- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
স্বপ্ন বিলাস
এক.
সিমিকে অবাক করে দিতে খুব ইচ্ছে হলো। প্রায় এক বছর হলো ওর সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। ওর সাথে দেখা নেই। গত এক বছরে ওকে একবারো ফোন করিনি। ওর সাথে যোগাযোগ হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিই। প্রথম প্রথম ও আমার খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছে। আমার বন্ধু আনিসের কাছে ম্যাসেজ রেখেছে ওকে ফোন করার জন্য। আমি জানি, উপেক্ষা সিমিকে ভীষণ খেপিয়ে তোলে। ইচ্ছে করেই আমি ওকে উপেক্ষা করেছি। একটা পর্যায়ে সিমি আমার সাথে যোগাযোগ করার আর চেষ্টা করেনি। গত এক বছর সিমির কথা যেনো ভুলেই গিয়েছিলাম। আজ ওর কথা খুব মনে পড়ছে। কেনো পড়ছে জানি না। আমার কারো প্রতি দুর্বলতা জন্মে না। কিংবা হয়তো জন্মে, আমি বুঝতে পারি না। অন্য সবাই সম্পর্ককে যেভাবে ধরে রাখেন বা সম্পর্কের একটি রূপ দেন, আমি সেভাবে ধরে রাখতে পারি না। রূপ দিতেও পারি না। কোনো সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা আমি করি না। এমনকি, কারো সাথে পরিচয় হলে তার সাথে আমার কী সম্পর্ক দাঁড়ালো তা নিয়ে মাথাও ঘামাই না। আমি আমার ভুবনেই সীমাবদ্ধ। নিজের সমস্যায় ডুবে থাকা নিঃসঙ্গ এক মানুষ আমি। সময় কতো কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি সময়ের স্রোতে ভেসে চলা যেনো উদ্দেশ্যহীন খড়কুটো। আমাকে পরিচিতদের অনেকে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ ‘অহংকারী’ ‘অসামাজিক’ ইত্যাদি বলেন। বন্ধুরা খেপে গিয়ে বলে-
‘তুই নিছক একটা প্রাণী। বস্তুবাদ বা ভাববাদ কেনোটাতেই তোকে ফেলা যায় না। এই পৃথিবীতে তোর অস্তিত্ব অর্থহীন।’
আমি তখন নিজের পক্ষ নিয়ে বলি- ‘আমার ভালো কোনো দিক কি নেই?’
‘আছে, তোর হাসিতে যাদু আছে। তোর হাসির সামনে সব রাগ গলে যায়। আর তোর উপস্থিতিকে উপেক্ষা করা যায় না। এ দুটি জিনিস নিয়েই তুই আমাদের পছন্দের মানুষ হিসেবে আছিস।’
বন্ধুরা আমাকে পছন্দ করে। আমি বুঝতে পারি, বন্ধুদের কাছে আমার একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে। আমার অসহায়ত্ত ওদের সামনে মেলে ধরি না। ওরা আমাকে ভালোবাসে, করুণা করে না। ওরা যখন আমার প্রশংসা করে, আমি হাসিতে ফেটে পড়ি। বন্ধুরা সুযোগ পেলেই আমার হাসির প্রশংসা করে। কিন্তু সিমি আমার হাসি একদম পছন্দ করে না। আমি হাসলেই ও রেগে যেতো। আর আমিও ওকে খুব রাগাতাম। সিমি কেনো জানি, যে কোনো বিষয়ে আমার ওপর চট করে রেগে যেতো। অন্য সবার সাথে ও বিনয়ী, নম্র ও বিনীত। শুধু আমার সাথে ওর যতো রাগ! আবার আমার সাথেই ও ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতো। আমি কোনোদিন ওর কাছে এর কারণ জানতে চাইনি। জানার ইচ্ছেও করেনি। ওর সাথে প্রায় দুই বছর এককাট্টা হয়ে ঘুরেছি। বন্ধুর মতো দুজন দুজনকে সঙ্গ দিয়েছি। আমাদের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল, না-কি তার চেয়েও বেশি কিছু? প্রশ্নটি মনে বিঁধে থাকলেও এর জবাব খুঁজে দেখিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আমরা সবচেয়ে বেশি আড্ডা দিয়েছি। টিএসসির চত্বর, পাবলিক লাইব্রেরি, মধুর ক্যান্টিন, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট, গাউছিয়ায় ছিল আমাদের হরহামেশা যাতায়াত। অনেকগুলো দুপুর আমরা ব্যয় করেছি বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে। কথা, কথামালা, তর্ক-ঝগড়া বা সমঝোতার সব পাঠই ছিল আমাদের সম্পর্কের অধ্যয়নে। ওর সাথে আমি এতোটা ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছিলাম যে, অনেকে আমাদের প্রেমিকযুগল ভাবতো। সিমির ক্লাসমেটরা আমাকে নিয়ে ওর সাথে ওসবের ইঙ্গিত দিয়ে রসিকতাও করতো। কেউ বিশ্বাস করতো না যে, আমাদের মধ্যে কোনো হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক নেই। এ নিয়ে সিমি মাঝে মাঝে আমাকে রেগে গিয়ে বলতো-
‘তুমি আমার সাথে আর ঘুরবে না। ফোনও করবে না। তোমার সাথে আমার সম্পর্ক কী, এ প্রশ্ন করছে অনেকে।’
আমি ওর কথায় খুব হাসতাম। এতে ও আরো রেগে যেতো। কখনো ও ভীষণ রেগে বাড়ি চলে যেতো। আমি তখন কিছুই বলতাম না। চলে না যাবার জন্য বাধাও দিতাম না। কিন্তু রাতে ওর বাসায় ফোন করতাম। ও তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার সাথে কথা বলতো। যেনো কিছুই হয়নি। আমরা আবার দেখা করতাম। ঘুরতাম। কথার রংধনু এঁকে, গল্পের ফানুস উড়িয়ে বা তর্ক-বিতর্কে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়াতাম রিকশায়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন গলিপথে আমরা রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছি। সিমি রিকশায় ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতো। আমি ঘণ্টা চুক্তিতে রিকশা ভাড়া করতাম। ও আমার সাথে ঘুরতে পছন্দ করতো। কিন্তু সুযোগ পেলেই বলতো-
‘তোমার সাথে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে না। কোনো চার্ম নেই।’
আমি ওর এ ধরনের কথায় রাগ করতাম না। আমি জানি, ওর এ কথাটি সত্যি নয়। সত্যি কথাটি প্রকাশ করতে ও হয়তো উল্টোদিক দিয়ে শুরু করতে চায়। আমি বুঝতে পারি, আমার উপস্থিতি ওকে উচ্ছ্বসিত করে। কিন্তু মাঝে মাঝে ও আমার প্রতি নির্লুপ্ত ভাব দেখায়। মেয়েরা নিজস্ব ভালোলাগাটুকু অপছন্দের মোড়কে ঢেকে রাখতে চায়। এটা হয়তো নিজেকে সংযত করার কৌশল। আমি সিমিকে খুব সহজে বুঝতে পারি। পড়তে পারি। আমার প্রতি ওর কপট রাগের আড়ালে যে অনুরাগের রংধনু আছে, তা আমি জানি। কিন্তু আমিও ওকে বুঝতে দিই না। ওর যতো রাগ বা উপেক্ষা আমি নীরবে মেনে নিই। আমার প্রতি ওর যতো রাগই থাকুক, যে কোনো ব্যাপারে আমার ওপর ও নির্ভরও করতো সবচেয়ে বেশি। আজ সিমির কথা মনে হতেই ওর কপট রাগের মিষ্টি মুখটি মনে পড়ে গেলো। সিমি আমাকে অনেক সময় উপেক্ষাও করেছে। আমাকে অনেকে উপেক্ষা করে। কেউ আমাকে উপেক্ষা করলে আমি বিষণ্ন হই না। উপেক্ষা আমার সয়। অবহেলা খুব চেনা। শিশু বয়স থেকেই উপেক্ষা, অবহেলা, অনাদর আমার খুব চেনা। আমার মধ্যে এ নিয়ে দুঃখ নেই। নিয়তির পরিহাস ভেবে সব মেনে নিই।
আমি দাঁড়িয়ে আছি একটি টেলিফোন বুথে। সিমিকে ফোন করে চমকে দেবো আজ। তিন বছর আগে এমন একটি দিনে সিমিকে ফোন করে চমকে দিয়েছিলাম। সিমির সাথে পরিচয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি ওকে ফোন করে ঘুরতে যাবার প্রস্তাব দিই। সেদিন আমিও নিজেকে নিজস্ব বৃত্ত থেকে বের করে এনেছিলাম। এটিই আমার জীবনের এ পর্যন্ত সবচেয়ে সাহসী কাজ। এর আগের দিন সিমির সাথে আমার পরিচয় হয় আনিসের মাধ্যমে। সেদিনটির কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন বিকেলে চাকরির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে আমি আনিসের মতিঝিলের অফিসে যাই। মতিঝিল এলাকায় গেলে আমি আনিসের অফিসে ঢুঁ মারি। আনিসের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের বিশাল পরিসরে ব্যবসা। এটি ওদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ওদের প্রতিষ্ঠান ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, কোরিয়ার ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারিজ আমদানি করে এবং দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে। ওর অফিসে গেলে মনটা জুড়িয়ে যায়। সুন্দর অফিস। সেক্রেটারি, কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যস্ততা। আনিস আমার বন্ধু ভাবতে ভালো লাগে। আনিস আমাকে ওর অফিসে দেখে খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। চেয়ার ছেড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। বললো-
‘আ-কা-শ! ঠিক সময়েই এসেছিস। তোকেই আজ দরকার।’
‘কেনো?’
‘দোস্ত, আমার এক আত্মীয়ার অনুষ্ঠান আছে শিশু একাডেমিতে। তোকে নিয়ে যেতে চাই।’
‘আমি যাবো কেনো?’
‘এমনিই যাবি। একা যেতে চাচ্ছি না। তোর সাথে সিমির পরিচয় করিয়ে দেবো।’
‘সিমি কে?’
‘ও উঁচুমাপের আবৃত্তি শিল্পী।’
‘এবার তা হলে আবৃত্তি শিল্পীর শিকারে নেমেছিস!’
‘আহ, অমন করে বলিস নে, বাপ। ও আমার বান্ধবীর ছোট বোন।’
‘কোনো বান্ধবীর ছোট বোন?’
‘রিমির।’
রিমির কথা আমি জানি। রিমি আনিসের ডিপার্টমেন্টে পড়তো। ওরা ক্লাসমেট ছিল। আনিসের সাথে রিমির হৃদয়ঘটিত সম্পর্কও ছিল। ওদের সম্পর্কটা কোনো পরিণতি লাভ করেনি। আনিসের সাথে সিমিদের পারিবারিক সম্পর্কটা আছে। আনিসের মুখ থেকেই এসব কথা শুনেছি। প্রশ্ন করি-
‘বান্ধবীর ছোট বোনকে নিয়ে তোর এতো উৎসাহ কেনো?’
‘তোর গলায় ওকে ঝুলিয়ে দেবো, তাই।’
আমি হো হো করে হেসে উঠি।
‘তোর মতো নিরস লোককে কে বিয়ে করবে বল? সিমি যদি তোকে দয়া করে, তবে তোর একটা হিল্লে হতে পারে।’
আনিস আমাকে ছাড়ে না। সন্ধ্যা পর্যন্ত ওর অফিসে আড্ডা মারি। সন্ধ্যায় ওর পাজেরো জিপে চড়ে বেড়িয়ে পড়ি দুজনে। আনিসের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পেরে ওঠা যায় না। কিংবা আনিস ওর ইচ্ছাকে ব্যর্থ হতে দেয় না। ও যখন যা চায়, তা আদায় করে নেয়। বিপুল অর্থ-বিত্তের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা আনিস সবসময় নিজের ইচ্ছার রঙে নিজের মতো করে ভুবন রাঙিয়ে নেয়। ওর জীবন ও যাপনের মধ্যে হাহাকার দেখা যায় না। ওর চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে ফারাক কম। ও যে স্বপ্ন দেখে, তা ফিকে হতে দেয় না। হাত বাড়িয়ে পাওয়ার আনন্দ ও উপভোগ করে সহজভাবে। ও যা চায়, তা বেপরোয়াভাবে চায়। ওর পাওয়ার উপাখ্যান এতোটা ভারি যে, ও এখন না পাওয়ার কথা ভাবে না। ওর স্বপ্নের কোনো সীমারেখা নেই। একটি স্বপ্ন ভেঙে আরেকটি স্বপ্ন গড়ার খেলায় ও সবসময় মশগুল। চঞ্চলতা ওর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তবে ওর মধ্যে একটা সরলতাও আছে। ও যা চায়, সরাসরি চায়। কোনো ভণিতা করে না। ও অকপটে নিজের দোষ স্বীকার করে। কোনো কপটতা নেই। এ কারণে আমি আনিসকে খুব পছন্দ করি। মাঝে মাঝে আমার আনিসের মতো হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি নিজের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। আনিসের একটা অপছন্দনীয় প্রবণতাও আছে। ও হুটহাট মেয়েদের প্রেমে পড়ে যায়। এ পর্যন্ত এক ডজন মেয়ের নাম আমি জানি, যাদের প্রত্যেককে ও প্রেম নিবেদন করেছে। প্রাচুর্যের একটা শক্তি আছে। এই শক্তি আনিসকে অনেকবার জিতিয়ে দিয়েছে। ওর প্রেমের অফার খুব একটা রিফিউজড হয়নি। কিন্তু কোনো মেয়েকেই ও ধরে রাখতে পারে নি। কিংবা ও ধরে রাখতে চায়নি। পেছনের পাতা পেছনে ফেলে আনিস সামনের দিকে ধাবমান। আনিসকে বলি- ‘তোর প্রেম প্রেম খেলা থামবে কবে?’
‘দোস্ত, এবার ঠিক করেছি, বিয়ে করে ফেলবো। আমি এখন ক্লান্ত পথিক।’
‘যাক বাবা, এই প্রথম তোর মুখে থামার কথা শুনলাম!’
আমরা শিশু একাডেমির মিলনায়তনে গিয়ে দেখি, সিমি আবৃত্তি করে ফেলেছে। মঞ্চে অন্য একজন আবৃত্তি শিল্পী আবৃত্তি করছিল। আবৃত্তি শোনার আগ্রহ মানুষের কম। তাই মিলনায়তন ফাঁকা। আমরা সামনের দিকের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিলাম সিমির আবৃত্তি শোনার জন্য। কিন্তু সিমি গ্রিন রুম থেকে বেরিয়ে এসে আনিসের সামনে এসে বললো-
‘আনিস ভাই, আমি জানতাম আপনি সময়মতো আসতে পারবেন না। তবুও যে এসেছেন, এজন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি আবৃত্তি করে ফেলেছি। কিছুক্ষণ পরই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু…!’
‘কোনো কিন্তু নয়, আপনি যথাসময়ে আসেন নি।’
‘হ্যাঁ, আমি তো জানি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যথাসময়ে শুরু হয় না এবং বিলম্বে শেষ হয়। তাই…!’
‘আপনার ধারণা অমূলক নয়। কিন্তু আমাদের অনুষ্ঠান যথাসময়েই শুরু হয়েছে।’
আনিস বিব্রতবোধ করতে থাকে। আমি বলি-
‘আপনি কি আনিসের জন্য আরেকবার মঞ্চে গিয়ে আবৃত্তি করতে পারবেন?’
আমার কথায় সিমি যেনো অবাক হয়।
‘আপনাকে তো চিনলাম না!’
‘ও আমার বন্ধু। আকাশ।’ আনিস আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়।
সিমি বলে- ‘আকাশ সাহেব, আমি কোনো কমার্শিয়াল শিল্পী নই যে বললেই মঞ্চে উঠে পারফর্ম করে আসবো।’
সিমি নিজের শিল্পীসত্ত্বার মর্যাদার জানান দেয়। আমি বিনীতভাবে বলি-
‘আমি এরকম ভেবে বলিনি। আসলে আপনার আবৃত্তি শোনার ইচ্ছে আমারও ছিল। আনিস বলছিল, আপনি খুব ভালো আবৃত্তি করেন। যাক, আপনার আবৃত্তি শোনার সৌভাগ্য আর হলো না।’
আনিস বললো- ‘আকাশকে ধরে নিয়ে এসেছি তোমার আবৃত্তি শোনার জন্য। ঠিক আছে, অন্য কোনো দিন না হয় শোনা যাবে। কী বলিস আকাশ?’
‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’
সিমি যেনো খানিকটা লজ্জা পেলো। ও বললো-
‘সরি, আমার কথায় রাগ করবেন না। অন্য একদিন আপনাকে আবৃত্তি শোনাবো।’
‘কথা দিচ্ছেন?’
‘দিলাম।’
আনিস বললো- ‘সিমি, আমার বন্ধুটা কিন্তু মেয়েদের মনের তাপমাত্রা বুঝতে পারে না। আর যা-ই করো, ওকে মনের আগুনে পুড়িয়ো না!’
আনিস সিমি আর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। যেনো আমাদের মধ্যে একটা লুকোচুরির সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। ওর কথায় আমি খানিকটা বিব্রত হলাম। সিমিও লজ্জা পেলো। ও বললো-
‘আনিস ভাই, আপনি যে কী!’
সেদিন সিমিকে আমরা ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলাম। আনিস আমাকে ছাড়েনি। তাই আমাকেও সাথে যেতে হলো। আমি আনিসের পাশের সিটে বসেছিলাম। সিমি বসেছিল গাড়ির পেছনের সিটে। শিশু একাডেমি থেকে মিরপুর পর্যন্ত যেতে গাড়িতে সিমি কোনো কথাই বলেনি। গাড়ি ওদের বাড়ির সামনে আসার পর সিমি বললো-
‘আপনারা বাসায় আসুন।’
‘আজ নয়। আমার একটা জরুরি কাজ আছে।’
আনিসের জবাব।
‘না, তা হয় না। আপনার বন্ধু আকাশ প্রথম এসেছেন…!’
‘ওর জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। অন্য একদিন ওকে নিয়ে আসবো।’
সিমি আমার জানালার সামনে এসে বললো-
‘আরেকদিন কিন্তু আসতে হবে!’
‘আসলে ফিরিয়ে দেবেন না তো?’
‘না, ফিরিয়ে দেবো না। ফোন করে আসবেন।’
‘তা হলে ফোন নম্বর দিন।’
‘লিখুন- ৮০২০০৪৮।’
সিমি চলে গেলো। আমরা ওদের বাড়ির গেট থেকে ফিরে এলাম। তখনো ভাবিনি সিমির সাথে আমার আবার দেখা হবে।
দুই.
আমজাদ হোসেন আমার চাচার বন্ধু। তিনি বিআরটিএ-তে চাকরি করেন। সেকশন অফিসার। চাকরির বয়স ফুরিয়ে এসেছে। এ বছরই এলপিআরএ যাবেন। তিনি থাকেন ৬নং মিরপুরে। চাকরির জন্য প্রায়ই তাকে ফোন করি। তিনি আমার জন্য চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম মিরপুরে। ফেরার পথে হঠাৎ সিমির কথা মনে পড়ে গেলো। সিমিদের বাড়ি ১১ নম্বরে। সিমি বলেছিল আবৃত্তি শোনাবে। হঠাৎ করে আমার আনিস হতে ইচ্ছে করলো। একটা খেপাটে ইচ্ছে মনে তোলপাড় তোলে। নিজেই অবাক হই নিজের এই পরিবর্তনে। এক অদ্ভুত ও অচেনা তাড়নায় সিমিকে ফোন করি। আমার ফোন পেয়ে সিমি ভীষণ অবাক হয়। ওকে আরো অবাক করে দিয়ে বলি- ‘সিমি, আপনি কি আমার সাথে কিছুটা সময় ঘুরে বেড়াবেন?’
‘কেনো!’
‘বিশেষ কোনো কারণ নেই। আপনার সাথে ঘুরতে ঘুরতে আপনার আবৃত্তি শুনতে ইচ্ছে করছে।’
‘আপনি আমাদের বাসায় এসেও তো অবৃত্তি শুনতে পারেন!’
‘আসলে আমার আপনার সাথে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করছে।’
‘কিন্তু আমি কেনো আপনার সাথে ঘুরতে যাবো!’
‘আপনার ইচ্ছে না হলে দরকার নেই। আমি একাই ঘুরবো।’
‘আপনি কোথায়?’
‘আমি আপনাদের বাড়ির সামনের একটি টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করেছি’।
‘কিন্তু?’
‘সরি, আমি আপনাকে বিব্রত করে ফেলেছি।’
‘আচ্ছা, আপনি অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।’
সিমির কণ্ঠে বিরক্তি। এতে খারাপ লাগলো না। অল্প পরিচিত একটি মেয়েকে ঘুরতে বেড়ানোর প্রস্তাব দিলে যে কেউ বিরক্ত হবে। আমি সিমির আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম। এবং নিজের ভেতরে নিজের একটা চ্যালেঞ্জ অনুভব করতে লাগলাম। সিমি কী সত্যিই আসবে! যদি আসে, ও কী খুুব সেজে আসবে? এ প্রশ্নটি অবান্তর হলেও আমার ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগলো। মেয়েদের সাজসজ্জা নিয়ে আমার তেমন কৌতূহল নেই। কিন্তু এখন কেনো জানি মনে হচ্ছে, সিমি সেজে এলে ভালো লাগবে। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এই স্থান থেকে কিছুটা পথ এগুলে বোটানিক্যাল গার্ডেন। আমার মাথার ওপর হেমন্তের উজ্জ্বল দুপুর। চারপাশ কেমন রোদেলা, ঝকঝকে। হালকা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত অবস্থায় দেখতে লাগলাম, রিকশা বা স্কুটারে চড়ে প্রেমিক যুগলরা যাচ্ছে বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে। ওদের উচ্ছ্বাসভরা মুখ দেখে মনটা পরিচ্ছন্ন আকাশের মতো হয়ে গেলো।
সিমি এলো প্রায় ত্রিশ মিনিট পর। সাজসজ্জার কোনো লেশ নেই। ওর গায়ে বিশ্রি কটকটে হলুদ রঙের কামিজ-পায়জামা। খোলা চুল। পায়ে সস্তা স্যান্ডেল। বিরক্তিভরা মুখ। ওকে দেখে আমি খুব হতাশ হলাম। ও আমার সামনে এসে বললো-
‘এই তো সেদিন মাত্র পরিচয় হলো, আর আজই চলে এসেছেন ঘুরতে! আপনি কী মেয়েদের খেলনা ভাবেন?’
কথা নয়, যেনো আগুনের হলকা! আমি কৈফিয়ত দেবার কণ্ঠে বললাম-
‘বিশ্বাস করুন, আমি কখনো কোনো মেয়েকে ঘুরে বেড়ানোর প্রস্তাব দিইনি। আজ কী ভেবে, আপনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে হলো।’
‘কিন্তু আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে হলো কেনো? আমাকে প্রেম নিবেদন করবেন না তো!’
আমি হেসে ফেলি। বললাম- ‘প্রেম-ট্রেমের সস্তা আবেগ আমার মধ্যে নেই। আপনার আপত্তি থাকলে ফিরে যেতে পারেন।’
সেদিন সিমি আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। আমরা বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘুরেছি। আমরা দুই ঘণ্টা ঘুরে বেড়ালাম। এ দুই ঘণ্টায় আমরা যেনো খুব কাছাকাছি চলে এলাম। দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। দুজনের কী পছন্দ, কী অপছন্দ এবং আবৃত্তি ও সাহিত্য বিষয়েই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এটুকু আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা একে-অন্যে যেনো একটি রেখাপাতের সৃষ্টি করলাম। এরপর থেকে সিমিকে মাঝে মাঝে ফোন করতে লাগলাম। টেলিফোনে আলাপ বেশ কদিন চললো। এরপর মুখোমুখি আড্ডা এবং রিকশায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। ঘুরে বেড়ানোটা আমাদের যেনো নেশা হয়ে গেলো। আমি কোনো কেনাকাটা করলে সিমিকে সঙ্গে নিয়ে যাই। সিমি কামিজ তৈরি বা কিছু কিনতে গেলেও আমাকে সাথে নিয়ে যাবে মার্কেটে। আমাদের চলাফেরা এমন পর্যায়ে চলে গেলো যে, অবসরে চিন্তায় সিমির কথা ভিড় জমাতে শুরু করলো।
‘হ্যালো, আমি কি সিমির সাথে কথা বলতে পারি?’
‘অপেক্ষা করুন, ডেকে দিচ্ছি।’ অন্য প্রান্তে একজন বয়স্ক পুরুষের ভারি কণ্ঠ। সম্ভবত সিমির বাবা। এর আগে যতোবার ফোন করেছি সিমির মা ধরেছেন। তিনি খুবই বিনয়ী। সিমিকে ডেকে দিয়েছেন। সিমির বাবা ওকে ডেকে দেবেন কি-না, কে জানে! কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছিল খানিকটা বিরক্ত হয়েছেন। কোনো ছেলে বন্ধুর টেলিফোনের জন্য মেয়েকে ডেকে দিতে যে কোনো বাবারই অস্বস্তি লাগতে পারে। আমি টেলিফোন ধরে অপেক্ষা করছি আর ভাবছি। সিমির সাথে আমার শেষ দেখা কবে হয়েছিল, তা মনে নেই। হঠাৎ করেই ওর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিই। ও অনেকদিন আনিসের কাছে আমার খোঁজ নিয়েছে। আমাকে ফোন করতে বলেছে। আমি ওকে ফোন করিনি। নিজের ভেতর থেকে কে যেনো বললো, সংযত হও। ব্যাস, নিজের ভেতরে নিজেরই নির্বাসন।
‘হ্যালো, সিমি বলছি…।’
‘আকাশ বলছি।’
‘আ-কা-শ!’
‘হ্যাঁ, কেমন আছো?’
‘এতোদিন পর খবর নিতে ইচ্ছে হলো! আমি তো ভেবেছি, তুমি আমাকে ভুলেই গেছো!’
‘ভুলে থাকতে চাইলেই কি ভুলে থাকা যায়? আজ তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। তুমি কি এখন আসতে পারবে?’
‘কেনো, তোমার কি হয়েছে?’
‘কিছু হয়নি তো!’
‘তোমার কণ্ঠ কেমন ভারি লাগছে।’
‘অনেকদিন পর তোমার কণ্ঠ শুনে আবেশিত হয়ে গেছি।’
‘ইডিয়ট!’
‘চলে আসো। আজ সারাদিন ঘুরে বেড়াবো।’
‘তুমি কোথায়?’
‘ফার্মগেট ওভারব্রিজে চলো আসো। আমি ওখানে অপেক্ষা করবো।’
‘আমি আসছি।’
ফোন রেখে দিলাম। সিমি আসছে। আমি ওর জন্য ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
তিন.
সিমি এলো শাড়ি পরে। নীল রঙের জামদানি শাড়ি। ওকে কখনো শাড়ি পরা অবস্থায় দেখিনি। কপালে নীল টিপ। চুল বাঁধা। সিমিকে আজ অন্যরকম লাগছে। ওর দিকে তাকিয়ে কেমন মুগ্ধ হয়ে যাই। চোখের পলক পরতে চায় না। সিমি মিটিমিটি হাসছে। যেনো আমাকে অবাক করে দিয়ে ও মজা পাচ্ছে। ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো-
‘অমন হা করে কি দেখছো?’
‘তোমাকে। শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে!’
‘আমাকে শাড়ি পরা দেখে খুব অবাক হয়ে গেছো?’
‘অবাক হবার চেয়ে চমকে গেছি খুব।’
‘চমকে গেছো! কেনো?’
‘তোমাকে বউ বউ লাগছে।’ এ কথায় না রেগে গিয়ে সিমি লজ্জা পেয়ে গেলো। ও বললো-
‘তা এই বউকে নিয়ে ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, না ঘুরতে যাবে? চারপাশের লোক হা করে দেখছে!’
ও এমন মিষ্টি একটা জবাব দেবে, ভাবিনি।
‘ঠিক আছে, চল।’
আমরা ওভারব্রিজ থেকে নিচে নামার জন্য হাঁটতে লাগলাম। সিমির গা থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে। দুজনে পাশাপাশি হাঁটার সময় সিমি আমার বাঁ হাতটি ধরে নিলো। আমি বাধা দেই না। আমার ভালো লাগে। ও ঘনিষ্ঠ হয়ে হাঁটতে থাকলো। ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধ আমাকে মাতাল করে তোলে। আমি মুহূর্তেই অদ্ভুত মাদকতায় বুঁদ হয়ে যাই। ফুটপাত ঘেঁষে রাস্তায় থেমে থাকা রিকশাগুলোর সামনে এসে দাঁড়িয়ে একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালাকে ইশারায় ডাকলাম। ঘুরে বেড়ানোর জন্য বয়স্ক রিকশাওয়ালা ভালো। কিশোর বা যুবক রিকশাওয়ালারা বেপরোয়াভাবে চালায়। বিশেষ করে আরোহী নারী হলে ওদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম ভাব কাজ করে। ওরা জোরগতিতে রিকশা চালাতে চেষ্টা করে। রাস্তার খানাখন্দ দেখে পথ চলে না। এ ছাড়া ওরা আরোহীদের কথপোকথন শোনার জন্য উদগ্রীব থাকে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বয়স্ক রিকশাওয়ালারা ধীরে চালায়। আরোহীদের কথাবার্তায় বিশেষ মনোযোগ দেয় না। আমাদের রিকশায় চড়ে সময় কাটানোটাই মুখ্য। তাই সব সময় বয়স্ক রিকশাওয়ালা আমি খুঁজি। একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালা রিকশা নিয়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো-
‘কোথায় যাবেন, স্যার?’
‘ঘণ্টা চুক্তি যাবেন? যেখানে ইচ্ছে ঘুরবো।’
‘পঁচিশ টাকা ঘণ্টা, স্যার।’
‘ঠিক আছে। সাবধানে চালাবে।’
আমরা দুজনে রিকশায় উঠে বসলাম। রিকশা চলতে শুরু করলাম। রিকশাচালক বয়স্ক হলেও রিকশা চালাচ্ছে একটু বেশি গতিতে। এতে ঝাঁকুনি লাগছে। সিমি বসেছে আমার বাঁ পাশে। রিকশার ঝাঁকুনি সামাল নিতে সিমি ওর ডান হাত দিয়ে আমার বাঁ হাত শক্ত করে ধরে রাখলো। ও আমার হাত ধরতেই পারে। কিন্তু আজ আমার ভেতরে কেমন ভাঙন হতে লাগলো। আড়ষ্টতা আর আবিষ্টতা আমাকে গ্রাস করলো।
‘কী ব্যাপার, তুমি এমন কাঠ হয়ে আছো কেনো?’
‘কই, না তো!’
‘আগে রিকশায় ঘুরে বেড়ানোর সময় তুমি কতো কথা বলতে! আজ কেমন চুপসে আছো! এক বছরে তোমার এমন বদল!’
‘আমার আবার বদল! এক বছর পর তোমাকে দেখলাম। তোমাকে কী সুন্দর লাগছে আজ! তাই ভাবের আবেগে ভাষাহীন হয়ে গেছি।’
‘তাই না-কি!’
‘জ্বি, ম্যাডাম।’
‘তা হলে তো সত্যিই বদলেছো। তোমাকে তো কখনো মুগ্ধ হতে দেখিনি!’
‘আমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টাও তো করোনি।’
‘তোমাকে মুগ্ধ করার আমার কী দায় পড়েছে?’
‘আজ কি আমার জন্য সেজে আসো নি? এটা কি দায় নয়?’
‘কোনো দায় থেকে সেজে আসিনি, স্মার্ট রমণীর দায়িত্ব থেকে সেজেছি।’
‘তবে এ আমার ভ্রান্তিবিলাস!’
‘জ্বি, জনাব। এবার বলো এতোদিন কোথায় ছিলে?’
‘এই শহরেই।’
‘আমার সাথে যোগাযোগ রাখোনি কেনো?’
‘ব্যস্ত ছিলাম।’
এ কথায় গম্ভীর কণ্ঠে সিমি বললো-
‘তোমার এড়িয়ে চলা বুঝতে পারি, আকাশ। শুধু জানি না, কেনো আমাকে এড়িয়ে চলো। আমি অনেকবার আনিস ভাইকে বলেছি, তুমি যেনো আমাকে ফোন করো। তুমি কোথায় থাকো তার ঠিকানাও আমাকে দাও নি। নিশ্চয়ই, আনিস ভাই তোমাকে আমার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে! সাধারণ সৌজন্যবোধ থাকলে, একটা ফোন করতে।’
ও হরহর করে কথাগুলো বলে গেলো।
‘সিমি। আমি আসলে…’
‘আমি জানি, তুমি এর জবাব তৈরি করে রেখেছো। তোমার সাথে আমি কথায় পারবো না। আমি শুধু জানতে চাই, তোমার এতো অহংকার কেনো?’
‘তুমিও আমাকে এ প্রশ্ন করলে?’
‘খুব কি কঠিন বা অবান্তর প্রশ্ন?’
‘কঠিন নয়, তবে বোঝার ভুল।’
‘কী রকম!’
‘আমি নিজেকে সংযত রাখতে পছন্দ করি।’
‘যেমন!’
‘আহ! এতোদিন পর দেখা হলো, আর তুমি কেবল জেরাই করে যাচ্ছো। এখন বলো, তুমি কেমন আছো?’
‘ভালো আছি।’
‘গত এক বছর কিভাবে কাটালে?’
‘গত এক বছরে আমার অনেক অভিজ্ঞতা বেড়েছে। অনেক ধরনের লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে। মানুষের চরিত্র কতো ফানি!’
‘কার কথা বলছো?’
‘নির্দিষ্ট কারো কথা বলতে চাইছি না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও আবৃত্তি চর্চা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত কতো রকম লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে এবং হচ্ছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, একেক মানুষ একেক রকম! বিশেষ করে পুরুষগুলোর চরিত্র বড় বিচিত্র!’
‘তুমি কি পুরুষ বিদ্বেষী হয়ে গেলে না-কি?’
‘হতেও পারি। তোমরা পুরুষরা কেবল দখল করতে চাও। জয় করতে চায় না।’
‘তাই না-কি! তোমাকে দখল করতে কে চায়?’
‘অনেক জনের নাম বলতে পারি। সবাইকে তুমি চিনো না। তোমার পরিচয়ের মধ্যে একজন আছে।’
‘আমার কৌতূহল বাড়ছে। কে সে?’
‘বলবো না।’
‘কেনো?’
‘কারণ, তোমাকে বলে লাভ নেই। তুমি আমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।’
‘এটা তোমার বিশ্বাস?’
‘হুম।’
আমি চুপসে যাই। আমার ভেতরে এক ধরনের বিব্রতবোধ পেখম ছড়িয়ে নেয়। সিমি কি সত্যি কথাটিই বললো? আমি কি ভরসা করার লোক নই?
‘তুমি কি রাগ করলে?’
‘নাহ।’
‘তুমি কি সত্যিই শুনতে চাও, কে আমাকে বিয়ে করতে চায়?’
‘বিয়ে?’
‘হ্যাঁ, বিয়ে।’
‘বিয়ে কি দখল করা?’
‘হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়। ধরো, একজনকে আমি চিনি না কিংবা চিনি, কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই। সেই ব্যক্তি যদি আমাকে বিয়ে করে, তা আমাকে দখল করা নয়?’
‘তুমি নিজেকে মানুষ এবং সামাজিক জীব ভাবলে তোমাকে সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হবে। তুমি তোমার পরিবারের প্রতিও দায়বদ্ধ। তা ছাড়া কজন বলো ভালোবেসে বিয়ে করতে পারে? পারিবারিক পর্যায়ে আমাদের সমাজে বিয়ে হচ্ছে। এটা চলে আসছে শত শত বছর ধরে। সামাজিক বিয়ের ভিত্তি ঠুনকো হলে তা এতোদিন টিকতো না। এই বিয়েকে তুমি নেগেটিভভাবে দেখছো কেনো? ভালোবাসার বিয়েও যে খুব মধুর হবে, তার গ্যারান্টি কী? আসলে, তোমাকে দেখতে হবে, তুমি যাকে বিয়ে করবে, সে তোমার যোগ্য কি-না। সে তোমাকে যথাযথ সম্মান ও অধিকার দেবার লোক কি-না। তার মানসিক গঠন, রুচি, স্বভাব, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি তোমার চাহিদা মতো আছে কি-না। তুুমি যদি আরো খুঁটিয়ে দেখতে চাও, দেখতে পারো তার সন্দেহ প্রবণতা, ঝগড়াটে মানসিকতা আছে কি-না এবং সে অসংস্কৃতিবান কি-না। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তি হলেও এই গুণাবলী থাকলে তুমি বিয়ে করতে পারো।’
‘বাহ, চমৎকার ব্যাখ্যা!’
‘খুব কি ভুল বললাম?’
‘মনে হয় না। তোমার কথা গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।’
‘যাক মনে হচ্ছে, অচিরেই তোমার বিয়ের দাওয়াত পাবো।’
বলেই আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম। সিমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভারি কণ্ঠে বললো-
‘আকাশ, আজ তোমাকে একটা প্রশ্ন করবো?’
‘করো।’
‘তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা কী? অন্তত তুমি কিভাবে দেখ?’
আমার ভেতরে কে যেনো হাতুরি পেটাতে শুরু করে। নিজের স্পন্দনের শব্দ শুনতে পাই। এমন তো হওয়ার কথা নয়! আমি নিজেকে সংযত করে বলি-
‘বিষণ্ন পথিকের সাথে বৃষ্টির যে রকম সম্পর্ক, তোমার আমার সম্পর্কটাও সেরকম।’
‘মানে!’
‘আমার যখন খুব মন খারাপ হয়, তখন আমি বৃষ্টিপাতের কামনা করি। বৃষ্টি হলে আমি আপ্লুত হই। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, আমার মাথার ওপর বৃষ্টি আর ভেতরের বৃষ্টি একাকার। তুমি আমার কাছে বৃষ্টির মতো প্রিয়।’
‘তুমি কি জানো, বৃষ্টি ধরা যায়। কিন্তু ধরে রাখা যায় না!’
‘বৃষ্টি তো ফুরিয়ে বা হারিয়েও যায় না।’
‘তোমার সাথে কথায় পারবো না। স্পষ্ট করে বলার সাহস তোমার নেই?’
‘যখন সাহস হয়, তখন সময় অনকূলে থাকে না। সময় হলে সাহস থাকে না। সময় ও সাহস যখন হয়, তখন তুমি পাশে থাকো না। হা-হা-হা…।
‘তোমার উপেক্ষা সহ্য করতে পারি। কিন্তু মাঝে মাঝে আমারও এর শোধ নিতে ইচ্ছে করে।’
‘শোধ নয়, রোধ করো আবেগের বহ্নিশিখা। নইলে এ আগুনে পুড়ে ছারখার হবে।’
‘অভিশাপ দিচ্ছো?’
‘না, সাজেশন দিচ্ছি। তা বললে না, আমার পরিচিত কে তোমাকে বিয়ে করতে চায়?’
‘তোমার বন্ধু আনিস।’
‘আ-নি-স!’
‘হ্যাঁ, আনিস ভাই। তিনি গত সপ্তাহে আমার বাবা-মার কাছে আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছেন।’
‘কিন্তু…!’
‘আমি জানি, আমার বড় বোন রিমির সাথে তার প্রেম ছিল। রিমি তার প্রতি ভীষণ দুর্বল ছিল। আনিস ভাই কিন্তু রিমিকে বিয়ে করেনি।’
‘হ্যাঁ…!’
‘রিমি আনিস ভাইয়ের ওপর রাগ করে বিয়ে করে ফেলে। কিন্তু আমি জানি, আনিস ভাইকে ভুলতে পারে নি রিমি। সেই রিমির ছোট বোনকে তিনি বিয়ে করে হয়তো তার পুরনো প্রেমের সম্পর্কটা জিইয়ে রাখতে চান।’
‘রিমি কি এই প্রস্তাবের কথা জানে?’
‘হ্যাঁ, আমি ফোন করে ওকে এ খবর জানিয়েছি। ও কিছু বলেনি। আমাদের বাড়িতে এই বিয়ের প্রস্তাব লুফে নিয়েছে।’
আমি কিছু বলতে পারি না। চুপসে যাই। একরাশ অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে চিন্তার মধ্যে। মন খারাপ হয়ে যায়। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাই না। সিমিও চুপ। সোবহানবাগের রাস্তা দিয়ে নিউমার্কেটের দিকে রিকশা চলছে। এ রাস্তা দিয়ে আমরা অনেক দিন রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছি। এখানকার চারপাশ আমার খুবই পরিচিত। কিন্তু চারপাশের চেনা দৃশ্যগুলো আজ কেমন অচেনা লাগছে। সিমির শরীরটা যেনো কাঁপছে। ও কি কাঁদছে? সিমির চাপা কান্নার সামনে নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে লাগলো। এখন যদি ঝমঝম করে বৃষ্টি হতো, ভালো লাগতো। কিন্তু আকাশে মেঘ নেই। মেঘ শুধু মনের আকাশে।
চার.
আমার ছাত্রী তিতলির বয়স নয় বছর। ও ভিকারুনিসা নূন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ও ভীষণ চটপটে। মাঝে মাঝে ও অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসে। আজ ওকে ঐকিক নিয়মে একটি অঙ্ক শিখাচ্ছিলাম। অঙ্ক করার সময় ও হঠাৎ প্রশ্ন করলো-
‘স্যার, হরতাল কি?’
‘হরতাল হচ্ছে ধর্মঘট।’
‘হরতাল কারা করে?’
‘যারা রাজনীতি করেন।’
‘কেনো করে?’
‘দাবি আদায়ের জন্য। তুমি এখন অঙ্ক কর।’
‘স্যার, হরতাল আমার ভালো লাগে।’
‘কেনো?’
‘হরতাল হলে স্কুলে যেতে হয় না। আচ্ছা, প্রতিদিন হরতাল হলে কেমন হবে?’
‘হরতাল ভালো নয়। হরতাল হলে দিনমজুর, শ্রমিকদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। পুরো দেশের মানুষের ক্ষতি হয়। তোমার স্কুল বন্ধ থাকলে পড়াশোনা শিখতে পারবে না।’
‘তা হলে ওরা হরতাল দেয় কেনো?’
‘ওরা নিজেদের স্বার্থের জন্য হরতাল দেয়। এখন তুমি অঙ্কটা শেষ কর।’
‘আচ্ছা।’
অনেক সময় তিতলির প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আমি জানি, দরজার ওপাশে তিতলির মা অর্থাৎ তামান্না হোসাইন দাঁড়িয়ে আছেন। তার অদ্ভুত স্বভাব। তিতলি যতোক্ষণ আমার কাছে পড়বেন, ততােক্ষণ তিনি দরজার ওপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবেন। টিচারের টিচিং এভাবে কড়া নজর কেউ রাখে বলে আমি জানি না বা কখনো শুনিনি। প্রথম দিনেই তিতলির মার এই স্বভাবের কথা জানতে পারি। সেদিন তিতলিকে পড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ তিতলি ফিক করে হেসে বললো-
‘স্যার, আপনার শার্টের একটি বুতাম নেই। হি হি হি।’
ওর হাসিতে বিব্রত হয়ে পড়ি। দেখি, সত্যিই শার্টের পেটের দিকে একটি বুতাম নেই। হয়তো রাস্তায় খুলে পড়ে গেছে। আমি টেনেটুনে শার্ট ঠিক করে ধমকের সুরে তিতলিকে বলি-
‘তিতলি, শিক্ষকের সাথে এমন করতে নেই!’
ভেতর থেকে এ কথার তাৎক্ষণিক জবাব দিলেন তামান্না হোসাইন।
‘টিচার, বাচ্চাদের অবান্তর প্রশ্নে রাগ করবেন না।’
‘না, না, আমি রাগ করিনি।’
এ ঘটনায় আমি অবাক হয়ে যাই। পরেরদিন তিতলির মা আমাকে আরো অবাক করে দেন। তিতলিকে পড়িয়ে ফেরার সময় তামান্না হোসাইন আমার সামনে এলেন। আমি চা পান করছিলাম। তিনি আমাকে একটি প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বললেন-
‘আপনার জন্য একটি শার্ট কিনেছি। এই শার্টটি নিয়ে গেলে আমি খুব খুশি হবো।’
আমি কি বলবো ভেবে পাই না। তিনি বলেন-
‘আমার কথায় কিছু মনে করবেন না।’
‘না, কিন্তু…!’
‘কোনো কিন্তু নয়, দেখুন তিতলি আপনাকে খুব পছন্দ করেছে। এটি আমাদের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে ধরে নেবেন।’
এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে আমি উপহার পেতে থাকলাম। তিতলির বাবা আফজাল হোসাইন কাস্টমস বিভাগের বড় কর্মকর্তা। তার অনেক অর্থ-বিত্ত। তিতলি তাদের আদরের একমাত্র সন্তান। তিতলিকে ওর মা যেনো চোখের আড়াল করতে চান না। পড়ার টেবিলেও তার দৃষ্টি। তিতলির পড়া শেষ হলে আমার জন্য মুখরোচক খাবার চলে আসে প্রতিদিন। কিছু না খেলে তিতলির মা অনুরোধ জানাবেন-
‘না খেয়ে যেনো না যাই।’
ভদ্রমহিলার দৃষ্টি যেনো সর্বত্র বিরাজমান। এই টিউশনিটা আমার ভালো লেগে যায়। বেতনও ভালো। মাস শেষ হলেই চার হাজার টাকা। আর আছে আপ্যায়ন ও উপহার সামগ্রী। গত পাঁচ মাস ধরে টিউশনিটা করছি। এই টিউশনিটা জুগিয়ে দিয়েছিল আমার কবি বন্ধু আরিফ। তামান্না হোসাইন আরিফের ফুপু। আরিফের জন্যই এমন ভালো বেতনের টিউশনিটা পেয়ে যাই। টিউশনির পর বাকিটা সময় চাকরি খুঁজি। চাকরি না পাওয়ার হতাশা দিনে দিনে জমাট বাঁধলেও টিউশনিটা আমাকে ঢাকার নাগরিক জীবনে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
‘স্যার, অঙ্কটা হয়ে গেছে।’
তিতলি সব কিছু সহজেই ধরতে পারে। ও খুব মেধাবী। ওকে পড়াতে আমিও আনন্দ পাই।
‘ঠিক আছে, আজ এ পর্যন্তই।’
‘আচ্ছা।’ বলেই তিতলি দ্রুত ওর বই-খাতা গুছিয়ে নেয়। তিতলিদের কাজের বুয়া আমার সামনে নুডুলস ও রসমালাই রাখলো। খাবারের আয়োজন প্রতিদিন তৈরি থাকে। তিতলি বই গুছানোর সময় খাবার চলে আসে। না খেয়ে যাওয়া যাবে না। তামান্না হোসাইনের চোখ সতর্ক। আমি নিঃসংকোচে রসমালাই খেতে থাকি। তিতলি বই গুছিয়ে চলে যায়। খাবার শেষ করে উঠতে যাবার সময় তামান্না হোসাইনের গলার স্বর ভেসে এলো-
‘আপনি একটু বসুন, আমি আসছি।’
আমি চুপচাপ তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি এলেন। তামান্না হোসাইনের দিকে আমি কখনো সরাসরি তাকাইনি। আজ একঝলক দেখলাম। ভদ্রমহিলার বয়স ৩৫-৩৬ বছর হবে। সুন্দরী। সেনা কর্মকর্তা ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্ত্রী সাধারণত অপূর্ব সুন্দরী হয়। তামান্না হোসাইনও অপূর্ব সুন্দরীদের একজন। তিনি স্মার্টও। তিনি আমার সামনের চেয়ারে বসলেন।
‘আপনি সব সময় মাথা নিচু করে থাকেন কেনো? আপনি কি খুব লাজুক?’
‘জ্বি, না।’
‘ঠিক আছে, এখন বলুন তো আপনার কে কে আছে? এই যেমন ধরুন মা-বাবা, ভাই-বোন।’
‘কেনো?’
‘এমনিই, জানতে ইচ্ছে করছে। বলতে অসুবিধা আছে? আরিফ বলেছিল, আপনার আপনজন বলতে কেউ নেই।’
‘আমার মা-বাবা বেঁচে নেই। ভাই-বোন বলতে কেউ নেই। নিকট আত্মীয়-স্বজন আছেন, তাদের সাথে এখন যোগযোগ নেই। আমার চাচা গ্রামের স্কুল শিক্ষক। তিনি আমাকে লালন-পালন করেছেন, পড়াশোনা শিখিয়েছেন। তিনিও এখন বেঁচে নেই।’
‘আপনি কোথায় এবং কার কাছে থাকেন?’
‘থাকি মগবাজারে, একটি মেসে।’
‘মেসে!’
‘মেস বলতে একটি চারতলা বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায় একরুমের বাসা। আমরা দুই বন্ধু থাকি। বাসাটা ভালোই।’
‘চাকরির চেষ্টা করছেন?’
‘হ্যাঁ, খুব চেষ্টা করছি।’
‘আপনি ইকোনোমিক্সে মাস্টার্স করেছেন না?’
‘হ্যাঁ।’
‘বিসিএস দিচ্ছেন না কেনো?’
‘দুবার দিয়েছি। রিটেনে ভালোই করি। কিন্তু ভাইবাতে আটকে যাই। আসলে, ঘুষের জন্য ভাইবার মাকর্স বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তাই ও পথে এগুবার ইচ্ছা ত্যাগ করেছি।’
‘ঠিক আছে, আমি আপনার জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করবো।’
‘কিন্তু আপনি আমার জন্য কেনো কিছু করতে চাচ্ছেন?’
‘ধরুন, আপনার কেউ নেই বলে।’
এই কথায় আমি কিছু বলতে পারি না। আমার প্রতি তার এক ধরনের স্নেহের প্রকাশ সব সময় দেখতে পাচ্ছি। ছয় বছর বয়সে মা এবং চৌদ্দ বছর বয়সে বাবাকে আমি হারিয়েছি। বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা শিশু বয়সে হারালেও মানুষের ভালোবাসা অনেক পেয়েছি। অসহায়-এতিম বলে আমাকে আমার বন্ধুর মা-বাবা খুবই স্নেহ করতেন। আমার জন্য অনেক বন্ধুর মা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। আমি মাতৃত্বের স্নেহ খুব সহজেই ধরতে পারি। তামান্না হোসাইনের স্নেহও সেরকম। আমার চোখ ভিজে আসতে চায়। আমি সামলে নেই।
‘ঠিক আছে, আজ আসি।’
‘আসুন।’
আমি দ্রুত বেরিয়ে আসি তিতলিদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে।
পাঁচ.
আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে হিরণ ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ছাত্র রাজনীতির জন্য হিরণ এখনো ছাত্রত্ব ছাড়েনি। ও ইকোনোমিক্সে মাস্টার্স করার পরও লাইব্রেরি সাইন্সে ফের ভর্তি হয়েছে। থাকছে হলে। নিয়ন্ত্রণ করছে একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন। রাজনীতি ওর ধ্যান-জ্ঞান। ওর ধারণা রাজনীতিই সমাজবদলের একমাত্র হাতিয়ার। দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব দিতে রাজনীতিবিদদের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক সচেতন না হলে সুশীল সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়। রাজনীতি নিয়ে হিরণের আরো অনেক কথা। ওর এ সব কথার তীব্র প্রতিবাদ করে আরিফ। হিরণও আরিফের কাব্যচর্চার নিন্দায় মুখিয়ে থাকে। আরিফের কবিতা লেখার বাতিক। যেখানে কবিতানুষ্ঠান, সেখানেই আরিফ। ও প্রতিদিন কবিতা লিখে যাচ্ছে। ও এতো কবিতা কিভাবে লিখে, কে জানে! দেখা হলেই ওর কবিতা শুনতে হয়। আজ টিএসসিতে জাতীয় কবিতা পরিষদের কবিতা উৎসব। আরিফ এই উৎসবে কবিতা পাঠ করবেন। আমি ও আনিস এসেছি আরিফের কবিতা শুনতে। টিএসসিতে হিরণের সাথে দেখা হয়ে গেলো। জমে গেলো চার বন্ধুর আড্ডা। আমাদের পেয়ে হিরণ রাজনৈতিক ভাষণ শুরু করে দেয়। আরিফ ওর বক্তব্যের বিরোধিতা করতে থাকে। ওরা দুজন এক সাথে হলে ওদের তর্ক যুদ্ধ থামাতে হিমশিম খেতে হয় আমাদের। টিএসসি সড়কদ্বীপ মোহনায় কবিতা উৎসবের মঞ্চ। এই উৎসবের কারণে টিএসসি আজ কবিদের পদচারণায় মুখর। গ্রামের স্বভাব কবি থেকে উত্তর আধুনিক কবি, সবাই এই উৎসবে সমবেত। আরিফের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা। এমন একটি অভিভূত সময় বন্ধুরা মিস করুক, আরিফ তা চায়নি। আরিফের অনুরোধ ফেলতে পারিনি আমি ও আনিস। আমরা এখন বসে আছি ফুটপাতের চায়ের স্টলে। মাথার ওপর গণগণে দুপুর। কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান চলছে। মাইকে কবিতা পাঠ হচ্ছে। চা পান করতে করতে হিরণ বললো-
‘দেশে যে হারে কবিদের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে কবিদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের ওষুধ আবিষ্কার করতে হবে বিজ্ঞানীদের।’
এই বিদ্রƒপে খেপে গেলো আরিফ।
‘কবিতা আছে বলেই এখনো মানুষের মনে সুকুমার বৃত্তির চর্চা আছে। তোরা রাজনীতিবিদরা তো এখন সন্ত্রাসীদের সংখ্যা বাড়াচ্ছিস।’
‘দেখো, রাজনীতিবিদরা হচ্ছে দেশের কাণ্ডারি। দেশের ক্রান্তিকালে তারাই পথ দেখান, ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন!’
‘তোদের অনেকগুলো মুখোশ পরে থাকতে হয়। মঞ্চে মায়াকান্নার মুখোশ। কর্মীদের সামনে এক মুখোশ, গোপন সমঝোতায় আরেক মুখোশ। এমনকি, বাড়িতেও আরেক রকম মুখোশ পড়ে থাাকিস, তা আমরা জানি।’
‘আরিফ-হিরণ আজকে তোরা ঝগড়া করিস নে বাপ। এসেছি আরিফের কবিতা শুনতে। আজকের দিনটি আরিফের। তাই না আকাশ?’
আনিসের এই প্রস্তাবে আমিও মাথা নেড়ে সায় দেই। চুপসে যায় হিরণ। আমরা টিএসসির গোলচত্বরের বাইরে ফুটপাতে মোখলেস মিয়ার চায়ের স্টলের টুলে বসে চা পান করছিলাম। মোখলেস মিয়ার চায়ের স্টলে অনেকদিন আড্ডা দিয়েছি। মোখলেস মিয়া আমাদের দেখে খুশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ছাত্রদের দেখলে শিক্ষক যেমন খুশি হন, মোখলেস মিয়ার খুশিও সে রকম। তার আন্তরিকতা আমাদেরও ভালো লাগে। আজ দুপুরে আরিফ আমাদের খাওয়াবে। কবিতা শোনার কাকফারা। আনিস বললো-
‘আমি কিন্তু মেঘলাকে আসতে বলেছি টিএসসিতে। অনেক দিন হলো ওর সাথে যোগাযোগ নেই। আজ ওর অভিমান ভাঙাবো। কাল রাতে মেঘলাদের বাসায় ফোন করেছিলাম। প্রথমে তো কতো বাহানা, অভিযোগ! পরে গলে জল হয়ে গেলো।’
‘আমাদের ডিপার্টমেন্টে পড়তো, সেই মেঘলা!’ আরিফের প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ, যাকে তুই কবিতা কখনো শুনাতে পারিস নি, সেই মেঘলা।’
‘মেঘলা আরিফের কাব্য প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পেরেছিল। হা হা হা।’
হিরণ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
‘মেঘলা রাজনীতিবিদদেরও পছন্দ করে না। ওর পছন্দ নতুন মডেলের গাড়ি এবং গাড়ির মালিক।’
আরিফের জবাব। সিমিকে বিয়ে করার প্রস্তাবের কথাটি আমি আনিসকে জিজ্ঞেস করি নি। আনিসও আমাকে কিছু বলেনি। আনিসের সাথে দেখা হবার পর থেকে আমার ভেতরে অস্বস্তি টের পাই। কিন্তু কৌতূহল চেপে রাখি। আনিসের এ কথায় আমি বলি-
‘শুনলাম, তুই সিমিকে বিয়ে করতে যাচ্ছিস। এখন আবার মেঘলার সাথে যোগাযোগ কেনো?’
‘তাই না-কি!’ আরিফ ও হিরণের বিস্ময়।
‘দোস্ত, বউ আর বান্ধবী এক কথা নয়। সিমি হবে বউ, আর মেঘলা বান্ধবী। সহজ সমীকরণ। মেঘলা কখনো বউ হবার মতো মেয়ে নয়। সিমি শান্ত দিঘির মতো। ঘরে ফিরে শান্ত দিঘিতে সাঁতার কাটতে চাই। উত্তাল সমুদ্র চাই না।’ জবাব দিলো আনিস।
‘তা বেশ। তোরা বিত্তবানরা সব কিছু নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারিস। সম্পর্কের নামও দিতে পারিস। তোদের স্বপ্নের পরিধি আমাদের চেয়ে অনেক বড়।’
‘তুই কি আশাহত হলি, না-কি আমাকে আঘাত করতে চাচ্ছিস?’
‘তোর আর আমার জীবনযাপনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা দেখতে চেষ্টা করছি।’
‘রাখ তো তর্ক! আনিস, তুই কি সত্যিই সিমিকে বিয়ে করছিস!’ আরিফের প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ, সম্ভবত খুব শিগগির সিমিকে বিয়ে করবো। যদি আকাশের আপত্তি না থাকে…।’
‘আমার আপত্তি থাকবে কেনো? আপত্তি থাকলেও তোর সাথে প্রতিযোগিতায় আমি কখনো পারবো?’
‘তুই চাইলে, আমি নিজেই সরে দাঁড়াতে পারি। আফটার অল, তুই আমার বন্ধু। তা ছাড়া সিমিকে তুই বিয়ে করলে আমার আপত্তি নেই।’
‘তুই কি বন্ধু হিসেবে আমাকে করুণা করতে চাচ্ছিস?’
‘করুণা কি-না জানি না, তবে তুই যদি ওকে বিয়ে করতে চাস, আমি আজই বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে নেবো।’
‘আনিস, আমার স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। সিমিকে নিয়ে আমি ভাবি না বা ভাবতে চাইও না।’
‘সিমিকে নিয়ে তুই স্বপ্ন দেখিস না!’
‘ও আমার কাছে স্বপ্নের চেয়েও দূরবর্তী কিছু। ও আমার স্বপ্ন বিলাস।’
‘যাক বাবা, বাঁচালি। আমি এখন নিশ্চিন্তে সিমিকে বিয়ে করতে পারি। কী বলিস?’
‘হ্যাঁ।’
আরিফ প্রশ্ন করে আমাকে-
‘সিমি আর তোর মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক নেই?’
‘আমরা বন্ধুর মতোই ঘুরে বেড়িয়েছি। আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করি ঠিক, ভালোবাসাবাসির কথা কখনো হয় নি। তোরা তো জানিস, আবেগের ব্যাপারে আমি কতোটা নিরুৎসাহিত।’
হিরণ কিছু বলতে যাচ্ছিল, ও মেঘলাকে দেখে থেমে গেলো। মেঘলা রিকশা থেকে নেমেই বললো-
‘বাহ, বহুদিন পর চার বন্ধুকে এক সাথে দেখছি!’
মেঘলা পরেছে জিন্স প্যান্ট আর টি-শার্ট। সানগ্লাসাটা বুকের ওপর টি-শার্টের বোতামে আটকে ঝুলছে। ও এসে বসলো আনিসের পাশে। মিষ্টি পারফিউমের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।
‘আমি মঞ্চের দিকে যাচ্ছি, এখনই আমার নাম ডাকা হবে।’ বলেই আরিফ উঠে চলে গেলো। মেঘলা বাঁকা চোখে আরিফের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। হিরণ বললো-
‘তোরা গল্প কর, আমি একটু মধুর ক্যান্টিন ঘুরে আসছি।’
আনিস আমাকে বললো-
‘তুই মঞ্চের সামনে যেয়ে আরিফের কবিতা শোনো। আমি মেঘলাকে নিয়ে ঘুরে আসি।’
কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের আড্ডা ভেঙে গেলো। আনিস ও মেঘলা হেঁটে চলে গেলো রাস্তার ওপাশে। আনিস ওর গাড়িতে চড়লো। মেঘলা বসলো ওর পাশের সিটে। আমার বিষণ্ন দৃষ্টির সীমারেখা থেকে আনিসের নিশান জিপটি ধূলি উড়ানোর অহংকারে চলে গেলো দ্রুত।
ছয়.
মিতাকে আমার মনে রাখার কথা নয়। মিতাও আমাকে মনে রাখবে, এমন সম্পর্ক আমাদের নয়। কলেজের অনেক সহপাঠীদের মতো মিতাও ছিল আমার ক্লাসমেট। ও ছিল খুবই লাজুক প্রকৃতির। মফস্বল শহরের নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের পর্দাসীন মেয়েরা কলেজে এসে খোলামেলা পরিবেশে কখনো বিব্রত হয়, কখনো অজানা ভালো লাগায় বুঁদ হয়ে যায়। ঘরের শাসনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে তারা চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু মিতা ছিল শান্ত ও লাজুক। ক্লাসে আমি বসতাম পিছনের বেঞ্চে। মিতাও বেশির ভাগ সময় পিছনের বেঞ্চে বসতো। নিজেকে গুটিয়ে রাখার অভ্যাসের কারণে আমার পিছনে বসতো ভালো লাগতো। মিতা হয়তো লাজুক স্বভাবের কারণে পিছনে বসে স্বস্তিবোধ করতো। পিছনে বসার নিয়মিত ছাত্র হিসেবে একপর্যায়ে মিতার সাথে আলাপ-পরিচয় হয়। দিনে দিনে ওর সাথে সম্পর্কটা বন্ধুত্বের দিকে মোড় নেয়। মিতার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপারে আমার কৌতূহল ছিল না। মিতাও আমার জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কে কখনো জানতে চায় নি। আমাদের আলোচনা পড়ার বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল বেশি। তবে সিনেমা হলে গিয়ে একবার দুজনে একটি ছবি দেখেছিলাম। এটা ছিল আমার কোনো মেয়েকে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে প্রথম ছবি দেখা। শেষ ছবিও বলা যায়। কারণ, এ পর্যন্ত আমি আর কোনো মেয়ের সাথে ছবি দেখিনি। এই সিনেমা দেখার ঘটনাটি বাদ দিলে মিতাকে মনে রাখার মতো কোনো অর্থপূর্ণ বা উজ্জ্বল ঘটনা আমার স্মৃতিতে নেই।
মিতা ছিল আমাদের ক্লাসের অসম্ভব সুন্দরী ছাত্রী। ওর গায়ের রং দুধে-আলতা। চোখ দুটি বড় মায়াবী। এক কথায় ওর ছিল চোখ ধাঁধানো রূপ। কলেজের সিনিয়র ছাত্র ও একাধিক ছাত্রনেতা মিতাকে দেখলে যেচে কথা বলতো। কলেজ চত্বরে ওকে দেখলে রোমিওরা কেমন বিনয়ীকণ্ঠে ওর কুশল জিজ্ঞেস করতো। ওর জন্য অনেকে আমাকেও অযাচিত খাতির করতো। কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ফখরুল ওকে একবার একগুচ্ছ ফুল পাঠিয়েছিল। মিতা ওই ফুল ফিরিয়ে দিতে পারেনি, ভয়ে। আবার গ্রহণও করতে পারে নি। সেদিন সেই ফুল সবার অলক্ষে আমি কলেজের টয়লেটে ফেলে এসেছিলাম। ফুল দেবার পর থেকে ফখরুল মিতাকে দেখলেই কেমন নয়া মজনুর চোখে তাকিয়ে থাকতো। আমি মিতাকে কটাক্ষ করে বলতাম-
‘তোর প্রেমিক ভাগ্য ভালো।’ এ কথায় মিতা খেপে যেতো।
সুন্দরী মেয়েরা জানে তাদের পেছনে ছেলেরা মৌমাছির মতো ঘুরতে থাকে। তাদের নিয়ে অনেক গুঞ্জন। এই ঘুরপাক ও গুঞ্জন সুন্দরী মেয়েরা এনজয় করে। অসংখ্য প্রেমিক হৃদয়ের আকুলতা তারা পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যায় কখনো নিঃসংকোচে, কখনো বাঁকা হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে কখনো বা ‘ও আচ্ছা!’ ধরনের রাজশ্বরী ভঙ্গিমায়। কিন্তু মিতা লজ্জায় কুকড়ে যেতো। কেউ প্রেম নিবেদন করলে ও রেগে যেতো। সুন্দরী মেয়েদের রাগের উত্তাপে সৌন্দর্য পিপাসু পুরুষ দমে যায় না। মিতার হৃদয় জয় করার চেষ্টা অনেকে করে যেতে থাকে। ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত প্রেমিকদের উপদ্রবে মিতা ছিল বিব্রত। এইচএসসি পাস করার পর মিতা কলেজে আসা বন্ধ করে দেয়। এর জন্য অবাকও হইনি। আমাদের দেশে সুন্দরী মেয়েরা কলেজে উঠলেই ওদের বিয়ের হিড়িক লেগে যায়। এইচএসসি পাস করার পর খুব কম সংখ্যক মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যায়। দীর্ঘদিন কলেজে না আসায় আমি ধরে নিই মিতা পড়াশোনা ছেড়ে সংসার করছে। অনেক সহপাঠীর মতো মিতাও হারিয়ে যায় আমার জীবন থেকে। ওর খোঁজ নেবার ইচ্ছে হয়নি। কালের স্রোতে ভেসে যেতে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম মিতার কথা। কিন্তু আজ এতোদিন পর মিতাকে দেখে শুধু অবাকই হলাম না, হতবাক হয়ে গেলাম ওর আমূল পরিবর্তন দেখে। ওর সাথে আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে গেলো বেইলি রোডে ফটোম্যাটিক স্টুডিওতে। এই স্টুডিওর ছবি খুব সুন্দর হয়। আমি চাকরির জন্য এখানে ছবি তুলেছিলাম। চাকরির জন্য বায়োডাটা দিতে দিতে ছবি ফুরিয়ে যায়। আমাকে আবার আসতে হয় ছবি রিপ্রিন্ট করার জন্য। আজও এলাম। স্টুডিওতে ছবির রিপ্রিন্টের অর্ডার দিচ্ছিলাম। আমার পাশ থেকে মিষ্টি নারী কণ্ঠ রিনরিনিয়ে উঠলো-
‘আপনার নাম কি আকাশ!’
পাশে তাকিয়ে দেখি অপূর্ব এক সুন্দরী মহিলা আমার দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে রয়েছেন। আমি মিতাকে প্রথমে চিনতে পারলাম না।
‘হ্যাঁ, কিন্তু …!’
‘আকাশ! কেমন আছিস!’
আপনি থেকে তুই। আমি আরো অবাক হয়ে যাই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি।
‘হ্যাঁ করে তাকয়ে আছিস কেনো? আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি মিতা!’
আমার মাথা যেনো শূন্য হয়ে যায়। কিংবা অতিরিক্ত বিস্ময়ে থ’ হয়ে যাই।
‘অমন করে তাকিয়ে থাকলে হবে? চল বাইরে যাই।’
মিতা আমার হাত ধরে ফটোমেটিক স্টুডিও থেকে বের করে নিয়ে এলো। ফুটপাতে পার্ক করা একটি লাল রঙের টয়োটা কারের সামনে এসে মিতা দাঁড়ালো। গাড়ির ড্রাইভার এসে পেছনের গেট খুলে ধরলো। মিতা আমার হাত ছেড়ে গাড়িতে ঢুকে পড়লো। বললো-
‘আকাশ, গাড়িতে ওঠ।’
মিতাকে দেখে আমি খুবই আনন্দিত। আমার বিস্ময়ের রেশ যেনো কাটছিল না। আমি গাড়িতে উঠলাম। বসলাম মিতার পাশে। মিতা ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো-
‘ড্রাইভার, গুলশান যাও।’
আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আমাকে দেখে তুই খুব অবাক হয়ে গেছিস?’
‘হ্যাঁ, এখনো বিস্ময়ের রেশ যেনো কাটছে না।’
‘তোকে দেখে আমিও অবাক হয়ে গেছি। খুব ভালো লাগছে। কতোদিন পর দেখা!’
‘হ্যাঁ, তোকে কেমন রানি রানি লাগছে। তুই অনেক বদলে গেছিস।’
‘রানি নয়, বল মহারানি! তা তোরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একটু মোটা হয়েছিস।’
‘তুই মোটা হলেও তোকে অপূর্ব লাগছে!’
‘তাই না-কি!’
‘হুম। তোর দিক থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।’
‘তুই তো দেখছি, মেয়ে পটাতে শিখে গেছিস!’
মিতার কথায় খানিকটা লজ্জা পেলাম। নিজের পক্ষ নিয়ে বললাম-
‘তোকে পটানোর কি আছে? তুই কি আমার কামনার নারী?’
‘তুই কি আমাকে কখনোই কামনা করিস নি!’
মিতা বিস্ময় প্রকাশ করলো।
‘না। কখনোই না।’
আমার কথায় ও হাসির দমকায় ফেটে পড়লো। যেনো আমি মিথ্যা কথা বলছি।
‘তোর সাথে একদিন সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম, মনে আছে?’
‘হুম।’
‘সেদিন সিনেমা হলে তুই আমার হাত চেপে ধরিস নি?’
আমি হো হো করে হেসে উঠি। বললাম-
‘সেদিন আমি তোর হাত ধরি নি, তুই আমার হাত টেনে নিয়ে ধরেছিলি।’
‘তাই না-কি!’
‘হ্যাঁ, আমার স্পষ্ট মনে আছে।’
‘ঠিক আছে, তোর কি সেদিন ভালো লাগেনি?’
‘ভালো লাগার চেয়ে ভয়টা ছিল বেশি।’
‘তুই কিন্তু তোর হাতটা সরিয়ে নিস নি। নিশ্চয়ই তোর ভালো লেগেছিল। তার মানে অবচেতন মনে হলেও তুই আমাকে কামনা করতিস।’
‘এ কথা ভেবে তুই কি আনন্দ পাচ্ছিস?’
‘পাচ্ছি। আচ্ছা আকাশ, তুই সেদিন কেনো আমার হাতটা ছেড়ে দিয়েছিলি?’
মিতা এবার সিরিয়াস হয়।
‘হাত ধরে রাখাটা হতো বেলাল্লাপনা। আজ এতোদিন পর এ প্রশ্ন করছিস কেনো?’
‘এমনিই জানতে ইচ্ছে করছে। যাক গে, এখন বল কেমন আছিস?’
‘ভালো আছি বলতে পারছি না। একটি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি। বেকারত্বের যন্ত্রণায় ছটফট করছি।’
‘তুই নিশ্চয়, পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, মাস্টার্স পাস করে বসে আছি।’
‘ঠিক আছে, আমি তোর জন্য চেষ্টা করবো। হয়তো পেয়ে যেতেও পারিস যে কোনো একটা চাকরি।’
‘তোর স্বামী কি খুব ধনী বা ক্ষমতাবান?’
এ কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো মিতা। ও বললো-
‘তুই যে মিতাকে চিনতিস, আমি এখন আর সেই মিতা নেই। আমি নিজেই অনেক ক্ষমতাবান। হ্যাঁ, আমার স্বামী ধনী ও ক্ষমতাবান ছিল।’
‘ছিল মানে! এখন কি নেই?’
‘না। এখন আমার স্বামী নেই।’
‘কি হয়েছে খুলে বলো তো!’
‘সে অনেক কথা। তোকে অন্য একদিন বলবো। শুধু জেনে রাখ, স্বামী আমাকে দিয়ে যা করাতো, আমি তাই-ই করছি। শুধু শুধু স্বামীকে লভ্যাংশ হাতিয়ে নিতে দেবো কেনো?’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘তোকে বুঝতে হবে না। সংক্ষেপে বলছি, শোন, আমার একজন ধনী লোকের সাথে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর ধনী স্বামী আরো ওপরে ওঠার জন্য আমাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। আমি হয়ে যাই অন্ধকারের জগদ্দল এক পাথর!’
মিতার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। আমি বিব্রত হই। এতোদিন পর দেখা হলো! দেখে মনে হয়েছিল মিতা ভালোই আছে, এখন মনে হচ্ছে ও সুখে নেই। মিতা বললো-
‘জানিস, পাথর কাঁদতে পারে না। আমিও কাঁদি না।’
মিতা ফুঁপিয়ে উঠলো। মেয়েদের কান্নার সামনে আমি ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে যাই। কী বলে সান্তনা দেবো বা কী বলবো, ঠিক করতে পারি না। মনে হচ্ছে মিতা কেঁদে ফেলবে। আমি বলি-
‘মিতা, তোকে দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম তুই ভীষণ ভালো আছিস, সুখে আছিস। এখন মনে হচ্ছে আমার ধারণা ভুল।’
মিতা মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো। বললো-
‘সরি, অনেক দিন পর তোকে দেখে আগের আমাকে মনে পড়ে গেলো। তুই কিছু মনে করিস না। আমি ভালোই আছি।’
‘আমি কি তোর জন্য কিছু করতে পারি?’
মিতা হাসলো। ওর হাসিতে মাদকতা আছে। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। মিতা বললো-
‘তুই আমাকে বিয়ে করতে পারবি?’
ওর প্রশ্নে আমি চমকে উঠি।
‘বিয়ে!’
‘হ্যাঁ, বিয়ে। পারবি?’
মিতা প্রশ্নভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে লাগলো। হাসির দমকায় ওর শরীর কাঁপছিল। ও বললো-
‘আমি জানি, তুই ভড়কে গেছিস। আকাশ, যেদিন তুই সিনেমা হলে আমার হাত ছেড়ে দিয়েছিল, সেদিন থেকে মিতা হারিয়ে গেছে। তোর সুন্দর জীবনে আমার কালো ছায়া ফেলবো না। তোর সাথে ফান করলাম।’
‘তা বুঝলাম, কিন্তু…?’
‘আমাকে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। এখন বল তুই বিয়ে করেছিস কি-না। বা কারো সাথে প্রেম করছিস কি-না।’
‘বিয়ে বা প্রেম!’
‘জানি, তোর মধ্যে প্রেম-ট্রেম নেই। তুই ভীতু ও আত্মকেন্দ্রিক।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ, তবুও ভয়কাতুরে ও পরাজিতকে কেউ কেউ ভালোবেসে ফেলে। তেমন কেউ আছে?’
এ প্রশ্নে আমার মনে সিমির ছবিটা ভেসে ওঠে। বুকের ভেতরটা কে যেনো মোচড় দেয়। মিতাকে প্রশ্ন করি-
‘মিতা, আমি কি সত্যিই পরাজিত মানুষ?’
‘তোকে যেমন দেখেছি, তাতে তুই সে রকমই। তোকে আজো দেখে বুঝতে পারছি, তুই বদলাস নি।’
‘বাহ, আমাকে তুই এতোটা মনে রেখেছিস! তা আমার প্রতি তোর সাজেশন কী?’
‘তোর সামনে এখনো অনেক পথ। তুই নিজেকে নিজের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোল। দেখবি, তুই একসময় ঠিক-ই জিতে যাবি।’
‘আমার সম্পর্কে তোর আর কী ধারণা?’
‘তোর মধ্যে চাওয়ার আকাক্সক্ষা নেই। তাই পাওয়ার চেষ্টাও নেই। তুই স্বপ্ন দেখতে জানিস না।’
‘স্বপ্ন!’
‘হ্যাঁ, জেগে ওঠ, স্বপ্ন দেখো। দেখবি জীবন কতো সুন্দর!’
‘মিতা, চাকরি ছাড়া আমার কোনো স্বপ্ন নেই। আর কোনো স্বপ্ন দেখতেও পারি না।’
‘তুই একাই এ দেশের শিক্ষিত বেকার নস। দেশে প্রায় দুই লাখ শিক্ষিত বেকার আছে। তারা কি প্রেম করছে না? জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখছে না?’
‘প্রেমটাই কি জীবনের মুখ্য বিষয়?’
‘কখনো কখনো শুধু মুখ্য নয়, গুরুত্বপূর্ণও। দেখ, আমার জীবনে প্রেম থাকলে হয়তো প্রেমিকের দরিদ্র সংসারে কষ্ট শেয়ার করতাম। কিন্তু ধনী স্বামীর স্ত্রী হয়ে অন্ধকারের কীট হতাম না। মাঝে মাঝে ভালোবাসার জন্য খুব আফসোস হয়।’
‘তোর হাহাকার আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’
‘আমাকে নিয়ে অহেতুক কষ্ট পাস নে। নিজের ব্যক্তিগত কষ্ট থাকলে তা লাঘবের চেষ্টা কর।’
‘ধন্যবাদ, এ পরামর্শের জন্য। এখন বল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
‘গুলশানে। আমার অ্যাপার্টমেন্টে। এর আগে আমরা ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খাবো।’
‘তোর বাসায় আজ যাবো না। বিকেলে আমি একটি টিউশনি করি। অন্য একদিন যাবো।’
‘ঠিক আছে, চল, গুলশানের ইকবাল টাওয়ারে যাই। ইকবাল টাওয়ারের রেস্টুরেন্টে দুজনে লাঞ্চ করি।’
‘আচ্ছা।’
মিতার গাড়ি ফার্মগেটের সড়ক দিয়ে ছুটে চলছে গুলশানের দিকে। চলন্ত গাড়িতে আমি নিজেকে নিজের আয়নায় দাঁড় করিয়ে খুঁজতে থাকি স্বপ্নের বিলাসিতা।
সাত.
ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকায় ব্যাচেলারদের বাসা ভাড়া পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। বাড়িওয়ালারা ব্যাচেলারদের বাসা ভাড়া দিতে চান না। ব্যাচেলার শুনলে ভ্রু কুঁচকে ওঠে তাদের। কেউ কেউ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করেও দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে দেবার সময় কোথায় উঠবো ঠিক করতে পারছিলাম না। বাসা খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারি ব্যাচেলারদের সম্পর্কে বাড়িওয়ালারা ভালো ধারণা পোষণ করেন না। তন্ন তন্ন করে বাসা খুঁজলাম। বাসা পেলাম অনেক; কিন্তু ব্যাচেলার বলে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হলেন না বাড়িওয়ালারা। নিজের গ্রামে ফিরে যাবো, সেই অবস্থাও নেই। চাচার মৃত্যুর পর তার সংসারের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। নিজে কোনো সহযোগিতা করতে পারছি না, আবার সংসারের দায় বাড়াতে ইচ্ছে করলো না। কিন্তু কোথায় থাকবো, তারও কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমনি সংকটকালে ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করলেন শিল্পী সমীরণ চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার সাথে আমার পরিচয়। আমরা যখন অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়তাম, সমীরণ চৌধুরী তখন চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্র। চারুকলার বকুলতলায় তিনি আড্ডা মারতেন, ছবি আঁকতেন। আমরা প্রায়ই আড্ডা দিতে যেতাম বকুলতলায়। এখানে সমীরণ চৌধুরীর সাথে পরিচয় হয়। তিনি চারুকলা থেকে বের হয়ে গেছেন তিন বছর আগে। কিন্তু তার সাথে আমার যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়নি। তিনি আড্ডা মারতে আসতেন চারুকলায়। মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেতো আমার সাথে। তাকে আমার সমস্যার কথা জানালাম। আমার থাকার কোনো জায়গা নেই শুনে তিনি বললেন-
‘তোমাকে থাকার একটা জায়গা দিতে পারি, তবে শর্ত আছে।’
‘বলুন কী শর্ত?’
আমি উদগ্রীব।
‘আমি বড় মগবাজার এলাকায় একটা রুম নিয়েছি। চারতলা বাড়ির ছাদে এক রুমের ছোট্ট বাসা। ছোট্ট একটা কিচেন ও বাথরুম আছে। বাসাটা আমার আত্মীয়ের বলে নিতে পেরেছি। বুঝলে?’
‘বুঝলাম। কিন্তু শর্তের কথা তো বললেন না। তা ছাড়া এই বাসায় আপনি থাকলে আমিই বা থাকি কী করে?’
‘ওই বাসায় আমি থাকি না। আমি দিনের বেলায় ওই রুমে ছবি আঁকি। বলতে পারো, শিল্পীর স্টুডিও রুম। এই রুমে তুমি রাতে থাকতে পারো।’
‘শুধু রাতে?’
‘হ্যাঁ, শুধু রাতে। দিনেও থাকতে পারো। তবে আমাকে কোনো বিরক্ত করতে পারবে না। তা ছাড়া তুমি দিনে বাসায় থেকে কী করবে? ধরো রাতে তুমি থাকলে, দিনে বেরিয়ে গেলে। আবার আমি দিনের বেলায় এলাম এবং সন্ধ্যায় চলে গেলাম। তোমার কাজ হলো। আমারও কাজ হলো।’
‘নট ব্যাট। আর কোনো শর্ত?’
‘বাসায় কোনো গেস্ট আনবে না। ব্যাচেলারদের বাসায় গেস্ট বেশি আসে। অনেক সময় মেয়ে বন্ধুও আসে। এসব বাড়িওয়ালারা পছন্দ করেন না।’
‘আমি এই শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। রুম পার্টনার হিসেবে মাসে ভাড়া কতো দিতে হবে?’
‘আমি ১ হাজার ৫০০ টাকা মাসে ভাড়া দিচ্ছি। তুমি মাসে ৫০০ টাকা দিবে। তোমার জন্য বিশেষ ছাড়। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে।’
সেদিনই আমি উঠে যাই শিল্পীর স্টুডিওতে। সমীরণ চৌধুরীর শর্ত পালন করতে আমার কোনো বেগ পেতে হয়নি। আরিফ শুধু আমার বাসার ঠিকানা জানে। ও কখনো আসেনি। কিন্তু আমাকে আজ ভীষণ অবাক করে দিলো বাড়ির দারোয়ান মফিজ মিয়া। সকাল ১১টা। আমি বাইরে বের হবার জন্য প্রস্তুত। এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ শুনতে পেলাম। গত দুই বছরে আমার বাসার দরজায় কেউ করাঘাত করেনি। আমি দরজা খুলতেই দেখি মফিজ মিয়া দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘কী ব্যাপার মফিজ মিয়া, তুমি!’
‘জ্বি, স্যার। একজন মহিলা আপনার কাছে আইছেন। বললেন, আপনাকে তেনার খুব দরকার।’
‘মহিলা!’
আমার বিস্ময়ের রেশ না ফুরাতেই মফিজ মিয়ার পাশ থেকে এগিয়ে এলেন একজন মহিলা। বললেন-
‘আপনার নাম কি আকাশ?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি…?’
‘আমি সিমির বোন, রিমি।’
‘ওহ! তা আপনি এ বাসায়! ঠিকানাই বা পেলেন কিভাবে!’
‘এতো প্রশ্নের জবাব এক সাথে দেয়া যাবে না। আমি কি আপনার বাসার ভেতরে আসতে পারি?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, আসুন।’
আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়াই। ভেতরে বসার একটি চেয়ার আছে। ওটার একটা হাতল ভাঙা। আমি হাতলভাঙা চেয়ারটি এগিয়ে দিই নিঃসংকোচে। রিমি ওতে বসেন। আমি বসি খাটে। আমার ভেতরে অজস্র প্রশ্ন আর অস্বস্তি। মফিজ মিয়া দরজা থেকেই বিদায় নিলো।
‘আপনার কি বাইরে বেরুবার খুব তাড়া আছে?’
‘জ্বি, না। আপনি বলুন কেনো এসেছেন? এসেছি আপনার সহযোগিতা চাইতে।’
‘আপনি বিরক্ত হয়েছেন, বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনার কাছে না এসে পারলাম না।’
‘ঠিক আছে, আপনি বলুন, আমি আপনার কি সাহায্য করতে পারি।’
‘আমরা একটা সমস্যার মধ্যে পড়েছি। আপনিই পারেন এ সমস্যা থেকে আমাকে ও সিমিকে উদ্ধার করতে।’
‘ঠিক বুঝলাম না। খুলে বলুন।’
‘আপনি তো জানেন, আনিস সিমিকে বিয়ে করতে চাইছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি কি জানেন, আনিসের সাথে আমার…?’
‘শুনেছি, আপনাদের মধ্যে…।’
‘আমি আনিসকে ভালোবাসতাম। দেখুন আমি চাই না, সিমি আনিসকে বিয়ে করুক।’
‘তা আমি কি করতে পারি?’
‘আপনি এই বিয়েটা আটকাতে পারেন।’
‘আমি! কিভাবে?’
‘আপনি আনিসকে বিয়ে না করার জন্য সিমিকে অনুরোধ করতে পারেন।’
‘আমার অনুরোধ সিমি কেনো রাখবে?’
‘আমি জানি, সিমি আপনারই অনুরোধ রাখবে।’
‘আপনি ওর বোন, আপনি অনুরোধ করলেও রাখবে।’
‘এটা আমার জন্য বিব্রতকর। আমার ব্যক্তিগত কষ্ট আর লজ্জার কথা ওকে বলতে চাই না।’
‘প্রেম করার মধ্যে লজ্জার কী আছে?’
‘প্রেম করে হেরে যাবার লজ্জা আছে। সব হারানোর লজ্জাও আছে। আপনি কি আনিসের চরিত্র সম্পর্কে কিছু জানেন না!’
‘প্রেম করাটা ওর হবি বলেই জানি।’
‘প্রেম নয়, প্রেমের অভিনয় করে মেয়েদের সর্বনাশ করাটাই ওর হবি। ও একটা লম্পট!’
এ পর্যন্ত বলে রিমি শাড়ির আঁচলে মুখে চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। কান্নার সামনে আমি বিব্রত হয়ে যাই।
‘রিমি, আপনি কাঁদবেন না, প্লিজ।’
রিমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আমিও চুপ। নীরবতা ভেঙে রিমি নরম কণ্ঠে বলে-
‘আমি উপায়হীন হয়ে আপনার কাছে এসেছি। আপনার ঠিকানা নিয়েছি আপনার বন্ধু আরিফের কাছ থেকে। কথায় কথায় সিমির কাছ থেকে আরিফের টেলিফোন নম্বর নিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট করে আপনার কাছে এসে পৌঁছেছি। আমার অনুরোধটা রাখুন, প্লিজ।’
‘দেখুন, আনিসও আমার বন্ধু। ও জানলেও তো ভাববে বন্ধু হয়ে আমি ওর ক্ষতি করেছি।’
‘আপনার কাছে কী সিমির সর্বনাশটা বড় নয়?’
রিমির কথায় আমি হচকিত হয়ে যাই। কোনো জবাব দিতে পারি না।
‘চুপ করে আছেন যে! আমি যতোটুকু জানি, সিমিকে আপনি পছন্দ করেন।’
‘তাতে কী?’
‘সিমির ভালোর জন্য বন্ধুর বিরুদ্ধে যেতে পারবেন না?’
প্রশ্ন নয়, যেনো বিবেকের পিঠে চাবুকের সপাং আঘাত। আমি কোনো জবাব খুঁজে পাই না। রিমির ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলি-
‘রিমি, আমি আনিসকে বিয়ে না করার জন্য সিমিকে অনুরোধ করবো।’
‘কথা দিচ্ছেন?’
‘কথা দিচ্ছি।’
‘তা হলে আমি আসি। আপনার সহযোগিতার কথা আমার মনে থাকবে। আর হ্যাঁ, আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, তা কখনো সিমিকে বলবেন না।’
‘আচ্ছা।’
সিমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। আমি বলি-
‘বসুন, আমি চা তৈরি করে দিচ্ছি। বাসায় এলেন, কিছু মুখে না দিয়ে…’
‘ধন্যবাদ, ব্যাচেলার বলে আতিথিয়েটা গ্রহণ করলাম না। আমি যাচ্ছি।’
সিমি খোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। আমি বললাম-
‘বাইরে একটু অপেক্ষা করুন, আমিও বের হচ্ছি। আপনাকে খানিকটা পথ এগিয়ে দেবো।’
‘ঠিক আছে।’
রিমি রুমের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। আমি দ্রুত বাসার চাবি নিয়ে বের হয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দিলাম। আমরা সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলাম। গেটের সামনে মফিজ মিয়া আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। আমি মনে মনে মফিজ মিয়ার উদ্দেশে বললাম- ‘স্টুপিড!’
আট.
‘হ্যালো, সিমি!’
‘হ্যাঁ, কেমন আছো আকাশ?’
‘ভালো। তুমি?’
‘ভালোই। তোমার মতো।’
‘তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।’
‘বল।’
‘ঠিক কথা নয়, অনুরোধ করতে চাই।’
‘ভনিতা করছো কেনো? বলে ফেলো।’
‘তুমি আনিসকে বিয়ে করো না।’
ও-প্রান্ত থেকে কোনো শব্দ পাওয়া গেলো না।
‘চুপ করে আছো যে!’
‘কেনো আনিসকে বিয়ে করতে না করছো?’
‘এমনিই।’
‘এমনি-এমনিই কি বিয়ে ভেঙে দেয়া যায়?’
‘দেয়া যায় না?’
‘না। বিয়ে ভাঙতে উল্লেখযোগ্য কারণ লাগে।’
‘আমার অনুরোধ কি উল্লেখযোগ্য নয়?’
‘তোমার অনুরোধ আমার কাছে হয়তো উল্লেখযোগ্য; কিন্তু আমার পরিবারের কাছে উল্লেখযোগ্য নয়।’
‘তাহলে…?’
‘তুমিই বলো। কিভাবে ভেঙে দেবো বিয়ে। কী কারণে ভাঙবো?’
‘আনিসকেই তোমার বিয়ে করতে হবে কেনো?’
‘অন্য কাকে করবো? আর কে আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছে?’
‘আনিসকে বিয়ে না করলেও তোমার জন্য পাত্রের অভাব হবে না।’
‘পাত্র হিসেবে আনিস ভাইয়ের অযোগ্যতা কি?’
‘আনিস! আনিসকে বিয়ে করে তুমি সুখী হতে পারবে না।’
‘ভবিষ্যত বাণী করছো? জ্যোতিষ শাস্ত্র শিখলে কবে?’
‘ভবিষ্যত বাণীর জন্য বলছি না। আনিস তোমার উপযুক্ত পাত্র নয়।’
‘কে আমার উপযুক্ত পাত্র?’
‘অনেকেই।’
‘আমি অন্তত একজনের নাম শুনতে চাচ্ছি।’
‘সিমি, তুমি আজ অনেক তর্ক করছো।’
‘তর্ক নয়, জানার চেষ্টা করছি। তা ছাড়া বিয়ে ভেঙে দেবার অনুরোধ রাখতে হলে আমাকে তো সবদিক বিবেচনা করতে হবে। তাই না?’
‘আমি ভেবেছিলাম, আমার অনুরোধ রাখবে।’
‘রাখবো না, তা তো বলিনি। জানতে চাচ্ছি তুমি এই অনুরোধ কেনো করছো?’
‘সব কথা খুলে বলা যায় না। তুমি কী সত্যিই আনিসকে বিয়ে করতে রাজি?’
‘আমাদের পরিবারের সবাই তো তাই চাইছেন। বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক হয়ে গেছে। ২২ সেপেটম্বর আমার বিয়ে। এক সপ্তাহ পর এনগেজমেন্ট। সময় আছে মাত্র তিন সপ্তাহ। আমি কার জন্য, কেনো এই বিয়ে ফিরিয়ে দেবো? তুমিই তো বলেছিলে আমরা সমাজ ও পরিবারের কাছে দায়বদ্ধ।’
‘যোগ্য লোককে বিয়ে করার কথাও আমি বলেছিলাম।’
‘আনিস ভাইয়ের অযোগ্যতা কম কিসে? তিনি শিক্ষিত ও বিত্তবান। তাদের পরিবারের পরিচিতি, প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক মর্যাদা অনেক উঁচুতে।’
‘সিমি, আমি ঠিক…’
‘বল, বলছো না কেনো?’
‘আনিসের কিছু সমস্যা আছে। এসব কথা স্পষ্ট করে তোমাকে বলতে পারবো না।’
‘আমি জানি, তুমি কী বলতো চাও বা বলতে পারছো না।’
‘চারিত্রিক ত্রুটিটুকু বাদ দিলে আনিসের আর সব কিছু আছে। তাই না?’
‘সিমি!’
‘অবাক হচ্ছো? আনিসকে তুমি এতো সহজেই হারিয়ে দিতে চাও? শুধু একটি মাত্র অনুরোধে!’
‘সিমি, আমি আর কিছু বলতে চাই না।’
‘তুমি অনুরোধ করছো, আর…।’
‘আমার অনুরোধ ফিরিয়ে নিচ্ছি।’
‘পিছিয়ে গেলে?’
‘আমি ধরে নেবো, তোমার সাথে আমার পরিচয়টা ছিল কোনো এক স্বপ্নের একখণ্ড চিত্রনাট্য।’
‘হার মানাটা তোমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।’
‘হয়তো বা। হারতে হারতেই আমি জিতে যাবো একদিন।’
‘জয় করার ইচ্ছাই তোমার মধ্যে নেই, জয় করার শক্তি কোথায় পাবে?’
‘পাওয়ার আনন্দের কথা জানি না, হারানোর বেদনা সহ্য করার শক্তি আমার আছে।’
‘তুমি কেবল পালাতে চাও। মুখোমুখি হতে চাও না। কেনো?’
‘আমি পরাজিত মানুষের দলের একজন।’
‘এ তোমার আত্মপক্ষের দুর্বল ঢাল। আসলে তুমি কাপুরুষ!’
‘সি-মি!’
‘খুব লাগলো বুঝি!’
‘আমি, আমি…!’
‘জেনে রেখো, এ বিয়ে আমি করছি। কথা বলছো না কেনো? তুমি নিশ্চয়ই বিয়েতে আসবে? আসবে না? হ্যালো…!’
ফোনটা রেখে দিলাম। আমার হাত কাঁপছে। বুকের ভেতর কষ্টের শীতল একটা ধারা বয়ে গেলো। বিল দিয়ে টেলিফোন বুথ থেকে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু পা চলতে চাইছে না। সকালের রোদেলা আকাশটা যেনো ভেঙে পড়ছে মাথার ওপর!
নয়.
বৃষ্টি হলে ঢাকা শহরটা যেনো নদী হয়ে যায়। বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকে গলির পথ, রাজপথ, ফুটপাত। মানুষের চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। যাদের গাড়ি আছে, তাদের বিড়ম্বনারও শেষ নেই। জলাবদ্ধ রাস্তায় গাড়ি চালানো বিপজ্জনক। আবার বৃষ্টির দিনে রিকশাওয়ালাদের ব্যবসা জমে ওঠে। বৃষ্টির দিনে সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীদের মতো রিকশাওয়ালারাও চড়া দাম হাঁকে। বিপর্যস্ত নগরবাসীর অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয় যাতায়াতে। বৃষ্টি নিয়ে কবিরা কাব্যময়তায় মুখর হলেও নাগরিক জীবন ঠিক এর উল্টো। কাব্য নয়, যেনো বিদ্রƒপময় গদ্য। বৃষ্টি মানে হাঁটুজলে চলাচল। বৃষ্টি মানে খানাখন্দ ভরা রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে পথ চলা। আজ অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল থেকে বিরামহীন বৃষ্টি। নগরী কেমন চুপসে গেছে। কিন্তু মানুষ থেমে নেই। বৃষ্টি মাথায় ছুটছে সবাই যে যার গন্তব্যে। আমি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাসায়। মুষলধারে বৃষ্টি হলে সমীরণ চৌধুরী আসেন না। এক রুমের রাজ্যে আমি তখন একাই রাজা। বিকেলে বাসা থেকে বের হলাম। তিতলিকে পড়াতে হবে। প্যান্ট গুটিয়ে ও স্যান্ডেল হাতে নিয়ে হাঁটুপানি ভেঙে গলির মোড়ে আসতেই একটি রিকশা পেয়ে গেলাম। বিনয় কণ্ঠে রিকশাওয়ালাকে বললাম-
‘নিউ ইস্কাটন যাবেন?’
‘দশ ট্যাকা।’
রিকশাওয়ালার তাচ্ছিল্যের জবাব।
‘ঠিক আছে, চলো।’
আমি অনেকটা লাফিয়ে রিকশায় চড়ে বসি। নইলে অন্য কেউ রিকশায় চড়ে বসতে পারে। বৃষ্টির দিনে দাম-দর করে রিকশায় ওঠা মুশকিল। দেখা যায়, একজন দাম করছে, অন্য একজন ওঠে বসে বলে, ‘যাও।’ রিকশাওয়ালারা প্যাসেঞ্জারের অধিকার নিয়ে মাথা ঘামায় না। কে বেশি টাকা দেবে, তারা তা-ই দেখে। আমি রিকশায় বসে ভাবতে লাগলাম, তিতলিকে পড়ানোর পর কী করবো। মনে পড়ে গেলো সন্ধ্যায় মিতাকে ফোন করতে হবে। মিতার সাথে আমি টেলিফোনে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। ও কাল বলেছে আমার চাকরির জন্য খুব চেষ্টা করছে। ভাবি, আমার চাকরি ঠিক করে দিতে দুজন মহিলা বেশি আগ্রহী। মিতা ও তামান্না হোসাইন আমার চাকরির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি হবে, এমন সম্ভাবনা দেখছি না। হায়রে দেশ! বন্ধুরা বলে, দেশে একটা চাকরি পেতে হলে যোগ্যতার চেয়ে ঘুষ বা মামার টেলিফোন লাগে। অর্থাৎ মোটা অংকের অর্থ বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোন না হলে কারো চাকরি হবে, এ কথা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। দুর্নীতি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সচিবালয় পর্যন্ত সর্বত্র দুর্নীতির শেকড় ছড়িয়ে গেছে। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে চ্যাম্পিয়নের ইতোমধ্যে কুমর্যাদা লাভ করেছে। এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক যুদ্ধ বাঁধলেও সাধারণ লোক দুর্নীতির করাল গ্রাসে জর্জরিত। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নির্যাতিতরা বিচার পাচ্ছে না। অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে থানা বা জেল থেকে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে, পেনশনের টাকা তুলতে বিড়ম্বনা। সর্বত্র প্রকাশ্যে ঘুষের লেনদেন চলছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দূষণ, সন্ত্রাসের বিস্তার, মূল্যবোধের অবক্ষয় মাত্রাতিরিক্ত জনগোষ্ঠী এই দেশকে অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অরাজকতা যতো বাড়ছে, আমাদের বিবেকের দরজা ততো যেনো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন স্বপ্নহীন চোখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাতড়ে পথ চলছি, তখন ভালোবাসাবাসির সাতকাহন নিয়ে পড়ে থাকা যায়? দেবদাস হওয়া সহজ; কিন্তু দায়িত্ব নেয়া সহজ নয়। এ কথা মনে এলেই সিমির জন্য আমার কোনো কষ্ট থাকে না। আমি সিমিকে ক্ষমাও করে দেই। সিমি আমাকে যে আঘাত করেছে, তার জন্য কোনো অভিযোগ থাকে না। ভাবি, আমাকে কাপুরুষ ভেবে সিমি হয়তো একসময় বিব্রত হবে; কিন্তু ওকে কখনো অনুশোচনার আগুনে পুড়তে হবে না। ভালো লাগার চেয়ে ভালো থাকার গুরুত্ব অনেক বেশি। সিমি কি একদিন এই সত্যটুকু উপলব্ধি করতে পারবে? রিকশায় বসে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম এসব কথার অতলে। রিকশাওয়ালার কথায় চিন্তার ছেদ কাটে।
‘স্যার, কই নামবেন?’
তাকিয়ে দেখি তিতলিদের অট্টালিকা ছাড়িয়ে এসেছি। রিকশাওয়ালাকে বলি-
‘একটু পেছনে যাও।’
রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়। রিকশা ঘুরিয়ে নেয় সে। তিতলিদের অট্টালিকার সামনে রিকশা আসতেই বলি-
‘থামাও, আমি এখানে নামবো।’
রিকশাওয়ালাকে দশ টাকার একটি নোট দিয়ে নেমে পড়ি রিকশা থেকে। অ্যাপার্টমেন্টের সিকিউরিটির লোক আমাকে চেনে। সিকিউরিটির লোকের দিকে তাকিয়ে হেসে আমি দ্রুত লিফটে ঢুকে পড়ি। পাঁচতলার বাটম টিপতেই লিফট ছুটে চললো। লিফট কত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। ভাবি, চাকরি পেতে যদি এমন একটি লিফট পেতাম! এ কথা ভাবতেই নিজের মনে হেসে উঠি। কিছুক্ষণের মধ্যে লিফট চলে আসে পাঁচতলায়। আমি তিতলিদের দরজার কলিংবেলে টিপ দেই। যেনো দরজা খোলার জন্য কেউ অপেক্ষায় ছিল। দরজাটা খুলে যায়। এমন কখনো হয়নি। প্রতিদিন দরজা খুলে তিতলিদের কাজের বুয়া। কিন্তু আজ দরজা খুললো মিষ্টি চেহারার একটি মেয়ে। মেয়েটির বয়স হবে উনিশ-বিশ বছর। ওর চোখ দুটি টানা টানা, ভীষণ মায়াবী। কারো কারো এমন চোখ আছে, যে চোখের দিকে তাকিয়ে চট করে চোখ ফেরানো যায় না। এই মেয়েটির চোখও সেরকম।
‘কাকে চাচ্ছেন?’ মেয়েটির কণ্ঠে প্রশ্ন।
‘জ্বি, আমি তিতলির প্রাইভেট টিউটর।’
‘ওহ, ভেতরে আসুন।’
মেয়েটি দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। আমি ভেতরে যাই। তিতলির মার গলা ভেসে এলো বেডরুম থেকে-
‘কে এসেছে, রিপা?’
‘তিতলির টিচার, অ্যান্টি।’
‘তাকে বসতে বল, আমি আসছি।’
আমি ড্রইংরুমের সোফায় বসলাম। মেয়েটিও ড্রইংরুমে এসে বসলো। আমি অবাক হলাম। অপরিচিত একজনের সামনে কোনো মেয়ে বসে, তা জানা ছিল না। আমি সংকোচবোধ করতে লাগলাম। মেয়েটি বললো-
‘আমার নাম রিপা। তিতলি আমার কাজিন।’
‘ওহ, আচ্ছা।’
‘আপনি কি খাবেন?’
‘না, না। আমি এখন কিছু খাবো না। ধন্যবাদ।’
‘আপনি ভিজে গেছেন। আপনাকে একটা তোয়ালে এনে দিচ্ছি, মাথার চুলগুলো মুছে ফেলুন।’
রিপা এমনভাবে কথা বললো যেনো আমরা অনেকদিনের চেনা এবং ঘনিষ্ঠজন। ও উঠে চলে গেলো এবং একটি তোয়ালে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলো। ওর আন্তরিকতায় আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। রিপার কাছ থেকে তোয়ালে নিলাম। কিন্তু ওর সামনে মাথার চুল মুছতে ইচ্ছে করছে না। রিপা বললো-
‘লজ্জা পাচ্ছেন? পুরুষ মানুষের অতো লজ্জা থাকতে নেই। যে কাজটা করে ফেলা জরুরি, তা করে ফেলাই ভালো। আপনি মাথার চুল মুছুন, আমি দেখবো। শার্টটা মনে হচ্ছে ভিজে গেছে। শার্ট খুলে দিন, আমি আয়রন করে দিচ্ছি।’
আমি রিপার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ও বললো-
‘আপনি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে রয়েছেন কেনো? তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছুন।’
ওর কথায় বিব্রত হই। নিজের লজ্জা আড়াল করতেই তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল মুছতে থাকি। বুঝতে পারছি, রিপা চটপটে ও ঠোঁটকাটা স্বভাবের। মাথার চুল মুছে তোয়ালেটি ওকে ফিরিয়ে দিই। ও বললো-
‘শার্ট দেবেন না?’
‘না, না। শার্ট তেমন ভিজে নি।’
হি-হি-হি করে হেসে ওঠে রিপা। যেনো আমাকে বোকা বানিয়ে মজা পাচ্ছে। ও চলে গেলো তোয়ালে নিয়ে। আমি তিতলির কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। এর আগে এমন হয়নি। তামান্না হোসাইন ড্রইংরুমে এলেন। বললেন-
‘তিতলিকে আজ পড়াতে হবে না। পাশের ফ্ল্যাটের মুমুর আজ জন্মদিন। তিতলি আছে ওদের বাসায়।’
‘ঠিক আছে, আমি তা হলে যাই।’
‘না, না। আপনি যাবেন না। এই অঝোর বৃষ্টিতে কিভাবে যাবেন? আপনি বসুন, রিপার সাথে কথা বলুন। আমি মুমুদের ফ্ল্যাট থেকে আসছি। আমি এলে আপনি যাবেন। আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবে ড্রাইভার।’
‘না, না। আমি যেত পারবো…।’
‘আপনি না খেয়ে যেতে পারবেন না। বসুন, আমি আসছি। বুয়া, টিচারকে চা-নাস্তা দাও।’
তামান্না হোসাইন আমার দিকে তাকালেন না। তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। কাজের বুয়া এসে দরজাটা লাগিয়ে দিলো।
রিপা চলে এলো ড্রইংরুমে। সোফায় বসলো, আমার মুখোমুখি। আমি ইতস্ততবোধ করতে লাগলাম। রিপা জিজ্ঞেস করলো-
‘আপনার কি খারাপ লাগছে?’
‘না, না। খারাপ লাগবে কেনো?’
‘কিন্তু, আপনি কেমন জড়সড় হয়ে বসে আছেন যে!’
‘জ্বি, মানে, ঠিকই তো আছি।’
রিপা হাসলো।
‘আপনার নাম আকাশ, তাই না?’
‘হ্যাঁ। এটি আমার ডাক নাম।’
‘খুব সুন্দর নাম।’
‘ধন্যবাদ।’
এ সময় কাজের বুয়া চায়ের ট্রে নিয়ে এলো ড্রইংরুমে। সোফার সামনের টেবিলে ট্রে রেখে চলে গেলো সে। ট্রেতে চা, বিস্কুট ও মিষ্টি রয়েছে। আমি চায়ের কাপ তুলে নিলাম। রিপাও চায়ের কাপ নিলো। বললো-
‘আপনি অনেকদিন ধরে একটা চাকরি খুঁজছেন, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘চাকরি পেয়ে যাবেন।’
‘রসিকতা করছেন?’
‘না, সত্যিই পেয়ে যাবেন। ইচ্ছে করলে, এ মাসেই পেয়ে যেতে পারেন।’
‘কিভাবে? কোথায়? কে দেবে?’
‘উত্তেজিত হচ্ছেন কেনো? এতে উত্তেজিত হবার কিছু নেই।’
‘কী বলছেন, চাকরি পাবার খবরে উত্তেজিত হবো না!’
‘বুঝতে পারছি, চাকরিটা আপনার খুবই দরকার।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু কে আমাকে চাকরি দেবে?’
‘আমার বাবা দিতে পারেন।’
‘আপনার বাবা!’
‘হ্যাঁ, আমার বাবা অনেক বড় পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তা। তিনি ইচ্ছে করলে, আপনাকে যখন-তখন চাকরি দিতে পারেন।’
‘তিতলি মা বুঝি আপনার বাবাকে আমাকে একটা চাকরি দেবার জন্য বলেছেন?’
‘সে রকমই।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। তাই আমার সুপারিশে আপনার চাকরি হতে পারে।’
‘থ্যাংকস গড। থ্যাংকস আপনাকে। আ-মি, আমি আপনার এই সহযোগিতার কথা আজীবন মনে রাখবো।’
আমার কথায় রিপা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ওর এই হাসির অর্থ খুঁজে পেলাম না। কিশোরী মেয়েরা অকারণে হাসে। কিন্তু রিপা কিশোরী নয়। রিপা হাসি থামিয়ে বললো-
‘কিন্তু আমার কথা আজীবন মনে রাখলেই হবে না, আমাকে আজীবন সঙ্গে রাখতে হবে।’
‘ঠিক, বুঝলাম না।’
‘আপনি কি বোকা? এই সহজ কথাটা কেনো বুঝতে পারলেন না?
‘সহজ কথা?’
‘হ্যাঁ, খুব সহজ কথা।’
‘আপনি কি আমাকে এই সহজ কথাটি খুলে বলবেন?’
‘বলছি। আন্টি অর্থাৎ আমার খালামণি, আপনার সাথে আমাকে বিয়ে দিতে চান।’
‘বিয়ে!’
‘নয় তো কী! আপনার-আমার মধ্যে বিয়ে ছাড়া আর কি সম্পর্ক হতে পারে?’
রিপার কথায় আমি যেনো আকাশ থেকে পড়ি। চাকরির জন্য বিয়ে, না-কি বিয়ের জন্য চাকরি? হঠাৎ জ্বলে উওা আশার প্রদ্বীপ দপ করে নিভে যায়। রিপা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ওর হাসির মধ্যে কেমন আবিষ্টতাও আছে। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বলি-
‘তার মানে আপনার আন্টি আমার জন্য চাকরি এবং বিয়ে দুটোই ঠিক করেছেন?’
‘ঠিক ধরেছেন। তবে বিয়ের ওপর নির্ভর করছে চাকরি।’
রিপার কথায় কোনো জড়তা নেই। ও যেনো আমার সাথে কথা বলার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিল। ওর কথায় হতাশ হয়ে পড়ি। আনন্দটা মিইয়ে যায়। বলি-
‘চাকরির জন্য আমি বিয়ে করবো কেনো? আপনিই বা আমাকে বিয়ে করবেন কেনো?’
‘আপনি আমাকে বিয়ে করবেন, কী করবেন না, তা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আমার অবলম্বন দরকার।’
‘অবলম্বন!’
‘হ্যাঁ, আমাকে নিয়ে আমার বাবা-মার অনেক টেনশন। তারা একজন সৎ ও চরিত্রবান পাত্রের হাতে আমাকে তুলে দিতে চান। তাই, আপনাকে ভালো চাকরি দিয়ে আমাকে বিয়ে দিতে চাইছেন।’
‘কিন্তু…!’
‘চাইলে আপনি অনেক টাকাও নিতে পারেন। আমার বাবার অনেক অর্থ-বিত্ত! তিনি তার একমাত্র মেয়ের সুখের জন্য সব বিলাতে পারেন। আপনি এ সুযোগটা নিতে পারেন।’
‘আপনি আমাকে প্রলুব্ধ করছেন, না-কি পরীক্ষা করছেন?’
‘প্রলুব্ধ হলেও আপনাকে অপরাধী করবো না। আপনার সাথে বিয়ে হলে আমি খুশিই হবো।’
‘কেনো?’
‘আপনাকে আমার ভালো লেগেছে।’
‘এতো অল্পতেই ভালো লাগার অভ্যাস ভালো নয়। এতে ঠকে যাবার সুযোগ থাকে।’
‘অনেক হিসাব করেও মানুষ ঠকে। আমিও ঠকেছি।’
‘যেমন?’
‘আমি অনেকদিন জানাশোনার পর একজনকে ভালোবেসে ছিলাম।’
‘তারপর?’
‘বাবা-মার অমতে ওকে বিয়েও করেছিলাম।’
‘বিয়ে!’
‘হ্যাঁ। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার। বিয়ের পরপরই জানতে পারলাম ও মাদকাসক্ত। অনেক চেষ্টা করেও ওকে ফেরাতে পারি নি।’
‘আচ্ছা! থামলেন কেনো, বলুন?’
‘নেশাগ্রস্ত স্বামীর অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি। একপর্যায়ে ফিরে আসতে হয়েছে আমাকে। ডিভোর্সের মধ্য দিয়ে আমার ভুলের সমাপ্তি। অনেক দিনের চেনা লোককেও তো চিনতে পারি নি!’
রিপা মাথা নিচু করে ফেললো। হয়তো কাঁদছে বা কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছে। এই মুহূর্তে রিপার জন্য মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলো। কত সহজভাবে রিপা ওর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর ঘটনার কথা অকপটে বলে ফেললো। ওর মধ্যে চতুরতা নেই। বরং মনের সরলতা প্রকাশে ও দ্বিধাহীন। আমি চটপটে ও চঞ্চল রিপার মধ্যে দেখতে পেলাম নিঃসঙ্গ এক রিপাকে। ওকে সান্ত¦না দেবার জন্য বললাম-
‘রিপা, আপনার ব্যক্তিগত বেদনার কথা শুনে আমিও ব্যথিত।’
‘সরি, আপনাকে ওসব কথা শুনতে হলো বলে।’
‘আপনার প্রতি আমার সহমর্মিতা সবসময় থাকবে। আমি চাই, আপনি নতুনভাবে জেগে উঠবেন। নিজের মতো করে সাজাবেন আপনার আগামী দিনগুলো।’
রিপা মুখ তুলে তাকালো। ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে। কষ্ট চেপে রাখার চেষ্টা কি-না, কে জানে। ও বললো-
‘খালামণি আপনাকে খুব পছন্দ করেন। তিনি ইচ্ছে করেই আজ আমাকে আপনার সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। তার ধারণা, আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবেন।’
‘আপনাকে বিয়ে করতে অনেকে রাজি হবে।’
‘আমার আগের বিয়ের কথা গোপন রেখে আন্টি আমার বিয়ে দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমি চাই আমার সব সত্য জেনে ও মেনে আমাকে কেউ বিয়ে করুক।’
‘আপনার এ সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সত্যকে অবলম্বন করে পথ চলাটাই ঠিক বলে আমি মনে করি। এতে কখনো কখনো হারানোর কষ্ট থাকলেও প্রবঞ্চার গ্লানি থাকে না।’
‘আপনাকে ধন্যবাদ, সাহস দেবার জন্য। আপনাকে কি আরেক কাপ চা দেবো?’
‘না। আমি বরং এখন যাবো।’
‘সে-কী! আন্টি বলেছেন, আপনি আজ রাতে এখানে খাবেন।’
‘তাকে বলবেন, অন্য একদিন খাবো। সন্ধ্যায় আমার জরুরি একটা কাজ আছে।’
‘আপনি কি আমার ওপর রাগ করে চলে যাচ্ছেন?’
‘না। বরং আপনার প্রতি এক ধরনের ভালো লাগার রেশ নিয়ে যাচ্ছি।’
রিপা এবার লজ্জা পেলো। কাজল দিঘির মতো চোখ দুটোতে খুশির দ্যুতি ঝিলিক দিয়ে উঠলো। কখনো কখনো একটি মাত্র মিষ্টি কথায় মেয়েরা কেমন কিশোরী হয়ে যায়!
দশ.
গুলশানের গোলচত্বর এলাকায় খুব সহজে খুঁজে পেলাম ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্ট। মিতা আমাকে এই রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করতে বলেছে। দুপুরে আমরা দুজন লাঞ্চ করবো। কাল টেলিফোনে মিতার সাথে কথা হয়েছে। ও জানিয়েছে আমার জন্য একটা সুখবর আছে। আমার সুখবর মানে চাকরি পাবার কোনো সম্ভাবনা। মিতা আমার চাকরির জন্য খুব চেষ্টা করছে। আমার প্রতি ও ভীষণ আন্তরিক। ওর আন্তরিকতায় আমি আপ্লুত। মিতাকে টেলিফোনে রিপার কথাও জানিয়েছি। রিপার কথা শুনে মিতা খুব হেসেছে। সিমির কথা ওকে এখনো বলিনি। বলার প্রয়োজনবোধ করিনি। আমার বর্তমান সময়ে সিমি ও রিপা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিমির কথা আমাকে ভাবায়। কখনো কখনো মন খারাপ হয়ে যায়। আগে এমন হয়নি। আমি নিজেই অবাক হই নিজের পরিবর্তনে। কিন্তু সিমিকে ফোন করি না। ফোন করার কথা মনে হলে ওর দেয়া অপমানের কষ্টটা জেগে ওঠে। আনিসকে বিয়ে করে ও সুখী হোক- এই ভেবে নিজেকে সংযত রাখি। মাঝে মাঝে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। রিপার কথা মনে হলে ওকে করুণা করতে ইচ্ছে করে। ওর জীবনের বেদনাবিধুর অধ্যায় আমাকে বিষণ্ন করে দেয়। ভাবায়। কিন্তু বিয়ের বিনিময়ে চাকরির প্রস্তাবটি আমাকে গ্লানিতে ডুবিয়ে দেয়। নিজের অসহায়ত্ত নিজেকে লজ্জা দেয়। এরপর থেকে তিতলিদের বাসায় আমার যেতে ইচ্ছে করে না। তিতলির মায়ের সামনে কেমন বিব্রতবোধ করি। এখন তিতলিকে মনোযোগ দিয়ে পড়াতে পারছি না। এক ধরনের অস্বস্তি লাগে। ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টে বসে সিমি ও রিমি কথা ভাবতে লাগলাম। ওদের কথা ভাবতে ভাবতে ওদের দুজনের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য খুঁজে বের করলাম। সিমি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবেগ সংযত রেখেছে। অর্থাৎ বিয়ের সিদ্ধান্তে আবেগকে প্রশ্রয় দেয়নি। প্রভাব, প্রতিপত্তি আর বিত্তবান স্বামী বেছে নিতে ও ভুল করেনি। অন্যদিকে রিপা আবেগকেই গুরুত্ব দিয়ে বিয়ে করেছিল ভালোবাসার মানুষকে। রিপা ঠকেছে। সিমি হয়তো ঠকবে না। কিংবা ঠকলেও মানিয়ে নিতে পারবে ও। কিন্তু রিপা পারেনি। এখন নতুন করে জীবন সাজাতে চাইছে। বিত্তবানদের নতুন করে সাজিয়ে নেবার সুযোগ ও প্রবণতা দুটোই আছে। তবে আমার প্রতি রিপা খানিকটা আবেগও জন্মেছে। ও বলছিল, আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। ভালো লাগাটা কতো সহজেই হয়ে যেতে পারে। বছরের পর বছর পাশে থেকেও ভালো লাগার মানুষ হওয়া যায় না। আবার ক্ষণিকের পরিচয়ে কেউবা ভালোবাসার মানুষ হয়ে যায়। আমার ভাবনা ভেঙে দিলো মিতার কণ্ঠস্বর-
‘সরি, একটু দেরি হয়ে গেলো।’
মিতা এসে বসলো আমার মুখোমুখি। আমার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলো। যেনো দেরি করে অনেক অপরাধ করে ফেলেছে। আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম-
‘একটু নয়, প্রায় ত্রিশ মিনিট। বেয়ারা কয়েকবার এসে জানতে চেয়েছে কী খাবো।’
‘ঠিক আছে, আমরা এখন খাবারের অর্ডার দিচ্ছি।’
বেহারাকে ডাকতে হলো না। যেনো আশপাশেই ছিল। বেহারা খাবার মেন্যু বই বাড়িয়ে দিলো আমার ও মিতার সামনে। মিতা বললো-
‘কী খাবি, বলো।’
‘আমার কোনো চয়েজ নেই। তুই অর্ডার দে।’
মিতা বিভিন্ন রকমের খাবারের অর্ডার দিলো। বেহারা চলে যেতেই মিতা বললো-
‘আমরা অনেকক্ষণ বসে আড্ডা দেবো।’
‘তার আগে আমার সুখবরটা বলো।’
‘অতো অধীর হচ্ছিস কেনো? আগে তোর রিপার কথা শুনি।’
‘রিপার কোনো গল্প নেই।’
‘কেনো?’
‘আরে বাবা, ওর সাথে কথা হয়েছে একদিন। ও টেলিফোন নম্বর দিয়েছিল। আমি ফোন করিনি।’
‘আহা, অমন ধনীর নিঃসঙ্গ দুলালীকে অবহেলা!’
‘মিতা, তুই যে কী বলিস!’
‘তা রিপার আন্টি তোকে কিছু বলেনি?’
‘বলেছেন। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, রিপাকে আমি বিয়ে করবো কি-না?’
‘তাই! তুই কী বলেছিস?’
‘বললাম, আমাকে সময় দিন। ভেবে জানাবো।’
‘সময় নিলি কেনো?’
‘বাহ, যদি মুখের ওপর বলে দেই বিয়ে করবো না, টিউশনিটা থাকবে? ওটাই তো এখন আমার সম্বল।’
মিতা হিহি করে হাসতে লাগলো। আমি ওর হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম-
‘তুই হাসছিস কেনো?’
‘তুই একটু চালাক হয়েছিস, তাই হাসলাম। আচ্ছা, এখন বল, রিপার আন্টি অর্থাৎ তিতলির মা কি তোকে বলেছেন যে, রিপার বিয়ে হয়েছিল?’
‘না। এর বেশি কথা হয়নি। তিনি বিয়ের কথা তুলতেই বলে দিলাম ভেবে জানাবো। তিনিও এ ব্যাপারে আর কিছু বলেন নি। হয়তো আমার জবাবে খানিকটা মনক্ষুণ্ন হয়েছেন।’
‘তা এখন চাকরিটা হারালে কী করবি?’
‘সেটাই তো ভাবছি।’
বেহারা এসে টেবিলে খাবার সাজাতে লাগলো। আমার ক্ষুধাটা যেনো আরো জানান দিচ্ছে। খাবারের সৌরভ ভেসে আসছে। ভাত, মুরগির মাংস, মাছ, ডাল, সবজি, সালাত থরে থরে সাজানো হলো টেবিলে। বেয়ারা চলে যেতেই আমরা খেতে লাগলাম। মিতা বললো-
‘তোর কথা এক শিল্পপতিকে বলেছিলাম। তোকে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে বলেছেন। তুই আগামী রোববার সকাল ১০টায় তার অফিসে যাবি।’
‘তিনি কে? কোথায় যাবো?’
‘তার ভিজিটিং কার্ড দিচ্ছি। তার নাম মাহমুদ হাসান। একটি বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ারম্যান। আশা করছি, তোর একটা চাকরি হয়ে যাবে।’
‘বলিস কি!’
‘অতো অবাক হচ্ছিস কেনো?’
‘অবাক হবো না? গত তিন বছর ধরেই তো চাকরি খুঁজছি। ইন্টারভিও কম দিলাম না। অভিজ্ঞতা যা হয়েছে, তাতে চাকরি পাবো বলে বিশ্বাস হয় না। আর এখন তুই বলছিস, চাকরি হয়ে যাবো।’
‘চাকরি পাওয়া অনেক কঠিন ব্যাপার ঠিক, আবার কেউ কেউ খুব সহজেই পেয়ে যায়। তাই না?’
‘হ্যাঁ, হয় টাকা, নয় কারো প্রভাব লাগে।’
‘তা ধরে নে, আমার প্রভাবে তোর চাকরি হচ্ছে।’
‘তোর আবার প্রভাব আছে!’
‘কেনো, শুধু পুরুষ মানুষেরই প্রভাব থাকে? মহিলাদের থাকতে পারে না?’
‘তা পারে…।’
‘কোনো কোনো মহিলার প্রভাব অনেক বেশি হয়। আমিও সে রকম এক মহিলা।’
বলেই মিতা হি হি করে হাসতে লাগলো। আমি বলি-
‘কিন্তু…’
‘কোনো কিন্তু নয়, রোববার সকালে তুই যাবি। তোর কথা বলে রেখেছি।
‘অবশ্যই যাবো। একটা চাকরি আমার খুব দরকার।’
‘চাকরি পেয়ে গেলে কী করবি?’
‘পাগল হয়ে যাবো।’
এ কথা বলে আমি হাসতে লাগলাম। মিতাও হাসলো। মনে মনে ভাবতে লাগলাম মফস্বলের একটি মেয়ে ঢাকায় এসে কিভাবে প্রভাবশালী রমণী হয়ে গেলো! ঢাকা শহরে অনেক কিছু বদলে যায়, বদলে দেয় অনেককে।
এগার.
ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে এসে আমি খুব অবাক হলাম। শুনেছিলাম বিশাল জায়গাজুড়ে বেসরকারি উদ্যোগে ফ্যান্টাসি কিংডম তৈরি করা হয়েছে। এখানে বিনোদন প্রিয় শিশু-কিশোর ও চিত্তবিলাসী মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। শিশুদের জন্য এ পার্কটি ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে বিনোদনের একটি প্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে। আমি কখনো ফ্যান্টাসি কিংডমে আসিনি। আজ আসতে হলো। আজ তিতলিকে পড়াতে গিয়েছিলাম। তামান্না হোসাইন বললেন-
‘আজ তিতলির জন্মদিন। আজ ওকে পড়াতে হবে না। আমরা তিতলিকে ফ্যান্টাসি কিংডমে নিয়ে যাবো।’
তিনি আমাকে চলে যেতে দিলেন না। বললেন-
‘আকাশ, আপনিও আমাদের সাথে যাবেন।’
‘আমি না গেলে হয় না?’
‘না, আপনাকে যেতে হবে। তিতলি আপনাকে ছাড়া যাবে না। আপনার কি খুব অসুবিধা হবে?’
‘না, না। অসুবিধা কিসের?’
‘তা হলে চলুন।’
তিতলি ও ওর মা তৈরিই ছিল। তামান্না হোসাইন ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন। নিউ ইস্কাটন থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে ফ্যান্টাসি কিংডমে পৌঁছে গেলাম আমরা। পার্কটির প্রবেশপথে এসে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বিশাল গেট। সুসজ্জিত দোকান। মানুষের ভিড়, কোলাহল। চারপাশে দৃষ্টি রেখে হাঁটতে লাগলাম। পার্কে প্রবেশ করার টিকিট কাটলেন তামান্না হোসাইন। আমরা লাইন ধরে পার্কের ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে আরো জমজমাট। যেনো আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা। দেয়ালজুড়ে দৃষ্টিনন্দন কার্টুন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দের হট্টগোল। গেট দিয়ে প্রবেশ করে তিতলির মা এক পাশে থামলেন। আমি তার পাশে দাঁড়ালাম। তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগলেন। অন্য পাশ থেকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এলো রিপা। রিপাকে দেখে প্রথম কয়েক মুহূর্তের জন্য অবাক হলাম। বুঝতে পারলাম রিপা আশপাশে অপেক্ষা করছিল। রিপা লাইট মেরুন রঙের একটি জামদানি শাড়ি পরেছে। শাড়ির পাড়ে হস্তশিল্পের কারুকাজ। শাড়িতে রিপাকে সুন্দর লাগছে। খোঁপায় একগুচ্ছ হাসনেহেনা। মুখমণ্ডলে প্রসাধনের প্রলেপ নেই। সাধারণ সাজের অসাধারণ দ্যুতি। ও কাছে আসতেই হাসনেহেনার গন্ধ পেলাম। কৈশোর উত্তীর্ণ মেয়েরা বিশেষ সময়ে বা অনুষ্ঠানে শাড়ি পরে। রিপার শাড়ি পরার মধ্যেও একটা বিশেষ কারণ আছে- এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা রইলো না। রিপা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। ওর সাথে আবার দেখা হবে, ভাবিনি। রিপাকে দেখে তামান্না হোসাইন বললেন-
‘তুই কি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলি?’
‘হ্যাঁ, আন্টি। প্রায় আধাঘণ্টা।’
‘ঠিক আছে, চল, সামনে যাই।’
রিপা আমাকে বললো-
‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি?’
‘এখন ভালো আছি। কিছুক্ষণ আগেও মনটা খারাপ ছিল।’
রিপা হাসলো। যেনো ওর হাসির মধ্যে কিছু কথা আছে। আমি বুঝতে পারলাম, তামান্না হোসাইন আমাকে ফ্যান্টাসি কিংডমে কেনো নিয়ে এসেছেন। তিতলির জন্মদিনকে উপলক্ষ করে তিনি আমার সাথে রিপার দেখা করিয়ে দিলেন ভিন্ন এক পরিবেশে। তামান্না হোসাইন ও রিপা তিতলির হাত ধরে হাঁটতে লাগলো। তিতলি থেমে থেমে বায়না ধরতে লাগলো পার্কের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নেবার জন্য। আমি নিঃশব্দে তাদের পেছনে হাঁটতে লাগলাম। হঠাৎ তামান্না হোসাইন দাঁড়ালেন। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। রিপাও দাঁড়ালো। তামান্না হোসাইন বললেন-
‘তোরা দুজন ঘুরে বেড়া। আমি তিতলিকে নিয়ে ঘুরছি।’
‘কেনো? আপনি কেনো কষ্ট করবেন?’
আমি ককিয়ে উঠি। তিনি বলেন-
‘আমার কোনো কষ্ট হবে না। তা ছাড়া তিতলিকে নিয়ে আমিও কিছু রাইডে চড়বো।’
‘কিন্তু…?’
‘কোনো কিন্তু নয়। আপনি রিপাকে নিয়ে ঘুরুন। রিপা, দুই ঘণ্টা পর তুই আমার মোবাইলে ফোন দিয়ে মিট করবি, কেমন?’
‘আচ্ছা, আন্টি।’
তামান্না হোসাইন আমাকে আর কিছু বললেন না বা আমাকে বলার কিছু সুযোগ দিলেন না। তিনি তিতলিকে নিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। রিপা আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনি কি রাগ করেছেন?’
‘রাগ করলেই বা কি হবে?’
‘রাগ করলে আমারও খারাপ লাগবে। আফটার অল, আমার জন্য…!’
‘না, রাগ করিনি। তবে…?’
‘তবে কী?’
‘আপনার সাথে দেখা করিয়ে দেবার জন্যই তো আমাকে আপনার আন্টি নিয়ে এসেছেন, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার এ উদ্দেশ্যটাই ভালো লাগছে না।’
‘আই অ্যাম সরি, আকাশ। এর জন্য আমি দায়ী। আমিই আন্টিকে অনুরোধ করেছি আপনাকে এখানে নিয়ে আসতে।’
রিপা বিনীত হলো। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেললো। আমার ওর জন্য মায়া হলো। আমি বললাম-
‘ঠিক আছে, এখন চলুন ঘুরে বেড়াই।’
‘আপনার রাগ কমেছে?’
‘বলেছি তো রাগ করে নি। চলুন।’
রিপা মিষ্টি করে হাসলো। ওর মিষ্টি হাসির দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই মেয়েটি জীবনে প্রবঞ্চিত হলো কেনো? যে এতো সুন্দর করে হাসতে পারে, তার ভুবনটা বিপর্যস্ত হয়ে গেছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আমরা দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। রিপা কিছুক্ষণ পর বললো-
‘আকাশ, আপনার কি খারাপ লাগছে?’
‘না। এ কথা কেনো বলছেন?’
‘আপনি কিছু বলছেন না যে! কেমন গম্ভীর হয়ে আছেন।’
‘কী বলবো, বলুন। আপনাকে বলা যায় আমার তেমন কোনো কথা যে নেই।’
‘একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবো?’
‘করুন।’
‘আপনি কাউকে ভালোবাসেন?’
‘ভালোবাসার জন্য সময় কোথায়? চাকরি খুঁজে খুঁজেই তো সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
এ কথায় রিপা খুব হাসলো। যেনো খুব হাসির কথা বলে ফেলেছি। বললো-
‘সময়ের অভাবে কেউ ভালোবাসে না- এমন কথা শুনিনি। তা সময় পেলে ভালোবাসবেন- এমনকি কেউ আছে?’
বুঝতে পারলাম রিপা কথা বাড়াবে। কথায় কথায় ও জেনে নিতে চায় আমার কথা। বললাম-
‘সময় বুঝে, পঞ্জিকা দেখে বা হিসাব করে ও মানুষ খুঁজে ভালোবাসা হয় না। তা ছাড়া ভালোবাসলেই তো হয় না। যাকে ভালোবাসবো, তার ভালোবাসাও পেতে হবে। তবেই এর স্বার্থকতা। আবার না পাবার ভালোবাসা বা পেয়ে হারানোর ভালোবাসাও আছে। আমার কী আছে, কে জানে!
‘না পাবার ভালোবাসা বা পেয়ে হারানোর ভালোবাসা কি?’
‘যেমন ধরুন, কেউ একজনকে ভালোবাসলো; কিন্তু সে ভালোবাসার মানুষের ভালোবাসা পেলো না। এটা হচ্ছে না পাবার ভালোবাবাসা। আবার দুজনে দুজনকে ভালোবাসলো, কিন্তু কোনো পরিণতি লাভ করলো না। আপনার কথাই ধরুন, যাকে ভালোবাসলেন, তাকে পেয়েও হারালেন। এটা হচ্ছে, পেয়ে হারানোর ভালোবাসা।’
‘ভালোবাসা সম্পর্কে দেখছি আপনার যথেষ্ট ধারণা আছে!’
‘আসলে ভালোবাসায় অনেক হুজ্জুত, অনেক কষ্ট। তাই কষ্ট বিলাসীরা প্রেমে পড়ে সহজে। আমি সে দলের নই।’
‘আপনি তা হলে কোন দলের?’
রিপার কৌতূহলী চোখ আমার দিকে নিবিষ্ট।
‘আমি আমার দলের। কেউ বলে আমি পরাজিত দলের।’
‘যদি আপনাকে কেউ এখন ভালোবাসে?’
‘সে মরীচীকার পেছনে ছুটবে। সে যাক, এবার আপনার কথা বলুন।’
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চেষ্টা করি। রিপা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘আমার উল্লেখযোগ্য প্রসঙ্গের কথা তো আপনি জানেন। নতুন কিছু নেই। বলার মতো কিছু ঘটবে বলেও মনে হচ্ছে না।’
‘হতাশ হয়ে গেলেন?’
‘না, হতাশ হাই নি। শুধু স্বপ্নের দরজাটা বন্ধ করে দিলাম।’
রিপার কণ্ঠ ভারি মনে হলো। ও হঠাৎ মিইয়ে গেছে। আমার কথাগুলো হয়তো ওকে আশাহত করেছে। সেটাই ভালো। মিথ্যে স্বপ্নের চেয়ে অপ্রিয় সত্য ভালো। আমি ওর মনের ভার হালকা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। মেয়েরা আইসক্রিম বা চটপতি খেতে পছন্দ করে। আমি বললাম-
‘চলুন, আইসক্রিম খাই।’
রিপা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। এ মুহূর্তে রিপার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। এক ধরনের গুমোট বিষণ্নতা দেখতে পাচ্ছি। আমরা একটি ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালাম। আইসক্রিমের অর্ডার দিতে যাবো, এমনি সময় পেছন দিক থেকে আনিসের ডাক এলো-
‘আকাশ, আমাদের জন্যও দুটা আইসক্রিম নিস।’
আনিসের কণ্ঠে চমকে উঠি। পেছনে ঘুরে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। আনিসের সাথে সিমিও দাঁড়িয়ে আছে। আমার মুখটা কেমন হয়ে আছে, কে জানে। আমি কয়েকটা মুহূর্ত থ’ হয়ে রইলাম। আমার ভেতরে কষ্টের ভীষণ তোলপাড় শুরু হলো। সিমি কিছু বললো না। ও আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। যেনো আমার ভেতরের সব পড়ে নিচ্ছে। মুহূর্তগুলো যেনো আটকে আছে আমার অবাক চোখের তারায়। আনিস বললো-
‘ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিস, মনে হচ্ছে?’
‘না, ঠিক তা নয়। তোরা এখানে!’
‘বিয়ের আগে হবু কনের সাথে একটু ঘুরে নিচ্ছি। বলতে পারিস, আলোপ-আলোচনা করে নিচ্ছি। তা তুই এখানে কেনো? তাকে তো চিনলাম না?’
রিপার দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্নটি করলো আনিস। আমি রিপাকে পরিচয় করিয়ে দিতে বলি-
‘ওর নাম রিপা। আমার পরিচিতা। আর রিপা, ও হচ্ছে আমার বন্ধু আনিস। আর ওর নাম সিমি। ওদের অচিরেই বিয়ে হচ্ছে।’
রিপা সালাম জানালো আনিস ও সিমিকে। সিমি রিপাকে বললো-
‘আপনি খুউব সুন্দর, রিপা।’
এ কথায় রিপা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। সিমি কথাটি রিপাকে খুশি করার জন্য যে বলেনি, তা আমি বুঝতে পারলাম। কথাটি যেনো আমার উদ্দেশেই বলা। আনিস বললো-
‘তা আকাশ, রিপার কথা তো তুই আগে বলিস নি! এমন সুন্দরী পরিচিতাকে লুকিয়ে রেখেছিলি কেনো?’
‘আমি লুকিয়ে রাখিনি। ও নিজেই লুকিয়ে ছিল।’
রিপা বললো-
‘আমাদের মধ্যে লুকোলুকির কিছু নেই। আমরা…’
আমি রিপার কথা কেড়ে নিয়ে বললাম-
‘আমরা একে-অন্যের কাছে স্পষ্ট এবং বিশ্বস্ত’
আমার এ কথায় সিমির চোখ দুটি যেনো জ্বলে উঠলো। ও বললো-
‘যাক, তুমি এখন নিজেকে স্পষ্ট করতে শিখেছো?’
‘আমি বরাবরই স্পষ্ট। তোমরা অনেকে অহেতুক আমাকে দুর্বোধ্য ভাবো।’
সিমি কিছু বলতে যাচ্ছিল। আনিস ওকে হাতের ইশারায় থামিয়ে বললো-
‘এখানে দাঁড়িয়ে শুধু তর্ক করলে হবে? রিপাই বা কী ভাববে? চলো, সবাই আইসক্রিম খাই।’
আনিসের প্রস্তাবে সায় দিলো রিপা। আনিস এগিয়ে গেলো আইসক্রিম কিনতে। আমি ও সিমি নিশ্চুপ। নীরবতারও একটা ভাষা আছে। এ ভাষা সেতুবন্ধন তৈরি করলো আমার ও সিমির মধ্যে। আমার দুপাশে সিমি ও রিপা। খুব ইচ্ছে হলো সিমির হাতটি ধরে বলি- ‘তুমি আনিসকে বিয়ে করো না!’ কিন্তু আমার ও সিমির মাঝে অদৃশ্য এক দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এই দেয়ালটা ভাঙতে পারছি না। সুপ্ত ইচ্ছেটা দেয়ালে হোঁচট খেয়ে গুমরে কাঁদতে লাগলো।
রিপা সিমিকে বললো-
‘আপনাদের কবে বিয়ে হচ্ছে?’
‘আর দুসপ্তাহ পর। ২২ সেপ্টম্বর। বিয়েতে আপনার নিমন্ত্রণ রইলো। আসবেন কিন্তু!’
‘চেষ্টা করবো।’
‘চেষ্টা নয়, আসতেই হবে। আকাশের সাথে চলে আসবেন। আসলে আমি খুব খুশি হবো।’
আমি সিমিকে বললাম-
‘তোমার বিয়েতে আমি আসবো কি-না তা তো আমাকে জিজ্ঞেস করলে না!’
দুচোখে বিস্ময় নিয়ে সিমি বললো-
‘তুমি কি আমার বিয়েতে আসবে না!’
‘না-ও তো আসতে পারি।’
‘কেনো?’
‘সব কেনোর জবাব দেওয়া যায় না। আর আমি জবাবদিহিতা করতে বাধ্য নই।’
‘আমার সাথেই তোমার যতো অহংকার। অহংকার ছাড়া তোমার আর…’
‘কিছুই নেই। আমার কিছু নেই, তাতে আমার কোনো দুঃখও নেই। না থাকারও একটা অহংকার আমার আছে।’
রিপা বিব্রতভাবে আমাকে ও সিমিকে দেখছে। সিমি বললো-
‘আরো কিছু বলবে?’
‘বিত্তের বেসাতি নিয়ে তোমাদের অনেক অহংকার। আমি চিত্তের বিলাসিতায় বিভোর। তোমাদের বৈষয়িক হিসাবকে আমি পায়ে দলে পথ চলতে পারি। দারিদ্র্যতা নিয়ে আমার কোনো লজ্জা নেই। মানুষকে মূল্য দিতে না পারার তোমাদের দীনতা দেখে, আমার আফসোস হয়।’
সিমি কোনো কথা বললো না। ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো অপলক। কথাগুলো বলে আমি যেনো ভারমুক্ত হলাম। চাপা ক্ষোভ বেরিয়ে এলো কথার মধ্যে। এর মধ্যে আনিস চলো এলো আইসক্রিম নিয়ে। বললো-
‘চলো আইসক্রিম খেয়ে সবাই একসাথে ঘুরে বেড়াই।’
আনিস আইসক্রিম বাড়িয়ে দিলো রিপার দিকে। রিপা আইসক্রিম নিলো। সিমির দিকে আইসক্রিম বাড়াতেই সিমি বললো-
‘আমি আইসক্রিম খাবো না। আমি এখনই বাড়ি যাবো।’
বলেই ও হাঁটতে লাগলো গেটের দিকে। আনিস হতভম্ব হয়ে গেলো। ও আমার দিকে তাকালো। আমি কিছুই হয়নি ভাব করে রইলাম। কয়েকটা মুহূর্ত নষ্ট করলো আনিস। এরপর আনিস জোরে পা চালালো সিমির উদ্দেশে। আমি আপন মনে হেসে উঠলাম।
বার.
আজকের দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। এ দিনটি স্মরণীয় হবার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। প্রথম কারণটি হচ্ছে আজ আমার চাকরি হয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো আজ সিমির বিয়ে হচ্ছে। দুটি ঘটনাই তীব্র আনন্দের। কিন্তু কেনো জানি, সিমির বিয়ের জন্য আমি কষ্ট পাচ্ছি। আনন্দ আর কষ্টের দুটি ধারা আমার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। চাকরি পাবার সীমাহীন আনন্দটা উপভোগ করতে পারছি না। নিজের ভেতর এক ধরনের মিহিন ভাঙাচোরা টের পাচ্ছি। আমাকে অনেকে ‘কঠোর’, ‘আবেগহীন’, ‘আত্মকেন্দ্রিক’, ‘অহংকারী’ তো কিছু ভাবে। সিমি ক্ষেপে গেলে বলতো, ‘তুমি হৃদয়হীন, নির্দয়!’ অথচ আজ আমার ভেতরে এ কিসের জলপ্রপাত? এ কথা ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করি। মাত্র কিছুক্ষণ আগে আমার চাকরিটা হলো। আনন্দের চেয়ে বিস্ময়ের রেশ বেশি গভীর। আমি অবিষ্টচিত্তে চাকরির নিয়োগপত্র নিয়ে মতিঝিলের ব্যস্ত ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার ওপর দুপুরের সূর্য। প্রখর রোদ। আজ রোদের তীব্রতা গায়ে লাগছে না। এ মুহূর্তে একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু আমি ধূমপান করি না। আশপাশে তাকিয়ে দেখে নিলাম টেলিফোনের দোকান আছে কিনা। চাকরির পাবার খবরটা প্রথমে জানাতে হবে মিতাকে। ওর জন্যই চাকরিটা হলো। কোনো ইন্টারভিউ নেই। শুধু কুশলবিনিময় করেই চাকরি পেয়ে গেলাম। মিতাকে আমার আলাদ্দিনের চেরাগ মনে হচ্ছে।
আমাকে চাকরি দিলেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি মাহমুদ হাসান। তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানির চেয়ারম্যান। তিনি যখন তখন যে কাউকেই চাকরি দিতে পারেন। এতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু আমি ভীষণ অবাক হয়েছি। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, তিনি আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে দেবেন। এই ত্রিশ মিনিট আগে তার বিশাল কক্ষে যখন গিয়েছিলাম, তখন আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। মাহমুদ হাসান ফাইল দেখায় মগ্ন ছিলেন। তিনি আমাকে ইশারায় তার সামনের চেয়ারে বসতে বললেন। আমি চেয়ারে বসলাম। বুক দুরু দুরু কাঁপছিল। মাহমুদ হাসান ফাইল থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-
‘আপনার কোয়ালিফিকেশন?’
‘জ্বি, ইকোনিমিক্সে অনার্স-মাস্টার্স। ফ্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’
‘চাকরির অভিজ্ঞতা নেই, তাই না?’
‘জ্বি। অনেকদিন ধরে বেকার।’
‘মি. আকাশ, আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিতে পারি। আপনি আপনার যোগ্যতা প্রমাণ করে চাকরিটা রক্ষা করবেন বলে আশা রাখি।’
‘জ্বি, জ্বি। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করবো, স্যার।’
‘আমি অনেস্টি, সিনসিনিয়ারিটি আর ডিসিপ্লিন পছন্দ করি। চাকরির জন্য এ তিনটি গুণের খুবই প্রয়োজন, বুঝলেন?’
‘আমি এ কথা মনে রাখবো, স্যার।’
‘কক্সবাজারে আমাদের একটি মাছ প্রসেসিংয়ের ইন্ডাস্ট্রি আছে। এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছ রপ্তানি করা হয়। আপনাকে ওই ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে আমি নিয়োগ দিচ্ছি। আপনি এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে জয়েন্ট করবেন। প্রথম তিন মাস আপনি ট্রেনিং পিরিয়ড হিসেবে কাজ করবেন। কাজ শিখবেনও। এই তিন মাস আপনি বেতন পাবেন ২২ হাজার ৫০০ টাকা। তিন মাস পর আপনার পারফরমেন্স ভালো হলে চাকরি স্থায়ী হবে। তখন আপনার বেতন হবে ৩০ হাজার টাকা। কোম্পানির ডাকবাংলো এবং অফিসের গাড়ি আপনার জন্য বরাদ্দ থাকবে।’
মাহমুদ হাসানের কথাগুলো আমাকে এলোমেলো করে দিলো। মনে হচ্ছিল কোনো স্বপ্ন দৃশ্য। আমি কোনো কথাই বলতে পারছিলাম না। তিনি বললেন-
‘আপনার কিছু বলার আছে?’
‘জ্বি, না স্যার। আমি… আমি…’
‘আপনি বাইরে গিয়ে আমাদের প্রধান ক্যাশিয়ারের সাথে দেখা করুন। তিনি আপনাকে এক মাসের বেতন অগ্রীম দিয়ে দেবেন। আমি টেলিফোনে বলে দিচ্ছি।’
তিনি টেলিফোনে তার সেক্রেটারিকে আমাকে অগ্রীম বেতন ও অস্থায়ী নিয়োগপত্র দেবার কথা বললেন। আমার হৃৎকম্পন যেনো বেড়ে গেলো। আমার খুব তৃষ্ণা পেলো। মাহমুদ হাসান টেলিফোন রেখে বললেন-
‘আমি আশা করছি আপনি এই চাকরিটা এনজয় করবেন।’
‘জ্বি, স্যার। আমি… আমি…।’
‘আপনি একটু নাভার্স হয়ে গেছেন।’
‘জ্বি, স্যার। আমার নার্ভ কাজ করছে না।’
‘বি ইজি, ম্যান। আই কংগ্র্যাচুলেট ইউ টু ইউর ফার্স্ট জব।’
মাহমুদ হাসান উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম। তার সাথে হ্যান্ডস্যাক করে বললাম-
‘গ্রেট থ্যাংকস টু ইউর গ্রেট কাইন্ড, স্যার।’
‘ওয়েলকাম। ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে কাজ করবেন। যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে ফোন করতে দ্বিধা করবেন না।’
‘ইয়েস, স্যার। একটা কথা বলতে পারি, স্যার?’
‘বলুন।’
‘আমি আজই চলে যেতে চাই।’
‘নো প্রবলেম, আমার সেক্রেটারি কক্সবাজার ফোন করে দেবে।’
‘থ্যাংকস এগেইন, স্যার।’
মাত্র এই কটি কথার মধ্য দিয়ে ঈর্ষণীয় চাকরিটা পেয়ে গেলাম। আমার পকেটে এখন এক মাসের বেতনের টাকা এবং চাকরির নিয়োগপত্র। মতিঝিলের সামনে দাঁড়িয়ে সামনের অট্টালিকাগুলোর দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। মনে হচ্ছিল আমিও ওই অট্টালিকার মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। আমি টেলিফোন করার জন্য একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে ঢুকে পড়লাম। ফোন করলাম মিতার মোবাইল ফোনে।
‘হ্যালো…।’
‘মিতা, আমি আকাশ বলছি।’
‘আকাশ! কী খবর বল, চাকরি হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, তোকে কী বলে ধন্যবাদ দেবো, ভেবে পাচ্ছি না।’
‘হয়েছে, হয়েছে। তোর চাকরি পছন্দ হয়েছে?’
‘হয়েছে। অনেক ভালো বেতন! আমার জন্য এই চাকরি স্বপ্নের মতো!’
‘বেতন পেলে আমাকে খাওয়াতে হবে কিন্তু!’
‘কী যে বলিস! তুই কি এখনই আসতে পারবি?’
‘না, কেনো?’
‘আমি তো আজই চলে যাচ্ছি।’
‘কোথায়!’
‘কক্সবাজার। সেখানেই থাকতে হবে।’
‘তা আজই যেতে হবে কেনো?’
‘আমিই চলে যাচ্ছি। এই শহর থেকে আজই চলে যেতে চাই।’
‘এই শহরের প্রতি এতো রাগ কেনো?’
‘তোকে এ কথা অন্য একদিন বলবো। তুই সত্যিই আসতে পারবি না?
‘নারে। আমি আজ ব্যস্ত থাকবো। ঠিক আছে, তুই চলে যা।’
‘তোর সাথে দেখা না করেই চলে যাবো?’
‘আমার জন্য তোর ভাবতে হবে না। তোকে তো সব সময়ের জন্য আমি পাবো না!’
‘তাই বলে…?’
‘আমি কক্সবাজার গিয়ে তোর সাথে দেখা করে আসবো।’
‘তুই আসবি!’
‘আমাকে মাঝে মাঝে কক্সবাজার যেতে হয়। এ নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই মনোযোগ দিয়ে চাকরি কর।’
‘তা করবো। এই চাকরি আমার জন্য বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ।’
‘আমার বিশ্বাস, তোকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।’
‘তোর ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না, মিতা!’
‘পাগল ছেলে! তোকে ঋণ শোধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে কে, শুনি?’
মিতার কণ্ঠও আবেগ-আপ্লুত। আমার দুচোখ ভিজে আসতে চায়। নিজেকে সামলে নেই। টেলিফোনের দোকানে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলাটা সস্তা আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এ মুহূর্ত আমার হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কান্নার বেগ রোধ করতে আমি ফোনটা রেখে দিলাম। কষ্টের অবদমন কি সমসময় চেপে রাখা যায়? দুচোখ থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। এই অপ্রতিরোধ্য অশ্রুকণা চট করে মুছে ফেললাম রুমাল দিয়ে। বিল দিতে গিয়ে দেখি, ফোন-ফ্যাক্সের দোকানের মালিক আমার বিষণ্ন মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।
তের.
ঢাকা শহরটা যেনো একমাসেই বদলে গেছে। সে সাথে বদলে গেছে মানুষও। এক মাস পর ঢাকায় ফিরে এ কথাই মনে হলো। সেই চেনা শহরটাকে কেমন অচেনা লাগছে। হেড অফিসের নোটিসে আমি একদিনের জন্য ঢাকায় এলাম। প্রক্রিয়াজাতকৃত সামুদ্রিক মাছ আমদানি করতে উৎসাহী একটি বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ঢাকায় এসেছেন। ওই প্রতিষ্ঠানটির সাথে আমাদের কোম্পানির যৌথভাবে নতুন ইন্ডাস্ট্রি তৈরির কথা চলছে। আমাকে জরুরিভাবে আসতে হলো আমাদের কোম্পানিতে উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাতকৃত মাছ নিয়ে। এই মাছ নমুনা হিসেবে দেখানো হবে বিনোয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের। রাতের বাস ধরে পৌঁছে গেলাম ঢাকা। রাতজাগা ভ্রমণের ক্লান্তি নিয়েও অফিসে থাকতে হলো দুপুর অবধি। অফিসের কাজ শেষ হবার পর বিকেলটা হাতে ছিল বিশ্রামের জন্য। রাতেই আমাকে ছুটতে হবে কক্সবাজারের উদ্দেশে। বিশ্রাম নিতে চাইলো না বিরহকাতর মন। টানা এক মাস না দেখা ঢাকা শহর আমাকে বিষণ্ন করে দিলো। মিতার কথা মনে হতেই ওকে ফোন করলাম। ওকে ফোনে পেলাম না। সিমির কথা মনে হচ্ছিলো একপশলা চাপা বেদনার রেশে। অন্য সময় হলে ওকে ফোন করে চমকে দিতাম। কিন্তু আজ ইচ্ছে করলো না। মনে মনে বললাম-
‘সিমি, আনিসকে নিয়ে সুখী হও।’ মনে গুমোট ভাব পেখম ছড়িয়ে রইলো। নিজের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি এবং কষ্ট টের পাই। সবচেয়ে বেশি অস্বস্তির মধ্যে পড়ি রিপার সাথে হঠাৎ দেখা হবার পর। রিপার আচরণে খুবই অবাক হই। ও যেনো আমাকে চিনতেই পারছিল না। বিষণ্ন বিকেলে নিউমার্কেটে ঘুরছিলাম। তিতলিকে দেখতে পেলাম রিপার সাথে। তিতলিকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেলো। একটি ফাস্টফুডের দোকানের সামনে ওরা দাঁড়িয়েছিল। আমি কাছে গিয়ে তিতলিকে বললাম-
‘কেমন আছো, তিতলি?’
তিতলি ভীষণ চমকে গেলো এবং খুশি হলো। ও অবাক চোখে বললো-
‘স্যা-র!’
‘হ্যাঁ, কেমন আছো?’
‘ভালো।’ তিতলি ছোট্ট করে জবাব দিলো।
‘তুমি এখন কার কাছে পড়ছো?’
‘নতুন একজন স্যারের কাছে। তার নাম হাবিব।’
আড়চোখে দেখলাম রিপা আমাকে দেখে না চেনার ভান করছে। আমি অবাক হলাম। তিতলিকে বললাম-
‘তোমার মা আসেন নি?’
‘না, স্যার। আমি আপুর সাথে এসেছি। হাবিব স্যারও এসেছেন।’
‘তাই না-কি!’
এবার রিপা তিতলিকে ধমকে উঠলো।
‘তিতলি, এতো কথা বলছো কেনো?’
তিতলি চুপসে গেলো। আমি রিপার দিকে চেয়ে বললাম। আপনি কি আমার প্রতি কোনো কারণে রেগে আছেন?’
‘আপনার প্রতি রাগ করবো কেনো? রাগ করার কারণই বা কি থাকতে পারে?’
‘আমারও তাই ধারণা।’
‘আপনার কী ধারণা, তা নিয়ে ভাববার আমার সময় নেই।’
রিপার কণ্ঠে ঝাঁঝ। আমি বিব্রত হয়ে যাই। এ সময় ফাস্টফুডের দোকান থেকে একজন সুদর্শন যুবক বের হয়ে এলেন তিনটি আইসক্রিম নিয়ে। রিপার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। যুবকটি রিপার কাছে আসতেই ও বললো-
‘এতো দেরি করলে কেনো? বাইরে এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়? একা মেয়ে মানুষ দেখলে কতো লোকের উপদ্রব সহ্য করতে হয়, জানো!’
রিপার বিদ্রƒপটা যেনো আমার উদ্দেশে। সুদর্শন যুবক অনেকটা অপরাধী গলায় বললো-
‘সরি, দোকানদার একশ টাকার ভাঙতি দিতে পারছিল না। তাই একটু দেরি হয়ে গেলো।’
যুবক এবার আমার দিকে তাকালো। রিপা তার চোখ অনুসরণ করে বললো-
‘হাবিব, তিনি নাকি তিতলিকে পড়াতেন। এখানে তিতলিকে দেখে কথা বলছেন।’
তিতলি বললো-
‘স্যার, উনি আমার আকাশ স্যার।’ তিতলির কথা শুনে হাবিব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-
‘ও আচ্ছা! আপনার কথা তিতলি প্রায়ই বলে। আমার নাম হাবিব। আপনি চলে যাবার পর আমি ওকে পড়াচ্ছি।’
তিতলি ও রিপাকে হাবিব একটি করে আইসক্রিম বাড়িয়ে দিলো। নিজের হাতের আইসক্রিমটি হাবিব আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-
‘এটি আপনি ধরুন, আমি আরেকটি কিনে আনছি।’
কিছু লোক আছেন, যারা কোনো ঘোরপ্যাঁচ বোঝেন না। সহজ এবং সরল। রহস্য, কপটতা বা সন্দেহ কোনোটাই তাদের চরিত্রে দেখা যায় না। পৃথিবীতে প্রলয় হয়ে গেলেও তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। তাদের সব সময় সুখী-সুখী মনে হয়। হাবিব এ ধরনের একজন লোক। খুব দ্রুত হাবিবের চরিত্র এঁকে ফেললাম। হাবিবকে বিয়ে করে রিপা সুখী হতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। এ ধরনের লোক পেছনে ফিরে তাকাতে চায় না। তাদের দৃষ্টি থাকে সামনের দিকে। রিপা এবার সঠিক লোক ধরেছে।
‘কী হলো, ধরুন।’
হাবিবের অনুরোধে আমি বললাম-
‘আপনাকে ধন্যবাদ। আমি আইসক্রিম খাই না। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো।’
রিপা হাবিবকে বললো-
‘হাবিব, তাড়াতাড়ি চলো, সিনেমা দেখবো, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আজ সিনেমা দেখবো আর রমনা রেস্তোরাঁয় ডিনার খাবো।’
হাবিব আমার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনি আমাদের সাথে যাবেন?’
এ কথার জবাব দেবার আগেই রিপা বললো-
‘তুমি যে কী! তিনি আমাদের সাথে কেনো যাবেন! তার কাজ আছে না?’
রিপার এই উদ্বেগ প্রকাশে খারাপ লাগলো না। আমাকে রিপা উপেক্ষা করছে ঠিক; কিন্তু আমার উপস্থিতি ওকে স্বাভাবিক রাখবে কি? আমি রিপার কথা সমর্থন করে বললাম-
‘আমার অনেক কাজ। সন্ধ্যায় আমাকে চলে যেতে হবে ঢাকার বাইরে।’
‘ঠিক আছে, আপনার সাথে আরেকদিন কথা হবে। আমরা আসছি।’
‘আচ্ছা, আসুন। দেখা হবে হয়তো।’
এ সময় রিপা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাবিবকে বললো-
‘হাবিব, তাকে আমাদের বিয়ের দাওয়াতটা দিয়ে দাও। তিতলির সাবেক টিচার হিসেবে তিনিও আমাদের বিয়েতে আসতে পারেন।’
দাওয়াত না দিয়ে যেনো ভীষণ একটা ভুল হয়ে গেছে, এমন ভাব ফুটে উঠলো হাবিবের চোখে-মুখে। তিনি লজ্জিত কণ্ঠে বললেন-
‘এ মাসের ২৮ তারিখে আমাদের বিয়ে। ইস্কাটনে অফিসার্স ক্লাবে। আপনি আমন্ত্রিত। আসবেন কিন্তু!’
‘চেষ্টা করবো আসতে। না আসতে পারলেও আপনাদের প্রতি আমার শুভ কামনা রইলো।’
রিপা তাড়া দিলো-
‘চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে!’
হাবিব বললো-
‘আচ্ছা, আসি?’
‘আসুন।’
ওরা চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম, প্রত্যাখ্যান কাউকে পাথর করে দেয়, আবার কাউকে তুষের আগুনে পোড়ায়। রিপা আজ আমার ওপর চেপে রাখা আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে গেলো। ওর জন্য খুব মায়া হলো। ও সংসারী হতে চায়, যে কাউকে নিয়েই সুখী হতে চায়। কেউ কেউ কতো সহজেই মুছে ফেলে সব, কতো সহজেই গ্রহণ করে!
চৌদ্দ.
সমুদ্রের যেমন নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আছে, তেমনি আছে এর অদ্ভুত শক্তি। সমুদ্রের সামনে মানুষ তার দুঃখ, কষ্ট, হাহাকার, গ্লানি নিয়ে মন খারাপ করে থাকতে পারে না। সমুদ্র দুঃখ-কষ্ট শুষে নেয় বা তা ঘুম পাড়িয়ে রাখে। তাই সব হারানো মানুষও সমুদ্রের সামনে নিজের নিঃসঙ্গতা ভুলে যায়। ‘যে কোনো বিশালত্বের সামনে কোনো ক্ষুদ্রতার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না’- এ সত্যটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এসে। সমুদ্রের সাথে আমার প্রতিদিন সখ্যতা হয়। আমার সমস্ত কষ্টের ভার তুলে দিই সমুদ্রের কাছে। সমুদ্রও আমার গোপন দুঃখগুলো নিয়ে যেনো খেলা করে। আজ সৈকতে সারাদিন কাটিয়ে দেবো। সমুদ্রের সাথে আমি দিনভর ভাব বিনিময় করবো। আজ আমার ছুটি। একটানা তিন মাস কর্মজীবনের প্রথম ছুটি। এই তিন মাস শুধু কাজ করেছি। বেকারত্বের দিন হয় দীর্ঘ। কর্মজীবীর সময় ফুরিয়ে যায় দ্রুত। কাজের ব্যস্ততায় দ্রুত ফুরিয়ে গেলো তিনটি মাস। এ তিন মাস ভুলে গিয়েছিলাম সবকিছু। কাজের চাপে তলিয়ে গিয়েছিলাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস করেও থেমে থাকিনি। প্রয়োজনে কোনোদিন মধ্যরাত অবধি ইন্ডাস্ট্রিতে শ্রমিকদের সাথে কাজ করেছি। কোম্পানির স্বার্থে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। নিজেকে দায়িত্ববান, যোগ্য ও কর্মঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সব চেষ্টাই করেছি। ইন্ডাস্ট্রির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে আমার মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, আমরা সকলে একটি পরিবার। এমন সুন্দর চাকরি পাবো আমি জীবনে স্বপ্নও দেখিনি। তাই কাজে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কারও পেলাম। আজই আমার চাকরি স্থায়ী হয়েছে। চাকরির স্থায়ী নিয়োগ প্রাপ্তিতে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। এমন একটি শুভদিনের অপেক্ষায় ছিলাম। তাই আজ ছুটি নিয়েছি। ইচ্ছে হলো সারাদিন সমুদ্র সৈকতে ঘুরে বেড়াবো। সমুদ্রের সাথে অনুচ্চারিত শব্দে হবে আমার কথপোকথন। এ ভাবনায় চলে এলাম সৈকতে।
সৈকতজুড়ে চিত্তবিলাসী মানুষের ভিড়। নারী-পুরুষ-শিশুদের কোলাহলে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বাতাসের শো শো শব্দ আর সমুদ্রের গর্জন। জানুয়ারির আকাশ মেঘমুক্ত। নীল। নীলাকাশের ছায়ায় সমুদ্রও নীল। শীতের হালকা হিমেল হাওয়ায় উড়ছে গাংচিল, ফের ঝুপ করে নামছে পানিতে। কক্সবাজার বিচে শীতের সময় অনেক ট্যুরিস্ট আসেন। ভ্রমণ ও বিনোদন প্রিয় মানুষ সমুদ্র দর্শনের জন্য এ সময়টা বেছে নেন। কারণ, ছেলেমেয়েদের স্কুল ছুটি যেমন থাকে, তেমনি ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয় থাকে না। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার বিচ থাকে জমজমাট। আমি বসে আছি সমুদ্রের জলসীমার খুব কাছাকাছি। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম বড় বড় ঢেউগুলো কিভাবে ভেঙে ভেঙে সৈকতে এসে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফের ঢেউ আসে। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ে সৈকতে। হঠাৎ একটি প্রশ্ন আমার আনমনা ভেঙে দেয়।
‘স্যার, আফনের নাম কি আকাশ?’
আমার পাশ থেকে প্রশ্নটি করেছে এক কিশোর হকার। ওর হাতে সিগারেটের প্যাকেট। সৈকতে স্থানীয় ছেলেরা সিগারেট, কোমল পানীয় ও অন্যান্য সামুদ্রিক দ্রব্য বিক্রি করে ঠিক; কিন্তু ওরা কারো নাম জানে না বা নাম জিজ্ঞেস করে না। কিন্তু ছেলেটি আমার নাম জানতে চাইছে। সিগারেট কিনবো কিনা জিজ্ঞেস করছে না। আমি সন্দিহান কণ্ঠে বললাম-
‘হ্যাঁ, কেনো?’
‘স্যার, আফনেরে ডাকছে।’
‘আমাকে! কে?’
‘ওই যে, এইখানে ছাতার নিচে।’
খানিকটা দূরের একটা ছাতার দিকে হাত তুলে ছেলেটি দেখালো। আমার ডান দিকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে একটি রঙিন ছাতার নিচে বসে আছেন একজন নারী। ‘কে সে?’ প্রশ্নটি ছলাৎ করে উঠলো। দূর থেকেও চেনাচেনা লাগছে। মিতা নয়তো! ছাতার নিচে বসে থাকা নারী আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ইতস্তত করে এগিয়ে গেলাম ছাতাটির দিকে। কিছুটা পথ যেতেই চিনতে পারলাম তাকে। রিমিকে দেখে চমকে উঠলাম। বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠলো যেনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে রিমিও উঠে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে একপশলা বিস্ময়। যেনো আমাকে এখানে দেখার কথা ছিল না। হাঁটার সময় কেনো জানি দুপুরের রোদে তাতিয়ে থাকা বালির উত্তাপ টের পেলাম না। কাছাকাছি যেতেই রিমি চিৎকার করে উঠলো-
‘আ-কা-শ! দূর থেকেও মনে হচ্ছিলো আপনিই হবেন!’
তার বিস্মিত কণ্ঠে আমিও বিস্মিত হই। যেনো হারিয়ে যাওয়া কাউকে পেয়ে গেছেন।
‘আপনি এতো বিস্মিত হচ্ছেন কেনো? আমি কি এখানে আসতে পারি না?’
‘আকাশ, আপনি এতোদিন কোথায় ছিলেন?’
তার প্রশ্ন অসংলগ্ন মনে হলো। বললাম-
‘কক্সবাজারে আছি আজ প্রায় তিন মাস হলো।’
‘আপনি কাউকেই তো বলে আসেন নি। বিনা নোটিসে নিরুদ্দেশ!’
এ কথায় আমার খানিকটা রাগ হলো। বললাম-
‘কেনো, কাউকে কি বলে আসার কথা ছিল?’
‘তা নয়, আপনাকে তো তিন মাস যাবতই খুঁজছি!’
‘আমাকে! কেনো? আমি তো আপনার কথা রেখেছিলাম। কিন্তু সিমি আমার অনুরোধ রাখেনি। আমাকে তো আর আপনার কোনো প্রয়োজন নেই! নতুন কোনো প্রয়োজনে খুঁজে থাকলে বলে দিচ্ছি, আমাকে ক্ষমা করবেন, প্লিজ!’
আমার কথায় রিমি হেসে ফেললো। আমি আরো অবাক হলাম। রিমি বললো-
‘আকাশ, আপনাকে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।’
‘তবে কার প্রয়োজন?’
‘সিমির প্রয়োজন।’
বুকের ভেতরে মিহিন ভাঙাচোরাটা ফের জানান দিলো। সিমির নামটা শোনামাত্রই আমি কেমন হয়ে গেলাম। কোনো কথা বলতে পারলাম না। রিমি মিটিমিটি হাসছে। যেনো আমার ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। নিজেকে সংযত করে বললাম-
‘সিমির কি হয়েছে! আনিসের সাথে কোনো সমস্যা…?’
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রিমি। বললো-
‘সিমির সমস্যা আপনাকে নিয়ে।’
‘ঠিক বুঝলাম না। সিমির কি হয়েছে বলুন তো?’
‘সিমিকে নিয়ে দেখছি আপনার অনেক উদ্বেগ!’
‘আপনি কি আমার সাথে রসিকতাই করে যাবেন? সত্যি সত্যি সিমির কোনো সমস্যা হয়ে থাকলে আমাকে বলুন।’
‘তার আগে বলুন, সিমির বিয়ের দিন আপনি পালিয়েছিলেন কেনো?’
‘পালাই নি। চাকরি পেয়ে চলে এসেছি।’
‘ও তাই! তা চাকরি পাবার কথাটা সিমিকে বলতেও তো পারতেন।’
‘দেখুন, এ নিয়ে তর্ক করার সময় এখন নয়। তবুও বলছি, সিমির বিয়ের দিন বাসে চড়ার ঠিক আগে আমি আপনাদের বাসায় ফোন করেছিলাম দুটি কারণে। এক ওকে বিয়ের জন্য উইস করা এবং দুই আমার চাকরির খবরটা জানানো।’
‘সত্যি!’
‘হ্যাঁ, আপনার বাবা ফোন ধরেছিলেন। তিনি বললেন-
‘সিমি বিউটি পার্লারে গিয়েছে সাজার জন্য। তাই আর ওকে বলা হয় নি।’
‘হ্যাঁ, আমি ওর সাথে ছিলাম।’
‘তা হলে? আর বিয়ের পর সিমিকে ফোন করাটা ঠিক হবে না ভেবে ফোন করি নি। এখন বলুন সিমি কেমন আছে?’
রিমি কোনো কথা বললো না। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তার দুচোখে জলের ধারা। নারী সহজে কাঁদে ঠিক; কিন্তু অকারণে কেনো কাঁদে? বললাম-
‘সিমি কি ভালো নেই?’
‘না, ও অসুস্থ।’
‘কি হয়েছে ওর!’
‘ভয় পাবার কিছু নেই। জটিল কোনো রোগ নয়। মানসিক বিষণ্নতা। এবং এর জন্য আপনিই দায়ী।’
‘আমি!’
‘হ্যাঁ, এখন ওকে সুস্থ করুন।’
‘আপনি কি বলছেন এসব! সিমি কি এখানে?’
‘হ্যাঁ।’
বুকের ভেতর চেপে রাখা জলপ্রপাতটা নেমে আসতে চাইছে। সিমিকে দেখার ইচ্ছেটাও অদমনীয় হয়ে উঠলো। ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম-
‘আনিসও এসেছে?’
রিমি চোখের জল মুছে বললো-
‘সিমি আনিসকে বিয়ে করেনি। আকাশ, সিমি আপনার অনুরোধ রেখেছে।’
কথাটি বজ্রপাতের মতো লাগলো। ইন্দ্রীয়বোধে মুহূর্তেই একটা ঝড় বয়ে গেলো। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম রিমির মুখের দিকে। রিমি আমার হতবিহ্বল মুখের দিকে চেয়ে বললো-
‘সিমি, বিয়ের দিন পর্যন্ত আপনার ফোনের অপেক্ষা করেছে। বিয়ের দিন বউ সাজার নাম করে ও চলে গিয়েছিল আপনার বাসায়। আমি ওর সাথে ছিলাম। কিন্তু বাসায় আপনাকে আমরা পাইনি। কেউ আপনার খোঁজও দিতে পারলো না। বলুন তো, বিয়ের দিন ঘর পালানো একটি মেয়ের জন্য এ কেমন বিড়ম্বনা?’
আমি মুখে কোনো কথা বলতে পারলাম না। নিজের ভেতর সে-কী তোলপাড় চলছে। অস্ফুট কণ্ঠে বললাম-
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী, সিমি ও আমি বাসায় ফিরে গেলাম। ওদিকে বরপক্ষ বাড়িতে এসে বসে আছে। সিমি ওর রুমে গিয়ে ওই যে দরজা লাগিয়েছিল, আর খোলেনি। সবাই ওর বন্ধ দরজা দাঁড়িয়ে শুনলো- ‘আমি বিয়ে করবো না!’
পুরো বিয়ে বাড়ির লোক থ’ হয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে ফিরে গেলো বরযাত্রা। আমার বাবা আর কখনো সিমিকে এ নিয়ে প্রশ্ন করেনি। আমি তো সব বুঝেও চুপচাপ। আপনাকে হন্য হয়ে কতো খুঁজেছি! আপনার কোনো বন্ধুই আপনার খবর দিতে পারে নি। যার প্রতি অভিমান করে পালিয়ে এলেন, একবারো ভাবলেন না তার কথা! আপনার একবারও সিমির খবর নিতে ইচ্ছে হলো না? আপনাদের পুরুষ মানুষের হৃদয় এতো পাষাণ কেনো?’
প্রশ্ন নয়, মনে হচ্ছিল বড় বড় ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অথৈ জলে। আমি রিমির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। যেনো ভাষামূক। রিমি খানিকটা সময় নিয়ে বললো-
‘এরপর থেকে সিমি যেনো পাথর হয়ে গেছে। ওর কোনো আনন্দ নেই, উচ্ছ্বাস নেই। নিজের মধ্যে ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আমি ওর কষ্টের কারণ জানি। কিন্তু সান্ত¦না দেবার ভাষা ছিল না। দিনে দিনে ওর মানসিক বিষণ্নতা বাড়ছিল। সিমিকে স্বাভাবিক করতে আমি ও আমার হাজব্যান্ড ওকে নিয়ে এলাম কক্সবাজার। আর কী সুভাগ্য দেখুন, আপনাকে পেয়ে গেলাম!’
তীব্র হাহাকারের ঝড় বইছে মনে। জলপ্রপাত নেমে আসছে প্রবল বেগে। অনুভূতিতে কষ্ট, গ্লানি আর অপার আনন্দের মিশ্রধারা। ‘সিমি’ ‘সিমি’ বলে বুকের ভেতর চাপা কান্নাটা উথলে উঠেছে। ব্যাকুল কণ্ঠে বললাম-
‘রিমি, সিমি কোথায়!’
‘ওই তো, সিমি!’
সমুদ্রের দিকে রিমি হাত উঁচিয়ে দেখালো। দেখতে পেলাম নিঃসঙ্গ সিমি সমুদ্রের জলসীমার খুব কাছে সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে। সিমি ও সমুদ্র মুখোমুখি। সিমি নীরব আর সমুদ্রমুখর। ছোট ছোট ঢেউ এসে ওর পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। ওর খোলা চুলগুলো উড়ছে হিমেল হাওয়ায়। সৈকত জুড়ে এতো হৈচৈ কোলাহল, সেদিকে ওর কোনো মনযোগ নেই। রিমি বললো-
‘আপনি ওর কাছে যান। আপনাকে দেখলে ও ভীষণ চমকে যাবে। আমি হোটেলে যাচ্ছি। আমার হাজব্যান্ডকে খবরটা দিয়ে আসছি।’
রিমি হন হন করে হেঁটে চলে গেলো হোটেলের দিকে। আমি এগিয়ে গেলাম সিমির দিকে। পরাজিত নয়, বিজয়ী মানুষের মতো আমার পা চলছে।
পনের.
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা সিমির খুব পছন্দ। আমার পছন্দ নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। সিমি সুনীলের অনেক কবিতাই আবৃত্তি করতো। এ মুহূর্তে আমার ইচ্ছে করছে ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলি- ‘যমুনা হাত ধরো, স্বর্গে যাবো…।’ এ কবিতার এই এক লাইন ছাড়া আর কোনো লাইন মনে পড়ছে না। আমি এর চেয়েও আরো যোগসূত্রপূর্ণ কোনো কবিতা খুঁজতে লাগলাম। আমার স্মৃতির স্টকে তেমন কবিতা নেই। সিমির পাল্লায় পড়ে অনেক কবিতা পড়েছি বা আবৃত্তি শুনেছি। কিন্তু ওসব কবিতা মনে রাখতে পারিনি। এ নিয়ে আমার আফসোস নেই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, দু-চারটি রোমান্টিক কবিতা মুখস্থ রাখা উচিত ছিল। জীবনের কোনো বিশেষ মুহূর্তে তা ভীষণভাবে কাজে লাগতে পারে। এখন আমি সিমিকে ভীষণরকম চমকে দিতে চাই। হাঁটতে হাঁটতে সিমির কাছে চলে এলাম, কিন্তু যুতসই কবিতা মনে আসছে না। নিজে নিজেই কয়েক লাইনের কবিতা তৈরি করার চেষ্টা করতে লাগলাম। প্রত্যেক মানুষ না-কি কখনো কখনো কবি হয়ে যায়। কিন্তু আমার মধ্যে কবিতা আসছে না। সিমি সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। আমি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কয়েকটা মুহূর্ত অপেক্ষা করলাম। সিমি সমুদ্রের দিকে তাকিয়েই আছে। ছোট্ট করে ডাকলাম- ‘সিমি!’
যেনো বিদ্যুৎ চমকালো। এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালো ও। আমার মুখোমুখি। বিস্ময় ভরা দুচোখ। আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম-
‘আমাদের সম্পর্কের একটা নাম দিতে চাই।’
সিমির শরীর যেনো কাঁপছে। মানুষের চোখে কতোটা বিস্ময় থাকতে পারে? সিমির দুচোখ বিস্ময়ে ফেটে যেতে চাইছে। আমি ওর বিস্মিত চোখে চোখ রেখে বললাম-
‘কেমন আছো?’
