- 1+718-414-3662
- darpanus@gmail.com

Description:
টুইন টাওয়ারের গুমোট কান্না
এক.
সুজানা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। ভদ্রলোকের দেখা নেই। বার্নস এন্ড নভেল বুকস্টোরের স্টারবাকস কফিশপে টানা দুই ঘন্টা বসে থাকা বিব্রতকর। যদিও অনেকে বই নিয়ে বসে থাকেন অর্র্থাৎ তারা বই পড়েন। কেউবা লেপটপ বা নেটবুক নিয়ে অনলাইনে জমে থাকেন। বার্নস এন্ড নভেল বুকস্টোরে এ ধরনের দৃশ্য হরহামেশা দেখা যায়। পড়ুয়া ছেলেমেয়ে, তরুণ-তরুণী এবং বয়স্করা নিয়মিত বার্নস এন্ড নভেলে আসেন। মার্কিনীরা বই পড়ুয়া জাতি। বাংলাদেশে লাইরেব্ররীগুলোতে পাঠকদের তেমন ভিড় দেখা যায় না। বুকস্টলগুলোতে বই পড়ার ব্যবস্থা নেই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বই পাঠের জন্য লাইব্রেরী ছাড়াও বুকস্টলগুলোতে ব্যবস্থা রয়েছে। বুকস্টলে কপিশপ থাকবেই। একজন মনযোগী পাঠক যদি পুরোদিন এ ধরনের বুকস্টলে কাটিয়ে দিতে চান, এতে কোন সমস্যা নেই। কফি, চা, কেক, বিস্কেট, পিজাসহ হালকা খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে বুকস্টলগুলোতে। ‘বার্নস এন্ড নভেল’ যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিখ্যাত বুকস্টলের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে এই বুকস্টল রয়েছে। এই বুকস্টলে সবধরনের বই পাওয়া যায়। পাঠক চাইলে বই না কিনেও বুকস্টলে বসে তার পছন্দের বই পাঠ করতে পারেন। সুজানা বার্নস এন্ড নভেলে আগে খুব আসত। ইদানিং খুব একটা আসে না ও। কাজের চাপ বেড়েছে। ও আজ বার্নস এন্ড নভেলে এসেছে একজনের সঙ্গে দেখা করতে। ভদ্রলোককে ও এর আগে কখনও দেখেনি। কথাও হয়নি। ও শুধু তার নামটা জানে। লোকটির নাম সিফাত চৌধুরী। সুজানার সঙ্গে তার বিয়ের কথা চলছে। সিফাত চৌধুরীও সুজানাকে চেনে না। পারিবারিকভাবে বিয়ের আলোচনাটা গুরুত্ব লাভ করায় সুজানাকে আসতে হল সিফাত চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে। দেখা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, একে অন্যকে দেখা এবং দুজন দুজনার সম্পর্কে কিছুটা ধারনা নেয়া ও আলাপাচারিতা। সুজানা ঠিক সময়ে এসেছে বার্নস এন্ড নভেলে। কিন্তু সিফাত চৌধুরী এখনও আসেনি। অপেক্ষার প্রহর পেরিয়েছে প্রায় দু’ঘন্টা। সুজানা বিরক্ত হয়ে টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছিল, এমন সময় এক ভদ্রলোক ওর টেবিলের সামনে এসে বলল,
‘আপনার ধৈর্য আছে, দেখছি! কনে হিসাবে কোন মেয়ে কারো জন্য দু’ঘন্টা অপেক্ষা করে বলে আমার জানা ছিল না। আপনার পেশেন দেখে আমি মুগ্ধ!’
ভদ্রলোকের কণ্ঠ ভরাট, গমগমে। উচ্চতায় পাঁচফুট পাঁচ-ছয় ইঞ্চি হবে। মায়াবী মুখ। চোখের দৃষ্টি একটু বেশি উজ্জ্বল। নাক খুব টিকালো নয়, মন্দও নয়। মাথায় ঝাকরা চুল, এলোমেলো। জিন্সপ্যান্ট ও টি-শার্ট পড়েছে। পেটানো শরীর। সম্ভবত নিয়মিত জিমে যায়। কয়েকমুহুর্তে ভদ্রলোককে দেখে নিল সুজানা। ওর মনে হল ভদ্রলোক নিশ্চয় সিফাত চৌধুরী হবেন। কারণ, ও যে এখানে প্রায় দু’ঘন্টা যাবত অপেক্ষা করছে, এ কথা সিফাত চৌধুরী ছাড়া আর কে জানে? সিফাত চৌধুরীর প্রতি যে বিরক্তি জন্ম নিয়েছিল, তাকে দেখে কেন জানি, ওই বিরক্তি উবে গেল। সুজানা হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে মিষ্টি একটা হাসি বিলিয়ে দিয়ে সুজানার টেবিলে ওর মুখোমুখি বসল। সুজানা ভাবল, দেরী করে আসার জন্য সিফাত চৌধুরী ‘সরি’ বলেননি। এটা অভদ্রতা। তার উচিত তাকে ‘বাই’ বলে চলে যাওয়া। কিন্তু সুজানার মন চেয়ার থেকে উঠতে চাইছে না। লোকটি এবার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘এখন আমি যা বলব, আপনি তা বিশ্বাস করতে পারবেন না। তারপরও আপনাকে বিনীত অনুরোধ করব, আপনি আমাকে একটু সময় দিয়ে আমার কথাগুলো শুনবেন, প্লিজ!’
লোকটির কথায় হোচট খেল সুজানা। ভদ্রলোক কি সিফাত চৌধুরী, না অন্যকেউ? ভাবল ও। লোকটি নিজ থেকেই বলল,
‘আমি জানি, আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমি কে।’
‘হুম, কে আপনি?’
লোকটি বলল,
‘আমি এলিয়েন।’
‘কি বললেন? এলিয়েন? আই মিন, অন্যগ্রহের প্রাণী!’
‘ধরুন, সেরকমই। ভয় পেলেন?’
‘শুনুন, আমার সঙ্গে রসিকতা করবেন না! এমনিতেই দু’ঘন্টা বসিয়ে রেখেছেন। এরপর কোথায় ‘সরি’ বলবেন, তা না, বলছেন এলিয়েন।’
সুজানার কথায় রাগের উত্তাপ। লোকটি হাসল। লোকটির হাসিতে কেমন জাদু যেন আছে। চোখ আটকে যায়। এ রকম হাসির জবাবে সুজানা কী বলবে? লোকটি এবার বলল,
‘আমাকে আপনি সিফাত নামে ডাকতে পারেন। আবার অন্য যে কোন নামে ডাকতে পারেন।’
‘শুনুন, হেয়ালি করে কথা বলবেন না। আপনি যদি সিফাত হন, বলুন। নইলে আমি উঠব।’
বলল সুজানা। লোকটি আবারও মিষ্টি করে হাসল। বলল,
‘সিফাত চৌধুরীর জন্য দু’ঘন্টা সময় নষ্ট করলেন। আর আমার জন্য পাঁচ-দশ মিনিট নষ্ট করলে ক্ষতি কি?’
‘আপনি কি আমাকে বিরক্ত করে আনন্দ পাচ্ছেন?’
‘না, না। আমি আসলে আপনাকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছি। আবার আমিও আপনার সহযোগিতা চাই।’
‘ঠিক বুঝলাম না। আপনি আসলে কে, বলুন তো!’
বিস্ময় ফুটে উঠে সুজানার কণ্ঠে। লোকটি বলল,
‘আমি এলিয়েন। অন্যগ্রহের বাসিন্দা। পৃথিবী থেকে সহস্র আলোকবর্ষ দূর থেকে এসেছি।’
লোকটির চোখের দিকে তাকাল সুজানা। এবার ওর শরীরটা যেন কেঁপে উঠল। লোকটি কি সত্যিই এলিয়েন? এলিয়েন কি মানুষের রূপ ধরে ওর সামনে বসে আছে? ও জড়তাকণ্ঠে বলল,
‘আমি এলিয়েন বিশ্বাস করিনা। অন্যগ্রহ বলতে কিছু নেই। যারা সাইন্সফিকশান ছবি বানান, তাদের বানানো কল্পনা হচ্ছে এলিয়েন। আমাকে ভয় দেখাবেন না, বলছি! তাছাড়া আমি এসব বিশ্বাস করিনা।’
সুজানার কথা শুনে ফের হাসল লোকটি বা এলিয়েন। সে বলল,
‘আপনি কি জানেন, বৃটেনের রানী এলিজাবেদের জ্যোর্তিবিদ লর্ড মার্টিন রিস ‘রয়াল সোসাইটি’র সভায় কী বলেছেন?’
‘কী বলেছেন?’
‘তিনি বলেছেন, আমাদের কাছাকাছি অন্য গ্রহের জীব রয়েছে। কিন্তু দিনদিন স্যাটালাইট টিভির সিগন্যাল, মহাকাশ যানের চলাচল, উপগ্রহ স্টেশন ইত্যাদির কারণে অন্যগ্রহের জীবের কাছে মানব জগতের অস্থিত্ব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ফলে দূর জগতের সঙ্গে মানব জগতের যোগাযোগে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যদি পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, তবে দূর জগতের সঙ্গে মানব জগতের যোগাযোগ স্থাপন করা অসম্ভব নয়।’
‘তাই নাকি? তিনি আর কী বলেছেন!’
‘তিনি আরো বলেছেন, পৃথিবীর ওপর ৫০ আলোকবর্ষ দীর্ঘ একটি বিকিরণের মোড়ক তৈরি হয়েছে।’
‘ও মাই গড! তাহলে তো অন্য কোন গ্রহ বা পৃথিবীর জীব সম্পর্কে তথ্য জানার সুযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!’
সুজানা বিদ্রুপ করল। লোকটি ওর বিদ্রুপ গায়ে না মেখে বলল,
‘শুধু তথ্য বলছেন? মানব সভ্যতার অগ্রগতি কোথায় গিয়ে পৌঁছুবে, ভেবে দেখুন!’
লোকটির কথা শুনতে ভাল লাগছে সুজানার, কিন্তু এ সব কথার কোন মানে নেই। ও বলল,
‘তা মিঃ এলিয়েন, আমি কি উঠতে পারি? আপনি এখানে বসে বসে অন্যগ্রহ আর পৃথিবীর দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করুন। ওকে?’
এ কথা বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল সুজানা। ওর কথায় ককিয়ে উঠে লোকটি। ও বলল,
‘আপনাকে তো আসল কথাই বলা হয়নি। আর একটু বসুন, আসল কথাটা বলছি।’
‘আসল কথা রয়ে গেছে। ওকে বলুন। আমি শুনছি।’
ও ফের চেয়ারে বসল। এলিয়েন এবার সুজানার দিকে মাথা ঝুকিয়ে এনে বলল,
‘সিফাত চৌধুরী কিন্তু কখনও আপনার সঙ্গে দেখা করবেন না। আপনি যে দু’ঘন্টা বসেছিলেন, অকারণেই। আমি এই দুই ঘন্টা আপনাকে শুধু দেখছিলাম।’
‘হোয়াটস! হোয়াট আর ইউ টকিং এবাউট ইট!’
‘আস্তে, রাগবেন না। যা সত্যি তাই বলছি। চারমাস আগেও আপনি আরেকজনের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন ম্যানহাটানে একটা জাপানিজ রেষ্টুরেন্টে। তার নাম ছিল রাশেদুল আলম। মনে পড়ছে?’
লোকটির কথা শুনে এবার সুজানার মুখে কথা সরছে না। ও হা করে তাকিয়ে আছে লোকটির মুখের দিকে। লোকটি বলল,
‘রাশেদুল আলমও আসেননি। তারও একটা কারণ আছে। না, আমি বলছি না, আপনি অসুন্দরী বা অযোগ্য কোন পাত্রী। বরং মনুষ্য জগতের সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় আপনি অসম্ভব সন্দরী ও ব্রিলিয়ান্ট! কিন্তু আপনার জীবনের সঙ্গে একটা রহস্য ঘুরপাক খাচ্ছে। এই রহস্য থেকে আপনি বের না হতে পারলে, আপনার বিয়ে হবে না। আই মিন, আপনাকে বিয়ে করতে আসা পাত্র মাঝপথ থেকে ফিরে যাবে। এটা এক রহস্য। আবার খারাপভাবে বললে, বলতে পারেন এটা অভিশাপ।’
লোকটির কথা আগুনের গোলার মত সুজানার ইন্দ্রীয়তে প্রবেশ করল। ও হতভম্ব হয়ে গেল কথাগুলো শুনে। সুজানা চারমাস আগে সত্যিই রাশেদুল আলম নামক একজনের জন্য অপেক্ষা করেছিল। রাশেদুল আলম আসেননি। আজ যেমন সিফাত চৌধুরী আসেননি। কিন্তু এটা যে রহস্য বা অভিশাপ, তা ও জানে না। কিন্তু লোকটি কী করে এ কথা বলছে? সুজানা অবাক ও অসহায় চোখে তাকাল লোকটির চোখের দিকে। লোকটির চোখের মণি যেন বদলে গেল। এতক্ষণ লোকটির চোখের মণি ছিল বাদামী, এখন ও দেখছে নীল। সুজানার গা শিরশির করে উঠল। ও ভয় পেলেও নিজেকে শক্ত করল। বলল,
‘কেন আমার জীবনে এই রহস্য বা অভিশাপ নেমে এসেছে বলতে পারেন?’
কথাটা বলতে গিয়ে সুজানার কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো। কেঁদে ফেলতে পারলে ভাল হত। মন হালকা হত। কিন্তু বার্নস এন্ড নোভেল বুকস্টোরে লোকজনের সামনে কান্না করা চরম লজ্জার ব্যাপার। সুজানা দু’হাতের অঞ্জলিতে নিজের মুখ ঢাকল। লোকটি বলল,
‘পারি, আপনাকে এই রহস্য বা অভিশাপ থেকে বের করে দিতেই তো আমি এসেছি। আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই। আর এই কাজে আমাকেও আপনি সাহায্য করবেন। করবেন নিশ্চয়?’
লোকটির কথায় ভরসা খুঁজে পেল সুজানা। যদিও সুজানার মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে, তবুও লোকটির কথা বিশ্বাস করতে মন সায় দিচ্ছে। ও বলল,
‘বলুন, কী করতে হবে? আমি করব!’
এবার লোকটি আগের মত হাসল। লোকটির চোখের রঙ ফের বদলে গেল। এখন তার চোখের দৃষ্টি সবুজ। সুজানার চোখে মেঘ জমছে। লোকটি এবার নিচু গলায় বলল,
‘আপনি কি জানেন, আপনার বিশেষ বন্ধু ধ্রুব একদিন আপনার জন্য অপেক্ষা করেছিল?‘
ধ্রুব’র কথা শুনে সুজানার বুকের ভেতরটা দুমরে-মুচরে উঠল। লোকটি এতোদিন পর ধ্রুব’র কথা বলছে! সে ধ্রুবকে চিনে কী করে? প্রশ্ন্টা ও করল না। লোকটি প্রশ্নটা জেনেই যেন বলল,
‘সেদিন সকালে আপনারা একসঙ্গে ব্র্যাকফার্ষ্ট করবেন কথা ছিল। ধ্রুব সকাল আটটা থেকে টুইন টাওয়ারে ‘উইন্ডোজ অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ রেষ্টুরেন্টে অপেক্ষা করছিল। আপনারা সেদিন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবেন বলেও ঠিক করেছিলেন। কিন্তু আপনি সেখানে যাননি।’
‘যাইনি ঠিক নয়। ঠিক সময়ে যেতে পারেনি। সেদিনই তো সন্ত্রাসীদের হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়ে গেল! ওহ! কী মর্মান্তিক, কী ভায়বহ! জানেন, আমি তখন ছিলাম টুইন টাওয়ারের কাছে!’
এ কথা বলে ও মুখ ঢাকল দু’হাতে। ওর শরীর থরথর করে কাঁপছে। কান্নার প্রবল স্রোত আটকে গেলে যা হয়। লোকটি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সুজানা যখন চোখের জল মুছে নিচ্ছিল, তখন লোকটি বলল,
‘টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনায় ধ্রুব সেদিন মারা যায়, জানেন?’
‘আমি ওর মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমি মৃত্যুদের তালিকায় ওর নাম দেখেনি। তাই অনেকদিন ওর জন্য অপেক্ষা করেছি। ওর কোন খবর আমি জানি না।’
‘টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনায় দুই হাজার নয় শ’ তিয়াত্তর জনের মৃতের তালিকা প্রকাশ করলেও মিসিং তালিকায় আরো অনেকের নাম আছে। ধ্রুব’র নাম মিসিং তালিকায়ও নেই।’
‘তাহলে..?’
‘ধ্রুবও সেদিন মারা যায়। মৃত্যুর সময় আমি ওর পাশে ছিলাম।’
বলল সে। সুজানা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর কান্নায় কফিশপের পরিবেশটা ভারি হয়ে গেল। আশেপাশের লোকজন উৎসুক দৃষ্টিতে সুজানার দিকে তাকাল। ও দ্রুত কান্না থামিয়ে নিল। এবার লোকটি বলল,
‘ধ্রুব মারা গেলেও ওর অতৃপ্ত আত্মা টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হতে পারেনি। ধ্রুব এখন ধ্বংসস্তূপে টুইন টাওয়ারের গোপন কান্না।’
‘বলেন কি!’
‘হুম। ধ্রুব’র আত্মা মুক্তি চায়। আপনাকে এর ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে আপনিও রহস্য বা অভিশাপ থেকে রেহাই পাবেন না।’
সুজানা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে। লোকটি কী বলছে! ও কী করে ধ্রুব’র আত্মাকে মুক্ত করবে? ওর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। এমন রহস্যে ও কোনদিন পড়েনি। লোকটি বলল,
‘কী ভাবছেন?’
‘ভাবছি, আমি কীভাবে ধ্রুব’র আত্মাকে মুক্ত করব? আপনি কি বলতে পারেন, আমাকে কী করতে হবে?’
‘পরে একদিন বলে দেব কী করতে হবে। আজ তাহলে উঠি?’
সুজানা কিছু বলার আগেই লেকাটি বা এলিয়েন উঠে পড়ল। সুজানা বলল,
‘এসব কথা বলে আমাকে সহযোগিতার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হঠাৎ করে উঠছেন কেন? আজই বলে দিন কী করতে হবে।’
সুজানার কণ্ঠে আকুতি। লোকটি বলল,
‘আমি বেশিক্ষণ পৃথিবীর আলোয় থাকতে পারিনা। আমাকে খুব দ্রুত অন্তর্ধান হতে হবে। হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে হবে। তাই উঠলাম। অপেক্ষা করুন, বলে দেব কী করতে হবে। অস্থির হবেন না।’
‘আপনার সঙ্গে আবার কখন এবং কীভাবে দেখা হবে?’
এ কথায় হাসল সে। বলল,
‘আমি তো এলিয়েন। আমার সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ নেই। সময় হলে আমি নিজেই দেখা দেব।’
এ কথা বলে এলিয়েন বার্নস এন্ড নভেল বুকস্টোর থেকে বের হবার পথের দিকে হনহন করে হাঁটতে লাগল। সে লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হাঁটছে। সুজানা তার চলে যাওয়া পথের দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইল।
দুই.
অনেকগুলো দিন পেরিয়ে গেল। এলিয়েনের দেখা নেই। সুজানা এলিয়েনের জন্য অপেক্ষা করছিল। অপেক্ষার বিস্বাদ যেন প্রলম্বিত হচ্ছিল। ও মাঝেমাঝে ভাবছিল সেদিন বার্নস এন্ড নভেল বুকস্টোরে ওর হেলিসুনেশন হয়েছিল। আসলে এলিয়েন ওর সামনে আসেনি। ধ্রুব’র আত্মা ওর সামনে এসেছিল। এলিয়েন পরিচয় দিয়ে ধ্রুব’র আত্মা ওর সঙ্গে কথা বলেছিল। এ কথা ভাবলেও ও এলিয়েনের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওর মন বলছিল, এলিয়েন ফের আসবে। অবশেষে এলিয়েন এগার মাস এগার দিন এগার ঘন্টা পর ওর সামনে এসে হাজির হল পঁচিশ ডিসেম্বর বড়দিনের সন্ধ্যয়। সুজানা এদিন ম্যানহাটানে রকফেলা সেন্টারে ক্রীষ্টমাস ট্রি দেখতে গেল। রকফেলা সেন্টারে প্রতিবছর বড় আকারের ক্রিষ্টমাস ট্রি স্থাপন করে সুসজ্জিত করা হয়। এই ক্রিষ্টমাস ট্রি দেখতে প্রচুর লোক ভিড় জমান। এতে ম্যানহাটানের ট্রাফিক ব্যবস্থা হিমসিম খায়। বড়দিনের বিকেলে ওর মনটা ক্রিষ্টমাস ট্রি দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ল। মনের ব্যাকুলতায় ও চলে গেল রকফেলা সেন্টারে। শীতের সন্ধ্যা ঝুপ করে নেমেছে। অন্ধকার ঘন হয়ে এলেও ম্যানাহাটনের আকাশমুখি অট্টালিকায় জ্বলে থাকা বাতির আলোর কাছে ম্রিয়মান। সুজানা সার্বক্ষণিক জেগে থাকা শহর ম্যানহাটান নিয়ে ভাবুলতায় ডুব যাচ্ছিল। বিজলি বাতির জৌলুসে ম্যানহাটানে কখনও রাত অন্ধকারের পেখম ছড়াতে পারে না। এ শহর কখনও ঘুমায় না বলে এখানে রাতও কখনও ‘নিস্তব্ধ রাত’ হতে পারে না। রকফেলা সেন্টারে মানুষের ভিড়ে হাঁটছিল সুজানা। ওর পাশ থেকে সেই গমগমে গলায় এলিয়েন হঠাৎ বলে উঠল,
‘ধন্যবাদ, এখানে আসার জন্য। আমি আপনাকে অনুভব করছিলাম।’
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ওর পাশে গায়ে গা ঘেঁষে এলিয়েন হাঁটছে। ওর গা শিরশির করে উঠল। এলিয়েন কি ওকে হিপ্টোনাইস করে এখানে নিয়ে এসেছে? প্রশ্নটা মনে এলেও মুখে বলল,
‘এতোদিন পর দেখা দিলেন! এটাও কি রহস্য?’
ওর কথায় এলিয়েন মুখ টিপে হাসল। বলল,
‘আপনাদের কাছে মাস-বছরটা অনেক বড় হলেও আমাদের কাছে শত বছর সময়টাও ছোট। মনে হয় এই তো কয়েকদিন মাত্র!’
‘বলেন কি! ভাগ্যিস, এক শ’ বছর পার করে আমার কথা ভাবেননি! তাহলে কী হত!’
ভিড়ের মধ্যেও ওরা দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। এলিয়েন সুজানার কথার জবাবে বলল,
‘আমার ডাক এসেছে। ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চলে যেতে হবে। পৃথিবীতে থাকার সময়কাল ফুরিয়ে গেছে। তাই বলতে পারেন, আপনার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।’
‘আমার শাপমোচন কী করে হবে? আপনি বলেছিলেন, উপায় বলে দেবেন।’
বলল সুজানা। এলিয়েন এ কথার জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল। সে বলল,
‘ধ্রুব’র আত্মার সঙ্গে অনেক তর্ক করেছি। সে কোনকিছুতেই পৃথিবী ছাড়তে চায়না। ওর আত্মা আপনার জন্য এখনও টুইন টাওয়ারের ধ্বংস স্থানে ঘুরপাক খাচ্ছে!’
‘ওহ, মাই গড!’
‘যাই হোক, আমি ওর আত্মাকে একরকম রাজী করিয়েছি। এখন আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।’
‘কী কাজ?’
‘কাজটা কঠিন নয়, আবার সহজও নয়।’
‘বলুন, কী করতে হবে। আমি যত কঠিনই হোক তা করব। আমাকে আর টেনশনে রাখবেন না, প্লিজ!’
সুজানার কণ্ঠে আকুলতা। ওরা মানুষের ভিড়ের মধ্যে হাঁটছে। ভিড় ঠেলে সুজানার হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এলিয়েন হাঁটছে নির্বিকার। সুজানার কথার জবাবে বলল,
‘এখন সন্ধ্যা, তাইনা?‘
‘হুম।’
‘আপনি চলে যান যেখানে টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়েছে, সেখানে।’
‘সেখানে কী করব?’
‘আপনারা প্রার্থনা করেন না?’
‘হুম, করি।’
‘আপনি মধ্যরাত থেকে সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা করতে পারবেন?’
‘এতোক্ষণ! অলমোষ্ট ৫/৬ ঘন্টা! আবার ধ্যানমগ্ন হয়ে!’
চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল সুজানার। এলিয়েন বলল,
‘এতো সহজেই আত্মার মুক্তি হবে? কষ্ট করতে হবে না? কষ্ট না করলে শাপমোচন হবে?’
এলিয়েনের কণ্ঠে প্রশ্ন। বিব্রত বোধ করল সুজানা। ও মিনমিনে গলায় বলল,
‘মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত অনেক সময়। এতোক্ষণ ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা করা যায়? আপনি বুঝবেন না, এটা কেমন কষ্টকর। তবু আমি করব। কিন্তু..?’
‘কিন্তু কি?’
‘যেখানে টুইন টাওয়ার ছিল, সেখানে গেলে পুলিশ এসে বাধা দেবে। এতে ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা করা যাবে না। ধ্যান ভেঙ্গে যাবে।’
সুজানার মনে চিন্তার রেখাপাত সৃষ্টি হল। এলিয়েন সুজানার কথায় বলল,
‘ধ্বংসস্থানের যতটুকু কাছে যেতে পারেন, চেষ্টা করবেন। কাছাকাছি থাকলেও চলবে। অথবা ধ্বংসস্থানের কাছাকাছি ব্রডওয়ের ওপর ভিসি ও ফুলটন স্ট্রিটের মাঝে ছোট্ট একটা কবরস্থান আছে। জানেন?’
‘জানি। টুইন টাওয়ার ধ্বংসে নিহত কয়েকজনের মরদেহ ওখানে সমাধি করা হয়েছে। ওটা কবরস্থান না। তবে এখন কবরস্থান বলা যায়।’
বলল সুজানা। ওর কথায় এলিয়েন যেন খুশি হল। সে বলল,
‘আপনি ঐ কবরস্থানে গিয়ে প্রার্থনা করবেন। নিমগ্নচিত্তে প্রার্থনা করবেন ধ্রুব’র জন্য। সেদিন ঠিক সময়ে আসতে পারেননি বলে ধ্রুব’র কাছে ক্ষমা চাইবেন। বারবার ক্ষমা চাইবেন। পারবেন না?’
‘পারবো। আমাকে পারতেই হবে। এরপর?’
‘সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত আপনি প্রার্থনা মগ্ন থাকবেন। ভোরের প্রথম সূর্যালোকে আমি ধ্রুব’র আত্মাকে সঙ্গে নিয়ে মিলিয়ে যাব। ওটাই হবে আপনার সঙ্গে আমার ও ধ্রুব’র আত্মার শেষ বিদায়। বুজেছেন?’
এ কথায় রিনরিনে এক বেদনা সুজানাকে গ্রাস করল। বেদনা মিশ্রিত এক রসস্যের সামনে ও কেন দাঁড়িয়েছে, এর জবাব কে দেবে? সুজানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওরা দু’জনে ভিড় ঠেলে ৫৩ স্ট্রিট দিয়ে কখন যে ব্রডওয়ের দিকে চলে এসেছে, সুজানা খেয়াল করেনি। খেয়াল হবার পর ও বলল,
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
এলিয়েন বলল,
‘আমি কিছুক্ষণের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে যাব।’
সুজানা ককিয়ে ওঠে,
‘ভোর পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকতে পারেন না?’
‘না, আমি বেশিক্ষণ পৃথিবীর আলোয় মনুষ্য স্বরূপ ধরে থাকতে পারিনা। তাই..।’
‘একটা প্রশ্ন করব?’
‘করুন।’
‘আপনি তো এলিয়েন, মানুষের চেয়ে অনেক শক্তিধর। যখন টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসীরা হামলা চালালো, তখন আপনি কি ওই সন্ত্রাসীদের কঠিন শাস্তি দিতে পারতেন না? সেদিন আপনিও তো টুইন টাওয়ারে ছিলেন, তাইনা?’
সুজানার প্রশ্নে একটু ভাবল এলিয়েন। এরপর বলল,
‘পৃথিবীর মানুষরা কী করে, কীভাবে জীবনযাপন করে, তা দেখার জন্য আমি এসেছিলাম। মানুষের কর্মকান্ডে কোন প্রতিক্রিয়া দেখানো আমার কাজ নয়। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সময় দেখলাম মানুষ কত বর্বর, কত হিংস্র, কত নিষ্ঠুর হয়। তখন মনে হয়েছিল মানুষের পৃথিবীটা ধ্বংস করে দেই। এরপর দেখলাম আরেক দল মানুষের মানবিকতা, মমত্ববোধ, মানুষের প্রতি মানুষের কী ভালবাসা! গোটা কয়েক হিংস্র মানুষ তিন হাজার মানুষকে হত্যা করল। আবার মানুষকে বাঁচাতে আরেকদল মানুষ কীভাবে নেমে পড়ল উদ্ধারকাজে। মানুষ বাঁচাতে গিয়ে অনেক মানুষ মারাও গেল। কী আত্মত্যাগ! মনুষ্য জীবনের কী মহিমা! আরো দেখলাম, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এ ঘটনায় দুঃখ-কষ্টে ছটফট করল। তখন বুঝলাম, পুরো মানবজাতি সভ্য না হলেও এবং তারা সকলে মানবিক বোধে উদার হতে না পারলেও অধিকাংশ মানুষ শান্তিকামী। তারা ধর্মে-কর্মে যেমন সাধারণ, তেমনি মানবতাবাদে বিশ্বাসী। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সাধারণ ও সরল। মনুষ্যজীবন সম্পর্কে এই উপলব্ধি সঙ্গে নিয়ে নিজের গ্রহে ফিরে যাচ্ছি।’
এলিয়েনের কথাগুলো সুজানা শুনছিল তন্ময় হয়ে। এ কি কথা বলছে এলিয়েন? মানুষ এতো যুদ্ধ করছে, লুটতরাজ করছে, অন্যায় করছে, প্রহসন-প্রতারনা করছে-এ সব কি সে দেখেনি? নাকি এ সব দেখলেও মানুষের মহত্বকেই বড় করে দেখছে সে? প্রশ্নটা ওর মনে উদয় হল। প্রশ্নটা ও করবে বলে এলিয়েনের দিকে তাকাল। কিন্তু ও দেখল এলিয়েন নেই। এলিয়েন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। সুজানার মন খারাপ হয়ে গেল।
ভোরের পেয়ালায় রাতের সমর্পণ হবার আকুতি। পূবের আকাশে ম্লান রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে। ব্রডওয়ের ওপর ছোট্ট কবরস্থানে রাতের হিম সহ্য করে প্রার্থনায় মগ্ন সুজানা। মধ্যরাত থেকে ও দাঁড়িয়ে আছে এই কবরস্থানে। ধ্রুব’র আত্মার শান্তি কামনায় ও প্রার্থনারত। কবরস্থানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছে বলে সুজানাকে পুলিশ বাধা দেয়নি। প্রার্থনায় সুজানা রাতভর ধ্রুব’র নাম জপেছে। দীর্ঘক্ষণের দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট ও মুখ বুজে সহ্য করেছে। ওর মনে হচ্ছিল ওর পা দুটি পাথর হয়ে গেছে। এক সময় ভোরের কুয়াশা সরিয়ে এলিয়েন ওর কানের কাছে এসে বলল,
‘আপনার নিমগ্ন প্রার্থনার জয় হয়েছে! ধ্রুব’র আত্মা আমার সঙ্গে পৃথিবী ছাড়তে রাজী হয়েছে।’
এ কথা শুনে চোখ খুলল সুজানা। ও দেখল, ওর সামনে এলিয়েন হাসিমুখে দৃশ্যমান। সুজানার মনটা অন্যরকম আলোয় ভরে গেল। এলিয়েন সুজানাকে বলল,
‘চলে যাবার আগে একটা কথা বলে যেতে চাই।‘
‘বলুন।’
‘আজকেই আপনাকে বিয়ে করার জন্য দু’জন ব্যক্তি পাগলের মত ছুটে আসবে।’
‘তাই নাকি! তারা কে?’
‘একজনের নাম রাশেদুল আলম, আরেকজন সিফাত চৌধুরী। আপনি কাকে বিয়ে করবেন?’
‘তাদের একজনকেও না।’
‘কেন?’
‘এরপর আমি একজন এলিয়েনকে বিয়ে করার জন্য অপেক্ষা করব। ঘন্টার পর ঘন্টা, মাসের পর মাস, বা বছরের পর বছর! শাপমোচন হলে বর পাব না? ধ্রুব তো আর ফিরে আসবে না। অন্তত এলিয়েন চাই। পাব কি?’
এর জবাবে এলিয়েন অনেকক্ষণ হাসল। এরপর সে বলল,
‘এলিয়েনদের রাজ্য থেকে পৃথিবীতে অর্থাৎ মনুষ্য সমাজে নির্বাসনের আসার আবেদন জানাব। আবেদন মঞ্জুর হলে আমি পৃথিবীতে আবার আসব। সেদিন আমি ধ্রুব হয়ে আসব। আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করবেন?’
এলিয়েনের এই প্রশ্নের জবাবে সুজানা কী বলবে? ও জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল, প্রবল আবেগে ওর ঠোঁট তিরতির করে কাঁপতে লাগল। ও চিৎকার করে বলতে চাইল, ‘তুমি এলিয়েন নও, আসলে তুমিই আমার ধ্রুব। মৃত্যুর পর এলিয়েন হয়েছো। তুমি ফিরে এসো, ফিরে এসো। আমি অনন্তকাল তোমার জন্য অপেক্ষা করব।’ কথাগুলো বলতে পারল না ও। ভোরের নরম সূর্য তেতে উঠল। আকাশ আলোয় ফর্সা হচ্ছে। আলোর উজ্জ্বলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলিয়েন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল খুব দ্রুত। সুজানা হাত নেড়ে শুধু বিদায় জানাতে পারল তাকে। অব্যক্ত কথাগুলো লোনা জল হয়ে ওর চোখ থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ল।
২.
বিষকাঁটা
একটা স্বপ্ন পূরণ হবার পর আরেকটি স্বপ্ন এসে হাজির হয়। স্বপ্ন পূরণের আগে মনে হয়, এটিই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন। কোনভাবে স্বপ্নটি পূরণ হলে মনে হয় অসম্ভব একটি প্রাপ্তি যোগ হলো জীবনে। কিন্তু এরপর যখন আরেকটি স্বপ্ন এসে কড়া নাড়ে, তখন নতুন স্বপ্নটিই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়। সেটি পূরণ হলেও একই পুনারাবৃত্তি! জীবন ও স্বপ্নের সাথে যেন এক লুকোচুরি খেলা। হার্ডসন নদীর পাড়ে বসে এ কথাই ভাবছিলো রিমন। ওর মন ভালো নেই। মন খারাপ করে ও অনেক কিছু ভাবছিলো কিংবা বলা যায় একটি বিষয় নিয়েই ও ভাবছিলো। ওর জীবন, বর্তমান সময় এবং আগামী দিনে ও কী করবে-এটাই ওর ভাবনার বিষয়। দুশ্চিন্তার বিষয়। এই দুশ্চিন্তা মাথায় চেপে ও বসে আছে হার্ডসন নদীর পাড়ে। শান্ত নদী, কিন্তু এ নদীর বয়ে চলায় এক ধরনের গাম্ভীর্যতা রয়েছে। এই নদী যে কাউকেই কাছে টানে। কোন চঞ্চলতা নেই, কিন্তু সৌন্দর্যের রহস্যজাল রয়েছে নদীর বুক জুড়ে। রাতের ম্যানহাটান বরাবরই আলোকিত। রাতে আলোর দ্যুতিতে ম্যানহাটানের অসম্ভব সৌন্দর্য ঠিকরে বেরোয়। রাতের অপরূপ ম্যানহাটান সবাইকে টানে। হয়তো এ কারণেই এ শহর কখনো ঘুমাতে পারে না। এ জন্য শহরটা কী তৃপ্ত? নাকি ওর মতো ম্যানহাটানও নিদ্রাহীনতার কষ্টে ছটফট করে? প্রশ্ন রিমন ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দীর্ঘশ্বাসটি যেন স্বপ্ন ভাঙ্গা বেদনার জলপ্রপাত হয়ে নেমে যায় হার্ডসন রিভারের শান্ত জলে। কিংবা রিমনের গোপন কান্না গলে গলে পড়ে।
এক অসম্ভব স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই রিমন স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় এসেছিল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পাড়ি দিয়েছিল আটলান্টিক মহাসাগর। আমেরিকায় এসে দেখে ওর স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে গেছে। এখানে এসে দেখে ওর স্বপ্নের রাজকুমারী আর ওর নেই! যার জন্য আটলান্টিক পাড়ি দিল, সে বিয়ে থা করে দিব্যি সংসার করছে। এ যেন জয়ের মালা গলায় পড়ার সময় পরাজয়ের চরম বিষাদ। স্বপ্ন ভাঙ্গা বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায় রিমন। কৈশোরের প্রেম বুকের ভেতর এক পশলা আগুন হয়ে থাকে। প্রায় সাত বছর পর ম্যারিল্যান্ডে তিথির সাথে দেখা হয়েছিলো রিমনের। তিথি অন্যের সংসারে নতুন স্বপ্নে আলোকিত করে আছে রাতের ম্যানহাটানের মতোই। রিমনের সাথে দেখা হতেই তিথি ‘হঠাৎ দেখা পরিচিত কেউ’ এমন ভাব প্রকাশ বলেছিলো,
‘আপনি কীভাবে এলেন আমেরিকায়! কবে এলেন?’
রিমন তখন নিজের ভেতরে ভেঙ্গে যাওয়া বিধ্বস্ত এক মানুষ। নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলেছিলো,
‘সংসার নিয়ে তো বেশ ভালোই আছো!’
তিথির দু’ চোখ যেন জ্বলে উঠেছিলো এক ধরনের অহংকারে। সেদিনই রিমনের জীবনের সবচেয়ে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্নটির অপমৃত্যু ঘটে। রিমন ধীরে ধীরে সামলে নেয় নিজেকে। স্বপ্নকে ছাইচাপা দিয়ে ও দাঁড়িয়ে থাকে স্বপ্নহীন মানুষের মতো। গতিময় শহর ওকেও টেনে নিয়ে যায়। রিমন চলতে থাকে। জীবন থেকে একটি অধ্যায়ের ইতি টেনে ও মানিয়ে নিয়েছিলো নিজেকে। ডলারের পেছনেই ও ছুটছিলো। রাতের ম্যানহাটানে ও ছুটে বেড়াতো ক্যাব নিয়ে। দিনে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু আবারো স্বপ্নের সম্মোহন নিয়ে রিমনকে নাড়িয়ে দেয় তিথি। যে ‘প্রেম’ অপ্রাপ্তির দহনে পুড়ে ছারখার তারই পুনুরুত্থান কেন? কান্নার অথৈ জল আর গ্লানির লাভা সরিয়ে তিথি একদিন রিমনের কাছে এসে বললো,
‘আমি শুধু তোমার। অন্য পুরুষকে বিয়ে করে ভুল করেছিলাম। এবার তোমার ভালোবাসার মূল্য দিতে চাই।’
তিথির চোখের জলের সামনে রিমনের সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। একটা অস্বস্থির জানান দিয়ে রিমন বললো,
‘তোমার জন্য কত কষ্ট করে আমি এ দেশে এলাম। আর এসে দেখি, তুমি সংসার করছো। আমাকে বিয়ের খবরটা জানাতে পারতে!’
‘আসলে একটা ট্রাপে পড়ে আমাকে বিয়ে করতে হয়েছিল। সে অনেক কথা। তোমাকেই আমি ভালোবেসে ছিলাম। এখনো বাসি। এই সত্যটুকু জেনো।’
‘কিন্তু এখন আর কী হবে? তোমার স্বামী আছে, দুটি ফুটফুটে ছেলেও আছে।’
‘ওকে আমি ডির্ভোস দিয়েছি।’
‘ডিভোর্স!’
‘হ্যাঁ, ডির্ভোস দিয়েছি। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’
এই প্রস্তাবটির জন্য ঘোর লাগা স্বপ্নে কতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছে রিমন। কিন্তু ও প্রস্তাবটি পেল বড্ড অসময়ে। যখন জীবনের অংক মেলানো দায়। ও তাৎক্ষণিক কিছুই বলতে পারলো না। তিথি নাছোর বান্দা। রিমনের দুর্বল জায়গায় হাত দিল। বললো,
‘তোমার তো বৈধ কোন কাগজ নেই। আমাকে বিয়ে করলে তুমি গ্রীনকার্ড পেয়ে যাবে।’
একদিকে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, অপরদিকে নিজের অসহায়ত্ব। প্রেম কিংবা প্রেমের মোহ থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি নেই রিমনের। ভালোবাসা নামক তীব্র আবেগের জয় হলো। ও তিথিকে বিয়ে করে ফেললো। সব কিছু ঘটে গেল দ্রুত। বিয়ের পর ওর সঞ্চিত অর্থ কর্পূরের মতো উড়ে গেল তিথির বিলাসী শখের মূল্য দিতে গিয়ে। ভালোবাসার কাছে অর্থ খুবই তুচ্ছ। স্বপ্নের মতোই কেটে গেল কয়েক মাস। এরপরই হঠাৎ করে স্বপ্নটা ফের ভাঙ্গতে শুরু করলো। এক সময় ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে গেল। তিথিকে উজার করে নিজের ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে রিমন। সপ্তাহের সাতদিন কাজ করে যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করছিলো। সব অর্থ তুলে দিতো তিথির হাতে। কিন্তু তিথি তাতেও যেন সন্তুষ্ট নয়। শপিং করাটা ওর হবি। ব্র্যান্ড আইটেম ছাড়া কিছু কিনে না। মাসে মাসে সোনার গহনা চাই। ওর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে রিমন যেন ক্রীতদাসে পরিণত হয়ে যায়। ভালোবাসাটা ফিকে হয়ে আসতে থাকে। এখানেই শেষ নয়, তিথি প্রতিদিন টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে সাবেক স্বামীর সাথে কথোপথনে। বিষয়টি জানার পর রিমন কেমন চুপসে যায়। তিথি রিমনকে বলে,
‘সাত বছর ওর সাথে সংসার করেছি। ইচ্ছে করলেই কি ওকে ভুলে থাকা যায়?’
রিমন এর কোন যুতসই জবাব খুঁজে পায় না। কিন্তু নিজের মনে আগুনও বাড়তে থাকে। ভালোবাসার স্বপ্নটা যখন চূর্ণ, তখনও নতুন একটা স্বপ্ন রিমনকে টেনে হিঁচড়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তা হলো গ্রীনকার্ডের স্বপ্ন। এরমধ্য দিয়েও যদি বৈধ হওয়া যায়, সেটাই না হয় প্রাপ্তির খাতায় যোগ হবে। তিথিকে খুশি রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যায় রিমন। কিন্তু স্বপ্নটা বিষ কাঁটা হয়ে ওর ভাগ্যকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। একদিন কাজ থেকে ফিরে ও দেখে তিথি নেই। ছোট্ট একটি চিরকুট লিখে তিথি চলে গেছে। চিরকুটে ও লিখেছে ‘তোমার সাথে জীবন কাটানো সম্ভব নয়। তাই চলে গেলাম। ডাকযোগে ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে।’
তিথির চলে যাওয়াটা মেনে নেয়া সহজ ছিল। কিন্তু তিথির চলে যাওয়ার মধ্যে ওর গ্রীনকার্ড প্রাপ্তির প্রচেষ্টা এখানেই ফ্রিজ হয়ে গেল। রিমন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ওর বিপন্ন ভবিষ্যতকে। রিমন বিশেষ রেজিষ্ট্রেশন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে স্ট্যাটাজ পরিবর্তনের আবেদন জানিয়েছিলো। আদালতে ওর আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। সিটিজেন নাগরিককে বিয়ে করার কারণে ও এক সময় বৈধ স্ট্যাটাজ পাবে, এ আশাটুকুই ওর অন্ধের যষ্টির মত ছিল। অর্থ গেছে, যাক। জীবনে কলংকের দাগ লেগেছে, লাগুক। ভালোবাসা ‘প্রহসন’ হয়ে গেছে, হোক। তবুও রিমন বৈধতা পেলে সান্ত¦না পেত। কিন্তু এখন কী হবে? রিমন কোন কিছুই ভাবতে পারে না। আলোকিত ম্যানহাটানে ও কোন আলো দেখতে পায় না। ওর চারপাশে শুধু অন্ধকারের কুহেলিকা!
