- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
এক
এ-গাঁয়ের সবাই জানে হরিনাথের মেজো ছেলে ভোলানাথের মাথায় ছিট আছে। ও কখন কী বলে এর কোনো মানে নেই। ওর কোনো কথারই অর্থ দাঁড়ায় না। তাই ভোলানাথের কোনো কথার মূল্যও নেই কারও কাছে। অথচ ভোলানাথ কথা বলবে এমনভাবে যেন রাজ জ্যোতিষী। কথা বলার মধ্যে সবজান্তা ভাব থাকবে। আর যা বলবে, তাতে অকল্পনীয় বিষয় থাকবে বেশি। ভোলানাথকে যে গ্রামের লোকেরা পাত্তা দেয় না, ওটা ও নিজেও বুঝতে পারে। কিন্তু এ নিয়ে ওর মন খারাপ হয় না। কেউ ওকে পাত্তা না দিলেও ওর যা মনে আসে, তাই বলে দেয়। ওর মনে কথা চলে আসেÑ ও কখনও বলে দেয়, কখনও বলে না। আজও ওর মনের ভেতরে কথার ধূম্রজাল সৃষ্টি হচ্ছে। ভোলানাথ ধলেশ^রী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দখিনা হাওয়া হা-করে কয়েক দম গিলে নিল। নির্মল বায়ু সেবন করতে পারলে ও খুব উচ্ছ্বসিতবোধ করে। সুযোগ পেলেই ও নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে হা-মুখ করে হাওয়া খাবে। মাঝে মাঝে হুড়মুড় করে দমকা হাওয়া এসে গায়ে ঝাপটা দেয়। দমকা হাওয়া এলে মাঝে মাঝে একসঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ হাওয়া খেয়ে ফেলে ভোলানাথ। অন্যথায় এক গোলা, দু-গোলা বা তিন গোলা হাওয়া খাবে ও। এরপর মুখ বন্ধ করবে। মনে ফুরফুরে ভাব থাকলে ফের মুখ হা করবে। হাওয়া খেলে শরীরের ভেতরে অক্সিজেন লেবেল ভালোভাবে সচল থাকেÑ এটা ওর ধারণা। বায়ু নির্মল না হলে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। যেমনÑ শহরের হাওয়ায় শিসার পরিমাণ মিশ্রিত থাকে। যানবাহনের ধোঁয়া, কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশে থাকা শহুরে হাওয়া খাওয়ার চেয়ে, না খাওয়া উত্তমÑ এটা ভোলানাথ ভালোভাবে জানে। ও এ-কথাটা অনেকের কাছে অনেকবার বলার চেষ্টা করেছে; কিন্তু শ্রোতারা ওর কথা বিশ^াস করে না। কেউ মুখ টিপে হাসে, কেউ পাল্টা ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে। অধিকাংশ লোক ওকে এড়িয়ে যায়। তা যাক, ওর কথা বলা দরকার, ও বলে ফেলে। মানুষ ওর কথা গ্রহণ করছে না কেনÑ এটা নিয়ে ও ভাবে না। ওর কথাবার্তা নিয়ে গ্রামের লোকদের মধ্যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আচরণ দেখতে পায় ও। অধিকাংশজন ওর কথা শুনে মাথা ঘামায় না। যেমনÑ ও জানে ওর হাওয়া খাওয়া নিয়েও গ্রামের লোকেরা মাথা ঘামায় না। গ্রামের লোকদের ধারণাÑ ও যেমন হাওয়া খায়, কথাও বলে হাওয়াই বুজরুকির মতো! ভোলানাথের কথা যদি একটিও সত্য হতো, তাহলে আবদুল্লাহপুর গ্রামের মানুষরা এতদিনে ধনী হয়ে যেত। কোনো দরিদ্র মানুষ এ-গাঁয়ে থাকত না এবং নদীর ভাঙনে কোনো পরিবারকে ‘সর্বস্ব হারানো বেদনা’ নিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হতো না। এসব কথা কদাচ সমালোচনায় উঠে আসে হাট-বাজারে। হাটের দিন মানুষের কত গপ্পো! গপ্পের কী শেষ আছে? ওসব গপ্পে ভোলানাথের কথাও ওঠে বৈকি! নিন্দুকেরা ফোড়ন কেটে ভোলানাথের ভবিষ্যদ্বাণীকে অসার প্রমাণের চেষ্টা করে। গ্রামবাসী স্বীকার না করলেও ভোলানাথ জানে, আবদুল্লাহপুর গ্রামে গত পাঁচ বছরে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। আগে যা একেবারেই হতো না। এখন হচ্ছে এবং এমন দিন আসবে, রাতারাতি বদলে যাবে এই গ্রাম। বিগত পাঁচ বছরে উন্নতির দিকে তাকালে বলতে হবেÑ বেশ কিছু কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে। পাইকপাড়ার পুলিন্দারপাড় এলাকায় একটি মেয়েদের স্কুল খোলা হয়েছে, যা গ্রামের লোকদের অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল। গ্রামের অনাথ ছেলেদের জন্য তিনটি এতিমখানাসমেত মাদ্রাসা বেড়েছে। পালবাড়ির বিশাল বাগানে এখন আর লেবু, আম-কাঁঠালসহ নানারকম ফল মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। ফলগুলো হাট-বাজারে যায়। গ্রামে ‘পাণ্ডা ডাকাত’ দলের উপদ্রব কমেছে এবং থানা-পুলিশের টহল বেড়েছে। রাজবাড়ি দখলদার উঠিয়ে সরকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এটি জাদুঘর হতে পারে। অনেকের বাড়ি-উঠানে গোবর লেপ্টে জ¦ালানি হতো, তা বন্ধ হয়েছে। এখন অধিকাংশ বাড়িতে গ্যাসের চুলার ব্যবহার চলছে। দীঘলি থেকে আবদুল্লাহপুর লঞ্চঘাট পর্যন্ত টেম্পো চলাচল করছে। মানুষ গরুর গাড়ি ছেড়ে রিকশা ও টেম্পোতে চলাচল করছে। পাঁচ বছরে এই পরিবর্তন বা জনজীবনের উন্নতি, এর প্রশংসা সরকারকে দিতে হবে। গ্রামের উন্নতি হবেÑ এমন আগামবার্তা দিয়ে আসছিল ভোলানাথ। ওর কথাকে কেউ গ্রাহ্য করেনি, এমন কী গ্রামের উন্নতি হওয়ার পরও ভোলানাথের কথাগুলো আলোচনায় আনেনি কেউ। শুধু একজন ওর কথাকে গুরুত্ব দেন, তিনি গোয়ালপাড়ার ননী গোয়ালা। এই ননী গোয়ালাই ওর সম্পর্কে একটু সমঝে কথা বলে। এরও নেপথ্য কারণ রয়েছে। ভোলানাথের ক্ষমতার বিষয়ে একমাত্র তারই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। পাঁচ বছর আগে একদিন চৈত্র মাসের বিকালে নদীর পাড়ে ভোলানাথ যখন এই গ্রামের উন্নতি হবে বলে নানা কথা আওড়াচ্ছিল, তখন নদীর জলে গরু স্নান করাচ্ছিলেন ননী গোয়ালা। ভোলানাথ আপন মনে বিড়বিড় করে বলছিল,
‘রাজবাড়ি ছাড়তে হবে! তোদের পালাতে হবে! ফের বলছিলÑ স্কুল হবে, মাদ্রাসা হবে। রাস্তা পাকা হবে। ননী গোয়ালার হারানো গরু ফিরে আসবে!’
নির্মল বায়ু সেবনের মধ্য দিয়ে যে-কথা ভোলানাথের কণ্ঠ থেকে বের হচ্ছিল, তা শুনে উচ্ছ্বসিত হননি ননী গোয়ালা। তিনি যখন নদীতীর থেকে উঠছিলেন ভোলানাথ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে বলেছিল,
‘ননী গোয়ালা, তোমার গরু দুটো ফিরে আসবে! তুমি অত ভাবছো কেন গো?’
ননী গোপালের গোয়ালঘর থেকে দুটি গরু চুরি হয়েছিল পনেরো দিন আগে। তিনি এই গাঁ, ওই গাঁয়ে কম খোঁজ করেননি। আজ অবধি গরুর হদিস পাননি। ভোলানাথের কথা শুনে অবিশ^াসী মনটাও কেমন চনচনিয়ে উঠল। ননী গোয়ালা হা করে তাকিয়ে রইল ভোলানাথের মুখের দিকে। ভোলানাথ কথাটা যেন হাওয়াকে বলেছেÑ এমন ভাব করে নদীর দিকে চেয়ে আছে। ননী গোপালের আনন্দটা মিইয়ে গেল বটে, কৌতূহলও জাগল। তিনি ভোলানাথের উদ্দেশে বললেন,
‘হ্যাঁ রে, ভোলা! তুই কী বললি রে?’
ভোলানাথ মুখ ফিরিয়ে তাকালো ননী গোয়ালার দিকে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ও বলল,
‘জি¦, কী যেন মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে! কিছু মনে করো না গো কত্তা!’
‘না, না। মনে করব কী? তবে তোর কথাটা শুনে মনটা ভিজে গেছে রে ভোলা! কথাটা হয়তো সত্যি হবে না। তবে শুনতে বেজায় ভালো লেগেছে রে!’
কথাটা বলতে গিয়ে ননী গোয়ালার চোখে জল টলমল করে উঠল। গরু দুটি বেশ বাড়ন্ত হয়েছিল। প্রতিদিন তিন কেজি করে দুধ দিত। আহা, এক রাতেই গরু দুটি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল যেন! ননী গোয়ালার বুক ছাপিয়ে যখন একটা দীর্ঘশ^াস বের হচ্ছিল, ঠিক তখনই ফের ভোলানাথ অন্যমনষ্কভাবে বলল,
‘তোমার গরু ফিরে আসবে গো! ফিরে আসবেই! আমি দেখতে পাচ্ছি যে!’
ননী গোয়ালা দীর্ঘশ^াসটা আরও গম্ভীর হয়ে ছাড়ল। দীর্ঘশ^াস ছাড়লে বুকের ভেতরের কষ্ট ডানা ঝাপটাতে পারে। বুকের ভেতর চেপে থাকা ভারটা নেমে যায়। একটি গাভি ও বাছুরকে নদীর জলে স্নান শেষে বাড়ি ফিরছিল ননী গোয়ালা। বাড়ি ফেরার পথে ননী গোয়ালা তার হারিয়ে যাওয়া গরু দুটিকে দেখতে পেল। তার জীবনে এত বড় বিস্ময়কর ঘটনা আর কোনোদিন ঘটেনি! ননী গোয়ালা হঠাৎ দেখতে পেল গরু দুটি আমিন মোল্লার পতিত জমিতে ঢুকে মনের আনন্দে ঘাস খাচ্ছে। এটি কোনোভাবে সাধারণ ঘটনা বলে মনে হলো না ননী গোয়ালার। কিছুক্ষণ আগে ভোলানাথ ‘গরু ফিরে আসবে’ বলেছে। আর গরু দুটি সত্যিই ফিরে এলো! এ ঘটনাকে ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে মেনে নিলেন ননী গোয়ালা। সেদিন থেকেই ভোলানাথের প্রতি যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাব তার মনে ছিল, তা মিলিয়ে গেল। বরং ভোলানাথের প্রতি এক ধরনের ভক্তি উদয় হলো ননী গোয়ালার মনে। তিনটি গরু ও একটি বাছুর নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ননী গোয়ালা মনে মনে বিশ^াস করে নিলেন এই গ্রামে স্কুল-মাদ্রাসা-রাস্তা হবে। রাজবাড়িও দখলমুক্ত হবে একদিন। যদিও এই গ্রামে রাজবাড়ি বলতে পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে বিধ্বস্ত ভবনকে বোঝায়। এসব ভবনে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুগ যুগ ধরে দখল নিয়ে আছে। ভবনগুলোর মালিক নেই, উত্তরাধিকার নেই, এমন কী থাকলেও কারও রা নেই। ভোগ দখলকারীরাই ওগুলোর মালিক হয়ে গেছে। রাজবাড়িগুলোর আশপাশে ঝোপঝাড়ে গোখরা সাপের বাসও আছে। গরু খুঁজে পাওয়ার দিন বাজারে গিয়ে কাবুল মিয়ার দোকানে বসে ননী গোয়ালা যতই ভোলানাথের কথা তুলে গরু ফিরে পাওয়ার অবিশ^াস্য কথা বললÑ কারও হাসি-তামাশা ছাড়া বিশ^াসের ছিটাফোঁটাও অর্জন করতে পারল না। কাবুল মিয়ার চায়ের দোকানে সমবেতদের সরল তাচ্ছিল্য সহ্য করল সে। গ্রামে স্কুল-মাদ্রাসা হওয়ার কথা আর তুলল না। রাজবাড়ি দখলমুক্ত হবেÑ সে-কথাও চেপে গেল। কিন্তু ননী গোয়ালা দেখল পাঁচ বছরের মধ্যে এসবই হয়েছে গ্রামে। ভোলানাথের কথা যে সত্যি হয়, তিনি অন্তত এর গোপন সাক্ষী। ননী গোয়ালা প্রায় পাঁচ বছর আগে বাজারে কাবুল মিয়ার চায়ের দোকানে বসে ভোলানাথের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বললেও, সেদিন কেউ তার কথা আমলে নেয়নি। তবে ননী গোয়ালা সেদিন থেকে ভোলানাথের কথা আমলে নেয়।
ভোলানাথ নদীর পাড়ে হাওয়া খাচ্ছিল যখন তখন পেশকার বাড়ির মালেক মিয়া নৌকায় চড়ে নদীর ঘাটে এসে নামলেন। মালেক মিয়া ঢাকা শহরে থাকেন। শাক-সবজির ব্যবসা করেন তিনি। শ্যামবাজারে তার দুটি আড়ত আছে। তিনি মাঝে মাঝে গ্রামে আসেন। ঈদের সময় স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং বেশ কয়েকদিন থাকেন গ্রামে। মালেক মিয়ার হাতে একটি বড় ব্যাগ। ওজন বেশি বলে তিনি ব্যাগটি বহন করতে পারছেন না। তিনি চারপাশে তাকালেন। গ্রাম সুনশান থাকে না। নদীর ঘাটে ছেলে-ছোকরা থাকে; কিন্তু আজ তেমন কাউকে দেখছেন না তিনি। অনতি দূরে এক কিশোর বড়শি ফেলে বসেছিল নদীর পাড়ে। মালেক মিয়া গলা ছেড়ে ওকে ডাকলেন,
‘এই ছেলে, এদিকে একটু আসো তো! কী নাম তোর?’
তিনি ‘তুমি’ এবং ‘তুই’ উভয় সম্বোধন করলেন ছেলেটিকে। বড়শি তুলে নদীর পাড়ে রেখে কিশোর ছেলেটি এগিয়ে এলো। মালেক মিয়া খুশি হলেন। গ্রামে এখনও ছেলে-ছোকরারা বড়দের সম্মান করে। ডাকলে ঘাড় বাঁকিয়ে অন্যদিকে চলে যায় না বা মুরুব্বীদের ডাক শোনেনিÑ এমন ভাব করে অন্যদিকে মুখ সরিয়ে রাখে না। শহরে এসব আকসার হচ্ছে, জানেন তিনি। শহরে নতুন এক সমস্যা হচ্ছে, ছেলে-মেয়েদের কানে তার ঝুলে থাকে। টাচ বা আইফোনের সঙ্গে সারাক্ষণ ওরা কী যেন শোনে। কেউ ডাকলে শুনবে কি, গায়ের ওপর গাড়ি উঠে গেলেও ওদের হুঁশ আসে না। আজব রে বাবা! এমন কলিযুগ এলো যে, এসব কথা ভাবলে তিনি বিষম খান। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে তার। ছেলেটি তার সামনে এসে বলল,
‘আমারে ডাকতেছেন ক্যান? কী হইছে? চিল্লাচিল্লি করলে তো মাছ দূরে চইল্যা যায়!’
মালেক মিয়া আদুরে গলায় বললেন,
‘তোমার নাম কী? কোন বাড়ির পোলা তুই?’
‘আমার নাম পটু। আমাগো বাড়ির নাম নাই। তবে গ্রামের লোকেরা কাউয়া বাড়ি কয়।’
‘কাউয়া বাড়ি!’
‘ঐ যে জাউল্যাপাড়ার পর খালি মাঠটা পার হইলে যে আট-নয়টা বাড়ি আছে না, ওইখানে থাকি আমরা।’
‘ওহ, বুঝেছি। তোমার বাবার নাম কী, বল্ তো?’
‘কলিমুদ্দিন।’
মালেক মিয়া মনে মনে কলিমুদ্দিন কে ভাবলেন। কলিমুদ্দিনের মুখটা মনে করার চেষ্টা করলেন, মনে পড়ল না। আজকাল তিনি সবার মুখ মনে করতে পারেন না। তিনি অনেক বছর ধরে ঢাকা শহরে বাস করছেন বলে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্কটায় কেমন ছেদ পড়ে যাচ্ছে। কী করবেন, গ্রামে তো অর্থ উপার্জন বলতে চাষাবাদই একমাত্র ভরসা। কিন্তু শ্যামবাজারে আড়ত দিয়ে তিনি বেশ অর্থ কামাচ্ছেন। প্রথমে একটি আড়ত ছিল, এখন দুটি আড়ত তার। অনেকদিন ধরে শাক-সবজি বিক্রি করছেন, নতুন করে মাছও বিক্রি শুরু করেছেন। এ ব্যবসায় কাঁচা পয়সা আসছে! কাঁচা পয়সার শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরবেন কেনÑ এ প্রশ্ন নিজেই নিজেকে করেন এবং শহরে থাকার প্রতি নিজের ভেতরে স্বস্তি অনুভব করেন। মালেক মিয়া পটুর উদ্দেশে বললেন,
‘পটু আমার এই ব্যাগটা ধর। আমি পেশকার বাড়ির মালেক। ঢাকা শহরে থাকি। ব্যাগটা আমার সঙ্গে নিয়ে চল। তোকে একশ’ টাকা দেব।’
‘একশ’ টাকা!’
পটুর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ও দৌড়ে এসে ব্যাগটা নিজের কাঁধে তুলে নিল। ব্যাগের যা ওজন, এটা বহন করা ওর জন্য নস্যি। পেশকার বাড়ি খুব বেশি দূরেও নয়, ব্যাগটি পৌঁছে দিয়ে এলে একশ’ টাকা পাবেÑ এটা ভাবতেই পটুর মনটা আনন্দে নেচে উঠল। পটুর চোখে-মুখে উৎসাহ দেখে মালেক মিয়া পুলকিত হলেন। তিনি মনে মনে ঠিক করে নিলেন ছেলেটিকে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে অবাক করে দেবেন। গ্রামের কাউকে অবাক করে দিতে তার ভালো লাগে। গত অগ্রহায়ণ মাসে রহিমা খালার নাতনির বিয়ে হলো। ঐ সময়ে তিনি গ্রামে এসেছিলেন। রহিমা খালা এসে তার কাছে নাতনির বিয়ের জন্য পাঁচ হাজার টাকা সাহায্য চাইলেন। রহিমা খালা এক সময় বটতলায় পিঠা বানিয়ে বিক্রি করতেন। মালেক মিয়া তার হাতে তৈরি করা পিঠা কিনে অনেকদিন খেয়েছেন। চিতই পিঠা খেতেন সরষে বাটা দিয়ে। ভাঁপা, তেলেভাজা পিঠাও বিক্রি করতেন রহিমা খালা। তিনি ওসব পিঠা অনেকদিন খেয়েছেন। বৃদ্ধা মহিলার একমাত্র নাতনি জমিলার বিয়েতে সাহায্য পাবেনÑ এই আশা নিয়ে তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। ‘পাঁচ হাজার টাকা হলে নাতনির বিয়েটা ভালোভাবে হয়ে যাবে’Ñ এমন কথা বলে রহিমা খালা চোখের জল ফেলে দিলেন। এমন অশ্রুজলে বেদনার গভীরতা থাকে না, আশা-প্রত্যাশার প্রজ¦লন থাকে শুধু। আশা-প্রত্যাশা পূরণ না হলে দহনও সৃষ্টি হয় নাÑ জানে মালেক মিয়া। রহিমা খালা হয়তো ভাবছিলেন তাকে দু-এক হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করবেন তিনি। এমন ভাবনাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি রহিমা খালার হাতে দশ হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন,
‘দশ হাজার টাকা দিলাম, খালা। এরপরও যদি টাকার টান পড়ে, চলে আসবেন। আপনার হাতে তৈরি করা কত রকম পিঠা এক সময় খেয়েছি! ওসব দিন ভুলতে পারি না!’
রহিমা খালার চোখে যেন জলের স্রোত নেমে এসেছিল। এই জলেরও বেদনা ছিল না। তার চোখের জলে অপার আনন্দ আর গভীর বিস্ময় মিশে একাকার হয়েছিল। সেদিন রহিমা খালাকে অবাক করে দিয়ে মনে মনে বেশ পুলকিত হয়েছিলেন তিনি। আজ কিশোর পটুকে তিনি অবাক করে দেবেন, ভেবে নিলেন। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভোলানাথকে এবার দেখতে পেলেন তিনি। ভোলানাথ উদাসভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি উৎসাহ নিয়ে ভোলানাথকে ডাকলেন,
‘এই ভোলা, কী করছিস? অমনভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’
ভোলানাথের জবাব এলো। ও মালেক মিয়ার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
‘শহর থেকে ফিরলেন বুঝি, কর্তা?’
মালেক মিয়া পুলকিত হলেন। ভোলানাথকে বললেন,
‘হ্যাঁ রে, তোর বাবা কেমন আছে?’
‘তেমন ভালো নাই। ঘরে শুইয়াই থাকে।’
‘আহা রে, তিনি কী যে ভালো কাবাডি খেলতেন! চার-পাঁচজন ধরলেও তাকে আটকানো যেত না! এই লোকটি এখন রোগে-শোকে বিছানায় পড়ে আছেন! ভাবলে কেমন অবাক হতে হয়।’
‘তা তো ঠিক। শরীরে রোগবালাই হইলে গুরুত্ব দিতে হয়। আমার বাবা তো রোগবালাইরে পাত্তাই দিত না! তাই তো বিছানায় পড়ে আছে। ডায়াবেটিস বাড়ছে দিনদিন; কিন্তু সকালবেলায় রসগোল্লা না খাইলে বাবুর চলেই না! তাহলে বলেন কর্তা, রোগবালাই বাড়বো না তো, কমবো?’
‘এ-কথা তো ঠিক বলেছিস? বাবার যত্ন নিস। তোর বাবাকে বুঝাবি, রোগবালাই হলে খাবার-দাবার ছাড়তে হয়। স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়। ডায়াবেটিস হলে মিষ্টি খাওয়া একেবারেই চলবে না!’
কথাটা বলতে গিয়ে মালেক মিয়া যেন নিজেকেই সাবধান করলেন। তারও খাবারের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে। মিষ্টি না খেলে মনে হয়ে দিনটাই যেন মাটি হয়ে গেল। তিনি প্রতিদিন রাতে মিষ্টি ও দই খাবেন। মালেক মিয়ার তন্ময়তা ভেঙে দিয়ে ভোলানাথ বলল,
‘একটা কথা মনে এলো, কর্তা। বলব?’
‘বল্। কথা শুনতে সমস্যা কী?’
‘না, কথা শুনে আপনার মন খারাপ হবে; কিন্তু কথাটা বলা দরকার।’
‘আহা, বলে ফেল। কথাটা নিশ্চয় খুব গুরুত্বপূর্ণ?’
‘জি¦, কর্তা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা!’
‘তাহলে বলে ফেল।’
মালেক মিয়া ভোলানাথের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভোলানাথ অন্যমনষ্কভাবে বলল,
‘আপনার ছেলেটাকে সাবধানে রাখবেন, কর্তা!’
ভোলানাথের কথা শুনে এবার বিরক্ত হলেন মালেক মিয়া। তিনি ওর দিকে চোখ ছোট করে তাকালেন। ভোলানাথ অন্যমনষ্ক কণ্ঠে ফের বলল,
‘আপনার ছেলেটি দুষ্ট চক্রের নজরে পড়েছে! সাবধান!’
‘কী বলছিস তুই? মিলন তো থাকে ঢাকায়। তুই থাকিস গ্রামে। তুই কী করে ঢাকার খবর রাখিস?’
ভোলানাথের প্রতি রাগ করলেও মনের ভেতরে নিজের ছেলের জন্য আশঙ্কা তৈরি হলো। ভোলানাথ মুখ ঘুরিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। মন খারাপ করে বাড়ির অভিমুখে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটতে লাগলেন মালেক মিয়া। তার পেছনে ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে পটু। ভোলানাথ মালেক মিয়ার উদ্দেশে গলা উঁচু করে বলল,
‘সন্ধ্যার আগে শহরে ফিরে যান কর্তা! বিপদ আসবে, আবার কেটেও যাবে। তবে আপনি গ্রামে থেকে গেলে বিপদ ভয়ঙ্কর হয়ে যেতে পারে!’
