- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
এক.
থুত্থুরে বুড়ো মিনমিনে গলায় বলল,
‘আমি এলিয়েন।’
কথাটা এমনভাবে বলল যেন কেউ শুনতে না পায়। যদিও কথাটা বিশ্বাস করার মত নয়, তবু কালো কুচকুচে রঙের জবুথবু বুড়োর দিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি রাখলো দ্যুতি। বুড়োর গায়ের পোষাক যেমনি মলিন, তেমনি শতচ্ছিন্ন। পাকা লম্বা চুলগুলো জট বেঁধে পিঠের ওপর লতার মত পড়ে আছে। চোখ দুটি কোটরের এতো ভেতরে যে চোখ আছে কী নেই ঠাওর করতে হলে ভালো করে তাকাতে হয়। দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে নক্ষত্রের দ্যুতি জ্বলে ওঠে যেন। চোখের মণি ঘন সবুজ। বুড়োর দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখতেই দ্যুতি কেঁপে উঠলো। ঠিক এই মুহুর্তে ওর মনে হল বুড়োটি সত্যিই অন্য গ্রহের প্রাণী। কিন্তু প্যারিসের মত ব্যস্ত শহরে আইফেল টাওয়ারের সামনে হাঁটু সমান উঁচু পাথরের স্তম্ভের ওপর এলিয়েন কেন বসে আছে, বুঝতে পারলো না ও। এখানে লোকজনের ভিড়ে এলিয়েনের কী কাজ, কে জানে। দ্যুতি বুড়োর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। হেঁটে যাবার সময় দমকা হাওয়ায় ওর গা থেকে বেগুনী রঙের ওড়না উড়ে গিয়ে বুড়োটার গায়ে জড়িয়েছিল। ও ঘুরে দু’কদম এগিয়ে এসে বুড়োর কাছ থেকে ওড়নাটা নিল। ওড়নাটা হাতে ধরতেই ওড়নার রঙ আকস্মিক বদলে গেল। বেগুনী ওড়নাটা হয়ে গেল সোনালী রঙের। সূক্ষ্ম চিকন সোনালী সূতোর বুননের ওড়নার ওপর আবার উজ্জ্বল কাঁচের কুচি সারি সারি সাজানো। নিজের ওড়নার এই আমূল পরিবর্তন দেখে ওড়নার দিকে বিস্মিত চোখে তাকায় দ্যুতি। বুড়ো গলা নামিয়ে দ্যুতির উদ্দেশ্যে ক্ষীণকণ্ঠে বলে,
‘সোনার সূতোর ওড়নায় ডায়মন্ডের কুচি! বৃটেনের রানীর কাছেও এমন মূল্যবান ডায়মন্ড নেই। বুঝলে?’
সোনার সূতো বা ডায়মন্ড পরখ করার কথা ভাবেনি দ্যুতি। বেগুনী রঙের সিল্কের ওড়নার রঙ ও ডিজাইন বদলে গেছে-এই বিস্ময়ে ও হতবাক। বুড়ো আর কোন কথা বলে না। উদাসভাবে আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে এলে দ্যুতি বুড়োর দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী গলায় প্রশ্ন করে,
‘হু আর ইউ?’
এর জবাবে বুড়ো ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে জানায় যে, সে এলিয়েন। লিদোফস্ সাবওয়ে স্টেশনের পাশে দ্যুতির খালার বাসা। আইফেল টাওয়ার এলাকা থেকে ট্রেন ধরলে তিরিশ মিনিটের মধ্যে খালার বাসায় পৌঁছে যাওয়া যায়। ও এমনিতেই লেট। খালার বাসায় ফেরার ওর তাড়া ছিল। কিন্তু ও বুড়োর সামনে থমকে দাঁড়িয়েছে। এমন এক আশ্চর্য ঘটনার মুখোমুখি হবার পর পা চলে না। ও বুড়োকে রসিকতা করে বলল,
‘তোমার বয়স কত এলিয়েন?’
বুড়োটি মুখ টিপে হাসলো। দাঁত আছে কী নেই, বোঝা গেল না। বুড়ো বলল,
‘পৃথিবীতে তোমরা যেভাবে বয়স গুনে থাকো, সেই হিসাব ধরলো কয়েক হাজার বছর তো হবেই। আমাদের গ্রহের হিসাবে আমার বয়স একুশ।’
দ্যুতি ভিড়মি খেল। বুড়োর সঙ্গে কথা আর বাড়াবে কি, বাড়াবে না-ভাবতে লাগলো। বুড়ো যেন ওর মনের কথা পড়ে ফেললো। বলল,
‘তুমি তোমার খালার বাড়ি যেতে চাইছো তো ? এতো তাড়া কিসের?’
এ কথা শুনে দ্যুতি থ’। ও বলল,
‘আমার তাড়া আছে। সো..?’
দ্যুতির কথার জবাবে বুড়ো বলল,
‘আজ ধীরে সুস্থে যাও। এতে তোমার মঙ্গল হবে। যার জন্য তাড়াতাড়ি যেতে চাইছো, তার জন্য তুমি নও।’
‘মানে?’
অবাক চোখ তুলে প্রশ্ন করলো দ্যুতি। বুড়ো দ্যুতির কথাটা শুনতে পায়নি, এমন ভাব করে রইলো। দ্যুতির মনে আজনা আশঙ্কা জেগে উঠলো। ও বলল,
‘তুমি রহস্য সৃষ্টি করতে চাইছো?’
