ধূসর প্রচ্ছদ

ধূসর প্রচ্ছদ

 Author: দর্পণ কবীর  Category: উপন্যাস  Published: August 13, 2020 More Details
 Description:

এক.
দরোজা খুুলে জয়া ভীষণ অবাক হলো। ঈদের দিন সকালে অচেনা এক যুবক ওদের দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে। যুবকটির বয়স ছাব্বিস-সাতাশ বছর হবে। খুব লম্বাও নয়, আবার বেঁটেও নয়। পাঁচ ফুট পাঁচ বা ছয় ইঞ্চি হবে। গায়ের রঙ শ্যামলা। পড়নে কালো প্যান্ট ও সবুজ রঙের নকশা করা পাঞ্জাবী। পায়ে নাগড়া স্যান্ডেল। মাথার চুল এলোমেলো, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। যুবকটির চোখ দুটি মায়াবী। মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা। ফলে হাসিতে প্রাণ নেই। কৃত্রিম হাসি। এক ঝলক তাকালেই বোঝা যায় যুবকটি অলস ও ভবঘুরে ধরনের। এই যুবক ঈদের দিন ওদের বাসায় কেন এসেছে-বুঝতে পারলো না জয়া। ভুল করে হয়তো ওদের ফ্লাটে এসেছে। পাশের ফ্ল্যাটের অতিথি হয়তো সে। জয়া যুবকটির মুখের দিকে চেয়ে জানতে চাইলো,
‘আপনি কাকে চাচ্ছেন?’
‘আপনি জয়া, তাইনা?’
যুবকের প্রশ্নে হচকিয়ে গেল জয়া। একটা ধাক্কা এসে লাগলো। সে চেনে না, অথচ যুবকটি ওর নাম ধরে কথা বলছে। জয়া বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
‘আপনি কে? আপনাকে তো আমি চিনতে পারছি না!’
জয়ার কথায় ম্লান হাসলো যুবক। সে গলা নামিয়ে বলল,
‘আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা জানাতে এসেছি। যেচেই এসেছি। ভাবলাম, আপনার উপকার করি।’
যুবকটির কথার মাথামুন্ডু বুঝতে পারছে না জয়া। ওর চোখের দৃষ্টিতে বিস্ময় লেপ্টে আছে। ও বলল,
‘আপনি কে? কী চান?’
‘আমাকে আপনি চিনবেন না।’
‘অচেনা মানুষের সঙ্গে আমি তো কথা বলি না!’
বিরক্তি প্রকাশ করলো জয়া। ঈদের দিন সকালে উটকো ঝামেলা এসে জুটেছে-মনে মনে বলল ও। যুবকটি ফের গলা নামিয়ে বলল,
‘আমি আপনার উপকার করতে এসেছি। আপনার সময় নষ্ট করবো না। কথাটা বলেই চলে যাবো।’
‘কিন্তু আপনি কে?’
‘আমার নাম রুদ্র। নাম শুনে আমাকে আপনি চিনবেন না। চেনার কথা নয়!’
‘কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার কী কথা?’
‘সেটাই বলতে চাচ্ছি।’

কথাটা বলে রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে ডান-বাম দেখে নিল। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে খুব গোপনীয় তথ্য জানাতে এসেছে। জয়ার হাসি পেল। ও হাসলো না। রুদ্র গলা আরো নামিয়ে বলল,
‘আপনি ‘রোদ্দুর’ নামে যার সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধু হয়েছেন, সে কিন্তু আপনার কাছে অনেক তথ্য গোপন করেছেন। ‘রোদ্দুর’ নামটাও ওর সঠিক নয়। ফেসবুকে ও বর্ণচোরা। আপনাকে মিথ্যে ফাঁদে জড়াতে চাইছে!’
রুদ্রের কণ্ঠে ‘রোদ্দুর’ নামটা শোনার পরই জয়ার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। ভয়ের কাঁপুনিটা শুরু হতেই ফের থেমে গেল রুদ্রের কথাগুলো শুনে। এখন ওর টেনশন শুরু হলো। ও হা করে তাকিয়ে থাকে রুদ্রের মুখের দিকে। রুদ্র নিচু গলায় ফের বলল,
‘রোদ্দুর’ নামে যার সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব সম্প্রতি হয়েছে, সে আসলে রোদ্দুর নয়। ওর নাম শাকিল। ও আমার বন্ধু। শাকিল আপনার সঙ্গে প্রেম করতে চাচ্ছে। এতেও কিছু বলার ছিল না আমার। কিন্তু শাকিল বিবাহিত। আপনি ওর সঙ্গে জড়ালে প্রতারিত হবেন!’
কথাগুলো ঝড়ের তান্ডব তুলে দিল জয়ার অনুভূতিতে। রোদ্দুর বা শাকিলের সঙ্গে ও প্রেম করেনি বা প্রেম করার আগ্রহও ওর জাগেনি। তবে ফেসবুকে রোদ্দুরের সঙ্গে বন্ধুত্বের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে মাত্র। বন্ধুত্ব গড়ে উঠেই তো বিশ্বাস আর আস্থার ভিত্তিতে। এর মধ্যেই প্রতারণার ডালপালা ছড়াচ্ছে? জয়ার মনটা বিষিয়ে গেল মুহুর্তেই। ফেসবুকে জয়ার একাউন্টটা খোলা হয়েছে তিনমাস আগে। ওর বান্ধবী সেমন্তী ফেসবুকে ওর একাউন্ট খুলে দিয়েছিল অনেকটা জোর করেই। সে থেকে ফেসবুকে মাঝে মধ্যে সময় কাটায় ও। কিছু বন্ধুর অফারও গ্রহণ করে নিয়েছিল। ফেসবুক নামের বন্ধুত্বের অকাশে যারা নিজের কথামালা নিয়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের অন্যের কথা ও স্বপ্নের অনুরণন স্পর্শ করতেই পারে। জয়াকেও স্পর্শ করেছিল রোদ্দুর-চট করে ভেবে নিল জয়া। ফেসবুকে রোদ্দুর খুব সুন্দর সুন্দর স্ট্যাটাস দিত। মাঝে মাঝে কবিতার লাইনও দিত। একদিন জয়া দেখলো রোদ্দুর তার স্ট্যাটাসে জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন লিখে কবির নাম লিখেছে নির্মলেন্দু গুণের নাম। জয়া এই প্রথম কারো স্টাটাস নিয়ে মন্তব্য করেছিল। ও রোদ্দুরের কবিতার লাইনের নিচে মন্তব্য কলামে কবির নাম জীবনানন্দ দাশ হবে বলে লিখেছিল। রোদ্দুর সঙ্গে সঙ্গে কবির নাম ঠিক করে নিয়ে নতুন করে লেখাটি পোষ্ট দিয়েছিল এবং জয়াকে ধন্যবাদও দিয়েছিল। সে থেকে রোদ্দুরের সঙ্গে জয়ার ফেসবুকে মন্তব্য চালাচালি হতো। রোদ্দুরের সঙ্গে দু’তিনদিন চ্যাটও করেছে ও। এই পর্যন্তই ছিল ওদের বন্ধুত্ব। জয়া ফেসবুকে রোদ্দুরের একাউন্ট নিয়ে আরো একটু ভাবলো। ফেসবুকে রোদ্দুরের কোন ছবি ছিল না। একটা মাছরাঙা পাখির ছবি ছিল। রোদ্দুর আরেকদিন একটা স্ট্যাটসে লিখেছিল-পুড়িবে নারী উড়িবে ছাই, তবু নারীকে বিশ্বাস নাই!’ এই দু’লাইনের কবিতা জয়াকে খানিকটা ক্ষুব্ধ করেছিল। ও মন্তব্য লিখেছিল-‘নারীর তিনটি রূপ। মা, স্ত্রী ও কন্যা। কতিপয় পুরুষ মায়ের মর্যাদা, স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা আর কন্যার প্রতি স্নেহের কথা ভুলে যায়। প্রেমে ব্যর্থ হলেই তারা নারী সম্পর্কে কূটক্তি করে আনন্দ পায়। রোদ্দুর সাহেব, আপনিও নিশ্চয়, সে কাতারের একজন।’ জয়ার এই মন্তব্যের পর রোদ্দুর তার পোষ্টটি সঙ্গেসঙ্গেই ডিলেইট করে দিয়েছিল। এরপর রোদ্দুর ইনবক্সে এসে জয়ার সঙ্গে চ্যাট রুমে কথা বলার চেষ্টা করে। জয়া প্রথমে সাড়া দিতে চায়নি। কিছুক্ষণ নীরব থেকে একসময় ও রোদ্দুরের কথার জবাব দিয়েছিল। রোদ্দুর লিখেছিল, কথাটি আমার নিজের নয়। একজন কবির কবিতার দুটি লাইন পোষ্ট করেছিলাম। আপনি মা, স্ত্রী ও কন্যার কথা তুলে নারীর মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন। কিন্তু এটাও সত্য যে, নারী কখনও কখনও ছলনাময়ী। বলা হয়, ঈশ্বরও নাকি নারীর মনের রহস্য বুঝতে পারেন না। এর জবাবে কোন তর্কে করেনি জয়া। ও ভেবেছিল রোদ্দুরের সঙ্গে আর কথা বাড়াবে না। কিন্তু সেটা হয়নি। ও ফেসবুকে গেলেই রোদ্দুর ওর ইনবক্সে কিছু লিখে অপক্ষো করতো জবাবের। ধীরে ধীরে জয়া ওর সঙ্গে কথার জবাব দিতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে ওদের মধ্যে কথার আদান-প্রদান হচ্ছিলো। এখানে প্রেম-ভালবাসা বলতে যা বোঝায়, তার লেশমাত্র নেই। এই পর্যন্ত ভেবে জয়া রুদ্রের দিকে তাকালো। রুদ্র হাসি বিস্তৃত করে বলল,
‘আপনাকে অনুসরণ করে রোদ্দুর আপনার বাড়ি পর্যন্ত এসেছে। আপনি এর কিছুই জানেন না।’
এমন হ্যাংলামো একদম পছন্দ করে না জয়া। এই মুহুর্তে সেমন্তীর প্রতি ওর রাগ হলো। সেমন্তীর চাপাচাপিতে ও ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছিল। নইলে এই অপ্রত্যাশিত বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না। জয়ার বান্ধবীদের মধ্যে সেমন্তী বরাবরই একটু বেশি রকম ফার্ষ্ট বা অগ্রসর। ও সাহসী এক মেয়ে। ও ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে অভ্যস্থ। অনার্স ফার্ষ্টইয়ারেই ও সিগারেট ফুঁকেছে। ওদের ডিপার্টম্যান্টে সেমন্তীকে বলা হয় নারীবাদী মেয়েদের মডেল। ক্যাম্পাসে ছেলেদের সঙ্গে হরহামেশা আড্ডা দেয় ও। এই সেমন্তী একদিন অনেকটা জোর করে জয়াকে চ্যাটিং রুমে প্রবেশ করিয়ে দেয়। শিখিয়ে দেয় চ্যাট করার কৌশল। এর আগে ইন্টারনেটে কারো সঙ্গে চ্যাট করবে, জয়া কল্পনাও করেনি। যা কখনো ভাবেনি, তা-ই করে ফেলেছে সে। এখন ওর আফসোস হচ্ছে। ফেসবুকে চ্যাটিং কীভাবে করতে তা শিখিয়ে দেবার দিন জয়াকে সেমন্তীকে বলেছিল,
‘চ্যাট করলে সময় কেটে যায়। এর জন্য কোন ক্ষতি নেই। ছদ্মনামে চ্যাট করলে পরিচয়ও গোপন থাকছে। অপরজনের পরিচয় জানারও প্রয়োজন নেই। অচেনা ও অজানা লোকদের সঙ্গে একরকম কথা বলার নাম হচ্ছে চ্যাটিং।’
‘এতে কী লাভ?’
দুরু দুরু বুকে জানতে চেয়েছিল জয়া। সেমন্তী একটু হেসে বলেছিল,
‘চ্যাটিং হচ্ছে ফান অর্থাৎ মজা করা। অলস সময়কে রঙিন করে তোলা। এরমধ্যে লাভ লোকসান নেই। কে-কার কাছে লাভ চাইবে, বল? লোকসানই বা হবে কার? ও সব মাথায় রাখবি না। যখন সুযোগ পাবি, চ্যাট করবি। আর নির্ধারিত একজনের সঙ্গে নয়, বারবার বন্ধু বদল করবি, বুঝলি?’
সেমন্তীর কথাগুলো মানেনি ও। ও ঘটনাক্রমে রোদ্দুরের সঙ্গেই চ্যাট করেছে। আর কারো সঙ্গে তা করেনি। বন্ধুদের তালিকাও তেমন বড় করেনি। নিজের চারিত্রিক বৃত্ত ভেঙ্গে জয়া রোদ্দুরের সঙ্গে চ্যাটি করলেও নিজের ভেতরের জড়তা, সঙ্কোচ ও লজ্জার বৃত্ত ভাঙ্গতে পারেনি। আজ নতুন এক লজ্জা এসে ওকে গ্রাস করলো। রুদ্র নামের এই তরুণ ওকে জানিয়ে দিল ‘রোদ্দুর’ নামে ফেসবুকে ও যার সঙ্গে কথা বলতো, সে ছদ্মবেশি প্রতারক। জয়া কথাগুলো ভেবে কেমন কুকড়ে যায় নিজের মধ্যে। ফেসবুক নিয়ে কথাগুলো ভাবতেই জয়ার মনে হলো ওদের বাসা রোদ্দুর বা ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রের চেনার কথা নয়। ও রুদ্রের দিকে তাকিয়ে সন্দেহের তীর্যক দৃষ্টি রেখে বলল,
‘আচ্ছা, আপনি আমার বাসা চিনলেন কীভাবে? ফেসবুকে তো আমার ঠিকানা দেয়া হয়নি। বাসায় এলেন কী করে?’
ওর কথা শুনে রুদ্র লাজুক হাসলো। ও বলল,
‘আপনাকে অনুসরণ করে বাড়ি চিনেছে শাকিল, আই মীন রোদ্দুর।’
‘তাই!’
‘হ্যাঁ। আপনি গত শুক্রবার বিকেলে বেইলী রোডে গিয়েছিলেন না?’
‘হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।’
‘আমরা আপনাকে সেদিন প্রথম দেখি।’
‘আমরা মানে?’
‘মানে শাকিল আপনাকে বেইলিরোডে দেখে চিনতে পারে। ওর সঙ্গে আমি ছিলাম। তাই আমরা বলেছি।’
‘তারপর! বলুন।’
তাগিদ দিল জয়া। রুদ্র বলল,
‘শাকিল ওর গাড়ি নিয়ে আপনাকে অনুসরণ করে। আপনি সেদিন একটি সিএনজিতে চড়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।’
‘হাউ ডেয়ার!’
অস্ফূট কণ্ঠে বিস্ময় প্রকাশ করে জয়া। রুদ্র বলে,
‘আপনি এই বাড়ির প্রধান দরোজা দিয়ে ঢুকে পড়েন। আমরা আপনাদের বিল্ডিংয়ের সামনে অনেকক্ষণ গাড়িতে বসে অপেক্ষা করেছিলাম। বাসায় ফিরেই আপনি কী কাজে যেন বারান্দায় এসেছিলেন। তাই না?’
‘হুম। সম্ভবত বারান্দায় রাখা ফুল গাছের টবে পানি ঢালতে এসেছিলাম।’
‘আমরা তখন বুঝতে পারি এই বাড়ির তিনতলার দক্ষিণ পাশের ফ্লাটে আপনি থাকেন।’
‘ছিঃ ছিঃ! আপনারা এতোটা স্থূল মানসিকতার! একটি মেয়ের সঙ্গে এক বা দুদিন ফেসবুকে কথা হয়েছে বলেই তাকে অনুসরণ করতে হবে? এতো লোলুপ আপনারা?’
জয়ার কণ্ঠে রাগের উত্তাপ। রুদ্র কাচুমাচু করে বলে,
‘আমাকে লোলুপের দলে ফেলছেন কেন? আমি কী করলাম?’
‘আপনি আপনার বন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। একটি মেয়েকে অনুসরণ করেছেন বা অনুসরণে সহযোগিতা করেছেন। এটা কি অপরাধ নয়?’
‘অপরাধ হয়ে থাকলে করেছি। কিন্তু এখন তো অপরাধ করতে আসিনি। এসেছি আপনার উপকার করতে।’
‘ইস্! উপকার! আপনার আসল মতলবটা কী বলুন তো?’
জয়া রেগে গেলে কথার খেই অনেক সময় ধরে রাখতে পারে না। এখন ও রেগে যাচ্ছে। সে নিজের ভেতরে ফুঁসে উঠা রাগ সামলে নেবার চেষ্টা করছে। রুদ্র ম্লান হেসে বলল,
‘আমার মতলব হচ্ছে, আপনি যেন প্রলোভনে না পড়েন, এটা আপনাকে সতর্ক করে দেয়া।’
‘কেন? আমার প্রতি আপনার এতো দরদ উথলে উঠেছে কেন? আপনি আমাকে চেনেন না, জানেন না, অথচ উপকার করতে এসেছেন। ষ্ট্র্যাঞ্জ!’
রুদ্র কয়েকমুহুর্ত চুপ করে থাকে। ওর ভেতরেও সঙ্কোচ ছড়িয়ে পড়ছে। জয়াকে সতর্ক করতে এসে এখন জয়ার প্রশ্নের সামনে বিব্রত হচ্ছে ও। ও অপরাধী কণ্ঠে বলল,
‘আমি এতো কিছু ভাবিনি। ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ পড়তে এসেছিলাম। আপনাদের বাড়ির সামনে দিয়ে রিকসায় চড়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আপনাকে শাকিলের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে যাই। তাই চলে এসেছি। এখন মনে হচ্ছে, কাজটি ঠিক হয়নি।’
হরহর করে কথাগুলো বলে ফেলল ও। জয়ার রাগ কমে এসেছে। যেন দপ করে নিভে যাওয়া দ্বীপ। রুদ্রের কথায় ওর মায়া হল। বলল,
‘সরি, ঈদের দিন এসেছেন, দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষণ হলো। আসুন, ভেতরে আসুন।’
দরোজা থেকে সরে দাঁড়ালো জয়া। রুদ্র একগাল হেসে বলল,
‘না, আমি চলে যাচ্ছি। ভালো থাকবেন।’
রুদ্র এ পর্যন্ত কথা বলার মধ্যে ভেতরের রুম থেকে ড্রয়ংরুমে চলে এলেন জয়ার মা জুলেখা বেগম। তিনি দরোজার বাইরে অচেনা রুদ্রকে দেখে জয়ার উদ্দেশ্যে অবাক কণ্ঠে বললেন,
‘জয়া, কে ও? বাইরে দাঁড় করিয়ে কথা বলছিস যে!’
জয়া ওর মা’র কণ্ঠ শুনে ঘুরে দাঁড়ালো। তথস্থ হয়ে বলল,
‘মা, আমার বান্ধবী মনোরমা আছে না? ওর ভাই এসেছেন। এদিক দিয়েই নাকি যাচ্ছিলেন..।’
কথাটা নিয়ে ভাবলেন না জুলেখা বেগম। ঈদের দিন কেউ বাসায় এলে তাকে আপ্যায়ন করতে হয়। তিনি রুদ্রের উদ্দেশ্যে বললেন,
‘ভেতরে এসো, বাবা।’
এরপর তিনি জয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘জয়া, ওকে আগে কিছু খেতে দাও। রান্না হয়ে গেছে। আমি গোসল করে আসছি।’
রুদ্র জয়াদের ড্রয়ং রুমে প্রবেশ করে একটি সোফায় সঙ্কোচ নিয়ে বসলো। এখন দরোজা থেকে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। জয়ার মা সন্দেহ করতে পারেন। একটি যুবক তার মেয়ের সঙ্গে দরোজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে-এটি সন্দেহমুক্ত দৃশ্য নয়। জয়াও মা’র কাছে ওর মিথ্যা পরিচয় দিয়েছে। সঠিক পরিচয় দেয়াও যায় না। চট করে জয়া যেটুকু মিথ্যা কথা বলেছে, এর জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। জয়া রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আপনি একটু বসুন, আমি আসছি।’
জয়ার কথা শেষ হতেই ওর মা ড্রয়ং রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,
‘জয়া, তুমি ওর সঙ্গে কথা বলো। আমি মায়াকে দিয়ে নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
কথাটা বলে ভেতরের রুমে চলে গেলেন জুলেখা বেগম। জয়া যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। জয়ার বিব্রত ও বিচলিত মুখচ্ছবি দেখে মনে মনে হাসলো রুদ্র। ও জয়ার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
‘শুনুন। এক কাপ চা দিন। চা পান করে চলে যাই। আপনাকে খুব নার্ভাস দেখাচেছ।’
‘নার্ভাস তো দেখাবেই! মিথ্যা কথা আমি একদম বলতে পারি না। নার্ভাস হয়ে যাই।’
‘বুঝতে পেরেছি। আমার উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আপনাকে মিথ্যা বলতে হলো। আই এ্যাম সরি।’
‘সরি বলে ভদ্রতা দেখাচ্ছেন?’
জয়ার কথায় হুল ফুটলো। রুদ্র অসহায় কণ্ঠে বলল,
‘তাহলে কী বলবো?’
‘কিছুই বলার দরকার নেই। ঈদের দিন এসেছেন বলে বাসায় প্রবেশ করতে দিয়েছি। নইলে দরোজার বাইরে থেকেই বিদায় করে দিতাম।’
কথাটা বলে জয়া ওর মুখোমুখি সোফায় বসলো। রুদ্র মনে মনে হাসলো। অপমানটা গায়ে মাখলো না। অচেনা একটা মেয়ের অপমান ওর গায়ে লাগবে কেন? প্রতিনিয়ত ওকে কতজন অপমান করছে। কত লাঞ্ছনা-কত গঞ্জনা ওকে সইতে হয়। মাঝেমাঝে নিজের বাসায় ফিরে বাবার দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মুখ, মায়ের বিষন্ন দৃষ্টি, ছোট বোনের উদ্যত কথার ছোবল ওকে সহ্য করতে হয়। এমন কি, গলির মুখের মুদির দোকানদার সেকান্দারের কটাক্ষ্যও ওকে হজম করতে হয় কখনও-সখনও। বেকার হয়ে ঘুরে বেড়ানোর মত জ্বালায় ওর মত ক’জন জ্বলছে? মনে মনে কথাগুলো ভেবে নেয় রুদ্র। জয়া কৌতুহল প্রকাশ করে বলল,
‘বন্ধুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে এসেছেন আপনি। এটাও তো অন্যায়। নয়কি?’
রুদ্র এ কথা ভেবে দেখেনি। ওর মনে হয়েছে শাকিল একটি মেয়ের সঙ্গে অন্যায় করছে, এর বাধা দিতে চাইছে ও। শাকিলকে বাধা দেয়ার শক্তি বা সামর্থ্য ওর নেই। বন্ধুদের কাছে ও তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বন্ধুদের ফুটফারমায়েশ খাটে ও। শাকিল ওকে দিয়ে ছোখাটো কাজ করিয়ে কিছু টাকা তুলে দেয় ওর হাতে। এই যেমন, শাকিল হয়তো ওর হাতে টাকা তুলে দিয়ে বলবে, ‘তুই বাজার থেকে বড় একটা রুই মাছ কিনে বাসায় দিয়ে আসতো।’ কখনও হয়তো বলবে, ‘গুলশান গিয়ে পিজা হাট থেকে একটি বড় পিজা কিনে বাসায় দিয়ে আস।’ ছোট-খাটো ফরমায়েশি কাজ করে দেয় ও। শাকিল ছাড়াও রুদ্র পিয়ালের ফরমায়েশি কাজ করে। বেশ কিছুদিন ধরে রুদ্র পিয়ালের সঙ্গে ঘুরছে বেশি। পিয়াল ওকে হাত খরচ বাবদ ভালো টাকা দিচ্ছে। বন্ধুদের ফরমায়েশি কাজের ওপরইতো ও বেঁচে-বর্তে আছে। বন্ধুদের ফরমায়েশি কাজ করে দিলেও অন্যায় কোন কাজের সমর্থন করে না ও। রুদ্র সবসময় অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করে। শাকিল অন্যায় কাজ করছিল বলে আজ ঈদের দিন জয়াদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় কী মনে করে ওদের বাসায় চলে এসেছে। আসার আগে ভাবেনি জয়ার প্রশ্নবাণের শিকার হতে হবে। রুদ্র কথাগুলো মনে মনে ভাবছিল। ওর নীরবতা দেখে জয়া ফের বলল,
‘আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না কেন? বিব্রতবোধ করছেন?’
‘না। আসলে আমি ওভাবে ভেবে দেখেনি। বন্ধু অন্যায় করছে, এর প্রতিবাদ সরাসরি করতে পারিনি। আমার সামাজিক অবস্থান অতোটা শক্ত নয়। আপনাকে হুঁশিয়ার করে দেয়ার কথাটা চট করে মাথায় এসেছে। আর আগ-পিছু না ভেবে আপনাদের বাসায়ও চলে এসেছি। এখন মনে হচ্ছে, ঠিক হয়নি।’ কথাগুলো বলল অপরাধীর মতো। রুদ্র’র কথায় জয়া হেসে ফেললো। রুদ্র লক্ষ্য করলো জয়ার হাসির মধ্যে কেমন মাদকতা আছে। হাসলে মনে হয় নিকট দূরে এক পাহাড়ি ঝর্ণার জলপ্রপাত হচ্ছে। ও এক ঝলক নির্লজ্জ মুগ্ধতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জয়ার দিকে। জয়া রুদ্রর বোকা ও অসহায় চোখের দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি রেখে বলল,
‘আপনি হয়তো একটু বোকা বা সরল শ্রেণীর লোক! আমার তাই মনে হচ্ছে।’
কথাটা শুনে কেমন স্বস্থি অনুভব করলো রুদ্র। ওকে অনেকে ‘বোকা’ বলে ভৎর্সনা করে। এই মুহুর্তে জয়ার মুখে ‘বোকা’ শুনে ওর মনে হলো প্রশংসা শুনতে পেল ও। রুদ্র জবাবে বলল,
‘আমি অতো বোকা নই। বোকারা অর্থনীতিতে মাষ্টার্স করে ফেলে না। যদিও মাষ্টার্স পাশ করে আমার কোন গতি হয়নি।’
‘ওহ!। আপনি অর্থনীতিতে মাষ্টার্স করেছেন? কোথায় পড়েছেন?’
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
‘ফলাফল?’
‘ফলাফল খারাপ হয়নি। তারপরও চাকুরি পাচ্ছি না। ইন্টারভিউতে ভালো করি। কিন্তু নিয়োগ পাইনা।’
কথাটা বলতে গিয়ে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে রুদ্র’র ফুসফুস থেকে। ও দীর্ঘশ্বাস আটকানোর চেষ্টা করলো না। জয়া নামের অজানা একটি মেয়ের সামনে নিজের বিপন্নতায় কেঁদে ফেললেই কি! মনে মনে ভাবে ও। জয়ার বুঝি মায়া হলো। ও বলল,
‘অনেক শিক্ষিত লোক আপনার মত বেকার ঘুরছে!’
‘জানি। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার।’
বলল রুদ্র। জয়া দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ বাড়াতে চাইলো না। ও বলল,
‘সরি, আপনার মন খারাপ করে দিলাম কি?’
‘না, না। আমার মন খারাপ হয়নি। হ্যাঁ, আপনি জানতে চেয়েছিলেন, আমি বন্ধুর অন্যায় কাজে বাধা দিইনি কেনো। আমি বাধা দিতে পারি না। এটি আমার দুর্বলতা। অতোটা ব্যক্তিত্ব আমি অর্জন করতে পারিনি।’
‘আমাকে সাবধান করতে এসেছেন, এটাও আপনার ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দিক। আপনি অতো হতাশ হবেন না।’
সাহস দিচ্ছে এমনভাবে কথাটা বলল জয়া। রুদ্র ম্লান হাসলো। এ কথার জবাবে কিছু বলল না। কয়েক সেকেণ্ড চুপ থেকে ও বলল,
‘জয়া, আপনার সঙ্গে আমার আর কখনও দেখা হবে না। দেখা হবার কথাও নয়। আমি যে কথা আপনাকে বলে গেলাম, তা কিন্তু মিথ্যা নয়। আমার কথা শাকিলকে বলে দেবেন না। আই মীন, ফেসবুকে আপনাদের বন্ধুত্ব বজায় থাকলেও আমার এই ভূমিকার কথাটা গোপন রাখবেন, প্লিজ।’
রুদ্র’র অনুরোধে জয়া অবাক কণ্ঠে বলে,
‘আরে কী বলছেন! আপনি আমার উপকার করেছেন। আপনার কথা আমি সবসময় স্মরণ করবো। আপনার কথা কাউকেই বলবো না। আর ফেসবুকে আমি রোদ্দুর নামক শাকিলকে ব্লক করে দেব আজই। ফেসবুকে আমার আসক্তি নেই।’
কথাটা শেষ হতেই মায়া খাবার সমেত একটি ট্রে নিয়ে ওদের সামনে এলো। মায়াকে দেখে চমকে গেল রুদ্র। জয়ার অবিকল এক কপি যেন মায়া। ওরা কি জমজ বোন? প্রশ্নটা উঁকি দিল রুদ্রর মনে। রুদ্র অবাক চোখে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে। জয়া আর মায়াকে প্রার্থক্য করতে হলে একটু ভালো করে তাকাতে হবে ওদের মুখের দিকে। জয়ার চিবুকে ছোট্ট একটা তিল আছে। জয়া যখন হাসে তিলটি তখন অপার সৌন্দর্যে বিকশিত হয়। মায়ার চিবুকে তিল নেই। দু’জনের চোখ, নাক, মুখশ্রীতে এক আদল। শারীরিক গঠনও একই রকম। রুদ্রর তন্ময়তাকে চুড়ির শব্দে ভেঙে দিয়ে মায়া ওর সামনে টি-টেবিলে ট্রে রাখলো। রুদ্র’র সম্বিত ফিরে আসে। ট্রে-তে তিন রকমের সেমাই, মিষ্টি আর চা রয়েছে। মায়া রুদ্রের দিকে চেয়ে বলল,
‘আমি মায়া। আমরা জমজ বোন নই!’
রুদ্র তাকালো জয়ার দিকে। জয়ার মুখে ঝুলে আছে মিষ্টি হাসি। জয়া ঐ হাসির মধুরেণু ছড়িয়ে রুদ্রের উদ্দেশে বলল,
‘মায়া আমার চেয়ে দেড় বছরের ছোট। কিন্তু আমাদের দেখে মনে হবে একসঙ্গেই আমরা জন্ম নিয়েছি।’
‘হুম! আমিও এ কথা ভাবছিলাম।’
ছোট্ট করে বলল রুদ্র। মায়া বসলো জয়ার পাশে। রুদ্রর মনে হচ্ছিলো দুটি হাজার পাওয়ারের বিজলী বাতি ওর সামনে জ্বলে আছে সৌন্দর্য আর সুষমা ছড়িয়ে। জয়া বলল,
‘নিন, ঈদের দিন কিছু মুখে দিন। মা’র গোসল শেষ হলে আমরা একসঙ্গে খাবো। আমার মায়ের রান্না করা খাবার খেলে অনেকদিন পর্যন্ত তা মনে থাকবে আপনার!’
রুদ্র অসহায় গলায় বলল,
‘আমি শুধু চা খাবো। এরপর চলে যাবো। ঈদের দিন আর আপনাদের সময় নষ্ট করতে চাই না।’
এর জবাবে মায়া বলল,
‘তা হবে না। আমার মা আপনাকে না খাইয়ে ছাড়বেন না। আপনাকে আমাদের সঙ্গে খেতেই হবে। মনোরমা আপু শুনলে কী ভাববে বলুন তো। ঈদের দিন সকালে বাসায় এসে না খেয়ে চলে গেলে কি মনোরমা আপু আমাদের ভালো বলবেন?’
মায়া কথাটা বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। রুদ্র আশ্চার্য হয়ে লক্ষ্য করলো জয়ার মত মায়ার হাসিতেও ঝর্ণার জলপ্রপাতের ছন্দ আছে। রুদ্র অস্থস্থিতে পড়ে গেল। জয়া নিচু গলায় মায়াকে বলল,
‘তার নাম রুদ্র। সে আসলে..।’
এ পর্যন্ত বলতে পারলো জয়া। মায়া ওকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘আমি তোমাদের কথা সব শুনেছি। জানো তো, আমি কান পেতে কথা শুনতে পছন্দ করি।’
জয়া কপট রাগ প্রকাশ করে বলল,
‘এটা তোর বাজে অভ্যাস। পরের কথা শুনবি কেন?’
‘পর কোথায়? কথা যা হয়েছে, তা তো তোমাকে নিয়েই হয়েছে। তোমার কথা শুনে আমার কোন অপরাধ হয়নি। বলো হয়েছে?’
মায়া চোখের ভ্রু নাচিয়ে জানতে চায়। জয়া রুদ্রের দিকে চেয়ে বলল,
‘আপনি অমন থ হয়ে গেলেন যে! নিন, কিছু মুখে দিন। চা তো ঠান্ডা হয়ে যাবে।’
রুদ্র অবোধ বালকের মত চায়ের কাপ তুলে নিল। চায়ের কাপে চুমুক দিল। ঘুম থেকে উঠে এ পর্যন্ত চা পান করেনি। চায়ের তৃষ্ণা ছিল। চা গলধকরণ করতে করতে রুদ্র ফের অনুভব করলো হাজার পাওয়ারের দুটি বিজলী বাতি ওর সামনে জ্বলজ্বল করছে। আলোর ধাঁধাঁয় ওর চোখ ঝলসে যাচ্ছে।