যেনো এ প্রশ্নটির জন্যই ও জমাট বেঁধে ছিল। এতেই গলে পড়লো অভিমান। ওর দুঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। দুচোখ নদী হয়ে গেলো। অশ্রুপাতের সামনে আমি চুপসে যাই। কান্না কি সংক্রামক ব্যাধি? আমার ভেতরেও কান্নার রোল। আমি দুহাত বাড়িয়ে আলতো করে ওর অশ্রুভেজা গাল ছুঁয়ে দিলাম। ও আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার বুকে। আমি দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। এই প্রথম ওকে জড়িয়ে ধরা। ওর শরীরের কাঁপুনি বেড়ে গেলো। ও আমার বুকে মুখ ঘষে কাঁদতে লাগলো। এই কান্না বেদনার, না আনন্দের, তা বলা মুশকিল। আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম-
‘একটিমাত্র অনুরোধেই আমাকে জিতিয়ে দিলে!’
ও কিছু বললো না। আমি আবার বললাম-
‘শুধু একটিমাত্র অনুরোধেই আমাকে জিতিয়ে দিলে, কেনো?’
এবার ও আমার বুক থেকে মুখ তুললো। কপট রাগের ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-
‘নিজেকে ঠকাতে চাই নি বলে তোমাকে জিতিয়ে দিয়েছি।’
‘এটা কি আমার প্রতি তোমার করুণা, না অনুরাগ?’
‘রাগ-অনুরাগ কি তুমি বুঝো?’
সিমি রেগে গেলো। ওর রাগকে উপেক্ষা করে বললাম-
‘যদি না বুঝি, তা হলে শেখাও।’
‘এখন থেকে শেখাবো। সারাটা জীবন শেখাবো।’
বলে সিমি আমাকে দুহাতে শক্ত করে ধরে ফেললো। মনে হচ্ছে, ছেড়ে দিলেই আমি পালিয়ে যাবো। আমি ওর মুখ তুলে কপালে একটা চুমু খেলাম। এ আমার প্রথম চুমু, ভালোবাসার স্পর্শ। আমার দুহাতের বন্ধনে কুঁড়ির পাপড়ি মেলার মতো ও ফুটতে থাকলো।
বসন্ত পথিক
এক.
বিন্দু, নামটি শোনামাত্রই মৃদুলের ভেতরটা যেনো মোচড় দিয়ে উঠলো। তিন বছর পর বিন্দুর ফোন! এতদিন পর, ও কি চায়? মনের ভেতর কেমন একটা তোলপাড় টের পেল মৃদুল। মলির কাছ থেকে বিন্দুর নাম শোনার পর থেকেই ওর অনুভবে বেদনার মিহিন বেহাগ সুর ছড়াতে লাগলো। কিন্তু এমন হবার কথা ছিল না। বিন্দু ওর কাছে এখন বিস্মৃত এক নাম, কষ্টের পাথরে চাপা এক টুকরো আবেগ কিংবা ফেলে আসা সময়ের বাঁকে এক সোনালি ফাঁস। মৃদুলের চিন্তায় কৌতূহলের রেখাপাত সৃষ্টি হলো।
মলি ফের বললো-
‘ছোটদা, তোমার খোঁজে কাল রাতে ওই ভদ্র মহিলা কয়েকবার ফোন করেছিলেন। তিনি তোমার মোবাইল ফোনের নম্বর চাইছিলেন। আমি একবার ভেবেছিলাম, তোমার মোবাইল ফোনের নম্বর তাকে দিয়ে দিই। আবার তোমার নিষেধের কথা মনে হতেই তাকে নম্বর দিইনি। তবে তার কথায় মনে হলো ভদ্র মহিলার তোমাকে খুব প্রয়োজন।’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললো মলি। গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলে ভারমুক্ত হলো যেনো ও। মৃদুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাড়ি কামাচ্ছিল। মলির কথা শুনে দাড়ি কামানোর কাজে ও মনোযোগ দিতে পারলো না। মলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
‘ছোটদা, ওই ভদ্র মহিলা আবার ফোন করলে তোমার মোবাইল ফোনের নম্বর দেবো?’
এর জবাবে মৃদুলের রাগত সুরে ‘না’ বলাটাই উচিত। কিন্তু ও না বলতে পারছে না। মন সায় দিচ্ছে না। ও ভাবলো, কী বলবে। ওর মধ্যে পুরনো এক কাঁপন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। এই কাঁপনে আগে ও শিহরিত হতো। কিন্তু এখন শিহরিত হবার কিছু নেই। অপ্রত্যাশিত এই কাঁপনটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দেবার চেষ্টা করতে করতে মৃদুল আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। আয়নায় তাকিয়ে নিজের প্রতিবিম্বটা ও দেখতে পেল না। অন্যমনস্কভাবে দাড়ি কামাতে গিয়ে গালের ওপর চলমান রেজারটা হাতের সামান্য কাঁপুনিতে আলতো কামড় বসালো। রক্ত বেরিয়ে এলো সামান্য। মৃদুলের তা নিয়ে ভ্রƒক্ষেপ নেই। মলি ককিয়ে উঠলো-
‘ছোটদা, তোমার গাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে!’
‘ও কিছু নয়। এখুনি লোশন লাগিয়ে নিচ্ছি, ঠিক হয়ে যাবে।’
মৃদুল হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে ওল্ড স্পাইসের বোতলটা টেনে নিল। বোতল খুলে ও গালের কেটে যাওয়া অংশে লোশন লাগালো। মনে মনে বললো, ‘বিন্দু, এতদিন পরে তুমি আবার রক্ত ঝরাতে এসেছো!’ মলি কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলো-
‘ছোটদা, তুমি ওই মহিলাকে চিনো?’
মৃদুল এ প্রশ্নটার জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে মলিকে কী বলবে, তা-ও ভেবে ঠিক করতে পারলো না। এ মুহূর্তে ও কেমন গুলিয়ে ফেলছে। ও ভাবতে লাগলো কী বলা যায় মলিকে। মৃদুলের নীরবতা দেখে মলি ফের বললো-
‘বললে না যে, ওই মহিলাকে তুমি চেনো কিনা?’
‘ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে নামটি পরিচিত মনে হচ্ছে। আচ্ছা, ভদ্র মহিলা আর কী বলেছে রে?’
‘কিছুই তো বলেন নি। শুধু বললেন, ‘তোমাকে তার জরুরি দরকার।’
‘ঠিক আছে, তুই এখন যা।’
‘তিনি আবার ফোন করলে কি তাকে তোমার মোবাইল ফোনের নম্বরটা দেবো?’
‘তোর ইচ্ছে হলে দিস। আর হ্যাঁ, মা কি ফোন ধরেছিল?’
‘না ছোটদা, মা ফোন ধরেন নি। ভাবীও ধরেন নি।’
মলি অতিরিক্ত তথ্য জানিয়ে দিলো। মলি ওর পাশে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। ও অকারণে মৃদুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে না। মৃদুল বুঝতে পারলো মলি কিছু চাইবে ওর কাছে। এক ধরনের সংকোচ ফুটে উঠেছে মলির চোখে-মুখে। মৃদুল বললো-
‘তুই কি আর কিছু বলবি?’
এ কথায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো মলি। বললো-
‘আমাদের কলেজ থেকে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের হচ্ছে।’
এটুকু বলে মলি চুপ মেরে যায়। মৃদুল আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে মলির দিকে তাকিয়ে বললো-
‘তাতে কী? সব কলেজ থেকেই প্রতিবছর সাহিত্য পত্রিকা বের করা হয়। তোদের কলেজ থেকেও না হয় একটা সাহিত্য পত্রিকা নামক কিছু বের হবে। এর মধ্যে নতুনত্ব কী আছে?’
‘না, বলছিলাম কী, আমি এই সাহিত্য পত্রিকায় একটা গল্প দেবো।’
এ কথা বলেই মলি সংকোচে জড়িয়ে গেলো।
‘গল্প! তুই লিখবি!’
বিস্ময়ের রেশ ছড়িয়েই মৃদুল হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। ওর হাসি যেনো থামতে চায় না।
মৃদুলের হাসিকে উপেক্ষা করে মলি বললো-
‘ছোটদা, আমি একটা গল্প লিখে ফেলেছি!’
‘তুই গল্প লিখেছিস? বলিস কী!’
‘হ্যাঁ, ভুলে যেও না আমি লেখক মৃদুল রায়হানের বোন।’
‘গল্প লিখতে হলে অনেক ঘুরতে হয়। অনেক রকম অভিজ্ঞতা অর্জন না করলে ভালো গল্প লেখা যায় না। আর তুই কী না ঘরে বসেই গল্প লিখে ফেলেছিস! তুই মৃদুল রায়হানের বোন বলেই গল্প লিখে ফেলতে পারিস!’
‘ছোটদা! তুমি যে কী!’
‘আহা, তুই খেপছিস কেনো? আচ্ছা, গল্প না হয় লিখলি। এখন আমার কাছে তোর বায়নাটা কী, বল।’
‘আমার গল্পটা তুমি দেখে ঠিক করে দেবে। মানে রি-রাইট করে দেবে। তারপর আমি গল্পটা কলেজের ম্যাগাজিনে দেবো।’
‘আচ্ছা, দেখে দেবো যা। তবে পড়াশোনা ফেলে বেশি গল্প লিখিস না, কিন্তু!’
‘ঠিক আছে। ছোটদা, আমি তোমার জন্য চা বানিয়ে আনছি।’
বলেই মলি মৃদুলের রুম থেকে চলে গেলো। মলি চলে যেতেই মৃদুলের মনে বিন্দুকে নিয়ে কৌতূহলটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। আজ এতদিন পর বিন্দু কেনো ওকে ফোন করলো- এই প্রশ্নটা ওকে ছোবল মারতে লাগলো। একটা সময় ছিল, যখন বিন্দুর নাম শুনলেই মৃদুলের ভেতরে কেমন উথাল-পাতাল ঢেউ তুলতো। বিন্দুর সামনে দাঁড়িয়ে এক ধরনের আবিষ্টতায় বুঁদ হয়ে যেত। বিন্দুকে কেন্দ্র করে ও স্বপ্নের বৃত্ত রচনা করতো যখন-তখন। বিন্দুও মৃদুলকে টেনে নিয়ে যেত আবেগের ডুব সাঁতারে, সম্মোহনের নিরেট নৈসর্গে। ভালোলাগার কাঁচা রঙে মৃদুল কেবল ছবি এঁকে যেত। উড়াত স্বপ্নের ফানুস। আর বিন্দু রহস্যের মায়াজাল ছড়িয়ে মৃদুলকে যেনো হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত স্বপ্নালোকে, ভালোবাসার খেয়ালি আকাশে। অন্ধ যেমন অবলম্বন নিয়ে পথে নামে, মৃদুলও সেরকম নেমেছিল বিন্দুকে ধরে। ভালোলাগাটা ‘ভালোবাসা’র পেখম ছড়াতে চেয়েছিল। ঠিক তখনই বিন্দুই একদিন মৃদুলের চোখের সামনে আরেকজনকে ভালোবেসে হুট করে বিয়ে করে ফেললো। এ যেনো অন্ধকে সাঁকোর মাঝখানে নিয়ে গিয়ে নিষ্ঠুর পরিহাসে ছেড়ে দেয়া। মৃদুলের স্বপ্নটা জমে ওঠার আগেই সব ভেঙে খান-খান! বিন্দুর সাথে মৃদুলের সম্পর্কটা যে করুণ রহস্যে পরিণত হবে, তা ও কল্পনাও করতে পারেনি। ধনীর সুন্দরী মেয়ের খেয়ালিপনাকে অবাক চোখে দেখলো মৃদুল। বিন্দু নিঃসংকোচ চিত্তে ওর চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো অন্যের ঘরে। বুক ভাঙা বেদনা চেপে রাখলো মৃদুল। এ বেদনার কথা কাউকেই ও বলতে পারেনি, বলা যায়ও না। মানুষের জীবনে ব্যর্থতার গ¬ানি বা অপমানের লজ্জা বিষফোঁড়ার মতো থাকে। এর মুখটা দেখা যায় না; কিন্তু এর অস্থিত্ব অনেক গভীর এবং বেদনাও ভীষণ তীব্র। বিন্দুর প্রতি মৃদুলের ভালোলাগার কথা; কিংবা না পাওয়ার বেদনা যখন বিস্মৃত হবার পথে, তখনই হঠাৎ বিন্দুর ফোনের খবর মৃদুলকে টেনে নিয়ে গেলো সেই অধ্যায়ে। মৃদুল অনেক চেষ্টা করলো বিন্দুর কথা ভুলে যেতে। কিন্তু মনে কাঁটার মতো বিঁধে রইলো ও। স্মৃতির সেলুলয়েডের ফিতায় ভেসে উঠলো বিন্দুকে ঘিরে এক টুকরো অতীত।
নারায়ণগঞ্জের সরকারি মহিলা কলেজ মিলনায়তনে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাহিত্য আসরে মৃদুলের সাথে বিন্দুর প্রথম পরিচয়। মৃদুল ওই সভায় নিজের লেখা একটি কবিতা পাঠ করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে ফেরার সময় কলেজের বারান্দায় বিন্দু মৃদুলের সামনে এসে দাঁড়াল। অকপটে বললো-
‘আমার নাম বিন্দু। আপনার কবিতাটি আমার খুব ভালো লেগেছে।’
‘ধন্যবাদ।’
জবাবে বললো মৃদুল। ও লক্ষ্য করলো মেয়েটি সপ্রতিভ এবং সাহসী। কিছু মেয়ে আছে, যাদের চট করে দেখেই বুঝা যায় তারা ভীতু ও লাজুক। আবার কাউকে এক ঝলক দেখেই বুঝা যায় সে সাহসী। বিন্দুর কথার মধ্যেই সাহসের ছবি দেখতে পায় মৃদুল। বিন্দু বললো-
‘আচ্ছা আপনি বিরহের কবিতা বেশি লেখেন কেনো? আপনার গল্পগুলোও দুঃখ ভারাক্রান্ত। আপনি কী দুঃখ বিলাসী লেখক?’
বিন্দুর প্রশ্নে চমকে উঠে মৃদুল। মৃদুল কোনো বিখ্যাত লেখক নয়। ও প্রতিশ্রুতিবান লেখক হিসেবে সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিত। তার কোনো পাঠক আছে, বা তার সব লেখা পাঠ করে এমন কারো সাথে পরিচয় হয়নি ওর। বিন্দুর কথায় মনে হচ্ছে ও মৃদুলের সব লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়েছে। মৃদুলের ভীষণ ভালো লাগলো। ও বললো-
‘আপনি আমার লেখা পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে। আমি খুব অবাক হলাম এবং ভালোও লাগছে। আপনি আমার মতো অখ্যাত লেখকের লেখা কেনো পড়েছেন, জানতে ইচ্ছে করছে।’
বিন্দু একটু হাসলো। যেনো মৃদুলের চমকে যাওয়াকে ও উপভোগ করছে। ও বললো-
‘আপনার লেখা পাঠ করি আমার প্রাইভেট টিউটরের কারণে। তিনি আপনার লেখার প্রশংসা করতেন। তার প্রশংসা শুনে আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আপনার লেখা পাঠ করতে থাকি। ধীরে ধীরে আমি আপনার লেখার একজন নিয়মিত পাঠক ও ভক্ত হয়ে যাই।’
‘আজ আপনার সাথে পরিচিত হয়ে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। আমার মতো নতুন লেখকদের যে পাঠক আছে, তা জানতাম না। আমি এ মুহূর্তে খুবই আবেগ আপ্লুত।’
মিষ্টি করে আবার হাসলো বিন্দু। হেমন্তের শেষ বিকেলের একখণ্ড রোদ এসে পড়েছে ওর মুখে। এ মিঠে-কড়া আলোয় বিন্দুকে খুবই সুন্দর লাগছে। মৃদুল মুগ্ধ হয়ে কবিতার লাইন হাতড়ে বেড়াতে লাগলো। বিন্দুর কণ্ঠ রিনরিনিয়ে ওঠে-
‘বললেন না যে, আপনার লেখায় এতো দুঃখ থাকে কেনো?’
এ প্রশ্নটি মৃদুলকে কাব্যময়তার দিকে ঠেলে দেয়। ওর কণ্ঠ থেকে কবিতার মতো কথা বেরিয়ে আসে-
‘দুঃখ, কষ্ট বা বিরহ সকলকে কাঁদায় ঠিক। কিন্তু লেখকের কাছে এ দুঃখ, কষ্ট বা বিরহ শিল্পের মতো ঐশ্বর্য্যময়। লেখক দুঃখকে শৈল্পিক রূপ দেন। আমিও তাই করি। হয়তো বেশি করি। এর কারণ আমি যে সমাজটাকে দেখি, সেখানে অপ্রাপ্তির হাহাকারই বেশি। বা যাদের জীবনযাপন দেখে অভ্যস্ত, তারা প্রতিনিয়ত দুঃখকে বরণ করছে বা মেনে নিচ্ছে। তাই আমার লেখক সত্ত্বায় এর প্রভাব বেশি।’
মৃদুলের জবাবে ওর মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিন্দু। একসময় দৃষ্টি অবনত হয়। ও বলে-
‘তাই বলে কেবলই দুঃখময়তা! আনন্দের কি কোনো শিল্পমান নেই?’
মৃদুল একটু সময় নিয়ে বলে-
‘জীবনের ছোট ছোট আনন্দও শিল্পের চেয়ে বেশি কিছু। আমি চেষ্টা করবো আমার লেখায় আনন্দের কথাও তুলে ধরতে। আপনি আমাকে যেনো সেই পথটির কথা আজ স্মরণ করিয়ে দিলেন। আপনার কথা আমার সব সময় মনে থাকবে।’
সেদিন বিন্দু আর কথা বাড়ায়নি। মৃদুলের কথা বলতে ভালো লাগলেও নিজেকে সে পথে বাড়াতে পারেনি। এমন-ই হয়, সুন্দর সময় হয় খুব অল্প।
ওদের পরিচয়টা ওখানেই শেষ হলো না। দু’জনের আবার দেখা হলো টিএসসিতে। বিন্দু যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, মৃদুল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র। প্রথম পরিচয়ের এক মাসের মধ্যে টিএসসিতে ওদের মধ্যে ফের দেখা হলো। মৃদুল এক পড়ন্ত দুপুরে টিএসসিতে ফুটপাতের চায়ের স্টলের সামনে বসে চা পান করছিল। ফুটপাত ঘেঁষে এসে থামলো বিন্দুর গাড়ি। গাড়ির জানালার আয়নার কাচ নামিয়ে বিন্দু মৃদুলকে খুব পরিচিতজনের মতো করে ডাকলো-
‘এই যে মৃদুল, এদিকে একটু তাকাবেন?’
চৈত্রের দুপুরের ভ্যাপসা গরমে অন্যমনস্ক মৃদুল প্রথমে বিন্দুর ডাক শুনতে পেলো না। চায়ের স্টলের মালিক হেদু মিয়া হাসির রহস্য ছড়িয়ে মৃদুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো-
‘স্যার, আফনেরে পেছন থেকে একজন মেম সাহেব ডাকতেছেন!’
মৃদুল অবাক হয়ে পেছনে তাকালো। বিন্দু হাতের ইশারায় মৃদুলকে ডাকলো। মৃদুল হাদু মিয়ার চায়ের দাম মিটিয়ে এগিয়ে গেলো বিন্দুর গাড়ির সামনে।
‘এখানে বসে বসে কবিতা লিখছিলেন নাকি? এতো কাছ থেকে ডাকছি, অথচ শুনতেই পারছিলেন না!’
‘সরি, আমি আসলে অন্য একটা চিন্তার মধ্যে ডুবে ছিলাম। তা আপনি এখানে কেনো?’
‘বাহ, আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, তা জানেন না বুঝি!’
‘আপনার সম্পর্কে এতো কিছু জানার সুযোগ হলো কোথায়? আর জানবোই বা কী করে?’
‘আগ্রহ থাকলেই জানা যায়। যেমন আমার আগ্রহ ছিল বলেই আপনার সম্পর্কে জেনেছি।’
‘এখন কিন্তু আপনাকে জানার আগ্রহ আমার বাড়ছে।’
‘তাই নাকি! তা হলে জানার চেষ্টা করুন।’
‘দেখি।’
‘শুধু দেখি বললেই হবে না। ভালো করে দেখতে হবে। আমার মধ্যে কিন্তু অনেক রহস্য আছে!’
‘তাই নাকি! শুনেছি, রহস্য উন্মোচন করার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ আছে।’
‘তা হলে নেমে পড়ুন।’
‘হুট করে নামা ঠিক হবে না। যদি রহস্যের গোলক ধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলি!’
‘লড়াইয়ের আগেই ভয় পেয়ে গেলেন?’
বিন্দু হাসলো। মৃদুল বললো-
‘ভয়টা রহস্য উন্মোচন করতে পারা, না পারার জন্য নয়। ভয়টা আসলে আপনার সৌন্দর্যকে নিয়ে। রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে যদি আপনার অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে ইমপ্রেসড হয়ে যাই!’
এ কথায় বিন্দু খিলখিল করে হাসলো। হাসি থামার পর ও বললো-
‘আপনি তো লেখক। আমার শারীরিক সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করুন।’
‘আমি লেখক হলেও, পুরুষও। আপনার সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই।’
কথা শুনে বিন্দু ফের খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। মৃদুল সংকোচ বোধে মনে মনে ভাবতে লাগলো ওর কথায় অসংযত আবেগ প্রকাশ পেয়ে গেছে কী না। কেনো জানি বিন্দুর সামনে ওর সংযম বা সংকোচের সীমারেখা ভেঙে যাচ্ছে।
বিন্দু হাসি থামিয়ে বললো-
‘ওভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন? গাড়িতে উঠুন।’
‘না, আমি একটু পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ে বাড়ি যাবো।’
‘আহা! আমি তো নারায়ণগঞ্জই যাচ্ছি। উঠে বসুন। আপনাকে নামিয়ে দেবো। যেতে যেতে কথাও হবে।’
মৃদুল আর কথা বাড়ালো না। ও নিঃসংকোচে উঠে পড়লো গাড়িতে। পেছনের সিটে বিন্দুর পাশে বসতে কোনো দ্বিধা করলো না। যেনো এখানেই ওর বসার কথা। সেদিন এক ধরনের সম্মোহনের মধ্য বুঁদ হয়ে পড়েছিল মৃদুল। বিন্দুর চোখে-মুখে ঝলমলিয়ে ছিল রহস্যময় হাসি।
এরপর থেকে ওদের প্রায়ই দেখা হতো। মৃদুলের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের জামতলায়। বিন্দুরা থাকে ১৫ নম্বর ধানমন্ডিতে। ওর নানীর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল¬ায়। বিন্দু ওর নানীর বাড়িতে প্রায় আসতো। নানী বাড়িতে এলেই বিন্দু মৃদুলের সাথে দেখা করার চেষ্টা করতো। প্রতিমাসের দ্বিতীয় শুক্রবার চুনকা পৌর পাঠাগারে অনুষ্ঠিত হতো প্রগতি সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য আসর। এই সাহিত্য আসরের নিয়মিত লেখক ছিল মৃদুল। বিন্দুও আসতে লাগলো এই আসরে। লেখালেখি নিয়ে এই আসরে লেখকদের জম্পেস আড্ডা হতো। বিন্দু থাকতো নীরব শ্রোতা হয়ে। সাহিত্যসভা শেষ হলে বিন্দু মৃদুলের সাথে বেরিয়ে যেতো। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো রিকশায় চড়ে ওরা ঘুরে বেড়াতো। অজস্র কথার খই ফুটতো ওদের কথামালায়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ওরা একে অন্যেকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে নিজেদের মধ্যে একটা অপ্রকাশিত সম্পর্ককে নিবিড়ভাবে গড়ে তুললো। ওরা প্রায়ই শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘুরে বেড়াতো নৌকা দিয়ে। মৃদুলের সামনে ছিল ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশোনার খুব চাপ। তবুও চাপা আবেগে পড়াশোনার অনেকটা সময় বিলিয়ে দিয়েছিল বিন্দুর সহচার্যে। সবটুকুই পরে অর্থহীন হয়ে যায় মৃদুলের কাছে। বিন্দু একদিন মৃদুলের আবেগ ও অস্তিত্বকে পায়ে মাড়িয়ে চলে গেলো অন্যের ঘর আলো করতে।
দুই.
তিথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে একটা নীল টিপ লাগালো। ওই টিপটি ওর সুন্দর মুখশ্রীর মধ্যে দৃষ্টিনন্দন অবয়ব ফুটিয়ে তুললো। তিথির সাজসজ্জা বলতে এ পর্যন্তই। ও ঠোঁটে লিপিস্টিক বা গালে প্রসাধনের প্রলেপ খুব একটা দেয় না। বড় ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে যেতে হলে ও সামান্য সাজে। সে সময় ও চোখে কাজল লাগায়। পাউডার ও পারফিউমের সামান্য ব্যবহার হয়। সাজসজ্জা নিয়ে তিথি উদাসীন। খুব সাধারণ পোশাক পরিচ্ছদে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করে। সাজসজ্জা না করলেও সাধারণ পোশাকে ওকে খারাপ লাগে না। ও মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সৌন্দর্য দেখে। তিথি জানে, ও যদি পরিপাটি করে সাজে তখন ওকে ভয়ঙ্কর সুন্দর দেখায়। এই ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের ভয়েই ও সাজে না। তিথির বাবা মোজাম্মেল হক ওকে বারবার বলেছেন-
‘মনের সৌন্দর্য নিয়ে যদি বিকশিত হতে পারো, আর যাই হোক কেউ তোমাকে অমর্যাদা করতে পারবে না। রূপের সৌন্দর্যের আবেদন আছে ঠিক। কিন্তু এই সৌন্দর্য সকলকে মোহগ্রস্ত হতে শেখায়, মর্যাদা আদায়ে ভূমিকা রাখে না। তাই, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে কিংবা তোমার পাশে মানুষকে দাঁড় করাতে হলে মনের সৌন্দর্য নিয়েই বিকশিত হও। রূপের সৌন্দর্যে কারো চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ো না।’
তিথি ওর বাবার কথা সব সময় মনে রাখে। ওর কাছে, বাবা একজন আদর্শ মানুষ। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই ও বড় হয়েছে। নিজের শিক্ষা, জ্ঞান, রুচি সব কিছুই অর্জন করেছে ওর বাবার কাছ থেকে। তিথি ওর বাবাকে নিয়ে গর্ববোধ করে। কারণ, ওর বাবা সারাটা জীবন সৎ জীবনযাপন করে এসেছেন।
মোজাম্মেল হক কাস্টমস বিভাগের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। কমিশনার হিসেবে তিনি অবসর নেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি কখনো ঘুষ খাননি। কোনো অন্যায় কাজকে প্রশ্রয় দেননি। দুর্নীতির আশ্রয় নিলে তিনি সম্পদের পাহাড় গড়তে পারতেন। তিনি তা করেন নি। এ নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। অহংকারও নেই। মোজাম্মেল হক তার পেনশনের টাকায় নিজের গ্রামে একটি স্কুল খুলেছেন। ওই স্কুল নিয়েই প্রত্যন্ত এক গ্রামে পড়ে আছেন। তার স্বপ্ন এই স্কুলে তিনি ছাত্রদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন এবং আজীবন সৎ থাকার আদর্শে অনুপ্রাণিত করবেন। তার এ প্রচেষ্টাকে নিকট আত্মীয়-স্বজনরা ‘বুড়ো বয়সের পাগলামী’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিথি ওর বাবার কাজকে সমর্থন করছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজতে গেলে ওর বাবার কথা মনে পড়ে যায়। তখন ওর মনে এক ধরনের পবিত্রবোধ কাজ করে। এ মুহূর্তে তিথি ওর বাবার উদ্দেশে মনে মনে বললো- ‘তোমাকে ভীষণ মিস করছি, বাবা!’
‘আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অমন মুগ্ধ হয়ে কী দেখছিস? নিজের রূপ?’
তিথির রুমে ঢুকেই প্রশ্নটি করলো শারমিন। শারমিনের কণ্ঠ শুনে আয়নার সামনে থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো তিথি। দেখলো শারমিনের মুখে দুষ্টুমীর হাসি। ও বললো-
‘নিজের রূপ নিজে দেখবো কেনো?’
‘আমিও তো তাই বলি, নিজের রূপ নিজে দেখার কী আছে? তোমার রূপ দেখার কেউ কী আছে?’
‘ভাবী!’
‘আহা! এতে লজ্জা পাবার কী আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছো। দেখতে সুন্দরী। তোমার পেছনে তো ছেলেদের ভিড় লেগে থাকার কথা! আর প্রেম করাটাও অপরাধ নয়। তোমার কেউ থাকতেই পারে।’
‘ভাবী। আমার কেউ থাকতে পারে কী না জানি না। তবে এমন কেউ আমার নেই।’
‘বড় হতাশার কথা। কারো নজরেই পড়ছো না?’
শারমিন বিস্ময় প্রকাশ করে। তিথি তা বুঝতে পারে। ও ব্যাখ্যা দেবার মতো করে বললো-
‘ছেলেরা যে বিরক্ত করে না, তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ছায়ানটে যেখানেই যাই মুগ্ধচোখের বিহ্বলতা দেখতে পাই। ওটা আমার ভালো লাগে না। কোনো ছেলে আমার দিকে হ্যাংলোর মতো তাকিয়ে থাকলে তাকে আমার ব্যক্তিত্বহীন পুরুষ মনে হয়। আমি তাদের উপেক্ষা করে চলি।’
শারমিন মিষ্টি করে হাসলো। তিথিকে শারমিন ভালো করেই চেনে। তারপরও রসিকতা করে বললো-
‘আমার এমন সুন্দরী ননদটার মন কেউ জয় করতে পারলো না! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা কি মেয়েদের মন জয় করার কৌশল ভুলে গেছে? না কী তারা প্রেম করার চেয়ে অসুস্থ রাজনীতিতেই জড়িয়ে পড়ছে?’
‘একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ছেলেদের জিজ্ঞেস করে জেনে নাও কোনটা সত্যি। একটা জরিপও করতে পারো।’
‘তাই-ই করতে হবে দেখছি! আমাদের সময় তো এমন ছিল না!’
‘তুমি তো মাত্র দুবছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুলে। দুবছরেই আমাদের এবং তোমাদের সময়ের পার্থক্য করে ফেলছো!’
‘দুবছর কী কম সময়? দুবছরে কত কিছু হয়ে যায়!’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো, দুবছরের মধ্যে আমার বিয়ে হলো। এখন মা হতে চলেছি। আর কয়েক মাস পর তো একটি শিশু আমাকে “মা” বলে ডাকবে! দুবছরের মধ্যে মেয়ে থেকে নারী, নারী থেকে মা হয়ে যাচ্ছি। তাই না?’
শারমিনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিথি শারমিনের কথাকে সমর্থন করে বলে-
‘তা ঠিক বলেছো। এখন বলো তো, আমাকে কী বলতে এসেছো?’
ফের মিষ্টি করে হাসলো শারমিন। শারমিন এমনিতেই সুন্দরী। তারপরও সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা শারমিনকে আজ আরো সুন্দর লাগছে। চোখে-মুখে কেমন মাতৃত্বের ভাব ফুটে আছে। তিথি শারমিনের মুখের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। শারমিন বললো-
‘তা, তুমি এখন কোথায় যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলে? ছায়ানটে যাবে?’
‘হুম।’
‘আজ ছায়ানটে না গেলে হয় না?’
‘কেনো বলো তো?’
‘তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতাম। তোমার ভাই ফোন করে জানালো, ও গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে আটকে গেছে। তাই ও আসতে পারবে না।’
‘হয়েছে, হয়েছে। অতো কথা বলতে হবে না। ডাক্তারের কাছে যাবে, বললেই হলো। তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার চেয়ে আমার ছায়ানটের ক্লাস কী বড় হলো?’
‘আমি জানি, তুমি আমাকে পছন্দ করো।’ এ কথা বলে শারমিন হাসলো। এর জবাবে তিথি বললো-
‘শুধু পছন্দ নয়, তোমাকে ভীষণ ভালোও বাসি।’
‘তা হলে তৈরি হয়ে নাও, ড্রাইভারকে বলছি তৈরি হতে। আমরা আধাঘণ্টা পর রওনা হবো। কেমন?’
‘আচ্ছা। আমি প্রায় তৈরি। তুমি তৈরি হয়ে আমাকে ডেকো।’
শারমিন তিথির রুম থেকে চলে গেলেন। তিথি শারমিনের চলে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো। ও ভাবতে লাগলো শারমিন কত ভালো মেয়ে। তিথির সাথে এমনভাবে কথা বলবে যেনো নিজের ছোট বোনের সাথে কথা বলছে। অথচ শারমিন ওর আপন ভাবী নন। শারমিন ওর মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী। তিথি মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে। ওর মামা আনোয়ার হোসেন একজন শিল্পপতি। সাভারে তাদের বড় স্পিনিং মিল ও বাড্ডা এলাকায় দুটো গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি রয়েছে। গুলশানে বায়িং হাউস। মতিঝিল সেনাকল্যাণ ভবনে তাদের ব্যবসার প্রধান কার্যালয়। ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে তাদের বিশাল বাড়ি। মামার একমাত্র ছেলে রাশেদ আনোয়ার বাবার ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। ছোট্ট সংসারে তিথি সবার আদরেই আছে। এ সংসারে প্রাচুর্যের কোনো উত্তাপ বা অহমিকা নেই। শ্রদ্ধা এবং স্নেহে ভীষণ অটুট পারিবারিক বন্ধন। তিথির তা-ই মনে হয়।
তিন.
মৃদুলদের বাবা আজমল রায়হান ব্যবসায়ী। নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার এলাকায় তার সুতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। দিনে দিনে তিনি নিজেকে আরো প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন। ভালো ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যবসায়িক মহলে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। ব্যবসাই তার ধ্যান-জ্ঞান। মৃদুলের বড় ভাই মাহাবুব রায়হান পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে পিতার সাথে ব্যবসা দেখছে। মাহাবুব পড়াশোনা করেছে রসায়ন নিয়ে। এখন পৈত্রিক ব্যবসা সামলাচ্ছে। রসায়ন পড়ে মাহাবুবের কী লাভ হয়েছে, তা ভেবে পায় না মৃদুল। মাহাবুব ব্যবসায় ভালোই করছে। মৃদুল এ কথা ভেবে মাঝে মাঝে অবাক হয়। মৃদুলের ভাবী নীতা সুগৃহিণী। নীতার হাতেই এখন ওদের সংসার পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত। ছোট বোন মলি এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ওর মা নাজমা রায়হান ধর্ম-কর্ম নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। তিনি বড় ছেলের স্ত্রীর কাছে সংসারের দায়িত্ব তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত। ওদের ছোট সংসার। সংসারে কারো তেমন অভিযোগ নেই। আজমল রায়হান ও তার বড় ছেলে মাহাবুব রায়হানের ব্যবসা আর সংসার ছাড়া তাদের অন্য কোনো দিকে নজর নেই। নীতা সংসারের দায়িত্ব পালন করে খুশি। মলি সকলের আদরের সংস্পর্শে সারাক্ষণ হাসি-খুশি। সবকিছু মিলিয়ে মৃদুলদের সংসারটা ‘সুখী সংসার’-এর মডেল হতো পারতো। কিন্তু এই সংসারেরও একটা চাপা বেদনা আছে। এক জায়গায় ছন্দপতন আছে। এ বেদনা বা ছন্দপতনের কারণ হচ্ছে মৃদুলের বাউণ্ডুলে স্বভাব। মৃদুল হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। তখন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। বিনা নোটিসেই হঠাৎ করে সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। গত এক বছরে সে নিরুদ্দেশ হয়েছে সাতবার।
মৃদুল মাস্টার্স পাস করেছে দুবছর হলো। এ পর্যন্ত ও কোনোদিন কোনো চাকরির চেষ্টা করেনি। বাবা ও ভাইয়ের সাথে ব্যবসার হালও ধরেনি। ওর বাবা ও বড় ভাই অনেকবার চেষ্টা করে বিফল হয়েছেন। মৃদুল ব্যবসার ব্যাপারে উদাসীন। ও বাড়িতে থাকলেও আজকাল ওর বাবা-ভাইয়ের সাথে খুব একটা দেখা হয় না। কারণ, মৃদুল অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে এবং প্রায় দুপুর অবধি ঘুমায়। মাঝে মাঝে শুক্রবার ছুটির দিনে মৃদুলের দেখা পান ওর বাবা ও ভাই। তা-ও সব সময় নয়। মৃদুল খাবার টেবিলে খুব একটা আসতে চায় না। ও ওর নিজের রুমেই খেতে পছন্দ করে। কাজের বুয়া সময়মতো খাবার দিয়ে আসে ওর রুমে। আজ দুপুরে মৃদুল ডাইনিং টেবিলে এলো।
আফজাল রায়হান কথা বলেন খুব কম। তিনি চুপচাপ থাকতে পছন্দ করেন। জরুরি বিষয় হলে তিনি কথা বলেন। খাবার টেবিলে তিনি ছোট ছেলের উদ্দেশে বললেন-
‘মৃদুল, এবার তুমি সাতদিন নিরুদ্দেশ থেকে কাল বাড়ি ফিরেছো, তাই না?’
‘জ্বি, বাবা।’
‘এতে তোমার কী লাভ হচ্ছে বলো তো।’
‘বাবা, যতোই ঘুরছি, ততোই বাড়ছে অভিজ্ঞতা। কত মানুষ, কত রকম চরিত্র! ঘরে বসে থাকলে কী এসব জানা হতো?’
‘এসব জেনেই বা তোমার কী লাভ হচ্ছে? তা ছাড়া বাইরে ঘুরে বেড়ানোটা যদি তোমার শখ হয়, বাসায় ফোনে যোগাযোগটা রাখতে পারো। তোমার মোবাইল ফোনও বন্ধ থাকে।’
‘তোমাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আসলে ঘুরে ঘুরে আমি গল্প খুঁজছি। আমি ভালো গল্প লিখতে চাই। আর পথে নামলে টেলিফোনে যোগাযোগ রাখাটা হয়ে ওঠে না। মোবাইল ফোন সাথে নিয়ে যাই না।’
এ কথায় মৃদুলের বড় ভাই মাহাবুব বললো-
‘এসব তোমার পাগলামী। পড়াশোনা শেষ করলে দুবছর হলো। ব্যবসার কথা বাদই দিলাম। এই দুবছরে তুমি একদিনও চাকরি খোঁজনি। খুঁজছো কী না গল্প। জীবনে কোনটা বেশি প্রয়োজন জীবিকা না গল্প?’
ডাইনিং টেবিলে রাখা পাত্র থেকে ভাজা ইলিশ মাছের টুকরো মৃদুলের খাবারের থালায় তুলে দিতে গিয়ে নীতা তার দেবরের পক্ষ নিয়ে স্বামীর উদ্দেশে বললো-
‘মাত্র তো পড়াশোনা শেষ করলো, ওকে ওর মতো ঘুরতে দাও না! দেখবে একসময় ও-ই সবচেয়ে ভালো করছে।’
‘সেটাই তো জানতে চাচ্ছি, ভালোটা কোথায় করবে। তুমি কী শুনেছো, গল্প-উপন্যাস লিখে কেউ কখনো সাবলম্বী হয়েছে? বরং লেখকরা শেষ বয়সে অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।’
জবাব দিলো মাহাবুব। প্রত্যুত্তরে মৃদুল বললো-
‘ভাইয়া, সে যুগ এখন আর নেই। এখন লেখকরা যথেষ্ট অর্থ আয় করছেন। হুমায়ুন আহমেদের কথাই ধরো। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যন্ত তিনি তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। প্রতিবছর তিনি লাখ লাখ টাকা আয় করছেন বই লিখে বা নাটক তৈরি করে। তার কী পরিমাণ আয়, তা কল্পনা করতে পারবে না। শুধু হুমায়ুন আহমেদই নন, ইমদাদুল হক মিলন, মইনুল আহসান সাবের বা অনিসুল হকও যথেষ্ট আয় করছেন। তা ছাড়া লেখকরা এখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে হরদম নাটক লিখছেন। তারা দুহাতে অর্থ আয় করছেন। লেখকদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা অবহেলার দিন শেষ হয়ে গেছে।’
‘আমরাও সেদিনটির অপেক্ষায় আছি যে, তুমি কবে বই লিখে যথেষ্ট আয় করবে, তা দেখবো বলে।’
‘আশীর্বাদ করো সেদিনটি যেনো খুব তাড়িতাড়ি দেখতো পাও।’
মৃদুলের মা এবার বললেন-
‘আজকালকার ছেলেরা কেমন বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তারা মাস্তান হচ্ছে। সন্ত্রাস করছে। ওইসব সন্ত্রাসীরা আবার সালামও পাচ্ছে। আমার মৃদুল তো সেরকম নয়। ও কাজ করছে না ঠিক, অন্যায় কিছু তো করছে না!’
নাজমা রায়হান বরাবরই ছোট ছেলের পক্ষ নেন। মায়ের কথার জবাবে মাহাবুব বললো-
‘মা, তোমার আশকারাতেই ও মাথায় উঠেছে। পড়াশোনা শিখে কিছু না করাটাও অন্যায়।’
নাজমা রায়হান বড় ছেলের কথা যেনো শুনতেই পাননি এমন ভাব করে রইলেন। মৃদুল মিটিমিটি হাসতে লাগলো। নাজমা রায়হান মৃদুলের দিকে তাকিয়ে নরোম গলায় বললেন-
‘মৃদুল, তোর কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। সেটা রাখতে হবে।’
‘বলো কী, আমার কাছে তোমার অনুরোধ!’
‘হ্যাঁ।’
‘মা, তুমি আবার অনুরোধ করবে কেনো? আদেশ করো।’
‘আহা, আদেশ করো! যেনো কত আদেশ তিনি মানেন!’
মায়ের কণ্ঠে আক্ষেপ। মৃদুল বলে-
‘আদেশ করেই দেখো না!’
‘ঠিক আছে, আদেশ করছি, তোকে বিয়ে করতে হবে।’
মায়ের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো মৃদুল। নাজমা রায়হান খেপা কণ্ঠে বললেন-
‘হাসছিস কেনো?’
‘মা, তুমি হাসির কথা বললে, আমি হাসবো না?’
‘আমি কী হাসির কথা বলেছি?’
‘হাসির কথা নয় তো কী! এ বেকারকে কে বিয়ে করবে?’
‘সে কথা তোকে ভাবতে হবে না। আমি মেয়ে দেখে রেখেছি। এখন তুই মত দিলেই হয়।’
‘মেয়ে বা মেয়ের পরিবার জানে তো, আমি বেকার? আমি যে হঠাৎ হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাই, তা বলেছো?’
‘তা বলতে যাবো কেনো?’
‘তা হলে তো মা, তুমি সত্যকে আড়াল করছো। এটা অন্যায়।’
‘হয়েছে। তোর কাছ থেকে ন্যায়-অন্যায় শিখতে হবে না।’ নাজমা রায়হান রাগ করে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেন। নীতা বললো-
‘মাকে তুমি না রাগালেও পারতে।’
মৃদুল জানে ওর মা আসলে রাগ করেন নি। ছেলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এটি তার কৌশল। ও আপন মনে খাবার খেতে লাগলো।
মাহাবুব ফের বললো-
‘তা লেখক সাহেব, তোমার পরবর্তী প্রজেক্ট কী?’
এই প্রশ্নের জবাবটা যেনো তৈরিই ছিল। মৃদুল বললো-
‘আমার পরবর্তী প্রজেক্ট হচ্ছে, বিভিন্ন পেশাজীবীর সাথে মিশে যাওয়া। তাদের জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে জেনে নিতে চাই ওদের জীবনটা কেমন। ওরাই বা ওদের জীবন নিয়ে কেমন আছে।’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো, এবার আমি ঠিক করেছি বেশ কয়েকদিন ট্যাক্সি চালাবো। মানে, ইয়েলো ক্যাব চালাবো। দেশে এই পেশাটা নতুন শুরু হয়েছে। এই পেশার লোকেরা কেমন আছেন, আমার জানতে ইচ্ছে করছে।’
‘এটার পর রিকশাও ধরবে নাকি!’
‘ধরতে পারি।’
এ কথায় আজমাল রায়হান ‘রাবিশ!’ বলে খাবার টেবিল ছেড়ে চলে গেলেন। মাহাবুব ও নীতা হাসতে লাগলো। মাহাবুব বললো-
‘ব্যবসায়ীরাও পেশাজীবী, জানো তো? এই পেশার লোকদের সম্পর্কে জানতে হলে নিজেদের ব্যবসায় প্রথমে এসো। কাছ থেকে দেখতে পাবে আমরা কেমন আছি। আমি তোমাকে সাহায্য করবো।’
‘হয়তো আসবো। এর আগে আমাকে অনেক কিছু জেনে আসতে হবে।’
খাবার টেবিলে দুই ভাইয়ের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। মাহাবুব খাবার টেবিল থেকে উঠে চলে গেলো। মৃদুল অনেকদিন পর তৃপ্তিসহকারে দুপুরের খাবার খেতে লাগলো। মলি খাবার টেবিলে বসে চুপচাপ দেখছিল ওর ছোটদা কতটা মনোযোগ সহকারে ভাত খাচ্ছে। তাকে নিয়ে বাবা ও বড় ভাইয়ার উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেও ছোটদা কেমন ভাবলেশহীন। লেখকরা কী এমন হয়? মলি কৌতূহলী গলায় মৃদুলকে জিজ্ঞেস করলো-
‘ছোটদা, তোমার এই প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে কী করবে? অনেক তো ঘুরলে!’
মৃদুল মুখ তুলে মলির দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলো। বললো-
‘পথ চলার কী শেষ আছে রে? কাজেরও শেষ নেই। প্রজেক্ট চলতেই থাকবে। এরপর আমি বিভিন্ন মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়াবো। মাজারগুলোতে কিছু মানুষ কেনো যায়। তারা কী পাচ্ছে বা কীসের আশায় তারা ছুটছে, তা জানার চেষ্টা করবো। প্রথম শুরু করবো আজমির শরীফ দিয়ে।’
এই কথার জবাবে নীতা রান্নাঘর থেকে উঁচু গলায় বললো-
‘মৃদুল, তোমার মাথাটা, সত্যিই গেছে! পীর-আউলিয়াদের মাজার নিয়ে কেউ এমন কথা বলে?’
মৃদুল সাথে সাথেই এর জবাব দেয়।
‘ভাবী, তোমার বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় চার বছর হলো। একটি সন্তানের আশায় তুমি কত কত পীর আউলিয়ার মাজারে গেলে। কোনো ফলাফল পেয়েছো?’
এই প্রশ্নের জবাব এলো না রান্নাঘর থেকে। মলি ফিসফিস করে বললো-
‘ছোটদা, তুমি যে কী!’
মৃদুল মলির এ কথায় বুঝতে পারলো অপ্রত্যাশিতভাবে ও নীতাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে। নীতা হয়তো রান্নাঘরে চোখের জল ফেলছে। একটা অপরাধবোধ গ্রাস করলো মৃদুলকে। ও কেমন বিষণ্ন হয়ে গেলো।
চার.
আকাশটা রোদে গমগম করছে। ভ্যাপসা গরম। থেমে থেমে বাতাস আসছে দক্ষিণ দিক থেকে। এই বাতাসে ভ্যাপসা গরমের কিছু হচ্ছে না। গ্রীষ্মের দাবদাহ। কোথাও দাঁড়িয়ে এই গরম থেকে রক্ষা পাবার জো নেই। বাড়ি কিংবা অফিস-আদালত বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যারা আছেন, তাদেরও স্বস্তি নেই। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের বিড়ম্বনা লেগেই আছে। এই দাবদাহেই ছুটছে মানুষ। কারো জিরিয়ে নেবার সময়ও নেই। ঢাকা শহরটা সব সময় খুব বেশি ব্যস্ত। নাগরিক জীবনের কোলাহলমুখর এই শহর। ইস্টার্র্ন প¬াজার প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে এ কথাই ভাবছিল তিথি। এ সময় সেলফোন থেকে ইয়েলো ক্যাব কোম্পানিতে ফোন করলো সুমি। এতে অবাক হলো তিথি। ওরা এসেছে গাড়ি নিয়ে। গাড়ি রয়েছে মার্কেটের পার্কিং প্লটে। অথচ সুমি কল করলো ইয়েলো ক্যাবের জন্য। তিথি সুমিকে বললো-
‘এলাম তোর গাড়িতে। এখন তুই ট্যাক্সিক্যাব ডাকছিস কেনো?’
সুমি হেসে বললো-
‘এতে রহস্য যেমন আছে, তেমনি সঙ্গত কারণও আছে। আমি আপাতত আমাদের ড্রাইভারকে সঙ্গে নিচ্ছি না। তাই, ট্যাক্সি কল করলাম।’
তিথি কথা বাড়ালো না। হাই স্টাটাজ বা ভীষণ ধনী পরিবারের মেয়েদের খেয়াল-খুশি বুঝা মুশকিল। ওরা মাথায় যা আসে, তাই-ই যেনো করে বসে। গভীরভাবে কিছু ভাবে না, বা ভাবতে চায় না। তিথি সুমির মুখ দেখে কিছু বোঝার চেষ্টা করলো। ওর চোখে-মুখে রহস্য বা সঙ্গত কারণের কোনো ছায়া দেখতে পেলো না। আশপাশেই হয়তো ট্যাক্সি ছিল। ইস্টার্ন প্লাজার সামনের ব্যস্ত সড়কে একটি ইয়েলো ক্যাব এসে থামলো। ড্রাইভার যাত্রীর অপেক্ষা করছে। সুমি দ্রুত পা বাড়ালো। তিথি ওকে অনুসরণ করলো।
ট্যাক্সিতে চড়েই সুমি ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো-
‘ড্রাইভার, মগবাজার যান।’
‘মগবাজারের কোথায় যাবেন?’
জানতে চাইলো ড্রাইভার। এ কথায় একটু বিরক্ত হলো সুমি। মেয়ে পেসেঞ্জার দেখলেই ড্রাইভাররা কেমন বেয়ারা হয়ে যায়। বেশি কথা বলে। ট্যাক্সির ড্রাইভার বা রিকশাচালক একই আচরণ করে। সুমি বিরক্তি প্রকাশ করে বললো-
‘আপনি আগে মগবাজার যান, আমি পরে বলবো কোথায় যেতে হবে।’
‘ম্যাডাম, মগবাজার দুটি। একটি বড় মগবাজার এবং অন্যটি শুধু মগবাজার। পুরো ঠিকানাটা বললে আমার যেতে সুবিধা হয়। ঘুরপাক খেতে হয় না।’
সুমি বুঝতে পারলো, ড্রাইভারটি খুবই চালাক-চতুর। বেশি টাকা বিল নেবার কৌশল করছে। সুমি ধমকের সুরে বললো-
‘ঘুরতে হয় ঘুরবো। আপনার অর্থ পেলেই হয়। যা বলছি, তাই করুন। বড় মগবাজার যান।’
এবার ট্যাক্সি চলতে শুরু করলো। সুমির দিকে তাকিয়ে তিথি হাসতে লাগলো। সুমি আজ অকারণে রেগে যাচ্ছে। কোনো বড় ধরনের টেনশনে মানুষ এ ধরনের আচরণ করে। তিথি বুঝতে পারছে না, ও কী নিয়ে টেনশন করছে। সুমিকে ও ভালো করেই জানে। ও অনেকটা আবেগপ্রবণ ও অস্থির চিত্তের মানুষ। চট করেই ও রেগে যায়। কিন্তু রাগ ধরে রাখতে পারে না। বাইরে ওকে রাগী দেখালেও আসলে ভেতরে ও সাদামাটা, সহজ-সরল এক মানুষ। তাই, সুমিকে তিথি ভীষণ পছন্দ করে, ভালোবাসে। সুমির সাথে ওর পরিচয় ছায়ানটে। গান শিখতে গিয়েই ওদের পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। সুমি দেশের একজন শিল্পপতির মেয়ে। ও পড়াশোনা করছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ও এমবিএ-তে পড়ছে। গণিতের ছাত্রী ছুটির দিনে শিখছে গান। এ ব্যাপারটি তিথিকে ভাবায়। মানুষের ইচ্ছা থাকলে কী না করতে পারে!
‘তুই কী ভাবছিস রে, তিথি?’ সুমির কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় তিথি। ও বলে,
‘ভাবছি, তুই আজকে কী নিয়ে টেনশন করছিস? আমাকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে আনলি। বললি, জরুরি কাজ আছে।’
‘এ কথাটি মিথ্যা বলিনি। সত্যিই জরুরি একটি কাজ আমি করবো। তোকে সাথে এনেছি নিজের ভেতরের ভয়কে দূর করার জন্য।’
‘তাই নাকি! তা কী এমন কাজ!’
‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একটু পরেই জানতে পারবি।’
‘সুমি, আজকে তোর আচরণ কেমন অসংলগ্ন লাগছে।’
‘বাহ রে, আমার বিয়ের দিন কী আমি স্বাভাবিক আচরণ করবো?’
‘বিয়ে! তোর!’
‘হ্যাঁ।’
‘তোর কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
‘না, না। আমি সত্যি কথাই এখন তোকে বলছি। আগে বললে তুই তো আসতিস না। আমি আজ অপুকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। আই মিন, গোপনে আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি।’
‘সুমি! তুই এসব কী বলছিস? অপু আর তুই না ক্লাসমেট!’
‘আমরা একসাথে পড়ছি বলেই তো ওকে ভালোবেসে ফেললাম। বাবা তো অপুকে তার মেয়ের জামাই হিসেবে মেনে নেবেন না। তাই, ঠিক করেছি, আমরা গোপনে বিয়ে করে ফেলবো। পরে পরিস্থিতি সামলে নেবো।’
‘এসব কথা তুই আমাকে আগে বলিস নি কেনো? বলা উচিত ছিল।’
‘তুই রাগ করিস নে, লক্ষ্মীটি। আমার বিয়ের দিন তুই পাশে না থাকলে…!’
‘কিন্তু!’
‘কোনো কিন্তু নয়।’
‘সুমি, তোর বাবা অনেক প্রভাবশালী। এ ঘটনা জানাজানি হবার পর কোথাকার পানি কোথায় গড়াবে, কে জানে!’
‘তিথি, ওসব কথা আমিও ভেবেছি। যা হবার হবে। আগে তো আমাদের বিয়েটা হোক।’
‘সুমি, আমার হাত-পা, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছে! আমাকে তুই কোন্ বিপদে টেনে আনলি?’
‘ভয় পাস নে। আমি তো বিয়ে করে আজই পালিয়ে যাচ্ছি না। আমরা বিয়ে করবো। তারপর দুজনেই দুজনার বাড়ি ফিরে যাবো। তুই, আমি আর অপু ছাড়া এই বিয়ের কথা কেউ জানতেই পারবে না।’
তিথি চিন্তিত গলায় বললো-
‘অপু এখন কোথায়?’
‘ও মগবাজার কাজি অফিসের সামনে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
‘বলিস কী! কী সাংঘাতিক ঘটনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি!’
‘তিথি, প্লিজ!’
ইয়োলো ট্যাক্সিটি বাংলামটর এলাকার যানজট গলে ধীর গতিতে ছুটে যাচ্ছে মগবাজারের দিকে। যানজটে গাড়ি এগুতে চায় না। নগরবাসী ঢাকা শহরের রাস্তায় নামেন যানজটের বিড়ম্বনাকে মাথায় রেখেই। এ শহরের বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়া হলেও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। অনেক অসঙ্গতি আর অসম্পূর্ণতায় ক্ষত-বিক্ষত থাকছে এ শহর!
অপু কাজি অফিসের সামনে সুমির জন্য অপেক্ষা করছিল। গাড়ি থেকে সুমি নামতেই অপু এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বললো-
‘একটা সমস্যা হয়ে গেছে।’
‘কি সমস্যা?’
সুমির উদ্বেগময় প্রশ্ন।
‘বিয়ে করতে হলে দুজন সাক্ষী লাগবে। আমি কাজির সাথে বিয়ের কথা বলতেই কাজি সাহেব সাক্ষীর কথা বললেন।’
কথা শুনে সুমি যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বললো-
‘এটা কোনো সমস্যা হলো? তুমি যে কী! সব সময় টেনশন তৈরি করো।’
‘বাহ্! এখন দুজন সাক্ষী পাবো কোথায়?’
‘কেনো তিথি তো আমার সঙ্গেই আছে। ও সাক্ষী হবে। আর আমি গাড়ি ছেড়ে দেইনি। গাড়ির ড্রাইভারকে সাক্ষী করা যাবে। ব্যাস!
‘তাই তো! তুমি সত্যিই বুদ্ধিমতি!’
অপু বিগলিত হয়ে উঠলো। তিথি গাড়ি থেকে নেমে বললো-
‘তোমরা হঠাৎ করে বিয়ে করছো, কাজটি কী ঠিক হচ্ছে?’
তিথি-এর কথায় অভিমানের কণ্ঠে সুমি বললো-
‘তুই সেই কখন থেকে ওই কথাটিই বলছিস। তুই তো জানিস, আমরা একে অন্যকে ভালোবাসি। পারিবারিকভাবে আমাদের বিয়ে হবার নয়। তাই নিজেরাই বিয়ে করছি।’
সুমিকে সমর্থন করে অপু বললো-
‘দেখুন, আমরা অনেক ভেবে-চিন্তে এভাবে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিথি অপুর দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনারা কি এ সিদ্ধান্তে অনড়?’
অপু কিছু বলার আগে সুমি এর জবাবে বললো-
‘আমরা এ সিদ্ধান্তে অনড়। তুই কি সাক্ষী হবি?’
‘হবো না, তা তো বলিনি।’
‘তা হলে চল ড্রাইভারকে ডেকে সঙ্গে নিয়ে নিই।’ এ কথা বলেই সুমি রাস্তার পাশে পার্ক করা গাড়ির দরজার সামনে গিয়ে ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো-
‘ড্রাইভার সাহেব, গাড়িটি লক করে নেমে আসুন তো।’
‘কেনো বলুন তো?’
অবাক চোখ তুলে বললো মৃদুল। ইয়েলো ট্যাক্সির ড্রাইভাররা যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু যাত্রীর ডাকে কোথাও নামে না। এতে অনেক সময় ঝামেলায় পড়তে হয়। গাড়ি ছিনতাই হবার ভয়ও আছে। মহিলা যাত্রীদেরও বিশ্বাস করা যায় না। ইয়েলো ক্যাব চালকরা মৃদুলকে এসব কথা বলেছে। মৃদুলের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে সুমি বললো-
‘ভয় নেই। আমরা কাজি অফিসে এসেছি। আপনি আমাদের বিয়ের সাক্ষী হবেন। এ জন্য আপনাকে ৫০০ টাকা দেবো। গাড়ির ভাড়াও পাবেন।’
মৃদুল কৌতূহল প্রকাশ করে বললো-
‘আমি বিয়ের সাক্ষী হতে যাবো কেনো?’
‘আমাদের প্রয়োজনে। আজ আমরা বিয়ে করছি। বিয়ে করতে হলে দুজন সাক্ষী লাগে। সাক্ষী আছে মাত্র একজন। তাই আপনি সাক্ষী হলে বিয়েটা হয়ে যায়।’
বিনীত গলায় কথাগুলো বললো অপু। মৃদুল ভাবতে লাগলো সে কী করবে। সুমি ফের বললো-
‘মাত্র আধাঘণ্টার কাজ। এ জন্য আপনাকে ৫০০ টাকা দেবো। এ কাজ তো যে কেউ করতে রাজি হবে।’
‘দেখুন, আমাকে অর্থের লোভ দেখাবেন না। বিয়ের সাক্ষী হওয়া আমার কাজের মধ্যে পড়ে না।’
মৃদুল বিরুক্তি প্রকাশ করে। ওর কথা শুনে অপু ও সুমি দুজনে দুজনার দিকে হতাশ চোখে তাকায়। তিথি মৃদুলের উদ্দেশে বললো-
‘দেখুন, এ কাজটি কোনো অন্যায় নয়। ওরা একে অন্যেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইছে। আমরা শুধু সাক্ষী হলেই ওদের আজ বিয়েটা হয়ে যায়। নইলে অন্য একদিন ওরা বিয়ে করবে। আপনি ওদের সহযোগিতা করতে পারেন। ভালো কাজে কাউকে সহযোগিতা করা অন্যায় নয়।’
‘বাবা-মাকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করাটা অন্যায় নয় বলছেন!’
মৃদুলের বিস্ময়ে তিথি বললো-
‘ওরা দুজনেই প্রাপ্ত বয়স্ক। বিয়ে করার অধিকার ওদের আছে।’
‘আইনগত অধিকার আছে; কিন্তু পারিবারিক দায়বদ্ধতাকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যায় কি?’
মৃদুলের এ কথায় তিথি একটু হচকিয়ে গেলো। একজন ট্যাক্সিচালক এ ধরনের কথা বলতে পারে কি? তিথি নরম গলায় বললো-
‘ভালোবাসার সামনে এ ধরনের দায়বদ্ধতা তুচ্ছ। আসুন না, আমরা তর্ক না করে ভালোবাসার পক্ষে থাকি।’
তিথির কথা ভালো লাগলো মৃদুলের। মেয়েটি গুছিয়ে সুন্দর কথা বলতে পারে। ও চুপসে গেলো। বিয়েতে সাক্ষী হতে ওর কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বিনিময়ে অর্থের প্রলোভন দেখানোটা ভালো লাগেনি ওর। মৃদুল ওদের কাউকেই চিনে না। অচেনা কারো বিয়ের সাক্ষী হলে মন্দ কী? মৃদুল তিথির দিকে তাকিয়ে বললো-
‘ঠিক আছে, আমি রাজি হলাম শুধুমাত্র আপনার অনুরোধে।’
মৃদুলের সম্মতিতে অপু ও সুমি খুশি হয়ে ওঠে। তিথি মৃদুলকে বলে-
‘আমার অনুরোধ রাখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’
‘ওয়েলকাম।’
অপু বললো-
‘চলো আমরা কাজি সাহেবের কাছে যাই।’
এ কথা বলে অপু সুমির হাত ধরে কাজি অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলো। ওদের অনুসরণ করলো তিথি ও মৃদুল।
প্রায় দুবছর পর বিন্দুকে দেখলো মৃদুল। বিন্দুর মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ছিপছিপে শরীর একটু মোটা হয়েছে। চোখে-মুখে কেমন একটা ক্লান্তির ছাপ। ওর মধ্যে চঞ্চলতাও যেনো নেই। বিন্দুর টেলিফোনকে উপেক্ষা করতে পারেনি মৃদুল। ওর ফোন পেয়েই সাক্ষাৎ করতে চলে এসেছে। মৃদুলের মনে নানা প্রশ্ন, কৌতূহল। আজ এতোদিন পর ওর কাছে বিন্দু কী চায়? মৃদুল বিন্দুকে সময় দিয়েছিল বেলা ৪টায়। ঠিক ৪টায় রমনা রেস্তোরাঁয় মৃদুল এসে দেখে বিন্দু আগে এসেই বসে আছে। অবাক হয় মৃদুল। আগে বিন্দু কখনো প্রতিশ্রুত সময়ে আসতে পারতো না। আজ ব্যাতিক্রম। মৃদুলকে দেখেই বিন্দুর দু’চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠলো। ও উঠে দাঁড়ালো। বিন্দু বসেছিল রেস্তোরাঁর লেকভিউ বারান্দায়। এ জায়গাটি মৃদুলের ভালো লাগে। মৃদুল বিন্দুর মুখোমুখি গিয়ে বসলো। বিন্দু হাতের ইশরায় বেয়ারাকে কাছে ডেকে বললো-
‘আমি যে অর্ডার দিয়েছি, তা ঠিক আধাঘণ্টা পর দেবে।’
বেয়ারা সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। মৃদুল বুঝতে পারলো বিন্দু আজ অনেকটা সময় কাটাবে ওর সাথে। বেয়ারা চলে যেতেই ও বললো-
‘কেমন আছো, বিন্দু?’
বিন্দু তৃষ্ণার্ত চোখে মৃদুলকে দেখলো। প্রশ্নটির জবাব না দিয়ে ও বললো-
‘তুমি সেই আগের মতোই আছো!’
‘তাই না কী! কোনো পরিবর্তন আশা করছিলে নাকি?’
‘আশা করছিলাম, তোমার মনের পরিবর্তন যেনো না হয়।’
‘এতে তোমার লাভ?’
‘লাভ কী হবে জানি না। তবে এতে আমার লোকসান হবে না- এ কথা বলতে পারি।’
‘আমার প্রতি একি তোমার আস্থা? না কী আমার দুর্বলতা ভেবে রহস্য করছো?’
মৃদুলের কণ্ঠে যেনো বিদ্রƒপ। বিন্দু হতাশ গলায় বললো-
‘আমি আর রহস্য করি না, মৃদুল। রহস্য করতে করতে একদিন দেখি, নিজেই এক রহস্যে পরিণত হয়ে গেছি। এ রহস্যের গোলক ধাঁধা থেকে বের হতে পারছি না। তাই তো তোমার কাছে ছুটে এসেছি।’
‘কেনো? ঠিক, আমার কাছেই বা কেনো এসেছো?’
প্রশ্নটির জবাব দিতে একটু সময় নিলো বিন্দু। বললো-
‘কারণ, আমি জানি আর সবাই ফিরিয়ে দিলেও তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না।’
‘রহস্য করাটা এখনো ছাড়তে পারোনি, দেখছি।’
‘না, মৃদুল। আজ কোনো রহস্য নয়। রহস্য করার মতো সময় বা পরিস্থিতি আমার নেই। তোমার সাথে খোলাখুলি কিছু কথা বলতে চাই। আই মিন, আমি তোমার সহযোগিতা চাই। হয়তো আরো বেশি কিছু।’
‘এতোদিন পর আমার কাছে কী চাইতে এসেছো, আমার দেবারই বা কী আছে, বুঝতে পারছি না।’
বিন্দু বিষণ্ন চোখে তাকালো মৃদুলের দিকে। মৃদুল খানিকটা উদ্বেগ প্রকাশ করে বললো-
‘তুমি কি কোনো সমস্যায় পড়েছো?’
‘হ্যাঁ।’
‘সমস্যাটা কী, খুলে বলো।’
‘আমার পাশে দাঁড়াবে তো!’
বিন্দুর কণ্ঠে আর্তি। মৃদুল বুঝতে পারে না এর জবাবে কী বলবে। আজ এতোদিন পর বিন্দু ওর কাছে কী চায়? মৃদুলেরই বা দেবার কী আছে? প্রশ্ন দুটো খোঁচাতে থাকে মনে। মৃদুল বলে-
‘আগে তোমার সমস্যাটার কথা বলো। তারপর দেখবো কী করতে পারি।’
বিন্দু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো-
‘মৃদুল, আমি ভালোবাসার নামে এক ধরনের উন্মাদনায় হুট করেই বিয়ে করে ফেলেছিলাম রাসেলকে। আমি জানি, আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি।’
‘থাক ওসব কথা। যা বলছিলে, বলো।’
মৃদুল অপ্রিয় প্রসঙ্গ টানতে চায় না। এখন ওসব কথা বলেই বা কী হবে? নিভে যাওয়া আগুন উসকে দিয়ে বা শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে মনকে বিষিয়ে তুলতে চায় না ও। বিন্দু নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো-
‘বিয়ের পর রাসেলের সাথে চলে গেলাম নিউইয়র্কে। স্বপ্নের দেশ আমেরিকা নিয়ে সীমাহীন স্বপ্নে তাড়িত ছিলাম। কিন্তু ওই স্বপ্নের দেশটা আমার কাছে দুঃস্বপ্নের দেশ হয়ে গেলো। একপর্যায়ে রাসেলের সাথে সম্পর্কটা কনটিনিউ করতে পারলাম না। তাই সব ছেড়ে ছুঁড়ে চলে এলাম।’
এ পর্যন্ত বলে ও থামলো। মৃদুল বললো-
‘তোমার আর রাসেলের মধ্যে কি ডিভোর্স হয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ। আমিই ওকে ডিভোর্স দিয়েছি।’
‘কেনো?’
‘ও একটা মিথ্যাবাদী, লম্পট। বিয়ের পর ওর আসল চেহারাটা চিনতে পারি। ও আমাকে বলেছিল, ও কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করছে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু ও নিউইয়র্ক সিটিতে ট্যাক্সি চালাতো। এর আগে ও একটি কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েকে বিয়ে করে ইমিগ্র্যান্ট হয়েছে। ওর সাবেক স্ত্রীর গর্ভে ওর একটি সন্তানও রয়েছে। এসব কথা ও কখনো বলেনি। ও একটা প্রতারক, ভণ্ড!’
এ কথা বলে বিন্দু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মৃদুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
‘এতো কিছু জানার পরও দুবছর ওর সাথে ছিলে?’
‘না। সব কিছু জানতে পারি বিয়ের ছমাসের মধ্যে। সাত মাসের মাথায় ওকে ডিভোর্স দিই। দেশে ফিরে আসতে চাইনি। অনেকদিন চেষ্টা করলাম নতুনভাবে জীবন সাজিয়ে নিতে। কিন্তু ওখানে আর ভালো লাগছিল না। তাই চলে এলাম। আমি বড্ড একা হয়ে গেছি, মৃদুল!’
বিন্দুর অকপটে এই অসহায়ত্ত প্রকাশে কেমন বিব্রত হয়ে গেলো মৃদুল। ও সব সময় দেখেছে প্রাণবন্ত বিন্দুকে। বিধ্বস্ত বিন্দুর এ রূপ ও কখনো দেখেনি। ওর মায়া হলো।
‘তুমি কি এখন অবলম্বন খুঁজছো?’
এ প্রশ্নে চমকে উঠলো যেনো বিন্দু। ও মৃদুলের চোখে চোখ রেখে বললো-
‘অবলম্বন! হ্যাঁ, সেরকমও বলতো পারো। মৃদুল, তুমি কি আমার পাশে দাঁড়াবে?’
প্রশ্নটি করে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে রইলো ও। মৃদুল এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ও বিব্রত হয়ে পড়লো। ও কী বলবে, বুঝতে পারছে না। বিন্দু কৈফিয়ত দেবার মতো করে বললো-
‘এ কথা ঠিক, আমি তোমাকে উপেক্ষা করেছি। আমি মোহগ্রস্ত হয়ে রাসেলের প্রেমে ঝাঁপ দিয়েছি। এখন কী নতুন করে…?’
‘বিন্দু, সব কিছু নিজের মতো হয় না।’
‘চেয়ে দেখো, আমি ফুরিয়ে যাই নি। আমি…’
‘বিন্দু! আলোচনার মধ্যে তোমার যৌবন আর শারীরিক সৌন্দর্যকে টেনে এনো না, প্লিজ!’
‘সরি, আমার মাথা ঠিক নেই। আমি আসলে এক্সপ্লেইন করতে পারছি না, তোমাকে আমার কতটা প্রয়োজন। আমি, আমি একটা শোধ নিতে চাই!’
‘শোধ!’
‘হ্যাঁ, আমি দেখিয়ে দিতে চাই, আমি ভালো আছি। আমি হেরে যাই নি। আমাকে ভালোবাসার এখনো কেউ আছে।’
এ কথা বলে ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো বিন্দু।
মৃদুল বুঝতে পারলো বিন্দু মৃদুলের কাছে এসেছে ওর নিজের প্রয়োজনে, ভালোবাসার কোনো দায় থেকে নয়। বিন্দু রাসেলকে ডিভোর্স দিলেও ও রাসেলকে দেখিয়ে দিতে চায় যে, সে ভালো থাকতে পারে। এটাও রাসেলের প্রতি ওর এক ধরনের প্রতিশোধ। রাসেলকে ও ঘৃণা করলেও ভালোবাসার বাঁধনটা যেনো অলক্ষ্যে রয়ে গেছে। যা বিন্দু নিজেই জানে না। জীবন এ রকমই। মৃদুল বললো-
‘তুমি জয়-পরাজয়ের হিসাবটা কেনো করছো? সব কিছু সহজ করে মেনে নাও। কাকে দেখাতে চাও যে, তুমি ভালো আছো? আগে নিজের মুখোমুখি হও।’
বিন্দু কান্না থামিয়ে মৃদুলের একটা হাত ধরে ফেললো।
‘আমি ভীষণ ক্লান্ত! আমাকে তুমি আশ্রয় দাও, প্লিজ!’
মৃদুলের মনটা আরো বিষণ্ন হয়ে গেলো। এই বিন্দুর হাত ধরার জন্য ওর কত স্বপ্ন ছিল। আজ বিন্দু নিজেই ওর হাত ধরলো, অথচ বড্ড দেরিতে। ও বললো-
‘বিন্দু, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তোমাকে আমি কী বলবো।’
এর জবাব তৈরি ছিল বিন্দুর। ও বললো-
‘আমি বলছি না, তুমি আমাকে বিয়ে করো।’
‘তা হলে?’
‘আমাকে তোমার পাশে রাখো। আমি বড্ড নিঃসঙ্গ! এই নিঃসঙ্গতা আমার ভালো লাগে না।’
‘ঠিক আছে, তোমার যখন খারাপ লাগবে, আমাকে ফোন করো। আমি ছুটে আসবো। আমরা গল্প করবো। ব্যাস।’
এ কথা শুনে ছোট্ট করে হাসলো বিন্দু। বললো-
‘তুমি এখনো বোকাই আছো। শুধু গল্প করার জন্য তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। আমার আরো কিছু প্রয়োজন।’
‘একটু খুলে বলো তো?’
‘যদি বলি, আজকের রাতটা আমি তোমার বুকে শুয়ে কাটিয়ে দিতে চাই, রাখবে আমার অনুরোধ?’
এ কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো মৃদুল। বিন্দু কী নির্লজ্জ হয়ে গেছে? নাকি ও পাগল? মৃদুল ভাবতে লাগলো। ওর হতভম্ব মুখের দিকে চেয়ে বিন্দু নিচু কণ্ঠে বললো-
‘আমার শরীরের প্রতি কি তোমার কোনো আকর্ষণ নেই, মৃদুল?’
কথাটি গরম সীসার মতো প্রবেশ করলো ওর কানে। বিন্দু এসব কী বলছে! বিন্দু তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে। প্রশ্নটির জবাব ও আশা করছে। মৃদুল কিছুটা সময় অবনত হয়ে থাকলো। এরপর মাথা তুলে বললো-
‘তোমার সৌন্দর্য উপেক্ষা করার মতো নয়। কিন্তু তোমার শরীরকে পাওয়ার মধ্য দিয়ে আমার কিছু পাওয়া হবে না, বিন্দু। আমার কাছে তোমার স্থান আরো ওপরে। ভালোবাসা না হোক, তোমাকে আমার ভালো লাগতো। এই ভালোলাগাটুকুর মর্যাদা আমি নষ্ট করতে চাই না। আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে চাই বন্ধু হিসেবে, পুরুষ হিসেবে নয়।’
এ কথা শুনে বিন্দু নিজের মাথাটা নিচু করে ফেললো। ওর শরীরটা কেঁপে উঠছে। হয়তো ও কাঁদছে। মৃদুল এ কান্নায় বাঁধা দিলো না। এ কান্না যে অনুশোচনা ও আত্মশুদ্ধির- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই ওর।
কখনো কখনো কান্না মানুষকে পবিত্র করে দেয়।
ছয়.
বাড়িটি চিনতে কোনো অসুবিধা হলো না মৃদুলের। বাড়ি নয় যেনো বিশাল অট্টালিকা। ধানমন্ডি এলাকায় এ ধরনের অট্টালিকা খুব ধনী লোকদের হয়ে থাকে। এ আবাসিক এলাকায় দেশের ধনী ব্যক্তিরা থাকেন। এখানে সুরম্য প্রসাদ নির্মাণের অঘোষিত প্রতিযোগিতা লেগে রয়েছে। কে কার চেয়ে সুন্দর ও সুরম্য প্রসাদ নির্মাণ করতে পারেন, এ লড়াই অনেকদিন যাবত চলে আসছে। এখন শুরু হয়েছে বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির ফ্ল্যাট নির্মাণের হিড়িক। এখানে বাড়ছে শুধু অট্টালিকা, সে সাথে কমছে ঐতিহ্যময় পরিবেশের জৌলুস। ধানমন্ডি এলাকায় এলে মৃদুলের তা-ই মনে হয়। গতকাল রাতে যে লোকটি এ বাড়িতে এসেছেন, তার পোশাক দেখে মনে হয়নি তিনি এ অট্টালিকায় বাস করেন। ভদ্রলোক মৃদুলের ট্যাক্সিতে চড়েছিলেন। তাকে শাহবাগ থেকে গাড়িতে তুলেছিল মৃদুল। ভাড়া হয়েছিল ৩৮ টাকা। তিনি গুনে ৩৮ টাকাই মৃদুলকে দিয়েছেন। কোনো বকশিস দেননি। অন্যচালক হলে এতে ভীষণ মন খারাপ করতো। মৃদুলের মন খারাপ হয়নি। ভদ্রলোকের বয়স প্রায় ৫০ বছর হবে। এ বয়সের লোকেরা খরচের বেলায় খুব হিসাবী হন। কিন্তু এমন অট্টালিকায় যারা থাকেন, তাদের কৃপণতা মানায় না। ভদ্রলোককে নামিয়ে আর কোনো যাত্রী পায়নি ও। গাড়ি গ্যারেজে জমা দিতে গিয়ে ও দেখতো পেলো যে, ভদ্রলোকটি তার ব্যাগ ফেলে গেছেন। এটা নতুন কিছু নয়। অনেকে ভুল করে গাড়িতে ব্যাগ ফেলে যান। ফেলা যাওয়া ব্যাগ যাত্রীরা ফেরত পান কিনা, তা জানে না মৃদুল। মৃদুল ব্যাগটি ফেরত দিতে এসেছে। এটি বাড়তি কাজ। একজন কৃপণ যাত্রীর ব্যাগ ফেরত দিতে কি সবাই আসে? এ প্রশ্নেরও জবাব জানা নেই মৃদুলের। বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদুল এ কথাই ভাবছিল। বাড়ির দারোয়ান সন্দেহের চোখে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনে কারে চান?’
‘কাল রাতে একজন ভদ্রলোক আমার গাড়িতে চড়ে এ বাড়িতে নেমেছিলেন। তিনি একটা ব্যাগ ফেলে গেছেন গাড়িতে। আমি সেই ব্যাগটি ফেরত দিতে এসেছি।’
মৃদুল বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে দেয়। দারোয়ান মৃদুলকে আপদমস্তক দেখলো। এরপর বললো-
‘আপনে ভেতরে যান। সাহেবরা ভেতরে আছেন।’
দারোয়ান গেট খুলে দিলো। মৃদুল অস্বস্তি নিয়ে গেটের ভেতরে প্রবেশ করলো। বাড়ির আঙিনায় একটি বিএম ডব্লিউ ভ্যান এবং একটি লেকসাস কার দাঁড়িয়ে আছে। যে বাড়িতে এ ধরনের গাড়ি থাকে, সেই বাড়ির কেউ ইয়োলো ক্যাবে চড়ার কথা নয়। হয়তো এ বাড়ির অতিথি কেউ হবেন। চট করে বুঝে নেয় মৃদুল। অট্টালিকার প্রবেশ মুখের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ও কলিংবেল টিপলো। টুং-টাং মিষ্টি একটা আওয়াজ হলো। প্রায় ২৫ সেকেন্ড পর দরজাটি খুলে গেলো। এবং দরজা খুললো রাশেদ। মৃদুলকে দেখে ভীষণ অবাক হলো রাশেদ। মৃদুলও রাশেদের দিকে অবাক চোখে চেয়ে রইলো। ওরা দুজন ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিল। দুজন ওই কলেজে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। এইচএসসি পাস করার পর রাশেদ বিজনেস ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা করতে চলে যায় অস্ট্রেলিয়ায় আর মৃদুল ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই বন্ধুর সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। আজ প্রায় আট বছর পর দুই বন্ধু মুখোমুখি হলো অপ্রত্যাশিতভাবে। দুজনে দুজনার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। একপর্যায়ে রাশেদ বললো-
‘মৃ-দু-ল, তুমি!’
‘এটা কি তোমাদের বাড়ি?’
মৃদুলের পাল্টা প্রশ্ন। রাশেদ ধাতস্থ হয়। বলে-
‘আগে ভেতরে এসো। কতদিন পর তোমার সাথে দেখা!’
রাশেদ দরজা থেকে সরে মৃদুলকে ভেতরে প্রবেশের পথ করে দেয়। মৃদুল দরজা গলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। ও রাশেদকে অনুসরণ করে ওদের বিশাল ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসলো। রাশেদ বসলো ওর মুখোমুখি। মৃদুল বললো-
‘তোমার সাথে আমার দেখা হবে, ভাবিনি।’
‘তোমাকে দেখে আমিও ভীষণ অবাক হয়ে গেছি। তোমার দেখা পেয়ে আমার খুবই ভালো লাগছে। তা আমাদের বাড়ির ঠিকানা পেলে কী করে?’
রাশেদের কথায় মৃদুল ছোট্ট করে হাসলো। বললো-
‘আমি ঠিক, তোমাদের বাড়িতে আসিনি। তোমার কাছেও আসিনি।’
‘ঠিক বুঝলাম না, কাদের বাড়িতে এসেছো! কার কাছে এসেছো! ফান করা এখনো ছাড়োনি, দেখছি!’
বিস্ময় প্রকাশ করে রাশেদ।
‘গতকাল রাতে এই বাড়িতে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমার গাড়ি থেকে নেমেছেন। গাড়িতে তিনি একটি ব্যাগ ফেলে যান। আমি সেই…’
‘কিন্তু ফুপা তো এসেছিলেন ইয়োলো ক্যাবে?’
‘আমি ওই ইয়োলো ক্যাবের ড্রাইভার।’
‘ইয়ার্কি করার আর জায়গা পাওনা, না?’
‘সত্যি বলছি, বন্ধু।’
‘ঠাট্টা রাখো। আসল ঘটনাটা খুলে বলো তো! ট্যাক্সি ড্রাইভার হবার জন্য তো তুমি আর পড়াশোনা শেখোনি!’
‘আসলে আমি ক্যাব চালাচ্ছি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য।’
‘সেটা আবার কী রকম?’
‘অন্য সময় তোমাকে এসব কথা খুলে বলবো। আমাকে উঠতে হবে।’
‘না, না। তোমাকে ছাড়ছি না। সেই সাত-আট বছর পর তোমার সাথে দেখা। যেভাবেই হোক দেখা যখন হয়েছে, তোমাকে ছাড়ছে কে? শারমিন, এদিকে আসো তো…’
রাশেদ উঁচু গলায় ওর স্ত্রীকে ডাকলো। মৃদুল বললো-
‘কাকে ডাকছো?’
‘আমার বউকে। তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো না?’
রাশেদের ডাকে দোতলা থেকে নেমে এলো তিথি। তিথি ড্রইংরুমের সোফায় মৃদুলকে দেখে ভীষণ অবাক হলো। রাশেদের পেছনে দাঁড়ানো তিথিকে দেখে মৃদুলও ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। তিথি বিস্ময়ভরা চোখ মৃদুলের দিকে চোখ রেখে রাশেদের উদ্দেশে ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-
‘ভাইয়া, ভাবীকে ডাকছো কেনো?’
মৃদুল বুঝতে পারলো তিথি রাশেদের বোন। রাশেদ বিগলিত কণ্ঠে বললো-
‘তোমার ভাবীকে বলো, আমার কলেজ জীবনের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এসেছে। ওর সাথে প্রায় সাত-আট বছর পর আজ দেখা।’
তিথি বোকার মতো হা করে তাকালো মৃদুলের দিকে। রাশেদ মৃদুলের উদ্দেশে বললো-
‘মৃদুল, তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ও হচ্ছে তিথি। আমার কাজিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ও ভালো গান গায়। আর তিথি ও হচ্ছে আমার বন্ধু, মৃদুল। আমরা একসাথে ঢাকা কলেজে পড়তাম। মৃদুলও ভালো গান গায়।’
মৃদুল আপত্তি জানিয়ে বললো-
‘রাশেদ, আমি কখনো ভালো গান গাইতাম না।’
‘হয়তো বা। ঠিক মনে পড়ছে না তোমার কী যেনো একটা ভালো গুণ আছে। সে অনেকদিন আগের কথা। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কে জানি ভালো গান গাইতো, মৃদুল?’
‘মোহন ভালো গান গাইতো।’
‘ও হ্যাঁ। আসলে আমার স্মৃতিশক্তি ভালো না।’
এ সময় রাশেদের স্ত্রী শারমিন ড্রইংরুমে ধীরে ধীরে এলো। তিথি সোফার এক কোণে দাঁড়িয়েছিল। ও এগিয়ে গিয়ে শারমিনের হাত ধরে এনে সোফায় বসালো। ও বসলো শারমিনের পাশে। ওর বুক দুরু দুরু কাঁপছে। রাশেদ মৃদুলকে দেখিয়ে বললো-
‘শারমিন, ও হচ্ছে আমার কলেজ জীবনের বন্ধু, মৃদুল। যার কথা তোমাকে অনেকবার বলেছি।’
শারমিন মৃদুলকে সালাম জানালো। মৃদুলও শারমিনকে শুভেচ্ছা জানালো। শারমিন বললো-
‘হ্যাঁ, ওর মুখে আপনার কথা শুনেছি। আপনি ভালো গল্প লিখতেন, তাই না?’
মৃদুল এ কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নিচু করলো। রাশেদ বললো-
‘ঠিক বলেছো। আমার এখন মনে পড়ছে, ও ভালো গল্প লিখতো। তুমি কি এখনো গল্প লিখো?’
তিথির দৃষ্টিতে কেমন গভীর পর্যবেক্ষণ। ও মৃদুলের মুখের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো ট্যাক্সিচালক ও লেখকের পার্থক্য। রাশেদের প্রশ্নের জবাবে মৃদুল বললো-
‘সে আর আমাদের লেখালেখি! গল্প লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ওসব কথা থাক, আমি যে কাজে এসেছি, সেটা আগে শেষ করে নিই। রাশেদ, তোমার ফুপার ব্যাগটি ফেরত দিতে চাই।’
রাশেদ বললো-
‘তিথিকে ব্যাগটি দাও। এটি ওর বাবার।’
মৃদুল ব্যাগটি তিথির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো-
‘এ ব্যাগটি কাল রাতে আপনার বাবা আমার গাড়িতে ফেলে গিয়েছিলেন। আমি এটি ফেরত দিতে এসেছি।’
তিথি যেনো সম্মোহনের মধ্যে রয়েছে। বিস্ময়ের রেশে ও সোফা থেকে উঠে মৃদুলের কাছ থেকে ব্যাগটি নিয়ে বললো-
‘এ ব্যাগটিতে অনেক জরুরি কাগজ রয়েছে। ব্যাগটি হারিয়ে আমার বাবা মূষড়ে পড়েছেন। আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ জানাবো, বুঝতে পারছি না।’
মৃদুল বললো-
‘আপনি একদিন গান শুনিয়ে দিলেই হবে।’
এ কথায় তিথি মৃদুলের দিকে আরেকবার তাকালো। ওর শেণ্য দৃষ্টি যেনো মৃদুলের ভেতরটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলো। রাশেদ বললো-
‘বড্ড সহজ কিছু দাবি করলে, মৃদুল।’
শারমিন আপত্তি জানালো। বললো-
‘তিথির গান শোনা অতো সহজ হবে কেনো?’
মৃদুল বললো-
‘ভাবী, সহজ বা কঠিন যাই হোক, গান শোনার কৌতূহল কিন্তু আমার বাড়ছে।’
তিথি এবার মুখ টিপে হাসলো।
‘আপনারা কথা বলুন, আমি ব্যাগটি বাবাকে দিতে যাচ্ছি।’
এ কথা বলে তিথি চলে গেলো। শারমিন মৃদুলের উদ্দেশে বললো-
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি কী করে ব্যাগটি পেলেন!’
রাশেদ বললো-
‘মৃদুল, বিশেষ শখ করে ইয়েলো ক্যাব চালাচ্ছে। ফুপা কাল ওর গাড়িতেই এসেছেন। তিনি ব্যাগ ফেলে এসেছিলেন ওর গাড়িতে। ও আজ সেই ব্যাগ ফেরত দিতে এসেছে। আর দেখা হয়ে গেলো আমার সাথে, ব্যাস!’
‘আপনি ক্যাব চালাচ্ছেন!’
‘হ্যাঁ।’
‘কেনো?’
‘ধরে নিন শখ করে।’
শারমিন হাসলো। বললো-
‘আপনি অদ্ভুত মানুষ তো!’
‘আমি কিন্তু অদ্ভুত হতে চাই না। খুব সাধারণ হতে চাই। সাধারণ লোক যা করে, আমি তা-ই করছি। কিন্তু পরিচিতজনরা তা মেনে নিতে পারছেন না।’
মৃদুল আত্মপক্ষের সমর্থন করলো। শারমিন এ নিয়ে তর্ক করলো না। ও সোফা থেকে ধীরে ধীরে উঠলো। বললো-
‘আপনারা দুই বন্ধু গল্প করুন। আমি কিছু খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, আপনি কিন্তু দুপুরে খেয়ে যাবেন।’
‘দেখুন, অন্য একদিন…!’
মৃদুলের আকুতি থামিয়ে রাশেদ বললো-
‘অন্য একদিন এলেই কি আমাকে পাবে, বন্ধু? আজ বাড়িতে আছি। ছুটির দিনেও আমি বাড়িতে থাকি না। এসেই যখন পড়েছো, চলো দুই বন্ধু মিলে আজ চুটিয়ে আড্ডা মারি।’
মৃদুল বললো-
‘রাশেদ, আমার সত্যিই কাজ আছে।’
‘রাখো তোমার কাজ। আজ তোমার দিন নয়, আজকের দিনটি আমার। আমি যা বলবো, তা-ই হবে।’
এতোদিন পরও কলেজ জীবনের এক বন্ধুকে পেয়ে রাশেদের উচ্ছ্বাস দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় মৃদুল। মৃদুলও ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার মনের জোর পায় না। তিথিকে দেখে ও কেমন আবেশিত হয়ে গেছে। ওর বুকের ভেতরে কোথাও একটা ভাঙন হচ্ছে। তিথিকে দেখে ও মুগ্ধ কেনো? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে ও। প্রথম পরিচয়ের দিন তিথির কথা ওর ভালো লেগেছিল ঠিক; কিন্তু কোনো ছায়া পড়েনি মনের ক্যানভাসে। এখন মনের ক্যানভাসে রং ছড়িয়ে যাচ্ছে। কেনো এমন হচ্ছে, কে জানে!
সাত.
অপুকে দেখে অবাক হলো তিথি। ছায়ানটে গানের ক্লাস শেষ হবার পর স্কুল থেকে বের হবার পথে ও অপুকে দেখতে পেলো। অপু তিথির জন্য অপেক্ষা করছিল। তিথিকে দেখে এগিয়ে এলো অপু। ওকে কেমন বিষণ্ন দেখাচ্ছে। তিথি অপুর উদ্দেশে বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘আপনি! এখানে!’
‘আপনার কাছে এসেছি।’
অপু তাড়াতাড়ি জবাব দিলো।
‘আমার কাছে? কেনো?’
‘আপনি কি জানেন, সুমি কোথায় গেছে?’
অপু উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ প্রশ্নে তিথির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। পাল্টা প্রশ্ন করে ও বলে-
‘সুমি কোথায় গেছে? কী হয়েছে বলুন তো!’
‘না, ঠিক আমিও বুঝতে পারছি না। গত তিন দিন যাবত সুমি ইউনিভার্সিটিতে আসছে না। ওর মোবাইলে ফোন করেও ওকে পাচ্ছি না। ওদের বাসায় ফোন করেছিলাম, স্পষ্ট কোনো উত্তর পাইনি।’
‘এসব কী বলছেন!’
‘আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো জানেন, ও কোথায় গিয়েছে।’
‘আমাকে ও কিছু জানায়নি। ও আজ গানের ক্লাসে আসেনি দেখে অবাক হইনি। কারণ, প্রায়ই ও গানের ক্লাসে আসে না। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে।’
‘আমারও তাই ধারণা।’
সম্মতি জানায় অপু। ও তিথিকে বলে-
‘আপনি কি ওদের বাসায় ফোন করে জেনে নিতে পারবেন, ও কোথায় গিয়েছে?’
‘চেষ্টা করে দেখতে পারি। সুমি আমার বান্ধবী ঠিক; কিন্তু আমি কখনো ওদের বাসায় যাইনি। এমন কী, কখনো টেলিফোনে ওর বাবা-মার সাথে আমার কথা হয়নি। শুনেছি, ওর বাবা যেমন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তেমনি ওর মা-ও সামাজিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সুমিই আমাকে এসব কথা বলেছে।’
‘আমিও এসব জানি। কিন্তু সুমি হঠাৎ কেনো নিখোঁজ হয়ে যাবে, বুঝতে পারছি না।’
অপুর চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা ফুটে ওঠে। তিথি বলে-
‘আমি আজ ওদের বাসায় ফোন করবো। চেষ্টা করবো ওর বাবা বা মায়ের সাথে কথা বলতে।’
‘আমি এ অনুরোধ নিয়েই আপনার কাছে এসেছি। সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি ছায়ানটের সামনে।’
‘আমি আপনাকে দেখে অবাক হয়েছি। আপনি কখনো এখানে আসেননি তো, তাই।’
অপু উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বললো-
‘আপনি তো জানেন, সুমির বাবা এ দেশের একজন বড় শিল্পপতি। তার অনেক ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি। আমি চাই না, আমার সাথে সুমির হৃদয়ঘটিত সম্পর্কটা ফাঁস হয়ে পড়ুক। তাই…’
‘আমি বুঝতে পেরেছি। আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না।’
‘আপনি কি সুমির খবর সংগ্রহ করে আমাকে ফোন করে জানাবেন?’
‘অবশ্যই। তবে যদি কোনো খবর সংগ্রহ করতে না পারি?’
‘আপনি ব্যর্থ হলে আমাকে বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমি আর আপনার সময় নষ্ট করতে চাই না। এখন যাই, কেমন?’
‘আচ্ছা, আসুন।’
তিথির জবাব।
‘আপনার ফোনের অপেক্ষায় রইলাম।’
এ কথা বলে অনেকটা উদ্ভ্রান্তেÍর মতো অপু চলে গেলো। পেছনে তিথি ছোট্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এরপর অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে লাগলো ও। ছায়ানট থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফাঁকা রাস্তার ফুটপাতে হাঁটতে ভালো লাগে ওর। ও মাঝেমাঝে হাঁটে। কিছুক্ষণ হেঁটে ও রিকশা নেয়। আজও তিথি ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগলো। চৈত্রের খরখরে দুপুর তেতে আছে। মাঝেমাঝে দমকা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে। কয়েক পা এগুতেই একটি ইয়েলো ক্যাব তিথির সামনে এসে জোরে ব্রেক কষলো। একটু চমকে উঠলো ও। আরো চমকে উঠলো গাড়িতে মৃদুলকে দেখে। ও থমকে দাঁড়ালো।
‘অন্যমনস্ক হয়ে পায়ে হেঁটে কোথায় যাচ্ছেন?’
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে প্রশ্ন করলো মৃদুল। তিথি বিরক্ত হলো এমন ব্যক্তিগত প্রশ্নে। ও বললো-
‘আমি কোথায় যাচ্ছি, তা জেনে আপনার কী হবে?’
‘আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারি।’
‘আপনার ব্যবসা কি আজ মন্দা?’
‘ব্যবসায়িক কারণে এ প্রস্তাব দেইনি।’
‘তাহলে কি বন্ধুর বোনকে একা দেখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাইছেন?’
‘ঠিক, তা-ও নয়।’
‘তাহলে?’
‘এক ধরনের মানসিক দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আপনাকে লিফট দিতে চাই।’
মৃৃদুল অকপটে এ কথা বললো। তিথি চোখ কপালে তুলে বললো-
‘আরেকজনের মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে নিজের মানসিক দায় পূরণ করাটা ভদ্রতার কোন অভিধানে আছে?’
প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিল না মৃদুল। ও কেমন হচকিয়ে গেলো। কোথাও একটা চাবুকের সপাং আঘাত লাগলো। ও গলা নামিয়ে বললো-
‘না, মানে, আপনাকে দেখে ইচ্ছে হলো আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।’
‘আপনি চাইলেই আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করবো কেনো?’
মৃদুল বুঝতে পারলো তিথি ওর এ প্রস্তাব পছন্দ করেনি। তিথি ওকে আঘাত করছে। মৃদুলের ভেতরে রাগ উসকে উঠলো। মুখে তা প্রকাশ করলো না। রাগ চেপে ও বললো-
‘আপনাকে তো আমি জোর করিনি আমার ইচ্ছা পূরণ করতে। আপনার ইচ্ছে হলে গাড়িতে উঠবেন, ইচ্ছে না হলে উঠবেন না। আপনি গাড়িতে না উঠলে আমি হতাশও হবো না, অপমানিত বোধও করবো না। আমি কোনো স্বপ্নের বিলাসিতায় বিভোর হয়ে এ প্রস্তাব দিই নি।’
মৃদুলের এ কথায় তিথি খানিকটা বিব্রত হলো। ও এর জবাবে কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। মৃদুল ফের বললো-
‘আপনাকে পথের মাঝে থামিয়ে বিব্রত করার জন্য আমি দুঃখিত। আসি।’
মৃদুলের কণ্ঠে রাগের উত্তাপ। ও গাড়ি স্টার্ট দিতেই তিথি ককিয়ে ওঠে-
‘শুনুন!’
‘বলুন।’
‘আমি উঠছি আপনার গাড়িতে।’
এ কথা বলেই তিথি গাড়ির দরজা খুলে সামনের সিটে গিয়ে বসলো। এতে অবাক হলো মৃদুল। ও বললো-
‘আপনি পেছনের সিটেও বসতে পারেন।’
‘আপনার গাড়িতে উঠছিই যখন তখন সামনে বা পেছনের হিসাব করে লাভ নেই। আপনি আমাকে বাসায় পৌঁছে দিন।’
মৃদুলের গাড়ি চলতে শুরু করলো। মৃদুল কোনো কথা না বলে গাড়ি চালাতে লাগলো। একটু পর তিথি নরোম গলায় বললো-
‘আপনি কি রাগ করেছেন?’
‘আমার রাগ বা অনুরাগ, কোনোটাই আপনার জন্য বিব্রতকর নয়।’
‘আপনি একটুতেই রেগে যান দেখছি! আমি কিন্তু আপনার গাড়িতে উঠেছি।’
এ কথা বলে তিথি হাসার চেষ্টা করলো। মৃদুল এর কোনো জবাব দিলো না। তিথি গুমোট পরিবেশকে হালকা করার জন্য বললো-
‘একটা প্রশ্ন করলে সঠিক জবাব দেবেন?’
‘প্রশ্নটা কি, বলুন।’
‘আপনি ছায়ানটের আশেপাশের রাস্তায় আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তাই না?’
‘কী করে বুঝলেন?’
‘মেয়েদের একটি বিশেষ ইন্দ্রীয় শক্তি আছে। মেয়েরা অনেক কিছু বুঝে ফেলতে পারে। এবার বলুন তো, কী উদ্দেশে আপনি আমার পিছু নিয়েছেন?’
‘বিশেষ ইন্দ্রিয় শক্তিতে কি উদ্দেশের কথা জানা যায় না?’
‘উদ্দেশের কথাটি আপনার কাছ থেকেই জানতে চাচ্ছি।’
‘জেনে আপনার লাভ?’
‘আমার লাভ-লোকসান যা-ই হোক, এতে আপনার কোনো লাভ হবে না- এ কথা বলতে পারি।’
তিথির কথায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মৃদুল। বললো-
‘আপনার খুব অহংকার, না?’
‘আমার অহংকার কোথায় দেখলেন, আপনি?’
তিথির কণ্ঠে বিস্ময়। মৃদুল বললো-
‘সেদিন ঘটনাক্রমে আপনাদের বাড়িতে গেলাম। রাশেদ আমাকে সারাটাদিন আটকে রাখলো। দিনভর গল্প করলাম। আপনাকে দেখলাম এক ঝলক মাত্র। খাবার টেবিল থেকে বিকেলের চা-পর্ব পর্যন্ত আপনি আমার সামনে আসেননি। আপনি যে কৌশল করে আমাকে এড়িয়ে গেছেন, তা আমি বুঝতে পেরেছি।’
‘এর মধ্যে আমার অহংকার কোথায় দেখলেন?’
‘এটা অহংকার নয়তো কি? উপেক্ষা?’
‘এর উত্তরটা আজ আমি দিতে চাচ্ছি না। শুধু এটুকু বলবো, সেদিন আপনার দৃষ্টির সামনে আমি বিব্রত হয়ে পড়ছিলাম।’
‘তাই নাকি!’
এক মুহূর্তে রাগ উবে গেলো মৃদুলের। ও হো হো করে হাসতে লাগলো। তিথি লক্ষ্য করলো মৃদুল প্রাণ খুলে হাসতে পারে। এ ধরনের মানুষ জটিল হয় না। এ কথা মনে হতে তিথি নিজেও আপন মনে হেসে উঠলো। গাড়ি চলছে ধীরগতিতে। মৃদুলের মন হঠাৎ যেনো হেমন্তের আকাশ হয়ে গেছে। অভিমানের মেঘ উধাও। তিথির জড়তা কমে এসেছে। ও মৃদুলের উদ্দেশে বললো-
‘শুনলাম, আপনি পড়াশোনা শিখে উদ্ভট শখে ইয়েলো ক্যাব চালাচ্ছেন?’
‘উদ্ভট শখে নয়, অভিজ্ঞতা অর্জনের বিচিত্র শখে তা করছি। গল্প লেখার জন্য আমি নানা রকম অভিজ্ঞতা অর্জন করছি।’
‘অভিজ্ঞতা অর্জন না, ছাই! আসলে ওসব আপনার পাগলামি। যে লিখতে পারে, সে এমনিতেই লিখতে পারে। তাকে ঘাটে ঘাটে ঘুরতে হবে- এমন কথা কখনো শুনিনি!’
‘তাই না-কি?’
‘হ্যাঁ। অবশ্য গল্প-উপন্যাসে কিংবা সিনেমায় এ ধরনের চরিত্র দেখা যায়।’
‘আরো কিছু বলবেন?’
‘যদি রাগ না করেন, তবে বলতে পারি।’
‘বলুন, প্লিজ!’
‘আপনি যা করছেন, তাকে বলে বাউণ্ডুলেপনা। আরো সহজ করে বললে, ভবঘুরের কাজ। যা করছেন, তা কিন্তু এক ধরনের হিপোক্রেসি!’
‘কার সাথে হিপোক্রেসি করছি?’
‘নিজের সাথেই করছেন। এ ছাড়া পরিবারের সাথে, সমাজের সাথে কখনো বা রাষ্ট্রের সাথেও করছেন।’
‘যেমন!’
‘যেমন, আপনি নিজেকে যোগ্য করার কোনো চেষ্টা করছেন না। আপনি আপনার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করছেন না। সমাজের প্রতি আপনার যেনো কোনো কমিটমেন্ট নেই। এমন কী, নাগরিক হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর কোনো কাজ করছেন না। অথচ আপনি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। সুশিক্ষিত হতে আপনার জন্য সরকারের যে ব্যয় হয়েছে, এর কোনো প্রতিদান দিচ্ছেন না। আপনি কি কখনো ওসব ভেবে দেখেছেন?’
তিথির কথাগুলো ভাবতে লাগলো মৃদুল। এমন কথা কেউ ওকে কখনো বলেনি। ওর কথাগুলোকে অর্থহীন মনে হলো না। ও বললো-
‘আপনার কথা শুনতে ভালো লাগছে। আরেকটু বলুন।’
মৃদুলের সম্মতি পেয়ে তিথি ফের বললো-
‘আপনি এক ধরনের আবেগ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন যে, গল্প লেখার জন্য আপনি ঘুরছেন। দায়িত্ব পালন না করে গল্প লেখার অজুহাতে যা করছেন, তা নিজের জীবনের সাথেই প্রহসন। হয়তো আপনার মনে হচ্ছে, জ্ঞান লাভ করছেন। কিন্তু একসময় দেখবেন, আসলে আপনার হাতে কিছুই নেই। আপনার জীবন এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতায় ঝুলে আছে। সেদিন আপনাকে শুধু অনুশোচনাই করতে হবে।’
‘থামলেন কেনো? আরো কিছু বলুন।’
‘আজ আপনি তারুণ্যের জোয়ারে ভেসে বেড়াচ্ছেন। হয়তো অকুণ্ঠ বাহাবা পাচ্ছেন। কিন্তু কাল হয়ে যেতে পারেন এক উচ্ছিন্ন নাগরিক। লেখক হয়তো হতে পারবেন, কিন্তু পরিপূর্ণ মানুষ বলতে যা বোঝায়, তা হতে পারবেন কিনা আমার সন্দেহ রয়েছে।’
তিথি দম নেবার ভঙ্গিতে থামলো। ও যথেষ্ট বলেছে। আর কিছু বলতে চায় না। মৃদুল এর কোনো প্রত্যুত্তর দিলো না। ও মিটিমিটি হাসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর তিথি জানতে চাইলো-
‘আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন, না?’
‘না, রাগ করিনি। বরং আমার ভীষণ ভালো লাগছে। আপনার প্রতি আমার আকর্ষণ আরো বেড়ে গেলো।’
‘আশ্চার্য! কেনো?’
‘আমাকে নিয়ে এতো অল্প সময়ে এতোকিছু ভেবেছেন বলে। আনন্দিতও হয়েছি। আমাকে নিয়ে এর আগে এভাবে কেউ ভাবেনি কিংবা এমন কথা বলেনি। আমি আপনার সমালোচনায় মুগ্ধ। হা-হা-হা।’
মৃদুলের প্রাণ খোলা অট্টহাসির সামনে তিথিও কেমন মুগ্ধ হয়ে যায়। মৃদুলের ইয়েলো ক্যাবটি বাতাস কেটে কেটে ছুটে চলছে ধানমন্ডির দিকে। মৃদুলের মনও অকারণে ছুটছে তিথির দিকে। মনের এ ছুটে চলা ও বুঝতে পারছে। কিন্তু তিথিকে তা বুঝতে দিতে পারছে না।
আট.
দেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে মৃদুলের যথেষ্ট আক্ষেপ আছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড এবং নেতাদের কার্যকলাপের প্রতি ওর কোনো আস্থা নেই। নেতা বা নেত্রীরা মঞ্চে যা বলেন, বাস্তবে তা করেন বলে মনে হয় না। তাদের দেশপ্রেমের প্রকাশকে মায়াকান্না বলে মনে হয় ওর। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা। মৃদুলও হতাশ। তবে শাহেদের প্রতি ওর দুর্বলতা আছে। শাহেদ ওর বন্ধু। ও রাজনীতি করে। সর্বক্ষণই ও ব্যস্ত রাজনীতি নিয়ে। রাজনীতি করে ও কী পায়, কে জানে। ফার্স্ট ইয়ার থেকেই শাহেদ রাজনীতিতে জড়িয়ে যায়। ও কেনো তারুণ্যের সময় নষ্ট করছে মৃদুল বুঝতে পারে না। রাজনীতি কি নেশা কিংবা কোনো অ্যাম্বিশন? মাঝে মাঝে প্রশ্নটির জবাব খোঁজে মৃদুল। শাহেদের চরিত্রের একটি বিশেষ দিক মৃদুলের ভালো লাগে। প্রেম কিংবা নারী কোনোটাই যেনো ওর অভিধানে নেই। কখনো কোনো কারণে মেয়েদের দিকে ওকে কেউ তাকিয়ে থাকতে কিংবা মেয়েদের নিয়ে গল্প করতে দেখেনি। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় মৃদুল যখন বন্ধুদের নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্কুলগামী মেয়েদের দেখে এক ধরনের আনন্দ পেতো, শাহেদ তখন মার্কসবাদের মোটা বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা এক মানুষ। যে বয়সে তারুণ্যে উচ্ছ্বল যুবকরা ভালো লাগার মুগ্ধ চোখ দিয়ে জগতটাকে দেখে, সে বয়সে শাহেদ ছিল কমরেড হবার এক অসম্ভব স্বপ্নে বিভোর। ও এখনো স্বপ্ন দেখে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্র-ব্যবস্থার। সুযোগ পেলেই ও বুর্জোয়া ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ভাষণ দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর ওর স্বপ্নের রং ফিকে হয়ে আসার কথা; কিন্তু তা হয়নি। ও মনে করে কমিউনিজমের আদর্শ বেঁচে থাকবে। একদিন না একদিন বিপ্লবের লাল পতাকা উড়বেই। ওর জন্য মৃদুলের মায়া হয়। দেশের সাধারণ লোক কমিউনিজম নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা গণতন্ত্র কী, তা নিয়েও খুব একটা ভাবে না। অথচ শাহেদের মতো কিছু লোক অসম্ভব এক স্বপ্নে নিজেকে কেমন বিলিয়ে দিচ্ছে। মৃদুল একদিন ঠাট্টা করে শাহেদকে জিজ্ঞেস করেছিল-
‘বিপ্লবের রং যদি লাল হয়, তবে রাজনীতির রং কি?’
এর জবাবে ও বলছিল-
‘বেদনার রং যদি নীল হয়, তবে অভিমানের রং কি?’
প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন। এ নিয়ে দু’বন্ধু খুব হেসেছিল। সমাজতন্ত্রের রাজনীতি বা আদর্শ নিয়ে দু’জনের মধ্যে আলোচনা হয়েছে মাঝে মাঝে; কিন্তু বিতর্ক হয়নি।
আজ অনেকদিন পর শাহেদ এলো। মধ্যরাতে মৃদুলের দরজায় কড়া নাড়লো ও। ও সবসময় মধ্যরাতেই আসে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যখন উত্তাল হয়ে যায়, তখন শাহেদকে প্রায়ই গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়। কখনো হুলিয়া মাথায়, কখনো অযাচিত গ্রেফতার এড়াতে ও আত্মগোপন করে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা নিকট আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ও লুকিয়ে থাকে। মৃদুল শাহেদের দরজায় করাঘাতের শব্দ চেনে। শব্দ সংকেত শুনে ও দরজা খুলে দিলো। শাহেদ মৃদুলের রুমে প্রবেশ করে বললো-
‘আমি কিছু খাবো না। খেয়ে এসেছি।’
‘এবার তুই অনেকদিন পর এলি! দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো বলতে হবে।’
‘ভালো না ছাই! দুই মহিলার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় কুলষিত হয়ে পড়ছে রাজনীতি। তাদের ছেলেরাও কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন মাঠে। নামেই গণতন্ত্র! প্রকারান্তরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে। শালা, বুর্জোয়ারা দেশটাকে কেক বানিয়ে খাচ্ছে!’
‘হয়েছে, হয়েছে। মধ্যরাতে খেপে উঠিস না। তোর ভাষণ শোনার এখানে কেউ নেই।’
মৃদুল ধমকে ওঠে। শাহেদ বলে-
‘তোরা যে কী! সবকিছু দেখেও মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিস। যাক ওসব। তা, তোর খবর কী? লেখালেখি কেমন চলছে?’
‘বেশ কিছুদিন হয় লেখালেখি করছি না।’
‘গল্প লেখা বাদ দিয়ে তুই নাটক লেখা শুরু কর। দেশে এখন স্যাটালাইট টিভি চ্যানেলের দমকা বাতাস বইছে। এ হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দে। অর্থ ও নাম দুটোই খুব সহজে ধরা দেবে।’
‘তুই, মনে হচ্ছে আজকাল টিভি দেখিস?’
‘না দেখার উপায় আছে রে? তুই না চাইলেও বুর্জোয়ারা তোকে ওদের সব খাওয়াবে। মানুষের চোখে রঙিন কাচ লাগিয়ে ওরা ওদের স্বার্থ হাসিল করছে। সবাইকে নেশাগ্রস্ত করে রাখাটা ওদের অন্যতম কৌশল।’
‘আহ্! সব কিছুতে রাজনীতি খুঁজিস কেনো, বলতো?’
‘বাপধন, ভাত খাওয়া থেকে শুরু করে চাঁদে যাওয়া পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতি পদক্ষেপেই রাজনীতি জড়িয়ে আছে। রাজনীতিতে তোর অরুচি থাকলেই তা থেমে যাবে না।’
‘আচ্ছা বন্ধু, তোর কথাই ঠিক। এবার বল, কদিন থাকবি? হুলিয়া মাথায় নিয়ে এসেছিস, নাকি…?
মৃদুলের কথা শেষ না হতেই শাহেদ বললো-
‘আজ আমি গা-ঢাকা দেবার জন্য তোর বাসায় আসিনি।’
‘তাই না-কি, আশ্চর্য!’
‘হুম, তোর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে। বলতে পারিস পরামর্শ নিতে এসেছি।’
‘বলিস কি! তাই বলে ফেল।’
‘বলছি। তার আগে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিই। তুই তো আবার সিগারেট খাস না। লেখক হতে চাস, অথচ সিগারেট খাস না। ব্যাপারটা কেমন পানসে পানসে লাগে। হা-হা-হা।’
শাহেদ একটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ মৃদুল সহ্য করতে পারে না। কিন্তু শাহেদ এলে ওকে এ অত্যাচার সহ্য করতে হয়। মানুষ কেনো সিগারেট খায় ও বুঝতে পারে না। শাহেদ সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে ফোঁস করে ধোঁয়া ছাড়লো। এরপর মৃদুলের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললো-
‘মৃদুল, আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। এ ধরনের সমস্যা কখনো মোকাবেলা করিনি বলে তোর কাছে এসেছি।’
‘অতো ভনিতা করছিস কেনো? সমস্যাটা কি, বলে ফেল।’
মৃদুল তাগিদ দেয়। শাহেদ বলে-
‘তুই তো জানিস, আমি আগে বেশ কজন ছাত্রছাত্রী পড়িয়েছি।’
‘হুম। সে তো তিন-চার বছর আগে। কিন্তু কাকে পড়িয়েছিস, তা কখনো বলিসনি।’
‘হ্যাঁ, তা ঠিক। টিউশনি করার বিষয়টি আমি গোপন রাখতে পছন্দ করতাম।’
‘এতোদিন পর ছাত্রছাত্রী নিয়ে কী হলো?’
‘প্রায় তিন বছর আগে আমি একটি মেয়েকে মাত্র তিন মাস পড়িয়েছিলাম। ওই ছাত্রীটির কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। গত কয়েকদিন আগে ছাত্রীটি আমার কাছে এসে হাজির হলো।’
এ পর্যন্ত বলে শাহেদ থামলো। মৃদুল বললো-
‘থামলি কেনো? বল।’
‘ও আমার সামনে এসে খুব কান্নাকাটি করলো। এতে আমি খুব বিব্রত হয়ে পড়লাম।’
‘কেনো তোর কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করলো?’
‘ওর জীবনে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওই সমস্যা থেকে ও বের হবার পথ খুঁজছে।’
‘পথটা কি তোকে ধরেই ও খুঁজতে চায়?’
‘সে রকমই বলছে।’
‘কিন্তু কেনো? শিক্ষক হিসেবে এটা তোর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।’
‘এটা আমিও ওকে বলেছি।’
‘ও কি বলেছে?’
‘ও বলছে, শিক্ষক হিসেবে ও আমার কাছে আসেনি। ও নাকি আমাকে পছন্দ করতো। গোপনে ভালোও বাসতো।’
কথা শুনে হো হো করে হেসে ফেললো মৃদুল। শাহেদ জানে এ কথা শুনে মৃদুল হাসবে। ওর পরিচিত যে কেউ হাসবে। মৃদুলের হাসিকে উপেক্ষা করে শাহেদ বললো-
‘মেয়েটি বলেছে, ও আমাকে ভালোবাসতো। আমি ভালোবাসতাম এ কথা বলিনি।’
‘তা তো বুঝেছি।’
‘তাহলে হাসছিস কেনো?’
‘আচ্ছা বাবা, বল। আর হাসবো না।’
‘মেয়েটি এখন আমাকে ওর পাশে চায়।’
‘মেয়েটির সমস্যা কী, সেটাই তো বললি না।’
‘ওর বিয়ে হয়েছিল। ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন…।’
‘তোকে বলছে বিয়ে করতে?’
‘হ্যাঁ, আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি। সে প্রতিদিনই আমাদের বাসায় আসছে। ভীষণ একটা উপদ্রবের মধ্যে আছি। ও আমার সামনে এসে কান্নাকাটি করছে। তুই তো জানিস, মেয়েদের আমি এড়িয়ে চলতে পারি; কিন্তু ট্যাকেল করতে পারি না।’
বিন্দুর কথা মনে পড়ে গেলো মৃদুলের। বিন্দুও এসেছিল মৃদুলের কাছে একই রকম দাবি নিয়ে। মৃদুল ফিরিয়ে দিয়েছে। শাহেদ হয়তো সরাসরি মেয়েটিকে কিছু বলতে পারছে না। ও বজ্রকণ্ঠে ভাষণ দিতে পারলেও মেয়েদের সামনে কুকড়ে যায়। মৃদুল বললো-
‘তোর কি ওই ছাত্রীর প্রতি কোনো অনুরাগ আছে?’
‘ছি! কি বলছিস!’
‘তাহলে ওকে সরাসরি বলে দে, তুমি আর আমার কাছে এসো না।’
‘সেটাও তো বলেছি। কিন্তু তারপরও ও আসছে। এই যে আজ তোর বাসায় থাকলাম। সকালে ঠিকই ও আমাদের বাড়ি যাবে।’
‘এতোদিন তুই পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিস। এখন ওই মেয়ের ভয়ে গা-ঢাকা দিতে হচ্ছে! হা-হা-হা।’
‘তুই হাসছিস?’
‘হাসবো না তো, কী?’
‘নাহ্! বুঝেছি, সত্যিই আমাকে বেশ কিছুদিনের জন্য গা-ঢাকা দিতে হবে।’
শাহেদ হতাশা প্রকাশ করলো। মৃদুল বললো-
‘তোর ছাত্রীর নাম কি? কে সে?’
‘ওর নাম বিন্দু।’
প্রচণ্ড ধাক্কা এসে লাগলো মৃদুলের ভেতর। ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেলো যেনো অনুভবে। ও কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারলো না। বিন্দু শাহেদের ছাত্রী ছিল অথচ মৃদুল আজ এতোদিন পর এ কথাটি জানলো। মৃদুল কেমন বোকা মনে গেছে। মৃদুল ভাবতে লাগলো, বিন্দু শাহেদকে বেছে নিলো কেনো? এটা কি শাহেদের প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা থেকে ওর কাছে যাচ্ছে? যেমন এসেছিল মৃদুলের কাছেও। অবলম্বনের প্রয়োজনে শাহেদকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে কি বিন্দু? নাকি মৃদুলের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে শাহেদকে বেছে নিয়েছে ও শিকার হিসেবে? এটা কী বিন্দুর রহস্য করার প্রহসন না-কি প্রতিশোধের খেলা? যদি প্রতিশোধই হয়, তবে কার প্রতি এ প্রতিশোধ? কেনো? প্রশ্নগুলো পেখম ছড়িয়ে গেলো মনে। শাহেদ বললো- ‘কীরে, তুই কিছু বলছিস না যে!’
‘কি বলবো? চল আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে কথা হবে।’
মৃদুলের কণ্ঠে কেমন জড়তা।
‘ঠিক আছে।’
সম্মতি জানায় শাহেদ। ওরা ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে বাতি নিবিয়ে খাটে শুয়ে পড়লো। দুজনে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। অনেক রাত পর্যন্ত ওদের ঘুম এলো না। ওরা ঘুমানোর ভান করে শুয়ে রইলো খাটে। রাতের অন্ধকারের মতো ওদের চিন্তায় ভিন্ন ভিন্নভাবে উঠে এলো বিন্দুর নাম।
নয়.
তিথি পরেছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। মেরুন পাড়ের হালকা সবুজ রঙের শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। কোনো প্রসাধন নেই। সাধারণ পরিপাটি সাজসজ্জার ছাপ। চোখে-মুখে স্নিগ্ধ লাবণ্যের দুত্যি। মৃদুল তিথির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। এতোটা মুগ্ধ কেনো হচ্ছে, ও জানে না। বিভিন্ন সময়ে ও অপরূপ সুন্দরী মেয়ে দেখেছে, কখনো এমন মুগ্ধ হয়নি। কিন্তু তিথির সামনে ও আজ বিহ্বল হয়ে যাচ্ছে। তিথি কী এসব বুঝতে পারছে? প্রশ্নটা মনের ভেতর খুঁচিয়ে ওঠে। তিথিকে নিয়ে মৃদুল একটা ভাবনার ছবি আঁকতে থাকে। কিছু মেয়ে আছে, যারা কোনো প্রলোভন, মোহ বা ভালো লাগার ফাঁদে পড়ে না। নিজেদের পছন্দের বিষয় নিয়েও মাথা ঘামায় না। কারো প্রতি ভালো লাগা তৈরি হলেও তা অনুচ্চারিত বেদনা হয়েই পড়ে থাকে মনের অন্তপুরে। ‘ভালোবাসা’ তাদের কাছে আক্ষরিক শব্দ মাত্র। ওরা সোজা পথে চলে। সোজাসাপটা কথা বলে। ওদের নিয়ে কারো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলেও ওরা সব আবেগকে নির্মোহভাবে পদদলিত করে চলে যায়। আপাতদৃষ্টিতে ওদের নিষ্ঠুর মনে হলেও আসলে ওরা নিজের মধ্যে ঝরনাধারার মতো চঞ্চল। ওদের মন সমুদ্রের মতো বিশাল। ওরা কাউকে ভালোবাসলে সর্বান্তকরণে ভালেবাসে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে যে কোনো ঘটনার মুখোমুখি থাকে পাহাড়ের মতো অনড় ও অবিচল। তিথি এ ধরনের একটি মেয়ে। তিথিকে নিয়ে মৃদুল এক মুহূর্তের ভাবনায় এ ধরনের ছবি আঁকলো। তিথি মৃদুলের ভাবুলতা দেখে অবাক দৃষ্টিতে বললো-
‘আপনি আজ এমন নির্বাক হয়ে কী দেখছেন?’
তিথির কথায় সম্বিৎ ফিরে আসে মৃদুলের। ও মনের কথা গোপন রেখে মুখে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বললো-
‘হঠাৎ আমাকে জরুরি তলব কেনো করেছেন, তাই ভাবছি।’
তিথির সাথে মৃদুলের আবার দেখা হবে, এমন ভাবেনি ও। আশাও করেনি। মৃদুল নিজেকে সংযত করে নিয়েছে। ছুটন্ত ঘোড়ার লাগাম টানার মতো মনকে টেনে রাখছে ও। হঠাৎ কাল রাতে তিথিই ওকে ফোন করলো। তিথির ফোন পেয়ে প্রথমে বিস্ময়ে থ হয়ে যায় মৃদুল। ফোনের রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই ও-প্রান্ত থেকে তিথি বললো-
‘কাল আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আপনাকে আমার খুবই জরুরি প্রয়োজন। দেখা করতে পারবেন?’
এ প্রশ্নের সামনে মৃদুল না করতে পারে? ওর ভেতরে কোথাও যেনো একটা সুরের লহরী বেজে ওঠে। ওই সুরে ডানা ঝাপটায় মন। ও বলে-
‘কোথায় দেখা করতে চান?’
‘শাহবাগে, সিলভিয়া রেস্টুরেন্টে। দুপুর দুটায়।’
‘আমি ঠিক দুটায় সিলভিয়া রেস্টুরেন্টের দোতলায় থাকবো।’
‘ধন্যবাদ। আমি খুবই খুশি হলাম, আমার অনুরোধে সাড়া দেবার জন্য। তাহলে ফোন রাখি?’
‘আচ্ছা, রাখুন।’
তিথি ফোন রেখে দেবার পর মৃদুল একরাশ প্রশ্ন এবং অর্থহীন ভালোলাগার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল।
আজ দুপুর পৌনে দুটায় মৃদুল চলে এলো সিলভিয়া রেস্টুরেন্টে। তিথি এলো দুটোয়। আবার দেখা হলো তিথির সাথে। ওরা এখন মুখোমুখি। সিলভিয়া রেস্টুরেন্টের দোতলায় স্ট্যান্ডফ্যান ঘুরে ঘুরে বাতাস ছড়াচ্ছে। থেমে থেমে বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে তিথির চুলে। বাতাস কিছুক্ষণ পরপর তিথির মাথার সামনের কিছু চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। তিথি তা ঠিক করে নিচ্ছে। বাতাসের লুটোপুটি এবং তিথির চুল সামলানোর দৃশ্য মৃদুল উপভোগ করছে। ‘এ দৃশ্যটি যে কোনো একটি প্রিয় কবিতার প্রিয় লাইনের মতো উজ্জ্বল ও নান্দনিক’- মনে মনে বললো মৃদুল।
তিথি বললো-
‘আপনাকে আজ সত্যিই অন্যরকম লাগছে। কেমন গম্ভীর হয়ে আছেন!’
মৃদুল গম্ভীর কণ্ঠে বললো-
‘আমার উচ্ছ্বাস বা চপলতা আপনার ভালো লাগে বলে তো মনে হয় না।’
মৃদুলের কথায় তিথি হেসে ফেললো। বললো-
‘আপনি কি এখনো আমার ওপর রেগে আছেন?’
‘রাগ করবার মতো কিছু ঘটেছে কি? রাগ করলে তো আমি আসতাম না।’
মৃদুল নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। তিথি ছাড়ে না। বললো-
‘এক কথাতেই মেয়েদের চোখ ফাঁকি দিতে চান? আপনার দেখছি, মেয়েদের সম্পর্কে ধারণা কম।’
‘আপনি কি আমাকে মেয়েদের সম্পর্কে ধারণা দিতে ডেকেছেন?’
এ কথায় তিথি যেনো লজ্জা পেলো। ও বললো-
‘সরি, আপনাকে কেনো ডেকেছি, তা-ই বলা হয়নি। আসলে আপনাকে কিছু কথা বলা দরকার। কারণ, এ ঘটনার সাথে আপনিও জড়িত রয়েছেন। তাই…’
‘ভনিতা না করে খুলে বলুন।’
মৃদুল তাগিদ দেয়। তিথি বললো-
‘সুমি এক সপ্তাহ যাবত নিখোঁজ। হঠাৎ করে ও নিখোঁজ হয়ে গেছে।’
‘তাই না-কি! কেনো?’
‘কারণটা আমিও জানি না। এদিকে ওকে খুঁজে না পেয়ে অপু গতকাল ওদের বাড়ি গিয়েছিল। সুমির বাবা ওকে আটক করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছে।’
‘বলেন কী!’
‘হ্যাঁ, একটা বিচ্ছিরি ঘটনায় টেনশনের মধ্যে আছি।’
উদ্বেগ প্রকাশ করলো তিথি। মৃদুল বললো-
‘এতে আপনার এতো টেনশন হচ্ছে কেনো? বান্ধবী নিখোঁজ বলে, নাকি নির্দোষ অপু মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে বলে?’
‘দুটোই। সঙ্গে আরো একটি কারণ আছে।’
‘সেটা কী?’
‘আমরা ওদের গোপন বিয়ের সাক্ষী হয়েছি। বিয়ের ঘটনা ফাঁস হবার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও ফাঁস হয়ে পড়বে!’
মৃদুল বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘ওদের বিয়ের সাক্ষী হয়েছি বলে আমাদের অপরাধ কী!’
‘এ ঘটনা জানাজানি হলে আমি আমার পরিবারের কাছে কি বলবো? এ ধরনের বিয়েকে আমাদের সমাজ মেনে নিতে চায় না। সেখানে ওদের বিয়েতে সাক্ষী হয়ে সহযোগিতা করেছি। তাছাড়া আপানার সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল বলেও পরিবারের সদস্যরা একটা কিছু ভেবে বসতে পারেন। কেমন একটা লজ্জার ব্যাপার বলুন তো!’
তিথির এ কথায় মিটিমিটি হাসতে লাগলো মৃদুল। তিথি কপট রাগ প্রকাশ করে বললো-
‘আপনি হাসছেন!’
‘হাসছি আপনার নানারকম সমস্য দেখে। এখন বলুন, আসলে আপনার উদ্বেগটা কী নিয়ে?’
‘আমি ওদের গোপন বিয়ে এবং এর পরবর্তী ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন।’
‘আমি ওদের বিয়ে নিয়ে উদ্বেগের কিছু দেখছি না। কারণ, এখন হরহামেশা ছেলেমেয়েরা একে অন্যকে পছন্দ করে বিয়ে করছে। বাবা-মায়েরা অনেক সময় আপত্তি করলেও পরে মেনেও নিচ্ছেন। বলতে পারেন, সমাজ বদলে যাচ্ছে।’
‘আপনার তর্ক মেনে নিলেও বলতে হয়, সুমি ও অপুর বিয়ের অ্যাকশনটা সেরকম হবে না। সুমির বাবা-মা এ বিয়ে মেনে নেবেন না। তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। ক্ষমতার জোর খাটিয়ে তারা অনেক কিছু করে ফেলতে পারেন।’
‘এর জন্য আমরা কী করতে পারি?’
‘এ জন্যই তো আপনাকে ডেকেছি। একটা উপায় বের করুন।’
‘আমার ওপর ভরসা করছেন! কেনো?’
জানতে চাইলো মৃদুল। মৃদুলের প্রশ্নময় চোখে দৃষ্টি রেখে তিথি শান্ত গলায় বললো-
‘আপনার ওপর ভরসা করতে চাই। করতে পারি কি?’
এ কথার কোনো জবাব দিলো না মৃদুল। ওর মনে হলো তিথির কথার মধ্যে একটা গভীর অর্থ রয়েছে। ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
‘আমি দেখি, কী করতে পারি। তবে অপুকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়ানো কঠিন হবে। সুমির শিল্পপতি বাবা পুলিশকে টাকা দিয়ে নিশ্চয়ই কিনে ফেলেছেন। তবুও আমি চেষ্টা করবো।’
তিথি চুপ করে রইলো। মৃদুল হাতের ইশরায় রেস্টুরেন্টের বেয়ারাকে কাছে ডাকলো। বললো-
‘আমাদের দুজনের জন্য ভাত-মাছ, সবজি ও ডাল দাও।’
তিথি কিছু খাবে না বলে আপত্তি জানালো। মৃদুল ওর আপত্তি উপেক্ষা করলো। বেয়ারা চলে যেতেই ও বললো-
‘কিছু না খেয়ে এভাবে গল্প করলে রেস্টুরেন্টের মালিক তার দোকান বন্ধ করে দেবেন। তাছাড়া দুপুরবেলা নিশ্চয়ই কিছু খাননি?’
‘আমি বাড়িতে গিয়েই খাবো।’ তিথি কৈফিয়তের সুরে বললো।
মৃদুল বললো-
‘একদিন রেস্টুরেন্টে খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। এ নিয়ে আর কথা বাড়াবেন না। প্লিজ।’
তিথি কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। মৃদুলের সামনে ভাত খেতে হবে বলে ও কেমন সংকোচবোধ করতে লাগলো। মৃদুল যেনো ওর কথাটি বুঝতে পারলো। বললো-
‘ভাত খাওয়াটা জীবনের একটা স্বাভাবিক কাজ। এতে লজ্জা পাবার কিছু নেই। আমিও তো আপনার সামনে ভাত খাবো। পুরুষ হিসেবে আমারও তো লজ্জা থাকতে পারে, তাই না?’
‘হয়েছে, হয়েছে। আজ আপনি অনেক চটে আছেন। কী হয়েছে, বলুন তো? ক্যাব চালাতে গিয়ে কোনো অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন না-কি?’
তিথির এ প্রশ্নে হো হো করে হেসে ফেললো মৃদুল। তিথিও ওর হাসির সাথে মৃদু হাসিতে একাত্ম হলো। রেস্টুরেন্টের অন্যান্য খদ্দেররা ওদের দিকে একঝলক তাকালো। হাসি থামার পর মৃদুল তিথির উদ্দেশে বললো-
‘আমি এখন ট্যাক্সি চালাই না।’
‘তাই না-কি! কেনো?’
‘অন্য কিছু করার কথা ভাবছি।’
‘তা বেশ, কী করার কথা ভাবছেন?’
তিথি কৌতূহলী গলায় জানতে চাইলো। মৃদুল এর কোনো উত্তর দিলো না। তিথি আবার জানতে চাইলো-
‘বললেন না, কী করার কথা ভাবছেন!’
মৃদুল মুখে দুষ্টামির হাসি ছড়িয়ে বললো-
‘এখন প্রেম করার কথা ভাবছি।’
‘তাই নাকি! স্ট্রেঞ্জ! আপনি সত্যিই একটা পাগল!’
এ কথা বলে হেসে উঠলো তিথি। ওর হাসির দমকা হাওয়ায় যেনো সাহসী হয়ে উঠলো মৃদুল। আবেগকাঁপা কণ্ঠে ও নিচু গলায় বললো-
‘তিথি, আপনি খুউব সুন্দর!’
হাসির ঢেউ হঠাৎ থেমে গেলো। তিথি সরাসরি দৃষ্টি রাখলো মৃদুলের দৃষ্টিতে। ওর চোখে-মুখে শেষ বিকেলের কোমল রোদের মতো রক্তিম আভা। কয়েকটা মুহূর্ত চেয়ে থেকেই ও দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। মৃদুল কিছুই বললো না আর। যেনো সব কথা বলা হয়ে গেছে। ও ভারমুক্ত হয়ে নিজের মধ্যে ডুবে গেলো নিজস্ব নৈঃশব্দে। মুহূর্তগুলো কেমন বিমূর্ত লাগছে ওর।
দশ.
পুলিশ সম্পর্কে মৃদুলের ধারণা ভালো নয়। সাধারণ মানুষ পুলিশকে ভয় পায়। মৃদুল ভয় না পেলেও সমীহ করে। নির্যাতিত অনেকে সহজে থানায় যেতে চান না। পুলিশের প্রতি তাদের আস্থা নেই। অথচ পুলিশকে জনগণের বন্ধু বলা হয়। মৃদুল একদিন তেজগাঁ শিল্প এলাকায় এক পুলিশের কনস্টেবলকে মাত্র এক টাকা ঘুষ নিতে দেখেছিল। কুড়ানো কাগজের বস্তা নিয়ে এক ব্যক্তি রিকশায় যাচ্ছিলেন। পুলিশ রিকশা থামিয়ে ওই বস্তায় কী আছে, তা দেখতে চায়। রিকশারোহী ঝামেলা এড়াতে এক টাকা বাড়িয়ে দেন পুলিশ কনস্টেবলের দিকে। কনস্টেবল হাসিমুখে টাকাটা নিয়ে রিকশা ছেড়ে দিলো। এ সময় মৃদুল যাচ্ছিল ওই পথে। এ দৃশ্য দেখে মৃদুলের খুব কৌতূহল হলো। ও রিকশা থামিয়ে নেমে গেলো পুলিশ কনস্টেবলের সামনে। কৌতূহলী গলায় বললো-
‘আপনি মাত্র এক টাকা ঘুষ খেলেন!’
মৃদুলের কথায় ওই কনস্টেবল কোনো লজ্জা পেলো না। বললো-
‘আমি খাই এক টাকা। আইজি না হয় খান এক লাখ টাকা। যার যেমন পদ, তার তেমন আয়। হি-হি-হি।’
গুলশান থানার ওসির রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদুলের আজ ওই কনস্টেবলের কথা বেশ মনে পড়লো। ওসি সাহেব কত টাকা ঘুষ খান, কে জানে! মৃদুল এসেছে গুলশান থানার ওসি রফিক আহমেদের সাথে দেখা করতে। মৃদুল জানে, পুলিশ ওকে পাত্তা দেবে না। তাই ও ওর এক সাংবাদিক বন্ধুর সাহায্য নিয়েছে। পুলিশ সাংবাদিকদের সমীহ করে। কখনো ভয়ও পায়। মৃদুলের বন্ধু আরিফ সোহেল একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক। ও ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিয়েছে থানার ওসির সাথে। আজ দুপুর ১২টায় মৃদুলকে থানায় আসতে বলেছেন থানার ওসি। ঠিক সময়ে ও এসেছে। এ মুহূর্তে ও ওসির রুমের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ওসির রুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে কনস্টেবল হারুন বললো-
‘যান, স্যার ভেতরে আছেন।’
এ কনস্টেবল একটু আগে ওর পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। রুক্ষ মেজাজে ও বিরক্ত গলায় জানতে চেয়েছিল-
‘কারে চাই?’
থানার ওসির রুমে ঢুকতে হলেও নাকি ঘুষ দিতে হয়। মৃদুল এসব কথা শুনেছে। তাই ও কনস্টেবলকে কোনো সুযোগ দিতে চায়নি। ও তাড়াতাড়ি বলে ফেলে-
‘জ্বি, আমি ওসি সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। তিনি আমাকে আসতে বলেছেন।’
এ কথায় গলা নেমে আসে কনস্টেবল হারুনের। ও বলে-
‘আপনি এখানে একটু দাঁড়ান। আমি স্যারেকে জিগাইয়া আসি। আপনার নাম কি?’
‘মৃদুল। বলবেন সাংবাদিক আরিফ সোহেলের বন্ধু।’
কনস্টেবল হারুন যেনো আরো চুপসে যায়। সে ওসির রুমে ঢুকে পড়ে। বেশিক্ষণ আপেক্ষা করতে হয়নি মৃদুলের। হারুন কয়েক মুহূর্ত পর এসে জানালো ওসি সাহেব তার রুমে আছেন। ওসির রুমে ঢুকে পড়লো মৃদুল। ও দেখলো ওসি রফিক আহমেদ বসে আছেন রিলভিং চেয়ারে। তার পেছনে একটি কাঠের সাইনবোর্ড। এ থানায় কে কখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নাম লেখা রয়েছে ওই সাইনবোর্ডে। ওসির টেবিলে রাখা ওয়ারলেস থেকে থেমে থেমে ম্যাসেজ আসছে। রফিক আহমেদ তার মোটা শরীরটা চেয়ারে হেলিয়ে দিয়েছেন। তার পেটের ভুঁড়ি জামা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেনো। পুলিশ অফিসারদের শারীরিক ফিটনেসের বিষয়টি ডিপার্টমেন্ট দেখে কি-না, প্রশ্নটি উঁকি দিলো মৃদুলের মনে। রফিক আহমেদের মোটা শরীর দেখলেই বোঝা যায়, কোনো অপরাধীকে ধরতে ওই কর্মকর্তা দৌড়ে ২০০ মিটারও যেতে পারবেন না। ওসি সাহেব ছোট কুতকুতে চোখে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে ওকে হাতের ইশারায় চেয়ারে বসতে বললেন। মৃদুল টেবিলের সামনে ওসির মুখোমুখি চেয়ারে বসলো। রফিক আহমেদ আয়েশী ভঙ্গিতে চেয়ার থেকে একটু এগিয়ে এলেন। বললেন-
‘আমি খুবই ব্যস্ত। একটু পরেই আমাকে উঠে যেতে হবে। আপনি, আপনার কথা তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।’
‘জ্বি, আমি এসেছি, অপুর ব্যাপারে কথা বলতে। কেনো ওকে থানায় আটকে রেখেছেন, তা জানতে।’
মৃদুলও সময় নষ্ট করতে চায় না। ওসি রফিক আহমেদ একটু মুচকি হাসলেন। বললেন,
‘আপনি কি জানেন, অপুর বিরুদ্ধে একজন শিল্পপতির বাড়িতে ডাকাতির চেষ্টার মামলা দায়ের হয়েছে?’
‘কিন্তু, এসব মিথ্যা।’
‘কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, এর মীমাংসা করবে আদালত। আমরা এর কিছুই করতে পারবো না।’
‘পুলিশও অভিযোগের তদন্ত করে মামলা নেয় বলে জানি। অভিযোগ সত্য না মনে করলে পুলিশ মামলা নেয় না। সেক্ষেত্রে…’
‘মৃদুল সাহেব। আপনার চিন্তাধারার মতো এ সমাজটা চলে না। যাদের প্রভাব আছে, তারা অনেক সময় সমাজকে নিজের মতো চালাতে পারেন। তারা যা বলে, তাই হয়। আপনাকে ওসব বুঝতে হবে।’
‘তাই বলে, ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু থাকবে না! অপুর কথাই ধরুন, একটি মেধাবী ছাত্র জড়িয়ে যাচ্ছে মিথ্যা মামলায়। আপনারা কি এ ব্যাপারে কোনো কিছু করতে পারেন না? আপনি কি আমার কাছ থেকে আসল ঘটনা শুনবেন?’
‘আমি ওসব শুনেছি। অপুর মা-বাবা মাত্র কিছুক্ষণ আগে চলে গেলেন। ওসব প্রেমের গল্প শুনে, আমি কী করবো?’
‘প্রেম করার অপরাধে অপু এ শাস্তি কেনো পাবে, বলুন?’
‘আপনি দেখছি, খুব ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। শুনুন, প্রেম করার জন্য নয়, অপু ফেঁসে যাচ্ছে প্রেমিকা হিসেবে ভুল মেয়েকে বেছে নেয়ায়। দেশে কী আর মেয়ে নেই? কেনো বাবা, শিল্পপতির মেয়ের প্রেমে ঝাঁপ দিতে গেলো আপনাদের ওই অপু!’
মৃদুল এবার বিনীত গলায় বলে-
‘ওসি সাহেব, আপনি তো আসল ঘটনা বুঝতে পারছেন। আপনি কি অপুকে ছেড়ে দিতে পারেন না?’
কথা শুনে আঁতকে ওঠেন ওসি। বলেন-
‘বলেন কী! তাহলে ওই শিল্পপতি আমাকে ছাড়বে?’
অবাক হয় মৃদুল। আইনকে কীভাবে ব্যবহার করছেন কেউ কেউ। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। হতাশ গলায় বলে-
‘তাহলে ওকে কোর্টে চালান করে দিন।’
‘কাল ওকে কোর্টে চালান করে দেব।’
‘আর দেখবেন, মিথ্যা মামলায় ও যেনো ফেঁসে না যায়।’
‘আমি চেষ্টা করবো চার্জশিট না দিতে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।’
‘ঠিক আছে। আমি আর আপনার সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি কি অপুর সাথে একটু দেখা করতে পারি?’
ওসি বলে-
‘না। আপনাকে দেখা করতে দিতে পারবো না। মৃদুল সাহেব, ওর সাথে দেখা করে কী হবে? তার চেয়ে কোর্টে ভালো করে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিন। ভালো কোনো উকিল ধরেন। আমিও নির্দোষ অপুর মঙ্গল চাইছি বলে এ পরামর্শ দিচ্ছি। কথাটি কাউকে বলবেন না, বুঝলেন?’
‘জ্বি, আচ্ছা।’
‘আরেকটা কথা আপনাকে বলে রাখছি, মামলাটা হয়তো চলবে। মামলাটা অন্যদিকে মোড় নিতেও পারে। মামলা চলাকালে যদি কোর্টে এসে সুমি বলে যে, অপু ওকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিল, তবে কিন্তু অপুকে কমপক্ষে সাত বছর জেল খেটে বের হতে হবে।’
রফিক আহমেদ সাবধানী গলায় এ কথা বললেন।
‘কী যে বলছেন, ওসি সাহেব! সুমি কি ওসব বলবে? ওরা একে-অন্যকে অনেক ভালোবাসে।’
‘রাখুন, ওসব ভালোবাসা। এ রকম কত দেখলাম! কত মেয়ে ভালোবেসে ফাঁসিয়ে দিলো প্রেমিকদের!’
‘আপনি এসব কী বলছেন!’
‘আপনাকে এ কথা বললাম, আপনি আরিফ সোহেলের বন্ধু বলে। সুমির বাবা সে চেষ্টাই করছেন। উনি খুবই ডেঞ্জারাস লোক!’
‘কিন্তু, সুমি নাকি নিখোঁজ? ওকে পাবে কোথায়?’
‘আপনি দেখছি, বোকার স্বর্গে বাস করছেন! যান, বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন।’
‘আপনি কী ভয় দেখাচ্ছেন?’
‘না। আপনাকে সর্তক করার জন্য কথাটি বললাম। মামলা যে কোনো সময় যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে!’
রফিক আহমেদ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মৃদুলও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো কয়েকটা মুহূর্ত। এরপর বিষণ্ন মনে ও বের হয়ে এলো ওসির রুম থেকে। ওসিও তার রুম থেকে বের হলেন। পুলিশ অফিসার হিসেবে রফিক সাহেবকে মন্দলোক বলে মনে হলো না মৃদুলের। ওসির কথা শুনে ওর গা যেনো মৃদু কাঁপছে। ওর পানির তৃষ্ণা পেয়ে গেলো। ও থানার গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো একটি খালি রিকশার জন্য। ওই পথ দিয়ে রিকশায় চড়ে যাচ্ছিল শাহেদ। থানার গেটের সামনে দাঁড়ানো মৃদুলকে দেখে রিকশা থামালো ও। শাহেদকে দেখে অবাক হলো মৃদুল। শাহেদ অনেকটা চিৎকার করে বললো-
‘কী রে, তুই থানার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস! এবার পুলিশ নিয়ে গবেষণা করবি নাকি?’
মৃদুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বললো-
‘সত্যিই পুলিশ নিয়ে গবেষণার অনেক কিছু আছে। তা, তুই এ-পথ দিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?’
শাহেদ ভীষণ উচ্ছ্বসিত গলায় বললো-
‘চল আমার সাথে। তোকে আজ ভীষণ চমকে দেবো।’
‘তুই চমকে দিবি, আমাকে! তুই কখনো কাউকে চমকে দিতে পেরেছিস?’
বিস্ময় প্রকাশ করে মৃদুল। শাহেদের চোখে মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠে। বললো-
‘ঠিক আছে, রিকশায় ওঠ। দেখি, আজ তোকে চমকে দিতে পারি কিনা।’
মৃদুল আর কথা বাড়ালো না। ও শাহেদের সাথে রিকশায় চড়লো। রিকশা চলতে শুরু করলো। মৃদুল দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলো। শাহেদও কোনো কথা বললো না। কিছুক্ষণের মধ্যে ওদের রিকশা দুই নম্বর গুলশানের একটি অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের সামনে এসে থামলো। শাহেদ রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিলো। মৃদুল অ্যাপার্টমেন্টের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘তুই তো থাকিস রায়ের বাজার। এখানে কার বাসায় এলি?’
‘সেটাই তো চমক, বন্ধু।’
‘মানে?’
‘আমার ঠিকানা এখন এই অ্যাপার্টমেন্টে। বাসায় গেলে আরো চমক দেখতে পাবি।’
ওরা লিফট ধরলো। লিফট চারতলায় থামতেই শাহেদ মৃদুলকে নিয়ে নেমে গেলো। মৃদুলের কৌতূহল বাড়তেই থাকে। শাহেদ ডি-৪ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে এসে কলিংবেল টিপলো। ওর পেছনে মৃদুল। কলিংবেল বাজার প্রায় পনের সেকেন্ড পর দরজা খুললো বিন্দু। বিন্দুকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো মৃদুল। ভীষণ ধাক্কা এসে লাগলো ওর মনে। শাহেদ যেনো মৃদুলকে চমকে দিতে পেরে খুব আনন্দিত। ও মৃদুলকে দেখিয়ে বিন্দুর উদ্দেশে বললো-
‘বিন্দু, আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ধরে এনেছি ওকে সারপ্রাইজ দেবো বলে।’
বিন্দু তাকিয়েছিল মৃদুলের দিকে। মুখে মিষ্টি হাসির ঝিলিক। শাহেদ পেছনে ঘুরে মৃদুলকে বললো-
‘অমন হা করে কী দেখছিস? ওর নাম বিন্দু। যার কথা তোকে বলেছিলাম। ও এখন আমার স্ত্রী। আয়, ভেতরে আয়।’
বিন্দু দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। শাহেদ ভেতরে প্রবেশ করলো। মৃদুলের মুখে কোনো কথা নেই। ও যেনো থ হয়ে গেছে। ও শাহেদকে অনুসরণ করে রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো। সুসজ্জিত ড্রইংরুম। শাহেদ রুমের দরজা লাগিয়ে বললো-
‘কী রে, চমকে গেছিস না?’
‘হ্যাঁ, তুই সত্যিই চমকে দিয়েছিস। আমি ভীষণ চমকে গেছি।’
মৃদুল কথাটি বললো বিন্দুর চোখে চোখ রেখে। বিন্দুর চোখ যেনো মিটিমিটি হাসছে। শাহেদ বললো-
‘তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেনো, বস।’
মৃদুল সোফায় বসে পড়লো। শাহেদ বসলো ওর মুখোমুখি। ও বিন্দুকে বললো-
‘বিন্দু, ও হচ্ছে মৃদুল। যার কথা তোমাকে বলেছি। টেবিলে খাবার সাজাও। আমরা আজ একসাথে লাঞ্চ করবো।’
এ কথায় আপত্তি জানিয়ে মৃদুল বললো-
‘না, না। আমার সময় নেই। একটা জরুরি কাজ আছে। আমাকে এখনই যেতে হবে।’
বিন্দু বললো-
‘বাহ্ রে, বন্ধুর স্ত্রীর সাথে প্রথম পরিচয় হলো। আর আপনি কিছু না খেয়ে এখনই চলে যাইতে চাইছেন!’
কথাটির মধ্যে কেমন ঝাঁঝ টের পেলো মৃদুল। শাহেদ বিন্দুর কথা সমর্থন করে বললো-
‘তোকে না জানিয়ে বিয়ে করেছি বলে রাগ করেছিস? জানিস, আমি অন্তত তোকে জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিন্দু চাচ্ছিল, কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করতে। অতো চিন্তা করার সময় পাইনি। হুট করেই গত সপ্তাহে বিয়ে করে ফেললাম, বুঝলি? বলতে পারিস, একেবারে নতুন সংসার। নতুন অ্যাডভেঞ্চার!’
কৈফিয়ত দেবার মতো করে কথাগুলো বললো শাহেদ। মৃদুল জানতে চাইলো-
‘এই অ্যাপার্টমেন্ট কবে কিনলি?’
এ কথায় যেনো লজ্জা পেলো শাহেদ। লজ্জিত গলায় বললো-
‘তুই যে কী বলিস! এমন অ্যাপার্টমেন্ট কেনার অর্থ পাবো কোথায়? এটি বিন্দুর অ্যাপার্টমেন্ট। বলতে পারিস, ঘরজামাই হয়েছি। হা-হা-হা।’
এ সময় বিন্দু চলে গেলো অন্য রুমে। শাহেদ এবার গলা নিচু করে বললো-
‘বন্ধু, মেয়েটিকে আর ফেরাতে পারলাম না। পরে ওর ভালোবাসার সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে দিলাম। কি রে, ভুল করেছি?’
এ প্রশ্নের জবাবে কী বলবে ভেবে পেলো না মৃদুল। ও কেনো জানি, এ মুহূর্তে কেমন অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো। ও শাহেদকে বললো-
‘দোস্ত, তুই সুখী হলে আমিও খুশি হবো। তুই তো কমরেড হবার অনেক চেষ্টা করলি। এবার সংসারি হ।’
‘ধন্যবাদ, বন্ধু।’
‘শাহেদ, আমাকে এখনই যেতে হবে। জরুরি একটা কাজ আছে। আবার তো আসবো। তখন খাবো।’
‘সত্যিই তোর জরুরি কাজ আছে?’
শাহেদ বিষণ্ন গলায় জানতে চায়।
‘বিশ্বাস কর, সত্যিই আমার একটা জরুরি কাজ আছে। কাজটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ এখন জরুরি কাজটির কথা মনে পড়লো।’
মৃদুলের কণ্ঠে আর্তনাদ ফুটে ওঠে।
‘ঠিক আছে, দাঁড়া। বিন্দুকে ডেকে আনছি।’
বলেই শাহেদ চলে গেলো কিচেনের দিকে। মৃদুল একঝলক তাকিয়ে দেখে নিলো ওদের ড্রইংরুম। রুমটি ছিমছাম, গোছানো। দেয়ালে হালকা সবুজ রঙের মোড়ানো। ডানপাশের দেয়ালে লিওনাদোঁ ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার ওয়েল পেন্টিংয়ের একটি ছবি ঝুলছে। মোনালিসার হাসি সবচেয়ে রহস্যময় বলে জনশ্রুতি আছে। মৃদুলের দৃষ্টি ওই ছবিটির দিকে আটকে গেলো। ওর মনে হচ্ছে, মোনালিসার হাসির মতোই বিন্দুও রহস্যময়। এ কথা ভেবে মৃদুল আপন মনে হেসে উঠলো। এ সময় ড্রইংরুমে ফিরে এলো শাহেদ এবং বিন্দু। বিন্দু কণ্ঠে কপট রাগ তুলে বললো-
‘আমার হাতের রান্না খেতে আপনার অরুচি কেনো? আমাকে কী আপনার বন্ধুর স্ত্রী হিসেবে পছন্দ করেননি?’
‘আহা! তুমি অমন কথা ওকে কেনো বলছো?’
ককিয়ে ওঠে শাহেদ। মৃদুল বিন্দুর দিকে তাকিয়ে বললো-
‘বন্ধুর স্ত্রী হিসেবে আপনি আমার কাছে সব সময় সম্মানিত। এখানে অপছন্দের বিষয়টি অবান্তর। আর হ্যাঁ, আমার সত্যিই জরুরি একটা কাজ আছে বলে চলে যাচ্ছি। অন্যদিন আসবো, কথা দিচ্ছি।’
‘শুধু অন্যদিন কেনো রে! তুই যখন-তখন চলে আসবি।’
‘হ্যাঁ, আপনি এলে আমারও ভালো লাগবে। শুনেছি, আপনি ভালো গল্প লিখেন। আমাকে নিয়েও একটা গল্প লিখতে পারেন। আমার জীবনে অনেক মজার গল্প আছে।’
এ কথা বলে বিন্দু আবার মিটিমিটি হাসতে লাগলো। মৃদুল ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলো। ও বললো-
‘ঠিক আছে, আজ যাচ্ছি।’ মৃদুল সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
শাহেদ বললো-
‘দাঁড়া, আমি একটু আসছি।’
শাহেদ বেডরুমের দিকে চলে গেলো। এবার বিন্দু এগিয়ে এলো মৃদুলের সামনে। ও খুবই নিচু গলায় বললো-
‘তোমাকে আবার দেখবো, এই অপেক্ষায় রইলাম।’
কথাটি ভীষণ বিব্রত করে দিলো মৃদুলকে। বিন্দুর এ কথার মধ্যে কী লুকিয়ে রয়েছে? কোনো অতৃপ্ত বাসনা নাকি ভালোলাগার সহজ স্বীকারোক্তি? মৃদুল শাহেদের জন্য আর অপেক্ষা করলো না। ও দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। বিন্দু কিছুই বললো না। পেছনে বিন্দুর রিনরিনে হাসির শব্দ শোনা গেলো। মৃদুল লিফটে ওঠার আগে পেছনে ফিরে তাকালো। ও দেখলো বিন্দু দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। ওর মুখে মোনালিসার হাসির চেয়েও রহস্যময় হাসি। ও শাহেদের উদ্দেশে মনে মনে বললো-
‘শালা! কাল মার্কসের আদর্শ এভাবেই আটকে যায় পুঁজিবাদের ফাঁদে!’
এগার.
শাহেদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে হনহন করে বেরিয়ে আসার পর থেকে মনটা বিষণ্ন হয়ে রইলো মৃদুলের। এভাবে চলে আসায় শাহেদ নিশ্চয় অবাক হবে। এ নিয়ে চিন্তা করবে। কিন্তু, না এসেও উপায় ছিল না ওর। বিন্দুর ব্যাকুল আর্তির সামনে ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। শাহেদকে না হয় পরে একটা কিছু বলে দিলেই হবে। এ কথা ভেবে মৃদুল নিজেকে নিজে সান্ত¦না দেয়। ও দাঁড়িয়ে আছে দুই নম্বর গুলশানের গোলচত্বর এলাকার ফুটপাতে। মাথার ওপর খটখটে রোদের ঝাঁঝালো দুপুর। ও দরদর করে ঘামছে। ওর ভেতরটাও ঘামছে। তিথিকে ফোন করতে হবে। ওকে ওসি রফিক আহমেদের কথাগুলো জানানো দরকার। ও মানিব্যাগে রাখা টেলিফোন ইনডেক্স বের করে তিথিদের বাড়ির টেলিফোন নম্বর খুঁজতে লাগলো। এমন সময় ওর সেলফোন বেজে উঠলো। সেলফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বর দেখে ও বুঝতে পারলো কলটি তিথিদের বাড়ি থেকে এসেছে। ও সেলফোন রিসিভ করলো।
‘হ্যালো…।’
‘আমি তিথি বলছি।’
‘তিথি, আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম। হয়তো এখনই ফোনও করতাম। এর মধ্যেই তোমার ফোন এলো…।’
‘কী খবর বলুন তো! থানায় গিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ। এই তো কিছুক্ষণ আগে কথা বলেছি ওসির সাথে।’
‘বলুন, থামলেন কেনো? ওসি সাহেব কী বললেন?’
‘তিনি বললেন, সুমির বাবা খুবই ডেঞ্জারাস লোক! অপুকে ফাঁসিয়ে দিতে যে কোনো কিছু করতে পারেন। এমন কী, সুমিকেও তিনি ব্যবহার করতে পারেন অপুর বিরুদ্ধে।’
‘তাই না-কি! স্ট্রেঞ্জ!’
‘হ্যাঁ, ওসি সাহেব আমাকে সর্তক করে দিয়েছেন। আমার খুবই দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে।’
‘পুলিশ মামলাটিকে কীভাবে দেখছে?’
‘পুলিশ মামলা কীভাবে দেখছে, সেটা বড় কথা নয়। আমার মনে হলো, ওসি সাহেব প্রকৃত ঘটনা জানেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে কোনো সাহায্য করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি ভালো একটা উকিল ধরার পরামর্শ দিয়েছেন।’
‘রাবিস!’
‘কে?’
‘আপনি না, পুলিশ!’
‘ও আচ্ছা।’
‘এখন কী করতে পারি, বলুন তো?’
‘কোনো ক্ষমতাবান লোকের সহযোগিতার প্রয়োজন। পত্রিকায় এ ব্যাপারে একটা নিউজ করিয়ে দিতে পারি। আমার একজন সাংবাদিক বন্ধু আছে…।’
‘না, না। এখনই পত্রিকায় এসব খবর দেয়া ঠিক হবে না। সুমি বা অপুর ব্যক্তিগত জীবন আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাছাড়া এতে ওদের গোপন বিয়ের খবর ফাঁস হয়ে পড়বে। সাংবাদিকরা কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের করে ফেলবেন।’
‘সেটাই তো ভালো। সত্য বেরিয়ে আসবে।’
‘কিন্তু এতে ওদের বিয়েতে আমরা যে সাক্ষী হয়েছি, তাও বেরিয়ে আসবে।’
‘তা আসুক। এ তো মিথ্যা নয়।’
‘সব সময় সব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো যায় না।’
‘কেনো যাবে না? তা ছাড়া আমার মনে হচ্ছে, ওদের বিয়ের বিষয়টি ফাঁস হয়েই যাবে। মিথ্যা মামলা আর নির্যাতন অপু মেনে নেবে কেনো? ও নিশ্চয়ই আদালতে ওদের প্রেম ও বিয়ের কথা বলবে। তখন প্রমাণও দেখাতে হবে। তাহলে কোনো কিছুই আর গোপন থাকছে না। তাই না?’
‘তা ঠিক। সেরকম হলে হবে। আমরাও তখন সাক্ষী দেবো।’
‘শুনে খুশি হলাম।’
‘আপনাকে খুশি করার জন্য এ কথা বলিনি। সে যাকগে, এখন আমাকে একটা পরামর্শ দিন।’
‘কী পরামর্শ?’
‘আমি আপনার বন্ধু অর্থাৎ আমার ভাইয়াকে ঘটনাটি খুলে বলতে চাই। মামাকে বলতে পারবো না। ভাবীর সাহায্য নিয়ে ভাইয়াকে বলতে পারি।’
‘রাশেদকে বলতে চাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ, এ মুহূর্তে তার সহযোগিতা পেলে একটা সমাধানের পথ তৈরি হতেও পারে।’
‘কীভাবে?’
‘বাহ্ রে, আপনিই তো বললেন, কোনো ক্ষমতাবান লোকের সহযোগিতা দরকার।’
‘হ্যাঁ, বলেছি।’
‘আমার ভাইও তো একজন শিল্পপতি। তারও তো কিছু ক্ষমতা আছে। তাই…।’
‘তাই তো! এ কাজটি করতে পারলে ভালোই হবে।’
‘তাহলে পরামর্শ দিচ্ছেন?’
‘দিচ্ছি।’
‘তাহলে আজ রাতেই ভাইয়াকে বলবো।’
‘বলো। বিয়ের বিষয়টি ফাঁস হলে পুলিশ আমাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। সে জন্য প্রস্তুত থাকা ভালো।’
‘ভয় দেখাচ্ছেন?’
‘না। সম্ভাবনার কথা বলছি। তুমি কি ভয়কাতুরে?’
‘আমি অপবাদকে ভয় পাই।’
‘আর নয়তো সাহসী?’
‘সাহসের প্রসঙ্গটি আসছে কেনো?’
‘জেনে নিতে চাইছি।’
‘ওসব জেনে কী হবে?’
‘আমি স্বপ্নের একটা খসড়া করছি। তোমাকে যতো জানবো, ততোই স্বপ্নটা আলোকিত হবে।’
তিথি কোনো কথা বলে না। মৃদুল বলে-
‘হ্যালো, হ্যালো, তিথি শুনছো?’
‘আপনি এখন কোথায়?’
তিথি নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। যেনো ছন্দ ফিরে পায় মৃদুল। বলে-
‘আমি এখন গুলশানে। অভিজাত এলাকায় ঘুরছি।’
‘ভরদুপুরে অহেতুক ঘুরছেন কেনো?’
‘কড়া রোদে ঘেমে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছি।’
টেলিফোনে তিথির হাসির শব্দ ভেসে এলো। ও বললো-
‘শুনেছি, কবিরা রাতের স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় আপ্লুত হয়ে কবিতা লেখেন। আপনি ভরদুপুরে কবিতা লিখছেন?’
‘কী করবো বলো, আমার সহজভাবে কিছু পাওয়া হয় না।’
মৃদুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
তিথি বলে-
‘সহজ করে কিছু পাওয়ার আনন্দও কম। পেয়ে যাওয়া জিনিসের মূল্যও কমে যায়।’
‘আমি যা চাচ্ছি, তার জন্য অনেক মূল্য দিতে প্রস্তুত আছি। বিশ্বাস করো!’
‘আমার বিশ্বাসে আপনার কী মিলবে?’
‘মিললেও মিলতে পারে, মানিক রতন…!’
মৃদুল কেমন উদাস হয়ে যায়। আসলে তিথির সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে ওর। মধুর আবিষ্টতা ছড়িয়ে যাচ্ছে ওর ভেতর থেকে আরো ভেতরে। ও প্রান্ত থেকে তিথি বলে-
‘বুঝতে পারছি আপনার মধ্যে কাব্যসত্ত্বা ভীষণভাবে কাজ করছে। এই ভরদুপুরে কী কবিতা লিখেছেন, বলুন তো!’
‘শুনে রাগ করবে না তো?’
‘রাগ করবো কেনো! আপনি বলুন।’
‘বলতে পারো এটি দুঃসময়ের কবিতা।’
‘আহা! ভূমিকা নয়, কবিতাটি বলুন।’
‘কবিতাটির প্রথম কয়েক লাইন হচ্ছে, ‘ছিলাম যেনো অনড় পাথর, তোমায় দেখে হলাম কাতর! পা বাড়ালাম যেনো। দেখি, দাঁড়িয়ে তুমি ঠিকই আছো, আমার তুমি নেই।’
‘এটুকুই?’
‘হ্যাঁ, এটুকুুই লিখেছি। খারাপ হয়েছে?’
‘না। তবে আজ আপনার মন যে খারাপ, তা কিন্তু আমি বুঝতে পারছি।’
‘কীভাবে বুঝলে! তুমি কি আমার অন্তর্যামী?’
টেলিফোনে তিথির খিলখিল হাসির ঢেউ এসে পড়লো। মৃদুল তন্ময় হয়ে গেলো। তিথি হাসি থামিয়ে বললো-
‘মৃদুল, আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?’
‘মাত্র একটা অনুরোধ!’
‘হ্যাঁ, মাত্র একটি অনুরোধ লাখলেই খুশি হবো।’
‘বলো, কী অনুরোধ?’
‘আপনি আজ আর ঘুরে বেড়াবেন না। সোজা বাড়ি চলে যান। বাসায় গিয়ে গান শুনতে পারেন, বই পড়তে পারেন। অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়ুন। অনুরোধটি রাখবেন তো?’
‘রাখবো। কিন্তু বললে না, কী করে বুঝলে আমার মন খারাপ?’
‘শুধু এর উত্তরটা দিতে পারি, যদি আর কোনো প্রশ্ন না করেন।’
‘আর প্রশ্ন করবো না। এবার বলো।’
তিথি একটু সময় নিলো। ও বললো-
‘আপনি আজ প্রথম থেকেই আমাকে তুমি সম্বোধন করে কথা বলছেন। এ থেকেই বুঝেছি, আজ আপনার কিছু একটা হয়েছে।’
এ কথায় কেমন লজ্জায় পড়ে গেলো মৃদুল। সত্যিই ও তিথিকে তুমি করে কথা বলছে। ও কি অসেচতনভাবে তিথিকে তুমি বলেছে, নাকি অবচেতন মনের দুর্বলতার প্রতিফলন ঘটেছে? প্রশ্নটি ছড়িয়ে গেলো ওর মনে। ও দুঃখিত কণ্ঠে বললো-
‘তিথি, এজন্য আমি দুঃখিত। আপনি কি রাগ করেছেন?’
কোনো জবাব এলো না। ও আবার বললো-
‘হ্যালো, তিথি। আপনি কি রাগ করেছেন?’
‘তা জেনে কী করবেন? আমি ফোন রাখছি।’
‘হ্যালো, হ্যালো..!’
তিথি ফোন রেখে দিলো। মৃদুল সদ্য লেখা নিজের কবিতার লাইনগুলো সাজাতে লাগলো ফের। ও এক ধরনের ঘোরের মধ্যে ডুবে গেলো। একসময় বিন্দুকে দেখেও এ ধরনের ঘোরের মধ্যে ডুবে যেতো ও। এ তন্ময়তার নাম কী?
বার.
রাশেদের অফিস মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনের পনের তলায়। এই ভবনে দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, ব্যাংক, বীমার কার্যালয় রয়েছে। বাণিজ্যিক মতিঝিলে ব্যস্ততম একটি ভবন। এই ভবনের লিফটের সামনে প্রায়ই দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। মৃদুল এই ভবনে আগে কয়েকবার এসেছে। নারায়ণগঞ্জ এলাকার একজন শিল্পপতির অফিস রয়েছে এই ভবনে। ওই শিল্পপতির কাছে চার বছর আগে মৃদুল ওর বন্ধু রুমনের সাথে এসেছিল একটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য বিজ্ঞাপন নিতে। তার অফিসের অভ্যর্থনা কক্ষে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ওরা দেখা পেয়েছিল ওই শিল্পপতির। অনেক অনুনয়ের পর বিজ্ঞাপনটি ওরা পেয়েছিল। কিন্তু সেটির বিল আর উদ্ধার করতে পারেনি ওরা। শুধু এই ভবনে যাওয়া-আসা হয়েছে। এ নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে মৃদুলের। আজ অনেকদিন পর সে কথা মনে হলো ওর। মৃদুল লিফট থেকে নেমে রাশেদদের কোম্পানির সাইন দেখে অভ্যর্থনা কক্ষে প্রবেশ করলো। অভ্যর্থনা ডেস্কে একজন তরুণী বসে আছেন। মুখে কৃত্রিম হাসি মাখামাখি। মৃদুল ওই তরুণীর কাছে গিয়ে বললো-
‘আমি আপনাদের এমডি সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। আমার নাম মৃদুল।’
ওর কথা শুনে মেয়েটি যেনো তটস্থ হয়ে পড়লো। ও মুখের হাসিটি আরো প্রশস্থ করে মিষ্টি গলায় বললো-
‘স্যার ভেতরে আছেন। আপনি ভেতরে যান। ডান দিকে তার রুম।’
মৃদুল বুঝতে পারলো রাশেদ অভ্যর্থনা ডেস্কে ওর নাম বলে রেখেছিল। নইলে এতো সহজে শিল্পপতিদের রুমে প্রবেশ করা যায় না। মৃদুল অফিসের প্রশস্থ করিডরে প্রবেশ করলো। এক পলকে দেখে নিলো অফিসজুড়ে থরে থরে সাজানো চেয়ার-টেবিল। তাতে লোকজন কাজে ব্যস্ত। ডানদিকে এগুতেই ও একটি দরজায় ঝুলানো রাশেদের নামের ‘নেমপ্লেট’ দেখতে পেলো। ও দরজার সামনে গিয়ে মৃদু টোকা দিতেই ভেতর থেকে রাশেদ বললো-
‘কাম ইন।’
মৃদুল দরজা খুলে ঢুকে পড়লো। রাশেদ যেনো ওর অপেক্ষাতেই ছিল। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো-
‘মৃদুল! এসো।! তোমার অপেক্ষাই করছিলাম।’
মৃদুল রাশেদের টেবিলের বিপরীতে ওর মুখোমুখি বসলো। বললো-
‘হঠাৎ আমাকে এমন জরুরি তলব কেনো করেছে, বলো তো!’
রাশেদ মুচকি হাসলো। মৃদুলকে সান্ত¦না দেবার ভাষায় বললো-
‘আগে একটু দম নিই, বন্ধু। পরে সব বলছি।’
‘না, কাল ফোনে তোমার কণ্ঠে কেমন উদ্বেগ টের পাচ্ছিলাম। তাই…।’
‘কাল রাতে আমি উদ্বিগ্ন নয়, খানিকটা উত্তেজিত ছিলাম। সে কথা শোনার আগে বলো, কী খাবে?’
‘কিছুই খাবো না। সময় নষ্ট না করে আমাকে কেনো ডেকেছো, তাই বলো। আমার আরো একটি জরুরি কাজ আছে।’
রাশেদ চুপ হয়ে গেলো। মৃদুল ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রাশেদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলবে। মৃদুল ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। মাত্র কয়েকটা মুহূর্তে বদলে গেলো পরিবেশ। রাশেদ বললো-
‘মৃদুল, তুমি আমার বন্ধু। দীর্ঘদিন আমাদের মধ্যে যোগাযোগ না থাকলেও আমরা আবার একে অন্যকে খুঁজে পেয়েছি। এ জন্য আমি আনন্দিত। আজ তোমাকে ডেকেছি, তোমার বিশেষ সহযোগিতা পাবার আশায়। বলতে পারো, বন্ধু হিসেবে তোমার সহযোগিতা দাবি করছি। তুমি কিন্তু আমাকে ফেরাতে পারবে না!’
মৃদুল এবার মুচকি হাসলো। বললো-
‘রাশেদ, ভূমিকা না করে কী বলতে চাও, বলে ফেলো। বন্ধু হিসেবে তোমাকে সহযোগিতা করার মানসিকতা আমার আছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, তুমি কী সহযোগিতা চাও।’
রাশেদ এবারো কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। এরপর বললো-
‘তুমি তো অপুর কথা জানো, তাই না? কাল রাতে তিথি আমাকে সব বলেছে। এরপর থেকে আমি এ ঘটনার সাথে জড়িয়ে গেছি।’
‘তাহলে তো ভালোই হলো!’
মৃদুল হাঁফ ছাড়লো। রাশেদ বললো-
‘তুমি যা ভাবছো, তা নয়। আমি জড়িয়ে গেছি অন্যভাবে। বলতে পারো বিপরীত দিক থেকে।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
মৃদুল প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে রইলো রাশেদের মুখের দিকে। রাশেদ ওর চেয়ার থেকে একটু এগিয়ে এলো। বললো-
‘তুমি তো জানো, সুমির বাবা মনোয়ার হোসেন দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। তার পরিবারের মান-সম্মান রক্ষা করাটা আমারও দায়িত্ব। তাই, আমি মনোয়ার সাহেবকে কথা দিয়েছি তার পক্ষে কাজ করবো। আমি শুনেছি, সুমি ও অপু গোপনে বিয়ে করেছে এবং তুমি ও তিথি ওই বিয়ের সাক্ষী হয়েছো। আমি তিথিকে ওর বাবার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এখন তুমি যদি এ ব্যাপারে মাথা না ঘামাও, তাহলে এ সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যাবে।’
এ পর্যন্ত বলে রাশেদ থামলো। ও মৃদুলের চোখের দিকে চেয়ে রইলো জবাবের আশায়। মৃদুল বললো-
‘নিরপরাধ অপুকে মিথ্যা মামলা থেকে রক্ষা করাটা তোমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?’
‘অপুও রক্ষা পাবে। তবে ওকে বা ওর বাবা-মাকে লিখিত দিতে হবে যে, ও আর কোনোদিন সুমির ধারে-কাছে আসবে না। এ শর্তে অপুও ছাড়া পেতে পারে। আমি সেরকম ব্যবস্থা করেছি। আমাকে তুমি বিবেকহীন ভেবো না।’
‘তোমার বিবেকটা দেখছি ব্যবসায়ীদের মতো লাভ-লোকসানের হিসাব করছে। পথ বের করেছো, নিজের লাভ ঠিক রেখে। তুমি সত্যিই জাত ব্যবসায়ী!’
মৃদুলের বিদ্রƒপে রাশেদ লজ্জা পেলো না। ও হো হো করে হেসে উঠলো। হাসি থামার পর বললো-
‘তুমি খুবই ইন্টেলিজেন্ট! তুমি ঠিকই ধরেছো, এর মধ্য থেকে আমি নিজের একটা লাভ পেতে যাচ্ছি। তুমি কি জানতে চাও, আমি কী পাবো?’
‘বলো।’
‘মনোয়ার সাহেব এফবিসিসিআইয়ের আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। তার প্যানেল হচ্ছে খুবই শক্তিশালী। আমি তার প্যানেল থেকে নির্বাচন করার সুযোগ পাবো। এ ছাড়া আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে আছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। এ ফাইলটি সচল করে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন তিনি। তার ক্ষমতার হাত অনেক বড়!’
‘তা বেশ। তোমার লাভ-লোকসান শুনলাম। এবার নির্র্দিষ্ট করে বলো, আমার কাছে তুমি কী চাও?’
‘নীরবতা। তুমি চোখ বন্ধ করে থাকো। তাহলেই হবে।’
‘তিথি কি এসব জানে?’
‘কী সব?’
‘এই যে তোমার লাভের কথা।’
‘না, না। ওকে তুমিও কিন্তু কিছু বলো না! ওর তো অনার্স ফাইনাল হয়ে গেলো। ওকে না হয় কিছুদিনের জন্য ওদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো। আশা করি, এর মধ্যে সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে।’
রাশেদ স্বস্তি প্রকাশ করলো। ও মৃদুলের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো-
‘আমার প্রস্তাবটি মেনে নিতে তোমার কী কোনো আপত্তি আছে? কিংবা তোমার কি কিছু চাওয়া বা বলার আছে?’
মৃদুল একটু ভাবলো। এরপর রাশেদের চোখে চোখ রেখে বললো-
‘দেখো, মনোয়ার সাহেবের হাত কতটা বড় বা ছোট তা জানার আমার দরকার নেই। অপু ও সুমির প্রেম বা বিয়ে নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমি চাই, অপু জেল থেকে ছাড়া পাক। মিথ্যা মামলায় ওকে জড়ানো হয়েছে, এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। যেভাবেই হোক, আমি এ ঘটনার সাথে খানিকটা জড়িয়ে গেছি। তুমি মনোয়ার সাহেবকে বলো, অপু যেনো ছাড়া পায়। তা নাহলে অপু বা ওদের পরিবারের কেউ আমাকে ডাকলে ওদের পাশে দাঁড়াবোই। ওদের বিয়ের যে সাক্ষী হয়েছি, তা বলতে দ্বিধা করবো না। প্রয়োজনে পত্র-পত্রিকায় এ খবর ফাঁস করে দেবো।’
‘বন্ধু, এসব তুমি কী বলছো!’
