অচেনা বিভাস

অচেনা বিভাস

 Author: দর্পণ কবীর  Category: উপন্যাস  Publisher: দর্পন মুদ্রণ  Published: August 13, 2020  ISBN: 3214569871236 More Details
 Description:

এক.

মেয়েটির নাম করবী। করবী হচ্ছে ফুলের নাম। ফুলের মতোই সুন্দর মেয়েটি। করবী ফুলের পাপড়ি লাল, ওর গৌরবর্ণ মুখেও এক ধরনের লাল আভা ফুটে আছে। করবীকে প্রথম দেখার সময়ও ওর মুখে এই লাল আভা দেখেছে মাহিন। গোধূলী বেলায় আকাশে জমে থাকা লাল আভার বিষণœতা করবীর মুখে এখনো ফুটে আছে। উড়োজাহাজে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিও আছে। ওই ক্লান্তি আড়াল করে করবী ওর মুখে এক চিলতে হাসি ধরে রেখেছে। মাহিনের ধারণা করবীর মুখে যে হাসি ও দেখতে পাচ্ছে, এ হাসি স্বতঃস্ফূর্ত নয়। এটি শুকনো হাসি। এমন হাসির আড়ালে বেদনা লুকিয়ে থাকে। কেউ কেউ আছে, যারা মুখে হাসি ধরে রাখলেও চাপা বেদনাকে আড়াল করতে পারে না, সম্ভবত করবী এ ধরনের একটি মেয়ে— মনে মনে কথাটি ভেবে নেয় মাহিন। করবীকে একা দেখে ওর মনে ভাবনা উদয় হয়। ও ভাবতে লাগলো জেএফকে বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা করিডরে কী এমন ঘটনা ঘটলো যে, করবীর চোখে-মুখে আনন্দের চেয়ে বেদনার কালোমেঘ জমে গেছে? প্রশ্নটা মাহিনের মনে উঁকি দিলো। সে সঙ্গে বিস্ময়ও। করবী কাস্টমস এরিয়া থেকে প্রায় দুঘণ্টা আগে বেরিয়েছে, এখনো অভ্যর্থনা করিডরে ওর দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। করবীকে কি কেউ নিতে আসেনি? প্রশ্নটা কাঁটার মতো খচ করে বিঁধে গেলো ওর মনে। করবী অভ্যর্থনা করিডরে দীর্ঘক্ষণ কেনো দাঁড়িয়ে আছে— এ নিয়ে মাহিনের কৌতূহল সৃষ্টি হতো না, যদি ওর সঙ্গে ঢাকায় বিমানবন্দরে পরিচয় না হতো। পরিচয় ব্যাপারটাই এক ধরনের সম্পর্কের সূত্রপাত। যে সম্পর্কের অস্তিত্ব নেই, অথচ সূক্ষ্ম টান আছে। করবীর দিকে তাকিয়ে থেকে এক ধরনের টান অনুভব করছে মাহিন। এই টানকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়া ঠিক নয়, ভেবে নেয় ও। সে সঙ্গে কিভাবে করবীর সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল, সে কথাও স্মরণ করে নিলো। ওর সঙ্গে করবীর পরিচয় হয়েছে ঢাকায় হযরত শাহজালাল (র.) বিমানবন্দরের লাগেজ তল্লাশি পয়েন্টে। মাহিন দুটি লাগেজ তল্লাশি মেশিনে দেবার সময় ওর পেছন থেকে বয়স্ক এক ভদ্রলোক বললেন—

‘বাবা, আপনি কি নিউইয়র্ক যাচ্ছেন? আই মিন যুক্তরাষ্ট্রে?’

মাহিন পেছনে ঘুরতেই ভদ্রলোককে দেখতে পেলো। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল করবী। মাহিন ভদ্রলোককে চেনার চেষ্টা করে চিনতে না পেরে অবাক চোখে তাকালো তাদের দিকে। ভদ্রলোক বিনীতকণ্ঠে বললেন—

‘বাবা, আমাকে আপনি চিনবেন না। আমার নাম কামরান আহমেদ। রিটায়ার্ড কলেজ শিক্ষক। আপনি কি নিউইয়র্ক যাচ্ছেন?’

‘জ্বি, হ্যাঁ। এ কথা কেনো জানতে চাচ্ছেন?’

জানতে চাইলো মাহিন। ওর কথায় ভদ্রলোকের চোখের দ্যুতি উজ্জ্বল হলো। তার মুখে স্বস্তির হাসি ছড়িয়ে পড়লো। তিনি করবীকে দেখিয়ে বললেন—

‘বাবা, ও হচ্ছে আমার মেয়ে। ওর নাম করবী। আমার একমাত্র মেয়ে। ও প্রথমবারের মতো যাচ্ছে নিউইয়র্কে। এমিরাটসের ফ্লাইটে।’

কামরান আহমেদের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে করবী মাহিনকে স্লøামালাইকুম বললো। মাহিন একপলক দেখে নিলো করবীকে। ও বুঝতে পারছিল না কামরান আহমেদ কেনো তার মেয়েকে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ও দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললো—

‘আমিও এমিরাটস ফ্লাইটে যাচ্ছি।’

কামরান আহমেদ বিগলিত হলেন যেনো। তিনি বললেন—

‘বাবা, আমার মেয়ে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক যাচ্ছে। এর আগে ও কখনো উড়োজাহাজে ওঠেনি। দীর্ঘ যাত্রা আবার মাঝখানে দুবাইয়ে ট্রানজিট। ও একা মেয়ে মানুষ, তাই আপনার কাছে একটা অনুরোধ রাখতে চাই। অনুরোধ রাখবো?’

মাহিনের বুঝতে অসুবিধা হলো না কেনো কামরান আহমেদ ওর সঙ্গে কথা বলছেন। কী অনুরোধ করবেন, সেটিও ও আঁচ করতে পারলো। ও হাসিমুখে কামরান আহমেদের দিকে তাকিয়ে বললো—

‘নিঃসংকোচে অনুরোধ করতে পারেন। কী অনুরোধ, বলুন।’

‘বাবা, পথে বা ইমিগ্রেশনে কোনো সমস্যা হলে আমার মেয়েকে একটু সাহায্য করবেন। এই অনুরোধ রাখছি।’

‘দেখুন, পথে কোনো সমস্যা হবে না।’

ছোট্ট করে জবাব দিলো মাহিন। কামরান আহমেদ বললেন—

‘তারপরও যদি হয়, একটু দেখবেন।’

‘আচ্ছা। দুবাইয়ে ট্রানজিট পয়েন্টে নিউইয়র্কের ফ্লাইট ধরতে কোনো সমস্যায় পড়লে আমি তাকে বলে দেবো। আর হ্যাঁ, নিউইয়র্কে জেএফকে বিমানবন্দরে নামার আগে একটি ফরম পূরণ করতে হয়, প্রয়োজন হলে আমি তা পূরণ করতে সহযোগিতা করবো। সমস্যা বলতে আসলে কিছু নেই।’

বললো মাহিন। কামরান আহমেদ খুশি হলেন ওর কথা শুনে। তিনি বললেন—

‘আমি খুব খুশি হলাম আপনার কথা শুনে।’

মাহিন বললো—

‘জেএফকে বিমানবন্দরে আমি ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এরিয়া পর্যন্ত আপনার মেয়েকে ওয়াচ করবো। যদি কোনো সাহায্য লাগে আমি এগিয়ে যাবো। ব্যস, হলো?’

মাহিনের কথায় কামরান আহমেদের মন থেকে আশঙ্কার মেঘ কেটে গেলো। তিনি বললেন—

‘বাবা, আমি আপনার জন্য চার রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া করবো।’

মাহিন হাসলো। ও করবীর দিকে তাকিয়ে বললো—

‘নিউইয়র্কে আপনি কোথায় উঠবেন, আই মিন কার কাছে যাবেন?’

এ কথায় কেমন আরক্ত হয়ে গেলো করবীর মুখ। করবী লাল হয়ে যাওয়া ওর মুখ অবনত করে ফেললো। মাহিন একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো। কামরান আহমেদ এর জবাব দিলেন। তিনি বললেন—

‘বাবা, আমার জামাতা থাকেন নিউইয়র্কে। করবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে টেলিফোনে। ভিজিট ভিসা নিয়ে ও যাচ্ছে নিউইয়র্কে। ওখানে ওদের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হবে। আপনি কিন্তু ওদের বিয়েতে থাকবেন!’

করবীর নিউইয়র্কে যাবার কারণ জানতে পারলো মাহিন। এমন বিয়ে হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন এমন অনেকে টেলিফোনে বিয়ে করে ফেলেন। পরে বাংলাদেশে গিয়ে রিজিস্ট্রি বিয়ে করেন। কেউ কেউ স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন এবং রিজিস্ট্রি বিয়ে সম্পন্ন করেন। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অজানা নয়। তবে এ ধরনের বিয়ের সংখ্যা কম। মাহিন আর কথা না বাড়াতে করবীর দিকে চেয়ে বললো—

‘ঠিক আছে, আপনার লাগেজ বুকিং দিন। বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন পেরিয়ে চলে আসুন ফ্লাইট ধরার গেটে। আমি ওখানে থাকবো। আপনি কোনো ভয় পাবেন না। আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে সংকোচবোধ করবেন না।’

করবী মাহিনের দিকে তাকিয়ে বললো—

‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’

‘ওয়েলকাম।’

এ কথা বলে মাহিন তল্লাশি পয়েন্ট থেকে লাগেজ ট্রলিতে তুলে চলে গিয়েছিল এমিরাটসের কাউন্টারের দিকে। এরপর এমিরাটসের ফ্লাইট ওঠার অপেক্ষামাণ যাত্রীদের করিডরে করবীকে একঝলক দেখেছিল ও। ঢাকা-দুবাই যাবার ফ্লাইটে কবরীর আসন ছিল মাহিনের চেয়ে চার সারি পেছনে। দুবাইয়ে নামার পর মাহিন নিজ থেকে করবীর পাশে পাশে হেঁটে গিয়েছিল ট্রানজিটের অপেক্ষামাণ যাত্রীদের করিডরে। ট্রানজিটের দেড়ঘণ্টা সময়ে ওদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। এরপর দুবাই-নিউইয়র্ক আকাশ পথের উড়োজাহাজে করবীর আসন কোথায় পড়েছিল, তা লক্ষ্য করেনি মাহিন। করবী কোনো সহযোগিতা চাইতেও আসেনি ওর কাছে। দুবাই থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত চৌদ্দ ঘণ্টার আকাশ পথ পাড়ি দেবার পর জেএফকে বিমানবন্দরে যাত্রীদের ইমিগ্রেশন লাইনে করবীকে দেখতে পায় মাহিন। এরপর ওর সঙ্গে ফের দেখা হয় লাগেজ এরিয়ায়। মাহিন এবার করবীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে—

‘কী, আপনার ভয় কেটেছে? বলেছিলাম না, ভয়ের কিছু নেই। দেখলেন তো, আপনি নিজে একাই চলে এসেছেন। ওয়েলকাম, নিউইয়র্ক!’

মাহিনের কথায় করবী মিষ্টি করে হাসলো। করবীর চোখে-মুখে ভ্রমণের ক্লন্তি আছে— লক্ষ্য করলো মাহিন। করবী মাহিনকে বললো—

‘ভয় কিন্তু ছিল। তবে ভরসাও ছিল আপনার ওপর।’

এ কথায় হো হো হো হেসে উঠলো মাহিন। করবীর চোখে বিস্ময়ের আভা ফুটে ওঠে। ও বললো—

‘হাসছেন কেনো?’

‘হাসছি। আমার প্রতি আপনার ভরসা রাখার কথা শুনে।’

‘আমি কি হাসির কথা বলেছি? আপনার প্রতি ভরসা করেছিলাম বলেই তো কথাটা বললাম।’

‘ভরসা করলে আমার কাছে তো কোনো সহযোগিতা চাইতে দেখলাম না।’

‘প্রয়োজন হয়নি, তাই সহযোগিতা চাইনি। তার মানে এই নয় যে, আপনার প্রতি ভরসা ছিল না।’

‘তাই! জেনে ভালো লাগলো। এবং এ কথা জেনে খানিকটা অপরাধবোধও কাজ করছে এখন।’

‘অপরাধবোধ, কেনো?’

‘আমি দীর্ঘ যাত্রাপথে আপনার কোনো খোঁজখবর নিইনি। এখন মনে হচ্ছে নেয়া উচিত ছিল।’

মাহিনের কথায় ম্লান হাসলো করবী। বললো—

‘খোঁজ নেননি বলে আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে।’

করবীর কথাটা খট করে লাগলো যেনো। কথাটার মধ্যে অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। মাহিন কৌতূহল প্রকাশ করে বললো-

‘এ কথা কেনো বললেন? ঠিক বুঝলাম না! কথাটার কী অর্থ দাঁড়ায়?’

মাহিনের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ম্লান হাসলো করবী। কথায় কথা বাড়ছে। ও নিজের মধ্যে সংকোচবোধ করছে এখন। ও কথা না বাড়াতেই যেনো বললো—

‘এর অর্থ খুঁজে কী হবে? ধরে নিন, এমনিতেই কথাটা বললাম।’

‘না। কথাটা একটু খুলে বলুন। কথাটার অর্থ জানতে ইচ্ছে করছে। কিছু মনে করবেন না, এই কৌতূহল প্রকাশ করায়।’

মাহিনের কথায় একটু ভাবলো করবী। কয়েক সেকেন্ড পর ও বললো—

‘না, মানে, একা একজন মেয়ে মানুষকে সহযোগিতা করার সুযোগ পেলে অনেকে অযাচিত সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। সহযোগিতার নামে উপদ্রব! আপনি সে দলের নন, এটাই মিন করতে চেয়েছি!’

কথাটা বলে চোখ মাহিনের চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নিলো করবী। মাহিন আপ্লুত গলায় বললো—

‘বাহ। আপনি তো দেখছি, আগ-পিছ অনেক কিছু ভেবে ফেলতে পারেন! আপনার আইকিউ খুব শার্প। আপনার স্বামীকে ভাগ্যবান বলতে হবে।’

‘কেনো?’

‘এই যে আপনার মতো একজন বিদূষী স্ত্রীর স্বামী হয়েছেন বলে।’

‘কী যে বলেন। বিদূষী না, ছাই!’

এ পর্যন্ত কথা হলো ওদের মধ্যে। করবীর লাগেজ টেনে ট্রলিতে তুলে দিলো মাহিন। মাহিনের লাগেজ তখনো আসেনি। ওকে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে হলো। করবী ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। প্রায় দুঘণ্টা অপেক্ষার পর যখন লাগেজ পাওয়া গেলো না, তখন মাহিন লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখায় অভিযোগ দাখিল করলো। এরপর বিষণœ মনে বেরিয়ে এলো অভ্যর্থনা করিডরে। অভ্যর্থনা করিডরে এসে করবীকে দেখে ও ভীষণ অবাক হলো। এতোক্ষণ ওর এখানে থাকার কথার নয়। লাগেজ না পাওয়ায় এমনিতেই মন খারাপ ছিল মাহিনের, এর ওপর করবীকে দেখে মনটা আরো তেতো হয়ে গেলো। ও এগিয়ে গেলো করবীর কাছে। করবী ওকে দেখে বিষণœকণ্ঠে বললো—

‘আপনার এতো দেরি হলো? আপনার লাগেজ কোথায়?’

‘আমার লাগেজ মিসিং! পরের ফ্লাইটে আসবে। কাল ফের জেএফকেতে আসতে হবে। লাগেজের জন্যই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আপনার খবর কি? আপনি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন যে!’

এ কথার কোনো জবাব দিলো না করবী। ও মাথা নিচু করে ফেললো। করবীর এই নীরবতার কী অর্থ দাঁড়ায়, তা জানে না মাহিন। তবে ওর মনে হলো করবী ওর সমস্যার কথা বলতে বিব্রতবোধ করছে। মাহিন আগ বাড়িয়ে করবীর সমস্যার কথা জানতে চাইবে কি, চাইবে না— এ নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। ওর মনে হলো করবীকে প্রশ্ন করে ওর সমস্যার কথা জেনে নেয়াটা অযাচিত হবে না। হোক একদিনের পরিচয়। মাহিন বললো—

‘আপনার স্বামী কোথায়? তাকে দেখছি না যে!’

এ কথায় কেমন লজ্জায় পড়ে গেলো যেনো করবী। ওর মুখে একরাশ বিষণœতা কালো মেঘের মতো ছেয়ে গেলো। মাহিন করবীর নীরবতা দেখে ফের বললো—

‘আপনার স্বামী আপনাকে এখনো নিতে আসেননি?’

প্রশ্নটা করে ও করবীর মুখের দিকে চেয়ে রইলো। করবী ইতস্তত করে বললো—

‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তার তো আমাকে নিতে আসার কথা।’

‘বলেন কী! এ কথা এতো পরে বললেন?’

‘না, মানে…। ভাবছিলাম…।’

‘ভাবছিলেন, আমাকে এ কথা বলে কী হবে, এই তো?’

‘না। মানে…।’

‘দেখুন, আপনাকে সাহায্য করবো বলে আপনার বাবাকে কথা দিয়েছিলাম। তাই…।’

‘এ কথা তো আমি জানি। তারপরও…।’

‘আমাকে সমস্যার কথা বলতে সংকোচবোধ করছিলেন?’

‘না, মানে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাকে আরো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কি-না। তিনি তো আসতে পারেন। নয় কী?’

করবী প্রশ্নটা করলেও প্রশ্নের মধ্যে সংশয় ছিল। মাহিনও বুঝতে পারছে না করবীর স্বামী কেনো এখনো তাকে নিতে আসেননি। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম হলেও এতো দেরি হবার কথা নয়। অপেক্ষার সময় প্রায় দুঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। যারা বিমানবন্দর থেকে কাউকে রিসিভ করতে আসেন, তারা সাধারণত উড়োজাহাজ অবতরণ করার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চলে আসেন। তারা অপেক্ষা করতে থাকেন, একসময় যাত্রী বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা গেট দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কেউ কখনো দেরি করে ফেলতে পারে ঠিক, তবে নববধূকে বরণ করতে কোনো স্বামী বিমানবন্দরে পৌঁছতে দুঘণ্টা দেরি করে ফেলবেন— এমন ঘটনা স্বাভাবিক নয়। কথাটা ভেবে মাহিন করবীর উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন—

‘তার সেলফোনে ফোন করেছিলেন?’

‘হুম। এ পর্যন্ত চারবার করেছি। তার সেলফোন বন্ধ।’

‘ফোন করলেন কিভাবে?’

‘বিভিন্ন জনকে অনুরোধ করে ফোন করেছি।’

‘ঠিক আছে এবার আমার সেলফোন দিয়ে একবার ফোন করুন তো।’

মাহিন ওর সেলফোনটা করবীর দিকে বাড়িয়ে দিলো। করবী যেনো এটাই চাইছিল। ও ফোন করলো ওর স্বামীর সেলফোনে। লাইন আগের মতো সরাসরি চলে গেলো ভয়েস ম্যাসেজে। ভয়েজ ম্যাসেজও ফুল হয়ে আছে। ম্যাসেজ রাখা যাচ্ছে না। করবীর বুক ভেঙে কান্না উথলে আসতে চাইছে, ও নিজেকে সামলে নিলো। ও মাহিনের সেলফোন ফিরিয়ে দেবার সময় বললো—

‘আমার মনে হয়, তার কোনো অসুবিধা হয়েছে। ফোন ধরছে না। নইলে, এমন তো হবার কথা নয়!’

‘হুম। আমারও তাই মনে হচ্ছে।’

‘আচ্ছা, আপনি কি আমাকে জামানের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারেন? এটুকু হেলফ করবেন?’

‘কী বলেন? এটুকু সাহায্য কেনো করবো না? আপনার স্বামীর নাম জামান?’

‘হুম।’

‘তিনি কোথায় থাকেন? ঠিকানা নিয়ে এসেছেন?’

‘হ্যাঁ, ঠিকানা আছে আমার কাছে। এখানে এস্টোরিয়া নামে একটি এলাকায় তিনি থাকেন।’

‘আমিও এস্টোরিয়ায় থাকি! ঠিক আছে, তা হলে আমার সঙ্গে চলুন। ঠিকানা যখন আছে তখন কোনো চিন্তা করবেন না। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে তারপর আমি আমার বাসায় যাবো।’

‘আপনাকে বিপদে ফেলে দিলাম, তাই না?’

‘হা-হা-হা। আমাকে বিপদে ফেললেন কিভাবে? বিপদে তো আপনি পড়েছেন।’

‘বিপদে পড়েছি বলেই তো আপনাকে আমার বিপদ টেনে নিয়ে এলো।’

‘যাই হোক, এ দেশে এটা কোনো বিপদ নয়। একজন আরেকজনকে লিফট দিতে পারে। তবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনার স্বামীর কী হতে পারে?’

‘আমিও বুঝতে পারছি না। আপনার কোনো ধারণা আছে?’

এ কথা বলতে বলতে লাগেজের ট্রলি নিয়ে মাহিন এবং করবী হেঁটে চললো বিমানবন্দরের বাইরের দিকে। করবীর কথার জবাবে মাহিন বললো—

‘আমার ধারণার কথা বলার আগে আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই, করবো?’

‘করুন।’

‘আপনার স্বামীর পেশা কী? আই মিন তিনি কী করেন এখানে?’

‘বাড়ি বেচাকেনা করেন। রিয়েল স্টেট ব্রোকার। সম্ভবত মর্টগেজ ব্রোকারও।’

‘আপনাদের টেলিফোনে বিয়ে হয়েছে কতোদিন আগে?’

‘প্রায় তিন মাস আগে।’

‘তার সঙ্গে কথা বলেছেন কদিন?’

‘বিয়ের পর থেকে সপ্তাহে প্রায় দু-তিন দিন কথা হতো।’

‘কথা বলে কী কখনো মনে হয়েছে যে, তিনি দায়িত্বহীন বা চিন্তা চেতনায় উদাসীন অথবা ভবঘুরে চরিত্রের লোক।’

‘না। তেমন মনে হয়নি। কেনো এ প্রশ্ন করছেন?’

‘জানতে চাইছি তিনি কেমন চরিত্রের লোক। আপনার সঙ্গে কথা হতো কেমন?’

‘তিনি কিন্তু লম্বা সময় নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। বলেছি তো, আমাদের টেলিফোনে বিয়ে হয়েছে। আমাদের কখনো দেখা হয়নি। বুঝতেই পারছেন, এমন অবস্থায় কথা বলার পরিধিও বাড়েনি।’

‘আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই, করবো?’

‘বাহ, করুন। সংকোচবোধ করছেন কেনো?’

‘বিয়ে করলেন টেলিফোনে। নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে চলে এলেন নিউইয়র্কে। কিভাবে? দেশে আপনি কী করতেন?’

‘প্রথমে আপনার শেষ প্রশ্নটার উত্তর দিচ্ছি আগে। আমি একটি বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানিতে চাকরি করছি। চাকরির বয়স বেশিদিন হয়নি। তবে পজিশনটা ছিল ভালো। অ্যাসিস্ট্যান্ট সেলস ম্যানেজার। ভালো বেতন। আমার বাবার এক ছাত্র ওই কোম্পানির এমডি। তার সহযোগিতায় ওই চাকরিটা পেয়ে যাই।’

‘ওপর মহলের কারো কৃপা থাকলে সহজে ভালো চাকরি পাওয়া যায় যেভাবে, সেরকম আরকি! তাই না?’

কথাটা বলে মৃদু হেসে বললো মাহিন। করবী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। করবী আর কিছু বলছে না দেখে কয়েক সেকেন্ড পর মাহিন ফের বললো—

‘কিভাবে নিউইয়র্ক এলেন বললেন না যে!’

করবীর চোখে-মুখে এক রাশ লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়েছে। মাহিন লক্ষ্য করলো করবী ওর আরক্ত মুখ ওকে দেখাতে চাইছে না। ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো—

‘জামান আমার পরিবারকে বলেছিল বিয়ে করার তিন বছর পর আমাকে সে নিয়ে আসবে নিউইয়র্কে। এর আগে সে আমাকে আনতে পারবে না। সে এখনো ইউএস সিটিজেন হয়নি। আমি যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ করে বলতে পারেন অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে আমি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পেয়ে যাই। তাই জামানের কাছে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিই।’

‘ওহ!’

মাহিন ছোট্ট করে জবাব দেয়। করবী এবার ওর দিকে তাকিয়ে বলে—

‘প্রথমে ভেবেছিলাম, জামানকে না বলে নিউইয়র্ক চলে এসে তাকে সারপ্রাইজ দেবো। পরে ভিসা প্রাপ্তির খবরটা তার কাছে গোপন রাখতে পারিনি। বিশেষ করে আমার বাবার কারণে তা পারিনি।’

‘হুম। আপনার বিয়ে এবং নিউইয়র্ক আসার গল্পটা একটু ভিন্নরকম।’

বললো মাহিন। করবী এর জবাবে কিছু বললো না, শ্রাগ করলো শুধু। মাহিন আর কোনো কথা বললো না। ও জেএফকে বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ ইয়েলো ক্যাব ধরলো। প্রথমে ও করবীর লাগেজ গাড়ির ব্যাকডালায় রাখলো। এরপর ওর একটি লাগেজ রাখতে পারলো। আরেকটি লাগেজ ও রাখলো গাড়ির ভেতরে প্যাসাঞ্জার সিটে। ওর লাগেজটার দুপাশে ওরা দুজন বসলো। লাগেজটা ওদের মধ্যে দেয়াল হয়ে থাকায় মাহিন স্বস্তিবোধ করলো। করবীর মুখ থমথমে। করবীর ইচ্ছা ছিল টেলিফোনে বিয়ে করা স্বামীকে নিউইয়র্কে এসে চমকে দেবে; কিন্তু তা পারেনি। বরং সে নিজেই চমকে গেছে তাকে রিসিভ করতে স্বামী না আসায়। মানুষ কী ভাবে, আর কী হয়! এ কথা ভেবে মাহিন গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। নিউইয়র্কের আকাশে শরতের মেঘ থোকা থোকা লেপ্টে আছে, এর সঙ্গে উজ্জ্বল রোদের বিকিরণ। ভ্যাপসা গরম নেই। তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। হালকা বাতাস বইছে। বাতাসে যে আদ্রতা তা উপভোগ করার মতো। গ্রীষ্মকালের নিউইয়র্ক যেনো করোজ্জ্বল এক কাব্যিক ক্যানভাস। আকাশের দিকে তাকিয়ে মাহিনের মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে যায়। ইয়োলো ক্যাব ছুটে চলছে এস্টোরিয়ার অভিমুখে। ভ্যানউইক সড়কে কোনো ট্রাফিক জ্যাম নেই। আনন্দের আবেশে মাহিন জানালা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে একসময় তাকালো করবীর দিকে। ওর দিকে তাকাতেই হচকিয়ে গেলো মাহিন। করবীর দুচোখ বেয়ে নেমে এসেছে অশ্রুর দুটি ধারা। এমন দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত ছিল না ও। ওর মন খারাপ হয়ে গেলো।

দুই.

