস্বর শোনা গেল ফের, ‘চুপ করে থাকলে হবে? বাহাদুরী করেই যখন ফেলেছেন, তখন তা বজায় রাখুন। কিছু একটা বলুন। ওদের সর্দার আছে, তাকে ডাকুন। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে এক সময় বজ্রাঘাতের শিকার হবেন, মশাই!’
এ কথায় জটেশ্বরের সম্বিত ফিরে এল। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘কোথায় তোমাদের সর্দার? তাকে ডাকো। আমার চারপাশে চক্কর কাটলেই ভেব না, ভয়ে সেঁটিয়ে যাব। তোমাদের সর্দারকে ডাকো এক্ষুনি!’
এ কথায় আলোর ঘূর্ণি নাচন থেমে গেল। বটগাছে উপর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘কে তুমি? এখানে কেন এসেছ?’
আকাশ পানে তাকিয়ে রাগতকণ্ঠে জটেশ্বর বললেন, ‘আমাদের গাঁয়ে এসে জানতে চাচ্ছ, আমি কে? তার আগে বল, তোমরা কারা?’
‘আমরা এলিয়েন। তুমি?’
‘আমি এই গাঁয়ের তান্ত্রিক। নাম জটেশ্বর। তোমার নাম কী?’
‘আমাদের কোনো নাম হয় না। আমাদের নম্বর দিয়ে ডাকা হয়।’
কথাটা উপর থেকেই এল। গাছের মগডালের দিকে তাকিয়ে জটেশ্বর বললেন, ‘তা নম্বরধারী এলিয়েন, এই বটগাছে ডেরা গেড়েছ কেন জানতে পারি?’
এবার একটা গোল চাকতির মতো আলোময় মুখাকৃতি গাছের উপর থেকে তার সামনে চলে এল। মুখটায় মানুষের অবয়ব থাকলেও পুরোপুরি মানুষ বলা যাবে না। মুখাকৃতিতে লম্বা দু’টি কান আছে। নাক নেই। পুরো শরীর আছে-কি নেই, বোঝা যাচ্ছে না। আলোর চাকতির মুখাকৃতি তার সামনে স্থির। মুখাকৃতি বলল, ‘আমরা এখানে এসেছি তোমাদের নিয়ে গবেষণা করতে।’
কথাটা বলার সময় জটেশ্বর লক্ষ্য করল মুখাকৃতির একটা মুখও আছে, তা কথা বলার সময় শুধু দেখা যায়। জটেশ্বরের ভেতরে ভয়টা যেন ঘুমিয়ে গেছে। বরং এক টুকরো সাহস পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘আমাদের গ্রামেই কেন তোমরা এলে? এখানে গবেষণা করার কী আছে?’
‘মনুষ্য জীবনের নানাদিক নিয়ে আমরা গবেষণা করতে চাই। পৃথিবীর প্রাণীর মধ্যে মানুষ কেন সর্বশ্রেষ্ঠ, এটা জানতে চাই আমরা। এ ছাড়া তোমাদের একদল মানুষ অসম্ভব মেধাবী-জ্ঞানী-প্রতিভাবান। আবার একদল মানুষ হদ্দ বোকা, বেকুব, সহজ-সরল। একদল বিশ্বাসী, আরেক দল ভণ্ড-প্রতারক-লুটেরা। একদল মানুষ সৃষ্টিশীল, আরেকদল খুনী। মানুষে-মানুষে চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের এত পার্থক্য কেনÑ এটা জানতে চাই আমরা।’
এ কথার কী জবাব দেবেন জটেশ্বর ভেবে পেলেন না। এমন শক্ত কথার পর কী ধরনের কথা বলা উচিত, তা তিনি রপ্ত করেননি। তিনি একটু ভ্যাবাচেখা খেয়ে গেলেন। আলোর চাকতির মুখাকৃতি যেন মুখ টিপে হাসছে। এ সময় পাশ থেকে ভূত বলল, ‘মানুষের চরিত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে তোমাদের এত আগ্রহ কেন? মানুষ কি তোমাদের আলোর পিদিমের মতো মুখাকৃতি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে? এই যে তোমাদের নাম নেই, শুধু একটা নম্বর নিয়ে পরিচয় বহন করছ, তা নিয়ে কি প্রশ্ন তুলেছে? তোমাদের কান বিশাল আকৃতির আবার নাক নেই, তারপর তোমাদের শারীরিক অবয়বও সব-সময় এক মাপে নির্ধারিত থাকে না, তা নিয়ে কি মানুষ গবেষণা করার কথা ভেবেছে? এখানেই শেষ নয়, তোমরা বাপু, কার অনুমতি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছ? এই যে গাঁয়ের বটগাছটায় আস্তানা গেড়েছ, তা কি আইনসিদ্ধ হয়েছে?’
ভূতের কণ্ঠে ক্ষোভের প্রকাশ। কথা শুনে আলোময় মুখাকৃতির অবয়বে কেমন বিষণ্নতা ছেয়ে গেল। জটেশ্বর মনে মনে ভূতের প্রশংসা না করে পারলেন না। এলিয়েনের প্রশ্নের মোক্ষম জবাব দিয়েছে সে। এলিয়েনটা যে একটু ঘাবড়ে গেছে, তা তিনি বুঝতে পারলেন। আলোময় মুখাকৃতিটা একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হল এবং বলল, ‘কে কথা বলল? জটেশ্বর, আমরা তো তোমাকে ছাড়া কাউকে দেখতে পারছি না। তোমার ঠোঁটও নড়েনি। তাহলে কথা বলল কে?’
জটেশ্বর ম্লান হেসে বলল, ‘জনাব এলিয়েন, পৃথিবীতে কি শুধু মানুষেরই বাস? এখানে ভূত-প্রেত-জ্বীন, আরও কত কিছু বাস করে!’
যে বৃত্তাকার আলোগুলো জটেশ্বরকে ঘিরে ছিল, সেই আলোগুলো চারপাশে ঘুরতে লাগল। জটেশ্বরের মনে হল আলোগুলো ভূতটাকে খুঁজছে। আলোকময় মুখাকৃতি ফের বলল, ‘আমরা জানতে চাচ্ছি, এখন যে কথা বলেছে, সে কে?’
জবাব দিল ভূত, ‘আমি কথা বলেছি।’
‘তুমি কে? তোমাকে দেখা যাচ্ছে না কেন?’
‘আমি ভূত। আমাকে দেখা যায় না।’
‘ভূত! ভূত আবার কী?’
‘ভূত, মানে ভূত!’
‘এই নাম তো আমরা শুনিনি?’
বলল আলোময় মুখাকৃতি। ভূত বলল, ‘সব কথা তোমাদের জানতে হবে কেন?’
‘ভূত আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য কী?’