৩.
পুনর্জন্ম
এক.
থুত্থুরে বুড়ো মিনমিনে গলায় বলল,
‘আমি এলিয়েন।’
কথাটা এমনভাবে বলল যেন কেউ শুনতে না পায়। যদিও কথাটা বিশ্বাস করার মত নয়, তবু কালো কুচকুচে রঙের জবুথবু বুড়োর দিকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি রাখলো দ্যুতি। বুড়োর গায়ের পোষাক যেমনি মলিন, তেমনি শতচ্ছিন্ন। পাকা লম্বা চুলগুলো জট বেঁধে পিঠের ওপর লতার মত পড়ে আছে। চোখ দুটি কোটরের এতো ভেতরে যে চোখ আছে কী নেই ঠাওর করতে হলে ভালো করে তাকাতে হয়। দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে নক্ষত্রের দ্যুতি জ্বলে ওঠে যেন। চোখের মণি ঘন সবুজ। বুড়োর দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখতেই দ্যুতি কেঁপে উঠলো। ঠিক এই মুহুর্তে ওর মনে হল বুড়োটি সত্যিই অন্য গ্রহের প্রাণী। কিন্তু প্যারিসের মত ব্যস্ত শহরে আইফেল টাওয়ারের সামনে হাঁটু সমান উঁচু পাথরের স্তম্ভের ওপর এলিয়েন কেন বসে আছে, বুঝতে পারলো না ও। এখানে লোকজনের ভিড়ে এলিয়েনের কী কাজ, কে জানে। দ্যুতি বুড়োর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। হেঁটে যাবার সময় দমকা হাওয়ায় ওর গা থেকে বেগুনী রঙের ওড়না উড়ে গিয়ে বুড়োটার গায়ে জড়িয়েছিল। ও ঘুরে দু’কদম এগিয়ে এসে বুড়োর কাছ থেকে ওড়নাটা নিল। ওড়নাটা হাতে ধরতেই ওড়নার রঙ আকস্মিক বদলে গেল। বেগুনী ওড়নাটা হয়ে গেল সোনালী রঙের। সূক্ষ্ম চিকন সোনালী সূতোর বুননের ওড়নার ওপর আবার উজ্জ্বল কাঁচের কুচি সারি সারি সাজানো। নিজের ওড়নার এই আমূল পরিবর্তন দেখে ওড়নার দিকে বিস্মিত চোখে তাকায় দ্যুতি। বুড়ো গলা নামিয়ে দ্যুতির উদ্দেশ্যে ক্ষীণকণ্ঠে বলে,
‘সোনার সূতোর ওড়নায় ডায়মন্ডের কুচি! বৃটেনের রানীর কাছেও এমন মূল্যবান ডায়মন্ড নেই। বুঝলে?’
সোনার সূতো বা ডায়মন্ড পরখ করার কথা ভাবেনি দ্যুতি। বেগুনী রঙের সিল্কের ওড়নার রঙ ও ডিজাইন বদলে গেছে-এই বিস্ময়ে ও হতবাক। বুড়ো আর কোন কথা বলে না। উদাসভাবে আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে এলে দ্যুতি বুড়োর দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী গলায় প্রশ্ন করে,
‘হু আর ইউ?’
এর জবাবে বুড়ো ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে জানায় যে, সে এলিয়েন। লিদোফস্ সাবওয়ে স্টেশনের পাশে দ্যুতির খালার বাসা। আইফেল টাওয়ার এলাকা থেকে ট্রেন ধরলে তিরিশ মিনিটের মধ্যে খালার বাসায় পৌঁছে যাওয়া যায়। ও এমনিতেই লেট। খালার বাসায় ফেরার ওর তাড়া ছিল। কিন্তু ও বুড়োর সামনে থমকে দাঁড়িয়েছে। এমন এক আশ্চর্য ঘটনার মুখোমুখি হবার পর পা চলে না। ও বুড়োকে রসিকতা করে বলল,
‘তোমার বয়স কত এলিয়েন?’
বুড়োটি মুখ টিপে হাসলো। দাঁত আছে কী নেই, বোঝা গেল না। বুড়ো বলল,
‘পৃথিবীতে তোমরা যেভাবে বয়স গুনে থাকো, সেই হিসাব ধরলো কয়েক হাজার বছর তো হবেই। আমাদের গ্রহের হিসাবে আমার বয়স একুশ।’
দ্যুতি ভিড়মি খেল। বুড়োর সঙ্গে কথা আর বাড়াবে কি, বাড়াবে না-ভাবতে লাগলো। বুড়ো যেন ওর মনের কথা পড়ে ফেললো। বলল,
‘তুমি তোমার খালার বাড়ি যেতে চাইছো তো ? এতো তাড়া কিসের?’
এ কথা শুনে দ্যুতি থ’। ও বলল,
‘আমার তাড়া আছে। সো..?’
দ্যুতির কথার জবাবে বুড়ো বলল,
‘আজ ধীরে সুস্থে যাও। এতে তোমার মঙ্গল হবে। যার জন্য তাড়াতাড়ি যেতে চাইছো, তার জন্য তুমি নও।’
‘মানে?’
অবাক চোখ তুলে প্রশ্ন করলো দ্যুতি। বুড়ো দ্যুতির কথাটা শুনতে পায়নি, এমন ভাব করে রইলো। দ্যুতির মনে আজনা আশঙ্কা জেগে উঠলো। ও বলল,
‘তুমি রহস্য সৃষ্টি করতে চাইছো?’
বুড়ো অন্যমনস্ক গলায় দ্যুতির উদ্দেশ্যে বলল,
‘পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মোহগ্রস্থ থাকে, বুঝলে?’
বুড়ো এ কথা কেন বলল বুঝতে পারল না দ্যুতি। বুড়োর কথায় হেয়ালি আছে। তারপরও বুড়োর কথাটির সাড়া দিয়ে বলল,
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো, আইফেল টাওয়ার নিয়ে কত ব্যাঞ্জণা, কত কথার ফানুস! উঁচু টাওয়ার বা অট্টালিকা মানুষ কেন বানায় বলো তো? প্রকৃতিকে নষ্ট করে এতো কৃত্রিমতা কেন? পৃথিবী এতো ভার সহ্য করতে পারবে কিনা-এই কথা কেউ ভাবছে না। মানুষ আধুনিক জীবনের প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে এসব করছে।’
‘শুধু এ টুকুর জন্য তোমার আক্ষেপ?’
জানতে চাইলো দ্যুতি। বুড়ো উদাস গলায় বলল,
‘সবক্ষেত্রেই তো মোহ!’
‘এতো ‘মোহ’ ‘মোহ’ করছো কেন? কোথায় এতো মোহ দেখলে?’
কথাটা বলার পর ওর মনে হল অকারণে ও বুড়োর সঙ্গে কথা বলছে। এ সব কথা না বললেও হতো। দ্যুতির কথাটা বুড়োর ভালো লাগলো। ও সরু গলায় বলল,
‘তোমাদের রাজনীতিবিদরা যা বলছেন, সাধারণ মানুষ তা শুনছে মোহগ্রস্থ হয়ে। ধর্মগুরুরা ধর্ম নিয়ে যা বলছেন, ঐ সব ধর্মের লোকেরা তা শুনছে ও মানছে মোহগ্রস্থ হয়ে। সবাই অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে। কেউ প্রশ্ন করছে না, প্রশ্নের জবাবও খুঁজছে না। এখানেই তো সবচেয়ে বড় মোহ।’
‘তা এলিয়েন সাহেব, পৃথিবীর মানুষের প্রতি এতো আক্ষেপ নিয়ে আমার ওড়নাটা বদলে দিলে কেনো? তুমি ম্যাজিশিয়ান, তাই না?’
দ্যুতির কথায় বুড়োটা যেন হাসার চেষ্টা করলো। তার চোখ দুটি বুজে এলো। বুঝা গেল না এলিয়েন হাসলো না চোখ বুঝে চিন্তা করলো। দ্যুতি বাসায় ফেরার তাড়া অনুভব করলেও পা বাড়াতে পারছে না। এটাও তো এক ধরনের মোহ-মনে মনে ভাবলো ও। এলিয়েন বলল,
‘আজ তোমার শাপমোচন হলো। তাই তোমার ওড়না বদলে দিলাম। বলতে পারো আমার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার।’
বুড়োর কথায় দ্যুতির চোখ ছানাবড়া হল। কী বলছে এই বুড়ো? দ্যুতি হা করে তাকিয়ে রইলো বুড়োর দিকে। বুড়ো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
‘আমার কথা তোমার বোঝার কথা নয়। আমি যা বলব, তা-ও বিশ্বাস করবে না তুমি। কিন্তু যা বলছি, তা ধ্রুব সত্য।’
বুড়োর কথায় স্মিত হেসে দ্যুতি বলল,
‘শাপমোচন! শুনতে ভালোই লাগছে, একটু খুলে বলবে কি?’
বুড়ো ফের ওর দিকে মুখ ফেরালো। একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘আগের জন্মে তুমি পৃথিবীর কোন এক দেশের রাজকন্যা ছিলে। তুমি শিকার করতে যেয়ে এক ভবঘুরে কবির সঙ্গে পরিচত হয়েছিলে। তোমাদের মধ্যে প্রেমও হয়েছিল।’
‘রিয়েলি! হাউফানি!’
‘হুম। তুমি এক সময় ঐ প্রেমিক কবিকে প্রত্যাখান করেছিলে। তোমার বিয়ের দিন কবিকে শূলে চড়তে হয়েছিল।’
‘ভেরি পেইফুল স্টোরি! তারপর?’
‘তুমিও আত্মহত্যা করেছিলে! তুমি অভিশপ্ত আত্মা নিয়ে ফের পৃথিবীতে এসেছো।’
‘স্ট্র্যাঞ্জ!’
‘সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনা হচ্ছে তুমি এবং ঐ কবি প্রায় একই সময়ে পৃথিবীতে ফের এসেছো।’
বলল বুড়ো। দ্যুতির হাসি পাচ্ছিলো, আবার গল্প শুনতে ভালো লাগছিল। ও চোখের দৃষ্টি নাচিয়ে বুড়োর কাছে জানতে চাইলো,
‘আমাদের পুনর্জন্ম হয়েছে?’
‘হুম।’
‘তাহলে সে কোথায়? কুড আই মিট হিম?’
‘সহজ নয়। তবে চাইলে তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে পারো।’
‘কে সে? কোথায় থাকে?’
কৌতুহল প্রকাশ করে হেসে ফেললো দ্যুতি। বুড়ো এবার গম্ভীর হল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
‘তোমার সঙ্গে তার দেখা হবে। তোমাকে এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
বলে হাসলো বুড়ো। দ্যুতি মাথা ঝাকিয়ে ‘না’ বোধক সম্মতি প্রকাশ করে বলল,
‘পরশু আমার এ্যাংগেজম্যান্ট। আমি যাচ্ছি আমার খালার বাসায়। সেখানে আমার হবু স্বামী অপেক্ষা করছেন। আমরা আজ দুজন দু’জনের সঙ্গে পরিচিত হবো। বুঝলে এলিয়েন?’
‘তুমি যদি অপেক্ষা না করো, তাহলে ফের অভিশপ্ত হতে পারো। তোমার ভবিতব্য ভালো দেখছি না।’
দ্যুতি ভেতরে একটু কেঁপে উঠলো। বাইরে তা প্রকাশ করলো না। ও বলল,
‘একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’
‘বলো।’
‘আজ আমি অভিশাপ থেকে মুক্ত হলাম কেন? আজকের দিনটি কেন এমন বিশেষ দিন?’
এ প্রশ্নের জবাব দিতে কয়েক সেকেণ্ড সময় নিল বুড়ো। একটু ভারী গলায় সে বলল,
‘আমি এখানে এসেছিলাম প্রিন্সেস ডায়না ও দোদির আত্মার সঙ্গে কথা বলতে। তুমি জানো, এখানেই ট্যানেলের মুখে ওরা অপঘাতে নিহত হয়েছিল। একটি অসম প্রেমের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতেই ওদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তাই ওদের আত্মা পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায়নি। আমার কাজ ছিল ওদের আত্মাকে বুঝিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা। আমি অনেকদিন ধরেই ওদের বুজাচ্ছিলাম। আজ ওরা রাজি হলো একটা শর্তে। আর শর্ত দিল তোমাকে শাপমোচন করে দেবার। তুমি আজ এখানে এসেছিলে বলে শাপমোচনের সুযোগ পেলে। তোমাকে শাপমোচন করে ডায়না-দোদির আত্মাকে পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারলাম। আমার কাজ শেষ।’
অভিভূত হয়ে কথাগুলো শুনলো দ্যুতি। ও বুঝতে পারছে না, এরপর ও কী বলবে। ও একটু ভাবলো। এরপর বলল,
‘আমার আরো দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন, ডায়না বা দোদির আত্মা কেন আমার শাপমোচনের জন্য তোমাকে অনুরোধ করবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আমার শাপমোচন না হতো, তাহলে কী হতে পারতো?’
প্রশ্ন শুনে কেমন ফ্যাকাসে হল বুড়োর মুখ। ও বিড়বিড় করে কী যেন বলল। দ্যুতি ওর বিড়বিড় কথা কিছু বুঝতে পারলো না। বুড়ো গলা খাকারী দিয়ে বলল,
‘ডায়নার আত্মা আমাকে বলেছে তুমিও রাজমহল ষড়যন্ত্রে ভালোবাসার মানুষকে প্রত্যাখান করেছিলে। তোমার ভালোবাসায় খাঁদ ছিল না। কিন্তু ভালোবাসাকে জয় করার মত তোমার শক্তি ছিল না। এখানটায় তোমার সঙ্গে ডায়নার বেদনার মিল আছে। তাই ওদের আত্ম আজ তোমাকে এখানে দেখে আমাকে এই অনুরোধ করে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারব না। আমি ভবিতব্য সম্পর্কে কিছু বলতে পারি না। এই শক্তি আমরা অর্জন করি, আমাদের হিসাবে তিরিশ বছর পূর্ণ হলে। আগেই বলেছি আমার বয়স একুশ।’
বুড়োর কথা শুনে দ্যুতি কেমন মুষড়ে পড়লো। ও এরপর কী বলবে, বুঝতে পারলা না। ওর ভীষণ কান্না পেয়ে গেল। ওর ভেতর থেকে অকারণে কান্নার রোল ওঠে আসছে। ওর দু’চোখ বেয়ে অশ্রুর দুটি ধারা নেমে এলো। ও ওড়না চেপে ধরলো নিজের চোখে-মুখে। ভেতর থেকে উথলে আসা কান্না সামলাতে পারলো না। আবার হাউমাউ করেও কাঁদলো না ও। অর্থহীন নীরব কান্নায় ও নিজের মধ্যে নিজে একাকার হল। কয়েকমুহুর্ত পর ও মুখ থেকে ওড়নার আঁচল সরাতেই দেখলো বুড়োটা নেই। ও চট করে চারপাশে তাকালো। কোথাও তাকে দেখা গেল না। মাত্র কয়েক মুহুর্তেই জবুথুবু বুড়ো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। দ্যুতি ফের ভীষণ অবাক হল। বিস্ময়ে ও থ’। দ্যুতি অনেকক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো আইফেল টাওয়ারের সামনে। যেন অভিশপ্ত এক জীবন্ত মূর্তি!
দুই.
সাবরিনাদের বিয়ে বার্ষিকীর পার্টিতে লোকটিকে দেখে চমকে উঠল দ্যুতি। দ্যুতিকে দেখে লোকটিও যেন ভড়কে গেল। পাংশুবর্ণ মুখ করে দ্যুতির সামনে থেকে দ্রুত কেটে পড়লো সে। সাবরিনার বিয়ে বার্ষিকীর পার্টিতে অনেক লোক এসেছে। পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অধিকাংশজন প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশী। সাবরিনার স্বামী শওকত জামান বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব প্যারিসের সাধারণ সম্পাদক। ফলে সাবরিনার বিয়ে বার্ষিকীর পার্টিতে বাংলাদেশী পরিবারগুলো এসেছে। বান্ধবী হিসাবে দ্যুতিও এসেছে এই পার্টিতে। সাবরিনাকে উইশ করে সফট ড্রিঙ্কস নেবার সময় লোকটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওর। লোকটিকে দেখে দ্যুতির প্রথম মনে হল লোকটি ওকে অনুসরণ করতে গিয়ে অনাহুতভাবে এই পার্টিতে চলে এসেছে। দ্যুতি একটু হচকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু লোকটির নার্ভাসনেস দেখে দ্যুতির ধারনা বদলে গেল। ওর মনে হল, লোকটি এই পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন। লোকটি যেভাকে দ্রুত সরে গেল, এতে মনে হলো দ্যুতিকে এই পার্টিতে দেখে লোকটিও চমকে গেছে। লোকটি ওকে অনেকদিন ধরে অনুসরণ করছে। কেন ওকে অনুসরণ করছে, ও জানে না। প্রথম প্রথম বিষয়টি ও গুরুত্ব দেয়নি। এক মাস আগে যখন ও ফ্রাঙ্কফুট গেল, সেখানেও লোকটির উপস্থিতি দেখে ও চমকে উঠলো। ফ্রাঙ্কফুটে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ওর বান্ধবী মলি থাকে ফ্রাঙ্কফুটে। মলির অনুরোধে ও গিয়েছিল ফ্রাঙ্কফুটে। সেখানে বইমেলার মানুষের ভিড়েও লোকটিকে দেখেছিল ও। একবার তো একটা কফি শপে লোকটির মুখোমুখি পড়েও গেল। দ্যুতি চট করেই লোকটিকে প্রশ্ন করলেছিল,
‘আর ইউ লুকিং সামওয়ান লাইক মি?’
লোকটি এর জবাব না দিয়ে মুখে ভূবন ভুলানো হাসি ঝুলিয়ে চটপট চলে গিয়েছিল। দ্যুতি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছিল। লোকটি সাড়া দেয়নি। ফ্রাঙ্কফুটে লোকটিকে দেখার পর থেকে ও নিশ্চিত হয় যে, লোকটি ওকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে।
পার্টিতে লোকটিকে দেখে দ্যুতি একটু আশ্বস্ত হল এই ভেবে যে, লোকটির পরিচয় জানা যাবে। লোকটির শারীরিক গঠন ও মুখায়ব দেখে দ্যুতির মনে হয়েছিল সে এশিয়ার কোন দেশের নাগরিক হবে। বাংলাদেশী, ভারতীয় বা পাকিস্তানীও হতে পারে। লোকটি উচ্চতায় পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চি হবে। চওড়া বুক, পেটানো শরীর। হয়তো নিয়িমতি জিমে যায়। টাইট শার্ট পরলে লোকটির পেশী উদ্ধতভাবে প্রতিফলিত হয়। বার বা নাইট ক্লাবের বাউঞ্চারদের মতো পেশীবহুল সে। লোকটি ওকে অনেকদিন যাবত কেন অনুসরণ করছে, তা জানে না। সাবনিার বিয়ে বার্ষির্কীর পার্টিতে তাকে দেখে প্রশ্ন আর কৌতুহল একসঙ্গে গ্রাস করলো দ্যুতিকে। ও কী ভেবে লোকটি খুঁজতে লাগলো পার্টিতে অংশগ্রহণকারী মানুষের ভিড়ে। দ্যুতি লোকটিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে হোটেলের বলরুম ছেড়ে লবিতে চলে এলো। এখানে সে লোকটিকে দেখতে পেল। লোকটি নির্জন লবির এককোণে দাঁড়িয়ে টেলিফোনে নিচুগলায় কথা বলছিল। দ্যুতি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। দ্যুতি লোকটির পাশে দাঁড়াতেই লোকটি সেলফোনের লাইন কেটে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। দ্যুতির মুখোমুখি হতেই লোকটির মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দ্যুতি পরিচয় হতে ইচ্ছুক এমন ভাব করে বলল,
‘আই এ্যাম দুতি। নাইস টু মিট ইউ এগেইন।’
লোকটি কয়েকমুহুর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। এরপর হঠাৎ নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল যেন। লোকটি বাংলায় বলল,
‘মিস, দ্যুতি। আমার নাম অনিন্দ্য হাসান।’
অনিন্দ্য বাংলায় কথা বলায় দ্যুতির মধ্যে তাৎক্ষণিক বিহবলতা ছড়িয়ে পড়লো। ও এমন আশা করেনি। নিশ্চয়, লোকটি বাংলাদেশী। এই বাংলাদেশী যুবক ওকে কেন অনুসরণ করছে? দ্যুতি সময় নষ্ট করতে চায় না। যেভাবেই হোক, মিষ্টি কথার জাল পেতে হলেও লোকটির পরিচয় এবং ওকে অনুসরণ করার কারণ বের করতে হবে-ভেবে নেয় দ্যুতি। ও বলল,
‘মিঃ অনিন্দ্য, আজকের পার্টিতে আপনাকে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ অনেকদিন ধরেই খুঁজছিলাম। আজ সুযোগ পেলাম।’
দ্যুতির কথায় একটু ভড়কে গেলেও অনিন্দ্যের মুখে রংধনুর মতো অদ্ভূত সৌন্দর্যমন্ডিত হাসিতে তা প্রতিফলিত হলো না। অনিন্দ্যের মায়াবী হাসিতে দ্যুতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। এই হাসির মধ্যে যেন জাদু আছে। অনিন্দ্য দ্যুতির উদ্দেশ্যে বলল,
‘আপনাকে এড়াতে পালাম না আজ। আজকের পার্টিতে না এসেও পারলাম না। জামান এমনভাবে ধরেছে যে, পার্টিতে না আসলে ও খুব রাগ করতো।’
‘আই সি, আপনি জামান ভাইয়ের বন্ধু বা পরিচিত কেউ তাহলে? জামান ভাই কি আপনাকে আমার পিছনে লাগিয়েছেন?’
অনিন্দ্য হাসান ফের ভূবন ভুলানো হাসি বিলিয়ে দিল। দ্যুতি তার মুখ থেকে চেষ্টা করেও চোখ ফেরাতে পারলো না। ও কেমন মুগ্ধভাবে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে। এমন কখনও হয়নি দ্যুতির। পুরুষ মানুষের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকাটা কোন স্মার্ট মেয়ের কাজ নয়। দ্যুতি কখনও কোন পুরুষ মানুষের দিকে মুগ্ধচোখে তাকায়নি। নিজের ভেতরে অস্বস্থি ছড়িয়ে পড়ে। অনিন্দ্য বলে,
‘আপনার কেনো মনে হলো যে আমি আপনার পেছনে লেগেছি? আর জামানই বা আপনার পেছনে আমাকে লাগাবে কেনো?’
অনিন্দ্যের প্রশ্নের জবাবে দ্যুতি বলল,
‘আপনি আমাকে অনেকদিন ধরে অনুসরণ করছেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু জানি না, কেন অনুসরণ করছেন। তা বলবেন কি, কেন আমাকে অনুসরণ করছেন?’
দ্যুতির প্রশ্নের জবাব দিল না অনিন্দ্য। সে কী যেন গভীরভাবে ভাবতে লাগলো। দ্যুতি দমে যাবার পাত্রী নয়। আজ সে জানতে চায়, কেন অনিন্দ্য তাকে অনুসরণ করছে। দ্যুতি গত এক বছরে আটজন পাত্রকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে অনিন্দ্য হাসান নেই। হতে পারে প্রত্যাখাত কোন পাত্র কৌতুহলবশত তাকে অনুসরণ করছে। অনিন্দ্য ওকে কেনো অনুসরণ করছে-ও বুঝতে পারছে না। দ্যুতি বলল,
‘আপনি কে এবং কেন আমাকে অনুসরণ করছেন-এই প্রশ্নের জবাব আপনাকে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর জবাব না পেলে আপনাকে ছাড়ছি না।’
দ্যুতির কথায় মিষ্টি করে হাসলো অনিন্দ্য। সে বলল,
‘কেন ছাড়বেন না আমাকে? এই প্রশ্নটার জবাব কী এমন গুরুত্বপূর্ণ?’
‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত আমার কাছে। আমার ব্যক্তিগত জীবনে একটা ছায়া অনবরত অনুসরণ করছে-এটার কারণ জানতে হবে না? কী বলছেন?’
দ্যুতি কথাগুলো জোর দিয়ে বলল। অনিন্দ্য ফের ভাবছে। দ্যুতি বলল,
‘প্লিজ, আমাকে বলুন। কারণটা শুধু বলুন, কথা দিচ্ছি আর কোন প্রশ্ন করবো না।’
অনিন্দ্য দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল,
‘বিপদে ফেললেন দেখছি!’
‘আমি কারণ না জেনে যে বিপদে আছি।’
‘আচ্ছা, আমি কারণটা বলবো। তবে কথা দিতে হবে এ কথা কাউকে বলতে পারবেন না। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে। কথা দিচ্ছি আমি কাউকে এ কথা বলবো না।’
অনিন্দ্যের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। দ্যুতি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অনিন্দ্য মাথা নামিয়ে দৃষ্টি অবনত করে বলল,
‘খুব সংক্ষেপে বলছি। আমি ইন্টারপোলের একজন ডিটেকটিভ কর্মকর্তা। আপনাকে অনুসরণ করছি, বিশেষ একটি কারণে। আমার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আমি শুধু দায়িত্ব পালন করছি।’
অনিন্দ্য থামলো। দ্যুতি বলল,
‘দায়িত্ব পালন? আমাকে অনুসরণ করছেন কেন? আমি কি কোন অপরাধ করেছি? আমি কি কোন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত মনে করছেন আপনারা?’
দ্যুতির প্রশ্নের জবাবে চোখ তুলে তাকালো অনিন্দ্য। সে স্মিত হেসে বলল,
‘আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি আমি।’
‘স্ট্যাঞ্জ! আমি কে? কেন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন?’
দ্যুতির বিস্ময়ের জবাবে অনিন্দ্য প্রশ্ন করে,
‘মিস, দ্যুতি, আপনার কাছে একটা বিশেষ ওড়না ছিল না?’
‘হুম। সেটা হারিয়ে গেছে।’
‘তা জানি। ওটা আসলে হারায়নি। ওড়নাটা চুরি হয়েছিল আপনার বাসা থেকে।’
‘রিয়েলি? আপনি জানলেন কীভাবে?’
‘সংক্ষেপে বলছি। শুনুন। আপনার ওড়নাটায় যে ডায়মন্ড আছে, সেটা অর্থের মূল্য বিবেচনায় কতটা মূল্যবান-তা আমিও বলতে পারবো না। ওড়নাটা চুরি করে নিয়ে যায় এক বৃটিশ চোর। সে বৃটেনে ওড়নাসহ ডায়মন্ড বিক্রি করতে গিয়ে ইন্টারপোল পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হয়। ওড়নার মালিককে খুঁজতে গিয়ে আপনাকে বের করে ইন্টারপুল পুলিশ। সবকিছু হয় খুবই গোপনে। ওড়নাটির আপনি মালিক বলে বৃটিশ সরকার মনে করছে আপনি সাধারণ কেউ নন। রাজকন্যা তো হবেনই। বংশ পরস্পর এই ডায়মন্ড হাত বদল হয়ে তা আপনার কাছে ছিল। আমরা আপনার অতীত রেকর্ড খুঁজে তেমন কিছু না পেলেও আপনার গুরুত্ব কমেনি আমাদের কাছে। বৃটিশ সরকার আপনার নিরাপত্তা দিতে বিশেষভাবে আগ্রহী। ইন্টারপোলের একজন কর্মকর্তা হিসাবে আমার ওপর আপনার নিরাপত্তার ভার পড়েছে। তাই আমি অনেকদিন থেকে আপনাকে অনুসরণ করছি। আসলে অনুসরণ নয়, আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।’
কথাগুলো শুনে মাথার ভেতরটা ভনভন করে চক্কর দিল যেন। এর জবাবে কী বলবে দ্যুতি? এই গল্প এতোটা সিনেম্যাটিক যে, শুনতে ভালো লাগে। দ্যুতি কিছু বলতে পারলো না। ও হা করে তাকিয়ে আছে অনিন্দ্যর মুখের দিকে। অনিন্দ্য পরিবেশকে হালকা করতে বলল,
‘আপনাকে নিয়ে কিন্তু আমারও কৌতুহল আছে? ব্যক্তিগত আগ্রহ তো বেড়েই চলেছে।’
‘কীরকম?’
‘কৌতুহল হচ্ছে আপনি কীভাবে এমন কতগুলো মহামূল্যবান ডায়মন্ডের মালিক হয়েছেন। আবার ডায়মন্ডগুলো হারিয়ে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন?’
অনিন্দ্য থামলো। দ্যুতি বলল,
‘বললে বিশ্বাস করবেন না। ওড়নাটা আমাকে এক অতিশীপর বৃদ্ধা শুভেচ্ছা উপহার দিয়েছেলেন। আর আমি বিশ্বাস করিনি যে, ওড়নায় এমন মূল্যবান ডায়মন্ড থাকতে পারে। বৃদ্ধা বলেছিলেন। আমি সে কথার গুরুত্ব দিইনি। ওড়নাটা আমি অল্প কয়েকদিন কাঁধে ঝুলিয়েছিলাম। একদিন দেখি, বাসা থেকে ওড়নাটা নেই। আমি আর ওড়নাটি নিয়ে ভাবিনি।’
‘হুম।’
‘তা আমার প্রতি আপনার ব্যক্তিগত আগ্রহ কেন?’
‘ওটা আজ বলতে চাই না। ও সব কথা বলার মত পরিবেশ এখন নয়। যথাযথ সময় ও পরিবেশের সম্মিলন ঘটলে সেদিন ব্যক্তিগত আগ্রহের কথা আপনাকে বলবো।’
বলল অনিন্দ্য। তার কথায় একটু লজ্জা অনুভব করলো দ্যুতি। ও কিছু বলার জন্য চিন্তা করতে লাগলো, এ সময় অনিন্দ্য বলল,
‘ডায়মন্ডগুলোকে আপনার কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা উচিত ছিল।’
দ্যুতি বলল,
‘আপনার কথা শুনে আমি কী বলবো, বুঝতে পারছি না। এলিয়েন পরিচয়দানকারী বুড়ো যে এমন ভয়ানক রসিকতা করবেন, আমি কি জানতাম!’
‘রসিকতা!’
‘হ্যাঁ, রসিকতাই তো। ও মাই গড! এখন আমার কী হবে? কী হতে পারে বলুন তো?’
‘আপনি ওড়নাটা ফেরত পেলে অনেক কিছু হতে পারে। আপনার ভাগ্য বদলে যেতে পারে।’
‘তাহলে ফেরত দিন আমার ওড়না।’
‘বৃটিশ সরকার হয়তো ফেরত দেবে। তার আগে নিশ্চিত হতে হবে, এই ওড়না অর্থাৎ ডায়মন্ডের মালিক আপনি কিনা। আপনার বাসা থেকে ডায়মন্ডগুলো চুরি হয়েছে ঠিক, ডায়মন্ডের মালিক আপনি কিনা-এটার প্রমাণ চাই।’
দ্যুতি হতাশা প্রকাশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘আমার কাছে কোন প্রমাণ নেই। বৃটিশ সরকার এই ডায়মন্ড হয়তো আত্মসাত করে ফেলবে। আমার ভাগ্য বদলালো না। যাই হো, আপনাকে ধন্যবাদ তথ্যগুলো জানানোর জন্য।’
দ্যুতির কথায় মৃদু হাসলো অনিন্দ্য। সে বলল,
‘এখনই হতাশ হবেন না। আমি প্রকৃত ঘটনার অনুসন্ধান করছি। যদি আপনার কথার সত্যতা পাওয়া যায়, আমি আপনাকে হেল্প করতে পারবো।’
‘আমার জন্য আপনার এতো দরদ কেন?’
প্রশ্নটা করে ফেললো দ্যুতি। এই প্রশ্নে সেই ভূবন ভুলানো হাসি ফুটে উঠলো ডিটেকটিভ অনিন্দ্যের মুখে। সে বলল,
‘আপনার প্রতি ব্যক্তিগত আগ্রহ এই দরদ সৃষ্টি করেছে। এই সত্যটুকু স্বীকার করছি।’
অনিন্দ্যের কথায় দ্যুতি কেমন চমকে উঠলো। অনিন্দ্য যদি পুলিশ না হয়ে কবি হতো, এ কথার অর্থ একভাবে করে নিত দ্যুতি। বুড়ো ওকে বলেছিল, ‘অপেক্ষা করো। তার সঙ্গে তোমার দেখা হবে।’
এই অনিন্দ্য কেন কবি হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়নি? প্রশ্নটা ওর মনে ছড়িয়ে গেল দ্রুত। দ্যুতি আর কোন কথা বলল না। ওর ভেতরে আনন্দ মিশ্রিত কষ্টের একটা ঝড় উঠলো। ও অনিন্দ্যকে আর কিছু না বলে আকস্মিকভাবে হনহন করে হোটেল লবি থেকে বেরিয়ে গেল। ওর মনে হচ্ছিলো, অনিন্দ্যের সামনে ও কেঁদে ফেলবে। উথলে উঠা কান্না সামলাতেই ও বেরিয়ে এলো। অনিন্দ্য দাঁড়িয়ে রইলো নীরবে।
তিন.
লিলোয়ানো প্যারিস শহরের উপকণ্ঠে একটি শহর। এই শহরে শীতের রাত মানেই নিঝুম রাতের অবগুণ্ঠনে ঢাকা। সন্ধ্যার পরপরই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। শহরতলীর বাসিন্দারা সন্ধ্যার পর ডিনার শেষ করে একটু তাড়াতাড়ি বিছানায় চলে যান। রাত নটার পর খুব কম লোকই জেগে থাকেন। দ্যুতি ভেবেছিল ট্যাক্সি কল করে হোটেল থেকে ফিরবে। তা আর হলো না। অনিন্দ্যর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভাবাবেগে ও হনহন করে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার পর ওর মনে হলো রাস্তায় ও সহজে ট্যাক্সি পাবে না। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ট্যাক্সি পেয়ে যেতেও পারে। ও রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় চোখ রাখলো চলমান গাড়ির দিকে। ট্যাক্সি না পেলে বাস ধরে ওকে বাসায় ফিরতে হবে। ও এগিয়ে যাচ্ছিলো বাস স্টপিজের দিকে। রাতের অন্ধকার থেকেই যেন বেরিয়ে এলো আলোকবর্তিকা সেই বুড়ো। রাস্তার কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল যেন। মনে হচ্ছিলো দ্যুতির জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। দ্যুতিকে ভীষণ চমকে দিয়ে বুড়ো জিজ্ঞেস করলো,
‘অনুষ্ঠান থেকে এভাবে পালিয়ে এলে যে!’
‘আ-প-নি! সেই এলিয়েন না?’
এ কথা বলতে গিয়ে বিস্ময়ে দ্যুতি খানিকটা তোতলালো। বুড়োর মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছেনা। দ্যুতি বুড়োর মুখটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো। খুক্ খুক্ কাশি ঝেড়ে বুড়ো বলল,
‘তোমরা পৃথিবীর মানুষ আমাদের তাই তো বলো। এলিয়েন! নামটা মন্দ নয়।’
আজ ফের এলিয়েনের সঙ্গে দেখা হওয়াটা কেমন কাকতালীয় ব্যাপার মনে হচ্ছে দ্যুতির। এই বুড়োর সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হলো। এই বুড়ো ওকে ডায়মন্ডের ওড়নাটা দিয়েছিল এবং কিছুক্ষণ আগেই ও ইন্টারপোলের পুলিশ অফিসারের সঙ্গে ডায়মন্ড নিয়ে কথা বলেছে। দ্যুতি নিজের ভেতরের বিহবলতা সংযত করার চেষ্টা করছে। ও বলল,
‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো। আমার একটা প্রশ্ন আছে।’
‘জানি প্রশ্ন করবে। তোমার কাছে আমারও প্রশ্ন আছে। আমি প্রশ্ন করতেই তোমার সামনে দৃশ্যমান হয়েছি।’
‘তাই নাকি? বেশ, ভালো। আগে আমি প্রশ্ন করবো।’
‘করো। কী তোমার প্রশ্ন?’
‘আমার যদি শাপমোচন হয়েই থাকে, তবে সেই কবি কোথায়? তার দেখা কী করে পাবো?’
দ্যুতির কথায় মুচকি হাসলো বুড়ো। এমনভাবে ওর দিকে তাকালো যেন দ্যুতি এই প্রশ্নটা করবে, তা সে জানতো। দ্যুতি একটু লজ্জিত হলো প্রশ্নটা করে। বুড়ো বলল,
‘তোমাদের বাংলা ভাষায় একটা গানের লাইন হচ্ছে-হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ!
তোমার প্রশ্ন শুনে গানের কথাটা মনে এলো।’
‘মানে?’
প্রশ্ন করতে গিয়ে ভ্রু কুচকে গেল দ্যুতির। বুড়ো বলল,
‘মানে, বুঝোনি? তোমার চোখ অন্ধ। তাকে দেখেও চিনতে পারছো না।’
ভিড়মি খাবার যোগাড় হলো দ্যুতির। বুড়ো কী বলছে! কে সে? অনিন্দ্য! দ্যুতির বুকের ভেতর ধরাস করে উঠলো। বুড়োর কথা সত্যি হলে অনিন্দ্যের তাহলে পুনর্জন্ম হয়েছে? দ্যুতির ভেতরে কাঁপুনি বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে, ওর মাথা ঘুরছে। ঘোর লাগা অনুভূতিতে ও বলল,
‘অনিন্দ্য তো পুলিশ, কবি নয়!’
‘বোকা মেয়ে। ও আগের জন্মে কবি ছিল। এই জন্মে নাহয় পুলিশ। তাতে কি? ওর ভেতরে কবি সত্ত্বা আছে, কি নেই-তা তো তুমি জানো না।’
কথাটা বলে বুড়ো মিটিমিটি হাসতে লাগলো। দ্যুতি ঠিক কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছে না। প্রবল শিহরণে ওর চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। ওর কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কণ্ঠ থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না। বুড়ো বলল,
‘পেছনে তাকিয়ে দেখো, তোমার কবি আসছে!’
দ্যুতি চট করে পেছনে তাকালো। ও দেখলো সত্যিই অনিন্দ্য লম্বা লম্বা পা ফেলে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ওর ভালো লাগলো। ও ঘুরে তাকিয়ে দেখলো এলিয়েন নেই। আগের মতো আবারো মিলিয়ে গেছে। দ্যুতি এর জন্য আক্ষেপ করলো না। অনিন্দ্য ওর সামনে এসে শঙ্কিত কণ্ঠে বলল,
‘অনেকক্ষণ যাবত দেখছিলাম, আপনি এইখানে দাঁড়িয়ে আছেন! কেন?’
এর জবাবে কিছু না বলে ঘোর লাগা চোখে অনিন্দ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো দ্যুতি। অনিন্দ্য একটু অবাক হলো। ও বলল,
‘আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি? বাড়ি ফিরবেন কীভাবে?’
‘আমি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনার কি?’
কপট রাগের ঝাঁঝ তুলে দ্যুতি কথাটা বলেলও কণ্ঠে একরাশ অভিমান ফুটে উঠলো। অনিন্দ্য হচকিয়ে গেল। ও বলল,
‘আপনার নিরাপত্তার কথা ভাবছি, এই আর কি?’
‘আমার নিরাপত্তা নিয়ে ভাববার তুমি কে?’
দ্যুতির কণ্ঠে ‘তুমি’ সম্বোধন শুনে ভীষণ কেঁপে উঠলো অনিন্দ্য। ও থ’ হয়ে গেল। ওর কেন জানি ইচ্ছে হলো দ্যুতির দু’হাত নিজের দু’হাতের মুঠোয় তুলে নেবে। এটা কি শোভনীয়? দ্বিধা-সঙ্কোচ আর আনন্দে অনিন্দ্য ভাষা হারিয়ে ফেলল দ্যুতির সামনে। দ্যুতি এক পা এগিয়ে ওর খুব কাছাকাছি চলে আসলো। অনিন্দ্যের চোখের চোখ রেখে বলল,
‘আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে?’
‘দেবো।’
আবেশিত গলায় বলল অনিন্দ্য। দ্যুতি বলল,
‘আমি দায়িত্বান কোন পুলিশের সহযোগিতা চাই না।’
‘তাহলে?’
‘তোমার সহযোগিতা চাই, যে জীবনসঙ্গী হয়ে বাকিটা জীবনের পথচলায় পাশে থাকবে। থাকবে পাশে?’
মিষ্টি করে হাসলো অনিন্দ্য। ও বলল,
‘তোমার হাত দুটি ধরতে দেবে?’
‘ধরো, ছাড়বে না কিন্তু!’
‘না, ছাড়বো না। ছাড়ার জন্য হাত ধরছি না।’
এ কথা বলে অনিন্দ্য দ্যুতির দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় ভরে নিল। শীতের রাতের কুয়াশার চেয়ে অনেক অনেক অর্থপূর্ণ জলের দুটি ধারা দ্যুতির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো। এই জলধারার প্রতিটি বিন্দু বৃটেনের রাণীর মুকুটের ডায়মণ্ডের চেয়ে মূল্যবান-ভাবলো অনিন্দ্য।
৪.
ফেরারী
এক.
নায়াগ্রা ফলসের যে স্থান দিয়ে জলের খরস্রোত লাফিয়ে নামছে উপত্যাকায়, এর কাছাকাছি স্থানে দাঁড়িয়ে অপূর্ব ভাবছিলো এতোজল কোথা থেকে আসছে এবং কতটুকু গতিতে উপত্যাকায় লাফিয়ে পড়ছে? নায়াগ্রার জল লাফিয়ে পড়ার সময় ওর মনে হচ্ছিলো শুভ্র রঙের তেজী ঘোড়া ছুটছে উপত্যাকার জলাধারের দিকে। ধাবমান জলস্রোতের পতনের দিকে চেয়ে থেকে অপূর্ব আরো ভাবছিলো ও যদি শুভ্র জলের ধারা হয়ে নেমে যেতে পারতো, কেমন হতো? নায়গ্রার জলপ্রপাতে তীব্র সৌন্দর্যের চেয়ে মাদকতা বেশি। চোখ ফেরানো যায় না। জলপ্রপাত হাতছানি দিয়ে ডাকে। রেলিংয়ে দু’ হাতের কুনই রেখে ঝুঁকে আছে ও। জলপ্রপাতের দিকে তন্ময়ভাবে চেয়ে থেকে অপূর্ব আনমনে নিজের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো,
‘কতফুট উঁচু থেকে এই জলের ধারা নিচে পড়ছে, বলতে পারিস, অপূর্ব?’