রিমঝিম দেখতে পেলো ও যে দোকানে প্রবেশ করেছে, এর ঠিক উল্টোদিকে ফুটপাতে পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ একটি পার্কিং মিটার থামের পেছনে এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, রিমঝিম ওর দিকে তাকালে ও চট করে নিজেকে আড়াল করে নিতে পারবে। রিমঝিম পলাশকে দেখলেও সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে থাকেনি। রিমঝিম ওকে আড়চোখে দেখেছে। রিমঝিমও বুঝতে দিতে চায় না যে, ও পলাশকে দেখেছে। এতে পলাশ প্রশ্রয় পেয়ে যেতে পারে। রিমঝিম পলাশকে প্রশ্রয় যেমন দিতে চায় না, তেমনি অনুকম্পাও দেখাতে চায় না। ও এখন পলাশকে ঘৃণা করে। রিমিঝিম অনেকদিন পর একজোড়া কানের দুল কিনলো। বিক্রয়কারী মহিলা আয়েশা কানের দুল দুটি প্যাকেট করছে। আয়েশা কানের দুলের সঙ্গে মানানসহ একটি চেইন বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল ওর কাছে। রিমিঝিম রাজি হয়নি। স্বর্ণালঙ্কার ও কিনলেও খুব একটা পরে না। ইমিটেশনের স্বর্ণালঙ্কার পড়তে ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ও স্বর্ণালঙ্কার কেনে শখের বশে। স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এই উপমহাদেশের নারীদের খুব দুর্বলতা। অথচ ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার নারীদের মধ্যে স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি দুর্বলতা ও দেখেনি। রিমঝিম নিউইয়র্কে বহুজাতিক অভিবাসী সমাজে বেড়ে উঠলেও ওর মধ্যে স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি টান আছে। কেনো এই টান-ও জানে না। রিমিঝিম জ্যাকসন হাইটস এলাকাটাকে পছন্দ করে না। কিন্তু ওকে এখানে আসতে হয় কেনাকাটা করতে। এই এলাকার ৭৩ এবং ৭৪ স্ট্রিট এবং রোজভেল্ট এভিনিউ থেকে ৩৭ এভিনিউ জুড়ে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানি মালিকাধীন দোকান। স্বর্ণালঙ্কারের দোকানগুলোও এখানেই। এখানে না এলে স্বর্ণালঙ্কার এবং উপ-মহাদেশীয় ডিজাইনের পোশাক কেনা যায় না। কেনাকাটার কথা চিন্তা করলে ওকে জ্যাকসন হাইটসে চলে আসতে হয়। এখানে সব সময় মানুষের ভিড় লেগে থাকে। দোকানগুলোতে কেনাকাটার ভিড় তো আছেই, আড্ডাবাজ মানুষদের উপদ্রবও আছে। বিশেষ করে ৭৩ স্ট্রিটে বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলোর সামনে আড্ডাবাজদের জটলা দেখা যায়। সবসময় কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে থাকে এখানে-সেখানে। সন্ধ্যা হলে তো ফুটপাত দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়ে। থোকা থোকা ফুলের মতো মানুষের জটলা এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে হরহামেশা দেখা যায়। শনি ও রোববার এখানে যেনো মানুষের হাট বসে। দূর-দূরান্ত থেকে বাংলাদেশিরা জ্যাকসন হাইটসে ছুটে আসেন। অধিকাংশজন কাঁচাবাজার করেন। এই দুদিন দোকানগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। মানুষের ভিড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ওর মাথার ভেতরে চিনচিন করে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। তাই রিমঝিম জ্যাকসন হাইটসে খুব একটা আসে না। আজ ও এসেছিল স্বর্ণালঙ্কার দেখতে। স্বর্ণালঙ্কার দেখতে গিয়ে একজোড়া কানের দুল কিনে ফেললো ও। কিছুদিন পর রিমঝিমের বিয়ে হবে। পাত্র একরকম ঠিক হয়ে আছে। পাত্রকে দেখে পছন্দ করেছে ও। মাহিনের সঙ্গে ওর কথাও হয়েছে। মাহিনকে সুপাত্র বলা যায়। হ্যান্ডসাম, কথাবার্তায় বিনয়ী, চাকরি করছে একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে। পেশায় ফিনানসিয়াল এক্সিকিউটিভ। মাহিম হান্টার থেকে মাস্টার্স করেছে দুবছর আগে। আর রিমঝিম দুমাস আগে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেছে। ওর বাবা-মার পছন্দের পাত্র মাহিন। ওকে দেখে এবং কথা বলে বিয়েতে রাজি হয়েছে রিমঝিম। আসন্ন বিয়ের কেনাকাটার প্রস্তুতির জন্য ও এসেছিল জ্যাকসন হাইটসে স্বর্ণের দোকানে। এই দোকানে বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ওর দৃষ্টি যায় বাইরে। আর তখনই ও পলাশকে দেখতে পায়। পলাশকে দেখে একটু হচকিয়ে গেলেও ও অবাক হয়নি। প্রায় দুমাস হলো পলাশ ওকে অনুসরণ করছে। পলাশ নিজেকে লুকিয়ে রেখে ওকে অনুসরণ করলেও রিমঝিম ঠিকই ওকে দেখে ফেলছে। পলাশের এই অনুসরণ করাটা রিমঝিম সহ্য করতে পারছে না। আবার উপেক্ষাও করতে পারছে না যেনো। রিমঝিম স্বর্ণালঙ্কারের দোকান থেকে বের হয়ে এলো। রিমঝিম ভেবেছিল আড়ালে লুকিয়ে থাকা পলাশ ওকে দেখে আড়ালেই লুকিয়ে থাকবে। গত দুমাস ও এমন আচরণই করেছে। কিন্তু আজ হলো উল্টো। রিমঝিমকে স্বর্ণের দোকান থেকে বের হতে দেখেই পলাশ ওর দিকে এগিয়ে এলো। পলাশের এই আচরণে ও অবাক এবং ক্ষুব্ধ হলো। ও গাড়ি পার্ক করেছে ৭৫ স্ট্রিটে পার্কিং লটে। ফুটপাত ধরে সে দিকে যাবার জন্য হাঁটতে লাগলো রিমঝিম। রাস্তা অতিক্রম করে পলাশ দ্রুত ওর সামনে চলে এলো। জিন্স প্যান্টের সঙ্গে টি-শার্ট পড়েছে পলাশ। কালো সানগ্লাসটি টি-শার্টের সামনে বুকের ওপর ঝুলানো। লম্বা চুলগুলো এলোমেলা। পলাশের দিকে বিরক্ত চোখে এক ঝলক তাকিয়ে দেখে নেয় রিমঝিম। পলাশের চোখ লাল, ফুলে আছে। রাতভর ড্রিং করেছে অথবা ঘুমায়নি— ভেবে নেয় ও। পলাশ রিমঝিমের পাশাপাশি হাঁটতে চেষ্টা করে। ফুটপাতে মানুষের খুব যাতায়াত। তাল মিলিয়ে রিমঝিমের পাশে হাঁটা সহজ নয়। পলাশ তবু চেষ্টা করতে থাকে। পলাশের এই চেষ্টাকে দুঃসাহস বলে মনে হয় রিমঝিমের। ও হঠাৎ ফুটপাতে থেমে যায়। পলাশও থমকে দাঁড়ায়। সে অপরাধীর মতো তাকিয়ে থাকে রিমঝিমের দিকে। রিমঝিম পলাশের আচরণে ভড়কে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও পলাশের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললো—

‘কী হচ্ছে? হাউ ডেয়ার ইউ! কেনো আমাকে অনুসরণ করছো!’

পলাশ কাচুমাচু করে বললো—

‘তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা বলার ছিল। কথাগুলো বলেই আমি চলে যাবো।’

‘হোয়াই ডু আই হ্যাভ টু লিসেন টু ইউ?’

এ কথার জবাব দেয় না পলাশ। ও জানে, রিমঝিম রেগে আছে। ও আমতা অমতা করে ক্ষীণকণ্ঠে বলে—

‘আমি জানি, আমার কথা শোনার সময় তোমার নেই। তারপরও আমি কিছু বলতে চাই।’

‘বাট হোয়াই? কেনো আমাকে তোমার কথা শুনতে হবে? হু আর ইউ?’

রিমঝিমের কণ্ঠে রাগের উত্তাপ। মিনমিনে গলায় পলাশ ককিয়ে উঠে—

‘প্লিজ, তোমার বেশি সময় নেবো না। দয়া করে, আমার কথাগুলো শুনো। কথা দিচ্ছি, তোমাকে আর বিরক্ত করবো না। অনুসরণও করবো না।’

পলাশের সঙ্গে কথা বলতে রুচিতে বাধছে ওর। তারপরও ওর কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিলো রিমঝিম। কারণ, পলাশ বলছে এরপর থেকে রিমঝিমকে আর বিরক্ত বা অনুসরণ করবে না। প্রস্তাবটা গ্রহণ করা যায়। রিমঝিমের নীরবতা দেখে পলাশ ফের বললো—

‘কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন তোমাকে বিরক্ত করবো না। আজ শুধু আমার কথাগুলো শোনো!’

রিমঝিম বলে—

‘ঠিক আছে বলো, কী বলতে চাও? টেল মি, হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু সে।’

‘এখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলবো?’

‘হোয়াটাস প্রবলেম টকিং টু মি অন দ্য স্ট্রিট? ইফ ইউ ওয়ান্ট টু সে এনিথিং, টেল মি অন হিয়ার।’

‘কোথাও বসে বলা যায় না? আই মিন এখানেই কোনো রেস্টুরেন্টে যদি বসি।’

পলাশের কণ্ঠে অনুরোধ। রিমঝিমের মাথায় যেনো রাগের আগুন জ্বলছে। ও রাগ সামলে নেবার চেষ্টা করে। ওদের পাশ দিয়ে যাতায়াত করা পথচারীদের কেউ কেউ আড়চোখে দেখছে ওদের। রিমঝিম এতে সংকোচবোধ করছে। পলাশ বলে—

‘একটু বসে কথা বলা যাবে না? বলেছি তো, এরপর আর কখনো তোমার সামনে আসবো না। প্রমিজ!’

রিমঝিম মনে মনে পলাশের উদ্দেশে বললো—

‘ডোন্ট সে প্রমিজ, ইউ আর এ প্যাথোলজিক্যাল লায়ার!’

নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলে—

‘ঠিক আছে চলো আশপাশের কোনো পার্কে গিয়ে বসি। কোনো রেস্টুরেন্টে তোমার সঙ্গে আমি বসবো না।’

‘ঠিক আছে, চলো তাই হোক। পার্কে গিয়ে কথা বলি।’

বলে সম্মতি জানালো পলাশ। ৭৪ রাস্তা দিয়ে একটা ব্যুরো কার যাচ্ছিল, রিমঝিম হাতের ইশারায় ওই গাড়ি থামালো। লিমোজিন কার থেমে গেলো। রিমঝিম গিয়ে কারের দরজা খুলে পেছনের আসনে বসলো। পলাশ বিপরীত দিক থেকে গাড়ির দরজা খুলে পেছনের আসনে বসলো রিমঝিমের সঙ্গে দূরত্ব রেখে। লিমোজন চালক মেক্সিকান। সে কিছু বলার আগেই রিমঝিম ট্যাক্সিচালকের উদ্দেশে বললো—

‘ড্রাইভার, কুড ইউ গো টু কুইন্স মল অ্যান্ড কাম ব্যাক এগেইন। রাউন্ডট্রিপ।’

‘ওকে।’

ড্রাইভার ছোট্ট জবাব দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। রিমঝিম গাড়িতে উঠেই ঠিক করে নিয়েছে পলাশ কী বলতে চায়, তা গাড়িতেই শুনে নেবে। পার্কে বসে তার সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। তাই সে গাড়ির ডাইভারকে কুইন্স মল যেতে এবং সেখান থেকে ফিরে আসতে বলেছে। এই রাউন্ডট্রিপে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় পাওয়া যাবে। পলাশের কথা শুনতে এ সময়ই যথেষ্ট। রিমঝিম গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো—

‘কী বলতে চাও, বলে ফেলো। এই গাড়ি জ্যাকসন হাইটস ফিরে এলে আর কোনো কথা বলার সময় পাবে না।’

পলাশের মুখে শুকনো হাসি। ও দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারলো। সময় নষ্ট না করে বললো—

‘আমি জানতে পারলাম তুমি মাহিন নামে একজনকে বিয়ে করছো খুব শিগগির।’

‘হুম। ঠিকই জেনেছো।’

‘মাহিনকে দেখে এবং তার সঙ্গে কথা বলে তুমি না-কি খুব ইমপ্রেসড?’

কথাটা রিমঝিমের রাগকে উসকে দেয়। ও বললো—

‘আমি শুধু ইমপ্রেসড নই, এক্সাসাইটেডও! এসব কথা জানতে এসেছো?’

‘না, মানে। আমার নিজের কথাও আছে।’

‘তো সে কথাগুলো বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ো। হোয়াই ডু ইউ বদার মি?’

‘বলছি, বলছি।’

বলে একটু দম নেয় পলাশ। রিমঝিম চুপ করে থাকে। ওর বুকের ভেতর কোথায় যেনো একটা মিহিন কান্না রিনরিন করছে। রিমঝিম এই কান্নাকে একদম পাত্তা দিতে চায় না। ও বলে—

‘চুপ করে থেকে সময় নষ্ট করছো তুমি। তুমি কী বলতে চাও বলে ফেলো। গাড়ি জ্যাকসন হাইটসে ফিরে এলে কিন্তু আমি আর তোমাকে সময় দেবো না।’

‘না, যা বলতে চাই, তা কিভাবে বলবো, ভাবছি।’

‘ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করছো। বলে ফেলো।’

রিমঝিম জানে পলাশ কী বলতে চায়। ও বলতে চাইবে লীনার সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক হয়নি। পলাশ এখনো ওকে ভালোবাসে। লীনার সঙ্গে একটু জড়িয়ে গিয়েছিল আর কী। ও ওর ভুল বুঝতে পেরেছে। এখন রিমঝিমকে নিয়ে বাকিটা জীবন কাটাতে চায়। এসব কথা বলতে চাইবে পলাশ। আগেও একবার এ কথাগুলো বলেছে। এবার শেষবারের মতো বলবে। এতে রিমঝিমের মন গলবে না। ও একটুও টলবে না। পলাশের প্রতি ওর একবিন্দুও দুর্বলতা নেই, ভালো লাগা নেই, ভালোবাসা নেই। বরং একতাল ঘৃণা দলা পাকিয়ে। রিমঝিমের ভাবনাকে ভেঙে দিয়ে পলাশ বললো—

‘রিমঝিম, আমি বলতে চাই, লীনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। আমি ট্র্যাপড হয়েছিলাম। লীনা তোমার বান্ধবী ছিল। কিন্তু ও তোমাকে ঈর্ষা করতো। তোমার প্রতি ঈর্ষা থেকে লীনা আমাকে ফাঁদে ফেলে।’

‘ইউ রাস্কেল, ইডিয়েট!’

‘আই নো, ইউ আর রাইট। বাট আই লাইক টু সে…।’

এ পর্যন্ত বলতে পারলো পলাশ। ওর কথা শেষ না হতেই রিমঝিম ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো—

‘লীনা তোমাকে ডেকেছে আর তুমি সুরসুর করে ওর সঙ্গে ফুর্তি করেছো, এই তো?’

‘না, মানে…।’

‘মানে কি? তুমি কি আমাকে বোকা ভাবছো? অ্যাম আই ফুলিশ?’

‘না, তা নয়। আমি বলতে চাচ্ছি, আমার দোষ তো আছেই। আমি জঘন্য অপরাধ করেছি।’

‘তো, এখন আমাকে কী করতে হবে? তোমার জঘন্য অপরাধকে গ্রহণ করতে হবে?’

এ কথার জবাবে পলাশ কিছু বলতে পারে না। ওর অভিব্যক্তিতে পাথুরে বিষণœতা। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রিমঝিম বলে—

‘পলাশ, আশা করছি, তুমি আজকের পর থেকে আর আমাকে অনুসরণ করবে না। আমাকে বদার করলে আমি আরো ক্ষুব্ধ হবো। আমার পেছনে ঘুরঘুর করলে তোমার সময় নষ্ট হবে শুধু। আমার অনুকম্পা পাবে না। একসময় আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, এটা ঠিক। বাট, নাউ আই হেইট ইউ!’

পলাশ মাথা নিচু করে নেয়। ও এর জবাবে কিছু বলে না। রিমঝিম আগেও পলাশকে ঘৃণা করে তা বলেছে। ঘৃণা করাই স্বাভাবিক। রিমঝিমের সঙ্গে তিন বছর প্রেম করার পর ও আকস্মিকভাবে লীনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। জড়িয়ে যায় বললে ঠিক হবে না, লীনার মায়াবী ফাঁদে ও আটকে যায়। মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল ও। ওর স্খলন হয়েছিল। ও রিমঝিমের বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। রিমঝিম পড়াশোনা করতে তিন মাসের জন্য লন্ডন গিয়েছিল। রিমঝিমের এই তিন মাসের অনুপস্থিতিতে পলাশের সঙ্গে লীনার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা ঠিক হয়নি; কিন্তু পলাশ লীনার ফাঁদ থেকে ফিরতেও পারেনি। লীনা পরিকল্পিতভাবে পলাশকে প্রেম নিবেদন করেছিল। পলাশ লীনাকে ফেরাতে পারেনি। ওরা কয়েকবার ঘনিষ্ঠভাবে আড্ডা মেরেছে, কিছু স্থানে ঘুরেছে; কিন্তু ‘ফুর্তি’ করার কথা বলে রিমঝিম যে ইঙ্গিত করছে, তা কিন্তু হয়নি। এ কথা খুলে বলার সাহস পাচ্ছে না পলাশ। তবে লীনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার কথা তো সত্যি। এই অপরাধবোধে ও রিমঝিমের সামনে দাঁড়াতে পারছে না। সব কথা খুলে বলতে চায় ও। কিন্তু পারছে না। পলাশ জানতে পেরেছে, লীনাই রিমঝিমকে জানিয়েছে যে, পলাশ ওর মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিল। কী সাংঘাতিক মেয়ে! বান্ধবীর প্রেমিককে মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে ফেলে আবার বান্ধবীকে সে কথা বলে দেয় যে মেয়ে, তাকে ডাইনি বললে কি ভুল হবে? কথাগুলো পলাশের মনে কালোমেঘের মতো জমে আছে। ও রিমঝিমকে নিজের স্খলনের কথা বলতে পারছে না। খুব দ্রুত কথাগুলো ভেবে নেয় পলাশ। রিমঝিম পলাশের নীরবতা দেখে বললো—

‘তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?’

‘বলার অনেক কথা আছে। কিন্তু বলতে পারছি না।’

‘এসব নাটুকে কথা বলতে আমার পিছু ছাড়ছো না?’

‘না, মানে… বিশ্বাস করো!’

‘পলাশ, তুমি আমাকে ভুলে যাও। আমি কিন্তু তোমার নাম, তোমার ছবি আমার মন থেকে মুছে ফেলেছি। আমার দূর্ভাগ্য, এনওয়াইইউতে পড়তে গিয়ে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তোমার প্রোপোজাল আমি একসেপ্ট করেছিলাম— এটা ছিল সবচেয়ে বড় অঘটন। বাট ইট ইজ ওভার। ফরগেট মি অ্যান্ড লিভ মি এলোন!’

পলাশ অসহায় গলায় বললো—

‘তার মানে মাহিনকেই বিয়ে করতো যাচ্ছো?’

‘হ্যাঁ, মাহিনকে বিয়ে করছি। খুব শিগগীর!’

‘এটাই তোমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত?’

‘বাহ রে! আমাকে তো বিয়ে করতে হবে। নয়কি? আর মাহিন একটি সৎ এবং ভদ্র ছেলে। আই থিং সো, হি উইল বি এ কেয়ারিং হাসব্যান্ড। সত্যি কথা বলতে কী, মাহিনের সঙ্গে কথা বলে ওকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি এখন মাহিনকে ছাড়া আর কিছু ভাবতেও পারছি না। ইট ইজ ট্রু।’

‘আই হ্যাভ নো কমেন্টস অ্যাবাউট মাহিন। সে তোমাকে সুখী করবে হয়তো।’

‘হয়তো কেনো বলছো? সে আমাকে সুখী করবে। তাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি সুখী হবো। আমিও তাকে সুখী করবো।’

‘আই নো…।’

পলাশের কথা শেষ না হতেই রিমঝিম রাগী গলায় বললো—

‘ইউ ডোন্ট নো, কমিটম্যান্ট কী জিনিস। তুমি জানো না, বিশ্বাস কতটা নিরেট রাখতে হয়। তুমি জেনে রাখো, সম্পর্কের মধ্যে আস্থার জায়গা অটুট রাখতে না পারলে সে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। এ সব তুমি জানো না বা শেখোনি। জানলে আমার সঙ্গে প্রেম করে আবার লীনার প্রেমে হাবুডুবু খেতে না।’

রিমঝিমের মুখ যেনো খুলে গেছে। অথবা ওর ভেতরের চাপা ক্ষোভ কথার আক্রমণে প্রকাশ পাচ্ছে। পলাশ অসহায় কণ্ঠে ফের বললো—

‘আসলে আমি কিন্তু লীনার প্রেমে হাবুডুবু খাইনি।’

‘তবে কি একটু একটু করে জল খাচ্ছিলে?’

রিমঝিমের এ কথার জবাবে কিছু বলতে পারলো না পলাশ। অপরাধবোধে নিজে যখন জর্জরিত, তখন অভিযোগকারীর সামনে আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলা যায় না। এ কথা ভাবার সময় রিমঝিমের সেলফোন বেজে ওঠলো। মাহিন ফোন করেছে। ও পলাশের সামনে সেলফোন অন করলো। রিমঝিমের আদুরে কণ্ঠ—

‘হাই মাহিন। আপনি ফিরেছেন? ও আচ্ছা। জার্নি ভালো হয়েছে তো? আই অ্যাম ফাইন। কাল দেখা করতে চান? হোয়াই নট? কাল সন্ধ্যার পর আমরা কোথাও মিট করবো, ওকে? না, না। আমার সময় আছে। আচ্ছা রাখছি। তাহলে কাল দেখা হচ্ছে।’

পলাশ লক্ষ্য করলো মাহিনের সঙ্গে কথা বলার সময় রিমঝিমের চোখে মুখে উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছিল। রিমঝিম সত্যিই মাহিনকে পছন্দ করে ফেলেছে। তারমানে খুব শিগগির ওরা বিয়ে করে ফেলবে। পলাশের বুকের ভেতরে যন্ত্রণার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। মুখে যন্ত্রণার প্রকাশ দেখাতে চায় না। ও নিরাসক্ত মুখে তাকায় রিমঝিমের দিকে। রিমঝিম পলাশের মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে মনে আনন্দ পায়। ও ভাবে, পলাশের সামনে মাহিনকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেতে পারলে ভালো হতো। তখন পলাশের মুখটা কেমন হতে পারে, ও মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করে ও। মুখে হাসি ফুটিয়ে পলাশের দিকে তাকিয়ে রিমঝিম বললো—

‘মাহিন আজই ঢাকা থেকে ফিরেছে। ফিরেই ফোন দিয়েছে। কাল আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’

‘হুম, বুঝতে পেরেছি।’

ছোট্ট করে বলে পলাশ। রিমঝিম বলে—

‘মাহিন খুব রোমান্টিকও। ও আমাকে তুমি করে বলতে অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমি সঙ্কোচবোধ করছি। ভাবছি, কাল ওকে তুমি করে বলবো। কী বলো?’

‘বলতে পারো। কদিন পর থেকে তো তুমি বলতেই হবে। বিয়ের পর তুমি বলা আর বিয়ের আগে তুমি বলা; একই কথা।’

সম্মতি প্রকাশ করার ভঙ্গিতে বললো পলাশ। রিমঝিম মিষ্টি করে হাসলো। ও বললো—

‘ভাবছি বিয়ের আগে ওর সঙ্গে কী আমোদ-ফুর্তি করে ফেলবো কী না। তুমি বলো তো ঠিক হবে কী-না? তুমি যেমন লীনার সঙ্গে আমোদ-ফুর্তি করেছো, আমিও করে ফেলি!’

কথাটা গরম সিসার মতো ওর ইন্দ্রীয়তে প্রবেশ করলো যেনো। কথাটা অশালীন মনে হলো ওর। ও বললো—

‘মাহিনও কী তোমার সঙ্গে ফূর্তি করতে চাচ্ছে?’

‘ছিঃ! ও কি তোমার মত নষ্ট পুরুষ নাকি? ও মেয়েদের রেসপেক্ট করতে জানে। সুযোগ পেলে নিজেকে এলিয়ে দেয় না।’

‘হুম। মাত্র কয়েকদিনেই মাহিন সম্পর্কে অনেক উঁচু ধারণা জন্মে গেছে দেখছি।’

‘ধারনা জন্মাতে অনেকদিন লাগে না। মেয়েরা পুরুষ দেখলেই বুঝতে পারে। মেয়েদের বিশেষ এক ধরনের চোখ আছে। এটা তোমরা পুরুষরা জানলেও মানতে চাওনা। যাক, ওসব কথা। তুমি কী আর কিছু বলবে? শেষ কোনো কথা আছে? থাকলে বলে ফেলো। গাড়ি কিন্তু জ্যাকসন হাইটসে চলে এসেছে!’

‘শেষ কথা বলতে কী, সম্ভব হলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।’

‘এই টুকুই!’

‘হুম।’

‘শুধু ক্ষমা করে দিলেই শেষ? তা হলে আর বিরক্ত করবে না?’

‘তা জানি না। আমি চেষ্টা করেও নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না। তোমাকে দেখার জন্য ছুটে আসি।’

‘ন্যাকামি করো না!’

‘আমাদের সম্পর্কটা ভেঙে  গেছে, জানি। তবু মন মানে না।’

‘আহারে! লীনা তোমাকে ভুলিয়ে রাখতে পারছে না। আমার বন্ধাবীটা আমাকে হারাতে গিয়ে এভাবে হেরে আছে! ওর শিকার ঘুরে ফিরে আমার কাছে এসে নতজানু হয়ে আছে! বড্ড আফসোস হচ্ছে!’

কথাটা বললো বিদ্রƒপ করে। পলাশ ওর বিদ্রƒপ গায়ে মাখলো না। ও বললো—

‘মাহিনকে বিয়ে করে সুখি হও। তবে বিয়ে করার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার কথা একবার অন্যভাবে ভেবে দেখো।’

‘অন্যভাবে ভাববো মানে?’

‘মানে হচ্ছে, আমি ভুল করেছি ঠিক। এই ভুলের জন্য আমি তোমার সামনে পুরোটা জীবন অপরাধীর মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। তুমি থাকবে সম্রাজ্ঞীর মত। আমাকে চান্স দিতে পারো।’

‘চান্স!’

‘প্রতিজ্ঞা করে বলছি, আমার সঙ্গে জীবন কাটালে তুমি যা বলবে, তা হবে আমার জন্য আদেশ। তোমার আদেশ মান্য করে তোমাকে পুরো জীবন আমি সুখি করবো।’

‘বাহ্! চমৎকার!’

‘তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, এখনও ভাসি এবং আগামীদিনেও বাসবো।’

‘এ কথাটা মনে থাকবে। আর কিছু?’

‘না। শেষ কথাটা আরেকবার বলছি, আমার ভুলের জন্য আমি অনুতপ্ত। আমাকে তোমার ক্ষমার মহত্বে ঠাঁই দাও।’

রিমঝিমের বুকের ভেতর গোপন কান্না মোচড় দিয়ে উঠলো। ও এই কান্না প্রকাশ করে দিয়ে পলাশকে প্রশ্রয় দিতে চায় না। ও একটু ধরাগলায় পলাশের উদ্দেশ্যে বললো—

‘তুমি এখন গাড়ি থেকে নেমে যাও। আর কোনদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না, কথা বলার চেষ্টা করবে না। অনুসরণও করবে না। তাহলে তোমার প্রতি আমার এক ফোঁটাও শ্রদ্ধা থাকবে না। আশা করি, নিজেকে এতোটা নিচুতে নামাবে না।’

ওর কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো পলাশ। রিমঝিম গাড়িচালকের উদ্দেশ্যে বললো—

‘ড্রাইভার, পুলওভার, প্লিজ!’

হালকা গ্রিন রঙের ব্যুরো কার থেমে যায় রাস্তার পাশে। পলাশ গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। ওর বুক ফেটে কান্না আসছে। কান্নার চেয়ে গভীর হচ্ছে অপরাধেবোধের গ্লানি। চাপা কান্না আর গোপন গ্লানি একাকার হয়ে যায় ওর চেতনার সর্বস্তরে। ওর বুকের ভেতরে এক অবর্ণনীয় কষ্টের পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। পলাশ নিজের ভেতরে এমন কষ্ট আর কখনও টের পায়নি। রিমঝিমের বিয়ে হয়ে যাবে বলেই হয়তো কষ্টটা প্রকটভাবে জানান দিচ্ছে। ও অন্তর্যামীর কাছে পণ করছে এমনভাবে স্বগোক্তির মত বলে উঠে—

‘যদি একবার রিমঝিম আমার কাছে ফিরে আসে, তবে আমি কোনোদিন কোনো নারীর প্রতি আসক্ত হবো না। কারো ফাঁদে পা দিবো না। রিমঝিমকে আমি পুরোটা জীবন ভালবাসবো! আই প্রমিজ!’

রিমঝিমকে নিয়ে ব্যুরো কার ধীর গতিতে ফের চলতে শুরু করে। পলাশ ওই গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। গাড়িটি রাস্তার বাঁকে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কষ্টের দৃষ্টি মেলে ও তাকিয়েই থাকে।

তিন.

কলিংবেল বাজলেও দরজা খুলল না কেউ। বাড়ির ঠিকানা মিলিয়ে দেখেছে মাহিন। ঠিকানা যা আছে, এতে ঠিক বাড়িতেই এসেছে ওরা। টু ফ্যামিলি এটাচ হাউজ। ৩৫ এভিনিউর ওপর এক লাইনে বেশ কয়েকটা বাড়ি সংযুক্ত। এ ধরনের বাড়িকে এটাচ বাড়ি বলা হয়। এ বাড়ির প্রথম ফ্লোরে থাকেন জামান। বাড়ির নম্বর ও ফ্লোর মিলিয়ে নিয়ে ওরা থেমে থেমে এগারবার কলিংবেল টিপে ক্ষান্ত হলো। এখনও কেউ দরজা খুলেনি। মনে হচ্ছে বাসায় কেউ নেই। রাস্তার ওপর ভাড়া করা ওদের ইয়েলো ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাবচালক ওদের নামিয়ে দিতে পারলে খুশি হতো। মাহিন ভেবেছিল, করবীকে ওর স্বামীর বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যাবে নিজের বাসায়। তা হলো না। করবীর লাগেজ নামিয়ে রেখে ও যেতে পারছে না। কথাটা বলতে পারেনি ও। করবীকে একা রেখে যাওয়া শোভন নয়। ট্যাক্সি না ছাড়লে অপেক্ষার বিল বাড়তে থাকবে। মাহিন ওই বিল নিয়ে চিন্তিত নয় মোটেও। পরোপকার করতে গেলে মাঝেমাঝে অর্থ খরচ হতেই পারে। তবে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে ক্যাবচালক মনে মনে বিরক্ত হবেন-এটা ভেবে ও একটু অস্বস্থিবোধ করল। ও মনে মনে কালক্ষেপণের প্রস্তুতিও নিলো। ক্যাবচালক যা ভাবে, ভাবুক। ও জানে, নিউইয়র্কে ইয়েলো ক্যবচালকদের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষাকে ক্যাবচালকরা গুরুত্ব দেন। যাত্রীরা কোনো কারণে অভিযোগ করলে ক্যাবচালকরা বিপদে পরে যাবেন। যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ এবং এর ব্যবস্থা নিতে টিএলসি নামক একটি বিভাগ আছে এই শহরে। টিএলসির খড়গের কথা ভেবে ক্যাবচালকরা যাত্রীসেবার ব্যাপারে মনযোগী থাকেন এবং নিয়ম-কানুন মেনে চলেন। মাহিন ক্যাবচালকের কথা ভাবছিল। ও ক্যাবচালকের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ওর হাতে রাখা কাগজে ফের চোখ বুলালো। কাগজে যে ঠিকানা লেখা রয়েছে, তা এই বাড়ির কথাই বলা হয়েছে। কাগজে প্রথম ফ্লোরের কথা লেখা আছে, ওরা প্রথম ফ্লোরের কলিং বেলই টিপেছে। কেউ দরজা খুলেনি। তার মানে, বাসায় কেউ নেই। বাসায় কেউ থাকলে নিশ্চয় দরজা খুলতো। করবীর স্বামী টেলিফোনে বিয়ে করা স্ত্রীকে বরণ করতে বিমান বন্দরে যাননি, তিনি বাড়িতেও নেই-ব্যাপারটা মাহিনের কাছে কেমন রহস্যজনক লাগছে। ও ভীষণ অবাক হয়েছে। করবী শুধু অবাকই হয়নি, ও এখন অপমানিত বোধ করছে। করবীর বুক ফেটে কান্না আসতে চাইছে। ভেতরে হু হু কান্নার ঝড় বইছে। ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কেনো এমন হল? করবীর বিপন্ন অবস্থা দেখে মাহিন বিব্রত। ও কী বলবে, কী করবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। ও কখনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। মাহিন লক্ষ্য করল, করবীর মুখ ফ্যাকাসে, চোখ দুটিতে জল টলমল। ওর মনে হলো পরিবেশের ভারি আবহ বদলে দেয়া দরকার। করবীর মধ্যে দুশ্চিন্তার মেঘ সরিয়ে দিতে কথা বলে সময় পার করা দরকার। এরমধ্যে যদি ওর স্বামী চলে আসেন, তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। হতে পারে জামান যথেষ্ট বিলম্ব করে বিমানবন্দরে গিয়েছেন এবং সেখানে করবীকে না পেয়ে নিজের বাসায় ফিরে আসবেন। চরম হতাশার মধ্যে এমন সম্ভাবনার কথা ধরে নেয়া যায়। মাহিন এমন সম্ভাবনার কথা মনে মনে ধরে নিচ্ছে। ও করবীর সঙ্গে কথা বলে সময় পার করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়।

ও মৃদু গলা কেশে নিয়ে করবীর উদ্দেশ্যে বললো-

‘আপনি কি নিশ্চিত যে, জামান সাহেব এই বাড়িতেই থাকেন?’

