আকাশ আয়না

আকাশ আয়না

 Author: দর্পণ কবীর  Category: কবিতা  Publisher: দর্পন মুদ্রণ More Details
 Description:

১.
আকাশ আয়না

তোমার ঘরের দেয়ালে আকাশ আয়না, বারান্দায়
মেঘের ঝাউবন দোল খায়, রোদ-জোস্নার কাব্যালাপ
তো আছেই! পোষা ময়না সকাল হলেই ‘সুপ্রভাত’ বলে
তোমাকে। সুসজ্জিত ড্রইংরুম, বিত্তের জৌলুস, বৈভব, সুখের খুনসুটি..
তোমার শুভ্র-কোমল পায়ের কাছে লুটোপুটি! বিশাল পালঙ্কে তুমি
যেভাবে সমর্পিত হও, চৈত্রের ঝরাপাতার মর্মর ধ্বণি প্রতিধ্বিণিত
হয় অকারণ! তারপরও তুমি সুরম্য অট্টালিকায় শোভিত এক সম্রাজ্ঞী!

মন খারাপ হলে তুমি চলে যাও দার্জিলিং, সিডনী, প্যারিস, নিউইয়র্ক বা
যে কোনো আলো জ্বলমলে শহরে। আটলান্টিক, প্রশান্ত বা তাসমান সমুদ্রে
পা ভেজালেও বুড়িগঙ্গার দূষিত জল তোমাকে ছোঁয়নি অনেকদিন হলো।
কোন এক ভবঘুরে কবি কবে তোমাকে ভালোবেসেছিলো, এতে
পৃথিবীর কী যায় আসে বলো? তোমার পায়ে পায়ে এতো বন্দনা, অর্ঘ্য।
নির্ঘাত বলে দিতে পারি তোমার মুঠোবন্দি হয়ে আছো স্বর্গ!

আকাশ আয়নায় মুখ দেখো রোজ। তারপরও
কেনো করো হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসের খোঁজ? কে কখন্ কী লিখলো,
সব হারিয়ে কী শিখলো-এ নিয়ে কেনো তোমার গোপন কৌতুহল?
আবেগের রঙ এভাবে ছড়ালে, গড়াবে কোথায় জানো, কোথাকার জল!
পরাজয় জেনে, জীবনের সব লেনদেন মেনে-নিঃস্ব কবি
নিয়েছে তার পথ চিনে। সে কি পারতো তোমায় মুঠো মুঠো সুখ কিনে
দিতে? কেনো মধ্যরাতে একাকী ভাসো লবণাক্ত জলপ্রপাতে?

২.
অন্ধকারের আলো

অন্ধকারেই তোমাকে চেয়েছিলাম। করোজ্জ্বল আলোয়
কেনো এলো? ভেবেছিলাম, তোমাকে ভেঙে ভেঙে
তুলে নেবো আঁধারের মৌলিক রঙ! আমার জমকালো ভাবনা,
বেহিসাবী স্বপ্নগুলো গোপন করে রেখে দেব তোমার নিজস্ব অন্ধকারে।
যদি আঁধার হয়েই দাঁড়াতে বড্ড শিল্পময় হতো তোমার উপস্থিতি!
আমার যাবতীয় অসম্পূর্ণতা নান্দনিক মাত্রা খুঁজে পেতো
তোমার অস্থিত্বের মুখোমুখি, হতো অদৃশ্য নির্মাণ।

হ্যাঁ, অন্ধকারেই তোমাকে চাই নিকষ অন্ধকারের মতো। অথচ
তুমি এসেছো সুতীব্র আলো হয়ে, বাহারী বর্ণছটায়! এই
অহংকারী আলো মুহুর্তেই বিঁধে গেছে চোখের মণিতে। আমি
ধাঁধানো আলোয় দেখতে চাই না পৃথিবীর দুর্লভ সৌন্দর্য বা সুন্দরের
সুষমা। শুধু দেখতে চাই, আঁধারের কতটা রূপ পেখম ছড়ায়
জমাট অন্ধকারে, ঘন আঁধারে কতটা তুমিও হতে পারে বন্য-লাবন্যময়।

যারা আলোর পূজারী তারা বাধুক জীবনের গান, যাপনের স্বপ্নাতুর
স্বরলিপি। মুগ্ধচোখে দেখুক তাজমহলের অমরকীর্তি বা পৃথিবীর আলোকিত
সব উপাদান। আমি সাধারণ একমুঠো আঁধার নিংড়ে খুঁজে নিতে চাই
আলোর স্বরূপ। তাই অনুরোধ, আঁধারে এসো-আঁধার হয়েই। তবেই দেবো
আটপৌড়ে কথামালা, সাদামাটা প্রেম আর প্রণয়ের সাতকাহন।

৩.
প্রিয় মুখ
দু’হাতের অঞ্জলিতে প্রিয়মুখ যেন
পূর্ণিমার লাবন্যময় চাঁদ। মুখের মিছিলে দেখি
তবু জীবনের ফাঁদ! তুমি সেই মুখ, কাছে
না এলে অভিমান সূর্যস্নান করে নায়াগ্রার জলে।
আবেগের থোকা থোকা রঙে থাকি উন্মুখ।

মুখ আছে, মুখোশও আছে ঢের, প্রবঞ্চিত জানে
বঞ্চনার কী জ্বালা-কতটুকু জের! পুড়ে
খাঁক হোক তাবৎ মায়াবী মুখোশ, প্রতারক হৃদয়
ফিরে পাক হুঁশ। জানো কি কোথায়
জীবনের জয়, আপেক্ষিক নয় সুখ? যদি থাকে
একান্ত এক সমর্পিত প্রিয়মুখ!

৪.
তুমি এবং অন্যজীবন

বেশতো ছিলাম একজীবন নিয়ে। আকাশ কতটা নীল, সমুদ্র
কতটা গভীর বা দিগন্ত কতটা দূরে, তার খবর
রাখার দায় ছিল না। সুর্যোদয় কিংবা সুর্যাস্তের মধ্যে সৃষ্টি ও সমর্পণের
নান্দনিক মাত্রা আছে, কী নেই, তা নিয়ে ছিলনা কৌতুহল।

আর সকলের মতো একজীবনের সাতকাহনে বেশতো ছিলাম
নিরুত্তাপ, নির্মোহ-নিমগ্ন, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণে। আলো এবং
আধাঁরের মধ্যে সহজাত পার্থক্যের বাইরে আমি কখনো খুঁজিনি
কার রয়েছে কতটা মৌলিক রঙ। পৃথিবীর তাবৎ মানুষ যখন যুদ্ধের
দামামায় শংকিত, অরণ্য জুড়ে বির্বণ গাছ, পাখিদের শব!
যখন নির্বাসিত হয়ে গেছে কবিতা ও বৃষ্টিপাত, ঠিক তখুনি তুমি এলে!
আমাকে শোনালে হিরন্ময় জীবনের স্বরলিপি।

আমি তোমাকে ছুঁয়ে এই প্রথম পবিত্র হয়ে
পা বাড়ালাম আরেক জীবনের পথে। পেছনে পড়ে রইলো
সব অপবাদ, ভালোবাসার নিরেট পাপ, পেছনের সৈকতে।

৫.
কথোপকথন-১
ঃ জীবনের ব্যপ্তিতে ডানা ঝাপটাচ্ছে লখিন্দর স্বপ্ন! আকাঙ্খার
পিঠ থেকে তুলে নাও প্রবঞ্চনার ছোরা!
ঃ এ তোমার চিত্ত বিভ্রম!
ঃ চিত্ত বিভ্রম নয়, আমি চিত্তের বিলাসিতায় মগ্ন। দীঘল ঘুম ভেঙে
দেখছি, শ্বেত পাথরের নিঃসঙ্গ সুরম্য প্রাসাদ থেকে কেটে যাচ্ছে
হাজার বছরের অন্ধকার!
ঃ কুহেলিকায় বিপন্ন তোমার স্বপ্নগ্রস্থ যাপন। দু’চোখে
অন্ধকারের ছোবল নিয়ে মণির আস্ফালন কেন?
ঃ অন্ধকারই তো আলোর স্বরূপ! আমার ধ্রুপদী কল্পনাগুলো
জীবনের রঙ মেখে ছড়িয়েছিলাম তোমার প্রেমের অর্ঘ্য।ে নয়?
ঃ ও তো সস্তা আবেগের নষ্ট রঙ!
ঃ অথচ তুমিই ভিনদেশী লোভাতুর বণিকের মতো
দলিত করেছো আমার বিশ্বাসের বেসাতি!
ঃ ভুল! ভুলের ভ্রান্তি বিলাসে অবসন্ন তুমি।
অভিযোগ ফেলে অনুরাগে মুখ তোল!
ঃ তবে তোমার মায়াবী মুখোশ খুলো!

৬.
ইচ্ছে, আকাশ এবং…

ইচ্ছে করে মাথার ওপর নেমে আসা
আকাশটাকে টেনে, ছিঁড়ে, ঝুলিয়ে রাখি
সদর দরোজায়। নক্ষত্রগুলো ঝনঝন করে
গড়িয়ে পড়ুক মেঝেতে। আমার সবুজাভ দুঃখের
লাবণ্য দেখে চাঁদ লুকিয়ে রাখুক শাদা জোছনা!
ছেঁড়া আকাশ ঝেড়ে খুঁজে নিতে চাই
আমার হারানো দীর্ঘশ্বাস।

সমুদ্রের আয়নায় মুখ দেখে দেখে
আকাশটা অহংকারী হয়ে গেছে!
আমার দু’চোখে অন্ধকার চুমো খেলেই উপহাসের
অট্টহাসিতে মাথার ওপর আকাশ
ফেটে পড়ে, মৃত্যু পথযাত্রীর ওপর
শকুন যে রকম! আকাশের অহংকার
দু’পায়ে দলে সব ব্যর্থতার ক্ষোভ ঝাড়তে চাই।

আমার না বলা কথাগুলোয় লেগে আছে
আকাশের রঙ, পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে পারিজাত স্বপ্ন।
আকাশ তোমাকে সূর্যস্নান করিয়ে
আমাকে বার বার নিয়ে গেছে মেঘের মিছিলে!
ইচ্ছে করে তোমার সমুদ্রে মুখ দেখে
নিজেই আকাশ হয়ে যাই।

৭.
অবেলার চাপা দহন

অন্ধকার ভেঙে ভেঙে সঞ্চিত করেছি
যেটুকু আলো ও আলোর ভেতরের
আলোড়ণ, তার সবটুকুই তোমাকে
দিলাম, অর্ঘ্য। তুমি বললে,
‘অন্ধকারের কুহেলিকা!’
সীমান্তে জমে থাকা কুয়াশার রঙে
এঁকে বিরহের বিনম্র মুখ, তুলে
দিলাম দূরাগত স্বপ্নের লাগাম।
তুমি বললে, ‘ভ্রান্তি বিলাস!’

পথ থেকে পথে, পাথেয় হয়েছে যা
প্রেম ও পবিত্রতা আগলে
তোমার জন্যে সাজালাম
অপার্থিব আয়োজন। তুমি বললে,
‘অবেলার চাপা দহন!’