‘ভূত আর মানুষের বড় পার্থক্য হচ্ছে মানুষ দেখা যায়, ভূত দেখা যায় না। পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব সব-সময় উপলব্ধি করা যায় কিন্তু ভূতের অস্তিত্ব সব-সময় উপলব্ধি করা যায় না। মানুষের স্বপ্ন আছে, আবেগ আছে। জীবন আছে, সংসার আছে। বৈরাগ্য আছে। অনুরাগ আছেও আছে। ভূতের এসব কিছু নেই।’
‘আশ্চর্য! এ কথা আমাদের জানা ছিল না। তা ভূতের কাজ কী? তারা কোথায় থাকে?’
‘ভূতের আবার কাজ কী! ভূতের কাজ করতে হয় না। ভূতের থাকারও জায়গা লাগে না। ভূত হাওয়ায় মিশে থাকে। তবে মানুষের ধারণা ভূতেরা নির্জন এলাকা, ঝোপঝাড়, গাছগাছালী, পুরানো দালান, শ্মশান-কবরস্থানে থাকে।’
‘অতি উৎসাহ পাচ্ছি। ভূত পাওয়া যাবে কোথায়, বলতে পারো?’
এবার জটেশ্বর বলল, ‘জনাব এলিয়েন, ভূত পাওয়া সহজ নয়। ভূত অনেক দুর্লভ। তিনকুড়ি বছর সাধনার পর এই ভূতের সঙ্গে আমার দেখা মিলেছে। অনেক মানুষ পুরো জীবন চেষ্টা-সাধনা করেও ভূতের দেখা পায় না। আর আপনি বলছেন, ভূত কোথায় পাওয়া যাবে। ভূত কি ছেলের হাতের মোয়া? নাকি মেলায় বিক্রি হওয়া পুতুল?’
এ কথায় ভূতটা যেন মুখ টিপে হাসলÑ চোখে না দেখলেও অনুভব করতে পারলেন জটেশ্বর। আলোময় মুখাকৃতির এলিয়েনটার মুখ ফের প্রশ্নবোধক হল। জটেশ্বর বলল, ‘তা বলছিলাম কি, এই মানুষ-ভূতের পৃথিবীটা ছেড়ে চলে গেলে হয় না? পৃথিবী ছাড়তে মন না চাইলে অন্তত এই গ্রামটা ছেড়ে দিন। আমি হলফ করে বলছি, এই গ্রামের মানুষ খুব সাটামাটা। সহজ-সরল। এরা দিনভর কাজ করে আর সন্ধ্যের পর ঘুমিয়ে পড়ে। এদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বৈচিত্র্য বলতে কিছু নেই। আপনারা ভুল স্থানে এসে গবেষণার কাজ করছেন। গবেষণার নামে আপনাদের সময় নষ্ট হবে আর আমাদের কিছু মানুষ হয়তো মারা যাবে।’
‘কিন্তু আমরা খালি হাতে ফিরে গেলে এলিয়েন রাজ্যে ‘ছিঃ ছিঃ রব’ পড়ে যাবে যে!’
‘তাই বলে…!’
‘আচ্ছা, জটেশ্বর তুমি কি তোমার ভূতটা উপহার হিসাবে আমাদের দিতে পারো?’
‘ভূত চাও! ভূত দিয়ে তোমরা কী করবে?’
‘আরে, ভূতটাই হতে পারে আমাদের গবেষণার বিস্ময়কর বিষয়। ভূত নিয়ে ফিরতে পারলে এলিয়েন রাজ্যে আমাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। বল, ভূতটাকে দিতে পারবে?’
জটেশ্বর বলতে যাচ্ছিল, ‘ভূত আমি দেব কী করে?’ বলতে পারল না। তার কথা বলার আগেই ভূত বলল, ‘আমাকে নিতে হলে একটা শর্ত আছে।’
‘শর্ত? কী শর্ত বল।’
‘শর্ত হচ্ছে তোমরা এরপর আর কখনো এই গাঁয়ে এবং এর চারপাশের ষোল গাঁয়ে আসতে পারবে না। কস্মিনকালেও তোমরা এই গাঁ-গুলোতে গবেষণা চালাতে পারবে না। শর্ত মানলে আমি যাব তোমাদের সঙ্গে।’
‘এ আর তেমন কঠিন শর্ত কি! শর্ত মানলাম।’
‘তাহলে চল।’
‘তোমাকে আমরা নেব কীভাবে? তোমাকে তো আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
‘আমি বলে দিচ্ছি, ভূত বলে আমি আলো সহ্য করতে পারি না। তোমরা ঘন অন্ধকার দিয়ে এমন একটি পাত্র তৈরি কর, যেখানে আমি বন্দী হয়ে থাকতে পারি। কাচের বোতল যেমন হয়, তেমনি হলেও হবে।’
‘ঠিক আছে। তৈরি করে নিচ্ছি।’
একটি অন্ধকারের বোতল তৈরি করে ফেলল এলিয়েন। ঐ বোতলে ভূতটা ঢুকে যাবার সময় জটেশ্বরের কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘মরে ভূত হয়ে গেছি। এখন ভূত রাজ্যে বাস করলে কী বা এলিয়েনদের রাজ্যে বাস করলেই বা কী! আমার বিনিময়ে সতের গাঁয়ের বাসিন্দারা তো এলিয়েনদের গবেষণার হাত থেকে রক্ষা পেল।’
জটেশ্বরের চোখ দু’টো ভিজে এল। সরলমনা ভূতটার জন্য এই প্রথম তার খুব মায়া হল। এলিয়েনরা ভূতটাকে বোতলবন্দী করে বটগাছ থেকে পাততাড়ি গুটাল দ্রুত। ওরা বটগাছ ছেড়ে যাবার সময় একটা আলোক বল ছুঁড়ে দিল জটেশ্বরের দিকে। বলটা তার দিকে আসতেই বাম হাতে খপ করে ধরে ফেললেন তিনি। বলটা ধরতেই জটেশ্বরের শরীরে একটা হালকা বিদ্যুৎ তরঙ্গায়িত হল যেন। তার শরীরের শিরায়-শিরায় কেমন এক চাঞ্চল্য ঢেউ তুলে গেল। বিস্মিত চোখে পা বাড়াতেই জটেশ্বর টের পেলেন তার ডান পায়ের বাতের ব্যথা নেই। তিনি যখন পা ফেললেন তার মনে হল শরীরে কেমন যৌবনের শক্তি ফিরে এসেছে। বলটা যে রোগ-বালাই শুষে নিতে পারেÑ এটা বুঝতে পারলেন তিনি। কথাটা ভাবতেই তিনি আলোক বলটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বলটা তার মুঠো ফসকে বেরিয়ে গেল। তিনি বলটাকে ধরতে গেলে বলটাও সমান দূরত্ব রেখে লাফাতে লাগল। তিনি এগুতেই বলটাও লাফাতে লাফাতে এগিয়ে যেতে লাগল। ‘এই বল কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না!’Ñ এমন পণ তার মনে শক্ত হয়ে গেল। তার সামনে বলটা লাফাচ্ছে আর এগুচ্ছে। বলটা ধরতে এক সময় জটেশ্বর দৌড়াতে লাগলেন। বলটাও লাফিয়ে লাফিয়ে দৌড়াতে থাকে। কেউ দেখতে পেল না অমাবস্যার মধ্যরাতে গাঁয়ের পথে জটেশ্বর একটা রহস্যময় বলের পেছনে ঘণ্টায় এক শ’ মাইল গতিতে দৌড়াচ্ছেন। একই সময়ে আকাশ ছাড়িয়ে দূরে এক আলোর মিছিল মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন দৃশ্য অবশ্যই অবিশ্বাস্য!