বুড়ো অন্যমনস্ক গলায় দ্যুতির উদ্দেশ্যে বলল,
‘পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মোহগ্রস্থ থাকে, বুঝলে?’
বুড়ো এ কথা কেন বলল বুঝতে পারল না দ্যুতি। বুড়োর কথায় হেয়ালি আছে। তারপরও বুড়োর কথাটির সাড়া দিয়ে বলল,
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো, আইফেল টাওয়ার নিয়ে কত ব্যাঞ্জণা, কত কথার ফানুস! উঁচু টাওয়ার বা অট্টালিকা মানুষ কেন বানায় বলো তো? প্রকৃতিকে নষ্ট করে এতো কৃত্রিমতা কেন? পৃথিবী এতো ভার সহ্য করতে পারবে কিনা-এই কথা কেউ ভাবছে না। মানুষ আধুনিক জীবনের প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে এসব করছে।’
‘শুধু এ টুকুর জন্য তোমার আক্ষেপ?’
জানতে চাইলো দ্যুতি। বুড়ো উদাস গলায় বলল,
‘সবক্ষেত্রেই তো মোহ!’
‘এতো ‘মোহ’ ‘মোহ’ করছো কেন? কোথায় এতো মোহ দেখলে?’
কথাটা বলার পর ওর মনে হল অকারণে ও বুড়োর সঙ্গে কথা বলছে। এ সব কথা না বললেও হতো। দ্যুতির কথাটা বুড়োর ভালো লাগলো। ও সরু গলায় বলল,
‘তোমাদের রাজনীতিবিদরা যা বলছেন, সাধারণ মানুষ তা শুনছে মোহগ্রস্থ হয়ে। ধর্মগুরুরা ধর্ম নিয়ে যা বলছেন, ঐ সব ধর্মের লোকেরা তা শুনছে ও মানছে মোহগ্রস্থ হয়ে। সবাই অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে। কেউ প্রশ্ন করছে না, প্রশ্নের জবাবও খুঁজছে না। এখানেই তো সবচেয়ে বড় মোহ।’
‘তা এলিয়েন সাহেব, পৃথিবীর মানুষের প্রতি এতো আক্ষেপ নিয়ে আমার ওড়নাটা বদলে দিলে কেনো? তুমি ম্যাজিশিয়ান, তাই না?’
দ্যুতির কথায় বুড়োটা যেন হাসার চেষ্টা করলো। তার চোখ দুটি বুজে এলো। বুঝা গেল না এলিয়েন হাসলো না চোখ বুঝে চিন্তা করলো। দ্যুতি বাসায় ফেরার তাড়া অনুভব করলেও পা বাড়াতে পারছে না। এটাও তো এক ধরনের মোহ-মনে মনে ভাবলো ও। এলিয়েন বলল,
‘আজ তোমার শাপমোচন হলো। তাই তোমার ওড়না বদলে দিলাম। বলতে পারো আমার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার।’
বুড়োর কথায় দ্যুতির চোখ ছানাবড়া হল। কী বলছে এই বুড়ো? দ্যুতি হা করে তাকিয়ে রইলো বুড়োর দিকে। বুড়ো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
‘আমার কথা তোমার বোঝার কথা নয়। আমি যা বলব, তা-ও বিশ্বাস করবে না তুমি। কিন্তু যা বলছি, তা ধ্রুব সত্য।’
বুড়োর কথায় স্মিত হেসে দ্যুতি বলল,
‘শাপমোচন! শুনতে ভালোই লাগছে, একটু খুলে বলবে কি?’
বুড়ো ফের ওর দিকে মুখ ফেরালো। একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘আগের জন্মে তুমি পৃথিবীর কোন এক দেশের রাজকন্যা ছিলে। তুমি শিকার করতে যেয়ে এক ভবঘুরে কবির সঙ্গে পরিচত হয়েছিলে। তোমাদের মধ্যে প্রেমও হয়েছিল।’
‘রিয়েলি! হাউফানি!’
‘হুম। তুমি এক সময় ঐ প্রেমিক কবিকে প্রত্যাখান করেছিলে। তোমার বিয়ের দিন কবিকে শূলে চড়তে হয়েছিল।’
‘ভেরি পেইফুল স্টোরি! তারপর?’
‘তুমিও আত্মহত্যা করেছিলে! তুমি অভিশপ্ত আত্মা নিয়ে ফের পৃথিবীতে এসেছো।’
‘স্ট্র্যাঞ্জ!’
‘সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনা হচ্ছে তুমি এবং ঐ কবি প্রায় একই সময়ে পৃথিবীতে ফের এসেছো।’
বলল বুড়ো। দ্যুতির হাসি পাচ্ছিলো, আবার গল্প শুনতে ভালো লাগছিল। ও চোখের দৃষ্টি নাচিয়ে বুড়োর কাছে জানতে চাইলো,
‘আমাদের পুনর্জন্ম হয়েছে?’
‘হুম।’
‘তাহলে সে কোথায়? কুড আই মিট হিম?’
‘সহজ নয়। তবে চাইলে তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে পারো।’
‘কে সে? কোথায় থাকে?’