৮.
কথোপকথন-২
ঃ কী চাও আমার কাছে?
ঃ জীবনের শুদ্ধতা, স্বপ্নের নিবির্মাণ, প্রায়শ্চিত্তের মন্ত্রণা, পবিত্রতার রঙ…।
ঃ আমার জানা নেই এর স্বরলিপি। বরং ভুল আর বিভ্রান্তির
মায়াজালে নিজেই জড়িয়ে আছি। জীবনের ফিকে রঙে আঁকছি মৃত্যুর অবয়ব।
ঃ তুমি ইচ্ছে করেই তোমার চাপাশে অন্ধকারের পেখম ছড়িয়ে রাখো। কবির ধ্রুপদী
কল্পনার মতো রহস্যময়। সহজপাঠে তোমাকে বুঝতে চাই সীমাবদ্ধতা জ্ঞানে।
ঃ আমাকে পড়ে নাও মানবিক প্রেমে। আমার নিঃসঙ্গ নির্বাসন ভেঙে বুকে
পাতো কান। শুনতে পাবে অভিশপ্ত রাতের বিষণ্ন বেহাগ।
ঃ আবারো দুঃখের বিলাসিতা!
ঃ না, এ আমার পোড় খাওয়া বাস্তবতার পরাবাস্তুব অবস্থান।
ঃ তুমি যাপনের যাবতীয় উৎসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছো নির্মোহ
অভিমানে। শুনতে পাচ্ছো না অপার্থিব অবগাহন?
ঃ আমার চোখের কোটরে পাথরের চাঁই রেখে ফেরারী হয়েছে
সবুজাভ বসন্ত! আমার কাছে চাইছো কেন ফুল ফুটানো গান?
ঃ বিমূর্ত প্রেমে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অবেলার চাপা দহন। এ কথা আমি
জানি, আর জানে তোমার অবুঝ মন।

৯.
বিনীত প্রার্থনা
সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ো না।
সূর্যোদয়ের গানে ভেঙেছে আমার
দীঘল ঘুম। এই দেখো, বুকের পাঁজরে
খিলখিলিয়ে হাসছে অবরুদ্ধ বেদনা,
ফুটছে স্বপ্নের পারিজাত। পাখিরা
গলা সাধছে বনে, নদীরা
ফিরে পেয়েছে যৌবন। কবিতার
মিছিলে সময় ছিঁড়েছে দুঃসময়ের শেকল।
আমার আঙিনায় সব সুন্দর মেতেছে
ধ্রুপদী গল্পে। ভোরের ডালিতে
খুঁজো না দীর্ঘশ্বাস, স্মৃতির সিম্পনি…।
প্রাণের আলোতে আজ প্রাণের ঝিলিমিলি।

কোনো দাবি নেই, দফা নেই
ভালোবাসি এবং বাসবো বলেই
আমি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি।
সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ো না।

১০.
মায়াবী আগুন
আজ মুখে কোন কথাই ফুটছে না, অথচ বুকের ভেতর
কেমন উথাল-পাতাল ঢেউ, অকারণে মুগ্ধ হবার
মদিরতা, অনুচ্চারিত কাব্যের অনুরণন!
না বলা কথার মিছিল মিসিসিপি নদীর চেয়ে ঢের দীর্ঘ
হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তোমার দিকে, অপ্রতিরোধ্য ফল্গুধারায়।
আজ দিনের আকাশেও সকল তারার সম্মিলন, সূর্যটা
বড্ড ঝলমলে! আমার ফ্যাকাশে দুঃখগুলো পেঁজা মেঘ হয়ে
চলে গেছে দার্জিলিংয়ে-নেমতন্ন খেতে। দীর্ঘশ্বাসকে হাওয়াই জাহাজ
ভেবে পরীরা তাতে চেপে ঘুরছে মহাশূন্যে-কক্ষপথের অলিতে
গলিতে, সে কী মহাসুখে! আজ স্যাটালাইট টিভিগুলোতেও কেবলি
সুরের ইন্দ্রজাল, কথা-গানের মাদকতা। রাজনীতিবিদ বা যুদ্ধবাজের
মিথ্যাচার বন্ধ করে টিভিগুলো কোরাস কন্ঠে করছে শুধু তোমার বন্দনা।

আজ আমার কোন কথাই ‘কথা’ হচ্ছেনা। কথাগুলো
অনবদ্য কবিতা হয়ে পেখম ছড়িয়ে নিচ্ছে বারবার। বিস্ময়ের
রেশ তাড়িয়ে উদাসীনতার আড়মোড়া ভেঙে
দেখি, রোমান্টিক দ্রোহে দুয়ারে এসেছে ফাগুন।
বসন্ত প্রদ্বীপে জ্বলে ওঠেছে ভালোবাসার মায়াবী আগুন!

১১.
এপিঠ ওপিঠ
তুমি যখন আলোর কাচ ভেঙে
খুঁজছিলে অন্ধকারের দ্যুতি, আমি তখন
নদীর বুকে কান পেতে শুনছিলাম
গুপ্তধনের নিঃসঙ্গ আহাজারি। তোমার কলহাস্যে
ভাঙলো পাখির উদাসীনতা, আমি
পা ভিজিয়ে নিলাম লাবণ্যহীন বেদনার জলে।
তুমি দু’হাতের চুড়ি ভেঙে সময়কে
চমকে দিলে, আমি আকাশকে বললাম,
‘রঙধনুর ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য নিয়ে
অহংকার করার কিছু নেই’। তুমি
হাওয়ায় আঁচল উড়িয়ে ছায়া দিলে
কবিতার নগরীতে, আমি পাহাড়ের গোপন
কান্না শুনে গলা সেধে নিলাম
বিলম্বিত রাগে। তুমি যখন স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে
পেরুচ্ছিলে পথের পর পথ, আমি
পথের ধুলো থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম
বলা, না বলা কথা, বিনম্র স্মৃতি।
তোমার খোঁপায় বসলো যেই
ভোরের প্রজাপতি, আমার চোখে
জমে গেলো অস্তাচলের রঙ।

১২.
ছেঁড়াপংক্তি

রাশি রাশি ফুটুক ফুল
বনে লাগুক হুলস্থূল!
আমার তাতে কী?
মনের আগুন দিয়ে শুধু
তোমায় পোড়াচ্ছি।
বুকের ভেতর পাহাড় ছিলো
এখন ভেঙে পাথর
পাথর গলে নদী হলো
তোমার প্রেমে কাতর।
কথার পাথর জমে।
জমে তা জমাট বাধে
আগুন কি আর কমে?
হঠাৎ করে যদি
আগুন তোমায় দেয় পুড়িয়ে,
পোড়ায মনের নদী।
সাধ্য বলো কার
ঠেকায় তখন পাথর ও নদীর একাকার!
আমায় নিয়ে তোমার ভেতর
অন্যরকম বোধ
তোমার উপর আমি নেবো
এক জীবনের শোধ!
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ুক
গাছেরা কাঁপুক ঝড়ে
ঝড়ের কাঁপন উঠুক না হয়
তোমার মনের ঘরে।
এ জীবনের যে পথ ছিলো
স্বপ্নালোকে আঁকা
সে পথ আজো তেমনি আছে
গোপন প্রেমে ঢাকা।

১৩.
শিরোনামহীন

আকাশমুখি খোলা চোখ, অন্তর্দৃষ্টিতে দ্যুতিময়
তোমার মুখ। অযাচিত বিরহে বসন্ত পুড়ে গেলে আমার
দীর্ঘশ্বাস সমুদ্র জলে তোলে ঢেউ, শুধু তুমি
জানো, জানে না আর কেউ।

আমার না বলা কথা পেখম ছড়িয়ে হয়
অরণ্যের নির্জনতা, অভিমান ঝরাপাতা। কথা রঙে
আবেগ, জমে থাকা মেঘ, বৃষ্টি হতে উন্মুখ। বাউল খেঁজে না
সুখ, বৈভব কিবা বিত্ত। শিল্পের চেয়ে শিল্পময় বিলাসী চিত্ত!

অঝোর বৃষ্টি যখন নামে, কবিতার খামে
কে যেন কীসের পিদিম জ্বালায়, বর্ণিল শব্দ মালায়,
তোমাকে পাই সমর্পণের দামে। তোমার গন্তব্যে
আমি সোজা পথে, দৃষ্টি নেই ডানে বা বামে।

হিসাব নেই লোকসান কী, হলো কি লভ্য। ক্রুশবিদ্ধ
হয়ে পড়ে থাক ভবিতব্য। হারাতে হারাতে মুখ থুবড়ে পড়ে
আর যখন পারিনা দাঁড়াতে, তখনও তোমার দিকে হাত বাড়াই।
কালস্রোতে আমি ভাসমান খরকূটো সময়ের বাঁকে উঠে
দাঁড়াই, রোমান্টিক দ্রোহে নিয়তির ছায়া তাড়াই।

১৪.
অপার্থিব ঘোর

একটা জলপাই রঙ ছায়া প্রতিনিয়ত
আমাকে করে তাড়া। অচল পয়সার মত হারিয়ে
যাওয়া একটা স্বপ্ন হঠাৎ ফিরে এসে আজকাল
ভীষণ দিশেহারা, আমাকে সপ্তলোকে নিয়ে জলপরীদের
নাচ দেখাবে বলে। যে নক্ষত্রগুলো কক্ষপথে অভিমানী
মেঘের মত হারিয়ে গেছে অঝোর বৃষ্টির নামকরণে,
ঐ নক্ষত্রগুলো আমার দু’পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসে
থাকে পোষা বিড়াল হয়ে, আশ্চার্য বিহবলতায়! ওরা
জানে, আমার ভেতরের অন্তর্যামী কতটা গেছে ক্ষয়ে! কতটা
ক্ষরণ এখনো যাচ্ছে বয়ে! আমি নায়াগ্রার জলপ্রপাতের
কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাসকে রঙধনু বানিয়ে, সেই কবেই ঝুলিয়ে
দিয়েছি আকাশ-ক্যানভাসে, সে কথা ওরা জানে না।
ওরা হতে চায় আমার কষ্টের দীর্ঘশ্বাস! আমি
বিনম্র লাজুকতায় ভাষামূক, অপার্থিব আয়োজনে!

