- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
উৎসর্গঃ জাতীয় হকি দলের সাবেক ক্রীড়াবিদ অকাল প্রয়াত খাজা রহমত উল্লাহকে।
স্বত্বঃ সীমা সুস্মিতা
ফ্লপিতে যাবে: রসুলপুরের সঙ্গে ফুটবল খেলে জিততে পারে না এলেঙ্গা এলাকার ছেলেরা। বিশেষ করে গত বছর রসুলপুরের খেলোয়াড়রা ওদের সঙ্গে মাঠে এমনভাবে খেলেছে যে, অনেকটা ‘মিকি-মাউস’ খেলার মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এবার শহর থেকে নবীন এলো খেলতে। নবীনের চাই ১০ নম্বর জার্সি। সুজন নিজের ১০ নম্বর জার্সিটা তুলে দিল নবীনকে। এরপর জয়ের আনন্দে ভাসলো এলেঙ্গা এলাকাবাসী। সুজন শুধু ফুটবল খেলাতেই জয়লাভ করতে চায় না। নিজের গ্রামকে কীভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়-এ সব নিয়ে খুব ভাবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ‘নিজে শিখি’ ক্লাব গঠন করে সুজন বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে নানাকাজে ব্যস্ত। ফুটবল দলের যেমন অধিনায়কের দায়িত্ব আছে, সমাজ সংস্কারেরও দায়িত্ব পালন করা যায়-এটা জানে সুজন। ধুমকেতুর মত উদয় হয়েছিল নবীন, আবার চলেও গেছে শহরে। নবীনের অসুস্থতার কথা জেনে সুজনরা একদিন শহরে গেল ওকে দেখতে। ‘নিজে শিখি’ ক্লাবের সদস্যদের কাছে নবীন হচ্ছে ১০ নম্বর জার্সির মত উজ্জ্বল। ওদের কাছে নবীন যদি বাতিঘর, তাহলে সুজন হচ্ছে ওই বাতিঘরের আলো। ১০ নম্বর জার্সি একটি হলেও এলেঙ্গাবাসীর অধিনায়ক দু’জন, নবীন ও সুজন।
লেখক পরিচিতঃ দর্পণ কবীর কথা সাহিত্যের একাধিক শাখায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তিনি কবিতা ও গল্প লেখায় মনযোগী বেশি। গানও লিখেন। তিনি লেখালেখির প্রথমদিকে পরিচিতি লাভ করেন ছড়াকার ও কিশোর গল্পকার হিসাবে। ১৯৯১ সালে তার প্রথম ছড়াগ্রন্থ-ধপাস এবং ১৯৯৫ সালে প্রথম কিশোর গল্পগ্রন্থ-ভোরের পাখি বের হয় একুশের বইমেলাতে। এ পর্যন্ত তার ৪টি ছড়াগ্রন্থ, ৪টি কাব্যগ্রন্থ ও ৯টি উপন্যাসসহ ২০টি বই বের হয়েছে। জার্সি নম্বর ১০ দর্পণ কবীরের প্রথম কিশোর উপন্যাস।
দর্পণ কবীর পেশায় সাংবাদিক এবং সর্বান্তকরণে একজন কবি ও লেখক। ১৯৯১ সালে দৈনিক আজকের কাগজ, ১৯৯২ সালে দৈনিক ভোরের কাগজ ও ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০২ সাল অব্দি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় পর্যায়ক্রমে সাংবাদিকতা করেছেন। ২০০২ সাল থেকে তিনি সপরিবারে নিউইয়র্ক শহওে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। এই শহরেও তিনি সাংবাদিকতা পেশায় সম্পৃক্ত রয়েছেন। তিনি আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং অনলাইন পোর্টাল দেশকণ্ঠ’র সম্পাদক।
দর্পণ কবীরের কবিতা আবৃত্তি করেছেন প্রয়াত বরেণ্য অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মধুমিতা বসু, আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রজ্ঞা লাবনী এবং মেহেদী হাসান ও ফারহানা তৃণা। কবিতাগুলো কাব্যপ্রেমিদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
জার্সি নম্বর ১০
দর্পণ কবীর
রসুলপুরের সঙ্গে ফুটবল খেলে জিততে পারে না এলেঙ্গা এলাকার ছেলেরা। বিশেষ করে গত বছর রসুলপুরের খেলোয়াড়রা ওদের সঙ্গে মাঠে এমনভাবে খেলেছে যে, অনেকটা ‘মিকি-মাউস’ খেলার মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। রসুলপুরের ছেলেদের সঙ্গে এলেঙ্গার ছেলেরা এর আগের দু-বছর হেরেছিল টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ খেলে। কিন্তু গত বছর হারলো ৫ গোল খেয়ে। অনেক কষ্টে খেলা শেষ হওয়ার দু-মিনিট আগে একটি গোল পরিশোধ করতে পেরেছিল এলেঙ্গা কিশোর সংঘ। তাও পেনাল্টি থেকে, গোলটি করেছিল সুজন। এই একটি গোল করতে পারার ঘটনাই ছিল ওদের ফাইনাল খেলার উজ্জ্বল দিক। না হলে তো ৫-০ গোলেই হারতে যাচ্ছিল ওরা। গত বছর লজ্জাজনক পরাজয়ের পর ওরা সান্ত্বনা খুঁজে নিয়েছিল যে রসুলপুরের গোলরক্ষককে একবার হলেও পরাস্ত করেছে। এলেঙ্গা কিশোর সংঘ ফুটবল দলের এ বছরও অধিনায়ক সুজন। স্কুলভিত্তিক জুনিয়র খেলোয়াড়দের মধ্যে এলেঙ্গা এলাকার সবচেয়ে তুখোড় ফুটবলারের নাম জিজ্ঞেস করলে গ্রামের সবাই বলবে একটি নাম, সুজন। স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক হামিদ স্যার খেলার নৈপুণ্যে সুজনকে ১০ নম্বর জার্সিটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রসুলপুরের সঙ্গে ফাইনাল খেলায় এই ১০ নম্বর জার্সির মূল্যায়ন ধরলে পেনাল্টি কিক থেকে গোলটি বিবেচনা করতে হয়। তবে টুর্নামেন্টের অন্য ৫টি খেলায় সুজন আরও ১০ গোল করেছিল। রসুলপুর একাদশের বিকাশ ফাইনালে ওদের বিরুদ্ধে ৩ গোল দিয়ে হ্যাটট্রিক করে। টুর্নামেন্টে ১২ গোল দিয়ে বিকাশ সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারটি সুজনের নাকের সামনে দিয়ে ছিনিয়ে নেয়। এ কষ্টটাও কম নয়। গত বছরের ফাইনাল খেলার কথা মনে হলে সুজনের মনে যেমন চাপা কষ্ট, তেমনি এলেঙ্গাবাসীর মাঝেও হাহাকার ছাপিয়ে ওঠে। গত তিন বছরের হারের শোধ নেওয়ার সুযোগ এ বছরও এলো। আরেকবার হেরে গেলে পরাজয়ের ইতিহাসটা দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাও আছে। আগামী শুক্রবার ফের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে রসুলপুর একাদশ বনাম এলেঙ্গা কিশোর সংঘ। এ কারণে আজ এলেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কুলশিক্ষকদের কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সভা চলছে। এই সভার আয়োজন করেছেন স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক আবদুল হামিদ, তাকে শিক্ষার্থীরা ‘হামিদ স্যার’ বলে সম্বোধন করে। ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে এলেঙ্গা হাইস্কুল মাঠে। এবারও দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ফাইনালে উঠেছে রসুলপুর একাদশ। এলেঙ্গা কিশোর সংঘও খারাপ খেলেনি। একটি ম্যাচ শুধু ড্র করেছে। রসুলপুর একাদশ সবগুলো ম্যাচে জয়লাভ করেছে। ওরা ৫ খেলায় গোল করেছে ১৫টি আর এলেঙ্গা কিশোর একাদশ ৪ খেলায় ৯ গোল করেছে। একটি খেলা হয়েছে গোলশূন্য ড্র। সুজন ও বিকাশ এবারও ৮টি গোল করে সমানভাবে শীর্ষে রয়েছে। ফাইনালে তারা গোল করলে নির্ধারিত হবেÑ কে হচ্ছে সর্বোচ্চ গোলদাতা। দুজনের কেউ গোল করতে না পারলে দুজনকে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এতে বিকাশের শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে না। সুতরাং, এবারের ফাইনাল খেলায় জয়লাভ করতে পারলে এলেঙ্গার সম্মান প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সুজন গোল করতে পারলে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হতে পারবে। দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সভায় তা আলোচনা করেছেন হামিদ স্যার। আজকের সভায় এলেঙ্গা কিশোর সংঘের সব খেলোয়াড়কে আসতে বলেছিলেন তিনি। কিন্তু নীরবকে দেখা যাচ্ছে না সভায়। সুজন লক্ষ করেছে নীরব সভায় না এলেও হামিদ স্যার ওদের কাছে জানতে চাননিÑ কেন নীরব আসেনি? নীরব ওদের দলের মধ্যমাঠের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। আজকের সভায় ওর উপস্থিত থাকার প্রয়োজন ছিলÑ মনে মনে ভেবে নিল সুজন। ও একটু চিন্তিত হলো। হামিদ স্যার ওকে বললেন,
‘সুজন, মনে হচ্ছে তুমি কিছু ভাবছো?’
‘জি¦ স্যার। মানে, ভাবছিলাম…’
এ পর্যন্ত বলে সুজন চুপ করে যায়। ও ফের ভাবলো, নীরবের অনুপস্থিতির কথা হামিদ স্যারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ঠিক হচ্ছে কি না? হামিদ স্যার বললেন,
‘চুপ করে গেলে কেন? বলো।’
‘না, স্যার, মানে সভায় নীরব আসেনি। ওর কথা ভাবছিলাম।’
‘ও আসবে। যে কোনো মুহূর্তেই এসে পড়বে।’
স্যারের কথায় উপস্থিত সবাই অবাক হলো। নীরব তাহলে কোথায় আছে বা কেন দেরিতে সভায় আসবে, তা হামিদ স্যার জানেনÑ ভেবে নিল ওরা। হামিদ স্যার যেন ওদের মনের কথাটা পড়ে নিলেন। তিনি বললেন,
‘আজকের সভা আয়োজনের আরেকটি উদ্দেশ্য আছে, যা তোমাদের বলিনি। ভেবেছিলাম, নীরব চলে এলেই বলব। যখন ওর আসতে দেরি হচ্ছে তখন বলেই ফেলি। শোন, আমাদের গ্রামে নবীন নামে একজন খেলোয়াড় বেড়াতে এসেছে। নবীন ঢাকা শহরের ধানমন্ডিতে থাকে এবং সে নীরবের কাজিন। পড়ছে ইস্কলাশটিকায়, ইংলিশ মিডিয়ামে। তোমাদের বয়সী সে, এইট গ্রেডে পড়ছে। খুব চৌকষ খেলোয়াড় নবীন!’
এ পর্যন্ত বলে থামলেন হামিদ স্যার। এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলোয়াড়দের মধ্যে কেমন একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল। ওরা একে-অন্যের দিকে চোখের দৃষ্টিবিনিময় করল। সুজনের মুখের দিকে অনেকে চেয়ে রইল কেউ কেউ। হামিদ স্যারের মুখে কেমন একটা স্নিগ্ধ হাসি ফুটে আছে। সুজন হামিদ স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘স্যার, নতুন খেলোয়াড় হঠাৎ করে আমাদের সঙ্গে ম্যাচ করতে পারবে? বা আমরা কি পারব?’
‘সুন্দর কথা বলেছ সুজন। প্রশ্নটা চমৎকার। তো বলছি শোন, নবীন খেলবে ফরোয়ার্ডে তোমার সঙ্গে। ও একজন দুর্দান্ত স্ট্রাইকার। বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং, বডি ডজ, ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে চলা, দূরপাল্লার শট মারায় ওর রয়েছে অতুলনীয় দক্ষতা। আর মাঠজুড়ে ও খেলতে পারে। ওকে শুধু মধ্যমাঠ থেকে যথাযথভাবে বলের জোগান দিতে হবে। আর সুজন, তোমার সঙ্গে ওর ভালো বোঝাপড়া থাকতে হবে। তুমি ওকে বল দেবে সুযোগ বুঝে, আবার নবীনও তোমাকে বল দেবে। বুঝলে?’
‘স্যার, ওর সঙ্গে তো আমরা খেলিনি! হঠাৎ ফাইনাল খেলায় নামিয়ে দেবেন?’
জানতে চাইল আশিক। হামিদ স্যার বললেন,
‘হুম। ভয় নেই। ভালো খেলোয়াড় হলে তারা সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। নবীন পারবে। এখন তোমরা ওর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ফাইনালে চমক সৃষ্টি করতে পারব আমরা।’
মাঠে রক্ষণভাগ সামলায় বিল্টু। বিল্টু ভীষণ চঞ্চল টাইপের ছেলে। ডানপিটে ও লড়াকু। সুজনের সঙ্গে বিল্টুর লাগালাগি লেগেই থাকে। সুজনকে বিল্টু পছন্দ করে না। সুজনের লিডারশিপ নিয়ে ওর ঈর্ষা হয়। কিন্তু সুজনের সঙ্গে বিল্টু পেরে ওঠে না। বিল্টু রক্ষণভাগ সামলায় দৃঢ়তার সঙ্গে; কিন্তু ও প্রশংসা পায় না। অথচ সুজন একটা গোল করলেই সবাই ওকে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে। ‘আরে বাবা, গোলপোস্টের সামনে খেললে অমন গোল আমিও দিতে পারি!’ খেলার মাঠে মনে মনে অনেকবার আওড়েছে বিল্টু। আজ যখন শুনছে সুজনের চেয়ে ভালো খেলোয়াড় আসছে, ওর মনে খুশির দমকা হাওয়া বইতে শুরু করল। ও গদগদ কণ্ঠে বলল,
‘স্যার, অনেক বড় সুখবর দিলেন আপনি। আমাদের একজন ভালো স্ট্রাইকার থাকলে গত বছরই আমরা জিতে যেতে পারতাম। এবার মনে হচ্ছেÑ আমাদের জয় হবে। কিন্তু স্যার, যে খেলবে, সে তো ঢাকা শহওে থাকে। খেলার নিয়ম হচ্ছে তো নিজ এলাকার ছেলে হতে হবে।’
বিল্টুর শেষ কথাটা ভালো লাগল সুজনের। সুজনও এ-কথাটি তুলতো। টুর্নামেন্টের নিয়ম হচ্ছে নিজ নিজ এলাকার ছেলে ছাড়া অন্য এলাকা থেকে খেলোয়াড় দলভুক্ত করা যাবে না। সুজনও তাকালো হামিদ স্যারের দিকে। প্রশ্নটার জবাব সবাই জানতে চায়। হামিদ স্যারের মুখের হাসির বদল হলো না। তিনি বললেন,
‘ওটা কোনো সমস্যা হবে না। নবীন এই গ্রামের সন্তান। রাজবাড়িতে ওদের বাপ-দাদার ভিটে। নীরবের চাচাতো ভাই। বাস করছে ঢাকায়; কিন্তু তাদের বাড়ি এই গ্রামে। নবীন জন্মগ্রহণও করেছে এই রাজবাড়িতে। এ কারণে নবীন খেলতে পারবে। তোমরা শুধু নবীনের কথাটা খেলার আগমুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখবে।’
‘কেন স্যার? কথাটা গোপন রাখতে হবে কেন?’