কৌতুহল প্রকাশ করে হেসে ফেললো দ্যুতি। বুড়ো এবার গম্ভীর হল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
‘তোমার সঙ্গে তার দেখা হবে। তোমাকে এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
বলে হাসলো বুড়ো। দ্যুতি মাথা ঝাকিয়ে ‘না’ বোধক সম্মতি প্রকাশ করে বলল,
‘পরশু আমার এ্যাংগেজম্যান্ট। আমি যাচ্ছি আমার খালার বাসায়। সেখানে আমার হবু স্বামী অপেক্ষা করছেন। আমরা আজ দুজন দু’জনের সঙ্গে পরিচিত হবো। বুঝলে এলিয়েন?’
‘তুমি যদি অপেক্ষা না করো, তাহলে ফের অভিশপ্ত হতে পারো। তোমার ভবিতব্য ভালো দেখছি না।’
দ্যুতি ভেতরে একটু কেঁপে উঠলো। বাইরে তা প্রকাশ করলো না। ও বলল,
‘একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’
‘বলো।’
‘আজ আমি অভিশাপ থেকে মুক্ত হলাম কেন? আজকের দিনটি কেন এমন বিশেষ দিন?’
এ প্রশ্নের জবাব দিতে কয়েক সেকেণ্ড সময় নিল বুড়ো। একটু ভারী গলায় সে বলল,
‘আমি এখানে এসেছিলাম প্রিন্সেস ডায়না ও দোদির আত্মার সঙ্গে কথা বলতে। তুমি জানো, এখানেই ট্যানেলের মুখে ওরা অপঘাতে নিহত হয়েছিল। একটি অসম প্রেমের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতেই ওদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তাই ওদের আত্মা পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায়নি। আমার কাজ ছিল ওদের আত্মাকে বুঝিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা। আমি অনেকদিন ধরেই ওদের বুজাচ্ছিলাম। আজ ওরা রাজি হলো একটা শর্তে। আর শর্ত দিল তোমাকে শাপমোচন করে দেবার। তুমি আজ এখানে এসেছিলে বলে শাপমোচনের সুযোগ পেলে। তোমাকে শাপমোচন করে ডায়না-দোদির আত্মাকে পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারলাম। আমার কাজ শেষ।’
অভিভূত হয়ে কথাগুলো শুনলো দ্যুতি। ও বুঝতে পারছে না, এরপর ও কী বলবে। ও একটু ভাবলো। এরপর বলল,
‘আমার আরো দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন, ডায়না বা দোদির আত্মা কেন আমার শাপমোচনের জন্য তোমাকে অনুরোধ করবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আমার শাপমোচন না হতো, তাহলে কী হতে পারতো?’
প্রশ্ন শুনে কেমন ফ্যাকাসে হল বুড়োর মুখ। ও বিড়বিড় করে কী যেন বলল। দ্যুতি ওর বিড়বিড় কথা কিছু বুঝতে পারলো না। বুড়ো গলা খাকারী দিয়ে বলল,
‘ডায়নার আত্মা আমাকে বলেছে তুমিও রাজমহল ষড়যন্ত্রে ভালোবাসার মানুষকে প্রত্যাখান করেছিলে। তোমার ভালোবাসায় খাঁদ ছিল না। কিন্তু ভালোবাসাকে জয় করার মত তোমার শক্তি ছিল না। এখানটায় তোমার সঙ্গে ডায়নার বেদনার মিল আছে। তাই ওদের আত্ম আজ তোমাকে এখানে দেখে আমাকে এই অনুরোধ করে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারব না। আমি ভবিতব্য সম্পর্কে কিছু বলতে পারি না। এই শক্তি আমরা অর্জন করি, আমাদের হিসাবে তিরিশ বছর পূর্ণ হলে। আগেই বলেছি আমার বয়স একুশ।’
বুড়োর কথা শুনে দ্যুতি কেমন মুষড়ে পড়লো। ও এরপর কী বলবে, বুঝতে পারলা না। ওর ভীষণ কান্না পেয়ে গেল। ওর ভেতর থেকে অকারণে কান্নার রোল ওঠে আসছে। ওর দু’চোখ বেয়ে অশ্রুর দুটি ধারা নেমে এলো। ও ওড়না চেপে ধরলো নিজের চোখে-মুখে। ভেতর থেকে উথলে আসা কান্না সামলাতে পারলো না। আবার হাউমাউ করেও কাঁদলো না ও। অর্থহীন নীরব কান্নায় ও নিজের মধ্যে নিজে একাকার হল। কয়েকমুহুর্ত পর ও মুখ থেকে ওড়নার আঁচল সরাতেই দেখলো বুড়োটা নেই। ও চট করে চারপাশে তাকালো। কোথাও তাকে দেখা গেল না। মাত্র কয়েক মুহুর্তেই জবুথুবু বুড়ো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। দ্যুতি ফের ভীষণ অবাক হল। বিস্ময়ে ও থ’। দ্যুতি অনেকক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো আইফেল টাওয়ারের সামনে। যেন অভিশপ্ত এক জীবন্ত মূর্তি!
দুই.