দুই.
রাশেদুল হক ড্রইং রুমে বসে খবরের কাগজ পড়তে পছন্দ করেন। নিজের বেডরুমে বসে খবরের কাগজ পড়তে তার ভাল লাগে না। ড্রইংরুমে বসে থাকলে বাসায় কে এলো বা কে বেরিয়ে গেলো তা তিনি দেখতে পান। যদিও তিনি কাউকে কিছু বলেন না। আজকাল তিনি বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়েন। রাশেদুল হকের দু’ ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের বড্ড আদর করতেন তিনি। এখন আদরে ভাটা পড়েছে। তার মনে হয় তার সন্তানরা বড় হয়ে গেল খুব দ্রুত। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের প্রতি তার আদরের মাত্রাটা উবে গেছে। সন্তানদের নিয়ে যে ধরনের স্বপ্ন দেখতেন, সেই স্বপ্নের ধারে কাছেও পৌঁছুতে পারেনি ওরা। তার স্বপ্ন খুব বেশি আহামারি কিছু ছিল না। অন্যসকল বাবা যেরকম নিজের সন্তান নিয়ে স্বপ্ন রচনা করেন, তার স্বপ্নও সেরকম ছিল। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ছেলে দুটো লেখাপড়া করে ভাল চাকুরি করবে। মেয়েটাও লেখাপড়া শেষ করে স্বচ্ছল ও সুশ্রী একটি ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবার পর হাসিখুশি মুখে সংসার করবে। কিন্তু সেরকম হয়নি। বড় ছেলে শিশির বখে গেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়। ছাত্ররাজনীতির বলয়ে পড়ে জড়িয়ে পড়লো ঠিকাদারী ব্যবসায়। অনার্সটা সম্পন্ন করলেও মাষ্টার্সটা দেয়া হয়নি ওর। ঠিকাদারী করে দেদার অর্থ আয় করছে, কিন্তু সংসারে থেকে হাল ধরার ভূমিকা পালন করেনি। নিজের পছন্দে বিয়ে করে আলাদা থাকছে। ওর স্ত্রী ললিতা স্বামীকে নিয়ে আলাদা থাকতে পছন্দ করে। এ ছাড়া গেণ্ডারিয়ার মত ঘনবসতি ও নোংরা পরিবেশে ও থাকতে চায় না। শিশির ভালবেসে ললিতাকে বিয়ে করেছে। ওরা বিয়ের খবরটা অনেকদিন পর্যন্ত গোপন রেখেছিল। একদিন রাশেদুল হক জানতে পারলেন বড় ছেলে শিশির বিয়ে করে ধানমণ্ডিতে একটা ফ্লাট কিনে ওখানে সংসার সাজিয়েছে। খবরটা জানতে পেরে কষ্ট পেলেও অবাক হননি তিনি। শিশির ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে ও সংসার থেকে ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ঠিকাদারী ব্যবসায় জড়িয়ে ও সংসার থেকে একেবারে ছিটকে গিয়েছে। বাড়িতে প্রায় আসতো না। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সময় বেশ কয়েকটা মামলায়ও জড়িয়ে পড়েছিল শিশির। পলাতক থাকতে হতো ওকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর মামলার হয়রানী বন্ধ হয়েছে। কিন্তু বাড়ি না ফেরার অভ্যাসটা রয়ে গিয়েছিলওর। একসময় স্থায়ীভাবে বাড়ি ফেরা বন্ধ হলো। পরে জানতে পারলেন ধানমণ্ডিতে ফ্ল্যাট কিনে স্ত্রী ললিতাকে নিয়ে থাকছে ও। আলাদাভাবে থাকলেও শিশির প্রতিমাসে টাকা পাঠায় ওর মায়ের কাছে। ওর পাঠানো টাকা সংসারের অভাব ঘুচিয়েছে।
ছোট ছেলে রুদ্র লেখাপড়া ভালভাবে শেষ করলেও চাকুরি জুটাতে পারছে না। চাকুরির জন্য যে ও খুব জোর চেষ্টা করছে, তেমন নয়। এই ছেলেটা আত্মকেন্দ্রিক। বেকার থাকার প্রতি এক ধরনের মোহ আছে যেন। কিংবা ওর ব্যক্তিত্ব বোধ টনটনে বলে মাথা নোয়াতে পারছে না। চাকুরির জন্য কারো অনুগ্রহ লাভ করতে যে ধরনের বিনয় বা অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলতে হয়, সেরকম বৈশিষ্ট ওর চরিত্রে নেই। হাত পাততেও পারে না, আবার কারো বিপদে নিজের পকেটের অর্থ বিলিয়ে দেয় আগ-পিছু না ভেবে। এ ধরনের সন্তান নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারে ফলহীন বৃক্ষের মত। অস্থিত্ব আছে,অথচ কাজে লাগে না। রাশেদুল হক তার ছোট ছেলেটাকে এরপরও কেন জানি বেশি পছন্দ করেন। ওর প্রতি দরদটা বেশি। এর কারণ হতে পারে, রুদ্র কখনও কিছু চাইতো না। কোন কারণে ওকে বকা দিলে ও মাথা অবনত করে দাঁড়িয়ে থাকতো। বাবা-মা যতই বকুনি দিক, ও জবাব দিতো না। বাবা-মা’র সঙ্গে মুখে মুখে কখনও তর্ক করতো না। চুপ থাকাটা বা কোন চাহিদার কথা না বলাটা ওর এক ধরনের অভ্যাস। শিশির ছিল ওর উল্টো। ছেলেবেলা থেকে ও এটা-ওটা চাইতো। দিতে না পারলে মুখ ভার করে থাকতো। কখনও রাগ প্রকাশ করতো। ‘এটা না কেন, ওটা দাও’ এ কথায় শিশির জ্বালাতো ওর মাকে। যেদিন থেকে ও নিজে উপার্জন করতে শুরু করলো, সেদিন থেকে ও যেন দাবি-দাওয়া থেকে বিরত হলো।
আর মেয়ে তৃষা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ঝুঁকে পড়তে চেয়েছিল মডেলিংয়ের প্রতি। রাশেদুল হক চাননি মেয়ে শো-বিজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলুক। কিন্তু তৃষা মডেল হতে চাইতো। মডেল হবার স্বপ্নটাই ওর ছিল, কিন্তু চেষ্টা ছিল না। তৃষা খুব সাজ-সজ্জা করতো পছন্দ করতো। স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত লেখাপড়া করতে গিয়ে পাড়ার বখাটে ছেলেদের ইভ টিজিং সহ্য করতে হতো ওকে। বাসায় ফিরে তৃষা মাঝেমাঝে কান্না করতো। রাশেদুল হক লক্ষ্য করতেন তার বাসার আশেপাশে তরুণদের আনাগোনা। বিভিন্ন সময়ে তাকে দেখলে তরুণরা খুব বিনয় প্রকাশ করতো। অকারণে সালাম দিতো। কিশোরী-তরুণী সুন্দরী মেয়েদের পিতারা সবসময় নিজ এলাকার যুবকদের কাছে বিশেষ সম্মান যেমন পায়, তিনি পেতেন। এতে তিনি বিব্রতবোধ করলেও মুখে কিছু বলতে পারতেন না। আগ বাড়িয়ে তিনি তো আর কোন যুবককে ডেকে বলতে পারেন না-‘এই তুমি আমাকে অকারণে সালাম দিচ্ছো কেন?’ আজকাল যেখানে তরুণ-তরুণীরা শ্রদ্ধা-বিনয় প্রকাশ করতে কার্পণ্য করে, সেখানে কেউ ভক্তি দেখালে ভৎর্সনা করা যায় না। রাশেদুল হক তাই তরুণদের কিছু বলতেন না। একদিন এক যুবক গলির মোড়ে তার পথ আটকে দাঁড়ালো। রাশেদুল হক মুদি দোকান থেকে চিনি কিনে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। যুবকটি তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
‘আংকেল, আপনার সঙ্গে দু’মিনিট কথা বলতে পারি?’
রাশেদুল হক যুবকটির আপাদমস্তক চোখ বুলালেন। যুবকটির গায়ে হালকা নীল রঙের শর্ট পাঞ্জাবী। জিনস প্যান্টের সঙ্গে পাঞ্জাবীতে মানিয়েছে। পায়ে চকচকে কালো জুতো। চকচকে জুতো দেখে তিনি বুঝতে পারলেন যুবকটি ধোপধুরস্ত থাকতে পছন্দ করে। তবে সালাম না দিয়ে ‘অংকেল, আপনার সঙ্গে দু’মিনিট কথা বলতে পারি?’ বলায় তিনি কয়েকসেকেণ্ড অস্বস্থিবোধ করেলেন। যুবকটির আচরণে বিনয় নেই কেন-ভাবছিলেন তিনি। যুবকটি চারপাশে সতর্কভাবে তাকিয়ে বলল,
‘তৃষার বিষয়ে দু’একটি জরুরি কথা বলতে চাই। আপনার জানা দরকার।’
রাশেদুল হক অবাক হলেন। পথিমধ্যে কোন যুবক দাঁড়িয়ে একজন পিতার কাছে তার মেয়ে সম্পর্কে কিছু বলতে চাইলে মনের মধ্যে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। তার মনেও আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়লো। তিনি বললেন,
‘আমি তো আপনাকে চিনি না। কে আপনি?’
রাশেদুল হক শিশু-কিশোর ছাড়া সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করেন। যুবকটিকেও অভ্যাসবশতঃ আপনি বললেন। যুবকটি বলল,
‘আমার নাম স্বপন। আমি থাকি ফরিদাবাদের মিলব্যারেক এলাকায়।’
‘তো কী বলতে চাইছেন?’
‘আমি বলতে চাইছি। এই মহল্লার কয়েকটি বখাটে ছেলে তৃষার পেছনে লেগেছে। সুমন ও জব্বার নামে দু’জনকে ঘুরাচ্ছে তৃষা। গতকাল সুমন ও জববারের মধ্যে মারামারি হয়েছে। আরো বড় ধরনের মারামারি হতে পারে!’
‘মারামারি তো প্রায়ই এই মহল্লায় হয়। এতে তৃষার দোষ কোথায়?’
রাশেদুল হক জানতে চান। স্বপন দুটি চোখ বড় করে নিচু গলায় বলল,
‘সুমন আর জব্বার দুজনই তৃষাকে ভালোবাসে! তৃষাও ওদের দুজনকে ঘুরাচ্ছে! প্রবলেমটা তো ওখানেই!’
রাশেদুল হক কেমন একটা ধাক্কা খেলেন যেন। স্বপনের কথা শুনে আকস্মিকভাবে মনটা মুষড়ে গেল। এই ছেলেটি কি বলতে চাইছে? কেনই বা তাকে এ সব কথা বলছে? তার মনে এ প্রশ্ন উদয় হলো। তাড়া আছে এমন ভাব চোখে-মুখে ফুটিয়ে স্বপন বলল,
‘আংকেল শুনুন, তৃষাকে চোখে চোখে রাখবেন, কয়েকদিন। ও যেন সাবধানে চলাফেরা করে! সুমন আর জব্বারের বন্ধুরা বলাবলি করছে-তৃষা প্রেমের ফাঁদ পেতেছে। ঐ ফাঁদে পড়ে সুমন ও জব্বার মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে। তৃষাকে ওরা দেখে নেবে। সুমন বা জব্বার, যে কোন একজনকে বিয়ে করতে হবে তৃষাকে-ওরা এ সব বলছে!’
‘আমার মেয়ে কাকে বিয়ে করবে, এটা ওরা ঠিক করার কে?’
জানতে চাইলেন তিনি। স্বপন বলল,
‘তৃষার বিয়ের বিষয়টা এখন আপনাদের হাতে নেই। ওর মিথ্যে ভালবাসায় জড়িয়ে সুমন ও জব্বার নিজেরা মারামারি করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একজনের হাত কেটেছে, আরেকজনের মাথা ফেটেছে, বুঝলেন! ওদের দলবল তেতে আছে। যে কোন সময় তৃষাকে ওরা তুলে নিয়েও যেতে পারে!’
‘কী বলছেন, আপনি? তৃষাকে তুলে নিয়ে যাবে? এটা কি মগের মুল্লুক?’
‘শুধু ওদেরটা দেখছেন? তৃষার অপরাধটা দেখছেন না? তৃষা তো এর আগেও আদিল নামে এক যুবককে ঘুরিয়েছে! ভাগ্যিস, আদিল বিদেশে চলে গেছে!’
‘কী আশ্চার্য, কি সব কথা শুনছি! আপনি এ সব কথা জানেন কীভাবে?’
‘জানি, আমি সব জানি। আমি তৃষার ভালো বন্ধু, তাই জানি।’
‘তৃষার বন্ধু আপনি? কখনও তো ওর মুখে আপনার নাম শুনিনি।’
‘ও কি বাড়িতে গিয়ে ওর কতজন বন্ধু আছে, এ নিয়ে আলোচনা করবে নাকি? বাবা-মা’কেই খোঁজ-খবর রাখতে হয়। আপনারা তো কোন খোঁজ-খবর রাখেন না!’
কথাটায় হচকিয়ে গেলেন রাশেদুল হক। এ কথা মিথ্যেও নয়। তিনি তো মেয়ে কার সঙ্গে মিশছে, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে-এ সবের খোঁজ-খবর রাখেননি। ওর মা কি কিছু জানে? মনে মনে একটু ভেবে নেন তিনি। স্বপন বলল,
‘আমি আর দাঁড়াচ্ছি না। আমাকে দেখলেও সুমন বা জব্বারের বন্ধুরা পেটাতে পারে! ওরা এখন ভীষণ খেপে আছে! যাচ্ছি। কথাগুলো আপনাকে বললাম তৃষার বাবা বলে। আমার কথা তৃষাকে বলবেন না। ও আমার ওপর রাগ করতে পারে। ওর ভালোর জন্যই কথাগুলো আপনাকে জানালাম।’
বলে স্বপন নামক যুবকটি দ্রুত চলে গেল। রাশেদুল হক রাস্তার ওপর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলেন-বাড়িতে গিয়ে তৃষাকে কীভাবে ভৎর্সনা করবেন। সেদিন বাড়ি ফিরে তৃষাকে স্বপনের কথা বলতেই ওর মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। ‘সুমন-জব্বার কে?’ জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তৃষা ‘চিনি না’ বললেও রাশেদুল হক বুঝতে পারছিলেন কথাটা সত্যি বলছে না তৃষা। স্বপন যে কথাগুলো বলেছে-তা যে একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মত নয়-সেটাও বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিলো বাবার কথা শুনে তৃষা খুবই অবাক হয়েছে। স্বপনের নাম শুনে তৃষা সেদিন যেন আকাশ থেকে পড়লো-এমন ভাব করেছিল। অথচ এ ঘটনার একমাস পর ঐ স্বপনের হাত ধরেই তৃষা বাড়ি থেকে পালালো। প্রথমে বুঝতে পারেননি রাশেদুল হক। তৃষা একদিন রাতে বাড়ি ফিরলো না। সেদিনের রাতটা অনেক উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছিলেন তিনি। স্ত্রী রাহেলা ও পুত্র রুদ্রসহ তারা রাতভর জেগে ছিল। এখানে-সেখানে ফোন করলো রুদ্র। কোন খবর পাওয়া গেল না। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় তিনদিন পেরুলো। তৃষা বাড়ি ফিরে এলো না। থানা-পুলিশে খবর দিতে যাবার সময় তৃষার ফোন এলো ওর মায়ের কাছে। তৃষা মাকে অনায়াসে জানিয়ে দিল ও স্বপন নামক একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। ওকে নিয়ে যেন কেউ দুঃশ্চিন্তা না করে। রাশেদুল হকের বুকে পুষে রাখা স্বপ্ন্টা শুধু ফিকেই হল না, স্বপ্নটা যেন চাপা অভিমানে রূপ পেল সেদিন থেকে। তিনি আজকাল টের পান সন্তানদের প্রতি এই অভিমান দিন দিন কেমন শক্ত-পোক্ত হয়ে যাচ্ছে। অভিমানকেন্দ্রিক এই অনুভূতিকে ‘রাগ’ও বলা চলে। কিন্তু রাশেদুল হককে কেউ কখনো রাগতে দেখেনি। ফলে সন্তানদের প্রতি তার রাগ আছে, এ কথা স্ত্রী রাহেলাও বিশ্বাস করবে না। তিনি সবসময় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন, তবে তার মনের ভেতরে একটা কষ্টের চাপা স্রোত বয়ে চলেছে।
রাশেদুল হক বসে আছেন তার বাসার বারান্দায়। বাড়ির প্রধান দরোজার সামনে এই বারান্দাটি প্রশস্ত। বারান্দায় বসলে বাড়ির উঠোনটিও দেখা যায়। তার জন্য বারান্দায় একটা ইজি চেয়ার রেখে দেন স্ত্রী রাহেলা। স্বামীর কোনটায় ভাল আর কোনটায় মন্দ-এটা যেন রাহেলাই ভাল বুঝতে পারে। রাহেলার সঙ্গে তিনি আটত্রিশ বছর পার করে দিয়েছেন। তাদের আটত্রিশ বছরের সংসারে সুখ-দুঃখের অনেক স্মৃতি আছে। অম্ল-মধুর অনেক ঘটনা আছে, আনন্দ-বেদনার নানা আখ্যান আছে। অনুভবে গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারি চেপে রাখা দুঃখও আছে। আক্ষেপ-হতাশা তো আছেই। তারপরও রাহেলার ভালবাসার স্নিগ্ধ সৌরভ আছে। তিনি স্ত্রী রাহেলার ভালবাসার সৌরভে আবেশিত হয়ে নিজের দুঃখ-কষ্টগুলোকে অবহেলা করতে পারেন। রাশেদুল হক স্বপ্নচারী নন বা তার কোন উচ্চাভিলাষ নেই। ছিলও না কখনও। চাকুরি করেছেন একটি প্রাইভেট বীমা কোম্পানীতে। বীমা’র এজেন্ট হিসাবে ঐ কোম্পানীতে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় চল্লিশ বছর আগে। একই প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শেষ করেছেন তিনি। বিশ্বস্থতার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। অবসরের যাবার আগে দু’বছর ঐ কোম্পানীর ব্যবস্থাপক হয়েছিলেন। সম্মানের সঙ্গে তিনি চাকুরি জীবন শেষ করেছেন। এখন পেনশন পাচ্ছেন। পেনশনের যৎ সামান্য অর্থ দিয়ে সংসার চলে না। তবে বড় সন্তান শিশির মাঝেমাঝে ওর মা’র কাঠে টাকা পাঠায়। নইলে তাদের অনাহারে-অর্ধহারে থাকতো হত। শিশির মাঝেমাঝে বাড়িতে এসেও ওর মায়ের হতে টাকা গুজে দিয়ে যায়। প্রতি মাসে শিশির টাকা পাঠায়। শিশিরের পাঠানো অর্থ এখন সংসারের ভরসা।
রাশেদুল হক মনে মনে চান, শিশির স্ত্রীকে নিয়ে তাদের কাছাকাছি থাকুক। ধূপখোলা বা ফরিদাবাদে অনেক অট্টালিকা আছে। এখানকার পরিবেশ অনেক বদলে যাচ্ছে। শ্রমিকবান্ধব এই এলাকায় এক সময় কয়েকটি বস্তি ছিল। যত দিন যাচ্ছে, তত বস্তি হটিয়ে ওখানে বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। আবাসিক এলাকার চেহেরার নতুন রূপে বিকিশিত এখন ধূপখোলা ও ফরিদাবাদ। শুধু রাস্তাঘাট সরু। নোংরা-আবর্জনা পরিস্কার করতে অনেক এলাকাবাসী নিজেরাই উদ্যোগী হয়েছে। তারা মাসিক চাঁদা দিয়ে পয়ঃনিষ্কাষণের জন্য কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। এই উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে বিভিন্ন এলাকার অট্টালিকার বাসিন্দারা। তারা সিটি কর্পোরেশনের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেরাই নিজ এলাকা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিচ্ছে। ঘণবসতির্পূণ এই ঘিঞ্জি এলাকা দিন দিন আলোকিত ও প্রসারিত হচ্ছে। এই এলাকাতেই জন্ম হয়ে বড় হয়েছে তার সন্তানেরা। বাবা-মা’র কথা ভেবে শিশির এখানে কোন এ্যাপার্টম্যান্ট কিনতে পারতো। হাতে বিপুল অর্থ এলে অধিকাংশ মানুষ কেন যে ধানমণ্ডি ও গুলশানে থাকতে চায়-ভেবে পান না রাশেদুল হক। তিনি কিছুদিন শিশিরকে এই এলাকায় থাকার কথা বলেছিলেন। তার কথা শুনে শিশির অবাক চোখ তুলে তাকাতো। প্রথম প্রথম কথাটায় আমল দেয়নি ও। একদিন শিশির বলল,
‘বাবা, আপনি কীসব কথা বলছেন! আমি কেন এই এলাকায় থাকব?’
‘না, মানে, এখানে থাকলে আমাদের কাছাকাছি থাকা হতো।’
‘কাছাকাছি বা দূরত্ব বলতে এখন কিছু নেই, বাবা। এখন সেলফোনের যুগ। প্রযুক্তির যুগ। ফোন করলেই কথা বলা যায়। টাকা পাঠাতে হলেও যেতে হয়না। বিকাশ করে দিলেই হয়। কাছে থাকাটা আপেক্ষিক ব্যাপার, বাবা!’
‘না, চোখের দেখাটাও হতো। সেলফোনে কী চোখের দেখা হয়?’
‘কেন হয় না? ইন্টারনেট কেন তাহলে? অনলাইনের কত অপশন! আপনি চাইলেই দেখতে পারেন, কথা বলতে পারেন। সেলফোনের ক্যামেরার কথা ভুলে যাচ্ছেন?’
কথাটা ঠিক। এখন সময় বদলে গেছে। চাইলেই সেলফোনের ক্যামেরায় দেখা যায়, কথা বলা যায়। চোখের সামনে হয়তো দেখা যায় না, তবে দেখা তো যায়। ছেলেকে কোন যুক্তি দিয়ে বোঝাবেন যে, বাবা-মা নিচের চোখের সামনে নিজের সন্তানকে দেখে যে আনন্দ বা তৃপ্তি পায়, তা কখনও সেলফোনের ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। প্রযুক্তি মানুষকে সুযোগ-সুবিধার বন্ধনে বেঁধেছে ঠিক, তবে মনকে কখনও পরিপূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনি, পারবেও না-মনে মনে বলেছিলেন রাশেদুল হক। ছেলের সঙ্গে আর তর্ক করেননি। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন শিশির নিজের মধ্যবিত্ত জীবনের স্মৃতিকাতর পরিবেশকে এড়িয়ে চলতে চায়। নব্য ধনীর অহম ওর চোখে-মুখে লেপ্টে গেছে। ওর দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করা বৃথা। তবে নিজ থেকে ও একদিন উপলব্ধি করবে মানুষ যেখানে বেড়ে উঠে, সেই স্থানটা অবজ্ঞা করলে নিজেকেই ঠকানো হয়। এ কথা মনে মনে ভেবে শিশিরকে আর ধানমণ্ডি ছেড়ে আসার কথা বলেননি। যার অর্থে এখন সংসারটা চলছে, তাকে ঘাঁটাতে মন সায় দেয়নি।
পাঁচ বছর ধরে ঠিকাদারী করছে শিশির। প্রথম প্রথম একজন ঠিকাদারের ফুট-ফরমাইস খাটতো। ধীরে ধীরে নিজেই ব্যবসায় নেমে যায় ও। কোথা থেকে টাকা জোগাড় করেছে তা জানেন না তিনি। মাষ্টার্সটা না দেয়া আার বিয়ের বিষয়টা বাদ দিলে শিশির কিন্তু নিজ পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এভাবে ভাবলে আজকাল শিশিরকে নিয়ে তার গর্বও হয়। রাশেদুল হক মনে মনে তার তিন সন্তানকে তিনটি বিশেষণে অভিহিত করেন। তিন সন্তানের মধ্যে একজনকে আনন্দ, একজনকে দুঃখ এবং একজনকে হতাশা বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। বড় ছেলে শিশির হচ্ছে ‘আনন্দ’। শিশিরকে তিনি কিছুই দেননি অথচ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে। দিনদিন ওর উন্নতি হচ্ছে। শুধু মাষ্টার্সটা ও দেয়নি। শিশির যথেষ্ট মেধাবী ছাত্র ছিল। অনার্স পর্যন্ত পড়তে গিয়ে ও জড়িয়ে পড়েছিল রাজনীতিতে। রাজনীতিই ওর লেখাপড়া থেকে সরিয়ে এনেছিল। তবে অভাবকে খুব কাছ থেকে চিনতে পেরেছিল বলে ও ধনী হবার লড়াইয়ে নেমে পড়েছিল। রাশেদুল হক জানেন, আজকাল রাজনীতি ও ঠিকাদারী দ্রুত ধনী হবার সহজ উপায়।
তিনি গেণ্ডারিয়ায় চারপাশে তাকালে এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখতে পান। এক সময়ে ডাকাতি যার পেশা ছিল এবং বাস করত বস্তিতে, রাজনীতির কারণে সে এখন সম্পদশালী এক ব্যক্তি। শুধু গেন্ডারিয়া নয়, ঢাকা শহরে তার এখন অকল্পনীয় প্রভাব। ঢাকা শহরে এমন লোকের সংখ্যা হাজার হাজার। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে দশজনকে পাওয়া যাবে, যারা রাজনীতিকে ব্যবহার করে অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। এদের সংখ্যা শতাধিক বা হাজার হলেও অবাক হবার কিছু নেই। এ সব তার ধারনা। শিশির তাদের দলের একজন। শিশিরের সফলতাকে তিনি তাই ‘আনন্দ’ হিসাবে নিয়েছেন। যদিও অন্তরে অস্বস্থি রয়েছে। কন্যা তৃষা হচ্ছে রাশেদুল হকের কাছে ‘দুঃখ’। মেয়েটি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরপরই কেমন হয়ে গেল। সবাইকে না জানিয়ে বিনা নোটিশে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল আদরের মেয়েটি! বিয়ে করে ফেলল একা। স্বপন নামের ছেলেটি কী করে, কোথায় বাড়ি, কার সন্তান, এর কিছুই জানেন না তিনি। ওরা এখন কোথায় বাস করছে, সেটাও জানেন না। শিশির তৃষার আচরণে ভীষণ রাগ করেছে। শিশির রাগ করবে বলে তৃষার খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টাও করেননি তিনি। মেয়ের নিষ্ঠুর আচরণের কষ্ট তিনি বুকে পুষে রেখেছেন। ‘তৃষার মুখ তিনি আর দেখতে চান না!; -মাঝেমাঝে তিনি এ কথা মনেমনে আউরে নেন।
তার কাছে দ্বিতীয় ছেলে রুদ্র হচ্ছে ‘হতাশা’। ছেলেটা শুধু ভবঘুরে টাইপের নয়, স্বপ্নবিমুখ মানুষও। কোনকিছুতেই ওর যেন আকর্ষণ নেই। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টাও নেই। সারাদিন টই-টই করে ঘুরে বেড়ায়। মেধাবী ছাত্র ছিল কিন্তু একটা চাকুরি জুটিয়ে নিতে পারছে না। টিউশুনি আর এটা-ওটা করে নিজের পকেটের খরচ যোগায়। সংসারে যে ওর অবদান রাখা দরকার, এটা যেন ওর ধারনা নেই। কথা বলে কম, প্রশ্ন করলে জবাব দিতে চায় না। অর্থনীতিতে মাষ্টার্স করেছে ও তিনবছর হলো। এখন ওর পরিচয়-শিক্ষিত বেকার। এমন ছেলেকে নিয়ে আজকাল গর্ব করা যায় না। তবে রুদ্র’র প্রতি মিহিন একটা মমত্ববোধ তার আছে। এ সব কথা যখন বারান্দার ইজি চেয়ারে ভাবছিলেন তিনি, এ সময়ে বাড়ির উঠোনে প্রবেশ করলো রুদ্র।
‘কে, রুদ্র এলি?’
জানতে চাইলেন রাশেদুল হক। এক চিলতে উঠোন পেরিয়ে রুদ্র বাসার প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে চেয়ে বলল,
‘বাবা, বারান্দায় বসে আছেন কেন? ঘরে যান। আকাশে মেঘ জমে আছে। বৃষ্টি নামতে পারে।’
‘আচ্ছা, ঘরে যাচ্ছি। তোর কিছু হলো?’
জানতে চাইলেন তিনি। প্রতিদিন তিনি এ কথা জানতে চান। রুদ্র রাগ করে না। রুদ্র বলল,
‘চেষ্টা করছি, বাবা। ভালো একটা চাকুরি হতে পারে। আমাকে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে হবে হয়তো।’
‘বলিস কি! বিদেশে!’
‘হ্যাঁ, বাবা। আমার এক বন্ধু দারুণ একটা সুযোগ করে দিচ্ছে। আজই পাসপোর্ট করতে দিয়ে আসলাম। জরুরিভাবে পাসপোর্ট হবে। এরপর ভিসা প্রসেস করবে ও।’
‘এতো বড় সু-সংবাদ!’
‘সু-সংবাদ আর কি? দেশ ছাড়তে হবে যে!’
রুদ্র মন খারাপ করে কথাটা বলল। রাশেদুল হক ছেলেকে সান্ত¦না দেয়ার কণ্ঠে বললেন,
‘লক্ষ লক্ষ লোক দেশ ছেড়েছে। এখনও ছাড়ছে কত! এরমধ্যে তুইও একজন।’
‘তা ঠিক, বাবা। তবে কখনও দেশ ছাড়তে হবে, ভাবিনি।’
‘দেশে যখন চাকুরি পেলি না, তখন বিদেশ যাবার সুযোগ ছাড়বি কেন? তুই ভুল করছিস না।’
‘সেটা আমিও জানি, বাবা। আমার কাছে তো এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে হচ্ছে।এখন দেখা যাক, কী হয়।’
বলল রুদ্র। রাশেদুল হকের মনে স্বস্তি ও আনন্দের স্রোত বইছে।
‘কেন, সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে!’
উদ্বেগ প্রকাশ পেল রাশেদুল হকের কণ্ঠে। রুদ্র বলল,
‘সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যেতেও পারে, বাবা। আমি একটা কাজের দায়িত্ব পেয়েছি। কাজটায় সফল হলেই সুযোগটা পবো।’
‘ওহ, আচ্ছা!’
রুদ্র’র চাকুরি পাবার সংবাদে আনন্দ পেলেও রাশেদুল হকের মনের ভেতরে ফের অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধলো। তিনি মনে মনে ভাবলেন রুদ্র’র ভাগ্য কি সুপ্রসন্ন হবে? রুদ্র’র কথায় তার চিন্তায় ছেদ কাটলো।
‘বাবা, আজ গ্রীনরোডে তৃষার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’
তৃষার নাম শুনে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মেয়ের প্রতি এতো রাগ পুষে রেখেছেন, অথচ নামটা শোনামাত্র কেমন মোমের মতো গলে যাচ্ছেন। তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন,
‘ও কেমন আছে? বলেছে কিছু?’
‘দেখে মনে হয়নি খুব ভালো আছে।’
‘কেন?’
‘তা-তো জিজ্ঞেস করিনি ওকে। গ্রীনরোড এলাকায় এক ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ওর সঙ্গে দেখা হলো। ওর স্বামীকে দেখলাম না। আমাকে দেখে ও খুব কাঁদলো, বাবা।’
রাশেদুল হক কিছু বললেন না। কিন্তু আশা করছেন রুদ্র তৃষাকে নিয়ে আরো কিছু কথা বলুক। রুদ্র একটু থেমে বলল,
‘বাবা, আমার মনে হয় তৃষা ভালো নেই। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ওরা কোথায় থাকে, স্বামী কি করে। ও শুধু কাঁদলো। কিছু বললো না।’
‘শুধু কাঁদলেই হবে! কিছু বললো না কেন? তুই ভালো করে জেনে আসবি না?’
‘আমি ওর ফোন নম্বর নিয়ে এসেছি। পরে কথা বলবো ওর সঙ্গে। আপনি শিশির দা’র সঙ্গে কথা বলেন। দাদা’র রাগ কমলে আমরা তৃষাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে পারি। ও কিছুদিন নাহয় থাকুক আমাদের সঙ্গে।’
রুদ্র’র কথাকে মনে মনে সমর্থন করলেন তিনি। তবে মুখে কিছু বললেন না। রুদ্র মনে পাষাণ বেঁধে রাখতে পারে না। ও রাগ করে, তবে রাগ বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনা। তৃষার সঙ্গে দেখা হয়েছে এবং রাগ ভুলে ছোট বোনের সঙ্গে কথাও বলেছে রুদ্র। শিশির হলো তা করতো না। বরং তৃষাকে চোখ রাঙিয়ে কঠিন কথা বলে ফেলতো। তৃষার কথা ভেবে রাশেদুল হক একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। রুদ্র তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। ও একটা জবাব আশা করছে। রাশেদুল হক রুদ্রকে বললেন,
‘শিশিরকে এখনই এ কথা বলা যাবে না! আরো কিছুদিন যাক।’
‘আচ্ছা।’
বলে রুদ্র ঘরে প্রবেশ করলো। রাশেদুল হক বিষন্ন কাতর অনুভূতি নিয়ে ইজি চেয়ারে থ’ হয়ে বসে রইলেন। রুদ্র বিদেশে চাকুরি পাওয়ার আনন্দ সংবাদের চেয়ে তৃষার কথা শুনে একতাল বেদনা ছাপিয়ে যাচ্ছে তার বুকের ভেতরে। হু-হু এক বোবা কান্নাও ঝড়ের মতো বইছে। পিতা হলে কত অসহনীয় যন্ত্রণা চেপে রাখতে হয়!