বিল্টুর প্রশ্ন। ওর দুচোখ চিকচিক করছে। এত আনন্দ অনুভব ও অনেকদিন হলো করেনি। হামিদ স্যার বললেন,
‘ধরে নাও এটা আমাদের কৌশল। প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর কৌশল। ওরা এক ধরনের হিসাব করে মাঠে নামবে। কিন্তু মাঠের হিসাবটা ওরা ধরতে পারবে না। উল্টো হবে। বোকা বনে যাবে। যেমন ধরো, ওরা সুজনকে সব সময় ট্যাকল করে রাখতে চাইবে। কড়া নজরে রাখবে সুজনকে আর নবীন রেসের ঘোড়ার মতো বাজিমাত করবে। সুযোগ পেলেই গোল করে ফেলবে ও। ফের ওরা নবীনকে নিয়ে ভাবতে-ভাবতে সুজনও নজরমুক্ত হয়ে যাবে। খেলার দিন নবীন আর সুজনকে সামলাতেই এবার রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়দের ‘ত্রাহি-মধুসুদন’ অবস্থা হয়ে যাবেÑ বলে রাখছি, দেখো তোমরা!’
পরাগের চোখের সামনে কেমন একটা গোলক ধাঁধা যেন। হামিদ স্যারের কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছে না। ‘পুরো দলের শক্তিমত্তা তেমন না থাকলে শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়ের নৈপুণ্যে কীভাবে জয়লাভ করা যাবে? অবশ্য রসুলপুর একাদশও ওদের দলের চেয়ে খুব বেশি শক্তিশালী নয়।’ মনে মনে কথাটা ভেবে নিল পরাগ। ও বলল,
‘স্যার, নতুন খেলোয়াড় নামালেই জিততে পারব আমরা?’
‘না, কথাটা তেমন নয়। জিততে হলে সকল খেলোয়াড়কেই নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে খেলতে হবে। সম্মিলিত চেষ্টা ছাড়া একজন মাত্র খেলোয়াড় জয় নিশ্চিত করতে পারে না। তবে খেলোয়াড়রা দলবদ্ধভাবে খেললে একজন ভালো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষকে নাকানি-চোবানি খাওয়াতে পারে। বিশ^ ফুটবলের মহাতারকা ম্যারাডোনা ছিলেন তেমন একজন খেলোয়াড়। পেলে তো ছিলেনই, পর্তুগিজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও এমন ঈর্ষণীয় প্রতিভাবান ফুটবলার! আরও অনেক এমন প্রতিভাবান ফুটবলার আছেন। অতীতে আমরা একক প্রতিভার নৈপুণ্য অনেক দেখেছি বিশ^ ফুটবলের নানা টুর্নামেন্টে। একক নৈপুণ্য ও প্রতিভাধর ফুটবলারদের বলা হয়Ñ ফুটবলের জাদুকর! বুজেছো?’
হামিদ স্যারের কণ্ঠ কেমন আবেশিত হয়ে আসে। সুজন বুঝতে পারল দুদিন পর ফাইনাল খেলায় ওর সঙ্গে ধ্রুব নয়, নবীন নামে একজন ‘স্ট্রাইকার’ পজিশনে খেলবে। ধ্রুবকে হয়তো মধ্যমাঠে খেলতে হবে। মধ্যমাঠে নিয়মিত সাগর ও নিজাম খেলে, ওদের মধ্য থেকে একজনকে বসিয়ে দেবেন হামিদ স্যার। এটা চিন্তার বিষয় নয়, সুজনের চিন্তা হচ্ছে নবীন কি সত্যি সত্যি ‘রেসের ঘোড়া’ হতে পারবে? বিল্টু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এ সময় নীরব ওদের বয়সী এক কিশোর ছেলেকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল। এই ছেলেটির নাম নিশ্চয়ই নবীনÑ ভাবল সুজন। নবীনের পোশাক কেতাদুরস্ত লাগল ওর। ছেলেটি পরেছে সাদা শার্ট আর নেভি ব্লু রঙের প্যান্ট। শার্টের ওপর হালকা মেরুন রঙের জিন্সের জ্যাকেট। পায়ে কেডস্। চুলগুলো ঢেউ তুলে আছে যেন। এক ঝলক নবীনকে দেখলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। সুজন মুগ্ধ হয়ে গেল। নীরব ও নবীনকে দেখে হামিদ স্যারের উচ্ছ্বাস বেড়ে গেল। তিনি বললেন,
‘তোমরা বসো। তোমাদের কথাই বলছিলাম এতক্ষণ।’
নীরব ও নবীন পাশাপাশি দুটি চেয়ারে বসল। চেয়ার দুটি খালি ছিল। ওরা বসেছে হামিদ স্যারের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হয়ে। সুজন এক পলক তাকিয়ে দেখল বিল্টুর মুখে হিংসার হাসি, আশিক গোমরা হয়ে আছে, রনির চোখ লাল, রিমনের মুখে ভাবলেশ নেই। আর অন্যদের মুখের দিকে তাকালো না ও। হামিদ স্যার নবীনের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললেন,
‘ওর নাম হচ্ছে নবীন। সে নীরবের চাচাতো ভাই। এক সপ্তাহ হবে নিজের গ্রামে এসেছে। নবীন আরও কিছুদিন থাকবে। হাওয়াবদলের জন্যও আসা বলতে পার। আজ থেকে সে আমাদের ফুটবল দলের সদস্য এবং তোমাদের বন্ধু। তোমরা কি নবীনকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছ? তাহলে হাত তোল।’
সবাই হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ সূচক সমর্থন জানাল। বিল্টু হাত তুলে দাঁড়িয়ে গেল। হামিদ স্যার ওকে হাতের ইশারায় বসিয়ে দিলেন। তিনি বললেন,
‘এবার নবীনকে কিছু বলতে বলছি। নবীন, তুমি তোমার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে কিছু বলো।’
নবীন উঠে দাঁড়াল। ওর দাঁড়ানোর মধ্যে কেমন মোহ ছড়ানো অভিব্যক্তি দেখতে পেল সুজন। নবীন বলল,
‘একসঙ্গে তোমাদের সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো বলে আমি ভীষণ একসাইটেড! বন্ধুত্ব হয় ধীরে ধীরে, চলতে-ফিরতে। কিন্তু এক মুহূর্তে এবং একটি কথার জবাবে তোমরা আমাকে বন্ধু করে নিলে বলে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। চলো, আমরা আমাদের বন্ধুত্বের সম্মান জানাতে একসঙ্গে খেলার মাঠে লড়াই করি। আমরা যেন দুদিন পর ট্রফি জিতে আমাদের বন্ধত্বের উৎসব করতে পারি। সবার মঙ্গল কামনা করছি।’
নবীন চমৎকার বক্তব্য রেখে বসে পড়ল। সুজনের মনে হলো কথা হচ্ছে মানুষের চরিত্রের আয়না। এই আয়নায় সভ্যতা, শিষ্টাচার, বিনয় সব দেখা যায়। খারাপ স্বভাব সেটাও দেখা যায়। নবীনকে ভীষণ ভালো লেগে গেল সুজনের। ‘কথার মতো খেলার মাঠেও যেন নবীন ওদের মন জয় করতে পারে’ মনে মনে বলল সুজন।
দুই
খেলার সাত মিনিটের সময় ডি-বক্সের কয়েক গজ দূর থেকে অসাধারণ ও দৃষ্টিনন্দন রংধনু কিকে রসুলপুর একাদশের জালে বল পাঠিয়ে দিল নবীন। মাঠের চারপাশের সব দর্শককে অবাক এবং প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের হতবাক করে দিয়ে ফ্রি-কিক থেকে গোলটি করে ফেলল সে। গোল করার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের চারপাশে যেন সমুদ্রের গর্জন উঠল। হাততালি আর নানা হর্ষধ্বনির ঢেউ খেলে যেতে লাগল। রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়রা এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তবে তারা খেলা শুরু হওয়ার পরপরই বুঝতে পারছিল নবীন নামক এক ‘ম্যারাডোনা’ মাঠে নেমেছে এলেঙ্গা কিশোর সংঘের পক্ষে। এই ছেলেটির ডান এবং বাঁ পা দুটোই যেন ফুটবলের ছন্দ জানে। দু’পায়েই ডজ, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং ছেলেটির শট মারার অসীম ক্ষমতা রয়েছে। মাঠে ছেলেটি এমনভাবে বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে যেন বল ওর কথা শোনে! বল যেচেই যেন ওর পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটে চলে। খেলা শুরুর ছয় মিনিটের মধ্যে রসুলপুর একাদশের রক্ষণভাগে তিনবার ঢুকে পড়েছে নবীন। দুটি শটও নিয়েছিল গোলবার লক্ষ্য করে। একটি শট বারের একটু ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমানের মতো উড়ে গেছে। আরেকটি শট থামাতে গিয়ে গোলরক্ষক মহসিনের হাত ভেঙে যেতে চাইছিল যেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। সাত মিনিটের মাথায় জাদুকরি শটে গোল করে ফেলল নবীন নামক আর্জেন্টিনার ‘ম্যারাডেনা’ বা ব্রাজিলের সেই ‘সক্রেটিস’! এ-কথা ভেবে প্রমাদ গুনলো রসুলপুর একাদশের গোলরক্ষক মহসিন। ও দেখছিল বলটি সবার মাথার ওপর দিয়ে প্রথম পোস্টের দিকে আসছে, পজিশন নিয়েছিল সেভাবেই। কিন্তু বলটি শেষ সময়ে এসে বাঁক নিয়ে দ্বিতীয় পোস্টে গিয়ে জালে জড়িয়ে পড়ল। মহসিন অসহায়ভাবে তা দেখল। এমন গোল খাওয়ার জন্য তাকে কেউ দায়ী করতে পারবে নাÑ এটা ও জানে। কিন্তু ওর মনে ভয় ছড়িয়ে পড়ল। নবীন কতটা বিপজ্জনক হতে পারেÑ সেটাই ভাবতে লাগল। সাত মিনিটের সময় নবীনের দেওয়া গোলের কারণে খেলায় চালকের আসনে বসে পড়ল এলেঙ্গা কিশোর সংঘ। খেলার শুরুর চিত্রপট এমন হতে পারেÑ আজকের মাঠে উপস্থিত সহস্রাধিক লোক ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। বিগত তিন বছরের চ্যাম্পিয়ন দলটি এবারও টুর্নামেন্টের ফেভারিট দল হিসেবে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিল আশপাশের এলাকাবাসী ও ক্রীড়ামোদিদের কাছে। এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলায়াড়দের প্রতি সমর্থনের কমতি নেই; কিন্তু প্রত্যাশায় জোরও ছিল না। অথচ আজকের খেলার শুরুতে ১ গোলে এগিয়ে গিয়ে দর্শকের মধ্যে প্রত্যাশা বাড়তে লাগল। খেলা শুরুর সময় সুজনের মনটা বিষণ্ন হয়ে গিয়েছিল ১০ নম্বর জার্সিটা নবীনকে তুলে দিতে হয়েছিল বলে। হামিদ স্যার খেলা শুরুর আগে ওকে ডেকে বললেন,
‘সুজন, তোমাকে একটা কথা বলব, কিছু মনে করবে না তো?’
‘জি¦ না স্যার, বলুন।’
‘নবীনকে ১০ নম্বর জার্সিটা দিলে তুমি কি কষ্ট পাবে?’
হামিদ স্যারের কথাটা মনে কেমন করে যেন বিঁধেছিল। ও হাসিমুখে বলেছিল,
‘না স্যার, কষ্ট পাব কেন?’
কথাটা বললেও একটু কষ্ট অনুভব করেছিল সুজন। ১০ নম্বর জার্সিটা ওর জন্য এক ধরনের অহংকার। আজ আকস্মিকভাবে ওকে তা ছেড়ে দিতে হবে, তাও ফাইনাল খেলার দিন! একটা ধাক্কা এসে লাগবে না? কিন্তু সুজন জানে, জীবনে ত্যাগ করার মহত্ত্ব আছে। ত্যাগ করতে না পারলে অর্জন করা সম্ভব নয়। জ্ঞানী-গুণীরা এমন কথা বলে গেছেন। সুজনের ইতস্ততবোধ পড়তে পেরেছিলেন হামিদ স্যার। তিনি মোলায়েম গলায় বলেছিলেন,
‘নবীন সব সময় ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলে। ও তো আমাদের জন্যই খেলবে। ও একটাই দাবি করেছিল ১০ নম্বর জার্সি ওকে দিতে হবে। ১০ নম্বর জার্সির প্রতি ওর কী কারণে যেন খুব দুর্বলতা আছে। আমিও ওকে কথা দিয়েছি। আমি জানি, তুমি এতে রাগ করবে না। তাই…’
‘ঠিক আছে স্যার। আমি দিচ্ছি। এটাও ঠিক ১০ নম্বর জার্সির প্রতি আমারও এক ধরনের দুর্বলতা আছে।’
কথাটা বলেছিল সুজন। হামিদ স্যার একটু বিব্রত হয়েছিলেন। তিনি সুজনকে বলেছিলেন,
‘একজনকে উদারতা দেখাতে হবে। তুমি দেখাতে না পারলে নবীনকে বলে দেখব ১১ নম্বর জার্সি পরে খেলতে।’
‘না, না স্যার! আমি ১১ নম্বর জার্সি পরে খেলব। আপনি নবীনকে ১০ নম্বর জার্সি দিন।’
মন তো আর নিজের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। উদার মনে ১০ নম্বর জার্সি নবীনকে দিলেও একটু বিষণ্নতা ছড়িয়েছিল মনে। কিন্তু সাত মিনিটের সময় নবীনের দেওয়া অভূতপূর্ব গোলের পর সুজন মনে মনে বললÑ ‘১০ নম্বর জার্সি তোমাকেই মানায় নবীন!’ ওর মনটা সোনালি রোদ্দুরের মতো হয়ে গেল। গোল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবীন এমনভাবে মাঠে দাঁড়িয়ে হাসলো, যেন এমন গোল দেওয়াই ওর কাজ। সুজন দৌড়ে গিয়ে নবীনকে জাপটে ধরলো প্রবল আনন্দে। আরও খেলোয়াড়রা ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলো। সুজনের চোখে কখন যে অশ্রুজল জমে গেল! এই অশ্রুজল একরাশ আনন্দের!