সাবরিনাদের বিয়ে বার্ষিকীর পার্টিতে লোকটিকে দেখে চমকে উঠল দ্যুতি। দ্যুতিকে দেখে লোকটিও যেন ভড়কে গেল। পাংশুবর্ণ মুখ করে দ্যুতির সামনে থেকে দ্রুত কেটে পড়লো সে। সাবরিনার বিয়ে বার্ষিকীর পার্টিতে অনেক লোক এসেছে। পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অধিকাংশজন প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশী। সাবরিনার স্বামী শওকত জামান বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব প্যারিসের সাধারণ সম্পাদক। ফলে সাবরিনার বিয়ে বার্ষিকীর পার্টিতে বাংলাদেশী পরিবারগুলো এসেছে। বান্ধবী হিসাবে দ্যুতিও এসেছে এই পার্টিতে। সাবরিনাকে উইশ করে সফট ড্রিঙ্কস নেবার সময় লোকটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওর। লোকটিকে দেখে দ্যুতির প্রথম মনে হল লোকটি ওকে অনুসরণ করতে গিয়ে অনাহুতভাবে এই পার্টিতে চলে এসেছে। দ্যুতি একটু হচকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু লোকটির নার্ভাসনেস দেখে দ্যুতির ধারনা বদলে গেল। ওর মনে হল, লোকটি এই পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন। লোকটি যেভাকে দ্রুত সরে গেল, এতে মনে হলো দ্যুতিকে এই পার্টিতে দেখে লোকটিও চমকে গেছে। লোকটি ওকে অনেকদিন ধরে অনুসরণ করছে। কেন ওকে অনুসরণ করছে, ও জানে না। প্রথম প্রথম বিষয়টি ও গুরুত্ব দেয়নি। এক মাস আগে যখন ও ফ্রাঙ্কফুট গেল, সেখানেও লোকটির উপস্থিতি দেখে ও চমকে উঠলো। ফ্রাঙ্কফুটে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ওর বান্ধবী মলি থাকে ফ্রাঙ্কফুটে। মলির অনুরোধে ও গিয়েছিল ফ্রাঙ্কফুটে। সেখানে বইমেলার মানুষের ভিড়েও লোকটিকে দেখেছিল ও। একবার তো একটা কফি শপে লোকটির মুখোমুখি পড়েও গেল। দ্যুতি চট করেই লোকটিকে প্রশ্ন করলেছিল,
‘আর ইউ লুকিং সামওয়ান লাইক মি?’
লোকটি এর জবাব না দিয়ে মুখে ভূবন ভুলানো হাসি ঝুলিয়ে চটপট চলে গিয়েছিল। দ্যুতি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছিল। লোকটি সাড়া দেয়নি। ফ্রাঙ্কফুটে লোকটিকে দেখার পর থেকে ও নিশ্চিত হয় যে, লোকটি ওকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে।
পার্টিতে লোকটিকে দেখে দ্যুতি একটু আশ্বস্ত হল এই ভেবে যে, লোকটির পরিচয় জানা যাবে। লোকটির শারীরিক গঠন ও মুখায়ব দেখে দ্যুতির মনে হয়েছিল সে এশিয়ার কোন দেশের নাগরিক হবে। বাংলাদেশী, ভারতীয় বা পাকিস্তানীও হতে পারে। লোকটি উচ্চতায় পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চি হবে। চওড়া বুক, পেটানো শরীর। হয়তো নিয়িমতি জিমে যায়। টাইট শার্ট পরলে লোকটির পেশী উদ্ধতভাবে প্রতিফলিত হয়। বার বা নাইট ক্লাবের বাউঞ্চারদের মতো পেশীবহুল সে। লোকটি ওকে অনেকদিন যাবত কেন অনুসরণ করছে, তা জানে না। সাবনিার বিয়ে বার্ষির্কীর পার্টিতে তাকে দেখে প্রশ্ন আর কৌতুহল একসঙ্গে গ্রাস করলো দ্যুতিকে। ও কী ভেবে লোকটি খুঁজতে লাগলো পার্টিতে অংশগ্রহণকারী মানুষের ভিড়ে। দ্যুতি লোকটিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে হোটেলের বলরুম ছেড়ে লবিতে চলে এলো। এখানে সে লোকটিকে দেখতে পেল। লোকটি নির্জন লবির এককোণে দাঁড়িয়ে টেলিফোনে নিচুগলায় কথা বলছিল। দ্যুতি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। দ্যুতি লোকটির পাশে দাঁড়াতেই লোকটি সেলফোনের লাইন কেটে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। দ্যুতির মুখোমুখি হতেই লোকটির মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দ্যুতি পরিচয় হতে ইচ্ছুক এমন ভাব করে বলল,
‘আই এ্যাম দুতি। নাইস টু মিট ইউ এগেইন।’
লোকটি কয়েকমুহুর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। এরপর হঠাৎ নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল যেন। লোকটি বাংলায় বলল,
‘মিস, দ্যুতি। আমার নাম অনিন্দ্য হাসান।’
অনিন্দ্য বাংলায় কথা বলায় দ্যুতির মধ্যে তাৎক্ষণিক বিহবলতা ছড়িয়ে পড়লো। ও এমন আশা করেনি। নিশ্চয়, লোকটি বাংলাদেশী। এই বাংলাদেশী যুবক ওকে কেন অনুসরণ করছে? দ্যুতি সময় নষ্ট করতে চায় না। যেভাবেই হোক, মিষ্টি কথার জাল পেতে হলেও লোকটির পরিচয় এবং ওকে অনুসরণ করার কারণ বের করতে হবে-ভেবে নেয় দ্যুতি। ও বলল,
‘মিঃ অনিন্দ্য, আজকের পার্টিতে আপনাকে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ অনেকদিন ধরেই খুঁজছিলাম। আজ সুযোগ পেলাম।’
দ্যুতির কথায় একটু ভড়কে গেলেও অনিন্দ্যের মুখে রংধনুর মতো অদ্ভূত সৌন্দর্যমন্ডিত হাসিতে তা প্রতিফলিত হলো না। অনিন্দ্যের মায়াবী হাসিতে দ্যুতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। এই হাসির মধ্যে যেন জাদু আছে। অনিন্দ্য দ্যুতির উদ্দেশ্যে বলল,
‘আপনাকে এড়াতে পালাম না আজ। আজকের পার্টিতে না এসেও পারলাম না। জামান এমনভাবে ধরেছে যে, পার্টিতে না আসলে ও খুব রাগ করতো।’
‘আই সি, আপনি জামান ভাইয়ের বন্ধু বা পরিচিত কেউ তাহলে? জামান ভাই কি আপনাকে আমার পিছনে লাগিয়েছেন?’
