Description:

ঃ আমরা মজিদ পাগলার সাথে দেখা করবো।
দৃঢ়কণ্ঠে বললো বিজু। কথা শুনে ভড়কে গেল পলাশ। ভয়ে ওর গা শিরশির করে উঠলো। এমনিতেই ওভয়কাতুরে। পাগলের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু বিজুর মুখেল উপর ‘না’ বলতে পারছে না। একজন বদ্ধ পাগলের সাথে দেখা করার কোনো মানে হয়? ওর অস্বস্থি হতে লাগলো। ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে রায় বাড়ির ন্যাড়া বেল গাছটির নিচে। ওদের সাথে রয়েছে অপু ও বিপুল। চার বন্ধুর মিটিং। পনের ডিসেম্বরের শেষ বিকেল সবে সন্ধ্যায় ঝুঁকেছে। স্থির আকাশে শীতের পাখিরা উড়ে যাচ্ছ্ েসারি বেঁধে। পাখিরা আকাশের আঁকছে সারি বদ্ধতার নকশা। তাকালে চট করে চোখ ফিরিয়ে নেয়া যায় না। কিন্তু সেদিকে কারো খেয়াল নেই। ওরা বিজয় দিবস উদযাপনের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত। ওদের মনে এক ধরনের উত্তেজনা জোছনার নরোম আলোর মত পেখম ছড়িয়ে রয়েছে। এবারের বিজয় দিবস ওরা বিশেষভাবে উদযাপন করবে বলে ঠিক করেছে। ঝোঁক চেপেছে দস্যিপনায়। মজিদ পাগলার সাথে দেখা করা চাট্টিখানি কথা নয়! বুক ভরা সাহস চাই। অবশ্য পলাশের ঘোর আপত্তি। বিজু অটল। অপুর ও বিপুল দোদুল্যমান। সন্ধ্যা সাতটা ঘন হয়ে এলো। বিজু কণ্ঠে জোর রেখে ঘোষণার মত বললো,
ঃ আমরা কাল খুব ভোরে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে মজিদ পাগলার কাছে যাবো। একাত্তরে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা আনার জন্যে তাকে অভিবাদন জানাবো। একজন বীরযোদ্ধার এই সম্মানপ্রাপ্য।
পলাশ গলা কেশে নিলো। গলা শুকিয়ে কাঠ। একটা প্রতিবাদ কণ্ঠ পর্যন্ত উঠেও আটকে গেল। প্রতিবাদ করে লাভ হবে না, ও জানে। বিজু বরাবরই দুরন্ত। ডানপিটে। একফোঁটাও ভয় নেই। ও পড়ে সপ্তম শ্রেণীতে। অথচ নবম শ্রেণীর ছাত্রদের সাথে হরহামেশা মারামারি করে। মাথা নোয়াতে শেখেনি। কারো না কারো সাথে ঢুঁশঢাশ লেগেই আছে। মাঝে মাঝে ওর উপর দিয়েও ঝড় বয়ে যায়। এইতো সেদিন আমলাপাড়ার ছেলেরা ও কে আচ্ছা মত ধোলাই দিয়েছে। ও পাড়ার সুমন, আজম ও লিয়াকত ওকে একা পেয়ে এমন প্যাঁদানী দিয়েছে যে, ও বামচোখ ফুলিয়ে গায়ের শার্টটি রেখে এসেছে। প্যান্টটাও ছিড়ে ফুড়ে চৌচির। কোনরকম ইজ্জত রক্ষা হয়েছে। তবে বিজুও ওদের ছেড়ে দেবে না। সময় মত গুনে গুনে সব শোধ দিয়ে দেবে। বিজুর মারকুটে বলে ক্লাসের সবাই ওকে সমীহ করে। অনেকে এড়িয়ে চলতেও পছন্দ করে। এই বিজুর মুখের উপর ‘না’ বলাটা পলাশের সাহসে কুলাচ্ছে না। আবার বিদঘুরে প্রস্তাবটাও মেনে নেয়া যায় না। একজন পাগলের সাথে দেখা করে কি হবে? তাছাড়া মজিদ পাগলা কাউকেই সহ্য করতে পারে না। ভীষণ উন্মাদ! তার কাছে কি কেউ ঘেঁষে? নাকি ঘেঁষার সাহস রাখে? একাত্তরে যুদ্ধ করে সেই যে পাগল হলো আজ অব্দি সুস্থ হলো না। একাত্তরেও পাগল ছিলো। তখন ছিল মুক্তি পাগল। সবাই বলতো ‘মুক্তিযোদ্ধা’। তার ছিলো সে কী সাহস! শত্রু হননে সে ছিলো বেপরোয়া। খেপাটে । যুদ্ধের ময়দানে বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করতো। শত্রুর মুখোমুখি ছিলো নির্ভীক।
পাকসেনারা গ্রামে প্রবেশ করার সময সে একবার জীবন বাজী রেখে পলাশডাঙ্গার ব্রীজ উড়িয়ে দিয়েছিলো। সেদিন গন্ডায় গন্ডায় পাকসেনা মারা পড়েছিলো! তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে মিলিটারি এসে গ্রাম ঘেরাও করলো। যে ক’টা যুবক পেল অস্ত্রের বর্বরতায় তাদের লাশ করে ফেলে রাখলো গ্রামের পথেÑঘাটেÑমাঠে। বেছে বেছে যুবতী মেয়ে ও নারী ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রাখলো ওদের ক্যাম্পে। ঘরেঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। সারা গাঁ পুড়ে খাঁক! মজিদ পাগলাও ছেড়ে দেযনি ওদের। দলবল নিয়ে লড়েছিলো ন’মাস। তখন শুধু লড়াই আর লড়াই! বোমা, গুলি, লাশ! চারদিকে ধ্বংস্তূপ। ক্রান্তিকাল। দেশ জুড়ে পাকবাহিনীর তান্ডবলীলা! দেশের দামাল ছেলেরা লড়তে লড়তে হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। বাতাসে ভেসে বেড়ায় মুক্তির অঙ্গীকার। বিপ্লবে সবুজ ভূমি হলো লাল। সমগ্র দেশ জুড়ে যুদ্ধ! মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার যুদ্ধ। সে অনেক বছর হয়ে এলো। মুক্তিপাগল মজিদ আজ বদ্ধ পাগল। বন্দী হয়ে পড়ে আছে চেয়ারম্যানের আমবাগানের খুপড়িতে। চেয়ারম্যান তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। একাত্তরের যুদ্ধের কথা উঠলে মজিদ পাগলার কথা উঠে। এ ছাড়া গায়ের মানুষ তাকে প্রায় ভুলতে বসেছে। কেউ তাকে দেখতেও যায় না। যাবেই বা কে? মজিদ পাগলার আপনজন বলতে কেউ বেঁচে নেই। যুদ্ধে সে সবাইকে হারিয়েছে। আহা বেচারা! পলাশের মনে দুঃখ জমে। মায়া হয়। ভাবনা গভীর হয়। ওর ভাবনার গভীরতা ভেঙে দেয় বিপুল।
ঃ পলাশ, তুই কি ভাবছিস?
ঃ লোকটা পাগল হলো কি করে?
পাল্টা প্রশ্ন করে ও।
ঃ কি জানি, হয়তো যুদ্ধে সবাইকে হারিয়েছে বলে।
ঃ না। মুক্তিযোদ্ধারা সবকিছু ত্যাগ করতে পারে। তারা সাধারণের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।
ভারী কণ্ঠে বললো অপু।
ঃ তুই কি করে জানলি?
জানতে চায় পলাশ
ঃ পন্ডিত স্যার ক্লাশে একদিন একথা বলেছেন।
পরিবেশ এ মুহূর্তে একটু গুমোট ও বিষণ্ন। ওদের মনে সূক্ষ্ম বেদান গলা সাধছে। বিজু মনযোগসহকারে কিছু একটা ভাবছে। পলাশের ভয় কমে এসেছে। মজিদ পাগলার জন্যে ও কোমল টান অনুভব করছে। বিজুর সিদ্ধান্তটা কেন জানি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে।
সোনারগাঁয়ের পূবাকাশে ডিমের কুসুমের মত লালচে আভা দেখা যাচ্ছে। সূর্য উঠি-উঠি করছে। রাতের অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছ্ েধূসর কুয়াশার চাদর বিছিয়ে রয়েছে। শিশির ভেজা ভোর। কনকনে শীত। অপু, বিপুল, পলাশ ও বিপু চেয়ারম্যানের আম বাগানে ঢুকে পড়েছে। ওরা সর্ন্তপণে হাঁটছে। ওদের উত্তেজনার কাছে হাড় কাপানো শীতও কাবু হয়ে গেছে। ওরা মজিদ পাগলার খুপড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিজুর হাতে একগুচ্ছ ফুল। টাটকা। বাগানের ভেতরে পাশাপাশি দুটি খুপড়ি। একটিতে মজিদ পাগলাকে শেকলে বেধে রাখা হয়েছে। অপরটিতে থাকে আদল দারোয়ান। সে চেয়ারম্যঅনের বিশ্বস্থ লোক। প্রভুভক্ত কুকুর যেমন। সে আমবাগান তদারক করে। শেকল বাধা মজিদ পাগলাকে সতর্ক চোখে রাখে। তাকে খেতে দেয়। যেন ছুটে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখে। মজিদ পাগলা ছুটলে আর রক্ষা নেই! হাতের কাছে যাকে পাবে তার প্রাণ বাঁচানো দায়! গেল বছর একবার ছুটে গিয়েছিলো। ব্যাস, এক ঘণ্টার মধ্যে এগারজন জখম হলো। সারা গা জুড়ে উৎপাত করেছিলো। কাছে যে যায় তাকেই মারে। এদিক ওদিক ছুটোছুটি। হৈ চৈ, চিৎকার-চেচামেচী। সেদিন গায়ের সবাই দল বেধে তাকে ধরেছিলো। এরপর থেকে মজিদ পাগলাকে কড়া পাহারায় রাখে আদল দারোয়ান। ওরা তাই পা টিপেটিপে হাঁটছে। শব্দ যতটা চেপে রাখা যায়। আদল দারোয়ান টের পেয়ে গেলে ওদের উদ্দেশ্যটা ভেস্তে যাবে। পলাশের ভেতরে ভয় ফণা তুলে আছ্ েও ফিসফিস করে বিজুকে জিজ্ঞেস করলো,
ঃ আচ্ছা, মজিদ পাগলাকে দূর থেকে দেখে চলে আসলে হয় না?
ঃ হি-স-স! চুপ!
সাবধান করে বিজু। পলাশ থামে না।
ঃ পাগলাকে ফুল দিয়ে কি হবে? সে কি ফুলের মূল্য বুঝবে?
ঃ বুঝুক না বুঝুক, ফুল দিয়ে আমরা তাকে অভিবাদন জানাবো। তাছাড়া আমরা ফুল কোনো পাগলকে দিচ্ছি না, দিচ্ছি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে।
রাগী গলায় জবাব দিলো বিপুল। পলাশ এমনিতেই তর্ক করতে পারে না। তার উপর এ রকম ভারী কথা শুনে যুতসই জবাব খুঁজে পায় না। ও চুপসে যায়। ওরা খুপড়ির কাছে চলে এসেছ্ েবিজু মুখে আঙ্গুল তুলে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিলো। খুপড়ির দরোজা হা করে খোলা। খুপড়ির ভেতরে ওরা মজিদ পাগলঅকে দেখতে পেলো। শেকল দিয় খুঁটির সাথে বাঁধা। শীর্ণ দেহ, লম্বা ঢ্যাঙ ঢ্যাঙা। মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফ। চুল এলোমেলো। ছেঁড়া পোশাক। ছেড়া ও মলিন একটা কোট গায়ে চাপানো। সারা দায়ে রাজ্যের ধুলোময়লা। মাথা অবনত। যেন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেকটা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ দৃশ্যের মত। ওরা শ্রদ্ধাচোখে চেয়ে থাকে। মনের বীণায় কে যেন মেঘমাল্লার রাগিণী তুলে যাচ্ছে। চোখ থেকে নদী নেমে আসতে চায়। ওদের পলক সহজে পড়ে না। ভাবে এ লোকটিই একদিন গর্জে উঠেছিলো। স্বাধীনতা তারই ফসল। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে আজ কালের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত। যে শেখালো মুক্তির মন্ত্রণা, সে-ই আজ বন্দী! বিজুর সাহস বরাবরই বেশি। ও মজিদ পাগলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নির্ভয়ে। হাতের মুঠোতে ফুলের গুচ্ছ। সতেজ। পলাশের বুক দুরুদুরু। কনকনে শীতেও ঘামতে থাকে ও। বিজু কথাবলে,
ঃ আজ ষোলই ডিসেম্বর, বিজয় দিবস। আমরা তোমাকে অভিবাদন জানাতে এসেছি।
মজিদ পাগলা অবনত মাথা তুলে তাকায়। যেন দীঘল ঘুম থেকে এইমাত্র উঠলো। টু শব্দ করে না। এ এক বিস্ময়!
পাগল কি মাঝে মাঝে শান্ত থাকে? পলাশের মনে পশ্ন। বিজু কথা বলে যায়,
ঃ তুমি একাত্তরের বীরযোদ্ধা। আমরা তোমাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাচ্ছি।
বিকট অট্টহাসিতে কেঁপে উঠে ঘর। শেকল ছেড়ার ধাতব শব্দ হয়। ভড়কে যায় ওরা। কিন্তু ওদের অবাক করে দিয়ে মজিদ পাগলা স্বাভাবকি মানুষের মতো কথা বলে ওঠে,
ঃ আমার জন্য ফুল কেন এনেছিস? আমি তো ভাত চেয়েছি।
ওদের সাহস ফিরে আসে। বিপুল বললো,
ঃ আমরা তোমাকে ভাত দেবো। কারণ, তুমি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছো।
আরো একবার হেসে উঠে পাগল। খুব মজা পেয়েছে যেন। প্রশ্ন করলো,
ঃ তবে আমার স্বাধীনতা কোথায়?
ওরা উত্তর খুঁজে পায় না। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। অবাক কণ্ঠে অপু বললো,
ঃ তুমি তো দেখছি পাগল নও! একবারেই সুস্থ!
ঃ তাহলে আমার শেকল খুলে দে।
ঃ শেকল খুলে দিলে কি করবে?
বিপুলের প্রশ্ন।
ঃ আমি আরেকবার যুদ্ধ করবো!
তার দৃঢ়কণ্ঠের জবাবে ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা, গ্লানি, ঘৃণা……. টের পাওয়া যায়। ভীত কণ্ঠে পলাশ জিজ্ঞেষ করে,
ঃ কার সাথে যুদ্ধ করবে?
জবাব দেবার জন্য পাগল যেন প্রস্তুত ছিলো। বললো,
ঃ যারা আমার স্বাধীনতা কাড়তে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করবো। ঘাপটি মেরে থাকা হায়েনার দল বেরিয়ে এসেছে। মাথার উপর উড়ছে শকুন। আবার যুদ্ধ করতে হবে। আমার শেকল খুলে দে।
গা ছম ছম করে ওদের। যেন এখনই বাঁধবে যুদ্ধ। পাগলের কণ্ঠে যুদ্ধের দামামা বাজছে। শেখল খুলতে এগিয়ে যায় বিজু। যেন ও শেকল খুলতেই এসেছে। অজানা ভয়ে পলাশ জড়োসড়ো। অথচ ভালো লাগছে। অদ্ভুত শিহরণ! আদল দারোয়ান যে কোন সময় এসে পড়তে পারেÑ সেই আশংকা এখন আর ওদের মনে নেই। পাগলকে মুক্ত করে দেয়া কি ঠিক? এ প্রশ্নটাও অবান্তর। ভোরের পাখিরা ঘুম ভেঙে উঠেছে। কিচিরমিচির শব্দ হচ্ছে আমবাগানে। খুপড়ির দরোজা গলে ভোরের নরোম আলো ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিজু শেকল খুলছে। ওর পাশে অনড় দাঁড়িয়ে রয়েছে বিপুল, অপু ও পলাশ। ভোরের আলোয় ওদের অন্যরকম মনে হয়।

আকাশ
বল্টু ভীষণ অবাক হলো। আকাশের হাতে কোনো বই নেই! বই ছাড়া আকাশকে ভাবাই যায় না। কিন্তু আজ ওর হাতে বই নেই। বল্টু দু’হাতে চোখ কচলে নিলো। আকাশ আসছে মুন্সিবাড়ির অঙিনা ছুয়ে যাওয়া পথ ধরে। পথটি বড় রাস্তা থেকে সরু ও ঢালু হয়ে নেমে এসেছে। আকাশ হাঁটছিলো আনমনে। বল্টুর মন ’থ মেরে গেছে। আকাশকে বই ছাড়া দেখে ওর বিস্ময়ের রেশ কাটছে না। আকাশ মানেই হাতের মুঠোতে বা বগলদাবায় বই ঝুলে থাকা একটি পড়ুয়া ছেলে। সকাল কিবা রাত, দুপুর কিবা বিকেল যখনই হোক ওর হাতে বই থাকবেই। অষ্টপ্রহর ও লেখাপড়ায মগ্ন। যেন এ ছাড়া জগতে আর কোন কাজ নেই। রাগ হয় বল্টুর। এতো লেখাপড়া শিখে কী হবে? পুঁথির মধ্যে ডুবে থাকতেই বা কী এমন স্বাদ! আকাশ কি ঘুড়ি উড়াতেপারে? সূতো ছেড়ে দূরের, ঐ বহু দূরের নীল আকাশটাকে ও কি ছুঁতে সাহস রাখে? ও-কি পারে দূরন্ত ঘাস ফড়িংকে দু’আঙ্গুলে বন্দী করতে? পারে, ঝাঁঝালো রোদের দস্যি দুপুরে বিলাস বাবুর আম বাগানে ঢুকে কোঁচড় ভর্তি আম চুরি করে আনত? বল্টু এসব খুব পারে। এ নিয়ে ওর এক ধরনের অহংকার আছে।
আকাশের পথ আটকে দাঁড়ালো বল্টু। আকাশ থমকে দাঁড়ালো। চারদিকে তখন বিকেলের সোনা রোদ ছড়িয়ে রয়েছে। দখিনা বাতাস বইছে। বল্টু বুক চিতিয়ে বাতাস ঠেকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
ঃ এই পথে যাচ্ছো কোথায় আকাশ?