মাহিনের কথায় ওর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে করবী। ওর মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। মাহিন কণ্ঠ নামিয়ে ফের বলে—

‘আই মীন, আমি বলতে চাচ্ছি, জামান সাহেবের বাড়ির ঠিকানা এটি, এ ব্যাপারে আপনি কি নিশ্চিত?’

করবী এর জবাবে বললো—

‘আমার কাছে তার বাড়ির ঠিকানা বলতে এই ঠিকানাটাই আছে। আর কোনো ঠিকানা তো আমার জানা নেই। এখানে কি কারো একাধিক ঠিকানা থাকে?’

‘সাধারণত কারো আবাসিক ঠিকানা বলতে একাধিক ঠিকানা থাকে না। তবে যারা রিয়েল স্টেট ব্যবসা করেন, তাদের থাকতে পারে।’

‘কেনো?’

‘কারো কারো একাধিক বাড়ি থাকে। তারা বাড়ি কিনে রাখেন। তারা হয়তো এক বাড়িতে থাকেন, আবার ঠিকানা ব্যবহার করেন অন্য বাড়ির। এমন হতেও পারে।’

কথাটা শুনে কেমন স্বস্তি পেলো করবী। ও মনে মনে বললো—

‘এমন যেনো হয়’। কিন্তু ওর মনে যে আশঙ্কার মেঘ জমেছে, তা আরো ঘন ও কালো হয়ে আসছে। ও বললো—

‘তাহলে বলছেন, জামান এই বাড়ির ঠিকানা আমাদের দিয়েছেন। কিন্তু তিনি হয়তো থাকছেন অন্য বাড়িতে?’

‘আমি নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাচ্ছি না। তবে আমার ধারণা এমন হতেও পারে। আবার এমনও হতে পারে, তিনি খুব দেরি করে এয়ারপোর্ট গিয়ে আপনাকে না পেয়ে বাসায় ফিরে আসতে পারেন।’

‘তাই যেনো হয়। জানেন, আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে!’

‘আপনাকে পানি খাওয়াতে পারলে ভালো হতো। আমি কি আশেপাশের কোনো গ্রোসারি স্টোর থেকে এক বোতল পানি কিনে নিয়ে আসবো?’

‘না, না। আপনি আমাকে ছেড়ে এ পা-ও নড়বেন না, প্লিজ! তাহলে আমি ভয়ে মরেই যাবো।’

আর্তনাদের মত ককিয়ে উঠে করবী। এ কথাটা এমনভাবে বললো যেনো মাহিন চলে গেলেই পালিয়ে যাবে। করবীর কথা শুনে ও মনে মনে হাসলো। ও কখনও বিপদগ্রস্থ মানুষকে ফেলে চলে যায় না-এ কথা করবীকে বলার প্রয়োজন নেই। করবীর কথার জবাবে ও মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে বললো—

‘আপনি নার্ভাস হয়ে গেছেন, দেখছি!’

‘নার্ভাস? হুম, বলতে পারেন তা একটু হয়েছি। আমার অবস্থা একটু ভাবুন। ঢাকা থেকে এলাম একজনের সঙ্গে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে। আর দেখুন প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা। ভদ্রলোক এয়ারপোর্টে আমাকে আনতেই যাননি। এখন দেখছি বাড়িতেও নেই। এমন দায়িত্বহীন মানুষ দেখেছেন কখনও?’

‘ভুলো মনের মানুষ হতে পারেন। ভবঘুরে স্বভাবের কবিও হতে পারেন। আপনি আসছেন, তা হয়তো ভুলে গেছেন তিনি।’

মৃদুকণ্ঠে বললো মাহিন। করবী শ্লেষ করে বললো—

‘এমন হলে তাকে বিয়ে করতে হবে কেনো? বা তিনিই বা কোন মেয়েকে বিয়ে করবেন কেনো?’

‘বিয়ে তো সকলেই করে। বিয়ে সকলকেই করতে হয়!’

কথাটা শেষ করতে পারে না মাহিন। কথা কেড়ে নিয়ে করবী বলে—

‘কিন্তু বিয়ে মানে কী জানেন?’

প্রশ্নটার সরাসরি জবাব না দিয়ে মাহিন করবীর দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে নিচু কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলো—

‘বিয়ে মানে কি?’

প্রশ্ন করে মাহিন মনে মনে প্রশ্নটার জবাব নিজের মধ্যে হাতড়াতে থাকে। ওর পাল্টা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে করবী। কথাটা বললেও এ নিয়ে বেশি কিছু বলার সময় এখন নয়-মনে মনে ভাবে করবী। মাহিন কথা বাড়াতেই ফের প্রশ্নটা করলো—

‘বললেন না, বিয়ে মানে কি?’

করবীর বুকের ভেতর আশঙ্কা, হতাশা, গ্লানি আর মিহিন কষ্টের সম্মিলিত স্রোত বইছে। চোখের জল সামলে নিতে পারছে। পৃথিবীর গোলার্ধের যে স্থানে বাংলাদেশের অবস্থান, ঠিক এর উল্টোদিকে যেনো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। হাজার-হাজার মাইল দূরে এসে এমন বিপদে পড়তে পারে-করবী কল্পনাও করেনি। ওর মনের মধ্যে অজানা ভয় পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই ভয় কাটাতে ও সিদ্ধান্ত নিল মাহিনের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবে। অল্প পরিচিত মাহিনের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে কথা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রসঙ্গটা ও নিজেই তুলেছে। করবী লক্ষ্য করলো মাহিন ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মাহিন ওর কাছ থেকে প্রশ্নটার জবাব আশা করছে। করবী একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো—

‘বিয়ে মানে মানব-মানবীর মধ্যে সম্পর্কের ভিত তৈরির পবিত্র মাধ্যম। আর আমার এবং জামানের মধ্যে সম্পর্কের ভিত দেখেছেন? এমনভাবে কি সম্পর্কে ভিত গড়ে উঠে?’

‘ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনার এবং আপনার স্বামী জামান সম্পর্কে কি বলবো। তবে বিয়ে প্রসঙ্গে আপনার ধারণার কথা কি আরেকটু খুলে বলবেন? আই মিন, আমি জানতে চাচ্ছি আপনার কাছে বিয়ের ডিফ্যানিশন কি?’

ও একটু ভেবে বলে,

‘বিয়ে হচ্ছে একজন নারী-পুরুষের জীবনসঙ্গী হবার আইনগত অধিকার। বিয়ে হচ্ছে একজন নারী এবং পুরুষের মধ্যে পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাখার সমঝোতা। একে-অন্যের পাশে থাকার, দায়িত্ব নেয়ার এবং তা পালন করার নিজের এবং সমাজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। বিয়ে দায়িত্ববান হবার প্রতিশ্রুতি। সংক্ষেপে বললে, আমার কাছে বিয়ের ডেফ্যানিশন এই!’

করবীর কথা ভালো লাগলো মাহিনের। ও কথা আরো বাড়াতে চায়। বললো—

‘বিয়ে মানে সংসার করা, সন্তানের পিতামাতা হওয়া। একজন নারী-পুরুষ পুরো জীবন একে-অন্যের সঙ্গে কাটিয়ে দেয়া। আপনি এ কথা বলতে চাচ্ছেন?’

‘না, আমার কথা আরেকটু বিস্তৃত হবে। আমি বলতে চাচ্ছি, বিয়ে মানে শুধু সংসার করা, সন্তান জন্ম দেয়া বা স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকা নয়। বিয়ে একে-অন্যের প্রতি সমর্পণ। এই সমর্পণের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া এবং তা রক্ষা করা।’

‘শুধু এটুকুই! আপনি না বললেন, আরো বিস্তৃত কিছু। আরেকটু বিস্তৃত করে বলবেন কি? শুনতে ভালো লাগছে!’

মাহিনের কথা বাড়ানোর কৌশল ধরতে পারলো না করবী। কথা বলতে বলতে ও এক ধরনের তন্ময়তার ঘোরে ডুবে যাচ্ছে। এই ঘোরের আচ্ছন্নে ও বললো—

‘আমাদের দেশের বিয়ের শ্বাশত এক রূপ আছে, ঐতিহ্য আছে। বিয়ের মূল্যবোধ আছে, ধর্মীয় মর্যাদা আছে। বিয়ে ধর্মের মত পবিত্র। ধর্মপ্রাণের সঙ্গে ধর্মের যে বন্ধন, বিয়ের বন্ধনও সেরকম-অন্তত আমি তাই মনে করি।’

‘বাহ্, চমৎকার!’

বললো মাহিন। করবী ঘোরলাগা কণ্ঠে ফের বললো—

‘বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে গভীর এক অর্থদ্যোতনা আছে, ব্যপ্তি আছে। উদাহরণ দিয়ে বলছি, বৃক্ষের শেকড় যেরকম মাটির গভীরে প্রোথিত হয়, বিয়ে তেমনি দুটি মানুষের চেতনার গভীরে প্রোথিত হওয়ার ভালোবাসার এক মাধ্যম।’

এ পর্যন্ত বলে থামলো করবী। ওর মনে হল বিয়ে নিয়ে ও বেশি কথা বলে ফেলেছে। কথায় কথায় এতো কথা বলার সময় এটা নয়। কিন্তু প্রসঙ্গটা ও এড়াতে পারেনি। ও নিজের ভেতরে কেমন চুপসে যেতে লাগল। মাহিন ম্লান হেসে বললো—

‘অনেকে মনে করেন এবং বলেনও, বিয়ে একটি দালিলিক চুক্তিপত্র মাত্র। একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরির আইনী অনুমোদন। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?’

কথাটা এমনভাবে মাহিন বললো যে, করবী কথাটার জবাব না দেয়া ঠিক হবে না ভেবে নিলো। এমন স্পষ্ট করে কথাটা বলায় তা এড়িয়ে গেলে এক ধরনের লজ্জা ওর মনের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। কথাটার জুতসই জবাব দিয়ে দিলে এ কথাটার কোনো রেশ লজ্জার জন্ম দেবে না-ভেবে নেয় করবী। ও ভাবনা সরিয়ে রেখে খরখরে গলায় বললো—

‘সমাজ বা রাষ্ট্র আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। আইনগত বৈধতার কারণে বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে হয়। এই অর্থে বিয়ে একটি দালিলিক চুক্তি। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কথাটা খাটে না। আপনি বলুন, ওই দালিলিক চুক্তি কি কখনও আমাদের সমাজে বা পরিবারগুলোতে বড় বিষয় হয়ে দেখা দেয়? বিয়ে একটি দালিলিক চুক্তি হলেও এর মধ্য দিয়ে মানব-মানবী এক ঐশ্বরিক বন্ধনে বাধা পরে। চুক্তির বাহ্যিকতা ঢাকা পরে থাকে মানবিক প্রেমের অন্তর্নিহিত দীপ্তিতে। এখানেই বিয়ের মাহত্য বা বলতে পারেন সুষমাম-িত অপার্থিব সৌন্দর্য। এটাকে দালিলিক চুক্তি বলে তর্ক করা যাবে, কিন্তু সঠিক মূল্যায়ন করা যাবে না। আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন, বিয়ে মানুষের জীবনের বড় এক অধ্যায়। বিয়ে করার মধ্য দিয়ে প্রত্যেকটি জীবন বর্ণিল এক বাঁক নেয়। বলুন, নেয় না?’

করবীর কথা শুনে কেমন মুগ্ধ হয়ে যায় মাহিন। ও বুঝতে পারে, করবী একজন শিক্ষিত মেয়ে যেমন, চিন্তা-চেতনার দিক থেকে আধুনিকও। ও নিজের মুগ্ধ অনুভূতি চেপে রেখে বললো—

‘আপনার কথাগুলো অর্থহীন নয়। ভাবাবেগের বিচারে এসব কথা অতুলনীয়, তবে আইনের বিচারে বিয়ে একটি দালিলিক চুক্তিমাত্র। এ কথাটাও উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

তর্কটা শেষ না করার জন্য বললো মাহিন। করবী ওর কথাটাকে লুফে নিলো ফের। ও বললো—

‘চুক্তিপত্র বলতে যে কাবিননামার কথা বলছেন, তা আইনের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হলেও জীবন-যাপনের প্রয়োজেন তা কিন্তু গৌণ্য। ভেবে দেখুন, বিয়ের কাবিননামা গুরুত্ব পায় তখনই, যখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ভাঙন দেখা দেয়। আমাদের দেশে যত বিয়ে হচ্ছে, এর কতগুলো পরিবার কাবিননামা তুলে আনছে, বলুন? এদের সংখ্যা কিন্তু কম। দেখা যায়, দাম্পত্য কলহ বা ডিভোর্সের ক্ষেত্রে কাবিননামা কাজি অফিস থেকে তোলা হচ্ছে। তার মানে কি, কাবিননামাটা একটা সামাজিক স্বীকৃতির দলিল, যা আইনগত অধিকারের সনদ। অথচ এই দলিল কিন্ত সংসারে মূখ্য ভূমিকা পালন করে না। নারী এবং পুরুষের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নির্ণিত করছে এই দলিল-এটা ঠিক। তবে দলিলটি বিয়ে সম্পন্ন হবার পর থেকেই আর কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না। শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হলেই এই দলিল গুরুত্ব পাচ্ছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবারে কাবিননামা নামক এই দলিলটির কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় না। এটা কিন্তু মঙ্গলজনক। তবে শুনেছি, এ দেশে ডিভোর্স হরহামেশা হচ্ছে। এই দেশে হয়তো এই দলিল গুরুত্বপূর্ণ, কী বলেন?’

‘হুম। ঠিক বলেছেন। এ দেশে ডিভোর্স হয় খুব বেশি। এ ক্ষেত্রে এখানে রেজিস্ট্রি বিয়ের দলিলটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি বিয়ে এবং জীবন-যাপন নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের কথা বলতে চাচ্ছি এবং জানতেও চাচ্ছি। ধরুন, আপনার ভাবনা কি বা আমার ভাবনাও কি-এই আরকি?’

‘আপনি বিয়ে নিয়ে এতো কৌতুহলী কেনো, বলুন তো?’

করবীর প্রশ্নে একরাশ লজ্জা এসে গ্রাস করে মাহিনকে। ও লাজুক হেসে বলে—

‘একটি মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে আছে। বিয়ের ডেট ঠিক হয়নি এখনও।’

‘ওহ! তাই বলুন। কনগ্রাচুলেশন!’

‘ওয়েলকাম।’

‘এখন বুঝতে পারছি, আপনি কেনো বিয়ে নিয়ে এতো সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন। তা মেয়েটির নাম কি?’

‘রিমঝিম।’

‘বাহ্, সুন্দর নাম তো!’

‘রিমঝিম এখানেই থাকেন?’

‘হুম। সে তার বাবা-মা, ভাইসহ নিউইয়র্কে থাকেন অনেক বছর হলো। আর আমি নিউইয়র্কে বাস করছি প্রায় সাত বছর ধরে।’

‘কিছু মনে করবেন না, আপনার বাব-মা, ভাইবোন এখানে থাকেন না?’

জানতে চাইলো করবী। মাহিন বললো—

‘আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বাংলাদেশে থাকেন। আমি ইউএস সিটিজেন হয়েছি কয়েক মাস হল। বাবা-মার জন্য আবেদন করেছি। তারা কয়েকমাস পর হয়তো চলে আসবেন।’

‘ওহ্, আচ্ছা!’

‘আপনার জীবন তো ভালোই। খুব শিগগীর বিয়ে করবেন। কনে পছন্দ করা আছে। বাবা-মা চলে আসবেন। আপনার কথা শুনে ভালো লাগলো।’

‘ধন্যবাদ। আপনাকে বিয়ে নিয়ে আমি বেশি প্রশ্ন করেছি। কিছু মনে করবেন না।’

‘না, না। মনে কিছু করিনি। আপনার কি আর কোনো প্রশ্ন আছে?’

‘না, মানে, বিয়ে করতে যাচ্ছি, তাই প্রসঙ্গটা এলো বলে তর্কটা আপনার সঙ্গে করে নিলাম। এরমধ্য দিয়ে একটা ধারণাও হল।’

‘হুম। আপনি আমার মত একজন সাধারণ মেয়ের কাছ থেকে বিয়ের ডেফ্যানিশন জানতে চাইলেন কেনো, তা বুঝতে পারছি না। তবে বিয়ে সম্পর্কে আমার মনে যা আছে, তাই বলেছি।’

‘আপনার কথাগুলো ভালো লেগেছে। আরেকটা প্রশ্ন করবো?’

‘করুন।’

‘আমি শিগগীর বিয়ে করতে যাচ্ছি। সংসার জীবনে একজন পুরুষের কোনদিকে বেশি নজর দেয়া উচিত। একজন মেয়ে হিসাবে আপনার পরামর্শ কি?’

এ কথায় না হেসে পারলো না করবী। হাসি থামার পর ও বললো—

‘একজন পুরুষের উচিত রেসপন্সিবল হওয়া। একজন স্ত্রী চায় তার স্বামী কতটা দায়িত্ববান, যত্মশীল, সহানুভূতিশীল, মানবিক, কেয়ারিং, সৎ, বন্ধু ভাবাসম্পন্ন হবে। একজন মেয়ে হিসাবে আমি আপনাকে বলবো, এ কথাগুলো মনে রাখবেন।’

‘চমৎকার বলেছেন! আপনাকে বিদূষী বলেছিলাম। কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়।’

‘ও কথা আর বলবেন না। দেখতে পাচ্ছেন তো আমি এই মুহূর্তে অভিশপ্ত জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। কোথায় স্বপ্ন, সম্ভাবনা, সৌন্দর্য এবং সুন্দরের ডালি নিয়ে জামান এসে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে, উল্টো আমি চরম অপমানজনক এক পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়েছি। আপনার সাহায্য না পেলে আমার কী হতো, বলুন তো!’

‘ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে বিপদে ফেলে চলে যাবো না।’

বললো মাহিন। করবী কপালে চোখ তুলে বললো—

‘আচ্ছা, অন্য ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপলে হয় না? কেউ যদি থাকেন, তো তার কাছ থেকে জামানের কথা জিজ্ঞেস করা যাবে।’

অন্য ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজানোর কথা মনে আসেনি মাহিনের। এ দেশে এক ফ্ল্যাটের লোক অন্য ফ্ল্যাটের লোকের খবর রাখে না। অন্য ফ্ল্যাটের লোকের কাছে জামানের কথা জিজ্ঞেস করা ঠিক নয়। তবে বাড়িটি যেহেতু এস্টোরিয়া এলাকায় বাড়িতে বাংলাদেশি ভাড়াটে থাকার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশি কেউ হলে তার কাছে প্রশ্ন করা যাবে। করবীর প্রস্তাবটা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে এই মুহূর্তে অন্য ফ্ল্যাটে কেউ আছে কিনা-কে জানে। মাহিন উৎসাহী কণ্ঠে বললো—

‘তাইতো। চলুন, অন্য ফ্ল্যাটের কলিংবেল টিপে দেখি।’

মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলো করবী। মাহিন দরজার সামনে এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় তলার কলিংবেল টিপল পরপর দুবার। বাড়ির দোতালার জানালা থেকে একজন মধ্যবষসী মহিলা প্রশ্ন করলো—

‘হু।’

মহিলা শাড়ি পরেছেন। তাকে বাংলাদেশি মনে হওয়ায় মাহিন বাংলায় বললো—

‘আমরা জামান সাহেবকে খুঁজছি। আপনি কি জানেন, তিনি এই বাড়িতে থাকেন কী-না?’

‘আপনারা দাঁড়ান। আমি আসছি।’

বললেন মহিলা। করবী এবং জামানের মুখ উজ্জ্বল হলো। ওদের মনের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি নেমে আসে। মধ্য বয়স্ক মহিলা এক মিনিটের মধ্যে দরজা খুলে ওদের সামনে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি অনুসন্ধিৎসু। তিনি বলেন—

‘আপনারা কারা? জামান সাহেব আপনাদের কী হন?’

হাঁফ ছেড়ে বাঁচে যেনো মাহিন। অন্তত জামান সাহেবের সন্ধান পাওয়া গেলো। মাহিন করবীর দিকে আঙ্গুল তুলে বলে—

‘তিনি হচ্ছেন, জামান সাহেবের স্ত্রী। আজই বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। এয়ারপোর্টে জামান সাহেবের যাওয়ার কথা ছিল। তিনি যাননি, তাই আমি তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এসেছি।’

মাহিনের কথা শুনে ভদ্রমহিলার যেনো চোখ কপালে উঠলো। তিনি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন করবীকে। মাহিন বললো—

‘জামান সাহেব বাড়িতে নেই। এখন বলুন তো কী করি? আমিও যেতে পারছি না তাকে একা বাড়ির সামনে রেখে যেতে।’

ভদ্রমহিলা ম্লান হাসলেন। তিনি মাহিনের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললেন—

‘জামান সাহেবকে কাল রাতে ধরে নিয়ে গেছে! তিনি কবে ফিরবেন, তা জানি না।’

কথাটা যেনো বজ্রপাতের মত মনে হলো করবীর। কথাটা শোনা মাত্র ওর মাথা চক্কর দিতে লাগল। ও কি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে? ও হয়তো পড়েই যেতো, পরে যেতে যেতে ও খামচে ধরলো মাহিনের ডান কাঁধ। মাহিনকে ধরে ও ভারসাম্য রক্ষা করলো। মুহূর্তেই ঘটে গেলো এই প্রত্যাশিত ঘটনা। মাহিনের মন বিষণœ হয়ে গেলো মহিলার কথা শুনে। করবী কয়েক মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো। ও মাহিনের কাঁধ ছেড়ে দিলো। মাহিন বললো—

‘জামান সাহেবকে কে ধরে নিয়ে গেছে?’

‘এফবিআই হতে পারে। ইমিগ্রেশন পুলিশও হতে পারে। ঠিক জানি না। শুধু দেখেছি, তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাদা পোষাকের পুলিশ।’

ভদ্র মহিলার কথা শুনে মাহিনও বিচলিতবোধ করছে। ও প্রশ্ন করলো—

‘এটা কি জামান সাহেবের বাড়ি?’

‘না। এটা আমাদের বাড়ি। জামান সাহেব ফার্স্টফ্লোরে ভাড়া থাকতেন।’

‘ওহ্, আচ্ছা! এখন কী করবো বলুন তো? জামান সাহেবকে কেনো ধরে নিয়ে গেছেন তা নিশ্চিত করে জানতে পারেননি?’

জানতে চাইলো মাহিন। ওর শিরায় ঠা-া একটা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ভদ্রমহিলা বললেন—

‘যতটুক জানি, জামানকে মর্টগেজ প্রতারণার অভিযোগে এফবিআই ধরে নিয়ে গেছে। সঠিক তথ্য জানতে হলে আপনারা খোঁজ নিন, জানতে পারবেন।’

কথাটা বললেন করবীর দিকে তাকিয়ে। কথার বলার ইঙ্গিত হচ্ছে, স্ত্রী যখন এসে হাজির হয়েছে, তাহলে সেই খোঁজ নিতে পারে। মাহিন নার্ভাস হয়ে ভদ্রমহিলার উদ্দেশ্যে অর্থহীন এক প্রশ্ন করলো—

‘জামান সাহেবের কী হতে পারে বলুন তো?’

‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ৫/৬ বছর কারাগারে থাকতে হবে। এরপর তাকে দেশে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’

‘কেনো তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে?’

উদ্বেগ প্রকাশ করে মাহিন। ভদ্রমহিলা সবজান্তার মত বললেন—

‘জামান সাহেব এখনও গ্রিনকার্ড পাননি। শুনেছি তার বৈধ কাগজপত্র নেই। এ ক্ষেত্রে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। এমনটাই শুনেছি।’

মাহিনের মুখ থমথমে হয়ে গেলো। ও করবীর মুখের দিকে দেখলো ওর মুখ যেনো রক্তশূন্য হয়ে গেছে। চোখ দুটি জল টলমল। ও আর কথা বাড়াতে চাইল না। বললো—

‘ঠিক আছে। আমরা তাহলে চলে যাই। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’

মাহিন বিদায় নেবার জন্য কথাটা বললো। ভদ্রমহিলা করবীর দিকে সন্দেহের দৃষ্টি মেলে মাহিনের উদ্দেশ্যে বললেন—

‘শুনুন। এই মেয়েটি কি সত্যিই জামানের স্ত্রী?’

প্রশ্নটায় বিব্রত হলো ওরা দুজন। মাহিন বললো—

‘বিয়ে বলতে টেলিফোনে বিয়ে হয়েছে ওদের। রেজিস্ট্রি বিয়ে হবার কথা এখানে। তাই তিনি নিউইয়র্কে এসেছেন।’

‘বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছে সংসার করতে?’

‘হুম। সেরকমই। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য দেখুন!’

এর জবাবে ভদ্রমহিলা করবীর উদ্দেশ্যে বললেন—

‘মন খারাপ করো না, তুমি। আমি বলবো, তোমার ভাগ্য ভালো যে জামানের সঙ্গে বিয়ে হয়নি।’

এ কথা শুনে করবী অস্ফূত কণ্ঠে বললো—

‘এ কথা কেনো বললেন?’

‘জামান স্বামী হলে তোমার জীবনটা সুখের হতো কী-না সন্দেহ আছে। তোমাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হতো। স্বামী থাকতো কারাগারে। আর তোমার জীবন হতো দূর্বিষহ। আরেকটি কথা না বলে পারছি না। কথটা বলা ঠিক হবে কি-না, ভাবছি।’

‘বলুন। আমি শুনতে চাই।’

আগ্রহ প্রকাশ করল করবী। ভদ্রমহিলা ইতস্তত ভাব প্রকাশ করে বললেন—

‘জামান কিন্তু এই দেশে একটি বিয়ে করেছিল। ওর একটি স্প্যানিশ বউ ছিল। দুই মাস আগেও তাকে দেখেছি এই বাসায় যাতায়াত করতে।’

এবার সত্যিসত্যিই বজ্রপাত হলো যেনো। করবী আকস্মিক ঢলে পড়ে যাচ্ছিলো, মাহিন চট করে ওকে দুহাতে ধরে ফেললো। মাহিন কখনও কোনো মেয়েকে এভাবে জড়িয়ে ধরেনি। ভদ্রমহিলাও দ্রুত এগিয়ে এলেন মাহিনের কাছে। মাহিন ততক্ষণে করবীর এলিয়ে যাওয়া শরীর দুহাতে জড়িয়ে বসে পড়েছে। মাত্র কয়েকমুহূর্ত। এই কয়েক মুহূর্তে পৃথিবীটা যেনো ল-ভ- হয়ে গেছে। করবী চোখ খুললো। চোখ মেলে দেখলো মাহিনের দুহাতের আলিঙ্গনে ও শুয়ে আছে। ভীষণ এক লজ্জার ঢেউ ওকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। এমন লজ্জায় ও কখনও পড়েনি। ওর মনে হলো সম্বিত না ফিরলেই ভালো হত। করবী চট করে উঠে দাঁড়ালো। উঠে দাঁড়ালো মাহিনও। ভদ্রমহিলা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন—

‘মা, তুমি ঠিক আছো তো!’

‘হুম। ঠিক আছি।’

ছোট্ট করে লাজুক জবাব দিলো করবী। ভদ্রমহিলা মমতাভরা কণ্ঠে বললেন—

‘তুমি আমার বাসায় এসে একটু বসো। রেস্ট নাও। এরপর কোথায় যাবে, যেয়ো।’

এ কথায় করবী তাকালো মাহিনের দিকে। মাহিনের মুখ কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। করবী মনে মনে বললো—

‘আমি কোথায় যাবো, নিজেই জানি না!’ ও ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললো—

‘না। আপনাকে আর কষ্ট দিতে চাই না। আমরা যাচ্ছি। আরেকদিন এসে আপনার সঙ্গে আলাপ করে যাবো।’

‘একটু রেস্ট নিয়ে যেতে পারতে!’

‘না, না। আমারা যাচ্ছি।’

যাবার তাড়া আছে, এমন আকুতি ফুটে উঠলো করবীর কণ্ঠে। ভদ্রমহিলা বললেন—

‘ঠিক আছে, যাও। আমি সবসময় বাসায় থাকি। যদি এদিকেই থাকো, তোমার যখন ইচ্ছা হয় আমার বাসায় চলে এসো।’

ভদ্রমহিলার কথায় ম্লান হাসলো করবী। ও মাহিনের দিকে তাকিয়ে বললো—

‘চলুন, আমরা যাই।’

মাহিন এর জবাবে কিছু বললো না। শুধু মনে মনে বললো-

‘আপনাকে এখন কোথায় নিযে যাবো?’ ও এগিয়ে গেলো ইয়োলো ক্যাবের দিকে। ওকে অনুসরণ করলো করবী। গাড়িতে চড়তেই মাহিন প্রশ্ন করলো—

‘আপনাকে এখন কোথায় নিয়ে যাবো, বুঝতে পারছি না।’

করবী যেনো প্রস্তুত ছিল এই প্রশ্নের জবাব দিতে। ও বললো—

‘আমার কাছে প্রায় ৩ হাজার ডলার আছে। আমাকে দেশে ফেরার একটা এয়ার টিকেট কিনে দিন। আর এয়ারপোর্টে একটু নামিয়ে দিয়ে আসবেন, প্লিজ। আমি আপনার এই সহযোগিতার কথা কখনও ভুলবো না।’

করবীর কথা শুনে থ’ হয়ে গেল মাহিন। ও কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললো—

‘এয়ার টিকেট কিনলে না হয় কাল-পরশু চলে যেতে পারবেন। এখন এয়ারপোর্টে গিয়েও কেনো যেতে পারে। তবে আমি বলতে চাচ্ছি অন্য কথা।’

‘কী কথা ?’

‘আপনি কিছুদিন এখানে থাকুন। জামান সম্পর্কে আরো খোঁজ-খবর নিন। এরপর সিদ্ধান্ত নিন থাকবেন, না চলে যাবেন।’

‘খোঁজ নিয়ে আর কী হবে?’

‘এমনও তো হতে পারে, ভদ্রমহিলার কথা সঠিক নয়। সে আসলে কাউকে বিয়ে করেনি। আর যে বিপদের কথা শুনলাম। এরও কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে। যে তথ্য পেলেন, এর ক্রস চেক করবেন না?’