ভূতের জেলখানা
এক
মরে ভূত হয়েই নগেন মিত্র জানতে পারলেন তার ভূতরাজ্যেও নিয়ম-কানুন বদলে গেছে। ভূত হলেই এখন আর সব ভূত জাদু সৃষ্টিকারী বিশেষ-শক্তি লাভ করতে পারবে না। ভূতরাজ এমন বিধি ঘোষণা করেছেন। ভূতরাজ্যে ভূতদেরও দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একভাগে সাধারণ ভূত ও অন্যভাগে অসাধারণ ভূত। যারা জাদু সৃষ্টিকারী বিশেষ-শক্তি প্রাপ্ত হবে না, তারা সাধারণ ভূত। আর যারা জাদু সৃষ্টিকারী বিশেষ-শক্তি লাভ করবেÑ তারা অসাধারণ ভূত। এই অসাধারণ ভূতরা যেকোনো রূপ ধরে মানুষের সামনে আবির্ভূত হতে পারবে, আবার যখন ইচ্ছে মিলিয়ে যেতেও পারবে। ছোট-খাটো কারিশমাও দেখাতে পারবে। আর সাধারণ ভূতদের কোনো জাদু নেই, শক্তি নেই, কারিশমাও নেই। মনুষ্য-সমাজে তারা আবির্ভূত হতে পারবে না। কদাচিৎ কেউ মনুষ্য-সমাজে পরিভ্রমণের সুযোগ পেলেও কাউকে ভয় দেখানো তো দূরে থাকÑ একটি চড়ুই পাখিকেও ভেংচি কাটতে পারবে না। ভূতরাজ্যে সাধারণ ভূতদের চলছে সাদামাটা জীবনযাপন। সাদামাটা বললেও ভুল হবে। বরং বলা উচিত ভূতরাজ্যে তাদের কয়েদীর জীবনযাপন। সাধারণ ভূতরা ভূতরাজ্যে দিনের বেলায় এদিক-সেদিক চলাফেরা করতে পারে না। একের অধিক ভূত কোথাও দাঁড়িয়ে বা বসে জটলা করে আড্ডা দিতে পারে না। যা কথাবার্তা আছে, তা ফিসফাস করে বলতে হয়। সন্ধ্যা হলেই সাধারণ ভূতরা প্রবেশ করে জেলখানায়। ভোরের আলোয় ওদের মুক্তি। সাধারণ ভূতদের জন্য জেলখানা বানিয়েছে ভূতরাজ।
নগেন মিত্র এত দিনে জেনে গেছে একেক ভূত রাজ্যে একেক নিয়ম। তবে মনুষ্য-সমাজের জেলখানা তার ভূতরাজ্যে কেন তৈরি করা হয়েছেÑ নগেন মিত্র এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। তাকে জানানো হয়েছে, সাধারণ ভূত হিসেবে জেলখানায় প্রতিরাত কাটাতে হবে। তিনি তথ্য-তালাশ করে জেনেছেনÑ সাধারণ ভূতদের মধ্যে যে চাপা ক্ষোভ জমছে, তা যেন গণআন্দোলনে রূপ না নেয়, এ কথা ভেবে ভূতরাজ জেলখানা তৈরি করেছেন। অবশ্য ভূতরাজ্যে এর নাম রাখা হয়েছেÑ বিশ্রামাগার। নগেন মিত্র মানুষ থাকাকালে কুড়ি বছর জেলখানায় চাকুরি করেছেন। প্রায় এক যুগ তিনি বিভিন্ন জেলখানার জেলার ছিলেন। চাকুরির সময়কাল আরও কয়েক বছর হাতে ছিল। এরমধ্যে এক রাতে তিনি খুন হয়ে গেলেন। খুনটা এমনভাবে হলেন, দম বন্ধ হয়ে ছটফট করতে করতে খুনীকে একটু দেখারও সুযোগ পেলেন না। তার মুখের উপর বালিশ চাপা দিয়ে কে যে তার প্রাণবায়ু এক মিনিটেই বের করে ফেলল, তিনি জানতেই পারলেন না। নিজের বিছানায় অসহায়ভাবে অপমৃত্যু! মরার সময় যদি জানতে পারতেন, ঠিক কোন শত্রু তাকে নিধন করলÑ তাহলে মরেও সুখী হতে পারতেন। এখন ভূত হয়েও টের পান বুকের ভেতর ‘খচ্খচ্’ করছে প্রশ্নটা। মাঝেমাঝে আনমনে বুকে হাত দেন, বুক নেই। ধূ-ধূ শূন্যতা! চোখের জল মুছতে যান, জল নেই। তাই বলে কি ‘খুনী কে’ এই প্রশ্নের ছটফটানি আর কমে?