ঃ অমিতদের বাড়ি।
ঃ নরম গলায় উত্তর করলো আকাশ।
ঃ কেনো?
ঃ ও একটা বই ধার নিয়েছিল, সেটা আনতে যাচ্ছি।
কথা শুনে রাগ চাপলো বল্টুর। ব্যাটা একেবারে হাড়কিপ্টে! একটা বই ধার নিয়েছে তো, সেটা আবার ফিরিয়ে আনতে হয়?
বল্টুর মাথায় রাগ চড়াৎ করে উঠলো। আকাশ বিদায়ী কণ্ঠে বললো,
ঃ আচ্ছা, আসি।
আকাশ বল্টুকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ওর হাতে সময় কম। ওকে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে। আকাশ তাই হাঁটতে শুরু করেছে। বল্টু বিপরীত দিকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ওরা মাথায় একটা ডানপিটে বুদ্ধি উঁকি দিলো। সামনে একটি ডোবা রয়েছে। ডোবার উপর রয়েছে একটি নড়বড়ে সাঁকো। এ সাঁকো দিয়ে অমিতদের বাড়ি যেতে হবে। আকাশকে শিক্ষা দেবার এই তো মোক্ষম সুযোগ!
নিঃশব্দে আকাশের পিছু নিলো বল্টু। দূরত্ব রেখে হাঁটতে লাগলো। আকাশ যখন সাঁকোটির মাঝখানে, বল্টু তখণ সাঁকোর প্রথম অংশ গিয়ে দাঁড়ালো। কোনো কালক্ষেপণ না করে ও সাঁকোটিকে সজোরে ঝাঁকাতে লাগলো। নড়বড়ে সাঁকো নেচে উঠলো। ভ্যাবাচোকা খেয়ে গেল আকাশ। আচানক ঝাঁকিতে টাল সামলাতে পারলো না সে। ঝপাৎ করে পড়ে গেল ডোবায়। বল্টু দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠলো। আকাশ অসহায় চোখে বল্টুকে দেখলো। ডোবাটি কচুরিপানায় ঠাসা। সাঁতরাতে কষ্ট হয়। ততক্ষণে বল্টু উধাও হয়ে গেছে।
এক, দুই, তিন…. করে সাতদিন পেরিয়ে গেল। বল্টুর দেখা নেই। ওর স্কুলে না আসাটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে ক্লাশের কেউ ভাবেও না। কিন্তু আকাশের ভাবনা হচ্ছিলো। ক্লাশে বল্টুর অনুপস্থিতি ওর বুকে লাগছে। ও কি স্যারের মারের ভয়ে স্কুলে আসে না? কিন্তু ও তো বল্টুর বিরুদ্ধে কারো কাছে নালিশ করেনি। এসব ভাবছিলো আকাশ। অনুভব হচ্ছিলো। অবশেষে টিফিন আওয়ারে ও হাবিবকে জিজ্ঞেস করলো,
ঃ বলতে পারো, বল্টু স্কুলে আসে না কেন?
হাবিব অবাক চোখে তাকিয়ে বললো,
ঃ আসবে কি করে ওর তো ডান পা ভেঙে গেছে!
ধক করে উঠলো আকাশের বুক।
ঃ কি করে ভাঙলো?
ঃ কাকের বাসায় হানা দিয়ে কোকিলের ছানা আনতে আম গাছের মগডালে চড়েছিলো। ব্যাস ডাল ভেঙে গাছ থেকে পড়ে কুপোকাৎ।
এই বলে হাবিব থামলো। আকাশের মন কেমন করে উঠলো। টলমল করে উঠলো চোখ। পরের ক্লাশগুলোতে ওর মনোযোগ বসলো না। এমন কখনো হযনি আকাশের।
গোধূলীর পেয়ালায় বিকেল ধীরে ধীরে জমতে থাকলো। সেই বিকেলের ফিকে রঙ জানালা গলে বল্টুর বিছানায় লুঠোপুটি খাচ্ছে। ওর মন ভালো নই। সেই কবে থেকে ভাঙা পা নিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। মন কেবলি উদাস হয়ে থাকে। সময় যেন পাথর হয়ে গেছে। বল্টু হঠাৎ চমকে উঠলো। বিস্ময়ের বিদ্যুত কোছে নিয়ে দেখতে পেলো আকাশ ওর ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর হাতের বগলে বই। নিশ্চয় স্কুল থেকে সরাসরি ওর বাড়ি চলে এসেছে। আকাশ এগিয়ে এলো এক গাল হাসি নিয়ে। ওর মাথার কাছে বিছানায় বসলো। তারপর আলতো ভাবে ওর কপালে হাত রেখে নরম গলায় প্রশ্ন করলো,
ঃ কেমন আছো বল্টু?
বল্টু কোন ভাষা খুঁজে পেলো না। লজ্জাবোধ হলো। ভীষণ লজ্জা! দুঃখিত হলো সে। লজ্জা আর দুঃখের গ্লানিতে দু’চোখে চল ভরে এলো। বুকের ভেতর অনুতাপের হু-হু করে কান্না উথলে উঠলো। বল্টু আকাশের মুখপানে চেয়ে রইলো অপলক। ভাবলো, আকাশের মনটা সত্যিই আকাশের মতো উদার!

দৌড়
আতার ডান হাতে একটি বড় ধরনের টিফিনক্যারিয়ার। ওর লিকলিকে দেহের তুলনায় ওটার ওজন বেশি মনে হচ্ছে। টিফিন ক্যারিয়ারটি ও এ-হাত ও-হাত বদল করে হাঁটতে লাগলো। মাথার উপর চৈত্রের দুপুর। উপচে পড়ছে রোদ। বাতাস নেই। ভ্যাপসা গরম। ও দর দর করে ঘামছে। লম্বা শার্টের মলিন হাতায় কপালের ঘাম মুছে নিলো সে। ডান হাতে টিফিন ক্যারিয়ার থাকায় বাম দিকে নুয়ে হাঁটছে। আজ ওর মন ভালো নেই। সকাল থেকে এ পর্যন্ত কিছুই পেটে পড়েনি। ক্ষুধা তীব্রভাবে জানান দিচ্ছে। দুপুর অব্দি ন’গ্লাস পানি খেয়েছে। পেচ্ছাব করেছে ঘন ঘণ। খালি পেটে ক্ষুধার রাক্ষস তোলপাড় করে। পানি পিপাসা মেটায়, ক্ষুধার আগুন নেভায় না। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখলো আতার বারো বছরের শীর্ণ বুক। ওদের আজ কিছুই রান্না হয়নি। ওরা অনাহারে আছে। মাঝে মাঝে দু’এক বেলা ওদেরকে অনাহারে কাটাতে হয়। কিন্তু আজ পুরো দিন করতে হবে। এমন কি আগামীকাল কিংবা তার পরের দিনও ঘরের চুলা জ্বালবে কিনা কে জানে। ঘরে কিছুই নেই। কিনে আনবে কে? ওরা বাবা তিন দিন ধরে নিখোঁজ। রিকশা নিয়ে বেরিয়েছিলো আর ফেরেনি। উধাও হয়ে গেিেছ। রিকশার মহাজন কোন সাহায্য করেনি। বরং রিকশা চুরির মামলা করেছে। এখন পুলিশের ঝামেলাও পোহাতে হবে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ওর মা থেমে থেমে কেঁদে উঠেছিলো। ওরা কাঁদছিলো ক্ষুধার তাড়নায়। ঘরে কান্নাকাটির বিদঘুটে পরিবেশ্ আতার ভালো লাগেনি। ওর সহজে কান্না পায় না।
এক মুঠো রুপালী ভাতের জন্য আতার মন আকুপাকু করে। ওর হাতেই রয়েছে ভাতের টিফিনক্যারিয়ার। কিন্তু তা ধরা ছোঁয়া যাবে না। ও বহনকারী মাত্র। এ ভাত ইয়াকুব সাহেবের। ও প্রতিদিন দুপুরে তার জন্য নিয়ে যায। তার অফিস মতিঝিলে। নারিন্দা থেকে প্রতিদিন নিয়ে যেতে হয়। এ বাবদ মাসিক বেতন একশ’ টাকা। নতুন চাকরি। সবে সাতদিন হয়েছে। ও নিয়মিত এবং যথাসময়ে টিফিনক্যারিয়ার ইয়াকুব সাহেবের অফিসে পৌঁছে দেয়। মাস ফুরোলেই একশ’ টাকা! একশ’ টাকার স্বপ্ন ওর মনে নানা রকম রঙ ছড়াতে থাকে। এ মুহূর্তে স্বপ্নটা মন থেকে উড়ে গেলো। ঝাঁঝাঁ রোদ। চুইয়ে ঘাম ঝরে শরীর থেকে। ও হাঁটতে থাকলো। বেশ ক্লান্তি লাগে। তবুও দুচোখ বেশ সজাগ। ছুটে চলা রিকশাগুলোর দিকে তীক্ষè দৃষ্টি রেখে হাঁটছে। ওর মন বলছে যে কোন সময় বাবাকে দেখেতে পাবে। হয়তো দেখবে, ওর বাবা এ পথেই রিকশা নিয়ে যাচ্চে। ও চিৎকার করে উঠবে,
ঃ বাবা…।
ডাক শুনে বাবা রিকশার ব্রেক কষবে। প্যাসেঞ্জার হঠাৎ মাঝ পথে রিকশা থামানোর জন্য রেগে যাবে। ওর বাবা প্যাসেঞ্জারের রাগ গায়ে মাখবে না। নরম গলায় বলবে,
ঃ পোলাটায় ডাক দিছে সাব। তিনদিন ধইরা বাড়ি যাই না, বড় চিন্তার মধ্যে আছে। ও ছুটে যাবে।
ঃ বাবা, তুমি বাড়ি যাওনা ক্যান? মা, আমিনা আর জরিনা খালি কান্তাছে। আমরা আইজ কিছুই খাই নাই।
ঃ আইজ যামু বাজান। এই খ্যাপটা মাইরাই যামু। চিন্তা কইরো না। যাও, বাড়ি যাও।
আতার মনে এ রকম ভাবনা পেখম মেলতে থাকলো। বাবার ভাবনায় বিভোর সে। চোখ কিন্তু সজাগ। টুং টাং শব্দ তুলে রিকশাগুলো এদিক-সেদিক যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে। কিন্তু কোনো রিকশায়-ই ওর বাবাকে দেখতে পায় না। তবুও মনে ক্ষীণ একটা আশা মাথা উঁচু করে রইলো। মনে হয় এই বুঝি দেখা যাবে। বিশ্বাসটুকু অদ্ভুতভাবে মনে সেঁটে থাকে। তাই যাবতীয় বিষণ্নতার ভেতরে এক ফালি আনন্দ নক্ষত্রের মত জ্বলে থাকে।
আতা একটি চায়ের স্টল থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলো। আবার হাঁটতে লাগলো। পেটে ক্ষুধা। মনে বাবাকে নিয়ে ভাবনা। ভাবনা গভীর হলে ভালো। ক্ষুধার কথা ভুলে থাকা যায়। ও বাবাকে নিয়ে গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেলো। মতিঝিলের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওর বাবা চা খাচ্ছে। গরম চা। ওকে দেখে বাবা লজ্জিত হয়ে উঠলো। বললো,
ঃ তোমার মা আমার ল্যাইগা চিন্তা করতাছে, তাই না বাজান?
ঃ হ। খালি কান্তাছে। আমরা অনাহারে আছি।
ঃ কও কি? চলো এক্ষুণি বাড়ি যাই। ভালো বাজার কইরা যামু। তার আগে চলো ভালো একটা হোটেলে তোমারে ভাত খাইয়াইয়া লই।
ওকে হিরহির করে টেনে নিয়ে যাবে। ভাত খাওয়ার আনন্দে ওর বুখ ধড়ফড় করতে থাকবে। আচানক ভাবনায় ছেদ পড়লো। একটা রিকশা প্রায় গ ঘেঁষে ছুটে গেলো। লাফিয়ে উঠলো আতা। পড়ি-পড়ি করেও হাত থেকে টিফিনক্যারিয়ারটি পড়েনি। পড়লে আর রক্ষা ছিলো না! চাকুরি শেষ। একশ’ টাকার স্বপ্নটা তখন স্বপ্নই থেকে যাবে। ওর হাতের মুঠো আরো শক্ত হলো। যেন টিফিনক্যারিয়ার ওর অন্য একটি প্রাণ।
টিকাটুলীতে আতা দাঁড়ালো। পেচ্ছাব ধরেছে। ঘন ঘন পানি খেলে যা হয়! ও পায়ের কাছে টিফিনক্যারিয়ার রেখে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করতে থাকে। নির্বিঘ্নে। হঠাৎ খেয়াল হল ও পশ্চিম দিকে ফিরে পেচ্ছাব করছে! তাও আবার দাঁড়িয়ে। তবে এ ব্যাপারে ওর তেমন লজ্জা হল না। পেচ্ছাব শেষে মনে হল পেটটা একেবারে খালি হয়ে গেছে। নিশ্বাস নিতে ভারী কষ্ট। হাত বাড়িয়ে পায়ের কাছ থেকে টিফিনক্যারিয়ার নিতে গিয়ে ও হতবাক। ওটা নেই। ধরাস করে উঠুলো বুক। নিঃশ্বাস আটকে যেতে চাইলো। মাথার ভেতরটা উঠলো চক্কর দিয়ে। তড়িঘড়ি আশপাশে তাকিয়ে দেখলো। কোথাও ওটা নেই। ওর বুক ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে থাকলো। ও দিশেহারা। অসহায় চোখ মেলে খুঁজতে লাগলো। অনেকটা দূরে দৃষ্টি আটকে গেল। বিদ্যুৎ জ্বলে উঠলো চোখে। তিন চারটি ছেলে টিফিনক্যারিয়ারটি নিয়ে ছুটে যাচ্ছে। নোংরা মলিন ছেলেগুলো ওর বয়সী কিংবা দু এক বছরের বড় হবে। ওরা দৌড়াচ্ছে। এক মুহূর্ত আর দেরী করলো না আতা। দৌড় দিলো ওদের পেছনে। যতটা জোরে সম্ভব দৌড়ানো যায়। দেহের যতটুকু শক্তি সবটুকু দিয়ে দৌড়ের গতি বাড়াতে চেষ্টা করলো। ওদের ধরতেই হবে। প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়েও ও এই ভাতে হাত দেয়নি। সেই ভাত অন্যে কেড়ে নেবে! একশ’ টাকার রঙ ছড়ানো স্বপ্নটা ভেঙে যাবে! প্রশ্ন দুটো ওর কাতর দেহে এক রকম শক্তি জোগালো। ও দৌড়াতে লাগলো। ওরাও দৌড়াচ্ছে। এ যেন এক লড়াই। প্রচন্ড হাঁফাচ্ছে আতা। কিন্ত থামলো না। ফুসফুসে দমের ঘাটতি পড়ছে। তবুও হারতে চায় না ও। দূরত্ব কমানোর আপ্রাণ চেষ্টায় আতা প্রাণপণ দৌড়াতে লাগলো।

কলম
রেবেকার দুচোখ ভিজে গেল। টপ টপ করে দড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোটা অশ্রু। শন্তু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। ওর ভেতরেও কষ্টের দমকা বাতাস। ও সামলে রাখে। রেবেকা শন্তুর ডান হাত ধরে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করলোÑ
ঃ কোথায় যাবি!