হাঁটতে হাঁটতে মালেক মিয়া হাসলেন। তার ছেলে এখন পড়ছে ও-লেভেলে। ইংলিশ মিডিয়ামে লেখাপড়া করছে ও। ইংলিশ মিডিয়ামে লেখাপড়া করানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি এক সময় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবেন। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় ছেলেকে পড়তে পাঠাবেনÑ এটা তার স্বপ্ন। ছেলে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত। ওর আবার কী বিপদ হবে? ভোলানাথ অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে, এটা শুনেছেন তিনি। আজ তার সঙ্গেও বলল ও। তিনি বাড়ি পৌঁছানোর আগে পটুর উদ্দেশে বললেন,
‘ভোলানাথ যা বলে, তা কি সত্যি হয় রে?’
‘হে-হে-হে। ভোলা দা-র তো মাথায় ছিট আছে, জানেন না?’
‘সত্যিই ছিট আছে? না-কি গ্রামের লোকেরা ওর কথাকে পাত্তা না দিতে এ-কথা বলে?’
‘জানি না। আমি কী কইরা জানমু? তবে, ভোলা দা বড়শি ফেললে বড় বড় মাছ উইঠ্যা আসে! গজার, বোয়াল, মৃগেল, রুই, কাতলা, আরও কত মাছ! নদীর পাড়ে ভোলা দা মাছ ধরতে দাঁড়াইলে মাছেরা পানিতে কিলবিল করে, শুনছি! তারে আমি বড় বড় মাছ ধরতে দেখছিও!’
পটুর কথা শুনে কেমন চমক লাগে মালেক মিয়ার। ভোলানাথের মাথায় ছিট আছে কি নাÑ এই ভাবনা তার চিন্তার মধ্যে পেখম ছড়িয়ে নিল। তিনি মনে মনে বললেন, ‘কিছু কিছু মানুষের জীবন কত রহস্যময়!’ কথাটা বললেন বটে; কিন্তু কথাটা রহস্য হয়েই ফিরে এলো সন্ধ্যায়। ঢাকা থেকে তার স্ত্রী রাহেলার কান্নাজড়িত ফোন এলো। রাহেলা জানাল তার ছেলে মিলন বাসায় ফেরেনি। কে বা কারা বাড়ির দরজার সামনে পত্র রেখে গেছে। ওই পত্রে লেখা আছে মিলনকে অপহরণ করা হয়েছে। দশ লাখ টাকা মুক্তিপণ পেলে ওকে ছাড়া হবে। এই খবর পেয়ে মালেক মিয়ার বুকের পাঁজর ভেঙে আসতে চাইছিল। পুত্র মিলন তার কলিজার টুকরো। পুত্র অপহৃত হয়েছেÑ এমন সংবাদ তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো! ভোলানাথের কথাটা মালেক মিয়ার মনে পড়ল। কী আশ্চর্য! ভোলানাথের মাথায় কি সত্যিই ছিট আছে? না-কি ওর মধ্যে অশরীরী আত্মা আছে? ও কি জাদু জানে? আধ্যাত্মিক শক্তি আছে ওর? প্রশ্ন মনে বুঁদবুঁদ করে উঠল। সন্ধ্যা মাথায় নিয়ে মালেক মিয়া গ্রাম থেকে ঢাকার দিকে রওনা দিলেন। পথে যেতে যেতে মনে মনে ভোলানাথের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘যদি মিলন ফিরে আসে, ওর কিছু না হোক, ভোলানাথ তোকে গ্রামে একটা আশ্রম খুলে দেব। আশ্রমে বসে তুই মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দিবি!’
দুই
চোরমর্দন, নামটা বেজায়। একটা সময় এই নামের জৌলুস ছিল। নামকরণের স্বার্থকতাও ছিল। এখন নামটাই যা আছে, চোরদের দিন ফুরিয়েছে। চোরমর্দন গ্রামে একটা সময় ডাকসাইটে চোরদের বাস ছিল। চোরেরা মাঠে সারিবদ্ধ হয়ে গায়ে সরষের তেল মাখত প্রতিদিন। গায়ে তেল মেখে রাতে চুরি করতে বের হতো। এ-কারণে গ্রামটির নাম হয়েছে চোরমর্দন। তবে আরেকটি ঘটনার কথাও জনশ্রুতি আছে। তা হলো, একটা সময় এই গ্রামে চোরের উপদ্রব বেড়ে গিয়েছিল। ওই সময়ে ঘরে ঘরে চুরি হচ্ছিল। গ্রামবাসী চোরের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে চোর ধরতে নামল। তারা পালাক্রমে রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিল। এক রাতে চোর ধরা পড়ল। চোরের প্রতি গ্রামবাসী ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিল। তারা চোরের সারা গায়ে তেল মেখে উত্তম-মধ্যম দিয়েছিল। তেলমর্দন থেকে গ্রামের নাম হয়ে যায় চোরমর্দন। চোরমর্দন গ্রামের বয়স্ক মানুষ হচ্ছেন নিতাই হাওলাদার। বৃদ্ধ থেকে পৌঢ় হয়েছেন তিনি। তবে এখনও বাড়ির উঠানে বসে হুঁকা টানেন। হাওলাদার বাড়ির অনেক ইতিহাস তার পেটে। কাউকে কাছে পেলেই হাওলাদার বাড়ির গল্প জুড়ে দেবেন বয়স্ক কাঁপাকণ্ঠে। তার বয়স কত জিজ্ঞেস করলে সঠিক বয়স বলতে পারেন না। তবে একটু ভেবে বলবেন,
‘তা আর কত হলো, ধরো, চার কুড়ি তো হয়েছে। গত চৈত্র মাসে চার কুড়ি পার করেছি। এখন আরও কয়েস মাস পেরুলো, আর কী!’
এক বছর আগেও তিনি চার কুড়ি বয়সের কথা বলেছেন। এখনও কেউ জিজ্ঞেস করলে চার কুড়ি বয়সের কথাই বলেন। গ্রামের চেয়ারম্যান মমিনুল হক অবশ্য ভোটার আইডি দেখে তার বয়স হিসাব করে দেখেছেন একশ’ তিন বছরে পড়েছেন নিতাই হাওলাদার। একশ’ তিন বছর বয়সেও তিনি হাঁটতে পারছেন। বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যাননি। এই বয়সে যারা বেঁচে থাকেন, তাদের দিন-রাত বিছানায় শুয়ে-বসে থাকতে হয়। নিতাই হাওলাদারের বরাত ভালো যে তিনি বাড়ির আশপাশে প্রায় প্রতিদিন হাঁটছেন। তামাকও টানছেন মাঝে মাঝে। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা শরীরটা বেঁকে গেছে। কুঁজো হয়ে হাঁটতে হয় তাকে। তো, তিনি হাঁটতে পারছেন তো! চোখেও যে কম দেখেন, তা নয়। দু-সপ্তাহ আগে মধু নিতাই হাওলাদারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দড়িতে ঝুলন্ত একটা গামছা সরিয়ে কেটে পড়তে চেয়েছিলেন। বুড়ো চিৎকার করে উঠলেন,
‘কে রে, তুই! দড়ি থেকে কী নিয়ে গেলি? চুরি করলি কেউ? ও নাতবৌ, শুনছো?’
নিতাই হাওলাদারের কাঁপাকণ্ঠ ছড়িয়ে পড়তেই তার নাতবৌ অনিতা ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠল,
‘চোর! চোর! কে আছিস, চোরকে ধর!’
মধু দ্রুত গামছাটা দড়িতে রেখে দিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
‘কেউ নেই এখানে! চোর কোত্থেকে আসবে, বৌদি?’
অনিতা হচ্ছে নিতাই হাওলাদের নাতি মানিক হাওলাদারের স্ত্রী। বড্ড রূপসি। মানিক হাওলাদার অনিতাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও থেকে। পরীর মতো সুন্দরী বলে অনিতার রূপের কথা গ্রামে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। অনিতা ঘর থেকে বের হয়ে মধুকে দেখে বলল,
‘ঠাকুরপো, তুমি এখানে কী করো?’
‘আমি এখান দিয়ে যাইতেছিলাম। তোমাগো উঠোনে একটা পাগলা কুকুর ঢুইক্যা পড়ছিল বইল্যা ওইটাকে তাড়াইতে আইছিলাম। উঠোনে আইলাম, আর দাদুর প্রলাপ কানে আইলো!’
কথাটা বলে কোনোভাবে লজ্জা থেকে রেহাই পেল মধু। ও হনহন করে নিতাই হাওলাদারের বাড়ির উঠান থেকে বেরিয়ে এলো। মনে মনে ভাবল, ভাগ্যিস, ‘অনিতা বৌদি ওকে দেখে সন্দেহ করেনি!’ আজকাল অবশ্য মধুকে দেখে ‘চোর’ বলে কেউ সন্দেহ করে না। এই গ্রামে চুরি হয়Ñ এমন কথা মানুষ যেন ভুলতে বসেছে। গ্রামের চোরমর্দন নামটা বদলে ফেলার সময় এসেছেÑ কথাটা প্রায়ই ভাবে মধু। কিন্তু এ-কথাটা কে শুনবে আর কে বা নামটা বদলে দেবে?
পদ্মা নদীর পাড়ে বিক্রমপুর এলাকায় চোরমর্দন গ্রাম। চোরদের নানা কীর্তির কারণে গাঁয়ের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এই গ্রামের চোরেরা চুরিবিদ্যার নানা কসরত জানতেন। আশপাশের গাঁ-গঞ্জে তাদের নিয়ে কতরকম গল্প হতো। নানা গল্প থেকেই তো গ্রামের নাম হয়েছিল চোরমর্দন। লোকমুখে চুরির নানা গল্প রটে গ্রামটির নামকরণ কবে হয়েছিল, এ-কথা এখন কেউ বলতে পারবে না। এই গ্রামে চোরদের শেষ বংশধর হচ্ছে মধু। ভারতবর্ষে যেমন মোগলদের পতন হয়েছে, নবাবী বা জমিদারি পতন হয়েছে, চোরমর্দন গ্রামের চোরদের কয়েক পুরুষের কর্মযজ্ঞের পতনও হয়েছে। এখন শুধু আছে পূর্ব-পুরুষদের চুরিবিদ্যার গৌরবগাঁথাÑ এ-কথা মাঝে মাঝে ভাবে মধু। গ্রামে অনেকে আড়ালে ওকে ‘মধু চোরা’ বলেই ডাকে। তবে এ বিদ্যায় ওর লবডঙ্কা! মধু জানে এখন চোরদের আর তেমন দিনকাল নেই। চুরি করার কাজ সে অনেক আগেই ছেড়েছে। তাও এক যুগ তো হবে। আজকাল কি চুরিবিদ্যায় পেট ভরে? চুরি করাও অসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে ঘরে এখন আজব এক ফোন এসে গেছে। ফোনের সঙ্গে ক্যামেরা। মানুষগুলো ফোনে কথার বলার চেয়ে ক্যামেরায় ছবি তোলার কাজই বেশি করে। এই তো সেদিন ও দেখল কামার বাড়ির নন্দিনী পুকুর ঘাটে বসে থালাবাসন মাজতে মাজতে হাতের ফোন দিয়ে কেমন করে যেন ছবি তুলছে। থালাবাসন ধোয়ার সময় ছবি তোলার কথা ও জীবনে শোনেনি বা দেখেওনি। এখন দেখতে হচ্ছে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, জমিতে বসে নিড়ানি দেওয়া, লগি দিয়ে নৌকা চালানো, গাছে উঠে ডাব পাড়া, উঠানে মুরগি ধরা বা পাটক্ষেতের আইলে পেচ্ছাব করার ছবিও তুলছে মানুষ। মানুষের কী যে আজব শখ! ঘরে ঘরে এখন ক্যামেরার দাপাদাপি! মা ভাত খাওয়াচ্ছে সন্তানের ছবি তোলো, বাবা পাঞ্জাবি পরছে ছবি তোলো, মা রান্না করছে ছবি তোলো, ভাই বই পড়ছে ছবি তোলো, বোন উঠানে কুতকুত খেলছে ছবি তোলোÑ আরও কত কী! এমনও হচ্ছে ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিচ্ছে, ওটারও ছবি তুলছে! এত ছবি দিয়ে মানুষগুলো কী করেÑ জানে না মধু চোরা। ও শুধু বুঝতে পারে ঘরে ঘরে ক্যামেরার যে তেলেসমাতি চলছে, এখন চুরি করা শুধু কঠিন কাজই নয়, দুঃসাধ্যও বটে! চুরি করতে গেলে কারও চোখ এড়ালেও কোনো-না-কোনো ক্যামেরায় ধরা পড়বে চোর। ফলে চোরকে শনাক্ত করা এখন নস্যি। চোরদের আর সেদিন নেই! এখন আবার ধরা পড়লে উত্তম-মধ্যম দিয়েও শেষ হয় না। এটারও ছবি তুলবে। চোর ধরেছে ছবি তোলো। চোরকে পেটাচ্ছে ছবি তোলো। চোরকে বেঁধে রেখেছে ছবি তোলো। চোরকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে ছবি তোলো। এসব ছবি আবার কীভাবে যেন এক কান থেকে পাঁচ কান হয়ে যাচ্ছে! এই গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম বা এই দেশ থেকে আরেক দেশেও ছবি চলে যাচ্ছে! কী বিচ্ছিরি কাণ্ড! এমন কলিযুগে কি আর ‘চুরিবিদ্যা’ টিকে থাকে? না চুরি করার জো আছে! না চুরি করে ধরা পড়লে রক্ষা আছে! আজকাল চুরি করার চেষ্টা মানে নির্ঘাত এলাহী কেলেঙ্কারির মধ্যে পড়া নিশ্চিত। এসব কথাই যখন মধুর মনে পুরোদিন হতাশার জাল বুনছিল। সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে শিমুলিয়া গ্রামের তরাক সরকার শহর থেকে চারজন বিদেশি সাহেব নিয়ে ওর সামনে হাজির হলেন। ঘটনাটি যেমন আকস্মিক তেমন গুরুত্বপূর্ণও। বিদেশি লোকদের সামনে তরাক সরকার ওকে একটি চোরের দল গড়ার প্রস্তাব করলেন। তরাক সরকারের কথা শুনে মধু যেন আকাশ থেকেই পড়লেন। তরাক সরকার মধুকে ঝোপের আড়ালে নিয়ে বললেন,
‘শোন, মধু। জীবনে এমন সুযোগ আর আসবে না। তোকে প্রস্তাবটা দিচ্ছি। তোকে একটা চোরের দল গড়তে হবে। কাজটা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি, বুঝলি!’
‘চোরের দল গড়তে হইব! এইকি চাট্টিখানি কথা, কত্তা! আপনি কি পাগল হইছেন? এটা দুবাই পাইছেন?’
অবাক হয়ে কথাটা বলে ফেললেন মধু। তরাক সরকার শুষ্ক হাসি হাসলেন। তিনি বললেন,
‘মধু, চেষ্টা করে দেখতে পারিস। আর যদি দল গঠন না করতে পারিস, তুই একা আমাদের জন্য কাজ করতে থাক। অনেক টাকা পাবি!’
তরাক সরকারের কথায় মধু ছোট্ট করে হেসে বললেন,
‘তা কাজটা কী?’
‘আমাদের কাজ হচ্ছে, পরিত্যক্ত রাজবাড়ির গুপ্তধন চুরি করা। তুই সঙ্গে থাকবি। চোরের দল বানাতে পারলে, ওরাও সঙ্গে থাকবে। তোর জন্য তো এটা কোনো শক্ত কাজ না।’
‘কিন্তু…!’
‘রাজবাড়ির গুপ্তধন চুরি করতে পারলে একটা ‘হৈ-হৈ, রৈ-রৈ’ ব্যাপার ঘটে যাবে, চারদিকে সাড়া পড়ে যাবে! এই চুরিতে সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষতি নেই। ভেবে দেখ, কাজটা করতে পারলে তোরও কত নাম হবে!’
বললেন তরাক সরকার। মধু নিজের মাথার চুল চুলকে বললেন,
‘তা কথাটা মন্দ কন নাই। কিন্তু রাজবাড়িতে কি গুপ্তধন আছে? কোনটাতে আছে, বলেন তো?’
‘ওসব ধীরে ধীরে তোকে বলব। আগে কাজে নাম।’
‘ঠিক আছে, কত্তা। চুরি করা তো আমার পেশাই ছিল। দিনকাল ভালো না, তাই…!’
কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে কথাটা বললেন মধু। তরাক সরকার বললেন,
‘মধু, রাজবাড়ির গুপ্তধন উদ্ধার করছি আমরা। এটাকে চুরি বলবি না! শোন, গুপ্তধন উদ্ধার করে আমরা ভাগ-বণ্টন করে নেব। এমন কাজের সম্মানও আছে। বুঝলি?’
তরাক সরকারের কথার কী অর্থ, এটা নিয়ে মধু ভাবলেন না। তরাক সরকার যা-ই বলুক, মধুর মনে হচ্ছিল এটা চুরি। সাধারণ চুরির ঘটনা নয়, চুরির মহাযজ্ঞ! কিন্তু এ-কথাটা তরাক সরকারকে মধু বললেন না। তবে মধু বুঝতে পারছেন না পরিত্যক্ত রাজবাড়িতে ভগ্ন-চূর্ণ ভবনের কোথায় গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। আর যদি থাকেও এমন বড় ধরনের চুরির কাজে ওকে কেন তারা দলে ভিড়াতে চাইছে। মধু এ অবধি হাড়ি-পাতিল, শাবল, বদনা, মুরগি, গাছের ফল চুরি করেছে। তাও বারো বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ বারো বছরে আর চুরি করেনি মধু। বলা যায় চুরি করতে পারেনি। যে বিদ্যাটা শিখেছিল তা এখন ভুলতে বসেছে মধু। আর হঠাৎ করে শহর থেকে ফিরে তরাক সরকার ওকে এই চুরির কাজে সঙ্গে থাকতে বলছেন কেনÑ মধু ভাবনায় পড়ে গেলেন।
মধু সেই শিশু বয়সে চুরিবিদ্যাটা শিখে নিয়েছিলেন ওর পিতার কাছ থেকে। কিন্তু বিদ্যেটা ভালো রপ্ত করতে পারেননি মধু। ওর পিতা যদু চোরের খুব নামডাকও ছিল এই তল্লাটে। কারও বাড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে তার স্বর্গীয় পিতা ঘরের সোনাদানাও না-কি হাতিয়ে নিতে পারতেন। মধু একবার এক কিশোরীর কান থেকে সোনার একটি দুল চুরি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু দুলটি বেচার আগেই ধরা পড়ে গিয়েছিলেন ও। রামধোলাই খেয়ে কানের দুল ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল ওকে। চুরির মোটাদাগের অভিজ্ঞতা বলতে ঐটুকুই! এ অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজবাড়ির গুপ্তধন কীভাবে চুরি করবে, ভেবে পায় না মধু। তরাক সরকার কেন ওর মতো ছেঁচড়া ও নিষ্প্রভ চোরের শরণাপন্ন হলেন সেটি ভেবে ওর হাসি পাচ্ছে। হাসিটা চেপে রাখলেন মধু। শহরের লোকগুলোর সামনে মধু হাসতে চান না। শহুরে লোকগুলো তাহলে কী ভাববে, কে জানে!
তরাক সরকার ওদের গ্রামের ছেলে। এক যুগ আগে দুবাই চলে গিয়েছিলেন। চার বা পাঁচ বছর পর যখন গ্রামে ফিরলেন, সে কী নায়কোচিত অবস্থা তার! হাতে সিকো-ফাইভ ঘড়ি, চোখে রোদচশমা, পায়ে কালো রঙের জুতা, গায়ে প্যান্ট-শার্ট। কখনও শার্টের ওপর কোট চাপিয়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামগঞ্জের দোকানে। তার শরীর থেকে মিষ্টি একটা গন্ধও ছড়াত। গ্রামের মানুষদের মুখে মুখে তরাক সরকারের প্রশংসা আর বিস্ময় ছড়িয়ে পড়েছিল। তরাক সরকারের সাহেবী ভাব দেখে দুবাইয়ে কীভাবে যাওয়া যায়Ñ এমন একটা জল্পনাকল্পনা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েকদিনের মধ্যে যুবকরা তরাক সরকারের পেছনে ঘুরতে লাগল। তরাক সরকার যেখানে যায়, স্বপ্নবিলাসী যুবকরা তার পেছনে যায়। মাস দুয়েক পর মধু জানতে পেরেছিলেন, বেশ কয়েকজন যুবকের পরিবার তাদের সন্তানদের দুবাই পাঠাতে অর্থ তুলে দিয়েছিল তরাক সরকারের হাতে। প্রথম দফায় চারজন যুবককে দুবাই নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর আর কাউকে নেয়নি। কিন্তু বেশ কয়েকটি পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছিলেন। প্রায় ছয় বছর পর তরাক সরকার গ্রামে এলেন। সে গ্রামে এলেও প্রকাশ্যে তাকে দেখা যাচ্ছে না। কয়েকদিন রাতের বেলায় এলেন মধুর বাড়িতে। ওর সঙ্গে রাজবাড়ির গুপ্তধন চুরি বিষয়টি আলোচনা করেছে। আজ রাতে তরাক সরকার শহর থেকে তার চারজন সঙ্গী নিয়ে এসেছেন। চারজনই চীনা নাগরিক বলে মনে হচ্ছে মধুর। অন্য কোনো দেশের নাগরিকও হতে পারে। লোকগুলোর চোখ ছোট, মাথায় ঠাসা চুল। এই লোকগুলো রাতের বেলায় কেন ওর কাছে নিয়ে এলেনÑ এটা ভেবে মধু কূলকিনারা পাচ্ছেন না। মধু মনে মনে ভাবছিলেন, দেশ থেকে কি চোর বিশারদরা বিলীন হয়ে যাচ্ছে? এমন কথা মানাও যাবে না। মধু তো শুনেছেন, শহরে অনেক স্মার্ট ও শিক্ষিত চোর গিজগিজ করছে। ঐসব চোরের কত যে এলেম! লাখো-কোটি টাকা চোখের নিমিষে হাতিয়ে নিতে পারে। তাদের কারও কারও কাছে কত টাকা আছে, খোদ নিজেরাও না-কি বলতে পারে না! শহরের ঐসব চোর বড় বড় গাড়িতে চড়ে বেড়ায়, শরীরে স্যুট-টাই থাকে, আর কেউ কেউ টাকার পাহাড় গড়ে তা অন্য দেশেও সরিয়ে ফেলে। অথচ অন্য দেশ থেকে চারজন বিশিষ্ট লোক তার কাছে কেন এসেছেÑ এ এক মহা প্রশ্ন নয় কি? মনে মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মধু লক্ষ করলেন, শহর থেকে আসা চারজনের মধ্যে একজন চোখে সোনালি রঙের ফ্রেমের চশমা পরে আছে। তার চুলগুলোও সোনালি রঙের। গায়ের রং দুধে-আলতা মেশানো। চোখের দৃষ্টি কেমন গভীর ও ধারাল। মধুর উদ্দেশে এবার সোনালি চুলের লোকটি বাংলায় বলল,
‘মি. মধু, আমাদের সঙ্গে কাজ করলে অনেক টাকা পাবে। তুমি রাতারাতি ধনী হয়ে যাবে। তুমি ভাবতে পারবে না কত টাকা তোমাকে আমরা দেব।’
কথাগুলো বাংলায় বললেও কেমন জানি অদ্ভুত শোনাল। বিদেশিরা বাংলায় বললে যেমন লাগে। বাংলায় ওর সঙ্গে কথা বলল বলে লোকটির প্রতি মধুর কী যে শ্রদ্ধা উদয় হলো! লোকটি ওকে ‘মি.’ বলে সম্বোধন করায় মধু ভীষণ বিগলিত হয়ে গেল। ওর মতো নিতান্ত গরিব লোককে এমন বিদেশি সাহেব ‘মি.’ বলেছে। জীবনে এর চেয়ে বড় আশ্চর্যের ঘটনা আর কী হতে পারে? মধু খুশি গলায় বলে ফেললেন,
‘আমি থাকব আপনাদের দলে। আপনারা আমাকে এত মান্যগন্যি করছেন, তো থাকব না কেন?’
চার বিদেশির মুখে হাসি ফুটল। তরাক সরকারও মøান হাসলেন। তিনি মধুকে বললেন,
‘তা হলে তোর সঙ্গে কিছু কাজের কথা সেরে নিই। কী বলিস?’
‘বলেন। কথা শুনতে দোষের কী?’