অনিন্দ্য হাসান ফের ভূবন ভুলানো হাসি বিলিয়ে দিল। দ্যুতি তার মুখ থেকে চেষ্টা করেও চোখ ফেরাতে পারলো না। ও কেমন মুগ্ধভাবে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে। এমন কখনও হয়নি দ্যুতির। পুরুষ মানুষের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকাটা কোন স্মার্ট মেয়ের কাজ নয়। দ্যুতি কখনও কোন পুরুষ মানুষের দিকে মুগ্ধচোখে তাকায়নি। নিজের ভেতরে অস্বস্থি ছড়িয়ে পড়ে। অনিন্দ্য বলে,
‘আপনার কেনো মনে হলো যে আমি আপনার পেছনে লেগেছি? আর জামানই বা আপনার পেছনে আমাকে লাগাবে কেনো?’
অনিন্দ্যের প্রশ্নের জবাবে দ্যুতি বলল,
‘আপনি আমাকে অনেকদিন ধরে অনুসরণ করছেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু জানি না, কেন অনুসরণ করছেন। তা বলবেন কি, কেন আমাকে অনুসরণ করছেন?’
দ্যুতির প্রশ্নের জবাব দিল না অনিন্দ্য। সে কী যেন গভীরভাবে ভাবতে লাগলো। দ্যুতি দমে যাবার পাত্রী নয়। আজ সে জানতে চায়, কেন অনিন্দ্য তাকে অনুসরণ করছে। দ্যুতি গত এক বছরে আটজন পাত্রকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে অনিন্দ্য হাসান নেই। হতে পারে প্রত্যাখাত কোন পাত্র কৌতুহলবশত তাকে অনুসরণ করছে। অনিন্দ্য ওকে কেনো অনুসরণ করছে-ও বুঝতে পারছে না। দ্যুতি বলল,
‘আপনি কে এবং কেন আমাকে অনুসরণ করছেন-এই প্রশ্নের জবাব আপনাকে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর জবাব না পেলে আপনাকে ছাড়ছি না।’
দ্যুতির কথায় মিষ্টি করে হাসলো অনিন্দ্য। সে বলল,
‘কেন ছাড়বেন না আমাকে? এই প্রশ্নটার জবাব কী এমন গুরুত্বপূর্ণ?’
‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত আমার কাছে। আমার ব্যক্তিগত জীবনে একটা ছায়া অনবরত অনুসরণ করছে-এটার কারণ জানতে হবে না? কী বলছেন?’
দ্যুতি কথাগুলো জোর দিয়ে বলল। অনিন্দ্য ফের ভাবছে। দ্যুতি বলল,
‘প্লিজ, আমাকে বলুন। কারণটা শুধু বলুন, কথা দিচ্ছি আর কোন প্রশ্ন করবো না।’
অনিন্দ্য দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল,
‘বিপদে ফেললেন দেখছি!’
‘আমি কারণ না জেনে যে বিপদে আছি।’
‘আচ্ছা, আমি কারণটা বলবো। তবে কথা দিতে হবে এ কথা কাউকে বলতে পারবেন না। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে। কথা দিচ্ছি আমি কাউকে এ কথা বলবো না।’
অনিন্দ্যের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। দ্যুতি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অনিন্দ্য মাথা নামিয়ে দৃষ্টি অবনত করে বলল,
‘খুব সংক্ষেপে বলছি। আমি ইন্টারপোলের একজন ডিটেকটিভ কর্মকর্তা। আপনাকে অনুসরণ করছি, বিশেষ একটি কারণে। আমার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আমি শুধু দায়িত্ব পালন করছি।’
অনিন্দ্য থামলো। দ্যুতি বলল,
‘দায়িত্ব পালন? আমাকে অনুসরণ করছেন কেন? আমি কি কোন অপরাধ করেছি? আমি কি কোন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত মনে করছেন আপনারা?’
দ্যুতির প্রশ্নের জবাবে চোখ তুলে তাকালো অনিন্দ্য। সে স্মিত হেসে বলল,
‘আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি আমি।’
‘স্ট্যাঞ্জ! আমি কে? কেন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন?’