খেলায় ১ গোলে পিছিয়ে থেকে রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়রা গর্জে ওঠার চেষ্টা করল মাত্র; কিন্তু পেরে উঠতে পারছিল না। ওদের রক্ষণভাগ তছনছ করে দিতে লাগল নবীন-সুজন জুটি। রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়রা আক্রমণ রচনার চেয়ে নিজেদের রক্ষণভাগ সামলাতে নিচে নেমে খেলতে লাগল। খেলায় ওদের কাছে নবীন এক আতঙ্ক হয়ে দেখা দিল। নবীনকে কড়া নজরে রাখলেও প্রথমার্ধ্বের ৩৩ মিনিটে একক নৈপুণ্যে তিনজন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলরক্ষক মহসিনকে বোকা বানিয়ে নবীন আরেকটি গোল দিল। মধ্যমাঠ থেকে লেফট উইং দিয়ে সাগর বল টেনে এনে বাড়িয়ে দিল সুজনকে। সুজন একজনকে কাটিয়ে ডি-বক্সের সামনে বলটি ব্যাকপাস করে দিল নবীনের কাছে। কাছেই ছিল নবীন। ও বলটি নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে এক ছন্দময় ভঙ্গিমায় ছুটে গেল গোলপোস্টের দিকে। শারীরিক শিল্পময় বাঁকে একে একে তিনজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় যেন কাটা কলাগাছের মতো পড়ল ওর ডজে। গতিময় ছন্দে নবীন যখন গোলপোস্টের কাছাকাছি গোলপোস্ট ছেড়ে খানিকটা বেরিয়ে এসেছিল গোলরক্ষক মহসিন, ওকেও ডজে পরাস্ত করল নবীন। এরপর প্লেসিং শটে জালের গায়ে জড়িয়ে দিল বল। মাঠের চারপাশটা যেন মানুষের চিৎকারে কেঁপে উঠল ‘গো-ল!’ শব্দে। অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল সুজন। প্রথমার্ধ্বের খেলা শেষ হওয়ার পর বিরতির সময়ে নবীনকে কাঁধে নিয়ে খেলোয়াড় নাচলো। লোকজন ছুটে এলো মাঠের ভেতরে। সবাই নবীনকে দেখতে মরিয়া যেন। এলাকার লোকেরা বলাবলি শুরু করলÑ নবীন কে? কার ছেলে ও? সুজন নবীনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘তুমি আমাদের সম্মানিত করেছ বন্ধু!’
নবীন বলল,
‘৪৫ মিনিটে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। এই ৪৫ মিনিট আমার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং। ওরা আমাকে কড়া নজরে রাখবে। আঘাতও করবে। আমি সুবিধা করতে না পারলে, তুমি কিন্তু হাল ধরবে। তোমাকে নিয়ে ওরা এখন ভাববে না তেমন। সুতরাং, ফাঁকায় থাকার চেষ্টা করবে। আমরা খেলার কৌশল একটু পরিবর্তন করব। এখন ছোট ছোট পাসের চেয়ে লম্বা পাসে খেলব। আর নিজেদের রক্ষণভাগ সামলাতে হবে।’
কথাগুলো খুব ভালো লাগল সুজনের। ‘১০ নম্বর জার্সির খেলোয়াড় এমন হওয়াই দরকার’ মনে মনে বলল সুজন। প্রবল হাতাতালির শুভেচ্ছাবর্ষণে মাথা উঁচু করে দ্বিতীয়ার্ধ্বে মাঠে নামলো এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলোয়াড়রা। রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়রা মাঠে নামলো রাগী চোখে, দেখে নেওয়ার চাপা অহম বুকে পুষে!
দ্বিতীয়ার্ধ্বের খেলায় ফাউল করে খেলে চলল রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়রা। নবীনের পায়ে বল গেলেই ওরা এলোপাতাড়ি আঘাতের চেষ্টা করছিল। কিন্তু নবীনকে ঠেকাতে পারছিল না। নবীন বল বেশিক্ষণ পায়ে রাখছিল না। বল বাড়িয়ে দিচ্ছিল সতীর্থ খেলোয়াড়দের। মরণপণ লড়াইয়ের মতো খেলতে লাগল রসুলপুর একাদশের ছেলেরা। দ্বিতীয়ার্ধ্বের ২৯ মিনিটের সময় রক্ষণভাগের খেলোয়াড় বিল্টুর ভুল পাসের খেসারত দিত হলো এলেঙ্গা কিশোর সংঘকে। বলটি বিল্টু বাড়িয়েছিল মধ্যমাঠে দাঁড়ানো নিজামের দিকে। বলটি পেয়ে গেল প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকার বিকাশ। ও বলটি নিয়ে দ্রুত ডিফেন্সে ঢুকে পড়ল। একই সময়ে বিকাশের সতীর্থ সাইফুল এগিয়ে এলো। বিকাশের একটি দুর্দান্ত উড়ন্ত শটে হেড করে সাইফুল গোল করে ফেলল এলেঙ্গা কিশোর সংঘের বিরুদ্ধে। মাঠের একদিকে ‘গোল’ বলে চিৎকার উঠল। অন্য তিন দিকে নিস্তব্ধতা। ২-১ গোলের সমীকরণে রসুলপুর একাদশে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো। কিন্তু সুবিধা করতে পারছিল না। নবীন-সুজন জুটির সমঝোতা ও ক্ষিপ্র আক্রমণ সামলাতে ওরা হিমশিম খাচ্ছিল। খেলাটি পুরোপুরি উপভোগ্য হয়ে উঠল। খেলা নয়, যেন যুদ্ধের দামামা বাজছে। খেলা শেষ হওয়ার ৯ মিনিট আগে নবীন হ্যাটট্রিক করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। সুজনের পাস থেকে বল নিয়ে ও প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়ল। সামনে একজন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক। ও ডিফেন্ডার নজরুলকে ডজ দিয়ে কাটিয়ে ফেলতেই পেছন থেকে বে-আইনি লাথির আঘাতে পড়ে গেল নবীন। রেফারির বাঁশি বেজে উঠল পেনাল্টির নির্দেশে। মাঠ ফের গর্জে উঠল। এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে ভয়-শঙ্কা মিলিয়ে গেল একেবারেই। ‘আর যা-ই হোক, জয়ের দ্বারপ্রান্তে ওরা!’ এ-কথাটা ওদের মনে স্বস্তি ছড়িয়ে দিল। পেনাল্টি কিক নেবে নবীন ভেবে নিল সুজন। গোল করলে ওর হবে হ্যাটট্রিক। পেনাল্টি কিকের জন্য নবীন সবচেয়ে যোগ্য। সুজন নবীনকে ডেকে বলল,
‘তুমি পেনাল্টি কিক নাও!’
নবীন হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
‘না, পেনাল্টি কিক তুমি নেবে।’
ভীষণ অবাক হলো সুজন। হ্যাটট্রিক করার এমন সুযোগ কি কেউ হাতছাড়া করে? নবীনের মতো খেলোয়াড়ের তো পেনাল্টি কিক থেকে গোল করা নস্যি ব্যাপার! কেন ও সুজনকে পেনাল্টি কিক নিতে বলছে? এ-কথা ভেবে সুজন বলল,
‘আমাকে পেনাল্টি কিক নিতে বলছো কেন?’
‘গোলটা করতে পারলে তুমি সর্বোচ্চ গোলদাতা হবে। আমি চাচ্ছি, তুমি তা করে দেখাও।’
‘তুমি তো হ্যাটট্রিক করতে পারবে, সেটি?’
‘আমার কাছে জয়লাভটাই বড় লক্ষ্য। আমরা সেই লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। এখন তুমি গোল করতে পারলে আরেকটি লক্ষ্য আমাদের পূরণ হবে। হিসাবটা খুব সহজ, বুঝলে?’
নবীনের কথা শুনে সুজন খুব অবাক হলো। ওর প্রতি ভালোবাসাটা যমুনা নদীর জোয়ারের মতো বাড়তে লাগল। প্রচণ্ড করতালির শব্দে সুজন পেনাল্টি শট নিল এবং বল জালে জড়িয়ে দিল। মাঠজুড়ে গগণবিদারী চিৎকার উঠল ‘গো-ল!’ এরপর যতক্ষণ খেলা হলো, তা ছিল বল দখলের খেলা। রসুলপুর একাদশের খেলোয়াড়দের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। ৩-১ গোলের ব্যবধানে এলেঙ্গা কিশোর সংঘ জয়ের আনন্দ নিয়ে মাঠ ছাড়ল। ওদের হাতে উঠল চ্যাম্পয়ন ট্রফি। এলেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জমির উদ্দিন প্রধান অতিথি হিসেবে সুজনের হাতে ট্রফিটা তুলে দেওয়ার সময় অনুভব করলেন তার দুচোখ জলে ভিজে আসছে। জয়ের আনন্দ বলে কথা! আজ এলেঙ্গা ইউনিয়নে উৎসবের সন্ধ্যা নেমে এলো। নবীন ও সুজনকে কাঁধে চড়িয়ে ছেলেরা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেড়াল। অনেক বাড়ি থেকে লোকজন ওদের দিকে ফুল ছিটিয়ে দিল। শহরে থাকা নবীন অবাক চোখে দেখল গ্রামের মানুষ কত সামান্য ঘটনায় গভীর আনন্দে ডুবে যেতে পারে।
পরের দিন এলেঙ্গা এলাকায় কয়েকটি ঘটনার জন্ম হলো, যা অতীতে এমন ঘটেনি। সকালবেলা সুজনকে ওর মা জানাল আগামী শুক্রবার লৌহজং নদীর পাড়ে যে ঘুড়ি উৎসব হবে, সেখানে এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলেয়াড়দের সংবর্ধনা দেবেন ইউপি চেয়ারম্যান জমির উদ্দিন। ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেট খেলায় চলে যাওয়া মিল্লাত, রহিম, সাজ্জাদ ও বকুলÑ সুজনের সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে গেল ওরা এখন থেকে নিয়মিতভাবে ওদের সঙ্গে ফুটবল খেলবে। এলেঙ্গা বাজারের চায়ের দোকানদার আবুল মিয়া বাজারে ঘোষণা দিয়েছেন, এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলোয়াড়রা চা খেলে তিনি দাম নেবেন না। সব সময় বিনামূল্যে খেলোয়াড়রা চা পান করতে পারবে। এ খবর সুজন পেল রিমনের কাছ থেকে। বিকেলে খবর পেল তালুকদার বাড়ির আমবাগানে গেলে খেলোয়াড়রা প্রতিদিন দুটো করে আম খেতে পারবে। ঢাকা থেকে টেলিফোনে বাড়ির দারোয়ান আমির মিয়াকে এই নির্দেশ পাঠিয়েছেন বাহার তালুকদার। বিকেলে সুজন যখন খেলার মাঠে গেল, দেখল অপরাপর খেলোয়াড়রা মাঠে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। নীল রঙের ট্রাউজার পরা ছিল নবীন। ওকে কী সুন্দর লাগছে! সুজনকে দেখে বন্ধুরা আনন্দে মেতে উঠল। সুজন এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল নবীনকে। নবীনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় নুয়ে আসছিল যেন সুজন।
তিন
সভা বসলো তিনটি বিষয় নিয়ে। বিষয়টি তিনটি তিন রকম হলেও নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের সাত সদস্য সভায় উপস্থিত। সবার চোখেমুখে গভীর চিন্তার রেখাপাত। সুজনের মুখ থমথমে। সে বসেছে হিজল গাছের গুঁড়িতে, গাছটির মূলজুড়ে ছড়ানো শীতল ছায়ায়। বাকিরা বসেছে অনেকটা গোলাকার হয়ে। সুজন সবার মুখ দেখতে পাচ্ছে। রিমন বসেছে দু-হাঁটুকে দু-হাতে পেঁচিয়ে। হাঁটুর বন্ধনীতে ও চিবুক রেখে ভাবছে। ও শুধু ভাবে। তাই ওরা ওর নাম দিয়েছে ‘ভাবুক’। ওর প্যান্টের নিম্নাংশ ছেঁড়া। শারীরিক চাপে ঐ ছেঁড়া অংশ দিয়ে গোপনাঙ্গ বেরিয়ে রয়েছে। সেদিকে রিমনের যেমন খেয়াল নেই, তেমনি অন্য কারও দৃষ্টি পড়েনি সেদিকে। অন্যদের দৃষ্টি পড়লে হাসাহাসির রোল পড়ে যেত। সুজন দৃশ্যটি দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল। আজকের মিটিংটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিন হলে ছেঁড়া প্যান্ট গলিয়ে গোপনাঙ্গ বেরিয়ে আসার বিষয়টি নিয়ে সুজন নিজেই রিমনকে ক্ষ্যাপিয়ে তুলত। এখন এ-বিষয়ে নজর দিলে মূল বিষয়টির গুরুত্ব কমে যাবেÑ ভেবে নিল ও। সুজন অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ক্লাবের অপর সদস্যদের দেখে নিতে হবে। সুজন দেখল, সাব্বিরের মুখ প্রখর রোদের আঁচে এখনও লাল হয়ে আছে। রোদে পুড়ে যাচ্ছেÑ এ নিয়ে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। রনিকে দেখে মনে হলো ও অন্যমনস্ক। হাসান রেগে আছে খুব। ও বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। রেগে গেলেই ও পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকে। আশিক অবশ্য মুখ গোমরা করে রাখার চেষ্টা করছে। ও বরাবরই ডানপিটে, ক্ষ্যাপাটে। শান্ত, সুস্থির বা গম্ভীর হয়ে থাকতে পারে না ও। একে চিমটি কাটা, ওকে উসকে দেওয়া বা যখন তখন বেফাঁস কথা বলা ওর স্বভাব। তবে আজ ও সভার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে বসে আছে। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের উপস্থিত সদস্যদের এক ঝলক দেখে নিতে গিয়ে সুজন মনে মনে খুশি হচ্ছিল। কিন্তু ভয়কাতুরে বিজু’র আচরণ ওর পছন্দ হলো না। বিজু বারবার তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। বিল্টু এসে যে কোনো সময় এ-সভায় হামলে পড়তে পারে, সে আশঙ্কা করছে কি বিজু? ভাবলো সুজন। বিজুর অহেতুক ভয় পাওয়া নিয়ে প্রায়ই বিরক্ত হয় ওরা। বিজুকে যত অভয় দেওয়া হোক, ও ভয় পাবেই। এই তো সেদিন তালুকদার বাড়ির আমবাগানে গিয়ে বিজুর ভয়ের কারণে ওরা আমচোর ধরতে পারেনি। ও পাড়ার দুষ্ট মাখন ওর দু-বন্ধু মিলে তালুকদার বাড়ির আমবাগানে ঢুকে আম চুরি করছিল। ওদের হাতেনাতে ধরার মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল বিজুর ভয় পাওয়ার কারণে। আমবাগানের দারোয়ান আমির মিয়া কোথায় ছিল, কে জানে। সুজন, বিজু, রিমন ও আশিক আমবাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল খেলার মাঠের দিকে। যাবার সময় আমবাগানে ঢিল ছোড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে চোর ঢুকেছে সন্দেহে ওরা প্রথমে থমকে দাঁড়ায় রাস্তার ওপর। এরপর বাগানবাড়ির গেট খোলা দেখতে পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ওরা চার বন্ধু। তালুকদার বাড়ির আমবাগানের চারপাশটা কাটাতারের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত। কাটাতারের কোনো কোনো অংশ টিন দিয়েও ঢাকা। বাড়িতে প্রবেশের জন্য একটি গেট আছে। গেটটি প্রায় সময় বন্ধ থাকে। আমবাগানের ভেতরে খুপরি ঘরে থাকে আমির মিয়া। সে বাগানটি চোখে চোখে দেখে রাখে। তালুকদার বাড়ির কেউ এখন এই বাড়িতে থাকেন না বলে আমির মিয়াকে দরোয়ানের কাজ দিয়েছেন বাহার তালুকদার। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন ঢাকা শহরে। এক মাস বা দু-মাস পরপর তিনি এই আমবাগানে, অর্থাৎ নিজেদের বাড়িতে আসেন। আমবাগান ছাড়িয়ে ভেতরে গেলে একতলা ভবন ও একটি পদ্মদিঘি আছে। এই ভবনে একসময় বাবা-মা’র সঙ্গে বাহার তালুকদার থাকতেন। এই বাড়িতে তার জন্ম এবং বেড়া ওঠা। সুজন ওর মা’র কাছে শুনেছে, বাহার তালুকদার লেখাপড়া শিখে অনেক বড় চাকরি করছেন ঢাকায়। বাবা-মা’কে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন তিনি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নির্জনতা ও পাখ-পাখালির গুঞ্জন ছেড়ে অট্টালিকার শহরে অ্যাপার্টমেন্টে বাস করছেন তারা। ঢাকায় তারা চলে যাবার পর থেকে তালুকদার বাড়িটা খাঁখাঁ করছে। এই তালুকদার বাড়িতে প্রবেশ করলে প্রথমে চোখে পড়বে সারিসারি আমগাছ। অনেক বাহারি নামের আমগাছ এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাহার তালুকদার ছোটবেলায় আম খেতে খুব পছন্দ করতেন বলে তার বাবা বাসু তালুকদার বাড়ির সুপরিসর আঙ্গিনায় আমগাছের অনেক চারা লাগিয়েছিলেন। আম গাছগুলো বড় হয়ে যাবার পর এই বাড়িটি ‘তালুকদার বাড়ির আমবাগান’-এর বিশেষ পরিচিতি লাভ করে এলাকাবাসীর কাছে। সেদিন আমবাগানে ঢুকে বিজু কী দেখে ‘ভূত’ মনে করে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল। ওর চিৎকার শুনে আমবাগানে ঢুকেপড়া মাখন ওর সঙ্গীদের নিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেল। ‘চোর’ ‘চোর’ বলে চিৎকার করে ছুটে এলো আমির মিয়া। তার সঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে বড় একটি জার্মান শেফার্ড কুকুর এলো ওদের সামনে। কুকুরটি এসে ওদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। লম্বা জিহ্বা বের করে কুকুরটা এমনভাবে ওদের দেখছিল যেন ওরা হাতেনাতে ধরা পড়া চোর! আমির মিয়া ওদের চেনে বলে রক্ষা পেয়েছিল ওরা। সুজন দেখেছিল মাখন ও ওর বন্ধুরা খুব দ্রুত কাটাতারের দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত টিনের ফাঁক গলে পালিয়ে যেতে। সুজন বিজুকে ছেড়ে মাখনদের পিছু নিতে পারে না। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের আদর্শ এটি নয়। কেউ বিপদে পড়লে তাকে ফেলে অন্য কাজে যাওয়া যাবে নাÑ এমন শর্ত মানতে হবে ক্লাবের সকল সদস্যকে। ফলে সুজন তাড়া করেনি মাখনদের। কিছুক্ষণ পরই সুজন জানতে পেরেছিল যে, আমির মিয়া বাগানবাড়ির বাইরে কুকুরটা নিয়ে একটু ঘুরে এসে বাগানের এক কোণায় গিয়েছিল কী একটা কাজে। গেটে তালা লাগাতে ভুলে গিয়েছিল সে। এই সুযোগে মাখন ওর সঙ্গী নিয়ে বাগানে ঢুকে পড়েছিল, তা বুঝতে পেরেছিল সুজন। সেদিন বিজুর ‘ভূত’ বলে চিৎকার করে সংজ্ঞা হারানোর কারণে হাতেনাতে আমচোর ধরা যায়নি। পরে অবশ্য বিজু বলেছিলÑ দূরে কুকুরটাকে দেখেই ও ভূত মনে করেছিল। বিজুর ভয় পাওয়া নিয়ে সুজন, রিমন, আশিক খুব হেসেছিল সেদিন।
সুজন বুঝতে পারে বিজুর ভয় পাওয়া স্বভাব নিয়ে বিচলিত হবার কিছু নেই। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের সকল সদস্য একরকম হবে না। কিন্তু কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলে জয়লাভ সম্ভবÑ এটা প্রবলভাবে বিশ^াস করে সুজন। সভায় গুমোট পরিবেশের নিস্তব্ধতা ভাঙল। ও বলল,
‘নির্বাচনের আগে আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় ‘এসো শিখি’ ক্লাবের সকল সদস্য উপস্থিত হবার জন্য ধন্যবাদ। বন্ধুরা, তোরা জানিস, কাল আমাদের নির্বাচন। কিন্তু এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা আজ গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।’
এ পর্যন্ত বলে সুজন থামল। কথা শুরু করার পর ও বন্ধুদের চোখেমুখে কী ফুটে আছে, দেখতে চায়। কিন্তু আশিক ফোড়ন কাটার মতো করে বলল,
‘ভাষণ দিচ্ছিস যে!’
‘ভাষণ দিচ্ছি নারে। কথা শুরু করেছি। তোরা মনোযোগ দিয়ে কথা শোন। এরপর তোরাও বলবি।’
‘আমরা আবার কী বলব? তুই হচ্ছিস ‘এসো শিখি’ ক্লাবের সভাপতি। মানে, আমাদের নেতা। তুই শুধু বলে যা। আমরা করে যাব।’
বলল আশিক। ও স্বভাবে ‘ঠোঁটকাটা’। মুখে যা আসে, বলে ফেলে। পরিবেশও বোঝে না। এটা যে একটা সভা, তা ও বোঝে না। কিন্তু ও সব সময় সব কাজে পাশে থাকে। সটকে পড়ে না। ভাবলো সুজন। ও বলল,
‘তোরা জানিস কাল কী হতে যাচ্ছে?’
‘নির্বাচন। এটাই তো জানি।’
জবাবে বলল রিমন। সুজন বলল,
‘ঠিক বলেছিস। তোরা জানিস, ‘এসো শিখি’ ক্লাবের পক্ষ থেকে আমি এই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। এই ইউনিয়ন শিশু পরিষদ নির্বাচনে আমার জয়-পরাজয় এখন আমাদের সবার সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাল নির্বাচন। অথচ আজই প্রতিপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছ থেকে তিনটি ধাক্কা খেলাম! সে কী যেমন-তেমন ধাক্কা! সে ধাক্কায় আমার কুপোকাত হবার দশা! তোরা আমার বন্ধু। এখন তোরাই এই সমস্যার সমাধান কর।’
কথাগুলো বলে সুজন থামল। সুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বিজু চিন্তা করতে লাগলÑ এ সভার গুরুত্ব আছে কি, নেই। ও এ-সভায় এসেছে জরুরিভাবে খবর পেয়ে। স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে হাসান শুধু বলেছে অতি জরুরি সভার কথা। বিজু চলে এসেছে। কেন এই জরুরি সভা, তা ও জানত না। সভায় এসে সুজনের বক্তব্য শুনে বিজু বুঝতে পারছে কোনো গভীর সমস্যা ওদের সামনে। কাল এলেঙ্গা ইউনিয়নের শিশু পরিষদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে সুজন দাঁড়িয়েছে চেয়ারম্যান পদে। ওর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিল্টু ও পরাগ। ওরা তিনজনই আবার ‘এলেঙ্গা কিশোর সংঘ’র সদস্য। ওরা সমঝোতা করেনি, করার কেউ চেষ্টাও করেনি। ফলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সুজনের সঙ্গে বিল্টুর তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। বিজু জানে, বিল্টু বড্ড পাজি ও ডানপিটে। ওকে দস্যুও বলা চলে। বিল্টুর সঙ্গে কেউ ভয়ে লাগতে চায় না। ওকে এড়িয়ে চলাই ভালো। বিল্টু কাকে, কখন নাকানি-চুবানি খাইয়ে দেবে তার ঠিক নেই। অথচ এই বিচ্ছু ছেলেটার সঙ্গে নির্বাচনে লড়াই করছে সুজন। বিজুর ভালো লাগেনি তা। কিন্তু সুজনকে ভয়ে এ-কথাও বলেনি। ওর হয়েছে উভয় সংকট! নির্বাচনের হাওয়া বইতেই ভয়ে কুঁকড়ে আছে বিজু। ‘সুজনের সঙ্গে বিল্টুর নিশ্চয়ই কোনো গোল বেধেছে!’Ñ ভেবে নিল বিজু। ও ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
‘কী হয়েছে খুলে বল। আমি তো কিছুই জানি না!’
এ-কথায় ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকালো রনি। শ্লেষ কণ্ঠে বলল,
‘জানলেও কি তুই কিছু করতে পারবি?’
‘রনি, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করা ঠিক হচ্ছে না।’
সাব্বির সাবধান করে দিল রনিকে। সুজন সবার উদ্দেশে বলল,
‘বিল্টু আমাকে অসম্মান করতে চায়। নানা কৌশলে আমাকে নির্বাচনে হারিয়ে দিতে চায়। সে আজ তিনটি ঘটনা ঘটিয়েছে। তার সঠিক জবাব আমাদের দিতে হবে।’
‘ঘটনা তিনটি কী?’
বিজুর ভয়কাতুরে প্রশ্ন। জবাবে সুজন বলল,
‘ঘটনা এক, বিল্টু আজ সকালে আমার পোস্টারে গোবর মেখে দিয়েছে। হাতে লেখা ১৪টি পোস্টার লাগিয়েছিলাম স্কুলের দেয়ালে। ৭টি পোস্টার এখন গোবরে লেপ্টালেপ্টি। মনে হচ্ছে আমাদের সাতজনের মুখে ও গোবর মেখেছে!’
‘তাহলে আমরা ওর মুখে মুরগির গু মেখে দিই।’
আশিকের উত্তেজিত প্রস্তাব।
‘সেটা কি ঠিক হবে? ও অপরাধ করলে, আমরাও কি অপরাধ করব?’
আশিকের প্রশ্নের জবাবে বলল হাসান।
‘তাহলে ওর পোস্টারেই মুরগির বা কুকুরের গু মেখে দিই।’
ফের বলল আশিক। হাসান একটু রাগ ঝরানো কণ্ঠে বলল,
‘ঐ একই অপরাধ!’
‘এর জবাব দিতে হলে আমাদেরও অপরাধ করতে হবে।’
রনি অন্যমনস্কভাবেই কথাটা বলল। ওদের কথার এ-পর্যায়ে সুজন বলল,
‘বিকল্প পথ খোঁজা যেতে পারে। সে-কথা পরে ভাবা যাবে। এখন সমস্যা দুই-এর কথা বলছি, শোন সকলে। বিল্টু আজ আমাদের একনিষ্ঠ কর্মী শামীমকে মেরেছে। সকালে ও স্কুলে আসার পথে বিল্টুর মুখোমুখি পড়ে যায়। বিল্টু শামীমকে আমার পক্ষে গণসংযোগ না করার প্রস্তাব দেয়। শামীম ওর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিল্টু ওকে মেরেছে।’
‘তাহলে আমরাও বিল্টুকে আচ্ছা করে পিটিয়ে দিই। সে-সাথে ওর প্যান্ট খুলে রেখে দেওয়া যেতে পারে। চেয়ারম্যান সাহেব নেংটা হয়ে ছুটবেনÑ দৃশ্যটি বেশ মজার হবে, হা-হা-হা!’
আশিকের রসিকতায় কেউ সায় দিল না। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের আদর্শ হচ্ছে পরের ক্ষতি না করা এবং ভালো কাজ শেখা। শত্রুকে বশ মানানোও ক্লাবের আদর্শের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। সুজন বলল,
‘তিন নম্বর সমস্যা হচ্ছে, বিল্টু আমাদের কিছু কর্মীকে হাতিয়ে নিয়েছে। লোভ ও প্রলোভন দেখিয়ে ও আজ নয়জন কর্মীকে ওর দলে টেনে নিয়েছে। বিল্টু ঐসব কর্মীকে একগাদা চকোলেট, আইসক্রিম খাইয়েছে। ওদের নয়জনকে আজ মর্নিং শো-র সিনেমার টিকিট দিয়েছে। ওরা আজ স্কুলে আসেনি। জানতে পেরেছি, ওরা সকালের শো-তে সিনেমা দেখেছে। এরপর থেকে ওরা আর আমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। বিল্টু যেমন অর্থের বাহাদুরি দেখাচ্ছে, তেমনি আমাদের সহপাঠীদের বিপদগামীও করছে।’
এর জবাবে হাসান বলল,
‘ওদের আমরাও ছবি দেখাব। ওরা তখন হুড়হুড় করে ফিরে আসবে।’
‘না। সিনেমা দেখার প্রবণতা পড়াশোনার ক্ষতি করে।’
বলল সুজন। এ পর্যন্ত এসে সভা ঝুলে গেল। কেউ কোনো পথ দেখাতে পারছে না। অথচ বিল্টুকে সবাই একটা জুতসই জবাব দেবার পক্ষে একমত। এ-কারণেই সভা বসেছে। অন্যমনস্কতা ঝেড়ে রনি এবার সিরিয়াসভাবে বলল,
‘তোরা কি জানিস, আজ ক্লাসে বিল্টু কী ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়েছে?’
কৌতূহলি চোখে সবাই ওর দিকে তাকালো। বিল্টু ওর ক্লাসেই পড়ে। এইটে। বিল্টু অবশ্য এবার নবম শ্রেণিতে থাকার কথা। কিন্তু গত বছর পরীক্ষায় লবডংকা পেয়েছে। পরাগও পড়ে ওদের ক্লাসে। বিল্টুর সাথে পরাগ বরাবরই পাল্লা দেয়। পরাগ যেমন স্বাস্থ্যবান তেমনি গোয়ার গোবিন্দও। ক্ষেপে গেলে ওকে ঠেকানো দায়। তাই বিল্টু ওকে সমঝে চলে। বিল্টু আজ অষ্টম শ্রেণির ক্লাসে কি ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা ওদের জানার কথা নয়। কারণ ‘এসো শিখি’ ক্লাবের অপরাপর ছয় সদস্য অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করলেও অন্য ক্লাসের ছাত্র। সুজন বলল,
‘কী হয়েছে বল? তোদের ক্লাসে কী হয়েছে, তা আমরা কী করে জানব?’