এর কোনো জবাব না দিয়ে করবী ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। মাহিন এই কান্নার সামনে চুপসে গেলো। ওর মনে হল, করবীকে কিছুক্ষণ কাঁদতে দেয়া দরকার। কান্না ভেতরের যন্ত্রণার ভার কমিয়ে নিজেকে হালকা করে দেয়। করবী নিজেকে হালকা করে নিক। মাহিন দুচোখ বন্ধ করে রিমঝিমের কথা ভাবতে লাগলো। রিমঝিম ওর জীবনে হঠাৎ নামা বৃষ্টির মত। ঝুপ করেই রিমঝিম ওর জীবনে চলে এসেছে। এক ধরনের আবেগে ও ভিজে যাচ্ছে, আবার পুরোপুরি যেনো ভিজছেও না।

চার.

তিন ডব্লিউ মানে ওয়েদার, ওয়াইফ এবং ওয়ার্ক। নিউইয়র্কে আসার পরেরদিনই মির্জা আজম জেনেছিল, এখানে তিন ডব্লিউ অর্থাৎ ওয়েদার, ওয়াইফ এবং ওয়ার্কের কোনো গ্যারান্টি নেই। ওয়েদার বা আবহাওয়া বদলে যেতে পারে যেকোনো সময়। স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে যেতেও পারে অর্থাৎ ডিভোর্স দিতে পারে যেকোনোদিন, যেকোনো সময়। আবার যেকোনো ব্যক্তির কর্মস্থল থেকে তার কাজ চলে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। নিউইয়র্কাররা এই তিনটি অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রাখে সবসময়। নিউইয়র্কে এসে এই তিন ডব্লিউর কথা প্রথমে শুনে খুব বিস্মিত হয়েছিল মির্জা আজম। এ কেমন দেশ? আবহাওয়া এবং কাজের কথা না হয় বাদ দেয়া যায়, তাই বলে স্বামী-স্ত্রীর সংসার কেনো এক লহমায় ভেঙে যাবে? এ কেমন সংস্কৃতি বা সামাজিক রীতি-নীতি? সংসারে ঝগড়া হবে, স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে মনমালিন্য হবে, আবার সেই ঝগড়া মিটেও যাবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালবাসার সেতুবন্ধন কি এতোই ঠুনকো যে, এদিক-ওদিক হলেই ডিভোর্স পর্যন্ত পৌঁছুবে? এসব কথা প্রথম প্রথম সে খুব ভেবেছে। পরে অবশ্য নিউইয়র্কের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে তালাক দেয়ার উকিলদের সাইনবোর্ড দেখে বিষয়টা ঠাওর করে নিয়েছে। এসব সাইনবোর্ড থেকেই অনুমান করা যায় নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রে খুব সহজেই ডিভোর্স হয়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখে গেছে এ দেশে ডিভোর্সের হার বেশি। সে বুঝে গিয়েছিল ডিভোর্স এখানে জল-ভাতের মত। আজ যে দম্পতিকে দেখা যাবে হাসি-খুশিতে কলকল করছে, কাল হয়তো তাদের দেখা যাবে দুজন আলাদা হয়ে যাচ্ছে। তাদের অধিকাংশজনই আবার সৌজন্য সম্পর্ক বজায় রাখে। ডিভোর্স দেবার পরও দুজনের দেখা হলে দুজন কথা বলেন খুব স্বাভাবিকভাবে। যেনো কিছুই হয়নি! কী সাংঘাতিক এদের বোধ! মির্জা আজম ভেবে পায় না। ডিভোর্সের কথা ভাবতে গিয়ে আজ তার এক দম্পত্তির কথা মনে পড়ে গেলো। সে নিউইয়র্কে এসে প্রথমে উঠেছিল এস্টোরিয়া এলাকায় থার্টি এভিনিউ এবং থার্টি সিক্স স্ট্রিটের কর্নারে অবস্থিত এক আত্মীয়ের বাসায়। তাদের বাড়ির পাশের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতো এক মার্কিন দম্পত্তি। গ্রিক বংশোদ্ভূত এঞ্জেলিনা হেলেন এবং ইতালীয় বংশোদ্ভূত ডেভিড ওয়াকারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় একটি দৈনন্দিন সামগ্রী বিক্রির দোকানে চাকরির সুবাদে। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের দোকানকে গ্রোসারি স্টোর বলে। মির্জা আজম এস্টোরিয়ায় থাকাকালে এস্টোরিয়া ডেলি নামে একটি গ্রোসারির দোকানে চাকরি করেছিল প্রায় একবছর। এই দোকানে কাজ করতে গিয়ে পরিচিত হয় এঞ্জেলিনা এবং ডেভিডের সঙ্গে। গ্রোসারি স্টোরে প্রায় প্রতিদিন পণ্য কিনতে আসতো এঞ্জেলিনা এবং ডেভিড। কখনও বিয়ার, কখনও সিগারেট, কখনও কোমল পানীয়, কখনও স্যান্ডউইচ, কফি কিনতো তারা। নিয়মিত কিনতো লটারির টিকেট। এঞ্জেলিনা নিয়মিত খেলতো টেক-ফাইভ লটারি এবং ডেভিড নিয়মিত খেলতো উইনার ফোর। গ্রোসারিতে কাজ করতে গিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে এই দম্পত্তির সঙ্গে বেশ খাতির হয়ে যায় মির্জা আজমের। এই দম্পত্তিকে দেখলেই তার মনটা ভালো লাগতো। তাদের সে-কী অমায়িক ব্যবহার! দুজনের মধ্যে সে-কী ভাব! কথায় কথায় তারা একে অন্যেকে হানি, সুইটহার্ট, ডার্লিং বলতো। তাদের মধ্যে কোনো খুনসুটি থাকতে পারে-এ কথা তাদের দেখে কেউ বলতে পরবে না। ঝগড়া-বিবাদ তো অনেক দূর! কিন্তু একদিন মির্জা আজম জানতে পারল এই দম্পত্তি দুভাগ হয়ে গেছে ডিভোর্সের মাধ্যমে। ডিভোর্সের কারণও ছিল অদ্ভূত এবং বিব্রতকরও। এঞ্জেলিনা ডিভোর্স দিয়েছিল অনুমতি ছাড়া স্বামী তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক লিপ্ত হতে বাধ্য করার কারণে। ধর্ষণের অভিযোগ এনে স্বামীকে ডিভোর্স দেয় সে। এ কথা জানতে পেরে থ’ বনে গিয়েছিল মির্জা আজম। ওদের কাছ থেকে এ কথা জানেনি সে। গ্রোসারি স্টোরে ওদের কম আসতে দেখে গ্রোসারির মালিক রবার্ট গেইলের কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছিল আলাপচারিতায়। এই প্রশ্ন তুলতেই রবার্ট গেইল স্বাভাবিক গলায় বলেছিল—

‘ওদের তো ডিভোর্স হয়ে গেছে!’ এর বেশি আর কিছু বলেনি রবার্ট গেইল। মির্জা আজমও এ নিয়ে আর প্রশ্ন করেনি, বা করার সাহস পায়নি। কথাটা শুনে সে কেমন মিইয়ে গিয়েছিল।

রবার্ট গেইল পরে আরেকদিন কথায় কথায় আরো জানিয়েছিল যে, এঞ্জেলিনা সেদিন রাতে একটু আগে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে ওর কাজ ছিল। ডেভিড সেদিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছিল। তার অফিসের একটা পার্টি ছিল। মাতাল ছিল বলেই স্ত্রীর ওপর নিজের অধিকার খাটিয়েছিল জোর করে। কিন্তু এ কথা আদালতে টিকেনি। স্বামীর অভদ্রচিত আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে এঞ্জেলিনা ডিভোর্সের মামলা ঠুকে দেয়। স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হবার চেষ্টা এ দেশে যে অপরাধ-এটা মির্জা আজম জেনেছিল এ ঘটনা জানার মধ্য দিয়ে। ‘দেশের কী নিয়ম-কানুন রে বাবা!’ তার মনে কাঁপন ধরে গিয়েছিল। এ দেশের আরেকটি বেমক্কা বিষয় হল ‘ডেমোস্টিক ভায়োলেন্স’। স্ত্রী-সন্তানকে ধমক পর্যন্ত দেয়া যাবে না। চোখ রাঙাতেও অনেকে ভয় পান। একটু এদিক-সেদিক হলেই ডোমোস্টিক ভায়োলেন্সে পড়ে যাবার আশংকা। মির্জা আজম এ ধরনের আইনের খড়গ নিয়ে বিস্তর ভেবেছে, কোন কূল-কুনারা পায়নি। ‘নারী স্বাধীনতা’র নামে নারীকে উচ্ছনে যাবার পথই যেনো তৈরি করে রেখেছে মার্কিনীরা। নইলে স্বামীদের কেনো সংসারে গো-বেচারা হয়ে গুটিয়ে-শুটিয়ে থাকতে হবে? স্ত্রীকে কিছু বলতে পারবে না ‘নাইন ওয়ান ওয়ান’ ফোন কলের আতংকে। এমন একটি ঘটনার কথাও জানে সে। গত বছর উডসাইড এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশি ভদ্রলোক অসুস্থবোধ করলে একদিন হঠাৎ কাজ থেকে বাসায় ফিরে পড়ে যান চরম বিপাকে। বাসায় ফিরে দেখেন তার স্ত্রী এক পাকিস্তানী যুবককে নিয়ে বেডরুমে শুয়ে আছে। স্ত্রী কোন সময় নষ্ট না করে নাইন ওয়ান ওয়ান কল করে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ বাহাদুররা এসে হাজির। স্ত্রী অভিযোগ করেন ডোমেস্টিক ভায়েলেন্সের। স্বামী বেচারা যতই বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, স্বামীর অবর্তমানে পরপুরুষের সঙ্গে শয্যাসঙ্গী হওয়া অন্যায়, ধর্ম বিরুদ্ধ-কে শোনে কার কথা। পুলিশ কর্মকর্তার ঝাঁঝালো বক্তব্য ছিলো—

একজন প্রাপ্ত বয়স্কা নারী যে কারো সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার আইনগত অধিকার রাখে। তাকে বাধা দেয়টাই বেআইনী। স্বামী হলেও তার কাজে বাধা দেয়া যাবে না। ভদ্রলোক আর ফিরতে পারেননি, তার নিজ বাসায়। ওই বাসায় তার স্ত্রী পাকিস্তানী যুবককে নিয়ে বাস করতে থাকে। একদিন তালাকের নোটিশও সে পেয়ে যায়। যাই হোক, এ দেশের অদ্ভূত নিয়ম-কানুন নিয়ে তার চাপা ক্ষোভ আছে। মির্জা আজম নিজের মধ্যে কুকড়ে থাকেন এই ক্ষোভ চেপে রেখে। এ তো একদিকের দৃশ্য, অন্য দৃশ্যও আছে। কেউ কেউ আছেন তারা ওই সব আইন-কানুন একেবারেই তোয়াক্কা করেন না। উল্টো স্ত্রীর ওপর নির্যাতর চালিয়ে সমাজে ভালো মানুষ সেজে থাকেন। লাম্পট্যেও কম যাননা। এমন দু-একটি ঘটনার কথাও জানেন মির্জা আজম। কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনুদান দেন এমন এক বাংলাদেশি নির্মাণ ব্যবসায়ীকে চেনেন সে। একদিন জানতে পারেন, ঐ ব্যক্তি প্রায় রাতে বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে পেটান। পাষা- স্বামীর নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছিলেন ওই ব্যক্তির স্ত্রী। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। লম্পট স্বামী একদিন তাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়। তিনি ফের একজন নারীকে বিয়ে করেন। বাড়িতে বউ পেটান-এমন লোক আরো আছে এই শহরে। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায় বউ পেটানো মার্কিনীদের সংখ্যা কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স যথেষ্ট হয়। নিউইয়র্কে অভিবাসীদের মধ্যে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সে প্রথম অবস্থান পাকিস্তানীদের, দ্বিতীয় অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশিরা-এই পরিসংখ্যানও আছে। এই পরিসখ্যান থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে নির্যাতিত স্ত্রীর সংখ্যা অনেক। আইন আছে এবং আইনের প্রয়োগও আছে-তারপরও এই চিত্র। আইনের প্রয়োগ না থাকলে কী হতো, কে জানে! যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইন অবশ্য মির্জা আজমের ভাল লাগে। তা হলো এ দেশে কেউ একের অধিক বিয়ে করতে পারে না। স্ত্রী হিসাবে একজনই থাকবে। যারা বহুগামীতায় অভ্যস্ত, তারা অবশ্য বিকল্প পথ ঠিক করে নেয়। এমন কয়েকজন বাংলাদেশীর কথাও জানে সে। ব্রুকলিনে থাকে জামাল নামে এক ব্যক্তি। দেশে তার দুটি স্ত্রী ছিল। দুজনকেই সে এদেশে নিয়ে আসে। একজন আইনগতভাবে তার স্ত্রী হিসাবে বাস করছে তার সঙ্গে। অপরজনকে আইনগতভাবে স্ত্রীর পরিচয় দিতে না পারলেও ধর্মমতে স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গেও সংসার করছেন। এ ছাড়াও তার নাকি এ দেশীয় একাধিক গার্লফ্রেন্ড আছে। একই এলাকায় ওবায়েদ নামে একজন ব্যবসায়ী বাস করেন, যার তিনটি স্ত্রী। তিন স্ত্রীর বাড়িতে পালা করে তিনি রাত্রি যাপন করেন। সোলেমান হোসেন নামে একজন থাকেন ব্রঙ্কস এলাকায়। তারও এ দেশে দুই স্ত্রী। দেশেও আরো এক স্ত্রী আছে। আইনকে রক্ষা করেই তারা বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থাৎ শরিয়ত মতে কলমা পাঠের মধ্য দিয়ে একাধিক স্ত্রী নিয়ে সংসার করছেন এ শহরে। একাধিক স্ত্রী থাকার কথা তারা গর্ব করে বলেও বেড়ান। এ সব কথা মাঝেমাঝে মির্জা আজমের মনে আকুলি-বিকুলি করে। সে জেনে গেছে নিউইয়র্কে বাস করতে গেলে অনেক অসঙ্গতি, অনেক প্রশ্ন, অনেক অইনের খড়গ। সে অনেকবার চেষ্টা করেছে যে, নিউইয়র্কের নানা বিষয় নিয়ে ভাববেন না। কিন্তু তার ভাবনা চলে আসে। একবার যদি ভাবতে বসে তখন আর ভাবনা যেনো ফুরায়ও না। একের পর এক ভাবনা এসে চিন্তার আকাশে জমে যায়। একবার সে ভাবতে বসলে অনেক কথা, অনেক ঘটনা হুরমুড়িয়ে ভেসে উঠে। সমুদ্রে তিনি মাছ যেমন লাফ দিয়ে জলরাশি থেকে উঠে ফের জলে তলিয়ে যায়, মির্জা আজমের ভাবনাগুলোও তেমনি চেতনার স্থরে উঠে এসে মিলিয়ে যায়। ভাবনার এই এক ঝলক উপস্থিতির আবেশ নিয়ে সে মাঝেমাঝে মস্ত এক ভাবুকে পরিণত হন। এ ধরনের ভাবনা এলে তখন তার কাজে বিঘœ ঘটে। অন্যমনস্কতা ভর করে। কারো সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারে না।

একবার এমন ভাবনায় তলিয়ে গিয়ে বিপাকেই পড়েছিল সে। তখন সে ম্যানহাটানের ডাউনটাইনে ওয়েস্ট ফোরে অবস্থিত একটা বারে ডেলিভারির কাজ করতো। সেদিন কী হল, চারটি ডেলিভারির অর্ডার নিয়ে সে যখন সাইকেলে প্যাডেল চালালো, তখনই তার মনে একটা অযাচিত ভাবনা পেখম ছড়িয়ে গেলো। সেদিন আপস্টেটে এক ব্যক্তি ২৩৪ মিলিয়ন ডলার লটারি পেয়েছিল। সাইকেল চালাতে গিয়ে মির্জা আজম ভাবতে লাগলো লটারিতে ২৩৪ মিলিয়ন ডলার সে পেয়ে গেলে কী হতে পারতো। এমন একটি উত্তেজনাকর ভাবনা মনের আকাশে রঙ ছড়িয়ে বসলে, তখন আর কী নিজেকে সামলে রাখা যায়? মির্জা আজম নিজেকে সামলাতে পারেনি। সে ২৩৪ মিলিয়ন ডলার দিয়ে কী কী করবে-এটা ভাবতে ভাবতে ডেলিভারির মালামালসমেত এস্টোরিয়ায় নিজের বাড়ি ফিরে এসেছিল। সেটি ছিল তার প্রথম দিনের কাজ। লজ্জায় পরেরদিন থেকে সে আর কাজে যায়নি। ভাবনা মাঝেমাঝে তাকে এলোমেলো করে দেয়। ভাবনা হচ্ছে লজ্জাবতী গাছের মত, ছড়িয়ে ধরলে ছাড়ানো কঠিন।

মির্জা আজম ভাবনার অতলে তলিয়ে আরো দুটি চাকরি হারিয়েছে। ওই দুটি ঘটনার কথা তার মনে পড়ে গেলো। ডাউনটাউনে একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি পেয়েছিল ওয়েটার হিসাবে। দুসপ্তাহ ছিল শিক্ষানবীশ ওয়েটার। এরপর ওই হোটেলে এক সঙ্গীত পরিচালক ডিনার করতে এসেছিলেন। মির্জা আজমের সঙ্গে আলাপচারিতায় ওই সঙ্গীত পরিচালক জানিয়েছিল যে, তার একটি কুকুর আছে। প্রিয় কুকুরকে গান শেখাচ্ছেন তিনি। কুকুরের গান শেখা নিয়ে ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিল সে। এতে বিপত্তি ঘটে। ওই দিন দুজন কাস্টমারকে স্যামন ফিসের পরিবর্তে তেলোপিয়া ফিস এবং স্ট্রিক এর পরিবর্তে আইসক্রিম দিয়েছিল। পানির জগ ও চায়ের কাপ হাত থেকে ভেঙেও গিয়েছিল। সবকিছু ঘটলো একই দিন। ফলে চাকরি থেকে সেদিনই অব্যাহতি!

এরপর থেকে সে ভাবনা নিয়ে সতর্ক থাকে। তারপরও মাঝে মধ্যে ভাবনা হুট করেই এসে যায়। চেষ্টা করেও সে তাড়িয়ে দিতে পারে না। মির্জা আজম নিউইয়র্কের তিন ডব্লিউর কথা ভাবতে গিয়েই ডিভোর্স, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, বহুবিবাহ ইত্যাদি বিষয়ে ডুবে গিয়েছিল। তার চিন্তার ছেদ কাটলো মাহিনের ডাকে।

‘আজম ভাই, কেমন আছেন?’

মাহিনের কথায় সম্বিত ফিরে পেলো সে। মাহিনের দিকে তাকিয়ে চমকেও উঠলো। মাহিনের সঙ্গে একটি তরুণী। তরুণীটিকে এক কথায় সুন্দরী বলে দেবে যে কেউ। তরুণীকে সে এর আগে কখনও দেখেনি। মাহিনের দিকে এক টুকরো হাসি বিলিয়ে দিয়ে মির্জা আজম বললো—

‘আরে কেমন আছেন মাহিন? দেশে গিয়েছিলেন না? কবে ফিরলেন?’

‘ফিরেছি আজই।’

‘উনি বুঝি ভাবী? দেশে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছেন!’

মির্জা আজমের এ কথার জন্য মাহিন এবং করবী একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। করবীর কানে কথা গরম শীসার মত ঢুকলো। এক রাশ লজ্জা এসে হামলে পড়লো যেনো ওর চেতনায়। মাহিন বিব্রতকণ্ঠে বললো—

‘না, না, না। আপনি ভুল করছেন। আমরা আসলে একে অন্যের বন্ধু।’

‘ও আচ্ছা। তাহলে এখুনি বিয়ে করেননি, এই তো? তা আর কতকাল বন্ধু থাকবেন? বিয়ে করে ফেলুন। আপনাদের ভীষণ মানাবে!’

মাহিন বুঝতে পারল মির্জা আজমকে সামলাতে হবে। লোকটি একটু বোকা ধরনের। যা মনে করে, তাই বলে ফেলে। ভেবে চিন্তে কথা বলে না। তার মগজ ঢিলেঢালা। সরলতা আছে, পরোপকারীও। মাহিন মির্জা আজমের বোকামী গায়ে না মেখে সময় নষ্ট না করে বললো—

‘আজম ভাই, আসলে আপনার কাছে আমরা মহা বিপদে পড়ে এসেছি। আমাদের সাহায্য করুন, প্লিজ।’

মাহিনের কথায় মির্জা আজম যেনো থমকে গেলো। করবী লজ্জাবতী গাছের মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মির্জা আজম প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে আছে মাহিনের মুখের দিকে। ও সঙ্কোচ ঝেড়ে বললো—

‘আজম ভাই, ওর নাম করবী। আমরা একই ফ্লাইটে এসেছি। ও যার বাসায় উঠবে বলে ঠিক করে এসেছিল, এখন দেখা যাচ্ছে সে বাড়িতে নেই। বাসায় কবে ফিরবে বা অদৌ ফিরবে কি-না, তা বাড়ির মালিক বলতে পারছে না। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, ওর থাকার একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে।’

হরহর করে কথাগুলো বলে ফেলল। কাজি আজম হচকিয়ে গেল মাহিনের কথা শুনে। মাহিন ফের বললো—

‘থাকার জায়গা বের করে দিতেই হবে। ওর কিন্তু নিউইয়র্ক শহরে কেউ নেই। আমি এবং আপনিই ওর পরিচিত।’

‘কিন্তু হুট করে এসে বললেই কী থাকার জায়গা পাওয়া যায়? বিশেষ করে মেয়ে হলে?’

‘এই জন্যই তো আপনার কাছে এসেছি। এমন ঘোর বিপদ থেকে আপনি ছাড়া কে উদ্ধার করবে, বলুন?’

‘কিন্তু…!’

‘ভাড়ার চিন্তা করবেন না। আমি দিয়ে দেবো। তা ছাড়া উনি চাকরি করবেন। তার জন্য একটা চাকরিও ঠিক করে দিতে হবে। আপাতত থাকার জায়গা ঠিক করে দেন, প্লিজ!’

এই পর্যায়ে করবী বললো—

‘আপনি আমার বাসা ভাড়া দেবেন কেনো? আমার কাছে তো টাকা আছে।’

‘ঠিক আছে। আপনিও দিতে পারেন। না হয় দেবেন।’

বললো মাহিন। ও মির্জা আজমের দিকে তাকিয়ে বললো—

‘ভাইজান, এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করুন। আপনি অনেকের বিপদে দাঁড়িয়েছেন, অনেক মুশকিল আসান করেছেন, আজ এই মেয়েটির উপকার করুন।’

‘আহা, এতো করে বলছেন কেনো? এসেছেন যখন, কিছু একটা করার চেষ্টা তো করবোই। তা উনার নাম পরিচয় বলুন।’

মাহিন কথা বলতে যাচ্ছিলো, করবী ওর আগে বললো—

‘আমার নাম করবী। আজ এই প্রথমবারের মত এসেছি নিউইয়র্কে, মানে আপনাদের স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে।’

‘মনে হচ্ছে এই স্বপ্নের দেশ নিয়ে বিদ্রƒপ করলেন?’

বললো মির্জা আজম। জবাবে করবী ম্লান হেসে বললো—

‘এই দেশকে সবাই ম্বপ্নের দেশ বলে। আমিও এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম এই স্বপ্নের দেশে। স্বপ্নগুলো কিছুক্ষণ আগে মরে গলিত লাশ হয়ে গেছে! আমার এই মুহূর্তে একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল দরকার। আপনারা যদি আমাকে এই সহযোগিতাটুকু করেন, আমি আজীবন আপনাদের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবো।’

এ পর্যন্ত বলতে গিয়ে করবীর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো। পরিবেশে কেমন গুমোট হয়ে গেলো। মির্জা আজম নিজের ভেতরে এক বিষণœ নদীর প্রবাহ টের পেলেন। পরিবেশকে হালকা করতে মির্জা আজমকে মাহিন বললো—

‘ঢাকায় বিমান বন্দরে করবীর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তার বাবাকে কথা দিয়েছিলাম যে, তার কোনো অসুবিধা হলে সাহায্য করবো।’

‘হুম। বুঝতে পেরেছি। দেখি কী করা যায়। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। আমি কয়েকজনকে ফোন করে দেখি। কিছু একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে।’

মাহিনের বুকের ভেতর চেপে থাকা আশঙ্কার পাথর নেমে গেলো। মির্জা আজম চেষ্টা করলে কোনো বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। তার লন্ড্রি স্টোরে প্রতিদিনই আশেপাশের বাংলাদেশি পরিবার কাপড় ওয়াশ করতে আসে। এস্টোরিয়া এলাকায় তার পরিচয়ের পরিধি বড়। মাহিন ও করবী অপেক্ষা করলো। এর মধ্যে মির্জা আজম ফোন করছেন। তিনি কয়েকজনকে ফোন করে একজনের বাসায় করবী রাখার বন্দোবস্ত করে ফেললেন। মির্জা আজমের টেলিফোন কথা থেকে বোঝা গেলো ফৌজিয়া নামে একজন মহিলা করবীকে রুমমেট করতে সম্মত হয়েছেন। মির্জা আজম মাহিন ও করবীর দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন—

‘যাক একটা ব্যবস্থা হলো। ফৌজিয়া খুব ভালো মেয়ে। ওর সঙ্গে থাকতে পারবেন।’

করবী অসহায় চোখে তাকালো মাহিনের দিকে। মির্জা আজম করবীর উদ্দেশ্যে বললেন—

‘সঙ্কোচের কিছু নেই। আপনাকে কারো না কারোর সঙ্গে থাকতে হবে। তার সঙ্গে থাকুন। ভালো না লাগলে পছন্দ অনুযায়ী বাসা খুঁজে নেবেন।’

করবী বললো—

‘না। কারো সঙ্গে থাকা নিয়ে আমি সঙ্কোচবোধ করছি না। আমার এই বিপদে যে আপনারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, এ কথা ভেবেই আমার কান্না চলে আসছে।’

‘কী যে বলেন! আপনি ওভাবে ভাবছেন কেনো? তাছাড়া আমরা এমন কিছু করিনি আপনার জন্য।’

বললো মাহিন। মাহিনের কথার সঙ্গে মির্জা আজম বললো—

‘আপনি মন থেকে এ ধরনের কথা ঝেড়ে ফেলুন। বিপদ আছে, থাকবে। মানুষ পাশেও দাঁড়াবে। এ সব চলবে নিরন্তর। আজ আপনি বিপদে পড়েছেন, কাল আমরাও বিপদে পড়তে পারি। কাল আপনিও আমাদের অথবা অন্য কারো পাশে দাঁড়বেন, এটাই স্বাভাবিক।’

করবীর চোখের কোণে জল টলমল করছে। ও দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। মাহিন মির্জা আজমের দিকি চেয়ে বললো—

‘ফৌজিয়া কী করেন, আজম ভাই?’

‘ও ড্রাম নামক একটি এনজিওতে কাজ করে। নির্যাতিত বা ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ও নিয়োজিত। মেয়েটি সব সময় বিপদগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ায়। করবীর সমস্যার কথা শুনেই ওকে রাখতে রাজী হয়ে গেলো।’

‘ভালোই হলো। আপনি ফৌজিয়াকে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দিয়ে দেবেন।’

আমি দেব কেনো? আপনি তো করবীকে ওর বাসায় নিয়ে যাবেনই। আমি ওর বাসার ঠিকানাটা দিয়ে দিচ্ছি। ওর বাসায় গিয়ে ওকে ধন্যবাদ দিয়ে দিয়েন।’

‘ওহ। ঠিক বলেছেন। তার সঙ্গে তো আমার দেখা হচ্ছেই।’

এ কথা বলে মাহিন করবীর দিকে তাকিলে বললো—

‘চলুন, আপনাকে ফৌজিয়ার বাসায় রেখে আসি। ও বাসায় গিয়ে ফোন করে আপনার বাবাকে পুরো ঘটনা খুলে বলতে পারেন। কীভাবে ফোন করতে হয়, বলে দেবো। কাল আপনাকে আমি একটা সেলফোন দেবো। ওটা দিয়ে কথা বলতে পারবেন।’

করবী মুখে কিছু বলে না। ও মাহিনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ওর চিন্তার মধ্যে দুঃশ্চিন্তা এসে জট পাকিয়ে ফেলছে। এই মুহূর্তে মাহিন কী বলছে, ও শুনতে পায়নি। মাহিন যখন কথা বলছিলো, ও মাহিনের সহযোগিতার কথা ভেবে কেমন বিহবল হয়েছিল। এই বিহবলতায় আবেগ লেপ্টে আছে। করবী দুচোখের পাতা বন্ধ করে। আর তখুনিই ওর চোখের কোণে জমে থাকা জল টপটপ করে নেমে আসে।

পাঁচ.