‘যা বলছি, আমি তা-ই করবো। এতে তোমার কী লাভ-লোকসান হলো, তা ভাববো না।’
‘তাতে তোমার কী লাভ হবে, বলো তো!’
‘এতে আর যাই হোক, বিবেকের আয়নায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো। কোনো গ্লানিতে ভুগবো না। বরং আত্মতৃপ্তিও পেতে পারি।’
মৃদুল জোর দিয়েই কথাগুলো বললো। রাশেদ হতাশ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ওর মুখের দিকে। ও একেবারেই চুপসে গেলো। যেনো মৃদুলের এই দৃঢ় জবাবের জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। মৃদুল রাশেদের ফ্যাকাশে মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে বললো- ‘হায় রে, কোথাকার পানি, কোথায় গড়াচ্ছে!’
রাশেদের অফিস থেকে বের হয়ে মৃদুল সেলফোনটা অন করলো। সেলফোন অন করতেই বেজে উঠলো। ও ফোন ধরলো। ও-প্রান্তে তিথি।
‘হ্যালো, সেই কখোন থেকে আপনাকে ফোন করছি। ফোন বন্ধ। আজকের দিনে ফোনটি বন্ধ রেখেছেন কেনো?’
তিথির কণ্ঠে অভিমান। তিথির ফোন পেয়ে মনটা ভালো হয়ে গেলো। ও বললো-
‘একটা জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তাই ফোন বন্ধ ছিল। এখন বলুন কী খবর। হ্যালো… শুনছেন?’
‘খুব ভালো খবর আছে। এ খবর জানানোর জন্যই আপনাকে ফোন করে যাচ্ছি।’
তিথি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। মৃদুল বলে-
‘ভালো খবরটি বলে ফেলুন, প্লিজ।’
‘অপুকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে!’
‘তাই না-কি!’
‘হ্যাঁ। রাশেদ ভাই সব ব্যবস্থা করেছেন। সুমির বাবা আদালতে অপুর জামিনে আপত্তি জানাবেন না। দেখলেন, রাশেদ ভাইয়ের সহযোগিতা নিয়ে কত ভালো হয়েছে।’
তিথির কণ্ঠে তৃপ্তির রেশ। মৃদুল বললো-
‘এ খবর শুনে ভালোই লাগছে।’
‘আরেকটি খবর আছে।’
‘বলুন।’
‘আজ সুমি আমাকে ফোন করেছিল! ওর বাবা ওকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দিয়েছেন। সিডনি থেকে ও আজ ফোন করেছে। অপুর কথা ওকে বললাম।’
‘ও কি বললো?’
‘প্রথমে ও কিছুই বলেনি। ফোনে ওর কান্নার শব্দ পেলাম। পরে ও বললো- ওকে আপাতত নাকি অস্ট্রেলিয়াতেই থাকতে হবে। ওকে বাধ্য হয়েই অস্ট্রেলিয়ায় যেতে হয়েছে। দেশে কবে ফিরতে পারবে ও জানে না।’
‘স্ট্রেঞ্জ!’
‘ওরা কেমন একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হলো, তাই না?’
তিথির দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলো মৃদুল। ও সান্ত¦না দেবার মতো করে বললো-
‘অনেককে ভালোবাসার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়। কেউ পোড়ে, কেউ রঙিন ঘুড়ির মতো ওড়ে। কেউ পেয়েও হারায়, আবার কেউ হারিয়েও পায়। কেউ কঠিন বিরহে নীল নদী হয়ে যায়, কেউ পাথরেও ফুল ফোটায়।’
এ পর্যন্ত বলে মৃদুল থামলো। ও-প্রান্তে তিথির খিলখিল হাসির ঢেউ আছড়ে পড়লো। ও বললো-
‘আপনি দেখছি, ভালোবাসা নিয়ে কাব্যের বিলাসিতা করতে বেশ ভালোই জানেন। লেখকরা ভালোবাসা নিয়ে এতো ভাবে কেনো, বলুন তো?’
প্রশ্নটি ভালো লাগলো মৃদুলের। যেনো এমন একটি প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিল ও। ওর মনের মধ্যে একখণ্ড আবেগ জড়ানো কিছু কথা প্রকাশের পথ খুঁজে ফিরছে। এ মুহূর্তে কথাগুলো আহত পাখির মতো ডানা ঝাঁপটাতে লাগলো। ও বললো-
‘কারণ, ভালোবাসা সৃষ্টি করতে শেখায়। ভালোবাসা মনের বিশালত্ব বাড়ায়। ভালোবাসা হচ্ছে আগুন! এ আগুনে পুড়ে যা অবশিষ্ট থাকবে, সেটুকুই খাঁটি!’
স্পষ্ট করে বলা নয়, তবু যেনো নিজের কথারই প্রতিফলন। মৃদুল মনে মনে তিথির কাছ থেকে প্রশ্রয় কামনা করছে। কিন্তু তিথিও যেনো পাথরের প্রতিমা।
‘হয়েছে, হয়েছে। আপনি আজ কেমন ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। সংযত হোন।’
এ কথা বলে তিথি ফের হাসলো। ওর হাসি ভীষণ ভালো লাগছে মৃদুলের। ও কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
তিথি বললো- ‘এবার আপনার কথা বলুন। কোথায় আছেন, কেমন আছেন?’
‘আমি শূন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে আছি।’
‘আবারো ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন!’
‘তবে কী আকাশের এক কোণে কালো মেঘ হয়ে জমে থাকবো? দূরের পাহাড়ের মতো বিষণ্ন হয়ে থাকবো? আমার কি ঝরনাধারা হতে ইচ্ছে করে না?’
‘আপনি… আপনি না…!’
‘তিথি, আমি ক্লান্ত পথিক। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে! স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে বসন্তের দরজায় কড়া নাড়ছি। কিন্তু দরজাটা খুলছে না। কেনো বলুন তো? আমি কি হতে পারি না বসন্ত পথিক?’
ও-প্রান্তে কোনো শব্দ নেই। কিন্তু সেলফোনের লাইন কেটে যায়নি। তিথি এর জবাবে কিছুই বলছে না। কথাগুলো কি ওকে বিব্রত করে দিলো? মৃদুল ডাকলো-
‘হ্যালো, তিথি…, হ্যালো! একটা কিছু বলুন!’
এবার লাইন কেটে দিলো তিথি। মৃদুলের মনটা মুহূর্তেই বড্ড খারাপ হয়ে গেলো। অন্যরকম খারাপ। মিহিন কষ্টে নীল হয়ে গেলো মন। এটাই কি ভালোবাসার কষ্ট?
তের.
অনেকে ভাগ্যে বিশ্বাস করেন। ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না কেউ কেউ। মৃদুল ভাগ্যে বিশ্বাস না করার দলের। কিন্তু আজকাল ওর মনে হয়, নিয়তি বলে কিছু একটা আছে। ও দেখেছে, অনেক লেখক অল্পতেই খ্যাতি পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ ভালো লিখে সামান্য খ্যাতিও পাননি। চটুল গান গেয়ে কেউ রাতারাতি তারকাশিল্পী হয়ে যাচ্ছে। আবার জাত কণ্ঠশিল্পীর নাম উচ্চারিত হচ্ছে না। কারো শিল্পকর্ম মূল্যায়িত হচ্ছে তার মৃত্যুর পর। এ যেনো ভাগ্যের পরিহাস। জীবনানন্দ দাশের কথাই বলা যায়। জীবদ্দশায় তার তেমন পরিচিতিই ছিল না। এখন তিনি দু-বাংলার সাহিত্যে উত্তরাধুনিক কবি হিসেবে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। বিন্দু-শাহেদের বিয়ে এবং অপু-সুমির অপ্রত্যাশিত বিরহকে ভাগ্যের ইঙ্গিত বলে মনে হয় ওর। মৃদুল জানে, দুর্বলচিত্তের লোকরা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে থাকে। নিজেদের ব্যর্থতাকে ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। সাহসীরা ভাগ্য তৈরি করার চেষ্টা করে। মৃদুল লড়াকু মনের হলেও ইদানীং ওর মনে হতাশার কুয়াশা জমে থাকে। বিন্দুর সাথে ওর ভালোবাসার সম্পর্ক হতে গিয়েও না হওয়া এবং ওর প্রতি তিথির উপেক্ষাকে এক করে দেখলে মনে হয়, ওর জীবনে ‘ভালোবাসা’ এক টুকরো প্রহসনের মতো। সব আলোই আলেয়া হয়ে যায়। এসব কথা ভাবলেই ভাগ্যকে না মানা মৃদুলের শক্ত মনটা ভাগ্যের প্রতি প্রার্থনায় অবনত হয়ে যায়। ভাগ্যদেবীর করুণায় হলেও ও তিথির ভালোবাসা চায়। এ চাওয়ায় ওর কোনো খেদ নেই, গ্লানি নেই কিংবা এক ফোঁটা সংকোচও নেই। আছে শুধু বুকভরা আর্তি। অথচ তিথি এর কিছুই জানে না। মৃদুল নিজের রুমে বিছানায় শুয়ে ওই কথাই ভাবছিল। এ ভাবনার অতল থেকে মনকে তুলে আনতে আনতে ও একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ও গত এক মাস বাড়ি থেকে খুব একটা বের হয়নি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক মাস ও নিজের রুমেই কাটিয়ে দিয়েছে। যে ছেলেটি হঠাৎ হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় এবং বাড়িতে থাকলে সাধারণত মধ্যরাতে বাড়ি ফেরে, সে-ই এখন নিজ কক্ষে কাটিয়ে দিয়েছে এক মাস। এ যেনো ওর স্বেচ্ছা নির্বাসন। এই এক মাস ও শুধু পড়াশোনা করেছে। ও গতকাল বাড়ি থেকে বের হয়েছিল বিসিএসের ভাইবা পরীক্ষায় অংশ নিতে। পরীক্ষা দিয়ে সোজা বাড়ি চলে এসেছে। ওর বাড়ি থেকে বের না হওয়ার ঘটনায় ওদের পরিবারের সকলে প্রথম প্রথম ভীষণ খুশি হয়েছিল। এখন সেই খুশি পানসে হয়ে গেছে। বরং ধীরে ধীরে ওর বাবা-মায়ের মনে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ‘মৃদুলের এ আমূল পরিবর্তন কেনো’র জবাব খুঁজছেন ওর মা-বাবা, ভাই-ভাবী। এমনকি ছোট বোন মলিও। নাজমা রায়হান চান ছেলেটা বাড়িতে থাকুক। সংসারী হোক। নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিক। বাউণ্ডেলে স্বভাবটা বদলে যাক সংসারের বাস্তব আবহে। মৃদুলের বাড়িতে থাকার ঘটনাটি ওর মায়ের এই ইচ্ছেকে আরো প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু টানা এক মাস ওর বাড়িতে থাকাটা চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে তাকে।
মৃদুলের আজ অকারণে মন খারাপ। ও মনের বিষণ্নতা কাটাতে সিডি প্লেয়ার অন করে দিলো। মন খারাপ হলেই ও জগজিৎ সিং-এর গজল শোনে। সিডি পে¬য়ারে জগজিৎ সিং-এর ভরাট কণ্ঠ সুরের মূর্ছনায় গমগম করে উঠলো। ও বিছানায় শুয়ে সমরেশ মজুমদারের কালবেলা উপন্যাসটি পড়তে লাগলো। এ উপন্যাসটি ওর পছন্দের একটি। ও মাঝে মাঝে এ উপন্যাসের অংশবিশেষ পাঠ করে। অনিমেষ ও মাধবীলতার প্রেম ওকে ভীষণ টানে। ও বইটির দ্বিতীয় পাতায় আসতেই দরজায় করা নাড়ার শব্দ হলো। ও বুঝতে পারলো মলি রুমে প্রবেশের অনুমতি চাইছে। ও বললো-
‘ভেতরে আসতে পারো।’
মলি নয়, রুমে প্রবেশ করলেন নাজমা রায়হান। মাকে দেখে বিছানা থেকে উঠে বসতে গেলো মৃদুল। নাজমা রায়হান ছেলের উদ্দেশে বললেন-
‘তোকে বিছানা থেকে উঠতে হবে না। শুয়েই থাক।’
মৃদুল বিছানা থেকে উঠলো না। ওর মা এসে বসলো ছেলের মাথার কাছে। মৃদুলের মাথায় হাত রেখে বললো-
‘কী রে, এভাবে শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিলেই হবে? তোর কি হয়েছে, বলতো?’
মৃদুল এর জবাবে কিছু বললো না। ও জানে, ওর মা ওকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছেন। নাজমা রায়হান মৃদুলের মাথায় বিলি কাটতে লাগলেন। মায়ের এ স্নেহ খুব ভালোলাগে ওর। ও বুঝতে পারছে ওর মা আজো অনেক প্রশ্ন করবেন। মৃদুল কিছুক্ষণ দুই চোখ বুজে মায়ের স্নেহের মমতা উপভোগ করতে লাগলো। নাজমা রায়হান নরোম গলায় বললেন-
‘বললি না, তোর কি হয়েছে? পুরো একটা মাস বাড়িতে থাকলি! আমাকে বল, কি হয়েছে।’
‘মা, গত এক মাসে এ প্রশ্নটি তুমি প্রতিদিনই করেছো। আমি তো বলেছি, আমার কিছু হয়নি।’
‘তুই বললেই হলো! আমি তোর মা। আমি ঠিকই বুঝতে পারি তোর কিছু একটা হয়েছে। মায়ের চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় না।’
‘আসলে মা, আমি অনেকদিন বাইরে বাইরে ঘুরেছি। এবার বিশ্রাম নিলাম। আর এই ফাঁকে একটু পড়াশোনা করে বিসিএসটা দিয়ে দিলাম। ব্যাস!’
‘বিসিএস দেবার তোর কি দরকার ছিল? বাবা ও ভাইয়ের সাথে নিজেদের ব্যবসা সামলাবি না?’
‘আমাকে দিয়ে ব্যবসা হবে না, মা। লাভ-লোকসানের হিসাবটা আমি ভালো বুঝি না। ব্যবসা তারাই করুক।’
‘ঠিক আছে, আগে না হয় তুই চাকরিই কর। ভালো না লাগলে পরে ব্যবসায় মন দিবি। এ নিয়ে আমি তোকে কোনো চাপ দিতে চাই না। তবে আমার অন্য কথা আছে।’
‘কি কথা?’
‘কাল, আমি একটি মেয়ে দেখে এসেছি। তোর সাথে ভীষণ মানাবে। তুই এখন মত দে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি তোকে বিয়ে দেবো।’
নাজমা রায়হানের কণ্ঠে ব্যাকুলতা ফুটে ওঠে। মৃদুল জানে, ওর মা সেই পুরনো দাবিটিই ওর সামনে তুলবে। ও বললো-
‘তুমি আর আমার জন্য বউ খুঁজো না তো! আমিই আমার বউ খুঁজে আনবো।’
মৃদুল এ ধরনের কথা আগে কখনো ওর মাকে বলেনি। তাই এ কথায় হেসে ফেললেন নাজমা রায়হান। তিনি বললেন-
‘তাহলে তো খুবই ভালো হয়। আমাকে আর কষ্ট করতে হয় না।’
‘ঠিক আছে, তুমি আর কষ্ট করো না।’
‘তা এনে দে আমার বউমাকে। এরপর থেকে তোকে আর কিছু বলবো না।’
‘ঠিক আছে, আমাকে কিছুদিন সময় দাও। আগে চাকরির নিয়োগপত্রটা হাতে পাই। তারপর যাবো বউ আনতে।’
‘সত্যি বলছিস!’
‘হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আর কিছু বলবে?’
‘তা কোথায় থাকে আমার বউমা?’
‘তা জেনে তোমার কী হবে। তোমার বউমা দরকার, এনে দেবো। ব্যাস।’
‘যদি এ কথা রাখতে না পারিস, তাহলে কিন্তু আমার কথা শুনতে হবে।’
‘কী কথা?’
‘আমি যখন বলবো, বিনাবাক্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে।’
‘মা, তুমি যে কী! আমার বিয়ে নিয়ে এতো ব্যস্ত হয়ো না তো!’
‘তুমি এসব কথা বললেই তো হবে না। আমি যে মা!’
‘ঠিক আছে, মা। অপেক্ষা করো, তোমার জন্য পুত্রবধূ ধরে আনছি।’
‘আজ আমার প্রাণটা জুড়ালো। তুই শুয়ে থাক। আমি যাচ্ছি। তবে মনে রাখিস, বউ এনে না দিলে কিন্তু আমার কথা রাখতে হবে!’
নাজমা রায়হান হাসিমুখে ছেলের রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। তার মন থেকে দুঃশ্চিন্তার পাথরটা যেনো সরে যাচ্ছে। মৃদুল ফের কালবেলা’য় মনোনিবেশন করলো। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে একসময় ও নিজেকে অনিমেষ ভেবে তিথিকে মাধবীলতা বানিয়ে নিজের স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে গেলো।
চৌদ্দ.
ফুলপুর গ্রামটির নৈসর্গিক দৃশ্য এমন যে, বাংলাদেশের যে কোনো একটি গ্রামের সাথে এর মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। ফসলের মাঠ, একে-বেঁকে বয়ে চলা নদী, সাপ্তাহিক হাট ও হাটের কলরব, কৃষকের বাড়িতে গরু ও গোয়ালঘর, জেলের মাছ ধরাসহ গ্রামীণ জনপদের চিরচেনা দৃশ্যগুলো এখানে দেখা যায়। তবে এই গ্রামের দুটো দৃশ্যর মিল হয়তো অন্যত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। একটি দৃশ্য হচ্ছে, এই গ্রামে সন্ধ্যা হলেই প্রতিঘরেই বিদ্যুতের বাতি জ্বলে ওঠে। অন্যটি হলো গ্রামের কোনো শিশু কাজ করে না। বা ওরা ঘরে বসেও থাকে না। সবাই স্কুলে যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের আওতায় পড়ে গ্রামটির রাতের চেহারা বদলে গেছে। শিশুরা স্কুলগামী হওয়ায় গ্রামের দিনের চেহারাও বদলেছে। আগে দেখা যেতো, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কেউ মাঠে বা খেতে কাজ করছে, কেউ মাছ ধরছে, কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন ওরা প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে। শিশুদের স্কুলগামী করতে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশুদের নিয়ে এসেছেন নিজের স্কুলে। বুঝিয়েছেন দরিদ্র পিতামাতাকে। অর্থ তুলেছেন বিত্তবানদের কাছ থেকে। স্কুলে সম্পৃক্ত করেছেন গ্রামের প্রায় সবাইকে। তিনি গত পাঁচ বছর ধরে এই স্কুল নিয়ে পড়ে আছেন। তার স্কুলটি গ্রামে এখন পল্লী বিদ্যুতায়নের মতো শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। নিজের সততা আর সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ সামনে এগিয়ে গেলে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন নয় বলে মনে করেন মোজাম্মেল হক। ফুলপুর গ্রামের দিকে তাকিয়ে তিনি এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। স্কুল প্রতিষ্ঠা করে এবং বিদ্যুতের আলো এনে ফুলপুরকে আলাদা মাত্রা দিতে পেরে তিনি খুশি। মোজাম্মেল হক মনে করেন অন্তত এ দুই কারণে ফুলপুরকে অন্য কোনো গ্রামের তুলনায় আলাদা করা যায়। যদি গ্রামে একটি হাসপাতাল করতে পারতেন, তবে তার প্রত্যাশা পরিপূর্ণতা পেতো। এ নিয়ে তার মনে চাপা আক্ষেপ। মোজাম্মেল হকের মাথায় গ্রামে একটি হাসপাতাল নির্মাণের স্বপ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এ স্বপ্নটা শুক্রবার দিন তাকে বেশি করে তাড়া করে। ছুটির দিন বলে স্বপ্নটা বেপরোয়া হয়ে যায়। আজ শুক্রবার। মোজাম্মেল হক চেয়ারে বসে আছেন নিজের বাড়ির উঠানে। তার সামনে রাখা টেবিলের ওপর একটা পত্রিকা। তিনি পত্রিকা একা পড়েন না। কেউ এলে তিনি পত্রিকা পড়ে শোনান। এতে দুটো কাজ হয়। নিজেরও পড়া হয়। অন্যকেও শোনানো হয়। গ্রামের অধিকাংশ লোক পত্রিকা পড়ে না, বা পড়তে চায় না। দেশের কী অবস্থা বা কী হতে যাচ্ছে এ নিয়ে তাদের যেনো মাথাব্যথা নেই। তাদের অসচেতনতার জন্য সুবিধাবাদীরা কেবল ফায়দা লুটছে। তাই কাউকে পেলেই তিনি পত্রিকার খবর পড়ে শোনান। অন্তত একজন দুজন লোকও যদি সচেতন হয়ে ওঠে, মন্দ কী? কিন্তু আজ এখনো কেউ আসেনি তার বাড়িতে। দুপুরের খাবারের পর তিনি চেয়ার নিয়ে বসেছেন বাড়ির উঠানে। গা ইজিচেয়ারে এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজেছিলেন অনেকক্ষণ। চোখ বুজলেই হাসপাতালের স্বপ্নটা কেঁপে কেঁপে ভেসে ওঠে। স্বপ্নটা মাত্র মনে পেখম ছড়াচ্ছিল। কিন্তু ওই মুহূর্তে স্বপ্নটা মিলিয়ে গেলো তিথির কথায়।
‘বাবা, তুমি রুমে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিলেই পারতে। সেই কখন থেকে চোখ বন্ধ করে আছো। বাতাস বইছে। তোমার ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে!’
মোজাম্মেল হকের বয়স হয়েছে। আজকাল অল্প কিছুতেই ঠাণ্ডা বা সর্দি-জ্বর লেগে যায়। তাই বলে লেপ মুড়িয়ে শুয়ে থাকলে হবে না। মোজাম্মেল হক মেয়ের কথা কানে তুললেন না। তিনি চোখ খুললেন।
তিথি ওর বাবার সামনে রাখা ছোট্ট টেবিলে এক কাপ চা রাখলো। মোজাম্মেল হক মেয়ের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। এরপর চায়ের কাপ তুলে নিলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন-
‘তুমি আমার সামনে একটু বসো, মা।’
তিথি একটি চেয়ারে বসলো। বাবার সাথে গল্প করতেই ও এসেছে।
‘কিছু বলবে, বাবা?’
তিথি জানতে চায়। মোজাম্মেল হক মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানান। তিথি বলে-
‘আগে চা শেষ করো। তারপর কী বলবে, বলো।’
মোজাম্মেল হক চায়ের কাপে ফের চুমুক দিলেন। অনেকে শব্দ করে চা পান করেন। চায়ের কাপে চুমুক দেবার সময় বিশ্রী শব্দ হয়। এটি তিথির ভালো লাগে না। ওর বাবা শব্দ করে চা পান করেন না। এটা তিথির ভালো লাগে। তিথি ওর বাবার উদ্দেশে বললো-
‘আজ সারাদিন তুমি একা বাড়িতেই থাকলে। বাইরে ঘুরে এলেই পারতে।’
‘তুই বাড়িতে থাকলে আমার আর বাইরে ঘুরতে ইচ্ছে করে না।’
‘আমাকে নিয়ে তুমি কেনো এতো চিন্তা করো, বাবা?’
‘না। তোকে নিয়ে চিন্তা করবো কেনো? তা ছাড়া চিন্তা করার লোক আমি নই। তবে…!
‘তবে কী? থামলে কেনো, বলো?’
‘না, বলছিলাম কী…। তোর তো অনার্স শেষ হলো। তাই না?’
‘হ্যাঁ। এখন মাস্টার্স দেবো।’
‘বলছিলাম কী…। তুই তো ইউনিভার্সিটির হলে থেকেই মাস্টার্স দিতে পারিস, তাই না?’
বাবার কথা শুনে তিথি ভীষণ অবাক হলো। মোজাম্মেল হক কখনো মেয়েকে হোস্টেলে রেখে পড়াতে চাননি। তাই মামার বাড়িতে থেকে তিথি অনার্স ফাইনাল পর্যন্ত পড়েছে। আজ ওর বাবা এসব কী বলছেন!
তিথি অবাক চোখ তুলে বললো-
‘আজ এ কথা বলছো কেনো? আমি তো মামার বাড়িতে ভালোই আছি।’
‘তা ঠিক। কিন্তু…?’
‘কিন্তু কী? আমাকে খুলে বলো।’
তিথি ওর বাবাকে তাগিদ দেয়। মোজাম্মেল হক বলেন-
‘কাল রাশেদের চিঠি পেলাম। ও লিখেছে, তুই যেনো আরো কিছুদিন গ্রামে থাকিস। অথচ তোর তো সামনের মাস থেকে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু, তাই না?’
‘হ্যাঁ। রাশেদ ভাই কেনো এ চিঠি লিখেছেন?’
‘বিস্তারিত কিছু লিখেনি। তবে মনে হচ্ছে, তুই ঢাকায় ফিরে যা, তা ও এ মুহূর্তে চাইছে না।’
‘কেনো, বাবা?’
‘এর উত্তর তো আমার জানা নেই। তবে রাশেদের এ পত্রটি আমার ভালো লাগেনি।’
‘তুমি কিছু ভেবো না। আমি কাল ঢাকায় ফোন করে জেনে নেবো।’
তিথি ওর বাবাকে সান্ত¦না দিলো। কিন্তু ওর মনে একটা অস্বস্তি ভাব ছড়িয়ে যায়। রাশেদ ভাই কেনো এ চিঠি লিখেছে, ও বুঝতে পারছে না। তবে এর মধ্যে যে সুমির কোনো বিষয় আছে, তা আঁচ করতে পারছে। মোজাম্মেল হক আমতা আমতা করতে লাগলেন। তিথি বুঝতে পারছে ওর বাবা আরো কিছু কথা বলতে চায়; কিন্তু বলতে পারছে না। বলার উপায় খুঁজছেন তিনি। তিথি ওর বাবাকে স্বাভাবিক করার জন্য বললো-
‘তুমি আর কি বলতে চাও, বলে ফেলো!’
‘না, বলছিলাম কী, আমার তো বয়স হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর আজকাল আমি এই স্কুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছি। তাই ভাবছিলাম, তোকে বিয়ে দিয়ে দিই।’
এ কথায় তিথি খিলখিল করে হেসে উঠলো। মোজাম্মেল হক তার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাসি থামার পর ও বললো-
‘বাবা, আমার বিয়ে নিয়ে তুমি মাথা ঘামাচ্ছো? কেনো!’
‘কেনো, তোর কি বিয়ে হবে না? তুই কি এভাবেই সারাজীবন থাকবি?’
‘বাবা, সত্যি করে বলো তো, আজ তুমি আমার বিয়ের কথাই বা কেনো বললে? রাশেদ ভাইয়ের চিঠি পেয়ে তোমার কি মন খারাপ?’
‘না, তেমন নয়। আবার সেরকমও।’
‘সহজ করে বলো তো, আজ তুমি আমার বিয়ে নিয়ে অতো ভাবছো কেনো?’
তিথি জানে, ওর বাবা সহজে কিছু বলে না। যদি কিছু বলে এর পেছনে কারণ থাকে। তিথি এ কারণটা বের করতে চাইছে। তিথির চাপে পড়ে মোজাম্মেল হক বললেন,
‘তোর জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, তাই। ছেলেটি সবে ডাক্তারি পাস করেছে। পাশের গ্রামেই ওদের বাড়ি। ঢাকায় থাকে। প্রস্তাবটা পেয়ে ভাবলাম…।
‘বিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে পর করে দিই।’
‘দুর, পাগলি! তোকে পর করবো কেনো?’
‘তাহলে আর কখনো আমার বিয়ের কথা বলবে না, বলে রাখছি!’
‘তুই বিয়ের প্রস্তাবটি নিয়ে সিরিয়াসলি ভেবে দেখ। এখনই আমাকে মতামত জানাতে হবে না। আমি ওদের আমার মতামত পরে জানাবো বলে জানিয়েছি।’
‘বাবা, আমি ঘরে যাচ্ছি। তুমি ওদের যা ইচ্ছে জানিয়ে দিও।’
এ কথা বলেই তিথি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। ও জানে, এ কথা বলার পর ওর বাবা এ নিয়ে আর এগুবেন না। তিথির বিয়ের প্রস্তাব আগেও এসেছে। ওসব প্রস্তাব এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে তিথি। বিয়ের কথা শুনে তিথির মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে গেলো। ও পা বাড়ালো ওর রুমের দিকে। পেছন থেকে মোজাম্মেল হক মিষ্টি করে বললেন-
‘তোর কি পছন্দের কেউ আছে, মা?’
প্রশ্নটি ভীষণ কাঁপিয়ে দিলো তিথিকে। ওর বাবা এ প্রশ্নটি কখনো ওকে করেননি। আজ কেনো করলেন প্রশ্নটি? এ প্রশ্নে তিথির পা যেনো থমকে গেলো। প্রশ্নটি শোনার সাথে সাথেই কেনো জানি ওর মনে মৃদুলের মুখটি ভেসে উঠলো। এতে তিথি নিজেই অবাক হয়ে গেলো। এমন তো হবার কথা নয়! কাঁপনটা মনের অন্তপুরে ঢেউ ছড়িয়ে দিলো। তিথি ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর বাবার উদ্দেশে লজ্জিত কণ্ঠে ছোট্ট করে বললো-
‘আমার অমন কেউ নেই, বাবা!’
এ কথা বলেই ও হনহন করে রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো। এ মুহূর্তে ও বাবার কাছ থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে।
পনের.
ফুলপুর গ্রামটিকে দেখে ভীষণ মুগ্ধ হয়ে গেলো মৃদুল। বেশি মুগ্ধ হলো গ্রামের মানুষগুলোর আন্তরিকতা দেখে। ট্রেন স্টেশন থেকে রিকশা নিয়ে বাজার পর্যন্ত আসতে প্রায় ত্রিশজন পথচারী ওকে সালাম দিলো। রিকশাচালক বদু মিয়া কেবল অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল। তার সব কথাই স্কুলমাস্টার মোজাম্মেল হককে নিয়ে। মোজাম্মেল হক যে এই গ্রামের একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, তা সহজেই বুঝতে পারলো মৃদুল। ট্রেন স্টেশনে নেমে মোজাম্মেল হকের নাম বলামাত্রই এগিয়ে এলো রিকশাওয়ালা, হকার, চায়ের দোকানদার, এমনকি স্টেশন মাস্টার। সবাই মৃদুলকে মোজাম্মেল হকের বাড়িতে সানন্দে পৌঁছে দিতে চাইলেন। তিনি ফুলপুর গ্রামবাসীর কাছে কতটা শ্রদ্ধার লোক, তা ট্রেন স্টেশনে নেমে ও বুঝতে পারলো। ও অভিভূত হয়ে গেলো। বদু মিয়ার রিকশায় চড়ে রওনা দিলো মৃদুল। যাত্রী হিসেবে মৃদুলকে পেয়ে বদু মিয়া খুশিতে আটখানা। রিকশা চলতে লাগলো কখনো পাকা সরু পথে, কখনো ইট বিছানো পথে আবার কখনো মেঠোপথ দিয়ে। বদু মিয়া খুব সাবধানে রিকশা চালাচ্ছে। যেনো সম্মানিত অতিথির কষ্ট না হয়। রাস্তার দু-ধারে ফসলি জমি। চারদিকে সবুজের সমারোহ। গ্রামের এই শ্যামল স্নিগ্ধ মুগ্ধ করা দৃশ্য মৃদুলের পরিচিত। এই ধরনের অনেক গ্রাম ও ঘুরে বেড়িয়েছে। তারপরও মুগ্ধ হলো ও। গ্রামের সৌন্দর্যে অপার্থিব টান আছে। যতোই দেখুক, মন ভরে না। পাঁচ মাইল পথ পেরুবার পর গ্রামের ছোট্ট বাজারে এসে পড়লো রিকশা। মৃদুল বললো-
‘বদু মিয়া, রিকশাটা একটু থামান।’
বদু মিয়া রিকশা থামিয়ে ফেললো। ও বললো-
‘আমি চা খাবো। আপনি খাবেন?’
‘জে না, স্যার। আপনেই খান। নাদের মিয়ার দোকানের চা বাজারের সেরা। চলেন, সেই দোকানে নিয়া যাই।’
এ কথা বলে বদু মিয়া রিকশাটা একটু এগিয়ে নিয়ে থামালো একটি চায়ের স্টলে। চায়ের দোকানে টেপ রেকর্ডে গান বাজছিল। মমতাজের গান। দোকানের সামনের টুলে তিনজন শ্রমিক শ্রেণির লোক বসে চা পান করছিল, আর মনোযোগ দিয়ে গান শুনছিল। বদু মিয়ার রিকশা থামতেই লোক তিনজন টুল থেকে উঠে দাঁড়ালো। মৃদুলকে তারা প্রায় একসাথে সালাম দিলো। ও হেসে বিনয় প্রকাশ করলো। বললো-
‘আপনারা বসুন। আমি এক কাপ চা খেয়েই চলে যাবো।’
লোকগুলো তবু টুলে বসলো না। বদু মিয়া তাদের উদ্দেশে বললো-
‘স্যার, ঢাকা থেইক্যা আইছেন। যাইবেন মোজাম্মেল স্যারের বাড়ি!’
লোক তিনটি যেনো আরো সটান হয়ে দাঁড়ালো। মুখের হাসিটা প্রশস্থ হয়ে গেলো। নাদের মিয়া দ্রুত তার গামছা দিয়ে টুলটি ঝাড়তে লাগলো। মুখে বিগলিত হাসি ঝুলিয়ে বললো-
‘স্যার, বসেন। আপনারে ফাসক্লাস এক কাপ চা খাওয়াইয়া দেই। শহরে গেলেও ভুলবার পারবেন না!’
লোক তিনটি মৃদুলকে আবারো সালাম দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেলো। মৃদুল টুলে বসলো। বদু মিয়াকে বললো-
‘তুমিও বসো। চা খাও।’
‘জে, না। আপনে বড় বাড়ির মেহমান! আপনের সামনে বেয়াদবি করলে জিভ খইসা পড়বো!’
এ কথা বলে বদু মিয়া ওর সামনে সংকোচ মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। নাদের মিয়া চটপট চা তৈরি ফেলছে। সে কাপটিকে গরম পানি দিয়ে ভালো করে কয়েকবার ধুঁয়ে নিলো। মৃদুল বুঝতে পারলো নাদের মিয়াও তাকে বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চা তৈরি করে মৃদুলের সামনে হাসিমুখে তা বাড়িয়ে দিলো নাদের মিয়া। মৃদুল চায়ের কাপে চুমুক দিলো। চা মন্দ হয়নি। কিন্তু চিনি বেশি। হয়তো বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ করতে গিয়ে চিনি বেশি দিয়েছে নাদের মিয়া। মৃদুল চায়ের কাপে কয়েক দফা চুমুক দিয়ে বললো-
‘সত্যিই, আপনার চায়ের তুলনা হয় না! চমৎকার!’
কথা শুনে নাদের মিয়ার মুখটি উজ্জ্বল হয়ে গেলো। যেনো বিরাট এক প্রশংসাপত্র সে পেয়ে গেছে। গ্রামের সাধারণ লোকরা কত সহজেই খুশি হয়ে যায়! এ কথা ভেবে মৃদুলের মনে কেমন বিহ্বলতা ছড়িয়ে যায়। চা শেষ করে দাম দিতে গিয়েও বিপত্তি দেখা দিলো। নাদের মিয়া চায়ের দাম নেবে না। মৃদুল বললো-
‘চায়ের দাম না নিলে আমি রাগ করবো।’
এর জবাবে নাদের মিয়া নিজের জিভে কামড় দিয়ে বললো-
‘আপনে মোজাম্মেল স্যারের অতিথি। আমাগোও মেজবান। আপনের থেইক্যা দাম নেয়াটা পাপ হইবো!’
এ কথায় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে গেলো মৃদুল। চেষ্টা করেও চায়ের দাম দিতে পারলো না ও। নাদের মিয়ার চা পান করে দাম দিতে না পারার অস্বস্তি নিয়ে ফের রিকশায় চড়লো ও। রিকশা চলতে লাগলো। আরো দুই মাইল পথ পেরুবার পর রিকশা এসে থামলো তিথিদের বাড়ির সামনে। ওদের বাড়িটি এল প্যাটার্নের একতলা দালান। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি গেট। রিকশা থামিয়ে বদু মিয়া বললো-
‘স্যার, এইটাই মোজাম্মেল স্যারের বাড়ি।’
মৃদুল রিকশা থেকে নেমে বদু মিয়ার দিকে ১০০ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিলো। এতে সে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলো। সে মাথা চুলকে বললো-
‘আপনার কাছ থেইক্যা ট্যাকা নিবার পারুম না, স্যার!’
বিস্মিত চোখে বদু মিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো মৃদুল। এ রিকশা শ্রমিক সাত মাইল রিকশা চালিয়ে এসে কী বলছে! মৃদুল বেপরোয়া হয়ে উঠলো। ‘যথেষ্ট হয়েছে!’ বলে ও একরকম জোর করে বদু মিয়ার হাতে টাকাটা গুঁজে দিলো। বদু মিয়া ‘না, না’ করে উঠলেও মৃদুলের সাথে পারলো না। সে এক ধরনের লজ্জিতভাবে রিকশা নিয়ে চলে গেলো। মৃদুল সংকোচ ও দ্বিধা নিয়ে তিথিদের বাড়ির খোলা গেট দিয়ে ঢুকে পড়লো। বাড়িতে ঢুকেই এক অকল্পনীয় দৃশ্য দেখতে পেলো ও। তিথি বাড়ির উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে। ওর গায়ে একটি মলিন শাড়ি। শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজা। উঠানে ধূলি উড়ছে। দৃশ্যটি ভীষণ ভালো লাগলো মৃদুলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও ছায়ানটের শিক্ষার্থী গ্রামের একটি সাধারণ মেয়ের মতো বাড়ির উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে, এ দৃশ্য দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না ও। কয়েক সেকেন্ডের বিহ্বলতা। তিথি হঠাৎ মৃদুলকে দেখতে পেলো। মৃদুলকে দেখে ও হতভম্ব হয়ে গেলো। কয়েকটা মুহূর্ত তিথির মুখে কোনো কথাই ফুটলো না। মৃদুল মিটিমিটি হাসতে লাগলো। তিথি যেনো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও অস্ফূট কণ্ঠে বললো-
‘আ-প-নি!’
লজ্জার ভীষণ এক ঢেউ কাঁপিয়ে দিলো তিথিকে। হঠাৎ হাতের ঝাড়ু ফেলে ঝড়ের গতিতে ও দৌড়ে পালালো নিজের রুমের দিকে। মৃদুল ওর দৌড়ে পালানোর দৃশ্যটি উপভোগ করলো। ও বেশ কিছুক্ষণ তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো তিথিদের বাড়ির উঠোনে।
সাঁইত্রিশ মিনিট পর তিথি এলো। এই সাঁইত্রিশ মিনিট মৃদুল অপেক্ষার প্রহর গুনছিল একটি রুমে বসে। রুমটি বৈঠকখানার মতো। তিথি দৌড়ে পালিয়ে যাবার পর মাথায় বড় ঘোমটা দেয়া একজন মহিলা এসে বললো-
‘আপনে আসেন, এই রুমে বসেন। আপা আসতাছেন।’
মহিলা রুমটি দেখিয়ে দিলেন। মৃদুল রুমটির ভেতরে ঢুকে পড়লো। রুমটিতে সারি সারি চেয়ার। একটি টেবিল। একটি খাট। একটি আলমারি। মৃদুল টেবিলের সামনের চেয়ারে গিয়ে বসলো। টেবিলে কিছু বই, খাতা ও খবরের কাগজ পড়ে আছে। ঘোমটা মাথার মহিলা কিছুক্ষণ পর টেবিলের ওপর পাটিসাপটা পিঠা ও পানির গ¬াস রেখে গেলো। যাবার সময় আবার বললো-
‘আপনে অপেক্ষা করেন। আপা আসতাছেন।’
সাঁইত্রিশ মিনিট পর তিথি এলো। এবার অন্য বেশে। ও পড়েছে সালোয়ার-কামিজ। চুল বেঁধেছে। কপালে নীল টিপ। অপূর্ব লাগছে ওকে। কিছুক্ষণ আগে দেখা তিথির সাথে এ তিথির যেনো মিল নেই। তিথি এসে বসলো টেবিলের অন্যপ্রান্তে রাখা চেয়ারে, মৃদুলের মুখোমুখি। ওর চোখে-মুখে লজ্জার রেশ লেগে আছে। মৃদুল আজ প্রস্তুত হয়েই এসেছে। ও আজ সব লজ্জা ভেঙে দিতে চায়। অপ্রকাশের দেয়ালটা ভেঙে ফেলতে চায়। ও আজ হাত বাড়িয়ে তিথির হাত ধরতে চায়। মৃদুলের ভেতরে এ ধরনের প্রস্তুতি তোলপাড় করছে। তিথি মিষ্টি কণ্ঠে বললো-
‘কেমন আছেন?’
‘ভালো নেই।’
মৃদুল অকপটে সত্য স্বীকার করে।
‘কেনো? কী হয়েছে?’
তিথি চোখ রাখে মৃদুলের চোখে। মৃদুল বলে-
‘তেমন কিছু হয়নি। একটা মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিলাম।’
‘কেনো?’
‘আপনার জন্য।’
‘আমার জন্য!’
‘হ্যাঁ। আপনি গ্রামে চলে এলেন। আমাকে একটা ফোন করলে কী এমন হতো, বলুন তো?’
তিথি এর কোনো জবাব দিলো না। ও মৃদুলের দৃষ্টি থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মৃদুল বললো-
‘বললেন না, ফোন করেননি কেনো?’
‘এর জন্য কষ্ট পেয়েছেন!’
তিথির বিস্ময় মিশ্রিত প্রশ্নের জবাব দিলো না মৃদুল। অভিমানেরও নিজস্ব একটা ভাষা আছে। মৃদুল কথা না বললেও সে ভাষাটা কথা বলছে। তিথি দুঃখিত গলায় বললো-
‘এ জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আপনাকে বলে আসাটা ভদ্রতার মধ্যে পড়ে। আমি…।’
‘শুধুই কি ভদ্রতার কথা বলছেন!’
এ প্রশ্নের জবাব দিলো না তিথি। ও মাথা নিচু করলো। মৃদুল বললো-
‘প্রায় দেড় মাস হয়ে গেলো ঢাকা ছেড়েছেন। একটা ফোনও করেননি। আমার ওপর কী, কোনো কারণে আপনি রেগে আছেন?’
‘এ প্রশ্নটার জবাব জানার জন্যই কী এতোদূর এসেছেন?’
তিথির এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মৃদুল বললো-
‘আমাকে উপেক্ষা করে কী আপনি আনন্দ পান?’
এ কথায় তিথি মিষ্টি করে হাসলো। বললো-
‘আপনি আমার ওপর খুব রেগে আছেন, দেখছি! আমি তো ‘সরি’ বলেছি।’
মৃদুল কিছু বললো না। অভিমানটাই ঠোঁট ফুলিয়ে ওঠে। তিথি ফের বললো-
‘আপনি এখন বিশ্রাম নিন। বাবাকে খবর পাঠিয়েছি। তিনি চলে আসবেন। পরে না হয় কথা হবে।’
তিথির এ কথায় রাগ, অভিমান ও কষ্ট মৃদুলের ভেতর একসাথে কঁকিয়ে উঠলো। ও বললো-
‘আপনার বাবা আসার আগে, আপনার সাথে আমি সিরিয়াস কিছু কথা বলতে চাই।’
‘বলুন। কী বলতে চান।’
তিথি সম্মতি জানায়। মৃদুল একটু সময় নিয়ে বললো-
‘তিথি, আমি আমার মাকে কথা দিয়ে এসেছি যে, তার জন্য পুত্রবধূ নিয়ে যাবো।’
মৃদুলের এ কথা শুনে তিথির শরীরটা যেনো কেঁপে উঠলো। ও মাথা নিচু করে ফেললো ফের। মৃদুল বললো-
‘আপনি কি আমার কথা শুনছেন? আমি আমার মাকে কথা দিয়ে এসেছি।’
তিথি এর কোনো জবাব দিলো না। মৃদুল আজ সময় নষ্ট করতে চায় না। ও স্পষ্ট হতে চায়। মনের কথাটি সরাসরি বলে ফেলতে চায়। ও বললো-
‘তিথি, আজ আপনাকে একটা কথা সরাসরি বলতে চাই।’
‘কথাটি বলবেন না, প্লিজ! আমি জানি, আপনি কী বলতে চান।’
তিথির কণ্ঠ কাঁপছে। মৃদুলের ভেতরের ঝড়টা কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ও নিজেকে সংযত করে বললো-
‘আমি এসেছি, আপনার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।’
তিথি দু-হাতে নিজের কান চেপে ধরলো। আর্তনাদের কণ্ঠে বললো-
‘প্লিজ, ওসব বলবেন না, প্লিজ!’
মৃদুল আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। তিথির মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলো। তিথির দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে আসছে। মৃদুল আর কিছুই বলতে পারলো না। তিথি নীরবে কাঁদতে লাগলো। ওর কান্নার সামনে কেমন চুপসে গেলো মৃদুল। ও বুঝতে পারছে না তিথি কেনো কাঁদছে।
এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো পড়েনি মৃদুল। ও অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইলো। তিথিকে কাঁদিয়ে দেবার জন্য তো ও আসেনি। ও ভেবে পাচ্ছে না এখন ও কী করবে। আর কিইবা বলবে। যা বলার তা বলে ফেলেছে। এখন ও শুনতে চায়। বেশ কিছুক্ষণ ও মাথা নিচু করে রাখলো। তিথিও নতমুখী। তিথি মুখ তুললো একসময়। বললো-
‘মৃদুল সাহেব, আপনার-আমার পরিচয়টা অল্পদিনের। এটুকু সময়ে আপনি আমার সম্পর্কে কী জেনেছেন, জানি না। হুট করে এতোদূর ভেবে বসাটা আপনার ঠিক হয়নি।’
‘আমার ভুলটা যে কোথায়, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’
কৈফিয়ত দেয় মৃদুল। তিথি বলে-
‘আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন কেনো?’
‘কারণ, আপনাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। এটা নিশ্চয়ই আপনিও বুঝতে পেরেছেন?’
‘কিন্তু, তা হয় না!’
‘কেনো? আমি কি আপনার যোগ্য নই? তিথি, আপনি আমাকে দায়িত্বশীল হতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিশ্বাস করুন, এরপর থেকে আমি বাউণ্ডেলে স্বভাবটা বদলে ফেলেছি। আমি, আমি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে একটা চাকরি পর্যন্ত জোগাড় করেছি। যা করেছি, সব আপনার জন্য। আমি আজ নিজেকে যোগ্য করেই এসেছি। যদি শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয়, তাহলে বলুন আমার অযোগ্যতা কোথায়?’
মৃদুলের কণ্ঠ কেমন বিমর্ষ হয়ে ওঠে। তিথি শান্ত গলায় বলে-
‘আপনার যোগ্যতা নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই। আমার জন্য আপনি যা করেছেন, তার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কিন্তু…!’
‘কিন্তু কী, বলুন?’
মৃদুল ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তিথি একটু সময় নিয়ে বলে-
‘এ কথা শুনলে আপনি কষ্ট পাবেন।’
‘আমি এমনিতেই কষ্ট পাচ্ছি। যা বলতে দ্বিধা করছেন, বলে ফেলুন, প্লিজ! আমি আজ যে কোনো কষ্টের জন্য প্রস্তুত।’
‘মৃদুল সাহেব, আপনি যে তিথিকে দেখছেন। আমি সেই তিথি নই। দুবছর আগে আমার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের দুমাস পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার স্বামী মারা যান।’
এটুকুই বলে থেমে গেলো তিথি। মৃদুল কোনো কথাই বললো না বা বলতে পারলো না। নদীর তীর ভাঙার মতো ওর ভেতরটা ভাঙছে। ও কষ্টের কুয়াশা থেকে আরো গভীর অতলে হারিয়ে যেতে থাকলো। মুহূর্তগুলো নৈঃশব্দ্যের তানপুরায় গলা সাধছে। তিথি ফের বললো-
‘আমি জানি, এ কথা শোনার পর আপনি কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু আমি এ কথা আপনাকে বলার সুযোগ পাইনি। বা বলার প্রয়োজনবোধ করিনি। আজ আপনি বিয়ের প্রস্তাব দেয়ায় এ কথা বলতে হলো। আপনার কষ্টের কারণ হয়েছি বলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। পি¬জ!’
তিথি ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মৃদুল তিথির অশ্রুভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘সব জানার পরও যদি আপনাকে বিয়ে করতে চাই?’
কথাটি ভীষণ নাড়িয়ে দিলো তিথিকে। ও হকচকিয়ে গেলো। ফ্যালফ্যাল করে তাকলো মৃদুলের দিকে।
মৃদুল আবারো বললো-
‘যদি তারপরও আপনাকে বিয়ে করতে চাই, রাজি হবেন?’
‘কেনো করুণা করতে চাইছেন?’
মাথা নিচু করে জানতে চাইলো তিথি। মৃদুল বললো-
‘আপনি ভুল ভাবছেন। আপনাকে করুণা করার মতো আমার কিছুই নেই। যার কিছু নেই, সে কাউকে করুণা দেখাতে পারে না। আমি সেদিক থেকে একজন নিঃশ্ব-রিক্ত মানুষ। ভালোবাসা ছাড়া আমার অবশিষ্ট কিছু নেই। সে ভালোবাসাটুকুই আপনাকে উজাড় করে দিতে চাই। আপনার সব কষ্টের ভার তুলে নিতে চাই।’
‘কিন্তু, কেনো!’
‘এই কেনোর সঠিক জবাবটা আমার জানা নেই। শুধু জানি, ভালোবাসা মনকে বিশাল করে।’
‘মৃদুল,প্লিজ! ওভাবে বলবেন না!’
‘আমার প্রতি কি আপনি বিশ্বাস রাখতে পারছেন না? কথা দিচ্ছি, আপনাকে কখনো অসম্মানিত করবো না। বিয়েতে মত দিন, প্লিজ!’
তিথি কোনো জবাব দিলো না। মৃদুল ওর জবাবের অপেক্ষা করছে। ওর মন থেকে কষ্টের মেঘ একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। মৃদুল তাগিদ দিয়ে বললো-
‘আপনার বাবা আসার আগে আপনার মতামতটা জানতে চাই। আপনি মত না দিলে আমি এখান থেকেই ফিরে যাবো। কথা দিচ্ছি, আমি আপনাকে আর কখনো বিরক্ত করবো না।’
‘আপনি ফিরে যান, প্লিজ!’
এ কথা বলেই উঠে দাঁড়ালো তিথি। মৃদুলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ও হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। মৃদুল হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলো তিথির চলে যাওয়ার পথের দিকে। দপ করে ওর আশার আলোটা নিভে গেলো। ও কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইলো। এ সময়টুকুতে ওর পৃথিবীতে যেনো ভূমিকম্প হয়ে যাচ্ছে। একসময় ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টেবিলে রাখা খাতার পৃষ্ঠায় তিথির উদ্দেশে চিঠি লিখলো।
‘তিথি,
ছিলাম বিষণ্ন পথিক। আপনাকে ভালোবেসে হতে চেয়েছিলাম বসন্ত পথিক। হতে পারলাম না। কারণ, আজ নিয়তির সঙ্গে হেরে গেলাম। বিশ্বাস করুন, আমি হেরে যেতে চাই না!
নিয়তিকে না মানলেও আজ স্বীকার করছি, নিয়তি যেমন আছে, তেমনি আছে এর পরিহাস। নিয়তি আমার সঙ্গে পরিহাস করতেই যেনো পছন্দ করে। আজো পরিহাসের শিকার হলাম।
তারপরও নিয়তিকে জয় করার ইচ্ছেটাকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলাম। যদি কখনো আমাকে জয়ী করিয়ে দিতে আপনার ইচ্ছে হয়, জানাবেন। আমি আপনার অপেক্ষায় থাকবো। ভালো থাকুন।
– মৃদুল
চিঠিটি লিখে মৃদুল ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। তিথিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ও উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে লাগলো। ওর দুচোখ যেনো ভারী হয়ে আসছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। পা চলছে না। হাঁটতে গিয়ে ও টলছে। এ মুহূর্তে হাউমাউ করে ওর কাঁদতে ইচ্ছে করছে। ও নিজেকে সামলে রাখলো। কিছুক্ষণ আগেও আজকের দিনটিকে এবং এই গ্রামটিকে খুউব সুন্দর লাগছিল ওর। এখন সবকিছুই ওর কাছে কেমন বিষদৃশ্যের মতো লাগছে!
ষোল.
মলির ডাকে ঘুম ভাঙলো মৃদুলের। সকালটা বেড়ে কড়া রোদের কাছিকাছি। জানালা গলে সেই রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। মৃদুল শেষ রাতে বাড়ি ফিরেছিল। মলির ডাকে ঘুম ঘুম চোখে তাকালো ও।
‘ছোটদা, আর ঘুমাতে হবে না। তাড়াতাড়ি ওঠো!’
‘আহ, এমন করছিস কেনো? আমি আরো ঘুমাবো। তুই যা তো!’
মৃদুল বিরক্তি প্রকাশ করে।
‘ছোটদা, তোমাকে এখন উঠতেই হবে। বাড়িতে ভয়াবহ একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে! তুমি ঘুমিয়ে থাকলে তো হবে না!’
মৃদুল জানে মলি ওর সাথে অনেক সময় ফান করে। ও মলির কথায় গা করলো না। বললো-
‘তুই যা তো! বিরক্ত করিসনে। আমাকে ঘুমোতে দে।’
‘আহা! তুমি যে কী! বললাম না বাড়িতে একটা ভয়াবহ কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে!’
এবার মৃদুল মলির প্রতি ভীষণ বিরক্ত হলো। বললো-
‘বাড়িতে মহাপ্রলয় হলেও আমি এখন ঘুমাবো। আমাকে বিরক্ত করিসনে।’
‘তুমি ঘুমালে যে প্রলয়ও হবে না, সৃষ্টিও হবে না!’
মৃদুল বুঝতে পারলো মলির উপদ্রব থেকে ওর নিস্তার নেই। আদরের ছোট বোন বলে মাঝেমাঝে মলির উপদ্রব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। মৃদুল বিছানায় উঠে বসলো। বললো-
‘বল, কী মহাকাণ্ড হতে যাচ্ছে?’
‘হি-হি-হি।’
মলি মৃদুলের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো।
‘তুই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিস কেনো!’
‘ছোটদা, তুমি কি কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছো না!’
মলির কথায় মৃদুল ইন্দ্রিয় শক্তি সর্তক করলো। একটা চাপা কান্নার আওয়াজ ও শুনতে পেলো। আওয়াজটা বাড়ির ভেতর থেকে আসছে। ও বললো-
‘কে কাঁদছে বলতো! কেনো কাঁদছে?’
মলি হাসির দমকায় ফেটে পড়লো। মৃদুল ওর ছোট বোনের এ প্রাণখোলা হাসিটা খুব পছন্দ করে। ও মলির হাসিভরা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। হাসি থামার পর মলি বললো-
‘ছোটদা, বাড়িতে কেউ কাঁদছে না। বাড়িতে সানাই বাজছে!’
‘সানাই!’
‘হ্যাঁ, সানাই!
‘সানাই বাজছে কেনো?’
‘আজ তোমার বিয়ে!’
বলেই মলি হাসতে লাগলো। মৃদুল অবাক চোখ তুলে তাকিয়ে রইলো মলির দিকে। নিজের ইন্দ্রিয় শক্তি আরো বেশি করে কাজ করছে বলে ও সানাইয়ের সুরটা ভালো করে শুনতে পেলো। সানাইয়ের সুর কেনো বাজছে ও বুঝতে পারলো না। মলি যা বলছে, তা সত্যি হবারও নয়। মৃদুলের বিয়ে হবে, আর ও জানবে না- এমন হবার নয়। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠেই বিয়ের পিঁড়িতে কেউ বসেছে বলে ওর জানা নেই। কিন্তু মলির খুশি খুশি ভাবে মনে হচ্ছে বাড়িতে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। ও বললো-
‘লক্ষ্মীবোন আমার, সত্যি করে বলতো, বাড়িতে সানাই বাজছে কেনো?’
‘আমি সত্যি বলছি, আজ তোমার বিয়ে! হঠাৎ করেই এ আয়োজন।’
‘আমার বিয়ে আর আমি জানবো না! আমার সাথে মশকরা করা হচ্ছে, না?’
‘ছোটদা, সত্যি করে বলছি, আজ তোমার বিয়ে। তাই তো তোমাকে ঘুম থেকে তুলতে এলাম। হি-হি-হি।’
এবার কেঁপে উঠলো মৃদুল। আশঙ্কার মেঘ ছড়িয়ে গেলো মনে। মুহূর্তেই ঘুম উবে গেলো। ও চিৎকার করে ডাকলো-
‘মা!’
ওর মা যেনো দরজার পাশেই ছিলেন। তিনি মৃদুলের রুমে ঢুকলেন। বললেন-
‘এমন ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেনো?’
‘মা, বাড়িতে সানাই বাজছে কেনো? মলি কী যা তা বলছে!’
‘ও যা তা বলতে যাবে কেনো? ও যা বলেছে, সত্যিই বলেছে।’
বিস্ময়ের আরেকটা ধাক্কা এসে লাগলো। ও বললো-
‘তুমি এসব কী বলছো! আজ আমার বিয়ে!’
‘হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।’
‘মা, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে!’
‘তুই আমার মাথা কখনো ঠিক থাকতে দিয়েছিস?’
‘মা! আমি কি বলেছি যে, বিয়ে করবো। তোমরা কার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করলে! আমি তো কিছুই জানি না! শেষ রাতে এসে ঘুমালাম, সকালে শুনছি আমার বিয়ে! এ রহস্যের কারণ কী?
এর জবাব দিলো মৃদুলের ভাবী নীতা। সে মৃদুলের রুমে প্রবেশ করার সময় বললো-
‘তুমি যে সব সময় রহস্য করতে পছন্দ করো, তাই এ রহস্যের আয়োজন।’
‘ভাবী!’
নাজমা রায়হান নীতার উদ্দেশে বললেন-
‘বউমা তুমি ওকে তৈরি হতে বলো, আমি অন্যদিকটা সামলাচ্ছি।’
তিনি বেরিয়ে গেলেন। মলিও চলে গেলো তার সাথে। মৃদুল ওর ভাবীর দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বললো-
‘ভাবী, সত্যি করে বলো তো, মা যা বললেন তা সত্যি কি-না?’
‘হ্যাঁ, মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় আছে, তুমি তৈরি হয়ে নাও।’
‘বুঝেছি, তোমরা কোনো ষড়যন্ত্র করছো। বাবা ও ভাইয়া কোথায়? আমাকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
মৃদুলের কথায় মিটিমিটি হাসতে লাগলো নীতা। বললো-
‘তারা বাইরে গেছেন বিয়ের জরুরি কিছু কেনাকাটার জন্য।’
‘উফ, ভাবী! আজকের দিনটা যে কীভাবে শুরু হলো! আমি যেনো পরিহাসের পাত্র হয়ে গেলাম!’
নীতা রসিকতার সুরে বললো-
‘বিয়ে তো একদিন না একদিন তোমাকে করতেই হবে। তা আজকে করলে দোষটা কোথায়, শুনি?
‘ভাবী, আমি কোনোদিন বিয়ে করবো না। আজকেও না।’
‘তাই না-কি! কেনো?’
‘সব সময় সব কেনোর জবাব দেয়া যায় না।’
‘এর জবাব আমাকে না দিলেও যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছো, তাকে কিন্তু দিতে হবে!’
‘তাকে আমার মুণ্ডু দেবো! দাঁড়াও আমি পালাচ্ছি! দেখি, আমাকে বিয়ে দেয় কে?’
বলেই বিছানা থেকে লাফিয়ে নামলো মৃদুল। ভয় পেয়ে নীতা বললো-
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, পালাতে হবে না। তিথিকে বলছি, তুমি বিয়েতে রাজি নও। জোর করে কি, কাউকে বিয়ে দেয়া যায়!’
তিথির নাম শোনামাত্রই মৃদুল থমকে গেলো। একটা আর্তস্বর ওর কণ্ঠ পর্যন্ত উঠে আটকে গেলো। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না। বিস্ময় থেকে আরো গভীর বিস্ময়ে তলিয়ে যেতে থাকে ও। নীতা ওর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে ফোঁড়ন কেটে বললো-
‘বাহ, নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই দেখছি, দেবর আমার কেমন মূর্তি হয়ে গেলো! বলছিলাম কী, তিথিকে এখন কী বলবো? তোমার জবাবটা এখনই জানতে চাই।’
মৃদুল সীমাহীন অতল এক রহস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চিন্তাশক্তিও থমকে গেছে। ও বোকার মতো চেয়েই রইলো নীতার মুখের দিকে।
‘এমন ভ্যাবলাকান্তের মতো চেয়ে আছো কেনো? জবাব দাও। জবাব হ্যাঁ হলে আমাকে এখনই বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন করতে হবে।’
‘ভাবী, আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। তিথির কথা তুমি জানো কী করে! ওর সাথে আমার বিয়েও বা হবে কী করে!’
‘তোমার কাছ থেকে কি আর ওর কথা জানতে পেরেছি? ও আজ সকালে নিজে এসেই সব জানালো।’
‘তিথি এখানে! আই মিন, আমাদের বাড়িতে!’
‘হ্যাঁ। কেনো সে কি আসতে পারে না?’
‘ও কোথায়!’
‘বাহ, ওকে দেখার জন্য দেখছি মরিয়া হয়ে গেলে! তা বিয়ের আয়োজন তাহলে করবো?’
‘ভাবী, তোমার যা ইচ্ছা করো। আমি তিথির সাথে কথা বলতে চাই।’
এ সময় তিথি মৃদুলের রুমে ঢুকলো। ওর পেছনে মলি। মৃদুলের বিস্ময়বোধ যেনো লোপ পেয়ে গেছে। তিথির দৃষ্টি অবনত। মৃদুল তিথিকে দেখে বাকরুদ্ধ। নীতা বললো-
‘কনের সাথে কথা বলে নাও। তোমার ভাই কাজি আনতে গেছেন। আজ দুপুরেই তোমাদের বিয়ে।’
এ কথা বলে নীতা মলিকে নিয়ে চলে গেলো। যাবার সময় রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেলো সে।
তিথি দাঁড়িয়ে আছে অনেকটা অপরাধীর মতো। চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। মৃদুল অন্য সময় হলে লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরে থাকার জন্য সংকোচবোধ করতো। এ ধরনের পোশাকে ও কখনো তিথির সামনে দাঁড়ায়নি। কিন্তু এখন ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। মৃদুল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। একটু দম নিয়ে বললো-
‘তিথি, আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, এ যেনো স্বপ্নের মতো লাগছে! আমি কি স্বপ্ন দেখছি?’
‘না।’
জবাব দিলো তিথি।
‘কিন্তু সেদিন যে আমাকে ফিরিয়ে দিলেন!’
‘আপনাকে ফেরাতে পারলেও নিজেকে ফেরাতে পারিনি। তাই তো চলে এলাম।’
‘কীভাবে এলেন?’
‘বাহ রে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন মেয়ে বুঝি একা আসতে পারে না! তবে আমি আমার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।’
‘তাই না-কি! তিনি কোথায়?’
‘বাবা আপনাদের ড্রইংরুমে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন।’
‘তা বাড়িতে এসে কী বললেন?’
‘প্রথমে আপনার মা-বাবাকে সালাম করলাম। তারা তো আমাকে দেখে অবাক। আপনার ভাবীকে বললাম, ‘আমি মৃদুলের বউ’। তার মনে দ্বন্দ্ব ছিল। তাই আপনার লেখা পত্রটা তাকে দেখালাম। ব্যাস, এতেই কাজ হলো।’
‘আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে!’
‘আপনি খুশি হয়েছেন?’
‘অ-নে-ক! আমার ঘোর কাটছে না! আচ্ছা,আপনি কি আমার মা-ভাবীকে আপনার আগের বিয়ের কথাও বলেছেন?’
এ প্রশ্নে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো তিথি। হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো ওর সর্বাঙ্গে। মৃদুল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। তিথি বললো-
‘বুদ্ধু, আমার আগে বিয়ে হয়নি!’
‘সেদিন যে বললেন!’
‘আপনাকে পরখ করার জন্য ও কথা বলেছিলাম।’
‘আশ্চার্য! কেনো!’
বিস্ময় প্রকাশ করে মৃদুল। তিথি এ প্রশ্নের অপেক্ষায়ই ছিল। ও কৈফিয়ত দিতে চায়। ও বললো-
‘আপনার আমার পরিচয়টা অল্প সময়ের। এ সময়ের মধ্যে আমরা যতোটুকু মেলামেশা করেছি, তাতে একে-অন্যকে সবটুকু জানা যায় না। মানুষ হিসেবে আপনি কেমন, চিন্তায় কতোটা আধুনিক, চেতনার দিক থেকে কতোটা মানবিকতাসম্পন্ন, ভালোবাসার জন্য কতোটা বিশ্বস্ত, নির্ভর করার মতো কতোটা দায়িত্ববান- তা বোঝার সুযোগ নেই। তাই আপনি যখন ভালোবাসার দাবি নিয়ে আমাকে জীবনসঙ্গী করার জন্য হাত বাড়ালেন, তখন আমার শরীর ও আত্মা অপ্রার্থিব আনন্দে কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সে সময় আমি আমার আবেগকে সংযত রেখেছি। কেনো জানি, তখন আপনাকে ভালো করে জানবার সাধ হলো। আপনার মনের উদারতা পরখ করার ইচ্ছে হলো। তাই মিথ্যে করে বলেছিলাম যে, আমার বিয়ে হয়েছিল।’
তিথির কথা শুনে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলো মৃদুল। কতোটা কষ্টের আগুনে ও পুড়েছে, পুড়ে পুড়ে খাঁক হয়েছে- তা কি তিথি জানে? মৃদুল বললো-
‘চমৎকার! গল্পকারের সাথেই গল্পের ফাঁদ!’
‘জ্বি, জনাব।’
তিথি মুচকি হাসলো। ওর চোখও হাসছে। ওকে ভীষণ খুশি দেখাচ্ছে। মৃদুল কৌতূহলী গলায় বললো-
‘তাহলে পরীক্ষায় পাস হয়েছি?’
‘হয়েছেন। সেদিন ভেবেছিলাম, পরে সত্যটুকু জানিয়ে দেবো। কিন্তু এসে দেখি আপনি নেই। এভাবে কেউ পালিয়ে আসে?’
কপট অভিমান তিথির কণ্ঠে। মৃদুল বললো-
‘দেহটা নিয়েই তো পালিয়ে এসেছি। মন তো রেখে এসেছিলাম আপনার কাছেই।’
‘তাই তো ছুটে এসেছি। আমাকে আপনি ক্ষমা করে দেবেন।’
‘কেনো?’
‘আপনার পরীক্ষা নিয়েছি বলে।’
‘না, এর জন্য কঠিন শাস্তি ও জরিমানা ঘোষণা করছি।’
‘কী শাস্তি ও জরিমানা!’
‘শাস্তি হচ্ছে আজই আমার মতো বাউণ্ডুলেকে তোমাকে বিয়ে করতে হবে।’
‘আর জরিমানা?’
‘আমি যখন নিরুদ্দেশ হবো তখন সঙ্গে থাকতে হবে। রাজি?’
‘রাজি।’
খিলখিল করে হেসে উঠলো ওরা দুজন।
সানাইয়ের সুরটা এ সময় হঠাৎ বেড়ে গেলো।
নষ্ট জীবন
এক.
মেয়েটি পুলকের পথ আটকে দাঁড়িয়ে বললো-
‘একজন মানুষ মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে বসেছেন, আর আপনারা কোনো সহযোগিতা করছেন না! আপনাদের মনুষ্যত্ব বলতে কিছু নেই?’
পুলক মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটির গায়ে মেরুন রঙের মলিন তাঁতের শাড়ি। মাথার চুল খোলা। এলোমেলো। মলিন মুখ। চোখের নিচে কালচে রং। গায়ের রংটা ফর্সা হলেও রোদে পুড়ে তা তামাটে হয়ে গেছে। মেয়েটির মুখায়বে কোথাও একটা সৌন্দর্যের ঝিলিক যেনো আছে। ওর অবয়বজুড়ে এক তাল বিষণ্নতা ফুটে রয়েছে। বিপদে পড়লে এ ধরনের মেয়েরা চট করেই চোখে-মুখে গভীর বিষণ্নতা ফুটিয়ে তুলতে পারে। পুলক দ্রুত মেয়েটির মুখ থেকে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। পুলকের সঙ্গে এই মেয়েটির দেখা হয়েছে আরো দুবার। তখন ও মেয়েটিকে ভালো করে দেখেনি। দেখার প্রয়োজনবোধ করেনি। এবার একটু তাকিয়ে দেখে নিলো। মেয়েটির অনুরোধে সাড়া দেয়া ঠিক হবে না বলে মনে মনে ঠিক করে নিলো পুলক। মেয়েটি খুবই অকৃতজ্ঞ শ্রেণির একজন মানুষ। তাই মেয়েটিকে ও উপেক্ষা করে যাচ্ছিল। এ ধরনের মেয়েদের উপকার করা ঠিক নয়। এক ধরনের মানুষ আছে, যারা বিপদে পড়লে বিনয় বিগলিত হয়ে যায়। আবার বিপদ কেটে গেলে বেমালুম চোখ উল্টে ফেলে। পুলক অকৃতজ্ঞ শ্রেণির কাউকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এই মেয়েটিকে উপকার না করে বরং ওকে এখন কষে একটা থাপ্পড় মারতে পারলে ওর ভালো লাগতো- ভাবলো ও। কিন্তু ও মেয়ে মানুষের গায়ে হাত তোলে না। মেয়েদের সব সময় সম্মান দিয়ে ও কথা বলে।
মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দাঁড়িয়ে আছে পুলক। ও বাহারকে দেখতে এসেছিল হাসপাতালে। বাহার ওর নতুন শিষ্য। ও মাস্তানির লাইনে নতুন। দুলুর লোকজন আজ বাহারকে একা পেয়ে বেধড়ক পিটিয়েছে। গুরুতর আহতাবস্থায় ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ খবর পেয়ে বাহারকে দেখতে ও হাসপাতালে ছুটে এসেছে। এ লাইনে নতুনাবস্থায় বেকায়দায় পড়ে অনেকের মার খেতে হয়। বাহারও খেয়েছে। পুলক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আসতেই মেয়েটির মুখোমুখি পড়লো। মেয়েটিকে ও প্রথমে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে এড়িয়ে যেতে পারলো না। মেয়েটি ওর পথ আটকে দাঁড়ায়। মেয়েটি এবার অনুনয়ভরা কণ্ঠে পুলকের উদ্দেশে বললো-
‘আমার বাবার স্ট্রোক হয়েছে। ইমার্জেন্সিতে তিনি পড়ে আছেন। কোনো ডাক্তার আসছেন না। আমাকে হেল্প করুন, প্লিজ!’
এ ধরনের অনুরোধ উপক্ষো করে না পুলক। বরং স্বেচ্ছায় এগিয়ে যায়। কিন্তু এই মেয়েটির প্রতি ওর তীব্র রাগ জমে আছে। মাত্র তিন মাস আগে ও মেয়েটিকে ভয়াবহ এক বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল। সেদিন রাতে ও এগিয়ে না এলে মেয়েটি অপহৃত হতো পারতো। এমনকি ধষর্ণের শিকার হতেও পারতো। তিন মাতাল ধরেছিল ওকে। সম্ভবত রাত করে বাড়ি ফিরছিল মেয়েটি। গলির মুখে তিন মাতাল মেয়েটির রিকশা থামিয়েছিল। এরপর চাকু বের করে ওকে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল ওরা। ওই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিল পুলক। মেয়েটির চিৎকার শুনে এগিয়ে গিয়েছিল ও এবং বখাটে মাতালদের হাত থেকে রক্ষাও করতে পেরেছিল ওকে। সেদিন রাতে ও মেয়েটিকে ওদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছেও দিয়েছিল। এর এক মাস পরই মেয়েটির কাছ থেকে ও উল্টো প্রতিদান পেলো। টহল পুলিশের ধাওয়া খেয়ে সেদিন অনেকটা কাকতালীয়ভাবে পুলক আশ্রয় নিয়েছিল মেয়েটির বাড়িতে। খোলা দরজা দিয়ে ও দৌড়ে ঢুকে পড়েছিল ওদের বাড়ির ভেতরে। মেয়েটির কাছে মাত্র তিরিশ মিনিটের আশ্রয় চেয়ে লুকিয়ে পড়েছিল ও। পুলিশ ওদের বাসায় এসে নক করতেই দরজা খুলে দিলো মেয়েটি। শুধু তাই নয়, পুলিশ ওর কাছে ‘পুলক এখানে এসেছে কি-না’ জানতে চাইতেই ও পুলককে দেখিয়ে দিয়েছিল। পুলক সেদিন অবাক চোখে দেখেছিল মেয়েটির অকৃতজ্ঞতা! পুলিশের কাছে একটা মিথ্যা কথা বললে কী এমন ক্ষতি হতো? আজ আবার এই মেয়েটিই পুলকের কাছে সহযোগিতা চাইছে। আশ্চার্য! পুলক মেয়েটিকে কিছু বলার আগেই ঠাণ্ডু ওর পেছন থেকে বললো-
‘অই মাইয়া, তোমার সাহস তো কম না! বসের পথ আটকাইয়া আছো? একদম ফুটা কইরা দিমু!’
ঠাণ্ডুর কথায় মেয়েটি একটুও ঘাবড়ালো না। ও পুলকের দিকে তাকিয়ে ফের বললো-
‘একজন মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, আর আপনারা একজন অসহায় মেয়ে মানুষকে ফুটা কইরা দেবার হুমকি দিচ্ছেন! আপনাদের বিবেক বলতে কিছু নেই?’
মেয়েটি বিবেকের কথা বলছে দেখে পুলক বিস্মিত হলো। এ যেনো ভূতের মুখে রাম নাম। পুলিশের হাতে পুলককে তুলে দেবার সময় তার বিবেকটা কোথায় ছিল? এ প্রশ্নে একটু হাসলো পুলক। মেয়েটি বললো-
‘আপনি হাসছেন! একজন লোক বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে, আর আপনি তা শুনে হাসছেন!’
পুলক এবার কথা না বলে পারলো না। ও বললো-
‘আপনাকে উপকার কেনো করবো? আপনি তো উপকারীর অপকার করেন!’
‘আজকের উপকারটা না হয় করুণা করেই করেন। কথা দিচ্ছি, যদি কখনো সুযোগ পাই, তবে এর প্রতিদান আপনাকে দেবো, প্লিজ!’
মেয়েটির এ কথা শুনে পুলকের ভীষণ হাসি পেলো। ও হাসি সামলে নিলো। এ মেয়েটি ওর কী উপকার করবে, তা ভেবে পেলো না ও। তবু মেয়েটির কথায় ও কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। কেনো জানি, মেয়েটির জন্য ওর মায়া হতে লাগলো। মেয়েটি অসহায় গলায় আবারো বললো-
‘বিশ্বাস করুন, আমার আপনজন বলতে কেউ নেই এই শহরে। আমাকে একটু হেল্প করুন!’
পুলক এবার গলে গেলো। বাইরে থেকে ওকে যতোটা কঠিন মনে হয়, আসলে ভেতরে ও ভীষণ নরোম। কারো ঘোর বিপদ দেখলে ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। পুলক মেয়েটির উদ্দেশে বললো-
‘ঠিক আছে, চলুন। দেখি কী করতে পারি।’
মেয়েটির দুচোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু নেমে এলো। পুলক দৃষ্টি সরিয়ে নিলো মেয়েটির মুখ থেকে।
ইমার্জেন্সি বিভাগের যে রুমটিতে ডাক্তার বসেন, পুলক সেখানে এলো। ওর পেছনে ঠাণ্ডু ও রহমতও এলো। ওদের পেছনে মেয়েটি। ঠাণ্ডু ও রহমত দুজনই পুলকের শিষ্য। ঠাণ্ডু কথা বলে বেশি আর ভীতু। রহমত ঠিক এর উল্টো। রেসিডেন্স মেডিকেল অফিসার অর্থাৎ আরএমও তার রুমে চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে একটি সিনে ম্যাগাজিন পড়ছিলেন। পুলক আরএমওর উদ্দেশে বললো-
‘ডাক্তার সাহেব, একজন মুমূর্ষু রোগী ইমার্জেন্সিতে অবচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন, আর আপনি বসে বসে সিনে ম্যাগাজিন পড়ছেন!’
পুলকের কথায় ম্যাগাজিনের পাতা থেকে চোখ তুললেন আরএমও। তিনি বিরক্ত চোখে তাকালেন পুলকের দিকে। এরপর আরএমও অলস একটি হাই তুলে বললেন-
‘রোগীর কী হয়েছে?’
‘স্ট্রোক!’
পেছন থেকে তড়িঘড়ি জবাব দিলো মেয়েটি। আরএমও অলস ভঙ্গিতে বললেন-
‘প্যাসেন্টকে রেফার করে দিচ্ছি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান।’
কথাটি বলে আরএমও ফের সিনে ম্যাগাজিনে চোখ রাখলেন। যেনো রোগী নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। পুলক অবাক ও ক্ষুব্ধ হলো আরএমওর এই আচরণ দেখে। এই আরএমও যে নতুন এসেছে, তা ও বুঝতে পারছে। নইলে পুলককে চিনতে পারতো এবং সমীহ করে কথা বলতো। পুলক এবার ঠাণ্ডা গলায় বললো-
‘ডাক্তার সাহেব, এতো রাতে মুমূর্ষু রোগীকে ঢাকায় কীভাবে নেবো? যদি নিজের ভালো চান, ম্যাগাজিনটা রেখে রোগীর চিকিৎসা করুন!’
এ কথায় আরএমও রাগী চোখে তাকালেন পুলকের দিকে। তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বললেন-
‘আপনার কথায় আমি কাজ করবো না-কি? আপনি কে? কোথাকার লাটবাহাদুর?’
পুলকের মাথায় রক্ত উঠে গেলো। ও জোরে একটা চড় মারলো আরএমওর গালে। ‘ঠাস’ একটা শব্দ হলো। এক চড়েই অরএমও পড়ে গেলেন মেঝেতে। রহমত এগিয়ে এসে তার কোমর বরাবর একটা লাথি মারলো। ‘কোৎ’ করে শব্দ বেরিয়ে এলো আরএমওর মুখ থেকে। পুলক এবার আরএমওকে তার শার্টের কলার চেপে টেনে তুললো ফ্লোর থেকে। আরএমওর শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো। পুলক কিছু বলে ওঠার আগেই আরএমও মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে দুহাত তুলে বললেন-
‘স্যার, স্যার! আমি আপনাকে চিনতে পারি নাই। আমি এখনই রোগীর চিকিৎসা করছি। আমাকে আর মারবেন না, প্লিজ!’
পুলক তার শার্ট ছেড়ে দিলো। বললো-
‘এখনই রোগীর চিকিৎসা কর। নইলে তোর মতো ডাক্তারকে আজ ধলেশ্বরীতে ভাসিয়ে দেবো!’
খুব রেগে গেলে পুলক প্রতিপক্ষকে ‘তুই’ করে কথা বলে। আরএমও পুলকের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে দৌড়ে গেলেন রোগীর চিকিৎসা করতে। সব কিছু ঘটলো এতোই দ্রুত যে, মেয়েটি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো অনেকক্ষণ। পুলক ডাক্তারের টেবিলের ওপর বসলো। মেয়েটির উদ্দেশে বললো-
‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? যান গিয়ে দেখেন, ডাক্তার আপনার বাবার চিকিৎসা করছে কি-না। আমি আছি। চিকিৎসা না করলে ডাকবেন।’
মেয়েটি দ্রুত চলে গেলো। আরএমওর রুমের বাইরে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো। পুলক বাইরের গুঞ্জন নিয়ে মাথা ঘামালো না। ঠাণ্ডু নিজের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বললো-
‘বস, শালা, ডাক্তাররে এতো সহজেই ছাইড়া দিলেন? আমার ইচ্ছা করতাছিল, ওর মুখে পেচ্ছাব কইরা দেই। ডাক্তারের মুখে গরম পেচ্ছাব! হা-হা-হা।’
‘শাট-আপ! যা তোরা বাইরে যা। বাইরের কী অবস্থা, ওয়াচ কর।’
পুলকের ধমকে চুপসে গেলো ঠাণ্ডু। রহমত বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। ওকে অনুসরণ করলো ঠাণ্ডু।
পুলক ডাক্তারের ফেলে যাওয়া সিনে ম্যাগাজিনটা তুলে পাতা উল্টাতে লাগলো। ম্যাগাজিনজুড়ে শো-বিজ তারকাদের নিয়ে রগরগে ছবি আর নানা গল্পের ফানুস। ও ডুবে যেতে লাগলো ওসব গল্পে। প্রায় বিশ মিনিট পর পুলকের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। রহমতের ফোন। ও ফোন অন করলো।
‘হ্যালো…।’
‘বস, জলদি কাইট্যা পড়েন!’
‘কেনো?’
‘মামুরা আইসা পড়ছে!’
‘পুলিশ!’
‘হ। ওই ডাক্তার শালা পুলিশ রে খবর দিছে। ইমার্জেন্সিতে দেখলাম, পুলিশ ওই মাইয়ার সাথে কথা বলতাছে।’
‘মেয়েটি পুলিশকে কী বললো?’
‘আপনে যে ডাক্তার রে মারছেন, সম্ভবত ওই মাইয়া পুলিশের কাছে সাক্ষী দিছে!’
‘বলিস কী! সত্যি!’
‘সত্যি! আপনি তাড়াতাড়ি ফোটেন!’
তড়িঘড়ি টেবিল থেকে লাফিয়ে নামলো পুলক। কিন্তু পালাতে পারলো না ও। ততোক্ষণে পুলিশ এসে ঘেরাও করে ফেললো আরএমওর অফিস। দরজার সামনে একদল পুলিশ দেখতে পেলো ও। পুলক মুহূর্তেই বুঝে নিলো পুলিশের বেষ্টনী থেকে ও এখন পালাতে পারবে না। সুতরাং, ও পালানোর চেষ্টা করলো না। ও দুহাত তুলে পুলিশের কাছে সারেন্ডার করলো। ও তেমন ভয় পেলো না। ও জানে, খুব তাড়াতাড়ি ও বের হয়ে আসবে থানার হাজত কিংবা জেল থেকে। তখন ও দেখে নেবে ডাক্তার আর ওই অকৃতজ্ঞ মেয়েটিকে। বেইমানদের একটা শিক্ষা দিবে ও। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো।
দুই.
বাড়িটায় এখন সুনসান নীরবতা। ছোট্ট বাড়ি। ছোট্ট উঠোন। এই বাড়ি থেকে উঠোন পর্যন্ত একটা শূন্যতা জমে আছে। এই শূন্যতা যেমন গভীর, তেমনি অস্থিত্বময়। এ ধরনের শূন্যতাকে ইচ্ছা করলেই ঝেড়ে ফেলে দেয়া যায় না। একজনের শূন্যতা বাড়িটিতে জমাট বেঁধে আছে। গতকালও এই বাড়িতে একজনের উপস্থিতি ছিল। তার থেমে থেমে খুকখুক কাশির শব্দ ছিল। আক্ষেপ ছিল, দীর্ঘশ্বাসও ছিল। আজ নেই। অমোঘ মৃত্যু বদলে দিয়েছে দৃশ্যপট। জলির বাবা জামাল উদ্দিন গতকাল মারা গেছেন হাসপাতালে। প্রথম স্ট্রোকেই পরপারে চলে গেলেন তিনি। বাবার আকস্মিক মৃত্যুকে মানতে পারছে না জলি। বাবাই ছিল ওর একমাত্র অভিভাবক। ওর এক মামা আছেন। থাকেন নীলফামারীতে। তিনি বিয়ে করে শ্বশুড়বাড়িতে থিতু হয়েছেন। মামার সঙ্গে ওদের যোগাযোগ খুব একটা নেই। তাই কার্যত সংসারে বাবা ছাড়া আপন বলতে ওর আর তেমন কেউ নেই। বাবার মৃত্যু একেবারেই নিঃসঙ্গ এবং অসহায় করে দিয়েছে ওকে। ডাক্তার সময়মতো চিকিৎসা করলে হয়তো ওর বাবাকে বাঁচানো যেতো। এ নিয়ে জলির আফসোসের শেষ নেই। ও এখন কীভাবে থাকবে এবং কী করবে এই দুঃশ্চিন্তা ওকে তাড়া করে ফেরার কথা। প্রতিবেশীরা ওকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছে। কিন্তু জলির মধ্যে এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তার ছায়া নেই। কারণ, ও জীবনমৃত একজন মানুষ। ও শুধু বেঁচে আছে। বাবাকে হারিয়ে ওর হারাবার মতো এখন আর কিছুই নেই। জলি বসে আছে ওদের বাড়ির বারান্দায়। তীর্যক রোদের বিকেল নেমে এসেছে বাড়ির আঙিনায়। দখিনা বাতাস থেমে থেমে আছড়ে পড়ছে গাছের ডালে, বাড়ির চালে, খোলা আঙিনায়। আজ ভ্যাপসা গরম নেই। বাতাসে মৌ মৌ গন্ধ। কিন্তু জলির ইন্দ্রীয়তে শুধু আগরবাতির গন্ধ। জলির বাবার মরদেহ কবর দেয়া হয়েছে দুপুরে। মরা বাড়ির আগরবাতির পবিত্র গন্ধ সহজে সরতে চায় না। তীব্র হাহাকারভরা মনে জলি ভাবছিল, বাড়ির উঠোনে ওর বাবা আর পায়চারি করবেন না। বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়বেন না। জলিকে একটা সৎ পাত্রের কাছে বিয়ে দেবার স্বপ্ন নিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথার জালও বুনবেন না। এই তো পরশু ওর বাবা জলিকে ডেকে বলছিলেন-
‘তোকে একটা সৎ পাত্রের দেখে বিয়ে দিতে পারলেই আমার শান্তি। নইলে মরেও শান্তি পাবো না।’
জলি রান্না করছিল রান্নাঘরে। ও রান্নাঘর থেকে বললো-
‘বাবা, সবাই মেয়েকে সৎ পাত্রের কাছে তুলে দিতে চায়। কোনো ছেলেকে সৎ মেয়ের কাছে তুলে দিতে চায় না কেনো?’
প্রশ্নটি জলির মনে অনেকদিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। ও বাবার কাছে জানতে চাইলো। জলির বাবা জামাল উদ্দিন জানেন, তার মেয়ে একটু অন্যরকম। সব কিছুর একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজতে চায়। নইলে বিপরীত দিক থেকে প্রশ্ন করে বসে। তিনি জবাবে বললেন-
‘সমাজে এ রকমটাই চলে আসছে, মা। আমরা সে পথটাকেই অনুসরণ করে যাচ্ছি।’
‘সেটাই তো জানতে চাই, তোমরা কোনো প্রশ্ন না করে কেবল একটা ধারাকে অনুসরণ করে যাচ্ছো। একবারো ভাবছো না, এর যৌক্তিকতা কী। উল্টোদিক থেকে তোমরা চিন্তা করে দেখতে চাও না। কেনো?’
বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই জলি নানাভাবে বাবার সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিতো। ওর বিয়ের ব্যাপারে ওর বাবাকে নিরুৎসাহিত করতেই ও নানা প্রশ্ন করতো। জামালউদ্দিন মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ তুলে আলোচনা করলেও মেয়ের প্রশ্নবাণে একপর্যায়ে চুপসে যেতেন। জলি এখন ভাবছে, ওর বাবা আর ওর বিয়ের প্রসঙ্গ তুলবে না। জলিও প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে না বাবাকে। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
‘কী রে, মা, সারাদিন অমন মন খারাপ করে বসে থাকলে হবে? হায়াত-মউত হচ্ছে আল্লাহর হাতে।’
হাসিনা খালার কথায় নিজের চিন্তায় ছেদ কাটে। হাসিনা খালা হচ্ছে জলিদের প্রতিবেশী। জলিকে সন্তানের মতোই স্নেহ করেন। তিনি অত্যন্ত স্নেহময়ী এক নারী। তার অভাবের সংসার। ভালো কিছু রান্না করলেই তিনি জলির জন্য নিয়ে আসবেন। গত শনিবার এক বাটি ইলিশ মাছের তরকারি এনে তিনি বললেন-
‘দেখতো মা, পিঁয়াজ দিয়ে ইলিশ মাছের দোপেঁয়াজি রান্নাটা কেমন হইছে? একটু খাইয়া দেখ। এক টুকরা মাছ আনছি। ভালো লাগলে আরো দিয়া যামু নে।’
জলি জানে, তাদের ইলিশ মাছ কেনার তেমন সামর্থ্য নেই। ডাল-ভাত জোগাড় করতেই তারা হিমশিম খায়। ও বললো-
‘খালা, তোমাকে না বলেছি, আমার জন্য তুমি কিছু আনবে না।’
‘আহা, তুই এমন করতাছস কেনো? তোর খালু আজ একটা বড় সাইজের পদ্মার ইলিশ নিয়ে আইসা বললো, মানুর মা, ইলিশ মাছটা পিঁয়াজ দিয়া ভালো কাইরা রান্না করো। অনেকদিন ধইরা পাইন্যা খোলা খাই না। এ কথা বইল্যা তিনি খালঘাটে গোসল করতে গেলেন। আমি যত্ন কইরা রান্না করলাম। তোরে ছাড়া কী এই মাছ আমি খাইতে পারি?’
জলি জানে, এসব হাসিনা খালার বানানো কথা। তার স্বামী জমির আলী কোনো কাজ করেন না। সে হাটে হাটে-গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। বাড়ি ফিরেন কখনো এক মাস, কখনো দুই মাস বা কখনো তিন মাস পর। গ্রামে গ্রামে পালাগানের আসরে তিনি ঢোল বাজান। তাকে ঢোলক হিসেবে সকলে চেনে। তার উপার্জন খুবই সামান্য। হাসিনা খালার সংসারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। তার পঁচিশ বছর বয়সী একটি ছেলে আছে। নাম মানু। মানু বখে গেছে। জুয়ার আসরেই পড়ে থাকে সে। বাড়ি ফেরে মধ্যরাতে। সংসারে কোনো সহযোগিতা সে করে না। হাসিনা খালা রাইস মিলে ধান শুকানোর কাজ করে সংসারটা চালাচ্ছেন। তার মিথ্যা বলাটা জলি খুব সহজেই ধরতে পারে। তিনি যখন মিথ্যা কথা বলেন, তখন হরহর করে কথা বলে ফেলেন। মিথ্যা কথা বলতে হলে হরহর করেই বলতে হয়। নইলে সত্য কথা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। জলি মুচকি হেসে বললো,
‘খালা, তোমার বড় ইলিশ মাছটার কতগুলো টুকরো হয়েছে, শুনি?’
এ কথায় দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো হাসিনা বেগম। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন বড় একটা ইলিশ মাছের কতোগুলো টুকরো হতে পারে। খালার তাৎক্ষণিক জবাব না পেয়ে জলি বললো-
‘এবার সত্যি করে বলো তো, কতো টুকরো মাছ কিনেছো? এবং কতো টাকা দিয়ে?’
এ কথায় ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলেন হাসিনা বেগম। জলির কাছে তিনি মিথ্যা বললেই ধরা পড়ে যান। তিনি আমতা আমতা করে বললেন-
‘তুই যে কী! শোন, কাল রাইতে তোর খালুজান বাড়ি ফিরেছে। সকালে ভাবলাম, অনেকদিন পর তিনি বাড়ি ফিরলেন, তাকে ভালো-মন্দ কিছু রান্না কইরা খাওয়াই। গেলাম বাজারে। মাছের যে দাম! ইলিশ মাছের চার টুকরা কিইন্যা আনলাম পঁচিশ ট্যাকা দিয়া! তোর খালু ইলিশ মাছ খুব পছন্দ করে, বুঝলি মা?’
‘যে লোকটা তোমার খোঁজখবর ঠিকমতো রাখে না। ভরণ-পোষণ দেয় না। তাকে তুমি ইলিশ মাছ খাওয়াচ্ছো!’
‘মারে, স্বামী বইল্যা কথা। স্বামীর ওপর রাগ করতে নাই।’
হাসিনা খালার পতিভক্তি দেখে অবাক হয় জলি। যে পুরুষ মানুষটার দায়িত্বজ্ঞান নেই, তারই সামনে অপরিসীম শ্রদ্ধায় মোমের মতো গলে পড়ছে সে।
জলির কোনো জবাব না পেয়ে হাসিনা বেগম সান্ত¦না দেবার গলায় ফের বললো-
‘মনটারে শক্ত কর, মা। আল্লাহর মাল আল্লাহই নিয়া গেছে! তুই না খাইয়া, পাত্থর হইয়া বইস্যা থাকিস না।’
তার সান্ত¦নার কথায় স্মৃতিচারণ থেকে ফিরে আসে জলি। ও বলে-
‘খালা, আমার মন অনেক শক্ত। অ-নে-ক শক্ত!’
হাসিনা বেগম জলির কাছে গিয়ে বসে। জলির মাথা টেনে নেয় নিজের বুকে। আবেগকাঁপা কণ্ঠে বলে-
‘তোর জন্য খুব চিন্তার মধ্যে আছি, মা। তুই এখন একা কীভাবে থাকবি?’
‘কেনো? একা থাকতে অসুবিধা কোথায়, খালা?’
‘না, মা। তুই একা থাকতে পারবি না। মাইয়া মানুষ একলা থাকতে পারে না। অনেক সমস্যা হয়! আইজ থেইক্যা আমি তোর লগে ঘুমামু। তুই চিন্তা করিস না।’
হাসিনা খালার এ কথার কোনো জবাব দেয় না ও। হাসিনা খালা জানে না, ও কতোটা সাহসী কিংবা নিজের জীবন নিয়ে কতোটা উদাসীন। ওর হারানোর কী আছে? হাসিনা বেগম ওর মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলে-
‘তোর এখন বিয়া হওয়া দরকার।’
এ কথায় ভীষণ চমকে ওঠে জলি। ও বলে-
‘বিয়ে! তুমিও দেখছি, বাবার মতো শুরু করলে…!’
‘কেনো, তোর কী বিয়ে হইবো না? বিএ পাস কইরা ঘরে বইসা আছোস। তুই কী দেখতে অসুন্দর? তুই তো অনেক সুন্দর। ডানাকাটা পরী! তোর বিয়া হইবো না কেনো?’
‘খালা, আমি কখনো বিয়ে করবো না।’
‘কেনো, মা?’
‘পুরুষ মানুষকে আমি ঘৃণা করি!’
‘বলিস কী!’
‘হ, খালা। বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে তুমি আর কখনো কথা বলো না।’
‘কিন্তু তোর মামা তো বিয়ে ঠিক করেছেন। তিনি তো তোকে নিয়ে যাবেন, শুনেছি।’
‘মামা! আমার বিয়ে ঠিক করেছেন!’
‘তাই তো শুনেছিলাম, মা।’
‘কার কাছে?’
‘তোর বাবার কাছে। গত সপ্তাহেই তিনি আমাকে ডাইক্যা বলছিলেন যে, তোর মামাকে তিনি চিঠি লিইখ্যা দিছেন।’
‘তাই না-কি!’
‘হ, মা। তোর মামা নাকি তোর জন্য একটা ছেলে ঠিক করেছেন।’
‘কিন্তু, বাবা তো আমাকে কিছুই বলেন নি!’
‘আমাকেও বলছিলেন যে, আমি যেনো তোকে এসব কিছু না বলি।’
হাসিনা খালার কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেলো জলি। ও আর কোনো কথা বললো না। ওর বাবা কী বুঝতে পারছিলেন যে, তিনি চলে যাবেন পরপারে? আশঙ্কা থেকেই কি চিঠি লিখেছিলেন ওর মামাকে আসতে? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো ওর মনে। বাবার মৃত্যুর খবরটা ও আজ সকালে ওর মামাকে জানিয়ে দিয়েছে টেলিফোন করে। নিশ্চয় ওর মামা রওনা হয়ে গেছেন। যে কোনো সময় ওর মামা এসে পড়তে পারেন। তিনি কি জলিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইবেন? তার সংসারে জলি কি ভারবাহী হয়ে যাবে না? প্রশ্নগুলো নিয়ে ডুবে গেলো জলি। হাসিনা বেগম গভীর মনোযোগে জলির মাথা বিলি কেটে যাচ্ছেন। চুলে বিলি কাটার কাজটি নারীদের চমৎকার মানিয়ে যায়।
তিন.
ঠাণ্ডু বললো-
‘বস, এ মাইয়ার সাক্ষীতে আপনার বিরুদ্ধে পুলিশ চার্জশিট তৈরি করতাছে! শালী, একটা অকৃতজ্ঞ হারামজাদি! আপনে যার ল্যাইগ্যা এতো কিছু করলেন, সে-ই কি-না আপনেরে ফাসাইয়া দিলো?’
পুলকের মুখে কোনো কথা জোগালো না। ও বিস্ময়ের অতলে তলিয়ে যায়। মেয়েটির বাবার জন্য ও ডাক্তারকে মারলো, আর সেই মেয়েটিই ওর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে! মানুষ এতোটা অকৃতজ্ঞ হয়? পুলক কখনো মানুষ খুন করেনি এবং কাউকে খুন করার কথা ভাবেওনি। কিন্তু এ মুহূর্তে পুলকের মনে হলো মেয়েটিকে খুন করতে পারলে ভালো হতো। এ কথা ভাবতেই ও মেয়েটিকে খুন করবে বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো। জেল থেকে বের হয়ে ও খুনটি করবে। মাস্তানির লাইনে ‘খুন’ একটা বড় ব্যাপার। এ লাইনে খুনির ‘তকমা’ নাম-যশ দুটোই বাড়িয়ে দেয়। তবে পুলক এ ধরনের তকমার জন্য মেয়েটিকে খুন করবে না। একটা বেপরোয়া শোধ নেবার জন্যই খুনটা করা দরকার। কাজটি অনেক কঠিন হলেও, তা করতে হবে। অকৃতজ্ঞদের একটা যুঁতসই জবাব দেয়া দরকার। পুলকের চিন্তামগ্নতা লক্ষ্য করে ঠাণ্ডু খুকখুক করে কাশলো। এরপর বললো-
‘বস! আপনের ব্যাপারে বিগবস এখন মাথা ঘামাইতে চায় না। শুধু বলে, দেখতাছি। আমারে সেদিন বইলা দিছে, আমি যেনো আপনার ব্যাপারে আর কোনো কথা না কই।’
কথা শেষ করে ঠাণ্ডু আবার খুকখুক করে কাশলো। পুলক চুপ করে রইলো। ও জেলখানার লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি অবনত। দৃষ্টিতে ফুটে ওঠা হতাশার ছায়া ও দেখাতে চায় না ঠাণ্ডুকে। ঠাণ্ডু ওর বিশ্বস্ত সাগরেদ ঠিক, তবুও নিজের অসহায়ত্ত ও প্রকাশ করতে চায় না। পুলকের নীরবতা দেখে ঠাণ্ডু আক্ষেপের গলায় বললো-
‘আপনে যে কেনো ছাড়া পাইতাছেন না, জানি না! একটা থাপ্পড়ের এমন খেসারত, ভাবতেই পারতাছি না! শালার, কতো লোকেরে ফুটা কইরা দিলাম! কিছুই তো হইলো না!’
পুলক এরও কোনো জবাব দিলো না। এর জাবাব ওর নিজেরও জানা নেই। সত্যিই, এ পর্যন্ত ও অনেককেই চড়-থাপ্পড় মেরেছে। অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখিয়েছে। এমনকি, অপহরণও করেছে। কেউ কিছুই করতে পারেনি ওর। অথচ হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে চড় মেরে ও বিপাকে পড়ে গেছে। এই প্রথম ঘোরপ্যাঁচে আটকে গেছে ও। পচা শামুকে পা কেটে গেছে। পুলকের বুক ছাপিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
ঠাণ্ডু বলে-
‘বস, অর্ডার দেন, ওই ডাক্তার শালারে রাস্তায় ধইরা ফুটা কইরা দেই! ওর একটা অণ্ডকোষ কাইট্যা নিমু? নইলে ওর ছেলেমেয়েরে অপহরণ কইরা আটকাইয়া রাখি! মামলা তুইলা নিলে ছাইড়া দিমু।’
পুলক জানে, ঠাণ্ডুর এসব-ই কথার কথা। ও এসব কিছুই করতে পারবে না। ও অতোটা সাহসী নয়। পুলক পাশে থাকলেই ও সাহসী হয়ে ওঠে বা সাহসের ভাব দেখায়। প্রকৃত অর্থে ও একটা ভীতুর ডিম। ঠাণ্ডুকে ও ভালো করে চেনে। পুলককে যারা ভয় পায়, ঠাণ্ডুকেও তারা ভয় পায়। অনেকটা সূর্যের আলোয় চাঁদের আলোকিত হবার মতো। ঠাণ্ডু পুলকের কাছ থেকে একটা জবাব আশা করছে। ও তাকিয়ে আছে পুলকের মুখের দিকে। জেলখানায় দর্শনার্থীদের করিডরে মানুষের জটলা লেগেই থাকে। আজো মানুষের জটলা। হৈচৈয়ের মধ্যেই কথা বলতে হয়। পুলকের এমন হৈচৈ ভালো লাগে না। কিন্তু অনেকদিন পর ঠাণ্ডু এসেছে। ওর সাথে কথা বলা দরকার। পুলক চোখ তুলে তাকালো ঠাণ্ডুর দিকে। বললো-
‘ভালো একটা উকিল ধর। এই উকিল দিয়েও হবে না, দেখছি।’
‘ওস্তাদ, এই পর্যন্ত চারবার উকিল বদলাইলাম। এই শহরের ক্রিমিন্যাল মামলার নামকরা উকিলই তো ধরছি!’
‘তা ঠিক। কিন্তু…!’
‘উকিল সাহেব বলেছেন, উপর থেইক্যা জোর তদবির চলতাছে! তাই, তিনি সুবিধা করতে পারতেছেন না।’
এ কথা এর আগেও শুনেছে পুলক। ওর বিরুদ্ধে ওপর মহল থেকে তদবির চলছে। ওকে এবার লড়তে হচ্ছে আইন ব্যবহারকারী নেপথ্য শক্তির সঙ্গে। ও আবার একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে। ঠাণ্ডু বলে-
‘ডাক্তার শালারে ধরমু?’
‘না।’
‘তাহলে এখন কী করমু? কোনো নির্দেশ দেবেন?’
ঠাণ্ডুর প্রশ্নের জবাবে পুলক বললো-
‘ওই মেয়েটার নাম যেনো কী বললি?’
‘জলি। ওর বাপটা ওই দিন হাসপাতালে মইরা গেছে, বস!’
‘বলিস কী!’
‘হ, বস। আমি ঠিকই কইতাছি।’
এ কথায় পুলকের মনটা কেমন কাতর হয়ে গেলো। কিন্তু এই আবেগকে প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। তবে শোধ নেয়া হবে না। মেয়েটির অকৃতজ্ঞতার প্রতিশোধ নিতেই হবে। পুলক ঠাণ্ডুর উদ্দেশে নির্দেশ দেবার গলায় বললো-
‘ওকে ওয়াচে রাখিস।’
‘বস, ঐ জলি মাগিটার কথা বলতাছেন!’
‘শাট-আপ! তোকে না বলেছি, মেয়েদের গালি দিয়ে কথা বলবি না!’
পুলকের গলা রাগে গমগম করে ওঠে। এতে ভড়কে যায় ঠাণ্ডু। ও নিজের জিভ এমনভাবে কাটে, যেনো ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছে। ও তাড়াতাড়ি বলে-
‘সরি, বস। আমার ভুল হয়ে গেছে।’
ঠাণ্ডু জানে, পুলক মেয়ে মানুষদের গালিগালাজ দেয়া পছন্দ করে না। ঠাণ্ডু আবার মেয়ে মানুষদের গালি না দিয়ে কথা বলতে পারে না। তাই মুখ ফসকে গালি বেরিয়ে যায়। কবিরা কেনো যে মেয়েদের ফুলের সাথে তুলনা করেন, এটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ও। মেয়েরা কি ফুল? বরং হুল বা শূল বলা যায়। মেয়েদের নিয়ে ঠাণ্ডুর মনে অনেক পুঞ্জিভূত রাগ। মেয়েদের গালি দিয়ে কথা বলার প্রবণতার জন্য ও এর আগেও পুলকের যথেষ্ট গালাগাল খেয়েছে। আজো মুখ সামলে রাখতে পারেনি। ও কাচুমাচু করে ফের বললো-
‘বস, জলিকে কী করবো বললেন?’
‘ওকে ওয়াচে রাখিস। ওর সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।’
ঠাণ্ডু উৎসাহী গলায় বললো-
‘বস, অর্ডার দেন, জলির মুখে এসিড মাইরা দেই! কড়া এসিড! আমার কাছে আছে!’
‘না, তোকে এসব কিছু করতে হবে না। তুই শুধু ওকে ওয়াচে রাখবি। যা করার আমিই করবো।’
পুলক ঠাণ্ডা গলায় এ কথা বললো। ঠাণ্ডু বুঝতে পারছে ওর বস জলির ওপর ভীষণ খেপেছেন। মেয়েদের ব্যাপারে বস বরাবরই উদাসীন। মেয়ে নিয়ে বসের রাগ বা অনুরাগ কোনোটাই দেখেনি ও। এখন মনে হচ্ছে ওর বস এই প্রথমবারের মতো একজন নারীর ওপর ভয়ানক খেপেছেন। এটা ওর ভালো লাগছে। অন্তত একটা মেয়ে মানুষের ক্ষতি হলেও মন্দ কী? ঠাণ্ডু বিগলিত হয়ে বললো-
‘বস, চিন্তা কইরেন না। জলির পেছনে ছায়ার মতো লাইগ্যা থাকমু। আপনে ছাড়া পাইলেই মাগিরে…!’
এ পর্যন্ত বলেই পুলকের রাঙা চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায় ও।
‘সরি, বস!’
‘তুই এখন যা।’
‘আচ্ছা। আসি বস।’
ঠাণ্ডু বিব্রত মনে চলে গেলো। পুলক পা বাড়ালো জেলের ভেতরে। জেলের আঙিনায় এসে হাঁটার সময় ও আকাশের দিকে তাকালো। জেলখানার আকাশটা অনেক ছোট। এই ছোট আকাশ দেখতে পুলকের একদম ভালো লাগে না। বিশালত্বের মহিমা নিয়েই তো আকাশ! জেলখানার চার দেয়ালের সীমরেখায় আকাশটা ভীষণ ছোট দেখায়। অবশ্য ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের আকাশটা বড়। জেলা শহরের জেলখানা ছোট হয়। এসব জেলখানার আকাশও ছোট। ছোট আকাশের দিকে তাকালে পুলকের মনটাও কেমন ছোট হয়ে যায়। তাই ও খুব একটা আকাশের দিকে তাকায় না। জেলখানার আঙিনায় হাঁটার সময় ও মাথা নিচু করে হাঁটে। এতে অনেকে মনে করে ও খুব বিনয়ী। আসলে জেলখানায় যারা আসে, তারা খুব একটা বিনয়ী হয় না। সাধারণত অপরাধীরাই জেলখানার বাসিন্দা হয়। তবে নিরপরাধ লোকও আসতে হয় এখানে। কেউ মিথ্যা মামলায়, কেউবা বিনাবিচারে জেলখানার চার দেয়ালে বন্দি হয়ে থাকে। পুলক যতোবারই জেলে এসেছে, ততোবারই এ ধরনের লোক দেখেছে। প্রথম প্রথম ওদের অকারণে জেলবাসের করুণ কাহিনি শুনে ওর মন খারাপ হতো। এখন আর হয় না। সব জেলের একই চালচিত্র। পুলক জানে, অর্থ ও পেছনে শক্তি থাকলে হাজারটা মামলা থাকলেও জেল থেকে বের হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আবার অর্থ বা নেপথ্য শক্তি না থাকলে নিরপরাধীরও রেহাই নেই। পুলকের পেছনে একজন রাজনীতিবিদ আছেন। তিনি পুলককে শেল্টার দেন। জেল থেকে ছাড়িয়ে আনেন। তবে পুলকের এবারের জেলবাসের সময়টা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। সেটাও নেপথ্য শক্তির লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণে। তুচ্ছ ঘটনায় ওকে কারাবাসের দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় থাকতে হচ্ছে। এতোটা দিন ও কখনো জেলে থাকেনি। অথচ গত বছর একটি খুনের মামলা থেকে কতো সহজেই ও বেরিয়ে এসেছে। হোক তা মিথ্যা মামলা। ৩০২ ধারার মামলায় জড়িয়ে গেলে অনেক হুজ্জুত। পুলকও এই হুজ্জুতে জড়িয়ে ছিল, আবার বেরিয়ে এসেছিল জলের মতো। কিন্তু এবার ভিন্ন কথা। একজন কসাই শ্রেণির ডাক্তারকে ও একটা চড় মারার খেসারত দিচ্ছে। এ মামলাটি প্রথমে ও পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়ে যাচ্ছে। তিন মাস ও জেলখানায় আটকে আছে। জামিন তো হচ্ছেই না, বরং এ মামলায় ফেঁসে যাবার আশঙ্কা বাড়ছে। পুলকের সময়টা ভীষণ খারাপ যাচ্ছে। ওর নেপথ্যের শক্তিদাতা ওর ওপর থেকে সাহায্যের হাত সরিয়ে নিচ্ছে। বিপদ বুঝে একে একে সটকে পড়ছে সহযোগীরা। সময় খারাপ হলে এমনই হয়। কোমরের বিছা সাপ হয়ে কামড়াতে চায়। পুলক তা জানে।
চার.
টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। আষাঢ় মাসের শুরু। সন্ধ্যার আকাশজুড়ে থোকা থোকা জমাট কালো মেঘ। আকাশের দিকে তাকালে মনে হবে যে কোনো সময় ঝরঝরিয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমে আসবে। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি নামছে না। বিকেল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি নামলে জলি ছাতা গুটিয়ে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতো। ‘টিপটিপ বৃষ্টিতে কোনো মানে হয় না’- ভাবে জলি। ও পা টিপে টিপে হাঁটছে। চারপাশে জেঁকে বসেছে অন্ধকার। সবে সন্ধ্যা। অথচ রাতের নিঃস্তব্ধতা নেমে এসেছে। জলি ডান হাতে মাথায় ছাতা ধরে হাঁটছে। ছাতার কারণে বৃষ্টি থেকে শরীর রেহাই পেলেও ওর হাঁটুর নিচের অংশের শাড়ি ভিজে গেছে। গোয়ালপাড়া থেকে ওদের বাড়ি পর্যন্ত পায়ে হেঁটে আসতে ত্রিশ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু আজ পথ যেনো ফুরাচ্ছে না। ত্রিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। ও এখনো বাড়িতে পৌঁছতে পারেনি। কমপক্ষে আরো দশ মিনিট লাগবে বাড়ি পৌঁছতে। জলি মনে মনে হিসাব করে নেয়। ছাতা দিয়ে বৃষ্টির সবটুকু ঝাপটা ঠেকাতে পারছে না ও। শাড়ি ভিজছে। গায়ে বৃষ্টি জলের ঝাপটা এসে লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে ও ভাবে, বৃষ্টির একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। ঐশ্বরিক স্পর্শ আছে! বৃষ্টির স্পর্শে সবাই কেমন আপ্লুত হয়ে যায়। ধনী বা দরিদ্র, সুখী বা অসুখী, সুস্থ বা রোগী, কবি কিংবা অ-কবি সবাই বৃষ্টি পছন্দ করেন। সময়ে-অসময়ে তারা বৃষ্টিতে ভিজে মুখর হন। বৃষ্টিকে মানুষ তাই এতো পছন্দ করে। একটা কুকুর হঠাৎ জলির সামনে দিয়ে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেলো। এতে একটু ভড়কে গেলো ও। আর ঠিক তখনই জলির উওর আছড়ে পড়লো ঝড়ো দমকা বাতাস। একপলকে ঝড়ো বাতাস উড়িয়ে নিলো ওর ছাতা। ও শাড়ির আঁচল সামলাতে গিয়ে কয়েকটা মুহূর্ত নষ্ট করলো। শাড়ি ঠিক করে জলি ছাতা খুঁজতে পেছনে ঘুরে দাঁড়ালো। এ সময় ও একটি কালো ছায়া দেখে ভীষণ চমকে উঠলো। ওর গা শিউরে উঠলো। ছায়াটি ওর মুখোমুখি কয়েক মুহূর্ত নড়লো না। জলি ছায়াটির দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু পরেই ছায়াটি নড়ে উঠলো এবং ছায়াটি ওর সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। প্রচণ্ড রাগ আর ঘৃণার রি রি করে উঠলো জলির শরীর। ও কাঁপতে লাগলো। প্রায় দুবছর ধরে এই ঘৃণার কাঁপন নিয়ে বিবর্ণ ফুলের মতো ও বেঁচে আছে। ঠিক বেঁচে আছে বলেও জলির মনে হয় না। ওর মনে হয় ও বেঁচে থাকা একজন জীবনমৃত মানুষ। নোংরা একটি মানুষের ছায়া ওর সামনে এগিয়ে আসছে। এই নোংরা মানুষটি একদিন ওর উনিশ বছরের জীবনকে বার্ধক্যে পৌঁছে দিয়েছে। ওর কিশোরী জীবনের অপার সৌন্দর্য নষ্ট করে তাতে এঁকে দিয়েছে বীভৎস ও কদর্য রূপ। অপমান আর গ্লানির দগদগে ক্ষতে ওর মনের সুকুমার আবেগ পুড়ে খাঁক হয়ে গেছে। অবসাদ আর গাঢ় বিষণ্নতায় ও হয়ে গেছে একখণ্ড লাবণ্যহীন বিষণ্ন পাথর। এতোদিন পর ওই নোংরা মানুষটি ওর দিকে এগিয়ে আসছে! লোকটি ওর খুব কাছে চলে এলো। জলি নিজেকে শক্ত করে নিলো। ও জানে, এই অশুভ লোকটির কোনো উদ্দেশ্য আছে। একে শক্তভাবে মোকাবেলা করতে হবে। জলি উচ্চৈঃকণ্ঠে বললো-
‘কে ওখানে?’
লোকটি একটু থামলো। এরপর আরেকটু এগিয়ে এলো। নিহার গায়েনকে স্পষ্ট দেখতে পেলো জলি। নিহার গায়েনের জেলে থাকার কথা। তার সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাজার মেয়াদ ফুরাবার আগেই ছাড়া পেলো কীভাবে? এ প্রশ্নে জলির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। নিহার গায়েন জলির প্রশ্নটি যেনো বুঝতে পারলো। এর জবাব নিজে থেকেই দিয়ে সে বললো-
‘হাইকোর্টে রিট করে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ট্যাকা খরচ করলে সাজাপ্রাপ্ত আসামির জেল থেকে বের হওয়া নতুন কিছু নয়। ফাঁসির আসামির ফাঁসিও মাফ হয় এই দ্যাশে।’
উৎফুল্ল গলায় কথাগুলো বলে মাথার চুল ঠিক করে নিলো সে। তার চুলগুলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে নেতিয়ে আছে। নিহার গায়েনের কথাগুলো তীরের মতো বিদ্ধ হলো জলির ইন্দ্রীয়তে। ও রাগী গলায় নিহার গায়েনের উদ্দেশে বললো-
‘তো, এখানে কী চাই?’
‘না, মানে, তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।’
নিহার গায়েন খুবই নিচুগলায় জবাব দিলো। সে কথা বলার এক ফাঁকে মাথার চুলগুলো আরেকবার ঠিক করে নেয়ার চেষ্টা করলো। জলি গলায় রাগ ধরে রেখে বললো-
‘আমি কোনো জানোয়ারের সঙ্গে কথা বলি না।’
‘কিন্তু আমার কথা বলার ছিল।’
‘ইতর ছোট লোক! তোর সঙ্গে কিসের কথা? আমার সাথে আর কোনোদিন কথা বলার চেষ্টা করলে দা দিয়ে কুপিয়ে খুন করে ফেলবো!’
‘না, মানে, বলছিলাম কী, আমরা কি…?’
‘আর একটি কথাও নয়। দূর হ, হারামজাদা!’
জলির ক্ষুব্ধ কণ্ঠে নিহার গায়েন একটু ঘাবড়ে গেলো। সে আর কোনো কথা বললো না। জলির ক্রুব্ধ মূর্তির সামনে চুপসে সে দু-পা পিছিয়ে গেলো। একটু দাঁড়িয়ে ফের মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে। জলি কয়েকটা মুহূর্ত থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো রাস্তার ওপর। ওর ভীষণ কান্না পেয়ে গেলো। ও কান্না সামলে নেবার চেষ্টা করলো। ও জানে, নিহার গায়েন এখনো দূরে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ওকে দেখছে। নিহার গায়েনকে ওর কান্না দেখাতে চায় না ও। বৃষ্টিস্নাত এই সন্ধ্যায় ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা। ওর সব হারানোর কথা। ওর একান্ত তীব্র লজ্জা আর ঘৃণার কথা।
প্রায় দুই বছর আগের কথা। জলি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ওর বাবার পোস্টিং ছিল ময়মনসিংহে। ফলে জলি ওর বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহ শহরে থাকতো। গানে জলির গলা ভালো ছিল। শিশু বয়স থেকেই ওর গানের প্রতি দুর্বলতা। মায়ের কঠিন আপত্তির কারণে ও গান শিখতে পারেনি। চৌদ্দ বছর বয়সে জলি ওর মাকে হারায়। মায়ের ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। অসুখ ধরা পড়ার চার মাসের মধ্যে ওর মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নেয় জলি। এইচএসসি পাস করার পর জলি গান শেখার বায়না ধরে বাবার কাছে। ওর বাবা মেয়ের ইচ্ছা পূরণে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মেয়ের জন্য গানের শিক্ষক হিসেবে নিহার গায়েনকে ঠিক করে দেন তিনি। কলেজ, সংসার আর সংগীত চর্চায় বাধা পড়ে যায় জলির দিনলিপি। ময়মনসিংহ শহরে গানের মাস্টার হিসেবে নিহার গায়েনের নাম-ডাক ভালোই ছিল। তার তত্ত্বাবধানে ও ভালোভাবেই গান শিখছিল। নিহার গায়েন সংগীত ছাড়া কখনো জলির সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা করেনি। ওর দিকে কখনো বিশেষ দৃষ্টিতেও তাকায়নি। গানের শিক্ষক হিসেবে জলি নিহার গায়েনকে খুবই শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু একদিন শ্রদ্ধার ব্যক্তিটির অন্য এক চেহারা দেখতে পেলো জলি। মানুষ কতটা কদর্য হতে পারে, তা ও বুঝতে পারলো। এক ঝড়ো রাতে নিহার গায়েন ওর কিশোরী জীবনের স্নিগ্ধ সৌন্দযকে লণ্ডভণ্ড করে দিলো। ওর জীবনের সবটুকু পবিত্রটা পুড়ে গেলো কামনার কুৎসিত আগুনে। সেই বিপর্যস্ত রাতে কিশোরী জলি পৌঁছে গেলো যেনো বার্ধক্যে। এ যেনো হঠাৎ দমকা হাওয়ায় বৃন্ত থেকে ফুলের পাপড়ি ঝরার করুণ বিপন্নতা। সে কথা মনে হলে এখনো ওর গা গুলিয়ে আসে। শরীরের প্রতিটি লোমকূপে রি-রি করে ওঠে ঘৃণা। তখন বেঁচে থাকাটা ওর কাছে নিদারুণ পরিহাস বলেই মনে হয়। এ মুহূর্তে সে রাতের বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেলো ওর।
জলি সেদিন রাতে নিহার গায়েনের সঙ্গে শহরের বাইরের একটি এলাকা থেকে ফিরছিল। গানের অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যায় শুরু হবার কথা থাকলেও রাত দশটায় শুরু হয়েছিল। জলি বাড়ি ফিরে আসতে চাইছিল। কিন্তু ওর শিক্ষক নিহার গায়েন রাজি হলেন না। এই অনুষ্ঠানের আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। শিক্ষকের অনুরোধ ও ফেরতে পারেনি। ও সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পায় সাড়ে এগারটায়। ফলে প্রায় মধ্যরাতে বাড়ির দিকে রওনা দেয় জলি। ওর সঙ্গে ছিল নিহার গায়েন। তিনি সব সময়ই ছাত্রীকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন। সেদিনও এলেন জলির সঙ্গে। তারা রিকশা চড়ে বাড়ি ফিরছিল। পথের মধ্যে হঠাৎ নিহার গায়েন জলিকে বললো-
‘সামনেই আমার একজন ছাত্রীর বাড়ি। আমি সেখানে একটু নামতে চাই। আরেকটু দেরি হলে তোমার কী খুব অসুবিধা হবে?’
‘স্যার, অনেক রাত হয়ে গেছে! বাবা, নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন।’
জলি উদ্বেগ প্রকাশ করে। নিহার গায়েন বিনীত গলায় বলে-
‘তা ঠিক। কিন্তু আমার ছাত্রীটি খুবই অসুস্থ। যাবার পথে ওকে একটু দেখে যেতে চাইছিলাম।’
‘কাল এসে দেখে গেলে হয় না? আমার অনেক ভয় করছে, স্যার!’
‘ভয় কিসের? আমি তো তোমার সঙ্গে আছি।’
‘তারপরও স্যার, আমার ভয় করছে। অনেক রাত হয়ে গেছে।’
‘ঠিক আছে, আমি পাঁচ মিনিট সময় নষ্ট করবো। রিকশা ছাড়ছি না। শুধু যাবার পথে ওদের বাড়িতে একটু নামবো। পথের মধ্যেই ওদের বাড়ি পড়বে। তুমি না করো না, প্লিজ।’
‘স্যার! কিন্তু?’
‘শিক্ষকের কথা রাখতে হয়।’
‘বাবা, নিশ্চয়ই ছটফট করছেন! এমন দেরি তো কখনো হয়নি, স্যার!’
‘তোমার বাবাকে আমি এর জবাব দেব। তুমি চিন্তা করো না।’
এর জবাবে জলি আর কিছুই বলতে পারে না। ও চুপ করে থাকে। রাস্তার পাশে নির্জন এলাকায় একটি বাড়ির সামনে দিয়ে রিকশা যাবার সময় রিকশাওয়ালাকে রিকশা থামাতে বললো নিহার গায়েন। জলি চুপ করে রইলো। ওর ভয় আর অস্বস্তি বাড়তে থাকে। নিহার গায়েন রিকশা থেকে নেমে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লো। দরজায় যেনো কেউ আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। দরজাটা খুলে দিলো একজন মধ্যবয়স্ক লোক। লোকটি নিহার গায়েনকে সালাম দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। নিহার গায়েন ঘরের ভেতরে চলে গেলো। রিকশার ওপর জলি অস্বস্তি নিয়ে এই দৃশ্য দেখলো। ও বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলো। রিকশাওয়ালা বিড়বিড় করে বিরক্তি প্রকাশ করছিল। জলির বিরক্তি যখন তুঙ্গে, বাড়ি থেকে তখন বেরিয়ে এলেন ওই মধ্যবয়স্ক লোকটি। লোকটি রিকশার সামনে এসে জলির দিকে তাকিয়ে বললো-
‘মা-জননী। আমার মেয়েটা জ্বরে ছটফট করছে। স্যার আপনাকে ডাকছেন। আপনি কি একটু বাড়ির ভেতরে আসবেন? আপনার স্যার আপনাকে কিছু কথা বলতে চাচ্ছেন। আপনি ভেতর যান, আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি।’
এমন একটি পরিবেশে এমন একটি প্রশ্নের জবাবে না বলা কি যায়? জলিও না বলতে পারলো না। ও বিরক্ত মনে রিকশা থেকে নামলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো হা-করা দরজার দিকে। জলি খোলা দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। ড্রয়ংরুমে কাউকে দেখতে পেলো না ও। ও ডাকলো-
‘স্যার, আপনি কোথায়?’
অন্যরুম থেকে নিহার গায়েনের জবাব এলো-
‘ভেতরে এসো। আমি এখানে।’
জলি ভেতরের রুমের দিকে পা বাড়ালো। ভেতরের রুমে গিয়ে জলি চমকে উঠলো। ও দেখতে পেলো নিহার গায়েন লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে একটি চেয়ারে বসে আছেন। কেমন একটা গা ছমছম করা দৃষ্টি তার দুচোখে। জলি ভীষণ রকম কেঁপে উঠলো। ঠিক তখনই, বাড়ির সদর দরজা দরাম করে বন্ধ হবার শব্দ শুনতে পেলো ও। সেদিন ওই বাড়ির বন্ধ দরজার ভেতরে কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো ও। জীবনের সবুজ রংটুকু যেনো হলদে বিবর্ণ হয়ে গেলো ভয়ার্ত ছোবলে!
আজ এতোদিন পর নিহার গায়েনকে দেখে সব হারানোর কষ্টের কথা জলির শিরায়-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়লো। ওর মাথার ওপর টিপটিপ বৃষ্টির মুখরতা। বৃষ্টিতে ও ভিজছে। পথে ও দাঁড়িয়ে আছে স্তম্ভের মতো। যেনো মহাপ্রলয় হলেও টলবে না। ওর পেছনে হারিয়ে গেছে ছাতা, কোথাও দাঁড়িয়ে আছে নিহার গায়েন নামক এক হিংস্র জানোয়ার। তা নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেই। বৃষ্টিস্নাত খোলা আকাশ মাথায় নিয়ে অনড় দাঁড়িয়ে রইলো জলি, অনেকক্ষণ। এই সময়টুকুতে বৃষ্টির সাথে একাকার হয়ে গেলো ওর দুচোখের অবিরল জলের ধারা।
পাঁচ.
জলি বশির আহমেদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। ওর এই হাসিটা মেকি। মেয়েদের কোন হাসিটা মেকি আর কোন হাসিটা সত্যিকারের, তা অনেক পুরুষ ধরতে পারেন না। বশির আহমেদও সেরকম। তার চোখের বিশেষ চাহনি দেখেই ও বুঝতে পেরেছে, একে হাসি দিয়েই কাবু করা যাবে। ও বশির আহমেদের চোখে চোখ রেখে মুখে মেকি হাসি ধরে রাখে। মেকি হাসি আর সত্যিকারের হাসির মধ্যে ফারাকটাই বা কী, ও জানে না। ও জানতে চায়ও না। জলির জীবনে সত্য মিথ্যার কোনো গুরুত্ব এখন নেই। ও জীবন মৃত একজন মানুষ। ওর কোনো স্বপ্ন নেই, লক্ষ্য নেই। কোনো চাওয়া নেই। পাওয়া নেই। আশা নেই কিংবা অক্ষেপও নেই। কোনো কিছুতে আনন্দ বা হতাশা নেই। ওর কিছুই নেই। আছে শুধু জীবনটা। এই জীবন চলছে গন্তব্যহীন পথে। জগত সংসারের কোনো কিছু নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেই। কিন্তু একটা ব্যাপারে ওর মাথাটা কেনো জানি কাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে ও সচেষ্ট হয়েছে বা বলা যায় ওকে সচেষ্ট হতে হয়েছে। হঠাৎ ওর কিছু টাকার খুব প্রয়োজন হয়েছে। এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ও একটা বিষয় থেকে আরেকটি বিষয় জড়িয়ে যাচ্ছে। বশির আহমেদ এজি অফিসের সহকারী হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তার কাছে আটকে আছে ওর বাবার পেনশনের ফাইল। ও তার কাছে এসেছে বাবার পেনশনের টাকা তুলতে। টাকাগুলো ওর ভীষণ প্রয়োজন। নিজের জন্য নয়, অন্য একজনের জন্য এই টাকাগুলো দরকার। কারো জন্য ওর কোনো দরদ নেই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু হঠাৎ করে একটা দায়বোধের চাপ ও অনুভব করছে। এ কারণেই বাবার পেনশনের টাকাগুলো তোলার চেষ্টা করছে ও। নিজের প্রয়োজনে ও এই টাকা কোনোদিন তুলতে আসতো না। ওর বাবা জীবিত থাকাকালে তিনি পেনশনের টাকা তুলতে পারেননি। এজি অফিসে শুধু আসা-যাওয়াই করেছেন। মৃত্যুর শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি অর্থের কষ্ট করে গেছেন। কর্মময় জীবনের সঞ্চিত অর্থ তিনি ভোগ করে যেতে পারেননি। এ রকম অনেকেরই হয়। প্রশাসনে অনেকের ফাইল নড়তেই চায় না। আবার অনেকের ফাইল দ্রুতগতিতে দৌড়ায়। জলির বাবা জামাল উদ্দিন তেমন কেউ ছিলেন না যে, তার ফাইলটা দৌড়াবে। তিনি সমাজকল্যাণ অধিদফতরের একজন সামান্য কেরানি ছিলেন। নিরীহ টাইপের লোক ছিলেন তিনি। তার অর্থ ছিল না, প্রভাব ছিল না, এমনকি সাহসও ছিল না। তার পেনশনের টাকা উঠবে কীভাবে? কেউ ফোন করে দিলে ফাইল ছুটবে, এমন কেউ ওদের নেই। ফলে জামালউদ্দিন তার পেনশনের টাকা তুলতে পারেননি। ওর বাবার সর্বশেষ পোস্টিং ছিল মুন্সিগঞ্জ শহরে। এখানে চাকরি করেছেন প্রায় তিন বছর। চাকরির শেষ সময়ে এসে তিনি এই শহরেই থিতু হয়ে বসার চেষ্টা করেছিলেন। মানিকপুরে একখণ্ড জমি কিনে, সেই জমিতে দোচালা টিনের একটি ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেছিলেন। ভাগ্য বিড়ম্বিত একমাত্র মেয়েকে কোনো সৎ পাত্রের হাতে তুলে দেবার স্বপ্নও দেখেছিলেন। তার স্বপ্নটা এক তাল বেদনা হয়ে জমে থাকতো মনে। জলিকে নিয়ে তার দুঃশ্চিন্তা করা বাবা এখন বেঁচে নেই। বাবাকে নিয়ে জলির চাপাকান্না আছে, আক্ষেপ নেই। আহাজারি বা হাহাকার নেই। জলির নিজেকে নিয়ে কোনো দুঃশ্চিন্তা বা কষ্ট নেই। বাবার মৃত্যুও জলিকে বিচলিত করেনি। ওর নির্মোহ চোখের দিকে ভালো করে তাকালে যে কেউ নিলুপ্ত জীবনের স্বরলিপি খুঁজে পাবে। ওর বর্তমান নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। ভবিষ্যতের রূপরেখাও নেই। নিজেকে নিয়ে ওর নিজের কোনো মায়া নেই। ওর চোখে যেমন জল নেই, ওর মনেও কোনো কোলাহল নেই। অন্য যে কোনো মেয়ে বা নারীর জীবনের সাথে ওর জীবনের কোনো মিল নেই। ও মিল খুঁজেও বেড়ায় না। ও জানে, একা চলার দুরন্ত সাহস ছাড়া ওর কিছুই নেই।
জীবন-মৃত এই জলি বশির আহমেদের সামনে বসে মেকি হাসি ধরে রেখেছে মুখে। অনেক দিন পর জলি আজ হাসছে। হোক তা মেকি হাসি। ও হাসতেই যেনো ভুলে গিয়েছিল। ওর হাসিটা কেমন হলো কে জানে, তবে বশির আহমেদ নড়েচড়ে বসলেন। এতোক্ষণ তিনি কেমন নির্লুপ্ত ভাব করে বসেছিলেন। তিনি যেনো জলির কথা শুনতেই পারছিলেন না। কিংবা শুনছিলেন না। একটা ফাইল টেনে নিজেকে ব্যস্ত রাখার ভান করছিলেন। ভাবটা এরকম যে, কন্যা হিসেবে বাবার পেনশনের টাকা তোলা এক অসম্ভব কাজ। জলি ওসব ভাব বুঝতে পারে। ওর ইচ্ছে করছিল পায়ের ছেঁড়া স্যান্ডেল দিয়ে বশির আহমেদের গালে ঠাস ঠাস করে আঘাত করে ভড়কে দিতে। যে বেঁচে থেকেও মৃত, তার ভয় কী? একটা নোংরা পুরুষকে জুতাপেটা করতে পারলে মন্দ কী? অবশ্য সব পুরুষকেই জলির নোংরা মনে হয়। ওর মনে হয় পুরুষ হচ্ছে কুকুর শ্রেণির। সব সময় লালসার জিহ্বাটা বের করে রাখে। বশির আহমেদকে জব্দ করতে জলি সহজ পথ ধরলো। তার ভেতরের কদর্য লোকটিকে জাগিয়ে তুলতে লাগলো ও। ওর হাসিটা মোক্ষম অস্ত্র হয়ে কাজে লাগলো। বশির আহমেদ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। যেনো ওর চোখের ভাষা পড়তে চাইছেন। জলি এবার হাতের ব্যাগটি ইচ্ছে করে ফ্লোরে ফেলে দিলো। ব্যাগটি তুলে আনার সময় ওর শাড়ির আঁচলটি কাঁধ থেকে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লো। জলি ওর শাড়ির আঁচল ঠিক করলো একটু সময় নিয়ে। আঁচলবিহীন ব্লাউজে আবদ্ধ জলির হৃষ্টপুষ্ট বুক মাত্র কয়েক মুহূর্ত ছিল বশির আহমেদের চোখের সামনে। ব্যাস, তার লালসার লম্বা জিহ্বাটা বেরিয়ে এলো। জলির এই মুহূর্তে বশির আহমেদকে জিহ্বা বের হওয়া কুকুরের মতো লাগছে। ও নিজের ভেতরে জেগে ওঠা চাপচাপ ঘৃণা চাপা দিয়ে ফের মিষ্টি করে হাসলো। বললো-
‘স্যার, আমার কেউ নেই। একা থাকি। অনেক কষ্টে আছি। বাবার পেনশনের টাকাটা তুলতে পারলে…।’
‘তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি সব ব্যবস্থা করছি।’
বশির আহমেদ বিগলিত গলায় বললো। জলি বললো-
‘স্যার, আপনি খুব ভালো মানুষ।’
জলির কথায় বশির আহমেদ হাসলেন। তিনি গলা নামিয়ে বললেন-
কাজটা অতো সহজ নয়। কিন্তু আমি করে দেবো। তবে আমাকে একটু খুশি করতে হবে।’
জলি দুচোখে রহস্য ছড়িয়ে বললো-
‘কী রকম খুশি, স্যার?’
‘তেমন কিছু নয়। এই ধরো আমরা একটু কোথাও ঘুরতে গেলাম। ধরো…।’
‘ওহ, বুঝেছি স্যার।’
‘সত্যি বুঝেছো?’
বশির আহমেদ নিশ্চিত হতে চান। আগুন নিয়ে খেলতে জলির ভয় কী? তবে একটু সাবধানে খেলতে হবে। ও বললো-
‘আপনি যা বলবেন, তাই হবে, স্যার। আগে বাবার পেনশনের টাকাটা যদি পাওয়ার ব্যবস্থা করতেন…।’
‘ওসব নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। তুমি আগামী সপ্তাহে একবার আসো। আমি দেখছি, কী করা যায়।’
এ কথা বলার সময় বশির আহমেদের মুখ থেকে থুতু ছিটকে বেরিয়ে এলো। কামনায় উদ্দীপ্ত কুকুরের যে রকম হয়। জলি চোখে-মুখে বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘সত্যি, স্যার!’
‘তিন সত্যি!’
এ কথা বলেই বশির আহমেদ জলির একটি হাত ধরলেন। নিঃসংকোচে। যেনো সব কথা হয়ে গেছে, এখন ওর হাত ধরার যায়। জলির ইচ্ছে করলো তার হাতটি তুলে কামড়ে দিতে। ও নিজেকে সংযত করলো। বশির আহমেদ জলির হাতটি নিজের দুহাতের মুঠোয় নিয়ে মৃদু চাপ দিতে লাগলেন। জলি বাধা দিলো না। পাপের স্পর্শ। জলি এই পাপটুকু মেনে নিলো। পাপ কিংবা পুণ্য কোনোটাই ওকে এখন স্পর্শ করে না। ওর বোধশক্তি যেনো পাথর হয়ে গেছে। জলি কয়েকটা মুহূর্ত পর বশির আহমেদের মুঠোবন্দি থেকে নিজের হাত আলতোভাবে মুক্ত করে নিলো। ও বললো-
‘আজ তাহলে আসি, স্যার? আগামী সপ্তাহে আসবো। টাকাটা পাবার ব্যবস্থা করে দেবেন, প্লিজ!’
‘তুমি বলছিলে, তুমি একা থাকো?’
‘জ্বি, স্যার।’
‘ঠিক আছে, আমি তোমার থাকার ব্যবস্থাও করবো। তোমার ভার আমি নিচ্ছি।’
বশির আহমেদের চোখ জ্বলজ্বল করছে। জলি জানে, বশির আহমেদ শুধু ওর শরীরের ভারটুকুই নিতে চায়। জীবনের ভার নয়। ওর ভেতর থেকে মুখে একদলা থুতু উঠে আসে। অন্য সময় হলে ও একদলা থুতু ‘ওয়াক থু!’ বলে বশির আহমেদের মুখে ছুড়ে মারতো। গা রিনরিনে ঘৃণার চাপ সামলে নিয়ে ও বললো-
‘কী রকম ব্যবস্থা করবেন?’
‘এই ধরো, কোথাও তোমাকে বাসা ভাড়া করে রাখবো। মাঝে মাঝে আমি আসবো, এই আর কী?’
বশির আহমেদের কুতকুতে চোখ খুশিতে ডগমগ করছে। জলি তার কথার অর্থ বুঝতে পারছে। ও এ নিয়ে আর কোনো কথা বাড়ালো না। আগে পেনশনের টাকাটা উঠে আসুক, পরে এর একটা ব্যবস্থা নেয়া যাবে, দ্রুত ভেবে নিলো ও। মেকি হাসিটি ও টেনে ধরে রাখলো মুখে। জলি দেখলো বশির আহমেদ কতো সহজেই ওর হাসির ছোরায় এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে। ও মনে মনে বললো- ‘লম্পট পুরুষরা কি এতো বোক হয়!’
ছয়.
পুলক লোকটিকে চিনতে পারলো না। এই লোকটি জেলখানায় ওর সাথে কেনো দেখা করতে এসেছে, ও তা জানে না। পুলকের সাথে ঠাণ্ডু ছাড়া এ পর্যন্ত কেউ দেখা করতে আসেনি। আসার কথাও নয়। ওর বাবা-মা জেল তো দূরের কথা, জেলের বাইরেও ওর সাথে দেখা করতে আসবেন না। ও বাড়িতে গেলে তারা ওকে তাড়িয়ে দেন। নষ্ট ছেলের মুখ দেখতে চান না তারা। ওর বাবা ভীষণ রাগী মানুষ। বাবা রাগ করবেন, এ কারণে মা ওর সাথে কথা বলেন না। বাড়িতে গেলে বসতেও বলেন না তিনি। এ নিয়ে মায়েরও অনেক কষ্ট। মায়ের কষ্ট বুঝতে পারে ও। তাই পুলক খুব একটা বাড়িতে যায় না। বাবার ঘৃণা ও রাগ এবং মায়ের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার দহন ও আর বাড়াতে চায় না। ছোট বোন শায়লার বিয়ে হয়ে গেছে। ও থাকে সিরাজদিখান। ও ছোট বোনের শ্বশুরবাড়িতে কখনো যায় নি। শায়লার সাথে ওর অনেকদিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। ওর সাথে দেখা করতে আসা লোকটি শায়লার শ্বশুরবাড়ির কেউ হবেন- এমন আশা করছে না পুলক। ও লোকটির দিকে ভালো করে তাকালো। লোকটির বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ বছর হবে। পুলকের সমবয়সী। গায়ের রং কালো কুচকুচে। গায়ে পড়েছে গাঢ় সবুজ রঙের খদ্দেরের পাঞ্জাবি। এমন কালো লোক গাঢ় সবুজ রঙের পাঞ্জাবি কেনো পড়েছে, কে জানে। এতে লোকটিকে আরো কালো দেখাচ্ছে। পরনে মলিন প্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল। তবে চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। লোকটির মাথাজুড়ে কোকড়ানো চুলের ঢেউ। গায়ের রং কালো হলেও লোকটির মুখের অবয়ব সুন্দর। কিন্তু দৃষ্টি সরল নয়। চোখের দিকে ভালো তাকালে লোকটিকে সুবিধার মনে হয় না। কিন্তু মুখের দিকে চট করে তাকালো লোকটিকে খুব নিরীহ ও বিনয়ী মনে হবে। পুলক লোকটিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নিলো। ও লোকটির মুখের ওপর কৌতূহলের দৃষ্টি ধরে রেখে বললো-
‘আমি ঠিক, আপনাকে চিনতে পারছি না।’
এ কথায় লোকটি ভীষণ লজ্জা পেলো। সে লজ্জিত কণ্ঠে বললো-
‘আমাকে আপনার চেনার কথা নয়।’
‘কে আপনি?’
‘জ্বে, আমার নাম নিহার গায়েন।’
‘আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন কেনো?’
‘জ্বে, একটা জরুরি কাজ আছে। আপনার সাথে জরুরি কাজটি নিয়ে কথা বলতে এসেছি।’
পুলক বুঝতে পারছে লোকটি কোনো মতলবে এসেছে। এ ধরনের লোক অকারণে জেলখানায় কারো সাথে দেখা করতে আসে না। পুলক আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলো নিহারের আপাদমস্তক। এরপর বললো-
‘আপনি কোথায় থাকেন? আমার সাথে আপনার কী এমন জরুরি কাজ?’
‘আমি এই শহরের কেউ নই। আমাকে আপনি চিনবেন না। তবে একটা ব্যাপারে আপনিই আমাকে সাহায্য করতে পারেন। তাই, আপনার কাছে এসেছি।’
নিহারের মুখে সরল হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলো। পুলক বুঝতে পারছে লোকটির উদ্দেশ্য সরল নয়। মাস্তানদের কাছে সরল উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ আসে না। অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই লোকজন আসে। পুলক সর্তক গলায় বললো-
‘তা জনাব, আপনার পেশা কি?’
এ প্রশ্নে নিহার আবার লজ্জা পেলো। সে মাথা নিচু করে বললো-
‘জ্বি, আমি গায়েন। গান গাই। ছাত্রছাত্রী পেলে গানও শেখাই।’
নিহারের কথা শুনে কেমন থমকে গেলো পুলক। একজন গায়েন এসেছে তার সাহায্য নিতে। বিষয়টি কেমন খটকা লাগার মতো। মাস্তানদের কাছে সাধারণত ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ বা সমস্যগ্রস্ত পেশাজীবীরা আসেন। জমি দখল-বেদখলের জন্যও অনেকে আসেন। কিন্তু গায়েন কোনো মাস্তানের শরণাপন্ন হয়েছে, এমন ও শোনেনি। পুলক ভীষণ অবাক হলো। ওর মাথায় একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠলো। পুলক একসময় গান গাইতো। ভালোই গাইতো সে। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কলেজে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। মুন্সিগঞ্জ শহরেও ওর নাম-ডাক ছিল। সে দু’তিন বছর আগের কথা। ও এখন আর গান গায় না। যে হাতে হারমোনিয়ামের বিটে সুর তুলতো, সে হাতের সঙ্গে এখন ছোরা বা আগ্নেয়াস্ত্রের সখ্যতা। এতোদিন পর এই গায়েন কী ওকে কোনো জলসায় গান গাইবার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে? এ কথা মনে হতেই পুলক কেমন বিব্রত হয়ে গেলো। ও লজ্জিত কণ্ঠে বললো-
‘গায়েন সাহেব, আমি গান-বাজনা অনেক দিন হলো ছেড়ে দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করবেন।’
পুলকের জবাবে নিহারও অবাক হলো। সে ফিক করে হেসে ফেললো। বললো-
‘আমি আসলে গান-বাজনার জন্য আপনার কাছে আসিনি। আপনি ভুল বুঝছেন।’
পুলক এবার বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘গায়েন সাহেব, তবে আপনি আমার কাছে কী চান!’
‘সহযোগিতা।’
‘সহযোগিতা?’
‘হ্যাঁ, সহযোগিতা। আপনার সহযোগিতা পেলেই আমার একটা ভীষণ কাজ হাসিল হয়ে যাবে। অনেক দিন ধরে আমি কাজটি হাসিল করার জন্য ঘুরছি।’
‘কাজটা কী, শুনি। আমি কিন্তু সব কাজ করি না। মানে খুন-খারাবি করি না।’
‘ছিঃ ছিঃ! কী যে বলেন! আমি শিল্পী মানুষ, খুন-খারবি কি করাইতে পারি?’
নিহার কঁকিয়ে ওঠে। পুলক বলে-
‘ঠিক আছে, কী করতে হবে বলুন। তবে জেল থেকে কবে বের হতে পারবো, বলতে পারছি না। আপনার কাজটা জরুরি হলে অন্য কারো কাছে যান।’
‘না, না। আপনি ছাড়া এই কাজটা কেউ করতে পারবে না।’
‘তাই না-কি! তা কাজটা কী?’
‘তা বলছি। শুনলাম, আপনি নাকি জলির ওপর খুব খেপেছেন?’
এ কথায় ফের অবাক হলো পুলক। পুলকের এমন ব্যক্তিগত রাগের কথা নিহার জানলো কী করে? নিশ্চয়ই, ঠাণ্ডুর কাছ থেকে জানতে পেরেছে। ঠাণ্ডু পেটে যে কথা ধরে রাখতে পারে না, তা ও জানে। ওর অনেকগুলো দোষের মধ্যে এটিও একটি। এ মুহূর্তে ঠাণ্ডুর প্রতি ভীষণ রাগ হলো পুলকের। ও রাগ সামলে নিয়ে নিহারের উদ্দেশে বললো-
‘আপনি কি জলির জন্য কথা বলতে এসেছেন?’
নিহার এর উত্তর না দিয়ে বললো-
‘আমি জানতে পেরেছি, আপনি জলির ওপর খুব রেগে আছেন। আপনি জেল থেকে ছাড়া পেলে ওর একটা কিছু করবেন, তাই না?’
পুলক রাগী গলায় বললো-
‘একটা কিছু নয়, আমি ওকে খুন করবো!’
‘আমি জানি, আপনি ওর প্রতি খুব রেগে আছেন। আমিও ওকে দেখে নিতে চাই।’
‘তো?’
‘না, বলতে চাচ্ছি, আপনার আমার দুজনেরই টার্গেট হচ্ছে জলি।’
‘আপনি কী বলতে চান?’
‘আমি বলতে চাই, জলিকে আপনি আমার হাতে তুলে দেন।’
‘শাট-আপ!’
চিৎকার করে উঠলো পুলক। এতে ভড়কে গেলো নিহার। ও কাচুমাচু করে বললো-
‘আহা! আমি তো জলিকে নিয়ে অভিসারে যাচ্ছি না! ওর সাথে আমার অনেক লেনদেন আছে। আমি ওকে পুড়িয়ে মারবো। ওকে জ্যান্ত কবর দেবো!’
‘তা আমার কাছে এসেছেন কেনো? আপনি নিজে ওকে কবর দিতে পারেন না?’
‘আমার অতোটা সাহস নেই। এসব কাজে আপনাদের মতো লোকের সাহায্যের প্রয়োজন হয়।’
‘কিন্তু?’
‘ওই যে বললাম। ও আমাদের দুজনারই শত্রু। তাই দুজনে হাত মেলাতে পারি।’
‘কিন্তু আমি ওকে আপনার হাতে তুলে দেবো কেনো?’
‘আপনি নিজের হাতে ওকে খুন করে লাভ কী বলুন? তার চেয়ে আমার হাতে তুলে দিলে আমারও কাজ হলো, আপনার শত্রুও খতম হলো।’
‘নিহার সাহেব, একটা মেয়েমানুষকে খতম করতে দুজন পুরুষকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে কেনো? এটা এক ধরনের কাপুরুষতা! আপনি আমার সামনে থেকে চলে যান।’
পুলকের রাগকে গায়ে না মেখে নিহার নরোম গলায় বললো-
‘আপনি জানেন না, জলি কতোটা জেদি আর সাহসী! ও কাউকে ভয় পায় না।’
‘নিহার সাহেব, আমি ওকে ভয় দেখাতে চাই না। আমি ওর প্রাপ্যটুকু ফিরিয়ে দিতে চাই। আপনি এখন যান। এ নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না।’
‘ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। তবে আমার প্রস্তাবটা একটু ভেবে দেখবেন। নিজের হাতে রক্ত না মেখে, ওকে তুলে দিতে পারেন আমার হাতে। ওকে হাতের নাগালে একবার পেলে আমি ওকে ভেঙে চুরমার করে দেবো!’
পুলক নিহারের কথা যেনো শুনতেই পায়নি এমন ভাব করে রইলো। ও আর কথা বাড়াতে চায় না। নিহার ‘আচ্ছা, আসি’ বলে বিদায় নিলো। নিহার জলিকে কেনো অপহরণ করতে চায় তা জানার কৌতূহল তৈরি হলেও পুলক কোনো প্রশ্ন করলো না তাকে। নিহারকে ওর সুবিধার লোক বলে মনে হয়নি। লোকটিকে দেখে নিরীহ মনে হলেও ভেতরে সে ভীষণ হিংস্র একজন মানুষ। তার প্রস্তাব ওর একেবারেই ভালো লাগেনি। পুলক ওর ব্যক্তিগত রাগ শেয়ার করতে চায় না কারো সাথে। নিহারকে ফিরিয়ে দিয়ে ও ভালোই করেছে। নিজের কাজ ও নিজে একাই করবে।
সাত.
বশির আহমেদ জলির হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিলেন। জলি বাধা দিলো না। ও বসে আছে বশির আহমেদের টেবিলের সামনে। জলি লক্ষ্য করলো বশির আহমেদের একটি পা টেবিলের নিচে নড়াচড়া করছে এবং খুব দ্রুত তার পা-টি জলির পায়ে ঘষতে লাগলো। আলতোভাবে। জলির গা শিউরে উঠলো। পুরুষ মানুষ চট করে এতো কুৎসিত কীভাবে হয়? জলি মুখে মেকি হাসিটা ধরেই রাখে। নোংরা এই অত্যাচার ওকে সহ্য করতে হবে। নইলে বাবার পেনশনের টাকা আর পাওয়া যাবে না। বশির আহমেদ জলির পায়ে পা ঘষে যাচ্ছে। তার দুচোখে গভীর মাদকতা। জলি বললো-
‘আজ চেকটা পাবো, সত্যি!’
এ কথায় দুচোখের তাড়া নাচিয়ে বশির আহমেদ হাসলেন। গলা নামিয়ে বললেন-
‘তোমার জন্য আমার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ফাইল কী সহজে নড়ে? আমি নিজে ফাইলের পিছু পিছু ছুটেছি।’
‘সত্যি!’
‘নয়তো কী? এতো সহজেই চেক পেতে?’
‘আপনার ঋত আমি কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।’
এ কথায় কেমন চোখে তাকিয়ে হাসলেন বশির আহমেদ। বললেন-
‘কিছুটা ঋত যে তোমাকে শোধ করতেই হবে!’
‘কী করতে হবে, বলুন।’
‘ওই যে বলছিলাম। একটু ঘুরবো, ফুর্তি করবো, এই আর কী।’
‘হ্যাঁ, আর বলছিলেন আমার ভার নেবেন।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। তা-ও বলেছিলাম।’
‘কবে ঘুরতে নিয়ে যাবেন, বলুন। আমি রাজি।’
এ কথায় বশির আহমেদের পায়ের ঘষাঘষিটা যেনো বেড়ে যায়। তার পা-টা বেপরোয়া হয়ে যেতে চেষ্টা করে। জলি নিজের পা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জলির খুব ইচ্ছা করছে বশির আহমেদের পা হাতুরি দিয়ে থেতলে দিতে। একদলা থুতু ছিটিয়ে দিতে তার মুখে। ও সামলে নেয় নিজেকে। বশির আহমেদ বললেন-
‘চলো, আশপাশের কোনো হোটেলে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে আসি। তারপর চেকটা নিয়ে যেও।’
জলি আবারো মেকি হাসিটা ঝুলিয়ে নিলো মুখে। লজ্জিতভাব প্রকাশ করে বললো-
‘আপনে যে কী! বললেই কী যখন তখন সব কিছু পাওয়া যায়? মেয়েদের কিছু সময় থাকে না?’
এ কথায় বশির আহমেদের পা থেমে গেলো। তিনি বোকার দৃষ্টি মেলে বললেন-
‘ঠিক বুঝলাম না। কী বলতে চাইছো।’
জলি এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। বশির আহমেদকে বোকা বানাতে পেরে ওর ভালোই লাগছে। ও বললো-
‘আমি শারীরিকভাবে সুস্থ কিনা, এটা আগে জানবেন না? শুধু হোটেলে গেলেই হবে?’
এ কথায় বশির আহমেদ খুব লজ্জা পেলেন। তিনি বললেন-
‘সরি, ও কথা আমার মাথায় আসেনি। তা আজ তুমি অসুস্থ?’
‘জ্বি।’
‘সুস্থ হবে কবে?’
‘পরশু।’
‘পরশু তো শুক্রবার। অফিস বন্ধ।’
‘তাতে কী হয়েছে? আমাকে চেকটা দিয়ে দিন। শুক্রবার না হয় সারাদিন আপনার সাথে থাকবো।’
‘না, মানে…।’
‘বাহ রে, আমাকে আপনি বিশ্বাস করছেন না!’
‘না, না, তা নয়। বলছিলাম কী, চেকটা শনিবার নিলে হয় না?’
এবার জলি নিজের পা রাখে বশির আহমেদের পায়ের ওপর। সুযোগটা ও হাতছাড়া করতে চায় না। জলির পায়ের স্পর্শে বশির আহমেদ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। জলি বললো-
‘চেকটা আমার আজই দরকার। কথা তো হয়েই গেলো, শুক্রবার আসবো। আপনি আমার যে উপকার করেছেন, আপনাকে আমি ঠকাবো না।’
বশির আহমেদ একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কয়েকবার চোখ রাখলেন জলির চোখে। কী যেনো পড়ার চেষ্টা করছেন। এরপর বললেন-
‘ঠিক আছে। চেক নিয়ে যাও। শুক্রবার আমার শ্বশুরবাড়িতে নেমতন্ন আছে। এখন ওই দাওয়াতে যাওয়া যাবে না।’
‘ওহ! আপনার খুব অসুবিধা হয়ে গেলো, না?’
জলি দুঃখ প্রকাশ করে। এর জবাবে বশির আহমেদ বলেন-
‘অসুবিধা আর কী, বউয়ের সাথে মিথ্যা কথা বলতে হবে। বড় স্যারের একটা কাজ দেখিয়ে দেবো। সে যাগগে, তাহলে তুমি শুক্রবার কোথায় আসবে?’
‘আপনিই বলুন, কোথায় আসবো?’
‘শুক্রবার সকাল এগারটায় তুমি আসবে তোপখানা রোডের হোটেল মৃগয়াতে। রুম নম্বর ২২০-এ আমি থাকবো। সোজা চলে আসবে রুমে, বুঝলে?’
‘জ্বি, বুঝেছি।’
‘কোনো সমস্যা হলে আমার মোবাইলে ফোন করবে।’
‘আচ্ছা।’
বশির আহমেদ অফিসের আলমারি খুলে একটি চেক বের করলেন। চেকটি রাখলেন টেবিলের ওপর। কাগজ তৈরিই ছিল। বশির আহমেদের বাড়িয়ে দেয়া কাগজে স্বাক্ষর করলো জলি। চেকটি নিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে ফেললো। ধীরে ধীরেই তা করলো ও। বশির আহমেদ একটু চিন্তিত। জলি ফের মেকি হাসিটা বিলিয়ে দিলো। জবাবে বশির আহমেদও হাসলেন। জলি মনে মনে বললো- ‘পিচাশ কোথাকার!’
শুক্রবার বেলা এগারটায় জলি ফোন করলো বশির আহমেদের বাসার নম্বরে। দুবার রিং বাজতেই ও প্রান্ত থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ ভেসে এলো-
‘হ্যালো।’
‘হ্যালো, কে বলছেন?’
জানতে চাইলো জলি। মহিলা পাল্টা প্রশ্ন করলো-
‘আপনি কে? কাকে চাচ্ছেন?’
‘আমি জলি।’
‘কাকে চাচ্ছেন?’
‘আমি বশির সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
‘আমিই উনার স্ত্রী। বলুন।’
‘আপনি কী জানেন, উনি এখন কোথায় আছেন?’
‘উনি অফিসের কাজে একটু বাইরে গেছেন। কেনো বলুন তো?’
মহিলার কণ্ঠস্বরে বিরুক্তি। জলি বললো-
‘উনি অফিসের কাজে নয়, একজন মহিলাকে নিয়ে ফুর্তি করতে একটি হোটেলের রুমে অপেক্ষা করছেন।’
ও-প্রান্ত থেকে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ শোনা গেলো না। জলি লাইন ধরে আছে। ও জানে, বশির আহমেদের স্ত্রী কথা বলবেন। স্ত্রীরা স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনলে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। বশির আহমেদের স্ত্রী একটু পর ভারি গলায় বললেন-
‘আমি আপনার কথা কেনো বিশ্বাস করবো? আপনার পরিচয়টা দিন তো!’
এ কথায় জলি ছোট্ট করে হাসলো। ও বললো-
‘আমার তেমন কোনো পরিচয় নেই। আপনার স্বামী হোটেলের রুমে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’
‘কী বললেন!’
‘হ্যাঁ। উনি এখন আছেন তোপখানা রোডের হোটেল মৃগয়াতে। রুম নম্বর ২২০-এ। আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হলে আপনি এখন ওখানে যেতে পারেন।’
‘আপনার কথা বিশ্বাস করতে যাবো কেনো?’
‘বিশ্বাস করবেন কী করবেন না সেটা আপনার ব্যাপার। তবে একটু সূত্র দিচ্ছি। আজ আপনার বাবার বাড়িতে দাওয়াত আছে, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘বশির সাহেব আপনাকে বলেছেন, অফিসের বড় কর্মকর্তার সঙ্গে তার জরুরি কাজ আছে, তাই না?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ!’
‘এবার বুঝতে পারছেন, আমি মিথ্যা কথা বলছি না?’
‘কিন্তু, আপনি আমাকে এ কথা বলে দিলেন কেনো?’
‘কারণ, আমি চাই, আপনি আপনার স্বামীকে ভালো করে চিনে নিন। তাকে চোখে চোখে রাখুন। আপনার স্বামী কদর্য শ্রেণির লম্পট পুরুষ!’
এ পর্যন্ত বলেই জলি লাইনটা কেটে দিলো। এর বেশি আর কথা বলার প্রয়োজন নেই। বশির আহমেদকে শায়েস্তা করার এর চেয়ে ভালো পথ ওর জানা নেই। অনেক লোক ঘরে ভালো মানুষের মুখোশ পরে বাইরে লাম্পট্য করে বেড়ায়। বশির আহমেদ সে ধরনের লোক। এবার স্ত্রীর সামনে তার মুখোশটা খুলে পড়ুক।
আট.
‘একা’ নামটি শুনে ভীষণ চমকে গেলো পুলক। কারারক্ষী বাতেন এসে ওকে জানালো যে, একা নামের একজন মেয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। একার নাম শুনে ও চমকে উঠলো। একার নাম শুনলে রাগে ওর গা রি-রি করে ওঠার কথা। কিন্তু রাগটা তেমন ও টের পাচ্ছে না। জেলখানায় ওকে একা দেখতে এসেছে বলেই হয়তো ওর রাগটা জ্বলে উঠছে না। এটাও এক ধরনের দুর্বলতার প্রকাশ। কিন্তু এমন হবার কথা নয়। নিজের এই পরিবর্তনকে খতিয়ে দেখতে হবে বলে ভেবে নেয় পুলক। পুলকের আজকের যে ‘মাস্তান’ হিসেবে পরিচয় গড়ে উঠেছে কিংবা ও যে পঙ্কিল পথে হারিয়ে যাচ্ছে, তার জন্য দায়ী ওই ‘একা’ মেয়েটি। একার জন্যই ও আজ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে মাস্তানিতে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে। বিপদগামী হয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। একা এবং একার পরিবারই ওকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের চোরবালিতে। আজ তিন বছর পর একা কোনো এসেছে ওর সঙ্গে দেখা করতে? জেলখানাতেই বা কেনো এসেছে? পুলকের বিস্ময়ের রেশ কাটে না। ও একার সঙ্গে দেখা করবে কিনা ভাবতে লাগলো। কী হবে একার সঙ্গে দেখা করে? যে মেয়েটি ওর জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়েছে, সে তিন বছর পর এখন কী বলতে চায়? জবাব না জানা এ প্রশ্নটার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে পুলক হারিয়ে গেলো নিকট অতীতে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো তিন বছর আগের কিছু স্মৃতি।
একা ছিল ওর ছাত্রী। পুলক তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের সময় ও একাকে পড়ানোর টিউশনিটা পায়। বইপাড়া হিসেবে পরিচিত বাংলাবাজারে একাদের পুরনো আমলের বিশাল বাড়ি। একার বাবার নবাবপুরে মোটর পার্টস এবং ইলেক্ট্রনিক্স মালামালের রমরমা ব্যবসা। ক্লাসমেট ইশতিয়াক ওকে এই টিউশনিটা জুটিয়ে দিয়েছিল। একাকে পড়ানো যে কোনো শিক্ষকেরই গলদগর্ম হবার কথা। পুলকের হতো। কিন্তু মোটা অংকের বেতনটার কথা মাথায় রেখে ও একাকে পড়িয়ে যাচ্ছিল। আসলে একা কখনোই পড়াশোনা পছন্দ করতো না। পড়তোও না। ও শুধু সিনেমা দেখতো। হিন্দি ফিল্মের সব নায়ক-নায়িকা, এমনকি পার্শ্ব চরিত্রাভিনেতার নামও ও বলে দিতে পারতো। হিন্দি বা বাংলা কোনো ছবি ও বাদ দিতো না। বাড়িতে প্রতিদিন ভিসিআরে এবং প্রতিসপ্তাহে সিনেমা হলে গিয়ে ও ছবি দেখতো। ধনী ব্যবসায়ী বাবার আদরের মেয়ে হিসেবে ও বড় হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত স্নেহে। মেট্রিক পাস করেছে তৃতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে। তা ও টেনেটুনে কোনোরকমে পাস হয়েছে। এতেই ওর বাবা-মা ভীষণ খুশি। তারা মেয়েকে নিয়ে আহলাদে আটখানা। ওর বাবা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। কিন্তু তিনি ঝানু ব্যবসায়ী। মা নিরক্ষর। তিনিও সারাক্ষণ সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতে চারটি কাজের লোক। এই বাড়িতে নিয়মিত ভুঁড়িভোজ লেগেই থাকে। একা ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। একাকে পড়াতে অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে যেতো পুলক। একা মাঝে মাঝে অদ্ভুত আচরণ করতো। পুলক লক্ষ্য করতো একা মাঝে মাঝে ওর পা রেখে দিতো পুলকের পায়ের ওপর। পুলক পা সরিয়ে নিলেও একা পা বাড়িয়ে দিতো ওর পায়ের দিকে। কিন্তু ‘মুখে কিছুই হয়নি’ ভাব ফুটিয়ে রাখতো। পুলক বিরক্ত হয়ে মাঝে মাঝে ওকে এজন্য বকা দিতো। পুলক বকা দিলেই একা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতো। ওর কান্না শুনে ছুটে আসতো ওর মা। পুলককে রাগী গলায় ঢাকাইয়া ভাষায় বলতো-
‘মাস্টার সাব, আমার মাইয়ার কী হইছে। বকা দিছেন না-কি? বকা দিছেন কেল্লাই?’
বকা দেবার কারণ একার মাকে পুলক বলতে পারতো না। ও জানতো সত্যি কথা বললেও একাকে ওর বাবা-মা কিছু বলবে না। কিন্তু পুলকের চাকরিটা যাবে। তাই ও চুপসে যেতো। ওর মধ্যেও একাকে পড়াশোনায় মনযোগী ছাত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে জেদ কাজ করতো। পুলকের মনে হতো একার দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলে দিতে পারলেই মেয়েটির ‘পাগলামি’ বন্ধ হয়ে যাবে। পুলক আন্তরিকভাবে সে চেষ্টাই করতো। কিন্তু আট মাসের মধ্যে ও পড়ে গেলো একার পাতানো ফাঁদে। এই ফাঁদটি একা তৈরি করেছিল সিনেম্যাটিক কনসেপ্টে। পুলক তখন মাস্টার্সের ছাত্র। অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল না পুলক। তাই ও মাস্টার্সে সিরিয়াস হয়ে ওঠে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় খুব একটা যেতো না। ক্লাস, কলেজের চত্বর, লাইব্রেরি আর হল- এই পরিধিতে নিজেকে আটকে রেখেছিল পুলক। শুধু বিকেলে টিউশনি করতে যেতো। প্রতিদিনের মতো সেদিনও পুলক একাকে পড়াতে গেলো। একা সেদিন একটি ব্যাগ হাতে উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওদের বাড়ির গেটের সামনে। পুলককে দেখেই বললো-
‘স্যার, আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।’
‘আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছো, কেনো!’
‘সেটা বলছি। আগে ট্যাক্সিতে ওঠেন।’
বেরিট্যাক্সি থামানো ছিল ওর সামনে। একা ওখানে চড়ে বসলো। এরপর পুলকের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘তাড়িতাড়ি বেবিট্যাক্সিতে ওঠেন!’
বিস্ময় প্রকাশ করে পুলক বললো-
‘কেনো উঠবো! কোথায় যাবে?’
‘আগে ওঠেন তো, পরে বলছি।’
পুলক অস্বস্তি নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠলো। একা বেবিট্যাক্সিওয়ালার উদ্দেশে বললো-
‘ফকিরেরপুল যান।’
পুলকের অস্বস্তি বাড়তে থাকে। ও উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চাইলো-
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি? কিছুই তো বললে না! এখন বলো।’
‘স্যার, আমরা চিটাগাং যাচ্ছি।’
‘হোয়াট! চিটাগাং!’
‘জ্বি, স্যার।’
‘কেনো?’
‘আপনে ঘাবড়াচ্ছেন কেনো? এতো ডরান কেনো?’
‘তুমি এসব কী বলছো? আমি চিটাগাং যাবো কেনো?’
এ প্রশ্নে একা পুলকের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। ও বললো-
‘স্যার, আমার মা আজ রাগ করো চিটিগাং চলে গেছেন। ফুপুর বাড়িতে। আমি যাচ্ছি তাকে আনতে। আমি একা মেয়ে মানুষ কেমনে যাই? তাই আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। চিটাগাং যাবো আর আসবো।’
‘তাই বলে এভাবেই কী চলে যাওয়া যায়? তা ছাড়া আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছো, এটা কী ঠিক হচ্ছে? সবাই কী ভাববে?’
এবার মুচকি হাসলো একা। ও বললো-
‘সবাই অপবাদ দিলে আমারে না হয় বিয়ে করে ফেলবেন।’
‘শাট-আপ! এ ধরনের ফাজলামি আমি পছন্দ করি না। মনে রেখো, তুমি আমার ছাত্রী।’
‘সরি, স্যার। এমন কথা আর বলবো না।’
একা চট্টগ্রাম যাওয়া পর্যন্ত সত্যিই আর কোনো কথা বলেনি। ধনীর আদরের কন্যা এই প্রথম ধমক হজম করে চুপসে গেলো।
ফকিরেরপুল থেকে ওরা টিকিট কেটে বিলাসবহুল বাসে চড়ে বসলো। পাঁচ ঘণ্টা পর বাস চট্টগ্রামে পৌঁছাল। এই দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা একা পুলকের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। পুলকও কথা বলার প্রয়োজনবোধ করেনি। ওর মনে অস্বস্তি ছড়িয়ে ছিল। বাস পাহাড়তলীতে এসে শেষ স্টপিজে থামলো যখন, তখন রাত সাড়ে এগারটা। বাস থেকে নেমেই পুলক জানতে চাইলো-
‘তোমার ফুপুর বাড়ি কোথায়?’
একা ছোট্ট করে বললো-
‘জানি না।’
এটুকু জবাবেই ভূমিকম্প শুরু হলো যেনো পুলকের বোধশক্তিতে। ও একার মুখের দিকে তাকালো। একার চোখে-মুখে কোনো উদ্বেগ নেই। পুলক ফের বললো-
‘তুমি না বলেছিলে, তোমার মা এসেছে ফুপুর বাড়িতে? সেই ফুপুর বাড়িটা কোথায়?’
‘এখানে আমার কোনো ফুপুর বাড়ি নেই।’
একার জবাবে হতভম্ব হয়ে গেলো পুলক। একা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পুলক ওর খুব কাছে গিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-
‘একা, তুমি এসব কী বলছো! তোমার মাথা কী ঠিক আছে!’
‘না, আমি সত্যি কথাই বলছি, স্যার।’
‘কোন কথাটি সত্যি? আমাকে আবার বলো। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!’
‘এখানে আমার মা আসেনি। এখানে আমার কোনো ফুপুর বাড়িও নেই।’
‘এসব কী বলছো! তাহলে তুমি কেনো এসেছো!’
‘আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি, স্যার!’
‘পালিয়ে এসেছো, কেনো!’
‘কেনো বুঝতে পারছেন না? আপনে কেয়ামত থেকে কেয়ামত তক্ দেখেন নাই?’
‘তুমি এসব কী বলছো!’
‘কেনো স্যার, আমাকে আপনি বিয়ে করতে পারেন না?’
‘বিয়ে! তোমাকে! কেনো!’
পুলকের কণ্ঠে বিস্ময় আর বেদনা আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে থাকে। একা একটু সময় নিয়ে বলে-
‘স্যার, আমি অনেকদিন চিন্তা করেই আপনাকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালানোর সিদ্ধান্তটা নিয়েছি। যা হবার হয়েছে, আমি আর বাড়ি ফিরে যাবো না।’
‘অসম্ভব!’
‘কী?’
‘তোমাকে বিয়ে করা।’
‘কেনো?’
‘এর উত্তর জেনে কী হবে? তুমি একবারও ভাবলে না, আমার মতামতটা কী হতে পারে! তোমার মনে ইচ্ছে হলো, আর এমনি মিথ্যা কথা বলে আমাকে নিয়ে পালিয়ে এলে? ছিঃ!’
এবার একা কাঁদতে শুরু করলো। কিন্তু একার এই কান্নার কোনো মূল্য নেই পুলকের কাছে। ওরা কথা বলছিল বাস স্টপিজের কাউন্টারের সামনে। কাউন্টারে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড়। রাতের বাস কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে যাবে। যাত্রীদের অনেকে পুলক এবং একাকে কৌতূহলী চোখে দেখছিল। ওদের কথা শুনতে না পেলেও ওদের মুখের অভিব্যক্তি যেনো পড়ে নিতে চাইছিল কেউ কেউ। পুলকের ওসব নিয়ে ভাববার সময় নেই। ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলো এখান থেকেই ঢাকায় ফিরে যাবে। যেভাবেই হোক। ও একাকে নরোম গলায় বললো-
‘যা হবার হয়েছে। চলো ফিরতি টিকিট কেটে ঢাকায় ফিরে যাই। এখান থেকেই।’
অশ্রুভেজা চোখে পুলকের দিকে তাকালো একা। বললো-
‘স্যার, আমি কি খুবই খারাপ মেয়ে? আমাকে বিয়ে করলে আপনি কি বেশি ঠকে যাবেন?’
‘ঠিক তা নয়, একা। প্রথমত তুমি আমার ছাত্রী। আমি তোমাকে কখনো ও চোখে দেখেনি।’
‘কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসি, স্যার!’
‘ওহ! তুমি বুঝতে পারছো না! শোনো, আমি এখনো ছাত্র। আমার পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো নয়। কবে মাস্টার্স পাস করবো আর কবে চাকরি পাবো- এর কোনো ঠিক নেই। তোমাকে বিয়ে করলে আমি খাওয়াবো কী?’
পুলকের এ প্রশ্নে যেনো খুশি হলো একা। ও উৎসাহ প্রকাশ করে হাতের ব্যাগটি দেখিয়ে বললো-
‘ভয় নেই। আমি অনেক টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছি! এখানে দশ লাখ টাকা আছে!’
এ কথায় আরো ভড়কে গেলো পুলক। এতোটা দুঃসাহসী কোনো মেয়ে হতে পারে? হয়তো কেউ কেউ হয়। পুলক নিচু গলায় বললো-
‘ঠিক আছে, আগে চলো ঢাকায় ফিরে যাই। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, আমি তোমাকে বিয়ে করবো। তবে এভাবে পালিয়ে নয়। তোমার বাবার অর্থও আনতে হবে না।’
‘কিন্তু, বাড়ি ফিরে গেলে আপনি আর আমাকে পাবেন না। আমি জানি, আমার বাবা আপনাকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তিনি খুবই ডেঞ্জারাস লোক!’
‘আমার যা হবার হবে। এখন চলো ঢাকায় ফিরে যাই। লক্ষ্মী মেয়ে!’
একা ঢাকায় ফিরে যেতে আপত্তি জানাতে লাগলো। কিন্তু পুলক নাছোড়বান্দা। ও এগিয়ে গেলো টিকিট কাউন্টারের দিকে। একা নড়লো না। পুলক টিকিট কেটে এনে বললো-
‘যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসো, তবে ফিরে চলো।’
‘কিন্তু স্যার, এতে আপনার বিপদ হতে পারে!’
‘হলে, হবে। তবুও ঢাকায় ফিরতে চাই। চলো।’
এ কথা বলে পুলক বাসের দিকে এগিয়ে গেলো। হতাশা আর স্বপ্নভাঙা বেদনা নিয়ে পুলককে অনুসরণ করলো একা।
ভোরবেলা ওরা ঢাকায় ফিরলো। পুলক একাকে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়াটাকে দায়িত্ব বলেই মনে করলো। ও একাকে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলো। একাদের বাড়িতে প্রবেশ করেই পুলক বুঝতে পারলো ওর বাবা-মা সারারাত কেউ ঘুমাননি। সেটাই স্বাভাবিক। বাড়ি থেকে সুন্দরী যুবতী মেয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে মা-বাবার চোখে ঘুম আসার কথা নয়। একাদের বাড়িতে কেমন একটা থমথমে ভাব। ভোরের নির্মল পবিত্রতাকে স্পর্শ করেই যেনো পুলক করাঘাত করলো একাদের বাড়ির দরজায়। দরজা খুললেন একার বাবা। তার পেছনে ওর মা। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময়ের ঢেউ। একা তাদের কোনো কিছু না বলে হন হন করে দরজা দিয়ে ঢুকে গেলো। একাকে ওর বাবা-মা কিছুই বললেন না। ‘কিছুই হয়নি’ এমন একটা ভাব তাদের মুখে ফুটে উঠলো। পুলক ইতস্তত করতে লাগলো। ওর কিছু একটা বলা দরকার। ঘটনাটা খুলে বলতে হবে। কামাল উদ্দিন পুলকের উদ্দেশে শান্ত গলায় বললেন-
‘আপনি ভেতরে আসুন।’
একার বাবা দরজা থেকে আগেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন। পুলক তাদের ড্রয়ংরুমে প্রবেশ করলো।
ও ড্রয়ংরুমে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এরপর বসলো সোফায়। একার মা বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। কামাল উদ্দিন বসলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। পুলক তার উদ্দেশে বললো-
‘আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। পুরো ঘটনাটা আপনাকে খুলে বলতে চাই।’
কামালউদ্দিন ঠাণ্ডা চোখে তাকালেন পুলকের দিকে। বললেন-
‘মাস্টার সাহেব, আপনি বসেন। আমি আসতাছি। আপনার সব কথা শুনবো।’
এই বলে কামাল উদ্দিন ভেতরের রুমের দিকে চলে গেলেন। পুলক অস্বস্তি নিয়ে একাদের ড্রয়ংরুমে বসে রইলো। ও অপেক্ষা করতে লাগলো কামালউদ্দিনের জন্য। তাকে আসল ঘটনা খুলে বলে ও চলে যাবে। দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণের ক্লান্তিতে পুলকের শরীর অবসন্ন। ও অবসাদ নিয়ে একার বাবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রায় আধাঘণ্টা পর কামালউদ্দিন ড্রয়ংরুমে ফিরে এলেন। তার পেছনে এলো পুলিশের একটি দল। কোতোয়ালি থানার ওসি আকবর হোসেন এগিয়ে এলেন পুলকের সামনে। পুলক পুলিশ দেখে হতবাক। কামালউদ্দিন পুলককে দেখিয়ে ওসির উদ্দেশে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন-
‘এই হারামজাদাকে লইয়া যান! ও আমার মাইয়া কিডন্যাপ করছিল। ওরে কিডন্যাপ কেনোসে এরেস্ট করেন!’
পুলক খুব দ্রুত বুঝে নিলো ওর ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে। ওর মনটা এতোই ভেঙে গেলো যে, ও টু শব্দও করলো না। ওসি সাহেব ‘ভয়াবহ এক ক্রিমিনাল ধরছেন’ এমন ভাব করে পুলকের শার্টের কলার চেপে ধরে চেয়ার থেকে ওকে টেনে তুললেন। পুলকের হাতে হাতকড়া লাগাতে লাগাতে একার বাবার উদ্দেশে ওসি বললেন-
‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। শুয়োরের বাচ্চাকে একেবারে সাত বছরের জেল খাটিয়ে ছাড়বো!’
পুলককে থানায় নিয়ে গেলো পুলিশ। সেই থেকে পুলকের নষ্ট জীবনের শুরু। ওর নষ্ট হবার কষ্টের কথা কেউ জানে না। পুলক এসব কথা কাউকে বলতেও চায় না।
জেলখানাটা বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে এলে কেউ আর সহজ পথে চলতে পারে না। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সমাজের বাঁকা পথটা বেছে নেয় অনেকে। জেলখানা নষ্ট হবার এক আদর্শ স্থান। এই জেলখানাই বদলে দিয়েছে পুলকের জীবন। একসময়ের মেধাবী ছাত্র এবং কণ্ঠশিল্পী পুলক এখন মাস্তান। জেলখানা থেকেই তো এই জীবনের শুরু। আর এর জন্য দায়ী একা। সেই একাই আজ এসেছে ওর সঙ্গে দেখা করতে। আশ্চর্য!
‘এমনভাবে চুপ মাইরা গেলেন কেনো? যান মেয়েটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। দেখা দিয়া আসেন।’
কারারক্ষী বাতেনের কথায় সম্বিৎ ফিরে আসে পুলকের। ও ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘মিয়া সাহেব, মেয়েটিকে গিয়ে বলেন যে, আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাই না। সে যেনো আর কখনো না আসে।’
‘কেনো?’
‘যা বললাম, তা মেয়েটিকে বলে আসুন। প্রশ্ন করবেন না।’
কারারক্ষী বাতেন খানিকটা অবাক হয়ে চলে গেলো জেলগেটের দিকে। পুলক স্মৃতি হাতড়ে ডুবে যেতে লাগলো নষ্ট হবার মিহিন কষ্টে।
নয়.
উকিলরা কি টাকার বুভুক্ষ প্রাণী? প্রশ্নটি জলির মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে। ও বসে আছে শহরের সবচেয়ে বয়স্ক একজন উকিলের সামনে। এই উকিলের নাম বিমল রায়। তিনি ক্রিমিনাল মামলার একজন নামকরা উকিল। তিনি মামলা নিয়ে আদালতে দাঁড়ালে দাগী আসামিরও জমিন মঞ্জুর হয়ে যায়। আর বাদীপক্ষের জন্য দাঁড়ালে আসামি ছিঁচকে চোর হলেও তার জামিন হয় না। বিমল রায়কে নিয়ে এ ধরনের গল্প চালু আছে আদালতপাড়ায়। জলি খোঁজখবর নিয়েই তার কাছে এসেছে। জলি জানে, ভালো একজন উকিল ধরলে পুলককে জেল থেকে বের করা যাবে। পুলককে জেল থেকে বের করার দায়বোধ ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। নইলে পুলক কেনো, সকল পুরুষগুলোই যদি জেলে থাকতো, ওর চেয়ে আর কেউ বেশি খুশি হতো না। ওর হাতে কোনো মন্ত্রবল থাকলে ও সকল পুরুষকেই জেলখানায় বন্দি করে রাখতো। মাঝে মাঝে জেলখানায় হিংস্র কুকুর ছেড়ে দিতো বা ওপর থেকে গরম পানি ঢেলে দিতো। উকিলের চেম্বারে বসে ও এ কথাই ভাবছিল। উকিলের কথায় ওর সম্বিৎ ফিরে আসে।
‘এখানে পঞ্চাশ হাজার টাকাই আছে তো?’
জলির দেওয়া টাকার বান্ডিল দেখিয়ে কথাটি বললেন উকিল। জলি বললো-
‘জ্বি। গুনে নিতে পারেন।’
‘আসামির জামিন মঞ্জুর হলে আরো বিশ হাজার দিতে হবে, জানেন তো?’
‘জ্বি, জানি। আপনি এর আগেও এ কথা বলেছেন। গত আধাঘণ্টায় এ কথাটি আপনি পাঁচবার বলেছেন।’
জলির কথায় উকিল সাহেব একটু হাসলেন। এরপর বললেন-
‘সব মক্কেলকেই টাকার কথাটি বেশি বলতে হয়। নইলে দেখা যায় পরে তারা টাকা দিতে পারেন না। তখন কান্নাকাটি শুরু হয়। ওসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’
‘আমার বেলায় তা হবে না। আমি টাকা জোগাড় করেই এসেছি।’
‘তাহলে একসাথেই সত্তর হাজার টাকাই দিতে পারতেন।’
‘পারতাম। ইচ্ছে করেই দেইনি। আগে জামিন হোক, তারপর বাকি বিশ হাজার দেবো।’
‘ঠিক আছে। তবে মনে রাখবেন, জামিন হবার পর কোনো গল্প-টল্প চলবে না। টাকা না পেলে আমি জামিননামায় সাইন করবো না।’
বিমল রায় জলিকে হুশিয়ার করে দেন। ওর মনে হলো লোকটি নিষ্ঠুর প্রকৃতির। টাকা ছাড়া যেনো কিছুই চেনেন না। জলি অর্থখেকো উকিলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভারি গলায় বললো-
‘বাকি বিশ হাজার টাকা আমি কাল এসে দিয়ে যাবো। আসামির জামিন না হলে কিন্তু আমার সব টাকা ফেরত দিতে হবে!’
বিমল রায় আবারো ছোট্ট করে হাসলেন। এ হাসিটি যেনো নিজের অহংকারের প্রতিফলন। হাসির অর্থ এ রকম যে, বিমল রায় মামলা নিলে আসামির জামিন না হবার উপায় নেই। তিনি বললেন-
‘কাল বাকি টাকা নিয়ে আসুন। আমি আগামী সপ্তাহে আসামির জামিনের জন্য আদালতে পিটিশন দাখিল করবো। আশা করি আসামি ছাড়া পাবে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।’
বিমল রায় গা এলিয়ে দিলেন চেয়ারে। জলি গলা নামিয়ে বললো-
‘একটা অনুরোধ রাখতে হবে।’
‘কিসের অনুরোধ আবার?’
বিরক্ত প্রকাশ করলেন তিনি। জলি বললো-
‘ভয় নেই, টাকা কমানোর কথা বলবো না।’
‘তবে আবার কিসের কথা?’
‘কথাটি হচ্ছে, আসামি কীভাবে, কেনো এবং কার জন্য জেল থেকে ছাড়া পেলো, তা তাকে বলা যাবে না।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, পুলককে কখনো বলবেন না যে, আমি তাকে ছাড়িয়েছি।’
‘কেনো?’
‘সেটা জেনে আপনার কোনো লাভ নেই। যে কোনো কারণেই হোক, আমি চাই না তিনি জানুক, আমি তাকে জেল থেকে বের করেছি।’
‘ও বুঝতে পেরেছি। তোমাদের মধ্যে কিছু একটা আছে। ঠিক আছে, তা-ই হবে। এটা কোনো শক্ত অনুরোধ নয়।’
‘আমার কথাটি রাখবেন, কিন্তু!’
‘রাখবো, রাখবো। কথা দিচ্ছি।’
‘তাহলে আমি আসি। কাল এসে বাকি টাকা দিয়ে যাবো।’
‘আচ্ছা আসুন। কাল টাকা আনতে ভুলবেন না।’
‘না, না। ভুল হবে না।’
জলি বিমল রায়ের চেম্বার থেকে বের হবার সময় দেখতো পেলো উকিলের সহকারীর রুমে বেশ কজন লোক বসে আছেন। দুজন মহিলাও আছেন। তারা নিশ্চয়ই মামলা সংক্রান্ত কারণে এসেছেন। উকিল সাহেবের দরজা হা করে খোলা। উকিলের সঙ্গে জলির যে কথা হলো, তা নিশ্চয় তারাও শুনতে পেরেছেন। বিমল রায় এমন প্রকাশ্যে মক্কেলদের সঙ্গে মামলা নিয়ে আলোচনা এবং অর্থিক লেনদেন কেনো করেন, জলি তা বুঝতে পারছে না। উকিল ও মক্কেলদের আলোচনা গোপন থাকাটাই ভালো। বিমল রায় জলির সঙ্গে মামলা ও টাকা নিয়ে যেভাবে আলোচনা করলেন, তা গোপনীয়তার মধ্যে পড়ে না। এ কথা ভেবে ও একটু বিরক্ত হলো তার ওপর। ও উকিলের চেম্বার থেকে দ্রুত বের হয়ে এলো। প্রতিদিন কতজন লোককে আসতে হয় উকিলদের কাছে? কী পরিমাণ টাকা লেনদেন হয় আদালাতপাড়ায়? প্রশ্ন দুটি উঁকি দিলো ওর মনে। কিন্তু প্রশ্ন দুটির জবাব ওর জানা নেই।
‘এই যে, শুনুন!’
জলিকে পেছন থেকে কে যেনো ডাকলো। ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়ালো ও। দেখতে পেলো ওর পেছনে বোরকা পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির শুধু মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছে। বয়স উনিশ-বিশ বছর হবে। মেয়েটিকে জলি চিনতে পারলো না। ও একটু অবাক হলো। মেয়েটি জলির খুব কাছে চলে এলো। বললো-
‘আপনার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?’
‘আমার সাথে! কেনো? আমি তো আপনাকে চিনতে পারলাম না!’
‘আমাকে আপনার চেনার কথা নয়।’
‘তাহলে?’
‘আপনি যখন উকিলের সঙ্গে কথা বলছিলেন, আমি তখন বাইরের রুমে বসেছিলাম। আপনার সব কথা আমি শুনেছি।’
‘তাতে কি হয়েছে?’
‘না, জানতে চাচ্ছিলাম আপনি দাদার কী হন?’
‘দাদা? কোন দাদা?
‘পুলক দাদা।’
মেয়েটির কথায় হচকিয়ে গেলো জলি। ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। কী বলবে তা ও ভাবতে লাগলো। মেয়েটি এবার শব্দ না করে কাঁদতে লাগলো। এতে অপ্রস্তুত হয়ে গেলো জলি। ও বললো-
‘তুমি কাঁদছো কেনো?’
মেয়েটিকে ও ‘আপনি’ থেকে তুমি করে বলে ফেললো। মেয়েটি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। একসময় কান্না সামলে বললো-
‘আমার দাদা মাস্তান ছিল না। জানেন, ও এখনো একজন ভালো মানুষ। অথচ…!’
মেয়েটি ফের ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। জলি এসব কান্নাকাটি পছন্দ করে না। মেয়েরা কথায় কথায় কাঁদবে কেনো? ও মেয়েটির হাত ধরলো। বললো-
‘তোমার নাম কি? পুলক তোমার কী হয়?’
‘আমার নাম শায়লা। পুলক আমার ভাই।’
‘ও আচ্ছা!’
শায়লা বললো-
‘আমিও এসেছিলাম উকিলের সাথে কথা বলতে। এসে দেখি, আপনি দাদার জামিনের ব্যাপারে উকিলের সঙ্গে কথা বলছেন।’
‘ওহ! তুমি একাই এসেছো এই আদালতপাড়ায়?’
‘হ্যাঁ। আমি কাউকে না বলে গোপনে এসেছি। ভাইয়াকে জেল থেকে বের করবে এমন কেউ নেই, তাই…।’
মেয়েটির কথা শুনে জলির মনটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। ওর মন সাধারণত কাঁপে না। এখন একটু কেঁপে উঠলো। শায়লা ফের বললো-
‘আপনি তো বললেন না, আপনি দাদার কী হন?’
এ কথার কী জবাব দেবে জলি? ও মুখে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে বললো-
‘আমি এর জবাবে যা বলবো, তা তুমি বিশ্বাস করবে না।’
‘তবুও বলুন।’
‘আমার পরিচয় জেনেই বা তোমার কী হবে?’
‘বাহ রে, আপনি দাদার জামিনের জন্য এতোগুলো টাকা দিলেন, আর বলছেন আপনার পরিচয় জেনে কী হবে!’
জলি বুঝতে পারলো শায়লাকে সত্য কথাটি বলা দরকার। নইলে ও ভুল বুঝবে। ও বললো-
‘তোমার দাদাকে আমি চিনি না। তবে তিনি আমার উপকার করেছিলেন। তাই ভাবলাম, তাকে জেল থেকে বের করিয়ে দিই। ব্যাস!’
‘তাই বলে এতোগুলো টাকা উকিলকে দিয়ে দিলেন!’
‘ওই টাকাগুলো আমার তেমন কোনো কাজে লাগতো না। তাই ব্যয় করে ফেললাম।’
‘জানেন, আসতে আসতে ভাবছিলাম, ভাইয়াকে অন্ধকার থেকে আলোতে টেনে আনার কেউ নেই। কিন্তু আপনাকে দেখে আমার আশঙ্কাটা দূর হয়ে গেলো।’
‘আমাকে দেখে! কেনো?’
‘বাহ রে, আপনি ভাইয়াকে জেল থেকে বের করার জন্য কতোগুলো টাকা দিচ্ছেন উকিলকে, নিজের চোখেই তো দেখলাম!’
জলি বুঝতে পারছে শায়লা ওকে নিয়ে ভুল অংক করছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আর কোনো কথা বলতে ওর মন চাইছে না। ভাইয়ের দুরাবস্থায় দুঃখ ভারাক্রান্ত বোন যদি কিছু দেখে বা ভেবে আনন্দ পায়, ক্ষতি কী? জলি ওই আনন্দ ভেঙে দেবে কেনো? ও বললো-
‘তুমি তো সবই শুনেছো। তোমাকে আর নতুন করে উকিল ধরতে হবে না। যা করার আমিই করছি। তুমি বাড়ি ফিরে যাও।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে, তা তো বললেন না।’
‘আমার নাম জলি। এটুকুই আমার পরিচয়।’
‘দাদার সঙ্গে আপনার…?’
‘কোনো সম্পর্ক নেই।’
‘তাহলে…!’
‘একটা দায়বোধ থেকে আমি তোমার দাদাকে জেল থেকে বের করতে এসেছি। তিনি আমাকে দুবার উপকার করেছেন। তাই ভাবলাম, তাকে একটু সহযোগিতা করি। আমি নিজেকে গোপন রেখেই তাকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি জেনে গেলে। একজন সাক্ষী হয়ে গেলো।’
‘আমার অবাক লাগছে।’
‘এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত অনেক অবাক হবার মতো ঘটনা ঘটছে। তুমি কী আরো কিছু বলবে? আমাকে যেতে হবে।’
শায়লা কিছু বললো না। ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো জলির পায়ের সামনে। ওকে সালাম করলো চট করে। জলির শরীর যেনো কেঁপে উঠলো। ও হতভম্ব হয়ে গেলো। ও কী শ্রদ্ধা করার মতো কেউ? শায়লা এ কী করলো! ভেতরের তুমুল কাঁপন সামলে নিলো জলি। এ ধরনের আবেগকে প্রশ্রয় দিতে নেই। শায়লা উঠে দাঁড়াতেই জলি কিছু না বলে হাঁটতে লাগলো। ও একবারও পেছনে ফিরে তাকালো না। সবাই কি পেছনে ফিরে তাকাতে পারে? জলির পেছনে অদ্ভুত বিহ্বলতার আবেশে দাঁড়িয়ে রইলো শায়লা। আদালতপাড়ায় লোকের ভিড়ে চট করেই হারিয়ে গেলো জলি।
দশ.
বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে রশিদ আহমেদ আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশটা খটখটে। সূর্যটা কড়া রোদে জ্বলজ্বল করছে। বাতাসও জোরে বইছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি। কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। এমন আবহাওয়া খুব একটা দেখা যায় না। আজকাল আবহাওয়া কেমন রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। শীতের সময় বেশি শীত। গরমের সময় বেশি গরম। অসহ্য! হয়তো কলিকাল এসে গেছে। সবকিছু কেমন উলট-পালট। এতোদিন যা দেখে আসছে, এখন তা দেখা যায় না। যেমন রশিদ আহমেদ বরাবরই দেখে এসেছেন রমজান মাসে থাকে প্রচণ্ড গরম। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রোজা রেখে কী কষ্টই না সহ্য করতো! দাবদাহে একেকজনের জিহ্বা যেনো বের হয়ে আসতে চাইতো। দীর্ঘ সময় ধরে সিয়াম সাধনা করে সন্ধ্যায় রোজাদাররা ইফতার করতেন। আর এখন? রোজা হচ্ছে শীতকালে। রোজার সকাল শুরু হতেই ঝুপ করে নেমে আসছে সন্ধ্যা। রোজাদারদের সেই পানির তৃষ্ণা কই? অনাহারের কষ্ট কই? এমন তো তিনি আগে কখনো দেখেননি। কলিকাল বলে কথা! রশিদ আহমেদ অবসর পেলে এসব কথা ভাবেন। তিনি প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষক। তিনি স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ধর্মের ক্লাসটা নেন। মাঝে মাঝে বাংলা বা সমাজ বিজ্ঞানের ক্লাসও তিনি নেন। রশিদ আহমেদ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা পেশায় সুনাম অর্জন করতে না পারলেও কৃষিকাজে তিনি সাফলতা অর্জন করেছেন। স্কুলে শিক্ষকতার পর তিনি কৃষিকাজ নিয়েই মেতে থাকেন। তিনি একজন স্বচ্ছল কৃষক হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তবে তিনি শিক্ষকতা পেশাও ছেড়ে দেননি। বাড়ির পাশেই স্কুল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন ‘স্যার, স্যার’ বলে ডাকে, তখন তার মনটা কেমন নেচে ওঠে। শিক্ষক বলে গ্রামবাসীরাও তাকে সম্মান করে। তিনি যতো বড় কৃষকই হন কেনো, গ্রামের লোকরা কৃষকদের যেনো সম্মান করতে কুণ্ঠাবোধ করে। আবার স্কুলের শিক্ষকদের দেখলে তারা সালাম দিয়ে সম্মান জানায়। একজন শিক্ষকের চেয়ে কি একজন কৃষকের সম্মান কম? এ প্রশ্নটার জবাব মাঝে মাঝে খোঁজেন তিনি। রশিদ আহমদের সম্মানবোধটা খুব টনটনে। তিনি অন্যায় কোনো কাজ করেন না, আবার অন্যায়কে সহ্য করতেও পারেন না। গ্রামে তার একটা সম্মানজনক ইমেজ আছে। কিন্তু এই ইমেজটা এখন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সেটা নিজের জন্য নয়, তার ছেলের জন্য। ছেলেটা হঠাৎ করে বখে গেছে। পড়াশোনা শিখেও নষ্ট স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এ নিয়ে তার দুঃখের চেয়ে ক্ষোভটাই বেশি। গ্রামের লোকরা ছেলের কুকর্ম নিয়ে নানা কথা বলে বেড়ায়। এসব শুনে লজ্জায় তার মাথা নিচু হয়ে যায়। তিনি নীরবে চোখের জল ফেলেন। রশিদ আহমেদ কদিন ধরে ভাবছিলেন ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেবেন। এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেবার কথা যখন ভাবছিলেন, তখনই মেয়ে শায়লার কাছ থেকে তিনি জানতে পারলেন একটি মেয়ে তার ছেলেকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে। খবরটা শুনে তিনি খুশি হলেন। মেয়েটি নিশ্চয়ই পুলককে পছন্দ করে। নইলে মাস্তান জেনেও মেয়েটি পুলককে জেল থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করবে কেনো? রশিদ আহমেদ অনেক মেয়েটির নাম ও বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করেছেন। এবং তিনি আজ চলে এলেন জলিদের বাড়ি। জলিদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে তিনি আকাশ দেখছিলেন। আকাশটা আজ মেঘমুক্ত ও স্বচ্ছ। গাঢ় নীল। এমন আকাশ দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। রশিদ আহমেদের মনটাও আজ ভালো।
বাড়ির উঠোনে একজন মধ্য বয়স্ক অচেনা লোককে দেখে অবাক হলো জলি। দরজায় দাঁড়িয়ে ও বললো-
‘আপনি কে? কার কাছে এসেছেন?’
জলির প্রশ্নে আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে আনলেন রশিদ আহমেদ। তিনি জলির দিকে তাকিয়ে বললেন-
‘তোমার নাম কি জলি?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কে?’
‘আমাকে তুমি চিনবে না। আমার নাম রশিদ আহমেদ। আমি গ্রামের একজন সাধারণ স্কুলমাস্টার।’
‘আপনি আমার কাছে কেনো এসেছেন, ঠিক বুঝতে পারছি না?’
জলি বিস্ময় প্রকাশ করে। রশিদ আহমেদ মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে বললেন-
‘তুমি কি আমাকে একটা মোড়া বা চেয়ার দিতে পারো। সেই অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি।’
এ কথায় জলি একটু লজ্জা পেলো। ও ঘর থেকে বেতের একটা মোড়া এনে রাখলো উঠোনে। অচেনা কাউকে ঘরে বসতে বলা ঠিক নয়। হোক বয়স্ক মানুষ। রশিদ আহমেদ মোড়ায় বসলেন। জলি কৌতূহলী গলায় বললো-
‘আমার কাছে কোনো এসেছেন, তা কিন্তু বলেন নি?’
‘বলছি। আমি আমি প্রায় ২০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তোমার কাছে এসেছি বড় আশা নিয়ে।’
‘আমার কাছে! কেনো? আপনার পরিচয় কিন্তু পেলাম না।’
‘তোমাকে একটা অনুরোধ করতে চাই।’
‘অনুরোধ! আমাকে! আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।’
জলির বিস্ময় বাড়তে থাকে। রশিদ আহমেদ বলেন-
‘আমি শুনেছি, তুমি পুলককে জেল থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছো। ওকে শুধু জেল থেকে ছাড়ালেই চলবে না, ওকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমি জানি, তুমি সেটা পারবে।’
এবার রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেলো জলির কাছে। ও বললো-
‘পুলক আপনার কী হয়?’
‘পুলক? ও, ও আমার ছেলে।’
বিব্রতভাবে জবাব দিলেন রশিদ আহমেদ। জলি বুঝতে পারলো, শায়লার মতো ওর বাবাও ভুল অংক করছেন। তাই তিনি ওর কাছে ছুটে এসেছেন। জলি একটু হাসলো। রশিদ আহমেদ জলির উদ্দেশে বললেন-
‘ছেলেটা আমার কেনো জানি নষ্ট হয়ে গেলো। পড়াশোনা করছিল। মাস্টার্স দেবার আগেই ও নষ্ট স্রোতে ভেসে গেলো। কেনো এমন হলো বুঝতে পারলাম না। ওকে নিয়ে অনেক আশা ছিল, মা!’
জলি বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘আপনার ছেলে অনার্স পাস করেছিল!’
‘কেনো তুমি জানো না? ও তো অনার্স সম্পন্ন করেছিল। ভেবেছিলাম, মাস্টার্সটা পাস করলে ভালো একটা চাকরি করবে। কিন্তু কী থেকে কী যে হয়ে গেলো!’
‘আপনার ছেলের জন্য আমারও আফসোস হচ্ছে।’
‘শুধু আফসোস করলে হবে না। ওকে সৎ পথে ফিরিয়ে আনো। তুমিই ওকে ফেরাতে পারবে।’
রশিদ আহমেদের কথায় হাসি পেলো জলির। ও হাসি সামলে নিলো। জলির মনে হলো, ‘পুলকের সঙ্গে যে ওর কোনো সম্পর্ক নেই’ এ কথাটি ও যতোবারই বলবে, রশিদ আহমেদ তা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। এক ধরনের লোক আছেন, যারা এতোই সরল যে, নিজে যা ভাবেন বা বিশ্বাস করেন তা থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারেন না। রশিদ আহমেদ সে ধরনের একজন লোক। জলি তার ভুল ভাঙানোর চেষ্টা না করে বললো-
‘ঠিক আছে, আপনি বাড়ি ফিরে যান। আমি আপনার অনুরোধ রাখার চেষ্টা করবো।’
‘চেষ্টা নয়, মা। আমার অনুরোধটা তোমাকে রাখতেই হবে।’
কঁকিয়ে উঠলেন রশিদ আহমেদ। জলি বললো-
‘আচ্ছা কথা দিচ্ছি। আপনি বাড়ি ফিরে যান। দেখি কী করা যায়।’
জলি রশিদ আহমেদকে আপ্যায়নের চেষ্টা করলো না। কারণ, ঘরে কিছুই নেই। হাসিনা খালা খাবার এনে না খাওয়ালে ওকে প্রায়ই উপোস করে থাকতে হয়। বাবার মৃত্যুর পর ওর রান্না করতে ইচ্ছে করে না। রশিদ আহমেদকে কিছু খেতে দিতে না পারায় ও কোনো সংকোচবোধ করছে না। রশিদ আহমেদ আকাশের দিকে আরেকবার তাকিয়ে মোড়া থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন-
‘যাচ্ছি মা। আর একটা অনুরোধ ছিল।’
‘বলুন।’
‘আমি যে তোমার কাছে এসেছিলাম, এটা ওকে বলো না।’
‘কাকে?’
‘পুলককে।’
‘ঠিক আছে, বলবো না।’
জলি মনে মনে বললো, পুলকের সঙ্গে আমার দেখা বা কথা হবে না। রশিদ আহমেদ জলির কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য বললেন-
‘আমি আসি, মা।’
রশিদ আহমেদের কণ্ঠে ‘মা’ ডাক শুনে শুনে জলির মনে কেমন আবেগ ছড়িয়ে যাচ্ছে। ওর বাবা ওকে সব সময় ‘মা’ বলে ডাকতো। ও রশিদ আহমেদের দিকে ছলছল চোখে তাকালো। রশিদ আহমেদ ফের বললেন-
‘আসি, মা।’
‘আচ্ছা, আসুন।’
রশিদ আহমেদ ওদের বাড়ির উঠোন থেকে বেরিয়ে গেলেন। জলি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো উঠোনে। রশিদ আহমেদের ভুল ধারণা এবং ওর কাছে তার অবান্তর অনুরোধের কথা ভেবে ও আপন মনে হেসে উঠলো। ও অনেকদিন হাসেনি। আজ হাসলো। সারাক্ষণ গম্ভীর ও বিষণ্ন হয়ে থাকা জলি যে হাসতে পারে, সেটা কেউ দেখতে পেলো না। একটা দমকা বাতাস এসে হামলে পড়লো জলির ওপর। ওর ভালো লাগলো।
এগার.
এবার দীর্ঘ চার মাস পর জেল থেকে ছাড়া পেলো পুলক। হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে একটা চড় মেরে ভীষণ ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিল ও। অবশেষে ও ছাড়া পেয়েছে। জেলগেটে দাঁড়িয়ে ও আকাশের দিকে তাকালো। বাইরের আকাশটা অনেক বড়। ঠাণ্ডু ও রহমত আগেই জানতো পুলক আজ ছাড়া পাবে। গতকাল জজকোর্টে পুলকের জামিন মঞ্জুর হয়। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় পুলক আর ছাড়া পায়নি। বেল পিটিশন আদালত থেকে জেলগেট পর্যন্ত আসতে সময় লাগে। কচ্ছপের গতিতে কাজ চলে। অবশ্য বিত্তবান ও প্রভাবশালীদের কাজ জোরগতিতেই চলে। জেলখানার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পুলকের জন্য অপেক্ষা করছিল ঠাণ্ডু ও রহমত। দুজনের হাতেই দুটো ফুলের মালা। পুলককে দেখেই ওরা দৌড়ে এগিয়ে এলো। পুলকের কাছে এসে ঠাণ্ডু বললো-
‘বস, এবার মেলাদিন শ্বশুরবাড়ি থাকলেন! আদর যত্ন কেমন হইছে?’
এ কথা বলেই বড় করে হেসে উঠলো ঠাণ্ডু। রহমতও ওর কথায় মিটিমিটি হাসছে। পুলক ঠাণ্ডুর এই তামাশায় রাগ করলো না। ঠাণ্ডু মাঝে মাঝে সীমা লঙ্ঘন করে ফেলে। পুলক আজ সাগরেদদের ওপর মেজাজ দেখাতে চায় না। ও বললো-
‘তোরা ফুলের মালা নিয়ে এসেছিস কেনো? আমি কি কোরবানির গরু?’
‘বস, আপনি এতোদিন পর ছাড়া পাইলেন, আমরা এই দিনটাকে স্মরণীয় কইরা রাখতে চাই।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, আপনের এখন র্যাংক বাড়ছে। আপনে অনেক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই কইরা জেল থেইকা ছাড়া পাইছেন। আপনের এই জয়ের লগ্নে আমরা ফুলের মালা পরাইয়া আপনারে সম্মান জানাইতে চাই।’
ঠাণ্ডু এ কথা বলে পুলকের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলো। পুলক ওকে বাধা দিলো না। রহমতও পুলকের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলো। এরপর দুজনে ছোট্ট করে করতালি দিয়ে পুলককে অভিবাদন জানালো। পুলক ওর সাগরেদ দুজনের উচ্ছ্বাসকে উপভোগ করলো। ও ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটতে শুরু করলো। ওর দুপাশে ঠাণ্ডু ও রহমত হাঁটতে লাগলো। পুলক গলা থেকে মালা দুটো বের করে এনে তুলে দিলো ঠাণ্ডুর হাতে। গলায় মালা পরে হাঁটতে ও সংকোচবোধ করছিল। চেনা বা অচেনা বেশ কজন পথচারী পুলককে সালাম দিলো। ও সালামের জবাব দিলো না। মাস্তানদের সকলে সালাম দেয়। পুলক জানে, যে যতো বড় মাস্তান, সে ততো বেশি সালাম পায়। চলার পথে মাস্তানরা হরহামেশা সালাম পায়। তবে এই সালামের পেছনে সম্মান থাকে না। ভয় থেকেই তারা সালাম দেয় মাস্তানদের। যারা সালাম দেয়, তারা আবার পেছনে গালিও দেয়। তাই কারো সালাম নেয় না পুলক। তবু অনেকে ওকে সালাম দেয়। হাঁটতে হাঁটতে পুলক ঠাণ্ডুর উদ্দেশে বললো-
‘ঠাণ্ডু, ওই মেয়েটির খবর কী, বল?’
‘কোন মাইয়ার খবর, বস?’
‘ওই যে জলি না মলি নাম?’
‘বস, তার নাম জলি।’
‘ওকে ওয়াচ করেছিলি?’
‘হ, বস। বাড়িতে একাই থাকে। বাপ মইরা এতিম হইয়া গেছে। বড় অসহায়।’
‘তোর দেখছি, ওর প্রতি মায়া জন্মে গেছে!’
‘বস, মেলা দিন ধইরা তারে লক্ষ্য করতাছি। একলা মাইয়া মানুষ বড় পেরেশানির মধ্যে আছে। আবার একটা বদ লোক মাইয়াটার পেছনে ছায়ার মতো লাইগ্যা আছে। ওই লোকটার হাবভাব ভালো ঠেকতাছে না।’
‘লোকটির নাম কি নিহার গায়েন?’
‘হ, বস। আপনে ওর নাম জানলেন কেমনে!’
ঠাণ্ডুর বিস্ময়কে উপেক্ষা করে পুলক বলে-
‘লক্ষ্য রাখিস, ওই মেয়েটিকে যেনো নিহার গায়েন কিছু করতে না পারে। ওর সাথে আগে আমার বোঝাপড়া করতে হবে।’
‘ঠিক আছে, বস। আপনে বললে, জলি ম্যাডাম রে আস্তানায় নিয়া আসতে পারি।’
‘কী বললি! জলি আবার তোর কাছে ম্যাডাম হলো কবে!’
পুলকের বিস্ময় আর বিরক্তিতে বিব্রত হয়ে পড়ে ঠাণ্ডু। ও লজ্জিত গলায় বলে-
‘বস, তিনি খারাপ মেয়ে মানুষ নন।’
এ কথায় রেগে গেলো পুলক। ও থমকে দাঁড়ালো রাস্তায়। রাগী গলায় ও ঠাণ্ডুকে বললো-
‘তুই আমার সামনে থেকে এখনই চলে যা! আর কখনো আমার সামনে আসবি না!’
ঠাণ্ডু কঁকিয়ে ওঠে-
‘বস, আপনে রাগ করতাছেন কেনো?’
‘তুই আমার সামনে থেকে দূর হ! আর কখনো আমার কাছে আসবি না!’
পুলকের কণ্ঠ গমগম করে ওঠে। ঠাণ্ডু ভ্যাবাচেগা খেয়ে যায়। ও বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। ও রহমতের দিকে তাকায়। রহমত ওকে চোখের ইশারায় চলে যেতে বলে। রহমত জানে, পুলকের রাগ কমে আসবে একসময়। তখন ঠাণ্ডু এসে ক্ষমা চাইলেই হবে। ঠাণ্ডু কাচুমাচু করে ঢুকে পড়লো রাস্তার একটি গলিতে। পুলক রহমতের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘রহমত, একটা রিকশা ডাক। হাঁটতে ভালো লাগছে না।’
রহমত রিকশা ডাকলো না। ও পুলকের উদ্দেশে বললো-
‘আপনার জন্য একজন ভদ্রমহিলা অপেক্ষা করতাছেন।’
‘ভদ্রমহিলা! কে? কেনো?’
‘তার নাম বলেন নাই। শুধু বলেছেন, আপনি জেল থেকে বের হলে যেনো আপনাকে তার কাছে নিয়ে যাই।’
‘তিনি কোথায়? আমিই বা তার কাছে যাবো কেনো? এসব তুই কী বলছিস?’
‘বস, আপনার ইচ্ছা হলে যাইতে পারেন। না হলে নাও যাইতে পারেন। আমি তারে কথা দেই নাই। তবে ভদ্রমহিলা সেই ভোর থ্যাইক্যা আপনার জন্য অপেক্ষা করতাছেন!’
পুলক আকাশ থেকে পড়লো। জেল থেকে ছাড়া পাবার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ে সংক্রান্ত সমস্যা। কে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়? একা নয় তো? প্রশ্নটা মনে উঁকি দিয়ে উঠলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে হলো একাই ওর জন্য অপেক্ষা করছে। এ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। পুলক শান্ত গলায় জানতে চাইলো-
‘ভদ্রমহিলা কোথায় আমার জন্য অপেক্ষা করছেন?’
‘সালমা রেস্টুরেন্টে।’
‘তার মানে আরেকটু হাঁটলেই তো সালমা রেস্টুরেন্ট, তাই না?’
‘জ্বি।’
‘ঠিক আছে, চল।’
ওরা সালমা রেস্টুরেন্টের দিকে হাঁটতে লাগলো। পুলকের মনে একরাশ বিরক্তি এবং কৌতূহল।
পুলককে দেখে একার দুচোখ ছলছল করে উঠলো। পুলক একাকে দেখে অবাক হলো না। তবে একাকে বোরকা পরা দেখে ও অবাক হলো। একাকে ও কখনো বোরকা পরা অবস্থায় দেখেনি। সালমা রেস্টুরেন্টের একটি কেবিনে একা ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। পুলক কবিনে ঢুকে বসলো গিয়ে একার মুখোমুখি। রহমত রেস্টুরেন্টের ভেতরে অন্য একটি টেবিলে গিয়ে বসলো। একা পুলকের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। পুলক কৌতূহলী গলায় বললো-
‘তুমি কেনো এসেছো?’
এর জবাব দিলো না ও। পুলকের মুখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো একা। পুলকের মনে হলো, একা এখন কাঁদবে। মেয়েরা সহজেই কাঁদতে পারে। মেয়েদের অদ্ভুত স্বভাব। কারণে-অকারণে তারা চোখের জল ফেলতে পারে এবং তারা ফেলেও। পুলক একার কান্না দেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলো। কিন্তু ও কাঁদলো না। একা চোখ তুলে স্বাভাবিক গলায় পুলককে বললো-
‘অনেকদিন পর আপনাকে দেখলাম! আপনি কেমন হয়ে গেছেন, স্যার! অনেক বদলে গেছেন!’
কথা বলার সময় একার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠলো। পুলক মুচকি হেসে বললো-
‘শুধু আমাকে দেখার জন্যই কি ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ চলে এসেছো!’
এর জবাব দিলো না একা। ও প্রশ্ন করলো-
‘জেলখানায় আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আপনি দেখা করলেন না কেনো আমার সঙ্গে?’
এ প্রশ্নের জবাবে ঝাঁঝালো কণ্ঠে পুলক বললো-
‘তোমার জন্য যে নষ্ট জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি, সেই জীবনটাকে দেখে তোমার কী লাভ বলো তো? বিশেষ কোনো আনন্দ পাও? আর যদি আনন্দ পাও-ও, আমি কেনো তোমাকে সেই আনন্দ পাবার সুযোগ করে দেবো?’
‘ওভাবে বলবেন না, প্লিজ!’
কঁকিয়ে ওঠে একা। পুলকের রাগ কমে না। ও বলে-
‘এই যে, আজ আমাকে দেখতে এসেছো। মায়া দেখাচ্ছো। কিন্তু এই মায়াটা সেদিন কোথায় ছিল? তোমার জবাববন্দিতেই তো আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো। তাই না?’
‘হ্যাঁ, স্যার। সেদিন আমার বাবার জন্য আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছিলাম।’
‘তবে এখন কেনো আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে আসো? আমি তো এর কোনো অর্থ খুঁজে পাই না!’
এবার কেঁদে ফেললো একা। পুলক ওর কান্নাকে উপেক্ষা করে বললো-
‘একা, সত্যি করে বলো তো, এতোদিন পর তুমি আমার কাছে কী চাও?’
একপর্যায়ে কান্না সামলে নিলো একা। ও বললো-
‘আপনার কাছে আসার একটা উদ্দেশ্য আমার আছে।’
‘সেই উদ্দেশের কথাটাই জানতে চাচ্ছি। বলো।’
‘কথা দেন, আমার অনুরোধ রাখবেন।’
‘আগে তোমার অনুরোধটা শুনি। সময় নষ্ট না করে বলে ফেলো।’
‘স্যার, আপনি ওসব ছেড়ে দিন। সুস্থ জীবনে ফিরে আসুন।’
‘কীভাবে ফিরে আসবো? কেনো?’
‘সুস্থ জীবনে ফিরে আসাটা খুব কঠিন হবে না। আপনি ঢাকায় চলে আসুন। মাস্টার্স পরীক্ষাটা দিয়ে দিন। অথবা ব্যবসা শুরু করুন।’
‘ব্যবসা! টাকা পাবো কোথায়?’
‘আমি আপনাকে টাকা দেবো। যতো টাকা লাগে, বলবেন।’
‘আমাকে লোভ দেখাচ্ছো?’
‘না, স্যার। আপনার লোভ যে নেই, তা আমিই তো ভালো করে জানি। লোভ থাকলে সেদিন আমাকে ফিরিয়ে দিতেন না। বরং ফিরিয়ে আনলেন বাড়িতে।’
‘রাখো ওসব কথা। ওসব কথা মনে হলে, ভালো লাগে না।’
‘আচ্ছা ওসব কথা তুলবো না। তাহলে কথা দিচ্ছেন?’
‘কিসের কথা?’
‘ওই যে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার।’
‘কার জন্য সুস্থ জীবনে ফিরবো? কেনো ফিরবো?’
‘না হয় আমার জন্যই সুস্থ জীবনে ফিরুন।’
‘কী বললে!’
‘রাগ করবেন না, প্লিজ!’
‘রাগ করার মতো কথা বলছো কেনো!’
একা পুলকের রাগ গায়ে না মেখে বললো-
‘স্যার, আপনার শোধ নিতে ইচ্ছে করে না?’
‘কার প্রতি শোধ নেবো?’
‘আমার বাবার প্রতি? আমার প্রতি?’
‘হ্যাঁ, ইচ্ছে করে। কিন্তু কীভাবে নেবো?’
‘আমাকে বিয়ে করে নিতে পারেন। আমাকে বিয়ে করে ছেড়ে দিতেও পারেন।’
খুব সহজভাবে কথাটি বললো একা। এ কথাটি শোনার পর চুপসে গেলো পুলক। এর জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারলো না ও। একা তাকিয়ে আছে পুলকের মুখের দিকে। মুহূর্তগুলো কেমন ভারি লাগছে ওর। একা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। পুলকের নীরবতার মধ্যে একটা জবাব ফুটে উঠেছে। এই জবাব বুঝতে পারছে একা। ও বিষণ্ন গলায় বললো-
‘জানি, আপনার কাছে আমার কোনো মূল্য নেই। তবু আমি আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। আপনার প্রতি আমি যে অবিচার করেছি, এর প্রায়শ্চিত্ত কীভাবে করবো, ভেবে পাই না। গত তিন বছর ধরে একটা মানসিক কষ্টের মধ্যে আছি।’
পুলক একার মুখের দিকে তাকালো। ও কি সত্যিই অনুশোচনায় পুড়ছে? ভাবে ও। একা ফের বললো-
‘স্যার, প্রায় তিন বছর পর আপনার সঙ্গে দেখা হলো। আপনি কি আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখছেন না?’
এ ধরনের প্রশ্নের জবাব দেয়া অবান্তর। তবু পুলক বললো,
‘হ্যাঁ, পরিবর্তন তো দেখছি।’
‘কী দেখলেন, বলুন না, প্লিজ!’
‘তুমি গুছিয়ে কথা বলতে শিখেছো। তোমার মধ্য থেকে কিশোরীর চপলতা কমে এসে নারীত্ব জেগে উঠেছে। তুমি আগে খুব সাজতে। এখন দেখছি, সাজ ছেড়ে বোরকা ধরেছো। তবে এখনো তুমি বিয়ে করোনি, তা দেখে অবাক হয়েছি।’
এ কথায় যেনো খুশি হলো একা। ও বললো-
‘আমি বোরকা ধরিনি, স্যার। আপনার সঙ্গে দেখা করতে বোরকা পরে এসেছি। বোরকা পরলে উত্ত্যক্তকারীর হাত থেকে অনেক সময় রেহাই পাওয়া যায়। আদালতপাড়ায় নাকি বখাটে লোকদের ভিড় থাকে, শুনেছি।’
‘ঠিকই শুনেছো। থানা-হাজত বা আদালতে ভালো লোকরা খুব একটা আসেন না। তা তুমি এখনো বিয়ে কেনো করোনি?’
এ প্রশ্নে পুলকের চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে একা বললো-
‘বাবা খুব ওঠে পড়ে লেগেছেন। এবার আমাকে মনে হয় বিয়ে করতেই হবে। তাই তো শেষবারের মতো ছুটে এসেছি আপনার কাছে।’
‘আমার কাছে কেনো এসেছো!’
‘আপনার কাছে কেনো এসেছি, তা আপনি জানেন। আমার যা বলার, তা তো বলেই ফেলেছি। এখন আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।’
পুলকের সঙ্গে একার দেখা করার বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট। একা ওর ইচ্ছার কথা জানাতে রাখ-ঢাক করেনি। পুলক কখনো একাকে বিয়ে করার কথা ভাবেনি। ও কি শোধ নেয়ার জন্য একাকে বিয়ে করবে? প্রশ্নই ওঠে না। তবে একার অপরাধবোধ ওর ভীষণ ভালো লেগেছে। এ মুহূর্ত থেকে একার প্রতি ও যেনো দুর্বলতা অনুভব করছে। পুলক নিজের ভেতরের ঝড় সামলে নিয়ে একাকে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ভঙ্গিতে বললো-
‘আমার কিছুই বলার নেই। তুমি চলে যাও। রহমত তোমাকে লঞ্চঘাটে নিয়ে যাবে। ও তোমাকে লঞ্চে তুলে দিয়ে আসবে। আর কখনো তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসো না। আমার জীবন নিয়ে তোমার কষ্ট পাওয়ার দরকার নেই। আমাকে নষ্ট করার দায় থেকে তোমাকে আমি মুক্তি দিলাম। যদিও আমার কোনো অভিযোগ ছিল না।’
পুলকের কথায় একা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। পুলক ওর কান্নায় বাধা দিলো না। আত্মগ্লানির কান্না কোনো বাধাই মানে না। এ কান্না মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়। পুলক হনহন করে বেরিয়ে এলো সালমা রেস্টুরেন্টের কেবিন থেকে। রহমতকে হাতের ইশারায় বসে থাকতে বললো। রহমত বসে রইলো রেস্টুরেন্টের ভেতর। পুলক রাস্তায় বেরিয়ে একটা রিকশা হাতের ইশারায় ডেকে তাতে চড়ে বসলো। আজ ও সারাশহরটা ঘুরে বেড়াবে। অনেকগুলো দিন কারাবাসের পর ও মুক্তি পেয়েছে। মুক্ত বাতাসের স্বাদ পাচ্ছে। আজ ও কোনোকিছু নিয়ে ভাবনায় তলিয়ে যেতে চায় না। একার কান্নাকাটি নিয়ে ও কিছুই ভাবতে চায় না। এ ভাবনা অবান্তর।
বার.
জলি আজ সুন্দর করে সেজেছে। সাজসজ্জা করাটা ও যেনো ভুলেই গিয়েছিল। ওকে আজ ওর পরিচিতি কেউ দেখে চিনতে পারবে না কি-না সন্দেহ আছে। মুন্সিগঞ্জ শহরে ওকে যারা চিনেন, তারা কেউ ওকে সাজসজ্জা অবস্থায় দেখেননি। তারা আজ ওকে দেখলে ভিড়মি খাবেন, এটা হলফ করে বলা যায়। ও পরেছে সবুজ রঙের জমিন ও মেরুন পাড়ের টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি। কপালে মেরুন রঙের বড় একটা টিপ। দুচোখে টেনেছে কাজল। ঠোঁটে মেরুন রঙের লিপস্টিকের প্রলেপ। খোঁপায় গুঁজেছে বেলিফুলের মালা। ফুলের সৌরভে মৌ মৌ করছে। খুব সাধারণ সাজ। কিন্তু জলিকে অসাধারণ লাগছে। যে কেউ ওর দিকে তাকিয়ে চট করে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। জলি অবশ্য কাউকে মুগ্ধ করার জন্য সাজেনি। বিশেষ একটা উদ্দেশে ও সেজেছে। হয়তো এটাই ওর জীবনের শেষ সাজ।
বোটখালের শশ্মানঘাট এলাকাটা বরাবরই নীরব, নির্জন। এখানে রিকশাওয়ালারা খুব একটা আসতে চায় না। এখানে আসতে জলির কোনো সমস্যা হলো না। একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালা ওকে শশ্মানঘাটে এনে নামিয়ে দিলো। রিকশাওয়ালা ভাড়া বুঝে নেবার সময় শুধু বললো-
‘মা-জননী, শুনেছি এই এলাকাটা ভালো না। একটু সাবধানে যাইবেন।’
রিকশাওয়ালার এ কথায় জলির কোনো ভাবান্তর হলো না। ওর ক্ষতি হবার কী আছে? ও কয়েক পা এগুতেই পরিত্যক্ত শশ্মানের পুরনো ভবনটির প্রবেশ পথ দেখতে পেলো। শশ্মানঘাটের এই পরিত্যক্ত ভবনটি একরকম বিধ্বস্ত ভবনই বলা চলে। ভবনের দুপাশে ঘন বাঁশঝাড়। এর চারপাশের ঘন ঝোপঝাড়। শশ্মানঘাট এলাকাজুড়ে জঙ্গলের পরিবেশ। নির্জন এলাকায় বিধ্বস্ত ও জরাজীর্ণ এই পরিত্যক্ত শশ্মানের ভবনটিকে ভয়কাতুরে লোকেরা ‘ভূতের বাড়ি’ বলে অভিহিত করবেন। জলি ওই ভবনটির প্রবেশ পথে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। ঝোপঝাড় থেকে পোকামাকড় বা বিভিন্ন প্রাণীর বিচিত্র শব্দ ভেসে আসছে। থেমে থেমে ব্যাঙের ডাকও শোনা যাচ্ছে। বাতাসে ভাসছে বন্য গন্ধ। তিন বছর আগে এই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকলে জলির গা ভয়ে ছমছম করে উঠতো। ওর এখন ভয়ডর বলতে কিছু নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর জলি এগিয়ে গেলো ভবনটির ভেতরের দিকে। ভবনটিতে প্রবেশ করে প্রথমে ও কাউকে দেখতে পেলো না। তবে ভেতরের কক্ষে একটি লোকের ছায়া সরে যেতে দেখলো। ও এগিয়ে গেলো ওই কক্ষের দিকে। এবার ও দেখতে পেলো রহমতকে। রহমত জলির পথ আটকে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বললো-
‘কাকে চাই?’
রহমত ওকে চিনতে পারেনি। জলি স্বাভাবিক গলায় বললো-
‘পুলক আছেন? আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘আপনার পরিচয়?’
‘আমার পরিচয়টা তাকেই দেবো। আপনি পথ ছাড়ুন। আমি তার সঙ্গেই কথা বলতে চাই।’
‘আপনার পরিচয় না পাইলে আমি পথ ছাড়তে পারুম না। তা ছাড়া বস, মাইয়া মানুষের সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করেন না। আপনার কী সমস্যা, তা আমারে বলেন।’
‘আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি পুলকের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনি সরুন তো!’
‘খবরদার! ওখানেই দাঁড়াইয়া থাকেন। সামনে আসবেন না। আগে আপনের পরিচয় দেন।’
রহমতের হুশিয়ারি গায়ে মাখলো না জলি। ও রহমতকে কঠিন একটা ধমক দিতে যাচ্ছিল। ঠিক এ সময় ভেতরের কক্ষ থেকে পুলকের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-
‘রহমত, ভদ্রমহিলাকে ভেতরে আসতে দে। তুই বাইরে গিয়ে দাঁড়া। পরিস্থিতি ওয়াচে রাখ।’
রহমত বিরক্তিভরা মুখে পথ ছেড়ে দিলো। ও সতর্ক দৃষ্টি মেলে চলে গেলো ভবনটির বাইরে। জলি ছোট পদক্ষেপে প্রবেশ করলো ভবনটির তৃতীয় কক্ষে। কক্ষটি প্রথম দুটি কক্ষের চেয়ে একটু ভালো। দুটি খোলা জানালা ও দরজা। দরজা ও জানালার কপাট নেই। একটি জানালার ওপর বসে আছে পুলক। ভাবলেশহীন। কক্ষটির চারপাশে তাকিয়ে নেয় জলি। দেয়ালজুড়ে মাকড়শার জাল। ছাদ ও দেয়ালের অনেক স্থান থেকে আস্তর খসে পড়েছে। কক্ষজুড়ে গুমোট গন্ধ। মাস্তানদের আস্তানা হিসেবে মন্দ নয়, ভাবে ও। জলিকে চিনতে পারলো না পুলক। ও ভারি কণ্ঠে বললো-
‘বলুন আপনার সমস্য কী? আমার হাতে বেশি সময় নেই। তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।’
পুলকের কথায় মিষ্টি করে হাসলো জলি। ও বললো-
‘আমার তো কোনো সমস্যা নেই!’
‘তাহলে আমার কাছে কেনো এসেছেন?’
‘আপনার একটা সমস্যার সমাধান করতে।’
‘আপনি কি রসিকতা করতে পছন্দ করেন? বলে রাখছি, রসিকতা করা বা শোনার আমার সময় নেই।’
পুলকের রাগী গলার জবাব গায়ে না মেখে জলি বললো-
‘আপনি আমার পরিচয়টা জানবেন না?’
‘আপনার পরিচয় জানার কৌতূহল আমার নেই। কাজটা কী বলুন। আমি কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করি। ন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করি না।’
‘তাই না-কি! মাস্তানরা ন্যায়-অন্যায় বুঝে কাজ করে- এমন তো শুনিনি!’
‘আপনি শুধু কথা বাড়াচ্ছেন। কেনো এসেছেন বলছেন না। আপনি কি পুলিশের চর?’
‘আপনি কি পুলিশকে খুউব ভয় পান?’
এ কথায় ভীষণ বিরক্ত হলো পুলক। অচেনা এক মেয়ে ওর আস্তানায় কেনো এসেছে এই কৌতূহলই ঘুরপাক খাচ্ছিল ওর চিন্তায়। এখন এই মেয়ের কথাবার্তা শুনে ও কেমন দ্বন্দ্বে পড়ে যাচ্ছে। ও ভালো করে তাকালো জলির দিকে। মেয়েটি অদ্ভুত সুন্দরী। মেয়েটিকে কেমন ‘পরী পরী’ এবং চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু মেয়েটিকে চিনতে পারছে না। ও গলা নামিয়ে বললো-
‘আপনি আমার আস্তানার ঠিকানা কার কাছ থেকে পেয়েছেন, বলুন তো!’
‘কেনো আপনি কী দস্যুবনহুরের মতো গোপন আস্তানায় থাকেন না-কি?’
‘আশ্চার্য! আপনি দেখছি, আমাকে জেরা করে যাচ্ছেন। আপনি কে?’
এ কথায় খিলখিল করে হেসে উঠলো জলি। পুলক যে ওকে চিনতে পারেনি, এটা ভেবে ওর ভালো লাগছে। ও বললো-
‘শুনেছি, আপনি জলি নামের একটি মেয়েকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
এ কথায় স্তম্ভিত হয়ে গেলো পুলক। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো জলির মুখের দিকে। জলি ফের বললো-
‘যাকে আপনি খুন করতে চান, সে নিজেই খুন হতে আপনার কাছে আজ এসেছে। আশা করি, আপনি সহজেই খুনটি করতে পারবেন।’
পুলকের মুখে কোনো কথা জোগাল না। এই মেয়েটি কি জলি? প্রশ্নটি ওকে গভীর বিস্ময়ে নিয়ে গেলো। কতোটা বিস্ময়ে মানুষ থ হয়ে যায়, তা জানে না পুলক। তবে এ মুহূর্তে ও গভীর বিস্ময়ের চেয়েও আরো বেশি এক ধরনের অবিষ্টতায় জড়িয়ে যাচ্ছে। পুলকের ঘোরলাগা তন্ময়তাকে ভেঙে জলি বললো-
‘আমার বেঁচে থাকাটা অর্থহীন। বরং বেঁচে থাকাটা অনেক কষ্টের এবং বিড়ম্বনার। আমিও মরে যেতে চাই। কিন্তু আত্মহত্যা করার সাহস আমার নেই। তাই, যখন শুনলাম, আপনি আমাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন আমিও মৃত্যুর জন্য তৈরি হলাম। আপনি অবাক হচ্ছেন? আমি সত্যিই মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে এসেছি।’
এ পর্যন্ত বলে জলি থামলো। পুলক হতভম্বের মতো চেয়ে আছে। ও সত্যিই জলিকে খুন করার কথা ভেবেছে, তাই বলে এমন ভাবেনি যে, জলি নিজে এসে খুন হবার জন্য ওর সামনে দাঁড়াবে। এ যেনো রহস্যময় এক গল্প। ‘জলি নিশ্চয় ঠাণ্ডুর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে এসেছে’ ভাবে পুলক। জলির প্রতি পুলকের তীব্র ক্ষোভ এ মুহূর্তে কেমন মিইয়ে যাচ্ছে। ওর কৌতূহল বাড়ছে। পুলক কৌতূহল চেপে বললো-
‘আপনার মতো একজন অকৃতজ্ঞ মেয়েকে খুন করাই আমার উচিত।’
‘তাহলে খুন করুন। আমি তো আপনার আস্তানায় এসে পৌঁছেছি। কীভাবে খুন করবেন, ঠিক করে নিন।’
বিব্রতকণ্ঠে পুলক বললো-
‘এটা কী করে হয়? আপনি নিজে এসে খুন হতেই বা চাচ্ছেন কেনো?’
‘সেটা তো আপনার জানার দরকার নেই। আপনি আমাকে খুন করতে চান। আমি আপনার কাজটি সহজ করে দিয়েছি। আপনি আমাকে অপহরণ করে এনে খুন করতেন বা কোথাও না কোথাও আমাকে প্রকাশ্যে খুন করতেন। সেটা হতো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ঝুঁকি নেই। আমিও প্রস্তুত মৃত্যুর জন্য।’
‘আপনি কি মানসিকভাবে অসুস্থ?’
‘খুন করার জন্য কি মানসিক সুস্থতা বা অসুস্থার প্রয়োজন আছে?’
‘আপনি দেখছি, আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলছেন! আমি… আমি…!’
‘আপনি উত্তেজিত হলে, আমার প্রতি রাগ বাড়লে খুনের কাজটি একটু সহজে করতে পারবেন। কী করলে আপনি বেশি রেগে যান, তা বলুন তো। আমি তাই-ই করবো।’
এ কথায় পুলক কেমন হতাশ হলো। যাকে সে খুন করবে বলো ভেবেছিল, এখন মনে হচ্ছে সে তাকে খুন করতে পারবে না। জলির অকৃতজ্ঞতাকে অবশ্য ক্ষমা করা যায় না। পুলক বললো-
‘আমি মনে হয়, আপনাকে খুন করতে পারবো না। তবে আপনার প্রতি আমার অনেক রাগ ছিল। সেটা থাকাটাও স্বাভাবিক। আপনি একজন অকৃতজ্ঞ শ্রেণির মানুষ।’
‘তাহলে খুন করতে অসুবিধে কোথায়?’
‘আমি পেশাদার খুনি নই যে, বললেই খুন করতে পারি। তা ছাড়া আমি আমার মাইন্ড চেইঞ্জ করেছি। আপনি চলে যান। আপনার ভয় নেই। আমি ভবিষ্যতে আপনার কোনো অপকার বা উপকার কোনোটাই করবো না। এখন যান, প্লিজ!’
‘এটা কী বলছেন! আমি তো বেঁচে থাকতে চাই না। আমি যে বড় আশা করে আপনার কাছে এসেছি।’
‘আশ্চার্য! আপনি খুন হতে চাচ্ছেন কেনো! আমিই বা আপনার ইচ্ছা পূরণ করবো কোনো!’
পুলকের কণ্ঠে বিস্ময়। জলি কেমন মুষড়ে পড়ে। ওর চোখ দুটি বিষণ্ন হয়ে যায়। ও কোনো কথা বলে না। একতাল বন্য বেদনা ওর ভেতরে পেখম ছড়িয়ে যায়। এ বেদনার কথা বলা যায় না। জলি বিষণ্ন চোখ তুলে বলে-
‘মৃত্যু ছাড়া আমার যে আর কোনো পথ জানা নেই। ভেবেছিলাম, আপনি আমাকে পৌঁছে দেবেন সেই গন্তব্যে। এখন দেখছি, তা আর হচ্ছে না।’
এ পর্যন্ত বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো জলি। অনেকদিনের জমাট বাঁধা কান্না খরস্রোতের মতো নেমে এলো দুচোখ থেকে। ওর শরীরটা কেঁপে উঠছে। এ ধরনের কান্নার কারণ কী অথবা কান্না থামানোর উপায়ই বা কী- এর কোনোটাই জানে না পুলক। পুলক নিঃশব্দে জলির কান্না দেখতে লাগলো। জলির কান্না খুব অল্প সময়ের মধ্যে থেমে গেলো। ও একটু লজ্জিত হলো। শাড়ির আঁচল দিয়ে ও দ্রুত মুখ মুছে নিলো। এ সময় চোখের কাজল খানিকটা লেপ্টে গেলো চোখের কোণে। পুলক মনযোগ দিয়ে তা দেখলো। জলি নিজেকে সামলে নেয়া গলায় বললো-
‘সরি, হঠাৎ করে কেঁদে ফেললাম। মরতে এসে মরতে না পারার বেদনায় কান্না এসে গেলো। আপনি কিছু মনে করবেন না।’
পুলক এর জবাবে কিছু বললো না। জলি ওর কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে বললো-
‘আমি তা হলে যাই। অহেতুক আপনার সময় নষ্ট করলাম।’
পুলক নরোম গলায় বললো-
‘চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।’
এ কথায় কণ্ঠে রাগ তুলে জলি বললো-
‘আপনি কেনো আমাকে এগিয়ে দেবেন? আপনার সাথে আমার কী সম্পর্ক যে, বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে?’
‘সব কিছু সব সময় সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো সময় সম্পর্ক তৈরি করে।’
জলির চোখে চোখ রেখে পুলক কথাটি বললো। জলি বললো-
‘ঠিক বুঝলাম না। সময় আপনার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক তৈরি করলো!’
‘এই মুহূর্তে আমি এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবো না। কেনো জানি মনে হচ্ছে, আপনার ভেতরে চেপে রাখা দহনের সঙ্গে আমার দহনের একটা মিল আছে। আপনি জানেন কি, আনন্দের চেয়ে বেদনার বন্ধুত্ব দ্রুত হয় এবং তা গভীরও হয়?’
‘আপনি আমার কান্নার ভুল ব্যাখ্যা করছেন। মরতে না পারার কান্না নিয়ে নিজের মধ্যে ভাবাবেগ সৃষ্টি করবেন না, প্লিজ!’
‘জলি, আপনি মরতে না পারার জন্য কাঁদেননি। বেদনার কান্না আমি বুঝতে পারি।’
পুলকের এ কথায় কেমন ম্রিয়মান হয়ে গেলো জলি। ও কোনো প্রতিবাদ করতে পারলো না। নীরব থাকার মধ্য দিয়ে ও যেনো পুলকের কথাটিকে মেনে নিলো। পুলক এবার বললো,
‘চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।’
এ কথা বলে পুলক কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। জলি নিঃসংকোচে অনুসরণ করলো ওকে। নিজের সাজসজ্জা নিয়ে এখন ওর ভীষণ লজ্জা লাগছে। এমনভাবে সেজে ও পুলকের সঙ্গে বাড়ি ফিরবে- এ কথা ভাবতেই ওর কেমন লজ্জার শিহরণ লাগছে। সে এক অদ্ভুত মধুর শিহরণ!
তের.
জলি কি এমন একটি বিকেলের স্বপ্ন দেখেছিল? ওর মনে হচ্ছে এমন স্বপ্ন ও মনের ক্যানভাসে এঁকেছিল। তবে কবে এঁকেছিল, তা ওর মনে আসছে না। আজকের বিকেলটি যেমনি অদ্ভুত, তেমনি অপ্রত্যাশিত। ও মনে মনে আজকের বিকেলের একটা নাম দিলো ‘হিরন্ময় বিকেল’। আজকের বিকেলটি প্রতিদিনের চেনা বিকেলের মতো নয়। চারপাশের দৃশ্যগুলোও কেমন বদলে গেছে। সবকিছুতে মোহনীয় দ্যুতি ফুটে উঠেছে। চেনা পথ দিয়েই ও যাচ্ছে, অথচ পথটিকে ও চিনতে পারছে না। মনে হচ্ছে, পথটি অজানা সুন্দরের গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। এমন কেনো মনে হচ্ছে, ও তা বুঝতে পারছে না। ওর ভেতরে এক ধরনের শিহরণ কাজ করছে। মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত ভালো লাগছে ওর। আবার এই ভালো লাগা নিয়ে ও নিজে নিজেই অবাক হচ্ছে। এমন তো হবার কথা নয়। জলি আলতো করে নিজের হাতে চিমটি কাটলো। চিমটি কেটে বুঝতে পারলো ও কোনো স্বপ্ন দেখছে না। রিকশা চলছে ধীরগতিতে। জলির পাশে নিঃশ্চুপভাবে বসে আছে পুলক। জলি চট করে এক পলক তাকালো পুলকের দিকে। বিকেলের করোজ্জ্বাল আলোয় অন্য মনস্ক পুলককে দেবদূতের মতো লাগছে। ওকে কেমন লাগছে, কে জানে। ভাবলো জলি। ওর ইচ্ছে হলো পুলককে জিজ্ঞেস করে জানতে, ওকে কেমন লাগছে দেখতে। এ কথা ভাবতেই ও কেমন লজ্জায় কেঁপে উঠলো। আশ্চার্য! যে জলি পুরুষদের তীব্রভাবে ঘৃণা করে, সে আজ একজন পুরুষের পাশে বসে কেমন বিহ্বল হয়ে যাচ্ছে! এটা কি ঐশ্বরিক কিছু? অপ্রার্থিব কোনো ইঙ্গিত? ভাবে ও। ও এখন অনেক কিছু ভাবছে। যে ভাবনার কোনো মাথা-মুণ্ডু নেই। কোনো অর্থ নেই। তবু ও ভাবছে। ভাবতে ওর ভালো লাগছে। এই যে ওর ভালো লাগছে, এটা তো বিস্ময়ের চেয়ে আরো বেশি কিছু। রহস্যের চেয়েও গভীর রহস্যময়। আজ কে এই রহস্য সৃষ্টি করলো? পুলকের পাশে বসে জলি তন্ময়ভাবে এ ধরনের নানা প্রশ্নের জবাব হাতরে বেড়াচ্ছিল। পুলকের কথায় ওর তন্ময়তা ভাঙে।
‘জানেন, একটা কথা ভেবে আমি অনেক অবাক হচ্ছি।’
এ কথায় জুলির বুকের ভেতর হৃৎকম্পন বেড়ে গেলো। ও বললো-
‘কী কথা ভাবছেন?’
‘আপনাকে খুন করার কথা ভেবেছিলাম। খুন হয়তো করতে পারতাম না। তবে আপনার প্রতি তীব্র রাগ কিন্তু ছিল। অথচ আজ আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।’
‘আমার প্রতি আপনার তীব্র রাগটা মিলিয়ে গেলো কেনো?’
এর জবাব দিলো না পুলক। অন্য সময় হলে জলি এ ধরনের প্রশ্ন করতো না বা প্রশ্ন করে জবাব না পেলে ফের প্রশ্ন করতো না। কিন্তু এখনকার জলি নিজের বৈশিষ্ট্যে নেই। ও ফের বললো-
‘বললেন না, আপনার রাগটা মিলিয়ে গেলো কেনো?’
পুলক বললো-
‘হয়তো আপনার মরে যাবার ইচ্ছা এবং আকুতি আমাকে স্পর্শ করেছে। অনেক বেদনায় বিমর্ষ হয়েই একজন মানুষ মরে যেতে চায়। এটা জীবনের চরম অসহায়ত্ত।’
‘তা হলে আমার অসহায়ত্ত দেখে করুণা করেছেন?’
‘করুণা কি-না জানি না, আপনার অসহায়ত্ত আমাকে বিচলিত করেছে। আমার সহানুভূতি জাগিয়ে দিয়েছে। রাগটা উল্টো মায়ায় পরিণত হয়েছে। সব কিছু হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। মানুষ তার মনের বিরুদ্ধে সহজে যেতে পারে না। আমিও যাইনি। মন বললো- আপনাকে এগিয়ে দিতে, তাই আপনার সঙ্গে চলে এলাম।’
‘আপনি কি সব সময় মনের নির্দেশ মানেন?’
‘চেষ্টা করি মানতে।’
‘তাহলে একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবেন?’
‘বলুন কী প্রশ্ন?’
‘আপনি যে মাস্তানি করেন, এতে কি আপনার মনের সায় আছে?’
জলির এ প্রশ্নে হচকিয়ে গেলো পুলক। ও কয়েকটা মুহূর্ত চুপ থেকে বললো-
‘এটাও সত্যি, অনেক সময় মনের বিরুদ্ধে অনেক কিছু করি। তবে আপনার প্রতি রাগ ধরে রাখার কোনো তাড়না নিজের মধ্যে ফিল করিনি। হয়তো আপনার কোনো জাদু আছে।’
এ কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো জলি। হাসির দমকায় ওর শরীর কাঁপতে লাগলো। জলির হাসির ফল্গুধারায় পুলক ভেসে গেলো সংকোচ আর ভালোলাগার আবিষ্টতায়। জলির হাসি একসময় থামলো। ও হাসিভরা মুখে বললো-
‘অনেকদিন এমন হাসিনি।’
‘আমি কি হাসির কথা বলে ফেলেছি?’
‘নয়তো কী? আমার যাদু আছে শুনলে পাখ-পাখালি, বন্য পশু পর্যন্ত হাসবে।’
পুলক এর জবাবে কিছু বললো না। কিন্তু ওর কথা বলতে ইচ্ছে করছে। ও নিজেকে সামলে নিলো। জলি পুলকের নীরবতা দেখে বললো-
‘একটা কথা বলবো।’
‘বলুন।’
‘আপনি মাস্তানি ছেড়ে দিন।’
‘কেনো?’
‘ওটা আপনার কাজ নয়?’
‘তাই না-কি?’
‘হ্যাঁ। আমি হলফ করে বলতে পারি, ওটা আপনার কাজ নয়। এ লাইনে আপনি সুবিধে করতে পারবেন না।’
‘আমি কি সুবিধের জন্য কিছু করছি?’
‘তবে কেনো করছেন? কি পাচ্ছেন মাস্তানি করে?’
এর জবাবে পুলক উদাস গলায় বললো-
‘আমি জড়িয়ে গেছি। এখন ফেরার পথ নেই। আমি নষ্ট হয়ে গেছি!’
‘কে বলেছে পথ নেই? তা ছাড়া আপনি এখনো নষ্ট হননি। আপনি চাইলেই সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এর জন্য আপনার ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। আমার মনে হয়, আপনার ওসব ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা উচিত।’
‘কেনো?’
‘আপনি নির্দয় বা হিংস্র শ্রেণির মানুষ নন। আপনাকে ওসব কাজে মানায় না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনার জন্য আপনার মা-বাবা ও বোন ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। তাদের কষ্ট দেয়া ঠিক হচ্ছে না। আপনি একজন শিক্ষত লোক। এভাবে নষ্ট হবার কোনো মানে হয়?’
পুলক ভীষণ অবাক হলো জলির কথা শুনে। ও বললো-
‘আপনি আমার সম্পর্কে দেখছি অনেক খবর জানেন!’
‘ঘটনাক্রমেই তা জেনেছি। আপনাকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো কৌতূহল ছিল না।’
‘ছিল না মানে, এখন আছে?’
এ প্রশ্নে জলি লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। ও মুখ ফিরিয়ে নিলো। যেনো প্রশ্নটি শুনতে পায়নি। রিকশা চলছে। মৃদু ঝাঁকুনি লাগছে। জলি কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেলো। পুলক বললো-
‘মাস্তানি ছেড়ে দেবার সাজেশন দিলেন। কিন্তু মাস্তানি ছেড়ে দিয়ে কী করবো, তা বললেন না।’
এর জবাবে একটু ভেবে জলি বললো-
‘প্রথমে এই শহরটা ছেড়ে দিন। নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। মাস্টার্সটা দিয়ে দিতে পারেন। এরপর একটা চাকরি জুটিয়ে নিবেন। অথবা ব্যবসা শুরু করতে পারেন। খুব সহজ। আপনার জীবনে কোনো জটিলতা তো দেখছি না। আপনি ভুল পথে চলে নিজেই নিজের জীবনকে জটিল করে তুলছেন।’
পুলক একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। জলি বললো-
‘আমি কি আশা করতে পারি যে, আপনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন?’
‘এতে আপনার লাভ?’
‘বাহ রে! আমার আবার লাভ কিসের! আপনার লাভের জন্যই আপনি তা করতে পারেন। তবে হ্যাঁ, আমার একটা লাভ হবে। আপনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে, আমি আনন্দ পাবো এই ভেবে যে, একজন মানুষ আমার কথা রেখেছে।’
পুলক বললো-
‘আপনার কথা বুঝি কেউ কখনো রাখেনি?’
এই প্রশ্নে থমকে গেলো জলি। রিকশার ঝাঁকুনির চেয়ে বেশি ঝাঁকুনি লাগছে মনে। ও বিষণ্ন গলায় আলতো করে বললো-
‘আমিও একটা মানুষ! আমার কথা কে রাখবে, কে-ই বা রাখবে না, তা নিয়ে পৃথিবীর কিছু যায় আসে না। পুলক সাহেব, আমার জীবন শুধু নষ্টই না, পচে গেছে!’
এ কথা বলতে গিয়ে জলির কণ্ঠ ভারি হয়ে এলো। পুলক ঘাড় ঘুরিয়ে জলির মুখটা দেখার চেষ্টা করলো। জলি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। একতাল বন্য বেদনা জলের ধারা হয়ে নেমে আসতে চাইছে জলির দুচোখ বেয়ে। ও সামলে নেবার চেষ্টা করছে। হিরন্ময় বিকেলটা হঠাৎ করে কেমন ফিকে হয়ে আসছে। গোধূলীর পেয়ালায় যেমন শেষ বিকেলের রোদ জমে যায়, জলিও জমে যেতে লাগলো নিজের অন্তর্গত কষ্টে। পুলকও আর কোনো কথা বললো না ঠিক, তবে ওর মনে অনেক কথা ভেসে বেড়াতে লাগলো। কেনো জানি, ওর ভীষণ ইচ্ছে হলো জলির একটি হাত নিজের হাতে তুলে নিতে। ও ইচ্ছের লাগামটাকে টেনে ধরে রাখলো। মন চাইলেই সব সময় সব ইচ্ছা পূরণ করা যায় না।
চৌদ্দ.
জলিদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই পুলকের মোবাইল ফোন বাজলো। ও ফোন অন করলো। ও-প্রান্তে ঠাণ্ডু। ও বললো-
‘বস, শালা গায়েনের দুই হাত পিছমোড়া কইরা বাইন্ধ্যা আস্তানায় ফালাইয়া রাখছি। সকাল থেইক্যা দুপর পর্যন্ত তিন গ্লাস পেচ্ছাব খাওয়াইছি। প্রথমবার বমি করছিল। পরে আর বমি করে নাই।’
পুলক মনোযোগ দিয়ে ঠাণ্ডুর কথা শুনলো। এই প্রথম ঠাণ্ডুর একটা কাজে ও সন্তুষ্ট হলো। ও নিহার গায়েনকে আস্তানায় ধরে আনার নির্দেশ দিয়েছিল। ঠাণ্ডু কাজটি করতে পেরেছে। ওকে কোনো দায়িত্ব দিলে ও ঠিকমতো তা পালন করতে পারে না। অনেক সময় গণ্ডগোল বাধিয়ে ফেলে। কিন্তু এবার কাজটি করতে পেরেছে এবং একধাপ এগিয়ে ও নিহার গায়েনকে শাস্তি পর্যন্ত দিয়ে ফেলেছে। যদিও এ ধরনের নির্দেশ পুলক ওকে দেয়নি। পুলক নিহার গায়েনের শাস্তির বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামালো না। পুলকের কোনো জবাব না পেয়ে ঠাণ্ডু বললো-
‘বস, অর্ডার দেন, গায়েন শালারে প্রতিদিন সকালে গরম পেচ্ছাব খাওয়াইয়া দেই। একমাস খাওয়ালেই হইবো। এরপর আর শালায় গান গাইতে পারবো না। গান গাইতে গেলেই গলা দিয়া সুরের বদলি বকবক কইরা পেচ্ছবের বদ গন্ধ বাইর হইয়া আসবো। গায়েনের মুখ থেইক্যা সুরের বদলে পেচ্ছাবের দুর্গন্ধ! হা-হা-হা।’
ঠাণ্ডুর কথা শুনে পুলকও না হেসে পারলো না। ও বললো-
‘ওকে আরো কঠিন শাস্তি দিতে হবে। ভয়ানক শাস্তি। এমন শাস্তি দিবি, ও যেনো জীবনে জলিকে বিরক্ত করার আর কখনোই সাহস না পায়।’
এ কথায় ভীষণ উৎসাহ পেয়ে ঠাণ্ডু বললো-
‘বস, শালারে পাগলা কুত্তা দিয়া কামরাইয়া দেই?’
‘পাগলা কুকুর পাবি কোথায়?’
‘আছে বস, আমার কাছে পাগলা কুত্তার সন্ধান আছে। আপনে খালি অর্ডার দেন!’
‘আমি ভেবে দেখি।’
‘ভাবনার কিছু নাই, বস। শালারে হাফ মার্ডার কইরা ফালাইতে হইবো। শালায় একটা হারামজাদা বজ্জাত!’
‘আমিও জানি ও একটা বজ্জাত!’
‘তাইলে শালার গোপন অঙ্গে জংলি বিচ্ছা ছাইড়া দেই?’
‘চুপ কর! কী করতে হবে, তা আমাকে ভাবতে দে।’
পুলক একটু ধমকে ওঠে। চুপসে যায় ঠাণ্ডু। ও বলে-
‘ঠিক আছে, বস। আপনে ভাইবা আমারে বইলেন। আমি কিন্তু শালারে পেচ্ছাব খাইয়াই যামু! প্রতিদিন সকালে পেচ্ছাব খাইয়াইয়া গায়েন শালারে রেওয়াজ করামু। ওর সারে গামা পাদা নিসা বাইর কইরা ফালাইমু!’
‘ঠিক আছে, তোর সাথে পরে কথা হবে। সাবধানে থাকিস!’
‘আ”চ্ছা বস।’
পুলক ফোন রেখে দেয়। ঠাণ্ডুর একটা বিষয় ওকে খুউব অবাক করেছে। ঠাণ্ডু মেয়ে মানুষদের একেবারেই পছন্দ করে না। সব সময় গালাগাল দিয়ে কথা বলে। এই প্রথম ও জলিকে সম্মান করে কথা বলছে। জলির ব্যাপারে ও সহানুভূতিতে ভীষণ বিগলিত। পুলক বুঝতে পেরেছে, ঠাণ্ডুর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়েই জলি ওর গোপন আস্তানায় গিয়েছিল। জলি ঠাণ্ডুকে কীভাবে বশ করেছে, তা জানে না পুলক। জলিকে অনুসরণ করার দায়িত্ব ঠাণ্ডুকে দেয়ার পর থেকে ওর মধ্যে এই পরিবর্তন এসেছে। এরপর থেকেই ঠাণ্ডু জলির পক্ষে নিয়ে কথা বলে। ‘এর কারণটা বের করতে হবে’ ভাবে পুলক। ও এ ভাবনার রেশ নিয়ে ও জলিদের বাড়ির ছোট্ট উঠোনে ঢুকে পড়লো। উঠোনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পুলক ডাকলো-
‘মামা কি বাড়িতে আছেন?’
কোনো জবাব এলো না। কিন্তু ঘর থেকে বের হয়ে এলো জলি। গায়ে মলিন শাড়ি। শাড়ির আঁচল কোমরে বাঁধা। পুলককে দেখে চোখে অবাক দৃষ্টি মেলে জলি বললো-
‘আপনি!’
পুলক মুচকি হাসলো। বললো-
‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি?’
‘আমি ভালো নেই।’
‘কেনো? কি হয়েছে?’
‘তেমন কিছু হয়নি। আপনি বিচলিত হবেন না।’
‘তাহলে যে বললেন, ভালো নেই!’
‘না, এখন ভালো আছি। আপনাকে দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।’
এ কথায় ভীষণ হাসি পেলো জলির। ও সামলে নিলো। বললো-
‘আপনি কাকে ডাকছিলেন, বলুন তো!’
‘আপনার মামাকে।’
‘আপনি আমার মামাকে চিনেন কীভাবে?’
‘কাল রাতেই তার সাথে পরিচয় হলো। লঞ্চঘাট থেকে আমি তাকে আপনাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলাম।’
‘ওহ, আচ্ছা! মামা আমাকে বলেছিলেন যে, একজন সুদর্শন ও ভদ্র যুবক তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে।’
‘ভাগ্যিস, আপনার মামা আমার আসল পরিচয় জানেন না!’
এ কথা বলেই পুলক হো হো করে হেসে ফেললো। জলি দেখলো পুলক খুউব প্রাণ খুলে হাসতে পারে। যে এমনভাবে হাসতে পারে, সে মাস্তানি কীভাবে করে? হাসি থামার পর পুলক বললো-
‘আপনার মামা কি বাড়িতে আছেন?’
‘না, তিনি একটু বাইরে ঘুরতে গেছেন। আপনি কি মামার কাছেই এসেছেন?’
এই প্রশ্নে একটু ভড়কে গেলো পুলক। ‘জলি কি অন্য কিছু মিন করছে?’ ভাবে পুলক। ও বলে-
‘আমি আপনার মামার কাছে যা বলতে এসেছি, তা আপনাকেই বলতে পারলে ভালো হয়। তবে কথাটি আপনার মামার কাছে প্রথমে বলতে চেয়েছিলাম।’
পুলকের কথায় জলি কেমন সর্তক হয়। ‘পুলক কি ওকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলতে চায়?’ প্রশ্নটি জেগে ওঠে ওর মনে। ও পুলকের চোখে চোখ রাখে। বলে-
‘মনে হচ্ছে, আপনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আমি যা বলতে চাই, তা আপনার আমার দুজনেরই জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, আপনি অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি আপনার জন্য একটা মোড়া নিয়ে আসি।’
এ কথা বলে জলি ওদের ঘরের ভেতর যাবার চেষ্টা করতেই পুলক বললো-
‘দাঁড়ান, প্লিজ! আমার মোড়া লাগবে না। আমি দাঁড়িয়েই কথা বলতে চাই।’
‘গুরুত্বপূর্ণ কথা এভাবে উঠোনে দাঁড়িয়ে বলবেন! আপনি কি পাগল না-কি?’
‘কখনো কখনো আমার মধ্যে পাগলামি কাজ করে ঠিক। তবে এখন আমি যা করতে চাচ্ছি, তা অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
‘কী করতে চাচ্ছেন, বলুন তো! আজ আপনার কথা শুনতে আমার কেনো জানি ভয় ভয় লাগছে!’
এ কথায় হেসে ফেললো পুলক। ও হাসিমুখে বললো-
‘আমি কিন্তু আপনাকে ভয় পাইয়ে দেবার জন্য আসিনি। আপনাকে জয় করতে এসেছি।’
কোথাও কি বজ্রপাত হলো? কিংবা ভূমিকম্প? জলির ভেতরে ভূমিকম্পই হচ্ছে। ওর ভেতরে ভীষণ একটা ভাঙচুর শুরু হলো। ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। মাথা যেনো ভনভন করে ঘুরছে। ওর বিশ বছরের জীবনে এমন কখনো হয়নি। ও কথা বলতে গিয়ে বলতে পারলো না। ওর কণ্ঠ যেনো আটকে গেছে। ও হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইলো পুলকের দিকে। পুলক একটু সময় নিয়ে ফের বললো-
‘আমি জানি, আমি একজন নষ্ট মানুষ। নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমি নিজেই সন্দিহান। তবু একটা অদ্ভুত স্বপ্নের ভীষণ রকম তোলপাড় চলছে আমার ভেতরে। এই স্বপ্নটা দেখছি আপনাকে নিয়ে। আমি, আমি…’
এ পর্যন্ত এসে পুলকের গলা আবেগে ভরে এলো। ও ‘আমি আমি’ করার সময় জলি বললো-
‘চুপ করুন, প্লিজ!’
ও নিজের দু-কানে দুই হাতের তালু চেপে ধরলো। ‘পুলক ওকে এসব কি বলছে!’ অপার বিস্ময়ে জলি থ। ও দুচোখ বন্ধ করে নিলো। চোখ ফেটে অঝোর কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। সামলে নেয় ও। কয়েকটা মুহূর্ত পর জলি ওর কান থেকে দুহাত নামিয়ে আনলো। পুলক তখন নরোম গলায় বললো-
‘আমি কি সুন্দর একটা স্বপ্ন রচনা করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারি না?’
জলির মনে হলো ওর কথা বলাটা খুবই জরুরি। এরপর চুপ করে থাকা ঠিক হবে না। ও শুকনো কণ্ঠে বললো-
‘যাকে নিয়ে আপনি সুন্দর স্বপ্ন রচনা করতে চান, তার মধ্যে সুন্দরের সোপান নেই। সে একটা নষ্ট-পচা জীবনকে বয়ে বেড়াচ্ছে। বেঁচে থাকলেও কার্যত সে মৃত। আপনি তার সব কথা জনেন না, পুলক সাহেব। যদি জানতেন, তবে তাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজানোর সাহস পেতেন না।’
জলির জবাবে অস্বস্তিটা কেটে গেলো পুলকের। ও বললো-
‘আপনি এখানে ভুল করছেন। আমি আপনার সবচেয়ে বড় বেদনার কথাটি জানি। সব জেনে এবং মেনে আমি আপনাকে নিয়ে একটা সুন্দর জীবন গড়তে চাই।’
এ কথায় একটু রেগে গেলো জলি। ও একটু উত্তেজিত কণ্ঠে বললো-
‘আপনি কি আমার সব হারানোর কথা জানেন?’
‘জানি।’
‘তারপরও একজন ধর্ষিতা মেয়েকে নিয়ে আপনি স্বপ্ন সাজাতে চান? কেনো? আপনি কি মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক? না-কি আমাকে করুণা করে মহানুভবতার তৃপ্তি পেতে চাইছেন?’
এ পর্যন্ত বলে কেঁদে ফেললো জলি। দুচোখ থেকে জলের ধারা নেমে এলো। কান্নার যে পবিত্র একটা রূপ আছে, এ মুহূর্তে বুঝতে পারলো পুলক। জলির কান্না ভালো লাগলো ওর। এ ধরনের কান্না চেপে থাকা ভারি বেদনাকে হালকা করে দেয়। জলির কান্নাটা যখন হঠাৎ বৃষ্টি থামার মতো থেমে গেলো, তখন পুলক বললো-
‘হ্যাঁ, আপনাকে বিয়ে করে আমি তৃপ্তি পেতে চাই। তবে এই তৃপ্তি মহানুভবতার তৃপ্তি নয়। আমি ভালোবাসতে পারার তৃপ্তি পেতে চাই। ভালোবাসার তৃপ্তি চাই। ভালোবাসা পাবার আনন্দ চাই। জীবনের স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়ার মতোই আমার এই চাওয়া। নিজেকে মহৎ করার কিংবা আপনাকে করুণা করার কোনো বিষয় এখানে নেই। তবে হ্যাঁ, আপনার জীবনের গোপন কষ্টের কথা জেনে আমার খুবই খারাপ লেগেছে। আপনার প্রতি এক অদ্ভুত টান সৃষ্টি হয়েছে। এই টানকে ভালোবাসা বললে ভুল হবে না।’
জলি আবার ওর কান দুহাতের তালুতে চেপে ধরলো। শব্দহীন চোখের জল বেদনাবিধুর অনেক শব্দের ব্যঞ্জনায় নেমে আসছে ওর গাল বেয়ে। পুলক জলির ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর জলি কান থেকে দুহাত সরিয়ে বললো-
‘আপনি এখন যান, প্লিজ!’
পুলক ওর রাগকে উপেক্ষা করে বললো-
‘আমি তো খালি হাতে ফিরে যাবার জন্য আসিনি।’
‘প্লিজ, পুলক সাহেব, প্লিজ! আমাকে নিয়ে এ খেলার কোনো মানে হয় না। আপনি কেনো এমন কথা বলছেন!’
জলির এ প্রশ্নের জবাবে পুলক বললো-
‘আমি জীবনে খুব বেশি কিছু চাইনি। আমার চাওয়ার আকাক্সক্ষা খুব কম। কিন্তু যখন কিছু চাই, তখন তা তীব্রভাবেই চাই। আপনি আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।’
‘আপনি আসলে বুঝতে পারছেন না! আমি, আমি আপনার যোগ্য নই। কেনো আমাকে প্রলুব্ধ করছেন?’
‘জলি, আপনি আবারো ভুল বকছেন। আমি আপনাকে… ভালোবাসতে চাইছি। সত্যি কথা বলতে কী, আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে আমার ভালোবাসার কথাই আজ বলতে এসেছি।’
‘চুপ করুন! প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ…!’
জলি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ও দৌড়ে চলে গেলো ঘরের ভেতর। পুলকের ইচ্ছে হলো ও জলির ঘরে প্রবেশ করে। কিন্তু এটা ঠিক হবে কি-না, এই ভাবনায় ও আটকে গেলো। ও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো উঠোনে। চুপচাপ। জলি ফিরে এলো না। ও নিশ্চয়ই বিছানায় মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। পুলক ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। কী করবে বা ওর এখন কী করা উচিত, তা বুঝতে পারছে না ও। মুহূর্তগুলো ভীষণ ভারি লাগছে ওর। পুলক কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে জোর গলায় জলির উদ্দেশে বললো-
‘জলি, আপনি আমাকে জেল থেকে বের করেছেন বলে জানতে পেরেছি। এটাকে আমি আমার প্রতি আপনার করুণা হিসেবে দেখিনি। আমার ভালোবাসাকেও আপনি করুণা বলে ভুল বুঝবেন না, প্লিজ! আমি কাল আবার আসবো। প্রয়োজনে প্রতিদিন আসবো। আমাকে আপনি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। আমি ফিরে যাবোও না। আমি বিশ্বাস করি, আজ, কাল বা যে কোনো একদিন, আপনি আমার ভালোবাসার মর্যাদা দেবেন। আমি চলে যাচ্ছি।’
পুলক আর দাঁড়ালো না। ও হনহন করে জলিদের উঠোন থেকে বের হয়ে এলো। ওর ভেতরে গুমোট কান্নার মেঘ জমতে লাগলো। ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। এ ধরনের মন খারাপ পুলকের কখনো হয়নি।
পনের.
আজকের দিনটিকে পুলক মনে মনে ‘বিশেষ দিন’ হিসেবে ঘোষণা করলো। আন্তর্জাতিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেমন বিশেষ উদ্দেশে বিশেষ দিন ঘোষণা করা হয়, আজকের দিনটিকেও পুলক তেমন একটি ‘বিশেষ দিন’ বলে ঠিক করে নিলো। আজকের দিনটিকে পুলক নাম দিলো ‘বিয়ে দিবস’। পুলক সকালে ঘুম থেকে উঠেই হঠাৎ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ও আজ জলিকে বিয়ে করবে। সিদ্ধান্তটা একাই ও নিয়েছে। নিজের বিয়েটাকে গুরুত্বপূর্ণ করতে ও আজকের দিনটিকে ‘বিয়ে দিবস’ বলেও ঠিক করে নিলো। আন্তর্জাতিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক রকম দিবস পালিত হলেও ‘বিয়ে দিবস’ পালিত হয়নি এখনো। ও নিজে বিয়ে করে ‘বিয়ে দিবস’ এর সূচনা করার কথা ভাবতে লাগলো। সকাল থেকে এসব কথাই ভাবছিল ও। এ কথা ভেবে নিজে নিজেই ও হাসছিল। ঠাণ্ডু পুলকের মেসে এলো সকাল ন’টায়। পুলক তখনো থেমে থেমে হাসছিল। ওর হাসি দেখে ঠাণ্ডু কৌতূহলী গলায় বললো-
‘বস, আইজ মনে হইতাছে ভীষণ কোনো ভালো খবর আছে? আপনার মেজাজ কেমন ফুরফুরা!’
পুলক ঠাণ্ডুর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো। ঠাণ্ডুও হাসলো। পুলক ঠাণ্ডুর উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে একটা রবীন্দ্র সংগীত ধরলো। ও গাইলো, ‘তুমি মোর পাও নাই, পাও নাই পরিচয়। তুমি যারে চিনো, সে তো কেহ নয়। পাও নাই, পাও নাই পরিচয়…।’ পুলকের কণ্ঠ খারাপ নয়। অনেকদিন হলো ও রেওয়াজ করে না। তারপরও ওর কণ্ঠে সুরের লালিত্ব ফুটে উঠেছে। ঠাণ্ডু মনোযোগ দিয়ে ওর গান শুনছিল। গানটির স্থায়ীটুকু দুবার গেয়ে থেমে গেলো পুলক। পুলকের গান শুনলেই ঠাণ্ডুর ঢোলক হবার ইচ্ছেটা জেগে ওঠে মনে। ও মুগ্ধ গলায় বললো-
‘বস, আপনে মাস্তানি ছাইড়া গানটাই ধরেন। আমি ঢোল বাজানোটা শিখা নেবো। আপনের গানের গলাটা জবর মিঠা!’
ঠাণ্ডুর এ ধরনের কথা পুলক আগেও শুনেছে। এর জবাব ও কখনো দেয়নি। আজ জবাবে ও বললো-
‘ঠাণ্ডু আজ থেকে আর মাস্তানি নয়। আমি আজ থেকে সৎ ও সুস্থভাবে জীবনযাপন শুরু করবো। তুইও ও সব ছেড়ে আমার মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আয়।’
পুলকের কথায় ভীষণ অবাক হয়ে যায় ঠাণ্ডু। ও কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থাকে পুলকের মুখের দিকে। পুলক ফের বললো-
‘কি বললাম, শুনেছিস?’
‘জ্বি, শুনলাম। আপনি কি বলছেন!’
‘যা বলেছি, তা খুব ভেবেচিন্তেই বলেছি। আমি আজ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছি। কোনো মাস্তানি নয়। কারো নির্দেশে কোনো অপরাধ আর করবো না। আমার মাথার ওপর কোনো বস থাকবে না। মুক্ত আকাশের নিচে মুক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে আমি আজ থেকে পথ চলবো।’
‘বস, এসব কী বলছেন!’
‘আজ থেকে আর আমাকে বস ডাকবি না। আমরা কেউ কারো বস নই। শিষ্যও নই। আমরা মুক্ত।’
পুলকের কণ্ঠ কেমন আবিষ্ট হয়ে আসে। ঠাণ্ডুর বিস্ময় সহে এসেছে। ও বলে-
‘মাস্তানি ছাইড়া দিলে খারাপ কিছু না। কিন্তু এসব ছাইড়া এখন কি করবেন?’
‘সেটা বলছি। তার আগে বল, তুই কি আমার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবি?’
‘আসবো, বস। কিন্তু পেট চলবে কী করে?’
‘ভয় নেই। একটা কিছু নিশ্চয় করবো। আমরা কাজ করে খাবো।’
‘কাজ! কী কাজ করবো?’
‘যে কোনো কাজ করবো। ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারি। তুইও থাকবি আমার সঙ্গে।’
‘রহমত কি জানে এসব কথা?’
‘ওকেও একটু আগে এ কথা বলেছি। ও রাজি হয়েছে।’
‘ও কোথায়?’
‘ওকে পাঠিয়েছি মসজিদে, হুজুরের কাছে তওবা করতে।’
‘তাই না-কি! ভীষণ আশ্চর্যের কথা!’
‘হ্যাঁ। তোকেও যেতে হবে। তওবা করে নতুন জীবন শুরু করতে হবে।’
‘জ্বি, আচ্ছা, বস।’
‘না, আজ থেকে আমাকে বস বলে ডাকবি না। ভাই বলবি। পুলক ভাই।’
‘ঠিক আছে, পুলক ভাই।’
ঠাণ্ডু মাথা নাড়ে। ও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। ও মনে মনে তিনবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করে নিলো। কোনো ভালো বিষয় ওর সামনে এসে দেখা দিলে ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ সূরাটি পাঠ করে। আজ ও সূরাটি পুরো মনে করতে পারছিল না। তাই তিনবার ‘আলহাদুলিল্লাহ’ পাঠ করলো। পুলক আবেশিত গলায় বললো-
‘শোন, আরেকটি কথা। আমি আজ জলিকে বিয়ে করবো।’
‘বলেন কী! ভীষণ আশ্চর্যের কথা!’
‘হ্যাঁ। আজ সন্ধ্যায় আমাদের বিয়ে হবে। আমি মসজিদের হুজুরকে বলে রেখেছি। তুই শুধু একজন কাজি ডেকে আনবি। পারবি না?’
‘বলেন কী, পারুম না ক্যান! শালা, কাজির কান ধইরা টাইনা লইয়া আমু না?’
‘উঁ-হুঁ। কোনো রকম মাস্তানি চলবে না। আজ থেকে আমরা ভদ্রলোকের মতো চলবো। মনে থাকে যেনো! তবে হ্যাঁ, জলি যদি বিয়ে করতে রাজি না হয়, তবে…!’
‘তবে কী করবেন?’
‘ওকে জোর করে ধরে নিয়ে আসবো, কী বলিস?’
‘তা খারাপ না। তবে আমার মনে হয়, জলি ম্যাডাম না করবেন না। উনি আপনাকে পছন্দ করেন।’
‘তাই না-কি! তুই কী করে বুঝলি?’
‘কী কইরা বুঝলাম, তা বলতে পারুম না। তবে আমার তাই মনে হয়।’
‘যাক, তাহলে তোর কথায় একটু ভরসা পেলাম। তুই যা। হুজুরের কাছে গিয়ে তওবা করে আস। এরপর যাবি কাজির কাছে। বলবি, আজ সন্ধ্যায় আমাদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে দিতে হবে।’
‘ঠিক আছে, যাচ্ছি। আপনি কী করবেন? বিয়ের দিন ঘরে বসে থাকবেন?’
‘না রে, না। আমি এখন বের হবো একটা বাসা খুঁজতে। বিয়ে করে বউকে তুলবো কোথায়? এরপর যাবো বিয়ের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে। কেনাকাটার পর যাবো জলিদের বাড়িতে। ওকে জানিয়ে আসবো বিয়ের জন্য তৈরি থাকতে।’
‘সব সুন্দর কইরা সাজাইয়া লইছেন। আজকের দিনটা আপনার ভালোই দেখতাছি!’
এ কথায় মুচকি হাসলো পুলক। ও বললো-
‘আর একটা কথা শুনে রাখ। আমি আজকের দিনটার একটা নাম দিয়েছি। দিনটির নাম হচ্ছে ‘বিয়ে দিবস’। বুঝলি? হা-হা-হা।’
ঠাণ্ডুও পুলকের হাসির সঙ্গে হো হো করে হেসে উঠলো। ও হাসিমুখে বেরিয়ে এলো পুলকের মেস থেকে। মেস থেকে বের হতেই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ সূরাটি ওর মনে পড়ে গেল। ও মনে মনে সূরাটি পাঠ করতে লাগলো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এলেও রহমত ফিরে এলো না। মসজিদে গিয়ে হুজুরের কাছে তওবা করে ওর ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ও ফিরেনি। এ নিয়ে পুলকের মন খারাপ হলো না। ঠাণ্ডু ফিরেছে। ঠাণ্ডু পুলকের কথা রাখবে, ও তা বিশ্বাস করতো। পুলক ঠাণ্ডুকে নিয়ে একটা রিকশায় চড়ে রওনা হলো জলিদের বাড়ির উদ্দেশে। ঘর ভাড়া এবং বিয়ের কেনাকাটা হয়ে গেছে। এখন শুধু বিয়ের আয়োজনটাই বাকি। পুলকের মনে অদ্ভুত সাহস কাজ করছে। সাহসটা ওর জীবনের একটা বড় বৈশিষ্ট্য। ওর সাহস মাঝে মাঝে দুঃসাহসের সীমানা পেরিয়ে যায়। জলিকে বিয়ে করার একা সিদ্ধান্ত নেয়াটা যেমনি ওর সাহস, তেমনি জলির মতামত না নিয়ে বিয়ের আয়োজন করাটাও দুঃসাহসিকতা। পুলকের অন্ধ বিশ্বাস জলি ওকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। জলি যে ওকে পছন্দ করে, এটা ও বুঝতে পারছে। ভালোলাগাটাই তো ভালোবাসার পথে ঠেলে দেয়। তাহলে জলি কেনো ওকে ভালোবাসবে না? সুস্থ জীবনে ফিরে গিয়ে হাত বাড়ালে জলি কি ওকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? নিজের ভেতরে যুক্তি এবং প্রশ্ন তৈরি করে ভাবতে থাকে পুলক। ভাবনার ভাবুলতার মধ্য দিয়ে পুলক একসময় পৌঁছে যায় জলিদের বাড়ি।
‘পুলক ভাই, আমরা জলি ম্যাডামের বাড়িতে আইসা পড়ছি।’
ঠাণ্ডুর কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় ও। বিকেল এখনো স্বর্ণাভা ছড়িয়ে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষামাণ। জলিরদের বাড়ির চালে শেষ বিকেলের রোদ লুটিয়ে আছে। বাড়ির উঠোনের আম গাছটির পাতা দুলছে হালকা হাওয়ায়। উঠোনে অদৃশ্য গুমোট নিঃসঙ্গতা। পুলক রিকশা থেকে নেমে গেলো। ঠাণ্ডুর উদ্দেশে বললো-
‘তুই রিকশায় বস। আমি জলিকে বিয়ের কথাটি বলে এখনই আসছি।’
পুলক ঝড়ো হাওয়ার মতো ঢুকে গেলো জলিদের বাড়ির উঠোনে। ঠাণ্ডুও পুলকের পেছনে ছায়ার মতো এলো। পুলক জলিদের উঠোনে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে ডাকলো-
‘জলি, একটু বাইরে আসো। তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।’
পুলক জলিকে ইচ্ছে করেই তুমি সম্বোধন করে ডাকলো। তুমি বলার মধ্য দিয়ে ও আজ নিজের অধিকার প্রকাশ করতে চায়। জলিদের ঘর থেকে বের হয়ে এলেন হাসিনা বেগম। তিনি পুলককে দেখে চিনতে পারলেন। হাসিনা বেগম স্থানীয় প্রায় সকল লোকদের চেনেন। তিনি পুলকের উদ্দেশে বললেন-
‘বাবা, জলি তো বাড়ি নেই।’
‘বাড়ি নেই? ও কোথায় গেছে? কখন আসবে?’
‘ও তো আর আসবে না। ও ওর মামার সঙ্গে আইজই চলে গেছে।’
‘কী বললেন! কোথায় গেছে?’
‘ওর মামার বাড়িতে।’
এ কথায় ভীষণ হতভম্ব হয়ে গেলো পুলক। ওর মুখ থেকে আর কোনো কথা বেরুলো না। ওর পৃথিবীটা যেনো কাঁপছে। ওর মনে হচ্ছিল, এখনই ও মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। ও নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। পেছন থেকে ঠাণ্ডু এসে পুলককে ধরলো। ওর শরীরটা যেনো মাটিয়ে লুটিয়ে পড়া থেকে রক্ষা পেলো। ঠাণ্ডু হাসিনা বেগমের উদ্দেশে বললো-
‘হাসিনা খালা, জলি ম্যাডাম কবে ফিরবেন, তা জানেন?’
এর জবাবে হাসিনা বেগম আনন্দিত গলায় বললেন-
‘বাবা, ওর বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হইয়া আছে। মামার বাড়িতে যাবার পরপরই ওর বিয়ে হবে। বিয়ে-শাদির পর মাইয়া মানুষ কখন নিজের বাড়িতে আসবো, তার কি ঠিক-ঠিকানা আছে? তা ছাড়া, ওর তো বাপ-মা কেউই বাইচা নাই। এইখানে আইসাই বা কি করবো?’
হাসিনা বেগমের কথাগুলো গরম সীসার মতো পুলকের ইন্দ্রীয়তে প্রবেশ করছিল। ঠাণ্ডু বললো-
‘সর্বনাশ! আপনে এই সব কী বলতাছেন!’
হাসিনা বেগম অবাক চোখ কপালে তুলে বললেন-
‘এইখানে বাবা, সর্বনাশের কী দেখলেন! এতিম মাইয়াটার একটা গতি হইলো, এইটারে সর্বনাশ কইতাছেন! কত বলাবলির পর মাইয়াটা বিয়াতে রাজি হইছে!’
‘খালা, চুপ করেন!’
ঠাণ্ডুর ধমকে ভড়কে যান হাসিনা বেগম। তিনি বুঝতে পারছেন কেনো জলির খোঁজে পুলক ও ঠাণ্ডু এসেছে। ওর বিয়ের খবরে ওরা কোনো রেগে যাচ্ছে। তিনি ভয়ার্ত গলায় বললেন-
‘বাবারা, আমার কি কোনো ভুল হইছে?’
‘না। আপনে ঘরের ভেতরে যান।’
পুলক ঠাণ্ডা গলায় বললো। ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বিধ্বস্ততার যে ছবি দেখা যায়, পুলকের মনের ছবিটাও এখন সেরকম। ও নিচু গলায় ঠাণ্ডুকে বললো-
‘ঠাণ্ডু চল, যাই। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।’
এ কথা বলে পুলক ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটতে লাগলো। ঠাণ্ডু ওকে অনুসরণ করলো। ঠাণ্ডু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পুলকের উদ্দেশে হতাশ গলায় বললো-
‘বস, বিবাহ দিবসটা আর পালন করা গেলো না! আসলে মাইয়া মানুষ হইলো হারামজাদি!’
এ কথার জবাবে পুলক কোনো কিছু বললো না। গভীর বেদনায় ও তলিয়ে যেতে লাগলো।
ষোল.
পুলক জলির সামনে দাঁড়িয়ে অবাক কণ্ঠে বললো-
‘আমাকে না বলে পালিয়ে এসেছো কেনো!’
জলি বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘পালিয়ে এসেছি মানে?’
‘নয় তো কী? আমাকে কিছু না বলে চলে আসাটা পালিয়ে আসা নয়? সে যাকগে, আমার হাতে সময় নেই। তুমি চট করে তৈরি হয়ে নাও। আমাদের এখনই যেতে হবে।’
‘কোথায়!’
‘আমাদের গ্রামে। আমার বাবা খুবই অসুস্থ। তিনি তোমাকে দেখতে চাইছেন। তিনি ছেলের বউ দেখে মরতে চান। তাই তোমাকে নিতে এসেছি।’
এ পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখলো জলি। স্বপ্নটা দেখলো ও ভোররাতে। স্বপ্নটা ভীষণ অদ্ভুত যা কখনো ও ভাবেনি বা কখনো কল্পনা করেনি, তা-ই স্বপ্নে দেখলো ও। স্বপ্নটা শেষ না হতেই ঘুম ভেঙে গেলো ওর। এই স্বপ্ন ওকে ভীষণ কাঁপিয়ে দিলো। বুকের ভেতর স্পন্দন বেড়ে গেলো। আজ জলির বিয়ে। বিয়ের দিন ভোরে এ ধরনের স্বপ্ন ও কেনো দেখলো, কে জানে! জলি বিছানায় উঠে বসে বেশ কয়েকবার অসমাপ্ত স্বপ্নটার কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভাবতে লাগলো। দুহাতের বন্ধনে জড়ানো দুই হাঁটুর ওপর চিবুক রেখে ও স্বপ্নটার কথা ভাবছিল। স্বপ্নটার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে, ওর চোখের কোণ থেকে অশ্রুজলের দুটি ধারা গাল বেয়ে নেমে এলো, ও বুঝতে পারলো না। যখন বুঝলো, তখন ওর মনে হলো এটা ঠিক ওর কান্না নয়, কান্নার চেয়েও গভীর কিছু। এই অশ্রুজল হয়তো অর্থহীন আবার অনেক অর্থবহ। অথৈ সমুদ্রে গভীর অন্ধকারে বাতিঘরের আলো যেমন পথহারা নাবিককে পথ দেখায়, এই স্বপ্নটা কি জলিকে কোনো পথ দেখাচ্ছে? এ কথা মনে হতেই জলির বুকের ভেতর দুমরে-মুচড়ে উঠলো। ও বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
‘আপা, তুমি কি কাঁদছো?’
শিলার প্রশ্নে হচকিয়ে গেলো জলি। শিলা জাগলো কখন? জলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো শিলা বিছানায় শুয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শিলা ওর মামাতো বোন। ও জলির চেয়ে চার বছরের ছোট। শিলা ওর ছোট হলেও দুজনের মধ্যে বেশ ভাব। ওদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। ওরা দুজনে প্রতিদিন এক বিছানায় ঘুমায়। প্রতিরাতেই দুজনে অনেক রকম গল্প করে। বিশেষ করে শিলাই গল্প করে বেশি। কিশোরী বয়সটাই স্বপ্নের নানা রং দিয়ে ঠাসা। শিলার সব কিছু নিয়ে গল্প করার প্রবণতা, উচ্ছ্বাস আর আবেগ ভালো লাগে জলির। জলিও হয়তো কথায় কথায় উচ্ছ্বসিত হতে পারতো। কিন্তু ওর জীবন- রং উঠে যাওয়া বিবর্ণ এক বিপন্ন চিত্রকল্প। ওর ভেতরে উচ্ছ্বাসের নদী মরে শুকিয়ে গেছে। ও যেনো হাসতেই ভুলে গেছে। ও কি শিলার মতো যখন তখন খিলখিলিয়ে হেসে উঠতে পারে? জলির ভাবনাকে ভেঙে দেয় শিলার প্রশ্ন।
‘বললে না, তুমি কাঁদছো কেনো?’
‘কই কাঁদছি? তুই কখন জাগলি?’
‘তুমি যখন বিছানা থেকে উঠে বসলে তখনই আমার ঘুম ভেঙে গেছে।’
‘তাই না-কি!’
‘হ্যাঁ। আপা তুমি কাঁদছিলে, তাই না? আমি জানি, বিয়ের দিন মেয়েরা কাঁদে।’
‘তুই দেখি, অনেক কিছু জানিস! তা মেয়েরা বিয়ের দিন কেনো কাঁদে, বল দেখি!’
‘তা জানি না। কাঁদতে হয় বলেই হয়তো মেয়েরা কাঁদে। আপা, আমি বিয়ের দিন কাঁদবো না।’
‘বলিস কী! কেনো?
‘বাহ রে, কান্নাকাটির কী আছে! ছেলেরা যদি না কাঁদে, আমরাও কাঁদবো না। শুধু মেয়েরাই কাঁদবে, তা কেনো?’
শিলার চিন্তা-ধারণা এবং কথা একটু ব্যতিক্রম। ওর ব্যতিক্রম চিন্তা এবং কথা জলি পছন্দ করে। জলি বললো-
‘শিলা তুই ঘুমিয়ে পড়। সবাই ঘুমাচ্ছেন। কথা বললে মামা-মামীর ঘুম ভেঙে যেতে পারে।’
‘তুমি ঘুমাবে না?’
‘না, আমার আর ঘুম আসবে না।’
‘তাহলে কি একা একা কাঁদবে?’
‘কাঁদবো কেনো? আর কাঁদলেই বা কী? আমার এই কান্না নিয়ে জগৎ সংসারের কি এমন ক্ষতি হবে বলো?’
জলির মনে হলো এ কথাটি ও ঠিক শিলাকে বললো না, নিজের উদ্দেশেই যেনো নিজেকে বললো। ও ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। শিলা নরোম গলায় বললো-
‘একটা প্রশ্ন করবো, আপা?’
‘কর।’
‘সঠিক উত্তর দেবে?’
‘তুই এমনভাবে বলছিস, যেনো খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন প্রশ্ন করবি?’
‘অনেকটা সেরকমই। খুবই ব্যক্তিগত প্রশ্ন।’
‘শুনি, কী তোর প্রশ্ন।’
‘আগে কথা দাও, সঠিক উত্তর দেবে।’
‘আচ্ছা দেবো।’
জলি হাসলো। শিলা বিছানা থেকে উঠে বসলো। ও জলির মুখোমুখি বসলো। জলির চোখে চোখ রেখে গলা নামিয়ে বললো-
‘তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?’
প্রশ্নটি শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো জলি। এমন প্রশ্নের জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। ও চুপসে গেলো। শিলা জলির দুহাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাগিদ দেয়া গলায় বললো-
‘বলো না, প্লিজ! তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?’
‘না।’
ছোট্ট করে জবাব দিলো জলি। এই ‘না’ বলতে গিয়ে ওর কণ্ঠস্বর যেনো একটু কেঁপে গেলো। শিলা বললো-
‘মনে হচ্ছে তুমি মিথ্যা কথা বলছো।’
‘কেনো মিথ্যা বলবো?’
‘সবাই যে কারণে বলে। ভালোবাসার কথাটা অনেকেই স্বীকার করতে চায় না।’
জলি শিলার কথায় মুখে হাসি টেনে বললো-
‘আমার জীবনটা অন্য সকলের মতো নয়। আমাকে কেউ ভালোবাসবে কিংবা আমি কাউকে ভালোবাসবো- এ ধরনের চিন্তা আমার মধ্যে কাজ করে না। বুঝলি?’
‘তাহলে তোমার খাতায় পুলক নামে একজনের নাম কেনো লিখেছো? পুলক কে?’
এ প্রশ্নে ভড়কে গেলো জলি। মিহিন একটা কষ্ট ছড়িয়ে পড়তে লাগলো ওর ভেতরে। শিলা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। জলি মুখ নামিয়ে বললো-
‘খাতায় একজনের নাম লিখে রাখার মধ্য দিয়েই কি ভালোবাসা হয়? তুই কি তাই মনে করিস?’
‘তা তো আমি বলতে পারবো না, আপা। তবে এটা যে ভালো লাগার প্রকাশ, তা বলতে পারি।’
‘তুই দেখছি, খুব পেকে গেছিস! এখন ঘুমাতো! আমাকে একটু একা থাকতে দে।’
‘একা বসে বসে কি ওই লোকটার কথা ভাববে আর কাঁদবে?’
‘কোন লোকটার কথা?’
‘ওই যে, যার নাম পুলক!’
‘চুপ কর তো! তার কথা ভাবলেই তোর কী?’
‘না, বলছিলাম কী, আজ বিয়ের দিন তার কথা ভেবে আর কী হবে, বলো?’
এ কথায় একটু থেমে গম্ভীর গলায় জলি বললো-
‘যদি বিয়ে না করি!’
‘কী বলছো, আপা! তোমার মাথা খারাপ না-কি! বিয়ের দিন সকালে কেউ এমন কথা বলে?’
শিলার বিস্ময় উপভোগ করে জলি হেসে বললো-
‘অনেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসার ঠিক আগ মুহূর্তেও পালিয়ে যায়। যায় না?’
‘তা যায়। তুমিও পালাবে না-কি!’
‘বিয়েটা করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।’
‘বলো কি! এসব কী বলছো!’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলছি।’
‘আপা!’
‘শোন, তুই ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেনো? বিয়ে করা বা না করা আমার জীবনের কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয়। এই বিয়েতে মামার উদ্বেগ দেখে রাজি হয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, বিয়ে করাটা আমার ঠিক হবে না।’
‘আপা, তুমি আস্তে বলো!’
জলি শিলার উদ্বেগ গায়ে মাখলো না। ও বললো-
‘শিলা, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে পড়বো। তুই চুপ থেকে আমাকে সাহায্য করবি।’
‘সত্যি, সত্যিই তুমি পালাচ্ছো!’
‘তুই অমন করছিস কেনো! আমার জীবন নিয়ে আমারই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাই না? শোন, মামা ঘুম থেকে উঠলে, আমার চলে যাওয়ার কথাটা জানাবি। বলবি, বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে দিতে। আর হ্যাঁ, তুই কিন্তু সবকিছু সামলাবি। বুঝলি?’
‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না। তোমার যা ইচ্ছা করো।’
জলি আর কোনো কথা বাড়ালো না। বিয়ে না করার ইচ্ছাটা অনড় পাথরের মতো চেপে রইলো ওর মনে। ও দ্রুত ওর ব্যাগ গুছিয়ে নিলো। এ সময়টুকু বিস্ময়ভরা চোখে জলির দিকে তাকিয়ে রইলো শিলা। ভোরের নরোম আলো ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে পাখিদের গুঞ্জন। জলি ব্যাগ গুছিয়ে যখন দরজা খুললো, তখন ভোরের আলো এসে হামলে পড়লো ওদের ঘরে। জলি খোলা দরজার সামনে একটু দাঁড়ালো। শিলা দেখলো, ভোরের কাঁচারোদের কোমল আলোয় জলিকে অদ্ভুত লাগছে। ওর মনে হচ্ছিল, জলি জীবন সংগ্রামের নির্ভীক এক পথযাত্রী। শিলা মনে মনে ওর সাহসী আপাকে শুভেচ্ছা জানালো। জলি যাবার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে বললো-
‘শিলা, যাচ্ছি।’
‘আচ্ছা, যাও। শেষ একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’
‘বলো।’
‘তুমি কি ওই পুলক লোকটির কাছে যাচ্ছো?’
এ কথায় জলি মুখ টিপে হাসলো। ও বললো-
‘যদি নিজেকে শুদ্ধ করতে পারতাম, তবে তার কাছেই যেতাম। কিন্তু আমার সেই ভাগ্য নেই। আমি যাচ্ছি, অজানার উদ্দেশে। ভাগ্যের কাছেই নিজের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়ে বের হচ্ছি। তোরা ভালো থাকিস। মামাকে বলিস, আমাকে যেনো ক্ষমা করে দেন।’
জলি আর দাঁড়ালো না। দাঁড়িয়েই বা কী হবে? ও হচ্ছে কালের স্রোতে ভেসে চলা একখণ্ড খড়কুটো।
সতের.
এক বছর কারো কাছে তেমন বেশি দিন নয়, আবার কারো কাছে অনেক দীর্ঘ সময়। এক বছরে অনেকের জীবনে যেমন খুব একটা পরিবর্তন আসে না, তেমনি অনেকের জীবনে আমূল পরিবর্তন চলে আসে। গত এক বছরে জলির জীবনে খুব একটা পরিবর্তন না এলেও ও নিজের জীবনের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে পেরেছে। এটাই ওর জীবনের বড় পরিবর্তন। জলির বুকভরা হতাশা আর কষ্ট থাকলেও জীবনযুদ্ধে ও কখনো হেরে যেতে চায়নি। ও এখন চাকরি করছে। একটি গুঁড়া সাবান উৎপাদনকারী কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির কাজ জুটিয়ে নিয়েছে ও। ওর কাজ হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওই কোম্পানির গুঁড়া সাবানের পাবলিসিটি করা এবং তা বিক্রি করা। ও শুধু ক্রেতার অর্ডার নেয়। এই অর্ডার মোতাবেক ওই কোম্পানি গুঁড়া সাবান পৌঁছে দেয় ক্রেতার কাছে। যৎসামান্য বেতন এবং সাবান বিক্রির ওপর যে কমিশন পায়, তাতে ওর ভালোই দিন কেটে যাচ্ছে। এই চাকরিটি আহামরি তেমন না হলেও অবিভাবকহীন জলির জন্য তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ওর তা-ই মনে হয়। তবে এই চাকরিটায় ঝুঁকিও আছে। অনেক সময় অনেক বাড়িতে গিয়ে ওকে বিব্রত হতে হয়। অনেক সময় পুড়তে হয় পুরুষদের লালসার আগুনে। সাবান বিক্রির কাজ করতে গিয়ে অনেক বাড়িতে পুরুষদের আকারে-ইঙ্গিতে আশালীন প্রস্তাবও পেয়েছে। এসব সহ্য করতে হয়। ওর তেমন ভয় নেই বলেই ও ঝুঁকি নিয়েই চাকরিটা করছে। ও প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায় এবং বিভিন্ন বাড়ির দরজায় নক করে।
জলি আজ এসেছে টিপু সুলতান রোডে। পুরনো ঢাকায় ও কখনো আসেনি। এবার ওর ডিউটি পড়েছে এই এলাকায়। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ও তিনটি বাড়িতে গিয়ে কথা বলে দুটি বাড়ি থেকে ও সাবান ক্রয়ের অর্ডার পেলো। এতে জলির মনটা খুশি হয়ে গেলো। গতকাল হাতিরপুল এলাকায় সারাদিনে বত্রিশটি বাড়িতে গিয়ে ও অর্ডার পেয়েছে মাত্র তিনটি বাড়ি থেকে। আজ সকালটাই শুভ। ভাবে ও। খুশি মনে ও ২০১ নম্বর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল টিপলো। বাড়িটি একতলা। বড় বড় অট্টালিকায় যারা থাকেন, তারা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো কিছু কিনতে চান না। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তরা কেনেন। জলি এখন যে বাড়ির কলিংবেল টিপেছে, এখানে ধনী লোক থাকার কথা নয়। বেশ পুরনো দিনের বাড়ি। জলি আরেকবার কলিংবেল টিপলো। ও মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখলো। বিক্রয় প্রতিনিধিদের মুখে সব সময় হাসি ধরে রাখতে হয়। দরজাটা খুললো পুলক। পুলককে দেখে জলির মুখে ধরে রাখা হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠলো অপার বিস্ময়। পুলকের চোখে-মুখেও গভীর বিস্ময় ফুটে উঠলো। দুজন দুজনার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কারো মুখে কোনো কথা জোগালো না। জলির মাথাটা যেনো ঘুরছে। পুলক একসময় ধাতস্থ হলো। ও বললো,
‘আপনি! আমি নিজের চোখকে যেনো বিশ্বাস করতে পারছি না!’
জলির ঠোঁট কাঁপলো। ও কিছু বলতে পারলো না। এতোটা বিস্ময় সহ্য করার মতো নয়। পুলক দরজা থেকে একটু সরে দাঁড়িয়ে বললো-
‘ভেতরে আসুন।’
জলি আদেশমানা মেয়ের মতো রুমের ভেতরে ঢুকলো। রুমটি অগোছালো। চারটি চেয়ার ও একটি টেবিল রয়েছে। টেবেলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বই ও ম্যাগাজিন পড়ে আছে। ছোট একটা কাঠের আলমারি ও একটি ওয়ারড্রব পাশাপাশি রয়েছে রুমটির এক কোণে। এটি সম্ভবত ড্রয়ংরুম। ভেতরে একটি রুম রয়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। ভেতরের রুমের দরজায় পর্দা ঝুলছে। পর্দাটাও মলিন। অনেকদিন ধোয়া হয় না। চট করে দেখে নিলো জলি। ওর বুক দুরু দুরু কাঁপছে। পুলক জলির সামনে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে এলো। নিজে আরেকটি চেয়ারে বসে বললো-
‘আপনি এই চেয়ারে বসুন।’
জলি চেয়ারে বসলো। বিস্ময়ের পাশাপাশি বেদনার একটা স্রোত বইছে ওর মনে। ও পুলকের দিকে তাকালো। পুলকের মধ্যে একটা পরিবর্তনের ছাপ দেখতে পেলো। পোশাকে-আশাকে স্মার্টনেস ফুটে উঠেছে। চেহারার মধ্যে রাগী ভাব নেই। দৃষ্টি কোমল। ও পুলকের দিকে তাকিয়ে চট করেই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলো না। পুলক বললো-
‘কী দেখছেন, অমন করে। আমি অনেক বদলে গেছি, তাই না?’
‘অনেক বদলেছেন!’
জলির কথায় একটু হাসলো পুলক। ও বললো-
‘আপনিও কিন্তু বদলেছেন। কেমন শুকিয়ে গেছেন। নিজের প্রতি যত্ন নিচ্ছেন না, বুঝতে পারছি। আচ্ছা, আপনি নিজেকে পুড়িয়ে কী পান, বলুন তো?’
একটা ধাক্কা এসে লাগলো জলির ভেতরে। একটা জলপ্রপাত নেমে আসতে চাইছে। এমনভাবে এই প্রশ্ন ওকে কখনো কেউ করেনি। ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো পুলকের মুখের দিকে। ও এর জবাবে কী বলবে, ভেবে পেলো না। পুলকের ভেতরে ভীষণ তোলপাড় চলছে। জলি কেনো এবং কীভাবে ওর কাছে এসেছে, তা ওর জানতে ইচ্ছে করছে। এক বছর পর জলি ওর কাছে কেনো এসেছে, তা ও বুঝতে পারছে না। এক বছর পুলকের কাছে অনেক দীর্ঘ সময়। গত এক বছরে ওর জীবনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। জলি ওর মামার সঙ্গে নীলফামারী চলে যাবার পর পুলক মুন্সিগঞ্জ ছেড়ে চলে আসে ঢাকায়। ও মাস্তানি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করে। এক বছরের মধ্যে ব্যবসায় ও যথেষ্ট সফলতা লাভ করে। ও প্রথমে শ্যামবাজারে আড়তগুলোতে আলু-পটলসহ বিভিন্ন তরকারি সরবরাহ করার ব্যবসায় নামে। ঢাকার কাঁচাবাজারে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুরের শাক-সবজি ও তরকারির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পুলক তরকারির ব্যবসা প্রথমে ছোটভাবে শুরু করেছিল। এখন এই ব্যবসা জমে উঠেছে। বেড়েছে ব্যবসার পরিধি। ব্যবসার কারণে পুলকের ব্যস্ততা দিনদিন বাড়ছে। ব্যবসা শুরুর ছয় মাসের মধ্যে ও টিপু সুলতান রোডের এই বাসাটি ভাড়া নেয়। এই বাসাতে থাকছে ও। একা। মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে যায় ও। মুন্সিগঞ্জ শহরে পুলক খুব একটা যায় না। ফেলা আসা দিনের স্মৃতি ওকে পীড়া দেয়। এই শহর জলির কথা মনে করিয়ে দেয়। কষ্ট দেয়। জলির কথা ভুলে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ জলি নিজে ওর বাসায় এসে হাজির। জলি কি কোনো সমস্যায় পড়ে ওর কাছে এসেছে? প্রশ্নটা মনে হতেই ও বললো-
‘আপনি কি কোনো সমস্যায় পড়েছেন?’
জলি অবাক চোখ তুলে বললো-
‘না!’
‘তাহলে…?’
‘কেনো আপনার কাছে কি আমি আসতে পারি না? আমার আসাটা কি অন্যায় হয়েছে?’
‘না, ঠিক তা নয়। আচ্ছা, আপনার স্বামী কোথায়? তিনি আসেননি?’
এ কথায় খিলখিলিয়ে হেসে ফেললো জলি। ওর হাসির সামনে বিব্রত হয়ে পড়লো পুলক। এরপর কী বলা যায়, তা ও ভাবতে লাগলো। হাসি থামিয়ে জলি বললো-
‘আমার স্বামী নিয়ে আপনার এতো কৌতূহল কেনো? আপনি বিয়ে করেননি?’
এ প্রশ্নে হেসে ফেললো পুলকও। ও বললো-
‘বিয়ে নিয়ে আর ভাবিনি। আর সত্যি কথা বলতে কী, আপনার স্বামীর কথা জানতে আমার ইচ্ছে করছে।’
‘জেনে কী হবে?’
‘কী আর হবে। আপনি ভালো আছেন জানলে ভালো লাগবে।’
‘সত্যি বলছেন! না-কি ভালো নেই জানলে, এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাবেন?’
‘আত্মতৃপ্তি পাবো কেনো? আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারার আপনার যেমন অহংকার আছে, আমারও না পাওয়ার কষ্ট মেনে নেবার মানসিকতা আছে। এই মানসিকতা আপনার অহংকারের চেয়ে কম মর্যাদার নয়।’
এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো জলি। ও বললো-
‘আপনার দ্বিধাহীন কথা এবং মানসিকতা আপনার ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। আজ আপনার এই রূপটি দেখে আমার ভীষণ ভালো লাগছে।’
‘ধন্যবাদ। তবে আমি আপনাকে মুগ্ধ করতে চাই না।’
‘কিন্তু আমি যে, সেই অনেক আগে থেকেই মুগ্ধ হয়ে আছি!’
বলেই জলি ফের হাসলো। এ কথায় একটু লজ্জা পেলো পুলক। ও বললো-
‘তাহলে আর পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করতেন না।’
‘আপনাকে কে বললো যে, আমি বিয়ে করেছি!’
‘মামার বাড়িতে গিয়ে আপনি বিয়ে করেননি!’
অবাককণ্ঠে জানতে চাইলো পুলক। জলি হাসলো। ও নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। ভেতরে ভাঙন হচ্ছে। ও বললো-
‘আমি কাউকে বিয়ে করিনি। তবে বিয়ে করার কথা ছিল।’
‘তাই না-কি! বিয়ে কেনো করেননি?’
‘এ প্রশ্নের জবাব আপনাকে কেনো দেবো? এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।’
পুলক জলির মুখের দিকে হা করে চেয়ে রইলো। ও কী বলবে, ভেবে পাচ্ছেন না। ওর ভেতরে মিহিন কষ্টটা যেনো মিইয়ে যাচ্ছে। আনন্দের একটা রিদম টের পাচ্ছে ও। জলি বললো-
‘আমি কিন্তু আজ আপনার কাছে আসিনি। আমি জানতাম না, আপনি এই বাসায় থাকেন।’
‘তাহলে…! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘আমি একটা চাকরি করি। চাকরিটা হচ্ছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নক করা। গৃহিণীদের কাছে গিয়ে একটি গুঁড়া সাবান কোম্পানির প্রোডাক্টস দেখানো। আমার কথা শুনে কেউ কেউ গুঁড়া সাবান কেনেন। এটাই আমার কাজ।’
‘আচ্ছা!’
‘হ্যাঁ, আপনার বাসার কলিংবেল টিপেছিলাম গুঁড়া সাবান বিক্রির জন্য। এখন দেখুন, ব্যবসার কথা ফেলে কেমন নিজেদের আলোচনা নিয়ে জমে গেছি।’
এ কথা বলে হাসলো জলি। পুলকও হাসলো। পুরো ঘটনাটাই ওর কাছে কেমন ‘নাটক’ ‘নাটক’ মনে হচ্ছে। ওর বিহ্বলতা কাটতে চায় না। জলির ওঠা উচিত। কিন্তু ও উঠতে পারছে না। পুলকের সামনে বসে থাকতে ওর ভালো লাগছে। নিজেকে নিয়ে নিজের ভেতরে ও শিউরে ওঠে। পুলক ওর সামনে এ মুহূর্তে চুপচাপ। জলি পরিবেশ হালকা করার জন্য কথা বললো।
‘আচ্ছা, আপনার সাগরেদ ঠাণ্ডু কী করেন? সে কি এখনো আপনার সাগরেদ আছেন?’
‘হ্যাঁ, আমার সঙ্গেই আছে। আমার ব্যবসায় ওকে রেখেছি।’
এ কথা বলেই পুলক প্রশ্ন করলো-
‘আচ্ছা, আপনি কোথায় থাকেন, কার সঙ্গে থাকেন?’
জলি বললো-
‘কার সঙ্গে আবার থাকবো! আমি থাকি মেয়েদের একটি হোস্টেলে। ঢাকা শহরে অভিভাবকহীন একটি মেয়েকে আশ্রয় কে দেবে?’
পুলক জলির জবাব শুনে যেনো স্বস্তি পেলো। জলি এবার প্রশ্ন করলো-
‘আপনার বাবা-মা কেমন আছেন? আর শিলা?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পুলক বললো-
‘বাবা খুবই অসুস্থ। আমি আজ বাড়ি যাচ্ছি। আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন? বাবা মৃত্যুর আগে তার পত্রবধূকে দেখতে চান।’
এ কথায় হতভম্ব হয়ে গেলো জলি। এক বছর আগে দেখা স্বপ্নটার প্রতিফলন আজ হলো কেনো? নিজের ভেতরের চেপে রাখা কান্নাটা ও আর ধরে রাখতে পারলো না। ওর দুচোখ জলে ভিজে গেলো। পুলক অবাক হলো না জলির এই কান্নায়। ও বললো-
‘তোমাকে কাঁদলেও ভালো দেখায়!’
জলিকে ও ইচ্ছে করেই ‘তুমি’ করে বললো। ওর মনে হলো এখন আর ওকে ‘আপনি’ বলাটা অবান্তর। পুলক সাহস করে দুহাত বাড়িয়ে জলির দুহাত ধরলো। জলি বাধা দিলো না। জলির শরীরটা কেঁপে উঠলো শুধু। ওর দুচোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে। এই অশ্রুজল আনন্দ, না বেদনার, তা ও বুঝতে পারছে না। পুলকের বুকে লুটিয়ে পড়তে ওর ভীষণ ইচ্ছে করছে।
স্বপ্নঘোর
এক.
কেয়ার ফোন এবার রিসিভ না করে পারলো না সৈকত। এগারোবারের সময় ও কেয়ার ফোন ধরলো। গত দশ মিনিটে কেয়া দশবার ফোন করেছে। সৈকত ওর ফোন ধরেনি। আসলে ও কেয়ার ফোন ধরতে চায়নি। তাই যতোবারই কেয়ার ফোন এসেছে, ও কেটে দিয়েছে। কিন্তু কেয়াও যেনো আজ নাছোড়বান্দা। এক মিনিট যেতে না যেতেই ফোন করছে। ব্যাপারটা ভীষণ বিরক্তিকর। কেয়ার ফোন নিয়ে সৈকত অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। ওর সামনে সুমন বসে আছে। সুমনের পাশে বসে আছে অহনা নামের এক মেয়ে। ওরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিল। আলোচনা শুরু হতেই কেয়ার ফোন এলো। সুমনের সামনে কেয়ার ফোন ধরা যায় না। সৈকত ওর ফোন না ধরে কেটে দিচ্ছিল। কিন্তু কেয়া থেমে থেমে ফোন করে যাচ্ছিল। এমন কখনো হয়নি। কেয়া সাধারণত একবার ফোন করে। ফোন না ধরলে আর ফোন করে না। শুধু তাই নয়, এরপর সৈকতকে অনেকবার ফোন করতে হয়। কেয়া ওর ফোন কেটে দেয়। অন্তত আট থেকে দশবার ও সৈকতের ফোন কেটে দেবে। এসএমএস করে অনেকবার ম্যাসেজ দেবে সৈকত। একসময় ফোন ধরবে কেয়া। ফোন ধরেই রাগের একটা ঝড় বইয়ে দেবে। সৈকত ওই ঝড়ে কাচুমাচু হয়ে যায়। কেয়ার মধ্যে এক ধরনের অহংকার আছে। রাগের উত্তাপ আছে। অভিমানের খরস্রোতা নদী আছে। ওর চরিত্রে রহস্যময় এক আকাশও আছে। ওর কথায় ঝাল আছে, ফুল ফুটনো হুল আছে এবং একরাশ মাদকতাও আছে। আর তাই সৈকত কেয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সবসময় বিহ্বল হয়ে যায়। অথচ কেয়ার রূপের সৌন্দর্য, চরিত্রের রহস্য বা কথার মাদকতা সযতনে সৈকতের উপেক্ষা করা উচিত। কিন্তু ও তা পারেনি বা এখনো পারছে না। বরং সমুদ্রের মোহনায় নদীর ছুটে চলার মতো ও ছুটে চলছে নীরবে এবং নিরুপায় হয়ে। এ এক ধরনের আত্মসমর্পণ। খুব অল্প সময়ে কথাগুলো ভেবে নিলো সৈকত। ফোন বেজে উঠতেই ও ফোন ধরলো। অস্বস্তিতে ও ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-
‘হ্যালো’।
অন্য প্রান্তে কেয়া কালবৈশাখী ঝড় হয়ে উঠবে ভেবেছিল সৈকত। কিন্তু তা হলো না। সৈকতকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে শান্ত গলায় কেয়া বললো-
‘তুমি কি কোনো জরুরি কাজে ব্যস্ত?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। একটা মিটিংয়ে আছি। মিটিং শেষ হলেই তোমাকে ফোন করছি। কেমন?’
‘ঠিক আছে। মিটিং শেষ করেই আমাকে ফোন করবে। ভুলে যেও না কিন্তু!’
কেয়া সাবধান করে দেয় সৈকতকে। যেনো ফোন করতে ভুলে গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। অন্যসময় হলে সৈকত হয়তো এ নিয়ে কেয়াকে একটা খোঁচা দিতো। আর এতেই গড় গড় করে কেয়ার মুখ থেকে বের হয়ে আসতো ঝাল কথার পাথর। কিন্তু এই মুহূর্তে কেয়াকে খোঁচা দেয়া যাবে না। ও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
‘না ভুলবো না। মিটিং শেষ করেই তোমাকে ফোন দেবো।’
‘মনে থাকবে তো? খুব জরুরি কিন্তু!’
‘মনে থাকবে। যদি একেবারেই ভুলে যাই, দুই ঘণ্টা পর তুমি ফোন দিয়ো।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
কেয়া ফোন রেখে দিলো। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সৈকত। ওর দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে সুমন। সুমনের চোখে চোখ রাখতে ওর বুকের ভেতরটা একটু কাঁপলো। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে ব্যক্তিগত কিছু গোপন থাকে না। কোনো কিছু গোপন করে রাখাও যায় না। ঘষ্ঠি বন্ধু মানে নিজের প্রতিবিম্ব দেখার স্বচ্ছ আয়না। নিজের সবরকম অপরাধও বন্ধুর কাছে অকপটে স্বীকার করে নেয়া যায়। সব কথা খুলে বলা যায় বা বলতে হয়। এ কথা জানে সৈকত। কিন্তু কেয়ার কথা খুব যত্ন করেই সুমনের কাছে গোপন রেখেছে ও। কতোদিন গোপন রাখতে পারবে, কে জানে! সৈকত চোখ নামিয়ে নিলো। ও তাকালো অহনার দিকে। অহনা কেমন ভাবলেশহীন। চিন্তিত। বিষণ্নতা মিশ্রিত এক ধরনের উদাসীনতা ওর চোখে-মুখে। সুমন বললো-
‘তুই ফোনটা এবার বন্ধ কর। আমরা ভীষণ একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলাপ করতে যাচ্ছি।’
সুমনের কথায় সৈকত ফোন টার্ন অফ করে ফেললো। কী বিষয়ে ওরা বসেছে, এখনো সৈকত জানে না। তবে সুমন ওকে বলেছে, খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওকে প্রয়োজন। সৈকতের সাহায্য দরকার। সুমন যখনই ওকে ডাকে সৈকত অনায়াসে চলে আসে। না ডাকলেও আসে। ওকে আসতে হয়। রাজনীতি ওকে নিয়ে আসে। সুমন ধনীর দুলাল, ব্যস্ত ব্যবসায়ী। সৈকত একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ। কলেজ-জীবন থেকেই ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সুমন ব্যবসা ছাড়া কিছুই বোঝে না। দুজনের জীবনযাপন এবং লক্ষ্য ভিন্ন হলেও দুই বন্ধুর মধ্যে প্রগাঢ় একটা হৃদয়িক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। সৈকত মাঝে মাঝে পার্টির জন্য সুমনের কাছে চাঁদা নিতে আসে, সুমন কখনো ওকে ফিরিয়ে দেয় না। আবার সুমন ওকে যখন কোনো কাজের জন্য ডাকে, সৈকতও ছুটে আসে। আজ ওরা সুমনের অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসেছে।
মতিঝিলের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় সুমনের অফিস। লাঞ্চ আওয়ার। সুমন আগেই পিয়নকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিয়েছে। সুমনের অফিসে এলে বেশিরভাগ দিন ‘ঘরোয়া’র ভুনা খিচুড়ি খায় সৈকত। ঘরোয়ার খিচুড়ি ওর ভালো লাগে। সৈকত এ কথা ভাবতেই ক্ষুধা টের পেলো। কিন্তু মুখে কিছু বললো না। অহনা মেয়েটিকে ও চেনে না। মাত্র পরিচয় হয়েছে। তা-ও শুধু ওর নামটা জেনেছে। ও কে, কেনো এসেছে- তা ও জানে না। নিশ্চয় সুমনের কেউ হবেন। ও বুঝতে পারছে, অহনা কোনো সমস্যা নিয়ে সুমনের কাছে এসেছে। সুমন যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে বা সমাধান করে দেয়। ও নিজে কোনো সমস্যার সমাধান করে না বা করার চেষ্টাও করে না। ব্যবসায়ীদের সেই সময় কোথায়? ব্যবসায়ীরা অর্থ খরচ করে সমস্যার সমাধান খুব সহজে করে ফেলতে পারে। সমস্যা বুঝে তারা লোক ঠিক করে। এসব জানে সৈকত। অনেকদিন ধরেই ও এসব দেখে আসছে। অহনার সমস্যাটা যা-ই হোক, ওর সমস্যার সমাধান সৈকতকে করতে হবে, এটুকুু ও বুঝতে পারছে। তাই সমস্যাগ্রস্ত অহনার সামনে নিজের ক্ষুধার কথা বলাটা শোভনীয় নয় বলে ও চেপে গেলো। সৈকত সুমনের দিকে তাকিয়ে তাড়া দেবার ভঙ্গিতে বললো-
‘সুমন, কেনো জরুরি তলব করেছিস, বলতো!’
‘অতো অস্থির হচ্ছিস কেনো? বস। জরুরি কথা আছে।’
বললো সুমন। সুমন অহনার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আমরা কি আলোচনা শুরু করতে পারি?’
অহনা মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো। সুমন এবার সৈকতের দিকে তাকালো। বললো-
‘তোর সেলফোনটা বন্ধ করেছিস?’
‘হ্যাঁ, করেছি।’
‘শোন, তোকে একটা কাজ করে দিতে হবে।’
‘কী কাজ?’
‘অহনাকে তোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম, তাই না?’
‘পরিচয় মানে, বললি তার নাম অহনা। নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ!’
এ কথা বলে সৈকত মুচকি হাসলো। অহনার চোখে লাজুক হাসির দ্যুতি ঝিলিক দিয়ে উঠলো। সুমন হেসে বললো-
‘ওর বিস্তারিত পরিচয় হচ্ছে, ও আমার কাজিন। থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। ওরা ওখানেই সেটেলড। পড়াশোনা করছে আইটি নিয়ে। দুদিন আগে ও ঢাকায় এসেছে। দুসপ্তাহ থাকবে। এই দুসপ্তাহে ও একজন লোককে খুঁজে বের করতে চায়। আমার ধারণা তুই ওকে সাহায্য করতে পারবি।’
সুমনের কথা শুনে সৈকত বললো-
‘একজন লোক খুঁজে বের করা এমন কঠিন কাজ কি? নাম ঠিকানা দে। দুসপ্তাহ লাগবে না। দুদিনেই বের করে ফেলবো।’
এবার অহনা বললো-
‘আমরা ছেলেটির নাম শুধু জানি। পরিচয় বা ঠিকানা জানি না।’
‘মানে!’
অহনার কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে সৈকত। সুমন বললো-
‘এ জন্যই তো তোকে ডেকেছি। যদি নাম-ঠিকানা জানতাম, তবে তোকে ডাকবো কেনো? আমার ড্রাইভারকে পাঠালেই তো ছেলেটিকে ধরে আনা যেতো।’
‘তোর কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি কি ম্যাজাশিয়ান বা গোয়েন্দা যে, একজনের নাম বলবি, আর অমনি আমি লোকটিকে তোদের সামনে এনে হাজির করে দেবো!’
‘আহা! তুই খেপে যাচ্ছিস কেনো? শান্ত হ।’
‘আসল ঘটনাটা কী, খুলে বলতো!’
সৈকতের কথায় সুমন বললো-
‘রাতুল নামে একটি ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতো। হঠাৎ করে ও ঢাকায় চলে এসেছে। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। ওই রাতুলকে খুঁজে বের করতে হবে। রাতুল সম্পর্কে ওর নাম ছাড়া আর কোনো তথ্য জানা নেই অহনার। বিষয়টি বুঝতে পারছিস?’
‘বুঝতে পারছি। রহস্যের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিস।’
অহনা বললো-
‘সত্যিই ভীষণ রহস্যের মধ্যে পড়েছি। এই রহস্য থেকে বের হতে চাই আমরা, আই মিন আমার পরিবার। রাতুলকে খুঁজে বের করতেই হবে। প্লিজ, আমাকে সাহায্য করুন!’
‘কিন্তু পুরো বাংলাদেশে কতগুলো রাতুল থাকতে পারে, জানেন? রাতুল কোন শহরে থাকতে পারে, গেইস করেছেন? বা ওর পরিবার কোথায় থাকে, তা জানেন কি?’
‘সঠিক বলতে পারবো না। তবে আমাদের ধারণা ওরা ঢাকাতে থাকে। আসলে, ওর নামটা ছাড়া আমরা ওর বিশদ কিছু জানি না। এটাই আমাদের সমস্যা।’
সৈকত চট করে অনেক কিছু ভেবে নিলো। অস্ট্রেলিয়াতে প্রতিবছর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনার জন্য যাচ্ছে। বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া গেছে এমন ছাত্রের মধ্যে কজনের নাম রাতুল, তা বের করতে পারলেই ঘুরপাকের বৃত্তটা কমে আসবে। অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশনের পিআরও সৈকত রুশদীর সঙ্গে ওর পরিচয় আছে। তার সহযোগিতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়নরত ছাত্রদের একটি তালিকা বের করা যেতে পারে। ওই তালিকা থেকে রাতুল নামের সব ছাত্রের পরিচয় ও ঠিকানা বের করলে নির্দিষ্ট রাতুলকে খুঁজে বের করা সম্ভব। সৈকতের চিন্তামগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে সুমন বললো-
‘কী ভাবছিস?’
‘ভাবছি, হয়তো রাতুলকে খুঁজে বের করা যাবে।’
‘সত্যি! সত্যি, বলছেন!’
অহনা বিস্ময়। সৈকত অহনার বিস্ময়কে উপেক্ষা করে সুমনের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘এতে আমার কী লাভ হবে, বন্ধু?’
সুমন হেসে বললো-
‘গুড, তুই লাভের কথা তুলেছিস। তোকে এর জন্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে। মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক!’
‘তাই না-কি! কত!’
সৈকতের প্রশ্নে অহনা বললো-
‘এক লাখ টাকা দেবো।’
‘এক লাখ মাত্র!’
সৈকত রসিকতা করে কথাটি বললো। অহনা বললো-
‘না, না, দুই লাখ দেবো।’
‘দুই লাখ?’
‘ঠিক আছে তিন লাখ, চলবে?’
অহনার প্রশ্নে মৃদু হাসলো সৈকত। সুমনও মিটিমিটি হাসছে। অহনা বিব্রত হলো। ও সৈকতের দিকে তাকিয়ে ফের বললো-
‘আপনার জন্য অঙ্কটা কি কম হয়ে গেছে? কাজটা করুন, প্রয়োজনে আরো টাকা দিতে প্রস্তুত। পাঁচ লাখ হলে চলবে?’
‘চলবে।’
বলে হাসলো সৈকত। এই কাজের জন্য পাঁচ লাখ টাকা আয় কম কথা নয়। এমন কাজ ও কখনো পায়নি। ওর খুব মজা লাগছে। ও বুঝতে পারছে না, রাতুলকে খুঁজে বের করতে এতো টাকা খরচ করতে চাচ্ছে কেনো অহনা। ও এ নিয়ে প্রশ্ন করলো না। সুমন সৈকতের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘তাহলে তুই কাজটা নিলি?’
‘হ্যাঁ, নিলাম। পাঁচ লাখ টাকা তো কম নয়! যদিও কাজটি করতে পারবো কি-না, জানি না।’
‘তুই চেষ্টা করলে পারবি।’
‘আমার প্রতি এতোটা ভরসা করা ঠিক নয়। যাক গে, কাজটা কিভাবে করবো এবং এর ফলোআপ কিছু থাকলে কাকে জানাবো?’
জানতে চাইলো সৈকত। জবাবে সুমন বললো-
‘এ মুহূর্ত থেকে তোর সঙ্গে অহনা প্রতিদিন যোগাযোগ করবে। তোরা ফোনে কথা বলতে পারিস। আবার দুজনে দেখাও করতে পারিস।’
‘মন্দ নয়!’
বলে হাসলো সৈকত। সুমন বললো-
‘অহনা ঢাকায় জন্ম নিলেও কিশোর বয়স থেকে ও অস্ট্রেলিয়ায়। তোর সঙ্গে ও ঘুরে বেড়ালে ওর ঢাকা শহরটাও দেখা হয়ে যাবে। তুই যেখানে যেখানে যাবি, অহনাকে সঙ্গে নিতে পারিস। বুঝলি? আমি চাচ্ছি, ও ঢাকা শহরটা ভালো করে দেখে যাক।’
‘সে দেখা যাবে।’
মাথা নাড়লো সৈকত। অহনা বললো-
‘আমি আপনার সঙ্গে ঘুরলে আপনার আপত্তি আছে? আই মিন, আপনার কাজের কোনো সমস্যা হবে?’
অহনার কথায় সৈকত কৌতূহলী চোখে তাকালো ওর দিকে। অহনার মতো ডানাকাটা পরীকে নিয়ে কে না ঘুরে বেড়াতে চাইবে? অহনার আয়ত চোখে চোখ রাখলে কেমন মদিরতায় বুঁদ হয়ে যেতে হয়। ওর হাসি এখন পর্যন্ত সৈকত দেখেনি, তবে ও হাসলে ধবল জ্যোৎস্নার লাবণ্য ঝিলিক দিয়ে উঠবে- এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। ওর শরীর থেকে অদ্ভুত মিষ্টি একটা সুবাস চুইয়ে চুইয়ে বের হয়ে আসছে, এটা ব্র্যান্ডেট কোনো পারফিউমের সৌরভ নয়। কোনো কোনো মেয়েদের শরীর থেকে মিষ্টি গন্ধের ঐশ্বরিক সুবাস বের হয়ে আসে। অহনার শরীর থেকেও এ ধরনের সুবাস পাচ্ছে সৈকত। ওর সঙ্গে ঘুরলে এই সুবাসের নির্যাস পাওয়া যাবে। মাত্র কয়েক মুহূর্তে অহনাকে নিয়ে ভাবনায় তলিয়ে যাচ্ছিল সৈকত। সুমনের কথায় সম্বিত ফিরে পায় ও।
‘কী রে, অমন হা হয়ে গেলি যে! কিছু বলছিস না কেনো?’
নিজেকে সামলে নিয়ে একটু লজ্জিত গলায় সৈকত বললো-
‘না, আমি ভাবছিলাম, অহনা আমার সঙ্গে ঘুরলে তার আবার অসুবিধা হয় কি-না! সিডনির পরিবেশ এক, আর ঢাকার পরিবেশ আরেক। তাই না?’
অহনা হেসে বললো-
‘আমি এ দেশেরই মেয়ে। আমার কোনো অসুবিধা হবে না।’
সৈকত অহনার দিকে চেয়ে বললো-
‘ঠিক আছে, আপনি আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারেন। তবে সব সময় নয়। আমার যখন সময় হবে, আমি আপনাকে নিয়ে ঘুরবো, কেমন?’
তবে ও মনে মনে বললো- ‘তুমি সারাক্ষণ আমার পাশে থাকলে ভালোই লাগবে।’
অহনা সৈকতের দিকে চেয়ে বললো-
‘নো-প্রবলেম।’
এ সময় সুমন বললো-
‘তাহলে কথা ফাইনাল। তোর কাজ দুটি। রাতুল নামের ছেলেটিকে খুঁজে বের করা এবং অহনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। আগামী দুসপ্তাহের জন্য তুই বুকড। বুঝলি?’
সৈকত অহনার চোখে চোখ রেখে বললো-
‘আপনি আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াবেন, বিষয়টি ভাবতে ভালো লাগছে না আমার।’
অহনা খানিকটা হচকিয়ে গেলো। ও বললো-
‘কেনো? আমি কী সঙ্গী হিসেবে খুব খারাপ হবো বলে ভাবছেন আপনি?’
এর জবাবে সৈকত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। সুমন ওকে কিছু বলতে না দিয়ে বললো-
‘তোর ভালো না লাগলেও অহনাকে নিয়ে তোকে ঘুরতে হবে। আমার কাজিন তোর পাশে থাকলে তোর মান বাড়বে বৈ কমবে না, বুঝলি!’
এ কথায় না হেসে পারলো না সৈকত। অহনা একটু লজ্জা পেলো। ও বললো-
‘আপনি কাজটির কথাই ভাবুন। আমি আপনাকে খুব একটা বিরক্ত করবো না।’
‘না, না, বিরক্ত হবো কেনো? আসলে আমি ছন্নছাড়া মানুষ। কখন কোথায় থাকি, নিজেই জানি না। তাই…!’
‘তোকে এতো কৈফিয়ত দিতে হবে না। তোকে যা বলেছি, তাই করবি। বন্ধু হিসেবে এটা বিশেষ অনুরোধ।’
সৈকত কোনো কথা বললো না। এরপর আর কিছু বলা যায় না। তা ছাড়া সুমন ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অনুরোধ না রাখার মতো ওদের বন্ধুত্ব নয়। সৈকত মনে মনে বললো- ‘কেয়া, কয়েকদিন তোমার সঙ্গে দেখা হয়তো হবে না। একটা পরীর সঙ্গে আমি ঢাকা শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়াবো। কী দারুণ মজা!’
দুই.
পুরনো ঢাকায় সহজে কেউ আসতে চায় না। সরু রাস্তা এবং দীর্ঘ যানজট পুরনো ঢাকার বিড়ম্বনা। এই বিড়ম্বনায় কেউ পড়তে চায় না। তবে যারা পুরনো ঢাকায় বসবাস এবং ব্যবসা করছেন তাদের কাছে এখানকার যানজটের বিড়ম্বনা সহে গেছে। তারা সরু অলিগলিতে যানবাহনে দিব্যি আসা-যাওয়া করছেন। সৈকত ভেবেছিল অহনা পুরনো ঢাকার যানজটের বিড়ম্বনায় বিরক্ত হবে। কিন্তু দেখা গেলো অহনা মোটেই বিরক্ত হলো না। বরং কেমন কৌতূহলী হয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। ওরা রিকশায় চড়ে লালবাগের দিকে যাচ্ছে। অহনার পাশে বসে সৈকতের মনের মধ্যে একটা মিহিন তোলপাড় চলছে। অহনাকে সুমনের অফিসে প্রথম যখন দেখেছিল ও, তখন ও পড়েছিল জিন্স প্যান্ট এবং টি-শার্ট। আজ অহনা পরেছে সালোয়ার-কামিজ। সালোয়ার কামিজের ওপর মেরুণ রঙের উলের স্যুয়েটার পরেছে। অক্টোবর মাস। শীতের মধ্য দুপুর। বাতাসে হালকা শৈত্যপ্রবাহ থাকলেও সূর্য ছড়াচ্ছে প্রখর কিরণ। আজকের দুপুরকে ‘রোমান্টিক দুপুর’ বলে দেয়া যায়। মনে মনে এ কথা ভাবলো সৈকত। যদিও অহনার সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। তবু ওর মনে হচ্ছে, এই শীতার্ত আলোকিত দুপুর ওদের মধ্যে অদৃশ্য কোনো সম্পর্ক তৈরি করে দিতে পারে। রিমঝিম বৃষ্টির দুপুর ছাড়াও হিমশীতের রোদ্রোজ্জ্বল দুপুরও কাব্যিক হতে পারে। অকারণ আবেগের এক পশলা উচ্ছ্বলতায় সৈকত ওর পাশে বসে থাকা অহনার দিকে তাকালো। অহনা আজ ঠোঁটে লিপিস্টিকের প্রলেপ ও কপালে দিয়েছে টিপ। ওর মনে হলো, অহনার মধ্যে অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে আছে। প্রথম দেখার দিন জিন্স-প্যান্ট পরে থাকা অহনাকে ডানাকাটা পরী মনে হয়েছিল সৈকতের। এখন ওকে মনে হচ্ছে অপ্সরী। ওর আয়ত চোখ, টিকালো নাক-মুখের মায়াবী হাসি, রিনরিনে মিষ্টি কণ্ঠ এবং উচ্চতা ও আকর্ষণীয় ফিগার যে কোনো বিচারে ওকে পৃথিবীর ‘শ্রেষ্ঠ সুন্দরী’ বলা যায়। তবে ওর চুল দীঘল না হয়ে কেনো যে ববকাট ছাট, এজন্য সৈকতের খানিকতা অস্বস্তি রয়েছে। যদিও ওকে ববকাট চুলে খারাপ লাগছে না। অহনা যখন রিকশায় ওর পাশে বসেছিল অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধ ওকে মাতাল করে তোলে। কেয়ার পাশে বসলেও সৈকত মিষ্টি একটা গন্ধ টের পায়। সব সুন্দরী মেয়েদের শরীর থেকে এমন মিষ্টি সুবাস বের হয়ে আসে। এক ধরনের আবিষ্টতায় ও ডুবে যাচ্ছিল। অহনার প্রশ্নে আবিষ্টতা ভাঙে।
‘শুনেছি লালবাগে একটি কেল্লা রয়েছে। এটি না-কি হিস্ট্রিক্যাল প্লেজ?’
‘ঠিকই শুনেছেন। এর নাম লালবাগ কেল্লা।’
বললো সৈকত। অহনা সৈকতের দিকে মুখ ঘুরিয়ে কৌতূহলী গলায় বললো-
‘এই কেল্লায় কী হতো?’
এর জবাবে সৈকত বলতে যাচ্ছিল যে, ‘এই কেল্লা ঈশা খাঁ তৈরি করেছিল যুদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত দুর্গ হিসেবে। এটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে।’
সৈকত এ কথা না বলে রসিকতা করে বললো-
‘এখানে ঈশা খাঁ নামক এক রাজা প্রেম করতেন। এটি ঈশা খাঁ-র প্রেমকুঞ্জ। এই কেল্লায় তার প্রেমিকা থাকতেন। ঈশা খাঁ-র প্রেমিকা ছিল তৎকালীন সময়ের ডাকসাইটে বাইজি। এই কেল্লায় জলসা বসতো। একদিন জমকালো এক জলসায় প্রেমিকার দেয়া মদের গ্লাসে বিষ পান করে ঈশা খাঁ মারা যান!’
সৈকতের কথায় রিনরিনিয়ে হেসে উঠলো অহনা। সৈকত ওর দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো। অহনার হাসি ধবল জ্যোৎস্নার মতোই লাবণ্যময়! সৈকত তন্ময় হয়ে যাচ্ছিল। অহনা হাসি থামিয়ে বললো-
‘হিস্ট্রিতে আপনার নলেজ ভীষণ পুওর!’
‘তাই না-কি? হবে হয়তো।’
নিজের অসহায়ত্ত প্রকাশ করলো ও।
অহনা হাসির রেশ নিয়ে সৈকতের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আমাকে কেল্লায় নিয়ে যাবেন?’
কথাটি এমন বিনয় মিশ্রিত অনুরোধে বললো, যেনো ওকে স্বর্গলোকে নিয়ে যাবার বিশেষ অনুরোধ করছে। সৈকতের ভালো লাগলো। ও অহনার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো- ‘আপনি যেখানে যেখানে যেতে চান, আমি সেখানে নিয়ে যাবো।’
‘সত্যি!’
‘সত্যি।’
‘তবে সবার আগে রাতুলকে খুঁজে বের করতে হবে। ওকে খুঁজে বের করতে পারবেন না?’
‘চেষ্টা করে দেখি। আশা করি পারবো। একটা প্রশ্ন করবো?’
‘করুন।’
‘কিছু মনে করবেন না তো?’
‘না, কিছু মনে করবো না। আমি বুঝতে পারছি, আপনি কী প্রশ্ন করবেন। আপনি জানতে চাচ্ছেন রাতুল কে এবং কেনো তাকে খুঁজছি, তাই না?’
‘হুম। এই কৌতূহল প্রথমে ছিল না। এখন জানতে ইচ্ছে করছে রাতুল কে এবং কেনো তাকে খুঁজছেন।’
অহনা সৈকতের দিকে তাকিয়ে আবারো মিষ্টি করে হাসলো। ওর এই হাসিতে সৈকত নিজের ভেতরে একটা ভাঙন টের পেলো। মিহিন তোলপাড় এবং ভাঙন কেনো হচ্ছে, কে জানে! অহনা ধাঁ ধাঁ দেয়ার মতো করে বললো-
‘আপনি গেইস করুন তো। আই মিন, বলুন তো রাতুলকে কেনো খুঁজছি?’
সৈকত এবার একটু চিন্তায় পড়ে গেলো। রাতুলকে অহনা চেনে না। ওকে কখনো দেখেনি। নাম-পরিচয়ও জানে না। যদি রাতুলকে চিনতো বা জানতো, তবে ধরে নেয়া যেতো ওদের মধ্যে বিশেষ কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। রাতুল কোন কারণে দেশে ফিরে এসেছে এবং অস্ট্রেলিয়ায় আর ফিরে যায়নি। তাই অহনা ওর সন্ধানে বাংলাদেশে এসেছে। এ রকম কিছু নয়। তবে? রাতুলকে খুঁজে বের করার সঠিক কারণ কী হতে পারে, তা নির্ণয় করা যায় না। তবু ধারণা করে সৈকত বললো-
‘এই ছেলেটি হয় কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চলে এসেছে বা আপনার অথবা আপনাদের কোনো বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। কিংবা তাকে আপনাদের ভীষণ প্রয়োজন। এ জন্য আপনি বা আপনারা ওকে খুঁজছেন।’
সৈকতের জবাবে ভীষণ খুশি হলো অহনা। ও বললো-
‘আপনার আইকিউ ভীষণ ভালো। আপনাকে দিয়ে হবে।’
‘কী হবে?’
‘রাতুলকে খুঁজে বের করার কাজটি হবে।’
‘ধন্যবাদ। তাহলে আমার ধারণা ঠিক আছে?’
‘অনেকটা কাছাকাছি আছেন।’
‘আমাকে কি নেপথ্য কারণটা বলবেন?’
এর জবাবে কিছু বললো না অহনা। ও চুপ হয়ে গেলো। ওর হঠাৎ চুপসে যাওয়ায় সৈকত একটু বিব্রত হলো। ও বললো-
‘ঠিক আছে, বলতে হবে না। খুব গোপনীয় কিছু হলে না বলাই ভালো। আমাকে গোপনীয় কিছু বলতে পারেন, এমন সম্পর্ক আমাদের নয়। আই অ্যাম সরি।’
অহনা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো-
‘এখন কেনো জানি মনে হচ্ছে, আপনার কাছে ঘটনাটা খুলে বলা দরকার। আমাদের কষ্টের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। হয়তো এতে আমাদের লাভ হবে।’
অহনার কথাগুলো সৈকতের মনে রেখাপাত করে গেলো। ও কিছু বললো না। অহনা ফের বললো-
‘আপনি কী শুনতে চান আমাদের কষ্টের কথা?’
অহনার কণ্ঠে বিষণ্নতার মেঘ। এই বিষণ্নতা ছুঁয়ে গেলো সৈকতের হৃদয়। ও বললো-
‘ভাড়াটে অনুসন্ধানকারীর কাছে কষ্টের কথা বলবেন? আপনার কষ্টের কথা শুনতে হলে আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হওয়া দরকার।’
এ কথায় কেমন চোখে সৈকতের দিকে তাকালো অহনা। সৈকতের ভেতরে আরো একবার ভাঙন হলো। ও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
‘যদি বন্ধু ভাবতে পারেন, তাহলে কষ্টের কথাটি বলুন। নইলে নয়।’
এ কথা বলে সৈকত যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ও আলোচনাকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গেছে। এখন অহনার পালা। অহনার জবাব আশা করছে ও। ওর মনে হচ্ছিল অহনা এর কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকবে এবং বাকিটা পথ এক ধরনের গুমোট অস্বস্তিতে ছটফট করতে হবে ওকে। কিন্তু অহনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
‘আপনাকে বন্ধু ভাবতে চাই না। বন্ধু বলেই জানতে চাই। আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম, কেমন?’
অহনার এ কথায় সৈকতের মন থেকে অস্বস্তির মেঘ মিলিয়ে গেলো। ওর ভেতরের তোলপাড়টাও থেমে গেলো। অন্য ধরনের অনুভূতি টের পেলো ও। সৈকত অহনার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো-
‘আপনার বন্ধু হতে পেরে আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি!’
সৈকতের এ কথায় ভীষণ লজ্জা পেলো অহনা। ও বললো-
‘আমাকে এতো বেশি মর্যাদা দিয়ে লজ্জিত করবেন না, প্লিজ! বিশেষ করে আজকের পর থেকে।’
এর জবাবে হাসলো সৈকত। ও বললো-
‘কথাটি মনে থাকবে। এবার বলুন তো রাতুল কে?’
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে অহনা বললো-
‘আমার ছোট এক বোন আছে। ওর নাম রায়না। রায়না আমার দেড় বছরের ছোট। আমরা দুই বোন বড় হয়েছি বন্ধুর মতো। স্বভাবের দিক থেকে রায়না একটু চটপটে। উচ্ছ্বল। ও ভীষণ প্রাণবন্ত একটি মেয়ে। রায়নার সঙ্গে রাতুলের পরিচয় হয় ইন্টারনেটে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে। পরিচয় থেকে প্রেম। প্রেম থেকে প্রণয়। আমরা এর কিছুই জানতে বা বুঝতে পারিনি। যখন জানতে পারলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
এ পর্যন্ত বলে অহনা থামলো। কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল সৈকত। ও প্রশ্ন করলো-
‘অনেক দেরি হয়ে গেছে মানে? রায়নার কিছু হয়েছে?’
‘রাতুল হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়া থেকে চলে এসেছে বাংলাদেশে। রায়নার সঙ্গে রাতুল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে রায়না।’
‘ও, আচ্ছা!’
‘এখানেই শেষ নেই। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা হচ্ছে, রায়না প্রেগন্যান্ট!’
এ কথা চমকে গেলো সৈকত। অহনাদের সংকট কতোটা গভীরে বুঝতে পারলো এ কথায়। ও কোনো কথা বলতে পারলো না। এ ধরনের কথার জবাবে কী বলা যায়- সৈকত বুঝতে পারছে না। ওর মনে হলো, রাতুলকে খুঁজে বের করতেই হবে। রাতুলকে পৌঁছে দিতে হবে রায়নার কাছে। যেভাবেই হোক, কাজটি ওকে করতে হবে। সৈকতের মনে একটা জেদ পেখম ছড়াতে থাকে। অহনা নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
‘আমি চাচ্ছি, রাতুলকে রায়নার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো। রায়না ভীষণ ভেঙে পড়েছে। ও আমার ঠিক উল্টো। অনেক সফট ওর মন। ভীষণ আবেগপ্রবণ ও। রাতুলকে না পেলে ও হয়তো কিছু একটা করে ফেলবে।’
‘রাতুলকে খুঁজতে আপনি কেনো বাংলাদেশে এলেন? আপনার বাবাও তো আসতে পারতেন।’
বললো সৈকত। অহনা অন্যদিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘বাবা অসুস্থ। তার তিনটি স্ট্রোক হয়ে গেছে। আমরা চাই না তিনি কোনো দুঃসংবাদ শুনুক।’
‘আমি বুঝতে পেরেছি। আমি দুঃখিত।’
‘না, না। আপনার দুঃখিত হবার কিছু নেই। আমাকে শুধু রাতুলকে খুঁজে বের করে দিন।’
‘আচ্ছা, রাতুল যদি এখন রায়নাকে অস্বীকার করে? অর্থাৎ রায়নার সন্তানের দায়িত্ব নিতে না চায়?’
প্রশ্নটি করেই সৈকতের মনে হলো এ ধরনের প্রশ্ন করা ওর ঠিক হয়নি। অহনার মনের এই অবস্থায় এ প্রশ্ন ভীষণ বিব্রতকর। প্রশ্নটি করে ও অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। অহনা একটু চুপ থেকে বললো-
‘এ রকম যেনো না হয়। আর যদি হয়, তবে চেষ্টা করবো রায়নাকে অ্যাব্রোশন করাতে। ওসব কথা ভাবতে চাই না সৈকত!’
অহনার মুখ থেকে এই প্রথম সৈকত ওর নিজের নাম শুনলো। ওর ভেতরে ভাঙচুর শুরু হলো। একরাশ বিষণ্নতা এবং একতাল আনন্দ ঢেউ তুলে আছড়ে পড়ছে ওর সমস্ত চেতনায়। রিকশা চলছে একটু দুলে দুলে। অহনার শরীরটাও দুলছে। ওর শরীরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তন্ময়তায় সৈকতের মনে হচ্ছিল অহনার হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে বলতে, ‘আমার নামটি আরেকবার বলো তো!’
সব কথা সব সময় বলা যায় না। তবে কল্পনার কোনো সীমারেখা নেই। কল্পনায় কোনো বাধা নেই, বিধি নেই। সৈকত ডুবে গেলো কল্পনার গভীর অতলে।
তিন.
সৈকতের মধ্যে এক ধরনের সরলতা আছে। এই সরলতার কারণে কখনো কখনো সৈকতকে বোকা মনে হয়; কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে ওর এই সরলতার এক নান্দনিক মাত্রা বের হয়ে আসে। ওর চরিত্রকে যদি আকাশ ধরা হয়, তবে ওর সরলতা হচ্ছে আকাশের ধ্রুবতারা। সৈকতের আরো অনেক গুণ আছে। যেমন সৈকত চমৎকার পেন্সিল স্কেচ করতে পারে। গলা ছেড়ে গান গাইতে পারে। ও কখনো গান না শিখলেও গলাটা ওর মন্দ নয়। ওর মধ্যে নির্লোভ এক সত্ত্বাও রয়েছে। ওর এই গুণগুলো কেয়া আগে জানতে পারেনি। এখন সৈকতের এই গুণগুলো জানতে পারছে। অথচ সৈকতকে বোকা ও ভবঘুরে ভেবে কেয়া ওকে বিয়ে করেনি। ও বিয়ে করেছে শ্যামলকে। অনেক হিসাব করেই কেয়া বিয়ে করেছে বিত্তবান ব্যবসায়ী শ্যামলকে। কিন্তু সব সময় সব কিছু হিসাবমতো হয় না। কখনো কখনো হিসাবের খাতায় গণেশ উল্টে যায়। বুমেরাংও হয়ে যায়। কেয়ারও হয়েছে তাই। শ্যামলকে বিয়ে করে বিত্তহীন স্বামী পেয়েছে ঠিক; কিন্তু সুখের সংসার গড়তে পারেনি। অথচ সৈকতকে বিয়ে করলে বিত্ত হয়তো পেতো না, চিত্তের বিলাসিতায় মুখর হতে পারতো। ওকে বিয়ে না করার জন্য এখন আফসোস হয় ওর। জীবনের বড় ভুলটাকে শুধরে নিতে ইচ্ছে করে। আর এই ইচ্ছেটা দিন দিন বাড়ছে। শ্যামলকে ছেড়ে সৈকতকে আকড়ে ধরবে কি-না- মাঝে মাঝে ভাবে ও। কিন্তু শ্যামলের ঐশ্বর্যকে উপেক্ষা করার সাহস ও পায় না। অথচ শ্যামল স্বামী হিসেবে ওর জীবনে ছায়ামাত্র, নির্ভাবনার বিশ্বস্ত অবলম্বন নয়। কেয়ার প্রতি শ্যামলের উপেক্ষা যেমন স্পষ্ট, তেমনি বিত্তশালীর সহজাত অহংকারও শ্যামলের আচার-আচরণে প্রকাশও বরাবরই স্পষ্ট। এ ছাড়া শ্যামলের অন্য নারীতে আসক্তির বিষয়টিও গোপন নয়। বিত্তশালীরা নারীতে আসক্তি, মদ পান ও জুয়া খেলাকে সামাজিক কাজের মতোই স্বাভাবিক মনে করেন এবং তারা এ ব্যাপারে আশ্চার্যজনকভাবে নিঃসংকোচিত। ঐশ্বর্য বা প্রাচুর্যের পরিধিতে বিত্তবানদের স্ত্রীরা ‘সব মেনে নেয়া’র বৃত্তে ঘুরপাক খান এবং তাদের কোনোরকম হা-পিত্তেস করতে দেখা যায় না। ওই সব বিত্তশালীদের স্ত্রীদের সঙ্গে কেয়ারও খুব একটা অমিল নেই। এ নিয়ে কেয়ার কোনো আফসোস বা আক্ষেপও নেই। কিন্তু কেয়ার সামনে সৈকতের নির্জলা প্রেমের দ্বিতীয় দফা সমর্পণ ওকে ভাবনায় ফেলে দেয়। ওর হিসাবের খাতায় জমাট বাঁধিয়ে দেয় আক্ষেপের মেঘ। বিয়ের চার বছর পর সৈকতের সঙ্গে ওর পুনরায় দেখা হবার পর থেকে কেয়া নিজের মধ্যে বৈভবের আড়ালে ‘সুখী না হবার’ গভীর বেদনার নম্রলাজ অন্য এক কেয়াকে আবিষ্কার করে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে সুখী না হবার অনুভূতিটা ওর মনের অন্তপুরে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। আগে সৈকতের সঙ্গে দেখা হলেই এই অনুভূতিটা চাঙা হতো। এখন সৈকতের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললেও এই অনুভূতি জেগে ওঠে। জীবনটা কেনো যে এমন হয়, তা ও জানে না! গুলশানে বুখারা রেস্টুরেন্টে কেয়া বসে এসব কথা ভাবছিল। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ও এখানে বসে আছে। সৈকতর সঙ্গে ও লাঞ্চ করবে। ও মাঝে মাঝে সৈকতকে লাঞ্চের আমন্ত্রণ জানায়। সৈকতকে ও লাঞ্চের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কেয়া বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে পছন্দ করে। কোন রেস্টুরেন্টের খাবার কেমন স্বাদ পরখ করে নিতেও চায় ও। বুখারা রেস্টুরেন্টে এক ঘণ্টা ধরে একটি টেবিলে ও বসে আছে বিষয়টি বিব্রতকর। এরই মধ্যে ও খাবারের মেন্যু দেখে বেয়ারাকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিয়ে রেখেছে। বেয়ারার হাতে অগ্রিম একশ টাকা টিপস দিয়ে বলেছে-
‘আমার বন্ধু এলে খাবার সার্ভ করবেন, প্লিজ।’
বেয়ারা ভীষণ খুশি হয়ে যায়। টাকার একটা শক্তি আছে। টাকা দিয়ে যে কোনো পরিবেশ নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা যায়। ‘ম্যাডাম, আপনি অপেক্ষা করুন। আপনার বন্ধু এলে আমি খাবার সার্ভ করবো’ বলে বেয়ারা চলে যায়। কেয়া স্বস্তি ফিরে পায়। তারপরও এক ঘণ্টা অপেক্ষা অনেক সময়। ও কখনো কারো জন্য এতো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেনি। এ কথাটি ভাবতেই ওর নিজের অহংকারে মৃদু ধাক্কা লাগলো। সৈকত কি ওকে উপেক্ষা করছে? সুন্দরী নারীরা উপেক্ষা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। সৈকত ওকে উপেক্ষা করছে কি-না, এ কথা মনে হতেই ও দেখলো সৈকত এগিয়ে আসছে ওর টেবিলের দিকে। কেয়ার মনে অভিমান এবং রাগ সংমিশ্রিত হয়ে একরকম তেতো অনুভূতি সক্রিয় হয়ে উঠলো। সৈকত অপরাধীর মতো ওর সামনে এসে লজ্জিত গলায় বললো-
‘আই এম সরি ফর টু লেট! আমি জানি, তুমি অনেকক্ষণ ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছো। আমি এক্সট্রেমলি সরি!’
এ কথা বলে ও বসলো কেয়ার মুখোমুখি। কেয়ার রাগ বাড়ছে। ও সৈকতের কথার জবাবে কিছু বললো না। এ সময় বেয়ারা এসে কেয়াকে জিজ্ঞেস করলো-
‘ম্যাডাম, খাবার সার্ভ করবো?’
কেয়া কিছু বলার আগে সৈকত বেয়ারাকে বললো-
‘একটু পর সার্ভ করুন, প্লিজ।’
বেয়ারা হেসে চলে গেলো। সৈকত কাচুমাচ হয়ে ফের বললো-
‘বিশ্বাস করো, একটা জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলাম। তার ওপর রাস্তায় যানজট। আমারও অনেক অস্বস্তি হচ্ছিল। তোমাকে আমি অনেকবার ফোন করলাম, তুমি ফোন ধরোনি।’
কেয়া ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-
‘দেরি হয়ে যাওয়ার জন্য মিথ্যা কথা বলতে, জানি। মিথ্যবাদীদের ফোন আমি কেনো ধরবো?’
‘আমি মিথ্যাবাদী!’
‘নয় তো কী?’
‘কেনো মিথ্যাবাদী বলছো?’
‘তুমি মিথ্যাবাদী, তাই মিথ্যাবাদী বলছি!’
‘কিন্তু আমি মিথ্যা কথা বলছি না, বিশ্বাস করো।’
‘রাজনীতিবিদদের কেউ বিশ্বাস করে না!’
‘তাই না-কি, কেনো?’
‘কারণ, তারা সব সময় মিথ্য কথা বলে। তারা মঞ্চে অকপটে মিথ্যা বলে হাজার হাজার মানুষের সামনে। তারা মানুষকে বোকা ভাবে। তারা কথার জাল বুনে নির্জলা মিথ্যার প্রতিশ্রুতি দেয়। অনেক রকম মিথ্যাই তারা আবেগ মিশ্রণ করে জনতার সামনে ছেড়ে দেয়। এসব তো তুমি নিশ্চয়ই জানো, তাই না?’