এর জবাবে রনি বলল,
‘আজ প্রথম পিরিয়ডে মিজবাহউদ্দিন স্যার পরাগকে সপ্তম কারকের এ বিভক্তির পড়া জিজ্ঞেস করেছিলেন। পরাগ উঠে দাঁড়িয়ে পড়া বলছিল। বিল্টু ওর পেছনের বেঞ্চে বসে ছিল। সেই বেঞ্চ থেকে বিল্টু একটি কাঠপেন্সিল দাঁড় করিয়ে রাখে পরাগের বসার স্থান বরাবর। পড়া শেষ করে পরাগ বসতেই সে-কী দুর্ঘটনা!’
‘বলিস কী! কী হয়েছিল?’
জানতে চাইল সুজন। রনি মুখে হাসি চেপে বলল,
‘পরাগের পশ্চাৎদেশ দিয়ে কাঠপেন্সিলের এক ইঞ্চি পরিমাণ ঢুকে গিয়েছিল। সে কী বিচ্ছিরি কাণ্ড! পরাগের চিৎকার শুনে ক্লাসজুড়ে হল্লা। হৈচৈ। মিজবাহউদ্দিন স্যার এসে পরাগকে নিয়ে বাইরে চলে যান। ততক্ষণে বিল্টু ক্লাস থেকে হাওয়া। কে এই কাজ করল? তা নিয়ে স্যারেরও খোঁজাখুঁজি, ঝক্কি-ঝালেমা কম হয়নি!’
‘এরপর কী হলো?’
কৌতূহল প্রকাশ করে জানতে চাইল হাসান। রনি বলল,
‘স্যার পরাগকে স্কুলের পুকুরে নামিয়ে রেখেছিলেন পুরো এক ঘণ্টা। এ নিয়ে টিচারদের কমনরুমে হিসপাস-ফিসফাস! আড়ালে ক্লাসের সবার মধ্যে হাসির হিল্লোল। কত কী হলো!’
রনির কথা শুনে সভার শ্রোতারা সমস্বরে বলল,
‘এমন একটি কাণ্ড হলো, আর আমরা জানতেও পারলাম না!’
‘সম্ভবত হেডস্যারের কঠোর নির্দেশে দুর্ঘটনার কথা চেপে যাওয়া হয়েছে। তবে বিল্টুর বরাত ভালো, হেডস্যার জানেন না, কে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।’
বলল রনি। আশিক বলল,
‘পরাগও চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিল্টু এমন জঘন্য কাজ করতে পারল! আমাদের এখনই সাবধান হওয়া প্রয়োজন। বিল্টু যদি সুজনেরও…!’
সবার হাসির হিল্লোলে আশিকের কথা মিলিয়ে গেল। হাসান সভার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
‘আমাদের আজকের সভা বিল্টুর অপকর্ম নিয়ে হাসি-তামাশা করার জন্য নয়। বরং কালকের নির্বাচনে ওকে কীভাবে মোকাবিলা করব, তার একটি রূপরেখা তৈরি করতে হবে।’
‘হ্যাঁ, সে-বিষয়েই আলোচনা হোক।’
সাব্বির হাসানের কথার জোর সমর্থন জানাল। বিজু ক্ষীণকণ্ঠে বলল,
‘সন্ধ্যা নেমে আসছে। সভার কাজ শেষ করা দরকার।’
ভাবুক রিমন এবার আলোচনায় ফিরে এলো। ও বলল,
‘বিল্টুকে শিক্ষা দিতে গিয়ে ওর মতো অপকর্ম করা যাবে না। এতে আমাদের বদনাম হবে। তাছাড়া এ-ধরনের কাজ আমাদের ক্লাবের আদর্শের পরিপন্থী। তবে ওকে শিক্ষাও দিতে হবে।’
‘কীভাবে?’
প্রশ্ন করল বিজু। এ-প্রশ্নে একে-অন্যের মুখের দিকে তাকালো। রিমন বলল,
‘কাল যদি বিল্টুকে আমরা নির্বাচনে হারিয়ে দিতে পারি, তবেই বিল্টুকে যথাযথ জবাব দেওয়া হবে। আর এক্ষেত্রে আমরা সবাই কাল বিল্টুর সাথে বিনয়ী ব্যবহার করব। কোনো দুর্ব্যবহার করা যাবে না। বিনয়-ই হবে আমাদের হাতিয়ার।’
সবার মধ্যে প্রস্তাবটা আলোচনা হলো। সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হলো। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আশিকের মন সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। তবে বিজুর মন থেকে আশঙ্কার মেঘ সরে যেতে লাগল। কী ভেবে সুজন বলল,
‘তোরা বল তোÑ নির্বাচন মানে কী?’
রিমন বলল,
‘নির্বাচন মানে ভোট দেওয়া। এই তো!’
‘ঠিক, তবে শুধুমাত্র ভোট দেওয়া নয়। আরও বেশি কিছু। বুঝলি?’
বলল সুজন। সুজনের দিকে চেয়ে আশিক বলল,
‘একটু সহজ করে কথাটা বুঝিয়ে দে!’
সুজন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের সদস্যরা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও বলল,
‘শুধু ভোট দেওয়াই শেষ কথা নয়। আমাদের কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে। কাল স্কুলে ভোট দেওয়ার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। সুশৃঙ্খল পরিবেশ রাখতে হবে। যারা ভোট দিতে আসবেন, তাদের সহযোগিতা করতে হবে। প্রয়োজনে দেখিয়ে দিতে হবে কীভাবে ভোট দিতে হয়।’
‘হুম। এটাও আমাদের ক্লাবের আদর্শ।’
বলল রনি। সুজন বলল,
‘সন্ধ্যা নেমে আসছে। সভার কাজ শেষ হলো।’
‘এসো শিখি’ ক্লাবের সাত সদস্য কাল নির্বাচনে কী কী করতে হবেÑ এ ভাবনার রেশ নিয়ে নিজ নিজ বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
চার
টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি উপজেলার এলেঙ্গা ইউনিয়নটি শহর সংলগ্ন। এই ইউনিয়নের ওপর দিয়ে যমুনা সেতুর দিকে যায় যানবাহন বা যমুনা সেতু থেকে যানবাহন নেমে এসে টাঙ্গাইল শহর হয়ে বিভিন্ন দিকে চলে যায়। অনতিদূরে যমুনা সেতুর কারণে এলেঙ্গা ইউনিয়নের গ্রামগুলোর রূপ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে যেন। গ্রামে এসে লাগছে শহুরে গ্রাস! একটা সময় ছিল এখানকার গ্রামে সন্ধ্যা মানে ঝুপ করে রাতের অবগুণ্ঠন। রাত মানে গ্রামবাসীর ঘুমিয়ে পড়া আর অন্ধকারের পেখম ছড়িয়ে থাকা। কেরোসিনের কুপি জ¦লত ঘরে ঘরে আর ছোট বাজারে হ্যাজাক লাইটের ধাঁধানো আলোর ঝলকানি দেখা যেত। এখন সন্ধ্যা ও রাতের রূপের বদল হয়েছে। সন্ধ্যা মানে বিজলিবাতির ঝলকানি আর রাত মানে তা গভীর হওয়া অবধি ঘরে ঘরে মানুষের জেগে থাকার আলোড়ন। বাজারে হ্যাজাক লাইটের অহম ফুরিয়ে স্থায়ীভাবে বিজলিবাতির রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ছোট বাজার ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। এলেঙ্গা বাজার এখন ব্যস্ত সরগরম এক বাজারে পরিণত হয়েছে। অনেক কাঁচা রাস্তা পাকা হয়ে এদিক-ওদিক চলে গেছে। একটা সময় যে রাস্তায় রিকশা চলতে হিমশিম খেতে হতো, ওসব রাস্তা এখন প্রশস্ত ও পিচঢালা পথ হয়ে শহুরে জনপদের সামঞ্জস্য জানান দিচ্ছে। ও-পথে মানুষ এখন প্রাইভেটকার হাঁকিয়ে বেড়ায়। গ্রামের পুকুরগুলো অবশ্য মলিন-দূষিত হচ্ছে আর জঞ্জালে ভরে যাচ্ছে। একটা সময় পুকুরগুলোতে মাছে কিলবিল করত, এখন মাছ চাষের উপযোগিতাও হারিয়ে ফেলছে পুকুরগুলো। লৌহজং নদীটাও কেমন বিষণ্ন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। স্কুলে পরিবেশ বিজ্ঞানের ক্লাসে পরিমল স্যার আক্ষেপ করে এই তো সেদিন বললেন,
‘আমরা দেখছি, গ্রামের কপালে শহরের আলো ঝলমলে টিপ পরছে। আমাদের গ্রাম দখল করে নিচ্ছে নগর, সভ্যতা বা উন্নতির অবকাঠামো। এখনও এর ভালো-মন্দ কতটুকু, তা বোঝার জ্ঞান তোমাদের হয়তো হয়নি। তবে পরিবেশ ও বিজ্ঞানের বিষয়ে জানতে হলে, তোমাদের নিজ নিজ এলাকার দিকে তাকাতে হবে। তোমরা যে পরিবেশে আছ, তা নির্মল-পরিচ্ছন্ন ও বসবাসের উপযোগী কি নাÑ জানতে হবে। এই পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেন না যায়, এর জন্য তোমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। বই পড়ে যেমন শিখবে বা জ্ঞান অর্জন করবে, চারপাশে তাকালেও শিখতে পারবে বা জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। যেমন ধরো, গ্রামগুলোতে শহরের জৌলুস ঢুকে যাচ্ছে বলে আমরা আনন্দিত হচ্ছি, পুলকিত হচ্ছি। এর অন্যদিকটাও ভাবতে হবে। আমরা হয়তো অগ্রসর হচ্ছি। কিন্তু আমরা কি আমাদের পরিবেশ রক্ষা করছি? আমরা কি ভারসাম্য রক্ষা করছি, না-কি হারিয়ে ফেলছি? আমরা কি বায়ুদূষণ করছি? আমরা কি প্রকৃতির বিরুদ্ধে কিছু করছি?’
পরিমল স্যারের কথায় সব সময় কেমন অর্থদ্যোতনা থাকে। গুরুত্ব থাকে। ভাবার মতো চিন্তার খোরাক জোগায়। সুজন ক্লাসে সব সময় পরিমল স্যারের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। ওর ভালো লাগে। তিনি মাঝে মাঝে বাংলারও ক্লাস নেন। কোনো কারণে ওদের বাংলার শিক্ষক ‘মিজান স্যার’ স্কুলে না এলে সেদিন তিনি বাংলার ক্লাসও নেন। পরিমল স্যার ওদের নিয়মিত পরিবেশ বিজ্ঞানের ক্লাসে পড়ান। তিনি অনেকটা গল্পের ঢংয়ে ক্লাসে কথা বলেন। তিনি এমনভাবে কথা বলবেন, যেন মনে হবে চোখের সামনে ছবি তুলে ধরছেন। পরিমল স্যারের কথা বলার ভঙ্গি খুব আকর্ষণীয়। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে ভাবনা এসে ভিড় করে মনের জগতে। তখন সমাজে ভালো কিছু করার ইচ্ছে জাগে। এমন ইচ্ছে যখন জাগে, তখন সুজনের মাঝে মাঝে মনে হয়, ও কবে বড় হবে। ‘বড় হয়ে ও সমাজে কবে ভালো ভালো কাজ করবে?’Ñ এ-কথাটা ওর মনে উঁকি দেয় বারবার। সেদিন ক্লাসে পরিমল স্যারকে সুজন বলেছিল,
‘স্যার, শহর কি খারাপ? বড় হয়ে সবাই তাহলে শহরে চলে যায় কেন?’
ওর প্রশ্ন শুনে পরিমল স্যার একটু হেসেছিলেন। ওর পাশে বসে রিমনও হেসেছিল, ওর হাসিটা ছিল ‘বক্রহাসি’। সুজন জানে, পরিমল স্যার ক্লাসে যা বলেন, তা ভালো লাগে না রিমনের। ও শুধু স্যারের কথা শুনে যায়। মগজে ঢুকায় না। পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ে ওর যথেষ্ট উদাসীনতা বা অনাগ্রহ রয়েছে। পরীক্ষার সময় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে নেয় রিমন। ওটাই ওর আত্মরক্ষার কৌশল। সেদিন রিমনের হাসিটা ছিলÑ ‘বেশ একটা প্রশ্ন করেছিস তো!’ টাইপের। সুজন রিমনের হাসিকে উপেক্ষা করে তাকিয়েছিল পরিমল স্যারের মুখের দিকে। স্যার ওর প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন,
‘শহর খারাপ, তা বলছি না। বলছি পরিবেশের কথা। শহরেও দূষণ হচ্ছে ঠিক। আবার শহরকে দূষণমুক্ত রাখার কাজও চলে। আসলে পরিবেশ তৈরি করতে হয়। যেমন ধরো, শহরের রাস্তার বিভিন্ন স্থানে আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন আছে। মানুষ ওখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে। নগর কর্তৃপক্ষের কর্মচারীরা তা নিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে পরিবেশ নষ্ট হয় না। গ্রামে কিন্তু মানুষ যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখে। এটা পরিবেশের জন্য খারাপ। আরও অনেক উদাহরণ দিতে পারি। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশ মানবজীবনের জন্য সব সময়ই ভালো। এটা গ্রামে বেশি দেখি আমরা। তাই বলছিলাম, শহরের যে সুবিধাগুলো আমাদের গ্রামে আসছে, তা যেন গ্রামের নৈসর্গিক পরিবেশকে ধ্বংস করে না দেয়। আর শহরে অনেকে যাচ্ছেন। তারা পড়াশোনা করতে, চাকরি বা ব্যবসা করতেই বেশি যাচ্ছেন। তাদের শহরমুখী হওয়ার কারণ আছে। বুঝতে পারলে, কী বলতে চাইছি?’
পরিমল স্যারের কথার জবাবে সুজন বলেছিল,
‘জি¦, স্যার। এখন একটু বুঝতে পারছি।’
এ-সময় নবীনের কথা মনে পড়ল সুজনের। নবীনের পরিবারও কোনো কারণে চলে গেছে শহরে। তারা না গেলে তো এই গ্রামে থাকত। এলেঙ্গা কিশোর সংঘ পেত একজন জাদুকরি ফুটবলার। সুজনের অন্যমনস্কতা ভেঙে পরিমল স্যার বলেছিলেন,
‘শহর বা গ্রাম, আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে নিজ নিজ এলাকাকে দূষণমুক্ত রাখা। বাড়িঘর, উঠোন, চলার পথ বা আশপাশের যে কোনো স্থান যেন অস্বাস্থ্যকর না থাকে, সেদিকে সবার নজর রাখা। বড়রা তো রাখবেনই, ছোটরাওÑ যেমন তোমরাও সচেতন এবং সতর্ক থাকবে।’
পরিমল স্যারের সেদিনের ক্লাসের পর থেকে সুজনের মনের মধ্যে আশপাশ এলাকায় চোখ আটকে যাচ্ছে। ঝোপঝাড় দেখলেই ওর মনে হচ্ছে এটি কি স্বাস্থ্যকর? কোথাও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখে থমকে দাঁড়াচ্ছে। এসব আবর্জনা কেন পড়ে আছে বা কেন কেউ পরিষ্কার করছে নাÑ প্রশ্নটা ওর মনে উদয় হচ্ছে। এমনকি, মজে যাওয়া পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ও ভাবছেÑ ‘পুকুরটা পরিষ্কার করে নতুনভাবে মাছ চাষ করলে কেমন হবে?’