তিন.
কিছু লোক আছে, কারণে-আকারণে নিজেকে রহস্যময় করে তুলতে পছন্দ করে। মায়ার সামনে যে লোকটি মুখে বোকা-বোকা হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে এরকম একটি লোক। এমন কিছু লোক আছে, যাদের মুখের দিকে তাকালে চালাক-চতুর মনে তো হয়ই না, উল্টো বোকা বলে ঠাউর হয়। ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই যুবকটি সে রকম একজন। যুবকটির মুখ একটু লম্বাটে এবং মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফ। গায়ের বর্ণ তামাটে। যুবকের পায়ে নাগড়া স্যান্ডেল, গায়ে জিন্স প্যান্ট ও খদ্দরের পাঞ্জাবী। পাঞ্জাবীর উপরে হাতকাটা ফতুয়া। মাথার বাবরি চুলগুলো এলোমেলো। ভবঘুরে বা দার্শনিক টাইপের লোক হবে হয়তো। তরুণ বয়সেই কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে যেন। আজকাল কেয়ারলেস থাকাটাও যেন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে-যুবকের অবয়ব বিবেচনা করে কথাটা ভেবে নিল মায়া। যুবকটিকে চেনে না ও। চারুকলার বকুল তলায় যুবককে দেখে ও অবাক হয়েছে। কিন্তু আঁকিয়ে যে নয়, এটা নিশ্চিত মায়া। আঁকিয়ে হলে অর্থাৎ ফাইন আর্টস-এর ছাত্র হলে অথবা তরুণ শিক্ষিক হলেও মায়া বুঝতে পারতো। যুবকটির চাল-চলনে তা বোঝা যাচ্ছে না।
তার কাঁধে বড় সাইজের একটা ক্যামেরা ঝুলছে। যুবকটির কাছে রঙতুলি-ক্যানভ্যাস নেই। ক্যামেরা নিয়ে যুবকটি বকুল তলায় কেন-ভেবে পেল না ও। ক্লাস চলাকালে এই রহস্যময় যুবক বকুলতলায় কেন?
মায়া বকুলতলায় বসেছিল ক্লাসে যাবার আগে। ওর হাতে ছিল ছোট্ট আকারের পিতলের ডাইনেসর। ওটা ও কাল উপহার পেয়েছিল বান্ধবী নায়নার কাছ থেকে। পিতলের ডাইনেসরটা দেখতে খুব সুন্দর। নায়নার বাবা ইউরোপ থেকে নিয়ে এসেছিল ওটি। নায়না কাল ওকে ডায়নেসরটি উপহার হিসাবে দিয়েছে। ক্লাস শুরুর আগে ডায়নেসরটি ওখানে রেখে এসেছিল মায়া। বকুল তলায় যেখানে বসেছিল সেখানে ঘাসের ওপর একটু খোঁজাখুঁজি করতেই ডায়নেসরটি পেয়ে গেল ও। ডানেসরটি পেয়ে চাপা আনন্দে ওখানে শরতের মধ্য দুপুর ঝিম মেরে বসেছিল ও। বকুলতলায় এ সময়টায় সাধারণত কেউ থাকে না। নির্জন বকুলতলায় নৈঃশব্দময় একতাল উদাসীনতা রঙ ছড়িয়েছিল। মায়া এক ধরনের তন্ময়তায় ডুবেও গিয়েছিল। একা আনমনে ও দাঁড়িয়ে ভাবছিল। বকুলতলায় দাঁড়িয়ে ক্লাসমগ্ন চারুকলা ভবনকে মায়ারর মনে হচ্ছিলো ধ্যানমগ্ন ঋষির মত। বাইরে পরিপাটি নিস্তব্ধতা, ভেতরে তপস্যার ব্যাপক আয়োজন। ঝাঁঝালো দুপুরে খানিকটা উদাস হয়ে গিয়েছিল মায়া। ওর উদাসীনতা ভেঙে দেয় ঐ যুবক। যুবকটি বকুল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। এতোক্ষণ মায়া লক্ষ্য করেনি। ওর চোখে চোখ পড়তেই এক গাল হেসে গাছের আড়াল থেকে সামনে এগিয়ে এলো যুবক। তার মুখে নির্লজ্জ টাইপ হাসি। অবাক চোখ তুলে মায়া যুবকোর কাছে জানতে চাইলে,
‘কে আপনি? এখানে কেন!’
‘কেন এখানে আসতে নেই বুঝি?’
যুবক পাল্টা প্রশ্ন করে। মায়ার গলা জোরালো হয়,
‘কে আপনি? আর্ট কলেজের ছাত্র যে নন, সেটা তো বুঝতে পারছি।’
‘তো?’
‘তাইতো জানতে চাচ্ছি আপনি এখানে কেন? এ সময়ে এখানে কেউ তো আসে না!’
‘আমি তো এসেছি। আমি যখন যেখানে ইচ্ছা যেতে পারি। আপনি অতো অবাক হচ্ছেন কেন?’
‘অবাক হবার মতই তো ঘটনা। আপনার নাম কি?’
জানতে চাইলো মায়া। ওর এ প্রশ্নে যুবকটি একগাল হেসে বললো,
‘আমার নাম লিওনার্দো ভিঞ্চি’।
কথাটা বিদ্রুপ বা কটাক্ষ মিশ্রিত মনে হলো মায়ার। ফাইন আর্টস-এর ক্যাম্পসে এসে অনেকে নিজেকে লিওনার্দো ভিঞ্চি বলে দাবি করতে পারে। এটা এক ধরনের রসিকতা। যুবকটিও তাই করছে। মায়া একটু বিরক্ত হলো। ক্লাস চলাকালে বকুলতলায় বহিরাগত কাউকে খুব একটা দেখা যায় না। যুবকটি প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়েছে হয়তো। মায়া যুবকটির সঙ্গে আর কথা না বলে পা বাড়াতেই সে তড়িঘড়ি করে বলল,
‘আমার নাম শুনে মনে হয়, আপনি বিরক্ত হলেন? নামটা যে আমার, বিশ্বাস হয়নি?’
‘আমার বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নিয়ে কী হবে? আমি আর আপনার সঙ্গে কথা বাড়াতে চাই না।’
‘কেন?’
‘আশ্চার্য! আপনাকে আমি চিনি না, জানি না। আমার সঙ্গে কথা বলবো কেন?’
‘এতোক্ষণ যে বললেন! নাম জানতে চাইলেন। নাম জানার পর বলছেন, আমার সঙ্গে আর কথা বলতে চান না। আমার কোন আচরণে আপনি কি কষ্ট পেয়েছেন?’
অপ্রত্যাশিত এক অস্থস্থিতে পড়ে গেল মায়া। ও একটু বিব্রত হলো। যুবকটির সঙ্গে ওর আর কী বলার আছে? বকুল তলায় তাকে দেখে কৌতুহল হয়েছিল, তাই কথা বলেছে। তার সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ কি? মায়া বলল,
‘দেখুন, আপনার সঙ্গে আমার কথা বলার কী আছে? এখানে আপনাকে কখনও দেখিনি,তাই কৌতুহলবশত আপনার নাম-পরিচয় জানতে চেয়েছি। স্রেফ কৌতুহল। আপনার কোন কথা বা আচরণে আমি কেন কষ্ট পাবো? এবার হলো!’
‘আপনি কি জানেন, আপনার চেহেরার মধ্যে কতরকম এক্সপ্রেশন আছে? লটস অফ এক্সপ্রেশন!’
যুবকের কথাটা আবোল-তাবোল মনে হলো ওর। ও বলল,
‘দেখুন, আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই আমার। আমার ক্লাস আছে। যাচ্ছি।’
মায়া অবশ্য আজ আর ক্লাস করবে না। ও বেরিয়ে যাবার সময় বকুল তলায় এসেছিল। ওকে যেতে হবে পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে। ওখানে জয়া আসবে। দু’বোন বসুন্ধরা মলে যাবে। কিছু কেনাকাটা করে এরপর বাড়ি ফিরবে। জয়া এসএমএস করে জানিয়েছে, কলাবাগান থেকে ও রওনা দিয়েছে পাবলিক লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে। বকুল তলায় এসে উটকো ঝামেলার মত এই যুবকের পাল্লায় পড়ে গেল ও। মায়া নরোম মনের মানুষ বলে যুবককে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছে না। ও বিদায় নেবার জন্য ক্লাসে যাবার কথাটা বলল। এখন ও সরাসরি গেট দিয়ে না বেরিয়ে ক্লাসের দিকে যাবে। কলাভবনের করিডোরে একটা চক্কর লাগাবে। এরপর গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবে পাবলিক লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে। মায়া লিওনার্দো ভিঞ্চি নামধারী রহস্যময় যুবকের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে ক্লাসের দিকে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। ওর পেছনে যে যুবকটি দাঁড়িয়ে হা করে দেখছে, এটাও কল্পনা করে নিল। চেষ্টা করেও একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ জমাতে না পরার আফসোস নিয়ে যুবকটি নিশ্চয় ওকে যতক্ষণ দেখা যায়, ততক্ষণ তাকিয়ে থাকবে। এমনটাই হয় সাধারণত, জানে মায়া। বারান্দায় উঠে আড়াল হবার আগে কী ভেবে পেছনে তাকালো মায়া। কিন্তু যা কল্পনা করেছিল, তা সঠিক হলো না। যুবকটিকে দেখতে পেল না ও। যুবকটি ওর পেছনে হা করে তাকিয়ে রয়েছে ভেবে, ওর অস্বস্থি হচ্ছিলো। পেছনে তাকিয়ে এখন ওর মন খারাপ হয়ে গেল। যুবকটির উদ্দেশ্যে ও মনে মনে বলল-‘পাগল!’।

রুদ্রকে দেখে লিয়োনার্দো চিৎকার করে উঠলো,
‘রুদ্র! তুই, এখানে! কী কো-ইনসিডেন্ট!’
রুদ্র দাঁড়িয়ে রয়েছে পাবলিক লাইব্রেরীর প্রধান ফটকের সামনে। ও অপেক্ষা করছে পিয়ালের জন্য। ওকে একটা এসাইনম্যান্ট দিয়েছে পিয়াল। বিদঘুটে এসাইনম্যান্ট এটি। তবু ওকে এই এসাইনম্যান্টা করতে হবে। এসাইনম্যান্টা সফলভাবে শেষ করতে পারলে, ওর একটা চাকুরি হবে। ভালো বেতনের চাকুরি। কাজটা একটু চ্যালেঞ্জিং। ঝুঁকিও আছে। বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ও দিতে হবে। খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজটা করতে হবে। একটা ভাল চাকুরির জন্য ও চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছে। অনেকদিন পর লিয়োনার্দোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আজ। রুদ্র একটু ভাবুলতার মধ্যে ছিল। লিয়োনার্দো ওর সামনে এগিয়ে এসে বলল,
‘কীরে, চিনতে পারছিন না! তাকিয়ে আছিস, কথা বলছিস না কেন?’
রুদ্র সম্বিত ফিরে পায়। আজকাল ওর মধ্যে এক ধরনের অন্যমনষ্কতা ছড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে দৃশ্যমান যা, তা যেন মিলিয়ে যায়। নিজের ভেতরে চিন্তাস্রোতে ভেসে যায়। ও লজ্জিত মুখে বলে,
‘সরি, লিয়োনার্দো, তোকে অনেকদিন পর দেখে অবাক হয়ে ভাবছিলাম।’
‘কী ভাবছিলি?’
‘না, মানে, তোর সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ নেই। তোকে লাষ্ট কল করেছিলাম দু’মাস আগে। সুইচ অফ ছিল। এর আগেও বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলাম।’
‘আরে, আমাকে পাবি কীভাবে? আমি তো বাংলাদেশে ছিলাম না।’
‘তাই নাকি? কোথায় ছিলি?’
অবাক হয়ে জানতে চায় রুদ্র। লিয়োনার্দো এক টুকরো হাসি বিলিয়ে বলে,
‘ভারতে ছিলাম। পুনাতে একটা কোর্স করে ফিরেছি।’
‘কীসের কোর্স?’
‘চলচ্চিত্রের কোর্স। সে কথা পরে বিস্তারিত বলবো তোকে। চল আমার সঙ্গে, ধানমণ্ডি যাবো। আামরা একসঙ্গে লাঞ্চ করবো। তখন তোকে বিস্তারিত বলবো-কী শিখে এসেছি পুনা থেকে।’
‘নারে, আমি যেতে পারবো না। আমি একটা জরুরি কাজে এখানে এসেছি।’
‘কী অমন জরুরি কাজ?’
‘পিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছি। তুই পিয়ালকে চিনিস না?’
‘কোন পিয়াল? আমাদের ডিপার্টম্যান্টে ছিল না? ঐ যে ধনীর দুলাল পিয়াল!’
‘হুম। এইতো চিনেছিস। ওর জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘তো? ফোন করে ওকে বলে দে, আমার সঙ্গে চলে যাচ্ছিস। তোর সঙ্গে এতোদিন পর দেখা হলো..!’
‘শোন, আরেকদিন তোর সঙ্গে আড্ডা দেব? টেলিফোন নম্বর দে। তোকে কালই কল দেব।’
বলল রুদ্র। লিয়োনার্দো নিজের মানিব্যাগ বের করে একটা বিজনেস কার্ড বাড়িয়ে দিল রুদ্রকে। রুদ্র কার্ডটি নিয়ে চোখ বুলালো। একটা এডফার্মের কর্ণধার ও। রুদ্র কার্ডটি পকেটে রেখে বলল,
‘শোন, পিয়ালের বিয়ে হবে শিগগীর। ও আসছে। তুই কি অপেক্ষা করবি? ওর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে..।’
‘না, না। আজ নয়। আমাকে যেতে হবে ধানমণ্ডি। একটা কাজের চুক্তি হবে লাঞ্চ আওয়ারে। তুই পিয়ালকে বলিস আমার কথা। বিয়েতে যেন নিমন্ত্রণ করতে ভুলে না যায়!’
‘বলব।’
প্রশ্নবোধক দৃষ্টি রেখে লিেেয়ানার্দো জানতে চাইলো,
‘আচ্ছা, কাকে বিয়ে করছে ও? ওর না মারিয়ার সঙ্গে প্রেম ছিল?’
জবাবে স্মিত হেসে রুদ্র বলল,
‘আরে, মারিয়া-ফারিয়া কত মেয়েই তো পিয়ালদের জীবনে আসে। ধনীর দুলাল বলে কথা!’
‘তা ঠিক। তো কাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে ও? আমাদের পরিচিত কেউ?’
‘না, না। আমিও ঠিক চিনি না। শুধু বলেছে-একটি মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ের কথা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। পারিবারিকভাবে সেটা হয়েছে। আমার ওপর একটা দায়িত্বও দিয়েছে।’
‘কী সেটা?’
‘তেমন কঠিন কিছু না। মেয়েটিকে কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মেয়েটি কোথায় যায়, কারো সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে কিনা, স্বভাব চরিত্র কেমন..ইত্যাদি ইত্যাদি।’
এ কথা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল লিয়োনার্দো। রুদ্রও মুচকি হাসলো। লিয়োনার্দো বলল,
‘আরে, তুই তো দেখছি মেয়ে বিশারদ হয়ে গেছিস!’
‘লিয়োনার্দো..! বাজে কথা বলবি না!’
‘বাজে কথা নয়। তোর কাজটা সম্পর্কে ইতিবাচক একটা মন্তব্য করলাম। আচ্ছা, তুই যেটা করবি, সে কাজটার কথা এক কথায় কী বলবি? বল আমাকে।’
‘কেন, প্রাইভেট ডিটেক্টিভ!’
‘আচ্ছা, যা মানলাম। তা গোয়েন্দা মহাশয়, মেয়েটি যদি তোকে ধরে ফেলে এবং তোর কাছে জানতে চায়-পিয়ালের স্বভাব চরিত্র কেমন?’
এ কথায় রুদ্র হাসলো। ও বলল,
‘সে সুযোগ নেই,বন্ধু। আমি গোয়েন্দাগিরি করবো কৌশলে। মেয়েটি যেন কিছু বুঝতে না পারে-সে দিকে লক্ষ্য থাকবে। এরপরও যদি ধরা পড়ে যাই এবং মেয়েটি পিয়াল সম্পর্কে আমার কাছে কিছু জানতে চায়-মুখে কুলুপ এঁটে থাকবো। বন্ধুর স্বার্থ বলে কথা!’
‘হা হা হা। পাপ-পূণ্যের হিসাব এবং বিচার কাজ সত্যি হলে তুই কিন্তু পরকালে আটকে যাবি, বন্ধু! কথাটা মনে রাখিস!’
‘বন্ধু, ইহকালে যেভাবে বেঁচে আছি, এটা কি কম যন্ত্রণার? এখনও একটা চাকুরি পাইনি। সমনে শুধু সম্ভাবনাই ঝুলে আছে! এখনও বাপের হোটেলে খাচ্ছি। বন্ধুদের কাছে তো দৌড়ঝাঁপ কম করলাম না! পরকালের কথা ভেবে কী হবে?’
জবাব দিল রুদ্র। লিয়োনার্দো কয়েকসেকেণ্ড ভেবে বলল,
‘ঠিক আছে, তুই আমার সঙ্গে কাজ করতে পারিস। আপাতত বিজ্ঞাপন তৈরি করবো আমরা। এরপর চলচ্চিত্র বানাবো। তুই ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসাবে যোগ দে আমার প্রতিষ্ঠানে।’
‘হা-হা-হা।’
‘হাসছিস যে! একমুহুর্ত ভাবিনি। তোকে চাকুরির অফার করলাম। আর তুই হাসছিস?’
‘ঠিক আছে, তোর প্রস্তাবটা ভেবে দেখব। তবে আপতত: পিয়ালের কাজটা করি। ওটা করতে পারলে একটা সুবর্ণ সুযোগ পাবো আমি!’
‘যেমন?;
‘পিয়াল বলেছে ওদের বাইং হাউজে আমাকে চাকুরি দেবে। খুব শগিগীরই চাকুরিটা পাবো। ওদের লন্ডনের অফিসেও আমার পোষ্টিং হতে পারে।’
‘তাই বল! সেটা হলে ভালই হবে।’
‘হুম, বন্ধু। চোখের সামনে এই আশাটাই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে!’
‘ঠিক আছে, দেখ। না হলে, আমার সঙ্গে কাজ করতে পারিস। প্রথমে ভাল বেতন দিতে পারব না। প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেলে তোকে ঈর্ষণীয় বেতন দিতে পারব। এটাও ভেবে দেখ, দেশে থাকবি, নাকি বিদেশে চলে যাবি।’
ঊলল লিয়োনার্দো। রুদ্র হাসিমুখে জবাব দিল,
‘ভাববো, বন্ধু।’
‘ঠিক আছে, আমি তাহলে বিদায় নিচ্ছি।’
‘যা, ভাল থাকিস।’
‘কাল ফোন দিস।’
‘দেব। গোয়েন্দাগিরির কাজটা আগে গুরুত্ব পাবে। এরপর তোর সঙ্গে দেখা করব।’
দু’বন্ধু হাতে হাত মিলালো। লিয়োনার্দো হেঁটে এগিয়ে গেল। শাহবাগে মানুষের স্রোতে খুব দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া যায়। ও মিলিয়ে গেল। রুদ্রর মনটা আবেশিত হয়ে রইলো। অনেকদিন পর লিয়োনার্দো’র সঙ্গে দেখা হলো ওর। অনেক কথা জানা হলো। লিয়োনার্দো একটা চাকুরির অফারও দিয়ে গেল। দিনটি শুভ বার্তায় পূর্ণ যেন। আজ থেকে পিয়ালের হবু স্ত্রীকে অনুসরণ করবে ও। মনে মনে কথাটা ভেবে নিল।
পিয়াল যে কোন সময় এখানে চলে আসবে। ওর হবু স্ত্রী’কে সঙ্গে নিয়ে আসবে বলে ফোনে বলেছিল। ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে আজ। এরপর থেকে ওর কাজ হবে মেয়েটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। মেয়েটি প্রতি শুক্রবার ছায়ানটে যায়। ওখানেও যেতে হবে। লক্ষ্য করতে হবে মেয়েটি কার বা কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে। এ কাজটি ওকে করতে হবে গোপনীয়তা রক্ষা করে। গোপনীয়তা রক্ষা করা কাজের অন্যতম শর্ত। রুদ্র এটাকে ভাগ্য বদলানোর বাজি হিসাবে নিয়েছে। ভাগ্যটাকে ওর বদলাতেই হবে। একটা সুবর্ণ সুযোগ ওর জীবনে এসেছে!