‘১৬৭ ফুট উঁচু থেকে।’
একটি মেয়েলী কণ্ঠের জবাব শুনতে পেল অপূর্ব। ও অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরালো। নীলাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলো। ভ্যাবাচেখা খেয়ে ও ঘুরে দাঁড়ালো। নীলার সঙ্গে কখনো দেখা হবে না, এমন কথা ভাবেনি ও। ওর মনে হতো একদিন নীলার সঙ্গে দেখা হয়েও যেতে পারে। কিন্তু নীলার সঙ্গে আজই দেখা হয়ে যাবে-এটা ও ভাবেনি। কল্পনাও করেনি। অথচ ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। তিন বছর পর দেখা হলো নীলার সঙ্গে। নীলার চোখে রাগের আগুন, না অভিমানের মেঘ, নাকি দুটোই সমানভাবে প্রতিফলিত, তা বুঝতে পারলো না ও। নীলার চোখ অপুর্বের চোখে প্রশ্ন হয়ে আছে। প্রশ্নের আড়ালে আরো অনেক কিছু আছে যেন। অভিযোগ, অনুযোগ, অনুরাগ বা ক্ষোভ অথবা ঘৃণা থাকতে পারে। ওর দৃষ্টিতে অনেক কিছু জমে থাকার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল ও। অপূর্বের ফ্যাকাশে মুখের দিকে চোখ স্থির রেখে নীলা প্রশ্ন করলো,
‘মাত্র একটি প্রশ্ন? আর কিছু জানতে চাওনা?’
‘নী-লা, তুমি!’
‘অবাক হচ্ছো? না, অবাক হবার ভান করছো?’
নীলার কণ্ঠে বিদ্রুপ। অপূর্ব ধাতস্ত হবার চেষ্টা করে। ক্ষীণ কণ্ঠে ফের বললো,
‘সত্যিই তুমি!’
‘হ্যাঁ, আমিই সেই নীলা। যাকে তুমি খুব সহজে উপেক্ষা করেছিলে।’
‘উপেক্ষো করেছিলাম?’
নীলার অভিযোগে আহত হয় অপূর্ব। যেদিনটি এমন নৈসার্গিক দৃশ্যের মনোরম পরিবেশে এক রকম আবিষ্টতা ছড়িয়ে পেখম ছড়িয়ে আছে, সেদিন এমন আশ্চর্যময় হয়ে ওঠলো কেনো? ভাবছিল অপূর্ব। অপূর্বের নীরবতায় নীলা হাল ছাড়ে না। ও বললো,
‘আমাকে উপেক্ষা করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভেবেছো, তোমার খুব জয় হয়ে গেছে। তাইনা?’
ধাতস্ত হয়ে আসছে অপূর্ব। নীলার উপস্থিতির ঘোর সহে এসেছে। ওর কথাগুলো শের্ণ ওয়ার্ণের নিক্ষিপ্ত ঘূর্ণিবলের মত লাগছে। ও অপ্রস্তুবোধ করছে। বললো,
‘কী সব জয়-পরাজয়ের কথা বলছো! আমি আবার তোমাকে ছুঁড়ে ফেললাম কবে?’
‘পালিয়ে যাওয়া আর ছুঁড়ে ফেলার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’
‘কী বলছো, আমি পালালাম কবে? বলতে পারো, তোমার বিয়ের দিন থেকে আমি আর তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি। এটাই হতে পারে অপরাধ।’
‘আমার বিয়ের দিন থেকেই তুমি ঢাকা শহর থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলে। কেনো? না, ঢাকাতেই আত্মগোপন করেছিলে?’
এ কথায় বিব্রতবোধ করে অপূর্ব। নীলার সঙ্গে এখানেই সমস্যা বাধে। ওর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই এই সমস্যা। নীলা এমনভাবে কথা বলবে, মনে হবে ওদের মধ্যে গভীর প্রেম চলছে। অথচ ওরা কেউ কাউকে ভালোবাসে না। ওদের মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুত্বের, অথচ নীলা ওর সঙ্গে আচরণ করবে কিশোরী প্রেমিকার মত। নীলার সঙ্গে অপূর্বের যখন পরিচয়, ও তখন একজনের বাগদত্তা। আমেরিকা প্রবাসী কাজিনের সঙ্গে নীলার টেলিফোনে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ওর সঙ্গে পরিচয়। ওদের মধ্যে পরিচয়টা প্রথমে সাদামাটা থাকলেও বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ওর সঙ্গে নীলার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। নীলা ছিল সমাজ বিজ্ঞানের অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। অপূর্ব অর্থনীতিতে মাষ্টার্স পাশ করলেও ক্যাম্পাস ছাড়েনি। ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা মারে। অপূর্বের বন্ধু সাফিনের বোনের ননদ হচ্ছে নীলা। সাফিনের অনুরোধে নীলাকে নোট সংগ্রহ করে দিয়ে সাহায্য করতো অপূর্ব। পরিচয়ের মধ্যে ঘটনার কোন বাহুল্যতা নেই। তবে একদিন কাটাবনের সামনে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিল নীলা। ছিনতাইকারীরা নীলার রিকসা থামিয়ে অস্ত্রের মুখে ওর ব্যানেটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিচ্ছিলো। এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে চড়ে ওই সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো অপূর্ব। ও মোটরসাইকেল থামিয়ে লাফিয়ে নামলো রাস্তায়। ছিনতাইকারীদের মোকাবেলা অপূর্ব আগেও করেছে। অপূর্ব রাস্তায় নামতেই ছিনতাইকারীরা বেবীটেক্সীতে চড়ে চলে যায় দ্রুত। নীলার ব্যাগ রক্ষা করতে পারেনি। নীল খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল। অপূর্ব ওকে এলিফ্যান্ট রোডে কফি রেস্তোরায় নিয়ে গেল। ওকে জোর করে লাঞ্চ করালো। এরপর ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে ওদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়লো। ওদের মধ্যে ‘আপনি’ সম্বোধন পরিণত হলো ‘তুমি’তে। সে থেকে নীলার মধ্যে কেমন একটা পরিবর্তন দেখতে পায় অপূর্ব। কিন্তু যে মেয়েটি অন্যের বাগদত্তা, তার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক করার কথা ঘুণাক্ষরে ভাবেনি ও। এমন নয় যে, নীলাকে ওর ভালো লাগতো না। নীলার মধ্যে শান্ত দীঘির মত সরলতা আছে। ও কোন জটিলতা বোঝে না, কুটিলতাও বোঝে না। ও খুব সহজেই মুগ্ধ হয়ে যায়। নীলা প্রাণবন্ত সবুজ সতেজ এক মেয়ে। ও ভালোবাসার মত পবিত্র, নির্ভর করার মত বিশ্বস্ত এবং জীবনসঙ্গী করার মত মানবিক এক নারী। কিন্তু ও একজনের বাগদত্তা। নীলা অপর একজনের কামনায় ও স্বপ্নে জড়িয়ে গেছে। এই বিষয়টি অপূর্বের মনে দাগ কেটে থাকতো। তাই অপূর্ব কখনোই নীলার সঙ্গে ওর সর্ম্পককে অন্যদিকে মোড় নিতে দেয়নি। জটিলতা বুঝেনা বলে সরলতার স্বভাবজাত ব্যাঞ্জনায় নীলা এক সময় এগিয়ে এসেছিল অপূর্বের সামনে। অকপটে বলেছিল নিজের ভালোলাগার কথা। কিন্তু অপূর্ব সাড়া দেয়নি। ফলে নীলার ভালোলাগা ভালোবাসায় প্রস্ফূটিত হয়েছিল কিনা, জানে না অপূর্ব। তবে একটা রেখাপাত যে সৃষ্টি হয়েছিল, তা বুঝতে পেরেছিল। নীলার ভালোলাগায় সাড়া না দেয়ার কষ্ট কি অপূর্বের নেই? আজ এতোদিন পর নীলার প্রশ্নের সামনে নিজেই যেন চাপা বেদনায় হতবিহবাল হয়ে গেল ও। অপূর্বের চুপসে থাকার অভিব্যক্তি যাই হোক, ওর চোখ দুটি ছলছল করছে। তা দেখে নীলা একটু কোমল হলো। বললো,
‘এভাবে তাকিয়ে থাকলেই হবে। জবাব দাও।’
এ কথায় না হেসে পারলো না অপূর্ব। মেয়েরা কখনো পাহাড় হতে পারে না। ওরা নদীর মত। নায়াগ্রার জলপ্রপাতের মত উচ্ছ্বল। ও বললো,
‘এখন সত্যি কথাটি বলছি। তোমার বিয়ের দিন পালিয়ে গিয়েছিলাম। দেখো, তোমার কাছ থেকে পালাতে চাই। কিন্তু পারি কোথায়? এই যে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেল।’
এ কথায় নরোম জ্যোৎস্নার মত গলে পড়লো নীলা। বললো,
‘তুমি অনেক কঠিন মনের মানুষ, জানি। কিন্তু এতোটা নিষ্ঠুর, তা কখনো কল্পনাও করিনি।’
‘কেন এ কথা বললে?’
‘তুমি নিউইয়র্কে এসেছো। অথচ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করোনি!’
নীলার অভিযোগ এক শ’ ভাগ সত্য। অপূর্ব জানে নীলা এই শহরে থাকে। কিন্তু ওর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছাটাকে দমন করেছে ও। নীলার সাজানো সংসারে ও ঝড় হতে চায় না। তিনবছর পর নীলাকে বিব্রত করতে চায়নি ও। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে নায়াগ্রায় দেখা হয়ে গেল ওর সঙ্গে। অপূর্ব বললো,
‘এই শহরের কোথায় তোমাকে খুঁজবো বলো। আমি তোমার ঠিকানা জানিনা। শুধু জানতাম, তুমি নিউইয়র্কে থাকো, ব্যাস। কিন্তু আমি যে নিউইয়র্কে এসেছি, তুমি জানলে কী করে?’
‘তোমার খবর কার কাছ থেকে পাবো? নায়াগ্রায় এসেছি বেড়াতে। এখানে তোমাকে দেখে চমকে উঠলাম। কিছুক্ষণ অনুসরণ করলাম তোমাকে। প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিলো না। তোমার কণ্ঠ শুনে নিশ্চিত হলাম।’
‘ও মাই গড! হোয়টস এ সারপ্রাইজড!’
‘ইয়েস, গ্রেট সারপ্রাইজ ফর মি!’
উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নীলা জানতে চাইলো,
‘তুমি নিউইয়র্কে কবে এসেছো? কোথায় উঠেছো? কীভাবে এলে?’
‘আস্তে, আস্তে! বলছি। ডিভি পেয়ে গত মাসে নিউইয়র্ক এসেছি।’
‘রিয়েলি! ও মাই গড!’
‘ভাবছি থাকবো কিনা। অর্থ-বিত্ত-প্রাচুর্যের এই দেশটি আমার ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, দেয়ালবিহীন এক কারাগার। আমি এই কয়দিনেই হাঁপিয়ে উঠেছি।’
‘কী যে বলো। আর কয়েকদিন থাকো। দেখো, ভালো লেগে যাবে। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ-তাই এমন লাগছে। কোথায় উঠেছো?’
‘কুইন্সে, জ্যামাইকায় আমার এক বন্ধু থাকে। ওর ওখানেই আপাতত উঠেছি। তুমি?’
‘আমি নিউজার্সী থাকি। আটলান্টিক সিটিতে।’
‘জুয়ার শহরে?’
‘হ্যাঁ। গিয়েছো, কখনো?’
‘না। তা, তোমার স্বামী কী করেন?’
প্রশ্নটা করতেই অপূর্বের বুকের ভেতরটা ‘ধরাস ধরাস’ করতে লাগলো। নীলার স্বামীর কথা জানতে গিয়ে ও কেমন বিষণ্নতা অনুভব করছে। নীলা এর কোন জবাব দিলো না। বললো,
‘আমার কথা বাদ দাও। তুমি বিয়ে করোনি?’
অপূর্ব হাসলো। এই হাসির মধ্যে জবাব রয়েছে। ও বললো,
‘তোমার বিয়ের দিন প্রথম অনুভব করি যে, তোমাকে আমি পছন্দ করতাম।’
নীলা কাতর চোখে চেয়ে রইলো অপূর্বের দিকে। অপূর্ব এ কি বলছে! অপূর্ব একটু দম নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বললো,
‘আজ বলতে দ্বিধা নেই, তোমাকে আমার ভালো লাগতো। তোমার বিয়েরদিন এটা অনুভব করি। সেদিন আর আমার হাতে সময় ছিল না। তোমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে সেদিন। তোমার বিয়ে ঠেকাতে পারবো না বলে আমি ঐদিনই নিরুদ্দেশ হলাম। অনেকগুলো দিন গ্রামে-গ্রামে ঘুরে বেড়ালাম-অকারণে। এক সময় মনে হলো, এভাবে আর কতদিন? ফিরে এলাম শহরে। একটা চাকরি জুটিয়ে নিলাম। তাতেও ভালো লাগছিল না। কোনরকম কাটছিল জীবন। যে জীবনের স্বপ্ন ফেরারী হয়ে যায়, তার বেঁচে থাকার মধ্যে আনন্দ কোথায়, বলো? আনন্দহীন ও বৈচিত্রহীন যাপনের একগুঁয়েমীতায় বোর হয়ে গিয়েছিলাম। কী মনে করে ডিভি লটারী পূরণ করলাম। পেয়েও গেলাম। চলেও এলাম। এই দেখো তোমার সঙ্গে দেখাও হয়ে গেল..।
এ পর্যন্ত বলে থামলো অপূর্ব। এরপর নীলার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। ঘুরে দাঁড়াতেই ও দেখলো নীলার দু’চোখ থেকে জলের দুটি ধারা গড়িয়ে পড়ছে। নায়াগ্রার জলপ্রপাতের চেয়ে ঢের শিল্পময় ও অর্থপূর্ণ কান্নার অবিরল ধারা। এমন দৃশ্যের আশা করেনি ও। অপূর্ব হচকিয়ে গেল। নীলা মাথা অবনত করে ফেললো। ওর শরীর কাঁপছে। অপূর্ব এক পা এগিয়ে এসে নীলাকে স্পর্শ করলো। এভাবে নীলাকে ও কখনো স্পর্শ করেনি। অঝোর কান্নার ঢেউ তুলে নীলা আছড়ে পড়লো অপূর্বের বুকে। এ ধরনের ঘটনার জন্য অপূর্ব একেবারেই প্র¯ত্তুত ছিল না। নীলা কখনোই অপূর্বের কাছে এভাবে ভেঙে পড়েনি বা সমর্পিত হয়নি। এই সমর্পণের কোন নাম নেই। এর নাম হতে পারে ‘পবিত্রতার অনিবার্য আশ্রয়’-মনে মনে ভাবলো অপূর্ব। এই মুহুর্তে ওর মনে হলো নীলা যেন নায়াগ্রা ফলসের ১৬৭ ফুট উঁচু থেকে লাফিয়ে নামা সৌন্দর্য মন্ডিত জলধারা, আর অপূর্ব জলধারাকে ধারন করার উপত্যাকা।
দুই.
নীলার ফোনে কোন সংযোগ নেই। ফোন করলেই বলা হচ্ছে ফোন ডিসকানেক্টেড। ভীষণ বিস্মিত হলো অপূর্ব। সে সঙ্গে হতাশায়ও ডুবে গেল ও। নায়াগ্রা ফলসে নীলার সঙ্গে দেখার হবার পর থেকে ওর মনটা হালকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আবার কেমন বিবর্ণ হয়ে গেল। নীলা ওকে ফোন নম্বর দিয়েছে, অথচ ফোন কাজ করছে না। এমন কেন হলো? কাল নীলার সঙ্গে দেখা হবার ঘটনাটা একটু ভেবে দেখলো ও। কাল নীলার একটা আচরণ কেমন বিটঘুটে লেগেছিল। ও অপূর্বকে একবারও ওর বাড়ি যেতে বলেনি। হয়তো স্বামীর সঙ্গে অপূর্বকে পরিচয় করিয়ে দিতে চায় না। ওর স্বামী সম্পর্কে কিছুই বলেনি নীলা। অপূর্ব ওর স্বামী সম্পর্কে কয়েকবার প্রশ্ন করেছিল। নীলা এ প্রসঙ্গে কোন জবাব দেয়নি। প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে। বিষয়টা কেমন খটকা লেগেছিল। নায়াগ্রা ফলসে নীলার সঙ্গে ওর স্বামীকে দেখেনি-এটা স্বাভাবিক মনে হয়েছে ওর। এখানকার ব্যস্ত জীবন যাপনে এ রকম হতেই পারে। নীলা ওর খালা-খালুর সঙ্গে নায়গ্রা ফলস দেখতে গিয়েছিলো। ওর সঙ্গে অপূর্বের যখন দখা হয়, তখন ওর খালা-খালু ১৬৭ ফুট নিচ থেকে উপত্যাকার জলাধারে শিপে চড়ে ফলসটাকে দেখছিল। পরে ওর খালা-খালুর উপরে উঠে এলে ওর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। নায়াগ্রায় ওরা বিকেল পর্যন্ত ছিল। নীলা ও ওর খালা-খালু নায়াগ্রায় এসেছিলেন নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে। অপূর্ব নায়াগ্রায় গিয়েছিল বাসে চড়ে। নীলা অপূর্বকে নিউইয়র্কে নামিয়ে দেবার কথা বলেছিল। অপূর্ব রাজী হয়নি। ও বাসে চড়েই নিউইয়র্ক শহরে ফিরে এলো। এতোদিন পর নীলার দেখা পেয়ে এক ধরনের তন্ময়তা ওর মনে কাজ করছিল। বিদায় বেলায় নীলা অপূর্বকে কোথায় থাকে বলেনি। ওর মুথ কেমন থমথমে ছিল। অপূর্ব মনে কিছু করলো না। যে মেয়েটিকে হরহামেশা উপক্ষো করেছে ও, আজ ওর কাছ থেকে উপেক্ষার মৃদু আঘাতে কষ্ট পেতে নেই। অপূর্ব যেচেই বলেছিলো,
‘নীলা তোমাদের বাড়ি যেতে চাইলে কীভাবে যাবো? তোমার বাড়ি গেলে কি বিরক্ত হবে?’
এই প্রশ্নে খুব লজ্জা পেয়েছে এমন ভাব ফুটিয়ে তুলে নীলা বললো,
‘ওহ্! সরি, সরি! তোমাকে তো আমাদের ঠিকানাই দেয়া হয়নি।’
এ পর্যন্ত বলে নীলা ব্যানেটি ব্যাগ হাতরিয়ে কাগজ-কলম খুঁজতে লাগলো। ও কাগজ-কলম খুঁজে পেল না। হতাশ হয়ে ম্লান হাসিমুখে নীলা অপূর্বের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘তুমি আমার সেলফোন নম্বরটি এখন রেখে দাও। বাড়িতে আসার আগে ফোন করো, তখন ঠিকানা বলে দেব।’
অপূর্ব দ্বিধান্বিতভাবে নীলার সেলফোনের নম্বর নিজের সেলফোনে অন্তর্ভূক্ত করে নিয়েছিল। ও নিজের সেলফোন নম্বরও নীলাকে দেয়। নীলা ওকে একবারও ফোন করেনি। কিন্তু ও যখন ফোন করে নীলার ফোন নম্বরটি ডিসকানেক্টেড জানতে পারলো, তখন ভীষণ অবাক হলো। এমনটা আশা করেনি ও। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যে নীলা এক সময় অবদমিত ভালোবাসায় ব্যাকুল হয়ে অপূর্বের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে ছিল নতজানু, আজ সেই নীলা তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ না রাখতে চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে। অপূর্বকে কি ও ভয় পাচ্ছে? নাকি এক সময়ের উপেক্ষার জবাব দিচ্ছে অবজ্ঞা প্রকাশ করে? প্রশ্নগুলো অপূর্বকে একরাশ বিষণ্নতায় ডুবিয়ে দেয়। একটা পুরানো কথা মনে পড়ে গেল অপূর্বের। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে পাবলিক লাইব্রেরীতে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হচ্ছিলো। একদিন নীলা ওর কাছে এসে আবদার করলো ওর সঙ্গে ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতার ‘লাল দরোজা’ ছবিটা দেখতে চায়। অনুরোধের এক পর্যায়ে অপূর্ব রাজীও হয়েছিল। সময় দিয়েছিল নীলাকে। কিন্তু অপূর্ব যায়নি। নীলা দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাবলিক লাইব্রেরীর গেটে দাঁড়িয়েছিল। অপূর্ব গুলশানে গিয়ে একটা কাজে আটকে গিয়েছিল। ও বেমালুম ভুলে গিয়েছিল নীলার সঙ্গে ছবি দেখার প্রতিশ্রুতির কথা। নীলা ভীষণ মনকষ্টে বাড়ি ফিরলো সেদিন। পরেদিন অপরাধীর মত অপূর্ব হাজির হলো নীলাদের বাড়িতে। এটাই ছিল অপূর্বের প্রথম নীলাদের বাড়ি যাওয়া। অপূর্বকে দেখে নীলা এতোই খুশি হলো যে, ও নীলার সরলতায় মুগ্ধ না হয়ে পারলো না। একদিন আগে পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট এবং লজ্জার কথা তুললো না অপূর্বের কাছে। সেদিনের অপমানের শোধ নিতে কি নীলা ভুল ফোন নম্বর দিয়েছে ওকে? ভাবলো অপূর্ব। ও মনে করার চেষ্টা করলো কাল নায়াগ্রা ফলসে নীলা ওর সঙ্গে কী কী অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। নীলা যখন ওর বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল, তখন অপূর্ব ওর মাথায় হাত রেখেছিল। নীলা তখন থরথর করে কেঁপে দু’ হাত দিয়ে অপূর্বকে জড়িয়ে ধরেছিল। অপূর্বের মনে হচ্ছিলো বড় বড় ঢেউয়ে এক অশান্ত সাগর আছড়ে পড়ছে ওর উপর। নীলা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। নীলার সঙ্গে এমন নিবিড় স্পর্শ হয়নি অপূর্বের। নীলা কখনো এমনভাবে অপূর্বের বুকে মুখ রাখেনি, তেমনি অপূর্বও কখনো নীলার মাথায় এমনভাবে হাত রাখেনি। নীলার এভাবে জলপ্রপাত হয়ে যাওয়ার অর্থ কী হতে পারে, তা ভেবে দেখেনি অপূর্ব। তাৎক্ষণিকভাবে ওর মনে হয়েছে অনেকদিন পর ওকে দেখে আবেগ সামলাতে পারেনি নীলা। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগছে ওর মনে। খালা-খালুর সঙ্গে দেখা হবার আগ পর্যন্ত নীলা অপূর্বের হাত ধরে হেঁটেছে। ওর হাত ধরে নীলা ঢাকাতেও হাঁটেনি। নায়াগ্রা ফলসের সামনে ফলস দর্শনার্থীদের ভিড় ঠেলে ওরা দু’জন এমনভাবে হেঁটেছে, মনে হবে প্রেমিক-যুগল। অপূর্ব প্রথমে সঙ্কোচবোধ করেছিল। কিন্তু নীলার মধ্যে সঙ্কোচ ছিল না। ওর খালা-খালু আসার পর নীলা যেন আমূল বদলে গেল। আবেগময়ী নারী পরিণত হলো কংক্রীটের মানবীতে। নীলার এই অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে অপূর্ব কাল মাথা ঘামায়নি। আজ মাথা ঘামাচ্ছে। অপূর্বের মনে হলো, নীলা ওর সঙ্গে রহস্য করেছে। ওর দেখা পেয়ে নীলা যে আচরণ করেছে, তা অতিরঞ্জিত। এটা হয়তো ও ইচ্ছে করে করেছে। টেলিফোন নম্বর দিয়ে তা ডিসকানেক্ট করে দিয়ে ওর সঙ্গে তামাশা করেছে। এ কথা মনে হতেই অপূর্বের মনে একটা আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠলো। ওর মনে হলো এখানে কোনো সেলফোনের স্টোরে গিয়ে নীলার নম্বর সার্চ করলে ওর বাড়ির ঠিকানা বের করা অসম্ভব নয়। কাজটি সহজ নয়, কিন্তু খুব কঠিনও নয়। জ্যাকসন হাইটসে রুজভেল্টের ওপর বাঙালী মালিকাধীন বড় একটি সেলফোনের দোকান আছে, নাম ডিজিটাল ওয়ান। এই দোকানের মালিক অপূর্বের পরিচিত। অপূর্ব জ্যামাইকা থেকে জ্যাকসন হাইটসের দিকে ছুটলো। ও ১৬৯ স্ট্রীট দিয়ে হনহন করে ঢুকে গেল হিলসাইডের পাতাল রেলের দিকে।
তিন.
নীলার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটু ভাবলো অপূর্ব। নীলা ওকে দেখে কতটা বিস্মিত হতে পারে, মনে মনে কল্পনা করলো ও। নীলা ওকে নিজের সেলফোন নম্বর দিয়ে পরেরদিন সকালেই ফোনটি ডিসকানেক্ট করে ফেলেছে। কেন এ কাজ করেছে, তা জানে না অপূর্ব। তবে এটা বুঝতে পেরেছে নীলা ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়না। নইলে ফোনলাইন বন্ধ করে দেবে কেনো? কিন্তু নীলা হয়তো জানে না, ফোন লাইন বন্ধ করলেও ওর ঠিকানা বের করা অসম্ভব কিছু নয়। অপূর্ব ডিজিটাল ওয়ানের মালিককে অনুরোধ করে ওর ঠিকানাটা বের করতে পেরেছে। এখন ওর নাটকের পালা। নীলা ওকে বোকা বানিয়েছে। এখন ওকেই বোকা বানাবে ও। এ কথা ভাবনায় পেখম ছড়িয়ে অপূর্ব কলিং বেল টিপলো। ৩০ সেকেন্ডেও দরোজা খুললো না। অপূর্ব আবার কলিং টিপলো। আরেকবার কলিং বেল টিপতে যাচ্ছিলো এমন সময় দরোজা খুলে গেল। দরোজায় নীলার খালা দাঁড়িয়ে অপূর্বকে দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন,
‘আরে, বাবা, তুমি!’
‘জ্বি, খালাম্মা। নীলা আছে?’
এ কথা বলার সময় কেমন নার্ভাস লাগছিল নিজেকে। ওর বুক ঢিবঢিব করছিল। নীরার খালা দরোজা থেকে সরে অপূর্বকে প্রবেশের জায়গা করে দিয়ে বললেন,
‘ভেতরে এসো। ও এখুনি চলে আসবে।’
অপূর্ব দরোজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। লিভিংরুমটি অনেকব বড়। নিউইয়র্কে এমন বড় লিভিংরুম ও দেখেনি। ও একটি সোফায় গিয়ে বসলো। নীলার খালা বললো,
‘তুমি বসো, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি। আর কি খাবে বলো?’
‘নান, না, খালাম্মা, খাবারের জন্য অস্থির হবেন না। আপনি আমাকে শুধু এখন চা দিতে পারেন।’
নীলার খালা চলে গেলেন। অপূর্ব নীলার লিভিংরুমটা চোখ বুলিয়ে নিল। দেয়ালে দুটি পেইন্টিং ও একটি ছবি রয়েছে। ছবিটি নীলার। নীলার এই ছবিটি অপূর্ব তুলেছিল। অপূর্ব মনে পড়লো ও একটি নিক্কন ক্যামেরা কিনেছিল। ঐদিনই ক্যাম্পাসে দেখা হয়ে গেল নীলার সঙ্গে। নীলাকে ডাচ এর সামনে দাঁড় করিয়ে তড়িঘড়ি করে ক্যামেরা তাক করে ক্লিক করেছিল ও। নীলার পেছনে শেষ বিকেলের আভা এমনভাবে ক্যামেরাবন্দি হয়েছিল যে, ছবির মানুষ ও পেছনের দৃশ্য দুটিই পৃথক সৌন্দর্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ তোলা একটি ছবি এতোটা সুন্দর হতে পারে, অপূর্ব ভাবেনি। অনেক সময় এমন হয়ে যায়। ছবিটি পেয়ে নীলা ভীষণ খুশি হয়েছিল। ও মুগ্ধচোখে প্রশ্ন করেছিলো,
‘হঠাৎ করে আমাকে দাঁড় করিয়ে ছবিটি তুললে, অথচ অদ্ভূত সুন্দর ছবি হয়েছে!’
এর জবাবে অপূর্ব বলেছিল,
‘শোন, সুনীল গঙ্গোপধ্যায় এক সংকলন প্রকাশকের চাপে পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকছত্র কবিতার লাইন লিখেছিলেন। সেই কবিতাটি ছাপা হলো। এরপর ঐ কবিতাটিই সুনীল গঙ্গোপধ্যায়কে বেশি পরিচিতি এনে দেয়। কোন কবিতাটি এটি, জানো?
‘না। কি,কোনটি?’
‘কেউ কথা রাখেনি, কবিতাটি।’
‘ওহ্!’ শব্দটি নীলার কণ্ঠ থেকে অস্ফূতভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। অপূর্ব বলেছিল,
‘কখনো কখনো হঠাৎ করে মহান কিছু সৃষ্টি হয়ে যায়। সাধারণও শিল্পময় হয়ে উঠে।’
অপূর্বের তোলা ঐ ছবিটাই নীলাদের লিভিংরুমে শোভা পাচ্ছে। নীলার স্বামী বা সন্তানের কোনো ছবি নেই দেয়ালে বা টেবিলে। নীলার খালা চা নিয়ে এলেন। তার কাছ থেকে চায়ের কাপ নেবার সময় অপূর্ব প্রশ্ন করলো,
‘খালা, নীলার স্বামী কি করেন? তিনি কখোন ফিরবেন?’
এই প্রশ্নে থমকে গেলেন যেন খালা। তিনি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন অপূর্বের মুখের দিকে। অপূর্বের ভেতরে একটা ভয় ঝংকার তুললো। খালার চোখ ছলছল করে উঠলো। তিনি বললেন,
‘নীলার স্বামীর সঙ্গে তো সেই কবেই ডিভোর্স হয়ে গেছে। তোমাকে ও সেদিন কিছু বলেনি?’
কথাটা শুনে ও ভীষণরকম বিব্রত হয়ে গেল। ওর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। ‘নীলার খালা কি বলছেন!’ বিস্ময়ে ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। নীলার খালা গলা নামিয়ে বললেন,
‘নীলা বিয়ের পর তো নিউইয়র্কেই ছিল। নিউইয়র্কে আসার দু’মাস পরই ও জানতে পারে হাবিব আগে একটি বিয়ে করেছিল। সে ঘরে একটি সন্তানও আছে।’
‘স্ট্র্যাঞ্জ! তারপর?’
‘নীলার স্বামী, মানে হাবিব দুঃচরিত্রবান লোক ছিল। নীলার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। কয়েক মাস পরই নীলা হাবিবকে ডিভোর্স দিয়ে আমার কাছে চলে আসে।’
এ পর্যন্ত বলে নীলার খালা বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। যেন তার বুকে পাথর চাপা। অপূর্ব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, এমন সময় দরোজার লক খোলার শব্দ এলো। নীলার খালা বললেন,
‘নীলা এসেছে। তুমি ওর কাছ থেকেই সব কথা শুনে নিও।’
এ কথা বলে তিনি ভেতরের রুমে চলে গেলেন। অপূর্ব এই মুহুর্তে হঠাৎ ঝড়ে বিধ্বস্ত হওয়া হতভম্ব এক মানুষ। ও পাথর চোখে দরোজার দিকে চেয়ে রইলো। নীলা দরোজা খুলে রুমে প্রবেশ করতেই চমকে উঠলো। অপূর্বের মুখে কোন রা নেই। কয়েক মুহুর্তের বিস্ময়। নীলা বিস্মতকণ্ঠে বললো,
‘অপূর্ব, তুমি! কীভাবে এলে? ঠিকানা পেলে কোথায়?’
এ কথা বলে নীলা ওর মুখোমুখি সোফায় বসে পড়লো। অপূর্ব নীলার কোন প্রশ্নের জবাব দিল না। নীলা লজ্জিত গলায় বললো,
‘আমি জানি, আমার প্রতি অনেক রাগ করেছো। আমি যা করেছি, তা ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু, আমি চাইনি, তোমার সাথে আমার আবার দেখা হোক। আই এ্যাম সরি, রিয়েলি, রিয়েলি সরি!’
এরও কোন জবাব দিল না অপূর্ব। অপূর্বের ভেতরে ভাংচুর হচ্ছে। এই ভাংচুরের খবর কি জানে নীলা? অপূর্বের বিষণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে নীলা ফের বললো,
‘কী ব্যাপার, কথা বলবে না?’ বলে নীলা হালাকা হাসার চেষ্টা করলো।
অপূর্ব নিজেকে প্রস্তুত করে নিল। ও কথা বলতে চায়। সিরিয়াস কিছু কথা বলতে চায়। যে কথা বলার জন্য ও প্রস্তুত হচ্ছে, এ কথা নীলাকে বলবে-কিছুক্ষণ আগেও ও ভাবেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অপূর্ব। এরপর বললো,
‘নীলা, তোমার সঙ্গে খুবই জরুরি কিছু কথা বলতে চাই। তুমি কি কথাগুলো শোনার জন্য প্রস্তুত?’
অপূর্বের কণ্ঠ কেমন শোনালো। নীলা একটু গাবড়ে গেল। ও বললো,
‘বলো। মনে হচ্ছে জরুরি কিছু বলবে।’
‘হ্যাঁ, খুবই জরুরি।’
‘বলো। আমি প্রস্তুত। আজকের দিন তোমার। তুমি যা-ই বলবে, আমি শুনবো।’
‘নীলা। একটা সময় ছিল, তোমাকে আমি ফিরিয়ে দিয়েছি। তাই বলে এই নয় যে, তোমাকে ভালোবাসিনি। তুমি একজনের বাগদত্তা ছিলে বলে আমি নিজেকে সংযত রেখেছিলাম। কারো কামনার নারীকে মাঝপথে এসে নিজের করে নেয়াকে নিজের মনই সমর্থন দেয়নি।’
‘এতোদিন পর এ সব কথা কোনো বলছো?’
‘তুমি কোনো কথা বলো না। শুধু শুনে যাও। তোমার বিয়ের দিন প্রথম উপলব্ধি করি যে, তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু আমার সামনে কোনো পথ খোলা ছিল না। আমি মনের চাপা বেদনাকে সঙ্গী করে নিরুদ্দেশ হই। এ কথা তোমাকে বলেছি।’
‘হ্যাঁ, আজ আবার কেনো পুরানো কথা তুলছো?’
‘আজ আমি তোমাকে অন্য কথা বলতে চাই।’
‘বলো, কী কথা বলতে চাও।’
অপূর্ব একটু সময় নিল। ও একটু ঝুঁকে এলো নীলার দিকে। নীলার চোখে চোখ রেখে বললো,
‘নীলা, আমাকে বিয়ে করবে?’
প্রশ্নটা প্রথমে যেন শুনতেই পেল না নীলা। বা শুনতে পেলেও তা যেন বুঝতে পারলো না। ও হা করে তাকিয়ে রইলো অপূর্বের দিকে। অনেকক্ষণ ওর মুখে কোনো কথাই ফুটলো না। অপূর্ব ফের বললো,
‘নীলা, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। করবে?’
নীলা কি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলবে? অন্য সময় হলে ও তাই করতো। ও বললো,
‘অপূর্ব, তুমি আমার সব কথা জানো না। তাই..’
‘অনেকটাই জেনে গেছি। স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছো, এইতো?
‘এ কথা জেনেও বিয়ে করতে চাইছো?
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু অপূর্ব, আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না।’
‘কেনো?’
‘অপূর্ব, একটা সময় ছিল, আমি তোমার কাছে ছুটে গিয়েছি। তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো আমাকে। আমার বিয়েরদিনও শেষ চেষ্টা হিসাবে তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তুমি তখন কাপুরুষের মত পালিয়ে গিয়েছিলে। তুমি আমাকে ভালোবাসা দাওনি, দিতে চাওনি। কেবল ফিরিয়ে দিয়েছো। আজ তোমার করুণা নিতে পারবো না। ভালোবাসা আর করুণার মধ্যে অনেক ফারাক, অপূর্ব!’
এ কথা শেষ করতেই একটা কান্না উঠে এসেছিল নীলার কণ্ঠ অব্দি। ও কান্না সামলে নিল। এই মুহুর্তে ও অপুর্বের সামনে কাঁদতে চায়না। অপূর্ব বললো,
‘ভালোবাসার ওপরে ‘মোহ’ নামে একটা মোড়ক থাকে, জানো? এই মোড়ক আমরা দেখতে পাইনা। আর করুণা ভালোবাসার ভেতরের একটা প্রবাহমান নদী। মোহগ্রস্থ ভালোবাসার চেয়ে করুণা সিক্ত ভালোবাসার আবেদন অনেক বেশি। তারপরও বলছি, তোমার প্রতি করুণা প্রকাশের দীনতা আমার নেই। তোমাকে উপেক্ষা করার মত ব্যক্তিত্বও আমার ছিল না। উপেক্ষার নামে আমি শুধু তোমার কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেছি মাত্র। এই স্বপ্নের দেশে এসে যখন তোমার সঙ্গে দেখা হলো আমি কোনো স্বপ্ন প্রদ্বীপ জ্বালাইনি। কিন্তু আজ যখন জানালাম, তোমার জীবনের বিপর্যয়ের কথা, তখন ভেঙে-চূড়মার হয়ে গেলাম।’
‘এটাই তো করুণা।’
‘দয়া পরবশতঃ করুণা আর জীবনের ছন্দ ফিরে পেতে করুণা এক নয়। যে করুণা ভালোবাসার খরস্রোতে দুটি জীবনকে ভাসিয়ে দিতে পারে, যে করুণা ঝরা পাপড়ির পতনের স্বরলিপি বদলে দিয়ে দুটি ফুলকে একবৃন্তে গেঁথে দিতে পারে-এর মহিমাকে অস্বীকার করবে তুমি? ‘করুণা-করুণা’ বলে জীবনের অপূর্ণতাকেই মেনে নেবে?’
‘অপূর্ব, প্লিজ!’
‘শুধু করুণা দেখো, ভালোবাসা দেখো না?’
নীলা নিজের দু’কানে দু’হাতের তালুতে চেপে ধরলো। ও অপূর্বের কথা শুনতে চায় না। অপূর্ব আর কিছু বললো না। মুহুর্তগুলো গুমোট হয়ে পার হচ্ছে। নীলা কাঁদছে। ওর চোখে নায়াগ্রার জলপ্রপাত। অপূর্ব ভাবছিল আর কী বলা যায়। নীলার কান্নার সামনে ও বিব্রতবোধ করছে। অপূর্ব জানে, ভেতরের রুম থেকে নীলার খালা ওদের সবকথা শুনছেন। এমন পরিস্থিতিতে আর কী বলা যায়, তা ও ভেবে পেল না। ও হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। নীলার উদ্দেশ্যে বললো,
‘নীলা, জানিনা, আমি তোমার যোগ্য কিনা। তবে কেউ কোনদিন আমার চেয়ে বেশি তোমাকে ভালোবাসতে পারবে না।’
‘অপূর্ব, প্লিজ! আমি সহ্য করতে পারছি না।’
ককিয়ে ওঠে নীলা। অপূর্ব বললো,
‘আমি চলে যাচ্ছি। আমার ফোন নম্বর তো জানোই। তুমি একটু ভাবো। যদি ফোন করো, আমি ফিরে আসবো। আর যদি ফোন না করো, ধরে নেব, করুণা ভেবে ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিয়েছো। আমি কখনোই আর তোমার সামনে আসবো না।’
এ কথা বলে অপূর্ব দরোজার দিকে এগিয়ে গেল। নীলা ওকে বাধা দিল না। ও থ’ হয়ে বসে আছে। অপূর্ব পেছনে তাকালো না। ও বেরিয়ে এলো নীলাদের বাড়ি থেকে। ওর ভেতরে কান্নার ঝড় বইছে। এতো কান্না কোথায় ছিল কে জানে! ও নিজেকে সামলাতে পারছে না। অপূর্ব জানে, ওর ফেরারী স্বপ্নটা আজ নীলার হাতে তুলে দিয়ে এলো। নীলা ওর স্বপ্নটাকে বন্দি করতে পারে, আবার ফেরারী করেও দিতে পারে। ওর স্বপ্ন যেমন ফেরারী, ওর জীবনটাও ফেরারী। শুধু কষ্টগুলো ফেরারী হয়না। নীলা ওকে ফোন করবে-নতুন এই স্বপ্নের ঘোরে ও হনহন করে হাঁটতে লাগলো। নিউইয়র্কগামী বাস ধরতে হবে ওকে। হাঁটতে হাঁটতে বাস স্টপিজের সামনে চলে এলো ও। নীলার ফোন এলো না। তবু নীলা ওকে ফোন করবে-এমন স্বপ্ন পেখম ছড়িয়ে রইলো ওর মনের উঠোনে।
৫.
রহস্য
মেয়েটি রোমেলের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলো, যেন রোমেল ওকে চিনতে পারছে না এটা ভীষণ হাস্যকর একটা ব্যাপার। অথচ রোমেল মেয়েটিকে সত্যিই চেনে না। কোনদিন ওকে দেখেনি। কিন্তু মেয়েটি ওর পথ আটকে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কথা বলছে যেন রোমেলের সঙ্গে ওর গভীর এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একটা ব্যাপার রোমেলকে তৎক্ষণিকভাবে ভীষণ ভাবনায় ফেলে দিয়েছে, তা হলো মেয়েটি ওর নাম ধরে কথা বলছে। মেয়েটি ওর নাম কী করে জানলো, এটি ও ভেবে পাচ্ছে না।। রোমেল হচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটির সামনে। মেয়েটি এক সময় হাসি থামিয়ে রোমেলের ডান হাতের কব্জি ওর দু’ হাতের মুঠোবন্দি করে নিল। রোমেল বিব্রত হলেও ওকে বাধা দিতে পারলো না। অন্যরকম এক শিহরণ রোমেলের ইন্দ্রিয়ে ছড়িয়ে পড়লো সঙ্গেসঙ্গেই। অন্য কোন সময় হলে রোমেল হয়তো এর জন্য রেগে যেত। মেয়েদের এ ধরনের হ্যাংলামো ও একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হচ্ছে, অপরিচিত মেয়েটি ওর হাত ধরে আছে, আর ও কিছুই বলতে পারছে না। শুধু তাই নয়, মেয়েটি ওর হাত ধরে আছে, এটা ওর ভালো লাগছে। এ রকম রোমেলের কখনো হয়নি। বাংলা ব্যাকরণে ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ শব্দের অর্থ ওকে অনেকদিন মুখস্থ করতে হয়েছে। এই শব্দ দিয়ে বাক্য গঠনও করতে হয়েছে পরীক্ষায় খাতায়। সে অনেকদিন আগের কথা। নিজের জীবনে এই শব্দের প্রয়োগ বা প্রয়োজনীয়তা ওর কখনো হয়নি। কিন্তু এই মুহুর্তে অচেনা মেয়েটির সামনে ও আপাদমস্তক কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে আছে। মেয়েটি এবার সিরিয়াস হবার ভান করে বললো,
‘রোমেল, তুমি কি আমাকে সত্যিই চিনতে পারছো না!’
রোমেল একটু ধাতস্ত হলো। ও ক্ষীণ কণ্ঠে বললো,
‘বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে সত্যিই চিনতে পারছি না।’
‘সত্যি!’
‘হ্যাঁ, সত্যি!’
‘তাহলে আপনি রোমেল নন!’
এ কথা বলেই মেয়েটি রোমেলের হাত ঝট করে ছেড়ে দিল। হঠাৎ মেয়েটি লজ্জিত হলো। রোমেল বললো,
‘কিন্তু আমি রোমেল। আপনি মনে হয়, অন্য কোন রোমেলকে খুঁজছেন?’
মেয়েটি ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। মেয়েটির দৃষ্টি এতোটা শানিত যে, রোমেলের মনে হচ্ছে ওর ভেতরের সবটুকু পড়ে নিতে চাইছে। ও বললো,
‘আপনি কোন রোমেলকে খুঁজছেন? সে কি হারিয়ে গেছে?’