ঃ অ-নে-ক দূরে!
ঃ রাগ করে কি কেউ বাড়ি ছেড়ে পালায়?
রেবেকার কথা কানে তুললো না শন্তু। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ছেলেবেলায় বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। এ মুহূর্তে শন্তু তাদের একজনের নামও মনে করতে পারছে না। মনে করতে পারলে তাদের কথা রেবেকার মুখের উপর ফটাফট বলে দিতো। শন্তু চুপ মেরে থাকে। রেবেকা নরম গলায় বললোÑ
ঃ পাগলামী করিস না, ভাই। তুই চলে গেলে আমি থাকবো কেমন করে?
রেবেকার কথা শুনে মন গলে আসতে চায়। মন থেকে ওর মায়াবী কথার রেশ ঝেড়ে ফেলে শন্তু। ভারী কণ্ঠে বললোÑ
ঃ জানি তুই আমার জন্য কষ্ট পাবি। কিন্তু বাড়িতে থাকাটাও যে আমার জন্য কষ্টকর। দেখ, কাল তোর সামনেই মা আমাকে কি বেধড়ক মারলেন। তুই দাঁড়িয়েÑ দাঁড়িয়ে দেখলি!
ঃ আমি ধরতে গেলে আমাকেও মারতেন।
ঃ মা শুধু শুধু মারে কেন?
রেবেকার সতর্ক চোখে চারপাশ দেখে নিলো। গলা নামিয়ে বললো,
ঃ বাহরে, সৎ মা যে! তিনি সুযোগ পেলে তো মারবেন-ই!
ঃ বাবা তাকে কিছুই বলেন না।
শন্তুর মনের ভেতর শক্ত অভিমান। রেবেকা ওর কথার সমর্থন করে ফিসফিস করে বললোÑ
ঃ জানিস, সবাই বলে বাবা এখন আমাদের পর হয়ে গেছেন।
ঃ তাহলে কি হবে!
ঃ সব মুখ বুজে সহ্য করে থাক।
ঃ না, আমি সহ্য করে থাকবো না। মার খাওয়াটা না হয় সহ্য করা যায়, কিন্তু লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়া কি সহ্য করা যায়?
শন্তুর মনে ক্ষোভ। লেখাপড়ার প্রতি ওর বেশ ঝোঁক। মনোযোগীও। কিন্তু অকারণে ওর লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বইগুলো সের দরে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে মুদি দোকানে। ওকে দিয়ে নাকি লেখাপড়া হবে না। বরং হাতের কাজ শিখে রাখলে ভালো। ভবিষ্যত উজ্জ্বল। লেখাপড়া শিখে কজন বড় হয়েছে? এ প্রশ্নে মা অস্থির। বাবাও একমত। ব্যাস পাঠশালার পাঠ শেষ। শুধু কি তাই! শন্তুর জন্য কাজ টিক করা হয়েছে। মা’র দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় থাকেন শহরে। তার রয়েছে যানবাহন মেরামতের গ্যারেজ। এই গ্যারেজে শন্তু কাজ শিখবে। এ লাইনে একবার হাত পাকিয়ে ফেলতে পারলে ভাগ্যদেবী হুড়মুড় করে পায়ের নিচে এসে পড়বে। শন্তুর মা-বাবা ওর সুন্দর ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছেন। শন্তুকে দু একদিনের মধ্যেই ওর বাবা শহরে নিয়ে যাবেন। কিন্তু শন্তুর মন বেঁকে গেছে। লেখাপড়া ওকে টানে। হাতছানি দেয় বই। স্কুলের ক্লাশ ভীষণ রকম ডেকে যায়।
শন্তু যখন বাড়ি থেকে পালাচ্ছিলো তখন কড়কড়ে রোদে সকাল তেঁতে উঠেছে। বাতাস বইছিলো হু হু করে। আকাশের নীল রঙটা বড় উজ্জ্বল দেখাচ্ছিলো। আকাশ ছিলো মেঘহীন। ঝকঝকে। শন্তু রেবেকার মুখের উপর থেকে চোখ নামিয়ে নিলো। বড় মায়া হলো। বাঁ পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়ে বললো,
ঃ আমার কথা কাউকে কিছু বলিস না, রেবেকা। আমি যাচ্ছি।
শন্তু ওদের বাড়িটাকে পেছনে ফেলে হাঁটতে লাগলো। রেবেকার চোখ এখন শ্রাবণের আকাশ। ঝর ঝর করে ঝরছে। ওদের মা মারা গেছে ন’বছর আগে। তখন শন্তুর বয়স এক। রেবেকার চার। মায়ের অস্পষ্ট একটি ছবি রেবেকার মনে পড়ে। উজ্জ্বল কোনো স্মৃতি নেই। জটিল অসুখে ভুগে মা মৃত্যুর দরোজা ডিঙিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর চার মাস পরই বাবা বিয়ে করলেন। ঘরে এলেন সৎ মা। শুরুতে তিনি ভীষণ আদর করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে অনাদর আর অবহেলাটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়ালো। পান থেকে চুন খসলেই তিনি গালাগাল দেন। ছুতো পেলেই হাত চালান। বাবাটা যেন অন্ধ হয়ে গেছেন। সৎ মায়ের অত্যাচার যতই বাড়ুক তা নিছক শাসন বলে তিনি উপেক্ষা করে চলেন। রেবেকা সব অত্যাচার সহ্য করে। টু শব্দ করে না। কিন্তু শন্তুটা বড্ড গোয়াড়। এই বয়সেই কেমন প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। অভিমানীও। ওর জন্য কষ্ট হয় রেবেকার। শন্তু চলে যাচ্চে। রেবেকা কিছুই করতে পারছে না। ও অসহায়। এক সময় রেবেকা দৌড়ে চলে গেলো ঘরে। ফিরে এলো দৌড়ে।
ঃ শন্তু, শোন, দাঁড়া…।
হাঁপিয়ে উঠলো রেবেকা। শন্তুর দাঁড়ানোর ইচ্ছে নেই। হাঁটা দিলো। রেবেকা দৌড়ে গিয়ে শন্তুকে ধরে ফেললো। শন্তু বিরক্ত হলো। রেবেকাকে বাড়ি পালানোর কথা বলে ভুল হয়েছে। চুপচাপ কেটে পড়তেই হতো। তাহলে কান্নাকাটির বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হতো না। শন্তু কণ্ঠে ঝাঁঝ তুলে বললো,
ঃ পিছু ডাকছিস কেনো?
ঃ তুই সত্যিই যাচ্ছিস!
ঃ হ্যাঁ।
ঃ এটা রাখ।
বলে রেবেকা শন্তুর হাতে একটি ঝরনা কলম গুজে দিলো। এ কলমটি রেবেকার খুব প্রিয়। এতো প্রিয় যে, ও এ কলম দিয়ে কখনো লিখেনি। কলমটি ওকে বাবা গত বছর কিনে দিয়েছিলেন। সে বছর রেবেকা জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলো। বাবার কাছ থেকে পাওয়া কলমটি ওর একমাত্র উপহার। গোপন সম্পদ। শন্তুর লোভ ছিলো কলমটির প্রতি। কলমটির জন্য ও অনেকদিন কেঁদেছে। রেবেকার খারাপ লেগেছে। তবুও কলমটি শন্তুকে ছুতে পর্যন্ত দেয়নি। কলমটি খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিলো রেবেকা। আজ নিজের প্রিয় সম্পদটুকু তুলে দিলো ভাইলে হাতে। বললো,
ঃ এই কলমটির দিকে তাকালে আমার কথা মনে পড়বে। এটা যত্ন করে রেখে দিস।
শন্তু অবাক চোখে রেবেকার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ওর ঠোঁট কাঁপলো। কথা ফুটলো না। কলমটির প্রতি শন্তুর দুর্বার আকর্ষণ। রেবেকা আজ ওর প্রিয় জিনিসটা এতো সহজভাবে দিয়ে দিলো! চোখের নদী বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়লো। শন্তু সামলে রাখতে পারলো না।
আহামরি স্টেশন নয়। ছোট। তবে এ স্টেশনে দূরপাল্লার ট্রেন থামে। তখন স্টেশনটি অল্পক্ষণের জন্য জেগে ওঠে। কুলি হকাররা ছুটোছুটি করে। যাত্রীদের হাঁকডাক। ব্যস্ততা। ইঞ্জিনের ফোঁসফোঁস। হুইশেল। সব মিলিয়ে গোলমেলে পরিবেশ। বেশির ভাগ সময় স্টেশনটি প্রাণহীন পড়ে থাকে। শন্তুর বাড়ি থেকে স্টেশন সাত মাইলের পথ। মাঝখানে ছোট্ট একটা নদী পেরুতে হয়। শন্তু নির্বিঘ্নে চলে এসেছে। ওর বুক ঢিব ঢিব করছে। চার পাশে তাকাচ্ছে বারবার। পরিচিত মুখ এড়িয়ে যেতে হবে। এ স্টেশনে গত দু’মাস আগে ও প্রথম এসেছিলো স্কুলের বাংলা পিরিয়ডের মেজবাহ উদ্দিন স্যারের সাথে। স্যারের এক আত্মীয় এসেছিলেন শহর থেকে। তাকে রিসিভ করে আনতে হয়েছিলো। মেজবাহউদ্দিন স্যার শন্তুকে পছন্দ করেন। একদিন স্কুল ছুটির পর তিনি শন্তুকে ডেকে বললেন,
ঃ কাল তো শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। তুই সকালে আমার বাড়ি চলে আসিস।
ঃ কেনো স্যার?
ঃ তোকে ট্রেন দেখাতে নিয়ে যাবো। কখনো দেখেছিস?
ঃ জ্বি-না, স্যার। তবে ছবিতে দেখেছি।
ঃ তাহলে চলে আসিস।
সে রাতে ভালো ঘুম হয়নি শন্তুর। পরের দিন সকালে মেজবাহউদ্দিন স্যারের সাথে ও এ স্টেশনে গিয়েছিলো। টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সেদিন এ স্টেশনের সাথে ওর প্রথম পরিচয় হয়। স্মৃতি থেকে ফিরে এলো শন্তু। এ মুহূর্তে স্টেশন ফাঁকা। শন্তুকে যেতে হবে অনেক দূরে। অনেক বড় হতে হবে ওকে। যেভাবেই হোক লেখাপড়া শিখতে হবে। একদিন ও বাড়ি ফিরবে বিদ্বান হয়ে। গ্রামের লোকেরা অবাক চোখ তুলে বলবে, শন্তু এতো বড় হয়েছে! বাবা ভড়কে যাবেন। মা নিশ্চয়ই কাচুমাচু করে বললেবন, লেখাপড়া শিখে বড় হওয়াযায় না, এটা ঠিক নয়। এই আমাদের শন্তু কতো বড় হয়েছে। রেবেকা হয়তো কিছুই বলবে না। ও চোখের জলে ভিজিয়ে দেবে শন্তুর সব অভিমান। ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদো গলায় বলবে, আমাকে ছেড়ে আবার পালিয়ে যাবি না তো?
ঢং ঢং ঢং…। স্টেশনের ঘণ্টা বাজলো। এর কিছুক্ষণ পরই দুপুর মাথঅয় নিয়ে একটি দূরপাল্লার ট্রেন স্টেশনে এসে থামলো। চঞ্চল হয়ে উঠলো স্টেশন। কুলি-হকাররা চিৎকার-চেচামেচি করে ট্রেনের কামরাগুলোর দিকে দৌড়াতে লাগলো। সবুজ ট্রেনের জানালা দিয়ে যাত্রীরা হাত বাড়িয়ে এটা ওটা কিনছে। শন্তু চটপট উঠে পড়লো ট্রেনে। ওর বুক দুরু-দুরু। সবটুকু সাহস এক করে ও ট্রেনের কামরার আরো ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালো। যাত্রীদের মধ্যে কেউ অলস ভঙ্গীতে বসে আছে। কেউ পেপার ম্যাগাজিনে চোখ রেখে ব্যস্ত। কেউ কেনা কাটায়, কেউবা খোশগল্পে মেতে আছে। শন্তু সরু চোখে চারপাশটা দেখে নিলো। বুকের ভেতর ঢিব ঢিব আরো বেড়ে গেছে। রেবেকার কথা মনে করে ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তখনি কান ফাটানো হুইশেল বাজিয়ে ট্রেনটি ঝাঁকুনি খেলো। শন্তুর বুক মুহূর্তেই যেন খালি হয়ে গেলো। ট্রেন চলতে শুরু করলো। বুকের কাঁপন এখন সমস্ত শরীরে। শন্তু ডান হাত প্যান্টের পকেটে ভরে দিলো। কলমটি হাতের মুঠোতে চলে এলো। কলমটির অস্তিত্বের কাছে ওর সব ভয় উবে গেলো।
নির্দিষ্ট লয়ে এক ধরনের বিদঘুটে ধাতব শব্দ তুলে ছুটে চললো দুর পাল্লার ট্রেন। শন্তুর কচি হাতে কলমটি সাহস জোগাতে লাগলো। ওকে যেতে হবে অনেক দূরে!