একটি অদৃশ্য মুখ, দৃশ্যমান হতে চেয়ে
বারবার ফিরে আসে কল্পনার ককপিঠে। আমাকে ঈশ্বর
বানিয়ে সে হতে চায় কামনার মানসী! ঈশ্বর কি নিছক মূর্তি,
নিরাকার বা ব¯ত্তুবাদ? আমি জানি, ঈশ্বর হলেও
তোমার সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করার শক্তি আামার নেই।
ছায়া, স্বপ্ন, নক্ষত্র, মেঘ….যে কোন অস্থিত্বে তুমি
থাকো, তোমার মুখোমুখি আমি হারাই খেই।
জানি, তোমার পথ অন্যপথে, আমিও অনেক দূরে,তবু
কেন পথ খুঁজে ফিরি, তোমাকে ছোঁয়ার গোপন
স্পর্ধায়, নির্লজ্জভাবে, নির্দ্বিধায়? জানি, এই না বলা কথা
সূর্যাস্তের মত ঠিকই যাবে ডুবে, ফিরবে না কাঁচা ভোরে। আমি
সাত জন্মে ও থাকবো তোমাকে দেখার ঘোরে।

১৫.
জীবনের পরিহাস

একটা ঘাসফড়িং দুপুর এসে বললো,
‘তোমার পা থেকে হারিয়ে যাওয়া এক নূপুর কাঁদছে
হিজল ছায়ায়।’ কী এক সম্মোহনে, আমি ছুটলাম
স্বপ্নাবিষ্ট মায়ায়। কতবার হিজল গাছে ওঠলাম-নামলাম,
কতটা পথ এগুলাম, কতটা যে থামলাম! হিজল
ছায়ায় ও ছায়াপাথে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম তোমার
নূপুর। গ্রীষ্মের দাবদাহে পুড়ে খাঁক দুপুর! তোমার
দু’চোখ জল টলমল পদ্মপুকুর!

নক্ষত্র নিহারিকা ঝরে যেতে যেতে রাতের কার্নিশে
লিখলো, ‘তোমার স্বপ্নের স্বরলিপি ছন্দ হারিয়ে
হয়েছে রাত জাগানিয়া গান।’ যে গানে বিরহের মূর্ছনা
কেবল, গহীন অরণ্যের নির্জনতার মতো একাকীত্ব
বিধুর। কে জানে, কোথায় ফুরিয়েছে জীবনের কলতান!
পথের পর পথে, দ্বিগি¦দিক ছুটলাম মনোরথে, আকাশ
দিগন্তে নেমে পাতে ফাঁদ! স্বপ্নবিহিন তোমার
মুঠোতে জমে রইলো স্বপ্ন হারানোর অবসাদ।

আমি আবেগের মদিরতায়, জীবনের শিল্পময়তায়
তোমাকে খুঁজি স্বপ্নের অনুরণনে বর্তমানকে বদলে দেয়ার
জন্য যুজি। তোমাকে খুশি করতে হই ভোরের দুর্বাঘাস,
শিশিরের উচ্ছ্বাস, বহতা নদী, পাখির গুঞ্জন..কত কি!
সব কিছু হয় স্বপ্নের মতো কি? তুমি আমার কাছে
চাও নূপুর, স্বপ্নের স্বরলিপি, আছে আরও অভিলাস! কী করে
বলি, আমি অন্য জীবনের বরপুত্র, এই জীবনের পরিহাস!

১৬.
বিপরীত

আমি হিমাঙ্কের নিচে জমাট তুষার, তুমি
সুর্যের মত গনগনে আগ্নিবালিকা। আমি কক্ষপথের নির্দিষ্ট
বৃত্ত, তুমি আলোকবর্ষ দূরের সীমারেখাহীন অসীম
নীলাভ। তুমি ঘাস ফড়িংয়ের দুরন্ত লম্ফ-ঝম্ফ, আমি
অলস দুপুরের গুমোট মৌনতা।

আমি অরণ্যের ঝরাপাতা-বিবর্ণের বিলাপ, তুমি
সবুজের সমারোহ-দূর্বাঘাসে শিশির মুক্তো। আমি
একাকীত্ব, অকারণ বিষণ্নতা, অবহেলা, নিঃসঙ্গ কেউ।
তুমি তুমুল কোলাহল, উৎসব মুখরতা, উচ্ছ্বাস-প্রাপ্তি,
হামলে পড়া আনন্দের ঢেউ!

তুমি কখনও সমুদ্র, কখনও আকাশ, নক্ষত্র, রঙধনু,
গন্তব্য জানা পথ..! আমি কুয়াশা, মলিন হতাশা,
দিকভ্রান্ত পথিক, অচল পয়সার মত অপাংক্তেয়, শ্লথ..।
তুমি আলোর বিচ্ছুরণ, আমি নিকষ অন্ধকার। আমি
উতলা দমকা হাওয়া হলে তুমি হও পাষাণ
প্রাসাদের বন্ধ দ্বার। তুমি জীবনের ক্যানভাসে স্বপ্নের
রঙে আঁকো জীবনের বিমূর্ত জলছবি। আমি জীবন
বিমুখ ভবঘুরে, ব্যর্থ কবি। বিত্ত-বৈভবে তুমি
দীপ্তিময়, আমি কর্দপহীন, নিষ্প্রভ, অনাহুত পরাজয়!

১৭.
লাবন্যহীন এক পাষাণ পাথর

এক কাক জ্যোৎস্নার রাতে
তুমি সম্রাজ্ঞীর কণ্ঠে আমার কাছে চাইলে অর্ঘ্য।
অনেক অবহেলার পর আমার প্রতি এটাই
ছিল তোমার প্রথম প্রশ্রয়। আমি নিজের সবটুকু দীনতা
দু’ পায়ে মাড়িয়ে ছুটলাম, দিগি¦দিক!

তোমাকে এনে দিলাম মেঘের পোড়া গন্ধ,আকাশ আয়না,
সমুদ্রের বিশালতা, অরণ্যের রহস্য..। এমন কী,
নাগরিক সভ্যতার জৌলুস! আরো দিলাম,
সুর্যোদয়ের গান, ধর্মপ্রাণের প্রার্থনা, কবির শব্দ বিলাস,
পাখিদের বিবাদহীন জীবনের কথামালা।

তোমাকে মুগ্ধ করে দিতে যুদ্ধবাজদের বসিয়ে
দিলাম কাব্য জলসায়, সৈনিকরা মরণাস্ত্র
ফেলে ভর্তি হলো শিশুদের স্কুলে। নিজেকে তোমার
যোগ্য করে নিতে পৃথিবীর তাবৎ মানুষের
দুঃখগুলোবানিয়ে দিলাম আতশবাজির ব্যাঞ্জনা!

তোমার দু’ পায়ের সামনে স্বপ্নরেণু
ছড়াতে ছড়াতে আমি স্পর্শ করলাম তোমাকে।
এতেই কঁকিয়ে উঠলে তুমি! মমি হতে হতে
তুমি বললে, ‘এ সবই ভ্রান্তি বিলাস!’ সে থেকেই
আমি হলাম লাবন্যহীন এক পাষাণ পাথর।

১৮.
লুকোচুরি

আমি গন্তব্যে পৌঁছুলেই তুমি
দিগন্ত হও নিমিষে। ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ি যেই
তুমি আকাশমুখী পাহাড়, দীপ্তিময় হয়ে
ওঠে নতজানু না হবার তোমার সহজাত অহংকার।

নদী হয়ে ভাবি, তোমার দু’ পা
একদিন নামবে আমার লাবণ্যজলে, ঘুচবে
একাকীত্বের অভিশাপ। মেঘের মিছিলে মিলিয়ে যাও
তুমি, নির্মোহ অভিমানে। নদীও পোড়ে বিরহের দাবানলে।

শেষ চেষ্টায় হই কাব্য বিলাসী কবি
তুমি কলহাস্যে হও নক্ষত্র-নিহারীকা, তবু
স্পর্শ করো আমার কল্পনা সবই।

১৯.
কথপোথন-৩

ঃ তুমি হাত বাড়ালেই আকাশ ছুঁতো পারো! কিন্তু আমি
জানি, তুমি ছুঁয়ো দেখোনি। তোমার কল্পনা ছাপিয়ে
যায় জীবনের সব অস্পূর্ণতাকে। আর তোমার আকাশ ছোঁয়ার
সাহস আর ধ্রুপদী কল্পনা আমাকে ছুঁয়ে যায়।

ঃ তুমি আছো বলেই আমার কল্পনার আকাশ সীমাহীন
দিগন্ত ছাড়িয়ে আরো দূর, বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। তোমার
ভালোবাসা আমার কল্পনার রঙ, তোমার সান্নিধ্য
আমাকে সাহসী করে তোলে।

ঃ তাই বলে তোমার সাহসকে সব সময় প্রশয় দেয়া যায় না।

ঃ কেনো?

ঃ প্রায়ই তোমার ঐ সাহস দুঃসাহসে পরিণত হয়।
আমার উপর ঝড় বয়ে যায় তখন।

ঃ হা-হা-হা। হাসালে। মাঝেমাঝে আমার মনে
হয় তুমি শান্ত সৈকত, আর আমি উত্তাল
সমুদ্র। তোমার নিবিড় সান্নিধ্যে আমি ঢেউ হয়ে
যাই। আছড়ে পড়ি তোমার ওপর।

ঃ আবারো কথায় মায়াজাল বুনছো!

ঃ মানে?

ঃ মানে খুব সহজ। সমুদ্রের ঢেউ নয়, জলোচ্ছ্বাস হয়ে
তুমি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাও। থামাতে চায়না
যেন তোমার আগ্রাসন। নয়?

ঃ অভিযোগ করছো? আমার আগ্রাসন কি তোমাকে
আপ্লূত করেনা কখনো? সত্যি করে বলো তো?

ঃ তোমাকে তা বলা যাবে না। তবে মিনতি করছি,
সামলে রাখো তোমার আবেগের উনুন। নইলে
হয়তো একদিন পুড়ে খাঁক হয়ে যাবো আমি।

ঃ তোমাকে পুড়িয়ে সেদিন বলে দেবো-কেন
নিখাঁদ বিরহে মরে যায় নদী। পাহাড়ের
একাকীত্ব কেন শিল্পীত সুন্দর। দমকায় হাওয়ায়
কেন কাব্যময় হয়ে ওঠে ঝাঁঝালো দুপুর।
হাতছানি দিয়ে ডাকে কেন ধূসর দিগন্ত।

ঃ আগ্রাসী পুরুষ যখন কথার মায়াজাল বুনে, তখন
খরস্রোতা নদী কী করে সামলাবে বলো
চলমান জলধারা? আমাকে তুমি এভাবেই টেনে
নিয়ে যাও ভালোবাসার সম্মোহনে।

ঃ ভালোবাসার সম্মোহনের অপর নাম ভালোবাসার সমর্পণ।
এখানে ‘ভালোবাসা’ দায় হয়ে যায়।

ঃ ভালোবাসার দায় বলো কিংবা অসহায় সমর্পণ বলো
আমার কাছে এর গুরুত্ব কম নয়। তোমার রাগ
কিংবা মায়া, আবেগ কিংবা অভিযোগ, হাসি
কিংবা কান্না-যতরকম প্রকাশ তোমার, সবটুকুই
আমার কাছে একেক রকম ভালোবাসা। এই
ভালোবাসা আমাকে দিয়েছে কল্পনার অসীম শক্তি।
তাই, আমি আকাশ ছোঁয়ার সাহস রাখি।

২০.
পাখি

বলেছিলে পাখি হবে, দিলাম বর। এরপর
চাইলে আকাশের পুরো চৌহদ্দি। তাও তোমার হলো!
কী দিইনি বলো? পাখি হয়ে উড়ে গেলে
দূরে-বহুদূরে সীমানা ছাড়িয়ে। দেখেছো কি তুমি
অরণ্য তোমায় ডেকেছে কত দু’হাত বাড়িয়ে? উড়ে যাও
তুমি, অস্তরাগে ডুবে বেলাভূমি, ফের
সূর্যালোকে জাগে অনাবিল ভোর, শস্যখেত, জনপদ..!
পুনারাবৃত্তি হয় জীবনের লেনদেন ঢের। স্মৃতিচিহ্ন হয়ে পড়ে রইলো
যে পালক অরণ্যের বুকে, হাহাকার-দীর্ঘশ্বাস রাখলো শুধু টুকে।
জোছনা প্লাবনে, বৃষ্টির টানা বর্ষণে বা দাবদাহে
খুব, গোপন কষ্ট ও প্রেম সেই কবে থেকে ক্রুশবিদ্ধ, তবু চুপ!