মেয়েটি কোন জবাব দিল না। ও রোমেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। রোমেলের অস্বস্থি হতে লাগলো। অন্য সময় হলে রোমেল আর কিছু না বলে হনহন করে একদিকে হাঁটা শুরু করতো। কিন্তু এখন ও এক পা-ও নড়তে পারছে না। চলে যেতে মনও সায় দিচ্ছে না। মানুষের জীবনে এমন ঘোর লাগা বৈপরীত সময় হয়তো আসে। রোমেল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো। তবে ওর দৃষ্টি স্বচ্ছ। ভাগ্যিস, জাতীয় জাদুঘরের সামনের ফাঁকা ফুটপাতে ওরা দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভরদুপুরের ফুটপাতে এক জোড়া তরুণ-তরুণী পরস্পর পরস্পরের দিকে বিহবল হয়ে তাকিয়ে আছে, এ ধরনের দৃশ্য দেখে পথচারীদের কৌতুহল বা বিরক্তি সৃষ্টি হবার কথা নয়। অন্য সময় বা অন্য কোথাও হলে না হয় বিষয়টা লজ্জাষ্কর হয়ে দাঁড়াতো। এ কথা ভেবে রোমেল একটু স্বস্থি পেল। কতগুলো মুহুর্ত ফুরিয়েছে কে জানে! এক সময় মেয়েটি বললো,
‘তুমি মিথ্যা বলছো, রোমেল!’
‘না, বিশ্বাস করুন, আমি অপনাকে চিনি না। কখনোই দেখেনি। হলফ করে বলছি।
‘না, আমি জানি, তুমিই আমার হারিয়ে যাওয়া রোমেল!’
‘আমি হাত জোড় করে বলছি, আপনি ভুল করছেন! আচ্ছা, আপনি বলুন তো, আপনি কে?’
এ কথায় মৃদু হাসার চেষ্টা করলো মেয়েটি। ও রোমেলের চোখে চোখ রেখে বললো,
‘আমি রিয়া! মনে করে দেখ, তোমার রিয়া তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যে রিয়াকে নিয়ে তুমি সারাদিন গান বাধতে, গান গাইতে, সেই রিয়া। যে রিয়াকে একদিন না দেখলে ব্যাকুল হয়ে যেতে, ছটফট করতে, সেই রিয়া আমি! ভুলে গেছো?’
এবার ভীষণ হতাশ হলো রোমেল। ও বুঝতে পারলো কোথায় একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে। রিয়া হয়তো রোমেলের মতো কাউকে খুঁজছে। রিয়ার হারানো রোমেলের সঙ্গে ওর হয়তো অদ্ভূত মিল আছে। গল্প-সিনেমায় এমন অনেক দেখা যায়। এ কথা ওর নিজের কাছে স্পষ্ট হতেই ও নিজেকে সামলে নিতে পারছে। রোমেল রিয়ার উদ্দেশে শান্ত গলায় বললো,
‘রিয়া, এবার বলুন, আপনি কোথায় থাকেন?’
এ কথায় মিষ্টি করে হাসলো রিয়া। বললো,
‘তুমি বাংলাদেশে এসে বুঝি ইন্দেনেশিয়ার কথা ভুলে গেছো! সিংগাপুরের কথাও কি ভুলে গেছো!’
রোমেল রসিকতার মত করে বললো,
‘হ্যাঁ, ভুলে গেছি। তুমি মনে করিয়ে দাও তো!’
‘ঠিক আছে, দিচ্ছি। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় সিংগাপুরে। তুমি পড়তে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ আর আমি মার্কেটিং-এ। দু’জনে একই কলেছের স্টুডেন্ট ছিলাম। মনে পড়ছে?’
রোমেল মনে মনে বললো ‘আমি পড়ছি কম্পিটার সাইন্স। আর কোথায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং! জীবনে একবার দার্জিলিং গিয়েছিলাম। বিদেশ বলতে এই! আর তুমি করছো সিংগাপুর, ইন্দেনেশিয়ার গল্প! এ কথা মনে মনে বললেও মুখে ও বললো,
‘তারপর?’
‘আমার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে আমরা স্যাটেলড হবো কুয়ালামপুরে, আর তোমার স্বপ্ন ছিল স্যাটলড হবে জাকার্তায়। এ নিয়ে আমাদের অনেক তর্ক-ঝগড়া হতো।’
‘আমি জাকার্তা পছন্দ করতাম কেন?’
‘কারণ, সমুদ্র তোমার খুব প্রিয়। তোমার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে তাসমন সমুদ্র। ইন্দেনেশিয়ার বালি দ্বীপ হচ্ছে তোমার সবচে’ প্রিয় স্থান, মনে পড়ছে ও সব?
‘অচ্ছা, আচ্ছা! তারপর?’
‘তারপর কী? তোমারই জয় হলো। আমাদের লেখাপড়া শেষ হলো। তুমি বললে দেশে ফেরার আগে বিয়েটা করতে চাও জার্কাতায়। আমি সানন্দে রাজী হলাম। আমরা বিয়ে করলাম এবং ঐ দিনই চলে গেলাম বালি দ্বীপে। মনে পড়ছে?
‘তারপর?’
‘তার আর পর কি? তারপর তো হারানোর কথা, বেদনার কথা! অথৈ জলে ডুবে যাবার কষ্টের কথা!’
এ পর্যন্ত বলে রিয়া কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল। ওর চোখের কোণে মুহুর্তেই মেঘ জমে গেল। মনে হচ্ছিলো এখুনি টলমল করে অশ্রুফোঁটা ঝরে পড়বে। রোমেল তাড়াতাড়ি বললো,
‘থাক, থাক, আর বলতে হবে না। আমার মনে পড়ছে! সব মনে পড়ছে! ’
রিয়ার চোখের দৃষ্টি জ্বল জ্বল করে ওঠলো। ও আবার রোমেলের দু’ হাত ধরলো। রোমেল বাধা দিল না। রোমেল ভাবতে লাগলো রিয়া যদি অপ্রকৃতিস্থও হয়, এই মুহুর্তে ওর বেদনার গল্প উপেক্ষা করা যায় না। বরং স্পর্শ করটাই মহানুভবতা। রোমেল যে রহস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, তা থেকে বের হতে পারবে কিনা-সেটা এই মুহুর্তে ও মাথায় নিতে চায় না। ও রিয়ার দু’ হাত মুঠোবন্দি করে আন্তরিক স্পর্শের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে বললো,
‘আমাকে খুঁজতে কি তুমি জাকার্তা থেকে ঢাকায় চলে এসেছো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! সেই কতদিন থেকে তোমাকে এই শহরে খুঁজছি!’
‘ঠিক আছে, আমাকে তো পেয়ে গেছো। এবার তুমি বাড়ি যাও। আমি তোমাদের বাড়ি যেয়ে দেখা করে আসবো।’
‘না, না! তোমাকে ছাড়া আমি বাড়ি যাবো না। কিছুতেই না!’
এ কথা বলে রিয়া রোমেলকে জড়িয়ে ধরলো। এবার ভড়কে গেল রোমেল। ও রিয়ার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে অনেক কষ্টে ছাড়িয়ে নিয়ে নরোম গলায় বললো,
‘লক্ষ্মীটি! তুমি বাড়ি যাও। আমি সত্যিই আসবো। আমার কাজ আছে। কাজ শেষ হলেই চলে আসবো। কথা দিচ্ছি।’
‘না, না। তুমি আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে আমি আর হারাতে চাই না।’
‘কথা দিচ্ছি, আমি আর হারাবো না।’
‘না, যদি আবার সুনামী আসে!’
‘না,না। এটা বাংলাদেশ। এখানে সুনামী আসবে কেন? তুমি কী আমাকে বিশ্বাস করো না?’
‘করি।’
‘তাহলে আমার কথা শোন। শোনবে তো?’
রিয়া মাথা নাড়িয়ে জানালো ও রোমেলের কথা শোনবে। রোমেল রিয়ার মনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে ভেবে ওর ভাল লাগছে। ও বললো,
‘তুমি এখন সোজা বাড়ি চলে যাবে। ঠিক আছে? আমি রাতে তোমাদের বাড়ি যাবো। কথা দিচ্ছি।’
রিয়া মাথা নেড়ে জানালো রোমেলের প্রস্তাবে ও রাজী আছে। রোমেল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। রিয়া চলে যাবার সময় রোমেলকে ওদের বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে দিয়ে যেতে ভুল করলো না। রোমেল একটা সিএনজি ডেকে রিয়াকে তুলে দিল। যাবার সময় রিয়া এমনভাবে হাসলো যেন রোমেলকে অকপটে বিশ্বাস করার মধ্যে গভীর আনন্দ আছে।
অবিশ্বাস্য হলেও রোমেলের সামনে আবার এক রহস্য এসে দাঁড়ালো। আলেয়ার মত দিক ভ্রান্ত করা, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া করোজ্জ্বল রহস্য! প্রকৃতি কখনো কখনো এমন কিছু রহস্য তৈরি করে, যা উন্মোচন করা অসাধ্য। কোন কোন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি খেলা করতে পছন্দ করে। মানব জন্ম থেকে মানব সভ্যতার এই প্রান্ত পর্যন্ত মহাকালের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির রহস্যের শিকার হয়েছে অনেকে। এবং মানুষ আগামীতেও বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির রহস্যের শিকার হতে পারে-এ কথা বিনা বাক্যে স্বীকার করবে ধর্মান্ধ থেকে বিজ্ঞান মনষ্ক সকলে। রোমেল তাই মনে করে। ওর সঙ্গে প্রকৃতি ভীষণরকম রহস্য করেছে। এটাকে ঠিক ‘রহস্য’ না বলে ‘রহস্যময় পরিহাস’ বলাই ভালো। মাঝেমাঝে ওর মনে হয় প্রকৃতি ওর সঙ্গে ইনজাষ্টিজ করেছে। প্রকৃতির রহস্যের জন্য অকারণে গভীর কষ্ট ও বয়ে বেড়াচ্ছে। এই কষ্টের কথা কাউকে বলাও যায় না, আবার সহ্য করাও যায় না। একদিন অচেনা এক রিয়া এসে ওর জীবনে এসে রহস্যের ধুম্রজাল ছড়িয়ে গিয়েছিলো। এই রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে আরেক রহস্যের অতলে ডুবে যেতে হয়েছে ওকে। এখন ওর সামনে যেন একই রহস্যের পুনরাবৃত্তি এসে হাজির! ওর জীবনের প্রথম রহস্যটা ছিল আচানক রিয়ার সঙ্গে দেখা। সেদিন রিয়াকে পথ থেকে বিদায় করে দিয়ে ও ভেবেছিল, অপ্রকৃতস্থ রিয়ার খোঁজ ও নেবে না। কিন্তু তা সে পারেনি। সপ্তাহ পেরুতেই ও রিয়ার খোঁজ নিতে ফোন করেছিল ওদের বাসার টেলিফোন নম্বরে। আর তখুনি রহস্যটা পরিহাসে পরিণত হয়। ফোন ধরেছিল রিয়ার মা। রিয়াকে চাইতেই তিনি বিষণ্ন গলায় বলেছিলেন,
‘বাবা, রিয়া তো বেঁচে নেই! তুমি জানো না?’
‘বলেন কি! কবে মারা গেছে! কীভাবে!’
‘সে তো দু’ বছর হলো। তুমি জানো না, ও সুনামীর আঘাতে অথৈ জলে ভেসে গিয়েছিলো?’
‘কী বলছেন! ওর সঙ্গে তো আমার গত সপ্তাহেই কথা হলো, শাহবাগে!’
‘এতো কষ্টের মধ্যেও হাসি পাচ্ছে আমার। যে দু’ বছর আগে মারা গেছে, গত সপ্তাহে তার সঙ্গে তোমার কীভাবে দেখা হবে?’
‘বিশ্বাস করুন, আমি সত্যি বলছি!’
‘তুমি কে বাবা? তুমি কি রিয়াকে খুব পছন্দ করতে? ওর জন্য কি তোমার কোন মানসিক কষ্ট হচ্ছে?’
এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারেনি রোমেল। ও শুধু ভাবছিলো, ওকে যে রিয়া জড়িয়ে ধরেছিল, ওর স্পর্শ তো মিথ্যা ছিল না। রোমেল ওর হাত ধরেছিল, এর স্পর্শও ওর স্পষ্ট মনে আছে। মৃত মানুষকে কি স্পর্শ করা যায়? রোমেলের নীরবতা দেখে রিয়ার মা বললো,
‘বুঝতে পারছি বাবা, আমার মত তুমিও ওকে অন্তর দৃষ্টিতে দেখতে পাও। এটা হতে পারে। এটা অলৌকিক! এর কোন অস্থিত্ব নেই। এ শুধু তোমার সামনেই হয়তো দৃশ্যমান। অন্য সকলের কাছে অদৃশ্য। তুমি ওকে ভুলে যাও, বাবা।’
‘আপনি যা ভাবছেন, আসলে আমি সে রকম কেউ নই। তবে এটা সত্য, গত রোববার দুপুরে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। ও এই ফোন নম্বর আমাকে দিয়েছিল। যদি ও দু’ বছর আগে মারাই যাবে, তবে এই ফোন নম্বর আমাকে কে দিল? তা ছাড়া ও আমাকে সুনামীর কথা বলেছিল। ইন্দেনিশয়া ও সিংগাপুরের কথা বলেছিল। আ”ছা, ও কি সিংগাপুরে লেখাপড়া করতো?’
‘হ্যাঁ, বাবা। ও সিংগাপুরে লেখাপড়া করতো। মৃত্যুর আগে ও রোমেল নামে একজন সহপাঠীর সঙ্গে ইন্দেনেশিয়ায় গিয়েছিল।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও আমাকে এ সব কথা বলেছে। আচ্ছা বলুন তো, রিয়ার চিবুকে কি বড় একটা তিল ছিল?’
‘হ্যাঁ, ছিল।’
‘ওর কপালের ডানপাশে কি ছোট্ট একটা কাটা দাগ ছিল?’
‘হ্যাঁ, ছিল। ছোটবেলায় ও খাট থেকে পড়ে গিয়েছিল। তখন ওর কপালে ডান পাশটা একটু কেটে যায়।’
‘তাহলে আমি রিয়াকেই তো দেখেছি, তাইনা!’
‘তুমি রিয়াকে অনেকদিন আগে দেখেছো। এখন তোমার চোখের সামনে তোমার অবচেতন মনের চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে। তুমি ওকে ভুলে যাও, বাবা। ও আর ফিরে আসবে না কখনো!’
‘ও তো সুনামীতে না-ও মরতে পারে। বেঁচে ফিরে আসতে পাারে! পারে না?’
‘তা কি করে হবে, বাবা? ওর লাশ উদ্ধার হয়েছিল। আমি ইন্দেনেশিয়ায় গিয়েছিলাম। আমি নিজের হাতে ওকে ইন্দেনেশিয়ায় দাফন করে এসেছি।’
রিয়ার মায়ের কাছ থেকে এ কথা শোনার পর রোমেল আর কথা বাড়ায়নি। ও ফোনটা রেখে দিয়েছিল। সুনামীর মত এক অচেনা কান্না ওর বুকের ভেতর ধেয়ে বয়ে যেতে লাগলো। এই কান্না আছড়ে পড়তে লাগলো ওর নিজের ভেতর।
তিন বছর পর একই রহস্য নতুনভাবে এসে দাঁড়ালো রোমেলের সামনে। মন্ট্রিয়ল শহরের সেন্ট জোনস রোডে এক বিয়ার বিক্রির দোকানে ও রিয়াকে দেখে চমকে ওঠলো। শুধু চমকে ওঠলোই না, ওর সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে ওঠলো। ও কি ঠিক দেখছে? অনেকক্ষণ ও তাকিয়ে রইলো রিয়ার দিকে। ঠিক সেই রিয়াই! ওর চিবুকে বড় একটা তিল আর কপালের ডানপাশে ছোট্ট কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। রোমেলের হার্টবিট বেড়ে গেল। সুনামীতে মৃত্যুর ঠিকানায় হারিয়ে যাওয়া রিয়াকে রোমেল দেখেছিল-এই অবিশ্বাস্য কথাটি কেউ বিশ্বাস করবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিš‘ রোমেলের জীবনে এটি ধ্রুব সত্য। এই রহস্যের কূল-কিনারা খুঁজে পায়নি ও। রিয়ার কথা ও অনেকদিন ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু মন্ট্রিয়লে রিয়াকে দেখে ও আবার ভীষণ চমকে ওঠলো। এ যেন রহস্যের পর রহস্য! ও বাংলাদেশ ছেড়েছে তিনবছর হলো। গত তিন বছরে ও একবারও ভাবেনি ওর সঙ্গে রিয়ার আর কখনো দেখা হবে। কিন্তু সেন্টস জোন সড়কের একটি বার হাউজে ও রিয়ার সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল আবার। সেন্ট জোনস এলাকার রাস্তার দু’ ধারে থরে থরে মদের দোকান। সন্ধ্যে হলেই মদ পিপাসুরা এখানে ভিড় জমায় এবং মধ্যরাত পর্যন্ত মদ পিপাসুদের এখনে বসে চুটিয়ে মদ বা বিয়ার পান করে। এখানে রোমেল খুব একট না এলেও মাঝেমাঝে ওকে আসতে হয়। ও এসেছে ওর বন্ধু মারুফের সঙ্গে দেখা করতে। আজ মারুফের জন্মদিন। বিয়ার পান করে মারুফের জন্মদিন পালনের উদ্দেশে ও এখানে এসেছে। মারুফ এখনো আসেনি, তবে চলে আসবে। ও বরাবরই লেটকামার। রোমেল যে মদের দোকনটিতে এসে বসেছে, রিয়া ঐ দোকানের কাষ্টমরদের মদ ও বিয়ার সার্ভ করছিলো। ও হা-করে তাকিয়ে থাকে রিয়ার দিকে। এক সময় রিয়া ওর টেবিলের সামনে এসে জিজ্ঞেস করলো,‘ম্যা আই হেল্প ইউ, স্যার!’
সেই কণ্ঠ! রোমেলের গা শিরশির করে ওঠলো। এ-ও কি বিশ্বাসযোগ্য! রোমেলের চিন্তা শক্তি লোপ পেয়ে যাচ্ছিলো যেন। রিয়ার কণ্ঠ ফের রিনরিনিয়ে ওঠলো। ও ইংরেজীতে বলল,
‘আমি আপনার কী সাহায্য করতে পারি, স্যার?’
রোমেল লক্ষ্য করলো রিয়া ওকে চিনছে না বা চিনতে পারছে না। ও তাকিয়ে থাকে। রিয়ার ফের বলে,
‘আপনাকে কী দেব, স্যার?’
রিয়ার এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রোমেল বলল,
‘আপনি কি রিয়া?’
প্রশ্নটি শুনে মুহুর্তেই হচকিয়ে গেল ও। রিয়া ওর দু’ চোখের দৃষ্টিতে কৌতুহলের ঝিলিক নাচিয়ে বিস্মিত গলায় বললো,
‘আপনি আমাকে চেনেন? কী অ™ভূত!’
রিয়া বিস্ময় প্রকাশ করে। রোমেল বিগলিত গলায় বলে,
‘আমি আপনার আরো অনেক কিছু জানি।’
‘সত্যি! আশ্চার্য!’
রোমেল রিয়ার বিস্ময়কে উপভোগ করে বলে,
‘আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমার কথা মনে আছে তো?’
এবার রিয়া খুব বিস্মিত হলো। ও বললো,
‘কে আপনি? আমার মনে হয় আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।’
‘সত্যি বলছেন? কী অ™ভূত রসিকতা!’
‘আসলে কে আপনি..!’
‘অমার নাম রোমেল। বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’
‘আমি রিয়া সেন। এসেছি ক্যালকাটা। আমি কখনও বাংলাদেশে যাইনি। কিন্তু..?’
‘আপনি মনে হয় রসিকতা করছেন।’
‘না, না। আমি সত্যি বলছি! বিশ্বাস করুন!’
এ কথায় ভড়কে গেল রোমেল। এ আবার কোন রহস্য? তবে কি সে অন্য কোন রিয়া? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ও বলল,
‘আমার মনে হয়, কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে?’
‘সে হবে হয়তো!’
বলল রিয়া। রোমেল ওর দিকে মিষ্টি করে হেসে বলল,
‘যদি কিছু মনে না করেন, একটা প্রশ্ন করবো?’
‘করুন।’
‘আপনার কপালের ডানপাশে একটা কাটা দাগ আছে না?’
‘হ্যাঁ, আছে!’
‘আপনি ছোটবেলায় খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানেন কী করে!’
‘আপনি সিংগাপুরে লেখাপড়া করতেন এবং ইন্দেনেশিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন, তাই না?’
‘না। আমি বড় হয়েছি মন্ট্রিয়লে। ছেলেবেলাটা কেটেছে কলকাতায়। কিন্তু এ সব প্রশ্ন কেন করছেন?’
রোমেল বুঝতে পারছে না ও এখন কী বলবে। রিয়ার কথা যদি সত্যি হয়, তবে বলতে হবে প্রকৃতি ওর সঙ্গে ভীষণরকম পরিহাস করছে। ওর সামনে যে রিয়া দাঁড়িয়ে আছে, ঢাকায় দেখা সেই রিয়ার সঙ্গে ওর অদ্ভূত মিল। এমন কি, কপালের কাট দাগ সৃষ্টির ঘটনাটারও অবিশ্বাস্য মিল! রোমেলের হঠাৎ মনে পড়লো ওর ওয়ালেটে রিয়ার একটা পেন্সিল স্কেচ আছে। রোমেল চিত্রশিল্পী না হলেও ও ভালো পেন্সিল স্কেচ করতে পারে। ও রিয়ার একটি পেন্সিল স্কেচ এঁকেছিল। রোমেল স্কেচটি সযতনে বের করে রিয়ার সামনে তুলে ধরে বললো,
‘দেখুন তো, এটা আপনার কিনা?’
রিয়া স্কেচটি দেখে ভীষণ অবাক হলো। ও রোমেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আপনি এঁকেছেন! সত্যি!’
রোমেল জানে সত্যিই এটি অবিশ্বাস্য। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। ও বুঝতে পারছে এই রিয়া অন্য এক রিয়া। ওদের চেহেরা, জীবনের ঘটনা প্রবাহ বা সত্ত্বা হয়তো এক। কিন্তু প্রকৃতির রহস্যে ওরা স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে ভিন্ন। এই রহস্যের খবর সবাই জানে না। জানার কথাও নয়। কিন্তু রোমেল বুঝতে পারছে। রিয়া বললো,
‘আমি খুবই একসাইটেড, রোমেল! আপনি কোথায় থাকেন?’
‘আমি লেখাপড়া করছি মন্ট্রিয়লের ম্যাগগিল ইউনিভার্সিটিতে। থাকি পার্ক এলাকায়।’
‘তাই নাকি! আমিও ঐ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি, এই সেমিষ্টারে।’
‘তাই নাকি! তাহলে তো আপনার সঙ্গে দেখা হবে আবার।’
‘অবশ্যই হবে। চাইলে কালই দেখা করতে পারি।’
‘কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’
‘কেন?’
‘কারণ, এর আগেও আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। এরপর আপনি হারিয়ে যান। আজ তিনবছর পর আপনার দেখা পেলাম।’
এ কথায় খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়লো রিয়া। যেন রোমেল ভীষণ মজার কোন কথা বলে ফেলেছে। ও দমকে দমকে হাসছে। এই মুহর্তে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য রহস্যটুকু ভীষণ ভালো লাগছে রোমেলের। মনে হচ্ছে রিয়ার সঙ্গে আর দেখা না হলেও ক্ষতি নেই। রিয়ার এই উদ্দাম হাসির মুদ্রায় ওর পুরোটা জীবন আটকে যাক। আটকে যাক সময়ও। এই রহস্য থেকে ও বের হতে চায় না।
৬.
অন্যরকম বিষাদ
আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো ‘নৌকায় চড়বেন?’
প্রশ্ন করেই রিনরিনিয়ে হাসলো। যেন আমার ধ্যানস্থ মনোযোগ ভেঙে খুব মজা পাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত বোকার মতো মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ও চোখ নাচিয়ে ফের বলল, ‘নৌকায় চড়বেন, নাকি হা-করে তাকিয়ে থাকবেন?’
আমি অপ্রস্তুত গলায় সম্মতির জানিয়ে বললাম, ‘চড়বো।’
‘পকেটে টাকা আছে?’
‘না। কেন?’
‘টাকা ছাড়া নৌকায় চড়াবো না। আমাদের কিছু খাওয়ালেও চলবে।’
মেয়েটি রহস্য সৃষ্টি করতে চাইলো। ওর সাথে আরো দুটি মেয়ে। তারা এবার একসাথে খিলখিলিয়ে হাসলো। নৌকার মাঝি ভাবলেশহীনভাবে বৈঠা হাতে বসে আছে। আমি মেয়েটিকে ভালো করে দেখলাম। শ্যামল, দীর্ঘদেহী, টানা চোখ, টিকোলো নাক। মিষ্টি করে হাসে। হাসলে পুরো মুখমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে লাবণ্যের দ্যুতি। মায়াবী চোখে চঞ্চল দৃষ্টি। মেদহীন ছিপছিপে শরীর। অপরিচিত মেয়েটি কেন যেচে দুষ্টুমি করছে, বুঝতে পারছি না। শেষ বিকেলের নরোম রোদ নেমে এসেছে ওয়াটার ফ্রন্টে। ওয়াটার ফ্রন্টের দু’পাশে ভ্রমণবিলাসী লোক ভিড় জমিয়ে আছে। ম্যাগাসিটি ঢাকা নগরীর কোলাহল ছেড়ে প্রতিদিন অনেক লোক চলে আসে এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ওয়াটার ফ্রন্টে। বিশেষ কাজে আমি এসেছিলাম এয়ারপোর্টে। ফেরার পথে এসে বসেছি ওয়াটার ফ্রন্টের এক পাড়ে, একটা গাছের নিচে। শান্ত ও ছায়া নিবিড় পরিবেশে যখন তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম, তখনই মেয়েটি আমার তন্ময়তা ভাঙলো। আমার নীরবতা দেখে মেয়েটি বিদ্রুপকণ্ঠে বলল,
‘টাকা ছাড়া এতদূর চলে এসেছেন? আপনি নিশ্চয়ই বেকার।’
আবারো হাসির ফোয়ারা। নৌকা চলতে শুরু করলো। আমি হতবিহ্বল চোখে মেয়েগুলোর অনাহূত উচ্ছ্বাস উপভোগ করতে লাগলাম। ফেরার পথে দেখতে পেলাম মেয়েটি ওয়াটার ফ্রন্টের ফাস্ট ফুডের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। উদাসীন। ওর সাথের মেয়ে দুটি একটি টেবিলে বসে আড্ডা মারছে কয়েকটি ছেলের সঙ্গে। আমার মনে ঝিলিক দিল দুষ্টবুদ্ধি। আমি এগিয়ে গেলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে বিনীত ও আন্তরিক গলায় বললাম,
‘আপনাকে কিছু খাওয়াতে চাই। নয়তো সারাজীবন আমাকে অনুশোচনা করতে হবে।’
এবার আমার কথাই মেয়েটি শুধু চমকেই ওঠলো না, লজ্জাও পেল। বিব্রত গলায় ও বলল,
‘না না, কিছু খাওয়াতে হবে না।’
‘কিন্তু আমি যে আপনকে ছাড়ছি না। আপনি আমার মনে যে রেখাপাত করেছেন, তা ধরে রাখতে চাই। আপনার সঙ্গে পরিচিতও হতে চাই।’
মেয়েটি যেন আরো লজ্জা পেল। আমি ওর জড়তা ও কুঁকড়ে যাওয়াকে উপভোগ করতে লাগলাম। বললাম,
‘ভয় নেই, খাবার বিল আপনাকে দিতে হবে না। আমিই দেবো। আমি বেকার নই। পকেটে যথেষ্ট টাকাও আছে।’
লজ্জিত কণ্ঠে মেয়েটি বলল,
‘আপনার সঙ্গে রসিকতা করেছিলাম। কিছু মনে করবেন না, প্লিজ।’
‘না, না। আমি কিছু মনে করিনি। আপনাকে রসিকতা করার আরো সুযোগ দিতে চাই। আমরা কি একে-অন্যে পরিচিত হতে পারি না?’
‘জ্বি, পারি। আমার নাম ঝুমুর। আমি বাংলায় এমএ পড়ছি।’
তড়িঘড়ি করে বলল ঝুমুর। আমি প্রশ্ন করি,
‘কোথায় পড়ছেন?’
‘ইডেনে।’
‘বাহ্, চমৎকার। বাংলায় পড়ছেন বলে খুশি হলাম। কারণ, আমারও কাজ বাংলা নিয়ে। আমি পেশায় একজন সাংবাদিক। লেখালেখির বাতিক আছে। প্রেমের কবিতা হরদম লিখি।’
‘আপনি প্রেমের কবিতা পছন্দ করেন?’
‘খুব। নিজেও লিখি।’
‘তাই নাকি? তাহলে তো সোনায় সোহাগা! পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।’
‘আমিও।’
এরই মধ্যে অপর মেয়ে দুটিসহ কয়েকজন ছেলে এসে পড়লো। ঝুমুর আমাকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ছেলেগুলো ঢাকা কলেজের ছাত্র। ওরা জানালো, ১৭ জন ছাত্রছাত্রী ঘুরতে এসেছে ওয়াটার ফ্রন্টে। ঝুমুর টিম লীডার। আমরা সকলে একসাথে কফি পান করলাম। গল্প হলো। এরই মাঝে আমি ও ঝুমুর পরস্পর পরস্পরকে দেখে নিচ্ছিলাম চোরাচোখে। মনে হচ্ছিলো আমাদের হৃদয়ে অন্যরকম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে। আমার ভেতরে ভাললাগার ঘোর সৃষ্ট হলো। ইচ্ছে হচ্ছিলো ঝুমুরকে কাছে ডেকে বলি,
‘হঠাৎ করে তুমি এসে আমাকে আলোড়িত করে দিলে কেন?’
কফির বিল ঝুমুর পরিশোধ করতে চাইলো। আমি জোর করেই বিল দিলাম। কথা হলো পরবর্তীতে ঝুমুর আমাকে খাওয়াবে। ঝুমুর ওর বাসার ফোন নম্বর দিল। আমি ওর সেলফোন নম্বর চাইলাম না। আমিও আমার ভিজিটিং কার্ড ওকে দিলাম। দু’জনেই যোগাযোগ রাখবো বলে কথা দিলাম দু’জনকে। একরকম আাবিষ্টতার বুদ হয়ে চলে এলাম আমি।
ঝুমুরকে ভুলতে পারছিলাম না কিছুতেই। কাজের ব্যস্ততায়ও ওর কথা মনে পড়ছিল। প্রথম কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম ওর দিক থেকে ফোন আসবে, এই আশায়। কিন্তু ফোন এলো না। মাস পেরুলো। অধীর আগ্রহে আমিই ফোন করলাম ওদের বাসায়। কিন্তু ওকে বাড়িতে পেলাম না। ফোন ধরলেন একজন ভদ্রমহিলা। তিনি জানালেন ঝুমুর বাসায় নেই। আমি তার কাছে নিজের পরিচয় দিতে সংকোচবোধ করলাম। কয়েকদিন একটানা ফোন করলাম। কিন্তু ঝুমুরকে পাওয়া গেল না। ওর বাসা থেকে জানানো হলো ও হোস্টেলে আছে। ইডেনের হোস্টেলে যেয়ে খোঁজ করার সাহস দেখালাম না। এরপর অফিসের কাজে হঠাৎ ঢাকার বাইরে যেতে হলো। সেখানে ফোন নম্বর সংরক্ষিত আমার পকেট ডায়েরিটা হারিয়ে গেল। সেসঙ্গে হারিয়ে গেল ঝুমুরের নম্বরটাও। এই কষ্টে কয়েকদিন ঘুমাতে পারলাম না। তবে আশা ছিল ঝুমুর আমাকে একদিন ফোন করবেই। এই আশায় রোমান্টিক দহনে পেরুতে লাগলো একেকটি দিন। একদিন অফিসে এসেই প্রচন্ড তোপের মুখে পড়লাম। আমার এসাইনমেন্ট ছিল। মিস করেছি। সম্পাদক ডেকে ভৎসর্না করলেন খুব। নির্দেশ দিলেন যেভাবেই হোক ঐ সংবাদ সংগ্রহ করতে। আমি স্নায়ুচাপে ভুগছি। টেনশন আর উৎকণ্ঠা নিয়ে নিজের চেয়ারে বসতেই এলা ফোন। ‘হ্যালো’ বলতেই একটি মেয়েলি কণ্ঠ বললো,
‘কেমন আছেন?’
‘কে আপনি?’
জানতে চাই আমি।
‘আমি ঝুমুর।’
বলে ঝুমুর। প্রচন্ড টেনশনের কারণে আমি ওকে চিনেত পারলামনা। বললাম,
‘কোন ঝুমুর?’
‘আমাকে চিনতে পারছেন না!’
ও প্রান্তে ঝুমুরের আহত কণ্ঠস্বর।
‘ঠিক, চিনতে পারছি না। আপনি কে?’
বললাম টেনশন থেকে। ঝুমুর বলল,
‘মনে করে দেখুন তো, চিনতে পারেন কিনা।’
‘না, পারছি না। বলুন তো আপনার সঙ্গে কোথায় পরিচয় হয়েছিলো?’
আমার প্রশ্নে স্মরণ করিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে ঝুমুর বলল,
‘মনে করে দেখুন, একটি অন্যরকম পরিবেশে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। জলাশয় ছিল, নৌকা ছিল। আর আমরা একদল ছেলেমেয়ে ছিলাম। মনে পড়ছে?’
আমি মনে করতে পারলাম না। স্নায়ুচাপে যেন সব চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছে। বললাম,
‘আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। দুঃখিত।’
এবার ঝুমুর অবাক হলো। হয়তো কষ্টও পেলো। বেদনাবিধুর কণ্ঠে ও বললো,
‘ঠিক আছে, কখনো যদি আমার কথা মনে পড়ে, তবে ফোন করবেন। আমি আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো। ফোন না করলে আমি কখনও আপনাকে ফোন করবো না।’
বলেই ঝুমুর ফোন রেখে দিল। আর ঐ মুহুর্তেই ওর কথা আমার মনে পড়ে গেল। বুকের পাঁজরটা হঠাৎই মোচড় দিয়ে উঠলো। আমি টেলিফোন রিসিভারটা তখনো ছাড়িনি। চিৎকার করে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলতে লাগলাম কিন্তু ও প্রাপ্ত নিথর, নি®প্রাণ। আমার বোধশক্তি যেন লোপ পেয়ে গেল। নির্বাক হয়ে ভাবতে লাগলাম,‘হায়, এ কি হলো!’
ঝুমুরের এই ভুল আমি ভাঙাবো কি করে? ওর কাছে আমি ফোন করতে পারবো না কোনদিন। অথচ ও ভাববে ওকে আমি সত্যিই ভুলে গেছি। আমাকে গ্রাস করলো অন্যরকম বিষাদ।
৭.
ক্লিওপেট্রার প্রেম
বৃটিশ মিউজিয়ামে প্রবেশ করতেই সেই অদ্ভূত সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেল শাকিব। এই ঘ্রাণ ওর ভীষণ চেনা। এই অদ্ভূত ঘ্রাণ ও টের পায় শুধু সামিয়া ওর সামনে এলে। মিষ্টি ও মাদকতাপূর্ণ ঘ্রাণ। এর যেন সম্মোহনী শক্তি আছে। সামিয়া ওর সামনে এলেই ও সব সময় কেমন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। সম্মোহিত হয়ে পড়ে। অপরূপা সামিয়ার ধাঁধানো সৌন্দর্যের সামনে যে কেউ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু শাকিব ওর শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য মন্ত্রমুগ্ধ হয় না। ও মুগ্ধ হয় ওর শরীর থেকে বের হয়ে আসা ঐ অদ্ভূত ঘ্রাণের জন্য। এই ঘ্রাণ শাকিবকে বুঁদ করে ফেলে। মাতাল করা গন্ধটা কিসের এই প্রশ্ন ও অনেকবার সামিয়াকে করেছিল। শুধু একদিন এর জবাবে সামিয়া দু’চোখে রহস্য ছড়িয়ে বলেছিল, ‘আমার শানিত যৌবনের অপার সৌন্দর্যই হচ্ছে এই ঘ্রাণ। বলতো পারো এটাই আমার সৌন্দর্যের ফাঁদ।’
‘ফাঁদ! এই ফাঁদ কেন? কখন পাতো এই ফাঁদ?’
এর জবাবে অনেকক্ষণ হেসেছিল সামিয়া। বলেছিল,
‘বিশেষ একটা দিনে আমার শরীরের লোমকূপ থেকে এই মিষ্টি গন্ধটা বের হয়ে আসে। আর ঠিক এই দিনটিতেই আমি তোমার কাছে ছুটে আসি। এই গন্ধ ঐশ্বরিক!’
এ পর্যন্ত বলে সামিয়া হাসির উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়েছিল। সামিয়া প্রায় সব কথাতেই রহস্য থাকে। কিংবা বলা যায় ও রহস্য তৈরি করে কথা বলে। একটু গভীর চিন্তা করে বললে বলতে হয়, সামিয়া নিজেই বড় একটা রহস্য। গভীর রহস্য। ওর কোন রহস্যই উদঘাটন করতে পারে না শাকিব। আর শাকিবকে রহস্য থেকে আরো গভীর রহস্যে ঠেলে দিয়ে সামিয়ারও খুব যেন আনন্দ। এই যে শাকিব আজ বৃটিশ মিউজিয়ামে এসেছে, সেটাও সামিয়ার তৈরি করা এক বড় রহস্য উদঘাটনের জন্য। এক অবিশ্বাস্য গল্পের ফাঁদে পড়ে ও নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন চলে এসেছে। এই গল্পের শুরু কিংবা শেষ অথবা সামিয়ার সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে যে কোন সূত্রের সন্ধান পেতে চায় ও। অন্তত একটি সূত্র ও চায়।
সামিয়া কে, কোথায় থাকে? এই প্রশ্নের জবাব ও কখনো শাকিবকে দেয়নি। অথচ গত তিন বছরে তিনবার সামিয়া ওর সঙ্গে দেখা করেছে এবং সারাদিন ও শাকিবের সঙ্গে থেকেছে। বছরের বিশেষ একটা দিনে সামিয়া চলে আসে শাকিবের কাছে। এই দিনটি হচ্ছে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালাইনটাইন ডে। অন্য আর কোনদিন সামিয়া ওর সঙ্গে দেখা করে না। পুরো বছর ওদের মধ্যে কথা বার্তা চলতে থাকে ই-মেইলে। কখনো কখনো চ্যাট করে সময় কাটায় ওরা। চ্যাটরুম থেকেই ওদের পরিচয় এবং বিশেষ সম্পর্ক তৈরি। তিনবছর আগে ভেলেনটাইন ডে’তে সামিয়া হঠাৎ শাকিবের সামনে এসে দাঁড়ায়। পরের বছরগুলোতেও এই দিবসে সামিয়া চলে এসেছিল শাকিবের কাছে। প্রথম বছর শাকিব কিছু না বললেও গত দু’ বছরে বিভিন্ন সময়ে ও অনেকবার সামিয়ার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সামিয়া রাজী হয়নি। চ্যাটরুমে অনেকবার প্রশ্ন করেছে শাকিব। জবাবে শুধু একদিন বলেছে, ‘আমি শুধু একদিনই দৃশ্যমান হতে পারি। আর সেই দিনটি হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি।’
‘এ কেমন রসিকতা!’
‘রসিকতা নয়, সত্যি!’
‘অন্যদিনগুলোতে তুমি কী করো?’
‘আমি মমি হয়ে থাকি।’
‘কি!’
‘মমি! মমি হয়ে থাকি।’
‘তাহলে এই যে আমার সঙ্গে চ্যাট করছো!’
‘তোমার সঙ্গে চ্যাট করছে আমার আত্মা। দৃশ্যমানে আমি মমি হয়ে আছি।’
‘ওফ্! সবসময় তোমার রহস্য!’
সামিয়া খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে। ওর রহস্যময় কথার অর্থ খুঁজে পায় না শাকিব। এবার ভেলেইনটাইন ডে এগিয়ে আসতেই সামিয়ার ই-মেইল পেয়ে চমকে যায় শাকিব। সামিয়া জানায় এবার ভেলইনটাইন ডে’তে শাকিবকে আসতে হবে লন্ডনে। বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত ক্লিওপেট্রার মমির সামনে ওকে অপেক্ষা করতে হবে। এখানে সামিয়া দেখা করবে ওর সঙ্গে। এই ই-মেইল পেয়ে শাকিব অবাক হলেও একটা বিষয় ও নিশ্চত হয় যে, সামিয়া লন্ডনে থাকে। ও ভাবে, রহস্যময় সামিয়ার পরিচয়ের একটা সূত্র হয়তো পাওয়া গেল।
শাকিব বরাবরই অনুসন্ধানী। রহস্যের বেড়াজালে ও আটকে থাকতে চায় না। বৃটিশ মিউজিয়ামের বিশালত্ব কিংবা বিষয় বৈচিত্রের অহংকার এতোই দ্যুতিময় যে, মহাকাল যেন এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মিউজিয়ামে ঘুরতে ঘুরতে শাকিবের তা-ই মনে হয়। সামিয়ার শরীরের ঐশ্বরিক ঘ্রাণ ওকে মাতাল করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। শাকিব টালমাটাল হয়ে হাঁটছে। ও এক সময় চলে আসে ক্লিওপেট্রার মমির সামনে। কিংবা বলা যায় ঐ ঘ্রাণ ওকে টেনে নিয়ে আসে ক্লিওপেট্রার মমির সামনে। এখানে দাঁড়িয়ে ক্লিওপেট্রার নাম অংকিত মমির মধ্যে সামিয়াকে দেখে ভীষণ চমকে ওঠে শাকিব। কাচের দেয়ালে ক্লিওপেট্রার মমি শায়িত। দর্শনৈচ্ছিুকরা ক্লিওপেট্রোর মমি দেখে চলে যাচ্ছে। তারা হয়তো সামিয়াকে দেখছে না। কিন্তু শাকিব স্পষ্ট দেখছে সামিয়াকে। ওর পা নড়ছে না। ও হতভম্ব। বিস্ময়ে চোখ ফেটে যেতে চাইছে। ওর কণ্ঠ খুলছে না। ওর এই বেহাল অবস্থা দেখে হেসে সামিয়া বললো,
‘তুমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছো না, তাইনা?’
‘হ্যাঁ, আমি, আমি..!’
‘আমি জানি, বিস্ময়ের তুমুল ঢেউ তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু!’
‘জানতে চাচ্ছো, ক্লিওপেট্রার মমিতে আমি কেন?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ..!’
‘আমিই ক্লিওপেট্রা। আমিই সেই ঐতিহাসিক সুন্দরী রমণী। শ’ শ’ বছর যাবত বন্দি হয়ে আছি মমির বেড়াজালে। আবার আমিই তোমার ভালোবাসার সামিয়া।’
‘এ সব কী বলছো!’
‘ঠিকই বলছি, শাকিব।’
‘তুমি আমার কাছে কী চাও?’
‘আমি মুক্তি চাই। মমির দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমি তোমার ভালোবাসা চাই। সত্যিকারের প্রেম তোমাকে দিয়ে নিজেকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে চাই। আমি ক্লিওপেট্রা নই, আমি সামিয়া হতে চাই!’
‘তাহলে তুমি সামিয়া নও! মানে, তুমি আত্মা! ক্লিওপেট্রার আত্মা!’
‘হ্যাঁ। সামিয়া হচ্ছে আমার কল্পনার নিজের স্বরূপ। আমি যে জীবনটা কামনা করি, সেটাই সামিয়ার জীবন।’
‘কিন্তু!’