সোহাগী
সকাল থেকে দুপুর অব্দি ঘুরে বেড়ালো সোহাগী। কোথাও ভিক্ষা পেল না। ওর মাথার উপর ঝাঁঝালো রোদের দুপুর। মাথায় উস্কো খুস্কো চুল। গায়ে নোংরা ও ছেড়া জামা। মলিন মুখ। ঘাম ঝরছে দরদর করে। ওর প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। পেটের ভেতরে ক্ষুধা তোলপাড় করছে। সকাল থেকেই ক্ষুধা নামক রাক্ষসটা ওকে খাবলে খাচ্ছে। ও সামলে উঠতে পারছে না। হণ্যে হয়ে ঘুরেছে। জোটেনি একমুঠো ভাত বা দু এক টুকরো রুটি। মানুষগুলো কেমন পাথর হয়ে গেছে। সোহাগী গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে কমলাপুর রেলস্টেশনের চওড়রা প্লাটফর্মে। এই স্টেশনে সারাক্ষণ মানুষের ব্যস্ততা। এদিক ওদিক সবাই ছুটছে। হরেকরকম মানুষ। এতো মানুষ গাড়িতে চেপে কোথায় যাওয়া আসা করে? এই প্রশ্নটা প্রায়ই ওর মনে জাগে। ও আপন মনে ভাবে মানুষে ঠাসাঠাসি ট্রেনগুলো যাচ্ছে অনেক দূরেÑ সুন্দর এক শহরে। সেখানে মানুষেরা পাথর নয়। ফুলের মত। হাত পাতলেই পেট পুড়ে খাওয়া যায়। ভাবতে ভালো বলেই ও এ ভাবনাটা প্রায়ই ভাবে। দূরগামী ট্রেন যখন দিগন্ত রেখায় মিলিয়ে যায় সেদিকে চেয়ে ও তা ভাবে। ওকে হাতছানি দেয় সেই শহর। তবে ওর কল্পনা এর বেশি বি¯তৃত হ না, বর্ণাঢ্যও হয় না। ওর ছয় বছরের মনে কেবল ছপিয়ে ওঠে হাহাকার। বুকের সমুদ্রে বেদনার পাল তুলে ছুটে দুখের নৌকো।
মানুষের ভিড় ভেঙে সোহাগী হাঁটছে। শীর্ণ হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইছে। কিন্তু কেউ ভিক্ষা দিচ্ছে না। সবাই ছুটে, চলছে। ওর অসহায় দুটি চোখ চলা ব্যস্ত মানুষগুলোর মুখে ফোকাস করে যায়। একটা দূরপাল্লার ট্রেনের সামনে ও থামে। ট্রেন হুইসেল বাজায়। এখনই ট্রেন ছাড়বে। যাত্রীরা হুড়মুড় করে ট্রেনে উঠছে। এ সময় তারা ভিক্ষা দেবার ফুসরত পান না। তবুও হাত পেতে ও ভিক্ষা পাবার চেষ্টা করছে। প্লাটফর্মে হৈ হুল্লোড় ও ছুটোছুটি। ট্রেনের ইঞ্জিন সচল হয়ে ওঠে। ঝিকঝিক ধাতব শব্দ তুলে ট্রেন স্টেশন ছাড়ে। চলন্ত ট্রেনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সোহাগী। ট্রেন ছেড়ে যাবার সময় ওর ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। একটি জ্বলজ্বলে স্মৃতি কেঁপে কেঁপে ওর চোখের তারায় ভেসে ওঠে। ট্রেনে চড়েই ও একদিন ফুলতলী গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলো। আশ্রয়হীন সোহাগী ঠাঁই খুঁজতে ছুটে এসেছিলো এই শহরে। এখানে ওর আশ্রয় খোলা আকাশ। কখনো পেটপুড়ে খেতে পায়নি। পেয়েছে অবহেলা ও অনাদর। এ নিয়ে আর দুঃখ হয় না। অভ্যস্ত হয়ে গেছে যেন। ক্ষুধার সাথে ও পেরে ওঠে না। ক্ষুধা ওকে তাড়া করে হরতামেশা। সব কষ্ট ও বুকে চেপে রাখে। ওর হাহাকার বাতাসে ভেসে আকাশে মিলিয়ে যায় নীরবে। আপনজন বলতে সোহাগীর এই পৃথিবীতে কেউ নেই। ছিন্নমূল। সব কেড়ে নিয়েছে ভয়াবহ বন্যা! ওর মা ছিলো, বাবা ছিলো। ফুলতলী গ্রামে ছিলো ছোট্ট একটি ঘর। সেই ঘরে অভাব-অনটন থাকলেও কখনো ও ক্ষুধার কষ্টে কাঁদেনি। ওদের বাড়ির উঠোনে সূর্য ছড়াতো আলো, চাঁদ বিলাতো জোৎস্না। ওর বাবা ছিলো সূর্যের আলোর মত জ্বলজ্বলে। মা ছিলো জ্যোৎস্নার মত মায়াবি। সোহাগীর বাবা ছিলো কৃষক। জমি বর্গা নিয়ে ফসল ফলাতো। বছরে যা কিছু ফসল ওদের ঘরে উঠতো তাতে কোনোরকমে দিন কেটে যেত। কিন্তু বন্যার করাল গ্রাসে হারিয়ে গেছে সব। সে কী ভয়াবহ বন্যা! ফুলতলী তখন ছিলো পানিতে ডুবুডুবু। পানিতে ভাসতে লাগলো গরু ছাগলের মরাদেহ। মানুষের প্রাণ যায় যায়। নিরাদপ স্থানে ঠাঁই নিতে সবার সে কী চেষ্টা! ওরা ওদের ঘরের চালে আশ্রয় নিয়েছিলো। দিনদিন পানি বেড়েই চললো। ঘরের চালেও পানি চাপলো। অবশেষে উপায়ান্ত না দেখে ওরা ছুটো এলো রিলিফ ক্যাম্পে। ততক্ষণে রিফিল ক্যাম্প মানুষের টইটুম্বুর। তিল ধরার জাযগা নেই যেন। গায়ের প্রায় সব লোক আশ্রয় নিয়েছে সেখানে। ওরা দিশে খুঁজে পেল না। অনেক বলে কয়ে সোহাগীকে ক্যাম্পে রেখে চলে গেল ওর বাবা মা। সেই যাওয়াই তাদের শেষ যাওয়া। আর ফিরে আসেনি। এক সময় বন্যার পানি নেমে গেল। জেগে উঠলো গ্রাম। জনপথ। প্রাণের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠলো। সোহাগী খুঁজে পেল না ওর বাবা-মাকে। ওর দিশেহারা চোখে ছলকে উঠে জল। বন্যার জল নেমে হারিয়ে গেল অজানায়। ওর চোখের জল ঝরে পড়ে দিনদিন। ও হণ্যে হয়ে এদিক ওদিক যা। পায়না কোনো আশ্রয়, øেহের ছাউনি। একদিন যাবতীয় দুঃখ কষ্ট বুকে চেপে ট্রেনে চড়ে সোগাহী। চলে আসে ঢাকায়। কমলাপুর রেল স্টেশনে নেমে ও অবাক হয়। গাড়ির বহর আর অট্টালিকার এই শহর দেখে ভাবে এখানে হয়তো ক্ষুধার কষ্ট থাকবে না। তখন ওর বিষণ্ন নিয়তি বুঝি মুচকি হেসেছিলো। কচি হাত বাড়িয়ে ও শহরে ঘুরে বেড়ায়। আহারে অনাহারে দিন কাটে কোন রকম। ওকে পাড়ায় ক্ষুধার দাবানল। ক্ষুধা লাগলেই ওর জন্য ফুটে না এখানে একমুটো রূপালী ভাতের ফুল!
চলন্ত ট্রেনটা বাঁক নিয়ে সোহাগীর দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। ক্ষুধা ওর পেটে মোচড় দিচ্ছে। কাল রাতে ভাতের ফেন খেয়েছিলো। আজ এ পর্যন্ত কিছুই পেটে পড়েনি। সোহাগী রেল স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে আসলো। রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলো। মাথার উপর কড়া রোদের দুপুর। ও দরদর করে ঘামতে থাকে। ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে ওর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। পা চলতে চায় না। এ রকম কষ্ট ওর প্রতিদিন হয়। ওর অনুভূতির খাতায় কষ্ট আঁচড় কেটে যায়। ও হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টগুলোর দিকে লোভী চোখে তাকায়। বুক ছাপিয়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। একটি রেস্টুরেন্টের সামনে হঠাৎ ও থমকে দাঁড়ালো। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবারে চমৎকার সুরভী ভেসে আসছে। ক্ষুধাটা চাঙ্গা হয়ে উঠলো।
ঃ এই ছ্যামরি, এইখানে দাঁড়াইয়া রইছস ক্যান?
খেঁকিয়ে উঠলো রেস্টুরেন্টের বেয়ারা। কাতর কণ্ঠে সোহাগী বললো,
ঃ আমারে একটু ভাতের ফেন দিবেন? বড় ক্ষিধা লাগছে।
ঃ ঐ ফকিন্নির বাচ্চা, গেলি!
ঃ ভাই, ক্ষিধায় আমি আর হাঁটতে পারতাছি না। দেন না একটু ভাতের ফেন! ভিখারীর সাথে তর্ক করতে বেয়ারার সময় কোথায়? এদের দু’ঘা না দিলে তাড়ানো মুশকিল। বেয়ারা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো। গলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো সোহাগীকে। ও হুমড়ি খেয়ে পড়লো রাস্তার উপর। হাঁটুর পাতলা চামড়া খানিক ছিড়ে গেল। সেখান থেকে চুইয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো। নিজের অজান্তে মাগো বলে একটা আর্তনাদ খরচ করে ফেলেছে সোহাগী। ওর চিৎকারে হেঁটে চলা একজন ভদ্রলোক থমকে দাঁড়ালেন। সোহাগীর কাছে এসে ওর মাথায় হাত রাখলেন। স্নেহশীল হাতের ছোঁয়া পেয়ে সোহাগী খুব বিস্মিত হলো। এই পাথুরে শহরে যে, কেউ আর করতে পারে এটা ভীষণ অবাক করার মতো। সোহাগী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার মুখপানে। বেদনায় নয়, এক টুকরো আনন্দাবেগে ওর চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়তে থাকে। ভদ্রলোক ওকে আরো অবাক করে দিয়ে একটি দশটাকার নোট ওর হাতে তুলে দিলেন। বললেন,
ঃ খুকী, কিছু খেয়ে নিস।
সোহাগীর চোখ ছানাবড়া! ঘোর লেগে গেছে। ভদ্রলোকের দু’ঠোটে হাসির ঢেউ তুলে হাঁটতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে গেলেন মানুষের ভিড়ে। তার চলে যাবার পথে সোহাগীর দু’চোখ স্থির। বিস্ময়ের রেশ ফুরাতে চায় না।
সোহাগী হাঁটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িযে। দশ টাকার নোটটিচোখের সামনে বারবার মেলে ধরছে। মনে ফুরফুর করে বইছে খুশীর বাতাস। খুশীর দ্যুতিতে দু’চোখ উজ্জ্বল। ক্ষুধাটাও তাল মিলিয়ে পেটে তোড়জোড় করছে। ও চট করে চারপাশে ছোট বুলিয়ে নিলো ছোট খাটো রেস্টুরেন্টের খোঁজে। পেটপুরে খাবার আকঙ্খা ওর মনে পেখম ছড়িয়ে রয়েছে। বড় রাস্তা ছেড়ে ও একটি গলিতে ঢুকে পড়তেই ওর পথ আটকে দাঁড়ায ৩ জন বখাটে ছেলে। ছেলেগুলো ওর মতই কালো। গায়ে নোংরা পোশাক। শীর্ণ ও লিকলিকে। বয়স ওর চেয়ে ৩/৪ বছর বেশি হবে। সোহাগী কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন ওর হাত থেকে টাকাটা ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিলো।
প্রশ্ন করলো,
ঃ ট্যাকা চুরি করছস কার কাছ থ্যাইক্কা?
ঃ না, না, আমি চুরি করি নাই। একজন সাহেব আমারে ভিক্ষা দিছে।
দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠলো বখাটে ছেলের দল। যেন দশ টাকা কেউ ভিক্ষা দেয় না। সোহাগী টাকার জন্যে হাত বাড়িয়ে কান্না কণ্ঠে বললো,
ঃ আমার ট্যাকা দেন।
ঃ চুট কর!
বলেই একজন চটাস করে ওর গালে চড় কষালো। অপর একজন ওর টুটি চেপে ধরলো। সোহাগীর চিৎকার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেল। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ওকে। সোহাগীর আর্ত চিৎকারে চটপট কেটে পড়লো ছিনতাইকারী কিশোর দল। অসহায় সোহাগী ভেজা চোখে চেয়ে রইলো সেদিকে। গলিটা ফাঁকা। অথচ ওরা হুট করে কোথায় যে মিলিয়ে গেল! সোহাগীর ভেতরে কান্না প্রশ্ন হয়ে ওকেই প্রশ্ন করে, ও কি শুধু কাঁদবেই? কেন ও খেতে পায় না? ওর মা-বাবা হারিয়ে গেল কেন? ও এখন কোথায় যাবে? প্রশ্নগুলো ঘূর্ণিবাতাসের মতো ওর ছোট্ট মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো। ওর নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলো। উঠে দাঁড়ালো। আবার হাঁটতে লাগলো। ওর পায়ে পায়ে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। অন্ধকার ভেঙে ভেঙে ও হাঁটতে থাকে।

বিদায়
অপুর বাষিক পরীক্ষা শেষ। তাই ওর ছোট কাকুর সাথে ও শিমুলপুরে বেড়াতে এলো। ওর মামা-মামী থাকেন ওই গায়ে। তারা ওকে দেখে খুব খুশী হয়ে উঠলেন। শীতের দিনে গায়ে বেড়াতে অপুর খুব ভালো লাগে। এখানে আসতেই ওর বয়সী কালো একটি ছেলের সাথে বেশ ভাব হয়ে গেলো। ওর নাম কালা। মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। ও এখন পাল বাড়িতে থাকে। ঐ বাড়ির গরু মাঠে চড়ায়। কালার জন্য দুঃখ হয় অপুর। কালা সকাল বেলা বকুল ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে আনে অপুর জন্য। অপুর আরো ভালো লাগে ওকে। সময়ের অল্প পরিসরেই ওদের বন্ধুত্ব গভীর হলো। কিন্তু ওর সাথে অপুর ভাব ওর মামা পছন্দ করেন না। কালাকে দেখেই ধমকে ওঠেন,
ঃ এই কালা, এখানে ঘুর ঘুর করছিস কেন? যা এখন।
কালা কাচুমাচু করে চলে যায়।
এখানেও শাসনের দেয়াল অপুর মনকে ক্ষুণ্ন করে। একা একা ভালো লাগে না ওর। ওর মামী ওকে আদর করেন। এটা ওটা খেতে দেন। কিন্তু ওর বুকে ছেয়ে থাকে কালার জন্য একটা সূক্ষ্ম সহানুভূতি। পরদিন ভোরে কালা এলো। অপু জানালার ধারে বসে মুগ্ধ চোখে দেখছিলো সবুজে চাওয়া দিগন্ত বি¯তৃত ফসলের মাঠ। বাতাস আছড়ে পড়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছিলো। ফিসফিস করে কালা ডাকলো,
ঃ এই অপু! তোর লাইগ্যা বকুল ফুলের মালা আনছি।
সদ্য গাঁথা ফুলের মালাটা অপুকে দিলো। ফুলের তাজা গন্ধ নিঃশ্বাসে টেনে নিলো অপু। খুশীতে ওর চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কালার চোখেও আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো। অপু লক্ষ্য করে এতো শীতেও কালার গায়ে মলিন একটা শার্ট মাত্র। ও দুঃখী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
ঃ তোর শীত করে না?
ঃ রাইত ভর একটু করে। কিন্তুক সকালে রইদ উঠলেই আর তেমন করে না। এইসব কথা থাউক। আমার লগে যাবি? ঐ মিয়াগো বাড়ির বাগানে কাউয়ার বাসায় কোকিলের ছাও আছে। তোরে পাইরা দিমুনে।
কথা শুনে খুশী হলো অপু। তাছাড়া একা একা থাকতে ওর ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে। প্রবল উৎসাহে ও কালার সাথে বেরিয়ে পড়লো। দুজনে দৌড়ে ছুটে গেলো মিয়া বাড়ির বিশাল বাগানে। বড় বড় গাছের সারি দাঁড়িয়ে আছে মাথা উচু করে। চারপাশের ছায়াছায়া পরিবেশ। পাখির গুঞ্জনে মুখর। মুগ্ধ হলো অপু। কালা তরতর করে উঠে পড়লো একটি আমগাছের মগডালে। কোকিলের ছানার জন্য কাকের বাসায় হানা দিলো। দুটি কাক কা কা চিৎকারে ওর মাথার উপর ঘুরতে শুরু করেছে। আরো কাক এসে যোগ দিলো। বিরক্তিতে নেমে পড়লো ও। ব্যর্থতার ম্লান হাসি বিলিয়ে দিয়ে বললো,
ঃ কোকিরের ছাও পরে পাইরা দিমুনে। চল, গাংচিলের ডিম খুজিগা।
ওরা আবার ছুটলো। অপুর ভালো লাগতে থাকে গায়ের দস্যি ছেলেটাকে। ওরা এসে পড়লো নদীর তীরে। কাশবন ঝোঁপ ঝাড়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজলো গাংচিলের ডিম। এক সময ক্লান্তিতে দু’জনে গড়িয়ে পড়লো ভেজা কাদামাটিতে। কি এক বন্য আনন্দে টান হয়ে শুয়ে থাকলো। নিঃশ্বাস নিলো বড় করে। চোখের দৃষ্টিতে বিশাল আকাশ জুলে রইলো। বেলা যে কত বেড়ে গেছে তা কারো খেয়াল ছিলো না। সময় কেটে যাচ্ছিলো অপরিসীম আনন্দে। ওদের আনন্দের ইতি টেনে অপুর খোঁজে নদীর তীরে এসে পড়লো ওর মামা আর ছোটকাকু।
ঃ দেখেছো কী দুঃসাহস! এই বজ্জাত ছেলেটা ওকে কত দূর নিয়ে এসেছে! আর কখনো যদি তোকে ওর সাথে মিশতে দেখি তবে চড় মেরে তোর দাঁত ফেলে দেবো।
ওকে কড়া করে শাসালো অপুর মামা। অপুকে বাড়িতে নিয়ে এলো তারা। বাকিটা দিন অপু মন খারাপ করে বসে রইলো। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত ওর মন বিষণ্নই থাকলো।
পরের ভোরেও কালা এলো। চুপি চুপি। অপু পিঠা খাচ্ছিলো। বাড়িতে পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে গেছে। সাবই রান্না ঘরে বসে খাচ্ছিলো। অপুকে খাটো গলায় ডাকলো,
ঃ এই অপু!
ঃ হি-স-স! চুপ!
ঃ এই নে তোর মালা। তুই কি বাইরে আইতে পারবি না?
ঃ না। মনে হচ্ছে বের হতে পারবো না।
ঃ ঠিক আছে। আমি অহন যাই। পারলে আইয়্যা পড়িস। আমি বটতলায় থাকমু। পদ্মফুল নিবি? ঐ কাজলা দীঘিতে সুন্দর সুন্দর পদ্মফুল ফুইটা রইছে!
ঃ না, থাক। এই নে, পিঠা দুটো খেয়ে নিস।
খুশী মনে পিঠা নিয়ে চলে গেল কালা। অপুর বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বটতলায় আর যাওয়া হলো না ওর। সারাদিন সবার চোখে চোখে বন্দী হয়ে রইলো। শাসনের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারলো না। রাতে শুয়ে কাঁদলো নীরবে। চাপা অভিমান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো শেষে। রাত পেরিয়ে আরেকটি সকাল হলো। আজ ও কালা এলো ফুলের মালা নিয়ে। অপু দুঃখ করে বললো,
ঃ কাল আমাকে বেরুতে দেয়নি। খুইব খারাপ লেগেছে।
ঃ আমারও, তোর কথা আমি সারা বেলাতেই ভাবছি।
অহন যাই। গরু গুলোরে মাঠে চরাইতে অইবো।
কালা চলে গেলো। অপু উঠোনে গিয়ে পায়চারী করতে লাগলো। সবার চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে পড়ার সুযোগ নিতে হবে।
উঠোনে ছড়িয়ে পড়েছে কড়া রোদ। বেড়ে উঠলো শীতের সকাল। ছটফট করতে লাগলো ওর মন। হঠাৎ ওর মামা আর ছোট কাকু বেরিয়ে প ড়লেন। আজ হাটবার। তাই তারা হাটে রওনা হলেন। আনন্দে লাফিয়ে উঠলো ওর মন। তারা বেরিয়ে যেতেই দৌড়ে পেরিয়ে গেল মাঠের পর মাঠ। থামলো একেবারে বটতলায় গিয়ে। ওকে দেখেই কালার চোখে আনন্দ ছলকে উঠলো। দুজন দুজনকে জাপটে ধরে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ছুটে গেল সরু মেঠো পথ ধরে। ফসলের মাঠে আছড়ে পড়ছিলো দামাল বাতাস। ওদের বুকেও দুরন্তপনা ঢেউ খেলে যাচ্ছিলো। বি¯তৃত ফসলের মাঠ পেরিয়ে গেল ওরা। কাজলা দীঘি থেকে পদ্ম ফুল তুলে আনলো কালা। খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো অপু গভীর আনন্দে। সময়ের কাঁটায় দুপুর গড়িয়ে গেল। দুপুরও এগিয়ে গেলো বিকেলের পথে। ক্লান্ত হলেও ওদের চোখে মুখে কোন ক্লান্তির চিহ্ন ছিলো না। পড়ন্ত বিকেলে বাড়ি ফিরলো অপু। ছোট কাকু গম্ভীর হয়ে বসে আছেন উঠোনে। মামা পায়চারী করছিলেন। ওর বুক দুরু দুরু কেঁপে উঠলো। কিন্তু ওকে কেউ কিছুই বললেন না। রাত অব্দি অপরাধীর মতো ও চুপটি করে রইলো। রাত নেমে এলো। কনকনে শীত। শুকনো ফুলের মালাগুলো নিয়ে অপু লেপের ভেতর ঢুকে পড়লো। কালার কথা ভাবলো। এতো শীতে নিশ্চয়ই কষ্ট করছে। ওর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো অপু। এক ঘুমে দীর্ঘ রাত পেরিয়ে গেল।
ঃ এই অপু। উঠে পড়। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নে।
অপু ঘুম ঘুম চোকে ওর ছোট কাকুর মুখে তাকিয়ে রইলো।
ঃ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছিস কেনো? তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে পড়। সকাল-সকাল লঞ্চ ধরতে হবে। আজই ঢাকা ফিরে যাচ্ছি। বুঝলি?
কথা শুনে ধক করে উঠলো অপুর মন। ওরা বেড়াতে এসেছে প্রায় পনেরো দিনের জন্য। কিন্তু আজ মাত্র চারদিন। ও কিছু বলার সাহস পেলো না। উঠে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিতে হলো। ওরা খেতে বসলো। কিন্তু অপুর কিছুই খেতে মন চাইছিলো না। মামী ওকে টাটকা রস এনে দিলেন। ও ছুয়েও দেখলো না। অথচ এই কদিন বেশ তৃপ্তি করে ও রস খেয়েছে।
কাপড় চোপড় গুছিয়ে নিলেন ছোট কাকু। হঠাৎ করে চলে যেতে হচ্ছে বলে ওর মন বিরস হয়ে গেল। কেমন একটা কষ্টবোধ ওর বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। ও মামা-মামীকে সালাম করে নিলো। ওদের এগিয়ে দিতে ওর মামাও সাথে এলেন। যাবার বেলায় কালার সঙ্গে দেখা হলো না বলে ভীষণ কান্না পেলো অপুর। বুকে কষ্ট চেপে রাখলো। ওরা লঞ্চ ঘাটে এসে পড়লো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই ঘাটে এসে ভিড়লো ঢাকা মুখী একটা লঞ্চ। ওরা উঠে পড়লো। লঞ্চের উপরে কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে অপু বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে রইলো। কালার জন্য দুঃখবোধ ওর প্রতি নিঃশ্বাসে উঠানামা করছে। লঞ্চ ছেড়ে দিলো ধীরে ধীরে। ওর মামা হাত নেড়ে বিদায় জানালো। ঠিক তখনই দেখা গেলো কালা হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটে আসছে লঞ্চ ঘাটের দিকে। হাতে বকুল ফুলের মালা। কালা আহত কণ্ঠে ডেকে উঠলো,
ঃ অ-পু!
দুমড়ে মুচড়ে উঠলো অপুর বুক। লঞ্চ কেবল দূরত্ব বাড়িয়ে চললো। অপু হাত নেড়ে ওকে বিদায় জানালো। অপুর দুচোখে জল গড়িয়ে পড়লো টপটপ করে।

আটক
হঠাৎ করেই টুলুল ঘুম চটে গেলো। গোঙানীর শব্দ ওর তন্দ্রাচ্চন্ন ভাবকে ফিকে করে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শব্দটা খুব কাছ থেকেই হচ্ছে। অবিরাম। ‘ঘুম-ঘুম’ ভাব কিছুক্ষণ মাত্র জিইয়ে রইলো। ও চোখ মেলে তাকালো। ওর চোখ বরাবর ঘরের জীর্ণ চাল। চালের সংখ্য ফুটো দিয়ে মধ্য রাতের আকাশ উকি-ঝুকি দিচ্ছে। টুলু অলস ভঙ্গিতে হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙলো। পাশ ফিরে তাকালো। দেখলো, মায়ের কোলে মাথা রেখে পাখি গোঙাচ্ছে। মা খুব যত্ন করে ওর কপালের ভেজাপট্টি ঘন ঘন বদল করছেন। কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। গভীর মনযোগে তিনি পাখিকে নিয়ে ব্যস্ত। ফোলা ফোলা চোখ! চোখে উৎকণ্ঠা ও ক্লান্তি পেখম ছড়িয়ে আছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। সারারাত এক ফোটাও ঘুমাননি! টুলুর মন উথলে উঠলো। মায়ের কোলের মতো এমন নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে মাথা রেখেও পাখি কাতরাচ্ছে! ‘ওহ! আহ-হ! শব্দ কণ্ঠে তুলে ও যন্ত্রণাকে জানান দিচ্ছে। টুলুর মন কাঁপে। কাঁদে। ওর বুক থেকে এর উত্তাপ নিয়ে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। অসুস্থ ছোটবোন বিছানায় ছটফট করছে। জ্বরটা কি খুব বেড়ে গেছে? জ্বর-সর্দির মতো ছোটখাটো রোগ ওদের দরিদ্র সংসারে প্রায়ই ‘অবহেলিত অতিথি’র মতো বেড়িয়ে যায়। কখনো-সখনো এসব অতিথি অভিমানে বেয়াড়া হয়ে পড়ে! তখন সামাল দেয়া কঠিন! দারিদ্রের আতিথেয়তায় কি একটু অনাদর-অবহেলা থাকবে না? টুলু ভাবলো। ওর বারো বছরের মনে ইদানিং হরেক রকম ভাবনা দূরাকাশের নক্ষত্রের মতো প্রায়ই জ্বলে ওঠে। এসব ভাবনা অবসন্ন অবসরে ভিড় করে থাকে। এই মধ্যরাতের অলস মুহূর্তে ওর ভাবনা গভীর হলো না। ভাবনা জমে উঠতেই তাতে কামড় বসায় পাখির আর্তনাদ! ও ঘোরলাগা যন্ত্রণায় কেমন ছটফট করছে! ওর কি খুব কষ্ট হচ্ছে? অসুখ বাঁধিয়ে পাখি তিনদিন ধরে বিছানায় নিয়েছে। কি যে হয়েছে বুঝা যাচ্ছে না! টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারেনি। জ্বরটা প্রচন্ড বাড়ছে আবার কমছে! টুলুর মন উচাটন করছে। মাত্র তিনদিনে পাখি কেমন শীর্ণ, ক্লিষ্ট এবং রোগাটে হয়ে গেছে! ওরা প্রথমে অসুখটাকে আমল দেয়নি! এখন সেটা ভয় জাগিয়ে তুলেছে।এই মুহূর্তে গোয়াড় জ্বরকে সামাল দিতে মায়ের নিবিড় স্নেহ ছাড়া কিছুই নেই! ঔষধের কথা ভাবা অরণ্যে রোদন মাত্র! টুলু বিষণ্ন। রিকশার গ্যারেজে কাজ করার সময় মাঝে মাঝে কারণে অকারণে হারু মিস্ত্রী খিস্তি আওরিয়ে ওর পাছায় লাথি মারে। তখন কান্না চেপে ও যে রকম বিষণ্ন হয়; ঠিক সে রকম বিষণ্নতা ওকে জেঁকে ধরেছে। বিষণ্ন হলেই গোপন কিছু কষ্ট হেমন্তের রোদ্দুরের মতো ঝকমকিয়ে ওর মনের উঠোনে খেলা করে। তখন বাবার কথা মনে পড়ে। মায়ের কাছে শোনা নদীর ভাঙনে ঘর-বাড়ি-জমি হারানোর কথা মনে বিলি কাটে। মেসে রান্না করে মায়ের কষ্টার্জিত আয়ের কথাও ওকে বেশ ভাবায়। তবে বাবার কথা বেশিক্ষণ দাগ কেটে থাকে মনে। অস্পষ্ট মুখ! এই মুখ মনে করতে গেলেই ঘোলা জোছনার মতো বেদনায় ঢেকে যায় স্মৃতির আকাশ। বাবার মুখের সম্পূর্ণ আদল ওর মনের আয়নায় কখনো ভেসে ওঠে না। বাবাকে দেখেছিলো সেই ছেলেবেলায়। সেই দেখা কি মনে রাখা যায়? বাবা এখন জেলখানায়। সেই কবে ঢুকেছে! অ-নে-ক সাজা হয়েছে। তার। কবে ফিরবে কে জানে! কেন যে বাবা জেলখানায় তা জানে না। বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে মা চুপ করে থাকেন। গম্ভীর হয়ে পড়েন। কখনো ক্ষেপেও যান! এর কোনো কারণ খুঁজে পায়নি ওর। মন খারাপ হলেই ওর কিশোর চোখের পাতায় বেদনার পাঁচালী পাতা উল্টাতে থাকে।
পাখির আর্তকণ্ঠ নিঝুম রাতকে ভয়ার্ত করে তুললো। টুলুল মনে খচ খচ করতে থাকে অজানা আশংকা। ও নরম গলায় মাকে জিজ্ঞেস করলো,
ঃ মা, পাখির অসুখ কি খু-উ-ব বাড়ছে?
ঃ হুঁ-ম!
দীর্ঘশ্বাস চেপে ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিলেন মা। উঠে বসলো টুলু। পাখির শিয়রে বসে ওর গরম কপালে হাত রাখলো। বললো,
ঃ ডরাইস না, সকাল হইলেই তোর লাইগ্যা ঔষধ কিইন্যা আনমু! কষ্ট চাইপা থাক।
পাখির কাতরানো থামলো না। ও ছটফট করতেই থাকলো। মায়ের সাথে টুলুও জেগে রইলো। ঘন হয়ে এলো রাত। পাখির জ্বর ও যেন বাড়তে থাকলো নির্মম বিদ্রুপে। কখন রাত ফুরাবে। এই আশায় প্রহর গুণতে থাকলো ওরা। সময় থেমে গেছে যেন কঠিন পরিহাসে। রাতটাকে টুলুর বিশাল দৈত্যের মতো মনে হচ্ছে।
টুলুদের ঘরের সামনে ছোট্ট নোংরা আঙিনায় ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লান্ত রাত ফুরিয়ে গেছে। পুবের আকাশে সোনা রোদের সূর্য উঠার প্রস্তুতি নিচ্চে। ঢুলুঢুলু চোখে মরিয়ম বিবি ঘরের কোণের মরচে ধরা ট্রাংক খুলছেন। ট্রাংক হাতড়িয়ে একটি নতুন দশ টাকার নোট বের করে আনলেন। এটা ছিলো সঞ্চয়।
অনাহারে থেকেও তিনি এ টাকায় হাত দেননি। কিন্তু মেয়ের অসুখে কি তা খরচ না করে পারা যায়? এ টাকায় ঔষধ কেনা যাবে কিনা কে জানে। আশংকা থেকেই গেলো।
টাকাটা টুলুর হাতে দিয়ে বললেন,
ঃ ওর অসুখটা বালা ঠেকতাছে না! ঔষধ কিইন্যা তাড়াতাড়ি ফিরবি। কেমন?
ঃ এই ভোর বেলায় কি ঔষধের দোকান খোলা পামু?
মায়ের মুখে দিকে প্রশ্ন করলো টুলু।
ঃ যেখানে থ্যান পারস কিইন্যা আনবি।
টুলু একটু চিন্তা করে নিয়ে বললো,
ঃ চিন্তা কইরো না, মা। যেখান থ্যান পারি, ঔষধ কিইন্যা তাড়াতাড়ি ফিরা আমু।
এক টুকরো দুরন্ত সাহস বুকে নিয়ে ও ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। ডান হাতের মুঠোয় দশ টাকার নোট বন্দী করে ও হন হন করে ছুটতে থাকে। ওর চোখ রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলোর উপর সতর্ক। বস্তির গলিপথ পেরিয়ে ও বড় রাস্তায় এসে পড়লো। টুলু দৌড়াচ্ছে। বুকের সবকটা বোতাম খুলে রাখা ওর গায়ের মলিন শাটটা ভোরের বাতাসে উড়ছে। রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলো বন্ধ। পাখির বেহায়া অসুখের মতো সব দোকানের ঝাপ বন্ধ কেন? যে ভাবে হোক ঔষধ কিনে ওকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠলো টুলু। তবুও ওর দৌড় থামলো না।
‘ক্র্যা-শ-শ’ ধাতব শব্দে ব্র্যাক করে হঠাৎ থেমে গেলো জলপাই রঙের পুলিশের ট্রাকটি। ট্রাক থেকে ঝটপট রাস্তায় লাফিয়ে নামলো একদল নীল পোশাকের পুলিশ। একজন কনস্টেবল খামচে ধরলো টুলুর মলিন শার্টের কলার। ও হচকিয়ে গেল। ওর চোখে ভয় জমে এলো। সেই ভয় থেকে একটি তার চিৎকার ওর কণ্ঠ গলে বেরিয়ে রোগ ভেজা ভোরটাকে কাঁপিয়ে দিলো। তাতে কি! ভোর কাঁপানো গেলেও পুলিশের মন কাঁপানো কি সহজ? কনস্টেবল ওকে টেনে হিঁচড়ে ট্রাকের পেছনের হা করা খোলা মুখের সামনে এনে দাঁড় করালো। এ সময় অন্য একজন কনস্টেবল টুলুর পাছায় জোর একটা লাথি মেরে তার পুলিশী চরিত্র নিখুঁত ফুটিয়ে তুললেন। মাগো। এই একটি মাত্র শব্দের আশ্রয়ে মনের যন্ত্রণা প্রকাশ করে টুলু রাস্তার উপর উপুড় হয়ে লুটিয়ে পড়লো। মাথাটার ভেতরে চক্কর দিচ্ছে। চোখে সর্ষে ফুলও দেখতে পেলো না ও! এবার দু’কনস্টেবল ওর হাত-পা ধরে শূন্যে তুলে নিলো। দু’জনে সমানভাবে ওর লিকলিকে দেহটাকে শূন্যে ঢেউ খেলিয়ে ছুড়ে মারলো ট্রাকের ভেতর। অব্যর্থ লক্ষ্য!
‘শালা! হরতাল করার সময় হিরু হইয়া যাও!’