গাব গাছটার মগডালে বসে কথাগুলো ভাবছিলেন নগেন মিত্র। অমাবস্যার রাত মধ্য প্রহরে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকারেরও যে একটা রূপ আছে-লাবণ্য আছে, ভূত না হলে তা-ও জানতে পারতেন না নগেন মিত্র। অন্ধকারকে তিনি সব-সময় ভয় পেয়ে এসেছেন। জেলখানার চারপাশে সার্চ লাইটের মতো আলো জ্বলে থাকত রাতে। কখনো বিদ্যুৎ চলে গেলে কর্মচারীরা খুব দ্রুত তার কক্ষে হ্যাজেক লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে যেত। মোমের আলোর মৃদু আলোকবিচ্ছুরণে তার ভয় কাটত না। পুরোটা জীবন তিনি অন্ধকারকে ভয় পেয়েছেন। আলোর দিকেই মোহমুগ্ধ হয়ে থেকেছেন। মরে ভূত হবার পর বুঝতে পারছেন অন্ধকারের রূপ কতটা ধাঁধাল এবং গভীর। শিল্পময়ও বটে। অন্ধকার নিয়ে কথাগুলো ভেবে তিনি আবিষ্ট হন। গাব গাছের মগডালে বসে এখন ভাবছেন সত্য যুগ নিয়ে। সত্য যুগে অমাবস্যার রাতে কেউ বাড়ি থেকে বাইরে বের হতো না। এই কলিযুগে ভয় বলতে যেন কিছু নেই। অমাবস্যার রাতেও যে কালো কুচকুচে অন্ধকারের বিভৎস রূপ আছে, এ নিয়ে কারো ভাবনা নেই। সর্বত্র আলোর ছোবলে অমাবস্যার রাতের বেহাল অবস্থা। এখানে সেখানে লাইটপোস্ট, বাড়ির আঙিনায় লাইটের জ্বলমলে আলোর নাচন। কৃত্রিম আলো যত্রতত্র খুবলে খাচ্ছে অন্ধকারের শরীর। এমনি একটি যুগে অমাবস্যারও তার মতো ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! কথটা এক ঝিলিক উঁকি দিয়ে মিলিয়ে গেল। নগেন মিত্র একটু যেন স্মৃতিকাতরও। তিনি পেছনে ফিরে যান। একটা সময় ছিল নগেন মিত্রের হাঁক-ডাকে দস্যু-খুনী-ডাকাতরাও ঠকঠক করে কাঁপত। তিনি হুংকার দিলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরাও মূত্রত্যাগ করে পায়জামা নষ্ট করে ফেলত। তার রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে ছিঁচকে চোর, নিরপরাধী আসামীরা হুড়মুড়িয়ে মূর্ছা যেত। এসব কথা ভূতরাজ্যের কেউ জানে না। এক সময়ের ডাকসাইটে জেলার মরে ভূত হয়ে এখন ভীষণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন। তিনি কিছুই করতে পারছেন না। নগেন মিত্র ভূতরাজ্যের নতুন সদস্য বা প্রজা। তার পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। অন্যান্য ভূতরা তাকে কেমন অবজ্ঞার চোখে দেখে। ভূতরাজ তো তার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল যেন একটা পিঁপড়ে দেখছে। ‘শালা, তোকে যদি আমার জেলে পেতাম, তোর পশ্চাৎদেশ দিয়ে গরম আণ্ডা ঢুকিয়ে দিতাম!’ ভূতরাজের অবজ্ঞাভরা মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে এ কথাটাই আওড়াচ্ছিলেন। মুখে অবশ্য মেকী শুকনো একটা হাসি ফুটিয়ে রেখেছিলেন। ভূতরাজ তার দিকে এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তো অপমৃত্যুটা কেন হয়েছিল?’
‘জ্বি, সঠিক কারণ জানি না। মানে, জানতে পারিনি, ভূতরাজ। শত্রুর বালিশে চাপা পড়ে টুক করেই অক্কা পেত হল। আঘাতটা ছিল বড্ড একপেশে। কোনো সুযোগই পেলাম না।’
‘ও আচ্ছা। অকারণেই অপমৃত্যু? মানুষ্য সমাজটা যে কী হল! একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। কারণে-অকারণে অপমৃত্যু! এই অপমৃত্যুর মিছিল এসে হামলে পড়ছে ভূতরাজ্যে। একবার ভেবে দেখুন, ভূতরাজ্যের কথা। দিনদিন কেমন বেহাল হয়ে যাচ্ছে!’
‘জ্বি, আজ্ঞে!’
ছোট্ট করে বলেছিল নগেন মিত্র। সরকারি চাকুরি করার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘হ্যাঁ’ সূচক কথা বলার অভ্যাসটা রয়ে গেছে। ভূতরাজের কথার সঙ্গে তাই তাল মিলিয়েছিলেন তিনি। ভূতরাজ নিজের সঙ্গে কথা বলছেন- এমন কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ভূতরাজ্যের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! চোর-বাটপার-ছিনতাইকারী, দস্যু, খুনী, মাতাল, লম্পট কত যে প্রতিদিন মরে ভূত হচ্ছে, এর ইয়াত্তা নেই। আর এরা ভূত হয়েই মনুষ্য-সমাজে ফিরে যেতে চায়। মনুষ্য-সমাজে ফিরে যাবার সুযোগ পেলেই তারা অকারণে মানুষদের ভয় দেখায়, নানা উপদ্রব করতে থাকে। ভাল-খারাপ মানুষ, এটাও বিবেচনা করে না। এতে ভূতদের প্রতি মানুষদের ক্ষোভ বাড়ছেই। আরে বাবা, জাদুকরী শক্তি পেলেই যার-তার ঘাড় মটকে দিতে হবে নাকি?’
‘ঠিক বলেছেন, মহারাজ!’
মাথা নাড়েন নগেন মিত্র, কিন্তু মাথা না থাকায় তা নড়ে না। ভূতরাজ বাতাসের সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গিতে বলছিলেন, ‘তাই ভূতদের মধ্যে যারা চরিত্রগতভাবে খাটাস, তাদের শাস্তির বিধান করেছি। আর সাধারণ ভূতদের জন্য বিশ্রামাগার তৈরি করেছি। ওটাকে আবার জেলখানা বলবেন না যেন। দিনভর টো টো করে এদিক-সেদিক ঘুরে ফের রাতের বেলায় ঘোরাঘুরি করার দরকার কী? একটা নির্দিষ্ট জায়গায় সকলে একত্রে থাকলেই তো বরং সময়টা খোশগল্প করে কাটিয়ে দেওয়া যায়। কী বলেন? আপনি তো মনুষ্য-সমাজে জেলার ছিলেন। আপনি নিশ্চয় এই জেলাখানাকে, না, মানে বিশ্রামাগারকে সমর্থন করেন?’
‘জ্বি, মহারাজ। আপনি যা বলেছেন, তা মন্দ বলেননি। তবে আমি মনুষ্য-সমাজে জেলার ছিলাম বটে। এখানে তো কয়েদীর মতো থাকতে হবে!’