‘শাকিব, আমি সামিয়া হতে চাই। সম্রাজ্ঞী নয়, সাধারণ হতে চাই। আমাকে মুক্ত করো।’
এ সময় দু’ হাতের তালুতে নিজের কান চেপে ধরলো শাকিব। ওর বোধ শক্তি যেন লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ওর মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ক্লিওপেট্রোর মমি যেন অদ্ভূত শক্তিতে ওকে টেনে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। ‘সামিয়া!’ বলে চিৎকার করে ও সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললো।
শাকিব চোখ মেলে দেখলো ও একটি বিছানায় শুয়ে আছে। ওর সামনে একটি চেয়ারে বসে আছে এক নার্স। নার্স ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
‘গুড ইভিনিং স্যার! আই এম নার্স জেসিকা। হাউ ফিল ইউ, নাউ?’
‘থ্যাংকস। বাট হয়ার এম আই?’
‘ইউ আর ইন লিভারপুল হসপিটাল।’
‘ইজ ইট ইন লন্ডন?’
‘হয়েস, স্যার। টেক রেষ্ট। আই হেভ টু গো। জাষ্ট এ মিনিট, ডাক্তর ইজ কামিং।’
‘ওকে। থ্যাকংস এ লট।’
‘ওয়েলকাম। হ্যাভ এ গ্রেট ডে!’
‘ইউ টু।’
ভুবন ভুলানো হাসি বিলিয়ে জেসিকা চলে গেল। শাকিব ভাবতে লাগলো ওর কী হয়েছিল। কেন ও হাসপাতালে। ওর মনে পড়তে লাগলো ক্লিওপেট্রার কথা। এ সময় দরোজা ঠেলে ডাক্তারের পোষাক পরিহিতা সামিয়া ওর রুমে প্রবেশ করলো। সেই মিষ্টি এবং মাদকতাপূর্ণ ঐশ্বরিক গন্ধটা এসে তীব্রভাবে স্পর্শ করলো ওর ঈন্দ্রীয়কে। বিস্ময়ের আরেক ধাক্কা এসে লাগলো। ওর ছানাবড়া চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি বিলিয়ে সামিয়া বললো,
‘তোমার নার্ভ এতো দূর্বল, তা জানা ছিল না।’
‘তুমি, তুমি!’
‘সামিয়া। তোমার সামিয়া। বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘সত্যিই তুমি আবার ক্লিওপেট্রা!’
‘হ্যাঁ, বছরের ৩৬৪ দিনই আমি ক্লিওপেট্রা। অর্থাৎ ক্লিওপেট্রার মমি। শুধু একদিন সামিয়া হতে পারি। এই ভেলেনটাইন ডে’তে। আজই তো সেইদিন।’
‘তুমি কেন আমার সঙ্গে এই রহস্য করছো? কে তুমি? তুমি কি মানবী? না অপ্সরী? নাকি ক্লিওপেট্রার অতৃপ্ত আত্মা?’
এ কথা বলেই চাপা কান্নার মত ককিয়ে ওঠলো শাকিব। সামিয়া আহত কণ্ঠে বললো,
‘তুমি অমন করো না শাকিব। আর কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা নামবে। তখন আমাকে চলে যেতে হবে মমির অভ্যন্তরে। এই কয়েকটা মুহুর্ত আমি তোমার পাশে থাকতে চাই।’
এ কথা বলে সামিয়া শাকিবের বিছানায় এসে বসলো। ওকে বেপরোয়া মনে হলো। শাকিব কিছু বলতে পারলো না। সামিয়ার গায়ের মিষ্টি গন্ধটা ওকে মাতাল করে ফেলছে। এ অন্য রকম মদিরতা। সামিয়া শাকিবের ডান হাতের কব্জি নিজের দু’ হাতের মুঠোতে বন্দি করলো। শাকিব মন্ত্রমুগ্ধ। ওর শরীর আজ কাঁপছে। অন্য রকম কাঁপন। সামিয়ার শরীরের ঘ্রাণ তীব্র হতে লাগলো। সামিয়ার চোখে মুখে রহস্যময় হাসি রঙধনুর মত ছড়িয়ে পড়ছে। ওর ঠোঁট প্রবল আবেগে কিংবা অতৃপ্তিতে কাঁপছে। কয়েক মুহুর্ত কাটলো মাত্র। সামিয়া হঠাৎ করে শাকিবের দিকে ঝুঁকে পড়লো। ও ঠোঁট এগিয়ে দিল শাকিবের ঠোঁটের দিকে। একটা ঝড় যেন এগিয়ে আসছে। অসহায় শাকিব ওর ভয়ার্ত চোখ বন্ধ করে ফেললো।
৮.
পত্র
এক.
আকাশ দরোজা খুলেই হতবাক। বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক আলোড়ণ উঠে থেমে গেল। কিছু বুঝে না উঠা দৃষ্টি মেয়েটির মুখে স্থির হয়ে থাকে। পলক পড়ে না। মাথাটা যেন হঠাৎ গুলিয়ে গেল। মুখে ভাষা নেই। পাশের বাড়িতে থাকে মেয়েটি। প্রত্যেকদিন ভোরে তার সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসে। ও কণ্ঠ সাধে, হয়তো উদীয়মান কণ্ঠশিল্পী। বিকেলে মেয়েটিকে ছাদে দেখা যায়। ওর চোখেমুখে এক ধরনের উদাসীনতা ফুটে থাকে। মেয়েটি কারো দিকে ফিরেও তাকায় না বা কাউকে গ্রাহ্য করে না। আকাশকেও গ্রাহ্য করে না। আকাশের মনে হয়, মেয়েটির মধ্যে এক ধরনের অহংকার আছে। আকাশ লক্ষ্য করেছে, মাঝেমাঝে সে আকাশপানে তাকিয়ে থাকে। কি যেন খোঁজে। হয়তো নক্ষত্র। কিংবা আকাশের নীল রঙের ঘনত্ব বোঝার চেষ্টা করে ও। আকাশ ঠিক বুঝতে পারে না। ছাদে পায়চারী করতে করতে কখনো গুণগুণ করে গান গায় ও। মেয়েটির রূপের লাবণ্য ছাদ জুড়ে পেখম ছড়িয়ে থাকে। ওর রূপের কাছে শেষ বিকেলের সোনারোদও ম্লান হয়ে যায়। মেয়েটির দিকে তাকালে স্নিগ্ধ অনুভূতিতে ছেয়ে যায় মন। ভালো লাগে। মনটা কেমন করে উঠে। আকাশ মেয়েটিকে নিয়ে দ্রুত ভেবে নিল। দরোজায় দন্ডায়মান মেয়েটি আকাশের উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,
‘অমন হা করে তাকিয়ে আছেন কেন?’
বোধের পিঠে কেউ যেন সপাং করে চাবুক মারলো। জড়তা কণ্ঠে আকাশ বললো,
‘জ্বি, মানে আপনি…….!’
‘খুব নার্ভাস হয়ে গেছেন মনে হচ্ছে?’
এই মুহূর্তে আকাশের মনে হচ্ছে মেয়েটি শুধু অহংকারী নয়, বেশ খেপাটেও। কাউকে ভড়কে দিতে পারলে ওর যেন খুব আনন্দ। আকাশ নিজের মধ্যে সাহস গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
‘আপনি কি আমাকে কিছু বলতে এসেছেন?’
‘তা নয়তো কি, আপনার সাথে খোশগল্প করতে এসেছি?’
রাগের উত্তাপ ঝরে পড়ে মেয়েটির কণ্ঠে। আকাশ মেয়েটিকে বুঝতে চেষ্টা করে। দুর্বোধ্য। ও বলে,
‘আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন?’
মেয়েটি কণ্ঠ আরো এক ধাপ ওপরে চড়িয়ে বলল,
‘রাগবো না কেন?’
‘কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না…….!’
‘আমার সাথে ন্যাকামী করবেন না!’
এবার আকাশ বিরক্ত হল। ও বলল,
‘আপনি কি বলতে চান?’
‘তার আগে বলুন, আপনার নাম ‘আকাশ’ কিনা?’
জানতে চাইলো মেয়েটি। আকাশ বলল,
‘জ্বি, ওটা ডাক নাম। আসল নাম….।’
‘থামুন! আপনার আসল নাম শুনতে চাই না।’
আকাশের ভেতরে রাগ ফুঁসতে থাকে। ও নিজেকে সংযত করে। বলে,
‘আমার নাম ‘আকাশ’ হওয়াটাই কি অপরাধ?’
‘তা কেন? নামখানা তো বেশ! কিন্তু অভদ্র কাজ করায় দেখছি সিদ্ধহস্ত!’
মেয়েটির মাথায় গোল নেই তো! সরাৎ করে শংকা মনে উঁকি দিয়ে উঠে। আকাশ ঘাবড়ে যায়। এমন সুন্দরী একটি মেয়েকে ‘পাগল’ ভাবতেও খারাপ লাগে। মেয়েটি কণ্ঠে বিদ্রুপ মিশিয়ে বললো,
‘মনে হচ্ছে খেই হারিয়ে ফেলছেন? ভেবেছিলেন আপনার প্রেমপত্র পাবার পর আমি হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেবো? আপনার চরণতলে এসে লুটিয়ে পড়বো?’
মেয়েটি যে পাগল, এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত হলো। ওর আবোলতাবোল কথার কিছুই বুঝতে পারছেনা আকাশ। পাগলকে কীভাবে সামাল দিতে হবে তা নিয়ে ভাবতে লাগলো। মেয়েটি বলল,
‘মুখটাকে পাংশুবর্ণ করে রাখলে চলবে না। আমার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।’
‘জ্বি, বলুন!’
ভীত গলায় বললো আকাশ।
‘আমাকে প্রেম নিবেদন করে পত্র লিখেছেন কেন? আর লেখার যা শ্রী! অসংখ্য বানান ভুল! ক’ ক্লাশ পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন?’
এ ধরনের অসংলগ্ন কথাবার্তার আকাশ বিব্রত ও অসহায়বোধ করতে লাগলো। মেয়েটির রক্ত চোখের দিকে চোখ রেখে ওর শেষ প্রশ্নের উত্তর দিল,
‘ইকোনোমিক্স-এ অনার্সসহ মাস্টার্স।’
ওর অজান্তেই জবাবটা শ্লেষ মিশ্রিত হল। মেয়েটি একটু হচকিয়ে গেল। ওর দিকে অন্যভাবে তাকালো। যেন উত্তরটার সত্যতা অনুধাবন করছে। মেয়েটির কণ্ঠ নরোম হলো। ও বলল,
‘এ ধরনের অসভ্যতা করলেন কেন?’
‘বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে পত্রটত্র লিখিনি!’
‘দেখুন মিথ্যা বলে আর অপরাধ বাড়াবেন না। আপনি আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েকে দিয়ে আমাকে পত্র পাঠিয়েছেন। আমি সেটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। এই দেখুন।’
বলেই মেয়েটি বাম হাতে দলাকরা রাখা একটি পত্র আকাশের চোখের সামনে তুলে ধরলো। আকাশ ওটার দিকে তাকালো না। অহেতুক একটা ঝামেলার পড়ে গেছে বলে খারাপ লাগছে ওর। মেয়েটির পাগলামী খুবই বিরক্তিকর। ঠিক এই সময়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলেন আসমত আলী চৌধুরী। তিনি আকাশের বাড়িওয়ালা। তাকে দেখে আকাশ আশ্বস্ত হলো। এবার যদি পাগল তাড়ানো যায়! আসমত আলী চৌধুরী মেয়েটির হাত থেকে পত্রটি ছুঁ মেরে নিয়ে নিলেন। মেয়েটি অপ্রস্তুত হলো। আসমত আলী চৌধুরী পত্রটি পকেটে পুড়ে রাখলেন। মেয়েটিকে সস্নেহে বললেন,
‘তুমি বাড়ি যাও মা। আমি এর ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
আসমত আলী চৌধুরীর কথায় মেয়েটি শান্তভাবে ফিরে গেল। আকাশের বুক থেকে পাথর নামলো যেন। ও আসমত আলী চৌধুরীর দিকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকালো। কিন্তু তার মুখের দিকে চোখ রাখতেই বুকটা জমে যেতে লাগলো। তার মুখ থমথমে। দৃষ্টি কঠিন। তিনি ভারীকণ্ঠে বললেন,
‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। আমি আগেই ভয়ে ছিলাম যে, ব্যাচেলার ভাড়াটে ঝামেলা বাধাতে পারে। যা আশংকা করেছিলাম, তাই হলো।’
আসমত আলী চৌধুরীর কথায় আকাশের দম বন্ধ হয়ে এলো যেন। ও ভাষামূক হয়ে গেল। কি থেকে কি হয়ে যাচ্ছে। ওর মাথা ভার হয়ে এলো। আসমত আলী চৌধুরী এ মুহূর্তে যেন এক খন্ড আগুন।
‘আবারও বলছি, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাড়িটি খালি করে দেবেন। তারপর যত ইচ্ছে পত্র লিখুন আমার কিছু বলার থাকবে না।’
বলেই বাড়িওয়ালা সদর গেট দিয়ে বের হয়ে গেলেন। আকাশ স্তব্ধ। বিমূঢ়। ওর সব কিছু এলোমেলো। এতটা অসহায় ও কখনো বোধ করেনি। ও কিছুই মেলাতে পারছে না। মনটা ভীষণ রকম খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত। বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে বলে দু’চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। সকালটা ওর শুরু হলো বিশ্রীভাবে।
দুই.
আকাশ এই বাড়িতে উঠেছে প্রায় দু’মাস। ব্যাচেলার বলে বাড়িওয়ালা ভাড়া দিতে চাননি। ঢাকা শহরে ব্যাচেলারদের নিয়ে বাড়িওয়ালাদের নানারকম সন্দেহ! ব্যাচেলারদের বাড়ি পাওয়া সোনার হরিণ পাওয়ার মত। আকাশের এ ব্যাপারে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাড়িটি ছেড়ে দিতে হবে বলে ওর ভেতরটা শূন্য মরুভুমি হয়ে গেল। আসমত আলী চৌধুরী শক্ত ধরনের মানুষ। কথা থেকে সরবেন বলে মনে হয় না। তার ভুল ধারণাকে ভাঙানোর পক্ষে আকাশের হাতে কোন প্রমাণও নেই। মেয়েটি হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ার মত ওকে তছনছ করে দিয়ে গেল। মনটাই তেতে গেছে। আকাশ পুরোদিন বাসা খুঁজলো। বাসা পাওয়া গেল না। ব্যাচেলারদের কেউ বাসা দিতে চায় না। বিপদটা সেখানেই। সকালের অপ্রত্যাশিত ঘটনা দুঃস্বপ্নের মত ওর চোখের পর্দায় বেসে উঠতে লাগলো। বাসার জন্যে ওর মনে দুঃশ্চিন্তার কালো মেঘ। বাসা না পেলে পথে নামতে হবে। নয়তো কারো ঘাড়ে চাপতে হবে। ও কারো সঙ্গে একরুমে থাকতে পারে না। মেসলাইভ ওর ভালো লাগে না। বাসা না পেলে সমস্যা হবে রঞ্জণকে নিয়ে। রঞ্জণ ওর বাল্যবন্ধু। পাঁচদিন আগে রঞ্জণ উঠেছে ওর বাসায়। ঢাকায় ওর থাকার কোন জায়গা নেই। ওর নতুন চাকুরি। রঞ্জণও বাসা খুঁজছে। বাসা পেলে চলে যাবে। এখন আকাশকেই বাসা ছাড়তে হবে। নিজের জায়গা ঠিক করলেই হবে না, রঞ্জণের জন্য একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এখন কি করবে আকাশ? আজকের অঘটনের জন্যে আকাশ প্রস্তুত ছিল না। অঘটন যখন ঘটে রঞ্জণ ঘরেই ছিল। ও সব শুনতে পেয়েছে। এমন কি বাড়িওয়ালার ঘোষণাও। ওকে কিছু বলতে হয়নি। ওর মুখও বিষণ্ন ছিল। আকাশ নিজের সমস্যার চেয়ে রঞ্জণের কথাটাই বেশি ভেবেছে দিনভর। রঞ্জণ উঠবে কোথায়? তবে রঞ্জণ বাড়ি থেকে বের হবার সময় ওকে বলেছে,
‘আকাশ, আমার জন্য চিন্তা করিস না। আমি একটা ব্যবস্থা করে নেবো এবং আজই চলে যাবো।’
আকাশ কিছু বলেনি। ও চুপচাপ বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। সারাদিন হন্যে হয়ে বাসা খুঁজেছে। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলো ও। অবসাদ আর বিষণ্নতায় আকাশ যখন বাড়ি ফিরলো তখন বিকেল শেষ হবার পথে। সন্ধ্যার আয়োজন চলছে। বাড়ির গেট ঘেঁষে রিকসা থামলো। ও ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বাসার গেটের দিকে যেতেই মেয়েটিকে দেখতে পেল। ওর বুকের ভেতরটা ঝলসে গেল যেন। মেয়েটি ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। নরোম গলায় বলল,
‘এতোক্ষণ আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।’
‘আমার আর কতটুকু ক্ষতি চান, আপনি?’
‘আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি।’
বলল মেয়েটি। আকাশ অবাক হয়। মেয়েটি এখন অন্যরকম। ও বলে,
‘কিন্তু……!’
‘দেখুন, সকালোর ঘটনায় আমারও দোষ ছিল না।’
‘তবে আবার ক্ষমা চাইতে এসেছেন কেন?’
‘কারণ, ভুল বুঝে আপনাকে আক্রমণ করেছি বলে।’
‘আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘আপনার বন্ধু যদি আমাকে কিছু না বলতো, তবে আমারও ভুলটা থেকে যেত।’
‘রঞ্জণকে আপনি চেনেন!’
‘আজই চিনলাম। শুনুন, আপনার নাম ব্যবহার করে রঞ্জণই আমাকে পত্রটা লিখেছিলো। তার ভাষায়, ‘এটা ছিল নিছক খেলা।’ কিন্তু সে বুঝতে পারেনি ঘটনা এভাবে মোড় নেবে। সে আজ আমার সাথে দেখা করেছে। পত্র লেখার জন্য সে অনুতপ্ত ও লজ্জিত।’
বলল মেয়েটি। আকাশ যেন হতভম্ব। ও কি শুনছে! ঘটনার অন্তরালে এই ছিল? আকাশ বলল,
‘আশ্চার্য!’
‘তার ওপর রাগ করবেন না। তিনি আপনাকে খুব ভালোবাসেন। সে আজ চলে গেছে।’
আকাশ কিছুই ভাবতে পারে না। গল্প-গল্প মনে হচ্ছে ওর। মেয়েটি লজ্জাবনত হয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যেন মস্তবড় অপরাধী। মেয়েটির এই উপস্থিতি আকাশের ভালো লাগলো। ও বলল,
‘যা হবার হয়েছে। এরজন্যে আপনার প্রতি রাগ করিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে কারো ওপর রাগ করতে পারি না। তাছাড়া আপনার তো কোন দোষ দেখছি না।’
আকাশের কথায় মেয়েটি চোখ তুললো। মেঘ জমেছে ওর চোখের কোণে। আকাশ ওর চোখের দিকে চেয়ে থাকতে পারলো না। ভেতরে এক ধরনের আলোড়ণ টের পাচ্ছে। ও নিজেকে ধরে রাখে। মেয়েটি বলে,
‘আচ্ছা, আমি আসি।
বলেই মেয়েটি দ্রুত হেঁটে চলে গেল। আকাশও আর দাঁড়ালো না। বাড়ির গেট খুলে ও ভেতরে চলে গেল। পেছনে ফিরে তাকালো না ও। তবে খুব ইচ্ছে করছিলো মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে। কিন্তু মেয়েটির অহংকার আরো বেড়ে যাবে বলে ও তাকায়নি। বাসার তালা খুলে ও রঞ্জণকে ঠিকই দেখতে পেলনা। ওর জামা-কাপড়ও নেই। টেবিলের ওপর তালার অপর একটি চাবি রেখে গেছে। ও আপন মনে হেসে উঠলো! রঞ্জণকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘তোর জন্যে বাসাটা ছাড়তে হবে বলে দুঃখ নেই। মেয়েটির অহংকার ভেঙেছে তো!’
কিছুক্ষণ পরই বাসার দরোজার কড়া নাড়ার শব্দ হলো মৃদুভাবে। দরোজা খুললো ও। একজন মাঝবয়সী মহিলা দাঁড়ানো। খানিকটা অপ্রস্তুত। কিছু বলার আগেই মহিলা একটা খাম বাড়িয়ে দিল। নীল খাম। বলল,
‘এটা আপা দিচ্ছে, রাখেন।’
খামটা নিল আকাশ। মহিলা চলে গেল। খাম খুললো ও। ছোট্ট একটা চিরকুট। বুকটা কাঁপছে ওর। চিঠিতে লেখা,
‘আকাশ,
আপনি বাসা ছেড়ে চলে যাবেন না। প্লিজ।
তাহলে আমি কষ্ট পাবো। ভীষণ কষ্ট……..
ইতি
নীলা
আকাশ বুঝতে পারলো মেয়েটির নাম নীলা। আরো বুঝতে পারলো নীলা আজ তার সব অহংকার বিসর্জন দিয়েছে। ও পত্রটি নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। ওর ছাব্বিশ বসন্তের জীবন অদ্ভুত আবিষ্টতায় ডুবে যাচ্ছে। ও নীলাকে দেখতে পেল ওদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন ওর অপেক্ষা করছে। আশ্চর্য! সন্ধ্যা নেমেছে। হেমন্তের আকাশে তারার হাট জমতে শুরু করেছে। ফিকে আলোয় নীলাকে কেমন মূর্তির মত লাগছে। অপূর্ব! ওর মুখে হাসির বিদ্যুত চমকালো। নীলা হাতে তুলে নাড়লো। আকাশও হাত তুলে প্রতুত্তর জানালো। অনেকটা সম্মোহিতের মতো। আকাশের হাতের মুঠোয় নীলার দু’ লাইনের পত্রটি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে।
৯.
অন্যলোক
লোকটিকে দেখে ভীষণ অবাক হলো মিথিলা। শুধু অবাক বললে ভুল হবে, ও বিস্ময়ে থ’ হয়ে গেল। এমন কাকতালীয় ঘটনা ওর জীবনে কখনো ঘটেনি। এ যেন অতিপ্রাকৃত যে কোন গল্পের চেয়েও বেশি রহস্যময়। এই লোকটিকে ও জীবনে কখনো দেখেনি। দেখার কথাও নয়। অথচ লোকটিকে ও চেনে। এবং খুব ভালো করেই চেনে। লোকটির সঙ্গে ওর কখনো পরিচয় হয়নি। ও জানে না লোকটি কে, কোথায় থাকে এবং কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু মিথিলা লোকটির নাম জানে। অবশ্য যে নামে লোকটি স্বপ্নে ওকে দেখা দেয়, বাস্তবে লোকটির তা-ই নাম কিনা-কে জানে! মিথিলার মন বলছে, লোকটির নাম অপুই হবে। আজকাল মিথিলার অদ্ভূত বোধ কাজ করে। হঠাৎ হঠাৎ ও যা ভাবে, পরে দেখা যায় তা সত্যি হয়ে যায়! এই তো সেদিন, ও ভাবছিল শামীম আজ দেরীতে বাড়ি ফিরবে। ওকে ফোন করে বলবে অফিসের কাজে ভীষণ ব্যস্ত আছে। কিন্তু শামীম ওকে মিথা কথা বলে ওর সেক্রেটারী রোমেলার সঙ্গে ডেট করতে যাবে গুলশানের একটি রেষ্ট হাউজে। সত্যি সত্যি সেদিন সন্ধ্যায় শামীম ওকে ফোন করে জানালো যে, সে অফিসের কাজে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইউরোপ থেকে ডেলিগেট এসেছে। তাদের সঙ্গে ডিনার করতে হবে। শামীমের ফোন পাবার পর মিথিলা সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল গুলশানের দিকে। ড্রাইভারকে বললো হোয়াইট ক্যাসেল রেষ্ট হাউজে যেতে। ও এই রেষ্ট হাউজে এসে রেষ্টহাউজের কেয়ারটেকারের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে জানতে চাইলো,
‘বলুন তো, এই মুহুর্তে আপনাদের রেষ্ট হাউজে কে আছে?’
কেয়ারটেকার সাবধানী গলায় বললো,
‘শামীম আহমেদ নামে একজন হাই অফিশিয়াল এসেছেন তার বান্ধবীকে নিয়ে। তিনি এখানে প্রায়ই আসেন, ম্যাডাম। আমি যে তথ্য দিয়ে দিলাম, তা বলবেন না, প্লিজ! তাহলে আমার চাকরিটা যাবে!’
মিথিলা কাউকে কিছু বলেনি। এমন কি, শামীমকে এ ব্যাপারে ও কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। ওর মনে হয়েছে, এ কথা জিজ্ঞেস করে কোন লাভ হবে না। সংসারে অহেতুক একটা ঝড় বয়ে যাবে। ও শামীমের অনেক রকম কপটতা আজকাল বুঝতে পারছে। ওর লাম্পত্যের খবর টের পেয়ে যাচ্ছে। শামীম বাইরে খারাপ কাজ যাই করছে, এর আগেই ওর চিন্তার জগতে ম্যাসেজ চলে আসছে। ঐ লোকটিকে স্বপ্ন দেখার পর থেকেই ওর মধ্যে অদ্ভূত এ সব কান্ড ঘটছে। মিথিলা এ সব কথা কাউকেই বলছে না। মিথিলা বুঝতে পারছে, ওর মধ্যে এক ধরনের হেলুসিনেশন কাজ করছে। তবে লোকটিকে নিয়ে প্রায় নিয়মিত স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটির কোন ব্যাখ্যা ও বের করতে পারছে না। গত তিন মাস যাবত ও লোকটিকে নিয়ে অদ্ভূত অদ্ভূত স্বপ্ন দেখে আসছে। কাল রাতেও লোকটিকে ও স্বপ্ন দেখেছে। ও স্বপ্নে দেখলো মিথিলা লোকটির অর্থাৎ অপুর বাম হাত জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নিচে। মিথিলা মুগ্ধ চোখে আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘দেখো অপু, আইফেল টাওয়ারটার কেমন আকাশ ছোঁয়ার সাধ! ওর এই সাহসটাই কি শিল্প?’
অপু একটু হাসলো। ও বললো,
‘আমি এই আইফেল টাওয়ার দেখে হতাশ, মিথিলা। এটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী কত তোলপাড়, গল্পকথা! আমার মনে হচ্ছে, ফ্রান্স সরকারকে ঢাকার ধোলাইখালের লৌহ ব্যবসায়ীদের কাছে এখন এটি বিক্রি করে দেয়া উচিত।’
‘কেন!’
‘বিশ্বজুড়ে এখন গগণচুম্বি অট্টালিকার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আকাশ ছোঁয়ার মানদন্ডে এই টাওয়ার এখন আর অপ্রতিদ্বন্দ্বি নয়। তা ছাড়া জরাজীর্ণ লোহার এই টাওয়ারে রঙের প্রলেপ দিয়ে লাবন্য আনা হয়তো যায়, কিন্ত আমি এর মধ্যে কোন শিল্প খুঁজে পাই না। তাই যার মধ্যে শিল্প নেই, তাকে নিয়ে অহংকারের মহত্ব কেন?’
এই হচ্ছে অপু। সবকিছুর মধ্যে একটা বিপরীত বক্তব্য দেবে, কিন্তু খুবই যুক্তি তুলে ধরে। ও যখন কথা বলে, তখন শুধু তন্ময় হয়ে শুনতে হয়। মিথিলা মুগ্ধতার রেশ নিয়ে ওকে আরো আঁকড়ে ধরে। অপু ওকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে যেই ওর ঠোঁটে ঠোঁট স্পর্শ করলো, তখনি ওর ঘুম ভেঙে গেল। অপুকে নিয়ে ও প্রায় ভীষণরকম রোমান্টিক স্বপ্ন দেখছে। এর কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না মিথিলা।
লোকটি দাঁড়িয়েছিল হিথ্রো এয়ারপের্টের তিন নম্বর লাউঞ্জে। এই লাউঞ্জে এসে দাঁড়িয়ে শামীমের জন্য অপেক্ষা করছিল মিথিলা। ওরা ওদের নির্ধারিত ফ্লাইট মিস করেছে। পরবর্তী ফ্লাইট ধরা যাবে কিনা- এর খোঁজে শামীম গেল এ্যামিরাটস এয়ারলাইনেরর কাউন্টারে। মিথিলা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। এ সময় হঠাৎ লোকটিকে দেখতো পেল ও। লোকটিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওর সর্বাঙ্গে একটা বিশেষ শিহরণ ঢেউ খেলে গেল। এমন কখনো হয়নি ওর। ও চেষ্টা করেও লোকটির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলো না। ওর বুক কাঁপছে। এমন কি হয়! মিথিলা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। ঠিক এমন সময় লোকটি ওর পাশে এসে বললো,
‘কেমন আছো, মিথিলা?’
বিস্ময় থেকে আরো বেশি কিছু বিস্ময় তুমুল নাড়িয়ে দিল মিথিলাকে। ও কয়েক মুহুর্ত বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ওর স্বাভাবিক জ্ঞান যেন লোপ পেল। লোকটি ফের বললো,
‘তুমি যে জীবন নিয়ে আছো, আসলে তুমি সে জীবনের নও। তাই হয়তো আমাকে চিনতে পারছো না। আমি অপু! চেনার চেষ্টা করো!’
কতটা প্রলয় হলে পাহাড় নদী একাকার হয়, জানে না মিথিলা। তবে এই মুহুর্তে ওর ভেতরে ভীষণ প্রলয় হচ্ছে। ও ভেসে যাচ্ছে অন্যলোকে। ও ছাড়িয়ে যাচ্ছে এক জীবন থেকে অন্য এক জীবনে। ও মূর্তমান, অথচ যেন বিমূর্ত! অপু ওর সম্বিত ফিরিয়ে আনার মত করে বললো,
‘মনে করো দেখো, তুমি জলাধার পছন্দ করতে বলে আমি তোমার জন্যই গড়েছিলাম ভেনাস নগরী! তোমাকে অমরত্ব এনে দেব বলে, আমি সূচনা করেছিলাম মমি সভ্যতার! তোমাকে ইতিহাসে ঠাঁই দেব বলে তৈরি করেছিলাম অমরকীর্তি তাজমহল! তুমি ভুলে গেছো ওসব!’
মিথিলার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওর ভেতরে কেউ যেন কথা বলতে চাইছে। ওর কণ্ঠ থেকে আর্তনাদের মতো বের হলো,
‘অপু!’
‘হ্যাঁ, মিথিলা, হ্যাঁ! চিনতে পারছো!’
‘কিন্তু তুমি তো জাগরণে আসো না! স্বপ্নে আসো। তুমি কি শুধুই স্বপ্ন?’
‘না, আমি শুধু স্বপ্ন নই! আমি তোমার আরেক জীবন!’
‘এটা কেন? কেন তুমি আরেক জীবন?’
‘প্রায়শ্চিত্ত! তোমাকে ভীষণ, ভী-ষ-ণ রকম ভালোবাসার প্রায়শ্চিত্ত! আদমের গন্ধম খাওয়ার মত প্রায়শ্চিত্ত!’
‘কেন এই প্রায়শ্চিত্ত? কতদিন এই প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে?’
‘যতদিন তোমার এই জীবনের অভিসম্পাত শেষ হবে না! যতদিন তোমার আমার অন্যজীবন এক বৃন্তে ফুল হবে না! যতদিন অন্যলোকে তোমার আমার দেখা হবে না!’
‘তাহলে! তুমি কেবল স্বপ্নেই দেখা দেবে!’
‘বাস্তবতা যেখানে সীমাহীন দেয়াল তুলে রাখে, সেখানে স্বপ্নই তো গোপন আনন্দের সোপান। স্বপ্নের মধ্যেও আমি তোমাকে নিয়ে যাবো অন্য জীবনে। যাবে?’
‘তোমাকে ফেরাবো সাধ্য আমার আছে! ছিলে স্বপ্নে, আজ এলে কাছে।’
এ কথা বলে থামলো মিথিলা। ও এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছে। অপু হাত বাড়িয়ে মিথিলার হাত ধরলো। এই প্রথম মিথিলা অপ্রার্থিব শিহরণে কেঁপে উঠলো। অপু মিথিলার হাতে এক টুকরো সবুজ রঙের কাগজ গুঁজে দিয়ে বললো,
‘ঢাকায় যাচ্ছো। এই কাগজে আমার বাড়ির ঠিকানাটা আছে। মা অনেক বছর ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাকে বলো, একদিন আমি ফিরবো।’
মিথিলা কাগজটা দু’হাতে টেনে ওর চোখের সামনে মেলে ধরে কাগজে লেখা ঠিকানাটা পড়ে নিল। এরপর তাকাতেই দেখলো ওর সামনে অপু নেই। আশেপাশে কোথাও নেই। ও কি সত্যিই এসেছিল? ও কি মুহুর্তেই মানুষের ভিড়ে হারিয়ে গেল? কেন? প্রশ্নগুলো নিয়ে মিথিলা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়েছিল, ও নিজেও জানে না।
তিনমাস পেরুলো, স্বপ্নে দেখা দিল না অপু। এই স্বপ্নহীনতার কষ্ট নিয়ে মিথিলা কেমন নিজের ভেতরে নিজে মরে যেতে লাগলো। অস্বস্থি আর ছটফট বাড়তে লাগলো ওর। একদিন ও হাজির হলো অপুদের বাড়ি। ‘তিনমাস আগে হিথ্রো বিমান বন্দরে অপুর সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল’ এ কথা শুনে অপুর মা ভীষণ বিস্মিত হলেন। তিনি মিথিলাকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলে বললেন,
‘মা, তোমার ভুল হয়েছে। নাইন ইলাভেনে সন্ত্রাসী হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে অপুও ওখানে মারা গেছে। সে তো অনেক বছর হলো! ও ফিরে আসবে কীভাবে!’
অপুর মায়ের এই বিস্ময়ভরা প্রশ্নের সামনে বিপন্ন হয়ে গেল মিথিলা। ওর মনে হলো এই জীবন নয়, ওর অন্য জীবন চাই, হোক তা অন্যলোকে। অন্যলোকে শামীম নয়, অপু হকো ওর অবলম্বন।
১০.
অন্তর্গত কষ্ট
ইমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় এক বিয়ে বাড়িতে। হিরণ ওর দুর সম্পর্কের ফুপুর বিয়েতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। আত্মীয়তার সূত্রে ঐ বিয়েতে এসেছিল ইমাও। বিয়ে বাড়িতে ইমা খুব অল্প সময়ের মধ্যে সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ওর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল বিয়েবাড়ির সকল যুবকরা। ছেলেরা পাল্টা দিয়ে ইমার পেছনে ছায়ার মত লেগেছিল। অনেকটা সম্মোহনের মত। শুধু হিরণ একটা দূরত্ব তৈরি করে রেখেছিল। ইমার চঞ্চলতায় মুখর হয়ে ওঠেছিল বিয়েবাড়ি। শহর থেকে আসা পরীর মত কিশোরী মেয়েটি সবার সাথে ভাব জমিয়ে হল্লা করে মাতিয়ে তুলেছিল বিয়েবাড়ির আনুসাঙ্গিক অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ থেকে কনেকে বর পক্ষের কাছে তুলে দেয়া পর্যন্ত ওর ছিল সরব অংশগ্রহণ। হিরণ লক্ষ্য করে ইমার দিকে তাকালে চট করে চোখ ফেরানো যায়না এবং ওর উপস্থিতিকে উপেক্ষাও করা যায় না। যেমন ওকে উপেক্ষা করতে পারেনি হিরণ। গায়ে হলুদের দিনে, মধ্যরাতে ইমার আর্ত চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল অনেকের। হিরণ তখনো ঘুমায়নি। হৈ-চৈ শুনে ও এগিয়ে গেল। ও দেখতে পেল ইমা ঠোঁট ফুলিয়ে বা”চা মেয়ের মত কাঁদছে। ওর মুখমন্ডল জুড়ে কালির আঁচড়। হিরণের কানে কানে একজন ফিস ফিস করে বলল,
‘ও যখন ঘুমিয়েছিল, তখন কে বা কারা ওর মুখে কালি মেখে দিয়েছে! হি-হি-হি!’
ইমাকে ঘিরে একটা সোরগোল হচ্ছে। কেউ কেউ ঠাট্টা-তামাশা করছেন। ইমা কান্না থামিয়ে হিরণের সামনে এসে বলল,
‘আমার সঙ্গে একটু যাবেন?’
বিব্রত কণ্ঠে হিরণ বলল,
‘কোথায়?’
‘নদীর পাড়ে। নদীর জলে মুখ ধোব।’
‘এতো রাতে নদীর পাড়ে যাবেন! কলের পানিতেই তো মুখ ধুয়ে নিতে পারেন।’
‘আপনার সাজেশন চাইনি। আমি নদীতেই যাবো। নিয়ে চলুন।’
যেন আদেশ করলো। হিরণও কেমন সম্মোহিত হয়ে যায়। ও দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল,
‘চলুন।’
ওরা অনেকগুলো চোখের নানা ভাষাকে উপেক্ষা করে নদীর দিকে হাঁটতে লাগলো। মধ্যরাতের বিয়েবাড়ির মিইয়ে যাওয়া কোলাহল ওদের পেছনে হারিয়ে গেল এক সময়। নদীর পাড়ে এলেও নদীর জলে নামার সাহস পেল না ইমা। ও বলল,
‘নদীর পানি দিয়ে আপনি আমার মুখ ধুয়ে দিন, প্লিজ!’
এ ধরনের আবদারের জন্য প্রস্তত ছিল না হিরণ। এক ধরনের শীতল ভয় আর অন্য রকম ভালো লাগার স্রোত ওর অনুভূতিতে বইতে লাগলো। ও দাঁড়িয়েই থাকে। ইমা তাগিদ দিয়ে বলে,
‘কলা গাছের মত দাঁড়িয়ে রইলেন যে! এই মধ্যরাতে আমি কি নদীর জলে নামতে পারি? তা ছাড়া আমি সাঁতার জানিনা!’
‘বলছিলাম কী, আমি আপনার মুখ ধুয়ে দেব!’
‘কেন ইচ্ছে করছে না? আমার মুখটি কি খুব খারাপ?’
‘তা নয়। বরং..।’
‘বলুন, থামলেন কেন?’
হিরণ বুঝতে পারছে ও একটা গোলক ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছে। এই ধাঁধায় ও পড়তে চায় না। কিন্তু ও যেন পা হড়কে সেদিকেই পড়ে যাচ্ছে । ও নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করে। ইমা হঠাৎ খিলখিল করে হাসিতে ফেটে পড়ে। ওর হাসির সামনে হিরণ কেমন বিব্রতবোধ করতে থাকে। ইমা বলল,
‘আপনি দেখছি একটা ভীতুর ডিম! আমার মুখটা ধুয়ে দিতে এতো ভয় পাচ্ছেন! আপনি জানেন, অন্য যে কোন ছেলেকে এ কথাটি বললে প্রথমে খুশিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো!’
ওর এ কথাটি সঠিক বলেই মনে হয় হিরণের। কিন্তু ও যে সে রকম নয়, তা কী করে ওকে বোঝাবে? ইমা বলে,
‘ঠিক আছে, আপনি দু’ হাতের অঞ্জলীতে নদীর জল আমাকে তুলে দিন, আমি মুখ ধুয়ে নিচ্ছি।’
হিরণ আর কথা বাড়ায় না। ও দু’হাতের অঞ্জলীতে নদীর জল তুলে আনলো। ইমা চোখ বুঝে রইলো। যেন ওর মুখ ধুয়ে দেবার জন্য অপ্রকাশিত আহবান। হিরণ বুকের সবটুকু সাহস এক করে কাঁপা হাতে ধুয়ে দিল ইমার মুখ। ওদের স্পর্শ বার্তা পৌঁছে দিল কোথাও। হিরণের একুশ বছরের জীবনটা এই প্রথম দুলে উঠলো অপার্থিব আবিষ্টতায়। ইমার ভেতরেও কী, কোন ভাঙন হচ্ছে? ভাবে হিরণ। ফেরার পথে ইমা বলল,
‘কই, পারলেন আমাকে উপেক্ষা করতে? শেষ পর্যন্ত তো আমাকে স্পর্শও করলেন!’
ইমার কথা বুঝতে না পেরে হিরণ বলল,
‘আমি ঠিক আপনার কথা বুঝতে পারছি না।’
ইমা হেসে উঠলো। বলল,
‘আমাকে কেউ উপেক্ষা করলে, আমি তা সহ্য করতে পারি না। এই বিয়েবাড়ির সব ছেলেরা আমার পেছনে ঘুরেছে। শুধু আপনি ছিলেন নির্বিকার। আমার প্রতি আপনার নির্লুপ্তভাব দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। তাই, আপনার সন্ন্যাসী চরিত্রের অহংকার ভেঙ্গে দিলাম। হা-হা-হা।’
অবাক চোখে হিরণ তাকিয়ে থাকে ইমার দিকে। জ্যোস্নাপ্লূত রাতে ওকে রহস্যময়ী অপ্সরীর মতো লাগছে!
ইমার সাথে আর কখনো দেখা হবে ভাবেনি হিরণ। কিন্তু ওর সাথে দেখা হোক এটা মনে মনে কামনা করতো। কিন্তু দেখা হবার সম্ভাবনা নেই। ইমা থাকে অন্য ছোট্ট এক শহরে। হিরণদের বাড়ি থেকে ওদের বাড়ির দূরত্ব অনেক। এই দূরত্ব ভাঙতে পারতো ও, ভাঙার সাহস পায়নি। দুর সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্র ধরে ইমাদের বাড়ি যাওয়া যায়, কিন্তু সেটা ঠিক হবে কিনা এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিল না হিরণ। তারপরও একদিন হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ইমার সঙ্গে। হিরণ কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল এক বন্ধুর সাথে। পথের মাঝে এসে ওর বন্ধু রিকশা থেকে নামতেই ইমার মিষ্টি ডাক হিরণের কানে ভেসে এলো। ও হচকিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো। ও চারপাশে এক ঝলক তাকিয়ে নিল। ও দেখতে পেল যেখানে ওর রিকশা থেমেছে, সেখানের সামনে একটা অট্টালিকার ছাদে ইমা দাঁড়িয়ে আছে। ছাদ থেকে ইমা জোরালো কণ্ঠে বলল,
‘এই যে শুনুন, গেট দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ুন।’
হিরণ চেষ্টা করেও নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ও রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে অট্টালিকার গেট দিয়ে ঢুকে পড়লো। ইমা ছাদ থেকে দৌড়ে নেমে এলো নিচে। ওর চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। হিরণ ভয়কাতুরে গলায় বলল,
‘এটা আপনার নানার বাড়ি না?’
‘হুম, এটা আমার নানার বাড়ি। আপনি আমাদের বাড়ি চেনেন তো?’
‘চিনি না। তবে ই”েছ করলে আপনাদের বাড়ির ঠিকানা জেনে নিতে পারবো। তা আপনি নানীর বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন?’
‘না, আপনাকে খুঁজতে এসেছি।’
বলেই ও হাসতে লাগলো। এরপর ইমা বলল,
‘আমি প্রায়ই নানার বাড়িতে আসি। ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে মাঝেমাঝে ভাবি, আপনি এই পথ দিয়ে যখন বাড়ি ফিরবেন, দেখা হবে। আজ দেখা হলো।’
হিরণ এর জবাবে কী বলবে, ভেবে পায় না। ওর কথাটি সত্য কিনা, কে জানে! হিরণ বলে,
‘এই বাড়িতে আজ কে কে আছেন। আমাকে ডেকে আনলেন, ভয় করছে না?’
এ কথায় হেসে ওঠে ইমা। ও বলল,
‘বাড়িতে শুধু ছোট মামা আছেন। সবাই গিয়েছেন মামার বউ দেখতে। আমি যাইনি। মনে হচ্ছে, আপনার সাথে দেখা হবে বলেই যাইনি। চলুন বাড়ির ভেতরে যাই।’
হিরণ আপত্তি জানালেও ইমা ওকে টেনে ড্রইং রুমে নিয়ে যায়। হিরণের অজানা ভয় বাড়তে থাকে। ইমা রান্না ঘরে গিয়ে কাজের বুয়াকে চা-নাস্তা দেবার কথা বলে ড্রইং রুমে ফিরে আসে। হিরণ ভয় ও ভালো লাগার বোধে জড়িয়ে থাকে। ইমা ফিরে এসে বলে,
‘আপনি আমার কোন খোঁজ নেননি! আমাকে দেখার ইচ্ছে করেনি আপনার?’
