- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
এক.
আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো ‘নৌকায় চড়বেন?’
প্রশ্ন করেই রিনরিনিয়ে হাসলো। যেন আমার ধ্যানস্থ মনোযোগ ভেঙে খুব মজা পাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত বোকার মতো মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ও চোখ নাচিয়ে ফের বলল, ‘নৌকায় চড়বেন, নাকি হা-করে তাকিয়ে থাকবেন?’
আমি অপ্রস্তুত গলায় সম্মতির জানিয়ে বললাম, ‘চড়বো।’
‘পকেটে টাকা আছে?’
‘না। কেন?’
‘টাকা ছাড়া নৌকায় চড়াবো না। আমাদের কিছু খাওয়ালেও চলবে।’
মেয়েটি রহস্য সৃষ্টি করতে চাইলো। ওর সাথে আরো দুটি মেয়ে। তারা এবার একসাথে খিলখিলিয়ে হাসলো। নৌকার মাঝি ভাবলেশহীনভাবে বৈঠা হাতে বসে আছে। আমি মেয়েটিকে ভালো করে দেখলাম। শ্যামল, দীর্ঘদেহী, টানা চোখ, টিকোলো নাক। মিষ্টি করে হাসে। হাসলে পুরো মুখমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে লাবণ্যের দ্যুতি। মায়াবী চোখে চঞ্চল দৃষ্টি। মেদহীন ছিপছিপে শরীর। অপরিচিত মেয়েটি কেন যেচে দুষ্টুমি করছে, বুঝতে পারছি না। শেষ বিকেলের নরোম রোদ নেমে এসেছে ওয়াটার ফ্রন্টে। ওয়াটার ফ্রন্টের দু’পাশে ভ্রমণবিলাসী লোক ভিড় জমিয়ে আছে। ম্যাগাসিটি ঢাকা নগরীর কোলাহল ছেড়ে প্রতিদিন অনেক লোক চলে আসে এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ওয়াটার ফ্রন্টে। বিশেষ কাজে আমি এসেছিলাম এয়ারপোর্টে। ফেরার পথে এসে বসেছি ওয়াটার ফ্রন্টের এক পাড়ে, একটা গাছের নিচে। শান্ত ও ছায়া নিবিড় পরিবেশে যখন তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম, তখনই মেয়েটি আমার তন্ময়তা ভাঙলো। আমার নীরবতা দেখে মেয়েটি বিদ্রুপকণ্ঠে বলল,
‘টাকা ছাড়া এতদূর চলে এসেছেন? আপনি নিশ্চয়ই বেকার।’
আবারো হাসির ফোয়ারা। নৌকা চলতে শুরু করলো। আমি হতবিহ্বল চোখে মেয়েগুলোর অনাহূত উচ্ছ্বাস উপভোগ করতে লাগলাম। ফেরার পথে দেখতে পেলাম মেয়েটি ওয়াটার ফ্রন্টের ফাস্ট ফুডের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। উদাসীন। ওর সাথের মেয়ে দুটি একটি টেবিলে বসে আড্ডা মারছে কয়েকটি ছেলের সঙ্গে। আমার মনে ঝিলিক দিল দুষ্টবুদ্ধি। আমি এগিয়ে গেলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে বিনীত ও আন্তরিক গলায় বললাম,
‘আপনাকে কিছু খাওয়াতে চাই। নয়তো সারাজীবন আমাকে অনুশোচনা করতে হবে।’
এবার আমার কথাই মেয়েটি শুধু চমকেই ওঠলো না, লজ্জাও পেল। বিব্রত গলায় ও বলল,
‘না না, কিছু খাওয়াতে হবে না।’
‘কিন্তু আমি যে আপনকে ছাড়ছি না। আপনি আমার মনে যে রেখাপাত করেছেন, তা ধরে রাখতে চাই। আপনার সঙ্গে পরিচিতও হতে চাই।’
মেয়েটি যেন আরো লজ্জা পেল। আমি ওর জড়তা ও কুঁকড়ে যাওয়াকে উপভোগ করতে লাগলাম। বললাম,
‘ভয় নেই, খাবার বিল আপনাকে দিতে হবে না। আমিই দেবো। আমি বেকার নই। পকেটে যথেষ্ট টাকাও আছে।’
লজ্জিত কণ্ঠে মেয়েটি বলল,
‘আপনার সঙ্গে রসিকতা করেছিলাম। কিছু মনে করবেন না, প্লিজ।’
‘না, না। আমি কিছু মনে করিনি। আপনাকে রসিকতা করার আরো সুযোগ দিতে চাই। আমরা কি একে-অন্যে পরিচিত হতে পারি না?’