গদগদভাবে বললেন মধু। তরাক সরকার বললেন,
‘আমরা গোপনে তথ্য উদ্ধার করেছি যে, রাজা লক্ষণ সেন থেকে বল্লভ সেনের গোপন স্বর্ণালঙ্কারের অনেকগুলো সিন্ধুক একটি রাজবাড়ির মাটির নিচে অনেক বছর ধরে পড়ে আছে। টঙ্গিবাড়ির কোথাও, কোনো গ্রামে আছে। আবদুল্লাপুরের কোথাও আছে হয়তো। ওই গুপ্তধন খুঁজতে হবে!’
তরাক সরকার কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে মধু বললেন,
‘হায় ভগবান, বলেন কী! এমন কথা তো জন্মেও শুনি নাই!’
‘তুই শুনবে কী করে? তুই তো লক্ষণ সেনের বংশধর না!’
‘তা ঠিক।’
‘এবার শোন, আমি তোকে কিছু এলাকার কথা বলব। আপাতত তুই ঐ এলাকায় ঘুরে বেড়াবি আর নজর রাখবি।’
বললেন তরাক সরকার। জবাবে মধু বললেন,
‘এটা তো সহজ কাজ!’
‘হ্যাঁ, সহজ কাজ। এরপর আরও কাজ আছে। ওগুলোর কথা পরে বলব।’
‘বুঝলাম না। আর কী কাজ?’
‘এই ধর, পুরনো রাজবাড়ির ভিতরে যাবি। খানাখন্দ করবি। আমরাও করব।’
‘মানে মাটি খুঁড়তে হবে?’
মধুর প্রশ্ন। তরাক সরকার জবাবে বললেন,
‘হ্যাঁ। কাজটা আমরাই করব। তুই শুধু সঙ্গে থাকবি।’
এ-কথায় বিদেশি লোকগুলোর দিকে তাকালো মধু। ও দৃষ্টি বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে বিদেশি এই লোকগুলো মাটি খনন করতে পারবে কি? মাটি খনন করা এত সহজ কাজ? মধুর চোখের দৃষ্টি যেন পড়তে পারল তরাক সরকার। তিনি বললেন,
‘শোন, মাটি খনন নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমরা তা করব। আমাদের কাছে অত্যাধুনিক মেশিন আছে। মেশিন দিয়ে আমরা অনেক কিছু খুব সহজেই খনন করতে পারব।’
‘বলেন কী! কী জিনিস?’
‘সেটি তুই কাজের সময় দেখতে পাবি। এখন নাম বললে চিনতে পারবি না। জীবনে তো কোদাল, ছোরা, দাও, হাতুড়ি ছাড়া আর তেমন কিছু দেখিসনি!’
‘তা কত্তা ঠিক কইছেন। আগে তো গরু আর লাঙল দিয়ে ক্ষেতে মাটির নিড়ানি দেখতাম। এখন দেখি ট্রাক্টর। কত বড় মেশিনের গাড়ি! কত অল্প সময়ে ক্ষেতের মাটি ফলানো হইয়া যায়!’
‘এই তো বুঝতে পারছিস! ওইরকমই ধর। আমরা মাটি খনন করব মেশিন দিয়ে। আরও আছেÑ গুপ্তধন খুঁজে বের করতেও মেশিন আছে। ঐ মেশিন আমাদের সংকেত দিয়ে বুঝিয়ে দেবে কোথায় গুপ্তধন আছে। বুঝলি?’
‘ও, ভগবান! এ কেমন মেশিন কত্তা? আহা, এমন একটা মেশিন পাইলে চুরিবিদ্যাটার সম্মান ফিরাইয়া আনতে পারতাম!’
বিস্ময় আর আনন্দের মিশ্রণে মধু একাকার। তরাক সরকার খুশি হলেন। তিনি বললেন,
‘ঠিক আছে, তুই আমাদের দলের সঙ্গে বিশ^স্ত হয়ে কাজ করতে থাক, আমরা টাকা তো দেবই, একটা মেশিনও দিয়ে যাব তোকে। এবার হলো?’
মধু মনে মনে বললেনÑ ‘ভাগ্যটা কি আজ ছাপ্পর ফাইরা আইছে!’ ও ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে আছে তরাক সরকারের মুখের দিকে। তরাক সরকার কথা বাড়ালেন না আর। তিনি একটা থলে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
‘এখানে পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। তোর জন্য এই সাহেবরা এনেছেন। এটা কাজের শুরু। নজরানা হিসেবে নে। কাজ না করলেও এই টাকা ফেরত দিতে হবে না। তবে কাজ করলে এর চেয়ে বেশি টাকা পাবি। কাজ হয়ে গেলে এমন টাকা পাবি, এই গ্রামে দশতলা ভবন বানিয়ে থাকতে পারবি। অথবা আবদুল্লাপুরের পালবাড়ির মতো চার-পাঁচ বিঘা জমির উপর আলিশান বাড়ি বানিয়ে থাকতে পারবি। বাকি জীবন কাজ করে খেতে হবে না। চুরি তো করতেই হবে না, চাইলে কয়েক বছর পর গ্রামের মেম্বার বা চেয়ারম্যানও হয়ে যেতে পাারবি!’
তরাক সরকারের কথাগুলো শুনতে এত ভালো লাগছিল মধুর, ওর মনে হচ্ছিল স্বর্গের মধ্যে ও বসে আছে আর বিধাতা ওর প্রশংসা করছেন। একজন মানুষের সামাজিক জীবনের মানদণ্ডে যে স্বপ্ন পেখম ছড়ায় অসম্ভবের দেয়াল ডিঙিয়ে, এর চেয়ে সীমারেখা ভাঙা আরও অকল্পনীয় স্বপ্ন যখন আচ্ছন্ন করে, তখন ঐ মানুষটার ভেতরে তুমুল বিহ্বলতা ছেয়ে যায়। এ-মুহূর্তে মধু তুমুল বিহ্বলতায় ডুবে যাচ্ছে। ওর সামনে যারা আছেন, তাদের মনে হচ্ছে দেবদূত।
দেবদূতরা কথা না বাড়িয়ে হতবিহ্বল মধুর হাতে টাকার থলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। তারা জানেন, টাকার যে শক্তি, ঐ শক্তিকে উপেক্ষা করার মতো শক্তি বা ব্যক্তিত্ব দরিদ্র মধুর নেই। তারা রাতের আঁধারের সঙ্গে মিলিয়ে গেলেন দ্রুত। মধু থ’ হয়ে বসে রইলেন আরও কিছুক্ষণ। চোরমর্দন গ্রামে অনেকদিন পর অন্যরকম একটি রাত জমে উঠল যেন। এ-রাতটি অলঙ্কৃত হলো বিদেশি চোরদের পদভারে। মধু এটা ভেবে আরও ঘোরের মধ্যে ডুবে গেল।
তিন
লোকটিকে বালিগাঁও বাজারে প্রথম দেখেছে রাজন। লোকটি সেদিন অদ্ভুত পোশাক পরেছিলেন। আফ্রিকান মানুষ যেমন রঙিন লম্বা আলখেল্লা পোশাক পরে, তেমন পোশাক পরেছিলেন তিনি। তার গলায় ছিল কৃত্রিম হাতির দাঁতের মালা। মাথায় পাখির পালকে সাজানো মুকুটও ছিল। বালিগাঁও বাজারে ফাল্গুনী মেলায় লোকটি বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। লোকটির পোশাক গ্রামের মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে অনেকে আবার তাকে দেখছিল। রাজনের মতো তাদের চোখেও কৌতূহল ছিল। এমন অদ্ভুত পোশাক পরিহিত লোকটি বালিগাঁও বাজারে কেন এসেছে, সেদিন ওর মনে প্রশ্নটা উঁকি দিয়েছিল। কিন্তু লোকটির সঙ্গে কথা বলার সাহস হয়নি ওর। ঐ লোকটির সঙ্গে আজ ফের দেখা হয়ে গেল। দেখা হয়ে গেল ঠিক বলা যাবে না, লোকটি নিজেই ওদের সঙ্গে এসে দেখা করতে এলেন। রাজন ওর বন্ধুদের নিয়ে গল্প করছিল স্কুলের মাঠের এক কোণে। মাঠে ওরা ক্রিকেট খেলেছে শেষ বিকাল অবধি। এরপর রাজন, সুমন, বিকাশ ও বিপ্লব থেকে গেল মাঠে। অন্য বন্ধুরা একে একে চলে গেছে। সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতি যখন তখন লোকটি মাঠে প্রবেশ করলেন। আজ লোকটি ধুতি-পাঞ্জাবি এবং কুর্তা পরেছেন। রাজন ওর বন্ধুদের নিয়ে গল্প করছিল যেখানে সেখানে লোকটি সরাসরি চলে এলেন। তিনি নিজের মুখে বড় এক হাসি ধরে রেখে ওদের সামনে দাঁড়ালেন। লোকটির আচরণে রাজন খুব অবাক হলো। তবে ভয় পেল না। স্কুলের পাশেই ওদের বাড়ি। লোকটি ‘ছেলে ধরা’ হবে নাÑ মনে মনে ভেবে নিল রাজন। লোকটি ওদের সামনে দাঁড়িয়ে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মুখের হাসি আরও বিস্তৃত করে বললেন,
‘আমি তোমাদেরই খুঁজছিলাম! তোমাদের খুঁজে পেতে আমার বেশি কষ্ট করতে হয়নি। মাঠে এসে পেয়ে গেলাম তোমাদের।’
লোকটির কথা শুনে একসঙ্গে অবাক হলো ওরা চার বন্ধু। ওদের চোখের তারায় একসঙ্গে বিস্ময়ের রংধনু ফুটে উঠল। ওরা লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। লোকটির মুখের হাসিতে নানা বর্ণ যেন আছে। হাসি নানাভাবে ফুটে ওঠে। হাসির মদিরতা ছড়িয়ে লোকটি ওদের দিকে চেয়ে এবার বললেন,
‘আমি জানি, তোমরা খুব অবাক হয়েছ আমার কথা শুনে। খুব স্বাভাবিক। আমাকে তোমরা চিনো না, অথচ আমি তোমাদের খুঁজছিÑ এ-কথা শুনলে তো অবাক হতেই হবে।’
‘তা তো সত্যি! কে আপনি? আমাদের খুঁজছেন মানে?’
জানতে চাইল রাজন। এবার তার হাসির রূপ একটু বদল হলো। হাসিটা চাঁদের মতো বাঁকা হলো। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের খুশির ঢেউ বইছে। তিনি বললেন,
‘মোক্ষম কথা! তা বলছি, শোনো। আমি হচ্ছি রাতুলের মামা। ও আমার কথা কখনও তোমাদের বলেনি?’
‘রাতুল, মানে আমাদের বন্ধু রাতুলের কথা বলছেন?’
জানতে চাইল বিকাশ। লোকটির চোখে এবার অন্যরকম হাসির দ্যুতি ফুটে উঠল। তিনি বললেন,
‘ঠিক বলেছ বিকাশ। আমি তোমাদের বন্ধু রাতুলের মামা।’
এবার ওরা আরেকবার একসঙ্গে অবাক হলো। লোকটি বিকাশের নাম ধরে কথা বলছেন। এর মানে, লোকটি বিকাশকে চেনে। হয়তো ওদের নামও জানেন। রাতুল অবশ্য ওদের একদিন বলেছিল যে, ওর একটা পাগলাটে মামা আছে, যিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ান। এ মাসে যদি এন্টারটিকা যাবেন, তো অন্য মাসে সাহারা মরুভূমিতে গিয়ে হাজির হবেন। তিনি না-কি ভ্রমণ করতে খুব পছন্দ করেন। নিজের বাড়িতে আসেন চার-পাঁচ বছর পরপর। কয়েকদিন থেকেই ফের চলে যান। রাতুল ওর মামাকে খুব পছন্দ করে বলেও ওদের বলেছিল। ওর মামা না-কি অনেক রহস্য করতে জানেন, রহস্যময় গল্পও জানেন। তার কথাবার্তা শুনলে মনে হবে খাপছাড়া; কিন্তু কথার নিগূঢ় অর্থ থাকে। ওর এই পাগলা মামাটা জাদুকর হলে ভালো মানাতÑ বলতো রাতুল। কিন্তু রাতুল বলেছে, ওর মামা বলে জাদু বলতে কিছু নেই। তিনি নিজেই যখন জাদু আছে বলে বিশ^াস করেন না, তাকে জাদুকর ভাবা যায় না। রাজনের মনে পড়ল, রাতুল ওর মামার কথা বলেছিল। এই লোকটি কি রাতুলের সেই রহস্যজনক চরিত্রের মামা? ভাবছে রাজন। লোকটি এবার রাজনের অন্যমনষ্কতা ভেঙে বললেন,
‘তা রাজন, তুমি কী ভাবছো? আমার কথা সত্যি কি না, তাই তো?’
রাজনের ভিরমি খাবার জোগাড়! কী বলছেন তিনি! ওর মনের কথা যেন পড়ে ফেলছেন। আশ্চর্য! এবার বিপ্লব লোকটির উদ্দেশে বলল,
‘রাতুল তো ঢাকায়। আপনি জানেন না?’
লোকটির মুখে এবার হাসির পরিবর্তে একরাশ বিষণ্নতা ফুটে উঠল। তিনি বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘বিপ্লব, এই দুঃসংবাদ পেয়েই তো আমি আমাজনের জঙ্গল থেকে ছুটে এসেছি! যখন জানতে পারলাম রাতুল ভীষণ অসুস্থ, হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে, তখন আর থাকতে পারলাম না। চলে এলাম।’
‘কীভাবে জানলেন এই খবর? আমাজনের জঙ্গলে কি সেলফোন চলে? মানে সেলফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়?’
কথাটা সন্দেহভরা কণ্ঠে বলে ফেলল সুমন। সুমনের কথা শুনে এ প্রশ্নটা যুক্তিযুক্ত হয়ে উদয় হলো রাজন, বিপ্লব ও বিকাশের মনে। লোকটির মুখে কেমন নির্জনতা গভীর রেখাপাত আঁকছে। তার মুখের অভিব্যক্তি এত দ্রুত বদলে যায় এবং নানা বিভাস ফুটে উঠে যে কেমন ভাবনা ছড়িয়ে দেয়Ñ ভাবে রাজন। লোকটির কণ্ঠ শোনা গেল,
‘শোনো, তোমরা অনেক পিছিয়ে আছ। খবর পাওয়ার নানা মাধ্যম আছে। খবর এখন হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়! শুধু চোখ-কান খোলা রাখতে হয়!’
‘তারপরও আমাজনের জঙ্গলে বসে মুন্সিগঞ্জের এই অজপাড়াগাঁয়ের খবরটা পেয়ে গেলেন কীভাবে, সেটিই ভাবছি!’
শুকনো হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল রাজন। লোকটি একটু বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালেন রাজনের দিকে। চোখের ভ্রু কপালের ওপরে তুলে তিনি রাজনকে বললেন,
‘ট্যালিপ্যাথি বলেও একটা মাধ্যম আছে, জানো তো?’
‘ট্যালিপ্যাথি?’
অস্ফুষ্ট কণ্ঠে বলল বিকাশ। লোকটি বললেন,
‘দিব্যদৃষ্টি বলেও একটা কথা আছে! জানো?’
লোকটির প্রশ্ন শুনে ওরা চারজন একে অন্যের মুখের দিকে চেয়ে নিল।
‘দিব্যদৃষ্টি?’
চোখে-মুখে প্রশ্ন ফুটিয়ে জানতে চাইল বিপ্লব। লোকটি এবার ঘোরলাগা কণ্ঠে বললেন,
‘তোমরা বিজ্ঞান সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখো না। রহস্য বলেও যে একটা জগৎ আছে, সেটিও হয়তো অনুমান করতে পারো না। তোমরা শুধু দিনের আলো আর রাতের আঁধার দেখো। এছাড়াও যে আলোর অন্ধকার আছে বা অন্ধকারের দ্যুতি আছে, জানো না তোমরা। দিন-রাত ছাড়াও সময়ের আরও রূপ আছে, বিকাশ আছে, বিচ্ছুরণ আছে, ভাষাও আছেÑ ওসব তোমরা কি জানো?’
লোকটির কথার কোনো মাথামুণ্ডু নেই! কী বলছেন তিনি? এমন কথার কী অর্থ দাঁড়ায়? রাজনের মনের কথা পড়ে নিয়ে তিনি বললেন,
‘রাজন, কোনো কিছু অর্থহীন নয়। অর্থ আছে, আমরা সেটি ধরতে পারি না। আমরা ঘটনা দেখি, নেপথ্য কারণ খুঁজি কম বা খুঁজি না। আবারও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে এর যোগসূত্র খুঁজি না। আমরা ঘটে যাওয়ার ঘটনা দেখে এবং মেনে এগিয়ে যাই। তথ্য-তালাশে মনোযোগী হই না। অনুসন্ধানী হতে চাই না। বুঝেছো?’
‘আপনার কথাগুলো ঘোলাটে লাগছে!’
একটা ঢোক গিলে নিয়ে বলল বিকাশ। লোকটি একটু ভাবিত হলেন যেন। কয়েক মুহূর্ত পর বললেন,
‘আমাকে তোমাদের বন্ধু করে নাও। দেখবে, এরপর আমি যা বলব, তা বুঝতে পারছো। বিশ^াস করতে পারলে অর্থ বোঝা সহজ হয়ে যায়। আমাকে তোমাদের বন্ধু করবে?’
‘আপনার নাম কী?’
জানতে চাইল রাজন। লোকটি এবার লজ্জিত হলেন। রাজনের দিকে তাকিয়ে লজ্জা জড়ানো কণ্ঠে বললেন,
‘আমার নাম রাইসুল শাকিল। সংক্ষেপে হচ্ছে রাশা। তোমরা আমাকে “রাশা মামা” বলে ডাকতে পারো।’
‘রাশা মামা! হ্যাঁ, রাতুল আপনার নাম বলেছিল আমাদের।’
বলল রাজন। ও আরও বলল,
‘কিন্তু আপনি এই গ্রামে কেন এসেছেন? রাতুল তো ঢাকায়!’
ফের কেমন হাসি ফুটে উঠল রাশা মামার মুখে। তিনি বললেন,
‘ঢাকায় ছিলাম। হাসপাতালে তো দুদিন কাটালাম রাতুলের সঙ্গে।’
‘তাই না-কি! ও কেমন আছে?’
রাজনের উদ্বেগভরা প্রশ্ন। রাশা মামা অন্যমনষ্ক হলেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ভারীকণ্ঠে বললেন,
‘ভালো আছে বলা ঠিক হবে না। তবে লড়ছে ও! চিকিৎসকরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন।’
‘আপনি তো বিজ্ঞানের কথা বললেন, রহস্যের কথা বললেন। দিব্যদৃষ্টির কথাও বললেন। আপনার কী মনে হয়? রাতুল কি সুস্থ হয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে?’
বিপ্লব জানতে চাইল। বিপ্লবের কথায় রাশা মামার কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল। তিনি বললেন,
‘বিজ্ঞান সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে জয়ী হয়ে যায় না বটে, তবে হেরে যায় না। এমন কিছু ব্যাধি আছে, যা বিজ্ঞানের আয়ত্তে এখনও আসেনি। যেমন ধরো, কোভিড-১৯ ভাইরাস এলো পৃথিবীতে, লণ্ডভণ্ড করে দিল জনজীবন! কত প্রাণহানি হলো! অজ্ঞাত এই ভাইরাসকে প্রথমে মোকাবিলা করতে পারেনি চিকিৎসাবিজ্ঞান। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর পর চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই ভাইরাস প্রতিরোধের উপায় বের করলেন। এভাবেই জীবাণুর সঙ্গে বিজ্ঞানের লড়াই বাঁধে। আমাদের ভরসা রাখতে হবে বিজ্ঞানের ওপর। বুঝলে?’
‘বুঝলাম, আর রহস্য বা দিব্যদৃষ্টি নিয়ে কিছু বললেন যে!’
বলল সুমন। রাশা মামা হেসে ফেললেন। তিনি হাসিমুখে বললেন,
‘এ নিয়ে আরেকদিন কথা বলব এবং তোমাদের এর নমুনাও দেখাব।’
‘সত্যি!’
বিস্ময় প্রকাশ করল বিকাশ। রাশা মামা মদিরতাময় হাসি ছড়িয়ে বললেন,
‘সত্যি, দেখাব। এমন কিছু ঘটনার কথা বলব, তোমরা যদি আমার কথা বিশ^াস কর এবং দেখার জন্য চোখ খুলে রাখো, দেখতে পাবে চারপাশে কত রহস্য আছে। রহস্য যে দেখতে পায় বা রহস্য যে উন্মোচন করতে পারেÑ তারই তো দিব্যদৃষ্টি আছে!’
‘এবার আপনার কথা কেমন জানি ভালো লাগছে।’
জবাবে বলল বিকাশ। রাশা মামার হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো তার মুখে। রাজন বলল,
‘রাতুলের কী হয়েছে? খুব জটিল অসুখ বুঝি! আমরা তো কোনো খবর পাচ্ছি না।’
জবাবে রাশা মামা হাসি ছোট করে এনে বললেন,
‘ওর হার্টে একটি বাল্ব লাগাতে হবে। আবার ওর কিডনিতেও সমস্যা আছে। এ অবস্থাকে জটিল বলা যায় এবং আশঙ্কাজনকও বলা যায়।’
‘আচ্ছা!’
মন খারাপের কণ্ঠে বলল রাজন। রাশা মামা বললেন,
‘তোমাদের মন খারাপ হয়ে গেল? তাই তো? এটাই স্বাভাবিক। আমারও ভীষণ মন খারাপ ছিল। কিন্তু রাতুল আমাকে বলল, আমি যেন মন খারাপ না করে আবদুল্লাপুর চলে যাই।’
‘কেন? আপনাকে ও এখানে আসতে বলেছে কেন?’
জানতে চাইল বিকাশ। রাশা মামা বললেন,
‘সেটিই তো আসল কথা। তোমাদের ঐ কথাই বলতে এসেছি।’
‘আচ্ছা! তাহলে বলুন। আসল কথা এখনও বলেননি কেন?’
প্রশ্ন করল বিপ্লব। জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘কারণ, তোমাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়াটাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেটি হলো। এখন কাজের কথা বলতে চাই।’
‘বলুন। আমরাও শুনতে চাই।’
আগ্রহ প্রকাশ করে বলল রাজন। রাশা মামা কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন। এরপর বললেন,
‘না, বাবা। অত সহজ কথা নয়। আবার কথাগুলো শুনলে তোমাদের বিশ^াস করতেও কষ্ট হবে।’
‘এ আবার কেমন কথা। অত হেঁয়ালি করছেন কেন, মামা?’
বলল রাজন। সুমনও ওর সঙ্গে বলল,
‘বলে ফেলুন, মামা।’
রাশা মামা একটু চিন্তিতভাবে বললেন,
‘হুম, বলব। তার আগে তোমাদের কাছ থেকে আমারও কিছু জানার আছে।’
‘কী জানতে চান?’
জানতে চাইল বিপ্লব। রাশা মামা খুশি হয়ে বললেন,
‘বলো তো, এই বিক্রমপুর কী জন্য বিখ্যাত?’
‘আলু উৎপাদনের জন্য। সবজির ফলনও এ অঞ্চলের মাটিতে ভালো হয়।’
উৎসাহ নিয়ে বলল বিকাশ। ওর কথা শেষ হতেই বিপ্লব বলল,
‘বিক্রমপুর এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল। লক্ষণ সেন ছিল শেষ রাজা।’
এরপর সুমন বলল,
‘পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ^রী, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা এই অঞ্চলের চারপাশে প্রবাহিত, এটাও অন্যতম কারণ হতে পারে।’
রাশা মামা একগাল হাসলেন। এরপর বললেন,
‘কারণগুলো উল্লেখযোগ্য বটে! তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিক্রমপুরের নাম যে-কারণে উচ্চারিত হয়, সে-কারণটা কী?’
‘বুঝতে পারছি না। আমরা তো এর বেশি কিছু জানি না। আপনিই বলুন, মামা।’
অসহায় কণ্ঠে বলল সুমন। রাশা মামা একবার দুচোখ বুঝে কী যেন ভাবলেন। চোখ খুলে বললেন,
‘এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং এই অঞ্চলে এক সময় নগর সভ্যতা ছিল। নয় শতকের আগে এই অঞ্চলে বৌদ্ধদের শাসন ছিল। পরে সেন শাসকরা প্রায় তিনশ’ বছর শাসন করেন। এই অঞ্চল ছিল বাংলার রাজধানী। বারোশ’ শতকে সেন শাসকদের পতন হলে বাংলার রাজধানী হয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। ইতিহাসের কথা বললাম তোমাদের।’
রাশা মামা একটু থেমে ফের বললেন,
‘এই অঞ্চলে মাটির নিচে কয়েকশ’ বছরের পুরনো নগরীর সন্ধান পাওয়া গেছে। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো বিজ্ঞানী এই এলাকার সন্তান, জানো তো? জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন জগৎ বিখ্যাত!’