হিরণ মনে মনে বলল ‘প্রতিনিয়ত ইচ্ছে করেছে।’ মুখে বলল,
‘আপনার খোঁজ নেব কেন? কিসের প্রয়োজনে?’
‘কোন প্রয়োজন নেই!’
‘আসলে প্রয়োজন আছে কী, নেই-তা ভাবিনি।’
‘আপনার অনেক অহংকার, না?’
‘না। তা নয়। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আসলে আমি একজন সাধারণ ছেলে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমার প্রয়োজনটা প্রথমে ভাত-কাপড়ের। তারপর লেখাপড়ার উপকরণ। ও সব জোগাতেই দিন ফুরিয়ে যায়।’
‘তারপরও আপনি স্বপ্ন দেখেন না?’
‘স্বপ্ন দেখার চেয়ে স্বপ্ন সাজিয়ে রাখি বেশি।’
‘কাউকে ভালো লাগে না? কাউকে ভালোবাসতে ই”েছ করে না?’
‘ভালোবাসার চাইতে, ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার ভয় আমাদের বেশি। পেয়ে হারানোর চেয়ে, না পাওয়াই ভালো নয় কি?’
এ কথায় ইমা কয়েক মুহুর্ত বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে থাকে হিরণের দিকে। ও একটু সময় নিয়ে বলে,
‘তার মানে আপনি স্বপ্ন সত্যি করার প্রতিশ্রুতি চাচ্ছেন? ভালোবাসা পাবার নিশ্চয়তা চাচ্ছেন?
‘আমার কোন কিছু চাওয়ার সাহস একেবারেই কম।’
‘কিন্তু আমি আজ আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।’
‘বলুন।’
‘আপনাকে আমার ভালো লাগে। আমরা কী..!’
‘আর বলবেন না, প্লিজ! আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছে!’
হিরণের আর্তি উপেক্ষা করে ও বলে,
‘আপনি এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো, হিরণ!’
ইমার এ কথা শেষ হতেই ড্রয়ং রুমে প্রবেশ করলো ওর মামা। তিনি হিরণকে দেখে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। ইমা ভড়কে যাওয়া গলায় মামার উদ্দেশ্যে তাড়তাড়ি বলল,
‘মামা, ও হচ্ছে হিরণ। ও চমৎকার কবিতা লেখে। ও..!’
‘ইমা, তুমি আমার জন্য এক কাপ কফি তৈরি করে নিয়ে আসো তো, মা! আমি ওর সাথে কথা বলছি।’
ইমা চলে গেল। যাবার সময় ও আকুতি ভরা চোখে এক ঝলক তাকায় হিরণের শুকনো মুখের দিকে। ইমা চলে যেতেই ওর মামা চাপা গলায় হিরণের উদ্দেশ্যে বললেন,
‘তুমি এখুনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। যদি কখনো ইমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করো, তবে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ! মনে রেখো, তুমি নিতান্তই গরীবের সন্তান। ইমা তোমার জন্য আকাশের চাঁদ! চাঁদ ধরার দুঃসাহস দেখিয়ো না!’
হিরণ আর বসেনি। ও হনহন করে বেরিয়ে আসে ঐ অট্টালিকা থেকে। ওর কানে বারবার ইমার মামার কথাগুলো বাজতে থাকে। এক ধরনের গ্লানি এবং কষ্টে ও ডুবে যায়।
ভয়, সংকোচ ও দ্বিধার অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে পারেনি হিরণ। অথচ নিজের ভেতরে রক্তক্ষরণ! চার বছর পর দেয়ালটাকে তুচ্ছ মনে হলো ওর। এই চার বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলেছে ও নিজেও। মার্ষ্টাস পরীক্ষা দেবার পর থেকেই ওর ভেতরে কেমন সাহস বাড়তে থাকে। ইমার মামার কথা অর্থহীন হয়ে যায়। এই চার বছরে ও ইমার সঙ্গে কোন যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। নানার বাড়িতে হিরণের দেখা হবার তিনমাস পর ইমা ওকে একটা চিঠি লিখেছিল। চিঠিতে ও লিখেছিল,
‘হিরণ,
সেদিন আপনি ভীতুর মত পালিয়ে গেলেন। আমি ভেবেছিলাম আপনি পরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং আপনার মনোভাব আমাকে জানাবেন। আমি আমার কথা অকপটে আপনাকে জানাতে চাই। প্লিজ, আপনার কথা আমাকে জানান। যদি না জানান, তবে ধরে নেব, আমাকে হারিয়ে দিতে এ আপনার এক ধরনের অহংকার। কোনটি বড় ভালোবাসা নাকি অহংকার?
ইমা’।
ইমার চিঠিটি এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছে হিরণ। এই পত্র ওর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে মূলবান সম্পদ। এ যেন পুষে রাখা একতাল অন্তর্গত কষ্ট। ইমার কথা মনে পড়লেই ও এই চিঠিটি পড়ে। ইমাকে ওর জবাবটি না জানালেও হিরণ ওর খোঁজ রাখতো। মাঝেমাঝে ও ইমার কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে দূর থেকে ওকে দেখে আসতো। নীরবে দেখার মধ্য দিয়েই ওর অপ্রকাশিত ভালোবাসার দ্বীপশিখাটি জ্বেলে রেখেছিল ও। আজ প্রায় চার বছর পর ও অদৃশ্য দেয়ালটা ভেঙে ফেললো। আজ কেন জানি, ইমাকে ওর দেখতে খুব ইচ্ছে করলো। না বলা কথাটি বলতে চাইলো ওর মন। মন এতোটা বেপরোয়া কখনো হয়নি। হিরণ সব ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে ছুটে চললো ইমাদের বাড়ির দিকে। চার বছর আগে যে জবাবটা ইমাকে জানাতে পারেনি, আজ তা বলে ফেলে ও হাল্কা হতে চায়।
ইমাদের বাড়ি খুঁজে পেত কোন কষ্ট হলো না হিরণের। ইমরানার দাদার নাম ওদের এলাকার সবাই জানে। ওদের শহরে গিয়ে রিকশাওয়ালাকে ‘চৌধুরী বাড়ি যাবো’ বলতেই রিকসাওয়ালা কোন উচ্চবাচ্য না করে ছুটে চললো। শহর, শহরতলী বা গ্রামে যে কোন ধনী বা সম্ভ্রান্ত পরিবারকে সাধারণ সকলেই চেনে। ইমার দাদাও তেমন একজন ব্যক্তি। রিকসাওয়ালা চৌধুরী বাড়ির গেটের সামনে নামিয়ে দিল। হিরণ দেখলো হক চৌধুরী বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছে। বাড়ির প্রবেশ মুখে বিয়েবাড়ির বিশাল গেট। দালান জুড়ে আলোক সজ্জা। মানুষজন ছুটোছুটি করছে বাড়ির সামনে। বাড়ির ভেতর থেকে আসছে হৈ-হল্লার শব্দ। হিরণের হার্টবিট যেন বেড়ে যাচ্ছে। ও একজন পথচারীকে থামিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললো,
‘এই যে শুনুন, এটা এনামুল চৌধুরীর বাড়ি?’
পথচারী মুখে লম্বা হাসি টেনে বললেন,
‘জে, হ। এইটা এনামুল চৌধুরীর বাড়ি। আপনি কার কাছে আইছেন?’
এর জবাব না দিয়ে ও বললো,
‘এই বাড়িতে আজ কার বিয়ে হচ্ছে, বলতে পারেন?’
‘আইজ এনামুল চৌধুরীর নাতনী ইমার বিয়া হইতাছে।’
‘ইমার বিয়ে!’
‘হ। ছেলে আমেরিকায় থাকে, ইঞ্জিনিয়ার!’
এ কথা বলেই পথচারী চলে গেল। ও হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো বিয়েবাড়ির সামনে। কতক্ষণ ও দাঁড়িয়ে ছিল, কে জানে! একসময় উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে লাগলো হিরণ। বিয়েবাড়ির দিকে ফিরেও তাকালো না। অন্তর্গত কষ্ট চেপে ও হাঁটতে লাগলো। ও হাঁটছে তো হাঁটছেই! পথ যেন ফুরাচ্ছে না।
১১.
রহস্যময়
চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে কোন প্রশ্নের মুখোমুখি না হওয়ায় মহিমা ভীষণ অবাক হলো। ইন্টারভিউ দিতে এসে ওর ভেতরে কী যে কাঁপুনি হচ্ছিলো, সে কথা বলে বোঝানো যাবে না। কী কী প্রশ্নের জবাব দিতে হবে , কীভাবে কথা বলতে হবে, কতটা বিনয় ভাব দেখাতে হবে আবার বেশি বিনয়ী ভাব দেখাতে গিয়ে স্মার্টনেস যেন লোপ পেয়ে না যায়, সেদিকটাও মনে রাখতে হবে..এ সব কথা এই কিছুক্ষণ আগেও ভাবছিলো। ভাবতে গিয়ে কেমন ভয় ভয়ও লাগছিলো। এক ধরনের অড়ষ্টতা ছিল। এই আড়ষ্টতা নিয়েই ও রুমে প্রবেশ করেছিল। কোম্পানীর এমডির কক্ষ। এমডির কক্ষে প্রবেশ করেই ও চট করে তাকিয়ে নিয়েছিল রুমটা। এটা ওর অভ্যাস। কারো বাড়ি বা অফিস কক্ষে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ও দেয়ালের চারপাশটা দেখে নেয়। কক্ষের মধ্যে কোন বড় ধরনের বিশেষত্ব আছে কিনা দেখে নেয়। প্রথম প্রথম মহিমা ওর এই অভ্যাসটার কথা বুঝতো না। একসময় ও নিজেই নিজের অভ্যাসটা আবিস্কার করে। এই অভ্যাসটা ভালো, না মন্দ-তা এখনো ভেবে দেখেনি। মহিমা লক্ষ্য করলো এমডির রুমটা বেশ বড়। ৭/৮ শ’ স্কয়ার ফিট হবে। রাউন্ড টেবিলের ওপাশে এমডি চেয়ারে বসে আছেন। রুমটির ডানপাশের দেয়ালের সঙ্গে সোফার কাছে একটা ওয়েল পেন্টিং রয়েছে। ছবিটা দেয়ালে ঝুলানো হবে হয়তো। সোফার কাছে রাখা পেইন্টিংয়ের বিষয়বস্তু যা, তা অফিসের জন্য মানানসই নয়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন নগ্ননারী বিছানায় শুয়ে আছেন। ছবিটার দিকে তাকানো যায় না। ঐ ছবিটার দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মহিমার কান লাল হয়ে গেলো। সব সময় সবদিকে তাকানো ঠিক নয়-ছবিটি দেখে এ কথাটি মনে হলো ওর। সবকিছু অনুভব হলো কয়েক মুহুর্তের মধ্যে। তবে পেইন্টিংটা চমৎকার। এমডির চেয়ারের পেছনে দেয়ালে আরেকটা পেইন্টিং। এই পেইন্টিং মানানসই। লিওনার্দো ভিঞ্চির আঁকা ছবি হবে। ছবির বিষয়বস্তু হচ্ছে কয়েকজন শিশুসহ একজন মা। ইন্টারভিউ দেবার টেনশন কাজ করছিলো। কোম্পনীর এমডির দিকে ভালো করে তাকানো হয়নি। তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসতেই এমডি সাহেবের গলা গমগম করে উঠলো,
‘মিস্ মহিমা, আপনি কি চাকরিটা চাচ্ছেন?’
চাকরি প্রার্থীকে মেধা যাচাইয়ের কোন প্রশ্ন না করে সমরাসরি চাকরিটা চাচ্ছেন কিনা, এমন প্রশ্ন করার কথা কেউ শুনেছে বলতে পারবে না। মহিমা অবাক হলো। নরোম গলায় বললো,
‘জ্বি, স্যার। এই জন্যই ইন্টারভিউ তো এসেছি। কোন প্রশ্ন থাকলে করুন, আমি চেষ্টা করবো জবাব দিতে।’
‘আপনাকে কোন প্রশ্ন করবো না। প্রশ্ন ছাড়াই আপনাকে সিলেক্ট করে ফেললাম। আপনার কোন প্রশ্ন আছে?’
প্রশ্ন ছাড়াই চাকরি হয়ে যাচ্ছে, এই বিস্ময়ের একটা ধাক্কা মহিমাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওর অবাক হবার রেশ যেন কাটছে না। এমডি সাহেব এক মিনিট চুপ থেকে মহিমার বিস্ময়ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আপনার কোন প্রশ্ন নেই?’
এমডির কথায় সম্বিত ফিরে আসে। মহিমা নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে বলে,
‘আপনার নাম কি স্যার?’
প্রশ্নটা করেই ওর মনে হলো এটা সঠিক প্রশ্ন হয়নি। কক্ষে প্রবেশ করার আগে ও নেমপ্লেট পড়েছে। সেখানে লেখা ছিলো সীমান্ত ফয়সাল। মহিমা নার্ভাস হয়েই এই প্রশ্নটা করেছে। সীমান্ত ফয়সাল বললেন,
‘আমার নাম সীমান্ত। পুরো নাম সীমান্ত ফয়সাল। আর কোন প্রশ্ন?’
‘না, মানে..!’
‘আপনি কি জানেন, আপনার পদবি এবং কাজ কি?’
‘জ্বি, স্যার। পদবি হচ্ছে সেক্রেটারী। কাজ হচ্ছে এমডির নির্দেশ ফলো করা। এমডিকে এসিষ্ট করা।’
‘রাইট। আপনি কবে থেকে জয়েন করতে পারবেন?’
‘যেদিন থেকে বলবেন, স্যার। তবে দু’তিন দিন সময় পেলে ভালো হয়। কেনাকাটার বিষয় আছে।’
‘হুম। এখুনিই একটা কথা বলে রাখছি, আমাকে কখনো ‘স্যার’ বলবেন না। আমার নাম ধরে ডাকবেন। সীমান্ত।’
এমডির এ কথায় কেমন ভড়কে গেল মহিমা। একটা বহুজাতিক কোম্পানীর এমডিকে নাম ধরে ডাকা যায়? তাছাড়া নাম ধরে ডাকলে কেমন বেমানান লাগবে না? সেক্রেটারী বসকে নাম ধরে ডাকবে, ব্যাপারটা কেমন বিদঘুটে লাগবে-এমন কথা ভাবছিলো মহিমা। মহিমার অস্বস্থি হয়তো এমডি বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন,
‘আমি যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করেছি। নাম ধরে ডাকাটা আমি পছন্দ করি। ‘স্যার’ ডাকলে আমার অস্বস্থি লাগে। তাই..।’
‘এখন বুঝতে পেরেছি, স্যার..!’
মহিমা কথাটা বলেও লজ্জা পেল। ওর মধ্যে চাকরি পাওয়ার আনন্দের চেয়ে টেনশন বেশি কাজ করছে। সীমান্ত বললো,
‘এটাই আপনার প্রথম চাকরি?’
‘জ্বি। প্রথম ইন্টারভিউও।’
‘আমি কিন্তু আপনার ইন্টারভিউ নিইনি।’
‘জ্বি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না..?’
‘খুশি হননি?’
‘এখন ভালো লাগছে। প্রথমে ঘোর লেগে গিয়েছিলো।’
‘আপনি আগামীকাল এসে এ্যাপয়ন্টম্যান্ট লেটারটা নিয়ে যাবেন। সাতদিন পর এক তারিখ থেকে জয়েন করবেন।’
‘জ্বি, স্যার! সরি স্যার! ও নো, সীমান্ত!’
মহিমার কণ্ঠে একতাল টেনশন। সীমান্ত মুখ টিপে হাসলো। সে বললো,
‘আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে বলুন।’
‘একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে।’
মহিমার ভয় কেটে যাচ্ছে। সীমান্ত মহিমার চোখে চোখ রেখে বললো,
‘বলুন।’
‘আপনার মাথার উপর যে ছবিটা আছে, সেটা খুবই ভালো একটা ছবি।’
‘থ্যাংকস।’
‘কিন্তু..?’
এ পর্যন্ত বলে থেমে যায় মহিমা। সীমান্ত চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করে,
‘কিন্তু কি?’
‘সোফার সামনে যে ছবিটা রয়েছে..,সেটা কিন্তু আপনার অফিসের সঙ্গে মানানসই হবে না।’
মহিমার কথা শুনে ‘হা-হা-হা’ করে হেসে ওঠলো সীমান্ত। রুম কাঁপানো হাসি। মহিমা একটু ভড়কে গেল। সীমান্ত হাসছে। মহিমা তার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। নতুন এক আড়ষ্টতা এসে ওকে গ্রাস করলো। হাসি থামিয়ে সীমান্ত বললো,
‘ও মাই গড! আপনি রুমে ঢুকে এতো কিছু লক্ষ্য করেছেন? আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় আমি মুগ্ধ।’
‘ধন্যবাদ। কিন্তু ছবিটা..?’
‘এবার কিন্তু আপনার ইন্টারভিউ নেবো।’
‘মানে! চাকরি হবার পর ইন্টারভিউ? এই নিয়ম কি যুক্তরাষ্ট্রে শিখেছেন?’
মহিমার কথায় নিজেকে সংযত করে আবারো হাসলো সীমান্ত। বললো,
‘না, না, ঠিক ইন্টারভিউ নয়। কিছু প্রশ্ন করবো।’
‘প্রশ্ন? করুন।’
‘আমার মাথার পেছনে যে ছবিটা রয়েছে, সেটা কার আঁকা বলতে পারবেন?
সীমান্তের প্রশ্নে গাবড়ালো না মহিমা। ও চোখ রাখলো ছবিটার দিকে। ওর মনে হলো ছবিটা লিওনার্দো ভিঞ্চির আঁকা। ছবির নামটা মনে পড়লো না। ও বললো,
‘জনাব সীমান্ত, ছবিটা লিওনার্দো ভিঞ্চির তৈলচিত্র। ছবির নামটা এই মুহুর্তে বলতে পারছি না।’
সীমান্ত বললো,
‘ছবিটির নাম ‘ভাজিন অফ দি রকস লুভার’। ছবিটি লিওনার্দো আঁকেন ১৫০৫ থেকে ১৫০৮ সালের মধ্যে।’
‘ওহ্!’
‘যে ছবিটা আপনি এই কক্ষের জন্য বেমানান বলেছেন, সেটা কার ছবি বলতে পারবেন?’
এ কথায় ঐ ছবিটার দিকে তাকালো না মহিমা। সীমান্তের সামনে নগ্ন এক নারীর ছবির দিকে সে কীভাবে তাকাবে? মহিমা অস্বস্থি নিয়ে বললো,
‘ছবিটা লিওনার্দোর নয়, এ টুকু বলতে পারি।
‘ঠিক বলেছেন। এই ছবিটি ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী টিটানের। ছবিটির নাম ‘ভেনাস অফ উরবানো’। টিটান এই ছবিটি আঁকেন ১৫৩৮ সালে।’
‘চিত্রশিল্পের প্রতি আপনার অনুরাগ খুব বেশি?’
এ কথার কোন জবাব দিল না সীমান্ত। ও হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেল। মহিমার শেষ প্রশ্নটি ও যেন শুনতে পায়নি। মহিমার একটু ভালো লাগছে। ‘বস’ হিসাবে সীমান্ত ভালোই হবে। শিল্পানুরাগী ‘বস’রা কি মন্দ হতে পারে? মনে মনে ভাবলো মহিমা। মহিমার দিকে কেমন ঘোরলাগা চোখে তাকালো সীমান্ত। সে বললো,
‘মহিমা, ছবিটা আজই মিলানো থেকে এসেছে। ছবিটা অফিসের দেয়ালে ঝুলবে না। ওটা ঝুলবে আমার বেডরুমে। অনফরচুনেটলি, ছবিটা এই কক্ষ থেকে সরাতে ভুলে গিয়েছিলাম।’
সীমান্তের কথায় ছবি নিয়ে জড়তা কেটে গেল মহিমার। ও কী বলবে ভেবে পেল না। চেয়ার থেকে উঠতেও মন চাইছে না। কী এক অদ্ভূত আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলো। এমন কখনো হয়নি ওর। সীমান্ত মহিমার দিকে তাকাচ্ছে না। সে ড্রয়ার খুলে কী যেন দেখছে। মহিমা অস্বস্থি বোধ ফের শুরু হতে যাচ্ছিলো, সীমান্ত মুখ তুলে তাকালো। তার চোখে কী এক বিস্ময় আর মাদকতা ফুটে আছে। মহিমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ও কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেসময় সীমান্ত বললো,
‘মহিমা, তুমি ১৫ শ’ খ্রীষ্টাব্দে টিটানের প্রেমিকা ছিলে! টিটান যে ছবিটা এঁকেছেন, সেটা তোমারই ছবি! তুমি কি জানো?’
মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন। প্রথমতঃ সীমান্ত ওকে তুমি সম্বোধন করে কথা বলছেন। দ্বিতীয়ত ঃ তিনি ওকে নিয়ে আবোল-তাবোল প্রলাপ বকছেন। এ ধরনের কথার জন্য ও প্রস্তুত ছিল না। ওর মুখে কোন কথা ফুটলো না। ও অবাক চোখে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে রাইলো। সীমান্ত ঘোরলাগা কণ্ঠে বললো,
‘মহিমা, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছো?’
‘না, স্যার।’
মহিমা চটপট জবাব দেয়। ‘স্যার’ বলে ইচ্ছা করে। এতে ম্যাসেজ দেয়া সীমান্ত ওকে তুমি করে বলছে। কিন্তু সীমান্তের হঠাৎ কী হলো? সে কেন আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলো? মহিমা ভাবনায় পড়ে গেল। কোম্পানীর এমডি ইন্টারভিউ না নিয়েই চাকরিটা দিয়ে দিলেন। এমডি এখন ‘তুমি’ করে সম্বোধন করছে, ও কি বলবে ভাবছিল। এবার সীমান্ত বললো,
‘সরি, আমি আপনাকে ‘তুমি’ বলে ফেলেছি। মাত্র কয়েকমুহুর্ত আগে সীমান্তের চোখেমুখে এক ধরনের তন্ময়তা দেখেছে মহিমা। এখন নেই। সীমান্ত ভাবাবেগ থেকে ফিরে এসেছেন বাস্তবে। কেমন একটা ধাক্কা এসে লাগলো মহিমার। ওর মনে সংশয় তৈরি হচ্ছে। সীমান্ত ওর দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিলেন। মহিমা খামটি হাতে নিল। সীমান্ত বললো,
‘আপনি বাসায় যাবার পর এটা খুলবেন। খামটি খোলার পর আপনি চমকে যেতে পারেন, বিস্ময়ে থ’ বনে যেতে পারেন। আপনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু যা দেখবেন তা অলীক কিছু নয়। মিথ্যাও নয়।’
‘স্যার, ও নো, সীমান্ত এতো রহস্য কেনো করছেন? আপনি কি রহস্য করতে পছন্দ করেন?’
মহিমা জানতে চাইলো। সীমান্ত এবার শব্দ না করে হাসলো। সে বললো,
‘বিশ্বাস করুন, আর না করুন, পৃথিবীতে অনেক রহস্যের সৃষ্টি হয়। তবে আমি কোনো রহস্য করছি না।’
‘কিন্তু..!’
‘এই খাম খুললে আপনি ধ্রুব এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবেন।’
‘ঠিক বুঝলাম না। আমার কাছে আপনার কথা রহস্যময় লাগছে।’
‘জানি। আপনি বাড়িতে চলে যান। রাতে ঘুমাতে যাবার আগে খামটি খুলবেন, প্লিজ!’
‘কি আছে খামে?’
‘একটা ছবি। এরবেশি কিছু বলবো। আর কোন প্রশ্ন করবেন না। আপনি বাড়ি চলে যান।’
মহিমা কথা বাড়ালো না। তাছাড়া ওর কেমন গা ছমছম করছিলো। ওর হাতের মুঠোয় খাম। ও চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। সীমান্ত ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। মহিমা হনহন করে সীমান্তের কক্ষ থেকে বের হয়ে এলো। চাকরি হয়ে যাওয়ার আনন্দের চেয়ে খামের রহস্য ওকে আচ্ছন্ন করে ফেললো।
মহিমা কৌতুহল ধরে রাখতে পারলো না। ও লিফটে উঠে খামটা খুলে ফেললো। খামটা খুলতেই একটা ছবি দেখতে পেলো ও। ছবিটার দিকে তাকাতেই ওর চোখ ছানাবড়া! টিটানের আঁকা নগ্ন ছবিটার সমানে ও দাঁড়িয়ে আছে সীমান্তের বাম হাত ধরে। ওদের দু’জনের মুখে হাসি। এটা কি সম্ভব? এ তো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। মহিমার গা শিরশির করে উঠলো। ওর মাথা যেন ভনভন করে চক্কর দিতে লাগলো। এ কি দেখছে ও? বুকের ভেতর অজানা ভয়ের স্রোত নেমে গেল। ফাঁকা লিফটে একা দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগলো ও। লিপট থেকে নামতেই ওর সেলফোন বেজে উঠলো। আননোন নম্বর। ও ফোন অন করলো। ও প্রান্তে সীমান্তের গলা।
‘হ্যালো, সীমান্ত বলছি!’
‘হ্যাঁ, বলুন।’
‘আপনি লিফটেই খামটি খুলে ফেললেন?’
সীমান্তের প্রশ্নে ভ্যাবাচোখা খেয়ে গেল মহিমা। ও কিছু বলতে পারলো না। ওর বিস্ময়ের যেন শেষ নেই। সীমান্ত কি করে বুঝলেন যে, ও খামটি লিফটে খুলে ফেলেছে। ও প্রান্ত থেকে সীমান্তের হাসি শুনতে পেলো ও। মহিমা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়লো। ও বললো,
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কি বলবো! ছবিটা দেখে আমার গা কাঁপছে!’
‘কেনো! ছবিটা কি তোমার নয়?’
এবার সীমান্ত ওকে ‘তুমি’ করে কথা বলছে।
‘না। আমার হবে কেনো? ছবিটা কার?’
মহিমার কণ্ঠে অসহায়ত্ব ফুটে উঠে। সীমান্তর গমগমে গলায় বললো,
‘ছবিটা তোমার-আমার। আমরা এই ছবিটা তুলেছিলাম ভেনাস নগরীতে। তুমি ভুলে গেছো?’
বিস্ময়ের তুমুল ঢেউ আছড়ে পড়লো মহিমার ওপর। ঢেউটা যেন ওকে ওর জীবন থেকে এক লহমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ও জীবনে কোনদিন বাংলাদেশের বাইরে যায়নি। এমন কি, ওর পাসপোর্ট পর্যন্ত নেই। আর সীমান্ত বলছেন কি! ও প্রাপ্ত থেকে সীমান্ত বলছে,
‘আমি জানি, তুমি মনে করতে পারছো না। তোমার স্মৃতিভ্রম হয়েছে। তোমাকে যেদিন হারিয়েছি, সেদিন থেকে আমিও নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। অভিশাপ মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সেই কবে থেকে..!’
‘আমি, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি কী আবোল-তাবোল বকছেন!’
‘আবোল-তাবোল নয়, মহিমা। আমি তোমাকে ফিরে পেতে চাই। অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে চাই।’
‘অভিশাপ! কিসের অভিশাপ?’
‘পেয়ে হারানোর অভিশাপ!’
‘আমি রাখছি, আর কথা বলতে চাই না।’
‘না, না। নিষ্ঠুর হয়োনা, প্লিজ! তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছো না, এইতো?’
‘বিশ্বাস করার কিছু নেই, সীমান্ত সাহেব। আপনি আমার সঙ্গে কেনো এমন করছেন?’
মহিমা হতাশা প্রকাশ করে। ওর কেন জানি, কান্না পেয়ে যাচ্ছে। ও নিজেকে সামলে নেয়। ও প্রাপ্ত থেকে সীমান্ত নরোম গলায় বলে,
‘মহিমা, একটা কথা বলছি, মন দিয়ে শোনো।
‘শুনছি, বলুন।’
‘আজ রাতে তুমি একটা স্বপ্ন দেখবে।’
‘স্বপ্ন?’
‘হ্যাঁ, স্বপ্ন। ঐ স্বপ্নই বলে দেবে প্রকৃত ঘটনা। এরপর তুমি আমার কাছে চলো এসো। তখন হয়তো তোমার বিশ্বাস হবে।’
এর জবাবে কিছু বললো না মহিমা। ওর কিছু বলারও নেই। ওর মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ও প্রান্ত থেকে সীমান্ত ফের বললো,
‘স্বপ্নটাই তোমাকে ঘটনা বলে দেবে। আজ রাখি।’
এ কথা বলে ফোন রেখে দিল সীমান্ত। মহিমা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে হতভম্বের মতো। ওর মনে হচ্ছিলো এই ভরদুপুরেই ও এক রহস্যময় স্বপ্নের ঘোরে ডুবে গেছে। এই স্বপ্ন থেকে ও যেন বের হতে পারছে না। অজানা ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে ওর সারা শরীরে।
অট্টালিকা নয় যেন সুরম্য প্রাসাদ! কতদিনের পুরানো কে জানে। জলের ওপর ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে এই প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। ভেনাস নগরী জুড়ে এরকম অনেক অট্টালিকা! পুরানো এই অট্টালিকাগুলো যেন একেকটি জীবন্ত জাদুঘর। ভেনাস নগরীতে এসে মহিমার চোখে অপার বিস্ময়। ও ভাবছিলো, জলের ওপর এমন পাথুরে নগর গড়ে তুলে রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট পৃথিবীতে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। এই নগরীকে মনে হয় জলের ওপর ভাসমান এক শহর। নৌকা ছেড়ে দিয়ে যে প্রাসাদে মহিমা ও সীমান্ত প্রবেশ করেছে, ঐ প্রাসাদটি একেবারে নির্জন ও ভূতুরে! প্রাসাদের প্রবেশ করার পর বড় হলরুমের দেয়াল জুড়ে দৃষ্টিন্দন তৈলচিত্র ওরা দেখতে পেলো। ওদের মাথার ওপর ১২টি ঝাড় ঝুলছে। মহিমার মনে হলো, প্রাসাদের কেয়ারটেকারের বয়স এক শ’র কম হবেনা। বয়সের ভারে বুড়ো গুজো হয়ে গেছেন। বুড়ো কথা খুব একটা বলেনি। এতো বয়সের একজন মানুষ কেনো এমন একটি অট্টালিকার কেয়ারটেকার হয়েছেন, বুঝতে পারছে না মহিমা। ও লক্ষ্য করেছে কেয়ারটেকারের চোখের দৃষ্টি বরাবরই নির্লুপ্ত। তার চোখের দিকে তাকালে গা ছমছম করে উঠে। একটি নগ্ন নারীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কেয়ারটেকারকে কাছে ডাকলো সীমান্ত। কেয়ারটেকার ওদের কাছে আসতেই তার দিকে ডিজিটাল ক্যামেরাটা বাড়িয়ে দিয়ে সীমান্ত বললো,
‘আমাদের একটা ছবি তুলে দিন তো!’
এ কথায় বুড়োর চোখে মুখে কেমন ভয়ার্ত ভাব ফুটে উঠলো। বুড়ো নিচু গলায় বললো,
‘এই ছবির সামনে ছবি তুললে টিটান রাগ করবে!’
‘টিটান? টিটান আবার কে?’
‘ঐ ছবি টিটান এঁকেছে।’
‘কবে এঁকেছেন?’
‘তা প্রায় ৫ শ’ বছর হবে!’
বুড়োর কথায় হো হো হো করে হেসে উঠলো সীমান্ত। মহিমা অজানা ভয়ে সীমান্তের বাম হাত শক্ত করে আকড়ে ধরলো। সীমান্ত বুড়োর কথায় অগ্রাহ্য করে বললো,
‘একটা ছবি তুলুন তো! দেখি, টিটান কী করে?’
বুড়ো গভীর অনীহা ও বিরুক্তি চোখে মুখে ফুটিয়ে ওদের দিকে ক্যামেরা তুললো। সীমান্ত ও মহিমা মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললো। ‘ক্লিক’ শব্দের সঙ্গে ক্যামেরার সাটারের আলো বিজলীর মত চমকালো। সীমান্ত এরপর চটপট বুড়োর কাছ থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে বললো,
‘থ্যাঙ্কস। কোথায় টিটান? ওর ভূত আছে নাকি এই প্রাসাদে? আসবে এখন?’
সীমান্তের প্রশ্নে রসিকতা ও তাচ্ছিলো ফুটে উঠলো। বুড়ো কিছু বললো না। সে প্রাসাদের প্রবেশ মুখের না দিকে না যেয়ে ভেতরের অন্দর মহলের দিকে ধীরে ধীরে হেঁটে গেল। মহিমা বুড়োর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘লোকটিকে অমনভাবে না বললেও পারতে! বুড়ো মানুষ, কষ্ট পেয়েছে হয়তো।’
মহিমার কথায় আলতো হেসে সীমান্ত বললো,
‘বিংশ শতাব্দীতে এই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ঐ সব ভূতুরে কথা বা আষাঢ়ে গল্প শুনলে, কী আর বলবো? ৫ শ’ বছর আগে যে টিটান মারা গেছে। তার ছবির সামনে ছবি তুললে সে রাগ করবে-এ কথা বিশ্বাস করতে হবে?’
সীমান্তের কথা শেষ হওয়া মাত্র জলের কান ফাটানো গর্জন শুনতে পেলো ওরা। অতর্কিত ভয়ে মহিমা ঝাপটে ধরলো সীমান্তকে। জলের গর্জন বাড়ছে এবং মনে হচ্ছে গর্জনটা ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। বাতাশের শো শো শব্দও শুনতে পাচ্ছে ওরা। বাইরে হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস শুরু হলো কি? এই প্রশ্নে ভড়কে গেল সীমান্ত। ঠিক এই সময়ে জলের বিশাল এক ঢেউ প্রাসাদের দেয়াল ভেঙ্গে ঢুকে পড়লো। কিছু বুঝে উঠার আগেই জলের তীব্র স্রোত এক লহমায় ওদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। মহিমা চিৎকার করে উঠতেই ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল। ওর শরীর কাঁপছিল। ঘুম ভাঙ্গা চোখে ও নিজের চারপাশটা দেখে নিল এবং বিছানায় উঠে বসলো। মধ্যরাতে ও এ কি স্বপ্ন দেখলো? প্রশ্নটা ওর মনে ছড়িয়ে যেতে লাগলো। ওর ভীষণ ভয় লাগছে এখন। সীমান্ত ওকে বলেছিল ও আজ রাতে একটা স্বপ্ন দেখবে। ঐ স্বপ্নে ও ছবির রহস্যের কথা জানবে। মহিমা তো সত্যি সত্যি একটা অদ্ভূত স্বপ্ন দেখলো। এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য? মহিমার চিন্তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম ও সীমান্তকে নিয়ে সিরিয়াসলি চিন্তা শুরু করলো। মাথার ওপর ফ্যান ফুলস্পিডে ঘুরছে। তারপরও ও ঘামছে। ওর ভেতরে দুঃশ্চিন্তার মেঘ জমে যেতে লাগলো।
মহিমার কথা শুনে ওর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন শফিক ফয়সাল। কাল তার অফিসে কারো ইন্টারভিউ নেয়া হয়নি। অথচ এই মেয়েটি বলছে সে কাল এখানে এসে ইন্টারভিউ দিয়েছে এবং ইন্টারভিউ নিয়েছে সীমান্ত। মেয়েটির কথা কোনভাবেই বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। কারণ, তার ছেলে সীমান্ত এক বছর আগে মারা গেছে। কিন্তু মেয়েটি সীমান্তের যে বর্ণনা দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করার মত নয়। মেয়েটি ইন্টারভিউর চিঠি পর্যন্ত দেখিয়েছে। শফিক ফয়সালের চিন্তায় একটা রহস্যের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বাড়ছে কৌতুহল। তিনি মহিমাকে বললেন,
‘মহিমা, কাল আমাদের অফিসে চাকরির জন্য কারো ইন্টাভিউ নেয়া হয়নি। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে স্বীকার করছি তুমি যে কালকের তারিখে ইন্টারভিউ গ্রহণের চিঠি দেখিয়েছো, তা আমাদের অফিস থেকে পাঠানো হয়েছে। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে আমাদের কোথাও একটা ভুল হয়েছে। ইন্টারভিউ নেয়া হবে তো আগামী সপ্তাহে!’
শফিক ফয়সালের কথা শুনে মহিমা ভড়কে গেল। ও এখন আর বিস্মিত হতে চায় না। ও বুঝতে পারছে এক রহস্য থেকে আরেক রহস্যে ও পড়ছে। ও বললো,
‘সীমান্ত ফয়সাল কি এই কোম্পানীর এমডি নন? আপনার রুমে আসার সময় আমি দেখলাম তার রুমে তার নাম এবং পদবীর নেমপ্লেটটা ঝুলছে।’
‘হ্যাঁ। সীমান্ত ফয়সাল আমার একমাত্র পুত্র। সে এই কোম্পানীর এমডি ছিলেন।’
‘ছিলেন মানে?’
‘মানে হচ্ছে, সীমান্ত এক বছর আগে এক দূর্ঘটনায় মারা গেছে।’
কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল মহিমা। এমন কথা শোনার পর আর কি বলা যায়? ও চুপসে গেল। শফিক ফয়সালও চুপ। কয়েক মিনিট মৌনতায় পার হলো। এরপর শফিক ফয়সাল বললেন,
‘মা, সত্যি করে বলো তো, সীমান্তের সঙ্গে কি তোমার আগে কখনো দেখা হয়েছিল? বা পরিচয়?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মহিমা। ও বললো,
‘না, কখনোই দেখা হয়নি। পরিচয়ও হয়নি। তবে কাল সীমান্ত আমাকে একটা ছবি দিয়েছিল।’
‘ছবি দিয়েছিল! বলো কি! ছবিটা আছে?’
বিস্মিত ও ব্যাকুল হয়ে উঠেন শফিক ফয়সাল। মহিমা বলে,
‘ছবিটা দেখে আমি চমকে উঠি। কারণ, ছবিটা আমি কখনো তুলিনি। অথচ ছবিতে দেখা যাচ্ছে সীমান্তের হাত ধরে আমি দাঁড়িয়ে আছি।’
‘স্ট্র্যাঞ্জ! ছবিটা বের করো, প্লিজ!’
মহিমা নিজের ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করে শফিক ফয়সালের দিকে বাড়িয়ে দিলো। তিনি অনেকটা ছোঁ মেরে ছবিটা নিলেন এবং দ্রুত চোখের সামনে মেলে ধরলেন। মহিমা ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। মাত্র কয়েকমুহুর্ত। ও দেখলো শফিক ফয়সালের দু’হাত কাঁপছে এবং দু’চোখের কোণ থেকে দু’টি জলের ধারা নেমে আসছে। মহিমা অবাক হলো না। ওর ভেতরে কান্নার ঢেউ বইছে। ও নিজেকে সামলে রাখছে। ও বললো,
‘কাঁদছেন কেনো?’
শফিক ফয়সাল রুমাল বের করে চোখের জল মুছলেন। তিনি কান্না সামলাতে সামলাতে বললেন,
‘মা, সত্যি করে বলো তো তুমি কে? সীমান্ত তোমাকে ভালোবাসতো, তাইনা?’
এই প্রশ্নের জবাব কী দেবে মহিমা? ও ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
‘বিশ্বাস করুন। আপনার ছেলেকে আমি কাল ছাড়া কোনদিন দেখিনি। এখন তো শুনছি, সে এক বছর আগে মারা গেছেন। তাহলে তার প্রেতাত্মার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, বলতে হবে।’
এ কথায় চুপ করে রইলেন শফিক ফয়সাল। মহিমা কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে প্রশ্ন করলো,
‘সীমান্ত কবে, কোথায় এবং কীভাবে মারা গেছেন, বলবেন?’
‘কাল ছিল সীমান্তের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর আগে সে ইতালির ভেনাস নগরীতে পানিতে ডুবে মারা যায়।’
শফিক ফয়সালের কথা শুনে মহিমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। রাতে যে স্বপ্নটা ও দেখেছে, সেটাও কি এক বছর আগের একটি সত্যি ঘটনা? সত্যি হলে মহিমা কী করে এর সঙ্গে জড়িত হবে? ও তো কখনো ভেনাস যায়নি, সীমান্তের সঙ্গে ওর পরিচয়ও হয়নি। রহস্যের পর্ব যেন বাড়ছে। মহিমা কাল রাতে দেখা স্বপ্ন এবং সীমান্তের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার বিষয়টা আর তুললো না। ওর জবাব না পেয়ে শফিক ফয়সাল বললেন,
‘আমরা জানতে পেরেছি, সীমান্তের সঙ্গে ওর গার্লফ্রেন্ড ছিল। সীমান্তের সঙ্গে সে-ও মারা গেছে, শুনেছি।’
এ পর্যন্ত বলে থামলেন তিনি। মহিমার চোখ ফেটে জল নেমে আসতে চাইছে। ও নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিচ্ছে। এখন ও কী বলবে, বুঝতে পারছে না। ওর চাকরি হয়েও হলো না। চাকরি নিয়ে ওর আফসোস হচ্ছে না। কিন্তু সীমান্ত নামক এক ঘোর লাগা রহস্য ওকে কোথায় যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মহিমা আলতো করে বললো,
‘আমি জানিনা, এরপর আমি কী বলবো, কী বলা উচিত। আমি নিজেই এক বিস্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষাও আমার জানা নেই।’
‘না, মা। অমন করে বলো না। আমি তোমার কথা ভাবছি।’
‘আমার কথা ভাববেন না। আমি চাকরি চাচ্ছি না। কাল যা হয়েছে, ধরে নোবো, কোন এক স্বপ্ন। আপনার কাছে আমার চাওয়ার কিছু নেই। বরং আপনার পুত্রহারার শোকের কষ্ট আমাকেও একরাশ কষ্টে ভাসিয়ে দিয়েছে।’
শফিক ফয়সাল ভেজা চোখে মহিমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আমি কিন্তু তোমাকে চাকরিটা দিচ্ছি। তুমি আমার এখানেই জয়েন করবে। আমার মৃত ছেলের আত্মা তোমার সামনে এসেছে। তোমাকে চাকরি দিয়েছে। তাছাড়া সত্যি-মিথ্যা যাই হোক, তোমার সঙ্গে সীমান্তের ছবি আছে। এতোকিছুর পর তোমাকেই তো চাকরি দেবো।’
‘কিন্তু আমি এখানে চাকরি করবো না। আমি যে কী রহস্যের জালে আটকা পড়েছি, আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না।’
বললো মহিমা। শফিক ফয়সাল বললেন,
‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো, মা। তোমার চাকরির প্রয়োজন। আমারও তোমাকে প্রয়োজন। অন্ততঃ আমার প্রয়াত সন্তানের আত্মার শান্তির জন্য তোমাকে দেখভাল করার দায়িত্ব আমার। তুমি অন্যভাবে বিষয়টা নিয়ো না। আমি তোমার পিতার সমান। একজন পিতা হিসাবে তোমাকে আমাদের এখানে জয়েন করার অনুরোধ করছি।’
মহিমা একটু ভাবলো। এরপর বললো,
‘আমি ভেবে দেখি, আপনাকে জানাবো।’
‘ঠিক আছে মা। তুমি আমাকে প্রতিদিন একবার ফোন করবে।’
‘আচ্ছা, ফোন করবো। আজ তাহলে উঠি?’