আকাশের ফাঁদে, কত পাখি কাঁদে! গন্তব্য খুঁজে
পায় কি পাখি? নিয়তির দেয়ালে মাথা
ঠুকে হা-পিত্তেস কেবল, ঈশ্বর ডাকাডাকি! অরণ্যের
নিঃসঙ্গতা বা স্বপ্ন মুঠো ভরে পড়ে থাকার
অপরাগতা, সব মিলিয়ে যায় আকাশে। দীর্ঘশ্বাসও হতে চায়
মেঘদল, অন্তর্গত কষ্ট ফ্যাকাসে। যতদূর উড়ে যাও,
আকাশের সীমানা পেরুবে আর কত?
জানি, অবসন্ন পাখি অরণ্যে ফিরবে, নীড়ে ফেরার মত।

২১.
চুম্বন প্রার্থনা

তুমি কানের কাছে মুখ এনে বললে,
‘কী চাও বলো? আমি দিতে পারি চিতার
অগ্নি-গঙ্গার জলও। বৃষ্টির মিছিল চাও, তেপান্তরের গাও!
নীলকণ্ঠের বিষ বা শুভাশীষ, এই নাও! তোমার
সামনে রেখেছি নদীর যৌবন, পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা,
দীর্ঘশ্বাসে বুনে রাখা অনুরাগ-আকুলতা। যা খুশি নাও,
আমার অশ্রুজল, তাও! তুমি কি আমাকে আলিঙ্গনে
জড়াতে উন্মুখ, আমার বুকে লুকাতে চাও মুখ?

আজ আমি উজার করে তোমাকে দেব সব। ভোরের
প্রার্থনা দেব, নিশির নৈবদ্য, অরণ্যের বিলাপ, ফুলের সৌরভ..!
আকাশ ওড়না চাও, নক্ষত্রের ঝুনঝুনি? পোষা
বেড়াল-ময়না, মুক্ত বিহঙ্গ টুনটুনি? কবিতার উষ্ণতা
নেবে, গদ্যের ঝাঁঝ? আছে সমপর্ণের অভিলাস,
কামনার লাজ। দিতে পারি অনিন্দ্য অনাবিল আজ!
বলো কী চাও, উদার আমি যা খুশি নাও!

অবহেলার স্তূপ থেকে আমি মুখ তুলে বলি, কী
দিয়ে ভরে দেবে নিঃশ্বের ঝুলি? যে জীবন নির্বাসনের
ফাঁদে, গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে হবে কি শাপমোচন?
ভালবেসে দেবে কি একটি দীঘল চুম্বন!

২২.
আমি

গহীন অন্ধকারে পড়ে থাকা আমি এক জগদ্দল পাথর!
কখন কোথায় কেন পৃথিবী আলোকময়, কোথায়
সৃষ্টি, কোথায় ক্ষয়? বা কে অল্পতেই হাউমাউ করে
কাঁদে, কে সব হারিয়েও নীরবে সয়-এসব কথা রাখিনা
টুকে। কখনো ঈর্ষা করিনি তোমার সুখে! আমি
পথের ’পরে পড়ে থাকা এক বির্বণ পাথর!
বৃষ্টিজলে-বর্ষায় ডুবে, পুড়ে খাঁক খরতাপে। পথিকের
পদতলে পিষ্ট হয়েছি কত, তবু নির্বাক-অবনত,
হইনি বিষণ্ন-কাতর! প্রখর সূর্যালোকে শিশিরের মত
অস্থিত্বহীন আমি, অথচ ভোরের নরোম আলোর
মত স্বপ্নের বিহবলতায় হতে চেয়েছিলাম
তোমার অন্তর্যামি! মিলেছে কেবল অট্টহাসি-উপহাস, আমি
পথের ধূলোয়, সুরম্য প্রাসাদে তোমার বাস। আকাশের
ডাকবাক্সে গোপন দীর্ঘশ্বাস রেখে দেখি সপ্তর্ষি-নিহারিকা, ভরা
পূর্ণিমার রাতে জোছনা মেখেছি যত হয়েছে কুহেলিকা!

তোমার খোঁপায় নক্ষত্রের ফুল! আমি এক নিদারুন
ভুল?দ্বিমত করিনা, ভুল করেই তো ভুল ভালোবাসা! ভুল
ঠিকানায় ফুল রেখে আসা! হিসাবের খাতায় শুন্য-হাবিজাবি!
প্রবঞ্চিত হলেও তুলিনি কোন দাবি। লবণাক্ত জলপ্রপাতে
অন্ধ হয়েছে চোখ, তবু বলেছি, ‘তোমার মঙ্গল হোক!’
তারপরও আমার অন্ধ চোখে রঙধনু রেখে যদি
বলো, ‘আঁকো অমর্ত্যরে জলছবি!’ মিনতি করে বলছি,
আমি শিল্পী নই, অবহেলিত এক দ্যুতিহীন পাথর, ব্যর্থ কবি!

২৩.
কথপোকথন-৪

ঃ মুখ তোল, চেয়ে দেখ, কুয়াশা নিংড়ে এনেছি
দীর্ঘশ্বাসের রঙ, বৃষ্টির পালক ঝেড়ে শিশিরের কান্না, ঝর্ণার
জলপ্রপাত থেকে চলমান ছন্দ। নতুন স্বপ্নে এবার দু’চোখ খোল।
ঃ তুমি কেবলই স্বপ্নের অনুরণন তোল। স্বপ্নের বিপরীতে
কষ্টের যে ধারাপাত, তার খবর কি রাখো?
কষ্ট নিয়ে তুমি স্বপ্ন মুখর থাকো।
ঃ আমি কষ্ট বিলাসী নই। জীবনের পথে যেতে যেতে
কে বলো কষ্ট পায়না? তাই বলে কষ্টকে এতো
ব্যাঞ্জনা কেন দেব? কষ্ট আত্মস্থ করে নতুন স্বপ্নের
মন্ত্রণায় সামনের পথে পা বাড়াবো।
ঃ স্বপ্নের মন্ত্রণা না, ছাই! এ সব কথা শুনলে আমিও
অন্যলোকে হারাই। তবু বলি, স্বপ্ন নিয়ে
আছে তোমার এক ধরনের মোহ। স্বপ্নগ্রস্থ বাতিকও
বলা চলে! আর আমি সদায় ভাসি চোখের জলে।
ঃ যে হিরণ¥য় জীবনের স্বরলিপি খোঁজে, সেই তো
স্বপ্ন বিলাসী হয়। কষ্টের ধারাপাতে
মুষড়ে থাকা জীবনের পরাজয়। নয়?
ঃ আমি ভাবি, তুমি কবি, না মানুষ। উড়াও কেবল কথার
ফানুস! বলতো ভেতরের চাপা কান্না, হৃদয়ের
রক্তক্ষরণ, হঠাৎ বুক ছাপিয়ে বেরিয়ে আসা
দীর্ঘশ্বাস-সব কিছু কি এক লহমায় কোন স্বপ্ন এসে
করতে পারে জয়? এমনও কি হয়?
ঃ স্বপ্নের সঙ্গে প্রেম, প্রেমের সঙ্গে জীবন যখন একবৃন্তে
দাঁড়ায়, দগ্ধ অতীত ফেলে মানুষ সামনের দিকে পা বাড়ায়।
ঃ অতীত সেও তো নিখাঁদ মায়া! দীর্ঘশ্বাসের নিভৃত ছায়া!
তুমি কবি বলেই তোমার স্বপ্ন দেখার শক্তি অফুরাণ।
আমি আঁধারে কান পেতে শুনি সূর্য ওঠার গান।

২৪.
মেঘ-বৃষ্টির কথা

আমি জানিনা মেঘের ভেতরে গুমোট বেদনা
আছে কী নেই, বৃষ্টির জলকণায় কার না বলা কথা,
একাকার। মেঘকে মেঘের মতো দেখি জমে
থাকে, কখনো সাদা, কখনো কালো-বাদামী, আকাশ
ক্যানভাসে। মেঘ কারো অভিমান, নাকি হাওয়ায়
উড়ে যাওয়া বেলা শেষের গান? হতেও পারে
ব্যর্থ কবির কবিতা না ছাপার স্বপ্ন ভাঙার উপাখ্যান।
ছুঁয়ে দেখিনি মেঘের শরীর, দেখেছি শরীর এলিয়ে
মেঘকে ভেসে যেতে। তীব্র খরায় মেঘের কাছে
চেয়েছি জল দু’হাত পেতে। মেঘ নিয়ে জন্মেনি বাস্তবিক
আগ্রহ। তবু জানি, মেঘের ছায়ায় কত
সৃষ্টি-প্রলয়, কত উত্থান-পরাজয়, কত তোলপাড়-ক্ষয়,
মেঘ বলে, ‘মুখ বুজে সব সহো!’

বৃষ্টি মানে জলের পতন, আকাশ থেকে জলরাশির ছান্দসিক
সমর্পণ-মুখরতা। জলের কণায় ভিজিয়ে দেবার
দস্যিপনায় বৃষ্টি নামে, ভাবি মেঘ-মল্লার রাগ কি আসে
বৃষ্টি-খামে? বৃষ্টি কবিদের প্রিয় শিল্পউপকরণ,
অলসদের প্রিয় অজুহাত, মূষল বৃষ্টি বিপন্ন পথিকের
বাড়ায় অবসাদ। আরো ভাবি, কারো চোখের
কোণে জমে থাকা জলের ভাষায়কাব্য লিখে বৃষ্টি
নামে। বৃষ্টি যতই অঝোর নামুক, প্লাবিত
হোক বাড়ির উঠোন, জলে জলে পথ হয়ে গেলেও
খাল-বিল-নদী, বৃষ্টি ঠিকই থামে। মেঘ বা বৃষ্টি
কেউ কিনতে পারে না কোনো দামে!