‘জানি। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন গাছেরও প্রাণ আছে।’
কথাটি বলল রাজন। ওর কথা শুনে রাশা মামা খুশি হলেন। তিনি বললেন,
‘বাহ, বেশ বলেছো! মাটির নিচে চাপা হাজার বছরের নগরী ছিল এখানে। এটা কিন্তু ভীষণ একসাইটেড একটা সংবাদ।’
‘হুম। কিন্তু?’
কথাটা বলার সময় কপালে চিন্তার রেখায় ভাঁজ পড়ল রাজনের। রাশা মামা প্রশ্ন করলেন,
‘কিন্তু কী?’
জবাবে রাজন বলল,
‘মাটির নিচে চাপা নগরীর সন্ধান চলছে, শুনছি। এর সন্ধান পেলে কী হবে?’
রাশা মামার প্রশ্ন,
‘এর আগে বলো ওখানে কী আছে?’
বিপ্লব বলল,
‘হাজার বছরের পুরনো শহরের ধ্বংসাবশেষ আছে।’
রাশা মামা বিপ্লবের দিকে দৃষ্টি রেখে বললেন,
‘তার মানে অতীতের ঝলমলে এবং ঐতিহ্যময় ইতিহাস বের হয়ে আসছে। অথচ এ অঞ্চলটা সবার কাছে অজপাড়াগাঁ বলে পরিচিত। একটা সময় এ অঞ্চল ছিল বাংলার রাজধানী। এ-কথা তো বললাম।’
রাশা মামার কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজন বলল,
‘সেন বংশের রাজারা এ অঞ্চলে বাস করতেন শুনেছি। একটা সময় বাংলার রাজধানী ছিল এখানে। এসব নিয়ে অনেক গল্পকথাও আছে। ইতিহাস বলে, বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে সেন রাজাদের রাজত্বের অবসান হয়। এরপর থেকে এ অঞ্চলে মুসলমানদেন বসতি শুরু হয়। তাই না?’
রাজনের কথার জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘না। বসতি শুরু হয় বললে ঠিক হবে না। এসব অঞ্চলে মানুষ ধর্মান্তরিত হয়। কয়েক শত বছর আগে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ হিন্দুদের মধ্যে বৈষম্য এত প্রকট হয়েছিল যে, নির্যাতন-নিপীড়নে বিক্ষুব্ধ হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হতে থাকে।’
সুমন জানার আগ্রহে বলল,
‘আচ্ছা। আপনি তো অনেক দেশ ঘুরে বেড়ান, মামা। ওসব দেশেও কি এমন হয়েছে?’
সুমনের কথায় হেসে ফেললেন রাশা মামা। তিনি বললেন,
‘শোনো, ধর্ম নিয়ে যত বাড়াবাড়ি অতীত থেকে এ পর্যন্ত ভারতবর্ষ, চীন-জাপান ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হয়েছে। এখনও হচ্ছে। তোমরা বড় হলে আরও অনেক কিছু জানবে, বুঝতেও পারবে। লেখাপড়া করলে এবং বই পড়লে অনেক কিছু জানা যায়।’
‘আপনি কিছু বলুন। শুনেছি, আপনি অনেক কিছু জানেন, অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখেন। রাতুল বলেছিল আমাদের।’
বিকাশ বলল কথাটা। জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘কি জানতে চাও, বলো। মানে আমাকে প্রশ্ন করো।’
‘এই ধরুন, ধর্ম কেন এবং কবে এসেছে। কত ধর্ম আছে বিশে^। কেন ধর্ম পরিচয়ে মানুষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।’
ফের বলল বিকাশ। রাশা মামা একগাল হেসে বললেন,
‘প্রশ্নটা ভালো। তবে জবাবটা অত সহজ নয়। ছোট করে বলাও কঠিন।’
‘তারপরও যদি সংক্ষেপে বলেন।’
তাগিদ দিল রাজন। ওরও জানতে মন চাইছে। রাশা মামার কথা ওদের শুনতে ভালো লাগছে। রাশা মামা রাজনের দিকে চেয়ে বললেন,
‘আচ্ছা, বলছি। তার আগে বলো তো এই বিশে^ এখন লোকসংখ্যা কত?’
‘কত হবে। পাঁচশ’ থেকে ছয়শ’ কোটি।’
জবাব দিল রাজন। রাশা মামা হেসে বললেন,
‘বিশে^র লোকসংখ্যা বর্তমানে সাতশ’ একাত্তর দশমিক পঞ্চাশ কোটি।’
‘বলেন কী?’
বিস্ময় প্রকাশ করল বিপ্লব। রাজন, সুমন ও বিকাশের চোখে-মুখেও বিস্ময় দেখা যায়। রাশা মামা তথ্য জানাচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন,
‘হুম। এই লোকগুলোর মধ্যে ধর্ম আছে চার হাজার তিনশ’টি। তবে তাদের মধ্যে পনেরো দশমিক আটান্ন শতাংশ লোক কোনো ধর্ম মানে না। যাদের অনেকে নাস্তিক বলে। এর মানে হলো, তাদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়!’
রাজন জানতে চাইল,
‘বিশে^ সবচেয়ে কোন ধর্মের লোক বেশি?’
‘সংখ্যা বিবেচনায় প্রথম খ্রিষ্টান এবং দ্বিতীয় হচ্ছে মুসলিম। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা একত্রিশ দশমিক এগারো খ্রিষ্টান এবং মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার শতকরা চব্বিশ দশমিক নয়। হিন্দু পনেরো দশমিক ষোলো শতাংশ এবং বৌদ্ধ ছয় দশমিক বাষট্টি শতাংশ।’
জবাব দিলেন রাশা মামা। রাজন বলল,
‘আচ্ছা!’
‘এবার বলো তো, ধর্মগ্রন্থ কয়টি?’
পাল্টা প্রশ্ন করলেন রাশা মামা। সুমন বলল,
‘জানি না। আমি মুসলমানদের কোরআন শরিফ এবং খ্রিষ্টানদের বাইবেলের কথা জানি।’
সুমনের কথার জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘আরও দুটি ধর্মগ্রন্থ আছে। ইহুদিদের তাওরাত, আরেকটি ধর্মগ্রন্থের নাম হচ্ছে জাবুর। এই চারটি ধর্মগ্রন্থ ঐশ্বরিক বলে দাবি করেন ঐসব ধর্মের অনুসারী লোকেরা।’
‘ঐশ্বরিক মানে কী?’
জানতে চাইল বিপ্লব। জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘মানে, নবীদের মাধ্যমে স্রষ্টা তা দিয়েছেন। যাকে অনেকে বলেন আসমানি কিতাব।’
‘মুসলমানরা মনে করেন, পবিত্র কোরআন শরিফ শেষ এবং শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ।’
বলল সুমন। এ-কথার জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘হুম।’
‘হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ নেই কেন?’
বিকাশ প্রশ্ন করল। জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘তা তো জানি না। তবে শ্রীমত ভগবৎ গীতা নামক একটি গ্রন্থকে হিন্দু সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মগ্রন্থ বলে বিবেচনা করে। আরেকটি কথা, হিন্দুইজম কিন্তু ধর্ম নয়!’
‘তাহলে ওটা কী?’
জানতে চাইল রাজন। রাশা মামার জবাব,
‘ওটা দর্শন। হিন্দু ধর্ম বলে কিছু নেই।’
‘তাহলে?’
অবাক চোখে প্রশ্ন করল বিকাশ। রাশা মামা বললেন,
‘হিন্দুইজম দর্শনে বিশ্বাসীদের সনাতনধর্মী বলে। এ দর্শনের প্র্যাকটিস শুরু হয় প্রায় চার হাজার বছর আগে। আরও জেনে রাখো, পৃথিবীতে ধর্মও এসেছে চার হাজার বছর আগে, মানুষের জন্ম বা মানুষের আগমন কিন্তু আরও হাজার হাজার বছর আগে!’
‘আচ্ছা!’
বলল রাজন। ওর বিস্ময় বাড়ছে। রাশা মামা কথা চালিয়ে যেতে চান। তিনি বললেন,
‘আরেকটি কথা, সনাতন ধর্মের লোকেরা তাই দাবি করে ধর্মের শুরু তাদের কাছ থেকে।’
‘এটা কি সত্যি?’
প্রশ্ন করল সুমন। জবাব পাওয়া গেল রাশা মামার কাছ থেকে। তিনি মøান হেসে বললেন,
‘কোনটা সত্যি, তা বলি কী করে। অকাট্য দলিল তো নেই। চার হাজার বছর আগের কথা কে সত্য বলে দাবি করবে? ঋগে¦দ নামে একটি ধর্মের কথা পাওয়া যায়, যা সবচেয়ে পুরনো ধর্ম বলে দাবি করা হয়।’
‘ইসলাম ধর্ম কি সকল ধর্মের পর এসেছে?’
সুমনের এ প্রশ্নের জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘না। এরপরও ধর্ম এসেছে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মাধ্যমে। তার মাধ্যমে মুসলমানদের পবিত্র কোরআন নাজিল হয় ৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে।’
‘আপনি এত তথ্য জানেন কী করে?’
বিস্ময় প্রকাশ করে রাজন বলল। জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘কঠিন কাজ তো নয়। বই পড়ো। অনলাইনে সার্চ করো, তোমরাও জেনে যাবে। আমি জানার চেষ্টা করি। তথ্য জেনে স্মরণে রাখারও চেষ্টা করি। এটা খুব বিস্ময়কর কাজ, তা কিন্তু নয়!’
এবার সুমন প্রশ্ন করল,
‘আচ্ছা মামা, বলুন তো, আমাদের পবিত্র কোরআন শরিফ কত কপি ছাপা হয়? কেমন বিক্রি হয়?’
রাশা মামার কাছে যেন সব প্রশ্নের জবাব আছে। তিনি সুমনের প্রশ্নের জবাবে বললেন,
‘ইন্টারনেটে গুগলে সার্চ করে যা জেনেছি, তা হচ্ছে, ৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানদের শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মাধ্যমে কোরআন শরিফ গ্রন্থটি নাজিল হয়। কোরআন শরিফের সূরাগুলো একত্রিত বা সন্নিবেশিত হয় ৬৪০ থেকে ৬৫৬ সালের মধ্যে। প্রথমে মুখস্থ রেখে এবং পরে হাতের লিখনে লিপিবদ্ধ হয়ে আসছিল কোরআন। ১৭২০ সালে “কোরআন” প্রথম মুদ্রণ হয় রাশিয়ায়। আর খ্রিষ্টানদের “বাইবেল” প্রথম পাথরে খোদাই করে মুদ্রিত হয় ১৪৫০ সালে। কী প্রশ্ন করছিলে, কোরআন কত কপি ছাপা হয়? বলছি…।’
রাশা মামা চোখ বুজলেন এবং কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে বললেন,
‘বর্তমানে পৃথিবীতে কোরআন শরিফ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বছর দুই কোটি কোরআন শরিফ ছাপা হচ্ছে এবং এক কোটি বিক্রি হচ্ছে। আর এক কোটি কোরআন বিনামূল্যে বিতরণ হচ্ছে। অন্যদিকে বাইবেল প্রতি বছর ছাপা হচ্ছে এক কোটি পাঁচ লাখ। এগুলো সব বিনামূল্যে বিতরণ হচ্ছে। পেশাদার ও অপেশাদার প্রায় দশ হাজার প্রকাশনী এ দুটি ধর্মগ্রন্থ ছাপছে। বুঝলে?’
‘বাহ্!’ অনেক তথ্য জানলাম।’
কথাটা বলল রাজন। রাশা মামা ওর কথা শুনে খুশি হলেন। তিনি বললেন,
‘আমি তোমাদের একটা কাজ দিতে চাই। কাজটা তোমাদের নিজের গ্রাম বা জেলার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
রাজন বলল,
‘কী কাজ, বলুন? আমরা কী করতে পারি?’
‘তোমরা পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই তো তোমাদের কাছে এসেছি।’
জবাবে বললেন রাশা মামা। বিপ্লব একটু চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
‘আমরা স্কুলে পড়ি। সামনে এসএসসি পরীক্ষা আমাদের। এ-সময়ে আমরা কী কাজ করতে পারি?’
জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘ভয়ের কিছু নেই। তোমরা সজাগ ও সতর্ক থাকবে। আর এলাকাবাসীদের নিয়ে একদিন রাত জেগে চোর ধরবে।’
‘চোর ধরা? এটা কোনো কাজ হলো?’
বলল সুমন। রাশা মামা সাবধানী কণ্ঠে বলল,
‘এই চোর, গাঁয়ের হাবলা-ক্যাবলার মতো নিরীহ চোর নয়! এই চোর আন্তর্জাতিক বাজারের দক্ষ ও দুর্ধর্ষ চোর!’
‘কী যে বলছেন!’
হেসে বলল রাজন। রাশা মামার এ-কথাটা তার কাছে হাস্যকর মনে হলো। রাশা মামা বললেন,
‘হুম, যা বলছি, ওটাই সত্যি! কথাটাকে উড়িয়ে দিও না! তোমরা সাবধানে থাকবে, লক্ষ রাখবে চারপাশ! আর হ্যাঁ, তোমাদের ভয়ের কিছু নেই, কারণ আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। কখন, কী করতে হবেÑ বলে দেব আমি। আবারও বলছি, ঐ চোরদের হালকাভাবেও দেখার কিছু নেই, কারণ, ওরা সংঘবদ্ধ ও প্রশিক্ষিত লুটেরা!’
এবার বিপ্লব বলল,
‘আচ্ছা, বলুন তো! আগে শুনি, তারা কারা। এখানে তাদের কাজ কী, বলুন, মামা!’
রাশা মামা বললেন,
‘বলব। আগে ওদের চোখে চোখে রাখি, দেখি ওরা কী করতে চাচ্ছে? সময়মতো তোমাদের সব কথা খুলে বলব।’
রাজন বলল,
‘মামা, আপনি নিশ্চয় কিছু আঁচ করতে পারছেন। তাহলে একটু ধারণা দিন। আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করে কিছু বললে তো আমরা ছোট মানুষ কী করতে পারব?’
জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘এ-কথটাও ঠিক। আচ্ছা, তোমাদের ধারণা দিচ্ছি। তবে আমি এখন যা বলব, শুনে পাঁচকান করবে না। মনে রেখো কথাটা!’
‘পাঁচকান কী বুঝলাম না?’
বলল সুমন। রাশা মামা বললেন,
‘পাঁচকান মানে কথটা কাউকে বলবে না। কথা শুনে মুখ বন্ধ রাখবে। একজনকে বলবে, সে আবার আরেকজনকে বলে দেবে। এভাবে কথা পাঁচকানে পৌঁছে যায়।’
‘ও আচ্ছা। বলুন। কথা দিচ্ছি, আমরা কথাটা কাউকে বলব না।’
রাশা মামাকে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, এমনভাবে কথাটা বলল সুমন। বিপ্লব কথার মধ্যে ফোড়ন কেটে বলল,
‘আচ্ছা, কথাটা আরও মানুষ জেনে গেলে কী হবে?’
জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘এতে চোর-লুটেরাও জেনে যাবে। তখন ওরা ওদের কৌশল পাল্টে ফেলবে। তখন আর ওদের ধরা কঠিন হয়ে যাবে। রক্তারক্তিও হতে পারে! তার চেয়ে আমরা কৌশল করে বিনা রক্তপাতে ওদের ধরে ফেলতে চাই। বুঝলে?’
বিপ্লব বলল,
‘এবার বুঝেছি। তাহলে ঘটনার আঁচ দিন। আমরা শুনে মুখ বন্ধ করে থাকব। কথা দিচ্ছি।’
কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে কী যেন ভাবলেন রাশা মামা। এরপর চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। চারজনের উদ্দেশে নিচু গলায় বললেন,
‘তোমার গ্রামে অথবা আশপাশের যে কোনো গ্রামে গুপ্তধন আছে বলে একটি প্রশিক্ষিত চোরের দল ঘুরঘুর করছে!’
‘গুপ্তধন!’
চারজনের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো শব্দটি। জবাবে রাশা মামা বললেন,
‘হ্যাঁ, গুপ্তধনই বটে!’
‘তা কোথায় আছে, ওই গুপ্তধন?’
জানতে চাইল রাজন। রাশা মামা বললেন,
‘আছে কোথাও। এই অঞ্চলে এক সময় রাজারা বাস করতেন। কোথাও থাকতে পারে। অসম্ভব বলে কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কী বলো?’
‘শুনেছি। দিঘলীতে তো রাজপুকুরও আছে!’
আচ্ছন্ন কণ্ঠে সুমন বলল। বিপ্লব বলল,
‘রাজপুকুর কী?’
এই প্রশ্নের জবাবে রাজন বলল,
‘অনেক, অনেক আগে কোনো এক রাজা অনেক বড় দিঘি বানিয়েছিল। ঐ দিঘির পাড়ে গিয়ে না-কি দরিদ্র মানুষ বিয়ে-শাদির জন্য ডেকচি-চামচ, হাড়ি-পাতিল চাইত রাতে। সকালে দেখত পুকুরের পাড়ে ওসব থরে থরে সাজানো আছে। ওসব নিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করত। পরে আবার রাতের আঁধারে পুকুরের জলে ওসব ডুবিয়ে দিত। এমন গল্প শুনেছি মায়ের কাছ থেকে।’
সুমন সোৎসাহে বলল,
‘আমিও শুনেছি।’
বিকাশ বলল,
‘আমিও!’
রাজন বলল,
‘তবে পুকুরটা দিঘলীতে কি না, জানি না। রঘুনাথপুরে একটা পুকুর ছিল। পুকুরটি শীতকালে শুকিয়ে যেত আর বর্ষকালে জলে ভরা থাকত। মানুষের মুখে একটা গল্পের কথা আছে। তা হলো, ঐ পুকুরটিতে মাঘ মাসে পূর্ণিমার রাতে পুকুরের জলে ধাম ভাসতে দেখা যেত। কুচরিপানায় জড়িয়ে ধামটি না-কি ভাসত। এ থেকে ঐ পুকুরের নাম হয়Ñ ধাম ভাসানি পুকুর। তবে আমি এ-ধরনের গল্প বিশ্বাস করি না।’
‘কেন বিশ্বাস করিস না?’
জানতে চাইল সুমন। রাজন জবাবে বলল,
‘অবিশ্বাস্য মনে হয়, তাই।’
এবার রাশা মামা হেসে রাজনের কাছে জানতে চাইলেন,
‘ঐ দিঘির জল থেকে এখন আর ওসব উঠে আসে না?’
‘না। অনেক, অনেক বছর আগেই তা বন্ধ হয়ে গেছেÑ এমন কথাও লোকমুখে শোনা যায়।’
‘কেন এমন কথা শোনা যায়?’
জানতে চাইল রাশা মামা। রাজন বলল,
‘শুনেছি, কোন এক পরিবার লোভের বশবর্তী হয়ে মালামালগুলো ফেরত দেয়নি। এতে ঐ পরিবার অনেক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল। অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে ঐ পরিবারের সদস্যরা মারা গিয়েছিল। তখন গ্রামের মানুষদের মনে ধারণা হয় যে, পুকুরের জলে থাকা দৈবশক্তি লোভী মানুষকে শায়েস্তা করেছে। গ্রামের মানুষরা আর কোনোদিন হাড়ি-পাতিল-ডেকচি পায়নি।’
বিপ্লব শিহরিত কণ্ঠে বলল,
‘দৈবশক্তি! কথাটা শুনে কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল!’
সুমন বলল,
‘এই সন্ধ্যেবেলায় তোরা কী সব বলছিস? আমার ভয় করছে!’
‘ভয় কীসের? আমরা আছি না!’
বলল রাজন। সুমন আমতা-আমতা করে বলল,
‘না, মানে। আমার আবার ভূতের ভয় আছে।’
‘তো আমরা তো ভূত নিয়ে গল্প করছি না। গল্প হচ্ছে গুপ্তধন নিয়ে। রাজার বাড়ির পুকুরটা প্রসঙ্গক্রমে চলে এলো।’
বলল রাজন। রাশা মামা কী মনে করে মুচকি হাসলেন। বললেন,
‘তোমরা যেটাকে গল্প বলছো, ওটা আসলে গল্প নয়। তোমরা বলো যে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছি।’
রাশা মামার কথাটার জবাবে রাজন বলল,
‘তাহলে মামা গুপ্তধন নিয়ে কী হচ্ছে বলুন। আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।’
রাশা মামা বললেন,
‘গুপ্তধনের সন্ধানে একটি সংঘবদ্ধ চোরের দল এখন এই অঞ্চলে ঘুরছে। ওদের প্রতিরোধ করতে হবে।’
‘কীভাবে? ওদের চিনব কী করে? আর চিনলেও আমরা কীভাবে প্রতিরোধ করব?’
জানতে চাইল রাজন। রাশা মামা জবাবে বললেন,
‘হুম, প্রশ্নটা খাসা! বলছি, শোন। এই অঞ্চলে তোমরা যদি অচেনা মানুষ দেখো, মানে যারা এই এলাকার নন, তাদের দেখলে চোখ-কান খোলা রাখবে। সম্ভব হলে অনুসরণ করবে। বোঝার চেষ্টা করবে তারা কী বলছে, কী করতে চাচ্ছে বা কোন দিকে যাচ্ছে।’
‘মানে ডিটেকটিভ হবো?’
জানতে চাইল বিপ্লব। রাশা মামা বললেন,
‘ওই রকমই। এমন কাজে কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার আছে! করতে পারলে ভালো লাগবে তোমাদের।’
রাজন সম্মতি জানিয়ে বলল,
‘ঠিক আছে। এরপর?’
রাশা মামা বললেন,
‘আবার যদি বিদেশি নাগরিক দেখ, বেশ সতর্ক থাকবে। তারা কেন এখানে এসেছে, কাদের সঙ্গে ঘুরছে, লক্ষ রাখবে।’
‘এই অজপাড়াগাঁয়ে বিদেশিরা আসবে!’
বিস্ময় প্রকাশ করল সুমন। রাশা মামা হেসে বললেন,
‘আসবে কী, এসে গেছে! তোমরা দেখোনি। হয়তো দেখা পাবে শিগগির!’
‘বলেন কী! এ-কথা আপনি জানেন কী করে?’
বিকাশ প্রশ্ন করল বিস্ময়ভরা কণ্ঠে। রাশা মামা বললেন,
‘আগেই তো বলেছিলাম, দিব্যদৃষ্টির কথা। আমি তো দিব্যদৃষ্টি দিয়ে ওদের দেখতে পাচ্ছি!’
‘আচ্ছা! মামা, আপনি তাহলে অনেক জিনিয়াস!’
আবেগে বলল সুমন। রাশা মামা ওর দিকে চেয়ে বড় একটা হাসি ফুটিয়ে ধরে রাখলেন মুখে। বললেন,
‘ধন্যবাদ। তোমাদের কী বলেছি, কথাগুলো মনে থাকবে?’
‘থাকবে।’
চারজন একসঙ্গে জবাব দিল। রাশা মামা এবার কী যেন ভাবতে লাগলেন। রাজন জানতে চেয়ে বলল,
‘কিন্তু চোরদের মানে অচেনা লোকদের দেখে আমরা কী করতে পারি? কী করে ওদের ঠেকাব? আই মিন, গুপ্তধনের চুরি কখন করবে ওরা, আমরাই বা তখন কী করব?’
ভাবনায় ডুবে আছেন, এমন ভাবুলতা কণ্ঠে রাশা মামা বললেন,
‘ও-কথা পরে বলব। আমিও ওদের পিছু ছাড়ছি না। হাওয়ায় মিশে থাকব আমি। ওদের কর্মকাণ্ড লক্ষ করব। যখন দেখব, ওরা গুপ্তধন হাতিয়ে নিচ্ছে, তখন তোমাদের ফোন করে ডাকব। তোমরা নিজেদের বাবা-মা এবং গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসবে। ওদের হাতেনাতে ধরবে।’
‘আমরা পারব?’
ভীরুকণ্ঠে জানতে চাইল সুমন। রাশা মামা বললেন,
‘তোমরাই পারবে! নইলে তোমাদের কাছে আমি আসতাম না-কি?’
‘আশ্চর্য কথা! আপনিও তো পুলিশ নিয়ে ওদের হাতেনাতে ধরতে পারেন?’