‘আর?’
‘আর হচ্ছে, রাজনীতিবিদদের এই মিথ্যা বলাটা পেশায় পরিণত হয়ে গেছে।’
‘তাহলে রাজনীতিবিদদের মানুষ ভালোবাসে কেনো? কেনোই বা তাদের প্রতি সমর্থন জানায়, ভোট দেয়?’
‘সাধারণ মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে ওই কাজ করে। কিংবা এর বিকল্প কিছু নেই বলেও মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের সমর্থন জানায়। তাই বলে রাজনীতিবিদদের এ নিয়ে আত্মতৃপ্তিরও কিছু নেই। একসময় সাধারণ মানুষের মোহ কিন্তু ভেঙে যায়!’
‘তুমি দেখছি, রাজনীতিবিদদের ওপর ভীষণ খেপে আছো! সেটি কি আমার জন্য?’
এর জবাবে কিছু বললো না কেয়া। মৌনতার মধ্য দিয়ে এর ‘হ্যাঁ’ বোধক জবাব প্রকাশ করলো ও। সৈকত পরিবেশকে সহজ করার জন্য হাসিমুখে বললো-
‘আমি কিন্তু ছেলেবেলায় খুব মিথ্যা কথা বলতাম।’
‘সেই বদ অভ্যাস তো এখনো যায়নি।’
‘পুরোপুরি যায়নি, ঠিক। তাই বলে সব সময় ঢালাওভাবে মিথ্যা আমি বলি না।’
‘কখন, কোন কোন সময় মিথ্যা বলো? কখন ঢালাওভাবে মিথ্যা বলো? আবার কখন সামান্য এবং হালকা-পাতলা মিথ্যা বলো, শুনি?’
‘আজকাল আমি খুব একটা মিথ্যা কথা বলি না বা বলতে হয় না।’
‘আহা! কী সাধু পুরুষ আমার!’
কপালে ভ্রু নাচিয়ে ফোড়ন কাটলো কেয়া। সৈকত ওর মিষ্টি অনুযোগকে উপভোগ করে বললো-
‘আমি সাধু পুরুষ বটে, তবে তোমার হলাম কবে?’
এ কথায় কেয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো। অভিমানের জমাট মেঘ মিলিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে হাঁফ ছাড়লো সৈকত। ওর হাসির দমকায় সৈকত সপ্রতিভ হতে লাগলো। কেয়া হাসি থামিয়ে বললো-
‘তুমি যে আমার নও, তা জানি। কিন্তু মানতে পারি না। মনে হয়, তুমি শুধু আমার।’
‘অথচ তুমি এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শ্যামলের।’
বললো সৈকত। কথাটি বলার সময় এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস ছাপিয়ে উঠেছিল, তা সামলে নিলো ও। কেয়া ভাবাবেগের মধ্যে বললো-
‘আসলে কী জানো, শ্যামল যেমনি আমার, তুমিও একরকম আমারই। শ্যামল আমার হাজব্যান্ড, মানে আশ্রয়। আর তুমি হচ্ছো আমার প্রেমিক, মানে স্বপ্নের অবলম্বন!’
এ কথায় না হেসে পারলো না সৈকত। কেয়া সৈকতের হাসিকে উপেক্ষা করে বললো-
‘আচ্ছা অনেক পুরুষ মানুষের যদি একের অধিক স্ত্রী থাকতে পারে, নারীদের কেনো একাধিক স্বামী থাকতে পারে না?’
কেয়ার এ প্রশ্নে সৈকত নিশ্চিত হলো, ওর মধ্যে রাগটা উবে গিয়ে এক ধরনের দার্শনিক ভাব জমে যাচ্ছে। সৈকত এই ভাবকে চাঙা করতে সিরিয়াস কণ্ঠে বললো-
‘প্রকৃতগতভাবে নারী ভোগবাদীর চেয়ে সমপর্ণকামী। নারী সমর্পণের মধ্য দিয়ে জয়ের আনন্দ পায়। বিগলিত হয়। নারী ভালোবাসা পাবার চেয়ে ভালোবেসে জীবনের মহিমা খোঁজে। এখানেই নারীর মহত্ব।’
‘আর পুরুষ?’
‘সাধারণত পুরুষ ভোগবাদী এবং দখলকামী। কখনো কখনো কপটও। ভোগ এবং দখলের মধ্য দিয়ে পুরুষ যেমন আনন্দ পায়, তেমনি অর্জন করে এক ধরনের অহংকারও। পুরুষ জীবনের মহিমার চেয়ে প্রাপ্তির অহংকারটাই বড় করে দেখে। তাই পুরুষের মধ্যে স্যাক্রিফাইস মানসিকতার প্রবণতা কম। পুরুষ সাম্রাজ্য ও সম্রাজ্ঞি দুটোর পাশাপাশি আরো অনেক কিছু চায়। কিন্তু নারীর চাহিদা নির্দিষ্ট গন্তব্যে এলে তারা আত্মতৃপ্তির বৃত্তে বাধা পড়ে যায়। কিংবা চাহিদা পূরণ না হলেও নারী আগ্রাসী হতে পারে না; কিন্তু পুরুষ বরাবরই আগ্রাসী!’
‘চমৎকার!’
‘কী?’
‘তোমার বিশ্লেষণ! বিভিন্ন জনসভায় কি এসব কথা বলো?’
কেয়ার কথায় মুচকি হাসলো সৈকত। বললো-
‘এসব কথা মঞ্চে বললে পুরুষরা আমাকে আর আস্ত রাখবে না। মেয়েরাও পুরুষের বিরুদ্ধে খুব বাজে কথা শুনতে পছন্দ করে না, জানো?’
‘তাই না-কি!’
‘হ্যাঁ। অন্তত আমার তা-ই মনে হয়।’
‘কেনো, নারীরা খুশি হবে না কেনো?’
‘ওই যে বললাম না, নারীরা সমপর্ণকামী। তা নারীরা কার কাছে সমর্পিত হয়, পুরুষের কাছেই তো? যার কাছে সমর্পিত হবে, তার বিরুদ্ধে কথা শুনতে কি নারীদের ভালো লাগবে, বলো?’
কেয়া কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো সৈকতের দিকে। সৈকত কেয়ার মুখের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে। কেয়ার রাগ থামিয়ে দিতে পেরে ও মনে মনে খুশি। কেয়ার বিহ্বলতা কাটিয়ে দিতে সৈকত বললো-
‘তা তোমার দুটো স্বামী কেনো দরকার?’
এ কথায় এক ধরনের ভাবনা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনলো কেয়া। ও কয়েক মুহূর্ত পর সৈকতের চোখে চোখ রেখে বললো-
‘চাহিদা পূরণের আত্মতৃপ্তি, সমপর্ণের আনন্দ কিংবা জীবনের মহিমা খোঁজার জন্য আমার দুটো স্বামীর প্রয়োজন নেই। কথাটি বললাম জাস্ট কৌতূহলবশত। তবে এটাও সত্যি তোমাকে বিয়ে করিনি বলে আমার ভীষণ আফসোস হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার কাছেই এসে আশ্রয় নিই। কিন্তু…!’
‘কিন্তু কী?’
‘এই কিন্তুর জবাব খুব সহজ। বিত্তশালী স্বামীর বৈভবের মধ্যে যে যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এর নাগপাশ থেকে বের হওয়া কি সহজ?’
‘সত্যিই কি সহজ নয়?’
‘আবেগে বের হওয়া যায়, কিন্তু যুক্তির সামনে এই আবেগ ভীষণ ম্রিয়মান!’
‘কিন্তু কেনো জানি মনে হয়, তুমি একদিন আমার কাছে ঠিকই চলে আসবে।’
এ কথা অনেকটা জোর দিয়েই বললো সৈকত। কেয়া একটু তন্ময় হলো। ও চোখের দৃষ্টিতে মাদকতা ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-
‘যদি তোমার কাছে চলে আসি, সেদিন ফিরিয়ে দেবে আমাকে?’
এর জবাব দিলো না সৈকত। ওর খুব খিদে পেয়েছে। ও বললো-
‘আমার খুব খিদে পেয়েছে। বেয়ারাকে বলো, খাবার দিতে। খালি পেটে প্রেমালাপ হয় না।’ সৈকতের কথা কেয়া শুনলো কি-না, বোঝা গেলো না। ও তাকিয়ে রয়েছে সৈকতের দিকে। যেনো প্রশ্নটার জবাব ওর এখন চাই। সৈকত একটু অস্বস্তি নিয়ে তাকালো বেয়ারার দিকে। ও হাতের ইশারায় ডাকলো বেয়ারাকে। বেয়ারা চলে এলো। সৈকত কিছু বলার আগে কেয়া বেয়ারার উদ্দেশে বললো-
‘আমাদের তাড়াতাড়ি খাবার সার্ভ করুন, প্লিজ।’
‘ঠিক আছে, ম্যাডাম। এখনই দিচ্ছি।’
এ কথা বলে বেয়ারা চলে গেলো। হাফ ছেড়ে বাঁচলো সৈকত। ও বললো-
‘তুমি কেনো আমাকে এখানে ডেকেছো, তা কিন্তু এখনো বলোনি, কেয়া!’
সৈকতের চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। কেয়া হালকা গলায় বললো-
‘আগে খেয়ে নাও। খাবার পর আমাকে বলবে, অহনা মেয়েটি কে?’
কেয়ার মুখে ‘অহনা’র নাম শোনামাত্রই চমকে গেলো সৈকত। ওর শিরা-উপশিরায় যেনো ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেলো। অথচ এমন হবার কথা নয়। ও হচকিয়ে তাকালো কেয়ার চোখে। কেয়া সৈকতের লাজুক ও ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে বিলিয়ে দিলো রহস্যময় হাসি। এই হাসির অর্থ দাঁড়ায় ‘তোমার সব কিছুর খোঁজ আমি রাখি!’
চার.
শফিকুর রহমান চাকরি করতেন পরিসংখ্যান ব্যুরোতে। সিনিয়র অফিসার পদে পদোন্নতি লাভ করে গত দুই বছর হলো রিটায়ার্ড করেছেন। চাকরি জীবন নিয়ে তিনি কখনো সন্তুষ্ট ছিলেন না। পরিসংখ্যান ব্যুরোতে উপরি আয় তেমন ছিল না। সংসারও চালাতেন টেনে-টুনে। স্ত্রী রাহেলা সংসারটাকে চালিয়ে নিয়েছে এবং এখনো নিচ্ছে। সংসারে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। এখন অভাব নেই বললেই চলে। বড় ছেলে জীবন ঠিকাদারির ব্যবসা করছে। ও যথেষ্ট আয় করছে। জীবনের উপার্জন বলা যায় ঈর্ষণীয়। ঠিকাদারি ব্যবসাটা অনেক বছর ধরেই বেশ রমরমা। তবে এই ব্যবসায় ঝুঁকি আছে।
মাস্তানি-চাঁদাবাজি হয় এবং কখনো কখনো খুন-খারাবি হচ্ছে। এসব নিয়ে ভয় পেলে তো হবে না। অভাবের সঙ্গে অসহায়ভাবে যুদ্ধ করার চেয়ে সাহস নিয়ে মাস্তান মোকাবিলা করে ঠিকাদারি ব্যবসা করা অনেক ভালো। অন্তত তাই মনে করেন শফিকুর রহমান। বড় ছেলে জীবনের ঠিকাদারি ব্যবসাকে তিনি ভীষণ পছন্দ করেন। তিনি গত ত্রিশ বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও সংসারের অভাব দূর করতে পারেননি। কিন্তু জীবন গত তিন বছরে আমূল বদলে দিয়েছে সংসারের চেহরা। এ কথা ভাবলে তার মনটা আনন্দে ভরে যায়। আগে তিনি কখনো খবরের কাগজ কিনে পড়তে পারেননি। পাড়ার মোড়ে দেয়ালে লাগিয়ে দেয়া পত্রিকায় চোখ বুলাতেন। অফিসে লাঞ্চ আওয়ারে তড়িঘড়ি করেও খবরের কাগজ পড়তেন। এতে তার তৃষ্ণা মিটতো না। চট-জলদি করে খবরের কাগজ পড়ায় চার্ম নেই। খবরের কাগজ পড়তে হয় ধীরে, খোশ মেজাজে এবং মনোযোগ সহকারে। আগে আয়েশ করে খবরের কাগজ পড়তে পারেননি তিনি। এখন বাড়িতে নিয়মিত দুটো সংবাদপত্র রাখা হচ্ছে। তিনি আরাম-আয়েশ করে এবং আপন মনে খানিকটা গর্ব অনুভব করে তিনি প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়েন। এর মধ্য দিয়ে তিনি রিটায়ার্ড লাইফের একটি চমৎকার ভুবন তৈরি করতে পেরেছেন। গত ত্রিশ বছর ধরে শফিকুর রহমানের অনেক দুঃখ ছিল। অনেক আক্ষেপ ছিল। না পাওয়ার অনেক হতাশা ছিল। এখন ওসব নেই। সব কিছু মিলিয়ে গেছে। শেষ বয়সে এসে স্বচ্ছল জীবনযাপন তার এতোদিনের অপ্রাপ্তির হাহাকার মিইয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি নিজেকে অসুখী ভাবলেও এখন তিনি নিজেকে একজন সুখী মানুষ ভাবেন। কিংবা নিজেকে সুখী মানুষ ভাবতে তার ভালো লাগে। শফিকুর রহমানের তিন ছেলেমেয়ে। তার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে জীবন প্রথম, সৈকত দ্বিতীয় এবং সোমা তৃতীয়। এই ছেলেমেয়েদের নিয়ে তার ভীষণরকম উচ্চাশা ছিল। তার তিনটি সন্তানই ছিল ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। মেধাবী ছাত্রছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও পিতার উচ্চাশা পূরণ করতে পারেনি তারা। তিনজনের কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেনি বা তারা তা হতে চায়নি। অথচ তারা তা হতে পারতো। জীবন ঢাকা মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েও ভর্তি হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে অর্থনীতিতে। ও মাস্টার্স পাস করেই নেমে পড়ে ঠিকাদারি ব্যবসায়। সৈকত ভর্তি হতে পারতো বুয়েতে। ও সে চেষ্টাই করেনি। পড়াশোনা করেছে ফার্মাসিতে। মাস্টার্স পাস করার পরপরই ও স্কালরশিপ পেয়েছিল ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ও যায়নি। ফার্মাসির ছাত্র জড়িয়ে পড়লো রাজনীতিতে। রাজনীতি ওর মাথাটা খেয়ে ফেলেছে। মেয়ে সোমা অনার্স পড়ার সময়ই প্রেম করে বিয়ে করে ফেললো। কোনোরকম অনার্সটা সম্পন্ন করেছিল ও। বড় ছেলে জীবনও বিয়ে করেছে প্রেম করে। ঠিকাদারি ব্যবসা সবেমাত্র শুরু করেছে, একদিন বউ এনে তুললো বাড়িতে। প্রথম প্রথম শফিকুর রহমানের আক্ষেপ ছিল বড় ছেলে এবং মেয়ের বিয়েতে তিনি কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে। এখন এই আক্ষেপটা তেমন নেই। ছেলের বউ লাইজু ভীষণ ভালো মেয়ে। শ্বাশুড়ির সঙ্গে সে ভালোভাবেই সংসার সামলাচ্ছে। সোমাও ভালো আছে ব্যবসায়ী স্বামীকে নিয়ে। সোমার বিয়েটা সংসারের কেউ সহজভাবে নেয়নি বলে ও আসে না বাবার বাড়িতে। বিশেষ করে জীবন সোমার বিয়ের ঘটনাকে একেবারেই মেনে নেয়নি। ও সোমার ওপর রেগে আছে। অথচ ও নিজেও প্রেম করে বিয়ে করেছে। জীবনের রাগ না কমলে সোমার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা ঠিক হবে না- এটা মেনে নিয়েছেন শফিকুর রহমান। কারণ সংসার চলছে জীবনের উপার্জনে। ওর মতামতের একটা গুরুত্ব আছে। শফিকুর রহমানের মনটা মাঝে মাঝে মেয়ের জন্য ককিয়ে ওঠে। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নেন। যে ছেলের উপার্জনে সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে, তার মনে আঘাত দেয়া যায় না, এটা কেউ না বললেও বুঝে নিতে হয়। তার ছোট ছেলে সৈকতের কোনো প্রভাব নেই সংসারে। ও কেনো যে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেলো, এর অর্থ খুঁজে পান না তিনি। এই ছেলের অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠিত তিনি। রাজনৈতিক নেতা হবার আকাশ কুসুম স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা সৈকত কার্যত বেকার এবং ভবঘুরে। রাজনীতির নামে ও এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিটিং-মিছিল করছে। মাঝে মাঝে পুলিশের হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে ওকে। এসব করে কী পায় ও? দেশ ও জনগণকে কী দিয়েছে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ? খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা কী এমন বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশের চেহারা? স্বৈরাচারী সরকার এরশাদকে হটিয়ে এই দুই নেত্রী জাতিকে কী উপহার দিয়েছেন? তারাও দেশকে নিমজ্জিত করে দিয়েছেন সীমাহীন দুর্নীতির অতল গহ্বরে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হবার পর থেকে এই দুই দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ঢালাও অভিযোগ প্রকাশ পায়। অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিতও হয়। খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা নিজেদের ‘সৎ’ বলে দাবি করলেও উভয়ই তা প্রমাণ করতে পারেননি। অথচ তাদের পেছনেই ছুটছে মোহগ্রস্ত লোকেরা। এসব কথা ভাবলে শফিকুর রহমান বিস্ময়ে ডুবে যান। সৈকতের জন্য আফসোস হয় তার। সৈকতকে এসব প্রশ্ন করলে ও বলে ওরা নাকি দেশটাকে বদলে দেবে! শফিকুর রহমানের ধারণা, মিথ্যা প্ররোচনায় রাজনীতির বলয়ে সৈকতের মতো এক শ্রেণির মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ছাত্ররা চরমভাবে বিঘ্নিত করছে শিক্ষাজীবন এবং তরুণরা নষ্ট করছে তাদের উদ্দীপ্ত সময়। তার আরো ধারণা, দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের মধ্যে আদর্শ বলতে কিছু নেই। তারা মুখে হরেকরকম মুখোশ পরে থাকেন। বাড়ির বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে আজো এসব কথা ভাবছিলেন শফিকুর রহমান। তিনি আজকাল অনেক কিছু ভাবেন। সন্তানদের কথা ভাবেন, প্রতিবেশির কথা ভাবেন, দেশের কথা ভাবেন। তার অখণ্ড সময়। বাসার প্রবেশ মুখে বারান্দায় বসে তিনি ভাবছিলেন। তার ভাবনা ভেঙে দেয় অহনার প্রশ্ন।
‘এক্সকিউজ মি! এখানে কি সৈকত থাকেন?’
শফিকুর রহমান একটু চমকে উঠলেন। সৈকতের কাছে অনেক লোক আসে ঠিক; কিন্তু কোনো তরুণী এ পর্যন্ত আসেনি। সাধারণত সমস্যাগ্রস্ত লোকেরা ওর কাছে আসে। অহনার দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এই মেয়েটিকে নিশ্চয় কোনো সমস্যা নিয়ে সৈকতের কাছে আসেনি। বিশেষ কোনো কারণে মেয়েটি সৈকতের কাছে এসেছে বলে শফিকুর রহমানের মনে হলো। অহনার দিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তিনি। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে অহনা আবার বললো-
‘এখানে কি সৈকত থাকেন?’
‘হ্যাঁ, থাকেন। আপনি কে?’
ভারী গলায় বললো শফিকুর রহমান। অহনা বললো-
‘আমি অহনা। আমি কি তার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’
অহনার কথায় একটু অবাক হলেন শফিকুর রহমান। মেয়েটি এমন বিনয়ের সঙ্গে কথা বলছে যেনো, সৈকত বিশেষ কোনো সম্মানিত লোক। শফিকুর রহমানের ভালো লাগলো। রাজনীতিবিদদের যখন মূল্য কমে যাচ্ছে, সেখানে তার ছেলের প্রতি সম্মান প্রকাশ করে কথা বলছে মেয়েটি। ‘এই মেয়েটি সৈকতকে নিশ্চয়ই খুব পছন্দ করে’ এ কথা ভেবে শফিকুর রহমান পুলকিত হলেন। তিনি বললেন-
‘দাঁড়াও মা, সৈকতকে ডেকে দিচ্ছি। না, না, তুমি বাসার ভেতরে চলে যাও। ও ভেতরেই আছে।’
‘না, না। আমি ভেতরে যাবো না।’
‘না, না, চলে যাও। ড্রইংরুমে গিয়ে বসো। আমার বড় ছেলের বউ লাইজুকে ডাকছি। ও ডেকে দেবে সৈকতকে।’
শফিকুর রহমান হাতের ইশারায় অহনাকে পথ দেখিয়ে দিলেন ভেতরে যাবার। অস্বস্তি নিয়ে সৈকতদের বাসায় প্রবেশ করলো অহনা। এরই মধ্যে বারান্দা থেকে গলা ছেড়ে শফিকুর রহমান তার বড় ছেলের বউকে ডাকলেন-
‘বউমা, দেখো সৈকতের কাছে কে যেনো এসেছে।’
বাসার ভেতর থেকে নারী কণ্ঠ ভেসে এলো-
‘আসছি বাবা।’
কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেলেও কেউ এলো না। অহনা সৈকতদের ড্রইংরুমে ঢুকে একটু অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো। ও যার বাড়িতেই যাবে ওর দৃষ্টি প্রথমে যাবে ওই বাড়ির দেয়ালে। সাধারণত প্রত্যেক বাড়ির দেয়ালে ছবির ফ্রেম টানানো থাকে। অহনার দৃষ্টি সব সময় আটকে যায় ছবির ফ্রেমে। এখনো আটকে গেলো সৈকতদের ড্রইংরুমের দেয়ালে টানানো ছবির একটি ফ্রেমে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সৈকত একজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবি দেখে মনে হচ্ছে ছবির লোকটি বিখ্যাত বা সম্মানিত কেউ হবেন। কিন্তু লোকটি কে অহনা জানে না। ও ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলো। এমন সময় ড্রইংরুমে এলো সৈকত। সৈকত বাসা থেকে বের হচ্ছিল। ড্রইংরুমে অহনাকে দেখে ভীষণ অবাক হলো ও। বিস্ময়ভরা চোখে অহনার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনি!’
অহনা মিটিমিটি হাসতে লাগলো। ও বুঝতে পারছে না ওকে দেখে সৈকত কেনো এতো অবাক হচ্ছে। এমন সময় ড্রইংরুমে এলো সৈকতের ভাবী লাইজু। অহনাকে দেখে লাইজু হচকিয়ে গেলো। সে অহনার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনি কার কাছে এসেছেন?’
ভাবীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চট করে এর জবাব দিলো সৈকত।
‘ও আমার কাছে এসেছে।’
‘ও আচ্ছা। তাহলে তোমরা গল্প করো। আমি চা-নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
এ কথা বলে মিষ্টি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে লাইজু ড্রইংরুম থেকে ভেতরের রুমে চলে গেলো। অহনা কিছু বললো না। ও সৈকতের বিস্মিত ও অপ্রস্তুত হয়ে থাকার অভিব্যক্তি উপভোগ করছিল। সৈকত অহনাকে বললো-
‘আপনি দাঁড়িয়ে কেনো, বসুন!’
অহনা সোফায় বসে পড়লো। সৈকতও ওর মুখোমুখি সোফায় বসলো। ও অহনাকে আর কোনো প্রশ্ন করলো না। অহনা ভাবছিল, সৈকত হয়তো আবারো ওকে বলবে, ‘আপনি আমাদের বাড়িতে কিভাবে এলেন? কেনো এলেন?’ কিন্তু সৈকত এ মুহূর্তে চুপ। এবার অহনা মুখ খুললো।
‘কাল আপনাকে অনেকবার ফোন করেছি। কিন্তু আপনি একবারো ফোন ধরেননি। এসএমএসও করেছিলাম। আপনি এরও জবাব দেননি। আপনি বুঝি খুব ব্যস্ত ছিলেন?’
এর জবাবে সৈকত মনে মনে বললো- ‘আমি আসলে কাল কেয়ার সঙ্গে ছিলাম। তাই ফোন ধরতে পারিনি। এসএমএসের জবাবও দিতে পারিনি।’ সৈকত বললো-
‘কাল আসলে পার্টির কাজে বিজি ছিলাম। আপনার ফোন না ধরতে পারিনি বলে দুঃখিত।’
সৈকত চোখে-মুখে দুঃখের ছবি ফুটিয়ে তুললো। অহনা বললো-
‘ঠিক আছে, এর জন্য দুঃখিত হবার কিছু নেই। আপনি ব্যস্ত থাকতেই পারেন। তবে আজ আমাকে সময় দিতে হবে। আমি একজন রাতুলের খবর পেয়েছি। আপনাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাবো।’
‘ঠিক আছে, যাবো। আমিও দুইজন রাতুলের খবর পেয়েছি। ওদের সন্ধানও করবো।’
এ কথায় খুশি হলো অহনা। ও বললো-
‘আমি যে রাতুলের খবর পেয়েছি, সে থাকে নারায়ণগঞ্জে।’
‘নারায়ণগঞ্জের কোথায়?’
‘বন্দর এলাকার সোনাকান্দা গ্রামে।’
‘ঠিক আছে। যাওয়া যাবে। তবে সোনাকান্দার রাতুলের সন্ধানে বের হলে আজকের পুরোদিন লাগবে।’
‘ইটস ওকে। আপনার সমস্যা হবে না তো?’
‘না, না। সমস্যা কেনো হবে। তা ছাড়া এই কাজের জন্য আমি চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। তাই না?’
এ কথা বলে সৈকত হাসার চেষ্টা করলো। অহনা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এ সময় ড্রইংরুমে ট্রেতে চা ও মিষ্টি নিয়ে প্রবেশ করলো সৈকতের ভাবী লাইজু। লাইজুর চোখে-মুখে মিষ্টি হাসির ঝিলিক। সৈকত বুঝতে পারছে ওর ভাবীর চোখে-মুখে ফুটে থাকা হাসির অর্থ। অহনা অবশ্য এসব কিছু বুঝতে পারছে না বলে মনে হচ্ছে সৈকতের। উন্নত দেশে থাকলে ছেলেমেয়েদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়ে যায়। কিছু মনে না করার এক ধরনের সরলতা তাদের মানসিকতা গড়ে ওঠে। লাইজু ট্রে-টেবিলে রেখে অহনাকে একটি প্লেটে মিষ্টি তুলে দিয়ে বললো-
‘মিষ্টি দিয়েই তোমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হোক। আমার নাম লাইজু। আমি সৈকতের ভাবী।’
লাইজু এমনভাবে কথা বললো যেনো অহনার সঙ্গে বিশেষ ভাব করছে। অহনা লাইজুর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলো। কেউ কেউ আছেন যারা সব সময় হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত থাকেন এবং অপরিচিতজনকে চট করেই কাছে টেনে নিতে পারেন, লাইজু সেরকম একজন নারী। অহনা লাইজুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো-
‘আমার নাম অহনা।’
‘বাহ! খুউব সুন্দর নাম!’
বললো লাইজু। আহনা বললো-
‘থ্যাকংস এ লট।’
‘তা তুমি থাকো কোথায়?’
‘অস্ট্রেলিয়ায়।’
‘অস্ট্রেলিয়ায়! বলো কী!’
এ কথা বলেই লাইজু সৈকতের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো। এই দৃষ্টির অর্থ ‘অহনার সঙ্গে তোমার পরিচয় হলো কিভাবে?’ সৈকত মুচকি হেসে ওর ভাবীকে বললো-
‘অহনা ঢাকায় এসেছে একটা জরুরি কাজে। আমি তাকে সাহায্য করছি। তার সঙ্গে আমার পরিচয় দুসপ্তাহের বেশি নয়। বুঝলে?’
‘বুঝলে’ শব্দটি জোর দিয়ে উচ্চারণ করেছে ও। এর মধ্যে ম্যাসেজ হচ্ছে, তুমি যা ভাবছো, তা ঠিক নয়। লাইজু একটু চুপসে গেলো। ও অহনার দিকে তাকিয়ে বললো-
‘তা সময় পেলে চলো এসো আমাদের বাড়ি। তোমার কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়ার গল্প শুনবো।’
অহনা চামচ দিয়ে কেটে মিষ্টি খাচ্ছিল। ও লাইজুর দিকে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সৈকতের চোখে চোখ রেখে ওর ভাবী চোখ নাচালো। এতে না হেসে পারলো না সৈকত। ওর ভাবী যে ইঙ্গিত করছে, তা কখনো হবার নয়। অহনা হচ্ছে দূর আকাশের ধ্রুবতারা। বিশাল দূরত্ব থেকে ধ্রুবতারার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, এর কাছে গেলে পুড়ে খাঁক হবার আশঙ্কা রয়েছে। এ কথা মনে মনে ভাবতে গিয়ে সৈকত ভাবুলতায় তলিয়ে যেতে লাগলো। না চাইলেও কখনো কখনো অনাকাক্সিক্ষত স্বপ্নের কক্ষপথে হারিয়ে যেতে হয় অনেককে। সৈকতও এ মুহূর্তে হারিয়ে গেলো অনাকাক্সিক্ষত স্বপ্নের কক্ষপথে।
পাঁচ.
সাঁতার না জানলেও নদীকে ভয় পায় না- নিজের সম্পর্কে এমন ধারণা ছিল অহনার। অস্ট্রেলিয়া সমুদ্র পরিবেষ্টিত দেশ। অস্ট্রেলিয়ার অনেক শহরের ভেতর দিয়ে সমুদ্রের জলধারা প্রবাহিত হচ্ছে। শহরে ঢুকে যাওয়া সমুদ্রের ক্ষীণ শাখা-প্রশাখায় নৌযান চলাচল করছে নিয়মিত। অহনা অনেকবার চড়েছে ওইসব নৌযানে। কখনো ভয় লাগেনি। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদী পার হতে গিয়ে ও নিজের মধ্যে ভয় অনুভব করলো। ছোট্ট নৌকায় ওরা শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিচ্ছে। ঢেউ এসে নাচিয়ে দিচ্ছে নৌকা। এই ঢেউ কাঁপিয়ে দিচ্ছে অহনাকে। ওর ভয় লাগছে। অহনার ইচ্ছা করছে, সৈকতের পাশে বসে ওর হাত ধরে রাখতে। এতে হয়তো ভয়টা কমে আসতো। কিন্তু তা করা যাচ্ছে না। নৌকা চলছে ধীরগতিতে। অহনা তকিয়ে দেখলো নৌকার মাঝি ভাবলেশহীনভাবে বৈঠা চালাচ্ছে। অহনা নিজের ভেতরের ভয় দূর করতে বা ভুলে থাকতে সৈকতের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলো।
‘আচ্ছা, আপনাকে একটা প্রশ্ন করবো?’
‘করুন। একটা কেনো, একশোটা করুন।’
অহনার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো সৈকত।
‘আপনি রাজনীতিতে জড়ালেন কেনো? ভবিষ্যতে কী করতে চান?’
প্রশ্ন শুনে হচকিয়ে গেলো সৈকত। ও কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলো। এরপর বললো-
‘রাজনীতিতে জড়ানোর কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। স্বভাবজাত কারণে আমি স্কুল বয়স থেকে বিভিন্ন সংগঠনের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যাই। ধীরে ধীরে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে যাই। কলেজ জীবনে এসে জড়িয়ে যাই রাজনীতিতে। সমাজ সম্পর্কে নিজের ভেতরের সচেতনা আমাকে রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়। এরপর রাজনীতিতে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এটা হচ্ছে আপনার প্রথম প্রশ্নে জবাব। দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, ভবিষ্যতে কী করবো এখনো ঠিক করতে পারিনি। অনেকদিন মনে হয়েছে, রাজনৈতিক নেতা হবো, এমপি হবো। দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো। কিন্তু এখন এই স্বপ্ন দেখি না।’
‘কেনো দেখেন না?’
‘কারণ, আমাদের দেশের রাজনীতিতে ফুলের বাগান তৈরি না হয়ে তৈরি হয়েছে চোরাবালির ফাঁদ!’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘আপনাকে এ কথা বিস্তারিতভাবে বোঝাতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে। তবে সংক্ষেপে বলছি, আমাদের রাজনীতিতে সততা এবং আদর্শের সংকট চলছে। এই সংকট আমাদের কেবল পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা নিজেরাই কখনো পথভ্রষ্ট, কখনো স্বপ্নবিমুখ হয়ে যাচ্ছি।’
সৈকতের কথায় রাজনীতি নিয়ে অহনার কৌতূহল বাড়ছে। ও বললো-
‘তারপরও এ দেশের মানুষ রাজনীতি নিয়ে অনেক মাথা ঘামায় কেনো?’
‘এ স্বভাব আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকারভাবে। এ কথা সত্যি, আমাদের জনগোষ্ঠী শিক্ষার আলোয় তেমন আলোকিত ছিল না। তারপরও ব্রিটিশ শাসনের দুইশ বছর এবং পশ্চিম পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শাসনের নামে শোষণ ব্যবস্থা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। নিষ্পেষণ এবং নির্যাতনের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের পূর্ব-পুরুষরা প্রতিবাদ করতে শেখেন। নিজের অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কারা থাকবে, তা নিয়ে ভাবতে ছিলেন পূর্ববঙ্গের মানুষ। এই ভাবনা রাজনীতিতে চলে আসে এবং তা কালের স্রোতে প্রবলভাবে প্রবাহিত হয়। পাকিস্তানি শোষকদের নির্যাতন-নিপীড়নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা শোষক হটানোর রাজনৈতিক আন্দোলন, মিটিং-মিছিল আমাদের জীবনে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায় এবং তা তুমুলভাবে আলোড়িত হতে থাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে। এভাবেই আমরা আপনার ভাষায় রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠি।’
‘আমার ভাষায় মানে?’
‘আমি মনে করি, আমরা রাজনৈতিক সচেতন নই। আমরা আসলে রাজনীতি সম্পর্কে কৌতূহলী। আমরা বলতে, আমি দেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের কথা বলছি। এই সাধারণ মানুষ যেমনি কৌতূহলী, তেমনি ভীষণ আবেগপ্রবণ।
‘আপনার কি মনে হয় রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের এই কৌতূহল এবং আবেগের সুযোগটা নিচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ, নিচ্ছে। এখানেই তো আমরা পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের রাজনীতিবিদদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। উন্নয়নের রোডম্যাপ আমাদের নেই।’
‘এটা কে করবে?’
‘রাজনীতিবিদরাই করবে। আমাদের মধ্য থেকেই একদিন কেউ দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দেবেন। আজ নয় তো কাল। এমন দিনের আশায় তো আছি।’
‘সঠিক নেতৃত্বের কথা বলছেন? সঠিক নেতৃত্বই কি সব কিছু আমূল বদলে দিতে পারবে?’
‘আমি তা-ই বিশ্বাস করি। আমাদের এখন সঠিক নেতৃত্বই দরকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সময় নেতৃত্ব তৈরি করে। আবার কখনো নেতৃত্ব সময়কে তৈরি করে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দেশ স্বাধীন হবার পর আমরা ডায়নামিক নেতৃত্ব বা নেতৃত্ব সৃষ্টির সময়- কোনোটাই পাইনি।’
‘এ জন্যই কি আপনি রাজনীতিতে নিবেদিত প্রাণ?’
‘ঠিক নিবেদিত প্রাণ কি-না জানি না। তবে রাজনীতি নিয়ে ভীষণ স্বপ্নপ্রবণ।’
‘আপনার স্বপ্নের থিম কি? আই মিন, কেমন একটা দেশের স্বপ্ন দেখেন?’
‘দেশের চৌদ্দ কোটি মানুষ নিরাপদে রয়েছে। দুর্নীতি নেই। হরতাল নেই। রাজনীতির নামে দাঙ্গা-হাঙ্গামা নেই। গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সরকার বদল হচ্ছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখি।’
‘ভালো লাগলো আপনার স্বপ্নের কথা জেনে।’
‘এবার আপনার স্বপ্নের কথা বলুন।’
এ কথায় হেসে উঠলো অহনা। যেনো অহনার কোনো স্বপ্ন থাকতে পারে না। এমন কোনো মানুষ আছে, যার কোনো স্বপ্ন নেই? একটু ভাবলো সৈকত। ও আহনার হাসির বিদ্যুৎ চমকানো মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো-
‘এমনভাবে হাসলেন, যেনো আপনার কোনো স্বপ্ন নেই। আমি কি খুব হাসির কথা বলে ফেলেছি?’
‘আসলে আমি হাসলাম অন্য কারণে।’
‘কী কারণ?’
‘বলছি। আপনার স্বপ্নের একটা তোলপাড় আছে, বর্ণাঢ্য একটি বিষয় আছে, ব্যাপ্তি আছে। স্বপ্ন পূরণের জন্য উৎকণ্ঠা আছে। স্বপ্ন পূরণ হলে তীব্র আনন্দও আছে। অথচ আপনার স্বপ্নের সঙ্গে পুরো জাতির স্বপ্নের মিল আছে। এই স্বপ্ন পূরণ হলে জাতির কল্যাণ হবে। আর আমার স্বপ্নের মধ্যে একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত। এমন স্বপ্নের কথা বলাটা হাস্যকর। এ কথা ভেবেই হাসলাম। আপনি ভুল বুঝবেন না। প্লিজ!’
‘আপনি অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেও চমৎকার বাংলা বলেন। আমি বিমোহিত।’
‘ধন্যবাদ। আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাই। সুতরাং বাংলা ভুলে না যাওয়ায় অবাক হবার কিছু নেই।’
‘ভুলে যাননি যেমন, তেমনি প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতে পারেন।’
অহনা আবারো হাসলো। সৈকত বললো-
‘আপনি কিন্তু বলেননি, আপনার স্বপ্নের কথা।’
‘আমার আপাতত স্বপ্ন হচ্ছে, রাতুলকে খুঁজে বের করা। আর আমার এই স্বপ্নটা আপনি পূরণ করে দিতে পারেন।’
অহনার এ কথাটি কেনো জানি সহজভাবে নিতে পারলো না সৈকত। কোথাও একটা মিহিন বেদনা গলা সেধে উঠলো। ও হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। অহনা সৈকতের অন্যমনষ্কতা বুঝতে পারলো যেনো। ও সৈকতের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো-
‘আপনি হঠাৎ চুপসে গেলেন যে!’
‘না, চুপসে যাইনি। হঠাৎ মনে হলো, আপনার স্বপ্ন পূরণ করার মধ্য দিয়ে আমার কী লাভ হবে। আর ক্ষতিই বা কী হতে পারে।’
অন্যমনস্কতা ঝেড়ে সৈকত এ কথা বললো। ওর কথাকে ভাবুলতা ছাড়া কী আর বলতে পারে অহনা? তবে তার এই কথার মধ্যে অনুচ্চারিত এক টুকরো বেদনার আভাস রয়েছে। অহনা ছোট্ট করে হেসে বললো-
‘পাঁচ লাখ টাকাটা কি কম লাভ বলে ভাবছেন?’
‘অর্থের দিক থেকে পাঁচ লাখ টাকা অনেক।’
‘তবে?’
‘এর বিপরীতে লোকসান হতে পারে না?’
‘যেমন?’
এবার হাসলো সৈকত। অনেকটা দুষ্টমি করে বললো-
‘রাতুলকে খুঁজতে গিয়ে আপনার সান্নিধ্য পাচ্ছি। যখন রাতুলকে পেয়ে যাবেন, তখন তো এই সান্নিধ্য আর পাবো না। এটা কি আমার লোকসান নয়?’
এ কথার জবাবে কী বলবে অহনা। ও বুঝতে পারছে সৈকতের মধ্যে অনাহুত আবেগ কাজ করছে। এ ধরনের আবেগকে গুরুত্ব দেয়া যায় না। আবার অহনা তা উপেক্ষা করতেও পারছে না। ও তর্ক করার ভঙ্গিতে বললো-
‘লাভ-লোকসান খুঁজে ব্যবসায়ীরা। আপনি তো সে রকম নন। তা ছাড়া এমন কিছু লোকসান আছে, যার বর্তমান মূল্যায়নটা আপেক্ষিক। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ ক্রেডিবেলিটি আছে। ধরে নিন, এটাও সে রকম।’
এর কোনো জবাব দিলো না সৈকত। ও শুধু ভাবতে লাগলো অহনা এমন চমৎকার বাংলা কী করে বলে। ওর কথায় ও চিন্তায় গভীরতা ফুটে ওঠে। অহনার কথায় সৈকত আবেশিত হয়ে রইলো অনেকক্ষণ। অহনা আর কোনো কথা বললো না। ছোট ছোট ঢেউ ভেঙে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে তীরের দিকে। এই ছোট নৌকার মতো সৈকতের মনের নদীতে একটি স্বপ্নতরীও এগিয়ে যাচ্ছে। সৈকত এর গন্তব্য জানে না।
ছয়.
ফজলুল হকের বাড়ির দরজা যে মেয়েটি খুললো, তাকে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হলো সৈকতের; কিন্তু ও মেয়েটিকে চিনতে পারলো না। অথচ মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। মাঝে মাঝে স্মরণশক্তিতে যেনো কুয়াশা জমে যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড মেয়েটির মুখের দিকে একরকম হা করে তাকিয়ে রইলো সৈকত। এর মধ্যে ও মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করে নিলো। মেয়েটির বয়স বিশ-একুশ হবে। হালকা-পাতলা শরীর। রোগাটে বলা যায়। চোখ দুটি ডাগর না হলেও দৃষ্টিতে মায়াবী টান রয়েছে। হালকা নীল রঙের সালোয়ার পড়েছে। সালোয়ারের গলা থেকে বুক অবধি কাচের নকশা। কিন্তু পায়জামা পরেনি ও। পড়েছে জিন্স প্যান্ট। গলায় ওড়না নেই। ফলে সালোয়ার ও প্যান্টে মেয়েটিকে অন্যরকম লাগছে। সৈকতের দৃষ্টির সামনে মেয়েটি নিঃসংকোচিত নয়; বরং কেমন সপ্রতিভ। মেয়েটি চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করলো-
‘কাকে চাই?’
এর জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারলো না সৈকত। মেয়েটি আবারো বললো-
‘কাকে চাই? আপনি কে? কার কাছে এসেছেন?’
‘এটা কি ফজলুল হক সাহেবের বাড়ি?’
এ প্রশ্নটি করেই সৈকতের মনে হলো ও এ প্রশ্নটি না করলেও পারতো। কারণ, ও নিশ্চিত এটি ফজলুর হকের বাড়ি। এই বাড়িতে ও অনেকবার এসেছে। বরং প্রশ্ন করা উচিত ছিল ‘ফজলুল হক সাহেব বাড়ি আছেন কি?’
‘হ্যাঁ, এটা ফজলুল হকের বাড়ি। আপনি?’
‘আমি তার বিশেষ পরিচিত। আমার নাম সৈকত।’
এবার মেয়েটি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। বললো-
‘ভেতরে আসুন।’
সৈকত বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। বলা যায় ফজলুল হকের বাড়ির দরজা সব সময় খোলা থাকতো। বাড়ির দরজায় কেউ প্রশ্ন করতো না ‘কে? কাকে চাই?’ রাজনীতিবিদদের বাড়িতে কতো লোকের আনাগোনা তার হিসাব রাখা যায় না। তাদের দরজা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের ঘটনা সৈকতকে একটু চিন্তিত করলেও ওর খারাপ লাগছে না। সৈকতের চিন্তায় ছেদ কেটে দিয়ে মেয়েটি বললো-
‘আপনি এখানে বসুন। আমি বাবাকে খবর দিচ্ছি।’
মেয়েটির এ কথা শোনামাত্র ওকে চিনতে পারলো সৈকত। ও হচ্ছে ফারিয়া। ফারিয়া হচ্ছে ফজলুল হকের মেয়ে। সৈকত ওকে দেখেছে কমপক্ষে আট বছর আগে। তখন অনেক ছোট ছিল ও। ফারিয়া দার্জিলিংয়ে পড়াশোন করছে- এটুকু শুধু ও জানতো। আজ ফারিয়াকে দেখে ও কেনো চিনতে পারলো না এ নিয়ে নিজের মধ্যে কেমন বিস্ময় তৈরি হলো। ও মুখে কিছু বললো না। ও বসে পড়লো সোফায়। ফারিয়া চলে গেলো ভেতরের রুমে। সৈকত ডুবে গেলো ফজলুল হককে নিয়ে নিজের ভাবনার ভুবনে।
রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ফজলুল হককে সৈকত ভীষণ পছন্দ করে। সমানভাবে শ্রদ্ধাও করে ও। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, তার কাছে কোনো সমস্যা নিয়ে এলে এ পর্যন্ত বিফল মনে ফিরতে হয়নি ওকে। তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ খালি হাতে ফিরেছেন, এমন কথা শুনেনি সৈকত। পার্টির জন্য মিছিল-সমাবেশ করতে অর্থের সংকট হলে সৈকত চিন্তিত হয়নি কখনো। ও চলে আসে ফজলুল হকের কাছে। তিনি অর্থের ব্যবস্থা করে দেন। অবশ্য তিনি কখনো নিজের পকেট থেকে অর্থ দেন না। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোন করে দিতেন। সৈকত ওই সব ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতেন। তারা সৈকতের হাতে অর্থ তুলে দিতেন। ফজলুর হকের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের লোকের সঙ্গে গভীর সখ্যতা রয়েছে। তিনি যে কতো লোককে চেনেন, তিনি নিজেও হয়তো বলতে পারবেন না। ব্যবসায়ী, আমলা, ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, ছোট-বড় চাকরিজীবী, শ্রমিক নেতা, পুলিশ এমনকি মাস্তানদের পর্যন্ত তিনি চেনেন। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার সম্পর্কের শেকড় ছড়িয়ে রয়েছে। কিভাবে তিনি বিভিন্ন পেশার এতো মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জাল তৈরি করেছেন, কে জানে! এ কথা ভাবলে সৈকতের বিস্ময় কাটে না। অর্থ সংকট ছাড়াও ছোটখাটো তদবির বা কোনো সমস্যা নিয়ে তার কাছে এসে সৈকত কখনো বিফল হয়নি। তাই ফজলুর হকের প্রতি সৈকতের অগাদ শ্রদ্ধা। এই লোকটি পার্টির জন্য নিবেদিত প্রাণ। অথচ পার্টির মহানগর কমিটির বড় কোনো পদ তিনি দীর্ঘদিনেও পাননি। তিনি মহানগর কমিটির সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে আটকে আছেন। ভোটাভুটি হলে তিনি মহানগর কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হয়ে যেতে পারতেন অনেক আগেই। কিন্তু পার্টির মধ্যে ভোটাভুটির চর্চা নেই। ওপর থেকে কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। ফলে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিশেষ পছন্দের মানুষ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নিয়েছে। ফজলুল হক পার্টির নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় হলেও পার্টিতে তার পদোন্নতি হয়নি। এ নিয়ে সৈকতের আক্ষেপ রয়েছে। কিন্তু ফজলুল হকের যেনো আক্ষেপ নেই। কিংবা হয়তো আক্ষেপ আছে, এর প্রকাশ তিনি করেন না।
সৈকত ফজলুল হকের বাড়ির ড্রইংরুমে বসে কথাগুলো ভাবছিল। এর মধ্যে বাড়ির কাজের বুয়া মরিয়ম ওর সামনে চা ও বিস্কুট রেখে গেছে। সৈকত ওসব স্পর্শ করেনি। ফজলুল হকের বাড়িতে সৈকত যতোবার এসেছে, ততোবারই লোকজন দেখেছে। কিন্তু আজ কোনো লোক নেই। ড্রইংরুমে ও একা বসে আছে। এর কারণ হতে পারে, দেশে জরুরি অবস্থা চলছে। শর্তসাপেক্ষে ঘরোয়া রাজনীতি চললেও রাজনীতির অঙ্গনে প্রাণ নেই। সবার মধ্যে অজনা ভয় কাজ করছে। সামরিক সরকার কিংবা সামরিক মদতপুষ্ট সরকারকে রাজনীতিবিদরা কখনোই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। সাধারণ মানুষেরও এ ধরনের সরকারের প্রতি সমর্থন থাকে না। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই সরকারের নির্ভীক পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। চুপসে গেছেন রাজনীতিবিদরা। সন্দেহ ও কৌতূহলীও রয়েছে অনেকের মনে। এমনি পরিস্থিতিতে ফজলুল হকের বাড়িতে মানুষের উপস্থিতি না থাকাটা অস্বভাবিক নয়, ভাবলো সৈকত।
‘আরে সৈকত যে!’
ড্রইংরুমে প্রবেশ করেই ফজলুল হক ভরাট গলায় বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ফজলুল হক বরাবরের মতো পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেছেন। কাঁধে ভাঁজ করা একটি শাল ঝুলছে। সৈকত সোফা থেকে অনেকটা লাফিয়ে উঠে গিয়ে ফজলুল হকের সামনে চলে গেলো এবং ও চট করে মাথা নুয়ে তাকে সালাম করলো। ও সব সময় এ কাজটি করে। ফজলুল হক ওকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিলেন। এরপর সৈকতকে বাহুমুক্ত করে বললেন-
‘বেশ কয়েকদিন ধরে তোমার কথাই ভাবছিলাম। তুমি তো অনেকদিন হয় আসো না!’
‘একটু ব্যস্ত ছিলাম ফজলু ভাই।’
‘তা কী খবর?’
‘খবর তো আপনি দেবেন।’
‘তা চারপাশে কি দেখছো?’
‘সবাই যা দেখছে, তাই দেখছি।’
‘সবার মতো করে তো তুমি দেখলে হবে না। তোমাকে অন্যভাবে দেখতে হবে। তোমরা দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই না?’
‘এসব কথা এখন আর বিশ্বাস করতে চাই না ফজলু ভাই?’
‘কেনো?’
‘রাজনীতির আড়ালে যে অবক্ষয় চলছে, এর দায়-দায়িত্ব এখন কে নেবে?’
‘তুমি দুর্নীতির কথা বলছো?’
‘এটাই তো আমাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এবং বিব্রতকর অভিযোগ, তাই না?’
‘এই অভিযোগ ঢালাওভাবে সবার বিরুদ্ধে। শুধু খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা এর জন্য দায়ী নন। এর জন্য দায়ী আমলা-কর্মকর্তা থেকে আরো অনেকে। অথচ দেখো খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনাসহ সাবেক বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে কারাবন্দি করে সরকার বাহাবা নিচ্ছে। এই সরকার কি দুর্নীতিবাজ সবাইকে ধরেছে বা ধরছে?’
ফজলুল হকের এ প্রশ্নটি সৈকতেরও। সুতরাং, এ প্রশ্নের জবাবে ও কিছু বললো না। ফজলুর হক একটু চুপ থেকে বললেন-
‘তা যাই-ই হোক। চোখ-কান খোলা রাখো। প্রস্তুত থাকো।’
‘কিসের জন্য প্রস্তুত থাকবো?’
এ কথায় হেসে ফেললেন ফজলুল হক। মনে হলো সৈকতের কথায় তিনি না হেসে পারলেন না। হাসি থামার পর তিনি বললেন-
‘তা তুমি কেনো এসেছো বলো। তোমার কথা শোনা হয়নি।’
একটু ইতস্তত ভাব এসে গেলো সৈকতের। ও ইতস্ততভাবে বললো-
‘আমি এবার অন্যরকম একটা সমস্যা নিয়ে এসেছি। আপনার সাহায্য ছাড়া মনে হচ্ছে, এ সমস্যার সমাধান সহজে হবে না।’
‘আহা! সমস্যাটা কী বলে ফেলো?’
‘আমি একটি ছেলেকে খুঁজছি। ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকতো। সিডনিতে। এখন দেশে ফিরে এসেছে। ওকে আমার খুঁজে বের করতে হবে। ছেলেটির নাম রাতুল। ওর নাম ছাড়া আমার কাছে আর কোনো তথ্য জানা নেই।’
কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ফজলুল হক। সৈকত তার মুখের দিকে আশার দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। একটু ভেবে তিনি সৈকতকে বললেন-
‘তুমি কাল আমাকে ফোন করো। আশা করি, ওর পরিচয় ও ঠিকানা পেয়ে যাবে।’
‘সত্যি বলছেন! কিভাবে বের করবেন!’
বিস্ময় প্রকাশ করলো সৈকত। ফজলুল হক স্বভাবসুলভ হাসিমুখে বললেন-
‘এটা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। তুমি সানোয়ারা গ্রুপের নাম শুনেছো?’
‘ওই যে ডানো গুঁড়া দুধের আমদানিকারক?’
‘হ্যাঁ। ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান আমার পরিচিত। তার ছেলে জাহিদ পড়াশোনা করেছে সিডনিতে। ও আবার বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের খোঁজখবর রাখে। আশা করি, ও রাতুলের সন্ধান দিতে পারবে। রাতুল নামে আর কজন ছাত্রই বা সিডনিতে পড়াশোনা করেছে, বলো? ওকে আজ রাতে ফোন করবো। তুমি কাল আমাকে ফোন করো।’
ফজলুল হকের কথায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সৈকত। ও জানে, ফজলুল হক যখন সমস্যা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে, তখন এর সমাধান হবেই। এ জন্যই এই লোকটিকে ভীষণ ভালো লাগে সৈকতের। তাকে ম্যাজিশিয়ানও বলা যায়। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সৈকত বললো-
‘আজ তাহলে যাই, ফজলু ভাই?’
‘যাবে? যাও। আজ তুমি কিছু মুখে দিলে না। চা তো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’
এ কথা বলে তিনি হাসলেন। সৈকত বললো-
‘আজ কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না।’
‘ঠিক আছে। যাও। ভালো থেকো।’
‘জ্বি, আচ্ছা। কাল আপনাকে ফোন করবো।’
‘করো। আর হ্যাঁ, প্রস্তুত থেকো!’
সৈকত মাথা নেড়ে ফজলুল হককে সালাম জানিয়ে তার বাড়ির ড্রইংরুম থেকে বের হয়ে এলো। ওর জন্য অহনা অপেক্ষা করছে। ওকে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। এ মুহূর্তে ওর মনে আনন্দের একটা ঢেউ খেলছে। রাতুলের সন্ধান পাওয়াটা ওর জন্য প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার সমাধানটা এতো সহজে হয়ে যেতে পারে, ও অতোটা ভাবেনি। ফজলুল হকের বাড়ির দরজা পেরিয়ে গেটের দিকে যেতেই পেছন থেকে মরিয়ম বেগমের ডাক শুনতে পেলো ও।
‘বাপজান, একটু দাঁড়ান!’
ঘুরে দাঁড়াতেই ফজলুল হকের বাড়ির কাজের বুয়া মরিয়ম বেগমকে ও দেখতো পেলো। মরিয়ম বেগম হয়তো সৈকতের জন্য বাড়ির বাইরে কোথাও অপেক্ষা করছিল। সৈকত একটু অবাক হলো। ও এক-পা দু-পা করে মরিয়ম বেগমের দিকে এগিয়ে গেলো। চারপাশে সতর্ক চোখ রেখে ওর সামনেও এগিয়ে এলো মরিয়ম বেগম। সৈকতের সামনে এসে একটা খাম বাড়িয়ে বললো-
‘এইট্যা তাড়াতাড়ি ধরেন! আফা দিছেন!’
সৈকত কিছুই বুঝতে পারলো না। মরিয়ম বেগম ওর হাতে খামটি ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে চলে গেলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় বাড়ির দোতলার দিকে তাকাতেই দোতলার বারান্দায় ফারিয়াকে দেখতে পেলো ও। ফারিয়া ওর দিকে তাকিয়ে এক টুকরো হাসি বিলিয়ে দিয়ে বারান্দা থেকে চট করে চলে গেলো। এই রহস্যের কোনো কারণ খুঁজে পেলো না সৈকত। ও খাম খুললো। খামের ভেতরে রাখা একটি কাগজে দুটি লাইন শুধু লেখা। লাইন দুটি ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো- ‘সৈকতে কেনো সমুদ্র ফিরে আসে? সৈকত কি সমুদ্রকে ভালোবাসে?’ সৈকতের উদ্দেশে এ দুটি লাইন লিখে পত্র পাঠানোর উদ্দেশ্য কী? ফারিয়া কি ওকে চেনে? কিন্তু ওর সঙ্গে আজ যখন দেখা হলো তখন ফারিয়ার আচরণ দেখে মনে হয়নি, সৈকতকে ও চেনে। তবে এ দুই লাইনের কাব্য কেনো? সৈকত গভীর রহস্যের অতলে হারিয়ে যেতে লাগলো। কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত রহস্যে থমকে যায় অনেকে। বিস্ময়ে হয় বিমূঢ়। সৈকতও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
সাত.
শাহবাগে পাবলিক লাইব্রেরির গেটের সামনে কারো জন্য অপেক্ষা করা মন্দ নয়। সময় কেটে যায়। এই পাবলিক লাইব্রেরির সামনে তরুণ-তরুণীদের জটলা লেগেই থাকে। বিভিন্ন তরুণ-তরুণীর যাওয়া-আসা তো আছেই। এখানে দাঁড়ালে মনটাও রোমান্টিক হয়ে যায়। চারপাশে প্রেমময় আড্ডার মৌ মৌ গন্ধ। কোলাহল আছে। উচ্ছ্বলতা আছে। এরই মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্যতাও আছে। পাবলিক লাইব্রেরির প্রাঙ্গণে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি এক ধরনের গাম্ভীর্যতা তৈরি করে। অনেক মুখরতার মধ্যেও এই গাম্ভীর্যতা মেঘলা আকাশে রংধনুর মতো দ্যুতিময়। পাবলিক লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে এ কথাগুলো ভাবছিল সৈকত। ও অপেক্ষা করছে অহনার জন্য। অহনা আসার কথা দুটোয়। সৈকত দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা পঞ্চাশ থেকে। এখন ঘড়িতে দুটো পঁচিশ। এর মধ্যে অহনা দুবার ফোন করে জানিয়েছে যে, ও আসছে। যানজটে আটকে গেছে। সৈকত ঘড়িতে অরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলো। নভেম্বর দুপুর। শীত জেঁকে বসেছে। সৈকত শার্টের ওপর হালকা একটি স্যুয়েটার এবং এর ওপরে চামড়ার জ্যাকেট পরেছে। জিন্স রঙের জিন্সপ্যান্ট ও শাদা শার্টের ওপর ‘এস’ রঙের স্যুয়েটার পড়েছে ও। জ্যাকেটটি কালো রঙের। পায়ে সাদা রঙের কেডস। সৈকত আজ ওর পছন্দের পোশাক পরেছে। অবচেতন মনের ইঙ্গিত ও উপেক্ষা করতে পারেনি। ওর অবচেতন মন ওকে পরিপাটি হতে বলেছে। অহনাকে নিয়ে যেতে হবে উত্তরায়। অহনার সঙ্গে কোথাও যাবার প্রোগ্রাম তৈরি হলে ওর মধ্যে এখন পরিপাটি থাকার চিন্তা ভীষণরকম কাজ করে। সৈকত অহনাকে নিয়ে নিজের মধ্যে আলো-ছায়ার মতো একরকম ভাবাবেগ টের পাচ্ছে। কিন্তু মনের ক্যানভাসে পুরোপুরি চিত্র তৈরি করতে পারছে না। এই অসম্পূর্ণ ও অযাচিত আবেগ অর্থহীন হলেও এর অস্তিত্ব ভালো লাগছে ওর। ও এই আবেগকে নিজের মধ্যে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। এসব কথা নানাভাবে ভেবে অপেক্ষার সময় পার করছে ও। ওর মাথার ওপর শীতের দুপুর। আজ শীত প্রবল হলেও সূর্য কিরণ প্রখর। বাতাসের দাপট কম। পাবলিক লাইব্রেরির গেটের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে শীতটাকে উপভোগ করছিল ও। একসময় সৈকতের স্বপ্নঘোর চটকে দিয়ে একটি টয়োটা করোলা কার এসে ওর সামনে ব্রেক কষলো। কারটি দেখে সৈকতের চোখ প্রথমে উজ্জ্বল হয়ে গেলো। ও ধরে নিয়েছিল অহনা এসে গেছে। কিন্তু গাড়িটির পেছনের আয়না যখন নামলো, তখন ও কেয়াকে দেখতে পেলো। অনেকটা ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো ও। ওর বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠলো। কেয়া এখানে কেনো এসেছে- ও তা বুঝতে পারছে না। ও সমূহ বিপদের আশঙ্কায় বিচলিত হলো। এখন যদি অহনা চলে আসে, তবে একটা বিচ্ছিরি ঘটনার মুখে পড়বে ও। কেয়াকে না হয় অহনার পরিচয় দেয়া যাবে; কিন্তু অহনার কাছে কেয়ার কী পরিচয় দেব ও। অহনাকে কী বলা যাবে, ‘ও হচ্ছে কেয়া, আমার প্রাক্তন প্রেমিকা। প্রেমিকা মানে ওয়ান সাইটেড লাভ! কেয়া আমাকে কখনো ভালোবাসেনি। নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে শুধু!’ সৈকতের ঘাবড়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কেয়া বললো-
‘অমন হা করে কী দেখছো? অনেক হয়েছে, এবার গাড়িতে ওঠো।’
কেয়ার কথা যেনো শুনতেই পেলো না সৈকত। ও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ওর চিন্তায় এলোমেলো হাওয়া বইছে। কেয়া এবার উঁচু গলায় বললো-
‘এই যে রাস্তার রোমিও, গাড়িতে ওঠো!’
সৈকত একটু নড়ে উঠলো। ও বললো-
‘তুমি! এখানে! কী ব্যাপার!’
বিস্ময় উজাড় করে ঢেলে দিলো ও। কেয়া বললো-
‘সব প্রশ্নের জবাব দেবো। আগে গাড়িতে ওঠো।’
‘কেনো? কোথায় যাবো?’
‘জাহান্নামে! কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে ওঠো।’
‘না, মানে, আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।’
‘আমারও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। ওঠো!’
‘আহা! তোমার সঙ্গে কাল দেখা করি।’
ককিয়ে ওঠে সৈকত। কেয়া নাছোড়বান্ধার মতো বলে-
‘তুমি গাড়িতে না উঠলে আমিও নড়ছি না। দেখবো তোমার কী কাজ!’
কেয়ার কথায় বিপদের গন্ধ পেলো সৈকত। কেয়ার মধ্যে বেপরোয়া ভাব। সৈকত জানে, ও আর এখান থেকে নড়বে না। আর যে কোনো সময় অহনা চলে আসবে। অহনা কেয়ার মুখোমুখি পড়লে ব্যাপারটি কোন দিকে গড়াবে, কে জানে! সৈকত নিজের মধ্যে ভয় টের পেলো। কেয়া ফের বললো-
‘তুমি গাড়িতে উঠবে, না-কি আমি গাড়ি থেকে নামবো?’
সৈকত বিরক্ত মুখে গাড়িতে গিয়ে উঠলো। এ মুহূর্তে মনে হলো কেয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখাটা ওর ঠিক হয়নি। এর কোনো অর্থ হয় না। এর মধ্য থেকে কোনো প্রাপ্তি নেই। বরং হারানোর ভয় আছে। কেয়ার সঙ্গে পুরনো সম্পর্কটা পুনরায় গড়ে তোলার জন্য এ মুহূর্তে সৈকতের ভীষণ অনুশোচনা হতে লাগলো। ও কেয়ার পাশে বসে চুপসে আছে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সৈকত ওর সেলফোনটি অফ করে দিলো। কারণ অহনা ফোন করলে ও কথা বলতে পারবে না। এ মুহূর্তে কেয়ার সামনে ও অহনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে না। শাহবাগে মোড় পেরুতেই গাড়ির গতি বেড়ে গেলো। কেয়া এবার বললো-
‘তা ওইখানে দাঁড়িয়ে কার জন্য অপেক্ষা করছিলে?’
সৈকত এর কোনো জবাব দিলো না। ও ভাবছে অহনা ওকে না পেয়ে কী ভাববে? কেয়া ফের বললো-
‘সৈকত, আমি তোমার সঙ্গে আজ চূড়ান্ত আলোচনা করতে প্রস্তুত হয়ে এসেছি।’
‘কী নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা?’
বিরুক্তি প্রকাশ করে জানতে চাইলো সৈকত। কেয়া বললো-
‘সেটা হচ্ছে তোমার আমার সম্পর্ক নিয়ে। আমাদের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে।’
‘ঠিক আছে, বলো কী জানতে চাও।’
‘প্রথমে বলো, তুমি গত দুই সপ্তাহ ধরে আমাকে কেনো উপেক্ষা করছো? আমার কোনো ফোন ধরোনি। তুমি একবারো ফোন করোনি। একটি এসএমএসের জবাবও দাওনি। কেনো?’
‘আমি ব্যস্ত ছিলাম। ভীষণ রকম ব্যস্ত আছি।’
‘এতো ব্যস্ত যে আমাকে ভুলে থাকতে পারলে! কী এমন কাজ, শুনি?’
‘কেয়া, এটা তোমার বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?’
‘হ্যাঁ। বাড়াবাড়িটা তুমিই শুরু করেছো।’
‘মানে!’
‘মানে খুব সহজ। তুমি বুঝতে পারছো না?’
‘কেয়া তোমার কী হয়েছে, বলো তো! অ্যানি প্রবলেম উইথ ইওর হাজব্যান্ড?’
‘সমস্যা হলে তুমি কী করবে? আমাকে বিয়ে করে আমার ইষ্টুপিট হাজব্যান্ড থেকে মুক্ত করবে?’
কেয়ার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো না সৈকত। ও হচকিয়ে গেলো। এ প্রশ্নটি এর আগেও বিভিন্ন সময়ে করেছে কেয়া। এর জবাবে ও বলেছে, ‘হ্যাঁ, তোমাকে বিয়ে করবো।’ কেয়া এ প্রশ্নটি করেছে রসিকতা করে, সৈকতও জবাব দিয়েছে রসিকতার মতো। কিন্তু কেয়া কখনো সিরিয়াসভাবে এ প্রশ্নটি করেনি। আজ ও সিরিয়াস। সৈকত কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বললো-
‘কেয়া তোমার কী হয়েছে, বলো তো? তুমি কোথায় গিয়েছিলে? এই গাড়ি কার?’
‘আমি কোথাও যাইনি। তোমাকে অনুসরণ করছিলাম। গাড়ি ভাড়া নিয়েছি।’
কেয়ার কথা শুনে ভীষণ অবাক হলো ও। বললো-
‘আমাকে অনুসরণ করছিলে? কেনো?’
‘শুধু জানতে কেনো তুমি আমাকে উপেক্ষা করছো।’
‘আশ্চার্য! তুমি পাগল হয়ে গেছো!’
‘তুমি ভাবছো আমি তোমার জন্য পাগল! তাহলে তুমি বোকার স্বর্গে বাস করছো।’
কেয়ার কথায় শ্লেষ। সৈকত বললো-
‘না। আমি জানি, তুমি আমার জন্য পাগল নও। কখনো ছিলেও না।’
‘এ কথা জেনেও তুমি আমার সঙ্গে প্রেম করছো?’
প্রশ্ন করলো কেয়া।
‘তোমার সঙ্গে কি আমি সত্যিই প্রেম করছি, কেয়া? তুমিও কি আমার সঙ্গে প্রেম করছো?’
পাল্টা প্রশ্ন করলো সৈকত। কেয়া বললো-
‘আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করছি না, ঠিক। তাহলে তুমিও কি আমার সঙ্গে আমারই মতো প্রেমের অভিনয় করছিলে?’
‘বেশ ভালো প্রশ্ন করেছো। সত্যি কথা বলতে কী, আমি অভিনয় পারি না। আর ‘অভিনয়’ বা ‘ভান’ করে তোমরা তোমাদের ভুবন সাজিয়ে রেখেছো।’
‘তাই না কি! এটা জেনেও আমাকে ভালোবাসতে?’
‘তোমাকে আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু তুমি আমাকে ভালোবাসোনি। আবার আমাকে ছেড়েও দাওনি। অভিনয় নামক অস্ত্রটা আমার ওপর চালিয়েছো। এখনো ওই অস্ত্রটা চালিয়ে যাচ্ছো।’
‘এ কথা জানার পরও তুমি আমার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছো কেনো? কোন লোভে? না-কি প্রতিশোধ নিতে?’
কেয়ার এ প্রশ্নের জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া যায় না। সৈকত মনে মনে কেয়ার উদ্দেশে বললো, ‘প্রত্যাখ্যানের আঘাত ভালোবাসাকে লাঞ্চিত করে আর প্রবঞ্চনার জ্বালা ভালোবাসাকে ঘৃণায় পরিণত করে, তুমি আমাকে দুটোর স্বাদই দিয়েছো। তোমার বিয়ের দুই বছর পর যখন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো, তখন তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা বলতে কিছু নেই। তবে একরকম মোহ আমাকে টেনে নিয়ে গেছে তোমার কাছে। মোহটা নিয়েই আমি তোমার সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক ধরে রাখছিলাম।’
কিন্তু মুখে কিছু বললো না সৈকত। কেয়া ফের বললো-
‘মুখ গোমরা করে বসে আছো কেনো? আমার প্রশ্নের জবাব দাও।’
‘কেয়া তোমার কী হয়েছে? এমন করছো কেনো? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?’
‘তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি। আপত্তি আছে?’
‘এটা তুমি কখনোই করবে না, তা আমি জানি।’
‘কেনো এমন মনে হচ্ছে?’
‘কারণ, বিত্তের প্রতি তোমার গভীর দুর্বলতা। ভবঘুরে শ্রেণির রাজনীতিবিদকে নিয়ে গল্প করে সময় কাটানো যায়, অতি গোপনে প্রেম প্রেম খেলায় মেতে থাকা যায়; কিন্তু তার সঙ্গে সংসার করা যায় না। তাই না?’
‘আর যদি সত্যি সত্যি তোমার কাছে চলে আসি!’
এর কোনো জবাব দিলো না সৈকত। অন্য সময় হলে রসিকতা করে বলতো, ‘চলো আসো, গ্রহণ করবো।’ কিন্তু এখন রসিকতার সময় নয়। কেয়া ফের বললো-
‘প্রশ্নটার জবাব চাই। তোমার কাছে চলে এলে আমাকে গ্রহণ করবে?’
সৈকত নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। ওর মনে হলো কেয়ার সঙ্গে আর লুকোচুরি খেলা ঠিক হবে না। ওদের সম্পর্কের যবনিকা এসে গেছে। ও বললো-
‘দেখো কেয়া, বাস্তবতা হচ্ছে, তুমি বিত্তশালী স্বামীকে ছেড়ে আমার কাছে আসতে পারবে না। আবার চলে এলেও আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারবো না। তোমার আমার মধ্যে যে সম্পর্কটা তৈরি হয়েছে, ওখানে প্রেম নেই।’
‘রিয়েলি! তাহলে তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছো? ভালোবাসার অভিনয় করেছো?’
‘না, তা নয়। তোমাকে আমি ভালোবাসতাম। তা ছিল একটা সময়ের এক পশলা আবেগ। তোমার সঙ্গে আবার যখন যোগাযোগ হলো, তখন আমি ভালোবাসার দাবি নিয়ে কখনো তোমার সামনে দাঁড়াইনি। তুমি জানতে তোমার প্রতি আমার দুর্বলতার কথা। তুমি এটাকে ব্যবহার করেছো। তুমি চাইতে বা এখনো চাও, আমি তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসবো। পাগলের মতো ভালোবেসে যাবো। আর তুমি দূর থেকে আমার অসহায় পাগলামিকে উপভোগ করে যাবে। বিত্ত-বৈভবের বিলাসি জীবনযাপনে তৃপ্ত হতে পারোনি তুমি। অখণ্ড অবসরের অবসাদ ছিল তোমার। তাই আমাকে পেয়ে তোমার মধ্যে এক ধরনের খেলার প্রবণতা জেগে ওঠে। প্রেমের অভিনয়ের খেলা। সেই পুরনো খেলাতেই মেতে উঠলে তুমি।’
‘আর তুমি?’
‘এবার আমি আগের মতো বোকা প্রেমিক ছিলাম না। আমি শুধু তোমার চালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছিলাম।’
‘চলছিলাম মানে, এই খেলা তাহলে শেষ।’
‘হ্যাঁ। এবার এর যবনিকা টানতে হবে। হবে কি, এসব কথা বলে ফেলার পর আর খেলা চলে না। তাই না?’
কেয়া আর কিছু বললো না। ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। কেয়ার এই কান্নাকে সহজভাবে নিলো সৈকত। মুখের ওপর যে কথাগুলো ও বলে দিয়েছে, তা শুনে যে কোনো মেয়ে কাঁদবে। অন্তত লজ্জায় হলেও কাঁদবে। সৈকত বাইরে তাকিয়ে দেখলো গাড়ি উত্তরা দিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি কোথায় যাচ্ছে, কে জানে। কেয়া নিশ্চয় ড্রাইভারকে আগেই বলে রেখেছে কোথায় যেতে হবে। ও একটু চিন্তিত হলো। গাড়ি শহর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। কেয়া ওকে বিপদে ফেলে দেবে না তো? নিজের ভেতরে অজানা ভয় ডানা মেললো। কেয়া চোখের জল মুছে নিলো। সৈকত অপরাধীর মতো চুপ করে আছে। কেয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘সৈকত, হয়তো তোমার কথাই ঠিক। তোমার আমার সম্পর্কের মধ্যে অভিনয়টাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’
সৈকত কিছু বললো না। ও গাড়ির আয়না দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো। কেয়া ফের বললো-
‘কিন্তু সৈকত তারপরও তোমাকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে একদিন।’
কেয়ার কথায় চমকে উঠলো সৈকত। ও মুখ ঘুরিয়ে কেয়ার দিকে তাকালো। বললো-
‘কেনো এ কথা বললে?’
‘অহনাকে তুমি পাবে না!’
কেয়ার এ কথায় ভীষণ অবাক হলো সৈকত। কেয়া কেনো এ কথা বললো, ও বুঝতে পারলো না। কিন্তু ওর মধ্যে একটা তোলপাড় শুরু হলো। অহনার প্রতি ও কি দুর্বল? যদি দুর্বল হয়েও থাকে, এটা কেয়া জানলো কী করে? সৈকত কেয়ার এ কথার কোনো জবাব দিলো না। ও চুপসে গেলো। ওর মনে হলো, কেয়া ওকে অভিশাপ দিলো। ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। কেয়া আর কিছু বললো না। ও ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো-
‘ড্রাইভার গাড়ি ঘুরাও। শাহবাগে যাও।’
সৈকত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আর যাই হোক, কেয়ার সঙ্গে আজ বোঝাপড়া হয়ে গেলো। তারপরও এক ধরনের কষ্টবোধ গ্রাস করছে ওকে। কেয়াকে এভাবে কঠিন কথাগুলো বলে ফেলে নিজের কাছে লজ্জাও লাগছে। শাহবাগ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সৈকত এবং কেয়া দুজনেই আর কোনো কথা বললো না। কথা না বলারও একটা কষ্ট টের পেলো সৈকত।
আট.
রাতুলকে এতো সহজে পেয়ে যাবে, তা কল্পনাও করেনি সৈকত। একেই বলে ফজলুল হকের ম্যাজিক। ফজলুল হক আজ সকালে নিজেই ফোন করে রাতুলের সেলফোন নম্বর দিলেন। সৈকত বাসা থেকে বের হচ্ছিল। এ সময় ফজলুল হকের ফোন এলো। রাতুল হ্যালো বলতেই ও-প্রান্ত থেকে ফজলুল হক বললেন-
‘সৈকত, তুমি যে রাতুলকে খুঁজছিলে, তার সেলফোন নম্বর পাওয়া গেছে। লিখে নাও।’
ফজলুল হকের কথা শুনে হঠাৎ করে সৈকতের হৃৎকম্পন বেড়ে গেলো। ও তাড়াতাড়ি পকেট থেকে কলম ও কাগজ বের করে রাতুলের নম্বরটি লিখে নিলো। রাতুলের ফোন নম্বর দিয়ে ফজলুল হক বললেন-
‘আমাকে জানিয়ো এই রাতুলকেই খুঁজছিলে কি-না।’
‘জ্বি, আচ্ছা। আপনাকে অবশ্যই জানাবো। আমার যে কী উপকার হলো, তা বলে বোঝাতে পারবো না।’
‘বুঝতে পারছি। কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হলে, ফোন করো।’
‘জ্বি, আচ্ছা।’
‘আর হ্যাঁ, ফারিয়া তোমার কথা বলছিল। তুমি নাকি ভালো গান গাও?’
ফজলুল হকের এ প্রশ্নে ভীষণ অবাক হলো সৈকত। গান সম্পর্কে ফজলুল হকের কখনো আকর্ষণ আছে বলে জানে না ও। তার সব কথা রাজনীতি নিয়ে। সব আকর্ষণ রাজনীতিতে। এই প্রথম তিনি সৈকতের সঙ্গে গানের কথা বলছেন। সৈকতের গানের গলাটা খারাপ নয়। একসময় গানের চর্চাও ও করতো। মিটিং-মিছিলে স্লোগান ও বক্তৃতা দিয়ে দিয়ে গলার অবস্থা এখন বেহাল। সৈকত গান গায় না অনেক বছর হলো। ফারিয়া ওর গানের কথা জানলো কী করে? জানলেও এ কথা সে ওর বাবাকে কেন বলেছে? ফারিয়ার উদ্দেশ্য কী? সৈকতের মনে প্রশ্নগুলো একসঙ্গে উঁকি দিলো। ফজলুল হকের কণ্ঠ ফের ভেসে এলো ফোনের ও-প্রাপ্ত থেকে।
‘কী হলো, কিছু বলছো না যে! তুমি কি সত্যিই গান গাও না-কি?’
সৈকত নিজেকে সংযত করে বললো-
‘একসময় একটু-আধটু গান গাইতাম। তবে বলার মতো তেমন কিছু নয়, ফজলু ভাই।’
‘ঠিক আছে, একদিন তোমার গান শুনবো। বাড়িতে একটা পার্টি দেবো শিগগিরই। কী বলো?’
‘তা দিয়েন। তবে যতোটা ভাবছেন, আমি ততোটা ভালো শিল্পী নই। এখন আর কণ্ঠে সুর উঠতে চায় না।’
‘তারপরও গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমার মেয়ে তোমার গানের খুব ভক্ত। কবে কোথায় না-কি ও তোমার গান শুনেছিল।’
ফজলুল হকের এ কথা শুনে অস্বস্তি হতে লাগলো সৈকতের। এর জবাবে ও কী বলবে, তা বুঝতে পারছে না। সৈকতের কোনো সাড়া না পেয়ে ফজলুল হক বললেন-
‘ঠিক আছে, আমি ফোন ছাড়ছি। তুমি রাতুলকে ফোন করে নিশ্চিত হও, এই রাতুলকেই তুমি খুঁজছো কি-না। তোমার সঙ্গে পরে কথা হবে।’
‘ঠিক আছে ফজলু ভাই। স্লামালাইকুম।’
‘অলাইকুম, সালাম।’
ফজলুল হক ফোন কেটে দিলেন। সৈকত একটু চিন্তিত হলো ফারিয়াকে নিয়ে। ফারিয়া ওকে নিয়ে কেনো এই রহস্য করছে, ও বুঝতে পারছে না। সৈকত ফারিয়ার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলো। ও আর দেরি করতে চায় না। ও ফোন করলো রাতুলকে। ও-প্রান্তে ফোন পিকআপ করলো রাতুল-
‘হ্যালো।’
‘হ্যালো, আপনি রাতুল বলছেন?’
‘হ্যাঁ, আপনি?’
‘আমাকে চিনবেন না।’
‘তাহলে আমাকে ফোন করেছেন কেনো?’
রাতুলের এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সৈকত প্রশ্ন করলো-
‘আপনি কি রায়নাকে চেনেন?’
ও-প্রান্তে কোনো সাড়া নেই। সৈকত নিশ্চিত হলো যে রাতুলকে অহনা খুঁজছে, এই সেই ব্যক্তি। রায়নার নাম শোনামাত্র চুপসে গেছে। সৈকত ফের বললো-
‘আমি ঠিক জানি না, আপনি সেই রাতুল কি-না।’
‘আপনি কে?’
‘আমার নাম সৈকত। আমরা এক রাতুলকে খুঁজছি, যিনি সিডনিতে ছিলেন।’
‘আমি সিডনিতে ছিলাম।’
‘আপনি কি রায়নাকে চিনতেন?’
‘কেনো এ প্রশ্ন করছেন?’
রাতুলের এই পাল্টা প্রশ্নে সৈকত বুঝতে পারলো কোথাও একটা সমস্যা তৈরি হয়ে আছে। রাতুল রায়নাকে চেনে কিন্তু রায়নাকে নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছে না। কী হতে পারে এর অন্তর্নিহিত কারণ? প্রশ্নটি ভেবে একটু কৌশল অবলম্বন করে বললো-
‘না, মানে, রায়না ভীষণ অসুস্থ কি-না!’
‘রিয়েলি! কী হয়েছে ওর?’
এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সৈকত। বললো-
‘না, মানে, আপনাকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল একবার!’
‘বলেন কী!’
রাতুলের কণ্ঠ থেকে যেনো আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। সৈকত রাতুলের মুখ দেখতে না পেলেও কল্পনায় ওর মুখ দেখতে পাচ্ছে। রাতুলের মুখে রক্তশূন্যতা। ওর চোখে কষ্টের মেঘ। ও যেনো দম নিতে পারছে না। রাতুলের জন্য একটু মায়া হলো সৈকতের। ও বললো-
‘হ্যালো, রাতুল, শুনছেন…?’
এর কোনো জবাব পেলো না সৈকত। রাতুল ফোনে আছে এটা বুঝতে পারলো। ও আবার বললো-
‘রাতুল, আপনি কি আমার কথা শুনছেন?’
‘হ্যাঁ, শুনছি। বলুন।’
‘আপনি কেনো সিডনি যাচ্ছেন না? রায়না আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।’
‘কিন্তু!’
‘কিন্তু কী?’
‘আপনি রায়নার কি হোন? আমার সেলফোন নম্বর পেলেন কী করে?’
জানতে চাইলো রাতুল। জবাবে সৈকত বললো-
‘আমি রায়নার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আর আপনার সেলফোন নম্বর সংগ্রহ করা কি খুব কঠিন? অন্তত আমার কাছে কোনো কাজই কঠিন নয়।’
কথাটি বলে ফেলে নিজের ভেতর এক ধরনের অহংকার টের পেলো সৈকত। ও ফের বললো-
‘রাতুল, আপনার সমস্যাটি কী, বলুন তো? রায়না আপনার জন্য মরতে বসেছে, আর আপনি ঢাকা শহরে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ব্যাপারটা কী?’
এর জবাবে কিছু বললো না রাতুল। তবে ফোনের লাইনে আছে। সৈকত বললো-
‘কথা বলুন, রাতুল। চুপ করে থাকবেন না, প্লিজ!’
‘কী বলবো।’
‘কেনো সিডনি যাচ্ছেন না? কেনো রায়নার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন?’
‘আমার বলার কিছু নেই যে! রায়নার কাছে ফিরে যাবার পথও আমার নেই, সৈকত ভাই।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
এবারো চুপ করে রইলো রাতুল। সৈকত বললো-
‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই, রাতুল। সময় দেবেন?’
‘দেখা হলে কী হবে?’
‘অন্তত দুজনে বসে আপনাদের সমস্যার কথা শুনবো। কেনো রায়নার কাছে ফিরে যাচ্ছেন না, এ প্রশ্নের জবাব জানাটা খুবই জরুরি।’
‘এটা তো ফোনেও বলতে পারি।’
‘ফোনেও বলুন। তারপরও আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। কখন সময় দিতে পারবেন, বলুন।’
আবারো চুপ করে রইলো রাতুল। সৈকত হতাশ হলো না। ওর মনে হচ্ছে, রাতুল দেখা করবে। যে কারণেই রাতুল রায়নার কাছে ফিরে না যাক, ওর প্রতি যে বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে- এটা সৈকত বুঝতে পারছে। সৈকত রাতুলের সঙ্গে কথা বলার মধ্যে এক ধরনের থ্রিল উপভোগ করছে। ও বললো-
‘আপনি আমার কথা শুনেছেন?’
‘হ্যাঁ, শুনেছি।’
‘তাহলে সময় দিন, প্লিজ! ভয়ের কিছু নেই। আমি আপনার সমস্যার কথাও শুনতে চাচ্ছি।’
‘না, মানে…। ঠিক আছে।’
‘তাহলে বলুন, কোথায় এবং কখন আমাদের দেখা হচ্ছে। সম্ভব হলে আজই সময় দিন।’
‘ঠিক আছে রাত আটটায় চলে আসুন হোটেল শেরাটনের লবিতে। সুইমিংপুলের পাশে যে কোনো একটি টেবিলে আমি থাকবো।’
‘আপনাকে আমি চিনবো কিভাবে?’
‘আমার টেবিলে ‘রাতুল’ নাম লেখা একটি ডেস্ক সাইনবোর্ড থাকবে।’
‘গুড! তাহলে দেখা হচ্ছে আজই।’
‘হ্যাঁ। তবে একটা প্রশ্ন।’
‘বলুন।’
‘রায়না ঢাকায় আসেনি তো?’
রাতুলের কণ্ঠ ভয়ার্ত মনে হলো। সৈকত ছোট্ট করে হেসে বললো-
‘ভয় নেই। রায়না ঢাকায় আসেনি। তাহলে আজ রাতেই দেখা হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, হচ্ছে।’
‘প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন তো?’
‘কথা দিচ্ছি থাকবো। আপনি আসুন। সাক্ষাতে কথা হবে।’
বললো রাতুল। সৈকতের ভেতর থেকে যেনো একটা পাথর নেমে গেলো। ও বললো-
‘ঠিক আছে, তাহলে রাখছি।’
‘আচ্ছা।’
সৈকত ফোনের লাইন কেটে দিলো। ওর মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। এতো সহজে রাতুলকে বের করে ফেলবো, ও কখনো ভাবেনি। সৈকত ঠিক করে নিলো ও এখনই ফোন করবে অহনাকে। সবার আগে অহনাকে এই খবরটা জানানো দরকার। অহনা নিশ্চয় অবাক হবে। সৈকতের মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে গেলো। ও ফোন করলো অহনার সেলফোনে। ও-প্রান্তে তিনবার রিং হতেই অহনা ফোন ধরলো।
‘হ্যালো, বলুন।’
‘কেমন আছেন?’
‘মন্দ নয়। আপনি?’
‘আমি এ মুহূর্তে ভীষণ আনন্দের জোয়ারে ভাসছি।’
‘কেনো?’ কী অমন হলো বাংলাদেশে? আপনার প্রিয় কোনো নেতা কি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছেন?’
‘তার চেয়েও বেশি আনন্দের সংবাদ আছে। তার আগে বলুন, আপনি কী করছিলেন?’
‘আমি বাইরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম।’
‘কোথায় যাচ্ছেন?’
‘ঢাকা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে একটু ঘুরে বেড়াবো।’
‘আমাকে সঙ্গে নেবেন না?’
জানতে চাইলো সৈকত। অহনা বললো-
‘আপনার কথা প্রথমে ভেবেছিলাম। পরে ভাবলাম, আপনি আবার কখন আমাকে একা ফেলে রেখে কোথায় চলে যাবেন, কে জানে!’
সৈকত বুঝতে পারলো দুদিন আগে শাহবাগের ঘটনার কথা। অহনা দেরিতে এসে পৌঁছলেও ও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল পাবলিক লাইব্রেরির প্রধান ফটকের সামনে। সৈকত তখন ছিল কেয়ার গাড়িতে। ওর সেলফোন বন্ধ ছিল। বিষয়টি অহনাকে বিব্রত করেছে। এর জন্য পরে ফোন করে সৈকত অহনার কাছে ক্ষমাও চেয়েছে। অহনা তেমন কিছু বলেনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, অহনার রাগ উবে যায়নি। সৈকত বিনীত কণ্ঠে বললো-
‘সেদিনের ঘটনার জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত। খুবই দুঃখিত।’
‘ঠিক আছে, আর দুঃখ প্রকাশ করতে হবে না।’
‘আমার প্রতি আপনার রাগ এখনো যায়নি বুঝি?’
‘আপনার ওপর রেগে থাকার আমার কি অধিকার আছে?’
প্রশ্নটি যেনো হঠাৎ করে একটি দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ওদের মধ্যে যে সম্পর্কটি তৈরি হয়েছে, এর নাম না থাকলেও এ প্রশ্নটি এখন ওদের সম্পর্কের মধ্যে কাঁটা বিধিয়ে দিলো। সৈকত একটু বিব্রত হলো। ও হতাশার দীর্ঘশ্বাস চেপে বললো-
‘যে কুড়ি পাপড়ি মেলে ফুল হয়ে ফুটতে চায়, সে কখনো ফোটার অধিকার নিয়ে ফোটে না। কুড়ির ফুল হয়ে ফোটার চলমান প্রক্রিয়াটিই একটি গ্রহণযোগ্য অধিকার। মানুষের মধ্যেও এমন কিছু অধিকার জন্ম নেয়, যা চলমান প্রক্রিয়ার মতোই স্বাভাবিক। এই অধিকার ঘোষণা দিয়ে হয় না। আবার এ ধরনের প্রক্রিয়া বা অধিকার প্রতিষ্ঠার সহজাত উচ্ছ্বাসকে বাধা দেয়ারও কিছু নেই। নিয়তি, প্রকৃতি কিংবা নিজের ভেতরের সত্ত্বার অপার্থিব নির্দেশে যা ঘটার কথা, তার জন্য আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন আছে কি? আপনি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, আমাদের সম্পর্কটা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, এর মধ্যে দুজনের প্রতি দুজনার এক ধরনের অধিকার জন্ম নিয়েছে। জন্ম নেয়নি কি?’
এ কথা বলে সৈকতের মনে হলো ও কথার পাহাড় নাড়িয়ে দিয়েছে। ওর নিজেকে হালকা লাগছে। কথাগুলো বলে ভাবের গভীরতায় তলিয়ে যেতে লাগলো ও। অহনা কিছুক্ষণ কথা বললো না। একটু সময় নিয়ে ও বললো-
‘শুনেছি, আপনি ফার্মাসির ছাত্র। এখন তো মনে হচ্ছে সাহিত্য, যুক্তি বা মনোবিজ্ঞান পড়লে ভালো করতেন।’
এর জবাবে কিছু বললো না সৈকত। অহনার একঝলক হাসির শব্দ শুনতে পেলো সৈকত। ওর মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। অহনা ফের বললো-
‘আপনি কি রেগে গেছেন?’
‘আপনার প্রতি আমার রাগ বা অনুরাগ জন্ম নিলে এর অধিকারও আমার নিজের ভেতর সপ্রণোদিতভাবে তৈরি হবে। আমি এর জন্য আপনার অনুমতি চাইবো না।’
‘ঠিক আছে, কথাটি মনে থাকবে। এখন একটু শান্ত হোন।’
সৈকত শান্ত হয়ে এলো। ও-প্রান্ত থেকে অহনার প্রশ্ন ভেসে এলো-
‘আপনি এখনো বলেননি আনন্দের সংবাদটি কী?’
‘এ কথা শুনলে আপনিও ভীষণ আনন্দিত হবেন।’
‘তাহলে বলছেন না কেনো? আনন্দের সংবাদ না দিয়ে সকাল-সকাল ঝগড়া করলেন আমার সঙ্গে!’
এ কথায় মৃদু হাসলো সৈকত। ও বললো-
‘রাতুলকে পেয়েছি।’
‘কী বললেন!’
‘রাতুলের সন্ধান পাওয়া গেছে।’
‘সত্যি!’
‘হ্যাঁ, সত্যি।’
‘আপনি সত্যিই জিনিয়াস!’
‘ধন্যবাদ।’
‘সে কোথায়? কিভাবে দেখা করতে পারি?’
অহনার কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা। সৈকত বললো-
‘আহা উত্তেজিত হবেন না। শান্ত হোন, বলছি।’
‘বলুন। তার সঙ্গে কবে দেখা করতে পারি?’
‘আজই দেখা করবো আমরা।’
‘রিয়েলি! তার সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার?’
‘হুম। এই কিছুক্ষণ আগে রাতুলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি।’
‘বলেন কি! এক্সসিলেন্ট! আপনি গ্রেট!’
‘আপনি বেশি প্রশংসা করে ফেলছেন। যাক গে, আপনি কি রাতুলের সঙ্গে দেখা করতে চান?’
‘অবশ্যই।’
‘তাহলে সন্ধ্যায় তৈরি থাকবেন।’
‘রাতুল কি আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলেছে।’
‘হ্যাঁ, সে রাজি হয়েছে। সময়ও দিয়েছে।’
‘কোথায় দেখা করবেন?’
‘হোটেল শেরাটনের লবিতে ও থাকবে। রাত আটটায় ও থাকবে সুইমংপুলের পাশের একটি টেবিলে। ওর টেবিলে রাতুল নামের একটি ডেস্ক সাইনবোর্ড থাকবে।’
‘বাহ! চমৎকার আয়োজন।’
‘আপনি খুশি হয়েছেন?’
‘আপনার কাজে আমি মুগ্ধ।’
‘তাহলে আমরা যাচ্ছি শেরাটনে।’
সৈকতের এ কথার জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলো অহনা। ও হয়তো কিছু ভাবছে। সৈকত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফের বললো-
‘কী ভাবছেন?’
‘ভাবছি, ওখানে আমি একা গেলে কেমন হয়?’
‘একা যাবেন? কেনো?’
‘আপনাকে সঙ্গে না নিয়ে গেলে কি মাইন্ড করবেন?’
‘না, না। মাইন্ড করার কী আছে। তবে…।’
‘নিরাপত্তার কথা বলবেন তো?’
‘হ্যাঁ, সমস্যাও তো হতে পারে।’
‘শেরাটন বলেই ওখানে আমি একা যেতে চাচ্ছি।’
‘ঠিক আছে। রাত আটটায় আপনি চলে যাবেন শেরাটনে।’
কথাটি বলতে গিয়ে চুপসে গেলো সৈকত। ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। কেনো ওর মন খারাপ হলো ও বুঝতে পারছে না। রাতুলকে খুঁজে বের করাটাই ছিল ওর কাজ। ওর দায়িত্ব শেষ। এখন অহনা ওকে সঙ্গে নিচ্ছে না বলে ও বিষণ্ন হয়ে গেলো। অনেক সময় অনেককে গ্রাস করে অযাচিত বিষণ্নতা। সৈকত এ মুহূর্তে আযাচিত বিষণ্নতায় ডুবে যেতে লাগলো। ফোনের ও-প্রান্ত থেকে অহনা ‘হ্যালো, হ্যালো’ বলছে। অহনার কথা সৈকত যেনো শুনতে পাচ্ছে না। একসময় ফোনের লাইনটা কেটে গেলো।
নয়.
অহনার আচরণে ভীষণ অবাক হলো সৈকত। ও ভেবেছিল অহনা ওকে ফোন করে জানাবে, রাতুলের সঙ্গে দেখা হলো কি-না। কিংবা রাতুলের সঙ্গে দেখা হবার পর কী আলোচনা হলো। রাতুল অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাচ্ছে কি-না। যদিও এসব অহনাদের পারিবারিক ব্যাপার, তারপরও সৈকত এ ঘটনার সঙ্গে অনেকটাই জড়িয়ে গেছে। সৈকতের এ বিষয়ে কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু অহনা ফোন করে সৈকতকে কিছু জানায়নি। মধ্যরাত অবধি ও অহনার ফোনের অপেক্ষা করেছে। রাত পেরিয়ে গেলো; কিন্তু অহনার ফোন এলো না। অহনার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ আশা করেনি ও। সৈকত কি খুব বেশি আশা করে ফেলেছে? সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই নিজে নিজে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজছে ও। ঘুম ভাঙার পর থেকে ও অস্বস্তিতে রয়েছে। প্রথমে ভেবেছিল, অহনাকে ও নিজে ফোন করে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু অহনার প্রতি ওর অভিমান জমে গেলো। এই অভিমানে চাপা রাগের রং তেতে উঠছে। এই অনাহুত অভিমান ওকে কষ্ট দিচ্ছে। সৈকত নিজের বিছানায় শুয়ে এ-পাশ ও-পাশ করছিল। এ সময় সুমনের ফোন এলো। ও ফোন ধরলো।
‘হ্যালো।’
‘সৈকত? কেমন আছিস?’
‘ভালো। তুই?’
‘আমি আগের মতোই ব্যস্ত।’
‘তো কী খবর? অনেকদিন পর ফোন করলি।’
‘হ্যাঁ, প্রথমে তোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
‘কেনো?’
‘রাতুলকে খুঁজে বের করতে পেরেছিস বলে।’
‘ও আচ্ছা। ওয়েলকাম।’
‘দোস্ত, তুই আসলে জিনিয়াস!’
‘হয়েছে, হয়েছে। তেল মারছিস কেনো?’
‘না, না, তেল নয়। তুই মনে হচ্ছে কেমন চুপসে আছিস? মুড ভালো নেই?’
‘না, তা নয়। ঘুম ভেঙেছে মাত্র। শুয়ে এ-পাশ ও-পাশ করছি।’
‘তা শোন, তুই কি আজ একবার আমার অফিসে আসতে পারবি?’
‘কেনো?’
‘বাহ রে! পাঁচ লাখ টাকার চেক নিবি না? তোর কাজ তো শেষ।’
‘ও আচ্ছা।’
‘এতো ও আচ্ছা করছিস কেনো? তোকে আজ কেমন বিষণ্ন লাগছে বন্ধু। কী ব্যাপার?’
এর জবাবে কিছু বললো না সৈকত। ফোনের ও-প্রান্ত থেকে সুমন ফের বললো-
‘অহনার সঙ্গে তোর কোনো মনোমালিন্য হয়েছে?’
‘কেনো এ প্রশ্ন করছিস?’
‘না, অহনাকে দেখে এলাম বিষণ্ন। ও কাল রাত থেকে একেবারেই চুপসে গেছে।’
এ কথা শুনে কোথাও যেনো বরফ গলতে শুরু করলো। সৈকত একটু বিচলিত হলো। ও প্রশ্ন করলো-
‘কেনো এখন তো ওর মন ভালো থাকার কথা। রাতুলের সন্ধান পেয়ে গেছে।’
‘সন্ধান পেলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? সমস্যা তো আরো বাড়তেও পারে।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘তোকে কিছু বলেনি অহনা?’
এ প্রশ্নে বিব্রতবোধ করলো সৈকত। ও কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো-
‘দোস্ত, অহনাকে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ওর মধ্যে গভীর রহস্য রয়েছে।’
এ কথায় ও-প্রান্তে হাসতে লাগলো সুমন। সৈকত সংকোচবোধ করলো না। সুমনের সঙ্গে সম্পর্কটা এমনই। ওরা কথা বলে অকপটে, নিঃসংকোচে। হাসি থামিয়ে সুমন বললো-
‘যাক তুই যদি এই রহস্য উদঘাটনে নেমে পড়িস, আমার কোনো আপত্তি নেই। চেষ্টা করে দেখ।’
এ কথায় স্বস্তি পেলো সৈকত। ও বললো-
‘তোর কাজিন কি আমাকে সে সুযোগ দেবে? ও ভীষণ মুডি?’
‘এটা তোর আর ওর ব্যাপার।’
‘তা বুঝলালম; কিন্তু অহনা আমাকে কাল রাত থেকে ফোন করেনি।’
‘ঠিক আছে, তুই ফোন কর। আর হ্যাঁ, অফিসে এসে পাঁচ লাখ টাকার চেক নিয়ে যাস।’
‘না। টাকা আমি নেবো না।’
‘কেনো?’
‘এতো ছোট একটা কাজের জন্য এতো টাকা নেয়া যায় না। তা ছাড়া আমি ভেবে রেখেছিলাম কাজটি করার পর টাকা নেবো না।’
টেলিফোনের ও-প্রান্তে সুমনের মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পেলো সৈকত। ও বললো-
‘আমি সিরিয়াস, টাকা নিচ্ছি না।’
‘এই টাকা তাহলে অহনাকে ফিরিয়ে দেবো?’
‘হ্যাঁ, ফিরিয়ে দে।’
‘ঠিক আছে। তবু তুই দুপুরে অফিসে আসিস। আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করবো।’
‘আচ্ছা, আসবো।’
‘তাহলে দেখা হচ্ছে, দুপুরে।’
‘হ্যাঁ। একটা প্রশ্নের জবাব দিবি? প্রশ্নটা করছি নিজের কৌতূহলবশত।’
‘কী প্রশ্ন, বল।’
‘রাতুল অহনাকে কী বলেছে?’
এ প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সুমন। সৈকত অপেক্ষা করছে। একসময় সুমন বললো-
‘খুব সংক্ষেপে বলছি। রাতুল এখানে বিয়ে করে ফেলেছে। রাতুল অহনাকে জানিয়েছে ও পরিবারের চাপে পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে। এ কারণে ও নাকি সিডনিতে ফিরে যায়নি। নিজের অসহায়ত্তের কথা জানিয়ে রায়নাকে কষ্ট দেবার জন্য অহনার কাছে ক্ষমা চেয়েছে রাতুল।’
‘বলিস কী!’
‘হ্যাঁ। অহনার খুব মন খারাপ। হয়তো এ কারণে ও তোকে ফোন করেনি। তুই ওকে ফোন কর। আর হ্যাঁ, রাতুলের কথা আপাতত জিজ্ঞেস করিস নে। গল্প করতে পারিস। এতে ওর মন হালকা হতে পারে।’
সৈকতের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। অহনার প্রতি জিইয়ে থাকা অভিমান বা রাগ মিলিয়ে গেলো। সুমন প্রান্ত থেকে বললো-
‘ফোন রাখছি, কেমন? তুই কথা বলে নিস অহনার সঙ্গে।’
‘আচ্ছা।’
সুমন ফোন লাইন কেটে দিলো। সৈকতের ভাবতে লাগলো অভিমান ভুলে অহনাকে একটা ফোন করলে কেমন হয়। এমন কী হয়েছে যে, অহনা চুপসে গেছে? কেনো ওকে ফোন করেনি? অহনা কি আরো জটিল কোনো সমস্যায় পড়ে গেছে? এ কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ও ফোন করলো অহনার সেলফোনে। অহনা ফোন ধরে বললো-
‘হ্যালো।’
অহনা কণ্ঠে যেনো হেমন্তের মেঘ জমে আছে। কেমন ভেজা ভেজা। সৈকত নরম গলায় বললো-
‘কেমন আছেন?’
অহনা এর জবাবে কিছু বললো না। ও চুপ করে রইলো। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে সৈকত ফের বললো-
‘আমি আশা করেছিলাম আপনি আমাকে ফোন করবেন। আমি নিজেই ফোন করলাম, কিন্তু আপনি কথা বলছেন না। আপনি কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন না?’
‘না, ঠিক তা নয়।’
‘তাহলে?’
‘আমার মনটা ভালো নেই। আই মিন আই এম ব্রোকেন।’
‘হোয়াই? এনি থিংস রঙ?’
এ প্রশ্নের জবাব দিলো না অহনা। সৈকত বললো-
‘অহনা, আমি রাতুলের ব্যাপারে কৌতূহল দেখাতে চাই না। আপনাদের পারিবারিক ব্যাপারে নিজের ব্যক্তিগত কৌতূহল দেখানোর ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কিছু কথা বলার প্রয়োজন আছে।’
‘বলুন।’
সৈকত এবার কয়েক মুহূর্ত ভাবলো। অহনা নিশ্চয় দু-একদিনের মধ্যে চলে যাবে। অহনার মনের অবস্থা জেনে নিতে চায় সৈকত। ও ‘অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো’ প্রশ্ন করলো-
‘অহনা আপনি কি অস্ট্রেলিয়াতেই সেটেলড হতে চান? না-কি প্রয়োজনে বাংলাদেশে থাকতে রাজি হবেন?’
‘কেনো এ প্রশ্ন করছেন?’
‘না, জানতে চাচ্ছি, আপনাদের মতো মেধাবী যারা আছেন, তারা যদি দেশে থাকেন, তাহলে দেশের জন্য মঙ্গলজনক।’
‘যদি থাকতে চাই, তাহলে আমাকে কী করতে হবে?’
‘এ দেশের সন্তান এমন কোনো যোগ্য ছেলেকে আপনি বিয়ে করতে পারেন।’
খুব সাহস করেই কথাটি বলে ফেললো সৈকত। অহনা কিছু বললো না। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষার পর সৈকত বললো-
‘এ প্রশ্ন শুনে আপনি কি রাগ করলেন?’
‘না, রাগ করিনি। তবে ভাবছি, আপনি ঘটকালীও করেন কি-না।’
‘এখনো করিনি। তবে আপনার জন্য আমি এ কাজটি করতে রাজি আছি।’
‘আমার প্রতি আপনার এই বিশেষ টান কেনো?’
এ প্রশ্নের জবাবে কী বলবে, সৈকত ঠিক করতে পারলো না। এতো সহজেই যে, এ প্রশ্নটা এসে যাবে, ও বুঝতে পারেনি। ও একটু এলোমেলো চিন্তার মধ্য দিয়ে বললো-
‘আসলে আমি চাই না, আপনি অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। আপনার মধ্য বাংলাদেশের কোমল সৌন্দর্য দেখতে পাই আমি।’
‘তাই না-কি? আর কী কী দেখতে পান আপনি?’
অহনার প্রশ্নে সৈকত বললো-
‘আপনার কথায় তেরশ নদীর ঢেউ দুলে ওঠে। আপনার হাসিতে জ্যোৎস্নার লাবণ্য ঝরে পড়ে। আপনার চোখে ছয় ঋতুর বর্ণিল বৈচিত্র্যতা দেখতে পাই। আপনার সান্নিধ্যে নিবিড় মমতার স্পর্শ পাই।’
সৈকত কথাগুলো বললো এক ধরনের তন্ময়তায়। ও-প্রান্তে অহনা কী ভাবছে, জানে না ও। অহনা যা-ই ভাবুক, যেভাবেই এ কথাগুলো নিক, সৈকত এ নিয়ে চিন্তিত নয়। সময়মতো নিজেকে প্রকাশ করতে না পারলে অহনার হৃদয়ে করাঘাত করার সুযোগ ও আর পাবে কি? অহনা বেশ কিছুক্ষণ এর কোনো জবাব দিলো না। সৈকত হতাশ না হয়ে ফোনের লাইনে চুপ করে রইলো। একসময় অহনার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-
‘সৈকত, আপনি সব কিছুতে সহজেই মুগ্ধ হয়ে যান।’
‘মানে?’
‘আপনি কি জানেন, চট করে মুগ্ধ হয়ে যাওয়ায় ভয় আছে।’
‘কিসের ভয়?’
‘হারানোর ভয়।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
নিজের অসহায়ত্ত প্রকাশ করলো সৈকত। অহনা বললো-
‘মুগ্ধতা ভালো। এটা সহজাত। আবেগের হালাকা প্রলেপের মতো। কিন্তু গভীর মুগ্ধতা চরিত্রের দুর্বল দিক। ব্যক্তিত্বকে হালকা করে তোলে। তা ছাড়া এতে সংশয়ও থেকে যায়।’
এ পর্যন্ত বলে থামলো অহনা। বিব্রতকণ্ঠে সৈকত বললো-
‘থামলেন কেনো, বলুন।’
অহনা বললো-
‘পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হবার অসংখ্য বস্তু আছে, মানুষও আছে। মুগ্ধ হতে পারেন; কিন্তু জমে যাওয়া ঠিক নয়। ওই মুগ্ধতাকে নিজের ভেতরের শুদ্ধতা দিয়ে, পবিত্র অনুভূতি দিয়ে উপভোগ করুন, ঠিক আছে। কিন্তু নিজেকে বিচ্যূত করলে পথভ্রষ্ট হবার আশঙ্কা বেশি। অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন।’
অহনার কথায় হোঁচট খেলো সৈকত। অহনার চমৎকার বাংলা বলা ওর ভালো লাগে। তার ওপর এমন ব্যাখ্যা কার না ভালো লাগবে। কিন্তু অহনার কথাগুলো কি মেনে নেয়া যায়? সৈকত বললো-
‘আধুনিক জীবনযাপনে চট করে মুগ্ধ হবার প্রতিযোগিতাই না-কি বেশি? এ নিয়েই তো মেতে আছে পশ্চিমারা। তাই না?’
জবাবে অহনা বললো-
‘এটা আধুনিকতার নামে কপটতা। তা ছাড়া তর্কের খাতিরে এটাকে যদি আধুনিকতা ধরেও নিই, আমি এই আধুনিকতার সমর্থক নই। আমি কথা বলছি, নান্দনিকতার। আধুনিকতা আর নান্দনিকতা এক নয়।’
সৈকত একটু চিন্তা করে বললো-
‘আমি কি নান্দনিকতার পক্ষের লোক নই? রাজনীতি করি বলে কি আমরা নান্দনিকতাকে বিসর্জন দিয়েছি?’
‘আমি কিন্তু তা বলিনি? আপনার সম্পর্কে আমার ধারণা ও রকম নয়। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, একপলকে মুগ্ধ না হয়ে অপেক্ষা করুন। অনুধাবন করুন। নিজেকে আরো ভালো করে প্রস্তুত করুন। এরপর এক্সপ্রোজ করুন দৃঢ়চিত্তে, নিঃসংকোচে। যা হাত বাড়িয়ে ধরতে চান, আগে দেখুন সে মরীচিকা কি-না!’
এরপর কী বলা যায়? সৈকত আরো বিব্রতবোধ করতে লাগলো। অহনার সঙ্গে কথায় হেরে যেতে হচ্ছে। ও বললো-
‘আসলে কী, আমার নিজের পছন্দের প্রতি নিজের অন্ধ বিশ্বাস রয়েছে। তাই আমি যাকে পছন্দ করি, তা মরীচিকা হতে পারে না- এটাই আমার বিশ্বাস। নিজের পছন্দ নিয়ে নিজের বিশ্বাসে আমি দ্বিধা বা সংশয় ছড়াতে চাই না। আপনি আমাকে সেদিকে নিয়ে যাবেন না, প্লিজ!’
অহনা এর কোনো জবাব দিলো না। সৈকতের মনে হচ্ছে ও যেনো অহনার হৃৎপিণ্ডের ‘ধুক ধুক’ শব্দ শুনতে পাচ্ছে। অহনা কি ভেঙে পড়ছে? অহনা নামক এক অনড় পাহাড় কি ভেঙে নদী হয়ে ধেয়ে আসছে সৈকতের দিকে? সৈকত কি ভেসে যেতে পারে না অহনা নদীর ফল্গুধারায়? এই মুহূর্তে এ প্রশ্নটাই রংধনুর মতো জ্বলজ্বল করছে সৈকতের আবেগ ভেজা মনের আকাশে। সৈকত ও অহনা কেউ আর কোনো কথা বললো না। ওরা কথা না বললেও কেউ ফোনের লাইন কাটছে না। মৌনতার সুতোয় কে যেনো বুনে যাচ্ছিল বিমূর্ত মুহূর্তহুলো। কিছুক্ষণ পর অহনা ফোনের লাইন কেটে দিলো। সৈকতের মন খারাপ হলো না। ও অদ্ভুত স্বপ্নঘোরে ডুবে গেলো।
দশ.
অনেকদিন পর কেয়া ফোন করলো। যদিও কেয়াকে নিয়ে সৈকতের আবেগ মথিত স্বপ্ন নেই, তবু একেবারে যে ওকে নিয়ে ওর মনে আবেগ মাঝে মাঝে তৈরি হয় না, তা নয়। অবচেতন মনে কেয়ার প্রতি বিবর্ণ হয়ে যাওয়া অনুরাগ মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে। সৈকত এই অনুরাগকে প্রশ্রয় দেয় না। তবে কিছুদিন আগেও এই অনুরাগের প্রশ্রয় ছিল। অহনার সঙ্গে পরিচয় হবার পর থেকে সৈকত কেয়া ও ওর মাঝখানে বিশাল দূরত্ব আবিষ্কার করে। সৈকতের উপলব্ধিতে আসে, কেয়ার সঙ্গে অনুরাগের যে গোপন সম্পর্কটা তৈরি করেছে, তা কখনোই কোনো পরিণতির দিকে যাবে না। পরিণতিহীন কিংবা গন্তব্যহীন পিচ্ছিল পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া সময়ের অপচয় ছাড়া আর কী? এ প্রশ্নটা সৈকতকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। অহনার সঙ্গে পরিচয় হবার আগ পর্যন্ত গোপন অনুরাগের পথে হাঁটতে ছিল ও। অহনা হঠাৎ ঝড়ের মতো এসে সৈকতের সম্বিত ফিরিয়ে দিয়েছে। কেয়ার ফোনটি একটু সময় নিয়ে রিসিভ করতে করতে এ কথাগুলো ভাবলো সৈকত। ফোনে কেয়ার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-
‘হ্যালো, সৈকত তুমি কোথায়?’
কেয়ার কণ্ঠস্বর যেনো কেমন মনে হলো। সৈকত বললো-
‘আমি ধানমন্ডিতে। কেনো?’
‘তুমি কি কোনো গোপন মিটিংয়ে যাচ্ছো?’
এ প্রশ্ন শুনে অবাক হলো সৈকত। ও সত্যিই একটি গোপন মিটিংয়ে যাচ্ছে। ফজলুল হক ভাই ডেকেছেন। ধানমন্ডির ঝিগাতলায় একটি বাড়ির ঠিকানা দিয়ে তিনি ওকে আসতে বলেছেন। রাজনৈতিক কারণে এ মিটিংটি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ঢাকা নগরীতে রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর থেকে নিষোধাজ্ঞা প্রত্যহার করেছে সরকার, তবু রাজনৈতিক সভা বা বৈঠক খুব একটা হচ্ছে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোতে নেতৃত্বশূন্যতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট। বেশ জোরালোভাবে বইছে সংস্কারের হাওয়া। সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থার গোয়েন্দারা সতর্কতার সঙ্গে ওয়াচ করছে প্রায় প্রতিটি দলের নেতাদের কর্মকাণ্ড। এমনই অবস্থায় ফজলুল হক ভাইয়ের গোপন মিটিংয়ের ডাক কৌতূহলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণও কম নয়। গোপন মিটিংয়ের কথা শুনে প্রথমে চমকে গিয়েছিল সৈকত। ফজলুল হক ভাই আগেই ওকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। হয়তো এই মিটিং থেকে কোনো দিক-নির্দেশনা আসতে পারে। সৈকত এই গোপন মিটিংয়ের কথা কাউকে বলেনি। কিন্তু কেয়া কী করে এই মিটিংয়ের কথা জানলো? সৈকতের মনে এ প্রশ্নটা বিস্ময় ছড়িয়ে দিলো। টেলিফোনের ও-প্রান্ত থেকে কেয়া বললো-
‘তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু…!’
‘আমি জানি, তুমি জানতে চাইবে তোমাদের গোপন মিটিংয়ের কথা আমি কী করে জানলাম।’
‘হ্যাঁ, তুমি কী করে জানলে?’
‘সেটা পরে বলবো। এখন আমার কথা শোন, তুমি ওই মিটিংয়ে যেয়ো না, প্লিজ!’
‘কেনো?’
‘তোমার বিপদ হতে পারে।’
এ কথায় না হেসে পারলো না সৈকত। ও বললো-
‘শোন, আমার ওপর নজরদারি করাটা ছেড়ে দাও। আমি বিরক্ত হচ্ছি। কেয়া, তুমি দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছো!’
‘যা ইচ্ছা বলতে পারো। তবে অনুরোধ করছি, তুমি ওই মিটিংয়ে যেও না। আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।’
‘যে বাড়িতে মিটিংটা চলছে, আমি কিন্তু ওই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছি। এখান থেকে কেনো ফিরে যাবো? আর মিটিংয়ে যাবোই না কেনো?’
এর জবাবে কেয়া একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘আমি জানি, তোমাকে ফেরানো যাবে না। তবু অনুরোধ করে রাখলাম। তুমি বোকা, তোমার রাজনীতি মানায় না। তুমি যেও না, তোমার বিপদ হতে পারে!’
‘তুমি বিপদের কথা বলছো কেনো? কী হতে পারে আমার? আমি কী এমন কাজ করেছি যে, আমার বিপদ হতে পারে?’
‘এর জবাব আমার কাছে নেই। তবে এখন তো অন্যরকম পরিবেশ। কখন কে বিপদে পড়ে যাবে, কে জানে। আমি আভাস পেয়েছি গোয়েন্দাদের ওয়াচের তালিকায় তোমার নাম আছে।’
আবার হাসলো সৈকত। ও বললো-
‘গোয়েন্দাদের তালিকায় আমার নাম তুমি উঠিয়েছো? না-কি তোমার বিত্তশালী হাজব্যান্ড উঠিয়েছেন?’
এর জবাব না দিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে কেয়া বললো-
‘তা হলে তুমি ওই মিটিংয়ে যাচ্ছো?’
‘অবশ্যই। বিপদ হলেও যাবো। আমি পেছন থেকে পালাতে শিখিনি।’
এ কথা সৈকত বললো অনেক জোর দিয়ে। ও-প্রান্তে কেয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সৈকত বললো-
‘তুমি কি আর কিছু বলবে? এমনিতেই আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমি আর সময় নষ্ট না করে মিটিংয়ে যেতে চাই।’
‘মিটিংয়ে যাবেই?’
‘আশ্চার্য! যাবো না কেনো?’
‘তুমি কি জানো, তোমার অহনা আজ অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছে?’
এ কথাটি সৈকতের কাছে বজ্রঘাতের মতো লাগলো। ও বিস্মিত না হয়ে পারলো না। অহনা যদি আজ অস্ট্রেলিয়া সত্যিই চলে যাবে, তা হলে ও জানবে না কেনো? অহনা বা সুমন ওকে কি এ কথা জানাবে না? কিন্তু কেয়ার কথাও অবিশ্বাস করা ঠিক হবে না। গোপন মিটিংয়ের কথা যখন ও জানতে পেরেছে, অহনার খোঁজখবরও ও নিশ্চয় রাখছে। সৈকত বিব্রতকণ্ঠে বললো-
‘তুমি কি বললে?’
‘বললাম, অহনা আজ চলে যাচ্ছে। আমি জানি, তুমি এ খবরটা জানো না।’
‘অহনা চলে গেলে আমার কী?’
সৈকত এ কথা বললেও মনে মনে কষ্ট টের পাচ্ছে। ও-প্রান্তে কেয়া কি হাসছে? কেয়া বললো-
‘তোমার অনেক কিছু। তুমি নিশ্চয় অনেক কষ্ট পাবে।’
‘পেলে পাবো। এখন ফোন রাখছি।’
‘শোনো, শোনো। মিটিং না করে সোজা চলে যাও অহনার কাছে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কথাটি বলে ফেলো। নইলে কিন্তু অহনাকে আর পাবে না!’
কেয়ার রিনরিনে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। এটা কি সৈকতের প্রতি কেয়ার উপহাস, না-কি করুণা? সৈকত অস্বস্তিতে ফোনের লাইন কেটে দিলো। এরপর ও প্রথমে ভাবলো অহনাকে ফোন করবে; কিন্তু এ ভাবনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলো পরক্ষণেই। অহনা যদি আজ অস্ট্রেলিয়ায় চলেই যাবে, ও কেনো নিজে ফোন করে এই সংবাদ জানবে? সৈকতের মনে অভিমান জমতে লাগলো। অভিমানের কুয়াশা নিয়ে ও হনহন করে ঢুকে গেলো মোতালেব হোসেনের বাড়ির প্রবেশ পথে। এই বাড়িতে ওকে আসতে বলেছেন ফজলুল হক। বাড়ির দারোয়ান ওকে দেখেও না দেখার ভান করে রইলো। সৈকত বুঝতে পরলো মোতালেব হোসেনের বাড়িতে সভা চলছে। ও মোতালেব হোসেনের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই দরজাটা খুলে গেলো। দরজা খুললেন ফজলুল হক, যেনো তিনি সৈকতের জন্য দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছিলেন।
‘এসো, এসো। ভেতরে চলে এসো।’
রাশভারি গলায় বললেন ফজলুল হক। রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই ভীষণ চমকে উঠলো সৈকত। মিটিংয়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বাম জোটের নেতারা রয়েছেন। এমন দৃশ্য দেখবে ও কল্পনাও করেনি। যেসব নেতারা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত বিষোদগার করে বক্তব্য দিয়ে এসেছেন, তারাই আজ এক হয়ে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই গোপন মিটিংয়ের উদ্দেশ্য কী? তারা কি গোপনে সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন? সৈকতের মনে তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রশ্ন উঠলো। ও হচকিতভাবে তাকালো ফজলুল হকের মুখের দিকে। ওর চোখের দৃষ্টিতে ‘এসব কী দেখছি!’ এমন প্রশ্ন বুঝি ফুটে আছে। ফজলুল হক ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন-
‘সৈকত, বসো। আমরা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করছি।’
সৈকত ওদের পার্টির ঢাকা মহানগরী শাখার এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা নন। তাই ওর উপস্থিতি নিয়ে অন্য দলের নেতারা কৌতূহল দেখাচ্ছেন না। তবে সৈকত এই নেতাদের সামনে বিব্রতবোধ করতে লাগলো। ও ফজলুল হকের কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় বললো-
‘ফজলু ভাই, আপনার সঙ্গে একটু আলাদা কথা বলতে চাই।’
‘ঠিক আছে, পাশের রুমে চলো।’
ফজলুল হক পাশের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। তাকে অনুসরণ করলো সৈকত। পাশের রুমে এসে ফজলুল হক দরজাটা লক করে দিলেন। তিনি সৈকতের দিকে তাকিয়ে বললেন-
‘বলো, কী বলতে চাও?’
‘ফজলু ভাই, আমি কী দেখছি এসব! প্রায় সব দলের নেতারা কিভাবে এক হলেন? এক হলেনই বা কেনো?’
‘সৈকত, সে জন্যই তো তোমাকে আসতে বলেছি। তুমি কি কিছু আঁচ করতে পারছো না?’
‘মনে হচ্ছে, সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচি আসছে। এতো নেতাদের একসঙ্গে বসালেন কিভাবে?’
এ কথায় হো হো করে হেসে ফেললেন ফজলুল হক। সৈকত বোকার মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। হাসি থামিয়ে ফজলুল হক বললেন-
‘তুমি যা ভাবছো, ঠিক এর উল্টোটি হচ্ছে এখানে।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘আমরা বর্তমান সরকারের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি।’
‘কী বললেন!’
‘আহা! অতো অবাক হচ্ছো কেনো?’
‘অবাক হবো না? এতোদিন যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছিলেন, এখন সেই দল ছেড়ে দেবেন?’
‘এই দল আমাদের কী উপহার দিয়েছে, বলো তো? দুর্নীতি ছাড়া আমাদের কী আছে? দলের মধ্যে গণতন্ত্র আছে? সঠিক ও যোগ্য নেতার মূল্যায়ন আছে?’
কথাগুলো ফজলুল হক বললেন অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গে। সৈকত যেনো তার মনে পুষে রাখা ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। সৈকত বললো-
‘আমরা একটি আদর্শকে সামনে নিয়ে রাজনীতি করছি না?’
‘আদর্শ! রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে আদর্শের কিছু দেখেছো? গালভরা কথার ফুলঝুরি আর তোষামোদি ছাড়া আর কী এমন কাজ এ পর্যন্ত করেছেন তারা?’
‘আপনার কথাও ঠিক। তবু…!’
‘তবু কী?’
‘বলতে চাচ্ছি, দল ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন? আই মিন, সরকারকে সমর্থন দিয়ে কী পাবেন?’
‘সরকারকে সমর্থন দিতে চাই সরকারি দলের সুবিধাবাদী সমর্থক হবার জন্য নয়। এই সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে নজীরবিহিন অভিযান চালিয়েছে, এর পক্ষে থাকাটা সচেতন সকলের দায়িত্ব। এই সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা উচিত নয় কী?’
‘ফজলু ভাই, এটি একটি অনির্বাচিত সরকার!’
‘তাতে কী! সরকার তো নির্বাচন দিচ্ছে। এ জন্যই তো সরকারের হাতকে শক্তিশালী করতে চাই। আগামী নির্বাচনে যাতে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা অংশ নেন এবং জয়লাভ করেন, এ লক্ষ্যে মাঠে নেমে পড়তে হবে আমাদের। এখন আর বসে থাকার সময় নেই, বুঝলে?’
‘এই সরকার পরিচালিত হচ্ছে সেনাবাহিনী দ্বারা। তা হলে বলছেন, সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাবে, আর আমরা এর সমর্থন দেবো?’
‘এতে সমস্যা কোথায়? তুমি কী জানো, দক্ষিণ কোরিয়াকে আজ যে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেখছো, এর নেপথ্য ভূমিকা রেখেছিলেন সে দেশের দুই জেনারেল। দক্ষিণ কোরিয়াতেও একসময় সীমাহীন দুর্নীতি ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতার কারণে ওই দেশের সেনাবাহিনীর দুই জেনারেল দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে নেন। এরপর তারা দেশকে উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে নিয়ে যান। এখন তারা তাদের জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।’
‘ফজলু ভাই, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আরোহণকে পছন্দ করে না। দেখবেন, একসময় গণরোষের শিকার হবে এই সরকার।’
‘সৈকত, তোমার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে। দুর্নীতির অতল গহ্বর থেকে দেশকে টেনে তুলতে হলে আমাদের সামনে অন্য কোনো চয়েজ নেই। এখন কোনটি বড়, গণতান্ত্রিক পরিবশে না-কি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ? তা ছাড়া গণতান্ত্রিক পরিবেশ তো রক্ষা হচ্ছেই। নির্বাচন হবে, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং তারা দেশকে উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাবেন- এটাই তো আমরা চাই। তাই না?’
‘তা ঠিক। তারপরও কোন ভরসায় আমরা এই সেনা সমর্থিত সরকারের পক্ষে কাজ করবো?’
এ কথায় একটু ভাবলো ফজলুল হক। সৈকতের চিন্তা এলোমেলো হয়ে আসছে যেনো। ফজলুল হক বললেন-
‘ভরসা রাখতে হবে নিজের ওপর। তুমি যদি দেশকে ভালোবাসো তবে সংস্কারের পক্ষে থাকো। দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুস্থ রাজনীতির চর্চা আর উন্নয়নের ধারায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
এ কথার সামনে কেমন চুপসে গেলো সৈকত। ও বুঝতে পারছে না কী করবে। ফজলুল হক ভাইয়ের যুক্তিও খণ্ডন করা যাচ্ছে না। কিন্তু ওর মন সায় দিচ্ছে না। ও বিব্রতবোধ করতে লাগলো। ফজলুল হক যেনো ওর মনের কথা বুঝতে পারছেন। তিনি বললেন-
‘সৈকত, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে আমাদের সঙ্গে এসো না। যদি মনে করো, দেশের জন্য কিছু করতে চাও, তবে আমাদের সঙ্গে এসে হাতে হাত রাখো। আমি তোমার মনের ওপর জোর খাটাতে চাই না। তবে বিশ্বাস করি, তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।’
ফজলুল হকের এই কথার কোনো জবাব দিলো না সৈকত। ও মাথা নিচু করে রইলো। জীবনে অনেক সময় চলে আসে, যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যেতে হয়। সৈকতও এই মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ও ফজলুল হককে কী বলবে, তা ঠিক করতে পারছে না। ফজলুল হক ওকে তাগিদ দেবার মতো করে বললেন-
‘সময় নষ্ট করার সময় আমার নেই, সৈকত। তুমি কি আমার সঙ্গে থাকতে চাচ্ছো না?’
‘ফজলু ভাই, আমাকে কয়েকদিন সময় দিন। আমি ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চাই।’
সৈকতের কথায় যেনো হতাশ হলেন ফজলুল হক। তিনি বেশ কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইলেন সৈকতের মুখের দিকে। যেনো সৈকতের ভেতরের গোপন কথা পড়ে নিচ্ছেন। সৈকত অস্বস্তিতে বললো-
‘আমি দুসপ্তাহ পর জানাবো আমার সঙ্গে থাকবো কি-না। আপনি কী রাগ করবেন?’
‘না, না। রাগ করবো কেনো? তুমি তো সময় নিতেই পারো। ভেবে দেখো, এরপর আমাকে জানিয়ো।’
বললেন ফজলুল হক। সৈকতের মনের ওপর থেকে যেনো অস্বস্তির অনড় পাথর সরে গেলো। ও আগের মতোই মাথা নুইয়ে ফজলুল হককে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। ফজলুল হক ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বললেন-
‘সৈকত, তুমি তা হলে আজকের মিটিংয়ে থেকো না। আর এই মিটিংয়ের কথা কাউকে বলো না। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। ঠিক আছে?’
‘জ্বি, আচ্ছা। ফজলু ভাই, আপনি রাগ করলেন না তো?’
‘আরে না, না। রাগ করবো কেনো? তবে তোমার ওপর আমার ব্লাইন্ড কনফিডেন্ট ছিল।’
‘জ্বি, এ জন্য আমি খুব লজ্জা পাচ্ছি।’
‘আরে থাক ওসব। তুমি চলে যাও। পরে আমাকে ফোন করো। কেমন?’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সৈকত। ফজলুল হক দরজা খুলে দিলেন। অনেকটা অপরাধীর মতো সৈকত ভেতরের রুম থেকে বের হয়ে এলা। সে ড্রয়িংরুমের ওপর দিয়ে মোতালেব হোসেনের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার সময় বিভিন্ন দলের নেতারা ওর এই ফিরে যাওয়ার দৃশ্যকে যেনো উপেক্ষার চোখে দেখছিল। ওর মন বিষণ্ন হয়ে গেলো। ও মনে মনে ভাবছিলো ফজলুল হকের ডাকে সাড়া দিতে পারলো না, অথচ তার কথাগুলো অযৌক্তিক নয়। ‘কেনো ওর মন বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিতে চাচ্ছে না?’ ও নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপগুলোকে ও সমর্থন করছে, অথচ সরকারের পক্ষে সক্রিয় হতে মন সায় দিচ্ছে না। কেনো? এ প্রশ্ন ওর চিন্তায় এখন যেনো গোল্লাছুট খেলছে। ও আনমনে হাঁটছিল। মোতালেব হোসেনের বাড়ির গেট পেরুতেই একদল পুলিশ ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। ও প্রথমে কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারেনি পুলিশ ওর পথ আটকে দাঁড়িয়েছে কেনো। একজন পুলিশ অফিসার কর্কশ গলায় ওকে বললো-
‘স্টপ! ডোন্ট মুভ!’
সৈকত দাঁড়িয়ে পড়লো। পুলিশ অফিসার বললো-
‘পালানোর চেষ্টা করবেন না!’
সৈকত বুঝতে পারলো পুলিশ ওকে গ্রেফতার করতে চাচ্ছে। পুলিশ ওকে ঘিরে ফেলেছে। দৌড়ে পালিয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। কেয়ার কথা মনে পড়লো ওর। সৈকত কিছুই বললো না। ধানমন্ডি থানার সেকেন্ড অফিসার জাকির হোসেন ওর মুখোমুখি এসে এবার নরোম গলায় বললেন-
‘সৈকত সাহেব, আপনাকে আমাদের সঙ্গে একটু থানায় যেতে হবে। কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করলে ক্রসফায়ারে পড়ে যেতে পারেন!’
পুলিশ এখন কথায় কথায় ক্রসফায়ারের ভয় দেখায়। যতো ভয়, ততো আয়- জানে সৈকত। ও শান্ত গলায় বললো-
‘ঠিক আছে, চলুন থানায় যাই। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ জানতে পারি?’
এ কথায় সেকেন্ড অফিসার মুচকি হাসলেন। বললেন-
‘অভিযোগ অনেক। রাজনীতির নামে রাষ্ট্রের ক্ষতি করছেন, এটা হচ্ছে একটি বড় অভিযোগ। আপনার আচরণের ওপর নির্ভর করছে আর কতো অভিযোগ উত্থাপিত হবে।’
‘আমি বুঝতে পেরেছি। চলুন। আমাকে কী হাতকড়া লাগাবেন?’
‘আপনি বিচক্ষণ ব্যক্তি বলে সহজেই পরিস্থিতি বুঝে নিয়েছেন। আপনাকে হাতকড়া লাগালাম না। তবে চালাকি করবেন না। চলুন, গাড়িতে উঠি।’
পুলিশের ভ্যান রাস্তার পাশেই ছিল। সৈকত পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে ওই ভ্যানে গিয়ে উঠলো। গাড়িতে ওঠার সময় ওর মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। সেকেন্ড অফিসার জাকির হোসেন ওর শার্টের পকেট থেকে ফোনটি বের করে নিজের কাছে নিয়ে নিলো। ফোনটি বাজছিল, তিনি ফোন অন করলেন।
‘হ্যালো, কাকে চাই? কী, সৈকত? উনি ব্যস্ত আছেন? কী বললেন… আপনি অহনা? আপনাকে বললাম না উনি ব্যস্ত আছেন! উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না, অর্থাৎ কথা বলতে চাচ্ছেন না। আহা! আপনি বুঝতে পারছেন না কেনো? ঠিক আছে, তাকে বলবো আপনাকে যেনো ফোন করেন। এখন রাখছি। আমি? আমি উনার শ্বশুড়বাড়ির লোক!’
এ কথা বলে ধানমন্ডি থানার সেকেন্ড অফিসার জাকির হোসেন ফোনের লাইন কেটে দিলো। এরপর সে সৈকতের দিকে তাকিয়ে ‘হো হো’ করে হাসতে লাগলো। সৈকত ভীষণ অসহায়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর ভেতরে রাগের একটা দমকা হাওয়া বয়ে যচ্ছে। এই সেকেন্ড অফিসার জাকির হোসেনকে যদি ও কখনো সাদা পোশাকে পেয়ে যায়, সেদিন তাকে ও কষে দুই চড় লাগাবে। এরপর মহিলাদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলার জন্য ওর কান ওকে দিয়ে ধরিয়ে একশ একবার উঠ-বস করাবে- সৈকত মনে মনে শপথ নিয়ে নিলো। ওর প্রশ্ন জাগলো সরকার দেশের এতো বিভাগে শুদ্ধি অভিযান চালালেও পুলিশ বিভাগে এমন অভিযান চালায়নি কেনো? সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে আরেকটি প্রশ্ন জেগে উঠলো, ‘পুলিশ বিভাগে কী একজন সৎ ও বিনয়ী ব্যক্তি আছেন?’ ধানমন্ডি থানায় যেতে যেতে এ প্রশ্নটাই বারবার ভেসে উঠছিলো ওর মনে।
এগার.
মাত্র তিন মাস। তিন মাসে অনেকের জীবনে কিছুই বদলায় না, আবার কারো জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসে। হয়তো কেউ তিন মাসে একটুও এগুতে পারে না, কেউ আবার অনেক এগিয়ে যায়। কখনো কখনো একটি দেশের সরকারও পরিবর্তন হয়ে যায়। সৈকতের জীবনে গত তিন মাসে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের শুরু হয়েছে হঠাৎ করে। রাজনৈতিক কারণে কারাবাস ওকে বদলে দিতে সাহায্য করেছে। এক মাস কারাবাসের পর জেল থেকে বেরিয়ে সৈকত রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়। প্রথমে ব্যবসা করার কথা ভাবলেও ও চাকরি জুটিয়ে নেয়। রাজনীতি ছেড়ে চাকরি করবে, এটা ও কখনো ভাবেনি। যেমন ভাবেনি অকারণে জেল খাটার কথা। ঝিগাতলায় মোতালেব হোসেনের বাড়ির সামনে থেকে যেদিন ওকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল, সেদিনই ও বুঝে নিয়েছে রাজনীতির পথে অনেক চড়াই-উৎরাই রয়েছে। অতীতের অনেক সরকারের মতো বর্তমান সরকারও ওকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করেছিল। ওর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তবু ওকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে এক মাসের ডিটেনশন দেয়া হয়। ওকে অসহায়ভাবে অকারণ কারাবাস মেনে নিতে হয়েছিল। রাজনীতির কুফল বলে কথা। সৈকত অতো বড় রাজনীতিবিদ নয়, অথচ সরকারের কাছে ওর গুরুত্ব কেনো বেশি- ও তা জানে না। ওর কারাবাসের অভিজ্ঞতা এটাই ছিল প্রথম। ওকে গ্রেফতার করার পর পুলিশ অনেকগুলো মিথ্যা মামলায় ফাঁসাতে চেয়েছিল। হয়তো ও ফেঁসেও যেতো। কিন্তু এবারো ওকে এই যাত্রা থেকে রক্ষা করেন ফজলুল হক। ওকে জেল থেকে বের করে নিয়ে আসেন তিনি। প্রথমে এ ব্যাপারটায় গভীর রহস্যের মধ্যে পড়ে যায় ও। যার ইঙ্গিতে ও গ্রেফতার হলো, সে-ই আবার মামলার বেড়াজাল থেকে ওকে বের করে নিয়ে আনলেন। এই রহস্য উন্মোচন করতে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ও সোজা চলে গিয়েছিল ফজলুল হকের বাড়ি। ফজলুল হকও ওর জন্য যেনো অপেক্ষা করছিলেন। সৈকতকে দেখামাত্র হেসে বলেছিলেন,
‘আমি জানি, তুমি আমার কাছে আসবে। এবং জানতে চাইবে কেনো তোমাকে জেল থেকে বের করে আনলাম।’
সৈকত শান্তচোখে বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকেছিল। এরপর ও বলেছিল-
‘আমাকে গ্রেফতার করিয়ে দিলেন। আবার জেল থেকে বের করে আনলেন। জানতে পারি কি, এটা কোন ধরনের রাজনীতি?’
এ কথায় মৃদু হেসে ফজলুল হক বলেছিলেন-
‘এটাও এক ধরনের রাজনীতি। এই রাজনীতির প্রচলন আছে; কিন্তু এর কোনো নাম নেই।’
সৈকত প্রশ্ন করেছিল-
‘আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন? মামলা, জেল-জুলুম দিয়ে আমাকে আপনাদের দলে ভিড়াতে চাচ্ছেন?’
একটু চুপ থেকে ফজলুল হক ওর চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন-
‘সৈকত, তোমার প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। তার ওপর আমার মেয়েও তোমাকে পছন্দ করে। তাই আমি তোমাকে জেল থেকে বের করে এনেছি। তোমাকে জেল থেকে বের করতে আমাকে কতোটা কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে, তা তুমি জানো না। তোমাকে ওসব কথা বলতেও চাই না। তবে আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিতে চাই।’
‘উপদেশ?’
‘হ্যাঁ, উপদেশ। সৈকত, তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও। ব্যবসা শুরু করো। চাকরিও করতে পারো। আমি তোমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবো।’
ফজলুল হক কথা বলার সময় তার কণ্ঠ কেমন কেঁপে উঠলো। সৈকত তার আবেগকে সম্মান দেখিয়ে শান্ত গলায় বলেছিল-
‘ধন্যবাদ। তবে আপনার সাহায্য ছাড়া যেনো চলতে পারি, সে চেষ্টা করবো।’
ফজলুল হক যেনো লজ্জায় কুকড়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন-
‘আমার প্রতি তোমার রাগ একদিন থাকবে না- এটা আমি জানি। অন্য কোনো সময়ে, অন্য কোনো পরিস্থিতিতে তোমাকে হয়তো সেদিনের কথা বলতে পারবো।’
‘আমার আর আগ্রহ নেই। তবে আপনাকে একটা কথা বলে বিদায় নিতে চাই।’
‘বলো।’
‘অনেক সাধারণ মানুষের মতো এই দেশ নিয়ে আমার একটা স্বপ্ন আছে।’
‘কী স্বপ্ন?’
‘সুস্থ রাজনীতি ও সঠিক নেতৃত্বের একটি বাতিঘর একদিন আমরা পেয়ে যাবো- এমন একটি স্বপ্ন আমি দেখি।’
‘বাতিঘর!’
‘হ্যাঁ, বাতিঘর। এই বাতিঘর অন্ধকারঘন রাজনীতির পথে আমাদের আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাবে। দুর্নীতি, শোষণ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার জঞ্জাল পরিষ্কার করে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব দেশকে নিয়ে যাবে উন্নয়নের ধারায়। এমন দিনের স্বপ্ন আমি প্রতিনিয়ত দেখি। বলতে পারেন, এমন স্বপ্নের ঘোরেই আমি থাকি।’
এ কথায় হেসে ফজলুল হক বলেছিলেন-
‘তোমার স্বপ্নের সঙ্গে আমার স্বপ্নের কোনো অমিল নেই। পার্থক্যও নেই। অমিলটা হচ্ছে পথ ও সময়ের। এর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’
এ পর্যন্ত সৈকতের কথা হয়েছিল ফজলুল হকের সঙ্গে। সৈকত বাড়ি ফিরে গিয়ে সাত দিন কোথাও বের হয়নি। ওই সাত দিন ও নিজেকে নিয়ে অনেক ভেবেছে। নিজেকে বদলে নেবার জন্য প্রস্তুত করেছে। এরপর সৈকত আর পার্টির কার্যালয়ের দিকে যায়নি। কোনো সভাতেও যোগ দেয়নি। পার্টির সকল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ও চাকরির আবেদন করতে থাকলো বিভিন্ন কোম্পানিতে। একসময় ইন্টারভিউর ডাক পেলো স্কয়ার ফার্মাসিটিক্যাসল কোম্পানি থেকে। এক ইন্টারভিউতেই স্কয়ার কোম্পানিতে চাকরি হয়ে গেলো ওর। চাকরি জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ও। পরিবর্তন এলো ওর দৈনন্দিন রুটিনেও। সৈকত আগে দেরিতে ঘুম থেকে উঠতো এবং অনেক রাতে বাড়ি ফিরতো। পার্টি অফিস, সভা, এখানে-সেখানে আড্ডা- এসব ছিল ওর দৈনন্দিন জীবনের চালচিত্র। এখন ৯টা-৫টা অফিস আর ইন্টারনেটে বিশ্বের তাবৎ খবরে ডুবে থাকে ও। আগে হাতে কখনো পোস্টার, কখনো ব্যাগ বা কখনো বই নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। এখন অফিসিয়াল ব্রিফকেস বা কখনো ল্যাপটপ থাকে ওর হাতে। পোশাক-আশাকের পরিবর্তনটাও চোখে পড়ার মতো। নিজেকে সব সময় পরিপাটি রাখে ও। তিন মাস আগে যে ওকে দেখেছে, এখন সে ওকে দেখে হচকিয়ে যাবে। কয়েক মুহূর্ত ওকে চিনতেও কষ্ট হতে পারে কারো।
সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক চাংকি বিমানবন্দরে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবর্তন নিয়ে ভাবছিল সৈকত। ও সিঙ্গাপুরে এসেছিল রিসার্চ কর্মকর্তা হিসেবে একটি ওয়ার্কশপে অংশ নিতে। কোম্পানি ওকে পাঠিয়েছে। রিসার্চ কর্মকর্তা হিসেবে স্কয়ারে যোগ দিলে বেশ কয়েকটি ওয়ার্কশপে অংশ নিতে হয়। এই ওয়ার্কশপে বিশ্ববাজারের বিভিন্ন ওষুধ সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত জানানো হয়। ওয়ার্কশপ শেষ করে সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় ফিরছে সৈকত। বিমানবন্দরের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে নিজেকে নিয়ে ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিল ও। ওর ভাবনা ভেঙে গেলো একটি মেয়ের প্রশ্নে। সৈকত দাঁড়িয়েছিল বিমানবন্দরের ফুড সার্ভিস এলাকায় স্টারবাগস কফি শপের সামনে। ওর পাশ দিয়ে যাবার সময় একটি মেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো। মেয়েটি ওর সামনে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো-
‘এক্সকিউজ মি, আর ইউ বাংলাদেশি?’
মেয়েটির প্রশ্নে একটু চমকে গেলো সৈকত। ও তাকালো মেয়েটির দিকে। মেয়েটি বাংলাদেশি হলেও ওর পোশাক-আশাকে বোঝা যাচ্ছে ও বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে থাকে। পড়েছে সাদা রঙের শর্ট স্কার্ট এবং লাল রঙের টপস। পায়ে হাইহিল। ববকাট চুল। সানগ্লাস বুকের টপসের ওপর ঝুলে আছে। মেয়েটি মিষ্টি হেসে ফের বললো-
‘আপনি কি বাংলাদেশি?’
‘হ্যাঁ, কেনো বলুন তো?’
‘আর ইউ মি. সৈকত?’
মেয়েটির এ প্রশ্নে অবাক হলো ও। সৈকত দুই সপ্তাহ ছিল সিঙ্গাপুরে। এ দুই সপ্তাহে ওকে কেউ প্রশ্ন করেনি ‘আর ইউ মি. সৈকত?’ সিঙ্গাপুরে ওকে কেউ চিনবে- এমন আশা ও করেনি। কিন্তু আজ দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দর লাউঞ্জে একটি অচেনা মেয়ে ওকে প্রশ্ন করছে, ‘আর ইউ মি. সৈকত?’ সৈকত কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারলো না। মেয়েটি ফের বললো-
‘আই থিংক, আমি যাকে চিনি, আপনি সেই সৈকত নন। বাট ইউ আর লুক লাইক!’
সৈকত নিজেকে ধাতস্থ করে বললো-
‘ম্যা বি ইউ আর রাইট। বাট আই অ্যাম সৈকত অলসো।’
‘রিয়েলি!’
‘বাট আই ডোন্ট নো, হু আর ইউ?’
‘আই নো, ইউ ডোন্ট নো মি। ইউ নেভার সি মি।’
এ কথা বলে মেয়েটি খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলো। সৈকত অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। মেয়েটি হাসি থামিয়ে বাংলায় বললো-
‘আমি আপনার ছবি দেখেছি। ছবির সঙ্গে আপনার অনেক অমিল দেখছি!’
এ কথায় ভাবনায় পড়ে গেলো সৈকত। ও বুঝতে পারছে না মেয়েটি কে, অথচ মনে হচ্ছে মেয়েটি ওর কথাই বলছে। ওর পরিবর্তনের কথাটাও বলছে মেয়েটি। ও বললো-
‘আপনি কে? আমি কি আপনাকে চিনি?’
মেয়েটির মুখে হাসির রেখা ফুটে রয়েছে। ও সৈকতের দৃষ্টিতে দৃষ্টি চোখ রেখে কপালের ভ্রু নাচিয়ে বললো-
‘আমার নাম রায়না!’
‘রায়না’ নামটি শোনামাত্র সৈকতের ভেতরে একটা ধাক্কা এসে লাগলো। ও হচকিয়ে গেলো। রায়না ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেনো সৈকতকে চমকে দিয়ে ও খুব মজা পাচ্ছে। সৈকত রায়নার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। এখন ওর মনে হচ্ছে অহনার চোখের সঙ্গে ওর চোখের মিল রয়েছে। অহনার শরীর পাতলা, রায়নার শরীর ভারী। অহনা শান্ত, রায়না চঞ্চল। অহনা কথা বলে দৃষ্টি নামিয়ে, রায়না কথা বলে চোখে চোখ রেখে। অহনা অন্তর্মুখি, রায়না সপ্রতিভ। কয়েক মুহূর্তেই অহনা ও রায়নার পার্থক্য বের করে ফেললো সৈকত। সৈকত জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল ‘অহনা কেমন আছে?’ প্রশ্নটি করার আগে রায়না বললো-
‘আমাকে দেখে অবাক হয়ে গেছেন?’
‘হয়েছি। তবে…।’
‘তবে অহনাকে দেখলে বেশি খুশি হতেন, এই তো?’
এ কথা বলে মুচকি হাসলো রায়না। সৈকত নিজের মধ্যে একটু ধাতস্থ হয়ে বললো-
‘আপনার এ ধারণা কেনো?’
‘অহনার কাছ থেকে আপনার সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে মনে হয়েছে আপনি অহনাকে পছন্দ করেন।’
রায়নার কথায় বিব্রত হলো ও। সহজভাবে ওর দুর্বলতার কথা রায়না বলে দিয়ে ওকে মৃদু লজ্জায় ফেলে দিলো। ও এ লজ্জা সামলে নিয়ে বললো-
‘অহনা বুঝি আমার সম্পর্কে এ ধারণা নিয়ে বসে আছেন?’
‘ধারণা কি মিথ্যা?’
‘এ নিয়ে তর্ক করতে চাই না। এবার বলুন তো, আপনি এখানে কেনো?’
এ প্রশ্নে আবারো মুচকি হাসলো রায়না। ও বললো-
‘এই তো আমরা সিঙ্গাপুরে এসেছিলাম হলিডে ভোকেশনে।’
‘আমরা মানে? আপনি আর…?’
‘আমি আর অহনা।’
সৈকতের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। অহনা কি তবে আশপাশে কোথাও রয়েছে? তিন মাস অহনার সঙ্গে ওর যোগাযোগ হয়নি। সৈকত নিজে কখনো অহনাকে ফোন করেনি। জেলে যাওয়ার লজ্জার কারণে এক ধরনের সংকোচে ও অহনাকে ফোন করেনি। ও ভেবেছিল, অহনাকে ফোন করে ওর খোঁজ নেবে। কিন্তু অহনাও ওকে ফোন করেনি। এ নিয়ে সৈকতের মনে অভিমান জমে আছে। অহনা কেনো ওকে ফোন করেনি, এ প্রশ্ন ওকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অহনার এই অকারণ নীরবতা ওকে অপমানের কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে। অপমানের কষ্ট নিয়ে ও কেনো অহনাকে যেচে ফোন করবে? এই কারণেও সৈকত অহনাকে ফোন করেনি। কিন্তু অহনার ফোন আসবে, এমন একটা ঘোরলাগা স্বপ্ন ও অবচেতন মনে আঁকতো মাঝে মাঝে। আবার স্বপ্নটা তাৎক্ষণিক ঝেড়ে ফেলে দিতো মন থেকে। মাঝে মাঝে স্বপ্নটা ফুটে উঠতো মনের ক্যানভাসে। এটা এক ধরনের কষ্টের স্বপ্ন। এ মুহূর্তেও এই স্বপ্নটা ঝিলিক দিয়ে উঠলো ওর মনে। ওর মনে হচ্ছিল নিশ্চয় অহনা আশপাশে কোথাও রয়েছে। যে কোনো সময় অহনার সঙ্গে ওর দেখা হয়ে যাবে। সৈকত নিজের ভেতরে মিহিন তোলপাড় টের পাচ্ছে। রায়না সৈকতের নীরবতা দেখে বললো-
‘আপনি দেখছি, কেমন হা হয়ে গেছেন, মি. সৈকত!’
রায়নার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলো সৈকত। ও বললো-
‘জ্বি, আমি ঠিক ভাবতে পারছি না কিছু। ঠিক মেলাতে পারছি আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো, আবার দেখা হয়ে যাবে অহনার সঙ্গে। তাই…।’
‘তাই, এক মুহূর্তেই ইমোশোনাল হয়ে যাবেন? আপনি তো দেখছি, অহনার নাম শোনামাত্র কেমন লাল হয়ে গেছেন! হোয়টাস হ্যাপেনড ইন ঢাকা উইথ অহনা?’
এ কথা বলে রায়না আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। কে বলবে এ মেয়েটি কয়েক মাস আগে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণার কষ্ট পেয়েছে। সৈকত অস্বস্তি প্রকাশ করে বললো-
‘কী যে বলেন! আপনি রসিকতা করতে বুঝি খুব পছন্দ করেন?’
অবারো হাসলো রায়না। রায়না কথায় কথায় হাসে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, ও ভীষণ হাসি-খুশি এক মানুষ। অথচ ও প্রবঞ্চনা এক দগদগে ঘা চেপে আছে! সৈকতের খুব ইচ্ছে করছে রায়নার প্র্যাগন্যন্সির কথা জানতে। কিন্তু এ প্রশ্ন কি ওকে করা শোভনীয় হবে? রায়নাকে দেখে ওকে প্র্যাগন্যান্ট বলে মনে হচ্ছে না। রায়না সৈকতকে বললো-
‘বাই দ্যা ওয়ে, আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আমি ঢাকায় ফিরছি।’
‘রিয়েলি! গুডস এনাফ! অহনা তো কিছুক্ষণ আগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো। কিছুক্ষণ আগে দেখা হলে তো ওর সঙ্গে আপনার দেখা হয়ে যেতো।’
রায়নার এ কথায় মন খারাপ হতে লাগলো সৈকতের। ও মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো-
‘ঠিক বুঝলাম না। অহনা ঢাকায় গেলো; কিন্তু আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আমি সিডনি যাচ্ছি। অহনা বিশেষ কাজে ঢাকায় যাচ্ছে। আমরা দুই বোন এক সপ্তাহ বেড়ালাম সিঙ্গাপুরে। এখন আমি সিডনিতে ফিরে যাচ্ছি। আমার ফ্লাইট দু-ঘণ্টা পর। আপনার?’
রায়নার কথায় সৈকত বুঝতে পারলো অহনার সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ নেই। ওর বুকের ভেতরের কুাঁপুনি কমে আসছে। ও সংকোচ নিয়ে প্রশ্ন করলো-
‘অহনা ঢাকায় গেলো কেনো? কয়দিন থাকবেন, বলতে পারেন?’
মুচকি হেসে রায়না বললো-
‘সত্যি কথা বলতে কী, অহনার জন্য একটি বিয়ের প্রস্তাব এসেছে ঢাকা থেকে। ও যাচ্ছে পাত্রের সঙ্গে কথা বলতে। বলতে পারেন পাত্র দেখতে। ও হয়তো ঢাকায় সাত দিন থাকবে।’
রায়নার শেষ কথা যেনো শোনতে পেলো না সৈকত। ওর মধ্যে কম্পন হচ্ছে। ওর কান দিয়ে যেনো কামানের গোলার মতো রিপিট হয়ে প্রবেশ করেছে ‘ও যাচ্ছে পাত্রের সঙ্গে কথা বলতে।’ সৈকত নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে বললো-
‘ঠিক আছে, অহনাকে আমার শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলে খুশি হবো।’
‘অবশ্যই জানিয়ে দেবো। তা ছাড়া আপনার সঙ্গে যে আমার দেখা হয়ে গেছে- এ কথা তো ওকে সবার আগে জানাবো। ও ঢাকায় পৌঁছে আমাকে ফোন করবে। আপনার ফ্লাইট কখন?’
‘এই তো আর ৩০ মিনিট পর। আমাকে এখনই যেতে হবে। সর্বশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হতে হবে।’
‘তা হলে এখনই চলে যান। আপনার আর দেরি করা ঠিক হবে না।’
রায়নার কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো সৈকত। ও বিদায় নেবার জন্য বললো-
‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগছে।’
‘আমারও। আর হ্যাঁ, আপনাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
‘কেনো?’
‘রাতুলকে খুঁজে বের করে দেবার জন্য।’
এ কথা বলার সময় রায়নার কণ্ঠ ভারী হয়ে গেলো। সৈকত এর জবাবে শুকনো হাসি হাসলো। ও পা বাড়ালো নিরাপত্তা তল্লাশির গেটের উদ্দেশে। পেছন থেকে রায়না বললো-
‘ঢাকায় পৌঁছে অহনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।’
এ কথায় ঘুরে দাঁড়ালো সৈকত। কৌতূহল প্রকাশ করে বললো- ‘কেনো?’
রায়না হেসে বললো-
‘এই কেনোর উত্তরটা আপনি নিজের মধ্যে খুঁজুন।’
এ কথা বলে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে রায়না পা বাড়ালো অন্যদিকে। সৈকত রায়নার চলে যাবার পথে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। এরপর ও ছুটলো সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের গেটের দিকে। ওর মনে হচ্ছে ঢাকায় দ্রুত যেতে হবে। অহনার মুখোমুখি হতে হবে ওকে। হেরে যাবার আগে হেরে যাবার কারণ ওকে জেনে নিতে হবে। ও কেনোই বা হেরে যাবে? প্রশ্নটা ওকে ভাবিয়ে তুললো। এরপর থেকে ওর ভেতরে কেনো জানি জয়ী হবার জেদ পেখম ছড়াতে লাগলো। এরকম কখনো হয়নি ওর।
বার.
ঘুম ভাঙার পর থেকেই সৈকত ছটফট করছিল। সকাল থেকেই অস্বস্তি, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং এক ধরনের উত্তেজনা ওর মনে। ও ধারণা ছিল অহনার টেলিফোনে ওর ঘুম ভাঙবে। কিন্তু অহনার ফোন আসেনি। অহনার ফোনের অপেক্ষার কষ্ট নিয়ে ও বাড়ি থেকে বের হয়। অফিসে আসার পর থেকে কাজে ওর মন বসেনি। অস্বস্তি আর কৌতূহলে অহনার খবর জানতে ও সুমনকে ফোন করেছিল সুমনের সেলফোনে। সুমন ফোন ধরেনি। ও ম্যাসেজ রেখেছে। সুমন এখনো কল ব্যাক করেনি। হয়তো ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত রয়েছে। কাজে ব্যস্ত থাকলে ও অনেক দেরিতে ফোন করে। এখন মধ্য দুপুর। দিনটি দুপুরে গড়াতেই আজকের দিনটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে অস্বস্তিকর ও খারাপ দিন হিসেবে ধরে নিলো সৈকত। এর মধ্যে ও দিনটিকে ‘অপয়াদিন’ বলে কয়েকবার মনে মনে গালি দিয়ে ফেললো। অফিসের কাজে মন বসাতে পারছে না ও। অহনার সেলফোন নম্বর জানে না সৈকত। জানলে ও অহনাকে ফোন করে ফেলতো। চেয়ারে হেলান দিয়ে অহনার কথা ভাবছিল ও। দরজায় নক হলো। ও সর্তক হয়ে বললো-
‘কান ইন।’
সৈকতের রুমে প্রবেশ করলো ওর অফিস সহকারী কাদের। কাদের বললো-
‘স্যার, আপনার সঙ্গে একজন ভদ্রমহিলা দেখা করতে এসেছেন। ভেতরে আসতে বলবো?’
কাদের মিয়ার কথায় সটান হয়ে বসলো ও। এ সময় ওর সঙ্গে কে দেখা করতে আসতে পারে? কেয়া নয়তো? ইদানীং কেয়া ওকে খুব ফোন দিচ্ছে। ও কেয়ার ফোন ধরছে না। কেয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ও রাখতে চায়নি। কেয়াও বেশ কিছুদিন ফোন করে না। ইদানীং ফের ও ঘন ঘন ফোন করছে। কেয়ার মধ্যে ‘হু কেয়ারস’ ভাব আছে। এই ভাবের কারণে ও চলে আসতে পারে ওর অফিসে। এ কথা ভাবতেই ওর গলা শুকিয়ে এলো। ও শুকনো গলায় কাদের মিয়ার উদ্দেশে বললো-
‘তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।’
কাদের মিয়া মাথা নেড়ে ওর রুম থেকে বের হয়ে গেলো। সৈকতের টেনশন অনুভব করতে লাগলো। নতুন চাকরি। এখনই ওর কাছে মেয়ে বা নারীর আগমন কলিগরা কী চোখে দেখবে, কে জানে। সৈকত অন্যরকম অস্বস্তিতে চেয়ে রইলো ওর রুমের প্রবেশের দরজার দিকে। কয়েক মুহূর্ত যাবার পর দরজা ঠেলে ওর রুমে প্রবেশ করলো অহনা। বিস্ময়ে থ’ হয়ে গেলো সৈকত। অহনা ওর অফিসে চলে আসতে পারে, এমন কথা ও স্বপ্নেও ভাবেনি। ও স্বপ্ন দেখছে না তো? অহনার মুখে স্মিত হাসি। ও এক-পা, দু-পা করে এগিয়ে ওর টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে এসে বললো-
‘বসতে পারি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসুন!’
‘ধন্যবাদ।’
বলে অহনা বসলো সৈকতের টেবিলের বিপরীতে রাখা চেয়ারে। সৈকতরে ঘোর কাটছে না। ওর মুখে কোনো কথা ফুটছে না। ও হা করে তাকিয়ে আছে অহনার মুখের দিকে। অহনা নিচু গলায় বললো-
‘অমন হা করে তাকিয়ে আছেন কেনো?’
‘না, মানে, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে, আপনি আমার সামনে!’
‘কেনো আমি কি আসতে পারি না?’
‘তা পারবেন না কেনো? কিন্তু…!’
‘কিন্তু কী?’
‘আমি ভীষণ সারপ্রাইজড…!’
‘কেনো?’
‘আপনাকে দেখে।’
‘এর আগে কি আমাকে দেখেননি?’
এর জবাব দিলো না সৈকত। ও কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। অহনাকে অনেক কথা বলার আছে। অভিমান ভেজা কিছু প্রশ্নও আছে। কিভাবে এবং কোথা থেকে কথা শুরু করবে, তা ঠিক করতে পারছে না ও। অহনাকে দেখার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিচ্ছে ও। অহনা ওর রুমের চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে বললো-
‘আপনার অফিসটা খুউব সুন্দর!’
‘তাই না-কি?’
‘হুম। এই চাকরির খবরটা কিন্তু আপনি আমাকে জানাতে পারতেন।’
অহনার কণ্ঠে অনুযোগ। সৈকত নিজেকে নিজের মধ্যে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। অহনার সব প্রশ্নের জবাব দিতে চায় ও। ও বললো-
‘অনেক কিছু চাইলেই কী পারা যায়?’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরুন, এই যে আপনি নীল রঙের জমকালো শাড়ি পরে এসেছেন এবং এতে আপনাকে অপ্সরীর মতো লাগছে, ইচ্ছে করলেই কি নিজের নিপাট মুগ্ধতার কথা বলে ফেলে যায়?’
এ কথায় স্নিগ্ধ হাসিতে কেমন উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো অহনা। ও মৃদু হেসে বললো-
‘আপনি অনেক বদলেছেন, দেখছি!’
‘আপনার চেয়ে বেশী বদলেছি কি?’
‘আমি আবার কতোটুকু বদলালাম?’
অহনার বিস্ময় দেখে বিস্মিত হলো সৈকত। ও বললো-
‘এই যে ঢাকা ছাড়লেন, দীর্ঘদিনে একটি ফোনও করেননি। খোঁজ নেননি আমার। এটা কি বদলানো নয়? না-কি এটাই আপনার বৈশিষ্ট্য?’
এ প্রশ্নে একটু চুপসে গেলো অহনা। ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
‘আমি জানি, আপনি এ প্রশ্ন করবেন। এর জবাব দেবার আগে আপনাকে পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই।’
‘করুন। আজ আমি প্রস্তুত। প্রশ্ন করুন।’
‘আপনিও তো আমাকে ফোন করতে পারতেন। করেননি কেনো?’
অহনার প্রশ্নে একটু ভাবলো সৈকত। এর মধ্যে ও অহনাকে ভালো করে দেখে নিলো। অহনা আজ সাজসজ্জা করে এসেছে। এর আগে ও কখনো সেজে ওর সামনে আসেনি। অহনাকে ভীষণ আকর্ষণীয় লাগছে। অহনার দিকে তাকিয়ে চোখ সরাতে পারছে না সৈকত। ওর সুবিধা হচ্ছে অহনার মুখোমুখি বসে ও কথা বলছে। সৈকতের নীরবতায় অহনা ফের বললো-
‘জবাব দিলেন না যে!’
‘আপনাকে ফোন না করার কারণ তো আছে।’
‘কারণটি বলুন।’
বললো অহনা। সৈকত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো-
‘আপনি কি জানেন, আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম।’
‘হ্যাঁ, অনেক পর এ খবর শুনেছি।’
‘এ ঘটনায় আমি মুষড়ে পড়ি। আপনাকে ফোন করতে লজ্জাবোধ করছিলাম। তা ছাড়া আপনিও আমাকে ফোন করেননি বলে অভিমানও জমে যায়।’
‘রাজনীতিবিদরা জেলে গেলে মর্যাদাহানি হয় না বলে শুনেছি।’
অহনার এ কথায় আবারো কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সৈকত। এরপর বললো-
‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। কিন্তু আমি এ ঘটনাকে সহজভাবে নিতে পারিনি। এবার আপনার কথা বলুন।’
তাগিদ দিলো সৈকত। অহনা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে গম্ভীরকণ্ঠে বললো-
‘আমি হঠাৎ করে সিডনি চলে যাবার দিন আপনাকে ফোন করেছিলাম। আপনার ফোন কেউ একজন ধরেছিল, তার কথাবার্তা ভীষণ ইনসাল্টিং ছিল।’
সৈকত মুচকি হেসে বললো-
‘তখন আমি পুলিশ কাস্টডিতে। আমার ফোন নিয়ে পুলিশ অফিসার কথা বলছিল আপনার সঙ্গে।’
‘ও তাই!’
‘হ্যাঁ। শুধুমাত্র এই কারণে আপনি আমাকে ফোন করেননি?’
এ প্রশ্নের জবাব দিলো না অহনা। ও বললো-
‘আজ থাক। কৈফিয়ত অন্য একদিন দেবো।’
সৈকতের মনে হলো অহনাকে চা বা কফির অফার করা হয়নি। ও বললো-
‘এখন বলুন, কী খাবেন? চা বা কফি?’
‘না, না। কিছুই খাবো না। আপনার কাজের সময় নষ্ট করছি না তো?
‘নষ্ট হলে হবে। ও সব নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। আপনার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে।’
‘বাহ রে, আবার কিসের বোঝাপড়া?’
‘এই যে আমাকে উপেক্ষা করে রইলেন, এর বোঝাপড়া। কেনো উপেক্ষা করেছিলেন?’
‘এর কারণ জানাটা কি খুব জরুরি?’
‘হ্যাঁ। অন্তত আমার জন্য খুব জরুরি।’
অহনা চুপ করে রইলো। যেনো এমন কথা আাছে, ও তা বলতে চাচ্ছে না। সৈকত কৌতূহলী চোখ ওর চোখে রেখে প্রশ্ন করলো-
‘চুপ করে গেলেন যে! কারণটি বলুন। আমার কিন্তু খুব জানতে ইচ্ছে করছে।’
অহনা বিব্রতবোধ করছে। ও বিব্রতভাবে বললো-
‘কেয়া নামে একটি মেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেছিল।’
অহনার কথাটি বজ্রঘাতের মতো লাগলো। সৈকতের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। ও বললো-
‘কেয়া আপনাকে কী বলেছিল?’
অহনা মাথা নিচু করে বললো-
‘সব কথা আপনাকে কেনো বলবো?’
‘কেয়া যদি কোনো ভুল তথ্য দিয়ে থাকে, তাই বলছিলাম…।’
‘সৈকত, আমি জানতে চাই না আপনার এবং কেয়ার সম্পর্কের কথা। ওসব আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।’
অহনা একটু বিরক্তি প্রকাশ করলো। সৈকত অহনার বিরক্তি গায়ে মাখলো না। ও নরোম গলায় বললো-
‘তবুও একটা কথা আপনাতে জানাতে চাই। কথাটি হলো আমার জীবনে কেয়ার কোনো অস্তিত্ব নেই। ওকে আমি পছন্দ করতাম। ভালোবাসাও ছিল। কিন্তু ওর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কটা গড়ে ওঠেনি।’
‘এসব কথা আমাকে কেনো বলছেন? আমি কি জানতে চেয়েছি?’
হেসে বললো অহনা। সৈকত বললো-
‘আপনাকে ওসব কথা বলে নিজেকে গ্লানিমুক্ত করছি।’
‘ঠিক আছে, আপনার কথা জানলাম। আরো জানলাম কেয়া নামে কেউ আপনার জীবনের অস্তিত্বে নেই। হয়েছে?’
‘না, হয়নি। আমাকে ফোন করেননি বলে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’
এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো অহনা। বললো-
‘শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়, এর জন্য দুহাত জোড় করে ক্ষমাও চাচ্ছি। এবার হয়েছে?’
অহনা দুহাত জোড় করে ক্ষমা চাইলো। সৈকত হাসলো। ও বুঝতে পারছে না এবার কী বলবে। অহনাকে ওর মনের কথাটি বলে ফেলা দরকার। কিন্তু এখন সংকোচবোধ করছে। আলোচনায় কেয়ার প্রসঙ্গ চলে এসে সংকোচের দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। অহনা সৈকতের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনি কিন্তু জানতে চাননি আমি আপনার কাছে কেনো এসেছি?’
‘হ্যাঁ, তাই তো! কেনো এসেছেন?’
‘একটা কাজে আপনার সহযোগিতা চাই।’
‘অবশ্যই সহযোগিতা করবো। বলুন, কী কাজ?’
জোর দিয়ে কথাটি বললো সৈকত। অহনা বললো-
‘আপনি বলেছিলেন, আমি যেনো এ দেশে সেটেলড হই।’
‘হ্যাঁ, বলেছিলাম।’
‘আমি এসেছি একজনের সঙ্গে দেখা করতে। আই মিন, একটি ছেলের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। পাত্র হিসেবে সে আমার যোগ্য কি-না তা জানতে চাই।’
এ কথা জানে সৈকত। তবু অহনার মুখ থেকে কথাটি শুনতে ওর কষ্ট হচ্ছে। ও বিষণ্ন হয়ে গেলো। অহনা একটু চুপ থেকে ফের বললো-
‘ছেলেটির সঙ্গে আজ বিকেল চারটায় দেখা করবো হোটেল সোনারগাঁওয়ের লবিতে।’
এ কথা বলে অহনা মাথা নিচু করলো। সৈকত নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে। ও বললো-
‘ছেলেটি কি আপনার খুউব পছন্দের?’
এর জবাবে চোখ তুলে তাকালো অহনা। বললো-
‘ছেলেটি তো আমি কখনো দেখেনি, এখনই পছন্দের প্রশ্ন আসছে কেনো?’
অহনার এ প্রশ্নের জবাবে সৈকত বললো-
‘আমার কাছে কী ধরনের সহযোগিতা চান?’
‘আমি চাচ্ছি, ছেলেটির সঙ্গে দেখা করতে যাবার সময় আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন।’
বললো অহনা। সৈকতেকর মনে হলো ও কষ্টের পাথর গড়িয়ে গড়িয়ে ওর ওপর পড়ছে। ও ঢেকে যাচ্ছে অসংখ্য পাথরে। অহনা কতো সহজভাবে ওর সহযোগিতা চাইছে। অথচ সৈকত নিজের ভেতরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ও নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করছে। ওর ভেতরে মিহিন কষ্টের পাশাপাশি হেরে না যাবার প্রত্যয় টের পাচ্ছে ও। অহনা প্রশ্ন করলো-
‘কী, যাবেন না আমার সঙ্গে?’
‘অবশ্যই যাবো। আমি সব সময় আপনার পাশে থাকতে চাই।’
এ কথায় কেমন করে তাকালো অহনা। ও বললো-
‘তা হলে চলুন, বেরিয়ে পড়ি। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। বাইরে গাড়ি আছে।’
সৈকত একটু হাসার চেষ্টা করলো। বিষণ্ন মুখের শুকনো হাসি। অহনার চোখে চোখ রেখে ওর চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে ও। কিন্তু ওর চোখের ভাষা পড়তে পারছে না। অহনা কি সত্যিই পাত্র পছন্দ করতে এসেছে ঢাকায়? পাত্র দেখতে অহনা ওকে সঙ্গে নিচ্ছে কেনো? প্রশ্ন বুঁদ বুঁদ করছে সৈকতের মনে। অহনা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এ সময় সৈকত বললো-
‘চলুন, বেরিয়ে যাই। তবে আপনার গাড়িতে যাবো না। আজ আপনাকে নিয়ে কিছুক্ষণ রিকশায় ঘুরবো। আপনার আপত্তি আছে?’
এ কথায় অহনা আবারো মিষ্টি করে হাসলো। ও বললো-
‘না, আপত্তি থাকবে কেনো? আপনার সঙ্গে তো অনেকবার রিকশায় ঘুরেছি। রিকশায় ঘুরতে আমার ভালোই লাগে।’
অহনার কথায় যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সৈকত। ও বললো-
‘অবশ্য শীতের দুপুরে শাড়ি পরে রিকশায় ঘুরে বেড়ানো কঠিন। পারবেন?’
‘ঢাকার শীত এমন আর কী? তা ছাড়া গাড়িতে সুয়েটার আছে। নিয়ে নেবো।’
সৈকত খুশি হলো। বিকেল ৪টা বাজতে এখনো দুই ঘণ্টা বাকি। ওর মনে হলো হেরে যাবার আগে জয়ী হবার শেষ একটা সুযোগ হাতে রয়েছে ওর। সময়টা খুবই অল্প, তবু জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। ফুটবল খেলায় এক গোলে পিছিয়ে থাকা কোনো দলকে অতিরিক্ত সময়ে যেমন মরিয়া হয়ে লড়তে হয়, সৈকতকেও তেমনি লড়তে হবে এখন। অহনাকে ও হারাতে চায় না, কিছুতেই না। ওরা দুজন বেরিয়ে পড়লো।
তের.
ফেব্রুয়ারির শীতের দুপুর। প্রখর সূর্য কিরণ আছড়ে পড়েছে সর্বত্র। ঝাঁঝালো রোদে শীতের প্রকোপ কমে এসেছে। রিকশায় অহনার পাশে বসে সৈকতের কেমন তন্ময়তা এসে যাচ্ছে। অহনা চুপচাপ মুডে। বেইলি রোডে এসে রিকশা থামিয়ে দুটো আইসক্রিম কিনলো সৈকত। মেয়ে ও শিশুরা আইসক্রিম পছন্দ করে, এ ধারণা ওর। ধারণা সত্যি প্রমাণিত হলো। আইসক্রিম দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো অহনা। রিকশায় বসে অহনা ও সৈকত আইসক্রিম খেতে লাগলো। রিকশা চলছে। অহনার পাশে বসে সৈকত রিকশায় আগেও চড়েছে। কখনো ওর প্রতিক্রিয়া হয়নি। কিন্তু আজ ওর অনভূতিতে কেমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। অহনার শরীর থেকে মাতাল করা মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। ওর ভেতরে এক ধরনের তোলপাড় চলছে অনেকক্ষণ থেকে। সৈকতের মনে হচ্ছিল অহনার শরীরে ওর শরীর স্পর্শিত হয়ে কোনো এক মধুর সংগীত রচিত হচ্ছে। এই সংগীতের মূর্ছনা শুধু ওরা দুজনই উপভোগ করছে। আইসক্রিম খেতে গেলে সৈকতের মুখে আইসক্রিমের গলিত অংশ লেগে যায় বরাবর। এখনো তাই হলো। ও পকেটে রুমাল হাতড়াতে লাগলো। এ সময় অহনা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলো টিস্যু। অহনা ভালোভাবেই আইসক্রিম খাওয়া সম্পন্ন করেছে। সৈকত টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নিলো। অহনা ঘাড় ঘুরিয়ে সৈকতের দিতে তাকিয়ে বললো-
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি? হোটেল সোনারগাঁওতেই তো যাচ্ছি, তাই না?’
‘কেনো আপনি কি পাত্রকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়ছেন?’
‘ছিঃ! আপনি যে কী বলেন!’
এ কথায় হেসে উঠলো সৈকত। লাজুক চোখে তাকালো অহনা। বললো-
‘হাসছেন কেনো?’
‘হাসছি আপনার লজ্জা দেখে। আচ্ছা, রায়নার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, জানেন তো?’
‘জানবো না কেনো? ও ফোন করে আপনার কথা জানিয়েছে।’
‘ও কী বলেছে?’
‘বলেছে আপনি একজন ভালো মানুষ ও ভদ্রলোক।’
‘আপনার দৃষ্টিতে আমি কেমন?’
‘এ প্রশ্ন করছেন কেনো?’
‘জানতে ইচ্ছে করছে।’
সৈকতের এ কথার জবাব দিলো না অহনা। ও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। সৈকত হতাশ হলো না। ও প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো-
‘আচ্ছা, আপনি যাকে দেখতে যাবেন, আই মিন আপনার পাত্র কী করেন?’
‘তিনি চার্টার অ্যাকাউন্ট্যান্ট। উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাবেন বলে শুনেছি।’
‘নিশ্চয়, বিত্তবান কেউ হবেন।’
‘ছেলেদের পারিবারিক ব্যবসা আছে। আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে।’
বললো অহনা। গোপন এক দীর্ঘশ্বাস চেপে সৈকত বললো-
‘একটা প্রশ্ন করবো?’