মাহিনের মনে একটা ইচ্ছা কয়েকদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইচ্ছাটা হচ্ছে, রিমঝিমকে নিয়ে একদিন ম্যানহাটানের ওয়াটার ক্লাবে ডিনার করবে। এর আগে বিকেলের দিকে হেলিকপ্টার দিয়ে পুরো ম্যানহাটানা একবার চক্কর দেবে। শেষ বিকেরে রোদ মাখামাখি আনন্দ ভ্রমণ আরকি! ম্যানহাটনের ইস্ট রিভারের লগোয়া ৩৪ স্ট্রিটের প্রান্তিক পয়েন্টে এই ওয়াটার ক্লাব। এই শহরের বিত্তবানরা ওয়াটার ক্লাবে লাঞ্চ বা ডিনার করে। ওয়াটার ক্লাব নাম হলেও এটি একটি অভিজাত রেস্টুরেন্ট। এই ক্লাবের নিকটেই আছে হেলিপ্যাড। প্রতি ঘণ্টার ভাড়ার অর্থ চুকালে যে কেউ হেলিকপ্টারে চড়তে পারে। হেলিকপ্টার সাধারণত ম্যানহাটানের ওপর চক্কর মারে। আগ্রহী নগরবাসী বা টুরিস্টরা এখানে এসে নিয়মিত হেলিকপ্টারে চড়েন। মাহিন হেলিকপ্টারে চড়ে ম্যানহাটান দেখেনি। তবে নৌজাহাজে চড়ে ম্যানহাটানের চারপাশ ঘুরেছে। গ্রীষ্মকাল এলেই এখানে বিভিন্ন সংগঠন ম্যানহাটানের চারপাশে ঘুরতে নৌযান ভ্রমণ অনুষ্ঠান করে থাকে। মাহিন দুবার নৌযানে চড়ে ম্যানহাটান দেখেছে। হেলিকপ্টারে চড়ে দেখার সাধ তার সম্প্রতি জেগেছে। রিমঝিমকে সঙ্গে নিয়েই সে হেলিকপ্টারে চড়ে ম্যানহাটান দেখতে চায়। তার এই ইচ্ছার কথাটা বলা হয়নি রিমঝিমকে। বাংলাদেশে যাবার আগে রিমঝিমকে কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারেনি ও। কেমন সঙ্কোচ বোধ করেছে। তবে আজ কথাটা বলে ফেলবে। মনের মধ্যে এ কথা চেপে রাখার দরকার কি-ভাবে ও। ওয়াটার ক্লাবের উল্টোদিকে লং আইল্যান্ড সিটি, যার আরেক নাম এস্টোরিয়া। ওয়াটার ক্লাবের উল্টোদিকে ইস্ট রিভারের পূর্বপাড়ে লং আইল্যান্ড পিয়ার নামে একটি নৌজেটি আছে। এই নৌজেটিতে বসে রিমঝিমের কথা ভাবছিল মাহিন। রিমঝিম ওকে এখানে আসতে বলেছে। জায়গাটা ভালো। জেটির সামনে ইস্ট রিভার, নদীর ওপাড়ে আকাশমুখী অট্টালিকার শহর ম্যানহাটান। জেটির ওপর রাখা বেঞ্চগুলোতে বসলে চোখের সামনে নগর জৌলুষের শহরটিকে আকর্ষণীয় লাগে। মাহিন বেঞ্চিতে বসে রিমঝিমের কথা ভেবে ভেবে একটু শিহরণ অনুভব করছিল। বেশি সময় নষ্ট হয়নি। মাহিন আসার ২০ মিনিট পরই রিমঝিম চলে এলো। মাহিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভুবন ভোলানো হাসি উপহার দিয়ে ও বললো—

‘আমি কি লেট করে ফেলেছি?’

কথাটার জবাব চট করে দিতে পারলো না মাহিন। রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে আকস্মিক তন্ময় হয়ে পড়ে। রিমঝিম আজ শাড়ি পরেছে। শাড়ি পরা রিমঝিমকে মাহিন কখনও দেখেনি। একটা ধাক্কা এসে লাগে ওর অনুভবে। রিমঝিম পরেছে মেরুন পাড়ের সবুজ রঙের শাড়ি। চুলগুলো বেঁধেছে। কপালে টিপ নেই। ঠোঁটে মেরুন রঙের লিপিস্টকের প্রলেপ। চোখে কাজল টেনেছে সরু করে। হালকা প্রলেপও আছে। ওকে সবুজ পরীর মত লাগছে। রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে থাকে মাহিন। রিমঝিম বুঝতে পারে মাহিনের চোখে মুগ্ধতার রেশ। ও বললো—

‘অমন করে তাকিয়ে আছেন যে!’

এ কথায় সম্বিত ফিরে পায় মাহিন। একটু লজ্জিতও হয়। এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকাটা ঠিক হয়নি-মনে মনে ভেবে নেয়। ও বলে—

‘না, মানে। আপনাকে শাড়ি পরা অবস্থায় কখনও দেখিনি তো!’

‘তাই বলে এভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে?’

কথাটা বলে রিনরিনিয়ে হেসে উঠলো রিমঝিম। ওর হাসির দমকে মাহিনের ভেতরে থাকা সঙ্কোচ হলকা হলো। ও বললো-

‘আপনার হাসিতে এক ধরনের ঝংকার আছে।’

‘তাই? আর কি আছে?’

রিমঝিমের কণ্ঠে রহস্য। কথাটা বলে রিমঝিম মাহিনের মুখোমুখি বেঞ্চে বসলো। ওদের মাঝখানে ছোট গোল একটি টেবিল। রিমঝিমের প্রশ্নে মাহিন ভ্যাবাচেখা খেয়ে যায়। এ ধরনের আলাপে ও অভ্যস্ত নয়। কিন্তু ও কথা বলতে চায়। রিমঝিমের এই বর্ণালী উপস্থিতিকে কথার মালায় সাজাতে চায় ও। ওর বোধের ভেতরে অজানা-অচেনা কথার ঢেউ উঠে আছড়ে পড়ে। কিছু আবেগ মথিত কথা ওর গলা পর্যন্ত উঠে এসে আটকে যায়। কণ্ঠ পর্যন্ত উঠে আসে না। মাহিন নিজের ভেতর জোর খাটায়। ও খুব সহজ একটা কথা বলে—

‘কি নেই আপনার মধ্যে?’

কথাটা বলে ওর মনে হয় কথাটা হালকা হয়ে গেলো। একটা কাব্যিক কথা বলতে পারলে ভালো হতো। মাহিন নিজের ভেতর কথা হাতরে বেড়ায়। রিমঝিম ওর অসায়ত্ব বুঝতে পারছে কিনা-এটাও চট করে ভেবে নেয় ও। রিমঝিম মিষ্টি করে হেসে বলে—

‘আপনিই বলুন, আমার মধ্যে কী আছে? আমাকে আপনি বিয়ে করতে রাজী হলেন কেনো? আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?’

এমন কথায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো ও। সৌন্দর্যের প্রশংসা থেকে বের হবার পথ পেয়ে গেলো। আলোচনা করার বিষয় টেনে এনেছে রিমঝিম। মাহিন আস্তে একটা গলা খাকারি দিয়ে বলে—

‘আপনাকে বিয়ে করতে রাজী হয়ে কি ভুল করেছি?’

‘পাল্টা প্রশ্ন নয়। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন।’

‘তাই? আচ্ছা বলছি। আপনার প্রশ্ন দুটি। একটি হচ্ছে কেনো আপনাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছি। প্রথমে এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। বিয়ের প্রস্তাবটা এসেছে আপনাদের পরিবার থেকে। আপনার ফুপু আমাকে চেনেন। তিনি আমাকে আপনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। আমি কিন্তু প্রথমে এই প্রস্তাবটিকে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু আপনাকে দেখার পর আমি রাজী হয়ে যাই।’

‘কেনো রাজী হয়ে গেলেন?’

মুখ টিপে হাসলো রিমঝিম। মাহিনও স্মিত হাসলো। ও রিমঝিমের চোখে চোখ রেখে বললো—

‘আপনার সৌন্দর্য কি উপেক্ষা করার মত? আপনার দিকে তাকালে কেউ কি চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে?’

‘শারীরিক সৌন্দর্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন আপনি?’

‘প্রথমে আপনাকে দেখে সম্মোহিত হয়েছি। এরপর আপনার বায়োডাটা পড়েছি। আপনার পরিবার সম্পর্কে জেনেছি। সব জেনে শুনে ভেবে দেখেছি, আপনাকে বিয়ে করলে ভুল হবে না। তাই…।’

‘শুধু এটুকু ভেবেই রাজী হয়ে গেলেন?’

‘সামাজিক প্রস্তাবে বিয়ে করার ক্ষেত্রে খুব বেশি জানার সুযোগ কোথায়, বলুন? এবার আপনার কথা বলুন। আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হলেন কেনো? আপনি আমার সম্পর্কে কী জানেন?’

জানতে চাইলো মাহিন। এ কথায় ফের হাসলো রিমঝিম। ও বললো—

‘এবার আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দিন। আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা কি? এরপর আমার কথা বলবো।’

‘আচ্ছা, দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব বলছি। আপনার কাছে আমার প্রত্যাশা বলতে আপনি শুধু স্ত্রী-ই হবেন, তা নয়। আমার বন্ধুও হবেন। আমার অপরাগতাগুলোকে সহমর্মিতা দিয়ে বিবেচনা করবেন। আমার ব্যর্থতায় মমত্ব দিয়ে পাশে থাকবেন। আমার সাফল্যে অংশীদারের অধিকার খাটাবেন। জীবন চলার পথে সব কিছু নির্দ্বিধায় শেয়ার করবেন। আমার প্রতি আস্থা রাখবেন। আমি বিচলিত হলে আপনি আমার ভরসা হবেন। প্রত্যাশা কি বেশি করে ফেললাম?’

এ কথার জবাবে তাৎক্ষণিক কিছু বললো না রিমঝিম। ও মাহিনের মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো। মাহিন রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললো। ও বললো—

‘এবার দেখছি, আপনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন!’

রিমঝিম একটু লজ্জিত হলো। বললো—

‘আপনার প্রত্যাশার কথাগুলো শুনতে গিয়ে কোথায় যেনো হারিয়ে যাচ্ছিলাম।’

‘খুব কি বেশি প্রত্যাশা করে ফেলেছি?’

‘না, না। তা নয়। আপনার প্রত্যাশা পূরণ করার চেষ্টা করবো। আমার সব সময় মনে থাকবে এই কথাগুলো।’

‘এবার আপনার কথা বলুন। আপনি কেমন স্বামী চান, আই মিন আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?’

এ কথায় খিলখিলিয়ে হেসে ফেললো রিমঝিম। ওর হাসির মধ্যে মাদকতা আছে। তাকিয়ে থাকলে তন্ময় হয়ে যেতে হয়। মাহিন ওর হাসির সামনে তন্ময় হয়ে থাকতে চায় পুরো জীবন মনেমনে ভাবে ও। রিমঝিম হাসি থামিয়ে বললো—

‘আমি তো আপনার মত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারবো না।’

‘না, আপনি যেভাবেই কথা বলেন, ওসব কথা কবিতা হয়ে যায়!’

বললো মাহিন। এ কথায় রিমঝিম ফের খিলখিলিয়ে উঠলো। ওকে আবার হাসিয়ে দিতে পারায় পুলক অনুভব করলো মাহিন। রিমঝিমের হাসি থামার পর ও বললো—

‘আপনি আমাকে ফ্লার্ট করছেন?’

‘না, মোটেই ফ্লার্ট করছি না। যা সত্যি তাই বলছি।’

‘না আপনি আমাকে কথার মায়াজালে জড়াতে চাচ্ছেন।’

‘বাহ্। আপনি সুন্দর বাংলা বলেন তো!’

‘বাংলা বলবো না কেনো? বাসায় তো বাংলা ভাষায় কথা বলে বড় হয়েছি।’

‘হুম। এটাও আপনার প্রতি আমার আকর্ষণের একটি দিক। আপনার ফুপুর বাসায় যেদিন আপনার সঙ্গে কথা বলি, আপনি আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেছিলেন। এটি আমার ভালো লেগেছিল।’

বললো মাহিন। এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো রিমঝিম। ও বললো—

‘আমার কিন্তু ভালো গুণই দেখেছেন। কিন্তু খারাপ অভ্যাসও আছে।’

‘তাই নাকি। কী খারাপ অভ্যাস আছে আপনার?’

‘অনেকরকম। শুনতে চান?’

‘হুম। শুনতে চাই। বলবেন?’

‘শুনতে চাইছেন যখন, তখন বলবো।’

কথাটা বলে মাহিনের মুখের দিকে তীর্যক দৃষ্টি রাখলো রিমঝিম। ও ভ্রু নাচালো। মাহিনের চোখে-মুখে দুঃশ্চিন্তার আভা। ও নিজের মনের ছায়াকে আড়াল করতে পারছে না। সহজ-সরল মানুষগুলো মনের ভাবকে চেপে লাখতে পারে না। মনের ভেতরের আনন্দ-বেদনা বা শঙ্কা থাকলে এর ছায়া ফুটে ওঠে মুখায়বে। কঠিন হৃদয়ের মানুষদের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, তাদের মনে কী আছে। মনেমনে ভেবে নেয় রিমঝিম। মাহিনকে ওর সহজ-সরল মানুষ বলে মনে হয়। স্মার্ট হলেও ওর চরিত্রে শিশুর সরলতা আছে। রিমঝিমের নীরবতা দেখে মাহিন তাগিদ দেয়—

‘কী ব্যাপার কিছু বলছেন না যে! আপনার খারাপ অভ্যাসগুলো কি কি?’

‘আরে বাবা, খারাপ অভ্যাসের কথা এতো সহজে বলে ফেলা যায়? তারওপর যার সঙ্গে আমার বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে আছে, তার কাছে কী করে এসব কথা বলি?’

‘আহ্। আমাকে পরীক্ষা করছেন? খারাপ অভ্যাসের কথা বলে ভয় দেখচ্ছেন?’

‘না, না। আমি সত্যি কথাই বলেছি। আমার কিছু খারাপ অভ্যাস আছে।’

‘ঠিক আছে, বলে ফেলুন। আমি নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছি। আপনার যে ধরনের খারাপ অভ্যাসই থাকুক, আমি শুনতে চাই।’

‘ঠিক আছে, এতোই যখন আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাচ্ছেন, তখন বলেই ফেলি।’

কথাটা বলে একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রিমঝিম। ও আড়চোখে তাকিয়ে দেখে কৌতূহল ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে মাহিন। রিমঝিম বলে—

‘আমার সবচেয়ে খারাপ অভ্যাস হচ্ছে, আমি চট করেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলি। আবার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি। আমার নিজের প্রতি যেমন আস্থা নেই, তেমনি কারো প্রতি আস্থা রাখতে পারি না। কখনও কখনও আমি সন্দেহপ্রবণ।’

এ কথা বলার পর রিমঝিম লক্ষ্য করলো মাহিনের মুখায়ব থেকে দুঃশ্চিন্তার ছায়া খুব দ্রুত মিলিয়ে গেলো। তারমানে ওর এই খারাপ অভ্যাস নিয়ে মাহিন চিন্তিত হলো না। রিমিঝিম এত একটু অবাক হলো। মাহিন ওর দিকে তাকিয়ে বললো—

‘শুধু এটুকুই? আর কোনো খারাপ অভ্যাস নেই?’

‘আছে। আমি খুব সুন্দরী মেয়ে দেখলে ঈর্ষায় পুড়ি। আমি তা চেপে রাখতে পারি না। আমি সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পছন্দ করি না।’

‘তো, এতে খারাপের কি আছে?’

‘আছে। ধরুন, আপনার সঙ্গে কোনো সুন্দরী মেয়ের পরিচয় হলো, তখন আমি তা স্বাভাবিকভাবে নিতে হয়তো পারবো না। আমার ভেতরে ঈর্ষা কাজ করবে। আমার আচরণ আপনাকে বিব্রত করতে পারে।’

‘ওহ, আচ্ছা? এরপর আর কি আছে?’

‘আমি খুব রেগে যাই। আবার কিছুক্ষণ পর আমার রাগ একেবারেই থাকে না। আমি যখন রেগে যাই, তখন হাতের কাছে যা পাই, তাই ছুড়ে মারি!’

‘ওহ্, আচ্ছা। আর?’

‘আর তেমন বদ অভ্যাস নেই। তবে চট করে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলার অভ্যাস আমাকে অনেক ক্ষতি করেছে।’

‘কীরকম?’

‘যেমন ধরুন, কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম আইন বিষয়ে। আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে রাগ করে বিষয় বদলে ফেলেছি। গ্র্যাজুয়েট হয়েছি একাউন্টিংয়ে। অ্যাটর্নির ক্যারিয়ার বেশি আকর্ষণীয় ছিল। আমি ওটা ছেড়ে দিয়েছি।’

‘হুম। তবে আমি ভেবেছিলাম, আপনি অন্যকোন বদ অভ্যাসের কথা বলবেন।’

‘যেমন…?’

‘যেমন আপনি হয়তো নাইট ক্লাবে যান, নিয়মিত মদ পান করেন, ক্যাসিনোতে ঘুরতে পছন্দ করেন এই সব আর কি?’

এ কথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রিমঝিম। হাসি থামার পর ও বললো—

‘আমি অ্যালকোহলিক নই। তবে মাঝে মধ্যে একটু আধটু পান করেছি। সত্যি কথা বলছি। আপনি কি মাইন্ড করলেন?’

‘না। মাইন্ড করিনি। সত্য কথা বলায় খারাপ লাগছে না।’

‘থ্যাংকস এ লট। আর হ্যাঁ, বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে দু-চারবার নাইট ক্লাবেও গিয়েছি। তবে কারো না কারো জন্মদিন সেলিব্রেট করতে আমাকে যেতে হয়েছে। নাইটক্লাব আমার ভালো লাগে না।’

‘কী ধরনের ক্লাবে গিয়েছিলেন, বলবেন কি? বলতে না চাইলে বলার দরকার নেই।’

‘বলছি। আপনি জানতে চাচ্ছেন কোনো নুডক্লাবে গিয়েছি কী-না, এই তো? না, যাইনি।’

রিমঝিমের কথা শুনে মাহিনের বুকের ভেতর থেকে কী একটা পাথর যেনো সরে গেলো। ওর ফুসফুসে কি বাতাস আটকে গিয়েছিল-ভাবে ও। রিমঝিম ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও কোনো জবাব আশা করছে। মহিন বলে—

‘আর?’

‘আর বলার মত কিছু নেই।’

‘কিছুই নেই? বিশেষ কেউ কি আছেন, যাকে জীবন সঙ্গী হিসাবে বেছে নেয়ার কথা ভেবেছিলেন?’

প্রশ্নটায় কয়েক মুহূর্ত থ’ হয়ে রইলো রিমঝিম। কথাটা ওকে যেনো স্পর্শ করলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর রিমঝিম বলে—

‘একটা কথা বলে নেয়া দরকার। এই কথাটা আগেই বলা উচিত ছিলো আমার।’

এ পর্যন্ত বলে রিমঝিম থামে। মাহিনের ফুসফুসে বাতাস আবার যেনো আটকে গেলো। রিমঝিম কয়েক সেকেন্ড পর বলে—

‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার পর ভাবছিলাম, কথাটা বলে ফেলি। কিন্তু বলা হয়নি। বা বলতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, কথাটা বলে ফেলা দরকার।’

‘বলে ফেলুন। এটা আমাদের দুজনের জন্যই মঙ্গলজনক।’

তাগিদ দেয় মাহিন। ওর ফুসফুসে আটতে যাওয়া বাতাস বের করা দরকার। রিমঝিম বললো—

‘আমি একটি ছেলেকে ভালোবেসেছিলাম। ছেলেটি আমাকে ইমপ্রেসড করে ফেলেছিল। আমি ওকে বিয়ে করবো-এমন কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু…।’

‘কিন্তু কি?’

‘না, মানে। ওই ছেলেটি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ও আমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করেছিল।’

‘তাই?’

‘হ্যাঁ। আই ওয়াইজ শকড। আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে ও সম্পর্ক গড়ে তোলে। আমি এ কথা জানার পর থেকে ওকে হেট করি।’

মাহিন চুপ করে থাকে। ওর দৃষ্টি রিমঝিমের মুখের দিকে। লাবণ্যে উদ্ভাসিত ওর মুখটি কেমন কঠিন রূপ ধারণ করে কয়েক মুহূর্তের জন্য। মাহিনের নীরবতা দেখে রিমঝিম বলে—

‘আপনি জানতে চান, ছেলেটি কে?’

‘না। তার নাম পরিচয় জেনে কী হবে? তার প্রতি যদি আপনার বিন্দুমাত্র অনুরাগ থাকে, তাহলে জানতে চাই। আর যদি আপনি তাকে ঘৃণাই করেন, তাহলে তার কথা আমি আর জানতে চাই না। কখনও জানতে চাইবোও না।’

‘ইটস ওকে। জেনে ভালো লাগলো। আসলে আমি কথাগুলো বলে নিজেকে হাল্কা অনুভব করছি। আপনি কথাগুলো কীভাবে নেবেন, সেটা আপনি ভাববেন। আমার যা বলার তা বলে ফেলেছি।’

‘আপনি সঠিক কাজটিই করেছেন। বিয়ের পর এ কথাগুলো জানলে আমি খুব কষ্ট পেতাম। এখন আর এ কথাগুলো আমার কষ্টের কারণ হবে না। তবে ওই ছেলেটির প্রতি যদি পুনরায়…।’

এ পর্যন্ত বলতে পারলো মাহিন। রিমঝিম রাগতকণ্ঠে বললো—

‘রাবিশ! ওসব কথা বলবেন না, প্লিজ! আমি ওই গ্লানি ভুলে যেতে চাই।’

‘ইটস ওকে। আমি আপনাকে সাহায্য করবো।’

‘তারমানে, আপনি আমার বদ অভ্যাসগুলো জেনেও বিয়ে করবেন?’

কপট বিস্ময় রিমঝিমের চোখে। স্মিত হেসে মাহিন বলে—

‘আপনার আপত্তি নেই তো?’

রিমঝিম হেসে ফেললো। ও বললো—

‘না, মানে..আমার আপত্তি থাকবে কেনো?’

এবার মাহিন জানতে চাইলো—

‘আমার সম্পর্কে আপনার কোনো প্রশ্ন নেই?’

‘তাইতো! আপনার বিষয়ে আমার কোনো জানতে চাওয়ার কিছু আছে কী-না, তো ভেবে দেখেনি। আজ থেকে ভাববো।’

‘কী ভাববেন?’

‘এই যে, আপনার জীবনে কেউ ছিল কী-না, আপনার বদগুণ কী, ইত্যাদি।’

এর জবাবে মাহিন বললো—

‘প্রশ্ন করুন। আমি জবাব দেবো।’

‘না। আমি আজ কোনো প্রশ্ন করবো না। অন্য একদিন প্রশ্ন করবো। আজ শুধু আমার কথা বললাম।’

মাহিন হাসি মুখে বলে—

‘ঠিক আছে। অন্য একদিন প্রশ্ন করবেন, আমি সেদিনটির অপেক্ষায় রইলাম।’

রিমঝিম হঠাৎ বলে—

‘যদি কিছু মনে না করেন, আমরা উঠতে পারি?’

অবাক চোখে মাহিন বললো—

‘বাহ্ রে, আমরা না একসঙ্গে লাঞ্চ করবো? এমন তো কথা ছিল আমাদের।’

‘হুম। আমি তো সেভাবেই এসেছি।’

‘তাহলে?’

‘আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মনটা বিষণœ হয়ে গেলো।এখন আর এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।’

বললো রিমঝিম। মাহিন একটু অস্বস্তি বোধ করলো ওর কথায়। সে বললো—

‘ঠিক আছে, চলুন, দুজনে কোথাও ঘুরে আসি। একটু দূরে কোথাও যাবেন? যেতে যেতে আপনার মন ভালো হয়ে যেতে পারে। দূরে কোথাও কোনো রেস্টেুরেন্টে লাঞ্চটা সেরে নেব। যাবেন?’

মাহিনের কথাটা ভালো লাগলো রিমঝিমের। ও মিষ্টি করে হাসলো। মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। মাহিনের বুকের ভেতর আটকে থাকা অস্বস্তির বাতাসের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে না এখন। ও রিমঝিমের উদ্দেশ্যে বললো—

‘কোনদিকে যাবেন? আপনার কোনো চয়েজ আছে?’

‘না। আজ আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন, আমি সেখানে যাবো। আমার কোনো চয়েজ নেই।’

মাহিন একটু ভাবলো। ওর ইচ্ছা ছিলো হেলিকপ্টারে চড়বে। কিন্তু আজ হেলিকপ্টারে চড়াটা উপভোগ্য হবে না। রিমঝিমের মন বিষণœ। বিষণœ মন প্রসণœ করতে হলে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে যেতে হবে। নিউইয়র্ক শহরের প্রায় সত্তর মাইল দক্ষিণে বিয়ার পাহাড়টি লেক পরিবেষ্টিত। এই এলাকায় গিয়ে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশে রিমঝিমকে নিয়ে ও কিছুটা সময় কাটাতে চায়। ও এ কথা ভেবে রিমঝিমের উদ্দেশ্যে বললো—

‘ঠিক আছে, চলুন। আপনাকে সুন্দর এক জায়গায় নিয়ে যাই। সেখানে আমরা কিছুটা সময় কাটিয়ে আসবো।’

বলে মাহিন উঠে দাঁড়ালো। রিমঝিমও উঠে দাঁড়ালো। ওরা পাশাপাশি একসঙ্গে হেঁটে এগিয়ে গেলো। রিমঝিম ট্যাক্সি ভাড়া করে এসেছিল। এখানে এসে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়েছে। মাহিনের লেক্সাস আরএমএক্স গাড়িটি পার্ক করা ছিল কাছাকাছি দূরত্বে। রিমঝিম মাহিনের ঘনিষ্ঠ হয়ে হাঁটছিল। ও হঠাৎ লক্ষ্য করলো রাস্তার অপর প্রান্তে নিরাপদ দূরত্বে পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। তারমানে পলাশ ওকে অনুসরণ করে এখানেও এসেছে। রিমঝিমের অনেক রাগ হলো। পলাশকে ও না দেখার ভান করলো। হঠাৎ কী ভেবে মাহিনের বাম পাশে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওর একটা হাত ধরলো রিমঝিম। পলাশকে দেখানোর জন্যই ও এ কাজটি করলো। রিমঝিমের আচরণে মাহিন ভীষণ চমকে উঠলো। এমন আচরণের জন্য ও প্রস্তুত ছিলো না। রিমঝিমের এই স্পর্শ কি ভালোলাগার প্রকাশ? ভাবলো মাহিন। ও মুখে কিছু বললো না। ওর ভেতরে অদ্ভূত এক শিহরণের স্রোতা বইয়ে যেতে লাগলো। এমন কখনো হয়নি ওর।

ছয়.

নিউইয়র্ক শহরটা কারা বানিয়েছিল তা জানতো না মাহিন। জানার কথাও নয়। ও শুধু জানতো নিউইয়র্ক পৃথিবীর বাণিজ্যিক রাজধানী। এ শহরের জৌলুস আছে, ব্যাপ্তী আছে, আকাশমুখী আট্টালিকার অহম আছে। শহরটি সবসময় জেগে আছে। শহরের কোনো ক্লান্তি নেই, খেদ নেই, ক্লেদ নেই, হয়তো আক্ষেপও নেই। এসব কথা অনেকে জানে। অনেকের মত মাহিনও তা জানে। ‘নিউইয়র্ক শহরটি কারা বানিয়েছিল?’ এই প্রশ্নটি ওকে করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তার নাম হুমায়ুন আজাদ। এমন প্রশ্নে একটু হচকিয়ে গিয়েছিল ও। হুমায়ুন আজাদ প্রশ্নটি এমন সময় করেছিল, যখন ও মাত্র মার্কিন ভিসাসমেত পাসপোর্ট নিয়ে কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে এলো। সেদিন মার্কিন দূতাবাসের অভ্যন্তরে সুনশান নীরবতা ছিলো। এই নীরবতা থেমে থেমে ভেঙে যাচ্ছিল ভিসা কর্মকর্তাদের রাশভারি কথায়। ভিসা কর্মকর্তারা অ্যাপয়েন্টমেন্টপ্রাপ্ত ভিসাপ্রার্থীদের নাম ধরে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিলেন নির্ধারিত জানালায়। মাহিনের ধারণা ঢাকা মার্কিন দূতাবাসের অভ্যন্তরে অপেক্ষামান ভিসাপ্রার্থীদের বুক দুরু দুরু করে। অকারণ এক টেনশন তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। কিন্তু সেদিন মাহিনের বুক একটুও কাঁপেনি। এক ফোঁটা টেনশনও ওর মধ্যে ছড়ায়নি। ও ডিভি লটারি ভিসার জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিল। ডিভি লটারি ভিসার জন্য মনোনীতরা খুব একটা খালি হাতে ফিরে আসেনা জানালা থেকে, তারপরও ইন্টারভিউ দিতে যাবার সময় ভিসা প্রার্থীদের অজানা আশঙ্কা চেপে থাকে। হুমায়ুন আজাদের এ ধরনের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না ও। প্রশ্নকর্তার দিকে ভালো করে তাকালো মাহিন। তাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছিল, কিন্তু ও চিনতে পারছিল না। ওর মনে হয়েছিল, হুমায়ুন আজাদকে ও অনেকবার দেখেছে টিভির স্ক্রিণে এবং পত্রিকার পাতায়। কিন্তু তাকে ও চিনতে পারছিল না। হুমায়ুন আজাদের মাথায় ঢেউ খেলানো কোঁকড়া চুল। চোখে পুরো ল্যান্সের চশমা। মুখের অবয়বে আদিবাসী পুরুষের রোদ তাতানো কাঠিন্য স্পষ্ট। চোখে সরলতা মাখামাখি। মুখের অবয়বের সঙ্গে দৃষ্টির সরলতা মেলে না, তবে তার উপস্থিতির মধ্যে এক ধরনের ব্যক্তিত্ব পেখম ছড়িয়ে ছিলো, যা উপেক্ষা করা যায় না। মাহিন অবাক চোখ তুলে তার উদ্দেশ্যে বলেছিল—

‘নিউইয়র্ক শহর কারা বানিয়েছে, তা জানিনা, স্যার!’

হুমায়ুন আজাদকে ‘স্যার’ বলে ফেলে ও মনে মনে ভেবেছিল ‘স্যার’ বলা ঠিক হল কি-না। কারণ, তখন পর্যন্ত মাহিন প্রশ্নকর্তার নাম-পরিচয় জানেনি। মাহিনের কথা শুনে প্রশ্নকর্তার চোখের দৃষ্টি গভীর হলো।

তিনি মাহিনের চোখে চোখ রেখে বললেন—

‘নিউইয়র্ক যাচ্ছো, অথচ ওই শহরটি সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে যাওয়া ঠিক নয় কি?’

‘জ্বি, ঠিক বলেছেন।’

আমতা আমতা করে বলেছিল মাহিন। ক্লাসের ছাত্রকে টিপস দিচ্ছে, এমন ভাব করে তিনি বললেন—

‘নিউইয়র্ক শহরটা বানিয়েছিল ডাচরা। জানোই তো যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছিল ১৭৭৬ সালে। তখন ১৩টি অঙ্গরাজ্য ছিল। নিউইয়র্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী। এই নিউইয়র্ক শহর জুড়ে বৃটেন, ফরাসি এবং ডাচদের বসবাস ছিল বেশি। ডাচরাই এই শহরকে গড়েছিল।’

‘তাই?’

‘হুম। বড় বড় অট্টালিকা, পাতাল রেল সব বানিয়েছিল ডাচরা।’

‘কৃষ্ণাঙ্গরা কী করেছিল?’

‘ওরা তো ছিল তখন দাস। ওদের দিয়েই তো মাটি খুঁড়ে পাতাল রেল বানিয়েছিল ডাচরা।’

‘ডাচরা এখন কোথায়?’