বলল বিপ্লব। কথাটা রাজন, বিকাশ ও সুমনের ভালো লাগল। ওরা তাকালো রাশা মামার মুখের দিকে। তিনি বললেন,
‘ইস্, তোমার মাথার বুদ্ধি বটে! পুলিশকে ওরাও ম্যানেজ করে রাখতে পারে। ওদের অর্থ যেমন আছে, ক্ষমতাও আছে। আর গ্রামবাসীকে এই গুপ্তধন চুরির কথা আমি বললে কেউ বিশ^াস করবে না। হেসে উড়িয়ে দেবে। তোমরা বললে তারা তোমাদের সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে আসবে। সত্য-মিথ্যা কিছুই ভাববে না। গ্রামের ছেলেদের পেছনে তারা ছুটবেন, এটা আমি নিশ্চিত!’
‘বাহ, আপনি তো অনেক বিচক্ষণ!’
কথাটা বলে রাজন হেসে ফেলল।
‘নইলে কি আর দেশ-বিদেশ এভাবে দাপিয়ে বেড়াতে পারতাম?’
কথাটা বলে রাশা মামা ভুবন ভোলানো হাসি ফুটিয়ে তুললেন মুখে। রাজন, বিকাশ, বিপ্লব ও সুমনের চোখে-মুখে একরাশ বিহ্বলতা ফুটে আছে। মুগ্ধ হয়ে থাকার এমন একটি সন্ধ্যা ওদের জীবনে কোনোদিন আসেনি। ওরা বাড়ি ফেরার আগে রাশা মামা বিদায় নিয়ে সন্ধ্যায় আঁধারে মিলিয়ে গেলেন। ধূমকেতুর মতো আগমন যার, তার দ্রুত আঁধারে মিলিয়ে যাওয়াটাও গভীর রহস্যের জন্ম দিতে পারে। কিশোর চার বন্ধুর মনে রহস্যের চেয়ে বিহ্বলতাই জমে এককার হয়ে রইল। ওরা যখন বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল, তখন একটু দূরে চালতা গাছের আড়ালে কার ছায়া যেন নড়ে উঠতে দেখল। সুমন ভয়ে ‘ওরে বাবা, ওখানে কে!’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। রাজন হাতের ইশারায় ওকে নির্ভয় থাকতে বলল। চালতা গাছের আড়াল থেকে ছায়াটা স্পষ্ট হয়ে গেল কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে। নীরাকে দেখে ওরা একসঙ্গে চমকে গেল। নীরা রাজনের চাচাতো বোন। নীরা ওদের প্রায় সমান বয়সী। নীরা এবার দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। ও হচ্ছে লড়াকু টাইপ মেয়ে। ভয়-ডর নেই ওর। এ বছর আন্তঃজেলা স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড়ে নীরা প্রথম হয়েছে। ওর স্কুলের ভলিবল টিমের অধিনায়কও সে। বিতর্ক প্রতিযোগিতায়ও ওর সঙ্গে সমান বয়সী মেয়েরা পেরে উঠে না। নীরার মধ্যে প্রতিভা যেমন আছে, স্বভাবে ডানপিটেও। নীরা চালতা গাছের আড়ালে লুকিয়ে ওদের কথা শুনছিল-এটা ভেবে নিল রাজন। নীরা ওদের সামনে এসে বলল,
‘ঐ লোকটি কে রে? তোরা কী কথা বলছিলি?’
রাজনকে নীরা সবসময় ‘তুই’ সম্বোধন করে। রাজনও ওকে ‘তুই’ সম্বোধন করে কথা বলে, পিঠাপিঠি ভাইবোনের মত। রাজন নীরাকে পাল্টা প্রশ্ন করল,
‘তুই কী করছিলি চালতা গাছের আড়ালে? আমাদের কথা শুনছিলি?’
‘শোনব না কেন? একটা উটকো লোক এসে তোদের সঙ্গে কী কথা বলছে, কেন বলছে, জানতে হবে না? তোদের যদি ধরে নিয়ে যায়, তখন কে বাধা দেবে?’
নীরার কথা শুনে চার বন্ধু অন্ধকারে মৃদু হাসল। নীরা ওদের হাসি দেখতে পেল না। বিকাশ নীরাকে বলল,
‘যাই হোক, তুমি সাহসী মেয়ে জানি। তাই বলে আমাদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে মাথা ঘামিয়ো না। আমরা ভীষণ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে নামছি। শুধু এটুকু জেনে রাখ।’
‘সেটাই তো জানতে চাচ্ছি। কী কাজ করতে চাচ্ছো তোমরা? আমাকে বলো।’
নীরার কথার জবাবে বিপ্লব বলল,
‘তুমি খেলাধূলায় ভাল। ছাত্রী ভাল। তাই বলে দুঃসাহসিক কাজে কিছু করতে পারবে? পারবে না। আমরা একটা দুঃসাহসিক কাজের জন্য তৈরি হচ্ছি। তোমাকে সব কথা বলা যাবে না। যাও, বাড়ি যাও।’
নীরা দু’কদম এগিয়ে এলো। বিপ্লবের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
‘তোদের কথা আমি অনেকটাই শুনেছি। আর আমাকে মেয়ে বলে তুচ্ছজ্ঞান করা ঠিক নয়। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কাজ মেয়েরা করেছে এবং করছে। তোমরা কি কল্পনা চৌহানের নাম শুনেছো?’
রাজন হেসে বলল,
‘নভোচারী ছিলেন। কল্পনা চৌহান একজন নারী। তিনি মহাকাশে গিয়েছিলেন। দূর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তার কথাই বলতে চাইছিস তো?’
‘হুম। একজন নারী যখন মহাকাশে যাচ্ছে, সেখানে আমাকে আমাদেরই গ্রামে তোমাদের অভিযানের সঙ্গে রাখতে অসুবিধা কোথায়? আরো অনেক নারীর কথাই বলতে পারি।’
কথাটা বলে সন্ধ্যার অন্ধকারে রাজনের মুখের অভিব্যক্তি দেখতে চাইল নীরা। কিন্তু অন্ধকারে ঠিকমত ওর মুখের অভিব্যক্তি দেখতে পেল না। রাজন বুঝতে পারছে এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। নীরা যখন জেনে গেছে, ওকে সঙ্গে রাখলে ক্ষতি নেই। ও বলল,
‘ঠিক আছে, তুই থাকবি আমাদের সঙ্গে। আমাদের অভিযান কী হবে, কখন হবে-এসব কথা কাউকে বলতে পারবি না। এই শর্তে তোকে আমাদের দলের সদস্য করতে রাজি আছি। তুই শর্ত মানবি?’
রাজনের কথা শুনে উৎফুল্ল হল নীরা। এতো সহজে ওদের দলে ঠুকে যেতে পারবে, ভাবতে পারেনি ও। নীরা চটজলদি জবাব দিল,
‘মানব। এটা তো আর কঠিন কোন শর্ত না। তাহলে আমি আছি তোদের সঙ্গে?’
‘ঠিক আছে, হাত বাড়িয়ে দে। সকলে শপথ নিই।’
বলল রাজন। রাজনের কথায় সায় দিয়ে ওরা নিজেদের একটি হাত বাড়িয়ে একে-অন্যের হাতের ওপর হাত রাখল। এ সময় আকাশে আকস্মিকভাবে বিদ্যুত চমকালো। এই আলোয় ওদের অন্যরকম দেখাচ্ছিল।
চার
দিনু গায়েনের কণ্ঠে গান শুনলে রাত যেন আরও ঝলমলিয়ে ওঠে। বীণের সুরে যেমন সাপ ফণা তুলে নেচে ওঠে, তেমনি দিনু গায়েনের দরাজ কণ্ঠের মিঠে সুরের গানে রাত ফণা তুলে নাচতে থাকে। তার গানে কেমন একটা মহল তৈরি হয়ে যায়। দিনু গায়েনের সুরেলা কণ্ঠের লালিত্বে যেন রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই থৈথৈ করে ফুটতে থাকে মনের অনভূতি। বিভোর হয়ে যেতে হয়। আর বিভোর হলে মধ্যরাতকে তখন আয়নার মতো লাগে। ওই আয়নায় জীবনে কত কিছু ভেসে ওঠে। দুঃখগুলোও ভাসে, তবে দুঃখগুলোর মুখে হাসি ফুটে থাকে। এই দুঃখগুলো অন্য সময়ে বুকের ভেতরে মিহিন কষ্ট ছড়িয়ে দেয়, অথচ দিনু গায়েনের কণ্ঠের দরদমাখা গানের সময় কষ্টগুলো হাসতে থাকে। বড় অদ্ভুত দিনু গায়েনের কণ্ঠ! কথাগুলো তন্ময়তার মতো মধুর ভাবনায় জমে আছে। মধু বিশেষ একটা লক্ষ্যে কয়েকদিন ধরে আবদুল্লাপুর, নাটেশ^র, সোনারঙ, আটপাড়া, বাহেরপাড়া, বালিগাঁও, কনকসার গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানে-ওখানে চোখ রাখতে হচ্ছে ওকে। সুযোগ পেলেই রাজবাড়িগুলোর চারপাশে চক্কর মারে মধু। রাজবাড়িগুলোর ভগ্নদশা দেখে মধু ভাবে, নামেই রাজার বাড়ি! রাজবাড়ির নামে পরিত্যক্ত এক শ্রীহীন অট্টালিকা! শীর্ণ-দীর্ণ, ভাঙাচোরা বেহাল অবস্থা রাজবাড়িগুলোর। দেয়ালে আস্তরণ বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই, পুরনো আমলের লাল ইটগুলো দেয়ালে আটকা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। ইটগুলো যেন বলছে, ‘আর কতকাল কালের সাক্ষী হয়ে জরাজীর্ণ ভবনের ঠেস হয়ে থাকব?’ টঙ্গিবাড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি রাজবাড়ি আছে। এসব রাজবাড়ি নিয়ে নানা গল্পকথাও আছে। যে কটি রাজবাড়ি মধু দেখেছে, এর মধ্যে ভাগ্যকূলের রাজবাড়িটি বেশ বড়। কিন্তু ওই রাজবাড়িতে নজর রাখার কথা বলা হয়নি ওকে। কোন রাজবাড়িতে গুপ্তধন আছে, নির্দিষ্ট করে বলেননি তরাক সরকার। ওকে শুধু বলা হয়েছে তক্কেতক্কে থাকতে। তরাক সরকার আরও বলেছেন সন্দেহজনক কাউকে দেখা যায় কি না লক্ষ রাখতে। এ-কাজের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা ওর হাতে গুঁজে দিয়েছে তরাক সরকারের সঙ্গে আসা বিদেশি মহাজনরা। সামান্য কাজে এতগুলো টাকা ওকে কেন দিল, এটাই বুঝতে পারছেন না মধু। পরে আরও অনেক টাকা না-কি তারা দেবে। কথায় বলে না, ‘ছাপ্পার ফাইরা টাকা আইলে থামায় কে?’ মধুর জীবনেও এমন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। ‘ছাপ্পর ফাইরা টাকা আসবে!’ কথাটা ভেবে ভেবে মধুর আজকাল রাতে ঘুম আসে না। জেগে থেকে মধু কেবল স্বপ্ন দেখে। কত টাকা পাবে, টাকা পেলে কী করবে, এই ভাবতে ভাবতে পথ চলে। পথ চলতে চলতে কখনও গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়, কখনও পথের পাশে খাদে পড়ে যায়, কখনও গন্তব্য ছেড়ে অনেক দূর চলেও যায়। সব সময় কেমন ঘোরের মধ্যে কাটছে মধুর সময়। আবদুল্লাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রাজবাড়িগুলোর ওপর নজর রাখতে গিয়ে মধু সন্ধান পেয়ে যায় দিনু গায়েনের ডেরার। কাল রাতে দিনু গায়েনের ডেরায় অতিথি হওয়ারও সৌভাগ্য হয়েছে তার। কাল শেষরাতে দিনু গায়েন মরমি সুরে কণ্ঠে যে গানটি তুলেছিলেন, এর কথা ছিল এ-রকমÑ
“আমার চালের ফুটা দিয়া
জোছনা নামে থৈথৈ-থৈ
আমার কোনো দুঃখ নাই গো
জেনো রাখো বন্ধু-সই।
দুঃখ থাকে রাজপ্রসাদে
চোখের জলও সামলায় নেয়
কুঁড়েঘরের বসত আমার
কে আর বলো কষ্ট দেয়।
মাথার ওপর বৃষ্টি বাদল,
ঝড়ের সঙ্গে আমি রই।
তোমরা সাজো, সাজাইয়া রাখো
আমরা ধুলো মাখি গা’য়।
সইগো তোমার মুখের হাসি
কত কথা কইয়া যায়।
দয়াল জানে, সুখী কে যে
সুখের ছবি হইয়া রই।”
গানের কী যে কথা, আর কী যে কণ্ঠের সুধা! গানটা শেষ হলে মধুর ইচ্ছে করেছিল দিনু গায়েনের দু-পায়ের সামনে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে একটা প্রণাম করতে। এমন জাতশিল্পী পায়ের কাছে নিজের শ্রদ্ধা প্রকাশ করলে কোনো পাপ হতো না। তারপরও এক ধরনের সংকোচের কারণে প্রণামটা করেননি মধু। তবে মনে মনে শত-সহস্রবার প্রণাম করেছেন। তবে মধু জীবনে যা করেননি বা করতে পারেননি, সে-কাজটি করে ফেললেন ঘোরলাগা আবেগে। নিজের গামছার বাঁধন খুলে সংরক্ষণে রাখা টাকার বান্ডিল থেকে একটি পাঁচশ’ টাকার নোট ফেলে দিলেন দিনু গায়েনের পায়ের সামনে, যেন পূজার অর্ঘ্য সমর্পণ করলেন। টাকাটা দিনু গায়েনের পায়ের সামনে রেখে মধু বললেন,
‘গুরুজি, সামান্য উপহার। রাজা-বাদশার বংশধর হইলে তো সোনার শেকল পরাইয়া দিতাম। নিজের বংশ পরিচয় ভালো নয়। এর ওপর আয়-রোজকার মন্দ, তাই এই সামান্য কয়টি টাকা আপনার চরণতলে সইপা দিলাম।’
দিনু গায়েন মুদিত নয়ন খুলে হেসে ফেললেন। তার হাসির মধ্যেও মাদকতা আছে, অনেক অর্থ ছড়িয়ে যায় হাসিতেÑ মনে মনে ভাবে মধু। মধু অবাক হয়ে ভাবে, এমন কণ্ঠের একজন গায়েন বাস করেন বটগাছের ছায়ায় ভাঙাচোরা এক খুপরিঘরে। আশ্চর্য রকম বেদনার কথা! দিনু গায়েন টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে মধুকে বললেন,
‘তোমার চেহারা-সুরুত ও পোশাক দেইখ্যা মনে হচ্ছে, তোমার সংসারের অবস্থা ভালো না। আমারে এতগুলা টাকা দিহা ফালাইছো, এইটাই আমার জন্য বড় আনন্দের সংবাদ।’
কথাটা বলে দিনু গায়েন কী যে এক নির্মোহ হাসি ফুটিয়ে তুললেন মুখে, ওই হাসির দিকে চেয়ে থেকে মধুর মনে হচ্ছিল টাকা-পয়সার প্রতি লোভ না থাকলে এ-রকম সুখী হওয়া যায়। দিনু গায়েন এর যথার্থ উদাহরণ। দিনু গায়েনের ডেরার সামনের দাওয়ায় বসে সকালবেলায় কাল রাতের কথাগুলো ভাবছিলেন মধু। মধুর মাথার উপরে বটগাছের বিশাল ছায়া। ওই ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে ভোরের নরম আলো তীর্যক হয়ে নেমে এসেছে নিচে। আজকের সকালটা বড্ড আলো ঝলমলে! বটগাছের মূল থেকে সামন্য দূরে দিনু গায়েনের ভাঙা ডেরা। ডেরার পাশ থেকে একটা রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে গেছে খালপাড়ে। বটগাছটা বহুকাল ধরে এখানে বড় বড় জট ছড়িয়ে প্রভাবশালী ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে। এই গাছ ঘেঁষে চওড়া রাস্তাটা আবদুল্লাপুর ইউপি কার্যালয়ের দিক থেকে এসে বাঁক নিয়ে পুলিন্দার পাড়ের দিকে গেছে। মধু লক্ষ করেছেন, বটগাছটির দৈত্যাকৃতির ছায়ার নিচে কয়েকটি দোকানের ঝাঁপ খুলেছে সকালে। সন্ধ্যা হলে দোকানগুলো বন্ধ হয়। এখানে রয়েছে করিম মিয়ার চায়ের দোকান, সফি মণ্ডলের মুদির দোকান, কেরামতের গামছার দোকানও আছে। পুলিন্দার পাড়ের রমজান মাঝে মাঝে বটগাছের নিচে তরমুজ, বাঙ্গি, খিরাই নিয়ে বসে পড়ে। আবার কোনোদিন দেখা যায় আমড়া, জাম, আম বা পেয়ারা বিক্রি করছেন। ফল বিক্রেতা হিসেবে তার একটা পরিচিতি হচ্ছে। গত কয়েকদিনে মধু নজর রেখে এসব দেখেছেন। মধু জানেন, এক দশক আগেও এই বটগাছের নিচে মানুষ দাঁড়াতে ভয় পেত। ভূতের ভয় যেমন ছিল, বিষধর সাপেরও ভয় ছিল গ্রামের মানুষের মনে। এখন ওসব ভয়ডর নেই। বটতলা দিনদিন জমে উঠছে। মধু খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, এই বটতলায় প্রথমে ডেরা তুলেছিলেন দিনু গায়েন। এরপর একটা একটা করে দোকান বসেছে। এভাবে একটা সময় ভয় জমে থাকা বটতলায় মানুষের পদভারে মুখর হয়ে উঠেছে। মধুর বসবাস পাশের গাঁয়ে হলেও এই গাঁয়ের খবর ভালোই জানেন। চুরিবিদ্যায় সফলতা অর্জন করতে হলে নিজের গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে কসরত করতে হয়। চুরিবিদ্যার কসরত করতে অতীতে অনেকবার এই গ্রামে এসে ঘুরেছেন মধু। তাই এই গাঁ বা আশপাশের গাঁও-গেরামের চেহেরাটা মধুর চেনা। তাই পরিবর্তনটাও তার চোখে ঠাওর হয় বেশি।
আবদুল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ওয়াহিদ বেপারীর খুব নামডাক। পরপর চারবার এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি কঠোর মানুষ, সৎ ও ন্যায় বিচারক। কোনো অন্যায়কে তিনি প্রশ্রয় দেন না। অনিয়ম দেখলে ক্ষুব্ধ হন। জাল দলিল, ভুয়া স্বাক্ষর, দুর্বলের জমি জবরদখল তার কঠোর মনোভাবের কারণে এই ইউনিয়নে এখন হয় না। যারা জমি জালিয়াতি করত, গরিব মানুষকে ঠকিয়ে জমি লিখে নিত বা অল্প জমি কিনে বেশি হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করত, তাদের কাছে ওয়াহিদ বেপারী ভীষণ অপছন্দের মানুষ। নির্বাচন এলে তারাই ওয়াহিদ বেপারীর বিরুদ্ধে মাঠে নেমে যায়। অবশ্য তারা কোনো সুবিধা করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ ওয়াহিদ বেপারীকে খুব পছন্দ করে, তারাই ভোটের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয় তাকে। ‘সৎ ও ন্যায়পরায়ণ থাকলে জীবনে কিছু অর্জন হয় না’Ñ এমন কথা যারা বলে বেড়ায়, ওয়াহিদ বেপারীর বারবার নির্বাচনে জয়লাভকে বিবেচনা করলে তাদের কথা অসাড় হয়ে যাবে। ওয়াহিদ বেপারীর বয়স হয়েছে। ছয় দশকের শেষপ্রান্তে জীবনের বয়স এসে দাঁড়িয়েছে। এ বয়সেও তিনি প্রতিদিন হেঁটে মানুষের বাড়ি বাড়ি যান, এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান। গ্রামের মানুষের কাছে গিয়ে খোঁজখবর নেন তিনি। প্রতিদিন ভোরবেলা প্রাতঃভ্রমণে বের হবেন এবং মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেলা বাড়লে এসে বসেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের অফিসে। এখানেও মানুষের ভিড় থাকে। কতজন কত অভিযোগ নিয়ে এসে হাজির হয়। তিনি চেষ্টা করেন অভিযোগকারীদের অভিযোগ শুনতে এবং সমস্যার সমাধানের চেষ্টাও করেন। আজ সকালে দিনু গায়েনের ডেরার সামনে ওয়াহিদ বেপারীর গলা শোনা গেল।
‘এই দিনু, কী করছো হে? একটু বাইরে আসো।’
ওয়াহিদ বেপারীর কণ্ঠ শুনে দিনু গায়েন জবাব দিলেন,
‘আইতাছি, চেয়ারম্যান সাহেব। গায়ে কাপড়টা পইরা আসি।’
লুঙ্গি পরা ছিলেন দিনু গায়েন। একটা হলুদ রঙের শার্ট গায়ে চাপিয়ে নিলেন। কাঁধে গামছাটা তুলে দরজা খুললেন। সকালের ভরাট ও ধাঁধানো আলো ডেরার দরজা দিয়ে এক লহমায় ঢুকে পড়ল। বটগাছের মূলের সামনে চেয়ারম্যান ওয়াহিদ বেপারী দাঁড়িয়ে আছেন, তার পেছনে সহকারী হোসেন এবং হোসেনের পেছনে আরও চারজন গ্রামবাসী। দিনু গায়েন তড়িঘড়ি করে নিজের ডেরার দরজা দিয়ে বের হলেন। তার পেছনে বের হলেন মধুও। দিনু গায়েন চেয়ারম্যানের মুখের দিকে চেয়ে মিষ্টি হেসে বললেন,
‘সালাম ও পেন্নাম জানবেন আমার, চেয়ারম্যান সাব।’
‘ঠিক আছে। তোমার খবর কী? কেমন আছ?’
প্রশ্নটা করে ওয়াহিদ বেপারী এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন মধুর আপাদমস্তক। দিনু গায়েন বললেন,
‘জি¦, ভালো আছি। তা, আমাদের মতো গরিব মানুষের থাকা, আর না-থাকা!’
‘কেন এমন কথা বললে, শুনি? তুমি তো কখনও আক্ষেপ করো না, বাউল। তোমাকে তো সব সময় সুখীই মনে হয়। নয় কী?’
‘তা বৈকি, চেয়ারম্যান সাব। সুখী না হইলে কি গান বাঁধতে পারি?’
বললেন দিনু গায়েন। চেয়ারম্যানের মনে কেমন খচ্খচ্ ভাব বিরাজ করছে। চেয়ারম্যান দিনু গায়েনকে বললেন,
‘এ-কথাটাও আজ ঠিক বললে না, দিনু। দুঃখেরও গান আছে। দুঃখ নিয়েই তো মনে হয় গান বেশি হয়। কী বলো?’
‘তা ঠিক বলেছেন। আপনি দেখছি গান-বাজনার খবরও রাখেন!’
‘রাখি বললে ঠিক হবে না। তবে কদাচিৎ রাখি। তা, তোমার ডেরার সামনে বসে আছে, ও কে?’
চেয়ারম্যানের এ-কথায় একটু ভড়কে গেলেন মধু। ওয়াহিদ বেপারী চোর-বাটপার-ডাকাত একদম সহ্য করতে পারেন না। মধুকে চিনে ফেললে কী হবে, কে জানে! মধুর গলা শুকিয়ে আসছে। দিনু গায়েন পেছনে ফিরে মধুকে দেখলেন একবার। তার মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন,
‘গানের সমঝদার এক লোক। কাল রাইতে পরিচয়। আমার গান শুইন্যা আর বাড়ি ফিরে নাই!’
‘মানে, অচেনা ব্যক্তি!’
‘জি¦, চেয়ারম্যান সাব। তার সঙ্গে ভালো কইরা এখনও চেনাজানা হয় নাই। গানের ঘোরে ছিলাম, সুরের মধ্যে ডুইবা ছিলাম। তবে মনে হচ্ছে, লোকটি অনেক ভালো মানুষ।’
‘আচ্ছা। তা, হতে পারে। তবে কি জানো, আজকাল আমাদের এখানে, মানে আশপাশের গ্রামগুলোতে হঠাৎ হঠাৎ নতুন মানুষের আনাগোনা দেখছি। খবর পাচ্ছি। ঠিক বুঝতে পারছি না, এটা কীসের লক্ষণ!’
চেয়ারম্যানের কথা শুনে অবাক কণ্ঠে দিনু গায়েন বললেন,
‘তাই না-কি?’
‘হুম। আমি বিভিন্নজনকে বলছি, চোখ-কান খোলা রাখতে। কেন জানি, মনে হচ্ছে অশুভ কোনো লক্ষণ এটি।’
‘কেন এমন মনে হইতাছে আপনার?’
জানতে চাইলেন দিনু গায়েন, জবাবে ওয়াহিদ বেপারী বললেন,
‘জানি না। নানা কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এখন। আমার বয়স তো আর কম হলো না। আমাদের গ্রামে হঠাৎ করে শহুরে মানুষরা কেন আসছে, বুঝতে পারছি না। তবে আঁচ করতে পারছি।’
‘তা কী আশঙ্কা করতেছেন, আপনি? আমারে বলবেন কি?’