২৫.
ভাবনা

ভাবি, তোমার চোখে চোখ রেখে
পড়ে নেবো না বলা সব কথা, স্বপ্নের অনুরণন,
নাতিদীর্ঘ বিরহের ব্যাকুলতা..। ভালোবাসা
জানায় কত দাবি! অকারণে নক্ষত্র ঝরে পড়ার মতো
উদাসী দুপুরে তুমি ফেলবে যখন গোপন দীর্ঘশ্বাস,
তুলে নেবো তা আমার কবিতার ব্যঞ্জনা ভেবে।
আবার তোমার খিলখিল হাসির মুদ্রা থেকে
জেনে নেবো কত্থোকের বোল। কখনো ভাবি, প্রিয়
কোনো বই পড়ার সময় তোমার মগ্নতা ভেঙে দেবো
আলতো ছুঁয়ে। রাগ করলে মুহুর্তেই সরে যাবো দিগন্ত হয়ে।

তোমাকে নিয়ে অহির্নিশ ভাবি আরো কতকিছু!
সঙ্গী হতে ছায়া হয়ে থাকি তোমার পিছু। জানি, আমার
কথা জানলে হেসে বলবে, ‘বড্ড বাড়াবড়ি!’ তোমাকে
নিয়ে দিচ্ছি শুধু ভাবের খেয়ায় ভাষার সাগর পাড়ি। আমি
বলবো, তোমাকে নিয়ে আমার আাবেগ, কতটুকু প্রেম, জেনে
নাও সব-ই। তোমার প্রেমের অর্ঘ্য পেতে নতজানু এই কবি!

২৬.
লখিন্দরের স্বপ্ন বিলাস

হাওয়ায় ভেসে আসে তোমার স্বপ্নরেণু, মদিরতা
ছড়ায় অরণ্য ছায়ায়, সমুদ্র জলে বিগলিত ঢেউ, পাহাড়ের
একাকীত্বে পেখম ছড়ায় গাম্ভীর্য। ইথারে ইথারে যেই
উড়িয়েছো আকাঙ্খার পরাগ, পৃথিবীর কোথাও বিধৃত হতে চায় না
অস্তরাগ! সূর্য আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কাঁঠাল-চাপার বনে
সব কুড়ি ফুল হয়ে ফোটে, মঙ্গল গ্রহেও ‘বসন্ত’ উৎসবে মাতে।

যে ঝরা পাতা বিবর্ণ বেদনার কথা বলে, যে কুড়ি
প্রস্ফূটনের স্বরলিপি না জেনে সমর্পিত হয় কুয়াশা ভেজা
ভোরের কার্নিসে, সেই ঝরা পাতা-কুড়ি ঝরে যেতে যেতেও
ক্ষণস্থায়ী জীবনের মহিমা খুঁজে পায়। তোমার অব্যক্ত কথার রঙধনু
পৃথিবী ছাড়িয়ে আলোকবর্ষ দূরে বা আমার কর্ণকুহরে এক
অমর কাব্য শোনায়, হাজার বছরের অভিশপ্ত দীঘল ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠি
আমি এ যুগের লখিন্দর! চিৎকার করে বলি, ‘তুমিই আমার বেহুলা,
তোমার সঙ্গে দেখা হবে জন্ম থেকে জন্মান্তর।

২৭.
কথোপকথন-৫

ঃ তোমাকে দেবো রোদেলা সকাল, গুমোট দুপুরের
উদাসীনতা, হিরন্ময় বিকেল বা চাঁদের আগুনে দগ্ধ নিঝুম রাত!
দিতে পারি মেঘের কাশবন, বৃষ্টির রাগ-সঙ্গীত বা
বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানোর দস্যিপনা। তোমার জানালায় টাঙ্গিয়ে দিতে পারি
আকাশের ক্যানভাস, নক্ষত্রগুলো গোল্লাছুট খেলবে তোমার
ঘরে-বারান্দায়, যখোন তখোন। তোমার ড্রইং রুমে সজ্জিত কৃত্রিম গাছগুলো
সরিয়ে সেখানে নিখাঁদ আবেগের ফুলদানীতে সাজিয়ে দিতে পারি
অপ্রকাশিত স্বপ্নের পারিজাত ফুল। তুমি চাইলে, পিরামিডে বন্দি মমিগুলোকে দিয়ে
গাওয়াতে পারি কীর্তণ, হামদ-নাত বা হারানো দিনের গান।

ঃ হা, হা, হা। কেনো যে আমাকে কথার জলপ্রপাতে ভাসাও? আমার-ই ওপর
আছড়ে পড়ে বুঝি তোমার কাব্য শক্তি? স্বীকার করছি, তোমার
কব্যিকতায় জেগে উঠে এক ধরনের ভক্তি।

ঃ তুমি যেন নিঝুম দ্বীপ বা নিঃসঙ্গ সৈকত। ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ি
আমি, তোমার দিকে এগুতে কখনো কি থামি?

ঃ ফের কাব্যিকতা! কাব্যিকতা হচ্ছে কল্পনার বিলাসিতা।

ঃ কাব্য ছাড়া কবির কী আছে? কবির কাছে সকলে কবিতাই তো যাচে। তুমি কি চাও না তা?

ঃ না, না। আমি শুধু কবিতা চাই না। কবিকেও চাই। তাইতো নিয়তির দিকে হাত বাড়াই। তুমি ডাকলেই, আমি থমকে দাঁড়াই। পেয়েছো তুমি জবাব।

ঃ লা-জবাব! বোধের মন্দিরে সুষমা ছড়ায় অপ্রাপ্তির অনুতাপ।
পবিত্র যা ভাবি, সমাজ বলে, সমাজের দেয়াল ভাঙা পাপ!

ঃ আর কথা নয়, এসো কিছুক্ষণ থাকি চুপচাপ।

২৮.
শৈশব

বর্ণাঢ্য দস্যিপনায় মুখর ছিল তোমার দুরন্ত শৈশব। নদীর
তীরে গাঙচিলের ডিম খুঁজে তন্ন তন্ন করেছো ঝাউবন, শামুক
কুড়ানো স্কুল বেলা স্মৃতির সেলুলয়েডে জীবন্ত ছবি।
দু’ হাতের মুঠোতে নিয়তিকে বন্দি করে খুলে বসেছো আজ
প্রাপ্তির হিসাব। করোজ্জ্বল আলোয় ধাঁধিয়ে থাকা তোমার জীবন
খুঁজে শৈশবের সোনালী দিন। তুমিও জানো, সৃষ্টি-প্রলয়ের
খুনসুটি, মানবিক প্রেম, সামাজিক দায়বোধ,
আলোর বিকিরণ-আঁধারের ছোবল যাপনের গন্ডিতে সাবলিল।
স্রষ্টার উদ্দেশ্যে অবনত হবার গৌরব নিয়ে আমাদের
জীবন নদীর মত প্রবাহমান। স্রষ্টা আছে কি নেই ‘বাহাস’
আছে, নিজেই স্রষ্টা সাজেন কেউ-কেউ, তথাকথিত সমাজ
বিরোধী বিপ্লবীরা মরুতেও তোলেন সমুদ্রের ঢেউ!

গাঁয়ের পথে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ তালগাছের মত
আজো বর্ণিল-দ্যুতিময় আমার একাকীত্ব। দূর আকাশে
হেলান দিয়ে পাহাড় যেমন আঁকে দিগন্তের সীমারেখা, আমিও
তেমনি আমার তারুণ্যকে উজ্জ্বল করেছি শৈশবের জলরঙে।
যে শৈশব তুমুল দস্যিপনায় ঠাসা, যে জীবন যাপনের
বর্ণাঢ্য সাতকাহনে ভরা, তেমন শৈশব বা জীবন
আমার নয়। ছন্দহীন, ব্যাপ্তিহীন, অবহেলিত আমার শৈশব
আমাকে দেয় নীরব কান্নার স্বরলিপি, পথ চলার লড়াকু সাহস!

তুমি হয়তো নিয়তি নির্ধারিত জীবনের রঙ্গমঞ্চে সুখি, আমি
নিঃসঙ্গ নিয়তির মুখোমুখি! রিক্ত, যাযাবর, ব্যর্থ কবি,
ভিখারী-ভবঘুরে বা যার আছে রাজপ্রসাদের জৌলুস, অঢেল
বিত্ত-বৈভব, প্রত্যেকে ফিরে পেতে চায় তার ফেলা আসা শৈশব।

২৯.
অথচ

সমর্পণ নয়, অথচ সমর্পণ!
স্পর্শ নয়, অথচ অস্থিত্ব কেঁপে ওঠা স্পর্শের
আলিঙ্গন! স্বপ্ন নয়, অথচ গভীর স্বপ্নাবিষ্টতায় মুহুর্তগুলো
রঙিন! ভেঙ্গে যাবার কথা নয়, অথচ নিজের ভেতরে নিজে ভেঙ্গে চূড়!
ভালোবাসা নয়, অথচ অপ্রার্থিব ভালোবাসার মদিরতা!
কবিতার মত কথামালা, ফুল ফুটানোর মত তোমার
প্রশ্ন আর জীবন বোধের নান্দনিক
বিশ্লেষণে আমার জবাব। তুমি এক জীবনের প্রতিমা, আমি
স্বপ্নালোকের পরিণাম। তুমি হাসির খুনসুটিতে কুয়াশা
জড়ানো বিকেলের রংধনু
হয়ে যাও, আমি ধ্যানস্থ তন্ময়তার খুঁজি তোমার অপ্রকাশিত
কথা, হৃদয়ের উত্তাপ। প্রশ্রয় খুঁজে যেই আমি হতে চাই
রোমান্টিক কবি, তুমি
খরতাপে এক পশলা বৃষ্টির স্বস্থি ছড়িয়ে হঠাৎ উধাও!

৩০.
নক্ষত্রের ফুল

তোমাকে দেবো নক্ষত্রের ফুল
জোছনার লাবণ্য সব মেখে
দেবো সূর্যোদয়ের গান, অস্তাচলের অভিমান
দেবো কল্পনার জলছবি এঁকে।

মেঘ ছুঁয়ো না, বৃষ্টি চেয়ো না
তুলে দেবো সাগরের জল
পাহাড়ের কান্না দেবো,অরণ্যের নির্জনতা
দিতে পারি পাখির কোলাহল।
বন্ধু হবার প্রতিশ্রুতি দেবো
সুভাশীষ হৃদয় থেকে।

দেবো সুর-গান, ঝর্ণার কলতান,
নিতে পারো স্বপ্নের মিথ
তোমার নামে যদি,
মনের গহীনে নদী,
বয়ে বয়ে গেয়ে যায় গীত।
পথ হারালেও বলে দেবো পথ
তোমার-ই পাশে থেকে।

 

৩১.
এসো বদলে যাই

একটা জীবন স্বপ্ন অনেক
হরেক রকম কল্পনা
সব হারিয়ে দাঁড়িয়ে আছি
এটা নিছক গল্প না।

আকাশ ছোঁয়ার সাহস আছে
হোক না আকাশ অনেক দূর
হোচট খেয়ে পড়বো কত
হবে কত স্বপ্ন চূড়?

প্রবঞ্চনার আঘাত যত
প্রত্যাখানের লাঞ্চনা
পড়ে থাকা পথটা জুড়ে
নিন্দা-কাঁটা, বঞ্চনা!

শূন্য দু’হাত, বিপন্নতায়
আমার কোন দুঃখ নেই
মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছি
যেমন ছিলাম, এখন সেই!