দ্যুতির বিস্ময়ের জবাবে অনিন্দ্য প্রশ্ন করে,
‘মিস, দ্যুতি, আপনার কাছে একটা বিশেষ ওড়না ছিল না?’
‘হুম। সেটা হারিয়ে গেছে।’
‘তা জানি। ওটা আসলে হারায়নি। ওড়নাটা চুরি হয়েছিল আপনার বাসা থেকে।’
‘রিয়েলি? আপনি জানলেন কীভাবে?’
‘সংক্ষেপে বলছি। শুনুন। আপনার ওড়নাটায় যে ডায়মন্ড আছে, সেটা অর্থের মূল্য বিবেচনায় কতটা মূল্যবান-তা আমিও বলতে পারবো না। ওড়নাটা চুরি করে নিয়ে যায় এক বৃটিশ চোর। সে বৃটেনে ওড়নাসহ ডায়মন্ড বিক্রি করতে গিয়ে ইন্টারপোল পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হয়। ওড়নার মালিককে খুঁজতে গিয়ে আপনাকে বের করে ইন্টারপুল পুলিশ। সবকিছু হয় খুবই গোপনে। ওড়নাটির আপনি মালিক বলে বৃটিশ সরকার মনে করছে আপনি সাধারণ কেউ নন। রাজকন্যা তো হবেনই। বংশ পরস্পর এই ডায়মন্ড হাত বদল হয়ে তা আপনার কাছে ছিল। আমরা আপনার অতীত রেকর্ড খুঁজে তেমন কিছু না পেলেও আপনার গুরুত্ব কমেনি আমাদের কাছে। বৃটিশ সরকার আপনার নিরাপত্তা দিতে বিশেষভাবে আগ্রহী। ইন্টারপোলের একজন কর্মকর্তা হিসাবে আমার ওপর আপনার নিরাপত্তার ভার পড়েছে। তাই আমি অনেকদিন থেকে আপনাকে অনুসরণ করছি। আসলে অনুসরণ নয়, আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।’
কথাগুলো শুনে মাথার ভেতরটা ভনভন করে চক্কর দিল যেন। এর জবাবে কী বলবে দ্যুতি? এই গল্প এতোটা সিনেম্যাটিক যে, শুনতে ভালো লাগে। দ্যুতি কিছু বলতে পারলো না। ও হা করে তাকিয়ে আছে অনিন্দ্যর মুখের দিকে। অনিন্দ্য পরিবেশকে হালকা করতে বলল,
‘আপনাকে নিয়ে কিন্তু আমারও কৌতুহল আছে? ব্যক্তিগত আগ্রহ তো বেড়েই চলেছে।’
‘কীরকম?’
‘কৌতুহল হচ্ছে আপনি কীভাবে এমন কতগুলো মহামূল্যবান ডায়মন্ডের মালিক হয়েছেন। আবার ডায়মন্ডগুলো হারিয়ে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন?’
অনিন্দ্য থামলো। দ্যুতি বলল,
‘বললে বিশ্বাস করবেন না। ওড়নাটা আমাকে এক অতিশীপর বৃদ্ধা শুভেচ্ছা উপহার দিয়েছেলেন। আর আমি বিশ্বাস করিনি যে, ওড়নায় এমন মূল্যবান ডায়মন্ড থাকতে পারে। বৃদ্ধা বলেছিলেন। আমি সে কথার গুরুত্ব দিইনি। ওড়নাটা আমি অল্প কয়েকদিন কাঁধে ঝুলিয়েছিলাম। একদিন দেখি, বাসা থেকে ওড়নাটা নেই। আমি আর ওড়নাটি নিয়ে ভাবিনি।’
‘হুম।’
‘তা আমার প্রতি আপনার ব্যক্তিগত আগ্রহ কেন?’
‘ওটা আজ বলতে চাই না। ও সব কথা বলার মত পরিবেশ এখন নয়। যথাযথ সময় ও পরিবেশের সম্মিলন ঘটলে সেদিন ব্যক্তিগত আগ্রহের কথা আপনাকে বলবো।’
বলল অনিন্দ্য। তার কথায় একটু লজ্জা অনুভব করলো দ্যুতি। ও কিছু বলার জন্য চিন্তা করতে লাগলো, এ সময় অনিন্দ্য বলল,
‘ডায়মন্ডগুলোকে আপনার কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা উচিত ছিল।’
দ্যুতি বলল,
‘আপনার কথা শুনে আমি কী বলবো, বুঝতে পারছি না। এলিয়েন পরিচয়দানকারী বুড়ো যে এমন ভয়ানক রসিকতা করবেন, আমি কি জানতাম!’
‘রসিকতা!’
‘হ্যাঁ, রসিকতাই তো। ও মাই গড! এখন আমার কী হবে? কী হতে পারে বলুন তো?’