‘না। এ-কথা সকলের সামনে বলে ফেলা ঠিক হবে না। তোমাকে বলব পরে। আপাতত একটা কথা শুনে রাখো।’
‘বলুন, চেয়ারম্যান সাব।’
সম্মতি প্রকাশ করলেন দিনু গায়েন। চেয়ারম্যান ওয়াহিদ বেপারী বললেন,
‘নতুন মানুষ দেখলে জানার চেষ্টা করবে, সে কেন এই গ্রামে এসেছে। কী তার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কী? সন্দেহজনক কিছু মনে হলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’
‘জি¦, আচ্ছা।’
‘চোখ-কান খোলা রাখবে, বুঝলে? শুধু গানের মধ্যে ডুবে থাকলেই হবে না।’
‘জি¦, আজ্ঞে। কথাটা মনে থাকবে।’
বিনয় বিগলিত কণ্ঠে বললেন দিনু গায়েন। ওয়াহিদ বেপারী বললেন,
‘তোমার পেছনের মানুষটাকে কি দু-একটি প্রশ্ন করতে পারি? কিছু মনে করবে না তো? বাড়িতে যে আশ্রয় নেন, সে তো অতিথি। অতিথিকে অসম্মান করছি বলে ভাববে না তো?’
দিনু গায়েন লজ্জিত কণ্ঠে বললেন,
‘না, না। কী যে বলেন! প্রশ্ন করেন।’
মধুর সামনে থেকে একটু সরে দাঁড়ালেন দিনু গায়েন। মধুর বুকের ভেতরে একটা ঢেউ উঠে নেমে গেল। দুম্দুম্ শব্দ হচ্ছে, মধু নিজেও এই শব্দ শুনতে পাচ্ছে স্পষ্ট। ওয়াহিদ বেপারী মধুর মুখের ওপর অনুসন্ধানী দৃষ্টি রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন,
‘তা, তোমাকে তো চিনলাম না! শহরে থাকো, তা মনে হচ্ছে না। বাড়ি কোন গ্রামে? কী নাম তোমার?’
‘জি¦, আমার নাম মধু। পাশের গ্রামেই বাস।’
‘পাশের গ্রামে? কোন গ্রামে? গ্রামের নাম কি?’
মধু ইতস্তত করে বললেন,
‘গ্রামের নাম চোরমর্দন।’
‘চোরমর্দনে বাস? মানে এখান থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে, তাই না?’
‘জি¦। গানের টানে কাল এই গ্রামে চলে এসেছি, চেয়ারম্যান সাব।’
‘তো, ঐ গ্রামে তো আগে অনেক চোর বাস করত! তাই না?’
প্রশ্ন করলেন ওয়াহিদ বেপারী। জবাবে মধু বললেন,
‘সে তো অনেক অনেক বছর আগের কথা! আমাদের গ্রামে এখন ভদ্রলোকেরা বাস করেন। খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন, কথাটা সত্য বললাম কি না।’
‘তা শুনেছি বটে! তারপরও গ্রামটির নাম শুনলে এখনও ভয় লাগে। আমি আবার চোর-ডাকাত পছন্দ করি না।’
‘এ-কথা চোরেরাও জানে, চেয়ারম্যান সাব। তাই তো চোরেরা এই গ্রামে আসার সাহসও করে না!’
‘এ-কথা তুমি কী করে জানলে হে?’
বেমক্কা কথা বললেও যে বিপদে পড়ে যেতে হয়, এ-কথা কি আর সব সময় মনে থাকে মধুর? মধু কথাটা বলে প্রমাদ গুনলেন। কী জবাব দেবে ভাবছিলেন, তখন পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘চেয়ারম্যান সাহেব, এখন চোরেরা আর গ্রামে থাকে না। শহরে গেলে দেখবেন চোরে গিজগিজ করছে!’
ভরাট কণ্ঠ শুনে সবাই তাকলেন লোকটির দিকে। মধু নিশ্চিত এই লোকটির বাস শহরে। কী ধোপদুরস্ত পোশাক পরে তাদের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে লোকটি। তার গায়ে স্যুট-বুট আর মাথায় ঢেউ খেলানো অদ্ভুত সুন্দর একটা টুপি। অনেক আগে টিভিতে রাজ কাপুরের একটা হিন্দি ফিল্ম দেখেছিলেন বসন্ত হাওলাদারের বাড়িতে গিয়ে। লোকটিকে ও-রকম লাগছে, রাজ কাপুরের চেয়ে একটু লম্বা বেশি হবে। লোকটি চেয়ারম্যানের সামনে এগিয়ে এসে একগাল হাসি মুখে ধরে নিজের পরিচয় দিতে বললেন,
‘আমার নাম রাসেদুল শাকিল। বেশ কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম, আপনার সঙ্গে পরিচিত হই। আজ আপনার সঙ্গে পথেই দেখা হয়ে গেল।’
‘শুধু নাম বললেই তো হবে না। আপনার বসবাস কোথায়? কী করেন? এই গ্রামে আগমনের হেতু কী?’
জানতে চাইলেন ওয়াহিদ বেপারী। রাসেদুল শাকিলের মুখের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো। তিনি বললেন,
‘আমার বাস কেপটাউন শহরে। আমার শখ ঘুরে বেড়ানো। চোর-ডাকাত ধরি। ডিটেকটিভ বলতে যা বোঝায়। এই গ্রামে আসার কারণও এটি।’
ওয়াহিদ বেপারীর পেছনে দাঁড়ানো হোসেন বলে উঠলেন,
‘টাউন শুনছি, কেপটাউন তো শুনি নাই। এটা আবার কেমন নাম?’
জবাব দিতে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘কেপটাউন হচ্ছে একটি শহরের নাম। এটি বিখ্যাত একটি শহর। দক্ষিণ আফ্রিকার শহর। এবার বোঝা গেল?’
মধুর বুকের ভেতরের ঢিবঢিব শব্দ কখন যে থেমে গেছে, নিজেই জানেন না। তার বিস্ফোরিত চোখ আটকে আছে সুদর্শন রাসেদুল শাকিলের মুখে। ওয়াহিদ বেপারীর সন্দেহ দূর হয় না। তিনি রাসেদুল শাকিলের আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়েছেন। তিনি বললেন,
‘এই গ্রামে যে গোয়েন্দাগিরি করতে এলেন, এর কারণটা পরিষ্কার হচ্ছে না। একটি আধুনিক শহর থেকে ছুটে এসেছেন এই অজপাড়াগাঁয়ে! তা জনাব, এখানে এসে কী এমন রহস্য উদ্ঘাটন করবেন, বুঝতে পারছি না।’
‘রহস্য মানে, গভীর রহস্য এই গ্রামে লুকিয়ে আছে! আপনারা, এই রহস্য জানেন না বলে বুঝতে পারছেন না। আচ্ছা, আপনি বলুন তো, নাটেশ^র গ্রামে মাটির নিচে যে হাজার বছরের পুরনো শহরের সন্ধান পাওয়া গেছে, এটা কি কম বড় রহস্য?’
এর জবাবে ওয়াহিদ বেপারী বললেন,
‘না, মানে, যেখানে-সেখানে বা যে কোনো স্থানে মাটির নিচ খুঁড়লে এমন রহস্য সব জায়গায়ই পাওয়া যাবে। খোঁড়া হয় না বলে রহস্য জানা যায় না। এটা আমার একান্ত ধারণা, জনাব।’
‘এ-কথাটা ঠিক নয় চেয়ারম্যান সাহেব। সব জায়গায় খনন করলেই মাটির নিচে শহর আবিষ্কৃত হবে, তা বিশ^াসযোগ্য নয়। শহর আবিষ্কৃত হয়, আবার শহর মাটির নিচে তৈরিও করা হয়।’
বললেন রাসেদুল শাকিল। ওয়াহিদ বেপারী বললেন,
‘ঠিক বুঝলাম না। মানুষ মাটির নিচে শহর তৈরি করবে কেন?’
‘প্রয়োজনেই তৈরি করে বা তৈরি করতে হয়। আচ্ছা, আপনাকে এমন একটি শহর তৈরির করা বলছি। ১৯১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর দিকে অবস্থিত কুবের পেডি শহরে স্বর্ণ খুঁজতে গিয়ে অভিযাত্রীরা পাথরের খনি আবিষ্কার করেন। এরপর তারা প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ার কারণে ঐ এলাকার মাটির নিচে শহর গড়ে তোলেন। ওখানে ৭০টির বেশি পাথরের খনি রয়েছে। ওপাল বা উপল পাথর অনেক মূল্যবান, এই পাথরের কারণে এই শহরের নাম হয়েছে ‘কুবের পেডি’। ২০১১ সালের এক আদমশুমারি অনুযায়ী ঐ শহরে ১৬৯৫ মানুষ বাস করছিলেন। তাদের ছিল ৯৫৩ জন পুরুষ ও ৭৪২ জন মহিলা। এছাড়া ২৭৫ জন আদিবাসী ছিলেন গণনায়। শহরটি এখনও আছে।’
যেন একটা অসাধারণ গল্প বললেন রাসেদুল শাকিল এমন দৃষ্টি মেলে ধরলেন নিজের চোখে। জবাবে চেয়ারম্যান বললেন,
‘তা মাটির নিচে মানুষ শহর বানিয়েছে, জানলাম। কিন্তু মাটি খুঁড়ে শহর পেয়েছেÑ এমন কথা এখন শুনছি আমরা।’
‘ভুল শুনছেন না। পাতালেও শহর পাওয়া গেছে। পাতালে মানুষের বসবাসের চিহ্ন এবং সভ্যতার নিদের্শনও পাওয়া গেছে। আচ্ছা, আপনি বলুন তো, পৃথিবীতে প্রথম কোথায় এবং কখন এমন পাতাল শহরের সন্ধান পেয়েছে মানুষ?’
রাসেদুল শাকিলের প্রশ্নে একটু হচকিয়ে ওয়াহিদ বেপারী বললেন,
‘আমি কি এ সব পড়েছি যে এমন কথার জবাব দাঁড়িয়েই দিয়ে দেব?’
‘তা বলছি না। তবে আপনাদের জানানোর জন্য বলছি, মাটির নিচে শহর আবিষ্কারের ঘটনা খুব বেশিদিনের নয়। পৃথিবীতে প্রথম মাটির নিচে শহরের অবিষ্কার হয় ১৯৪৬ বা ১৯৪৭ সালে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম গুপ্তশহর আবিষ্কৃত হয়। পূর্ব জর্ডান ও পশ্চিম ইসরায়েলের মাঝখানে যেখানে ডেড সি বা ভূমধ্যসাগর অবস্থিত, সেখানে এমন গুহা বা প্রথম গুপ্তশহর আবিষ্কৃত হয়। এটি সমুদ্র তলদেশ থেকে ৪২৭ মিটার নিচে অবস্থিত এবং ৩০৬ মিটার গভীরে। এটি বিশে^র গভীরতম লোনাজলের হ্রদও। এর নাম হচ্ছে কুমরান গুহা। ১৯৪৬-৪৭ সালে এর সমতল ভূমিতে ভেড়া চড়াতে এসে রাখালরা একটি গুহার সন্ধান পায়। ওই গুপ্ত গুহায় প্রায় এক টন পরিমাণ সোনা ও রুপা ছিল। ওসব কারা নিয়ে গেছে তা প্রকাশ পায়নি।’
এ পর্যন্ত বলে থামলেন রাসেদুল শাকিল। সমবেতদের মধ্যে কেমন ঘোর সৃষ্টি হলো। ওয়াহিদ বেপারী অপলক চেয়ে রইলেন রাসেদুল শাকিলের মুখের দিকে। এর চেয়েও সম্মোহিত চোখে তাকিয়ে আছেন মধু। ওর মনে হচ্ছিল আসমান থেকে কোনো মনীষী এসে কথা বলছেন। মধু মনে মনে লোকটিকে ওস্তাদ মেনে নিলেন। এই ওস্তাদকে মধু কোনোভাবে ছাড়বেন না, মনে মনে পণও করলেন। জীবনে যথাযথ ওস্তাদ না পেলে সাফল্য আসে নাÑ এ-কথা জানেন মধু। ভালো ওস্তাদ পেলেন না বলে চুরিবিদ্যাটা তার কাছে চমকালো না; বরং সাদামাটা ও তুচ্ছ বিষয় হয়ে রইল। চুরি করতে গেলে ধরা পড়ে যায়। জ্ঞান খোলে না। প্রতিভা বলতে লবডঙ্কা! এ নিয়ে গোপনে চোখের জল ফেলে চলেছেন মধু। সবাইকে কেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছেন সামনের লোকটি, এর কাছেই দীক্ষা নিতে হবে তার। মধু লক্ষ করেছেন, কঠোর চরিত্রের ওয়াহিদ বেপারীও লোকটির সামনে কথা গিলে ফেলেছেন শিশু-বালকদের মতো! মনে মনে লোকটির প্রতি মধু একটা পেন্নাম জানিয়ে দিলেন।
ওয়াহিদ বেপারীও যেন রাসেদুল শাকিল নামধারী লোক বা গোয়েন্দাকে ঘাঁটাতে চাইলেন না। তিনি রাসেদুল শাকিলের উদ্দেশে বললেন,
‘আপনি কোথায় উঠেছেন, বলুন তো? আপনার মতো এমন একজন ডাকসাইটে গোয়েন্দার থাকার জায়গা তো এই গ্রামে নেই। আপনি কি আমার বাড়ির অতিথি হবেন?’
‘হতাম; কিন্তু এই গ্রামে আমার বোনের বাড়ি আছে। আমি বোনের বাড়িতে উঠেছি। তবে কখনও ঢাকা, কখনও নারায়ণগঞ্জ চলে যাই। কখন, কোথায় রাত্রিযাপন করি, এর ঠিক নেই।’
‘কোন বাড়িতে উঠেছেন, বলুন তো! আপনার ভগ্নিপতির নাম কী?’
‘গোলাম রাব্বানী। আবদুল্লাপুর বাজার থেকে মিরকাদিম যেতে তাদের বাড়িটা পড়ে।’
‘হ্যাঁ, তাকে আমি তো চিনি। তারা তো এখন ঢাকায় আছেন। তাই না?’
‘ঠিক বলেছেন। আমার ভাগ্নে রাতুল খুব অসুস্থ, তাই তারা ঢাকায় আছেন। কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রামে ফিরে আসবেন।’
‘আচ্ছা। কথা হলে আমার সালাম জানাবেন রাব্বানীকে।’
‘অবশ্যই জানাব।’
‘ঠিক আছে, আমরা তাহলে যাই।’ বলে ওয়াহিদ বেপারী ইউনিয়ন পরিষদের পথে হাঁটতে শুরু করলেন। তার পেছনে সঙ্গীরাও হাঁটতে লাগল।
দিনু গায়েন রাসেদুল শাকিলের দিকে চেয়ে বললেন,
‘আমি পৃথিবীর অত খবর জানি না। তবে আপনার কথা শুনতে ভালো লাগতেছিল!’
‘ধন্যবাদ। আপনি গান নিয়ে পড়ে আছেন, এই তো?’
‘জি¦। গান আর সুর, এর মধ্যে বান্ধা পইড়া আছি।’
‘বেশ ভালো। তবে এখন থেকে সাবধানে থাকবেন। যাকে-তাকে নিজের ঘরে প্রবেশ করতে দেবেন না। এই গ্রামে চোর-ডাকাত ঘুরছে খুব!’
‘বলেন কী! এই হতশ্রী গ্রামে ওদের কী কাজ?’
‘জানতে পারবেন। তখন নতুন গানও বাঁধতে পারবেন। আজ যাই, সময় পেলে একবার এসে আপনার গান শুনে যাব।’
‘আচ্ছা। আসবেন। রাতে আমি গান গাইতে ভালোবাসি। যে কোনো রাতে আসবেন।’
‘আসলে, রাতেই আসব।’
দিনু গায়েন মুখে হাসি নিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন। রাসেদুল শাকিল হাঁটতে লাগলেন লম্বা লম্বা পা ফেলে। মধু দেখলেন দ্রুত হাঁটতে পারেন তিনি। মধু আর ভুল করতে রাজি নন, হাতের কাছে পেয়েও ওস্তাদ হারাতে চান না। মধু লোকটির পেছনে ছুটলেন। লোকটি হাঁটছেন, মধু যেন দৌড়ে চলেছেন। বেশি দূর পথ যেতে হলো না। পুলিন্দার পাড় সেতুর কাছে লোকটি থামলেন এবং পেছনে ফিরে তাকালেন। মধু লজ্জিত কণ্ঠে বললেন,
‘আপনি আমার মা-বাপ! আমারে আপনার শিষ্য কইরা লন। আপনের যে বিদ্যা-বুদ্ধি, এমন ওস্তাদ পাইলে জীবনে সফল হমুই, হমু!’
রাসেদুল শাকিল মøান হাসলেন। মধুর বুকের ভেতর আনন্দের একটা ঢেউ উঠল। রাসেদুল শাকিল মধুর উদ্দেশে বললেন,
‘তুমি তো ছিঁচকে চোরও হতে পারোনি! বাপ-দাদার নাম ডুবিয়েছ। মাথার মধ্যে শুধু ‘চোর’ হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্ন আছে, প্রতিভা নেই। এখনকার সময়টা হচ্ছে প্রতিভা দেখানোর সময়, বুঝলে?’
মধু হা করে তাকিয়ে রইলেন। মধু যে চোর এ-কথা তিনি জানলেন কীভাবে? আশ্চর্য! মধু ভেবে পান না। তিনি ফের মধুকে বললেন,
‘দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর রাখো? রাখো না! রাখবে কী, লেখাপড়াও তো গোল্লা! মাথা ভরা গোবর!’
‘জে¦, আজ্ঞে! এ-কথা একেবারেই খাঁটি কথা, ওস্তাদ! আমার মাথায় কিছু খেলে না! কী করব, বলুন!’
‘খেলবে কী! নাক বোচা কয়টি লোক এসে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিল তো, মাথা ঘুরে গেল! এই তো?’
লোকটির কথা শুনে এমন চমকালো মধু, তার মাথা যেন ভনভন করে ঘুরছে! মধু ভাবলেন, লোকটি কি জাদুকর? এমন গোপন কথাও জেনে বসে আছেন! রাসেদুল শাকিলের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন মধু। ভয়ও হচ্ছে। মধুর মনে হচ্ছে, পেচ্ছাব করে লুঙ্গি ভিজিয়ে ফেলবেন। রাসেদুল শাকিলের কণ্ঠ ফের শুনতে পেলেন মধু।
‘যাদের টাকা নিয়েছ, তাদের কাজটি পর্যন্ত করতে পারছ না। সেদিকে মনোযোগ নেই। চোর হিসেবে খ্যাতি চাও, আবার বিদ্যাটার প্রতি যত্ন বা মনোযোগ কোনোটাই নেই।’
‘জে¦, আজ্ঞে, ওস্তাদ! চোরদের দিন ফুরাইয়া গেছে! এখন পুলিশদের দিন! তাদের চোর ধরতে হয় না। দিব্বি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারছে!’
‘তুমি তো বোকা চোর। চোরদের দিন ফুরিয়েছে কে বলল? এ বিদ্যায় যারা পারদর্শী তারা ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করে ফেলছে। বিখ্যাতও হয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। তোমাকে একটি ঘটনার কথা বলছি, শোনো। আচ্ছা, তুমি ম্যারাডোনার নাম শুনেছ? বলতে পারবে তিনি কে ছিলেন?’
‘ম্যারাডোনারা চিনুম না! ম্যারাডোনা সে-ই একটাই, ফুটবলের রাজা! দুনিয়ার সকল লোক তারে চেনে!’
‘যাক, চিনেছ তাহলে। এই ম্যারাডোনা দু-হাতে দুটি একইরকম ঘড়ি পরেছিলেন ২০১০ সালে। তার আজব শখ হয়েছিল বলতে পার। ওই সময়ে ম্যারাডোনা দুই হাতে দুটি উবলো বিগ ব্যাং ঘড়ি নিয়ে মাঠে নামতেন। কারণ, এক হাতের ঘড়িতে দক্ষিণ আফ্রিকার সময় দেখতেন। আরেক ঘড়িতে সময় দেখতেন আর্জেটিনার। তিনি নিজের দুই কন্যাদের সঙ্গে আটলান্টিকের অন্য প্রান্তেও একান্ত থাকতে চাইতেন। এভাবে দুই ঘড়ি দু-হাতে পরার অভ্যাসও হয়ে গিয়েছিল তার। বাইশ লাখ টাকা মূল্যের একটি ঘড়ি চুরি হয়ে গিয়েছিল দুবাই থেকে। বুঝলে?’
‘বলেন কী!’
‘হ্যাঁ, এটাই সত্যি। আর এই চুরি হওয়া ঘড়িটি তার মৃত্যুর এক বছর পর পাওয়া যায় ভারতের আসামের শিবসাগর এলাকা থেকে। এই ঘড়ি চুরির অভিযোগে ওয়াজিদ হুসেইন নামে একজনকে পুলিশ গ্রেফতারও করে।’
‘ওরে বাব্বা! লোকটি কি চোর ছিল?’
‘সে দুবাইয়ে কাজ করত নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে। সুযোগ পেয়ে হাত সাফাইয়ের কাজটাও করে ফেলেছে। শোনো, চুরি করার প্রতিভা আর বিচক্ষণতা থাকতে হয়। ওয়াজিদ চুরি করে অনেক পর ধরা পড়েছে ঠিক, একই সঙ্গে বিখ্যাতও হয়েছে। বলো তো কেন?’
‘কেন, ওস্তাদ?’
‘আরে, ও কার ঘড়ি, কোন স্থান এবং কীভাবে চুরি করেছেÑ এ নিয়ে বিস্তর গল্প হয়েছে এবং গল্প এখনও হয় মানুষের মধ্যে। এমন চুরির ঘটনাকে প্রতিভাবান চোরেরা আর্ট বলে অহংকার করে।’
‘ওসব তো জানি না, ওস্তাদ। আমরা তো চুরি করি পেটের ক্ষুধায়, অভাবের তাড়নায়। তাহলে ওটা আর্ট না?’
‘চুরি করা কখনই আর্ট নয়। আমার বিবেচনায় ওটা অপরাধ। এই অপরাধ না করাই মানুষের ধর্ম-কর্ম এবং দায়িত্ব হওয়া উচিত।’
‘তাহলে যে, এই গল্প বললেন, আপনি। আমি তো…!’
মধু এ পর্যন্ত বলত পারলেন। রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘গল্প বলেছি, একজন মানুষের বিখ্যাত হওয়ার বাসনার কথা বলতে। চুরি করার কাজকে সমর্থন করতে নয়।’
‘তাহলে আমি দেখতাছি, কোনো কাজেই লাগতে পারমু না! এই পৃথিবীতে অকারণেই আগমন হইছে আমার!’
আক্ষেপ প্রকাশ পেল মধুর কণ্ঠে। রাসেদুল শাকিল মধুকে বললেন,
‘না। তা নয়। তুমিও ভালো কাজ করে বিখ্যাত হতে পার।’
‘যেমন, ওস্তাদ! ক্যামনে?’
রাসেদুল শাকিল চারপাশে তাকালেন। কণ্ঠ নামিয়ে বললেন,
‘তোমাকে যারা টাকা দিয়েছে, তারা সংঘবদ্ধ একটি অপরাধী চক্র!’
কথাটা শুনে ভড়কে গেলেও চমকালেন না মধু। রাসেদুল শাকিল যেন সব কথা জানেন। তার কাছে কোনো কথাই গোপন নেই। মধু বললেন,
‘তাইলে আমি এখন কী করমু? তারাই বা কী করবে এইখানে?’
‘তারা গুপ্তধন খুঁজতে আসেনি। তোমাকে তারা মিথ্যে কথা বলেছে। এটা জানো?’
‘না, জানি না। কিন্তু কেন?’
‘তারা তোমাকে চর হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। তোমাকে বলেছে, গুপ্তধনের কথা। কিন্তু তারা আরও মূল্যবান কিছু জিনিস হাতিয়ে নিতে চাইছে।’
‘কী জিনিস? আমাকে তারা সত্য কথা বললেই বা কী হইতো?’
অবাক কণ্ঠে জানতে চাইলেন মধু। রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘সত্য কথা বললে তা তুমি ফাঁস করে দিতে, এটা তাদের আশঙ্কা ছিল।’
‘তাইলে সত্য ঘটনা কী, ওস্তাদ?’
‘এই অঞ্চলে অতীশ দীপঙ্কর জন্মেছিলেন। তুমি তার নাম শুনেছ?’
‘না, ওস্তাদ। তিনি কে?’