‘করুন।’
‘কেমন পাত্রকে আপনার জন্য যোগ্য মনে করেন?’
এ প্রশ্নে ঘাড় ঘুরিয়ে সৈকতের দিকে তাকালো অহনা। সৈকত একটু বিচলিত কণ্ঠে বললো-
‘খুব কঠিন প্রশ্ন করে ফেললাম?’
‘না, তা কেনো। তবে ভাবছি এ প্রশ্ন কেনো করছেন?’
‘আসলে জানতে ইচ্ছে করছে, আপনার জীবনসঙ্গী হিসেবে আপনি কেমন একজন মানুষকে কল্পনা করেন। বলতে অসুবিধা আছে, বা সংকোচবোধ করছেন?’
অহনা ফের মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ও বললো-
‘আমি মনে করি, শিক্ষিত, মার্জিত, স্মার্ট, দায়িত্ববান ও ব্যক্তিত্ব আছে এমন একজন মানুষকে বিয়ে করা উচিত। তবে সে সঙ্গে তাকে হতে হবে উদার মানসিকতার বন্ধু ভাবাপন্ন এবং সংস্কৃতমনা।’
‘আর?’
‘আর পরোপকারী, নিরাহঙ্কারী এবং স্বপ্নপ্রবণ হলে আরো একধাপ এগিয়ে গেলো।’
‘আরো চাওয়ার কিছু থাকলে কী চাইবেন?’
‘অসম্ভব জ্ঞানী, মেধাবী এবং ঈর্ষণীয় গুণের অধিকারীও হতে পারে।’
‘আরো বলতে বললে?’
‘বলবো বিত্তবান ও প্রভাবশালীও হতে হবে।’
অহনার কথায় একটু ভাবলো সৈকত। এরপর ও বললো-
‘একজন মানুষের এতোগুলো গুণ বা ক্ষমতা কিংবা সক্ষমতা আছে, এমন পাওয়া সহজ নয়। তাই না?’
‘হুম।’
‘এখন যদি বলি, খুব সাধারণ চাওয়ার মতো কাউকে পছন্দ করতে হলে কেমন মানুষ আপনি চাইবেন?’
এ প্রশ্নে অহনা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। হয়তো ও কিছু ভেবে নিলো। এরপর ও বললো-
‘আমি মানবিক বোধসম্পন্ন, সৎ, শিক্ষিত, রুচিবান ও সংস্কৃতমনা কাউকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করতে চাই।’
‘বিত্ত আর প্রভাবশালী না হলেও আপনার পছন্দের তালিকায় ঠাঁই পাবেন যে কোনো শিক্ষিত, মার্জিত, সৎ ও সুশীল মানসিকতার যে কেউ?’
‘অফকোর্স!’
জোর দিয়ে বললো অহনা। সৈকতের বুকে জমে থাকা অস্বস্তির পাথর যেনো নেমে গেলো। ওর ভেতরে এক ধরনের সাহস জেগে উঠছে। ও নিজের ভেতরে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে যেনো। ও এবার রিকশাওয়ালার উদ্দেশে বললো-
‘এই রিকশা ঘুরাও। মগবাজার যাও।’
রিকশাওয়ালা বললো-
‘জ্বে, স্যার। যাইতাছি।’
রিকশাওয়ালা রিকশা ঘুরিয়ে নিতেই অহনা প্রশ্ন করলো-
‘মগবাজার কি হোটেল সোনারগাঁওয়ের কাছে? ৪টা কিন্তু হয়ে আসছে।’
সৈকত মুসকি হাসি মুখে ধরে রেখে বললো-
‘আমি কিন্তু আপনাকে হোটেল সোনারগাঁওয়ে নিয়ে যাচ্ছি না।’
‘হোয়াটস, বলেন কী! কেনো?’
‘আমরা এখন বিশেষ একটি স্থানে যাচ্ছি, বিশেষ একটি উদ্দেশে।’
‘কোথায়?’
‘মগবাজার, কাজি অফিসে।’
‘কাজি অফিসে! কেনো?’
বিস্ময় প্রকাশ করলো অহনা। সৈকত স্বপ্নাবিষ্ট কণ্ঠে বললো-
‘আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, অহনা! এবং আজই। কিছুক্ষণের মধ্যেই!’
সৈকতের কথায় হতভম্ব হয়ে গেলো অহনা। ওর শরীর কেঁপে উঠলো। ওর মাথার ভেতরটা চক্কর দিয়ে উঠলো। ধাক্কা লাগলো ঈন্দ্রীয় শক্তিতে। সৈকতের কথাটি কি ও ঠিকমতো শুনতে পেয়েছে? সৈকতের আবেগতাড়ি কণ্ঠ ও আবার শুনতে পেলো।
‘অহনা, আপনার জন্য পাত্র হিসেবে যে যোগ্যতার কথা বলেছেন, আমি কিন্তু সেই যোগ্যতার বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আমি ওই যোগ্যতার মাপকাঠিতে নিজেকে বিচার করছি না। আমি আপনাকে চাই ভালোবাসার দাবিতে।’
অহনা কী বলবে বুঝতে পারছে না। ও শরীরের কাঁপুনি বেড়ে যাচ্ছে। ওর কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সৈকত যেনো এ মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড করে দেয়া এক ঝড়। ওর ভেতরের লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে ও, কিন্তু এই ভেঙে যাওয়া ওর ভালো লাগছে। ওর ভেতরে ভয়, আড়ষ্টতা আর অজানা ভালোলাগার তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সৈকত এবার আরো দুঃসাহসী হয়ে অহনার একটি হাত ধরলো। বিদ্যুৎস্পর্শ হলো যেনো অহনার পুরো শরীরে। ও বাধা দিতে পারছে না। অহনার ডান হাতের মুঠো সৈকত ওর দুহাতের মুঠোতে বন্দি করে বললো-
‘তোমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখে আসছি, এ স্বপ্ন সফল করতে চাই। আমি সর্বান্তকরণে তোমাকে চাই।’
‘এসব কী বলছেন!’
অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো অহনা। ও নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়নি। সৈকতের হাতের মুঠো থেকে ওর হাত বের করতে সায় দিচ্ছে না ওর মন। কিন্তু ওর ভেতর থেকে একটা গুমোট কান্নার প্রবল ঢেউ যেনো বেরিয়ে আসতে চাইছে। সৈকত অহনার দিকে মুখ নিয়ে বললো-
‘আমার দিকে তাকাও, অহনা।’
অহনা তাকালো। ওর দুচোখে জলের দুটি ধারা নেমে আসছে। সৈকত এই অশ্রুজলকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বলে ধরে নিলো। ও আবেশিত গলায় বললো-
‘আমি দায়িত্বশীল স্বামী হবো অহনা। তোমার বন্ধু হবো। তোমাকে সুখী করার চেষ্টা করে যাবো আজীবন। তোমাকে ভালোবেসে যাবো পাগলের মতো। তোমাকে…!’
‘চুপ করো, প্লিজ!’
বললো অহনা। সৈকতকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে কথাটি বলার মধ্য দিয়ে অহনা নিজের অজান্তেই সমর্পণের স্বীকৃতি দিলো ওকে। সৈকতের মনে হলো ও চিৎকার করে কেঁদে ওঠে জীবনের সবচেয়ে গভীর আনন্দে। ভালোবাসাকে এভাবে মুঠোবন্দি করার কী যে আনন্দ, ওটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ও অহনার হাত তুলে এনে রাখলো নিজের বুকে। অহনা লাজুক চোখে তাকিয়ে বললো-
‘এসব কী হচ্ছে!’
‘প্রলয় এবং সৃষ্টি! একটু পরেই করবো বিয়ে, হবে শুভ দৃষ্টি!’
সৈকতের ছড়ায় না হেসে পারলো অহনা। ওর মধ্যে সৈকতকে নিয়ে এক ধরনের স্বপ্নের ঘোর ছড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত। হঠাৎ করেই বদলে যাচ্ছে ওর পৃথিবী। এতো দ্রুত কি আমূল বদলে যায় সবার জীবন? এ প্রশ্ন নিয়ে অহনা অন্যরকম আবিষ্টতায় নিজের মাথা এলিয়ে দিলো সৈকতের কাঁধে। ওর মনে হচ্ছে পৃথিবীটা ভীষণ আলোকিত!
________________________________________
বিষন্ন বেহাগ
এক.
লিজি সাধারণত কারো ব্যাপারে কৌতূহল দেখায় না। বিশেষ করে কারো ব্যক্তিগত ব্যাপার জানার ওর কৌতূহল নেই। ওর মধ্যে কৌতুহলবোধ কম। ও বড় হয়েছে নিউইয়র্কে। নিউইয়র্কে বড় হয়েছে বলেই হয়তো ওর মধ্যে আমেরিকানদের চারিত্রিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমেরিকানরা কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কৌতূহল দেখায় না। বাংলাদেশের লোকেরা ঠিক এর উল্টো। বাংলাদেশের সবার মধ্যে তীব্র কৌতূহল। কে কী করলো, কার চরিত্র কেমন, কার বদ অভ্যাসগুলো কী- এসব নিয়ে অনেকে আলোচনা করতে পছন্দ করে। অন্তত লিজির তাই ধারণা। ও যতোবার বাংলাদেশে এসেছে, ততোবার ওকে পরিচিতজনের নানা রকম কৌতূহলী প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। ওর বিয়ে কেনো হয়নি, বা হচ্ছে না- এই প্রশ্নের জবাব এ পর্যন্ত ওকে দিতে হয়েছে অনেকবার। হয়তো আরো দিতে হবে। ও এটা জানে। যে লিজি কারো ব্যাপারে কৌতূহল প্রকাশ করে না, সে এবার বাংলাদেশে এসে হঠাৎ করে একজনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। এই কৌতূহল সৃষ্টির যথেষ্ট কারণও আছে। যাকে নিয়ে ওর এই কৌতূহল, তার নাম আবিদ। আবিদের আচরণ রহস্যজনক। তার অদ্ভুত আচরণ ওর মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। আবিদ ভাতসাইল গ্রামের একটি নৈশ্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই অজপাড়া গাঁয়ে সে স্কুল নিয়ে পড়ে আছে। এই স্কুলটি খুলেছে লিজির মামা আকরাম চৌধুরী। ওর মামা চাকসাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। গ্রামের কৃষক, দিনমজুর বা কর্মজীবী নিরক্ষর মানুষদের রাতের বেলায় সাক্ষরতা জ্ঞান দেয়ার লক্ষ্যে তিনি এই নৈশ স্কুল খুলেছেন। আবিদ এই স্কুলের একমাত্র শিক্ষক। গ্রামে বেড়াতে এসে এই স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে লিজি। ওর স্কুলে যোগ দেবার গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে। ও নিউইয়র্কে একটি কলেজে পিএইচডি করছে। ওর পিএইচডির বিষয় হচ্ছে ‘তৃতীয় বিশ্বের গ্রামীণ জনজীবন’। উন্নত বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বের নানা বিষয় নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়। সামার ভেকেশনে এসে লিজি মামার বাড়িতে থেকে বোঝার চেষ্টা করছে গ্রামীণ জনজীবনের প্রকৃত চিত্র কী রকম। বলা যায় ও এবার গ্রামে এসে প্রাকটিক্যাল ক্লাস করছে। অনেকটা হাতে-কলমে শেখার মতো। ওর মামার বাড়ি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকায়। এখানকার গ্রামগুলো ঘুরে ও থিসিস তৈরি করতে চায়। তাই লিজি গ্রামে এসেই যোগ দেয় ওর মামার গড়া নৈশ স্কুলে, শিক্ষিকা হিসেবে। স্কুলে যোগ দিয়েই ওর মনে হয়, গাঁয়ের অতি সাধারণ লোকদের সাক্ষরতাদানের মধ্য দিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতা লাভ করতে যাচ্ছে ও।
লিজি চাকসাইল ও ভাতসাইল গ্রামে আগেও এসেছে। তখন গ্রামের মানুষ নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এবার গ্রামে বেড়াতে এসে ও এই প্রথম সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রামে ঘুরে লোকদের সঙ্গে মিশে ওর মনে হয়েছে গাঁয়ের লোকদের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের নিরন্তর সরলতা। তাদের এই সরলতা সবসময় প্রকটভাবে ফুটে থাকে, শান্ত পুকুরে পদ্ম ফুটে থাকার মতো। সামগ্রিক বিষয়ে গ্রামের লোকগুলোর অজ্ঞতা রয়েছে, অথচ এই অজ্ঞতার জন্য তারা মোটেও বিব্রতবোধ করে না। তাদের জীবন দর্শন সাটামাটা। বেঁচে থাকার জন্য তারা প্রতিদিন সংগ্রাম করে। দারিদ্র্যতার সঙ্গে তাদের লড়াই আর দৈনন্দিন টানাপড়নে তারা অভ্যস্ত। প্রতিনিয়ত তাদের স্বপ্ন ভেঙে যায়। কিন্তু তারা এতে মুষড়ে পড়ে না। বরং কখনো কখনো তারা স্বপ্নহীন পথ চলে। আবার একটু কিছু প্রাপ্তিতেই তারা সীমাহীন আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটলো, কোথায় যুদ্ধের দামামা বাজলো বা কোথায় নতুন কিছু আবিষ্কারের ডামাডোল হচ্ছে, সে খবর তারা রাখে না। বা রাখতে পারে না। অনেক সময় তারা এসব জানতে পারে না, বা জানতে চায় না। ঘটনাক্রমে এ ধরনের খবর তাদের কানে এসে পৌঁছলেও এসব খবর তাদের স্পর্শ করে না। গ্রামের মানুষ নিয়ে লিজির ধারণা হয়েছে ও রকম। গ্রামের লোকদের নির্মোহ জীবনযাপন লিজিকে ভীষণ অবাক করে। অবশ্য ওর মা ওকে বলেছেন যে, গ্রামে কুটিল বুদ্ধিসম্পন্ন হিংস্র এবং পরশ্রীকাতর শ্রেণির লোকও রয়েছে। তারা সর্বক্ষণ অন্যের অমঙ্গল কামনা করে এবং নির্দয়ভাবে অন্যের ক্ষতি সাধন করে। চাকসাইল ও ভাতসাইল গ্রামে ঘুরে লিজি এ ধরনের লোক এখনো দেখতে পায়নি। হয়তো তারা আছে, লিজি তাদের দেখা পাচ্ছে না। ওর মা এই গ্রামেরই মেয়ে। নিজের গ্রামের লোকদের চরিত্রের একটা ধারণা নিশ্চয় তার আছে। মাঝে মাঝে এ কথাও ভাবে লিজি।
লিজি গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে বুঝতে পেরেছে তাদের প্রায় সকলে আবিদকে খুব সম্মান করে। ও বিভিন্ন সময় অনেকের সঙ্গে আবিদের ব্যাপারে কথা বলে দেখেছে, আবিদকে তারা ‘পাগল’ বলে মনে করে। আবার তাকে খুব পছন্দও করে। লিজির ধারণা, আবিদ ইচ্ছে করে নিজের পাগলামি একটা চরিত্র নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। ও নিশ্চিত, আবিদ পাগল নয়। সে পাগলের ভান করে থাকে। কখনো কখনো সে ইচ্ছে করে অস্বাভাবিক আচরণ করে, যা দেখে অনেকে তাকে পাগল ভেবে নেয়। অনেক লোক আছে, যারা ভান করে থাকতে পছন্দ করে। কেউ আছে নিজেকে রহস্যের মধ্যে রাখতে আনন্দ পায়। কেউবা নানা কারণে নিজেদের আড়াল করে রাখতে চায়। এ ধরনের রহস্য শিল্পীও করতে পারে, খুনিও করতে পারে। লিজির ধারণা, আবিদ খুনিটুনি কেউ হবে। আবিদকে নিয়ে লিজির প্রথম থেকেই এ রকম সন্দেহ। সন্দেহ থেকেই কৌতূহলের সৃষ্টি। লিজি ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেছে, আবিদ সব সময় নিজেকে সবার কাছ থেকে সযত্নে আড়াল করে রাখে। কারো সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। কারো সঙ্গে মেশে না। এমনকি কারো মুখের দিকে তাকায়ও না। এমন নির্লিপ্ত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য কারো হতে পারে না। এটা আবিদের নিজের মধ্যে নিজেরই আরোপিত চরিত্র। খুব নিখুঁতভাবে কৃত্রিম নির্লিপ্ততাকে সে নিজের মধ্যে ধরে রেখেছে। লিজি প্রথম প্রথম আবিদের রহস্যময় চরিত্র নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়নি। ও ধরে নিয়েছিল, আবিদ একজন নিষ্ঠুর শ্রেণির আত্মকেন্দ্রিক এবং অহংকারী মানুষ। কিন্তু যতোই দিন যাচ্ছে, আবিদের ভেতরের অন্য এক সত্ত্বার সন্ধান পাচ্ছে লিজি। ধরা যাক কালকের কথা। কাল আবিদ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ বিকেলে দিগন্তের দিকে তাকিয়েছিল তন্ময়ভাবে। লিজি আবিদকে এমন তন্ময় হয়ে থাকতে দেখেনি। ও স্কুলঘর থেকে বের হয়ে আবিদের সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশে ওর কাছে এসে শান্ত গলায় বললো-
‘যারা এভাবে মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে, তারা এমন অহংকারী হয় কিভাবে!’
শান্ত পুকুরে হঠাৎ ঢিল ছুড়ে মৃদু ঢেউ তোলার মতো প্রশ্ন। প্রশ্নটা করে লিজি ভেবেছিল আবিদ তার আরোপিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রশ্নের জবাব দেবে না। কিন্তু লিজিকে অবাক করে দিয়ে আবিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
‘প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব অহংকার থাকা উচিত!’
আবিদ কথাটি বললো নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার মতো করে। লিজি সময় নষ্ট না করে কণ্ঠে বিস্ময় তুলে বললো-
‘কেনো!’
এক ধরনের তন্ময়তার মধ্যে আবিদ বললো-
‘অহংকার হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্বের দ্যুতি।’
‘তাই না-কি! যারা নিরাহংকারী, তবে তারা কী? তাদের কি ব্যক্তিত্ব নেই?’
‘আমার কাছে অহংকারহীন মানুষকে ছাপোষা প্রাণী বলে মনে হয়। তারা বেঁচে থাকে শুধু। এই বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে তারা জীবনটাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। একসময় মরে যায়। এই দ্যুতিহীন জীবন কী দিতে পারে সমাজকে, এই পৃথিবীকে?।’
আবিদের প্রশ্নটা ভালো লাগলো লিজির। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর চট করে দেয়া যায় না। অনেক সময় বুঝে ওঠাও যায় না। লিজি তর্ক করার ভঙ্গিতে বললো-
‘আপনার দৃষ্টিতে যারা দ্যুতিহীন, তারা বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে কি জীবনকে উপভোগ করছে না?’
দিগন্তে মুখ রেখেই আবিদ বললো-
‘যারা বৈষয়িক এবং বিত্ত-বৈভব হাতড়ে বেড়ায়, যারা প্রাপ্তিটাকেই জীবনের বড় অর্জন বলে মনে করে, তারা সময়কে উপভোগ করে, জীবনকে নয়।’
‘কী রকম?’
‘তারা আসলে জীবনটাকে চেনে না। বিশেষ বিশেষ সময়ে তারা ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত হয়ে জীবনের স্বার্থকতা খোঁজে। আমি মনে করি, তারা জীবনের জানান দিতে পারে না। যাপনের শুদ্ধতা বোঝে না। তারা কখনো সৃষ্টির মহত্ব খোঁজে না। তারা এক ধরনের অন্ধ, পথভ্রষ্ট!’
আবিদ যেনো অন্যলোকে হারিয়ে গেছে। কথা বলছে দিগন্তের দিকে চেয়ে। এমনভাবে কথা বলছে, যেনো বাণী আওড়াচ্ছে। লিজি তাকে থামাতে চায় না। ও বললো-
‘আর!’
‘তারা অন্ধের মতো স্রষ্টার বন্দনা করে। তারা স্রষ্টার সন্ধান করতে জানে না। তারা সৃষ্টিশীলতা, শিল্পময়তা বা নান্দনিকতা বোঝে কি-না- কে জানে! তারা আটপৌড়ে জীবনের সীমারেখায় বন্দি হয়ে থাকে।’
‘এক্সিলেন্ট! তারপর…! আরেকটু বলুন, প্লিজ!’
লিজির আকুতি আবিদ শুনতে পেলো না যেনো। সে তন্ময়তার মধ্যে বললো-
‘আর যে জীবনের মহত্ব নিয়ে ভাবে, যে জীবনের সীমারেখা ভেঙে চলে, যে এক তুমুল স্বপ্ন থেকে হাজার স্বপ্নের অনুরণন তোলে- সেই তো জীবনবোধে সংগ্রামী মানুষ হয়। আর তখনই তার মধ্যে জন্ম নেয় এক ধরনের অহংকার।’
‘বেশ তো! বলে যান, প্লিজ!’
‘এই অহংকার হাত পেতে পাওয়া যায় না। এটি কোনো স্বপ্নে পাওয়া অলৌকিক কিছুও নয়। এটা অর্জন করতে হয়। তাই আমাকে যদি অহংকারী বলেন, তবে আমি বলবো- এই অহংকার আমি অর্জন করেছি।’
কথার জলপ্রপাত যেনো নামলো। কথায় কথায় কেমন মুগ্ধ হয়ে গেলো লিজি। আবিদ তাহলে অতটা অজ্ঞ নয়। অজ্ঞতার ভান করে থাকে। এটাও তো এক ধরনের কপটতা, বুঝতে পারলো লিজি। আবিদ দিগন্তের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে লিজির মুখোমুখি হলো। দৃষ্টি অবনত। লিজি মুগ্ধকণ্ঠে বললো-
‘আমি এমন কথা কখনো শুনিনি!’
হঠাৎ আবিদের যেনো তন্ময়তা ভেঙে গেলো। ও চুপ মেরে গেলো। কিন্তু লিজি নাছোড়বান্দা। ও চায় আবিদ কথা বলুক। কথা বললে মানুষ তার স্বরূপ গোপন করে রাখতে পারে না। কথা বললে নিজের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। লিজি আবিদকে উসকে দিতে বললো-
‘আপনি যা বললেন, তা কখনো আমি শুনিনি। বা আমাকে এমন করে কেউ বলেনি!’
আবিদ লিজির এ কথায় বিরুক্তি প্রকাশ করে বললো-
‘সব কথা সবাইকে শুনতে হবে, এ ধারণা ঠিক নয়।’
এ কথায় লিজির মাথায় রাগ চেপে যাওয়ার কথা। অন্য সময় বা অন্য কেউ এমন কথা বললে ও রেগে যেতো। ও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-
‘তা ঠিক, সব কথা সবাই জানবে, এমন হতে পারে না। কিন্তু আপনার কথাই যে সত্যি, তা কেনো বিশ্বাস করবো?’
আবিদ এর কোনো জবাব দিলো না। ও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। লিজি ফের বললো-
‘কি হলো, আমার প্রশ্নের জবাব দেবেন না?’
‘আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না।’
আবিদ বিরক্ত গলায় বললো। লিজি তাগিদ দেবার মতো করে বললো-
‘কিন্তু আমার জানতে হবে, কেনো আপনার কথা বিশ্বাস করবো। আপনাকে তা বলতে হবে।’
‘জোর কথা বের করা হয়তো যায়; কিন্তু বিশ্বাস জোর করে হয় না। আমার কথাকে আপনাকে বিশ্বাস করতে কে বলেছে? আপনি বিশ্বাস করতে না চাইলে, করবেন না। ব্যাস!’
বললো আবিদ। লিজি বললো-
‘আপনার কথাগুলো সুন্দর। তবে যুক্তিনির্ভর কিনা বুঝতে পারছি না। তবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। তাই আপনার কাছ থেকে এ কথাগুলোর যুক্তিও খুঁজছি।’
আবিদ ফের ঘুরে দিগন্তের দিকে চেয়ে রইলো। ও লিজির এ প্রশ্নের জবাব দিতে চায় না। লিজিকে সে উপেক্ষা করছে, সেটা সে জানান দিতে চায়। লিজি বললো-
‘আপনি কি কিছুই বলবেন না?’
এর কোনো জবাব দিলো না আবিদ। ও লিজির প্রশ্নকে উপেক্ষা করে দিগন্তের দিকে চেয়ে রইলো। লিজির রাগ বাড়তে লাগলো। ও এবার রাগী গলায় বললো-
‘আপনি ভাবছেন আপনার দাম্ভিকতা আপনার ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করছে? আপনি কি জানেন, অহংকার করার মতো আপনার কিছু নেই? অন্তত আমি আপনার মধ্যে এমন কিছু দেখছি না।’
আবিদ লিজির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলো। দিগন্তের দিকে মুখ রেখে ও বিনয়ী গলায় বললো-
‘আমি কি বলেছি যে, অহংকার করার মতো আমার কিছু আছে? আপনি কেনো আমার মধ্যে ওসব খুঁজতে যান?’
‘আমি আপনার মধ্যে ও সব খুঁজতে যাবো কেনো? আপনার অজ্ঞতা দেখে আমার আফসোস হচ্ছে!’
আবিদ চুপ করে রইলো। লিজির ভেতরে একটা প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। ও ফের বললো-
‘আপনি কি শুনেছেন যে, আপনার অজ্ঞতা দেখে আমার আফসোস হচ্ছে?’
আবিদ এবার একটু হাসলো। ও বললো-
‘আমার দুর্ভাগ্য যে, আপনার আফসোসের কারণ হয়েছি।’
লিজি ভীষণ অপমান বোধ করলো এ কথায়। ও বললো-
‘আপনি একটা ইডিয়েট!’
এ কথা বলে লিজি রাগে কাঁপতে লাগলো। আবিদ ওর রাগকে গায়ে না মাখার ভাব করে বললো-
‘আপনি অকারণে আমার ওপর রাগছেন। আমাকে বা আমার কথাকে অতোটা গুরুত্ব দিচ্ছেন কেনো? আমার কোনো গুরুত্ব নেই। আমার কথারও গুরুত্ব নেই।’
‘আপনি ভীষণ সিলি ক্যারেক্টরের লোক। আপনাকে গুরুত্ব দেবার মতো রুচি আমার নেই।’
‘শুনে ভালো লাগলো।’
‘আপনার ভালোলাগা বা মন্দলাগাতেও আমার কোনো কিছু যায় আসে না।’
‘আর কিছু বলবেন?’
‘না। আপনি আমার সামনে থেকে যান, প্লিজ!’
আবিদ আর কোনো কথা বললো না। ও নিঃশব্দে চলে গেলো। ও লিজির দিকে ফিরে তাকালো না। লিজি রাগের উত্তাপে কাঁপতে লাগলো। এ রকম রাগ ওর কখনো হয়নি। ওর দুচোখ গড়িয়ে অশ্রুধারা নেমে এলো। রাগলেই ওর কান্না পেয়ে যায়। এখনো তাই হলো। টপটপ করে ওর দুচোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছে। একসময় লিজি মনে মনে এই অশ্রুধারার নাম দিলো ‘অপমান’।
দুই.
বাস থেকে নেমে ভীষণ অবাক হলো রাহাত। চাকসাইলের চেহারাই যেনো বদলে গেছে। ও চিনতে পারছিল না। মাত্র ছয় বছরে একটি গ্রাম এমন বদলে যেতে পারে, তা ও কল্পনাও করেনি। চারপাশে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে রাহাত ভাবলো চাকসাইলকে এখন আর গ্রাম বলা যাবে না। ছোট একটি উপশহর বলা যায়। ও এই চাকসাইলকে অজপাড়া গাঁ হিসেবে দেখে ঢাকা গিয়েছিল। ছয় বছর পর এসে দেখলো চাকসাইল এখন ব্যস্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। রাহাত ঢাকায় থাকতে শুনেছে চাকসাইল ভাতসাইলসহ আশপাশের গ্রামগুলো একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। এখানে আর গরুর গাড়ির চলাচল নেই। চাকসাইলে পাকা রাস্তা হয়েছে। নগর জীবনের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে এসব গ্রামে। বাস এসে থামছে এখানে। রাস্তার দু-পাশে এখানে-সেখানে খোলা হচ্ছে দোকানপাট। চাকসাইলে মানুষের জটলা, হৈ-হুল্লোড় যখন-তখন লেগেই থাকে বলে ও শুনেছে। আজ চাকসাইলে বাস থেকে নেমে কথাটি সত্যি মনে হলো ওর। যদিও এই মুহূর্তে রাস্তা ফাঁকা। কিন্তু বাসস্ট্যান্ড থেকে নামার পর ও অচেনা লোকজনের ব্যস্ত ছুটোছুটি ও হৈ-হুল্লোড় দেখেছে। লোকগুলো কোথাও যেনো দ্রুত মিলিয়ে গেলো। গ্রামে অচেনা লোক খুব একটা দেখা যায় না। রাহাতের বাড়ি চাকসাইলের পাশের গ্রাম ভাতসাইলে। শহরে যেতে হলে ভাতসাইলের সবাইকে চাকসাইল হয়েই যেতে হয়। আজ ছয় বছর পর গ্রামে ফিরে চাকসাইলের পরিবর্তন দেখে রাহাত অবাক না হয়ে পারলো না। ও বেশি অবাক হলো, যখন দেখলো রাস্তার পাশে টপস ও স্কার্ট পরিহিত এক তরুণী চেইন খুলে যাওয়া সাইকেল নিয়ে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেয়েটির গায়ে লাল রঙের টপস। টপসের গলায় নকশী আঁকা সুতার কাজ। সাদা স্কার্টের ওপর টপসটি বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। এখানে টপস ও স্কার্ট পরিহিতি কোনো মেয়ে দেখবে রাহাত কখনো কল্পনাও করেনি। মেয়েটি চারপাশে তাকিয়ে কেউ সাহায্য করতে পারে- এমন কাউকে খুঁজছে। চাকসাইল বা ভাতসাইলের মেয়েরা হঠাৎ করে কোন মন্ত্রবলে আধুনিক হয়ে গেলো কি? প্রশ্নটা রাহাতের মনে কিছুক্ষণের জন্য উঁকি দিয়েছিল। এই প্রশ্ন জড়ানো চোখে ও মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকাতেই ওর বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। হৃৎপিণ্ডে ধুকধুক শব্দ বেড়ে গেলো। ওর মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল যেনো। ও নিজেকে সামলে নিলো। ছয় বছর পর হলেও রাহাত লিজিকে চিনতে পারলো। প্রথম দেখাতেই ও লিজিকে চিনতে পারতো, যদি লিজির গায়ে সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি থাকতো- এটা ও হলফ করে বলতে পারে। টপস ও স্কার্ট পরা অবস্থায় রাহাত লিজিকে দেখবে, এর জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। লিজির সঙ্গে ওর দেখা হবে, এটাই ও ভাবেনি। অথচ ওর চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত লিজি দাঁড়িয়ে আছে! এ যেনো বিস্ময়ের চেয়েও ঢের বিস্ময়কর দৃশ্য। রাহাত লিজির দিকে ভালো করে তাকালো। লিজি আগের মতো ছিপছিপে নেই। ওর শরীর একটু ভারী হয়েছে। টপস পরায় ওর হৃষ্টপুষ্ট বুক নিটোল সৌন্দর্যের অহংকার জানান দিচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে রাহাতের ভেতরে মিহিন একটা তোলপাড় উঠলো। রাহাত দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। একটু পর ও তাকালো লিজির মুখের দিকে। ওর সুশ্রী মুখমণ্ডলে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য প্রতীয়মান। ওর টিকালো নাকে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝিলিক দিচ্ছে। চিবুকের মাঝখানের ছোট্ট বাঁক ওর মিষ্টি মুখটাকে অপ্সরীর মাত্রা এনে দিয়েছে। প্রায় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা লিজিকে এ মুহূর্তে পথভোলা এক পরীর মতো লাগছে। কোমল ধবধবে ওর পা দুটি চাকসাইলের নির্জন রাস্তায় টিউবলাইটের মতো জ্বলজ্বল করছে। পরীর ডানা থাকে এবং পরনে থাকে মখমলের গাউন। লিজির ডানা নেই এবং ওর পরনে টপস ও স্কার্ট। এটুকুই পার্থক্য। এ কথা ভাবতে ভাবতে রাহাত ওর দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো। যেনো সৌন্দর্য পিপাসু ধ্যান ভেঙে যাওয়া এক মন্ত্রমুগ্ধ সন্যাস। এই মুগ্ধতার মধ্যে রাহাত ভাবলো আগে এই লিজিকে এক ঝলক দেখার জন্য ওর বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করতো। ওর দেখা না পেলে দিনভর ছটফট করতো। ওর রাতে ঘুম হতো না। ও লিজির মুখোমুখি কখনো দাঁড়ায়নি। দূর থেকে ওকে দেখেও রাহাত তন্ময় হয়ে যেতো। লিজিকে এক ঝলক দেখার জন্য ওকে অনেক বড় খেসারত দিতে হয়েছে। ওকে গ্রাম পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছে। চাকসাইলের চৌধুরী বাড়ির মেয়েদের দিকে আশপাশের গ্রামের কোনো যুবকরা সাধারণত চোখ তুলে তাকাতে সাহস পায় না। পুরো অঞ্চলে চাকসাইলের চৌধুরী বাড়ির ভীষণ প্রভাব-প্রতিপত্তি। ভাতসাইল গ্রামেও চৌধুরী বাড়ি রয়েছে। এদের প্রভাব বা প্রতিপত্তি নেই। রাহাত ভাতসাইলের চৌধুরী বাড়ির ছেলে। ওরা নামের শেষে চৌধুরী লেখে ঠিক, তবে ওদের সামাজিক প্রভাব নেই। চাকসাইলের চৌধুরী বাড়ির লোকেরা বিত্তশালী আর ভাতসাইলের চৌধুরী বাড়ির লোকেরা নিম্ন মধ্যবিত্ত। অর্থনৈতিক বৈষম্য দুটি চৌধুরী বাড়ির সামাজিক পার্থক্য নির্ণয় করে রেখেছে।
কিন্তু ভালোলাগার সম্মোহন অনেক সময় ভয়কে তোয়াক্কা করে না। রাহাতও ভয়-ভীতিকে তোয়াক্কা না করে এগিয়ে গিয়েছিল লিজির দিকে। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারেনি। চাকসাইলের চৌধুরী বাড়ির ছেলেরা ওকে গ্রামছাড়া করেছিল। আজ ছয় বছর পর যখন ও গ্রামে ফিরলো, প্রথমেই ও দেখা পেলো লিজির। এ যেনো অদৃশ্য শক্তির অদ্ভুত রহস্য!
লিজি নিউইয়র্ক থেকে চাকসাইলে নিশ্চয় বেড়াতে এসেছে। রাহাত মনে মনে ভাবে। এর আগেও লিজি চাকসাইলে বেড়াতে এসেছে, তবে সে সময় রাহাত গ্রামে আসেনি। ও লিজির গ্রামে আসার খবরটা পেয়েছিল। কিন্তু ও গ্রামে আসেনি। লিজিকে দেখার প্রবল ইচ্ছেটা ততোদিনে থিতিয়ে এসেছিল। গ্রাম ছাড়ার পর থেকে ও লিজিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছিল। আজকের দিন পর্যন্ত লিজিকে নিয়ে ওর কোনো কল্পনা ছিল না। আজ লিজিকে দেখামাত্র ওর বুকের ভেতরটা খরস্রোতা নদী হয়ে গেলো। ভেতরে ভেতরে কল্পনার একটা রিদম টের পেলো ও। যেনো বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের লাভার মুখ হাজার বছরের ঘুম ভেঙে খুলে যাচ্ছে। লিজির দিকে কতোক্ষণ অপলক তাকিয়েছিল, কে জানে। হঠাৎ রাহাত লক্ষ্য করলো লিজি ওকে হাতের ইশারায় ডাকছে। তন্ময়তার মধ্যে ফের একটা বিস্ময়ের ধাক্কা এসে লাগলো ওর। রাহাত নিজের চারপাশে চেয়ে দেখে নিলো অন্য কাউকে লিজি ডাকছে কিনা। কিন্তু রাহাত যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওর পেছনে বা পাশে কেউ নেই। অনেক মানুষ জীবনে অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়ে ঢের বেশি কিছু বুঝি পেয়ে যায়। রাহাতের এখন তাই মনে হচ্ছে। ও বিহ্বলতার মধ্যে এগিয়ে গেলো লিজির দিকে। মাত্র কয়েক কদম। রাস্তা পার হয়ে রাহাত গিয়ে দাঁড়ালো লিজির সামনে। ওর বুকের ভেতর তুমুল ভাঙচুর হচ্ছে। লিজি ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। বললো,
‘এক্সকিউজ মি, আমাকে একটু সাহায্য করবেন? আই নিড ইউর হেল্প। প্লিজ!’
রাহাত কোনো ভাষা খুঁজে পেলো না। ও কী বলবে, তা ঠিক করতে পারলো না। মনে মনে বললো- ‘একটু সাহায্য কেনো, অনেক সাহায্যই তো করতে প্রস্তুত।’
‘এক্সকিউজ মি, আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’
জানতে চাইলো লিজি। রাহাত এবার ধাতস্ত হলো। ও বললো-
‘কী বলছিলেন?’
‘বলছি, আমাকে একটু সাহায্য করবেন?’
রাহাতকে লিজি চিনতে পারছে না। ব্যাপারটা ও বুঝতে পারলো এবং ও ফের অবাক হলো। লিজির সঙ্গে রাহাতের কখনো কথা হয়নি। কিন্তু দেখা হয়েছে অনেকবার। যতোবার দেখা হয়েছে, তারপর রাহাতকে চিনতে না পারাটা একটু ভাবনার বিষয়। রাহাত এই ভাবনায় মুহূর্তেই অন্যমনষ্ক হয়ে গেলো। লিজি ফের বললো-
‘এই যে, শুনছেন? ক্যান ইউ হেল্প মি?’
রাহাত স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললো-
‘হ্যাঁ, বলুন- কী করতে পারি?’
লিজি মিষ্টি করে হাসলো। বললো-
‘আমার সাইকেলের চেইনটা খুলে গেছে। লাগাতে পারছি না। ওটা একটু ফিক্সড করে দেবেন?’
‘ঠিক আছে, দিচ্ছি।’
বলে রাহাত হাতের ব্যাগটি রাস্তার ওপর রেখে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো। বসতেই ওর চোখের সামনে লিজির কোমল দুটি পা জ্বলজ্বল করে উঠলো। এতো কাছ থেকে ও কখনো লিজির খোলা পা দেখেনি। রাহাতের ভেতরে কামনার দমকা হাওয়া বইতে লাগলো। কামনাসিক্ত আবেগ মানুষকে শুধু কাঁপায় না, ভাসিয়ে নিয়ে যায় অনেকদূর। নিজের ভেতরে নিজে ভাসতে ভাসতে রাহাত মন্ত্রমুগ্ধের মতো লিজির সাইকেলের চেইনটা একটু সময় নিয়ে লাগিয়ে দিলো। লিজি সাইকেলের সিটে পেট ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে দেখছিল রাহাতের চেইন লাগানোর কাজ। সাইকেলের চেইন লাগানোর পর রাহাত মাথা তুলতেই দেখলো লিজি ওর দিকে ঝুঁকে আছে। ওর টপসের ভেতর থেকে উদ্যত সৌন্দর্যের হৃষ্টপুষ্ট বুকের ঊর্ধাংশ যেনো বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওখানে দৃষ্টি পড়তেই রাহাতের চোখ যেনো ঝলসে গেলো। মাত্র কয়েকটা মুর্হূত। রাহাতের সাতাশ বসন্তের জীবন তুমুল কেঁপে উঠলো। উত্তেজনা ও আকর্ষণের মুহূর্তগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়। রাহাত উঠে দাঁড়াতেই লিজি হাসিমুখে বললো-
‘আমি অনেক ট্রাই করেছিলাম। আই কান্ট। বাট আপনি কত সহজে ফিক্সড করে ফেললেন!’
সাইকেলের চেইন লাগানো বিস্ময়ের কী আছে? লিজির বিস্ময় দেখে রাহাতের হাসি পেলো। ও হাসলো না এবং জবাবে কিছু বললো না। ভাব যেখানে গভীর, ভাষা সেখানে নীরব। লিজি ফের বললো-
‘আপনাকে মেনি মেনি থ্যাংকস।’
ধন্যবাদ পেয়ে রাহাত হাসলো। ওর মনে হলো সাইকেলের চেইনটা আরেকটু সময় নিয়ে লাগালে পারতো। লিজি বললো-
‘আপনি কোথায় যাবেন?’
এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রাহাত বললো-
‘আপনার নাম কি লিজি?’
রাহাতের প্রশ্নে এবার অবাক হলো লিজি। ওর কপালে কৌতূহলের ভাঁজ পড়লো। ও বললো-
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি আমার নাম জানেন কী করে!’
রাহাত মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে বললো-
‘আপনার অনেক কথাই আমি জানি।’
‘তাই না-কি! স্ট্রেঞ্জ!’
‘এতে অবাক হবার কী আছে? আপনি তো এই গ্রামে অনেক বছর কাটিয়েছেন।’
‘হুম। তা ঠিক। কিন্তু আপনি আমাকে চেনেন, আর আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। এটা কেমন, বলুন তো!’
‘অনেক সময় এমন হয়। তা ছাড়া আপনি এখন থাকেন নিউইয়র্কে। এই পাড়াগাঁয়ের কথা কী মনে থাকার কথা? সবার কথা মনে রাখাটাও তো কঠিন, তাই না?’
‘হয়তো আপনার কথাই ঠিক। তবে আমি এই গ্রামকে ভীষণ মিস করি।’
‘জেনে ভালো লাগলো।’
‘কী?’
‘এই যে গ্রামকে মিস করেন। পোশাকে-আশাকে শহুরে হলেও মনের দিক থেকে পুরোপুরি শহুরে হননি বলে!’
‘হয়তো তাই। তা আপনি কোথায় থাকেন? আপনার নাম কী?’
‘আমার বাড়ি ভাতসাইলে।’
রাহাতের নিজের নাম বলতে দ্বিধা লাগছে। ও বললো না। লিজি বললো-
‘আপনার নাম বললেন না যে!’
‘নাম জেনে কী হবে? আপনার সঙ্গে পথে দেখা হলো, কথা হলো- এটুকুই যথেষ্ট। তা ছাড়া আপনি চাকসাইলের চৌধুরী বাড়ির মেয়ে। আপনার সঙ্গে এভাবে কথা বলছি কেউ দেখলে আর রক্ষা নেই!’
এ কথায় হেসে ফেললো লিজি। হাসিমুখে ও বললো-
‘ডোন্ট ওরি। আমি এখন বড় হয়েছি। আপনাকে কেউ কিছু বললে, আমি দেখবো। তা ছাড়া কেউ কিছু বলবেও না। আগে এমন হতো, এখন দিন বদলেছে, বুঝলেন?’
এ কথা শুনে স্বস্তি পেলো রাহাত। ও বললো-
‘তারপরও আমরা আপনাদের বাড়ির লোকদের ভয় পাই। আপনার সামনে হয়তো কিছু বলবে না, পরে ঠিকই এর খেসারত দিতে হবে।’
‘স্ট্রেঞ্জ!’
‘আপনি অবাক হচ্ছেন কেনো? আপনি কি জানেন, আপনার জন্য একজনকে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল?’
প্রশ্নটা করে ফেললো রাহাত। ও ভেবেছিল এর জবাবে কিছু বলতে পারবে না লিজি। কিন্তু লিজি বললো-
‘হ্যাঁ, আমি এমন একটি ঘটনার কথা শুনেছিলাম।’
আবার অবাক হলো রাহাত। ও বললো-
‘কি শুনেছিলেন?’
‘শুনেছিলাম, একটি ছেলে না-কি আমাকে খুব ফলো করতো। এ কথা আমার কাজিনরা জেনে যায় এবং তারা ওই ছেলেটিকে মামাদের আমবাগানে কয়েকদিন আটকে রেখেছিল। হতে পারে, ওকে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। আই থিংক ইট ওয়াজ ভেরি হরোয়বল! আই কান্ট সাপোর্ট ইট।’
রাহাতের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সত্যিই লিজির মামাতো ভাইরা ওকে চৌধুরী বাড়ির আমবাগানে তিনদিন হাত-পা বেঁধে আটকে রেখেছিল। খেতে দিয়েছিল ভাতের ফেন। রাহাতের বাবা আলাপ-আলোচনা করে ‘তার ছেলে আর কোনোদিন লিজিকে অনুসরণ করবে না’ এই মর্মে মুচলেকা দিয়ে ওকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। এ ঘটনা গোপন থাকেনি। রাহাতও আর ভাতসাইলে থাকেনি। একরাশ লজ্জা নিয়ে ও চলে গিয়েছিল ঢাকায়। আজ অনেকদিন পর সেদিনের কথা মনে পড়ে গেলো ওর। ওর চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। ও তা সামলে নিয়ে। ছোট্ট করে বললো-
‘আচ্ছা, আসি। আমাকে ভাতসাইল যেতে হবে।’
লিজি বললো-
‘আমিও ভাতসাইল যাচ্ছি। আমার সঙ্গে যাবেন?’
লিজির এই প্রশ্নে হকচকিয়ে গেলো রাহাত। ও বললো-
‘না, না। আমি একটা ভ্যান নিয়ে চলে যাবো। আমি একটা রিকশা বা ভ্যানের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলাম।’
‘কিন্তু আপনার নামটা বললেন না।’
‘আমার নাম রাহাত। রাহাত চৌধুরী।’
জোর দিয়ে বললো রাহাত। ওর মনে হলো, যে গল্পের শুরু হয়নি, সে গল্পের মাঝখানে ও অর্থহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই গল্পের পরিণতি বললেও কিছু হবে না। সুতরাং গল্পের নায়িকার কাছে নিজের নাম যে কারণে ও গোপন রাখতে চেয়েছিল, সময়ের বিচারে এটি এখন অর্থহীন। এখন ওর আর লজ্জিত হবার কিছু নেই। লিজি বললো-
‘আপনার নাম বলার জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনার নামটা চেনাচেনা লাগছে।’
রাহাত বললো-
‘মনে করে দেখুন, আমাকে চিনতে পারেন কি-না। তবে আমাকে আপনি চিনতে না পারলে, এটা হবে আমার জন্য অনেক স্বস্তির ব্যাপার।’
‘রিয়েলি! হোয়াই?’
‘সব প্রশ্নের জবাব সব সময় দেয়া যায় না। আমিও আপনার এই প্রশ্নের জবাব এখন দিতে পারবো না।’
এ কথা বলার সময় রাহাত দেখলো রাস্তা দিয়ে একটি ভ্যান এগিয়ে আসছে। ও হাতের ইশারায় ভ্যান থামাতে বললো চালককে। ভ্যানচালক রাহাতের কাছে এসে ভ্যান থামালো। ভ্যানচালক কাঁধে রাখা ছেঁড়া মলিন গামছা দিয়ে তার ঘর্মাক্ত মুখ একবার মুছে নিয়ে রাহাতের উদ্দেশে বললো-
‘কনে যাবেন?’
‘ভাতসাইল।’
এ কথা বলে রাহাত ওর ব্যাগ রাস্তা থেকে তুলে রাখলো ভ্যানের ওপর। এরপর ও ভ্যানে চড়লো। এই কয়েকটা মুহূর্ত ও ইচ্ছে করেই লিজির দিকে তাকালো না। অর্থহীন ভালোলাগা প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কী? রাহাত ভ্যানে চড়ে লিজির দিকে তাকিয়ে শুধু হাত নাড়লো। ভ্যানটা চলতে শুরু করলো। রাহাতকে ‘কোথায় যেনো দেখেছে বা চেনাচেনা লাগছে’ লিজি এই চিন্তায় ডুবে গিয়েছিল। রাহাতের হাত নাড়ার জবাবে ও পাল্টা হাত নেড়ে বিদায় জানালো। ভ্যানটা একটু দূরে যেতেই লিজি রাহাতকে চিনতে পারলো। এই রাহাতই লিজিকে অনুসরণ করতো। ওকেই ওর কাজিনরা আমবাগানে আটকে রেখেছিল। এ কথা মনে করে লিজি আপন মনে হেসে উঠলো। লিজি মনে মনে ওর এই হাসির নাম দিলো ‘লাজুক উচ্ছ্বাস!’
তিন.
ফোনটার রিং বাজছে। ক্রিং ক্রিং শব্দ হচ্ছে। সুমিতা রহমান ফোন ধরছেন না। আজকাল তার ফোন ধরতে ইচ্ছে করে না। দিনদিন মানুষ কেবল ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফোনের ব্যবহার কেবল বাড়ছে। সবার হাতে হাতে এখন সেলফোন। আজকাল মাছ বিক্রেতার কাছেও সেলফোন থাকে, আশ্চর্য! সেলফোনের ব্যবহার নিয়ে সুমিতা রহমানের বিস্ময়ের শেষ নেই। আজকালকার ছেলেমেয়েরা সব কথাই যেনো ফোনে সেরে নিচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে অফিসের কার্যক্রম, পড়াশোনা কিংবা গবেষণায় সর্বত্র ফোন অপরিহার্যভাবে কাজে লাগছে। ফোনের দিকে তাকিয়ে চট করে এ কথাটা আরেকবার ভেবে নিলেন সুমিতা রহমান। তিনি ড্রইংরুমে সোফায় বসে আয়েশী ভঙ্গিতে টিভি দেখছিলেন। স্যাটেলাইটের যুগ। ক্যাবলে এখন শত শত টিভি চ্যানেল। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা থেকে সম্প্রচারিত হচ্ছে একডজনের বেশি বাংলা চ্যানেল। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এসটিভি ইউএস নামের একটি বাংলা চ্যানেল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারেন না, চারদিকে কেনো এতো টিভির ছাড়াছড়ি।
সুমিতা রহমান এসটিভি ইউস-এর কিছু প্রোগ্রাম নিয়মিত দেখেন। বিশেষ করে এই চ্যানেলে প্রতিদিন সম্প্রচারিত ‘আজকের শিরোনাম’ অনুষ্ঠানটি তিনি মিস করেন না। কারণ, এ অনুষ্ঠানটি দেখলে দেশ এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো তিনি জেনে যান। বলা যায় এ অনুষ্ঠান দেখে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার সংক্ষিপ্ত চিত্র পেয়ে যান। বাংলাদেশের মহিলারা সাধারণত বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে হিন্দি ভাষার নাটকের সিরিয়াল দেখেন। কিন্তু তিনি ওসব পছন্দ করেন না। তিনি ইনফরমেটিভ অনুষ্ঠান পছন্দ করেন কিংবা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে যে কোনো টকশো। তিনি এসটিভি ইউস-এর স্ক্রিনে আজকের শিরোনাম অনুষ্ঠানটি মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। আজকের শিরোনাম অনুষ্ঠানে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন ফোনটা বাজতে শুরু করে। ফোনটা বাজছে। তিনি ফোনটার দিকে কিঞ্চিৎ বিরক্ত চোখে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। ফোনটার ক্রিং ক্রিং শব্দ এক ময় বন্ধ হয়ে গেলো। আগস্টের মধ্য দুপুর। বাইরে গনগনে রোদ। গরমের তীব্রতা আছে। সুমিতা রহমান বসে আছেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রইংরুমে। এই রুমে বসে বাইরের গরমের উত্তাপ অনুভব করা যায় না। তিনি কাচের জানালা দিয়ে বাইরে একটু তাকিয়ে কথাটি ভেবে নিলেন। তিনি জানালা থেকে টিভির দিকে চোখ ফেরাতেই ফোনটা আবার বেজে উঠলো। তিনি আবার বিরক্ত হলেন। ফোনটা ক্রিং ক্রিং ক্রিং … তার স্বরে বাজছে। এ সময় বাথরুম থেকে বের হলো মিথিলা। মিথিলা ওর ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো ফোনের দিকে। সুমিতা রহমান তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মিথিলাকে কেমন পরীর মতো লাগছে। মিথিলা বরাবরই সুন্দরী। ছোটবেলায় ওকে পুতুলের মতো লাগতো। মিথিলা হচ্ছে প্রতিমার মতো। যে কেউ ওর দিকে তাকালে চট করে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না- এটা জানেন তিনি। তারপরও মেয়েকে নিয়ে তার মধ্যে অনড় পাথরের মতো চেপে আছে একতাল কষ্ট। সুমিতা রহমানের অন্যমনস্কতাকে ভেঙে দিয়ে মিথিলা বললো-
‘মা, ফোনটা ধরছো না কেনো? সেই কখন থেকে বাজছে!’
সুমিতা রহমান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। তিনি কথা বলার আগেই মিথিলা দ্রুত এগিয়ে এসে ফোন ধরলো-
‘হ্যালো…। জ্বি, বলছি। সত্যি! তাই না-কি! থ্যাংকস গড! আচ্ছা, আমি আসছি। আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করুন, প্লিজ! রাখি। দেখা হবে।’
ফোন রেখে দিলো মিথিলা। সুমিতা রহমান মেয়ের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকালেন। মিথিলা কারো সঙ্গে এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কথা বলে না। টেলিফোনে কথা বলার সময় ও কেমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল। গত দুবছর ধরে তিনি মিথিলাকে এমন উচ্ছ্বসিত হতে দেখেননি। মিথিলা নিজের মধ্যে নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে। ওর বয়স বাড়ছে। কিন্তু ও বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। ও কাউকে বিয়ে করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তাকে। বিয়ে করবে না- এমন পণ কোনো মেয়ে করেছে কি-না সুমিতা রহমানের জানা নেই। মেয়ের জেদ উপেক্ষা করে তিনি দু-দফা ওর বিয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু মিথিলার জেদের সঙ্গে পারেননি। ও হঠাৎ করে একরোখা হয়ে গেছে। এ নিয়েই সুমিতা রহমানের কষ্ট। তিনি অনেক ভেবে দেখেছেন, এ যুগের মেয়েদের মধ্যে যে কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতি মেনে নেবার মানসিকতা কমে আসছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে না নেয়ার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে চায়। তারা নিজেদের আবেগ নিয়ে যতোটা অনুরাগী, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ততোটা অবদমিত। বিশেষ করে মিথিলার চরিত্রের মধ্যে এটা প্রকট। একজনকে ভালোবাসলে তাকেই বিয়ে করতে হবে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে অটল থাকা মেয়েদের মানায় না। মেয়েদের অনেক সময় অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। বাবা-মা বা পরিবারের পছন্দের মূল্য দিতে হয়। কিন্তু তার মেয়েটি সে রকম নয়। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মিথিলা যাকে পছন্দ করে, সেই ছেলেটি দুবছর ধরে নিখোঁজ। স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে ও। নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া একটি ছেলের জন্য কোনো শিক্ষিত ও সুন্দরী মেয়ে কতো বছর অপেক্ষা করতে পারে? আর ওই ছেলেটিই বা কেমন? মিথিলাকে যদি সে সত্যিই ভালোবাসে, একবারো ওর খোঁজ নিচ্ছে না কেনো? এ প্রশ্নের জবাব জানা নেই সুমিতা রহমানের। এ প্রশ্ন মিথিলাকে তিনি কয়েকবার করেছেন। মিথিলা এর কোনো জবাব দেয়নি কখনো। প্রশ্ন শুনে ও মন খারাপ করে থেকেছে। তাই তিনি আর এ প্রশ্ন করেন না ওকে। ও যেভাবে থাকতে চায়, থাকুক। মনে মনে কথাগুলো ভেবে মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। মিথিলা ওর রুমের দিকে যাবার সময় সুমিতা রহমান বললেন-
‘তুমি কি এখন বের হবে?’
‘হ্যাঁ, মা।’
‘কে ফোন করেছিল, রাশেদ?’
‘কী করে বুঝলে?’
‘তোমার উচ্ছ্বাস দেখে। রাশেদ বুঝি তোমার ভালো বন্ধু?’
‘মা, তুমি এ প্রশ্নটা আগেও করেছো। রাশেদ আমার বন্ধু নয়। আমার তিন বছরের সিনিয়র। তিনি চাকরি করছেন। আর আমি পোস্টিংয়ের জন্য বসে আছি। আমার পোস্টিং নিয়ে তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল।’
‘ও কী বললো?’
‘বললো বগুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি পোস্টিং আছে। চাইলে আমি সেখানে জয়েন করতে পারি।’
‘বলো কী! ঢাকা ছেড়ে বগুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেনো যাবে? এতেই তুমি খুশি হয়ে গেলে?’
‘কি করবো মা। ইন্টার্নি করে বসে আছি। অনেকদিন তো বসে থাকলাম। আর ভালো লাগছে না। ডাক্তার হয়েছি তো ঘরে বসে থাকার জন্য নয়?’
‘তুমি ঢাকায় বসে প্র্যাকটিস করতে পারো বা এফআরসিএস বা এমআরসিপি পড়তে লন্ডন চলে যাও। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গাঁয়ে তুমি থাকতে পারবে না। তোমার থাকা ঠিকও হবে না। এটা তুমি বুঝতে পারছো না কেনো?’
সুমিতা রহমানের কণ্ঠে রাগের ঝাঁঝ। মিথিলা বললো-
‘মা, তুমি তো জানো, আমি এতোদিন রেজার জন্য অপেক্ষা করেছি। ও ফিরে আসেনি। আমি আর ওর জন্য অপেক্ষা করবো না। এখন আমাকেই ওকে খুঁজে বের করতে হবে। আমি বিদেশ চলে গেলে ওর সঙ্গে দেখা হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
মেয়ের কথা ভালো লাগলো না তার। আজকালকার মেয়েগুলোর মুখে মুখে কথা বলার স্বভাব! ওরা চাল-চলনে আধুনিক; কিন্তু সেকেলে মানসিকতা ছাড়তে পারছে না। অগ্র পশ্চাৎ না ভেবে হুট করে কাউকে ভালোবেসে ফেলে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ওরা পুরনো দিনের সিনেম্যাটিক কনসেপ্ট লালন করছে মনে। বাবা-মায়ের উদ্বেগকে ওরা কেয়ারই করছে না। সুমিতা রহমান এ কথা মনে মনে ভেবে রাগ পুষে বললেন-
‘যে ছেলেটি এতোদিন ধরে নিরুদ্দেশ, তার জন্য কতোকাল অপেক্ষা করবে তুমি!’
মিথিলা এই প্রশ্নের জবাব আগেও অনেকবার ওর মাকে দিয়েছে। তাই প্রশ্নটা শুনে ও একটু হাসলো। বললো-
‘নিজেই জানি না, কতোকাল অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমি জানি, আমি ওর দেখা পাবো।’
‘যে ছেলে তোমার কথা ভাবে না। যে এতোদিনেও তোমার খোঁজ নেয়নি, তার জন্য তুমি কেনো যে নিজের জীবন নষ্ট করছো, বুঝি না!’
মায়ের এ কথায় আহত হলো মিথিলা। ওর ভেতরে চাপা কান্নার একটা ঢেউ আছড়ে পড়লো। ও ঢেউটা সামলে নিয়ে মায়ের উদ্দেশে বললো-
‘রেজা নিরুদ্দেশ হয়নি। ও অভিমানে স্বেচ্ছায় হারিয়ে গেছে। আর এর জন্য তোমরাই দায়ী। দায়ী আমিও। সেদিন যদি তোমরা অন্য একজনের সঙ্গে আমার বিয়ের আয়োজন না করতে, তাহলে রেজা আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতো না। এটা তুমি জেনেও এ কথা বললে মা!’
সুমিত রহমানের মেয়ের বিষণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে বিব্রত হয়ে গেলেন। সত্যিই মিথিলাকে তিনি ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ওর বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই হঠাৎ করে এই বিয়ের আয়োজন করতে হয়েছিল সেদিন। মৃত্যু পথযাত্রী বাবার অনুরোধে মিথিলা বিয়েতে রাজি হয়েছিল অনেকটা উপায়হীনভাবে। বিয়েটা হয়তো হয়ে যেতো; কিন্তু বিয়ের সময় রেজা এসে হাজির হলো। মিথিলার সঙ্গে ওর কথা কাটাকাটি হলো। মিথিলা রেজাকে ফিরিয়ে দিলেও নিজেকে ফেরাতে পারে নি। রেজা চলে যেতেই ও অসুস্থ বাবাকে জানিয়ে দিলো ও এই বিয়ে করছে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে, শুধু বাবার অনুরোধে। মেয়ের কথা শুনে ওর বাবা মুমূর্ষু অবস্থায় একটু হেসে উঠেছিল। এই হাসিটাই ছিল তার শেষ হাসি। হাসিমুখেই তিনি মারা যান। বিয়ে বাড়ি পরিণত হয় শোকের বাড়িতে। স্মৃতির সেলুলয়েডের ফিতায় সেদিনের দৃশ্য এখনো ভেসে ওঠে সুমিতা রহমানের চোখের সামনে। তিনি মিথিলার কথার কোনো জবাব দিলেন না। একেবারে চুপসে গেলেন। মায়ের নীরবতা দেখে মিথিলা বললো-
‘এখন কোনো কথা বলছো না কেনো?’
‘কি বলবো? আমার বলারই বা কী আছে?’
‘তাহলে সুযোগ পেলেই ওসব কথা বলো কেনো, মা?’
মেয়ের কথায় সুমিতা রহমান বিষাদ মুখে বললেন-
‘আমি যে মা! তুই মা হবার পর বুঝতে পারবি, মায়ের বেদনা কিসে।’
‘মা, ভেবো না, আমি তোমার দুঃশ্চিন্তার কথা বুঝতে পারি না। আমাকে নিয়ে তুমি দুঃশ্চিন্তা করো না, মা।’
‘তা কি আর ইচ্ছে করে করি। আচ্ছা, বলতো তুই রেজার জন্য আর কতোদিন অপেক্ষা করবি?’
উদ্বিগ্ন মায়ের এ প্রশ্নের সামনে একটু ভাবলো মিথিলা। এরপর ভারী কণ্ঠে বললো-
‘রেজাকে কষ্ট দিয়ে, মিথ্যা বলে যে পাপ আমি করেছি, ওর জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করে আমি প্রায়শ্চিত্ত করবো। এটা কি অন্যায়? বলো মা?’
সুমিতা রহমানের একটু নিচু গলায় বললেন-
‘ন্যায়-অন্যায়ের অঙ্ক করে জীবন চলে না। জীবনের একটা রূপ আছে, এর বিস্তার আছে, আছে ব্যঞ্জনাও। কিন্তু তুমি এক স্থানে আটকে থাকলে জীবনের রূপ, বিস্তার, ব্যঞ্জনা সবকিছু হারিয়ে ফেলবে। একসময় হয়তো দেখবে, তোমার হাতে অপেক্ষার কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই। সেদিন আমার কথা মনে করে তোমার কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে। বুঝলে?’
‘মা, সেদিন ওই দীর্ঘশ্বাস হবে আমার অহংকার!’
এ কথা বলে মিথিলা নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। মেয়ের এ কথায় সুমিতা রহমান আর কোনো কথা বাড়ালেন না। তিনি যতোবার মেয়েকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, ততোবারই ব্যর্থ হয়েছেন। মেয়ের সঙ্গে তিনি কথায় পারেন না। কথায় না পারলেও তিনি মিথিলাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। ওর বাবা বেঁচে নেই। তিনি আর কতোদিন বাঁচবেন, কে জানে! তিনি বেঁচে থাকতে মেয়েকে দেখে যেতে চান কারো সংসারের সত্যিকারের প্রতিমা হিসেবে। কিন্তু তার এই ইচ্ছা আদৌ পূরণ হবে কি-না, এ নিয়ে তিনি সন্দিহান। সুমিতা রহমান রিমোট টিপে টিভিটা অফ করে দিলেন। টিভির অনুষ্ঠান এ মুহূর্তে তার ভীষণ বিরক্তিকর লাগছে। তিনি সোফায় গা এলিয়ে দুচোখের পাতা এক করার চেষ্টা করলেন। তাকে গ্রাস করলো একরাশ হতাশা।
চার.
জালাল একটু লজ্জিত গলায় বললো-
‘জ্বে, পেশায় আমি চোর।’
এ কথা বলে ও চুপ হয়ে গেলো। লিজি জালালের কথা শুনে ভীষণ অবাক হলো। কী কাজ করো? এর জবাবে কেউ অকপটে বলে যে, সে চুরি করে- এমন কথা ও কখনো শোনেনি। চোরের কথা ও শুনেছে, তবে লিজি কখনো চোর দেখেনি। চোর কেমন হয়, ও তা জানে না। চোর কেমন হতে পারে, এ নিয়ে ও কখনো কল্পনাও করেনি। কিন্তু জালালকে দেখে চোর মনে হচ্ছে না। জালাল ওর সামনে নিঃসংকোচে নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে। লিজি জালালের আপাদমস্তক দেখে নিলো।
লিজি মানুষের এ ধরনের সরলতা নিউইয়র্ক শহরে দেখেনি। নিউইয়র্ক শহরটা অবশ্য বিভিন্ন দেশের মানুষে ঠাসাঠাসি। এখানে নানা দেশ, জাতি ও বর্ণের লোকদের মধ্যে ভণ্ড, প্রতারক, ছিনতাকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীরা রয়েছে। এটি অভিবাসীদের শহর বলে এখানকার জনজীবন তেমন শান্ত নয়। যারা শান্তিপ্রিয় এবং নীরবে-নিভৃতে থাকতে চান, তারা এই শহরে থাকলে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠবেন। লিজি নিউইয়র্কে থাকলেও সারি সারি অট্টালিকার ওই পাথুরে শহরটা ওর ভালো লাগে না। এই শহরের নগর সৌন্দর্যের অহংকারই যা আছে, সুনসান প্রকৃতির কোমল মমতা এখানে লিজি দেখতে পায় না। অবশ্য এই শহর থেকে বেরিয়ে একটু দূরে গেলেই আধুনিক গ্রামের নিবিড় সান্নিধ্য পাওয়া যায়। তারপরও বাংলাদেশের গ্রাম ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাই ও সুযোগ পেলেই চলে আসে বাংলাদেশে। লিজি এবার তিন বছর পর বাংলাদেশে এসেছে। চাকসাইল গ্রামে ওর জন্ম। এখানে ওর নানার বাড়ি। এখানেই কেটেছে ওর শৈশব। কৈশোরে পা দিতেই মায়ের সঙ্গে ওকে চলে যেতে হয়েছে বাবার কাছে, নিউইয়র্কে। টানা দশ বছর ধরে ও নিউইয়র্ক শহরে বাস করছে। নিউইয়র্কে ও কখনো চোর দেখেনি। এ মুহূর্তে ওর সামনে নিঃসংকোচে দাঁড়িয়ে রয়েছে জালাল নামের এক ছিঁচকে চোর। ও জালালের দিকে চেয়ে আনমনে এসব কথা ভাবছিল।
লিজি বসেছিল স্কুলের বারান্দায় একটি চেয়ারে। ও চেয়ারে বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য উপন্যাস শেষের কবিতা পড়ছিল। জুনের বিকেল। আজ রোদের তেজ না থাকলেও বাতাসে গরমের হালকা উত্তাপ। একটু পরপরই বাতাস এসে হামলে পড়ছিল। গরম নিঃশ্বাসের মতো বাতাস। এই বাতাসের উপদ্রব নিয়ে লিজির কোনো বিরুক্তি নেই। কারণ, একবার বেড়াতে গিয়ে এর চেয়ে ঢের গরম বাতাসের হলকা ওকে সহ্য করতে হয়েছিল অ্যারিজোনাতে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অঙ্গরাজ্যটিকে মরুভূমির সঙ্গে সবাই তুলনা করা চলে। এই অঙ্গরাজ্যে যারা থাকেন গ্রীষ্মকালে তারা তীব্র দাবাদাহের কারণে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। আবার শীতকালে এখানে ছেলেরা শার্ট-প্যান্ট বা মেয়েরা শাড়ি পরে ঘুরে বেড়ায়। শীতকালে নিউইয়র্ক কিংবা ওয়াশিংটনে যখন তুষারপাতের তাণ্ডব, অ্যারিজোনায় তখন খটেখটে রোদের ঝিলিমিলি। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ভূ-খণ্ডে একই সময় প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় রূপ! প্রকৃতির এই বৈচিত্রটা লিজি দেখেছে। বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালের গরমকে ও একেবারেই পাত্তা দেয় না। আজও ভাতসাইল গ্রামের খটখটে রোদের তাতানো বিকেলকে ও পাত্তা না দিয়ে স্কুলের বারান্দায় চেয়ারে বসে বই পড়ছিল। বই পড়ার সময় হঠাৎ ও দেখতে পায় জালাল ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জালালের পড়নে লুঙ্গি এবং ছেঁড়া জামা। খালি পা। উচ্চতায় পাঁচ ফুট চার বা পাঁচ ইঞ্চি হবে। লিকলিকে। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, এলোমেলো। লিজি জালালের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে এবার বললো-
‘জালাল, তুমি চুরি করো কেনো?’
‘কী করুম, কোনো কাজ পাই না। তাই চুরি করি।’
জালালের সহজ জবাব। লিজি বললো-
‘কি চুরি কর?’
‘তেমন কিছু না। হাতের কাছে যা পাই, তাই চুরি করি। এই ধরেন হাঁড়ি-পাতিল, বদনা, লাউ, মুরগি, লুঙ্গি-গামছা…’
‘বুঝেছি, বুঝেছি। এবার থামো।’
লিজির কথায় চুপ মেরে গেলো জালাল। লিজি একটু ভেবে বললো-
‘তুমি এখানে কেনো এসেছো? আমার কাছে কি চাও? আমার কি চুরি করতে এসেছো তুমি?’
এ কথায় জালাল লজ্জিত হলো। ও মাথা নিচু করে গলা নামিয়ে বললো-
‘জ্বে, আমি আইছি স্কুলে ভর্তি হইতে। শুনছি, এই স্কুলে রাতের বেলা লেখাপড়া হয়?’
লিজি ফের একটু অবাক হলো। গ্রামের ছিঁচকে চোর স্কুলে পড়াশোনা করতে এসেছে শুনে ও বিস্মিত হলো। এই স্কুলে রাতের বেলায় গ্রামের নিরক্ষর বয়স্ক লোকদের পড়াশোনা শেখানো হয়। এই নৈশ্য স্কুলের শিক্ষক হচ্ছে আবিদ। সে বয়স্ক লোকদের ভালোমতো বর্ণমালা শেখায়। ও সাহায্য করে তাকে। আবিদ শিক্ষক হিসেবে ভালো হলেও, মানুষ হিসেবে ও ভীষণ অহংকারী! গ্রামের একটি নৈশ্য স্কুলের মাস্টার, অথচ তার সে-কী দাম্ভিক ভাব! এমন একটি লোককে ওর মামা কেনো স্কুলের শিক্ষক করেছেন, তা ও বুঝতে পারছে না। লিজি অকারণে আবিদের কথায় ডুবে গেলো। লিজি গ্রামের লোকদের কাছে শুনেছে, আবিদ অনেকদিন আগে এই গ্রামে এসে বটতলায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ওর মামা আবিদকে পথ থেকে তুলে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে আবিদ এখানেই থিতু গেড়ে বসেছে। আবিদ কোথাকার, কোথা থেকে এসেছিল আবার কোথায় বা যাচ্ছিল, সে কথা কেউ জানে না। আবিদের আপনজন বলতে পৃথিবীতে কেউ আছে- কী নেই, তা কেউ বলতে পারে না। আবিদ পড়াশোনা কতটুকু শিখেছে, সে খবরও কেউ জানে না। এমন একটি লোককে দিয়ে ওর মামা কেনো স্কুল চালাচ্ছেন, তা ওর বোধগম্য নয়। ব্যাপারটা লিজির কাছে প্রশ্ন হয়েই আছে।
‘আপনে কি জানেন, মাস্টার সাহেব কখন আইবো?’
জালালের প্রশ্নে লিজির সম্বিত ফিরে আসে। লিজির একটা মুদ্রা দোষ হচ্ছে, ও কাউকে নিয়ে অকারণে খুব বেশি ভেবে ফেলে। অনেক আযাচিত প্রশ্নের জবাব খোঁজে। এ মুহূর্তে ও সেরকমই ভাবছিল। লিজি জালালের দিকে চেয়ে বললো-
‘তার আগে বলো, তুমি পড়াশোনা শিখে কি করবে?’
এ কথা শুনে একগাল হাসলো জালাল। ও বললো-
‘পড়াশোনা শিখে শিক্ষিত চোর হবো, আপা!’
‘তাই না-কি!’
বিস্ময় প্রকাশ করেই লিজি হাসতে লাগলো। জালাল এতে লজ্জা পেলো না। লিজি অনেকক্ষণ হেসে নিলো। লিজির মনে হলো, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য বিষয়ে অগণিত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেখার অনেক বিষয় বৈচিত্র্য থাকলেও চুরি শেখানোর মতো বিষয় বা পাঠ্য নেই। থাকলে ভালো হতো। তবে জালালকে ও চুরি শেখার ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিতো। গাঁয়ের ছিঁচকে চোর হতো আধুনিক শিক্ষিত চোর! এ কথা কল্পনা করে লিজি আপন মনে আবার একটু হেসে উঠলো। জালাল লিজির হাসিকে গায়ে না মেখে বললো-
‘আপা, আবিদ স্যার কি স্কুলের ভেতর আছেন?’
‘না।’
অকারণে মিথ্যা কথা বললো লিজি। কেনো ও মিথ্যা কথা বললো, ও নিজেও তা জানে না। কখনো কখনো অনেকের এমন হয়। জালাল ফের প্রশ্ন করলো-
‘তিনি কোথায় গেছেন?’
‘বিলে স্নান করতে।’
লিজি আরেকটি মিথ্যা কথা বললো। একটা মিথ্যা বললে আরেকটি মিথ্যা বলতে হয়। তারপর আরেকটি। যতো প্রশ্ন ততো মিথ্যা জবাব। জালাল আর প্রশ্ন না করে বললো-
‘ঠিক আছে। আমি বিলের দিকে যাই।’
‘আচ্ছা, যাও।’
জালাল বিলের দিকে হাঁটতে লাগলো।
লিজি জালালের চলে যাবার পথের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। জালাল গুটিগুটি পায়ে অনেকটা কচ্ছপের গতিতে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাঁকে মিলিয়ে গেলো। লিজি আর বই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারলো না। জালালের কথা ওর মনে বারবার ভেসে উঠতে লাগলো। ওর মনে এক পশলা অনুশোচনাও পেখম ছড়িয়ে রইলো। কারণ, আবিদ স্কুলের ভেতরই আছে, অথচ লিজি জালালকে সত্য কথা বলেনি। বয়স্ক চোর পড়াশোনা শিখে কী করবে? এ প্রশ্নটি লিজিকে মিথ্যা বলায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করেছে। এখন ওর কেমন খারাপ লাগছে।
বিকেল গোধূলীর পেয়ালায় জমে যাচ্ছিল। এ সময় স্কুলের ভেতর থেকে বের হলো আবিদ। সে স্কুলের বারান্দায় বসে থাকা লিজিকে না দেখার ভান করে হেঁটে যাচ্ছিল। তাকে পেছন থেকে ডাকলো লিজি-
‘এই যে শুনুন?’
লিজির ডাকে আবিদ ঘুরে দাঁড়ালো। ওর চোখে-মুখে বিরক্তি। লিজির দিকে একটু তাকিয়ে বললো-
‘আমাকে বলছেন?’
‘তাহলে কাকে বলবো? এখানে কি অন্য কেউ আছে?’
লিজির গলায় তেজ। আবিদ শান্ত কণ্ঠে বললো-
‘বলুন?’
‘আপনার স্কুলে ভর্তি হতে এক ছিঁচকে চোর এসেছিল।’
‘হ্যাঁ, আমি আপনাদের কথা শুনেছি।’
‘আপনি স্কুলে নেই বলে আমি তাকে মিথ্যা কথা বলেছি।’
‘ওটা না বললেও পারতেন।’
‘আপনি কি চোরকে পড়াতেন? ভর্তি করাতেন স্কুলে!’
এ কথায় আবিদ একটু হাসলো। ও বললো-
‘আমার ক্লাসে আরো নয়জন চোর আছে।’
‘বলেন কী! সত্যি!’
‘এতে অবাক হচ্ছেন কেনো? চোরেরা কি পড়াশোনা শিখতে পারে না?’
‘চোর পড়াশোনা শিখে কী করবে?’
‘ওদের জ্ঞান বাড়বে। ওদের দৃষ্টি প্রসারিত হবে। ওদের সহজেই কেউ মিথ্যা বলে বোকা বানাতে পারবে না। হয়তো পড়াশোনা শিখলে ওদের আর অভাবের কারণে চুরি করতে হবে না।’
এ কথা বলেই আবিদ হাঁটতে লাগলো। পেছন থেকে লিজি বললো-
‘শুনুন!’
আবিদ দাঁড়ালো এবং লিজির দিকে ঘুরে বললো-
‘বলুন?’
‘আপনি সব সময় আমার সঙ্গে এমন আচরণ করেন কেনো?
‘কেমন আচরণ?
‘এই যে, গম্ভীর হয়ে থাকেন?’
‘এটা আমার স্বভাব।’
‘তা ছাড়া কথাও খুব একটা বলেন না। আপনি ছাত্রদের পড়ান কী করে? না-কি ছাত্রদের সামনেও মুখ গোমরা করে থাকেন?’
এ কথা বলে লিজি হাসার চেষ্টা করলো। আবিদ বললো-
‘আমাকে এসব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেনো?’
‘জিজ্ঞেস করছি, কারণ, আপনাকে আমার মামা একটি স্কুলের দায়িত্ব দিয়েছেন। আর আমাকেও বলেছেন যে, আপনাকে সাহায্য করতে। আমি বুঝতে পারছি না, আপনাকে মামা কেনো এই দায়িত্ব দিয়েছেন।’
‘আর কিছু বলবেন?’
হ্যাঁ, আমি আরো কিছু বলবো। আই মিন বলতে চাই।’
আবিদ একটু এগিয়ে এসে বললো-
‘বলুন।’
লিজি তাকালো আবিদের দিকে। আবিদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লিজি জেরা করার মতো করে বললো-
‘আপনার বাড়ি কোথায়? আপনি আগে কী করতেন? পড়াশোনা কতটুকু শিখেছেন?’
এমন প্রশ্ন শুনে আবিদ অবাক হলো। এমন প্রশ্ন ওকে কেউ খুব একটা করে না। এমনকি লিজির মামা আকরাম চৌধুরীও ওকে এ প্রশ্ন করেননি। হঠাৎ করে এই মেয়েটি কেনো ওকে এ প্রশ্ন করছে, তা ও বুঝতে পারছে না। ও এর কোনো জবাব দিলো না। লিজি জবাব না পেয়ে বললো-
‘কী হলো, আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না কেনো?’
‘এই প্রশ্নের জবাব আমি কাউকে দেই না।’
ভরাট ও দৃঢ় কণ্ঠে বললো আবিদ।
‘কেনো?’
‘এরও কোনো জবাব দিই না।’
‘আপনি কি খুনি? কোনো কারণে খুনটুন করে ছদ্মবেশ ধরেছেন?’
‘আর কিছু বলবেন?’
‘বললে কী হবে? কোনো প্রশ্নের জবাবই তো দিচ্ছেন না।’
‘কেনো আমার ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাচ্ছেন?’
‘কৌতূহল। শ্রেফ কৌতূহল।’
‘আমাকে নিয়ে আপনার কৌতূহল কেনো?’
‘সত্যি, আপনাকে নিয়ে আমার দিনদিন কৌতূহল বাড়ছে!’
এ কথা বলে লিজি হাসলো। যেনো রসিকতা করছে। আবিদ বললো-
‘কিন্তু কেনো আপনার কৌতূহল বাড়ছে?’
‘আরে, আপনি দেখছি, আমাকে প্রশ্ন করছেন? আমার প্রশ্নের জবাব না দিলে আপনার প্রশ্নের জবাব দেবো কেনো?’
আবিদ চুপ হয়ে গেলো। লিজি বললো-
‘কী ব্যাপার, চুপ করে আছেন যে!’
‘দেখুন, আপনার কৌতূহল মেটানোর সময় আমার নেই। আমি যাচ্ছি।’
আবিদ যাবার জন্য উদ্যত হতেই লিজি কণ্ঠে কপট রাগ তুলে বললো-
‘মি. আবিদ, আমাকে রাগাবেন না, বলছি!’
আবিদ অবাক চোখে লিজির দিকে তাকালো। লিজি অগ্নিমূর্তির মতো তাকিয়ে আছে আবিদের দিকে। আবিদ একঝলক লিজিকে দেখে হতাশ গলায় বললো-
‘আপনি অহেতুক রাগছেন!’
‘অহেতুক নয়। আমি রাগছি, আপনি আমাকে উপেক্ষা করছেন বলে। আপনি আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছেন! এবং সব সময় অপমান করে যাচ্ছেন!’
আবিদ বললো-
‘আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন কেনো? আসলে আপনি আমার কাছে কি চান?’
‘আপনার পরিচয় জানতে চাই। আপনার ছদ্মবেশ নেবার কারণ জানতে চাই।’
‘আমি কোনো ছদ্মবেশ নেইনি।’
‘দেখুন, আমেরিকাতে প্রত্যেকটি মানুষের পরিচয়পত্র আছে। এই পরিচয়পত্রে নাম ছাড়াও জন্মদিনের তারিখও উল্লেখ থাকে। এটা সভ্য দেশের স্বাভাবিক পদ্ধতি। পরিচয় গোপন করার মধ্যে সুস্থ মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় না। আপনি কি এটা জানেন?’
‘আপনার জানার সঙ্গে আমার জানার বিস্তর ফারাক আছে। আপনার চেনা দেশ বা সমাজের সঙ্গে আমার চেনা সমাজের যেমন মিল নেই, তেমনি আছে বৈপরীত্য। আপনার চিন্তার সঙ্গে আমার চিন্তারও যথেষ্ট অমিল আছে। আপনার সঙ্গে কথা বলে এটুকু শুধু বুঝতে পারছি।’
‘আমাকে নিয়ে আপনার কৌতূহল নেই?’
‘না, আমার কৌতূহল থাকবে কেনো?’
‘কোনো কিছুর প্রতি আপনার কৌতূহল নেই?’
‘না।’
‘কেনো নেই?’
‘আমি এসব কেনোরও উত্তর দিই না।’
‘ঠিক আছে, সত্যি করে বলুন তো আমার প্রতি আপনার কোনো কৌতূহল নেই? যেমন আমি কে, কোত্থেকে এসেছি, কেনো এসেছি, কয়দিন থাকবো- এসব জানতে ইচ্ছে করে না?’
‘আপনার প্রতি আমার কৌতূহল কেনো থাকবে? এ প্রশ্নটি বারবার কেনো করছেন?’
‘সত্যি বলছেন! কৌতূহল নেই?’
আবিদ একটু হাসলো। ও বললো-
‘আপনি কোনো মানসিক রোগের ডাক্তার দেখাতে পারেন।’
‘আমাকে নিয়ে যাবেন, কোনো ডাক্তারের কাছে?’
লিজি রসিকতায় আবিদ বিস্ময় প্রকাশ করলো-
‘আমি আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো কেনো!’
‘একজন মানুষ হিসেবে অন্য একজন মানুষকে সাহায্য কেউ করে না বুঝি!’
‘আপনার সঙ্গে কথা বলে পারবো না। আমি কি যাবো?’
‘যেতে দেবো, শুধু একটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।’
‘কী প্রশ্ন?’
‘আপনি কে?’
এবার আবিদ ভীষণ বিরক্ত হলো। ও একটু ভাবলো। নিজের ভেতরে নিজেকে প্রস্তুত করে বললো-
‘আমি একজন নিতান্ত সাধারণ মানুষ। আমার একটা নাম আছে। সেটা হলো আবিদ। পুরো নাম আবিদ রেজা। আমার আর কোনো পরিচয় নেই। আমার কোনো যোগ্যতা নেই। সমাজে টিকে থাকার আমার কোনো সংগ্রাম নেই। পথ চলার স্বপ্ন নেই। লক্ষ্য নেই। বেঁচে থাকার প্রেরণা নেই। ধরে থাকার মতো অবলম্বন নেই। হারিয়ে যাবার মতো নিজের কিছু নেই। আমি এক যাযাবর। পথ চলতে চলতে এই অচেনা গাঁয়ে এসে থমকে গেছি। আবার হয়তো একদিন পথে নেমে হারিয়ে যাবো কোথাও। এবার হয়েছে?’
একটু রাগী গলায় বললো আবিদ। লিজি বললো-
‘পৃথিবীতে আপনার আপনজন বলতে কেউ নেই?’
‘আমিই আমার আপনজন।’
‘জানেন, আমেরিকাতেও এ ধরনের লোক আছে। তাদের বলে হোমল্যাস। আবিদ আর দাঁড়ালো না। ও হনহন করে হাঁটতে লাগলো। লিজি একটু বিষণ্ন মনে ওর চলে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। অপছন্দ করা এই লোকটির জন্য এ মুহূর্তে ওর মায়া হলো। লিজি মনে মনে এই মায়ার নাম দিলো ‘অনুকম্পা’।
পাঁচ.
ছোট্ট একটা স্বপ্ন দেখে মিথিলার ঘুমটা হঠাৎ করে ভেঙে গেলো। স্বপ্নে ও রেজাকে দেখতে পেলো। স্বপ্নটা এ রকম, একটি বিলের সামনে রেজা দাঁড়িয়ে আছে। বিলজুড়ে অসংখ্য সাদা বক, পানকৌড়ি আর হাঁস সাঁতার কাটছে। রেজা মুগ্ধ হয়ে তা দেখছিল। কী মনে করে, একসময় রেজা একটা ঢিল ছুড়লো বিলে। সঙ্গে সঙ্গে বক ও পানকৌড়ি বিলের জল থেকে উড়ে এলো রেজার দিকে। হাঁসগুলো কটমট করে তাকালো। বক ও পানকৌড়ি উড়ে এসে রেজার চারপাশে বৃত্তাকারে চক্কর দিতে লাগলো। রেজা ভয় পেয়ে মাটিতে বসে পড়লো। বক ও পানকৌড়িরা অসহায় রেজার চারপাশে চক্কর দিচ্ছে। আফ্রিকার গহীন জঙ্গলে পথভোলা মানুষকে শত্রু ভেবে উপজাতি জংলিরা যে রকম চক্কর দেয়। স্বপ্নটা এ পর্যন্ত দেখলো মিথিলা। ভয়ে ওর ঘুম ভেঙে গেলো। আর ঘুম ভাঙতেই ওর রেজার কথা মনে পড়লো। আর তখনই মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলো। এই বিষন্নতা ওর জন্য নতুন নয়। প্রায়ই মিথিলার মন বিষণ্ন থাকে। এর একটিই কারণ, সেটি হচ্ছে রেজার অন্তর্ধানের ঘটনা। দুবছর আগে একদিন একটি বিচ্ছিরি ঘটনার শিকার হয়েছিল মিথিলা। এই ঘটনার অশুভ লগ্নে রেজা ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় উপায়হীনভাবে সেদিন রেজাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল মিথিলা। ওর আর কোনো পথ ছিল না। সেদিনের কথা মনে পড়লে ও ভীষণ মুষড়ে পড়ে। তীব্র অপরাধবোধ ওকে কুরেকুরে খায়। ও নিজের ভেতরে নিজে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এ মুহূর্তে মিথিলার চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিনের গ্লানিময় ঘটনার কথা। মিথিলা ফিরে গেলো প্রায় দুবছর আগে এক অশুভ দিনের অধ্যায়ে। ওর বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েছিলেন। ভুগছিলেন দুরারোগ্য ক্যানসারে। তার চিকিৎসা চললেও তিনি বেশিদিন আর বাঁচবেন না, ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন। নিজেদের বাড়িতে ওর বাবার চিকিৎসা চলছিল। এমনি অবস্থায় হঠাৎ একদিন ওর বাবার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। মায়ের টেলিফোন পেয়ে মিথিলা হোস্টেল থেকে ছুটে যায় কুমিল্লায়, নিজেদের বাড়িতে। এ দিনটি ছিল মিথিলার জীবনে সবচেয়ে অশুভ একটি দিন। সেদিন আগে থেকেই বাবা ও মা ওর বিয়ের আয়োজন করে রেখেছিলেন। পাত্র ঠিক করাই ছিল। পাত্র মিথিলার বাবার ঘনিষ্ট এক বন্ধুর ছেলে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকাতেই সেটেলড। একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করছে। বাবার মুমূর্ষু অবস্থার কথা শুনে হন্ততন্ত হয়ে মিথিলা বাড়ি এলো। ঝাঁপিয়ে পড়লো বাবার বিছানায়। ঠিক সে সময়, মিথিলার মৃত্যু পথযাত্রী বাবা শফিক রহমান মেয়ের দুহাত জাপটে ধরলেন। মিথিলা কাঁদছিল বাবার জন্য। এই বিশেষ মুহূর্তে শফিক রহমান মেয়ের হাত ধরে ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন-
‘তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে, মা।’
‘অনুরোধ! আমার কাছে!’
‘হ্যাঁ, মা।’
‘বলো বাবা। আমার কাছে কী তোমার অনুরোধ?’
‘আগে কথা দাও, অনুরোধ রাখবে?’
‘হ্যাঁ, রাখবো। বলো কী তোমার অনুরোধ।’
‘কথা দিচ্ছো কিন্তু!’
‘আহা বলো তো! মেয়ের কাছে বাবার আবার কিসের অনুরোধ? আদেশ করো। তোমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো আমি।’
‘কথা দিচ্ছো!’
‘হ্যাঁ, দিচ্ছি। এখন বলো।’
‘আমি জানি, তুমি আমার কথা রাখবে। শোন, আমি তোমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছি। আজ রাতেই তোমাকে বিয়ে দিতে চাই। সবকিছুর আয়োজন ঠিক করা আছে।’
বাবার কথায় মিথিলার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে। ও হতভম্ব হয়ে যায়। আহত কণ্ঠে বলে-
‘বাবা! এসব কী বলছো তুমি!’
‘মা, যোগ্য ছেলের সঙ্গেই তোমার বিয়ে ঠিক করেছি। ওদের কথা দিয়েছি।’
‘তাই বলো, তোমার এ অবস্থায় আমার বিয়ে! কেনো?’
‘আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে, মা। তাই তোমার বিয়ে দেখে যেতে চাই।’
‘না, বাবা, না। এ হয় না!’
‘তুমি কথা দিয়েছো মা। তুমি এখন না করো না। তাহলে আমি কষ্ট পাবো।’
এ পর্যন্ত বলে শফিক রহমান খুকখুক করে কাশতে লাগলেন। অসুস্থ বাবার বিছানায় বসে অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়লো মিথিলা। ওর বাবার অবস্থা আরো অবনতি হলো। মিথিলা নিজের বিবেক আর ভালোবাসার দায়বদ্ধতার নানা প্রশ্ন নিয়ে গোলক ধাঁধায় যেনো হারিয়ে গেলো। ঘটা করে না হলেও ওদের বাড়িতে মিথিলার বিয়ের আয়োজন চলছিল। সবকিছু হচ্ছিল যেনো চুপিচুপি। সেদিন মিথিলার ওর বাবার সঙ্গে আর কথা হয়নি। বাবার বিছানা থেকে উঠে এসে ও নিজের রুমে গিয়ে বসে রইলো প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। এ সময় পর্যন্ত ওকে কেউ ডাকেনি। মা আসেননি ওর সামনে। ব্যাপারটা কেমন অবিশ্বাস্য লেগেছে ওর। সন্ধ্যা নামার পর কাজের মেয়ে জরিনা এসে ওকে বললো-
‘আপা, রেজা নামে একজন আফনের সঙ্গে দেখা করতে আইছেন।’
রেজার নাম শুনেই ওর বুকের ভেতরটা কাঁপতে লাগলো। রেজা কেনো হঠাৎ ওদের বাড়িতে এলো এ প্রশ্নটা মনে উঁকি দিতেই ওর মনে হলো ওর খোঁজে রেজার কুমিল্লা পর্যন্ত চলে আসাটা অসম্ভব নয়। মিথিলা ভাবতে লাগলো ও এখন কী বলবে রেজাকে। রেজা নিশ্চয় ওর বিয়ের কথা শুনে ভেঙে পড়বে। একদিকে মৃত্যু পথযাত্রী বাবার অনুরোধ, অন্যদিকে ভালোবাসার দায়। কোনদিকে যাবে ও? এ প্রশ্নের জবাব হাতড়ে খুঁজতে খুঁজতে উদ্বেগভরা দৃষ্টিতে মিথিলা জরিনার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-
‘তাকে আমার রুমে নিয়ে আস।’
‘জে, আচ্ছা।’
জরিনা চলে গেলো। মিথিলা নিজেকে তৈরি করে নিতে লাগলো। ও জানে না, কী বলবে রেজাকে। রেজাকে ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া ওর কোনো পথ নেই- এটাই ওর মনে হচ্ছিল তখন। ঝড়ের গতিতে রেজা ঢুকলো ওর রুমে। ওর চোখে-মুখে গভীর উদ্বেগ। মিথিলার দিকে তাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে রেজা বললো-
‘কী ব্যাপার, আমাকে একটা ফোন না করে, তুমি ঢাকা থেকে কুমিল্লায় চলে এলে!’
‘তুমি কীভাবে জানলে যে, আমি কুমিল্লায় এসেছি? তুমি কেনো এসেছো?’
‘ফোনে তোমাকে না পেয়ে তোমার খোঁজে তোমার হোস্টেলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে জানলাম, জরুরি কারণে তুমি কুমিল্লায় চলে এসেছো। তাই আমিও চলে এলাম।
‘ওহ, আচ্ছা।’
‘কিন্তু তোমাদের বাড়িতে এসে এসব কী শুনছি!’
‘কি শুনেছো?’
‘আজ না-কি তোমার বিয়ে?’
এ প্রশ্ন শুনে চুপ করে রইলো মিথিলা। রেজা তাগিদ দিলো-
‘কথা বলছো না কেনো? তোমাদের কাজের মেয়ে যা বললো, তা কি সত্যি?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো।’
ছোট্ট করে বললো মিথিলা।
‘তুমি বিয়ে করছো! সত্যি!’
‘করছি নয়, করতে হচ্ছে।’
কান্ত ও নিষ্প্রাণ গলায় বললো মিথিলা। আরো বিস্মিত কণ্ঠে রেজা বললো-
‘মিথিলা!’
‘হ্যাঁ, রেজা, এটাই সত্যি।’
‘এমন তো হবার কথা ছিল না! তুমি তো কথা দিয়েছিলে…!’
‘অনেক সময় চাইলেও কথা রাখা যায় না, রেজা। মানুষের অনেক দায়বদ্ধতা আছে।’
‘দায়বদ্ধতা?’
‘হ্যাঁ, দায়বদ্ধতা।’
‘ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাটা দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে না?’
‘পড়ে।’
‘তাহলে একটি দায়বদ্ধতা ভেঙে আরেকটি দায়বদ্ধতা রক্ষা করছো?’
‘আমি প্রতিশ্রুতি ভেঙে একজনকে কষ্ট দিচ্ছি। অন্যদিকে পরিবারের সকলকে খুশি করতে পারছি।’
‘নিজে খুশি হতে পারছো?’
কোনো জবাব দিলো না মিথিলা। একটু চুপ থেকে আহতকণ্ঠে রেজা বললো-
‘জানতে পারি, আমাকে এভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার মধ্যে তোমার কী অর্জন হলো।’
মিথিলা কোনো জবাব দিলো না। ও মাথা নিচু করে রইলো। রেজা ফের বললো-
‘বললে না, তোমার কী অর্জন হচ্ছে?’
মিথিলা জানে, রেজা ওকে প্রশ্ন করেই যাবে। ও নিজেকে প্রস্তুত করে বললো-
‘আমার কোনো অর্জন নেই। তা নিয়ে ভাবছিও না। শুধু আমি আমার অপরাগতাকে ভাগ্যের খণ্ডব দাহন বলে মেনে নিচ্ছি। এর বেশি কিছু আর বলতে পারছি না, রেজা।’
‘চমৎকার!’
‘তুমি ফিরে যাও। আমাকে অভিশাপ দিও।’
‘আরো চমৎকার! তোমাকে অভিশাপ দেবো!’
‘হ্যাঁ, অভিশাপ দিও। আর কী বলবো?’
‘অভিশাপ! অভিশাপ দিলেই বুঝি জীবনের সবচেয়ে বড় গ্লানি, সবচেয়ে বড় পরাজয়ের কষ্ট মুছে যায়! তুমি কি তাই বলতে চাচ্ছো?’
‘তোমাকে সান্ত¦না দেবার ভাষা আমার জানা নেই। আমি যা বলছি, তা তো স্পষ্ট করেই বলছি।’
‘আমি তোমার মুখের কথা নয়, তোমার স্পষ্ট মনোভাব জানতে চাচ্ছি।’
‘তুমি এতো কিছু জানতে চাচ্ছো কেনো?’
‘কারণ, নিশ্চিত হবার জন্য। আজ যে কথাগুলো বলছো, তা যেনো সময়ের ভুলের কাঁটা হয়ে না থাকে, তা স্পষ্ট করে বুঝে নেবার চেষ্টা করছি।’
রেজার কথায় বিব্রত হয়ে যায় মিথিলা। ওর ভেতরে অপরাধবোধ তীব্র হতে থাকে। ও বলে-
‘তুমি ফিরে যাও, রেজা!’
বুকের ভেতর ভীষণ তোলপাড় সহে রেজা আকুতভরা গলায় বললো-
‘এতো সহজে এমন সম্পর্ক ভেঙে দেয়া কি ঠিক হচ্ছে, মিথিলা!’
‘বললাম তো, এর জন্য আমাকে অভিশাপ দিও।’
‘যদি তোমার নিজের বিবেক তোমাকে প্রশ্ন না করে, যদি তোমাকে কষ্ট না দেয়, তাহলে আমার অভিশাপ তোমাকে কী দেবে? কতটুকু পোড়াবে?’
‘আমি, আমি আর কিছু বলতে পারছি না, রেজা! আমাকে ক্ষমা করো, প্লিজ!’
‘আশ্চার্য! প্রতিশ্রুতি ভাঙবে, ফিরিয়ে দেবে, আর কথা বলবে না, তা কেনো?’
‘কারণ, আমি অপরাধী।’
‘স্বীকার করছো?’
‘স্বীকার করবো না কেনো? আমি জানি, আমার অপরাধের কোনো ব্যাখ্যা নেই। আমাকে তুমি ঘৃণা করো! আমি ঘৃণার যোগ্য!’
‘চমৎকার! নিজের অবস্থানও ঠিক করে রেখেছো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাকে ঘৃণা করো। সেখানেই আমার অবস্থান।’
‘তোমাকে ঘৃণা করতেও আমার কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ করুণা হচ্ছে!’
‘আমি জানি, তুমি আমাকে ঘৃণা করবে। সেটাই আমার প্রাপ্য।’
‘এখন মনে হচ্ছে, তুমি ঘৃণারও অযোগ্য!’
এ কথারও কোনো জবাব দিতে পারলো না মিথিলা। রেজা আবেগ জড়ানো গলায় বললো-
‘আমি বিশ্বাস করতাম, সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার যেমন সম্পর্ক, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কও তেমনি। আমরা কতোবার বলেছি, আত্মার সম্মিলনে আমরা অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু আজ এই বিশ্বাস, কাচের ঘর ভাঙার মতো ভেঙে দিলে তুমি! এ জন্য তোমাকে অভিবাদন।’
‘কেনো?’
‘জীবনে এমন দগদগে ঘা সৃষ্টি করার জন্য। মানুষের চরিত্রের এমন নোংরা রূপ চিনিয়ে দেবার জন্য।’
‘তুমি তো ভালো চাকরি করছো। বই পড়ো। সংস্কৃতবান। ধৈর্যশীলও। আমি জানি, তুমি এই যাতনা সহে নিতে পারবে। আমাকে ঘৃণা করার মধ্য দিয়ে নিজের জীবনও ঘুছিয়ে নিতে পারবে।’
নিজের ভেতর থেকে উথলে বেরিয়ে আসা কান্নাকে সামলে নিয়ে কথাগুলো বললো মিথিলা। ওর কথায় রেজা একটু মুচকি হাসলো। বললো-
‘তাই না-কি! তুমি সে দিকটাও বিবেচনা করে রেখেছো! তোমার এটুকু দয়ার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবো।’
‘আমি জানি, তুমি আমার কথাকে পরিহাস করছো। সেটাই স্বাভাবিক।’
‘পরিহাস আমি করছি! সবচেয়ে বড় পরিহাস তো তুমিই করছো!’
‘আগেই বলেছি, এ আমার অপরাগতা।’
‘অপরাগতা শব্দ উচ্চারণের মধ্য দিয়েই কি একটি জীবনের স্বপ্ন প্রদীপ এক ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেয়া যায়? একটি হৃদয়ের আকুতি মাড়িয়ে, সেখানে রক্তক্ষরণ বইয়ে দেয়া যায়! আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো তো?’
‘আমি তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারবো না। আমার সেই শক্তি নেই!’
‘কারণ, তুমি অপরাধী।’
‘ঠিক।’
‘তুমি প্রতারক, ভণ্ড!’
‘ঠিক।’
‘তুমি নিচ, লালসাগ্রস্ত নোংরা মনের নারী!’
‘আর কিছু বলবে?’
‘না। বলার মতো আর কী থাকতে পারে?’
‘ঠিক আছে, এবার তুমি যাও! প্লিজ!’
মিথিলার কথায় মুষড়ে পড়েও রেজা এবার বিনীতভাবে বললো-
‘যাবার আগে, শেষবারের মতো একটি প্রশ্ন করতে চাই।’
‘বলো।’
‘তুমি কি সত্যিসত্যিই বিয়ে করছো?’
‘হ্যাঁ। বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে হচ্ছে আমাকে। আমি তাকে কথা দিয়েছি, রেজা।’
এ কথা বলে ঠুকরে কেঁদে উঠলো মিথিলা। রেজা একটু হচকিত হলো। ওর ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে। ভীষণ প্রলয় হচ্ছে। ও নিজেকে সামলে নিতে পারছে না। ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে থমথমে গলায় বললো-
‘এরপর তোমাকে ঘৃণা করাই আমার উচিত। কিন্তু আমি তা করবো না। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।’
‘কেনো!’
‘জেনো, সব মেনে নিয়ে ক্ষমা করে দেয়াটাই তোমার প্রতি আমার প্রতিশোধ!’
এ কথা বলে আর দাঁড়ায়নি রেজা। ঝড়ের মতোই ও বেরিয়ে গিয়েছিল। মিথিলা শুধু অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়েছিল, নিঃশব্দে, একাকী। সেই কান্নার মূর্ছনা আজো মিথিলাকে গ্রাস করলো। বিছানায় শুয়ে মিথিলা দুচোখের পাতা এক করে ফেললো। ওর বন্ধ চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো জলের ধারা।
ছয়.
রাহাতের চোখ যেনো ক্যামেরা হয়ে গেছে। ও যা দেখে তা ক্যামেরার ফ্রেমের মধ্য দিয়ে দেখে। চোখের সামনে দৃশ্যমান যে কোনো কিছু কোন ফ্রেমে ভালো লাগবে তা-ই ওর মাথায় কাজ করে। ও হয়তো ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটছে। ক্ষেতে কর্মরত কৃষক হয়তো ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো, তখন ওর মনে হবে এ দৃশ্যটা ক্লোজশটে চমৎকার হবে। হয়তো সবুজ ধানক্ষেতে ঢেউ তুললো দামাল বাতাস, তখন ওর মনে হবে এটি লং শটে টেক করলে চমৎকার হতো। রাহাতের এই অভ্যাস হয়েছে নাটক নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে। ও ঢাকায় একটি প্রোডক্টশন হাউসে কাজ করছে। ওর পজিশন সহকারী পরিচালক। কাজ করছে নাট্য নির্মাতা শহিদুল ইসলাম মিন্টুর সঙ্গে। ওদের একটি ধারাবাহিক নাটক অনএয়ার হচ্ছে এক স্যাটালাইট টিভিতে। নাটকের পর্ব শেষ হলে টাইটেলে রাহাতের নাম দেখা যায়। টিভি পর্দায় যখন ওর নাম ভেসে ওঠে, তখন গর্বে ভরে যায় ওর বুক। এই নাট্য জগতটা ভীষণ আকর্ষণীয়। এই জগতে সবাই যেতে পারে না। আবার এ লাইনে অনেকে গেলেও সবাই জায়গা করে নিতে পারে না, এটা জানে রাহাত। এ লাইনে টিকে থাকতে হয়। এখানে টিকে থাকাটাই বড় কথা। তিন বছর ধরে ও মনে-প্রাণে লেগে আছে। রাহাতের স্বপ্ন ও একদিন পরিচালক হবে। ঢাকায় নাট্যপাড়ায় ইতোমধ্যে ওর একটু পরিচিতি হয়েছে। নাটক করতে আসা নতুন নতুন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে ও সালাম পায়। ওর ভালো লাগে। রাহাত এখন দাঁড়িয়ে আছে গুকসির বিলের সামনে। এই বিলের সামনে দাঁড়িয়ে ও ভাবছিল, বিলটিতে একটি নৌকাবাইচের আয়োজন করলে ভালো হতো। এই নৌকাবাইচ তিন ক্যামেরায় শুট করতে পারলে এক্সসিলেন্ট দৃশ্য ধারণ করা যেতো। দৃশ্যটা ও কল্পনা করে নিলো। নায়ক নৌকাবাইচে অংশ নিয়েছে। প্রায় ত্রিশটি নৌকা ছুটছে। এর মধ্যে নায়কের নৌকাটি সবার আগে ছুটছে। বিলের পাড়ে গ্রামের শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে এই প্রতিযোগিতা। ঢাক-ঢোল বাজছে। সবাই চিৎকার করছে। এদের মধ্যে নায়িকাও রয়েছে। সে হাততালি দিয়ে নায়ককে সমর্থন দিচ্ছে। প্রতিযোগিতার একসময় নায়কের নৌকাটি মাঝপথে পানিতে ডুবে যেতে থাকবে। নায়িকার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসবে আর্তচিৎকার। এ পর্যন্ত ভাবলো ও। এমন দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করতে হলে একটি ক্যামেরা সার্চ করবে বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীর ওপর। নায়িকার মুখটি বারবার ক্লোজ শটে আসবে। নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতা লং শটে নিতে হবে। আবার নায়ককে নিতে হবে ক্লোজ শটে। হেলিকপ্টার দিয়ে ওপর থেকে কয়েকটা শট নিতে পারলে খুবই ভালো হবে। কিন্তু এটা সম্ভব নয়। একটি নাটকে এতো টাকা কখনো কেউ ব্যয় করে না। ভেবে নিলো রাহাত। যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় ও নাটকের মধ্যে ঢুকে যায়। ও তন্ময় হয়ে গুকসার বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকাবাইচের কথা ভাবছিল। ওর ভাবনা ভেঙে দিলো লিজি। লিজি বিলের পাড় ধরে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল। বিলের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা রাহাতকে দেখে লিজি সাইকেল থামিয়ে দিলো। রাহাতের খুব কাছ থেকে লিজি জিজ্ঞেস করলো-
‘হ্যালো, আপনি রাহাত না!’
লিজির কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে রাহাত বিলের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ালো। ও লিজিকে দেখে বিস্ময়ে থ হয়ে গেলো। লিজির কপালে কৌতূহলের ভাঁজ পড়লো। বললো-
‘হোয়াট ডিড ইউ সিন? হ্যাড ইউ ইমপ্রেসড? বিলের নীরবতার সৌন্দর্য দেখছিলেন, বুঝি!’
এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রাহাত শুধু বললো-
‘আপনি, এখানে!’
‘স্ট্রেঞ্জ! আমি কি এখানে আসতে পারি না!’
এ কথা বলে মিষ্টি করে হাসলো লিজি। রাহাত ওর হাসির মাদকতায় ইমপ্রেসড হয়ে গেলো। বললো-
‘না, আমি ভাবতেই পারছি না, আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন?’
‘কেনো? আমি তো অন্য গ্রহ থেকে আসিনি। এই গাঁয়েই তো আছি। দেখা তো হতেই পারে।’
‘হতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিসত্যি ভাবিনি আপনার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে।’
‘বাই দ্যা ওয়ে, আপনি এখানে কি করছিলেন?’
‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এখানে শুটিং করবো। অর্থাৎ নাটক বানাবো।’
‘নাটক?’
‘হ্যাঁ, নাটক। আপনি কি নাটক দেখেন? আই মিন বাংলা নাটক?’
রাহাতের এ কথায় না হেসে পারলো না লিজি। ও হাসতে হাসতে বললো-
‘আপনার কি ধারণা নিউইয়র্কে যারা থাকেন, তারা বাংলা নাটক দেখেন না? ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, নিউইয়র্কে অনেক বাঙালির বাসায় বাংলা ভাষার টিভি আছে। এ ছাড়া তারা নাটকের ক্যাসেট ভাড়ায় বা কিনে দেখেন।’
‘না, জানতে চাচ্ছিলাম, আপনি দেখেন কি-না?’
এবার একটু বিব্রত হলো লিজি। ও নাটক খুব একটা দেখে না। লিজি নিঃসংকোচে বললো-
‘না, আমি বাংলা নাটক খুব একটা দেখি না। কিন্তু কেনো বলুন তো!’
এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রাহাত পাল্টা প্রশ্ন করলো-
‘আপনি কী সাঁতার জানেন?’
‘না, জানি না। কেনো?’
‘ইস! আপনি যদি সাঁতার জানতেন!’
‘কী হতো?’
‘একটি নাটকে চান্স দিতাম। আই মিন নায়িকা বানাতাম।’
‘নায়িকা!’
‘হ্যাঁ। নায়িকা। এখানে দাঁড়িয়ে চমৎকার একটা গল্পের প্লটও তৈরি করে ফেললাম।’
‘আপনি কি নাটক লেখেন, আই মিন ড্রামা!’
‘এখনো লিখিনি। তবে লিখে ফেলবো। মাথার মধ্যে লেখালেখি কিলবিল করছে। হা হা হা।’
‘আপনি আসলে কী করেন?’
লিজির এ প্রশ্নটা রাহাতের খুব ভালো লাগলো। গ্রামে আসার পর ঢাকায় ও কী কাজ করে, কেউ জিজ্ঞেস করেনি। ওকে নিজ থেকেই বলতে হয়েছে ঢাকায় ও কী করছে। কেউ প্রশ্ন না করলে নিজের কাজের ব্যাপারে কথা বলার মধ্যে সংকোচ লাগে। রাহাত লিজির দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জিতভাবে বললো-
‘একটা প্রোডাক্টশন হাউসের সঙ্গে আছি। পদবিতে সহকারী পরিচালক। যেদিন পুরোপুরি পরিচালক হবো, সেদিন এই বিলের সামনে এসে সেট ফেলবো। গ্রামের সকল মানুষ অবাক চোখ তুলে দেখবে, রাহাত কতদূর গিয়েছে!’
লিজি রাহাতের দিকে চেয়ে রইলো। ওর দৃষ্টিতে মুগ্ধতা আছে, কি নেই তা বুঝতে পারলো না রাহাত। স্বপ্নের ঘোর থেকে নিজেকে বের করে এনে ও লিজির উদ্দেশে বললো-
‘আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আমার প্রথম নাটকে আপনাকে নায়িকা হিসেবে কাস্ট করলে ভালো হবে।’
‘নায়িকা, আমাকে! রিয়েলি!’
এ কথা বলে লিজি হাসতে লাগলো। যেনো রাহাত খুব একটা হাসির কথা বলে ফেলেছে। রাহাত বিব্রত হলো না। নাটকের জগতে এমন অবস্থায় একটু সিরিয়াস থাকতে হয়। রাহাত নিজের মধ্যে গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললো-
‘জানেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন কতো লাখ মেয়ে নাটকের নায়িকা হবার স্বপ্ন দেখে?’
‘আই ডোন্ট নো। বাট হাউ মাচ? কুড ইউ টেল মি?’
‘কমপক্ষে দশ লাখ মেয়ে এই স্বপ্ন দেখে।’
‘স্ট্র্যাঞ্জ!’
‘জ্বি, সত্যি বলছি! বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘হচ্ছে। তা আমি কি করবো?’
‘কিছুই করতে হবে না। আপনি চাইলে আপনাকে আমি নায়িকা বানিয়ে দিতে পারি। ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই ক্যান ডু ইট!’
লিজি ফের হাসলো। মুখে হাসি ধরে রেখে বললো-
‘ও সব আমি পারবো না। আমাকে দিয়ে হবেও না, বুঝলেন?’
‘কী বললেন? ঐশ্বরিয়া রাইকে চিনেন?
‘হ্যাঁ। ও হচ্ছে মুম্বাইয়ের হার্টথ্রুব নায়িকা।’
‘ওর চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ কখনো অভিনয় করেছে?’
‘তা তো জানি না!’
‘আমার কাছ থেকে শুনুন। ঐশ্বরিয়া অভিনয়ের অ-ও জানতো না। এখন দেখুন, অভিনয় দিয়ে পুরো বিশ্বটাকে জয় করে নিয়েছে। অক্ষয় কুমার হোটেলে ওয়েটারের চাকরি করতো। আজ অভিনয় দিয়ে কোথায় চলে গেছে? রাজেশ খান্নার কথাই ধরুন, অভিনয় শেখার জন্য নাটকের স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে কোনোদিন পাস করেননি। কিন্তু তারপর? তারপর সেই লোকটিই অভিনয় দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন বলিউডে। এ রকম অনেক উদাহরণ দিতে পারবো। আপনার ভয় নেই। আমি আপনাকে অভিনয় শিখিয়ে দেবো। অভিনয় কেউ শিখে আসে না। ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে, ওটা এমনি এমনি হয়ে যায়।’
ক্লাসে ছাত্রকে শিক্ষক যেভাবে জ্ঞান দেন, সেভাবে কথাগুলো বললো রাহাত। লিজি ছোট্ট করে বললো-
‘কী যে বলেন!’
‘আপনি ভয় পাচ্ছেন? তারা কিভাবে স্টার হয়েছেন, জানেন?’
‘না।’
‘তারা ভালো পরিচালকের হাতে পড়েছিলেন বলে।’
লিজি বললো-
‘সরি, আমার ওসবে কোনো আগ্রহ নেই।’
লিজির কথায় রাহাত ভীষণ হতাশ হলো। এতো সুন্দর একটি মেয়ে নাটকে এলে আলাদা গ্লামারস ফুটিয়ে তোলা যেতো। হৈচৈ ফেলে দেয়া যেতো। অথচ লিজি না করছে। ও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এ সময় লিজি বললো-
‘আমার নাটক করার কোনো ইচ্ছা নেই। নাটক আমি তেমন বুঝি না, পছন্দও করি না। নিউইয়র্কে আমি একবার মাত্র ম্যানহাটানের ব্রডওয়েতে নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। ভীষণ বোরিং লেগেছে। মঞ্চের মধ্যে হৈচৈ, গলাবাজি আর ন্যাকা কান্না! আমার শিল্পবোধ নিয়ে আমি নিজেই শঙ্কিত।’
লিজির কথায় হতাশা বাড়তে লাগলো রাহাতের। তবে ও হাল ছাড়তে নারাজ। ও বললো-
‘ঠিক আছে, তারপরও আপনাকে নায়িকা বানাবো।’
‘এরপরও! কেনো?’
‘এই কেনোর উত্তর আপনি পরে বুঝতে পারবেন। একদিন দেখবেন, অটোগ্রাফ শিকারির জ্বালায় রাস্তায় হাঁটতে পারবেন না।’
লিজি খিলখিল করে হেসে উঠলো। রাহাত ওর হাসির সামনে মুগ্ধ হয়ে গেলো। ও ভাবতে লাগলো লিজির এমন প্রাণখোলা হাসিটা ক্যামেরা জুম করে ক্লোজ শটে নিলে অদ্ভুত একটা সুন্দর দৃশ্য হবে। হাসি সামলে নিয়ে লিজি বললো-
‘বাই দ্যা ওয়ে, আমি একজনকে খুঁজছি। লোকটি না-কি এই বিলের দিকে এসেছেন। আপনি এদিকে কাউকে দেখেছেন?’
‘কেমন লোক বলুন তো!’
‘রহস্যময় এক লোক। কথা খুব কম বলেন। কারো দিকে তাকান না, এ ধরনের লোক।’
‘ওহ, বুঝতে পেরেছি। আপনি নৈশ্য স্কুলের শিক্ষক আবিদের কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তার কথাই বলছি। তাকে দেখেছেন?’
‘দেখেছি। ওই পাগলটা এদিকে এসে একটা নৌকা খুঁজছিল।’
রাহাতের কথায় প্রতিবাদের সুরে লিজি বললো-
‘দেখুন, সে পাগল নয়!’
‘কিন্তু…?’
‘আপনারা তাকে চিনতে পারছেন না। বাই দ্যা ওয়ে, সে কোন দিকে গিয়েছে বলুন তো!’
‘ওই দিকে।’
রাহাত বিলের পাড়ে দূরে গোবিন্দপুর গ্রামের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো। লিজি সেদিকে তাকিয়ে বললো-
‘ধন্যবাদ। আমি আসছি। তাকে ধরতে হবে।’
লিজি সাইকেলের প্যাডেলে পা চালালো। সাইকেলটা চলতে শুরু করলো। রাহাত হাত নেড়ে শুধু বিদায় জানালো লিজিকে। ওর মুখে কোনো কথা ফুটলো না। ওর মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে গেলো। একটা পাগল লোকের জন্য লিজির এই টান ভালো লাগলো না রাহাতের। ও কেমন একটা নাটকের গন্ধ পাচ্ছে। বিলের পাড়ে মন খারাপ করে রাহাত অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। শান্ত বিলের নীরবতার মধ্যে ওর নিজের না বলা কথাগুলো যেনো মিলিয়ে গেলো।
সাত.
বিলের শান্ত জলের এক ধরনের ভাষা আছে। নীরবতার যেমন ভাষা আছে, শান্ত জলেরও তেমনি একটা ভাষা আছে। এই ভাষা সবাই পড়তে পারে না বা পড়তে চায় না। গুকসির বিলের জলে নৌকা চালানোর সময় আবিদ রেজার তাই মনে হলো। বিলের শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে ও আজ উদাস হয়ে যাচ্ছে। গ্রীষ্মের গুমোট বিকেল। বিলের শান্ত জলের ওপর ছোট্ট ডিঙি নৌকায় চড়ে ও ভেসে বেড়াচ্ছে। নৌকার মাঝি ও নিজেই। আজ অনেকদিন পর ওর মনটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠেছে। একটা হাহাকার টের পাচ্ছে ও। আনন্দ বা বিষণ্নতা আজকাল ওকে তেমন স্পর্শ করে না। অথবা বলা যায়, আনন্দ বা বিষণ্নতাকে ও নির্মোহভাবে উপেক্ষা করে চলে। কিন্তু আজ ওর মনটা হেরে গেছে। নিজের ভেতরের একটা অস্থিরতা নিয়ে আবিদ চলে এসেছিল বিলের পাড়ে। বিলে মাছ ধরছিল ধীরেন জেলে। ও ধীরেন জেলের কাছ থেকে নৌকাটি চাইতেই সে হাসিমুখে নৌকাটি তাকে দিয়ে দেয়। আবিদ বুঝতে পারে ওকে গ্রামের প্রায় সকলে পছন্দ করে। ওকে নৌকা দিতে দ্বিধা করেনি ধীরেন জেলে। তবে আবিদ নৌকা চালাতে পারবে কি-না, এ নিয়ে ধীরেন জেলে সন্দিহান ছিল। আবিদ যখন স্বাভাবিকভাবে নৌকার বৈঠা চালালো, ধীরেন জেলে তখন স্বস্তি পেলো। সে চলে গেলো নিজের বাড়ির দিকে। আবিদ বৈঠা চালিয়ে নৌকা নিয়ে চলে এলো বিলের মাঝখানে। শান্ত বিলের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে ও যেনো নিজের কিছু একটা খুঁজছে। বিষণ্ন বিকেলের এই বিল আবিদকে নিয়ে গেলো অদ্ভুত সুন্দর এক বিকেলের কাছে। মনের প্রবল আপত্তি ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনের পর্দায় ভেসে উঠলো স্মৃতিতে উজ্জ্বল সেই বিকেলের কথা। সেই বিকেলটি পেখম ছড়িয়ে ছিল এমনি একটি বিলের ওপর। সেই বিকেলটি স্মৃতির সোনালি ফ্রেমে বাঁধা। আবিদ রেজার জীবনের প্রথম রোমান্টিক বিকেল ভেসে উঠলো চোখের সামনে। ওই বিকেলটি তিনটি কারণে ওর জীবনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এক হচ্ছে- এদিন ও প্রথম কোনো মেয়েকে নিয়ে আশুলিয়ায় বিলের পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিল। দুই হচ্ছে- এদিন ও প্রথম কোনো মেয়েকে প্রপোজ করেছিল এবং তিন হচ্ছে- মেয়েটি ওর প্রপোজকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। এজন্য ওই বিকেলটিকে আবিদ রেজার কাছে হিরন্ময় এক বিকেল বলে মনে হয়। মিথিলাকে নিয়ে প্রথম ঘুরতে যাওয়া, প্রথম ভালোলাগার কথা বলার যে উপাখ্যান ও চেপে রেখেছে মনের অন্তপুরে, তা এ মুহূর্তে ওর চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো।
বর্ষাকালে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় ভিড় জমায় চিত্ত বিলাসীরা। এখানে বর্ষার পানিতে ফসলের ঢালু মাঠ পরিণত হয় বিশাল বিলে। এই বিলের পাড়ে নগর জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে ছুটে আসেন নানা বয়সের মানুষ। পাঁচ বছর আগে আবিদ রেজা আশুলিয়ার বিলের পাড়ে ছুটে গিয়েছিল মিথিলাকে সঙ্গে নিয়ে। মিথিলা ভীষণ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। আবিদ রেজার ওপর ভর করেছিল কবি সত্ত্বা। সেদিন একপর্যায়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে মিথিলা তন্ময়তার মধ্যে ওর কাছে প্রশ্ন করেছিল-
‘বলতে পারেন, আকাশ নীল কেনো?’
‘খুব সহজ। আকাশজুড়ে রয়েছে আপনার স্বপ্ন। আপনার স্বপ্নের রং নিয়েই আকাশের নীল হবার অহংকার। এ ছাড়া আকাশের কোনো রং নেই। অহংকারও নেই।’
‘সত্যি!’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি ভালোই রসিকতা করতে পারেন।’
‘রসিকতা নয়। সত্যি বলছি।’
ওর কথায় খুব হেসেছিল মিথিলা। কিন্তু ওর কথা মিথিলার ভালো লেগেছিল। ও একটু হেসে চোখের মণিতে কৌতূহল নাচিয়ে প্রশ্ন করেছিল-
‘এবার বলুন তো দিগন্তের রেখা কালো কেনো?’
আবিদ রেজা প্রস্তুত ছিল। ও কঠিন প্রশ্নের সহজ উত্তর দিচ্ছে এমন ভাব করে বলেছিল-
‘ওখানে জমে থাকে আপনার গোপন কষ্ট। তাই দিগন্তের রেখা কালো দেখা যায়।’
‘গ্রীষ্মে হাওয়ার এমন মাতম কেনো?’
‘হাওয়াকে তাড়িয়ে বেড়ায় আপনার দীর্ঘশ্বাস।’
‘বৃষ্টি ছন্দময় কেনো?’
‘বৃষ্টিতে মিশে থাকে আপনার অপ্রকাশিত আবেগ।’
‘সমুদ্রের এতো গর্জন কেনো?’
‘সমুদ্র জানতে চায় আপনার না বলা কথা। তাই ওর এতো গর্জন।’
‘শিশুরা সরল হয় কেনো?’
‘ওরা আপনার হাসির মুদ্রার স্বরলিপি জানে।’
‘কবিরা এতো রোমান্টিক কেনো?’
‘ওরা প্রেমকে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেন।’
‘আপনি সত্যিই কথা জানেন। অর্থাৎ কথা বানাতে পারেন।’
এ কথা বলে মিথিলা হাসিতে লুটিয়ে পড়ছিল। মিথিলার হাসির জবাবে ও মিটিমিটি হেসেছিল। মিথিলার হাসি থামার পর ও বলেছিল,
‘আমি কিন্তু কথা বানিয়ে বলতে পারি না। তবে আপনার সামনে এলে আমার মধ্যে কথার মাদকতা তৈরি হয়। কথার জাল বুনতে থাকে।’
‘তাই না-কি!’
‘হুম। আপনি কাছে এলেই আমার ভেতরে কে যেনো কথা বলে ওঠে। আপনি প্রশ্ন করলে আমার ভেতর থেকে উত্তর দেয় অন্যকেউ। আর আপনি যখন থাকেন না, তখন আমি স্বাভাবিক হয়ে যাই। আসলে আমি আপনাকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাই।’
‘বেশ তো! শুনেছি, মন্ত্রমুগ্ধরা প্রিয়জনের সামনে ভাষামূক হয়ে যান। আপনি দেখছি ঠিক এর উল্টো!’
‘ইদানীং আমার ইমোশন খুব বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।’
অপরাধ স্বীকার করার মতো বলেছিল ও। মিথিলা কণ্ঠে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিল,
‘মনে হচ্ছে, আর কয়েকদিনের মধ্যে আপনি আমাকে প্রেম নিবেদন করে ফেলবেন!’
এ কথায় মিথিলার চোখে চোখ রেখেছিল ও। এমন সরাসরি ও কখনো মিথিলার চোখে চোখ রাখেনি। মিথিলা একটু কেঁপে উঠেছিল যেনো। ও ভারী কণ্ঠে বলেছিল-
‘প্রেম আমার কাছে নিবেদনের বিষয় নয়, মিথিলা!’
ওর কণ্ঠে ‘মিথিলা’ নামটি এমনভাবে উচ্চারিত হয়েছিল যে, মিথিলা কয়েকটা মুহূর্ত আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মিথিলা আড়ষ্ট গলায় বলেছিল-
‘ঠিক বুঝলাম না।’
ও হালকা করে একটু হেসেছিল। বলেছিল-
‘আমি বলতে চাচ্ছি, আমার কাছে প্রেম নিবেদনের বিষয় নয়। ওটা সমর্পণের। প্রেম নিবেদন করাটা আমার কাছে আপেক্ষিক ব্যাপার বলে মনে হয়। আমি মনে করি, প্রেম স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নেবে এবং তা সমর্পিত হয়ে যাবে। যা ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না। আমারও হয়েছে তাই।’
‘হয়েছে তাই মানে!’
মিথিলা বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। ও আর কালক্ষেপণ না করে না বলা কথাটি সহজভাবে বলে ফেলার মতো করে বলেছিল-
‘বলতে চাচ্ছি, আপনার প্রতি আমার সর্বস্ব সমর্পিত হয়ে গেছে।’
এ কথায় ভীষণ লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল মিথিলা। মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সে নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারে না। মিথিলারও তাই হয়েছিল। ও আবেগজড়িত গলায় জানতে চেয়েছিল-
‘তাহলে এটার নাম কি হবে?’
মিথিলার এ কথায় বুকের ওপর চেপে থাকা অনড় পাথর নেমে গিয়েছিল যেনো। ও আবেগমথিত কণ্ঠে বলেছিল-
‘এটার নাম দিতে চাই প্লাটনিক লাভ।’
এ কথায় খিলখিল করে হাসির দমকায় ভেঙে পড়েছিল মিথিলা। ওর হাসি থামছিল না। মিথিলা এমনভাবে হাসছিল, ওই মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছিল ভালোলাগারও অতুলনীয় মহত্ব আছে। যদিও মিথিলার হাসির কোনো অর্থ ও বুঝতে পারছিল না। বিশেষ একটা মুহূর্তে মেয়েরা এমনভাবে হাসবে যে, এই হাসির সঠিক ব্যাখ্যা বের করা কঠিন। মনে হবে হাসির মধ্যে প্রশ্রয় থাকতে পারে, আবার উপেক্ষাও থাকতে পারে। মিথিলার হাসিতে ওই রকম একটা ছবি দেখতে পেয়েছিল ও। ওর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে মিথিলা একসময় হাসি সামলে নিয়েছিল। ও মিথিলার কাছ থেকে একটা জবাব আশা করছিল। মিথিলাও সেটা বুঝতে পেরেছিল যেনো। মিথিলা ওর চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলেছিল-
‘প্লাটনিক লাভ, না ছাই! আমি এর নাম দিচ্ছি একতরফা মোহ বা সস্তা আবেগ!’
এ কথায় তাৎক্ষণিকভাবে ভীষণ হতাশ হয়েছিল ও। একতাল লজ্জায় ও কুকড়ে গিয়েছিল। ওর দিকে তাকিয়ে ফের মিথিলা হাসির দমকায় ভেঙে পড়েছিল। সেদিন থেকেই ওর সঙ্গে মিথিলার সম্পর্কের একটা অর্থপূর্ণ রূপ প্রকাশ পেয়েছিল। যা পরবর্তীতে প্রহসনে পরিণত হয়। সেদিনের স্মৃতি মনে করে আবিদ রেজা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এই দীর্ঘশ্বাস বিলের শান্ত জলে ঢেউ না তুললেও ওর মনে গোপন কান্নার ঢেউ বইতে লাগলো। ও নিঃসঙ্গ বিলের হাহাকারের সামনে নিজের হাহাকার সামলে রাখতে পারলো না। অনেক চেষ্টা করেও সামলে রাখতে পারলো না দুচোখের জলপ্রপাত।
আট.
মিথিলা প্রতিমাসে একবার দেখা করে রেজার মায়ের সঙ্গে। দুটো কারণে তার সঙ্গে দেখা করে ও। রেজা বাড়ি ফিরেছে কি-না তা জানার জন্য এবং আরেকটি কারণ হচ্ছে ওকে দেখলে রেজার মা খুব খুশি হন। মিথিলাকে দেখলে তিনি খুশিতে ওকে জড়িয়ে ধরেন। কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। যতোবার মিথিলা তার সঙ্গে দেখা করতে গেছেন, ততোবারই তিনি তাই করেছেন। মিথিলা কাঁদতে চায় না। কিন্তু কান্না যেনো সংক্রামক ব্যাধি। যতোবার রেজার মা ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন, ততোবার মিথিলাও কেঁদেছে। তাদের মধ্যে আর বিশেষ কোনো কথা হয় না। কান্নাই তাদের ভাষা। প্রতিমাসে মিথিলা যায় রেজাদের বাড়ি এবং ওর মায়ের সঙ্গে কান্নাকাটি করে বাড়ি ফিরে আসে। একজন পুরুষ মানুষের জন্য দুটি অবস্থানের দুজন নারী অপেক্ষা করছে এবং তারা কাঁদছে। কিন্তু ওই মানুষটির কোনো হদিস তারা পাচ্ছে না। মা এবং প্রেমিকার ওই সম্মিলিত কান্না, আলাদা বেদনার খবর কি জানে রেজা? প্রশ্নটি মাঝে মাঝে মিথিলার মনে উঁকি দেয়।
রেজাদের বাড়ি ঢাকা শহরের ভূতের গলিতে। আগে ওদের বাড়ি আসতে মিথিলার ভয় করতো। মনে হতো ভূতের গলিতে সারিসারি ভূত দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এখানে সারিসারি ভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে রাস্তাগুলো সরু। ভবনঘেরা এমন ব্যস্ত এলাকায় ভূত থাকার জো নেই। প্রথম দুবার আসার পর মিথিলার ভয় কেটে গেছে। এখন তো ভূতের গলি ওর কাছে খুব চেনা এলাকা। আজ রেজাদের বাড়ি এসে ওর মায়ের দেখা পায়নি মিথিলা। ও রেজার বাবাকে কখনো দেখেনি। তিনি ভীষণ ব্যস্ত একজন ব্যবসায়ী। সংসারের কোনো খোঁজখবর তিনি না-কি রাখেন না বা রাখতে পারেন না। রেজাই ওকে এ কথা বলেছিল। ওর মা ঠিক এর উল্টো। সংসারকে তিনিই আগলে রেখেছেন। রেজার ছোট একটি বোন আছে। ওর বিয়ে হয়ে গেছে। রেজাদের ছোট্ট পরিবার। আজ রেজাদের বাড়ির গেটের সামনে মিথিলার রিকশা থামার সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ান হারু মিয়া ওর উদ্দেশে বললো-
‘আপা, আম্মা বাড়ি নাই। আপনারে এক হপ্তা পর আইতে কইছে।’
‘বাড়িতে নেই মানে, তিনি কোথায় গিয়েছেন?’
রিকশায় বসে জানতে চাইলো মিথিলা। হারু মিয়া বললো-
‘আম্মা খালুজানরে লইয়া খাজা বাবার দরবারে গেছেন।’
‘মানে ভারতে?’
‘হ। আম্মা বইল্যা গেছেন, আপনারে আরো এক হপ্তা পর আইতে।’
‘ঠিক আছে। আমি এক সপ্তাহ পরে আসবো। এই রিকশা ঘুরাও।’
রিকশাওয়ালা রিকশা ঘুরিয়ে বললো-
‘আফা, এখন কোথায় যাইবেন?’
‘পান্থপথ যাও। বসুন্ধরা সিটি মার্কেটে।’
‘ঠিক আছে।’
রিকশা চলতে লাগলো। মিথিলার মনটা এ মুহূর্তে বিষণ্ন হয়ে গেলো। ও বুঝতে পারছে রেজার জন্য ওর মা আজমির শরিফ গেছেন। ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য এক মায়ের কী বেদনাবিধূর অপেক্ষা! কতোরকম চেষ্টা! অথচ রেজা কতোটা নিষ্ঠুর, কতোদিন ধরে নিরুদ্দেশ! ওর কি একবারো মায়ের কথা মনে পড়ে না? বাবার কথা মনে পড়ে না? একমাত্র বোনের কথা মনে পড়ে না? এভাবে হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রেজা কার ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে? কাকে কষ্ট দিতে গিয়ে আরো কাকে কাকে কষ্ট দিচ্ছে? ভাবে মিথিলা। ও না হয় অপরাধ করেছে। তাই বলে ওর মা-বাবা ও বোনের কী অপরাধ? রেজা কী এই কথা ভাবছে না? প্রশ্নগুলো মিথিলার মনে রংধনুর মতো ফুটে উঠলো। এ প্রশ্নগুলো প্রায়ই ওর মনে ছড়িয়ে থাকে। মিথিলার রিকশা ভূতের গলি থেকে বের হয়ে গ্রিন রোড দিয়ে পান্থপথের সামনে আসতেই রিনির ডাক শুনতে পেলো মিথিলা। অন্যদিক থেকে রিকশায় চড়ে আসছিল রিনি। ও মিথিলাকে দেখে উঁচু গলায় ডাকলো-
‘এই মিথিলা! রিকশা থামা! মিথিলা!’
রিনির ডাক শুনে মিথিলা রিকশাওয়ালাকে রিকশা থামাতে বললো। রিনির রিকশা ঘুরে এসে থামলো ওর রিকশার সামনে। রিনি মিথিলার উদ্দেশে সোৎসাহে বললো-
‘তোদের বাসায় যাচ্ছিলাম! আজ তোকে ভীষণ দরকার, বুঝলি!’
‘কেনো রে?’
‘বলছি, বলছি। আগে উঠি তোর রিকশায়। তারপর বলছি।’
এ কথা বলে রিনি ওর রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে মিথিলার রিকশায় উঠে বসলো। রিনি মিথিলার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। দুজনেই ঢাকা মেডিকেলের ছাত্রী। মেডিকেলে থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় এক ইন্টার্নি ডাক্তারের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করে ফেলে রিনি। ফাইনাল পরীক্ষাটা ওর আর দেয়া হয়নি। ওর স্বামী এফআরসিএস করতে লন্ডনে গিয়ে এখনো ফেরেনি। ওদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা আছে, যোগাযোগটা তেমন নেই। কোথাও একটা ছন্দ পতন হয়েছে, বুঝতে পারে মিথিলা। রিনি ওর স্বামীর ব্যাপারে কোনো কিছু বলতে চায় না। মিথিলাও জানতে চায়নি। কতোজন কতো অসম্পূর্ণতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। কতো ধাঁধানো আলোর অন্তরালে কত গভীর অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, কে জানে!
রিকশায় উঠেই রিনি বললো-
‘জানিস, তোর জন্য আজ একটা সারপ্রাইজ আছে!’
‘সারপ্রাইজ!’
‘হ্যাঁ, সত্যি সত্যি সারপ্রাইজ!’
‘বলে ফেল, শুনি।’
‘এখনই বলছি না। তার আগে বল, তুই কোথায় যাচ্ছিলি?’
‘বসুন্ধরা সিটি মার্কেটে। মন ভালো নেই। তাই ভাবলাম, একটু কেনাকাটা করি। তুই আমাদের বাসায় কেনো যাচ্ছিলি?’
‘ওই যে বললাম তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে। আমি তোকে বাসা থেকে আনতে যাচ্ছিলাম।’
‘এখন কোথায় যাবি?’
‘বসুন্ধরা সিটি মার্কেটেই। তিনতলায় একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে না, কী যেনো নাম? ও, মনে পড়েছে, ওটার নাম কী যেনো? ওখানে যাবো?’
‘কী ব্যাপার, একেবারে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত যেতে হবে? কী এমন সারপ্রাইজ, বলতো শুনি! মনে হচ্ছে, খুব সিরিয়াস কিছু?’
‘তোর জন্য সিরিয়াস কি-না জানি না, তবে…?’
‘তবে কী?’
‘রাশেদ ভাইয়া ওখানে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।’
‘আমার জন্য অপেক্ষা করছেন! কেনো?’
‘আজ তার জন্মদিন।’
‘তাই না-কি!’
‘হুম!’
‘এতে আমার আবার সারপ্রাইজ কী?’
‘আছে, আছে। চল, যেতে যেতে বলছি।’
‘বিশেষ কিছু বলবি বলে মনে হচ্ছে?’
‘সে রকমই।’
‘খুলে বল তো!’
মিথিলা বিস্ময় প্রকাশ করে। রিকশা চলছে। রিনি মিথিলার দিকে মিষ্টি করে হাসলো। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার আগে রিনি মিষ্টি করে হাসে। এই হাসি মিথিলার চেনা। ও রিনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। রিনি একটু ভারী কণ্ঠে বললো-
‘তুই কি বুঝতে পারিস না, রাশেদ ভাইয়া তোকে পছন্দ করে?’
রিনি এমন তীর্যক প্রশ্ন করবে, ভাবেনি মিথিলা। প্রশ্নটা শুনে ও একটু হচকিয়ে গেলো। রিনি মিথিলার কোনো জবাব আশা না করে বললো-
‘আমি জানি, রাশেদ ভাইয়া যে তোকে পছন্দ করে, সেটা তুই জানিস। মেয়েরা এ ব্যাপারটা সহজেই বুঝতে পারে। তবে অনেক মেয়ে এ ধরনের পছন্দকে প্রশ্রয় দেয় না। আমি জানি, তুই সে দলেরই একজন। ঠিক বলেছি?’
‘হঠাৎ এসব কথা বলছিস কেনো!’
‘বলছি, প্রয়োজনে। আমাকে বলতে হচ্ছে।’
‘কেনো?’
‘সেটাই তো বলতে চাচ্ছি। রাশেদ ভাইয়া আজ তোকে প্রপোজ করতে চায়।’
‘হোয়াট?’
‘আহা, রাগছিস কেনো!’
‘রাগবো না? রাগের কথা বলছিস, আর আমি রাগবো না? কেনো রাশেদ তোর ভাই বলে?’
ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো মিথিলা। রিনি গলা নামিয়ে বললো-
‘আমি জানি, এ কথা শোনার পর তুই রেগে যাবি। আমি এ কথা বলেছি ভাইয়াকে। কিন্তু আমার কথা শুনছে না ও।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, ভাইয়া বলেছে তোকে নিয়ে যেতে। আজ ওর জন্মদিনে ও তোকে প্রপোজ করবে।’
মিথিলার রাগটা বেড়ে গেলো। ও বললো-
‘রিনি, তোর কথাগুলো আমার ভালো লাগছে না। তোর কথাগুলো নোংরা লাগছে।’
‘মিথিলা, প্লিজ রাগ করিস না! আমার কথা শোন।’
‘এ ধরনের কথা আমি শুনতে চাই না। আমার ভালো লাগে না।’
‘আমি জানি, তুই রেজাকে ভুলতে পারছিস না।’
‘তুই আবারো ভুল করছিস। এটি ভুলতে পারার বিষয় নয়। একটি নিদারুণ ভুল এবং এক দুঃসহ প্রায়শ্চিত্তের ব্যাপার এটি। এ স্থানটিতে কোনো আঘাত আমি সহ্য করতে পারি না, রিনি!’
‘সরি, মিথিলা। তোর ওই একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত দিতে চাইনি। আমি, আমি শুধু ভিন্ন দৃষ্টিতে আমার ভাইয়ের আবেগকে বিচার করেছি। তোর মনের অবস্থার কথা বিবেচনা করিনি।’
রিনি বিব্রতভাবে নিজের কথার ব্যাখ্যা দিলো। মিথিলা কোনো কথা বললো না। রিনিও কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। একসময় মিথিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে প্রস্তুত করে বললো-
‘রিনি, রেজা আমার ওপর এক ধরনের প্রতিশোধ নিতে অভিমানে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। ও নিজের জীবনের সকল সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়ে আমাকে কোনোরকম অনুশোচনায় ভোগাতে চায় না। নিজে হেরে ও আমাকে জিতিয়ে দিতে চায়। আমাকে ঘৃণা না করে ক্ষমা করে দিয়ে ও মহৎ প্রেমিক হতে চায়। কিন্তু আমিহীন ও যে বিপন্ন, এর দায়ভার কে নেবে? আমিই বা ওর এই একা একা সব হারানোর জয়, মহত্ব বা কষ্টকে সহজভাবে ছেড়ে দেবো কেনো? বিত্ত, বৈভব, ভবিষ্যৎ বা স্বপ্ন, সংসার, সাজানো জীবন- যা-ই হাতের কাছে আসুক, তা মুঠোবন্দি করে আমিও কোনোদিন স্বস্তি পাবো না। সুখী হবার কথা বাদই দিলাম। নিজেকে নিজে ভালো করে চিনি বলেই, চোখের সামনে আলো যতোই ধাঁধিয়ে থাকুক, কখনো স্বপ্নাবিষ্ট হই না। তোর কাছে অনুরোধ, আমাকে লোভ দেখাস না। জীবন আমার কাছে এখনো ভারবাহী হয়ে ওঠেনি।’
এ কথা শুনে রিনি থ হয়ে গেলো। ও কোনো কথা বলতে পারলো না। নিজের অজান্তে ওর দুচোখের পাতা ভিজে এলো। ওর মনে হলো মিথিলার এই উপলব্ধি গভীর প্রেম এবং নির্লিপ্ত কষ্ট থেকে উৎসারিত। ও মনে মনে রেজার উদ্দেশে বললো-
‘তুমি ভীষণ ভাগ্যবান, রেজা! অনেক সাধনায় এমন প্রেম মেলে!’
রিকশা এসে থামলো বসুন্ধরা সিটি মার্কেটের সামনে। রিকশাওয়ালা বললো-
‘আফা, নামেন।’
মিথিলা বললো-
‘না, এখানে নামবো না। রিকশা ঘুরাও। এলিফ্যান্ট রোড চলো। রিনি, তুই কি এখানে নামবি?’
‘না। আমিও তোর সঙ্গে যাবো।’
জবাব দিলো রিনি। রিকশাওয়ালা রিকশা ঘুরালো। মিথিলা মনে হচ্ছিল রিনি ওর সঙ্গেই যাবে। রিনি ওকে খুব পছন্দ করে। পছন্দের মানুষকে কষ্ট দিয়ে ফেললে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না। রিনি ওর সঙ্গে থাকবে- এটাই স্বাভাবিক।
নয়.
লিজির খুব ইচ্ছে হলো আজ ও শাড়ি পরবে। সুন্দর করে সাজবে। প্যান্ট-শার্ট বা স্কার্ট-টপস পরে পরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। গ্রামে এসেও লিজি শার্ট-প্যান্ট বা স্কার্ট-টপস পরে। এতে ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শাড়ি পরার ইচ্ছে মাঝে মাঝে উঁকি দেয়, কিন্তু শাড়ি পরতে না পারার কারণে ও শাড়ি পরার চেষ্টা করে নি। কিন্তু আজ লিজির শাড়ি পরার খুব ইচ্ছে হলো। আজকের দিনটিকে ও বিশেষ করে তুলতে চায়। কিন্তু শাড়ি পরতে গিয়ে ও ভীষণ অসুবিধায় পড়লো। যতো চেষ্টাই করলো, ও শাড়ি পরতে পারলো না। শাড়ির আঁচল বা কুঁচি কোনোটাই ও ঠিক করতে পারছিল না। শাড়ি পরা দুঃসাধ্য ব্যাপার বলে মনে হলো ওর। একসময় শাড়ির আঁচল মাটিতে ফেলে ও আয়নার সামনে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আর তখনই আয়নায় নিজের অন্য এক রূপ দেখতে পেলো ও। কোমরে এঁটে থাকা অসংলগ্ন শাড়ি, বুকে ব্লাউজ, কপালে টিপ, খোলা চুল, লাজুক দৃষ্টি- এই কম্বিন্যাশনে? অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। লিজি নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানে। কিন্তু নিজের এমন বন্য সৌন্দর্য কখনো দেখেনি ও। অর্থাৎ এভাবে নিজেকে ও কখনো দেখেনি। আয়নায় প্রতিবিম্বত নিজের এই অন্যরকম সৌন্দর্য দেখে লিজি নিজেই বেশ কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো আয়নার দিকে। এ সময় ও ভাবলো, মানুষের শারীরিক সৌন্দর্যের তীব্র আবেদন পৃথিবীতে ছিল, আছে এবং থাকবে। এই সৌন্দর্যের আকর্ষণে কামুক পুরুষ পুড়ে খাঁক হয় কামনার অশ্লীল আগুনে, কবিরা মগ্ন হয় সৃষ্টিশীলতায়, প্রেমিকরা হয় নির্ভীক-উচ্ছ্বসিত এবং নারীদের চোখ জ্বলে ওঠে রোমান্টিক ঈর্ষায়। তন্ময় হয়ে আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল লিজি। এরপর শাড়ি পরানোর জন্য ওর মামীকে ডাকলো। ওর মামী সংসার সামলাতে সব সময় ব্যস্ত থাকেন। লিজির ডাক শুনে তিনি ছুটে এলেন ওর রুমে। রুমে ঢুকে লিজিকে শাড়ি পরতে না পারার বেহাল অবস্থা দেখে হেসে ফেললেন। বললেন-
‘এতো বড় হয়েছিস, এখনো শাড়ি পরতে শিখিসনি!’
‘না মামী। আমাকে একটু হেল্প করো না!’
লিজির মামী এগিয়ে গিয়ে ওর শাড়ি ঠিক করে দিতে লাগলেন। তিনি বললেন-
‘তুই অনেক সুন্দর লিজি!’
কথাটা লিজির কানে রিনরিনিয়ে উঠলো। ওর ভালো লাগলো। ও ভীষণ লজ্জা পেলো। লিজি বললো-
‘মামী, কেনো এ কথা বললে আজ? শাড়িতে কি আমাকে সুন্দর লাগে?’
‘তোকে সব কিছুতেই সুন্দর লাগে।’
‘কিন্তু আগে তো, এ কথাটি বলোনি। আজ বললে কেনো?’
‘কী জানি বাবা, অতো হিসাব করে কথাটি বলিনি। তোকে আজ অন্যরকম লাগছে, তাই কথাটি বলে ফেললাম।’
লিজির মামী ওর শাড়ির কুঁচি ঠিক করে ওর কোমরে পেটিকোট গুঁজে দিতে দিতে এ কথা বললেন। লিজি বললো-
‘মামী, প্যান্ট-শার্ট পরলে কি আমাকে খারাপ লাগে?’
‘না। কে বললো খারাপ লাগে?’
‘না, কেউ বলেনি। এমনি জিজ্ঞেস করলাম। তবে গ্রামের লোকেরা মনে হয়, আমার পোশাক পছন্দ করে না।’
‘ওটা স্বাভাবিক। গ্রামের মেয়েরা তো প্যান্ট-শার্ট পরে না। শুধু গ্রাম নয়, শহরের মেয়েরাও শার্ট-প্যান্ট পরে না। তাই তারা একটু অন্যচোখে দেখে।’
লিজির মামী ওকে শাড়ি পরিয়ে দিলেন। লিজি ভীষণ খুশি হলো। ওর মামী বললো-
‘আজ শাড়ি পরলি কেনো? বিশেষ কোনো কারণ আছে?’
‘আছে।’
বললো ও। ওর মামী মুখ টিপে হাসলেন। তিনি বললেন-
‘কোথাও যাবি বলে মনে হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, মামী। আজ ঢাকা থেকে একজন ডাক্তার আসবেন। তাকে আমরা আনতে যাবো। আই মিন, আমাকে তো খুব একটা দূরে যেতে হবে না। বাস স্টপিজে যাবো। ডাক্তারকে বাস স্টপিজ থেকে ভাতসাইল নিয়ে যাবো।’
‘ভাতসাইলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য অবশেষে ডাক্তার তাহলে আসছে?’
‘হুঁম। এতোদিন পরে একজন ডাক্তার আসছেন। তাই আমরা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে যাচ্ছি। বুঝলে না, গ্রামে কোনো ডাক্তার আসতে চান না। তাই বিশেষ যত্ন নিতে হচ্ছে আমাদের।’
‘কিন্তু এই গ্রামে ডাক্তার থাকবে তো!’
‘সে চেষ্টাই তো করবো। দেখা যাক, কে আসছেন? নিশ্চয়ই গ্রামপ্রিয় কেউ হবেন। আর শোন, মামা বলেছেন, ডাক্তারের কোনোরকম যেনো অযত্ন-অবহেলা না হয়। আমাকেও লক্ষ্য রাখতে বলেছেন।’
‘তা বুঝলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার তো বুঝলাম না।’
‘কী?’
‘তুই আজ শাড়ি পরলি কেনো? ওই ডাক্তারের জন্য?’
এ কথায় হাসির দমকায় ভেঙে পড়লো লিজি। ওর মামী ওর হাসির সামনে কেমন বিব্রতবোধ করতে লাগলেন। মনে হচ্ছে, তিনি যেনো বোকার মতো কোনো কথা বলে ফেলেছেন। তিনি অস্বস্তি নিয়ে লিজির দিকে তাকিয়ে রইলেন। লিজি হাসির থামার পর বললো-
‘মামী, আমি ওই ডাক্তারকে চিনি না। কে আসছেন, তা-ও জানি না।’
‘তাই না-কি! তবে এই সাজসজ্জা কেনো?’
‘এমনিই। তুমি বুঝবে না। এখন তুমি যাও। আমি নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছি।’
লিজির মামী হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছিলেন। তিনি দরজার কাছে গিয়ে বললেন-
‘তোর কাছে একটি ছেলে এসেছে। সে অপেক্ষা করছে অতিথিদের রুমে।’
মামীর এ কথায় লিজি একটু কেঁপে উঠলো। আবিদের আসার কথা। আবিদের সঙ্গে ও বাস স্টপিজে যাবে। আবিদের সঙ্গে এ কথা হয়েছে কাল। তারা দুজনে ডাক্তারকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভাতসাইল নিয়ে যাবে। আবিদ ডাক্তারকে বাস স্টপিজ থেকে ভাতসাইলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাবার প্রস্তাবে প্রথমে রাজি হয়নি। ওর মামা আবিদকে অনুরোধ করায় সে পরে রাজি হয়। আবিদের আসার কথা; কিন্তু ওর মামী বলছে ‘একটি ছেলের কথা’। ওর মামী আবিদকে নাম ধরে কথা বলে। সুতরাং আবিদ নয়, অন্য কেউ হবে। দ্রুত কথাগুলো ভেবে লিজি ওর মামীর দিকে অবাক চোখ তুলে বললো-
‘আমার কাছে এসেছে? কে?’
‘হ্যাঁ, তোর কাছেই এসেছে। ভাতসাইলের ছেলে। নাম বললো রাহাত। তুই না-কি চিনিস ওকে?’
প্রশ্নের জবাব না নিয়েই ওর মামী বের হয়ে গেলেন রুম থেকে। লিজি ভীষণ অবাক হলো। রাহাত কেনো এসেছে, ও বুঝতে পারলো না। ও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। এরপর ও শাড়ি খুলে ফেললো। শাড়ি-ব্লাউজ খুলে ও প্যান্ট-শার্ট পরলো। শাড়ি পরে ও রাহাতের সামনে যেতে চায় না। ও রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেলো অতিথিদের রুমে। বিশাল ড্রয়ংরুম এটি। ওর মামার কাছে প্রতিদিন অনেক লোক আসেন। এই রুমেই সবাই বসেন। লিজি রুমে ঢুকতেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো রাহাত। রুমে আর কেউ নেই। লিজি রাহাতের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনি না-কি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’
‘জ্বি।’
‘কেনো বলুন তো?’
লিজির এ প্রশ্ন বিব্রত হয়ে গেলো রাহাত। ও বললো-
‘আপনাকে বলেছিলাম…।’
‘আমি নাটক করতে পারবো না, আগেই তো বলেছি।’
লিজির এ কথায় একটু ভড়কে গেলেও রাহাত বললো-
‘সবাই প্রথমে এ রকম বলে। পরে যখন স্টার হয়ে যায়, তখন তারা প্রথম দিনের কথা মনে করতে চান না।’
‘ঠিক বুঝলাম না, আপনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন?’
‘বলতে চাচ্ছি, আমাদের প্রোডাক্টশন হাউস এই গ্রামে এসে একটা টেলিফিল্ম বানাতে রাজি হয়েছে। গল্প এখনো ঠিক হয়নি। তবে গল্পের নায়িকা হিসেবে আপনাকে ঠিক করেছি। এখন আপনি রাজি থাকলে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে শুটিং শুরু করতে পারি। আপনার বিপরীতে নায়ক থাকবেন মাহফুজ। এখন ওর ভীষণ ক্রেজ, বুঝলেন!’
রাহাতের কথায় একটু হাসলো লিজি। ও বেশি কথা বাড়াতে চায় না। যে কোনো সময় আবিদ চলে আসবে। ওকে যেতে হবে বাস স্টপিজে। ও রাহাতের উদ্দেশে বললো-
‘রাহাত সাহেব, আপনি কি সত্যিসত্যি নাটকের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?’
এ ধরনের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না রাহাত। ও হচকিয়ে গেলো। ও কিছু বলতে পারলো না। ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলো। লিজি বললো-
‘আমি জানি, নাটকের প্রস্তাবটা একটা অজুহাত। আপনি নিশ্চয় জানেন, আমার কাজিনরা এ কথা জানলে তারা আপনার কী করবেন?’
‘জ্বি, জানি।’
‘তারা কিন্তু একবার একজনকে…!’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটি তো জানি!’
‘তাহলে?’
‘তাহলে কি আমি চলে যাবো?’
‘দ্যাটস রাইট!’
‘ঠিক আছে, যাচ্ছি। তবে আপনি যদি নাটক করতে চান, জানাবেন।’
‘আপনাকে আগেও বলেছি। এখনো বলছি, নাটক আমাকে দিয়ে হবে না। আমার মধ্যে সে গুণ নেই।’
‘কিন্তু আমি জানি, আপনি এ লাইনে এলে খুব নাম করতে পারবেন। আপনি কিন্তু ভীষণ ফটোজেনিক!’
‘তাই না-কি! আপনি কি আমার ছবি কখনো দেখেছেন?’
বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন করলো লিজি। রাহাত দ্বিধাহীন কণ্ঠে বললো-
‘আমার চোখই ক্যামেরা! আপনাকে দেখেই মনে হয়েছে, ক্যামেরায় আপনাকে অস্পরীর মতো লাগবে। আপনার স্মার্টনেসটার আলাদা মাত্রা আছে। আমার কথা হেসে উড়িয়ে দেবেন না!’
রাহাতের কথা শুনতে শুনতে লিজি হাসছিল। ও বললো-
‘রাহাত সাহেব, আপনার ওই চোখের ক্যামেরাটা এবার আমার দিক থেকে সরিয়ে নিন, প্লিজ! আমি আপনার ফ্লাটারিংয়ে একটুও গলবো না। আমাকে দিয়ে অভিনয়-টভিনয় হবে না- তা আমি নিজেই জানি। তাই, সে চেষ্টা আর করবেন না, প্লিজ!’
‘আপনি আরো কয়েকদিন ভেবে দেখবেন কি?’
এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে লিজি বললো-
‘আপনি কি যাবেন? আমাকে একটু বের হতে হবে।’
রাহাত ভেবেছিল লিজির কাছে ও প্রশ্রয় পাবে। কিন্তু ও বুঝতে পারছে, তা হবে না। লিজি বাইরে থেকে নরম মনের মানুষ হলেও ভেতরে ভীষণ কঠিন। রাহাত হতাশ হয়ে দরজার সামনে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে লিজির উদ্দেশে বললো-
‘যাবার সময় আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।’
‘বলুন।’
‘যে ছেলেটি আপনাকে ফলো করে কঠিন শাস্তি পেয়েছিল, সে ছেলেটি হচ্ছি আমি।’
‘আমি জানি।’
‘জানেন! মানে জানতেন!’
‘হুঁম। এর জন্য আপনার প্রতি আমার সহানুভূতি আছে। কিন্তু আপনি যা চাইছেন, সেটি সহানুভূতি নয়।’
এ কথার জবাবে কী বলা যায়, রাহাত সেটি ঠিক করতে পারলো না। ও বিষণ্ন হয়ে গেলো। বিষণ্নতার রেশ নিয়ে ও দ্রুত বেরিয়ে গেলো লিজিদের অতিথি রুম থেকে। লিজির মনটাও একটু বিষণ্ন হয়ে গেলো। অকারণে বিষণ্নতা। লিজি মনে মনে এ মুহূর্তের নাম দিলো ‘বিষণ্ন বিলাস!’
দশ.
আবিদ এ বেরিয়ে আসতে চাইছে। এলিনার সঙ্গে ওর সম্পর্ক কোন পর্যায়ে দাঁড়াবে, বা আদৌ কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠবে কি-না, তা ও জানে না। তবে আজ এলিনা ওর সঙ্গে আটলান্টিক সিটিতে গেলে দু-বন্ধু বিদ্রুপের জবাব দেয়া হয়ে যাবে। এটাই বা কম কি? এ কথা ভাবতে ভাবতে ও নিজের ভেতরে উথলে ওঠা ঝড় সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে। রোমানের কোনো জবাব না পেয়ে ও-প্রান্ত থেকে এলিনা ফের বললো-
‘রোমান, আর ইউ হিয়ারিং মি!’
এর জবাবে রোমান পাগলের প্রলাপ বকার মতো একটা কথা বলে ফেললো-
‘এলিনা, আই লাভ ইউ!’
এ কথায় এলিনার হাসির শব্দ শুনতে পেলো ও। এলিনা খিলখিলিয়ে হাসছে। রোমান নার্ভাস হয়ে গেলো। কথাটা বলার পর একটা ভালোলাগা এবং অস্বস্তি একসঙ্গে ওর অনুভূতিতে ছড়িয়ে পড়লো। ও এলিনার জবাবের অপেক্ষা করছে। এলিনার হাসির শব্দ একসময় থামলো। কিন্তু এলিনা কিছু বলছে না। রোমান বললো-
‘এলিনা, আমি সিরিয়াসলি কথাটি বলেছি। তুমি কিছু বলো।’
ও-প্রান্ত থেকে এলিনা বিষণ্ন কণ্ঠে বললো-
‘রোমান, এ কথাটি আমি আরো অনেকবার অনেকের কাছ থেকে শুনেছি। বাট, আই কান্ট বিলিভ ইট। আমি কাউকে ট্রাস্ট করতে পারি না। আই আ্যাম সরি, রোমান!’
এ কথা বলেই রোমানকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এলিনা ফোনের লাইন কেটে দিলো। রোমানের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। গুপ্তধন পেয়েও হারিয়ে ফেলার কষ্ট ওকে গ্রাস করলো। ও ফের ফোন করলো এলিনাকে। এলিনা ওর ফোন রিসিভ করলো না। রোমান আরো কয়েকবার এলিনাকে ফোন করে ব্যর্থ হলো। ও অসহায় চোখে তাকালো স্টাচু অব লিবার্টির দিকে। যেনো স্টাচু অব লিবার্টির মশাল ওকে হতাশার অন্ধকারে আলোর পথ দেখাবে। ব্যাটারি পার্কে একরাশ বিষণ্নতায় রোমানও যেনো স্টাচু অব লিবার্টির মতো অনড় দাঁড়িয়ে আছে। চেষ্টা করেও ও পা নড়াতে পারছে না। এমন কখনো হয়নি ওর। কবি মুজিবুল হক কবীরের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘পা যে আমার অনড় পাথর’। ওর এ মুহূর্তে ওই কবির বইয়ের নামটি মনে পড়লো। কারণ, রোমানের মনে হচ্ছে, ওর পা দুটিও অনড় পাথর হয়ে গেছে।
সাত.
দরজা খুলে শায়লাকে দেখতে পাবে, এটা কল্পনাও করেনি রিয়াজ। শায়লাকে দেখে এতটাই অবাক হলো যে, ও কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। গোধূলিতে সূর্য ডুবে যাবার সময় পশ্চিমাকাশে যে বিষণ্ন সন্ধ্যার ছবি ফুটে ওঠে, শায়লার মুখে সে রকম ম্লান হাসি। ওর হাসির মধ্যে লজ্জা ও বেদনার সংমিশ্রিত আবহ ফুটে আছে। শায়লার এই ম্লান হাসি রিয়াজকে দমকা হাওয়ার মতো স্পর্শ করে গেলো। শায়লা রিয়াজের মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিলো। রিয়াজ কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। শায়লা কেনো ওর কাছে এসেছে, এটা ও স্পষ্ট করে বুঝতে না পারলেও ওর মনে হলো শায়লার বিপদ বেড়েছে। শায়লার জন্য কী করতে পারবে বা আদৌ কিছু করতে পারবে কি-না, রিয়াজ মনে মনে একটু ভাবলো। ওর মনের কথা বুঝতে পারলো যেনো শায়লা। ও মুখ খুললো-
‘আপনার কাছে আমি কোনো সাহায্য চাইতে আসিনি।’
শায়লার কথাটি ওকে চমকে দিলো। শায়লা সাহায্য চাইতে আসেনি, তবে কেনো এসেছে ওর কাছে? শায়লাকে রিয়াজ ওর বাড়ির ঠিকানা কখনো দেয়নি। অথচ শায়লা ওর বাড়িতে এসে হাজির এবং বলছে ‘কোনো সাহায্য চাইতে আসিনি’। রিয়াজ শায়লার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বললো-
‘আপনাকে দেখে বিস্ময়ের রেশ কাটছে না। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি আমার বাড়িতে কিভাবে এলেন এবং কেনো এলেন?’
এ কথায় মুচকি হাসলো শায়লা। ওর এই হাসিতে বিষণ্নতা নেই। রিয়াজ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। শায়লা রিয়াজের চোখে চোখ রেখে বললো-
‘কলিবেলের শব্দ শুনে ভেবেছিলেন প্রপা এসেছে?’
এ কথায় রিয়াজ আরেকবার ধাক্কা খেলো। ও বুঝতে পারলো শায়লা ওর সব খবর রাখে। প্রপ্রার কথাও সে জানে। এতে স্বস্তিবোধ করলো রিয়াজ। ও বললো-
‘আপনি কি আজ আমাকে চমকে দিতে এসেছেন? তা হলে বলছি, আমি কিন্তু সত্যিই চমকে গেছি।’
‘রিয়েলি?’
‘হুম। আপনাকে দেখে আমার মুখে কথাই ফুটছিল না। আমি ভাষামূক হয়ে গিয়েছিলাম।’
রিয়াজের কথা শুনে এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো শায়লা। রিয়াজ শায়লার এভাবে হেসে ওঠার কারণ বুঝতে পারলো না। একটু আগেও ওর মুখায়বে গোধূলির বিষণ্নতা জমে ছিল। এখন এমনভাবে হাসলো মনে হলো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চঞ্চল ঝরনা লাফিয়ে নামছে। রিয়াজ একটু বিব্রত হলো। হাসি থামলো শায়লার। এরপর ও রসিকতা করে বললো-
‘শুনেছি, ভাব গভীর হলে ভাষা হারিয়ে যায়। কিন্তু আমাকে নিয়ে আপনার তো কখনো ভাবই হয়নি। ভাষামূক হলেন কেনো? না-কি আজ হঠাৎ করে ভাবের গভীরতায় ডুবে গেলেন?’
রিয়াজ বুজতে পারলো শায়লার উৎকণ্ঠিত হবার মতো বিপদে নেই। বিপদ মাথায় নিয়ে ও রিয়াজের কাছে আসেনি। বিপদগ্রস্ত হলে এমন রসিকতা করতো না। বিপদগ্রস্তরা সাধারণত বিষণ্ন ও গম্ভীর থাকে। রিয়াজ মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো-
‘যেহেতু প্রপার কথা জানেন, সেহেতু অকপটে বলছি, আমার যাবতীয় ভাব, ভাবের গভীরতা, মুগ্ধতা যা-ই বলেন, ওই প্রপাকে কেন্দ্র করেই। আমি ভাষামূক হলেও প্রপার অনুরাগে ভাষামূক হই। আবার ওর অনুযোগে বা রাগেও ভাষামূক হই।’
রিয়াজ কথাগুলো বলে নিজেকে হালকা করে নিলো। রিয়াজের কথায় একটু লজ্জা পেলো যেনো শায়লা। ও বললো-
‘অতিথি না হই, অপরিচিত তো নই। পরিচিতজনকে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে কথা বলবেন? বাসার ভেতরে আসতে বলবেন না?’
শায়লার কথায় লজ্জা পেলো রিয়াজ। ওর মনে হলো দরজায় দাঁড়িয়ে ও শায়লার সঙ্গে কথা বলছে। ও লজ্জিতকণ্ঠে বললো-
‘আই অ্যাম সরি। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে আপনাকে বাসার ভেতরে আসতে বলবো। আসুন, ভেতরে আসুন।’
কথাটা বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো রিয়াজ। শায়লা নিঃসংকোচে রিয়াজের বাসায় প্রবেশ করলো। দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই লিভিংরুম। শায়লা লিভিংরুমে ঢুকে সোফার ওপর বসলো। রিয়াজ দরজা বন্ধ করে দিলো। এরপর ও গিয়ে বসলো শায়লার মুখোমুখি একটি সোফায়। একটা অজানা অস্বস্তি ওর ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে। শায়লা ওর কাছে কেনো এসেছে ও বুঝতে পারছে না। শায়লা ওর মনের অস্বস্তি টের পেলো। ও বললো-
‘আমি জানি, আমাকে দেখে খুব অবাক হয়েছেন আপনি। হয়তো আমি কেনো এসেছি, এ নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন।’
‘না, মানে…।’
‘আমি আগে বলছি, শুনুন।’
এ কথা বলে রিয়াজকে থামিয়ে দিলো শায়লা। রিয়াজ বললো-
‘ঠিক আছে বলুন।’
‘আমি জ্যাকসন হাইটসে এসেছি এয়ারলাইন্সের টিকিট কাটতে। কাল যখন এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন আপনাকে আপনার বাড়ি থেকে বের হতে দেখি।’
‘ওহ, তাই?’
‘আজ এয়ারলাইন্সের টিকিট নিয়ে যাবার সময় ভাবলাম দেশে চলে যাচ্ছি, যাবার আগে আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। বলতে পারেন আপনার সঙ্গে দেখা করার অযাচিত সাধ!’
এ পর্যন্ত বলে থামলো শায়লা। রিয়াজের মনে হলো শায়লা ওকে দেখতে এসেছে মনের টানে, ওর মনে কোনো উদ্দেশ্য নেই। রিয়াজের প্রতি শায়লার যে একটা অযাচিত দুর্বলতা আছে, সেটা জানান দিতে শায়লার কোনো সংকোচ নেই। আবার ওকে নিয়ে ওর কোনো স্বপ্নও নেই। ওকে নিয়ে শায়লার মধ্যে এক ধরনের তন্ময়তা আছে। রিয়াজ শায়লার দিকে ভালো করে তাকালো। শায়লা আজ পড়েছে আকাশি শাড়ি। শাড়ির পাড় রয়েল ব্লু। পাড়ে রূপালি সুতার কাজ। আঁচলের রয়েল ব্লুর রং মিলিয়ে ব্লাউজ। কপালে ছোট্ট একটা টিপ পরেছে। টিপটিও নীল। ঠোঁটে লিপিস্টিকের প্রলেপ নেই। সাধারণ সাজের সৌম্য সৌন্দর্য ওর মুখে ফুটে আছে। কয়েক মুহূর্তের পর্যবেক্ষণে শায়লাকে দেখে নিলো রিয়াজ। রিয়াজের পর্যবেক্ষণ দৃষ্টি বুঝতে পারলো শায়লা। ও বললো-
‘অমন করে কী দেখছেন?’
শায়লার কথায় হচকিয়ে গেলো রিয়াজ। ও হেসে ফেললো। শায়লা মিটিমিটি হাসছে। রিয়াজ অপরাধ স্বীকার করে নেয়ার মতো করে বললো-
‘মাফ করবেন, আপনাকে দেখছিলাম, আই মিন আপনার সাজসজ্জা দেখছিলাম।’
রিয়াজের অকপট স্বীকারোক্তি ভালো লাগলো শায়লার। ও বললো-
‘আপনার সব মুগ্ধতা প্রপার মধ্যে। অথচ…!’
‘বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছি, তাতে অন্যায় কোনো কিছু নেই। অপবিত্রতারও কিছু নেই।’
‘তাই না-কি? দেখার মধ্যে পবিত্র-অপবিত্র বা ন্যায়-অন্যায়ও আছে না-কি?’
শায়লার প্রশ্নটা কেমন বিদ্রƒপপূর্ণ মনে হলো। রিয়াজ বিব্রতকণ্ঠে বললো-
‘দেখার মধ্যে অনেক কিছুই আছে।’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরুন, কারো সৌন্দর্যকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখার মধ্যে পাপ নেই। এটা পবিত্রতা, ন্যায়সঙ্গত।’
‘আর পাপ কোনটা?’
‘সৌন্দর্যকে কামনার চোখে দেখাটা হচ্ছে পাপ। বা অন্যায়।’
এ কথায় শায়লার মুখে ঈদের চাঁদের মতো আকর্ণ বিস্তৃত এক হাসি ফুঠে উঠলো। রিয়াজের কথা ওর ভালো লেগেছে। ও বললো-
‘আপনার কথা যদি সত্যি হয়, তা হলে আপনি কি জানেন, পুরুষরা প্রতিদিন কত পাপ করছে?’
শায়লার কথায় একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো রিয়াজ। ওর চোখে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি। এর অর্থ রিয়াজ বলতে পারছে না, প্রতিদিন কতজন পুরুষ কামনার আগুনে পুড়ে পাপ করছে। রিয়াজের কাছ থেকে জবাবের আশা না করে শায়লা বললো-
‘আপনার ধারণার জন্য বলছি, ৯৯ শতাংশ পুরুষ প্রতিনিয়ত এই পাপ করছে। যে কোনো মেয়ে আমার এ ধারণার সঙ্গে একমত হবেন।’
‘হতে পারে। আমি এ নিয়ে তর্ক করছি না।’
‘তবে…!’
‘তবে কি?’
‘আপনি ওই ৯৯ শতাংশের মধ্যে পড়েন না।’
বললো শায়লা। এ বলার মধ্য দিয়ে রিয়াজকে যেনো চারিত্রিক সার্টিফিকেট দিলো ও। রিয়াজ শায়লার মন্তব্য গায়ে মাখলো না। ও ভদ্রতা করে বললো-
‘আমাকে নিয়ে এ কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ। অন্তত আপনার সাজসজ্জার সৌন্দর্যকে উপভোগ করার অপরাধে অভিযুক্ত হওয়া থেকে রেহাই পেলাম।’
রিয়াজের কথার জবাবে শায়লা ম্লান হেসে বললো-
‘আপনাকে অভিযুক্ত করতে পারলে আমার ভালো লাগতো।’
‘মানে?’
‘মানে বুঝতে পারছেন না?’
‘না। ঠিক বুঝতে পারছি না। স্পষ্ট করে বলুন।’
‘অতো স্পষ্ট করে বলা যায় না। তবু বলছি, কিছু অভিযোগ ভালোলাগার মধ্যে প্রশ্রয় পেয়ে যায়। ওই অভিযোগটাই আবার ভালোলাগার মধুর স্মৃতি হয়ে যায়। অনেকের জীবনে অর্থাৎ অনেক মেয়ের জীবনে এমন ভালোলাগা আছে, যা বিবেচনা করলে অভিযোগ বা পাপ। আবার ভালোলাগার বিচারে তা পাপ নয়, পবিত্রতা। ভালোবাসাবাসির মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ, পাপ বা পবিত্রতার জন্ম নেয়।’
‘তাই না-কি?’
বিস্ময় প্রকাশ করে রিয়াজ। শায়লার কথায় কেমন এক ধরনের মাদকতা আছে। ও বললো-
‘আপনি দেখছি, অনেক কিছু জানেন!’
রিয়াজের কথায় স্মিত হাসলো শায়লা। ও বললো-
‘কচু জানি! জানলে কি আর জয়নালের মতো লম্পটকে বিয়ে করতাম, বলুন!’
‘হুম। তা ঠিক। আচ্ছা, আপনি জয়নালকে বিয়ে করলেন কেনো?’
প্রশ্নটা করে রিয়াজের মনে হলো প্রশ্নটা করা ঠিক হয়নি। শায়লার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ওর এতো কৌতূহল দেখানো ঠিক হচ্ছে না। শায়লা ওর প্রশ্নের জবাবে বললো-
‘আপনারা মনে করেন, আমেরিকাতে সকলেই নিরাপদ। নারীদের কেউ কিছু বলতে পারে না। আইনের কড়া শাসন আছে, তাই না?।’
‘হুম, তাই তো জানি।’
‘কিন্তু এ দেশেও নারীদের নিরাপত্তা বা স্বাধীনতা তেমন নেই। শুধু হাঁটতে চলতে হয়তো কেউ গায়ে হাত দিচ্ছে না। আর বাকিটা সময় পুরুষের লালসার চোখ আমাদের লেহন করছে।’
‘কী বলছেন!’
‘শুধু তাই নয়। একা একজন নারী এখানে নিরাপদও নয়। একজন নারীকে সবসময় নানা বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়। সুন্দরী হলে তো কথাই নেই। কামুক পুরুষদের উপদ্রব যে কী, তা আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না।’
এ পর্যন্ত বলে শায়লা থামলো। ও হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো। রিয়াজও আর কথা বাড়াতে চায় না। আলোচনাটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেছে। শায়লার নিশ্চয় কোনো কষ্ট আছে। কামুক পুরুষদের যন্ত্রণার কষ্ট। রিয়াজ আর কিছু জানতে চায় না। ওর কষ্টের কথা জেনেই বা কী হবে? শায়লার জন্য তো রিয়াজ কিছু করতে পারবে না। তবে ওর জন্য কেমন সহানুভূতি বাড়ছে রিয়াজের। রিয়াজ যখন এসব কথা ভাবছিল, তখন শায়লার চোখ থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। রিয়াজ ভীষণ ভ্যাবাচেখা খেয়ে গেলো। ও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এর মধ্যে শায়লা বললো-
‘জয়নালকে আমি কখনোই বিয়ে করতাম না। তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি।’
রিয়াজ অস্পষ্টভাবে বলে ফেললো-
‘কেনো?’
‘একদিন তুমুল তুষারপাত হচ্ছিল। ইমার্জেন্সি ঘোষণা করলো সিটি। দোকান বন্ধ করে ফেললাম। চলে যাবো, এমন সময় জয়নাল এলো। আমি তাকে দোকানের চাবি বুঝিয়ে দেবার সময় পশুটা আমাকে জাপটে ধরলো…!’