‘আপনি ওড়নাটা ফেরত পেলে অনেক কিছু হতে পারে। আপনার ভাগ্য বদলে যেতে পারে।’
‘তাহলে ফেরত দিন আমার ওড়না।’
‘বৃটিশ সরকার হয়তো ফেরত দেবে। তার আগে নিশ্চিত হতে হবে, এই ওড়না অর্থাৎ ডায়মন্ডের মালিক আপনি কিনা। আপনার বাসা থেকে ডায়মন্ডগুলো চুরি হয়েছে ঠিক, ডায়মন্ডের মালিক আপনি কিনা-এটার প্রমাণ চাই।’
দ্যুতি হতাশা প্রকাশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘আমার কাছে কোন প্রমাণ নেই। বৃটিশ সরকার এই ডায়মন্ড হয়তো আত্মসাত করে ফেলবে। আমার ভাগ্য বদলালো না। যাই হো, আপনাকে ধন্যবাদ তথ্যগুলো জানানোর জন্য।’
দ্যুতির কথায় মৃদু হাসলো অনিন্দ্য। সে বলল,
‘এখনই হতাশ হবেন না। আমি প্রকৃত ঘটনার অনুসন্ধান করছি। যদি আপনার কথার সত্যতা পাওয়া যায়, আমি আপনাকে হেল্প করতে পারবো।’
‘আমার জন্য আপনার এতো দরদ কেন?’
প্রশ্নটা করে ফেললো দ্যুতি। এই প্রশ্নে সেই ভূবন ভুলানো হাসি ফুটে উঠলো ডিটেকটিভ অনিন্দ্যের মুখে। সে বলল,
‘আপনার প্রতি ব্যক্তিগত আগ্রহ এই দরদ সৃষ্টি করেছে। এই সত্যটুকু স্বীকার করছি।’
অনিন্দ্যের কথায় দ্যুতি কেমন চমকে উঠলো। অনিন্দ্য যদি পুলিশ না হয়ে কবি হতো, এ কথার অর্থ একভাবে করে নিত দ্যুতি। বুড়ো ওকে বলেছিল, ‘অপেক্ষা করো। তার সঙ্গে তোমার দেখা হবে।’
এই অনিন্দ্য কেন কবি হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়নি? প্রশ্নটা ওর মনে ছড়িয়ে গেল দ্রুত। দ্যুতি আর কোন কথা বলল না। ওর ভেতরে আনন্দ মিশ্রিত কষ্টের একটা ঝড় উঠলো। ও অনিন্দ্যকে আর কিছু না বলে আকস্মিকভাবে হনহন করে হোটেল লবি থেকে বেরিয়ে গেল। ওর মনে হচ্ছিলো, অনিন্দ্যের সামনে ও কেঁদে ফেলবে। উথলে উঠা কান্না সামলাতেই ও বেরিয়ে এলো। অনিন্দ্য দাঁড়িয়ে রইলো নীরবে।
তিন.
লিলোয়ানো প্যারিস শহরের উপকণ্ঠে একটি শহর। এই শহরে শীতের রাত মানেই নিঝুম রাতের অবগুণ্ঠনে ঢাকা। সন্ধ্যার পরপরই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। শহরতলীর বাসিন্দারা সন্ধ্যার পর ডিনার শেষ করে একটু তাড়াতাড়ি বিছানায় চলে যান। রাত নটার পর খুব কম লোকই জেগে থাকেন। দ্যুতি ভেবেছিল ট্যাক্সি কল করে হোটেল থেকে ফিরবে। তা আর হলো না। অনিন্দ্যর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভাবাবেগে ও হনহন করে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ওর মনে হলো রাস্তায় ও সহজে ট্যাক্সি পাবে না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ট্যাক্সি পেয়ে যেতেও পারে। ও রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় চোখ রাখলো চলমান গাড়ির দিকে। ট্যাক্সি না পেলে বাস ধরে ওকে বাসায় ফিরতে হবে। ও এগিয়ে যাচ্ছিলো বাস স্টপিজের দিকে। রাতের অন্ধকার থেকেই যেন বেরিয়ে এলো আলোকবর্তিকা সেই বুড়ো। রাস্তার কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল যেন। মনে হচ্ছিলো দ্যুতির জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। দ্যুতিকে ভীষণ চমকে দিয়ে বুড়ো জিজ্ঞেস করলো,
‘অনুষ্ঠান থেকে এভাবে পালিয়ে এলে যে!’
‘আ-প-নি! সেই এলিয়েন না?’
এ কথা বলতে গিয়ে বিস্ময়ে দ্যুতি খানিকটা তোতলালো। বুড়োর মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছেনা। দ্যুতি বুড়োর মুখটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো। খুক্ খুক্ কাশি ঝেড়ে বুড়ো বলল,
‘তোমরা পৃথিবীর মানুষ আমাদের তাই তো বলো। এলিয়েন! নামটা মন্দ নয়।’
আজ ফের এলিয়েনের সঙ্গে দেখা হওয়াটা কেমন কাকতালীয় ব্যাপার মনে হচ্ছে দ্যুতির। এই বুড়োর সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হলো। এই বুড়ো ওকে ডায়মন্ডের ওড়নাটা দিয়েছিল এবং কিছুক্ষণ আগেই ও ইন্টারপোলের পুলিশ অফিসারের সঙ্গে ডায়মন্ড নিয়ে কথা বলেছে। দ্যুতি নিজের ভেতরের বিহবলতা সংযত করার চেষ্টা করছে। ও বলল,
‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো। আমার একটা প্রশ্ন আছে।’
‘জানি প্রশ্ন করবে। তোমার কাছে আমারও প্রশ্ন আছে। আমি প্রশ্ন করতেই তোমার সামনে দৃশ্যমান হয়েছি।’
‘তাই নাকি? বেশ, ভালো। আগে আমি প্রশ্ন করবো।’
‘করো। কী তোমার প্রশ্ন?’