সুজন একটা বিষয়ের অবশ্য পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছে না। তা হলো, গ্রামে শহরের সুবিধা চলে আসছে, এটা কি ভালো, না মন্দ? পরিমল স্যারের কাছে আরেকদিন প্রশ্ন করে সঠিক ধারণা নিতে হবে, ভাবছিল সুজন। ও পড়ার টেবিলে বসে এসব কথায় ডুবে আছে। কাল সকালে ওর নির্বাচন, তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। কী হবে ভেবে? নির্বাচন মানে জয় অথবা পরাজয়। জয়ী হলে ভালো, যা ভাবছে তা হয়তো কিছুটা হলেও করতে পারবে। আর হেরে গেলে মানেই তো থেমে যাওয়া নয়! শুধু একটু ধমকে দাঁড়ানো, এই তো। কথাটা ভাবতেই ওর রুমে মা ঢুকে বললেন,
‘কী রে, চুপচাপ বসে আছিস যে! কী হয়েছে? তোর শরীর খারাপ?’
‘না, মা।’
‘তাহলে কেমন চুপ করে বসে আছিস যে! কী ভাবছিস?’
মা কাছে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল পরম মমতায়। মা যখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, ওর কী যে ভালো লাগে। মা বললেন,
‘বললি না যে কী ভাবছিস?’
‘মা, আমি ভাবছিলাম আমরা গ্রামে থাকি। এখানে জামরুল গাছ আছে, বটগাছ আছে, ছাতিম-চালতা-গাবগাছ, আরও কত গাছ আছে। শহরে এসব গাছ নেই কেন? ওখানে শুধু দালান আর দালান। রাস্তা আর গাড়ি। বড় বড় বিপণি বিতান আর মানুষের ভিড়। নদী-গাছপালা, ফসলে মাঠ, পুকুর ভরা মাছ, শাক-সবজি এত কিছু গ্রামে আছে, তাহলে মানুষ শুধু শহরে চলে যেতে চায় কেন?’
সুজনের প্রশ্নে ওর মা সুফিয়া বেগম প্রথমে হতচকিত হয়ে গেলেও কয়েক মুহূর্ত পর খুশি হলেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের মুখে এমন কথা শুনলে একটু অবাক হবারই কথা। তবে তিনি খুশি হলেন যে, ছেলের মাথায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা এসেছে। সুফিয়া খাতুন নিজেও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিনিও শিশুদের পড়ান। স্কুলের শিশুদের সঙ্গেই দিনভর সময় কাটান। ফলে শিশুদের মনজগত সম্পর্কে তার কৌতূহল যেমন আছে, ধারণাও আছে। তিনি ছেলের চুলে বিলি কেটে দিয়ে বললেন,
‘শহরেও গাছপালা আছে। তবে গ্রামের মতো এখানে-সেখানে নেই। শহর পরিকল্পিতভাবেই গড়ে তোলা হয়, বাবা। প্রত্যেক শহরে বোটানিক্যাল গার্ডেন থাকে। ঢাকা শহরের মিরপুরে আছে। ওয়ারীতেও বলদা গার্ডেন আছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সব রকম উপাদান রেখেই শহর তৈরি হয়। আর মানুষের প্রয়োজনেই মার্কেট, রাস্তা, উঁচু উঁচু ভবন তৈরি হয়। গ্রামেও মানুষ নিজের প্রয়োজনে পুকুর কাটে, ফসল ফলায় ও রাস্তা বানায়। সবকিছু মানুষ নিজের প্রয়োজনে করে। বড় হতে হতে আরও জানতে পারবে, বাবা।’
‘তাহলে মা শহরের সুবিধা যা গ্রামে চলে আসছে, তা-ও কি মানুষের প্রয়োজনে হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, বাবা। মানুষের প্রয়োজনেই হচ্ছে। তবে মানুষকে লক্ষ্য রাখতে হবে প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যেন প্রকৃতির ক্ষতি না করে।’
‘যেমন?’
‘মানুষ প্রয়োজনে গাছ কাটে; কিন্তু গাছ না লাগালে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ধরো, মানুষ পুকুর ভরাট করে ফেলল। নদীর জলের স্রোতও আটকে দিলÑ এসব আর কী!’
‘ও আচ্ছা।’
ছোট্ট করে বলল সুজন। ওর চিন্তার জট যেন একটু খুলল। নিজের মধ্যে জমাট হয়ে থাকা ধারণাটা জলের স্রোতের মতো গড়াতে শুরু করল। ওর মা বললেন,
‘ওসব চিন্তা আজ কেন করছো? কাল সকালে তোমার নির্বাচন। আমি তো ভাবছিলাম নির্বাচন নিয়ে তুমি বুঝি দুশ্চিন্তা করছিলে?’
‘না, মা। আমি নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তা করছি না। যা হবার হবে কাল। আমি ভাবছি, জয়ী হলে কী করব বা কী করতে পারব।’
ওর মা স্মিত হাসলেন। বললেন,
‘কী করতে চাও?’
মায়ের প্রশ্নের জবাবে সুজন স্বপ্নভরা চোখের দৃষ্টি মেলে ধরে বলল,
‘গ্রামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাতে চাই। আমরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নোংরা আবর্জনা পরিষ্কার করব। গ্রামের লোকদেরও বলব, তারা যেন নিজের বাড়িঘর-উঠোন, পথ পরিষ্কার রাখেন।’
‘বাহ্! বেশ চিন্তা তো!’
ওর মা সুজনের মাথাটা টেনে নিয়ে বুকের কাছে রাখলেন। পরম স্নেহের কণ্ঠে বললেন,
‘সমাজের কল্যাণ করতে না পারলে মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার কোনো স্বার্থকতা নেইÑ কথাটা সব সময় মনে রাখবে, বাবা!’
পাঁচ
মানুষ ভোট দিতে আনন্দ পায় বলে নির্বাচনের দিন উৎসবের আমেজ দেখা যায়। ভোট দিয়ে কী পেল বা কী পেল নাÑ এ নিয়ে মানুষ পরে ভাবে কি? মানুষের ভাবনার অত সময় কোথায়? একেকটি দিন আসে, মানুষ ঐ দিনের মধ্যে নিজের জীবনযাপনকে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সকাল থেকে রাত অবধি মানুষের কাজ, ছুটে চলা আর রাত হলে ঘরে ফেরাÑ এই তো চলছে। গ্রাম কিংবা শহর, সব জনপদে একই রকম দৃশ্য। সব জনপদেই ভোটের দিন ‘ভোট’ দেওয়ার আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। তাই ভোটকেন্দ্রগুলোতে দেখা যায় ভোটারদের ভিড়। আজ এলেঙ্গা ইউনিয়নে ভোটগ্রহণের দিন। বড়দের ভোট নয়, ছোটদের ভোট আজ। প্রার্থীরা যেমন শিশু, ভোটাররাও শিশু। একটি এনজিও কর্মকর্তাদের আয়োজনে এই ভোট উৎসব হচ্ছে। স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা এলেঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে প্রার্থী হয়েছে। তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। আজকে যারা ভোটে নির্বাচিত হবে, তারা শিশু ভোটারদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে। মূলত শিশুদের অধিকার, সমস্যা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে তারা ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে যোগাযোগ রক্ষা করবে। দাবি আদায়ে তারা নেতৃত্ব দেবে। এই চেতনা ও আদর্শের রূপরেখায় উজ্জীবিতরা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সুজন, পরাগ ও বিল্টু। ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গেল সকাল আটটায়। ভোট শুরু হবার পর থেকেই ভোটারদের ভিড় বাড়তে লাগল ভোটকেন্দ্রে। এলেঙ্গা ইউনিয়নের তিনটি স্কুলে ভোটগ্রহণ চলছে। ‘এসো শিখি’ ক্লাবের সদস্যরা সকাল আটটা থেকে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে তিনটি কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। সুজন সকালবেলায় ওর ভোটটি দিল এলেঙ্গা হাইস্কুল কেন্দ্রে। এরপর ও দাঁড়াল ভোটকেন্দ্রের প্রবেশমুখে। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ওর লক্ষ্য।
আজ শিক্ষার্থীদের নির্বাচন নিয়ে ঘরে ঘরে আলোচনা চলছে। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা আজ কেউ পড়তে বসেনি। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অভিভাবকরাও আসছেন ভোটকেন্দ্রে। তারাও ভোট দেওয়ার আনন্দ উপভোগ করছেন যেন। সুজন লক্ষ্য করল, সকাল নয়টার মধ্যে এলেঙ্গা হাইস্কুলের সামনে ভোটারদের লম্বা লাইন এবং আশপাশে অভিভাবকদেরও উপস্থিতি বাড়ছে। ওর ভালো লাগছে এই দৃশ্য দেখে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ভোটকেন্দ্রের বাইরে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়েছে। জীবনের প্রথম ভোট দেবার অন্যরকম আনন্দ ওদের চোখেমুখে। ওদের ভোটেই আজ নির্বাচিত হবে এলেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের শিশু চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। ভোটকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় একটা উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। সুজন জানে নির্বাচনে জয়লাভ করাই শেষ কথা নয়। জয়ী হওয়া মানে দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া। আবার পরাজয় হলেই সব আশা ফুরিয়ে যাওয়া নয়। পরাজিত হলে সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে, নির্ণয় করতে হবে ব্যর্থতার কারণ। সুজনের মনে আত্মবিশ^াস আছে, স্কুলের শিক্ষার্থীরা নেতা নির্বাচিত করতে ভুল করবে না। কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের দিকে তাকিয়ে সুজন ভোট চাইছিল। বাইনাবাড়ির রমজান আলী হেঁটে যাচ্ছিলেন, তিনি সুজনকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন,
‘বাবা, সুজন। দোয়া করছি, তোমার জয় হোক।’
সুজনকে অনেক বয়স্ক মানুষ খুব পছন্দ করেন। ও যখন বাড়ি থেকে স্কুলে যায়, তখন রাস্তায় বয়স্ক বা মধ্যবয়স্ক মানুষ ওকে ডেকে বলবে,
‘ভালো আছো, বাবা?’
‘ভালো আছি। আপনার শরীর ভালো আছে?’
সুজন সাধারণত তাদেরও কুশল জিজ্ঞেস করে। পথে যেতে যেতে অনেকের স্নেহ-ভালোবাসা পায় ও। বিশেষ করে ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে এলাকার মানুষদের এই স্নেহ-ভালোবাসাটা আরও বেড়ে গেছে। ‘নবীন যদি শহরে বাস না করে এই গ্রামে থাকত, তাহলে যে কী হতো!’ কথাটা প্রায়ই ভাবে সুজন। এক মাস হয়ে গেল নবীন চলে গেছে ঢাকা শহরে। ওর জন্য সুজনের মনটা খুব টানে। ভাবনায় তন্ময় হয়ে পড়েছিল সুজন। বৃৃদ্ধ রমজান আলী ফের বলল,
‘বাবা, পাস করলি কিন্তুক আমাকে একখানা টিউবওয়েল দিত অইবো! চেয়ারম্যান হইলে তুমি দিতে পারবা না?’
এ কথায় হেসে ফেলল সুজন। রমজান আলী জানেন না, ওরা হবে প্রতীকী চেয়ারম্যান ও মেম্বার। ছোট ছোট শিশুর প্রতিনিধিত্বকারী জনপ্রতিনিধি মাত্র। ওদের তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। টিউবওয়েল কেন, এক জোড়া কাঁচি দেওয়ার ক্ষমতাও ওদের নেই। তবে ওরা চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে এলাকাবাসীর সমস্যার কথা তুলে ধরতে পারবে। নানা সমস্যার কথা বলে তা সমাধানের দাবিও জানাতে পারবে। সুজন রমজান আলীর একটি হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল,
‘চাচা, আমরা তো আপনার সমস্যার কথা, আপনাদের দাবির কথা গিয়ে বলতে পারব চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে। আমরা নিজেরা কিছু এনে দিতে পারব না। নির্বাচিত হলে আমরা শুধু এমনি-এমনি চেয়ারম্যান আর মেম্বার! বুঝলেন?’
‘ও, বুঝছি! তোমরা হচ্ছো দুধভাত!’
বলে তিনি রসিকতার কণ্ঠে হাসলেন। সুজনও হাসলো রমজান আলীর রসিকথার সমর্থনে। ও তাকে একটু পথ এগিয়ে দিয়ে ফের এসে দাঁড়াল ভোটকেন্দ্রের গেটে। তিনটি বিদ্যালয়ের মধ্যে এলেঙ্গা হাইস্কুলের শিক্ষার্থী অর্থাৎ ভোটারদের প্রতি ওর আস্থা বেশি। এই ভোটকেন্দ্রে ভোটার বেশি। তাই সুজন এখানে বেশি সময় থাকতে চায়। সুজন মনে করে নিজের ঘর সামলানোও বড় কাজ। ও এই ভোটকেন্দ্রের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। সকালের নরম রোদ তেতে দুপুরের আঁচলে ছড়িয়ে পড়ল বেশ। দুপুরবেলা সুজনের কাছে খবর এলো, বাঁশি গ্রাম থেকে এলেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে আসার পথে বিল্টুর সঙ্গে পরাগের খুব মারামারি হয়ে গেছে। আশিক ওর কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
‘আমি নিজের চোখে দেখে এলাম বিল্টু আর পরাগের মারামারি!’
‘তা কী দেখেছিস? বর্ণনা কর, শুনি।’
সুজনের কথায় আশিক বড় একটা শ^াস ছেড়ে বলল,
‘বাঁশি গ্রাম থেকে ওরা একসঙ্গে এদিকেই আসছিল। আমি ছিলাম ওদের পেছনে। হঠাৎ কী হলো, রাস্তার ওপর বিল্টু আর পরাগ দাঁড়িয়ে গেল। ওদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। তুই তো জানিস, গায়ের জোরে পরাগের সাথে বিল্টুর পাবার কথা নয়।’
এ পর্যন্ত বলে থামল আশিক। সুজন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলল,
‘জানি। এরপর কী হলো, বল!’
‘পরাগ বিল্টুকে জাপটে ধরে খানিকটা তুলে ছুড়ে মারতে চেষ্টা করছিল। বিল্টু পরাগের আক্রমণকে প্রতিহত করছিল প্রাণপণ। কিন্তু পারছিল না। একটা সময় বিল্টুকে মাটিতে আছড়ে ফেলল পরাগ!’
‘ইশ, এটা ঠিক হয়নি! মারামারি করলে আমাদের বদনাম হবে!’