এ পর্যন্ত বলে থেমে গেলো শায়লা। ও আর কিছু বলতে পারলো না। ওর শরীরটা কাঁপছে। গোপন কান্না ওকে এই মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রিয়াজ জানে না, আজ কেনো শায়লা ওর জীবনের গোপন কষ্ট ও লজ্জার কথা ওকে জানিয়ে দিলো। রিয়াজ কিছুই বলতে পারলো না। ওদের মধ্যে কেমন গুমোট পরিবেশ নেমে এলো। এমন পরিবেশে আশা করেনি রিয়াজ। ও এখনো জানতে চায়নি শায়লা কী খাবে। এখন কী বলবে ওকে, ভাবতে লাগলো। ওকে কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হতে হবে। প্রপাকে পিক করতে হবে লং আইল্যান্ড থেকে। এরপর ওরা যাবে সিটি হলে। আজ সিটি হলে গিয়ে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন করবে ওরা। বিয়ে করতে হলে এই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এরপর যার যার ধর্মমতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ম্যারিজ রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ের বৈধতা নেই এ দেশে। তাই আজকের দিনটি রিয়াজের জীবনের বিশেষ একটি দিন। এমন দিনে শায়লা এসে দিনটির নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। শায়লার ব্যক্তিগত গ্লানিকর কষ্টের কথা শুনে রিয়াজের মন খারাপ হয়ে গেলো। ও পরিবেশকে হালকা করার জন্য বললো-
‘শায়লা, আই অ্যাম সরি। আপনার মন খারাপ করে দিয়েছি। আমি জানতাম না…।’
‘না, না। আমিই সরি। আমি এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আর দেখুন, কথায় কথায় কী সব কথা বলে ফেলেছি।’
‘না, না। আমি ভাবতেই পারিনি, এ দেশেও মেয়েরা কত জঘন্য ঘটনার মুখোমুখি হয়। আপনার কথা আমি কখনো ভুলবো না।’
এ কথায় মুচকি হাসার চেষ্টা করলো শায়লা। ও নিজের চোখের জল মুছে নিয়েছে। নিজেকে স্বাভাবিক করছে। রিয়াজ বললো-
‘কী খাবেন বলুন? আমি তো অতিথিকে কিছুই খেতে দেইনি। শুধু কথাই বলে গেলাম।’
‘না, না। আমি কিছু খাবো না। শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। হয়তো এটাই আমাদের শেষ দেখা।’
শায়লার কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে রিয়াজ বললো-
‘শেষ দেখা মানে?’
শায়লা বললো-
‘শেষ দেখা মানে, আমি কাল বাংলাদেশে চলে যাচ্ছি।’
রিয়াজ বললো-
‘শায়লা, আপনি বাংলাদেশে চলে যাচ্ছেন মানে?’
‘বাংলাদেশের উদ্দেশে কাল নিউইয়র্ক ছাড়বো। রাত ১১টায় আমার ফ্লাইট।’
‘কাল যাচ্ছেন! জেএফকে থেকে?’
‘হুম। কাল যাচ্ছি। তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই।’
কথাটা বলে শায়লা একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখলো। রিয়াজ বললো-
‘আপনি কি দেশ থেকে আর ফিরবেন না?’
এ প্রশ্নে শায়লা কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো রিয়াজের মুখের দিকে। এরপর বললো-
‘জীবনের এতো বড় একটা পরাজয়ের ক্ষত নিয়ে দেশে যাচ্ছি। যে দেশটা আমার সর্বস্ব কেড়ে নিলো, সে দেশটার প্রতি কি কোনো দুর্বলতা থাকতে পারে, বলুন?’
এর জবাবে কিছু বললো না রিয়াজ। শায়লা বললো-
‘ডিভি লটারি পেয়ে এ দেশে এসেছিলাম। জীবনের ভুল অংক কষে এখন ফিরছি। ফিরে আসবো কি-না জানি না। ফিরে আসার মতো মনের জোর নেই। অন্যদিকে দেশে আমার বাবা-মা, ভাইবোন অপেক্ষা করছেন। তারাও চান না, আমি একা এই দেশে থাকি। তাই…!’
‘এখন বুঝতে পারছি। একটা প্রশ্ন করবো?’
জানতে চাইলো রিয়াজ। শায়লা বললো-
‘করুন।’
‘জয়নাল সাহেবকে কি করবেন?’
এ কথায় শায়লার চোখেমুখে বিষণ্নতার ছায়া পড়লো। ও বললো-
‘জয়নালকে সাহেব বলছেন! সে তো এক লম্পট, প্রতারক শ্রেণির ব্যক্তি! সে নারীদের ভোগের পণ্য মনে করে।’
‘না, মানে…।’
‘জানতে চাচ্ছেন, আমার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক থাকবে বা আদৌ সম্পর্ক থাকবে কি-না, এই তো?’
‘সে রকমই। জানতে চাইছি, জয়নালকে নিয়ে ফাইনালি কি সিদ্ধান্ত নিলেন।’
‘জয়নালকে আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি। সে ওটা পেয়ে খুব খুশি।’
‘রিয়েলি!’
‘হ্যাঁ, সত্যি। সে তো খুশি হবেই। সময় সুযোগ পেলে আরেকজনকে ফুসলিয়ে বিয়ে করে ফেলবে!’
‘আপনি তাকে সহজেই ছেড়ে দিলেন? এ দেশে তো নারীদের পক্ষে আইন অতন্ত্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে!’
রিয়াজের এ কথায় শায়লা হেসে ফেললো। ও বললো-
‘আইন কি আমার জীবনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা ফিরিয়ে দিতে পারবে?’
‘তা ফিরিয়ে দিতে না পারুক, দুষ্টু ও লম্পটকে দণ্ডাদেশ তো দিতে পারবে, তাই না?’
‘তা ঠিক। কিন্তু আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্থ। এ অবস্থায় একা মেয়ে মানুষ কী করবো, কতটুকু করতে পারবো- তা জানি না। আগে দেশে যাই, এরপর ভাববো কী করা যায়। দেশে থেকে গেলে জয়নাল হয়তো আমার কাছ থেকে বেঁচে গেলো। আর যদি ফিরে আসি, তা হলে ওর বিরুদ্ধে মামলা করবো।’
‘এই তো সাহসের কথা বললেন। কেনো জানি, আপনার মধ্যে অসহায়ত্ত মানায় না।’
রিয়াজের কথায় ফের হেসে ফেললো শায়লা। এই হাসিটা একেবারেই শুকনো হাসি। অসহায়রা যে রকম হাসে, সে রকম হাসি। রিয়াজ কিছু বলতে যাচ্ছিল, শায়লা বললো-
‘আজ যাচ্ছি। আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম। ভালো থাকুন।’
শায়লার বিদায় নেয়াটা মনে মনে কামনা করছিল রিয়াজ। ও স্বস্তিবোধ করলো। কারণ, ওকে এখনই বের হতে হবে। লং আইল্যান্ডে প্রপা ওর বান্ধবীর বাসায় অপেক্ষা করছে। রিয়াজ ওকে নিয়ে যাবে সিটি হলে। শায়লার উদ্দেশে রিয়াজ বললো-
‘আপনাকে কিছু খাওয়াতে পারলাম না। আমারও তাড়া আছে। বের হতে হবে। তাই আপনাকে জোর করলাম না।’
শায়লা বললো-
‘ইটস ওকে। আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না।’
‘ধন্যবাদ, শায়লা।’
‘ওয়েলকাম।’
দরজা লক করে ওর রুম থেকে শায়লার সঙ্গে রিয়াজও বের হয়ে এলো। শায়লা বললো-
‘আমাকে এগিয়ে দিতে হবে না, আপনি যান।’
রিয়াজ সংকোচ প্রকাশ করে বললো-
‘শায়লা, আপনাকে একটা কথা জানাতে চাই।’
‘বলুন।’
‘আজ আমি আর প্রপা সিটি হলে যাচ্ছি। আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি!’
এ কথা শুনে ভীষণ আনন্দ প্রকাশ করে শায়লা বললো-
‘এই সুখবরটা এতোক্ষণ বলেননি! আপনি কি মানুষ বলুন তো? এতো বড় একটা সংবাদ এভাবে চেপে রেখেছিলেন?’
শায়লার উচ্ছ্বাস দেখে রিয়াজের ভালো লাগলো। ও কিছু বলতে পারলো না। শায়লা বললো-
‘ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে চমকে দেবো। এখন তো দেখছি, আপনিই আমাকে চমকে দিলেন!’
‘তবে চমকে দেবার জন্য খবরটি জানাইনি।’
‘কংগ্রাচুলেশন!’
‘ওয়েলকাম!’
শায়লার চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো। ও রিয়াজের উদ্দেশে বললো-
‘আমি জানি, আপনারা দুজনে খুব সুখি দম্পতি হবেন। আমি সর্বান্তকরণে এ কামনা করছি।’
‘প্রপাকে আপনার কথা বলবো।’
‘তাকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন।’
‘জানাবো।’
শায়লা হাত নেড়ে বিদায় নিলো। ও ৭৪ স্ট্রিটের সাবওয়ের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। রিয়াজ দাঁড়িয়ে রইলো ওর বাড়ির সামনে। ওর মধ্যে একটা তোলপাড় চলছে। বিয়ে করার ঠিক আগে সবার মধ্যে এ ধরনের তোলপাড় চলে। রিয়াজ অবশ্য একটু নার্ভাসও। তোলপাড়টা এখন বেশি মাত্রায় অনুভব করছে ও। হাঁটতে হাঁটতে শায়লা একসময় ৩৭ এভিনিউ থেকে মিলিয়ে গেলো ৭৪ স্ট্রিটের বাঁকে। রিয়াজ পকেটে হাত দিয়ে সেলফোন বের করলো। লং আইল্যান্ডে যাবার আগে প্রপাকে ফোন করতে হবে, ও যেনো তৈরি থাকে। প্রপার বান্ধবীর বাসায় ও বসতে চায় না। ও প্রপার নম্বর বের করে সেন্ডবাটন টিপে দিলো। কয়েক মুহূর্ত পার হলো। প্রপার ফোনের রিংটোন বাজছে। তিন বার রিং বাজার পর প্রপা ফোন ধরলো,
‘হ্যালো, রিয়াজ!’
প্রপার কণ্ঠে জড়তা। বিয়ে করার আগ মুহূর্তে মেয়েরা একটু বেশি নার্ভাস থাকে হয়তো। ওর নিজেরও নার্ভাস লাগছে- ভাবলো রিয়াজ। ও বললো-
‘প্রপা তুমি তৈরি হও। আমি আসছি।’
এ কথার জবাবে প্রপা কিছু বললো না। রিয়াজ একটু চিন্তিত হলো। প্রপা কি বেশি নার্ভাস? বিয়ের ব্যাপারে প্রপাই তো বেশি উৎসাহী। রিয়াজ জানতে চাইলো-
‘প্রপা তুমি কি খুব বেশি নার্ভাস?’
‘রিয়াজ, আমি শুধু নার্ভাস নই। আমি খুব শঙ্কিত!’
প্রপার কথা শুনে কেমন ভড়কে গেলো রিয়াজ। প্রপার কণ্ঠ কেমন যেনো লাগছে ওর। প্রপা কি কাঁদছে? ওর কি কিছু হয়েছে? মেঘ সরিয়ে রোদের ফালি বের হয়ে আসার মতো এ প্রশ্নটা রিয়াজের মনে ঝলমলিয়ে উঠলো। ও আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশ্ন করলো-
‘আর ইউ ওকে, প্রপা? তোমার কি কিছু হয়েছে?’
ও-প্রান্তে প্রপা গুমরে কেঁদে উঠলো। রিয়াজ প্রমাদ গুনলো। ও কী বলবে বুঝতে পারলো না। প্রপার কী হয়েছে, সে তা-ও বুঝতে পারছে না। ও ফের বললো-
‘কী হয়েছে আমাকে বলো। তুমি কাঁদছো কেনো?’
‘আমি কাঁদছি না। এমনিতেই কান্না এসে যাচ্ছে।’
‘কেনো কাঁদছো? কী হয়েছে?’
রিয়াজ অস্থির হয়ে ওঠে। প্রপা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলে-
‘রিয়াজ, আমি আজ বিয়ে করতে পারবো না।’
‘কী বললে!’
বিস্ময় ভরা কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে রিয়াজ। ও-প্রান্ত থেকে প্রপা বললো-
‘আহা! অমন অস্থির হচ্ছো কেনো?’
‘অস্থির হবো না? কি বলছো, তুমি?’
প্রপা একটু দম নিলো। রিয়াজ ফের বললো-
‘তোমার কী হয়েছে প্রপা? আমাকে বলো।’
‘বলছি। আগে তুমি মনকে শক্ত করো।’
‘মন শক্ত করবো? কী যে বলছো তুমি! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘শোনো, আমি কাল ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ছাড়ছি।’
‘কী বললে? ঢাকায় যাচ্ছো? কালই? কেনো?’
রিয়াজের চিন্তার মধ্যে যেনো এক উ™£ান্ত হাওয়া বইতে শুরু করলো। প্রপার কথায় ও এলোমেলো হয়ে গেলো। প্রপা বললো-
‘আগেই বলেছি, মনকে শক্ত করো। তুমি এমন করলে আমি কার কাছে যাবো, বলো তো?’
প্রপার কণ্ঠে অসহায়ত্ত ফুটে ওঠে। রিয়াজ নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে। হঠাৎ করে প্রপাকে দেশে যেতে হবে- কথাটি শুনে ওর মধ্যে যে ঝড় শুরু হয়েছে, ও তা সামলে নেয়ার জন্য নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। ও প্রান্ত থেকে প্রপা বললো-
‘তুমি শুনছো? হ্যালো, রিয়াজ? তুমি কথা বলছো না কেনো!’
‘শুনছি। বলো।’
‘তুমি রাগ করছো। কিন্তু তুমি কি জানবে না, কেনো আমাকে ঢাকায় জরুরিভাবে যেতে হচ্ছে?’
প্রপার কথাটা এমন মোলায়েমভাবে বললো যে রিয়াজের ভেতরের ঝড়টা থেমে গেলো। ও বললো-
‘কেনো হঠাৎ করে ঢাকায় যাচ্ছো, বলো?’
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। রিয়াজ অপেক্ষা করছে। প্রপা বললো-
‘আমার বাবা খুবই অসুস্থ। মুমূর্ষু অবস্থায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এখন বলো, আমি কী করবো?’
প্রপার কথা শুনে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলো রিয়াজ। বাবার অসুস্থতার সংবাদে মেয়ে দেশে যাবে, এটা তো স্বাভাবিক ঘটনা। বরং বাবার অসুস্থতার খবর পেয়েও মেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসলে সেটা বরং অস্বাভাবিক ও অস্বস্তিকর ঘটনা হবে। প্রপার কাছ থেকে ওর বাবার অসুস্থতার কথা শুনে রিয়াজ কেমন বিষণ্ন হয়ে গেলো। ও বললো-
‘সরি, প্রপা। আমি বুঝতে পারিনি। তুমি কি এয়ার টিকিট কিনেছো?’
‘হ্যাঁ। ইন্টারনেটে সার্চ করে ই-টিকিট কিনলাম।’
‘এক্সিসিলেন্ট! কোন এয়ারলাইন্সে যাচ্ছো, কখন ফ্লাইট?’
‘এমিরাটস এয়ারলাইন্সের টিকিট পেয়েছি। কাল রাত ১১টায় ফ্লাইট।’
‘ফিরবে কবে?’
‘ফেরার ডেটটা ওপেন রেখেছি। ঢাকায় আগে যাই, দেখি বাবার কী অবস্থা। এরপর ফেরার ডেট ঠিক করবো। তুমি কি বলো?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই করেছো। ফেরার ডেট ওপেন রাখাটাই ঠিক হয়েছে।’
টেলিফোনে প্রপার একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলো রিয়াজ। প্রপার জন্য বুকের ভেতরটা উথলে উঠলো। ওর বাবার অবস্থা কতটা খারাপ কে জানে। রিয়াজ মনে মনে প্রার্থনা করলো প্রপার বাবার যেনো কিছু না হয়। অন্তত প্রপা যেনো ঢাকায় ফিরে ওর বাবাকে দেখতে পায়। অনেকে তার বাবা-মার অসুস্থতার খবর পেয়ে দেশে ফিরে যান। কিন্তু তাদের সকলে দেশে ফিরে বাবা-মা’কে জীবিত দেখতে পান না। নিজের দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকার এই এক বিড়ম্বনা। রিয়াজের কোনো কথা শুনতে না পেয়ে প্রপা প্রশ্ন করলো-
‘তুমি কিছু বলছো না যে?’
‘কী বলবো, প্রপা। এ মুহূর্তে শুধু প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছু বলার নেই আমার। তুমি কি লাগেজ গুছিয়েছো?’
বললো রিয়াজ। প্রপা আরেকটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো যেনো। ও বললো-
‘লাগেজ গুছাচ্ছি। তুমি চলে আসো। আমার হেলফ লাগবে।’
‘আমি আসছি, প্রপা। একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসছি।’
‘কতোক্ষণ লাগবে?’
‘ধরো হাফ এন আওয়ার। বড় জোড় এক ঘণ্টা।’
‘ওকে আসো। সাক্ষাতে কথা হবে।’
‘ওকে।’
রিয়াজ ফোন রেখে দিলো। ওর মনটা বিষণ্নতায় ডুবে গেছে। একটু আগেও ওর মন ছিল গভীর আনন্দে উচ্ছ্বল। একটি দুঃসংবাদ পণ্ড করে দিলো ওদের বিয়ের সব আয়োজন। কেনো এমন হয়? এটা কি কারো অভিশাপ? কথাটা মনে হতেই শায়লার মুখ ভেসে উঠলো ওর মনের পর্দায়। শায়লা কিছুক্ষণ আগেও বলে গেছে ও সর্বান্তকরণে ওদের মঙ্গল কামনা করছে। অথচ এক চূড়ান্ত মুহূর্তে মঙ্গল পিদিমের দ্বীপশিখা দপ করে নিভিয়ে দিলো অমঙ্গলবার্তা। এটা কি নিয়তির পরিহাস? এ কথা ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগলো রিয়াজ। ও চারপাশে তাকিয়ে ট্যাক্সি খুঁজতে লাগলো। ওর ভেতরে হু হু শূন্যতা গুমোট কান্না ছড়িয়ে দিচ্ছে। রিয়াজ নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করছে। মন কিছুতেই বশ মানছে না!
আট.
এক ঘণ্টায় এগারোবার ফোন করলো জেনিফার। জেনিফারের কথা প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি অলক। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে একপর্যায়ে সিরিয়াস হতে হলো। পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখিকা ম্যাকালি জ্যাকসন লাইব্রেরিতে পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। একজন স্বনামধন্য লেখক বা লেখিকা তার পাঠকের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতেই পারেন। এ নিয়ে জেনিফারের এতো উৎসাহিত হবার কী আছে? প্রশ্নটা অলকের। ও অবশ্য এ প্রশ্নটা জেনিফারকে করেনি। জেনিফার যা পছন্দ করে, অলক ওর পছন্দকে গুরুত্ব দিতে চায়। তবে সবসময় মনের সায় থাকে না। সাহিত্য হচ্ছে অলকের কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় বিষয়। সাহিত্য নিয়ে মানুষের অতিরিক্ত আগ্রহ ওর কাছে হাস্যকর মনে হয়। কিন্তু এসব কথা মুখ ফুটে কাউকে বলে না ও। জেনিফারকে তো বলার প্রশ্নই ওঠে না। আজ ‘সাহিত্যিক’ নামক এক ‘বিষাদ’-এর মুখোমুখি হতে হবে ওকে। জেনিফার এ পর্যন্ত এগারোবার ফোন করে ফেলেছে। হয়তো আরো কয়েকবার ফোন করবে ও। জুম্পা লাহিড়ির সঙ্গে পাঠক আড্ডায় যোগ দিতেই হবে ওকে। এর অন্যতম এবং প্রধান কারণ হচ্ছে জুম্পা লাহিড়ি বাংলায় কথা বলেন। জুম্পা লাহিড়ির পিতা-মাতার বাড়ি কলকাতায়। যদিও এই লেখিকার জন্ম লন্ডনে, তিনি অবলীলায় মাতৃভাষায় কথা বলতে পারেন। জুম্পা লাহিড়ি ইংল্যান্ড ও কানাডায় পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি বাস করছেন নিউইয়র্কে। বিয়ে করেছেন স্প্যানিশ এক সাংবাদিককে। বাংলা ভাষা জানা এই লেখিকা ‘ইন্টারপ্রেটার অব মেলোডিজ’ বই লিখে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ পুরস্কার ‘পুলিৎজার পুরস্কার’ লাভ করেছেন। জুম্পা লাহিড়ির লেখা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হচ্ছে। টেলিফোনে জুম্পা লাহিড়ি সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্যগুলো জেনিফার ওকে জানিয়ে দিয়েছে। এমন একজন লেখিকার সঙ্গে আড্ডা দিতে জেনিফার নির্ধারিত সময়ের আগেই ম্যাকালি জ্যাকসন লাইব্রেরিতে চলে গেছে। ওখানে বসে জেনিফার পাঁচ থেকে দশ মিনিট পরই অলককে ফোন দিচ্ছে। গাড়ি চালাচ্ছে রোমান। বি কিউ হাইওয়ে থেকে উইলিয়ামবার্গস সেতুতে ওদের গাড়ি ট্রাফিকে পড়ে গেছে। উইলিয়ামবার্গ সেতুতে উঠতেই বাম্পার টু বাম্পার ট্রাফিক। এই হচ্ছে ম্যানহাটান! এই শহরে প্রতিনিয়ত কত শত গাড়ি যাওয়া-আসা করছে। ‘উইলিয়ামবার্গ সেতু থেকে অবশ্য বেশি দূরে নয় ম্যাকালি জ্যাকসন লাইব্রেরি। সেতু থেকে নামলে কয়েকটি ব্লক এগুলে বাউরি রোড। এই বাউরি থেকে প্রিন্স স্ট্রিট শুরু। ৫২ প্রিন্স স্ট্রিটে এই লাইব্রেরি। ট্রাফিক না থাকলে তিন থেকে চার মিনিট লাগতো। মনে মনে হিসাব করে রোমান। ও অলককে কিছু বলতে যাচ্ছিল, অলকের ফোন ফের বেজে উঠলো। অলক ফোন ধরেই বললো-
‘ডার্লিং, আই অ্যাম কামিং। উই আর অন উইলিয়ামবার্গ ব্রিজ। হেভি ট্রাফিক!’
আই অ্যাম কামিং ভেরি সুন! ওকে… ওকে। ’
অলক ফোন রেখে দিলো। ও রোমানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো। ঠিক এ সময় গাড়িগুলোর গতি বেড়ে গেলো। সারিসারি গাড়ি ছুটছে। ডিলেন্সি রাস্তার ওপর অনেক ট্রাফিক পুলিশ। তারা ইশারা করে গাড়িগুলোকে এগিয়ে যেতে বলছে। ট্রাফিক পুলিশের ইশারায় রেড লাইটেও গাড়িগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। অলক হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো। রোমান ডিলেন্সি থেকে রাইট টার্ন নিয়ে হাডসন রাস্তায় গিয়ে পড়লো। রাস্তাটা ফাঁকা। ও অনেকটা ঝড়ের গতিতে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে হাডসন থেকে বাউরিতে লেফট টার্ন নিলো। এ রাস্তায়ও তেমন ট্রাফিক নেই। কয়েকটি ট্রাফিক লাইট পেরিয়ে প্রিন্স স্ট্রিটে লেফট টার্ন নিয়ে ঢুকে পড়লো। একটু এগুতেই লাইব্রেরি পাওয়া গেলো। রোমান ইয়েলো ক্যাবচালক বলে ম্যানহাটানের সব ঠিকানা ওর নখদর্পণে। ও গাড়ি থামালো ম্যাকালি জ্যাকসন লাইব্রেরির সামনে। অলকের মন নেচে উঠলো। অলক বললো-
‘দোস্ত, তোকে অসংখ্য, অসংখ্য ধন্যবাদ। ড্রাইভার হিসেবে তুই একটা জিনিয়াস!’
অলকের কথা শুনে মুখ টিপে হাসলো রোমান। ও বললো-
‘গাড়ি থেকে নাম। তোর জেনিফার কিন্তু আবার ফোন করে ফেলবে।’
অলক রোমানের উদ্দেশে অনুরোধের কণ্ঠে বললো-
‘তুইও আস না। জুম্পা লাহিড়ির দু-চারটে কথা শুনে যা। জীবনে কাজে লাগবে!’
অলকের কথায় এক ধরনের খোঁচা আছে। রোমান ওর কথা গায়ে মাখলো না। হঠাৎ ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে আটকে গেলো ম্যাকালি জ্যাকসন লাইব্রেরির গেটে। লাইব্রেরির গেটে ও এলিনাকে দেখতে পেলো। গেট দিয়ে ঢুকছিল এলিনা। এলিনাকে এখানে দেখবে রোমান কল্পনাও করেনি। এলিনার সঙ্গে এক যুবককেও দেখতে পেলো ও। ওরা দুজনে লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়লো। এমন দৃশ্য আশা করেনি রোমান। ওর বুকের ভেতর মিহিন বেদনার একটা ঝড় উঠলো। ওর দৃষ্টি আটকে আছে লাইব্রেরির গেটে। রোমানের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো অলক। ও বললো-
‘কী রে, কিছু বলছিস না যে! কী দেখছিস অমন হা করে?’
‘না, তেমন কিছু না। তুই গাড়ি থেকে নাম, আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।’
‘বলিস কি বন্ধু! সত্যি আসবি?’
‘আসবে না মানে? আসবো। তুই গাড়ি থেকে নাম।’
রোমানের কথায় একটু অবাক হয় অলক। বলে-
‘তুই আবার কবে সাহিত্য প্রেমিক হলি!’
অলকের কথার জবাব দিলোনা রোমানের। ওর ভেতরে একটা তোলপাড় চলছে। লাইব্রেরিতে এলিনাকে ঢুকতে দেখে রোমান কেমন একটা শিহরণ টের পাচ্ছে। এলিনাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলার পর ও ফোন রেখে দিয়েছিল। এরপর এলিনা ওকে আর ফোন করেনি। এটা ওর জন্য যেমন লজ্জার তেমনি অপমানেরও। আজ এলিনার মুখোমুখি হয়ে ওই লজ্জার গ্লানি থেকে বের হয়ে আসতে হবে ওকে ভাবলো রোমান। অলক রোমানের নীরবতা দেখে ফের বললো-
‘তোর কি হলো বল তো? কী হয়েছে?’
‘কিছু হয়নি। তুই গাড়ি থেকে নাম।’
‘নামছি। তুই কি সত্যি আসবি?’
‘হুম। আসছি। আর শোন, লাইব্রেরিতে আমি একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবো। তখন তুই সামনে আসবি না। বুঝলি?’
‘বলিস কী!’
‘হুম। মনে থাকে যেনো!’
‘বন্ধু, তুমি তো দেখছি, ডুবে ডুবে জল খাচ্ছো! তা মেয়েটি কে?’
অলকের চোখ নেচে উঠলো রসিকতায়। রোমান মুচকি হাসলো। ও বললো-
‘বন্ধু, যা ভাবছো, তা নয়।’
‘তাহলে কি? এমনি-এমনি একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে?’
‘সেটাও ঠিক নয়। তোকে জানাবো। আসলে অনেকদিন ধরে ঘুরছি।’
‘তুই তো শালা, এক ড্যান্সারের পিছে ঘুরতি! কী যেনো নাম বলেছিলি?’
‘এলিনা।’
‘হ্যাঁ, এলিনা!’
‘ওই এলিনাকেই তো লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেখলাম!’
বললো রোমান। ওর কথা শুনে অলক বিস্ময় প্রকাশ করে বললো-
‘বলিস কি! ঝুম্পা লাহিড়ি দেখছি অনেক জনপ্রিয় লেখিকা!’
‘আরে বাদ দে, জুম্পা লাহিড়ির কথা! এখন গাড়ি থেকে নাম। আমাকে গাড়ি পার্ক করতে হবে।’
‘ওহ, নামছি, নামছি!’
এ কথা বলে গাড়ি থেকে অলক নামলো। ওর ভালো লাগছে রোমানও লাইব্রেরিতে যাবে বলে। আর এলিনাকেও দেখার সুযোগ হয়ে গেলো। রোমান বলেছিল এলিনা অসম্ভব সুন্দরী! অলক রোমানকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, বলতে পারলো না। রোমান খুব দ্রুত গাড়ি নিয়ে প্রিন্স স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে গেলো। লাইব্রেরির গেটের সামনেই দাঁড়িয়েছিল জেনিফার। অলককে দেখে সে এগিয়ে এলো। অলকের সামনে এসে বিগলিত কণ্ঠে জেনিফার বললো-
‘থ্যাংকস টু কাম অন টাইম।’
‘ওয়েল কাম। আর ইউ ওকে?’
‘ডার্লিং, আই অ্যাম এক্সসাইটেড!’
‘হোয়াই?’
‘ফর জুম্পা লাহিড়ি!’
‘রিয়েলি!’
বিস্ময় প্রকাশ করে অলক। ও বুঝতে পারে না, একজন লেখকের প্রতি পাঠকের এমন তীব্র মুগ্ধতা সৃষ্টি হয় কেনো? লেখার মধ্যে কী এমন জাদু আছে? আর লেখায় যদি জাদু থাকেও, লেখকের প্রতি এমন আকর্ষণ তৈরি হয় কেনো? অলকের ভাবনার মনোযোগ ভেঙে দেয় জেনিফারের কথা।
‘ইউ নো, আই বিলিভ জুম্পা লাহিড়ি উইল গেট নোভেল প্রাইজ! আই হোপ ভেরি সুন!’
‘ও মাই গড! রিয়েলি!’
‘হোয়াই ইউ সে রিয়েলি রিয়েলি? ডিড ইউ রিড অ্যানি বুক অব হার?’
এ প্রশ্নে ভ্যাবাচোখা খেয়ে গেলো অলক। ও জুম্পা লাহিড়ি কেনো, অন্য কোনো লেখকের বইও পড়েনি। কলেজ স্টুডেন্ট থাকাকালে বন্ধুদের দেখাদেখি হাতেগোনা কয়েকটি বাংলা উপন্যাস পড়েছিল। বই পড়ার অভিজ্ঞতার মধ্যে এটুকুই যা। এখন মনে হচ্ছে আমেরিকান লেখকদের বই দেদারছে পড়তে হবে ওকে। জেনিফারকে পেতে হলে বই হতে পারে সহায়ক শক্তি। কথাগুলো চট করে ভেবে নিলো অলক। জেনিফার ওর প্রশ্নের জবাব না পেলেও বিষয়টা ভুলে গেলো। জেনিফার প্রহর গুনছে কখন জুম্পা লাহিড়ি আসবেন। ৭টায় জুম্পা লাহিড়ি লাইব্রেরিতে আসবেন। ৭টা বাজতে এখনো দশ মিনিট বাকি আছে। জেনিফারের মধ্যে এক ধরনের আনন্দের উত্তেজনা কাজ করছে। অলক জেনিফারের উদ্দেশে মনে মনে বললো- ‘বাসর রাতে জুম্পা লাহিড়ির ইন্টারপ্রেটার অব মেলোডিজ উপন্যাসটি তোমাকে পাঠ করে শোনাবো। এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে শনি অথবা রোববার অন্তত একটি বই তোমাকে পাঠ করে শোনাব, সুইট হার্ট। বছরে ৫২টা বই!’
রোমানকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো এলিনা। চমকে ওঠারই কথা। ও কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারলো না। এলিনা কফি কিনছিল। পাশ থেকে রোমান বললো-
‘দুটো কফি নিয়ো, এলিনা। আমিও আছি।’
এলিনা ঘাড় ঘুরিয়ে রোমানকে দেখে চমকে গেলো। রোমানও এলিনাকে চমকে দিতে চেয়েছিল। এলিনার চোখ দেখে ওর মনে হলো, ও এলিনাকে চমকে দিতে পেরেছে। লাইব্রেরিতে জুম্পা লাহিড়ি নিয়ে অনুষ্ঠান চলাকালে সবার পেছনে চুপ করে বসেছিল ও। জুম্পা লাহিড়ি নিজের বইয়ের একটি অংশ পাঠ করেছেন। এরপর উপস্থিত শ্রোতা ও পাঠকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। পুরো এক ঘণ্টা রোমান চুপ ছিল। অনুষ্ঠান শেষে এলিনার সঙ্গে আসা যুবক এলিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। হয়তো যুবকটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। যুবকটি চলে যাওয়ায় রোমানের অস্বস্তিও কমে গেলো। ওর মনে হলো আজ ওর ভাগ্য সুপ্রসন্ন। এলিনা লাইব্রেরির কফিশপে গিয়ে কফি কেনার সময় ও নিজের উপস্থিতি জানান দিলো। এলিনার মুখে কথা সরছিল না। ও বললো-
‘খুব কি চমকে গেছো?’
এলিনা ধাতস্ত হয়ে আসছে। ও বললো-
‘রো-মা-ন!’
‘লাইনে আরো লোক আছে। তাড়াতাড়ি দুটো কফি নাও।’
‘ও, আচ্ছা।’
বলে এলিনা দুটো কফি নিলো। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে রোমানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললো-
‘কোথায় বসবে?’
‘একটু নিরিবিলিতে বসতে চাই। তোমার কি সময় হবে?’
‘কেনো?’
‘তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।’
এ কথার জবাবে এলিনা মুখ টিপে হাসলো। যেনো রোমান কী বলতে চায়, ও তা জানে। একটা টেবিল দেখে ওরা মুখোমুখি বসলো। রোমান লক্ষ্য করলো অলক ও জেনিফার একটু দূরে আরেক টেবিলে বসে আছে। অলক বারবার মুখ ঘুরিয়ে ওদের দেখছে। ‘শালা, বদমাইস!’ অলকের উদ্দেশে মনে মনে গাল দিলো রোমান। এলিনা কফির কাপে চুমুক দিয়ে রোমানের উদ্দেশে বললো-
‘তোমার সঙ্গে এখানে দেখা হবে, ভাবতেই পারিনি!’
‘হুম। আমিও ভাবিনি, এখানে তোমার সঙ্গে হবে। তাও আবার বয়ফ্রেন্ডসহ!’
এ কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো এলিনা। হাসির শব্দ যাতে বেশি জোরে না হয়, এর জন্য মুখে হাত চাপা দিলো। হাসির দমকে দমকে এলিনার শরীর কাঁপছে। রোমান বললো-
‘হাসছো কেনো? আমি কি হাসির কিছু বলেছি?’
এলিনা নিজের হাসি সংযত করলো। ও রোমানের চোখে চোখ রেখে বললো-
‘যাকে দেখেছ, সে এখনো আমার বয়ফ্রেন্ড হয়নি।’
‘যেমন?’
‘যেমন অনেকটা তোমার মতো। প্রপোজ করেছে মাত্র।’
‘ওহ! তোমার সিদ্ধান্তের টেবিলে কতজনের প্রপোজ পড়ে আছে?’
এ কথায় ফের হাসলো এলিনা। রোমানের বুকের ভেতর ভেঙেচুড়ে যাচ্ছে। এলিনার হাসির মাদকতায় ও কেমন মন্ত্রমুগ্ধও হয়ে যাচ্ছে। সে সঙ্গে ‘আই লাভ ইউ’ বলার লজ্জা এবং এর কোনো জবাব না পাওয়ার অপমান ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ও বললো-
‘আজ শুধু তোমার হাসির মাধুর্যের কাছে হেরে যেতে চাই না, এলিনা।’
‘তাই না-কি? আমার হাসিতে আবার মাধুর্যতা আছে না-কি?’
‘এলিনা, তুমি নিজেও জানো, তোমার হাসির সামনে আমরা কতো অসহায়!’
‘আমরা মানে?’
‘আমরা মানে হচ্ছে, আমার মতো যারা তোমার মজনু, তারা।’
এলিনা মিষ্টি করে হাসলো। ও কিছু বলতে যাচ্ছিল, রোমান বললো-
‘একটা কথা বলতে চাই।’
এলিনা চোখের ভ্রু নাচিয়ে বললো-
‘বলো। কী বলতে চাও, বলে ফেলো।’
এ কথায় রোমান মনে মনে বললো ‘যা বলতে চাই, সেটা তো বলেই ফেলেছি। তুমি তো এর কোনো জবাব দাওনি। আজ আর নতুন কী বলবো। আই লাভ ইউ বলার চেয়ে পৃথিবীর আর কি কোনো শ্রেষ্ঠ কথা আছে?’ ও মুখে বললো-
‘কথাটি বলার আগে একটা প্রশ্ন আছে।’
‘প্রশ্ন করো।’
একটু সংকোচ বোধ করলেও প্রশ্নটা করলো রোমান।
‘তুমি তো অনেকের প্রপোজাল পেয়েছো। কাউকে কি কথা দিয়ে ফেলেছো? আই মিন, রেসপন্স করেছো।’
‘কেনো?’
হেসে জানতে চাইলো এলিনা। রোমান বললো-
‘প্রশ্ন করবে না, জবাব দাও। কাউকে রেসপন্স করেছো কি-না?’
‘এখনো করিনি। কেনো?’
‘আজকে যাকে দেখলাম, তাকেও না?’
‘না। সে সম্ভবত আজ আমাকে প্রপোজ করতো। কী এক জরুরি ফোন পেয়ে সে চলো গেলো। বেচারা!’
এলিনার মুখে একটা হাসির দ্যুতি ঝলমল করছে। এই হাসির দ্যুতিতে একতাল রহস্যও যেনো জমে আছে। রোমান একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। ও কী বলবে, তা ঠিক করছে। ওর নিজের ভেতরে নিজেকে প্রস্তুত করছে। এলিনা ওর জড়তা কমিয়ে দিতেই যেনো বললো-
‘রোমান, তুমি একবার আমাকে তোমার মনের কথাটি বলেছো। আজ আর নতুন করে কী বলবে, জানি না। তুমি যা বলেছিলে, এর সঙ্গে কী নতুন কিছু যোগ করতে চাও।’
রোমান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো এলিনার মুখের দিকে। এলিনা ওর চোখের দৃষ্টি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো না। এলিনা জবাব আশা করছে। গুমোট বেদনা মিশ্রিত জড়তা ভেঙে রোমান বললো-
‘এলিনা, তোমার জীবনসঙ্গী হওয়ার যোগ্যতা হয়তো আমার নেই। তোমাকে বিয়ে করাটা কেবল স্বপ্নের প্রিয় বিষয় হতে পারে। তোমার সঙ্গে এই যে কফি পান করছি, কথা বলছি- এ মুহূর্তগুলো হয়তো জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা।’
‘রোমান, তুমি কী সব বলছ…!’
‘লেট মি সে, এলিনা। আমি যা বলতে পারি না, অথচ বলতে না পারার কষ্ট নিয়ে কথা বলি। লেট মি সে!’
‘ওকে, গো এহেড!’
‘আমি জানি, সেদিন ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। তুমি কি আমার কথায় রাগ করেছিলে?’
এ প্রশ্নের জবাব দিতে কয়েক মুহূর্ত ভাবলো এলিনা। এপর বললো-
‘না, রাগ করিনি। আমার প্রতি তোমার বিশেষ দুর্বলতা যে আছে, সেটা আমি জানতাম। তুমি সেদিন দুর্বলতার কথাটা বলে ফেলেছো।’
‘এরপর থেকে তুমি আর কখনো আমাকে ফোন করোনি।’
‘হুম। বিশেষ দুর্বলতার কথা জানার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকে না। এরপর সম্পর্ক রাখলে সেটা দুর্বলতার স্বীকৃতি পেয়ে যায়। আমি তো সে অবস্থায় নেই, রোমান।’
‘আমি জানি, তোমার স্বীকৃতি পাবার যোগ্যতা আমার নেই।’
‘যোগ্যতার বিবেচনা তো আমি করিনি!’
‘তা হলে?’
‘আমি বিবেচনা করেছি, নিজেকে নিয়ে। আমার জীবনের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে আমি কাউকে জড়াতে চাই না। আমি একা এগুতে চাই, রোমান।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে এলিনার কণ্ঠ কেমন জমে যাচ্ছিল। রোমানের চোখ ছলছল করে উঠছে। এলিনার কথাগুলো কেমন বিষণ্ন কবিতার মতো লাগছে। ওর ভেতরে চেপে থাকা পাথর গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে। এলিনা ওকে উপেক্ষা বা তাচ্ছিল্য করেনি, এটা ভেবে ওর মনটা ভরে গেলো। ও বললো-
‘আমি কি তোমার জীবনসঙ্গী হতে পারি না? তোমাকে বলে রাখছি, আমি এই সেমিস্টারে কলেজে ভর্তি হয়ে যাচ্ছি। এখানে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে চাই। আমি তোমার যোগ্য হতে চাই।’
রোমানের কথায় স্মিত হাসলো এলিনা। ও বললো-
‘রোমান, আমার যে বড় এক অযোগ্যতা আছে, সেটা তো জানো।’
‘তোমার আবার অযোগ্যতা কি?’
‘আমি একজনকে বিয়ে করেছিলাম।’
‘শুধু এটাই?’
‘দ্বিতীয় অযোগ্যতা হচ্ছে আমি নাইটক্লাবের ড্যান্সার!’
এ কথায় হো হো করে হেসে ফেললো রোমান। এলিনা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। রোমানের হাসি থামার পর কপট বিস্ময় চোখে মুখে ফুটিয়ে এলিনা বললো-
‘আমার অযোগ্যতা কি তোমার কাছে একেবারেই বিবেচনার বিষয় নয়?’
‘না। আমার কাছে তুমি হচ্ছো চাঁদ, আর ওই তোমার কথিত অযোগ্যতা হচ্ছে চাঁদের কলঙ্ক।’
‘হুম, বুঝতে পারছি তুমি অন্ধ হয়ে গেছো।’
এলিনার কথায় রোমান ওর দুহাত বাড়িয়ে এলিনার দুহাতের কজি মুঠোবন্দি করলো। এলিনা ওকে বাধা দিলো না। এলিনার দুহাত মুঠোবন্দি করে রোমান বললো-
‘আমি বাকি জীবন তোমার প্রেমে অন্ধ থাকতে চাই। অন্ধ থাকতে দেবে?’
রোমানের কথায় কেমন শিহরণ অনুভব করলো এলিনা। ওর বুকের ভেতরটা কাঁপছে। ও রোমানের দিকে তাকাতে পারছে না। ও চোখ নামিয়ে নিলো। দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া যে নিজেকে সরিয়ে নেয়া নয়, এটা বুঝতে পারছে রোমান। ওর ভেতরে তোলপাড় চলছে। এ মুহূর্তে এলিনা কিছু বলুক, আর না বলুক এলিনার হাত দুটি যে ওর মুঠোবন্দি হয়ে আছে এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। ও এলিনার হাতের কব্জি আরো শক্ত করে ধরলো। এলিনা ওর হাত সরিয়ে নিলো না। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ায় যেমন অকারণে ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ে, তেমনি এলিনার দুচোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু হঠাৎ গড়িয়ে পড়লো। অশ্রুর ফোঁটা পড়লো রোমানের হাতের ওপর। অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠলো রোমান। ওর মনে হলো, এলিনার অশ্রুজলে ও পবিত্র হয়ে গেলো। রোমান কিছু বলতে যাচ্ছিল, এ সময় ক্যামেরার ফ্লাশলাইট জ্বলে উঠলো। রোমান তাকিয়ে দেখলো অলক ওদের ছবি তুলছে। রোমানকে অলক ও জেনিফার একসঙ্গে বলে উঠলো-
‘কংগ্রেচুলেশন, রোমান অ্যান্ড এলিনা!’
রোমান হেসে ফেললো। এলিনা কিছু না বুঝতে পেরে ভ্যাবাচেখা খেয়ে গেলো। রোমান লজ্জা পেয়ে এলিনার হাত ছেড়ে দিলো। অলক রোমানকে বললো-
‘ভালোবাসা নিবেদন এবং গ্রহণের মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি করে ফেললাম, বন্ধু। আমরা লাইব্রেরির বাইরে যাচ্ছি। তোমরাও আসো। রিয়াজও আসছে।’
‘মানে?’
‘মানে আমি ওকে ফোন করে জানিয়েছি, তুমি হাঁদারাম প্রেম করছো। ও আসছে। আজ আমরা সেলিব্রেট করবো।’
‘হোয়াট?’
এ কথার জবাব না দিয়ে অলক ও জেনিফার লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে গেলো। রোমান লাজুক ও বিব্রত হলো। এলিনা বললো-
‘আমি ঠিক বুজতে পারছি না। ওরা কারা?’
‘অলক আমার বন্ধু। ওর সঙ্গেই এখানে এসেছিলাম। ও তোমার কথা জানতো। কখনো তোমাকে দেখেনি। ও ধরে নিয়েছে, তোমার সঙ্গে আমার প্রেম হয়ে গেছে।’
‘ও আচ্ছা!’
বিব্রতকণ্ঠে ছোট্ট করে জবাব দিলো এলিনা। রোমান বললো-
‘এখন কী করবো?’
‘কি?’
‘এই যে অলক বলে গেলো যে সেলিব্রেট করবে!’
এ কথায় হেসে ফেললো এলিনা। রোমান অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে এলিনার দিকে। এলিনার হাসি থামার পর বললো-
‘লেটস সেলিব্রেট!’
‘রিয়েলি!’
‘হোয়াই নট? লেটস গো!’
উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল এলিনা। এলিনার কথায় তুমুল এক ঢেউ উঠলো ওর বুকে। ও কি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে? এলিনার এই সম্মতি রোমানের পৃথিবী বদলে দিলো। এলিনাকে ও পাবে কি, পাবে না, ও জানে না। কিন্তু এ মুহূর্তে এলিনা ওর।
নয়.
ঢাকায় ফিরে প্রপা রিয়াজকে ফোন করবে না- এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। অথচ সাত দিন পেরিয়ে গেলো প্রপার ফোন আসেনি। প্রপা ওদের বাসার ফোন নম্বর রিয়াজকে দিয়ে গিয়েছিল, ওই নম্বরে ও ফোন করেছে অনেকবার। ফোন বাজে, কেউ ধরে না। প্রপার আচরণে রিয়াজ এতোটাই বিস্মিত হয়েছে যে, ও প্রপার কথা ভাবলেই স্তম্ভিত হয়ে যায়। মন বেদনাবিধুর হয়ে থাকে। অনেক রকম প্রশ্ন ওকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। প্রপা কি রাগ করেছে বা অভিমান? রাগ বা অভিমান করে থাকলে কেনো করবে? এ প্রশ্নটাই বেশি ওর মনে জাগছে। প্রপার আচরণে রিয়াজ যেনো এক গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছে। ও গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারছে না। এই প্রথম প্রপার সঙ্গে ওর একটা সংকট তৈরি হলো। প্রপা ঢাকায় যাবার পর থেকেই রিয়াজের টেনশন বেড়েছে। ঢাকায় ঠিকমতো পৌঁছল কি-না, এ খবরটি ওকে জানানো উচিত ছিল। ‘প্রপার বাবার কি কিছু হলো? তিনি কি বেঁচে আছেন?’ প্রশ্ন দুটো রিয়াজকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে। রিয়াজ এ কদিন ঘুমাতে পারেনি। কাজে মন বসাতে পারেনি। ওর কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। প্রপার এমন আচরণে ভীষণ হতবাক রিয়াজ। গত সাত দিনে ও কেমন উ™£ান্ত হয়ে গেছে। ওর বুকের ভেতর এক অজানা কষ্ট দুমড়ে-মুচড়ে উঠছে। এমন কখনো হয়নি ওর। মানুষের জীবনে এমন কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যে, মুহূর্তগুলো মোকাবেলা করতে ধৈর্যশক্তি থাকে না। অসহনীয় যন্ত্রণা সে ছটফট করে। রিয়াজ যেনো সে ওই রকম সময়কে মোকাবিলা করছে। সাত দিনে ওর মন বিষিয়ে উঠেছে। প্রপার কোনো খোঁজ না পাবার কারণে ও ঢাকায় যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। ১১ বছর ও দেশে যায়নি। আসলে যায়নি বললে ঠিক হবে না, ও যেতে পারেনি। স্টুডেন্ট ভিসায় নিউইয়র্কে ও পড়তে এসেছিল। প্রথমে ভর্তি হয়েছিল আইটিতে। টিউশন ফি জোগাতে পারেনি। শেষে নেটওয়ার্কিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছে ও। এরপর স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় বৈধ অভিবাসী হবার অনেক চেষ্টাই করেছে। অধরাই থেকে গেছে বৈধ অভিবাসী হবার স্বপ্ন। দেশে যাবার আর সুযোগ হয়নি ওর।
মনের দুর্বল অবস্থার কারণে প্রপার সঙ্গে ওর পরিচয়ের ঘটনা এবং প্রেম করার সময়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো এখন ওর মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে। রিয়াজ সচেতনভাবে এসব ঘটনা ভাবতে চাইছে না। কিন্তু ওর অবচেতন মন ওই ঘটনা টেনে আনছে স্মৃতির সেলুলয়েডের ফিতায়। আজ ঘুম থেকে ওঠার পরই ওর মনে ভেসে উঠলো কিভাবে প্রপার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল, সে ঘটনার কথা। প্রপার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ফেইসবুকে। অন্য সবার মতো রিয়াজও প্রপার বন্ধু হয়েছিল। প্রথমে ফেইসবুকে মাঝে মধ্যে মন্তব্য করা ছাড়া ওদের মধ্যে কখনো চ্যাটিংয়ে কথা হয়নি। ওরা একে-অন্যকে ভালো করে চিনতোও না। একটি ঘটনা ওদের মধ্যে পরিচয়ের নতুন এক সেতুবন্ধন তৈরি করে। প্রপা ওর খালা-খালুর সঙ্গে একদিন নিউইয়র্ক এলো। নিউইয়র্ক শহরের কুইন্সে এসে প্রবল তুষারপাতে রাস্তায় বিপদে পড়ে গিয়েছিল তারা। সেদিন এতো তুষারপাত হয়েছিল যে, নিউইয়র্ক শহরের জনজীবন অচল হয়ে পড়েছিল। রাস্তাগুলো বারো ইঞ্চি পুরু বরফে ঢেকে গিয়েছিল। শহরের বাড়িগুলো বরফে ঢেকে যাওয়ায় সাদা ভুতুড়ে বাড়ির মতো লাগছিল। প্রবল তুষারপাতের কারণে সিটি কর্তৃপক্ষ এদিন দুর্যোগ ঘোষণা করে জরুরি কাজ না থাকলে নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে বের না হতে অনুরোধ করলো। এদিন বিকেলটা ঝুপ করে সন্ধ্যা কোলে ডুবে গেলো। তুষারপাতের দিন সব সময় ছোট হয়ে যায় এবং রাত হয় দীর্ঘ। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যারা রাস্তায় গাড়ি চালান তাদের কেউ কেউ আটকে যান রাস্তার ওপর। এমন দৃশ্য প্রায় সব রাস্তায় দেখা যায়। প্রপাদের গাড়িও আটকে গিয়েছিল জ্যাকসন হাইটসে। দুর্যোগের সময় বেলচা নিয়ে কেউ কেউ বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তারা বরফ কেটে আটকেপড়া গাড়ি চলার সুযোগ করে দেন। বিপদগ্রস্তরা খুশি হয়ে মোটা অংকের বকশিস দেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বেলচা দিয়ে বরফ কাটা সহজ কাজ নয়। যারা সাহস করে বের হয়ে এ কাজ করেন, তাদের ভালো আয় হয়। প্রপাদের গাড়ি আটকে গিয়েছিল নির্জন এলাকায় ৩৪ এভিনিউর ওপর ৬২ স্ট্রিটের কর্নারে। এখানে ওরা প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাউকে দেখতে পেলো না। ‘গাড়িটা রাস্তার ওপর ফেলে রেখে চলে যাবে’- যখন এমন কথা ভাবছিলেন প্রপার খালু মোজাম্মেল হক, তখন ব্রডওয়ে থেকে ৬২ স্ট্রিট দিয়ে বেলচা হাতে এগিয়ে এলো রিয়াজ। প্রপার কাছে মনে হলো দেবদূত এগিয়ে আসছে। রিয়াজ ওদের গাড়ির সামনে এসে বললো-
‘ডু ইউ নিড হেলপ, স্যার?’
রিয়াজকে দেখে বাংলাদেশি যুবক বলে মনে হলো মোজাম্মেল হকের। তিনি আনন্দের অতিশয্যে বাংলায় বলে উঠলেন-
‘বাবা, আমরা এক ঘণ্টা ধরে আটকে আছি। আমাদের সাহায্য করো।’
তুমি সংবধন করে বললেন তিনি। বাংলা কথা শুনে রিয়াজ বিগলিত হয়ে গেলো। ও বেলচা দিয়ে গাড়ির চাকার সামনের বরফ কেটে সরাতে লাগলো। সিক্স সিলিন্ডারের ফোর্ড কোম্পানির মিনিভ্যান বরফে আটকে গেছে। ফোর হুইল গাড়ি হলে হয়তো আটকাতো না। বরফ কেটে পরিষ্কার করতে গিয়ে ভাবলো রিয়াজ। বরফ পরিষ্কার করার কাজের মধ্যে ও মোজাম্মেল হকের উদ্দেশে বললো-
‘স্যার, আপনারা কোথায় যাবেন?’
‘এলমার্স্টে যাবো। আমার বন্ধুর বাড়িতে।’
বললেন মোজাম্মেল হক। রিয়াজ বললো-
‘তা হলে আপনি সিক্সটি ওয়ান স্ট্রিটে রাইট টার্ন করে ব্রডওয়ে ধরে এগুবেন। হয়তো যেতে পারবেন। অন্য রাস্তা ধরলে কিন্তু আবারো আটকে যেতে পারেন।’
‘ধন্যবাদ, তোমাকে। আমরা এসেছি বস্টন থেকে। বুঝতে পারিনি কোন রাস্তায় গেলে ভালো হতো। এখানে এসে সেই কখন থেকে আটকে রয়েছি।’
মোজাম্মেল হকের এ কথার জবাবে আর কিছু বললো না রিয়াজ। ও বরফ পরিষ্কার করতে লাগলো। মোজোম্মেল হক গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসেছিলেন। পাশের সিটে তার স্ত্রী। পেছনের সিটে প্রপা বসেছিল। বরফ পরিষ্কার করে রিয়াজ মোজাম্মেল হকের জানালার কাছে এসে বললো-
‘এবার যেতে পারবেন। আবারো বলছি, ব্রডওয়ে ধরে যাবেন।’
মোজাম্মেল হক ভীষণ খুশি হলেন। তিনি বললেন-
‘তোমাকে কত দিতে হবে? তুমি যা চাইবে, আমি তাই দেবো। ওহ, কী বিপদেই না পড়েছিলাম!’
মোজাম্মেল হককে অবাক করে দিয়ে রিয়াজ বললো-
‘আমি কোনো অর্থ নেই না। আমি বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে বরফ কেটে দিচ্ছি। সুতরাং আমাকে কোনো অর্থ দিতে হবে না।’
মোজাম্মেল হক কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারলেন না। এমন দুর্যোগে কেউ কেউ সহযোগিতা করেন ঠিক, তবে বাংলাদেশি কাউকে এ রকম স্বেচ্ছাশ্রম দিতে তিনি দেখেননি। মোজাম্মেল হক অভিভূত হয়ে গেলেন। রিয়াজ আর কিছু না বলে হাঁটতে লাগলো নর্দান ব্লুভার্ডের দিকে। মোজাম্মেল হক ওর পেছনে চিৎকার করে বললেন-
‘তোমার নাম কি বাবা?’
রিয়াজ এর জবাব না দিয়ে পেছনে ঘুরে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। বললো-
‘সাবধানে যাবেন।’
মোজাম্মেল হক বললেন-
‘তোমার কথা ভুলবো না আমরা।’
রিয়াজ আর পেছনে তাকালো না। ও হাঁটতে লাগলো। ও মোজাম্মেল হককে অভিভূত করার জন্য এ কাজ করেনি। ওর নিজের ভালো লাগে বলে এমন দুর্যোগের সময় বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করতে ও বেরিয়ে পড়ে। এদিন রিয়াজ গাড়ির পেছনের সিটে বসে থাকা প্রপাকে লক্ষ্য করেনি। অন্ধকার ছিল বলে গাড়ির পেছনের সিটে চুপ করে বসে থাকা একটি মেয়ের অস্থিত্ব ও টের পায়নি। প্রপা কখন যে সেলফোনের ক্যামেরা দিয়ে ওর ছবি তুলেছে, সেটাও টের পায়নি। পরেরদিন ফেইসবুকে প্রপা ওর ছবিটা ছেড়ে দিলো ‘সাডেনলি এঞ্জেল’ শিরোনাম দিয়ে। প্রপা সংক্ষেপে বরফে আটকেপড়া এবং আটকেপড়া থেকে কিভাবে উদ্ধার হলো তা লিখে দিলো। ফেইসবুক বন্ধু হিসেবে রিয়াজও পেলো ওর ছবি এবং প্রপার কথা। ও যেমন ভীষণ চমকে গেলো, তেমনি লজ্জার মধ্যেও পড়লো। ও প্রপাকে ওর ম্যাসেজ বক্সে চিঠি লিখলো ছবিটা ফেইসবুক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য। প্রপাও অবাক হলো জেনে যে, রিয়াজ ওর ফেইসবুক বন্ধু। রিয়াজের কয়েক দফা অনুরোধে প্রপা অবশেষে ফেইসবুক থেকে রিয়াজের ছবিটা ডিলেইট করে দিলো। সেদিন থেকে প্রপার সঙ্গে রিয়াজের ব্যক্তিগত পর্যায়ের বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। তারা চ্যাটিং করতো নিয়মিত। ধীরে ধীরে ওদের বন্ধুত্বে খুব দ্রুত প্রেম পেখম ছড়ালো। এরপর থেকে ওদের প্রেম গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। একে অন্যকে জানার মধ্য দিয়ে জীবন পথে যুগলযাত্রার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে দুজনে। প্রপার কাছে রিয়াজ স্ফটিক জলের মতো পরিষ্কার, রিয়াজের কাছেও প্রপা তেমনি। ওদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়নি, দ্বিধা বা অভিমান জন্ম নেয়নি। এই প্রথমবারের মতো প্রপার আচরণে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রিয়াজকে করেছে ব্যাকুল, উদগ্রীব ও অস্থির। এ অস্থিরতার মধ্যে ও দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। রিয়াজ জানে, ঢাকায় গেলে ও হয়তো আর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে পারবে না। ওসব নিয়ে ভাবতে চায় না ও। কী হবে ভেবে? যার জন্য এই দেশে থাকতে চায় ও, তারই কোনো হদিস পাচ্ছে না। প্রপার জন্য হলেও তো ওকে যেতে হবে। রিয়াজ এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটে কাল রাতে ফোন করে অলক ও রোমানকে বলেছিল, ‘সকালে বাসায়, তোদের সঙ্গে জরুরি মিটিং আছে’। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ও অলক ও রোমানকে ডেকেছে। রিয়াজ ওদের লিভিং রুমে বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে। বসে প্রপার কথাই ভাবছিল। রোমান ঘুমিয়েছিল, ও ঘুম উঠে এলো ঢুলু ঢুলু চোখে। অলক সকালেই ঘুম থেকে ওঠে। ও পরিপাটি হয়ে চলে এলো ওর রুম থেকে।
সোফায় বসতে গিয়ে রিয়াজকে অলক বললো-
‘বন্ধু, কী খবর? প্রপা কি এখনো ফোন করেনি?’
এ প্রশ্নটার জবাব প্রতিদিন ওদের দিতে হচ্ছে রিয়াজের। ও মুখ শুকনো করে বললো-
‘না। আজো ওর ফোন পাইনি।’
রোমান বসলো অলকের পাশে। ও বললো-
‘প্রপা তো এমন করার কথা নয়? ওর বাবার খবর কি? তার কিছু হয়নি তো?’
রিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ও বললো-
‘আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না। কী হয়েছে আমি কী করে বলবো?’
অলক বললো-
‘তুই ওর খালা-খালুর বাসায় ফোন করেছিস? ওর বান্ধবীর বাসায়?’
রিয়াজ বললো-
‘ওর খালার বাসায় প্রতিদিন ফোন করছি। ম্যাসেজ রাখছি। কোনো কলব্যাক নেই। এখন তো ম্যাসেজও ফুল হয়ে গেছে।’
‘তারাও কি বাংলাদেশে গিয়েছেন?’
জানতে চাইলো রোমান। রিয়াজ বললো-
‘কী জানি। যেতেও পারেন।’
‘আর লং আইল্যান্ডে যে বান্ধবী থাকে, কী যেনো নাম লুবনা…! না?’
জানতে চাইলো রোমান। রিয়াজ এবার ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ও বললো-
‘লুবনাকেও ফোন করেছি। ও বলেছে, প্রপা না-কি ওকেও ফোন করেনি। প্রপার আচরণে লুবনাও বিস্মিত।’
‘বলিস কী? ব্যাপারটা কেমন সিলি হয়ে গেলো না?’
বললো অলক। রিয়াজ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো। রোমান বললো-
‘তো এখন কী করবি? জরুরি মিটিং ডেকেছিস কেনো?’
রিয়াজ বললো-
‘আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই তোদের ডেকেছি। তোরা দুজন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তোদের সঙ্গে আমার সিদ্ধান্তটা শেয়ার করতে চাই।’
‘অবশ্যই শেয়ার করবি। তো বল, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?’
জানতে চাইলো অলক। রোমানের ঘুম ঢুলু চোখও প্রশ্নবোধক হয়ে তাকিয়ে আছে রিয়াজের মুখের দিকে। রিয়াজ একটু চুপ করে দম নিলো যেনো। এরপর ও দুবন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আমি বাংলাদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
‘কী বললি?’
অলক ও রোমান সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো। রিয়াজের কথায় ওদের যেনো বজ্রপাত হলো। রিয়াজ দুবন্ধুর আর্তকণ্ঠকে উপেক্ষা করে বললো-
‘আমি অনেক ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বন্ধু। যদি প্রপার কোনো বিপদ হয়ে থাকে। কে জানে, কী হয়েছে। আমি আর এখানে বসে থাকতে পারি না। প্রপার জন্যই আমি বাংলাদেশে যাবো।’
রিয়াজের কথার পর অলক ও রোমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। ওরা রিয়াজের সিদ্ধান্তের কথায় হঠাৎ চুপসে গেছে। রিয়াজ ফের বললো-
‘আমি জানি, আমি হয়তো আর এই দেশে ফিরে আসতে পারবো না। কিন্তু আমার আর কোনো চয়েজ নেই।’
এ কথা বলার সময় রিয়াজের কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। ওর বুকের ভেতরে হু হু কান্না উথলে উঠল লাগলো। ও নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করলো। অলক ও রোমানের চোখে-মুখেও বিষণ্নতা নেমে এসেছে। ওরা যেনো ভারি তুষারপাতে ঢেকে যাচ্ছে। অলক বিষণ্ন কণ্ঠে বললো-
‘বন্ধু, তুই কী বলছিস? আমার মাথা ঘুরছে। তুই বাংলাদেশে কেনো যাবি?’
‘আগেই তো বললাম, আমার আর কোনো চয়েজ নেই। আমি এখানে বসে কী করবো? প্রপার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে। নইলে ও আমাকে ফোন তো করতো।’
বললো রিয়াজ। অলক বললো-
‘কী সমস্যা হতে পারে? আর তুই গিয়ে কি ওই সমস্যার সমাধান করতে পারবি?’
‘সমস্যার সমাধান করতে পারা বা না পারার বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে বিপদের সময় প্রপার পাশে দাঁড়ানোর।’
‘কিন্তু প্রপার পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের কী ক্ষতি হবে, তা ভেবেছিস?’
প্রশ্ন করল রোমান। রিয়াজ বললো-
‘অনেক ভেবেই তো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জানি, হয়তো আর ফিরে আসতে পারবো না এই দেশে।’
‘তা হলে? তারপরও বাংলাদেশে যাবি?’
বললো অলক। রিয়াজ ম্লান হেসে বললো-
‘আমি যাবো। প্রপাকে নিয়ে বাংলাদেশেই সংসার শুরু করবো। কী বলিস?’
‘এরপর?’
রোমানের প্রশ্ন। রিয়াজ বললো-
‘এরপর কী হবে, তা নিয়ে ভাবতে চাই না। যা হবার হবে।’
অলক রিয়াজের কাছে প্রশ্ন করলো-
‘আচ্ছা, প্রপা যেদিন ঢাকায় যায়, সেদিন তো শায়লা নামের মেয়েটিও ঢাকায় গিয়েছে, তাই না?’
‘হুম।’
বললো রিয়াজ। অলক বললো-
‘এয়ারপোর্টে দেখলাম, তুই প্রপার সঙ্গে শায়লাকে পরিচয় করিয়ে দিলি।’
‘হ্যাঁ, দিয়েছি। একই ফ্লাইটে যাচ্ছে। পরিচয় করিয়ে দিলাম। দীর্ঘ যাত্রাপথে গল্প করে ওরা সময় কাটাতে পারবে।’
বললো রিয়াজ। চোখে মুখে ঘোরতর সন্দেহ ফুটে উঠল অলকের। ও বললো-
‘বন্ধু, এমন তো হতে পারে, শায়লা এমন কিছু বলেছে যে, প্রপা তোর প্রতি রেগে আছে।’
‘কেনো? আমি তো এমন কিছু করিনি। তা ছাড়া শায়লার সঙ্গে তো আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নয়।’
বললো রিয়াজ। রোমান বললো-
‘শায়লার প্রতি তোর হয়তো দুর্বলতা নেই, তোর প্রতি শায়লার কি দুর্বলতা নেই?’
রোমানের কথায় একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো রিয়াজ। ও এভাবে ভাবেনি। হতে পারে শায়লা এমন কিছু বলেছে যে প্রপা রাগ করতে পারে। কিন্তু একজনের কথা শুনে শায়লা কেনো রাগ করবে এবং ঢাকায় ফিরে একবারও রিয়াজকে ফোন করবে না কেনো? প্রপা এমন নয়। ও কোনোকিছু চেপে রাখে না। সরাসরি কথা বলে ফেলে। রাখঢাক করে পেটে কথা ধরে রাখে না। মনে মনে এ কথাগুলো ভাবলো রিয়াজ। এরপর ও বললো-
‘আমার মনে হয় না, সে রকম কিছু। প্রপা রাগ করলেও রাগ প্রকাশ করে। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়াটা ওর রাগ বলে ধরে নিতে পারছি না। আমার মন বলছে, ওর কোনো সমস্যা হয়েছে।’
রিয়াজের কথার সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ হবে না- ভাবলো অলক। প্রপা ওর চিন্তা-চেতনায় এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, ওর জন্য বাংলাদেশ কেনো, নির্জন দ্বীপে নির্বাসনেও যেতে রাজি হবে। তাই হাল ছেড়ে দেয়ার মতো করে অলক বললো-
‘তা কবে যাচ্ছিস বাংলাদেশে?’
‘আজই। রাতের ফ্লাইটে।’
বললো রিয়াজ। ওর কথায় অলক ও রোমান আকাশ থেকে মাটিতে পড়লো যেনো। ওদের দৃষ্টিতে ফের বিস্ময় ফুটে উঠলো। কী বলবে ওরা বুঝে উঠতে পারলো না। রোমান অস্ফূট স্বরে বললো-
‘কী বলছিস, তুই!’
‘ঠিক-ই বলছি, বন্ধু। আমি কাল এয়ার টিকিট কেটে ফেলেছি।’
বললো রিয়াজ। অলক বললো-
‘একা একা এসব করলি। আমাদের বললি আজ সকালে?’
‘কী করবো বল, আমার মনের অবস্থা ভালো নেই। তোদের কষ্ট দিতে চাইনি।’
রিয়াজের কথায় অলকের মুখে একটা খারাপ গালি চলে এসেছিল। ও গালিটা দিলো না। আজ ও চলে যাচ্ছে, যাবার দিন ওকে গালি দিতে মন সায় দিলো না। অন্যদিন হলে ও খারাপ গালিটা দিয়ে ফেলতো। অলক বললো-
‘দেশে যাবিই যখন, আদালত থেকে একটা দেশে যাবার পারমিশন নিলে ভালো হতো না? ফিরে আসার একটা সুযোগ তো থাকতো।’
অলকের কথায় মুচকি হাসলো রিয়াজ। ও বললো-
‘বন্ধু, সেটা নিয়েছি কাল। কোর্টের একটা অর্ডার নিলাম অ্যাটার্নি ধরে। ফেরার চেষ্টা তো করবো। আগে দেখি, প্রপা কী বলে।’
রোমান বললো-
‘শালা, সব কাজই একা একা করে রেখেছো। আমাদের বললে আজ সকালে। এটা তোমার ঠিক হয়নি।’
রোমানের কথার সমর্থন জানিয়ে অলকও বললো-
‘রিয়াজ, আমিও একমত ওর সঙ্গে।’
রিয়াজ বললো-
‘ভুল হয়ে থাকলে মাফ চাইছি তোদের কাছে। আজ যাবার দিন তোরা আমার সঙ্গে থাকবি, এটা মনে থাকে যেনো।’
অলক বললো-
‘শালা কাজে যাবার জন্য তৈরি হয়েছিলাম। দাঁড়া রেস্টুরেন্টে সিক কল দেবো।’
রোমান বললো-
‘আমার তো নিজের স্বাধীন ব্যবসা। সিক কল দেয়ার কিছু নেই। গাড়ি চালালে এ সুবিধা আছে।’
কথাটা অলকের উদ্দেশে বললো রোমান। অলক ওর কথা গায়ে মাখলো না। আজ রিয়াজ দেশে ফিরে যাচ্ছে, এমন দিনে ঝগড়া করতে চায় না ও। ও চুপ করে রইলো। রিয়াজও চুপ। ওদের দুজনের মুখ থমথমে। রোমান আর কোনো কথা বললো না। তিন বন্ধুকে গ্রাস করলো একরাশ বিষণ্নতা।
দশ.
এগার বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে কেমন শিহরণ অনুভব করলো রিয়াজ। রোদ ঝলমলে উজ্জ্বল সকাল। রোদের তেজ আছে। মাঝে মাঝে হালকা দমকা হাওয়া এসে লাগছে। অনেকদিন পর নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশের গ্রীষ্ম ঋতুর সকালের স্বাদ নিলো রিয়াজ। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই ওর মনে হলো, যে বাংলাদেশ থেকে ও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল সেই বাংলাদেশ আর নেই। বাংলাদেশ এতোটাই বদলে গেছে যে, ওর চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। ও বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলো। এর মধ্যে ওকে কয়েকজন ঘিরে ধরলো। ও কোথায় যাবে- এ প্রশ্নে লোকগুলো যেনো হুমড়ি খেয়ে পড়লো ওর ওপর। ‘ভাগ্যিস, ওর সঙ্গে হ্যান্ডলাগেজ ছাড়া আর কিছু নেই! নইলে লাগেজ নিয়ে টানাটানি করে দিতো লোকগুলো!’ মনে মনে ভাবলো ও। রিয়াজ আগেই ঠিক করে রেখেছে ও প্রপাদের বাড়িতে প্রথমে যাবে। প্রপাদের বাড়ি রামপুরায়, উলন রোডে। প্রপার সঙ্গে দেখা করে এরপর ও যাবে নিজেদের বাড়িতে। রিয়াজদের বাড়ি রায়েরবাজার। রিয়াজ দেশে ফিরছে এ কথা জানায়নি ওর বাবা-মা ও ভাই-বোনকে। আজ ওকে দেখলে তারা ভীষণ চমকে যাবে। তাদের জন্য সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। মাকে দেখার জন্য ওর মনটা ছটফট করছে। কিন্তু যার জন্য দেশে ফিরে আসা, তার সঙ্গে দেখা না করে কোথায় যাবে ও?
রিয়াজের বাবা সরকারি চাকরি করতেন, গত বছর রিটায়ার্ড করেছেন। রায়েরবাজারে ওদের ছয়তলা দালান। প্রতিমাসে ভাড়া পায় প্রায় লাখ টাকা। ওর ছোট ভাই রোমেল মাস্টার্স সম্পন্ন করে রাইফেল স্কয়ারে দুটি দোকান নিয়ে ব্যবসা করছে। ফার্স্টফুড ও গিফট শপ চালাচ্ছে ও। ছোট বোন রিমু ইডেনে পড়ছে। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। রিমু যখন ক্লাস ফোরের ছাত্রী, তখন দেশ ছেড়েছিল রিয়াজ। আজ এগার বছর পর ওদের সঙ্গে দেখা হবে। ওকে দেখে তারা কী করবে, কতোটা অবাক হবে- কে জানে। রিয়াজ আনমনা হয়ে পড়েছিল। একজনের কথায় ওর সম্বিত ফিরে আসে।
‘স্যার, আপনে রামপুরা যাবেন না? আমারে চিনছেন? আমি হানিফ। আপনারে অনেকবার বিমানবন্দরে নামাইছি। চিনছেন? আপনি আজ ফিরছেন জেনে আপনারে নিতে আইছি।’
ট্যাক্সি ড্রাইভার হানিফের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো রিয়াজ। ও কিছু বলতে পারলো না। ও হানিফকে চেনার চেষ্টা করছে। হানিফ ফের বললো-
‘স্যার, গত মাসে আপনি সিঙ্গাপুর গেলেন না? আমিই তো নামাইছিলাম। মনে পড়ছে? এইবার কই গেছিলেন, ব্যাংকক? আমার জ্বর হইছিল, তাই এবার আপনারা নামাইতে পারি নাই।’
রিয়াজ বুঝতে পারছে হানিফ হয় ভুল করছে বা মিথ্যা বলছে। ও কখনো সিঙ্গাপুর বা ব্যাংকক যায়নি। হানিফ তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছে, যেনো রিয়াজকে সে ভালো করে চেনে। রিয়াজ একটু অবাক হলেও ওর ভালো লাগলো। বিশেষ করে রামপুরার কথা বলায় ও আকৃষ্ট হলো। রিয়াজের চারপাশে আরো ড্রাইভার আছে। রিয়াজকে ঘিরে তারা দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে কয়েকজন ওর কাছে জানতে চেয়েছিল ও কোথায় যাবে। রিয়াজ হানিফের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘হানিফ, তোমার গাড়ি কোথায়?’
এ কথা বলে রিয়াজ এগিয়ে গেলো হানিফের দিকে। হানিফ বিগলিত এক হাসি বিলিয়ে এগিয়ে এসে রিয়াজের হাতের ব্যাগটি নিজের হাতে তুলে নিলো। ও বললো-
‘স্যার, আসেন। গাড়ি একটু দূরে রাখছি। বেশি দূরে না। কয়েক কদম হাঁটলেই হইবো।’
রিয়াজ হানিফের সঙ্গে হাঁটতে লাগলো। অপরাপর ড্রাইভাররা হতাশ হয়ে ফিরে যেতে লাগলো এয়ারপোর্টের গেটের দিকে। তাদের জন্য মায়া হলো রিয়াজের। হাঁটতে হাঁটতে রিয়াজ হানিফের উদ্দেশে বললো-
‘তুমি যাকে মনে করছো, আমি কিন্তু সেই ব্যক্তি নই। আমি কখনো সিঙ্গাপুর বা ব্যাংকক যাইনি। তবে তোমার কথা শুনে আমার ভালো লেগেছে, তাই চলে এলাম।’
হানিফ একগাল হাসলো। ও বললো-
‘স্যার, আমি তো আপনারে চিনি না। এয়ারপোর্টে আসলে একটু ট্রিকস করতে হয়। মিথ্যা বইল্যা পেসেঞ্জার নেয়ার চেষ্টা করি। নইলে স্যার, ওই ড্রাইভাররা আমার বারোটা বাজাইয়া দিবো।’
‘কী রকম?’
‘স্যার, তারা এয়ারপোর্টের লিস্টেড ড্রাইভার। প্যাসেঞ্জার তাদের। আমরা বাইরের ড্রাইভার।’
‘তোমরা এ কাজ করছো কেনো?’
‘স্যার, এতে আমাগোও লাভ, আপনাদেরও লাভ।’
বললো হানিফ। রিয়াজ কৌতূহল প্রকাশ করে বললো-
‘কিভাবে?’
‘স্যার, এয়ারপোর্ট থেকে আপনি ট্যাক্সি নিলে অনেক টাকা লাগতো। আর আমারে টাকা দিবেন মিটার দেইখ্যা।’
এ কথা বলা শেষ হতেই হানিফ একটি হলুদ রঙের গাড়ির সামনে দাঁড়ালো। রিয়াজের ব্যাগটি গাড়ির ব্যাকডালায় রেখে দরজা খুলে দিয়ে ও রিয়াজের উদ্দেশে বললো-
‘ওঠেন স্যার।’
রিয়াজ হানিফের গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে রিয়াজের কোনো মাথাব্যথা নেই। ও হানিফের কথায় আকৃষ্ট হয়ে ওর গাড়িতে উঠেছে। ও বললো-
‘হানিফ, আমি প্রথমে যাবো রামপুরায়। উলন রোডে। সেখানে কিছুক্ষণ থাকবো। এরপর যাবো রায়েরবাজার। ওয়েটিং চার্জ ও বকশিস দুটোই পাবে। বুঝলে?’
‘ঠিক আছে স্যার।’
বলেই হানিফ গাড়ি স্টার্ট দিলো। রিয়াজ প্রপাদের বাড়ির ঠিকানা লেখা একটা কাগজ হানিফের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো-
‘হানিফ, এই ঠিকানায় প্রথম যাবে। ওখানে একটু বেশি সময় তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। টাকার জন্য ভেবো না।’
‘আচ্ছা স্যার। আপনারে দেইখাই বুঝতে পারছি, আপনি খুব ভালো লোক।’
হানিফের এ কথা গায়ে মাখলো না ও। রিয়াজ এখন প্রপার কথা ভাবতে লাগলো। ওকে দেখে প্রপা কতোটা অবাক হবে, এ কথা ও অনেকবার ভেবেছে। আবারো ভাবতে লাগলো। গাড়ি ছুটে চলছে। রিয়াজ নিউইয়র্ক থেকে গ্রামীণফোনের একটা সিমকার্ড কিনে এনেছে। গাড়িতে বসে ও সেলফোনে সিমকার্ডটি ভরে নিলো। এরপর ও রাস্তার চারপাশটা দেখতে লাগলো। সবকিছু যেনো আমূল বদলে গেছে। রাস্তায়-ফুটপাতে এতো মানুষ! ওর মনে হচ্ছে, দেশের জনসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এগার বছর আগে ও যখন ঢাকায় ছিল তখন এতো মানুষ ছিল না বলে ওর মনে হলো। হৈচৈ, গাড়ির হর্ন, ধুলো-ময়লায় রিয়াজ অস্বস্তিবোধ করলেও ‘এটাই ওর শহর’ বলে নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিলো। সেদিনের ঢাকা আর আজকের ঢাকা যেনো এক নয়। ঢাকা আরো হতশ্রী হয়েছে। বেড়েছে ভাসমান মানুষের চাপ। মনে মনে এ কথা ভাবলো রিয়াজ। আবার এটাও ভাবলো যে, উন্নত ও আধুনিক শহরে অনেকগুলো বছর থাকার পর হঠাৎ করে ঢাকাকে হতশ্রী ও মলিন মনে হচ্ছে। হয়তো ঢাকা শহর আগের মতোই আছে। এতো বছর পর আধুনিক শহর থেকে ফিরে ও হয়তো চিনতে পারছে না ঢাকাকে। তাড়াতাড়িই যেনো হানিফ উলন রোডে প্রপাদের বাড়ির সামনে চলে এলো। এতো তাড়াতাড়ি উলন রোডে চলে আসবে রিয়াজ আশা করেনি। হানিফের কথায় ওর চিন্তামগ্নতা ভাঙে।
‘স্যার, এই যে এইটাই আপনার ঠিকানা। এই বাড়ি।’
রিয়াজের বুকের ভেতরটা ধরফর করে উঠলো। গাড়ির জানালা দিয়ে দেখলো প্রপাদের দক্ষিণমুখী দোতলা বাড়ি। দোতলায় খোলা বারান্দা। খোলা বারান্দায় বেশ কয়েকটি ফুলের গাছ। সবগুলো জানালা মেরুন রঙের পর্দায় ঢাকা। বাড়িটি সম্প্রতি অফ হোয়াইট রং করা হয়েছে। চকচক করছে বাড়িটি। বাড়ির ভেতরে বড় জায়গাজুড়ে ফুলের বাগান। রিয়াজের ভালো লাগলো প্রপাদের বাড়িটি দেখে। ও ট্যাক্সি থেকে নামলো। মনে মনে একবার ওর হ্যান্ডলাগেজের কথা ভাবলো। হ্যান্ডলাগেজে তেমন মূল্যবান কিছু নেই। ও হানিফকে বললো-
‘তুমি গলির মোড়ে গিয়ে অপেক্ষা করো। আমি আসছি।’
হানিফ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো। রিয়াজ প্রপাদের বাড়ির গেট দিয়ে প্রবেশ করলো। বাড়ির গেটে কোনো দারোয়ান নেই। ‘এ ধরনের বাড়িতে দারোয়ান থাকলে মানানসই হয়’ কথাটা ভাবলো ও। বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত চারপাশটা দেখে নিলো। দোতলায় বাড়ির কোন ফ্লোরে প্রপারা থাকে ও জানে না। বাড়িটি দেখে মনে হয়নি যে, এই বাড়িতে প্রপারা ছাড়া অন্য কেউ ভাড়া থাকে। রিয়াজ একটু দ্বিধান্বিত হয়ে দরজায় লাগানো কলিংবেলে চাপ দিলো। বাড়ির ভেতরে পাখির শব্দ হলো। শব্দটি মিষ্টি ও রিনরিনে। ও প্রায় এক মিনিট অপেক্ষা করলো। এর মধ্যে ও ভাবলো কে দরজা খুলতে পারে। ওর মনে হলো প্রপা দরজা খুলবে। প্রপা দরজা খুললে ওকে দেখার পর প্রপার চোখের দৃষ্টি কেমন হবে- কথাটি নিয়ে ভাবতে গিয়ে ও কেমন ভাবুলতায় ডুবে গেলো। ঘোরলাগা ভাবুলতায় ও আবার কলিংবেল টিপলো। দ্বিতীয়বার কলিংবেল বাজার প্রায় এক মিনিট পর দরজা খুললেন একজন বয়স্ক মানুষ। ভদ্রলোককে দেখে রিয়াজের মনে হলো, তিনি প্রপার বাবা হবেন। প্রপার চোখ ও নাকের সঙ্গে তার চোখ ও নাকের মিল আছে। এ কথা ভাবতেই ওর বুকের ভেতরে আটকে থাকা দুঃশ্চিন্তার পাথরটা যেনো নেমে গেলো। প্রপার বাবা সুস্থ আছেন, এটা ওর জন্য ভীষণ স্বস্তিদায়ক। দরজার এক পাট খুলে দাঁড়িয়ে আছেন ভদ্রলোক। তিনি ভরাটকণ্ঠে রিয়াজের উদ্দেশে বললেন-
‘কাকে চাই?’
‘এটা কি প্রপাদের বাড়ি?’
প্রশ্ন করলো রিয়াজ। এবার ভদ্রলোক রিয়াজের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলেন। এরপর বললেন-
‘তোমাকে তো কখনো দেখেনি? কে তুমি?’
রিয়াজকে তিনি তুমি সম্বোধন করলেন। রিয়াজের ভালো লাগলো। ও বললো-
‘আমি নিউইয়র্ক থেকে এসেছি। এটা নিশ্চয় প্রপাদের বাড়ি?’
এবার ভদ্রলোক একটু চমকালেন যেনো। তিনি বললেন-
‘নিউইয়র্ক থেকে এসেছো? কবে এলে? কী নাম তোমার? প্রপা তো কিছু বলেনি!’
ভদ্রলোকের কণ্ঠে প্রপার নাম শুনে রিয়াজ নিশ্চিত হলো এটা ওদের বাড়ি। ভদ্রলোক যে প্রপার বাবা এটা ওর নিশ্চিত মনে হলো। ও বললো-
‘আমি কিছুক্ষণ আগে নিউইয়র্ক থেকে এসেছি। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আপনার বাড়িতে এসেছি প্রপাকে চমকে দিতে। ও জানে না, আমার ঢাকায় আসার কথা।’
‘ও আচ্ছা। এসো, ভেতরে এসো।’
বলে ভদ্রলোক দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন। রিয়াজ ভেতরে প্রবেশ করলো। বিশাল ড্রইংরুম। দুই সেট সোফা বড় বৃত্তাকারে সাজানো। ড্রইংরুম লাগোয়া ডাইনিং স্পেস। ডাইনিং স্পেসে বড় একটা ডাইনিং টেবিল। টেবিলের চারপাশে আটটি চেয়ার। ড্রইংরুমের দেয়ালে প্রপার একটি ছবি ঝুলছে। একঝলক তাকিয়ে এসব দেখলো রিয়াজ। ও সোফায় বসতে গিয়ে বললো-
‘আপনি প্রপার বাবা, তাই না?’
‘হুম। আমি প্রপার বাবা। তোমার নাম কি? নিউইয়র্কে কী করো?’
‘আমার নাম রিয়াজ। আমি নিউইয়র্কে নেটওয়ার্কিংয়ের ওপর গ্র্যাজুয়েশন করেছি। চাকরি করতাম। প্রপা বলেছিল, আপনি অসুস্থ। আপনি কি…।’
‘অসুস্থ ছিলাম বাবা। এই তো কয়েকদিন হলো সুস্থ হয়েছি।’
প্রপার বাবার কথা শুনে স্বস্তি পেলো রিয়াজ। ও বললো-
‘প্রপা কি বাড়িতে আছে?’
‘না, বাবা। তুমি কি প্রপার বিয়ের খবর জানো না?’
প্রশ্ন করলেন প্রপার বাবা। রিয়াজ যেনো তার কথা শুনতেই পেলো না। বা কথাটা শুনতে পেলেও ওর ইন্দ্রিয় শক্তি যেনো লোপ পেয়ে গেলো। ও হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলো প্রপার বাবার মুখের দিকে। প্রপার বাবা ওর মুখোমুখি সোফায় বসতে গিয়ে বললেন-
‘গত সপ্তাহে ওর বিয়ে হয়েছে। মেয়ে মানুষ তোমাদের হয়তো লজ্জায় নিজের বিয়ের কথা জানায়নি। কিংবা হয়তো জানাতে চেয়েছিল, তোমাদের ফোন করে পায়নি। তা প্রপার সঙ্গে তোমার কিভাবে পরিচয় হয়েছিল, বাবা?’
কথাগুলো গরম সীসা হয়ে রিয়াজের কানে প্রবেশ করছিল যেনো। ‘প্রপার বাবা এসব কী বলছেন!’ ও থ’ হয়ে আছে। ওর বুক কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। রিয়াজের স্বাভাবিক চেতনা যেনো লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ও কী বলবে ভেবে পেলো না। প্রপার বাবা ফের বললেন-
‘অনেক দূর থেকে জার্নি করে এসেছো। প্রপার মা হাঁটতে বেরিয়েছে। হ্যাঁ, প্রপার মা-ও অসুস্থ ছিল। মেয়ের বিয়ের পর সুস্থ হয়েছে। তুমি কী খাবে, বলো বাবা?’
‘না, না, আমি কিছুই খাবো না।’
তারস্বরে ককিয়ে ওঠে রিয়াজ। ওর কণ্ঠস্বর কেমন ফ্যাসফ্যাসে লাগছে। প্রপার বাবা বললেন-
‘খাবে না মানে? নাস্তা খেয়ে যাবে না? নিউইয়র্ক থেকে সরাসরি আমার বাড়িতে এসেছো। মুখে কিছু না দিয়েই যাবে না-কি?’
রিয়াজের মাথা যেনো ভনভন করে ঘুরছে। প্রপার বাবার কথা শোনার পর ওর কি কিছু খাবার শক্তি আছে? রিয়াজের মনে হচ্ছিলো সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলবে। প্রপার বাবার মুখে পিতৃত্বের মমতা ফুটে আছে। রিয়াজ তার মুখের দিকে চোখ রেখে বললো-
‘না, আঙ্কেল, আমি কিছু খেতে পারবো না। এয়ারপোর্টে নামার আগে এয়ারলাইন্সে খেয়েছি। আপনি সত্যি করে বলুন তো প্রপার কি বিয়ে হয়ে গেছে?’
রিয়াজের প্রশ্নে প্রপার বাবা বিস্মিত হলেন। তার কপালের ওপর কয়েকটি ভাঁজ পড়লো। তিনি স্মিত হেসে বললেন-
‘মনে হচ্ছে প্রপাকে চমকে দিতে এসে তুমি নিজেই খুব চমকে গিয়েছো? তুমি কি প্রপার বিয়ের খবর জানতে না?’
‘না, মানে… প্রপা বিয়ে করলে আমি জানবো না, এমন তো হবার কথা নয়! তাই…!’
‘বুঝেছি, প্রপা তোমাকে বিয়ের খবরটি দেয়নি। এমন হতে পারে। তা তুমি মনে কিছু করো না, বাবা। ঢাকায় এসেই যখন পড়েছো, তখন জানতে পারবে। প্রপাই তোমাকে বলবে।’
‘জ্বি, তা ঠিক। প্রপা এখন কোথায়, আঙ্কেল?’
‘ওরা তো এখন কক্সবাজার। আজই ফেরার কথা। কালও ফিরতে পারে। আমি ওকে তোমার কথা বলবো।’
রিয়াজের মুখ দিয়ে শব্দ বের হতে চাচ্ছে না। ওর ভেতরটা ভেঙেচুড়ে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। প্রপার বাবার সামনে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললে লজ্জার বিষয় হবে। ও কী বলবে বা কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। জীবনে এমন কি হয়, যার সঙ্গে বিয়ে হয়ে যেতে পারতো, তার বিয়ে বিনা নোটিসে অন্যজনের সঙ্গে হয়ে যাবে। এমন হলে কারো জীবনে এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে? রিয়াজের ভেতরে কষ্টের দাবানল দাউদাউ করে জ্বলছে। ও সোফা থেকে উঠে দাঁড়লো। বললো-
‘আঙ্কেল, আমার মা-বাবা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। এগার বছর পর দেশে ফিরলাম। আমি এখনই চলে যাবো। কিছু মনে করবেন না।’
রিয়াজের কথায় প্রপার বাবা কয়েক পলক তাকিয়ে রইলেন ওর মুখের দিকে। এরপর তিনি বললেন-
‘তা হলে আগে নিজের বাড়িতে যাও। তোমাকে আটকাবো না। কাল ফোন করে জেনে নিও প্রপা এসেছে কি-না।’
বললেন প্রপার বাবা। রিয়াজ বললো-
‘আঙ্কেল, প্রপার সেলফোন নম্বরটা কি আমাকে দেবেন। ওকে ফোন করে উইশ করতে চাই।’
‘নিশ্চয়, নিশ্চয় দেবো। একটু অপেক্ষা করো।’
প্রপার বাবা শার্টের পকেট থেকে কলম বের করে টেবিলের ওপর রাখা একটা কাগজে প্রপার সেলফোনের নম্বর লিখলেন। এরপর কাগজটা রিয়াজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-
‘প্রপার জন্য দোয়া করো, বাবা। ও যেনো সুখী হয়।’
রিয়াজ কাগজটা নিয়ে হাসার চেষ্টা করলো। ওর মুখে শুকনো হাসি ফুটলো। এই হাসির মধ্যে আনন্দের উচ্ছ্বাস নেই। বরং হাসির আড়ালে গভীর বেদনা মৌনতার সুষমায় ফুটে রইলো। রিয়াজ উথলে ওঠা কান্না এবং চোখের কোণে টলমল করা অশ্রুজল সামলাতেই প্রপার বাবার উদ্দেশে হাত নেড়ে ‘আচ্ছা যাই’ বলে ও হনহন করে প্রপাদের বাসা থেকে বের হয়ে এলো। প্রপাদের বাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ও। এ মুহূর্তে রিয়াজ যেনো ঝড়ে লণ্ডভণ্ড বিধ্বস্ত এক অন্য মানুষ। ঝড়ের গতিতে ও প্রপাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। নিজের ভেতরের ঝড় সামলে রাখার চেষ্টা করছে ও। রিয়াজ ফোন করলো প্রপার নম্বরে। রিং বাজলো, কেউ ধরলো না। ও আবার ওই নম্বরে ফোন করলো। ফোন নম্বর ডায়াল করার কয়েক মুহূর্ত পর রিং বাজতে লাগলো। এবার ফোন রিসিভ করলো প্রপা।
‘হ্যালো…!’
‘কে?’
‘রিয়াজ বলছি।’
ও-প্রান্তে নীরবতা। রিয়াজ নিজেকে শক্ত করে নিচ্ছে। তুমুল ভাঙচুর হচ্ছে ওর ভেতর। ওর মনে হচ্ছে পৃথিবীটা ওলট-পালট হয়ে গেছে এবং ওলট-পালট পৃথিবীটা দুলছে। এর মধ্যে ও নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলো। ও বললো-
‘হ্যালো, প্রপা, শুনতে পাচ্ছো?’
ও-প্রান্তে ফোনের লাইন কেটে গেলো। রিয়াজ অবাক হলো না। লাইন কেটে যাওয়ায় ও বুঝতে পারলো ফোনের ও-প্রান্তে প্রপা ছিল। আজ প্রপা রিয়াজকে কী বলবে? প্রপার কাছে কোনো জবাব নেই বলেই ও ফোনের লাইন কেটে দিলো। রিয়াজ দমে গেলো না। ও আবার ফোন করলো। ফোনের রিং বাজতে লাগলো। রিয়াজ মনে মনে প্রার্থনা করে বললো- ‘প্রপা, প্লিজ, ফোনটা ধরো। একবার ধরো। আর কখনো তোমাকে ফোন করবো না!’ রিয়াজের প্রার্থনা যেনো শুনলো প্রপা। ও ফোন রিসিভ করলো। ও-প্রান্ত থেকে। কিন্তু কোনো কথা বললো না ও।
রিয়াজ বললো-
‘আমি জানি, আমার কথা তুমি শুনছো। প্রপা, তুমি ফোনের লাইনটা কেটে দিবে, এটাও জানি।’
রিয়াজের এ কথায় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে প্রপা বললো-
‘তা হলে কথা বলছো কেনো? ফোন রেখে দাও।’
রিয়াজ অনুনয় করে বললো-
‘একটা অনুরোধ করতে চাই। হয়তো এটাই আমার শেষ অনুরোধ।’
‘এরপরও আমার কাছে তোমার অনুরোধ!’
‘হ্যাঁ, তবুও অনুরোধ করছি।’
‘বলো, কী অনুরোধ?’
‘আমি তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে চাই। কথা দিচ্ছি, আর কখনো তোমাকে ফোন করবো না।’
‘কথা বলে কী হবে তোমার? কী পাবে তুমি?’
‘আমার লোকসান ছাড়া আর তো কিছুই নেই। কথা বলতে চাই কিছু প্রশ্নের জবাব খুঁজতে।’
‘তুমি নিশ্চয় জেনে গেছো, আমার বিয়ে হয়ে গেছে?’
‘হুম। জানলাম মাত্র!’
‘এরপরও তুমি আমাকে ফোন করলে?’
‘হ্যাঁ, ফোন করলাম। ফোন করলাম অমীমাংসিত এক উপখ্যানের হঠাৎ বিপরীতমুখী যবনিকার অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজতে।’
রিয়াজের মনে হলো ওর কথায় শরৎ সাহিত্যের আবহ ফুটে উঠেছে এবং ফোনের ও-প্রান্তে প্রপা ওর কথায় হয়তো ঠোঁট উল্টিয়ে পরিহাস প্রকাশ করছে। ওসব আজ গায়ে মাখবে না ও। প্রপার সঙ্গে ধৈর্য নিয়ে কথা বলতে হবে। রিয়াজ মনে মনে নিজেকে শক্ত করছে। ও বললো-
‘তুমি কি আমার কথা শুনছো?’
কয়েক মুহূর্ত পর প্রপার কণ্ঠ-
‘শুনছি।’
‘তুমি নিশ্চয়ই ভালো আছো।’
‘এটা জানা কি জরুরি?’
বললো প্রপা। রিয়াজ বললো-
‘তোমার ভাগ্যবান হাসব্যান্ড কোথায়?’
‘ও বাইরে গিয়েছে। চলে আসতে পারে যে কোনো সময়। তুমি কী বলতে চাও, বলে ফেলো। ও চলে এলে আমি ফোন রেখে দেবো।’
‘তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছো আমি বাংলাদেশে চলে এসেছি?’
‘হুম। ফোনের নম্বর দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। তা বাংলাদেশে এলে কেনো?’
‘নিয়তি আমাকে নিয়ে এসেছে। নিজে আসিনি।’
এ কথার জবাবে প্রপা বললো-
‘রিয়াজ, আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে তোমার সঙ্গে কথা বলতে। তা ছাড়া আমি এখন অন্যের স্ত্রী!’
‘জানি, তুমি বিরক্ত হচ্ছো।’
‘আমি সত্যিই বিরক্ত হচ্ছি।’
‘আমি দুঃখিত। আগেই তো বলেছি, আমি কিছু বলতে চাই।’
‘রিয়াজ, এরপরও তুমি আমার সঙ্গে কোনো কথা বলতে চাও? তুমি আমাকে ঘৃণা করতে শেখো! ঘৃণিত এক নারীর সঙ্গে কী বলতে চাও?’
‘ওই যে বললাম, অমীমাংসিত জীবন কাহিনীর একটা উপসংসার চাই।’
‘শোনো, আমি এখন বিবাহিতা। অন্যের স্ত্রী। আমাকে ভুলে যাও।’
‘চেষ্টা করবো ভুলে যেতে। ভুলে যেতে হলেও তো কিছু কথা জানা দরকার।’
‘কী জানতে চাও? তাড়াতাড়ি বলো। ও যে কোনো সময় চলে আসতে পারে!’
‘জানতে চাই, আমার কী অপরাধ ছিল? কেনো আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলে? বাবার অসুস্থতার কথা বলে ঢাকায় চলে এসে বিয়ে করলে। আমার অযোগ্যতা কি ছিল? আর মিথ্যা কথা বলেছিলে কেনো?’
এ প্রশ্নের জবাব দিতে একটু সময় নিলো প্রপা। রিয়াজ লাইনে আছে। ও প্রশ্নগুলোর জবাব চায়। প্রায় এক মিনিট পর প্রপার কণ্ঠ শোনা গেলো। প্রপা বললো-
‘রিয়াজ, এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না। শুধু এটুকু বলবো, আমাকে ভুলে যাও। নিজের জীবন সাজাতে চেষ্টা করো।’
‘এ কথার মধ্য দিয়ে কি আমার প্রশ্নের জবাব হলো?’
‘রিয়াজ, আমি তোমার এ প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত নই। তুমি ফোন রেখে দাও এবং আমাকে আর কখনো ফোন করবে না।’
রিয়াজ একটা বড় করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। ও আজ কোন প্রপার সঙ্গে কথা বলছে? এই প্রপাই কি সেই প্রপা, যার সঙ্গে যুগল জীবনের স্বপ্ন মধুর কাব্যময়তায় সময় পার করতো। জীবন চলার পথে কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না, এমন প্রতিশ্রুতি প্রপা নির্মোহকণ্ঠে রিয়াজকে দিয়েছিল। অবশ্য প্রপা নায়াগ্রার জলপ্রপাতের সামনে রিয়াজকে বলেছিল, ‘তুমি সব সময় আমার কছে হেরে যাবে। কখনোই জিততে পারবে না।’ ওকে আরো বলেছিল, ‘পরাজয়টা তোমার ভবিতব্য। জয়টা আমার প্রাপ্য।’ কথাগুলো তর্কের একপর্যায়ে বলেছিল প্রপা, কিন্তু সেদিন রিয়াজ ভাবেনি ওই কথাই ওর জীবনে চরম সত্য হয়ে দেখা দেবে। আজ চরমভাবে ও পরাজিত। শুধু পরাজিত নয়, প্রবঞ্চিতও। এই গ্লানিময় প্রবঞ্চার যন্ত্রণা সহ্য করেও রিয়াজ কথা বলার চেষ্টা করছে। ও-প্রান্ত থেকে প্রপা বললো-
‘আচ্ছা, তুমি আমার ফোন নম্বর পেলে কী করে?’
‘আমি তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোমার বাবাকে বললাম, আমি তোমার বন্ধু নিউইয়র্ক থেকে এসেছি। তার কাছে তোমার সেলফোন নম্বর চাইলাম, তিনি দিয়ে দিলেন। আমি এখন কথা বলছি, তোমাদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে।’
ও-প্রান্তে প্রপা কিছু বললো না। রিয়াজ বললো-
‘তোমার স্বামী কী করেন? কিভাবে বিয়ে হলো? স্যাটেল ম্যারেজ?’
‘আমার স্বামী কী করেন, এটা তোমার জানার বিষয় নয়। স্যাটেল ম্যারেজ। আর কিছু জানতে চাও?’
‘কেনো তাকে বিয়ে করলে জানতে পারি?’
‘এ কথা বললে তুমি বিশ্বাস করবে না।’
বললো প্রপা। রিয়াজ নাছোড়বান্দার মতো বললো-
‘তারপরও বলো, দেখি বিশ্বাসযোগ্য কি-না।’
‘আমি বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি, রিয়াজ। বিশ্বাস করো!’
‘বাধ্য হয়েছো! কেনো?’
‘সে অনেক কথা!’
‘সংক্ষেপে বলো। আমি শুনতে চাই। অন্তত সান্ত্বনার জন্য হলেও শুনতে চাই।’
বললো রিয়াজ। প্রপা ফের কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললো-
‘বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে এসে দেখি বাবার চেয়ে মা বেশি অসুস্থ। অসুস্থ মায়ের আপসহীন অনুরোধে আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। আমার মা খুব জেদি। তার জেদের কাছে আমি হেরে গেছি রিয়াজ। আমার কোনো উপায় ছিল না। মা এতোই অসুস্থ ছিল যে, মনে হচ্ছিলো মাকে বাঁচাতে হলে মায়ের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে হবে।’
এ পর্যন্ত বলে থামলো প্রপা। রিয়াজ মুষড়ে গেলো। ও বুঝতে পারছে না প্রপার মা আজ হাঁটতে বেরুলো কিভাবে। তিনি কি মেয়েকে বিয়ে দেবার জন্য অসুস্থতার নাটক করেছিলেন? না-কি এমন হতেও পারে? প্রশ্নটা ওর মনে জাগলেও ও প্রপার প্রতি রাগ অনুভব করলো। ও বললো-
‘প্রপা, বলতো, আমার সঙ্গে কি তুমি প্রেম করেছিলে? না-কি অভিনয় করেছিলে?’
রিয়াজের এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না প্রপা। ও চুপ করে রইলো। রিয়াজ বললো-
‘প্রশ্নটা কি খুব কঠিন, প্রপা?’
‘তুমি কেনো এ প্রশ্ন করছো? আমি তোমাকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি, এরপরও নিজেকে বলতে হবে আমি প্রতারণা করেছি কি-না?’
‘অপ্রিয় ও বিব্রতকর হলেও প্রশ্নটার জবাব আমার জানা দরকার।’
বললো রিয়াজ। প্রপার কোনো জবাব না পেয়ে ও বললো-
‘আমি জানি, তুমি এ প্রশ্নের জবাব দেবে না।’
‘তা হলে কেনো এ প্রশ্ন করছো?’
‘মন মানছে না। তাই করছি। কোনো প্রশ্ন না করে তোমাকে অভিবাদন জানাতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আমি অতোটা উদার মানসিকতার পরিচয় দিতে পারলাম না, প্রপা। রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ আমি। নিজেকে মহৎ করার চেষ্টা করি ঠিক, হতে পারি না। আজ যদি তোমার নতুন জীবনের যাত্রাপথে ফুল ছিটিয়ে দিতে পারতাম, তবে আরো ভালো হতো। অথচ দেখো, বুকের ভেতরে তুমুল ভাঙচুর হচ্ছে। বুকের ভেতরে হু হু কান্না নায়াগ্রার জলপ্রপাতের মতো নামছে। আমি এতো সাধারণ এক মানুষ না হয়ে যদি দেবদাসের মতো হতে পারতাম, তা হলে তোমাকে না পাওয়ার কষ্টকে এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারতাম।’
রিয়াজ যখন এ কথাগুলো বলছিল তখন ওর অজান্তেই যেনো দুচোখ দিয়ে অশ্রুজলের দুটি ধারা গড়িয়ে নামলো। ‘ভাগ্যিস, প্রপা সামনে ছিল না। নইলে রিয়াজের এই নিদারুণ অসহায়ত্ত প্রপাকে অহঙ্কারী করে দিতো।’ ভাবলো রিয়াজ। ও চোখের জল মুছে নিলো। ও-প্রান্ত থেকে প্রপা বললো-
‘তুমি বরাবর দেবদাসের সমালোচনা করতে। বলতে দেবদাস প্রকৃত অর্থে ভীতু এবং কাপুরুষ। এখন দেবদাস হতে চাচ্ছো?’
‘আমি এখন যে অবস্থান থেকে কথা বলছি, সেখান থেকে মনে হচ্ছে দেবদাস হচ্ছে প্রকৃত সাহসী প্রেমিক। যে নিজের প্রেমিকাকে হারিয়েও টু শব্দ করেনি। কষ্টকে নিজের মধ্যে লালন করেছে। মৃত্যুকে অনায়াসে আলিঙ্গন করেছে। তবু পার্বতীর জন্য ভেঙে পড়েনি। আর আমি তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কী আকুলতাই প্রকাশ করেছি। প্রবলভাবে প্রবঞ্চিত হবার পরও বোকার মতো প্রশ্ন করছি, কেনো প্রবঞ্চিত করলে? নিজের এই ব্যক্তিত্বহীনতা নিজেকে ভিখারি বানিয়েছে। আর তোমার অহঙ্কারকে করেছে আরো উজ্জ্বল।’
এ পর্যন্ত বলে রিয়াজ থামলো। প্রপা কোনো কথা বলছে না। রিয়াজের মনে হচ্ছে প্রপা যে কোনো সময় ফোনের লাইন কেটে দেবে। ও বললো-
‘তোমাকে আরেকটা কথা বলতে চাই।’
‘বলো।’
‘তুমি সুখে থেকো। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।’
‘কেনো, অভিশাপ দেবে না?’
জানতে চাইলো প্রপা। রিয়াজ কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ও-প্রান্ত থেকে প্রপা ককিয়ে উঠলো,
‘রিয়াজ, রাখছি। ও এসে গেছে!’
এ কথা বলে প্রপা ফোনের লাইন কেটে দিলো। রিয়াজের মনে হলো প্রপাকে ওর আর কিছু বলার নেই।
ও নিজেকে নিজে মনে মনে বললো-
‘প্রপা, তোমার নামের অর্থ হচ্ছে জলের উৎস। আমি জলের উৎসের কাছে গিয়ে জল চেয়েছিলাম। আর তুমি আমাকে জলপ্রপাতের উপত্যকায় এনে নিচে ঠেলে দিয়েছো। আমার অনিবার্য পতনে তোমার কী প্রাপ্তি হলো জানি না। তোমাকে না পেয়ে আমি হলাম এ কালের দেবদাস। রিয়াজের বুক ছাপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠলো। ওর বুক ভেঙে উথলে উঠছে কান্না। বুক সামলালেও চোখ সামলাতে পারছে না ও। ওর দুচোখে নায়াগ্রার জলপ্রপাত নেমে এসেছে যেনো। ও রুমাল বের করে এই জলপ্রপাত মুছার চেষ্টা করলো না। গভীর বেদনার এই জলপ্রপাত আটকানো যায় না। প্রপাদের বাড়ির গেটের সামনে রিয়াজ অশ্রুসজল চোখে অনেকক্ষণ অকারণে দাঁড়িয়ে রইলো।
পাদটীকা : জীবন থেমে থাকে না, জীবন চলে জীবনের নিয়মে। এ গল্পের চরিত্রগুলোর জীবনও থেমে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রে আর ফিরে যায়নি রিয়াজ। নিউইয়র্কে বাস করছে প্রপা। বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে ওর স্বামীও চলে যান নিউইয়র্কে। রোমান অবশেষে বিয়ে করেছে এলিনাকে। অলক জেনিফারের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছে। শায়লা নিউইয়র্কে ফিরে গেলেও জয়নালের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। রিয়াজের সঙ্গে প্রপার বিয়ে হয়েছে- এ কথা ভেবে শায়লা কখনো রিয়াজের খোঁজ নেয়নি।
________________________________________
ফেরারী বসন্ত
এক.
লোকটিকে দেখে চিনতে পারলো না নীরব। লোকটিকে একপলক দেখেই বলে দেয়া যায়, সে বিত্তবান কেউ হবে। তার গায়ে নেভি ব্লু স্যুট। সাদা শার্ট। লাল রঙের ওপর নকশা করা টাই। পায়ে টিম্বারল্যান্ড ব্র্যান্ডের কালো জুতো। গা থেকে ক্যানিথকোল পারফিউমের মৌ মৌ গন্ধ ভেসে আসছে। লোকটি ভিআইপি কেউ হবে। ভিভিআইপিও হতে পারে। এমন একজন লোক ওর সঙ্গে কেনো দেখা করতে এসেছে, বুঝতে পারলো না নীরব। মনে ফেনিয়ে ওঠা কৌতূহলের ঢেউ চোখের দৃষ্টিতে যাতে ফুটে না ওঠে, এ ব্যাপারে সতর্ক হলো ও। দুই বছরের কারাজীবন ওকে অনেক বদলে দিয়েছে। সরলতা ছিল ওর জীবনবোধের অন্যতম ভিত। সেই সরলতায় মরচে ধরেছে। সব কিছু সহজভাবে বিশ্বাস করার স্নিগ্ধ চেতনা মিইয়ে গেছে। সামান্য কিছু পেয়ে উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হওয়া বা না পেয়ে বিষণ্ন হবার অনুভূতি কি ওর আছে? তাও নেই। ওর এখন অনেক কিছুই নেই। মাঝে মাঝে ওর মনে হয়, ও শুধু বেঁচে আছে। কারাবন্দি নিষ্প্রভ জীবন নিয়ে ও যেনো এক গন্তব্যহীন মরা নদী। এই নদীতে জোয়ার নেই, ভাটা নেই, ঢেউ নেই, তরী নেই- কিছুই নেই। দুর্ভাগ্যের পাহাড়ে আটকে থাকা ও যেনো এক অভিশপ্ত নদী। ওর পুরো জীবনজুড়ে ঘন কুয়াশার গভীর হতাশা জমাট বেঁধে আছে। লোকটিকে দেখে এ কথাগুলো ওর মনে উঁকি দিলো। ধোপদুরস্ত পোশাকের এই লোকটি ওর কাছে কেনো এসেছে, ও জানে না। নীরবকে দেখে ম্লান হাসলো লোকটি। লোকটি হাসলে তার চোখের মণি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ও মনে করতে পারলো না, এমন একটি লোকের সঙ্গে ওর পরিচয় ছিল কি-না। অথচ লোকটি ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। খুব ঘনিষ্ঠজন না হলে খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে দেখতে আসার কথা নয়। ও লোকটির চোখে চোখ রেখে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললো- ‘আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। আপনি কি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’
‘আপনার নাম কি নীরব?’ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো লোকটি।
‘হুম।’
‘পুরো নাম?’
‘পুরো নাম আহসান হাবিব নীরব। কেনো, বলুন তো?’
‘না, আমি নিশ্চিত হতে চাচ্ছি। নাবিলা হত্যাকাণ্ডে আপনার চৌদ্দ বছর জেল হয়েছে, তা-ই না?’
প্রশ্নটা শুনতে ভালো লাগলো না। তবু ও মুখে কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটি বললো- ‘দুঃখিত, আপনাকে প্রশ্নটা করতে হলো বলে। মিস্টার নীরব, আমার নাম শাকিল চৌধুরী। পেশায় ব্যবসায়ী।’
‘আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারছি না। শাকিল চৌধুরী নামে আমি কাউকে চিনতাম না।’ নীরব বুঝতে পারছে না, ওর সঙ্গে শাকিল চৌধুরী কেনো দেখা করতে এসেছে। ও রহস্যের মধ্যে পড়ে গেলো।
শাকিল চৌধুরীর মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে আছে। সে বললো- ‘এটা ঠিক, আপনি আমাকে চেনেন না এবং আমিও আপনাকে চিনতাম না।’
‘তা হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন কেনো?’
নীরবের প্রশ্নে ফের ম্লান হাসলো শাকিল চৌধুরী। তার চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল হলো। ‘আপনার সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্য আছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি।’
শাকিল চৌধুরীর কথায় দ্বিধান্বিত হলো নীরব। ও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে। ‘আমার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা! কী বলছেন! একজন খুনির সঙ্গে কী আলোচনা হতে পারে?’
শাকিল চৌধুরী নীরবের বিস্ময় গায়ে মাখলো না। সে বললো- ‘মিস্টার নীরব, আমি অকারণে আসিনি। এটুকু নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। তবে আপনার বিস্মিত হবার কারণ আছে। আপনি আমাকে চেনেন না, তাই বিস্মিত হচ্ছেন। আসার কারণ বললে আপনার বিস্ময় কমবে।’
‘তা হলে আসার কারণ বলুন, প্লিজ।’ তাগিদ দেবার মতো করে বললো নীরব।
শাকিল চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো। নীরব তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শাকিল চৌধুরী বললো- ‘কী দিয়ে শুরু করবো, বুঝতে পারছি না। আপনার বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা আগে বলবো কি-না ভাবছি।’
নীরবের বুকের ভেতরে মৃদু একটা ঝড় উঠলো যেনো। এতোদিন পর বাবা-মা, ভাই-বোনের কথা শুনে মুহূর্তেই ওর বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠলো। সেই কবে মা-বাবাকে দেখে এসেছে। কতো দিন হয়ে গেছে, মাকে দেখে না! নাবিলা হত্যা মামলায় গ্রেফতার হবার আগে ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল ও। মায়ের জন্য একটা কলাপাতা রঙের জামদানি শাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। নীরব কখনো মাকে একটা ভালো শাড়ি পরতে দেখেনি। শাড়ি দেখে ওর মা চোখের জল মুছে বলেছিল- ‘তুই এতো টাকা খরচ করেছিস কেনো? ঠিকমতো পড়াশোনা করছিস তো?’
আবেগমথিত কণ্ঠে ও বলেছিল- ‘মা, ঈদের দিন শাড়িটা পরো। তোমাকে কখনো ভালো শাড়ি পরতে দেখিনি।’
‘কী যে বলিস! তুই যখন খুব ছোট ছিলি, তখন তোর বাবা কতো শাড়ি কিনে দিতো! এখন না হয় কিনে দিতে পারে না।’
‘মা, আমি পড়শোনা শেষ করে যখন চাকরি করবো, তখন প্রতিমাসে বেতন পেয়ে তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেবো।’
ওর মা কেবল চোখের জল মুছেছিল। ছেলের কথায় তার মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠেছিল। আজ অনেক দিন পর মায়ের মুখটি ওর মনে ভেসে উঠলো। ওর মা কি শাড়িটা পরেছিল? কে জানে, হয়তো পরেনি। বাবা কেমন আছে? আমাদের চারপাশে এমন কিছু লোক আছে, যারা সারাক্ষণই চুপসে থাকে। খুব একটা কথা বলে না। কারো সঙ্গে তর্ক করে না। কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে না, আবার মাথাও ঘামায় না। এমন কী নিজের সংসারে কী আছে, বা কী নেই- এসব নিয়েও ভাবে না। তারা যেনো বেঁচে থাকার জীবন প্রণালিতে নিজেদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে অভ্যস্ত। জগৎ-সংসার নিয়ে তারা হয় উদাসীন, নয় তো অসহায়। ওর বাবাও সেরকম একজন। তিনি তরুণ বয়সে ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন, সফল হননি। বিয়ের পরপর জমি বিক্রি করে বাজারে একটি বড় মনোহারির দোকান দিয়েছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে ব্যবসা বেশ জমেও গিয়েছিল। এই সফলতার অধ্যায় ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একদিন দোকানে আগুন লাগলো। অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু ধূলিসাৎ। ওর বাবা আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি, বা দাঁড়াতে চেষ্টাও করেননি। একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন। ওদের দোকানে কেউ ঈর্ষাবশত আগুন লাগিয়ে দিয়েছে- এমন কথা শোনা গিয়েছিল। বাবা ও কথার সত্যতা খুঁজতে যাননি। নিজের ভেতর চুপসে থাকা সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে সংসারে অসহায় মানুষের কাতারে নিজেকে দাঁড় করিয়ে নেন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কিছু কৃষি জমি ছিল, ওসব বর্গা দিয়ে যা আয় করতেন, তা ওর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে চোখ-কান বন্ধ করে থাকতেন যেনো। অভাব-অনটন ওদের সংসারে নিয়মিত অতিথির মতো দেখা দিতো। মায়ের ইচ্ছা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে নীরব। তখন ওদের সুদিন আসবে। কিন্তু তা আর হলো কই? আজ এতোদিন পর নীরবের চোখের সামনে একঝলক অতীত দীর্ঘশ্বাসের মোড়কে ভেসে ওঠে। ওর ছোট ভাই রায়হান কি পড়াশোনা করছে? ও নিশ্চয় কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট বোন নায়না নিশ্চয় এখন কলেজে ভর্তি হয়েছে। ও নিশ্চয় কিশোরী থেকে তন্বী তরুণী হয়েছে। ও কি নীরবের নিরুদ্দেশের কথা ভেবে কখনো কখনো ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে? প্রশ্নগুলো একের পর এক উদয় হয় আর ওর বুকের ভেতরে হাহাকার তুলে দেয়। কারাগারের চার দেয়ালের মতোই এ প্রশ্নগুলো ও বন্দি করে রেখেছিল। আজ শাকিল চৌধুরী আসায় দেয়াল ভেঙে প্রশ্নগুলো বেরিয়ে এলো। নীরবের চোখের দৃষ্টি ছলকে ওঠে। চোখের কোণ থেকে জলের ধারা নেমে আসতে উদ্যত হয়, ও তা সামলে নেয়। কারো সামনে চোখের জল ফেলা নিজের দুর্বলতার প্রকাশ। ও নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না। নীরব কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিলো। শাকিল চৌধুরী শিকার ধরার মতো করে ফের কথা বললো- ‘আপনার বাবা-মা, ভাইবোন কেউ জানে না যে আপনি কারাগারে বন্দি। এটা আমাকে খুব ভাবিয়েছে। এই পাবলিসিটির সমাজে কেউ কি এমন অন্তরালে থাকতে পারে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য, বলুন?’
শাকিল চৌধুরীর কথায় ককিয়ে উঠতে চায় নীরবের মন। ও নিজের ভেতরের ঝড় সামলে নেয়। নিজেকে আবেগের কাছে ছেড়ে দিলে কারাবন্দি জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, এটা ও জানে। ওর চোখ ফেটে জল নেমে আসতে চায়। ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। শাকিল চৌধুরী বলে- ‘আপনার ছোট বোন নায়না কলেজে পড়ছে। আপনি তাকে শেষ দেখেছেন ও যখন নাইনে পড়ছিল। আপনার ছোট ভাই রায়হান হাবিব ছোটখাটো একটা চাকরি করছে। ও অনার্স পরীক্ষা দিতে পারেনি। আপনার বাবা হাবিবুর রহমান হাই ব্লাড প্রেসারের রোগী। আপনার মা সংসার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আপনাদের সংসারে অভাব-অনটন এ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, প্রায়ই অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হয় আপনার বাবা-মা, ভাই-বোনকে। এর ওপর সংসারের মেধাবী ও বড় সন্তান নিরুদ্দেশ। ভেবে দেখুন তো, আপনার বাবা-মার মনের অবস্থা কী রকম!’
নীরব চুপ থাকতে পারলো না। ও অনেকটা আর্তনাদ করে বলে উঠলো- ‘শাকিল সাহেব, কী চান আমার কাছে! কে আপনি?’ নীরবের কণ্ঠ বিষণ্ন শোনায়।
নরম কণ্ঠে শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আপনার মন খারাপ করে দিলাম বলে আমি আবারো দুঃখ প্রকাশ করছি।’
নীরব চুপ করে থাকে।
শাকিল চৌধুরী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে শাকিল চৌধুরীর দিকে মুখ তুলে নীরব বলে- ‘আপনি কী চান আমার কাছে?’
‘সহযোগিতা।’
‘সহযোগিতা! আমার কাছে! আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?’
‘পারেন। এ জন্যই তো এসেছি।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, একজন কারাবন্দি মানুষ কী সহযোগিতা করতে পারে?’ বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব।
এবারো নীরবের বিস্ময়বোধ গায়ে মাখলো না শাকিল চৌধুরী। সে কণ্ঠ নামিয়ে বললো- ‘আপনি আমাকে ভীষণ রকম সহযোগিতা করতে পারেন। শুধু আপনি “হ্যাঁ” বললেই হয়ে যাবে।’
নীরব দুকাঁধ উঁচিয়ে ছেড়ে দিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বললো- ‘আপনার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’
শাকিল চৌধুরী মৃদু হাসলো। ‘খুলে বলছি। আপনাকে ধৈর্য ধরে শুনতে হবে।’
‘বলুন, আমি শুনবো। তার আগে আপনার বিশদ পরিচয় দিন।’
‘পরিচয় তো দিলাম। আমি একজন ব্যবসায়ী।’
‘কিন্তু আমার কাছে…’
‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণে আপনার কাছে এসেছি। বলতে পারেন, একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। বিজনেস ডিল।’
‘বিজনেস ডিল! কী রকম?’ নীরবের বিস্ময় আরো বাড়ে।
শাকিল চৌধুরীর মুখে হাসি লেগে আছে। সে বলে, ‘তার আগে আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই।’
‘প্রশ্ন? কী প্রশ্ন?’
‘বলছি। আপনি একটু স্বাভাবিক হন। আপনার মধ্যে একরাশ বিস্ময় জমাট বেঁধে আছে।’
‘আমার বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কী করার আছে, বলুন? আপনি প্রশ্ন করুন। আমি তৈরি।’ বললো নীরব। ও বুঝতে পারছে, শাকিল চৌধুরী নাছোড়বান্দা ধরনের লোক। ঝানু ব্যবসায়ীর মতো তার আচরণ। সে নিশ্চয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে। তার কথা শুনতে হবে। মনে মনে একথা ভেবে নীরব নিজেকে প্রস্তুত করলো।
শাকিল চৌধুরী নীরবের চোখে চোখ রেখে বললো- ‘আপনি নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেননি। তার মানে আপনি এই রায় মেনে নিয়েছেন। কেনো?’
প্রশ্নটির জবাব দিতে হলে অনেক কথা বলতে হবে। নীরব এ ব্যাপারে বিশদ কিছু বলতে প্রস্তুত নয় বা বলতে চায় না। দুবছর পর এসব কথা বলেই বা কী লাভ? ও বললো- ‘এ ছাড়া আমি কী করতে পারতাম? আমাকে সাহায্য করতো কে? উকিলের জন্য কোথায় টাকা পেতাম? তা ছাড়া সে সময় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। তাই রায় মেনে নিই। আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব।’
‘ঠিক আছে। এবার বলুন, আপনি বাকি বারো বছর জেলে থাকার জন্য প্রস্তুত?’
‘এ ছাড়া আর উপায় কী? জেলে তো থাকতেই হবে।’ বললো নীরব। ও শাকিল চৌধুরীর কথার সারমর্ম বুঝতে চেষ্টা করছে।
শাকিল চৌধুরী বললো- ‘এটা নিয়েই আপনার সঙ্গে আমি একটা ব্যবসায়িক ডিল করতে চাই।’
‘ঠিক বুঝতে পারছি না। খুলে বলুন।’ শাকিল চৌধুরীর কথায় নীরব বিরক্তবোধ করলো।
শাকিল চৌধুরী কয়েক মুহূর্ত সময় পার করে বললো- ‘মিস্টার নীরব, আপনাকে তো আরো এক যুগ কারাগারে থাকতে হবে। কারাগার থেকে বের হবার পর আপনার জীবন কী হবে, কোন দিকে যাবে, তা আপনিই বলতে পারবেন। তবে আমি বলতে পারি, জেল থেকে বের হবার পর আপনি এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে এগুবেন। আপনার পরিবার আরো অসহায় পরিস্থিতিতে পড়বে। আপনার আজকের তারুণ্য থাকবে না। সমাজেও আপনি অপরাধী হিসেবে ট্রিটেড হবেন। এ কথাগুলোর সঙ্গে আপনি কি একমত?’
‘দ্বিমত করবো কিভাবে? এটা আমার ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য বলতে পারেন!’ কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আপনি ভাগ্য বলে মেনে নিচ্ছেন। আর আমি আপনার ভাগ্য বদলাতে না পারলেও এখান থেকে আপনাকে কিছু পাইয়ে দেবার চেষ্টা করবো, যা আপনার ভাগ্য বদলাতে সাহায্য করবে।’
‘মানে?’
‘বলছি, সবটুকু না শুনলে বুঝতে পারবেন না।’ শাকিল চৌধুরী থামলো। তার সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় সিগারেট খাওয়া তার অভ্যাস। কিন্তু ওর সঙ্গে সিগারেট নেই। একটা অস্বস্তি তাকে গ্রাস করলো।
নীরব তাকিয়ে আছে শাকিল চৌধুরীর দিকে। শাকিল চৌধুরী নিজের শার্ট ও প্যান্টের পকেট হাতালো কিছুক্ষণ। সে জানে, তার সঙ্গে সিগারেট নেই, তবু সে পকেট হাতিয়ে দেখলো সিগারেট পাওয়া যায় কি-না। পকেটে সিগারেট না পেয়ে নীরবের দিকে তাকিয়ে লজ্জিতভাবে হাসলো। ‘মিস্টার নীরব, আপনাকে আমি জেলখানা থেকে বের করে আনবো। এরপর আপনাকে ফের একটি অপরাধের ঘটনার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে কারাগারে আসতে হবে। আপনার ফের সাজা হবে। সাজা সর্বোচ্চ আট-দশ বছরের জেল হতে পারে। তার মানে আপনার যে বারো বছর জেল খাটার কথা, একই মেয়াদকাল পর্যন্ত আপনি জেলে থাকবেন। আমার কথায় রাজি হলে বিনিময়ে আপনার পরিবারের সদস্যদের প্রতিষ্ঠিত করাসহ আপনার ভবিষ্যতের জন্যও কিছু করবো। অল্প কথার মধ্যে যা বললাম, তা বুঝতে পেরেছেন?’
শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলো নীরব। এটাও কি সম্ভব? একজন ব্যক্তি বিনা অপরাধে খুনি হয়ে গেলো, আদালত তাকে কারাদণ্ড দিলো। আবার ওই খুনিকেই কিভাবে জেলখানা থেকে বের করে ফেলা যায়? জেলখানা বা আইন আদালত কি এ ধরনের লোকদের পকেটে থাকে না-কি? প্রশ্নটা নীরবের মনে জাগলো। আবার নতুন একটা অপরাধের দায়-দায়িত্ব নিয়ে ওকে জেলে আসতে হবে। অর্থাৎ আরেকটি অপরাধের দায় ওকে স্বীকার করতে হবে। এর বিনিময়ে ওর ভাগ্য বদলাতে পারে, অর্থাৎ আর্থিক স্বচ্ছলতা আসতে পারে। অর্থের প্রতি ওর মোহ নেই। অর্থ দিয়ে ও কী করবে? নীরব চুপ করে ভাবতে লাগলো। শাকিল চৌধুরী কিছুক্ষণ নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নীরবতা ভাঙতে সে বললো- ‘আমি জানি, হঠাৎ করে এ ধরনের প্রস্তাব পেয়ে আপনি অবাক হয়েছেন। এবং ভাবছেন, কী করবেন। এ প্রস্তাবটি নিয়ে আপনি কয়েক দিন ভাবুন। আমি অন্য একদিন এসে জেনে নেবো, আপনি রাজি আছেন কি-না।’ কথাটা বলে নীরবের দিকে তাকিয়ে ফের মিষ্টি করে হাসলো সে।
নীরব বললো- ‘আপনার উদ্দেশ্য কী, বলুন তো? আমাকে দিয়ে কী করাতে চান?’
‘আমি প্রথমেই বলেছি, আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি এসেছি একটা ব্যবসা করতে। ব্যবসাটা করতে পারলে আমার অনেক লাভ হবে। আপনার হবে সামান্য। এই তো।’
‘আমাকে দিয়ে ব্যবসা করাতে চাইছেন কেনো? আমার পরিচয়ই বা পেলেন কিভাবে?’
‘আপনার পরিচয় কিভাবে পেয়েছি, সেটি বড় কথা নয়। প্রস্তাবটার কথা ভাবুন। এতে আপনার লাভ হবে। অন্যথায় অকারণে কারাগারের অন্ধকারে পচে মরবেন!’
‘কিন্তু আপনি আসলে কী করতে চান? আমাকেই বা বেছে নিলেন কেনো?’ কৌতূহল প্রকাশ করে নীরব।
শাকিল চৌধুরীর মুখে যেনো উত্তরটা তৈরি ছিল। সে বলে, ‘ভেরি সিম্পল অ্যান্সার। আমি যা করতে চাই, এর মধ্যে নাটকীয়তা আছে। এই নাটকীয়তার জন্যই আপনাকে প্রয়োজন। এই প্রয়োজন থেকে আপনার খোঁজখবর নিয়েছি। আপনার সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জানি। আপনার বাবা-মা, ভাইবোন সকলের সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি।’
‘কেনো?’
‘প্রয়োজনেই খোঁজ নিয়েছি। অবাক হয়েছি, যখন জানতে পারলাম, তারা কেউ আপনার কারাবন্দির কথা জানে না। আপনার বাবা-মার ধারণা, আপনি হারিয়ে গেছেন বা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। মারা গিয়েও থাকতে পারেন- এমন আশঙ্কাও তাদের আছে।’
‘আমি তো মৃতই!’ কথাটা বলতে গিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীরব। ওর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। ও নিজেকে সামলে নেয়। শাকিল চৌধুরী ওর বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গেও দেখা করেছে। সে অনেক হিসাব করেই পা ফেলে, বুঝতে পারছে ও। কিন্তু ওকে নিয়ে তার ব্যবসাটা কী, এটা বুঝতে পারছে না। নীরব ভেবেছিল, শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বাড়াবে না। কিন্তু ওর মনের কৌতূহল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আপনি আসলে মৃত নন। জীবন্মৃত। আপনার সামনে দুটি অপশন আছে। তা হলো, আপনি জীবনকে বেছে নেবেন, না-কি মৃতই থেকে যাবেন। সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে।’
‘আপনার কথায় রহস্য আছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আপনার উদ্দেশ্য কী?’
‘আমার উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, আপনি ভাবুন আপনার লাভ কী হবে। তা হলে আলোচনাটা এগুতে পারবে।’
‘শাকিল সাহেব, আপনি ব্যবসায়ী, তাই লাভ-লোকসানের কথা ভাবেন। আমি কিন্তু ব্যবসায়ী নই।’
‘আপনি একটু বোকা, এরকম আমি শুনেছি। কিন্তু দুবছর জেল খাটার পর কেউ আর বোকা থাকে না, এটা আমার ধারণা। আমি জানি, জেলখানায় থাকলে বোকা, নিরীহ বা অসহায় লোকদের বুদ্ধি খুলে যায়। জেলখানা হচ্ছে অপরাধীদের আশ্রয়স্থল। এই আশ্রয়স্থলে বোকারাও অনেক কিছু শিখে ফেলে। আমি কি ভুল বললাম?’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি শাকিলের চোখে।
নীরব ম্লান হাসলো। ‘আপনার কথাটা ঠিক কি-না, ভেবে দেখবো। তবে আমি বোকা হলে আমাকে দিয়ে আপনার ব্যবসা হবে কিভাবে?’
‘ব্যবসার জন্য আপনার মতো লোকই আমার দরকার। এখানে বোকা-চালাকের হিসাব নেই। তবে বোকার মতো আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে আমার একটু অসুবিধা হবে। যে স্ক্রিপ্ট আমি তৈরি করেছি, এর রদবদল করতে হবে। এই যা!’
‘আপনার কথায় আকর্ষণ আছে।’
‘আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি হলে অনেক অ-নে-ক টাকা পাবেন। টাকার আকর্ষণটা অনেক বড়, নীরব সাহেব।’
শাকিল চৌধুরীর এ কথাটায় নিজের মধ্যে মৃদু আঘাত লাগলো। নীরব কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুটিয়ে বললো- ‘আমার টাকার প্রতি আকর্ষণ নেই।’
নীরবের কথায় স্মিত হাসলো শাকিল। ‘আকর্ষণ নেই, তবে প্রয়োজন যে আছে, সেটি নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না? টাকা ছিল না বলেই আপনি খুন না করেও খুনের সাজা ভোগ করছেন।’ শ্লেষ মিশিয়ে বললো শাকিল চৌধুরী।
‘শুধু কি টাকার জন্য আমার সাজা হলো? সমাজ, আইন, রাষ্ট্র কি এসব দেখবে না, বলুন?’
‘শুনুন, টাকা থাকলে আপনার কিছুই হতো না। সমাজ, আইন, পুলিশ, রাষ্ট্র- সব আপনার পক্ষে থাকতো। একথা কি এখনো বুঝতে পারেননি?’
এর জবাবে কিছু বললো না নীরব। ওর মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলো। শাকিল চৌধুরীর কথা ফেলে দেয়া যায় না। টাকা থাকলে হয়তো বিনা অপরাধে ওকে জেল খাটতে হতো না। নীরব ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আপনাকে আরেকটা কথা বলছি। আমি খেঁাঁজ নিয়ে জেনেছি, আপনাকে নাবিলা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থ ঢেলেই আপনাকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। নাবিলার প্রকৃত খুনি ভালোভাবেই জীবনযাপন করছে। আপনি যদি নাবিলার প্রকৃত খুনিকে বিচারের সম্মুখীন করতে চান, তা হলে আপনাকে জেল থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবটা কিন্তু লোভনীয়, ভেবে দেখবেন।’
কথা শুনে কেমন শিহরণ অনুভব করলো নীরব। নাবিলার প্রকৃত খুনির সন্ধান জানে শাকিল চৌধুরী। এ কথা ভাবতেই নীরবের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেলো। দুবছর পর নীরব নিজের মধ্যে একটা তোলপাড় অনুভব করলো। শাকিল চৌধুরী ধূমকেতুর মতো উদয় হয়ে ওর ভেতরে কেমন জাগরণ সৃষ্টি করে দিলো। নীরব প্রথমে ভেবেছিল, শাকিল চৌধুরীকে উপেক্ষা করবে; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তাকে উপেক্ষা করা যাবে না। সে নীরবের ভেতরে নির্জীব বা নিষ্ক্রিয় সত্তাকে চাঙ্গা করে দিচ্ছে। নীরব কী বলবে, ঠিক করতে পারছে না। শাকিল চৌধুরী কারাগারের লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নীরবও অপরপ্রান্তে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
শাকিল নীরবের হাতে হাতের স্পর্শ রেখে বললো- ‘একটা চান্স নিয়ে দেখতে পারেন। আপনার তো হারাবার বা ক্ষতির কিছু নেই। অন্তত নাবিলার খুনি কে, তা জানতে হলেও আপনার জেলখানা থেকে বের হওয়া দরকার।’ শাকিল চৌধুরী কথাটা বলে নীরবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
নীরব চুপ করে আছে। ও শাকিল চৌধুরীর কথাগুলো ভাবছে। ওর মনের মধ্যে এতোদিনের পুঞ্জিভূত রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, হতাশা একসঙ্গে তোলপাড় করছে। মরা নদীতে যেনো জোয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ওর মুখে কোনো কথা ফুটছে না।
শাকিল চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ‘আমি যাচ্ছি। কয়েকদিন পর আবার আসবো। আপনার জবাব পেলে আমি আমার কাজ শুরু করবো। আশা করি, আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। এমন সুযোগ কখনো পাবেন না।’ কথাটা বলে শাকিল চৌধুরী আর দাঁড়াল না। হনহন করে চলে গেলো।
নীরব হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আকস্মিক একটা ঝড় এসে যেনো হামলে পড়েছে ওর ওপর। ও অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
দুই.
দুবছর হলো নীরব কারাগারে বন্দি। এই দুবছরে ওর সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসেনি। আসার কথাও নয়। নীরব যে কারাগারে বন্দি, এ কথা ওর পরিবারের কেউ জানে না। ও নিজেও জানায়নি। জানালেও ওর কোনো লাভ হতো না। বরং ওর মা-বাবা অনেক কষ্ট পেতেন। ছেলে হত্যা মামলায় জেল খাটছে- এ কথা শুনলে সব মা-বাবাই কষ্ট পাবেন। বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী? একথা ভেবে বাবা-মাকে নিজের বিপর্যয়ের কথা জানায়নি ও। ছেলে হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট পাচ্ছে ওর মা-বাবা। ‘ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে’- এ ধরনের কষ্টের চেয়ে ‘ছেলে হারিয়ে গেছে’ এই কষ্ট অনেক বেশি সহনশীল। নীরব তা-ই মনে করে। ওর পরিবারের লোকরা জানে, ও হারিয়ে গেছে। কিংবা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কেউ কেউ আছে, হঠাৎ করে সংসার থেকে পালিয়ে যায়। নীরব ওর পরিবারের কাছে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ। অথচ ও হারাতে চায়নি। আর সবার মতো স্বাভাবিক জীবন চেয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। ভাগ্য বিড়ম্বনায় ও জড়িয়ে গেলো হত্যা মামলায়। সাজাও হলো। রায় হয়ে গেলো খুব দ্রুত। নাবিলাকে ভালোবাসার চরম মূল্য দিতে হলো ওকে। খুন না করেও খুনি হয়ে তলিয়ে গেলো কারাগারের অন্ধকার জগতে। জগৎ-সংসারে কতো বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে! নির্দোষ ব্যক্তি খুনের দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়, খুনি থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব কি জগতের বিচিত্র ঘটনা, না-কি বিচার ব্যবস্থার বিচিত্র প্রহসন? এ প্রশ্ন নীরবের মনে আকুলি-বিকুলি করে। নীরব জানে, এ প্রশ্নের জবাব ও কারো কাছ থেকে পাবে না। তবে একটা দ্বিধা ওর মনে লেগেই আছে। যাকে ও ভালোবেসেছিল, তাকে কেনো ও খুন করবে- এ কথাটা রায় ঘোষণাকারী বিচারকের মনে কেনো প্রশ্ন জাগালো না? এ প্রশ্নটা দ্বিধার প্রচ্ছন্নে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে ওর মনে। উকিলদের প্রতি ওর রাগ-ক্ষোভ পুাঞ্জভূত। উকিলদের বিবেকবোধ আছে কি নেই, এ নিয়ে ওর ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। ওর ধারণা, উকিলরা ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে অর্থের বিনিময়ে মামলার জন্য লড়েন। তারা হরহামেশা অর্থের জন্য আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। যার জন্য আইনি লড়াই করছেন, সে প্রকৃত অপরাধী কি-না কিংবা বিবাদী নিরপরাধ হয়েও দণ্ডাদেশ পাচ্ছে কি-না, এ ন্যায়সঙ্গত বিষয়টি উকিলদের বিবেচনায় থাকে না বলে মনে করে নীরব। খুনের মামলায় জড়িয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এতে আদালতপাড়ার প্রতি ওর শ্রদ্ধাবোধ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। অকারণে হত্যা মামলায় সাজা হয়ে গেলে যে েেকানা ব্যক্তির আদালত সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়ে যাবে। নীরবেরও হয়েছে। নাবিলাকে ও খুন করেনি, অথচ নাবিলা হত্যাকাণ্ডের দায়ে আদালত ওকে চৌদ্দ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালতের রায় মেনে নেয়া ছাড়া ওর কোনো উপায় ছিল না। অসহায়ভাবে ও আদালতের রায় মেনে নিয়েছে। রায় ঘোষণার দিন ও টুঁ শব্দও করেনি। শুধু মামলা চলাকালে আত্মপক্ষ সমর্থনে ও আদালতের কাছে বলেছে- ‘আমি নির্দোষ!’ ওর এই দাবি নিষ্ফল হয়েছে। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হচ্ছে, জীবনের এই চরম দুঃসময়ে ওর পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। কোনো সহপাঠী বা বন্ধু-বান্ধব এগিয়ে আসেনি। বড় কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ও জড়িত ছিল না। তবে ছাত্রমৈত্রীর কর্মী হিসেবে পরিচিতি ছিল ওর। যদিও এই ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল না। মাঝে মাঝে সংগঠনের সভায় বা নেতাদের সঙ্গে আড্ডায় থাকতো। এতেই ছাত্রমৈত্রীর কর্মী হিসেবে পরিচিতি পায় নীরব। এ বিষয়টি ও কখনো গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখেনি। হত্যা মামলার আসামি হবার পর ওই সংগঠনের কোনো নেতা বা কর্মী ওর পক্ষে সমবেদনা জানায়নি। বরং নাবিলা হত্যা মামলা নিয়ে যখন পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হলো, ওই পার্টি থেকে বিবৃতি দেয়া হলো যে, নীরব তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মী ছিল না। এজন্যও ছাত্রমৈত্রীর প্রতি ওর রাগ জন্মেনি। তবে সংবাদপত্রগুলোর রিপোর্ট ওকে বিস্মিত ও ব্যথিত করেছে। মামলা চলাকালে সংবাদপত্রগুলো ওকে পেশাদার খুনি বানিয়ে দিয়ে হরেকরকম রিপোর্ট প্রকাশ করেছে! মামলার রায়ের আগেই পত্রপত্রিকা ওকে খুনি বানিয়ে ফেলে। একটি মফস্বল শহর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ঢাকাকে একদিন ওর যতোটা আলোকময় শহর মনে হয়েছিল, এ হত্যকাণ্ডের ঘটনায় যে অভিজ্ঞতা লাভ করে ও, এতে শহরটাকে ওর মনে হয় হিংস্র পশুদের এক গহীন জঙ্গল! পুলিশ ও পত্রপত্রিকা সম্পর্কে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা লাভ করে ও। কারাগারের দেয়ালে হেলান দিয়ে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির কথা ভাবছিল নীরব। শাকিল চৌধুরী ওর সঙ্গে দেখা করার পর থেকেই ওর পেছনের দিনগুলো বারবার ভেসে উঠছে। ওর মনের পর্দায় নাবিলার সঙ্গে ওর পরিচয় ও পরিণতির কথা ভেসে উঠলো। নীরব পড়তো লোক প্রশাসন ডিপার্টমেন্টে। নাবিলা ছিল একই ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী। নীরব যখন মাস্টার্স দিয়েছে মাত্র, তখন নাবিলার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়। একটি ছোট ঘটনা নাবিলার সঙ্গে পরিচয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করে। ঘটনাটির কথা মনে পড়লো ওর। একদিন টিএসসিতে ডাচের সামনে দাঁড়িয়ে চা-পান করছিল নীরব। ছাত্রমৈত্রীর এসএম হল শাখার সভাপতি মাহাবুব হাসান ওর কাছে এসে আন্তরিক গলায় বললো- ‘নীরব, তোমার ডিপার্টমেন্টের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা চলছে। পারিবারিকভাবে বিয়ের আলোচনা হচ্ছে। আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই। তবে মেয়েটিকে দেখে মত পাল্টেছি।’
‘তা-ই না-কি?’
‘হুম। খবরটা তোমাকে দিলাম।’
‘বিয়েতে আমাকে যেতে হবে বলছো? কবে বিয়ে?’ প্রশ্ন করলো নীরব।
ওর প্রশ্নে মাহাবুব একগাল হাসলো। বললো- ‘না, না। বিয়ে তো আর এখনই হয়ে যাচ্ছে না। আমার মাস্টার্সটা হয়ে গেলেই বিয়ে হবে।’
‘ও আচ্ছা। বিয়ের নিমন্ত্রণ দিও।’
নীরবের কথা শুনে ফের হাসলো মাহাবুব। ও বললো- ‘বিয়ের আগে তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে যে!’
‘কাজ! কী করতে হবে?’
‘খুব বেশি শক্ত কাজ নয়। এই ধরো, একটা খাম তোমাকে দেবো, তুমি ওই মেয়েটিকে দিয়ে দেবে, এই যা!’
মাহাবুবের কথায় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো নীরব। ও ঠিক বুঝতে পারছিল না মাহাবুব কী বলতে চাইছে। মাহাবুব যেনো নীরবের চোখের ভাষা পড়তে পারলো। ও বললো- ‘না, মানে বিয়ের আগে একটু হবু বধূর সঙ্গে কথা বলতে চাই, বুঝলে? খামটি ওকে দিলেই তোমার কাজ শেষ। আমি আসলে সামনাসামনি কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছি। তাই চিঠি লিখে ওর সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানাতে চাই। তুমি শুধু চিঠিটা ওর কাছে পৌঁছে দিলেই হবে। পারবে না?’
নীরব মাহাবুবের কথার সারমর্ম বুঝতে পেরে রাজি হয়েছিল নাবিলাকে ওর খাম পৌঁছে দিতে। নাবিলা তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। নীরব নাবিলাকে চিনতো না। নীরবকে ওদের ডিপার্টমেন্টের চত্বরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে মাহাবুব নাবিলাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। মাহাবুবের খাম নিয়ে এগিয়ে গিয়ে নাবিলার সামনে গিয়ে নীরব আন্তরিক গলায় বললো- ‘আপনি তো নাবিলা, তা-ই না?’
দুপুরের তাতানো রোদে দুজন সহপাঠীর সঙ্গে নাবিলা দাঁড়িয়ে ছিল ক্লাসরুমের বাইরে বারান্দায়। অবাক চোখ তুলে তাকালো নীরবের দিকে। নাবিলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতে খামটি তুলে দিয়ে নীরব বললো- ‘এটি দিয়েছে আমার বন্ধু মাহাবুব। পড়ে নেবেন।’
পত্রটি নাবিলার হাতে তুলে দিয়ে নীরব হনহন করে চলে এসেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একটি মেয়ের হাতে পত্র তুলে দেয়া কী আর এমন কঠিন কাজ। নীরব কাজটি সহজেই করে ফেলেছিল। এর প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলো ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই। খাম পৌঁছে দেয়ার জন্য মাহাবুব একরকম জোর করে নীরবকে নিয়ে এলো ডাচের সামনে। এখানে দুজনে গরম সিঙারা খাচ্ছিল। মাহাবুব বললো- ‘আজ তোমাকে হোটেলে খাওয়াবো, বন্ধু। রাতে ভদকা পার্টি দেবো।’
নীরবের ভালো লাগছিল মাহাবুবের উচ্ছ্বাস দেখে। মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিলো ও। মাহাবুব চায়ের অর্ডার দেবে, এমন সময় দেখলো, নাবিলা ওর দুই সহপাঠীকে নিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাহাবুব নাবিলাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো যেনো। মনে হলো, সে ভড়কে গেছে। অথচ নাবিলার মধ্যে কোনো রুদ্ররূপ নেই। নাবিলা মাহাবুবকে কিছু না বলে নীরবের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো- ‘এই যে মিস্টার! আপনার সাহস দেখে আমি ভীষণ মুগ্ধ হয়েছি। একটি মেয়েকে সরাসরি প্রেমপত্র দিতে আপনার জুড়ি নেই। কিন্তু আপনি যার প্রেমপত্র আমাকে দিয়েছেন, তার মতো দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিদের আমি খুবই অপছন্দ করি। যারা ভালোবাসার কথা ভালোবাসার মানুষকে সরাসরি বলতে পারে না, আমার কাছে সে ধরনের ব্যক্তির কোনো মূল্য নেই। আপনার মতো সাহসী যুবক আমার খুবই পছন্দ। আপনি কি আমার সঙ্গে প্রেম করবেন?’
কথা নয়, যেনো কথার ঝড় বয়ে গেলো। নীরব কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো নাবিলার দিকে। মাহাবুব এক-পা দু-পা করে স্থান ত্যাগ করলো কখন, তা সে দেখতে পেলো না। নাবিলা এক টুকরো হাসির মহিমা ছড়িয়ে ফের নীরবকে বললো- ‘আমি শুনেছি, আপনি একটু বোকা ধরনের মানুষ। সরলতা আছে। স্মার্ট নন। তাতে সমস্যা হবে না। আমার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে স্মার্ট হয়ে যাবেন। বোকা থাকবেন না। আমি ঠিক করে নেবো।’
নাবিলার কথাগুলো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের, না বিদ্রুপের, বুঝতে পারলো না নীরব। ও বোকার মতো ‘নাবিলা’ নামক অপূর্ব সুন্দরীর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। নাবিলার কথা শোনার পর নীরবের মনে হচ্ছিল, ও সত্যিই যেনো বোকা শ্রেণির একজন মানুষ। নাবিলা নীরবের দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। নীরবের কাছ থেকে কোনো জবাব পায়নি সে। দমকা হাওয়ার মতো নাবিলা যেমন এসেছিল, তেমনি চলে গিয়েছিল। সেদিন ঘোরলাগা বিকেলে নীরব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। নাবিলা চলে যাওয়ার পরও ও দীর্ঘক্ষণ ভাষামূক হয়ে গিয়েছিল। নাবিলা সেদিন ওকে প্রেম করার প্রস্তাব দেয়ার পর কয়েকদিন খুব ভেবেছিল নীরব। এই ভাবনার মধ্য দিয়ে নীরব নাবিলার প্রতি আকর্ষণবোধ করতে থাকে। ডিপার্টমেন্টে নাবিলাকে ও একদিন একা পেয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বললো- ‘আপনার প্রস্তাবটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। এবং ভেবে ঠিক করেছি, আপনার প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া যায় না। আপনি কি সিরিয়াস?’
নীরবের কথায় খানিকটা ভড়কে গিয়েছিল নাবিলা। ও কোনো জবাব না দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল। এরপর প্রায় এক মাস নাবিলার কোনো দেখা নেই। নীরব একপর্যায়ে ধরেই নিয়েছিল নাবিলা ওর সঙ্গে রসিকতা করেছে। কিছুদিন পর টিএসসিতে নাবিলার সঙ্গে ফের দেখা হলো, কথা হয়নি। এর কয়েকদিন পর ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় নাবিলার সঙ্গে ওর দেখা হলো। নীরব নাবিলার সামনে এসে ফের পথ আটকে বললো- ‘ভালো আছেন?’
নাবিলা হাসলো। ওর হাসিতে মাদকতা আছে, চোখ ফেরানো যায় না। নীরব মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকে। নাবিলা বললো- ‘আমি তো ভালো আছি। কিন্তু আপনি দেখছি ভালো নেই!’
নাবিলার চোখের মণি উজ্জ্বল হয়। নাবিলার চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে এনে নীরব বললো- ‘হবে হয়তো। আপনার কথাগুলো শোনার পর থেকে বলতে পারেন অসুস্থ হয়ে গেছি। কী করি বলুন তো?’
নাবিলা দমকে দমকে হাসে। নীরব ভেবে পায় না নাবিলার সৌন্দর্য ও রহস্য একই সঙ্গে অপরূপ কেনো? শারীরিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চরিত্রের রহস্য একাকার। নীরব যেনো নাবিলার সৌন্দর্য ও রহস্যের প্রতি খরস্রোতে ধাবমান এক খড়কুটো। নীরবের ভাবুলতাকে উসকে দিয়েই যেনো নাবিলা হাসি থামিয়ে বললো- ‘পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন, নিজের অসুস্থতার কথা জানাতে?’
‘না, সেরকম নয়। তবে আপনার প্রস্তাবটা নিয়ে অনেক ভেবেছি।’ ইতস্তত করে বলে নীরব।
নাবিলা চোখের দৃষ্টিতে কপট বিস্ময় ফুটিয়ে বলে- ‘তা-ই?’
‘হুম। আপনি কি সত্যিই আমার সঙ্গে প্রেম করতে চান?’ সাহস করে বলে ফেলে নীরব।
এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে নাবিলা। ও বলে- ‘আমার সঙ্গে প্রেম করবেন? আপনি!’
একরাশ লজ্জা এসে গ্রাস করে নীরবকে। ও চোখ নামিয়ে বলে- ‘জানি না। আপনিই তো বলেছিলেন।’
নীরবের কথার জবাব না দিয়ে নাবিলা হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিল। নাবিলা সেদিন চলে গেলেও ওদের মধ্যে সম্পর্কের যবনিকা হয়নি। পরে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নাবিলা নিয়মিত আসছিল ক্লাসে। নিয়মিত দেখা হতে থাকে নীরবের সঙ্গেও। কিন্তু নীরব আর নাবিলাকে কিছু বলেনি। কিন্তু নাবিলাকে দেখলে চোখের দৃষ্টি আটকে যেতো। নাবিলা একদিন নীরবের সামনে এসে বলে- ‘আপনি দূর থেকে যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন, এতে বুঝতে পারছি আপনার অসুখটা দিন দিন খুব বেড়ে যাচ্ছে।’
নীরব এর জবাবে মুখ টিপে হাসে। এই হাসির মধ্য দিয়েই নাবিলার কথার স্বীকৃতি দেয় ও। নাবিলা বলে- ‘চলুন, আজ দুজনে রিকশায় ঘুরে বেড়াই। যাবেন?’
নাবিলাকে ‘না’ করেনি নীরব। ও নাবিলার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। সেদিন থেকে ওরা একে অন্যের ঘনিষ্ঠ হয়। সেদিন রিকশায় ঘুরে বেড়ানোর সময় নীরব নাবিলার কাছে একবার জানতে চেয়েছিল নাবিলা ওকে সত্যিই ভালোবাসে কি-না। নাবিলা মুখে কিছু না বললেও হাসির দমকে দমকে ভালোবাসার সম্মতি প্রকাশ করেছিল। এটুকুই যথেষ্ট ছিল নীরবের জন্য। নাবিলার চরিত্রের রহস্যের সামনে আর কোনো আলোর সুড়ঙ্গ খুঁজে পায়নি ও। নীরব একতরফাভাবে নাবিলার প্রেমে ডুবে যায়। এক ধরনের ঘোরলাগা প্রেম। এই ঘোরটুকু ওর ভালো লাগত। নাবিলা ওকে অদৌ ভালোবাসে কি-না, এ নিয়ে ভেবে কোনো কূল-কিনারা পায়নি নীরব। নাবিলার ভালোবাসা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল ওর। সন্দেহটা ওর মনে অস্বস্তির কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকতো। তারপরও নাবিলার কাছ থেকে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি ওর। যদিও নীরব ভেবেছিল যে নাবিলার চরিত্রের সঙ্গে ওর চরিত্রের একটা বৈপরীত্য আছে। এই বৈপরীত্য নিয়ে ওর অস্বস্তিও কম ছিল না। নাবিলা খুবই চটপটে ও ফ্যাশন সচেতন মেয়ে। ও সারাক্ষণই যেনো দৌড়াচ্ছে। ওকে দেখলে মনে হতো রেসের ঘোড়া। স্থির হয়ে থাকে না। নীরব ঠিক যেনো উল্টো। ধীর ও স্থির। নাবিলার সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি ও। টিএসসিতে নাবিলার সঙ্গে নীরবের দেখা হলে ওরা একসঙ্গে ঘোরে, গল্প করে- এটুকুই ওদের প্রেমের উপকরণ। নীরব জানতো না প্রেম করার মধ্যে আর কী কী পাঠ আছে। আর যতোক্ষণ ও নাবিলার সামনে থাকতো, ততোক্ষণ চুপসে থাকতো। হাজার পাওয়ার ভোল্টের বাতির সামনে পতঙ্গ যেমন থাকে। কথাবার্তা যা হতো, এর মধ্যে আবেগতাড়িত কথামালা হবার সুযোগ কোথায়? নাবিলা চঞ্চলা হরিণী! ওর কথা শুনতে শুনতে সময় ফুরিয়ে যেতো। নিজের মনের কথা বলার সুযোগ মেলেনি নীরবের। ও সে চেষ্টাও করেনি। আর নাবিলার ফ্যাশন, নাটক, সিনেমা, পার্টি-আড্ডার কথামালার মধ্যে নীরব ছিল নীরব শ্রোতা। ওদের প্রেমটা ফ্রেমে বাঁধা ছবির মতো আটকে যাওয়া একটা ব্যাপার মনে হতে পারে। নীরবের মনের ভেতরে এমন একটা ধারণা ছায়া ফেলেছিল। নীরবের সঙ্গে দেখা হলে নাবিলা কথা বলতো ঠিক; কিন্তু কখনো ফোন করতো না ওকে বা এসএমএস করতো না। নীরব ওকে ফোন করে দেখেছে, নাবিলা ওর ফোন ধরতো না। গভীরভাবে চিন্তা করলে একটা খটকা লাগতো। নীরব এ কথাটাও নাবিলার সামনে তোলেনি। ও ভেবে দেখেছে, নাবিলার প্রতি ওর ভালোবাসার চেয়ে মোহ ছিল বেশি। ভালোবাসা আচ্ছন্ন করে আর মোহ ঘোরের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। নীরব নাবিলাকে নিয়ে ঘোরের মধ্যেই ডুবে গিয়েছিল। পতঙ্গ জানে আগুনে ঝাঁপ দিলে পুড়ে যাবে, তারপরও পতঙ্গ ঝাঁপ দেয়। তেমনি নীরব নাবিলার রূপের আগুনে মন্ত্রমুগ্ধ পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দিয়েছিল। নাবিলার মনের নাগাল পায়নি, পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। এ সত্যটুকু নীরব মেনেও নিয়েছিল। ঝাঁপ দিয়ে নীরব ভেবেছিল এরপরও যদি নাবিলার ভালোবাসা পাওয়া যায়। এই আশা রং ছড়ানোর আগেই নাবিলা খুন হয়ে গেলো। ও খুন হয়েছিল গুলশানে একটি রেস্ট হাউসে। ওই রেস্ট হাউসে নীরব কখনো যায়নি। নাবিলা কেনো ওই রেস্ট হাউসে গিয়েছিল, তা ও জানে না। নাবিলা যেদিন খুন হয়, সেদিন বিকেলে নাবিলা ওকে ফোন করে বললো- ‘নীরব, তুমি কোথায়?’
নীরব ছিল শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের একটি রেস্টুরেন্টে। ছাত্রমৈত্রীর নেতাদের সঙ্গে একটা ঘরোয়া মিটিংয়ে ছিল ও। নীরব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করার পরও হলে ছিল। হল ছেড়ে দেয়ার নোটিস পেয়েছে মাত্র। কোথাও কোনো মেসে উঠবে, এই প্রচেষ্টা ছিল ওর। ক্যাম্পাসে জমিয়ে আড্ডা দেয়ার অভ্যাসটা বদলে ফেলতেই ও ক্যাম্পাসে যাচ্ছিল না। দুটি টিউশনি করছিল এবং এদিক-সেদিক ঘুরে চাকরি খুঁজছিল। ছাত্রজীবন থেকে বেরিয়ে পড়ার এক অম্লমধুর সময় পার করছিল ও। নীরব ছাত্রমৈত্রী সংগঠনের কয়েকজনের নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসেছিল। ছাত্রমৈত্রীর নেতা ফয়সাল ওর থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেবে বলে ও ছাত্রমৈত্রীর সভায় চলে আসে। সভায় আসামাত্র এলো নাবিলার ফোন। নীরব একটু বিরক্ত হলেও ফোন রিসিভ করে বলেছিল- ‘আমি আজিজ সুপার মার্কেটে। কেনো?’
‘নীরব, তুমি কি এখনই গুলশানে আসতে পারবে? খুবই জরুরি।’
নাবিলার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেলো। নীরব একটু বিচলিত হলো। নাবিলার সঙ্গে পরিচয় তিন মাস হবে। এই তিন মাসে নাবিলা কখনো ওকে কোথাও যাবার জন্য অনুরোধ করেনি। এমনকি, ওরা দুজনে একসঙ্গে কোথাও ঘুরে বেড়ায়নি। শুধু একদিন পাবলিক লাইব্রেরিতে একটা শর্টফিল্ম, বেইলি রোডে মহিলা সমিতির মঞ্চে একটা নাটক এবং বসুন্ধরা মার্কেটের সিনেমা হলে একটা ইংরেজি ছবি দেখেছিল। পাবলিক লাইব্রেরিতে শর্টফিল্ম দেখার সময় নীরবের বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। কোনো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে এটাই ওর প্রথম শর্টফিল্ম দেখার অন্যরকম অভিজ্ঞতা। শর্টফিল্মের কোনো কিছুই ওর দেখা হয়নি। ও শুধু ডুবে গিয়েছিল নাবিলাকে নিয়ে শর্টফিল্ম দেখার শিহরণের আবিষ্টতায়। এক সপ্তাহ পর নাবিলা ওকে নিয়ে গেলো বেইলি রোডে মঞ্চনাটক দেখতে। মঞ্চনাটক দেখার সময় বুক দুরুদুরু কাঁপেনি ঠিক, এখানেও ভালো লাগার আবিষ্টতায় ও বুঁদ হয়ে ছিল। এর সাত দিন পর নাবিলা বায়না ধরলো সিনেমা হলে ইংরেজি মুভি দেখবে। তখন বসুন্ধরা মার্কেটে সিনে কমপ্লেক্স সিনেমা হলে হলিউডের একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছিল। নীরব একটু দ্বিধান্বিত থাকলেও নাবিলার প্রবল আগ্রহে যেতে হলো সিনেমা দেখতে। সিনেমা হলে গিয়ে নীরব দেখলো অনেক তরুণ-তরুণী ছবি দেখতে এসেছে। নীরবের জড়তা কমে আসে এবং নাবিলার উচ্ছ্বাসও বেড়ে যায়। মুভি দেখার একপর্যায়ে নাবিলা হঠাৎ নীরবের বাম হাত ওর হাতে মুঠোবন্দি করে নেয়। নীরবের ভেতরে রিনরিনিয়ে ওঠে ঘূর্ণিঝড়। আবেগ ও কামনার এক অদম্য স্রোত ওর চেতনায় বয়ে যেতে থাকে। একরাশ লজ্জায় ও চোখ বন্ধ করে। আর এতেই যেনো ক্ষিপ্ত হয়ে যায় নাবিলা। হঠাৎ নাবিলা ওর গালের কাছে মুখ এনে চট করে চুমু খায়। নাবিলার চুমু খাওয়াটা এতো অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হলো যে, নীরবের তা বুঝে উঠতে সময় লাগলো। ও কতোক্ষণ হতবিহ্বল হয়ে ছিল, তা জানে না। যখন সম্বিত ফিরে এলো, ততোক্ষণে মুভিও শেষ হয়ে গেছে। নাবিলার ডাকে নীরব সিনেমা হলের সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল ঠিক; কিন্তু ও যেনো হাঁটতে পারছিল না। নাবিলার অপ্রত্যাশিত চুমুর তন্ময়তায় ও ছিল টালমাটাল। সেদিন ও হলে ফিরেছিল মাতালের মতো এক ধরনের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে। এরপর কয়েকদিন নীরব নাবিলার কাছে সিনেমা হলে চুমু খাওয়ার কথা তোলার চেষ্টা করেছে; কিন্তু নাবিলার অনাগ্রহ ও হাসির দমকে কথাটি প্রশ্রয় পায়নি। একবার শুধু নাবিলা বলেছিল- ‘নীরব, তুমি একটা হাঁদারাম, বোকা!’ এ বিশেষণটুকুই যা প্রাপ্তি। নীরব এর বেশি কিছু নাবিলার কাছ থেকে পায়নি। অথচ ও নাবিলার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। নাবিলার সঙ্গে প্রেম করা নিয়েও একটু খটকা লাগতো নীরবের। নাবিলার আর ওর সম্পর্কের মধ্যে আদৌ প্রেম আছে কি-না বুঝে উঠতে পারেনি নীরব। তবে নীরবের ভাবতে ভালো লাগতো যে নাবিলার মতো সুন্দরী মেয়ে ওর প্রেমিকা। নাবিলার পেছনে এতো ছেলে ঘুরে বেড়ায় যে, এর সংখ্যা গুনে রাখা মুশকিল। অথচ সেই মেয়েটি ওর সঙ্গে প্রেমিকার মতো ঘুরে বেড়ায়।
মাহাবুবের চিঠি দেবার পর নাবিলা এসে নীরবকে সরাসরি প্রপোজ করার ঘটনার পর ও তো তিন রাত ঘুমাতেই পারেনি। ওর কেবল মনে হয়েছে এ স্বপ্ন বা স্বপ্নের চেয়েও গভীর কিছু। সেই নাবিলা ওকে বলছে গুলশানে যেতে। নাবিলার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ফুটে ওঠায় ভীষণ এক তোলপাড় শুরু হলো নীরবের ভেতরে। ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বললো- ‘নাবিলা, গুলশানে কোথায় আসবো, বলো। তোমার কি কোনো সমস্যা হয়েছে?’
নাবিলা বললো- ‘এখনই তুমি একটা ট্যাক্সি বা সিএনজি নিয়ে চলে আসো। গুলশান দুইয়ে। কাগজ-কলম বের করো। আমি ঠিকানাটা বলছি। আর শোনো, যতো তাড়াতাড়ি পারো চলে আসো। আমি একটু বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।’
নীরবের বুকের ভেতরটা দুমড়ে উঠলো। নাবিলাকে সাহায্য করাটা জরুরি। নীরব পকেটে রাখা একটি নোটবুক বের করে সেখানে ঠিকানা লিখে নিলো চটজলদি। নাবিলা আর কথা না বলে ফোন রেখে দিয়েছিল। ফোনের কথাই ছিল নাবিলার সঙ্গে নীরবের শেষ কথা। নীরব নাবিলার কাছে পৌঁছেছিল ঠিক; কিন্তু নাবিলাকে জীবিত দেখেনি ও। রেস্ট হাউসের গেটে কোনো দারোয়ান ছিল না। নীরব একরকম দৌড়ে ঢুকেছিল রেস্ট হাউসের কক্ষে। ছুরিকাঘাতে আহত নাবিলার রক্তাক্ত দেহ পড়েছিল মেঝেতে। নাবিলার প্রাণ তখনো ছিল কি-ছিল না, তা জানে না নীরব। ওর মনে হয়েছিল নাবিলা ওকে দেখে যেনো কাছে ডেকেছিল। নীরব হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চিৎকার দিয়ে নাবিলাকে আঁকড়ে ধরেছিল। সিনেমার গল্পের মতো কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে হাজির হলো। পুলিশ নীরবকেই গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো থানায়। এরপর জেলহাজতে স্থানান্তর। নাবিলাকে বাঁচাতে গিয়ে নাবিলাকে খুনের দায়ভার চাপলো ওর ওপর।
সেদিন নাবিলা খুন হবার কিছুক্ষণ পর নীরব ওর রুমে গিয়েছিল। আর এটাই হলো ওর জন্য কাল বা দুর্ভাগ্য। অথচ নাবিলার রক্তাক্ত দেহ দেখে ও প্রথম চিৎকার করে উঠেছিল। হাউমাউ করে কেঁদেছিল। পুলিশ এসে নাবিলার মরদেহের কাছ থেকে ওকেই গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো খুনের আসামি সন্দেহে। নাবিলার খুনি হিসেবে প্রথমে পুলিশের সন্দেহ পড়ে ওর ওপর। এরপর নাবিলার পরিবারের লোকেরা ওকে অভিযুক্ত করে মামলা করে। খুন না করেও খুনের আসামি হয়ে যায় ও। আশ্চর্য! এ কথা ভাবলে নীরব কিছু বুঝে উঠতে পারে না। বিস্ময়ের রেশ ফুরায় না। ও হতভম্ব হয়ে থাকে। বিষণ্নতা গ্রাস করে ওকে। খুনের দণ্ডাদেশ মেনে না নিয়ে উপায় ছিল না ওর। ওর কাছে কোনো অর্থ ছিল না। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ও কোনো চৌকস উকিল ধরতে পারেনি। আদালতে নিজেকে ‘নির্দোষ’ বলে চিৎকার করা ছাড়া ওর কিছুই করার ছিল না। তাই দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হয়ে জেল খাটছে। অসহায়ভাবে নীরব মেনে নিয়েছে এই জেলজীবন।
তিন.
সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বর্ষা যাই যাই করছে। দুদিন পেরুলেই শরতের শুরু। ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল নীরবের। সারারাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি ওর। শাকিল চৌধুরী ওর সঙ্গে দেখা করে ঘুম হরণ করে নিয়েছে যেনো। মনের অন্তঃপুরে মিহিন এক কষ্টের সঙ্গে আকুতি সন্ধ্যা তারার মতো জ্বলছে-নিভছে। ও চায় না, তবু মনের আকাশে তারা জ্বলে ওঠে। ও স্বপ্ন দেখতে চায় না, তবু ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন এসে ভিড় জমায়। ও কারাগার থেকে বের হতে চায় না, তবু বাইরের জগৎ ওকে হাতছানি দিয়ে কথা শেষ করতে পারলো না ও।
স্বর্ণা বললো- ‘ আপনি অতো সম্পর্ক খোঁজেন কেনো, বলুন তো? এতােই যখন দ্বিধা-সংকোচ, তা হলে একটা সম্পর্ক তৈরি করে নিন। ’
স্বর্ণার কথায় ভীষণ ভড়কে গেলো নীরব। স্বর্ণা কি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, না পরীক্ষা করছে? এমন একটি সুন্দরী মেয়ে একজন খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামির চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব যাচাই করছে না তো? এটাও কি ওর অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ের মধ্যে পড়ে? সন্ধ্যা হলে এই শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড যেমন বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করে ওঠে, প্রশ্নগুলোও ওর মনে তেমনি ঝলমল করে উঠলো। ও দ্বিধার মধ্যে পড়ে যায়। এর জবাবে কিছু বলা দরকার; কিন্তু ও বলতে পারছে না। স্বর্ণা ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ও হয়তো একটা জবাব আশা করছে। নীরব ওর নিজের ভেতরে জবাব খুঁজে বেড়ায়। একটা গুমোট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, মমতাজ আহমেদ চলে আসায় পরিবেশটা মিলিয়ে গেলো। ওরা সোফায় বসেছিল, মমতাজ আহমেদ ওদের মুখোমুখি অবস্থানে সোফায় গিয়ে বসলেন। নরম কণ্ঠে বললেন- ‘সরি, আমি তোমাদের কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। কিছু মনে করো না।’
‘না, না। ঠিক আছে। আমাদের হাতে সময় আছে।’ বললো নীরব।
মমতাজ আহমেদ স্বর্ণার দিকে তাকালেন। নীরব পরিচয় করিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বললো- ‘স্যার, ও হচ্ছে স্বর্ণা। নাবিলার ছোট বোন।’
‘স্লামালাইকুম।’ মমতাজ আহমেদকে স্বর্ণা সালাম দিলো।
মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘অলাইকুম সালাম। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, তোমরা একসঙ্গে কিভাবে?’ এ কথা বলে প্রশ্নবোধক চোখে মমতাজ আহমেদ তাকালেন নীরবের দিকে।
নীরব বললো- ‘স্যার, স্বর্ণা পেশায় সাংবাদিক। আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। সেই থেকে পরিচয়। আজ জানতে পারলাম যে, সে নাবিলার ছোট বোন। এতোদিন ও এ পরিচয়টা গোপন রেখেছিল?’
‘ও আচ্ছা। স্বর্ণা কি জানে, তুমি নাবিলার প্রকৃত হত্যাকারী নও?’ জানতে চাইলেন মমতাজ আহমেদ।
নীরব একবার স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে ফের মমতাজ আহমেদের চোখে চোখ রেখে বললো- ‘স্যার, ও এবং ওর পরিবার বিশ্বাস করেছে যে, আমি নাবিলাকে খুন করিনি। ওরা অন্য কাউকে সন্দেহ করছে; কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছে না। তাই ওকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। আপনি আমাকে ফোনে বলেছিলেন, নাবিলার প্রকৃত খুনি কে, তা আপনি জানতে পেরেছেন। স্বর্ণাও জানতে চায়, নাবিলার প্রকৃত খুনি কে।’
মমতাজ আহমেদ একটু ভাবলেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বললেন- ‘নীরব, তোমার প্রতি আমার বিশেষ একটা টান জন্ম নিয়েছে বলেই আমি এই খুন-খারাবি নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি। এটা আমার কাজ নয়। তোমার প্রতি চরম অন্যায় হয়েছে বলে আমি সত্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়েছি। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের বেশ কয়েজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার বন্ধু। তাদের সহায়তায় এবং রাজনৈতিক নেতা ও আরো কিছু ব্যক্তিগত বন্ধুর সহযোগিতায় আমি এই হত্যাকাণ্ডের কারণ, মোটিভ এবং সম্ভাব্য কে বা কারা জড়িত ছিল, এ তথ্য সংগ্রহ করেছি। এ কাজে আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এ ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করে আমিও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি যে, নাবিলাকে কে খুন করেছে। তবে এই খুনের পেছনে দুজন ব্যক্তি জড়িত ছিল, এ কথা জানতে পেরেছি।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন মমতাজ আহমেদ।
ওরা মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো।
‘দুজন! কারা?’ গভীর আগ্রহে জানতে চায় নীরব। স্বর্ণা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে মমতাজ আহমেদের মুখের দিকে। ওর বুক দুরুদুরু কাঁপছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেনো। চোখ ফেটে জলের ধারা নেমে আসতে চাইছে। ও কান্না সামলে নেয়। মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘তারা দুজনেই নাবিলার প্রেমিক। একজনের সঙ্গে নাবিলা প্রেম করতো। তার নাম-’
‘রাশেদুল শামীম।’ নামটি উচ্চারণ করলো স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ স্বর্ণার দিকে চেয়ে বললেন- ‘তা হলে তাকে তুমি চেনো, মা?’
‘ঠিক চিনি না। তবে তার কথা সম্প্রতি জানতে পেরেছি নাবিলার একটি গোপন ডায়রি থেকে। দ্বিতীয় জনের নামটা বলুন, প্লিজ।’
মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘আরেকজন ছিল নাবিলার প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক। নাবিলা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার নাম মাহাবুব হাসান। একসময় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে ব্যবসা করছে।’
মাহাবুবের নাম শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলো নীরব। মাহাবুবকে ও ভয়কাতুরে বলে জানে। এমন ভীতু একজন ব্যক্তি খুনের নেপথ্যে থাকতে পারে? ভাবে ও। মমতাজ আহমেদ নীরবের উদ্দেশে বললেন- ‘নীরব, শামীম এবং মাহাবুবকে তুমি চেনো?’
নীরব একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- ‘শামীমকে আমি চিনি না, তবে মাহাবুবকে চিনি। ও আমার বন্ধু। মাহাবুব আমাকে দিয়ে নাবিলাকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। নাবিলা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই নাবিলার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এবং নাবিলার সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হই।’
‘হয়তো তোমাদের এই ঘনিষ্ঠতা মাহাবুবকে ক্ষুব্ধ করেছিল। হয়তো প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছিল সে।’ বললেন মমতাজ আহমেদ।
এর জবাবে নীরব বললো- ‘কিন্তু স্যার, মাহাবুব খুবই ভীতু শ্রেণির মানুষ। ও খুন-টুন করবে বা খুন করাবে- এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।’
এর জবাবে মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘মাই সান, প্রেম বড় জটিল বিষয়। প্রেম কাউকে মহান করে, উদার করে। আবার কাউকে ভয়ঙ্কর মানুষে পরিণত করে। প্রেম কাউকে মহৎ করে, কাউকে খুনি করে। হয়তো ভয়কাতুরে মাহাবুব নীরবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল।’
নীরবের মনে ভেসে উঠলো মাহাবুবের মুখ। যে রেস্ট হাউসে নাবিলা খুন হয়েছিল, সেই রেস্ট হাউসটির মালিক মাহাবুবের বাবা, অর্থাৎ রেস্ট হাউসটির মালিক মাহাবুবও। এই খুনের সঙ্গে মাহাবুবের সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেয়া যায় না। নীরব অবাক হয়ে ভাবতে থাকে। স্বর্ণা মমতাজ আহমেদের উদ্দেশে বললো- ‘আচ্ছা, মাহাবুব আর শামীম এক হলো কিভাবে বলতে পারেন? তারা কি পূর্বপরিচিত ছিল বা তাদের মধ্যে কোনো বন্ধুত্ব ছিল?’