চার.
আজকের দুপুরটা যেন রহস্য সৃষ্টি করতে কলকাঠি নাড়ছে। এক রহস্য থেকে বের হতেই আরেক রহস্যের মুখোমুখি। মায়া অবাক চোখে দেখছিল রুদ্র আর ঐ যুবককে, অর্থাৎ লিয়োনার্দো ভিঞ্চিকে। চারুকলা ভবন থেকে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীর দিকে হেঁটে আসছিল ও। কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীর গেটের কাছাকাছি আসতেই ও দেখতে পেল রুদ্র ও লিয়োনার্দো ভিঞ্চি কথা বলছে। বিস্ময়ের ধাক্কা এসে লাগে। রুদ্রকে দেখে চিনতে কষ্ট হয়নি ওর। কিন্তু বুঝতে পারছিল না রুদ্র আর লিয়োনার্দোর মধ্যে সম্পর্ক কী। তাদের মধ্যে যে সখ্যতা আছে-ওটা কথা বলার ধরন দেখেই বোঝা যায়। রুদ্রকে মায়া একদিনই দেখেছে। দু’সপ্তাহ আগে ঈদের দিন রুদ্র ওদের বাসায় গিয়েছিল জয়াকে হুঁশিয়ার করতে। শাকিল নামে রুদ্র’র এক বন্ধু জয়াকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে চাইছিল-এমন একটা গল্প বলেছে সে। গল্পটা সত্য কিনা কে জানে। মিথ্যাও হতে পারে। মিথ্যা গল্প ফেঁদে রুদ্র জয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারে-প্রথমে ভেবেছিল মায়া। পরে এই ধারনাটা ভিত্তি পায়নি। রুদ্র গত দু’সপ্তাহে জয়াকে একবারও ফোন করেনি। রুদ্রকে জয়া ওর সেলফোন নম্বর দিয়েছিল। রুদ্র’র সেলফোন নম্বরও রেখেছিল জয়া। কয়েকদিন আগে রুদ্রকে জয়া ফোন করেছিল। নম্বরটি সঠিক ছিল না। অন্য একজন মহিলা ফোন ধরে জয়াকে বিরক্তকণ্ঠে বলেছিল-
‘রং নম্বর!’
জয়া আরো কয়েকবার ফোন করেছিল। একই কণ্ঠের একই জবাব পেয়েছিল ও। এরপর মায়ার মনের সন্দেহটা মিলিয়ে গিয়েছিল। এখন রুদ্র আর লিয়োনার্দো’র কথা বলা দেখে ওর মনে অন্য একটি সন্দেহ উঁকি দিয়েছে। রুদ্রই কি লিয়োনার্দোকে পাঠিয়েছে ওর কাছে? এর পেছনে কি কোন উদ্দেশ্য আছে? থাকলে কী উেেদ্দশ্য থাকতে পারে? রুদ্র কি মায়াকে টার্গেট করেছে? লিয়োনার্দো ভিঞ্চি পরিচয়ের লোকটি কি ছদ্মনামে মায়ার কাছে গিয়েছিল? এর পেছনে কি রুদ্র’র হাত আছে? কয়েক মুহুর্তে প্রশ্নগুলো মায়ার মনে পেখম ছড়ালো। ও ভাবতে লাগলো। রুদ্র আসলে কে এবং কী উদ্দেশ্যে ওদের বাসায় গিয়েছিল?
শরতের ভরদুপুর মায়ার সামনে যে রহস্য সৃষ্টি করুক-এই রহস্য উদঘাটন করে ছাড়বে ও। নিজের ভেতরে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ টের পায় মায়া। লিয়োনার্দো ভিঞ্চি চলে যাবার পর মায়া মৃদু পায়ে রুদ্র’র পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। হঠাৎ রুদ্র’র সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে এমন ভাব মুখে ফুটিয়ে ও বলল,
‘আরে আপনি রুদ্র না? কেমন আছেন?’
প্রশ্নটায় একটু চমকে গেল রুদ্র। ঘাড়টা ডানপাশে ঘুরাতেই দেখতে পেল মায়াকে। লাইটপোষ্টের উজ্জ্বল আলোটা ওর চোখে-মুখে এসে হামলে পড়লো যেন। ও হচকিয়ে বলল,
‘আপনি? এখানে?’
হাসলো মায়া। হাসিটা মিষ্টি দেখালে এর আড়ালে রহস্যের অদৃশ্যমান ঘুর্ণন। ও বলল,
‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যে? কারো জন্য অপেক্ষা করছেন বুঝি?’
‘হা্যাঁ। অপেক্ষা করছি। আপনি?’
‘আমি অপেক্ষা করতে এলাম মাত্র।’
‘ওহ। কার জন্য অপেক্ষা করবেন?’
প্রশ্নটা করার পর রুদ্রর মনে হলো এটা ঠিক হলো কিনা। একদিনের পরিচিত এক তরুণীর কাছে জানতে চাওয়া যায় না-কার জন্য অপেক্ষা করবেন। মায়া সহজভাবে নিয়েছে বোধ হয়। ও বলল,
‘জয়া আসবে। ওর জন্য অপেক্ষা করবো। আপনি?’
‘আমি আমার এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি। ও যে কোন সময় চলে আসবে।’
‘ওহ, আচ্ছা! আপনার বুঝি অনেক বন্ধু!’
প্রশ্নটায় সামান্য শ্লেষ ছিল কি? রুদ্র ডানদিকে ঘুরে মায়ার মুখোমুখি হলো। বলল,
‘এ কথা কেন বললেন? আমার বন্ধুর তালিকা জেনে কী হবে আপনার?’
‘না, এমনিই জানতে চাইছি। কারণ তো একটা আছেই।’
‘যেমন?’
‘যেমন একদিন আমাদের বাড়িতে এলেন এক বন্ধুর নাম করে। কী নাম ছিল-শাকিল, তাইনা? কিছুক্ষণ আগে দেখলাম আরেক বন্ধুর সঙ্গে কথা বললেন। ফের বলছেন এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছেন।’
‘আচ্ছা, আপনি তাহলে লিয়োনার্দো’র সঙ্গে কথা বলতে দেখেছেন।’
‘তার নাম সত্যিসত্যি লিয়োনার্দো ভিঞ্চি?’
জানতে চাইলো মায়া। ওর কৌতুহলী চোখের দিকে চোখ রেখে রুদ্র স্মিত হেসে বলল,
‘ওর ডাক নাম লিয়োনার্দো। ভিঞ্চিটা ও রসিকতা করে ডাক নামের সঙ্গে মাঝেমাঝে জুড়ে দেয়।’
‘আচ্ছা!’
‘হুম। আপনি ওকে চেনেন নাকি?’
‘না। আজই তাকে দেখলাম। চারুকলা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। আমার সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলার চেষ্টাও করেছেন। নিজের নাম বললেন-লিয়োনার্দো ভিঞ্চি। আমার মনে হয়েছিল নামটা মিথ্যা। এখন মনে হচ্ছে সঠিক নামই বলেছিলেন।’
‘ঐ ভিঞ্চিটা বাদ দিলেই হয়। লিয়োনার্দো ঠিক আছে।’
‘তা আপনার বন্ধু কী করেন? প্রাইভেট ডিটেকটিভ নন তো?’
কথাটা শুনে রুদ্রর বুকের ভেতরটা ধরাস করে উঠলো। ও মায়ার মুখে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি ফেললো। শুকনো কণ্ঠে বললো,
‘না, না। ও ডিটিকটিভ হতে যাবে কেন? ও ফিল্মমেকার।’
‘ফিল্মমেকার! বলেন কি!’
‘না, মানে। এখনও কোন ফিল্ম বানায়নি। বানাবে। ওসব কথাই বলে গেল।’
‘যাক, আশ্বস্থ হলাম।’
বলল মায়া। রুদ্র জানতে চাইলো,
‘কেন আশ্বস্ত হলেন?’
‘না, তার আচরণে ভড়কে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, গুপ্তচর হবে হয়তো। পরে যখন তাকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে দেখলাম, তখন সন্দেহটা বেড়ে গিয়েছিল। আপনি যখন বললেন, তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা সন্দেহটা দূর হয়ে গেল।’
‘তাই বলুন।’
‘এবার আপনার কথা বলুন তো!’
‘আমার আবার কী কথা? কী জানতে চান বলুন।’
‘আপনি যে ঈদের দিন বলে গেলেন জয়াকে ফোন দিয়ে আপনার বন্ধু শাকিলের কথা জানাবেন। তাও তো জানাননি। জয়া আশা করেছিল আপনি ওকে ফোন করবেন।’
‘আমি আসলে পরে ভাবলাম, অতোটা জড়ানোর কী আছে। জয়াকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছি। আমার এরবেশি কিছু করার নেই। তাই আপনার বোনকে আর ফোন দেইনি।’
কৈফিয়ত দিল রুদ্র। দৃস্টি অন্যত্র সরিয়ে কথাটা বলল ও। এরপর তাকালো মায়ার দিকে। মায়ার মুখে কেমন হাসির ঝিলিক। মায়া বলল,
‘কিন্তু জয়া আপনাকে ফোন করেছিল। একবার নয়, কয়েকবার।’
‘তাই নাকি! কেন?’
‘ওর প্রয়োজন ছিল তাই ফোন করেছিল। কিন্তু..!’
‘আমি জানি, ওই ফোন নম্বরে ফোন করে থাকলে আমাকে পায়নি।’
‘হুম। ওটা রং নম্বর ছিল। আপনি ইচ্ছে করে ভুল নম্বর দিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন, বলুন তো! আপনাকে দেখে কিন্তু..!’
‘আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি সেদিন আপনাদের চাপে পড়ে ফোন নম্বর দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। উপায় না পেয়ে ভুল নম্বর দিয়েছি।’
‘জানেন, জয়া আপনাকে কতটা বিশ্বাস করেছিল? ও একবারও আপনার সামনে ফোন নম্বরটা সঠিক কিনা পরীক্ষা করে দেখেনি। আমি হলে কিন্তু পরীক্ষা করতাম। ওর সঙ্গে আমার এখানে বিরাট ফারাক। আমি সহজে বা চট করে কাউকে বিশ্বাস করে ফেলতে পারি না। ও পারে।’
কথাটা শুনে রুদ্র অপরাধ বোধে অস্বস্থিতে পড়ে গেল। মায়ার সামনে হঠাৎ করে ও চুপসে যায়। সেদিন ও বুঝতে পারেনি জয়া বা মায়ার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যেতে পারে। ওর মনে হয়েছিল ওদের সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না। কিন্তু বিধিবাম আজ মায়ার সঙ্গে পথে দেখা হয়ে গেল। মায়া বলল-জয়া আসছে। এরমানে কিছুক্ষণ পর জয়ার সঙ্গেও ওর দেখা হয়ে যেতে পারে। এ কথা ভাবতেই ওর ভেতরে একরাশ লজ্জা সূর্যমুখি ফুলের মতো মাথা তুলে জানান দিল। এখন ও কী বলবে? জয়া কি প্রতারক ভেবে ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে? রুদ্র’র চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘যা হবার হয়েছে। এবার আপনার সঠিক ফোন নম্বরটা আমাকে দিন। চালাকি করবেন না। আমি ফোন নম্বর সঠিক কিনা এখনই চেক করব, বলে রাখছি।’
রুদ্র মৃদু হেসে ওর সেলফোন নম্বর বললো। মায়া সেলফোন নম্বর ওর সেলফোনে সংরক্ষণ করে নিল। ও কল দিয়ে পরখ করে নিল না দেখে রুদ্র বলল,
‘পরীক্ষা করলেন না যে! আমি এবারও তো ভুল নম্বর দিতে পারি।’
এর জবাবে মায়া বলল,
‘অতোটা কপট আপনি নন। আমি জানি, আপনি সঠিক নম্বরই দিয়েছেন।’
‘কেন এমন বিশ্বাসের জন্ম হলো?’
জানতে চাইলো রুদ্র। স্মিত হেসে মায়া বলল,
‘মানুষের চোখ হচ্ছে মনের ছবি দেখার আয়না। আপনার চোখের দৃষ্টি দেখে আমি বুঝতে পেরেছি।’
‘বাহ! আপনার অন্তরদৃষ্টি দেখছি প্রখর!’
মায়া মিষ্টি করে হাসলো। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো এর মধ্যে ওদের সামনে এসে একটা মার্সিডিজ ভ্যান থামলো। গাড়িটা পিয়ালের। রুদ্র অবাক হলো না। পিয়াল ওকে বলেছিল কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীর গেটের সামনে অপেক্ষা করতে। যথাস্থানেই ওর গাড়ি এসেছে। গাড়িটার দু’পাশের দরোজা খুলে নেমে এলো পিয়াল এবং জয়া। বিস্ময়ের যদি কালবৈশাখী ঝড় ধরে নেয়া যায়, তাহলে রুদ্র এই মুহুর্তে ঐ কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে। ঝড়টা ওকে এক মুহুর্তে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পিয়াল ও জয়া ওদের সামনে আসতে যতটা ক্ষণ ব্যয় করলো, ততটা ক্ষণকে রুদ্রর মনে হচ্ছিলো থ’ হয়ে থাকা কালান্তর। পিয়াল রুদ্রর সামনে এসে বলল,
‘কীরে. অমন হা করে আছিস যে! মূর্তি হয়ে গেলি নাকি!’
মায়ার হাসির রিনরিনে শব্দ রুদ্র’র অনুভূতিতে রিমঝিম বৃষ্টির মত লাগল। ধাতস্থ হতে এমন হাসি যথেষ্ট। পিয়াল ফের বলল,
‘তোর সঙ্গে মায়া কথা বলছিল। ওকে তুই চিনতিস নাকি?’
জবাবটা দিল মায়া। ও বলল,
‘চিনব না কেন? আমরা তো ছবির হাটে মাঝেমাঝে আড্ডা মারি। শুধু জানতাম না তিনি আপনার বন্ধু।’
এক সরল মিথ্যা। এই মিথ্যা কথাটা ভাল লাগল রুদ্রর। এ সময়ে এরচেয়ে সহজ জবাব আর কী হতে পারে? সত্য কথা বললে, অনেক কথার অবতারনা করতে হতো। বরং এমন মিথ্যা কথায় ক্ষতির কারণ নেই। কখনও কাউকে কৈফিয়ত দেয়ারও কিছু নেই। রুদ্র মনে মনে মায়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। জয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মায়ার পাশে। কেমন অন্যমনস্ক লাগছে জয়াকে। পিয়াল হাসিমুখে জয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘জয়া, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি-আমার বন্ধু রুদ্র। আর রুদ্র, এই হচ্ছে জয়া। যার কথা তোকে বলেছি।’
রুদ্র জয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘হাই।’
জয়া কুশল বিনিময় করতে কোন শব্দ ব্যবহার করলো না। এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে রাখলো মুখে। রুদ্র পিয়ালের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আমরা কি কোথাও বসতে পারি?’
‘না, রুদ্র। আমাকে গুলশানে যেতে হবে। আমি এখুনি চলে যাবো। তুই কিছুক্ষণ ওদের সঙ্গে থাক। গল্প কর।’
‘আচ্ছা।’
পিয়াল জয়া ও মায়াকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতে বললো,
‘আমি যাচ্ছি। পরে আবার দেখা হবে। কথা হবে ফোনে। রুদ্র রইলো তোমাদের সঙ্গে।’
জয়া বলল,
‘আচ্ছা।’
পিয়াল দ্রুত ওর গাড়িতে গিয়ে বসলো। গাড়িটি উল্টোমুখি হয়ে শাহবাগ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকলো। রুদ্রর বুক ঢিবঢিব করছে। ওর সামনে হাজার পাওয়ারের দুটি আলোর বাতি ভরদুপুরে জ্বলজ্বল করছে। একজনের মুখে দুষ্টমির হাসি, আরেকজনের মুখে গভীর নির্জনতা। রুদ্র ঈদের দিন জয়ার বাসায় যাওয়ার জন্য মনে মনে নিজেকে নিজে তিরস্কার করলো। শরতের দুপুরের মাধুর্যতা হচ্ছে-থেমে থেমে দমকা হাওয়া নাচন। বাতাসের নাচন আছে, কিন্তু সেটা উপভোগ করতে পারছে না রুদ্র। সঙ্কোচের ঝড় বইছে ওর মনে। জয়ার সামনে ও কেমন গ্লানিবোধ করছে। মায়া চোখের ইশারায় রুদ্রকে দেখিয়ে জয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘তাকে চিনতে পেরেছো, আপু?’
জয়া রুদ্রের মুখের দিকে তাকালো। শান্ত দৃষ্টি অথচ শানিত। দৃষ্টি নয়, যেন আতশকাচ দিয়ে দেখছে ওর ভেতরের সবটা। রুদ্রর ভেতরটা কি একটু কেঁপে উঠলো? ওর চোখের দৃষ্টিতে কি অপরাধ বোধ ফুটে আছে? ভাবে রুদ্র। মায়া ফের বলল,
‘আরে, যাকে তুমি ফোন করে পাওনি। মিঃ রুদ্র, এখন তোমার সামনে। জানো, তিনি তোমাকে ভুল সেলফোন নম্বর দিয়েছিলেন সেদিন!’
সপাং করে চাকুকের বাড়ি খেল যেন রুদ্র। মায়া যেন কাটা গায়ে লবণ ছিটিয়ে দিচ্ছে। জয়া রুদ্রর মুখে দৃষ্টি রেখে বলল,
‘ভুল মানুষ হয়তো! তাই ভুল নম্বর দিয়ে গেছেন।’
মেয়েদের অবজ্ঞা বা হেয়ালী কথার সামনে রুদ্র সবসময় বিব্রতবোধ করে। যুতসই কথা বলতে পারে না। ও কিছু বলতে পারলো না। তবে ইচ্ছে করছিল-কৈফিয়ত দেয়ার। মায়া এবার ওর পক্ষ নিয়ে বলল,
‘তবে হ্যাঁ, তিনি আজ আমাকে সঠিক নম্বরটি দিয়েছেন। এবং বলেছেন, এই নম্বরটি যেন তোমাকে দিই। আর সেদিনের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।’
এবারের মিথ্যা কথাটির পক্ষে রুদ্র মায়ার প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। কখনও কখনও কথা প্রবাহমান নদীর মত। নদীর স্রোত বইতে থাকে। জয়া ঐ স্রোতের একটি ধারা হলো। ও বলল,
‘একটি ভুলের অপরাধ বোধে তিনি দেখছি কুকড়ে আছেন! কোন কথাই তো বলতে পারছেন না, মায়া।’
জয়ার চোখে কটাক্ষ দৃষ্টি। ওর কথায় রিনরিনিয়ে মায়া হেসে উঠলো। ও বলল,
‘দেখছো না, তিনি কেমন কাঁপছেন!’
মায়ার রসিকতায় জয়াও হাসলো। কথার স্রোত রুদ্রকে স্পর্শ করলো। ও গুমোট হয়ে থাকার আগল ভেঙে বলল,
‘আমাকে ফোন করেছিলেন, শুনলাম। কেন?’
জয়া এমনভাবে তাকালো যেন রুদ্রকে ভাল করে দেখে নিচ্ছে। জবাব দিলো মায়া,
‘আপনাকে জয়া আপুর খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল! তাই ফোন করেছিল। হা-হা-হা।’
জয়া এবার লাজুক হাসলো। ও রুদ্রকে বলল,
‘ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। ও সবসময় দুষ্টমি করতে পছন্দ করে। আপনি কি মায়ার কথায় মাইণ্ড করলেন?’
‘না, না। মাইণ্ড করবো কেন? এখন বলুন, আমাকে কেন খুঁজেছিলেন?’
ধীরে ধীওে ধাতস্ত হয়ে আসে রুদ্র। এমন কখনও ওর হয়নি। জয়া বলল,
‘যে কারণে খুঁজেছিলাম, সেটা এখন আর বলার প্রয়োজন নেই। সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।’
‘আচ্ছা। তাহলে তো ভাল। তো, আমি কি যেতে পারি?’
মায়া বলল,
‘না। আপনি যেতে পারেন না। আপনাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে কয়েকঘন্টা।’
‘কয়েকঘন্টা! কেন?’
জয়া কিছু বলতে যাচ্ছিলো, মায়া ওকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘আমরা যাবো বসুন্ধরা মলে। কেনাকাটা করবো। ঘুরবো। কফি খাবো। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। এটা হচ্ছে আপনার দণ্ড।’
‘দণ্ড! কিসের দণ্ড?’
‘ঐ যে ইচ্ছে করে ভুল নম্বর দিয়েছিলেন। ওটার দণ্ড।’
রুদ্র মনে মনে ভেবে নিল পিয়ালের এসাইন্টম্যান্ট সম্পন্ন করতে হলে জয়ার সঙ্গে থাকাটা জরুরি। সুযোগটা যখন না চাইতেই এসেছে, সেটা হাতছাড়া করা যাবে না। ও মনে মনে হেসে বলল-‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!’ জয়া ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আপনার যদি কাজ থাকে, তাহলে যেতে পারেন। মায়ার কথা গুরুত্ব দেবেন না।’
‘না, না। আমার তেমন কাজ নেই। চলুন, যাওয়া যাক। আমি থাকবো আপনাদের সঙ্গে।’
জয়া খুশি হলো। মায়ার মুখে রহস্যময় হাসি। রুদ্র ভাবলো এদের সঙ্গে যাবে কীভাবে? দু’ঊর্বশীকে নিয়ে রিকসায় যাওয়া যাবে না। সিএনজিতে যাওয়া যেতে পারে। সেটাও চাপাচাপি হবে। এই ভাবনা থেকে ও জানতে চাইলো,
‘যাবো কীভাবে?’
জবাব দিল মায়া,
‘আমি উবার কল করে দিয়েছি। গাড়ি আসছে। আপনি সামনের সীটে বসবেন, নাকি আমাদের সঙ্গে বসবেন?’
বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো ও। জয়া কপট রাগ প্রকাশ করে বলল,
‘মায়া, তুই সবসময় ঠাট্টা করিস কেন? তিনি কী ভাববেন?’
রুদ্র লজ্জিতকণ্ঠে বলল,
‘মায়া, আমি সামনের সীটেই বসবো।’
কথাটা বলে ও যেন স্বস্থি পেল। জয়া এবার প্রসঙ্গ বদলে ফেলে বলল,
‘পিয়াল, আপনার কেমন বন্ধু? আপনারা কি খুব ঘনিষ্ট?’
জয়ার প্রশ্নে রুদ্র’র বুকের ভেতরটা আঁতকে উঠলো। ওর কাজ হচ্ছে জয়ার তথ্য সংগ্রহ করা। পিয়ালের তথ্য সরবরাহ করা নয়। জয়া ঢিল ছুঁড়েছে। ও পিয়াল সম্পর্কে অনেক কথা জানতে চাইবে হয়তো। ওকে সতর্ক থাকতে হবে। ও বলল,
‘ঘনিষ্ট ছিলাম ঢাকা ইউনিভার্সিতে পড়ার সময় অব্দি। লেখাপাড়া শেষ হয়েছে। কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে ঠিক, এখনও আমাদের বন্ধুত্বটা আছে। ঘনিষ্টতা আছে কিনা-নিজেও জানি না।’
‘ও, আচ্ছা।’
বলল জয়া। রুদ্র মনে মনে বলল, আমার কাছ থেকে তেমন কিছু তথ্য আদায় করতে পারবেন না। আমার ভাল একটা চাকুরির সুযোগ আমি কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারবো না। উবারের গাড়িটা চলে এলো। জয়া ও মায়া গাড়ির পেছনের সীটে গিয়ে বসলো। রুদ্রও ড্রাইভারের পাশের সীটে নিশ্চিন্তে বসলো। জীবনটাকে নিশ্চিন্ত করতে যে চাকুরির প্রস্তাবটা ওর সামনে ঝুলছে, সেই সিঁড়ির প্রথম ধাপে রুদ্র পা রাখলো আজ। তাই এই শরত দুপুরের কর্ণকুহরে ওর চাপা আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ছে এখন।
ও মনে মনে নিজের উদ্দেশ্যে বলল-সাবধানে এগিয়ে যাও, রুদ্র! পিয়ালের সঙ্গে জয়ার বিয়ে হলে কে ঠকবে আর কে জিতবে-ওসব নিয়ে ভাববে না। নিজের ভাগ্য বদলের কথাটাই সবসময় ভাববে। সুযোগ সবসময় আসে না।