স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন ছড়াই
খুব সাধারণ জীবন বোধ
বন্ধু হতে পাশে দাঁড়াই
কারোর প্রতি নেই না শোধ।

অরণ্যে যাই, পাহাড় দেখি
সাগর-নদী কত কি!
ঘরের কোণে কাঁদলে একা
মনটা উদার হতো কি?

বন্ধু আসে, বন্ধু যে যায়
পরিচয়ের গন্ডিতে
কে যে কখোন হৃদয় কাড়ে
হৃদয় দেয়ার সন্ধিতে!

বন্ধু হয় দাঁড়িয়ে আছি
আমার মত বন্ধু চাই
হৃদয় খুলে আকাশ হয়ে
আমরা এসো বদলে যাই।

৩২.
ভালোবাসি

আমি যতই কুয়াশা সরাই, তুমি রহস্যের পর্দা টেনে যাও
বৈরী স্রোত ঠেলে যতই ছুটি, স্বপ্নের খুনসুটি, তীরে
এসে ডুবে যায় নাও! আমি আকাশ ছুঁতে নক্ষত্র লুটে, ভাবি
তোমাকে দেব অর্ঘ্য। তোমার কলহাস্যে-খেয়ালে,
প্রতিনিয়ত হামলে পড়ে উপেক্ষার দেয়ালে আবেগ মথিত
স্বর্গ। আমি স্বপ্ন আবার বুনি, তুমি ফিরে
আসবে, প্রত্যশায় কাব্যময় প্রহর গুনি।

আমি যতবার তোমার সামনে দাঁড়াই, যতই
দু’হাত বাড়াই কেবলই নিন্দা জোটে। তোমার দু’চোখে
জ্বলে ওঠে আগুন ভরা দ্রোহ, তুমি নিপাট নির্মোহ,
আমাকে ফিরিয়ে পুষে রাখো অহংকার। আমি
যেন ঝরা ফুল,ভেঙে পড়া কূল বা বলতো
পারো অযতনে থাকা কোন বীণার ছেঁড়া তার।

আমি তারপরও তোমার সামনে আসি
বলতে না পারি, জানান দিই ‘শুধু তোমাকেই ভালোবাসি!’

৩৩.
অমাবশ্যার রাত

এক অমবশ্যার রাত এসে আমার কাছে চাইলো
জোনাকীর আলো অথবা নক্ষত্রের পতনের
অহংকার। আমার স্বপ্নভাঙা অনুচ্চারিত বেদনাকে
পেঁচার আর্তনাদ ভেবে মুঠোবন্দি
করে নিল অনায়াসে। ঘুম না আসা চোখের
কার্নিসে ঘন অন্ধকার রেখে বেহিসাবী
রাত বললো, ‘মোহগ্রস্থ জীবন আলোর তীর্যকে অন্ধ।’

আমি সূর্য পিপাসী জানালা বন্ধ করতে যেয়ে
দেখি, অস্তে ডুবে যাওয়া সূর্য হাঁটু গেড়ে বসে আছে
নিকষ অন্ধকারের গহীনে!
আলোর ফাঁদে কে হারিয়েছে পথ, কীভাবে আটকে
গেছে মনোরথ, গন্ধম খাওয়ায় কতটা পাপ,
তোমাকে ছুঁয়ে বির্বণ করায় কতটা
তোমার অনুতাপ-আঁধারের কাছে এ সবের
কৈফিয়ত দিচ্ছে সূর্যদেবতা! আমি বিস্ময়ে
অমবশ্যার রাতকে বলি, ‘তুমি কি চাও
আমি জোনাকীর মত জ্বলি?’ খিলখিলিয়ে হাসে
রাত, অনুভবে পেখম ছড়ায় বিরহের অবসাদ।

অন্ধকারের বিহবলতায় নতমুখে দেখি, করতলগত
আলোর ফানুস কবেই হয়েছে মেকী! রাতের
কাছে রিক্ত দু’হাত বাড়াই, তোমার কাছে
পৌঁছুবো বলে আবার উঠে দাঁড়াই। কালো রাত
বলে, ভালোবাসা আছে বলেই চাঁদের লণ্ঠন জ্বলে!

রাতের কাছে প্রশ্ন রাখি, ‘কত করলাম ঈশ্বর
ডাকাডাকি, তবু কেন আমার খাতায় শুভঙ্করের
ফাঁকি?’ জবাব পাইনা এর, রাত ফুরালে
তোমার নামে সূর্য উঠে ফের।

৩৪.
অভিমান

কাচের মশাল ভাঙ্গুক, উস্কে উঠুক আগুন!
তবু বলবো না, ‘তুমি আসো না কেন’?
অপেক্ষার পেয়ালায় আর জমবো না।

চোখের জলরঙ জানালা গলে নেমে যায়
পথে, আঁকে নৈঃশব্দের গুমোট মৌনতা। পথ
পড়ে থাকুক বিমর্ষ বিলাপে, জনারণ্য থেকে
ফাগুনের গুঞ্জন এনে তোমার জন্য তুলে রাখবো না।

আঙিনা জুড়ে ভেঙে পড়ে পাথুরে সময়, রাতের
কার্নিসে লেগে থাকে গলিত স্বপ্নের লাভা।
কথার কুঁড়ি অন্তপুরে কেবল ঝরে
সঙ্গোপনে। আকাশের পরে হাজারো আকাশ
ভাঙ্গুক। বুক চিতিয়ে আকাশ ধরে রাখবো না।

৩৫.
অনুচ্চারিত শ্রাবণ

তুমি আকাশ মুঠোবন্দি করে
আমার কাছে চাইলে নক্ষত্রের লাবণ্য। আমি
আকাশের নিরুদ্দেশ সংবাদ স্রষ্টাকে
জানিয়ে প্রার্থনায় হলাম অবনত। পেলাম না স্রষ্টার
অনুকম্পা। বরং উপহাস মিললো অবিরত।
‘আকাশ ভরা নক্ষত্র চাই’-এ কথায়
আমিও অনড় পাথর। বাতাস হামলে
পড়ে বললো, আমি অনুরাগ কাতর!

তুমি সমুদ্রকে বাথটবে আটকে রেখে
বললে ঢেউয়ের স্বরলিপি খুঁজে এনে দিতে। আমি
ছুটোছুটি করলাম দিগি¦দিক, দেখি কেবল
বালুচর। বুকের ভেতর ককিয়ে ওঠে
ঝরা পাতার মর্মর। কলহাস্যে কে যেন বলে
গেল, আমি এক অভিশপ্ত লখিন্দর!

তুমি অমাবশ্যার অতলে কেন খুঁজো জ্যোস্নার প্লাবন?
আমি দিতে পারি অপ্রকাশিত প্রেমের অনুচ্চারিত শ্রাবণ।

৩৬.
উপলব্ধি

চেনামুখ হয়ে যায় অচেনা, মায়াবী মুখোশ
ঢের হলো চেনা! তোমাদের কপটতা যদি যেত
যে কোন মূল্যে কেনা, আমি কিনতাম। সরল পথে
তোমার গরল, অবিশ্বাসের ক্লেদ ও তরল, নিংড়ে দু’ হাতে
সামনে চলি। তোমরা পোড়াও, বিনম্র লাজে আমিও জ্বলি!

৩৭.
প্রশ্ন

হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাই আকাশ
মুঠোবন্দি হয় মেঘ, নক্ষত্র নাচে কত্থকের বোলে।
আকাশের রঙ স্বপ্নে ছড়ায়, না বলা কথা দীর্ঘশ্বাসে
যেমন জড়ায়। আকাশ বলে আমি যেন রোজ তোমার দিকে
দু’হাত বাড়াই, তোমার
মনের অন্তপুরে নিবিড় ছুঁয়ে একটু দাঁড়াই।

আমি ভীষণ স্বপ্নপ্রবণ তোমার দিকে কেবল ছুটি,
গোপন কথা, ব্যাকুলতা অনুরাগে লুটোপুটি। প্রশ্ন যখন
সামনে দাঁড়ায়, প্রশ্ন-দ্বিধার দেয়াল ভেঙে
ভালোবাসা হাত যে বাড়ায়। তোমার মনে এমন কিগো
আকাশ মদিরতা ছড়ায়?
নিজের ভেতর নিজকে দেখো মিহিন কোনো ভাঙা-গড়ায়?

৩৮.
গল্প

যে গল্পের তুমি টেনেছিলে ইতি
সে গল্পের হয়নি তো শেষ, জেনে
কাঁপিয়োনা ভ্রুকুটি।

চাইলেও সবকিছু হয়না তো নিজের মতো
কখনও বা অলক্ষে থেকে যায় ক্ষত।
ছায়া হয়ে তাড়া করে দুঃসহ স্মৃতি।

গল্পের শেষ জেনে বুক ছিল দুরু
পরে দেখি শেষ নয়, হয়েছে তা শুরু।
যেখানেই শেষ হোক, রেখে যাই প্রীতি।

৩৯.
শাপমোচন

গোধূলীর বিষন্নতার মতো আমি পড়েছিলাম
সবার অলক্ষে। আমাকে ছুঁয়ে কত নদী মরে গেল
নিখাঁদ বিরহে, কত মুখ হারিয়ে গেল মুখের
মিছিলে, কত মায়ামী মুখোশ শুনিয়ে গেল জীবনের
গান-যাপনের প্রহসনে।কতদিন, কতবার ‘নিদারুন অবহেলা’
পরিহাস করে গেছে আমার নিঃসঙ্গতাকে। আমি গলে
যাওয়া শবের মতো, নিভে যাওয়া মোমের মতো, স্মরণের
আয়না থেকে বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার মতো
হারিয়ে গিয়েছিলাম নিঃশব্দে, পাথুরে অভিমানে।

পথে যেতে যেতে, আমাকে দেখে
তুমি কী ভেবে, থমকে দাঁড়ালে। স্বপ্নরেণু উড়লো
হাওয়ায়,স্বর্গ দুয়ার খুলে দিল বুঝি ‘নিয়তি’, আড়ালে!
তুমি এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলে আমার চোখে জমে
থাকা জমাট অন্ধকার। আমি জেগে ওঠলাম
হাজার পর, কাঁপছিল আমার অধর! তুমি
তখন তোমার দু’ঠোঁট রাখালে আমার ঠোঁটে। ভাবলে
না তো, তা পূন্য কিনা পাপ। তোমার প্রেমে
ঘুচলো আমার পাষাণ অভিশাপ!

৪০.
তুমি

বদলে গেল গল্পগুলো
কাব্য যত নদী
এমন বদল হতো না তুমি
থাকতে পাশে যদি।

বদলে গেল আকাশের রঙ
মূষরে গেল চাঁদ
জ্যোস্না ছাড়া রাত্রি হলো
লাবণ্যহীন ফাঁদ!
অন্ধকারে মিলিয়ে গেল
সকল তারার জ্যোতি।

সাগর জলে ঢেউ ওঠে না
মরুর বুকে ঝড়
হাসে না কেউ, কান্না গুমোট
ভাসায় চরাচর।
ফিরলে তুমি জলের ধারা
বইবে নিরবধি।

৪১.
স্বপ্নালোকের গান

শোভন শৃঙ্খলিত তোমার স্বাভাবিক যাপনে হঠাৎ
বিষণ্ন পথিকের মতএক অস্বাভাবিক ঝড় ঘূর্ণিয়মান, তুমি
কৌতুহলে ঝড়ের বুকে পাতো কান। ঝড়
তোমাকে শোনায় প্রলয়ের গান, তুমি
কলহাস্যে বলো, ‘এ রোমান্টিক অভিমান!’

তোমার আঙিনায় কূড়ির ঘুম ভাঙানিয়া সুরের
মৌতাত, দিনলিপিতে বর্ণাঢ্য আয়োজন, পায়ে পায়ে
বন্দনা, মুঠো মুঠো সুখের বৈভব। জানি, তুমি
গীতাঞ্জলীর মত অর্থবহ ও শিল্পময়। এখানেই আমার পরাজয়।

পারিজাত স্বপ্নালোকে তুমি ফিরে আসো বারবার,
অস্পর্শের অনুতাপ বাড়ায় হাহকার। তুমি উপেক্ষায়
বলো, ‘নায়াগ্রার জলে অনেক কিছুই ভাসে!’
তুমি কি জানো, পথভোলা ঝড় কেন আমার দীর্ঘশ্বাসে?

৪২.
তুমি হতে আমার

আমার দুঃখগুলো যদি তুষারপাতের মতো ঝরে
পড়তো তোমার নির্জন বাড়ির আঙিনায়, কিংবা
পেঁজা তুলোর মতো উড়ে যেত বিষন্ন দিগন্তে! তুমিও
নিজেকে খুঁজে পেতে অশ্রুপাতের গোপন
অহংকারে,আমার দীর্ঘশ্বাস হতো না রঙধনু।

আমার স্বপ্নগুলো যদি নক্ষত্র হতো, দেখে
নিতে পারতে, না বলা কথার স্বরলিপি। ভেতরের
রক্তক্ষরণ চেপে কীভাবে বেঁচে আছি, বুঝতে।
জানতে, অমলিন হাসির উপাখ্যান। যদি আমার
চোখের নদীও দেখতে, মথিত আবেগ হতো না
গড়ানো পাথরের আহাজারি, বিষন্ন হতো না কোন বিকেল!

যদি দেখার মতো করে আমাকে দেখতে, জীবন বৃত্তে
জীবন হতো না মমি, তুমি হতে আমার সব সীমারেখা ভেঙে!

৪৩.
ছায়া গল্প

আমার পথ আটকে দাঁড়ালো এক ছায়া! আমি
এদিক-ওদিক যাওয়ার চেষ্টা করতেই ছায়াও সমান
তালে এদিক-ওদিক করে আমার সামনে মুখোমুখি,যেন
যমদূত দাঁড়িয়েছে! আমি ছায়ার দিকে রক্তচোখে
তাকালাম, চিন্তার মধ্যে গ্রীষ্মের তাপদাহে বিদ্যুতের
লোডশেডিংয়ের বিরুক্তি। ছায়া আমার রক্তচোখ
যেন দেখতেই পেলো না। ছায়া নয়, যেন
আমার পথ অবরুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছে এক অনড় পাথর!

আমার মাথার ওপর আকাশ নেমে আছে, হাওয়ায়
উড়ে এসে শরীরে আছড়ে পড়ছে স্যাঁতস্যাঁতে
মেঘ, পাকস্থলীতে হরহর করে ঢুকে যাচ্ছে মেঘের পোড়াগন্ধ।
আমার বুক পকেটে সাজিয়ে রাখা কল্পনার বরফকুচি
গলে একাকার, অচল পয়সার মত কিছু কষ্ট
কেন জানি গুপ্তধনের ঐশ্বর্যের দ্যুতি ছড়াতে লাগলো। এতো
দ্রুত এতো কিছু ঘটে গেল, আমি বিবর্তনের কম্পন
বিন্দুমাত্র টের পেলাম না। এক ছায়া রহস্যের
সামনে কম্পমান আমার অস্থিত্ব। আমি নিজেকে প্রস্তুত
করে নিতে মাথা তুলে দাঁড়ালাম।

স্রোতস্বনী নদীগুলোর আজ অকারণ মন খারাপ, ভাটা
স্থির-জোয়ারের দেখা নেই। সমুদ্র জলে নেই ঢেউ, সৈকতে
জনশূণ্যতার বিলাপ, অরণ্য ছেড়ে পাখিরা গেছে
নির্বাসনে, জোছনা হারিয়ে চাঁদ হয়েছে অলুক্ষণে! কবিরা
শব্দ খুঁজে না পেয়ে
ডুবে গেল মদের পেয়ালায়, প্রেমিকার হৃদয়ে অভিমানের
অমবশ্যা! প্রতিদিনের চেনা পথ
আজ রহস্যময় কুহেলিকা, পথ নয় যেন সাত আসমানের
ওপর দিয়ে সর্পিলভাবে ছুটে চলা কোন জাদুকরী
কার্পেট! আমি ঘোরলাগা রহস্যের কুয়াশা
সরাতে ছায়াকে জিজ্ঞেস করি, ‘কে তুমি? কী চাও
আমার কাছে?’ ছায়া বলে, ‘আমি তোমার অভিশপ্ত নিয়তি!
পূন্যের চেয়ে তোমার ঢের বেড়েছে
পাপ! প্রায়শ্চিত্তে তোমাকে শুধরে দিতে
আমি তোমার ছায়া অভিশাপ!’

৪৪.
ট্রেজেডী

অচেনাকেই তুমি নিয়েছো চিনে
মুঠো মুঠো সুখ নিবে যে কিনে,
স্বপ্ন তোমার খুব।

ভেঙে ভেঙে হলাম টুকরো কত
হারানোর দহন পোড়ায় যত
আমিও নিশ্চুপ।
পৃথিবী এগোয় ভাঙে গড়ে
তারারা ঝরে, পাতাও ঝরে
হিসাব কে তার রাখে।
দিন চলে যায় বিবেকের আয়নায়
কিছু কথা ঠিকই থাকে।

গোপন ব্যথা রাখোনি ফ্রেমে
মধ্যরাতের ধরাবাধা প্রেমে
ভেবে নিতে পারো তুমি হারোনি।
আমিও জানি তার নাম জপে
উজার করে নিজেকে সঁপে
তুমিও তার, হতে পারোনি।

৪৫.
পথিক ও প্রতিবিম্ব

গন্তব্য জানা এক পথিক অস্তাচলের ম্লান সুবর্ণ রেখায়
দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতা রেখে যায় বসন্ত বিলাপে।
আকাশের পিঠে আকাশ ছিল না, নির্বাসিত নক্ষত্রগুচ্ছ, মেঘদল,
চাঁদ, গ্রহপুঞ্জ..! অথচ বাতাসে ছিল মাতাল করা তোমার
গায়ের মিষ্টি গন্ধ। সমুদ্রমুখি নদী বর্ণিল বাঁকে এঁকে
নেয় না বলার কথার প্রচ্ছদ। তাবৎ বিরহ এসে
জমে হয় পাহাড়ের
কালো রঙ-তবু পথিক বিচলিত নয় মোটে। যতই এগোয়
সে, পথে সবকূড়ি ফুল হয়ে ফোটে। আকাশবিহীন
আঁধারঘন সন্ধ্যা মুঠোবন্দি করে পথিক স্বপ্নগ্রস্থ,
স্বরলিপিহীন আবেগ
মদিরতায় সে খোঁজে তোমার মনের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ। পথিক
জানে না, তুমিও আকাশের মত রহস্যময়।
ভালোবাসলেই গন্তব্যে
যায়না পৌঁছানো, করতলগত হয়না জয়। জীবনের
জয়গানে, টানাপাড়েনেও গন্তব্যের পথে চলা।
সামনে এসে দাঁড়ায় তোমার প্রেম, হাত
বাড়লেই প্রতিবিম্ব, একতাল অবহেলা!

৪৬.
প্রতিশ্রুতি

তোমার দীর্ঘশ্বাস কি আমাকে ছুঁয়ে গেল? নিজের
ভেতর নিজের দীঘল ঘুম ভেঙে গেলে আচনক দেখি,
সূর্যোদয় নয়, আমি বিপন্ন এক সূর্যাস্তের মুখোমুখি! কে জানে,
কতকাল ঘুমিয়েছিলাম
স্বপ্নহীন, করতলে মরুঝড় এসে থমকে হতবিহবল!

জেগে থেকেও লক্ষ্যহীন পথে ছিল গন্তব্য খোঁজার
প্রহসন সেকি! ধ্রুবসত্য বলে আকড়েছি যা, হয়েছি সবই মেকী।
মুখোশের ভিড়ে খুঁজেছি প্রিয়মুখ, চোখের কোণে জমেছে
কেবল অশ্রুজল, অচল পয়সার মত অপাংক্তেয় আমি
তোমার নামে
উন্মুখ। নিঃসঙ্গ নির্বাসনে হাওয়ায় উড়িয়েছি স্বপ্ন ভাঙার
বেদনার জল, জলতরঙ্গে রেখেছি হাত পেয়েছি
আগ্নেয়গিরির অনল! তোমার প্রেমে হলাম যত উন্মাতাল,
পুড়ে খাঁক হয় মহাকাল।

কালের পিঠে দিগি¦দিক ছুটে জুটলো শুধু কড়ামিঠে
অপবাদ। চড়তে পেরেছি কি তোমার মনরথে? নাকি বিপরীত
স্রোতে ভেসে হয়েছি কুহেলিকা, জীবন ঘঁষে ঘঁষে কত
বলো জীবনের পাঠ শেখা?
হারাতে হারাতে হারাবার কী আর আছে? নিয়তির
কাছে দৃপ্তকণ্ঠে বলি, আমি যতবার জন্ম নেব
আসবো ফিরে তোমার কাছে।

৪৭.
দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের কাবাব

তোমাদের ‘জ্যোতির্ময়’ ভেবে আমাদের মাথা
অবনত, শ্রদ্ধা-ভালোবাসায়। খুনির বুলেটে আমাদের খুলি
উড়ে যায় যখন-তখন, অর্ঘ্য সমর্পণ ভেবে সহে যাই
বিভীষিকা। রক্তের দাগ দেখেছো কি তোমাদের মুখোশে?

তোমাদের কত রকম ভবন, কত নাম! আমাদের
মাথার ওপর ভাঙ্গা আকাশের দুর্বিপাক, পায়ে
পায়ে অন্ধকারের জগদ্দল পাথর। তবু
সামলে রাখি অশ্রুজল, দীর্ঘশ্বাস।

আমরা দুঃশাসনে ডুবে যেতে যেতেও
অকুণ্ঠ গুণকীর্তণে তোমাদের মায়াকান্নার
নাম দিই দেশপ্রেম। আর তোমরা আমাদের সর্বস্ব
বন্ধক রেখে গণতন্ত্রকে কাবাব বানিয়ে খাও!