“আহা, কয়েদী ভাবছেন কেন? একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে ‘সকলে ভাই-ভাই’ মনোভাব নিয়ে রাত কাটিয়ে দেবেন। হল্লা করবেন, আনন্দ করবেন। চাইলে গানও গাইতে পারেন…।”
নগেন মিত্র কেমন কাচুমাচু খেয়ে চুপ মেরে গিয়েছিল। ভূতরাজের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছিল হদ্দ বোকা টাইপের কেউ হবে। এ কথাগুলো শোনার পর মনে হল এই ভূতরাজ বিটকেলেও। তিনি তর্ক না করে একটা আর্জি পেশ করলেন। আকুতি-মিনতি কণ্ঠে ভূতরাজের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘মহারাজ, যদি অভয় দেন, তো একটা আর্জি রাখতে চাই।’
‘আর্জি! কেন? আচ্ছা বলুন, শুনি কী আর্জি।’
নগেন মিত্র ভূত হবার সঙ্গে সঙ্গে জেনেছিলেন, ভূতরাজের মুখের ওপর কেউ কথা বলে না। এখানে কেউ দাবী-দফা পেশ করে না। ভূতরাজ কঠিন শাস্তি দেন দাবী পেশকারী ভূতকে। তাই ‘আর্জি আছে’ কথাটা হন্ হন্ করে ধরা গলায় বলে দিয়েও ঠাণ্ডা একটা ভয় অনুভব করছিলেন। যত বিপত্তি হোক, তার আর্জি পেশ করার গুরুত্বপূর্ণ কারণও ছিল। এক পলকে তাকে কে মেরে ফেললÑ এ নিয়ে তার খচ্্খচানী কমছিল না। তার খুনী কেÑ তা জানতেই হবে তাকে। আর খুনীকে সনাক্ত করতে হলে মনুষ্য-সমাজে তাকে ফিরে যেতে হবে। আর্জিটা পেশ না করেও পারছিলেন না তিনি। আর্জির কথাটা তুলে নগেন মিত্র কিছুক্ষণ হচকিয়ে চেয়েছিলেন ভূতরাজের দিকে। তার আর্জি আছে কথাটি শুনে ভূতরাজ কী যেন ভাবছিলেন। বেমক্কা সুযোগ বুঝে নগেন মিত্র খনখনে গলায় তোষামোদের প্রলেপমাখা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মহারাজ, আপনার জেলখানা, না-মানে, বিশামাগার তৈরির চিন্তাটা অতি উত্তম। হিসাব করে দেখবেন, মনুষ্য-সমাজে জেলখানা ছাড়া সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব ছিল না। বলা যেতে পারে- সভ্যতার প্রথম সোপন হচ্ছে জেলখানা! আর নিয়ম-কানুন শিথিল করে তৈরি করেছেন বিশ্রামাগার। অতি উত্তম!’
তার কথা শুনে ভূতরাজ খুশি হয়েছিলেন। এ টুকু প্রশ্রয়ই যথেষ্ট ছিল। ভূতরাজের কুৎসিত মুখায়বের বিচ্ছিরি হাসির ঝিলিক নগের মিত্রের দৃষ্টি এড়ায়নি। ভূতরাজ বিরক্তভরা কণ্ঠে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আর্জিটি কী?’
‘মহারাজ, আমাকে মনুষ্য-সমাজে কয়েকদিনের জন্য জাদুকরী শক্তি দিয়ে যদি পাঠাতেন…।’
‘কেন? ভূতরাজ্য কি ভাল লাগছে না?’
‘ছিঃ ছিঃ! কী যে বলেন, মহারাজ! এটা তো হীরক রাজার দেশের চেয়ে অতি-উত্তম!’
‘হীরক রাজাটা আবার কে?’
`মনুষ্য-সমাজে অনেক হীরক রাজা আছে, মহারাজ। তাদের রাজ্যের জনগণের সে কী সুখ-শান্তি! ফলে রাজা রাজ্যের নিয়ম ভাঙলেও প্রজারা মুখে টু’ শব্দটি করে না। আমি ঐ রকম একটি রাজার কথা বলছিলাম, আরকি! আপনি তার চেয়েও ঢের সফল, ভূতরাজ!’
নগেন মিত্রের টিপ্পনী কি আর ভূতরাজের বোঝে? বরং প্রশংসা ভেবে ভূতরাজ খুশি হয়ে যায়। ভূতরাজ বললেন, ‘মনুষ্য-সমাজে আমার রাজ্যের সাধারণ ভূতের যাবার বিধান নেই। কিন্তু আপনি কেন যেতে চাচ্ছেন? ওখানে কী আছে?’
`ভূতরাজ, আমাকে যারা খুন করেছে। তাদের প্রতি এখন আর আমার রাগ নেই। কিন্তু ওরা কারা, আমি জানতে চাই। এই না জানার কষ্টটা ভূত হয়েও ভুলতে পারছি না। সারাক্ষণ ছটফট করছি।’
`আমি আপনার জন্য আমার রাজ্যের নিয়ম ভাঙব কেন?’
ভূতরাজ প্রশ্ন করলেন। নগেন মিত্র ছাড়বার পাত্র নয়। ভূত হয়ে গেলেও স্বভাবটা বদলে যায়নি। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, আপনিই এই রাজ্যের রাজাধিরাজ। আপনি চাইলে যা ইচ্ছা-তাই করতে পারেন। নইলে আর হীরক রাজা খেতাব আপনাকে দেব কেন? হীরক রাজা চাইলে সবকিছুই করতে পারে। যাকে খুশি পুরস্কার দেয়, যাকে খুশি জেলে রাখে। যাকে খুশি তাকে শূলেও চড়ায়। নইলে কি আর হীরক রাজা!’
ভূতরাজ একটু যেন দ্বিধায় পড়ে যায়। নগেন মিত্র বিগলিত কণ্ঠে বলে যায়, ‘মহারাজ, আমার আর্জিতে সাড়া দিয়ে আপনি যে এই রাজ্যের হীরক রাজা, সেটাও প্রমাণ করতে পারেন। আপনিই এই রাজ্যের সর্বশক্তিধর, এ কথাটা ভূতেরা ভুলতে বসেছে। সব-সময় একটা নিয়মের আবর্তে তারা ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে আপনার অপার ক্ষমতার কথা মনে রাখা একটু যেন মিইয়ে এসেছে। তাই বলছিলাম কি, আমার ক্ষেত্রে নিয়মটা বদলে দিয়ে আপনি এটাও প্রমাণ করুনÑ ভূতরাজ চাইলে নিয়ম বানাতে পারে, আবার নিয়ম ভাঙতেও পারে। আপনার ইচ্ছায় এ রাজ্যে সবকিছু হয়।’
কথাটা ভূতরাজের মনে ধরেছিল। হীরক রাজা যে দেশেরই হোক, ভূতরাজ্যের হীরক রাজাও সে। ভূতরাজ ঘোষণা করার মতো বললেন, ‘পূর্ণ অমাবস্যার রাতে আপনি মনুষ্য-সমাজে যাবেন। ভরা পূর্ণিমার রাতের আগে আপনাকে ফেরত আনা হবে। এ ক’দিনের মধ্যে যদি একজন মানুষকে ভয় দেখাতে পারেন, তাহলে আরেক অমাবস্যা পর্যন্ত থাকতে পারবেন। যতজন মানুষকে ভয় দেখাতে পারবেন, ততটা অমাবস্যা তিথি আপনি পাবেন।’
`মহারাজ!’