‘আরে ডাচরা কী আর ডাচ আছে? ওরা তো কবেই মার্কিনী হয়ে গেছে। তবে ওদের নিজস্ব সংস্কৃতি, জাতিসত্ত্বার অস্থিত্ব বিদ্যমান। জাতিতে ওরা মার্কিনী হলেও সংস্কৃতিতে ওরা এখনো ডাচ আছে।’

‘ও, আচ্ছা!’

‘আরো জেনে রাখো, ডাচরা পরবর্তীতে নিউইয়র্ক শহর ছেড়ে দক্ষিণের কাউন্টিগুলোতে সরে গেছে।’

‘তাই?’

‘যেমন ধরো নিউইয়র্ক শহর থেকে আশি মাইল দূরে একটি কাউন্টির নাম ডাচেচ কাউন্টি। এই নামটা ডাচদের কারণে হয়েছে। বুঝেছো?’

‘জ্বি, স্যার! আমি কিন্তু আপনার নামটা জানি না। আপনাকে চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু চিনতে পারছি না।’

মাহিনের কথায় মৃদু হেসে তিনি বলেছিলেন—

‘আমার নাম হুমায়ুন আজাদ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।’

‘অসংখ্য ধন্যবাদ, স্যার।’

‘কেনো ধন্যবাদ দিচ্ছো?’

‘এই যে নিউইয়র্ক সম্পর্কে কিছু তথ্য দিলেন, এই জন্য।’

‘তথ্য দেয়ার একটা কারণ আছে, কারণটা বলতে চাই। শুনবে?’

‘অবশ্যই, বলুন।’

‘তোমরা চলে যাচ্ছো, যাও। মার্কিনী হয়ে যাবে, এতেও বলার কিছু নেই। শুধু বলবো, নিজের সংস্কৃতি, কৃষ্টি আর ঐতিহ্যের কথা ভুলে যেও না। বাঙালিত্বকে ছেড়ে দিয়ো না। ডাচদের মত, আইরিশদের মত, ইতালীয়দের মত, পোলিশদের মত নিজেদের সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রেখো।’

মাহিন হুমায়ুন আজাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল কয়েকসেকেন্ড। তার কথাগুলো কেমন রিনরিন করে ওর ঈন্দ্রীয়তে বাজতে ছিল। হুমায়ুন আজাদ কয়েক সেকেন্ড পর বলেছিলেন—

‘আমি কয়েকটি জাতির কথা বললাম। ইউরোপ থেকে আরো অনেক জাতি পাড়ি জমিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। তারা কিন্তু নিজেদের আত্ম পরিচয়কে ভুলে যায়নি। নিজেদের  সংস্কৃতি চর্চা থেকে বিচ্যূত হয়নি। ইহুদি কিংবা চাইনিজ জাতিও নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য নিয়ে বহুজাতিক মার্কিন অভিবাসী সমাজে নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছে। বুঝলে?’

‘জ্বি, বুঝতে পারছি।’

‘তোমাকে যে কথাগুলো বললাম, তা মনে রাখলে কখনও ছোট হবে না। আত্মপরিচয় ধরে রাখলে মর্যাদা বাড়ে বৈ কমে না।’

‘আপনার কথাগুলো মনে রাখবো, স্যার।’

‘ভালো থেকো।’

এ পর্যন্ত কথা হয়েছিল শিক্ষক হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে। কথাগুলো কিন্ত সেদিন থেকে ওর মনে গেঁথে আছে।

কথাগুলো মনে পড়লো একটি মার্কিন ছেলের সঙ্গে বাঙালি এক মেয়ের চুমু খাওয়ার দৃশ্য দেখে। মাহিন ম্যানহাটানের দিকে যাচ্ছিলো এন ট্রেনে চড়ে। ৩৬ এভিনিউ থেকে বাঙালি তরুণী এবং ওর বয়ফ্রেন্ড একসঙ্গে উঠেছিল ট্রেনে। ওরা একে-অন্যকে ঝাপটে ধরে দাঁড়িয়েছিল মাহিনের সামনে। ট্রেনটি কুইন্সব্যুরো প্লাজা স্টেশন পার হতেই মার্কিন যুবকটি বাঙালি মেয়েটির মুখ টেনে এনে গাঢ় চুম্বনে আরো ঘনিষ্ঠ হলো। মেয়েটি কোনো বাধা দিলো না। মাহিনসহ আরো কয়েকজন বাংলাদেশি রয়েছে ট্রেনের কামরায়। মেয়েটি কোনো সঙ্কোচ বোধ করলো না চুম্বনে লিপ্ত হতে। এ দৃশ্য দেখে একরাশ লজ্জা এসে ওকে গ্রাস করো। সেসঙ্গে ওর মনে পড়ে গেলো দূতাবাসে দেখা হওয়া অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের কথাগুলো।

গ্র্যান্ড সেন্ট্রালে নেমে গেলো মাহিন। মেয়েটিও নামলো, একা। মাহিনের অফিস লেক্সিনটন এভিনিউতে ৪২ স্ট্রিটের কর্নারে। সকাল বেলা এমন একটি আপত্তিকর দৃশ্য দেখে ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। যদিও ও এমন দৃশ্য হরহামেশা দেখে, তারপরও একটি বাঙালি মেয়ের প্রকাশ্যে চুমু খাওয়াকে ওর বেলাল্লাপনা মনে হলো। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এটি কোনো বেলাল্লাপনার ঘটনা নয়। প্রেমিক-প্রেমিকা চুমু খাবে-এ দেশে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আমরা যে জীবন-আচরণ ও সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি, এর মধ্যে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া বেলাল্লাপনাই-ভাবে মাহিন। মাহিন এলিভেটর ধরলো। মেয়েটিও ঠিক এলিভেটরে উঠে ওর পাশে দাঁড়ালো। মাহিন মেয়েটিকে দেখে নেবার জন্য ওর মুখের দিকে তাকালো। মেয়েটি ওর চোখে চোখ রেখে ম্লান হাসলো। মাহিন অবাক হলো মেয়েটির লজ্জা-শরম কম দেখে। ও বাংলায় কথা বলে ফেললো—

‘কী ভালো?’

ঢিলটা কাজে লাগলো। মেয়েটি বাংলায় জবাব দিল।

‘হুম। ভালো। আপনি.?’

‘আমি? এই মুহূর্তে আমার মন খারাপ।’

‘কেনো?’

মেয়েটি ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো। এলিভেটর থেকে ওরা নেমে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। মাহিন ওর প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার কথাটা তুলতে চাইছে, কিন্তু কীভাবে বলবে ভাবতে থাকে। ও বললো—

‘আপনার বয়ফ্রেন্ডকে দেখে হিংসা হচ্ছিলো।’

‘কেনো?’

‘এই আপনার মত একজন মিষ্টি মেয়েকে কীভাবে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। দৃশ্যটি আমি মেনে নিতে পারছি না।’

এ কথায় হি-হি করে হেসে উঠলো মেয়েটি। গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের বহিরাগমন পথ দিয়ে ওরা বের হলো। এই ট্রেন স্টেশনটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ট্রেন স্টেশন। স্টেশনটিতে সব সময় লোকের ভিড় লেগে থাকে। অনেক সময় জন¯্রােত ঠেলে হাঁটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। মাহিন লেক্সিটন এভিনিউনির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটিও ওর সঙ্গে হাঁটছে। হাসি থামার পর মেয়েটি বললো—

‘এ্যালেক্স আমার বয়ফ্রেন্ড। ও টাইমস স্কোয়ারে গেলো। ও আমাকে সব সময় জড়িয়ে ধরে কিস্ করে। এটা ওর অভ্যাস।’

‘হুম। বুঝতে পেরেছি। তবে আমাদের সামনে একটি অন্য গোত্রের ছেলে আপনাকে প্রকাশ্যে যেভাবে চুমু খেলো, তা মেনে নিতে পারিনি। তাই মন খারাপ হয়ে গেছে।’

ফের হাসলো মেয়েটি। যেনো মহিনের মন খারাপের কথা শুনে ও মজা পেয়েছে। ও বললো—

‘বাহ্ রে, আমি তো আপনাকে চিনি না। আপনি আমার পারিবারিকভাবে পরিচিত কেউ হলে এ্যালেক্সকে বারণ করতাম।’

এ কথায় মাহিনের মনে হলো মেয়েটি একেবারে বখে যায়নি। ও বললো—

‘পরিচিত নই ভাবেন কেনো? এখানে বাঙালি যে কেউ একে-অন্যের কাছে জাতিগতভাবে পরিচিত। নাইবা থাকলো ব্যক্তিগত পরিচয়। বললাম না, আপনাকে যখন এ্যালেক্স চুমু খাচ্ছিলো, আমি তখন লজ্জা পাচ্ছিলাম। কেনো এই লজ্জা পেলাম? কারণ, জাতি হিসাবে আপনিও আমার পরিচিত। আমার মনে হচ্ছিলো কাজটা বেমানান।’

‘আপনার কথা আমি এ্যালেক্সকে বলবো। এরপর থেকে ও যেনো বাঙালি কারো সামনে আমাকে প্রকাশ্যে চুমু না খায়-এ কথাও বলবো।’

কথাটা বলে মেয়েটি মুখ টিপে হাসলো। মাহিন বললো—

‘এ্যালেক্সকে শুধু নয়, নিজেরে মনকেও বলবেন। নিজেকে সংযত করবেন।’

মেয়েটি কথা বাড়ালো না। ও হাসছে। ওরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে লেক্সিটন এভিনিউর ওপর এসে পাশাপাশি দাঁড়ালো। মাহিন বললো—

‘আপনি কোনোদিকে যাবেন?’

‘আমি ৪৩ স্টিটে যাবো। আপনি?’

‘আমার অফিস ৪২ স্টিটে।’

বললো মাহিন। মেয়েটি জানতে চাইলো—

‘আপনি কী করেন?’

‘আমি একটি কোম্পানিতে চাকরি করছি। আপনি?’

বললো মাহিন। এর জবাবে রিপা বললো—

‘আমি আপাতত কিছু করছি না। চাকরি খুঁজছি।

‘ওকে। বাই বাই।’

মাহিন বিদায় নিতে বলে। মেয়েটি জবাব বলে—

‘থ্যাংকস।’

রিপার ছোট্ট জবাব। মাহিন এর জবাবে বলে—

‘ইউ অয়েল কাম।’

মাহিনের প্রত্যুত্তরে মেয়েটি বললো—

‘বাই দ্য ওয়ে, আপনার রাগ কমেছে?’

‘রাগ? এ প্রশ্ন করছেন কেনো?’

‘না, মানে, আমি এ্যালেক্সকে প্রকাশ্যে চুমু খেয়েছি বলে আপনি রাগ করেননি?’

মাহিন দাঁড়িয়ে গেলো ফুটপাতে। মেয়েটিও দাঁড়ালো। মাহিন মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো—

‘রাগ করেছিলাম। এখন রাগ নেই। আবার যদি কোনও বাঙালি মেয়েকে অন্য কোনো ছেলেকে প্রকাশ্যে চুমু খেতে দেখি, তাহলে আবার রাগ করবো।’

শাসনের ভঙ্গিমায় কথাগুলো বললো ও। মৃদু হেসে মেয়েটি বললো—

‘যে কোনো ছেলেকে চুমু খেলেই রাগ করবেন? বাঙালি ছেলে-মেয়ে হলেও?’

‘হুম। রাগ করবো। আমাদের কালচারে এটি নেই।’

‘তাহলে তো এখন থেকে কেয়ারফুল থাকতে হবে, দেখছি!’

কৃত্রিম ভয় প্রকাশ করলো মেয়েটি। মাহিন অনুশাসনের কণ্ঠে বললো—

‘কেয়ারফুল থাকলে খুশি হবো।’

মেয়েটি মিটিমিটি হাসছে। মাহিনের কথা গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা-ও বুঝতে পারছে না। তবু মেয়েটি যে ওর সঙ্গে কথা বলেছে বা কথায় তর্ক জুড়ে দেয়নি-এটা ভালো লক্ষণ। ও বললো—

‘বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটা বলবেন কি? আপনার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। অথচ আপনার নাম জিজ্ঞেস করিনি।’

নাম বলার জন্য প্রস্তুত ছিল মেয়েটি। ও চট করে জবাব দিলো—

‘আমার নাম রিপা। আপনার নাম?’

‘মাহিন।’

‘আপনি কোথায় থাকেন?’

‘এস্টোরিয়ায়।’

‘আমি থাকি সানিসাইড? আপনি কি আমার সেলফোন নম্বর নিতে চান?’

জানতে চাইলো রিপা। মাহিন বললো—

‘না। সেলফোন নম্বর নিয়ে কী হবে? আপনার তো বয়ফ্রেন্ড আছে।’

ও কথাটা বললো ঠাট্টা করে। রিপা হেসে ফেললো। ও মাহিনের রসিকতা জবাবে বললো—

‘জানেন তো, বয়ফ্রে- বা গার্লফ্রে- এ দেশে বদলে যায় খুব সহজে?’

‘জানি।’

বলে মাহিনও হাসলো। রিপা বললো—

‘চান্স নিতে পারেন।’

কথাটা শুনে খানিকটা বিব্রত হলেও মাহিন তা প্রকাশ করলো না। রিপা কথাবার্তায়ও খোলামেলা-বুঝতে পারলো ও। বললো—

‘ভেবে দেখবো। ফের দেখা হলে জানাবো। তবে এ্যালেক্সকে যেভাবে চুমু খেয়েছেন। এরপর ওকে ত্যাগ করা কি ঠিক হবে?’

খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রিপা। হাসির কম্পন ওর শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মাহিন হচকিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসি থামার পর রিপা বললো—

‘আমার চুমু খাওয়াতে আপনি দেখে ফেলেছেন বলে কথাটা বললেন। আপনি যাকে বিয়ে করবেন, তাকে কেউ চুমু খায়নি-এমন কথা নিশ্চিত করে বলতে পারবেন? বিশেষ করে এ দেশে যে ছেলে-মেয়েগুলো বেড়ে উঠেছে, তাদের বয়ফ্রে–গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কে আপনার ধারনা আছে?’

কথাটা মহিনের ভেতরে চাবুকের মত সপাং আঘাত করলো। ওর অফিসে যাওয়ার সময় ছুঁইছুঁই করছে। তাড়া অনুভব করলেও রিপার কথার একটা যুতসই জবাব দেয়া দরকার। ও নিজের ভেতরে উসকে উঠা রাগ সংযত করে বললো—

‘চোখের সামনে যা দেখছি, তারই দহন সহ্য করতে পারি না। অর্ন্তরালে যা ঘটছে, তা জানতে গেলে রক্তক্ষরণ বেড়ে যাবে। স্খলনের কথা যত কম জানবো, তত ভালো। কষ্ট কম পাবো।’

কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওর রিমঝিমের মুখটা ভেসে উঠলো। রিমঝিমও এই শহরে এসেছে কিশোরী বয়সে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলাদেশে লেখাপড়া করেছে। বাবা মায়ের সঙ্গে এখানে এসে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। রিমঝিম এই সংস্কৃতিতে বড় হয়েছে। ও কি কাউকে এভাবে চুমু খেয়েছে? বা এরচেয়ে বেশি কিছু করেছে? ও বলেছিল, একটি ছেলেকে ভালোবাসতো। এখানে ভালোবাসা মানেই তো চুম্বন। কখনও একধাপ এগিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। রিমঝিম কি…? এ পর্যন্ত ভাবতে পারলো মাহিন। রিপার কথায় ও ভাবনায় ছেদ পড়ে। রিপা বললো—

‘প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনকে স্খলন বলছেন?’

এর জবাবে জোরালো কণ্ঠে মহিন বললো—

‘ওটা স্খলনই তো। ওসব নিয়ে কথা বাড়াতে চাই না। আমার অফিসে যেতে হবে। অন্য একদিন কথা বলবো। যদি আমাদের আবার দেখা হয়। তবে আমি যেনো আর না দেখি, আপনি কাউকে প্রকাশ্যে চুমু খাচ্ছেন?’

মাহিনের কণ্ঠে কৃত্রিম শাসন ফুটে উঠে। রিপার মুখে চাঁদের মত লম্বা হাসি আরো বিস্তৃত হয়। ও বলে—

‘আপনার সঙ্গে কথা বলে মজা পেলাম। এখন অপরাধ বোধও অনুভব করছি।’

‘অপরাধ বোধ অনুভব করছেন? কেনো?’

‘ওই যে এ্যালেক্সকে আপনার সামনে চুমু খেয়েছি বলে।’

রিপার কথায় একটু স্বস্থি অনুভব করলো মাহিন। বাঙালী নারীর লজ্জা না থাকলে কি হয়? ও স্মিত হেসে বললো—

‘তাহলে বিদায় নিচ্ছি। আশা করি, আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে।’

‘হুম। দেখা না হলেও আপনার কথা আমার মনে থাকবে। বাই।’

মাহিন হাত নেড়ে রিপাকে বাই জানালো। রিপা নিজের পথে হাঁটতে লাগলো। মাহিন ওর অফিসের দিতে হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে রিমঝিমের কথা মাহিনের মনে ফের ভেসে উঠলো। রিমিঝিম কি ওর প্রেমিককে চুমু খেয়েছিল? প্রশ্নটা চোরা কাঁটার মত বিঁধে রইলো মনে। এ এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

সাত.

জামানের সন্ধান পাওয়া গেলো নিউজার্সির এলিজাবেথ ডিটেইনশন সেন্টারে। ফৌজিয়া ভীষণ করিৎকর্ম নারী। ও বিভিন্ন স্থানে ফোন করে জামানের সন্ধান করে ফেললো। ফৌজিয়ার কাজ দেখে ভীষণ অবাক হলো করবী। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হলো জামানের আচরণে। জামানের সন্ধান পাওয়ার পরপরই ফৌজিয়াকে নিয়ে নিউজার্সির এলিজাবেথ ডিটেইনশন সেন্টারে গেল করবী। এলিজাবেথ ডিটেইনশন সেন্টার হচ্ছে অবৈধ অভিবাসীদের কারাগার। জামানের বিরুদ্ধে ডোপের্টেশন অর্ডার ছিল। সে এ দেশে বৈধতা পায়নি। অথচ ওর বাবা-মাকে সে বলেছিল, সে ইউএস সিটিজেন। ডাহা মিথ্যা কথা বলেছিল সে। আদালত কর্তৃক ডিপোর্টেশন অর্ডার থাকায় অনেক বছর ধরে ফেরারী ছিল জামান। কে বা কারা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে জামানের অবস্থান জানিয়ে দেয়। জামানের সন্ধান পেয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। জামানের বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশন অর্ডার থাকায় তাকে ডিটেইনশন সেন্টার থেকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তবে তার বিরুদ্ধে মর্টগেজ প্রতারণার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে এফবিআই এজেন্ট। যদি মর্টগেজ প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই মামলায় কয়েক বছর জেল খেটে দেশে ফিরতে হবে তাকে। এ সব তথ্য বের করে ওকে হরহর করে বলে দিয়েছে ফৌজিয়া। ফৌজিয়ার কাজ দেখে ভীষণ অবাক করবী। বাংলাদেশের একজন সাদামাটা নারী এ দেশে এসে কেমন চৌকস কাজ করছে। ফৌজিয়া একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের কর্মী। ইমিগ্রেশন, মানবাধিকার, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ইত্যাদি নিয়ে সে ব্যস্ত থাকে। তার কাজকর্ম দেখলে মনে হবে, সে মার্কিন প্রশাসনের আইন-কানুন সম্পর্কে অনেক জানেন। প্রশাসনের কোথায় কী আছে, কোথায় কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কার তথ্য কোথায় খোঁজ নিয়ে জানা যাবে-এ সব তার নখদর্পণে। অথচ তাকে দেখলে মনেই হবে না, স্বামীর নির্মম প্রতারণার শিকার হয়ে প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছে। ঢাকায় ফৌজিয়ার একটি এনজিও ছিল। এনজিও কর্মকর্তা হিসেবে সে জাতিসংঘে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিউইয়র্ক এসেছিল। স্বামীর অনুরোধে নিউইয়র্কে থেকে যায় সে। এখানে কাজ করে যা উপার্জন করতো, তাই পাঠিয়ে দিত স্বামীর কাছে। পাঁচ বছর পর একদিন আকস্মিকভাবে সে জানতে পারে, তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘর-সংসার করছে। স্বামীর এই প্রতরাণায় শকড হয়ে বুকে পাষাণ বেঁধে প্রবাস জীবন বেছে নেয়। ফৌজিয়া আর দেশে ফিরে যায়নি। স্বামীকে ভুলে থাকার চেষ্টা এখনও করছে। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখকষ্ট ভুলে সে এই বহুজাতিক অভিবাসীর আধুনিক শহরে অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তাদের আইনী অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে। এটাই তার ব্রত-জীবনের লক্ষ্য। এই ফৌজিয়ার রুমমেট হয়েছে করবী। করবীর কাছে জামানের নিখোঁজ হবার কথা শুনে কয়েকদিনের মধ্যে ফৌজিয়া তার সন্ধান বের করে ফেলে। কিন্তু তখনও করবী জানতো কত নির্মম আচরণের শিকার হতে হবে ওকে। ফৌজিয়াকে নিয়ে নিউজার্সির ডিটেইনশন সেন্টারে গিয়ে জামানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ভীষণ লজ্জা পায় ও। ডিটেইনশন সেন্টারে গিয়ে জামানের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে করবীর সঙ্গে দেখা করেনি সে। একটা চিরকুট লিখে জামান ওকে জানায়, জামানের সঙ্গে ও যেনো কখনও দেখা করতে না আসে। ওর কথা যেনো ভুলে যায়। করবী একরাশ বোবা বেদনায় স্তম্ভিত হয়ে ফিরে আসে। ও কাঁদেনি। জামানের জন্য ওর কোনো মায়া নেই, অনুকম্পা নেই। তবু ও জামানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল কয়েকটি প্রশ্নের জবাব জানতে। ও জামানের কাছে জানতে চাইতো কেনো মিথ্যাচার করেছিল সে। ডিপোর্টেশনের খড়গ মাথায় নিয়ে কেনো ও টেলিফোনে ওকে বিয়ে করেছিল? কেনো নিজেকে ইউএস সিটিজেন বলেছিল ওর বাবা-মা’র কাছে? এই যে হাজার-হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ওর কাছে এলো এবং এ দেশে এসেই কষ্ট, লাঞ্ছনা,লজ্জা-অপমানের গ্লানি বয়ে বেড়ালো-এর দায় কে নেবে? কী অপরাধ করেছিল করবী? এই প্রশ্নগুলো ওর মনের মধ্যে সপাং সপাং চাবুক মারছে যখন-তখন। এ কথা ও কাউকে বলতে পারছে না। ফৌজিয়া ওর কাজে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। করবী মনে মনে ঠিক করলো ও দেশে ফিরে যাবে। এই স্বপ্নের দেশে ওর থাকার কোন মানে হয় না। ও কার জন্য এ দেশে থাকবে? যার সঙ্গে পুরো জীবন কাটাবে বলে এসেছিল, তা হয়নি। আর হবেও না। জামানকে নিয়ে ওর কল্পনা শেষ হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে টেলিফোনে বিয়ে হবার গ্লানিটুকু ও মন থেকে মুছতে পারছে না। নিজেকেই যেনো ওর অপরাধী মনে হয়। আবার সান্ত¦না খুঁজে পায়, জামানের সঙ্গে এসে সংসার করতে হয়নি বলে। সংসার করার পর জামান গ্রেপ্তার হলে এক অভিশপ্ত জীবন হতো ওর। ফৌজিয়া রুম থেকে বের হবার আগে করবীর দিকে তাকিয়ে বললো—

‘দু’দিন ধরে মন খারাপ করে বসে আছো, দেখছি। তুমি খুব ভেঙে পড়েছো?’

‘না। ভেঙে পড়বো কেনো? তবে মন খারাপ আরকি।’

‘মন খারাপ থাকবে, স্বাভাবিক। তবে এতোটা মূষড়ে পড়ো না। জামানের জন্য খুব মায়া হচ্ছে তোমার?’

প্রশ্নটা ওর ভেতরে মিহিন যন্ত্রণা ছড়িয়ে দিলো। ও বললো—

‘কী বলছেন আপনি? জামানের জন্য আমার মায়া হবে কেনো? বরং রাগ আর ঘৃণা দলা পাকিয়ে আছে। আমার ও আমার পরিবারের সঙ্গে যে ধরনের প্রতারণা সে করেছে, এর জন্য আমি সারাজীবন তাকে অভিশাপ দেবো।’

এ কথায় হেসে ফেললো ফৌজিয়া। ও বললো—

‘তোমার অভিশাপের আগেই তাকে জেলে যেতে হয়েছে। অভিশাপের পর কী হয়, তা এখন দেখার পালা।’

‘আপু, আপনি রসিকতা করছেন!’

‘রসিকতা ধরলে রসিকতাই। অভিশাপ দেবার কথা শুনে মনে হলো কী হতে পারে জামানের। তাই কথাটা বললাম।’

‘আপু, অভিশাপ দিতে হয় না। তবে যারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, যারা মানুষের মন ভেঙে দেয়, তাদের কখনও না, কখনও প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। জীবনে কঠিন মূল্য দিতে হয়।’

‘তোমার কথাই যেনো সত্য হয়। প্রতারকদের সাজা যদি প্রতারিতের সামনে ঘটতো, তাহলে ভালো হতো। যেমন ধরো, আমার এক্স-হাজব্যান্ড আমার সঙ্গে যা করেছে, এর সাজা যদি আমি স্বচক্ষে দেখতে পাই, এতে আমার যন্ত্রণা একটু কমবে।’

‘হুম। তবে আমি মনে করি, আপনার এক্স-হাজব্যান্ডকে একদিন না, একদিন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। নইলে পৃথিবীটা প্রতারকদেরই জয়-জয়কার দেখতে হতো।’

ফৌজিয়ার মুখে ম্লান হাসি। করবীর কথাটা ওর বিশ্বাস করতে ভালো লাগছে। এমন কিছু কথা আছে, যা শুনতে ভালো লাগে। ফৌজিয়া প্রসঙ্গ পাল্টে করবীকে বললো—

‘তোমার জন্য একটা চাকরি ঠিক করেছি। এভাবে বসে বসে খেলে রাজার ভান্ডর ফুরিয়ে যাবে। আগামী সপ্তাহ থেকে চাকরি করবে। কাল তোমাকে নিয়ে যাবো।’

‘আমি তো দেশে ফিরে যাবো, আপু।

‘বলো কি! দেশে ফিরে যাবে কেনো?’

‘বাহরে। আপনি এমনভাবে কথা বলছেন, যেনো এই দেশটা আমার। এখানেই আমার ঠিকানা।’

‘সবাই তো এ দেশেই থাকতে চায়। এখান থেকে কেউ ফিরে যেতে চায় না।’

‘সবার কথা জানি না। আমি কেনো এই দেশে থাকবো?’

‘তুমি তো দেশে থাকার জন্যই এসেছিলে। ভাগ্যটা খারাপ বলে সংসার সাজাতে পারলে না। তাই বলে চলে যাবে কেনো?’

বললো ফৌজিয়া। এর জবাবে করবী দুচোখ কপালে তুলে বললো—

‘এখানে কেনো থাকবো আপা? এখানে থেকে গেলে আমার কী হবে? কী পাবো আমি?’

‘নিরাপদ জীবন পাবে। স্বাবলম্বি হবে। স্বচ্ছলতা আসবে। তোমার ভালো একটা বিয়েও হবে।’

‘বিয়ে! এখানে? আপনি হাসালেন আপা।’

কথাটা বলে ম্লান হাসলো করবী। ফৌজিয়া মিষ্টি হেসে বললো—

‘করবী, তুমি হতাশ হয়ো না। তুমি দুভার্গ্যরে শিকার। তারপরও বলবো, এ দেশে এসেই যখন পড়েছো, নিজেকে গড়ে নাও। আমি বলতে চাচ্ছি, নিজের পায়ে দাঁড়াও।’

‘আপা, দেশে আমার বাবা-মা অনেক দুশ্চিন্তা করছেন। তাদের কথা ভেবে দেখুন, আমার ভাগ্য বিপর্যয় নিয়ে কতটা কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।’

‘হুম। তা ঠিক। তারা কি তোমাকে দেশে ফিরে যেতে বলছেন?’

‘হ্যাঁ। তাছাড়া আমিও এখানে থাকতে চাইনা। একা একা এই অচিন দেশে হয়তো স্বচ্ছলতা পাবো, কিন্তু শান্তি পাবো না।’

করবীর কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে ফৌজিয়া। এরপর সে বলে—

‘তা হলে আমার আর কিছু বলার নেই। তুমি ফিরে যেতে চাইলে যাও। বাধা দেব না।’

‘থ্যাংক ইউ, আপা!’

খুশি হয়ে বলে করবী। ফৌজিয়া ছোট্ট করে জবাব দেয়—

‘ওয়েল কাম।’

‘আপা আপনি কি আমার জন্য এয়ার টিকেট কিনে দিতে পারবেন?’

‘পারবো না কেনো? তুমি মাহিনকেও বলতে পারো। ও টিকেট কিনে দিতে পারবে।’

‘না, আপা। তাকে আর কত বিরক্ত করতে চাই না। আপনি এয়ার টিকেটটা কিনে দিন। তাকে যাবার দিন বলবো যে, চলে যাচ্ছি।’

‘ঠিক আছে, তাই হবে। কাল তোমার এয়ার টিকেট কিনে নিয়ে আসবো। কবে যেতে চাও?’

জানতে চাইলো ফৌজিয়া। করবী বললো—

‘যে কোনোদিন যেতে প্রস্তুত আমি। যেদিনের টিকেট পাবেন, কিনে ফেলবেন।’

‘ঠিক আছে।’

বলে ফৌজিয়া। করবী তার কাছে এসে আবেগভরা কণ্ঠে বলে—

‘আপা, আপনার কথা আমি কখনও ভুলবো না।’

করবীর কথায় ম্লান হাসে ফৌজিয়া। সে বলে—

‘ঢাকায় ফিরে ফোন করে যোগাযোগ রেখো।’

‘অবশ্যই। আপনার সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখবো আমি।’

কথার এই পর্যায়ে করবীর সেলফোনে মাহিনের ফোন এলো। করবী ফোন রিসিভ করলো।

‘হ্যালো।’

বললো করবী। মাহিন ও প্রান্ত থেকে বললো—

‘কেমন আছেন?’

‘ভালো। আপনি?’

‘ভালো।’

‘রিমঝিম কেমন আছে?’

‘মনে হয় ভালোই আছে।’

‘মনে হয় কেনো? নিশ্চিত নন সে ভালো আছে কী-না?’