৪৮.
বন্ধু

হাতের মধ্যে আকাশ নিয়ে
সমুদ্র জলে স্বপ্ন ভাসিয়ে
বাতাসে পাতি কান
ফাগুন সাজে ‘ভ্যালাইনটাইন’ নামে
না বলা কথা হৃদয়ের খামে
শুনি ভালোবাসার জয়গান।

স্বপ্ন কে ভাঙে? ভাঙ্গুক তারা
বেদনার আর্তিতে নই দিশেহারা
বন্ধুত্বের হাত বাড়াই
যার যা আছে, যার কিছু নেই
হাহাকার-হতাশায় হারিয়ো না খেই
এসো মাথা তুলে দাঁড়াই।

বন্ধু হও, বন্ধু করো
হাতে রাখো হাত
ভালোবাসার স্বরলিপি হোক
শুভ দৃষ্টিপাত।

৪৯.
পরজন্মেও তোমার হবো

তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো, দিন,মাস বছর..
এমন কি অনন্তকাল! আমি স্বপ্ন বিলাসী কবি
উচ্ছ্বাস-অনুরাগে, তোমাকে দেবো অর্ঘ্য। হাসলো
কি-কাঁদলো স্বর্গ, অভিমানের মলাটে মেঘ বন্দি
হলো কি-হলো না, পরিবেশ বিপর্যয়ে হিমালয়ের উষ্ণতা
বাড়লো কি-কমলো, এ নিয়ে ভাববার কিছু নেই।
কে-কি পেলো, কে কোথায় খেই হারালো, নায়াগ্রার জলে
কী ভেসে গেলো-ওসবে আগ্রহ নেই একবিন্দু। তুমি
যে আমার সামনে অপার বিস্ময়ের এক সিন্ধু!

পৃথিবীর কোথায় সুনামী-প্রলয়-শোক, কোথায়
উৎসব-আবিস্কারের মাতম, যুদ্ধবাজ শাসকের অট্টহাসিতে
কে কাঁপলো বা রূপের হাটে কোন ঊর্বশী মুকুট জিতে
নিলো-এ সব খবরে আমার কি যায়-আসে? নিরেট
নির্মোহে আমি নদীর কলধ্বণির মতো শুধু তোমার বন্দনায়
ব্যস্ত। আমি এই জন্মে, পরজন্মেও তোমার হবো।

৫০.
তুমি ও অনুভব

আকাশ যখন প্রদ্বীপ জ্বালায় চাঁদের
জোছনালোকের মদিরতায় মন ভিজে না কাদের?
তুমি যখন পাশে থাকো
স্বপ্ন যত সীমা পেরোয় সাধের!

তুমি যখন আমার দু’ হাত ধরো
স্বর্গ-ধরা কাঁপে থরোথরো।
জীবন ছোট, ভালোবাসা
অনেক মহান, বড়।

হঠাৎ যখন হামলে পড়ে বাতাস
বুঝি ওটা, তোমার দীর্ঘশ্বাস!
মনের গহীন কোণে তোমার
নিবিড় বসবাস।

তোমার চোখে রাখলে আমার দৃষ্টি
হয় যে তুমুল কাব্যিকতার সৃষ্টি।
তীব্র দাবদাহে যেন হঠাৎ নামা বৃষ্টি!

৫১.
কথোপকথন-৬

ঃ খ্রীষ্টপূর্বের আগে, প্রাগ ঐতিহাসিক যুগে কিংবা
মানব সভ্যতার সূচণা লগ্নে, প্রথম যখন মানুষ পাথরে পাথর ঘঁষে
জ্বালাতে শিখলো আগুন। সেদিনই তোমার খোঁপায় বনফুল গুঁজে আমিও
উদাস হয়েছিলাম অন্যরকম ভাবালুতায়। তখনো ইতিহাস বেত্তার
জন্ম হয়নি বলে লেখা হয়নি অপ্রকাশিত প্রেমের উপাখ্যান। তাই না?

ঃ তাই নাকি? আর?

ঃ তোমার সঙ্গে কতবার দেখা হলো! কতবার জন্ম হলো আমাদের!
জন্ম-জন্মান্তর হলো খান্ডব দহন! জন্মান্তরের অভিশাপ করে যাচ্ছি বহন।

ঃ জন্ম থেকে জন্মান্তর আমাদের হয়েছে দেখা! যেমন?

ঃ তুমি ছিলে গ্রীসের রাণী ক্লিওপেট্রা। আমি ছিলাম তোমার প্রেম পাগল
সিজার। তোমার জন্য সে-কী যুদ্ধ করেছি অবলীলায়! ভালোবাসা
কখনো কখনো কত ধ্বংস-যুদ্ধের জন্ম দেয়! কিংবা মোগল সম্রাট
আকবরের শাসনামলে তুমি ছিলে আনার কলি, আমি শাহাজাদা সেলিম।
আবার তুমি যখন রাজরাণী মমতাজ,আমি তখন বাদশাহ শাহজাহান।
তোমাকে উৎসর্গ করতে নিছক একটা তাজমহল বানিয়ে ভালোবাসার
বৈষায়িক মূল্য দিয়ে তাবৎ মানুষকে বোকা বানিয়ে দিয়েছিলাম।
ঐ তাজমহল এখন ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন! ভালোবাসার জন্য
যুদ্ধ-প্রলয় এবং নান্দনিক সৃষ্টি, আমিই তো করেছি! পথের ভিখারীও
ছিলাম, তুমি কাঙালীনি। মজনু ছিলাম, তুমি লাইলী, তুমি শিরি যেই আমি ফরহাদ..।
ফিরে ফিরে আসার নিয়তির ফাঁদ!

ঃ তোমার কথা বিশ্বাস করতে ভালো লাগছে আমার! হয়তো
তোমার কথাই ঠিক। তোমার সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন জনমে ভিন্ন
পরিচয়ে আমার হয়েছে দেখা। ও সব যদি সত্যিও হয়, তা নিয়ে
আমার উচ্ছ্বাস নেই। এই যে তুমি কবি, আর আমি তোমার
কাব্য প্রেমে বিমোহিত এক নারী, এটাই ভীষণ আনন্দের! অতীতের
কথা অতীতে থাকুক পড়ে! কী হবে ওসব হিসেব করে?

ঃ কিন্তু অতৃপ্ত আত্মা বারবার আসে ফিরে। অপার্থিব
ভালোবাসা আমাকে বারবার তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়,
জন্ম থেকে জন্মান্তর! কল্পনায়ও পেখম ছড়ায় অদৃশ্য
অনুতাপ, স্পর্শ করো, ঘুচে যাক অভিশাপ!

ঃ না, না। কল্পনাকে টেনে এনে কী লাভ? কবি, তুমি
কবিতার মধ্যেই থাকো বন্দি। এটাই হোক আমাদের সন্ধি।

৫২.
জীবন শিরোনামে

আমার চোখের অশ্রুজলে
দীর্ঘশ্বাসের দামে
তোমার প্রেমের অর্ঘ্য দেবো
ভালোবাসার খামে।

কথা আছে, স্বপ্ন-আবেগ
ছন্দ, সুর ও গান
নিতে পারো এক জীবনের
মধুর কলতান।
আদি থেকে অন্ত দেবো
সব-ই তোমার নামে।

চাইলে তুমি স্বর্গ দেবো
দিতে পারি মর্ত্য
যখন যা চাও, নিতে পারো
নেই কোন যে শর্ত।
থাকবে তুমি জড়িয়ে আমার
জীবন শিরোনামে।

৫৩.
পাষাণ পাথর

আমার জন্মান্ধ চোখে মণি হবে
বলে পুড়িয়ে যাচ্ছো ঢের, যখন-তখন। ছাইভষ্ম
হয়ে উড়ে যেতে যেতে আমি গেয়ে যাই
আত্মশুদ্ধির গান। তবু প্রেম-অপ্রেমের আলো-আঁধারিতে
হয় দ্বন্দ্বের খুনসুটি, বিশ্বাসের আরশিতে মিহিন ভাঙন।

আমাকে ছুঁয়ে পবিত্র করে দেবে বলে
আঘাতে আঘাতে চূর্ণ করছো বারবার? বেদনায় নীল
হয়ে খুঁজি স্বপ্নের ফসিল, যেন ঝাঁঝালো গদ্যে
অহর্নিহিশ খোঁজা অন্তমিল! তোমাকে নিয়ে আমি
যতই হই না কাতর, তুমি অনাবিল অনুরাগে
পাষাণ পাথর! বিরহের কবিতায় ককিয়ে ওঠে বুকের পাঁজর!

৫৪.
কথা

একটি কথা, চরম নীরবতা আবার উচ্ছ্বাস-প্রগলভতা।
একটি কথা, তুমুল আলোড়নে হৃদয়ের মুখরতা। কথাটি বলতে
পারে কেউ, উঠে আবেগের ঢেউ। আবার পারেনা
বলতে অনেকে, না বলা কথার বেদনায় থাকে ঢেকে।
জীবনের স্বপ্নবিধুর কথার দ্বীপশিখা প্রজ্জ্বলিত
হলে, স্বর্গ এসে দাঁড়ায় ভূমিতলে। প্রেম আলোকিত হয়
কথার লাবন্য জলে! ‘ভালোবাসি’ কথাটি কে না বলে?

৫৫.
একটি দীর্ঘশ্বাস ও স্বপ্নভূক জলকন্যা

আমার একটা দীর্ঘশ্বাস ঘুড়ি হয়ে উড়ে গেছে
নীলাভ দিগন্তে। আমি সূতোহীন নাটাই পড়ে আছি
তুমুল কোলাহল মুখর আলো ঝলমলে এক জৌলুসময়
শহরে, অরণ্যের গুমোট নীরবতার মতো। ঝরা
পাতার মতো শুয়ে আছি আপন নিঃসঙ্গতায়, অথচ
নাইটক্লাবগুলো থেকে নর্তকীর উদ্দাম নৃত্য শহরের গলিপথ
খেয়ে পড়ে আমার ওপর। আমি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা
অনড় পাথর, বিরহে পুড়ে ভীষণ কাতর!

কতকাল এভাবে পড়ে আছি, কে জানে! কত অর্থ
নিরর্থক হয়েছে, আবার অনেক অর্থের খুঁজিনি মানে। দমকা
হাওয়ার মতো অপাংক্তেয় এক জলকন্যা এসে
আমাকে ছুঁয়ে হয়েছে নক্ষত্র-নীহারিকা, কখনো সংকুল
সমুদ্রে বাতিঘর। আমি অবলীলায় আমার যত পাপ দিয়েছি তুলে,
স্বপ্নভূক জলকন্যা আমাকে চুঁয়েছে নির্মোহ ভুলে। জলকন্যার
কাছে চাই জল, সে দেয় জীবনের স্বরলিপি, স্বপ্নের নির্যাস!
জীবনবিমুখ বিদগ্ধ প্রাণে হয় কি বলো স্বপ্নের চাষ?

আমি দীর্ঘশ্বাস ফিরে পেতে চাই না, নিজেই হতে চাই দীর্ঘশ্বাস
জলকন্যা তুমি শিশির হও, আমি হবো দূর্বাঘাস।

 Back