‘তোমাকে চিনতে হবে না। যারা এই অঞ্চলে ঘুরছে, তারা একটি মহামূল্যবান পাথরের মূর্তির সন্ধান করছে।’
‘ওটার অনেক দাম বুঝি?’
‘কত দাম, তা নির্ণয় করে বলা কঠিন। মিলিয়ন মিলিয়ন বা বিলিয়ন ডলার দাম হতে পারে। আরও বেশি হতে পারে।’
বললেন রাসেদুল শাকিল। মধু কৌতূহলী কণ্ঠে বললেন,
‘টাকায় গুনলে কত লাখ হবে, ওস্তাদ?’
‘ওসব বলা যাবে না তোমাকে। শুধু বুঝে নাও, অনেক, অ-নে-ক মূল্যবান পাথরের মূর্তি!’
‘ওরে, ওরে! কী সাংঘাতিক কথা! এখন আমি কী করমু?’
‘তুমি যা করছিলে, তাই করবে। বেশি চালাকি করতে গেলে ওরা তোমাকে ছাড়বে না। সাবধান!’
‘কী করমু আমি? পুলিশকে গিয়ে বইল্যা দিমু?’
জানতে চাইলেন মধু। জবাবে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘কাজ হবে না। ওসব ম্যানেজ করেই ওরা কাজ করে। ওদের মোকাবিলা করতে হবে বুদ্ধি দিয়ে।’
‘আমার তো বুদ্ধি নাই, ওস্তাদ!’
‘আছে। শুধু জানো না, কীভাবে বুদ্ধি খাটাতে হয়।’
‘আপনি আমার মা-বাপ! আমাকে বলে দেন কী করমু, আমি।’
‘ঠিক আছে, এখানকার রাজবাড়ি ছেড়ে নাটেশ^র গ্রামে ঘুরবে বেশি। ওদের সঙ্গে তোমার দেখা হয়ে গেলে বলবে, এমনিই ওখানে এসেছো। বোকার মতোই থাকবে।’
‘আচ্ছা। আপনার কি ধারণা মহামূল্যবান পাথরের মূর্তিটা নাটেশ^র গ্রামে আছে?’
‘ওখানে থাকার সম্ভাবনা বেশি। মাটির নিচে চাপা নগরীর সন্ধান করার সময় এটা বেরিয়ে আসতে পারে।’
‘তাহলে তো ওইটা বের হইবোই! তাহলে ওরা আগেই খুঁজতেছে ক্যান?’
‘এ-কারণেই তুমি বোকা। ওটা প্রকাশ্যে বের হলে এদেশের সরকার ওটার মালিক হবে। আর এটা আগেই হাতিয়ে নিতে পারলে ওটা যার হাতে, তারাই মালিক হবে।’
রাসেদুল শাকিলের কথায় মধু বললেন,
‘আচ্ছা! তাহলে? আপনার কাজ কী, ওস্তাদ’
‘আমার কাজ হচ্ছে, ওটা যেন দুষ্কৃতিকারীরা হাতিয়ে নিয়ে না যায়, সেই চেষ্টা করা। এর আগেই আমাকে অ্যাকশনে যেতে হবে।’
‘ওস্তাদ, আপনি তাহলে কে? সরকারের লোক? অ্যাকশনে যাইবেন বলতাছেন!’
‘ওই রকমই। সরকার আমাকে গোপনে এ-কাজে নামিয়েছে।’
‘আপনি একা এই কাজে নামছেন!’
‘না, আমি একা নই। আরও লোক আছে।’
‘তারা কোথায়? এমন লোক তো আমি দেখি নাই।’
‘তারা আছে, বলতে পারো হাওয়ায় মিশে আছে।’
এ-কথায় মধু বললেন,
‘ওরা মাত্র চারজন, আমি দেখছি, ওস্তাদ!’
জবাবে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘কচু দেখেছ! ওদের সংখ্যা আরও বেশি। অমাবশ্যার রাতে অপারেশনে নামবে ওরা। ওদের পুরো টিম তৈরি।’
‘আপনারাও তৈরি?’
‘হুম।’
‘আপনি চেয়ারম্যানকে বলছেন, আপনি গোয়েন্দা। সত্যি আপনি গোয়েন্দা?’
‘হুম। কেন এই প্রশ্ন করছো?’
জানতে চাইলেন রাসেদুল শাকিল। মধু মøান হেসে বললেন,
‘আমি কোনোদিন গোয়েন্দা দেখি নাই। আসলে আমাদের মতো চোরদের পুলিশ ছাড়া আর কিছু দেখা হয় নাই!’
‘আমিও পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশ!’
‘এটা আবার কী?’
মধুর প্রশ্নে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘ইন্টারপুল পুলিশের নাম শুনেছ?’
‘না, ওস্তাদ। এটা কী?’
‘বিশে^র বিভিন্ন দেশে এই পুলিশ অভিযান চালাতে পারে। পুলিশের আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা।’
‘আপনিও তাহলে পুলিশ, স্যার!’
‘হ্যাঁ। স্যার বললে যে!’
‘আমরা স্যার, পুলিশ শুনলেই স্যার বলি।’
‘ও আচ্ছা! তুমি তাহলে এখন যাও।’
রাসেদুল শাকিল বললেন। মধু বললেন,
‘কোন দিকে যাব, স্যার?’
‘নাটেশ^রের দিকে চলে যাও। যা বলেছি, মনে রাখবে। আর কারও সঙ্গে আমার কথা বলবে না। মনে থাকবে?’
‘জি¦, স্যার।’
মধু আস্থার সঙ্গে কথাটা বললেন। রাসেদুল শাকিল পুলিন্দার পাড়ের সেতু পেছনে রেখে হনহন করে হাঁটতে লাগলেন। মধু কেমন আবেশিত হয়ে তার চলে যাওয়ার পথে নিষ্পলক চেয়ে রইলেন। মধু মনে মনে নিজেকে যেন বলল, ‘পৃথিবীতে কত কিছু ঘইটা যাইতেছে, ওরা কিছুই জানে না! গ্রামের সাধারণ চোররা কত পিছাইয়া আছে!’
পাঁচ
টঙ্গিবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মফিজুর রহমান ছুটিতে রয়েছেন এবং অন্য ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অপারেশন) হাবিবুর রহমানের স্ত্রী অসুস্থ বলে আকস্মিক আজ ঢাকায় চলে গেছেন। ফলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়েছেন দারোগা হাতেম আলী। তিনি এই থানার সিনিয়র দারোগা। মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে জীবনের প্রথমবারের মতো হাতেম আলী একটি থানার ইনচার্জ হলেন। হোক তা ঘটনাক্রমে এবং একদিনের জন্য হলেও তো তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হলেন! তার চাকরি জীবনের সবচেয়ে বর্ণিল ঘটনাটা এটি। হাতেম আলী পুলিশের চাকরি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর মাত্র এক মাস পর অবসরে যাবেন। আজকাল পুলিশের চাকরি করে সুনামের চেয়ে দুর্নাম বেশি হয়। হাতেম আলীকেও নানা দুর্নাম শুনতে হয়। অথচ পুলিশ না থাকলে সমাজ টিকত না। মারামারি, খুনোখুনিতে সমাজটা অরাজকতায় ভরে থাকত। চোর-ডাকাতদের স্বর্গরাজ্য হয়ে যেত দেশটা। নিরীহ এবং ভালো লোকদের নিজ বাসায় খিল দিয়ে বসে থাকতে হতো। পুলিশ বাহিনী আছে বলেই সমাজে ভারসাম্য আছে। মানুষজন নিরাপদে বাস করছে এবং কেউ আক্রান্ত হলে বা কারও বাড়িতে হামলা হলে তারা পুলিশের কাছে এসে অভিযোগ করতে পারছে। মামলা হচ্ছে এবং পুলিশও অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। এসব কথা যখন হাতেম আলী দারোগা হিসেবে ভাবেন, তখন তিনি পুলিশে চাকরি করেন বলে গর্ব অনুভব করেন। তবে তিনি এ গর্বটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেন না। এর কারণ হচ্ছে, তিনি লক্ষ করেছেন পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে কেমন একটা দূরত্ব দিনদিন বাড়ছেই। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’Ñ এ-কথাটি তিনি মনে-প্রাণে বিশ^াস করেন। কিন্তু এ-কথা নিয়ে জনগণের বিশ^াসে ফাটল তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে জনমনে নানা অবিশ^াস তৈরি হয়েছেÑ এটা জানেন হাতেম আলী। তবে তিনি মনে করেন, জনমনে এক সময় পুলিশ বাহিনী নিয়ে শ্রদ্ধা বাড়বে। হাতেম আলী এএসআই থেকে এসআই হওয়ার পর থেকে সুযোগ পেলে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবেনÑ এমন কথাটা খুব ভাবতেন। এ নিয়ে অনেকবার নিজের মধ্যে স্বপ্ন রচনাও করেছেন। তিনি মনে করেন, সুযোগ পেলে পুলিশ কি না করতে পারে? তিনি সুযোগ পেলে তো দেখিয়ে দেবেন! কিন্তু তার জীবনে তেমন সুযোগ আসেনি। যে থানাতেই চাকরি করেছেন, সেখানে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে বড় ধরনের মামলার তদন্তভার দিতেন না। ডাকাত-দস্যু গ্রেফতার করার কোনো অভিযানেও তাকে নেওয়া হতো না। অধিকাংশ সময় থানায় বসে সাধারণ ডায়রি লিখতে হতো তাকে। লেখালেখির হাতটা তার ভালোই। তবে অভিযানেও যে তিনি দুর্ধর্ষ হতে পারেন, এটা কোনো বড় কর্মকর্তা পরখ করেননি। এটা তার গোপন দুঃখ। আজ হাতেম আলী থানার দায়িত্বভার পেয়ে যখন ভাবছিলেন কী করতে পারেন, কী করলে জনগণের মনে শ্রদ্ধার ভাব তৈরি হবে, ঠিক ওই সময়ে সুদর্শন এক লোক তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। কনস্টেবল রামকানাই খবরটা এসে দিলে তিনি দর্শনার্থীকে তার রুমে পাঠাতে বললেন। লোকটি প্রবেশ করতেই একটা মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল কক্ষে। লোকটির পোশাক দেখে তার বুঝতে অসুবিধে হলো না যে প্রভাবশালী কেউ হবেন। লোকটির প্রথম কথাতে তিনি চমকেও উঠলেন। লোকটি তার সামনের টেবিলে অন্যপ্রান্তে চেয়ারে মুখোমুখি বসে মুখে মিষ্টি একটা হাসি ধরে রেখে বললেন,
‘ভালো কাজ করার বাসনাটাই বড় কথা। আমাদের মধ্য থেকে এমন বাসনা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে!’
লোকটি যেন তার মনের কথাটাই বলে ফেললেন। কী আশ্চর্য! হাতেম আলী বিনয়ভরা কণ্ঠে বললেন,
‘আপনাকে কিন্তু চিনতে পারলাম না। এই এলাকায় আপনার মতো ধোপদুরস্ত পোশাকের কোনো ব্যক্তিকে আমি আগে দেখিনি! আপনি নিশ্চয়ই শহর থেকে এসেছেন? কী খেদমত করতে পারি আপনার, বলুন তো?’
রাসেদুল শাকিল পুলিশ কর্মকর্তা হাতেম আলীর কথায় ভীষণ খুশি হলেন। এমন আচরণই তো তিনি আশা করেন। তিনি সাবধানী কণ্ঠে বললেন,
‘আমি এসেছি আপনাকে বিশেষ একটা খবর জানাতে। সংবাদটা খুব গুরুত্বপূর্ণ!’
‘আপনার পরিচয়? আগে তো নিজের পরিচয় দিন!’
বললেন হাতেম আলী। রাসেদুল শাকিলের মুখের হাসিটা বড় হলো। তিনি বললেন,
‘আমার নাম রাসেদুল শাকিল। আমি থাকি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন শহরে। আবদুল্লাহপুরে আমার বোনের বাড়ি। এখানে এসেছি, অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে।’
‘কী কাজ, জনাব? আমি আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি?’
‘হুম। আপনিই পারেন। কাজটা করতে হবে আপনাকেই।’
এ-কথায় হাতেম আলীর কপালের রেখায় ভাঁজ পড়ল। কৌতূহলী কণ্ঠে তিনি বললেন,
‘খুলে বলুন তো! আপনি কী কোনো বিপদে পড়েছেন?’
‘না, আমাদের সবার জন্যই বিপদ! আপনার জন্য আরও বেশি বিপদ!’
‘কী কথা বলছেন আপনি? আমাকে ভড়কে দিচ্ছেন কেন?’
হাতেম আলীর কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল। জবাবে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘ভড়কে দিচ্ছি না। আপনাকে চমকে দিতে পারি। কথাটা শুনলে ভীষণ চমকে যাবেন আপনি!’
‘আরে, রাসেদুল শাকিল সাহেব, হেঁয়ালি ছাড়ুন তো! কী বলতে চান বলে ফেলুন। আপনি কোনো ভয় পাবেন না! আমি, মানে আমরা যারা পুলিশ, তারা মানুষের পাশে আছি। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে আমি বিন্দুমাত্র ভীত নই!’
‘তা বুঝতে পারছি। আপনার চোখে-মুখে কেমন তেজোদীপ্ত ভাব ফুটে আছে, আমি তা দেখতে পাচ্ছি!’
‘তা বলুন। কী বিপদ আপনার এবং আমারও? এমন কথা শুনিনি যে, থানার ওসিরও বিপদের কথা নিয়ে কেউ থানায় আসেন। যাই হোক, বলে ফেলুন।’
‘বলছিলাম কী, আপনি জানেন এই অঞ্চলে কত রকম মানুষের আনোগোনা চলছে?’
‘তা শুনছি বটে। আবদুল্লাহপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়াহিদ বেপারীও সেদিন এমন কথা বলছিলেন। আমাকে বললেন, শহর থেকে নানারকম মানুষ আসা-যাওয়া করছে!’
‘শুধু শহর থেকেই নয়, বিদেশ থেকেও এসেছে! আন্তর্জাতিক দস্যুচক্রের সদস্যরা এই অঞ্চলে বসতি গড়েছে, জনাব!’
‘কী বলছেন আপনি! আন্তর্জাতিক দস্যুরা এই অজপাড়াগাঁয়ে এসে পড়েছে!’
‘জি¦, জনাব। আপনি থানার হর্তাকর্তা এখন। এই দস্যুদের আপনাকে এখন ধরতে হবে। আপনিই পারবেন, এদের শায়েস্তা করতে। আপনার ভেতরে সেই তেজ আছে, আপসহীন ব্যক্তিত্ব আছে, গর্জে ওঠার মতো শক্তি আছে! পুলিশ বাহিনীতে আপনার মতো তেজস্বী পুরুষ ক’জন আছে, বলুন?’
রাসেদুল শাকিলের এ-কথাটায় হাতেম আলী কেমন একটা আলোড়ন টের পেলেন নিজের ভেতরে। তবে শেষ কথাটা ভালো লাগল না তার। পুলিশ বিভাগে অনেক তেজস্বী পুরুষ আছে, শুধু তারা কারিশমা দেখাতে পারেন না। হাতেম আলী রাসেদুল শাকিলের দিকে একটু তীর্যক দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। লোকটিকে তার সন্দেহজনক বলে মনে হলো না। কিন্তু লোকটির কথায় ঘোর বিপদের আভাস পাচ্ছেন। তিনি যে কোনো বিপদ মোকাবিলা করতে প্রস্তুতÑ নিজের মনে নিজে বললেন। রাসেদুল শাকিলের দিকে চেয়ে কঠোর দৃষ্টি মেলে ধরে হাতেম আলী বললেন,
‘কে, কোথায়, কী করছে, জানা থাকলে বলুন। আমি সবকটা দস্যুকে টেনেহিঁচড়ে থানার লকাবে ঢুকাব! কথা দিচ্ছি আপনাকে। তবে, আমাকে জানতে হবে দস্যুগুলো কারা এবং কী অপরাধ করতে যাচ্ছে।’
রাসেদুল শাকিল জবাবে বললেন,
‘জি¦, আমি জানি। আপনি অন্যায় না করলে কাউকে কিছু বলেন না। নিজেও অন্যায় করেন না। আজকের দিনে আপনাকে থানার ইনচার্জ দেখে আমারও বুকের ছাতিটা বেড়ে গেছে।’
‘আরে জনাব, ঘটনা খুলে বলুন। সংক্ষেপে বলুন। আপনার সঙ্গে সময় কাটিয়ে ফেললে আর মানুষের কথা শুনব কখন?’
‘বলছি। আমার কথা শুনলে তো আপনি আর কোনো কাজ করতে পারবেন না। এই কাজে আপনাকে ব্যস্ত থাকতে হবে।’
‘তা বলে ফেলুন না! কী যেন বলছিলেন? আন্তর্জাতিক দস্যুরা এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে? কেন বলুন তো?’
‘এই অঞ্চলে ওরা গুপ্তধনের সন্ধানে এসেছে।’
‘বলেন কী! গুপ্তধন! কোথায় গুপ্তধন? আমি তো এমন কথা প্রথম শুনলাম!’
‘গুপ্তধন উদ্ধার করতে ওরা এসে ঘুরঘুর করছে। দল গড়েছে। আর আপনি প্রথম শুনলেন? আপনাদের পুলিশ বিভাগে না সোর্স থাকে?’
জানতে চাইলেন রাসেদুল শাকিল। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাতেম আলী উত্তেজনা অনুভব করছেন নিজের ভেতরে। তিনি বললেন,
‘আরে রাখুন, ওসব সোর্স-টোর্সের কথা! আগে বলুন, গুপ্তধন কোথায়? দস্যুগুলোই বা কোথায়? কথাটা শুনে আমার তো হার্টবিট বেড়ে গেছে!’
‘বলছি, শান্ত হোন। আমার কথা শুনে উত্তেজিত হবেন না। উত্তেজিত হয়ে অভিযান চালালে সফল হওয়া সহজ নয়। তাছাড়া ওরা ছিঁচকে চোর নয়। সিঁধেল চোরও নয়। ওদের ধরতে হবে ফাঁদ পেতে। আর আপনি যদি ধরতে পারেন, ভেবে দেখুন, কী হবে! রাষ্ট্রীয় পুরস্কার তো পাবেনই, সে-সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে আপনার নাম-যশ ছড়িয়ে যাবে।’
‘আহা, আপনি ওভাবে বলবেন না! আমি তো এমন একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিলাম। আজই এলো এ-সুযোগ। বলুন, খুলে বলুন আমাকে। কোথায় ওরা?’
রাসেদুল শাকিলের মুখের হাসিটা মুছে গেল। তিনি যেন গম্ভীর হলেন। বললেন,
‘আপনি শুধু আমার কথা শুনে এগুবেন। তাহলে ওদের ধরতে পারবেন।’
‘তা মানছি। তাহলে বলুন, কী করতে হবে আমাকে। ওরা কোথায়, কী করছে? বলুন। আপনি জানেন না, আমার ওপর থানার যে দায়িত্বভার, তা দু-একদিনের জন্য। এরপর থানার ওসি চলে আসবেন। আমি তখন কিছু করতে পারব না। আপনি আমাকে সাহায্য করুন, প্লিজ!’
‘আপনি আজ রাতেই তৈরি থাকবেন। ওদের কীভাবে ধরবেন, কোথায় ধরবেন। সব কথা লিখে এনেছি। আপনি শুধু আমার নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তাহলে রাত ফুরালেই আপনি “হিরো”তে পরিণত হবেন।’
‘ওহ্! কী যে একসাইটেড ব্যাপার! আপনি মানুষ, না-কি দেবদূত, বলুন তো!’
‘হা হা হা। আপনি দেখছি, এখনই ভীষণ একসাইটেড হয়ে পড়েছেন? তা তো হবেনই। এত বড় সুযোগ আপনার সামনে এসে হাজির!’
‘আচ্ছা, বলুন তো, কোথায় কী ঘটতে যাচ্ছে?’
হাতেম আলীর কণ্ঠে কৌতূহল। জবাবে রাসেদুল শাকিল মৃদু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
‘বলছি। আজ রাতে অমাবশ্যার ঘন অন্ধকারে একটি সংঘবদ্ধ দস্যু নাটেশ^র গ্রামে মাটি খনন করে গুপ্তধন বের করবে।’
‘এক রাতে গুপ্তধন বের করে ফেলবে, ওরা!’
‘ওদের কাছে অত্যাধুনিক মেশিন আছে। ওরা অনেকদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক দূর এগিয়েও আছে ওরা।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, ওরা অনেক দূর থেকে মাটি খনন করে নাটেশ^রের দিকে চলে এসেছে। আজ রাতে ওরা চূড়ান্ত কাজটি করবে।’
‘কী বলছেন, আপনি! এত বড় দস্যুতা চলে আসছে, আর আমরা পুলিশ কিছুই জানি না!’
‘ওরা তো অনেক প্রশিক্ষিত এবং দুর্ধর্ষ! আর আপনাদের চোখ-কান খোলা ছিল না হয়তো। সোর্সও আছে কি নেই, কে জানে!’
‘হুম, তা বটে!’
‘আজ মধ্যরাতে বা রাতের যে কোনো সময় নাটেশ^র এলাকার কোথাও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারে দস্যুরা। আপনাকে থানার সব পুলিশ সদস্য নিয়ে নাটেশ^রে ওতপেতে বসে থাকতে হবে।’
বললেন রাসেদুল শাকিল। তিনি লক্ষ করলেন হাতেম আলী দারোগার চোখে-মুখে রাগের আভা ফুটে আছে। তিনি যে সত্যিকার অর্থে একজন সৎ এবং সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই রাসেদুল শাকিলের। হাতেম আলী জানতে চাইলেন,
‘বসে থাকতে হবে কেন?’
জবাবে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘কারণ, আপনাদের উপস্থিতি টের পেল ওরা কাজটা করবে না।’
‘আচ্ছা! তাহলে বসেই থাকব। বলুন, এরপর কী করব?’
‘ওরা যখন বিস্ফোরণ ঘটাবে, তখন আপনারা আবির্ভূত হবেন। কী করতে হবে, আমি কাগজে লিখে এনেছি। ওটা পড়বেন এবং তা অনুসরণ করবেন। তাহলে আপনারা দস্যুদের হাতেনাতে ধরতে পারবেন। আমার কথা শুনলেই তা পারবেন! না শুনলে, ওরা হয়তো পালিয়ে যেতে পারবে।’
‘বলছেন কী! এভাবে নিশ্চিত করে বলছেন কীভাবে আপনি?’
হাতেম আলীর প্রশ্নের মধ্যে একরাশ বিস্ময়ও। রাসেদুল শাকিল শান্ত গলায় বললেন,
‘কারণ, আমি ওদের অনেকদিন ধরে ওয়াচ করছি। ওদের কাজ সম্পর্কে আমার ধারণা আছে।’
‘তা, আপনি কী করেন বলুন তো? কেপটাউন শহরে বাস করেন বলেই তো ওদের এভাবে চিনতে পারবেন, তা বিশ^াসযোগ্য নয়। কী বলেন?’
‘তা ঠিক। তবে গুপ্তধন, হীরক বা মহামূল্যবান পাথর বিক্রির জন্য কেপটাউন শহর বিখ্যাত। দুর্ধর্ষ দস্যুদের বাসও ওই শহরে।’
‘আপনি কী করেন? মানে, আপনার পেশা কী, জনাব?’
জানতে চাইলেন হাতেম আলী। জবাবে মøান হেসে রাসেদুল শাকিল বললেন,
‘আমার পেশার পরিচয় দিতে বারণ আছে। তবে আপনাকে অব দ্যা রেকর্ডে বলছি, আমি ইন্টারপুল পুলিশের সঙ্গে কাজ করছি। গোয়েন্দা বলতে পারেন, আবার এজেন্টও বলতে পারেন।’
‘কেমন ধোঁয়াশে লাগছে! বিশেষ করে আপনার পরিচয় পাওয়ার পর।’
‘শুনুন, আমার কথা শুনলে আপনার পায়ের নিচে খ্যাতি এসে লুটিয়ে পড়বে। এবং তা কালই হবে। আর না শুনলে, আপনি নিছক দারোগা পদবি নিয়ে এক মাস পর অবসরে যাবেন। যে স্বপ্ন লালন করে আসছিলেন, তা স্বপ্নের বৃত্তেই থাকবে।’
‘আশ্চর্য, আমার স্বপ্নের কথা আপনি জানেন কী করে?’
বিস্ময়ভরা কণ্ঠ হাতেম আলীর। রাসেদুল শাকিল জবাবে বললেন,
‘ওটা বলে কী হবে? ওসব নিয়ে আলোচনা আরেকদিন করা যাবে। এখন আমাদের রাতের অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কী বলেন?’