পাঁচ.
লিয়োনার্দোর অফিসে পৌঁছুতে রুদ্রুর একটু দেরী হয়ে গেল। ও কোথাও যেতে হলে দেরী করতে চায় না। ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে কখন পৌঁছুতে পারবে ওটা হিসাব করে ওই সময় নির্ধারণ করে ও। তারপরও সবসময় নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো যায় না। যারা ঢাকা শহরে বসবাস করেন, তারা জানেন ইচ্ছা থাকলেও সময় মত নিজের গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এই শহরের বিভিন্ন সড়কে কখন, কোথায়, কী কারণে যানজট লেগে যাবে এবং এই যানজট কতক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হবে-এ কথা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। লিয়ানার্দোর অফিসে রুদ্র পৌছুঁতে দেরী হচ্ছিলো বলে ও অস্বস্থিবোধ করছিল। কারণ, লিয়ানোর্দোর অফিসে জয়া ও মায়াকে আসতে বলেছিল ও। ঠিক বলা নয়, অনুরোধ করেছিল রুদ্র। কাল ফোন করে ওদের সঙ্গে কথা বলেছিল। প্রথমে মায়াকে ফোন করেছিল রুদ্র। এর আগে ও লিয়োনার্দোর সঙ্গে সেলফোনে কথা বলার সময় মায়ার কথা বলেছিল। প্রথমে ‘মায়া’ নাম শুনে লিয়োনার্দো চিনতে পারছিল না। রুদ্রকে বলেছিল,
‘কী বলছিস তুই! মায়া নামে কাউকে আমি চিনি না। তুই মনে হচ্ছে রসিকতা করছিস?’
‘রসিকতা করবো কেন? মায়াই তোর কথা বলল! তুই দুদিন আগে চারুকলায় গিয়েছিলি?’
‘হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। তোর সঙ্গে যেদিন দেখা হলো, ঐদিনই তো গিয়েছিলাম।’
বলেছিল লিয়োনার্দো। রুদ্র বলেছিল,
‘সেদিন তুই চলে যাবার পর মায়া এসে আমাকে জানালো তুই চারুকলা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলি। তুই নাকি ওর সঙ্গে যেচে কথা বলেছিলি। তার নাম জানতে চেয়েছিস..!’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বন্ধু, মনে পড়েছে! এখন বুঝতে পারছি কার কথা বলছিস!’
‘তাহলে মনে পড়ছে?’
‘হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তো, মেয়েটির নাম মায়া?’
‘হুম।’
বলেছিল রুদ্র। লিয়োনার্দো বলেছিল,
‘তোর সঙ্গে পরিচয় কীভাবে?’
‘মায়ার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে সম্প্রতি। ও কথা তোকে পরে বলবো। সেদিন মায়া দেখেছিল যে, আমার সঙ্গে তুই কথা বলেছিস। তুই চলে যাবার পর মায়া আমার কাছে এসে জানতে চেয়েছিল তুই কে? আর তোর নাম লিয়োনার্দো ভিঞ্চি কিনা।’
এ কথা শুনে ফোনের ও প্রান্তে খুব হেসেছিল লিয়োনার্দো। হাসি থামিয়ে ও বলেছিল,
‘কী, কো-ইনসোডেন্ট! বন্ধু, আমি মেয়েটির চোখ-মুখের অভিব্যক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম! জানিস, মেয়েটিকে আমি আমার প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য কাষ্ট করতে চাই। আই মীন, প্রধান নারী চরিত্রে মেয়েটি যদি অভিনয় করে, নিশ্চিত বলে দিচ্ছি, সাড়া পড়ে যাবে আমাদের চলচ্চিত্রে!’
‘থাম। তোর কল্পনা রাখ!’
‘কেন থামতে বলছিস?’
‘ও মেয়ে অভিনয় করবে না। ওদের পরিবার খুব রক্ষণশীল।’
‘তুই ওদের পরিবারের সকলকে চিনিস? ওদের সঙ্গে তোর পরিচয় আছে মনে হচ্ছে!’
‘চিনি। অল্পদিনের পরিচয়। ওদের সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বলতে পারব না।’
‘একটু খুলে বল না! কীভাবে ওদের সঙ্গে তোর পরিচয়?’
জানতে চেয়ে অনুনয় কাতর হয়েছিল লিয়োনার্দো। রুদ্র বলেছিল,
‘একদিন ঘটনাক্রমে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। আর দুদিন আগে মায়া আর ওর বোন জয়ার সঙ্গে ঘুরে বেড়ালাম। এ টুকই যা অভিজ্ঞতা!’
‘ফাইন। ওতেই হবে।’
‘কী হবে?’
‘তুই কি মায়াকে আমার অফিসে আনতে পারবি?’
‘কী যে বলিস! অফিসে সে এলেই কী হবে?’
‘আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখতে চাই।’
‘তোর মাথা কি ঠিক আছে? আমি মায়াকে তোর অফিসে আসতে বলবো, আর যদি রাজী হয়েও তোর অফিসে সে আসে, তুই হুট করে তাকে অভিনয় করার প্রস্তাব দিবি!’
রুদ্র’র কণ্ঠে বিস্ময় ফুটে উঠে। লিয়োনার্দো বলে,
‘আরে না, আমি ওকে অভিনয়ের প্রস্তাব প্রথমদিনেই দেব নাকি? তুই ওকে আনতে পারবি কিনা বল?’
কয়েক সেকেণ্ড সময় ভেবে রুদ্র বলে,
‘চেষ্টা করে দেখতে পারি। তবে দু’বোনকে অনুরোধ করে দেখবো। কিন্তু তাদের কি বলবো?’
‘বলবি, মায়া, আমার বন্ধু একটা টিভি বিজ্ঞাপনের জন্য সুন্দরী-সুশীল এক তরুণী খুঁজছে। আপনাকে ও দুদিন আগে দেখেছিল চারুকলায়। আমার সঙ্গে আপনাদের পরিচয় আছে জানতে পেরে ও এখন আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে চাচ্ছে। অন্তত এক কাপ চা খাওয়ার সময় যদি দেন, বন্ধুর কাছে আমার মুখ রক্ষা হয়।’
‘বাহ, কী বলব, ও কথাও কী সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিলি!’
‘আরে, এ কথাটা বলে দেখ না! চেষ্টা করতে দোষ কী।’
‘ঠিক আছে, দেখি চেষ্টা করে।’
লিয়োনার্দোর সঙ্গে টেলিফোন আলাপ বন্ধ করেই রুদ্র ফোন করেছিল মায়াকে। লিয়োনার্দোর অনুরোধের চেয়ে জয়ার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করার কথাটাই ওর মনে ঘুরছিল। যে কোন অজুহাতে জয়ার সান্নিধ্যে সময় কাটালে ওর সম্পর্কে আরো ধারনা পাওয়া যাবে। হয়তো জয়ার অনেক কথা জানাও যাবে। এটাই ওর কাজ। কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলে তা জানাতে হবে পিয়ালকে। কথাটা ভাবতে ভাবতে তিনবার রিং করলো মায়াকে। তিনবার রিং বাজার পর মায়া ওর ফোনকল রিসিভড করেছিল।
‘হ্যালো..!’
‘রুদ্র বলছি। ভালো আছেন?’
‘ওহ, মাই গড! জানেন, এই কিছুক্ষণ আগে আপনার কথাই বলছিলাম।’
‘কার সঙ্গে?’
‘আর কার সঙ্গে আবার! জয়া আপুর সঙ্গে। তা কী মনে করে আমাকে ফোন করলেন? আমি কিন্তু অবাক হয়েছি!’
‘আচ্ছা! আপনাকে আরো অবাক করার মত একটা কথা বলতে ফোন করেছি।’
‘তাই নাকি! তাহলে কথাটা বলে ফেলুন।’
‘সেদিন আমাকে আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলেন না? লিয়োনার্দো? আপনাকে ওর নাম লিয়োনার্দো ভিঞ্চি বলেছিল? নিশ্চয়ই মনে আছে তার কথা?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে।’
‘সেদিন ও আসলে আপনার মুখশ্রী দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। ও এমন একটা মেয়ে খুঁজছিল মডেল হিসাবে। টিভি বিজ্ঞাপনের জন্য মডেল।’
‘তাই?’
‘হুম। একটি বহুজাতিক কোম্পানীর বিজ্ঞাপন তৈরির কাজ পেয়েছে ও। সেদিন আপনাকে দেখে ভেবেছিল-আপনাকে মডেল হবার কথাটা বলবে, কিন্তু সাহস পায়নি।’
‘আচ্ছা! এ কথা জেনে আমার অবাক হবার কী আছে?’
‘তা ঠিক, আপনি কেন অবাক হবেন? আমার মনে হচ্ছিলো-ওর কথাটা জেনে আপনি অবাক হবেন।’
‘ঠিক আছে, এরপর বলুন।’
‘ওর সঙ্গে আজই ফোনে কথা হলো। ওকে আমি আপনার কথা বললাম। আপনাকে আমি চিনি জেনে ও খুব লজ্জিত ও বিব্রত হলো।’
‘কেন?’
‘ও বলল, সেদিন আপনার সঙ্গে ও যে আচরণ করেছে, সেটা ঠিক হয়নি।’
‘তো?’
‘ও আমাকে অনুরোধ করেছে, আমি যেন আপনাকে ওর অফিসে নিয়ে যাই। আমি বলেছি-এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। মায়া কেন আমার অনুরোধে তোর অফিসে যাবে?’
‘ঠিক কথাটাই বলেছেন।’
‘হুম। তারপরও ভাবছি, আপনি এবং জয়া যদি লিয়োনার্দোর অফিসে একদিন যেতেন..!’
ওর কথা শেষ না হতেই মায়া বলেছিল,
‘এতে কী হবে? আপনার কী প্রাপ্তি হবে?’
‘আমার একটু কৃতিত্ব হবে বন্ধুর কাছে। যাবেন?’
‘কোথায় তার অফিস?’
‘ওর অফিসটা বারিধারায়। যদি কখনও গুলশানের দিকে যাবার পরিকল্পনা থাকে, একটু নাহয় বারিধারায় থামলেন। দশ-পনের মিনিট সময় নষ্ট করলেন।’
‘আরে, আমরা তো কালই গুলশান যাচ্ছি আমার ফুপুর বাড়িতে!’
‘তাহলে দেখুন না, একটু সময় বের করা যায় কিনা?’
রুদ্র কথাটা বলে অপেক্ষা করে। ও প্রাপ্ত কয়েক মুহুর্ত চুপ। মায়া একটু ভেবে বলে,
‘ঠিক আছে, যেতে পারি। তবে এই অনুরোধ রাখতে হলে জয়া আপুর সম্মতি লাগবে। তাকে বলুন।’
‘তিনি কি রাজী হবেন?’
হাসির এক ঢেউ আছড়ে পড়ে ফোনের ও প্রান্তে। হাসির ঢেউ ওকে যেন ভাসিয়ে নিতে চায়। রুদ্র নিজেকে এই হাসির অবিষ্টতায় জড়াতে চায় না। ও নিজেকে সামলে নেয়। মায়ার কণ্ঠ শোনা যায়,
‘জয়া আপুকে আমি বলছি। আপনি বিকেলে ফোন করে জয়া আপুর সঙ্গে কথা বলে নেবেন। ও রাজী হলে কাল সকাল ১১টার সময় আমরা বারিধারায় থাকবো। আপনি জয়া আপুকে আপনার বন্ধুর অফিসের ঠিকানা জানিয়ে দেবেন। আর হ্যাঁ, আপনাকে থাকতে হবে ঐ অফিসে। আমরা পৌঁছানোর আগে আপনি ওখানে থাকবেন। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে। শর্ত মানছি। কিন্তু ভাবছি, জয়া রাজী হবেন কিনা।’
‘দেখুন চেষ্টা করে। জয়া আপু আপনার অনুরোধ না রাখলে, আমার বলার কিছু নেই।’
‘আচ্ছা, আপনার কী মনে হয়, জয়া আমার অনুরোধ রাখবেন?’
ফের ও প্রান্তে হাসির ফোয়ারা। মায়া কি সব কথাতেই হাসে? রুদ্র ভাবে। হাসির ফোযারা থামিয়ে মায়ার কণ্ঠ রিনরিনিয়ে উঠে,
‘জয়া আপু আপনার অনুরোধ রাখবে, কি রাখবে না-এটা আমাকে জিজ্ঞেস না করে নিজের মনকে জিজ্ঞেস করুন। যদি আপনার মন বলে, অনুরোধ রাখবে, তাহলে ওকে বিকেলে ফোন করবেন। এবার রাখি?’
‘আচ্ছা, রাখুন।’
ফোনের লাইন কেটে দিয়েছিল মায়া। রুদ্র বেশ কিছুক্ষণ ভেবেছিল মায়ার শেষ কথাটা। ওর মনে হয়েছিল জয়ার সামনে দাঁড়িয়েই মায়া ওর সঙ্গে কথা বলেছিল। হয়তো ভয়েজ স্পিকারে দিয়ে ও কথা বলেছে। এটা হয়ে থাকলে জয়া ওদের কথা শুনেছে। এ কথা কল্পনা করতে গিয়ে রুদ্র অচেনা সাহস টের পেয়েছিল অনুভবে। পরে বিকেলে ও জয়াকে ফোন করেছিল ঐ সাহসের মন্ত্রণায়।
সেলফোনে জয়ার কণ্ঠ,
‘হ্যালো..!’
‘ভাল আছেন?’
‘হুম। আপনি ভালো আছেন?’
‘ভালো আছি। ফোন করেছি-একটা বিষয়ে..।’
‘জানি, মায়া আমাকে বলেছে।’
‘এখন আপনার মতামতটা পেলে ..!’
‘আচ্ছা, কী হবে এতে, বলুন তো! আমরা তো মডেলিং বা অভিনয় সম্পর্কে কিছু জানি না। আমাদের আগ্রহও নেই।’
‘ও কথা আমিও আমার বন্ধুকে বলেছি। আসলে ও আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হতে চায়।’
‘বুঝলাম।’
‘আপনি কি যাবেন?’
‘আপনি কি এতে খুশি হবেন?’
‘অবশ্যই খুশি হবো। যদি অল্প সময়ের জন্য যান, আমি সম্মানিত বোধ করবো।’
‘আচ্ছা, যাবো। কাল সকাল এগারটায় আমরা বারিধারায় থাকবো। আপনি ঠিকানাটা এসএমএস করে দিন।’
‘আমি খুব খুশি হলাম।’
‘আপনাকে খুশি করার জন্যই যেতে রাজী হলাম। অন্য যে কেউ বললে যেতে রাজী হতাম না। এমন কী, আপনার বন্ধু পিয়াল বললেও যেতেম না।’
‘সত্যি! আমাকে খুশি করাতে চাইলেন কেন?’
‘আপনি আমাকে একটা উপকার করেছিলেন না? ও কথাটা আমার মনে দাগ কেটে আছে।’
‘ও আচ্ছা! তাহলে কাল সকালে দেখা হচ্ছে।’
‘হুম। দেখা হবে। আপনি কিন্তু এগারটার মধ্যে ওখানে থাকবেন!’
এ কথা বলে ফোন রেখে দিয়েছিল জয়া। রুদ্র এখন ঘড়ির দিকে তাকালো এগারটা বিশ। ও লিফট থেকে নেমে হনহন করে লিয়োনার্দোর অফিসে ঢুকলো। অভ্যর্থনা ডেস্কে বসা থাকা এক তরুণী মিষ্টি হাসি বিলিয়ে হাতের ইশরায় লিয়োনার্দোর রুমটা দেখিয়ে দিল। অভ্যর্থনা ডেস্কের মেয়েটিকে লিয়োনার্দো ওদের কথা বলে রেখেছে-বোঝা গেল। লিয়োনার্দের রুমে ঢুকতেই একগাল হাসলো ও। লিয়োনার্দোর অফিসটি খুব গোছানো। ওর রুমটি ইংরেজী অক্ষর ‘ভি’ আকারে। ‘ভি’ লিখতে দুটি রেখার সংযোগস্থলে লিয়োনার্দোর উল্টো ‘ভি’ আকারের চেবিল এবং টেবিলের ও প্রান্তে ওর চেয়ার। ‘ভি’ আকারের দুটি রেখার ওপর দুটি লম্বা সোফা। সোফায়র মাঝখানে লম্ব সরু টেবিল। লিয়োনার্দোর টেবিলের সামনে কোন চেয়ার নেই। কক্ষটির কোণে কোণে আলোর প্রদ্বীপ ও ফুলের টবের নান্দনিক স্থাপনা আছে। দু’পাশের দেয়ালে জল রংয়ে আঁকা দুটো নৈস্বার্গিক ছবি। দৃষ্টি পড়লে ছবিতে আটকে যায়। রুদ্র ভেবে নিল পরে লিয়োনার্দোর কাছ থেকে জেনে নেব ছবি দুটো কার আঁকা। জয়া ও মায়া এখনও এসে পৌঁছেনি বলে রুদ্র যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। এ কথা মনে হতেই জয়ার ফোন এলো।
‘হ্যালো, জয়া বলছি। আপনি কোথায়?’
‘আমি লিয়োনার্দোর অফিসে আছি।’
জয়া বলল,
‘আমরাও এসেছি। নিচে আছি।’
‘আচ্ছা, আমি নিচে আসছি।’
‘না,না, আপনাকে নিচে আসতে হবে না। আমরা লিফট ধরে উপরে আসছি। আপনি ওখানেই থাকুন।’
বলে ফোন কেটে দিল জয়া। রুদ্র বসলো ‘ভি’ চিহ্নরেখায় স্থাপিত একটি সোফার ওপর। এরপর ও তাকালো লিয়োনার্দোর দিকে। লিয়োনার্দো হাসলো রুদ্রর দিকে তাকিয়ে। বলল,
‘তুই কিন্তু চাইলেই অনেক কিছু করতে পারিস। তুই নিজের ভেতরের শক্তিটাকে কাজে লাগাতে জানিস না। এটা তোর চরিত্রের ছোট্ট ত্রুটি।’
‘পরিচিত দু’জন তরুণীকে তোর কাছে নিয়ে আসাটাকে তুই এতোবড় করে দেখছিস?’
‘এটা ছোট কোন ঘটনা নয়, বন্ধু। আর কোন ছোট ঘটনাই উপেক্ষা করা ঠিক নয়। এটাকে একটা কাজ হিসাবে দেখ। এখন কী দাঁড়ালো? তুই একটা কাজে সফল হয়েছিস। সফলতা ছোট বা বড় যাই হোক-ওর জন্য প্রশংসা করা যায়।’
‘আচ্ছা, প্রশংসা রাখ। ওদের সঙ্গে আলাপ যাই হোক, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথা কিন্তু বলে ফেলিস না আবার!’
লিয়োনার্দো মুখ টিপে হাসলো। ও কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
‘কোন একদিন মায়াকে যদি মডেল বা অভিনেত্রী হিসাবে দেখিস, সেদিন আমার প্রশংসা করতে হবে তোকে। ওটাও কাজের সফলতা হিসাবে, কী বলিস?’
এ কথায় দু’বন্ধু হাসলো। কথাটা সিরিয়াসও হতে পারে, রসিকতাও হতে পারে। সব কথা নিয়ে তর্ক করা যায় না-জানে রুদ্র। লিয়োনার্দোর রুমে প্রবেশ করলো জয়া ও মায়া। ওদের সঙ্গে বাতাসে চ্যানেল সেভেন পারফিউমের মিষ্টি সৌরভ রুমটিতে ছড়িয়ে পড়লো। রুদ্র চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের মুখোমুখি হলো। পরস্পর পরস্পরকে হাসি বিনিময় করলো। রুদ্র সোফা দেখিয়ে বসতে বলল জয়া ও মায়াকে। ওরা রুদ্রর বিপরীত দিকের সোফায় বসলো। রুদ্র বসলো ওদের মুখোমুখি সোফায়। লিয়োনার্দোও দাঁড়িয়েছিল, সে বসলো নিজের চেয়ারে। লিয়োনার্দোর মুখে হতভম্বের ছাপ। সে হয়তো আশা করেনি-একইরকম চেহেরার দু’তরণী তার সামনে এসে হাজির হবে। জয়া ও মায়াকে একসঙ্গে প্রথম দেখলে যে কেউ বিস্মিত হতে পারে। লিয়োনার্দোও বিস্ময়ে থ’ হয়ে গিয়েছে-বুঝতে পারছিল রুদ্র। পরিবেশকে সহজ করতে রুদ্র লিয়োনার্দোর দিকে চেয়ে বলল,
‘কীরে, তুই হতভম্ব হয়ে গেছিস নাকি?’
রুদ্রর কথায় সম্বিত ফিরে আসে লিয়োনার্দোর। সে লজ্জিতভাবে বলে,
‘সরি, আমি একটু হচকিয়ে গিয়েছিলাম।’
জয়া ও মায়ার মুখে মিটিমিটি হাসির ঝিলিক। ওরা জানে, ওদের একসঙ্গে দেখলে কেউ কেউ বিহবল হয়ে যায়। রুদ্র জয়া ও মায়াকে দিখিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলল,
‘এ হচ্ছে জয়া। আর পাশে তার ছোট বোন মায়া। তারা দেখতে অবিকল হলেও বয়সে দেড় বছরের ছোট মায়া।’
এবার জয়া ও মায়াদের দিকে তাকিয়ে লিয়োনার্দোকে দেখিয়ে রুদ্র বলল,
‘আর এ হচ্ছে আমার বন্ধু লিয়োনার্দো। আমরা অবশ্য এক ডিপার্টম্যান্টে ছিলাম না। ও পড়েছে সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে। ও পুনাতে গিয়ে ফিল্ম-এর উপর লেখাপড়া করেছে। এখন টিভি বিজ্ঞাপন বানাচ্ছে। ভবিষ্যতে ওর আরো বড় ধরনের কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
জয়া ও মায়া ভূবন ভোলানো হাসি ধরে রাখলো মুখে। লিয়োনার্দো মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘সেদিন আমার আচরণে আপনি কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা চাচ্ছি। আসলে..!’
মায়া লিয়োনার্দোর কথার এ পর্যায়ে বলে উঠলো,
‘ও সব কথা বলছেন কেন? মনে কিছু ধরে রাখলে তো আপনার অফিসে আসতাম না।’
‘তারপরও ..!’
সঙ্কোচ প্রকাশ করে লিয়োনার্দো। মায়া বলে,
‘সেদিনের কথা ভেবে এতো সঙ্কোচ প্রকাশ করবেন না। আমি বিব্রত হচ্ছি।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি হালকা হলাম। তা আপনারা কী খাবেন? চা বা কফি? দুপুরে কিন্তু আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করবো!’
জয়া বলল,
‘কিছুই খাবো না। এক ঘন্টা থাকতে পারবো। আমাদের ফুপুর বাড়িতে যেতে হবে। ওখানে লাঞ্চ করতে হবে। লাঞ্চ খাওয়ার প্রস্তাবের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’
জবাবে লিয়োনার্দো বলল,
‘তাহলে চা হোক। আমাদের অফিসে আপনারা প্রথম এসেছেন।’
কথাটা বলেই ইন্টারকমে লিয়োনার্দো কাউকে চা দিতে বলল। জয়া অবাক কণ্ঠে বলল,
‘আমাদের অফিস বলছেন যে!’
‘আমার সঙ্গে রুদ্রকেও এই অফিসে রেখেছি। তাই আমাদের বললাম।’
কথাটা শুনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল রুদ্র। লিয়োনার্দো কী বলে ফেলল! ও লিয়োনার্দোর উদ্দেশ্যে বলল,
‘আমি আবার তোর অফিসের সঙ্গে কবে যুক্ত হলাম? কী বলছিস!’
‘যুক্ত হসনি। তাই বলে হবিনা? তোকে তো অফার দিলাম সেদিন। তুই অকারণে এদিক-সেদিক ঘুরছিস। ও সব ঘোরাঘুরি ছেড়ে আমার সঙ্গে কাজ কর।’
রুদ্র কথা বাড়াতে চায় না। লিয়োনার্দো কী না কী বলে ফেলবে! মনে মনে বিচলিত বোধ করতে থাকে ও। জয়া লিয়োনার্দোর কাছে জানতে চাইলো,
‘আপনার অফিসে তিনি কীভাবে যুক্ত হতে পারেন?’
যেন এমন একটা প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করছিল লিয়োনার্দো। সে বলল,
‘কী যে বলেন! ও কিন্তু একজন প্রতিভাবান মানুষ! ও দারুণ স্ক্রীপ্ট লিখতে পারে, জানেন? রুদ্র এক সময় তো চমৎকার গল্প লিখতো! ওর লেখালেখির হাত কতটা ভালো, তা আমি জানি। ও এখন ওসব ছেড়ে দিয়েছে শুনলাম।’
রুদ্র লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে কি? লিয়োনার্দো কেন এ সব কথা বলছে-ও বুঝতে পারছে না। জয়া কী যেন ভাবছে। মায়া লিয়োনার্দোকে দৃষ্টি রেখে বলল,
‘আপনার বন্ধুকে দেখে কিন্তু মনে হয় খুব সরল ও নিরীহ টাইপ! এক ধরনের বোকাও বলা যায়। গল্প লিখিয়ে বলে মনে হয় না।’
‘ওর ক্ষেত্রে সরল ও নিরীহ দুটি বিশেষণ সঠিক আছে। এর সঙ্গে আমি যোগ করতে বলব, ও আত্ম-অভিমানীও।’
বলল লিয়োনার্দো। জয়ার কৌতুহলী দৃষ্টি আটকে আছে রুদ্র’র মখেুর ওপর।
‘আত্ম-অভিমানী! কেন? কার প্রতি অভিমান?’
ডলয়োনার্দোর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো মায়া। লিয়োনার্দো জবাবে বলল,
‘সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি ওর অভিমান। জীবনের প্রতিও থাকতে পারে।’
রুদ্র বিব্রত হচ্ছে। ও প্রসঙ্গ পাল্টাতে লিয়োনার্দোর উদ্দেশ্যে বলল,
‘আমাকে নিয়ে ময়না তদন্ত থামা তো! তারা এসেছেন কি আমাকে নিয়ে গল্প করতে?’
‘সরি, সরি! আমি আসলে একটু ভাবুলতার দিকে চলে যাচ্ছিলাম।’
বলল লিয়োনার্দো। জয়া হঠাৎ চুপসে গেল। মায়া মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল,
‘আপনার প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কামনা করছি। আর যদি আপনার বন্ধু এখানে যোগ দেন, তাহলে আমিও আবার আসব। আপনাদের কাজ দেখবো।’
‘অবশ্যই আপনারা আসবেন। যদি আগ্রহ থাকে, আমাদের সঙ্গে আপনারাও কাজ করতে পারেন।’
‘কীভাবে কাজ করতে পারি?’
মায়ার প্রশ্ন। লিয়োনার্দো বলল,
‘কাজ করতে পারেন পেশা হিসাবে নিয়ে। শখ হিসাবেও করতে পারেন। আবার শিল্পের প্রতি অনুরাগ থেকেও সহযোগিতামূলক কাজ করতে পারেন। কাজ করার নানা অপশন আছে আমার প্রতিষ্ঠানে। আপনি কীভাবে কাজটা করতে চান-এটা ঠিক করতে হবে আগে।’
‘ভালো বলেছেন। কথাগুলো ভেবে দেখবো আমি।’
বলল মায়া। রুদ্র বুকের ভেতরে একটা শ্বাস আটকে রেখেছিল, ওটা ছাড়লো। আলোচনাটা বেশি দূর টেনে নিয়ে যায়নি লিয়োনার্দো। আবার একটা রেখাপাত সৃষ্টি করেও রাখলো। কে জানে, মায়া জড়িয়ে যাবে কিনা লিয়োনার্দোর কাজে। এ সময় অফিস সহকারি একটি ছেলে চা এবং পেয়ারা, আপেল, কমলা সাজানো ট্রে নিয়ে এলো। ট্রেতে চার কাপে গ্রীন টি। ওদের চারজনের সামনে টেবিলের ওপর কাপ ও ফলের প্লেট সাজিয়ে রেখে চলে গেল ছেলেটি। জয়া ও মায়া চায়ের কাপ তুলে নিল। ওদের দেখাদেখি রুদ্র লিয়োনার্দো চায়ের কাপ তুলে দিল এবং নিজেও নিল। রুদ্র চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে লিয়োনার্দোর চোখে চোখ রাখলো। লিয়োনার্দোর চোখে খুশির দ্যুতি। রুদ্র মনে মনে হাসলো। লিয়োনার্দো কি মায়াকে চলচ্চিত্রের নায়িকা বানাতে চায়? নাকি নিজের জীবনের নায়িকা বানানোর স্বপ্ন দেখছে? মায়া তো লিয়োনার্দোর জন্য দুর্লভ নয়! লিয়োনার্দোর বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ওদের আমদানী-রপ্তানীর ব্যবসা আছে। ঢাকার নবাবপুরে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের ওদের চারটি দোকানও আছে। খুব বিত্তশালী না হলেও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সে। লিয়োনার্দো শিক্ষিত, সুদর্শন ও স্মার্ট যুবক। ক্রিয়েটিভ ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকতে পছন্দ করে। স্বভাবের দিক থেকে স্পষ্টবাদী ও লড়াকু। ভনিতা করতে জানে না। যা ভালো লাগে, সরাসরি বলে দেয়। যা পছন্দ করে, তা হাত বাড়িয়ে নিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। সরল বা বোকা নয়, আবার চালাকিও জানে না। লিয়োনার্দোকে যদি মায়া ভালোবাসে এবং ওদের বিয়ে হয়, জুটি হবে মণিকাঞ্চন! চায়ের স্বাদ নিতে নিতে কথাগুলো ভেবে নিল রুদ্র। পিয়ালের সঙ্গে জয়ার বিয়েটা এই মুহুর্তে কেন জানি পানসে লাগছে ওর। লিয়োনার্দো ও মায়ার জুটির সঙ্গে পিয়াল ও জয়ার জুটি মেলাতে গিয়ে একরাশ বিষন্নতা ছড়িয়ে পড়লো ওর মনে। এর কোন অর্থ নেই, অথচ মনের গহীনে মিহিন কষ্ট পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। যার জীবন স্বপ্নবিমুখ, তার মনে কেন রোদন ভরা বিলাপ অকারণে ছড়িয়ে পড়ে-এর কারণ খুঁজে পায় না রুদ্র। কিছু কারণ, অকারণের কফিনে মমি হয়ে থাকাই ভালো।

ছয়.