আহ্লাদে ককিয়ে উঠেছিল নগেন মিত্র। ভূতরাজ ফের বললেন, ‘মনে রাখবেন, কাউকে ভয় দেখাতে না পারলে দৈব ক্ষমতা বলেই আপনি ভূতরাজ্যে ফিরে আসবেন। যত মানুষকে ভয় দেখাতে পারবেন ততটা অমাবস্যার সময়কাল মনুষ্য-সমাজে থাকতে পারবেন আপনি। মনুষ্য-সমাজে থাকা এবং ঐ সময়কালে আপনার খুনীকে সনাক্ত করাÑ দু’টোই আপনার কাজ। এই শর্তে আপনার আর্জি গ্রহণ করা হল।’
ঘোষণা দিয়ে ভূতরাজ হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন। নগেন মিত্র আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। এ ঘটনার সময় হাজার হাজার বিড়ালের চোখ যেন তার চারপাশে জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। মিঁউমিঁউ তারস্বরও যেন শুনতে পেয়েছিলেন তিনি। হাওয়ায় মিলিয়ে থাকা অজস্র ভূত যে তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়েছিল- এটা বুঝতে পেরেছিলেন। এই ভূতরাজ্যের নিয়ম এই প্রথম ভাঙা হল যে!
দুই
একেই বলে কলি যুগ! মানুষের মধ্যে ভয়-ডর একেবারেই নেই। একটা সময় ছিল ‘ভূত’ শব্দটা শুনলেই যে কারো গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। শীতের রাতেও প্রবল জলচেষ্টা পেয়ে যেত। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে আসত। অনেকে তো সন্ধ্যা হলেই ঘরের খিল লাগিয়ে দিত, ভোর হবার আগ পর্যন্ত দরোজা খুলত না। প্রতিবেশী কেউ বিপদে পড়ে দরোজায় কড়াঘাত করলেও তারা দরোজা খোলার সাহস দেখাত না। বরং ভয়ে জড়সড় হয়ে কুঁকড়ে থাকত। ‘প্রাকৃতিক ডাকে’ও তারা বাইরে বের হতো না রাতের কোনো প্রহরে। মল ও মূত্রত্যাগের চাপ সৃষ্টি হলে তা চেপে রাখতেন তারা। সেই মানুষ আর কোথায় পাওয়া যাবে? আসলে ওটাই ছিল সত্য যুগ! সত্য যুগে মানুষের মন, চিন্তা-চেতনা ছিল নরম-কোমল। সরলও বটে। এখন নরম বা সরল মানুষের সন্ধান পাওয়া আর সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা মণি-মুক্তো পাওয়ার মতোই দুরূহ ব্যাপার। কলিযুগ বলেই ভয়কাতুরে মানুষ আজকাল দেখাই যায় না। বরং মানুষগুলোর মধ্যে কেমন একটা জেদী, একরোখা, বেপরোয়া, খেপাটে ভাব চলে এসেছে। ভয়-ডর তো নেই-ই, উল্টো অন্যকে ভয় পাইয়ে দেবার কসরৎ তারা যেন স্বভাবে রপ্ত করে নিয়েছে। মধ্যরাতে সুনসান নীরবতায় গাব গাছের মগডালে বসে সদ্য ভূত হওয়া নগেন মিত্র এ কথা ভাবছিল। ভাবার সঙ্গত কারণও ছিল। এই যে কিছুক্ষণ আগে কান্দীপাড়ার সিঁধেল চোর আব্দুল কাদের মিয়া মিয়াকে সে ভয় দেখানোর দু’দফা চেষ্টা করেও সফল হতে পারল না। অমাবস্যার মধ্যরাতে আব্দুল কাদের কী মনে করে গাব গাছের নিচে এসে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। একটা বিড়িতে আগুন জ্বালিয়ে টানল। বিড়ি ফুরাতেই সে নির্লজ্জের মতো লুঙ্গিটা তুলে গাছের নিচে বসে পড়ল মলত্যাগ করতে। মল ত্যাগ করার সময় বায়ু ছাড়ার বিকট ও বিশ্রী শব্দও শুনতে পেল মগডালে বসে থাকা নগেন মিত্র। তার মনে হচ্ছিল গা গুলিয়ে আসছে। কিন্তু ভূতের তো গা নেই। গুলিয়ে আসার সুযোগও নেই। তিনি আব্দুল কাদেরকে ভয় দেখানোর এক দফা কসরৎ করলেন। নগেন মিত্র কালো বিড়াল হয়ে গাব গাছের মগডাল থেকে হরহর করে নেমে তার গায়ের উপর লাফিয়ে পড়লেন। বিদ্ঘুুটে একটা শব্দও করলেন। কিন্তু আব্দুল কাদের মিয়ার ভয়ডর কই? মধ্যরাতে গায়ের উপর আচমকা একট কালো বিড়াল লাফিয়ে পড়লেও তার মধ্যে কোনো ভয়-ডর সৃষ্টি হল না। বরং সে চট করে পশ্চাৎদেশের দিকে হাত বাড়িয়ে একটা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে আঘাত করতে চাইল বিড়ালটাকে। ইটের টুকরোতে সদ্য ত্যাগ করা মলও লেগেছিল। মলসমেত ইটের টুকরোর আঘাত সামলে নিতে বিড়াল অর্থাৎ নগেন মিত্রকে মিলিয়ে যেতে হল হাওয়ায়। এতেও সে ভয় পেল না। মলত্যাগ শেষ করে সে নামল খালের জলে। সে যখন জলখরচ করছিল, দ্বিতীয় দফা প্রচেষ্টা চালাল নগেন মিত্র। জাদু বলে বড় একটা ঢিল ছুঁড়ল খালের জলে। ঢিলটা পড়ল আব্দুল কাদেরের গা ঘেঁষে। মধ্যরাতের নির্জনতা ভেঙে খালের জলে প্রচণ্ড শব্দ হল-ঝপাৎ! কিন্তু সিঁধেল চোর আব্দুল কাদের মিয়া একটুও ভড়কাল না। উল্টো রাগী চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে মুখ খিঁচিয়ে বলল, ‘কোন শালা ঢিল মারলি রে! সামনে আয় দেখি!’