বলল সুজন। আশিক বলল,
‘আমাদের কী তাতে? ওরা মারামারি করলে তো আমাদের লাভ! ওদের ভোট দেবে না ভোটাররা।’
সুজন দেখল পরাগ ও বিল্টু এদিকে আসছে। বিল্টুর গায়ে ধুলো-ময়লা মাখামাখি। পরাগের চোখেমুখে ক্রোধ। সুজন ডাকল,
‘পরাগ এদিকে আসো। বিল্টু তুমিও আসো।’
বিল্টু সুজনের সামনে এসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
‘পরাগ আমাকে মেরেছে! দেখো, আমার কী হাল করেছে ও!’
পরাগও দাঁড়িয়েছে সুজনের সামনে। আশিক উদ্বিগ্ন চোখে ওদের দেখছে। ভোটারদের লাইন ছোট হয়ে গেছে। ভিড় নেই। সুজন চারপাশে তাকিয়ে পরাগের হাত ধরে বলল,
‘মারামারি করলে কেন, পরাগ? তুমি যদি এভাবে জিততে চাও, বলো, আমি সরে দাঁড়াচ্ছি নির্বাচন থেকে। মারামারি করে জিতে কী হবে? বলো!’
পরাগ কাতরকণ্ঠে বলল,
‘তুমি তো জানো, বিল্টু সব সময় কী করে বেড়ায়! স্কুলেও ও আমাকে কি করেছে, শুনলে তুমিও…!’
এ পর্যন্ত এলে পরাগ বলল,
‘আমি জানি! বিল্টুর ওটা করা ঠিক হয়নি। আবার নির্বাচনে আমরা তিনজনই চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছি। এখন আমরা যদি রাস্তায় মারামারি করি, মানুষ আমাদের কী ভাববে, বলো?’
সুজনের এ-কথার জবাবে পরাগ বলল,
‘এভাবে বলো না, সুজন। আমারও ইচ্ছে নেই, নির্বাচন করার। ইচ্ছেটা মরে গেছে কিছুক্ষণ আগে। বিল্টু আমাকে যে গাল দিয়েছে, ওটা শুনলে তোমার চেয়ারম্যান হতেও আর ইচ্ছে করবে না। আমি চাই না এমন বন্ধুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচন করতে!’
বলেই দুচোখের জল ছেড়ে দিল পরাগ। সুজন বুঝতে পারছে বিল্টুর গালি সহ্য করতে পারেনি পরাগ। বিল্টুকে হয়তো এ জন্য মেরেছে পরাগ। সেটাও পরাগ ঠিক কাজ করেনি। ও বিল্টুর দিকে চেয়ে বলল,
‘বিল্টু, তুমি কি পরাগের কাছে ক্ষমা চাইতে পারবে?’
বিল্টু অবাক চোখ তুলে বলল,
‘বাহ! ও আমাকে মারল আর আমাকে বলছো ক্ষমা চাইতে?’
‘বিল্টু, তুমি স্কুলে যা করেছ, সেটা কিন্তু ভীষণ খারাপ কাজ করেছ! আজ আবার ওকে গালি দিয়েছ। এখন ওর কাছে ক্ষমা চাইলে তুমি ছোট হয়ে যাবে না, বিল্টু!’
বিল্টু ইতস্তত করে পরাগের কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
‘আমাকে ক্ষমা করো, পরাগ। আর আমি এমন গালি কাউকেই দেব না। কথা দিচ্ছি।’
পরাগ হঠাৎ দু-হাতে বিল্টুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদো গলায় বলল,
‘আমাকেও ক্ষমা করো, বিল্টু। আমাকে ক্ষমা করো! তোমার গায়ে হাত তোলা আমারও ঠিক হয়নি।’
ওদের জড়িয়ে ধরল সুজনও। আবেগভরা কণ্ঠে সুজন বলল,
‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাক। আমরা কিন্তু একই ক্লাসে পড়ি। আমরা সমবয়সী আর একটি ফুটবল দলে খেলি। আমাদের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি কেন হবে?’
ওদের কান্নাকাটি থেমে গেল, যেমন হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া উঠে হঠাৎই থেমে যায়। তিন বন্ধু, তিন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এলেঙ্গা হাইস্কুল ভোটকেন্দ্রের সামনে গলাগলি করে ভোটগ্রহণের শেষ সময় অবধি দাঁড়িয়ে রইল। ওরা ভোটারদের দেখে নিজের জন্য কেউ কারও কাছে ভোট চায়নি। বিকেল অবধি ভোটাররা তাদের গল্প করতে আর থেমে থেমে হাসতে দেখল শুধু। রাতে ফলাফল ঘোষণা হলে জানা গেল সুজন বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। পরাগ ও বিল্টুর একটুও মন খারাপ হলো না এই সংবাদ শুনে। ওরা সুজনকে কাঁধে তুলে নাচলো কিছুক্ষণ। নাচলো অন্য বন্ধুরাও।
ছয়
চেয়ারম্যান হলে সালাম-শুভেচ্ছা ও সম্মান বেড়ে যায় ঠিকই, হুজ্জতও কম নয়। এলেঙ্গা ইউনিয়নে ছোটদের চেয়ারম্যান হিসেবে ভোটে নির্বাচিত হবার পর এ উপলব্ধি হয়েছে সুজনের। শিশুদের ভোটে চেয়ারম্যান হবার ঘটনা এই এলাকায় প্রথম, সম্ভবত অন্য কোনো এলাকায়ও এমন নজির সৃষ্টি হয়নি। নির্বাচনের মাধ্যমে সুজন চেয়ারম্যান হয়েছে এবং আরও তিনজন মেম্বার নির্বাচিত হয়েছে। ওরা চারজন এখন শিশুদের অর্থাৎ এই ইউনিয়নের স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের জনপ্রতিনিধি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ওদের কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা তুলে ধরতে হবে জনপ্রতিনিধিদের কাছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গ্রামের নানা ঘটনায় ওর কাছে চলে আসছে লোকজন। তাদের অনেকে বোঝেন না যে, ও সত্যিকারের চেয়ারম্যান নয়। ও হচ্ছে প্রতীকী চেয়ারম্যান। ওর কথায় প্রশাসনেও কিছু হবে না। এই যেমন কাল বিকেলে খেলার মাঠে চলে এলেন পাইকান্দি গ্রামের কৃষক ছানাউল্লাহ মিয়া। তার গরুটা দুদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছেন না। তার ছেলে শাহীন গরুকে ঘাস খাওয়াতে গিয়ে গিয়েছিল লৌহজং নদীর পাড়ে। শাহীন সব সময় গরুকে ছেড়ে দিয়ে খেলা করে। সেদিনও খেলতে খেলতে কাশবনে ঢুকে গাংচিলের ডিম খুঁজছিল। কাশবন থেকে ফিরে এসে দেখে গরু নেই। এদিক-ওদিক খুঁজে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিলেছিল শাহীন। গত দুদিন ছানাউল্লাহ মিয়া এখানে-ওখানে খুঁজেছেন; কিন্তু কেউ গরুর হদিস দিতে পারেনি। উপায় না পেয়ে বুকভরা আশা নিয়ে তিনি সুজনের সঙ্গে এসে দেখা করলেন। খেলা থামিয়ে সুজনকে কথা বলতে হলো তার সঙ্গে। ছানাউল্লাহ মিয়া বললেন,
‘চেয়ারম্যান সাব। আমার সব্বনাশ হইয়া গেছে! আমার গরুটা পাইতেছি না! আপনি এর একটা বিহিত করেন।’
বলে তিনি কেমন ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন সুজনের দিকে। একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ সুজনকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলছেন। আবার ‘চেয়ারম্যান সাব’ বলে সম্মান দেখাচ্ছেন। ওর ভীষণ লজ্জা লাগছিল। কষ্ট হচ্ছিল গরু হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে। এ-ধরনের সমস্যায় ও কী করতে পারে? কিছুই করতে পারবে না, অথচ ছানাউল্লাহ মিয়া বড় আশা নিয়ে ওর কাছে এসেছেন। কী বিব্রতকর অবস্থা! সুজন বলল,
‘চাচা, আমি তো এর কিছু করতে পারব না। তবে দেখি, কাল সকালে আমি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে কথা বলব। গ্রামের কেউ নিশ্চয়ই গরুটা চুরি করে নিয়ে গেছে। আমি চেয়ারম্যানকে জানাব। তিনি যেন থানা পুলিশের কাছে এ-ব্যাপারে নালিশ করেন এবং গরুটা উদ্ধার করা যায় কি না, সেই ব্যবস্থা নেন।’
‘ওরে বাবা, আপনারে আমি অনেক দোয়া করতাছি! আপনি এই গরিবের গরুটা ফিরাইয়া আইন্যা দেন!’
ছানাউল্লাহ মিয়া সুজনের হাত ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। ওর মন খারাপ হয়ে যায়। ও আশ^াস দিয়ে ছানাউল্লাহ মিয়াকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল।
পরশুদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে মেহেরের মা আছিয়াবিবি ওর পথ আটকে দাঁড়ালেন। রাস্তার পাড়ে নিচু জমি থেকে শাক তুলে রাস্তায় উঠতেই তিনি সুজনকে পেলেন সামনে। ওকে দেখে তিনি বললেন,
‘এই যে সুজন। তুই যে চেয়ারম্যান হলি, তো আমাদের কী কম্মে লাগছে রে?’
আছিয়াবিবিকে এলাকার লোকেরা ‘ঝগড়াটে’ বলে আড়ালে নানা কথা বলে। কিন্তু সুজনকে দেখলে আছিয়াবিবি কখনও ঝগড়াটে গলায় ওকে কিছু বলেননি। বরং ওকে যেন একটু স্নেহই করেন। সুজন মুখে হাসি ছড়িয়ে বলে,
‘খালা, কী কাজে লাগব, বলুন তো! আপনি কী আশা করছেন?’
‘আরে তুই যে চেয়ারম্যান হলি, তো আমার ঘরের টিনের চাল দিয়া যে পানি পড়ে, সেটা বন্ধ করবি না? বৃষ্টি আইলেই ঘর ভাইস্যা যায়! তুই হইলি চেয়ারম্যান। আমাগো পোলা! অহন আমার ঘরটা ঠিক কইরা দিবি না?’
সুজন কীভাবে এই সহজ-সরল মানুষগুলোকে বোঝাবে যে, ওর এই ক্ষমতা নেই। ও কিছুই বদলাতে পারবে না। শুধু সচেতন করতে পারবে। এলাকার সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারবে। সুজন আছিয়াবিবিকে বলেছিল,
‘খালা, আরেকটু বড় হয়ে নিই। আমি আপনার ঘর ঠিক করে দেব। যখন চাকরি করব, ঘর ভেঙে দালান বানিয়ে দেব।’
ওর কথা শুনে আছিয়াবিবির চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা যায়। আছিয়াবিবি কত সহজভাবে ওর কথা বিশ^াস করে আনন্দ পায়। সুজনের উদ্দেশে বিড়বিড় করে দোয়া করতে থাকেন তিনি। সুজন হাসতে হাসতে বাসায় ফিরেছিল। এই তো মাত্র কয়েকদিন হলো ও চেয়ারম্যান হয়েছে, এর মধ্যে নানা ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আজ ওর বাসায় এসে হাজির প্রতিবেশী শায়লা, নাজু আর চৈতী। ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জোটবদ্ধ হয়েছে ওর ছোট বোন তিতলিও। আজ শুক্রবার। নাস্তা খেয়ে সুজন ভাবছিল বাইরে বের হবে, এমন সময় তিতলি এসে বলল,
‘ভাইয়া, তুমি এখন বের হতে পারবে না। তোমার সঙ্গে আমাদের মিটিং আছে।’
ছোট বোনের কথা শুনে অবাক সুজন। ও বলল,
‘কীসের মিটিং তোর আবার? আমাদের মানে কী? আমরা কারা?’
‘শায়লা আপু, চৈতী আপু আর নাজু এসেছে।’
‘তো, আমার সঙ্গে ওদের আবার কীসের মিটিং?’
বিস্ময় প্রকাশ করে সুজন! তিতলি মুখে হাসির বিজলি চমকিয়ে বলল,
‘ভাইয়া, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে আমাদের। তোমরা শুধু ছেলেদের নিয়ে থাকলে হবে। মেয়েদের কথা ভাবতে হবে না?’
সুজন বুঝতে পারল শায়লা, চৈতী ও নাজু ওর কাছে কিছু বলতে এসেছে। শায়লা ওদের বাড়ির পাশে থাকে। শফিক চাচার মেয়ে। ওর বাবার চাচাতো ভাই হচ্ছেন শফিক চাচা। শায়লারা ওদের নিকট আত্মীয়। ওর বাবা দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকেন। সেখানে দোকান খুলে ব্যবসা করছেন। শায়লার ছোট এক ভাই আছে, ওর নাম কিশোর। শায়লাও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে ওর স্কুলে আর কিশোর পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। চৈতী ও নাজু পাশের বাঁশি গ্রামে থাকে। চৈতী সপ্তম শ্রেণিতে এবং নাজু ওর বোন তিতলির সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ওরা কী কথা বলতে চায় ওর সঙ্গেÑ এক ঝলক ভেবে নিল সুজন। ও তিতলিকে বলল,
‘ওরা কোথায়? আমার ঘরে নিয়ে আয়?’
‘না, মা ওদের আমাদের বাগানে বসতে দিয়েছে। মা ওদের তেলে ভাজা পিঠা খেতে দিয়েছে। তুমি চলো।’
সুজন তিতলির সঙ্গে ঘর থেকে বের হলো। ওদের বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। ফুলবাগানে চেয়ারে বসে আছে শায়লা, চৈতী ও নাজু। টেবিলের ওপর পিঠার পাত্র। পিঠা খেয়ে শেষ করে ফেলেছে ওরা। সুজনকে দেখে শায়লা, চৈতী ও নাজু তিনজনেই ওঠে দাঁড়াল। ওদের মুখে হাসির বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল। সুজন একটি চেয়ারে বসল। ওরাও বসল। সুজনের পাশে বসল তিতলি। সুজন শায়লার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কী ব্যাপার, শায়লা? তোমরা না-কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও?’
জবাব দিল চৈতী। ও বলল,
‘হ্যাঁ। আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।’
‘বলে ফেলো। কী কথা?’
শায়লা বলল,
‘আমাদের কিছু ইচ্ছার কথা তোমাকে জানাতে চাই। তুমি এ-কথা শুনে আশা করি উদ্যোগ নেব। তুমি হচ্ছো আমাদের চেয়ারম্যান!’
‘আচ্ছা, বলে ফেলো। সময় নষ্ট না করে কী বলতে চাও, বলে ফেলো। তাড়াতাড়ি বলো।’
শায়লা ওর চোখের দৃষ্টিতে কপট রাগের ঝিলিক ফুটিয়ে বলল,
‘অত তাড়াহুড়ো করবে না তো! তুমি কি জানো, আমরা মেয়েরা সবাই তোমাকে ভোট দিয়েছি?’
সুজন হেসে বলল,
‘আচ্ছা। সেটা মানলাম। এখন কী বলবে বলো।’
শায়লাকে সুজনের মা একটু বেশি মায়া করেন। তিতলির সঙ্গে নাজুর খুব ভাব। আর চৈতী হচ্ছে ওর বন্ধু বিজুর ফুপাতো বোন। সুজন ওকে খুব স্নেহ করে। এই তিন মেয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে প্রস্তুত সুজন। শায়লা সুজনকে বলল,
‘তোমরা শুধু ফুটবল খেলো। আমরা মেয়েরাও ফুটবল খেলতে চাই। তোমাকে এ-ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। এমনকি ক্রিকেটও খেলতে চাই। আজকাল দেখছি, বিভিন্ন দেশে মেয়েরা ফুটবল এবং ক্রিকেট খেলছে।’
কথা নয়, যেন বাজ পড়ল সুজনের মাথায়। কী বলছে শায়লা? এই গ্রামে মেয়েরা ফুটবল খেলবে? ওরা ক্রিকেট খেলবে? আর এই উদ্যোগ ওকে নিতে হবে? প্রশ্নগুলো ঘূর্ণিঝড়ের মতো ওকে উড়িয়ে নিল যেন। তিতলি ফিক করে হাসলো, যেন ওর ভাই জব্দ হয়েছে বলে খুব আনন্দ পাচ্ছে ও। সুজন আমতা-আমতা করে বলল,
‘ঠিক আছে, আমি হামিদ স্যার এবং স্কুল কমিটির সঙ্গে কথা বলব। এরপর জমির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা বলব। প্রয়োজনে অভিভাবকদের নিয়ে মিটিং করব। সবার সম্মতি পেলেই তো গ্রামের মেয়েরা ফুটবল খেলতে পারবে। নইলে কি আর পারবে?’
‘এ-জন্যই তো তোমার কাছে এসেছি, সুজন ভাই।’
বলল চৈতী। শায়লা বলল,
‘আমাদের আরও দাবি আছে। অন্যদিন বলব। তবে স্কুলে মেয়েদের টয়লেট নোংরা থাকে। তা সব সময় পরিষ্কার রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলের বাইরে মাঝে মাঝে কিছু ছেলে মেয়েদের উদ্দেশে টিপ্পনী কাটে। ওসব বন্ধ করতে হবে।’
তিতলি বলল,
‘ভাইয়া, মনে রেখো, আমাদের দাবি মানতে হবে!’
সুজন অসহায় চোখে তাকালো তিতলির দিকে। শায়লা মুখ টিপে হাসলো। চৈতী ও নাজু নিজেদের মধ্যে চোখের দৃষ্টিবিনিময় করে নিল। ওদের দৃষ্টি ভাষায় ছিলÑ ‘সুজন ভাই, ওদের দাবি পূরণ করবে।’
সুজন শায়লার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তোমাদের কথা শুনলাম। আমি এ-বিষয়ে কী করতে পারি, দেখি। তবে তোমাদেরও আমার সঙ্গে একটা কাজ করতে হবে।’
‘কী কাজ?’
জানতে চাইল শায়লা। সুজন বলল,
‘আমরা খুব শিগগির এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন অভিযানে নামব। তোমরা আমাদের সঙ্গে এ-কাজে হাত লাগাবে। মেয়ে বলে ঘরে বসে থাকতে পারবে না।’
‘অবশ্যই করব।’
জোর দিয়ে কথাটা বলল শায়লা। সুজন খুশি হলো এবং ও মনে মনে বলল,
‘দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ!’
সাত
জীবনচক্র নিয়ে পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে; কিন্তু জীবন বিপন্ন নিয়ে তেমন কিছু লেখা পড়েনি সুজন। জীবন কেন বিপন্ন হয়, বিপন্ন হয়ে গেলে কীভাবে এ থেকে উত্তরণ পাওয়া যায় বা বিপন্নতাকে হারিয়ে কীভাবে জীবন জাগানিয়া গানে জেগে ওঠা যায়, তা যদি ও জানত, তাহলে ভালো হতো। নবীনের অসুস্থতার কথা শোনার পর থেকে এ-কথাটি ওর মনে বারবার জেগে উঠছিল। নীরবের কাছ থেকেই একটা দুঃসংবাদ জানতে পারে সুজন, হামিদ স্যার এবং পরে এলেঙ্গা কিশোর সংঘের সব খেলোয়াড়। নীরবের কাছ থেকে ওরা জানতে পারে নবীনের শরীরে জটিল এক রোগ শনাক্ত করেছেন চিকিৎসকরা। ঘন ঘন জ¦র হচ্ছিল নবীনের। শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে দেখা দেয় রক্তশূন্যতা। হাসপাতালে নানারকম প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর চিকিৎসকরা নবীনের বাবা-মাকে জানিয়েছেন ওর শরীরের শেত রক্তকণিকা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি এক ধরনের ক্যানসার রোগ। নবীনকে একদফা রক্ত দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দু-মাস পরপর এখন ওকে রক্ত দিতে হবে। ধীরে ধীরে তা এক মাস পর বা আরও কম সময়ের মধ্যে রক্ত দিতে হবে। রোগের প্রকোপ বাড়লে রক্ত দেওয়াও বাড়াতে হবে। রোগটি জীবননাশক হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তা শনাক্ত হয়েছে বলে চিকিৎসদের অভিমত। নবীনকে সর্বোত্তম চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে ওর বাবা-মা খুব শিগগির সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাবেন, এ-কথা চোখের জল মুছতে মুছতে জানিয়েছিল নীরব। সেদিন নীরবের কাছ থেকে এই দুঃসংবাদ শুনে কারও চোখে জল, কারও মনে-অনুভবে জলেরও যেন রোদন উঠেছিল। হামিদ স্যার তো অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসেছিলেন। তিনি যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। সুজনেরও একই অবস্থা ছিল। ও নিজের চোখের জল সামলে রেখেছিল, তবে বুকের ভেতরে কান্নার রোল হু হু করে বইছিল। এলেঙ্গা কিশোর একাদশের খেলোয়াড়দের নিয়ে পদ্মাসেতু এলাকা ভ্রমণের প্রস্তুতি সভা চলছিল সেদিন। এ সভায় নীরব এসে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেওয়া বেদনার সংবাদ জানিয়েছিল। সভার কাজ আর সেদিন এগোয়নি। সুজন প্রস্তাব করেছিল পদ্মাসেতু এলাকা ভ্রমণ নয়, এলেঙ্গা কিশোর সংঘের খেলোয়াড়রা নবীনকে দেখতে যাবে ঢাকা শহরে। সুজনের প্রস্তাব সভায় পাস হয়ে গিয়েছিল অনায়াসে। আজ হামিদ স্যারের সঙ্গে এলেঙ্গা কিশোর সংঘের সব খেলোয়াড় একটি বাসে চড়ে চলে এসেছে ধানমন্ডিতে। বাসে চড়ে শহরে ওরা যখন পথ পেরুচ্ছিল, সুজনের মনে হচ্ছিল সারিসারি আট্টালিকার কারণে রোদের হামলে পড়ার সুযোগ নেই। এখানে-সেখানে চিলতে রোদের ছড়িয়ে থাকা। ফাঁকা স্থানে রোদের অহম শুধু। শহরের বাতাস কেমন সতেজ নয় যেন। ও পড়েছেÑ ঢাকা শহরের বাতাসে সীসার পরিমাণ বেশি। গ্রামের হাওয়া যেমন ফুরফুরে, তেমনি ফুল বা গাছ-গাছালির সুরভি মিশে থাকে যেন। শহুরে হাওয়ায় মাদকতা কোথায়Ñ ভাবছিল সুজন।
সুজনরা এখন বসে আছে নবীনদের বাড়ির বিশাল ড্রইংরুমে। বড় আকারের ড্রইংরুমের চারপাশে চার সেট সোফা। এছাড়াও চেয়ার আছে আটটি। হামিদ স্যারসহ খেলোয়াড়দের মধ্যে ওরা বারোজন এসেছে। নবীনদের ড্রইংরুমে ওদের বসতে কোনো অসুবিধা হলো না। হামিদ স্যারকে নবীনের বাবা ডেকে নিয়ে অন্য একটি রুমে চলে গেলেন। নীরব বাড়ির অন্দরমহলে চলে গিয়েছিল। একটু পরেই ও ফিরে এসে সুজনকে বলল,
‘সুজন, তোকে ডাকছে। আয়।’
‘কে ডাকছে?’
‘নবীন। তোর সঙ্গে একা ও কথা বলতে চায়। পরে এখানে এসে সবার সঙ্গে ও দেখা করবে। চল।’
‘ও আচ্ছা!’
সুজনের বুকের ভেতরটা খাঁখাঁ করে উঠল। ও নবীনের মুখোমুখি হবে। ওর মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলÑ ‘মানুষকে কেন এমন বিপন্নতায় পড়তে হয়?’ নীরবকে অনুসরণ করে একটি নীলাভ রঙের একটি কক্ষে প্রবেশ করল সুজন। দেখতে পেল একটি নীল চাদর বিছানো শয্যায় নবীন শুয়ে আছে। ওর মুখে নির্মল হাসিটা ফুটে আছে। সুজনকে দেখে ওর চোখের মণি উজ্জ্বল হলো। সুজন হাসতে পারল না। ওর মুখে বিষণ্নতার গভীর ছাপ। নীরব সুজনকে বলল,
‘তোরা কথা বল। আমি আসছি।’
কথাটা বলে নীরব কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। সুজনের মনে হলো নীল কষ্টরা এই কক্ষে পেখম ছড়িয়ে আছে। ওরা দেয়ালে বা বিছানায় আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে নবীনকে যেন বলছেÑ ‘তোমার জীবন মেলে ধরো। তুমি নীল কষ্টের প্রতিবিম্ব!’ নবীনের কণ্ঠ শুনে সম্বিত ফিলে পেল সুজন।
‘আরে, তুমি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? সামনে এসে চেয়ারটায় বসো!’
সুজন ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে নবীনের মাথার নামনে রাখা চেয়ারটায় বসল। নবীন হাসলো। ফুটফুটে এক শিশু যেন হাসছে! সুজন বুকের ভেতরের উথলে ওঠা কান্না সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। নবীন বিছানা থেকে উঠে বসল। সুজনের মুখোমুখি হয়ে হাসিমুখে বলল,
‘তোমার কী মনে হয় আমি খুব অসুস্থ? শুয়ে ছিলাম বলে তাই মনে হচ্ছে?’
সুজন বলল,
‘তোমাকে সুস্থ হতে হবে। শুধু এটুকু বুঝি!’
‘শোন, আমার কিছু হবে না। এই তো কাল চলে যাচ্ছি সিঙ্গাপুরে। ওখানকার মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের চিকিৎসা হচ্ছে সর্বোত্তম। বিশে^র কয়েকটি সেরা হাসপাতালের মধ্যে ওটি একটি, জানো তো?’
‘শুনেছি। হামিদ স্যার পথে এ-কথা বলছিলেন।’
‘হ্যাঁ’, অবশ্য অনেক ব্যয়বহুল! যাই হোক, আর আমার অসুখটা প্রাইমারি স্টেজে ধরা পড়েছে। বাবা বলেছেন, চিকিৎসা করলে আমি ভালো হয়ে যাব।’
‘আমরাও সেটা চাই, নবীন! তোমার এই অসুখের কথা শোনার পর থেকে আমরা কী যে কষ্ট বুকে চেপে আছি!’
সুজনের কণ্ঠে বিষণ্নতা। নবীন বলল,
‘আমি জানি। আমি বুঝতে পারি। তোমরা আমাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছ।’
‘তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু করার মতো বিকল্প কি আছে? বলো, আছে?’
বলল সুজন। এ-কথায় ‘হা হা হা’ গলা ছেড়ে হাসলো নবীন। ওর এমন হাসিরও এক ধরনের সৌন্দর্য উপভোগ করল সুজন। ‘এমন একটি ছেলের কি না দুরারোগ্য ক্যানসার হবে?’ প্রশ্নটা সুজনের মনের মধ্যে শীতল ক্রোধ সৃষ্টি করে দেয়। হাসি থামার পর নবীন বলল,
‘তোমাকে একা ডেকে এনেছি কেন, জানো?’
‘না, বলো।’
‘তুমি আমার অধিনায়ক, তাই।’
‘কী যে বলো! সেদিন তুমিই ছিলে আমাদের অধিনায়ক, সর্বশ্রেষ্ঠ স্ট্রাইকার। আমাদের ম্যারাডোনা!’
ফের হাসলো নবীন। ও খুব হাসছে দেখে মনটা একটু ভালোও লাগছে সুজনের। নবীন ওর বিছানায় রাখা একটা জার্সি বের করে সুজনের হাতে দিল। সুজন বলল,
‘এটা কী?’
‘এটা হচ্ছে আমার ১০ নম্বর জার্সি। আজ থেকে এটা তোমার।’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে, আমার ১০ নম্বর জার্সির প্রতি ভীষণ অনুরাগ ছিল, এখনও আছে। আমি ১০ নম্বর জার্সি ছাড়া খেলি না। তাই সেদিনের ফাইনালে আমার একটাই শর্ত ছিলÑ ১০ নম্বর জার্র্সি দিতে হবে। আমি জানতাম, ওটা তোমারও পছন্দ ছিল।’
‘তো কী হয়েছে? আমি তো মনে কিছু করিনি!’
‘সেটা তোমার উদারতা ছিল। তোমার কাছ থেকে সেদিন আমিও শিখেছি।’
‘কী বলছো, নবীন!’
‘হ্যাঁ, বন্ধু। শিখেছি জিততে হলে ত্যাগ করতে শিখতে হবে আগে। তুমি ত্যাগ স্বীকার করেছিলে বলে আমরা জিতেছিলাম সেদিন।’
‘আমাকে কাঁদাতে চাও বুঝি?’
‘না, কাঁদবে কেন? তুমি তো অধিনায়ক! তুমি সাহস দেবে, পথ দেখাবে।’
‘নবীন!’
সুজনের কণ্ঠ ভারী শোনা যায়। নবীন বলল,
‘১০ নম্বর জার্সিটা তোমার কাছে রইল। নিজের গ্রামে তুমি এই ১০ নম্বর জার্সির দায়িত্ব পালন করো। যদি বেঁচে থাকি, দেখা হবে আমাদের। নইলে অন্তত এটা ভেবে ভালো লাগবে যে, আমার ১০ নম্বর জার্সিটা যোগ্য স্ট্রাইকারের কাছেই আছে। সে শুধু গোল দেবে!’
সুজন কান্না আর ধরে রাখতে পারল না। ওর গাল বেয়ে চোখের জলের দুটি ধারা নেমে এলো। নবীন ভীষণ অবাক চোখে বলল,
‘একি তুমি কাঁদছো! ১০ নম্বর জার্সিধারী কেউ বুঝি কাঁদে! আশ্চার্য!’
নবীনের মুখে দেবদূতের হাসি। আর সুজনের চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। চোখের জলের ভাষা অনেক গভীর আর ভালোবাসা প্রকাশে ভীষণ অপার্থিব!
[টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ইউনিয়নে ১৯৯৯ সালের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় ‘শিশু ইউনিয়ন পরিষদ’ নির্বাচন। সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনা অবলম্বনে এই উপন্যাস।]