কারা যে আকাশের বিশালত্ব খোঁজে, সমুদ্রের গর্জনকে সুরের মূর্ছনা ভাবে, আবার একাকী অনড় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের মধ্যে নিঃসঙ্গতার অহম দেখতে পায়! অরণ্যের ঘন সবুজ গাছগাছালীর দিকে তাকিয়ে থেকে সবুজ উদ্যানের ছবি আঁকে অনেকে। কেউ কেউ বিভিন্ন শব্দ সাজিয়ে, ব্যাঞ্জণা দিয়ে আবার ভাবার্থ সৃষ্টি করে কবিতা লিখে। তারা কবিতা লিখে কী পায়, কে জানে! ভাবাবেগ প্রত্যেকের মধ্যে আছে। কিন্তু সবাই কি ভাবাগের রঙ ছড়াতে পারে? সকলের জীবন কি সমান? জীবনে সকলেরই কি লক্ষ্য থাকে? আবার যাদের লক্ষ্য থাকে, তাদের সকলেই কি লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে? বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো রুদ্রর মনে ছড়িয়ে আছে। ওর মনের মধ্যে মাঝেমাঝে যেন বৈরাগ্য বোধ ধুমকেতুর মত উদয় হয়। তখন উল্টা-পাল্টা অনেক কিছু ভাবে ও। ভেবে কোন কূল-কিনারা পায়না। বিক্ষিপ্ত চিন্তা নিয়ে ও ডুবে যেতে পারে। এই মুহুর্তে ও ডুবে ছিল, কিন্তু ভাবনায় ছেদ পড়লো জয়ার কণ্ঠে। ও বসেছিল জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে প্রশস্ত রাস্তার ফুতপাটের উপর একটি বেঞ্চিতে। একটু দূরে চটপতি-ফুসকা বিক্রি হচ্ছে ভ্রাম্যমান স্টোরে। এখানে জয়াকে আসতে বলেছে রুদ্র। জয়া একঘন্টা আগে ওকে ফোন করে জানিয়েছে ওর সঙ্গে জরুরি কথা আছে। ওর সঙ্গে জয়ার কী জরুরি কথা থাকতে পারে? ভেবে সদুত্তর খুঁজে পায়নি নিজের কাছে। জয়া খুব অনুরোধ করল,
‘প্লিজ, আপনার সঙ্গে এখুনি দেখা করতে চাই। আমাকে একটু সময় দিন। আমার জন্য খুব জরুরি।’
‘বুঝলাম, কিন্তু আমার সঙ্গে জরুরি কথা কেন-সেটাই ভাবছি। ঠিক আছে ফোনে বলে ফেলুন না!’
‘কেন আপনার সময় নেই?’
‘না, তা থাকবে না কেন? আমি বরং আজ ফ্রি আছি।’
‘এই মুহুর্তে কোথায় আছেন?’
‘এই তো সংসদ ভবন এলাকায়। মানিক মিয়া এভিনিউতে।’
‘ওখানে কী করছেন?’
‘ভাবছি মানুষ কবিতা কেন লিখে? লিখে কী আনন্দ পায়। আরো নানা সস্তা বিষয় নিয়ে ভাবছি।’
‘আপনি সত্যিই স্ট্র্যাঞ্জ!’
কথাটা বলে হাসলো জয়া। রুদ্র বলল,
‘এই কথাটা বলতে ফোন করেছেন?’
‘বললাম না, জরুরি কথা আছে!’
‘সেটাই বলুন, শুনছি।’
‘সব কথা ফোনে বলা যায় না! বললেও আপনি এই কথাগুলোর মর্ম পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবেন না।’
‘কী বলছেন এ সব! আমার মাথায় তো আরো চিন্তা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এ তো মনে হচ্ছে কবিতার মত অর্থহীন কথাবার্তা!’
‘আচ্ছা, ফোনে শুধু তর্ক করবেন?’
‘তর্ক করতে আমিও চাচ্ছি না। যা বলার বলে ফেলুন।’
‘আপনি ওখানে থাকুন। আমাকে আপনার লোকেশনটা এসএমএস করে দিন। আমি একঘন্টার মধ্যে আসছি। আপনি অপেক্ষা করুন।’
জয়া ফোন রেখে দিয়েছিল। কী আর করা, রুদ্র ওর লোকেশন এসএমএস করে দিল। জয়ার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে নিজের মধ্যে বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো নিয়ে খেলা করছিল। একঘন্টা সময় পার করতে হবে ওকে। জয়া এলো একঘন্টা দশ মিনিট পর। জয়ার গায়ে হালকা হলুদ রঙের সালোয়ার-কামিজ। মাথার চুলগুলো পরিপাটি করে ক্লিপে আটকানো। কপালে ছোট্ট করে হলুদ রঙের একটা টিপ। টিপ দেয়ায় জয়াকে আরো আকর্ষণীয় লাগছে। জয়াকে কখনও টিপ পড়া দেখেনি বলেও হতে পারো। মানুষের চেহেরার নানারকম সৌন্দর্য বিকাশ ঘটায় উপকরণ। টিপ এমন একটি উপকরণ। ঠোঁটে মেরুন রঙের লিপষ্টিক মেখেছে। জয়ার ঠোঁটে লিপষ্টিকও রুদ্র এর আগে দেখেনি। জয়া রুদ্র’র সামনে এলো ফাগুন হাওয়ার মত উতালা মাদকতা ছড়িয়ে। যে মাদকতার অস্থিত্ব নেই, তবে অনুরণন আছে। দৃশ্যমান নয়, তবে কল্পনার চোখ খুলে দেয়। রুদ্র জয়াকে এক ঝলক দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। জয়া বসলো ওর পাশে। মিষ্টি একটা গন্ধ হাওয়ার সঙ্গে মিতালী করে নিল যেন। সুগন্ধী হাওয়ার ঝাপটা লাগছে রুদ্র’র। ও অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা করলো। জয়া ওর মুখোমুখি বসে বলল,
‘আচ্ছা, আপনি সবসময় কী আতো ভাবেন, বলুন তো? আপনাকে স্পষ্ট করে বোঝা যায় না।’
‘কেনো এ কথা বলছেন? আমি কি দূবোর্ধ্য?’
নিজের ভেতরের আবিষ্টতা তাড়িয়ে দিয়ে বলল রুদ্র। জয়া বলল,
‘আপনি কি নিজেকে সহজ বলে দাবি করছেন?’
‘তার আগে বলুন আমাকে কঠিন ভাবার কারণ কি? অথবা সহজ নই-এটা ভাবছেন কেনো?’
জানতে চাইলো রুদ্র। কথাটা জয়ার দিকে না তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল রুদ্র। জয়া বলল,
‘আপনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। এটা আমার ধারনা।’
এ কথা বলে জয়া কয়েক সেকেণ্ড রুদ্র’র দিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। রুদ্র তাকালো জয়ার দিকে। জয়া রুদ্রর চোখে চোখ রেখে বলল,
‘আপনাকে আমার দূবোর্ধ্য মনে হয়। সত্যি বলছি!’
জয়ার কথায় কেমন একটু ধাক্কা লাগলো রুদ্রর। ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলল,
‘তাই নাকি! আর কি মনে হয় আপনার?’
‘বেশ ডিফিকাল্ট আপনি। প্রথম দেখাতে মনে হয় সহজপাঠে আপনাকে পড়ে নেয়া যায়, কিন্তু তা নয়। আপনি ধোঁয়াসে। ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস। বোধের অগম্য।’
এ পর্যন্ত বলে জয়া থামলো। রুদ্র অবাক দৃষ্টি জয়ার মুখের ওপর স্থির হয়ে রইলো। এমন কথা হয়তো ও আশা করেনি। জয়া জমে যাওয়া মুহুর্তগুলোকে ছলকে দিতে কালক্ষেপণ না করে জানতে চাইলো,
‘আপনার সম্পর্কে আমার কথাগুলো শুনে অবাক হলেন? এ কথাগুলো কি বিশ্বাস করছেন?’
একটু ধাতস্ত হলো রুদ্র। ও বলল,
‘বিশ্বাস করছি না। আবার অবিশ্বাসও করছি না।’
জয়ার একটু ঝলসে উঠলো যেন। ওর চোখের দৃষ্টি তীর্যক হলো। বলল,
‘এই যে কথাটা বললেন, এটাও দ্বন্দ্বে ফেলা দেয়ার ছক। আপনি নিজের আচরণে এক ধরনের রহস্য সৃষ্টি করতে পছন্দ করেন। অথবা বলা যায়-আপনার নিজের অজান্তে আপনি নিজেকে রহস্যময় করে তোলেন!’
এ কথা বলে জয়া যেন হালকা হলো। রুদ্র জয়ার মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়নি। জয়ার কথাগুলোর অনুরণন ওর ভেতরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ও ভেবে নিল-জয়া আসলে কী বলতে চায়? এটা কি ওর জরুরি কথা? জয়া দপ করে জ্বলে মুহুর্তেই চুপসে গেল কি? রুদ্র আলতো কণ্ঠে বলল,
‘জরুরি কথাটা বলছেন না যে!’
‘বাহ অতো তাড়া কিসের? আপনার তো কাজ নেই বলেছিলেন।’
বললো জয়া। রুদ্র ভেবেছিলো জয়া এসেই খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে ফেলবে। তা বলছে না, বরং কথা শুরু করলো ওকে নিয়ে। যে ধরনের কথার কোন মাথামুণ্ডু নেই। অর্থহীন। রুদ্র উপক্ষো করতেও পারছে না। জয়া হতে যাচ্ছে পিয়ালের স্ত্রী, এর মানে ওর ভবিষ্যত বসের স্ত্রী। বসের স্ত্রী’র ক্ষমতার কথাও ওকে মনে রাখতে হবে। নইলে যে চাকুরিটা পেয়ে ওর জীবন বদলে যাবে বলে ও স্বপ্ন দেখছে, স্বপ্নটা অঙ্গুরেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ওকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে-ভেবে নিল রুদ্র। জয়া ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও কোন একটা জবাব আশা করছে। রুদ্র মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
‘শুনেছি মেয়েদের মনের রঙ নাকি ঘনঘন বদলায়। কখনও মেঘে ঢাকা তারা, কখনও করোজ্জ্বল রোদে ঝিকিমিকি, কখনও ধবল জোছনায় দিশেহারা, আবার কখনও গোধূলীর আভার মত বিষণ্ন!’
কথাটা কীভাবে বলে ফেললো ও নিজেও জানে না। রুদ্রর ভেতর থেকে কেউ যেন কবিতার লাইন আউরে দিল। রুদ্রর কথা শুনে জয়া হঠাৎ খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ওর হাসিতে দূরের ঝর্ণাধরার মত শব্দ হয়। ও হাসছে, আর রুদ্রর মনে হচ্ছিলো দূর অরণ্য থেকে ঝর্ণার চপলতার শব্দ আসছে। আজ ওর কী হলো!
জয়া হাসছে আর আবেগ মধুর অথচ সংযত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো রুদ্র। জয়া হাসি থামিয়ে বলল,
‘আমি ভেবেছিলাম, অর্থনীতির মত আপনি রসহীন, কাঠখোট্টা মানুষ। এখন দেখছি-পাথরের ভেতরে ঝর্ণাধারাও আছে!’
রুদ্রর হাসিভরা মুখটি উজ্জ্বল হলো। জয়ার প্রসংশায় ওর লজ্জা লাগছে। ও বলল,
‘অর্থনীতি মনে হতে পারে রসহীন। এর ভেতরে কিন্তু খরস্রোত আছে। ওটা জানতে হলে অর্থনীতির ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।’
‘ঠিক আছে, জানার চেষ্টা করবো। এ কথা আমার জানা ছিল না।’
‘আপনি তো ল’তে অনার্স করেছেন। তাইনা?’
‘হুম।’
‘ল’ পড়লেন কেন? আইনজীবী হবেন? বা বিচারপতি?’
‘আমার বাবা ব্যারিস্টার ছিলেন। বাবার উৎসাহেই আমি ল’তে ভর্তি হয়েছিলাম। জানেন, আমি পড়তে চেয়েছিলাম ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে। কিন্তু বাবার স্বপ্ন ছিল আমি বিচারপতি হবো। ওটাই ছিল আমার লক্ষ্য। এখন আর বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো না!’
‘কেন পারবেন না বলে মনে হচ্ছে?’
‘আপনি তো জানেন সে কথা। আপনার বন্ধু পিয়ালের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা চলছে। তার সঙ্গে বিয়ে হলে আমাকে কি আর বিচারপতি হতে দেবেন তিনি বা তার পরিবার? তারা হচ্ছেন শিল্পপতি। ক’জন শিল্পপতির স্ত্রীকে দেখেছেন, তারা চাকুরি করছেন?’
‘কথাটি ঠিক। এ ছাড়া পিয়ালকে আমি চিনি, ও আপনাকে চাকুরি করতে দেবে না। আপনার ঘর-সংসার সামলানোর কাজটাই হবে প্রধান। ওরা অর্থবিত্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ওদের এতো টাকা থাকতে আপনিই বা কেন চাকুরি করতে যাবেন?’
‘সবাই কি শুধু টাকার জন্য চাকুরি করে? নিজস্ব একটা পরিচিতিও গুরুত্বপূর্ণ-তাইনা?’
রুদ্র চুপ করে থাকে। এর জবাবে ও কী বলবে? জয়া ফের বলে,
‘তাছাড়া আমার বাবার স্বপ্ন পূরণের কথাটাও তো ভাবতে হবে। আমাদের ছেড়ে বাবা চলে গেছেন আজ দু’বছর হলো। বাবার অকাল মৃত্যুর পর থেকে আমরা এক ধরনের সংগ্রাম করছি।’
‘বাই দ্যা ওয়ে, আমার জানা নেই, আপনার বাবা অকালে মারা গেছেন বললেন!’
‘হুম। মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে তিনি মারা গেলেন। রাতে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক হয়েছিল। আমাদের ঘুমের মধ্যে রেখেই তিনি চলে গেলেন!’
কথাটা বলতে জয়ার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠলো। রুদ্র দুঃখভরা কণ্ঠে বলল,
‘সরি, আপনাকে বিষন্ন করে দিলাম বলে!’
‘ইটস ওকে!’
জয়া চুপসে গেল। কিছুটা মুহুর্ত কেমন গুমোট হয়ে গেল। গুমোট মুহুর্ত হালকা করতে রুদ্র জানতে চাইলো,
‘আপনাদের সংসার কীভাবে চলে? কথাটা জানতে চাইলাম বলে কিছু মনে করবেন না।’
জয়া মৃদুকণ্ঠে বলল,
‘পারিবাররিকভাবে আমার বাবার পরিবার যথেষ্ট সম্পদের মালিক। আমার বাবাও স্বচ্ছল ছিলেন। ঢাকা শহরে আমাদের দুটো বাড়ি আছে। একটি বাড়ি যাত্রাবাড়িতে এবং আরেকটি রায়েরবাগে। ঐ বাড়ির ভাড়ায় আমরা চলছি। এ ছাড়া আমাদের গ্রামে বেশ জমিজমা আছে। ওসব দেখেন আমার ফুপু।’
‘ওহ, আচ্ছা।’
বলল রুদ্র। জয়া ফের বলল,
‘আমার ফুপুর অবস্থা আরো ভালো। তার স্বামী একজন শিল্পপতি। ফুপুর পরিবার বেশ বিত্তশালী। বাবা মারা যাবার পর থেকে ফুপুই আমাদের গার্জেন। তিনি আমাদের সবকিছু দেখভাল করেন।’
‘আচ্ছা!’
বললো রুদ্র। জয়ার কথা শুনে ওর বুকের ভেতরে মায়ার আদ্রতা ছড়িয়ে পড়লো। জয়ার পরিবারের কথা সংক্ষেপে জানলো ও। জয়ার পরিবার সংকটে নেই, তবে অভিভাবক সংকট তৈরি হয়েছে। বাবার মৃত্যুর কারণে ফুপুর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ওদের সংসারে। রুদ্র জয়াকে বলল,
‘আপনার মনের কথা ফুপুকে বলুন!’
জবাবে জয়া বলল,
‘ফুপুর কারণেই তো বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পারছি না। এই বিয়ের ব্যাপারে ফুপুর আগ্রহটাই বেশি। নইলে আমি বিয়েতে রাজী হতাম না।’
‘কেন রাজী হতেন না? কোনদিন বিয়ে করবেন না-এমন পণ করে বসে আছেন নাকি?’
এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো জয়া। মুখে হাসি ধরে রেখে ও বলল,
‘না, এমন পণ করিনি।’
‘তবে?’
‘তবে, মানে আমি শিল্পপতি বা ধনীর দুলালকে বিয়ে করবো-এমন কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।’
‘ও, তাই বলুন। এ কথাটাই আপনার ফুপুকে বলে দিন।’
‘কীযে বলেন! আমরা ফুপুকে আমরা ভীষণ ভয় পাই। আমার ফুপু ভীষণ রাগী। তিনি রাগ করলে আমাদের মাথার উপর থেকে ছাদ সরে যাবে। ফুপুও আমাদের অনেক ভালবাসেন। তাকে আমরা খুব শ্রদ্ধা করি।’
‘তাহলে ফুপুকে বলেন পিয়ালের সঙ্গে মায়াকে বিয়ে দিতে। নাকি মায়ারও ধনীর দুলাল বিয়ে না করার বাসনা আছে?’
এবার মুখ টিপে হাসলো জয়া। জয়া যেভাবেই হাসুক, ওর হাসির মধ্যে ঝর্ণধারার জল গড়িয়ে পড়ার ছান্দসিকতা সৃষ্টি হয়। ওর হাসির মধ্যে দৃষ্টি আটকে গেলে কেমন সম্মোহনেরও সৃষ্টি হয়। রুদ্র তাকিয়ে থাকে জয়ার দিকে। হাস্যোজ্জ্বল জয়া বলল,
‘আপনি তাহলে পেছনের কথা জানেন না? আপনার বন্ধু পিয়াল কিছু বলেনি?’
‘না। শুধু জানি আপনার সঙ্গে ওর বিয়ে হবে।’
‘তাহলে শুনুন। আমার ফুপুর বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে আপনার বন্ধু পিয়াল মায়াকে দেখে পছন্দ করে ফেলে। পিয়ালের পরিবার এ কথা জানায় আমার ফুপুকে। ফুপুও খুশি হন। তিনি আমার মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে একটি দিন নির্ধারণ করেছিলেন। ঐ দিন পিয়াল মায়াকে দেখতে এসেছিল। মায়ার সঙ্গে কথাও বলেছিল। ঐ সময় পিয়াল আমাকে দেখে তিনি তার মত পাল্টান। আমার সঙ্গে পিয়ালের ঐদিন কোন কথাই হয়নি। অথচ বাড়ি ফিরে পিয়াল ফুপুকে জানায়, মায়াকে নয়, সে আমাকে পছন্দ করেছেন।’
‘কী বলছেন! এ কথা তো পিয়াল আমাকে বলেনি!’
রুদ্রের ভেতরে বিস্ময় আর মিহিন কষ্টের একটা স্রোত বইতে শুরু করে। জীবনে এমন ঘটনাও ঘটে? প্রথমে একজনকে পছন্দ করে দেখতে এসে মত বদলে অপর বোনকে পছন্দ করে বিয়ে করার চেষ্টা কি ঠিক? বিত্তবান হলে নিজের ইচ্ছে চরিতার্থ করতে একটুও ভাববে না? শিষ্টাচার, ভদ্রতা বা লোক-লজ্জা বলে কি কিছু নেই এদের? রুদ্র এ কথাগুলো মনে মনে ভাবলেও মুখে এ বিষয়ে কিছু বলল না। পিয়াল যে ওর কাছে ভাগ্য-বিধাতার মত। পিয়ালের দোষ-ত্রুটি ধরে কথা বললে কোন কিছুরই পরিবর্তন হবে না। রুদ্র কোন কিছু বদলে দিতেও পারবে না। রুদ্রকে চুপ করে থাকতে দেখে জয়া বলল,
‘কিছু বলছেন না যে!’
‘আমি কী বলতে পারি। মায়াকে পিয়াল পছন্দ করলো না? প্রথম পছন্দ করলো, ফের আপনাকে দেখে তাকে বাদ দিয়ে দিল। বিষয়টি কেমন খটকা লাগছে।’
‘আমি ঠিক জানি না-কেন এমনটা হলো। পিয়াল আমার ফুপুকে বলেছে-মায়ার চেয়ে আমি নাকি শান্ত-ধীর। এটা ওর ভাল লেগেছে। পিয়াল নাকি শান্ত-ধীর চরিত্রের মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে বেশি পছন্দ করে।’
‘ও, আচ্ছা! মায়া কি এতে মন খারাপ করেছে?’
‘মুখে কিছু বলেনি। ভাব দেখে মনে হয়েছে ও খুশি হয়েছে। পিয়ালকে ও পছন্দ করেনি।’
‘কেন?’
‘জানি না। মায়া আমাকে বলেছে, পিয়ালের সঙ্গে শেষ অব্দি আমার বিয়ে না হলে ও নাকি খুশি হবে।’
রুদ্র এর জবাবে কী বলবে, ভেবে পাচ্ছে না। ঘটনাটা মায়া কীভাবে নিয়েছে-জয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট নয়। তবে পিয়ালের আচরণ যে জয়া ও মায়া ভালোভাবে নেয়নি, এটা ও বুঝতে পারছে। জয়া সত্যিই শান্ত স্বভাবের মেয়ে। ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে না। পরিবারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবার ইচ্ছা ওর নেই। ফুপুকে রাগাতে চায় না ও। জয়া কি এ সব কথাই বলতে এসেছে ওর কাছে-চট করে ভেবে নিল রুদ্র।ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। জয়াও চুপ। ওদের মধ্যে নীরবতা এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অস্বস্থিও তৈরি করছে। চুপ থাকলে জয়ার মনে লেপ্টে থাকা গ্লানির রেশ যেন রুদ্রকেও স্পর্শ করছে সন্তর্পণে। এক সময় জয়া নীরবতা ভাঙে। ও বলে,
‘আপনার কাছে আমার কিছু জানার আছে। এ কারণে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। নিজের বাসায় ডেকে নিয়ে এ সব কথা বলা যেত না।’
কথা শুনে রুদ্র বুঝতে পারলো জয়া পিয়াল সম্পর্কে জানতে চাইবে। পিয়ালের বন্ধু হিসাবে ওর কাছে নানা বিষয়ে জানতে চাইবে ও। কিন্তু সব কথা বলতে পারবে না রুদ্র। মনে মনে সতর্ক হলো ও। জয়া বলল,
‘আপনি আমাকে একটা সহযোগিতা করতে পারবেন?’
‘কী রকম সহযোগিতা?’
‘পিয়ালের সঙ্গে আমার যাতে বিয়েটা না হয়-এমন কোন একটা কাজ করে দেখাতে পারবেন?’
‘কী বলছেন, আপনি!’
রুদ্রর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠে। ওর বুকের ভেতরে শ্বাসকষ্ট শুরু হলো কি? শ্বাস-প্রশ্বাস কেমন আটকে যাচ্ছে! ওর ভেতরে কেউ একজন চিৎকার করে বলল-‘জয়া এসব কি বলছে!’ রুদ্রর মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেছে বুঝতে পারছে জয়া। ও ম্লান হেসে বলল,
‘আপনি মনে হয় শকড্ হয়েছেন? আমার কথায় কি আপনি বিব্রত বোধ করছেন?’
‘অনেকটা তাই। আপনি কেন বিয়ে না করার কথা ভাবছেন, বলুন তো!’
‘না, মানে, আমি মাষ্টার্সটা শেষ করে চাকুরি করার কথা ভাবছি। এরমধ্যে বিসিএস দেয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। এখন যদি বিয়ে করে ফেলি, তাহলে আর ক্যারিয়ার তৈরি করা যাবে না। সংসারের চার দেয়ালে বন্দি এক পুতুল হয়ে যাবো। তাইনা?’
রুদ্র বুঝতে পারছে জয়া যা বলছে, তা ওর স্বপ্নের কথাগুলো বলছে। ওর স্বপ্ন পূরণ হলে রুদ্রর স্বপ্নটা অধরা থেকে যাবে। যদিও জয়ার বিয়ে হওয়া বা না হওয়া নিয়ে ওর কোন ভূমিকা নেই, তারপরও পিয়ালের সঙ্গে জয়ার বিয়ে হয়ে গেলে ওর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। এখন জয়া বলছে, এতে ওর বুকের ভেতরে ধুপ-ধুপানি শুরু হয়েছে। জয়া প্রশ্নবোধক দৃষ্টি রেখে রুদ্রের কাছে জানতে চাইলো,
‘কোন কথা বলছেন না যে! আমি কি অযৌক্তিক কিছু বললাম?’
জবাব দিতে একটু সময় নিল রুদ্র। এ ধরনের কথার জবাব চট করে দেয়া যায় না। ভেবে, যুতসই জবাব দিতে হয়। রুদ্র কণ্ঠ গম্ভীর করে বলল,
‘অযৌক্তিক বলবো না। তবে বিয়ে করাটাও অযৌক্তিক নয়। পিয়ালের সঙ্গে বিয়ে হলে আপনাকে ক্যারিয়ার গড়ার বিষয়টা চিন্তা থেকে বাদ দিতে হবে। একটি ধনী বা বিত্তবান পরিবারের বউ হলে সেটাও আপনার জন্য অনেক নিরাপদ, অর্থাৎ আমি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলছি। এর মধ্য দিয়ে আপনার একটি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটবে, তবে জীবন বিফল হয়ে গেলো-এটা ভাববার কোন সুযোগ নেই। সাধারণত একটি মেয়ে সৎ চরিত্রবান স্বামী ও স্বচ্ছল সংসারই চায়। এই বিচারে পিয়াল সর্বোত্তম পাত্র। এভাবে ভেবে দেখুন না!’
কথাটা বলে রুদ্র জয়ার মুখের দিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি রাখলো। চোখ ও মুখের অভিব্যক্তিতে অনেক সময় মনের প্রতিক্রিয়ার ছবি ফুটে উঠে। যে কথাটা ও বলল, ওটার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে-তা জানার প্রবল আগ্রহ থেকে রুদ্র জয়ার মুখের অবয়ব পড়তে চায়। জয়ার মনের মধ্যে হয়তো ভাবনার রেশ ছড়িয়েছে। এর মানে ওর কথাটা উড়িয়ে দিতে পারেনি জয়া। ও ভাবছে। রুদ্র ফের বলল,
‘অনেক সময় ভাল সুযোগ গ্রহণ না করলে, ঐ সুযোগ ফের নাও আসতে পারে। আমি অনেক মানুষকে দেখেছি-তারা একটি সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায় বছরের পর বছর প্রতীক্ষা করেছে। সুযোগ আসেনি, জীবনের বাঁকও বদলাতে পারেনি। আবার কেউ কেউ যথাসময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। আপনিও আপনার চারপাশে তাকালে এমন অনেককে দেখতে পাবেন।’
জয়া মনে হলো মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে। কথাগুলো কি জয়ার মনকে স্পর্শ করেছে? এই মুহুর্তে ভাল লাগছে রুদ্রর। জয়া আরো কিছু মুহুর্ত ভাবলো। এরপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘এবার বলুন তো, আপনার বন্ধু পিয়ালের স্বভাব-চরিত্র কেমন?’
‘খারাপ কিছু দেখছি না তো! ধনীর সন্তানদের যে ধরনের স্বভাব-চরিত্র থাকে, ওর মধ্যে সেটাই আছে!’
‘যেমন?’
‘যেমন আর কি, দু’হাত খুলে অর্থ খরচ করে। কারো বিপদ দেখলে পাশে দাঁড়ায়। পার্টি করতে পছন্দ করে। পার্টি করলে একটু ড্রিংকস করার অভ্যাসও আছে।’
‘আর কোন বদ আভ্যাস নেই?’
জানতে চাইলো জয়া। রুদ্রর ভেতরে একটু কাঁপুনি লাগলো। ও সামলে নিল। বলল,
‘আমি পিয়ালের স্বভাব-চরিত্রে খারাপ কিছু দেখেনি। ওর সঙ্গে মেলামেশা করার যতটুকু সুযোগ পেয়েছি, এর মধ্যে খারাপ কিছু আমার চোখে পড়েনি।’
‘আপনি কি সত্যিই কিছু দেখেননি? নাকি কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন?’
‘না, সত্যি কথাটাই বললাম। আপনার সন্দেহ হচ্ছে?’
‘আপনাকে সন্দেহ করতে পারছি না। বরং ভরসা করতে ভাল লাগছে।’
জয়ার জবাবে রুদ্র নিজের ভেতরে কেমন একটা আনন্দানুভূতি টের পেল। জয়া ওর উপর ভরসা করছে-কথাটা এক ধরনের অনুরাগ মেশানো। রুদ্র মনে মনে আপ্লূত হলেও মুখে ফুটিয়ে তুললো না। ও বলল,
‘শুধু ভরসা নয়, বিশ্বাসও করতে পারেন আমাকে।’
‘সেটাই করছি। আপনার প্রতি ভরসা ও বিশ্বাস-দুটোই জন্ম নিয়েছে। গত দু’তিন ধরে ভাবছিলাম আপনার সঙ্গে আলোচনা করবো। আলোচনা করাটা ঠিক হবে কিনা-এ নিয়ে নিজের মনে মধ্যে নানা প্রশ্ন ছিল। একটা সময় উপলব্ধি করলাম, আপনাকে বিশ্বাস করা যায়, ভরসা রাখা যায়। আর..!’
জয়ার কণ্ঠ ধরে এলো। কণ্ঠে আবেগের কম্পন। রুদ্র জানতে চাইলো,
‘আর কি? বলুন তো!’
‘আর কিছু নয়, বা অনেক কিছু। ও সব আপনাকে জানতে হবে না।’
‘ঠিক আছে, না জানালে জানবো না। জানতে চাইবোও না। এবার বলুন, পিয়ালকে বিয়ে করতে এখন আর কোন আপত্তি আছে?’
রুদ্র প্রশ্নটা করে কৌতুহলী দৃষ্টি রেখে তাকিয়ে থাকে জয়ার চোখে-মুখে। জয়া একটু লজ্জা পেল যেন। বিয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কথা বলতে গেলে সাধারণত মেয়েরা লজ্জা পায়। জয়ার লজ্জাবতী মুখ দেখে স্বস্থি পেল রুদ্র। জয়া রুদ্রর চোখে চোখ রেখে বলল,
‘এবার আপনি বলুন তো, পিয়ালকে আমি বিয়ে করলে ঠকবো নাতো? জবাবটা দেবেন আমাকে নিজের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে। ভেবে নিন, আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম।’
‘শুধু ভেবে নেবো? নাকি সত্যি সত্যি ভেবে নেবো?
জানতে চাইলো রুদ্র। ওর কথা শুনে জয়া মিষ্টি করে হাসলো। ও বলল,
‘সত্যি সত্যি আমাকে বন্ধু করে নিন। নেবেন?’
‘নিলাম। আমার অনেক বন্ধু আছে। তবে এই প্রথম মেয়ে বন্ধু হলো কেউ!’
কথাটা বলে রুদ্র হেসে ফেললো। জয়া তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। কিছু কথা আছে, সাধারণ অর্থের চেয়ে অনেক বেশি গভীর অর্থময়। কিছু সময় আছে, ঐ ধরনের কথায় অদ্ভূত বিহবলতায় ডুবে যায়। আবার কথা ও সময় আছে, যা কারো মনে বর্ণিল রেখাপাত সৃষ্টি করে। জয়ার মনের কোণে এমন এক বর্ণিল রেখা উঁকি দিয়ে মিলিয়ে গেল। কয়েক মুহুর্তের তন্ময়তা। জয়ার তন্ময়তাকে ভেঙে দিয়ে রুদ্র বলল,
‘পিয়ালকে বিয়ে করার কথা নিয়েই ভাবুন। ওর সঙ্গে কীভাবে পুরো জীবন কাটাবেন, নিজেকে প্রস্তুত করুন। একটা স্বপ্ন সাজিয়ে নিন। জানেন তো, স্বপ্ন নিয়েই জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়।’
জয়া রুদ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। আজ ও যেন খুব বেশি বিহবল হয়ে যাচ্ছে। নাকি রুদ্র নিজেকে ওর সামনে অন্যরূপে পেখম ছড়িয়ে নিচ্ছে? এই প্রশ্নটা ওর অনুভবে জমে রইলো কিছুক্ষণ।

সাত.