‘এসো। ভালো থেকো, মা।’
মহিমা শফিক ফয়সালের রুম থেকে বের হয়ে এলো। শফিক ফয়সালের ব্যবহার ওর ভালো লেগেছে। পুত্রকে ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি। পুত্রের প্রতি ভালোবাসার টান থেকে তিনি মহিমাকে চাকরি দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু মহিমা এক অপার রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে হাতরে বেড়াচ্ছে অনেক প্রশ্ন। মৃত ব্যক্তির আত্মা কি দৃশ্যমান হয়? অবিকল নিজের অবয়বে ফিরে আসতে পারে? আত্মা কি টেলিফোনে কথা বলতে পারে? এই প্রশ্ন যখন গভীর ছায়া ফেললো, ঠিক তখনই ওর ফোন বেজে উঠলো। ফোন অন করতেই সীমান্তের কণ্ঠস্বর!
‘বাবার সঙ্গে কী এতো কথা বললে?’
মহিমা সেল ফোনটা চোখের সামনে ধরলো। আননোন নম্বর। ও প্রান্তে সীমান্তের হাসির শব্দ শুনতে পেলো। লিফট থেকে নেমে ও পা চালিয়ে ভবনের বাইরে চলে এলো। বললো,
‘তুমি কে? সীমান্ত?’
এই প্রথম মহিমা ওকে ইচ্ছা করে ‘তুমি’ করে বললো। ও প্রান্তে সীমান্ত এতে খুশি হলো। সীমান্ত বললো,
‘কাল স্বপ্ন দেখেছিলে?’
‘হুম। বুড়ো কেয়ারটেকার টিটানের ছবির সামনে ছবি তুলতে বারণ করেছিল। তুমি ওর বারণ শুনোনি, কেনো?’
‘আম জানতাম না, ঐ বুড়োটাই ছিল টিটান। এক জন্মে সে ছিল জগতবিখ্যাত চিত্রশিল্পী, উদারমনা। পরের জন্মে হিংস্র, প্রলয় সৃষ্টিকারী জাদুকর!’
মহিমা ধাতস্ত হয়ে আসছে। ও সীমান্তের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে চায়। ও বললো,
‘তুমি এখন কোথায়? আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারি?’
এ কথায় হাসলো সীমান্ত। ও বললো,
‘আমি জানি, আমার বাবার কাছ থেকে তুমি আমার মৃত্যুর কথা শুনেছো, তাইনা?’
এর জবাব না দিয়ে মহিমা বললো,
‘তুমি কি সীমান্তের আত্মা?’
এ কথায় হো হো হো সীমান্ত হেসে উঠলো। মহিমার সারা গা কাটা দিয়ে উঠলো। ও প্রশ্ন করলো,
‘হাসছো কেনো? আমাকে গভীর রহস্যে ঠেলে দিয়ে তোমার আনন্দ?’
‘কেনো, তুমি রহস্য পছন্দ করো না?’
‘জানি না। ভেবে দেখেনি। তবে তোমার রহস্য উন্মোচন করতে চাই। তোমার মুখোমুখি আরেকবার দাঁড়াতে চাই। দেখা দেবে?’
মহিমার কথায় অনুরোধ ফুটে উঠে। সীমান্ত চুপ। মহিমা ফের বললো,
‘আমি জানি, তুমি আমাকে ভালোবাসো। যদি ভালোবাসো, আমাকে দেখা দাও, প্লিজ!’
সীমান্ত বললো,
‘তাহলে এখুনি চলো আসো, আমি যেখানে আছি।’
‘তুমি কোথায় আছো?’
‘আশুলিয়ায়। যেখানে বর্ষার জল তৈরি করেছে বিশাল জলাশয়, সেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি। এখানে এলে আমাকে দেখতে পাবে। চলে এসো।’
‘সত্যি বলছো? আসলে তোমার দেখা পাবো?’
‘একবার এসো দেখো। ভেনাস নগরীতে অভিশাপের জলের স্রোতে তোমাকে হারিয়েছি, আজ আশুলিয়ার জলের ধারে তোমাকে পাবো! এ কথা ভাবতেই আমার ভালো লাগছে।’
‘রিয়েলি! সত্যি বলছো?’
‘সত্যি বলছি, তুমি না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়বো না।’
এ কথা বলে ফোন কেটে দিল সীমান্ত। মহিমার মাথা চক্কর দিচ্ছে যেন। ও কিছুক্ষণ ভাবলো। এরপর রাস্তায় নেমে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলো। ও আশুলিয়া গিয়ে দেখতে চায় সীমান্ত সশরীরে আছে কি, নেই। আত্মা এমন রহস্য করতে পারে কি? নাকি হেলুসিনেশন? মহিমা নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখলো এটি কোন স্বপ্ন নয়। ও ট্যাক্সিতে চড়ে ড্রাইভারকে তাড়তাড়ি যেতে তাড়া দিল। ও জানে না, সীমান্তের সঙ্গে ওর দেখা হবে কিনা। যদি দেখা না হয়, তাহলে এটাও রহস্য বলে ধরে নেবে। কিন্তু মহিমার মন বলছে, সীমান্তের সঙ্গে ওর দেখা হবে। ও গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলো, মেঘের আড়াল সরিয়ে উজ্জ্বল হচ্ছে শেষ বিকেলের সূর্য।
১২.
শ্রাবণ ধারা
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকার ফুটপাত দিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছিলো রাজীব। সোনাচান্দি জুয়েলারী শপের সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণ চমকে উঠলো ও। এই জুয়েলারী শপের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। দীর্ঘ আট বছর পর নীলাকে এক ঝলক দেখেই চিনতে পারলো ও। আট বছর নয়, আট হাজার পরও নীলাকে এক দেখাতেই চিনতে পারবে রাজীব। নীলাকে দেখে রাজীবের ভেতরে মিহিন ভাঙাচোরা হতে লাগলো। ও প্রথমে ভাবলো নীলার সঙ্গে দেখা করবে না। কী হবে এখন দেখা করে? আজ এতোদিন পর পুষে রাখা আগুনকে উস্কে দিয়ে কী হবে? এ প্রশ্ন ওর ভেতরে তোলপাড় তুললেও একটা অদৃশ্য টানও তীব্রভাবে অনুভূত হতে লাগলো। রাজীব এগুতে গিয়ে টের পেল ও পা যেন অনড় পাথর হয়ে গেছে। ও খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ঐ জুয়েলারী শপের সামনে। দোকানের বিশাল আয়নার ভেতর দিয়ে ও অপলক দেখতে লাগলো নীলাকে। এই কয়েকটি মুহুর্তে রাজীবের পৃথিবী লন্ডভন্ড হয়ে গেল। ওর ভেতরে আবেগ হলো বরফ গলা নদী। এক সময় নিজের কাছে হার অথবা জয় হলো নিজেরই। ও পা বাড়ালো সোনাচান্দি জুয়েলারী দোকানের দিকে। ভেতরের কষ্টকে সামলে নেবার চেষ্টাও করলো। অনেক মানুষকেই জীবনের বিশেষ কোন সময়ে নিজেকে সামলে নিতে হয়।
নীলা সোনাচান্দি জুয়েলারী শপে বিক্রয় প্রতিনিধির চাকরি করে। আজ ক্রেতার ভিড় নেই। ক্রেতা না থাকলে ও কাঁচের স্যুকেসের মধ্যে রাখা স্বর্ণালংকার ভালোভাবে সাজিয়ে নেয়। কখনো নতুন নতুন ডিজাইনের স্বর্ণালংকারের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। নীলা এই মুহুর্তে স্বর্ণালংকার সাজাচ্ছিলো। রাজীব নীলার সামনে গিয়ে আলতো গলায় বললো,
‘আমাকে বিয়ের কনের জন্য একসেট ভালো গহনা দিতে পারেন?’
কন্ঠ নয়, যেন বিদ্যুতের চমক। এই কণ্ঠে ভীষণ চমকে গেল নীলা। চোখ তুলতেই আরো গভীর বিস্ময়ের ধাক্কা! ওর চোখের সামনে রাজীব দাঁড়িয়ে আছে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না ও। আর্ত চিৎকারের মতো ওর কণ্ঠ থেকে অস্পষ্ট নাম বেরিয়ে এলো,
‘রা-জী-ব!’
‘হ্যাঁ, এতো অবাক হচ্ছো কেন?’
‘সত্যিই তুমি! আই মিন, তুমি আমেরিকায়! কীভাবে এলে!’
নীলার এই বিস্ময়ের সঙ্গত কারণ আছে, তা জানে রাজীব। নীলা যে রাজীবকে দেখেছে, সেই রাজীবের আমেরিকায় আসাটা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চার্যের ব্যাপারের মতোই। একেবারেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু রাজীবের যে দিন বদলে গেছে, সে কথা তো নীলা জানে না। রাজীব কণ্ঠে বিস্ময় ছড়িয়ে বললো,
‘বাহ্, আমেরিকায় শুধু তোমরাই আসবে নাকি? ওপি-ডিভি বা বৈবাহিক কারণ ছাড়াও অনেকে এই দেশে আসতে পারে। তা জানো?’
‘না, মানে..!’
‘তুমি যে রাজীবকে চিনতে, সে ছিল বেকার ও ভবঘুরে। ব্যর্থ কবিও বটে। আজকের রাজীব সফল ও স্বচ্ছল একজন চাকরিজীবী।’
‘তাই নাকি! তা দেশে কি করছো?’
‘একটা এনজিওতে প্রজেক্ট পরিচালক পদে চাকরি করছি। নিউইয়র্কে এসেছি জাতিসংঘের একটি সেমিনারে অংশ নিতে।’
‘বলো কি!’
‘হ্যাঁ। এখানে এসে ভাবলাম, বাঙালি আধ্যূষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসে ঘুরে যাই। তাই এলাম। আর দেখো, তোমাকে পেয়ে গেলাম!’
নীলার মুখে কোন কথা জোগায় না। ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রাজীবের মুখের দিকে। ও এক নতুন রাজীবকে দেখছে। নীলার তন্ময়তা ভেঙে দিয়ে রাজীব বললো,
‘অমন হা করে কি দেখছো?’
‘রাজীব আমি কেমন ঘোরের মধ্যে ডুবে আছি। সত্যিই কি আমার সামনে তুমি?”
‘হ্যাঁ, আমিই তোমার সামনে। তা কেমন আছো?’
ধাতস্থ হয়ে আসে নীলা। ওর শিরা-উপশিরায় কষ্ট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ও দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। এটা ওর পুরানো অভ্যাস। রাজীবের সামনে অভিমান বা রাগ করলে ও ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখতো। কোন কথা বলতো না। এ দৃশ্যটা রাজীবকে কাঁপিয়ে দিল। ও তাগিদ দিয়ে বললো,
‘স্বামী-সংসার নিয়ে এই স্বপ্নের দেশে কেমন আছো, বললে না যে?’
‘ভালোই আছি। তুমি?’
‘স্বাভাবিক এবং কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি।’
‘কেন তোমার স্ত্রীকে সময় দেও না?’
এ কথায় হো হো করে হেসে ফেললো রাজীব। ওর হাসিতে বিব্রত হয়ে পড়লো নীলা। ওর সহকর্মী নাজরা ওদের কথা শুনছে। তবে নাজরা বাংলা বুঝে না। ও ইন্ডিয়ান। তবুও রাজীবের সঙ্গে নীলার কথাবার্তা যে, ক্রেতা ও বিক্রেতার নয়, তা ও নিশ্চয় বুঝতে পারছে। তা বুঝুক। নীলা আজ ওসব নিয়ে ভাবতে চায় না। আট বছর পর রাজীবকে ও দেখছে। যাকে একদিন না দেখলে ওর কোনকিছুতেই মন বসতো না, আজ তাকে দেখছে আট বছর পর। ওর ভেতরে সে-কী উথাল পাতাল ঢেউ বইছে! রাজীব হাসি থামিয়ে বললো,
‘সরি, অনেকদিন পর খুব হাসলাম।’
‘আমি কি হাসির কথা কিছু বলেছি?’
‘তা নয়। তবে..?’
‘তবে কি?’
‘না কিছু না। তুমি এই চাকরিটা কতদিন যাবত করছো?’
‘কথা ঘুরাবে না। আগে বলো, তোমার স্ত্রী কেমন আছে? তুমি কেমন আছো, ধনীর মেয়েকে বিয়ে করে?’
এই প্রশ্নের জবাবে রাজীব কি বলবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। প্রশ্নটার জবাব দেয়া যায় না। আবার এখন আর মিথ্যা বলা ঠিক হবে কিনা-তাও ভাবছে ও। নীলার কৌতুহলী চোখ প্রশ্ন হয়ে আটকে রইলো রাজীবের বিব্রতকর মুখের দিকে। অস্বস্থিতে পড়ে রাজীব ভাবতে লাগলো ও কী করে বলবে যে, ওর স্ত্রী বলতে কেউ ছিল না, এখনও নেই। তাহলে অনেক প্রশ্ন উঠবে। এর জবাব ও দিতে পারবে না। রাজীবের চোখের সামনে জ্বলজ্বলে করে ভেসে উঠলো আট বছর আগের দুটো ঘটনার কথা। দুটো ঘটনাই একটি অপরের পরিপূরক। আজ সে ঘটনার কথা নীলাকে বলা যায় না। স্মৃতির খামে বেদনার নক্ষত্র হয়েই থাকুক তা। ভাবে রাজীব। ওর মন ছুটে যায় ফ্লাশব্যাকে।
আট বছর আগের কথা। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে রাজীব হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে তখন। হতাশা, আক্ষেপ, স্বপ্ন ও সংগ্রাম ছিল ওর দিনলিপিতে। মধ্যবিত্তের টানাপোড়ন, অপ্রাপ্তির দহন, আর স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার সাতকাহনে ভরা জীবনের সঙ্গে নীলাকে জড়িয়ে নিতে চেয়েছিল রাজীব। নিজের দারিদ্রতা নিয়ে ওর কোন সংকোচ ছিল না। নীলাকে ভালোবেসে ও জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পেত। কিন্তু একদিন ভালোবাসার অন্য মানে এসে দাঁড়ালো ওর সামনে। ভালোবাসার মানুষকে ‘সুখী’ দেখার দৃষ্টি খুলে গেল সেদিন। নীলা’র মা ওর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিল। নীলা মায়ের আকুতির কাছে হেরে গেল রাজীব। একদিন সকালে নীলা’র মা এলেন রাজীবের মেসে। তিনি মায়ের দাবি নিয়ে রাজীবকে বললেন,
‘বাবা, আমি জানি, তুমি নীলার ভালো চাও। নীলার বাবা সামান্য একজন চাকরিজীবী। আমার আরো তিনটি মেয়ে আছে। অভাব-অনটনের সংসার। তুমি নিশ্চয় আমাদের সব কথা জানো।’
‘জানি, মা। আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?’
‘নীলার জন্য একটি ভালো বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। ছেলে আমেরিকায় থাকে! নীলা যদি এই বিয়েতে রাজী হয়, আমরা বেঁচে যাই। ওর ছোট তিনটি বোনের ভবিষ্যতও এই বিয়ের উপর নির্ভর করছে, বাবা। বিয়েটি একটি অসহায় পরিবারকে ওক্ষা করতে পারে। কিন্তু নীলা এই বিয়েতে রাজী হচ্ছে না। একমাত্র তুমিই পারো ওকে রাজী করাতে।’
এ পর্যন্ত বলে নীলার মা কাঁদতে লাগলেন। রাজীব বিব্রত ও বিষন্ন হয়ে পড়লো। একসময় ও বললো,
‘নীলাকে আমি কিভাবে রাজী করাবো?’
‘আমি জানি না, বাবা। শুধু বুঝি, তুমিই পারবে ওকে রাজী করাতে। একজন অসহায় মাকে সাহায্য করো, বাবা! তোমার উপর আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছে।’
মাত্র কয়েক মুহুর্তে রাজীব ভেঙে চূড়ে কেমন বদলে যেতে থাকে। নীলার মায়ের কান্না আর আকুতির সামনে ও ত্যাগের মহিমাকে বেছে নেয়। একদিকে নিজের অসহায়ত্ব, অপরদিকে নীলা এবং ওর পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিন্তার কথা ভাবিয়ে তোলে ওকে। একসময় নীলার মায়ের আকুতিই জিতে যায়। রাজীব বলে,
‘আপনি বাসায় চলে যান। দেখি, আমি কি করতে পারি।’
‘তুমি কথা না দিলে আমি যাবো না, বাবা।’
অশ্রুভরা চোখ তুলে নীলার মা বলেন। রাজীব কথা দেয়। এ ছাড়া ওর আর কোন উপায় ছিল না। নীলার মা চলে যাবার সময়ও বারবার বললেন,
‘তুমি কিন্তু কথা দিয়েছো, বাবা! যেভাবেই হোক, ওকে রাজী করাতে হবে।’
‘আচ্ছা!’
এরপর রাজীব নিজেকে খুব দ্রুত তৈরি করে নেয়। নীলাকে ফিরিয়ে দিতে গুছিয়ে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করে। নীলাকে রাজীব পত্র লিখে জানিয়ে দেয় যে, ও একজন ধনী ব্যক্তির মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। ঝড় হয়ে ছুটে আসে নীলা। রাজীবের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বেদনা বিধুর কণ্ঠে বলে,
‘সত্যিই তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছো! টাকার লোভে..ছিঃ!’
‘নিজের দারিদ্রতাকে জয় করার অন্যকোন পথ আমার জানা নেই। দারিদ্রতাকে মেনে নেবার সাহস বা ইচ্ছা কোনটাই আমার নেই। তাই, ধনী হতে আমি তোমাকে ত্যাগ করছি।’
‘ছিঃ রাজীব, ছিঃ!’
‘আমাকে ক্ষমা করো, নীলা।’
‘ক্ষমা? তোমাকে করুণা করতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। তুমি ঘৃণারও অযোগ্য!’
সেদিন অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল রাজীব। নীলার অঝোর কান্নার সামনে পাষাণ পাথর হয়ে গিয়েছিল ও। নীলা ফিরেছিল ওর প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে। অথচ আজ ওকে দেখামাত্রই নীলা সব ভুলে কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। নারীরা নদীর মতোই সব সহে যায়, বয়ে যায়। রাজীব সেদিনের কথাই ভাবছিল। নীলা বললো,
‘উদাস হয়ে কী ভাবছো?’
‘না, কিছু না।’
‘তাহলে চুপ করে আছো যে! বললে না তোমার স্ত্রী কেমন আছে? ছেলে-মেয়ের বাবা হয়েছো কিনা?’
রাজীব এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বললো,
‘নীলা, আজ তোমাকে সত্যি কথাটি বলছি। আমি বিয়ে করিনি।’
‘হোয়াট! কি বললে!’
‘তুমি শান্ত হও।’
‘সেদিন যে বলেছিলে..?’
‘সেদিন মিথ্যা কথা বলেছিলাম। ঠিক বলেছিলাম নয়, বলতে বাধ্য হয়েছিলাম।’
‘রা-জী-ব!’
‘নীলা তোমাকে না পাওয়ার দুঃখ আমার নেই। তুমি ভালো আছো, এ টুকুই আমার আনন্দ।’
‘চুপ করো! সেদিন কেনো মিথ্যা বলেছিলে? দেবদাস হবার জন্য?’
এ কথা বলেই নীলা অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়লো। ওর সহকর্মী নাজরা এই দৃশ্যে ‘হোয়াটস হ্যাপেনড!’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। নীলা কান্না সামলানোর চেষ্টা করলো না। রাজীব ওর কান্নার সামনে খুবই অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ও নীলা কান্না দেখতে চায় না। রাজীব হঠাৎ হনহন করে দরোজার দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে কান্না জড়িত গলায় নীলা ডাকলো,
‘রাজীব!’
রাজীব ওর ডাকে সাড়া দিল না। পেছনে ফিরে তাকালো না। রাজীব ওর দু’ চোখের শ্রাবণ ধারা দেখাতে চায় না নীলাকে। কিছুতেই না। ঝড়ো গতিতে ও বেরিয়ে এলো দোকান থেকে।
১৩.
ইরিনা
্‘ইরিনা’ নামটি শুনে একটু চমকে গেল অনন্ত। যদিও একই নামে অনেকজন থাকতে পারে, তবু ‘ইরিনা’ নাম খুব বেশি শোনেনি ও। পাশের রুম থেকে অনন্তের সেক্রেটারী ইন্টারকমে জানালো ইরিনা নামে একটি মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। প্রথমে ভেবেছিল ‘না’ বলে দেবে। কারণ, অনন্ত আজ ভীষণ ব্যস্ত। দেড় ঘন্টা পর বোর্ড মিটিং। ও এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখে শেষ করতে পারেনি। নতুন অফিস। অফিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা ঢিলেঢালা ভাব। অফিস গুছানোর কাজ এখনো শেষ হয়নি। কাউকে কোন ফাইল আনতে বললে, অনেকক্ষণ পর এসে হয়তো বলবে, ‘স্যার, কোথায় যে ফাইলগুলো রেখেছি! কাল দিচ্ছি। খুঁজে বের করতে হবে।’ বড় পরিসরের অফিস নেয়া হয়েছে। আগের অফিসের চেয়ে এই অফিসে অনেক বেশি জায়গা। অফিসে প্রবেশ মুখে ওয়েটিং রুমটিও বেশ বড়। দু’সেট সোফা বসানো হয়েছে এই রুমে। অনন্তের রুমটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে চার শ’ স্কয়ার ফুট। ওর রুমে ঢুকলে একটা বিশালত্ব টের পাওয়া যায়। অনন্তের খুব পছন্দ হয়েছে এই অফিস। ব্যবসা বেড়েছে, বাৎসারিক টার্ণওভারও বেড়েছে। ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অফিসও বদলিয়েছে অনন্ত। সাত বছর আগে বনানীতে দু’কক্ষ বিশিষ্ট একটি অফিস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল অনন্তের বাইংহাউজ ব্যবসা। এখন উত্তরায় একটি ভবনের চারতলার পুরো ফ্লোর জুড়ে তার প্রতিষ্ঠান। সাত বছরে ও অনেক এগিয়েছে। অনন্ত কয়েকমূহুর্তে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটু ভেবে নিল। ফাইল দেখার কাজে মগ্ন ছিল। ‘ইরিনা’ নামটি ওর চিন্তার মধ্যে বিজলীর মত ঝলসে উঠলো। প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে লোরে শহরে ‘ইরিনা’ নামের একটি মেয়ের সঙ্গে ওর আকস্মিক পরিচয় হয়েছিল। ‘পরিচয়’ বললে ঠিক বলা হবে না, মেয়েটি রহস্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে ওর সামনে হাজির হয়েছিল। ইরিনার আচরণ ছিল রহস্যময়। অথচ ওর চোখের দৃষ্টি ছিল শান্ত, গভীর এবং পবিত্র। ওর চোখ বলছিল, ওর মুখের কথা একটাও মিথ্যা নয়। অথচ ইরিনা মুখে যা বলছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য! বলা যায়, আধুনিক শহরে গিয়ে অতিপ্রাকৃত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল অনন্ত। সেদিনের ঘটনা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
ব্যবসায়িক কাজে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়েছিল অনন্ত। ওয়াশিংটন ডিসি ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের লগোয়া। এখানে এলে সাধারণত ট্যুরিষ্টরা লোরে শহরের পাহাড়ের গুহা দেখতে যায়। প্রায় তিন শ’ বছর আগে এই গুহাটি আবিস্কৃত হয়। গুহাটি প্রায় নয় শ’ ফুট গভীর। গুহায় বাঁক আছে, খাদও আছে। গুহা জুড়ে শিল্পকর্মের নির্দশনের মত নানা পাথুরে অবয়ব রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় তিন শ’ বছর আগে আদিবাসীরা এই গুহায় বাস করতো। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গুহাটির ভেতরে ইট বিছানো কৃটিম পথ এবং বিভিন্ন স্থানে বিজলীবাতি স্থাপন করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে প্রচুর ট্যুরিষ্ট এই গুহা পরিদর্শন করতে আসে। অনন্তও গুহা পরিদর্শন করেছিল। গুহা থেকে বের হবার প্রান্তিক পথে স্যুভেনির বিক্রির স্টোর থেকে ও একটা দৃষ্টি নন্দন স্কার্ফ কিনেছিল। মেরুন রঙের স্কার্ফটির ওপর নীল রঙেন কারুকাজ এবং মাঝখানে একটি আদিবাসী মেয়ের লাবণ্য উজ্জ্বল মুখ আঁকা ছিল। স্কার্ফটি দেখেই তা কিনে ফেলে অনন্ত। হাতের মুঠোয় স্কার্ফ পেঁচিয়ে ও যখন গাড়ি উঠতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখুনি একটি মেয়ে এসে ওর পেছন থেকে ইংরেজীতে বলল,
‘আমাকে সঙ্গে নেবে না, অনন্ত?’
অনন্ত গাড়িতে না উঠে পেছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো। মেয়েটির বয়স ২২ বা ২৩ বছর হবে। গায়ের রঙ ফর্সা হলেও তামাটে রঙের মিশ্রন আছে। মুখের আদল আদিবাসীর মত, চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল। চুলগুলো খোঁপা করা, ক্লীপে আটকানো। গায়ে ঘাগড়া জাতীয় পোষাক। আদিবাসী মেয়েরা যেরকম পোষাক পড়ে। মেয়েটির মুখের অবয়বে মিশনের পিরামিডে আঁকা রাজকীয় রমণীদের মুখের ছাপ আছে। অনন্ত মেয়েটির কথায় হচকিয়ে গেলেও কয়েক মূহুর্তে ও মেয়েটিকে দেখে নিল। মেয়েটি অনন্তের চোখে চোখ রেখে ফের বলল,
‘তুমি ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন?’
অনন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে ইংরেজীতে বলল,
‘আপনি কে?’
‘আমাকে চিনতে পারছো না!’
মেয়েটির চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে। অনন্ত বলে,
‘আশ্চর্য, আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না! কে আপনি?’
মেয়েটি মুখ মলিন করে বলল,
‘আমি ইরিনা। আমাকে চিনতে পারছো না, সত্যি!’
‘ইরিনা নামে কাউকে আমি চিনি না। আপনি ভুল করছেন।’
বলল অনন্ত। কথাটা বলতে গিয়ে ও কেমন অসহায় বোধ করল। ইরিনা ‘উফ্!’ শব্দের সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘এ কি বলছো, অনন্ত! অনন্তকাল আমাকে চিনবে বলেই তো তুমি অনন্ত। অথচ আজ কী বলছো! আমাকে চিনতেই পারছো না!’
ইরিনার কথায় থ’ হয়ে যায় অনন্ত। ওর নাম সম্বোধন করে এই অচেনা মেয়েটি কী বলছে। ইরিনার মুখের দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকে ও। ওর মুখে কোন কথা জোগায় না। ইরিনা বলে,
‘আমার স্কার্ফ নিয়ে চলে যাচ্ছো। আমাকে সঙ্গেও নেবে না? তাহলে তুমি এলে কেন এই গুহায়? এতোকাল ভালোই তো ছিলাম একা। তুমি এসে কেন অভিশাপের দীঘল ঘুম থেকে জাগালে?’
ইরিনার প্রশ্ন বিব্রত করে দিল অনন্তকে। ও যেন এক রহস্যময় গোলাক ধাঁধাঁয় পড়ে গেছে। ও কিছু বলতে যাচ্ছিলো গাড়ির ভেতর থেকে ওর বন্ধু জামান বলল,
‘অনন্ত, মেয়েটির সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠুন, যেতে হবে।’
জামান অনন্তের বন্ধু। তিনি ম্যারিল্যন্ডে থাকেন। জামানই ওকে এই গুহা দেখাতে নিয়ে এসেছে। জামানের কথায় সায় দিয়ে ইরিনাকে অনন্ত বলল,
‘দেখুন, আমার নাম বলে আমাকে চমকে দিয়েছেন ঠিক। তারপরও আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারছি না। তাছাড়া আমি এই দেশেও থাকি না। আমি থাকি বাংলাদেশে। বাংলাদেশে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে-এ কথাও মেনে নেয়া যাবে না। যাই হোক, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।’
অনন্তের কথায় ইরিনার মুখ বিষন্ন হয়ে গেল। ওর চোখের কোণে জল জমলো। ওর ঠোঁট তিরতির কাঁপছে। মেয়েটি কি হাউমাউ কেঁদে ফেলবে? ভাবলো অনন্ত। ও ফের বলল,
‘আমাকে যেতে হবে। আপনাকে চিনতে পারছি না বলে কিছু মনে করবেন না।’
ইরিনা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
‘তুমি এসেছো বলে আজ আমার মুক্তি হয়েছে। আমি তোমাকে ভালোবেসে অভিশপ্ত হয়ে ৩ শ’ বছর এই গুহায় বন্দি ছিলাম। আজ তুমি এসে আমাকে মুক্তি করলে। অথচ আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছো!’
ইরিনার এ কথা শোনার পর অনন্ত নিশ্চিত হলো মেয়েটির মাথায় গন্ডগোল আছে। ও আর এ ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। অনন্ত স্মিত হেসে বলল,
‘আচ্ছা, আসি। আমাকে ভালোবেসে থাকলে আরো অপেক্ষা করুন। গুহা থেকে মুক্তি পেয়েছেন যখন, বাংলাদেশে আসুন। তখন দেখা যাবে আপনার ভালোবাসার শক্তি কত।’
অনন্তের কথায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ইরিনা। কান্না জড়িত কাঁপা কণ্ঠে ও বলল,
‘আরো যত বছর অপেক্ষা করতে হয়, আমি তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবো-কথাটি মনে রেখো।’
অনন্ত গাড়িতে চড়ে বসতেই ইরিনা বলল,
‘আমি কী নিয়ে থাকবো, অনন্ত?’
এ কথায় বিব্রত ও বিরক্ত হলো ও। গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে অনন্ত ইরিনার দিকে স্কার্ফটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘এটা রেখে দিন। যদি আপনার কথা সত্যি হয়, তাহলে এই স্কার্ফ আমাদের মিলন ঘটিয়ে দেবে।’
কথাটা রসিকতা করে বলল অনন্ত। ও হাসিমুখে স্কার্ফটা তুলে দিল ইরিনার হাতে। ইরিনা স্কার্ফটা হাতে নিয়ে বিহবল চোখে তাকিয়ে রইলো অনন্তের দিকে। ওর আকুতিভরা দৃষ্টিতে কেমন সম্মোহন ছিল যেন। ওর চোখের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে অনন্তের বুকে মিহিন কাঁপুনি উঠেছিল। ইরিনা হঠাৎ ওর বাম কান থেকে একটা রিং খুলে অনন্তের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘আমারও একটা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যাও। হয়তো আমাদের মিলনের যোগসূত্র হবে এটি।’
ইরিনার বাড়িয়ে দেয়া কানের রিংটা অনন্ত নিল সম্মোহনের মত। ও তাকিয়ে থেকেছিল ইরিনার দিকে। দৃষ্টি সরাতে পারেনি। জামান ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে দিল। ওদের গাড়ি খুব দ্রুত চলে এসেছিল লোরে ক্যাভেন এলাকা থেকে। যতক্ষণ দেখা গেছে ইরিনা দাঁড়িয়ে ছিল অনড়।
আজ প্রায় এক বছর পর ‘ইরিনা’ নামটা শুনে অনন্ত একটু কেঁপে গেল। ইরিনা’র সঙ্গে দেখা করতে পারবে না-কথাটা বলতে পারলো না।
দরোজায় নক করে মেয়েটি অনন্তের রুমে প্রবেশ করলো। অনন্ত তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। মেয়েটি ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো ওর টেবিলের সামনে। মুখে একফালি হাসির বিদুৎ চমকিয়ে বলল,
‘আমার নাম ইরিনা।’
রিনরিনিয়ে উঠলো যেন মিষ্টি একটা কণ্ঠ। ইরিনার হাসিতেও মাদকতা আছে। ইরিনার মুখটি প্রতিমার মত আকর্ষণীয়। চোখের দৃষ্টিতে নক্ষত্রের লাবণ্য ঠিকরে বেরুচ্ছে। ভার্জিনিয়া দেখা ইরিনার সঙ্গে এই ইরিনার কোন মিল নেই। শুধু বয়সের মিল আছে। এই ইরিনা ধবধবে ফর্সা, কোমল ত্বক ওর। মুখের গড়ন পানপাতার মত। ওর উপস্থিতির মধ্যে তীর্যকতা নেই, বরং এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, এক ধরনের বিনয় ফুটে উঠেছে। ইরিনার উপস্থিতি ভালো লাগলো অনন্তের। ও বলল,
‘বসুন।’
ইরিনা অনন্তের সামনের টেবিলের বিপরীত প্রান্তে রাখা চেয়ারে বসলো। অনন্ত বুঝতে পারছিল এই ইরিনা নামের মেয়েটি ওর কাছে কেন এসেছে। ওর মনে হচ্ছিলো মেয়েটি ওর কাছে চাকরি চাইতে পারে। ইরিনাকে চাকরি দিতে পারবে ও, দেবে কিনা ভাবতে লাগলো। ইরিনার মিষ্টি কণ্ঠ রিনরিনিয়ে উঠলো,
‘আপনি নিশ্চয়, এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান?’
‘হুম।’
‘আপনার নাম অনন্ত চৌধুরী?’
‘এটাও ঠিক।’
‘তাহলে যথাযথ ব্যক্তির কাছেই আমি এসেছি।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনি কেন আমার কাছে এসেছেন। যদি চাকরির..।’
এ পর্যন্ত বলতে পারলো অনন্ত। ইরিনা কথার মাঝখানে বলল,
‘আমি কিন্তু চাকরি প্রার্থনা নিয়ে আসিনি।’
নিজের ভেতরে হোচট খেল অনন্ত। মেয়েটি তাহলে ওর কাছে কেন এসেছে? প্রশ্নটা করতে হলো না। ইরিনা বলল,
‘আমি বিশেষ একটা আবেদন নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। আশা করি, আপনি আমাকে হতাশ করবেন না।’
অনন্ত একটু বিরক্তবোধ করলেও মুখে তা প্রকাশ করলো না। এ রকম অপরূপা সুন্দরী মেয়ের রিনরিনে মিষ্টিকণ্ঠের মাধুর্য উপভোগ করার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায় না। অনন্ত মুখ টিপে হাসলো। ইরিনা বলল,
‘আপনার মূলবান সময় বেশি নষ্ট করবো না। কাজের কথায় আসি। আমার বাবা ইব্রাহিম খালিদ আপনার অফিসের ইন্ট্যারিয়ার ডিজাইনের কাজ করেছেন। আপনি নিশ্চয় জানেন?’
ইরিনার কথায় অনন্ত বুঝতে পারলো বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ইব্রাহিম খালিদের মেয়ে সে। অনন্ত ইরিনার কথার জবাবে বলল,
‘আপনি ইব্রাহিম খালিদ এর মেয়ে? নাইস টু মিট ইউ!’
‘নাইস টু মিট ইউ টু, মিঃ অনন্ত চৌধুরী।’
বলল ইরিনা। অনন্ত প্রশ্ন করল,
‘আপনি কেন আমার কাছে এসেছেন, বলুন তো?’
‘আমার বাবার বিলটা আটকে আছে। আমি গত তিনদিন ধরে আপনার হিসাব বিভাগের কর্মকর্তাদের পেছনে ঘুরেছে। কিন্তু বিলের টাকা পাইনি। আমার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে টাকাটা পাওয়া খুবই জরুরি। তাই, আপনার কাছে এসেছি।’
ইরিনার কথা শুনে লজ্জায় মূষড়ে পড়লো অনন্ত। ‘ইব্রাহিম খালিদ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন, আর তার কাজের পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি একাউন্টেন্ড’ কথাটা জানার পর একরাশ গ্লানি গ্রাস করলো ওকে। ও বলল,
‘আমি খুবই দুঃখিত এবং লজ্জিত এর জন্য। আমি এর বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নেব।’
ইরিনা বলল,
‘না,না, এর জন্য আর কী ব্যবস্থা নেবেন। এমন তো হরহামেশা হচ্ছে। আমার কোন অভিযোগ নেই। শুধু অনুরোধ আমার বাবার কাজের বকেয়া অর্থগুলো দিয়ে দিন।’
‘ঠিক আছে আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি আপনাকে চেক দিয়ে দিতে বলছি।’
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, মিঃ অনন্ত। এ সময়ে আমাদের টাকার খুব প্রয়োজন।’
‘কিছু মনে করবেন না, ইরিনা। আমি আপনার বাবার চিত্রকর্মের একজন মুগ্ধ দর্শক। তার ইন্ট্যারিয়ার ডিজাইনের সেন্স অপূর্ব। তার কাজে নান্দনিক মাত্রা ফুটে উঠে। তাইতো আমি, আমার অফিসের ইন্ট্যারিয়ার ডিজাইনের কাজ তাকে দিয়ে করিয়েছি। অথচ দেখুন, আমরাই তার অর্থ পরিশোধ করতে কাপর্ণ্য করেছি। আমি যে কীরকম লজ্জাবোধ করছি!’
‘না, না। আপনার দোষ কোথায়? তারপরও আপনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, চেক দিয়ে দিচ্ছেন-এটাই বা ক’জন করে, বলুন?’
ইরিনার কথায় মনের ওপর ছেয়ে যাওয়া গ্লানির মেঘ সরে যেতে লাগলো। অফিসের চীফ একাউন্টেন্ড করিম হাওলাদারকে ডেকে এনে ঝাল মেটানো ভৎসর্ণা করে দিতে ইচ্ছে করছিল অনন্তের। সেদিকে সে গেল না। ইন্টারকম ফোন তুলে সে চীফ একাউন্টেন্ডকে রাগী গলায় বলল,
‘করিম সাহেব, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইব্রাহিম খালিদের সমুদয় অর্থের চেক লিখে আমার রুমে নিয়ে আসুন।’
ইন্টারকমের রিসিভার রেখে দিল ও। ইরিনা মিষ্টি করে হেসে বলল,
‘যদি অনুমতি দেন, আমি বরং করিম সাহেবের কাছে যাই। চেক নিয়ে চলে যাবো। আপনার আর সময় নষ্ট করতে চাই না।’
‘হুম্। যেতে পারেন।’
বলল অনন্ত। ওর কথায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো ইরিনা। ওর মুখে মিষ্টি হাসি লেগে আছে। অনন্ত ওর মুখের দিকে চোখ রেখে বলল,
‘আমি আজ সন্ধ্যার পর আপনার বাবাকে দেখতে যেতে চাই। তিনি কোন হাসপাতালে এডমিটেড আছেন?’
‘স্কয়ার হাসপাতালে। কেবিন নম্বর ২০৪।’
‘ওকে, অল দ্যা বেষ্ট।’
‘লটস অব থ্যাংকস!’
‘ওয়েল কাম।’
অনাবিল উপস্থিতির মৌতাত রেখে দখিনা হাওয়ার মত অনন্তের রুম থেকে বেরিয়ে গেল ইরিনা। বেশ কিছুক্ষণ কাজে মনযোগ দিতে পারলো না অনন্ত। এমন কখনও হয়নি ওর।
দুই.
ভীষণ মন খারাপ করে অনন্ত আজ অফিসে এলো। মন খারাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। শায়লার সঙ্গে ওর এ্যাংগেজম্যন্ট হয়েছিল তিনমাস আগে। আগামী মাসের ২৪ তারিখ ওদের বিয়ে। বিয়ের আয়োজন চলছে পুরোদমে। অনন্তও কাকে কাকে ওদের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করবে, এমন একটা তালিকা বানিয়ে ফেলেছে। কার্ড ছাপতে দেয়া হয়েছে। উভয় পরিবারের লোকদের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতির কাজ চলছে। এমননি সময়ে কাল রাতে শায়লা ওর সঙ্গে দেখা করে জানালো, ও অন্য একজনকে ভালোবাসে। অনন্তকে বিয়ে করতে পারবে না। পরিবারের চাপে পড়ে শায়লা ওর এ্যাংগেজম্যান্টের আংটি গ্রহণ করেছে, কিন্তু ও এই বিয়েতে রাজী নয়। শায়লা আরো অনুরোধ করেছে, এ কথা অনন্ত যেন শায়লার পরিবারকে না বলে এবং বিয়েটা ওর দিক থেকেই যেন ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাহাড় ঠেলে সরানোর মত কঠিন অনুরোধ। শায়লা বিয়ে করতে না পারার জন্য অনন্তের আফসোস নেই, কিন্তু এরই মধ্যে অনেকে জেনে গেছে ওর আর শায়লার বিয়ে হচ্ছে। শায়লা ওর বাগদত্তা। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হবার পর যখন নিমন্ত্রণপত্র ছাপাখানায়, তখন শায়লা এসে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো অনুরোধ নিয়ে। যাকে নিয়ে পুরো জীবন কাটাতে হবে, যাকে নিয়ে সংসার সাজাতে হবে, সেই নারী যদি বিয়ে করতে না পারার অপরাগতার কথা জানায় এবং ভালেবাসার মানুষকে বিয়ে করার অদমনীয় আকাঙ্খার কথা প্রকাশ করে, তখন অনুচ্চারিত বেদনায় ভাষামূক হয়ে যেতে হয়। অনন্তও এই বেদনায় ভাষামূক। ভালোবাসার ক্ষেত্রে যুক্তির চেয়ে আবেগের জয় হয় বারবার। এখানেও তাই হয়েছে। অনন্ত কথা দিয়েছে ও নিজ থেকেই ওর আর শায়লার বিয়ে ভেঙে দেবে কোন এক অজুহআতে। দোষটা ওর কাঁধেই নিতে হবে। প্রেমের প্রতি সম্মান দেখানো আর কি। এ সব কথা ভাবতে ভাবতে ভারাক্রান্ত মনে অনন্ত ওর রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল ওর টেবিলে দুটি খাম রাখা আছে। একটি চিঠির ছোট খাম, অপরটি একটু বড় ধরনের খাম। অনন্ত প্রথমে চিঠির খামটি খুলল। শায়লার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চিঠি। ও লিখেছে,
অনন্ত চৌধুরী,
আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা জানা নেই। রাতে শুনেছি, বাবা বলছিলেন, আপনি এখন বিয়ে করতে প্রস্তত নন। আমার মা মূষড়ে পড়েছেন। বাবা চিন্তিত। কিন্তু আমি আনন্দে বিগলিত। আমি শাকিলকে ভীষণ ভালোবাসি। সে-ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমাদের মিলনের পথ আপনি তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা আজ কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুখবরটা আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।
আমি জানি, আপনাকে যে নারী স্বামী হিসাবে পাবেন, সে অনেক ভাগ্যবতী। আপনার উদার মানসিকতা আপনার ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা বাড়িয়েছে। আপনি ঠকবেন না, এই বিশ্বাস আমার। আমার অনুরোধে আপনি যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তা আজীবন মনে রাখবো।
আপনার প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা। পত্রটি লিকে নিজে আপনার অফিসে এসে দিয়ে গেলাম। ভালো থাকবেন।
ইতি
শায়লা
চিঠিতে পড়ে ড্রয়ারে রেখে দিল অনন্ত। শায়লার পত্রে সান্ত¦না আছে, কিন্তু সামাজিকভাবে ও যে সমস্যায় পড়লো এর কোন সমাধান নেই। অনন্ত দ্বিতীয় বড় খামটি হাতে দেখলো খামটির প্রেরক হচ্ছে ইরিনা। নামটি দেখে ওর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ইরিনা ওকে কী পাঠাতে পারে? নিশ্চয় কোনো উপহার। ওর সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল হাসপাতালে ওর বাবার কেবিনে। সেদিন অনন্ত গিয়েছিল ওর বাবাকে দেখতে। ইব্রাহিম খালিদও অনন্তকে দেখে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। সেদিনও ইরিনা অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছিল ওর বাবার পাওনা অর্থের চেক দিয়ে দেয়ার জন্য। উপর্যুপরি ধন্যবাদ পেয়ে ও বিব্রত হয়েছিল। ইব্রাহিম খালিদের কাজের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেয়াটাই স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু এই কাজের জন্য এতো ধন্যবাদ প্রাপ্তি অনুভব করিয়ে দেয়, অফিসগুলোতে শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা হয়না। সেদিনের ধন্যবাদের রেশ না ফুরাতেই এবার এলো উপহার। বিষণ্ন মনে অনন্ত উপহারের খামটি খুলল। খামটি খুলতেই ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। খাম থেকে বের হয়ে এলো সেই স্কার্ফ, যেটি ও ভার্জিনিয়ার লোরে শহরে কিনেছিল এবং ইরিনা নামের মেয়েটিকে দিয়েছিল। ঠিক সেই স্কার্ফটিই ইরিনা ওকে পাঠিয়েছে। এ-ও কি সম্ভব? স্কার্ফটি দেখে অনন্তের গা শিরশির করে কেঁপে উঠলো। যে ইরিনাকে ও স্কার্ফটি দিয়েছিল, সে ছিল অন্য জাতির বা গোত্রের মানুষ। আর এই ইরিনা বাংলাদেশের এক মেয়ে। দু’জনের মধ্যে যোগসূত্র কীভাবে? অনন্তের মাথা যেন চক্কর দিয়ে উঠলো। ও কিছু ভেবে পেল না। ও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত উঠা-নামা করছে। ও কী করবে-কিছুক্ষণ ভেবে পেল না। প্রায় এক বছর পর আবারো রহস্য এসে হাজির ওর সামনে। কেন এই রহস্য? প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগলো। সেদিন হাসপাতালে কথা প্রসঙ্গে ও ইরিনার সেলফোন নম্বর নিয়েছিল। ও নিজের সেলফোনের নামের তালিকা থেকে ইরিনার নম্বর বের করলো। ফোন করলো ওকে। দু’বার রিং বাজতেই ও প্রান্তে ফোন রিসিভ করলো ইরিনা।
‘হ্যালো.. কে বলছেন?’