‘শুনেছি, ঈশ্বরও নাকি মেয়েদের মনের খবর জানেন না। আমি তো সাধারণ এক মানুষ।’

‘মেয়েদের নিয়ে কটাক্ষ করে পুরুষরা এক ধরনের আনন্দ পায়।’

‘তাই? মেয়েরা পুরুষ নিয়ে কটাক্ষ করে না?’

‘মেয়েরা পুরুষদের সমীহ করে।’

‘শুধু সমীহ করে?’

কৌতুহল প্রকাশ করলো মাহিন। করবী এই তর্কটা আর বাড়াতে চাইলো না। ও বললো—

‘কী ব্যাপার, আজ রিমঝিমের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে নাকি?’

‘না, না। ঝগড়া করার অবকাশ কোথায়? এই প্রশ্ন করলেন যে?’

‘এমনিই করলাম। রাগ করলেন না তো?’

‘না, না। রাগ করবো কেনো? এবার আপনার কথা বলুন।’

‘আমার তেমন কোন কথা নেই। যা বলবো, তা কেবল দুঃখের কথা। এতো দুঃখের বিলাপ করে লাভ কি?’

এ সময় ফৌজিয়া করবীর কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলো। ও প্রান্ত থেকে মাহিন বলে—

‘ওসব দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলে যান। নিজের জীবন নিয়ে ভাবুন। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটাবেন, সেটা ভাবুন। আর হ্যাঁ, আপনি চাকরিতে জয়েন করে ফেলুন। কাজে ডুবে গেলে দেখবেন, দুঃখ এসে আপনাকে গ্রাস করতে পারবে না।’

‘হুম। দেখি, কী করা যায়।’

বলে করবী। ও ঢাকা ফিরে যাবে, এ কথাটা মাহিনকে কেনো জানি বলতে পারলো না। এয়ার টিকেট কাটার পর কথাটা মাহিনকে বলবে বলে মনে মনে ঠিক করে নিলো। ও প্রান্ত থেকে মাহিন বললো—

‘আজ তাহলে রাখি। কাল ফোন দেব। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা বলতে চাই।’

‘কী কথা, বলুন।’

‘জামানের কথা একেবারেই ভুলে যান। মনে করুন, টেলিফোনে বিয়ের ঘটনা আপনার জীবনে কখনও ঘটেনি। তাছাড়া টেলিফোনে বিয়ের কোনো গুরুত্ব নেই।’

মাহিনের কথায় ম্লান হাসলো করবী। ওর বুক ছাপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও বললো—

‘পরামর্শের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার কথাগুলো মনে রাখবো।’

‘ওয়েল কাম। তাহলে রাখি?’

‘রাখুন, বাই।’

‘বাই।’

মাহিনের ফোন লাইন কেটে গেলো। করবী সোফায় বসেছিল। ও সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো। করবী সোফায় শুয়ে একটা অদ্ভূত কল্পনা করতে লাগলো। এ ধরনের কল্পনার কোনো যুক্তি নেই, মানেও নেই। এই কল্পনার কথাও কখনও একমুহূর্তের জন্যও ভাবেনি। অথচ কল্পনাটা ওর চেতনার মধ্যে ম্লান জোছনার মত আলোকিত হলো। আকস্মিকভাবে জেগে উঠা কল্পনায় করবী জীবন-সঙ্গী হিসাবে ভেবে বসলো মাহিনকে। কল্পনাটা বেশিদূর এগুতে দিলো না ও নিজে। কল্পনার রাশ টেনে ধরলো। এরপর একরাশ লজ্জা ওকে গ্রাস করলো নিমেষে। ও যা এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করেনি, তা কেনো কল্পনায় এসে পেখম ছড়ালো? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে?

আট.

যুবকটি দেখে চিনতে পারলো না মাহিন। যুবকটি ওর সামনে এসে বললো-

‘হাই।’

ও ‘হাই’ বললো এমনভাবে, যেনো মাহিনের পরিচিত কেউ। অথচ মাহিন যুবকটি চিনতে পারলো না। কেউ ‘হাই’ বললে ভদ্রতা করে ‘হাই’ বলতে হয় বলে একটু আনমনে যুবককে বললো—

‘হাই।’

যুবকটি খুশি হলো। মাহিন লং আইল্যান্ড সিটির লং আইল্যান্ড পিয়ারে রিমঝিমের জন্য অপেক্ষা করছিল। এখানে কয়েকদিন আগেও রিমঝিম এসেছিল ওর সঙ্গে দেখা করতে। রিমঝিম সকালে ফোন করে জানিয়েছে ওর সঙ্গে জরুরি কথা আছে। ফোনে এই জরুরি কথা বলা যাবে না। রোববার ছুটির দিনে ঘুম থেকে দেরীতে উঠে মাহিন। আজ দুপুরে জামাকাপড় ধোলাই করতে মির্জা আজমের লন্ড্রিতে যাবে ভেবেছিল। রিমঝিম ফোন করে জানালো ও খুব জরুরি কিছু কথা বলতে চায়। দুপুরে আসতে বললো এই ফেরিঘাটে। ভর দুপুরে ইস্ট রিভারের পাড়ে লোকজন খুব বেশি থাকে না। মাহিনের মনে হলো এখান থেকে রিমঝিম হয়তো কোনো রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে। জরুরি কথাগুলো বলবে লাঞ্চ করতে করতে। মাহিন রিমঝিমের ডাকে সাড়া দিতে এক মুহূর্তও ভাবেনি। ও লন্ড্রির কাজ ফেলে পরিপাটি হয়ে চলে এলো। এখানে বসে আছে পনের মিনিট হবে। রিমঝিম যে কোন সময় চলে আসবে, ঠিক এ সময় যুবকটি ওর সামনে এসে হাই বললো। মাহিন চোখ তুলে যুবককে পর্যবেক্ষণ করলো। যুবকের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখে কালো ¯œানগ্লাস। চুলগুলো একটু বেশি বড়, মাথা থেকে কান ঢেকে ঝুলে আছে। কাঁধ ছুঁইছুঁই করছে চুল। জিনস প্যান্টের সঙ্গে টি-শার্টে যুবকটিকে রকস্টারের মত লাগছে। কালো সানগ্লাসে চোখ ঢাকা বলে যুবকের দৃষ্টি পাঠ করতে পারছে ও। মাহিন যুবকের দিকে খানিকটা বিস্মিতভাবে তাকিয়ে থাকে। যুবকটি এবার চোখ থেকে সানগ্লাসটি খুলে বুক পকেটে ঝুলিয়ে নেয়। যুবকের চোখের দৃষ্টি তীর্যক। যুবকের চোখে-মুখে এক ধরনের গাম্ভীর্যতা আছে। মাহিন বিস্মতকণ্ঠে বললো—

‘ডু আই নো ইউ?’

‘না। আমাকে আপনার চেনার কথা নয়।’

বাংলায় জবাব দিলো যুবক। মাহিন এবার অপ্রস্তুত হলো। ও বললো

‘তাহলে? আমি ঠিক..!’

‘আমি জানি, আপনাকে বিব্রত করে ফেলেছি।’

‘না, মানে। আপনি?’

‘আমার ডাক নাম পলাশ। পুরো নাম মাহাবুবুল আলম।’

‘কিন্তু এই নামে আমি কাউকে চিনি না।’

পলাশের চোখে চোখ রেখে বললো মাহিন। পলাশ যেনো এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল। সে বললো—

‘ঠিকই বলেছেন, আপনাকে আমার চেনার কথা নয়। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আই মীন ভালো করেই চিনি।’

‘আশ্চার্য! আমাকে আপনি চেনেন, অথচ আমি আপনাকে চিনি না।’

‘হুম। তাই পরিচিত হতে এলাম। না, ঠিক তা নয়, আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এলাম। কিছু মনে করলেন না তো?’

পলাশের কথায় কেমন রহস্য আছে। মাহিন মনে মনে বিব্রত বোধ করলেও চোখে মুখে তা প্রকাশ করলো না। সে বুঝতে পারছে না পলাশ তার সঙ্গে কী কথা বলতে চায়। মাহিনের মনের কথা পড়তে পারলো যেনো পলাশ। সে বললো—

‘আমি আপনাকে বিব্রত করছি বলে দুঃখিত। কিন্তু আমার কোনো চয়েজ ছিল না। আপনার সঙ্গে কথা বলা খুবই প্রয়োজন।’

‘বুঝতে পারছি না, আপনি আমার সঙ্গে কী বলতে চান। বা কী করে জানলেন যে, আমি এখানে! আমি তো ব্যক্তিগত একটি কাজে এখানে এসেছি এবং কিছুক্ষণ পর এখান থেকে চলেও যাবো।’

‘জানি। আপনি রিমঝিমের জন্য অপেক্ষা করছেন। রিমঝিম এলে আপনি ওকে নিয়ে কোথাও চলে যাবেন।’

পলাশের এ কথায় আরো বিস্মিত হলো মাহিন। সে কি জাদু জানে? সে কী করে ওর মনের কথা জানলো? মাহিন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। পলাশের মুখে শুকনো হাসি ফুটে উঠে। মাহিন নিজেকে সামলে নেয়। ও বলে— ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না রিমঝিমকে আপনি চেনেন কীভাবে? আর চিনে থাকলেও আমাকে আপনার কী বলার আছে।’

‘জানি, আপনি বুঝতে পারছেন না। আমি খুলে বলছি। আপনাকে ধৈর্য্য ধরে আমার কিছু কথা শুনতে হবে। আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি।’

‘অনুমতি? কীসের?’

‘আমি যা বলবো, আপনি তা শুনবেন। আমাকে কথা বলতে দেয়ার অনুমতি চাইছি।’

মাহিন এবার বিচলিত বোধ করছে। কিন্তু মনে মনে তা সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে। ও বললো—

‘আসলে আপনি কে? আমার সঙ্গে আপনার কী কথা?’

মাহিনের প্রশ্নের জবাবে পলাশ বললো—

‘আগেই বলেছি, আমার পলাশ। আমি রিমঝিমের বিশেষ বন্ধু।’

পলাশের কী কথা বলতে চায়, অনুমান করার চেষ্টা করলো মাহিন। ও বললো—

‘কী বলবেন, বলে ফেলুন। বেশি সময় নষ্ট করবেন না, প্লিজ!’

‘থ্যাংকস এ লট। আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইউর কো-অপারেশন!’

‘সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন, প্লিজ!’

‘ঠিক আছে, বলছি। আপনি কিছু মনে করবেন না, প্লিজ। আমি যা বলবো, তা হয়তো আপনার ভালো লাগবে না।’

মাহিন এবার একটু বিরক্ত হলো। ও বললো—

‘অতো ভনিতা না করে যা বলার বলে ফেলুন। আমার সময় নষ্ট হচ্ছে।’

‘আচ্ছা, বলছি। সময় বেশি নষ্ট করবো না। তারপরও…!’

‘প্লিজ, গো এহেড!’

‘রিমঝিমকে তো আপনি বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তাই না?’

‘হুম। পারিবারিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। আগামী মাসের ১০ তারিখ আমাদের বিয়ে হবে। কেনো বলুন তো?’

‘না, মানে, রিমঝিম একটি ছেলেকে ভালোবাসতো।’

‘এটা আমি জানি। রিমঝিম আমাকে বলেছে। ও অকপটে সত্য স্বীকার করেছে। এটা আমার ভালো লেগেছে। আর কিছু বলবেন?’

‘বলতে চাচ্ছিলাম, রিমঝিম যে ছেলেটাকে ভালোবেসেছিল, ওই ছেলেটাও রিমঝিমকে খুব ভালোবাসে।’

‘তো? শুনেছি, ওই ছেলেটা একটা বদমাশ-চরিত্রহীন-লম্পট! রিমঝিম আমাকে তাই বলেছে।’

‘ও সব কথা ও রাগ করে বলেছে। আসলে ছেলেটারও দোষ ছিলো। তাই ভুল বুঝে রিমঝিম ছেলেটিকে ছেড়ে দিয়েছে।’

এ কথায় মৃদু রাগ চাপলো মাহিনের। ও বুঝতে পারছে না পলাশ ওর সঙ্গে এ সব কথা কেনো বলছে। কথা বলার অনুমতি নিয়ে এ ধরনের কথা বলা কতটুকু শোভন-ভাবতে লাগলো। পলাশ কণ্ঠে আরো বিনয় তুলে বললো—

‘ওই ছেলেটা কিন্তু বদমাশ বা লম্পট নয় মোটেও। রিমঝিম তাকে ভুল বুঝেছিল।’

‘শুনুন, এ সব কথা আমাকে কেনো বলছেন বুঝতে পারছি না! আমি এ সব কথা শুনে কী করবো, বলুন?’

মাহিনের প্রশ্নের জবাবে পলাশ নরোম গলায় বললো—

‘আপনার কাছেই সব। আপনিই পারেন রিমঝিমকে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে। আপনার সহৃদয় সহযোগিতা পেলে এক প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ফিরে পেতে পারে।’

‘আপনি কি সেই প্রেমিক? আই মীন রিমঝিমের সাবেক বয়ফ্রন্ড?’

এ কথায় মাথা নিচু করে ফেলল পলাশ। মাহিন বুঝতে পারলো পলাশ তার কাছে কেনো এসেছে। ও কী বলবে, বা কী বলা উচিত তা ভাবতে লাগলো। যে কোন সময় রিমঝিম চলে আসতে পারে। রিমঝিম যদি দেখে ও পলাশের সঙ্গে কথা বলছে, এর প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটাও ভাবনার বিষয়। মাহিন পলাশের উদ্দেশ্যে বললো—

‘পলাশ, শুনুন। আমি আপনাদের প্রেমকাহিনী শুনতে চাই না। রিমঝিম আপনার কথা আমাকে বলেছে। সে আরো বলেছে, আপনাকে ও ঘৃণা করে। এদিকে আমাদের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। এমনি অবস্থায় এখন আমি কী করতে পারি?’

পলাশ চোখ তুলে মাহিনের চোখে চোখ রাখলো। আত্মবিশ্বাস ভরা কণ্ঠে বললো—

‘রিমঝিম আমাকে আসলে ঘৃণা করে না। মুখে হয়তো বলেছে। তাছাড়া আমার দোষের কারণে ও আমাকে ত্যাগ করেছিল। আমি ঘটনার শিকার। আমাকে ও ভুল বুঝেছিল, এই যা!’

‘ভুল বুঝেছিল মানে? এখন কি ওর ভুল ভেঙেছে?’

‘হুম। ব্যাপারটা সেরকমই দাঁড়ায়। কাল ওর সঙ্গে কথা বলে এ টুকু নিশ্চিত হয়েছি, ওর ভুল ভেঙেছে।’

পলাশের কথাটা মিহিন বেদনার ¯্রােত বইয়ে দিলো ওর চেতনায়। পলাশ কাল কথা বলে রিমঝিমের ভুল ভাঙিয়েছে। অথচ আজ রিমঝিম ওর সঙ্গে দেখা করতে ইস্ট রিভারের পাড়ে আসছে। রিমঝিম কি দ্বি-চারিনী? মাহিনের বুকের পাঁজরে একটা কষ্টের দমকা ঝড় বইতে শুরু করলো। এমন কথা শোনার জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। পলাশ মুখ শুকনো করে বললো—

‘সরি, আপনাকে কথাগুলো বলে কষ্ট দিচ্ছি আমি। কিন্তু আমারও উপায় নেই।’

‘কষ্ট! কষ্ট পাবো কেনো? বলুন, আর কি বলতে চান।’

নিজেকে প্রবোধ দেয়ার মত করে কথাটা বললো মাহিন। আসলে ওর কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট ও প্রকাশ করতে চায় না। ও অপেক্ষা করছে পলাশ আর কী বলে, তা শোনার জন্য। পলাশ একটু সময় নিল। কয়েক সেকেন্ড পর ও বললো—

‘রিমঝিমের ভুল এমন সময় ভেঙেছে, যখন আপনার সঙ্গে ওর বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। তাই.!’

‘তাই? থামলেন কেনো, বলুন।’

‘না, মানে আমরা তিনজনই একটি সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছি। আমি, রিমঝিম এবং আপনি।’

‘সংকট? মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কথা বলছেন?’

‘শুধু মনস্তাত্ত্বিক সংকট নয়, সামাজিক সংকটও আছে। যেমন ধরুন, রিমঝিম এখন যদি আপনার সঙ্গে বিয়েটা প্রত্যাখান করে, সেটা সামাজিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে আপনার ও রিমঝিমের পরিবারকে। অনেকেই বিব্রত হবেন। ব্যথিতও হবে। আমার কথাটা কি বুঝতে পারছেন?’

মাহিন একটা অশুভ ঝড়ের আভাষ পাচ্ছে। ভাঙনের খর¯্রােত ওকে যেনো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওর ভেতরে যন্ত্রণা ও ভয় ছড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ওর মুখ যেনো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ভাগ্যিস, ওর নিজের মুখ নিজেকে দেখতে হচ্ছে না এখন। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো পলাশের মুখের দিকে। পলাশ কয়েকমুহূর্ত অপেক্ষা করলো। মাহিনের কাছ থেকে কোন জবাব না পেয়ে সে ফের বললো—

‘আমি জানি, আপনি এলোমেলো হয়ে গেছেন। খুব স্বাভাবিক। আপনি ধাতস্ত হন। এরপর কথা বলবো।’

মাহিন নিজেকে গভীর খাদ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ও বললো—

‘না, না, আমি স্বাভাবিক আছি। কী বলবেন, বলুন।’

‘না, আপনি বেশ বিচলিত হয়ে গেছেন, বুঝতে পারছি।’

বিনয় কণ্ঠে বলে পলাশ। মাহিন বলে—

‘না, না, আমি ঠিক আছি। আপনি কী চান আমার কাছে, বলুন তো!’

ওর কথায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে পলাশ। এই কয়েক সেকেন্ডকে কয়েক বছর মনে হয় মাহিনের। ওর ভেতরে হু হু কান্না তোলপাড় করছে। ও নিজের মুখের অবয়বে হু হু কান্নার ছায়া পড়তে দিতে চায় না। ও নিজেকে হালকা করতে বলে—

‘বলুন, আমাকে কী করতে হবে?’

এবার পলাশ বলে—

‘আপনি যদি নিজ থেকে রিমঝিমের পরিবারকে বলে দেন যে, আপনি ওকে বিয়ে করতে রাজী নন। তাহলে আমার আর রিমঝিমের জন্য ভালো হয়। শুধু ভালো হয় বললেই ঠিক হবে না, এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আপনার প্রতি আমরা দুজনই কৃতজ্ঞ থাকবো অজীবন।’

‘কিন্তু আমি কেনো এ কথা বলতে যাবো?’

‘আপনি এ কথা বললে বিষয়টা সহজভাবে মীমাংসা হয়। নইলে রিমঝিমের বাবা-মা ওর প্রতি রাগ করবেন। আপনি যদি এই উদারতাটুকু দেখান, এতে আমরা খুবই উপকৃত হই।’

‘এ কথা আপনি বলছেন, ঠিক আছে। কিন্তু রিমঝিমের কি একই বক্তব্য? আমি রিমঝিমের সঙ্গে কথা বলে দেখি। ও যদি বলে আমি তা করবো। আপনি একটু অপেক্ষা করুন, রিমঝিম যে কোনো সময় এখানে চলে আসবে।’

বললো মাহিন। ওর মধ্যে অস্বস্থি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির মুখোমখি পড়বে, ও ক্ষুণাক্ষরেও ভাবেনি। এইতো সেদিনও রিমঝিম ওকে বলে গেছে পলাশকে সে ঘৃণা করে। আজ পলাশ এসে ওকে বলছে, রিমঝিমের ভুল ভেঙেছে। ওদের মাঝখানে মাহিন এখন কি দায়গ্রস্থ এক মানুষ? মনে মনে ভাবে ও। পলাশ রাস্তার দিকে তাকিয়ে কী যেনো দেখলো। হাত তুলে কাকে যেনো ইশারা করলো। মাহিন ফের বললো—

‘ঠিক আছে পলাশ, রিমঝিম এলে বিষয়টি ফয়সালা করা যাবে। ও যে কোনো সময় আসবে, আপনি অপেক্ষা করুন।’

পলাশ লাজুক কণ্ঠে বললো—

‘রিমঝিম আমার সঙ্গেই এসেছে। আপনার সঙ্গে আগে আমি কথা বললাম। ও বসেছিল গাড়িতে। ও এখন আসছে।’

মাহিনের অবাক হওয়ার যেনো বাকি ছিল। ও পলাশের কথা শুনে তাকিয়ে দেখলো রিমঝিম সত্যিই একটি লিমোজিন কার থেকে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার মানে রিমঝিম এতোক্ষণ অপেক্ষা করছিল গাড়িতে। পলাশকে ওর কাছে পাঠিয়েছে রিমঝিম? এখন ও আসছে পলাশের ইশারা পেয়ে? এ প্রশ্ন মাহিনের মধ্যে বিষণœতার রেশ ছড়িয়ে দিলো। রিমঝিম ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। ও ভ্যাবাচেখা খেয়ে গেলো। রিমঝিমের চোখ-মুখ কেমন ফোলাফোলা লাগছে। ভালো ঘুম না হলে বা বেশি কান্না করলে এমন হয়। মাহিন নিজের ভেতেরে নিজেকে শক্ত করে নেয়। রিমঝিম দাঁড়ালো অপরাধীর মত মাথা নিচু করে। মাহিনের মুখে কোনো কথা ফুটলো না। পলাশ গুমোট পরিবেশকে কথা বলে হালকা করে দিতে বললো—

‘রিমঝিম, আমি মাহিনকে সব কথা খুলে বলেছি। আমাকে নিয়ে তোমার ভুল ভেঙেছে, এটাও বলেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো, এ কথাও বলেছি। আরো বলেছি, মাহিন যেনো নিজ থেকে তোমার পরিবারকে বলে দেন, তিনি রিমঝিমকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না। মাহিন অবশ্য, তোমার মতামত জানতে চাচ্ছেন।’

রিমঝিম ক্ষীণ কণ্ঠে বললো—

‘আই অ্যাম সরি, মাহিন। আপনি অনেক ভালো মানুষ। আপনাকে আমরা অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম। বিশ্বাস করুন, আমি কালও ভাবিনি পলাশকে ক্ষমা করে দেব। আসলে…!’

এ পর্যন্ত বলতে পারলো ও। মাহিন ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো—

‘ইটস ওকে। এর জন্য আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। আপনাদের আগামী দিনগুলো সুন্দরভাবে কাটুক। আপনাদের প্রেম আরো মর্যাদা লাভ করুক।’

এর জবাবে পলাশ বললো—

‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, মাহিন। আপনি সত্যিই মহৎ!’

মাহিন বললো—

‘না, না। আমাকে মহৎ বলে লজ্জা দেবেন না।’

রিমঝিম কিছু বলতে যাচ্ছিল। মাহিন হাতের ইশারায় ওকে কিছু না বলার ইশারা করে বললো—

‘রিমঝিম, আপনি এতোটা দূর এসে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আপনার কিছুই হয়নি। আপনি কিছু হারালেনও না। হারালাম শুধু আমি। কখনও সময় পেলে আমার কথা একটু ভেবে দেখবেন। আমার পরিবারের লোক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরা জানে যে, আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে। এখন তারা জানবে, বিয়েটা হচ্ছে না। আপনি তো আপনার জীবন-সঙ্গী পেয়ে গেছেন। কিন্তু আমি পেলাম কি? আমি পেলাম প্রবঞ্চণা!’

এ কথায় রিমঝিম আর পলাশ কিছু বললো না। ওরা অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে রইলো মাহিনের সামনে। মাহিন মনে মনে ঠিক করে নিলো রিমঝিমের বাবা-মা বা ওর ফুপুকে ফোন করে বলে দেবে যে, ও রিমঝিমকে বিয়ে করতে চায় না। মায়ের অসুখ বলে ও চলে যাবে ঢাকায়। কিছুদিন ঢাকায় থেকে আসতে হবে ওকে। নইলে এখানে বন্ধু-বান্ধবদের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এই লজ্জা থেকে রেহাই পেতে কিছুদিনের জন্য ওকে পালাতে হবে। কর্মস্থল থেকে ছুটি মঞ্জুর করা কঠিন হবে না। সম্ভব হলে কালই ও ঢাকায় চলে যাবে। মাহিনের ভাবনায় ছেদ কাটলো পলাশের কণ্ঠস্বর—

‘মাহিন, আপনি রিমঝিমকে ক্ষমা করে দিন। মনের দিক থেকে আপনি অনেক বড় মাপের মানুষ!’

এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে যে চেয়ারে মাহিন বসেছিল, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ালো। ও আর কিছু বলতে চায় না। ওর বুক ছাপিয়ে কান্না আসছে। ভেঙে পড়ার কান্না, বিধ্বস্ত হবার কান্না সামলে রাখা কঠিন। ও রিমঝিম ও পলাশের সামনে কাঁদতে চায় না। মাহিন ওদের উদ্দেশ্যে বললো—

‘আমি ফোন করে বিয়ে প্রত্যাখান করে দেবো। আপনাদের মঙ্গল কামনা করছি।’

কথাটা বলে ও হনহন করে হাঁটতে লাগলো। ও পেছনে ফিরে তাকালো না। কী হবে পেছনে তাকিয়ে? রিমঝিন ওর জীবনের পেছনে হারিয়ে যাক। একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ছাপিয়ে বেরিয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চোখের কোণ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রুও নেমে আসে। ও সামলে রাখতে পারে না।

নয়.

করবীর সঙ্গে মাহিনের কখনও দেখা হবে-এ কথা ও ভাবেনি। ভাবার কথাও নয়। করবী নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় ফিরে আসার সময় ওকে বলে আসেনি। কেনো ঢাকায় চলে আসার কথা বলেনি, এর সঠিক জবাব ওর জানা নেই। করবী যখন বিপদগ্রস্থ তখন ও তাকে সহযোগিতা করেছে। অথচ সে ওকে কিছু না জানিয়ে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় ফিরে আসে। একটা ফোনকল পর্যন্ত করেনি। ফৌজিয়ার কাছ থেকে ও যখন জানতে পারলো, করবী ঢাকায় চলে গেছে, তখন ভীষণ বিস্মিত ও ব্যথিত হয়েছিল। করবীর আচরণে খানিকটা ক্ষুব্ধও হয়েছিল। আজ যখন করবীকে দেখতে পেল রাগ-ক্ষোভের কথা কথা যেনো ভুলে গেলো। করবীকে দেখে খুব চমকে গেলো ও। রিপার সঙ্গে ফের দেখা হবার পর এমন চমকে গিয়েছিল মাহিন। ঢাকায় ফেরার পথে জেএফকে বিমান বন্দরে রিপার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল। সেদিন অন্য এক বেশভূষায় রিপাকে দেখে ভীষণ চমকে যায় ও। বোরকা পড়ে বাবা-মার সঙ্গে রিপা ঢাকায় ফিরছিল। ওরা একই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলো। বিমানবন্দরে রিপাকে প্রথমে চিনতে পারেনি মাহিন। জেএফকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশী গেট পেরিয়ে উড়োজাহাজে প্রবেশের আগে অপেক্ষামান যাত্রীদের কক্ষে বসে বই পড়ছিল ও। ওর সামনে এসে রিপা বলেছিল—

‘আস্সালামালাইকম। কেমন আছেন?’

বই থেকে মুখ তুলে হা করে তাকিয়ে থেকেছিল বোরকার নেকাবে মুখ ঢাকা রিপার দিকে। রিপা ওর বোরকার নেকাব মুখ থেকে সরাতেই ওকে দেখে চমকে উঠেছিল মাহিন। ওর মুখ থেকে কয়েক মহূর্ত টু শব্দ বের হয়নি। স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। রিপা ফের বলেছিল—

‘আরে, এমন হা করে তাকিয়ে আছেন কেনো? চিনতে পেরেছেন? আমি রিপা!’

এ কথায় সম্বিত ফিরে পায় মাহিন। ও বলে—

‘চিনেছি বললে ভুল হবে। আপনার বেশ-ভূষা দেখে আমি তো হতবাক হয়ে গেছি। আপনি সেই রিপা তো, যার সঙ্গে…!’

‘হিস্স্স্!’

মাহিন যেনো সেদিনের কথা না তোলে এর সংকেত দিলো রিপা। ওর বিস্ময়ের রেশ কাটে না। রিপার সঙ্গে মধ্য বয়স্ক একজন পুরুষ ও নারী আছে। সম্ভবত তারা ওর বাবা-মা। একটু দূরে সোফায় বসে আছেন তারা। তাদের চোখ রিপার প্রতি সজাগ। তাদের দিকে তাকিয়ে খানিকটা সঙ্কোচ বোধ করলো মাহিন। ও রিপার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে কণ্ঠ নামিয়ে প্রশ্ন করলো—

‘কী ব্যাপার, এই বেশভূষা কেনো? কোথায় যাচ্ছেন? বাংলাদেশে?’

‘হুম্।’

‘হঠাৎ করে বাংলাদেশে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে?’

‘জরুরি কারণে বাংলাদেশে যেতে হচ্ছে। আমার দাদা খুবই অসুস্থ। বাবা-মার সঙ্গে দেশে যাচ্ছি।’

‘তা বুঝলাম। কিন্তু বোরকা পড়ে দেশে যাচ্ছেন, হেতু কি?’

এ কথায় মিটিমিটি হাসতে লাগলো রিপা। মাহিন ওর হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসার চেষ্টা করল। রিপা হাসি মুখে বললো—

‘আমার বাবা-মা খুব কনজারভেটিভ। তারা পর্দা করেন। আমাকেও নিজের বাসায় পর্দা করতে হয়। দেশে যাবার সময় আমাকে বোরকা পরে যেতে হয়।’

‘বলেন কি!’

‘হুম। আপনি অতো অবাক হচ্ছেন কেনো? বোরকা পরাটা কি দোষের?’

‘না, না। দোষের বলছি না। বোরকা পড়া যদি পর্দা করা হয়, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আপনি তো পর্দা করেন না। ট্রেনে বয়ফ্রেন্ডকে…!’

রিপার চোখের ইশারায় মাহিনের কথা বলা থামিয়ে দিলো। ও বললো—

‘আপনি ওসব কথা এখন তুলবেন না, প্লিজ! বাবা-মা শুনে ফেলতে পারে!’