জয়া গেটের সামনে এসে দেখলো রেঞ্জ রোভার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র। রুদ্রের পড়েছে কালো প্যান্ট ও হালকা হলুদ রঙের ফতুয়া। পায়ে কোলাপুরি স্যাণ্ডেল। এমন বিলাসবহুল গাড়ির সঙ্গে এই পোষাকে রুদ্রকে একেবারেই বেমানান লাগছে। জয়া ভীষণ অবাক হলো রুদ্রকে এই পোষাকে দেখে। একইসঙ্গে পিয়ালের রেঞ্জ রোভার গাড়ি নিয়ে সে এসেছে বলে তার ভাল লাগল না। জয়ার মনটা তেতে উঠলো। রুদ্র হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে অফ হোয়াইট রঙের রেঞ্জ রোভার গাড়ির সামনে, যেন জয়াকে অভ্যর্থনা জানিয়ে গাড়ির দরোজা খুলে দেবে ও। আজ অস্টিনে পার্টি দিয়েছে পিয়াল। হবু স্ত্রী’কে নিজের বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য এই পার্টির আয়োজন করেছে সে। জয়া প্রথমে এমন পর্টিতে যেতে রাজী হয়নি। ওর ফুপুর অনুরোধে যেতে হচ্ছে ওকে। ও আজকের পার্টির প্রধান আকর্ষণ। জয়া পার্টিতে যাবে নিজেদের গাড়িতে-এটা সে ঠিক করে রেখেছে। পিয়ালকে কালরাতে এ কথা জানিয়েছেও টেলিফোনে। কিন্তু পিয়াল ওর কথা গ্রাহ্য করেনি। জয়াকে জানিয়েছিল ওকে বাড়ি থেকে রুদ্র নিয়ে আসবে অস্টিনে। পিয়ালের কথায় আপত্তি করেনি জয়া। কিন্তু রুদ্রকে নিজের রেঞ্জ রোভার গাড়িসহ পাঠিয়ে আজ নিজের বিত্তের অহম প্রকাশ করলো যেন পিয়াল। কথাটা ভেবে বিষন্ন হয়ে গেল জয়া। নিজ বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে ও ফোন করলো পিয়ালকে। ও প্রান্তে পিয়ালের কণ্ঠস্বর,
‘হ্যালো, কী খবর জয়া? রুদ্র পৌঁছুছে?’
‘হ্যাঁ। তিনি এসেছেন, তবে আপনার গাড়ি পাঠানোটা আমার ভাল লাগেনি।’
‘হোয়াই? এতে খারাপ লাগার কি আছে?’
‘বাহ রে। আমাদের কি গাড়ি নেই? হোক সেটা ছোট গাড়ি। তাতে কি?’
‘ইটস ওকে! আমার গাড়ি তো আপনারও গাড়ি, তাইনা?’
‘সেটা আরো কিছুদিন পর থেকে অনুভব করবো। আজ করতে পারছি না।’
জয়ার কণ্ঠে রাগের উত্তাপ। ও প্রান্তে পিয়ালের চেহেরাটা কেমন দেখাচ্ছে, কো জানে! জয়া রাগলে তখন কাউকে তোয়াক্কা করে না। পিয়ালের নরোম কণ্ঠ শোনা যায়,
‘ওকে, ওকে। বি কুল! গাড়ি পাঠিয়েছি, এটা নিজের দায়িত্ব মনে করে। আপনি যদি ওটাতে না আসতে চান, নো-প্রবলেম! আপনার গাড়িতেই আসুন। আমার ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিন। দ্যাটস অল!’
‘ঠিক আছে, আমি তাই করছি।’
‘উই আর ওয়েটিং ফর ইউ! কাম, সুইটহার্ট!’
এর জবাবে কিছু বলল না জয়া। ফোনের লাইন কেটে দিল। রুদ্র হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। জয়ার ভেতওে ঝড় বইছে। রুদ্র’র সামনে গিয়ে ও বলল,
‘আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন?’
‘হুম। আপনাকে নিয়ে যেতেই তো এসেছি।’
‘তাহলে বিলাসবহুল গাড়িটি পাঠিয়ে দিন ওটার মালিকের কাছে।’
‘কেন? এ গাড়িতে যেতে কোন অসুবিধা আছে?’
‘সুবিধা-অসুবিধা বোঝেন শুধু? আর কিছু চোখে পড়ে না আপনার?’
জয়ার কণ্ঠে ঝড়টা জানান দিতে চায়। রুদ্র বুঝতে পারে না। ও মুখে হাসি ধরে রেখে জানতে চায়,
‘কী রকম বলুন তো! কোন ভুল হলো কি?’
‘আপনি তো ভুল-শুদ্ধ নিয়ে মাথা ঘামান বলে মনে হয় না। শুধু ফরমায়েস পালন করতে ব্যস্ত থাকেন।’
জয়ার কথায় রাগ নাকি শ্লেষ-বোঝার চেষ্টা করলো রুদ্র। ও একটু ভেবে জয়াকে বলল,
‘আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলবেন?’
রুদ্র’র প্রশ্নবোধক চোখে চোখ রেখে জয়া বলল,
‘বলছি। এর আগে আপনি পিয়ালের গাড়ির চালককে বলুন চলে যেতে। আমাদের গাড়িতে আমরা যাবো।’
‘ও আচ্ছা, এবার বুঝতে পেরেছি।’
বলে রুদ্র পিয়ালের গাড়ির চালকের কাছে গিয়ে ফিরে যাবার কথাটা বলল। গাড়ির চালক হাসিমুখে গাড়িটি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। জয়া দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল ওদের গাড়ির জন্য। একটা মেরুন রঙের টয়োটা গাড়ি ফ্ল্যাটের গেট দিয়ে বেরিয়ে এলো। জয়া দেখলো রুদ্র অন্যমনস্কভাবে দাঁড়িয়ে আছে। জয়া ডাকলো ওকে,
‘আসুন। গাড়িতে উঠুন।’
জয়া গাড়ির পেছনের সীটে গিয়ে বসলো। রুদ্র বিব্রতবোধ নিয়ে গাড়ির সামনের সীটে বসতে গেলে পেছন থেকে জয়া বলল,
‘পেছনে আসুন। সামনে বসছেন কেন?’
রুদ্র মনে মনে প্রমাদ গুনলো। জয়ার সঙ্গে পেছনের সীটে বসে যেতে হবে-ভেবে বিচলিত বোধ করলো। তবে জয়ার কণ্ঠে ছিল যেন নির্দেশ। ওটা ভেবে গাড়ির পেছনের সীটে গিয়ে বসলো যতটা সম্ভব জয়ার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে। জয়া রুদ্রের অস্বস্থি টের পেয়ে মনে মনে হাসলো। জয়া রুদ্রর অস্বস্থি কাটাতে মিষ্টি করে বলল,
‘আপনি জানেন তো, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
‘জানি। উত্তরায়, পাঁচ তারকা অস্টিন হোটেলে।’
‘কেন ওখানে যাচ্ছি, জানেন?’
‘আজ একটা জমকালো পার্টি হবে ওখানে।’
মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে এমনভাবে জয়ার প্রশ্নের জবাব দিল রুদ্র। জয়া বলল,
‘বা বেশ, জানেন দেখি! কীসের পার্টি, সেটা জানেন?’
‘না। পার্টি হবে, শুধু এটুকু জানি। পিয়াল এর বেশি কিছু বলেনি আমাকে।’
‘স্ট্র্যাঞ্জ! আপনি তার বন্ধু, আর আপনাকে কীসের পার্টি, তা বলেনি!’
‘না বললেই বা কি? ওসব পাঁচ তারকা হোটেলের পার্টি নিয়ে আমার নিজেরও আগ্রহ নেই।’
রুদ্রর কণ্ঠে তাচ্ছিল্যভাব। চোখে-মুখে কৌতুহল প্রকাশ করে জয়া জানতে চাইলো,
‘আপনার তাহলে কীসে আগ্রহ আছে, বলুন তো?’
রুদ্র জানে, জয়া ওর প্রতি রাগ করে আছে। পিয়ালের গাড়ি নিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া পছন্দ করেনি জয়া। কিন্তু এতে রুদ্র’র দোষ কোথায়? পিয়াল গাড়ি পাঠালে ও কি বলবে-না, জয়া তোর গাড়িতে আসবে না। বা জয়া যে পিয়ালের গাড়িতে আসবে না, এটাও তো সে নিজে জানে না। যে ঘটনার জন্য ও নিজে দায়ী নয়, সে কারণে জয়ার রাগ করাটা যৌক্তিক কি? কিন্তু এ কথাটা ও জয়াকে এখন বলতে চায়না। পার্টিতে যাবার আগে জয়ার মনকে বিষন্ন করে দিতে চায় না রুদ্র। কথাগুলো মনে মনে ও ভাবছিল। রুদ্র চুপ করে থাকায় জয়া ফের বলল,
‘কি, কথা বলছেন না কেন? আমাকে বলুন, আপনার কিসে আগ্রহ আছে?’
চুপ করে থাকা যাবেনা, বুঝলো রুদ্র। কথা চালিয়ে যেতে হবে। তা ও ম্লান হেসে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
‘আপনি কি আমার ওপর রেগে আছেন?’
‘রাগ করবো না? আপনি কেন পিয়ালের গাড়ি নিয়ে আমাকে নিতে এসেছেন?’
‘পিয়াল বলল, তাই এসেছি।’
শান্তকণ্ঠে বলল রুদ্র। জয়া অবাক চোখ তুলে বলল,
‘পিয়াল যা বলবে, আপনি তাই করবেন? একটু ভাববেন না, কাজটা কী ঠিক হচ্ছে কিনা?’
‘আমি আসলে অতোকিছু ভাবতে পারি না।’
‘ভাবতে পারেন না, নাকি ভাবতে চান না?’
‘আপনার কী মনে হয়?’
জানতে চাইলো রুদ্র। জয়া বলল,
‘আপনি আসলে যার কাজ করেন, তার সব কথাকেই শিরোধার্য মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভাল-মন্দটুকুও বিচার করেন না।’
জয়ার অভিযোগ শুনে রুদ্র মৃদুকণ্ঠে প্রশ্ন করল,
‘আমি কি মন্দ কিছু করেছি?’
‘অবশ্যই করেছেন।’
‘কী করেছি?’
‘পিয়ালের কথায় আমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করেছেন।’
জয়ার এ কথায় রুদ্র নিজের মধ্যে চমকে উঠলো। ও আমতা-আমতা করে বলল,
‘কেন তা মনে হলো?’
‘আপনি গত শুক্রবার ছায়ানটে গিয়ে ঘুরাঘুরি করেছেন না? ছায়ানটে আমি কী করি-লক্ষ্য করেছেন দূর থেকে। আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে যেচে কথা বলে নানা অজুহাতে আমার কথা জানতেও চেয়েছেন। বলুন, এ কথা মিথ্যা?’
জয়ার কথা শুনে হচকিয়ে গেল রুদ্র। জয়া যা বলল, তা একবিন্দুও মিথ্যা নয়। ও তো জয়ার খোঁজ-খবর নিয়েছে। কিন্তু জয়া তা কীভাবে জেনে গেল, তা নিজের মনে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিল। ও নরোমকণ্ঠে কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,
‘না। মিথ্যে নয়। আমি ছায়ানটে গিয়েছিলাম। আপনার সম্পর্কে তথ্য-তালাশ করেছি। কিন্ত..!’
‘কিন্তুু কি?’
‘কিন্তুু আপনার ক্ষতি করেছি কি?’
জানতে চাইলো রুদ্র। ওর প্রশ্নের জবাবে জয়া বলল,
‘আমার ক্ষতির কথা ছাড়ুন। এ ধরনের কাজে কি আপনার ক্ষতি হচ্ছে না? পিয়ালকে খুশি করতে আপনি কেন এতো তুচ্ছ কাজ করছেন? পিয়াল যা বলবে, আপনাকে তাই করতে হবে?’
জয়ার এ কথাটা যেন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ওর সামনে। কথাটাকে উড়িয়ে দিতে পারলো না। বরং ওর মনে হলো কথাটা তো সত্যিই। ও কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ালো। ও কী বলবে-ভেবে পেল না। ও কথার জবাব দিচ্ছে না বলে জয়া বললো,
‘কথা বলছেন না কেন? বলুন, আমি কি ভুল বলছি?
‘না। ভুল বলছেন না। তবে..!’
‘তবে কি? বলুন!’
তাগিদ দিল জয়া। রুদ্র বলল,
‘আমি একটা স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে পিয়ালের কথায় এ কাজ করেছি।’
‘পিয়াল আপনাকে ভালো একটা চাকুরি দেবে, এইতো? আচ্ছা, আপনার আরেক বন্ধু লিয়োনার্দোও তো আপনাকে চাকুরির প্রস্তাব দিয়েছে। ওটা করছেন না কেন?’
‘না, মানে..।’
রুদ্র যেন কথার ঝড়ে লন্ডভন্ড! ও যুতসই জবাব খুঁজছে নিজের মধ্যে। জয়াই যেন জবাবটা বলে দিলো,
‘পিয়াল, এরচেয়ে আকর্ষণীয় বেতনের চাকুরি দেবে, এই আশায় রয়েছেন।’
‘ঠিক ধরেছেন। আমি একটা স্বপ্ন নিয়ে আছি। আমার চোখের সামনে স্বপ্নটা ছাড়া আর কিছু নেই।’
‘তাই বলে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে? নিজের মর্যাদাকে ম্লান করে পথ চলতে হবে?’
‘আপনার কেন তা মনে হচ্ছে?’
জানতে চাইলো রুদ্র। ওর প্রশ্নে জয়ার মুখে বিষন্ন হাসি ফুটে উঠলো। জয়া একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
‘আমার মনে হওয়াটা অমূলক কিছু নয়। ছায়ানটে আপনাকে দেখার পর থেকে আমি আপনাকে নিয়ে অনেক ভেবেছি। আপনার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্য দিয়ে বুঝতে পেরেছি, পিয়াল আপনাকে আমার পেছনে লাগিয়েছে। আর আপনি পিয়ালের কথামত আমার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। বলুন, ঠিক বলছি কিনা?’
জয়ার কথার কোন জবাব দিল না রুদ্র। এমন সত্যের মুখোমুখি হবার জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। ওর মনের ভেতরে লজ্জা মিশ্রিত অপরাধবোধ সক্রিয় হলো। জয়া রুদ্রর কোন জবাব না পেয়ে আর কথা বলল না। ও গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। গাড়ি ছুটছে উত্তরার দিকে। জয়াদের গাড়ির চালক কালাম মিয়া প্রায় দশ বছর ধরে ওদের গাড়ি চলাচ্ছে। মধ্য বয়সী মানুষ, গাড়ি চালায় বেশ সতর্কতার সঙ্গে। গাড়িটা যখন মহাখালীতে পৌঁছুলো, তখন জয়ার হঠাৎ মনে হলো রুদ্রর পোষাক পার্টির জন্য মানানসই নয়। ও চালকের উদ্দেশ্যে বলল,
‘ড্রাইভার, উত্তরা যাবার আগে যমুনা ফিউচার পার্ক মলে যান তো। ওখানে আমরা একটু থামবো।’
‘জ্বি, আচ্ছা’
বলল গাড়িচালক কালাম মিয়া। রুদ্র জয়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে জানতে চাইলো,
‘ওখানে যাবেন কেন? দেরি হয়ে যাচ্ছে না?’
‘হোক দেরি। আপনার পোষাক দেখেছেন? পার্টিতে যাবেন, এই পোষাক পড়ে?’
‘আমি পার্টিতে যাবো! কে, বললো?’
বিস্ময় প্রকাশ করে রুদ্র। পাল্টা বিস্ময় প্রকাশ করে জয়া বলল,
‘কেন আপনি পার্টিতে যাবেন না!’
‘না। পিয়াল তো এমন কথা আমাকে বলেনি!’
‘আশ্চার্য! আপনি পিয়ালের বন্ধু, আর আজকের পার্টিতে আপনাকে ও বলেনি!’
‘না। এতে অবাক হচ্ছেন কেন?’
‘আমি অবাক হবো না? আপনি এই ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে মানছেন?’
‘হ্যাঁ। আমি তো পিয়ালদের সোসাইটির কেউ নই। আমার অবস্থান অতো উঁচুতে নয়। এ ছাড়া এ ধরনের পার্টিতে আমি কখনও যাইনি। এ নিয়ে আমার কৌতুহলও নেই।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে রুদ্র’র কণ্ঠ যেন বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো। জয়া শ্লেষ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
‘আপনার অবস্থানটা তাহলে কতটা নিচুতে? আমাকে একটু বলুন তো!’
‘আপনি আজ খুব রেগে আছেন, বুঝতে পারছি।’
‘হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। আমি খুব রেগে আছি।’
‘আপনার রাগটা আমার ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো বইছে!’
আহত কণ্ঠে বলল রুদ্র। জয়া জবাবে বলল,
‘হ্যাঁ, এটাও ঠিক বলেছেন। আপনার ওপরই আমার যত রাগ!’
রুদ্র নিজের ভেতরে এক ধরনের দহন টের পাচ্ছিলো। এ ধরনের দহন মনকে শুধু পোড়ায় না, এমন অস্থিরতা অন্তরে ছড়িয়ে দেয়, যা কোন কিছুতেই উচ্ছ্বাস অনুভব করতে পারে না। পার্টির সাজ-সজ্জায় জয়াকে এতো অপূর্ব লাগছিল যে, চোখ ফেরাতে পারছিল না রুদ্র। এই মুহুর্তে জয়ার সৌন্দর্য ওর দৃষ্টিতে লাগছে না। এই ধরনের দহনকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না-চট করে ভেবে নিল রুদ্র। ও নিজেকে স্বাভাবিক করতে জয়ার উদ্দেশ্যে হাসিমুখে বলল,
‘হয়েছে, এবার একটু রাগ কমান। জানেন তো, ঐ পার্টিতে কিন্তু আপনিই প্রধান আকর্ষণ!’
‘তো? আমাকে মেকী হাসি বিলিয়ে দিয়ে থাকতে হবে?’
কপট রাগ প্রকাশ করে জয়া। রুদ্র মুখের হাসি আরো বৃস্তিৃত করে বলে,
‘মেকী হাসবেন কেন? ওটা আপনার হয় না। আপনার মধ্যে মেকী কিছু মানায় না।’
‘এটা আমাকে খুশি করার জন্য বললেন, নাকি কমপ্লিম্যান্ট?’
‘যা সত্যি, তাই বললাম।’
রুদ্র’র জবাবটা ভাল লেগেছে জয়ার। ও কৌতুহল প্রকাশ করে বলল,
‘আমার সম্পর্কে আর কী কী জানেন? কতটা খোঁজ নিতে পেরেছেন?’
এ কথায় শুধু হাসলো রুদ্র। জয়া বলল,
‘হাসছেন যে! বলুন, কী জানতে পেরেছেন।’
‘তেমন কিছু জানতে পারিনি। শুধু পর্যবেক্ষণ করেছি।’
‘তাহলে তো কাজে ফাঁকি দিয়েছেন। পিয়ালকে কী বলেছেন?’
জয়ার প্রশ্নটায় একটু চিন্তিত হলো রুদ্র। ও ভেবে বলল,
‘বলেছি, জয়া উত্তাল সমুদ্র নয়, ও হচ্ছে নিটোল পদ্মদীঘি!’
এ কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো জয়া। এ কথাটার কী অর্থ দাঁড়ায়, বুঝতে পারেনি জয়া। তবে কথাটা ওর ভাল লেগেছে। হাসি থামার পর জয়া বলল,
‘পিয়ালকে এটাও বলেছেন কি-পদ্মদীঘিতে পদ্ম আছে, কি নেই?’
এর জবাবে রুদ্র কিছু বলল না। কথা বাড়াতে চায় না ও। কথা আরো অনেক কথার দিকে টেনে নিয়ে যাবে। তবে এই মুহুর্তে জয়ার মন শান্ত হয়েছে-এটাই ওর ভাল লাগছে। ওদের গাড়ি গুলশান হয়ে যমুনা ফিউচার পার্কের কাছাকাছি চলে এলো। রুদ্র আজকের পার্টিতে কিছুতেই যাবে না। ওর পোষাক কিনে দিয়ে পার্টিতে রুদ্রকে নিয়ে যাবার জয়ার প্রচেষ্টা সফল হতে দেবে না ও। মনে মনে এ কথা ভেবে জয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘আমি যদি এদিকে নেমে যাই, রাগ করবেন?’
‘কেন? পার্টিতে যাবেন না?’
‘না। তা হয় না। আমি আমন্ত্রিত নই। তাই আমি পার্টিতে যেতে পারি না। এটা তো আপনি বুঝতে পারছেন।’
‘কিন্তু আমি চেয়েছিলাম..!’
‘সেটা সম্ভব নয়। আপনি এ চেষ্টা করবেন না, প্লিজ!’
রুদ্রর কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ে। জয়া বলে,
‘আপনি আমার অতিথি হিসাবে যেতে পারেন। আমি নিজেও এতে স্বস্থি পাবো।’
‘কিন্তু এটা আমার জন্য বিব্রতকর। আমি যেতে পারি না। আমি শুধু আপনাকে অস্টিন অব্দি দিয়ে আসতে পারি।’
বলল রুদ্র। জয়া কণ্ঠ নিচু করে বলল,
‘আপনি কি আমার নিরাপত্তা কর্মী? পিয়ালের এ কাজ আমার ভাল লাগছে না! বন্ধুকে ‘বন্ধু’র সম্মান দিতে হয়!’
এ কথায় চুপসে গেল রুদ্র। কী বলবে ও? জয়ার সঙ্গে কথা বাড়াতে চায় না ও। যা মনে হচ্ছে, কথা বাড়ালে কথার ঝড় বয়ে যাবে আজ। ও বলল,
‘আমাকে বরং এই এলাকায় নামিয়ে দিন। সেটাই আমার জন্য ভালো হবে।’
জয়ার ওদের গাড়ির চালক কালাম মিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘ড্রাইভার, এদিকে কোথাও থামুন তো!’
গাড়িরচালক কালাম মিয়া গাড়ির গতি কমিয়ে এনে ধীরে-ধীরে রাস্তার একপাশে থামালো। রুদ্র জয়ার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল,
‘আপনাকে ধন্যবাদ। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি পিয়াল ও আপনার সুন্দর জীবন কামনা করি। আজকের পার্টির মধ্য দিয়ে আপনাদের যুগল জীবনের বর্ণিল অধ্যায়ের শুরু হোক।’
কথাটা বলে রুদ্র গাড়ির দরোজা খুলে বের হলো। ওকে অবাক করে দিয়ে জয়াও বেরিয়ে এলো। জয়াকে পার্টির সাজে অপন্সীর মত লাগছে। গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছে। চুলগুলো মাথার ওপর ঢেউ তুলে একপাশে ক্লিপবন্দি হয়ে আছে। মুখায়বে হালকা প্রশাধন আর চোখের নিচে কাজল মেখেছে ও। নারীদের সাজ-সজ্জার এক অন্যরকম ব্যাপ্তি আছে। জয়ার সৌন্দর্য আর সাজের ব্যাপ্তিতে ওকে আজ প্রষ্ফূটিত গোলাপের মতো লাগছে। রুদ্র নিজের মুগ্ধতাকে সম্মানের উপলব্ধিতে মিশিয়ে দিয়েছে। রুদ্র জয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘আপনি গাড়ি থেকে নামলেন কেন?’
‘আপনাকে কঠিন দু’একটা কথা বলার জন্য।’
জয়ার জবাবে ছেদ করে উঠলো রুদ্রর বুক। কী বলছে জয়া! ও চোখ গোল করে চেয়ে রইলো জয়ার মুখের দিকে। জয়া গম্ভীরকণ্ঠে বলল,
‘রুদ্র, আপনি কি জানেন, আপনি এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগছেন?’
কথা নয়, যেন কথার চাবুক মারলো জয়া। রুদ্র ক্ষীণকণ্ঠে বলল,
‘কেন এমন মনে হলো আপনার?’
‘সেটাই বলছি। আপনি নিজেকে অসহায় ভেবে-ভেবে নিজের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি করেছেন। এ কথাটা বলার উদ্দেশ্যে হলো, আপনি মন থেকে ওসব হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলুন!’
এবার ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে রুদ্র বলল,
‘আপনি আসলে কী বলতে চাইছেন?’
‘বলতে চাইছি, দাসত্ব মানসিকতা আপনার মধ্যে কখনও ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে দেবে না। অথচ আপনার মধ্যে ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা দুটোই রয়েছে। এখন থেকে ধনী বন্ধুদের দ্বারস্থ হওয়ার চিন্তা ছাড়ুন। ওরা আপনাকে চাকুরি বা কাজ দেবে ঠিক, একইসঙ্গে ব্যবহারও করবে। এভাবে নিজের মধ্যে নিজে মরে থাকার মত, বুঝলেন? নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করুন। সাহসী হোন, ভালবাসতে শিখুন!’
কথাগুলো বলে জয়া হনহন করে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসলো। রুদ্র হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো ফুটপাতে। জয়ার কথাগুলো গরম শীসার মতো লেগেছে ওর। এক ধরনের ঘোরের মধ্যে ও ডুবে যাচ্ছে। ও ভাবছে-জয়ার কথাগুলো কি বিদ্রুপ? জয়ার গাড়িটা চলে যাচ্ছে উত্তরার দিকে। রুদ্র দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল-জয়া এমন কথা বলল কেন? জয়ার কথাগুলো রুদ্র’র অন্তরে প্রতিধ্বণিত হতে লাগলো। ও নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো- সত্যিই কি আমি হীনমন্যতায় ভুগছি? আমার কি আত্মবিশ্বাস কম? ফের ভাবলো, রেগে গেলে মানুষ অনেক কথাই তো বলে। জয়া নিজের রাগ প্রকাশ করতে এমন কথাগুলো বলল? একরাশ বিষন্নতায় রুদ্র অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ফুটপাতের ওপর। অনেক সময় কেউ কেউ এমন তন্ময়তায় দাঁড়িয়ে থাকে বিষণ্ন বৃক্ষের মত।

আট.

আকাশে হালকা হলুদ ও লালচে রঙের আভায় কামরাঙা রঙের বিকেলটা আচ্ছন্ন করে দেয়ার মত। শরতকালে প্রকৃতিকে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ঐশ্বর্যময় মনে হয় মায়ার। শরত প্রকৃতি রূপের স্নিগ্ধতায় মোহাবিষ্ট করেও রাখতে পারে। যারা চিত্তবিলাসী, তারা শরতকালে প্রকৃতির সান্নিধ্য একাগ্রচিত্তে উপভোগ করতে পছন্দ করেন বলে মায়ার ধারনা। ওর নিজের মধ্যে এক ধরনের চিত্তবিলাস আছে। বিশেষ করে শরতের বিকেল ওর মনকে খুব টানে। মায়া আর জয়া বসে আছে ওদের ফ্ল্যাটের বারান্দায়। বারান্দা জুড়ে ফুলের টব। ওরা দু’বোন মাঝেমাঝে বারান্দায় বসে সময় কাটায় গল্প করে। কখনও ওরা বই পড়ে, কখনও চা পান করে, আবার কখন নীরব হয়েও বসে থাকে। আজকের বিকেলটা মিষ্টি ও নরোম রোদে কেমন মাখামাখি। থেমে থেমে মৃদু বাতাস বইছে। মায়া এমন বিকেলে আবেশিত হয়ে পড়ে, তবে আজ মনটা মুগ্ধতায় ডুবে যাবার অবস্থায় নেই। কাল রাতে জয়া পিয়ালের দেয়া পার্টি থেকে ফিরে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে। মায়া লক্ষ্য করেছে পর্টি থেকে ফেরার পর থেকে জয়াকে কেমন বিষন্নতা গ্রাস করেছে। জয়াকে ও ভালভাবে চেনে। মন খারাপ থাকলে জয়া মুখে কিছু বলে না, তবে বিষন্নতাও আড়াল করতে পারে না। মেঘে ঢাকা আকাশের মত থাকে ওর মুখ। আগামী মাসে পিয়ালের সঙ্গে জয়ার বিয়ের তারিখ একরকম চূড়ান্ত করেছেন ওদের ফুপু। দু’পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা হয়ে আছে। ওদের বিয়ে উপলক্ষে কাল রাতে অস্টিনের বলরুমে পার্টি দিয়েছিল জয়ার হবু বর পিয়াল। ওই পার্টিতে পিয়ালের বন্ধুরা অংশ নিয়েছে। হবু বধূকে নিজের বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই পার্টির আয়োজন করেছিল পিয়াল। জয়া এই পার্টিতে যেতে হবে শুনে ভীষণ আপত্তি প্রকাশ করেছিল ফুপুর কাছে। মায়াও জয়ার পক্ষে কথা বলেছিল। ওদের ফুপু কী কারণে পিয়ালকে এতো পছন্দ করেন, কে জানে। পিয়ালের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারেননি তিনি। জয়াকে ফুপুর নির্দেশ মেনে পিয়ালের পার্টিতে যেতে হয়েছে। কালরাতে পার্টিতে কী হয়েছে-তা জানে না মায়া। জয়া ওকে পার্টি সম্পর্কে কিছু বলেনি এখনও। জয়া সাধারণতঃ সবসময় ওর সঙ্গে সব বিষয়ে কথা বলে। কিন্তু কালকের পার্টির বিষয়ে ওকে কিছু বলেনি জয়া। আজ সকাল থেকে মায়া লক্ষ্য করেছে জয়া কেমন মন খারাপ করে আছে। জয়ার সঙ্গে কথা বলতে ও জয়াকে নিয়ে বসেছে বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগে ওরা চা পান করেছে। চায়ের কাপ ছোট্টা টেবিলে রাখার পর মায়া মোলায়েম কণ্ঠে জানতে চাইলো,
‘আপু, তুমি কিন্তু আমাকে ভীষণ অবাক করেছো!’
মায়ার কথায় জয়া অবাক চোথে তাকায়। ও বলে,
‘কীভাবে তোকে অবাক করলাম? আমি কী করেছি?’
‘তুমি আমাকে কালকের পার্টি নিয়ে কিছু বলোনি। আমি ভেবেছিলাম, পার্টিতে শুধু আনন্দ-উল্লাস হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে-এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা তোমাকে কিছু ভাবতে বাধ্য করছে। তোমাকে বিষন্ন দেখাচ্ছে, আপু!’
মায়ার এ কথায় নিজের ভেতের নিজে চমকে গেল জয়া। কথাটা ঠিক বলেছে মায়া। জয়া চুপ করে রইলো। মায়া ফের বলল,
‘আমি শুধু তোমার ছোট বোন নই, বন্ধুও। এ কথা একদিন তুমিই আমাকে বলেছিলে।’
‘হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। এখনও এ কথা স্বীকার করছি।’
‘তাহলে আমাকে মনের কথাটা বলছো না কেন?’
জানতে চাইলো মায়া। ও জয়ার মনে আটকে রাখা কথা জানতে চায়। জয়া বলে,
‘মনের কথা কি বলবো? আমার মনে তো এমন কথা লুকিয়ে নেই, যা তোকে বলা হয়নি।’
‘না। আজ তোমার এ কথা মানতে পারছি না। তোমার মনে শুধু কথা নয়, এক ধরনের ঝড়ও বইছে।’
‘তুই কি আমার মনের সব কথা জানিস। আমাকে পড়তে পারিস?’
জয়ার প্রশ্নে হাসলো মায়া। ও বলল,
‘তোমার মনের সব কথা হয়তো জানি না। তবে তোমাকে আমি পড়তে পারি।’
‘তাই?’
‘হুম। তাই। এখন বলো, কাল রাতে কী হয়েছে ওই পার্টিতে।’
‘না, তেমন কিছু হয়নি। পার্টিতে যা হয়, তাই হয়েছে।’
‘যেমন? একটু খুলে বলো!’
‘এই যেমন ধর, নাচ-গান, ড্রিংকস এবং সব শেষে ডিনার। পার্টিতে তো এইসবই হয়।’
‘তা হয়। এর বাইরে কিছু একটা আছে। সেটা বলো। যা আমাকে এখনও বলোনি।’
‘তোর এমন কেন মনে হচ্ছে?’
‘কারণ, তুমি সারাদিন ধরে বিষন্ন বা চিন্তিত রয়েছো। আমি ভালভাবে লক্ষ্য করেছি। তুমি কী ভাবছো, বলো তো! আমরা তো দু’বোন। সবসময় তুমি আমার সঙ্গে ভালমন্দ শেয়ার করো। কী হয়েছে, বলো! আমি ছোট হলেও হয়তো ভাল কোন পরামর্শ তোমাকে দিতে পারি।’
মায়ার কথায় জয়া বেশ কিছুক্ষণ ভাবলো। মায়ার দৃষ্টি আটকে আছে জয়ার মুখের দিকে। জয়া যে কিছু ভাবছে-এটা ও আরো নিশ্চিত হলো। ও অপেক্ষা করছে জয়ার কথা শুনতে। এক সময় জয়া নিচু গলায় বলল,
‘ঠিক আছে, তোকে বলছি। তুই ভেবে চিন্তে আমাকে পরামর্শ দিবি, আমি কী করতে পারি।’
‘অবশ্যই দেবো। তুমি বলো, কী হয়েছে পার্টিতে?’
‘কাল পার্টিতে বেশ কিছু তরুণী এসেছিল। ওরা পিয়ালদের বন্ধু। কিন্তু দু’একজন তরুণীর আচরণ আমার ভাল লাগেনি। পিয়ালের সঙ্গে ওদের ঘনিষ্ঠতা আমার মনে অস্বস্থির জন্ম দিয়েছিল পার্টিতে।’
‘আচ্ছা! শুধু এটুকুই?
‘না। আরেকটু আছে।’
‘সেটাও বলো।’
‘আমি ওয়াশরুমে যাবার সময় জেসিন নামে এক তরুণী ফাঁকা জায়গায় আমাকে হাতের ইশারায় থামায়। আমি দাঁড়াতেই ও নিচু গলায় জানালো আমি যেন পিয়ালকে সবসময় চোখে চোখে দেখে রাখি।’
‘তুমি কিছু বলোনি?’
‘আমি জানতে চেয়েছিলাম কেন ও কথা বললো সে। জিসান আমাকে সাবধান করে দিচ্ছে এমনভাব করে জানালো পিয়ালের প্রতি ক্রাশ খেয়ে আছে-এমন চারজন তরুণী ওই পার্টিতে আছে। এ ছাড়া একজন ছিল ওর প্রাক্তন প্রেমিকা। জেসিন চার তরুণীর নাম বলেনি। তবে প্রাক্তন প্রেমিকার নাম বলেছিল।’
‘কি নাম ছিল তার?’
‘ক্যামেলিয়া।’
‘ক্যামেলিয়া নামে কেউ কি ছিল পার্টিতে?’
‘হুম, ছিলো। আমিও পরে লক্ষ্য করেছি, আমার প্রতি ক্যামেলিয়া কেমন ঈর্ষান্বিত দৃষ্টি ফেলছিল!’
‘জিসান, তোমাকে গায়ে পড়ে এ কথা কেন বলেছে?’
‘সেটা আমিও ভাবছি। তবে মেয়েটি যেন আমাকে ইনফরমেশন দিতে উৎসাহিত বোধ করছিল।’
‘তোমার কী মনে হয় না, পিয়ালের বন্ধু-বান্ধবীদের মধ্যে কেউ হয়তো ঈর্ষাকাতর হয়েও এ কাজ করিয়ে থাকতে পারে?’
‘হতে পারে। কিন্তু জিসানের কথা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে।’
বলল জয়া। মায়া একটু ভাবলো। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। মায়া ভেবে বলল,
‘ধরে নিচ্ছি, পিয়ালের প্রতি চার-পাঁচজন মেয়ে ক্রাশ খেয়ে আছে। এতো পিয়ালের দোষ কোথায়? আর ক্যামেরিয়া যদি তার প্রাক্তন প্রেমিকা হয়ে থাকে, সেটা তো মেনে নিতেই হবে। নাকি তুমি মেনে নিতে পারছো না?’
‘আমিও তা নানাভাবে ভাবছি, মায়া। প্রথমে এ সব কথাগুলো উড়িয়ে দেয়া উচিত বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। একবার ভাবছি, পিয়ালকে একসঙ্গে চার-পাঁচজন মেয়ে কেন পছন্দ করবে। আবার ভাবছি, ক্যামেলিয়া যদি তার প্রাক্তন প্রেমিকাই হবে, তাকে কেন ওই পার্টিতে নিমন্ত্রণ দিয়েছে পিয়াল?’
‘এই জন্যই তোমাকে আজ খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে, আপু!’
‘তাই? হবে হয়তো!’
ছোট্ট জবাব জয়ার। মায়া বলল,
‘শোন, অতো কিছু ভাবছো কেন? তুমি এখুনি পিয়ালের বন্ধু মিঃ রুদ্রকে ফোন করো। তাকে ডেকে এনে পিয়াল সম্পর্কে ভাল করো খোঁজ নাও। যদি মনে হয়, পিয়ালের স্বভাব-চরিত্র সুবিধের নয়, বিয়েতে ‘না’ বলে দাও। তুমি কি দায়গ্রস্ত কোন কনে নও যে, পিয়ালকে বিয়ে করতেই হবে!’
মায়ার কথায় হালকা হাসির আভা ফুঠে উঠলো জয়ার মুখে। ও মায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘মিঃ রুদ্রকে আজ সারদিনে বেশ কয়েকবার ফোন করেছি। তিনি ফোন ধরছেন না!’
‘কেন?’
মায়ার প্রশ্ন। জয়া বলে,
‘জানি না। তাছাড়া তিনি কি নিজের বন্ধুর বিরুদ্ধে কোন কথা থাকলে বলবেন আমাকে? তিনি তো নিজেই পিয়ালের দয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন!’
জয়া কথাটা বলে মনে মনে রুদ্রর মুখটা মনে মনে ভাবলো। এই মুহুর্তে যেন রুদ্রকে চিনে নিতে চেষ্টা করছে ও। মায়া বলে,
‘তারপরও আমার মনে হয়, মিঃ রুদ্র মিথ্যা কথা বলায় পারদর্শী নন। তাকে একটু চাপাচাপি করলে পেট থেকে কথা বের করে ফেলা যাবে।’
‘আমারও তাই মনে হয়।’
সম্মতি প্রকাশ করলো জয়া। মায়া তাগিদ দিয়ে বলল,
‘তাহলে তার সঙ্গে কথা বলো। আবার ফোন করো। এক সময় ফোন তো ধরবেই!’
দ্বিধান্বিত দৃষ্টি মায়ার ওপর ফেলে জয়া বলল,
‘আসলে কী, কাল আমি তাকে বেশ কিছু কঠিন কথা বলে ফেলেছি। হয়তো তাই আজ আর আমার ফোন ধরছেন না। ঐ লোকটা কেমন জানি বোকা! বুঝলি?’
এ কথায় মৃদু হাসলো মায়া। ও বলল,
‘আসলে আপু তোমার জন্য এমন একটা বোকা লোকই দরকার। পিয়ালের মত চতুর লোককে তুমি বশ করতে পারবে না। বরং তোমাবে বশ হয়ে থাকতে হবে। হা হা হা।’
মায়ার কথায় রাগ করলো না জয়া। ও সবসময় দুষ্টমী করে। অনেক সময় কী সব কথা বলে ফেলে, সেটা ও নিজেও জানে না-কী বলছে!।জয়া মায়ার কাছে জানতে চাইলো,
‘আচ্ছা, পিয়ালকে বিয়ে করা আমার ভুল হচ্ছে না তো! তোর কী মনে হয়?’
কঠিন প্রশ্ন-ভেবে নিল মায়া। ও কী বলবে-বুঝতে পারছে না। জয়ার প্রশ্নের জবাবে কিছু বলতে হবে, তাই ও বলে,
‘আমি এই প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারছি না, আপু। কী বলবো, বুঝতে পারছি না।’
‘তারপরও কিছু একটা বল। তোর যা মনে আসে, তাই বল।’
অনুরোধ করে জয়া। মায়া বলে,
‘পিয়াল বর হিসাবে তো যোগ্যতার বিচারে আমি বলবো-শ্রেষ্ঠ। আর তুমি যে কথা জেনেছো, এ সব কথা ধরলে সৎ চরিত্রবান বর খুঁজে পাবে কিনা, জানি না। কথায় বলে, সোনার আংটি বাঁকাও ভালো!’
‘তার মানে তোর সমর্থন আছে?’
‘সমর্থন আছে। তবে সেটা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।’
‘কী রকম কথা হলো? ধুম্রজাল সৃষ্টি করছিস। সারাদিন আমি ভাবছি। এখন তুইও ভাবনায় ফেলে দিচ্ছিস।’
কথাটা বলে জয়া ভাবনাক্লিষ্ট চোখে তাকায়। মায়া ফিক করে হেসে ফেলে। এরপর ও বলে,
‘চলো, কাল ফুপুর বাড়িতে গিয়ে ফুপুকেই সব কথা খুলে বলি।’
‘ফুপুকে বলব? ফুপু কি পিয়ালকে নিয়ে সন্দেহ করবেন?’
‘সন্দেহ করবেন কিনা জানি না। অন্তত আমরা কালকের ঘটনা ফুপুকে জানাতে পারি। তুমি তোমার মনের কথাটাও ফুপুকে বললে!’
‘আমার আবার মনের কথা কি?’
‘এই যে তুমি পিয়ালকে বিয়ে করতো চাইছো বা চাইছো না। এ কথাটা ফুপকে বলবে।’
‘এই সিদ্ধান্ত তো আমি নিজেই নিতে পারছি না!’
‘আপু, তোমার হাতে আরো একটি দিন আছে। ভাবো। ভাল করে ভাবো। প্রয়োজনে আরো দুদিন পর ফুপুর বাড়িতে যাবো। তুমি কনফিউজড থেকো না। আগে নিজে একটা সিদ্ধান্ত নাও। এরপর ফুপুকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানাও।’
‘আচ্ছা, তুই যখন বলছিস, আমি ভেবে দেখি।’
এ সময় মায়ার ফোন বেজে উঠলো। ও প্রান্তে লিয়োনার্দোর কণ্ঠ,
‘হ্যালো, মায়া বলছেন?’
লিয়োনার্দোর কণ্ঠ চিনতে পারলো মায়া এবং ও খুব অবাক হলো তার ফোন পেয়ে। মায়া হালকা কণ্ঠে বলল,
‘হ্যাঁ, বলছি।’
‘আমি লিয়োনার্দো।’
‘চিনতে পেরেছি।’
‘ভাল লাগলো চিনতে পেরেছেন বলে। তা কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি কেমন আছেন?’
‘আমিও ভালো আছি। আপনার বোন জয়া কেমন আছেন?’
‘ভাল আছে। ও আমার সামনেই বসে আছে।’
‘তাকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন।’
বলল লিয়োনার্দো। জবাবে মায়া বলল,
‘আচ্ছা। তা কী মনে করে ফোন করলেন?’
‘আপনাদের একটা নিমন্ত্রণ জানাতে ফোন করেছি। রাগ করলেন না তো?’
‘না, না। রাগ করবো কেন? বলুন, কীসের নিমন্ত্রণ?’
‘আমরা বাংলাদেশের এসিডদগ্ধদের নিয়ে একটা ডমুমেন্টরী তৈরির কাজ পেয়েছি। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা আমাদের ফিন্যান্স করছে। কাজটির মানবিক দিক ও সামাজিক দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি আমাদের পরিচিতি তুলে ধরারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছি পরশু সন্ধ্যায়, হোটেল সোনারগাঁয়ের বলরুমে। অনুষ্ঠানটিতে দেশি ও আন্তর্জাতিক ডেলিগেট থাকবে। সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীরাও থাকবেন। নিজেদের লোকজন থাকলে অনুষ্ঠানটি আরো উজ্জ্বল হবে। আপনি এবং জয়া যদি আমাদের এই অনুষ্ঠানে আসতে পারেন, খুব খুশি হবো।’
‘আমরা? আমরা এলে কী হবে?’
‘কিছু হবে না, এটা বলতে চাচ্ছি না। কয়েকজন এসিডদগ্ধ মেয়েও থাকবে অনুষ্ঠানে। আপনারা এসে জানলেন কিছু মেয়ে কতটা কষ্টে জীবন-যাপন করছে।’
কিছুক্ষণ ভাবলো মায়া। কী বলবে? টেলিফোনের স্পীকারে লিয়োনার্দোর কথা শুনছিল জয়াও। ও চোখের ইশারায় মায়াকে সম্মতি দিল। ও প্রান্ত থেকে লিয়োনার্দোর কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘আমি কি আমাদের অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতি আশা করতে পারি?’
‘ভেবে বলছি।’
জবাবে বলে মায়া। লিয়োনার্দো বলে,
‘না আসতে চাইলেও মনে কিছু করবো না আমি। আসলে আমার মনে হলো, আমাদের এই অনুষ্ঠানে আপনাদের নিমন্ত্রণ করি, তাই ফোন করেছি।’
কৈফিয়ত দেয়ার মত করে কথাটা বলল লিয়োনার্দো। মায়া জানতে চাইলো,
‘আপনার বন্ধু রুদ্র থাকবেন অনুষ্ঠানে?’
‘অবশ্যই থাকবে। তবে ওকে আজ ফোন করে পাচ্ছি না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলে অনুষ্ঠানে আসার কথা বলব, ও আসবেই।’
‘ঠিক আছে, আমরা আসবো।’
‘আপনাকে এবং আপনার বোন জয়াকে অসংখ্য ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
‘কেন?’
‘এই যে অনুষ্ঠানে আসতে রাজী হলেন বলে। ‘না’ করে দিলে বিব্রত হতাম। বিব্রত করেননি, এটা আমার কাছে অনেক আনন্দের বিষয়।’
‘কী যে বলেন! আচ্ছা, আপনার বন্ধু রুদ্র কেমন মানুষ, একটু বলুন তো!’
মায়ার প্রশ্নটা অপ্রসঙ্গিক মনে হল জয়ার, তবে প্রশ্নটার পক্ষে নিজের সমর্থন অনুভব করলো। ও প্রান্ত থেকে লিয়োনার্দো একটু হেসে বলল,
‘ওকে আমি ভাল মানুষ বলে বিবেচনা করি। চরিত্রে কোন জটিলতা নেই, লোভ দেখিনি ওর মধ্যে। মনের মধ্যে ঘোরপ্যাঁচ নেই। স্বভাবের দিক থেকে একটু আত্মকেন্দ্রিক। কথা যা বলে, এর চেয়ে ঢের কথা মনে ধরে রাখে।’
‘আর..?’
‘ও ভাল গল্প লিখে, আগেও বলেছি। কিন্তু গল্পকার হওয়ার ওর কোন চেষ্টা নেই।’
‘আরেকটু বলতে পারবেন?’
মায়ার আগ্রহ প্রকাশ দেখে জয়া ম্লান হাসে। লিয়োনার্দো বলে,
‘রুদ্র মোহগ্রস্থ হতে শিখেনি। ও স্বপ্নও দেখে নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। ও একটা শান্ত নদীর মতো, অতলে প্রবল স্রোত আছে, কিন্তু ঢেউ নেই।’
‘আচ্ছা! সত্যবাদী? নাকি মাঝেমাঝে একটু-আধটু মিথ্যা কথা বলেন?’
‘এ সব কথা কেন জানতে চাইছেন, বলুন তো!’
জানতে চাইলো লিয়োনার্দো। মায়া হেসে বলল,
‘না, জানতে ইচ্ছে হলো। বন্ধুরাই তো বন্ধু সম্পর্কে ভালো বলতে পারে, তাই না?’
‘তা ঠিক। রুদ্র কখনও মিথ্যা কথা বলেছে, আমি দেখেনি।’
‘তিনি কি মাঝেমাঝে লাপাত্তা হয়ে যান? মানে, নিরুদ্দেশ হতে পছন্দ করেন?’
‘এটা বলতে পারছি না। কেন বলুন তো?’
‘আজ সারাদিন জয়া তাকে কয়েকবার ফোন করেছে। তিনি ফোন ধরেননি। ফোন ব্যাকও করেননি।’
‘ওহ, আচ্ছা। আমিও ফোন করে পাইনি। ঠিক আছে, কাল প্রয়োজনে আমি ওর বাসায় যাবো।’
‘যদি আপনার সঙ্গে কথা হয়, প্লিজ, তাকে বলবেন, জয়াকে যেন একটা ফোন করেন।’
‘অবশ্যই বলব। তাহলে পরশু সন্ধ্যা সাতটায় আমাদের দেখা হচ্ছে।’
‘হুম, দেখা হবে।’
‘ভাল থাকবেন।’
বলে লিয়োনার্দো ফোনের লাইন কেটে দিলো। জয়া মায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
‘তুই এভাবে রুদ্র সম্পর্কে জানতে চাইলি কেন? তার বন্ধু কী ভাববেন?’
চোখের ভ্রু নাচিয়ে একটা রহস্যময় হাসি মুখে ধরে মায়া বলল,
‘আপু, জেনে রাখা ভালো। মিঃ রুদ্র কেমন মানুষ-জেনে নিতে দোষ কি? ধরো, পিয়াল সম্পর্কে আমরা যেমন এখন জানতে চাইছি। কারো সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকলে জেনে নেয়া দরকার। আপু কাজটি কি অন্যায় হলো?’
মায়ার প্রশ্নে জয়া বলল,
‘না, ঠিক করেছিস। যদিও অপ্রাসঙ্গিক ছিল। প্রয়োজন নেই, তারপরও রুদ্র সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেয়াটা মন্দ লাগেনি আমার।’
মায়া বলল,
‘আরো খোঁজ-খবর নেব, আপু?’
‘কেন?’
‘যদি তুমি আরো তথ্য জানতে চাও..!’
‘তুই কিন্তু অনেক ফাজিল হয়েছিস, মায়া!’
কথাটা বলে জয়া কপট রাগী চোখে তাকাল। মায়া নিজের দু’কান ধরে বলল,
‘ক্ষমা করো, আপু। আর কিছু জানতে চাইবো না। চুলোয় যাক ঐ রুদ্র!’
মায়ার কথায় জয়া মিষ্টি করে হাসলো। জয়ার হাসিমুখটা দেখে মায়ার মনটা আনন্দে ভরে গেল। বিষাদ ছায়া মুখে হাসির আভা ফুটে উঠলো অদ্ভূত সুন্দর লাগে। (হয়েছে)।