প্রচন্ড খেদ মেশানো পুলিশের কর্কশ কণ্ঠ খেঁকিয়ে উঠলো। এরপর ট্রাকে লাফিয়ে উঠলো পুলিশের দল। ট্রাক আবার চলতে শুরু করলো।
মতিঝিল থানা হাজতের লোহার শিক ধরে টুলু দাঁড়িয়ে রয়েছে। ডান হাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে রয়েছে দশ টাকার নোট। ওটা হাত ছাড়া করেনি। এই হাজতে ওর সাথে রয়েছে আরও ২শ’ ৫ জন ছেলে। সবাই ওর বয়সী। ওদেরও পুলিশ কোনো কারণ ছাড়া ধরে এনেছে। আটক করে রেখেছে থানা-হাজতে। কিন্তু ওদের কেন আটক করা হয়েছে তা ওরা কেউ জানে না। পাখির অসুস্থ মুখ বারবার ভেসে উঠছে টুলুর মনে। ওর মুষড়ে পড়া বুক ফেটে কান্না আসতে চায়। মা নিশ্চয়ই ওর অপেক্ষায় ছটফট করছেন! এখন পাখির কি হবে? সময় তরতর করে গড়িয়ে যাচ্ছে। দুপুর ঝুঁকে পড়েছে বিকেলে কোলে। টুলুর মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জট পাকিয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে ওর জীবনের চারপাশে ও হাজতের শিক ঘিরে রয়েছে। অদৃশ্য কেউ ওকে আটকে রেখেছে। আটক করা হয়েছে ওর আকাঙ্খা ও অধিকার। কেনো ওদের আটক করে রেখেছে পুলিশ? ক্ষেপে ওঠে মন। এই প্রশ্নটা বিদ্রোহের আগুন হয়ে ওর মনকে পুড়িয়ে খাঁক করে দিচ্ছে। মতিঝিল থানা-হাজতের শিক ধরা টুলুর বালক হাত শক্ত হয়ে আসে। প্রশ্নটার উত্তর জানতেই হবে!

আহত বিশ্বাস
ছেলেটি রহমান সাহেবের পথ রোধ করে দাঁড়ালো। কণ্ঠে কাতর প্রার্থনা, ‘সাব আমার ছোট বোনটার খুব অসুখ। আমারে কিছু সাহায্য করেন। ওর চিকিৎসার ল্যাইগা অনেক ট্যাকার দরকার।’ ভ্রুক্ষেপ করলেন না তিনি। হাঁটা শুরু করলেন। ছেলেটিও কিচুটা দৌড়ে দৌড়ে তার সাথে হাঁটতে লাগলো। কণ্ঠে একই আর্তনাদ। এরকম দৃশ্য কমলাপুর রেলস্টেশনে হরহামেশা দেখা যায়। রহমান সাহেব দু’বছর পর চট্টগ্রাম থেকে আজ ঢাকায় এলেন। স্টেশনে নামতেই এই বিড়ম্বনা! ছেলেটি একে বারে নাছোড়বান্দা। পিছু ছাড়ে না। ‘ভিক্ষে দিবে না’ তার বুকেও শক্ত জেদ। এর কারণ জানতে হলে চার বছর আগে যেতে হবে।
সেবারও তিনি অফিসের কাজে ঢাকায় এলেন। বায়তুল মোকাররমে একজন অসহায় মহিলার কথা শুনে তার মনে কেঁদে উঠলো। মহিলার বাড়ি ময়মনসিংহে। স্বামীর সাথে বেড়াতে এসেছে ঢাকায়। হঠাৎ স্বামী বেচারা উধাও! এখন ভাড়ার জন্য দেশে ফিরতে পারছে না। মহিলাকে এই ঘোর বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন রহমান সাহেব। পকেট হাতড়ে একশত টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিলেন। তার বুকে ঢেউ ভাঙালো পরোপকারের এক টুকরো সুখ। কিন্তু সেই সুখটুকু মিলিয়ে গেলো দুদিন পরেই। সেই মহিলাকে যখন আবার দেখতে পেলেন মহাখালীতে। এবার মহিলার সাথে দুটি ছেলে মেয়ে। বলছে, ‘আমি একজন অসহায় মহিলা, আপনাগো কাছে হাত পাতছি। আমার স্বামী হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতাছে। পয়সার অভাবে চিকিৎসা করতে…।’ রহমান সাহেব আর দাঁড়াননি। ঘৃণায় রিরি করে উঠছিলো তার গা। তিনি ছেলেটির দিকে গভীর চোখে তাকালেন। শীর্ণ লিকলিকে দেহ। বয়স তের চৌদ্দের কোঠায়। বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে ছেলেটি আবার বললো, ‘সাব আমার বোনটার ভীষণ অসুখ!’
খেঁকিয়ে উঠলেন রহমান সাহেব, এই হারামজাদা পথ ছাড়!
কমলাপুর রেল স্টেশনের বিরাট প্লাটফর্মের এক কোণের এক বেঞ্চিতে বসে ছিলেন রহমান সাহেব। দৃষ্টি ঘন ঘন হাতের ঘড়িতে। অপেক্ষায় প্রায় তিরিশ মিনিট। অথচ আবেদ আলী এখনও এলেন না। চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা, চিৎকার চেঁচামেচী! ট্রেনের হুইশেল হট্টগোল। আবেদ আলীর প্রতি কিছুটা রাগ অনুভব করলেন।
আবেদ আলী তার আত্মীয় কেউ নন। তারা চট্টগ্রামে একই অফিসে চাকরি করতেন। দু’জনের মধ্যে বেশ ভাব জমে উঠেছিলো। গত বছর বদলি হয়ে আবেদ আলী ঢাকায় চলে আসেন। রহমান সাহেব সপরিবারে চট্টগ্রামেই আছেন। তাদের মধ্যে পত্র যোগাযোগ নিয়মিত। রহমান সাহেব ঢাকা আসছেন শুনে আবেদ আলী জানিয়েছিলেন সে তাকে রিসিভ করতে আসবে। বন্ধুর আন্তরিকতা দেখে রহমান সাহেব পুলকিত হন। অথচ সময় যাচ্ছে আবেদ আলী আসছেন না। জীবনের প্রথম রিসিপশনের আনন্দটুকু উল্টো তার বুকে ছড়াতে শুরু করলো কষ্ট বোধের ঝড়।
‘সাব, দেন না কিছু সাহায্য! বোনটার ভীষণ অসুখ!’এখানেও ছেলেটির উৎপাত! রাগের ঝাপটা লাগলো। ছোট লোকের বাচ্চা, অন্য কোথাও দেখ। বলেই উঠে পড়লেন। হন হন করে হাঁটতে লাগলেন। বুকের জমিনে বিরক্তি চষে বেড়ালো। স্টেশনের মেইন গেইটে জনস্রোত। সেই স্রোত গলে তিনি বেরিয়ে গেলেন বাইরে। মানুষে গাদাগাদি একটা বাসে ঝুলে পড়লেন। এই বাদুর ঝোলা অবস্থার সাথে তিনি পরিচিত।
রহমান সাহেবকে দেখে খুব লজ্জিত হলেন আবেদ আলী। অফিসের জরুরি কাজের জন্য সময় করে যেতে পারেননি স্টেশনে। রহমান সাহেবের বিষণ্ন মুখে চেয়ে নরম কণ্ঠে বললেন, অনেক চেষ্টা করেও অপিস থেকে বেরুতে পারিনি। আমি খুবই দুঃখিত।
‘আজ আমর সর্বনাশ হয়ে গেছে!’
আঁতকে উঠলেন আবেদ আলী। কি হয়েছে?
‘মানি ব্যাগটা হাত সাফাই হয়েগেছে। সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা ছিলো। এখন যে কি…।
তার কণ্ঠ আটকে গেলো। দু চোখে গভীর বিষণ্নতা সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পেলেন না আবেদ আলী। শহরের যা অবস্থা! টাকা পয়সা সাথে নিয়ে চলা মুশকিল। চোর, বাটপার, পকেটমার, ছিনতাইকারীরা ছেয়ে গেছে শহরে। ছেলে মেয়েদের জন্য কিছু কেনাকাটা করতেন রহমান সাহেব। বেতন থেকে জমানো এই টাকাগুলো খুইয়ে বসলেন। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো। আবেদ আলী অনুরোধ করে রহমান সাহেবকে নেিজর বাসায় নিয়ে শোকের চিহ্ন লেগে রইলো। আবেদ আলীর বুক পর্যন্ত ছুয়ে গেলো।
এক এক করে পাঁচকে পেরোল দিন। এর মধ্যে হাতের কাজ গুছিয়ে আনলেন রহমান সাহেব। বাড়ি মুখে রওনা দিলেন তিনি। শূন্য হাতে বাড়ি ফেরার বিষণ্নতা ভেতরে কাজ করছিলো। তাকে কমলাপুর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন আবেদ আলী।
‘আবার কবে আসবেন?’
‘ঠিক বলতে পারছি না।’
‘আবার যখন আসবেন আমাকে জানাবেন।’
‘আচ্ছা, আপনিও আসুন না চট্টগ্রামে।’
‘সময় পেলে যাবো।’
‘আমি খুব খুশী হবো।’
তাদের বিদায়ী আলোচনা দীর্ঘ হলো না। আবেদ আলী বিদায় নিলেন। তাকে অফিস ধরতে হবে। রহমান সাহেব এগিয়ে গেলেন কাউন্টারে। তার দিকে তাকিয়ে একটি কুলি ছেলের চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি খেয়াল করলেন না। তার মনের আকাশে উদাসীনতার মেঘ।
রহমান সাহেবের সীট জানালার পাশে। জানালার পাশে বসতে তার ভালো লাগে। দুরন্ত বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে। ছবির মতো বাইরের দৃশ্যগুলো সারিবদ্ধভাবে পেরিয়ে যায়। তখন অন্য রকম আনন্দ তার বুকে ঢেউ ভাঙে। তিন সীট মিলিয়ে বসে পড়লেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছাড়বে।
‘মহানগরীর সময় জ্ঞান ভালো।
‘সাব..?’
কিশোর ছেলেটি জানালার সামনে এসে তার একটা হাত ধরে ডাকলো। ও বেশ হাঁপাচ্ছে। খুব দৌড়ে এসে থামলে যেমন হাঁপায়। চকিত তাকালেন তিনি এবং চিনতে পারলেন সেই ভিখারী ছেলেটিকে। যে বোনের অসুখের নাম করে সাহায্য চেয়েছিলো। বিরক্তিতে গা জ্বলে উঠলো।
‘সাব আপনারে আমি অনেক খুঁজছি। চোখ দুইটা খোলা রাখছি সারাক্ষণ। মনটা আমার কইতো আপনে আবার আসবেন স্টেশনে।
হর হর করে কথাগুলো বলে গেলো ছেলেটা। রহমান সাহেব এর অর্থ খুঁজে পেলেন না। তাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে ছেলেটি তার মানিব্যাগটা সামনে তুলে ধরলো। বিস্ময়ের হোঁচটে প্রতমে নিজের ব্যাগটি নিজেই চিনতে পারলেন না। ঘোর লেগেছে যেন।
‘সাবÑ এই ব্যাগটা আপনে ঐ দিন ফালাইয়া গেছেন। আপনেরে অনেক খুইজাও পাই নাই। শেষে যতন কইরা রাইখা দিচ্ছি।
তিনি লুফে নিলেন ব্যাগটি। হাতড়িযে টাকাগুলো বের করলেন। গুনে দেখেন সব ঠিক আছে।
‘সব ঠিক আছে, সাব?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু!’
‘আমি অহন যাই।’
‘এই শোন, ধর; তোকে দিলাম।’
অনেকগুলো টাকা বাড়িয়ে ধরলেন ওর দিকে। তার বুকে এখন আনন্দ আর বিস্ময়ের মিলিত স্রোত।
‘না সাব। আমি অহন ভিক্ষা করি না। কাম কইরা খাই।’
‘তোকে ভিক্ষা দিচ্ছি না। তোর সততায় মুগ্ধ হয়ে বকশিস দিচ্ছি। এই টাকা দিয়ে তোর অসুস্থ বোনের চিকিৎসা করিস।
থমথমে হয়ে গেলো ছেলেটির মুখ। ওর কিশোর বুকে জমে থাকা কষ্টের চিহ্ন এঁকে দুচোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো দুফোটা জল। উথলে উঠলো রহমান সাহেবের মন। আশপাশের কৌতূহলী যাত্রীদের চোখেও জমে উঠরো করুণার ছায়া। তারা ঘটনার সারমর্ম বুঝতে চেষ্টা করছে। ও কান্না ভেজা কণ্ঠে বললো,
‘তার আর দরকার নাই সাব। বোনটা আমার বিনা চিকিৎসায় দুই দিন আগে মারা গেছে।’
প্রচন্ড ধাক্কা এসে লাগলো রহমান সাহেবের মনে। টাকার অভাবে ওর বোনটি মারা গেছে অথচ কুড়িয়ে পাওয়া টাকার একটিও ভাঙেনি!
দুমড়ে মুচড়ে উঠলো তার বুক। নিজেকে অপরাধী মনে হলো। ঐদিন ভুল না বুঝে যদি ছেলেটিকে কিছু সাহায্য দিতেন তবে হয়তো………..। একটি ভুল দিয়ে সবগুলো বিচার করা যায় না। গ্লানিতে মূক তিনি। এই ছেলেটি আজ বুঝিয়ে দিলো অন্ধকারে ওর জীবন হলেও জীবনের ভিতরে আছে সততার এক ফালি উজ্জ্বল আলো। তার চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠলো। তাকিয়ে দেখলেন ছেলেটি নেই। তখনই মনে পড়লো ছেলেটির নামটি পর্যন্ত জানা হয়ন্ িখচ করে বিঁধে গেলো সেই কষ্ট। হুইশেল বাজলো। নড়ে উঠলো মহানগরী। রহমান সাহেবের বুকের ভেতর সূক্ষ্ম ভাঙাচোরা হতে লাগলো। মনের পর্দায় ছেলেটির মুখ ভেসে উঠলো। ওর চোখের জলের আড়ালে কি ছিলোÑ কোন ক্ষোভ কিংবা ঘৃণা?
ছেলেটির চোখের জলে ভিজে চুপসে গেছে রহমান সাহেবের আহত বিশ্বাস।

আগন্তুক
মামুন, রফিক, সজীব ও নিপুণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। ওরা কেউ লোকটিকে চিনতে পারলো না। বাগান বাড়িতে কেউ থাকে না। কিন্তু হঠাৎ এ রকম দুপদুরস্ত পোশাকের লোক কোত্থেকে এলো? খটকা গেলে গেছে। লোকটির চোখে রোদ চশমা। এখন বিকেল পড়ে গেছে। রোদের তেজ নেই। শেষ বিকেলে কেউ রোদ চশমা পড়ে? বিটকেলে লোক তো! লোকটির মাথায় ছাইরঙা ওয়েস্টার্ন ক্যাপ গায়ে স্যুট। হালকা ক্রীম রঙ। কালো জুতো চকচকে। গোফনিখিুঁত ভাবে ছাঁটা।যেন ঠোঁটের উপর কেউ আলতো ভাবে বসিয়ে দিয়েছে। হেলে দুলে হাঁটছ্ েকি যেন গান কণ্ঠে তুলে যাচ্ছে গুন গুন করে। হাত বাড়িয়ে দু ধারের ফুলগাছ ছুইছে। ফুল ছিড়ছে। বাগান বাড়িতে বিশাল ফুলের বাগান। অজস্র ফুলগাছ্ সারি সারি। অসংখ্য ফুল ফোটে প্রতিদিন। নানা রঙের ফুলে বাগান বাড়ি সেজে থাকে। এ বাড়িতে এখন কেউ থাকে না। সেকেলে বিশাল এক অট্টালিকা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে রয়েছে। জরাজীর্ণ। এটি পুরনো আমলের জমিদার বাড়ি। এক সময় এই বাড়ি প্রাণের স্পন্দনে ছিলো মুখর। আজ খাঁ খাঁ শূন্যতায় কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে কয়েক বছর পরপর বাড়িটিতে প্রাণের সাড়া মেলে। আজমল চৌধুরী পরিবার পরিজন নিয়ে এ বাড়িতে যখন আসেন। তিনি এ বাড়ির পৈত্রিক সূত্রে মালিক। শহরের যান্ত্রিক জীবনের এক ঘেয়েমি যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে চলে আসেন গ্রামে, বাগান বাড়িতে। কাটিয়ে যান কয়েকটি দিন। গ্রামের সবুজ পরিবেশে স্বস্থির শ্বাস ফেলেন। আজমল চৌধুরী সৌখিন মানুষ। ফুলের প্রতি রয়েছে তার বিশেষ দুর্বলতা। তাই বাগান বাড়িতে অগণিত ফুলের গাছ। হরেক রকম! জবা, টগর, গোলাপ, জুঁই, বেলী, হাসনাহেনা, চামেলী, গন্ধরাজ, কাঁঠালচাপা, শিউলী, কামিনী ছাড়াও আরো অনেক রকম বাহারী ফুলগাছ রয়েছে। এছাড়া বিদেশী ফুল গাছও প্রচুর রয়েছে। ও সব ফুল গাছের নাম ওরা জানে না। ফুল বাগানের যত্নের জন্য রয়েছে জমির মিয়া। সে বাগান বাড়ির দারোয়ান। কিন্তু জমির মিয়া বাগানের তেমন যত্ন নেয় না। সে অলস। বড্ড ঘুমকাতুরে। যখন তখন নাক ডেকে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়। তাতে ওদের অবশ্য বেশ লাভ হয়। তখন ওরা বাগানবাড়ির সদর গেট দিয়ে বুক চিতিয়ে ঢুকে পড়ে। নির্বিঘ্নে। কখনো কখনো সজীবের খুব ইচ্ছে করে জমির মিয়ার মাথায় একটা গাট্টা মারতে। বিশ্রীভাবে নাক ডাকে! ওরা ইচ্ছে মতো বাগান থেকে ফুল তুলে নিয়ে যায়। ক্লাশে বন্ধুদের উদার হাতে ফুল বিলি করে। জমির মিয়ার ঘুম স্বভাবের সুযোগ নিয়ে ওরা এখন প্রতিদিন বিকেলে বাগান বাড়িতে বল খেলার প্র্যাকটিসটা চালিয়ে যাচ্ছে। অট্টালিকার পেছনে বাগানের শেষ অংশে রয়েছে এক টুকরো সবুজ জমি। ঘাসে ঠাসা। এ জমিতে ওদের সকাল-বিকেল অনুশীলন চলছে। গন্ডায় গন্ডায় গোল খাওয়া ওদের যেন অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। বিজয়ের স্বাদ নিতে ওদের খুব ইচ্ছে। তাই অনুশীলনটা চালিয়ে যেতে পারলে খেলার নানা কসরত ভালোভাবে আয়ত্বে চলে আসবে। আগামী পনের দিন পর উত্তর পাড়ার ডাবলুদের সাথে খেলা। হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হওয়া চাই।
মামুন, রফিক, সজীব ও নিপুন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলো। মামুনের হাতে বল। অনুশীলনের সময় বলটা বাগানে উড়ে এসেছিলো। বল কুড়াতে এসে মামুন প্রথমে লোকটিকে দেখতে পেলো। মামুনের ইশারায় পা টিপে টিপে ওরা তিনজন চলে আসে। লোকটিকে দেখে ওদের চোখে বিস্ময়ের কমতি নেই। কিন্তু লোকটি ওদের এখনো দেখতে পায়নি। ওরা দাঁড়িয়ে ছিলো গাছের আড়ালে। সজীব রফিকের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
ঃ লোকটি ছেলেধরা নয়তো।
ঃ ধ্যাৎ! বাগান বাড়িতে ছেলেধরা আসবে কেন?