‘জ্বি, পারি। আমার নাম ঝুমুর। আমি বাংলায় এমএ পড়ছি।’
তড়িঘড়ি করে বলল ঝুমুর। আমি প্রশ্ন করি,
‘কোথায় পড়ছেন?’
‘ইডেনে।’
‘বাহ্, চমৎকার। বাংলায় পড়ছেন বলে খুশি হলাম। কারণ, আমারও কাজ বাংলা নিয়ে। আমি পেশায় একজন সাংবাদিক। লেখালেখির বাতিক আছে। প্রেমের কবিতা হরদম লিখি।’
‘আপনি প্রেমের কবিতা পছন্দ করেন?’
‘খুব। নিজেও লিখি।’
‘তাই নাকি? তাহলে তো সোনায় সোহাগা! পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।’
‘আমিও।’
এরই মধ্যে অপর মেয়ে দুটিসহ কয়েকজন ছেলে এসে পড়লো। ঝুমুর আমাকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ছেলেগুলো ঢাকা কলেজের ছাত্র। ওরা জানালো, ১৭ জন ছাত্রছাত্রী ঘুরতে এসেছে ওয়াটার ফ্রন্টে। ঝুমুর টিম লীডার। আমরা সকলে একসাথে কফি পান করলাম। গল্প হলো। এরই মাঝে আমি ও ঝুমুর পরস্পর পরস্পরকে দেখে নিচ্ছিলাম চোরাচোখে। মনে হচ্ছিলো আমাদের হৃদয়ে অন্যরকম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে। আমার ভেতরে ভাললাগার ঘোর সৃষ্ট হলো। ইচ্ছে হচ্ছিলো ঝুমুরকে কাছে ডেকে বলি,
‘হঠাৎ করে তুমি এসে আমাকে আলোড়িত করে দিলে কেন?’
কফির বিল ঝুমুর পরিশোধ করতে চাইলো। আমি জোর করেই বিল দিলাম। কথা হলো পরবর্তীতে ঝুমুর আমাকে খাওয়াবে। ঝুমুর ওর বাসার ফোন নম্বর দিল। আমি ওর সেলফোন নম্বর চাইলাম না। আমিও আমার ভিজিটিং কার্ড ওকে দিলাম। দু’জনেই যোগাযোগ রাখবো বলে কথা দিলাম দু’জনকে। একরকম আাবিষ্টতার বুদ হয়ে চলে এলাম আমি।
দুই.