‘আমি অনন্ত, চিনতে পারছেন?’
‘বাহ, চিনতে পারবো না কেন? আপনাকে একটা উপহার পাঠিয়েছি, পেয়েছেন?’
‘হুম। উপহারটা পেয়েই ফোন করলাম। ধন্যবাদ জানাতে।’
‘ওয়েল কাম।’
‘কিন্তু আমার প্রশ্ন আছে। জবাব দিতে হবে ঠিক ঠিক।’
‘প্রশ্ন করুন, জবাব দিতে সমস্যা কী?’
‘আমাকে উপহার পাঠিয়েছেন কেন”
অনন্তের কথায় ও প্রান্তে রিনরিনিয়ে হেসে উঠলো ইরিনা। ও বলল,
‘বিশেষ কোন কারণ নেই, অনন্ত চৌধুরী। আপনার ব্যবহারে আমি ও আমার বাবা মুগ্ধ হয়েছি। এ ছাড়া আমার বাবা যেখানে বা যার কাজ করেন, লেনদেন শেষে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সৌজন্য স্মারক হিসাবে উপহার দিতে পছন্দ করেন। এবার বাবা অসুস্থ বলে আমিই উপহার পাঠানোর কাজটি সম্পন্ন করি। এইতো, আর কিছু জানতে চান?’
ইরিনার কথা শুনে অনন্তের মধ্যে ঘোরলাগা তন্ময়তা ছড়িয়ে পড়ছে। ও অবাক হলো নিজের মধ্যে এক ধরনের বিহবলতা সৃষ্টি হওয়ায়। ইরিনার কথা ওর ভীষণ ভালো লাগছে। ইরিনার প্রতি ও দূর্বার আকর্ষণ অনুভব করছে। অথচ প্রথমদিন এই আকর্ষণ অনুভব করেনি ও। কেন ওর ভেতরে এমন অমূল পরিবর্তন? কেন ইরিনার কথায় শিহরণ অনুভব করছে? অনন্ত কোথায় যেন তলিয়ে যেতে থাকে। ও বলে,
‘এই স্কার্ফটি কোথায় পেয়েছেন, সত্যি করে বলুন তো!’
‘আশ্চর্য, আপনি এমনভাবে কথা বলছেন কেন? আপনার কী হয়েছে?’
জানতে চাইলো ইরিনা। অনন্ত বলল,
‘আমার এখনও কিছু হয়নি, তবে হবে। আপনি আগে বলুন, স্কার্ফটি কোথায় পেয়েছেন, প্লিজ!’
ও প্রান্তে কয়েক মূহুর্তের নীরবতা। অনন্তের হৃৎপিন্ডে ধুকধুকানির শব্দ। ইরিনা বলল,
‘দেখুন, রুমালটি আমি নিজে তৈরি করেছি। আই মীন, একটি সিল্কের কাপড়ে আমি রঙ মেখেছি। ছবি এঁকেছি।’
‘আপনি রুমালটি তৈরি করেছেন? আদিবাসী মেয়েটির ছবি এঁকেছেন, সত্যি বলছেন?’
‘আপনি মনে হচ্ছে, উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। এ্যানিথিং রং?’
‘না, না। প্লিজ, আমার প্রশ্নের জবাব দিন।’
ককিয়ে উঠে অনন্ত। ইরিনা বলে,
‘আপনি হয়তো জানেন না, আমি গত বছর চারুকলা ইন্সিটিউট থেকে মাষ্টার্স পাশ করেছি। বাবার মত আমিও আঁকিয়ে। রঙতুলি নিয়েই তো আমাদের কাজ। পুতুলও বানাই। কেন এ সব প্রশ্ন করছেন, বলুন তো?’
জানতে চাইলো ইরিনা। অনন্তের ভেতরে ঘোরলাগা আবেগ পেখম ছড়িয়ে গেছে। ও নিজেকে সংযত করতে পারছে না। ও বলল,
‘ইরিনা, তুমি জানো না, আমাকে কী অপার রহস্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছো। যুক্তরাষ্ট্রে তুমি দেখা দিলে আদিবাসী নারীর বেশে, ঢাকায় দেখা দিলে আমার কল্পনার মানসীরূপে। যুক্তরাষ্ট্রে আমি তোমাকে চিনতে পারিনি বলে ফিরিয়ে দিয়েছি, কিন্তু এবার আমিই আসছি তোমার কাছে। আমাকে ফেরাতে পারবে না। কিছুতেই ফেরাতে পারবে না।’
‘মিঃ অনন্ত চৌধুরী, আপনি মনে অসুস্থ। আপনি কিন্তু প্রলাপ বকছেন। আপনার কী হয়েছে?’
‘আমি তোমার কাছে আসছি, ইরিনা। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাই।’
‘আপনি আমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করছেন অনন্ত চৌধুরী। আমি বিব্রত বোধ করছি। আপনি প্রলাপ বকছেন। আপনার কী হয়েছে? ’
এ কথার জবাব দিল না অনন্ত। ও ঘোরলাগা ভাবাবেগে ফোন লাইন কেটে দিল। এরপর ইরিনার পাঠানো স্কার্ফটি নিয়ে অফিস থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল ও।
তিন.
দরোজা খুললেন ইব্রাহিম খালিদ। তার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন তিনদিন হলো। বেডরেষ্টে আছেন। অনন্ত তাকে সালাম দিয়ে বলল,
‘ইরিনা কি বাসায় আছেন? আমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারি?’
ওর কথা শুনে ইব্রাহিম খালিদের মুখে বড় একটা হাসি ঝরমলিয়ে উঠলো। তিনি বললেন,
‘তুমি ওকে রাগিয়ে দিয়েছো কী বলে? তোমাদের মধ্যে কি রাগ-অনুরাগের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? হলে আমাকে জানিয়ো। যাও, ও পাশের রুমে আছে। ওটা আমাদের ছবি আঁকার রুম। ওখানে যা আছে, সবই শিল্প। আমার মেয়েটা কিন্তু বড় শিল্প। দেখো, অযত্ম, অনাদর বা অবহেলা যেন না হয়!’
ইব্রাহিম খালিদের এমন মিষ্টভাষী কথার জবাবে অনন্ত কোন কথা বলতে পারলো না। বলবেই বা কী। যে কথা ওর মনের মধ্যে রঙের ফোয়ারার মত ছড়িয়ে যাচ্ছে, সে কথার বিচ্ছুরণ তো ইরিনার বাবা ঘটালেন। এমন সমর্থন এবং সম্মতি সহজে কে পেয়েছে? অনন্ত এগিয়ে গেল ইব্রাহিম খালিদের অঙ্গুলী নির্দেশনায় দেখিয়ে দেয়া অন্যরুমের দিকে। ইরিনা কি অনন্তের জন্য অপেক্ষা করছিল? প্রশ্নটা ওর মনে ছিল। ও দেখলো আবক্ষ এক মূর্তির সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ইরিনা। অনন্ত রুমটির চারপাশে তাকিয়ে দেখলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পেইন্টিংয়ের ক্যানভাস, রঙের প্যাকেট ও রঙতুলি। দেয়ালগুলিতে লাটকানো আছে জলরঙ-তৈলচিত্রে ক্যানভাস কয়েকটি। অনন্ত ইরিনার উদ্দেশ্যে বলল,
‘ইরিনা, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমি অযাচিতভাবে আমাকে মানসিক কষ্ট দিয়েছি। আমি বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে আপনাকে ‘তুমি’ বলিনি। আমার ভেতর থেকে এই সম্বোধন উঠে এসেছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমার এই অপরাগতার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি।’
আবক্ষ মূর্তির সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়ালো ইরিনা। ওর চোখে জলের ধারা। প্রতিমার মত অপরূপা মেয়ের কান্নাও যে শিল্পের সুষমামন্ডিত হতে পারে, তা ইরিনার অশ্রুভেজা মুখের দিকে তাকালে যে কেউ স্বীকার করবে। অনন্ত বিষণ্ন না হয়ে বিহবল হল। ও লক্ষ্য করলো, যে আবক্ষ মূর্তির সামনে ইরিনা দাঁড়িয়ে আছে, সেই মূর্তির মুখচ্ছবি, স্কার্ফের মাঝখানে আঁকা আদিবাসী মেয়ের একই মুখের ছবি। রহস্যের যেন শেষ নেই। ও আরো দেখতে পেল আবক্ষ মূর্তির ডান কানে একটি রিং। বাম কানে রিং নেই। ওর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠলো। ও বলল,
‘এই মূর্তির ডান কানের রিং কোথায় পেয়েছেন? বাম কানের রিংটা কোথায়?’
ইরিনা চোখ কপালে তুলে বলল,
‘রিং কোথায় আবার পাবো! আমার কানের রিং পরিয়েছিলাম। বাম কানের রিংটা হারিয়ে গেছে। কেন?’
অনন্ত প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগে সযতনে রাখা বাম কানের রিংটা বের করে ইরিনার সামনে ধরে বলল,
‘দেখুন তো, এটাই আপনার হারিয়ে যাওয়া রিং কিনা?’
অনন্তের হাত থেকে ইরিনা রিংটা নিয়ে ভালো করে দেখল। ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলল,
‘এই রিং আপনি পেলেন কোথায়? আশ্চর্য!’
ইরিনা রিংটা মূর্তির বাম কানে লাগিয়ে দিল। অনন্ত স্মিত হেসে বলল,
‘আমাকে ‘তুমি’ বলার অনুমতি দিলে বলব, এই রিংটা কোথায় এবং কীভাবে পেয়েছি। অনুমতি দেবেন?’
অনন্তের কথায় কপট রাগী চোখে তাকালো ইরিনা। অনন্ত ওর রাগকে গায়ে মাখলো না। বলল,
‘নিয়তি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। ফেরাতে পারবেন না। রিংটা যেমন হারিয়ে গিয়েও ফিরে এসেছে, আমিও ফিরে ফিরে আসবো। এই যেমন এসেছি, ফিরিয়ে দিলে ৩ শ’ পরও আবার আসবো।’
‘তাই নাকি! তাহলে শায়লার কী হবে? আগামী মাসে যার সঙ্গে বিয়ে..?’
ঠিক এ সময়ে অনন্তের ফোন বেজে উঠলো। সেলফোনের স্ক্রীণে শায়লার নাম দেখে ও ধরলো। ও প্রান্তে শায়লার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,
‘অনন্ত, জানেন, শাকিল আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ও এখন বলছে আমাকে বিয়ে করবে না। ও কাজী অফিসে আসেনি। আমি বাসায় চিঠি লিখে এসেছি যে, আজ আমি শাকিলকে বিয়ে করবো। আমি ভীষণ মূষড়ে পড়েছি। এই সময়ে যদি আপনি আমার পাশে এসে দাঁড়ান, আমি সাহস পাবো। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আমাদের বিয়ের আয়োজন তো চলছিল। আমরা কি আজকের দিনটির কথা ভুলে গিয়ে বিয়ে করতে পারি না? আমি জানি, আপনি অনেক মহৎ, অনন্ত, শুনছেন? হ্যালো..!’
অনন্ত বলল,
‘শায়লা, আমি যে আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। নিয়তি আমাকে নিয়ে রহস্য করেছে, আবার সেই রহস্য আমাকে পৌঁছে দিয়েছে আমার গন্তব্যে। আমি আসলে আপনার জন্য এই পৃথিবীতে আসিনি, আমি এসেছি ইরিনার জন্য। আমি এখন ওর সামনে দু’হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি।’
কথাটা বলে ও ফোন রেখে দিল। ইরিনা এবার অন্যভাবে তাকিয়ে আছে অনন্তের দিকে। অনন্তের মনে হচ্ছে, ইরিনার ঘোরলাগা এই দৃষ্টি এক পলকের জন্যও সরবে না। অনন্ত এগিয়ে গিয়ে ইরিনার দুটি হাতের মুঠো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। ইরিনা ওকে বাধা দিল না। অনন্ত মনে মনে ভাবলো, কে জানে, লোরে শহরের গুহাতে এখন কী হচ্ছে। যাই ঘটুক, বা না ঘটুক, ইরিনার কাছে তো ও পৌঁছেছে।
১৪.
লাবণ্য ভেজা মেঘ
এক.
মেয়েটি রাতুলের দিকে অবাক চোখে তাকালো। ও বিস্মিত কণ্ঠে বললো,
‘আপনি আমাকে চিনতে পারছে না! সত্যি বলছেন?’
রাতুল মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালো। মেয়েটির মায়াবি মুখ। ডাগর চোখ, দৃষ্টিতে এক ধরনের লাবণ্য আছে। নাক টিকালো না হলেও মন্দ নয়। ঠোঁট পুরুও নয়, সরুও নয়। চিবুকটা একটু লম্বা হওয়ায় মেয়েটির মুখমন্ডলে অতিরিক্ত সৌন্দর্য দৃশ্যমান। হাসলে মেয়েটিকে অপ্সরীর মত লাগতে পারে, মনে মনে ভাবলো রাতুল। মেয়েটির চোখেমুখে বিস্ময় এবং বিস্ময়ের আড়ালে হালকা রাগের আস্তরণ। রাতুল মেয়েটিকে চিনতে পারছে না, এটাই রাগ ও বিস্ময়ের কারণ। অথচ রাতুল সত্যিই মেয়েটিকে চিনতে পারছে না। ও মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে নরোমকণ্ঠে বলল,
‘আমার স্মৃতিভ্রম রোগ আছে, জানতাম না। এখন মনে হচ্ছে, এই রোগের চিকিৎসা করাতে হবে। আপনি আমাকে চেনেন, অথচ দেখুন, আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে!’
এবার মেয়েটি হেসে ফেললো। রাতুল যা ভেবেছিল, তাই। হাসলে মেয়েটিকে অপ্সরীর মত লাগে। হাসলে মেয়েটির লাবণ্যময় দৃষ্টি এতো উজ্জ্বল হয় যে, মনে হবে মেয়েটি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখছে। রাতুল চোখ নামিয়ে নিল। মেয়েটি বলল,
‘আমি ধরে নিচ্ছি, আপনি রসিকতা করছেন। আমাকে না চেনার ভান করছেন। আমি বৃষ্টি। রাকিবের কাজিন..।
‘বৃষ্টি’ নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রাতুলের যেন বজ্রপাত হলো। ও চমকে তাকালো বৃষ্টির মুখের দিকে। ওর দৃষ্টি আটকে গেল। এ কথা ঠিক, এতোদিন পর বৃষ্টিকে ওর চেনার কথা নয়। চারবছর আগে ও বৃষ্টিকে দেখেছে। রাতুলের সঙ্গে বৃষ্টির কোন সম্পর্কও নেই। ছোট্ট দুটো ঘটনার জন্য বৃষ্টি ওর স্মৃতিতে কাঁটার মত বিধে আছে। যা ঘটেছে, তা কখনো বিশেষ ঘটনা হিসাবে ভাবেনি রাতুল। বিয়ে বাড়িতে অনেক রকম ঘটনাই ঘটে। ওসব মনে রাখতে নেই। বিয়ে বাড়ির উৎসবে হাসি-তামাশার মত ঐ সব তুচ্ছ ঘটনা মিলিয়ে যায়। বৃষ্টির কথাও মিলিয়ে গিয়েছিল। বলা যায়, বৃষ্টির কথা রাতুল ভুলেই গিয়েছিল। অথচ সেই বৃষ্টি ওর সামনে বসে আছে। জলজ্যান্ত বৃষ্টি ওর সামনে বসে আছে আর ও চিনতে পারছিল না। বৃষ্টিকে চিনতে না পারার জন্য ও একটু বিব্রত হলো। রাকিবদের বাড়িতে বৃষ্টিকে ও দেখেছে, কথাও হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির পরিচয় ও জানেনি। বৃষ্টি কে, কোথায় থাকে বা বিয়ে বাড়িতে ও কার আত্মীয়, এ সব কিছুই জানতো না। জানার কথাও নয়। রাতুল ঐ বিয়েবাড়িতে ছিল অপরিচিত অতিথি। বন্ধু রাকিবের বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে ও গিয়েছিল খুলনায়। রাতুল স্মৃতি হাতরে পেছনে ফিরে গেল। রাকিবের সঙ্গে ওর পরিচয় টিএসসিতে। ডাচের সামনে আড্ডা মারতে গিয়ে একদিন পরিচয় হয় ওদের। পরিচয়টা কয়েকদিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। রাকিব ছিল রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র। রাতুল ইংরেজী সাহিত্যে পড়ছিল। রাকিব ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। ও পুরো ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতো। রাতুল পাবলিক লাইব্রেরী আর শাহ আজিজ মাকের্টের বইয়ের দোকান ছাড়া কোথাও খুব একটা যেত না। চরিত্রের দিক থেকে রাকিব যতটা ডানপিটে-চঞ্চল, রাতুল ঠিক তার উল্টো। তারপরও ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিল। রাকিবের অনুরোধে রাতুল ওর সঙ্গে একবার খুলনায় গিয়েছিল। সেটা ছিল রাতুলের প্রথম খুলনায় যাওয়া। রাকিবের বড় ভাইয়ের বিয়ের আগেরদিন সকালে ওরা হাজির হল ওদের সোনাডাঙ্গার বাড়িতে। বাড়িতে গমগম করছিল মানুষ। হৈ-হুল্লোর, গানবাজনা, চিৎকার-চেঁচামেচি ছিল। সেসঙ্গে ভূড়িভোজের নানা আয়োজনও। রাকিবদের বাড়ি গিয়ে রাতুল বুঝতে পেরেছিল ওরা কতটা ধনাঢ্য পরিবার। রাকিবকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। রাতুল ওদের বাড়িতে গিয়ে ভীষণ লজ্জায় মিইয়ে গেল। ও হৈচৈ, হট্টগোল পছন্দ করছিল না। বিয়েবাড়ির অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও রাকিবের মা ওকে যত্ন করে খাবার দিয়েছিলেন। মাতৃস্নেহের পরশ পেয়েছিল ও।
রাকিবের ভাইয়ের বিয়েতে অংশ নেয়াটা তেমন বড় কোন ঘটনা নয়। কিন্তু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মুখোমুখি হয়ে রাতুল নতুন এক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। ঐ বিচ্ছিন্ন ঘটনা দুটির কারণে রাকিবের ভাইয়ের বিয়েতে অংশ নেয়ার স্মৃতি মাঝেমাঝে মনে পড়ে ওর। বিয়ের আগেরদিন বিকেলে রাকিবদের দোতালা বাড়ির ছাদে গানের আসর বসেছিল। ঐ আসরে পেছনের সারিতে নীরব শ্রোতা ছিল রাতুল। রাকিব ছিল না। গানের আসরে অনেকে গান গেয়েছিল। বৃষ্টিও গান গেয়েছিল। বৃষ্টির কণ্ঠে মাধুর্যতা ছিল, কিন্তু ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের অন্তরা ভুল সুরে গেয়েছিল ও। ভুল সুরটা রাতুলের ইন্দ্রিয়তে বাজছিল। বৃষ্টির গান শেষ হবার পর উপস্থিত সকলে করতালির মধ্য দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো। দু’তিন জন বৃষ্টিকে টাকাও উপহার দিল। দর্শক-শ্রোতাদের কাছ থেকে ‘ওয়ান মোর, আরেকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত হোক’ দাবি উঠলো। আনন্দের উচ্ছ্বাসে বৃষ্টি হারমোনিয়ামে হাত রাখার সময় রাতুল মুখ ফসকে বলে ফেললো,
‘খেয়াল রাখবেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরটা যেন ঠিক থাকে!’
এই এক কথায় যেন বজ্রপাত হলো। বৃষ্টি রাগে ও লজ্জায় আসর ছেড়ে চলে গেল। শ্রোতারা পেছনে ফিরে কটমট করে রাতুলের দিকে তাকালো। রাতুল ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে, এমন ভাব চোখেমুখে ফুটিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আসর থেকে সরে পড়লো। রাতের বেলায় এক বিব্রতকর ঝড়ের কবলে পড়লো ও। বাড়ির ছাদ তখন জনশুন্য। বিয়েবাড়ির উৎসব চলছে বাড়ি জুড়ে। রাতুল বাড়ির ছাদের এক কোণে বসে আকাশের তারা দেখছিল। হঠাৎ ঝড়ের তান্ডব হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো বৃষ্টি। ও একটি কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে রাগী গলায় প্রশ্ন করলো,
‘আমাকে প্রেমপত্র কেন পাঠিয়েছেন? হাউ ডেয়ার ইউ! ছোটলোক, লম্পট! রাস্কেল!’
বৃষ্টির গালাগাল আগুনের গোলার মত লাগছিল। রাতুল কিছুই বুঝতে পারছিল না। কী বলবে, তাও বুঝতে পারলো না। ও হত বিহবল হয়ে গেল। বৃষ্টি থামলো না। ও চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিল। বৃষ্টির কান্না শুনে ছাদে এলেন রাকিবের মা ও আরো কয়েকজন মহিলা। বৃষ্টি ঐ কাগজটা রাকিবের মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঁদো গলায় বললো,
‘খালা, দেখো ভাইয়ার বন্ধু আমাকে প্রেমপত্র পাঠিয়েছে!’
রাকিবের মা বৃষ্টিকে ছাদ থেকে নিচে নিয়ে গেলেন। রাতুল এমনই লজ্জায় পড়লো যে, ওর মরে যেত ইচ্ছা করছিল। কিছুক্ষণ পর কাউকে না জানিয়ে ও রাকিবদের বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল। এরজন্য ঢাকায় ফিরে রাকিব ওকে অনেক ভৎসর্না করেছিল। রাকিব ওকে জানিয়েছিল, বৃষ্টিকে পছন্দ করে ওদের প্রতিবেশী এক তরুণ সেদিন প্রেমপত্র পাঠিয়েছিল। ঐ তরুণ প্রেমপত্রে রাতুলের নাম ব্যবহার করেছিল। এ খবর জানার পর বৃষ্টির অনেক মন খারাপ হয়েছিল। যাই হোক, সত্য উদঘাটনের মধ্য দিয়ে রাতুল এক নিদারুন লজ্জা থেকে রেহাই পেয়েছিল। সেই বৃষ্টি এখন বসে আছে ওর সামনে। রাতুল বৃষ্টির দিকে মুচকি হাসলো। ও বললো,
‘আমি ঠিক আশা করিনি, আপনার সঙ্গে আমার কখনও দেখা হবে।’
এ কথায় বৃষ্টির চোখের দৃষ্টি যেন কেমন হল। কয়েক সেকেন্ড পর বৃষ্টি বলল,
‘আমি অবশ্য আশাবাদী। আমি সহজে আশা ছাড়ি না। এই যে দেখুন, আপনি আমাকে না চেনার ভান করলেন, কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।’
‘হুম। তা আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন এবং কী জন্য এসেছেন, বলবেন কি?’
রাতুলের প্রশ্নে মিষ্টি করে হাসলো বৃষ্টি। ও বললো,
‘আপনার অফিসে এসে বিরক্তির কারণ হলাম নাতো?’
‘না, তা নয়। পত্রিকার অফিসে গেষ্ট তো হরহামেশা আসছে। আমি আসলে আপনার আসার কারণ জানতে চাচ্ছি। আমি বুঝতে পারছি, আপনি নিশ্চয় জরুরি কোন কাজে আমার কাছে এসেছেন। তাইনা?’
রাতুলের কথায় মৃদু হাসলো বৃষ্টি। বৃষ্টির হাসি কেমন মাতাল করে দিচ্ছে। রাতুল নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। ও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, এরমধ্যে বৃষ্টি বলল,
‘আপনার কাছে একটি দাবি নিয়ে এসেছি। দাবিটি আমাদের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কাছে তুচ্ছ হতে পারে হয়তো। কিন্তু আমাদের দাবি আপনাকে পুরণ করতে হবে।’
বৃষ্টির কথায় কিছু আঁচ করতে পারল না রাতুল। ও বলল,
‘ঠিক বুঝলাম না। পরিচয়ের চার বছর পর আপনি কী দাবি তুলতে চাইছেন?’
আবারো হাসলো বৃষ্টি। সুন্দরী মেয়েরা কেন যে অকারণে কেবল হাসে! মনে মনে ভাবলো রাতুল। ওর কথার জবাবে বৃষ্টি বলল,
‘খুব সংক্ষেপে বলছি। আপনি তো জানেন, আপনার বন্ধু রাকিব ভাইয়া ফ্রান্সে থাকেন?’
‘হুম। ছাত্র রাজনীতির খেসারত। মাষ্টার্সটা দিতে পারলো না। হত্যা মামলায় জড়িয়ে গেল। হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে গেল ইউরোপ। ওর জন্য দুঃখ হয়!’
রাতুর কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বৃষ্টি বলল,
‘রাকিব ভাইয়া দেশে ফিরেছেন কাল। শুক্রবার তার বিয়ে!’
‘তাই নাকি! ও তো আমাকে ফোন করল না! স্টুপিড!’
‘না, না। রাগ করবেন না। ভাইয়া আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে চান। আমাকে বলেছেন, যেভাবে পারি আপনাকে যেন খুলনায় নিয়ে যাই। দায়িত্বটা আমার ওপর পড়েছে।’
‘কিন্তু সারপ্রাইজ আর রইলো কোথায়? আপনি তো ওর কথা বলেই দিলেন।’
‘আমি জানি, ও কথা না বললে আপনি আমার সঙ্গে খুলনায় যাবেন না। তাই বলে ফেললাম। কাল তৈরি থাকবেন। আমি আপনাকে এই অফিস থেকেই পিক করবো।’
বৃষ্টির কথায় বিষম খেল রাতুল। ও বলল,
‘কী বলছেন!’
‘না, করবেন না, প্লিজ! আমার জন্য আপনি খুলনা থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। এবার আমার শাপমোচনের পালা। আপনাকে খুলনায় নিয়ে যেত পারলে হয়তো সেদিনের অপরাধের খানিকটা হলেও সাজা মওকুফ হবে। তাছাড়া আপনাকে খুলনায় নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর।’
কথাগুলো বলে বিনীতচোখে রাতুলের মুখের দিকে চেয়ে রইল ও। রাতুল ভাবনায় পড়ে গেল। বৃষ্টি বলল,
‘অতো কি ভাবছেন? বন্ধুর বিয়েতে যাওয়া তো আপনার দায়িত্ব। না হয় নিমন্ত্রণটা আমার কাছ থেকে পেলেন, এই যা!’
‘না, ভাবছি, সেই খুলনা থেকে আমাকে নিয়ে যেতে আপনি যখন এসেছেন..!’
এ পর্যন্ত বলল রাতুল। বৃষ্টির হাসির সামনে ও ফ্রিজ হয়ে গেল। ও আর কিছু বলল না। হাসি সামলে নিয়ে বৃষ্টি বলল,
‘আমি কিন্তু ঢাকাতেই থাকি। নিবাস রোকেয়া হল। অর্থনীতিতে অনার্স ফাইনাল দিয়েছি এবার।’
বৃষ্টির কথায় ভিড়মি খেল রাতুল। বৃষ্টি ঢাকায় থাকে এবং ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, এ কথা রাকিব ওকে বলেনি। আশ্চার্য! বিস্ময়ের ধাক্কায় ও থ’ হয়ে গেল। ও রাগে বৃষ্টির সঙ্গে খুলনায় যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল মনে মনে। রাকিবকে গালাগাল দিতে হবে। বৃষ্টি বলল,
‘আমি উঠি? কাল তৈরি থাকবেন। অফিসে আজ ছুটির নোটিশ জমা দিয়ে রাখুন। কয়েকদিন থাকতে হবে খুলনায়।’
বৃষ্টির কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল রাতুল। খুলনায় যাবার ব্যাপারে ওর আর কোন অস্বস্থি রইল না। বৃষ্টি ফের একটা হাসির বাণ মেরে দমকা হাওয়ার মত ওর অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
দুই.
টয়োটা এলিয়ন নতুন গাড়িতে বসে কেমন অস্বস্থি লাগলো রাতুলের। ওর এই অস্বস্থি নতুন গাড়ির জন্য, না বৃষ্টির পাশে বসার জন্য-এটা ঠিক বুঝতে পারছে না ও। রাতুল সত্যি সত্যি খুলনায় যাচ্ছে। গাড়িতে উঠতে গিয়ে অবাক হয়েছিল ও। এটা যে বৃষ্টিদের গাড়ি, এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়নি। ড্রাইভার রব বৃষ্টিকে সমীহ প্রকাশ করে ‘আপা-আপা’ করছিল খুব। রাতুল মিলাতে পারছিল না এই গাড়িটি খুলনা থেকে ওকে নিতে এসেছে কিনা। এমন হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা করা সমীচিন নয় বলে করেনি। প্রশ্নটা মনে খচখচ করছিল। গাড়ি ছুটছে পথে। গাড়ির ভেতর গুমোট পরিবেশ হালকা করতেই যেন বৃষ্টি রাতুলের উদ্দেশে বলল,
‘আমি এতো সহজে আপনাকে খুলনায় নিয়ে যেতে পারবো, ভাবিনি। আমার মনে হয়েছিল আপনি শিলাপ্রস্তুরের এক পাথুরে মানুষ।’
রাতুল বৃষ্টির কথায় চকিত তাকালো ওর দিকে। বলল,
‘এখন কী মনে হচ্ছে?’
এ কথার জবাব দিতে গিয়ে মিষ্টি করে হাসলো বৃষ্টি। বলল,
‘অনেক কিছুই তো মনে হচ্ছে। কোনটা বলবো?’
এর জবাবে কী বলা যায়, তা ভেবে পেল না রাতুল। বৃষ্টি ওর কাছ থেকে কোন জবাব না পেয়ে বলল,
‘আচ্ছা, আপনি ইংরেজী সাহিত্যে মাষ্টার্স করে পত্রিকার সাংবাদিক হলেন কেন?’
রাতুল বলল,
‘সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, আমি সেই সাংবাদিক নই। সংবাদপত্রে কাজ করছি সাব এডিটর হিসাবে। সাংবাদিকতা আমি করিনা। সাংবাদিক হতে হলে সাহসী হতে হয়। আমি সাহসী নই। আমি বিভিন্ন সংবাদ অনুবাদ করি। সাংবাদিকদের সংবাদ কখনও রি-রাইট করি। ইংরেজী সাহিত্যে লেখাপড়া করেছি বলে অনুবাদের কাজটা আমার জন্য সহজ হয়েছে।’
কথাগুলো এক নিশ্বাসে যেন বলল। বৃষ্টি বলল,
‘একটা ভালো চাকরির সন্ধান করলেও পারেন।’
‘এটা যে ভালো চাকরি নয়, তা কে বলল আপনাকে?’
রাতুলের কথায় লজ্জা পেল বৃষ্টি। লজ্জা কাটিয়ে উঠতে ও বলল,
‘অনুবাদক বা সাব-এডিটরের চাকরি সম্পর্কে আমার সঠিক ধারনা নেই। তাই..।’
বৃষ্টির কথায় হো হো করে হেসে উঠলো রাতুল। বৃষ্টি বলল,
‘বলুন তো, আপনার বিশেষ গুণ কি?’
এই প্রশ্নের জবাবে রাতুল রসিকতার কণ্ঠে বলল,
‘কেউ ভুল সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে সেই ভুল ধরিয়ে দিতে পারি।’
ও এবার মিটিমিটি হাসতে লাগল। বৃষ্টি কথাটাকে পজিটিভলি নিল। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাতুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমাকে হারিয়ে দিয়ে আপনার খুব বড় জয় হবে ভাবছেন? আমি আপনাকে সহজেই ছাড়ছি না।’
বৃষ্টির কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝলো না রাতুল। কিন্তু কথাটায় যে এক কিছু ইঙ্গিত আছে, তা বুঝতে পারলো। ও কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এ সময় বৃষ্টির সেলফোন বেজে উঠলো। বৃষ্টি ফোনের কল রিসিভ করলো।
‘হ্যালো, কে, ভাইয়া? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে তো আছে। আমার সঙ্গে যাচ্ছে। হ্যাঁ, খুলনাতেই নিয়ে যাচ্ছি। কী, কথা বলবে? দাঁড়াও, দিচ্ছি।’
বৃষ্টি ওর সেলফোনটা বাড়িয়ে দিল রাতুলের দিকে। রাতুল কৌতুহল নিয়ে সেলফোনটি ওর কানে রাখলো। ও প্রান্তে রাকিব।
‘কীরে, কী খবর? অনেক বছর তোর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ক্ষমা করে দিস।’
রাকিবের কথার জবাবে বাজে কিছু কথা বলার ইচ্ছে হল ওর। কিন্তু বৃষ্টির সামনে ওসব কথা বলা যায় না। ও রাগ সংযত করে বলল,
‘তুই আমার সঙ্গে এতো নাটক করছিস কেন, বলতো? দেশে ফিরলি, ফোন না করে বোনকে পাঠালি আমাকে নিয়ে যেতে। তোর বিয়ে বলে যাচ্ছি।’
ও প্রান্ত থেকে খিলখিল করে হাসছে রাকিব। রাতুলের পাশে বৃষ্টিও হাসছে। রাকিবের এই হাসির কারণ খুঁজে পেল না ও। রাতুল ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
‘আবার হাসছিস? তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ঠিক হয়নি।’
রাকিব বলল,
‘আমি এখন যা বলবো, শুধু শুনে যাবি। এরপর কথা বলবি।’
‘আবার কী নাটক,শুনি?’
‘শোন, আমি দেশে আসিনি। আমি কথা বলছি প্যারিস থেকে। আর আমি গত বছরই এখানে বিয়ে করে ফেলেছি।’
‘কী বললি!’
‘চেঁচাস নে! শুধু কথা শুনে যা। আমিই বৃষ্টিকে বলেছি মিথ্যা গল্প বলতে।’
‘মিথ্যা গল্প? কেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তাহলে আমি খুলনায় যাচ্ছি কেন?’
‘বলছি। তোকে খুলনায় যেতে হবে। বৃষ্টির জন্য তোকে যেতে হবে।’
রাকিবের কথায় স্তম্ভিত হয়ে গেল রাতুল। ওর কান যেন লাল হয়ে গেছে। রাকিব কী বলছে! ও বলল,
‘রাকিব, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ঘটনা কি খুলে বলবি?’
রাতুলের অস্থিরতায় রাকিব বলল,
‘বলছি, ধৈর্য ধরে শোন। বৃষ্টির বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। কিন্তু বৃষ্টি বিয়েতে রাজী হচ্ছে না। ও তোকে বিয়ে করতে চায়। না, কোন কথা তুই বলবি না। আমি যা বলছি, আগে তা শোন। বৃষ্টি আমার খালাতো বোন, জানিস তো?’
‘জানি।’
‘তুই ওকে অপমান করেছিলি। আবার তোকে ও না জেনে অপমান করেছিল। এরপর থেকে তোর প্রতি একটা আধো ছায়া স্বপ্নময়তায় ওর মনে রেখাপাত সৃষ্টি হয়ে আছে। এই রেখাপাতটা যে দিনেদিনে গভীর হয়ে যাচ্ছিলো, ও বুঝতে নাকি পারেনি। এ কথা বৃষ্টি আমাকে বলেছে।’
‘রাকিব, তোদের এই নাটকের কোন স্থানে, কোন চরিত্রে আমি আছি, বলতো?’
‘তুই কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছিস। আমি পার্শ্বচরিত্রে। শোন, আমি বৃষ্টির গার্জেন হিসাবে তোর কাছে বৃষ্টির বিয়ের প্রস্তাব করছি। তুই প্রস্তাব গ্রহণ কর।’
রাকিবের কথায় মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ও তাকাতে পারছে না বৃষ্টির দিকে। বৃষ্টি গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে আছে। রাতুল বলল,
‘বন্ধু, জীবনে এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত এক লহমায় নিয়ে ফেলা যায়? আর বৃষ্টিই বা আমাকে বিয়ে করবে কেন? আমি আহামরি কোন চাকরি করিনা। আমার নিজের কোন অর্থবিত্ত নেই। আমার জীবনের সঙ্গে বৃষ্টি কেন সংযুক্ত হবে। এখানে ভালোবাসা বলেও তো কিছু নেই! অকারণে একটি পরীর মত মেয়ে আমার মত সাধারণ একজনের সঙ্গে কেন জড়াবে, সেটা ভেবে পাচ্ছি না। জীবন তো নাটক নয় বন্ধু!’
‘কিন্তু বন্ধু, আমাদের বাড়িতে গিয়ে যে নাটকের প্রথম দৃশ্যটা তুই শুরু করেছিলি, এর শেষ পর্বটা যে বৃষ্টির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আমি শুধু ঘটনা এবং বাস্তবতা তোর সামনে তুলে ধরলাম। এখন তুই আর বৃষ্টি সিদ্ধান্ত নে, কী করবি। আমি পরে জেনে নেব। ফোন রাখছি।’
বলেই রাকিব ফোনটা রেখে দিল। রাতুল অবাক হল। ওকে এমন এক সমস্যার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ফোন রেখে দিল। রাতুল বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর ও বৃষ্টির উদ্দেশে বলল,
‘আপনি আসলে কী চান? আমি কিছু বুঝতে পারছি না। রাকিব যা বলল, তা কি সত্যি?’
বৃষ্টি গাড়ির জানালা থেকে মুখ ফেরালেও ওর মুখ অবনত। অবনত মুখে ও বলল,
‘আমি কি আপনার অযোগ্য?’
‘যোগ্য বা অযোগ্যতার কথা নয়। আপনি আমাকে ভালো করে চেনেন না, জানেন না। আমাদের মধ্যে কোন সম্পর্কও নেই। ভালোবাসা হলে নাহয় বলা যেত, চলো আমরা বিয়ে করি। কিন্তু..!’
‘কিন্তু কি?’
‘কিন্তুটা বুঝতে পারছেন না?’
কণ্ঠে কপট রাগ তুলে বৃষ্টি বলল,
‘আপনি কি সবসময় সবকিছু বুঝতে পারেন? না, বোঝার চেষ্টা কখনো করেছেন?’
বৃষ্টির কথায় বিচলিত বোধ করল রাতুল। ও যেন আজ ঘোরের মধ্যে পড়েছে। বৃষ্টি কী বলছে? রাতুলের বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতরের কাঁপুনিটা বাড়ছে। রাতুল নরোম গলায় বলল,
‘আপনি ভুল করে আমাকে ভালোবেসে ফেলেননি তো!’
কথাটা যেন গুমোট দুপুরে উদাসী পুকুরে ঢিল ছোড়ার মত। ঢিলটা পড়লো এবং মৃদু ঢেউ উঠল। বৃষ্টি ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
‘ভালোবাসলেই কী! আপনি কী আর ওসবের খবর রাখেন?’
বৃষ্টির কথায় রাতুল কী বলবে? ও একটু চুপ থেকে বলল,
‘ভুল সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে তা শুধরে নেয়া যায়, ভুল মানুষকে ভালোবাসলে তা কিন্তু শুধরে নেয়া যায় না। নীলকণ্ঠের বিষ হয়ে যায়। জানেন তো?’
বৃষ্টি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ওকে অদ্ভূত সুন্দর লাগছে। রাতুল মুগ্ধচোখে তাকিয়ে রইল বৃষ্টির দিকে। টয়োটা এলিয়ন গাড়িটি বাতাস কেটে ছুটে চলছে হাইওয়েতে। রাতুলের মনটাও যেন এরচেয়েও বেশি গতিতে কোথাও ছুটে যাচ্ছে। নিজের মনকে টেনে ধরে নিজের কাছে রাখতে পারছে না। এমন কখনও হয়নি ওর। খুলনায় যাওয়াটা ওর ঠিক হচ্ছে কিনা, ও ঠিক বুঝতে পারছে না। বৃষ্টির হাসির থামার পর রাতুল বলল,
‘এখন বলুন তো, আমি খুলনায় কেন যাবো, কাদের বাড়ি যাবো?’
বৃষ্টি বলল,
‘ভেরি সিম্পল। আপনি আমাদের বাড়ি যাবেন। আমি আপনাকে আমার বাবা-মা’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলবো, ইনি হচ্ছেন মিঃ রাতুল। বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশরাদ। তার সামনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভুল সুরে গাওয়া যায় না। রাকিব ভাইয়া আমার বর হিসাবে তাকে পছন্দ করেছেন। এখন তিনি যদি রাজী হন, বিয়ের আয়োজন করো। আর যদি তিনি রাজী না হন, তাহলে যে পাত্র তোমরা পছন্দ করেছো, তার সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করো। ব্যস!’
রাতুলের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ। ও কী বলবে? বৃষ্টিকে উপেক্ষা করার শক্তি কি ওর আছে? এই প্রশ্নটাই ওর মনে পেখম ছড়িয়ে যাচ্ছে। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি কেউ কখনও পড়েনি, এটা রাতুল জোর দিয়ে বলতে পারে। রাতুল কিছু বলতে পারলো না। ও চিন্তা করতে লাগল গত চার বছর বৃষ্টি কী করেছে। বৃষ্টি যদি রাতুলের প্রতি অনুরক্ত হবে, তবে ও কেন ওর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। রাকিবও বৃষ্টি সম্পর্কে ওকে কিছু বলেনি। আজ চার বছর পর আচমকা বৃষ্টি ওকে এলেমেলো করে দিল। এটা কি সহজভাবে মেনে নেয়া যায়? ও কি বৃষ্টিকে ফিরিয়ে দেবে? পাটুরিয়াঘাট থেকে ও কি বাস ধরে ঢাকায় ফিরে আসবে? প্রশ্নগুলো ওর চেতনায় কালোমেঘের মত জমতে লাগল। এক সময় ওর খেয়াল হল বৃষ্টি নিশ্চুপ। রাতুল তাকাল ওর দিকে। ও দেখল গাড়ির জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বৃষ্টি কাঁদছে। হঠাৎ করে ও কেন কাঁদছে, কে জানে! রাতুল সিদ্ধান্ত নিল ও বৃষ্টির সঙ্গে খুলনায় যাবে এবং বৃষ্টির বাবা-মা’র কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। বৃষ্টির চোখের জল অনেক অর্থপূর্ণ। একে উপেক্ষা করা যায় না। রাতুল একাকীত্বের রোদে পোড়া খড়খড়ে কাঠ হয়েছিল। এই একাকীত্বে বৃষ্টি যেন লাবণ্য ভেজা মেঘ।