‘তা ঠিক, তা ঠিক। আপনাকে আজ কোনো প্রশ্ন করব না। তাহলে দিন, কী লিখে এনেছেন। আমি আপনার উপদেশ-নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। মনে হচ্ছে, আপনার কথা সত্যি হবে।’
‘অবশ্যই সত্যি হবে। তবে ওরা যদি বুঝতে পারে, ওরা অভিযানটি আজ করবে না। আমি শুধু, ওটা নিয়ে ভাবছি।’
‘ঠিক আছে। আমি সাবধানে থাকব। দিন, আপনার লেখা কাগজ।’
রাসেদুল শাকিল একটা খাম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
‘এ খামটি এখন খুলবেন না। সন্ধ্যা ছ-টার পর খুলে পড়বেন। নির্দেশনা মেনে এগুবেন। আশা করি, আপনার সঙ্গে আমার পুনরায় দেখা হবে নাটেশ^রে।’
‘আপনাকে কী বলে যে ধনবাদ দেব! অবশ্য আগে দেখি, আপনার কথা সত্যি হয় কি না। আমার কাছে এখনও অবিশ^াস্য লাগছে। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি।’
আবেগে কাঁপলো হাতেম আলীর কণ্ঠস্বর। রাসেদুল শাকিল জ্যোতিষীর মতো বললেন,
‘এমন হয়, স্বপ্নের মতো কিছু ঘটে যায়!’
‘বাহ্! ভালো বলেছেন কথাটা। স্বপ্নের মতো ঘটে যাক আজকের রাত!’
‘তাহলে যাচ্ছি। রাত অবধি কথাটা যেন ফাঁস না হয়! কাউকে বলবেন না। বুঝলেন?’
‘বুঝছি। কাউকেই বলছি না। এমন কী, আমার বউকেও বলব না।’
‘বিদায় নিচ্ছি তাহলে।’
‘বিদায়। দেখা হবে রাতে, নাটেশ^র গ্রামে। বাই।’
বললেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাতেম আলী। রাসেদুল শাকিল নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘বাই।’
এ বিদায় সম্ভাষণ বলে তিনি টঙ্গিবাড়ি থানার ওসির কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। ওই কক্ষে ঘোরের মধ্যে ডুবে গেলেন হাতেম আলী। তিনি মনে মনে ঘোরলাগা কণ্ঠে বললেন, ‘পুলিশের ভাবমূর্তি আমি উজ্জ্বল করবই!’
ছয়
এমন রাত কোনোদিন আসেনি এই অঞ্চলে। সে কী ভয়াবহ রাত! দস্যুদের সঙ্গে গ্রামের লড়াকু মানুষের লড়াইয়ের এক রাত! বোমার শব্দে প্রকম্পিত হওয়ার রাত। আতঙ্কের রাত! এই অঞ্চলে ভয়ঙ্কর ও রোমহর্ষক একটি দিন এসেছিল ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আবদুল্লাহপুর গ্রামে অমূল্য পালের বাড়িতে গণহত্যা হয়েছিল। পাকবাহিনীর দোসররা অমূল্য পালের বাড়িতে হামলা করে পালবাড়ির চব্বিশজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। মর্মান্তিক ওই হত্যাকাণ্ডের পর এবার একটি শ^াসরুদ্ধকর ঘটনা ঘটল কাল রাতে। তবে এবার কোনো প্রাণনাশের ঘটনা ঘটেনি। ঘটতে পারত, গ্রামবাসীর চতুর্মুখী আক্রমণে দস্যুরা আত্মসমর্থন করে ফেলায় প্রাণনাশ বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের কারণেও দস্যুরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে যেন লড়াইটা চালিয়ে না গিয়ে দু-হাত ওপরে তুলে হার মেনে নিল। দস্যুদের এই পরাজয়ের পেছনে অবশ্য রাশা মামার অবদান বেশি। নাটেশ^র গ্রামে কয়েক স্থানে গভীর কূপের মতো বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্তের দিকে তাকালে না-কি গভীর অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখা যায় না। পাতাল পথে সুড়ঙ্গ তৈরি করে দস্যুরা বোমা ফাটিয়ে গর্তগুলো তৈরি করেছেÑ এমন কথা বলাবলি করছে গ্রামের লোকজন। রাজন যেতে পারেনি নাটেশ^র গ্রামে। পুলিশ ঘিরে রেখেছে ওই গ্রাম। নাটেশ^র গ্রামে দস্যুদের অভিযান আর রাশা মামার প্রতিরোধের কথা মনে মনে ভাবছে রাজন। আজ সকাল থেকে তাদের গ্রামে পুলিশ আর সাংবাদিকে ভরে গেছে। চারপাশে তারা গিজগিজ করছে। টিভিগুলোতে বুলেটিন প্রচার হচ্ছে। ব্রেকিং নিউজ আপডেট হচ্ছে। সংবাদপত্রগুলোতে ওদের গ্রামের কথা ছাপা হয়েছে। ঢাকা থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না-কি পরিদর্শনে আসছেন তাদের গ্রামে। আজকের সকালটা ভীষণ, ভীষণ অন্যরকম! কী এক দুর্ধর্ষ রাতের কারণে তাদের গ্রাম নিয়ে সরগরম আলোচনা চলছে দেশজুড়ে! রাজন, বিকাশ, বিপ্লব, সুমন, বিপুল, সীমান্ত বসে আছে ভোলানাথের আশ্রমে। ভোলানাথকে একটি আশ্রম তৈরি করে দিয়েছেন পেশকার বাড়ির ছেলে মালেক মিয়া। মালেক মিয়ার ছেলে মিলনকে অপহরণ করেছিল ঢাকা শহরের দস্যুরা। এ-কথা ভোলানাথ বলেছিল। পুত্র মিলনকে ফিরেও পেয়েছেন মালেক মিয়া। এ ঘটনায় অত্যন্ত খুশি হয়ে ভালানাথকে নদীর পাড়ে নিজের এক বিঘা জমি দান করেছেন। ওই জমিতে টিন দিয়ে একটি ঘরও তুলে দিয়েছেন। এটি এখন ভোলানাথের আশ্রম বলে নাম দেওয়া হয়েছে। মাত্র কয়েকদিন হলো ভোলা এই আশ্রম পেয়েছে। তারা বসে আছে ভোলানাথের আশ্রমে। আশ্রমটি মানুষের বসতবাড়ি থেকে দূরে। নির্জনতার কারণে ভোলার আশ্রম তাদেরও খুব পছন্দ। রাজনের মনে বারবার কাল রাতের কথা ফিরেফিরে আসছে। ছবির মতো ভেসে উঠছে মনে। কাল রাত আটটা নাগাদ রাশা মামা ওকে ফোন করে বলেছিলেন,
‘রাজন, তুমি এখনি বাড়ি থেকে বের হয়ে মসজিদে যাও।’
‘মসজিদে? কেন?’
‘মসজিদের মাইক ব্যবহার করতে হবে তোমাকে। তুমি একা যেও না। তোমার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যাও।’
‘কিন্তু কেন? কী করতে হবে? বাবাকে কী বলব?’
‘তুমি তোমার বাবাকে বলবে যে গ্রামে ডাকাত পড়েছে। মানে, একদল ডাকাত নাটেশ^র গ্রামে ডাকাতি করছে। গ্রামবাসীকে বলবে, সবাই যেন বের হয়ে আসে। তারা যেন নাটেশ^র গ্রামের মানুষদের রক্ষায় এগিয়ে যায়।’
‘এ-কথা কাকে বলব?’
‘প্রথমে তোমার বাবাকে বলবে। এরপর এ-কথা বারবার বলতে থাকবে মসজিদের মাইকে। সবাইকে জানিয়ে দেবে। এরপর সম্ভব হলে তোমরাও এগিয়ে আসবে নাটেশ^র গ্রামের দিকে।’
‘কিন্তু!’
এ-কথার সঙ্গে সঙ্গে বিকট একটা শব্দ শুনতে পেল রাজন। ও-প্রান্ত থেকে রাশা মামা বললেন,
‘শুরু হয়ে গেছে! শুনলে তো! এটা বোমা বিস্ফোরণের শব্দ! ওরা বোমা ফাটাচ্ছে! যা বলেছি, তাই করো। আমি ফোন রাখছি।’
রাশা মামা আর ফোন করেননি। রাশা মামার কথামতো রাজন ওর বাবাকে ডাকাতদের কথা বলেছিল। ওর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পাশে মসজিদে গিয়ে মোয়াজ্জিনকে দিয়ে মাইকে ‘নাটেশ^র গ্রামে ডাকাত পড়েছে’Ñ এই ঘোষণা দিয়েছিল। আরও আশপাশের মসজিদ থেকে একইরকম ঘোষণা শোনা গেল। এরপর মানুষের হৈ-হৈ, রৈ-রৈ ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষরা দলবেঁধে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল কাল রাতে। অনেকে এগিয়ে গেল নাটেশ^র গ্রামের দিকে। অধিকাংশজনের হাতে ছিল লাঠি, চাকু, বল্লম, ট্যাটাসহ আরও নানা অস্ত্র। বন্দুক থেকে গুলি ছোড়ার শব্দও পাওয়া গেল একটা সময়। পরে রাজন জেনেছে, পুলিশ দস্যুদের লক্ষ্য করে বন্দুক উঁচিয়ে গুলি ছুড়েছিল। অমাবশ্যার রাতটিতে নাটেশ^রসহ আশপাশ এলাকায় লোমহর্ষক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। দস্যুরা বেশিক্ষণ লড়াই করতে পারেনি। ওরা পুলিশের কাছে খুব সহজে আত্মসমর্পণ করে ফেলে। হয়তো গ্রামবাসীর পাল্টা আক্রমণকে ভয় পেয়েছিল। এ ঘটনায় টঙ্গিবাড়ি থানা পুলিশের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। টিভির পর্দায় থানার কর্মকর্তা হাতেম আলীর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হচ্ছে থেমে থেমে। আইজিপির অভিনন্দন বার্তা টিভির স্ক্রলে দেখা যাচ্ছে। রাজনের খুব ভালো লাগছে দস্যুরা পরাজিত হয়েছে বলে। ভোলানাথের আশ্রমে বসে রাজন এসব কথা ভাবছিল। রাজনের ভাবনাকে ভেঙে দিয়ে বিপ্লব বলল,
‘আচ্ছা, সব প্রশংসা তো চলে গেল পুলিশের কর্মকর্তা হাতেম আলীর পকেটে। আমাদের রাশা মামার কথা তো কেউ বলছে না! টিভির রিপোর্টাররা তার কথা বলছে না কেন রে?’
‘হতে পারে, সাংবাদিকরা তার কথা জানতে পারেননি।’
জবাবে বলল বিকাশ। বিপ্লব ফের বলল,
‘কিন্তু তিনিই তো দস্যুদের অভিযান ব্যর্থ করে দিয়েছেন। ধর, আমাদের দিয়ে যদি মসজিদের মাইকে ডাকাতদের খবরটা প্রচার না করাতেন, গ্রামবাসী কি ঘর থেকে বের হয়ে আসত?’
‘না। তারা ঘরেই ঘুমাত।’
বিকাশের জবাব। বিপ্লব চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
‘তাহলে? রাশা মামার ভূমিকা তো কম নয়! তাছাড়া তিনি হয়তো আরও কিছু করেছেন, যা আমরা জানতে পারছি না।’
সুমন বলল,
‘ঠিক বলেছিস তো! রাশা মামা কোথায় আছেন, আমাদের জানা দরকার। তিনি সুস্থ আছেন কি না, এটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার।’
বিপ্লব রাজনের উদ্দেশে বলল,
‘রাজন, তুই রাশা মামাকে ফোন কর তো। আমি করেছিলাম, তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।’
‘আমিও করেছিলাম। তার ফোনের সুইচ অফ।’
জবাবে বলল রাজন। বিকাশ বলল,
‘হয়তো চার্জ ফুরিয়ে গেছে। আচ্ছা, রাতুলকে একটা ফোন কর তো। যদি ও ফোন না ধরে, তখন ওর বাবাকে ফোন কর। রাতুল বলতে পারবে, রাশা মামা কোথায় আছেন। কী বলিস?’
সুমন বলল,
‘ঠিক বলেছিস। রাজন, তুই এখন রাতুলকে ফোন কর।’
রাজন চিন্তিত খুব। ওরও চিন্তার মধ্যে রাশা মামা জমে আছে। রাশা মামা কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেনÑ ওরা জানে না। অথচ লোকটিকে ওরা খুব ভালোবেসে ফেলেছে। রাজন নিজের সেলফোন থেকে রাতুলের নম্বরে ফোন করল। ওদের অবাক করে দিয়ে ফোন ধরল রাতুল। এতদিন ও ফোন ধরেনি।
‘হ্যালো, রাতুল! কেমন আছিস তুই?’
জানতে চাইল রাজন। রাতুল ও-প্রান্ত থেকে বলল,
‘একটু ভালো আছি। তোরা কেমন আছিস?’
‘আমরা কেমন থাকব, জানিস না? তোকে মিস করছি খুব।’
‘তোরা আমার ভালো বন্ধু, জানি আমি।’
‘শোন, আমাদের এখানে কী ঘটেছে জানিস?’
‘জানি। আমি তো টিভিতে দেখছি এখনও। কী সাংঘাতিক ঘটনা!’
‘হুম।’
বলল রাজন। রাতুল বলল,
‘তাই তো তোর ফোনটা ধরতে দিল বাবা। আজ তো আমাদের এলাকা নিয়ে দেশব্যাপী হৈচৈ পড়ে গেছে। সবাই টিভির সংবাদ দেখছে।’
‘বাহ্! কিন্তু এত যে হৈচৈ হচ্ছে, এর কৃতিত্ব যার তার কোনো খবর নেই! টিভিগুলো একইরকম, একই তথ্য দিয়ে খবর প্রচার করছে। আড়ালের খবরটা কেউ বলছে না রে!’
বলল রাজন। জবাবে রাতুল বলল,
‘আড়ালের খবর! ওটা আবার কী? আমাকে বল্ তো!’
‘তোকে তো বলবই। তুইও আড়ালে থাকা আসল মানুষটার হদিস বের করতে পারবি। তোর সাহায্য লাগবে।’
‘কী বলছিস? বুঝতে পারছি না।’
‘খুলে বলছি, তাহলেই বুঝতে পারবি।’
‘বল্ তো, শুনি।’
‘তোর মামা আছে না? রাশা মামা?’
‘হুম।’
‘এই যে দস্যুগুলো ধরা পড়ল, এর নেপথ্যে ছিলেন তোর মামা। মানে, আমাদের রাশা মামা! অথচ দেখ, কেউ তার নামটি নিচ্ছে না। তিনিও সামনে আসছেন না!’
ও-প্রান্তে কোনো শব্দ হচ্ছে না। রাতুল চুপ করে আছে। রাজন বলল,
‘কথা বলছিস না যে! আচ্ছা, তুই জানিস, রাশা মামা আজ কোথায় আছেন? তার সঙ্গে তোর বা তোদের কারও কথা হয়েছে?’
‘কী যে বলছিস তুই। প্রলাপ বকছিস কেন?’
বলল রাতুল। রাজন বলল,
‘প্রলাপ! আমার মনে হচ্ছে, তুই মনে হয় প্রলাপ বকছিস।’
‘না রে। রাশা মামার হদিস নেই প্রায় তিন বছর হলো। তিনি তো দু-এক মাস পরপর ফোন করতেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন। আমার সঙ্গেও খুব কথা বলতেন। লেখাপড়া করার উৎসাহ দিতেন। তিন বছর হলো তার কোনো ফোন আসে না!’
‘কী বলছিস! কয়েকদিন আগে তোর সঙ্গে রাশা মামার দেখা হয়নি? তিনি তোকে হাসপাতালে দেখতে যাননি?’
‘না। কী বলছিস তুই! চার বছর হলো, তার সঙ্গে আমাদের কারও দেখা হয়নি।’
বিস্ময় ফুটে ওঠে রাতুলের কণ্ঠে। রাজন বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
‘তাহলে রাশা মামা যে আমাদের সঙ্গে দেখা করে তোর কথা বললেন। তুই অসুস্থ বলে হাসপাতালে তোর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন, বললেন। তাহলে তিনি কে?’
‘কী যে বলিস! পাগল হয়ে গেলি?’
‘না। আচ্ছা বল্ তো, তোর হার্টে বাল্ব লাগানো হয়েছে? তোর কিডনিতে সমস্যা হয়েছে?’
‘হুম।’
‘এ-কথা আমরা শুনেছি তোর রাশা মামার কাছ থেকে।’
‘আমরা মানে?’
জানতে চাইল রাতুল। জবাবে রাজন বলল,
‘আমি, বিকাশ, বিপ্লব আর সুমন। মাত্র কয়েকদিন আগের কথা। আমরা মাঠে বসেছিলাম। এক সন্ধ্যায় তিনি এলেন এবং আমাদের সঙ্গে আলাপ জমালেন। তোর কথা বললেন। আর তুই বলছিস…!’
ফোনের ও-প্রান্ত থেকে রাতুলের ফুঁপিয়ে কান্না করার শব্দ ভেসে এলো। রাজন বিষণ্ন কণ্ঠে বলল,
‘কাঁদছিস তুই!’
‘কী করব বল্? রাশা মামা, আমার আইডল ছিলেন!’
‘আমার মনে হয়, কোথাও ভুল হচ্ছে। তিনি হারিয়ে যাননি। আছেন। হয়তো ফিরেও আসবেন। আচ্ছা, বল্ তো তিনি দেখতে লম্বা, সুদর্শন এবং ভরাট গলায় কথা বলেন?’
জানতে চাইল রাজন। রাতুল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল,
‘হুম। আর কথায় কথায় উদাহরণ দেন। কথা বলবেন যেন মনে হবে তথ্য-উপাত্ত সামনে হাজির করে রাখছেন।’
‘আশ্চর্য! আমি কী বলব, বুঝতে পারছি না। যাক, তারপরও তোকে বলছি, যদি রাশা মামা ফোন করেন তোদের, আমাকে জানাবি। ফোন রাখছি। পরে কথা বলব। আমার ফোন ধরিস।’
এ-কথা বলে ফোন রাখল রাজন। রাতুল কাঁদছে বলে ও কথা আর বাড়াতে চাইল না। ফোনালাপ বন্ধ হওয়ার পর সুমন বলল,
‘কী বলল রাতুল।’
‘সবই তো শুনলি। স্পিকার অন করেই তো কথা বললাম।’
জবাবে বলল রাজন।
‘হুম। ভীষণ রহস্য লাগছে এখন।’
বলল বিপ্লব। বিপুল বলল,
‘তোরা কী নিয়ে রহস্য পাচ্ছিস, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’
জবাবে বিকাশ বলল,
‘তুই বুঝতে পারবি না। সীমান্তও পারবে না। আমরা চারজন ঘোর রহস্যের মধ্যে পড়েছি, বন্ধু!’
বিপ্লব বলল,
‘আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে, রাশা মামা পরিচয় দিয়ে স্মার্টলি কেউ আমাদের ব্যবহার করে গেছেন।’
‘এটা কেন করবেন?’
জানতে চাইল বিকাশ। বিপ্লব একটু ভেবে বলল,
‘উল্টো করে ভাবি। ধরে নিই, তিনিও একটি সংঘবদ্ধ দলের নেতা। তারও লক্ষ্য ছিল গুপ্তধন হাতিয়ে নেওয়া। আমরা সবাই যখন দস্যুদের নিয়ে ব্যস্ত। তখন তিনি গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে গেছেন। হতে পারে না?’
জবাবে সুমন বলল,
‘হতে পারে। এ-কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রহস্য গল্প বা চলচ্চিত্রে এমন দেখা যায়।’
বিকাশ বলল,
‘আবার এটাও হতে পারে, তিনি এই এলাকার হিতাশী কেউ। উপকার করে চলে গেছেন।’
‘এটাও হতে পারে।’
সম্মতি প্রকাশ করে বলল বিপ্লব। বিকাশ বিপ্লবের উদ্দেশে বলল,
‘রাশা মামার আবির্ভাব এবং অন্তর্ধান নিয়ে তোর কী মনে হয়?’
‘তিনি একজন রহস্যময় চরিত্র। তাকে আমি রহস্যময় আগন্তুক বলব।’
ভাবুক কণ্ঠে জবাব দিল বিপ্লব। এ সময় হন্ততন্ত হয়ে ওদের সামনে এলো নীরা। ও রাজনকে বলল,
‘আহা, কী সব হচ্ছে রে! আমাদের গ্রামে মিডিয়ার সাংবাদিকরা এসে কত রিপোর্ট করছে। আমাদের গ্রামের কথা দেশের মানুষ জানতে পারছে। আমি যে কী একসাইটেড! উহ্!’
রাজন নীরাকে বলল,
‘এখন চুপ করে বস তো! আমরা রাশা মামাকে খুঁজে পাচ্ছি না! তিনি যে কোথায় চলে গেছেন, বুঝতে পারছি না।’
রাজনের কথার জবাবে বিকাশ বলল,
‘আচ্ছা, আমরা যখন নিশ্চিত হতে পারছি না। তাহলে চল, ভোলাকে জিজ্ঞেস করি। ও তো যা বলে, মাঝেমাঝে সত্যি হয়ে যায়।’
বিপ্লব সোৎসাহে বলল,
‘জিজ্ঞেস কর! ও তো আমাদের সামনেই আছে। জিজ্ঞেস কর ওকে।’
ভোলানাথ আপন মনে কী যেন বলছিল। অন্যমনষ্ক। ওর মধ্যে অনমনষ্ক ভাব থাকলে ভাল। এই ভাবের মধ্যে যা বলে, তাই সত্যি হয়। রাজন চুপ করে ভাবছিল। বিকাশ ও বিপ্লবের কথার প্রতি নিজের মনের সমর্থন পেল। তাই ও ভোলানাথের উদ্দেশ্যে বলল,
‘এই ভোলা, তুই বলতো, রাশা মামা যে এসেছিলেন এই গ্রামে। কাল রাত পর্যন্ত তাকে দেখা গেল, আর আজ সকাল থেকে তার দেখা পাচ্ছি না। ফোনও ধরছেন না। তিনি আসলে কে? কী তার পরিচয়?’
ভোলার অনমনষ্ক মুখে সুবর্ণ রেখার মত একটা হাসির আভা ফুটলো। ওই আভা মিলিয়ে না যেতে ও বলল,
‘অলৌকিক আগন্তুক!’
কথাটা শুনে রাজন, বিপ্লব, সুমন, বিকাশ ও নীরা একে-অন্যের দিকে মুখের দিকে তাকাল। পাশের গ্রামের বিপুল ও সীমান্তও ওদের সঙ্গে বসে আছে। ওদের মুখে তাচ্ছিল্য ফুটে আছে। বিপ্লব নিচু কণ্ঠে জানতে চাইল,
‘অলৌকিক আগন্তুক, মানে কি?’
রাজন এ প্রশ্নের জবাবে বলল,
‘অলৌকিক মানে, যা লৌকিক নয়। অর্থাৎ অলৌকিক আগন্তুক মানে, তিনি মানুষ নন! অশরীরী কেউ হবেন!’
সুমন বলল,
‘এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে অলৌকিক প্রাণী বাস করে?’
ভোলার অন্যমনষ্ক কণ্ঠ ফের ধ্বণিত হল,
‘অন্য পৃথিবী থেকে এসেছিলেন! চলে গেছেন এক লহমায়!’
কথাটা বলে ভোলা ওর আশ্রম থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে নদীর জলে ঝাঁপ দিল ও। সুমন কটাক্ষ করে বলল,
‘ভোলা আজ বেফাঁস কথাটাই বলল। ওর কথা সত্যি নয়। অন্য পৃথিবী বলতে কিছু আছে? পৃথিবী তো একটাই! শালা, গুল মারতেও জানে!’
নীরা ওর উদ্দেশ্যে বলল,
‘কেন তুই এ কথা বলছিস? এলিয়েনের নাম শুনিস নি? এলিয়েন কি পৃথিবীর প্রাণী? ওরাও তো অন্য কোন গ্রহে বাস করে, জানিস না? পৃথিবী ছাড়াও আরো অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ আছে, এটা বিজ্ঞানও বলছে। মানুষ মঙ্গলে চলে গেছে। আর তুই বসে আছিস একটা পৃথিবী নিয়ে! হতে পারে, আমাদের পৃথিবীর মত অন্য কোন পৃথিবীর প্রাণী তিনি। রাশা মামা সেজেছিলেন। হতে পারে না?’
নীরার কথার কোন জবাব কেউ দিল না। ওদের মধ্যে নৈঃশব্দ জমে আসতে চাইছে। শুধু রাজন বিস্মিত হয়ে অস্ফুষ্ট কণ্ঠে বলল,
‘অলৌকিক আগন্তুক!’
উৎসর্গ
নাট্যকর্মী ও সাংবাদিক স্নেহের তোফাজ্জল লিটনকে।
প্রচ্ছদ মামুন হোসাইন।