সিঁধেল চোরের এই অবস্থা! গৃহস্থের ভয়-ডর আছে কি-নেই, এ থেকেই অনুমান করা যায়। আজ অমাবস্যার তিথির শেষ রাত। এই রাতের মধ্যে যদি একজনও নগেন মিত্র ভয় দেখাতে না পারেন, তাহলে তাকে ভূতরাজ্যে ফিরে যেতে হবে। সাধারণ ভূত হয়ে বাস করতে হবে কারাগারে। অথচ এখনো তিনি জানতে পারেননি কে তাকে খুন করেছে। নিজ বাড়িতেও তিনি প্রতিদিন ঢুঁ মেরেছেন। স্ত্রী অমলা পুত্র-কন্যা নিয়ে ভালই আছে। ওদের আনন্দ-ফূর্তি দেখে মনে হয়নি- তিনি মরে গিয়ে সংসারের কোনো ক্ষতি হয়েছে। সংসারের এই দৃশ্যপট অবলোকন করে খারাপও লেগেছে, আবারও স্বস্তিও পেয়েছেন। কিন্তু কে বা কারা এবং কেন তাকে খুন করেছে, এর কোনো ক্লু তিনি অমলার আচরণ থেকে এখনো অনুমান করতে পারেননি। একবার বলরাম ডাকাতের সঙ্গে ভাব বিনিময় হয়ে গিয়েছিল অমলার। ভাবটাও একটু মাখামাখির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। বলরাম ডাকাতের সঙ্গে একরাতে পালিয়েও গিয়েছিল অমলা। দু’দিনের মধ্যে খুঁজে বের করে ফেলেছিলেন নগেন মিত্র। ধরে এনে বলরামকে যথেষ্ট প্যাঁদানী দিয়েছিলেন। জেলারের স্ত্রীকে নিয়ে পলায়ন সহ্য করার মতো নয়। এ ধরনের দুষ্কর্মের কঠিন সাজা হওয়া উচিত। চরিত্রহীন, লোভী ও দুঃসাহসী বলরামকে নগেন মিত্র অনেক কারসাজি করে বড় একটি ডাকাতি মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড করিয়েছিলেন। এরপর থেকে আর কোনো ডাকাত-দস্যু বা কারাবন্দী আসামী অমলার দিকে চোখ তুলে তাকাতে সাহস করেনি। অমলাকে অবশ্য তিনি শাস্তি দেননি। চাঁদের যেমন কলঙ্ক আছে, তেমনি অমলার বলরামের সঙ্গে পালিয়ে যাবার মোহগ্রস্ত ঘটনাটাকেও ‘কলঙ্ক’ হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন তিনি। এ ঘটনার পর থেকে অমলা সম-সময়ই অপরাধীর মতো থাকত। আগে অমলার আদেশ-হুকুম পালন করতেন নগেন মিত্র। ঘর পালানোর পর থেকে নগেন মিত্রকে কোনো আদেশ-হুকুম অমলা করেনি। কারাগারে আসা দরিদ্র ও অজ্ঞ অপরাধীরা যেমন চুপসে থাকে, তেমনি অমলাও সংসারে চুপসে থাকত। বলরাম ছাড়াও তার খুনী হিসাবে আরও দু’জনকে সন্দেহ আছে। একবার নুরু নামে এক গরুচোরকে কারাগারে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন। গরু চুরির মামলায় সাজা হয়েছিল নুরুর। ওকে কারাগারের হিসাব রক্ষক বানিয়েছিলেন তিনি। প্রতিদিন কত আসামী আমদানি হল, কতজন বের হয়ে গেলÑ এই হিসাব রাখত নুরু। আমদানি হওয়া আসামীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে অর্থ আদায় করার কাজ ছিল ওর। অর্থ যা উঠত, তা চলে আসত তার কাছে। তিনিই এই অর্থ থেকে নুরুকে কিছু দিতেন। কিন্তু চোরের মন তো লোভে পূর্ণ! অর্থ সরিয়ে ফেলার তথ্য যাচাই করে নুরুকে হাতে-নাতে ধরেছিলেন তিনি। এরপর কয়েকজন কয়েদী দিয়ে নুরুকে আচ্ছা করে ধোলাই করেছিলেন। চারজন কয়েদী বেধড়ক পিটিয়ে ছিল নুরুকে। বিশ্বাস ঘাতকের শাস্তি! মারের চোটে ও রক্তবমি করে ফেলেছিল। হাসপাতাালে নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন ওর। এ ঘটনার দু’সপ্তাহ পর নুরু উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কারাগার থেকে বের হবার সময় দু’-একজন কয়েদীকে নুরু বলেছিল, ‘জেলার নগেনকে সময় মতো দেখে নেব!’ কথাটা তার কানে এসেছিল। একজন গরু চোরের হুমকি গায়ে মাখেননি তিনি। তবে আকস্মিকভাবে খুন হবার পর সম্ভাব্য খুনী হিসাবে নুরুকেও তিনি সন্দেহ করেন। সন্দেহের তীর তার ভাগ্নে সমীরণের দিকেও আছে। নগেন মিত্র বেনামে যত জমি কিনেছিলেন তার অধিকাংশ ছিল সমীরণের নামে। সরকারি চাকুরি করলে কত হুজ্জৎ পোহাতে হয়। বিষাক্ত সাপের ফণা তুলে চেয়ে থাকে দুদক। যদিও দুদককে তার সব-সময় বিষহীন, দন্তহীন সর্পই মনে হয়েছে। সাপ ফণা তুললে মুখে কলা গুঁজে দিলেই হয়। এই কসরৎ জানতেন তিনি। কিন্তু তারপরও সাবধান থাকতে হতো। সাবধানের মার নেইÑ কথাটা গুরুজনরাই বলে গেছেন। সমীরণের মাথায় বিষয়-বিত্তের বুদ্ধি ছিল না বলেই ওর নামে তিনি বিভিন্ন স্থানে জমি কিনেছিলেন। ভয়ের কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু তিনি খুন হবার এক বছর আগ থেকে আকস্মিকভাবে সমীরণ নিখোঁজ হয়ে গেল। কয়েক কোটি মূল্যের জমি ওর নামে। সমীরণ নিখোঁজ হবার পর তার মনে নানা সন্দেহ-আশঙ্কা দানা বাঁধতে থাকে। সমীরণকে তিনি অনেক খুঁজেছেন। তথ্য-তালাশ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। উড়ো খবরও পাচ্ছিলেন। একবার খবর পেলেন সমীরণ দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছে। খবরটি সঠিক কিনা জানতে পারেননি। নিশ্চিত হতে পারলে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ওকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতেন। সমীরণ একবার হাতের কাছে পেলেই জমি নিজের নামে লিখিয়ে নিতেন তিনি। ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতেন। তা আর হয়নি। সমীরণের মা সন্ধ্যা ছাড়া ওর ত্রিকূলে কেউ নেই। সন্ধ্যা তো গ্রামের বাড়িতেই পড়ে থাকত। একমাত্র বোন সন্ধ্যাকে তো আর সমীরণের জন্য মারধর করা যায় না। নজর রাখছিলেন বোনের ওপর। কিন্তু সমীরণের দেখা মেলেনি। ও নিখোঁজ হবার এক বছর পেরুতেই অক্কা পেলেন তিনি। তার অর্থে ক্রয়কৃত কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি আত্মসাৎ করার জন্য সমীরণ তাকে খুন করাতে পারেÑ এই সন্দেহ ও আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সম্ভাব্য তিনটি ঘটনার কারণে নগেন মিত্র নিশ্চিত হতে পারছেন না, আসলে কোন ঘটনার কারণে কে বা কারা তাকে খুন করেছে?