ঝুমুরকে ভুলতে পারছিলাম না কিছুতেই। কাজের ব্যস্ততায়ও ওর কথা মনে পড়ছিল। প্রথম কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম ওর দিক থেকে ফোন আসবে, এই আশায়। কিন্তু ফোন এলো না। মাস পেরুলো। অধীর আগ্রহে আমিই ফোন করলাম ওদের বাসায়। কিন্তু ওকে বাড়িতে পেলাম না। ফোন ধরলেন একজন ভদ্রমহিলা। তিনি জানালেন ঝুমুর বাসায় নেই। আমি তার কাছে নিজের পরিচয় দিতে সংকোচবোধ করলাম। কয়েকদিন একটানা ফোন করলাম। কিন্তু ঝুমুরকে পাওয়া গেল না। ওর বাসা থেকে জানানো হলো ও হোস্টেলে আছে। ইডেনের হোস্টেলে যেয়ে খোঁজ করার সাহস দেখালাম না। এরপর অফিসের কাজে হঠাৎ ঢাকার বাইরে যেতে হলো। সেখানে ফোন নম্বর সংরক্ষিত আমার পকেট ডায়েরিটা হারিয়ে গেল। সেসঙ্গে হারিয়ে গেল ঝুমুরের নম্বরটাও। এই কষ্টে কয়েকদিন ঘুমাতে পারলাম না। তবে আশা ছিল ঝুমুর আমাকে একদিন ফোন করবেই। এই আশায় রোমান্টিক দহনে পেরুতে লাগলো একেকটি দিন। একদিন অফিসে এসেই প্রচণ্ড তোপের মুখে পড়লাম। আমার এসাইনমেন্ট ছিল। মিস করেছি। সম্পাদক ডেকে ভৎসর্না করলেন খুব। নির্দেশ দিলেন যেভাবেই হোক ঐ সংবাদ সংগ্রহ করতে। আমি স্নায়ুচাপে ভুগছি। টেনশন আর উৎকণ্ঠা নিয়ে নিজের চেয়ারে বসতেই এলা ফোন। ‘হ্যালো’ বলতেই একটি মেয়েলি কণ্ঠ বললো,
‘কেমন আছেন?’
‘কে আপনি?’
জানতে চাই আমি।
‘আমি ঝুমুর।’
বলে ঝুমুর। প্রচণ্ড টেনশনের কারণে আমি ওকে চিনেত পারলামনা। বললাম,
‘কোন ঝুমুর?’
‘আমাকে চিনতে পারছেন না!’
ও প্রান্তে ঝুমুরের আহত কণ্ঠস্বর।
‘ঠিক, চিনতে পারছি না। আপনি কে?’
বললাম টেনশন থেকে। ঝুমুর বলল,
‘মনে করে দেখুন তো, চিনতে পারেন কিনা।’
‘না, পারছি না। বলুন তো আপনার সঙ্গে কোথায় পরিচয় হয়েছিলো?’
আমার প্রশ্নে স্মরণ করিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে ঝুমুর বলল,
‘মনে করে দেখুন, একটি অন্যরকম পরিবেশে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। জলাশয় ছিল, নৌকা ছিল। আর আমরা একদল ছেলেমেয়ে ছিলাম। মনে পড়ছে?’
আমি মনে করতে পারলাম না। স্নায়ুচাপে যেন সব চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছে। বললাম,
‘আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। দুঃখিত।’
এবার ঝুমুর অবাক হলো। হয়তো কষ্টও পেলো। বেদনাবিধুর কণ্ঠে ও বললো,
‘ঠিক আছে, কখনো যদি আমার কথা মনে পড়ে, তবে ফোন করবেন। আমি আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো। ফোন না করলে আমি কখনও আপনাকে ফোন করবো না।’
বলেই ঝুমুর ফোন রেখে দিল। আর ঐ মুহুর্তেই ওর কথা আমার মনে পড়ে গেল। বুকের পাঁজরটা হঠাৎই মোচড় দিয়ে উঠলো। আমি টেলিফোন রিসিভারটা তখনো ছাড়িনি। চিৎকার করে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলতে লাগলাম কিন্তু ও প্রাপ্ত নিথর, নি®প্রাণ। আমার বোধশক্তি যেন লোপ পেয়ে গেল। নির্বাক হয়ে ভাবতে লাগলাম,‘হায়, এ কি হলো!’
ঝুমুরের এই ভুল আমি ভাঙাবো কি করে? ওর কাছে আমি ফোন করতে পারবো না কোনদিন। অথচ ও ভাববে ওকে আমি সত্যিই ভুলে গেছি। আমাকে গ্রাস করলো অন্যরকম বিষাদ।