মমতাজ আহমেদ মনে মনে বললেন- ‘তোমার প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ’, মুখে বললেন- ‘মাহাবুবের সঙ্গে শামীমের পূর্বপরিচয় ছিল কি ছিল না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। আমার ধারণা, তাদের মধ্যে পূর্বপরিচয় ছিল না। সম্ভবত নাবিলাকে কেন্দ্র করে মাহাবুব এবং শামীমের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। আমি আরো জানতে পেরেছি, নাবিলার সঙ্গে শামীমের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছিল। নাবিলা মনে হয় অন্য কারো প্রেমে পড়েছিল। এতে ক্রুব্ধ হয়েছিল শামীম। সে সময় হয়তো মাহাবুব শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দুজনে এক হয়েছিল নাবিলাকে শায়েস্তা করতে।’ এ পর্যন্ত বলে থেমে যান মমতাজ আহমেদ। স্বর্ণার চোখে-মুখে বেদনার কালো মেঘ। নীরবের মুখও শুকনো। মমতাজ আহমেদ বুঝতে পারছেন, এমন ঘটনার কথা শুনে ওদের দুজনের মনের ভেতর ঝড় বইছে।
নীরব মুখ তুলে বললো- ‘স্যার, শামীমের সঙ্গে মাহাবুবের বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের কথা কী করে নিশ্চিত হলেন?’
‘আমি জানতে পেরেছি, শামীম আর মাহাবুব যৌথভাবে একটি ব্যবসা করছে। গুলশানে ওদের অফিস আছে। এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা। নাবিলা হত্যা মামলায় তোমার বিরুদ্ধে রায় হবার পর ওরা এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছে।’
‘বলেন কী!’ বিস্ময় প্রকাশ করে নীরব।
মমতাজ আহমেদ বলেন- ‘আমার ধারণা, পরিকল্পিতভাবে নাবিলাকে হত্যা যেমন করা হয়েছে, তেমনি এ হত্যা মামলায় তোমাকেও ফাঁসানো হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।’
‘কেনো ওরা এ কাজ করেছে, স্যার?’ আহত কণ্ঠে জানতে চায় নীরব। ওর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে।
মমতাজ আহমেদ বলেন, ‘ঈর্ষা। ঈর্ষার কারণে তুমি ফেঁসেছ। তুমি নাবিলার সান্নিধ্য পেয়েছো, এটা মাহাবুবকে ঈর্ষান্বিত করতো। তোমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে মাহাবুব। আর শামীম নিয়েছে নাবিলার ওপর প্রতিশোধ। ভেরি সিম্পল অ্যান্সার।’
নীরব চুপসে যায়। ওর বুকের ভেতরে তোলপাড় চলছে। কষ্টের মিহিন ভাঙচুরও হচ্ছে। যদিও নাবিলার প্রকৃত খুনি কে বা কারা, ও জানতে পারলো, তবু এই খুনের পেছনে মাহাবুবের সম্পৃক্ততায় ও স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণা মমতাজ আহমেদের কাছে জানতে চাইলো- ‘আমরা কি নাবিলার খুনিদের বিচারের সম্মুখীন করতে পারবো বলে মনে করেন?’
‘তাদের বিচারের সম্মুখীন করতে হলে প্রমাণ লাগবে। প্রমাণ হাতে এলে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।’
‘কিভাবে প্রমাণ পাবো? আপনি কি আমাদের এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন? আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি ভরসা পাচ্ছি। আশা করি, আমাকে ফেরাবেন না।’ স্বর্ণার কণ্ঠে আকুলতা ফুটে ওঠে।
মমতাজ আহমেদ স্মিত হেসে বললেন- ‘আমি তো আগেই বলেছি, খুন-টুন নিয়ে মাথা ঘামানো আমার কাজ নয়। নীরবের প্রতি যে অবিচার হয়েছে, তা আমাকে ভীষণভাবে আহত করেছে। তাই আমি এই খুনের রহস্য বের করার চেষ্টা করছি। এখন আসল কাজ করতে হবে তোমার পরিবারকে।’
‘কী করতে হবে বলুন, আমরা করবো।’ বলে স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ বলেন- ‘আমি একটা প্রমাণ সংগ্রহ করেছি পুলিশের এক বড় কর্মকর্তার সাহায্যে। সেটি হলো, নাবিলার সেলফোনে সেদিন কে কে ফোন করেছিল, এর রেকর্ড বের করেছি। এর মধ্যে একটি ফোন নম্বর ছিল ওই রেস্ট হাউসের কেয়ারটেকারের। ওই নম্বর থেকে ফোন করে কথা বলেছিল শামীম। নাবিলাকে মিথ্যা কথা বলে শামীম ওই রেস্ট হাউসে নিয়ে গিয়েছিল। আমি মনে করি, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে এটি একটি ক্লু। তোমার পরিবার প্রভাব খাটিয়ে যদি মামলাটি পুনর্জীবিত করতে পারে, তা হলে নতুন করে তদন্ত করাতে হবে। তদন্তে ওই সেলফোনের সূত্র ধরে শামীমকে ধরতে পারবে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনা বেরিয়েও আসতে পারে। তবে…’
‘তবে কী স্যার?’ উদগ্রীব হয়ে জানতে চায় নীরব।
মমতাজ আহমেদ বলেন- ‘তবে মানে, কাজটি সহজ নয়। শামীমের পরিবার প্রভাবশালী। সচিবের ছেলে সে। মাহাবুবের পরিবারও বিত্তবান। তোমাকে আগেও বলেছিলাম, হাই প্রোফাইল মামলা হলে অনেক কিছুই হয় না। সবকিছু ফ্রিজ হয়ে যায়।’
স্বর্ণা বলে- ‘আমার পরিবারও দুর্বল নয়। আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমরা প্রকৃত খুনিদের বের করবো এবং বিচারের সম্মুখীন করবো।’
স্বর্ণার কণ্ঠে প্রত্যয় ও দৃঢ়তায় মমতাজ আহমেদ খুশি হন। তিনিও চান নাবিলার প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ুক এবং তাদের বিচার হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এটা ভীষণ জরুরি।
নীরব বলে- ‘আপনাকে কিভাবে ধন্যবাদ জানাবো স্যার, জানি না। এখন আমি কী করবো, বলে দিন।’
এ কথায় মমতাজ আহমেদ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন- ‘তোমার এখন একটাই কাজ। তা হচ্ছে, স্বর্ণাকে সার্বক্ষণিকভাবে সময় দেয়া।’
‘মানে?’ বলে নীরব।
মমতাজ আহমেদ বলেন- ‘মানে হচ্ছে, স্বর্ণার পরিবার প্রভাবশালী। ওর বাবা বিত্তবান। তিনি নিশ্চয়ই তার মেয়ের প্রকৃত হত্যাকারীকে বিচারের সম্মুখীন করবেন। এ কাজে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে স্বর্ণা। আর স্বর্ণাকে সহযোগিতা করবে তুমি।’
মমতাজ আহমেদের কথাটা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু স্বর্ণার পরিবার কি পারবে শামীম এবং মাহাবুবকে বিচারের সম্মুখীন করতে? স্বর্ণা বলে- ‘আপনার সহযোগিতা পেলে আমরা নাবিলার খুনিদের বিচারের সম্মুখীন করবোই। আজ আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গেলো।’
‘হুম। তোমার কথা শুনে আমারও ভালো লাগলো। জানো মা, নীরবের ভাগ্য বিপর্যয়ের কথা মনে হলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ও ছিল নিরপরাধী, অথচ ও হয়ে গেলো খুনের মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।’
মমতাজ আহমেদের কথায় লজ্জা আর গ্লানি স্বর্ণাকে গ্রাস করলো। যেদিন থেকে ও বুঝতে পেরেছে নীরব নাবিলাকে খুন করেনি, সেদিন থেকেই এই লজ্জা আর গ্লানি ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। নীরব একদিন ওর কাছে জানতে চেয়েছিল, ও কেনো তার প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছে। এর জবাবে কিছু বলেনি, তবে মনে মনে বলেছিল- ‘আমাদের ভুলের কারণে আপনার প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, এর জন্য আমরাই দায়ী। বিবেকের তাড়না আর গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ি। আরো গভীর অনুভূতি কাজ করে।’ স্বর্ণার মনে কথাটি এ মুহূর্তেও ভেসে উঠলো। চাপা কান্না উথলে ওঠে ওর মনে। ও নিজেকে সামলে নেয়। ওর দুঠোঁট তিরতির করে কেঁপে উঠলো অব্যক্ত বেদনায়। মমতাজ আহমেদ তা লক্ষ্য করলেন।
মমতাজ আহমেদের দিকে তাকিয়ে নীরব বললো- ‘স্যার, আমরা কি উঠবো? আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম।’
‘ঠিক আছে, যাও। তোমরা নিজেরা ঠিক করো, কী করবে। পরে এসে আবার দেখা কোরো আমার সঙ্গে। দেখি, আরো কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি-না।’
‘জি, আচ্ছা। কোনো তথ্য পেলে আমাকে ফোন করবেন, প্লিজ।’ বললো নীরব।
মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘যা-ই করো, খুব সাবধানে এগুবে। যতোটা সম্ভব গোপনীয়তা বজায় রাখবে। খুনিরা তোমাদের কার্যকলাপ টের পেলে সাবধান হয়ে যাবে।’
স্বর্ণা জানতে চাইলো- ‘আমাদের কি টেলিফোনের রেকর্ডটি দিতে পারবেন? ওটাই তো আমাদের একমাত্র ক্লু।’
‘কাল আমাকে ফোন কোরো। জানিয়ে দেবো, পুলিশের কোনো কর্মকর্তার কাছে তোমাদের যেতে হবে। ওই পুলিশ কর্মকর্তা তোমাদের টেলিফোনের রেকর্ডটি দিয়ে দেবেন। এ ছাড়া কী করতে হবে, তাও বলে দেবেন ওই কর্মকর্তা। সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার নাম গোপন রেখো, কেমন?’
মমতাজ আহমেদের কথা শেষ হলে স্বর্ণা বলে- ‘আপনার ঋণ কিভাবে শোধ করবো, জানি না!’
এ কথা শুনে হো-হো করে হেসে ফেললেন মমতাজ আহমেদ। তার হাসিতে স্বর্ণা ও নীরব প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকে। এভাবে হাসার কী আছে, বুঝতে পারে না ওরা। মমতাজ আহমেদের হাসি থামার পর স্বর্ণা লাজুক মুখে বলে- ‘এভাবে হাসলেন কেনো? আমি কি হাসির কথা বলেছি?’
‘না, না, মা। সে রকম নয়। ঋণ শোধের কথা বলেছো তো, তাই হাসলাম।’ বলেন মমতাজ আহমেদ।
স্বর্ণা বিস্ময় প্রকাশ করে বলে- ‘সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। এ কথার মধ্যে হাসির কী হলো?’
মমতাজ আহমেদ নীরবের দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘নীরব, তুমি বাইরে যাও। আমি ওর সঙ্গে একা কিছু বলতে চাই।’
মমতাজ আহমেদের এ কথার কোনো মানে খুঁজে পেলো না নীরব। তবে কোনো প্রশ্ন না করে উঠে দাঁড়ালো ও। স্বর্ণা কৌতূহলী চোখে তাকালো একবার নীরবের দিকে, আরেকবার মমতাজ আহমেদের দিকে। নীরব কক্ষ থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেলো। স্বর্ণার দৃষ্টি আটকে গেলো মমতাজ আহমেদের মুখের ওপর। নীরব কক্ষ থেকে বের হবার পর মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘তোমাকে দু-একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি? আপত্তি থাকলে করবো না।’
‘করুন। আপত্তি নেই।’ সম্মতি প্রকাশ করে স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ কয়েক সেকেন্ড ভাবেন। এরপর তিনি স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বলেন- ‘দেখো মা, তোমার সঙ্গে আমার আজই পরিচয় হলেও কিছু কথা জানতে ইচ্ছে করছে এবং কিছু কথা বলতেও ইচ্ছে করছে। আমার কথা অযাচিত হলে মনে কিছু কোরো না।’
‘না, না। কী বলতে চান, বলুন। আমি আপনার কথা শুনতে প্রস্তুত আছি।’
স্বর্ণার কথায় আশ্বস্ত হলেন মমতাজ আহমেদ। তিনি বললেন- ‘তুমি কি কাউকে পছন্দ করো, মা? আই মিন, এমন কেউ কি আছে, যাকে তুমি ভালোবাসো বা বিয়ে করতে চাও?’
স্বর্ণা মমতাজ আহমেদের এ ধরনের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত না থাকলেও বিব্রতবোধ করলো না। ও ঝটপট বললো- ‘না, আমার এমন কেউ নেই। কিন্তু আপনি এ কথা জানতে চাচ্ছেন কেনো?’
‘তোমার কাছে আমি একটা অনুরোধ রাখতে চাই। অনুরোধ রাখার আগে জেনে নিলাম, অনুরোধ রাখা ঠিক হবে কি-না।’
‘বলুন, কী অনুরোধ?’
‘স্বর্ণা, তুমি তো জানো, তোমাদের কারণে এবং আদালত থেকে ন্যায়বিচার না পাওয়ায় নীরবের মতো একজন মেধাবী ছাত্রের ললাটে খুনির তকমা লেগে গেছে। ওর জীবনটা বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। ও চাইলেই সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে না।’
‘জি, আমিও এ বিষয়ে ভেবেছি।’ বললো স্বর্ণা।
মমতাজ আহমেদ আশ্বস্ত হয়ে বললেন- ‘তাই তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, যদি রাগ না করো।’
‘বলুন। রাগ করবো না।’
‘তুমি কি ওকে বিয়ে করতে পারো না?’ কথাটা খুব সহজভাবে বলে ফেললেন মমতাজ আহমেদ। এ কথা বলে তিনি যেনো ভারমুক্ত হলেন। তার কথা শুনে স্বর্ণা মাথা নিচু করে ফেললো। মমতাজ আহমেদ ওর চোখের দৃষ্টি পড়তে চেয়েছিলেন, পারলেন না। স্বর্ণাকে দেখে তার মনে হয়েছিল, ওদের দুজনের বিয়ে হলে মন্দ হবে না। অবশ্য স্বর্ণা একজন শিল্পপতির মেয়ে আর নীরব দরিদ্র পিতার সন্তান। এখানেই বড় পার্থক্য। নীরব মেধাবী ছাত্র, সৎ এবং নির্লোভ। দেখতে সুদর্শন। স্বর্ণার পাশে ওকে খুব মানাবে। স্বর্ণার নীরবতা দেখে মমতাজ আহমেদ বললেন- ‘আমার অনুরোধ রাখতে হবে, এমন নয়, মা। আমি কথাটা বলেছি, তোমাদের দেখে আমার মনে হয়েছে, তোমাদের বিয়ে হলে সুখি হতে পারবে। পাত্র হিসেবে নীরবের অযোগ্যতা একটি, সেটি হলো সে দরিদ্র এবং তার পরিবার দরিদ্র। আর সব দিক দিয়ে বিচার করলে তার তুলনা হয় না। বর্তমান সময়ে এমন সৎ, সরল এবং মেধাবী ছেলে পাওয়া সহজ নয়। ওর মধ্যে কোনো ভণিতা নেই, কপটতা নেই, অহঙ্কার নেই, লোভ-লালসাও নেই।’ এ পর্যন্ত বলে থামলেন মমতাজ আহমেদ।
স্বর্ণা এবার মুখ তুললো। ওর দুচোখ দিয়ে জলের দুটি ধারা নেমে এসেছে। মমতাজ আহমেদ এই কান্নার অর্থ খুঁজলেন না। তিনি ওর অশ্রুভেজা চোখে চোখ রেখে বললেন- ‘আমার কথাটা ভেবে দেখো, মা। যদি তোমার মন সায় দেয়, আমাকে জানিও। আমি নীরবের অভিভাবক হয়ে না হয় তোমার বাবা-মার সঙ্গে কথা বলবো। আর যদি মন সায় না দেয়, এ কথা আমি আর কখনো বলবো না।’
স্বর্ণা লাজুক কণ্ঠে বললো- ‘আমি আপনার কথাটা ভেবে দেখবো। পরে আমার মতামত জানাবো।’
মমতাজ আহমেদ মুখে অমলিন হাসি ফুটিয়ে বললেন- ‘তোমার সঙ্গে আমার কী কথা হলো, এ কথা কিন্তু নীরবকে বলো না। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে, বলবো না।’ ছোট্ট জবাব স্বর্ণার।
মমতাজ আহমেদ বলেন- ‘এবার তুমি বাইরে যাও। নীরব তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
স্বর্ণা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওর ইচ্ছে করছিল এগিয়ে গিয়ে মমতাজ আহমেদকে পা ছুঁয়ে সালাম করার। কিন্তু সংকোচে তা করলো না। মনে মনে তাকে সালাম করলো। এরপর ও ছোট ছোট পদক্ষেপে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। নীরব দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে, এই প্রথম ওকে দেখে অজানা লজ্জা এসে গ্রাস করলো স্বর্ণাকে। নীরব স্বর্ণাকে দেখে কৌতূহলী গলায় বললো- ‘মমতাজ স্যার কী বললেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, আমাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে আপনার সঙ্গে কী এমন গোপন আলোচনা করলেন।’
স্বর্ণা বললো- ‘চলুন, আগে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবো না-কি?’
‘ওহ, হ্যাঁ, চলুন।’
মমতাজ আহমেদের বাড়ির বারান্দা দিয়ে ওরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। স্বর্ণাকে মমতাজ স্যার কী বললেন- এই জিজ্ঞাসা নীরবের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বর্ণার গাড়ি মমতাজ আহমেদের বাড়ির ড্রাইভওয়েতে পার্ক করা ছিল। ওরা গিয়ে গাড়িতে বসলো। গাড়ির চালক গাড়ি স্টার্ট দিতেই স্বর্র্ণা তার উদ্দেশে বললো- ‘গুলশানে যাও।’
গাড়ি চলতে শুরু করলো। ওদের গাড়ি মমতাজ আহমেদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। এরপর স্বর্ণা নীরবের দিকে তাকিয়ে বললো- ‘এবার বলুন, কী জানতে চান।’
‘জানতে চাচ্ছিলাম, মমতাজ স্যার আপনার সঙ্গে কী কথা বললেন।’ বললো নীরব। এ কথা বলার পর ওর মনে হলো, এই কৌতূহল না দেখালেও চলতো। স্বর্ণা কী ভাববে, কে জানে। ওর মনে একরকম অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বর্ণা মিষ্টি করে হাসলো। ওর মুখে হাসি দেখে নীরবের মনের অস্বস্তি সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে গেলো। স্বর্ণা বললো- ‘মমতাজ আহমেদ আপনাকে নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। আমার ব্যক্তিগত কিছু কথা জানতে চেয়েছেন।’
‘ওহ, আচ্ছা।’
নীরব আর কোনো প্রশ্ন না করলেও স্বর্ণা ইচ্ছে করেই বললো- ‘তিনি জানতে চেয়েছেন, আমি কাউকে ভালোবাসি কি-না, বিয়ে করার মতো পছন্দ করি, এমন কেউ আছে কি-না। এই আর কী। আমি তাকে বললাম- ‘আমার এমন কেউ নেই। আমার কথা শুনে মনে হলো তিনি বিস্মিত হলেন।’ কথাটা বলে মিটিমিটি হাসলো স্বর্ণা।
ওর হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীরব বললো- ‘কাউকে ভালোবাসেন কি-না বা বিয়ে করার জন্য পছন্দের কেউ আছে কি-না, একদিনের পরিচয়ে এই সত্য স্বীকার করা যায় না। আপনিও তাকে সত্য বলেননি। এটা কোনো অপরাধ নয়।’
নীরবের কথায় হোঁচট খেলো স্বর্ণা। ও পাশ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে নীরবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি মেলে বললো- ‘সত্য বলিনি মানে? এ কথা কেনো বললেন?’
নীরব স্বর্ণার প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। এ কথা বলা ওর ঠিক হয়নি। নীরব জানে, মেহেদী নামে একজন স্বর্ণাকে ভালোবাসে। কী এক ঘটনার কারণে স্বর্ণা অভিমানে মেহেদীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কাল মেহেদী ওর সঙ্গে দেখা করে এ কথা জানিয়েছে। মেহেদীর ধারণা, স্বর্ণা নীরবকে পছন্দ করে, হয়তো ভালোও বাসে। নীরব অবশ্য মেহেদীকে জানিয়েছে স্বর্ণার সঙ্গে ওর কোনো আবেগময় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এ কথা জানতে পেরে মেহেদী ওর কাছে বিনীত অনুরোধ করেছে, ও যেনো স্বর্ণার জীবনে না জড়ায়। মেহেদীকে খুব চিন্তিত মনে হয়েছিল। স্বর্ণার সঙ্গে ওর সম্পর্ক যে আর আট-দশ জনের মতোই, এ কথা বলেও যেনো মেহেদীর সন্দেহ দূর করতে পারেনি। মেহেদীর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে। ওর মধ্যে সন্দেহ প্রবণতাও প্রকট। নীরব মনে মনে একঝলক মেহেদীর কথা ভেবে নিলো। ওর নীরবতা দেখে স্বর্ণা ফের বললো- ‘আমাকে অভিযুক্ত করে এখন চুপ করে আছেন যে! আমি কোন কথাটা সত্য বলিনি?’
নীরব বুঝতে পারছে, চুপ করে থাকা ঠিক হবে না। স্বর্ণাকে ও আঘাত করে ফেলেছে। কেনো এবং কার কথা ভেবে ও এ কথা বলেছে, তা এখন খোলাসা করে বলতে হবে। নইলে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি হবে। নীরব একটু ইতস্তত করে বললো- ‘আসলে আমি একটা কথা আপনাকে বলবো বলে ভাবছিলাম। বলতে পারিনি। আবার বলার যখন চেষ্টা করছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আপনার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি কেনো নাক গলাতে যাবো।’
নীরবের কথায় অবাক চোখ তুলে স্বর্ণা বললো- ‘ঠিক বুঝতে পারছি না, কী বলতে চাচ্ছেন।’
‘আমি সঠিক জানি না, মেহেদী নামে কাউকে আপনি ভালোবাসেন কি-না। কাল মেহেদী নামে এক যুবক আমার সঙ্গে দেখা করেছিল।’
‘ও, তা-ই? কিভাবে ওর সঙ্গে দেখা হলো?’ স্বর্ণা উদগ্রীব হলো।
স্বর্ণা মেহেদীকে চিনতে পারায় আশ্বস্ত হলো। ও বললো- ‘প্রথমে আমাকে ফোন করে দেখা করতে চায়। আমিও ফ্রি ছিলাম। গুলশানে দেখা করলাম তার সঙ্গে। মেহেদী কাল আমাকে জানালো যে, সে আপনাকে ভালোবাসে। আপনিও বাসেন, শুধু কী এক অভিমানে আপনি ওকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। আমি তাকে বললাম, এসব কথা আমাকে কেনো বলছেন?’
‘সে কী বললো?’
‘সে বললো- আমি না কি আপনাদের দুজনের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।’ কথা বলতে বলতে নীরব তাকালো স্বর্ণার দিকে। স্বর্ণার মুখ বিষণ্ন হয়ে গেছে। ওর বিষণ্নতা দেখে নীরবের মায়া হলো। স্বর্ণাকে বিষণ্ন করে দিতে কথাগুলো বলেনি ও। মেহেদীর কথা কতটুকু সত্যি, ও জানে না। তবে মেহেদীর কথাগুলো সত্যি হলে নীরবের উচিত স্বর্ণার সঙ্গে একটু দূরত্ব রাখা। নীরবের কাল মনে হয়েছে, কখনো কখনো স্বর্ণার কথা, অভিব্যক্তি, আবেগ ওকে ছুঁয়ে যায়। নীরব নিজের ভেতরে নিজের এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয় না।
নীরব এ কথা ভাবছিল, স্বর্ণা ওর ভাবনাকে চটকে দিয়ে বললো- ‘আপনার কাছে যখন মেহেদী ঁেপৗছেই গেছে, তখন আপনাকে একটা কথা জানিয়ে রাখতে চাই।’
‘বলুন।’
‘আমি মেহেদীকে প্রচণ্ড… প্রচণ্ড রকম ঘৃণা করি! কেনো ঘৃণা করি, সে কথা অন্য একদিন বলবো।’
‘আচ্ছা।’
‘আপনার কাছে একটা অনুরোধ রাখতে পারি?’
‘অবশ্যই। কী অনুরোধ, বলুন।’
‘আপনি আর কখনো মেহেদীর সঙ্গে কথা বলবেন না। দেখা করতে চাইলে দেখা করবেন না, ফোনেও কথা বলবেন না। অনুরোধটা রাখতে পারবেন?’
এ কথায় স্মিত হাসিতে নীরব বললো- ‘এতো সহজ একটা অনুরোধ করলেন?’
‘এ অনুরোধটা রাখলেই আমি খুশি হবো।’
নীরব ফের হেসে বললো- ‘আপনাকে এতো সহজেই খুশি করা যায়, জানতাম না।’
এ কথায় কপট লাজুকতার দৃষ্টি মেলে ওর দিকে তাকালো স্বর্ণা। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ও রিনরিনে কণ্ঠে বললো- ‘এরপর অনেক কঠিন কাজ দেবো। তখন দেখবো, আমাকে খুশি করতে এগিয়ে আসবেন, না পিছিয়ে যাবেন।’
ওর কথাটার মধ্যে কেমন এক অর্থদ্যোতনা আছে। সাগরের অতল জলে গুপ্তধন থাকার ইঙ্গিত যেনো। নীরব কি কোনো গুপ্তধনের সন্ধানে অতল জলে তলিয়ে যাচ্ছে? ও কি আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে? ও কি নিজের অজান্তে স্বর্ণার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, না-কি স্বর্ণা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? এ প্রশ্নের মদিরতা নিয়ে নীরব গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। এ মুহূর্তে স্বর্ণার দিকে ও তাকাতে চায় না। নিজেকে ধরে রাখতে চায় ও। গাড়ি ছুটছে ফার্মগেট হয়ে গুলশানের দিকে। রাস্তার চারপাশের বাড়ি, দোকানপাট, স্থাপনা গাড়ির গতির সঙ্গে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। নীরব ভাবে, গাড়ির ছুটে চলার মতো প্রত্যেকের জীবন গতিময়। সবাই ছুটছে। শুধু নীরব কোথায় যেনো আটকে আছে। ও এগুতে পারছে না। কিন্তু ওর মন এগুতে চায়। ও স্বর্ণাকে কী বলবে, ভেবে পাচ্ছে না। ওর কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে স্বর্ণা বললো- ‘কিছু বলছেন না যে! ঘাবড়ে গেলেন?’
‘আমি তো ঘাবড়েই যাই সব সময়। মনের মধ্যে কতো কথার আলোড়ন সৃষ্টি হয়; কিন্তু তা বলতে পারি না।’
ওর কথায় টিপ্পনি কেটে স্বর্ণা বলে- ‘যেমন নাবিলাকেও বলতে পারেননি।’
‘কী বলতে পারিনি?’
‘বলতে পারেননি, আপনি ওকে পছন্দ করেন, তা-ই না?’
‘না, ওকে এ কথা বলেছিলাম।’
‘না, বলেননি। নাবিলা আপনাকে ফান করে প্রশ্ন করেছিল যে, আপনি ওর সঙ্গে প্রেম করবেন কি-না, আর আপনি ওই ফোনকে সত্যি ভেবে ওর পেছনে মোহগ্রস্ত হয়ে ঘুরেছেন।’
‘মোহগ্রস্ত কেনো বলছেন?’
‘মোহ নয় তো কী? ভালোবাসা কি এতো ঠুনকো বিষয় যে, বললেই ভালোবাসা হয়ে যায়?’
স্বর্ণার কথায় কৌতূহল প্রকাশ করে নীরব বলে- ‘তা হলে ভালোবাসা কিভাবে হয়, বলুন তো!’
‘পরস্পরের মধ্যে ঐশ্বরিক জাগরণ সৃষ্টি হলেই ভালোবাসা জন্ম লাভ করে। দুটি হৃদয়ে আকর্ষণ ও চাওয়া-পাওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি, ভাববিনিময় না হলে কি ভালোবাসা হুট করেই জন্ম নিয়ে নেবে? ভালোবাসা তো আগাছা নয়। পরগাছাও নয়। অনুভবে শেকড় প্রোথিত হবার মধ্য দিয়ে ভালোবাসা নামক বৃক্ষ ডালপালা ছড়ায়। এক দেখাতে বা এক কথাতে যারা প্রেমে পড়ে, তারা আসলে প্রেমে পড়ে না, সাময়িক মোহগ্রস্ত হয়। কিন্তু ওই মোহগ্রস্ত মানুষ তা বুঝতে পারে না।’
‘আপনি দেখছি, ভালোবাসা সম্পর্কে একরকম ভাষণ দিয়ে ফেললেন?’ কথাটা বলে হেসে ফেললো নীরব।
স্বর্ণা গম্ভীর কণ্ঠে বললো- ‘ভাষণ নয়। ভাষণ বললে ভালোবাসাকে ছোট করা হয়। আসলে আমি ভালোবাসা সম্পর্কে আমার ধারণার ব্যাখ্যা দিলাম।’
‘ঠিক আছে, আপনার কথা মেনে নিলাম। স্বীকার করছি, নাবিলার পেছনে মোহগ্রস্ত হয়ে ঘুরেছি। মরীচিকার পেছনে যেমন কেউ কেউ ছোটে। এ কথাও সত্যি যে, আমি কিন্তু বুঝতে পারতাম, নাবিলা আমাকে ভালোবাসে না। যা-ই হোক, এখন এসব কথা টেনে আর লাভ কী?’
‘লাভ-লোকসান নিয়েও আপনাকে এখন থেকে ভাবতে হবে। কী চান, বা কী চাইলেও বলতে পারেন না, এসব কথাও ভাবতে হবে। ভেবে যা চান, তার জন্য হাত বাড়াতে হবে। নইলে আপনার জীবনে কেবল না পাওয়ার কষ্টই বাড়বে।’
‘আমাকে এভাবে উৎসাহিত করছেন কেনো?’
‘বাহ, উৎসাহ না থাকলে কোনো সৃষ্টিই তো হয় না। কোনো কিছু পাওয়াও হয় না।’ বলে মৃদু হাসলো স্বর্ণা। ওর চোখে রহস্যময় দৃষ্টির ঝিলিক।
নীরব ভাবালুতা টের পায় নিজের অনুভবে। ও বলে- ‘আমি যদি অতি উৎসাহে আকাশের চাঁদের দিকে হাত বাড়াই, সেটি কি ঠিক হবে? চাঁদ কি আমার মুঠোবন্দি হবে? যা হাত বাড়িয়ে পাওয়া যাবে না, সেদিকে হাত বাড়িয়ে না পাওয়ার বেদনা কেনো চাঙ্গা করবো? এর চেয়ে নিজেকে সংযত রাখাই ভালো নয়?’
নীরবের কথাটা লুফে নেয় স্বর্ণা। ও বলে- ‘কী পাবেন, কী পাবেন না, এটাও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। অন্তত ভালোবাসার ক্ষেত্রে, আই মিন কাউকে পছন্দ করলে, তাকে কথাটা সরাসরি বলে ফেলা উচিত। বলে ফেলার সাহস তো অন্তত প্রকাশ পায়। এই সাহসেরও একটা মানসিক মূল্য আছে।’
‘কী রকম?’
‘মনের আত্মতৃপ্তির কি মূল্য নেই?’
‘ঠিক বলেছেন তো! এভাবে তো কখনো ভাবিনি।’
‘তা হলে ভাবুন।’
‘হুম। মনে হচ্ছে, আপনি আমাকে যেনো গহীন অন্ধকারে আলোর সুড়ঙ্গ দেখাচ্ছেন।’
‘তা-ই? এর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাবেন?’
‘কৃতজ্ঞতা? শুধু একবার কৃতজ্ঞতা জানালেই কী হবে?’
‘তা হলে কতবার জানাতে চান?’ চোখের মণি নাচিয়ে জানতে চাইলো স্বর্ণা।
নীরব বললো- ‘পুরো জীবন আপনার পাশে থেকে প্রতিদিন একবার করে কৃতজ্ঞতা জানালে কেমন হয়?’ অসম্ভব সাহসিকতায় কথাটা বলে ফেললো ও। কথাটা বলার পর ওর মনে হলো, এমন কথা বলার মতো সম্পর্ক ওদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি এবং গড়ে ওঠার কারণও সৃষ্টি হয়নি। অথচ কথাটা ও বলে ফেলেছে। আবেগ এবং ভাবালুতার সম্মিলনে ওর মনের ভেতরে অন্য এক নীরবের আত্মপ্রকাশ হয়ে গেলো। যেনো পাহাড়বন্দি এক নদী পাথরের বেষ্টনী ভেঙে লাফিয়ে নেমে এলো। নীরব নিজের ভেতরে তোলপাড় অনুভব করে। নীরবের কথা শুনে ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে স্বর্ণা। নীরবের কথায় স্বর্ণার বুকের ভেতরে যেনো উড়ন্ত এক নদী কান্নার ঢেউ তুলে ছুটোছুটি করে দিলো। ও কি কেঁদে ফেলবে? স্বর্ণা নিজের উথলে ওঠা কান্না প্রবল চেষ্টায় সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে। ও নীরবের প্রশ্নের জবাবে আর কিছু বলতে পারলো না। নীরব কথাটা বলে স্বর্ণার সামনে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলো। এমন লজ্জায় ও কখনো পড়েনি।
এগারো.
নীরব রুমে প্রবেশ করতেই আলোচনা থেমে গেলো। রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ও ভেতরে কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেয়েছিল। ও রুমে প্রবেশ করতেই কারো মুখে কোনো কথা নেই। শাকিল চৌধুরীর জরুরি ফোন পেয়ে ওকে আসতে হলো ওয়েস্টিনে। ওয়েস্টিনের পঞ্চম তলায় নির্দিষ্ট একটি রুমে প্রবেশ করেছে নীরব। রুমে প্রবেশ করার পর ওর মনে হলো, শাকিল চৌধুরী গোপন মিটিং করছেন। রুমটির সোফায় তিনজন লোক বসে আছে। লোকগুলোর বেশভূষা ভদ্রোচিত মনে হলো না ওর। শাকিল চৌধুরীর পাশে যে লোকটি বসে আছে, তার কপালের ডান পাশ থেকে লম্বা একটা কাটা দাগ ডান চোখের পাতা হয়ে গাল অবধি নেমে এসেছে। এই কাটা দাগটা লোকটির চেহারাকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। অন্য সোফায় যে দুব্যক্তি বসে আছে, এদের চোখে-মুখে তাচ্ছিল্য ভাব স্পষ্ট। তিনটি লোকেরই স্বাস্থ্য ভালো, পেটানো শরীর। লোকগুলোর ওপর চট করে চোখ বুলিয়ে নেয় নীরব। শাকিল চৌধুরী নীরবের উদ্দেশে বললো- ‘থ্যাংকস, নীরব, ঠিক সময়ে চলে আসার জন্য।’
‘ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি ফোনে বলেছিলেন খুব জরুরি মিটিং আছে।’
‘জরুরি মিটিংই তো করছি। আমরা অনেকদূর পর্যন্ত আলোচনা করে ফেলেছি। এখন আপনার অংশগ্রহণ হলেই হবে।’
এই লোকগুলোর সঙ্গে কী জরুরি মিটিং করছেন শাকিল চৌধুরী? প্রশ্নটা খচ করে বিঁধে গেলো। ওকেও তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিছু বুঝে উঠতে না পারার দৃষ্টি মেলে নীরব বললো ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কী নিয়ে মিটিং!’
‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জানতে পারবেন।’ বললো শাকিল চৌধুরী।
নীরব লোকগুলোর দিকে এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করে জানতে চাইলো- ‘এরা কারা?’
‘ও, হ্যাঁ! আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আপনি আগে সোফায় বসুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?’
শাকিল চৌধুরীর কথায় নীরব তার মুখোমুখি একটি সোফায় বসলো। শাকিল চৌধুরী তার পাশে বসা লোকটিকে দেখিয়ে বললো- ‘এ হচ্ছে হিমু। সবাই তাকে জল্লাদ হিমু বলে চেনে।’
শাকিল চৌধুরী কথাটা এমনভাবে বললো যে, নীরবের মনে হলো, লোকটির নামের আগে ‘জল্লাদ’ বিশেষণ সংযুক্ত হওয়ার মধ্যে মহত্ত্ব আছে। সে বিস্ময় প্রকাশ করে বলে- ‘জল্লাদ হিমু!’
‘হ্যাঁ, জল্লাদ হিমু।’ মৃদু হেসে বলে শাকিল চৌধুরী।
নীরব জল্লাদ হিমুর দিকে অবাক চোখ রেখে জানতে চায়- ‘তাকে এই নামে সবাই চেনে কেনো?’
নীরবের প্রশ্ন শুনে শাকিল চৌধুরীর ভালো লাগে। মনে মনে সে এমন প্রশ্নই আশা করছিল। সামনে বসা তিন পেশাদার খুনির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরতে তাদের নামের একটু কার্যকারণও বলা দরকার বলে মনে করছে সে। নীরবের প্রশ্ন সে সুযোগ সৃষ্টি করে দিলো। শাকিল চৌধুরী নীরবের মুখের দিকে দৃষ্টি রেখে বললো- ‘হিমুর কাজ জল্লাদের মতোই। যে কাউকেই সে সহজে জবাই করে ফেলতে পারে। কর্মগুণে ওর নাম হয়েছে জল্লাদ হিমু।’
নীরব ভীষণ অবাক হলো শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে। ও ভাবতে লাগলো, লোকটি যদি সত্যিই মানুষ জবাই করতে পারদর্শী হয়, তা হলে এমন লোকের সঙ্গে কীসের মিটিং? ওর চেতনার মধ্যে একটা ধাক্কা এসে লাগে। নীরবের মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন দেখে শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো? আপনার ভয়ের কিছু নেই।’
‘না, মানে… আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কেনো আমাকে এখানে ডেকেছেন।’
‘বলছি। তার আগে আরো দুজনের নাম বলছি। তাদেরও চিনে রাখুন।’
‘ঠিক আছে। বলুন।’ আহত কণ্ঠে বললো নীরব। ওর পানির তেষ্টা পেয়ে গেলো। কিন্তু মুখে তা বললো না। শাকিল চৌধুরী অন্য দুজনকে পরিচয় করিয়ে দেবার ভঙ্গিতে বললো- ‘ওদের একজনের নাম ড্যাগার মুনির আর অন্যজনের নাম রোহিঙ্গা জসিম।’
‘ও আচ্ছা। নাইস টু মিট ইউ।’ নীরব লোক দুটির দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বললো।
লোক দুটি ওর কথা গায়ে মাখলো না। এ ধরনের আচরণও অপমানজনক। খুনি-মাস্তানরা সম্ভবত কথা কম বলে বা একেবারেই বলে না। কাজ কী এবং কাজের জন্য কতো টাকা পাবে, এর বেশি কথা বলা তারা পছন্দ করে না। ড্যাগার মুনির আর রোহিঙ্গা জসিমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এ কথা ভেবে নিলো নীরব। কক্ষে বসে থাকা বিদঘুটে নামের তিনজনই চুপচাপ এবং ভাবলেশহীন। নীরব এবার শাকিল চৌধুরীর চোখে চোখ রাখলো। ও বোঝার চেষ্টা করছে এ ধরনের অদ্ভুত নামধারী লোকদের সঙ্গে ওকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে কেনো। শাকিল চৌধুরী যেনো নীরবের মনের কথাটা অনুধাবন করতে পারলো। সে মুচকি হেসে নীরবের উদ্দেশে বললো- ‘এদের নাম ড্যাগার মুনির এবং রোহিঙ্গা জসিম কেনো হয়েছে, জানতে ইচ্ছে করছে না?’
‘নামের অর্থ বুঝতে পারছি। নামকরণের কারণটা অনুমান করছি।’
‘অনুমান কেনো, শুনে রাখুন। সংক্ষেপেই বলছি। ড্যাগার মুনির যাত্রাবাড়ি এলাকায় এক সময় ছিনতাই করতো, তার কোমরে সবসময় ড্যাগার লুকানো থাকতো। কথায় কথায় মানুষের সামনে ড্যাগার বের করতো এবং যার-তার ওপর চালিয়ে দিতো। ছিনতাই করতে করতে অপরাধ জগতের বাসিন্দা হয়ে যায়। এখন ছিনতাই করে না। খুন করার কাজ নেয়। আর রোহিঙ্গা জসিম অনেক দিন ছিল মিয়ানমারের জঙ্গলে। পাবর্ত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডাকাত দল গড়ে তুলেছিল। সেও অপরাধ জগতের বাসিন্দা। হিমুর কথা আগেই বলেছি, ও কী করতে পারে। ওর সম্পর্কেও আরেকটু বলছি। হিমু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। ভর্তি হওয়া পর্যন্তই পড়াশোনার দৌড়ঝাঁপ শেষ। আর এগুতে পারেনি। একটি রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে গিয়েছিল। সতেরবার জেলখানায় গিয়েছে। ও গুলি করে পাখি মারার মতো মানুষ মারতে পারে বলে জনশ্রুতি আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।’
শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে পানির তৃষ্ণা বেড়ে গেলো নীরবের। ও অনুভব করছে, ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে পানি খেতে চাইলে দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। তাই ঢোক গিলে তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টা করতে লাগলো ও। এবার নীরবকে দেখিয়ে শাকিল চৌধুরী তিনজনের উদ্দেশে বললো- ‘পরিচয় করিয়ে দিই। ও হচ্ছে নীরব। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার জন্য যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। একটু সফট মাইন্ডেড, তবে যে কোনো পরিস্থিতি সামলে নিতে পারে।’
নীরবের দিকে শান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো তারা। তাদের মুখে এবারো কোনো কথা নেই। তাদের চোখের দৃষ্টিতে কেমন নিষ্ঠুরতা দেখতে পেলো নীরব। লোকগুলো যে ভদ্র নয়, এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত। ও শাকিল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে শুকনো মুখে বললো- ‘আমাকে কি তাদের সঙ্গে কোনো কাজ করতে হবে?’
নীরবের কথায় স্মিত হাসি ফুটে ওঠে শাকিল চৌধুরীর মুখে। সে বললো- ‘কাজ করতে হবে বলেই তো তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। তবে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আপনার কোনো কাজ নেই। তারা একটি কাজ করবে। এরপর আপনি ওই কাজের সমাপ্তি টানবেন। এই আর কী।’
‘ঠিক বুঝলাম না। এ কেমন কাজ?’
‘বলছি, বলছি। ধীরে ধীরে বলছি। কাজটি সহজ নয়। আবার কাজটি নিষ্ঠুরও। তাই সময় নিয়ে বলছি।’ বললো শাকিল চৌধুরী। তার কথা শুনে কেমন ভয় ধরে যাচ্ছে। নীরবের এখন মনে হচ্ছে, শাকিল চৌধুরী শুধু চতুর ব্যবসায়ীই নয়, ভয়ঙ্করও। লোকগুলো কী কাজ করবে, ও ভেবে পেলো না। ভালো কোনো কাজ করবে না তারা, এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত। শাকিল চৌধুরী নীরবের উদ্দেশে বললো- ‘নিজ নামেই তারা অপরাধ জগতে পরিচিত। জেলখানাতেও এদের নাম উচ্চারিত হয়। না-কি হয় না?’ শাকিল চৌধুরী জল্লাদ হিমুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো। তার প্রশ্নে হিমু মৃদু হাসার চেষ্টা করলো। তার ঠোঁট একটু ফাঁক হলো। মনে হচ্ছিল, পুরোপুরি হাসলে যেনো ঠোঁট ফেটে যাবে, তাই পুরোপুরি হাসছে না। জল্লাদ হিমুর শুকনো হাসির অর্থ হলো- ‘শাকিল চৌধুরী যা বলেছে তা সঠিক’, অর্থাৎ জেলখানায়ও তাদের নাম উচ্চারিত হয়। নীরব জেলখানায় তাদের দেখেনি এবং তাদের নামও শোনেনি। ও অবশ্য অপরাধী কয়েদিদের এড়িয়ে চলতো। ও বললো- ‘তাদের নাম মনে রাখার মতো অবশ্য।’
‘শুধু তা-ই নয়, এদের নামে এই শহরে অনেক কিছুই হয়। তারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাদশা! বুঝতে পারছেন?’
‘জি, পারছি’, বললো নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো- ‘র্যাবের হিটলিস্টেও এদের নাম আছে!’
‘বলেন কী!’
‘হুম।’
‘তা হলে?’
‘আপনি ভয় পাচ্ছেন কেনো?’
‘না, বললেন না যে, তাদের একটা কাজের সমাপ্তি আমাকে করতে হবে?’
‘হ্যাঁ, বলেছি।’
‘কী কাজ বলুন তো! উৎকণ্ঠার মধ্যে রাখবেন না, প্লিজ!’ তাগাদ দিলো নীরব।
কথাটা বলতে শাকিল চৌধুরীর মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। সে নীরবের দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললো- ‘কথাটা শুধু শুনে রাখবেন। কাউকে কিন্তু এ কথা বলতে পারবেন না, মনে থাকবে?’
সাসপেন্স বাড়ছে পরিবেশে। নীরবের বুক দুরুদুরু করছে। ও নিজের ভেতরে সাহস সঞ্চার করে নেয়ার চেষ্টা করে যায়। ও বলে- ‘বলে ফেলুন। নিশ্চয় খুব গোপন কথা?’
‘শুধু গোপন নয়, অতীব গুরুত্বপূর্ণও!’
‘আহা, বলেই ফেলুন না! টেনশন তৈরি করছেন কেনো?’ ককিয়ে ওঠে নীরব। শাকিল চৌধুরী এবার পকেট থেকে বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেটের প্যাকেট বের করে প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট দুঠোঁটে চেপে ধরে তাতে অগ্নিসংযোগ করে। নীরব উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে থাকে শাকিল চৌধুরীর মুখের দিকে।
জ্বলন্ত সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে শাকিল চৌধুরী বলে- ‘কথাটা বলছি। কথাটা শোনার পর আঁতকে উঠবেন না কিন্তু!’
‘ঠিক আছে, বলুন।’ সম্মতি প্রকাশ করার ভঙ্গিতে বলে নীরব। শাকিল চৌধুরী সিগারেটের ছাই অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে নিলো। এরপর সে বললো- ‘অনেকদিন ধরেই আমি পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। আমার পরিকল্পনা মোতাবেক এই তিন পেশাদার খুনি কয়েক দিন পর সুবিধামতো সময় এবং সুবিধামতো স্থানে তানজিলাকে খুন করবে।’
‘কী বললেন, খুন! তানজিলাকে!’ চেঁচিয়ে ওঠে নীরব।
শাকিল চৌধুরী শান্ত গলায় বলে- ‘বলেছিলাম আঁতকে উঠবেন না। শান্ত হোন। আমার কথা শেষ হয়নি।’
‘তানজিলাকে তারা খুন করবে! কেনো? কী বলছেন এসব!’ কথাটা বলতে গিয়ে নীরবের গা শিরশির করে ওঠে। শাকিল চৌধুরীর চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ দেখতে পায় ও।
শাকিল চৌধুরী বিরক্ত কণ্ঠে বললো- ‘তানজিলাকে খুন করবে তারা। আপনি আঁতকে উঠছেন কেনো?’
‘আপনি কী বলছেন, শাকিল ভাই! আপনি আপনার স্ত্রীকে খুন করার কথা বলছেন।’
‘তো, আপনি চেঁচাচ্ছেন কেনো? বলেছিলাম না, শান্ত থাকবেন। শান্ত হোন।’ বলে শাকিল চৌধুরী।
নীরব নিজেকে শান্ত করলেও ওর ভেতরে অশান্ত ঢেউ বইছে। পেশাদার তিন খুনির সামনে এ নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য না করাই ভালো, ভাবে ও। ও নিচু গলায় বলে- ‘আর কী বলবেন, বলুন। আমি শান্তভাবেই শুনছি।’
শাকিল চৌধুরী ফের নীরবের চোখে চোখ রেখে বললো- ‘তানজিলা খুন হবার পর আপনি ওর খুনের দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। পারবেন না?’
নীরবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এ কী কথা বলছে শাকিল চৌধুরী? সে কি আদৌ মানসিকভাবে সুস্থ? না-কি মানসিক বিকারগ্রস্ত? প্রশ্নগুলো কুণ্ডলি পাকিয়ে ওঠে মনের ভেতর। শাকিল চৌধুরীর কথা শুনে ওর গা ঝিমঝিম করছে। ওর শরীরে ঠাণ্ডা একটা স্রোত সঞ্চালিত হলো যেনো। ও শাকিল চৌধুরীকে কী বলবে, ভেবে পেলো না। ও স্তম্ভিত। হতবাক। ওর বিস্ফোরিত চোখ আটকে ছিল শাকিল চৌধুরীর মুখের ওপর, ও দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। শাকিল চৌধুরী বললো- ‘নীরব, আমি বলেছিলাম, কোনো একটি অপরাধের দায় স্বীকার করে আপনি আবার কারাগারে ফিরে যাবেন। আশা করি, আপনি কথাটি ভুলে যাননি।’
নীরব এ কথার কোনো জবাব দিলো না। ও অবনত মুখে ভাবছে, ওর ভাগ্যে কেনো এতো বিপর্যয় দেখা দেয়? নীরবের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আমি আমার পরিকল্পনামতোই এগিয়েছি। আপনাকে কারাগার থেকে বের করে এনেছি, তানজিলার সঙ্গে ফের পরিচয় করিয়ে দিয়েছি এবং আপনি তানজিলার সঙ্গে ঘুরে বেড়াবেন, এটাও আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল। সব ঠিকঠাকমতোই হয়েছে। এখন শুধু আসল কাজটা করতে হবে।’
নীরব মুখ তুলে শাকিল চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললো- ‘আপনি কি সিরিয়াসলি এসব কথা বলছেন, না রসিকতা করছেন?’
‘কী আশ্চর্য, রসিকতা করবো কেনো?’
‘তা হলে একটা প্রশ্ন করি?’
‘করুন।’
‘আপনি নিজের স্ত্রীকে খুন করতে চাইছেন কেনো?’
এ কথায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো শাকিল চৌধুরী। নীরব তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। শাকিল চৌধুরী বললো- ‘এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি আপনার এ প্রশ্নটার জবাব দেবো না। অন্য কোনো প্রশ্ন আছে? থাকলে করুন।’
‘না। আমার অন্য কোনো প্রশ্ন নেই।’
‘এবার আপনাকে আমি একটা প্রশ্ন করি?’ বললো শাকিল চৌধুরী।
‘করুন।’
‘আপনি কি তানজিলাকে ভালোবাসেন?’
প্রশ্নটা শুধু বিব্রতকরই নয়, অসম্মানজনকও। নীরব এ প্রশ্নে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলো। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শাকিল চৌধুরীর মুখের ওপর। শাকিল চৌধুরী মিটিমিটি হাসছে। সে ফের বললো- ‘বললেন না, আপনি তানজিলাকে ভালোবাসেন কি-না?’
‘আপনি কী মনে করেন? আমি তাকে ভালোবাসি?’ জানতে চাইলো নীরব।
শাকিল চৌধুরী বললো- ‘আপনার মনের কথা আমি জানি না। তবে তানজিলা যে আপনাকে পছন্দ করে, এটা বুঝতে পারি।’
‘পছন্দ করা আর ভালোবাসা কি এক?’
‘এক নয়? এক না হলেও কাছাকাছি একটি বিষয় তো, কী বলেন?’
‘আপনি সাংঘাতিক লোক! নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করছেন।’
‘হা-হা-হা। মিস্টার নীরব, আমার পরিকল্পিত চিত্রনাট্যে এটাও আছে যে, তানজিলাকে আপনি ভালোবাসতেন, তানজিলাও আপনাকে ভালোবাসতো। বিয়ে হয়নি আপনাদের। ভালোবেসে না পেয়ে প্রেমিকাকে খুন করেছেন, এ কথা পুলিশের কাছে এবং আদালতে বলবেন আপনি।’
‘তার মানে নাবিলার পর ফের তানজিলার খুনি হবো আমি? আই মিন সিরিয়াল কিলার?’
‘মন্দ কী? বিনিময়ে আপনাকে ঠকাবো না। যে পরিমাণ অর্থ আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে আমি দেবো, বাকি জীবন আরাম-আয়েশ করে কাটিয়ে দিতে পারবেন। হা-হা-হা।’
শাকিল চৌধুরী এতোটা কদাকার-কুৎসিত চরিত্রের লোক, তা ভাবেনি নীরব। নীরবের মনে হলো, এ মুহূর্তে এই মিটিং থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে ভালো হতো। ও নিজের ভেতরে রাগ বাড়ছে। ও নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। এ মুহূর্তে রেগে গেলে পরিস্থিতি ওর অনুকূলে থাকবে না। শাকিল চৌধুরীকে ওর মনের অবস্থাটা বুঝতে দেয়া ঠিক হবে না, এ কথা ভেবে নীরব বললো- ‘শাকিল ভাই, আপনি নাটকীয়তা পছন্দ করেন, জানি। তবে স্ত্রীকে খুন করার মতো নাটকীয়তা ঠিক নয়।’
নীরবের কথায় শাকিল চৌধুরী মুখ একটু গম্ভীর করে ফেলে। ‘আমি কোনো নাটক করছি না। বলতে পারেন, নাটকীয়ভাবে বা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে তানজিলাকে খুন করতে চাচ্ছি।’
‘কিন্তু কেনো? আমার তো মনে হয়, আপনাদের দাম্পত্য জীবন ভালোই আছে। হতে পারে আপনাদের সন্তান নেই বা হচ্ছে না অথবা তানজিলা মা হতে চাচ্ছে না। আমি ধারণা করেই কথাটা বলছি। এমন হলেও আপনাদের আরো অপেক্ষা করার সময় আছে। নিজের স্ত্রীকে খুন করবেন কেনো?’
নীরবের কথায় ফের মিটিমিটি হাসে শাকিল চৌধুরী। নীরব বুঝতে পারে না, লোকটির মনে আসলে কী চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। তানজিলাকে খুন করার কথা বলছে সিরিয়াসলি। কিন্তু কেনো তাকে খুন করতে চায়, এটা বলছে না। ও শাকিল চৌধুরীর কাছ থেকে এর জবাব আশা করছে। শাকিল চৌধুরী ওর কথার জবাবে বলে- ‘আগেও বলেছি, আমি তানজিলাকে কেনো খুন করতে চাই, সেটা বলবো না। বাট আমি চাই তানজিলার খুনের দায় আপনি নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। নেবেন কি-না বলুন।’
এ কথায় ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো নীরব। ও কী বলবে, ভেবে পেলো না। এ মুহূর্তে ওর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছু বলা ঠিক হবে না। মনে মনে ভেবে নেয় ও। বলে- ‘আমাকে দু-তিন দিন ভাবতে দিন। আমি জানাবো।’
‘কেনো ভাবতে হবে? এখনই বলতে অসুবিধা কোথায়?’
নীরব ম্লান হেসে বললো- ‘আমি মানুষ হিসবে অতোটা নিষ্ঠুর হতে পারিনি। চট করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। তাই কয়েক দিনের সময় চাইছি।’
‘ঠিক আছে। তিন দিন সময় দিলাম। আপনার সিদ্ধান্ত না হলে আমি পরিকল্পনা পরিবর্তন করবো। মনে রাখবেন, তানজিলা খুন হবেই। যদি আপনি আমাকে সহযোগিতা না করেন, তা হলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন। এ কথাও মনে রাখবেন।’
‘জি। এ কথা মনে আছে, থাকবে।’ বললো নীরব। ওর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ফুসফুসে শ্বাস আটকে যাচ্ছে। দম বন্ধ হবার মতো পরিবেশ। খুনিগুলোর কোনো ভাবান্তর নেই। তারা অলস ভঙ্গিতে সিগারেট ফুঁকছে। রুমটা সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ওয়েস্টিনের রুমে সিগারেট নিষিদ্ধ হলেও তারা তা মানছে না। যারা ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে পারে, তারা হোটেলের বিধিনিষেধ কি আর তোয়াক্কা করে? নীরবের মনে হলো, এই কক্ষ থেকে ওর বেরিয়ে পড়া উচিত। এ কথা ভেবে ও শাকিল চৌধুরীর উদ্দেশে বললো- ‘কিছু মনে করবেন না, আমি একটু অস্বস্তিবোধ করছি। যদি অনুমতি দেন, তা হলে আমি আমার হোটেলে ফিরে যেতে চাই।’
শাকিল চৌধুরী নীরবের মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো। ওর মুখের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলো যেনো। এরপর সে শান্ত গলায় বললো- ‘ঠিক আছে, যান। আপনার সঙ্গে পরে আমি কথা বলবো। আজ যা আলোচনা হলো, তা কিন্তু কাউকে ভুলেও বলবেন না। মনে থাকবে তো?’
‘মনে থাকবে। কাউকে বলবো না। আর বলার মতো আমার আছেই বা কে? আমি তো একাই থাকি। আপনার তত্ত্বাবধানেই থাকি।’ বললো নীরব। এ কথা বলার মধ্য দিয়ে শাকিল চৌধুরীকে বোঝাতে চাইলো, সে তার হাতের মুঠোয় আছে।
শাকিল চৌধুরী বললো, ‘ইদানীং দেখছি, স্বর্ণা নামে মেয়েটি আপনার সঙ্গে খুব ভাব জমিয়ে ফেলেছে। ও কিন্তু সাংবাদিক! ওকে কিছু বলে ফেললে বিপদে পড়ে যাবো। তখন কিন্তু আপনিও রক্ষা পাবেন না। জল্লাদ হিমুর একটা কাজ বাড়বে আর কী।’ সরাসরি হুমকি দিলো শাকিল চৌধুরী। নীরব এর প্রত্যুত্তরে কিছু বললো না। বলবেই বা কী? ও এখন এই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচে।
‘নিশ্চিত থাকুন, এসব কথা কেউ জানবে না। স্বর্ণাকেও বলবো না।’
‘ঠিক আছে যান। পরে কথা হবে।’
নীরব রুম থেকে বেরিয়ে এলা। ওর মাথা যেনো ভনভন করে ঘুরছে। ওর চিন্তাশক্তিতে বিষণ্নতা ছড়িয়ে আছে। এই বিষণ্নতা গভীর থেকে গভীর হচ্ছে যেনো। নীরব অনেকটা উদভ্রান্তের মতো লিফট ধরে নিচে নেমে এলো। শাকিল চৌধুরীর পরিকল্পনাকে ঠেকাতে কী করা উচিত, এই চিন্তা ওর মনের মধ্যে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। ও জানে, ওর নিজের তেমন শক্তি বা ক্ষমতা নেই। শাকিল চৌধুরীকে মোকাবিলা করতে হলে ওকে ক্ষমতাবান হতে হবে। কিন্তু ওর কি ক্ষমতাবান হবার সুযোগ আছে? নেই। এ কথা মনে মনে ভেবে একতাল হতাশার মেঘ জমিয়ে নেয় চেতনায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও ওয়েস্টিন হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। ওয়েস্টিন থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামতেই ওর সামনে এসে দাঁড়ায় মেহেদী। নীরব ভীষণ অবাক হয় মেহেদীকে দেখে। মেহেদী নিশ্চয় ওয়েস্টিনের সামনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েছিল। এমন হবার কথা নয়, তবু এমন অভাবিত ঘটনার মুখোমুখি পড়লো নীরব। নীরব মেহেদী কিছু বলার আগেই মেহেদী বললো- ‘হ্যালো, নীরব, কেমন আছেন?’
‘মেহেদী, আপনি এখানে?’
‘আপনার জন্যই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম।’
‘আমার জন্য?’
‘হুম। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ভেবেছিলাম, আরো পরে বের হবেন। হোটেল থেকে তাড়াতাড়িই বের হলেন।’
মেহেদীর কথায় বিস্ময়ের ধাক্কা লাগে। ও বলে- ‘আমার জন্য রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন? কেনো?’ প্রশ্নটা করতে গিয়ে নীরব বিরক্তি প্রকাশ করে।
মেহেদী মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ‘কী করবো বলুন। আপনার সঙ্গে আমি কিছু কথা বলতে চাই। হোটেল থেকে আপনাকে অনুসরণ করছিলাম।’
‘বলেন কী! এটা তো ঠিক নয়।’
‘আমার উপায় ছিল না। আপনাকে ফোন করলে আপনি ফোন রিসিভ করেন না। অথচ আপনার সঙ্গে আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা ছিল।’
‘কিন্তু আপনাকে বলার মতো আমার কোনো কথা নেই। কেনো আমাকে বিরক্ত করছেন?’
‘ওই যে বললাম, আমার উপায় নেই। তাই আপনাকে বিরক্ত করছি।’ কথাটা বলে রাস্তার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেনো দেখে নেয় মেহেদী।
নীরব বলে- ‘আমি আপনার কোনো কথা শুনতে বা বলতে প্রস্তুত নই। তবু কেনো যে আমাকে বিরক্ত করছেন, বুঝতে পারছি না!’
‘নীরব, আজ সকাল থেকে আপনার হোটেলের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। যখন বের হলেন, তখন আপনাকে অনুসরণ করলাম। দেখলাম, আপনি ওয়েস্টিনে ঢুকে গেলেন। আপনাকে থামালাম না। ভাবলাম, ওয়েস্টিন থেকে বের হলে কথা বলবো। তাই এতোক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই অপেক্ষার কী মূল্য পাবো না?’ মেহেদীর কণ্ঠে আকুতি ফুটে ওঠে।
নীরব চোখ কপালে তুলে বলে- ‘মাই গড! আপনার কথা শুনে অবাক হচ্ছি। আচ্ছা, আমাকে আপনি অনুসরণ করছেন কেনো, বলুন তো!’
‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘কথা বলার জন্য আমাকে অনুসরণ করবেন কেনো? এটা কি ঠিক করছেন?’
‘না, অনুসরণ করা ঠিক নয়। কিন্তু আপনি আমার ফোন ধরেন না। আপনাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল। এ নিয়ে আমি খুব বিচলিত। মানসিকভাবে অসুস্থও বলতে পারেন।’ এ কথা বলতে গিয়ে মেহেদী নিজের দুকাঁধ উঁচিয়ে তা আবার ছেড়ে দেয়।
নীরবের বিরক্তি বাড়তে থাকে। ও বলে- ‘আমার সঙ্গে আপনার কী কথা থাকতে পারে? একদিন তো কথা হলো। আবার কী কথা বাকি রয়ে গেলো?’
কথাটা বলার মধ্য দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ পায় ওর। মেহেদী মাথা চুলকে নরম কণ্ঠে বলে- ‘চলুন না, কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।’
মেহেদীর প্রস্তাবে নিজের মধ্যে রাগের উত্তাপ টের পায় নীরব। ও আজ রেগে যাচ্ছে বা রেগে আছে। কিছুক্ষণ আগে ওর চেতনার মধ্যে রাগ নামক প্রতিক্রিয়া ঝড় তুলে দিয়েছে। রাগ জন্ম দেয়া এক ঘটনার পরপর আরেক রাগের ঘটনার আবর্তে ও পড়ে গেছে। ও রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বললো- ‘দেখুন, মেহেদী, আমি আজ খুব ব্যস্ত আছি। আমার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যাও আছে। আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় আমার নেই।’
‘দেখুন, আমার তেমন বেশি কথা নেই।’ অনুনয় করে বলে মেহেদী। ও আজ যেনো নাছোড়বান্দা।
নীরব বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এরপর বলে- ‘তা হলে কথাটা বলে ফেলুন। এর জন্য রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসতে হবে কেনো? কী বলবেন, বলুন।’
নীরবের কথায় মেহেদীর চোখ দুটোর মণি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মেহেদী কালক্ষেপণ না করে বলে- ‘না, মানে, আপনি তো জানেন, স্বর্ণাকে আমি ভালোবাসি। ও আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, এটা ঠিক। একদিন ও আমাকে হয়তো গ্রহণ করবে। কিন্তু…’ এ পর্যন্ত বলে থামে মেহেদী।
নীরব বলে- ‘কিন্তু কী?’
‘না, মানে… মাঝখানে আপনি এসে পড়ায় আমার আশাভঙ্গ হবার উপক্রম।’
‘তো আমি এখন কী করবো? আপনি আমাকে কেনো ক্লেইম করছেন? স্বর্ণা আর আপনার মধ্যে প্রেম আছে কি নেই, এর জন্য আমাকে কেনো টানছেন?’
‘টানছি না। আপনি এসে দাঁড়িয়ে গেছেন। তাই…’
‘দেখুন, মেহেদী। আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না, প্লিজ।’ এ কথা বলে নীরব পা বাড়াতে উদ্যত হয়। ওয়েস্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে দুজনের কথা বলা শোভনীয় নয়। এই পাঁচ তারকা হোটেলে কিছুক্ষণ পরপর গাড়ি আসছে, গাড়ি থেকে ভিআইপি ব্যক্তিরা হোটেলে প্রবেশ করছে। এমন একটি হোটেলের প্রবেশমুখের সামনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলা বেমানান। হোটেলের প্রবেশদ্বারে দণ্ডায়মান নিরাপত্তাকর্মীরা হয়তো বিরক্তি ভরা চোখে ওদের দেখছে, মনে মনে ভাবে নীরব। ও বিনয়ী কণ্ঠে মেহেদীর উদ্দেশে বলে- ‘আমরা ওয়েস্টিনের সামনে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছি, ভালো দেখাচ্ছে না। আপনি আর কী জানতে চান, বলুন তো?’
মেহেদীর মুখে ম্লান হাসি ঝলমলিয়ে ওঠে। সে বলে- ‘আপনি স্বর্ণার বোন নাবিলাকে খুন করেছেন বলে সে মামলায় আপনার সাজা হয়েছে, এটা তো ঠিক?’
‘ঠিক। তো?’ রাগ চেপে হতাশ কণ্ঠে বলে নীরব।
মেহেদী প্রস্তুত ছিল। সে বলে- ‘যেখানে আপনাকে স্বর্ণার ঘৃণা করার কথা, সেখানে ও আপনাকে পছন্দ করছে। আমি এই রহস্য ভেদ করতে পারছি না। আপনি ওকে কী করেছেন, বলবেন কি?’
এ কথার জবাব কী দেবে নীরব? সত্য কথা বলার কোনো মানে হয় না। মেহেদীর সঙ্গে নাবিলা হত্যা এবং স্বর্ণাকে নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না ওর। তবে মেহেদীর প্রশ্নের একটা জবাবও দেয়া দরকার। ও বললো- ‘এ প্রশ্নটা স্বর্ণাকেই করবেন। ও বলতে পারবে, কেনো ও আমাকে পছন্দ করে। আমি অবশ্য মনে করি না, ও আমাকে বিশেষরকম পছন্দ করে। আপনার ধারণা মিথ্যাও তো হতে পারে।’
‘না, আমি জানি, ও আপনাকে পছন্দ করে। আমি ওকে চিনি। আপনি হয়তো স্বীকার করছেন না।’
‘দেখুন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব কথা বলার কি প্রয়োজন আছে? আমার তাড়া আছে। যাচ্ছি।’ নীরব ফের পা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
মেহেদী ওর সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলে- ‘আরেকটি প্রশ্ন, শেষ প্রশ্ন। প্লিজ, জবাব দেবেন।’
‘বলুন।’
‘আপনি কি স্বর্ণাকে ভালোবাসেন?’
এমন প্রশ্ন শোভন নয়। বিশেষ করে মেহেদী আর নীরবের মধ্যে যেটুকু পরিচয়, এই পরিচয়ের সীমারেখায় প্রশ্নটি শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। মেহেদীর প্রশ্নটা নীরবের ভেতরে চেপে থাকা রাগকে উসকে দিলো। ও মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বললো- ‘স্বর্ণার মতো মেয়েকে যে কোনো যুবক ভালোবাসতে পারে। ভালোবাসাটাই স্বাভাবিক। আমিও ভালোবাসি। আর কী জানতে চান?’ কথাটা মিথ্যা হলেও সে জোর দিয়েই কথাটা বললো। নীরব ভেবেছিল, এ কথা শুনে মেহেদী উত্তেজিত হয়ে ওকে কিছু বলবে, গালাগালও দিতে পারে। কিন্তু মেহেদী যেনো চুপসে গেলো। মেহেদীর মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেলো মুহূর্তেই। এমন জবাব সে হয়তো আশা করেনি।
মেহেদী মৃদুকণ্ঠে বললো- ‘আর কিছু জানতে চাই না। আপনি যান। আর আপনাকে অনুসরণ করবো না। কোনো প্রশ্নও করবো না।’
মেহেদী নীরবের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। নীরব যেনো হঁাঁপ ছেড়ে বাঁচে। নীরব মেহেদীকে কিছু বলে না।
‘আপনি ভীষণ ভাগ্যবান, নীরব!’
কথাটা বলে মেহেদী আপন মনে হেঁটে রাস্তার ওপাশে চলে যায়। নীরব মনে মনে নিজের উদ্দেশে বলে- ‘আমি যে কতোটা ভাগ্যবান, তা আমিই কেবল জানি।’ ওয়েস্টিনের বিপরীতে রাস্তার পাশে একটা সিএনজি থেমে ছিল। নীরব হেঁটে গিয়ে সিএনজিতে চড়ে বসলো। ঠিক এ সময় স্বর্ণার ফোন এলো ওর সেলফোনে। নীরব ফোনের স্ক্রিনে দেখলা স্বর্ণার নম্বর। রিং বাজছিল। নীরব লাল বাটন টিপে লাইন কেটে দিলো। এখন ও স্বর্ণার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। সিএনজিচালকের উদ্দেশে ও বললো- ‘মহাখালি যাও।’
সিএনজিচালক গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা দিলো- ‘একশ টাকা দিতে হবে। মিটারে যামু না।’
সিএনজিচালকরা এ কাজটা হরহামেশা করে। যাত্রী দেখলেই ভাড়া বেশি চাইবে এবং মিটারে যেতে চাইবে না। নীরব এ নিয়ে আপত্তি করলো না। ও বললো- ‘যাও। একশ টাকার সঙ্গে বকশিসও দেবো।’
সিএনজি স্টার্ট নিতেই ফের স্বর্ণার ফোন এলো। নীরব এবারো ফোন কেটে দিলো। স্বর্ণার ফোন এভাবে অবজ্ঞা ও কখনো করেনি। সিএনজি চলতে শুরু করলো। ফের স্বর্ণার ফোন এলো। এবার নীরব ওর ফোনের সুইচ অফ করে দিলো। স্বর্ণা আর ওকে ফোনে পাবে না। ও আশ্বস্ত হলো। মনে মনে ও স্বর্ণার উদ্দেশে বললো- ‘স্বর্ণা, আমার জীবনের আপনার সম্পৃক্ততা না থাকাই ভালো। আমাকে ক্ষমা করুন।’
বারো.
ভোররাতে মাকে স্বপ্ন দেখেছিল নীরব। স্বপ্নে দেখলো, ওর মা রান্না করছেন। রান্না করার সময় অসতর্ক মুহূর্তে চুলোর আগুন ছড়িয়ে পড়লো। ‘বাঁচাও, বাঁচাও!’ বলে ওর মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দাউদাউ করে রান্নাঘর জ্বলছে। ওর মা চিৎকার করে ওকে ডাকছে- ‘নীরব, বাবা আয়, ঘর পুড়ে গেলো! বাবা, আমাদের বাঁচা!’
‘মা’ বলে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠলো নীরব। ঘুম ভাঙার পর বুঝতে পারলো, ও স্বপ্ন দেখছিল। নীরব যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, একদিন সন্ধ্যায় ওদের রান্নাঘরে আগুন লেগেছিল। ওর মা আগুন নেভাতে গেলে তার শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে যায়। ওর মা ভীষণ ভয় পেয়ে যান। তিনি ‘আগুন, আগুন!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন। মায়ের চিৎকার শুনে ঘর থেকে দৌড়ে এসে মাকে দ্রুত রান্নাঘর থেকে বের করে এনেছিল নীরব। ঘর থেকে কাঁথা এনে মায়ের শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে আগুন নিভিয়েছিল। রান্নাঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিবেশীরা এসে কলস কলস পানি ঢেলে আগুন নিভিয়েছিল। আজ এতো বছর পর ও স্বপ্নে দেখলো ওদের রান্নাঘর পুড়ে যাচ্ছে আর মা ওকে ডাকছে।
ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর ও টের পেলো, ওর হার্টবিট বেড়ে গেছে। এই স্বপ্ন ওর চিন্তার ভেতরে গভীর রেখাপাত সৃষ্টি করলো। কারাগারে থাকার দুবছরে ও মাকে স্বপ্নে দেখেনি। কাল তানজিলাকে খুন করার শাকিল চৌধুরীর লোমহর্ষক পরিকল্পনার কথা শোনার পর রাতে মাকে স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নের মধ্য দিয়ে ওর মা যেনো ওকে ডাকছে। ওকে ফিরে যেতে বলছে। নীরব সকালে ঘুম থেকে উঠেই সিদ্ধান্ত নিলো, আজ ও এই শহর ছেড়ে নিজের গ্রামে ফিরে যাবে। ভোররাতের স্বপ্নটা ওকে যেনো পথ দেখালো। কাল থেকেই ওর ভীষণ মন খারাপ। এমন আপসেট ও কখনো হয়নি। শাকিল চৌধুরী এতোটা নিচ আর হীন, ভাবেনি ও। যে ব্যক্তি অর্থের লোভে স্ত্রীকে খুন করতে চায়, সে প্রকৃতপক্ষে অমানুষ। এ কথাটা ওর মনে বারবার ফিরে আসছে। তানজিলা খুন হোক, এটা ও চায় না। ওর খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়ার প্রস্তাব তো কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ও এতোটা অমানুষ হতে পারবে না। আবার শাকিল চৌধুরীর সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছিল, তা রাখতে না পারার গ্লানিও আছে। কষ্ট আছে। একটা অপরাধের দায় স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি সে শাকিল চৌধুরীকে দিয়েছিল। কিন্তু তানজিলা খুন হবে এবং ওর খুনের দায়ভার ওকে নিতে হবে, এমন তো ও ভাবেনি। এ কথা ভেবে রাতভর নীরব যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। কাল থেকে ও হোটেলের রুম থেকে বের হয়নি। সেলফোন বন্ধ রেখেছে। নিজেকে নিয়েই ছিল ও। শাকিল চৌধুরী নিশ্চয় ওকে ফোন করে পায়নি। তবে সে হোটেলের নম্বরে ফোন করেনি। স্বর্ণা নিশ্চয় ওকে অনেকবার ফোন করেছিল। স্বর্ণাকে হঠাৎ করে উপেক্ষা করা ওর ঠিক হয়নি, এ কথা ভেবেছে নীরব। কিন্তু ও কী করবে? এমন মানসিক চাপে ও কখনো পড়েনি। রাতে মাকে স্বপ্নে দেখে ও যে পথ হারিয়ে আলোর দিশা খুঁজে পেলো। ঘুম ভাঙার পর নিজের গ্রামে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো। ঢাকা শহরটাকে ওর কাছে এখন ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। আর শহরের মানুষগুলোকে নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে। ও নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিলো দ্রুত। ব্যাগ গুছিয়ে ও অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। একপর্যায়ে ও তৈরি হয়ে নেয়। আজ ও কালো প্যান্ট আর নেভি ব্লু ফুলহাতা শার্ট পরলো। কালো রঙের টিম্বারল্যান্ডের এক জোড়া জুতো কিনেছিল গত সপ্তাহে। পরা হয়নি। সেই জুতো পরলো ও। হোটেলের রুম থেকে বের হবার আগে ও তানজিলাকে ফোন করার কথা ভাবলো। হয়তো এটাই হবে ওর শেষ ফোন। এরপর সেলফোনটা হোটেলের কাউন্টারে রেখে যাবে শাকিল চৌধুরীর জন্য। এই সেলফোন সে দিয়েছিল। তার সেলফোন সঙ্গে নেবে না ও। তানজিলার খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারবে না, এ কথা শাকিল চৌধুরীকে পরে ফোন করে জানিয়ে দেবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে নীরব। তানজিলাকে ফোন করলো ও। তানজিলার ফোনের রিং বাজছিল, রিংটোন পাঁচবার বাজার পর ও-প্রান্তে তানজিলা ফোন রিসিভ করলো।
‘হ্যালো!’ তানজিলার মৃদুকণ্ঠ।
তানজিলা ফোন রিসিভ করায় নীরব আশ্বস্ত হলো। ও বললো, ‘হ্যালো, তানজিলা? কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি কেমন আছেন?’
‘আমি ভালো নেই।’
‘কেনো? কী হয়েছে? এনিথিং রং?’ তানজিলা উদ্বিগ্ন হয়।
নীরব বলে- ‘আপনার স্বামী শাকিল চৌধুরী কি বাসায় আছেন?’
‘না। ও বের হয়ে গেছে। কেনো?’
‘আপনাকে আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। আমার কথাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বুঝলেন?’ এ পর্যন্ত বলে থামলো নীরব। ওর বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। উত্তেজনা বাড়ছে শ্বাস-প্রশ্বাসে।
ও-প্রান্ত থেকে তানজিলা বললো- ‘আপনার কী হয়েছে বলুন তো? আপনি কি অসুস্থ?’
‘না, না। আমি সুস্থ আছি। তবে যা বলতে চাচ্ছি, তা বলতে গিয়ে ভড়কে যাচ্ছি।’
‘কী বলতে চান, বলে ফেলুন। আমাকেও বের হতে হবে কিছুক্ষণের মধ্যে।’
‘বলতে চাচ্ছি, আপনি আজ কোথাও বের হবেন না।’
‘কী বলছেন! কেনো এ কথা বলছেন?’
‘আগে আমার কথা শুনুন। এরপর সিদ্ধান্ত নেবেন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা।’
‘আহা, বলুন! কী বলতে চান?’
‘তার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই। করবো?’
‘করুন।’
‘আপনার স্বামী, আই মিন শাকিল চৌধুরী কেমন মানুষ?’
এ কথার জবাবে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে তানজিলা বললো- ‘আপনি হঠাৎ এ প্রশ্ন কেনো করছেন? আপনার আজ কী হয়েছে?’
‘আমার কিছু হয়নি। কিন্তু আপনার ভয়ানক কিছু হতে পারে। তাই প্রশ্নটা করেছি।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন। যা বলতে চান, তা খুলে বলুন। আমাকে বিচলিত করবেন না, প্লিজ!’
‘না, না। আমি আপনাকে বিচলিত করতে চাই না। আপনি ভুল বুঝবেন না, প্লিজ।’
‘তা হলে বলে ফেলুন। এতো সময় নিচ্ছেন কেনো?’
‘আমি আসলে বলতে চাচ্ছি, আপনার স্বামী আপনাকে খুন করার পরিকল্পনা করছে। আমার কথাটা বিশ্বাস করুন, প্লিজ।’
ও-প্রান্তে তানজিলা হাসছে। ওর হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে নীরব। ওর কথা তানজিলা বিশ্বাস করছে না। নীরব নিজের মধ্যে অসহায়ত্ত টের পায়। ও হাল ছাড়ে না। বলে- ‘বিশ্বাস করুন, আমি যা বলছি, তা সত্যি। আপনি আমার কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দেবেন না, প্লিজ!’
নীরবের কথার জবাবে হাসির মদিরতা মিশ্রিত কণ্ঠে তানজিলা জানতে চাইল- ‘আচ্ছা, শাকিল কেনো আমাকে খুন করবে? ওর কীসের অভাব? কী কারণে আমাকে খুন করবে ও? খুন করার তো একটা রিজন থাকতে হবে, তা-ই না?’
‘দেখুন, আমি সত্যি কথাটাই বলছি। আপনাকে খুন করে সে আপনার অর্থ-সম্পদের একক মালিক হতে চায় হয়তো।’
‘আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! আপনি অসুস্থ! আর কিছু বলবেন?’
‘আমার কথা বিশ্বাস করুন, প্লিজ! আমার কথা মিথ্যা হলেও কথাটাকে উড়িয়ে না দিয়ে একটু ভাবুন। সতর্ক থাকুন। নিজেকে নিরাপদে রাখুন।’ নীরব হড়বড় করে কথাগুলো বলে। কথাটা বলতে ওর তৃষ্ণা পেয়ে গেলো। ঢোঁক গিলে তৃষ্ণা নিবারণ করে সে।
ও-প্রান্ত থেকে তানজিলার প্রশ্ন- ‘নীরব, আপনি কারাগার থেকে বের হয়ে কখনো কোনো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়েছিলেন?’
‘না।’
‘যাওয়া দরকার ছিল। কারাগারে থাকলে অনেকের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।’
‘তানজিলা, আপনি কি আমার কথা একেবারেই বিশ্বাস করতে পারছেন না?’
‘এমন কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে, ভাবছেন? আমার স্বামী আমাকে কেনো খুন করবে, বলুন? আমাদের দাম্পত্য জীবনও ভালো। আমাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝিও আজ পর্যন্ত হয়নি। অকারণে সে কেনো আমাকে খুন করবে?’
নীরব বুঝতে পারছে, তানজিলা ওর কথা বিশ্বাস করছে না। তাকে বিশ্বাস করানোর মতো যথাযথ যুক্তিও ওর কাছে নেই। এখন ও কী বলবে? ভাবে নীরব। ও-প্রান্ত থেকে তানজিলা বলে- ‘আমি রাখছি, পরে কথা হবে।’
‘শুনুন, একটা কথা বলতে চাই।’
‘বলুন।’
‘আপনার স্বামী আমাকে কারাগার থেকে বের করেছিলেন একটি শর্তে। শর্তটি ছিল আমি কোনো একটি অপরাধের দায় স্বীকার করে ফের কারাগারে চলে যাবো।’
‘হাউ ফানি!’
‘হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন। আমি নাবিলার খুনিকে শনাক্ত করার জন্য তার শর্ত মেনে কারাগার থেকে বের হয়ে আসি। আমার কথা শুনছেন?’ নীরবের কণ্ঠে অসহায়ত্ত ফুটে ওঠে।
তানজিলা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে- ‘ও আসলে সবসময় নাটকীয় কিছু করতে চায়। ওর কথাবার্তায়ও নাটকীয়তা থাকে। এটা ওর অদ্ভুত হবি। এ কারণে হয়তো আপনাকে নাটকীয় শর্ত দিয়েছে। আসলে আপনাকে ও কারাগার থেকে বের করে এনেছে আমার অনুরোধে। আমিই ওকে বলেছিলাম, সম্ভব হলে আপনাকে যেনো কারাগার থেকে বের করে আনে।’
‘হতে পারে। কিন্তু কাল সে আমাকে বলেছে যে, আপনাকে খুন করা হবে। পেশাদার খুনি ভাড়া করেছে সে। আমার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছে। পরিকল্পনা হয়েছে, খুনিরা আপনাকে খুন করবে। এরপর এই খুনের দায়-দায়িত্ব আমি স্বীকার করবো। ব্যস, আমার কাজ শেষ। আমি ফের কারাগারে চলে যাবো। আমার কথা বিশ্বাস করুন, প্লিজ!’
ও-প্রান্তে তানজিলা চুপ। সে হয়তো ওর কথা এখন উড়িয়ে দিচ্ছে না, ভাবে নীরব। তানজিলার জবাব না পেয়ে ও বলে- ‘আমার কথাগুলো ভাবুন। শাকিল চৌধুরী নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে পছন্দ করেন, এটা ঠিক। তারপরও আমার মনে হচ্ছে, সে আপনাকে সত্যি সত্যি খুন করার পরিকল্পনা করছে।’
তানজিলার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার শব্দ শুনতে পায় নীরব। টেলিফোনের অন্য প্রান্ত থেকে তানজিলার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে- ‘নীরব, শাকিল আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমার খুশির জন্য ও সব সময় তটস্থ থাকে। আমাদের মধ্যে কোনোরকম মনোমালিন্য বা ঝগড়াও হয় না। সে আমাকে খুন করার জন্য পেশাদার খুনি ভাড়া করবে, এ কথা বিশ্বাস করতে পারছি না।’
এ কথার জবাবে কী বলা যায়, ভেবে পায় না নীরব। ও কেমন হতাশার মধ্যে তলিয়ে যায়। ও যা বলতে চাচ্ছে, তাও যে সঠিক, এ কথা হলফ করে বলা যায় না। শাকিল চৌধুরী সত্যিই নাটকীয়তা তৈরি করতে পছন্দ করে। হতে পারে, কয়েকজন অভিনেতাকে ভাড়া করে এনে ওর সামনে খুনি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছে কাল। কিন্তু সত্যি সত্যি যদি শাকিল চৌধুরী তানজিলাকে খুন করতে খুনি ভাড়া করে থাকে, তা হলে কী হবে? প্রশ্নটা কাঁটার মতো বিঁধে গেলো মানসপটে। ও অসহায় গলায় তানজিলাকে বলে- ‘কিন্তু আমি কেনো জানি, নিশ্চিত হতে পারছি না। মনে হচ্ছে, শাকিল চৌধুরী আপনাকে খুন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আমার কথাকে সত্যি ভেবে নিন। প্লিজ!’ নীরবের কণ্ঠে আকুতি।
তানজিলা কয়েক মুহূর্ত ভাবে। টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে তানজিলার একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় সে। তানজিলা বলে- ‘আপনি যখন জোরালোভাবে বলছেন, তখন আমি সতর্ক থাকবো। ওকে ওয়াচ করবো। সন্দেহজনক কিছু দেখলে আমি যা করার করবো।’
নীরবের টেনশন একটু কমল। শাকিলকে নিয়ে সন্দেহ নেই তানজিলার। বরং তার প্রতি গভীর আস্থা আছে। তারপরও ওর কথা একেবারে উড়িয়ে না দেয়ায় আশ্বস্ত হলো নীরব। তানজিলা বিত্তবান পরিবারের মেয়ে। ও নিশ্চয় নিজেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা রাখে। নীরব বললো- ‘আমি যেখানেই থাকি, আপনি নিরাপদ থাকবেন, এই শুভ কামনা থাকবে আমার।’
‘কোথাও যাচ্ছেন না-কি?’
‘হুম।’
‘কোথায় যাচ্ছেন?’
‘এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। পঞ্চগড়ে নিজের গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।’
‘কেনো?’ তানজিলা অবাক হয় নীরবের কথায়। অবাক হবারই কথা।
নীরব জবাবে বলে- ‘এই শহর আমার জীবন বিপন্ন করেছিল। এখন বিষিয়ে তুলেছে। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। তাই গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।’
‘কিন্তু আমি বলেছিলাম, আপনি আমাদের কোম্পানিতে একটা ভালো পজিশনে চাকরি করুন।’ বলে তানজিলা।
তানজিলার জন্য মায়া অনুভব করে নীরব। ও বলে- ‘না, গ্রামে ফিরে গিয়ে কিছু করবো। না হয় চাষাবাদ করবো। শহর বড় নোংরা!’ কথাটা বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নীরব।
তানজিলা বলে- ‘ঠিক আছে, আপনি নিজের গ্রাম ঘুরে আসুন। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকায় ফিরে আসুন। ঢাকায় ফিরে আমাকে ফোন দেবেন। আপনার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করবো আমি।’
‘ধন্যবাদ, তানজিলা। তবে আমি ফিরছি না। এই শহর থেকে আমি পালাতে চাই। আবারো বলছি, আপনি নিরাপদে থাকবেন।’
‘আচ্ছা, আগে গ্রামে যান। কিছুদিন থাকেন বাবা-মার সঙ্গে। এরপর আপনার সঙ্গে শহর ও চাকরি নিয়ে কথা হবে।’
‘ঠিক আছে। আপনি ভালো থাকবেন।’
‘আপনিও ভালো থাকবেন। বাই।’
‘বাই।’
তানজিলা ফোন রেখে দিলো। নীরবের বুকের ভেতর থেকে সরে গেলো জমে থাকা আশঙ্কার কালো মেঘ। তানজিলা ওর কথা বিশ্বাস করুক, বা না করুক, অন্তত নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করবে। শাকিল চৌধুরী নিশ্চয় তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করবে, তানজিলা তাকে ওয়াচ করলে হয়তো অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাবে, মনে মনে ভাবে ও। বিছানায় রাখা হ্যান্ডলাগেজ তুলে নিয়ে হোটেলের কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়লো নীরব। হোটেলের কাউন্টারে গিয়ে রুমের চাবি এবং সেলফোনটা রেখে হোটেল ম্যানেজার হাবিবকে ও বললো- ‘এই সেলফোনটা শাকিল সাহেবকে দিয়ে দেবেন।’
হাবিব হাসিমুখে চাবি এবং সেলফোনটা নিয়ে বললো- ‘জি, আচ্ছা, স্যার।’
নীরব হোটেলের লবিতে আসতেই স্বর্ণার মুখোমুখি পড়ে গেলো। এ সময় স্বর্ণার আসার কথা নয়। ওকে দেখে অবাক হলো নীরব। নীরব ও স্বর্ণা মুখোমুখি থমকে দাঁড়িয়েছে। নীরবকে দেখে চোখ কপালে তুলে স্বর্ণা বিস্মিত কণ্ঠে বললো- ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন!’
‘আপনি এই সাতসকালে এখানে!’ পাল্টা প্রশ্ন করলো নীরব।
স্বর্ণা বললো- ‘কাল থেকে আপনাকে ফোন করছি। নো রেসপন্স। একসময় দেখলাম আপনার ফোনও বন্ধ। আমার ফোন ধরছেন না কেনো?’
নীরব ইচ্ছে করে স্বর্ণার ফোন ধরেনি, এ কথা ওকে বলা যায় না। তানজিলাকে খুন করা হবে এবং এই খুনের দায়ভার ওর কাঁধে তুলে নিতে হবে, শাকিল চৌধুরীর এই পরিকল্পনা শোনার পর থেকে ও এতোটাই আপসেট হয়ে পড়ে যে, স্বর্ণার ফোন ওর কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছিল। তাই ও ফোন ধরেনি। একথা স্বর্ণাকে এখন বলা যাবে না। ও মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে বললো- ‘মন ভাল ছিল না। তাই ফোন ধরিনি। সরি।’
‘এটা কোনো কথা হলো! আর আপনার হাতে লাগেজ কেনো? কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
‘কোথায় যাচ্ছেন? কেনো?’
‘নিজের গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।’
‘ও, আচ্ছা। তাই বলে আমাকে কিছু না বলে এভাবে চলে যাচ্ছিলেন? আমি কি আপনার কাছ থেকে একটা ফোনকল পেতে পারতাম না? আমাকে এই সাতসকালে আপনার হোটেলে এসে জানতে হলো আপনি চলে যাচ্ছেন!’ স্বর্ণার কণ্ঠে বিস্ময় ও বেদনার মিশ্রণ।
নীরব ওর কথায় বিব্রতবোধ করে। এ কথার সঠিক জবাব ও দিতে পারবে না। স্বর্ণার কথায় ও লজ্জিত হয়। স্বর্ণা এমনভাবে কথাটা বললো যে, মনে হচ্ছে ওর ওপর অভিমান করার অধিকার জন্ম নিয়েছে। কথাটা ওর ফেরারি জীবনে বসন্তের পরশ বুলিয়ে দিলো। নীরবের এ মুহূর্তে মনে হলো, ওর ফেরারি জীবনে স্বর্ণা যেনো বসন্ত। স্বর্ণা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও নীরবের কাছ থেকে জবাব আশা করছে। নীরব অস্বস্তি নিয়ে বলে- ‘আপনার সঙ্গে গাড়ি আছে না?’
‘আছে। কেনো?’
নীরব মুচকি হেসে বলে- ‘আমাকে বাস টার্মিনালে নামিয়ে দেবেন?’
‘দেবো।’ নীরবের অনুরোধে স্বর্ণার ছোট্ট জবাব।
নীরব বলে- ‘চলুন, যেতে যেতে কথা বলব। কাল থেকে আপনার ফোন ধরিনি বলে রাগ করে থাকবেন না, প্লিজ।’
স্বর্ণাও চাচ্ছিল হোটেলের লবি থেকে বের হয়ে যেতে। লবিতে দাঁড়িয়ে কথা বললে হোটেলের স্টাফদের কৌতূহলী চোখ ওদের দিকে আটকে থাকবে। ও বললো- ‘ঠিক আছে চলুন। বাইরে আমার গাড়ি পার্ক করা আছে। গাড়িতে কথা বলবো।’
ওরা হোটেল থেকে বের হয়ে এলো। বাইরে সকালের ঝকঝকে রোদ। শহরের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে আগেই। স্বর্ণা ড্রাইভারকে গাড়ির ব্যাকডালা খুলতে বলে গাড়ির পেছনের আসনে গিয়ে বসলো। ড্রাইভার ব্যাকডালা খুলে দিলে নীরব ওর হ্যান্ডলাগেজ সেখানে রেখে দেয়। ও ব্যাকডালা লাগিয়ে গাড়ির পেছনে গিয়ে বসলো স্বর্ণার পাশে। এবার স্বর্ণা বললো- ‘কোথায় যাবেন?’
‘গাবতলী। পঞ্চগড় যাবার বাস ধরতে চাই।’
‘ড্রাইভার, গাবতলীর দিকে যাও।’ বলে স্বর্ণা।
কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি চলতে শুরু করে। বেশ কিছুক্ষণ স্বর্ণা চুপ থেকে বলে- ‘আমি ভীষণ ভীষণ অবাক হয়েছি আপনার আচরণে!’
এর জবাবে অপরাধীর মতো নীরব বলে- ‘আমি জানি, আমি যা করেছি, তা ঠিক করিনি। কিন্তু আমার মনের অবস্থার কথা জানলে আপনি আর রাগ করবেন না।’
এ কথায় স্বর্ণা নীরবের মুখের দিকে অনুসন্ধানী চোখে তাকায়। ‘আপনার মধ্যে কেমন অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছি। আপনার কী হয়েছে বলুন তো? হঠাৎ করে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন কেনো? আপনার বাবা-মা ভালো আছেন তো?’
স্বর্ণার এই ব্যাকুলতা ভালো লাগে নীরবের। ওকে নিয়ে এবং ওর বাবা-মাকে নিয়ে কেউ কখনো এমন ব্যাকুলতা দেখায়নি। ও বললো- ‘মানসিক চাপে আমি বিপর্যস্ত। তাই এই শহর ছেড়ে পালাচ্ছি।’
‘পালাচ্ছেন মানে? কেনো?’ বিস্মিত হয় স্বর্ণা।
নীরবের মনে হলো, স্বর্ণার কাছে সব কথা খুলে বলা উচিত। ও সাংবাদিক। হয়তো তানজিলাকে শাকিল চৌধুরী যেনো খুন করতে না পারে, এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে। নীরব বলে- ‘আপনাকে সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি। কথাগুলো শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে।’
‘আচ্ছা, বলুন।’
‘আমাকে শাকিল চৌধুরী কারাগার থেকে বের করেছেন একটা শর্ত দিয়ে। শর্ত ছিল, আমি কোনো এক অপরাধের দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ফের কারাদণ্ড ভোগ করবো।’
‘স্ট্রেঞ্জ! এমন শর্তের কথা কখনো শুনিনি!’
‘প্রথমে এই শর্ত নিয়ে বিচলিত হইনি। ভেবেছিলাম, নাবিলার খুনি কে, তা জানা হলে ফের না হয় কারাগারে ফিরে যাবো। মন্দ কী? এই চিন্তা থেকে রাজি হয়েছিলাম শাকিল চৌধুরীর প্রস্তাবে।’ এ পর্যন্ত বলে থেমে যায় নীরব।
উদগ্রীব হয়ে স্বর্ণা বলে- ‘এরপর কী হলো, বলুন!’
‘কাল শাকিল চৌধুরী আমাকে জানান, কোনো একদিন তার স্ত্রী তানজিলা খুন হবে এবং আমাকে ওই খুনের দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। আই মিন, আমি তানজিলাকে খুন করেছি, এ কথা স্বীকার করতে হবে।’
‘ও মাই গড! বলেন কী! এ তো ভয়ঙ্কর ঘটনা!’
‘হ্যাঁ, ভয়ঙ্কর তো বটেই। এখন বুঝুন, আমার মনের অবস্থা কেমন হতে পারে।’
‘আপনি কি শাকিল চৌধুরীর কথায় রাজি হয়েছেন?’
‘রাজি হইনি- এমন কথা বলিনি। কিন্তু এ কাজ আমি করতে পারবো না। কিছুতেই না। তাই তো শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’
কথা শুনে স্বর্ণা চুপসে গেলো। বিস্ময়ে ও থ’ বনে গেছে। ও মনে মনে ভাবে, এও কি বিশ্বাসযোগ্য? নিজের স্ত্রীকে খুন করতে চাইছেন কেনো শাকিল চৌধুরী, এটা ওর বোধগম্য হচ্ছে না। তবে শাকিল চৌধুরী যে ভীষণ চালাক-চতুর শ্রেণির লোক, এটা বোঝা যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নিজ স্ত্রীকে খুন করতে চাচ্ছেন এবং নিজেকে আইনের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে নীরবকে ফাঁসাতে চাচ্ছেন। চতুরতায় পরিপূর্ণ তার পরিকল্পনা। স্বর্ণা এ কথা ভেবে নীরবের উদ্দেশে বললো- ‘আপনি তানজিলাকে এ কথা বলে দিলেই পারেন।’
‘কিছুক্ষণ আগে তাকে এ কথা বলেছি। কিন্তু সে আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না।’
‘হুম। বিশ্বাস করার মতো কথা নয়। কিন্তু সে যদি খুন হয়েই যায়?’
‘আমিও এ কথা ভাবছি।’
‘ভাবলে এভাবে পালাচ্ছেন কেনো?’
‘আমি কী করতে পারি? এমনিতেই আমি প্রতিশ্রুতি ভাঙছি। শাকিল চৌধুরী শর্ত দিয়ে আমাকে জেল থেকে বের করেছেন। শর্ত না মেনে পালিয়ে যাচ্ছি। এরও তো গ্লানি আছে।’
‘শুনুন। আপনি খুন না করেও খুনের সাজা পেয়েছেন। এই অন্যায়ের জন্য দায়ী কে? এর জন্য দায়ী আইন-আদালত, পুলিশসহ আমরা অনেকে। এর জন্য আমরা কি গ্লানিতে ভুগছি? আপনি কেনো গ্লানিতে ভুগবেন? যে শর্ত আরেকটি অন্যায়ের জন্ম দেয়, সে শর্ত না মানা কোনো অপরাধ নয়। বরং আপনি সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ করেছেন। এখন আরেকটি কাজ আপনার করা উচিত।’
‘কী কাজ করা উচিত?’
‘শাকিল চৌধুরীকে আইনের হাতে সোপর্দ করা উচিত।’
‘বলো কী! কিভাবে করবো? পুলিশকে এসব কথা বললে আমার কথা বিশ্বাস করবে না। আমার কাছে কোনো প্রমাণও নেই। উল্টো আমি ঝামেলায় পড়বো। শাকিল চৌধুরী তখন আমাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করবেন। আমি তার সঙ্গে পারবো না।’
‘পুলিশকে কিছু বলতে বলছি না। আগে প্রমাণ সংগ্রহ করুন। পরে কী করতে হবে আমি করবো।’
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘আমি বলতে চাচ্ছি, আপনি শাকিল চৌধুরীর পরিকল্পনামতো কাজ করতে থাকুন। এখন থেকে তার কথা টেপ বা গোপন ক্যামেরায় ভিডিও করবেন। ঠিক খুন হবার আগে আমরা পুলিশ নিয়ে শাকিল চৌধুরী এবং খুনিদের গ্রেফতার করতে পারি।’
‘কী বলছেন! এসব কেনো করবো বলুন তো?’ ভীতুর মতো জানতে চায় নীরব।
স্বর্ণা বলে- ‘করবেন এমন অন্যায় হতে দেয়া যায় না বলে।’
‘আমার কি এতো শক্তি আছে? ওরা সব ধনী ও প্রভাবশালী। ওদের সঙ্গে আমি পেরে উঠবো না। ওরা আমাকে ভ্যানিশ করে ফেলবে। আপনি জানেন, শাকিল চৌধুরী তিনজন পেশাদার খুনিকে ভাড়া করেছে? তারা আমাকেও এক ঝটকায় খুন করে ফেলতে পারে!’
নীরবের কথায় চিন্তিত হয় স্বর্ণা। ও কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ভাবে। এরপর বলে- ‘আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি একবার। বরং খুনের মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। এ কথা মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেনো?’
‘তা হলে আপনার নতুন করে আর ভয় কী?’
‘মানে?’
‘মানে, এবার প্রতিরোধ করুন। খুনিদের ঠেকান।’
‘এতে ঝুঁকি আছে। আমি কেনো ঝুঁকি নেবো?’
‘ঝুঁকি নেবেন একজনের জীবন বাঁচাতে। এটা করা উচিত। নাবিলার কথা ভাবুন। ওকেও পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। আমরা যদি কোনো কিছু না করি, তা হলে হয়তো তানজিলাও খুন হয়ে যাবে। এ কথা জানার পর আমরা তা হতে দিতে পারি না।’
এ কথায় গভীর চিন্তায় পড়ে যায় নীরব। ও বলে- ‘আপনার কথা ঠিক। কিন্তু…’
‘কোনো কিন্তু নয়। লড়াই করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। ভীতুর মতো জীবনযাপন করে কিছু পাবেন না। সাহসী হন, কিছু পাবেন। অন্তত সাহস করে লড়াই করার মর্যাদা তো পাবেন।’
স্বর্ণার কথায় নীরবের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ভয়ের কুয়াশা কেটে যেতে থাকে যেনো। স্বর্ণা কি ওকে সাহসী করে তুলছে? ও নিজের মধ্যে কেমন অনুপ্রাণিত হয়। ও স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বলে- ‘আপনি আজ আমাকে ভীষণরকম চাঙ্গা করে দিচ্ছেন। আমার মতো একজন সব হারানো লোককে খেপিয়ে তুলছেন কেনো? আমার জীবন আর আপনাদের জীবন এক নয়।’
ওর কথা শুনে স্বর্ণা মিটিমিটি হাসতে থাকে। নীরব বুঝতে পারে না, স্বর্ণা এ কথায় কেনো হাসছে। তবে স্বর্ণার হাসির মাধুর্যে ওর ভেতরে অস্থিরতা মিলিয়ে যায়। ও তাকিয়ে থাকে স্বর্ণার মুখের দিকে। স্বর্ণা চোখে কৌতূহল ফুটিয়ে বললো- ‘এবার তানজিলার প্রসঙ্গ রেখে আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে। করবো?’
স্বর্ণা প্রসঙ্গ বদলাতে চাইছে। মন্দ নয়, ভাবে নীরব। ও বলে- ‘করুন। কী প্রশ্ন?’
‘নিজের জীবন সম্পর্কে কী ভেবেছেন ?’
এমন প্রশ্ন স্বর্ণা ওকে আগেও করেছে। স্বর্ণা আসলে এ ধরনের প্রশ্ন করে জীবন সম্পর্কে ওকে সচেতন করতে চায়। নীরব এর জবাবে ভাবালুতা প্রকাশ করে বলে- ‘আমার ভাবনার কিছু নেই। কী ভাববো, বলুন, আমার জীবন কি আর জীবন আছে? একটা ক্ষয়ে যাওয়া জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি।’
‘ক্ষয়ে যাওয়া জীবন মানে?’
‘ক্ষয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবন আমার। আমার কথা বুঝতে পারছেন না?’
‘কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি আপনার ধারণার সঙ্গে একমত নই।’
‘যেমন?’
‘যেমন, আপনি ভাবছেন আপনার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে, আমি কথাটি মেনে নিতে পারছি না। আপনার জীবনে বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা সত্যি যে, আপনি অনেক অ-নে-ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আপনি বিপন্ন। তারপরও বলবো, আপনার জীবন নষ্ট হয়ে যায়নি। আপনি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আপনার ঘুরে দাঁড়ানো উচিত।’
‘ঘুরে দাঁড়াবো, কিভাবে? কার জন্য? কী পাবো?’
‘একসঙ্গে তিন প্রশ্ন। জবাব দিচ্ছি। ঘুরে দাঁড়াবেন নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য। ঘুরে দাঁড়াবেন নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ে, অ্যাম্বিশন নিয়ে, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে। নিজের ভেতর নিজেকে মিইয়ে রাখলে হবে না। দ্রোহ নিয়ে জেগে উঠুন। আর বলছিলেন, কী পাবেন? আপনার কাছেই প্রশ্ন করি, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার আনন্দ কি নেই? জীবনের মহত্ত্ব কি নেই? মাধুর্য নেই?’
‘আছে। কিন্তু জীবন নিয়ে আমার আকর্ষণ নেই।’
‘বিহ্বলতা, অনুরাগ, দুঃখতাপ, অনুযোগ-অভিযোগ, অভিলাষ ইত্যাদি নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে। আপনিও এভাবে জীবনকে উপভোগ করবেন।’
‘কিন্তু আমার জীবন তো সে রকম নয়। লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া এক জীবন। এ কথা তো আপনি জানেন।’
‘পৃথিবীতে অনেক কিছুই তো লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মানুষই ফের ঘুরে দাঁড়ায়। আপনি কেনো হতাশার তলিয়ে যাবেন? হতাশায় ডুবে গেলেই বা আপনি কী পাবেন?’
‘আপনার কথাগুলো ঠিক, তা আমি জানি। তারপরও আমার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। আমি যে নিজের মধ্যে মিইয়ে গেছি।’
‘আসলে আপনার ভেতরে আপনি ঘুমিয়ে গেছেন। এই ঘুমন্ত সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। জেগে উঠতে হবে আপনার নিজেকেই।’
‘এবার আপনি বলুন তো, জীবন সম্পর্কে আমার কেনো আকর্ষণ নেই? কেনো এমন হলো?’
‘আপনি স্বপ্নহীন এবং লক্ষ্যহীন হয়ে আছেন। বিনা অপরাধে কারাদণ্ডের আঘাত আপনাকে স্বপ্নহীন-লক্ষ্যহীন করেছে। জীবন নিয়ে আপাতত আকর্ষণ নেই, তাই বলে আকর্ষণ একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি। আই বিলিভ, আপনার মধ্যে জীবন, আই মিন বেঁচে থাকার আকর্ষণ ফিরে আসবে।’
‘আপনি কি হিউম্যান সাইকোলজি পড়েছেন?’
এ কথায় স্বর্ণা মিষ্টি করে হাসলো। ‘কেনো জানতে চাচ্ছেন যে, আমি হিউম্যান সাইকোলজি পড়েছি কি-না।’
‘আপনার কথায় তা-ই মনে হলো। জীবন সম্পর্কে যেভাবে কথা বলেন, তাতে এমন মনে হতেই পারে।’
‘আমি এমবিএ করেছি। গণিত নিয়ে আমার কাজ। তবে হিউম্যান সাইকোলজি সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বই পড়তে হয় না। জীবনের দিকে গভীর পর্যবেক্ষণ করলে হিউম্যান সাইকোলজির সব কিছু দেখতে পাবেন। বলতেও পারবেন।’
নীরবের মনে হলো, নাবিলার খুনি কে বা কারা এ নিয়ে স্বর্ণা কোনো আলোচনা করছে না। অথচ নাবিলার খুনি শনাক্তকরণের বিষয়টি ওদের দুজনের কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একথা মনে হতেই নীরব বললো- ‘আচ্ছা, নাবিলার খুনির ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি?’
এ প্রশ্ন শুনে স্বর্ণার মুখে উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠলো। ও মুখে হাসি বিস্তৃত করে বললো- ‘আমি আশা করছিলাম, আপনি এ ব্যাপারে কিছু জানতে চাইবেন। জানতে চাওয়ায় খুশি হলাম।’
‘যাক, পরীক্ষা অনেক নিচ্ছেন। এবার বলুন, এর অগ্রগতি কী?’
‘আপনাকে খুঁজছিলাম তো এর অগ্রগতি জানানোর জন্য। কিন্তু আপনাকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে অস্থির হয়ে সকালে নিজেই চলে এলাম আপনার হোটেলে। আপনাকে তো আসল কথা এখনো বলা হয়নি।’
‘কী সে কথা বলুন। আমরা আরেকটি সম্ভাব্য খুনের বিষয় নিয়ে মেতে আছি। অথচ নাবিলার খুনিদের সম্পর্কে কোনা আলোচনা করিনি। বলুন, কী আপডেট আছে।’
‘আপডেট হচ্ছে, আমরা নিশ্চিত হয়েছি, নাবিলাকে শামীম এবং মাহাবুব পরিকল্পিতভাবে খুন করেছে। ওরা পেশাদার খুনিদের দ্বারা নাবিলাকে খুন করেছিল।’
‘কিভাবে জানলেন?’
‘নাবিলাকে ফোন করে গুলশানের রেস্ট হাউসে নিয়ে গিয়েছিল শামীম। এর টেলিফোন রেকর্ড আমরা উদ্ধার করেছি। আমার ফুপা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার নির্দেশে কাল রাতে শামীমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।’
‘কী বলছেন! এতো বড় একটা সংবাদ এতো পরে বললেন?’ চেঁচিয়ে ওঠে নীরব।
স্বর্ণা বলে- ‘বলার সুযোগ পেলাম কখন?’
‘তারপর বলুন, শামীম কি মুখ খুলেছে?’
‘হুম। সে-ই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, নাবিলাকে সে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করেছে। এই খুনের পেছনে মাহাবুবও জড়িত- এ কথাও সে বলেছে।’
‘হাউ স্ট্রেঞ্জ!’
‘পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এই মামলা নতুন করে উঠবে আদালতে। কাল আমার পত্রিকায় একটি বিশেষ রিপোর্টও ছাপা হবে এই খুন নিয়ে। আপনার সাক্ষাৎকারও ছাপা হচ্ছে।’
স্বর্ণার কথায় নীরব স্তম্ভিত হয়ে যায়। ওর ঠোঁট তিরতির করে কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরে কান্নার অজস্র ঢেউ উথাল-পাতাল করে ওঠে। ও কিছু বলতে পারে না। স্বর্ণা বলে- ‘নাবিলার প্রকৃত খুনিকে ধরতে পেরে আমি ও আমার পুরো পরিবার আনন্দিত। নিশ্চয় আপনিও আনন্দিত?’
‘আমার খুব ভালো লাগছে। এ কথা শোনার পর কী বলবো? কিছু বলতে পারছি না। এখন মনে হচ্ছে, এই শহর বিষাক্ত হয়ে যায়নি। এইমুহূর্তে মনে হচ্ছে, শহর ছাড়া ঠিক হচ্ছে না। গ্রামে পরে গেলেও হবে। কী বলেন?’
স্বর্ণা নীরবের কথার জবাব না দিয়ে ড্রাইভারের উদ্দেশে বললো- ‘ড্রাইভার, গাবতলী নয়, পঞ্চগড় চলুন।’
নীরব অবাক হলো। আজ ওর অবাক হবার পালা চলছে। একদিনে ঘটনার এতো বাঁক, দৃশ্যপটের এতো পরিবর্তনের জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। ও অবাক চোখ তুলে বললো- ‘গাড়ি পঞ্চগড় যাবে মানে?’
স্বর্ণা ঘোষণা করছে, এমনভাবে বললো- ‘আপনি আজ আপনাদের বাড়ি যাবেন। আমিও আপনার সঙ্গে যাবো। পঞ্চগড়ে একদিন থেকে কাল ঢাকায় ফিরবো আমরা।’
‘কী বলছেন আপনি! আপনি যাবেন আমাদের বাড়িতে! আমার সঙ্গে!’
‘কেনো, সঙ্গে নিতে আপত্তি আছে?’
‘না। আপত্তি থাকবে কেনো?’
‘তা হলে?’
‘না, ভাবছি, মা-বাবাকে আপনার কথা কী বলবো? কী পরিচয় দেবো?’
নীরবের এ কথায় স্বর্ণার মুখে গোধূলি বেলার রক্তিমাভা ফুটে ওঠে। ওর দৃষ্টিতে কেমন গভীর রেখাপাত সৃষ্টি হয়। এই দৃষ্টি নীরবের দৃষ্টিতে রেখে গাঢ় ও নিচু কণ্ঠে বলে- ‘এমন পরিচয় দেবেন, যাতে আমি অসম্মানিত না হই।’
কথা নয়, যেনো পাহাড় ভেঙে এক খরস্রোতা নদী ধেই ধেই করে নেমে এলো। এই নদীর স্রোতে ভেসে যেতে যেতে নরম কণ্ঠে নীরব বললো- ‘কী পরিচয় দিলে আপনার সম্মান বাড়বে?’
‘সেটিও বলে দিতে হবে? আপনি বুঝতে পারেন না, শহর থেকে একটি মেয়েকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে মা-বাবাকে কী বললে তারা খুশি হবেন?’
এ কথায় থ’ হয়ে যায় নীরব। যে অবগুণ্ঠন ও খুলতে চায়, আবার অজানা ভয়ে খুলতে চায়ও না, সেই অবগুণ্ঠন স্বর্ণা খুলে দিচ্ছে। নীরব চুপ মেরে যায়। তিন দিন আগে সাহস করে যে কথাটা স্বর্ণাকে বলে ফেলেছিল, সে কথার জবাব যেনো আজ পেলো স্বর্ণার কাছ থেকে। জবাবটা মধুর ও স্বপ্নপ্রবণ; কিন্তু নীরব কি এমন স্বপ্নের চিত্রনাট্যের বরপুত্র হতে পারবে? ওর মনে আশঙ্কার কুহেলিকা পেখম ছড়ায়। এ মুহূর্তে কী বলবে, ঠিক করতে পারে না। ও হাঁ করে তাকিয়ে থাকে স্বর্ণার মুখের দিকে। স্বর্ণার কণ্ঠ ফের রিনরিনিয়ে ওঠে- ‘আমার পুরো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলেন না?’
ঘোরলাগা কণ্ঠে নীরব বলে- ‘হ্যাঁ।’
স্বর্ণা দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে বলে- ‘তা হলে জড়িয়ে নিন।’
নীরবের বুকের ভেতরটা ধ্রুম ধ্রুম বাজতে থাকে। পাহাড়ভাঙা নদী আলিঙ্গনে ওকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। ও বুকের সবটুকু সাহস এক করে স্বর্ণার দুহাতের মুঠো নিজের মুঠোবন্দি করে। এক অপার্থিব স্পর্শ ছড়িয়ে পড়ে ওর অনুভূতিতে। ফেরারি বসন্তটা ওকে কেমন আচ্ছন্ন করে দেয়। এই আচ্ছন্নতায় বিভোর হয়ে স্বর্ণার কোমল দুটি হাত নিজের হাতে তুলে নেয় নীরব। স্বর্ণার হাত দুটিও যেনো ওর হাতের মুঠোয় আশ্রয় খুঁজে পায়। হাতেরও এক ধরনের ভাষা আছে যেনো। স্বর্ণার হাত যেনো ওর হাতকে বলছে- ‘আমাকে আজীবন ধরে রাখো।’
স্বর্ণার হাতের কথাটা ওর অনুভবে ছড়িয়ে যেতেই পাহাড়ভাঙা নদীটা ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো তুমুল স্রোতে। স্বর্ণার চোখের কোণেও ওই নদী টলমল করে গড়িয়ে নামে। আশ্চর্য রকম বসন্ত!
________________________________________
অচেনা বিভাস
এক.
মেয়েটির নাম করবী। করবী হচ্ছে ফুলের নাম। ফুলের মতোই সুন্দর মেয়েটি। করবী ফুলের পাপড়ি লাল, ওর গৌরবর্ণ মুখেও এক ধরনের লাল আভা ফুটে আছে। করবীকে প্রথম দেখার সময়ও ওর মুখে এই লাল আভা দেখেছে মাহিন। গোধূলী বেলায় আকাশে জমে থাকা লাল আভার বিষণ্নতা করবীর মুখে এখনো ফুটে আছে। উড়োজাহাজে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিও আছে। ওই ক্লান্তি আড়াল করে করবী ওর মুখে এক চিলতে হাসি ধরে রেখেছে। মাহিনের ধারণা করবীর মুখে যে হাসি ও দেখতে পাচ্ছে, এ হাসি স্বতঃস্ফূর্ত নয়। এটি শুকনো হাসি। এমন হাসির আড়ালে বেদনা লুকিয়ে থাকে। কেউ কেউ আছে, যারা মুখে হাসি ধরে রাখলেও চাপা বেদনাকে আড়াল করতে পারে না, সম্ভবত করবী এ ধরনের একটি মেয়ে- মনে মনে কথাটি ভেবে নেয় মাহিন। করবীকে একা দেখে ওর মনে ভাবনা উদয় হয়। ও ভাবতে লাগলো জেএফকে বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা করিডরে কী এমন ঘটনা ঘটলো যে, করবীর চোখে-মুখে আনন্দের চেয়ে বেদনার কালোমেঘ জমে গেছে? প্রশ্নটা মাহিনের মনে উঁকি দিলো। সে সঙ্গে বিস্ময়ও। করবী কাস্টমস এরিয়া থেকে প্রায় দুঘণ্টা আগে বেরিয়েছে, এখনো অভ্যর্থনা করিডরে ওর দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। করবীকে কি কেউ নিতে আসেনি? প্রশ্নটা কাঁটার মতো খচ করে বিঁধে গেলো ওর মনে। করবী অভ্যর্থনা করিডরে দীর্ঘক্ষণ কেনো দাঁড়িয়ে আছে- এ নিয়ে মাহিনের কৌতূহল সৃষ্টি হতো না, যদি ওর সঙ্গে ঢাকায় বিমানবন্দরে পরিচয় না হতো। পরিচয় ব্যাপারটাই এক ধরনের সম্পর্কের সূত্রপাত। যে সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই, অথচ সূক্ষ্ম টান আছে। করবীর দিকে তাকিয়ে থেকে এক ধরনের টান অনুভব করছে মাহিন। এই টানকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া ঠিক নয়, ভেবে নেয় ও। সে সঙ্গে কিভাবে করবীর সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল, সে কথাও স্মরণ করে নিলো। ওর সঙ্গে করবীর পরিচয় হয়েছে ঢাকায় হযরত শাহজালাল (র.) বিমানবন্দরের লাগেজ তল্লাশি পয়েন্টে। মাহিন দুটি লাগেজ তল্লাশি মেশিনে দেবার সময় ওর পেছন থেকে বয়স্ক এক ভদ্রলোক বললেন-
‘বাবা, আপনি কি নিউইয়র্ক যাচ্ছেন? আই মিন যুক্তরাষ্ট্রে?’
মাহিন পেছনে ঘুরতেই ভদ্রলোককে দেখতে পেলো। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল করবী। মাহিন ভদ্রলোককে চেনার চেষ্টা করে চিনতে না পেরে অবাক চোখে তাকালো তাদের দিকে। ভদ্রলোক বিনীতকণ্ঠে বললেন-
‘বাবা, আমাকে আপনি চিনবেন না। আমার নাম কামরান আহমেদ। রিটায়ার্ড কলেজ শিক্ষক। আপনি কি নিউইয়র্ক যাচ্ছেন?’
‘জ্বি, হ্যাঁ। এ কথা কেনো জানতে চাচ্ছেন?’
জানতে চাইলো মাহিন। ওর কথায় ভদ্রলোকের চোখের দ্যুতি উজ্জ্বল হলো। তার মুখে স্বস্তির হাসি ছড়িয়ে পড়লো। তিনি করবীকে দেখিয়ে বললেন-
‘বাবা, ও হচ্ছে আমার মেয়ে। ওর নাম করবী। আমার একমাত্র মেয়ে। ও প্রথমবারের মতো যাচ্ছে নিউইয়র্কে। এমিরাটসের ফ্লাইটে।’
কামরান আহমেদের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে করবী মাহিনকে স্লøামালাইকুম বললো। মাহিন একপলক দেখে নিলো করবীকে। ও বুঝতে পারছিল না কামরান আহমেদ কেনো তার মেয়েকে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ও দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললো-
‘আমিও এমিরাটস ফ্লাইটে যাচ্ছি।’
কামরান আহমেদ বিগলিত হলেন যেনো। তিনি বললেন-
‘বাবা, আমার মেয়ে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক যাচ্ছে। এর আগে ও কখনো উড়োজাহাজে ওঠেনি। দীর্ঘ যাত্রা আবার মাঝখানে দুবাইয়ে ট্রানজিট। ও একা মেয়ে মানুষ, তাই আপনার কাছে একটা অনুরোধ রাখতে চাই। অনুরোধ রাখবো?’
মাহিনের বুঝতে অসুবিধা হলো না কেনো কামরান আহমেদ ওর সঙ্গে কথা বলছেন। কী অনুরোধ করবেন, সেটিও ও আঁচ করতে পারলো। ও হাসিমুখে কামরান আহমেদের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘নিঃসংকোচে অনুরোধ করতে পারেন। কী অনুরোধ, বলুন।’
‘বাবা, পথে বা ইমিগ্রেশনে কোনো সমস্যা হলে আমার মেয়েকে একটু সাহায্য করবেন। এই অনুরোধ রাখছি।’
‘দেখুন, পথে কোনো সমস্যা হবে না।’
ছোট্ট করে জবাব দিলো মাহিন। কামরান আহমেদ বললেন-
‘তারপরও যদি হয়, একটু দেখবেন।’
‘আচ্ছা। দুবাইয়ে ট্রানজিট পয়েন্টে নিউইয়র্কের ফ্লাইট ধরতে কোনো সমস্যায় পড়লে আমি তাকে বলে দেবো। আর হ্যাঁ, নিউইয়র্কে জেএফকে বিমানবন্দরে নামার আগে একটি ফরম পূরণ করতে হয়, প্রয়োজন হলে আমি তা পূরণ করতে সহযোগিতা করবো। সমস্যা বলতে আসলে কিছু নেই।’
বললো মাহিন। কামরান আহমেদ খুশি হলেন ওর কথা শুনে। তিনি বললেন-
‘আমি খুব খুশি হলাম আপনার কথা শুনে।’
মাহিন বললো-
‘জেএফকে বিমানবন্দরে আমি ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এরিয়া পর্যন্ত আপনার মেয়েকে ওয়াচ করবো। যদি কোনো সাহায্য লাগে আমি এগিয়ে যাবো। ব্যস, হলো?’
মাহিনের কথায় কামরান আহমেদের মন থেকে আশঙ্কার মেঘ কেটে গেলো। তিনি বললেন-
‘বাবা, আমি আপনার জন্য চার রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া করবো।’
মাহিন হাসলো। ও করবীর দিকে তাকিয়ে বললো-
‘নিউইয়র্কে আপনি কোথায় উঠবেন, আই মিন কার কাছে যাবেন?’
এ কথায় কেমন আরক্ত হয়ে গেলো করবীর মুখ। করবী লাল হয়ে যাওয়া ওর মুখ অবনত করে ফেললো। মাহিন একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো। কামরান আহমেদ এর জবাব দিলেন। তিনি বললেন-
‘বাবা, আমার জামাতা থাকেন নিউইয়র্কে। করবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে টেলিফোনে। ভিজিট ভিসা নিয়ে ও যাচ্ছে নিউইয়র্কে। ওখানে ওদের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হবে। আপনি কিন্তু ওদের বিয়েতে থাকবেন!’
করবীর নিউইয়র্কে যাবার কারণ জানতে পারলো মাহিন। এমন বিয়ে হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন এমন অনেকে টেলিফোনে বিয়ে করে ফেলেন। পরে বাংলাদেশে গিয়ে রিজিস্ট্রি বিয়ে করেন। কেউ কেউ স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন এবং রিজিস্ট্রি বিয়ে সম্পন্ন করেন। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অজানা নয়। তবে এ ধরনের বিয়ের সংখ্যা কম। মাহিন আর কথা না বাড়াতে করবীর দিকে চেয়ে বললো-
‘ঠিক আছে, আপনার লাগেজ বুকিং দিন। বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে চলে আসুন ফ্লাইট ধরার গেটে। আমি ওখানে থাকবো। আপনি কোনো ভয় পাবেন না। আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে সংকোচবোধ করবেন না।’
করবী মাহিনের দিকে তাকিয়ে বললো-
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
‘ওয়েলকাম।’
এ কথা বলে মাহিন তল্লাশি পয়েন্ট থেকে লাগেজ ট্রলিতে তুলে চলে গিয়েছিল এমিরাটসের কাউন্টারের দিকে। এরপর এমিরাটসের ফ্লাইট ওঠার অপেক্ষামাণ যাত্রীদের করিডরে করবীকে একঝলক দেখেছিল ও। ঢাকা-দুবাই যাবার ফ্লাইটে কবরীর আসন ছিল মাহিনের চেয়ে চার সারি পেছনে। দুবাইয়ে নামার পর মাহিন নিজ থেকে করবীর পাশে পাশে হেঁটে গিয়েছিল ট্রানজিটের অপেক্ষামাণ যাত্রীদের করিডরে। ট্রানজিটের দেড়ঘণ্টা সময়ে ওদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। এরপর দুবাই-নিউইয়র্ক আকাশ পথের উড়োজাহাজে করবীর আসন কোথায় পড়েছিল, তা লক্ষ্য করেনি মাহিন। করবী কোনো সহযোগিতা চাইতেও আসেনি ওর কাছে। দুবাই থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত চৌদ্দ ঘণ্টার আকাশ পথ পাড়ি দেবার পর জেএফকে বিমানবন্দরে যাত্রীদের ইমিগ্রেশন লাইনে করবীকে দেখতে পায় মাহিন। এরপর ওর সঙ্গে ফের দেখা হয় লাগেজ এরিয়ায়। মাহিন এবার করবীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে-
‘কী, আপনার ভয় কেটেছে? বলেছিলাম না, ভয়ের কিছু নেই। দেখলেন তো, আপনি নিজে একাই চলে এসেছেন। ওয়েলকাম, নিউইয়র্ক!’
মাহিনের কথায় করবী মিষ্টি করে হাসলো। করবীর চোখে-মুখে ভ্রমণের ক্লন্তি আছে- লক্ষ্য করলো মাহিন। করবী মাহিনকে বললো-
‘ভয় কিন্তু ছিল। তবে ভরসাও ছিল আপনার ওপর।’
এ কথায় হো হো হো হেসে উঠলো মাহিন। করবীর চোখে বিস্ময়ের আভা ফুটে ওঠে। ও বললো-
‘হাসছেন কেনো?’
‘হাসছি। আমার প্রতি আপনার ভরসা রাখার কথা শুনে।’
‘আমি কি হাসির কথা বলেছি? আপনার প্রতি ভরসা করেছিলাম বলেই তো কথাটা বললাম।’
‘ভরসা করলে আমার কাছে তো কোনো সহযোগিতা চাইতে দেখলাম না।’
‘প্রয়োজন হয়নি, তাই সহযোগিতা চাইনি। তার মানে এই নয় যে, আপনার প্রতি ভরসা ছিল না।’
‘তাই! জেনে ভালো লাগলো। এবং এ কথা জেনে খানিকটা অপরাধবোধও কাজ করছে এখন।’
‘অপরাধবোধ, কেনো?’
‘আমি দীর্ঘ যাত্রাপথে আপনার কোনো খোঁজখবর নিইনি। এখন মনে হচ্ছে নেয়া উচিত ছিল।’
মাহিনের কথায় ম্লান হাসলো করবী। বললো-
‘খোঁজ নেননি বলে আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে।’
করবীর কথাটা খট করে লাগলো যেনো। কথাটার মধ্যে অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। মাহিন কৌতূহল প্রকাশ করে বললো-
‘এ কথা কেনো বললেন? ঠিক বুঝলাম না! কথাটার কী অর্থ দাঁড়ায়?’
মাহিনের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ম্লান হাসলো করবী। কথায় কথা বাড়ছে। ও নিজের মধ্যে সংকোচবোধ করছে এখন। ও কথা না বাড়াতেই যেনো বললো-
‘এর অর্থ খুঁজে কী হবে? ধরে নিন, এমনিতেই কথাটা বললাম।’
‘না। কথাটা একটু খুলে বলুন। কথাটার অর্থ জানতে ইচ্ছে করছে। কিছু মনে করবেন না, এই কৌতূহল প্রকাশ করায়।’
মাহিনের কথায় একটু ভাবলো করবী। কয়েক সেকেন্ড পর ও বললো-
‘না, মানে, একা একজন মেয়ে মানুষকে সহযোগিতা করার সুযোগ পেলে অনেকে অযাচিত সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। সহযোগিতার নামে উপদ্রব! আপনি সে দলের নন, এটাই মিন করতে চেয়েছি!’
কথাটা বলে চোখ মাহিনের চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নিলো করবী। মাহিন আপ্লুত গলায় বললো-
‘বাহ। আপনি তো দেখছি, আগ-পিছ অনেক কিছু ভেবে ফেলতে পারেন! আপনার আইকিউ খুব শার্প। আপনার স্বামীকে ভাগ্যবান বলতে হবে।’
‘কেনো?’
‘এই যে আপনার মতো একজন বিদূষী স্ত্রীর স্বামী হয়েছেন বলে।’
‘কী যে বলেন। বিদূষী না, ছাই!’
এ পর্যন্ত কথা হলো ওদের মধ্যে। করবীর লাগেজ টেনে ট্রলিতে তুলে দিলো মাহিন। মাহিনের লাগেজ তখনো আসেনি। ওকে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে হলো। করবী ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। প্রায় দুঘণ্টা অপেক্ষার পর যখন লাগেজ পাওয়া গেলো না, তখন মাহিন লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখায় অভিযোগ দাখিল করলো। এরপর বিষণ্ন মনে বেরিয়ে এলো অভ্যর্থনা করিডরে। অভ্যর্থনা করিডরে এসে করবীকে দেখে ও ভীষণ অবাক হলো। এতোক্ষণ ওর এখানে থাকার কথার নয়। লাগেজ না পাওয়ায় এমনিতেই মন খারাপ ছিল মাহিনের, এর ওপর করবীকে দেখে মনটা আরো তেতো হয়ে গেলো। ও এগিয়ে গেলো করবীর কাছে। করবী ওকে দেখে বিষণ্নকণ্ঠে বললো-
‘আপনার এতো দেরি হলো? আপনার লাগেজ কোথায়?’
‘আমার লাগেজ মিসিং! পরের ফ্লাইটে আসবে। কাল ফের জেএফকেতে আসতে হবে। লাগেজের জন্যই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আপনার খবর কি? আপনি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন যে!’
এ কথার কোনো জবাব দিলো না করবী। ও মাথা নিচু করে ফেললো। করবীর এই নীরবতার কী অর্থ দাঁড়ায়, তা জানে না মাহিন। তবে ওর মনে হলো করবী ওর সমস্যার কথা বলতে বিব্রতবোধ করছে। মাহিন আগ বাড়িয়ে করবীর সমস্যার কথা জানতে চাইবে কি, চাইবে না- এ নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। ওর মনে হলো করবীকে প্রশ্ন করে ওর সমস্যার কথা জেনে নেয়াটা অযাচিত হবে না। হোক একদিনের পরিচয়। মাহিন বললো-
‘আপনার স্বামী কোথায়? তাকে দেখছি না যে!’
এ কথায় কেমন লজ্জায় পড়ে গেলো যেনো করবী। ওর মুখে একরাশ বিষণ্নতা কালো মেঘের মতো ছেয়ে গেলো। মাহিন করবীর নীরবতা দেখে ফের বললো-
‘আপনার স্বামী আপনাকে এখনো নিতে আসেননি?’
প্রশ্নটা করে ও করবীর মুখের দিকে চেয়ে রইলো। করবী ইতস্তত করে বললো-
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তার তো আমাকে নিতে আসার কথা।’
‘বলেন কী! এ কথা এতো পরে বললেন?’
‘না, মানে…। ভাবছিলাম…।’
‘ভাবছিলেন, আমাকে এ কথা বলে কী হবে, এই তো?’
‘না। মানে…।’
‘দেখুন, আপনাকে সাহায্য করবো বলে আপনার বাবাকে কথা দিয়েছিলাম। তাই…।’
‘এ কথা তো আমি জানি। তারপরও…।’
‘আমাকে সমস্যার কথা বলতে সংকোচবোধ করছিলেন?’
‘না, মানে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাকে আরো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কি-না। তিনি তো আসতে পারেন। নয় কী?’
করবী প্রশ্নটা করলেও প্রশ্নের মধ্যে সংশয় ছিল। মাহিনও বুঝতে পারছে না করবীর স্বামী কেনো এখনো তাকে নিতে আসেননি। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম হলেও এতো দেরি হবার কথা নয়। অপেক্ষার সময় প্রায় দুঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। যারা বিমানবন্দর থেকে কাউকে রিসিভ করতে আসেন, তারা সাধারণত উড়োজাহাজ অবতরণ করার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চলে আসেন। তারা অপেক্ষা করতে থাকেন, একসময় যাত্রী বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা গেট দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কেউ কখনো দেরি করে ফেলতে পারে ঠিক, তবে নববধূকে বরণ করতে কোনো স্বামী বিমানবন্দরে পৌঁছতে দুঘণ্টা দেরি করে ফেলবেন- এমন ঘটনা স্বাভাবিক নয়। কথাটা ভেবে মাহিন করবীর উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন-
‘তার সেলফোনে ফোন করেছিলেন?’
‘হুম। এ পর্যন্ত চারবার করেছি। তার সেলফোন বন্ধ।’
‘ফোন করলেন কিভাবে?’
‘বিভিন্ন জনকে অনুরোধ করে ফোন করেছি।’
‘ঠিক আছে এবার আমার সেলফোন দিয়ে একবার ফোন করুন তো।’
মাহিন ওর সেলফোনটা করবীর দিকে বাড়িয়ে দিলো। করবী যেনো এটাই চাইছিল। ও ফোন করলো ওর স্বামীর সেলফোনে। লাইন আগের মতো সরাসরি চলে গেলো ভয়েস ম্যাসেজে। ভয়েজ ম্যাসেজও ফুল হয়ে আছে। ম্যাসেজ রাখা যাচ্ছে না। করবীর বুক ভেঙে কান্না উথলে আসতে চাইছে, ও নিজেকে সামলে নিলো। ও মাহিনের সেলফোন ফিরিয়ে দেবার সময় বললো-
‘আমার মনে হয়, তার কোনো অসুবিধা হয়েছে। ফোন ধরছে না। নইলে, এমন তো হবার কথা নয়!’
‘হুম। আমারও তাই মনে হচ্ছে।’
‘আচ্ছা, আপনি কি আমাকে জামানের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারেন? এটুকু হেলফ করবেন?’
‘কী বলেন? এটুকু সাহায্য কেনো করবো না? আপনার স্বামীর নাম জামান?’
‘হুম।’
‘তিনি কোথায় থাকেন? ঠিকানা নিয়ে এসেছেন?’
‘হ্যাঁ, ঠিকানা আছে আমার কাছে। এখানে এস্টোরিয়া নামে একটি এলাকায় তিনি থাকেন।’
‘আমিও এস্টোরিয়ায় থাকি! ঠিক আছে, তা হলে আমার সঙ্গে চলুন। ঠিকানা যখন আছে তখন কোনো চিন্তা করবেন না। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে তারপর আমি আমার বাসায় যাবো।’
‘আপনাকে বিপদে ফেলে দিলাম, তাই না?’
‘হা-হা-হা। আমাকে বিপদে ফেললেন কিভাবে? বিপদে তো আপনি পড়েছেন।’
‘বিপদে পড়েছি বলেই তো আপনাকে আমার বিপদ টেনে নিয়ে এলো।’
‘যাই হোক, এ দেশে এটা কোনো বিপদ নয়। একজন আরেকজনকে লিফট দিতে পারে। তবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনার স্বামীর কী হতে পারে?’
‘আমিও বুঝতে পারছি না। আপনার কোনো ধারণা আছে?’
এ কথা বলতে বলতে লাগেজের ট্রলি নিয়ে মাহিন এবং করবী হেঁটে চললো বিমানবন্দরের বাইরের দিকে। করবীর কথার জবাবে মাহিন বললো-
‘আমার ধারণার কথা বলার আগে আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই, করবো?’
‘করুন।’
‘আপনার স্বামীর পেশা কী? আই মিন তিনি কী করেন এখানে?’
‘বাড়ি বেচাকেনা করেন। রিয়েল স্টেট ব্রোকার। সম্ভবত মর্টগেজ ব্রোকারও।’
‘আপনাদের টেলিফোনে বিয়ে হয়েছে কতোদিন আগে?’
‘প্রায় তিন মাস আগে।’
‘তার সঙ্গে কথা বলেছেন কদিন?’
‘বিয়ের পর থেকে সপ্তাহে প্রায় দু-তিন দিন কথা হতো।’
‘কথা বলে কী কখনো মনে হয়েছে যে, তিনি দায়িত্বহীন বা চিন্তা চেতনায় উদাসীন অথবা ভবঘুরে চরিত্রের লোক।’
‘না। তেমন মনে হয়নি। কেনো এ প্রশ্ন করছেন?’
‘জানতে চাইছি তিনি কেমন চরিত্রের লোক। আপনার সঙ্গে কথা হতো কেমন?’
‘তিনি কিন্তু লম্বা সময় নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। বলেছি তো, আমাদের টেলিফোনে বিয়ে হয়েছে। আমাদের কখনো দেখা হয়নি। বুঝতেই পারছেন, এমন অবস্থায় কথা বলার পরিধিও বাড়েনি।’
‘আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই, করবো?’
‘বাহ, করুন। সংকোচবোধ করছেন কেনো?’
‘বিয়ে করলেন টেলিফোনে। নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে চলে এলেন নিউইয়র্কে। কিভাবে? দেশে আপনি কী করতেন?’
‘প্রথমে আপনার শেষ প্রশ্নটার উত্তর দিচ্ছি আগে। আমি একটি বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানিতে চাকরি করছি। চাকরির বয়স বেশিদিন হয়নি। তবে পজিশনটা ছিল ভালো। অ্যাসিস্ট্যান্ট সেলস ম্যানেজার। ভালো বেতন। আমার বাবার এক ছাত্র ওই কোম্পানির এমডি। তার সহযোগিতায় ওই চাকরিটা পেয়ে যাই।’
‘ওপর মহলের কারো কৃপা থাকলে সহজে ভালো চাকরি পাওয়া যায় যেভাবে, সেরকম আরকি! তাই না?’
কথাটা বলে মৃদু হেসে বললো মাহিন। করবী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। করবী আর কিছু বলছে না দেখে কয়েক সেকেন্ড পর মাহিন ফের বললো-
‘কিভাবে নিউইয়র্ক এলেন বললেন না যে!’
করবীর চোখে-মুখে এক রাশ লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়েছে। মাহিন লক্ষ্য করলো করবী ওর আরক্ত মুখ ওকে দেখাতে চাইছে না। ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো-
‘জামান আমার পরিবারকে বলেছিল বিয়ে করার তিন বছর পর আমাকে সে নিয়ে আসবে নিউইয়র্কে। এর আগে সে আমাকে আনতে পারবে না। সে এখনো ইউএস সিটিজেন হয়নি। আমি যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ করে বলতে পারেন অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে আমি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পেয়ে যাই। তাই জামানের কাছে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিই।’
‘ওহ!’
মাহিন ছোট্ট করে জবাব দেয়। করবী এবার ওর দিকে তাকিয়ে বলে-
‘প্রথমে ভেবেছিলাম, জামানকে না বলে নিউইয়র্ক চলে এসে তাকে সারপ্রাইজ দেবো। পরে ভিসা প্রাপ্তির খবরটা তার কাছে গোপন রাখতে পারিনি। বিশেষ করে আমার বাবার কারণে তা পারিনি।’
‘হুম। আপনার বিয়ে এবং নিউইয়র্ক আসার গল্পটা একটু ভিন্নরকম।’
বললো মাহিন। করবী এর জবাবে কিছু বললো না, শ্রাগ করলো শুধু। মাহিন আর কোনো কথা বললো না। ও জেএফকে বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ ইয়েলো ক্যাব ধরলো। প্রথমে ও করবীর লাগেজ গাড়ির ব্যাকডালায় রাখলো। এরপর ওর একটি লাগেজ রাখতে পারলো। আরেকটি লাগেজ ও রাখলো গাড়ির ভেতরে প্যাসাঞ্জার সিটে। ওর লাগেজটার দুপাশে ওরা দুজন বসলো। লাগেজটা ওদের মধ্যে দেয়াল হয়ে থাকায় মাহিন স্বস্তিবোধ করলো। করবীর মুখ থমথমে। করবীর ইচ্ছা ছিল টেলিফোনে বিয়ে করা স্বামীকে নিউইয়র্কে এসে চমকে দেবে; কিন্তু তা পারেনি। বরং সে নিজেই চমকে গেছে তাকে রিসিভ করতে স্বামী না আসায়। মানুষ কী ভাবে, আর কী হয়! এ কথা ভেবে মাহিন গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। নিউইয়র্কের আকাশে শরতের মেঘ থোকা থোকা লেপ্টে আছে, এর সঙ্গে উজ্জ্বল রোদের বিকিরণ। ভ্যাপসা গরম নেই। তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। হালকা বাতাস বইছে। বাতাসে যে আদ্রতা তা উপভোগ করার মতো। গ্রীষ্মকালের নিউইয়র্ক যেনো করোজ্জ্বল এক কাব্যিক ক্যানভাস। আকাশের দিকে তাকিয়ে মাহিনের মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে যায়। ইয়োলো ক্যাব ছুটে চলছে এস্টোরিয়ার অভিমুখে। ভ্যানউইক সড়কে কোনো ট্রাফিক জ্যাম নেই। আনন্দের আবেশে মাহিন জানালা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে একসময় তাকালো করবীর দিকে। ওর দিকে তাকাতেই হচকিয়ে গেলো মাহিন। করবীর দুচোখ বেয়ে নেমে এসেছে অশ্রুর দুটি ধারা। এমন দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত ছিল না ও। ওর মন খারাপ হয়ে গেলো।
দুই.
রিমঝিম দেখতে পেলো ও যে দোকানে প্রবেশ করেছে, এর ঠিক উল্টোদিকে ফুটপাতে পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ একটি পার্কিং মিটার থামের পেছনে এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, রিমঝিম ওর দিকে তাকালে ও চট করে নিজেকে আড়াল করে নিতে পারবে। রিমঝিম পলাশকে দেখলেও সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে থাকেনি। রিমঝিম ওকে আড়চোখে দেখেছে। রিমঝিমও বুঝতে দিতে চায় না যে, ও পলাশকে দেখেছে। এতে পলাশ প্রশ্রয় পেয়ে যেতে পারে। রিমঝিম পলাশকে প্রশ্রয় যেমন দিতে চায় না, তেমনি অনুকম্পাও দেখাতে চায় না। ও এখন পলাশকে ঘৃণা করে। রিমিঝিম অনেকদিন পর একজোড়া কানের দুল কিনলো। বিক্রয়কারী মহিলা আয়েশা কানের দুল দুটি প্যাকেট করছে। আয়েশা কানের দুলের সঙ্গে মানানসহ একটি চেইন বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল ওর কাছে। রিমিঝিম রাজি হয়নি। স্বর্ণালঙ্কার ও কিনলেও খুব একটা পরে না। ইমিটেশনের স্বর্ণালঙ্কার পড়তে ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ও স্বর্ণালঙ্কার কেনে শখের বশে। স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এই উপমহাদেশের নারীদের খুব দুর্বলতা। অথচ ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার নারীদের মধ্যে স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি দুর্বলতা ও দেখেনি। রিমঝিম নিউইয়র্কে বহুজাতিক অভিবাসী সমাজে বেড়ে উঠলেও ওর মধ্যে স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি টান আছে। কেনো এই টান-ও জানে না। রিমিঝিম জ্যাকসন হাইটস এলাকাটাকে পছন্দ করে না। কিন্তু ওকে এখানে আসতে হয় কেনাকাটা করতে। এই এলাকার ৭৩ এবং ৭৪ স্ট্রিট এবং রোজভেল্ট এভিনিউ থেকে ৩৭ এভিনিউ জুড়ে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানি মালিকাধীন দোকান। স্বর্ণালঙ্কারের দোকানগুলোও এখানেই। এখানে না এলে স্বর্ণালঙ্কার এবং উপ-মহাদেশীয় ডিজাইনের পোশাক কেনা যায় না। কেনাকাটার কথা চিন্তা করলে ওকে জ্যাকসন হাইটসে চলে আসতে হয়। এখানে সব সময় মানুষের ভিড় লেগে থাকে। দোকানগুলোতে কেনাকাটার ভিড় তো আছেই, আড্ডাবাজ মানুষদের উপদ্রবও আছে। বিশেষ করে ৭৩ স্ট্রিটে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোর সামনে আড্ডাবাজদের জটলা দেখা যায়। সবসময় কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে থাকে এখানে-সেখানে। সন্ধ্যা হলে তো ফুটপাত দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়ে। থোকা থোকা ফুলের মতো মানুষের জটলা এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে হরহামেশা দেখা যায়। শনি ও রোববার এখানে যেনো মানুষের হাট বসে। দূর-দূরান্ত থেকে বাংলাদেশিরা জ্যাকসন হাইটসে ছুটে আসেন। অধিকাংশজন কাঁচাবাজার করেন। এই দুদিন দোকানগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। মানুষের ভিড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ওর মাথার ভেতরে চিনচিন করে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। তাই রিমঝিম জ্যাকসন হাইটসে খুব একটা আসে না। আজ ও এসেছিল স্বর্ণালঙ্কার দেখতে। স্বর্ণালঙ্কার দেখতে গিয়ে একজোড়া কানের দুল কিনে ফেললো ও। কিছুদিন পর রিমঝিমের বিয়ে হবে। পাত্র একরকম ঠিক হয়ে আছে। পাত্রকে দেখে পছন্দ করেছে ও। মাহিনের সঙ্গে ওর কথাও হয়েছে। মাহিনকে সুপাত্র বলা যায়। হ্যান্ডসাম, কথাবার্তায় বিনয়ী, চাকরি করছে একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে। পেশায় ফিনানসিয়াল এক্সিকিউটিভ। মাহিম হান্টার থেকে মাস্টার্স করেছে দুবছর আগে। আর রিমঝিম দুমাস আগে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেছে। ওর বাবা-মার পছন্দের পাত্র মাহিন। ওকে দেখে এবং কথা বলে বিয়েতে রাজি হয়েছে রিমঝিম। আসন্ন বিয়ের কেনাকাটার প্রস্তুতির জন্য ও এসেছিল জ্যাকসন হাইটসে স্বর্ণের দোকানে। এই দোকানে বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ওর দৃষ্টি যায় বাইরে। আর তখনই ও পলাশকে দেখতে পায়। পলাশকে দেখে একটু হচকিয়ে গেলেও ও অবাক হয়নি। প্রায় দুমাস হলো পলাশ ওকে অনুসরণ করছে। পলাশ নিজেকে লুকিয়ে রেখে ওকে অনুসরণ করলেও রিমঝিম ঠিকই ওকে দেখে ফেলছে। পলাশের এই অনুসরণ করাটা রিমঝিম সহ্য করতে পারছে না। আবার উপেক্ষাও করতে পারছে না যেনো। রিমঝিম স্বর্ণালঙ্কারের দোকান থেকে বের হয়ে এলো। রিমঝিম ভেবেছিল আড়ালে লুকিয়ে থাকা পলাশ ওকে দেখে আড়ালেই লুকিয়ে থাকবে। গত দুমাস ও এমন আচরণই করেছে। কিন্তু আজ হলো উল্টো। রিমঝিমকে স্বর্ণের দোকান থেকে বের হতে দেখেই পলাশ ওর দিকে এগিয়ে এলো। পলাশের এই আচরণে ও অবাক এবং ক্ষুব্ধ হলো। ও গাড়ি পার্ক করেছে ৭৫ স্ট্রিটে পার্কিং লটে। ফুটপাত ধরে সে দিকে যাবার জন্য হাঁটতে লাগলো রিমঝিম। রাস্তা অতিক্রম করে পলাশ দ্রুত ওর সামনে চলে এলো। জিন্স প্যান্টের সঙ্গে টি-শার্ট পড়েছে পলাশ। কালো সানগ্লাসটি টি-শার্টের সামনে বুকের ওপর ঝুলানো। লম্বা চুলগুলো এলোমেলা। পলাশের দিকে বিরক্ত চোখে এক ঝলক তাকিয়ে দেখে নেয় রিমঝিম। পলাশের চোখ লাল, ফুলে আছে। রাতভর ড্রিং করেছে অথবা ঘুমায়নি- ভেবে নেয় ও। পলাশ রিমঝিমের পাশাপাশি হাঁটতে চেষ্টা করে। ফুটপাতে মানুষের খুব যাতায়াত। তাল মিলিয়ে রিমঝিমের পাশে হাঁটা সহজ নয়। পলাশ তবু চেষ্টা করতে থাকে। পলাশের এই চেষ্টাকে দুঃসাহস বলে মনে হয় রিমঝিমের। ও হঠাৎ ফুটপাতে থেমে যায়। পলাশও থমকে দাঁড়ায়। সে অপরাধীর মতো তাকিয়ে থাকে রিমঝিমের দিকে। রিমঝিম পলাশের আচরণে ভড়কে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও পলাশের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললো-
‘কী হচ্ছে? হাউ ডেয়ার ইউ! কেনো আমাকে অনুসরণ করছো!’
পলাশ কাচুমাচু করে বললো-
‘তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা বলার ছিল। কথাগুলো বলেই আমি চলে যাবো।’
‘হোয়াই ডু আই হ্যাভ টু লিসেন টু ইউ?’
এ কথার জবাব দেয় না পলাশ। ও জানে, রিমঝিম রেগে আছে। ও আমতা অমতা করে ক্ষীণকণ্ঠে বলে-
‘আমি জানি, আমার কথা শোনার সময় তোমার নেই। তারপরও আমি কিছু বলতে চাই।’
‘বাট হোয়াই? কেনো আমাকে তোমার কথা শুনতে হবে? হু আর ইউ?’
রিমঝিমের কণ্ঠে রাগের উত্তাপ। মিনমিনে গলায় পলাশ ককিয়ে উঠে-
‘প্লিজ, তোমার বেশি সময় নেবো না। দয়া করে, আমার কথাগুলো শুনো। কথা দিচ্ছি, তোমাকে আর বিরক্ত করবো না। অনুসরণও করবো না।’
পলাশের সঙ্গে কথা বলতে রুচিতে বাধছে ওর। তারপরও ওর কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিলো রিমঝিম। কারণ, পলাশ বলছে এরপর থেকে রিমঝিমকে আর বিরক্ত বা অনুসরণ করবে না। প্রস্তাবটা গ্রহণ করা যায়। রিমঝিমের নীরবতা দেখে পলাশ ফের বললো-
‘কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন তোমাকে বিরক্ত করবো না। আজ শুধু আমার কথাগুলো শোনো!’
রিমঝিম বলে-
‘ঠিক আছে বলো, কী বলতে চাও? টেল মি, হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু সে।’
‘এখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলবো?’
‘হোয়াটাস প্রবলেম টকিং টু মি অন দ্য স্ট্রিট? ইফ ইউ ওয়ান্ট টু সে এনিথিং, টেল মি অন হিয়ার।’
‘কোথাও বসে বলা যায় না? আই মিন এখানেই কোনো রেস্টুরেন্টে যদি বসি।’
পলাশের কণ্ঠে অনুরোধ। রিমঝিমের মাথায় যেনো রাগের আগুন জ্বলছে। ও রাগ সামলে নেবার চেষ্টা করে। ওদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করা পথচারীদের কেউ কেউ আড়চোখে দেখছে ওদের। রিমঝিম এতে সংকোচবোধ করছে। পলাশ বলে-
‘একটু বসে কথা বলা যাবে না? বলেছি তো, এরপর আর কখনো তোমার সামনে আসবো না। প্রমিজ!’
রিমঝিম মনে মনে পলাশের উদ্দেশে বললো-
‘ডোন্ট সে প্রমিজ, ইউ আর এ প্যাথোলজিক্যাল লায়ার!’
নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলে-
‘ঠিক আছে চলো আশপাশের কোনো পার্কে গিয়ে বসি। কোনো রেস্টুরেন্টে তোমার সঙ্গে আমি বসবো না।’
‘ঠিক আছে, চলো তাই হোক। পার্কে গিয়ে কথা বলি।’
বলে সম্মতি জানালো পলাশ। ৭৪ রাস্তা দিয়ে একটা ব্যুরো কার যাচ্ছিল, রিমঝিম হাতের ইশারায় ওই গাড়ি থামালো। লিমোজিন কার থেমে গেলো। রিমঝিম গিয়ে কারের দরজা খুলে পেছনের আসনে বসলো। পলাশ বিপরীত দিক থেকে গাড়ির দরজা খুলে পেছনের আসনে বসলো রিমঝিমের সঙ্গে দূরত্ব রেখে। লিমোজন চালক মেক্সিকান। সে কিছু বলার আগেই রিমঝিম ট্যাক্সিচালকের উদ্দেশে বললো-
‘ড্রাইভার, কুড ইউ গো টু কুইন্স মল অ্যান্ড কাম ব্যাক এগেইন। রাউন্ডট্রিপ।’
‘ওকে।’
ড্রাইভার ছোট্ট জবাব দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। রিমঝিম গাড়িতে উঠেই ঠিক করে নিয়েছে পলাশ কী বলতে চায়, তা গাড়িতেই শুনে নেবে। পার্কে বসে তার সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। তাই সে গাড়ির ডাইভারকে কুইন্স মল যেতে এবং সেখান থেকে ফিরে আসতে বলেছে। এই রাউন্ডট্রিপে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় পাওয়া যাবে। পলাশের কথা শুনতে এ সময়ই যথেষ্ট। রিমঝিম গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো-
‘কী বলতে চাও, বলে ফেলো। এই গাড়ি জ্যাকসন হাইটস ফিরে এলে আর কোনো কথা বলার সময় পাবে না।’
পলাশের মুখে শুকনো হাসি। ও দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারলো। সময় নষ্ট না করে বললো-
‘আমি জানতে পারলাম তুমি মাহিন নামে একজনকে বিয়ে করছো খুব শিগগির।’
‘হুম। ঠিকই জেনেছো।’
‘মাহিনকে দেখে এবং তার সঙ্গে কথা বলে তুমি না-কি খুব ইমপ্রেসড?’
কথাটা রিমঝিমের রাগকে উসকে দেয়। ও বললো-
‘আমি শুধু ইমপ্রেসড নই, এক্সাসাইটেডও! এসব কথা জানতে এসেছো?’
‘না, মানে। আমার নিজের কথাও আছে।’
‘তো সে কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ো। হোয়াই ডু ইউ বদার মি?’
‘বলছি, বলছি।’
বলে একটু দম নেয় পলাশ। রিমঝিম চুপ করে থাকে। ওর বুকের ভেতর কোথায় যেনো একটা মিহিন কান্না রিনরিন করছে। রিমঝিম এই কান্নাকে একদম পাত্তা দিতে চায় না। ও বলে-
‘চুপ করে থেকে সময় নষ্ট করছো তুমি। তুমি কী বলতে চাও বলে ফেলো। গাড়ি জ্যাকসন হাইটসে ফিরে এলে কিন্তু আমি আর তোমাকে সময় দেবো না।’
‘না, যা বলতে চাই, তা কিভাবে বলবো, ভাবছি।’
‘ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করছো। বলে ফেলো।’
রিমঝিম জানে পলাশ কী বলতে চায়। ও বলতে চাইবে লীনার সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক হয়নি। পলাশ এখনো ওকে ভালোবাসে। লীনার সঙ্গে একটু জড়িয়ে গিয়েছিল আর কী। ও ওর ভুল বুঝতে পেরেছে। এখন রিমঝিমকে নিয়ে বাকিটা জীবন কাটাতে চায়। এসব কথা বলতে চাইবে পলাশ। আগেও একবার এ কথাগুলো বলেছে। এবার শেষবারের মতো বলবে। এতে রিমঝিমের মন গলবে না। ও একটুও টলবে না। পলাশের প্রতি ওর একবিন্দুও দুর্বলতা নেই, ভালো লাগা নেই, ভালোবাসা নেই। বরং একতাল ঘৃণা দলা পাকিয়ে। রিমঝিমের ভাবনাকে ভেঙে দিয়ে পলাশ বললো-
‘রিমঝিম, আমি বলতে চাই, লীনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। আমি ট্র্যাপড হয়েছিলাম। লীনা তোমার বান্ধবী ছিল। কিন্তু ও তোমাকে ঈর্ষা করতো। তোমার প্রতি ঈর্ষা থেকে লীনা আমাকে ফাঁদে ফেলে।’
‘ইউ রাস্কেল, ইডিয়েট!’
‘আই নো, ইউ আর রাইট। বাট আই লাইক টু সে…।’
এ পর্যন্ত বলতে পারলো পলাশ। ওর কথা শেষ না হতেই রিমঝিম ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-
‘লীনা তোমাকে ডেকেছে আর তুমি সুরসুর করে ওর সঙ্গে ফুর্তি করেছো, এই তো?’
‘না, মানে…।’
‘মানে কি? তুমি কি আমাকে বোকা ভাবছো? অ্যাম আই ফুলিশ?’
‘না, তা নয়। আমি বলতে চাচ্ছি, আমার দোষ তো আছেই। আমি জঘন্য অপরাধ করেছি।’
‘তো, এখন আমাকে কী করতে হবে? তোমার জঘন্য অপরাধকে গ্রহণ করতে হবে?’
এ কথার জবাবে পলাশ কিছু বলতে পারে না। ওর অভিব্যক্তিতে পাথুরে বিষণ্নতা। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রিমঝিম বলে-
‘পলাশ, আশা করছি, তুমি আজকের পর থেকে আর আমাকে অনুসরণ করবে না। আমাকে বদার করলে আমি আরো ক্ষুব্ধ হবো। আমার পেছনে ঘুরঘুর করলে তোমার সময় নষ্ট হবে শুধু। আমার অনুকম্পা পাবে না। একসময় আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, এটা ঠিক। বাট, নাউ আই হেইট ইউ!’
পলাশ মাথা নিচু করে নেয়। ও এর জবাবে কিছু বলে না। রিমঝিম আগেও পলাশকে ঘৃণা করে তা বলেছে। ঘৃণা করাই স্বাভাবিক। রিমঝিমের সঙ্গে তিন বছর প্রেম করার পর ও আকস্মিকভাবে লীনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। জড়িয়ে যায় বললে ঠিক হবে না, লীনার মায়াবী ফাঁদে ও আটকে যায়। মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল ও। ওর স্খলন হয়েছিল। ও রিমঝিমের বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। রিমঝিম পড়াশোনা করতে তিন মাসের জন্য লন্ডন গিয়েছিল। রিমঝিমের এই তিন মাসের অনুপস্থিতিতে পলাশের সঙ্গে লীনার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা ঠিক হয়নি; কিন্তু পলাশ লীনার ফাঁদ থেকে ফিরতেও পারেনি। লীনা পরিকল্পিতভাবে পলাশকে প্রেম নিবেদন করেছিল। পলাশ লীনাকে ফেরাতে পারেনি। ওরা কয়েকবার ঘনিষ্ঠভাবে আড্ডা মেরেছে, কিছু স্থানে ঘুরেছে; কিন্তু ‘ফুর্তি’ করার কথা বলে রিমঝিম যে ইঙ্গিত করছে, তা কিন্তু হয়নি। এ কথা খুলে বলার সাহস পাচ্ছে না পলাশ। তবে লীনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার কথা তো সত্যি। এই অপরাধবোধে ও রিমঝিমের সামনে দাঁড়াতে পারছে না। সব কথা খুলে বলতে চায় ও। কিন্তু পারছে না। পলাশ জানতে পেরেছে, লীনাই রিমঝিমকে জানিয়েছে যে, পলাশ ওর মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিল। কী সাংঘাতিক মেয়ে! বান্ধবীর প্রেমিককে মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে ফেলে আবার বান্ধবীকে সে কথা বলে দেয় যে মেয়ে, তাকে ডাইনি বললে কি ভুল হবে? কথাগুলো পলাশের মনে কালোমেঘের মতো জমে আছে। ও রিমঝিমকে নিজের স্খলনের কথা বলতে পারছে না। খুব দ্রুত কথাগুলো ভেবে নেয় পলাশ। রিমঝিম পলাশের নীরবতা দেখে বললো-
‘তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?’
‘বলার অনেক কথা আছে। কিন্তু বলতে পারছি না।’
‘এসব নাটুকে কথা বলতে আমার পিছু ছাড়ছো না?’
‘না, মানে… বিশ্বাস করো!’
‘পলাশ, তুমি আমাকে ভুলে যাও। আমি কিন্তু তোমার নাম, তোমার ছবি আমার মন থেকে মুছে ফেলেছি। আমার দূর্ভাগ্য, এনওয়াইইউতে পড়তে গিয়ে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তোমার প্রোপোজাল আমি একসেপ্ট করেছিলাম- এটা ছিল সবচেয়ে বড় অঘটন। বাট ইট ইজ ওভার। ফরগেট মি অ্যান্ড লিভ মি এলোন!’
পলাশ অসহায় গলায় বললো-
‘তার মানে মাহিনকেই বিয়ে করতো যাচ্ছো?’
‘হ্যাঁ, মাহিনকে বিয়ে করছি। খুব শিগগীর!’
‘এটাই তোমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত?’
‘বাহ রে! আমাকে তো বিয়ে করতে হবে। নয়কি? আর মাহিন একটি সৎ এবং ভদ্র ছেলে। আই থিং সো, হি উইল বি এ কেয়ারিং হাসব্যান্ড। সত্যি কথা বলতে কী, মাহিনের সঙ্গে কথা বলে ওকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি এখন মাহিনকে ছাড়া আর কিছু ভাবতেও পারছি না। ইট ইজ ট্রু।’
‘আই হ্যাভ নো কমেন্টস অ্যাবাউট মাহিন। সে তোমাকে সুখী করবে হয়তো।’
‘হয়তো কেনো বলছো? সে আমাকে সুখী করবে। তাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি সুখী হবো। আমিও তাকে সুখী করবো।’
‘আই নো…।’
পলাশের কথা শেষ না হতেই রিমঝিম রাগী গলায় বললো-
‘ইউ ডোন্ট নো, কমিটম্যান্ট কী জিনিস। তুমি জানো না, বিশ্বাস কতটা নিরেট রাখতে হয়। তুমি জেনে রাখো, সম্পর্কের মধ্যে আস্থার জায়গা অটুট রাখতে না পারলে সে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। এ সব তুমি জানো না বা শেখোনি। জানলে আমার সঙ্গে প্রেম করে আবার লীনার প্রেমে হাবুডুবু খেতে না।’
রিমঝিমের মুখ যেনো খুলে গেছে। অথবা ওর ভেতরের চাপা ক্ষোভ কথার আক্রমণে প্রকাশ পাচ্ছে। পলাশ অসহায় কণ্ঠে ফের বললো-
‘আসলে আমি কিন্তু লীনার প্রেমে হাবুডুবু খাইনি।’
‘তবে কি একটু একটু করে জল খাচ্ছিলে?’
রিমঝিমের এ কথার জবাবে কিছু বলতে পারলো না পলাশ। অপরাধবোধে নিজে যখন জর্জরিত, তখন অভিযোগকারীর সামনে আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলা যায় না। এ কথা ভাবার সময় রিমঝিমের সেলফোন বেজে ওঠলো। মাহিন ফোন করেছে। ও পলাশের সামনে সেলফোন অন করলো। রিমঝিমের আদুরে কণ্ঠ-
‘হাই মাহিন। আপনি ফিরেছেন? ও আচ্ছা। জার্নি ভালো হয়েছে তো? আই অ্যাম ফাইন। কাল দেখা করতে চান? হোয়াই নট? কাল সন্ধ্যার পর আমরা কোথাও মিট করবো, ওকে? না, না। আমার সময় আছে। আচ্ছা রাখছি। তাহলে কাল দেখা হচ্ছে।’
পলাশ লক্ষ্য করলো মাহিনের সঙ্গে কথা বলার সময় রিমঝিমের চোখে মুখে উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছিল। রিমঝিম সত্যিই মাহিনকে পছন্দ করে ফেলেছে। তারমানে খুব শিগগির ওরা বিয়ে করে ফেলবে। পলাশের বুকের ভেতরে যন্ত্রণার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। মুখে যন্ত্রণার প্রকাশ দেখাতে চায় না। ও নিরাসক্ত মুখে তাকায় রিমঝিমের দিকে। রিমঝিম পলাশের মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে মনে আনন্দ পায়। ও ভাবে, পলাশের সামনে মাহিনকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেতে পারলে ভালো হতো। তখন পলাশের মুখটা কেমন হতে পারে, ও মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করে ও। মুখে হাসি ফুটিয়ে পলাশের দিকে তাকিয়ে রিমঝিম বললো-
‘মাহিন আজই ঢাকা থেকে ফিরেছে। ফিরেই ফোন দিয়েছে। কাল আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’
‘হুম, বুঝতে পেরেছি।’
ছোট্ট করে বলে পলাশ। রিমঝিম বলে-
‘মাহিন খুব রোমান্টিকও। ও আমাকে তুমি করে বলতে অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমি সঙ্কোচবোধ করছি। ভাবছি, কাল ওকে তুমি করে বলবো। কী বলো?’
‘বলতে পারো। কদিন পর থেকে তো তুমি বলতেই হবে। বিয়ের পর তুমি বলা আর বিয়ের আগে তুমি বলা; একই কথা।’
সম্মতি প্রকাশ করার ভঙ্গিতে বললো পলাশ। রিমঝিম মিষ্টি করে হাসলো। ও বললো-
‘ভাবছি বিয়ের আগে ওর সঙ্গে কী আমোদ-ফুর্তি করে ফেলবো কী না। তুমি বলো তো ঠিক হবে কী-না? তুমি যেমন লীনার সঙ্গে আমোদ-ফুর্তি করেছো, আমিও করে ফেলি!’
কথাটা গরম সিসার মতো ওর ইন্দ্রীয়তে প্রবেশ করলো যেনো। কথাটা অশালীন মনে হলো ওর। ও বললো-
‘মাহিনও কী তোমার সঙ্গে ফূর্তি করতে চাচ্ছে?’
‘ছিঃ! ও কি তোমার মত নষ্ট পুরুষ নাকি? ও মেয়েদের রেসপেক্ট করতে জানে। সুযোগ পেলে নিজেকে এলিয়ে দেয় না।’
‘হুম। মাত্র কয়েকদিনেই মাহিন সম্পর্কে অনেক উঁচু ধারণা জন্মে গেছে দেখছি।’
‘ধারনা জন্মাতে অনেকদিন লাগে না। মেয়েরা পুরুষ দেখলেই বুঝতে পারে। মেয়েদের বিশেষ এক ধরনের চোখ আছে। এটা তোমরা পুরুষরা জানলেও মানতে চাওনা। যাক, ওসব কথা। তুমি কী আর কিছু বলবে? শেষ কোনো কথা আছে? থাকলে বলে ফেলো। গাড়ি কিন্তু জ্যাকসন হাইটসে চলে এসেছে!’
‘শেষ কথা বলতে কী, সম্ভব হলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।’
‘এই টুকুই!’
‘হুম।’
‘শুধু ক্ষমা করে দিলেই শেষ? তা হলে আর বিরক্ত করবে না?’
‘তা জানি না। আমি চেষ্টা করেও নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না। তোমাকে দেখার জন্য ছুটে আসি।’
‘ন্যাকামি করো না!’
‘আমাদের সম্পর্কটা ভেঙে গেছে, জানি। তবু মন মানে না।’
‘আহারে! লীনা তোমাকে ভুলিয়ে রাখতে পারছে না। আমার বন্ধাবীটা আমাকে হারাতে গিয়ে এভাবে হেরে আছে! ওর শিকার ঘুরে ফিরে আমার কাছে এসে নতজানু হয়ে আছে! বড্ড আফসোস হচ্ছে!’
কথাটা বললো বিদ্রƒপ করে। পলাশ ওর বিদ্রƒপ গায়ে মাখলো না। ও বললো-
‘মাহিনকে বিয়ে করে সুখি হও। তবে বিয়ে করার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার কথা একবার অন্যভাবে ভেবে দেখো।’
‘অন্যভাবে ভাববো মানে?’
‘মানে হচ্ছে, আমি ভুল করেছি ঠিক। এই ভুলের জন্য আমি তোমার সামনে পুরোটা জীবন অপরাধীর মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। তুমি থাকবে সম্রাজ্ঞীর মত। আমাকে চান্স দিতে পারো।’
‘চান্স!’
‘প্রতিজ্ঞা করে বলছি, আমার সঙ্গে জীবন কাটালে তুমি যা বলবে, তা হবে আমার জন্য আদেশ। তোমার আদেশ মান্য করে তোমাকে পুরো জীবন আমি সুখি করবো।’
‘বাহ্! চমৎকার!’
‘তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, এখনও ভাসি এবং আগামীদিনেও বাসবো।’
‘এ কথাটা মনে থাকবে। আর কিছু?’
‘না। শেষ কথাটা আরেকবার বলছি, আমার ভুলের জন্য আমি অনুতপ্ত। আমাকে তোমার ক্ষমার মহত্বে ঠাঁই দাও।’
রিমঝিমের বুকের ভেতর গোপন কান্না মোচড় দিয়ে উঠলো। ও এই কান্না প্রকাশ করে দিয়ে পলাশকে প্রশ্রয় দিতে চায় না। ও একটু ধরাগলায় পলাশের উদ্দেশ্যে বললো-
‘তুমি এখন গাড়ি থেকে নেমে যাও। আর কোনদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না, কথা বলার চেষ্টা করবে না। অনুসরণও করবে না। তাহলে তোমার প্রতি আমার এক ফোঁটাও শ্রদ্ধা থাকবে না। আশা করি, নিজেকে এতোটা নিচুতে নামাবে না।’
ওর কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো পলাশ। রিমঝিম গাড়িচালকের উদ্দেশ্যে বললো-
‘ড্রাইভার, পুলওভার, প্লিজ!’
হালকা গ্রিন রঙের ব্যুরো কার থেমে যায় রাস্তার পাশে। পলাশ গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। ওর বুক ফেটে কান্না আসছে। কান্নার চেয়ে গভীর হচ্ছে অপরাধেবোধের গ্লানি। চাপা কান্না আর গোপন গ্লানি একাকার হয়ে যায় ওর চেতনার সর্বস্তরে। ওর বুকের ভেতরে এক অবর্ণনীয় কষ্টের পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। পলাশ নিজের ভেতরে এমন কষ্ট আর কখনও টের পায়নি। রিমঝিমের বিয়ে হয়ে যাবে বলেই হয়তো কষ্টটা প্রকটভাবে জানান দিচ্ছে। ও অন্তর্যামীর কাছে পণ করছে এমনভাবে স্বগোক্তির মত বলে উঠে-
‘যদি একবার রিমঝিম আমার কাছে ফিরে আসে, তবে আমি কোনোদিন কোনো নারীর প্রতি আসক্ত হবো না। কারো ফাঁদে পা দিবো না। রিমঝিমকে আমি পুরোটা জীবন ভালবাসবো! আই প্রমিজ!’
রিমঝিমকে নিয়ে ব্যুরো কার ধীর গতিতে ফের চলতে শুরু করে। পলাশ ওই গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। গাড়িটি রাস্তার বাঁকে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কষ্টের দৃষ্টি মেলে ও তাকিয়েই থাকে।
তিন.
কলিংবেল বাজলেও দরজা খুলল না কেউ। বাড়ির ঠিকানা মিলিয়ে দেখেছে মাহিন। ঠিকানা যা আছে, এতে ঠিক বাড়িতেই এসেছে ওরা। টু ফ্যামিলি এটাচ হাউজ। ৩৫ এভিনিউর ওপর এক লাইনে বেশ কয়েকটা বাড়ি সংযুক্ত। এ ধরনের বাড়িকে এটাচ বাড়ি বলা হয়। এ বাড়ির প্রথম ফ্লোরে থাকেন জামান। বাড়ির নম্বর ও ফ্লোর মিলিয়ে নিয়ে ওরা থেমে থেমে এগারবার কলিংবেল টিপে ক্ষান্ত হলো। এখনও কেউ দরজা খুলেনি। মনে হচ্ছে বাসায় কেউ নেই। রাস্তার ওপর ভাড়া করা ওদের ইয়েলো ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাবচালক ওদের নামিয়ে দিতে পারলে খুশি হতো। মাহিন ভেবেছিল, করবীকে ওর স্বামীর বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে নিজের বাসায়। তা হলো না। করবীর লাগেজ নামিয়ে রেখে ও যেতে পারছে না। কথাটা বলতে পারেনি ও। করবীকে একা রেখে যাওয়া শোভন নয়। ট্যাক্সি না ছাড়লে অপেক্ষার বিল বাড়তে থাকবে। মাহিন ওই বিল নিয়ে চিন্তিত নয় মোটেও। পরোপকার করতে গেলে মাঝেমাঝে অর্থ খরচ হতেই পারে। তবে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে ক্যাবচালক মনে মনে বিরক্ত হবেন-এটা ভেবে ও একটু অস্বস্থিবোধ করল। ও মনে মনে কালক্ষেপণের প্রস্তুতিও নিলো। ক্যাবচালক যা ভাবে, ভাবুক। ও জানে, নিউইয়র্কে ইয়েলো ক্যবচালকদের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষাকে ক্যাবচালকরা গুরুত্ব দেন। যাত্রীরা কোনো কারণে অভিযোগ করলে ক্যাবচালকরা বিপদে পরে যাবেন। যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ এবং এর ব্যবস্থা নিতে টিএলসি নামক একটি বিভাগ আছে এই শহরে। টিএলসির খড়গের কথা ভেবে ক্যাবচালকরা যাত্রীসেবার ব্যাপারে মনযোগী থাকেন এবং নিয়ম-কানুন মেনে চলেন। মাহিন ক্যাবচালকের কথা ভাবছিল। ও ক্যাবচালকের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ওর হাতে রাখা কাগজে ফের চোখ বুলালো। কাগজে যে ঠিকানা লেখা রয়েছে, তা এই বাড়ির কথাই বলা হয়েছে। কাগজে প্রথম ফ্লোরের কথা লেখা আছে, ওরা প্রথম ফ্লোরের কলিং বেলই টিপেছে। কেউ দরজা খুলেনি। তার মানে, বাসায় কেউ নেই। বাসায় কেউ থাকলে নিশ্চয় দরজা খুলতো। করবীর স্বামী টেলিফোনে বিয়ে করা স্ত্রীকে বরণ করতে বিমান বন্দরে যাননি, তিনি বাড়িতেও নেই-ব্যাপারটা মাহিনের কাছে কেমন রহস্যজনক লাগছে। ও ভীষণ অবাক হয়েছে। করবী শুধু অবাকই হয়নি, ও এখন অপমানিত বোধ করছে। করবীর বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। ভেতরে হু হু কান্নার ঝড় বইছে। ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কেনো এমন হল? করবীর বিপন্ন অবস্থা দেখে মাহিন বিব্রত। ও কী বলবে, কী করবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। ও কখনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। মাহিন লক্ষ্য করল, করবীর মুখ ফ্যাকাসে, চোখ দুটিতে জল টলমল। ওর মনে হলো পরিবেশের ভারি আবহ বদলে দেয়া দরকার। করবীর মধ্যে দুশ্চিন্তার মেঘ সরিয়ে দিতে কথা বলে সময় পার করা দরকার। এরমধ্যে যদি ওর স্বামী চলে আসেন, তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। হতে পারে জামান যথেষ্ট বিলম্ব করে বিমানবন্দরে গিয়েছেন এবং সেখানে করবীকে না পেয়ে নিজের বাসায় ফিরে আসবেন। চরম হতাশার মধ্যে এমন সম্ভাবনার কথা ধরে নেয়া যায়। মাহিন এমন সম্ভাবনার কথা মনে মনে ধরে নিচ্ছে। ও করবীর সঙ্গে কথা বলে সময় পার করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়।
ও মৃদু গলা কেশে নিয়ে করবীর উদ্দেশ্যে বললো-
‘আপনি কি নিশ্চিত যে, জামান সাহেব এই বাড়িতেই থাকেন?’
মাহিনের কথায় ওর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে করবী। ওর মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। মাহিন কণ্ঠ নামিয়ে ফের বলে-
‘আই মীন, আমি বলতে চাচ্ছি, জামান সাহেবের বাড়ির ঠিকানা এটি, এ ব্যাপারে আপনি কি নিশ্চিত?’
করবী এর জবাবে বললো-
‘আমার কাছে তার বাড়ির ঠিকানা বলতে এই ঠিকানাটাই আছে। আর কোনো ঠিকানা তো আমার জানা নেই। এখানে কি কারো একাধিক ঠিকানা থাকে?’
‘সাধারণত কারো আবাসিক ঠিকানা বলতে একাধিক ঠিকানা