নগেন মিত্র হতাশ হলেন ছিঁচকে চোরের সাহস দেখে। শুধু হতাশ নয়, বেশ বিমর্ষও হলেন। ভূত বলে তা দেখা যাচ্ছে না। এরপর তিনি কী করবেন বা কাকে ভয় দেখাবেনÑ এ কথা ভাবতে লাগলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্তের মতো। ভোর হবার সময় চলে আসছে। চারপাশটায় তাকিয়ে দেখলেন অন্ধকার ফিকে হয়ে আসবে ধীরে ধীরেÑ এমন পরিবেশ উঁকি দিচ্ছে গাছের ডাল-পালা ঠেলে। গাছের দিকে তাকাতেই তিনি অদ্ভুত একটা দাঁড় কাক দেখতে পেলেন। দাঁড় কাকটি গম্ভীর হয়ে মগডালে বসে আছে। কাকের মুখ বড্ড কুৎসিত। যেন এসিডে ঝলসে যাওয়া বিকৃত মুখ! কাকটিকে এক ঝলক দেখে নগেন মিত্রই যেন ভয়ে কেঁপে উঠলেন। তার ভয়কাতুরে মুখের ছবিটা অবলোকন করেই যেন কুৎসিত চেহারার দাঁড় কাকটা অন্যমনস্কতা ঝেড়ে বলল, ‘ভয় দেখাতে এসে নিজেই ভয় পেলে চলবে? ভীরু-কাপুরুষরাও আজকাল দেখছি মরে ভূত হচ্ছে। কলিকাল-ই বটে!’
দাঁড় কাকের শ্লেষ মিশ্রিত কথাটা অপমানিত বোধ করলেও নগেন মিত্র তর্ক করার সাহস পেলেন না। চুপসে রইলেন। কাকটা ফের বলল, ‘নিজের খুনী কে, তা জানতে ভূতরাজ্য থেকে ধরায় কেউ আসে? এমন হদ্দ বোকা ভূত আমি আর দেখিনি।’
ছেদ করে কথাটা বিঁধল যেন অনুভবে। নগেন মিত্র ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কাকের দিকে। কাক বলে যায়, ‘ভূতরাজকে জিজ্ঞেস করলেই তো জানা যেত কে তোমাকে খুন করেছে। ভূতরাজের এমন দৈব্য শক্তি আছে। তা না করে, এই ধরাধামে এসে কী হল? মানুষজনকে ভয় দেখানো কি সহজ কাজ? সেদিন ফুরিয়েছে।’
নগেন মিত্র মিনমিনে কণ্ঠে বলল, ‘তা তোমার পরিচয়? ভূত নিশ্চয়? দাঁড় কাক সেজে কাকে ভয় দেখাবে, শুনি? মুখটাই যা কুৎসিত, এই যা!’
কাকটা কি একটু বাঁকা হাসল? অন্ধকারে ভাল করে ঠাহর করতে পারলেন না তিনি। কাকের কণ্ঠ ধ্বনিত হল, ‘আমি এক অভিশপ্ত ভূত। দাঁড় কাক হয়ে ধরাধামে সাজা খাটছি। তবে জেনো রাখো, আমি চাইলেই যে কাউকে ভয় দেখাতে পারি, কিন্তু দেখাই না।’
‘তাই নাকি? শক্তি থাকলে কাউকে ভয় দেখাও না কেন, তা জানতে পারি?’
‘ওটা আমার প্রতিবাদ।’
‘প্রতিবাদ? কীসের? কেন?’
‘মরে ভূত হবার প্রতিবাদ। আমি ভূতের জীবন চাই না।’
‘ভূতের জীবন তো কেউ চায় না।’
‘তোমরা চাও না, আবার মেনেও নাও। প্রতিবাদ করো না। মেনে নাও বলেই ভূত হয়ে থাকতে হয়।’
‘তুমি না মেনে কী হয়েছ?’
‘অভিশপ্ত ভূত হয়েছি। সাজা খাটছি। প্রতিবাদও করছি। প্রতিবাদের কারণে আমাকে ভূতরাজ্যে রাখা হয়নি। এটা কি জয় নয়? প্রতিবাদ ঠেকাতে ভূতরাজ্যে জেলখানা তৈরি করা হয়েছে। এটা কি কম্পন নয়?’
`হুম। তো?’
নগেন মিত্রের কণ্ঠে মৃদু বিদ্রুপ। দাঁড় কাক জোরালো কণ্ঠে বলে, ‘প্রতিবাদীর সংখ্যা বাড়লে ভূত হওয়াও একদিন ঠেকানো যাবে।’
‘এতে লাভ?’
প্রশ্ন নগেন মিত্রের। কাক বলে, ‘মরে গিয়েও ভূতরাজের গোলামী খাটবে, নাকি আত্মার শান্তি চাও?’
দাঁড়কাকের কথাটা রিনরিনিয়ে বাজতে থাকে কয়েকমুহূর্ত। নগেন মিত্র বলে, ‘তুমি প্রতিবাদ কীভাবে করো?’
‘ভূতরাজ যা বলে আমি এর উল্টোটাই করি অথবা তার কোনো নির্দেশ মানি না।’
‘তবে তো শাস্তি পেতেই হবে।’
‘ভূতের আবার শাস্তি কী? ভূত হয়েছি, এটাই তো বড় শাস্তি।’
আক্ষেপ ভরা কণ্ঠে বলে কাক। নগেন মিত্র একটু ভাবে। বলে, ‘ঠিক তো। এভাবে তো ভেবে দেখেনি!’
‘তাহলে এখন কী করবে?’
‘আমার খুনী কে, এখন থেকে তা আর জানতে চাইব না।’
বলে নগেন মিত্র। কাক জানতে চায়, ‘কেন?’
‘জেনেই বা কী হবে? ভূতের জীবন থেকে কি রেহাই পাব?’
‘না, মোটেই তা সম্ভব নয়।’
জবাব দেয় কাক। নগেন মিত্র জড়তাহীন কণ্ঠে বলে, ‘তাহলে ফিরছি এই ধরা থেকে। কাউকে ভয় দেখাতে না পারার গ্লানি থেকে মুক্ত হলাম।’
নগেন মিত্র ধ্যানস্থ হয়ে মনুষ্য-জগৎ থেকে ভূতরাজ্যে ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবেন। দাঁড় কাকের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর তিনি শুনতে পেলেন, ‘সকল খুনীকেই ভূত হতে হয়। ভূতরাজ্যেই তুমি তোমার খুনীর দেখা পাবে।’
নগেন মিত্র হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে যেতে অভিশপ্ত দাঁড়কাকের কথাটায় স্বস্তি পেলেন। এটা তিনিও চান। তিনি নিজেও প্রতারিত হয়ে রাগে-ক্ষোভে নিজের প্রেমিকাকে খুন করে ধামাচাপা দিয়েছিলেন- এ কথাটা মনে পড়ে গেল তার। হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বললেন- ভূতরাজ্যে খুনীদের জন্য জেলখানা।