এ বাড়ি তো খালি! কেউ থাকে না।
জবাব দিলো রফিক। নিপুন বললো,
ঃ লোকটিকে এ তল্লাটে কখনো দেখিনি!
সজীব ভীত গলায় বললো,
ঃ চোর ডাকাতও হতে পারে। বাগান বাড়ি খালি পেয়ে হয়তো আস্তানা গড়ার মতলবে এসেছে!।
সজীবের ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে মামুন ভারিক্কি কণ্ঠেবললো,
ঃ চোর ডাকাত কখনো ও রকম ধুপদুরস্ত পোশাক পরে না। মাথায় ক্যাপ, চোখে রোগ চশমাÑ এসব পরার রুচি ওদের নেই।
সজীব দু চোখ ছানাবড়া করে বললো,
ঃ তাহলে প্রেতাত্মা নয়তো! শুনেছি, পুরনো জমিদার বাড়িতে প্রেতাত্মারা ভিড় করে থাকে! কথা শুনে গা কাঁটা দিয়ে উঠলো নিপুনের। ভূত-প্রেত এ ওর ভীষণ ভয়। মামুন খেঁকিয়ে উঠলো,
ঃ এসব বাজে চিন্তা করছিস কেন? চল লোকটিকে অনুসরণ করে দেখি, সে কী করে।
ওদের মধ্যে কথা আর এগোলো না। তবে লোকটি সামনে অগ্রসর হতে লাগলো। সারি সারি গাছের ফাঁক গলে ওরা লোকটির পিছু নিলো। কোন শব্দ করলো না। হাঁটতে হাঁটতে লোকটি ফুল ছিড়ছে। বেছে বেছে কিছু ফুল হাতে রাখছে। কিছু ফুল ফেলে দিচ্ছে। সদ্য ছেড়া ফুলগুলো টাটকা বেদনায় পড়ে থাকছে পথে। ওদের পায়ে পায়ে চাপা পড়লো সে ফুল। লোকটি হঠাৎ থামলো একটি কামিনীর ঝাড়ের সামনে। গাছ নয় যেন ঝাকড়া ঝোঁপ। থোকা থোকা ফুল ফুটে রয়েছে। সাদা। ফুলের গন্ধে বাতাস ভারি। অন্যমনস্কভাবে লোকটি হাত বাড়ালো গাছের একটি ডালে। ডালটিতে এক গুচ্ছ কামিনী। কিন্তু ফুলের আড়াল থেকে একটি সাপ ফোঁস করে ফনা তুললো। লোকটির চোখে পড়লো না ধড়াস করে উঠলো ওদের বুক। লোকটির হাত ডালটির এতো কাছে চলে গেল যে, এখন চিৎকার করলেও কাজ হবে না। হয়তো তিনি ডালে হাত রেখেই পেছনে তাকাবেন। টেনশন আর উত্তেজনায় প্রতিটি মুহূর্ত টানটান। ওদের চোখের সামনে লোকটি সাপের ছোবল খেতে যাচ্ছে! হাতের বলটি ছুড়ে মারলো মামুন। বলটি লোকটির মাথায় গিয়ে লাগলো। মাথা থেকে ছিটকে পড়লো ক্যাপ। রোদ চশমাও। আচানক বরের আঘাতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো লোকটি। ঘুরে দাঁড়ালো। ঘটনার আকস্মিকতায় রফিক, সজীব ও নিপুন ভড়কে গেছে। মামুনের মুখে ততক্ষণে এক খন্ড হাসির চাঁদ ফুটে উঠেছে। লোকটি খেপা চোখে ওদের দিকে এগিয়ে আসলো। সজীব, রফিক ও নিপুন ভোঁ দৌড়। মামুন দাঁড়িয়ে রইলো নির্ভয়ে। লোকটি মামুনের কাছে এসেই ওর গালে চটাস করে একটা থাপ্পড় কষলো। রাগী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
ঃ বল ছুড়েছিস কেন? এটা কি খেলার জায়গা?
মামুন কান্না সামনে নিলো। আংগুল উচিয়ে বললো,
ঃ ঐ কামিনী গাছের ডালে সাপ ছিলো! আপনি ডালটি ভাঙতে যাচ্ছিলেন! তাই……।
লোকটি কামিনী গাছের দিকে তাকিয়ে থ। হতভম্ব। সাপটি তখনো মাথা উচু করে রয়েছে। জিহ্বা বের করছে তির তির করে। মহূর্তেই বদলে গেলো লোকটি। লোকটার মুখ দিয়ে কোনো কথা ফুটলো না। মামুনের দিকে তাকিয়ে রইলো। অপলক। হঠাৎ মামুনকে জাপটে ধরলো। তার বুকের সাথে লেপ্টে গেলো ও। অপরাধী গলায় লোকটি বললো,
ঃ বড্ড ভুল করে ফেলেছি। তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো! অথচ…………।
আগন্তুক আর অপরিচিত থাকলো না। বরং বন্ধু হয়ে গেলো। তার নাম জানা গেলো আবিদ চৌধুরী। আজমল চৌধুরীর বড় ছেলে। লন্ডন থেকে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে এসেছে। বেড়াতে এসেছে বাগান বাড়িতে। জমির মিয়া চাকুরিটা একেবারে হারিয়েই বসেছিলো। ওদের অনুরোধে অবশেষে রক্ষা পেলো। বাগান বাড়িতে শুরু হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজ। ওদের ফুটবল অনুশীলন আরো কঠোর হলো। খেলার কৌশলগত দিকে চাপ পড়লো। কারণ, আগন্তুক অর্থাৎ আবিদ চৌধুরী ওদের অনুশীলনে কোচের দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। উত্তর পাড়ার ডাবলুদের হারানো এখন আর ওদের কাছে নিছক স্বপ্ন নয়, জয় ওদের হাতের নাগালে বলে মনে হচ্ছে।

ঘর পাল্টানো ছোট কাকু
ছোট কাকু এবার ফিরলেন আটমাস সতের দিন পর। এ নিয়ে তার উনিশবার নিরুদ্দেশ হওয়া। প্রথম যেদিন তিনি নিরুদ্দেশ হলেন, সবাই ভাবলো বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। এ রকম ভাবনার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিলো। ছোটকাকু সে বছর সাতবারের মতো মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল মারলেন। এ ধরনের ব্যর্থতায় তিনি যে গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়েননি এটাই রক্ষা! সবার মায়া হলো। খোঁজাখুঁজি হলো বিস্তর। বাড়িতে সকাল-বিকাল আলোচনা। দিন যায়, দুশ্চিন্তা বাড়ে। সাত রকম সন্দেহ উকি দেয়। কেউ কেউ চোখের জল বা দু এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস খরচ করে ফেললো। তার জন্য ভাবনাটা যখন ফিকে হয়ে আসছিলো হঠাৎ একদিন তিনি বাড়ি ফিরে এলেন। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। প্রশ্ন উঠলো হরেক। জেরা হলো ঢের। কিন্তু ছোট কাকু মুখ খুললেন না। সবার উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে খুব যেন মজা পেলেন। তিনি মুখে এক ফালি রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রাখলেন সারাক্ষণ। এক সময় সবাই চুপ মেরে গেলো। ছোটকাকু নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখলেন। হঠাৎ আবার একদিন ছোটকাকু উধাও। খোঁজাখুঁজির চেষ্টা চললো এদিক-ওদিক। সংসারের আকাশে হালকা মেঘের ছায়া। দিন গেল। মাস গেল। ছোটকাকু শীর্ণ দেহে, ক্লান্ত মনে ফের বাড়ি ফিরে এলেন। কারো কাছে কোনো কৈফিয়ত দিলেন না। শুধু সবাইকে এক জবাব জানিয়ে দিলেন,
ঃ পৃথিবী আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
সবাই বুঝে নিলো তার ঘরপালানো রোগ হয়েছে। মাথার ভেতরের স্ক্রু নড়বড়ে হয়ে গেছে। ছোটকাকুর মাথা নিয়ে অড়ালে আবডালে নানারকম মন্তব্য চালাচালি চলতে লাগলো। বাতাসে ভেসে তার কানেও তা পৌঁছুলো। কিন্তু তিনি তা গায়ে মাখলেন না। পৃথিবীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি নিরুদ্দেশ হতে লাগলেন। গত ৪ বছরে নিরুদ্দেশ হলেন উনিশবার। তাকে নিয়ে বড়রা কেউ এখন আর মাথা ঘামায় না। ছোটকাকুও তাদের দিকে ফিরে তাকান না। তার মতে, সংসার তুচ্ছ জিনিস। এখানে সীমাবদ্ধ গন্ডিতে জীবন বাঁধা পড়ে যায।
ছোট কাকুকে পেয়ে আমাদের আনন্দ আর ধরে না! তিনি বড়দের তুচ্ছজ্ঞান করলেও আমাদের সাথে তার খুব ভাব। তিনি বাড়ি ফিরে এসে আমাদের নানা দেশের গল্প শোনান। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। ছোটকাকু কী রকম দেশ বিদেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন! তার মাথা এখন ফাঁকা নয়। মজার মজার অভিজ্ঞতায় ঠাসা। ভ্রমণ মানেই জ্ঞান আহরণ। ছোট কাকুকে এখন জ্ঞানী বলা চলে। তিনি নিজেকে নিয়ে অহংকার করেন। ছোটকাকু ফিরে আসায় নিজে শিখি ক্লাবে স্বস্থি নেমে এলো। এ ক্লাব গঠন করা হয়েছে পনের দিন হলো। ক্লাসের সদস্য সংখ্যা নয় জন। নিজেদের সাবলম্বী করে তোলাই এ ক্লাবের লক্ষ্য। আমরা অর্থাৎ ক্লাবের ন’জন সদস্য যে সমস্যাউৎরাবার পথ খুঁজছি তা হলো সাঁতার শেখা। এ ক্লাবের কোনো সদস্যই সাঁতার কাটতে জানে না। সদস্যদের মধ্যে সোহানী, নিপুন এবং উৎসব এইটে উঠেছে এ বছর। শ্রাবণী, শিপন আর আমি আছি ক্লাস সেভেনে। সৌমিক, মিশু সিক্সে। ঐশিক ফাইভে। আমরা সাঁতার শেখার সহজ উপায় খুঁজছি। ছোটকাকুকে পেয়ে আমরা তাকে জেঁকে ধরলাম। আমাদের সমস্যার কথা শুনে তাচ্ছিল্য করে হাসলেন। বললেন,
ঃ আজই ক্লাবের জরুরি সভা ডাকো।
মুখে মুখে জরুরি সভা ডাকা হলো। সভা বসলো বাড়ির ছাদের চিলে কোঠায়। সভার মধ্যমণি ছোটকাকু। সভার মধ্যে তিনি চোখ বন্ধ করে রাখলেন। কপালে চিন্তার ভাজ। ভাবনায় ডুবে গেছেন। যেন ঘোরতর সংকটের সমাধান খুঁজছেন। আমরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। আমাদের মধ্যে ফিসফাস, টুকিটাকি কথার ঝনঝনানি। অকারণে হাসায় মিশুর বদনাম আছে। ও সেটা জরুরি সভায় জানান দিয়ে অকারণে ‘হি-হি-হি’ করে হেসে উঠলো। ছোটকাকু চোখ মেললেন। আমরা কাচুমাচু। কিন্তু তিনি ধমকে উঠলেন না। খুকখুক করে গলা কেশে হালকা কণ্ঠে বললেন,
ঃ সাঁতার শেখার সহজ উপায় পাওয়া গেছে।
ঃ উপায়টা কি?
সোহানীর প্রশ্ন। একই প্রশ্ন সবার চোখে মুখে। ছোট কাকু দাঁত কেলিয়ে হাসলেন। চোখে অহংকারের দ্যুতি ঝলসিয়ে বললেন,
ঃ পৃথিবীর বড় বড় নদীগুলোতে সাঁতার কেটে এলাম, আর তোরা কিনা মাত্র সাঁতার শেখার কথা ভাবছিস!
ছোট কাকুর গল্প শুনে আমার বরাবরই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। প্রশ্ন। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,
ঃ কোন কোন নদীতে সাঁতার কেটেছেন?
যেন এ প্রশ্নের অপেক্ষায়ই তিনি ছিলেন। আয়েশী ভঙ্গিতে বললেন,
ঃ সে আর একটা দুটো! কটার নাম বলবো? এ মুহূর্তৈ যে কটার নাম স্মরণে আসছে সেগুলোর নাম বলছি, শোন, ইউএসএ’র মিসিসিপি, আমেরিকার আমাজান, ইউরোপের রাইন, রাশিয়ার ভলগা, মিশরের নীলনদ, আফগানিস্তানের কাবুল, চীনের হোয়াংহো, পাকিস্তানের সিন্ধু আরো কত নদী! এগুলো পৃথিবীল বিখ্যাত নদী। নদীগুলোর নাম বলার সময় ছোটকাকু দু চোখের পাতা এক করে নিয়েছিলেন। বুঝা যাচ্ছিলো স্মরণ করে বলেছেন। তার কথা শুনে সবার চোখ ছানাবড়া। এতগুলো নদীতে সাঁতারকাটা চাট্টিখানি কথা নয়! ছোটকাকু আমাদের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন। তিনি স্মৃতিচারণ কণ্ঠে বললেন,
ঃ জানিস, কাবুল নদীর কথা মনে হলে এখনো গা ঠান্ডায় জমে যেতে চায়!
ঃ কেন?
সৌমিকের প্রশ্নের সাথে সবাই কণ্ঠ মেলালো।
ঃ কাবুল নদীতে যেই নামলাম মনে হলো হিন্দুকুশ থেকে মাত্র বরফ গলে নেমে এসেছে! শরীরে রক্ত জমে যাচ্ছিলো!
ঃ ছোটকাকু স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন। এতে সাঁতার শেখার সহজ উপায়টা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমি আলোচনায় এই সমস্যার কথা তাকে মনে করিয়ে দিতে বললাম,
ঃ সাঁতার শেখার সহজ উপায়টা তো বললেন না।
সবাই গল্পে মজে গিয়েছিলো। আমার কথায় ওরা ফিরে এলো। ছোটকাকু স্মৃতির নগরীতে প্রবেশের সুযোগ পেলেন না। তচ্ছিল্য করে বললেন,
ঃ সাঁতার শেখার জন্য কোনো মন্ত্র পাঠ করতে হয় না। মাত্র সাত দিনের একটা কোর্স সম্পন্ন করতে পারলেই এ সমস্যা ত্রাহি-ত্রাহি করে পালাবে। তখন তোমরা প্রত্যেকে পুকুরে বা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেই হয়ে যাবে পাটকাঠির মত। পানিতে ভেসে থাকা ছাড়া ডুবে যাবার কোনো পথই খুঁজে পাবে না।
ঃ তা সেই কোর্সটা কি?
আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি।
ছোটকাকু আদেশের গলায় বললেন,
ঃ যে সব খাবারে ছাতকুরা পড়েছে অর্থাৎ পোকা ধরেছে তা গপাপগ এখন থেকে খেয়ে ফেলবে। এ সকল খাবার আগামী ৭ দিন গোগ্রাসে খেতে থাকো।
ঃ পোকা ধরা খাবার!
বোধগম্য হয় না।
ঃ হ্যাঁ পোকা ধরা খাবার। যেমন ধরো পেয়ারা, আঁখ, আপেল ইত্যাদি ফল-ফলাদির যেগুলোকে পোকা ধরেছে সেগুলো খুঁজে বের করে খাবে। চীনাবাদাম, সীমবিচি ইত্যাদির মধ্যেও যেগুলোতে পোকা ধরেছে তা পেলেই এক লহমায় খেয়ে ফেলবে। মোট কথা যে সব খাদ্য দ্রব্যে পোকা ধরেছে তা তোমাদের পেটে চালান করে দিতে হবে। যে যত পোকা খাবে সে তত সাঁতারে পারদর্শী হয়ে উঠবে।
ছোট কাকুর কথা শুনে পেটে গোঁৎলানী দিয়ে উঠলো। বমি আসতে চাইলো গলা বেয়ে। সামলে নিলাম। পোকা খাওয়ার মধ্য দিয়ে সাঁতার শেখার কী সম্পর্ক তা মাথায় ঢুকলো না। ছোটকাকু যেন তা বুঝতে পারলেন। বললেন,
ঃ জেনে রাখ, ব্রজেন দাসও ছেলে বেলায় পোকা ধরা খাবার খেয়ে সাঁতারের হাতে খড়ি নিয়েছিলো। এক সময় সে তো শুধু পোকামাকড়ই খেতে লাগলো। নইলে কি তিনি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে পারতেন?
যার এতো দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার সাথে তর্কে যাবে কে? সন্ধ্যা যখন ভারী হয়ে এলো, তখন সভা ভাঙলো। আমরা পোকা ধরা খাবার গোগ্রাসে খেয়ে ফেলবো বলে মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম।
কোর্স সম্পন্ন করার আজ শেষ দিন। আমরা এ কদিন পোকা ধরা খাবার পেলেই হামলে পড়েছি। কে কত খেতে পারে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে পাল্লা। অঘোষিত প্রতিযোগিতা। আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে দেবার মত নই। অবশ্য মিশু ও ঐশিক এ কোর্সে অংশগ্রহণ করেনি। ঘরে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছে পোকা ধরা খাবার। শ্রাবণী তো ওর মার কাছে এই খাবারের জন্য বায়না ধরে বসলো। মেয়ের বিটকেলে আবদার শুনে তিনি অবাক হলেন। শ্রাবণী অবশ্য কারণটা চেপে গেছে। যাই হোক। আজ কোর্সের সপ্তম দিন। আগামীকাল ছোটকাকু পরীক্ষা নেবেন। আমাদের বাড়ির পেছনে বিশাল বাগানের শেষ প্রান্তে যে পুকুরটি সাধারণত জনশূন্য হয়ে নিথরভাবে পড়ে থাকে, সেই পুকুরটিকে পরীক্ষা নেয়অর জন্য নির্ধারন করা হয়েছে। আগামীকাল সকালে কোর্সে অংশগ্রহণকারী সবাই ঐ পুকুরে এক এক করে নামবো। শান্ত জলে গা ভাসিয়ে সাঁতার কাটবো। যে এ ক’দিন বেশি পোকা ধরা খাবার খেয়েছে সে ভাল সাঁতরাবে এটাই স্বাভাবিক। আর এভাবে বুঝা যাবে কে কেমন পরিমাণ খেয়েছে। যারা আদৌ খায়নি কিংবা খুবই কম খেয়েছে তারা যেন পুকুরে নামার দুঃসাহস না দেখায় ছোটকাকু সাবধান করে দিয়েছেন। আমি ভালোভাবেই কোর্স সম্পন্ন করেছি। তবুও এই প্রক্রিযা নিয়ে সন্দিহান। এদিকে নিজে শিখি ক্লাবের সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, পৃথিবীর সবচে বড় ও বিখ্যাত নদীগুলোতে ছোটকাকু সাঁতার কাটায় তাকে ক্লাবের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। এ সম্মান তার প্রাপ্য। আজকাল গুণীদের সম্মান দেখানো সবাই যেন ভুলে বসেছে। আমাদের সদ্য গঠিত ক্লাব এ সুবাদে সকলের দৃষ্টিতে আসবে। ছোটকাকুকে সংবর্ধনা দেয়া হবে আজই এবং ঐ পুকুর পাড়ে। আমাদের মধ্যে হৈ হৈ রৈ রৈ ভাব। উৎসাহের কমনি নেই কারো।
সংবর্ধনার ব্যাপারটি মোটামুটি গোপন রাখা হয়েছে। অন্তত বড়দের চোখ এড়িয়ে কাজটি সেরে ফেলতে হবে। ছোটকাকু আত্ম প্রচার বিমুখ বলে জানিয়েছেন। প্রস্তাব শুনে অনেকক্ষণ তিনি রা করেননি। অনেক ভেবে বলেছেন,
ঃ শুধু তোমরা বলে কথা, তোমাদের উৎসাহটা মাটি করতে চাই না। তাছাড়া তোমাদের ক্লাবেরও একটা পরিচিতির সুযোগ পেয়েছো। নইলে আমি মোটেই রাজি হতাম না। প্রতিভার আলো এমনিতেই টিকরে বেরুয়। ঢাক ঢোল পিটিয়ে গুণের কথা বলতে নেই।
তা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের পড়ার ঘরের টেবিলটা সরিয়ে ফেলা হলো। শিপন ও ওদের পড়ার টেবিল নিয়ে এলো। এ কাজ সম্পন্ন হলো ভর দুপুরে। ঘরের সবাই তখন ঘুমের আয়োজন করছিলো। দুটি টেবিল পাশাপাশি রেখে ছোট মত মঞ্চ তৈরি করা হলো। মঞ্চের উপর সৌমিক একটা লাল চাদর এনে বিছিয়ে দিলো। যেন মনে হয় লাল গালিচা সংবর্ধনা। নিপুন ও মিশু এক মুঠো শিউলি ও দুটো গন্ধরাজ ফুল সংগ্রহ করে এনেছে। ফুলগুলো বাসি হওয়ায় কালচে রঙ ধরেছে। তবে শিউলি থেকে এখনো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বিকেলের তীর্যক আলোয় ভরে গেছে পুকুর পাড়। মঞ্চ ঘিরে রয়েছি আমরা। এ অনুষ্ঠানে নিজে শিখি ক্লাবের সদস্য ব্যতীত অতিথিও রয়েছে। আমরা কয়েকজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেছি। পলাশ, আনিস, পটল, জামান, সূচী, ত্রোপা, হিরণ ও মায়া এসেছে। ওরা এ পাড়াতেই থাকে। আমাদের ক্লাস বন্ধু। মঞ্চের সামনে সবুজ ঘাসের উপর আমরা হল্লা করে বসলাম। একে অন্যে আলোচনা। গুঞ্জন। ছোটকাকু এলেন পারিপাটি হয়ে। পোশাকে সুসজ্জিত। কালো প্যান্ট। কালো জুতো। লাল শার্ট। এখানে বলে নেয়া দরকার লাল রঙের প্রতি তার বরাবরই দুর্বলতা। তিনি যখন বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন তখন তার গায়ে লাল রঙের শার্ট থাকে। আবার যখন ফিরে আসেন তখনও গায়ে লাল রঙের শার্ট থাকে। এ ব্যাপারটি প্রথমে খেয়াল না হলেও পরে চোখে আটকে যায়। ছোটকাকুকে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,
ঃ লাল হচ্ছে বিপ্লবের রঙ। আমি তো সংসারের শেকল ছেড়ার জন্য বিপ্লব করেছি। এ রঙটা আমাকে উদ্দীপনা জোগায়।
ছোটকাকুর লাল রঙ প্রীতির কথা সবারই জানা। তিনি মঞ্চের সামনে আসতেই আমরা চঞ্চল হয়ে উঠলাম। দাঁড়িয়ে পড়লাম সকলে। তিনি মঞ্চের দিকে হেলাফেলা করে তাকালেন। বললেন,
ঃ মঞ্চের পেছনে একটা ব্যানার থাকলে ভালো হতো। এই ধরে ব্যানারে সংবর্ধনার কথাটা লিখে তোমাদের ক্লাবের নাম লিখে রাখতে পারতে। যাই হোক, তোমাদের ভুল দেখে ফিরে যেতে তো আর পারি না।
আমরা সত্যিই লজ্জিত হলাম। আয়োজনে এত বড় একটা ফাঁক দেখতে পেয়ে কুঁকড়ে গেলাম। ছোটকাকু নিজেই মঞ্চে উঠে বসলেন। পা দুটো ভেঙে বাঁ পায়ের ফাঁক গলিয়ে ডান পায়ের গোড়ালী রাখলেন। দু’হাঁটুর উপর দুহাত রাখলেন। ঋষি বা সাধক পুরুষরা যেভাবে বসে ধ্যান করেন ঠিক সেভাবে বসলেন। এর মধ্যে করতালির ঢেউ খেলে গেলো। আমরা বসলাম দুর্বা ঘাসের উপর। শিপন উঠে গিয়ে মঞ্চের পাশে দাঁড়ালো। ছোটকাকু মুখ নত করে আছেন। চোখের পাতা বন্ধ। বিশেষ সময়গুলোতে তিনি চোখ বুজে থাকেন। শিপন কণ্ঠ তুলে বললো,
ঃ বন্ধুরা, আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন । এখানে এসে শিপনের কণ্ঠ আটকে গেল। ওর চোখ কেমন করে উঠলো এবং কি ভেবে ও পেছনে ঘুরে দৌড় দিল। ব্যাপারটা ঘটলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে। কিছুই বুঝতে পারলাম না। পেছন থেকে একটা চিৎকারে রোল উঠলো। পেছনে ফিরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা দ্রুম দাড়ুম করে ভাঙতে লাগলো। গলা শুকিয়ে গেল। চিৎকার দিতে পারলাম না। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। ঝড়ের বেগে একটা কালো ষাঁড় মঞ্চের দিকে আসছে। আমাদের বাগানে ষাঁড় কেন, ছাগলও পথ ভুলে ঢুকে না। বাগানটা সব সময় বিরান হয়ে পড়ে থাকে। অথচ এই বাগান থেকে আস্ত একটা ষাঁড় বেরিয়েছে! এ নিয়ে ভাবা যাবে পরে। ষাঁড়টা তেড়ে আসছে। সবাই ভোঁ দৌড় লাগালো। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও এমনভাবে কেউ দৌড়াতে পারেনি এ কথা হলফ করে বলতে পারি। বাতাস কেটে সবাই দৌড়াচ্ছে। ষাঁড়টাও কম যায় না। ওটা আরো জোরে ছুটে আসছে। ওটার মাথা এমনভাবে নোয়ানো এতে শিং দুটো হিংস্রতার কথা জানান দিচ্ছে। সবকিছু ঘটছে মুহূর্তেরও কম সময়ে। আমার মাথা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলো। কি করবো ঠিক করতে পারিনি। পা তো পাথর হয়ে গিয়েছে। দৌড়াতে পারিনি। এদিকে ষাঁড়টা একেবারে কাছে চলে এসেছে। এ সময় মাথাটা খুলে গেল। পুকুর পাড়ে একটি পেয়ারা গাছ ছিলো। আমি লাফিয়ে চলে গেলাম গাছটির কাছে। প্রাণপণ লাফিয়ে গাছে চড়ে বসলাম। এতক্ষণে ছোটকাকু চোখ মেলে তাকিয়েছেন। টাইমিং না হলে জাঁদরেল ব্যাটসম্যান যেমন ক্রিজে বল খেলতে পারেন না, ব্যাপারটা সে রকম দাঁড়ালো। ছোটকাকু উঠে দাঁড়াতেই কেল্লাফতে। ষাঁড়টা গোঁৎ গোঁৎ করে ওর শিং দুটো ঠুকে দিলো। ভাগ্যিস তিনি মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন! তার শরীরে লাগলো না। তবে টেবিল উল্টে পড়ে গেলেন। এ সময় বাগানের দিক থেকে একটা হৈ হৈ রব উঠলো। চোখ যেতেই দেখতে পেলাম মদন গোয়াল ও একদল লোক। তারা দৌড়ে আসছে। এদিকে ষাঁড় মানুষে লড়াই! ছোটকাকু বুঝে গেছেন প্রাণটা যায় যায়! তিনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। ষাঁড়টা শিং তাক করে তার বরাবর বুনোকায়দায় মাথাটা গুঁতিয়ে দিতে চাইলো। তিনি সাঁই করে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। গাছের উপর থেকে বেশ একটা দৃশ্য আমি চোখের ক্যামেরায় বন্দী করলাম। ষাঁড়ের গুঁতিয়ে দেবার উৎসাহটা যেন বেড়ে গেল। ষাঁড় ঘাড় ঘুরিয়ে আবার ছোটকাকুকে আক্রমণ করলো। ছোটকাকু একই কায়দায় নিজেকে বাঁচাতে গেলেন। এবার গুঁতোটা থেকে পুরোপুরি বাঁচতে পারলেন না। একটা শিং তার পাজরকে পরখ করলো। ওতেই যথেষ্ট। ছোটকাকু গড়িয়ে পড়লেন পুকুর পাড় থেকে। একটা ড্রাম নামছে যেন। পুকুরের খাড়া পাড় গড়িয়ে তিনি জলে ঝপাৎ শব্দ তুলে তলিয়ে গেলেন। গাছের উপর বসে বুকের ভেতর আটকে থাকা বাতাস ছাড়লাম। ষাঁড়টা বুঝতে পেরেছে ওর কাজ ফুরিয়েছে। সে নিজেকে ঘুরিয়ে নিতেই মদন গোয়ালার মুখোমুখি হলো। তার পেছনে ১০/১২ জন লোক। লাঠি ও দড়ি হাতে তারা এগিয়ে এলো। পুকুর পাড়ে আবার মল্লা-যুদ্ধ বাঁধলো। ষাঁড়ের সাথে মানুষের। দৌড় লাফালাফি, চিৎকার চেচামেচী। ষাঁড়টা হার মানলো। মদন গোয়ালা দলবল নিয়ে ষাঁড়টাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললো। ষাঁড়ের গলায় দড়ি, পায়ে দড়ি। নিশ্চিন্ত হয়ে আমি গাছ থেকে নামলাম। ফিরে এলো, সৌমিক, সোহানী, নিপুন, শিপন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো বড়রা। পুকুর পাড়ের লংকাকান্ড শেষ হয়েছে। মদন গোয়াল বিনয় কণ্ঠে জানালো ষাঁড়টা দড়ি ছিড়ে পালিয়ে এসেছে এখানে। বড়দের মধ্য থেকে প্রশ্ন উঠলো,
‘হরমুজ আলী কোথায়?
হরমুজ আলী অর্থাৎ ছোটকাকুর কথা মনে পড়লো। তিনি পুকুরে ডুব সাঁতার দিয়েছেন, তা অনেকক্ষণ হলো। আমার উত্তর দেবার আগেই মদন গোয়াল হরহরিয়ে বললো,
ঃ বাবু, পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমেছেন।
বড়দের মধ্যে চিৎকার উঠলো।
ঃ ও তো সাঁতার কাটতে জানে না!
আমরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে নিলাম। মদন গোয়ালার লোকজন পটাটপ নামলো পুকুরে। শংকিত সকলে পুকুর পাড়ে জড়ো হলো। কেউ কেউ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। ১০ জন লোক পুকুরটি চিরে ফেললো। ডুব সাঁতার দিয়ে গুপ্তধন খোঁজার মত ছোটকাকুকে খোঁজলো। তাকে পেলো না। বুক দুরু দুরু কাঁপছে। পাড়া প্রতিবেশী ছুটে এলো। জাল ফেলা হলো পুকুরে। জালকে ফাঁকি দিতে পারলেন না ছোটকাকু। জালে আটকা পড়ে ডাঙায় উঠে এলেন। তিনি জল খেয়ে পটকা মাছ হয়ে গেছেন। হাত-পা ছেড়ে দিয়েছেন। মরে যায়নি তো! চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। একজন ছোটকাকুর শিরা সঞ্চালন পরীক্ষা করে বললেন,
ঃ বেঁচে আছে।
‘নিজে শিখি’ ক্লাবের সদস্যদের মনে স্বস্থি নেমে এলো।

 

 

 Back