‘ও আচ্ছা! ঠিক আছে ও সব কথা তুলছি না। তবে আপনাকে বোরকা পরিহিত দেখে আমার খুব হাসি পাচ্ছে।’

‘হাসুন। তবে এখন না। আমি যখন বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে ফ্লাইটের আসনে গিয়ে বসবো, তখন যত ইচ্ছা আমাকে নিয়ে হাসবেন। ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছে। আপনি যা বলবেন।’

কথাটা বললেও মাহিনের হাসি পাচ্ছে খুব। ও হাসি সামলে নেবার চেষ্টা করে। মানুষ সাধারণত কান্না সামলে নেয়, হাসি সামলে নেয়ার পরিস্থিতিতে খুব কম মানুষের পড়তে হয়। রিপা প্রশ্ন করলো—

‘আসল কথায় আসি। আপনি দেশে যাচ্ছেন কেনো? আমার মত জরুরি কোন কাজে যাচ্ছেন?’

‘হুম।’

‘কী জরুরি কাজ? কতদিন থাকবেন?’

‘দেশে যাচ্ছি বিয়ে করতে। এক বা দুই সপ্তাহ থাকবো। বড়জোর এক মাস থাকতে পারি। ভালো কোন মেয়ে পেলে বিয়ে করে ফেলবো।’

কথাটা জোর দিয়ে বললো মাহিন। রিপা ওর কথার সত্যতা অনুধাবণ করার চেষ্টা করলো। ও কয়েক পলক মাহিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো—

‘আমারও বিয়ে হয়ে যাবে হয়তো। দাদা খুব অসুস্থ বলে বাবা-মা আমাকে দেশে নিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, কথাটা সত্য নয়। তারা হয়তো আমার বর ঠিক করে রেখেছেন।’

কথাটা এমনভাবে ও বললো যেনো খুব গোপন কথা মাহিনকে বলে দিচ্ছে। মাহিন ওর কথায় মজা পেলো। ও বললো—

‘বলেন কি! তাহলে এ্যালেক্সের কী হবে?’

‘হিস্স্! ওর নাম মুখে উচ্চারণ করবেন না, প্লিজ! এ্যালেক্সের কথা হয়তো বাবা-মা জেনে গেছে। আমার প্রেমের কবর রচনা হয়ে গেছে!’

‘আপনি বিয়েতে রাজী না হলেই পারেন। আপনাকে তো জোর করে বিয়ে দেবে না। আপনি সরাসরি বাবা-মাকে জানিয়ে দেন যে, আপনি একজনকে ভালোবাসেন।’

উপদেশের মত করে বললো মাহিন। রিপা ম্লান হেসে বললো—

‘নো ওয়ে। এ্যালেক্সকে বলেছিলাম আমাকে বিয়ে করতে। ও রাজী হয়নি। তো কার জন্য ভালোবাসার কথা বলবো? কার জন্য বাবা-মার সঙ্গে লড়াই করবো, বলুন?’

‘রিয়েলি! আই অ্যাম ভেরি শকড! তাহলে কেমন প্রেম করেছেন?’

রিপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। যেনো ওই দীর্ঘশ্বাসে এই প্রশ্নের জবাব নিহিত। মাহিন বললো—

‘তাহলে প্রেমিক হারিয়ে এখন বাবা-মায়ের পছন্দে বিয়ে করতে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন? দেশে যাচ্ছেন এই প্রস্তুতি নিয়ে?’

জানতে চায় মাহিন। রিপা জবাবে বলে—

‘এটাই ছিল নিয়তির লিখন! এই যে দেখুন, আপনার সঙ্গেও আমার দেখা হয়ে গেলো। অথচ ভাবিনি, আমাদের ফের দেখা হবে।’

‘আমিও ভাবিনি। তবে দেখা হয়ে ভালোই হলো। আপনার নতুন রূপ দেখলাম। আপনার জীবনের বাঁক সৃষ্টির কথা জানলাম।’

এ কথায় কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে রিপা বললো—

‘আর কথা বাড়াবো না। বাবা-মার অনুমতি নিয়ে এসে আপনার সঙ্গে কথা বললাম।’

‘তাই? আমার কথা কী বলেছেন?’

‘বলেছি, আপনি আমার বান্ধবী মীরার বড় ভাই। আমাকে আপনি অনেক স্থে করেন।’

‘ও আচ্ছা। নট ব্যাড।’

কথাটা বলে মৃদু হাসলো মাহিন। রিপা ওর সঙ্গে ম্লান হাসি বিলিয়ে দিলো। এরপর রিপা চলে গিয়েছিল ওর বাবা-মার কাছে। উড়োজাহাজে ওরা যে আসন বসেছিল, এর উল্টো দিকের সারিতে এবং অনেকটা পেছনে বসেছিল মাহিন। দুবাই বিমান বন্দরে রিপার বাবা-মা যখন রেস্টরুমে গিয়েছিল, রিপা ঝড়ের মতো মাহিনের সামনে এসে একটা চিরকুট ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। চিরকুটে রিপা লিখেছিল—

‘আমাকে বিয়ে করবেন? আমি কিন্তু নষ্ট মেয়ে নই।’ একটা ফোন নম্বর লেখা ছিল চিরকুটে। ওই চিরকুটটা অনেক ভাবিয়েছে মাহিনকে। ও রিপাকে ফোন করেনি। আজ বসুন্ধরা মলে করবীকে দেখে সেদিনের মত ভীষণ চমকে উঠলো মাহিন। কাল রাতে এমিরাটসের ফ্লাইট ধরে ঢাকা ছাড়বে ও। যাবার আগের দিন ওকে আসতো হলো বসুন্ধরা মলে। একটি মেয়েকে দেখে মতামত দিতে হবে ওকে। মেয়েটিকে পছন্দ হলে ওর সঙ্গে খুব শিগগীর বিয়ে হবে। মায়ের চাপাচাপি ফেলতে পারেনি ও। ঢাকায় এসে গত এক মাসে চারটি মেয়ে দেখেছে ও। কোন মেয়েকেই পুরোপুরি পছন্দ করতে পারেনি। মায়ের শেষ অনুরোধ রাখতে ও এসেছে এই মলে। মাহিনের শর্ত ছিল, যে মেয়েকে ও দেখবে, ওই মেয়েটি যেনো তা জানতে না পারে ওকে কোন ছেলে দেখছে। একটি মেয়েকে দেখে তাকে পছন্দ না করতে পারলে তা নিজের কাছেও লজ্জা লাগে। অন্তত মেয়েটির অজান্তে যদি তাকে দেখা হয়, তাহলে পছন্দ না হওয়ার লজ্জা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ওর অনুরোধ রাখতে ঘটক মতিউর রহমান এই ব্যবস্থা করেছেন। মেয়েটির বাবা-মা শুধু জানে, ওকে মাহিন দেখবে। বসুন্ধরা মলে মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করতে এসেছে মেয়েটি। ঘটক মতিউর রহমানের সঙ্গে মাহিন বসুন্ধরা মলের তিনতলায় হাঁটছিল। মতিউর রহমানকে অনুসরণ করে ও মেয়েটির খুব কাছে চলে গেলো। মেয়েটির কাছে যেতেই মাহিন দেখতে পেলো ওর সঙ্গে আলাপ করছে করবী। করবীকে দেখে মাহিনের বুকের ভেতর ছেদ করে উঠে। ঘটক মতিউর রহমান করবীর পাশে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখিয়ে বললো—

‘ভালো করে দেখুন। ওর নাম স্বর্ণা। দুধে আলতা গায়ের রঙ! হাসলে মুক্তো ঝরে! খুব বিনয়ী! একেবারে শান্ত। আপনার সঙ্গে মানাবে খুব!’

মাহিন করবীর দিকে চোখ রেখে মতিউর রহমানের উদ্দেশ্যে বললো—

‘স্বর্ণার পাশের মেয়েটিকে চেনেন?’

‘না। হয়তো স্বর্ণার বান্ধবী হবে। কাজিনও হতে পারে। আপনার কি তাকে পছন্দ হয়েছে? পছন্দ হলে আমি তার খবরও নিতে পারি।’

‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি আসছি।’

বলে মাহিন দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে গেল করবীর দিকে। মতিউর রহমান কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। এক মিনিটের মধ্যে মাহিন করবীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ও কবরীর উদ্দেশ্যে বললো—

‘করবী কেমন আছেন?’

ভূত দেখার মত চমকে গেলো করবী। এতোটা চমকে গেলো যে, কয়েক সেকেন্ড ওর মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। মাহিন স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে বললো—

‘আমি কি তার সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত কথা বলতে পারি? যদি কিছু মনে না করেন…!’

‘ও, শিউর! কথা বলুন। আমরা আছি করবী। কথা শেষ হলে ফোন করিস।’

স্বর্ণা ওর মাকে ঠেলে নিয়ে প্রবেশ করলো একটি শাড়ির দোকানে। করবীর বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ এখনো হচ্ছে। মাহিন করবীর চোখে চোখ রেখে বললো—

‘আমাকে একটা ফোন করে জানিয়ে আসলে আপনার কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?’

‘আপনি এখানে? কবে এসেছেন?’

বললো করবী। মাহিন এর জবাব না দিয়ে ফের জানতে চাইলো—

‘আমাকে একটা কল করার প্রয়োজন বোধ করেননি? আমাকে বলে আসলে কি আপনাকে বাধা দিতাম?’

‘আপনি এর জন্য কি খুব রেগে আছেন?’

‘রাগ করাটাই স্বাভাবিক নয়কি? যদিও আমার রাগ আপনার কাছে মূল্যহীন।’

মাহিনের কথায় শুকনো হাসি ফুটে উঠলো করবীর মুখে। ও বললো—

‘আমি আপনাকে ফোন করেছিলাম। আপনি ফোন ধরেননি। আমি ম্যাসেজ রাখিনি। তাছাড়া আমি খুব আপসেট ছিলাম। তারপরও আপনাকে না বলে ঢাকায় ফিরে আসায় আমি দুঃখিত।’

‘ব্যস্, এইটুকুই। আপনারা মেয়েরা শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই ভাবেন, হয়ে গেলো!’

মাহিনের কথায় কেমন অভিমান লেপ্টে আছে। করবী ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে স্বর্ণা ও তার মা নেই। ও বলে—

‘কবে এসেছেন বললেন না তো?’

‘এক মাস আগে এসেছি।’

‘একাই এসেছেন? নাকি রিমঝিমও এসেছে?’

এ কথার কোনো জবাব দিল না মাহিন। করবী ফের বললো—

‘আপনাদের না এ মাসেই বিয়ে হবার কথা? আমি তো সেরকমই শুনেছি।’

এর জবাবে মাহিন বললো—

‘ওহ্, ওসব খবরও রাখেন দেখছি!’

এ কথায় ম্লান হাসলো করবী। বললো—

‘আপনাকে না বলে ঢাকায় ফিরেছি, এটা সত্য। তাই বলে আপনার খবরাখবর রাখার চেষ্টা করেছি।’

‘কার কাছ থেকে খবরাখবর নেন, শুনি!’

‘কেনো, ফৌজিয়া আপার কাছ থেকে। তার সঙ্গে তো আমার টেলিফোনে প্রায় কথা হয়। আমি সবসময় আপনার খবর নেয়ার চেষ্টা করি।’

‘তা, ফৌজিয়া কি আপনাকে এই খবরটা জানিয়েছে, রিমঝিম নামে যে মেয়েটির সঙ্গে আমার বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল, সেই মেয়েটি আমাকে প্রত্যাখান করেছে? আই মীন, আমাকে বিয়ে করবে না বলে ফিরিয়ে দিয়েছে?’

কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলো করবী। ওর চোখে-মুখে বিষণœতা ছড়িয়ে গেলো দ্রুত। এমন কথা শুনবে-ও এর জন্য প্রস্তুত ছিলো না। ওর কণ্ঠ থেকে অস্পষ্ট একটা শব্দ বেরলো—

‘উফ্!’

করবীর বিষণœ মুখের দিকে তাকিয়ে মাহিনের মনটা বরফ গলা নদীর মতো হয়ে গেলো। ও অভিমানী কণ্ঠে বললো—

‘যাক, আপনাকে আমার দুঃখের কথা বলে কি হবে? আমার কথায় যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন, কিছু মনে করবেন না, প্লিজ!’

‘না, না, আমি কিছু মনে করিনি। আমি জানতাম না, এতো বড় একটা ঘটনার কথা। এখন জেনে আমার খারাপ লাগছে।’

বললো করবী। মাহিনের ভেতরে একটা অচেনা নদী পাহাড় ভাঙা গতিতে নেমে আসছে। নদীর জল তরঙ্গে কথা, আবেগ, কান্নার সম্মিলিত ঢেউ। ওই ঢেউ ও সামলাতে পারছে না। মনের অন্তপুরের বন্ধ দরজাটা হঠাৎ যেনো খুলে গেছে। মাহিন বললো-

‘আমার জন্য আপনার মন খারাপ কেনো হবে? যাক, আমার কথা। আপনার খবর কি, বলুন।’

করবী বললো—

‘ঢাকায় ফিরে চাকরিতে জয়েন করেছি। বাবা-মা আমার জন্য পাত্র খুঁছছেন।’

‘জামান সাহেবের খবর কি?’

জানতে চাইলো মাহিন। করবী প্রত্যুত্তরে বললো—

‘জানি না। জানতে চাইও না। আমার জীবনে জামান অভিশাপের মত। তার কথা আমি মনে করিনা।’

‘হুম। তাহলে আপনার জন্য পাত্র দেখবো?’

মাহিনের প্রশ্নে হেসে ফেললো করবী। ও বললো—

‘আমার অভিশাপ মোচন কে করবে? অতোটা বড় মনের মানুষ পাবো কি?’

মহিন বললো—

‘পাবেন কি, আপনি তো পেয়েই আছেন। শুধু চিনতে পারছেন না।’

কথাটার মধ্যে গভীর অর্থদ্যোতনা আছে, ইঙ্গিতও আছে। তারপরও কথাটা যেনো বুঝতে পারলো না করবী। ও মাহিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাহিনের বুকের ভেতরের নদীটা তোলপাড় করে নেমে আসছে। নদীটার খর¯্রােত যেনো সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ও বললো—

‘দেশে ফেরার সময়, দুবাই এয়ারপোর্টে একটি মেয়ে আমাকে চিরকুটে লিখে সরাসরি একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেদিন মেয়েটির কাজটিকে পাগলামো ভেবেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, জীবনের কোনো না, কোনো সময়ে পাগলামীর প্রয়োজন আছে, গুরুত্বও আছে।’

মাহিনের বুকের ভেতর নদীটার পাগলামী চলছে। চেতনায় নদীটার জলতরঙ্গের গর্জন বর্ণিল রূপ নিয়ে কণ্ঠনালীতে এসে কথামালায় পরিণত হচ্ছে। ও কথামালা আটকাতে পারছে না। আবার কথা বলতে দ্বিধা-সঙ্কোচ-লজ্জায় এককার হয়ে যাচ্ছে। ও চট করে করবীর একটি হাত দুহাতের মুঠোর তুলে নিলো। এই স্পর্শ করবীর কাছে এতোটাই আকস্মিক ছিল যে, ও কিছুই ভাবতে পারলো না কয়েক মুহূর্ত। স্পর্শেরও যে একটা ভাষা আছে, উপলব্ধি আছে, অভিজ্ঞান আছে, মাধুরী আছে, মহিমাও আছে-এটা ও প্রথম টের পেল। করবীর পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। ভয়ে, না অপার্থিব চেতনার সম্মোহনে এই কাঁপন-তা ও বুঝতে পারছে না। করবীর মনে হচ্ছিলো, ও কেঁদে ফেলবে। কান্নার প্রবল চাপ ও সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। বসুন্ধরা মলে মানুষের ভিড়ে ওর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে মাহিন, আর ও কাঁদছে-এমন দৃশ্য অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দেবে। করবী সঙ্কোচ ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে মাহিনের দিকে। মাহিন ওর হাত ধরে বললো—

‘আমাকে বিয়ে করবেন? আমি নষ্ট পুরুষ নই!’

শুধু এ কথা বলেই করবীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো ও। করবীর ওর চোখের কোণে ধরে রাখা অশ্রুজল সামলাতে পারলো না। টল টল করে কয়েক ফোঁটা জল চোখ থেকে গড়িয়ে নেমে এলো গাল বেয়ে। চোখের জল দেখে ওর হাত ছেড়ে দিলো মাহিন। যে থামালার চাপ বুকের ভেতর অনুভব করছিল, তা একটি প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মিলিয়ে গেলো যেনো। ‘আমাকে বিয়ে করবেন?’ প্রশ্নটার মধ্যে সব না বলা কথার সমর্পণ। মাহিন আর কিছু বলতে চায় না, বলতে পারবেও না। শুধু কথাটার জবাব আশা করছে ও। করবী দৃষ্টি অবনত করে ফেললো। ও চোখের জল মুছে বললো—

‘আমি আপনার যোগ্য নই। আপনার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধাটুকু অটুট থাকুক।’

‘তাহলে আমি আপনার অযোগ্য? আপনাকে স্ত্রী হিসাবে পাবার আমার কোনো যোগ্যতা নেই?’

এবার চোখ তুলল করবী। ও বললো—

‘না, না, তা নয়। আমি তা বলিনি।’

‘তাহলে?’

মাহিনের এই প্রশ্নের জবাবে করবী ওর চোখে চোখ রেখে বললো—

‘বিয়ে করে আমাকে আপনি করুণা করতে চাচ্ছেন?’

‘না। করুণা কেনো করবো? আপনাকে ভালোবাসিনি ঠিক, তাই বলে ভালো লাগেনি, তাতো নয়! ভালো লাগা কি ভালোবাসা হতে পারে না?’

মাহিনের কথার কোনো জবাব দেয় না করবী। ওর ভেতরে মিহিন ভাঙাচোড়া হচ্ছে। মাহিন থেমে থাকে না। ও ঘোর লাগা কণ্ঠে বলে—

‘আমার জীবনে আপনি যেনো অচেনা বিভাস। আকস্মিকভাবে আলোকছটা হয়ে এসেছেন। আমি এই আলোয় পুরোটা জীবন পথ চলতে চাই। যাকে চিনতে পারিনি, তাকে চিনে নিয়েছি। তার দিকে হাত বাড়িয়েছি। আমাকে ফিরিয়ে দেবেন?’

করবীর বুকের ভেতরে ঝড়ের তা-ব চলছে। ও মাহিনের সঙ্গে আর কথা বাড়াতে চাইলো না। ও বললো—

‘মাহিন, আপনি নিউইয়র্কে ফিরে যান। আমাকে আপনার জীবনের সঙ্গে জড়ানোর কথা ভাববেন না, প্লিজ!’

কথাটা বলে করবী আর দাঁড়ালো না। ও দ্রুত পায়ে চলে গেলে শাড়ির দোকানে, যেখানে স্বর্ণা ও তার মা রয়েছেন। মাহিন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। করবী ওকে এভাবে ফিরিয়ে দেবে, ভাবতে পারেনি ও। ওর ধারনা ছিল সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে করবী খুশি হয়ে যাবে। কিন্তু করবী উল্টো ওর সামনে থেকে একরকম ঝড়ের গতিতে পালিয়ে গেলো। একেই বলে দুর্ভাগ্য! মাহিন এই প্রথম মনে মনে নিজেকে নিজে একজন ‘অভাগা’ বলে সম্বোধন করলো।

দশ.

বিমানবন্দরে তল্লাশী পয়েন্টে লাগেজ চেক করার সময় পেছন একজন বললেন—

‘বাবা, আপনার সঙ্গে কি কথা বলতে পারি?’

মাহিন ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল কামরান আহমেদ দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ হাসিতে উজ্জ্বল। মাহিন একটু অবাক হলো। কয়েক মাস আগে এখানে কথা হয়েছিল কামরান আহমেদের সঙ্গে। তিনি করবীকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আজ আবার তিনি এসেছেন কেনো এবং ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন কেনো, বুঝতে পারলো না। কামরান আহমেদ একা ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। মাহিন বললো—

‘স্লামালাইকুম।’

‘অলাইকুম সালাম। কেমন আছেন, বাবা?’

‘ভালো। আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান?’

‘জ্বি, বাবা।’

‘বলুন। আমার হাতে সময় কম। বোর্ডিং পাস নিতে হবে।’

‘বলছি। বাবা, আমার মেয়ে করবীকে তো চেনেন? গতবার নিউইয়র্কে আপনি তাকে ভীষণ হেল্প করেছেন, শুনেছি।’

কামরান আহমেদ এ সব কথা এখন কেনো বলছেন, কে জানে। কিন্তু এ সব কথা শুনে কী হবে? মনে মনে ভাবে মাহিন। ও মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে না। বলে—

‘ও সব কথা থাক। আপনি এখানে কেনো এসেছেন, সেটা বলুন।’

‘বাবা, আমার মেয়ে করবী আজ আবার নিউইয়র্কে যাচ্ছে। ওকে একটু খেয়াল রাখবেন।’

কামরান আহমেদের কথায় থ বনে গেলো মাহিন। করবী তো ওকে কাল এ কথা বলেনি! কামারান আহমেদ ওর কাঁধে একটি হাত রেখে আর্শীবাদের মত স্পর্শ করে বললেন—

‘আমার মেয়েটি অনেক লক্ষ্মী, বাবা। আমি দোয়া করছি, তোমরা সুখী হও!’

কামরান আহমেদের এ কথায় তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মাহিন। কামারান আহমেদ আপনি থেকে তুমি সম্বোধন করেছেন। সব কিছু যেনো এলোমেলো লাগছে ওর। বিস্ময়ের প্রবল ধাক্কা এসে লাগলো তখন, যখন করবীকে এগিয়ে আসতে দেখলো ও। করবীকে ও কখনও জিন্স প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখেনি। করবী পরেছে জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট। পায়ে কেডস। পনিটেলে বাঁধা চুলগুলো পিঠের পেছনে সন্নিবেশিত। এমন বেশভূষায় ওকে কখনও দেখেনি মাহিন। হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে করবী মাহিনের সামনে এসে এমনভাবে হাসলো যেনো, সব আনন্দ ওর চোখে-মুখে ঠিকরে বেরুচ্ছে। করবী ওর বাবাকে বললো—

‘বাবা, তুমি বাইরে যাও। তারা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’

করবীর কথায় কামরান আহমেদ হাসিমুখে বিমানবন্দরের বাইরে চলে গেলেন দ্রুত। মাহিন ভাষামূক। করবীর দিকে ওর বিস্ময় ও কৌতুহল মেশানো দৃষ্টি নিবন্ধ। করবী ওর আরো কাছে এসে বললো—

‘অমন হা করে তাকিয়ে থাকলে হবে? চলুন।’

‘আপনি!’

‘কেনো, আসতে পারি না?’

‘না, মানে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’

‘খুব সহজ। আমি আপনার সঙ্গে নিউইয়র্ক যাচ্ছি। ভাগ্যিস, আমার মাল্টিপল ভিসা ছিল!’

‘সত্যি বলছেন!’

‘হুম। সত্যি। আমি যেখানে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে উঠে দাঁড়াবো, আপনার হাত ধরে, আপনার জীবনসঙ্গী হয়ে।’

বিস্ময়ের ধাক্কায় টালমাটাল সামলানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। মাহিনের এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, বিস্ময়ের ধাক্কা সামলাতে পারবে না। ওর মাথা কি চক্কর দিচ্ছে? করবী ওর একটি হাত ধরে বললো—

‘আমাকে বিয়ে করবেন?’

কথাটা বলে ও মাহিনের হাত ছেড়ে দিলো। মাহিন টাল সামলে নিয়েছে। করবীর প্রশ্ন শুনে ও হেসে ফেললো। বললো—

‘বিয়ের ডেফিন্যাশন মনে আছে তো?’

‘আছে। তোমার মনে আছে তো একটি মেয়ে কেমন স্বামী চায়?’

করবী আবেগ তাড়িত হয়ে মাহিনকে তুমি সম্বোধন করলো। মাহিনের ভীষণ ভালো লাগলো। ও বললো—

‘কাল ফিরিয়ে দিলে। আজ এভাবে আমার জীবনে এলে! এতো নাটকীয়ভাবে এলে কেনো?’

‘তোমাকে কাল ফিরিয়ে দেইনি। ফেরাতে চেয়েছি নিজেকে। পারিনি। তাই চলে এলাম।’

‘স্ট্রেঞ্জ!’

‘তুমি খুশি হয়েছো?’

জানতে চাইলো করবী। মাহিন বললো—

‘শুধু খুশি নয়। আমি বিজয়ী হয়েছি। কাল থেকে মনে হচ্ছিল, আমি জীবন যুদ্ধের একজন পরাজিত সৈনিক। অভাগা!’

করবী মৃদু হেসে বললো—

‘তুমি সত্যিই অভাগা। নইলে আমার মত মেয়েকে বিয়ে করতে রাজী হবে কেনো?’

‘না, না। করবী, তোমাকে পেয়ে আমার জীবনের অপূর্ণতা রইলো না।’

‘কথা আর না বাড়িয়ে তোমার লাগেজ স্ক্যান করতে দাও।’

এ কথায় খেয়াল হলো করবীর কোনো লাগেজ নেই। ছোট একটি ব্যাগ ওর হাতে। ও জানতে চাইলো—

‘তুমি লাগেজ আনোনি? এয়ারটিকেট আছে, না, কিনতে হবে?’

করবী মুচকি হেসে বললো-

‘লাগেজ গুছানোর সময় পেলাম কোথায়? ভাবলাম, নতুন জীবন নতুনভাবেই শুরু করবো। নিউইয়র্কে গিয়ে কেনাকাটা করবো। আর হ্যাঁ, এয়ারটিকেট কিনেছি।’

মাহিন হেসে বললো—

‘নো প্রবলেম। সবকিছু নিউইয়র্কে গিয়ে কিনবো।’

করবী হাতের ব্যাগ থেকে ওর পাসপোর্ট ও এয়ার টিকেট বের করে মাহিনের হাতে তুলে দিল। ও বললো—

‘তুমি লাগেজ স্ক্যান করিয়ে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে যাও। আমি আসছি।’

‘কোথায় যাচ্ছো?’

‘বাইরে গিয়ে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ীকে একবার সালাম করে আসি।’

করবীর কথায় ওর মনে হলো বিমানবন্দরের বাইরে ওর বাবা-মা, ভাই-বোন দাঁড়িয়ে আছে। করবীর বাবাও আছেন। দুপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে করবীর পরিচয় হওয়াটা জরুরি। ও বললো-

‘ঠিক আছে, যাও। আমার বাবা-মার সঙ্গে পরিচয় হয়ে আসো।’

করবী হেসে বললো—

‘আজ সকালেই তাদের সঙ্গে আমি পরিচিত হয়েছি।’

‘মানে?’

‘আরে বুদ্ধু, তোমাকে তারা কিছুই জানাননি। সকালে তারা আমাদের বাসায় এসেছিলেন। বাবার সঙ্গে কথা বলেন তারা। আমার বাবা তাই তোমাকে অর্শীবাদ করতে এসেছিলেন এখানে। দুপরিবারের সম্মতিতে আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।’

‘এতো কিছু ঘটেছে, আর আমি কিছুই টের পেলাম না!’

বিস্ময় প্রকাশ করে মাহিন। করবী বলে—

‘সব কথা তোমার কাছে গোপন রাখা হয়েছে। তোমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য।’

‘ওহ, মাই গড! এতো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র!’

করবী মিষ্টি হাসির মদকতা ছড়িয়ে দ্রুত পায়ে বিমানবন্দরের বাইরে চলে গেলো। ঘোর লাগা ভালো লাগায় ও লাগেজ স্ক্যান করিয়ে নিলো। ও যখন এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে লাইনে গিয়ে দাঁড়ালো, তখন ওর ফোন বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে দেখলো রিমঝিমের টেলিনম্বর। ও ফোন অন করে বললো—

‘হ্যালো!’

‘হ্যালো, মাহিন বলছেন?’

‘হ্যাঁ, রিমঝিম?’

‘হুম। কেমন আছেন? আপনি কবে নিউইয়র্ক ফিরবেন?’

‘আমি তো আজই ফিরছি। এখন ঢাকা এয়ারপোর্টে। কিছুক্ষণ পর ফ্লাইটে উঠবো। কেনো বলুন তো?’

ও প্রান্তে কয়েক মুহূর্ত রিমঝিম চুপ। মাহিন বুঝতে পারছে না রিমঝিম কেনো ওকে ফোন করেছে। ওর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করেনি মাহিন। রিমঝিমও ওকে টেলিফোন করেনি। আজ হঠাৎ ফোন কেনো? ও প্রান্ত থেকে রিমঝিমের কণ্ঠ শোনা যায়।

‘হ্যালো, মাহিন!’

‘বলুন। শুনছি।’

‘মাহিন আমি আবারো প্রতারিত হয়েছি। পলাশ কাল বিয়ে করেছে লীনাকে। মাহিন আপনি শুনছেন?’

কষ্টের একটা মৃদু ঝাঁকুনি লাগলো মাহিনের। ও বললো—

‘রিমঝিম, শুনছি।’

‘মাহিন, দেখুন আমার জীবন নিয়ে কেমন ছিনিমিনি খেললো পলাশ!’

রিমঝিমের কথায় কয়েক সেকেন্ড পর মাহিন কণ্ঠ নামিয়ে বললো—

‘আমার দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু বলার নেই।’

‘মাহিন, আমি ভীষণ ভেঙে পড়েছি। পলাশকে ক্ষমা করা আমার ঠিক হয়নি। ও একটা আপদমস্তক প্রতারক! ও পরিকল্পিতভাবে আমার উপর প্রতিশোধ নিয়েছে। মাহিন, আপনি শুনছেন?’

রিমঝিমের এসব কথা শুনে মাহিনের করার কিছু নেই। রিমঝিম ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিল। তার কাছ থেকে সরে এসেও ভুল করে আবার ফিরে গেছে। এই ভুলের মাশুল তাকে দিতে হলো। ও প্রাপ্ত থেকে রিমঝিম ফের বললো—

‘মাহিন, আপনি কি আমার পাশে দাঁড়াবেন? আই মিন…!’

‘না, রিমঝিম। আমি আজ আমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নিউইয়র্ক ফিরছি।’

কথাটা বলে চুপ করে রইলো মাহিন। ওই প্রান্তে রিমঝিমের কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছে ও। ওর একটু খারাপ লাগছে রিমঝিমের এই পরিণতির জন্য। কিন্তু ওর কিছুই করার নেই। রিমঝিম ফোনের লাইন কাটছে না। ও কাঁদছে। যাত্রীদের লাইন ছোট হয়ে এসেছে। মাহিন তাকিয়ে দেখলো করবী আসছে খরস্রোতা নদীর মত। এই নদী মাহিনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অন্য এক ভূবনে। নতুন ভূবনে রিমঝিমের কোনো স্থান নেই। প্রশ্রয় নেই। মাহিন রিমঝিমের ফোনের লাইন কেটে দিলো।

 Back