নয়.
চারবার সেলফোনের লাইন কেটে দিয়েছিল রুদ্র। ও ভেবেছিল-লাইন কেটে দিলে জয়া আর ফোন করবে না। কিন্তু ফের ফোন করলো। আজকের দিনে ও জয়ার ফোন আশা করেনি। ফোনটা ধরতেও চায়নি। বিমানবন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা তল্লাশীর কক্ষে প্রবেশের লাইনের সামনে ও দাঁড়িয়ে পড়েছে। এ লাইন ধরে ওকে ভেতরে যেতে হবে। একঘন্টা পর ওর ফ্লাইট আকাশে উড়বে। ফ্লাইট ধরে প্রথমে ও যাবে — এবং পরে আরেকটি ফ্লাইটে যাবে লন্ডন। লন্ডনই ওর গন্তব্য। অনেকদিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হতে যাচ্ছে।
‘হ্যালো..!’
বলল রুদ্র। ও প্রান্ত থেকে জয়া বলল,
‘হ্যালো, রুদ্র, আপনি কোথায়?’
‘কেন বলুন তো!’
‘আপনাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন! আমি পাগলের মত আপনাকে খুঁজছি!’
এই সময় এমন কথা শোনার সময় ওর আছে? অন্য কারো ফোন হলে ও ধরতোই না। জয়ার ফোন বলে ধরেছে। এখন জয়ার কথা শুনে মনে হলো ফোনটা রিসিভ না করাই ভালো ছিল। ও চুপ করে থাকে। ও প্রান্তে জয়ার কণ্ঠ,
‘হ্যালো, শুনছেন? হ্যালো, রুদ্র..!’
‘শুনছি। বলুন।’
‘আপনাকে আমি কতদিন ধওে ফোন করছি, আপনি আমার ফোন ধরছেন না। আমার ওপর এতোটা রেগে আছেন? সেদিনের কথাগুলোর জন্য বুঝি? সেদিন, রাগ কওে কথাগুলো বলেছিলাম। এরজন্য এমন শাস্তি দেবেন?’
রুদ্র কী বলবে তাকে? সেদিনের কথা ও পিয়ালকে বলেছিল। পিয়াল অনেকক্ষণ ভেবে জয়ার সঙ্গে ওকে আর যোগাযোগ করার কথা জোর দিয়ে বলেছিল। পিয়ালের কথা রাখতে ও আর জয়ার ফোন ধরেনি। এ কথা তো জয়াকে বলে দেয়া যাবে না। ও কী বলবে, ভাবছিল। ও প্রান্তে জয়ার কণ্ঠ,
‘হ্যালো, রুদ্র, লাইনে আছেন তো!’
‘হুম, আছি। বলুন, কী বলতে চান!’
জয়া উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল,
‘আপনি এখন কোথায়?’
‘আমি কোথায় আছি সেটা বড় কথা নয়। আপনি আমাকে খুঁজছেন কেন, সেটা বলুন। আমি একটা ইমার্জেন্সী কাজে ব্যস্ত আছি। কেন ফোন করেছেন, সেটা বলুন!’
‘না, মানে, আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। দেখা করে কথাটা বললে ভালো হতো।’
‘কিন্তু আমি দেখা করতে পারবো না। সরি। কী বলতে চান, ফোনেই বলুন।’
‘আচ্ছা বলুন তো, আপনি কি আজ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?’
বুকের ভেতর ধক্ করে উঠলো। রুদ্র আজ চলে যাচ্ছে লন্ডন। এ কথা জয়াকে ও বলেনি। পিয়ালই বলেছে এ কথা জয়া-মায়াকে বলা যাবে না। রুদ্র লিয়োনার্দোকেও লন্ডন চলে যাওয়ার কথা বলেনি। আজ কী মনে করে জয়ার ফোনটা ধরে ফেলল। বৃটেনে চলে যাচ্ছে বলে মনে পাষাণ বাঁধতে পারেনি ও। রুদ্র ভাবছিলো জয়া কী করে জানলো যে, ও চলে যাচ্ছে? প্রশ্নটা একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বুক ছাপিয়ে বেরিয়ে এলো। ও মৃদু গলায় জয়াকে বলল,
‘আমি লন্ডন চলে যাচ্ছি, আপনি কী করে জানলেন?’
‘তাহলে সত্যিসত্যি আজ আপনি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন?
‘হ্যাঁ। সরি, জয়া, আমি এ কথাটা আপনাকে বলিনি। আসলে কথাটা বলতে সঙ্কোচবোধ করছিলাম।’
‘ওহ! তা তো করতেই পারেন। আপনাদের কাছে অর্থ বা লোভনীয় চাকুরি অনেক বড় ব্যাপার! মানুষের সম্পর্ক নিয়ে আপনাদের ভাবনা ও বোধে এক ফোঁটাও শ্রদ্ধা নেই। এমন কী করুণাও নেই!’
জয়ার কথায় বিব্রতবোধ করলো ও। এর জবাব কী দেবে? এই মুহুর্তে কথা বড়ানোও যায় না। ওকে চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশীর গেট পেরুতে হবে। অপরাপর যাত্রীরা এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। ও লাইন ধরছে না। জয়ার সঙ্গে কথা শেষ করে লাইনে দাঁড়াবে। রুদ্র অপরাধীর কণ্ঠে বলল,
‘জয়া, আমি জানি, আমার আচরণ ঠিক হয়নি। আপনাকে জানাতে পারতাম। আমি ভেবেছি-বিয়ের প্রস্তুতি চলছে আপনাদের পরিবারে। আপনিও ব্যস্ত আছেন এসব নিয়ে। পিয়াল বলল, জরুরি কারণে আমাকে দ্রুত চলে যেতে হবে। তাই আজ রওনা হয়েছি। আপনি জানেন, আমি এখন কোথায়?’
‘জানি। আপনি এখন এয়ারপোর্টে। ঠিক বলেছি?’
‘হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন। আপনি জানলেন কি করে?’
‘কেন, জানাটা কি অন্যায় হয়েছে?’
‘না..তা নয়! আপনাকে এ কথা কে বলেছে?’
‘আপনার বাবা বলেছেন।’
‘কী বললেন!’
‘বললাম তো, আপনার বাবা বলেছেন।’
‘বাবা বলেছেন!’
‘কেন, অবাক হচ্ছেন?’
‘কথাটা বিশ্বাস করতে পারছি না। সত্যি বলছেন?’
‘আমাকে কখনও দেখেছেন, আমি মিথ্যা কথা বলেছি বা ছলনার আশ্রয় নিয়েছি?’
‘না, তা নয়।’
‘যা বললাম, তা সত্যিই বললাম। আমি এখনও আপনাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি।’
আজ দেশ ছাড়ার দিনে কেন এই নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি হলো? জয়া কেন গিয়েছে ওদের বাড়ি? ভীষণরকম বিস্ময়ের ঢেউ ওকে ভাসিয়ে নিচ্ছে। ও বলল,
‘আচ্ছা, আপনি সুস্থ আছেন তো! কী হয়েছে আপনার? আমাদের বাড়ি গেলেন কী করে? কেন?’
‘একসঙ্গে চার প্রশ্ন! কোনটার জবাব দেব আগে?’
‘আহা, বলুন তো! আমার মাথা ঘুরছে!’
‘আপনাকে আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আজ। অনেক ভরসা নিয়ে আমি আপনাদের বাড়ি এসেছি। এখানে এসে জানলাম, আপনি আজ লন্ডন চলে যাচ্ছেন। ভীষণ অবাক আর বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি আমি!
‘ওহ মাই গড! কী বলছেন!’
‘যাই হোক, আপনার বাবা ও মায়ের সঙ্গে আজ আমার পরিচয় হলো। তাদের সঙ্গে কথা বললাম। তারাও ভীষণ অবাক হয়েছেন আমাকে দেখে। আমি নিজ থেকেই তাদের বলেছি-আমি কে। আমি আপনার একমাত্র মেয়েবন্ধু-এটা বলেছি। তারা অবশ্য অবাক হয়েছেন যে, আপনার লন্ডন চলে যাওয়ার খবরটা আমি জানি না বলে।’
জয়া থামলো। রুদ্রের বুকের ভেতরে উথাল-পাতাল ঢেউ বইছে। ও বুঝতে পারছে না জয়া কেন ওদের বাড়িতে গেল। ও বলল,
‘আচ্ছা, আপনি আমাদের বাড়ি গেলেন কেন? আপনার কী সমস্যা হয়ে বলুন তো!’
‘আমি গত দু’সপ্তাহ ধরে ফোন করে আপনাকে পাচ্ছিলাম না। আপনি আমার ফোন ধরছিলেন না। এসএমএস করেছি। জবাব নেই। আমাকে আপনি এড়িয়ে চলছিলেন, উপেক্ষাও করছিলেন। শেষে উপায় না পেয়ে আপনার বন্ধু লিয়োনার্দোর কাছ থেকে আপনাদের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করেছি। আজ আপনাদের বাড়িতে এসে জানলাম, আপনি স্বার্থপরের মত দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কী অদ্ভূত মানুষের চরিত্র!’
শেষ কথাটায় শ্লেষ বা চাপা দুঃখের আভাস আছে। রুদ্র বলল,
‘আমি হয়তো স্বার্থপর। আপনার অভিযোগ খন্ডন করতে পারছি না। তবে এক সময় এই অভিযোগ সঠিক, না মিথ্যা-তা প্রমাণ করার চেষ্টা করবো।’
‘কোন সময়ে? কতটা সময় পেরুলো তা করবেন? আমাদের জীবন তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?’
‘এর জবাব আমার জানা নেই।’
‘আপনার কী জানা আছে, বলুন তো!’
‘আপনি খুব রাগ করেছেন, বুঝতে পারছি।’
‘রাগ? সেটা বুঝতে পারেন তাহলে!’
‘আমাকে শুধু লজ্জা দিয়েই যাবেন? আচ্ছা, মানছি আপনাকে না বলে দেশ ছাড়ছি। এইটুকু অপরাধের জন্য কী শাস্তি পেতে পারি?’
‘শাস্তি গ্রহণ করবেন?’
‘করবো। বলে দেখুন।’
‘সত্যি?’
‘সত্যি, বলছি।’
‘তাহলে ফিরে আসুন। আপনি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে সোজা আপনাদের বাড়িতে চলে আসুন। আমি কিন্তু এখনও আপনাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি যদি ফিরে আসেন, তাহলে আপনাদের বাসায় গিয়ে অপেক্ষা করবো। ফিরে আসুন, প্লিজ!’
‘বুঝতে পারছি, আপনার মাথা আজ ঠিক নেই। এলোমেলো, না এলোমেলো নয়, আপনি আবোল-তাবোল, যা তা বলছেন!’
‘আমি সুস্থ আছি। যা বলছি, তা সজ্ঞানে বলছি। আপনি ফিরে আসুন তো!’
‘জয়া, আপনি প্রলাপ বকছেন! আসলে আপনার কী হয়েছে বলুন তো!’
‘আমার কিচ্ছু হয়নি। স্বাভাবিক আছি। সত্যি বলছি!’
‘তাহলে কীসব বলছেন! আমি চলে যাচ্ছি লন্ডন। কতদিনের স্বপ্ন আমার। এমন একটা চাকুরি নিয়ে দেশ ছাড়ছি, এটা যে কী আনন্দের, আপনাকে বোঝাতে পারবো না।’
‘অর্জন করার আনন্দের চেয়ে, জীবনের মহত্ত্ব কোথায়-সেটা দেখবেন না?’
কথাটা বলতে গিয়ে জয়ার কণ্ঠটা একটু কাঁপলো। এই কম্পন রুদ্রকে স্পর্শ করল। ও কয়েক সেকেণ্ড কেমন তন্ময় হয়ে রইল। জীবনে এমন কিছু মুহুর্ত আসে, এমন কথা রিনরিনিয়ে উঠে, যা বাঁক সৃষ্টির মন্ত্রণা। এমন মন্ত্রণা উপেক্ষা করা সহজ নয়। রুদ্র ভেবে নিল, ওর সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যে বাঁক, ওটা ধরেই এগুতে হবে। মধ্যবিত্তের জীবনের যে টানাপোড়েন ওকে সামলে চলতে হয়েছে, এতে ও যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। এখন জয়ার কথাকে গুরুত্ব দিলে এগুতে পারবে না। আটকে যেতে হবে। রুদ্র নিজের মনের ভেতরে একটি পাহাড় তৈরি করে নেয়। যে পাহাড়ে কোন ঝর্ণা নেই, আছে নির্মম অবয়ব। ও স্বাভাকি কণ্ঠে জয়াকে বলল,
‘আচ্ছা, আজ আপনার কী হয়েছে? কী বলছেন, বুঝতে পারছি না। জীবনের মহত্ব কী, দায়িত্ব কী-এ নিয়ে তখনই ভাববো যখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পাড়বো। আর আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতেই লন্ডনে যাচ্ছি। এটা বুঝতে পারছেন না?’
‘নিজেকে কেউ যখন নিঃশ্ব করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে, তখন তার জন্য দুঃখ হয়। যাক, আপনি কি ফিরছেন বাড়িতে?’
‘জয়া, আপনি আমাকে বিভ্রান্ত করছেন কেন? কী হয়েছে আপনার? কোন অসুবিধা?’
‘আমার অসুবিধা হলে সাহায্য করবেন?’
‘করবো। বলুন আগে কী হয়েছে।’
‘তাহলে শুনুন, আমি পিয়ালকে বিয়ে করছি না।’
‘কী বলছেন! আগামী মাসেই তো আপনাদের বিয়ে!’
‘তা এখনও ঠিক আছে। কিন্তু আমি পিয়ালকে বিয়ে করছি না। এটা আমার সিদ্ধান্ত।’
‘কেন? হঠাৎ করে বিয়ের দিনক্ষণের এতো কাছে এসে আপনি বেঁকে বসলেন কেন? প্রবলেমটা কোথায়?’
‘সেটা বলতেই তো আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরতে বলছি।’
‘না, তা সম্ভব নয়। আমাকে একটু খুলে বলুন, কেন আপনি বিয়ে করতে চাইছেন না। আগে শুনি, এরপর সিদ্ধান্ত নেব।’
কয়েকমুহুর্ত চুপ থেকে জয়া বলল,
‘কাল আমার ফুপু আমাদের বাসায় এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কাউকে পছন্দ করি কিনা। বা ভালোবাসি কিনা। ফুপু বলেছিলেন-যদি কাউকে পছন্দ করি, সেটা যেন এখনই তাকে জানিয়ে দিই। যদি আমি কাউকে ভালোবাসি, তার সঙ্গেই আমার বিয়ে দেবেন ফুপু। তার কথাটা শুনে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। মাথা নিচু করে ভাবছিলাম আসলেই আমি কাউকে ভালোবাসি কিনা।’
রুদ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাগুলো শুনছিল। ও বলল,
‘এরপর কী হলো?’
‘ভাবছিলাম। হঠাৎ একটা মুখ আমার মনে ভেসে উঠলো। আমি ফুপকে বলে ফেললাম যে আমি একজনকে পছন্দ করি। হয়তো ভালোও বাসি। ফুপু আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। কথাটা বলার পর আমার দু’চোখে দুটি জলের ধারা নেমে এলো। আমার এমন স্বীকারোক্তিতে ফুপু খুশি হলেন। তিনি বললেন-যা, তাকে নিয়ে আয় আমার কাছে। ওর সঙ্গেই তোর বিয়ে দেব।’
রুদ্রর বুকের ধুক-ধুকানিটা বেড়ে যাচ্ছে। রুদ্র বুঝতে পারছে না-এসব কথা কেন বলছে জয়া। ও কাকে ভালোবাসে? কেন ভালোবাসে? ক’দিন পরই তো পিয়ালের সঙ্গে ওর বিয়ে হবে। এই সময়ে কেন হঠাৎ আবিস্কার করলো-ও কাউকে ভালোবাসে? ভালোবাসা এমন দূর্বোধ্য হয় নাকি? ভালোবাসা হবে স্বচ্ছ স্ফটীকের মতো! ঝকঝকে, পরিস্কার! ভালোবাসায় ঘোরপ্যাঁচ থাকবে না, স্পষ্ট ও সরল হবে। জয়া কার কথা ভেবে ওর ফুপুকে এমন বিদঘুটে কথা বলছে? রুদ্র জানার আগ্রহে বলল,
‘আপনি হঠাৎ করে কাকে ভালোবাসলেন? ভীষণ ইন্টারেষ্টিং তো! তার নামটা বলুন। আমি কি চিনি?’
জয়া জবাব দিল না। রুদ্র ফের বলল,
‘জয়া, কথা বলুন। আপনি কাকে ভালোবেসে ফেললেন?’
‘আপনাকে!’
একটি শব্দ, অথচ ওর মনে হলো এ শুধু শব্দ নয়, পৃথিবীতে প্রলয়নাচন সৃষ্টিকারী এক বিস্ফোরণ! এমন সময়ে এভাবে এ ধরনের কথা কেউ বলে? জয়া এ কি বলল! ফোনের ও প্রান্তে জয়া চুপ, এ প্রান্তে রুদ্রও চুপ। রুদ্রর বুকের ধুক-ধুকানীর শব্দ কি জয়া শুনতে পাচ্ছে? রুদ্র কী বলবে এখন? ও তো ফিরতে পারবে না। পিয়ালকেও ধোঁকা দিতে পারবে না। পিয়াল কি ভাববে? রুদ্র যতই বলার চেষ্টা করুক, জয়ার প্রতি ওর কোন আকর্ষণ ছিল না, আবেগ ছিল না, ভাল লাগা তৈরি হয়নি, পিয়াল বিশ্বাস করবে না। বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবার পর জয়া আবিস্কার করলো সে রদ্রকে ভালোবাসে আর রুদ্র ঐ ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে জীবনের মহত্ত্ব খুঁজে নেবে-এমন কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ও নিজের ভেতরের প্রবল ঝড় সামলে নিয়ে বলল,
‘জয়া, আমি ধরে নিচ্ছি, আপনি এই মুহুর্তে যা বলেছেন, সেটা সত্যি নয়। এমন কথা আমি কখনও শুনিনি। আমি আরো ধরে নেব,এটা ছিল কোন স্বপ্ন।’
কথাগুলো বলার সময় রুদ্রর কণ্ঠ কেঁপে গেল। জয়া আহত কণ্ঠে জানতে চাইলো,
‘কেন সত্য নয় বলছেন?’
‘যে সত্য গ্রহণ করার মত নয়, তা অধরাই থাক না!’
বিব্রত কণ্ঠে বলল রুদ্র। জয়া জবাবে বলল,
‘সত্যকে গ্রহণ করার জন্য তো আপনাকে কোন অগ্নিপরীক্ষা দিতে হচ্ছে না? আপনার কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশাও করছি না। তাহলে সত্যকে গ্রহণ করতে আপনার ভয় কেন?’
‘ওই যে বললেন না, জীবনের মহত্ত্ব।এর মধ্য দিয়ে ভালোবাসাকেই বোঝাতে চেয়েছেন, তাইনা? আমি কি কাউকে ভালোবাসার স্পর্ধা রাখি না? রাখি। সে সাহস আমার আছে। কিন্তু সময়টা আমার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুনুন, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন এক সন্তান, যে কিনা হতাশার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। নিজেকে দাঁড় করানোর ভিত তৈরি করতে গিয়ে সফল হইনি। এই প্রথম সফলতার সিঁড়িতে পা রাখলাম। ঠিক এই সময়ে ভালোবাসা এসে হাজির। এমনভাবে ভালোবাসা এলো, আমি দু’হাত বাড়িয়ে ধরতে পারছি না।’
বলে থামলো রুদ্র। জয়া কিছু বলছে না। ও রুদ্রর আরো কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। রুদ্র ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘এতোদিন ভালোবাসার জন্য আমার কোন আক্ষেপ ছিল না, কারো প্রতি অনুযোগ ছিল না, গোপন অশ্রুজলও ছিল না। আজ এই ত্রি-আঘাত হৃদয়ে ধারন করতে হলো!’
ও প্রান্তে জয়ার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনতে পেল রুদ্র। জয়াকে কখনও কাঁদতে দেখেনি। জয়া কাঁদবে-এমন কথা ভাবেওনি রুদ্র। এই মুহুর্তে জয়ার কান্নার শব্দ ওর মনটাকে মূষড়ে দিল। ও কিছু বলল না। কী বলবে? সমুেেদ্রর সৈকতে জলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে থেমে থেমে ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দেয়। কিন্তু পুরো সমুদ্রটাই যদি আকস্মিক হামলে এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কাউকে, তার কী প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকে? এই মুহুর্তে রুদ্র’র মনে হচ্ছে জয়া এক সমুদ্র জল হয়ে ওকে আচমকা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ও তো জয়াকে নিয়ে কোন স্বপ্ন দেখেনি! ভালবাসাবে এমন কথা একবারও ভাবেনি। তাহলে জয়া কি মনে করে আজ ওকে এভাবে ভালোবাসার কথা জানালো? আর আশ্চার্য, জয়া ওকে ভালোবাসে জানার পর মুহুর্ত থেকেই ওর মনে অনাবিল আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে। এর মানে কি-অবচেতন মনে জয়ার প্রতি ওর অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছিল? অনুরাগ এক ঝটকায় ভালোবাসার বর্ণিল রঙ ছড়িয়ে যাচ্ছে অনুভবে। অথচ জয়াকে ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া ওর কোন পথ নেই। কয়েকবছর বেকার থেকে জীবন সম্পর্কে ওর মনে তিক্ত ধারনার জন্ম নিয়েছে। আজ বেকারত্বের যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে ও প্রবেশ করছে ঈর্ষণীয় এক কর্মময় জীবনে। এই মুহুর্তে ও ফিরে আসতে পারে না-মনে মনে ভাবলো রুদ্র। ও প্রান্তে জয়ার কান্নার শব্দ থেমেছে। জয়া অপেক্ষা করছে রুদ্র’র জবাবের। রুদ্র জয়ার উদ্দেশ্যে মিনতিভরা কণ্ঠে বলল,
‘আমাকে ক্ষমা করবেন, জয়া! আজ আপনি আমাকে যে স্থান দিয়েছেন, এর জন্য নিজেকে এতোটাই সম্মানিত বোধ করছি যে, ভাবছি-এর মর্যাদা আমি সারা জীবন ধরে রাখবো। আমাদের মিলন নেই হয়তো। বিচ্ছেদই হোক ভালোবাসার সেতুবন্ধন। আমি লন্ডন যাওয়াটাকে বাতিল করতে পারছি না।’
‘কেন?’
জয়ার প্রশ্নটা করুন আর্তির মত শোনালো। রুদ্র বলল,
‘জয়া, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতার কারণে আমি আসলে জীবন-বিমুখ হয়ে আছি। আপনি আজ অপার্থিব এক ফল্গুধারায় ভাসিয়ে দিয়ে আমাকে জীবনমুখি করে দিলেন। এরপরও নিজের জীবনের প্রয়োজনেই আমাকে যেতে হচ্ছে। যাবার সময়ে নিজের অপরাগতার জন্য ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমার কিছুই করার নেই। তাই আবারো বলছি-মিনতি করেই বলছি-আমাকে ক্ষমা করে দেবেন!’
জয়া কোন জবাব দিল না। ওর কান্নার শব্দও শোনা গেল না। মুহুর্তগুলো বিষন্নকাতর। রুদ্র অপেক্ষা করছে জয়া কিছু বলবে বলে। ওর বুকের ভেতরে ঝড়ের তান্ডবের সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসের দাপাদাপি চলছে। ওর মনের আকাঙ্খা পূরণ হলো। ওর কণ্ঠ শোনা গেল। জয়া জানতে চাইলো,

‘আমার জীবনে আপনার অবস্থানটা তাহলে কী দাঁড়ালো?’
ভারী কণ্ঠ জয়ার। রুদ্র নরোম গলায় বলল,
‘ধরে নিন, আপনার জীবনে আমি এক অব্যক্ত আখ্যান!’
‘আর আপনার জীবনে আমি?’
‘আপনি হলেন অব্যক্ত আখ্যানের ধূসর প্রচ্ছদ!’
কথাটা বলে রুদ্র ফোনের লাইন কেটে দিল। ওর বুক ফেটে কান্না আসছিল। জয়াকে ওর কান্নার শব্দ শোনাতে চায়না। ফোনের লাইন কেটে দিয়ে চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাসীর গেট পার হতে ও এয়ারলাইন্সের যাত্রীদের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালো। এ সময় বুকের ভেতর উথলে উঠা কান্না সামলে নিলেও দু’চোখ সামলাতে পারলো না রুদ্র। ওর দু’চোখ থেকে দুটি জলের ধারা নেমে এলো। রুদ্র’র মনে হলো এই অশ্রুজল চাপা আখ্যানের জলপ্রপাত।

— সমাপ্ত —

উৎসর্গ
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ সাহা’কে। যিনি নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন ধরে একুশের প্রভাত ফেরী, বইমেলা ও বাংলা উৎসবের আয়োজন করে আসছেন।

স্বত্ত্বঃ সীমা সুস্মিতা। 
 Back