‘আমার যদি শাপমোচন হয়েই থাকে, তবে সেই কবি কোথায়? তার দেখা কী করে পাবো?’
দ্যুতির কথায় মুচকি হাসলো বুড়ো। এমনভাবে ওর দিকে তাকালো যেন দ্যুতি এই প্রশ্নটা করবে, তা সে জানতো। দ্যুতি একটু লজ্জিত হলো প্রশ্নটা করে। বুড়ো বলল,
‘তোমাদের বাংলা ভাষায় একটা গানের লাইন হচ্ছে-হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ!
তোমার প্রশ্ন শুনে গানের কথাটা মনে এলো।’
‘মানে?’
প্রশ্ন করতে গিয়ে ভ্রু কুচকে গেল দ্যুতির। বুড়ো বলল,
‘মানে, বুঝোনি? তোমার চোখ অন্ধ। তাকে দেখেও চিনতে পারছো না।’
ভিড়মি খাবার যোগাড় হলো দ্যুতির। বুড়ো কী বলছে! কে সে? অনিন্দ্য! দ্যুতির বুকের ভেতর ধরাস করে উঠলো। বুড়োর কথা সত্যি হলে অনিন্দ্যের তাহলে পুনর্জন্ম হয়েছে? দ্যুতির ভেতরে কাঁপুনি বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে, ওর মাথা ঘুরছে। ঘোর লাগা অনুভূতিতে ও বলল,
‘অনিন্দ্য তো পুলিশ, কবি নয়!’
‘বোকা মেয়ে। ও আগের জন্মে কবি ছিল। এই জন্মে নাহয় পুলিশ। তাতে কি? ওর ভেতরে কবি সত্ত্বা আছে, কি নেই-তা তো তুমি জানো না।’
কথাটা বলে বুড়ো মিটিমিটি হাসতে লাগলো। দ্যুতি ঠিক কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছে না। প্রবল শিহরণে ওর চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। ওর কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কণ্ঠ থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না। বুড়ো বলল,
‘পেছনে তাকিয়ে দেখো, তোমার কবি আসছে!’
দ্যুতি চট করে পেছনে তাকালো। ও দেখলো সত্যিই অনিন্দ্য লম্বা লম্বা পা ফেলে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ওর ভালো লাগলো। ও ঘুরে তাকিয়ে দেখলো এলিয়েন নেই। আগের মতো আবারো মিলিয়ে গেছে। দ্যুতি এর জন্য আক্ষেপ করলো না। অনিন্দ্য ওর সামনে এসে শঙ্কিত কণ্ঠে বলল,
‘অনেকক্ষণ যাবত দেখছিলাম, আপনি এইখানে দাঁড়িয়ে আছেন! কেন?’
এর জবাবে কিছু না বলে ঘোর লাগা চোখে অনিন্দ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো দ্যুতি। অনিন্দ্য একটু অবাক হলো। ও বলল,
‘আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি? বাড়ি ফিরবেন কীভাবে?’
‘আমি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনার কি?’
কপট রাগের ঝাঁঝ তুলে দ্যুতি কথাটা বলেলও কণ্ঠে একরাশ অভিমান ফুটে উঠলো। অনিন্দ্য হচকিয়ে গেল। ও বলল,
‘আপনার নিরাপত্তার কথা ভাবছি, এই আর কি?’
‘আমার নিরাপত্তা নিয়ে ভাববার তুমি কে?’
দ্যুতির কণ্ঠে ‘তুমি’ সম্বোধন শুনে ভীষণ কেঁপে উঠলো অনিন্দ্য। ও থ’ হয়ে গেল। ওর কেন জানি ইচ্ছে হলো দ্যুতির দু’হাত নিজের দু’হাতের মুঠোয় তুলে নেবে। এটা কি শোভনীয়? দ্বিধা-সঙ্কোচ আর আনন্দে অনিন্দ্য ভাষা হারিয়ে ফেলল দ্যুতির সামনে। দ্যুতি এক পা এগিয়ে ওর খুব কাছাকাছি চলে আসলো। অনিন্দ্যের চোখের চোখ রেখে বলল,
‘আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে?’
‘দেবো।’
আবেশিত গলায় বলল অনিন্দ্য। দ্যুতি বলল,
‘আমি দায়িত্বান কোন পুলিশের সহযোগিতা চাই না।’
‘তাহলে?’
‘তোমার সহযোগিতা চাই, যে জীবনসঙ্গী হয়ে বাকিটা জীবনের পথচলায় পাশে থাকবে। থাকবে পাশে?’
মিষ্টি করে হাসলো অনিন্দ্য। ও বলল,
‘তোমার হাত দুটি ধরতে দেবে?’
‘ধরো, ছাড়বে না কিন্তু!’
‘না, ছাড়বো না। ছাড়ার জন্য হাত ধরছি না।’
এ কথা বলে অনিন্দ্য দ্যুতির দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় ভরে নিল। শীতের রাতের কুয়াশার চেয়ে অনেক অনেক অর্থপূর্ণ জলের দুটি ধারা দ্যুতির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো। এই জলধারার প্রতিটি বিন্দু বৃটেনের রাণীর মুকুটের ডায়মণ্ডের চেয়ে মূল্যবান-ভাবলো অনিন্দ্য।