‘দর্পণ কবীরের কাব্যগ্রন্থ বসন্ত নয় অবহেলা’
প্রেমার্তি ও দ্রোহের স্তিমিতি : সৈয়দ কামরুল
দর্পণ কবীর সার্বক্ষণিক লেখক। পেশায় সাংবাদিক। দূরবাসী। বসবাস নিউ ইয়র্কে। তার স্বভাবজ ঝোঁক,স্পৃহা, অভিনিবেশ জারি রয়েছে লেখালেখিতে। ছড়া দিয়ে তার লেখালেখির শুরু। উপন্যাস বেরিয়েছ বেশ কটি। কবিতার মেধাবী-নীলিমায় ডানা মেলেছে নতুন উড্ডয়ন। দ্রোহ আর প্রেম-এই দুই মানবিক অনুষঙ্গ দর্পণ কবীরের কবিতার ল্যান্ডস্কেপ। জীবন যাপনের গ্লানিরোরুদ্যমানতা ছড়িয়ে আছে তার কবিতার লাইনে লাইনে। অবহেলায় অভিমানে চলে যাওয়া অনির্দেশ একেলা প্রেমিকের মনস্তাপ, পরাস্তপ্রেমের দীর্ঘশ্বাস, প্রেমার্তি যেমন স্বনিত হয়েছে তার কবিতায়-দ্রোহের আস্ফালন ও প্রতিবাদের স্তিমিতি তিনি লিখেছেন দ্বিধা-উৎসার শব্দে,
“জয়নুলের রং নিয়ে কল্পনার বেসাতি হারানো
দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা বা ফুল পাখি-নদীর
কাব্যালাপে কারা মশগুল হল এ নিয়ে কৌতুহল
দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনও এতো কিছু নেই
জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হব -সেই অমিত
শক্তিও আমার ছিলনা”।
আপাতদৃষ্টিতে পয়ারের প্রবাহমানতা মনে হলেও টানা গদ্যভঙ্গীর এই লাইনগুলোর বিন্যাস মীড়ের মতো মিহি টানে নেয়না টেনে লাইন থেকে লাইনে। লাইনগুলো আচমকা ভেঙে দেয়ার ফলে পঠনের ধাক্কা লাগে। মাত্রার জন্য যদি নয়, তবে কেন এমন বিন্যাস বোঝা গেল না। ‘জয়নুলের রং নিয়ে কল্পনার বেসাতি’— এ কথায় কাব্য ঢং আছে। কিন্তু জয়নুল তো এঁকেছেন গদ্য-রঙে বিবর্ণ বাস্তবতার ছবি। যুক্তির অনুমানবাক্যে হ্বেতাভাস যেমন ম্রিয়মান করে যুক্তিকে; কবিতায় শব্দের জাত্যর্থ অর্থাৎ শব্দের মূল অর্থের অতিরিক্ত দ্যোৎনা দেয়ার ক্ষেত্রে মেটাফর বা উপমা যদি মেঘে ঢাকা তারার মতো ঢাকা পড়ে যায় বা অর্থচ্যূত হয়, তাহলে তা কবিতা হারায় কাব্যিক মাধুরী। তবে, এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, ওই লাইনগুলোয় কবি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, তার মনোলোক স্পস্ট করে তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেক্ষেত্রে, জাত্যর্থে হ্বেতাভাস কবিতার পাল্লা থেকে নামিয়ে নেয়া যায়।
ধর্মচারীতার নৈতিকতা এবং নৈতিকতার অসংগতি অতিক্রম করে তিনি বৈরী উচ্চারণে বলে ওঠেন,
“মসজিদের আযান, মন্দিরের
শঙ্খধ্বণি গীর্জার ঘণ্টার গাম্ভীর্যতা আর মানুষের
প্রার্থনায় ভোর যতোটা পবিত্র হয়, আমি এর
চেয়ে ঢের পবিত্র হতে সূর্যোদয়ের স্বরলিপি খুঁজি”
কবিতা মানবিকতার শুদ্ধ উচ্চারণ এবং এলিয়ট যাকে বলেছেন, বংংবহপব ড়ভ ধষষ ধৎঃং – দর্পণ কবীর তাকে বলেন,‘সূর্যোদয়ের স্বরলিপি’। কবি সেই চিরকালের কাব্যিক অণ্বেষার স্বরলিপি রেয়াজ করেন এবং নিজের বিশ্বাসের কথা বলে যান ‘বসন্ত নয় অবহেলা’র শুরুর বয়ানে মীমাংসিত ঘোষণায়।
কবিতার উত্তরাধুনিকতার কালে দর্পণ কবীর তার বসন্ত নয় অবহেলা-কে রোমান্টিকতার মলাটে বাঁধাই করেছেন। রোমান্টিক কবিতা অপসৃয়মান হয়নি, হারিয়ে যায়নি কখনো। আটলান্টিক সাঁতরে তা পৌঁছে গিয়েছে ভিন্ন জনপদে ওয়াল্ট হুইটম্যানের তৃণের পাতার গন্ধ। রোমান্টিক কবিতার পথ ধরে এসেছিল প্রতীক, এসেছিল পরাবাস্তবতা, এসেছিল আরো কতকিছু। হয়তো দর্পণ কবীরের হাতে উঠে আসবে নতুন কোনো কবিতার ধারা। দূরবাসী জীবনের অনপনেয় ডিলেমার দ্বিধামঙ্গল কাব্য। ছড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কবি এমন কিছু পঙক্তি সৃষ্টি করেন যা পাঠকের ইচ্ছা থাকুক আর নাই থাকুক, পরাস্ত করে ঢুকে যায়। প্রত্যাঘাত তেমনি একটি কবিতা।
“আমার কন্ঠ চেপে ধরে
তুমি গলা সাধো নিজের ঘরে
তুমি যতোই যাচ্ছো চাবুক মেরে
ঐ চাবুকই আসতে পারে
তোমার দিকে তেড়ে”।
এ রকম অনেক সুন্দর লাইন রয়েছে তার কবিতায়।
‘আমি কোথাও ছিলাম না” কবিতায় তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ছলকে যায় মর্মদ্রাবী :
“কতো বর্ণিল স্মৃতি তোমাদের
আমি বোবা নদীর মতো বয়ে গেছি নিরবধি
ধারন করেছি কেবল ঝরা পাতার গান।”
রূপকে উপমায় এভাবে তিনি বলে যান হৃৎকথন। মনোলগের ভঙ্গীতে সরাসরি কথা বলেছেন সে একটানা।
“তোমাকে অবজ্ঞা করে
জিতব বলে বড্ডো ছিলাম কাতর
তুমি দীঘল ঘুমের আদল ভেঙে
জাগালে এক অভিশপ্ত পাথর”

বইটি কাব্যপ্রেমী পাঠকদের ভালোলাগবে। তার শব্দাবলী টেনে নিয়ে যাবে পাঠকের মন মননের পালতোলা নাও।
বইটি প্রকাশ করেছে বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা।